Sunday, December 18, 2022

কোমর ব্যথা হলেই কিডনির সমস্যা নয়! by ডাঃ এম. ইয়াছিন আলী

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে ভীতি আছে কোমরে ব্যথা হচ্ছে ভাবছেন কিডনির কারণে হচ্ছে না তো? হ্যাঁ কিডনিতে পাথর বা কিডনির সমস্যা হলেও কোমর ব্যথা হতে পারে কিন্তু এর সংখ্যা খুবই কম তবে কোমর ব্যথার অনেক কারণের মধ্যে এটিও একটি। তাছাড়াও বিভিন্ন কারণে কোমর ব্যথা হতে পারে। যেমন-

ম্যাকানিক্যাল ব্যাকপেইন বা পশ্চারজনিত কোমর ব্যথা : এই পশ্চারজনিত কোমর ব্যথা বা মেকানিক্যাল ব্যাকপেইনে ৮০ শতাংশ মানুষ ভুগে থাকে যারা একাধারে দীর্ঘক্ষণ বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করে তাদের এই ধরনের সমস্যা বেশি দেখা দেয়। যেমন- মাসল-স্পাজম বা মাংসপেশির সংকোচন, মাংসপেশির দুর্বলতা ইত্যাদি।

লাম্বার স্পনডাইলোসিস : এটি মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলোর ক্ষয়জনিত রোগ এখানে মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলো ক্ষয় হয়ে দুইটি কশেরুকার মধ্যবর্তী স্থানের ফাঁকা স্পেস কমে যায়। পাশাপাশি কশেরুকাগুলোর সঙ্গে ছোট ছোট নতুন হাড়ের সৃষ্টি হয়, যাকে অস্টিওফাইট বলে, স্পাইনাল নার্ভগুলোর ওপর চাপ দেয় যার ফলে কোমরে ব্যথা অনুভ‚ত হয়।

লাম্বার স্পনডাইলোলিসথেসিস : আমাদের মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলো একটি নির্দিষ্ট এলাইনমেন্ট বা অবস্থানে থাকে যখন কোনো কারণে এই কশেরুকাগুলোর এক বা একাধিক কশেরুকা তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে যায় তখন এই সমস্যাটিকে লাম্বার স্পনডাইলোলিসথেসিস লা হয়, এর ফলে কোমরে ব্যথা অনুভ‚ত হয় ।

এনকাইলোজিং স্পনডাইলাইটিস : এটি একটি মেরুদণ্ডের বাত রোগ এর ফলে মেরুদণ্ডটির স্বাভাবিক বক্রতা নষ্ট হয়ে সোজা হয়ে যায় পাশাপাশি একটি কশেরুকা অন্যটির সঙ্গে ফিউজড বা জমাট বেঁধে যায় যার ফলে রোগীর মেরুদণ্ডের মুভমেন্ট বা নড়াচড়া কমে যায় যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘাড় ও কোমরের রেঞ্জ অব মোশন বা মুভমেন্ট কমে যায়।

পিএলআইডি বা ডিস্ক-প্রলেপস : আমাদের মেরুদণ্ডের গঠন অনুযায়ী প্রত্যেকটি কশেরুকার মধ্যবর্তী স্থানে পেশির ন্যায় সেমি এলিড এক ধরনের পদার্থ থাকে সেটিকে মেডিকেল পরিভাষায় ডিস্ক বলে। এটির মাঝখান থেকে স্পাইনাল নার্ভগুলো বের হয়ে রুট অনুযায়ী হাত ও পায়ের দিকে যায় যখন এই ডিস্ক তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে যায় তখন এটিকে ডিস্ক প্রলেপস বলে। এই ডিস্ক সরে গিয়ে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ পড়ে তখন ব্যথা অনুভ‚ত হয়।

অস্টিও পোরোসিস বা হাড়ের ভঙ্গুরতাজনিত কোমর ব্যথা : এটি হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেমন আমাদের চুল পেকে যায় তেমনি হাড়ের ভেতরের উপাদানগুলো কমে যায়, যার ফলে বোন মিনারেল ডেনসিটি কমে যায় তখন হাড়গুলো ভঙ্গুর হতে থাকে। কোমরের মেরুদণ্ডের হাড়গুলো যখন অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হয় তখন কোমর ব্যথা অনুভ‚ত হয়।

স্পাইনাল টিউমার বা ক্যান্সার : আমাদের মেরুদণ্ডের লাম্বার স্পাইনে বা কোমরের অংশে যদি টিউমার, টিউবার কোলোসিস বা টিবি অথবা ক্যান্সার হয় সে ক্ষেত্রেও কোমর ব্যথা হতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো বেশিরভাগ কোমর ব্যথার কারণগুলোর উপসর্গ প্রায়ই একই। যার কারণে কোমর ব্যথা হলে অবহেলা না করে দ্রæত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কোমর ব্যথার সঠিক কারণটি নির্ণয় করে চিকিৎসা নিন কোমর ব্যথা মুক্ত জীবনযাপন করুন।

>>>লেখক- ডাঃ এম. ইয়াছিন আলী: কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয়প্রধান, ফিজিওথেরাপি বিভাগ প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চিফ-কনসালট্যান্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, ধানমণ্ডি, ঢাকা। মোবাঃ ০১৭৮৭-১০৬৭০২

Sunday, November 27, 2022

ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা: মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার পর্যালোচনা by অধ্যাপক গ্রায়েম ম্যাককুইন

সন্ত্রাসীয় জ্বলছে মুম্বাইয়ের তাজমহল হোটেল
বর্তমান সময়ে আমরা মিডিয়ায় একটি কাহিনী থেকে আরেকটিতে ছুটি, সর্বশেষ সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে অবগত থাকার চেষ্টা করি। গতকাল প্যারিসে, আজ লন্ডনে, আগামী কাল কোথায়? কে জানে? ধর্মীয় চরমপন্থীরা যখন আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বোকা বানিয়ে হামলা চালায়, তখন তা হয় বেশ মর্মান্তিক ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে এসব ঘটনার অনেকগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষবাবে আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আয়োজনে করা হয়ে থাকে। এসব ঘটনা কেবল মানুষের দুর্ভোগই বাড়ায় না, সেইসাথে তা নাগরিক সমাজ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথেও প্রতারণা। তারা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থার হাতেই প্রতারিত হচ্ছে, ভীতির শিকর হচ্ছে, শাস্তি পাচ্ছে, এমনকি তাদের ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে চলা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যা হচ্ছে, তা আসলে এ ধরনেরই জালিয়াতি।
কিন্তু যেসব সংস্থার হামলা তদন্ত ও প্রতিরোধের দায়িত্বে ছিল, তারাই যদি হামলায় অংশ নিয়ে থাকে, তবে নাগরিক সমাজ কিভাবে নিজেদের রক্ষা করবে? তারা কি প্রমাণ সংগ্রহ করে আসলেই কারা হামলা চালিয়েছিল, তা নির্ধারণে এগিয়ে আসবে? বছরের পরিক্রমায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকেরা বিভিন্ন ধরনের গ্রুপ গঠন করে তথ্য বিনিময়ের জন্য নাগরিক তদন্তের ধারা সৃষ্টি করছে।
এ ধরনের এক তদন্তকারী হলেন ইলিয়াস ডেভিনসসন। তার ‘হাইজাকিং আমেরিকারস মাইন্ড অন ৯/১১’ কিংবা আরো সাম্প্রতিক লেখা ‘সাইকোলজিচে ক্রিয়েজসফুহহাঙ আন্ড জেগেসলচটলিচে লেগনাঙ’-এর সাথে অনেক পাঠক পরিচিত। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলা নিয়ে সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ করেছেন। ‘দি বিট্রেয়াল অব ইন্ডিয়া: রিভিজিটিং দি ২৬/১১ ইভিডেন্স’ নামের বইটি প্রকাশিত হয়েছে নয়া দিল্লি থেকে।
ওই হামলা নিয়ে ভারত সরকার যে ভাষ্য দিয়েছে, তা পাঠ করার পর আর উইকিপিডিয়া না পড়লেও চলে। সরকারি গোয়েন্দাদের ভাষ্যের বাইরে তো তারা যায় না। তাতে বলা হয়েছে: ওই হামলাটি হয়েছিলো ২০০৮ সালের নভেম্বরে। পাকিস্তানভিত্তিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার ১০ সদস্য ১২টি সমন্বিত হামলা চালিয়েছিল। মুম্বাইয়ে তাদের ওই হামলার স্থায়িত্ব হয়েছিল চার দিন। এতে ১৬৪ জন নিহত ও অন্তত ৩০৮ জন আহত হয়েছিল।
এই ভাষ্য অবশ্যই ত্রুটিপূর্ণ। ঘটনাটিকে ভারতের ৯/১১-এর মতো ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করার জন্যই এ ধরনের ভাষ্য প্রদান করা হয়েছিল। আমরা জানি, ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ। যখন এ ধরনের কাজ পাকিস্তান সমর্থন করে বলে অভিযোগ করা হয়, তখন আমাদের বুঝতে হবে এ ধরনের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার দেড় শ’ কোটি মানুষের ওপর কত বড় বিপদ ঝুলছে।
এ ধরনের ভাষ্যের ভিত্তি যে কত সহজ, সেটাও আমরা বুঝতে পারব যদি মুম্বাই পুলিশের তহবিল ও সরঞ্জামে মচ্ছব (৭৩৫-৭৩৬) শুরু হয়ে যায় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে যুদ্ধের জন্য সমরিক ব্যয় ২১ শতাংশ বাড়তে থাকে।
উইকিপিডিয়ার অনুচ্ছেদে সোজাসাপ্টা কাহিনী বলছে। তবে সোজাসাপ্টা কথায় অনেক কিছুই কাটছাঁট করা হয়। পাকিস্তান ও লস্কর-ই-তৈয়বা উভয়েই হামলার দায়িত্ব অস্বীকার করেছে। ডেভিডসসন জানিয়েছেন, তাদের অস্বীকার করার পেছনে যুক্তি রয়েছে।
বইয়ের শেষভাগে ডেভিডসসন সত্যিকারের হামলা এবং হামলা সম্পর্কে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান নিয়ে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে আমাদের উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, খুবই সম্ভব যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভবত ইসরাইলের প্রধান প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক কুশীলবেরা ২৬/১১ হামলার পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিচালনা ও সম্পাদনের কাজটি করেছে।
তবে তদন্তকাজে প্রতারণা সম্পর্কে আরো জোরালো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেছেন। তিনি তার বইতে দেখিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার, পার্লামেন্ট, আমলাতন্ত্র, সশস্ত্র বাহিনী, মুম্বাই পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ ও মিডিয়া পরিকল্পিতভাবে ২৬/১১ সম্পর্কিত সত্য চাপা দিয়েছে এবং এখনো তা করে যাচ্ছে। ওই ভয়াবহ ঘটনা সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ উপস্থাপন করতে উল্লেখিত পক্ষগুলোর কোনো ইচ্ছাই দেখা যায়নি।
এ বিষয়টিই নাগরিক সমাজের তদন্তকারীদের জন্য খুবই কার্যকর। প্রমাণ গোপন করার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার কারণ রয়েছে দুটি। প্রথমত অপরাধ ধামাচাপা দেওয়াটাও অপরাধ। যেসব কুশীলবের কথা বলা হয়েছে, তারা অপরাধটির সাথে জড়িত না থাকলে অন্তত তদন্ত চালানোর চেষ্টা করত। কিন্তু তারা তা করেইনি।
এখন তদন্ত নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। প্রমাণ ধামাচাপা দেওয়ার কয়েকটি প্রমাণের কথা উল্লেখ করা যাক
১.  অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণ
পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আগেই যখন কর্মকর্তারা অপরাধী ব্যক্তি বা গ্রুপ সম্পর্কে দাবি করেন, তখনই বোঝা যায়, ভুয়া একটি ধারণা দেওয়ার প্রয়াস চলছে এবং জনগণের মধ্যে তা গেঁথে দিতে সঙ্ঘবদ্ধ প্রয়াস চলবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লি হার্ভে অসওয়াল্ডকেই নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের দিন বিকেলের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে হত্যার জন্য একমাত্র দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেন। অথচ তখন তেমন কোনো তদন্তই হয়নি, তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণও উপস্থিত করা হয়নি। একই ঘটনা দেখা যায় ২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাতেও। ওসামা বিন লাদেন ও তার গ্রুপকেও প্রমাণ ছাড়াই নাইন ইলেভেনের জন্য দায়ী করা হয়।
মুম্বাই ঘটনায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের দিকে আঙুল তাক করেছিলেন।
একইভাবে হামলার পর হেনরি কিসিঞ্জারও পাকিস্তানকে সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টা করেন। মুম্বাইয়ের প্রধান হামলাটি হয় তাজ হোটেলে। হামলার তিন দিন আগে ওই হোটেলেই ছিলেন কিসিঞ্জার। তিনি আমেরিকান রাজনীতি নিয়ে গোল্ডম্যান স্যাচস ও ভারতীয় টাটা গ্রুপের কর্মকর্তাদের সাথে সেখানে কথাবার্তা বলেন। ভারতীয় এলিটদের সাথে (টাটা পরিবার ভারতের সবচেয়ে ধনী এবং টাটা গ্রুপ হলো তাজের মালিক) কিসিঞ্জারের খোশগল্প প্রশ্নের জন্ম দেয়। অধিকন্তু পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে তার বক্তব্য প্রদানেও সন্দেহ জাগে।
২.  সরকারি তদন্তকারীদের প্রমাণ নষ্ট করা
পরিকল্পিতভাবে প্রমাণ নষ্ট করার প্রমাণ রয়েছে। ডেভিডসসন দেখিয়েছেন, কর্মকর্তারা কত তাড়াহুড়া করেছেন।
  • *পুলিশ, বিচারক- কেউই একমাত্র বেঁচে যাওয়া সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করেননি।
  • *প্রধান সাক্ষীদের স্বাক্ষী দিতে ডাকা হয়নি। যারা সন্ত্রাসীকাজ চালাতে দেখেছে, তাদের সাথে কথা বলেছে কিংবা একই কক্ষে ঘুমিয়েছে, তাদের সবাইকে আদালত অগ্রাহ্য করেছে।
  • *পরস্পরবিরোধী ও কাকতালীয় ঘটনাগুলো আলাদা করা হয়নি। পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় মৃত ঘোষিত একজন প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন। আবার দ্বিতীয় এক লোক দুই জায়গায় মারা গিয়েছিলেন। আবার এক লোক তো মারা গেলেন তিন জায়গা। কেন এমন হলো, তা কেউ খতিয়ে দেখেনি।
  • *প্রত্যক্ষদর্শীরা সন্ত্রাসীদের পোশাক ও গায়ের রঙ সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছেন।
  • *এক সাক্ষী তো বলেই ফেলেছেন, তিনি সন্ত্রাসী ও ‘বন্ধুদের’ মধ্যে পার্থক্য করতে পারেননি।
  • *কতজন সন্ত্রাসী এতে অংশ নিয়েছিল, তা নিয়ে একেকবার একেক রকম তথ্য দেওয়া হয়।
  • *ঘটনাস্থলের দৃশ্যপট পরিবর্তন করা হয়। পরীক্ষা করার আগেই লাশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
  • *সন্ত্রাসীরা একে-৪৭এস ব্যবহার করেছিল বলে বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু কামা হাসপাতাল একটি একে-৪৭ বুলেট উপস্থাপন করতে পারেনি।
  • *ক্যাফে লিওপোল্ড, তাজমহল প্যালেস হোটেল, ওবেরিও ট্রাইডেন্ট হোটেল বা নরিম্যান হাউসের শত শত সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু তাদের একজনও আট অভিযুক্তের কাউকে হত্যা করতে দেখেননি।
  • *নরিম্যান হাউস নামের ইহুদি কেন্দ্রে নিহতদের লাশের ময়না তদন্ত করতে অস্বীকার করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এখানে নিহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই ইসরাইলি নাগরিক। বলা হচ্ছে, ইহুদি ধর্মে ময়না তদন্তের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা থাকায় তা করা হয়নি।
৩.  জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে হামলা সম্পর্কে মৌলিক তথ্য জনসাধারণকে জানানো হয়নি।
  • * বেঁচে যাওয়া সন্ত্রাসীর প্রকাশ্যে বিচার হয়নি।
  • * তার গোপন বিচারের ভাষ্য প্রকাশ করা হয়নি।
  • * আসামির পক্ষে কাজ করতে আগ্রহী এক আইনজীবীকে আদালত খারিজ করে দেয়, অপরজন গুপ্তহত্যার শিকার হন।
  • * জনসাধারণকে বলা হয়, হামলা সম্পর্কে বিপুল সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। কিন্তু শুনানির দিন সিসিটিভি ফুটেজের বেশির ভাগই অকেজো বলে বলা হয়।
  • * আট সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অভিযানে নামা ৪৭৫ থেকে ৮০০ কমান্ডোর একজনকেও আদালতে সাক্ষী দিতে তলব করা হয়নি।
  • * সন্দেহভাজনের ‘স্বীকারোক্তি’ প্রকাশ করা হয়নি। তা গোপনই রাখা হয়েছে।
ডেভিডসসন দেখিয়েছেন, ওই হামলার ফলে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য আর্থিক বরাদ্দ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ভারত সন্ত্রাসী হামলার হুমকিতে- এমন আশঙ্কা সৃষ্টি করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। হামলার ব্যাপারে এফবিআই বেশ আগ্রহ দেখায়। এই সংস্থাকে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ইসরাইল লাভবান হয় ব্যাপকভাবে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখন ভারত।
তাহলে ডেভিডসনের বই থেকে আমরা কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি? ৯০০ পৃষ্ঠার বইটিতে ধৈর্যশীল পাঠক কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য সহজেই ধরতে পারবে। যাদের পুরোটা ধৈর্য ধরে পাঠ করার অভ্যাস নেই, তাদের জন্য সংক্ষিপ্তসারের ব্যবস্থা করা রয়েছে।
এসব কারণে বইটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
লেখকঃ ড. গ্রায়েম ম্যাককুইন কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের সাবেক পরিচালক। তিনি টরোন্টো হেয়ারিংস অন ৯/১১-এর একজন সংগঠক, কনসেনসাস ৯/১১ প্যানেলের একজন সদস্য।

Friday, November 11, 2022

শীতে মাথার ত্বকে খুশকির প্রকোপ বেড়ে গেলে by ডা. এস এম বখতিয়ার কামাল

দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন কারণে মাথার ত্বকে খুশকি হওয়া একটি স্বাভাবিক ব্যাপার মাত্র। কিন্তু দেখা যায় শীতকালে অনেকেরই মাথার ত্বকে খুশকির প্রকোপ বেড়ে  যায়। এমনটি হলে বেশি চিন্তা না করে একটু বাড়তি যত্ন নিলে চুল ঝলমলে ও ভালো থাকবে। শীতে খুশকির কারণে মাথায়  ত্বকে প্রচণ্ড চুলকানি, চুল রুগ্‌ণ ও ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যায়। আবার চুলপড়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। মনে রাখতে হবে খুশকি জটিল কোনো রোগ নয়, আবার ছোঁয়াছে রোগও নয়। খুশকি হলে তার ধরন নির্ণয় করে চিকিৎসা করা হলে, তা থেকে সহজেই পরিত্রাণ পাওয়া যায়। মাথার ত্বক ভালো রাখতে প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি খেতে হবে ও ফলমূল খেতে হবে। প্রতিদিন প্রচুর পানি পান করতে হবে। কোষ্ঠ্যকাঠিন্য থাকলে নরম খাবার খেতে হবে।


শীতে ত্বক ও চুলের পরিচর্যা যেভাবে

চুল খুশকিমুক্ত রাখার অন্যতম উপায় হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।

চুল অপরিষ্কার থাকলে খুশকি বেশি হয়। ভেজা অবস্থায় চুল বেঁধে রাখা যাবে না। চুল ভালো করে মুছে নিতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে নিতে হবে। চিরুনিটাও পরিষ্কার রাখতে হবে এবং নিজস্ব চিরুনি ব্যবহার করতে হবে।  যাদের খুশকি বেশি হয়, তারা প্রতিদিন চুলে পরিমিত শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন। বাইরে বের হলে ধুলাবালি রোধে মাথায় স্কার্ফ বা ওড়না ব্যবহার করতে পারেন। অন্যের চিরুনি ব্যবহার করবেন না। তাতে আপনার মাথাতেও খুশকি সংক্রমিত হতে পারে। খুশকির জন্য দায়ী ছত্রাকগুলোর প্রক্রিয়া কমিয়ে দিতে বেকিং সোডাও ভালো কার্যকর। এতে শুরুতে চুলে একটু শুষ্ক ভাব দেখা দিতে পারে। তবে ধীরে ধীরে চুল আবার আর্দ্রতা ফিরে পাবে।  শীতে চুলের সমস্যা পরিত্রাণে সপ্তাহে অন্তত দুইবার নারকেলের তেল হালকা গরম করে চুলে ম্যাসাজ করে নিতে হবে। এরপর চুলে শ্যাম্পু লাগিয়ে মাথা পরিষ্কার করে নিতে হবে। তাহলে চুলের খুশকি দূর হবে। * যাদের ত্বক শুষ্ক, তাদের নিয়মিত অ্যান্টিড্যানড্রাফ শ্যাম্পু এবং কন্ডিশনার ব্যবহার করা উচিত।

চুলের ধরন অনুযায়ী কিছু ঘরোয়া যত্ন-আত্তি

তৈলাক্ত চুলের পরিচর্যা সাধারণভাবে তৈলাক্ত চুলে ধুলাবালি ও ময়লা বেশি  আটকায় বা পড়ে। এ ধরনের তৈলাক্ত চুলে শ্যাম্পু প্রায় প্রতিদিনই করতে হয়। শীতের সময় শ্যাম্পু করলেও তৈলাক্ত চুল নির্জীব দেখায়। শ্যাম্পুর সঙ্গে সামান্য বেকিং পাউডার মিশিয়ে ব্যবহার করলে চুল দেখাবে সজীব।  প্রয়োজনে মেডিকেটেড পদ্ধতির চেয়ে ঘরোয়া কিছু পদ্ধতি এ ধরনের তৈলাক্ত ত্বক ও চুলকে ঝলমরে করে থাকে। যেমন- শুকনো রিঠা, শিকাকাই ও আমলকি সারা রাত ভিজিয়ে পরদিন ফুটিয়ে ছেঁকে নিন। তরল মিশ্রণটি শ্যাম্পুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।  

শুষ্ক চুলের যত্ন

চুলের উজ্জ্বল ও মসৃণ ভাব ফিরিয়ে আনতে আধা মগ পানিতে লেবুর রস ও চায়ের লিকার মিশিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত করলে চুলের উজ্জ্বলতা ও মসৃণতা ফিরে আসবে।  

স্বাভাবিক চুলের যত্ন

সব ধরনের চুলের মধ্যে সবচেয়ে ঝামেলামুক্ত চুল হলো স্বাভাবিক চুল। এ ধরনের চুলের জন্য স্বাভাবিক পরিচর্যাই ভালো। হট অয়েল ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে সপ্তাহে দুই দিন। নিয়মিত চুল পরিষ্কার রাখাটা খুব জরুরি। ন্যাচারাল কন্ডিশনিংয়ের জন্য চুলে তেল দিলেই যথেষ্ট। দিনে কয়েকবার মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে পারলে ভালো। তাহলে চুলে যেমন জট হবে না, তেমনি মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালনও ভালো থাকবে। শীতে চুলে রং করা বা স্ট্রেট বা স্মুদিং করবেন না। এর ফলে, খুশকি ও চুল পড়ার সমস্যাতে ভুগতে পারেন।

কেমিক্যাল ব্যবহার না করাই ভালো

চুলের নানা জটিলতা বা সমস্যা হলে পরিত্রাণ পেতে অনেকেই বিউটি পার্লার থেকে কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করে থাকেন। যা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে কেমিক্যাল ট্রিটমেন্টে চুলের ক্ষণিকের সৌন্দর্য বাড়লেও, তা স্থায়ী হয় না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক (সাবেক) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগ বিভাগ)। চেম্বার- কামাল হেয়ার অ্যান্ড স্কিন সেন্টার ফার্মগেট, গ্রিন রোড, ঢাকা। সেল- ০১৭১১৪৪০৫৫।


Friday, October 21, 2022

শওকত আলীর গল্পে স্বপ্ন ও আকাঙক্ষার জীবনবেদ by সুশান্ত মজুমদার

সৃষ্টির বিচারে কথাসাহিত্যে শওকত আলীর নান্দনিক অর্জন ও প্রভাব উপেক্ষা করা অসম্ভব। বিষয়নিষ্ঠা ও জীবনমুখী প্রবাহ বিবেচনা করলে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে তাঁর শিল্পসিদ্ধির সফল সত্মর। অসাড়, পানসে, প্রচল, বহুল পঠনে নিষ্ফলা গল্পের বিপরীতে সমাজবাসত্মবতার গল্প যাঁরা প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাঁদের অন্যতম শওকত আলী। দেশভাগের পর খ–ত, ভেদবুদ্ধির গুণাতীত গল্পের অক্ষরকলা মোকাবেলা করার প্রয়াসে তাঁর শ্রম নিবিড় ও উজ্জ্বল। এই ভূখ– স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের যে-কথাসাহিত্য, বিশেষত গল্পের ধারা যাঁদের নিরলস অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, তাঁদের অন্যতম তিনি। বানোয়াট কেচ্ছা, মধ্যবিত্তের বিবর্ণ উপাখ্যান পত্তন অস্বীকার করে গল্পে তিনি ধারণ করেছেন মানুষ, সংগ্রাম এবং লড়াকু মানুষেরই প্রবল স্বপ্ন ও আকাঙক্ষা।

কর্মজীবনের কারণে রাজধানীতে বসবাস, তবু শওকত আলীর গল্প ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে সক্রিয় লেখালেখি শুরু করলেও ষাটের দশকে এসে তাঁর সাহিত্যের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা। আমাদের গল্প-সাহিত্যের পালে লেগেছে তখন উপযুক্ত বাতাস। বহুসত্মরা পর্যাপ্ত অর্থ সন্ধানের অভিপ্রায়ে লেখকরা প্রবেশ করেন জীবনের অমত্মর্লীন জগতে। নতুন সাহিত্যাদর্শের নামে লেখকদের অনেকে গল্পের আঙ্গিক বা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সচেষ্ট হন। নিজস্ব চর্চায় আস্থা রেখে জীবনবাদী গল্প-সাহিত্যে ভাষা-ভাবনা-মাত্রাযোগে শওকত আলী মনোনিবেশ করেন।

মেহনতি কিষান – যাঁদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই – এই তাঁরা শ্রমে, প্রাপ্তিতে প্রচ- মার-খাওয়া, বঞ্চিত; এই মানুষ মাটি আবাদ করে ফসল ফলায়, ফসল লালন করে; কিন্তু ফসল তুলে দিয়ে আসে মহাজনের গোলায়। চামড়া ফাটানো, হাড়-ছেঁদা তুমুল শীতের রাতে কিষানের মহাজনের ফসলও পাহারা দিতে হয়, বিনিময়ে সে হারায় স্বাস্থ্য, আয়ু ও সুখ। উত্তর বাংলার কিষানদের বিসত্মারিত জীবন নিয়ে এত গল্প শওকত আলীর মতো কোনো কথাশিল্পীই লেখেননি। উত্তরের জনগোষ্ঠী তাদের প্রাত্যহিক জীবন-সংসারের চালচিত্র জল-হাওয়া  কথাসাহিত্যে রূপ দেওয়া এবং তা ব্যাপক পাঠক সমীপে উপস্থিত করার সিংহভাগ কৃতিত্ব শওকত আলীর প্রাপ্য। হাড্ডিসার, হাঁটুভাঙা মানুষ নিয়ে তাঁর কারবার অথচ তাঁর গল্পের মানুষ জীবন-জীবিকায় উপর্যুপরি মার খেতে খেতে বুক দিয়ে হেঁটে হলেও দাঁড়াতে প্রয়াস নেয় – পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। রুখে-দাঁড়ানো মানুষের স্বভাবের অমত্মর্গত – জেগে ওঠা সেই দ্রোহী মানুষ সংঘবদ্ধ হয় এবং মহাজনের ঘরে আগুন দিয়ে নিপীড়কের বিনাশ ঘটায়। কেবল ব্যর্থতার কাহিনি রচনা করে শওকত আলী জীবনকে নঞর্থক করে তোলেননি, জীবনে জীবন যোগ করে মানুষের সংগ্রামী রূপও গল্পে পেশ করেন। জীবন যে হারিয়ে ফুরিয়ে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়নি, এখনো তার অবশিষ্ট আছে এবং সমুদয় প্রাপ্য আদায় সম্ভব সমষ্টির ঐক্যবদ্ধে তাই তাঁর গল্পের মর্মার্থ। শেষাবধি ইতিবাচক জীবনের গাথাই শওকত আলীর গল্পের উদ্দিষ্ট।

দেশভাগ-পরবর্তীকালের ছোটগল্পে সমাজের অসাম্য, অনাচার ও দুষ্টমতী মানুষের পাপাচার নিয়ে দুর্নীতির চিত্র থাকলেও তা কেবল অচঞ্চল স্থিরচিত্রই হয়ে থাকে। মানুষকে চলিষ্ণু মনে হয় না। শওকত আলীর গ্রাম ও চরিত্র পাঠকের পাশে যাতায়াত করে এবং মানুষের মর্যাদা দাবি করে। এমনকি শওকত আলীর গল্পের প্রকৃতিও জীবমত্ম। আবার প্রকৃতি শত্রম্নতাও করে। যে-জনপদের মানুষের জীবন তাঁর গল্পের বিষয় অনুরূপ নির্দয় প্রকৃতির সাক্ষাৎই আমরা পাই। প্রকৃতি মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ গল্পের পরিপ্রেক্ষিতের অনুগামী হয়েছে প্রকৃতি। গল্পের সঙ্গে প্রকৃতি একাকার হয়ে থাকে। গল্পে শওকত আলী প্রকৃতিকে চাপিয়ে দেননি বা কোথাও থেকে তুলে এনে পরিপূরণ করেননি। প্রকৃতি থেকে মানুষ যেন বেরিয়ে আসে – উত্তরবাংলার আদিজগতের মতো গল্পের মানুষ রুক্ষ, রোদে পোড়া, শীতজর্জর, বৃষ্টিতে ভিজে অবসন্ন। তাঁর গল্পের মানুষ ও প্রকৃতিকে ছিঁড়ে তাই আলাদা করা যায় না। মানবজীবন ও প্রকৃতি অবিচ্ছিন্ন। কখনো কখনো সরাসরি না হলেও গল্পের পশ্চাৎপটে নৈসর্গিক উপাদানের প্রতীকী উপস্থাপনা উপস্থিত। এখানে বলার আছে যে, শওকত আলী মধ্যবিত্তের রুচি ও লাবণ্য, প্রীতিদায়ক আগ্রহ ও আসক্তি, শিহরণ-জাগানো অনুভূতির আধিক্য পরিবেশন করে পাঠককে পুলকিত করতে চাননি। তাঁর লেখক-মানসে মধ্যবিত্তের জীবনযাপনের চর্বিতচর্বণ ক্রিয়া করেনি। ভগ্ন, আপসকামী, দ্বিধাগ্রসত্ম, সংশয়াচ্ছন্ন মধ্যবিত্ত নিয়ে বাংলা গল্প-সাহিত্য থেকে শওকত আলীর গল্প স্বতন্ত্র। তাঁর গল্পের পোড়-খাওয়া চরিত্র ভেঙে পড়ে না, সাময়িক পরাজয়ের বার্তাও প্রকাশে অনাবশ্যক কাঁদে না। বরং প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত রাখা মুষ্টিমেয় শ্রেণিপ্রভু প্রতিপক্ষ দিনমজুরের উত্থানে কেঁপে ওঠে। এই কাঁপুনি গিয়ে স্পর্শ করে স্যাঁতসেঁতে গল্প-সাহিত্যের বিষয় ও শরীরে।

এগারোটি গল্প নিয়ে শওকত আলীর প্রথম গ্রন্থ উন্মূল বাসনার নামসূত্র বিশেস্নষণ করলে পাওয়া যায় মানবজীবনের কামনা ও অধীর অভিলাষের উপাখ্যান। কোনো কোনো আলোচকের মতে, উন্মূল বাসনা থেকে বেরিয়ে আসে লেখকের সাহিত্যিকসত্তার প্যাশননির্ভর রোমান্টিকতা। আমরা জানি, প্যাশন হচ্ছে প্রেম, ঘৃণা, ক্রোধের অনুভূতি, যার মধ্যে তীব্র উত্তেজনা। গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোর চরিত্রের ভ্রষ্টাচারে পরিষ্কার হয়ে যায় তারা উন্মার্গগামী। উত্তরাঞ্চলের বিত্তবানরা তাদের সমাজ-অনুপযুক্ত হীনপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করে নারীসঙ্গ প্রমোদে। হতদরিদ্র অসহায় নিতামত্ম খোসাসর্বস্ব নারীকে ইন্দ্রিয়-সেবায় ব্যবহার করে তারা। এমনকি ট্রাক ড্রাইভার, সাঁওতাল, চোর-বাটপার, রিফিউজি, চোরাচালানি সবাই অবৈধ কাজে লিপ্ত। নিঃস্ব কিষান তাঁর অসামর্থ্যের কারণে জোত-জমি-হালের মালিকের কাছে স্বীয় নারীকে বিলি করে দিচ্ছে। রিপুর প্রাবল্যে পুরুষ ভারসাম্যলুপ্ত মানসিকতা ও শরীরের উত্তেজনা চুকায়। ‘রঙ্গিনী’ গল্পে সংঘাত-ঈর্ষা-চিত্তচাঞ্চল্যের প্রকাশে শুনি : ‘সব নেশার চাইতে বড় নেশা হলো এই মেয়েমানুষ।’ ‘ফাগুয়ার পর’ গল্পে বৃদ্ধ সুখলাল নেশাখোর ছেলের জোয়ানি বউয়ের প্রতি লক্ষ নেই দেখে পুতের বউ গঙ্গাময়ীকে অন্য পুরুষের প্রতি তাকানো পাপ বলে উপদেশ দেয়। ‘ডাইন’ গল্পে সুবলা ও বিনোদচরণের স্মৃতিচারণেই জ্বলে ওঠে কামনার পুরনো আগুন ‘পুরুষের গলা জড়িয়ে ধরে না ঘুমোলে তোর ছাতি ঠান্ডা হতো না। প্রথম রাতে লোকটি ক্লামত্ম হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে মাঝরাতে তুই তাকে আবার জাগাতিস। মনে পড়ে সুবলা।’ উন্মূল বাসনার গল্পগুলোর চারপাশের প্রকৃতি  যেন সম্ভোগেচ্ছুকের পক্ষে সমর্থন দেয় শীত-বৃষ্টি-অন্ধকারের জোগান দিয়ে। ‘তৃতীয় রাত্রি’ গল্পে সার্কাসের বৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রী সাজাহান ওসত্মাদকে আগলে বসে আছে অসমবয়সী বালিকা কাননবালা। এখানে সময়-প্রকৃতি, স্বজন-সংসারহীন মানুষ একাকার হয়ে যায় – ‘কে জানে ভোর হতে কতক্ষণ বাকী। বারান্দার বাইরে শ্মশানের ওপর শীতের দীর্ঘরাত আর কুয়াশাঢাকা বিশাল আকাশ একাকার হয়ে আছে। উত্তরের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে নদীর ওপর দিয়ে। মেয়েটা অন্ধকারের দিকে চোখ মেলে রাখলো। পঞ্চচূড়া কাঞ্চনজংঘা আবার উত্তরের দিগমেত্ম ঝলমল করে উঠবে – যদি কাল আকাশ পরিষ্কার থাকে।’ জটিল রহস্যময় পরিবেষ্টন আর শরীরী ক্ষুধার উদ্রেকে পাঠকের অমত্মরাত্মা অনুশোচনা ও গস্নানিতে টাটিয়ে ওঠে। এমনকি অন্যথাচারীর অবৈধ সম্বন্ধ ও ক্রিয়াকলাপে আলেখ্যের পারিপার্শ্বিকতা পর্যমত্ম ভারি হয়ে যায়। গল্প সৃষ্টির এমন সার্থকতার জন্য সজ্ঞান পাঠক মনে করেন, উন্মূল বাসনার চরিত্রগুলো মনে হয় লেখকের নয়, তারা যেমন, তাদের চারপাশের পৃথিবীটা যেমন, লেখক যেন তেমনি যথাযথ তুলে দিয়েছেন ঘটনার ভাঁজে ভাঁজে। অধ্যবসায়ী পাঠক বিষয়ের আরো গভীর খনন করেন : প্রতিটি গল্পের অবলম্বন সমাজের পরাশ্রিতজন, প্রতিটি কাহিনিই শক্তিশূন্য পরাভূত মানুষের উপাখ্যান। জীবন সফলতার স্বাদবঞ্চিত যেসব মানুষ, পীড়নে, ছিবড়ে-যাওয়া ছিন্নভিন্ন তাদের অতলস্পর্শী বেদনা যেন ছুঁতে চেয়েছেন লেখক। শওকত আলীর উন্মূল বাসনায় রিরংসার ইচ্ছাপূরণে পুরুষের শিকার কেবল নারী। তাঁর গল্পে যে পুরুষতান্ত্রিক পলিস্ন সমাজের আদ্যোপামত্ম চিত্র, চরিত্রের পুনরাবৃত্তিময় আদিম মানসিকতা, প্রামিত্মক নিম্নবর্গের জীবনধারণ, তার উপস্থিতি, এমনকি অন্দর অবধি পৌঁছে যাওয়ায় আমরা বুঝতে পারি, যেখানে মানুষ শুধু পণ্য। যেখানে ধ্বংস হয়েছে মানবিকতা ও শুভবোধ। তবু জীবনপাত্রের তলানিতে পড়ে থাকা শেষ শাঁস নিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে তার মেরুদ- ঋজু করতে তৎপর হয়। উন্মূল বাসনার ‘ডাইন’ গল্পে এর ইশারা লক্ষ করা যায় : ‘আকাশ ভরানো জ্যোৎস্না। আমগাছগুলো মাথা দোলাচ্ছে থেকে থেকে। হাটের আড়তে মিটমিট করে বাতি জ্বলছে। বাতি জ্বালিয়ে লোকটা এখন বুকের ধ্বক ধ্বক শব্দ নিয়ে অপেক্ষা করছে।’ শেষাবধি প্রতিবাদ ও শ্রেণিক্রোধের সাক্ষাৎ পাই শওকত আলীর লেলিহান সাধের গল্পসমূহে। চেতনাপ্রাপ্তির সুবাদে ন্যাড়া শুকনো বর্ণবঞ্চিত জনপদ কেঁপে ওঠে দলিত নিষ্পিষ্টদের প্রতিরোধে।

ধূসর কুয়াশার ভেতর দিয়ে চুইয়ে পড়ে জ্যোৎস্না, কখনো কুয়াশার মধ্যে অনাথ শিশুর মতো শুয়ে থাকে অন্ধকার, সত্মূপীকৃত খড় জ্বালিয়ে শীত থেকে রেহাই খোঁজে কিষান। এই কিষানের একটা জীবনের কত কথার গ্রন্থ শওকত আলীর লেলিহান সাধ। গল্পে আছে অগ্নিশিখার লকলকে জিভের মতো আগ্রাসী চরিত্রের তেজ ও প্রতাপের প্রকাশ। ‘একটি-দুটি করে লোক দেখা গেল একসময় বড় সড়কের ওপর। কৌতূহল না সমবেদনার কারণে তারা একে একে এসে পৌঁছাচ্ছিল বোঝা মুশকিল। তবে লোকগুলো ঈষৎ আন্দোলিত হচ্ছিল। আন্দোলিত হচ্ছিল যে তার প্রমাণ তারা ক্রমেই কাছাকাছি জড়ো হচ্ছিল এবং জড়ো হয়ে কাছে এগিয়ে আসছিল -’ এই উদ্ধৃতাংশ ‘নয়নতারা কোথায় রে’ গল্পের। কিষানদের আগমন, তাদের ঈষৎ আন্দোলন এবং জড়ো হয়ে তারা এগিয়ে এলে উত্তরবাংলার সমসত্ম জনপদ কেঁপে যায়। এই গল্পে মনোহরের সুন্দরী মেয়ে নয়নতারাকে মহাজনের পোষা মসত্মানরা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। ঘটনা শুনে সহানুভূতিশীল পাড়া-প্রতিবেশীরা বড় সড়কের ওপর পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়। এমন জটলার মুখে পড়ে বাজার-ফেরা মহাজন। মনভোলানো কথা বলে সে মানুষের ক্রোধ কিছুতেই প্রশমিত করতে পারে না। শেষে মহাজন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণপণে ছুটতে থাকে। তাকে ধাওয়া করে পেছন পেছন ছুটতে থাকে সব মানুষ। ‘মা আর কান্দে না’ গল্পের রমজান আলী অহর্নিশ ক্রন্দনরত বৃদ্ধ মা-কে কোনোভাবে নিবৃত্ত করতে না; পেরে মেরে ফেলতে চায়। কিন্তু মায়ের মরা মুখ কল্পনা করতে তার খারাপ লাগে। বাপ-ভাই সবাই মরেছে। কেবল সে মুমূর্ষু ক্ষুধার্ত মাকে আগলে আছে অথচ ঘরে খুদ-কুঁড়ো নেই। শেষে রমজান আলী চোরের সর্দার কলিমদ্দিনের শাগরেদি নেওয়া মনস্থ করে। রোজগার হলে মা অমন করে কাঁদবে না। কিন্তু ঘরে ফিরে সে টের পায় মা তার কাঁদছে না। রমজান আলী তখন চিৎকার করে – ‘মা তুই চুপ করে আছিস ক্যানে, মা আর কান্দিস না ক্যানে।’ ‘নবজাতক’ গল্পের মমত্মাজ ধান মাপার পর ভাগাভাগি নিয়ে মহাজনের পোষ্য গু-াদের হাতে প্রহৃত হয়। তার পিতা হাসন আলীর মনে পড়ে ধান নিয়ে আধিয়ার কিষানের লড়াইয়ের স্মৃতি। এদিকে অনেক টানাহেঁচড়া, কষ্ট-যন্ত্রণার পর গরু একটা বাচ্চা প্রসব করেছে। গল্প এখানে এসে প্রতীকধর্মী হয়ে ওঠে। আগুনের আলোয় দেখা যায় বাচ্চাটা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। চারদিকের অন্ধকারের মধ্যে রক্তের আর কান্নার স্রোত এবং নবজাত গোবৎস মমত্মাজ আলীর চোখের সামনে জেগে থাকে। গল্পের মূল বিষয় গাভির বাছুর প্রসব নয়। যদিও মনে মনে প্রত্যাশা, গাভি থেকে একটা পুরুষ বাছুরের জন্ম হোক। পুরুষ মমত্মাজ জমির গর্ভে জন্মানো ধান ভাগাভাগি আর মহাজনের ঠকানো আচরণ নিয়ে ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ। সে পূর্বপুরুষের কিষান আন্দোলনের স্মৃতি ধরে উদ্বেলিত। নিজের মধ্যে সেদিনের বিদ্রোহের অনুরণন শোনে। মহাজনকে সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে – ‘আচ্ছা মহাজন, তেভাগার কথা জানেন তুমরা? ঐ যে ধানকাটা নিয়ে গোলমাল, জানেন তুমরা? ঐ বছরও কি ধান কর্জের এই নিয়ম ছিল?’ ‘লেলিহান সাধ’ গল্পে মনোহর ও সবদর দুই কিষান রাতে মহাজনের ধান পাহারা দেয়। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি-শীতের মধ্যে ‘ইঃ শালার কুন জাড় নামিল বাহে’ মনোহরের উক্তি ধরে আমরা গল্পে দেখতে পাই – ‘কুহার বড়ই কুহক বাহে। চোখ আছে তুমার – কিন্তু লজরটা চলে না, রাসত্মা আছে কিন্তুক দেখা যায় না। কুহার ভিতর গাঁও নাই, বাগিচা নাই, মানুষ নাই – কিছু নাই। খালি একটা জিনিষ আছে – সে তুমার জাড়টা,  শরীরের কষ্টটা। জাড়টা তুমার দেহের চামড়া কামড়ায়, মাংস কামড়ায়, হাড্ডি কামড়ায় – ছাড়ে না কিছুতে। মহাজনের ধারের মতোন বাহে শরীলের এ জাড়ের কষ্টটা।’ তীব্র শীতের কষ্ট থেকে বাঁচতে মনোহর ও সবদর মধ্যরাতে আগুনের ব্যবস্থার জন্য মহাজনকে ডাকে। মহাজন তখন দুর্যোগের রাতে লেপ-কাঁথার উমের মধ্যে কাসেমালির বউটাকে বুকে জড়িয়ে সুখনিদ্রায়। দুই উজবুক দিনিয়ারের ডাক শুনে মহাজন চৌধুরী যখন বাইরে বেরোলো, তখন তার হাতে গরু-তাড়ানো লাঠি। সটাসট সে মারতে থাকে দুজনকে। – ‘জীবন এমনই। কিষান এমনই হয়, মহাজনও এই রকম। ঝড় বৃষ্টি বাতাস সব এমনই হয়ে থাকে। রক্তমাখা সবদর আলীর মুখ ঠান্ডা জ্যোৎস্নায় জ্বলজ্বল করে উঠলো।’ মহাজন ঘরে ফিরে গেলে দুই কিষান খড়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। শেকল তুলে দেয় মহাজনের দরজায়। মনোহর আর সবদর – ‘নয়নভরে দেখছে দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখাগুলোকে। জন্ম-জন্মামত্মরের সাধ, সারাজীবনের সবকিছু তখন চোখের সামনে জ্বলে জ্বলে উঠতে লাগল। আর মানুষ দুজন প্রাণভরে তাই দেখতে লাগলো।’ শওকত আলীর তিনটি গল্প ‘আর মা কান্দে না’র রমজান আলী বেকার, গ্রামে কাজ নেই, তার করার কিছু নেই। এখানে সে একা। ‘নবজাতক’ গল্পের চরিত্রের সামনে তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি আছে, কিন্তু ‘বড় ডর করে এখন। বুনো আধিয়ার কিষান উ কথা কহে না’ বলে, মহাজনের মার হজম করে। এখানে চরিত্র একজন জোয়ান এবং একজন বৃদ্ধ। ‘লেলিহান সাধ’ গল্পে দুই কিষান মার খায় এবং মার দেয়। এখানে লক্ষ করা যায় শওকত আলীর গল্পের চরিত্রের ক্রমবিকাশ। ভয়কে জয় করছে চরিত্র। এরই প্রভাব পড়েছে তাঁর পরবর্তী সময়ে লেখা গল্পে। স্রোতে ভেসে যাচ্ছে মহাজনসহ তার নৌকা। কিন্তু পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকেও ‘ভবনদী’ গল্পের নসরউদ্দিনের নৌকার কাছিটা গাছের গুঁড়িতে পেঁচিয়ে দিতে ইচ্ছা হয় না। তার মনে পড়ে, ‘সংসারে কত দুঃখ – হায়, আমার বউয়ের বুকে দুধ নাইগো। মেয়েটা ভয়ানক কান্দে।’ ‘কপিল দাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে বৃদ্ধ সাঁওতাল কপিল দাস বসত উচ্ছেদের বিরুদ্ধে একাই প্রতিবাদ করে – ‘মহাজন বসত উঠায় দিবা চাহিলেই কি হোবে, ক্যান হামার কমরত জোর নাই।’ বুড়ো বয়সে সে তীর তুলে নিলে কিশোরকাল ফিরে পায়। জীবনে প্রথম নিশানা ভেদ করার খুশি আর একবার শেষ জীবনে এসে উপলব্ধি করে।

শওকত আলী সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণা, উঁচু ও নিচু সত্মরের অনিবার্য দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছাড়াও লোকসমাজে প্রচলিত মুখের ভাষা ব্যবহার করে নগণ্য মানুষকে নিয়ে হিউমার সৃষ্টি করেছেন। হাস্যকৌতুক, বিকল-মেজাজের মধ্য দিয়েও চরিত্রের ঘুমমত্ম নাখোশ বেরিয়ে আসে। এর উদাহরণ ‘দুই গজুয়া’র গল্পটি। অবোধ্য বিষয় নিয়ে ভাগ্নে রহিমুদ্দিন বারবার প্রশ্ন করে মামা পোহাতুকে জ্বালাতন করে। ‘বৃষ্টির শব্দ, ভাগ্নের গুনগুনানি আর কাঁথার উম, এই তিন মিলে ভারি আরামের একটা ভাব তৈরি করে ঘরের ভেতর।’ মামা নাক ডাকতে শুরু করলে ভাগ্নে জানায় : ‘তোর নাকের ডাক শুনে সাপ বাহার হইছে। চুপশালা, বলে পোহাতু ফের শুয়ে পড়ে।’ পোহাতু মনে করে বোধহয় ছোট মহাজন এসেছে। ভাঙা ঘুমের মধ্যে এখানেও মহাজনভীতি। মহাজনের বাড়িতে হা-ভাতের দল হাজির হলে রহিমুদ্দিনের মগজে ঘুরপাক নির্ধারিত ধারণা – মহাজনের দয়ামায়া নেই, গোলায় ধান, অথচ আকালের সময় ধান চাইলে সে তেড়ে আসবে। গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি শওকত আলীর লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘শুন হে লখিন্দর’-এ মহাজন এখানে দ্রোহী মজুরকে ভয় করছে। উভয়ে রাতে অবস্থানের সময় গুপীনাথ মহাজনকে বলে – ‘হামরা কিন্তুক আন্ধারে থাকি। আন্ধারে জনম, আন্ধারে বাঁচন, আন্ধারে মরণ।’ অনেকদিন পর সুযোগ পেয়েছে গুপীনাথ। পুরনো হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার জন্য সে মহাজনকে লখিন্দর বলে সম্বোধন করে জানায় : ‘হিসাবটা যে বহুতদিনের লখিন্দর। কতদিন আর ঘুরে ঘুরে যামো হামরা। সামত্মালী পাহাড়ত হামার দাদা, পরদাদার বাস ছিল। কালীনাগের রক্ত হামার শরীলে বহে যাচ্ছে। কতকালের পুরানো হিসাব, ফম করে দেখ তুই। কত আকাল গেল, ব্যারাম গেল, বানবরিষা গেল – কিন্তুক হামরা খোরাকি পাই নাই। সওদাগরের বেটা, সেই হিসাবটা ইবার দিবা হবে।’ পৌরাণিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সমকালীন জীবন একীভূত করে শওকত আলী মহাজন ও মজুরকে মুখোমুখি গল্পে দাঁড় করিয়ে দেন। এই মজুর গোসাপ-ধরা সাঁওতাল সাপুড়ে গুপীনাথ। তাঁর কবলে পড়েছে সীমামেত্মর ওপার থেকে চোরাচালানি লক্ষ্মীকামত্ম। বর্ডারের গোলমালে যেতে না পেরে রাতে সে হাঙ্গামার ভয়ে পলাতক এপারের কসিমুদ্দিনের আড়তে আশ্রয় নেয়। সেখানে এসে উপস্থিত হয় এই গুপীনাথ। এদিকে লণ্ঠনের তেল ফুরিয়ে গেলে গাঢ় অন্ধকার হয়ে যায় আড়তের ঘর। লক্ষ্মীকামত্ম একবার সরে বসতে চাইলেন, আর তাতেই ভয়ানক শব্দে ফুঁসে উঠল একটা সাপ। পুরনো হিসাব বুঝে নিতে গুপীনাথ প্রথম থেকে বেপরোয়া। কেবল জীবন-জীবিকার কারণে তাঁর চরিত্র রুক্ষ নয়, মহাজনকে মুঠোয় পেয়ে প্রতিশোধ নিতেও সে তৎপর। শওকত আলীর গল্পের এই গুপীনাথ ভয়কাতুরে ও আপসকামী নয়। অন্যান্য গল্পের চরিত্রে যে দ্বিধা, পিছুটান, আফসোস আছে গুপীনাথ চরিত্রে তা নেই। প্রথম থেকেই সে মেজাজি। সওদাগর লক্ষ্মীকামত্ম বাবুরা ন্যায্য পাওনা আদায়ে নির্ভীক চরিত্র গুপীনাথদের ভয় পায়, সমীহ করে। এই গুপীনাথদের গল্পে জায়গা দেওয়া ও ফুটিয়ে তোলার জন্য আমরা পাই শওকত আলীর জীবনবাদী সৃষ্টিশীলতার পরিচয়।

গল্পের আবহ পরিবেশ রচনায় শওকত আলীর গল্পের সঙ্গে আরেক গল্পের বহুলাংশে সাযুজ্য বা একাত্মতা আছে। গল্পে ঘুরেফিরে আসে রাত-শীত-বৃষ্টি-কান্দরের একই সবিসত্মার বিবরণ। মনে হয় কেবল চরিত্র ও ঘটনা ছাড়া অকুস্থল প্রায় এক। লোভ-ক্ষুধা-ক্ষক্ষাভ-প্রতিবাদ-যৌন অবদমন সঙ্গে নিয়ে উত্তরবঙ্গের বুনোগন্ধময় পাড়াগাঁয় যাবতীয় কাজকর্ম করলেও বারবার এক বর্ণনানির্ভর প্রকৃতির মধ্যেই তাদের স্থিতি। ‘আর মা কান্দে না’ গল্পের অংশবিশেষ ‘অন্ধকার চারদিকে থৈ থৈ করে। মনে হয় বাতাসে অন্ধকারটা পাক খাচ্ছে, ফুলছে আর চারদিকে কেমন ছড়িয়ে যাচ্ছে। উত্তর দেখো, দক্ষিণ দেখো, আসমানে তাকাও – শুধু কালো। থেকে থেকে কালো মেঘের পি-গুলো একদিক থেকে গড়িয়ে যাচ্ছে আরেক দিকে। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এসে শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে।’ বিরুদ্ধ চরাচরের বর্ণনার সঙ্গে ‘লেলিহান সাধ’ গল্পের দৃশ্যমান অবস্থার মিল আছে। – ‘খোলা কান্দরে হাওয়ার ঝাপটা ভীষণ আছাড় যাচ্ছে। উত্তর থেকে বাতাস শব্দ করে ছুটে আসছে। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে উথাল-পাতাল অন্ধকারটা দেখে নিলো দু’জনে। তারপর পা বাড়াল। কিন্তু কোথায়? তখুনি শুরু হলো বেদম বৃষ্টি।’ ‘নয়নতারা কোথায় রে’ গল্পেরও আকাশ-বাতাস-বৃষ্টির বর্ণনা অনুরূপ – ‘আসমানের লীলা বোঝা ভার। এই বাতাস বন্ধ, গুমোট ভাব, যেন চেপে আসছে বুকের উপর ভারী বোঝার মতো – তারপর এই আবার দেখো, দেখতে দেখতে কোনদিক থেকে বাতাস বইতে শুরু করে দিলো, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ফুটে উঠল বাতাসের গায়ে। শেষে মেঘ ডাক ছেড়ে বৃষ্টি ঢালতে শুরু করে দিলো।’ শীতের প্রকোপ এবং চরম শীতে শায়েসত্মা হওয়া কামলা-কিষানের দুরবস্থাও একইভাবে গল্পে ঘুরেফিরে এসেছে। পরিপ্রেক্ষিত এক হতে পারে, কিন্তু তা ভাষায় মূর্ত করতে গিয়ে বারবার একরকম হয়ে এলে পাঠকের সামনে চলে আসে লেখকের পুনরাবৃত্তির প্রবণতা। কিন্তু মানুষ, তার কার্যক্ষমতা, রোদজ্বলা প্রামত্মর, অন্ধকারশাসিত রাত্রির প্রকৃতি এক জায়গায় এসে মিলেমিশে গেলে বাসত্মবের পুনর্জীবন ঘটতে দেখা যায়। অঞ্চল বিশেষের ঘাত-প্রতিঘাত, মানুষের ক্ষয়, ঘটনাস্রোত এবং শেষাবধি পুনরুত্থান মানুষেরই শক্তিকে অভিনন্দন জানায়। তখন গল্প বর্ণনায় দুর্বলতা জোরালো বলে মনে হয় না।

শওকত আলীর গল্পের গদ্য প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য। সর্বত্র আবার অলংকারবর্জিত নয়। অনায়াস স্বচ্ছন্দে তিনি বৃত্তামত্ম লিখে গেছেন। জয়-পরাজয়, আলো-অন্ধকারের পালটাপালটি যে-জীবন তিনি চিত্রিত করেছেন সে-জীবন প্রতিদিনের বাঁচার জন্য লড়াই করে, প্রতিদিন সে-জীবন আবার নিঃশেষিত হয়। অশামিত্মময়, সুখবঞ্চিত। সারাংশশূন্য এই জীবন রূপায়ণে বিষয়ানুগ গল্পভাষা ব্যবহারে অনমনীয় হওয়ার প্রয়োজন ছিল। জীবন ও সমাজের যে ভাগ ধূসর, ধূলিমলিন, নিষ্প্রভ, ফাটলপূর্ণ তার যথাযথ প্রকাশে গদ্য অনুরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়। শওকত আলীর গল্পভাষা লিরিক্যাল থেকে যায়। কি প্রকৃতি বা দৃশ্য বর্ণনায়, কি মানুষের স্মৃতি রোমান্থনে, কি ঘটনা উপস্থাপনে গল্পে শওকত আলীর রোমান্টিক মনের খোঁজ পাওয়া যায়।

উন্মূল বাসনার গল্পের প্রধান প্রবণতা যে জৈবিক প্রবৃত্তি তা থেকে সরে এসে শওকত আলী সমাজ ও মানুষের শ্রেণিদ্বন্দ্ব গল্পে মূর্ত করে নিশ্চিত করেছেন তাঁর নিজের ক্রম-উত্তরণ। বানোয়াট কাহিনি পরিবেশন অস্বীকার করে তিনি গল্পে ধারণ করেছেন মানুষের বেঁচে থাকা, জেগে ওঠার প্রবল স্বপ্ন ও আকাঙক্ষা। কথাসাহিত্য নিয়ে শওকত আলীর মনোভাব তাঁর সাহিত্যের জন্যও প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে এখানে পেশ করা যায় : আসলে মানুষের জীবনই কথাসাহিত্যের বিবেচ্য বিষয়। তাতে পূর্ণাঙ্গ কাহিনি থাকতেও পারে, না-ও পারে। বিচার্য বিষয় হচ্ছে, লেখক জীবনের কতটুকু দেখলেন ও দেখালেন এবং কীভাবে দেখালেন। লেখক জীবনের গভীর থেকে গভীরতর ভেতরের দিকে যদি যেতে পারেন, তাহলে তাঁর লেখায় যা উঠে আসবে তাতেই পাওয়া যাবে সাহিত্যের সেই অন্বিষ্টকে, যা মানুষকে ভাবায় এবং আলোড়িত ও উদ্দীপ্ত করে।

Wednesday, October 19, 2022

মূত্রনালীর ইনফেকশন by ডা: জ্যোৎস্না মাহবুব খান

ইউটিআই বা মূত্রনালীর ইনফেকশন এক ধরনের সাধারণ সমস্যা, যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউই আক্রান্ত হতে পারে। তবে মধ্য বয়সী মহিলারাই বেশি আক্রান্ত হন। গ্রীষ্মকালেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে সব ঋতুতেই হয়ে থাকে। প্রতিটি জীব খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে, তার প্রয়োজনীয় অংশ শোষণ করে এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ বা বর্জ্য দ্রব্য পায়খানা ও প্রস্রাবের মাধ্যমে দেহ থেকে বের করে দেয় এটাই স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো কারণে প্রস্রাব করা যদি যন্ত্রণাদায়ক হয় তবে বুঝতে হবে এটা কোনো রোগের উপসর্গ। এসব উপসর্গের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে- মূত্রনালীতে ইনফেকশন, প্রস্রাবের থলিতে ইনফেকশন, পাইলাইটিস, প্রোস্টটাইটিস, ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বা সিস্ট ফেটে যাওয়া, সিফিলিস ও গনোরিয়ায় আক্রান্ত হলেও হতে পারে।
মূত্রনালীর সংক্রমণের লক্ষণগুলো রোগীর বয়স এবং মূত্রনালীর উপরিভাগ অথবা নিম্নভাগ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত মূত্রনালীর উপরিভাগ সংক্রমণে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে- উপর পেটে বা পিঠের দিকে বা কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা, প্রস্রাব করতে জ্বালা যন্ত্রণা বোধ করা, ব্যথার সাথে কাঁপুনি দিয়ে অনেক জ্বর, খাবারে অরুচি, বমিভাব বা বমি হয়ে যাওয়া, পিপাসা বোধ করা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া এবং ঘোলাটে দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হওয়া ইত্যাদি।
মূত্রনালী ও মূত্রথলি থেকে ইনফেকশন সাধারণত উপরের দিকে অগ্রসর হয়ে মূত্রনালীর উপরের অংশকে আক্রান্ত করে। সদ্য বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে মূত্রনালীর উপরের অংশের প্রদাহকে বলা হয় হানিমুন পাইলাইটিস এবং নিচের দিকের প্রদাহকে বলা হয় হানিমুন সিস্টাইটিস।
মূত্রনালীর নিচের অংশ সংক্রমণে কতগুলো উপসর্গ দেখা দেয়- তলপেটে ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ এবং প্রস্রাব হওয়ার সময় তীব্র ব্যথা হওয়া, ফোঁটায় ফোঁটায় গরম প্রস্রাব হওয়া। প্রস্রাব করতে জ্বালা-যন্ত্রণা অনুভব করা, প্রস্রাবের সাথে কখনো কখনো রক্ত পুঁজ নির্গমন হওয়া ইত্যাদি। শিশুদের ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ দেখা দেয় তা হলো জ্বর, ঘন ঘন প্রস্রাব করা, প্রস্রাব করার সময় কান্নাকাটি করা, বিছানায় প্রস্রাব করা, বমি ও ডায়রিয়া হওয়া, খাবারে অরুচি ও দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ইত্যাদি।
এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা করতে হবে কোনো সংক্রমণ আছে কিনা দেখার জন্য। প্রস্রাব কালচার করে সঠিক এন্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। তার সাথে ব্যথানাশক ওষুধ দিতে হবে। প্রয়োজনে এক্স-রে করে রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিতে হবে।
মূত্রনালীর ইনফেকশন দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হতে পারে বিভিন্ন কারণে যেমন একবার ইনফেকশন হলে উপযুক্ত এন্টিবায়োটিক না খাওয়া বা এন্টিবায়োটিকের কোর্স অসমাপ্ত করা, প্রস্রাবের বেগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখা, কোষ্ঠ কাঠিন্য, মলত্যাগের পর মলদ্বার ঠিকমত পরিষ্কার না করা, স্বামী বা মেল পার্টনারের চিকিৎসা না করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব ইত্যাদি। দীর্ঘস্থায়ী মূত্রনালীর ইনফেকশন থাকলে তা উপরের দিকে উঠে কিডনিকে আক্রান্ত করতে পারে। সুতরাং এ ইনফেকশনকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয় যথাযথ সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় মূত্রনালীর ইনফেকশন হলে সঠিক এন্টিবায়োটিক খাওয়াতে হবে এবং মাঝে মধ্যেই প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা করে দেখতে হবে ইনফেকশন মুক্ত আছে কিনা। কারণ এ সময় ইনফেকশন থাকলে মা এবং গর্ভস্থ সন্তান ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
মূত্রনালীর ইনফেকশন প্রতিরোধে প্রচুর পানি পান করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে বিশেষ করে মাসিকের সময়। প্রস্রাবের চাপ থাকলে সময়মতো প্রস্রাব করে মূত্রথলি খালি রাখা উচিত। কখনো অনেক সময় আটকে রাখা উচিত নয়। প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত এবং নিয়মিত ওষুধ খাওয়া উচিত।
>>>লেখক : জেনারেল প্রাকটিশনার (মহিলা ও শিশু)
মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।

Tuesday, October 11, 2022

স্বাস্থ্য: হার্ট সতেজ রাখতে প্রয়োজন খাদ্যভ্যাসে ৫টি পরিবর্তন

বিজ্ঞানীরা বলছেন, খাদ্যাভ্যাসে মাত্র পাঁচটি পরিবর্তন এনে হৃদরোগ ও স্ট্রোক থেকে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি।
ব্রিটেনে পুষ্টি ফাউন্ডেশন তাদের নতুন এক রিপোর্টে বলছে, বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও এই দুটো কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
এক পরিসংখ্যান বলছে, ব্রিটেনে যতো মানুষের অকাল মৃত্যু হয় তার অন্তত চার ভাগের এক ভাগের মৃত্যুর জন্যে দায়ী হৃদরোগ।
স্বাস্থ্য গবেষকরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
পুষ্টি ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মানুষের দেহের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অণুজীব মাইক্রোবায়োম যদি সুস্থ থাকে এবং কোমরের আকার যদি খুব বেশি বেড়ে না যায়, পাশাপাশি রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা কম রাখা যায় তাহলেই হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তন এনেই এসব অর্জন করা সম্ভব।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে খাবার-দাবারের বেলায় কী ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে?

১. বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খান

যেসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ আছে সেসব খাবার খাবেন। এসব খাবারের কারণে শরীরে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়।
কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে সাহায্য করে এই ব্যাকটেরিয়া।
বেশি আঁশ আছে এরকম সবজির মধ্যে রয়েছে শিম ও মটরশুঁটি জাতীয় সবজি, কলাই ও ডাল জাতীয় শস্য এবং ফলমূল।
পুষ্টি বিজ্ঞানীরা বলছেন, আলু এবং শেকড় জাতীয় সবজি খোসাসহ রান্না করলে সেগুলো থেকেও প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়।
এছাড়াও তারা হোলগ্রেইন আটার রুটি এবং বাদামী চাল খাবারও পরামর্শ দিয়েছেন।

২. স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট-বাঁধা চর্বি জাতীয় খাবার কমিয়ে ফেলুন

খাদ্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেসব খাবারে বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট-বাঁধা চর্বি থাকে সেসব খাবার খেলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বেড়ে যায় হৃদরোগের ঝুঁকিও।
চিজ, দই, লাল মাংস, মাখন, কেক, বিস্কিট ও নারকেল তেলে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে।
তারা বলছেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে হলে স্যাচুরেটেড নয় এমন চর্বি (যেসব খাবারের উপর চর্বি জমাট বাঁধে না) সে ধরনের খাবার খেতে হবে।
এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে, তেল সমৃদ্ধ মাছ, বাদাম ও বীজ। অলিভ, রেপসিড, সানফ্লাওয়ার, কর্ন এবং ওয়ালনাট তেল দিয়ে রান্নার বিষয়ে তারা জোর দিয়েছেন।
দুধের বেলায় স্কিমড বা সেমি-স্কিমড (দুধ থেকে চর্বি সরিয়ে নেওয়া) দুধ খেতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে খাবারে যাতে বাইরে থেকে চিনি মেশানো না থাকে। লাল মাংসের বদলে খেতে হবে মুরগির মাংস। মুরগির চামড়া তুলে ফেলে দিন। গরুর মাংস খেলে তার উপর থেকে চর্বি ফেলে দিয়ে রান্না করতে হবে।
সপ্তাহে অন্তত একদিন এমন মাছ খেতে হবে যাতে প্রচুর তেল আছে।
ক্রিস্প ও বিস্কিটের বদলে নানা ধরনের বাদাম ও বীজ খেতে পারেন।

৩. লবণকে বিদায় জানান

লবণ বেশি খেলে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর ফলে বৃদ্ধি পায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও।
ব্রিটেনে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয় যে এনএইচএস থেকে তাদের পরামর্শ হলো দিনে সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম (এক চা চামচের পরিমাণ) লবণ খাওয়া যেতে পারে।
তারা বলছে, লবণ কম-বেশি খাওয়া একটি অভ্যাসের ব্যাপার। লবণ যতো কম খাওয়া হবে তার চাহিদাও ততো কমে যাবে।
এই অভ্যাস বদলাতে মাত্র চার সপ্তাহের মতো সময় লাগে। এই সময় পর দেখা যাবে আপনি যে খাবারের সাথে লবণ খাচ্ছেন না, সেটি আপনি বুঝতেই পারবেন না।
খাদ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, লবণের পরিবর্তে মশলা দিয়ে খাবার প্রস্তুত করলে তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাবে।

৪. ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার খাবেন

যেসব খাবারে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ বেশি থাকে সেগুলো আমাদেরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
শুধু তাই নয়, এসব খাবার হৃদরোগের ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।
ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাশিয়ামের মতো খনিজ উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করে। হৃদরোগের যেসব কারণ আছে সেগুলো ঠেকাতেও এসব খনিজ ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে।
অনেক খাদ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডায়েটের মাধ্যমেই এসব ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া সম্ভব।
এসবের জন্যে ট্যাবলেটের উপর নির্ভর করতে হবে না। তবে তার মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে ভিটামিন ডি।
কারো শরীরে ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব থাকলে যেসব খাবার খাওয়া প্রয়োজন:
প্রতিদিন পাঁচটি ফল বা সবজি খাওয়া। ছোট্ট এক গ্লাস জুস। শিম ও ডাল জাতীয় শস্যও খেতে পারেন। বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবারে থাকে ভিটামিন ই।
মাছ, দুগ্ধজাত খাবার ও হোলগ্রেইনে পাওয়া যায় ভিটামিন বি। কলা, আলু এবং মাছে পটাশিয়াম।
ডাল ও হোলগ্রেইনে ম্যাগনেসিয়াম। দুগ্ধজাত খাবার ও সবুজ পাতার সবজি থেকে পাওয়া যায় ক্যালসিয়াম।

৫. বেশি মোটা হলে ক্যালরি কমিয়ে দিন

হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেওয়ার জন্য উপরের চারটি ধাপ অনুসরণ করলেই আপনি অনেক দূর অগ্রসর হয়েছেন।
কারণ আপনি যদি চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড চর্বিযুক্ত খাবার কম খান, ভিটামিন ও মিনারেল আছে এরকম খাবার বেশি খান তাহলে আবার মোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম।
মনে রাখতে হবে মোটা হলে তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে কোমরে চর্বি জমা হলে।
পুরুষের কোমর যদি ৩৭ ইঞ্চি আর নারীর কোমর ৩১ দশমিক ৫ ইঞ্চির বেশি হয় তাহলে ওজন কমাতে হবে।
ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আরো যেসব উপায়:

১. প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
২. সপ্তাহে অন্তত আড়াই ঘণ্টা ব্যায়াম করুন।
৩. মানসিক চাপ কমিয়ে ফেলুন।
৪. ধূমপান ছেড়ে দিন।
বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যাবে

Sunday, October 9, 2022

বাইরের খাবারে অভ্যস্ত করবেন না শিশুদের

বাচ্চাদের খাবার নিয়ে বাবা মাকে কী ঝক্কি যে পোহাতে হয় তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। শিশুদের খাবার বাছার সময় সবসময় মাথায় রাখতে হবে এই খাবারের উপরেই তাদের জীবনের স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধি নির্ভর করছে। যদি বর্তমানে শিশুর স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ না দেওয়া হয় তবে ভবিষ্যতে শিশুরা অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। কিন্তু ব্যস্ত সময়সূচিতে বাবা-মায়ের পক্ষেও সন্তানের স্বাস্থ্যের প্রতি কড়া নজর রাখা অসম্ভব। সেই কারণেই ছোট্ট বয়স থেকে বাইরের খাবার, প্যাকেটজাত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে বাচ্চারা। ঘুমের অভাব, শারীরিক ক্রিয়াকলাপের অভাব এবং মোবাইল বা টিভি দেখার সময় বৃদ্ধিতে শরীরের নানা ক্ষতি হচ্ছে।

শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর, সহজ এবং পুষ্টিকর রাতের খাবারের পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। সপ্তাহে অন্তত ছয় দিন শিশুকে স্বাস্থ্যকর খাবার দিতেই হবে বাবা মাকে। রাতে আপনার সন্তানকে ডাল এবং ভাত, খিচুড়ি, রুটি এবং সবজি খাওয়ানোই সবথেকে ভালো। এই খাবারগুলি অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং বাড়ন্ত বয়সে প্রয়োজনীয়। প্রায় সবরকম পুষ্টিই পাবেন এই খাবারে।

পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন বাবা মায়ের কখনোই তাদের সন্তানদের জিজ্ঞাসা করা উচিৎ নয় যে, তারা রাতে কী খাবে। পরিবর্তে তাদের বলা যেতে পারে যে আজ রাতের খাবারে এই এই রান্না হয়েছে। শিশুদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি স্থায়ী, সহজ, স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর রাতের খাবার প্রয়োজনীয়।

শিশুদের জন্য দিনের শেষ খাবার কেমন হওয়া উচিৎ:

রুটি এবং সবজি, ডাল ভাত, খিচুড়ির মতো খাবারে শরীরের সমস্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা সম্ভব। আমাদের সন্তানদের ক্রমবর্ধমান শারীরিক বিকাশ এবং মস্তিষ্কের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে এই খাবারগুলি। এই খাবার খেলে ঘুমও ভালো হয়। সপ্তাহের বেশিরভাগ রাতেই একই ধরণের খাবার দিন, বাচ্চাদের একঘেয়ে মনে হলেও। এছাড়াও, মাঝে মাঝে রান্নায় স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যেমন ঘি যোগ করতে ভুলবেন না।

রাতে খাবারে কী দেবেন না শিশুদের:
১. বৈচিত্র্য: প্রতিদিন আপনার বাচ্চাদের নানা রকমের খাবার দেবেন না।
২. প্যাকেটজাত খাবার: নুডুলস এবং পাস্তা এবং হিমায়িত খাবার বাচ্চাদের দেওয়া বন্ধ করুন। এই জাতীয় খাবারে কোনও পুষ্টি হয় না বরং এই খাবার অস্বাস্থ্যকর। তাছাড়া এই খাবারে চিনি এবং অন্যান্য সংরক্ষণ জাতীয় উপাদান রয়েছে যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৩. বাইরের হোটেল থেকে আনা খাবার: শিশুদের জন্য বাড়িতে রান্না করা পুষ্টিকর খাবারই সর্বোত্তম। আপনার সন্তানদের বাইরের খাবারে অভ্যস্ত করবেন না। এই খাবারে শিশুর বিকাশের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নেই এবং বাচ্চাদের ঘুমের সমস্যাও হতে পারে।
৪. বাইরে খাওয়া: মাসে দুবারের বেশি বাবা মায়েরা বাচ্চাদের বাইরে হোটেলে খেতে নিয়ে যাবেন না। বাইরের খাবারে শিশুদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না।
৫. সপ্তাহে একবার মেনুতে বদল: সপ্তাহে একবার আপনার সন্তানের জন্য রাতের খাবারে অন্যরকম কিছু বানান। সাপ্তাহিক ছুটির আগের রাতে খাবার অন্যরকম হতে পারে।

Saturday, September 24, 2022

মূত্রনালীর ইনফেকশন by ডা: জ্যোৎস্না মাহবুব খান

মূত্রনালীর ইনফেকশন
ইউটিআই বা মূত্রনালীর ইনফেকশন এক ধরনের সাধারণ সমস্যা, যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউই আক্রান্ত হতে পারে। তবে মধ্য বয়সী মহিলারাই বেশি আক্রান্ত হন। গ্রীষ্মকালেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে সব ঋতুতেই হয়ে থাকে। প্রতিটি জীব খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে, তার প্রয়োজনীয় অংশ শোষণ করে এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ বা বর্জ্য দ্রব্য পায়খানা ও প্রস্রাবের মাধ্যমে দেহ থেকে বের করে দেয় এটাই স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো কারণে প্রস্রাব করা যদি যন্ত্রণাদায়ক হয় তবে বুঝতে হবে এটা কোনো রোগের উপসর্গ। এসব উপসর্গের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে- মূত্রনালীতে ইনফেকশন, প্রস্রাবের থলিতে ইনফেকশন, পাইলাইটিস, প্রোস্টটাইটিস, ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বা সিস্ট ফেটে যাওয়া, সিফিলিস ও গনোরিয়ায় আক্রান্ত হলেও হতে পারে।
মূত্রনালীর সংক্রমণের লক্ষণগুলো রোগীর বয়স এবং মূত্রনালীর উপরিভাগ অথবা নিম্নভাগ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত মূত্রনালীর উপরিভাগ সংক্রমণে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে- উপর পেটে বা পিঠের দিকে বা কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা, প্রস্রাব করতে জ্বালা যন্ত্রণা বোধ করা, ব্যথার সাথে কাঁপুনি দিয়ে অনেক জ্বর, খাবারে অরুচি, বমিভাব বা বমি হয়ে যাওয়া, পিপাসা বোধ করা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া এবং ঘোলাটে দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হওয়া ইত্যাদি।
মূত্রনালী ও মূত্রথলি থেকে ইনফেকশন সাধারণত উপরের দিকে অগ্রসর হয়ে মূত্রনালীর উপরের অংশকে আক্রান্ত করে। সদ্য বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে মূত্রনালীর উপরের অংশের প্রদাহকে বলা হয় হানিমুন পাইলাইটিস এবং নিচের দিকের প্রদাহকে বলা হয় হানিমুন সিস্টাইটিস।
মূত্রনালীর নিচের অংশ সংক্রমণে কতগুলো উপসর্গ দেখা দেয়- তলপেটে ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ এবং প্রস্রাব হওয়ার সময় তীব্র ব্যথা হওয়া, ফোঁটায় ফোঁটায় গরম প্রস্রাব হওয়া। প্রস্রাব করতে জ্বালা-যন্ত্রণা অনুভব করা, প্রস্রাবের সাথে কখনো কখনো রক্ত পুঁজ নির্গমন হওয়া ইত্যাদি। শিশুদের ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ দেখা দেয় তা হলো জ্বর, ঘন ঘন প্রস্রাব করা, প্রস্রাব করার সময় কান্নাকাটি করা, বিছানায় প্রস্রাব করা, বমি ও ডায়রিয়া হওয়া, খাবারে অরুচি ও দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ইত্যাদি।
এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা করতে হবে কোনো সংক্রমণ আছে কিনা দেখার জন্য। প্রস্রাব কালচার করে সঠিক এন্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। তার সাথে ব্যথানাশক ওষুধ দিতে হবে। প্রয়োজনে এক্স-রে করে রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিতে হবে।
মূত্রনালীর ইনফেকশন দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হতে পারে বিভিন্ন কারণে যেমন একবার ইনফেকশন হলে উপযুক্ত এন্টিবায়োটিক না খাওয়া বা এন্টিবায়োটিকের কোর্স অসমাপ্ত করা, প্রস্রাবের বেগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখা, কোষ্ঠ কাঠিন্য, মলত্যাগের পর মলদ্বার ঠিকমত পরিষ্কার না করা, স্বামী বা মেল পার্টনারের চিকিৎসা না করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব ইত্যাদি। দীর্ঘস্থায়ী মূত্রনালীর ইনফেকশন থাকলে তা উপরের দিকে উঠে কিডনিকে আক্রান্ত করতে পারে। সুতরাং এ ইনফেকশনকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয় যথাযথ সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় মূত্রনালীর ইনফেকশন হলে সঠিক এন্টিবায়োটিক খাওয়াতে হবে এবং মাঝে মধ্যেই প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা করে দেখতে হবে ইনফেকশন মুক্ত আছে কিনা। কারণ এ সময় ইনফেকশন থাকলে মা এবং গর্ভস্থ সন্তান ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
মূত্রনালীর ইনফেকশন প্রতিরোধে প্রচুর পানি পান করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে বিশেষ করে মাসিকের সময়। প্রস্রাবের চাপ থাকলে সময়মতো প্রস্রাব করে মূত্রথলি খালি রাখা উচিত। কখনো অনেক সময় আটকে রাখা উচিত নয়। প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত এবং নিয়মিত ওষুধ খাওয়া উচিত।
লেখক : জেনারেল প্রাকটিশনার (মহিলা ও শিশু)
মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।

Tuesday, September 20, 2022

পরিপাকতন্ত্রকে কেন দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা হয়? অন্ত্র সম্পর্কে ৭টি বিস্ময়কর তথ্য

অন্ত্রের রয়েছে স্বাধীন স্নায়ুতন্ত্র।
আপনার শরীরের কোন অংশে মেরুদণ্ডের চাইতেও বেশি নিউরন থাকে এবং কোন অংশটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে?
সম্ভবত "অন্ত্র" আপনার প্রথম উত্তর ছিল না। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, আমাদের অন্ত্র লাখো নিউরনের সঙ্গে সংযুক্ত, যে কারণে অন্ত্রকে মানবদেহের "দ্বিতীয় মস্তিষ্ক" হিসেবে ডাকা হয়।
আমাদের পরিপাকতন্ত্রের কাজ শুধুমাত্র খাবার দাবার শোষণ করা নয়, বরং এর-চাইতেও আরও বেশি কিছু।
আমাদের শরীরে যে পরিমাণ রোগজীবাণু রয়েছে সেগুলো আমাদের শরীরকে অসুস্থ করে ফেলতে পারে।
অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে কিনা সে বিষয়ে এখনও গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এবার জেনে নেয়া যাক অন্ত্র সংক্রান্ত কিছু বিস্ময়কর তথ্য:
১. অন্ত্রের রয়েছে স্বাধীন স্নায়ুতন্ত্র:
পুষ্টিবিদ ডা. মেগান রসি বলেছেন, " শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের তুলনায় আমাদের অন্ত্র স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এটি মস্তিষ্কের কোন কোন সাহায্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।"
ডা. মেগান রসি একাধারে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এবং অন্ত্রের চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি বইও লিখেছেন।
অন্ত্রের এই স্বাধীনভাবে কাজ করাকে অভ্যন্তরীণ স্নায়ুতন্ত্র (ইএনএস) বলা হয়, যেটা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (সিএনএস) একটি শাখা। যার কাজ শুধুমাত্র পরিপাকতন্ত্রের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা।
এই পুরো ব্যবস্থাটা নিউরনের সমন্বয়ে তৈরি একটি নেটওয়ার্কের মতো কাজ করে। যেটা পাকস্থলী ও হজম-ক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত।
অন্ত্রকে মানবদেহের "দ্বিতীয় মস্তিষ্ক" হিসেবে ডাকা হয়।
অন্ত্রের এই অভ্যন্তরীণ স্নায়ুতন্ত্র মূলত সিম্প্যথেটিক ও প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
২. আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অন্ত্রের ভূমিকা:
ডাঃ রসি'র মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার পেছনে অন্ত্রের স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা আমাদের রোগ প্রতিরোধক কোষের ৭০% অন্ত্রের ভিতরে থাকে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল বা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাগুলো, সর্দি, কাশি, জ্বরের মতো সাধারণ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
৩. কতোবার টয়লেট হওয়া স্বাভাবিক?
আমাদের শরীরের বর্জ্য শুধুমাত্র খাদ্যের অবশিষ্টাংশ নয়। বরং এর ৫০% জুড়ে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া।
এরমধ্যে এমন সব ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যেটা কিনা আমাদের শরীরের জন্য আসলেই উপকারী।
এ কারণে, যাদের অন্ত্রে "খারাপ" ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ফিকাল ট্রান্সপ্লান্ট একটি কার্যকর চিকিৎসা হতে পারে।
এই চিকিৎসা স্টুল ট্রান্সপ্লান্ট বা মল প্রতিস্থাপন হিসেবেও পরিচিত। এটি এমন এক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া যেখানে একজন সুস্থ মানুষের শরীর থেকে মলের ব্যাকটেরিয়া অসুস্থ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।
এই বিষয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে ডাঃ রসির কাছে জানতে চাওয়া হয় আমাদের দিনে কয়বার টয়লেটে যাওয়া উচিত?।
তিনি বলেন, প্রতিদিন তিনবার থেকে শুরু করে সপ্তাহে তিনবার টয়লেট হওয়া গবেষণায় স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়।
৪. অন্ত্র সুস্থতায় খাদ্য নির্বাচন:
আমাদের অন্ত্রে রয়েছে কয়েক ট্রিলিয়ন জীবাণুর বসতি।
এই জীবাণুগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ কেননা তারা নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টিকর উপাদান হজম করতে সাহায্য করে।
প্রতিটি মাইক্রোবায়াল গ্রুপ একেক ধরণের খাবারের উপর কাজ করে।
তাই বিভিন্ন বৈচিত্র্যের খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে, যা আমাদের আরও সুস্থ হয়ে ওঠার সঙ্গে সম্পর্কিত।
"আমি বলতে চাই যে মাইক্রোবসরা আমাদের অভ্যন্তরীণ পোষা প্রাণীর মতো, আপনি যার যত্ন নিতে এবং লালন পালন করতে চান," বলেছেন ডাঃ রসি।
যারা সবসময় একই ধরণে খাবার খায় তাদের অন্ত্রের জীবাণুগুলো এতোটা সক্রিয় বা শক্তিশালী থাকেনা।
৫. অন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত আপনার মেজাজ মর্জি:
ডাঃ রসি বলেছেন যে আপনার যদি অন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে আপনি কতোটা মানসিক চাপে আছেন সেটা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন: "ডাক্তারি অনুশীলনে থাকাকালে আমি সবসময় আমার রোগীদের দিনে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য ধ্যান করার পরামর্শ দিতাম। চার সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ধ্যান করায় এক পর্যায়ে এটি তাদের অভ্যাসে পরিণত হতো। এবং এতে তাদের অন্ত্রের সমস্যাও ঠিক হয়ে যায়।
"তাই মানসিক চাপমুক্ত থাকা সত্যিই অনেক গুরুত্বপূর্ণ।"
আমাদের অন্ত্রের সঙ্গে মেজাজ যুক্ত থাকার পেছনে একটি সাধারণ কারণ হল, আমাদের পরিপাকতন্ত্রে আনুমানিক ৮০% থেকে ৯০% সেরোটোনিন উৎপন্ন হয়।
সেরোটোনিন এক ধরণের রাসায়নিক বার্তাবাহক যার সঙ্গে আমাদের পরিপাক ক্রিয়া থেকে শুরু করে মানসিক রোগ সংক্রান্ত শরীরের নানা কার্যক্রম জড়িত।
এক কথায় সেরোটোনিনের নি:সরণের ওপর নির্ভর করে আমাদের মেজাজ ভাল থাকা, না থাকা।
দীর্ঘমেয়াদী চাপ শরীরে সেরোটোনিন নি:সরণের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে যা আমাদের মন মেজাজ, উদ্বেগের মাত্রা এবং সুখের মতো মানসিক অবস্থা প্রভাবিত করতে পারে।
পশু এবং মানুষের ওপর আগের গবেষণাগুলো থেকে পাওয়া তথ্য প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, বিষণ্ণতাসহ অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর অন্ত্রে মাইক্রোবায়াল গোলযোগ পাওয়া গেছে।
সাইকোবায়োটিক্সের ওপর নতুন একটি গবেষণা চলছে। যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে সুস্থ অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
৬. বিশ্বাসের নেতিবাচক প্রভাব:
যদি আপনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে কয়েক ধরণের খাবার আপনার জন্য খারাপ, তাহলে আপনার এ সংক্রান্ত নেতিবাচক উপসর্গ দেখা দেবে।
সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, আপনি যদি কোন নির্দিষ্ট ধরণের খাবার খেতে ভয় পাওয়া শুরু করেন তবে সেটি খাওয়ার সময় আপনার উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে।
কেননা কিছু মানুষের পাকস্থলী বেশ সংবেদনশীল।
ডাঃ রসি বলেন, "আমার ক্লিনিকে আমি প্রতিনিয়ত দেখেছি যে একটা বিশ্বাস কিভাবে অন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে"। অনেকে বিশ্বাস করে যে গ্লুটেন বা ল্যাকটোস তাদের জন্য খারাপ হবে, বাস্তবে তাদের ওইসব খাবারে এলার্জি বা অসহিষ্ণুতা না থাকলেও শুধুমাত্র বিশ্বাসের কারণে সেগুলো খাওয়ার পরে তারা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
৭. আপনি চাইলেই পারেন পরিপাক স্বাস্থ্য উন্নত করতে:
ডঃ রসি কিছু অভ্যাস তালিকাভুক্ত করেছেন। যা পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখার জন্য মেনে চলা প্রয়োজন। সেগুলো হল:
  • অন্ত্রের মাইক্রোবায়াল সক্রিয় ও শক্তিশালী রাখতে বিভিন্ন ধরণের খাবার খান।
  • পছন্দমতো উপায়ে নিজের মানসিক চাপ মোকাবিলা করুন: সেটা হতে পারে, ধ্যান, শিথিলকরণ, বা যোগব্যায়াম।
  • আপনার যদি ইতিমধ্যে অন্ত্র সমস্যা থাকে, তাহলে অ্যালকোহল, ক্যাফিন এবং মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কেননা এ ধরণের উপাদান সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • ভালভাবে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আপনি যদি ঘুমের ধরণ পরিবর্তন করে দেহঘড়ির ছন্দ ব্যাহত করেন তবে আপনার অন্ত্রের জীবাণুগুলির চক্রও বাধাগ্রস্ত হবে। এবং মনে রাখবেন, অন্ত্রের জীবাণুগুলোকে সুস্থ রাখতে তাদের সঙ্গে ভাল আচরণ করা জরুরি।
অন্ত্র ঠিক রাখতে খেতে হবে নানা ধরণের খাবার।

টমাস আলভা এডিসনঃ বধিরতা যার জন্য ছিল আশীর্বাদ… by সাইকা তাসনিম

বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন অনেকটা খোলা বইয়ের মত। তাদের ব্যর্থতা-সফলতা অনেক কিছুই আমাদের জানা থাকে। কিন্তু তাদের জীবনে এমন আরো অনেক কিছুর উপস্থিতি আছে যা থেক যায় আমাদের সম্পূর্ণ অজানা। তেমনি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ও বিজ্ঞানী হলেন টমাস আলভা এডিসন। হয়ত আমরা অনেকেই টমাস আলভা এডিসনের ব্যাপারে জানি। তার আবিষ্কার, সফলতা সব ব্যাপারেই জানি কিন্তু তার জীবনের এমন কিছু জিনিস রয়েছে যেগুলো আমাদের অজানা। নিচে সেগুলো দেওয়া হল-
টিচারদের অনাগ্রহ
সাত ভাইবোনের মধ্যে টমাস আলভা এডিসন ছিলেন সবার ছোট। তার স্কুলের শিক্ষকরা তাকে খুবই দুর্বল ছাত্র ভেবেছিল। পড়ায় মন বসতো না বিধায় প্রায় সময়ই শিক্ষকরা প্রায় সময়ই তাকে বাসায় পাঠিয়ে দিত। কিন্তু এডিসন তার সাফল্যের জন্য তার সম্পূর্ণ কৃ্তিত্ব তার মাকে দিয়েছেন। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তার পাশে তার মাকে পেয়েছেন। তার প্রতি শিক্ষকদের অনীহার কারণে তার মা তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনেন। তার প্রতি তার মায়ের পুরো আস্থা ছিল। তিনি নিজেই পরবর্তিতে এডিসনের পড়ানোর দায়িত্ব নেন।
প্রথম ল্যাব
ছোটবেলা থেকে এডিসনের তার চারপাশের জিনিসের প্রতি আগ্রহ ছিল অসীম। ৯ বছর বয়স থেকেই তিনি বাসায় ছোট ছোট এক্সিপেরিমেন্ট চালান। তিনি তার হাত খরচের পুরোটাই এক্সপেরিমেন্টের জন্য বিভিন্ন কেমিক্যাল কেনার জন্য ব্যয় করতেন। তিনি এমন কিছু কেমিক্যাল কিনেছিলেন যেগুলো ছিল অমূল্য। তিনি সেগুলোকে সাবধানে একটি বোতলে সংরক্ষন করতেন। বোতলগুলোকে সবার কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য সেগুলোকে “বিষ” নামে লিখে রেখেছিলেন। ১০ বছর বয়সে বাড়ির বেজমেন্টে তিনি তার প্রথম ল্যাবরেটরি বানান।
বধিরতা,আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ
এডিসনের কানে শোনায় সমস্যা ছিল। তিনি কানে শুনতে পেতেন না। অনেকের ধারনা তিনি তার বাবার কাছ থেকে বধিরতা পেয়েছেন কারণ তার বাবাও শুনতে পেতেন না। কিন্তু বধিরতার ফলে তার বেশ সুবিধাও হয়েছে। যেহেতু তিনি শুনতে পেতেন না তাই মনযোগ সহকারে কাজ করতে পারতেন। কোন শব্দই তার কানে যেত না যার কারণে তার কাজে কোন বিঘ্ন ঘটতো না। এছাড়াও তিনি কাজপাগল বিজ্ঞানী ছিলেন। বধিরতার কারণে তিনি বেশি সময় ধরে কাজ করতে পারতেন। বস্তুতই বধিরতা তার জন্য আশীর্বাদ ছিল।
প্রথমবার চাকরিচ্যুত হওয়া
১৪ বছর বয়সে এডিসন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। তিনি দিনের বেলা কাজ না করে রাতের বেলা কাজ করতেন যাতে করে তিনি তার এক্সপেরিমেন্ট গুলো করতে পারতেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই চাকরি রক্ষা করা সম্ভব হয় নি। ব্যাটারিতে সালফিউরিক এসিডের উপর পরীক্ষা চালানোর সময় আগুন ধরে যায়। আগুনে টেলিগ্রাফ অফিস ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর এই ঘটনার পরেই তার চাকরি চলে যায়।
প্রথম প্যাটেন্ট
নিবার্চনের সময় ভোটিং রেকর্ড করার জন্য এডিসন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করে। সেই সময়ে তার বয়স ছিল ২২ বছর। তিনি সেই আবিষ্কারের জন্য প্যাটেন্ট ও নেন। ভোট রেকর্ড করার জন্য ব্যবস্থাপককে প্রত্যেকবার সুইচ পরিবর্তন করতে হত। কিন্তু মেম্বাররা সঠিক ভাবে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারেনি। ভোট ঠিকমত রেকর্ড করা যায়নি কারণ মেম্বাররা বারবার তাদের ভোট চেঞ্জ করছিল। পরবর্তীতে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান যন্ত্রটি বাতিল করে দেন ও প্যাটেন্ট ও বাতিল হয়ে যায়।
মিনাকে গোপন কোডের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব
এডিসনের স্ত্রী মেরি মারা যাওয়ার ২ বছর পর তার সাথে সুদর্শন মিনা মিলারের সাথে দেখা হয়। এটি উভয়ের জন্যই প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ে যাওয়া ছিল। তারা একসাথে সময় কাটাতো। এডিসন তাকে মোর্স কোড ট্যাপিং ভাষাও শিখিয়েছিল। তারা যখন অন্যান্য মানুষদের সাথে থাকতো তখন মোর্স কোড ট্যাপিং এর মাধ্যমে কথা বলত। একদিন এডিসন মিনাকে মোর্স কোডের মাধ্যমে “. – — ..- .-.. -.. -.– — ..- — .- .-. .-. -.– — .” ম্যাসেজ পাঠায় ও মিনাও তাকে “-.– .” লিখে ফিরতি বার্তা দেয়। এর কিছুদিন পরেই তারা বিয়ে করে।
রহস্যজনক ট্যাটু
মিচুয়াল লাইফ ইন্সুরেন্সের রেজিস্টার মতে এডিসনের বাম হাতে ট্যাটু আঁকা ছিল। ট্যাটুতে মাত্র ৫ টি ডট ছিল। ট্যাটুর ব্যাপারটি সম্পূর্ণই রহস্যজনক ছিল কারণ কেউই এই ট্যাটুর মানে জানতো না। এডিসনই প্রথম আনঅফিসিয়ালি stencil-pen ব্যবহার করে ট্যাটু মেশিন বানায়। ১৮৭৬ সালে তিনি stencil-pen এর জন্য প্যাটেন্ট গ্রহন করেন। পরবর্তীতে Samuel O’Reilly এডিসনের ট্যাটু মেশিনকে কিছুটা পরিবর্তন করেন।
এক্সরে
হাসপাতালগুলিতে ব্যবহৃত আধুনিক ফ্লোরোস্কোপ আবিষ্কারের জন্য এডিসন এক্স-রে ব্যবহার করেছিলেন। সেই সময় এক্স-রে গুলি অনিরাপদ বলে বিবেচিত হতো না। এডিসন তার কর্মচারী ক্লারেন্স ড্যালিকে একটি ফ্লোরোস্কোপ তৈরি করতে নির্দেশ দেন। ক্লারেন্স তার হাতে এক্স-রে টিউব পরীক্ষা করেন এবং এর ফলে তার হাতে সংক্রমণ তৈরি হয়। এই সংক্রামনের ফলে ড্যালিকে শুধু তার হাত নয় বরং তার জীবন ও হারাতে হয়েছিল। এডিসন ড্যালির মৃত্যুর ব্যাপারে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন ও হতাশ হয়ে পড়েন। পরে তিনি এক্সরে গবেষনা বন্ধ করে দেন।
কংক্রিটের বাসা
এডিসন এক সময়ে সিমেন্ট ব্যবসা শুরু করার কথা ভেবেছিলেন। তিনি নিই ইয়র্ক শহরের বাসস্থানের সমস্যা সমাধানের করতে চেয়েছিলেন। তিনি ছাচের মাধ্যমে শুধু সিমেন্ট দিয়ে বাড়ি বানাতে চেয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সাইজের জানালা,সিড়ি ও বাথটাব বানানোর কথাও ভেবেছিলেন ছাচের মাধ্যমে। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত ছিল না। তাই এই পরিকল্পনা থেকে তাকে সরে আসতে হয়। যদিও তিনি নিজের জন্য এরকম একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন। তিনি কংক্রিটের পিয়ানো ও আসবাবপত্রও বানিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলো জনসাধারনের মনযোগ আকর্ষন করতে ব্যর্থ হয়।
হাতি ও এডিসন
একশতের ও বেশি পাওয়ার স্টেশনের মাধ্যমে এডিসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদুৎ সরবরাহ করত কিন্তু তিনি DC ব্যবস্থায় বিদুৎ সরবরাহের পক্ষপাতিত্ব ছিলেন না। এমন সময়ে তিনি DC ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রমানের জন্য একটি সুযোগ পেয়ে যান। হুট করে সার্কাসের একটি হাতি বন্য হয়ে ওঠে। এই বুনো হাতির আক্রমনে বেশ কিছু মানুষ মারাও যান। হাতিটি একটি হুমকি হয়ে দাড়িয়েছিল ও সার্কাস মালিক একে মেরে ফেলতে চান। যদিও এডিসন হাতিটি মারার পক্ষে ছিলেন না তাও তিনি এটির দায়িত্ব নেন প্রমানের জন্য। তিনি হাতিটির উপর ৬০০০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক AC current ব্যবহার করেন ও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাতিটি মারা যান।

Monday, September 19, 2022

স্পন্ডিলাইটিস : কী করবেন আর কী করবেন না

অফিস ডেস্কে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই টনটন করে উঠছে পিঠ, কাঁধ।কিংবা বাড়িতেও একটানা টিভি দেখতে গিয়ে বা ঘুম থেকে উঠে ঘাড় ঘোরাতে গেলেই মনে হচ্ছে কলকব্জা বশে নেই। দৈনন্দিন দৌড় ঝাঁপের সময়ও মাঝে মাঝেই টের পান যে ব্যথা, তা আধুনিক জীবনযাত্রার অসুখ বা লাইফস্টাইল ডিজিজ বলছেন চিকিৎসকরা। শিরদাঁড়ার হাড় ক্ষয়ের জানান দেয় অকালেই। সহজ করে বললে, স্পন্ডিলাইটিস বাসা বাঁধছে শরীরে। এ রোগের কোনো বয়সসীমা যেমন নেই, তেমন নেই কোনো লিঙ্গ প্রাধান্যও। শিশুদের বেলাতেও এমন উচ্চতায় টেবিল-চেয়ার দিন, যাতে পড়তে বা লিখতে গেলে খুব ঘাড় ঝোঁকাতে না হয়। এই অসুখ সামলাতে নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম আছে, বিশেষ করে কিছু স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ।
কেবল ঘাড়ে ব্যথাই নয়, হাতে এবং ব্যথার অংশ অবশ হয়ে যাওয়া, সূচ ফোটানোর মতো বোধ হওয়া মাথা ঘোরার সমস্যাও এই অসুখের লক্ষণ। তবে এ রোগের হাত থেকে বাঁচতে কেবল ওষুধ খেলেই হবে না, মেনে চলতে হবে কিছু অভ্যাসও। মাংসপেশিকে শক্ত রাখার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করুন। ছয় ঘণ্টা থেকে আট ঘণ্টা ঘুমোতেই হবে রাতে। বালিশ ব্যবহার করা নিয়েও সচেতন হোন। অনেকেই বালিশ ছাড়া ঘুমোন। কখনোই বালিশ ছাড়া ঘুমোবেন না। নরম দেখে একটা বালিশ নিন। কেমন বালিশে শোবেন তা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। ঘুম ভাঙার পর পাশ ফিরে উঠুন। সোজা উঠলে মেরুদণ্ডে চাপ পড়বে আরো। রান্না করার সময় একটা চুল ব্যবহার করুন। সাধারণ টয়লেট নয়, কমোডের ব্যবস্থা করুন। কমোড একান্তই না থাকলে প্লাস্টিকের কমোড কিনুন।
চিকিৎসকের মতে, শুধু ওষুধ খাওয়াই নয়, তার পাশাপাশি কাজ করার ভঙ্গীও বদলাতে হবে। ঘাড় বা পিঠ বেঁকিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসার অভ্যাস বদলাতেই হবে। আমাদের শিরদাঁড়ায় কিছু ডিস্ক রয়েছে তা ব্যবহারের ফলে নষ্ট হতে পারে। এরা আশপাশের হাড় ও মাংসপেশির উপরে চাপ দেয়। পেশার তাগিদে তেমনভাবে বসতে হলে মাঝে মাঝেই উঠে হাঁটতে হবে। ঘাড় এ দিক ও দিক ঘুরিয়ে নিতে হবে, ঘড়ির কাঁটার দিকে ও ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘাড় ঘুরিয়ে ফের সিটে এসে বসুন। চাকা লাগানো ঘোরানো চেয়ারে না বসে চেষ্টা করুন। কাঠের চেয়ারের ব্যবস্থা করতে হবে। চেয়ারে সোজা বসুন। আরাম করে হেলান দিয়ে পিঠকে সাপোর্ট দিয়ে নয়, এতে মেরুদণ্ডকে বেঁকে যেতে থাকে। ২০-৩০ মিনিট অন্তর অবশ্যই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। খেয়াল রাখবেন বসার সময় পা যেন মাটি ছুঁয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে বেল্ট, কলার বা বিশেষ ট্রাকশান নেয়ার ব্যায়াম দেওয়া হয়।
অস্থি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পন্ডিলাইটিস আসলে শিরদাঁড়ার হাড়ের সমস্যা। জন্মের পর থেকে আমাদের হাড়ের সংযোগস্থল বা অস্থিসন্ধিগুলো যেমন থাকে, তা নিয়েই আমরা বেড়ে উঠি, এ বার সে সব ব্যবহার করতে করতে যন্ত্রের মতোই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। কখনও আবার অস্থিসন্ধির অঞ্চলে থাকা তরল জেল বাইরে বেরিয়েও আসে। তখনই জানান দেয় ব্যথা। ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সারাক্ষণের ব্যথা, ঘাড় নাড়াতে অসুবিধা হওয়া এই রোগের মূল কষ্টের দিক। ঘাড়ের দিকের অংশে এই রোগ হলে তাকে আমরা বলি, সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলাইটিস। আবার শিরদাঁড়ার নিচের দিকের অংশে অর্থাৎ পিঠের নিচের দিকে হলে তাকে আমরা বলি লাম্বার স্পন্ডিলাইটিস।

যে ব্যাঙ নিখুঁতভাবে প্রেগনেন্সি পরীক্ষা করতে পারে

ব্যাঙ দিয়ে প্রেগনেন্সি টেস্টের একটি পুস্তিকা
আফ্রিকায় সাহারা মরুভূমির আশেপাশের দেশগুলোতে, যা সাব-সাহারান এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে ছিল বিশেষ এক জাতের নখওয়ালা ব্যাঙ। এর নাম জেনোপস।
ওই এলাকার পানিতে লাখ লাখ বছর ধরে শান্তিতেই বাস করছিল ব্যাঙটি। কিন্তু হঠাৎ করেই, ১৯৩০ এর দশকে, ব্রিটিশ এক বিজ্ঞানী তার জীবনে বড়ো ধরনের এক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিলেন। কিন্তু কীভাবে?
জেনোপস নামের এই ব্যাঙটির শরীরে তিনি ইনজেকশন দিয়ে মানুষের মূত্র ঢুকিয়ে দিলেন।
ল্যান্সলট হগবেন নামের এই প্রাণীবিজ্ঞানীর কাজই যেন ছিল বিভিন্ন প্রাণীর শরীরের নানা রকমের জিনিস, বিশেষ করে হরমোন ঢুকিয়ে দেওয়া। তার উদ্দেশ্য ছিল এর ফলে ওই প্রাণীর শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটে সেটা লক্ষ্য করা।
প্রেগনেন্সি পরীক্ষায় এই জেনোপস ব্যাঙ ব্যবহার করা হতো ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত।
ঠিক এই একই ধরনের আরেকটি পরীক্ষার পর, অনেকটা দুর্ঘটনাবশতই, তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন যে এই ব্যাঙের ভেতরে প্রেগনেন্সি হরমোন ঢুকিয়ে দিলে সেটি ডিম পাড়তে শুরু করে দেয়।
শুধু তাই নয়, আজকের দিনে ভাবলে খুব অবাক হতে হয় যে ওই জেনোপস ব্যাঙ নির্ভুলভাবে ফলাফল বলে দিতে পারতো।
পরীক্ষাটি ছিল এরকম: নারী জেনোপস ব্যাঙের চামড়ার নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমে নারীর মূত্র ঢকিয়ে দেওয়া হতো। ৫-১২ ঘন্টা পর দেখা হতো ব্যাঙটি ডিম পেড়েছে কিনা।
ডিম পাড়লে নিশ্চিত হওয়া যেত যে ওই নারী গর্ভবতী।
প্রেগনেন্সি টেস্ট এখন খুব সহজ ও সাধারণ একটি বিষয়। একজন নারী ঘরে বসে একটি স্টিক দিয়েই জেনে নিতে পারেন তিনি গর্ভধারণ করেছেন কিনা।
নিখুঁতভাবেই বলে দিতে পারতো ব্যাঙটি। পরীক্ষাগারে করা হতো এই টেস্ট।
কিন্তু কয়েক দশক আগেও এই কাজটা এতোটা সহজ ছিল না।
মরেন সাইমন্স নামের এক নারী বলছিলেন, ১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি এই ব্যাঙ-এর সাহায্যে কীভাবে তার প্রেগনেন্সি টেস্ট করা হয়েছিল। তার এখনও মনে আছে এরকম এক পরীক্ষার কথা।
বিবিসিকে তিনি বলেন, "আমার মাথায় এই দৃশ্যটা এখনও পরিষ্কার গেঁথে আছে, অন্তত দুবার, একজন ডাক্তার আমার কাছে এসে বললেন, আপনি গর্ভবতী হয়েছেন - ব্যাঙটা ডিম পেড়েছে।"
সাধারণ লোকজনের জন্যে এই জেনোপস টেস্ট ব্যবহার করা হতো না। শুধুমাত্র জরুরী চিকিৎসাতেই এই এই পরীক্ষাটা করা হতো। যেমন আসলেই ভ্রুণের মতো কোন কিছুর জন্ম হচ্ছে নাকি তৈরি হচ্ছে টিউমার - সেটা নির্ণয় করতে জেনোপস টেস্ট করা হতো।
ব্রিটেনের অল্প কিছু হাসপাতালের ল্যাবে এই জেনোপস পরীক্ষা করা হতো।
মরেনের দুবার মিসক্যারেজ অর্থাৎ সন্তান জন্ম হওয়ার আগেই গর্ভপাত হয়ে গিয়েছিল। এবং এই জেনোপস ব্যাঙ-ই সেই সত্যটা বলতে পেরেছিল।
অল্প কিছু ল্যাবে এই পরীক্ষা করা হতো।
তিনি বলেন, "আমি এখন বুঝতে পারি যে ওরকম একটা টেস্ট করিয়ে আমাকে কতোটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।"
চিকিৎসা-ইতিহাসবিদ জেসে ওলসজিঙ্কো-গ্রিন বলেন, আধুনিক কালে এই টেস্টটিকে খুব অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে এটা ছিল খুব বড় ধরনের ঘটনা। আজকে যেমন বাড়িতে পরীক্ষা করেই বোঝা যায় কেউ সন্তানসম্ভবা কিনা, তখনও এই টেস্ট অনেকটা সেরকমই ছিল।
গর্ভধারণ ও তার পরীক্ষার ব্যাপারে এটা ছিল একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
"আপনি নিজেকে ১৯৩০ এর দশকে নিয়ে যান, তখন বুঝতে পারবেন, কারণ সেসময় কেউ গর্ভধারণ করেছেন কিনা সেটা বোঝার উপায় ছিল না। এ নিয়ে কথাও বলা যেত না। সংবাদপত্রে প্রেগনেন্সি শব্দটাই লেখা যেত না। এটা এতোটাই জীববিজ্ঞানের বিষয় ছিল। ছিল অভদ্রতাও," বলেন তিনি।
তিনি বলছেন, এই টেস্টের মাধ্যমেই প্রেগনেন্সি বিষয়টি দৃশ্যমান হলো। আর সেটা করেছিল জেনোপস নামের এই ব্যাঙটি।
"প্রেগনেন্সি পরীক্ষা হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীর আবিষ্কার। কিন্তু ওই জেনোপস টেস্টের মাধ্যমেই গর্ভধারণ, শিশু জন্মদান এবং প্রজননের মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে," বলেন তিনি।
১৯৭০ এর দশকেই বাড়িতে বসে প্রেগনেন্সি টেস্টের উপায় বের হলো। এর পর থেকেই জেনোপস ব্যাঙ ফিরে গেল তার শান্তিপূর্ণ জীবনে।
পরীক্ষাটি ছিল এরকম: নারী জেনোপস ব্যাঙের চামড়ার নিচে মূত্র ঢকিয়ে দেওয়া হতো। ৫-১২ ঘন্টা পর দেখা হতো ব্যাঙটি ডিম পেড়েছে কিনা।

Thursday, September 15, 2022

গল্প- অবচেতনের সহোদরা by জাকির তালুকদার

[৪৮ বছর মনের ওপর পলেস্তারা পড়ার মতো যথেষ্ট সময় বলে যখন মনে হতে থাকে, ঠিক তখনি একজন বোনের আর্তি হুড়মুড় করে ধসিয়ে দেয় ভুলে-যাওয়া দেয়ালগুলোকে। আর মানুষ তখন পুরোপুরি ফিরে যায় ৪৮ বছর আগে।]

মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ১৭ বছর হলে এখন ৬৫। কিন্তু গোলাম রসুলকে দেখলে কেউ তার বয়সের কথা ধারণাই করতে পারবে না। বড়জোর এটুকু বলতে পারবে যে, বয়স তার পঞ্চাশের এপার-ওপার। গোলাম রসুলের দোকানের সামনে সাইকেল থেকে নেমে আবদুর রশিদ বলল – ব্যানার্জিরা গাছ বেচবে রসুলভাই। চলো কাল দেখে আসি গাছগুলো। দেখেশুনে দরদাম করা যাবে।

নিশ্চিন্দিপুরের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের একসময়ের রেশন-ডিলার আরশেদ আলীর সেজো ছেলে আবদুর রশিদ। রেশন দোকান ছাড়াও আরো ব্যবসা আছে আরশেদ আলীর; কিন্তু লাল হয়ে গেছে রেশন দোকানের কল্যাণেই। সেই স্বাধীনতার পরপরের কথা। বঙ্গবন্ধু সে-সময় সব জিনিসের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন রেশনে। বাজারে তখন চাল-গম-তেলের আগুনদর। লোকে বলে রেশনের জিনিস বস্ন্যাকমার্কেট করত আরশেদ আলী। আরশেদ আলীর কানেও গেছে কথাটা; কিন্তু কোনো উচ্চবাচ্য করে না সে এ-ব্যাপারে। করলই না-হয় সে কালোবাজারি। আরশেদ আলী তবে ছাড়বে কেন? সেও তো বঙ্গবন্ধুর দলেরই লোক, সত্তরের ইলেকশনে ভোটও দিয়েছিল নৌকায়। ওর দোকানঘরে টাঙানো থাকত বঙ্গবন্ধু আর সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ছবি। প্রথমটা অবশ্য পঁচাত্তরে পনেরোই আগস্টের পর নামিয়ে রেখেছিল আরশেদ আলী। এ থেকেই বোঝা যায়, হাওয়া বুঝে পাল খাটাতে জানে আরশেদ আলী। তারপর রেশন উঠে গেল। এলো ভিজিডি কার্ড। কিন্তু পুঁজি যা বানিয়েছিল আরশেদ আলী, তা দিয়ে নানা ধরনের ব্যবসা করে এখন এলাকার মান্যিগণ্যি লোক। এহেন বাপের সেজো ছেলে আবদুর রশিদ জন্মদাতার বৈষয়িক বুদ্ধির এক কানাকড়িও পায়নি। আরশেদ আলীর অনেক দোকান। ধরে-বেঁধে ছেলেকে কোনো দোকানে বসালে মনমরা হয়ে বসে থাকে, খদ্দেরদের ত্যাড়া কথা বলে। আরশেদ আলী ব্যাটাকে পোষ মানানোর জন্য বিয়েও দিয়েছে অল্প বয়সেই। বছর ঘুরতে না ঘুরতে রশিদের বউ একটা নাতিও উপহার দিয়েছে আরশেদ আলীকে। কিন্তু রশিদকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আটকানো যায়নি। বিভিন্ন ব্যবসায় ফেল মেরে আবদুর রশিদ এখন কাঠের ব্যবসা করছে পার্টনারশিপে।

আবদুর রশিদের পার্টনার গোলাম রসুল নিশ্চিন্দিপুর বাজারের ‘পলাশ ফার্নিচার হাউজ’-এর মালিক। স্বাস্থ্যটা খুব সুন্দর। হাত-পায়ের থোকা থোকা পেশিই বলে দেয় একসময় দশাসই জোয়ান ছিল সে। এখনো অবশ্য মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়েনি। মাথার চুল উঠে গেছে সামনে আর ওপর থেকে। শুধু কানের পাশ আর ঘাড়ের ওপর দিয়ে অল্প কাঁচা আর বেশি পাকা চুলের একটা রেখা ঘিরে রেখেছে চকচকে টাককে। গোলাম রসুল অবশ্য এখানকার আদি বাসিন্দা নয়। সে এসেছে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়। ঢাকায় তার বাপ কী একটা চাকরি করত। পঁচিশে মার্চের রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে ব্রাশফায়ারে মারা গেছিল। মা আর বোনকে নিয়ে গোলাম রসুল আটকা পড়েছিল ঢাকাতেই। বাধ্য হয়ে সেখানেই ছিল। কিন্তু রাজাকার আর মিলিটারিরা ওর বোনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আর চুপ থাকেনি সে। মাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিল নিশ্চিন্দিপুরে। মায়ের দূরসম্পর্কের ভাই শওকত উকিলের বাড়িতে মাকে রেখে যুদ্ধে গেল গোলাম রসুল। যুদ্ধশেষে আর ঢাকায় ফিরে যায়নি। উকিলের একমাত্র মেয়ে নয়নতারাকে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেছে সে। এর মধ্যে শওকত উকিল মরে গেছে। দুই ছেলে এক মেয়ের বাপ হয়েছে গোলাম রসুল। যুদ্ধশেষে ঢাকায় গিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজেছে বোনকে, কিন্তু পায়নি। বোনের কথা কখনো মুখে আনে না গোলাম রসুল। কিন্তু ওর ঘনিষ্ঠ লোকেরা জানে, বোনের জন্যে একটা ভীষণ নরম জায়গা আছে ওর বুকের মধ্যে।

আবদুর রশিদের কথা শুনে মুখ তুলল গোলাম রসুল। একটা ন্যাকড়ায় হাত মুছতে মুছতে বসল বেঞ্চিতে। জানতে চাইল – ব্যানার্জিদের গাছগুলো কি ভালো?

ভালো মানে! – বেঞ্চিতে একটা চাপড় মেরে বলল আবদুর রশিদ – এই তল্লাটে অমন গাছ অন্য কোথাও নেই, এ আমি হলপ করে বলতে পারি রসুলভাই। চলো না নিজের চোখেই দেখবে।

বলতে বলতে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে গোলাম রসুলের দিকে বাড়িয়ে ধরল আবদুর রশিদ। গোলাম রসুল বয়সে ওর বেশ কয়েক বছরের বড়। আগে লুকিয়ে সিগারেট টানত আবদুর রশিদ। একসঙ্গে কাজ করতে হয়, বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে হিসাবপত্তর করতে হয়। বারবার আড়ালে সিগারেট টানতে যেত আবদুর রশিদ। বুঝতে পেরে তার সামনেই সিগারেট খাওয়ার পারমিশন দিয়ে দিয়েছে গোলাম রসুল।

আবদুর রশিদের প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে দেশলাই জ্বালালো গোলাম রসুল। নিজেরটা ধরিয়ে রশিদের দিকে আগুনটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে দেখল রাস্তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সে। সেদিকে তাকিয়ে ছাপা শাড়িপরা একটা মেয়েকে দেখতে পেল গোলাম রসুল। ওর চেনা মেয়েটা। দুখু পাগলার বউ পুতুল। দুখু পাগলা অর্থাৎ দুখেন ছেলেটার রাজনীতির খাই ছিল খুব। আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করত। মাকে নিয়ে থাকত। হঠাৎ একদিন বিয়ে করে বউ নিয়ে এলো। কোথা থেকে কে জানে। ওর শ্বশুরবাড়ি কোথায়, শ্বশুর-শাশুড়ি, শালা-সম্বন্ধী কেউ আছে কিনা তা জানে না নিশ্চিন্দিপুরের মানুষ। তাই অনেকের ধারণা, পুতুলকে তুলে এনেছিল দুখেন কোনো দূরের গ্রাম থেকে। মা আর বউ নিয়ে ভালোই ছিল দুখেন। কিন্ত মাথায় অতিবিপস্নবী রাজনীতির পোকা। সর্বহারাদের দলে নাম লিখিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল। কাটা বন্দুক আর কয়েকটা থ্রি-নট-থ্রি দিয়ে সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিজিবিকে হারিয়ে বিপস্নব করবে। ছয়-সাত মাস পরে খবর এলো ধরা পড়েছে দুখেন পুলিশের হাতে। জেলে বোধহয় মাত্রাছাড়া টর্চার করা হয়েছিল। বছর দেড়েক পরে বদ্ধপাগল অবস্থায় ছাড়া পেল জেল থেকে। একেবারে বদ্ধপাগল। এখানে-সেখানে পড়ে থাকত, নিজের মনে বিড়বিড় করত। তারপরে বছর-দুই হলো উধাও গ্রাম থেকে।
কোথায় গেছে কেউ জানে না। মাঝে মাঝে গুজব শোনা যায় কেউ এখানে দেখেছে কেউ সেখানে দেখেছে – কিন্তু ওই পর্যন্তই।

আর এদিকে যা হওয়ার তাই ঘটল। শাশুড়িকে নিয়ে থাকে পুতুল। বাপের বাড়ির কথা নেই মুখে। রাত-বিরেতে ঘরের দরজায় টোকা, ফিসফিস করে ডাকা শুরু হলো কদিন বাদেই। শাশুড়িরও  নাকি সায় ছিল। খেয়ে তো বাঁচতে হবে। কিছুদিন পর জানা গেল ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে বুড়ো চৌধুরীর ছেলে খোকা চৌধুরী মজমা করছে রোজ পুতুলের ঘরে। আরো অনেকের চোখ ছিল পুতুলের ওপর, কিন্তু খোকা চৌধুরীর সঙ্গে পাল্লা দিতে যাবে কে? অমন বুকের পাটা নিশ্চিন্দিপুরে কারো নেই। কিন্তু হালে শোনা যাচ্ছে, খোকা চৌধুরীর সঙ্গে আর বনিবনা নেই পুতুলের। ব্যানার্জি-গিন্নির কাছে আশ্রয় নিয়েছে পুতুল। কাজকাম করে, থাকে ব্যানার্জিদের বাড়িতেই। ব্যানার্জিদের বাড়িতে অবশ্য বেশি লোক নেই। শুধু বুড়োবুড়ি দুজন আর সরকারমশাই। ব্যানার্জিরা আগে এই তল্লাটের জমিদার ছিল। দুই ছেলের একজন ডাক্তার, একজন ঠিকাদার। একজন থাকেন ইরানে, একজন ঢাকায়। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে ওপারে। বহরমপুরের এক বনেদি পয়সাওয়ালা ঘরে। এখানকার বিশাল বাড়ি আর সম্পত্তি আগলে রেখেছে দুই বুড়াবুড়ি আর তাদের পরিবারের সঙ্গে ষাট বছরের সম্পর্কযুক্ত সরকারমশাই।

আবদুর রশিদের ঘাড়ে একটা থাবড়া মারল গোলাম রসুল। চমকে উঠে পুতুলের ওপর থেকে দৃষ্টি ফেরাল সে। হেসে উঠে বলল গোলাম রসুল – কী রে! চোখ দিয়ে যে চাটছিস মেয়েটাকে। অবশ্য তুই যে চান্স নিতে গেছিলি, সে-খবরও আমি জানি।

মুখ কাঁচুমাঁচু করে ফেলল আবদুর রশিদ – কী যে বলো রসুলভাই। আল্লাহর কিরে, অমন বদচিন্তা আমার মনে আসেনি কখনো।

গোলাম রসুল বলল, জানি বাবা জানি। চিন্তা তোর মাথায় ঠিকই এসেছিল। তুই তো কিছুদিন ঘুরঘুরও করেছিস। পারিসনি শুধু ওই খোকা চৌধুরী আর তার দুই সাগরেদ হীরু আর অনন্ত গু-ার ভয়ে।

-------দুই-------

পরদিন সকালে ব্যানার্জিদের বাগানে এলো দুজন। আবদুর রশিদ গেল সরকারমশাইকে খুঁজতে। তিনিই গাছ দেখাবেন, দামদস্ত্তর করবেন; কিন্তু সরকারমশাই বাজারে গেছেন। অবশ্য ফেরার কথা কিছুক্ষণ বাদেই। অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল ওরা।

বাগানটা ব্যানার্জিদের বাড়ির পেছনদিকে। বিরাট বড় বাগান। আম-কাঁঠাল, কড়ই আর শিমুলের গাছ। বাগানের পরই বিরাট পুকুর। গোটা এলাকাই দেড় মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এখন অবশ্য পাঁচিল ভেঙে পড়েছে এখানে-ওখানে। পুকুরের ঘাটের অবস্থাও সেরকম। পুকুরের ধারে চিৎ হয়ে শুয়ে সিগারেট টানতে লাগল গোলাম রসুল। পাশে বসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল আবদুর রশিদ। হঠাৎ উলটো দিকের ঘাটে চোখ আটকে গেল ওর। সিঁড়িতে বসে গা ডলছে পুতুল। মুখ তুলে ওদের দিকে পিছন ফিরে টুপ করে ডুব দিলো বারকয়েক। তারপর ঘাটে উঠে চুল মুছল, আঁচল চিপল পিছন ফিরেই। ভেজা কাপড়ের নিচে দেহের বাঁকগুলো স্পষ্টই বোঝা যায়। নিজের অজামেত্মই ঢোক গিলল আবদুর রশিদ। শরীর বটে মেয়েটার। চট করে গোলাম রসুলের দিকে তাকাল আবদুর রশিদ। চোখ বুঁজে চিৎ হয়ে আছে সে। মুখ তুলে আবার পুতুলের দিকে তাকাল আবদুর রশিদ। পুতুল ততক্ষণে ব্যানার্জি বাড়ির খিড়কি দুয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।

এই সময় আরো লোকের উপস্থিতি অনুভব করল আবদুর রশিদ। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো তিনজন মানুষ। ভালো করে তাকাতেই আঁতকে উঠল সে। খোকা চৌধুরী আর তার দুই সঙ্গী হীরু, অনন্ত। অনমেত্মর হাতে ওর সবসময়ের অস্ত্র – সাইকেলের চেইন। দৌড়ে গিয়ে খোকা চৌধুরী জাপটে ধরল পুতুলকে। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে একটা ঝোপের দিকে।

ছেড়ে দাও আমাকে, ছেড়ে দাও বলছি – চেঁচিয়ে উঠল পুতুল। এতক্ষণে বোধহয় তন্দ্রামতো লেগেছিল গোলাম রসুলের। পুতুলের চিৎকার শুনে চোখ খুলল। ভয়ে উত্তেজনায় এরই মধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে আবদুর রশিদ। কোনোমতে বলল – খোকা চৌধুরী … পুতুলকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে!

পুতুলের চিৎকার শোনা গেল আবার – ভাই তোমরা আমাকে বাঁচাও!

‘ভাই’ শব্দটা কানে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিক শক খাবার মতো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল গোলাম রসুল। একরোখা ষাঁড়ের মতো ছুটল ঝোপের দিকে। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তার পিছু নিল আবদুর রশিদও। ঝোপের কাছে গোলাম রসুলের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে হীরু আর অনন্ত। বলল – এদিকে আইসেন না। মাগিটার বড় বাড় হইছিল। টাইট দিয়ে চলে যাব আমরা।

রাগে ফুলছে গোলাম রসুল – এ কি মগের মুলস্নুক পেয়েছ? মেয়েছেলেকে জোর করে …

কথা শেষ না হতেই মুখিয়ে উঠল অনন্ত – যা খুশি করব আমরা। ও কি আপনার বউ না বেটি যে নাক গলাতে আইছেন?

আর সহ্য করতে পারল না গোলাম রসুল। চটাস করে চড় মারল অনমেত্মর গালে। স্তম্ভিত হয়ে গেল অনন্ত। হীরু আর আবদুর রশিদও কম অবাক হয়নি। এই তল্লাটে কেউ অনন্তর গায়ে হাত তুলতে পারে! তার ওপরে এই প্রায়-বুড়ো, নিশ্চিন্দিপুরের অস্থানীয় গোলাম রসুল। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে কোমর থেকে ছোরা বের করল হীরু। ভাঁজ খুলছে। জোয়ান বয়সে ঘুসি মেরে ঝুনো নারকেল ছিলেছে গোলাম রসুল। সেই রকমের ওজনের একটা ঘুসি ছুড়ল হীরুর মুখ লক্ষ্য করে। কাটা কলাগাছের মতো ধপাস করে মাটিতে পড়ল হীরু। হাত থেকে ছুরি ছিটকে চলে গেছে দূরে। হাতের চেইন ঘুরিয়ে মারল অনন্ত। সরে দাঁড়িয়েছিল গোলাম রসুল। তবু ডান ভুরুর কাছে কপাল ছুঁয়ে গেল চেইন। সঙ্গে সঙ্গে চামড়া ফেটে রক্ত বেরোল। কিন্তু ভ্রম্নক্ষেপ না করে অনন্তর কবজি ধরে মোচড় দিলো গোলাম রসুল। ফট শব্দ তুলে ভাঙল কবজির হাড়। পেছনদিকে কষে একটা লাথি মারতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল অনন্ত। তারপর উঠে দাঁড়িয়েই ছুট দিলো বাগানের গেটের দিকে। এদিকে হীরু সবেমাত্র মাথা তুলতে যাচ্ছে। তার চোয়াল বরাবর লাথি হাঁকাল গোলাম রসুল। এক গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অনন্ত যেদিকে গেছে সেদিকেই দৌড় লাগাল হীরু।

ঝোপের ওপাশে গাঁ-গাঁ শব্দ হচ্ছে। বোধহয় খোকা চৌধুরী মুখ চেপে ধরেছে পুতুলের। টর্পেডোর মতো ছুটে গেল গোলাম রসুল।

পুতুলকে চিৎ করে ফেলে ওর ওপর উঠে বসেছে খোকা চৌধুরী। শাড়ি, বস্নাউজ ছিঁড়ে ফেলেছে। কোমরের কাছে হাত দিয়ে পেটিকোটের ফিতে ধরে টানছে। ঝাঁকড়া চুল মুঠি করে ধরে খোকা চৌধুরীকে টেনে তুলল গোলাম রসুল। তারপর ধাঁই করে বসাল ঝুনো নারকেল-ছেলা ঘুসি। পড়ে গিয়েও এক গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়াল খোকা চৌধুরী। চোখে আগুন জ্বলছে – আমার কাজে নাক গলানোর শাস্তি তুমি পাবে। চবিবশ ঘণ্টার মধ্যে তোমাকে যদি নিশ্চিন্দিপুরছাড়া না করি তো …

অনন্তর ফেলে যাওয়া চেইনটা তুলে নিয়ে এগোচ্ছে গোলাম রসুল। দেখতে পেয়ে মুখের কথা শেষ না করেই ছুট লাগাল খোকা চৌধুরী। বলা যায় না বাবা। যে-মূর্তি ধরেছে গোলাম রসুল – জানে মেরে ফেলতে পারে!

------তিন------

মাঝরাতে দাওয়ার বাঁশের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে গোলাম রসুল। একা। কপালে লিউকোপস্নাস্ট দিয়ে তুলো লাগানো। তারার আলোয় ঝকঝক করছে আকাশ। আটচলিস্নশ বছর আগে ফিরে গেছে সে। একাত্তরের সেই রাতটাও এমনি তারাজ্বলা ছিল। সেদিনও বাতাসে ভেসে এসে গোলাম রসুলের কানের পর্দায় আছড়ে পড়েছিল দুটো শব্দ – ‘ভাইজান বাঁচাও!’

সেদিন কিছুই করতে পারেনি গোলাম রসুল।

আজ এত বছর পরে বোধহয় একটু সান্তবনার শান্তি নিয়ে ঘুমাতে পারবে সে।