Tuesday, May 26, 2015

মাইক্রোবাসে আদিবাসী তরুণী ধর্ষণ- জড়িত যুবকদের চিহ্নিত করার দাবি পুলিশের

রাজধানীতে মাইক্রোবাসে তুলে আদিবাসী এক তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত যুবকদের চিহ্নিত করার দাবি করেছেন মামলাটির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, ওই যুবকদের খুব দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। তবে চিহ্নিত যুবকেরা কারা, সে ব্যাপারে এখনই কিছু জানাতে অপারগতা জানিয়েছেন তাঁরা।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ভাটারা থানা এলাকায় যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানের কর্মী ওই গারো তরুণীকে মাইক্রোবাসে তুলে গণধর্ষণ করে কয়েকজন যুবক। পরে তাঁকে উত্তরা এলাকায় মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। ওই তরুণী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় ওই তরুণীকে নিয়ে তাঁর পরিবার মামলা করতে বিভিন্ন থানায় যায়। কিন্তু এক থানার পুলিশ মামলা না নিয়ে আরেক থানায় যেতে বলে তাঁদের হয়রানি করে। পরে শুক্রবার ভাটারা থানার পুলিশ মামলা নেয়।
পুলিশ যমুনা ফিউচার পার্কের বিভিন্ন স্থান ও ফিউচার পার্কসংলগ্ন বিভিন্ন ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। পুলিশ এসব ফুটেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। বিষয়টি তদারকির জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
ধর্ষণ ও নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস)। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে চলন্ত মাইক্রোবাসে পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার হন এক আদিবাসী তরুণী। বিক্ষোভকারীরা ওই তরুণীর ধর্ষণকারীদের বিচার দাবি করে l প্রথম আলো
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা গতকাল সোমবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গেছে। তাঁদের অবয়বও স্পষ্ট। ফুটেজ আরও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তারি অভিযান শুরু হবে।
তবে কমিটির প্রধান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ওই তরুণীর বড় বোন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনার পর আমার বোন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। জানি না পুলিশ কী করছে। তবে আসামিরা ধরা না পড়া পর্যন্ত আমাদের মনে কোনো শান্তি নাই।’ তিনি বলেন, ‘টার্গেট করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এখন আদিবাসী বলেই কি এমনটা করা হলো, নাকি অন্য কোনো কারণ, তা বুঝতে পারছি না।’
নিন্দা-প্রতিবাদ: গারো তরুণীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে ও জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ যৌন-সন্ত্রাস বন্ধের দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণবিক্ষোভ করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। এতে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, যৌন-সন্ত্রাসের কবল থেকে প্রথম শ্রেণিতে পড়া শিশু থেকে তরুণী, বৃদ্ধ নারী—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। এ দেশের মানুষের নাগরিক মর্যাদা নেই।
বিকেল চারটার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র। সমাবেশে বক্তারা গারো তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এ ছাড়া গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

সালাহ উদ্দিনের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন আদালত

ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে শিলংয়ে আটক বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন আদালত। শিলংয়ে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নয়াদিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব শম্ভু সিং গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান।
এদিকে, শিলংয়ের নেগ্রিমস হাসপাতালের পরিচালক এ জে এহেনগার প্রথম আলোকে জানান, সালাহ উদ্দিন আহমদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও জটিল রোগের কারণে তাঁকে চিকিৎসকদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁকে হাসপাতাল থেকে আদালতে পাঠানোর ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
সালাহ উদ্দিন আহমেদকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এ জে এহেনগার বলেন, চিকিৎসকের উপস্থিতিতে তাঁকে জেরা করার অনুমতি দিতে পুলিশ সুপারের কার্যালয় অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় এখনো তাঁকে জেরা করার পক্ষে চিকিৎসকেরা মত দেননি।
সালাহ উদ্দিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে শম্ভু সিং বলেন, ‘আদালত ওঁর বিরুদ্ধে পাসপোর্ট (এনট্রি ইনটু ইন্ডিয়া) আইন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিতে পারেন। এটা হলো অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ-সংক্রান্ত মামলা। অথবা আদালত ওঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশও দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সালাহ উদ্দিনের বিচার বাংলাদেশের আদালতে হবে।’
সালাহ উদ্দিনের ভাগ্যে কী আছে, তা অনুমান করা সম্ভব নয় জানিয়ে শম্ভু সিং বলেন, ‘দুই-এক দিনের মধ্যেই মনে হচ্ছে আদালতের মত জানা যাবে। আদালতই চূড়ান্ত। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা।’
প্রসঙ্গত, বিনা পাসপোর্টে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে শিলংয়ের পুলিশ সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট-৪৬’-এ মামলা দায়ের করেছে।
শম্ভু সিং বলেন, ‘উনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র হিসেবে ভারত অভিযোগ এনেছে। তবে তাঁরও নিশ্চয় কিছু বলার আছে। আদালতই সেই কথা শোনার একমাত্র স্থান। কিন্তু উনি কিছুতেই হাসপাতাল ছেড়ে যেতেই চাইছেন না। বারবার অসুস্থতার কথা বলছেন। সে জন্যই সোমবার একটা মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সেই বোর্ড আজ মঙ্গলবার খতিয়ে দেখবে তিনি কতটা অসুস্থ। তাঁকে হাসপাতাল থেকে আদালতে নেওয়া যাবে কি না। কিংবা গেলেও কবে। মেডিকেল বোর্ড ছাড়পত্রের অনুকূল প্রতিবেদন দিলে মঙ্গলবার তাঁকে আদালতে হাজির করানো যেতে পারে।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় ঘুরতে দেখে শিলংয়ের গলফ-লিংক এলাকার লোকজন গত ১১ মে ভোরে পুলিশে খবর দেয়। এরপর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাস্তুর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। পরে তাঁকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর নেওয়া হয় সেখানকার সিভিল হাসপাতালে। এরপর শিলং সদর পুলিশ থানা হয়ে নেওয়া হয় মানসিক হাসপাতাল মিমহানসে। এক দিন পর মিমহানস থেকে আবার তাঁকে পাঠানো হয় সিভিল হাসপাতালে। আট দিন পর সিভিল হাসপাতাল থেকে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে স্থানান্তরিত করা হয় নেগ্রিমসে।

চীনে স্বপ্নপূরণের চেষ্টা কখনো থেমে থাকেনি

চীনে অনেক উত্থান-পতন হলেও স্বপ্নপূরণের চেষ্টা কখনো থেমে থাকেনি বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ানডুং। তিনি বলেন, ১৩০ কোটি মানুষকে নিয়ে ‘চীনা স্বপ্ন’ পূরণের লক্ষ্যে কয়েক প্রজন্ম ধরে নিরলস প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তৃতায় চীনা উপপ্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে তাঁর তিন দিনের সফরের গতকাল ছিল দ্বিতীয় দিন।
লিউ ইয়ানডুং বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ‘এটিই আমার প্রথম বাংলাদেশ সফর। কিন্তু বাংলাদেশ আমার কাছে পুরোপুরি অচিন দেশ নয়। বাংলার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। সুবিখ্যাত শিক্ষাঙ্গন হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অসংখ্য গুণী ও প্রতিভাবান মানুষ তৈরি করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সত্যেন্দ্র নাথ বসু, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ।’ তিনি বলেন, চীন-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিকাশের ক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রগামীর ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৫৬ ও ১৯৬৫ সালে চীনের তৎকালীন জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির উপসভাপতি সুং শিং লিং এবং প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই পৃথকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছিলেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থকে তাঁদের সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়।
চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনা সরকার এখন থেকে প্রতিবছর ১০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেবে। এ ছাড়া এ বছর ১০০ জন তরুণ-তরুণীকে চীনের কনফুশিয়াস সদর দপ্তরে অনুেষ্ঠয় শান্তি ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা গবেষণা কেন্দ্রে কম্পিউটারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি দেওয়ারও ঘোষণা দেন তিনি। তিনি বলেন, চীনে অনেক উত্থান-পতন হলেও স্বপ্নপূরণের চেষ্টা কখনো থেমে থাকেনি। ১৯৭৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ২৮ দশমিক ৩ গুণ বেড়েছে। আমদানি-রপ্তানি বেড়েছে ২০৩ গুণ। মাথাপিছু জিডিপি ১৯ দশমিক ৮ গুণ বেড়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে ৬০ কোটি মানুষের। জনগণের জীবনমানেরও অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এরপরও চীন বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশ। মোট জিডিপির দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে অবস্থান এখনো ৮০তমের পরে। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী চীনে এখনো ১০ কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। ১৩০ কোটি মানুষকে নিয়ে আধুনিকায়ন এগিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় পুনরুত্থানে ‘চীনা স্বপ্ন’ পূরণের লক্ষ্যে কয়েক প্রজন্ম ধরে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
লিউ ইয়ানডুং বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ছয় শতাংশে রয়েছে। ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ প্রস্তাবকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের প্রস্তাবটি খুব ভালো। তিনি জানান, সহযোগিতা ও পারস্পরিক কল্যাণমূলক নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে মানবজাতির জন্য এক অভিন্ন স্বার্থভোগী গোষ্ঠী তৈরি করতে ইচ্ছুক চীন। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ অন্যের সহযোগিতা ছাড়া এগিয়ে যেতে পারে না, তাই সবাই এক ধরনের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে চীন-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রজন্মের পর প্রজন্মে সঞ্চারিত করা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। তিনি বক্তৃতাকালে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্তরিক স্বাগত জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। হাজার বছরের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে উভয় দেশের। এ প্রসঙ্গে তিনি ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের মাধ্যমে ২০০০ বছর আগে থেকেই উভয় ভূখণ্ডের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেনের কথা উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) নাসরীন আহমাদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান।
আজ যাবেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে: চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ানডুং আজ মঙ্গলবার বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটের এক দশক পূর্তি উপলক্ষে তাঁর সম্মানে বিশ্ববিদ্যালয়টি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

অবশেষে জামিন পেলেন সাংবাদিক মিজান

গ্রেপ্তার হওয়ার দুই মাস পর অবশেষে জামিন পেলেন প্রথম আলোর বাউফল প্রতিনিধি মিজানুর রহমান। গতকাল সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ দুটি মামলাতেই তাঁকে জামিন দেন।
মিজানের পক্ষে শুনানিকালে প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক আদালতকে বলেন, হয়রানিমূলক এই মামলায় সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘটেছে। কারণ, সংবিধান সাংবাদিকদের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে।
আদালতে ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে সহায়তা করেন বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক ও মনজুর কাদের।
গত ১৭ মার্চ বাউফলে এক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয় মিজানের। এ ঘটনার মীমাংসা হয়ে গেলেও রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর সরকারি কাজে বাধাদান ও হামলার অভিযোগ এনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে থানায় নিয়ে রাতভর তাঁকে নির্যাতন করা হয়। তাঁকে যথাযথ চিকিৎসা না দিয়েই পরে পাঠানো হয় কারাগারে। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার দায়ের করা পুরোনো একটি চাঁদাবাজির মামলায়ও মিজানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
২২ মার্চ মিজানকে পটুয়াখালীর দ্বিতীয় বিচারিক হাকিম এ এস এম তারিক শামসের আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে পটুয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আবেদন করা হয়। কিন্তু ওই আদালতে জামিনের কোনো শুনানি হয়নি। ১৫ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির তারিখ ছিল। কিন্তু সেদিনও পটুয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক বিমল চন্দ্র সিকদার মিজানের জামিন দেননি।
২৩ মার্চ মিজানুরের বাবা আবদুস সালাম হাইকোর্টে একটি রিট করেন। এই আবেদনে মিজানুরকে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দেশনা চাওয়া হয়। ২৪ মার্চ মিজানুরকে পুলিশি হেফাজতে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দেন হাইকোর্ট। নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, আদালত তাও জানতে চান।
মিজানের বাবা আবদুস সালামের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের অনিয়ম তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মিজানকে নির্যাতন করে মামলা দেওয়া হয়েছে। এর আগেও তাঁকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করা হয়।

খোঁজ নেই ৩১ যুবকের

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ থেকে
মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়ে নিখোঁজ হওয়া কয়েকজন
মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র ও বেকার যুবকরা সাগর পথে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড যাত্রা করছেন। তাদেরকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা নিয়ে গেলেও পরে তাদের জিম্মি করে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা। এসব যুবকের বেশির ভাগই এখন নিখোঁজ রয়েছেন। হবিগঞ্জ ও মাদারীপুরে এমনিভাবে নিখোঁজ হয়েছেন ৩১ যুবক। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবর আবিষ্কারের পর এবং সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের খবরে ওইসব যুবকের স্বজনদের মাঝে দেখা দেয় অজানা আতংক। আদরের সন্তানদের খোঁজে পাগলপ্রায় তাদের মা-বাবা। হবিগঞ্জ থেকে যুগান্তর প্রতিনিধি সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন জানান, সাগর পথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন হবিগঞ্জের ২৪ যুবক। দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না তাদের পরিবারের সদস্যরা। এ অবস্থায় প্রতিটি পরিবারেই এখন শুধু কান্নার রোল।
পুত্রশোকে পাথর চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের নিখোঁজ জসিমের বাবা আবদুল হাই জানান, তার ছেলেকে জিম্মি করে স্থানীয় টেকেরঘাট গ্রামের দালাল বাচ্চু ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। ইতিমধ্যেই তারা ৫ লাখ টাকা নিয়েছে। তিনি সর্বস্ব বিক্রি করে এ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও সন্তানের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না তিনি।
আরেক নিখোঁজ যুবক আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশা ইউনিয়নের পশ্চিমভাগের তিনকোশা মহল্লার মৃত নিহার মনির চৌধুরীর ছেলে নোমান চৌধুরী। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবার মৃত্যুর পর তিনি স্থানীয় বাজারে ব্যবসা করে পরিবার চালাতেন। সম্প্রতি দালালদের মাধ্যমে কম খরচে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব পেয়ে রাজি হয়ে যান। পাড়ি জমান নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে। কিন্তু প্রায় ২ মাস অতিবাহিত হলেও তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা তার পরিবার জানে না। একদিনও তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ হয়নি। এ কথা জানিয়েছেন তার ছোট ভাই উমান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমভাগের গোপী চন্দ্র চন্দ ও নোমান ভাই মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ৫৩ দিন আগে রওনা হন। দালালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যাচ্ছে না।’
আরেক নিখোঁজ বানিয়াচং উপজেলা সদরের শরীফ উদ্দিন রোডের রশিদ আহমদের ছেলে সাইফুল ইসলাম জুসেদ (২৭)। শোকে পাথর তার বাবা রশিদ আহমদ জানান, মানব পাচারকারী দলের খপ্পরে পড়ে জুসেদ। তাদের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে কাউকে না জানিয়ে ১ এপ্রিল বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। ৭ মে জুসেদের বাবাকে জানানো হয় তার ছেলে মালয়েশিয়ার বর্ডারে আছে। ০০৬৬৮০৫৩৯১৪৮৯৩ ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করলে জুসেদকে পাবেন। সে অনুযায়ী তিনি ওই নাম্বারে ফোন করে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। তখন জুসেদ জানায়, তারা থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বর্ডারে অমানবিক কষ্টে জাহাজে আছে। শিবপাশা ইউপির রহমত আলীর ছেলে মেম্বার আবদুল আজিজ ও আলী আকবরের ছেলে মকবুল আলীর মাধ্যমে উদ্ধারের জন্য আকুতি জানান তিনি। আজিজ ও মকবুলের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও ছেলেকে উদ্ধারের কোনো কূলকিনারা না পেয়ে তারা এখন পীর ফকিরের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
চুনারুঘাটের দালাল হিরাই ও বাচ্চু মিয়ার মা রহিমা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, কিভাবে তারা বিদেশ গেছে সে ব্যাপারে তারা কিছুই জানেন না। তাদের সঙ্গে তার কখনোই দেখা হয় না।
বানিয়াচংয়ের ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী যুগান্তরকে জানান, তার এলাকা ও আজমিরীগঞ্জে শিবপাশার ইউপি মেম্বার আবদুল আজিজ দালাল চক্রের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এসব দালাল চক্রের সদস্যদের বিচার দাবি করেন তিনি। গাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা তাজুল ইসলাম জানান, নিখোঁজ যুবকদের দেশে ফিরিয়ে আনা, তাদের টাকা উদ্ধার ও দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি উদ্যোগ নেবেন।
চুনারুঘাট থানার ওসি অমূল্য কুমার চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘আজ (রোববার) উপজেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা তাজুল ইসলাম বলেছেন, তার ইউনিয়নে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে তাদের কি অবস্থা তিনি জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, সভায় আমি বলেছি নির্দিষ্ট করে যদি কেউ অভিযোগ দেয় তবে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, ১৫ মার্চ মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা বলে রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের তেলিকান্দি গ্রামের ৭ যুবককে ঢাকা নিয়ে যায় একই উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের পাখুল্যা গ্রামের মানব পাচারকারী দালাল সাদেক বয়াতী ও এহছাক মল্লিক। এরপর থেকেই ওই ৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বর্তমানে তাদের পরিবারে চলছে কান্নার রোল।
নিখোঁজরা হলেন- তেলিগ্রামের বান্দু মাতুব্বরের ছেলে হান্নান মাতুব্বর (২৮), সোহরাব মাতুব্বরের ছেলে জহিরুল মাতুব্বর (২০), আবেদ আলীর ছেলে রাসেল মোল্যা (২১), মতি শেখের ছেলে হানিফ শেখ (১৮), জাহাঙ্গীর খাঁর ছেলে ওবায়দুর খাঁ (১৬), তৌয়ব আলী খাঁয়ের ছেলে অহিদুল খাঁ (১৮), কাজল খাঁর ছেলে বিনাদ খাঁ (২৪)।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক জিএসএম জাফরউল্লাহ্ বলেন, ‘নিখোঁজদের পরিবারের অভিযোগ পেলে তাদের ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দফতরের মাধ্যমে প্রয়াজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আমি রাষ্ট্রের প্রধান সেবক আমিই সবচেয়ে বিশ্বস্ত -নরেন্দ্র মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেকে রাষ্ট্রের প্রধান সেবক ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাগরিক বলে অভিহিতি করেছেন। বিজেপি সরকারের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সোমবার মথুরায় এক জনসভায় তিনি সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে জনগণকে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারে এক বছর উদযাপনের জন্য বিজেপির পরিকল্পনামাফিক ২০০টি সভার প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয়েছে সোমবার। এদিন ছিল সরকারের ৩৬৫তম দিন। ৩৬৫ দিন যা শোনা যায়, এদিন তার থেকে আলাদা কিছু হবে বলে মনে করেছিলেন শ্রোতারা। কিন্তু, সেই আশায় জল ঢেলে সারা বছরের প্রকল্পগুলোর খতিয়ান তুলে ধরলেন মোদি। ইউপিএ’র দুর্নীতি, কয়লা কেলেংকারির অভিযোগ আর জনধন যোজনা এসবই ছিল তার এদিনের বক্তব্যের মূল উপজীব্য। কংগ্রেস সরকারকে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে বারবার কটাক্ষ করেন তিনি। পাশাপাশি, মোদি সরকারের আমলে উন্নয়নের খতিয়ান পেশ করেন। অনুষ্ঠানে মোদি বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রের প্রধান সেবক ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাগরিক।’ জনগণের উদ্দেশে মোদি বলেন, ‘এক বছর আগে আপনারা ৩০ বছরের খরা কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ করে সরকারে পাঠিয়েছিলেন। আজ তার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। আমাদের সরকার গরিবের সরকার। এ সরকার গরিবের জন্যই কাজ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা থামব না, মচকাব না।
আপনারা নিরন্তর কাজ করে যান। ভারতের রাজনীতিতে গান্ধী, লোহিয়া, দীনদয়াল- এ তিন মহাপুরুষের প্রভাব রয়েছে। তিন মহাপুরুষের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা আজ দেশকে সুশাসন দিচ্ছি।’
মোদি বলেন, আর এক বছর ইউপিএ সরকার থাকলে দেশের অবস্থা অনেক খারাপ হতো। কংগ্রেসকে রিমোট কন্ট্রোলের সরকার বলে কটাক্ষ করেন তিনি। পৃথিবীর ১৩০টিরও বেশি দেশে সরাসরি মোদির সভা সম্প্রচারিত হয়।

লতিফ সিদ্দিকীর জামিন

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সাতটি মামলায় জামিন পেলেন সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। মঙ্গলবার দুপুরে বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ তাকে অন্তবর্তীকালীন এই জামিন দেন। এর আগে আদালতে জামিনের আবেদন করেন লতিফ সিদ্দিকী। একই সঙ্গে স্থায়ী জামিন প্রশ্নে রুল জারি করে রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলাগুলোর কার্যক্রম স্থগিতও আদেশ দিয়েছে আদালত। ২০১৪ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে টাঙ্গাইল সমিতির মতবিনিময় সভায় লতিফ সিদ্দিকী বলেন, আমি কিন্তু হজ আর তাবলিগ জামাতের ঘোরবিরোধী। হজে যে কত ম্যানপাওয়ার নষ্ট হয়। হজের জন্য ২০ লাখ লোক আজ সৌদি আরব গেছে। তাদের কোন কাম নাই। তাদের কোন প্রোডাকশন নাই। শুধু রিডাকশন করতেছে। শুধু খাচ্ছে আর দেশের টাকা নিয়ে ওখানে দিয়ে আসছে। এ্যাভারেজে যদি বাংলাদেশ থেকে এক লাখ লোক হজে যায়, প্রত্যেকের ৫ লাখ টাকা করে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়।
হযরত মুহম্মদ (স.) সম্পর্কে তিনি বলেন, আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ চিন্তা করল এ জাজিরাতুল আরবের লোকেরা কীভাবে চলবে। তারা তো ছিল ডাকাত। তখন একটা ব্যবস্থা করল যে, তার অনুসারীরা প্রতিবছর একবার একসঙ্গে মিলিত হবে এবং এর মধ্য দিয়ে একটা আয়ের ব্যবস্থা হবে। লতিফ সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কেও কটূক্তি করেন। তার এ বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় ঢাকার আদালতে বিভিন্ন ব্যক্তি এ মামলাগুলো দায়ের করেন। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও বেশ কয়েকটি মামলা করা হয়। ওই বছরের ২৩শে নভেম্বর রোববার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে ভারত থেকে দেশে ফেরেন লতিফ সিদ্দিকী। ২৬ শে নভেম্বর ধানমণ্ডি থানায় আত্মসমর্পণ করার পর লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানো হয়।

পূর্ণ সহায়তা দেবে চীন

বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের উন্নত জাতিতে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার গৃহীত পরিকল্পনা রূপকল্প-২০২১ ও ৪১ অর্জনে পূর্ণ সহায়তা দেবে চীন। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এ আশ্বাস দেন সফররত দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ানদং। গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে সাক্ষাৎটি হয়। প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণমাধ্যমকে সাক্ষাতের বিষয়ে ব্রিফ করেন। জানান, সাক্ষাৎকালে লিউ ইয়ানদং প্রেসিডেন্টকে আবদুল হামিদকে আশ্বাস দেন যে, চীন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১-এর লক্ষ্যসমূহ অর্জনের ক্ষেত্রে পূর্ণ সহায়তা দেবে। লিউ ইয়ানদংকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৪০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তার এ সফর দুটি দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করবে। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে চীনে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ চীন সফর করেন। এর আগে জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটি সফর করেন। দুটি সফর ফলপ্রসূ উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বলেন, এই সফরগুলো দুই দেশের বন্ধনকে জোরদার করেছে। শাহজালাল সার কারখানা ও কাজীরটেকে ৭ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুসহ চলমান প্রকল্পগুলোতে চীনের সহায়তা প্রশংসা করে প্রেসিডেন্ট চীনের কাছ থেকে আরও সহায়তা কামনা করেন, যাতে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি আরও বেগবান হয়। চীনা উপ-প্রধানমন্ত্রীকে প্রেসিডেন্ট আরও অবহিত করেন যে, বাংলাদেশ সরকার চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের জন্য ৭৭৪ একর ভূমি বরাদ্দ করেছে। তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানি করায় চীন সরকারের প্রশংসা করেন। প্রেসিডেন্ট চীনা নেত্রীর এ সফরকালে দুটি দেশের মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বিসিআইএম ইনিশিয়েটিভ (বাংলাদেশ চীন ভারত মিয়ানমার) এগিয়ে নিয়ে সেটিকে বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর (বিসিআইএম ইসি) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চীনের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ এই অঞ্চলে যোগাযোগ বৃদ্ধি করার বিষয়ে আগ্রহী। ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে চীনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আবদুল হামিদ আশা প্রকাশ করেন, এই তহবিল থেকে বাংলাদেশ অবকাঠামো খাতে অর্থ পাবে। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার বিষয়ে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ানদং বলেন, চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, যাতে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য এখান থেকে মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি করতে পারে। বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উল্লেখ করে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এসব সমঝোতা স্মারক বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে চীনা সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করবে। চীনা শিক্ষামন্ত্রী ইউয়ান গুইরেন ও বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং কিয়াং এবং চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল করিম এবং প্রেসিডেন্ট  কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিবগণ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

‘আমার স্বামী বাংলাদেশে নিরাপদ নন’

আমার স্বামী বাংলাদেশে নিরাপদ নন। আমি তাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবো না। বরং আইনি সুযোগ থাকলে আমি তাকে যত দ্রুত সম্ভব সিঙ্গাপুরে নিয়ে যেতে চাই। সেখানেই গত কয়েক বছর ধরে তার হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যার চিকিৎসা করা হচ্ছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ ভারতীয় দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এসব কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, এতোদিন তিনি কোথায় ছিলেন আমি তা জানিনা, তিনি কিভাবে শিলং পৌঁছালেন সেটাও জানিনা। তবে আমি খুশি যে তিনি এখানে নিরাপদ আছেন। আর এখানে তার ভালো দেখাশোনা করা হচ্ছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বর্তমানে নেইগ্রিমস হামপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। মেঘালয়ের পুলিশ সদস্যরা তাকে ২৪ ঘণ্টা প্রহরা দিয়ে রাখছে। বিদেশী নাগরিক আইন লঙ্ঘনের মামলায় ২৯শে মে আদালত পুলিশকে রিপোর্ট দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে হাসিনা আহমেদ আরও বলেন, আমার স্বামী অনেক অসুস্থ। তার হার্টে তিনটি রিং রয়েছে। আর তার বাম কিডনি ঠিক মতো কাজ করছে না। আমি বলছিনা যে এখানে তার ভালো চিকিৎসা হচ্ছে না। কিন্তু সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল তার রোগের ইতিহাস জানে। তারা প্রায় ২০ বছর ধরে তার চিকিৎসা করে আসছে। আর এখন যদি আমি তাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাই, তাহলে আমি জানি না কি ঘটবে।

শিশুনিগ্রহ- যে মায়েরা সাহসে বড় by ফারুক ওয়াসিফ

যখন প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়, তখন সমাজ দাঁড়িয়ে পড়ে এভাবেই
মানুষের আবেগ অদ্ভুত, কখন কোথায় তার বিস্ফোরণ হবে, কেউ বলতে পারে না। রাষ্ট্র-প্রশাসন বলতে পারে না, আবেগের জোরে কেন মানুষ রুখে দাঁড়ায়। ওদের বোধ হয় মন থাকতে নেই। তাই নির্যাতিতের কান্না তাদের কমই স্পর্শ করে। মায়েদের ক্ষোভ কতটা জ্বালাময় হতে পারে তা এখন টের পাচ্ছে মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি গার্লস স্কুলের (সংক্ষেপে এমপিএস) অধ্যক্ষ মহোদয়। মায়ের হৃদয় যে বাঘিনীর হৃদয়, সেই সত্যটা রাষ্ট্রযন্ত্রের জানা থাকা ভালো। প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রীকে মুখ চেপে ধরে নিয়ে গিয়েছিল মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি গার্লস স্কুলের এক পাষণ্ড কর্মচারী। এই নিয়ে ক্ষোভ-অসন্তোষ চলছে ৫ মের পর থেকে। অভিযোগ উঠেছে আরও দুটি ছাত্রীকে নিপীড়ন করার বিষয়েও। কিন্তু তদন্তে চলছে গড়িমসি। অভিভাবকদের চাপে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো বটে, কিন্তু তার প্রতিবেদন আর জমা পড়ে না। দফায় দফায় তাঁরা সময় বাড়ান। এসব দেখে-শুনে অভিভাবকদের চাপা ক্ষোভ শনিবার দুপুরে শতজলঝরনার মতো ফেটে পড়ল।
শত শত অভিভাবক আর ছাত্রী প্রথমে সকালে স্কুলের সামনে জড়ো হয়ে মানববন্ধন করলেন। এদিনই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অভিভাবককদের জানানোর কথা। কিন্তু তার কোনো হদিস না পেয়ে তাঁরা ঢুকে পড়লেন স্কুলের মাঠে। এরপর ঘটনার নিয়মে ঘটনা ঘটতে থাকল। শত শত নারী, যাঁদের অধিকাংশই মা, প্রথমে মিথ্যাচারের অভিযোগে রেক্টরের কক্ষের দরজার কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। কিন্তু তিনি সেখানে ছিলেন না। এরপর তাঁরা ঘিরে ধরলেন অধ্যক্ষকে। স্কুলটির প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রীরা হাতে হাত বেঁধে ব্যূহ রচনা করে তাঁকে আটকালেন। কোনোভাবে পার পেয়ে তিনি আশ্রয় নিলেন একটি কক্ষে। বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিল বাইরে, বিচার ছাড়া তাঁরা কাউকে ছাড়বেন না।
চারদিকে ভবনের মাঝখানে মাঠ। তার একদিকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাপসিবল গেট। প্রশ্ন উঠবে, মেয়েদের স্কুলের মধ্যে অন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা থাকবে কেন? স্কুলের ভেতরই ক্যানটিন, সেটা চালান পুরুষ কর্মীরা। মেয়েদের বাথরুমের ছিটকিনি ঠিক নেই, পুরুষ পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অবাধ যাতায়াত সেখানে। ছাত্রী ও মায়েদের অভিযোগের পাহাড়ের চূড়ায় ছিল একটি কথা। ফারুক আহমেদ নামের এক অভিভাবক জানান, ‘আমরা যখন কোনো অভিযোগ নিয়ে যাই, তখন বলে মেয়েরাই খারাপ।’ পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ ফজলুর রহমান বলে উঠলেন, ‘এটা কোনো শিক্ষক বলতে পারেন তাঁর ছাত্রীদের সম্পর্কে? যদি খারাপই হয়, তাহলে আপনারা ভালো করবেন। সব জায়গায় ওদের দালাল, কথা বলতে গেলে থানার লোক দিয়ে ভয় দেখায়।’ মানুষটার নাতনি এখানে পড়ে। শনিবারের বিক্ষোভের মানুষ ছিলেন তিনিও।
অভিভাবক ও ছাত্রীদের অভিযোগ অনেক, কর্তৃপক্ষের অস্বীকৃতিও অনেক। তবে গোপাল দাস নামের এক তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মুখ চেপে পাশের নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নিয়ে এখন আর সন্দেহ নেই। স্কুলের প্রশাসনের বিরুদ্ধে যখন অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ, তখন তাদের দিয়ে কীভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব? এসব ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তৃতীয় কোনো আস্থাভাজন ব্যক্তিকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। ঠিক যেমনটা করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সময়। শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরীকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হয় এবং তাঁর কাছে গোপনে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। এই ঘটনাতে সেটাই করা উচিত।
অবরুদ্ধ হওয়ার আগেই কথা হলো অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘গোপাল দাস তো এখন ভারতে। সে এখন ছুটিতে আছে।’ জিজ্ঞাসা করলাম, অভিযোগ ওঠার পরে কেন তাকে ছুটি নিয়ে পালাতে দেওয়া হলো? তাকে তো এখন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যাবে না। তিনি বললেন, ‘আগেই সে ছুটি নিয়েছে।’ তিনিই জানান, ‘ছুটি নিয়েছে ১১ মে।’ ঘটনার তারিখ ৫ মে, এটা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে শোরগোল ওঠে ৭ তারিখে। তার মানে তিনি ছুটি দিয়েছেন সজ্ঞানে। শুধু এই একটা কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযুক্তকে রক্ষার চেষ্টার অভিযোগ উঠতে পারে।
দুপুর ১২টার দিকে স্কুলের সামনে সাদা পোশাক পরা একদল মেয়ে জটলা করে কথা বলছিল। তারা জানাল, মেয়েরা যাতে আন্দোলন না করে সে জন্য ক্লাসে ক্লাসে হুমকি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কাউকে আন্দোলনে দেখা গেলে তাকে ‘বড় মিস’ স্কুল থেকে বের করে দেবেন। তৃতীয় শ্রেণির দুটি ছাত্রীর মুখে এমন অভিযোগ শুনে মনটা বিষিয়ে উঠল। শিশুদের কেন এভাবে হুমকি দেওয়া হবে? অভিভাবকদের মুখে মুখে ঘুরছে রেক্টর জিন্নাতুন্নেসার একটি উক্তি। তিনি নাকি বলেছিলেন ‘মধু থাকলে মৌমাছি আসবেই!!!’ তাহলে ছয় বছরের শিশুরা যাঁর চোখে ‘মধু’, তাঁর সঙ্গে আগ্রাসী পুরুষ মনের আর কী পার্থক্য থাকল? এ কারণেই অভিভাবকেরা দাবি তুলেছেন, অধ্যক্ষ ও রেক্টরকে অব্যাহতি দিতে হবে। অভিযুক্ত গোপাল দাসকে গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করতে হবে। স্কুলের প্রাঙ্গণে কোনো পুরুষ কর্মচারী রাখা যাবে না।
এ ঘটনায় উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়েছে, আদালত তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন। অধ্যক্ষ মহোদয়কে মনে করিয়ে দিলাম, ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ বিধিমালা প্রণয়ন এবং নিপীড়নবিরোধী অভিযোগ সেল গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তো, আপনার প্রতিষ্ঠানে কি এ ধরনের কোনো কমিটি আছে? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কমিটি তো আছে।’ সেই কমিটিতে কারা কারা আছেন? তিনি ‘আছে আছে’ বলে উপস্থিত শিক্ষকদের মুখের দিকে তাকালেন। সম্ভবত, এমন কথা তাঁরাও প্রথম শুনছেন। নাম বলতে পারলেন না কেউই। অধ্যক্ষ হিসেবে নিজের তৈরি করা কমিটির কারও নামই যখন বলতে পারছেন না, তার মানে এ ধরনের কোনো কমিটি নেই বা থাকলেও তার কোনো কাজ নেই। তাঁর জবাব: ‘কমিটির কাজ নেই, কারণ এখানে কোনো দিন কোনো অঘটন ঘটেনি।’ বাহ! হতবাক ও নির্বাক হয়ে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে তখন তুমুল হট্টগোল। হ্যান্ডমাইক ফেলে এখন মাইকে কথা বলছেন নারীরা। স্কুলের মাঠে, বারান্দায় চার থেকে পাঁচ শ অভিভাবক। বেলা দুইটার পর এলেন স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ম. তামিম। তিনি একপর্যায়ে অভিভাবকদের কথা মেনে নিলেন এবং দায়ীদের শাস্তির অঙ্গীকার, অভিভাবক বা ছাত্রীদের হয়রানি না করার আশ্বাস এবং বিচারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন। উত্তপ্ত রোদের মধ্যে ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের শান্ত করায় এ ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। তবে নিপীড়কদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। অনেক সময় আন্দোলনের মুখে ‘বহিষ্কার’ ‘অব্যাহতি’ ইত্যাদি করা হলেও, আইনের বিচারটি আর হয় না। সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
যে প্রশ্নটি করা দরকার: অভিযোগ আসামাত্রই যদি বিচার হতো তাহলে প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থাহীনতা আসত না। কিন্তু ক্ষমতায় থাকলে কাণ্ডজ্ঞান সম্ভবত লোপ পায়। তাই একটি অন্যায় ঢাকতে আরও আরও অন্যায় চলতে থাকে।
এরই মধ্যে ঢুকে পড়লেন একদল তরুণ। তাঁরা আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগত খুঁজছেন! সেই চিরাচরিত কৌশল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উপাচার্য যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে বলেছিলেন, ‘বহিরাগত গার্মেন্টসের মেয়েরা আন্দোলন করছে।’ যেন গার্মেন্টসের মেয়েমাত্রই খারাপ, ‘তাদের কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই।’ এভাবে নিজের ছাত্রীদের বিরুদ্ধে তিনি যে বাচনিক সন্ত্রাস চালিয়েছিলেন, মোহাম্মদপুরের এমপিএসেও সেটাই দেখা গেল।
শিক্ষকদের কেউ কেউ বলতে চাইলেন, ‘ছোট একটি ঘটনাকে অনেক বড় করা হচ্ছে।’ আমাদের পুলিশ–প্রধান নববর্ষে যৌন নির্যাতনকারী ছেলেদের কাজকে ‘দুষ্টামি’ বলে হালকা করতে চেয়েছিলেন। যাঁরা নিষ্পাপ শিশুর সঙ্গে অন্যায় আচরণকে ছোট ঘটনা বলে মনে করেন, তাঁদের টনক নড়াতে বড় আকারের একটা প্রতিবাদের দরকার ছিল। সাম্প্রতিক সময়ের অনেক যৌন নিপীড়নের ঘটনায় যা ঘটেনি, মোহাম্মদপুরে সেটাই ঘটল। ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসে প্রতিরোধের দায়িত্ব নিজ হাতে নিলেন। এই মায়েদের, এই মেয়েদের অভিবাদন।
পরিবার ও সন্তানের জন্য মানুষ কী না করে। সেই সন্তানটি যখন এমন অনিরাপদ দশায় পড়ে, তখন পরিবার রুখে দাঁড়াবেই। যখন প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়, তখন সমাজ দাঁড়িয়ে পড়ে। এবং তারা বারেবারেই দেখতে পায়, আসলেই জনগণের জনগণ ছাড়া আর কেউ নেই।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

ইচ্ছে হলেই মুছে ফেলা যাবে স্মৃতি

ইচ্ছে হলেই মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলা যাবে স্মৃতি। আবার যখন তখন ফিরিয়েও আনা যাবে। নিজের মগজ ধোলাইয়ের রসায়ন এখন মানুষের নাগালে। মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রাখার জটিল রসায়নটি আবিষ্কার করে ফেলেছেন সুইজারল্যান্ডের একদল চিকিৎসাবিজ্ঞানী। চিকিৎসাশাস্ত্রে, বিশেষ করে স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্তদের চিকিৎ??সায় এ আবিষ্কারকে এক যুগান্তকারী সাফল্য বলেই আখ্যা দিচ্ছেন বিশ্বের তাবড় চিকিৎসকরা। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইকোলে পলিটেকনিক ফেডারেল ডি লুজানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দীর্ঘদিন ধরেই মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রাখা ও মুছে যাওয়ার রসায়নটি খুঁজে বের করতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের মূল গবেষণার বিষয় ছিল, ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক স্মৃতি জমা রাখে এবং ভুলে যায়। বিজ্ঞানীদলের প্রধান উলফার্ম গার্স্টনার জানাচ্ছেন, এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া।
নাম মেমরি অ্যাসেম্বলিজ। মস্তিষ্কে নিউরোনের প্রচুর নেটওয়ার্ক আছে। বহু সিনাপসি (এক ধরনের নার্ভাস সিস্টেম, যার মাধ্যমে নিউরোন ব্রেনে সিগন্যাল পাঠায়)-এর সঙ্গে ওই নেটওয়ার্কগুলো যুক্ত। এভাবে প্রত্যেকটি স্মৃতির অ্যাসেম্বলিজ তৈরি হয়। যখনই মস্তিষ্ক কোনো স্মৃতি মনে করে, সেই স্মৃতির নির্দিষ্ট অ্যাসেম্বলিজ গোটা বিষয়টির জোগান দেয়। ইঁদুরের ওপর বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, ইঁদুর যখন ঘুমোচ্ছে, কীভাবে তার মস্তিষ্কের প্রক্রিয়াগুলোর পরিবর্তন হচ্ছে। ইঁদুরের মস্তিষ্কে সেই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছেন। তাদের বক্তব্য, ওই একই প্রক্রিয়ায় মানুষের মস্তিষ্ক থেকে স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে, কিংবা পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে অদূর ভবিষ্যতেই। গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এখন ডাক্তাররাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন মানুষের মস্তিষ্ক।

নেপালে এবার বন্যা, ভূমিধস

দুর্যোগ যেন নেপালের পিছু ছাড়ছে না। ভূমিকম্প, বৃষ্টি, ভূমিধস- একটার পর একটা দুর্যোগ লেগেই আছে। এরই মধ্যে আরও একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা চরম আকার ধারণ করেছে। যে কোনো সময় বন্যা হতে পারে নেপালে। ধারণা করা হচ্ছে, সম্প্রতি যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছে, তার প্রভাবে সংঘটিত হতে পারে একাধিক ভয়াবহ ভূমিধস। বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার ভূমিধস ঘটলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এতে করে অকস্মাৎ ভয়াবহ বন্যার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে শনিবার মধ্যরাতে নেপালের পশ্চিমাঞ্চলে মায়াগদি জেলায় ভূমিধসে কালী গন্ধকি নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে হাজার হাজার আতঙ্কিত লোকজন ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তবে এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ১৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এ নদীটি ভূমিধসের পর একটি হ্রদে পরিণত হয়েছে। গতকাল মধ্যরাতে হঠাৎ করেই ভূমিধস হয়। এতে নদীর পানির উচ্চতা ২০০ মিটার বৃদ্ধি পায়। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লক্ষ্মী প্রসাদ ধাকাল বলেন,
‘আমার ওই এলাকার লোকজন, বিশেষ করে যারা নদী তীরবর্তী এলাকায় বাস করছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলেছি।’ এ ঘটনায় ওই এলাকায় অবস্থিত নেপালের সবচেয়ে বড় পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে কর্মকর্তারা আশংকা প্রকাশ করেছেন। সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে পুরো এলাকায় জরিপ চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত বর্ধনশীল হ্রদের কাছেও সামরিক বাহিনী পাঠানো হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে যে কোনো সময় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। কালী গন্দকি নদী নেপাল থেকে ভারতে প্রবেশ করে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে। নেপালের ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে-পর্বত, সিয়াংজা, গুলমি, পালপা, নাবালপারসি এবং চিতবান। ফের তিন ভূমিকম্প কাঁপল কাঠমান্ডু : ২৫ এপ্রিলের তীব্র ভূমিকম্পের ঠিক একমাস পর, রোববার আবারও তিন-তিনটি ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল কাঠমান্ডু ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা। যদিও কম্পনের তীব্রতা ছিল সামান্যই। তবে গত একমাসে ভূকম্পন ও আফটারশকে জেরবার নেপালবাসীর কাছে ভূমিকম্প মানেই একটা ত্রাস। রোববার সকাল ৭.০৬ মিনিটে প্রথম ভূকম্পনটি অনুভূত হয়, রিখটার স্কেলে যার তীব্রতা ছিল ৪.২। এর উৎসস্থল ছিল দোলাখা অঞ্চল। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি হয় সকাল ১০.৩৮ মিনিটে। এবারের তীব্রতা ছিল ৪.৪। এ কম্পনের উৎসস্থলও ছিল দোলাখাই। এরপর পৌনে ১২টা নাগাদ তৃতীয় কম্পনটি অনুভূত হয়। ৪.২ তীব্রতার এ ভূমিকম্পের উৎসস্থল সিন্ধুপালচক।

সবাই নির্বাচনের অপেক্ষায়

থাইল্যান্ডে সামরিক শাসন কায়েমের পর এক বছর বেশ শান্তভাবেই কেটে গেল। এই এক বছরে সামরিক আইন জারি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী, সংবিধান স্থগিত করেছে এবং গোটা দেশটির নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করেছে, আর এসবে জনগণের আপত্তির বহিঃপ্রকাশ খুব একটা লক্ষ্যণীয় নয়। থাইল্যান্ডে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সরকার সমর্থক ও সরকারবিরোধীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ২০১৪ সালের ২২ মে দেশটির সেনাবাহিনী এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাগ্রহণ করে।
একটি প্রস্তাবিত রাজক্ষমাবিষয়ক বিলের বিরোধিতা করে তৎকালীন থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগ চেয়েছিল সরকারবিরোধীরা। নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকারবিরোধীদের শক্তির কিছুটা নমুনা পাওয়া গিয়েছিল এবং এরপরই দ্রুত ক্ষমতাচ্যুত হন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগে একটি সাংবিধানিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তার প্রধানমন্ত্রিত্ব স্থগিত করা হয়। অবশ্য ওই বছরের ৭ মে-তেই আবার ইংলাককে নির্দোষ হিসেবে মামলা খারিজও করে দেয়া হয়। এর দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশটির সেনাপ্রধান প্রায়ুথ চ্যান-ওচা দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠেন এবং বিরোধীদের চুপ করিয়ে দেন। গণহারে গ্রেফতার, হুমকি ও হয়রানির কারণে অধিকাংশ সমালোচক নিশ্চুপ হয়ে যান। ছাত্রকর্মী থ্যান রিত্তিফ্যান আল জাজিরাকে বলেন, ‘ওরা আমাদের বাড়িঘর তছনছ করে দিয়েছে, দরজায় লাথি মেরেছে, আমাদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে অসদাচরণ করেছে। অভ্যুত্থানের মাত্র এক বছর হয়েছে? মনে হচ্ছে এরই মধ্যে চার বছর পেরিয়ে গেছে।’ রেডশার্ট নেতা নাত্তায়ুত সায়কুয়াব বলেন, ‘সবাই নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে। আমি আশা করি সেনাবাহিনী তাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।’ শেষবার এক বছর আগে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা উঠেছিল। প্রতিবাদে মুখর সেই বন্ধুদের আজ কারাগারে দেখা ভীষণ কষ্টকর, জানান থ্যান। যারা কারাগারে নেই, সেই সাবেক বিক্ষোভকারীদের আজও গ্রেফতারের আশংকায় নিয়মিত জায়গা বদলাতে হয় বলেও জানান তিনি। গত বছরের ২২ মে টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে থাই সেনাবাহিনী বলেন, ‘দেশকে সঠিক পথে সহজে পরিচালিত করতে ২০০৭ সালের সংবিধান স্থগিত করা হচ্ছে। তবে এই স্থগিতাদেশ বহির্ভূত থাকছে রাজতন্ত্রের অধ্যায়টি।’ ১৯৩২ সাল থেকে থাইল্যান্ডে সাংবিধানিকভাবে রাজতন্ত্র বহাল রয়েছে।
অভ্যুত্থানের পরপর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে রাজধানী ব্যাংককে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বিরোধীরা। অভ্যুত্থানের মাত্র দু’দিনেই দেশটির কয়েকশ’ শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের বিরোধিতার অপরাধে গ্রেফতার করে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর পিস অ্যান্ড অর্ডার (এনসিপিও)। গ্রেফতার থেকে বাঁচতে পালিয়ে যান আরও অনেকে। থাই আইনি অধিকার কেন্দ্র আই-ল’র তথ্য অনুযায়ী- সাড়ে সাতশ’র বেশি মানুষ গত এক বছরে আটক হয়ে সেনাশিবিরে রয়েছেন। পাঁচজনের বেশি মানুষের একসঙ্গে হওয়ার ওপর সেনাবাহিনী নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেয়ায় অন্তত ১৪৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের উপস্থিতির বিষয়ে জানেন না তাদের স্বজনরা। আটককৃতদের স্বজনদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে জানতে তাদের অনুসরণ করেন গোয়েন্দারা। গত বুধবার এফআইডিএইচ জানিয়েছে, এনসিপিও ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখনও অন্তত ৪৭ জনকে বিতর্কিত একটি আইনে আটক রাখা হয়েছে যা নজিরবিহীন। আটককৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাই হোক না কেন, সামরিক আইনের অধীনেও তারা ন্যূনতম মৌলিক কিছু অধিকার আশা করতে পারেন। সেনাবাহিনী একজন আটককৃতকে অভিযোগ ছাড়া সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত আটক রাখতে পারে, যা ক্ষমতার প্রতি ভীত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে বলে জানান আই-ল’র নির্বাহী পরিচালক জন উংফাকর্ন। থাই স্বৈরশাসক প্রায়ুথ যেখানে যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে রেখেছেন, সেখানে খুব শিগগিরই এই দিন দেখার ব্যাপারে আশাবাদী নন অনেকেই। অভ্যুত্থানের পর তাৎক্ষণিকভাবে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য ১৫ মাস সময় চাওয়া হয়েছিল, যা শেষ হবে আগামী জুন মাসে। এরই মধ্যে নির্বাচন পিছিয়ে অক্টোবরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ইসমতকে পেটালেন, ঝর্ণা বেগমকে ভুলে গেলেন! by আলী ইমাম মজুমদার

আহত পুলিশকে উদ্ধার করেন ঝর্ণা বেগম,
ইসমতকে গলা চেপে ধরেন পুলিশ সদস্য
১০ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র ইউনিয়ন আয়োজিত শতাধিক ছাত্রছাত্রীর একটি মিছিল যাচ্ছিল ডিএমপি সদর দপ্তর অভিমুখে। উদ্দেশ্য, গত পয়লা বৈশাখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নারী লাঞ্ছনাকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশি ব্যর্থতার প্রতিবাদ। মিন্টো রোডে আটকে দেওয়া হয় মিছিলকারীদের। তারা সেখানে অবস্থান নিলে একপর্যায়ে রণসাজে সজ্জিত পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ওপর। লাঠিপেটায় আহত হয় ১৫-২০ জন ছাত্রছাত্রী। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মিছিলকারীরা।
এ রকম সাদামাটাই যদি ঘটনাটি হতো, তাহলে তেমন কথা ছিল না। সময়ে সময়ে ছত্রভঙ্গ করতে মিছিলে বাধা দিতে হয় পুলিশকে। তবে ছাত্রছাত্রীদের ওপর তারা যেভাবে হামলাটি চালিয়েছিল, তা বিস্ময়কর ও অভাবিত। লাঠিপেটা করেছে, হেলমেট দিয়ে করেছে আঘাত, মেয়েদের চুলের মুঠি ধরে মারধর করেছে। মাটিতে পড়ে যাওয়া ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতিসহ আরও কয়েকজন ছাত্রের পিঠে পড়েছে পদাঘাত। হামলায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইসমত জাহান নামের একজন ছাত্রীকে চুলের মুঠি ধরে বের করে এনে করেছে লাঠিপেটা। ঘটনাটি বিস্ময়ের এ জন্য যে মিছিলটি ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ আর কলেবরে খুবই ছোট। তারা যদি রাস্তা অবরোধ করেও রাখে, সেটা ভেঙে দিতে এ মাত্রায় শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন ছিল, এমনটা মনে করার কোনো সংগত কারণ নেই। ঘেরাও-অবরোধ হিংস্র হয়ে উঠলে আর সরকারি স্থাপনা, জনজীবন, বিশেষ করে কর্তব্যরত পুলিশ বিপন্ন হলে গুলিও চালানো যায়। মিছিলকারীদের বেআইনি জনতা বলে চিহ্নিত করলেও তাদের সংখ্যা ও আচরণ বিবেচনায় শক্তি প্রয়োগে গ্রহণযোগ্য মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। গণমাধ্যমে প্রচারিত ছবিগুলোতে পুলিশকে যে রূপে দেখা গেল, তা অভাবিতও বটে।
ঝর্ণা বেগম ব্যাপক ঝুঁকির মুখে তাঁর নাগরিক দায়িত্ব পালন করেছেন। সেটার মূল্যায়ন বৈষয়িকভাবে করা যায় না। তবে নৈতিক দিকটি শিক্ষণীয় সবার কাছে। পুলিশ সদস্যরা এ দেশেরই সন্তান। তাঁরা বিপন্ন হলে এরূপ সহায়তা করাই সংগত ছাত্র ইউনিয়ন নামক সংগঠনটি হালে তেমন জোরদার নয়। তাদের কর্মসূচিও এখন তাই সীমিত থাকে আকৃতি ও প্রকৃতিতে। তাদের নেতা-কর্মীদের আচরণ অনেকটা পরিশীলিত। তারপরও যে উদ্দেশ্যে আলোচ্য ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে মিছিল নিয়ে তারা অগ্রসর হচ্ছিল, তা খুবই যুক্তিসংগত বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। পয়লা বৈশাখের বিকেলে নববর্ষ অনুষ্ঠানে নারী লাঞ্ছনাকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা বিরাজ করছে সব বিবেকবান মানুষের মধ্যে। সবাই আশা করেন পুলিশ তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনবে। কিন্তু এক মাস চলে গেলেও কোনো সাফল্য দেখা যাচ্ছে না তদন্তে। এতে নাগরিক সমাজ উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। প্রতিবাদও সংগত। এ অপরাধীদের শনাক্ত ও শাস্তি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায়। আর উল্টোটা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে করবে আরও জোরদার। দ্বিগুণ উৎসাহে সময়-সুযোগে এরূপ ঘটবে। এ কথা সত্যি যে সব অপরাধ তাৎক্ষণিক বা অতি দ্রুত উদ্ঘাটিত হয় না। সেসব ক্ষেত্রে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের প্রতি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা সংবেদনশীল থাকবেন, এটাই প্রত্যাশিত।
শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে কোনো দপ্তর ঘেরাও করা কোনো অভিনব বা সব ক্ষেত্রেই আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ঘটনা নয়। আর এখানে মিছিলকারীদের সংখ্যা ও তাদের আচরণঘটিত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিলে মোটেই নয়। এরূপ কত ঘটনায় ডিসি, এসপিদের অফিস ঘেরাও হয়। আর তার সুন্দর পরিণতিও ঘটে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মিন্টো রোডে ক্ষুব্ধ ছেলেমেয়েদের প্রতি পুলিশের এতটা অসহিষ্ণু হওয়ার কারণটি দুর্বোধ্য। বলা হচ্ছে, তারা মিনিট বিশেক রাস্তা আটকে রেখে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছিল। এরূপ বিঘ্ন সৃষ্টি অসংগত, এটা কেউ অস্বীকার করবে না। তবে কত আনন্দ মিছিল কিংবা ‘সরকারি প্রয়োজনে’ ঢাকার কোনো না কোনো রাস্তা প্রায়ই আটকে থাকে দীর্ঘ সময়। অবর্ণনীয় দুর্দশার শিকার হয় যাত্রীরা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষেত্রে এত দ্রুত পুলিশি তৎপরতার নৈতিক দিকটি খুঁজে পাওয়া যায় না।
ঘটনার পরপর একজন নিম্নপদস্থ পুলিশ সদস্য সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। তবে ডিএমপি সদর দপ্তরে সেদিনকার নিরাপত্তার দায়িত্বে কোন কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিলেন, কার সিদ্ধান্তে এমনটি ঘটল, তা তলিয়ে দেখা দরকার। পুলিশের পক্ষ থেকে কেউ কেউ বলছেন মিছিলকারীদের ওপর হামলা করা হয়নি, সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বক্তব্যটি কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো। টেলিভিশন আর সংবাদপত্রের কল্যাণে সে ‘সরিয়ে দেওয়ার’ চিত্রের সঙ্গে দেশবাসী পরিচিত হয়েছে পুরোপুরি। ঘটনাটি পুলিশের ভাবমূর্তিকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। এটা উপেক্ষা করার নয়। দায়ী ব্যক্তিদের দায় ভোগ করা সংগত। ঠিক তেমনি পয়লা বৈশাখের বেদনাদায়ক ঘটনাও সঠিক তদন্তে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো আবশ্যক। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, সে ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য পুলিশের তিনজন সদস্যকে তাঁদের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি চিহ্নিত করেছে। কারও বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই জানা যায়।
পুলিশের ক্ষমতার উৎস আইন। আইন পুলিশকে জনজীবনে শান্তিশৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব দিয়েছে। এ দায়িত্ব পালনে শুধু আমাদের দেশ নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই আবশ্যক হয় জনগণের সহযোগিতা। জনগণের একটি বড় অংশের সহযোগিতা ছাড়া তাদের সফল হওয়ার কথা নয়। সে সহযোগিতা নৈতিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে বৈষয়িকও হতে পারে। কিছুদিন আগেও পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে জনগণই পুলিশকে সহায়তা করে তাদের আইনের আওতায় আনতে।
আর ২০১৩ সালে পুলিশের সামনে ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। সে সময়ে হঠাৎ শুরু হওয়া হিংসাত্মক আক্রমণের মুখে পুলিশ ক্ষেত্রবিশেষে অনেকটা অপ্রস্তুতই ছিল। তখন ঢাকা মহানগরেও এসব হামলাকারীর ঝটিকা আক্রমণে পুলিশের বেশ কিছু সদস্য আহত হন। তাঁদের অনেক গাড়িও পুড়িয়ে দেওয়া বা ভেঙে ফেলা হয়। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে এ ধরনের হামলা ছিল অনেক বেশি আগ্রাসী। কোথাও পিটিয়েও পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে। তখন জনগণের বিশাল অংশ নৈতিকভাবে পুলিশের ওপর হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। পত্রপত্রিকায় নিবন্ধ লিখে, টিভি টক শোতে, তাঁদের অনেকে সে অবস্থান জানান দেন। এটা সবাই বলতে থাকেন, পুলিশ এ ধরনের হামলায় নিজেদের রক্ষা করতে সফল না হলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবে কীভাবে? পরামর্শ আসে পুলিশকে ঘুরে দাঁড়ানোর। সেটা তারা অনেকটা করতেও পেরেছে। এ-জাতীয় হামলায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে সাধারণ মানুষ, এমন নজিরও রয়েছে। একটি ঘটনা তো পুলিশ মহলসহ সারা দেশেই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। সেটা ঘটে ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী মহানগরে। হরতাল চলাকালে রাজশাহীর শালবাগান এলাকায় বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অতর্কিত হামলার মুখোমুখি হয়। এসআই জাহাঙ্গীর গুরুতর আহত হয়ে রাজপথে পড়ে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে টহলদানকারী অবশিষ্ট সদস্যরা হয়তো বা টিকে উঠতে না পেরে পালিয়ে যান তাঁকে ফেলে। নিকটবর্তী কোনো টহল দলও এগিয়ে এল না। এগিয়ে এলেন বিউটি পারলারকর্মী ঝর্ণা বেগম। তিনি দ্রুত সে মুমূর্ষু এসআইকে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। প্রাণে বেঁচে সুস্থ হন সেই এসআই। পুলিশ সদর দপ্তর ঝর্ণা বেগমকে আন্তরিক সংবর্ধনা দেয়। উদ্যোগ নেওয়া হয় তাঁর জন্য একটি স্থায়ী চাকরির।
ঝর্ণা বেগম ব্যাপক ঝুঁকির মুখে তাঁর নাগরিক দায়িত্ব পালন করেছেন। সেটার মূল্যায়ন বৈষয়িকভাবে করা যায় না। তবে নৈতিক দিকটি শিক্ষণীয় সবার কাছে। পুলিশ সদস্যরা এ দেশেরই সন্তান। তাঁরা বিপন্ন হলে এরূপ সহায়তা করাই সংগত। তেমনি এ দেশের জনগণেরও প্রত্যাশা থাকে, তাঁরা সদাচারী ও ন্যায়নিষ্ঠ হবেন। অনেকেই তেমন আছেনও বটে। বিপন্নের সহায়তায় দ্রুত হাত বাড়ান। তবে ব্যতিক্রমও কম নয়। আর সেটাই তো দেখা গেল নববর্ষের অপ্রীতিকর ঘটনা তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অসামর্থ্য এবং প্রতিবাদকারী সামান্যসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর ওপর হামলার ধরন থেকে। ঝর্ণা বেগম নামটি কিন্তু প্রতীকী হয়ে আছে। ইসমত জাহানদের অপ্রয়োজনীয় লাঠিপেটা আর চুল ধরে টানাহেঁচড়ার সময় সে প্রতীকী চিত্র মনে রাখাই তো স্বাভাবিক ছিল। অন্তত তা প্রত্যাশিত ছিল এ অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তার কাছে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সবকিছুই আজ দ্বিখণ্ডিত এই মূল্যবোধ দিয়ে গণতন্ত্র হবে না -আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ by মনির হায়দার

দেশে বইপড়া আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান রাজনৈতিক দলগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত করে দিয়েছে। আজকে সবকিছু দ্বিখণ্ডিত। এই মূল্যবোধ দিয়ে গণতন্ত্র হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক এ বাংলা উৎসব ও বইমেলার শেষদিনে গত রোববার দেয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
সাংবাদিক হাসান ফেরদৌসের সঞ্চালনায় শেষদিনের আয়োজনে আরও বক্তৃতা করেন পশ্চিম বঙ্গের বিশ্ব ভারতীর পরিচালক রামকুমার মুখোপাধ্যায়। আগের দিন শনিবারের মতো এদিনও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বক্তব্য চলার সময় বার বার চিরকুট দিয়ে তাকে দ্রুত বক্তব্য শেষ করতে বলা হয়। এমনকি একপর্যায়ে কয়েক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে হইচই করে বক্তব্য থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। এরপর তিনি দ্রুত কথা শেষ করেন।
বরাবরই সব রকম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থাকা এই বিশিষ্টজন তাঁর বক্তৃতায় বলেন, স্বধীনতার পর গত সাড়ে চার দশকে যেভাবে দেশ এগিয়ে যাবে বলে আমরা আশা করেছিলাম, বস্তুুত সেভাবে দেশ আগায়নি। তিনি বলেন, যে ব্যর্থতার জন্য দেশ এগুতে পারছে না, সেটা হলো রাজনৈতিক ব্যর্থতা। আর পরের সমস্যাটা হলো সংবিধান। যে সংবিধানের শিকার হয়ে রাজনীতি বিপাকে পড়েছে। এর থেকে রাজনীতি বের হতে পারছে না।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কখনই খারাপ ছিলেন না। কিন্তু তারা খারাপ হয়ে পড়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে সংবিধানের একটি ধারা পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত করে দিয়েছে। এটা করতে গিয়ে পুরোপুরিই সংঘাতের দিকে চলে গেছে দেশের রাজনীতি। এর থেকে মুক্তির পথ আমি আজ বলতে পারছি না। গত শনিবার মেলার দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় তা বোঝাতে চেয়েছি।
এ পর্যায়ে আয়োজকদের কেউ কেউ যখন তাঁর বক্তব্য থামিয়ে দেয়ার জন্য বার বার চিরকুট দিচ্ছিলেন, তখন আক্ষেপের সুরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, আপনারাই বলুন কারা দেশ চালাবে? সেই ধরনের মানুষ কি গড়ে উঠছে? সবগুলো সরকারি ইউনিভার্সিটির যা অবস্থা! সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যাড ইনভেস্ট হচ্ছে এই  ইউনিভার্সিটিগুলো। টাকা দিচ্ছে, কিন্তু ইউনিভার্সিটিগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্য মেধা বের করে আনতে পারছে না। সরকার নিজের কারণেই এটা করতে পারছে না। কারণ, রাজনীতি এখন সবকিছুর মধ্যেই ঢুকে পড়েছে।  আজকে সবকিছু দ্বিখণ্ডিত। এ অবস্থাই গণতন্ত্রের বড় শত্রু।
আলোকিত মানুষ গড়ার এই কারিগর আরও বলেন, মূল্যবোধের যে মান আমাদের; এই মূল্যবোধ দিয়ে কখনও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। সুশিক্ষা দিয়ে সামাজিক মূল্যবোধকে গড়ে তুলতে হবে। রোধ করতে হবে সামাজিক অবক্ষয়। তাহলেই আবার গণতন্ত্র জেগে উঠবে।
বাংলাদেশের জনগণকে অসহায় অভিহিত করে তিনি বলেন, জনগণ বর্তমানের দুই স্বৈরাচারকে হাতবদল করে নির্বাচিত করছে। একবার এ দলকে তো পরের বার অন্য দলকে। হতাশা থেকেই মানুষ এমনটি করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এক স্বৈরাচারের আচরণে হতাশ হয়ে মানুষ আবার আগের স্বৈরাচারকেই ভোট দিচ্ছে। আর এভাবেই হাতবদল করে স্বৈরতন্ত্র আমাদের গণতন্ত্রের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, যা এখন স্থায়ী হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদকে একটু সংশোধন করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
উগ্রবাদ শুধু ধর্মীয় হয় না উল্লেখ করে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, বাঙালিত্বও এক ধরণের উগ্রবাদ। রবীন্দ্রনাথও এক ধরণের উগ্রবাদ। মোল্লা শুধু ধর্মীয় মোল্লা হয় না। বাঙালি মোল্লা হয়। এমনকি রবীন্দ্রনাথ মোল্লাও হয়।
প্রসঙ্গত, গত ২২শে মে শুক্রবার সন্ধ্যায় মঙ্গল শোভাযাত্রা ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নিউ ইয়র্ক-এর বার্ষিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা এবং গত  রোববার তা শেষ হয়।

সুন্দরবন দিয়ে তেল ট্যাংকার নয়- সিদ্ধান্তটি আত্মঘাতী

তেলবাহী ট্যাঙ্কার ডুবি, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকিতে
সুন্দরবনের ব্যাপারে সরকারের অবস্থানকে আত্মঘাতী হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে। তা না হলে গত ডিসেম্বরে সুন্দরবনে তেলবাহী কার্গো ডুবে যাওয়ার মতো বিপর্যয়কর ঘটনার পর আবার একই রুটে তেল ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতো না। বোঝা গেল, মুখে যা-ই বলুক, বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের কোনো সদিচ্ছাই নেই। তেলের কার্গো ডুবে যাওয়ার ফলে সে সময়ে যে মাত্রায় দূষণ হয়েছে, তা বনটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। ওই দুর্ঘটনায় সে সময়ে যে তেল সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়েছে, তার তিন ভাগের এক ভাগও অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। এসব বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের যৌথ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সীমিত আকারে ও কিছু শর্ত মেনে সেই রুটে কিছু নৌ–চলাচলের কথা বলা হয়। এসব কিছু তো মানা হচ্ছেই না, এখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সেখান দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সুন্দরবন যেহেতু ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, তাই এই বন সব সময়ই তাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই বনের মধ্য দিয়ে নৌ–চলাচল ও এর পাশেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অনন্য এই বনের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। সরকার যদি এই বন রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নিতে না পারে, তবে তা বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা হারাতে পারে। আগামী জুনে ইউনেসকোর এক সম্মেলনের আগে এ ধরনের একটি পদক্ষেপ সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
সরকার যদি বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা থেকে সুন্দরবনকে ‘বিপন্ন’ অবস্থায় নামিয়ে আনতে না চায়, তবে এ ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ থেকে সরে আসতে হবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে আমরা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সুন্দরবন দিয়ে আবার তেল ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি by ইফতেখার মাহমুদ ও সুমেল সারাফাত
আপডেট:  ২৩মে, ২০১৫
জাতিসংঘের উদ্বেগ আর পরিবেশবাদীদের উৎকণ্ঠা উপেক্ষা করে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে আবারও তেলবাহী কার্গো চলাচলের অনুমতি দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। গত ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ‘ওটি সাউদার্ন সেভেন’ নামে একটি তেলবাহী কার্গো ডুবে বনে সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সরকার ওই পথ দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে।
তেলবাহী কার্গোডুবির পর বন বিভাগের চেষ্টায় সুন্দরবন থেকে এক লাখ লিটার তেল অপসারণ করা হয়। বাকি আড়াই লাখ লিটার তেল থেকে যায়, যা বনের প্রতিবেশে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি করতে পারে বলে জাতিসংঘ, বন বিভাগ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দিয়ে বলেছিল, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল করায় এবং রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে বনের বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। এই ক্ষতি বন্ধে সরকার পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে সুন্দরবন ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান হারাবে। এ ক্ষেত্রে ইউনেসকো থেকে সুন্দরবন রক্ষায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, আবার তেল ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি দেওয়া অন্যায়। সুন্দরবনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বনটি ধ্বংস হলে শত চেষ্টা করেও তা ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই বনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কিছু দুর্বৃত্তের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরা নিজেদের স্বার্থে সুন্দরবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সরকারের নৈতিক দায় থেকে সুন্দরবন রক্ষায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
নতুন করে তেলবাহী কার্গো চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয় গত ৬ এপ্রিল। তবে এবারও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের লিখিত অনুমতি নেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই বনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কিছু দুর্বৃত্তের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে-সুলতানা কামাল, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় ,কমিটির আহ্বায়ক
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, নদী দিয়ে নৌযান চলাচলের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের। তারা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন ও সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে আছেন। তাঁরা দেশে ফিরলে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল: ৫ মে ৬৭০ মেট্রিক টন এমওপি সার নিয়ে ‘জাবালে নূর’ কার্গো জাহাজ সুন্দরবনের মরাভোলায় আটকে ডুবে যায়। এ সময় সরেজমিনে সেখানে গিয়ে তেলবাহী কার্গো চলাচল করতে দেখা যায়। শ্যালা নদীতে গিয়েও একাধিক তেলবাহী কার্গো চলাচল করতে দেখা গেছে। এগুলো চলাচলের সময় কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএর কোনো তদারকিও চোখে পড়েনি। অথচ সরকার গত ১ মার্চ শুধু দিনের বেলা সরকারি সংস্থাগুলোর তত্ত্বাবধানে সীমিত পরিমাণে নৌযান চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল।
শরণখোলা এলাকার নৌকার মাঝি রাসেল মুন্সীসহ কয়েকজন জেলে জানান, গত ২৪ এপ্রিল শ্যালা নদী দিয়ে আসা তেলবাহী একটি জাহাজ শরণখোলার ভোলা নদীর মুখ ঘুরতে গিয়ে অল্পের জন্য দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। এ সময় এখানে নোঙর করে থাকা আরও চারটি কার্গোর ওপর তেলবাহী কার্গোটি প্রায় উঠে পড়েছিল।
বেশ কয়েকজন জেলে জানান, প্রতিদিনই ৮ থেকে ১০টি তেলবাহী কার্গো শ্যালা নদী দিয়ে চলাচল করছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, গত মাস থেকে প্রতিদিনই ওই পথ দিয়ে তেলবাহী কার্গো চলছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে কিছু জানানো হয়নি।
আবার তেলবাহী কার্গো চলাচলের অনুমতিপত্রে বলা হয়, ‘বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড ও পুলিশ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সাপেক্ষে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনা থেকে গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ খুলনার দৌলতপুর ডিপোতে জ্বালানি তেল সরবরাহব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখার জন্য সুন্দরবন চ্যানেল তথা চট্টগ্রাম-বরিশাল-হুলারহাট-বগি সন্ন্যাসী-জয়মনীরঘোল-মংলা ও দৌলতপুর রুট দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন করার অনুমতি নির্দেশক্রমে দেওয়া হলো।’

প্রশিক্ষণের ২০ কোটি টাকা কর্মকর্তাদের পকেটে by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্য খাতের টাকা লোপাট হচ্ছে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার নামে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনারে অংশ নিয়েছেন ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৮১৮ জন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস্তবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা অনেক কম। কাল্পনিক প্রশিক্ষণ, বানোয়াট প্রশিক্ষণার্থীর তালিকা ও ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন কর্মকর্তারা।
সরকারি নিরীক্ষায় দেখা গেছে, গত অর্থবছরে প্রশিক্ষণ খাত থেকে ২০ কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ না দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের টাকা লোপাট করছেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। অন্তত তিন বছর ধরে একই পন্থায় দুর্নীতি করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিংহভাগ কাজ ৩২টি কার্যকর পরিকল্পনা বা অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে দাতাদের অর্থসহায়তা আছে। মহাহিসাব নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ফরেন এইডেড প্রোজেক্ট অডিট ডাইরেক্টরেট (ফাপাদ) ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০টি ওপির হিসাব নিরীক্ষা করেছে। তাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়েছে। নিরীক্ষা-সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, সবগুলো ওপি নিরীক্ষা করলে প্রশিক্ষণে শতকোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ হচ্ছে না। দুর্নীতি রপ্ত করতেই প্রশিক্ষণ হচ্ছে।’
টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি স্বাস্থ্যসচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। ১১ মে মন্ত্রণালয়ে নিজ কক্ষে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনিয়মের বিষয়ে অবগত আছি। অনিয়ম দূর করার চেষ্টা করছি।’
অনিয়মের ধরন: ফাপাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন কর্মকর্তা একই দিনে দুই জেলায় উপস্থিত থেকে কর্মশালা পরিচালনা করেছেন। এভাবে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা শতাধিক কর্মশালা থেকে সম্মানী নিয়েছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর নিজস্ব অফিস আছে জেলা পর্যায়ে। সেখানে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা না পাঠিয়ে জেলা সিভিল সার্জন অফিসে নগদ টাকা পাঠানো হয়েছে, যা বড় ধরনের অনিয়ম। তিন দিনের অন্তত ৪০টি কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রশিক্ষণার্থীদের আমন্ত্রণপত্র কিছুই খুঁজে পায়নি নিরীক্ষক দল।
এই অনিয়মের সময় আব্দুল ওয়াহিদ আকন্দ ও নাসির উদ্দিন লাইন ডিরেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। এঁরা কেউই অনিয়মের কথা অস্বীকার করেননি। তবে একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। আব্দুল ওয়াহিদ আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি লাইন ডিরেক্টর থাকাকালে অনিয়ম হয়নি। আমি কিছু দিন ছিলাম না, তখন হয়ে থাকতে পারে।’ আবার তিন মাস লাইন ডিরেক্টরের পদে থাকা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রশিক্ষণের কোনো বিল চূড়ান্তভাবে পরিশোধ করিনি। অনিয়ম কিছু হয়ে থাকলে আমার আগে যিনি ছিলেন তাঁর (আকন্দ) সময়ে হয়েছে।’
দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি দেখিয়ে টাকা পকেটে ঢুকিয়েছেন কর্মকর্তারা। ইন-সার্ভিস (পেশায় থাকাকালীন) প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাস্তবে ২ হাজার ৬৫৬ জন প্রশিক্ষণ পান। অথচ কাগজে-কলমে ৩ হাজার ৯২১ জন দেখানো হয়েছে। ১ হাজার ২৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ না দিয়েই তাঁদের নামে খরচ দেখানো হয়েছে।
কাগজপত্রে দেখা গেছে, রাজধানীর পান্থপথের একটি প্রতিষ্ঠানে ৩৬০ জন সরকারি কর্মকর্তাকে ইংরেজি, আরবি ও কম্পিউটারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসেবে তিন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন একই ব্যক্তি। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, ওই প্রতিষ্ঠানটির আকার এতই ছোট যে সেখানে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়। আর এক ব্যক্তি কী করে তিনটি বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এই সময় লাইন ডিরেক্টর ছিলেন সুভাস কুমার সাহা। যোগাযোগ করা হলে অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চাকরিতে থাকার সময় এসব অভিযোগ শুনিনি।’
সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) কর্মসূচিতে। দরপত্র ছাড়াই কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রশিক্ষণ সামগ্রী কেনা হয়েছে। সবগুলো ভাউচার ১৪ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৬২ হাজার ৪২৮ জনকে, কিন্তু খরচ দেখানো হয়েছে ৬৮ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর। একই প্রশিক্ষণের বিপরীতে একাধিকবার খরচ দেখানো হয়েছে। সব জেলাতেই হোটেল ভাড়া ১৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে কারও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ, ওই অর্থবছরে তিনজন লাইন ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন। এঁদের দুজনকে ওএসডি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় অন্যজনকে প্রথমে ওএসডি করে এবং পরে দাতাদের অর্থসহায়তা নেই এমন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক করেছে।
বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে: বিদেশে প্রশিক্ষণের নামেও অনিয়ম হয়েছে। ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থেকে মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণে পাঠানো হয় সরকারি কর্মকর্তাদের। মালয়েশিয়ার হাসপাতালে প্রশিক্ষণের টাকা পাঠানো হয়নি। টাকা দেওয়া হয়েছে একটি দালাল প্রতিষ্ঠানকে।
অন্যদিকে একাধিক প্রশিক্ষণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন কর্মকর্তারা গেছেন, যাঁদের সঙ্গে স্বাস্থ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, এ প্রশিক্ষণ গ্রহণের উপযুক্ত না হলেও এঁদের সম্মানী, বিমান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এঁদের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানে টিউশন ফিও দেওয়া হয়েছে।
দিনে ৪,৭২৮ জনকে প্রশিক্ষণ: গত অর্থবছর শেষে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচির মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করেছে। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৮১৮ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। অর্থাৎ দিনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৪ হাজার ৭২৮ জন। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন বাদ দিলে দৈনিক ৮ হাজারের বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িত একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, বাস্তবে কিছু কর্মকর্তা প্রশিক্ষণকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের পন্থা হিসেবে ব্যবহার করছেন।
টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যে বাস্তবে সম্ভব নয়, এটা দাতাদেরও বুঝতে হবে। দাতারা কী করে বাজেট অনুমোদন করে? দুর্নীতির দায় তাদেরও নিতে হবে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান: ফাপাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধূমপান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে চিকিৎসকদের জন্য ১৪৫টি কর্মশালার আয়োজন করে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) কর্তৃপক্ষ। এতে ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৩১ হাজার ৬১৮ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ না দিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যাচাইয়ের জন্য নিরীক্ষকদের সদস্যরা নোয়াখালী সফর করেন। তাঁরা জানতে পারেন, নোয়াখালীতে কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি।
সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট জেলার প্রশিক্ষণ-সম্পর্কিত কাগজপত্র প্রথম আলো সংগ্রহ করেছে। তাতে দেখা যায়, লালমনিরহাটের বড় বাড়ির হাড়াটি কমিউনিটি সেন্টারে ২৪ থেকে ২৬ মে তিন দিনের কর্মশালা হয়। কর্মশালার জন্য শহরের আর এন ইসলাম মার্কেটের মিয়াজী বই ঘর থেকে খাতা, পেনসিল, কলম, প্যাড, ফাইল; আহমেদ অ্যান্ড সন্স থেকে ব্যাগ; হাবিব প্রিন্টার্স থেকে ব্যানার, কেরামত ফটোকপিয়ার থেকে ফটোকপি, হাবিব ডেকোরেটরস থেকে সাউন্ড সিস্টেম, আউয়াল মিষ্টি ঘর থেকে শিঙাড়া, সন্দেশ, লাড্ডু; শাওন কম্পিউটারস থেকে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল এবং তাপস সিডি থেকে সিডি কেনা হয়েছে। আর এন ইসলাম মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, এসব দোকানের অস্তিত্বই নেই। হাড়াটি কমিউনিটি সেন্টার নামে কমিউনিটি সেন্টারও নেই।
লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, ওই সময় তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে লালমনিরহাটে কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি।
কাগজপত্রে দেখা যায়, একই তারিখে প্রশিক্ষণ কর্মশালা হয়েছিল ঠাকুরগাঁওয়ে। শহরের গোড়িয়া সড়কে মানবকল্যাণ সংস্থা নামের একটি এনজিওর মিলনায়তন ব্যবহারের বিল জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ঠাকুরগাঁও শহরে নেই।
শহরের সমবায় মার্কেটের সেলিম স্টেশনারিকে খাতা, কলম, ফাইলের দাম, আরমান লেদার শপকে ব্যাগের দাম, মাসুম ব্যানারকে ব্যানারের দাম, মামুন ফটোস্ট্যাটকে ফটোকপির, নবরূপা সাউন্ড সিস্টেম থেকে শব্দযন্ত্র ভাড়া, মোহনা কনফেকশনারিকে নাশতা, প্রান্তিক এন্টারপ্রাইজ থেকে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল বাঁধাই এবং প্রিয়া কম্পিউটার্সকে সিডি রাইট করার দাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরগাঁও শহরে এসব দোকান খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, এই সময় ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো প্রশিক্ষণই হয়নি।
প্রশিক্ষণার্থীর তালিকায় সবাই চিকিৎসক। অথচ কোনো চিকিৎসককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁদের কেউ কেউ ২০ বা ১২ বছর আগে এই দুই জেলায় কাজ করতেন বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে।
২০১২ সাল থেকে প্রথম আলো স্বাস্থ্য খাতে প্রশিক্ষণে অনিয়ম অনুসন্ধান করছে। ওই বছরের ১১ জুন বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিন দিনের পুষ্টি প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন দিনের কর্মশালা শেষ হয় দুই ঘণ্টায়। ঢাকা থেকে যাওয়া কর্মকর্তা ব্যাগ, খাতা, কলম ও প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল নিয়ে যাননি। এমনকি প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানীও দিয়ে আসেননি। এ নিয়ে প্রথম আলোতে ২ অক্টোবর ২০১২ প্রতিবেদন ছাপা হয়।
২০১১-১২ অর্থবছরে কয়েকটি ওপির হিসাব নিরীক্ষা করেছিল ফাপাদ। সেই নিরীক্ষায় দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ একাধিক পরিচালক ও কর্মসূচি ব্যবস্থাপক প্রশিক্ষণের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ নিয়েও ২০১৩ সালের ৮, ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রশিক্ষণ নিয়ে এই দুর্নীতি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বছরের পর বছর এটা হচ্ছে বেশ কিছু সংখ্যক কর্মকর্তার যোগসাজশে। যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাঁদের শাস্তি না দিলে এই দুর্নীতি বন্ধ হবে না।

মেয়রদের সামনে তিন চ্যালেঞ্জ by আব্দুল কাইয়ুম

তিনজন মেয়র হয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁদের একটা আফসোস রয়ে গেল। এই মেয়র তো সেই মেয়র নন, যাঁরা সত্যিকার অর্থে জোর গলায় দাবি করতে পারেন যে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাঁরা ম্যানডেট পেয়েছেন। হয়তো এটা তাঁদের দোষ নয়। বিএনপি মাঝপথে রণে ভঙ্গ দিয়ে এমন এক অবস্থা করল যে ভোটের দিনের শেষ অর্ধেক প্রতিপক্ষবিহীন নির্বাচন করতে তাঁরা বাধ্য হলেন। ফলে অনেকের কাছে সেই ভোটের আর দাম থাকল না।
এখন বিতর্ক হতে পারে যে বিএনপির আর কী উপায় ছিল। তাদের এজেন্টদের গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। অথবা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রের কাছেধারে যেতে দেয়নি ইত্যাদি। আবার আওয়ামী লীগ বলবে, বিএনপির এজেন্টরা নিজেরাই ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে যায়নি, তাদের বের করে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে কীভাবে? এই বিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু যা বোঝার, মানুষ তা যে যার মতো করে বুঝে নিয়েছে।
মানুষের এই নিস্পৃহতা দূর করাই হবে তিন মেয়রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নাগরিকদের আস্থা অর্জন করতে হলে মেয়রদের এমন কিছু করতে হবে, যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। মানুষ যদি দেখে যে মেয়ররা উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচিত না হলেও জনজীবনের দুর্ভোগ কমাতে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন, তাদের নিত্যদিনের ঝামেলা কমাতে কাজ করছেন, তাহলে ধীরে ধীরে একটা অবস্থা তৈরি হলেও হতে পারে।
এ রকম অবস্থা বিএনপির আমলেও হয়েছিল। সাদেক হোসেন খোকা ২০০২ সালে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ মেয়র পদে প্রার্থী দেয়নি। কারণ, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি এমন তাণ্ডব শুরু করে, নেতাদের ধরপাকড়, মারধর করে এমন বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করে যে মাথা তুলে দাঁড়ানো আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন ছিল। কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে মেয়র হয়েও ২০১১ সাল পর্যন্ত সাদেক হোসেন খোকা টিকে ছিলেন। নানা কারসাজি হয়তো ছিল, কিন্তু তিনি মেয়র হিসেবে টিকে ছিলেন। কিছু কাজও হয়েছিল তাঁর আমলে।
তবে এ দেশে কোনো ভালো কাজও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এবং সমালোচনাগুলোর পেছনে যথেষ্ট যুক্তিও থাকে। সাদেক হোসেন খোকার মেয়রগিরিও ভালো-মন্দ মিশিয়ে পার হয়ে গেছে। তিনি যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থীর অনুপস্থিতিতে একটি নিষ্প্রাণ নির্বাচনে মেয়র হয়েছিলেন, সেটা সময়ের সঙ্গে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। তাঁর একটা কৌশল ছিল। তিনি কাজ করার সময় আওয়ামী লীগসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছেন।
এখন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়ররা আর কাকে সঙ্গে নেবেন? বিএনপি তো মাঠে নেই। মারপিট-ভয়ভীতি-মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে তাদের রাজনীতির মাঠ থেকে তাড়ানো হয়েছে। বিএনপি আপাতত শীতনিদ্রায়। সংগঠন গুছিয়ে, শক্তি সঞ্চয় করে মাঠে নামবে। এখন নগরবাসীর আস্থা অর্জন করতে হলে মেয়রদের সত্যিকার অর্থে কাজ করে দেখাতে হবে যে তাঁরা জনগণের সঙ্গে আছেন।
কাজটা খুব সহজ নয়। মেয়রদের প্রথম কাজ হবে একটা চেক লিস্ট তৈরি করা। মানুষের সমস্যাগুলোর তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সেগুলো সাজাতে হবে। অফিসে চোখের সামনে সেই তালিকা টাঙানো থাকবে। তালিকার একটি কপি বাসায় টাঙিয়ে রাখলে আরও ভালো। ভোরবেলা চায়ের টেবিলে বসলেই সেই সমস্যার তালিকা চোখের সামনে ভেসে উঠবে, অফিসে গেলেও সেটা তিনি দেখবেন। বাসায় ফিরে আবার দেখবেন। প্রতিদিন কতটা কাজ তিনি করতে পারলেন, তাঁর লোকজন দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে কতটা অগ্রসর হতে পারলেন, সেটা দিন শেষে তিনি হিসাব করবেন।
যেমন, ঢাকায় যে সমস্যাটা সকাল থেকে মানুষের জান শেষ করে দেয়, সেটা হলো যানজট। আপনি যেখানেই যান, দু-তিন ঘণ্টা রাস্তা খেয়ে ফেলবে। কীভাবে এ সমস্যা দূর করা যায়? সরকারের সাহায্য দরকার। আর দরকার ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তরের দুই মেয়রের সমন্বিতভাবে কাজ করা। মানুষের আয় বেড়েছে, গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। কী করা যায়? সকালে গুলিস্তান থেকে গুলশান-বনানী পর্যন্ত অবর্ণনীয় যানজট। এটা চলতে থাকে রাত পর্যন্ত। কারণ, উত্তর-দক্ষিণে চলাচলের জন্য এখন কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ ছাড়া উপায় নেই। কাকরাইল-মগবাজার-তেজগাঁওয়ের রাস্তাটিতে বছরের পর বছর ধরে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। মগবাজার-মৌচাক রাস্তারও একই দশা। ফলে গুলিস্তান-গুলশান পথে যাতায়াতের জন্য সব গাড়ি ফার্মগেটের রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর তো কোনো উপায় নেই। এই রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের কত লাখ ঘণ্টা যে যানজটে আটকা পড়ে নষ্ট হয়, তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
এই সমস্যার একটা সুরাহা হওয়া দরকার। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর, দুই কূলেরই সমস্যা। এখন দুই মেয়র সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ করতে পারেন যে ওই দুটি ফ্লাইওভার যেন খুব দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা হয়। কেন বছরের পর বছর ফ্লাইওভারের কাজ চলবে? যে কাজ এক বছরে হতে পারে, সেটা চার-পাঁচ বছরেও শেষ হওয়া তো দূরের কথা, অর্ধেকও কেন হয় না? এর রহস্য কী? কাজ চলছে ঢিমে তালে। দেখার কি কেউ নেই? সরকারের কেউ কি বলতে পারেন না, কেন কাজ হচ্ছে না? কেন মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো হচ্ছে?
যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের কাজটিও ঝুলে থাকত, যদি সরকার তাড়া না দিত। কিন্তু সেখানেও গ্যাঞ্জাম। ওপর দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে সাঁই–সাঁই করে, আর নিচের রাস্তায় দুনিয়ার জঞ্জাল। রাস্তা ভাঙাচোরা, ইট-পাথরের ব্লক। যেখানে-সেখানে বাস-ট্রাক ফেলে রাখা হয়েছে। নিচের রাস্তা দিয়ে বাস-গাড়ি চলাচল করতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অথচ আরও অনেক আগেই ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা জঞ্জালমুক্ত করে দেওয়ার কথা। সেটা যে হচ্ছে না, তার কোনো জবাবদিহি নেই।
মেয়ররা হয়তো বলবেন, এসব ফ্লাইওভার তো তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই। মেয়রের কাজ না। হয়তো তাঁরা বলবেন, ‘নগর সরকার’ না হলে কীভাবে কী করব? ঠিক। নগর সরকার হলে তো ভালোই। কিন্তু সেটা না হলে যে নগরবাসীকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তার দায় তো তাঁরা এড়াতে পারবেন না। তাই দুই মেয়র মিলে সরকারকে বোঝান, যেন দ্রুত ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করা হয়।
মেয়ররা তো পরিষ্কার ঢাকার জন্য ঝাড়ু হাতে রাজপথে নেমেছেন। ভালো কাজ। এ রকম একদিন সকাল থেকে দু-এক ঘণ্টা তেজগাঁও-মগবাজার-মৌচাক রাস্তাজুড়ে অবস্থান করেন না দুই মেয়র, তাঁদের সমর্থকদের নিয়ে। ডাক দেন ভুক্তভোগী নাগরিকদের। কোনো হই–হাঙ্গামা নয়, কোনো ভাঙচুর নয়। শান্তিপূর্ণ অবস্থান। ন্যায্য দাবি। ছয় মাসের মধ্যে ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করতে হবে।
তারপর ক্ষণ গণনা শুরু করুন। নগর ভবনে একটা বড় ইলেকট্রনিক ঘড়ি লাগিয়ে দেন। সেখানে প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে, ফ্লাইওভার শেষ করতে আর মাত্র ১৮২ দিন বাকি, পরদিন দেখা যাবে, আর মাত্র ১৮১ দিন বাকি! নগরবাসী দেখুক, কাজ কত দূর হচ্ছে।
ইতিমধ্যে মেয়ররা সরকারকে অনুরোধ করতে পারেন, যেন সরকারি অফিসগুলো সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত করা হয়। তাহলে যানজট কিছুটা কমানো যাবে। শুক্র-শনি ছুটি যথারীতি থাকবে। আগে তো সকালে অফিস হতো।
সরকার উঠেপড়ে লাগায় বিদ্যুৎ সমস্যা প্রায় মিটিয়ে ফেলা গেছে। এ রকম জানপ্রাণ চেষ্টা করলে যানজটও কমিয়ে আনা যাবে। তাহলে কত লোকের যে কত সময় বেঁচে যাবে, তা বুঝিয়ে বলা লাগে না। এটা যেন হয়, সে জন্য ঢাকার দুই মেয়র একযোগে কাজ করুন। যদি তাঁরা সফল হন, তাহলে মেয়রদের প্রতি মানুষের নিস্পৃহ ভাব অনেকটাই কেটে যাবে। নির্জীব নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়রও যে খুব তেজি মেয়র হতে পারেন, তা তাঁরা প্রমাণ করতে পারবেন।
এর সঙ্গে আরও দুটি চ্যালেঞ্জ তাঁদের মোকাবিলা করতেই হবে। একটি হলো টেন্ডারবাজি-দলবাজি বন্ধ, অপরটি হলো জলাবদ্ধতার অবসান। এ দুটি বিষয়ে আগামী দিনে লিখব।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail. com

দেশি ফলই কিনছেন সবাই by মোছাব্বের হোসেন

রাজধানীর বিভিন্ন আড়ত, বাজার ও দোকান এখন ভরে উঠেছে আম, লিচু, কাঁঠাল, জামরুল, আনারসসহ নানা রকম মৌসুমি ফলে। ক্রেতাদেরও আগ্রহ এই মৌসুমি ফলের দিকে। তাঁরা বলছেন, এসব দেশি ফল সারা বছর পাওয়া যায় না। তাই এই সময়টাতে দেশি ফলই বেশি কিনছেন। এতে খুচরা দোকান ও আড়তে মৌসুমি ফলের চাহিদা বেড়েছে। কমেছে আপেল, মালটা, আঙুরের মতো ভিনদেশি ফলের চাহিদা।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ভরে উঠেছে মৌসুমি ফলে। ছবিটি
কারওয়ানবাজার এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম
রাজধানীর, হাতিরপুল, কারওয়ানবাজার, বউবাজার, কলাবাগানসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, ফলের স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি অস্থায়ী বেশ কিছু দোকান বসেছে, যেখানে মৌসুমি ফল বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আম, লিচু ও সিলেটের জলডুবি আনারস।
রাজধানীর হাতিরপুলের ফল বিক্রেতা মো. আলী গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, মৌসুমি ফলের এই সময়টাতে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা পদের ফল আসতে শুরু করে। মানুষের আগ্রহও থাকে এই দেশি ফলের দিকে। আপেল, মালটা, বেদানা, আঙুরের মতো ফলগুলোর চাহিদা বেশ কমে যায়। অপর ফলবিক্রেতা মো. সোহাগ বলেন, ‘সারা বছর মানুষ অপেক্ষা করে দেশি ফলের লাইগ্যা। এগুলো বাজারে আইলে অন্য ফলের বিক্রি কিছুটা কইমা যায়।’
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ভরে উঠেছে মৌসুমি ফলে। ছবিটি
কারওয়ানবাজার এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম
কারওয়ান বাজারে মো. শফিকুল ইসলাম (৫৮) প্রায় ২৪-২৫ বছর ধরে ফল বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘মৌসুমি ফল মানুষ নিজে খায়, আত্মীয়গো লাইগ্যা কিনে। এই জন্যে অন্যান্য বিদেশি ফলের চাহিদা কমে।’
ফলের এ মৌসুমে ভিন্ন জীবিকার অনেকে ফল বিক্রি করে বেশ আয় করে থাকেন। এমন একজন আবদুল হান্নান। সোনারগাঁও হোটেলের সামনে তিনি আগে পোশাক বিক্রি করতেন। গত কয়েক বছর ধরে মৌসুমি ফলের সময়ে ওই ব্যবসা ছেড়ে আম-লিচু বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘ফলে নগদ লাভ বেশি আর বিক্রিও ভাল তাই এই সময়ে প্রতি বছর আমি এই ব্যবসা করি। আমার মতো অনেকেই এই ব্যবসা করে।
অনেক ফল বিক্রেতা এ সময় অন্য ফল বিক্রি বাদ দিয়ে কেবল মৌসুমি ফল বিক্রি করেন। কারওয়ান বাজারের জাকির হোসেন এমন সময়ে আপেল, পেঁপে, কমলা, আঙুর বিক্রি করেন। কিন্তু গত এক মাস থেকে তিনি আর ওই ফল বিক্রি না করে লিচু আর আম বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘এই সময় মানুষ দেশি ফল কেনে বেশি, ওগো চাহিদার কথা মাথায় রাইখ্যা ব্যবসাও বদলাই ফেলি। আবার মৌসুমি ফল যাইবো আবার ওই ফল বেচমু।’
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ভরে উঠেছে মৌসুমি ফলে। ছবিটি
কারওয়ানবাজার এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম
কলাবাগান মাঠ-সংলগ্ন রাস্তার পাশে বসেছে আমের কয়েকটি দোকান। সেখানে আম কিনছিলেন ধানমন্ডির বাসিন্দা সাব্বির হোসেন। তিনি বলেন, ‘সারা বছর অপেক্ষা করি এই সময়ের জন্য। দেশি ফল আমাদের বাসার সবার পছন্দ।’ তিনি বলেন, ‘সারা বছরই ফল খাওয়া হয়, তবে এই সময়ে দেশি ফল বেশি খাওয়া হয়। অন্য ফল সব সময় পাওয়া যায়। আম-লিচু সব সময় পাওয়া যায় না।’
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা অঞ্চলের হিমসাগর আম পাওয়া যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। আমের আকার ও মান অনুসারে কেজি প্রতি এই আম বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ১২০ টাকায়। রাজশাহীর ল্যাংড়া আম পাওয়া যাচ্ছে কম। ১০০ লিচু মিলছে ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায়। জলডুবি আনারস এক হালি মিলছে ৪০-৬০ টাকায়। ভ্যানে করে বিভিন্ন এলাকার মোড়ে মোড়ে এই আনারস কেটে কেটে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। জামরুল ১০০-১২০ টাকা, জাম ১৫০-২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকার ভেদে কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায়।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ভরে উঠেছে মৌসুমি ফলে। ছবিটি
কারওয়ানবাজার এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম
মৌসুমি ফলের দাপটে বিদেশি ফল আমদানি কমে যায় বলে জানালেন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুট ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২৫-৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি এ সময় মানুষ মৌসুমি ফল বেশি কেনে। এ জন্য বিদেশি ফলের আমদানিও কমে যায়। তিনি বলেন, এক মাস আগেও যেখানে ৮০-৯০ ট্রাক বিদেশি ফল আমদানি করতে হতো, সেখানে এখন তা ১৫-২০ ট্রাকে নেমে এসেছে।