Thursday, August 8, 2019

রিফাতের পাশাপাশি নয়ন বন্ডের সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্ক ছিল মিন্নির -আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি হওয়া রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, মিন্নি ছিলেন রিফাত শরীফ হত্যার মাস্টারমাইন্ড। স্বামী রিফাত শরীফের পাশাপশি নয়ন বন্ডের সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্ক করতেন মিন্নি।

আজ বৃহস্পতিবার বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে জামিন শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষ এসব কথা বলেন।

আদালতে মিন্নির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির শুনানি করেন।

এ সময় মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর ও রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফও উপস্থিত ছিলেন। মিন্নির আবেদনের পক্ষে অর্ধশতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মামলার শুনানি দেখতে অনেক আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। আদালতের কক্ষে জায়গা সংকটের কারণে নিরাপত্তাকর্মীরা পরিচয় জেনে আদালতে প্রবেশ করান।

শুনানিকালে আদালত কক্ষের বাঁ পাশে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দোয়া-দুরুদ পড়তে থাকেন। অপরদিকে রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ আদালত কক্ষের ডান পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। 

বিকেল ৩টায় জামিনের শুনানি শুরু হয়। শুনানির শুরুতে মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না আদালতে বলেন, মাই লর্ড, আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি এ মামলার প্রধান সাক্ষী। স্বামী হত্যায় তাঁকে বানানো হলো আসামি। ১৯ বছরের একজন মেয়ে মিন্নি। পুলিশ তাঁকে নির্যাতন করায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নারী ও অসুস্থ বিবেচনায় জামিন চাই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী নারী, শিশু ও বৃদ্ধা হলে জামিন পাওয়ার বিধান রয়েছে।

জেড আই খান পান্না আদালতে আরো বলেন, আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি নিজের জীবনবাজি রেখেই ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি যদি জড়িত হতেন তাহলে এত জীবনবাজি রেখে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেন না। তিনি তো ঘটনাস্থলেই  যেতেন না। 

পুলিশ মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নিজের কাস্টডিতে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখাল। এরপর তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনা মানা হয়নি। জেলগেট থাকতে তাঁকে পুলিশ লাইনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একজন ১৯ বছরের তরুণীকে পুলিশ লাইনে নিয়ে পুরুষ পুলিশ দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতন করা হয়। পুলিশের এ ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জেড আই খান পান্না আরো বলেন, বিচারিক আদালতে মিন্নির পক্ষে প্রথম দিন কোনো আইনজীবী ছিলেন না। একজন আইনজীবী নিয়োগ দিলেও তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রচারিত হয়।

এ সময় জেড আই খান পান্না কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ আদালতে উপস্থাপন করেন।           

জেড আই খান পান্না বলেন, একটি বিশেষ মহলকে বাঁচানোর জন্যই পুলিশ প্রশাসন উঠে পড়ে লেগেছে। মিন্নি যদি জামিন পান তাহলে তিনি পালিয়ে যাবেন না। কিন্তু এ মামলার প্রধান সাক্ষীকে সরিয়ে দিলে মামলার মূল আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। মিন্নিকে আসামি রাখায় মামলার এখন ১২টা বাজানো হয়েছে।

মাই লর্ড, এ মামলার মূল আসামি ছিল চারজন। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কোনো তৎপরতা ছিল না। অথচ প্রধান সাক্ষীকে নিয়ে পুলিশ নির্যাতন করে মামলার নতুন গল্প সাজিয়েছে। আমরা নারী ও অসুস্থ বিবেচনায় আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন চাই। এ বিষয়ে সারা দেশের মানুষের সহানুভূতি রয়েছে।

এ সময় মিন্নির পক্ষে অপর আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন শুনানিতে বলেন, দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে ঘটনা ঘটল। দেশবাসী সবার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। অথচ কিছু লোককে রক্ষা করার জন্য মিন্নিকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার ১৮ দিন পর সাক্ষীকে আসামিকে করা হলো। আমরা নারী ও অসুস্থ বিবেচনায় তাঁর জামিন চাই।         

এরপর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির জামিনের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন।

এ সময় আদালত জানতে চান, আপনি কী বক্তব্য রাখবেন? কী আছে?

জবাবে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির শুনানিতে বলেন, ভিডিও আছে, আনেক কিছুই আছে। আমি আপনাকে জানাচ্ছি। মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। শুধু তাই নয়, রিফাতের আগে মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের বিয়ে হয়। সেই বিয়ে গোপন করেই মিন্নি রিফাতের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নয়ন বন্ড যখন জেলে থাকে তখন মিন্নি তথ্য গোপন করে রিফাত শরীফকে বিয়ে করেন। সেই কাবিননামা আমাদের কাছে রয়েছে। শুধুই তাই নয়, নয়ন বন্ড জেল থেকে বের হয়ে আসার পর এক সঙ্গে দুটি সম্পর্ক বজায় রাখেন মিন্নি। স্বামীর পাশাপাশি নয়ন বন্ডের সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্ক করতেন মিন্নি। কলেজে যাওয়ার নাম করে মিন্নি নয়ন বন্ডের বাসায় গিয়ে মেলামেশা করতেন। এ বিষয়গুলো মিন্নি নিজেই স্বীকার করেছেন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। রিমান্ড আবেদনে এসব বিষয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

দুজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখায় এক সময় নয়ন বন্ড ও রিফাতের মধ্যে ঝামেলা তৈরি হয়। পরে মিন্নি ও নয়ন বন্ড মিলে রিফাত শরীফকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। হত্যার উদ্দেশ্যে রিফাতকে কলেজে নিয়ে যান মিন্নি। এরপর তাঁর সামনে রিফাতকে ধরে নিয়ে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে নয়ন বন্ড কোপাতে থাকলে মিন্নি বাঁচানোর অভিনয় করেন। রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার আগে এবং পরে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের কাছে রয়েছে। সেই রেকর্ডে বলা আছে, তাঁরা রিফাত শরীফকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। মিন্নি ও নয়ন বন্ডের ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের কাছে রয়েছে।  

মিন্নির পক্ষের আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে বলেন, এগুলো তৈরি করা যায়। ভেরিফায়েড কি না, তা দেখতে হবে। এসব তো মামলার মেরিটের অংশ নয়। আপনি মূল জায়গায় আসেন।

তখন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, আপনারা পত্রিকার সংবাদ উপস্থাপন করেছেন। তা কি মামলার নথি? প্লিজ, সাইড টক করবেন না। কোনো কিছু কি জোরপূর্বক আদায় করবেন?

এ সময় আদালত বলেন, কেউ কোনো কিছুই জোরপূর্বক আদায় করতে পারবে না। ফেসবুকের আইডি সঠিক কি না, তার তো সার্টিফায়েড লাগবে।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, মাই লর্ড, ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রিফাত শরীফকে যখন ধরে নিয়ে যায়, তখন মিন্নির আচরণ সন্দেহজনক মনে হয়েছে। কেননা কলেজের গেটে তিনি একবার এসে আবার ভেতরে যান। আবার ফিরে আসেন। রিফাত শরীফকে যখন মারার জন্য ধরে নিয়ে যাচ্ছে তিনি তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। যখন কোপানো শুরু করল তখন বাঁচানোর নামে অভিনয় করেছেন। রিফাতকে কোপানোর সময় বাঁচাতে এলো অথচ মিন্নির গাঁয়ে একটু নখের আচড়ও লাগল না। তদন্ত কর্মকর্তার মামলার জব্দ তালিকায় দেখা যায়, মিন্নির জামাকাপড়ে কোনো প্রকার আচড় লাগেনি। ঘটনার আগে পরে বহুবার নয়ন বন্ড এবং মিন্নির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের কাছে রয়েছে।    

মমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, মিন্নির আইনজীবীরা দাবি করেছেন, মিন্নি অসুস্থ। তিনি যদি অসুস্থ হন তাহলে জেল কোড অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে পারেন। মিন্নি অসুস্থ, কী ধরনের অসুস্থ এ বিষয়ে কোনো ডাক্তারি সার্টিফিকেট দিতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে মিন্নি ছিল রিফাত হত্যার মাস্টারমাইন্ড। মিন্নি নয়ন বন্ডকে বিয়ের তথ্য গোপন করে দুই মাস পর রিফাতকে বিয়ে করেন। বিচারিক আদালত মিন্নির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির স্বীকারোক্তি, নয়ন বন্ডের সঙ্গে বিয়ের কাবিননামা, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে জামিন নামঞ্জুর করেন।

এ সময় আসামপিক্ষে আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী নারীদের জন্য জামিনের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনার বিধান রয়েছে। এ যুক্তিতে তাঁকে জামিন দেওয়া যায়।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, আইনে থাকলে বাধা নেই। সেক্ষেত্রে রিজনেবল যুক্তি থাকতে  হবে।

এ সময় মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, পুলিশ কী বলল, সেটা দিয়ে তো এখানে বিচার হবে না। পাবলিক কী বলে সেটা এখানে বিবেচনায় নিতে হবে।

তখন আদালত বলেন, আপনাদের কাছে ১৬৪ ধারায় নেওয়া জবানবন্দি আছে?

জেড আই খান পান্না বলেন, অভিযোগ গঠনের আগে পুলিশ এটা আমাদের দিচ্ছে না। সেটা আমাদের কাছে নেই।

এ সময় আদালত বলেন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি আইনের ৪৯৭ ধারা এখন আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থার আলোকে প্রযোজ্য হবে না। ১৬৪ ধারায় নেওয়া জবানবন্দি দিতে পারলে আমরা সেক্ষেত্রে জামিনের রুলের বিষয়ে বিবেচনা করব। আপনারা কি আদেশ  নেবেন নাকি ফেরত নিবেন?

মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, আমরা ফেরত নেব।

এরপর আদালত মিন্নির জামিন আবেদন ফেরত দেন।

পরে জেড আই খান পান্না সাংবাদিকদের বলেন, আমরা মর্মাহত। এখন অন্য কোনো বেঞ্চে আবেদনটি নিয়ে যাব।

শুনানির পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, আমার মেয়ে পুলিশ প্রশাসনের হয়রানির শিকার। স্থানীয় একজন নেতার কারণে প্রশাসন মিন্নিকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। দেশবাসীর উদ্দেশে বলব, আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার। ন্যায়বিচার চাই।           

এর আগে গত ৫ আগস্ট মিন্নির জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়।

গত ৩০ জুলাই মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

এর আগে ২২ জুলাই বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে প্রথমবার মিন্নির জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী মো. মাহবুবুল বারী আসলাম। ওই দিনই শুনানি শেষে আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

এরপর গত ২৩ জুলাই ‘মিস কেস’ দাখিল করে বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আসাদুজ্জামানের আদালতে ফের জামিনের আবেদন করেন মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম। পরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের নথি তলব করে  ৩০ জুলাই জামিন শুনানির দিন ধার্য করেন ।

সেদিন তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে উভয়পক্ষের শুনানি চলতে থাকে। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেন আদালত। তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির আদালতে উপস্থিত হলে এ হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয়। সবার উপস্থিতিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ল্যাপটপে হত্যাকাণ্ডের আগের ও পরের ভিডিও ফুটেজ দেখান। এ ছাড়া মিন্নির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিসহ হত্যার আগে ও পরে প্রধান আসামি নয়ন বন্ডসহ অন্যান্য আসামির সঙ্গে মিন্নির কললিস্টের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন। শুনানি শেষে মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

গত ২৬ জুন বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে বরগুনা সরকারি কলেজ থেকে ফেরার পথে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীসহ একদল যুবক রিফাত শরীফের ওপর হামলা চালায়। তারা ধারালো দা দিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এ সময় মিন্নি হামলাকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন; কিন্তু তাদের থামানো যায়নি। খুনিরা রিফাত শরীফকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যায়। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়। এ হত্যার ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ পরের দিন সকালে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় মামলা করেন। মিন্নি ছিলেন সেই মামলার এক নম্বর সাক্ষী। পরে ১৬ জুলাই রাতে এ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

ভারত কর্তৃক অধিকৃত কাশ্মীরের স্ট্যাটাস বদলের অর্থ কি

ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান অব্যাহত রেখে ওই রাজ্যের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ স্ট্যাটাসটি সংবিধান থেকে বাতিল করেছে ভারত সরকার।

সংবিধানের ওই স্ট্যাটাস অনুসারে কাশ্মীরের বাইরের নাগরিকরা ওই রাজ্যে জমি বা সম্পদ কিনতে পারবে না বা সেখানে স্থায়ী বসতি গড়তে পারবে না।

কি ঘটছে?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার সোমবার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে, সেখানে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের স্থায়ী অধিবাসীদের বিশেষ অধিকার দেয়া হয়েছে।

মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন ১৯৪৭ সালে ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার আগ থেকে যে অধিকারের বিষয়টি চলে আসছে, সেটা ছিল ‘অস্থায়ী’ এবং সরকার এটাকে বিলুপ্ত করবে।

এই ধরনের সিদ্ধান্তের সমালোচকরা বলেছেন যে, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করার মাধ্যমে সেখানে হিন্দুদের বসতি গড়ে রাজ্যের জনসংখ্যার চেহারা বদলে দিতে চায় সরকার।

সেখানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার জন্য বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং জনগণের সভা সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সেখানকার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিকে রোববার থেকে গৃহবন্দী রেখেছে ভারত সরকার। পাশাপাশি উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে কারফিউয়ের মতো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং ইন্টারনেট ও ফোন সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের বিশেষ স্ট্যাটাসটা কি?
ভারতীয় সংবিধানের ৩৫এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের স্থানীয় আইনসভা ওই এলাকার জন্য স্থায়ী নাগরিকত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করবে।

১৯৫৪ সালে এক প্রেসিডেন্টের আদেশের মধ্য দিয়ে এটি সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে যুক্ত হয়, যেখানে কাশ্মীরকে বিশেষ স্বায়ত্বশাসনের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

৩৫এ অনুচ্ছেদে কাশ্মীরের বাইরের নাগরিকদের সেখানে স্থায়ী বসতি স্থাপন, জমি কেনা, স্থানীয় সরকারে চাকরি করা এবং শিক্ষা স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

এই অনুচ্ছেদকে পার্মানেন্ট রেজিডেন্ট ল হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এতে আরও বলা হয়েছে যে, রাজ্যের কোন মেয়ে রাজ্যের বাইরের কোন ছেলেকে বিয়ে করলে সে এখানকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। ওই মেয়ের সন্তানরাও এখানকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে বলে এতে উল্লেখ রয়েছে।

কিভাবে ৩৫এ প্রণীত হয়েছিল?
১৯২৭ সালে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের প্রশাসনের এক আদেশের মাধ্যমে এই এলাকার জন্য বিশেষ এক মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার দুই মাস পরে তৎকালীন কাশ্মীরের শাসক মহারাজা হারি সিং কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে ট্রিটি অব অ্যাকসেশান স্বাক্ষর করেছিলেন, যেটার মাধ্যমে ভারতের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৩৭০ যুক্ত হয়।

১৯৫২ সালের দিল্লী এগ্রিমেন্টের মধ্য দিয়ে এটি আরও বিস্তৃত হয়। এ সময় প্রেসিডেন্টের আদেশের মধ্য দিয়ে এই রাজ্যের অধিবাসীদের ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হয় কিন্তু এখানকার অধিবাসীদের যে আলাদা মর্যাদা আগে ছিল, সেটিও বজায় রাখা হয়।

কিভাবে এটার বিলোপ হতে পারে?
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০(৩) অনুচ্ছেদে এই বিধান রাখা হয়েছে যে, প্রেসিডেন্টের আদেশের মাধ্যমে এটা বাতিল হতে পারে। তবে, এ ধরনের আদেশ অবশ্যই রাজ্যের কন্সটিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে অনুমোদিত হতে হবে। যেহেতু এই অ্যাসেম্বরি ১৯৫৭ সালে বিলুপ্ত করা হয়, তাই এই অনুচ্ছেদের বাতিলের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ বলেছেন, এটার জন্য রাজ্যের এমপিদের অনুমোদন লাগবে এবং অন্যেরা বলছেন, প্রেসিডেন্টের আদেশই এ জন্য যথেষ্ট হবে।

৩৫এ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতার বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নেয়া হয়েছিল। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা বলেছিলেন যে, আদালত যদি এ বিষয়টি বজায় রাখে, তাহলে মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার প্রেসিডেন্টের আদেশের মাধ্যমে এটাকে বাতিল করবে।
>>>এপি

মানবপাচারের ঝুঁকিতে ১৫ লাখ নেপালি

প্রায় ১৫ লাখ নেপালি নানাভাবে মানব পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশটির মানবাধিকার কমিশনের এক রিপোর্টে এ কথা বলা হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়, পাচারের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বা বিদেশে রয়েছে এমন ব্যক্তি, এডাল্ট বিনোদন ক্ষেত্রের লোকজন, গ্রামীণ এলাকার নারী ও মেয়েরা, নিখোঁজ ব্যক্তি ও শিশু শ্রমিকরা। নেপাল এখন মানব পাচারকারীদের একটি উৎস ও ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে।

মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে হিসাব দিয়ে বলা হয়, গত বছর প্রায় ৩৫,০০০ নেপালি নাগরিক পাচার হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫,০০০ পুরুষ, ১৫,০০০ নারী ও ৫,০০০ শিশু। পাচার হওয়া মোট মানুষের ৭০ শতাংশই বিদেশী চাকরি ও শিশু শ্রমের কারণে হয়েছে। এর পরে আছে বিনোদন খাত।

চীন থেকে ৪৪ জন নেপালী নারীকে ফেরত পাঠানোর এক সপ্তাহ পর প্রকাশিত এই রিপোর্টে নেপালে মানবপাচার পরিস্থিতির করুণ চিত্রটি প্রকাশিত হলো। নেপালের একটি আদম কোম্পানি বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে এসব নারীকে চীনে পাচার করেছিলো।

রিপোর্টে আরো বলা হয় যে, প্রতিবছর ভারত থেকে প্রায় ১,০০০ নেপালী নাগরিককে উদ্ধার করা হয়। তাদেরকে যৌনবাণিজ্য, দাসশ্রমিক, গৃহকর্মী হিসেবে নিয়ে গিয়ে তৃতীয় দেশে পাচার করা হয়। এসব কাজে অনেক এনজিও জড়িত। নেপাল ও ভারতের মধ্যে শিথিল সীমান্তের কারণে পাচারকারীরা সহজেই এর সুযোগ গ্রহণ করে।

ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করছে পাকিস্তান, বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত

কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সিদ্ধান্তের জেরে রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারসহ চির প্রতিদ্বন্দ্বী এই প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান, বন্ধ করেছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও।

নরেন্দ্র মোদীর সরকার কাশ্মীরের ভারত নিয়ন্ত্রিত অংশের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা রদ করে কেন্দ্রের শাসন জারির প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি (এনএসসি) বুধবার এই পদক্ষেপ নেয়।

ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে, আবার দুই দেশই কাশ্মীরের একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ করে।

আরেক বড় প্রতিবেশী চীনও কাশ্মীরের একটি অংশের দাবিদার। পাক-ভারত উত্তেজনায় ইসলামাবাদের ‘বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত চীনও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

তবে পাকিস্তানের বাণিজ্য বন্ধ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার ঘোষণা নিয়ে ভারত সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

‘দ্য ইকোনোমিক টাইমস’ পত্রিকা জানায়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বুধবার রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জাতীয় সুরক্ষা কমিটির (এনএসসি) একটি বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্তগুলো হয়।

বৈঠকেই ভারতীয় হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়াকে ভারতে ফেরত পাঠানো এবং নয়া দিল্লিতে পাকিস্তানের হাই কমিশনার না রাখার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের ‘দ্য ডন’ পত্রিকা।

পাকিস্তানের টিভি নেটওয়ার্ক ‘এআরওয়াই’ নিউজে ঘোষণা দিয়ে পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি বলেন, “আমাদের দূত আর নয়াদিল্লিতে থাকবেন না। আর এখানেও তাদের অনুরূপ পদমর্যাদার ভারতীয়কে রাখা হবে না।”

এর পরপরই পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হাই কমিশনারকে প্রত্যাহার করে নিতে নয়া দিল্লিকে বলা হয়েছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া বলেছে, এই ঘোষণার কারণে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিসারিয়াকে ফিরে আসতে হচ্ছে।

তবে ভারতে বর্তমানে পাকিস্তানের হাই কমিশনার নেই। সদ্য নিয়োগ পাওয়া মইনুল হক এখনও নয়া দিল্লিতে কাজে যোগ দেননি। এখন ইসলামাবাদের সিদ্ধান্তের কারণে তার আর ভারতে যাওয়া হচ্ছে না।

এনএসসির বৈঠকে ইমরান খান ভারতীয় বিমানের জন্য পাকিস্তান আকাশসীমা বন্ধ এবং ভারতের ‘বৈষম্যমূলক শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ চিত্র তুলে ধরতে সব কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বৈঠকে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবৈধ এবং একতরফা পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতিসহ ভারত শাসিত জম্মু-কাশ্মীর এবং নিয়ন্ত্রণ রেখার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এর ভিত্তিতেই কমিটি ভারতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এগুলো হল:
  • *ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করা
  • *ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বন্ধ করা
  • *দুই দেশের কূটনৈতিক নানা চুক্তি পুনরায় পর্যালোচনা করে দেখা
  • *ভারতের ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘে তোলা
  • *১৪ অগাস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসকে কাশ্মীরিদের জন্য সৌহার্দ্য দিবস এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রাধিকারের ন্যায়সঙ্গত লড়াইয়ের স্পৃহার সঙ্গে একাত্ম হয়ে উদযাপন করা।
  • *ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ অগাস্ট-কে কালো দিবস হিসাবে উদযাপন করা।

আমির কন্যার ফটোশুট নিয়ে হইচই

ফটোশুটে আমির কন্যা ইরা খান
বলিউড তারকা আমির খানের প্রথম পক্ষের স্ত্রী রিনা দত্তের কন্যা ইরা খান। আর আমির খানের দুই সন্তানের মধ্যে ইরা ছোট ৷ 

সম্প্রতি মিশাল কির্পালানির সঙ্গে আমির কন্যার  সম্পর্ক নিয়ে বেশ গুঞ্জন উঠেছিল সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

সংগীতশিল্পী, প্রযোজক ও কম্পোজার মিশালের সঙ্গে সেই সম্পর্কের কথা স্বীকার করে নেন ইরা। ইতিমধ্যেই বলিউডের নেক্সট জেনারেশন পা দিচ্ছে সিনে দুনিয়ায় ৷ জাহ্নবী, সারা, অনন্যা সকলেই পা দিয়েছেন বি-টাউনে? কিন্তু আমির খানের মেয়ের সিনেমায় পা দেওয়ার বিষয়ে এতদিন কোনও কথা শোনা যায়নি। 

তবে এবার প্রথম ফটোশ্যুটেই ঝড় তুলে আলোচনায় এলেন আমির কন্যা ইরা। ক্রচেড টপ, বিডেড হেয়ারে বোহেমিয়ান লুকে ধরা দিয়েছেন ২২ বছর বয়সী ইরা ৷ আর তার এমন লুক ভাইরাল হতে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। সূত্র: এনডিটিভি

মিয়ানমারের নিজস্ব স্যাটেলাইট এখন কক্ষপথে

প্রায় দুই বছর প্রচেষ্টার পর মিয়ানমারের নিজস্ব স্যাটেলাইট বুধবার সফলভাবে কক্ষপথে উৎক্ষেপন করা হয়েছে। ফলে দেশবাসী বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ আরো ভালোভাবে টেলিযোগাযোগ সুবিধা পাবেন।
ফরাসী কোম্পানি এরিয়ানিস্পেস গিয়ানা স্পেস সেন্টার থেকে মিয়ানমার স্যাট-২ নামের এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করে।
২০১৯ সালের চতুর্থ কোয়ার্টার থেকে মিয়ানমারের পরিবহণ ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় স্যাটেলাইটটি থেকে সি ও কু ব্যান্ডের তরঙ্গ রিসিভ করবে। ফলে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের ৯৫ ভাগ জনগণের কাছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌছে দেয়া যাবে বলে সরকার আশা করছে।
মিয়ানমারের মোবাইল নেটাওয়ার্কের সঙ্গে স্যাটেলাইট সেবার সংযোগ স্থাপন করার পর নেটওয়ার্ক ব্যান্ডউইথ, গতি ও নির্ভরযোগ্যতার নাটকীয় উন্নতি ঘটবে। এতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌছে দেয়া সহজ হবে। পাশাপাশি এই স্যাটেলাইট সরকারের বিভিন্ন ই-সেবার চাহিদাও পূরণ করতে পারবে। বিশেষ করে ই-ব্যাংকিং সেবা ও তথ্য সারা দেশে বিস্তার করতে চাচ্ছে সরকার।
গত সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাতকারে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার উ উইন অং বলেন, নিজস্ব স্যাটেলাইট পুরোপুরি ব্যবহার করা গেলে দেশের জিডিপি ৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
মিয়ানমার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। এতে প্রতিবছর খরচ হচ্ছে ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

কাশ্মিরে উত্তেজনা: শতাধিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গ্রেফতার

জম্মু-কাশ্মিরে তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে একশ’র বেশি রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। একইসঙ্গে সেখানকার দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আব্দুল্লাহ বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন।  

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু-কাশ্মিরের জন্য বিশেষ মর্যাদা সম্বলিত ৩৭০ ধারা বাতিল করা এবং রাজ্যটিকে কেন্দ্রীয় সরকার শাসিত দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করার পর থেকে সেখানে চাপা উত্তেজনা রয়েছে।

কাশ্মির উপত্যাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা এজেন্সি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ একশ’র বেশি মানুষকে শান্তির জন্য হুমকি হিসেবে উদ্ধৃত করে গ্রেফতার করেছে।  

নবভারত টাইমস জানিয়েছে, আজ (বুধবার) রাজ্য সরকারের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, এখনো পর্যন্ত শতাধিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।

তিনি বলেন, জম্মু-কাশ্মির পিপলস কনফারেন্সের নেতা সাজ্জাদ লোন ও ইমরান আনসারিকেও গ্রেফতার করা  হয়েছে। কাশ্মির উপত্যকায় তাদের কার্যক্রম থেকে শান্তি ও সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার ভয়ে ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।   

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর থেকে কাশ্মির উপত্যকায় উত্তেজনার পরিবেশ রয়েছে। দক্ষিণ কাশ্মিরের সমস্ত জেলায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাসহ ইন্টারনেট ও রেল পরিষেবা এখনও বন্ধ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে, নিরাপত্তা এজেন্সির কর্মকর্তারা পরিস্থিতির উপরে একনাগাড়ে নজর রাখছেন। 

আজ (বুধবার) এক ভিডিও ক্লিপে শ্রীনগরে রাজ্য সচিবালয় ভবনের মাথায় ভারতের জাতীয় পতাকা ও জম্মু-কাশ্মিরের পতাকা উড়তে দেখা যায়। যদিও খুব শিগগিরি সেখান থেকে জম্মু-কাশ্মিরের পতাকা সরিয়ে দিয়ে সেখানে ভারতের কেবল জাতীয় পতাকাকেই রাখা হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

গতকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় লোকসভায় জম্মু-কাশ্মির পুনর্গঠন সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার পরে জম্মু-কাশ্মির বিধানসভার (সাবেক) স্পিকার নির্মল সিং তার সরকারি গাড়ি থেকে রাজ্যের পতাকা খুলে ফেলেন। তিনি এখন বিজেপি কর্মকর্তা সেজন্য জম্মু-কাশ্মির পুনর্গঠন বিল পাস হতেই রাজ্যের পতাকা খুলে ফেলেছেন বলে সাফাই দিয়েছেন। রাজ্যটি কেন্দ্রীয় সরকারশাসিত প্রদেশে পরিণত হওয়ায় বর্তমান স্পিকার পদ বিলুপ্ত হবে। তিনি এখন থেকে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না বলেও মন্তব্য করেছেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্পেশাল মশার কামড়! by ফাওজিয়া ফারহাত অনীকা

একবার ভাবুন তো, মশার কামড় ডেঙ্গুজ্বরের কারণ হওয়ার বদলে ডেঙ্গুর প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করছে!

খুব অবাক করার মতোই এমন এক চমকপ্রদ ঘটনা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান কিছু গবেষকেরা দারুণ সাড়া ফেলে দিয়েছেন।

গবেষকেরা দাবী করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার শহর টাউনসভিল ভাইরাল রোগ ডেঙ্গু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। শহরটি ডেঙ্গু মুক্ত কিন্তু একদিনেই হয়ে যায়নি। তার জন্য প্রয়োজন হয়েছে দীর্ঘ সময় ও প্রস্তুতির।

প্রথমে প্রাকৃতিক একটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ক্যাপটিভ-ব্রিড কিছু মশাকে উক্ত শহর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তিতে এই মশাগুলোই প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী স্থানীয় মশাদের সাথে মিলিত হয়।

ক্যাপটিভ-ব্রিড মশাদের ভেতর থাকা ওলব্যাকিয়া (Wolbachia) ব্যাকটেরিয়া ডেঙ্গুর সংক্রমণে বাধা দান করে। যে কারণে ডেঙ্গুবাহী মশা থেকেও ডেঙ্গু ছড়াতে পারে না। যার ফলাফল স্বরূপ, এই শহরটি ২০১৪ সাল থেকেই ডেঙ্গু মুক্ত।

মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন ইতিবাচক ফলাফলে দারুণ আশাবাদী। তারা আরো আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মশা বাহিত রোগ জিকা ও ম্যালেরিয়াও প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিগত চার বর্ষায় গবেষকেরা ১৮৭,০০ মানুষের গ্রীষ্মপ্রধান শহর কুইন্সল্যান্ডেও ওলব্যাকিয়াবাহী মশা ছড়িয়ে দেবার কাজ করে আসছে।

তবে এই মশা বিনামুল্যে পাওয়া যাবে না। স্পেশাল ওলব্যাকিয়া মশা পাওয়ার জন্য খরচ করতে হবে টাকা। প্রফেসর ও’নিল বলেন, ‘জনপ্রতি ১৫ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১২০০ টাকা) খরচ করে টাউনসভিল দেখিয়েছে যে দ্রুত, কার্যকর ও স্বল্প খরচে মশাবাহিত রোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব’।

বর্তমানে এই মশার কার্যক্রমটি চালু রয়েছে ১১ টি ভিন্ন দেশে। গবেষকদের মূল লক্ষ্য ওলব্যাকিয়া মশার সাহায্যে পৃথিবীর বড় ও দরিদ্র দেশগুলোতে সাহায্য করার। যেখানে প্রতিজনের জন্য গুণতে হবে মাত্র এক ডলার, যার বাংলাদেশী মূল্যমান ৮০ টাকা।

গবেষকদের পরবর্তি টার্গেট দেশ ও শহর হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার ইয়গাকার্তা (Yogyakarta). প্রায় ৩৯০,০০০ মানুষের এই শহরে বর্তমানে এই মশার ট্রায়াল চলছে।

কাশ্মীর: আমরা স্বাধীনতা হারালাম- বলছেন বারামুলার কাশ্মীরী বাসিন্দা by অমিতাভ ভট্টশালী

ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে সেখানকার মানুষ মনে করছেন তারা স্বাধীনতা হারিয়েছেন।
এমনটাও কেউ বলছেন, যে চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরের ভারত-ভুক্তি হয়েছিল, সেটাই তো এখন আর রইল না
আর তার মধ্যেই অন্যান্য রাজ্য থেকে কাশ্মীরে যাওয়া হাজার হাজার মানুষ সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন যে কোনও উপায়ে।
বাইরে থেকে খবর সংগ্রহ করতে কাশ্মীরে যেসব সাংবাদিক গেছেন , তাদের প্রায় কেউই সর্বশেষ খবরাখবর জানাতে পারছেন না।
ভারত শাসিত কাশ্মীর রবিবার রাত থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কারফিউ চলছে, দোকান, স্কুল কলেজ সব বন্ধ। বন্ধ মোবাইল আর ল্যান্ডলাইন ফোন, ইন্টারনেট পরিষেবা, এমনকী কেবল টিভিও।
বিবিসি-র সংবাদদাতা জুবেইর আহমেদ বেশ কয়েকদিন চেষ্টার পরে কোনওক্রমে সেখানকার পরিস্থিতি আর মানুষের কথা রেকর্ড করে দিল্লিতে পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি জানাচ্ছেন, রাজধানী শ্রীনগরে নিরাপত্তা বাহিনী গাড়িতে চড়ে মাইকে বলতে বলতে যাচ্ছে যে কারফিউ জারি রয়েছে, কেউ যেন বাড়ির বাইরে না বের হন।
রাস্তাঘাট শুনশান কদিন ধরেই। প্রতিটা রাস্তায়, গলির মুখে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারা।
জুবেইর আহমেদ বলছিলেন, "শ্রীনগর বা তার আশপাশের এলাকায় আমরা যেখানেই যাচ্ছি, সেখানে মানুষজন প্রায় চোখেই পড়ছে না। যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি, তারা সকলেই সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।"
"বেশিরভাগ নেতাই আটক হয়ে রয়েছেন, তারা ছাড়া পাওয়ার পরে যেভাবে নির্দেশ দেবেন, সেইভাবে প্রতিবাদে রাস্তায় নামবেন মানুষ, এমনটাই বলছেন তারা।"
কাশ্মীরের অনেক বাসিন্দা জানেন না কী ঘটেছে - তারা শুধু জানেন তারা স্বাধীনতা হারিয়েছেন।
দিল্লির মানবাধিকার সংগঠন রাইটস এন্ড রিস্কস অ্যনালিসিস গ্রুপের প্রধান, সুহাস চাকমা বলছিলেন, এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় মানুষদের সমর্থন পাবে না বুঝেই সরকার গোটা রাজ্যকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দিয়েছে।
"সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে স্থানীয় মানুষের সমর্থন নেই। সেজন্যই যেকোন রকম প্রতিবাদ বন্ধ করার জন্য একরকম একনায়কতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে সেখানে। কিন্তু হাতি মারা গেলে কি লুকিয়ে রাখা যায়?" বলছিলেন মি. চাকমা।
বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
আবার কিছু এলাকায় বিক্ষোভ চলছে, এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেইসব খবর যাচাই করার উপায় নেই।
তবে জম্মু আর লাদাখ অঞ্চল থেকে জানা যাচ্ছে যে সেখানকার বহু মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরে বিজয়োল্লাস করছেন। ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়ে আনন্দোৎসব, মিষ্টি বিলি, নাচ এসব হচ্ছে।
অন্যদিকে কাশ্মীরের বেশিরভাগ মানুষ এখনও খুব ভাল করে জানেনই না, যে সংবিধানের যে ধারা দুটির মাধ্যমে তাদের রাজ্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
তাদের কানে যেটুকু এসেছে, তাতেই তাদের মনে হয়েছে, যে স্বাধীনতা তারা ভোগ করতেন, সেটা হারালেন তারা। বারামুলার এক বয়স্ক লোক বিবিসিকে বলছিলেন, "ওই ধারা দুটি আমাদের কাছে স্বাধীনতার মতো ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে আমি যেন স্বাধীনতা হারালাম। আমি এখন আর স্বাধীন নই।"
রাস্তাঘাট শুনশান কদিন ধরেই। প্রতিটা রাস্তায়, গলির মুখে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারা।
আরেক যুবকের কথায়, "ভারত সরকারের যা ভাল মনে হয়েছে তা করুক। কিন্তু জম্মু-কাশ্মীরকে পুরোপুরি বন্ধ কেন করে দিল সরকার! তার মানেই এখানকার মানুষের বিরুদ্ধে কোনও পরিকল্পনা এটা। ৩৭০ আর ৩৫এ - এই দুটো ধারার মাধ্যমেই তো কাশ্মীরের ভারতভুক্তি হয়েছিল। সেদুটো তুলে দেওয়ার অর্থ বিয়েটাই তো ভেঙ্গে গেল।"
অন্যদিকে বাইরে থেকে ওই রাজ্যে কাজে যাওয়া হাজার হাজার মানুষ কোনওভাবে সেখান থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন।
তাদের কেউ কেউ বলছেন বাস স্টেশনে তারা বেশ কয়েকদিন ইতিমধ্যেই কাটিয়ে দিয়েছেন। কোনও খাবার নেই, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছেন না তারা।
"ঘরে ঘরে গিয়ে বলা হচ্ছে তাড়াতাড়ি চলে যেতে। অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে," বলছিলেন একজন।
আরেকজন বলছিলেন, "আমি বিহার থেকে এসেছি কাশ্মীরে রঙ মিস্ত্রির কাজ করতে। আগের দিন থেকে চেষ্টা করছি বাস ধরার। কিন্তু গাড়ি পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার লোক ফিরতে চাইছে।"
৩৭০ ধারা বিলোপের পর জম্মুতে বিজেপি সমর্থকদের বিজয়োল্লাস।
এই রকম একটা অভূতপূর্ব পরিস্থিতি আগে কখনও ভারত শাসিত কাশ্মীরে হয় নি। কিন্তু সেভাবে রাজনৈতিক দলগুলি বা অন্যান্য সংগঠনের কোনও প্রতিবাদ চোখে পড়ছে না কেন, জানতে চেয়েছিলাম কলকাতার সিনিয়ার সাংবাদিক ও বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্যের কাছে।
"শুধু তো ৩৭০ বা ৩৫এ প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনার সময়ে নয়, সংসদের এই অধিবেশনে অন্যান্য আরও কিছু বিল নিয়েও দেখলাম বিরোধী গোষ্ঠী দ্বিধাবিভক্ত।"
তিনি বলেন, "লোকসভা নির্বাচনের সময়ে তারা যেমন বিজেপির হিন্দুত্ব অ্যাজেন্ডার মোকাবিলা করতে গিয়ে নিজেরাও নরম হিন্দুত্বের কথা বলতে শুরু করেছিল, কাশ্মীর ইস্যুতেও দেখছি তারা দ্বিধায় রয়েছে।"
"কতটা প্রতিবাদ করবে, যদি প্রতিবাদ হয় তাহলে যেটুকু যা তাদের ভোটব্যাঙ্ক অবশিষ্ট আছে, সেটা থাকবে কী না - এইসব তাদের ভাবাচ্ছে," বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।
হাজার হাজার মানুষ কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসার চেষ্টা করছে।
কংগ্রেস দলের উদাহরণ টেনে মি. ভট্টাচার্য বলছিলেন যে দলের একেকজন নেতা একেকরকম বক্তব্য দিচ্ছেন। সেগুলো পরস্পরবিরোধী মন্তব্য।
কেউ এটাকে সমর্থন করছেন, কেউ বিরোধীতা করছেন। আবার কেউ বিরোধীতা করতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভুল তথ্য দিয়ে সংসদে হাসির খোরাক হচ্ছেন।
৩৭০ আর ৩৫এ প্রত্যাহারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো যেমন দ্বিধাবিভক্ত, তেমনই অবস্থান ভারতের সংবাদমাধ্যমেরও।
হাতে গোণা কয়েকটি টিভি চ্যানেল এবং সংবাদপত্র সরকারের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরণের প্রশ্ন তুললেও বেশিরভাগ গণমাধ্যমই সরকারের পক্ষ নিয়েছে।
কাশ্মীরীদের সঙ্গে একাত্মতা দেখাতে দিল্লিতে বিক্ষোভ হয়েছে বুধবার।

কাশ্মীর: বিশেষ মর্যাদা বাতিল নিয়ে কি বলছে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ by মুনাজ্জা আনওয়ার

ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে সেই ধারা অনুযায়ী কাশ্মীর এতদিন একটা স্বায়্ত্ত শাসিত এলাকার বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু এই ধারা বাতিলের পর উদ্বিগ্ন কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যেসব কাশ্মীরী রয়েছেন তাদের সাথে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করেছিলাম ৩৭০ নম্বর ধারাটি বাতিল করার ফলে কাশ্মীরীদের প্রতিক্রিয়া কী? কীভাবে এটা তাদের পরিচিতি এবং অর্থনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করবে?
ইজাজের প্রতিক্রিয়া: কাশ্মীরের প্রভাবশালী পরিবারগুলোও এখন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভাষায় কথা বলছেন
৩৫ বছর বয়সী ইজাজ মুম্বাইতে থাকেন। গত দুই বছর ধরে তিনি ভারতের এই শহরটিতে থাকেন কিন্তু তার জন্মস্থান শ্রীনগরে।
প্রথম বিষয়টি হল মেনে নেয়া। কাশ্মীরের মানুষ এটা মানছে না। কাশ্মীরীরা ৩৭০ আর্টিকেল যে বাতিল করা হয়েছে সেটা সঠিক পদক্ষেপ হয়েছে বলে মানছে না। কাশ্মীরীরা ভারতকে আর বিশ্বাস করে না। তাদের মনে হচ্ছে সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। কারণ এই ধারার ফলে তাদের জন্য একটা আস্থার পরিবেশ ছিল।
কাশ্মীর যে ভারতের সঙ্গে গিয়েছিল তার জন্য বিশেষ কিছু শর্ত ছিল যার ভিত্তি ছিল এই ৩৭০ ধারাটি। এখন বিশেষ মর্যাদা বাতিল হয়ে গেলে, ভারতের সঙ্গে থাকার ব্যাপারে আমাদের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এর প্রতিক্রিয়ায় যে ধরনের বিক্ষোভ হবে তা সবার জন্য ক্ষতিকর হবে।
দুটি বড় রাজনৈতিক পরিবার (আবদুল্লাহ এবং মুফতি) ছিলেন ভারতের প্রতিনিধি। তারা ভারতের এজেন্ডা কাশ্মীরে তুলে ধরার কাজ করেছেন। এখন তাদের সাথে যেধরনের আচরণ করা হচ্ছে সেটাও তাদের চিন্তাধারা বদলে দিচ্ছে। আজ তারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মত একই ভাষায় কথা বলছেন।
এটার মানে যেসব লোক জম্মু এবং কাশ্মীরে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করতেন তারাও এখন সাধারণ মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারছেন না।
৩৭০ ধারা বাতিল করার ফলে কে লাভবান হবে? এটা কি কাশ্মীরীদেরকে কোনভাবে লাভবান করবে?
ভারত এটা বাস্তবায়নে কীধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সেটা দেখার বিষয়। এটা বাস্তবায়ন করার জন্য তাদের অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন, কারফিউ জারি, ইন্টারনেট বন্ধ এবং সব ধরণের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে।
ইজাজ বলছেন এসব কিছুই পরিষ্কার করে দিয়েছে কাশ্মীরীরা তাদের বিপক্ষে ছিল এবং তারা এখনো এটার বিপক্ষ অবস্থানেই আছে। এখন শুধু কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এসব বাধ্যবাধকতা একবার উঠিয়ে নেয়া হোক, যখন কারফিউ তুলে নেয়া হবে, তখন দেখবেন এর প্রতিক্রিয়া কেমন হয়। সেটা হবে একটা রক্তাক্ত প্রতিক্রিয়া।
আমি মনে করি না এই পদক্ষেপ কাশ্মীরের অর্থনীতিকে উন্নত করবে। অর্থনীতির উন্নতি হয় শান্তির সাথে।
৩৭০ ধারা বাতিলের ফলে কোন শান্তি আসবে বলে আমি মনে করি না। আমার বিশ্বাস দীর্ঘ সময়ের জন্য কাশ্মীরে শান্তি ফিরে আসবে না।
আপনি যে কোন অর্থনীতিবিদের সাথে কথা বলুন তারা আপনাকে বলবে শান্তির উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
কিন্তু আপনার রাজ্যে যদি অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে তাহলে আপনি কীভাবে আশা করেন আপনার এখানে অনেক বিনিয়োগ আসবে?
এটা কাশ্মীরের পর্যটন, শিক্ষা এবং ব্যবসাকে প্রভাবিত করবে। ৩৭০ ধারা বাতিলের বিবৃতিতে অর্থনৈতিক উন্নতির যে কথা বলা হয়েছে সেটা একটা উপহাস মাত্র। এরপর পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে।

শেহলা রাশিদ-এর প্রতিক্রিয়া : আমি এটা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করবো

শেহলা রাশিদ একজন পিএইচডির স্টুডেন্ট। দিল্লিতে তিনি জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি পড়েন এবং একজন মানবাধিকার কর্মী।
শেহলার মতে এটা কাশ্মীরীদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করবে। যেভাবে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তাতে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কাশ্মীরীদের মনে আঘাত লেগেছে।
এটা আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করবে। কারণ জম্মু এবং কাশ্মীর একটা রাজ্যের ভিতর ছিল।
তিনটি অঞ্চল জম্মু, কাশ্মীর এবং লাদাখের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম পালন করে। আমরা বড় হয়েছি এই সংস্কৃতিতে, এখন এই পদক্ষেপ নেয়াতে তারা রাজ্যকে বিভক্ত করলো।
এটা শুধু মাত্র দ্বিজাতি তত্ত্বকে উসকে দেবে না এটা মানুষের জন্য বড় একটা সাংস্কৃতিক আঘাত।
এই পদক্ষেপ কাশ্মীর ইস্যুকে আরো জটিল করবে। কেউ জানে না কাশ্মীরে কি হচ্ছে। যেহেতু তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
এটার মানে ভারত সরকারের ওপর আস্থার অভাব। তাদের যদি বিন্দুমাত্র আস্থা থাকতো তাহলে তারা জম্মু এবং কাশ্মীরে নির্বাচন দিত।
তারা এই ইস্যুকে বিধানসভায় নিয়ে আসতে পারতো , তারপর তারা নিজেরাই দেখতে পারত যে সভা এটা পাশ করে, নাকি করে না।
এই পরিবর্তনটা অগোচরে করে, বিপুল পরিমাণ সৈন্য মোতায়েন করে, সব রকম যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রীয় সরকার এটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে যে তারা জানে তারা ভুল কিছু করেছে।
যেভাবে সিদ্ধান্তটা নেয়া হয়েছে সেটা ভুল। আমি এটা সর্বোচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করবো। এবং আমি আশা করছি সুপ্রিম কোর্ট আমাদের প্রতি ন্যায় বিচার করবেন।

রাহিলের প্রতিক্রিয়া : তারা তাদের সংস্কৃতি নিয়ে আসবে আর আমাদেরটা ধ্বংস করবে

রাহিল (আসল নাম নয়) পুলওয়ামার বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে ব্যাঙ্গালোরে পড়ালেখা করছেন।
তিনি বিবিসিকে বলেছেন আমি সত্যি খুব উদ্বিগ্ন কারণ আমার মা অসুস্থ আর আমার আশেপাশের এলাকায় সব যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ। আমি আমার মায়ের কোন খোঁজ নিতে পারছি না।
আমরা চাকরি পেতাম কারণ আমাদের একটা বিশেষ কোটা ছিল। আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচাতাম।
আমাদের রাজ্যে পুলিশ ছিল কাশ্মীরী আর সরকারের বিভিন্ন দফতরের লোক ছিল আমাদের নিজেদের রাজ্যের।
কিন্তু ৩৭০ ধারা বাতিলের পর ভারতের ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য থেকে লোক আসবে এবং এখানে কাজ করবে।
তারা পুলিশে এবং অন্যান্য বিভাগে কাজ পাবে। তারা তাদের ভাষায় কথা বলবে যেটা আমাদের স্থানীয় ভাষার চেয়ে ভিন্ন।
কাশ্মীর এমনিতেই বর্বরতার শিকার, তারপরেও অন্তত তারা পুলিশের কাছে গিয়ে নিজের ভাষায় কথা বলতে পারতো।
এখন স্থানীয় মানুষ কীভাবে তাদের সমস্যাগুলো সেইসব মানুষের কাছে বলবে যারা আমাদের ভাষাটাই বুঝতে পারবে না?
বেশিরভাগ কাশ্মীরী জনগণ মুসলমান আর এটাই ভারতের সরকার পরিবর্তন করতে চাইছে। যাতে করে এখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হয়ে যায়।
বর্তমানে কাশ্মীরের কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র কাশ্মীরের শিক্ষার্থীরা পড়ে।
কিন্তু এখন বাইরে থেকে আসা মানুষ তাদের সন্তানদের এখানে নিয়ে আসবে পড়ার জন্য। এই শিশুরা তাদের সংস্কৃতি নিয়ে আসবে আর আমাদের সংস্কৃতি নষ্ট করবে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হল অন্য রাজ্যের লোক এখানে আসতে পারবে এবং বসতি শুরু করবে। তাদের জনসংখ্যা এখানে বাড়বে।
এখন ভারতীয় শিল্পপতিরা কাশ্মীরকে কিনে নেবে। তারা সরকারের সাথে চুক্তি করবে , আমাদের জঙ্গল , আমাদের সম্পদ কিনবে এবং সব কিছু শেষ করে দেবে।
এই সরকারের সিদ্ধান্ত হচ্ছে আমাদের ক্ষতস্থানে লবণের ছিটা দেয়ার মত। সাধারণ কাশ্মীরীরা মনে করছে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার শেষ হয়ে গেছে।

মুজামিলের প্রতিক্রিয়া: উন্নয়ন কাশ্মীরের জন্য ইস্যু না, আমরা অন্য রাজ্যের চেয়ে ভালো

মুজামিল একজন কাশ্মীরী। তিনি দুবাই-এ কাজ করেন। তার বিয়ে করার কথা ছিল চলতি মাসের ১৮ তারিখে।
কিন্তু পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হচ্ছে বিয়েটা নির্দিষ্ট তারিখে আর হচ্ছে না।
আত্মীয়দের কথা বাদ দিলাম এখন মনে হচ্ছে আমি নিজেই কাশ্মীরে যেতে পারবো না।
সেখানে গিয়ে যদি আপনার ৫ থেকে ৬ মাস আটকা পড়ে থাকতে হয় তাহলে যাওয়ার কোন মানে হয় না।
ভারতে আমাদের যে একটা বিশেষ মর্যাদা ছিল সেটা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।
ভারতের সাথে যে সম্পর্কের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে আমরা ভারতের সাথে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা ভেঙ্গে গেছে। এখন মনে হচ্ছে এটা একটা 'ভগ্ন প্রতিশ্রুতির গল্প'।
এটা কোনভাবেই আমাদের সাহায্য করবে না। যেটাকে সংস্কার বলা হচ্ছে সেটার মানে কি বড় কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে?
কিন্তু আমরা কোন বিনিয়োগ চাই না। উন্নয়ন কাশ্মীরের জন্য ইস্যু না - আমরা ভারতের অন্য রাজ্য থেকে ভালো আছি।
কাশ্মীরীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির প্রলোভন দেখানো হয়েছে।
আমি মনে করি না বাস্তবে এটার কোন ভালো প্রভাব হবে। বরং এটার আরো খারাপ প্রভাব পড়বে আমাদের অর্থনীতির উপর।
প্রথম প্রভাব হল কেউ জানে না কাশ্মীরের এই অস্থির অবস্থা কতদিন থাকবে- ছয় মাস, এক বছর নাকি দুই বছর।
স্থানীয় স্কুল, ব্যবসা, বা সরকারি চাকরি কবে থেকে আবারো চালু হবে।
আমাদের বড় শিল্প হল পর্যটন। আমরা সবচেয়ে ভালো মানের জাফরান, হাতে তৈরি কার্পেট এবং রপ্তানি করার মত ফল উৎপাদন করি।
যদি পরিস্থিতি ভালো না হয় তাহলে এখানে কে আসবে? এটা ভারতের ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ তৈরি করবে।
তারা আমাদের কথা ভাববে না। তারা স্বার্থপরের মত তাদের প্রয়োজন মেটাবে আর এই অবস্থার পূর্ণ সুবিধা ভোগ করবে।
হাজিকের প্রতিক্রিয়া : আমাদের নিজেদের নিয়ম অন্য রাজ্য থেকে আমাদের ভিন্নতা দিয়েছে
হাজিক শ্রীনগরের বাসিন্দা, বর্তমানে দিল্লিতে থাকেন।
সরকার সব যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করার ফলে গত কয়েকদিন ধরে তিনি তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
তিনি বলছেন এই সিদ্ধান্ত প্রত্যেকটা কাশ্মীরীর মতের বিরুদ্ধে করা হয়েছে।
একজন কাশ্মীরী হিসেবে আমি মনে করি আমার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।
তারা সব কিছু বন্ধ করে দিয়েছে কারণ তারা জানত কাশ্মীরীরা এটা মেনে নেবে না।
এই ধরণের নিষ্ঠুরতা দিন দিন বাড়ছে। কাশ্মীরীরা সবসময় মেনে এসেছে যে কাশ্মীর একটা বিতর্কিত ইস্যু।
আমরা কখনো ভারতের অংশ ছিলাম না। আমাদের নিজেদের আইন ছিল যেটা আমাদের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
আমাদের ভারতের অংশ করা হয়েছিল কিছু নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে। সেটা তারা এখন শেষ করে দিয়েছে।
গত কয়েকদিনে অমরনাথ যাত্রী ও পর্যটকদের এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় আমাদের অর্থনীতির প্রচুর ক্ষতি হয়েছে।
ওরা যদি আমাদের ভাল চাইত, তাহলে বছরের যে সময়ে এখানে সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসে, সেসময় এরকম ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করত না।
ভবিষ্যতে সহিংসতা আরও বাড়বে, কেউ কাশ্মীরে আসবে না। সেটা কি আমাদের অর্থনীতির জন্য ভাল হবে?
ইসরায়েল প্যালেস্টাইনের সাথে যা করছে, ভারতের সরকারও কাশ্মীরের সাথে সেটাই করতে চায়। তারা একই প্যাটার্ন অনুসরণ করছে।
কাশ্মীরে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে

কোণঠাসা কাশ্মিরিরা, বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে ভারত by নূর উল হক

শেখ মোস্তাক, ৫৫, ভারত-শাসিত কাশ্মিরের উত্তর অংশ বারামুল্লা জেলার অধিবাসী। তিনি এখন উদ্বিগ্ন।

সোমবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারির পর তার মেয়েকে তার বন্ধুদের সাথে জম্মুর প্রধান নগরীর কাছে অবস্থিত বাবা গুলাম শাহ বাদশাহ ইউনিভার্সিটি থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো কাশ্মিরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকে। কাশ্মিরিদের প্রবল প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় ক্যাবল টিভি, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ বাতিল করা হয়েছে।

মোস্তাক বলেন, ২৪ ঘণ্টারও বেশি আগে তার মেয়ে ও তার বন্ধুরা জম্মু ত্যাগ করেছে। কিন্তু এখনো তাদের তারা বাড়ি ফেরেনি।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, আমরা পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু তারা মেয়েদের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। তারা এখনো জম্মুতেই আছে না কাশ্মিরের দক্ষিণ অংশে ফিরতে পেরেছে জানি না।

তিনি বলেন, আমরা অসহায়। আমরা আশা করছি, মেয়েদের সাথে খারাপ কিছু করা হয়নি।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরের ৭০ লাখ অধিবাসীর একজন হলেন মুস্তাক। ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর তারা এখন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন।

ঈদের কোনো আবহ নেই

আগামী সোমবার কাশ্মিরে ঈদ উল আযহা উদযাপিত হওয়ার কথা। কিন্তু অধিবাসীরা বলছে, তাদের মধ্যে ঈদ উৎসবের কোনো আনন্দ নেই। তারা বলছেন, তাদের বাজার থেকে কোরবানির পশু কেনার অনুমতিও দেয়া হচ্ছে না।

বিক্রেতারা বলছে, বর্তমান অবস্থায় ব্যবসা চালানো কঠিন। জহুর আহমদ শেখ, ২৯, বলেন, তিনি ঈদের জন্য ৬০টি পশুর অর্ডার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন কোনো ক্রেতা নেই।

তিনি বলেন, আমি এবার ব্যাপক বিক্রির আশা করেছিলাম। কিন্তু সব আশা শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, লোকজন ঈদে পশু কিনতে চায়। কিন্তু এ ধরনের পরিবেশে কেউ এ খাতে টাকা খরচ করতে চাইবে না।

কাশ্মির অঞ্চলে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। কারফিউয়ের মধ্যে লোকজন নিত্যপণ্য সংগ্রহ করতেও সমস্যায় পড়ছে। রোগী ও শিশুরা পড়েছে সবচেয়ে বড় অসুবিধায়। ফার্মেসিগুলো বন্ধ রয়েছে। শিশুদের ফরমুলা দুধ পাওয়া যাচ্ছে না। দোকানিরা বলছে, তাদের মজুত শেষ হয়ে আসছে।

মোহাম্মদ রফিক দার নামের ২৭ বছরের এক ব্যক্তি জানান, চাল, ময়দা ও অন্যান্য ভোজ্য সামগ্রীর প্রায় শেষের পথে। আর দুদিন চলতে পারে। উপত্যকার বাইরে থেকে কোনো চালান আসছে না। কাশ্মিরিরদের সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে।

অবরোধের ফলে এই অঞ্চলের আপেল চাষীদের জন্যও সমস্যা হচ্ছে। বছরের এই সময়ই তাদের ফসল তুলতে হয়।

রাজ্যটির অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সেখানকার আপেল বাগানের গুরুত্ব ব্যাপক। চাষীরা জানিয়েছে, আপেলবোঝাই ট্রাকগুলো গন্তব্যে যেতে পারছে না। নিরাপত্তা বাহিনী মহাসড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দিচ্ছে না।

ফয়াস আহমদ মালিক, ২৭, বলেন, আপেল বেশি দিন রাখা যায় না।

ভারত এখন দখলদার শক্তি

এদিকে রাস্তায় রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনী যখন টহল দিচ্ছে, তখন কাশ্মিরের অধিবাসীদের মধ্যে ক্রোধ আর অসহায়বোধ তাড়িয়ে ফিরছে। কর্তৃপক্ষ চারজনের বেশি লোককে একসাথে হতে দিচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষ জটিল রোগীদের শ্রীনগরের প্রধান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে, তবে এজন্য তাদেরকে বিশেষ অনুমতিপত্র দেখাতে হচ্ছে।

আইনজীবী আবরার আলী, ৩৫, বলেন, কাশ্মিরে ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা নতুন মাত্রায় নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, আমাদের আগে মুখ্যমন্ত্রী ছিল। তারা ছিল কাশ্মিরে ভারতীয় প্রতিনিধি। তাদেরকে জেলে রাখা হয়েছে। কাশ্মিরিরা কিভাবে নিজেদের এখন নিরাপদ মনে করবে। ৩৭০ ও ৩৫ক ধারা বাতিল করে ভারত এখন দখলদার শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

অধিবাসী সোহাইল রাশিদ বলেন, ভারতের পদক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের শান্তিতে প্রভাব ফেলবে।

কাশ্মিরিদের ভাগ্য শত শত মাইল দূরে দিল্লি থেকে নির্ধারিত হচ্ছে দেশের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের মাধ্যমে। এতে কাশ্মির নিয়ে কাশ্মিরিদের কোনো কথা থাকছে না।

সাবেক আইন পরিষদ সদস্য জাভেদ হাসান বেগ বলেন, এখন কাশ্মির পরিণত হয়েছে পঞ্চায়েতে। সারা বিশ্বে ভারত পরিচিত ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য এখন তা আর নেই।

কোরবানির গোশতের সামাজিক বণ্টন কি জায়েজ? by মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব

কোরবানির গোশত বণ্টনের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,‌ ‌তোমরা খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্র লোকদের খাওয়াও' (হজ্জ ২৮)।

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‌তোমরা নিজেরা খাও, যারা চায় না তাদের খাওয়াও এবং যারা নিজেদের প্রয়োজন পেশ করে তাদের খাওয়াও' (হজ্জ ৩৬)।

ইবনু মাসঊদ (রা.) কোরবানির গোশত তিনভাগ করে একভাগ নিজেরা খেতেন, একভাগ যাকে চাইতেন তাকে খাওয়াতেন এবং একভাগ ফকির-মিসকিনকে দিতেন।

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হুজুর (সা.)-এর কোরবানির গোশত বণ্টন সম্পর্কে বলেন, তিনি একভাগ নিজের পরিবারকে খাওয়াতেন, একভাগ গরিব প্রতিবেশীদের দিতেন এবং একভাগ ফকিরদের দিতেন।

অতএব কোরবানির গোশত তিনভাগ করা উত্তম ও মুস্তাহাব মাত্র। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। প্রয়োজনে বণ্টনে কম-বেশি করাতেও কোনো দোষ নেই (আল-মুগনী ১১/১০৮; মির'আত ২/৩৬৯; ঐ, ৫/১২০ পৃঃ)।

উল্লেখ্য, কোরবানির গোশত যতদিন খুশি রেখে খাওয়া যায় (তিরমিজী হা/১৫১০, মিশকাত হা/২৭৪৪)।

বর্তমানে বিভিন্ন মহল্লায় প্রচলন রয়েছে, কোরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ একস্থানে জমা করে মহল্লায় যারা কোরবানি করতে পারেননি তাদের তালিকা করে সুশৃংখলভাবে তাদের মধ্যে বিতরণ করা ও প্রয়োজনে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। কাজটি দেখতে ভালো হলেও এটি জায়েজ নয়। কেননা এই প্রচলনের ফলে কারও দিতে মনে না চাইলেও তাকে সমাজের খাতিরে দিতে হয়।

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো মুসলমানে মাল তার সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা হালাল নয়।

(মুসনাদে আহমদ : ১৫/২৯৩, রদ্দুল মুহতার : ৬/৪২৭, আলমগিরী/হিন্দিয়া : ৫/৩০০, হেদায়াহ : ৪/৪৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪)

ডেঙ্গু রোগীদের সর্বত্রই ভোগান্তি: হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল by শুভ্র দেব

হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল। ছুটছে মানুষ। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী নিয়ে এমন দৌড়ঝাঁপ নিত্যদিনের। হাসপাতালে ঠাঁই পাওয়া যেন এখন ভাগ্যের ব্যাপার। এমনিতেই হাসপাতালে রোগীতে ঠাঁসা। বেড, ফ্লোর, বারান্দায়ও রোগী। অতিরিক্ত এসব রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। সরজমিন বেশ ক’টি হাসপাতালে দেখা গেছে- শয্যাতো দুরের কথা বাথরুমের আশেপাশের ফাঁকা জায়গায়, হাঁটা-চলার রাস্তা সর্বত্রই ডেঙ্গু রোগী।
এমনকি লিফট, সিঁড়িতে উঠানামার পথেও শুয়ে আছেন রোগীরা। ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়ানক হওয়াতে হাসপাতালে বেড পাওয়াটা হয়ে গেছে সোনার হরিণ। এছাড়া পরীক্ষা নিরীক্ষার টাকা জমা দেয়ার জন্য ব্যাংকের কাউন্টারে, রক্ত দেয়ার জন্য প্যাথলজি বিভাগে ও রিপোর্ট সংগ্রহ করার জন্য ডেলিভারি কাউন্টারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। পাশাপাশি রোগীর চাপ সামাল দিতে না পেরে রোগীর সঙ্গে নার্সদের খারাপ আচরণ, নোংরা শৌচাগার ও সময়মত রোগীর খাবার না পাওয়া। সব মিলিয়ে ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তরা রয়েছেন চরম বিপাকে। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে ভোগান্তির নানা চিত্র পাওয়া গেছে। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, জ্বর নিয়ে আসার পর চিকিৎসকের দেখা পেতেই সারাদিন চলে যায়। রোগীর চাপ বেশি তবুও বাড়তি চিকিৎসক বসানো হচ্ছে না।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর চিকিৎসকের দেখা পেলেও তারা বাসায় গিয়ে ঠিকমত খাবার খাওয়া, প্রচুর তরল জাতীয় খাবার ও প্লাটিলেট পরীক্ষার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি নিতে চান না। রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হলে ভর্তি নেন। এছাড়া ভর্তি রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেছেন রক্ত পরীক্ষার জন্য ভোর চারটা থেকে সিরিয়াল দিতে হয়। রক্ত দেয়ার পর রিপোর্ট পেতে লম্বা সময় লাগছে। আবার রিপোর্টের জন্য চিকিৎসকরা তাগদা দেন। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন, যেভাবে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন অন্যান্য সময়ের চেয়ে কয়েকগুন কাজ বেশি করে সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্টাফদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। রাতদিন সবাই কাজ করছেন।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালে শাহজাদপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেনের স্ত্রী মাকসুদা বেগম বলেন, আমি ও আমার ছোট ছেলে একসঙ্গেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছি। শুক্রবার আমি হাসপাতালে আসি। সারাদিন অপেক্ষা করে চিকিৎসকের দেখা পাই। তারা রিপোর্ট দেখে নিশ্চিত হন যে আমাদের ডেঙ্গু হয়েছে। কিন্তু তারা ভর্তি না নিয়ে বাসায় চলে যাওয়ার কথা বলেন। অথচ আমি হাঁটতেই পারছিলাম না। আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরে আমার স্বামী আবার জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করে চিকিৎসককে আমার অবস্থার কথা বলেন। তখন চিকিৎসক আমার অবস্থা খারাপ দেখে ভর্তি নেন। তিনি বলেন, এখানে সবকিছুতেই লম্বা সিরিয়াল থাকে। আমি ও আমার ছেলের প্রতিদিন রক্তের প্লাটিলেট পরীক্ষা করাতে হয়। কিন্তু ভোর চারটা থেকে লাইনে দাড়াতে হয়। কয়েক ঘন্টা অপেক্ষার পর রক্ত দেয়া যায়। আবার রিপোর্ট পাওয়ার জন্য বিকাল বেলা লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। একই হাসপাতালে শারমিন নামের আরেক রোগী বলেন, আমি ও আমার সন্তান এক সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছি। হাসপাতালে নার্সদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা রেগে যায়। একটু পরামর্শও করা যায় না। শৌচাগারের এত নোংরা ওই দিকে যাওয়ার উপায় নাই। এছাড়া শুধু স্যালাইন আর নাপা দিয়েই চিকিৎসা চলছে। যে মানের চিকিৎসা তারা করছে মান আরও বাড়ানো দরকার।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাজারখানেক মানুষ লম্বা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। সবার উদ্দেশ্য ডেঙ্গুর পরীক্ষা করা। আবার অনেকেই রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। রোগী ও তাদের স্বজনদের চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবকরা হিমশিম খাচ্ছেন। আল-আমিন নামের এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাদের ডেঙ্গু হয়েছে তারা ও তাদের পরিবারের লোকজন বুঝতেছে ভোগান্তি কাকে বলে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে পরীক্ষা করানো যাচ্ছে না। আবার রিপোর্ট পাওয়ার জন্য একই রকম ভোগান্তি ও সময় নষ্ট হচ্ছে। এমন অবস্থা হাসপাতালের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছয় তলার মেডিসিন ওয়ার্ডের ডেঙ্গু রোগীর স্বজন আরফাত বলেন, রোগীর তুলনায় নার্সদের সংখ্যা এত কম একটা স্যালাইন দেয়ার জন্য নার্সের জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। ওয়ার্ডের বাইরে ফ্লোরের মধ্যে যে রোগীরা আছে তাদের কাছে নার্স-চিকিৎসকরা কম আসেন। তাদের নাই শৌচাগারের ব্যবস্থা। এত রোগীর জন্য ওয়ার্ডের ভেতরের শৌচাগারই ভরসা। জরুরি প্রয়োজনে যেতে হলেও লাইন ধরতে হয়। সালেহা বেগম নামের আরেক রোগীর স্বজন জানান, টেস্ট করানোর জন্য এত চাপ থাকার পরও কর্তৃপক্ষ সীমিত লোক দিয়ে কাজ করাচ্ছে। তাই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক সময় লেগে যায়। প্রচন্ড গরম, রোগী নিয়ে টেনশন তার ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা। সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে সময় যাচ্ছে। ঢামেকের ২০৭, ২০৮ ও ২১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ডেঙ্গু রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা। বড় ওয়ার্ডের চেয়ে শিশু ওয়ার্ডে তুলনামুলক চাপ বেশি। প্রতিটা বেডে তিন চারজন করে শিশু রোগী রাখা হয়েছে। আবার সঙ্গে তাদের মায়েরাও আছেন। জন্মের পরপরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া এসব শিশুদের নিয়ে তাদের স্বজনদের ভোগান্তির শেষ নাই। একদিকে প্রচন্ড জ্বর অন্যদিকে কোনো কোনো শিশুর শরীরে ব্যাথা। সহ্য করতে না পেরে চিৎকার দিয়ে কান্না করছে অনেক শিশু। পরীক্ষার জন্য অনেক শিশুর শরীর থেকে রক্ত টানা কঠিন হয়ে পড়ে। নার্সরা জানিয়েছেন, ছোট শিশুর শরীর থেকে রক্ত টানা খুব কঠিন। এসব ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসকরাও রোগীদের ফাইল, রিপোর্ট নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

এদিকে বিভিন্ন ডেঙ্গু রোগীকে রাখা হয়েছে এমন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায় আরও বেহাল দশা। ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর জন্য যত বেড বরাদ্দ আছে তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। মেডিসিন ওয়ার্ডের মোহাম্মদ আলী নামের এক রোগী বলেন, সিট পাওয়ার কোন আশাই করছি না। বরং ফ্লোরে থেকে চিকিৎসা নেয়ার নিশ্চয়তা চাই। কোনরকম গাদাগাদি করে শুয়ে আছি। ঘুমানোর কোনো উপায় নাই। সবসময়ই মানুষের হাঁটাচলা লেগেই আছে। শিশু ওয়ার্ডে নাফিসা নামের এক শিশুর অভিভাবক বলেন, বাচ্চাটাকে নিয়ে তিনদিন ধরে মেঝেতে শুয়ে আছি। এখনও তার কোনো পরিবর্তনও হয় না। প্লাটিলেট শুধু উঠানামা করছে। ঘনঘন প্লাটিলেট টেস্ট করাতে হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতালে যে সিরিয়াল দিয়ে টেস্ট করাতে হয় ও রিপোর্ট পেতে হয় ততক্ষণে রোগীই মারা যাবে।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেও ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা কম নয়। গতকাল সকাল থেকেই হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে ব্যাপক ভিড় ছিল। যাদের একটা বড় অংশই ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসা। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টারে রক্তের পরীক্ষা করে ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। তাই এখন এই হাসপাতালে এসেছেন ভর্তি হতে। রাহুল দেবনাথ নামের এক অভিভাবক বলেন, আমার ভাতিজির জ্বর ছিল কয়েকদিন ধরে। জ্বরে কাতর হয়ে গেছে আর শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা।  তারপর অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে ডেঙ্গু টেস্ট করিয়েছিলাম। রিপোর্টে ডেঙ্গু পজেটিভ এসেছে। অ্যাপোলো হাসপাতালে খরচ বেশি তাই এখানে নিয়ে এসেছি। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি এখন ভর্তি করাতে পারি নাই। জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক রোগী বলেন, দাঁড়িয়ে আছি ঘন্টাখানেক ধরে। শুনেছি এই হাসপাতালে চিকিৎসা ভাল। তবে ভর্তি করাতে পারব কিনা জানিনা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ডেঙ্গু রোগীদের ভোগান্তির শেষ নাই। এখানেও সিটের সমস্যার কারণে রোগী ভর্তি করাটা কঠিন। তারপরও অন্যান্য হাসপাতালের মতই এই হাসপাতালে রোগীর চাপ। পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আর রিপোর্ট পেতে অপেক্ষার শেষ নাই। অপেক্ষা প্রহর গুনতে গুনতে রোগীরা বাইরে থেকে টেস্ট করাতে বাধ্য হচ্ছেন।

উজানী by জাকিয়া সুলতানা

অফিসে বেরোনোর সময় পাশের ফ্ল্যাটের সামনে জটলা চোখে পড়ল রায়হানের। কী হলো! ওপরতলার হাসিব সাহেবও আছেন। উনাকে প্রশ্ন করল,
– এত ভিড় কেন ভাই?
– কবির সাহেব মারা গেছেন আজ ভোরে।
রায়হানের একটু অপরাধবোধ হলো। ওরই তো সবার আগে জানা উচিত ছিল খবরটা নিকট প্রতিবেশী হিসেবে। ও প্রতিদিন সন্ধ্যায় একবার দেখা করে আসে বয়স্ক দম্পতির সাথে। কাল অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল ফিরতে। এজন্য আর বিরক্ত করেনি ওনাদের। সকালে উঠেও খেয়াল হয়নি অফিসে যাওয়ার চিন্তায়। আজকে ঘুম থেকে উঠতেও একটু দেরি হয়েছে ওর। এই পরিস্থিতিতে আর অফিসে যেতে মন চাইল না। ফোন করে জানিয়ে দিলো আজ যাবে না। তারপর কবির সাহেবের ফ্ল্যাটে ঢুকল। আত্মীয়স্বজন কেউ কেউ এসে পড়েছেন। মরদেহ বারডেমের মর্গে রাখা হবে। ছেলেমেয়েরা এলে তারপর দাফন করা হবে। তিন ছেলেমেয়ে ভদ্রলোকের। একজন ইংল্যান্ডে, একজন কানাডায়, আরেকজন আমেরিকায় থাকে। সবাইকে খবর দেওয়া হয়েছে। খালাম্মা মানে মিসেস কবির বসে আছেন স্তব্ধ হয়ে। নিজের মায়ের কথা মনে হলো রায়হানের। মা যখন মারা যান ও দেশের বাইরে ছিল। দেখতে পারেনি শেষবারের মতো। তিনদিনের মাথায় দেশে ফিরে শুধু মুখটা দেখতে পেয়েছিল। তার আগে অনেকবার ডেকেছিল ওকে কিছু বলবে বলে। কিন্তু অভিমানে ও মায়ের সেই আহ্বানে কোনো সাড়া দেয়নি। আবার মা যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে – সেটাও ভাবেনি। খালাম্মার সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকল। তারপর আবার নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকল। বিশাল এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল বিয়ের পরিকল্পনা করে। কিন্তু মায়ের আপত্তির মুখে বিয়েটা হয়নি। মাকে এই ফ্ল্যাটে রেখে নিজে চলে গিয়েছিল দেশের বাইরে। মায়ের সাথে অবশ্য ওর বিধবা বোনটা থাকত।
মা যে ঘরটায় থাকত সেই ঘরে গিয়ে ঢুকল রায়হান। দেয়ালে একটা বড় ছবি বাঁধাই করে টাঙিয়ে রাখা আছে। ছবিটার সামনে দাঁড়াল। মনে হলো মা যেন অনুযোগ করছে,
– এত ডাকলাম তোকে। তবু এলি না!
আসবে কি! ও তখন অভিমানে অন্ধ হয়ে ছিল। কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ঠিক বলতে পারবে না। দরজায় শব্দ হতে সম্বিত ফিরল। ডাইনিং স্পেসে এসে দেখল রহিমা ঢুকছে। ওর কাছে একটা চাবি থাকে। রোজ এসময় এসে সারাদিন থাকে। সন্ধ্যার পর রুটি বানিয়ে হটপটে রেখে তারপর যায়। বাইশ বছর বয়স মেয়েটার। বিয়ে হয়েছে। একটা ছেলেও আছে চার বছর বয়সের। দুই বছর আগে স্বামী আবার একটা বিয়ে করলে নিজে আলাদা থাকতে শুরু করেছে। বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে। একজন মহিলার সাথে থাকে। দুজন মিলে ভাড়া দেয় ঘরের। ছেলেটাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছে। রায়হানকে এইসময় বাসায় দেখে অবাক হলো একটু।
– এসেছিস?
– জি চাচাজান। আপনি অফিসে যান নাই ক্যান?
– পাশের বাসার খালুজান মারা গেছেন আজ ভোরে।
– ও আল্লাহ্‌!
বলে ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়ল জোরে জোরে। রায়হানও মনে মনে পড়ে নিল। ঘটনার আকস্মিকতায় এতক্ষণ পড়তে ভুলে গিয়েছিল।
– তুই একটু দেখে আয় তো ওখানে কিছু লাগবে কিনা?
বেরিয়ে গিয়ে প্রায় পনেরো মিনিট পর ফিরল রহিমা।
– নানি তো কিছুই খায় নাই অহনতরি। আবার ওই বাসায় তো আইজকা চুলা জ্বালান যাইব না।
রায়হান খালাম্মা সম্বোধন করে বলে ও নানি বলে ডাকে।
– তুই কিছু নাস্তা বানাতে শুরু কর। আমি উনাকে নিয়ে আসছি।
বলে নিজের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পাশের ফ্ল্যাটে গেল রায়হান। মহিলার আত্মীয় এসেছে কয়েকজন। তাদের সহায়তায় নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে এলো। রহিমা মেয়েটা বেশ চটপটে। চিনি ছাড়া চা বানিয়ে ফেলেছে এক কাপ। দীর্ঘদিন ওর কাজ করায় খালাম্মার অনেক কিছুই জেনে গেছে মেয়েটা। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ করে নিয়ে এলো রহিমা খালাম্মাকে। তারপর দুটো নোনতা বিস্কিট আর এক গ্লাস পানি দিয়ে বলল,
– নানি খাইয়া লন।
সামনে দাঁড়িয়ে যত্ন করে খাওয়াল বিস্কিট দুটো । তারপর পানি খাইয়ে চায়ের কাপ নিয়ে এলো। সেটাও পুরো খাইয়ে আবার রান্নাঘরে চলে গেল। রায়হান গিয়ে উনাকে মায়ের ঘরে বসাল। রহিমা যখন উনাকে চা খাওয়াচ্ছিল তখন ও এসে মায়ের বিছানায় পরিষ্কার চাদর বিছিয়ে দিয়ে বালিশের কভার বদলে দিয়ে গেছে। একজন আত্মীয়া থেকে গিয়েছিল। সে শুইয়ে দিলো বিছানায়। উনার বিহ্বল ভাবটা এখনো কাটেনি। রায়হান বেরিয়ে এলো। রান্নাঘরে গিয়ে ওকে এক কাপ চা বানিয়ে দিতে বলল রহিমাকে।
বিকেল নাগাদ সব কাজ হয়ে গেল। গোসল করিয়ে খালুজানকে বারডেমের হিমঘরে রেখে আসা হলো। রায়হান গিয়েছিল সাথে। যাবার আগে খালাম্মাকে যত্ন করে খাইয়ে দিয়ে গেছে। সকালের নাস্তা রহিমা খাওয়াতে পারলেও দুপুরের খাবার কিছুতেই খাওয়াতে পারছিল না। তখন হয়তো উনি বুঝতে শুরু করেছিলেন কী হারিয়েছেন। রায়হান খাবারের থালা হাতে নিলে উনি বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে নিলেন। সকালের নাস্তা খাওয়ানোর আগে সেই আত্মীয় মহিলা ইনসুলিন পুশ করে দিয়েছিল। রাতেও ইনসুলিন নেন উনি। সেটা খেয়াল করে দিয়ে দিতে হবে। বাসায় ফিরে এলে খালাম্মা ওর হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। রায়হান একটু স্বস্তি পেল। এই কান্নাটা দরকার ছিল। ও আর খালাম্মা বাসায় একা। একটু আগে রহিমাকে বস্তিতে পাঠিয়েছে ওর পোশাক নিয়ে আসতে আর বলে আসতে যে ক’দিন ও এখানে থাকবে। বারডেমে যাবার আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যে ক’টা দিন ছেলেমেয়েরা এসে না পৌঁছায় সে-কটা দিন উনি রায়হানের বাসাতেই থাকবেন। সাথে রহিমা থাকবে। আর উনার একজন নিকট আত্মীয়া।

তিনদিন পর –
কবির সাহেবের তিন ছেলেমেয়ে আর রায়হান বসেছে ড্রয়িংরুমে। কবির সাহেবের ছোট ভাইও আছেন। গতকাল খালুজানকে চিরতরে শুইয়ে রেখে এসেছে ওরা আজিমপুরে। আজ কুলখানি হয়ে গেছে। আগামী পরশু তিনজনই ফিরে যাবে যে যার কাজের জায়গায়। খালাম্মা মানে উনাদের মা কীভাবে থাকবেন সেটা স্থির করার জন্য এই সভা। গতকাল একমাত্র ছেলে বলেছিলেন,
– আমি মাকে নিয়ে যাব।
– আমি বাবা দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না।
খালাম্মা চটজলদি উত্তর দিয়েছিলেন। রাতে উনারা বসে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। সেটা কিভাবে কার্যকর করা যায় সেজন্যই একসাথে বসা।
– চাচা আমাদের ফ্ল্যাটে তো মাকে একা রাখা যাবে না।
তুহিন মানে কবির সাহেবের ছেলে বলল।
– না সেটা ঠিক হবে না।
– আমরা ঠিক করেছি মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে দিব।
রায়হান চমকে উঠল। ওর মায়েরও একই পরিণতি হতো যদি ওর বড় আপা বিধবা না হতো। মা মারা যাবার কিছুদিন পর উনিও মারা গেছেন। অবশ্য তখন উনি একমাত্র ছেলের কাছে থাকতেন।
ওরা কথা বলছেন আর রায়হানের মনে তোলপাড় চলছে। অনেকক্ষণ উসখুস করার পর রায়হান মুখ খুলল।

আরো একমাস পর —
রায়হান ফুরফুরে মেজাজে অফিস থেকে বেরিয়ে বাসার পথ ধরল। একমাস আগে কবির সাহেবের ছেলেমেয়েরা যে যার কর্মস্থলে ফিরে গেছে। সাথে নিয়ে গেছে চোখেমুখে স্বস্তি আর রায়হানের প্রতি কৃতজ্ঞতা। ওর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ওরা খালাম্মাকে মানে ওদের মাকে রায়হানের বাসায় রাখতে সম্মত হয়েছে। রহিমাকে বস্তি থেকে আনিয়ে ওর ফ্ল্যাটে স্থায়ীভাবে রেখে দিয়েছে। সারাদিন রান্নাবান্না করে আর খালাম্মাকে সঙ্গ দেয়। ওর ছেলেকেও আনিয়ে নিয়েছে রায়হান। মাদ্রাসা থেকে ছাড়িয়ে এলাকার একটা সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। শুধু সমস্যা করতে চেয়েছিল বস্তির রহিমার ঘরের মহিলা। রায়হান বলে দিয়েছে যতদিন উনি নতুন ভাড়াটে না পান ততদিন রায়হানই রহিমার অংশের টাকাটা দিয়ে দিবে। এখন বাসায় ফিরে খালাম্মাকে ইনসুলিন দিয়ে দুজনে একসাথে খেতে বসে। আর তখন দুজনেই গল্পের ঝাঁপি খুলে মেলে দেয়। রহিমা মাঝে মাঝে বলে,
– এতদিনে বাড়িটারে বাড়ি বইলা মনে হয়।
– কেন এতদিন কি মনে হতো তোর?
খালাম্মা জানতে চান।
– এতদিন মনে হইত কোনো শ্মশানে আইছি কাম করতে।
– হুম বাবা! সবই তো হলো। এখন শুধু একটা বৌমা যদি পেতাম!
এই কথাটা শুনলেই রায়হানের মুখটা কালো হয়ে যায়। মিতুর মুখটা মনে পড়ে। কোথায় আছে ও? মিতুর কথা ভাবতে ভাবতে কখন বাসায় এসে গেছে বুঝতে পারেনি। ড্রাইভারের কথায় খেয়াল হলো,
– স্যার এসে গেছি।
অপ্রস্তুত মুখে গাড়ি থেকে নামল রায়হান। লিফটে ওঠার আগে একটা খালি পার্কিংয়ে নতুন গাড়ি দেখতে পেল। আগে কখনো দেখেনি গাড়িটা। বাসার কলবেলটা বাজাতে রহিমা এসে দরজা খুলল।
– চাচা একজন মেহমান আইছে। নানির কে জানি লাগে।
ভেতরে ঢুকে অবাক রায়হান! সারা রাস্তা যার কথা ভাবতে ভাবতে এসেছে সেই মিতু বসে আছে ওর ড্রয়িংরুমে।
– এসো বাবা। আমার বৌমার দূরসম্পর্কের বোন এ।
– ভালো আছো?
সরাসরি মিতুকে প্রশ্ন করল ও। মিতুও অবাক! স্বর ফুটল না গলায় কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
– ভালো আছি। তুমি দেশে এসেছ কবে?
– তোমরা পরিচিত?
– জি খালাম্মা।
রায়হান উত্তর দিলো। ভদ্রমহিলা কোনো প্রশ্ন করলেন না আর। মিতু এসেছে খালাম্মার কিছু জিনিস নিয়ে। ছেলে পাঠিয়েছে। মিতুর এক ভাই নাকি ইংল্যান্ডে থাকে।
– আমি এখন যাব। অনেকক্ষণ হলো এসেছি।
– চা খেয়েছ?
– হুম। শুধু চা-ই নয়। সাথে টা-ও খাইয়েছেন খালাম্মা।
মিতু উত্তর দিলো।
– তোমার কন্ট্যাক্ট নম্বরটা দেবে?
ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো মিতু। তারপর বিদায় নিয়ে চলে গেল। চলে যেতে মনে হলো মিতুর মেয়েটার কথা জানতে চাইল না তো! কোথায় আছে, কী পড়ছে কিছুই জানা হলো না। হাতে মিতুর দেওয়া কার্ডটা নিয়ে কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
– কিভাবে পরিচয় তোমাদের?
সামনে কেউ বসে আছে এতক্ষণ মাথায় ঢুকল ওর।
– আরেকদিন বলব আপনাকে।
বলে নিজের ঘরে চলে গেল রায়হান।
রাত দশটা বাজে। কার্ডটা নিয়ে মিতুর নম্বরে ফোন করল রায়হান। খালাম্মাকে ইনসুলিন দিয়ে একসাথে ডিনার সেরে নিজের ঘরে এসেছে। খেতে পারেনি। শুধু খাবার নাড়াচাড়া করেছে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ফোনটা করল। ওপারে রিং হচ্ছে।
– আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?
এতদিন পরেও কণ্ঠ চিনতে অসুবিধা হলো না। মৌলী ফোন রিসিভ করেছে।
– ওহ! কাকু তুমি!
পরিচয় দিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে গেল।
– তুমি হোল্ড করো একটু। আমি আম্মুকে ডেকে আনছি।
– কে ফোন করেছে?
মিতুর গলা শুনতে পেল।
– হ্যালো। কে বলছেন?
বুঝতে পারল মৌলী ওর পরিচয় না দিয়েই পালিয়েছে।
– আমি।
মুহূর্ত কয়েক নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল মিতু।
কিছুক্ষণ কথা বলার পর রায়হান প্রশ্ন করল মিতুকে,
– আমরা কি এবার বিয়েটা করতে পারি না?
– তোমার মা বেঁচে থাকতে যে বিয়েটা মেনে নেননি উনি মারা যাবার পর সেই বিয়ে করা মানে উনাকে অপমান করা, এটা আশা করি বোঝার বয়স তোমার হয়েছে।
– আমরা কি কাল একবার দেখা করতে পারি?
– হ্যালো কে বলছেন?
এতক্ষণে ফোনের রিং বন্ধ হয়ে কেউ কথা বলল ওপারে। অবাক ব্যাপার! এতক্ষণ ও তাহলে কল্পনা করছিল। মৌলী ফোন ধরেনি – এতক্ষণ পর মিতুই ধরেছে ফোনটা। তারপরেও কল্পনায় করা দ্বিতীয় অনুরোধটা বাস্তবে করল।
ওপাশ থেকে কোন উত্তর এলো না।
– মিতু আমি তোমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছি।

পরদিন –
আড়ং-এর চারতলায় কফি হাতে মুখোমুখি দুজন বসে আছে। গতকালের কল্পনায় করা অনুরোধটা আবার করল রায়হান। মিতু কী বলবে? আজ থেকে দশ বছর পেছনে ফিরে গেল ও। ভয়াবহ দুঃসংবাদ নিয়ে রায়হান এসেছিল। ওর মা ওদের দুজনের বিয়েতে রাজি হননি। মিতু সেটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল। আর এরকম কিছু যে ঘটতে পারে সেটাও আগে আঁচ করেছিল। শুধু কষ্ট হয়েছিল এটা ভেবে যে, ছেলে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে বলে ভদ্রমহিলা এত উৎফুল্ল হয়েছিলেন কিন্তু যেই শুনেছেন যে ও ডিভোর্সি তখনই বেঁকে বসেছিলেন। আচ্ছা বিপরীত চিত্র যদি হতো। মিতু হতো প্রেম ভেঙে যাওয়া হতাশ এক তরুণী আর রায়হান হতো ডিভোর্সি – তাহলে কী হতো?
– দ্যাখ আমি এতদিন স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছি। আর সেটায় আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু এতদিন পর স্রোতের দিকে হেঁটে যাওয়াটা হয়তো কঠিন হবে আমার জন্য।
নাহ! দশ বছর আগে করতে চাওয়া প্রশ্নটার মতো এই বাক্যটাও মিতু উচ্চারণ করতে পারল না। আর রায়হান ওর উত্তরের অপেক্ষায় ওর দিকে তাকিয়ে থাকল।

শাহানারা হোসেনের বেলাশেষের পাঁচালি by সনৎকুমার সাহা

তাঁ কে প্রথম দেখি ১৯৬০ সালে। একা নন। স্বামী ডক্টর এ.বি. মোশাররফ হোসেনও তাঁর সঙ্গে। দুজনই এসেছেন আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দিতে। আমি তখনো ছাত্র। তাঁদের বিষয়ে কিছুই জানি না। কিন্তু চোখে পড়াতেই মুগ্ধ। দুজনেই সাধারণের তুলনায় দীর্ঘদেহী-দিব্যকাস্তি। শাহানারা হোসেন যেন রাজহংসী। লালিত্যের সঙ্গে গাম্ভীর্যের মিশেল। দেবী প্রতিমার মতো। আপনা থেকে মাথা নত হয়। গুণের কথা জেনে অবাক হই আরো। দুজনেই লন্ডন-স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে এসেছেন। এ.বি. এম হোসেন ইসলামের ইতিহাসে ডক্টরেট। আর শাহানারা হোসেন পরে গিয়ে খুব অল্প সময়েই সাধারণ ইতিহাসে এমএ। অবশ্য তার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নজরকাড়া ফল দেখিয়ে যোগ্যতার ছাপ রাখতে পারেন বলেই লন্ডনের সেরা স্কুলে তাঁরা ভর্তি হতে পারেন। শাহানারা হোসেন পরে আবার ওখান থেকে ডক্টরেট করেন। সেটা ১৯৬৬ সালে। ডক্টর এ.বি. এম হোসেন এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর এমেরিটাস। ক’বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ডক্টর শাহানারা হোসেনকেও তাঁদের বিশেষ মর্যাদার ইউজিসি-প্রফেসর পদে বরণ করে তাঁর মেধার প্রতি সম্মান জানান। দুজনই আমাদের অশেষ শ্রদ্ধার। এ.বি. এম হোসেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামিক সংস্কৃতি, বিশেষ করে স্থাপত্যকলার ওপর একজন বিশেষজ্ঞ বলে নন্দিত। শাহানারা হোসেনের অবিসংবাদী দক্ষতা প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে।

শাহানারা হোসেনের সঙ্গে আমার বোধহয় বছর-তিনেকের ফারাক যখন এখানে এলেন, তখন ওই বয়সেই তাঁর জুটেছে মেধার পূর্ণ
স্বীকৃতি, এটা আমাদের সমীহ জাগায়। আত্মবিশ্বাসের অভাব তাঁর ভেতরে কখনো চোখে পড়েনি। মনে হয়েছে এমনটিই বুঝি স্বাভাবিক। যদিও মহিলা শিক্ষক ঠিক তখন আর কেউ ছিলেন কিনা মনে করতে পারছি না।

আমি অবশ্য তাঁকে দেখেছি কালে-ভদ্রে। এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নির্মাণকাজের তখন শৈশব। ছাড়া ছাড়া কটি ভবনে চলে পাঠদান। প্রত্যেকটি পরস্পর বিচ্ছিন্ন। ইতিহাস-সংলগ্ন বিষয়গুলো পড়ানো হতো শহরে। আমরা পড়তাম ক্যাম্পাস যেখানে গড়ে উঠছিল, সেই মতিহারে। পুরনো কটা কুঠি ছিল, সেগুলোতেই ঝাড়াই-বাছাই করে। আর সবার সঙ্গে দেখা হতো গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে। তখন এখানে শুধু দু-বছরের মাস্টার্স কোর্স ছিল। স্নাতক-পাশ ও সম্মান পাঠ সারা হতো কলেজে। কতইবা ছিল ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা! সব মিলিয়ে বড়জোর হাজারখানেক। শিক্ষক-সংখ্যা কি পঞ্চাশ-ষাটের বেশি ছিল? কখনো কখনো এই হোসেন দম্পতি থাকলে তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন অবশ্যই। তবে ওই সময়ে তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। যদিও শিক্ষক হিসেবে তাঁরা যে সমীহ আদায় করতেন, এটা ভেবে এখন অবাকই হই।

একটু হিসাব করলেই ধরা পড়বে, যে বয়সে শাহানারা হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ মানে পড়াবার দায়িত্ব নিয়ে আসেন – এবং তা তাঁর স্বোপার্জিত সর্বজনমান্য সক্ষমতায় – সে বয়সে আজকাল খুব কম ছেলেমেয়েই আমাদের দেশে তাদের ছাত্রজীবনের সমাপ্তি ঘটায়। এখন সম্মান-পাঠে এমনিতে এক বছর বাড়তি যোগ হয়েছে। তার সঙ্গে পরীক্ষা-পদ্ধতির নতুন বিন্যাসে পাঠক্রম শেষ হতে কমপক্ষে আরো এক বছর লেগে যায়। নিটফল দাঁড়ায় এই, শাহানারা হোসেন যখন ঢাকা-লন্ডনে তাঁর কৃতিত্বের সর্বোচ্চ স্বাক্ষর রেখে ফিরে আসেন, তার তুল্য সময়ে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের নির্ধারিত পাঠচক্র অসমাপ্তই থেকে যায়। শাহানারা হোসেন কিন্তু তাঁর মেধার স্বীকৃতি আদায় করেছেন শুরু থেকেই। এবং তা যথার্থ। অবাক হই এ কারণে যে, আমাদের নীতিনির্ধারকরা যে ছেলেমেয়েদের ছাত্রত্ব অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবে নিঃশব্দে দু-বছর বাড়িয়ে দেন, তার সার্বিক ভালোমন্দ আমরা যাচাই করি না।

কথাগুলো মনে এলো শাহানারা হোসেনের সম্প্রতি প্রকাশিত অতি উজ্জ্বল স্মৃতিকথা বেলাশেষের পাঁচালি পড়া শেষ করে। বইটি ছেপেছে বাংলা একাডেমি। আমার বিশ্বাস, এটি তাদের সেরা প্রকাশনার একটি বলে গণ্য হতে থাকবে। প্রফেসর এ.বি. এম হোসেনের আত্মকথা পড়ন্ত বেলার গল্প ছেপে বেরোয় বছর দুই আগে। সেটিও উপাদেয়। শালীন, মার্জিত ও আন্তরিক। বেগম হোসেনের এই বইটিও তেমন। সবাই তাঁদের রাজযোটক বলে মানে। তার পরিচয় মিলল এখানেও। মেধার কর্ষণার অনায়াসলব্ধ ছাপ আমাদের সম্ভ্রম জাগায়। তবে দূরতব বাড়ায় না। আমরা বরং আকৃষ্ট হই। যদিও মেজাজ বারোয়ারি নয়। অন্তর্মুখীই বলা চলে। এতেই কিন্তু তাঁর সত্যস্বরূপ ফোটে। আমরা মুগ্ধ হই।

শাহানারা হোসেনের কথা শুরু তাঁর পূর্বমাতাদের স্মরণ করে, –  যতদূর জানা যায়। তাও আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছরের ব্যাপ্তি। এটা ইঙ্গিতবহ। নারী-বাস্তবতার প্রবাহকেই যে তিনি অগ্রাধিকার দেন, তার অনুমান এতে মেলে। তবে সক্রিয়বাদী তিনি নন। ঐতিহাসিকের অনাচ্ছন্ন দৃষ্টি বরাবর বজায় থাকে। তাতে অন্যরাও গুরুত্ব হারান না। তারপরও তাঁর সময় পর্যন্ত কত সম্ভাবনাময় নারী যে সংসারচক্রে বাঁধা পড়ে অকালে পথ হারান, পছন্দের সীমা তাঁদের কতটা যে সংকুচিত হয়, অভ্যাসের গতানুগতিকতায় তাঁরাও যে তাল মেলান, কারণ সেইটিই বাস্তব এবং তাতেই সমাজের প্রশ্নহীন অনুমোদন, – সংবেদনশীল মন নিয়ে পড়তে গেলে এগুলোও আমাদের চোখে পড়ে। অসহায় আক্ষেপ বাড়ে। তিনি অবশ্য কোথাও অভিযোগের আঙুল তোলেননি। আপন বৃত্তে চলমান বাস্তবতার স্বরূপটাকে চেতনায় ধরতে চেয়েছেন। আবেগের অতিরিক্ত মিশেল দেননি। তাঁর ইতিহাস পাঠের শৃঙ্খলা যেন স্বয়ং তাঁকে চালিত করে। যদিও সমবেদনার অশ্রুত রাগিণী আপনা থেকে বেজে চলে। ভূমিকায় তিনি জানান, ‘… বিশেষ করে পূর্ব মাতাগণের জীবনকথা স্মরণ হলে হৃদয়ে বেদনা বোধ করি। তাদের বঞ্চিত জীবন, অবহেলার কারণে তাদের কারও কারও অকালমৃত্যু – এসবই এখনও আমাকে কাঁদায়। আমার আম্মার মুখে আমি সদাই দেখতে চেয়েছি ম্যাডোনার প্রশান্ত হাসি – কিন্তু বারবার আমার সেই আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে। মনে পড়ে আমার অন্ধ মাতামহীর কপোল প্রায়ই অশ্রুতে সিক্ত থাকত।…’ – এই স্মৃতির সঙ্গে প্রতারণা তিনি করেননি। তবে আতিশয্যে ও অতিনাটকীয়তায় ভেসেও যাননি। ভাষার নির্মাণ পূর্বাপর সভ্য ও সংযত।

শাহানারা হোসেনের শৈশব ও বালিকাবেলার অনেকটা সময় কাটে কলকাতায়। বাবা ছিলেন সেখানে পুলিশের সর্বজনমান্য কর্মকর্তা। আস্থা ও শ্রদ্ধা তিনি অর্জন করেছিলেন চারপাশে সবার। বেড়ে ওঠার এই পর্বে কোনো বিভেদ বা বৈষম্যের কাঁটা তাঁর মনে ফোটেনি। তবে ওই সময়েই জাতিগত নৈর্ব্যক্তিক সাম্প্রদায়িকতা বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে। তা নিয়ন্ত্রণাতীত প্রচ-তায় ফেটে পড়ে ১৯৪৬-এর আগস্ট মাসে। প্রধানত নিরাপত্তার কারণেই তাঁরা তখন বারবার বাসা বদল করেন। কোনো অঘটনের শিকার তাঁরা হননি। তবে সামষ্টিক চিন্তার কক্ষপথ আর আগের মতো থাকে না। তা পারিবারিক সিদ্ধান্তকেও প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৪৭-এই দেশভাগের আগে-পরে কর্মসূত্রে শাহানারা হোসেনের আত্মীয়স্বজন যাঁরা ওপারে ছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই এপারে চলে আসেন। এটা অবশ্য তাঁদের স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনই। কারণ তাঁদের স্থায়ী নিবাস কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে। অভিজাত এবং শিক্ষ-দীক্ষায় অগ্রগণ্য। শিক্ষর মাপকাঠি অবশ্য পুরুষকেন্দ্রিক। মেয়েদের কথা বিবেচনায় আনা কেউ প্রয়োজন মনে করতেন না। তারা ভবিষ্যতে নম্র-বাধ্য-সুগৃহিণী হবে, এতেই ছিল প্রত্যাশায় অগ্রাধিকার। বাকিটা ভাগ্যের ব্যাপার।

শাহানারা হোসেন জানাচ্ছেন, তাঁর মা বিরক্ত হলে রান্না করাকে বলতেন ‘হাঁড়ি ঠ্যালা’। আমার মা-ও ওই শব্দটি প্রায় ব্যবহার করতেন। এছাড়া বাবা ছিলেন স্কুলমাস্টার। তার সঙ্গে মিলিয়ে বলতেন, তিনি করেন ‘ডেগ মাস্টারি’। তবে এটা কিন্তু ছিল পরিবারে গৃহিণীর অধিকারের জায়গা। ভাগ্যের পরিহাস, বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের রীতিনীতি বজায় রেখে পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ মজবুত করায় মূল ভূমিকাও আরোপিত থাকে তাঁদের ওপরেই। নিজেদের নিয়ে স্বপ্নের সীমা তাঁদের পরিবারের গ– পেরোতে পারত না। এখনো কতটা পারে জানি না। শাহানারা হোসেনরা ছিলেন কেবল দুবোন। তাঁদের কোনো আপন ভাই ছিল না। বাবা আধুনিক শিক্ষয় শিক্ষিত, উদারমনা। মায়ের আক্ষেপ পূরণের আকাঙ্ক্ষা হয়তো মেয়েদের ভেতর সঞ্চারিত হয়েছিল। তবু অদম্য মনোবল নিয়ে প্রতিকূলতা ঠেলেই তাঁদের এগিয়ে যাওয়া। মেধার উত্তরাধিকার অবশ্য তাঁরা পেয়েছেন নিঃসন্দেহে। অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। অনুপ্রেরণাও। কিন্তু বাস্তবের অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সব মেয়ের সামনে আয়ত্তসম্ভব-উদাহরণ কতটা হতে পারেন, জানি না। এটা ঠিক, রন্ধন-প্রযুক্তি অনেক পালটেছে। যোগাযোগে বিস্ময়কর উন্নতি স্থানের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তবু আমাদের মনোজগৎ এদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলায় না। মেয়েরা একরকম ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’ অবস্থায় থেকে যায়। আর কষ্ট পায়। আমাদের উদাসীনতা এতটুকু কমে না। বরং প্রতিক্রিয়ায় অনেকে আরো বেশি মারমুখো হই।

শাহানারা হোসেনের শৈশব স্মৃতিতে আরো সেঁটে আছে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর। পথে-পথে মানুষের হাহাকার তাঁর কানে এসে বেজেছে। মৃত ও অনশনক্লিষ্ট মুমূর্ষুরা খোলা আকাশের নিচে চোখেও পড়েছে। তিনি লিখছেন, ‘সেই সব দৃশ্য দেখে আমাদের মুখে আর হাসি ফুটত না, আমরা মানসিক ক্লিষ্টতায় ভুগতাম।’ বড় হয়ে জেনেছেন, ‘এই মন্বন্তর ছিল মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ, ইচ্ছে করেই একটা সংকট সৃষ্টি করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার বাংলা ও পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলোর সকল শস্য মজুত করেছিল সেনাবাহিনীর জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সরকার পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করেছিল। সরকারের স্বার্থপর প্রজাপীড়ন ও নির্যাতনের নীতির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল দেশীয় মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সম্প্রদায় …।’ পরে জেনেছি, এইসব নয়। পাছে শত্রম্নরা নদীপথ ব্যবহার করে, তাই সব নৌকো তারা বাজেয়াপ্ত করেছিল। হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষের কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতা পারস্পরিক যোগাযোগে উবে গেল। দুর্ভিক্ষ দ্রম্নত গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। এরই দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়ায় ঢিলেঢালা সরল উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করে। রেশনিং, বণ্টন ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক বহুমুখী সংযোগ, – এগুলো আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। অর্থনীতিতে রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ে। তবে ওই সময়ের মন্বন্তরেই পঞ্চাশ লাখের ওপর মানুষ প্রাণ হারায়। সবই শাসনব্যবস্থায় নির্মম উদাসীনতার কারণে। শাহানারা হোসেনের শৈশব স্মৃতির এই নিষ্করুণ টুকরো আমাদের সংক্ষোভ আবার জাগিয়ে তোলে।

সাতচলিস্নশে দেশভাগের পরিণামে পিতা আবদুল হাফিজ সপরিবারে এ-বাংলায় চলে এসে থিতু হন ঢাকায়। কোনো অনিশ্চয়তা তাঁকে তাড়া করে না। দুই মেয়েকেই স্কুলে ভর্তি করে দেন। শাহানারা পড়েন মুসলিম গার্লস হাইস্কুলে, ও পরে কামরুন্নেসা হাইস্কুলে। স্কুলজীবনের বান্ধবীদের তিনি এ-বইতে আন্তরিক সহমর্মিতায় স্মরণ করেছেন। তাঁর অনুভবের নির্মাল্য ও প্রখর স্মরণশক্তি আমাকে মুগ্ধ করে।

তবে এই পর্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তাঁর বড় বোন হাসনা বেগমের বিয়ে। বিয়ের তারিখ ১৮ মে, ১৯৪৯। পাত্রীর বয়স তখন বোধহয় বছর-চোদ্দ। এমনটি তখন ছিল খুবই স্বাভাবিক। আর পাত্রও সদ্বংশজাত, উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য। তবু শাহানারা হোসেনের এই বিয়ে মেনে নিতে কষ্ট হয়। অকপটে তিনি জানাচ্ছেন, ‘… আপার প্রতি আমার একটা প্রবল অধিকারবোধ ছিল। বিয়ের পরপরই আববা যেভাবে দুলাভাই ও তার আববার হাতে আপার সকল দায়িত্ব সমর্পণ করলেন তা থেকে এ-কথা বুঝতে আমার এক মুহূর্তও দেরি হয়নি যে, এখন থেকে আপার ওপর দুলাভাইয়েরই সর্বাধিকার। তাছাড়া
পিতৃতন্ত্র, পুরুষতন্ত্র এসব শব্দের সঙ্গে তখনো পরিচিত না হলেও নানি, মা, খালা, ফুফু, বিবাহিতা আত্মীয়া এবং আশপাশের অন্য মহিলাদের জীবনধারা দেখে ছোট হলেও এই জ্ঞান আমার হয়েছিল যে, একটি বিবাহিতা মেয়েকে তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করেই আজীবন চলতে হয়।’ শাহানারা তখন নিতান্ত বালিকা। বয়স মাত্র তেরো। তিনি আরো লিখছেন : ‘… বেদনার মেঘে ঢাকা হৃদয়ে আমি সেদিন নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলাম, পরিস্থিতি যাই হোক কোন বিয়ের প্রস্তাবে আমার অভিমত জানতে চাইলে আমি কোনদিনই আপার মত বলবো না, ‘আববা-আম্মার মতই আমার মত’। আমি আরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম পরিণত বয়স না হওয়া পর্যন্ত এবং বিয়ে ও ঘরকন্না করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্ত্ততি গ্রহণ না করে কোনো চাপের মুখেই আমি বিয়েতে সম্মত হব না। …।’ আমরা জানি, তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করার পরই তিনি প্রফেসর এ.বি. এম হোসেনকে বিয়ে করেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় লন্ডনে। এ-বইয়ে তারও রুচিস্নিগ্ধ বিবরণ আছে।

বইটিতে আরো আছে বিয়ের পর সাত বছরের ভেতরেই হাসনা বেগম তিন কন্যার জননী। এছাড়াও ষোলো বছর বয়সে এক শিশুপুত্রের মৃত্যুশোক তিনি সহ্য করেছেন। মেয়েদের যত্ন নিয়ে ঘর-সংসারের কাজকর্ম সামলাতে তাঁর হিমশিম অবস্থা। এমনে এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু যা আমাকে বিস্মিত করে, তা হলো, এইসব দায়িত্ব যথাযথ পালন করে কখন তিনি পড়াশোনায় মন দিতে পারলেন? কেমন করে তিনি বিশ্ববিদ্যা সভায় দর্শনে মুর, রাইল এঁদের ধ্যান-ধারণার বিচার-বিশেস্নষণের পর আপন যুক্তি প্রতিষ্ঠা করে একজন বিশেষজ্ঞের মর্যাদা পেলেন? আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের সর্বজনমান্য অধ্যাপক থেকে নিজের কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটালেন? আমার বিস্ময় আকাশ ছোঁয়। এই বইতে দুই বোনের বেড়ে ওঠার কথা অনেকদূর পর্যন্ত একত্রে পাই। কিন্তু অগ্রজাকে নিয়ে কৌতূহল পুরো মেটে না। অবশ্য এখানে তা মেটানো প্রাসঙ্গিক নয়।

মাধ্যমিক পর্ব পেরিয়ে শাহানারা হোসেন উচ্চ মাধ্যমিকের পাট সারেন ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে। বরাবরই তিনি মনোযোগী ছাত্রী। তবে অংকে দুর্বল। আগ্রহ বেশি সাহিত্যে – দেশি-বিদেশি, দুই-ই। পাঠ তালিকা থেকে বুঝি, তা ছিল সুনির্বাচিত ও ব্যাপক। পারিবারিক আবহ যে অনুকূল ছিল, তাও বোঝা যায়। উদার-মুক্ত মন তাঁর গড়ে ওঠে এভাবে। উচ্চ মাধ্যমিকে দারুণ ভালো ফল করে এবার তিনি পা রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর ইচ্ছে ছিল, পড়বেন ইংরেজি সাহিত্য, কিন্তু বাবার পছন্দ ইতিহাস। ভেবেচিন্তে তিনিও বাবার ইচ্ছাতেই সম্মতি দিলেন। পেছন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, ভুল করেননি। সাহিত্য পাঠের স্বাধীনতা তাঁর অক্ষুণ্ণই থাকে। বাড়তি যোগ হয় ইতিহাসের ব্যাপ্তি ও দূরান্বয়ী দৃষ্টি। বিশ্বাস, কর্মজীবনে তাঁকে কখনো আফসোস করতে হয়নি। এই বইতেও দেখি ভাষার কমনীয়তার সঙ্গে আতিশয্যহীন অনাচ্ছন্নতা। ইতিহাস ও সাহিত্যের সমন্বিত প্রভাব। তার গরিমায় আমরা মুগ্ধ। পূর্ণ ব্যক্তিত্বে তিনি ধরা দেন।

তাঁর দেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো এখানে আঁকা। বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন নেই। যাঁদের কাছে পড়েছেন, যাঁরা সতীর্থ ছিলেন, তাঁদের পরিচয়ও মেলে। যেন একটানা ছবি। এবং সবই তিনি যেমন দেখেন, তেমন। তাতে কোনো কপটতা নেই। মালিন্যও নেই। অস্থিতিশীল দেশের রাজনৈতিক অবস্থা। তার ছাপও পড়ে। তবে তিনি তাতে সক্রিয় নন। যদিও গণজাগরণ ও প্রগতির পক্ষে তাঁর অনুচ্চারিত মনোভাব একেবারে অস্পষ্ট থাকে না। এছাড়া যা চমৎকৃত করে, তা হলো, তাঁর অসাধারণ স্মরণশক্তি। আপন পরিসরে যা ঘটে, যা দেখেন, সবই তিনি মনে রাখেন। কিছুই হারিয়ে যায় না। চেনাজানা কেউ না। সব মিলিয়ে তারা বইটিতে অন্তরঙ্গতার স্বাদ দেয়। মনে হয়, যেন এই তো সেদিন!

পরের কথা তাঁর ‘পাঁচালির শেষ কথা’। লন্ডনে পৌঁছুনো, বিয়ে, পড়াশোনা, ফিরে আসা, দুজনেরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দেওয়া, আবার গিয়ে ছেষট্টি সালে তাঁর ডক্টরেট করে আসা, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, শহীদ-ডক্টর জোহার কথা, মুক্তিসংগ্রাম, আটকেপড়া জীবনের আতঙ্ক, স্বাধীনতা, এ সবের কথা তিনি বলে গেছেন একটানা। অনেকটা প্রামাণ্যচিত্রের মতো। আগের পরিচ্ছেদগুলোর মতো নিচে থেকে বা ভেতর থেকে দেখা নয়। ফলে একটু ভিন্ন রকম লাগে বইকি! তবে এখানে তাঁর বাবার পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পদ থেকে স্বেচ্ছা-অবসরে যাওয়ার যে-কাহিনি তিনি শুনিয়েছেন, তা পড়ে ওই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মহান ব্যক্তিটিকে মনে করে শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াই। কন্যা লিখছেন : ‘পাক-ভারত যুদ্ধ শেষ হবার কিছুদিন পর আববা আমাদের (লন্ডনে) চিঠি লিখে জানান যে, তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন এবং একটি বিদেশি পুস্তক প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি করছেন। অবসর গ্রহণ করার পর তিনি অনেক মুক্তবোধ করছেন। ১৯৬৬ সালে দেশে ফিরে আম্মা ও আপাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করে জানতে পারি যে, Intelligence Branch-এর একজন পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে আববা ১৯৬৫ সালের আগে হতে বুঝেছিলেন যে সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো উত্তাল হতে চলেছে। একজন পুলিশের কর্মকর্তাকে সে ধরনের বিপর্যয় ঘটলে অনেক বিবেকহীন কাজ করতে হবে এবং অসত্য কথা বলে পাকিস্তানি শাসকদের নির্দেশে বাঙালি রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করতে হবে। তিনি একজন বিবেকবান মানুষ ও বাঙালি। উচ্চপদ ও অর্থের প্রলোভনে তিনি তাঁর মানবিক সততা ও বাঙালি সত্তা বিসর্জন দিতে পারেন না। তাই তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছেন।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হোসেন দম্পতি সপরিবারে দেশেই আটকা পড়েছিলেন। প্রফেসর এ.বি. এম হোসেনকে যে একাধিকবার সামরিক বাহিনীর লোকেরা তুলে নিয়ে গিয়ে ভয় দেখায়, আর উপাচার্য প্রফেসর সাজ্জাদ হোসেন জেনেও যে শুধু উদাসীন থাকেন, তাই নয়, এমন ঘটনার জন্যে সবসময় প্রস্ত্তত থাকাই উত্তম, এই বলে শাহানারা হোসেনকে বিদায় করেন, এ-কথার উল্লেখ বইটিতে পাই। পড়ে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

বইটি নিঃসন্দেহে বাংলায় স্মৃতিকথা পর্যায়ে সেরা তালিকার একটি। আরো উল্লেখযোগ্য এখানে নারী লেখকদেরই প্রাধান্য। তাঁরা কি প্রকৃতিগতভাবে বেশি অনুভূতিশীল? অথবা এমনকি হতে পারে, তাঁদের মনে বলার কথা জমে অনেক, যা প্রকাশের সুযোগ তাঁদের হয় না? বাংলা ভাষায় এমন প্রথম বই এবং অন্যতম সেরা, আমার জীবনকথা – লেখক, রাসসুন্দরী দেবী পাবনার পোতাজিয়া গ্রামের এক অখ্যাত মহিলা, যিনি বাড়ির ছেলেদের পড়া শুনে শুনে আর অক্ষর পরিচয় অনুকরণ করে, নিজে লেখা শেখেন। এবং আত্মগোপনে। এখন এ জাতীয় যেসব বই মনে দাগ কাটে তাদের ভেতর অবশ্যই থাকবে হামিদা খানমের ঝরা বকুলের গন্ধ ও অলকনন্দা প্যাটেলের পৃথিবীর পথে হেঁটে। শাহানারা হোসেনের এই বইতে হামিদা খানমের বিনম্র উল্লেখ আছে। এঁরা তিনজনই প্রতিভাময়ী ও উচ্চশিক্ষিত। বিশ্ববিদ্বৎসভায় অতি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় তাঁদের নাম। আরো বলবার, তিনজনেরই বাড়ি এই বাংলায়। তাঁদের স্মৃতিতে রয়ে গেছে কলকাতাও। এঁদের লেখার আলাদা আলাদা আবেদন আমাদের চেতনাকে ঋদ্ধ করে, দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন এঁদের প্রাপ্য।বেলাশেষের পাঁচালিতে সবশেষে আছে ছবির অ্যালবাম। লেখা যেখানে সমাপ্ত, তার পরের পর্বের কিছু নিদর্শন বেশকটি ছবিতে আছে। লেখকের জীবন-সংক্ষেপও তাঁর কৃতি মেলে ধরে। তা সামান্য নয়।

বই: বাংলাদেশের আকাশ; কবিতায় প্রিয় বঙ্গবন্ধু by শিউল মনজুর

শোকাচ্ছন্ন আগস্ট মাস। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের একটি রক্তাক্ত দিন। বাংলাদেশের মহানায়ক শতাব্দীর শ্রেষ্ট বাঙালী শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হাজারো বুলেটের আঘাতে একদল খুনী হত্যা করে। যদিও ভাগ্যগুণে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ওই সময় বিদেশ থাকায় বেঁচে যান। এই মহানায়কের নিকট বাংলাদেশের মানুষ আজীবন ঋণী। তাঁর আহ্বানেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সমগ্র বাঙালী জাতি সশস্ত্র পাকবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নয় মাসের অক্লান্ত সংগ্রামের পর পাক বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে নেয়। অতঃপর বাঙালী জাতির সবচেয়ে প্রিয় স্বাধীন দেশের পতাকা বিশ্বদরবারে উড্ডীন হয়। বিশ্বমানচিত্রে জন্মলাভ করে নতুন দেশ বাংলাদেশ। মুক্ত স্বাধীনতার দেশ বাংলাদেশ। আর এই স্বাধীন দেশের রূপকারই হচ্ছেন আমাদের সকলের মহানায়ক প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। যে কারণে এই মহানায়ককে বাঙালী জাতি নানাভাবে স্মরণ করে। বিশেষ করে কবিতায় গানে চিত্রকলায় এই মহানায়ককে আমরা স্মরণ করি। হৃদয়ের অফুরন্ত ভালবাসায় তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চেষ্টা করি। এ দেশের নবীন প্রবীণ কবি সাহিত্যিকরাও এই মহানব্যক্তিত্বকে তাদের কবিতার ভেতরে দিয়ে তার মুখচ্ছবিকে তাঁর অমূল্য কর্মকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের স্থপতি মুজিবকে স্মরণ করে বা তাঁকে কেন্দ্র করে বহু রচনা বা সাহিত্য লেখকরা উপহার দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বেরিয়েছে প্রবন্ধের বই, গল্প ও উপন্যাসের বই। তবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বেরিয়েছে সম্পাদিত কবিতার বই। আর কোন রাজনৈতিক নেতাকে কেন্দ্র করে এত কবিতা আমার মনে হয় লেখা হয়নি। এসব সম্পাদিত বইগুলোতে শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণসহ দেশের খ্যাতিমান কবিরা তাঁকে নিয়ে স্মরণীয় পঙ্্ক্তি রচনা করেছেন। এসব পঙ্্ক্তি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পাঠককে আবেগাপ্লুত করে। মনে হয় যেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মাঝে আজও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জেগে আছেন। এই মহানব্যক্তিত্বকে নিয়ে প্রবাস থেকেও বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য কবিতার সঙ্কলন কবি কাজল রশীদ সম্পাদিত বাংলাদেশের আকাশ। এই গ্রন্থে দেশে ও প্রবাসে অবস্থানরত অসংখ্য কবিরা জাতির জনককে শ্রদ্ধায় ভালবাসায় কবিতার মধ্য দিয়ে স্মরণ করেছেন। লন্ডনের প্রবাস প্রকাশনীর এই সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত বেশকিছু কবিতা মনে রাখার মতো। গ্রন্থটির ছাপা বাঁধাই অত্যন্ত উন্নতমানের। বইটি থেকে দেশের সুপরিচিত কয়েকজন কবির কবিতার অংশ বিশেষ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :

----এক.-----

এ মাটির সোঁদা গন্ধে

বাতাসের উদ্দাম বেগে

নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে

আপনি তো কোন পৃথক সত্তা নন; আমাদের সকলের

প্রাণের গভীরে অবিরাম ধ্বনিত একটি নাম- শেখ মুজিব।

(দশ বছর পর- সোহরাব হাসান, পৃষ্ঠা-১২৩)

----দুই.-----

পিতা নয়; পুত্র হিসেবে তোমাকে চাই-

যেন পুত্র হিসেবে পাই।

আমাদের বিসন্ন ব্যর্থতাগুলো, ঘৃণিত গ্লানিগুলো

শোকার্ত শূন্যতাগুলো মুছে দিয়ে-

অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো

আলোকিত করবে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।

(স্থলাভিষিক্ত-সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, পৃষ্ঠা-১১৩)

----তিন.-----

প্রতিবার ঝড়ের শেষে ভাঙ্গনের পর একটি সূর্য ওঠে

রক্তের সাগর উথাল পাতাল, দাঁড়ায় একটি সূর্য

আঁধার আচ্ছন্ন কাল থেকে নিশিলাগা কাল থেকে

একটি সূর্য দাঁড়ায় এসে আমাদের শিয়রের পাশে

বত্রিশের সিঁড়িতে এক সাগর রক্তের মাঝে ফুটে ওঠে এক সূর্য

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, আলো দিয়ে যায় সে সূর্য।

(একটি সূর্যের গল্প-রবীন্দ্র গোপ, পৃষ্ঠা-৯৬)

-----চার.----

যেহেতু তিনি হিমালয়ের চেয়েও উঁচু ছিলেন

তাই দুর্বৃত্তরা কিছুতেই তার নাগাল না পেয়ে

তারা পিঁপড়ের ঢিবির চেয়েও অতি খাটো রয়ে গেল।

(যেহেতু তিনি খুব বড় ধরনের মানুষ ছিলেন- রবিউল হুসাইন, পৃষ্ঠা-৯৫)

-----পাঁচ.-----

হঠাৎ জানতে চাইলেম

‘খোকা’

লোকটির বসবাস

এখন কোথায়!

প্রথম জন

দ্বিতীয় জন

শেষ জন

এক বাক্যে উচ্চারণ করলেন,

লোকটির বসবাস

বাঙালীর হৃদপুরে।

(হৃদপুরে-মাকিদ হায়দার, পৃষ্ঠা-৭৫)

এই সব কবিতার ভেতর দিয়ে মনে হয় যেন আমাদের প্রিয়নেতা বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান যেন জীবন্ত, আমাদের সম্মুখে দ-ায়মান। কবিরা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী পঙ্্ক্তির ছোঁয়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনালি মুখ অঙ্কন করেছেন, এক একটি কবিতা যেন এক একজন বঙ্গবন্ধু। তাই ঘাতকরা তাঁর প্রাণ কেড়ে নিলেও তিনি বাংলার ঘরে ঘরে তুমুল সজীবতা নিয়েই আমাদের মাঝে জেগে আছেন। কবি কাজল রশীদ সম্পাদিত বাংলাদেশের আকাশ শিরোনামের এই মূল্যবান গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর মুখকে সোনালি অক্ষরে চিত্রিত করেছেন আরও অসংখ্য কবি। তাদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চোধুরী, নাসির আহমেদ, মাহমুদ কামাল, কামাল চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, অসীম সাহা, আনোয়ারা সৈয়দ হক, আসলাম সানী, তপন বাগচী, তিতাশ চৌধুরী, ইকবাল আজিজ, ইকবাল হাসান, আতাউর রহমান মিলাদ, হালিম আজাদ, শিহাব শাহরিয়ার, শামীম রেজা, আনজীর লিটন, শিউল মনজুর, মুজিব মেহদী, মাহবুব বারী, গোলাম কিবরিয়া পিনু প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থের চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিহাব শাহরিয়ার। এক কথায় বাংলাদেশের আকাশ ও প্রিয় বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে এক হয়ে আছেন। বইটি হৃদয়ে হৃদয়ে পৌঁছে দেবে জাতির জনকের অমূল্য স্মৃতি। ধন্যবাদ প্রবাস প্রকাশনীকে।