Wednesday, December 10, 2014

মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে গবেষণার পরামর্শ

মেয়েদের বিয়ের বয়স আসলে কতো হওয়া উচিত? ১৬ বছর,  ২০ বছর, না-কি ১৮ বছরই সঠিক এনিয়ে এবার প্রতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণার পরামর্শ দিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। আজ সংসদ সচিবালয়ে কমিটির বৈঠকে এই পরামর্শ দেয়া হয়। রেবেকা মমিনের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ, মোহাম্মদ সিরাজুল আকবর, মোছা. মাহাবুব আরা বেগম গিনি, নাসরিন জাহান রতœা, মনোয়ারা বেগম ও ফজিলাতুন নেসা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ফোর্স ম্যারেজ, বিয়ের বয়স, সস্তান ধারণের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে একটি মানসম্মত গবেষণা প্রতিষ্ঠান দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজকে প্রতিটি জেলার তৃণমূল পর্যায় থেকে গুনগত ও পরিমানগত তথ্য সংগ্রহ করে একটি গ্রহণযোগ্য ও মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনাও দেয়া হয়। বৈঠকে জয়িতার কার্যক্রমকে আরও পরিচিত করতে জয়িতা অন্বেষণ কার্যক্রমকে আরও যুগপোযোগী করার পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০১৫ জয়িতার একটি দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় প্যাভিলিয়ান নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে জয়িতার সব ধরনের পণ্য মানসম্মত করার সুপারিশ করা হয়।

৭ খুনে তারেক, আরিফ ও রানাকে দায়ী করে র‌্যাবের প্রতিবেদন : শাহজাহান মোল্লাকে বহাল রাখার নির্দেশ

তারেক সাঈদ, আরিফ ও রানা ৭ খুনে দায়ী বলে প্রতিবেদন দিয়েছে র‌্যাব। প্রতিবেদনে ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ,মেজর আরিফ হোসেন এবং নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানাকে দায়ী করে নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনে র‌্যাব এদের দায়ী করেছে। ঘটনার আট মাস পর বুধবার এই এলিট বাহিনীর প থেকে হাই কোর্টে এই প্রতিবেদন দেয়া হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার সময় নারায়ণগঞ্জ র‌্যাবে থাকা তারেক সাঈদ ও আরিফ সাতজনকে অপহরণ থেকে শীতল্যায় লাশ ডুবনো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর রানা অপহরণে অংশ নিয়ে ঘটনায় আংশিক জড়িত ছিলেন বলে র‌্যাবের এই অভ্যন্তরীণ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
ওদিকে একই বেঞ্চ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় গঠিত সার্বিক তদন্ত কমিটিতে নতুন প্রধান নিয়োগের আদেশ নাকচ করেছেন। শুরু থেকে এই কমিটির নেতৃত্বে থাকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান মোল্লাকেই প্রতিবেদন দিয়ে বাকি দায়িত্ব শেষ করতে বলেছেন আদালত। সাতখুনের ঘটনায় নূর হোসেনের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে গত ৭ই মে ঘটনা তদন্তে হাইকোর্টে নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান মোল্লকে প্রধান করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। তার নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গত সাত মাসে চার শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য নেয়। এরই মধ্যে গত ৯ই নভেম্বর শাহজাহান মোল্লাকে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের (পিএসসি) ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল হাকিমকে মঙ্গলবার সার্বিক তদন্ত কমিটির প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু আদালত শাহজাহান মোল্লাকেই প্রতিবেদন দিয়ে বাকি দায়িত্ব শেষ করতে বলেছেন।

উপজেলা পরিষদের সামনে গণধর্ষণ: ৬ দিন পর মামলা

শ্রীনগরে উপজেলা পরিষদের সামনে গণধর্ষণের ঘটনার ৬ দিন পর থানায় মামলার হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় ঐ ধর্ষিতা বাদী হয়ে শ্রীনগর থানায় মামলাটি দায়ের করেন। গণধর্ষণের অভিযোগ এনে এজাহারে পাঁচ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান জানান। ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়, গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে নয়টার দিকে উপজেলা পরিষদ থেকে পঞ্চাশ গজ দুরে রাজ্জাক মিয়ার ভাড়াটিয়া ঐ নারী (২৬) তার স্বামীর অনুপুস্থিতিতে পাশের বাসার খোকন মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে বসে টিভি দেখছিল। এসময় ওই এলাকার দিপক মেম্বারের ছেলে জাকির হোসেন জ্যাকি (২৩), ফখরুল মিয়ার ছেলে বুলেট (২৫), চান্দু মন্ডলের ছেলে  তাপস (২২), বলাই মন্ডলের ছেলে সম্রাট (২৪) ও অজ্ঞাতনামা আরও দুজন মিলে তাকে খোকন মিয়ার স্ত্রীর সামনে থেকে টেনে হিচঁড়ে পার্শ্ববর্তী দেলোয়ার মোল্লার নির্মানাধীন ছয়তলা বিল্ডিংয়ের তিন তলায় নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে। বখাটেরা শেষ রাতের দিকে ঐ নারীকে হত্যার হুমকি দিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়। শনিবার সকালে সে মিডফোর্ড হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে কেরাণীগঞ্জ গোলচত্ত্বর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেয়। কিছুটা সুস্থ্য হয়ে আজ শ্রীনগর সার্কেল এএসপি কার্যালয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় বসে থেকে পরে শ্রীনগর থানায় মামলা করতে আসে। স্থানীয়রা জানান, শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক নার্সের আত্মীয় হিসাবে মেয়েটি এই এলাকায় আসে। তার বাড়ী রংপুরের পিরগঞ্জ উপজেলায়। প্রায় ছয়মাস পূর্বে মাওয়া এলাকার এক ট্রলি চালকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। গত দুই মাস আগে তারা ওই এলাকার রাজ্জাক মিয়ার বাসাটি ভাড়া নেন। পরে মেয়েটি শ্রীনগর বাজারের একটি ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে চাকুরি নেয়। ঘটনার পর থেকে রাগে-ক্ষোভে তার স্বামী আর তার সঙ্গে কোন যোগাযোগ করছেনা বলে জানায় ঐ নারী। এলাকাবাসী আরও জানায়, ঘটনার পরদিন শ্রীনগর জোনের ডিআইও এসআই শহিদুল ইসলাম, দিপক মেম্বার, মহিলা মেম্বার সাজেদা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। এব্যাপারে ডিআইও শহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের সত্যতা স্বীকার করেন। উপজেলা পরিষদ থেকে পঞ্চাশ গজের মধ্যে গনধর্ষনের ঘটনা ঘটলেও শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কোন রকম তৎপরতা না থাকায় স্থানীয় জনগনের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। শ্রীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান বলেন, ধর্ষণের বিষয়টি মামলা হিসাবে রেকর্ড করা হয়েছে। আসামিদের সনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন: ভুক্তভোগীদের দুর্বিষহ বর্ণনা

বিভিন্নভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা তাদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন। আজ রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত ‘মানবাধিকার হরণ: এ কী পরিস্থিতিতে দেশ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব বর্ণনা শোনা যায়। আলোচনার প্রথম পর্বে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মো. রফিক বলেন, ২০০০ সালের ২৩ই অক্টোবর সেনাবাহিনী ও এলাকাবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের সময় তার ছেলে জামাল নিহত হন। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকি। আজ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছি। বাড়িতে ফিরে আমার কী পরিস্থিতি হবে তা ভাবতেও পারি না।’ সবুজবাগ থানা ছাত্রদলের নেতা মাহবুব হাসানের স্ত্রী তানজিনা আক্তারের অভিযোগ, এক বছর আগে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার  পরিচয় দেয়া লোকজন। তিনি বলেন, ‘দুই সন্তান নিয়ে আমাদের দিনগুলো কীভাবে কাটছে, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।’ রাজধানীর মিরপুর বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা শহীদ আলী বাহাদুর অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্যাম্প দখল করার জন্য নয়জনকে হত্যা করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে একজনকে পিটিয়ে মেরেছে পুলিশ। এর এক মাস আগে চাঁদা দাবি করে না পেয়ে জাবেদ নামের একজনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত আমাদের ক্যাম্প দখলের চেষ্টা হচ্ছে।’ যশোরের মালোপাড়ার বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। একটাও পূরণ হয়নি। পুলিশ আসামি ধরে। ১০-১২ দিন পরে আসামির জামিন হয়ে যায়।’

সম্পত্তি নিয়ে ম্যান্ডেলা পত্নীদের বিরোধ

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে আবার নতুন করে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন ম্যান্ডেলার দুই পত্নী। সম্পত্তি সুষ্ঠু বণ্টন করতে ম্যান্ডেলার সাবেক স্ত্রী উইনি মাদিকিজেলা (৭৮) ম্যান্ডেলার বিধবা স্ত্রী গ্রাসা মাচেলকে এবার আদালতের ভয় দেখালেন। ম্যান্ডেলার প্রস্থানের পর থেকেই গ্রামের বাড়ি কুনুর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছে এ দু’জনের মধ্যে। এএফপি জানায়, মঙ্গলবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে উইনি বলেছেন, ম্যান্ডেলার সম্পত্তির অধিকার অর্জনে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। গত অক্টোবরে ম্যান্ডেলা এ ব্যাপারে আদালতে একটি লিগ্যাল চ্যালেঞ্জ দায়ের করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে উইনির সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয় ম্যান্ডেলার। উল্লেখ্য, ম্যান্ডেলা তিন স্ত্রীর সঙ্গে সংসার পাতেন। ম্যান্ডেলার গ্রামের বাড়িটির বর্তমান বাজারদর ৪৪ লাখ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। ম্যান্ডেলার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি নিয়ে এটিই প্রথম টানাপোড়েনের ঘটনা। কারণ ম্যান্ডেলার পরিবারের অন্য সদস্যরা এর আগে ওই বাড়িটির অধিকার নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। উইনির সঙ্গে ম্যান্ডেলার সংসার জীবনে তাদের ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আসে দুই কন্যাসন্তান।

কোনো মেয়ে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত হবে না : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাজে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পুনরায় আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জনসংখ্যার অর্ধেককে পেছনে রেখে সমাজের অগ্রগতি হতে পারে না। সমাজের অগ্রগতির জন্য অবশ্যই নারী ও পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এটি বাস্তবতা, অগ্রগতি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সমাজের অর্ধেককে বাদ দিয়ে সমাজের উন্নয়ন অথবা অগ্রগতি হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেগম রোকেয়া দিবস এবং বেগম রোকেয়া পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। তিনি নারী শিক্ষা বিস্তার এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমাজে দরিদ্র এবং অসহায় নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার জন্য অধ্যাপক মমতাজ বেগম ও মিসেস গোলাপ বানুর হাতে বেগম রোকেয়া পদক তুলে দেন। শিশু ও নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। অনুষ্ঠানে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল-ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। এছাড়া বেগম রোকেয়া পদক-২০১৪ বিজয়ী অধ্যাপক মমতাজ বেগম এবং মিসেস গোলাপ বানু তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেন, কোনো মেয়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে না। তার সরকার বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বেগম রোকেয়া স্বপ্ন দেখতেন, সমাজের অবহেলিত নারীরা শিক্ষিত হবে এবং স্বাবলম্বী হবে। তার এ স্বপ্নের অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি প্রতিটি শিক্ষিত নারীর হৃদয়ে বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেগম রোকেয়ার জন্ম না হলে এবং তিনি শিক্ষার পথ না দেখালে দেশের অগ্রগতি হতো না। তিনি সমাজে একটি বিপ্লব এনেছেন। সমাজের অনেক নারী স্বাধীনতার জন্য এবং নারীর সম্মান ও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সে সময় মুসলিম মহিলারা ঘরে বন্দি থাকতেন। কুসংস্কার, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষাহীন জীবন ছিল তাদের নিত্যসঙ্গিনী। পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে তাদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না।
বেগম রোকেয়া ঘরে বন্দি থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল শিক্ষার আলোর মাধ্যমে নারীর সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা সম্ভব। এটাও তিনি বুঝেছিলেন যে, সমাজের উন্নয়নের জন্য কেবল পুরুষ নয়, নারীর অংশগ্রহণও অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে তিনি শাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ওই যুগে এটা ছিল এক সাহসী পদক্ষেপ। তার এ অসামান্য অবদানের ফলশ্র“তিতে আজ নারী শিক্ষায় উন্নতি সাধিত হয়েছে। নারী উন্নয়নে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রকল্প কর্মসূচি ও শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বিনামূল্যে শিক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও বৃত্তি দেয়ায় নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার নারী উন্নয়ন নীতি-২০১৪ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ আইন-২০১০ প্রণয়ন করেছে। বিভিন্ন সরকারি কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ৪০ মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সেনসেটিভ বাজেট তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী ও স্পিকার হচ্ছে নারী। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও অন্যান্য স্তরে নারীর শক্তিশালী অংশগ্রহণ রয়েছে। বেগম রোকেয়া পদক-২০১৪ বিজয়ী প্রফেসর মমতাজ বেগম তার অনুভূতি প্রকাশকালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, এ মহিয়সী নারী তাকে নারী কল্যাণে নিয়োজিত হতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
তিনি বলেন, আমি বেগম মুজিবের পরামর্শে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করি। নারীরা যেন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রত্যেক বাড়িতে এ ধরনের পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান প্রফেসর মমতাজ বেগম।
মিসেস গোলাপ বানু বলেন, নারীরা পশ্চাদপদ নয়, তবে তাদের সাহসের অভাব রয়েছে। আমাদের সাহস নেই এবং সবকিছুতে ভয় পাই। আমার একাডেমিক কোনো শিক্ষা নেই। তবে আমার স্মৃতি শক্তি খুব ভালো। আমি নারীদের সঙ্গে নিয়ে আমার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে চাই।
বারিধারা সমবায় সমিতি লি. প্রতিষ্ঠায় তার সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে গোলাপ বানু বলেন, নারীরা পুরুষদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে চায়। পুরুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলে কোনো সমস্যা হবে না। ১৯৯৫ সালে বেগম রোকেয়া পদক প্রবর্তিত হয়। এ পর্যন্ত ৩৭ জন নারী এ পদক পেয়েছেন। বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ১৯৯৫ এবং প্রফেসর হামিদা বানু ও ঝরনা ধারা চৌধুরী ২০১৩ সালে এ পদক লাভ করেন।

সাত খুন: র‌্যাবের প্রতিবেদন দাখিল, মোল্লাকে বহাল রাখার নির্দেশ

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। বিচারপতি মো. রেজাউল হক এবং বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে আজ এ প্রতিবেদন দাখিল করেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নূর হোসেন কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করে। এ ঘটনার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ অপহরণ থেকে শুরু করে নদীতে লাশ ডুবানো পর্যন্ত লে. কর্ণেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও মেজর আরিফ হোসেন জড়িত ছিলেন। তবে লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানা অপহরণ পর্যন্ত অংশ নিয়ে আংশিক জড়িত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ওদিকে একই বেঞ্চ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় গঠিত সার্বিক তদন্ত কমিটিতে নতুন প্রধান নিয়োগের আদেশ নাকচ করেছেন। শুরু থেকে এই কমিটির নেতৃত্বে থাকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান মোল্লাকেই প্রতিবেদন দিয়ে বাকি দায়িত্ব শেষ করতে বলেছেন আদালত। সাতখুনের ঘটনায় নূর হোসেনের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে গত ৭ই মে ঘটনা তদন্তে হাইকোর্টে নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান মোল্লকে প্রধান করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। তার নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গত সাত মাসে চার শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য নেয়। এরই মধ্যে গত ৯ই নভেম্বর শাহজাহান মোল্লাকে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের (পিএসসি) ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল হাকিমকে মঙ্গলবার সার্বিক তদন্ত কমিটির প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু আদালত শাহজাহান মোল্লাকেই প্রতিবেদন দিয়ে বাকি দায়িত্ব শেষ করতে বলেছেন।

দুর্নীতি ও জালিয়াতি গিলে খাচ্ছে মূলধন

এ মুহূর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রধান সমস্যা- খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির কারণে ব্যাংকগুলোতে বেড়েছে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ। সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ মূলধন ঘাটতি। আর এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সোনালী ও বেসিক ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদন এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উত্থাপন করা হয়। ওই বৈঠকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম বলেছেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ থাকায় প্রচুর মূলধন ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে হলমার্ক কেলেংকারি এবং অন্যান্য অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ সমস্যা প্রকোট হয়ে দেখা দিয়েছে।’ আর কমিটির সভাপতি ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ঋণখেলাপি, ক্লাসিফাইড লোন, কু-ঋণসহ বিভিন্ন সমস্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা গোপন করার প্রবণতা আগের মতোই অব্যাহত রেখেছেন সংশ্লিষ্টরা। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের নানা অনিয়মের ওপর বিস্তারিত আলোচনা হয় বৈঠকে। এসব ব্যাংকে বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ গঠন এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে আনাসহ সাত দফা সুপারিশ করে স্থায়ী কমিটি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন ও স্থায়ী কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির নেপথ্যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। পাশাপাশি বেসিক ব্যাংক থেকে রাতের আঁধারে বস্তা ভরে টাকা পাচারের ঘটনাকেও দায়ী করা হয়। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা ও অর্থ লুটে নেয়ায় খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ২৪ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ২৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ শতাংশ হচ্ছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের। মোট খেলাপি ঋণের ৮০ শতাংশই মন্দ হয়ে পড়ায় প্রভিশনের পরিমাণ বাড়ছে। যে কারণে ব্যাংকগুলোতে মূলধনের ওপর পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।
সোনালী ব্যাংকের দেড় হাজার কোটি টাকার ঘাটতি : এ মুহূর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত শীর্ষ এ ব্যাংকের ঘাটতি মূলধনের পরিমাণ হচ্ছে ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনের কারণে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সোনালী ব্যাংকে নতুন নতুন ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়েছে। যে কারণে শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। এ ব্যাংকে হলমার্কসহ পাঁচটি বড় ধরনের আর্থিক কেলেংকারির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে হলমার্কের অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ হচ্ছে ২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দিলে সরকার গত বছর ১ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা দেয়। ব্যাংকটিতে বর্তমান ৫২টি অলাভজনক শাখা রয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের ১২০ কোটি টাকা লাপাত্তা : অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটাতে গত বছর ১ হাজার ৮১ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। এরপর শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে মূলধন ঘাটতি আরও বেড়েছে। সর্বশেষ ব্যাংক থেকে আলু প্রসেসিং শিল্পে তিনজন উদ্যোক্তাকে ১২০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু পুরো অর্থই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ঋণ গ্রহণকারী উদ্যোক্তা নির্বাচনে ভুলের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ঋণখেলাপির একজন হচ্ছেন প্রাইভেট ব্যাংকের একজন পরিচালক। এ ব্যাংকের ৮৮৯টি শাখার মধ্যে ৫৮ শাখা হচ্ছে অলাভজনক।
জনতা ব্যাংকের ঋণের ৯ হাজার কোটি টাকা ৪০ কোম্পানির হাতে : শ্রেণীকৃত ঋণই হচ্ছে জনতা ব্যাংকের বড় সমস্যা। ব্যাংকটিতে গত বছরের তুলনায় এ বছর শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাংকে ২৯ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে বেক্সিমকো এবং পারটেক্স গ্রুপের মতো ৪০টি বড় কোম্পানির কাছে ৯ হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে। জানা গেছে, বর্তমান ব্যাংকটিতে লোকসান কমাতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মূলধন ঘাটতি মেটাতে ২০১৩ সালে এ ব্যাংককে ৮১৪ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।
বেসিক ব্যাংকের ১৩৩ ঋণগ্রহীতার কাগজ ঠিক নেই : ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০-১৩ সাল পর্যন্ত ঋণ বিতরণে চরম অনিয়মের কারণে বেসিক ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে। এ ব্যাংক থেকে ৮ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে ৩৩৫ জন গ্রাহককে। যার মধ্যে ১৪ জনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লাপাত্তা ঋণগ্রহীতাদের কাছে পাওনা অর্থের পরিমাণ হচ্ছে ৫৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১৩৩ জন গ্রাহককে ঋণ দেয়া হয়েছে কিন্তু যথাযথভাবে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র (ডকুমেন্ট) তৈরি করা হয়নি। বর্তমানে ব্যাংকটিতে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ১ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। দুর্নীতি ও জালিয়াতির কারণে এ ব্যাংকের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সংসদীয় কমিটির সাত সুপারিশ : ব্যাংকগুলোর সার্বিক সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সাত দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলো হল : ১. ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে নির্ধারণ। ২. উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ গঠন। এতে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিরসন হবে। ৩. হলমার্ক গ্রুপের লোপাটকৃত অর্থ আদায়, মামলা-মোকাদ্দমা নিষ্পত্তি এবং তাদের শিল্পকারখানাগুলো চালু রাখতে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলের সিদ্ধান্ত নেয়া। এ ব্যাপারে সোনালী ব্যাংকের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি গাইডলাইন প্রদানের ব্যবস্থা করা।
৪. বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া। ৫. প্রকৃত শিল্পোদ্যাক্তাদের ঋণ পাওয়ার বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদকে নিশ্চিত করা ও ব্যাংকগুলোর ওপর অপেশাধারী হস্তক্ষেপ কমান। ৬. পোলট্রি ও ডেইরিসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ বা ভর্তুকি প্রদান এবং ৭. ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো, জনবলের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো ও পরিচালনা পর্ষদে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মনোনয়ন দিয়ে ব্যাংকগুলো লাভজনক করা।

চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে বালু উত্তোলনের নামে নৈরাজ্য

কর্ণফুলী নদীর চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা রক্ষায় বালু উত্তোলনের নামে চলছে ভয়াবহ নৈরাজ্য। চ্যানেলের বাইরে গিয়ে উপকূলের কাছাকাছি যত্রতত্র ড্রেজার বসিয়ে কখনও দিনের বেলায় আবার কখনও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে লাখ লাখ সিএফটি বালু উত্তোলন করায় হুমকির মুখে পড়েছে আনোয়ারার গহিরা-বার আউলিয়া উপকূল এবং সম্ভাবনাময় পারকি সমুদ্র সৈকত। এই উপকূল এবং সৈকতে থাকা বন বিভাগের বনায়নের শত শত গাছ, ঝাউ বাগান ও প্যারাবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের কবলে পড়ে সংকুচিত হয়ে আসছে সৈকত। অভিযোগ আছে, বিনা টেন্ডারে নামধারী কিছু প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়ে প্রকারান্তরে বন্দর কর্তৃপক্ষ এই নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান মান্ধাতার আমলের ড্রেজার দিয়ে নির্ধারিত স্থানের পরিবর্তে কখনও কখনও উপকূলের কাছাকাছি গিয়ে বালু উত্তোলন করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের হারবার মেরিন ও হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে ঠিকাদাররা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বালু উত্তোলন করছেন। বন্দরের অধীনে কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের নামে যে মহাচুরির ঘটনা ঘটেছে তাও এরই ধারাবাহিকতায় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজের নামে শত কোটি টাকা হাতিয়ে মাঝপথে কাজ ফেলে সপরিবারে কানাডা পাড়ি জমিয়েছেন মেরিন প্যাসিফিক নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার আবু জাফর ওরফে বালু জাফর। মূলত বন্দর কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতা, অদক্ষতা সর্বোপরি অসাধু কর্মকর্তাদের অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের কারণেই এভাবে ড্রেজিংয়ের নামে কর্ণফুলী ও বন্দর মোহনাজুড়ে ভয়াবহ নৈরাজ্য চলছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের হারবার মেম্বার কমডোর শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, উপকূলের কাছাকাছি কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বালু তোলার অনুমতি দেয়া হয়নি। যদি কেউ তুলে থাকে তা চুরি করে তুলছে। তাছাড়া হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের তত্ত্বাবধানে তাদের অনুমোদিত ৭-৮টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরের আউটার বারে চ্যানেল ঠিক রাখতে নিয়মিত ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলছে।
এক সময় নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিংয়ের নামে বন্দরের কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হলেও বর্তমানে চ্যানেলে ড্রেজিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো টাকা খরচ হয় না। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বোর্ড মিটিংয়ে পাস করেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে চ্যানেলের বালু তোলা বা ড্রেজিংয়ের কাজ দেয়া হয়েছে।
আনোয়ারার পারকি এলাকার বাসিন্দা নুরুল আনোয়ার ও আবদুর রশিদ যুগান্তরকে অভিযোগ করে বলেন, দিনে-রাতে বিভিন্ন সময়ে আউটারে বালু তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা বন্দরের ড্রেজার উপকূলের কাছাকাছি এসে বালু তোলে। এতে করে প্রচণ্ড স্রোতে বালুর স্তর নিচে নেমে গিয়ে উপকূলে ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। পারকি সৈকত সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বিলীন হচ্ছে বন বিভাগের লাগানো ঝাউ বাগান ও প্যারাবন। পশ্চিমকূলে ব্লক বসিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে উপকূল রক্ষা করা হলেও আনোয়ারা উপকূল অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে স্মার্ট ট্রেডিং, রীমা কর্পোরেশন, বোয়ালিয়া এন্টারপ্রাইজ, তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজসহ ৭-৮টি প্রতিষ্ঠান বন্দর চ্যানেলে ড্রেজিং পরিচালনা করছে। এর মধ্যে তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজ নগর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। সিটি এন্টারপ্রাইজ দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান। মূলত এসব প্রতিষ্ঠান ‘বিনা পয়সায় ড্রেজিংয়ের নামে কর্ণফুলী থেকে লাখ লাখ সিএফটি বালু তুলে তা বাইরে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই টাকার একটি মোটা অঙ্ক যাচ্ছে বন্দরের হারবার ও হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে, বন্দরের নিজস্ব অত্যাধুনিক খনক ড্রেজার পরে মেরামত করা হলেও সেটিকে ড্রেজিংয়ে ফিরিয়ে আনা হয়নি। সরকারদলীয় নেতাদের স্বজন এবং অসাধু ঠিকাদারদের পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রেখে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্যই এই কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়। সূত্র অভিযোগ করেছে, বন্দরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের আশ্রয়-প্রশয় ও আন্ডারহ্যান্ড ডিলিং থাকার কারণেই আউটার বার ফেলে উপকূলের কাছাকাছি ড্রেজার বসানো হচ্ছে। আবার নির্দ্দিষ্ট স্থান থেকেও অপরিকল্পিতভাবে বালু তুলছে ঠিকাদার। যার বলি হচ্ছে আনোয়ারা উপকূল ও পারকি সৈকত। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন্দর চ্যানেলও।

আগে আন্দোলন পরে নির্বাচন : বিএনপি

হঠাৎ করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সরকারি পরিকল্পনা সামনে রেখে বিএনপিতে চাঙ্গা ভাব ফিরছে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য নয়, আন্দোলনের মাধ্যমে মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায়ের দাবিতে দলটি চাঙ্গা হচ্ছে। বিএনপির আন্দোলনমুখী মনোভাবকে কৌশলে দমনের জন্যই সরকার ডিসিসি নির্বাচনের চাল দিয়েছে বলে মনে করছেন দলের হাইকমান্ড। এ পরিস্থিতিতে সরকারের কর্মকান্ডের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বিএনপি। যদি শেষ পর্যন্ত সরকার নির্বাচন করেই তাহলে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না দলটি। তাদের মতে, আগে আন্দোলন পরে নির্বাচন। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, হঠাৎ করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের বিষয়টিকে সামনে আনায় অনেকেই তা সন্দেহের চোখে দেখছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ফেরাতেই নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে আনা হচ্ছে বলে তারা মনে করেন। তবে সরকার যতই কৌশলের আশ্রয় নেক, এই মুহূর্তে আন্দোলন ছাড়া তারা অন্য কিছু ভাবছেন না বিএনপি।
তারপরও সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে বিএনপি এতে অংশ নেবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ নেয়া বা না নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এখনো আসেনি। যখন আসবে তখন এ বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত জানানো হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার হঠাৎ করে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দেয়ার পরিকল্পনা কেন নিয়েছেন সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখছে বিএনপির হাইকমান্ড। বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে অনির্ধারিত আলোচনা চলছে। নির্বাচনের উদ্দেশ্য নিয়ে নেতাদের সঙ্গে শিগগিরই আলোচনা করবেন খালেদা জিয়া। হাইকমান্ডের মতে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে এই মুহূর্তে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার সময় হয়নি। কারণ বিষয়টি এখনো সরকারের চিন্তাভাবনা পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর নির্বাচন কমিশন কি পদক্ষেপ নেয় সেদিকে নজর দেয়া হবে। তারপরও সরকার যদি নির্বাচন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন সেটাও সময়সাপেক্ষ। নির্বাচন কমিশন জানুয়ারিতে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিলে তফসিল ঘোষণাসহ নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে কমপক্ষে দুইমাস সময় লাগবে। এ দীর্ঘসময় তারা আন্দোলনে গ্যাপ দিতে চান না। নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকলে আন্দোলনের প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
দলের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, আপাতত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে তারা ততটা ভাবছে না। এই মুহূর্তে সরকারবিরোধী আন্দোলনকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আন্দোলনের কৌশল চূড়ান্ত করতে হোমওয়ার্ক চলছে। জানুয়ারির শুরুর দিকে তারা রাজপথে নামার চিন্তা-ভাবনা করছে। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারিতে ঢাকায় ব্যাপক শোডাউনের কথা ভাবা হচ্ছে। ওইদিনকে গণতন্ত্র হত্যা বা কালো দিবস আখ্যা দিয়ে ব্যতিক্রমী কিছু করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। দেশে এবং বিদেশে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন হিসেবে স্মরণ করিয়ে দিতেই চলছে এ আয়োজন। ইতিমধ্যে মহানগরসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাদের এমন নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। ওইদিনের কর্মসূচিতে সরকার বাধা দিলে হরতাল অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা রয়েছে দলটির। জানুয়ারিতে আন্দোলনকে রাজপথে গড়িয়ে তা ধীরে ধীরে কঠোরতর করা হতে পারে। এমন চিন্তা-ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েই চলছে দলটির কর্মপরিকল্পনা।
তবে দলের একটি অংশ নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। তাদের মতে, সরকার এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা করছে। বিএনপির আন্দোলন দমনের পাশাপাশি ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চাইছে। কিন্তু সরকারকে সহজে ছাড় দেয়া উচিত হবে না। আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নামতে হবে। আন্দোলন চলাকালে নির্বাচন হলে সেটাকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে দলের ওই অংশটি। যুক্তি হিসেবে তারা আরও বলেন, বিগত আন্দোলনে ঢাকা মহানগর বিএনপি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। সারাদেশে কঠোর আন্দোলন হলেও ঢাকার চিত্র ছিল উল্টো। তাই এবার আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেয়া হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য আসবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মহানগরীর প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের স্বক্রিয় করা সম্ভব হবে। যা আন্দোলনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র জানায়, সবশেষ নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সেখানেও নেয়া হবে ভিন্ন কৌশল। দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থী না দিয়ে নাগরিক সমাজের ব্যানারে প্রার্থী দেয়া হতে পারে। আর যেহেতু এটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাই যে কেউ এতে অংশ নিতে পারেন- এমন কৌশলের আশ্রয় নেয়া হতে পারে। যা বিগত কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এ ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়-বিএনপির এমন দাবির যৌক্তিকতা হিসেবে তারা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়।
বিগত নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির পক্ষ থেকে দক্ষিণের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র কেনেন দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রথম থেকেই সরকারের মতলব, কৌশল ছিল নিন্দনীয়। নির্বাচন নিয়ে তারা নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। আদালতকে ব্যবহার করে তারা নির্বাচনকে বন্ধ করে দেয়। আবার নতুন করে সরকার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের কথা বলছেন। এখানেও তাদের অন্য কোনো কূটকৌশল রয়েছে বলে মনে হয়। কারণ যেসময় তারা আন্দোলনের কথা বলছেন ঠিক সেসময় হঠাৎ করে নির্বাচনের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হল।
তারপরও নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় এখনো আসেনি। কারণ এখনো নির্বাচন কমিশন কিছু ঘোষণা করেনি। আগে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করুক। তারপর দল এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

বড়ই অসহায় মানবাধিকার কমিশন

আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই অসহায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। সরকারের কাছে সুপারিশ আর তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া ছাড়া কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের। কেউ বা কোনো কর্তৃপক্ষ কমিশনের আদেশ না মানলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ জানাতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। নানা আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে মানবাধিকার রক্ষায় তেমন একটা ভূমিকা রাখতে না পারলেও কমিশন ধীরে ধীরে সফলতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানের।
মানবাধিকার কমিশনের অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার নজির থেকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো একটি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় কমিশন প্রতিবেদন চেয়ে পাঠালেও সরকারের পক্ষ থেকে তেমন সহযোগিতা করা হয় না। একটি প্রতিবেদন পেতে ১৫ থেকে ২০ বার তাগিদ দেয়ার, এমনকি চার বছর ধরে অপেক্ষারও নজির রয়েছে। এ অবস্থায় কমিশনের নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন চেয়ারম্যান ড. মিজান।
জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে সাভারের আমিন বাজার এলাকা থেকে সাদা পোশাকে র‌্যাব সদস্যরা শহীদুল্লাহ ওরফে সুমন ও তার স্ত্রী রানী আক্তারকে আটক করেন। তাদের র‌্যাব-৪-এর নবীনগর অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরের দিন র‌্যাবের একটি দল রানী আক্তারকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে ছেড়ে দেয়। পরে রানী আক্তার তার স্বামীকে খুঁজতে র‌্যাব-৪-এর ক্যাম্পে যান। কিন্তু সাদা পোশাকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি অস্বীকার করা হয়। আটকের ১২ দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে শহীদুল্লাহর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। এ নিয়ে একই বছরের ২৭ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে একটি অভিযোগ করে। আইন অনুযায়ী এ অভিযোগের সরাসরি তদন্তের এখতিয়ার কমিশনের নেই। তাই অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য মানবাধিকার কমিশন ২০১০ সালের ২৯ জুন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। এরপর চার বছর কেটে গেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে ২০ বার তাগিদ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন পাঠাতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের প্রতি নির্দেশনা চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের হস্তক্ষেপ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। শুধু এ প্রতিবেদনটিই নয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ রকম বহু প্রতিবেদনই দুই থেকে তিন বছরেও পায়নি কমিশন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের বিভিন্ন অফিস থেকে দীর্ঘসূত্রতার কৌশল অবলম্বন করা হয়। ধরুন, কোনো একটি থানার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু এ অভিযোগের সরাসরি তদন্ত করার এখতিয়ার কমিশনকে দেয়া হয়নি। তদন্ত করতে দিচ্ছি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। আমরা বলে দিচ্ছি তদন্ত করুন, প্রতিবেদন পাঠান। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ১২, ১৩, ১৪ বার চিঠি দিয়েছি; কিন্তু প্রতিবেদন পাইনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় চিঠি পাঠিয়ে বলা হচ্ছে, এখনও প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি, প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে জানানো হল। সেই নির্দেশনার কপি মন্ত্রণালয় আমাদের কাছেও পাঠিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বিষয়টির নিষ্পত্তি করছে না। ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দিচ্ছে। এর ফলে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, যারা গুরুত্ব দিচ্ছে না, এভাবে ফেলে রাখছে, তাদের সবার তালিকা করে আমরা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে একটি চিঠি লিখব। অনুগ্রহপূর্বক হস্তক্ষেপ করার জন্য। এরপরও যদি না হয়, যে কাজটি এখনও করিনি, আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করার, সেটি করব। আইনে বলা আছে, সুপারিশ বাস্তবায়ন না করলে সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টিতে আনতে হবে। রাষ্ট্রপতি মনে করলে সেটি সংসদে উত্থাপন করবেন।
মানবাধিকার কমিশন আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের কাছে কমিশন থেকে কোনো সুপারিশ পাঠানো হলে তার তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠানো ওই ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলে বিবেচিত হবে। প্রতিবেদন না পাঠালে বা অপর্যাপ্ত প্রতিবেদন পাঠালে কমিশন ঘটনাটির পূর্ণ বিবরণ রাষ্ট্রপতির কাছে দাখিল করবে এবং রাষ্ট্রপতি এ ধরনের প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপনের ব্যবস্থা করবেন। আইনগত দিক থেকে এরচেয়ে বেশি কিছু করার ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনের নেই। এ সীমাবদ্ধতায় কমিশনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তাই আইনের পরিবর্তন দরকার রয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে ড. মিজানুর রহমান বলেন, কমিশনের অর্জনগুলো ধীরে ধীরে হচ্ছে। রাতারাতি সব পরিবর্তন সম্ভব হবে না। মানবাধিকার কমিশনের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। কোনো সরকারি অফিসকে কোনো কথা বললে তা ওই অফিসের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আইনে বাধ্যবাধকতা নেই। নিজস্ব তদন্ত ক্ষমতার জন্য আইনের পরিবর্তন প্রয়োজন। আর প্রবল রাজনৈতিক ইচ্ছা না থাকলে এটা হবে না।
তিনি আরও বলেন, এ আইনের পরিবর্তন প্রথম থেকে কামনা করলে তা পরিবর্তন হতো না। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, যতটুকু ক্ষমতা আছে ততটুকু প্রয়োগ করি। এটা করে যে কমিশনকে একসময় তোয়াক্কাই করা হতো না তা এখন শ্রদ্ধা ও আস্থার জায়গায় পৌঁছেছে। এটাকে বিরাট অর্জন বলে মনে করি। মানুষ তার অধিকারের জন্য কমিশনে ছুটে আসছে।
এদিকে মানবাধিকার কমিশন আইন অনুযায়ী সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে কমিশন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষে সুপ্রিমকোর্টে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করতে পারবে। কিন্তু ১২, ১৩ কিংবা ১৪ বার চিঠি পাঠিয়েও প্রতিবেদন না পাওয়ার পর কমিশন কেন এ সুযোগ গ্রহণ করেননি- এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুর রহমান বলেন, মানবাধিকার রক্ষায় আমাদের যত সুযোগ রয়েছে আমরা কিন্তু সব একবারে ব্যবহার করিনি। ধাপে ধাপে এগোনোর চেষ্টা করেছি। এখন কিন্তু আমরা সে রকম অবস্থা মনে করছি, কারও পক্ষে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার জন্য। তানভীরের পক্ষে তা করা হয়েছে। আগামী ১৪ তারিখের সভায় আরও একজনের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. মিজান বলেন, যত অভিযোগ আসে, তা পর্যালোচনায় দেখা যায় সিংহভাগই আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। কারও দ্বারা নিগৃহীত হয়েছে, মামলা করতে যাচ্ছি, অভিযোগ করতে যাচ্ছি, এজাহার নেয়া হচ্ছে না, মামলা নেয়া হচ্ছে না, টাকা চাওয়া হচ্ছে- এ ধরনের বেশিরভাগ অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। খতিয়ে দেখার পরে বেশিরভাগেরই সত্যতা রয়েছে বলে প্রতিভাত হয়। তবে হয়তো যতটা নৃশংসভাবে বলা হয়, ততটা না হলেও মানবাধিকার লংঘন যে হয়, তা সুস্পষ্ট।
কমিশনের সফলতার প্রশ্নে তিনি বলেন, সফলতা-ব্যর্থতা বিচার করবে সাধারণ মানুষ। তবে দুটো জায়গাতে অন্তত সফল হয়েছি। তার একটা হচ্ছে, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী কোনো একটি বিশেষ বাহিনীকে এক রকম এরোগেন্স লক্ষ্য করা গিয়েছিল। মনে করা হতো যে তারা আইনের ঊর্ধ্বে, তাদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। সে অবস্থা থেকে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে দায়বদ্ধতার একটা জায়গায় কিন্তু নিয়ে আসতে পেরেছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত মানবাধিকার বলতে এদেশে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে বোঝানো হতো। পুলিশ কাউকে লাথি মারছে কিনা, সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে কিনা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হচ্ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু দরিদ্র মানুষের যে অধিকার, চাষী, শ্রমিকের যে অধিকার, শিক্ষা, চিকিৎসার যে অধিকার তা মানবাধিকার কিনা সেটা বিবেচনায় আনা হতো না। এটা পরিবর্তন করতে কমিশন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বলে আমি মনে করি।
র‌্যাবের হাতে গুলিবিদ্ধ লিমন ও সাগর-রুনি হত্যা মামলায় দীর্ঘ ২৭ মাস ধরে বিনা বিচারে আটক থাকা তানভীর রহমানের বিষয় উল্লেখ করে মিজানুর রহমান বলেন, লিমনের ঘটনায় রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মিথ্যা, বানোয়াট ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ জন্য রাষ্ট্র শুধু লজ্জায় পড়েছে তা নয়, রাষ্ট্র যে নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে সেটিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই সাগর-রুনীর হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার হোক। কিন্তু দীর্ঘ ২৭ মাসে তানভীরের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও আনতে পারল না, অথচ কারাগারে আটক রইল। আমরা কমিশনের পক্ষ থেকে তাকে কারামুক্তির ব্যবস্থা করেছি।
বিভিন্ন জায়গায় যান, আবেগময়ী বক্তব্য দেন, কার্যত কোনো ফলাফল দেখতে পান না বলে জনসাধারণের মধ্যে ধারণা রয়েছে- এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, প্রত্যাশা যখন আকাশচুম্বী হয়, প্রাপ্তি ততটা না হলে তখনই মনে হয় কথাবার্তায় লাভ কিছু নেই। শুধু হম্বিতম্বি করে বেড়াচ্ছে- এর বাইরে কিছু নয়। ম্যাক্রো লেভেলে দৃশ্যমান নয়, মাইক্রো লেভেলে আসেন। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, রাঙ্গামাটিতে গিয়ে শিশুসদনে দেখলাম পরিচারিকার পদ নেই। ছোট ছোট বাচ্চাদের রান্না করতে হয়। একদিকে শিশু অধিকারের কথা বলছি, অন্যদিকে সেই ছোট্ট শিশুরা কাজ করছে। ফিরে এসে তৎকালীন মহিলা ও শিশু প্রতিমন্ত্রী বর্তমানে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে বলেছি। আমার বিশ্বাসও হচ্ছিল না এত দ্রুত পরিবর্তন হবে। এখন দুজন করে পরিচারিকা দেয়া হয়েছে। মাইক্রো লেভেলে পরিবর্তন হচ্ছে। দৃশ্যমান না হলেও কাজ হচ্ছে।

চিটাগাং ফিজিক্যাল এডুকেশন কলেজ এর ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

চিটাগাং ফিজিক্যাল এডুকেশন কলেজ এর ওরিয়েন্টেশন ২০১৪-২০১৫ ও বিদায় ২০১৪ এ প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ

ব্যাংকে অবৈধ লেনদেন দেড়শ কোটি টাকা!

কূটনীতিকদের কাছে শুল্কমুক্ত মদ বিক্রেতা মেসার্স সাবের ট্রেডার্স কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে ২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত মোট বিক্রয় ঘোষণা দিয়েছে ৬৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অথচ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে কোম্পানির অ্যাকাউন্টে একই সময়ে জমা পড়েছে ১২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অপরদিকে ঢাকা ওয়্যারহাউস নামের আরেক ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস বন্ড কমিশনারেটে একই সময়ে মার্কিন ডলারে বিক্রয় দেখিয়েছে ৫২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটির বিভিন্ন ব্যাংকে এই সময়ে জমা পড়েছে ৬৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। চাঞ্চল্যকর এই বিক্রয় কারচুপি ধরা পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স সেলের (সিআইসি) তদন্তে। একই চিত্র অপর ৪ ডিপ্লোমেটিক ওয়্যারহাউস টস বন্ড প্রাইভেট লি., মেসার্স এইচ কবীর অ্যান্ড কোং লি., ন্যাশনাল ওয়্যারহাউস, ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেসের ব্যাংক হিসেবেও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ৬ ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের কোম্পানি ব্যাংক হিসেবে প্রায় দেড়শ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর এসবই জমা হয়েছে মার্কিন ডলারে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে ব্যাংকে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রায় অতিরিক্ত এই অর্থ জমার উৎস কী? যুগান্তরের অনুসন্ধানে এ তথ্য যাচাই করতে গিয়ে পাওয়া গেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। কূটনীতিক ও প্রিভিলাইজড পারসনদের কাছে ভুয়া মদ-বিয়ার বিক্রি দেখিয়ে এবং মাত্রাতিরিক্ত মদ আমদানি প্রাপ্যতার সুযোগ নিয়ে ডিপ্লোমেটিক ওয়্যারহাউসগুগুলো একদিকে সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিছে। অপরদিকে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে।
সিআইসির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আয়কর বিভাগ এ জমার উৎস সম্পর্কে অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর ব্যাখ্যা তলব করবে। বিভিন্ন কর বছরে ব্যাংক হিসাবসমূহে মোট জমার উৎস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট এবং তথ্যপ্রমাণাদিনির্ভর উপযুক্ত আইনানুগ ব্যাখ্যা পাওয়া না গেলে তা সংশ্লিষ্ট আয়কর আইন অনুযায়ী আয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এরপর কর ফাঁকির জন্য জরিমানা ও সরল সুদ ধার্য করে কর আদায় করা হবে।
সূত্রমতে, গুলশান-১ এ অবস্থিত মেসার্স ঢাকা ওয়্যারহাউস ২০০৭-০৮ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছরে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে প্রতিষ্ঠানটি মদ ও বিয়ার বিক্রি দেখিয়েছে ৫২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত বিক্রয় দেখানো হয়েছে ৩৭ কোটি ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ টাকা। অথচ বিভিন্ন ব্যাংকের লেনদেন অনুযায়ী প্রকৃত বিক্রয় পাওয়া গেছে ৬৮ কোটি ২৯ লাখ ১ হাজার ৮৯৯ টাকা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গুলশানের ঢাকা ওয়্যারহাউসের মদ বিক্রয়ের অর্থ জমা হয় ঢাকা ব্যাংক গুলশান শাখা (হিসাব নং-০২১৫১০০০০০০০১৩২৯, ০২১৫১৭৫০০০০০০২২৩, ০২১৫১২০০০০০০০১৩) এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক গুলশান শাখায় (হিসাব নং০১১৬১২০০০০০০০৯৩৬)। এর মধ্যে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ঢাকা ব্যাংকের জমার পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৪৭ লাখ ৭ হাজার ৮৩৬ টাকা, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ঢাকা ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে জমার পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৩০৭ টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৭ কোটি ২৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০৯ টাকার মধ্যে ঢাকা ব্যাংকেই জমা হয়েছে ১৬ কোটি ৫৬ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এছাড়া ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ৩০ টাকা এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা জমা পড়েছে এই দুটি ব্যাংকে। আর এসবই হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রায়।
গুলশানের ১০ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত সাবের ট্রেডার্স লিমিটেড কর অঞ্চল-২ এর কোম্পানিজ সার্কেল-২৩ এর অধিক্ষেত্রভুক্ত। এর টিআইএন নং-০৩৬-২০০-৩২৩৩। প্রতিষ্ঠানটি শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে মদ-বিয়ার আমদানি করে তাদের ঢাকা অফিস ও ডিইপিজেডে অবস্থিত বিদেশী ক্রেতাদের কাছে মদ-বিয়ার বিক্রয় করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ লেনদেন হয়েছে এইচএসবিসি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংকের গুলশান শাখায়।
ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত বিক্রয়ের পরিমাণ দেখায় ৬৬ কোটি ১৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এর বিপরীতে আয়কর রিটার্নে বিক্রয় দেখানো হয় ৫৬ কোটি ৭৯ লাখ ৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ কর ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি মোট বিক্রয়ের চেয়ে ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৭২ হাজার টাকার বিক্রয় গোপন করে। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের কোম্পানির হিসাবে জমা পাওয়া গেছে ১১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, কর বিভাগ ও ব্যাংক জমা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, বন্ড কমিশনারেটে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বিক্রয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৪১ লাখ ৮ হাজার টাকা। তবে কর বিভাগে দাখিল করা আয়কর রিটার্নে বিক্রয়ের পরিমাণ দেখানো হয় ৯ কোটি ৭২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক জমা ছিল ১৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
একইভাবে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বন্ড কমিশনারেটে বিক্রয় দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি ৯৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্নে দেখানো হয় ১১ কোটি ৪৬ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। আর ব্যাংকে জমা পাওয়া যায় ২৭ কোটি ২১ লাখ ৯২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত বিক্রয়ের পরিমাণ বন্ড কমিশনারেট ও আয়কর বিভাগে গোপন করেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বন্ড কমিশনারেটে বিক্রয় দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৮৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা পাওয়া যায় ১৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিক্রয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ১০ লাখ ৮২ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ১৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা। ব্যাংকে জমা পাওয়া যায় ২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে বন্ড কমিশনারেটে বিক্রয় দেখানো হয়েছে ১৫ কোটি ৭৯ লাখ ৭১ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ৮০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। ব্যাংকে জমা পাওয়া যায় ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করলেন মালালা ও কৈলাস

শান্তিতে এ বছরের নোবেল পুরস্কার তুলে দেয়া হয়েছে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই ও ভারতের কৈলাস সত্যার্থীকে। কিছুক্ষণ আগে যখন তাদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেয়া হয় তখন পুরো হলরুম করতালিতে ফেটে পড়ছিল। এ রিপোর্ট লেখার সময়ও চলছিল অনুষ্ঠান। মেয়ে শিশুদের শিক্ষার প্রচার, প্রসার ও তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অগ্রপথিক পাকিস্তানের ১৭ বছর বয়সী নির্ভীক কিশোরী মালালা ইউসুফজাই সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। মালালার সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করলেন ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাস সত্যার্থী (৬০)। এরই মধ্যে বহু বিরল সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন মালালা। নোবেল গ্রহণের প্রাক্কালে এক সংবাদ সম্মেলনে মালালা ইউসুফজাই বলেন, আমরা এখানে শুধু আমাদের পুরস্কার গ্রহণ করতে আসি নি, এই মেডেলটি নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে আসি নি। আমরা এখানে বিশেষ করে শিশুদের বলতে এসেছি, তোমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে, তোমাদের অধিকার সম্পর্কে তোমাদেরকেই মুখ খুলতে হবে। তোমরাই পারো বিশ্বকে পরিবর্তন করতে। ১৫ বছর বয়সে পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় মালালার মাথায় গুলি করে তালেবানরা। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য গুরুতর অবস্থায় তাকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। বার্মিংহামের একটি হাসপাতালে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয় এবং ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন মালালা। সেখানেই স্কুলে ভর্তি হন তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরাও তার সঙ্গে সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। মালালা মেয়ে শিশুদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সেখানেই বিভিন্ন কর্মকা- পরিচালনা করছেন এবং এ পর্যন্ত নানা বিরল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

সবচেয়ে বড় পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

সুন্দরবনের ভেতরে তেল নিয়ে জাহাজ–ডুবির ঘটনা বনটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যা সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি করতে পারে। বন বিভাগ ও সুন্দরবনবিষয়ক গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় এই বনে এর আগে ছোটখাটো জাহাজডুবি এবং বর্জ্য তেল ছড়িয়ে পড়লেও তার মাত্রা এত বিস্তৃত ছিল না। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী একটি জাহাজ ডুবে যায়। এতে সাড়ে তিন লাখ লিটারের বেশি ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর বন বিভাগের পাশাপাশি বন্য প্রাণীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি এবং ওয়াইল্ড টিমের দুটি দল সুন্দরবনে অবস্থান করছে।
তেল ছড়িয়ে পড়া এলাকাটি সরকার ঘোষিত ডলফিনের অভয়ারণ্য। এ ছাড়া সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য এবং জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। জাতিসংঘের ওই দুই সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরবনের ভেতর এ এলাকা দিয়ে নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে নৌপরিবহন অধিদপ্তর বন আইন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জাতিসংঘের কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি (সিবিডি), ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিশনের নিয়ম লঙ্ঘন করে বনের ভেতর দিয়ে নৌপথ চালু করে। গত ১ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে তিনিও নৌপথটি বন্ধের জন্য নির্দেশ দেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কার বনের ভেতর দিয়ে চলত। এক বছর ধরে বনের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২৫০টি জাহাজ চলাচল করছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে এই নৌপথটি বন্ধের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছি। কিন্তু তা বন্ধ না হওয়ায় আজকে এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এই তেল সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উচিত জাহাজটি দ্রুত উদ্ধার করা এবং তেল ছড়িয়ে পড়া বন্ধে কাজ করা।
গতকাল রাত সোয়া আটটায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান ড. শামসুদ্দোহা খন্দকারের কাছে ওই নৌ দুর্ঘটনা এবং তেল ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ দুর্ঘটনা বিষয়ে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। আমি আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম।’ তবে শ্যালা নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়লে বড় কোনো আশঙ্কা নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘জোয়ার-ভাটার টানে তেল বঙ্গোপসাগরে চলে যাবে।’
২০১১ সাল থেকেই এই নৌপথের ব্যাপারে প্রথম আলোসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। বন বিভাগ থেকে একাধিকবার এবং জাতিসংঘের জলাভূমিবিষয়ক সংস্থা রামসার কর্তৃপক্ষ এবং বিজ্ঞান-শিক্ষা ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকে নৌপথটি নিয়ে আপত্তি তুলে তা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই নৌপথসহ সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য শিল্পকারখানার কারণে বনের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র থেকে সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান হারাতে পারে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
বন বিভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের মংলা থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার এলাকায় আট প্রজাতির ডলফিন দেখতে পাওয়া যায়, যা বিশ্বের সবচেয়ে কম স্থানে বেশি প্রজাতির ডলফিনের বিচরণ এলাকা। ইরাবতী, বোতলনাক, গাঙ্গেয়, ইন্দো প্যাসিফিক হাম্পব্যাক, ফিনলেস পরপয়েস, প্যানট্রপিক্যাল স্পটেড ডলফিনের প্রজাতি একসঙ্গে এই এলাকাতেই দেখা যায়। এ ছাড়া বেঙ্গল টাইগারসহ বিশ্বের মহাবিপন্ন প্রজাতির ১২ থেকে ১৫ প্রজাতির প্রাণী বনের এই এলাকায় বিচরণ করে থাকে। তেল ছড়িয়ে পড়ায় এই প্রাণীদের জীবন বিপন্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বন্য প্রাণীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি এবং ওয়াইল্ড টিম।

প্রতিদিনই হোক মানবাধিকার দিবস by আবদুল লতিফ মন্ডল

এ বছর বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হল হিউম্যান রাইটস ৩৬৫। অর্থাৎ বছরের ৩৬৫ দিনই মানবাধিকার দিবস। প্রত্যেক মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে ঘোষিত হয় The Universal Declaration of Human Rights বা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা। তবে ১৯৫০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এক রেজুলেশনের মাধ্যমে ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা পায়। ১০ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে মানবাধিকার দিবস হিসেবে। বাংলাদেশে সরকারিভাবে দিবসটি পালিত না হলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোসহ অনেক বেসরকারি সংগঠন দিবসটি পালন করবে।
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৩০টি অনুচ্ছেদে মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা, মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার ঘোষণা রয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে এখানে এর কয়েকটি উল্লেখ করছি। বলা হয়েছে, বন্ধনহীন অবস্থায় এবং সমমর্যাদা ও অধিকারাদি নিয়ে সব মানুষই জন্মগ্রহণ করে। বুদ্ধি ও বিবেক তাদের অর্পণ করা হয়েছে; অতএব ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে তাদের একে অন্যের প্রতি আচরণ করা উচিত। প্রত্যেকেরই জীবন ধারণ, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। কাউকে নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা চলবে না। আইনের সমক্ষে প্রত্যেকেরই সর্বত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার রয়েছে। আইনের কাছে সবাই সমান এবং কোনোরূপ বৈষম্য ব্যতিরেকে সবারই আইনের দ্বারা সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। কাউকে খেয়ালখুশি মতো গ্রেফতার, আটক অথবা নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে না। কাউকেই যথেচ্ছভাবে তার জাতীয়তা থেকে অথবা তাকে তার জাতীয়তা পরিবর্তনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা চলবে না। প্রত্যেকেরই চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। প্রত্যেকেরই মতামত প্রকাশের স্বাধিকার রয়েছে; বিনা হস্তক্ষেপে মতামত পোষণ এবং যেকোনো উপায়ে এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে তথ্য ও মতামত সন্ধান, গ্রহণ এবং জ্ঞাত করার স্বাধীনতা এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
মানবাধিকার সনদে এসব ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার পদে পদে লুণ্ঠিত হচ্ছে। ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিরা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করছে। আর যারা ভূমি কামড়ে পড়ে আছে, তারা ইসরাইলি বর্বরতার শিকার হয়ে সর্বদা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বসবাস করছে। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে ইসরাইলিরা গোপনে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মিয়ানমারে বছরের পর বছর রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চলছে। রোহিঙ্গারা আজ তাদের আদি নিবাসে বহিরাগত। মানবাধিকার সনদের ১৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জাতীয়তা সংক্রান্ত ঘোষণার প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশটির সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটির সরকার। কয়েক লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে পালিয়ে যাচ্ছে।
প্রত্যেকেরই মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে- মানবাধিকার সনদে এ ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশে, বিশেষ করে গণতন্ত্রহীন রাজতান্ত্রিক দেশে মানুষের মত প্রকাশের কোনো অধিকার নেই। নেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। অনুরূপভাবে উত্তর কোরিয়ার মতো একনায়কতান্ত্রিক দেশে মত প্রকাশের ও বাকস্বাধীনতার কোনো অধিকার নেই জনসাধারণের।
এবার বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়া যাক। আমাদের সংবিধান প্রণেতারা ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর আমাদের এমন একটি সংবিধান (মূল সংবিধান বলে অভিহিত) উপহার দেন, যেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলোর আওতায় প্রজাতন্ত্রকে একটি গণতন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়, নিশ্চয়তা দেয়া হয় মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার। মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। নিশ্চয়তা দেয়া হয় সব নাগরিকের সুযোগের সমতার। কর্মকে অধিকার ও কর্তব্যরূপে স্বীকৃতি দেয়া হয়। মৌলিক অধিকারগুলোর আওতায় যেসব বিধান করা হয় সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের আশ্রয়লাভে সবার সমান অধিকার; ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্য না প্রদর্শন; আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করা; গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কারণ না জানিয়ে আটক নিষিদ্ধ এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত না করা; জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরণ; প্রত্যেক নাগরিকের চলাফেরা, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের প্রায় সব ঘোষণার প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের মূল সংবিধানে।
চিন্তা, বিবেক ও মতামত প্রকাশের যে স্বাধীনতার অধিকারের ঘোষণা সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ এবং আমাদের মূল সংবিধানে রয়েছে, তাতে প্রথম বাধা আসে মূল সংবিধান গৃহীত হওয়ার ১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। ১৯৭৩ সালে সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধানাবলী সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে জরুরি অবস্থা বিদ্যমান থাকাকালীন জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কমবেশি ১০ বছর সামরিক শাসনামলে এবং ২০০৭-০৮ সময়কালে সেনাসমর্থিত নির্দলীয় সরকারের আমলে জনগণ এ জরুরি বিধানাবলীর শিকার হয়ে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত থাকেন। ভবিষ্যতেও যে তারা এরূপ বঞ্চনার শিকার হবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মূল সংবিধানে প্রজাতন্ত্র হবে গণতন্ত্র মর্মে যে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা হোঁচট খায়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় একদলীয় শাসন। প্রত্যক্ষভাবে বা অবাধে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজ দেশের সরকারে অংশগ্রহণের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে মর্মে সর্বজনীন মানবাধিকার সনদে ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যেমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ সম্পর্কিত বিধানটুকু বিলুপ্ত করা হয়। বিচার বিভাগ তার অনেক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পরপরই ৪টি ছাড়া অন্যসব দৈনিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। জনগণের বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সম্প্র্রচার নীতিমালা-২০১৪-এর কঠোর সমালোচনা করেছেন সম্পাদক পরিষদ, গণমাধ্যম কর্মীসহ অনেকে। বলা হয়েছে, এই নীতিমালা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করবে, গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ, ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত দি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসাপিয়ারেন্সেস (আইসিপিপিইডি) এবং আমাদের সংবিধানের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ঘটানো হচ্ছে আটকাবস্থায় খুন, আইনবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ। আটকাবস্থায় খুন ও আইনবহির্ভূত হত্যা আগেও সংঘটিত হলেও গুমের ব্যাপকতা লক্ষ করা গেছে সাম্প্র্রতিক সময়ে। বলতে গেলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমল থেকে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১৫০ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন। ৩১ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দেশে ২২৯ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৪ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে এক নেতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সরকারের নির্যাতন ও দমননীতির বিশদ বিবরণ রয়েছে।
দেশে একটি মানবাধিকার কমিশন রয়েছে। জনগণের কাছে এটির পরিচয় নখদন্তহীন বাঘ হিসেবে। সুশীল সমাজ ও জনগণের অভিযোগ, কমিশন আইন অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধে নেয়নি কোনো উদ্যোগ। নির্বিকার থেকে এটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষা সেদিনই সম্ভব হবে, যেদিন নিজ নিজ দেশের সরকার সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ, দি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব আল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসাপিয়ারেন্সেস এবং নিজ নিজ দেশের সংবিধান অনুযায়ী তাদের নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষায় আন্তরিক হবে। শুধু ১০ ডিসেম্বর নয়, বছরের অন্যসব দিন হোক মানবাধিকার দিবস। মানবাধিকার দিবস পালন সেদিনই সার্থক হবে, যেদিন বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা আর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষা আজ চূর্ণ-বিচূর্ণ by ড. মাহবুব উল্লাহ্

১৯৯৮ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক আয়োজিত ABCDE কনফারেন্সে যোগ দেয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। পাঠক নিশ্চয়ই ABCDE শব্দ সংক্ষেপটি শুনে কিছুটা কৌতূহল বোধ করতে পারেন। ABCDE-র সম্প্রসারিত রূপটি হল Annual Bank Conference on Development Economics। প্রতিবছরই বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে উন্নয়ন অর্থনীতির একটি নির্ধারিত থিমের ওপর আলোচনা করেন। সম্মেলনে বিশ্বের নামজাদা অর্থনীতিবিদরা বড় বড় গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নোবেল লরিয়েট। সে বছরের সম্মেলনে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জেম্স টবিনও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন। তারা অনেকে নিজ নিজ গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও উপস্থাপনায় তেমন সাবলীল হন না। ফলে অনেকের উপস্থাপনাই অবোধগম্য থেকে যায়। এছাড়া অর্থনীতি শাস্ত্রের জটিল কনসেপ্টগুলো উপস্থাপনাকে আরও অবোধগম্য করে তোলে। সেবারের কনফারেন্সের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘Knowledge of Development’। এ থিমটি নির্ধারণ করেছিলেন বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন চিফ ইকোনমিস্ট প্রফেসর যোসেফ ই স্টিগলিৎজ। স্টিগলিৎজ তখনও নোবেল প্রাইজ পাননি। তদসত্ত্বেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বময়। তিনি ছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্সিয়াল ইকোনমিক্সের অধ্যাপক। এছাড়াও তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৮০-র দশকে বিশ্বব্যাংকের দর্শনে যে নিও লিবারেল ধারার সূচনা হয়, তিনি ছিলেন তার কঠোর সমালোচক। তার মতো ব্যক্তির বিশ্বব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট হিসেবে নিযুক্তি লাভকে বিশ্বব্যাংকের দর্শনে একটি পরিবর্তন হিসেবে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। স্টিগলিৎজকে বিশ্বব্যাংক ত্যাগ করতে হয়েছিল মতপার্থক্যের কারণে। স্টিগলিৎজ বিশ্বব্যাংকের কর্মকাণ্ডে একটি মানবিক ধারার সূচনা চেয়েছিলেন। এ কারণে উন্নয়নের ক্ষেত্রে জ্ঞানের ভূমিকাকে তিনি সামনে নিয়ে এসেছিলেন। তার দৃষ্টিতে জ্ঞান কোনো ব্যক্তিবিশেষের সম্পদ নয়। এটি সমগ্র মানবজাতির যৌথ সম্পদ। কারণ জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডারে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত প্রতিটি মানুষই প্রতি মুহূর্তে অবদান রেখে চলেছে। জ্ঞান কখনও হয় চিন্তার প্রকাশযোগ্য ক্ষমতা, আবার কখনও হয় চিন্তার অপ্রকাশযোগ্য ক্ষমতা। সাধারণ মানুষ কাজ করতে গিয়ে কাজের নতুন নতুন হিকমত বা কৌশল আবিষ্কার করে। কিন্তু সে ব্যাখ্যা করে বলতে পারে না কাজটি কীভাবে সম্পাদিত হল, কেন হল? এভাবে প্রকাশযোগ্য ও অপ্রকাশযোগ্য জ্ঞানরাশি সঞ্চিত হয়ে মানবজাতির জ্ঞান ভাণ্ডার সৃষ্টি হয়। এর ওপর কারোর ব্যক্তিমালিকানা দাবির সুযোগ নেই। কারণ বর্তমানে চিন্তারাশি অতীতের চিন্তারাশির দ্বারা প্রভাবিত হয়। একইভাবে একজন ব্যক্তির চিন্তাও অন্যসব ব্যক্তির চিন্তাকে ভিত্তি করে অগ্রসর হয়। সুতরাং কোনো মানুষই এককভাবে দাবি করতে পারে না কোনো একটি বিশেষ চিন্তা বা কর্ম প্রক্রিয়া কিংবা প্রযুক্তি তার নিজস্ব অবদান। এ যুক্তিতে নতুন আবিষ্কারকে যতই নতুন বলা হোক না কেন, এর ভিত্তি অন্তর্নিহিত আছে অতীতে উদ্ভাবিত আবিষ্ক্রিয়ার মধ্যে। একজন ব্যক্তিবিশেষকে পেটেন্ট রাইট দেয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। অথচ নিও লিবারেল অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস বা মেধাস্বত্ব অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ মতবাদের ধারক-বাহকরা মনে করেন, মেধাস্বত্ব অধিকার সুরক্ষিত না হলে নতুন আবিষ্কারের প্রক্রিয়া থেমে যাবে। কারণ যিনি গবেষণা করে আবিষ্কার করতে চান, তিনি পুরস্কৃত হবেন না ভেবে নিরুৎসাহিত হন। স্টিগলিৎজের সুস্পষ্ট বক্তব্য হল, মানুষ লাভের আশায় জ্ঞান সাধনা করেন না। সক্রেটিস কোন লাভের জন্য দর্শনের চর্চা করেছিলেন? কার্ল মার্কস বিশাল জ্ঞান সাধক হওয়া সত্ত্বেও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করেছেন। একই রকম জীবনযাপন করেছেন আরও অনেক জ্ঞান সাধক। জ্ঞান সাধকরা জ্ঞানের চর্চা করেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। কারও তিরস্কারের ভয়ে কিংবা কারোর দ্বারা পুরস্কৃত হওয়ার লোভে নয়। যিনি প্রথম পলিওর টিকা আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি তার আবিষ্কারকে পেটেন্ট করেননি। যদি পেটেন্ট করা হতো তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাখ লাখ ডলার পেতেন, কিন্তু দুনিয়ার লাখ লাখ মানুষকে পলিওর হাত থেকে বাঁচার জন্য পলিওর টিকা কিনতে হতো অনেক অর্থ ব্যয় করে। টিকাটি পেটেন্ট করা হয়নি বলে আজ বিশ্বের কোটি কোটি শিশুকে পলিওর টিকা দিয়ে পলিওমুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে। কত মহান ব্যক্তি ছিলেন পলিওর টিকা আবিষ্কারক মানুষটি!
Knowledge for Development কোনো নতুন প্রথা নয়। শত শত বছর ধরে আমরা জানি, জ্ঞানই শক্তি। আমরা আরও জানি, অসির চেয়ে মসী অনেক বেশি শক্তিশালী। একটি অনুন্নত দেশের উন্নয়নে জ্ঞানের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আমি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করছিলাম তখন আমাদের ডরমিটরিতে এসেছিলেন অর্থনীতিবিদ প্রফেসর নুরুল ইসলাম। তার আগমন উপলক্ষে আমার এক বন্ধু ড. সাইফুল হক নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব মঞ্জুরুল করিমও ছিলেন। এছাড়াও ছিলেন তখন হার্ভার্ডে অধ্যয়নরত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরী। এছাড়া জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকও উপস্থিত ছিলেন। ভোজপর্ব শেষ হওয়ার পর গল্প-গুজবের মধ্যে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গও আলোচিত হল। প্রফেসর রাজ্জাক শিক্ষার গুরুত্বের কথা তুলে ধরলেন। ড. তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরী বিষয়টিকে আরও বোধগম্য করে তোলার জন্য বললেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত সব নাগরিককে শিক্ষিত করে তোলা। প্রত্যেকটি নাগরিক যখন শিক্ষার আলোকে আলোকিত হবে, তখন সে নিজেই তার উন্নতির পথ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম হবে। এভাবে সফল নাগরিকের সজ্ঞান প্রয়াস দেশটিকে সুখী-সমৃদ্ধ করে তুলবে।’ ভোজসভায় উপস্থিত সবাই ছিলেন জ্ঞানের উচ্চতম স্তরে অধ্যয়নরত। কেউ এ অভিমত সম্পর্কে দ্বিমত প্রকাশ করেননি। আজ এত বছর পরও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ প্রজ্ঞার কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সূচকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৮ দেশের মধ্যে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ২৭তম, শিক্ষায় ২৫তম, উদ্ভাবনে ২৭তম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ২৬তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষায় বাংলাদেশের নিচে আছে দুটি দেশ : নেপাল ও পাকিস্তান। উদ্ভাবন ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই রয়েছে সবার নিচে। উল্লেখ্য, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে। আর এ গাঁথুনিগুলোতেও বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন এগিয়ে যাবে, সেই ভিত্তিটিই এখনও তৈরি হয়নি। এ বিচারে বাংলাদেশের উন্নয়ন মোটেও টেকসই নয়।
কথায় বলে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড শক্ত হলে একজন মানুষ যেমন দৃঢ় ও ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়াতে পারে, ঠিক তেমনি শিক্ষার বলে বলীয়ান একটি জাতিও দৃঢ়তার সঙ্গে নিজ পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারে। গত ৪৩ বছরে শিক্ষার ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসৃত হয়েছে, তাতে জাতির মেরুদণ্ড দৃঢ় হওয়া তো দূরের কথা বরং এটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দিয়ে ১০০ নম্বরের জায়গায় ৫০ নম্বরের পাবলিক পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। গ্রাম-গ্রামান্তরে দেখা গেল যারা সেভেন-এইট পর্যন্ত পড়েছে, তারাও নকলের মহোৎসবের মধ্য দিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে। পরবর্তীকালে এদের মধ্যে যারা স্কুল শিক্ষক হলেন তাদের বিদ্যার দৌড় সহজেই অনুমেয়। তারা ছাত্রছাত্রীদের কী শেখাবেন বা কেমনভাবে শেখাবেন, সে ব্যাপারে ছিলেন বলতে গেলে অজ্ঞ। তারপর একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর পক্ষ থেকে দাবি উঠল, মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রদান করতে হবে। আমার মতো মানুষ যে প্রজন্মের, সে প্রজন্মে হাইস্কুলের চৌহদ্দি পার হওয়ার পর কলেজে এসে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই পড়তে হতো। কলেজের অধ্যাপকরাও বাংলা সাহিত্য ব্যতিরেকে অন্য বিষয়গুলোর ওপর আগাগোড়া ইংরেজিতে লেকচার দিতেন। পাঠ্যবইগুলোও ছিল ইংরেজিতে রচিত। এমনকি পাশ্চাত্য দেশ থেকে প্রকাশিত পাঠ্যবইও আমরা পড়েছি। স্যামুয়েলসনের ইকোনমিক্সের ষষ্ঠ সংস্করণ আমাদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও ছিল স্টোনিয়ের ও হেগের বই। ভূগোলের জন্য পড়েছি ওর্চেস্টারের জিওমর্ফলোজি, মংক হাউসের ও ফিলিথ লেকের ফিজিক্যাল জিওগ্রাফি। এছাড়াও ছিল কেন্ড্রুর ক্লাইমেটলোজি। এছাড়া অর্থনৈতিক ভূগোলের জন্য পড়েছি ওএইচকে স্পেইট, এল ডাডলিস্টাম্প ও ড. নাফিস আহমেদের বই। ইংরেজি সাহিত্যের সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে পড়েছি অক্সফোর্ড কম্পেনিয়ন টু ইংলিশ লিটারেচার। বাংলা সাহিত্যের সহায়ক গ্রন্থ ছিল অনেকগুলো। স্কুল জীবনেও ইতিহাসের জন্য জওহরলাল নেহেরুর ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া, ভিনসেন্ট স্মিথের হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, খুদা বক্সের বই, হিট্টির বই, লেইন কুলের বই এবং গিবনের বই। এছাড়াও ছিল আমির আলীর স্পিরিট অব ইসলাম।
আমাদের ইতিহাস শিক্ষা ভারতবর্ষের বৈদিক যুগ থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর ফলে আমরা দেশ ও জাতি সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা লাভ করতে পেরেছিলাম। আজকাল বিশ্বব্যিালয়ে পড়ুয়া একজন ছাত্রকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় পলাশীর যুদ্ধ কখন হয়েছিল, অধিকাংশ ছাত্রই তখন থাকে নিরুত্তর। স্কুলে আমরা যেসব শিক্ষকের কাছে পড়েছি, তাদের মান ইদানীংকালের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলনায় উন্নত ছিল। এ কারণে তাদের প্রতি আজও গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করি। এর একটা সামাজিক-ঐতিহাসিক কারণও ছিল। ১৯৩০-এর দশকে যে মুষ্টিমেয় মুসলিম ছাত্র উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করত, তাদের কপালে কোনো ভালো সরকারি চাকরি জুটত না। ফলে তারা হাইস্কুলের শিক্ষক হতেন। জীবনের কাক্সিক্ষত উচ্চ স্তরে পৌঁছতে না পারলেও তারা হতেন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। তাদের ক্লাস নিয়মিত করলে প্রাইভেট টিউটরের কাছে যেতে হতো না। আমরা ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় সমান দক্ষতা অর্জন করেছিলাম। ইংরেজিতে ভালো দখল থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে ইংরেজি ভাষায় রচিত কোনো রেফারেন্স বই পড়তে ও বুঝতে কষ্ট হতো না। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক ছাত্রছাত্রী শুদ্ধ ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না, রেফারেন্স বই পড়া তো দূরের কথা। ফলে তাদের জ্ঞান হয় অত্যন্ত সীমিত। এভাবে ক্রম-পুঞ্জীভূতহারে শিক্ষার মানে ধস নেমেছে। এর পাশে যখন যোগ হল নকলের মচ্ছব, তখন অনেকেই পড়াশোনা শিখে পরীক্ষার হলে যাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলল। কী করে নকল করা যায় সেটাই হল সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। দৈনিক ইত্তেফাকে একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। ছবিতে দেখা গেল স্কুলের টিনের চাল খুলে নকল সরবরাহ করা হচ্ছে। কী ভয়াবহ অবস্থা! পরীক্ষা পাসের সনদ মিললেও বিদ্যাটা রয়ে গেল অধরা। হাল আমলে প্রাইমারি ও জুনিয়র স্তরে পাবলিক পরীক্ষা চালু হয়েছে। এসব পরীক্ষারও প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে বেশুমার। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করবে কেন? যারা বছরজুড়ে লেখাপড়া করেছে, তারাও এখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বলছে, আমার কষ্ট করে লেখাপড়া করার সার্থকতা কোথায়? অন্যরা তো লেখাপড়া না করেই আগের রাতে প্রশ্ন পেয়ে সেটুকু মুখস্থ করে আমার চেয়ে ভালা করবে। প্রতিযোগিতার কোনো মূল্য থাকবে না।
একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তখনই সৃষ্টি হয়, যখন জ্ঞান আহরণের জন্য প্রতিযোগিতা থাকে। শিক্ষার সর্বস্তরে রাজনীতিকরণ ঘটার ফলে এখন শিক্ষক রিক্রুট হচ্ছে না, রিক্রুট হচ্ছে দলীয় ক্যাডার। এরা শিক্ষাব্যবস্থায় পচন ধরিয়ে দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের চেয়ে এরা শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হয়ে টাকা-পয়সা রোজগার করাকেই জীবনের মোক্ষ হিসেবে ধরে নিয়েছে। এরা কী নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দেবে? এদের হাত দিয়েই গড়ে উঠছে নৈতিকতাবর্জিত, আদর্শহীন, লক্ষ্যহীন, সৃজনশীলতাহীন একটি প্রজন্ম। এ প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মকে সব দিক থেকে প্রতিবন্ধী করে ফেলবে। সমাজে জ্ঞান ও শিক্ষার কোনো মর্যাদা থাকবে না। বলা হচ্ছে, ফাঁস করা প্রশ্নপত্র যারা ফেসবুকে দিচ্ছে তাদের আইটি অপরাধে অভিযুক্ত করতে হবে। আসল ফাঁসকারীকে চিহ্নিত না করে যারা ফেসবুকে প্রশ্ন প্রচার করে উত্তেজনা বোধ করে, তারা এক অর্থে ভালো কাজই করছে। কারণ এর ফলে ব্যাপক জনগণের কাছে ফাঁসের ব্যাপারটি উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির একটি ভালো দিক হল অনেক অপকর্মকেই এটি জনসমক্ষে স্বচ্ছ করে দেয়। অবশ্য এদের বিরুদ্ধে যে কথাটি বলা যায় সেটা হল, এরা শতসহস্র ছাত্রছাত্রীকে স্বেচ্ছা মৃত্যুবরণে উৎসাহিত করে। এদিক থেকে তারা দ্বিতীয় পর্যায়ের দোষী। কিন্তু মূল দোষীদের সম্পর্কে কিছুই করা হচ্ছে না। আমি জানি না, আর কী করলে জাতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত শিক্ষার আর কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে। সর্বোপরি দুঃখজনক হলেও অনেকে বলে থাকেন, পরীক্ষকদেরও বেশি নম্বর দেয়ার জন্য উপরের মহল থেকে চাপ দেয়া হয়। বেশি নম্বর কেন দিতে হবে পরীক্ষার্থীকে? যে নম্বর প্রাপ্য সেটাই প্রদান করতে হবে। পাসের হার বেশি দেখানোর মধ্যে আত্মপ্রসাদ থাকতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে আত্মপ্রবঞ্চনা। যারা ব্যাংকের টাকা মেরে দিচ্ছে, শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লুট করছে কিংবা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মান-এ ঘাটতি সৃষ্টি করে অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছে, যারা মাদকের ব্যবসা করে তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে, তারা নিঃসন্দেহে জাতির শত্রু। কিন্তু যারা জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে জাতিকে চিরতরে পঙ্গু করে ফেলছে, জাতির আত্ম-উন্নতির পথকে কণ্টকাকীর্ণ করছে, তারাও লুটেরা শ্রেণীর চেয়ে কম পাপে পাপী নয়। এ পাপ মহাপাপ। এ পাপ দুর্নীতির মধ্যে ঘৃণ্যতম দুর্নীতি। শিক্ষার মান ও গুণে উন্নতি ঘটলে একদিন না একদিন
জাতির সত্যিকার মুক্তির একটি সম্ভাবনা থাকে। সেটিকেও যখন চরমভাবে অধঃপতিত করা হয়, তখন আর কোনো আশার আলোক দেখা যায় না।
আশা করব, সব বিবেকবান মানুষ শিক্ষাব্যবস্থাকে এভাবে ধ্বংস করার ঘৃণ্য প্রয়াসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। এতে দল ও মতের কোনো প্রশ্ন নেই। একটি অধঃপতিত শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে যখন গ্রাস করে, তখন সব মত ও পথের অনুসারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হন তাদের ভবিষ্যৎ বংশধররাও। সম্পদে অপ্রতুল বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধ করার একটি মাত্র পথ খোলা আছে। সেটি হল শিক্ষা, শিক্ষা, আরও শিক্ষা; জ্ঞান, জ্ঞান ও আরও জ্ঞান। জ্ঞান থেকে জাত অভিজ্ঞানই আমাদের একমাত্র মুক্তির পথ।
ড. মাহবুব উল্লাহ : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অর্জন ও লংঘন by কাজী ফারুক আহমেদ

আজ সর্বজনীন মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালে ৩০টি ধারা সংবলিত ঘোষণা প্রকাশের পর ১৯৫০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মানবাধিকার দিবস উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই থেকে প্রতিবছর দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন দিবসটি উপলক্ষে প্রদত্ত বার্তায় বলেছেন : ‘আমরা ঘোষণা করছি যে, যে যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের শ্রেণী ও মতামত, জেন্ডার পরিচয় যাই হোক না কেন, মানবাধিকার সবার জন্য। প্রত্যেকেই অবিচার, অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থার বিরদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে পারেন। মানবাধিকার লংঘন ব্যক্তিগত দুঃখ-বেদনাকে অতিক্রম করে। বৃহত্তর সংকটের সতর্কবার্তা দেয়। আমি সব রাষ্ট্রের প্রতি বছরের প্রতিদিন মানবাধিকার রক্ষার দায়বোধ থেকে দায়িত্ব পালনের আহবান জানাই। জনগণকে আহ্বান জানাই তাদের নিজ নিজ সরকারকে দায়বদ্ধ করতে।’ জাতিসংঘ মহাসচিবের এ বার্তার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সব অঞ্চলের সব জনগোষ্ঠীর মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা ও মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়েছে।
এটা সত্য, পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত কোনো দেশে মানবাধিকার পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করছে। এ খাত থেকে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার অবৈধ মুনাফা অর্জিত হচ্ছে। ‘প্রফিট অ্যান্ড পোভারটি : দি ইকোনমিক্স অব ফোর্সড লেবার’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত আনুমানিক ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার অবৈধ মুনাফার দুই-তৃতীয়াংশ যৌন ব্যবসা থেকে এবং ৫ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার গৃহস্থালি কাজ, কৃষি, শ্রম ও অন্য খাতের শ্রম শোষণের মাধ্যমে অর্জিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ওপর জোর করে শ্রম শোষণ করা হয়, তাদের অর্ধেকের বেশি নারী ও কিশোরী। এদের দিয়ে প্রধানত জোরপূর্বক যৌন ব্যবসা ও বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করানো হয়। অন্যদিকে পুরুষ ও কিশোরদের দিয়ে জোরপূর্বক কৃষি, নির্মাণ ও খনি শ্রমিক হিসেবে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হয়।’ অন্য এক জরিপ প্রতিবেদনে পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনে জড়িত থাকার দায়ে রাষ্ট্রকে দোষারোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে ওই দেশের সরকারগুলো ধর্মীয় সহিংসতা রোধ করতে এবং বিতর্কিত ব্লাসফেমি আইন সংশোধন করতে কেবল ব্যর্থই হয়নি, অনেক রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাও ঘৃণা ছড়ানোর অপরাধে জড়িত আছেন। ইসলামাবাদভিত্তিক এক গবেষণা সংস্থা পরিচালিত জরিপে এ কথা বলা হয়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণ ও খুনের অপরাধে ৩০ বছর কারাবাসের পর সে দেশের দু’জন নাগরিক ডিএনএ পরীক্ষায় নিরপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর মুক্তি পেয়েছেন। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে জাপানে। ৪৬ বছর পর এক ব্যক্তির মামলা আবার শুনানির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক এ কথা বলা যাবে না। আমাদের সমাজেও নানাবিধ বৈপরীত্য বিরাজ করছে। ইতিবাচক উদাহরণ যেমন আছে, একই সঙ্গে আছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ। সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সক্রিয়। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন প্রণীত হয়েছে। নারীনীতি অনুমোদিত হয়েছে। হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি মিলেছে। সংশোধিত শিশুনীতি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। উচ্চ আদালত ফতোয়াকে আইনবহির্ভূত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হওয়ার পর ধীরগতিতে হলেও তা কার্যকরের প্রক্রিয়ায় এবং আদালতের নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তিদান নিষিদ্ধ হয়েছে। যদিও শিক্ষক নামধারী একশ্রেণীর শিক্ষকের অশিক্ষকসুলভ আচরণের জন্য তা পুরো বন্ধ হয়নি। এসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। আবার বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যে জানা যায়, ২০১৩ সালে সারা দেশে ৫০০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৫০ জন, হত্যাকাণ্ডের শিকার ১৮০ শিশু এবং ১৭০ শিশু শিক্ষাঙ্গনে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ৪২ শিশু অপহরণ, ২৫ শিশু নিখোঁজ ও ১৪৯ শিশু দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে।
বাংলাদেশে এবারের মানবাধিকার দিবসটি পালিত হচ্ছে নারী-পুরুষের সমঅধিকারসহ নানা অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকে প্রধান উপজীব্য করে। এর মধ্যে আছে শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিবন্ধীদের অধিকার। পাঁচ কোটি কর্মহীন তরুণের কর্মসংস্থান, উৎপাদিত ফসলের জন্য কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও দলিত জনগোষ্ঠী হরিজনদের মানবিক অধিকার। পাবর্ত্য জনগোষ্ঠীর সম্পত্তির ওপর ন্যায্য অধিকার। চা শ্রমিক ও নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তির অধিকার। দরিদ্র মানুষের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা লাভের অধিকার। ভেজালবিহীন ওষুধ, সুপেয় পানির অধিকার, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার। প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা লাভের অধিকার। পুষ্টিবঞ্চিত মা ও শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির উপকরণ প্রাপ্তির অধিকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর আনন্দের মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশে শিক্ষা লাভের অধিকার। খালি পেটে না থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের অধিকার। পরিবেশবাদীদের কাছে আজকের দিনটির বিশেষ তাৎপর্য হল শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন গ্যাস নিঃসরণের প্রতিক্রিয়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশ, ভাটির দেশের মানুষ হিসেবে বর্ষায় বন্যার হাত থেকে ও খরায় শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য পানির হিস্যা পাওয়ার অধিকার সুরক্ষা। বছরে পর বছর বিনা বেতনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য বেতন ভাতা/এমপিও প্রাপ্তির অধিকার। তবে একাত্তরে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু এবং বিচারের রায় ও তা কার্যকরের মধ্য দিয়ে এবারের মানবাধিকার দিবসটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিকতায় ও ঘটনার পারম্পর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত হবে; উগ্রপন্থী, মৌলবাদ ও অধিকারহীনতা দেশটিকে গ্রাস করতে পারবে না- এ আশাবাদ ও প্রত্যয়ে তারা নতুন করে আজকের দিনে উজ্জীবিত হবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অধিকারের সীমা ও পরিধি নিয়ে আলোচনায় নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাকে অন্যতম মানবাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে জনমত গড়ে উঠছে। এ মাধ্যমকে ব্যবহার করে বাধাহীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ যাতে সীমিত হয়ে না যায়, সে জন্য ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ একক কোনো দেশ কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা উচিত নয় বলে মনে করছেন ব্যবহারকারীরা। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, মিসর, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রেট ব্রিটেন, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, পোল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ওপর ৭ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বরের মধ্যে চালানো এ জরিপে এ তথ্য জানা যায়।
আমাদের উপমহাদেশে শিশু ও তরুণদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তালেবান হামলায় বেঁচে যাওয়া পাকিস্তানি কিশোরী মালালা ইউসুফজাই এবং ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাশ সত্যার্থী। ১৭ বছর বয়সী মালালা নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে শান্তি পুরস্কার পেলেন। তিনি তালেবান হামলায় বেঁচে যাওয়ার পর নারী শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করছেন। আর ৬০ বছর বয়সী কৈলাস দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছেন। গড়ে তুলেছেন ‘বচপন বাঁচাও’ আন্দোলন। গ্লোবাল ক্যাম্পেইন ফর এডুকেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সেই সুবাদে রাশেদা কে চৌধুরীর মাধ্যমে কৈলাস আমার পরিচিত। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে পাঠানো আমার অভিনন্দন বার্তার জবাবও তিনি দিয়েছেন।
মানুষের অধিকারের প্রশ্নে, মূল্যবোধ প্রসঙ্গে পূর্ব-পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিণ মিল-অমিল দুটিই আছে। একেকটি সমাজ ও সংস্কৃতির উপকরণ বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ভিন্ন হতে পারে। পাশ্চাত্যের সমকামিতার স্বীকৃতির দাবি সর্বত্র অধিকারের তালিকাভুক্ত নয়। সে জন্য সাধারণভাবে স্বীকৃত ও গ্রাহ্য অধিকারগুলো নিয়েই সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে সুসংরক্ষণ করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নতুন শক্তি ও সাহসে বিকাশ লাভ করেছে। খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষার অধিকার, চিকিৎসা লাভের অধিকার, নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর বৈষম্য, কর্মবৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য নিরসন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি সেজন্য দেশে মানবাধিকার আন্দোলনের প্রধান উপজীব্য।
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান, শিক্ষাবিদ

পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে এখনই আলোচনা চায় ইইউ

৫ই জানুয়রির নির্বাচন প্রশ্নে অবস্থান অপরিবর্তীত রয়েছে জানিয়ে ঢাকায় সফররত  ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংসদীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান জেন ল্যাম্বার্ট বলেছেন,  পরবর্তী নির্বাচনটি কিভাবে অংশগ্রহনমূলক করা যায় সেটা নিয়ে এখনই আলোচনা শুরু করতে হবে। তার মতে, নতুন নির্বাচন নয়, পরবর্তী নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হবে, কোন পদ্ধতিতে নির্বাচনটি সংঘঠিত হবে- তার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হওয়া উচিত। চার দিনের ঢাকা সফরের শেষ দিনে আজ গুলশানে অবস্থিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেলিগেশন প্রধানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশেষ করে বিচার বর্হিভূত হত্যাকা- এবং গুমের বিষয়ে বরাবরের মত উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রত্যেকটি ঘটনার পূর্ণ তদন্তের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কতৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান, ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা- যাতে ভূক্তভোগীরা ন্যায় বিচার পায়। এনজিওদের নিয়ন্ত্রণে প্রণীত আইনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইইউ পার্লামেন্টের ওই সদস্য বলেন, এমন কোন নিয়ন্ত্রণমূলক আইন করা উচিৎ নয়, যা গতিশীল নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রোধ করে।

সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ছে তেল- এ বছরে তিন জাহাজডুবি

(পূর্ব সুন্দরবনের জয়মনির ঘোল এলাকায় শ্যালা নদীতে গতকাল ভোরে ডুবে যায় তেলবাহী জাহাজ ওটি সাউদার্ন স্টার-৭। এতে নদীতে ছড়িয়ে পড়ে তেল (ইনসেটে) l ছবি: প্রথম আলো) পূর্ব সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে জ্বালানি তেলবাহী একটি জাহাজ ডুবে গেছে। এতে জাহাজটি থেকে সাড়ে তিন লাখ লিটারের বেশি ফার্নেস তেল সুন্দরবনে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে নদীটির তীরের কাছাকাছি নোঙর করা ওই জাহাজটিকে অন্য একটি পণ্যবাহী জাহাজ ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলটি মংলা বন্দরের জেটি থেকে নয় নটিক্যাল মাইল দূরে। ছড়িয়ে পড়া তেলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছে বন বিভাগ। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জাহাজটি উদ্ধার এবং তেল ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণে সরকারি কোনো সংস্থা উদ্যোগ নেয়নি। তেলবাহী জাহাজটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেসার্স হারুন অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দিন জানান, খুলনার পদ্মা অয়েল থেকে তেলবাহী জাহাজ ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে সোমবার বিকেলে গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্দেশে যাত্রা করে। রাতে কুয়াশার কারণে জাহাজটি সুন্দরবনের শ্যালা নদীর তীরের কাছাকাছি জয়মনি ঘোল এলাকায় নোঙর করে। ভোর চারটার দিকে বিপরীত দিক থেকে আসা এম টি টোটাল নামে একটি পণ্যবাহী জাহাজ ওটি সাউদার্ন স্টার–৭কে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তেলবাহী জাহাজটি ডুবে যায়। দুর্ঘটনায় জাহাজটির চালক (মাস্টার) মোখলেসুর রহমান নিখোঁজ হন। জাহাজের অপর ছয় কর্মচারী সাঁতরে তীরে ওঠেন। গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘এ ঘটনায় আমাদের দুই কোটি ৩৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। চালকের সন্ধানে তল্লাশি চলছে।’
মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার খান মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জাহাজটির চার ভাগের তিন ভাগ ডুবে গেছে। যে স্থানে জাহাজটি ডুবেছে, সেটি বন্দর চ্যানেলের বাইরে। ফলে বন্দর চ্যানেল ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমীর হোসাইন চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে জানান, গতকাল বিকেল পর্যন্ত তেল সুন্দরবনের জয়মনি, নন্দবালা, আন্ধারমানিক, মৃগমারী এলাকার প্রায় ২০ কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জোয়ার-ভাটার টানে দ্রুত এই এলাকা বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে পানিতে ভেসে থাকা এই জ্বালানি তেল অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
আমীর হোসাইন চৌধুরী আরও বলেন, ‘জোয়ারের সময় বনের ভেতর এই দূষিত পানি ঢুকে যাচ্ছে। এতে বিভিন্ন প্রাণীসহ বনজ সম্পদও ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আমরা কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে জাহাজটি উত্তোলনের কথা বলেছি।’ জাহাজটির উদ্ধারকাজ শুরু করা নিয়ে এর মালিকপক্ষ সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।
তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নৌবাহিনীর জাহাজ বিএনএস শহীদ রুহুল আমিনকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর হাবিবুর রহমান খান। তিনি বলেন, ভাসমান তেলের আস্তরণকে ভারী ও একত্র করার মতো রাসায়নিক দ্রব্য নৌবাহিনীর কাছে থাকার কথা। এই দ্রব্য ব্যবহার করে ক্ষতি কিছুটা কমানো যেতে পারে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার দত্ত বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, এত তেল পানিতে ভেসে থাকায় উপকূলীয় প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর এর মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। সুন্দরবনের মতো শ্বাসমূলীয় বনের গাছপালা শ্বাসমূল দিয়ে শ্বাস নেয়। এই তেলের আস্তরণ জোয়ারের সময় মাটির ওপরে বিস্তৃত হয়ে গাছের শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে গাছ মারা যাবে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেবে এবং মাছসহ জলজ প্রাণীও অক্সিজেন সংকটে ভুগবে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, তেল দূষণের কারণে মৃগমারী-নন্দবালা-আন্ধারমানিক ডলফিন অভয়াশ্রম মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। এখান থেকে ডলফিনের বসতি সরে যেতে পারে।
ভারত-বাংলাদেশ নৌ প্রটোকল রুট ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে দেশের নৌবাণিজ্য যোগাযোগ পথ হিসেবে ব্যবহৃত ঘষিয়াখালী চ্যানেল মংলা নালা ও রামপালের কুমার নদ ভরাট হয়ে প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। তখন থেকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীকে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করছে বিআইডব্লিউটিএ।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ৬০০ মেট্রিক টন সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে এম ভি নয়ন শ্রি-৩ নামে একটি জাহাজ পশুর চ্যানেলের জয়মনির ঘোল এলাকায় ডুবে যায়। একই মাসের ১২ তারিখে পশুর চ্যানেলের হাড়বাড়িয়া এলাকায় প্রায় ৬৩০ মেট্রিক টন সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে এম ভি হাজেরা-২ নামের আরও একটি মালবাহী জাহাজ ডুবে যায়। ওই জাহাজ দুটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত -প্রথম আলোকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান by মানসুরা হোসাইন

দেশে বর্তমানে আইনের শাসন কতটুকু প্রতিষ্ঠিত? মানবাধিকার পরিস্থিতিই বা কেমন? গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে অনেক কথাই বলেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান | এ সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক মানসুরা হোসাইন...
প্রথম আলো: দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন বলে আপনি মনে করেন?
মিজানুর রহমান: দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন, তা নিয়ে একবাক্যে কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আর আমি যেভাবেই উত্তর দিই না কেন, তার কিন্তু অনেক ব্যাখ্যা হতে পারে। মানবাধিকার পরিস্থিতি এখন কেমন, তা বলতে গেলে অতীতের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। আমি তো বলব, ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেছে। তা অনেক সন্তোষজনক। ২০১৩ সালে দেশে যে সহিংসতা ছিল, তা মানুষের নিরাপত্তাকে প্রকট করে তুলেছিল। নিরাপত্তাহীনতা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সেই অবস্থা থেকে বের হতে পারা একটি শুভ লক্ষণ।
প্রথম আলো: দেশে আইনের শাসন কোন পর্যায়ে আছে বলে আপনি মনে করেন?
মিজানুর রহমান: আমি বলব, আইনের শাসনের জায়গাটি আমাদের দেশে বরাবরই দুর্বল ছিল। আইনের শাসন এখনো যে খুব একটা উন্নতি সাধন করেছে বা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তা বলাটা কষ্টকর। কেননা আইনের শাসনের কিন্তু বহুমাত্রিকতা আছে। আমরা জানি, খুব সাধারণভাবে একটি কথা প্রচলিত, তা হচ্ছে আমাদের এখনকার বিচারব্যবস্থা ধনীবান্ধব। দরিদ্র মানুষ মনে করেন আদালতপাড়া তাঁর জন্য নিষিদ্ধ। কেননা তিনি সেখানে গিয়ে কিছু পাবেন না। বিচারব্যবস্থাটা যেন ধনীর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ কথাগুলো সমাজে প্রচলিত থাকার অর্থই হচ্ছে দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত রয়েছে। আমরা এটাও লক্ষ করি অনেক ক্ষেত্রে যেখানে ন্যায়বিচারের স্বার্থেই আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার, সেখানে অনেক সময় তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘জাস্টিস ডিলেড, জাস্টিস ডিনাই’ কথাটি সত্য প্রমাণিত হয়। একটি উদাহরণ দিই। সাগর-রুনি চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনা যেখানে আপনারা, সাংবাদিক গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট। এর পরও প্রকৃত খুনি কে, তা কি বের করতে পেরেছেন? ‘কেষ্ট বেটাই চোর’ এটা বানাতে গিয়ে নিরীহ, যাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই, তাদের সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে। আইনের শাসনের ওপর এর চেয়ে বড় আঘাত আর কী হতে পারে? এগুলো তো আমরা অহরহ দেখছি। তাহলে আমরা কী করে বলব যে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? তবে আমরা সবাই প্রত্যাশা করি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
প্রথম আলো: আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ও মানবাধিকারের সম্পর্ক যদি একটু স্পষ্ট করেন...
মিজানুর রহমান: আইনের শাসনের সঙ্গে মানবাধিকারের নিবিড় সম্পর্ক আছে। আপনি যদি একটি অপরাধ করেন, কিন্তু আপনার নানা ধরনের প্রভাবের কারণে বা রাষ্ট্রের সঙ্গে নানাবিধ সম্পর্কের কারণে রাষ্ট্র যদি ব্যবস্থা নিতে অপারগতা প্রকাশ করে বা অনিচ্ছুক হয় বা অন্য কোনো অপকৌশল ব্যবহার করে, আপনাকে আইনের স্পর্শ থেকে দূরে রাখতে চায়, তাহলে সেখানে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়। তখন আর আইনের শাসন থাকছে না। আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর প্রভাবটি মানবাধিকারের ওপর পড়ে। এ রকম ঘটনা যে এখানে ঘটছে না, তা বলতে পারব না। যেমন ধরুন, একজন দরিদ্র মানুষ, তিনি তাঁর মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেরে ফেলল। তারা একটু পয়সাওয়ালা হলে থানায় বিষয়টিকে হত্যা মামলা হিসেবে অভিযোগই নেবে না। অভিযোগ নিলেও তদন্ত শেষে একটা চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে দেবে যে এটা হত্যা মামলা নয়। আপনারা মাহজাবীনের (চিকিৎসক শামারুখ মাহজাবীন) কেসটা একটু দেখেন। তাঁর বাবা প্রকৌশলী। কিন্তু রাজনৈতিক এক ধরনের প্রভাবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাল্টে যাচ্ছে। আমরা গণমাধ্যম থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি, এতে মনে হচ্ছে পোস্টমর্টেম রিপোর্টটি একটি অসত্য রিপোর্ট। চিকিৎসকই দিয়েছেন এ রিপোর্ট। তার মানে কী? টাকার কাছে সবাই বিকিয়ে যাচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচার হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকছে না।
প্রথম আলো: মাহজাবীনের কেসটার ক্ষেত্রে কমিশন কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে?
মিজানুর রহমান: যখন মামলা বিচারাধীন, তখন কমিশনের পক্ষে করার কিছু থাকে না। তবে অনেক সময় আমরা আইনকে উপেক্ষা করে হলেও কিছু পদক্ষেপ নিই। তবে তা বিচারে প্রভাব ফেলবে সেই ধরনের তদন্ত করি না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তখন আমরা দাবি করি এমন একজন চিকিৎসক বা বোর্ডকে দিয়ে পোস্টমর্টেম করানো হোক, যাতে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, সেটি চাওয়া নিশ্চয়ই আইনের লঙ্ঘন নয়। আমরা সাধারণত সেই কাজ করছি। মাহজাবীনের কেসে তেমন কিছু করেছি কি না, মনে করতে পারছি না। তবে জান্নাতি নামের মেয়েটির বেলায় করার চেষ্টা চলছে। মেয়েটি নিজেই দুর্ঘটনার শিকার। এখন তাঁকে হত্যাকারী বা হত্যায় সহায়তাকারী হিসেবে দেখানোর যে অপচেষ্টা চলছে তা জানাতে তাঁর পরিবারের সদস্যরা এসেছিলেন কমিশনের কাছে। সামনে কমিশনের সভায় সিদ্ধান্ত হবে। কমিশনের পক্ষ থেকে এ মামলাটি নিয়ে লড়াই করার সিদ্ধান্ত এলে তাঁর হয়ে আমরা আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হব।
প্রথম আলো: কমিশনের এ পর্যন্ত যত অর্জন, তা কি যথেষ্ট বলে মনে করেন?
মিজানুর রহমান: এ ক্ষেত্রে আমি গর্ব করেই বলতে পারি সীমাবদ্ধতা, জনবলের সংকট, আর্থিক সংকট, লজিস্টিক সাপোর্টের স্বল্পতার পরও আমরা যা করেছি, তা অন্য আর কারও পক্ষে করা সম্ভব না। কমিশনকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি, যেখানে সাধারণ মানুষ যদি কোনো সংস্থার ওপর আস্থা রাখে, তো সে হচ্ছে মানবাধিকার কমিশন। তারা জানে, এখানে তাদের হয়রানি হতে হবে না। হেনস্তা হতে হবে না। পয়সা খরচ করতে হবে না। এখানে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই। এটি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বলেই কমিশনে অভিযোগপ্রাপ্তির সংখ্যা ৩০০ ভাগের বেশি হয়ে গেছে। অন্য কোথাও গিয়ে তারা প্রতিকার পাচ্ছে না বা প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা এতটাই ক্ষীণ যে, তারা কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে বেশি স্বস্তিকর মনে করছে। একটা পরিবর্তন, তফাৎ আনতে সক্ষম হয়েছি। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারি অফিস ও কর্মকর্তারাও কমিশনকে শ্রদ্ধার চোখে দেখছে। এই শ্রদ্ধার জায়গাটিকে মজবুত করতে হবে। যেন আমাদের কোনো সুপারিশ শুধু সুপারিশ হিসেবেই না থাকে। সুপারিশটা যে তাদের প্রতিপালন করতে হবে, সে জায়গাটা তৈরি করতে হবে। এখনো অনেকে ভাবছে, কমিশন বলেছে, তা আমরা করলাম না। মানলাম না।
প্রথম আলো: কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা কালক্ষেপণ করলে তা রাষ্ট্রপতিকে জানাতে পারে কমিশন...
মিজানুর রহমান: কমিশন এখন পর্যন্ত এ হাতিয়ারটি ব্যবহার করেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি বিষয়ে আমরা ১৯ বার তাগাদা দিয়েছি। এখন ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে লেখা হবে। সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তার পরও যদি কাজ না হয়, তখন আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করব। আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছি। কৌশলগতভাবে কাজ করার চেষ্টা চালাচ্ছি।
প্রথম আলো: কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি প্রথম দিকে সরকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যে ভাষায় সমালোচনা করতেন, এখন আর আমরা তা দেখতে পাচ্ছি না। আপনি কী কোনো চাপের মুখে আছেন?
মিজানুর রহমান: (হেসে) সরকারের সমালোচনা করাই কমিশনের একমাত্র কাজ নয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ, আবার রাষ্ট্রকে আস্থায় নিয়েই কাজ আদায় করতে হয়। বিচিত্র ও অদ্ভুত ধরনের সম্পর্ক। শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি করে পৃথিবীর কোথাও কোনো কমিশন কাজ করতে সফল হয়নি। তবে যখন সরকারের সমালোচনা করা প্রয়োজন, সাধুবাদ জানানো প্রয়োজন—সবই করা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারি না, যা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদকে উসকে দিতে পারে; যা মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আরও বেশি হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই আমাদের নানাবিধ কৌশল সামনে রেখে কাজ করতে হয়। এ ছাড়া কোনো মন্ত্রী বক্তব্য বা বক্তৃতায় আমাকে নিয়ে কিছু বললে তাঁকে আমি চাপ মনে করি না। নির্ভেজাল সত্য, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে কখনোই কোনো রকম নির্দেশ, আদেশ, অনুরোধ বা উপদেশ দিয়ে কোনো বার্তা পাঠানো হয়নি। অন্তত আমার কাছে দেয়া হয়নি; বরং উল্টোটি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, আমার কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করলে তা যেন তাঁকে জানাই। যখন দু-একজন মন্ত্রী আমার নামে মন্তব্য করেছেন, তা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, মন্ত্রীরা যেভাবে মন্তব্য করছেন, তা কমিশন বা সরকারের জন্য শুভবার্তা বহন করছে না। এতে অনেকেই মনে করতে পারেন আমাদের কাজে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। বিদেশের কাছেও ভুল বার্তা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, ‘মিজান, আমি কি কিছু বলেছি?’ আমি বলেছি, ‘না?’ তখন তিনি বলেছেন, ‘তুমি তোমার মতো করে কাজ চালিয়ে যাও।’ প্রধানমন্ত্রী বোঝেন, কমিশনের স্বাধীনতা কেমন থাকা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই তিনি লাইসেন্স দিয়েছেন। তবে জনবল সংকট, অর্থ খরচের সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন বিষয় সমাধান না করে সরকার আমাদের কাজে ইনডাইরেক্টভাবে বাধা দিচ্ছে বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, তা তো বলাই যায়। তবে জনবল সংকট খুব শিগগির দূর হবে বলে আশা করছি। ২০১৫ সালে কমিশনের কাজের গতি আরও বাড়বে।
প্রথম আলো: কমিশনের বা আপনার সামনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি?
মিজানুর রহমান: আমার বড় ইচ্ছা ও স্বপ্ন ছিল আমার মেয়াদেই যেন দেশব্যাপী মানবাধিকার কৃষ্টি প্রতিষ্ঠার অন্তত প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করতে পারি। এ কাজটি করতে দেশব্যাপী যে পরিমাণ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন ছিল, তা করতে পারিনি। আমরা এখন পর্যন্ত প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি ঘরে পৌঁছাতে পারিনি। এটিই কমিশন ও আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথম আলো: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মিজানুর রহমান: প্রথম আলোকেও অনেক ধন্যবাদ। গণমাধ্যমের সহায়তা ছাড়া কমিশন খুব বেশি কিছু করতে পারবে না।

মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে বিচার বিভাগীয় দুটি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক। আজ বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে এ দাবি জানান এই আইনজীবী। ‘মানবাধিকার হরণ: এ কী পরিস্থিতিতে দেশ’ শিরোনামের ওই আলোচনা সভার আয়োজন করে ‘মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি’।
বেলা পৌনে ১১টার দিকে আলোচনা সভা শুরু হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের প্রায় ২০ জন সদস্য আলোচনার প্রথম পর্বে তাঁদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। দ্বিতীয় পর্বে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে বিচার বিভাগীয় দুটি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে শাহদীন মালিক বলেন, গুম-খুন-অপহরণের ঘটনায় একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন হবে। বিচার বিভাগীয় অপর কমিশনটি হবে আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য।
আগামী ২১ ফেব্রুয়ারির আগে এই কমিশন দুটি গঠন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অভিযোগ তদন্তের দাবি জানান শাহদীন মালিক। র‍্যাবের ‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, এসবের পেছনে রয়েছে দেশের সংঘাতময় রাজনীতি। সংঘাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান তিনি। আলোচনায় আরও অংশ নেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, আইনজীবী সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী শাহনাজ হুদা প্রমুখ। আলোচনা শেষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়।

বেনজীরের ওপর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী নিহত

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানোর মূল পরিকল্পনাকারী তালেবান কমান্ডার ফিরদৌস খান পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। করাচির মাঙ্গোপির এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ১ ঘণ্টা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ফিরদৌস। অপরাধ তদন্ত বিভাগের সিনিয়র এক কর্মকর্তা উসমান বাজওয়া এ তথ্য দিয়েছেন। ২০০৭ সালে ওই বোমা হামলায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন বেনজীর ভুট্টোর ৪৫০ সমর্থক। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সৌভাগ্যক্রমে, ওই হামলায় বেঁচে গেলেও, মাত্র দুই মাস পর রাওয়ালপিন্ডিতে এক সমাবেশে আততায়ীর গুলি ও আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন বেনজীর। দীর্ঘ ৮ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পর করাচিতে প্রথমবার বোমা হামলার মুখে পড়েন বেনজীর। জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করার কিছুক্ষণ পর দুটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। হাজার হাজার সমর্থক সেদিন বেনজীরকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বেনজীর দেশে ফেরার দিন তাকে হত্যার জন্য আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল এবং তাকে টার্গেটের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছিল ফিরদৌস। বাজওয়া বলেন, সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। বন্দুকযুদ্ধের সময় অন্ধকার থাকায় বেশ কয়েকজন তালেবান কমান্ডার পালাতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল (অব.) পারভেজ মোশাররফ বেনজীরের হত্যাকা-ের জন্য পাকিস্তান তালেবানের প্রধান বাইতুল্লাহ মেহসুদকে দায়ী করেছিলেন। তবে বেনজীরের হত্যাকা-ের সঙ্গে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছিল সে। ২০০৯ সালের আগস্টে মার্কিন এক ড্রোন হামলায় নিহত হয় মেহসুদ।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। বঙ্গন্ধুকে পাকবন্ধু বলার অভিযোগে দায়ের করা মানহানি মামলায় এই পরোয়ানা জারি করে আদালত। আজ সমন ফেরতের নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় মহানগর হাকিম আতাউল হকের আদালত তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। সেই সঙ্গে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৯শে জানুয়ারি দিন ধার্য করেন আদালত। এর আগে ১৭ই নভেম্বর মহানগর হাকিম রেজাউল করিম ১০ই ডিসেম্বরের মধ্যে তারেক রহমানকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়, তারেক রহমান চলতি বছরের ১১ই নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের আট্রিয়াম হলে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে লন্ডন বিএনপি শাখা আয়োজিত সভায় ‘বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু নন, পাকবন্ধু’ বলে মন্তব্য করেছেন। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ায় মানহানির অভিযোগ এনে দন্ডবিধি ৪৯৯/৫০০ ধারায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মো. মনির খান ১৭ই নভেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম রেজাউল করিমের আদালতে মামলা দায়ের করেন।

তাঁকে খেল না অ্যানাকোন্ডা

অ্যানাকোন্ডার সঙ্গে পল রোজোলির ধস্তাধস্তির একটি মুহূর্ত।
তাঁর ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি।
ইচ্ছা ছিল অ্যা​না​েকান্ডার খাবার হয়ে ঢুকবেন তার পেটে। সারা বিশ্ব দেখবে সেই দৃশ্য। কিন্তু হল না, অ্যানাকোন্ডা খেল না তাঁকে। ধ্বংসের হাত থেকে আমাজন বন রক্ষায় বিশ্ববাসীকে আগ্রহী করতে এমন উদ্ভট পরিকল্পনায় করেছিলেন মার্কিন প্রকৃতিবিদ পল রোজোলি। পরিকল্পনা মতো জীবন্তই অ্যানাকোন্ডার পেটে ঢুকতে প্রস্তুত হলেন রোজোলি। পুরো ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণের প্রস্তুতিও নেওয়া হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে পেটে ভরেনি অ্যানাকোন্ডা। ফলে ওই সাপের জীবন্ত মানুষ ভক্ষণের দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে দর্শকেরা। তবে সাপের সঙ্গে রোজোলির ভয়ংকর সংগ্রামের দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছে তারা। খবর এএফপির। সাপটি রোজোলিকে গিলে ফেলার পরিবর্তে তাঁর পুরো শরীর পেঁচিয়ে ধরে। সাধারণত কোনো খাবার শিকার ধরে পেটে ভরার আগে এটাই করে থাকে অ্যানাকোন্ডা। পেঁচিয়ে ধরায় রোজোলির জন্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ, তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁর ডাকে সহযোগীরা চলে আসায় রোজোলি প্রাণে বেঁচে গেছেন। রোজোলি জানিয়েছেন, আমাজন রক্ষায় এক দশক ধরে কাজ করতে গিয়েই তাঁর মাথায় ওই পরিকল্পনা আসে। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সবাই জানে আমাজন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সবাই বলবে, এই বনের গুরুত্ব কত। কিন্তু আজ পর্যন্ত লোকজন এদিকে যথেষ্ট দৃষ্টি দিচ্ছে না।’
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রোজোলির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দম বন্ধ হওয়া এড়াতে তাঁকে কার্বন ফাইবার ব্যবহার করে বিশেষভাবে নির্মিত স্যুট দিয়ে মুড়িয়ে দেন বিশেষজ্ঞরা। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল শ্বাস গ্রহণের ব্যবস্থাও। আরও ছিল কয়েকটি ক্যামেরা এবং সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি পদ্ধতি। সরঞ্জামগুলো সঙ্গে নিয়ে আমাজনে অ্যানাকোন্ডার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে রোজোলির দলটি। টানা ৬০ দিন হন্যে হয়ে বেড়ানোর পর অবশেষে একটি স্ত্রী অ্যানাকোন্ডা পান তাঁরা, যেটি লম্বায় ছিল ২০ ফুট। রোজোলি বলেন, ‘আমি যখন সাপটির কাছে গেলাম, সেটি আমাকে খাওয়ার চেষ্টাই করল না। বরং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। আমি যখন কিছুটা উসকানি দিলাম; কিছুটা শিকারির মতো আচরণ করলাম, তাতে কাজ হলো। সাপটি ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করল।’ এরপর সাপটি রোজোলিকে আক্রমণ করে। তবে তাঁকে পুরোপুরি গিলে না ফেলে তাঁর পুরো শরীর পেঁচিয়ে ধরে। রোজোলি জানান, সাপটি তাঁকে এত শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে যে, একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল তাঁর হাত ভেঙে যেতে পারে। পাশাপাশি রোজোলির শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল এবং হৃৎস্পন্দন কমে আসছিল। ভয় পেয়ে গিয়ে তিনি সহযোগীদের কাছে সাহায্য চান। তাঁরা এলে সাপটি রোজোলিকে ফেলে পালিয়ে যায়।