Monday, March 24, 2014

বাকস্বাধীনতা ও কণ্ঠরোধের চেষ্টা!

দীর্ঘকাল উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্তকেই প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা গেছে। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাকস্বাধীনতার প্রতি হুমকি। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে টিআইবি নিয়ে যা ঘটল তা উপমহাদেশীয় উদ্বেগজনক প্রবণতা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। আবার বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঘটনা ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনজনিত দুর্বিপাক থেকেও বিচ্ছিন্ন নয়। ভারতের দৈনিক হিন্দুর শীর্ষ সম্পাদকের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে সিদ্ধার্থ ভারাদারাজনকে। পত্রিকার মালিক চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির আলোকচিত্র প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপাতে হবে। সম্পাদক রাজি হননি। এরপর সিদ্ধার্থের বাড়ির তত্ত্বাবধায়ককে ‘চার দুর্বৃত্ত’ পেটায়। তাঁর অধ্যাপক স্ত্রীকে হুমকি দেওয়া হয়। থিরু বিরুপ্পনের তামিলভাষী জনপ্রিয় টক শো ১৭ বছর চলার পর গত ডিসেম্বরে বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ তিনি বলেছিলেন, মোদিকে ভোট দেওয়ার আগে ভাবুন। ১৭ মার্চে আল-জাজিরার একটি নিবন্ধের শিরোনাম ‘ভারত এখনো মুক্তকথার দেশ নয়’। নির্বাচন সামনে রেখে বাধানিষেধের বেড়াজাল বাড়ছে। ওপেন ম্যাগাজিনের সাংবাদিক হরতোষ সিং মোদি ও রাহুল গান্ধীকে সমালোচনা করে নিবন্ধ লেখেন। তিনি চাকরি হারান। কারণ, মালিকপক্ষ ‘রাজনৈতিক শত্রু’ সৃষ্টি করতে চায়নি। ভারতের বিখ্যাত লেখক অনন্য বাজপাই আল-জাজিরাকে বলেন, কংগ্রেস, শরিক সরকার, বিজেপি, কি বাম—কারও অবস্থানই পরিষ্কার নয়। বাকস্বাধীনতায় তাদের অসহিষ্ণুতা ও অবিশ্বাস সাধারণ ঘটনা। বাজপাই ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩ক (সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি)
ও ২৯৫ক (ধর্মবিশ্বাস) এর সংস্কার চান। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও শৈল্পিক লেখালেখিকে সুরক্ষা দিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিদ্বেষপ্রসূত ও ভুয়া মামলা থেকে সুরক্ষা দরকার। ১১ মার্চে তিনি তবু চার হাজার ৬০টি সইসহ আবেদনটির ইতি টানেন। ওই দুটো ধারা আমাদের দণ্ডবিধিতেও অবিকল আছে। বাজপাই জানেন ক্ষমতায় যিনিই আসুন, এই আইন কেউ বদলাবে না। ওখানে তবু সংস্কারের দাবি উঠেছে। এখানে তাও নেই। গলাটেপা রোগের বিষয়ে হালকাচালে নিন্দামন্দ করে সবাই চুপ থাকব। অস্ত্রোপচার করব না। বিষবৃক্ষের শিকড় ওপড়াব না। বাংলাদেশ সংবিধানে বাকস্বাধীনতা যেভাবে আছে সেটা বুঝতে ভারত ও মার্কিন সংবিধানকে বুঝতে হবে। ভারতে ১৯৮৬ সালে একটি মামলা উঠল সুপ্রিম কোর্টে। স্কুলের তিনটি বাচ্চা জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকৃতি জানাল। কারণ, ওরা জেহভা ধর্মাবলম্বী। জাতীয় সংগীতে বর্ণিত ঈশ্বরে ওদের বিশ্বাস নেই। ওদের বহিষ্কার করা হলো। কেরালা হাইকোর্টে ওরা বিচার পেল না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বললেন, যুক্তিসংগত বাধানিষেধ দিয়ে নির্দিষ্ট আইন থাকতে হবে। ওরা আইন মান্যকারী। গান না গাইলেও ওরা গানের সময় দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানায়। আর ধর্মীয় স্বাধীনতার জায়গা থেকে জাতীয় সংগীত না গাওয়ার অধিকার তাদের আছে। হাইকোর্টের রায় নাকচ হলো। ওরা জিতল। কোর্ট বললেন, ধর্মীয় বিশ্বাসে গান না গাওয়া কোনো আইনে বারণ ছিল না। তাই বহিষ্কারাদেশ অবৈধ। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ওই যুক্তি আমাদের জন্যও প্রযোজ্য। এটা বললাম এ কারণে যে দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা টিআইবি, সুজন এবং মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে অন্যায়ভাবে আক্রমণ করেছেন। নাগরিক সমাজের ভিন্নমত কীভাবে আইনবিরুদ্ধ, তা মন্ত্রীরা বলেননি।
কোথায়, কীভাবে তাঁরা ‘যুক্তিসংগত বাধা’ অতিক্রম করেছেন, তা নির্দিষ্ট করুন। সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হোক। ১৫৩ জন বিনা ভোটে কী করে জিতলেন, তা উচ্চ আদালতে বিচার্য। এই রিটের শুনানি শুরু হচ্ছে। তাই আমরা কী বলব না খোদ সংসদের বৈধতা এখনো অমীমাংসিত। টিআইবির ওপর আক্রমণ নতুন নয়। তাদের সূচকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের খেতাব দুই বড় দল পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। সংসদে প্রকৃত বিরোধী দল নেই। এ বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামানের যুক্তি সত্য। কিন্তু আগের সংসদেও কি ‘প্রকৃত বিরোধী দল’ ছিল? ৭০ অনুচ্ছেদ রেখে বৈধ বিরোধী দল দূরে থাক, সংসদীয়ব্যবস্থা চলতে পারে কি না, তা নিয়ে আমরা সংশয়গ্রস্ত। সব অবস্থায় কার্যকর দলের অস্তিত্ব একটারই থাকে, তার নাম ক্ষমতাসীন দল। গণতন্ত্রে বহুমত থাকবেই এবং তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতেই হবে। টিআইবির মন্তব্য যুক্তিনির্ভর। ডেপুটি স্পিকার যদিও টিআইবির অভিমতকে খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলেছেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও বলার অধিকার তাঁর আছে। নাগরিক সমাজের আয়ের উৎস বের করতে তদন্তের প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই। কিন্তু টিআইবির সঙ্গে কথিত মতে জঙ্গিবাদের সম্পর্ক থাকা এবং খালেদা জিয়ার সঙ্গে টিআইবির পার্থক্য খুঁজে না পাওয়া কার্যত বিদ্বেষপ্রসূত। ‘নির্বাচন শুধু জনগণের জন্য, সন্ত্রাসীদের জন্য নয়’ এই মন্তব্য আমাদের যারপরনাই বিচলিত করে। মিজানুর রহমান বলেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় হাতে গোনা কয়েকজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হলেও অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে কয়েক শ বা কয়েক হাজার।’ এ জন্য তাঁকে নিন্দা করা,
তাঁকে নীরব করে দেওয়া উত্তর নয়। এর উত্তর হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বিবৃতি দেবেন। সেখানে আমরা দেখব, সংখ্যাটা ‘হাতে গোনা’ কি না? ‘অজ্ঞাতনামারা’ কয়েক শ, নাকি কয়েক সহস্র। এজাহার তো অত্যন্ত বাসি খবর। অবিলম্বে আমরা ওসব মামলার অগ্রগতি জানতে চাই। দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লিখিত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা জানতে চাই। বিচারের হাল কী জানতে চাই। একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী করে মিজানুর রহমানের কাছে ‘হামলাকারীদের নাম’ জানতে চান। এ কাজ তো তাঁর নয়। তাই বিস্ময় প্রহসনমূলক হয়ে ওঠে যখন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কেন তিনি নাম বললেন না? কারণ এরা হলো সেই শক্তির বংশদলীয় ও তাদের ধারক। এরা তাদের খরচ জোগায়।’ এই বক্তব্য সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদকে অন্তত তিন শর্তে লঙ্ঘন করেছে। মন্ত্রীর ওই মন্তব্য প্ররোচনামূলক বটে। ক্ষমতাসীন দলের আরেকজন প্রবীণ নেতা অপ্রিয় বাস্তবতা উচ্চারণ করেছেন। ‘এই সমাজে দুই জাতের বুদ্ধিজীবী আছে।’ তাঁর কথায়, ‘আমাদের (আওয়ামী) বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের বুদ্ধিজীবীদের পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা স্পষ্ট করে কথা বলেন না। যেটা প্রকারান্তরে বিএনপি-জামায়াতের পক্ষেই যায়।’ এটা বুদ্ধিবৃত্তিক বাংলাদেশকে ভাগ করার স্বীকৃতি। একে জোড়া লাগাতে হবে। আমাদের বুদ্ধিজীবী। আমাদের সাংবাদিক। আমাদের কবি। আমাদের পেশাজীবী। সবই ঠিক থাকবে। কেবল ‘আমাদের’ শব্দটি আওয়ামী ও বিএনপি তরিকামুক্ত করে নৈতিক বাংলাদেশনির্ভর করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আপাতত এই ‘আমাদের’ কিংবা ‘ওদের’ ছাড়া এই রাষ্ট্রে তাঁরা আর কাউকে থাকতে দেবে কি না। মিজানুর রহমান ইচ্ছা-অনিচ্ছায় একটি নাজুক সংস্থার ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। ক্ষমতাসীনরা সেটুকুও সইতে পারছেন না। সরকারি ও তাদের মিত্র ‘বিরোধী দলের’ দায়িত্বশীল নেতাদের অসংযত মন্তব্য আমাদের উদ্বিগ্ন করে। তাঁরাও ভাবেন মুক্তকথাই এখন একমাত্র হুমকি। তাই আঘাত হানো। শাসকদের বুঝতে হবে এই রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতা কোনো নির্বাচন বা সরকারের বৈধতার ওপর নির্ভর করে না। এটা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ থেকে এসেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলাদেশ একটি বদ্ধ সমাজে পরিণত হতে চলেছে। ভিন্নমতের ওপর আক্রমণ চলছে। একটি একতরফা নির্বাচনের পরে বাকস্বাধীনতাকে এভাবে রুদ্ধ করার প্রবণতা শুভ নয়। সরকারকে এখন কেবল সহনশীল হলেই চলবে না, তার উচিত সমালোচনাকে আহ্বান জানানো। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সংসদের সমালোচনা করা নাগরিকের বাকস্বাধীনতার সীমার মধ্যে পড়ে কি না। পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ টিআইবিকে ‘সহিংসতা উসকে’ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। কিন্তু সেটা কীভাবে তা নির্দিষ্ট করেননি। তাদের বক্তব্য কি আশু হুমকি বয়ে এনেছে? এটা প্রমাণ করা যাবে না। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের উক্তি তাই দায়িত্বহীন। সরকার অন্যায্য নির্বাচন করেছে। এখন তার বায়না হচ্ছে তাকে বৈধতার সনদ দিতে হবে নবম সংসদের মতো। ভিন্নমতের বিরুদ্ধে যে প্রবণতা ক্রমে তীব্র হচ্ছে, যে অভিযোগ তাঁরা মুখে বলছেন, সেটা প্রচলিত আইনে রাষ্ট্রদ্রোহ বটে। যুক্তরাষ্ট্র ১৭৯১ সালে প্রথম সংশোধনী পাস করে বলেছিল কংগ্রেস বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করে কোনো আইন করবে না। ১৭৯৮ সালের মার্কিন রাষ্ট্রদ্রোহ আইনটা তাই টিকল না। ভারত রাষ্ট্রদ্রোহ-সংক্রান্ত ঔপনিবেশিক ১২৪ক রেখে দিলেও জওহরলাল নেহরু থেকে অমর্ত্য সেন তাকে ‘সেকেলে ও উদ্ভট’ মনে করেন। বাংলাদেশের শাসককুল ভুলেও এটা স্বীকার করে না। সত্য বটে ভারতের অর্থলোভী রাজনীতিকেরাও এ থেকে বেরোতে চান না। আসলে ভিন্নমত দলনে, ভয় পাইয়ে দিতে একে বর্ম হিসেবে ব্যবহারের লোভ সামলানো কঠিন। অরুন্ধতী রায় ও ড. বিনায়ক সেনদের শায়েস্তা করার অস্ত্র হাতছাড়া হয়ে গেলে চলবে কি করে?
ভারতীয় কার্টুনিস্ট অসীম ত্রিবেদিকে দুই বছর আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি তাঁর কার্টুনে ভারতের সংসদ নিয়ে টয়লেট, নর্দমা এঁকেছেন। লন্ডনের গার্ডিয়ান তাঁর কার্টুন ছেপেছে, পাকিস্তানি সন্ত্রাসী আজমল ভারতীয় সংবিধানের ওপর প্রস্রাব করছে। রাষ্ট্রদ্রোহ ও সংসদকে ঠাট্টার দায়ে অসীম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সংসদে জ্বালাময়ী বক্তৃতাও হলো। কিন্তু তা প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে নয়। ভারতের প্রেস কাউন্সিলের বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি মারকান্ডেকাজু। তিনি সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। তিনি বললেন, ‘এটা তাঁর বাকস্বাধীনতার অংশ। অসীম অবৈধ কিছুই করেননি।’ ২০ মার্চ লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস-এ পড়লাম। কয়েক দশক ধরে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কর্মী, নাগরিক অধিকারকর্মীদের সুরক্ষা দিতে প্রথম সংশোধনী ছিল লিবারেলদের রক্ষাকবচ। এখন রক্ষণশীলরা একে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আমাদের সংশোধনীর কমতি নেই। দুর্ভাগ্য আমাদের বাকস্বাধীনতা সংরক্ষণ করে, তেমন সংশোধনী নেই। রক্ষাকবচ নেই। টিআইবি, সুজন ও মিজানুর রহমানকে যা নিয়ে সমালোচনা, তা দুর্ভাগ্যজনক। সংসদ ও সরকারের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ রেখে এখন কণ্ঠরোধের এতখানি চেষ্টা, পরিহাসমূলকই মনে হয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

সকালে ঢাকায় প্রাতরাশ, ইয়াঙ্গুনে দুপুরের খাবার

৬ মার্চ আমরা বিমানের যে ফ্লাইটে ইয়াঙ্গুন যাই, তার বেশির ভাগ যাত্রীই ছিলেন ব্যবসায়ী। ফিরতি ফ্লাইটে এ আর দাশ নামে একজনের সঙ্গে আলাপ হলো। কিছুটা ঠাট্টার সুরে তিনি বললেন, ‘আপনাদের জন্য বাংলা নববর্ষের ইলিশ আনতে গিয়েছিলাম।’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি আরও জানালেন, ‘আপনারা যে মাছ খান তার বড় একটা অংশ আসে মিয়ানমার থেকে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেখানে মাছের ঘের আগাম কিনে রাখেন। আর ইলিশ আসে বর্মার সমুদ্র থেকে।’ বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তারই একটি চালানের টাকা জমা দিতে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের এই তরুণ ব্যবসায়ী। জাহাজযোগে মাছ আসবে আরও কদিন পর। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ কাঠও আনেন মিয়ানমার থেকে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ সারা পৃথিবীতে বার্মাটিকের কদর। বর্তমানে আস্ত গোল কাঠ আমদানি করা গেলেও ৩১ মার্চের পর আর সেটি সম্ভব হবে না, মিয়ানমার সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে। এই ফ্লাইটেই পারটেক্স গ্রুপের এক কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় হলো। ইয়াঙ্গুনে তাঁদের অফিস আছে। পারটেক্স আসবাবে ব্যবহূত কাঠও তাঁরা আনেন মিয়ানমার থেকে। আমাদের ফ্লাইটে চট্টগ্রামের আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী ছিলেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে ব্যবসা করেন। মিয়ানমার সরকার শর্তসাপেক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলে দিয়েছে। ব্যবসার লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব সবই করতে হয় স্থানীয় নাগরিকের নামে। যাকে বলে স্লিপিং পার্টনার। তবে তাঁরা বিশ্বস্ত। সম্প্রতি মিয়ানমার পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইনে বিদেশি নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইদানীং মিয়ানমারে কাজ শুরু করেছে ব্র্যাক।
তাদের অফিস ও কর্মী আছে। গ্রামীণ ব্যাংক মডেলের মাইক্রোক্রেডিট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্যাক্ট বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে কয়েকজন বাংলাদেশি কাজ করছেন মিয়ানমারে। সরকারি পর্যায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মিয়ানমারে রপ্তানি করত ৩৪৬.১৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০১২-১৩ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১০৯২.৫১ মিলিয়ন ডলারে। একই সময় আমদানি বেড়েছে যথাক্রমে ১৯৮৩.৬ মিলিয়ন থেকে ৬৭০৩ মিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ বাণিজ্য কমিশন (জেটিসি) বৈঠক হয় নেপিডোতে ১৪-১৫ জানুয়ারি। আলোচনা হয় সীমান্ত বাণিজ্য, কৃষি, পণ্য, মাছ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং নৌ, বিমান ও সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার। বিমান চালু হয়েছে। জুন নাগাদ জাহাজ চলাচল শুরু হবে। ২০১১ সালে মিয়ানমারে রাজনৈতিক সংস্কার শুরু হওয়ার পর দেশটিতে ব্যাপক বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য বেড়েছে। আগে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মিয়ানমার প্রতিবেশী চীন ও থাইল্যান্ডের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন বন্ধ দুয়ার খুলে গেছে। সারা বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল—সব দেশই সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমরা পিছিয়ে থাকব কেন? বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে মিয়ানমারে জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব গৃহীত হলে প্রচুর কৃষিশ্রমিকের কাজ মিলবে সেখানে। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের যে দুটো সমস্যা ছিল তার একটির শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ। এতে দুই দেশই খুশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখন সমুদ্রে যৌথ বিনিয়োগও সম্ভব। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চি এই সমুদ্রসীমা নির্ধারণকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, এর ফলে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা আরও বাড়ল। মিয়ানমার ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ামনার সীমান্তে পাইকারি ও মুক্তবাজার প্রতিষ্ঠারও প্রস্তাব দিয়েছে। দেশটির রয়েছে প্রচুর জমি, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ। আর আমাদের রয়েছে জ্বালানি ঘাটতি। সে ক্ষেত্রে মিয়ানমার থেকে আমরা সহজেই গ্যাস আমদানি করতে পারি। ভারত ইতিমধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্য দিয়ে গ্যাসলাইন স্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রথম প্রস্তাব ছিল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সেই গ্যাসলাইন যাবে। ত্রিদেশীয় গ্যাসলাইন না হলেও মিয়ানমার থেকে আমাদের সরাসরি গ্যাস আনতে কোনো বাধা নেই। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের দ্বিতীয় যে সমস্যা রোহিঙ্গা শরণার্থী। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে দেশের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সঙ্গে বৈঠককালে এর শান্তিপূর্ণ সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সম্পর্ক খুবই সোহার্দ্যপূর্ণ ছিল। দেশটির সঙ্গে আছে আমাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন। ব্রিটিশ আমলে অনেকে ভাগ্যের সন্ধানে ইয়াঙ্গুনে যেতেন, যার বর্ণনা আছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস শ্রীকান্ত-এ। শরৎচন্দ্র নিজেও ইয়াঙ্গুনে একসময় চাকরি করতেন। দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সবখানেই আছে। সমস্যা মিটিয়ে ফেলে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই উত্তম। কিন্তু সেটি সম্ভব না হলে সম্পর্ক তো থেমে থাকতে পারে না। ভারত-চীন সীমান্তবিরোধ বহুদিনের।
তার পর দুটি দেশ ব্যবসা-যোগাযোগ বাড়িয়ে চলেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের বেলায় আমাদের সেই নীতি অনুসরণ করা উচিত। গত ৩-৪ মার্চ মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে অনুষ্ঠিত হয় বহুমাত্রিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বঙ্গোপসাগরীয় উদ্যোগের (বিমসটেক) তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে সাতটি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান যোগ দেন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়াও দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দেন। এর আগে তিনি ২০১১ সালেও একবার মিয়ানমার সফর করেন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের ওপর জোর দেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার না হলে আঞ্চলিক জোট যে কোনো কাজে আসে না, সার্ক তার প্রমাণ। ২০১৩ সালের ৭ জুন মিয়ানমার নৌবাহিনীর ইউএনএসএস মহর থি হাম থুহারাজ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে শুভেচ্ছা সফর করে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে বিমান ও নৌ-যোগাযোগ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়; যার পরিপ্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা-ইয়াঙ্গুন সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান সপ্তাহে দুই দিন ইয়াঙ্গুন যায়। মিয়ানমারের বিমানেরও শিগগিরই ঢাকায় ফ্লাইট চালু করার কথা আছে। ২০১২ সালের মে মাসে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং নয়াদিল্লি সফরকালে ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাব দিলে মনমোহন সিং তা স্বাগত জানান। এই প্রস্তাবে সম্মতি আছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারেরও। এরপর ঢাকা ও ইয়াঙ্গুন হয়ে কলকাতা-কুনমিং মোটর শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়,
কুনমিংয়ে আয়োজন করা হয় বাণিজ্য মেলার। উল্লেখ্য, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে দক্ষিণ চীন থেকে দক্ষিণ এশিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ ছিল। সেই যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করতে চীন সাউদার্ন সিল্ক রোড তৈরি প্রস্তাব দিয়েছে; যার রুট হবে কলকাতা থেকে ঢাকা ও মান্দালে হয়ে চীনের কুনমিং। এই সড়ক চালু হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বহুগুণ বেড়ে যাবে, সাশ্রয় হবে পরিবহন খরচ। মিয়ানমারসহ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিনিয়োগ-বাণিজ্যের মহা আয়োজন চলছে। এর সক্রিয় অংশীদার হতে না পারলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। বিগত জোট সরকারের আমলে এশীয় মহাসড়ক ও ট্রান্স এশীয় রেলওয়ের রুট নিয়ে বিতর্কে অযথা সময় নষ্ট করা হয়েছে। আমাদের একশ্রেণীর রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবী এখনো হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সব ক্ষেত্রে তারা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব গেল গেল রব তোলেন। কিন্তু সার্বভৌমত্ব সুদৃঢ় করার উপায় হলো অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো। আর সেটি সম্ভব আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমেই। তবে আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য প্রতিবেশী বৃহৎ দেশগুলোরও উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তারা কেবল নিজেদের স্বার্থ দেখলে ছোট দেশগুলোর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আঞ্চলিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে একবার বলেছিলেন, ‘আমি সেই দিনের স্বপ্ন দেখি যেদিন একজন অমৃতসরে সকালের প্রাতরাশ সারবেন, লাহোরে দুপুরের খাবার খাবেন এবং রাতে কাবুলে গিয়ে নৈশভোজে অংশ নেবেন।’ আমরাও কি এ রকম স্বপ্ন দেখতে পারি না যে, সকালে ঢাকায় নাশতা খেয়ে (অবশ্যই সড়কপথে) ইয়াঙ্গুনে দুপুরের খাবারটি সারব আর রাতে কুনমিংয়ে নৈশভোজ সম্পন্ন করব?
আগামীকাল: সু চি কি পারবেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

এক পরির প্রেতজীবনের কথা

সুমাইয়া খাতুন
কত ফুল ফোটে আর ঝরে। সুমাইয়াও ঝরে গেছে। খুবই দীর্ঘ ছিল ওর ঝরে যাওয়া। লোভের আগুনে মিনিমাগনা জীবনগুলোর একটি ছিল সে। তাজরীনে বা রানা প্লাজায় যাঁরা হঠাৎ মরে বেঁচে গেছেন দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে, সুমাইয়া তাঁদের মধ্যে ছিল না। তাজরীনের আগুনের পরও মৃত্যুযন্ত্রণার ভয়াবহতা সওয়া ও দেখানোর জন্য বাড়তি কিছুদিন বেঁচে ছিল সে। বেঁচে ছিল একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জি ধরে তিলে তিলে শেষের দিনের অপেক্ষায়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সাভারের নিশ্চিন্তপুরে ওর যন্ত্রণার অবসান হয়। সেই গানটা মনে পড়ে: সারা নিশি জ্বলে কত দীপ নিভে যায়/ নিজে রে পোড়ায়ে ধূপ গন্ধ বিলায়। মুনাফা চুল্লির জ্বালানি এসব সুমাইয়াদের কথা কে আর মনে রাখে? মনে রাখলে অন্তত ক্ষতিপূরণ পেত, চিকিৎসায় সরকারি সাহায্য পেত। কিছুই না পেয়ে সুমাইয়া কেবল সরকার ঘোষিত মৃতশুমারির আরও একটি সংখ্যাই হয়ে গেল। ১৬ বছর বয়স হয়েছিল ওর। এই বয়সের কিশোরীর মন চৈতি হাওয়ার মতো ফুরফুরে হওয়ার কথা। কত কী প্রিয় হওয়ার কথা। দেলোয়ার হোসেনের তাজরীন কারখানায় কত কত রঙের সুতা-কাপড়-বোতাম-স্টিকার-লেইসের রংদার পোশাক সেলাই করত ও। অথচ ওর কোনো প্রিয় রং ছিল না। ও জানত যে মানুষ ৪০ বছরের বেশি বাঁচে না। ওর কোনো স্বপ্ন নেই; ওর মায়ের বয়স এখন ৩৩ কি ৩৪। ও জানত, ও বাঁচবে না, তবু মা যেন অন্তত ৪০ পর্যন্ত বাঁচে। ওর মায়ের একটা স্বপ্ন তবু ছিল। ইটভাটায় যতই তিনি রক্ত পানি করা খাটুনি খাটতেন, ততই স্বপ্নটা তীব্র হতো। বাচ্চামেয়েটি ওভারটাইম করে কিছু বাড়তি টাকা পেলে স্বপ্নটা সম্ভব মনে হতো। মায়ে-ঝিয়ে মিলে তারা ঘর তুলবে গ্রামে। দুজনে মিলে একদিন চলে যাবে রাক্ষসপুরী থেকে।
এই শহরে আর ভাল্লাগে না। আগুনে আহত সুমাইয়ার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্নটাও ধসে গেছে রানা প্লাজার মতো, পুড়ে গেছে তাজরীন ফ্যাশনসের মতো। শেষের তিন মাসে ভাত খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দিনে সাত-আটটা মরফিনেও ব্যথা যেত না। ওকে বাঁচানো, অভিযুক্ত কারখানা-মালিক দেলোয়ার হোসেনকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য নৃবিজ্ঞানী সায়দিয়া আহমেদ, মাহমুদ সুমন এবং অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল ইসলাম, নাজনীন শিফা ও কামরুল হাসানের মতো মানুষেরা যত লড়েছেন, তার তিলমাত্রও যদি সরকার করত, তাহলে সুমাইয়ার জীবনটা অন্য রকম হতে পারত। তাজরীনে আগুন লাগার পর ধোঁয়ায় অন্ধকার কারখানায় মেশিনপত্রের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে ভাঙা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে আহত হয় সে। খবর পেয়ে আশুলিয়ার ইটভাটা থেকে মা আসেন। সাহায্য না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে বাসে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ রওনা হন। বাসের ভেতরই; রক্ত থামাতে চার-পাঁচটি ওড়না ভিজে যায়। পরের ইতিহাস ভুল চিকিৎসায় জীবন আর সঞ্চয় হারানোর ইতিহাস। তাজরীনে আগুন লাগার তিন দিন আগের একটি ছবি আছে ওর, মুঠোফোনে তোলা। ১৮ ঘণ্টা কাজ করেও পরির মতোই ছিল সে। গত রোজার ঈদের আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে যাকে দেখি, সে আর সেই ছোট্ট পরিটি নেই। সে তখন নিজেরই প্রেতমূর্তি। বাঁ চোখটি ক্রমশ ঠেলে বেরিয়ে আসছে। দৃষ্টি নিভে যাচ্ছে, শরীর শুকিয়ে কাঠ, মাথার ভেতর চলছে অসহ্য যন্ত্রণা। তার দরকার ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যাওয়া। কিন্তু বিজিএমইএর মেডিকেল অফিসার একপ্রকার বাধ্য করেন ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হতে। অথচ সেখানে ওর অসুখের কোনো চিকিৎসা নেই। মাথার মধ্যে ‘ক্যানসারাস টিউমার’। চিকিৎসকেরা বলে দিয়েছেন, কিছু করার নেই। কিছু যখন করার থাকে না, তখনো তো অসহ্য যন্ত্রণা থেকে বাচ্চামেয়েটি পরিত্রাণ চায়।
পরিত্রাণ চায় ওর মাথার ভেতরের আগুনের পোকাগুলো থেকে। ওর বিশ্বাস, তাজরীনের সেই মরণসন্ধ্যায় আগুনের পোকাগুলো ওর মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। আসলেই দেলোয়ার হোসেনের মতো মালিকদের লোভের আগুনের পোকাই ওর মতো শ্রমিকদের কুরে কুরে খেয়ে শেষ করে দেয়নি কি? সায়দিয়াদের সুমাইয়াকে বাঁচাতে ব্যর্থ হলেও ওদের নিরন্তর আরজিতে আদালত কান পাতেন। দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনসে মালিকপক্ষের সুস্পষ্ট অবহেলায় আগুন লাগে। প্রাণ বাঁচানোর ব্যবস্থা না থাকায় ১১১ জনের তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে। সেই ঘটনার ঠিক এক বছর তিন মাস পর দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিয়তির করুণ লীলা, ঠিক সেদিনই চিকিৎসকেরা জানান, সুমাইয়ার সময়শেষ। ৬ মার্চ সুমাইয়া খাতুন মায়ের সঙ্গে চলে যায় সাভারের সেই নিশ্চিন্তপুরে। ওর মতো আরও ৩০-৪০ জন আহত শ্রমিক সেখানে স্বেচ্ছাসেবীদের দয়ায় বসবাস করতেন। সেখানেই সুমাইয়া শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে। বড়লোকের হয় মহাপ্রয়াণ, মাঝারিরা মৃত্যুবরণ করে, আর সুমাইয়ারা অকাতরে ঝরে যায়। অন্যদিকে রানা প্লাজার রানা একটি মামলায় জামিন পেয়েযান। সুমাইয়ার কাহিনি এখানেই শেষ। কিন্তু দেলোয়ার হোসেনের কাহিনি এখনো চলছে। সরকারি তদন্ত রিপোর্টে গ্রেপ্তারের সুপারিশ থাকার পরও যে ক্ষমতাবলে বছরের বেশি সময় তিনি অধরা ছিলেন, সেই ক্ষমতার দৌড়ও শেষ হয়নি। শ্রম ও জীবনের চূড়ান্ত ব্যবস্থাপক আসলে রাষ্ট্র ও সরকার। তারা চাইলে মালিকেরা নিয়ম মানবেন, শ্রমিকেরও জীবন বাঁচবে— শিল্পটিও টিকবে। সুমাইয়াদের মৃত্যুর দায় তাই রাষ্ট্রেরও। শ্রমবাজারের নামে যে দাসের বাজার চলছে, সেই বাজারে মানুষের জীবনের দাম কতটুকু হে রাজাধিরাজ?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

সুমাইয়ার মৃত্যু- এক পরির প্রেতজীবনের কথা by ফারুক ওয়াসিফ

কত ফুল ফোটে আর ঝরে। সুমাইয়াও ঝরে গেছে। খুবই দীর্ঘ ছিল ওর ঝরে যাওয়া। লোভের আগুনে মিনিমাগনা জীবনগুলোর একটি ছিল সে। তাজরীনে বা রানা প্লাজায় যাঁরা হঠাৎ মরে বেঁচে গেছেন দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে, সুমাইয়া তাঁদের মধ্যে ছিল না। তাজরীনের আগুনের পরও মৃত্যুযন্ত্রণার ভয়াবহতা সওয়া ও দেখানোর জন্য বাড়তি কিছুদিন বেঁচে ছিল সে। বেঁচে ছিল একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জি ধরে তিলে তিলে শেষের দিনের অপেক্ষায়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সাভারের নিশ্চিন্তপুরে ওর যন্ত্রণার অবসান হয়। সেই গানটা মনে পড়ে: সারা নিশি জ্বলে কত দীপ নিভে যায়/ নিজে রে পোড়ায়ে ধূপ গন্ধ বিলায়। মুনাফা চুল্লির জ্বালানি এসব সুমাইয়াদের কথা কে আর মনে রাখে? মনে রাখলে অন্তত ক্ষতিপূরণ পেত, চিকিৎসায় সরকারি সাহায্য পেত। কিছুই না পেয়ে সুমাইয়া কেবল সরকার ঘোষিত মৃতশুমারির আরও একটি সংখ্যাই হয়ে গেল।

তালেবান কি ফিরে আসছে? by মশিউল আলম

আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান ও ন্যাটো সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের সময় যত এগিয়ে আসছে, তালেবানের সহিংস তৎপরতায় ততই বাড়তি উদ্যম লক্ষ করা যাচ্ছে। গত দুই-আড়াই মাসে অল্প সময়ের ব্যবধানে তারা বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে অনেক মানুষকে হত্যা ও জখম করেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে কাবুলের অন্যতম বিলাসবহুল হোটেল সেরেনায় চার কিশোর তালেবান যোদ্ধা ঢুকে পড়ে দুই শিশুসহ নয় ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে, গুরুতর জখম করেছে ছয়জনকে। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশিসহ চারজন বিদেশি নাগরিক। শুক্রবার সকালে দক্ষিণ কান্দাহারে আরেক সন্ত্রাসী হামলায় তালেবানরা হত্যা করেছে তিনজনকে।

বাকস্বাধীনতা ও কণ্ঠরোধের চেষ্টা! by মিজানুর রহমান খান

দীর্ঘকাল উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্তকেই প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা গেছে। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাকস্বাধীনতার প্রতি হুমকি। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে টিআইবি নিয়ে যা ঘটল তা উপমহাদেশীয় উদ্বেগজনক প্রবণতা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। আবার বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঘটনা ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনজনিত দুর্বিপাক থেকেও বিচ্ছিন্ন নয়।

সকালে ঢাকায় প্রাতরাশ, ইয়াঙ্গুনে দুপুরের খাবার by সোহরাব হাসান

৬ মার্চ আমরা বিমানের যে ফ্লাইটে ইয়াঙ্গুন যাই, তার বেশির ভাগ যাত্রীই ছিলেন ব্যবসায়ী। ফিরতি ফ্লাইটে এ আর দাশ নামে একজনের সঙ্গে আলাপ হলো। কিছুটা ঠাট্টার সুরে তিনি বললেন, ‘আপনাদের জন্য বাংলা নববর্ষের ইলিশ আনতে গিয়েছিলাম।’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি আরও জানালেন, ‘আপনারা যে মাছ খান তার বড় একটা অংশ আসে মিয়ানমার থেকে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেখানে মাছের ঘের আগাম কিনে রাখেন। আর ইলিশ আসে বর্মার সমুদ্র থেকে।’ বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তারই একটি চালানের টাকা জমা দিতে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের এই তরুণ ব্যবসায়ী। জাহাজযোগে মাছ আসবে আরও কদিন পর।

‘রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়াকে যুক্ত করা পরিকল্পিত নয়’

ক্রিমিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করার দিকে নজর দিচ্ছে রাশিয়া। গত শনিবার রুশ বাহিনী সেখানে ইউক্রেনের একটি বিমানঘাঁটি দখলে নেওয়ার এবং রুশপন্থী বিক্ষোভকারীরা আরেকটি নৌঘাঁটিতে ঢুকে পড়ার পর এমনটাই মনে হচ্ছে। তবে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি ‘পরিকল্পিত’ ছিল না বলে দাবি করেন ইইউতে মস্কোর রাষ্ট্রদূত ভ্লাদিমির শিজভ। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিলে পশ্চিমারা ‘মারাত্মক ভুল’ করবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ন্যাটোর ইউরোপীয় কমান্ডার জেনারেল ফিল ব্রিডলাভ ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সেনা জড়ো করার পদক্ষেপের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মলদোভার ট্রান্স-ডাইনেস্টার অঞ্চল নিয়ে ন্যাটোর বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন সামরিক সহায়তা চাইলেও তাতে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। অবশ্য গতকাল রোববার কিয়েভে ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী আরসেনিয়ে ইয়াতসেনিউক ও জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক-ওয়াল্টার স্টেইনিমিয়ারের মধ্যে এক বৈঠকে ‘সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউক্রেন নিয়ে মস্কোর তৎপরতাকে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মতো ইউরোপকে বিভাজিত করার চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ সতর্ক করে দেন, ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার তৎপরতা দেশটিকে দীর্ঘ মেয়াদে ‘একঘরে’ করে ফেলবে। রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ গত বছরের নভেম্বরে ইইউর সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানালে ইইউপন্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। বিক্ষোভের মুখে তিনি গত ২২ ফেব্রুয়ারি পালিয়ে যান। এরপর ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত ক্রিমিয়ার কর্তৃপক্ষ ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ায় যোগ দেওয়ার তৎপরতা শুরু করলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ‘ইউরোপের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে’: ইউক্রেনের অন্তর্বর্তী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে জার্মানি বলেছে, রাশিয়ার তৎপরতা ইউরোপ মহাদেশের ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকিতে ফেলছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেইনিমিয়ার গতকাল ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ইয়াতসেনিউকের সঙ্গে বৈঠক শেষে বলেন, ‘ক্রিমিয়ার গণভোট... আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং তা ইউরোপকে বিভাজিত করার চেষ্টা।’ যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেগ প্রভাবশালী পত্রিকা সানডে টেলিগ্রাফ-এ লেখা এক নিবন্ধে মন্তব্য করেন, যুক্তরাজ্য ও তার মিত্ররা ভয়ে পালাবে না। ইউক্রেন প্রশ্নে মস্কো যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা রাশিয়াকে দীর্ঘ মেয়াদে ‘একঘরে’ করে ফেলবে বলেও সতর্ক করে দেন তিনি। এদিকে ইইউতে মস্কোর রাষ্ট্রদূত ভ্লাদিমির শিজভ দাবি করেন, ক্রিমিয়াকে যুক্ত করার মাধ্যমে ৬০ বছর ধরে চলা ‘অস্বাভাবিক’ অবস্থার অবসান ঘটেছে।এএফপি, বিবিসি ও সিএনএন।

ক্রিমিয়া সংকট মাথায় নিয়ে ইউরোপে ওবামা

বারাক ওবামা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আজ সোমবার থেকে ছয় দিনের ইউরোপ ও সৌদি আরব সফর শুরু করছেন। ক্রিমিয়া পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন মিত্রদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রশ্নে মার্কিন অবস্থানের যৌক্তিকতা তুলে ধরাই তাঁর এই সফরের লক্ষ্য। গত কয়েক বছরের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফর বলে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কঠোর বিরোধিতা সত্ত্বেও রাশিয়া ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়াকে রুশ ফেডারেশনের অংশ করে নেওয়াতেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ইউরোপ সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওবামা তাঁর সফরের শুরুতে আজ বেলজিয়াম যাবেন। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইউরোপ সফরে তিনি নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও ভ্যাটিকান সিটিতে যাবেন।
এই সফরে তিনি ব্রাসেলসে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ সম্মেলনে যোগ দেবেন। এই সম্মেলনে ক্রিমিয়ায় রুশ ‘আগ্রাসনের’ অভিযোগে মস্কোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হতে পারে। ওবামা এই সফরে দ্য হেগে উন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-৮-এর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। সেখানে সংগঠনে রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। ইউরোপ সফর শেষে সৌদি আরব যাবেন ওবামা। এএফপি।

নান থেকে পপ তারকা

সিস্টার ক্রিস্টিনা সুচিয়া
সন্ন্যাসিনী (নান) থেকে রাতারাতি পপ সংগীত তারকা। ইতালিতে মেধা খোঁজার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের কল্যাণে এমনটিই ঘটে গেল খ্রিষ্টান এক সন্নাসিনীর জীবনে। গত বুধবার অনুষ্ঠানে সিস্টার ক্রিস্টিনা সুচিয়া নামের ওই সন্ন্যাসিনী একটি পপ গান গেয়ে নজর কাড়েন। ২৫ বছর বয়সী সিস্টার ক্রিস্টিনা সুচিয়া স্বাভাবিক সন্ন্যাসিনীর পোশাকেই অর্থাৎ কালো আলখাল্লা ও বড় আকৃতির ক্রুশ চিহ্নযুক্ত নেকলেস পরে অনুষ্ঠানের মঞ্চে হাজির হন।
এ সময় অনুষ্ঠানের বিচারক ও উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা উল্লাস প্রকাশ করে তাঁকে স্বাগত জানান। ক্রিস্টিনা সংগীত তারকা অ্যালিসিয়া কি-এর ‘নো ওয়ান’ শিরোনামের পপ গানটি পরিবেশন করেন। গানের ভিডিওচিত্রটি ইন্টারনেটে ঝড় তুলেছে। উরসুলাইন সিস্টারস অব দ্য হোলি ফ্যামিলি নামক সন্ন্যাসিনী দলের সদস্য ক্রিস্টিনা বলেন, তিনি নিজের প্রতিভা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতেই মেধা অনুসন্ধানের ‘দ্য ভয়েস’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ভ্যাটিকানের নতুন পোপ ফ্রান্সিসের মঠ থেকে বেরিয়ে এসে সৃষ্টিকর্তার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানেও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় ভ্যাটিকানের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ক্রিস্টিনা বলেন, তিনি পোপের ফোনের অপেক্ষায় আছেন। এএফপি।

৩০ ভাগ প্রার্থী মামলার আসামি

ভারতজুড়ে এখন নির্বাচনী আমেজ। ক্ষমতাসীন জাতীয় কংগ্রেস ও প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিভিন্ন আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা শুরু করেছে। এ পর্যন্ত ঘোষিত কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ বর্ষীয়ান অনেক নেতার নাম নেই। কংগ্রেস ও বিজেপির মনোনীত প্রার্থীদের কারও কারও বিরুদ্ধে খুন ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগে মামলা রয়েছে
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও প্রধান বিরোধী দল মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে ৩০ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৩ শতাংশের বিরুদ্ধে খুন ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগের মামলাও রয়েছে। ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচ ও অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসের (এডিআর) সর্বশেষ জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেস ও প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) লোকসভা নির্বাচনের জন্য এ পর্যন্ত দলীয় মনোনীত ৪৬৯ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। তাঁদের মধ্যে জরিপের নমুনা হিসেবে ২৮০ জন প্রার্থীকে বেছে নেয় ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচ ও এডিআর। দুই দলের এসব প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩০ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা আছে। আর এই ৩০ শতাংশের মধ্যে ১৩ শতাংশের বিরুদ্ধেই খুন ও অপহরণের মামলা রয়েছে। জরিপে জানানো হয়, কংগ্রেস ও বিজেপির প্রার্থীদের আলাদা করলে দেখা যায়, বিজেপির ৩৫ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আর কংগ্রেসের প্রার্থীদের মধ্যে মামলা রয়েছে ২৭ শতাংশের বিরুদ্ধে। মামলা থাকা বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যে ১৭ শতাংশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে মামলা হয়েছে।
আর কংগ্রেসের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের মামলা কিছুটা কম—১০ শতাংশের বিরুদ্ধে। রাজধানী নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস ও বিজেপির অন্তত দুজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা আছে। তাঁরা হলেন কংগ্রেসের রমেশ চাঁদ টোমার ও বিজেপির সতীশ দুবে। বিজেপির প্রার্থী ইদ্দুরাপার বিরুদ্ধে খনি থেকে অবৈধভাবে সম্পদ আহরণের অভিযোগে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। আর সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও কংগ্রেসের নেতা পবন কুমার বানসালের ভাইপোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। এবার চণ্ডীগড় থেকে নির্বাচন করছেন বানসাল। জরিপে দেখা গেছে, ২৮০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬০ শতাংশ প্রার্থীর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ এক কোটি রুপির ওপরে। অবশ্য জরিপে আম আদমি পার্টি (এএপি) ও আঞ্চলিক দলগুলোর প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিভিন্ন অভিযোগে মামলা থাকা ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে সাফাই গাইছে কংগ্রেস-বিজেপি দুই পক্ষই। কংগ্রেসের মুখপাত্র সালমান সজ বলেন, ‘আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত আপনি নির্দোষ।’ বিজেপির মুখপাত্র মীনাক্ষী লেখি বলেন, ‘সবার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সত্য নয়।’ এনডিটিভি।

বিজেপি ছাড়ছেন যশোবন্ত সিং?

যশোবন্ত সিং
দল তাঁর পছন্দের আসনে মনোনয়ন না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা যশোবন্ত সিং। তিনি আজ রোববার দল থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। ৭৬ বছর বয়সী যশোবন্ত রাজস্থান রাজ্যে তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকা বারমার থেকে শেষবারের মতো নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অনুরোধ উপেক্ষা করে ওই আসনে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা সোনারাম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয় দল।
গতকাল তিনি এ নিয়ে এনডিটিভির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিজেপির ওই সিদ্ধান্তে হতাশা ব্যক্ত করেন যশোবন্ত। তিনি সেখান থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন। অবশ্য এ ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত করেননি তিনি। বিজেপির সভাপতি রাজনাথ সিং বলেন, যশোবন্ত দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা। একটি আসনের মনোনয়ন নিয়ে তাঁকে মূল্যায়ন করা যাবে না। এনডিটিভি।