Saturday, September 5, 2026

মুসলিমদের কি ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই—ভারতে মসজিদ ধ্বংসের তীব্র নিন্দা ওয়াইসির

ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট চত্বরে থাকা মসজিদ ভেঙে ফেলার তীব্র নিন্দা করেছেন সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি দাবি করেন, ১৯১১ সাল থেকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নথিতে ওই স্থানে মসজিদের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। এ সময় তিনি বলেন, ‘শুধু আপনাদের মনে খচখচের কারণে আমাদের মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিতে পারেন না।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ওয়াইসি প্রশ্ন তোলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা কি মুসলমানদের জন্য আর প্রযোজ্য নয়? কেন আমাদের উপাসনালয়গুলো ক্রমাগত তুচ্ছ কারণে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়?

ওয়াইসি বলেন, “মসজিদ কমিটি এর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ১৯১১ সাল পর্যন্ত পুরোনো নথি উপস্থাপন করেছিল। সেখানে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নামাজ আদায় করা হয়েছে। এটিই ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’-এর প্রকৃত সংজ্ঞা, যা এখনো আইনের অধীনে ওয়াকফ হিসেবে সুরক্ষিত।”

সরকারের ওই সম্পত্তির ওপর দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওয়াইসি। এ ক্ষেত্রে তিনি তামাদি আইন এবং স্থাবর সম্পত্তির দখলসংক্রান্ত বিধানের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “তামাদি আইন সাধারণত সরকারকে কোনো স্থাবর সম্পত্তির দখল দাবি করার জন্য সীমাহীন সময় অপেক্ষা করে এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই সম্পত্তির মালিকানা দাবি করার সুযোগ দেয় না।”

দীর্ঘদিনের দখলকে সম্পত্তিটির আইনগত অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলেও যুক্তি দেন তিনি।

এআইএমআইএম প্রধান বলেন, “এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রকাশ্য, ধারাবাহিক ও সর্বসাধারণের সামনে দখল ছিল না কি? রাষ্ট্র এমন ভান করতে পারে না যে এই দখল গতকাল থেকে শুরু হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের যুক্তি মেনে নিলেও ‘অ্যাডভার্স পজেশন’ বা দীর্ঘদিনের বিরোধী দখলের নীতি এখানে প্রযোজ্য হবে।”

ওয়াইসি আরও দাবি করেন, কালেক্টরেট প্রতিষ্ঠার আগেই মসজিদটি সেখানে ছিল।

তিনি বলেন, “মসজিদ আগে এসেছে, কালেক্টরেট পরে।” এরপর তিনি বলেন, “কিছু মানুষের কাছে হয়তো মসজিদ দেখাটাই কষ্টের কারণ। সেটা তাদের সমস্যা, আমাদের নয়।”

তিনি আরও বলেন, “প্রয়োজনে চোখ ফিরিয়ে নিন। শুধু আপনাদের মনে খচখচ করছে বলে আমাদের মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিতে পারেন না। আমার ধর্মীয় স্বাধীনতা আপনার দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়।”

সাহারানপুর কালেক্টরেটে মসজিদটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরুর পর ওয়াইসি এসব মন্তব্য করেন। একটি আদালতের আদেশে মসজিদটি অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল থাকার পরই এর ধ্বংসকাজ শুরু হয়।

গত ৪ সেপ্টেম্বর জেলা জজের আদালত মসজিদ কমিটির করা আপিল খারিজ করে এবং সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আগের আদেশ বহাল রাখেন। এর আগে ১৭ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত মসজিদটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। পাশাপাশি, সরকারি জমিতে কথিত অবৈধ দখল ও অপব্যবহারের অভিযোগে প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়েছিল।

সাহারানপুরের ডিআইজি অভিষেক সিং বলেন, সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত মসজিদটিকে সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত বলে রায় দিয়েছিল এবং পরবর্তী আপিলও খারিজ হয়ে যায়।

তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কৌশলগত বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ছড়ানো ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি করা হচ্ছে।

মসজিদটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ইকরা হাসান অভিযোগ করেছেন, সাহারানপুর যাওয়ার চেষ্টা করার সময় তাকে কাইরানায় গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল।

কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদও মসজিদটি ভেঙে ফেলার সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, মসজিদটি ১৯১১ সালেরও আগে থেকে সেখানে ছিল। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ওয়াকফ বোর্ডকে মামলার পক্ষ করা হয়নি এবং বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করা হবে।

সূত্র: ডেকান ক্রনিকল

Amardesh_Mosjid_bREAKING

ইসরাইলের নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভিরকে থামাবে কে

আল জাজিরার প্রতিবেদনঃ ইতামার বেন-গভির ইসরাইলের অন্যতম বিতর্কিত ও কট্টরপন্থি রাজনীতিক। ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী হিসেবে বেন-গভির দেশটির পুলিশ ও কারা ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। আর এই ক্ষমতা তিনি কীভাবে ব্যবহার করতে চান, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কারাগারে বন্দিদের ওপর আরো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এছাড়া ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।

অন্যকে অপমান ও হেয়প্রতিপন্ন করাকে তিনি যেন তার কর্মকাণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছেন। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গাজায় ইসরাইলের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করতে গিয়ে আটক হওয়া কর্মীদের তিনি উপহাস করছেন।

কারাগারকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই তার বক্তব্য সীমাবদ্ধ নয়। গাজায় প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস হামলায় উৎসাহ দিয়েছেন, অবৈধ ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদেরও পক্ষে কথা বলেছেন।

বেন-গভিরের উসকানিমূলক বক্তব্যের উদ্দেশ্য মানুষকে চমকে দেওয়া। তবে এর চেয়েও বড় বিপদ সম্ভবত তখনই তৈরি হয়, যখন এসব বক্তব্য আর কাউকে বিস্মিত করে না।

একসময় ইসরাইলি সরকারের জন্য অতিরিক্ত কট্টরপন্থি বলে বিবেচিত এই রাজনীতিক এখন ফিলিস্তিনিদের জীবনের ওপর বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। আর তিনি একের পর এক সীমারেখা অতিক্রম করে চলেছেন। ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু—বেন-গভির কতদূর যেতে চান, এরমধ্যে আটকে নেই, বরং প্রশ্ন হলো—তার আশপাশের মানুষজন তাকে কতদূর যেতে দিতে প্রস্তুত?

ইসরাইলের নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভিরকে থামাবে কে
ইতামার বেন-গভির

গাজা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে তাড়ানোর ছক ইসরাইলের

গাজা উপত্যকা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক সরিয়ে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) গার্ডিয়ানের অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনের আগে দেয়া বক্তব্যে বেন-গভির বলেন, প্রথম বছরে গাজা থেকে আড়াই লাখ ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নেয়া হবে। এরপর ছয় বছরে উপত্যকার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দার বাকি অংশকেও সরিয়ে নেয়া হবে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত দাবি করে বেন-গভির বলেন, কয়েকটি দেশ গাজার ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে তিনি দেশগুলোর নাম জানাননি।

গার্ডিয়ান বলছে, ইসরাইলি মন্ত্রীর প্রস্তাবটি ২০ পৃষ্ঠার একটি নথিতে রয়েছে, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘গাজা উপত্যকা থেকে স্বেচ্ছায় অভিবাসনের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’। যদিও এতে ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে জবরদস্তিমূলক পরিকল্পনা হিসেবে দেখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেন-গভিরের বক্তব্যের আগে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজও জানিয়েছিলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদন চাইছে তেল আবিব।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের ‘যেকোনো উপায়ে’ দেশত্যাগে সহায়তা করা হবে।
এদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার বলেন, গাজায় ইসরাইল দখল করা এলাকা থেকে তারা সরে যাবে না। তার দাবি, বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে।

দেশটির ডেপুটি চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল তামির ইয়াদাইয়ের হিসাবে, নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার পরিমাণ ৬৫ শতাংশ।
জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে বেসামরিক জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আগামী অক্টোবরে ইসরাইলের নির্বাচন সামনে রেখে বেন-গভিরের দল জিউইশ পাওয়ার প্রায় সাতটি আসন পেতে পারে বলে জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। 

গাজা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে তাড়ানোর ছক ইসরাইলের

‘অকল্পনীয় শোকে’ কাঁদছে ইরানের পুরো শহর

বিয়ের আসরে মার্কিন হামলাঃ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশের ছোট শহর কুহেস্তাকে বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোকে। গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় বিস্ফোরণে অন্তত চারজন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চার বছরের এক শিশুও রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ইরানের রেড ক্রিসেন্ট হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত বালুচ-অধ্যুষিত শহরটিতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন বিয়ের অনুষ্ঠান মাত্র শুরু হয়েছিল। বর-কনের স্বজন ও বন্ধুরা অপেক্ষা করছিলেন, আর মেহেদি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আরও অতিথি আসার কথা ছিল। এর মধ্যেই বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাড়িটির একাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ, বিয়ের ফুলের মালা ও সাজসজ্জার সামগ্রী। কোথাও পড়ে আছে রক্তমাখা জুতা। স্থানীয়দের প্রকাশ করা এসব ভিডিওতে হামলার পরের ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির মালিক আলি মাল্লাহি একজন জেলে। নিজের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে সেখানে অতিথিদের জড়ো করা হয়েছিল। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে এক ভিডিওতে মাল্লাহি বলেন, হামলায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। তবে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়ায় তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।

হামলার পর কুহেস্তাকজুড়ে নেমে এসেছে শোক। স্থানীয় এক নাপিত আহমাদ বলেন, ক্ষয়ক্ষতি শুধু বিয়ের বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আশপাশের বহু বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিস্ফোরণের সময় ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষে প্রতিবেশীরাও আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের শহর ছোট। আমরা সবাই একে অন্যকে চিনি, ভাইয়ের মতো। আমরা সবাই শোকাহত।’ আরেক পর্যায়ে তার কণ্ঠে উঠে আসে ক্ষোভ ও হতাশা। তিনি বলেন, ‘আমরা কাঁধে কফিন বহন করছি না, আমরা বহন করছি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য অপেক্ষা করা অন্ধকার ভবিষ্যৎ।’

বালুচ মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা এবং বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ে স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে। ফলে ঘটনার স্বাধীন তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে যাচ্ছেন।
বালুচিস্তানের মানবাধিকারকর্মী ফারজিন কাদখোদায়ি বলেন, নিহতরা ছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া সাধারণ বেসামরিক মানুষ। আনন্দের একটি দিনে তাদের মৃত্যু পরিবারগুলোর জন্য ‘অকল্পনীয় শোক’ বয়ে এনেছে।
মাকরান উপকূলের ৩৫ বছর বয়সী জেলে চাকর বালুচ বলেন, ‘আমরা ভুক্তভোগী। আমরা উপকূলের মানুষ। বছরের পর বছর সমুদ্রে যাই, জীবিকার জন্য সংগ্রাম করি এবং শুধু বেঁচে থাকতে চাই।’

সিরিকের এক বালুচ বাসিন্দার প্রশ্ন আরও তীব্র- ‘আমি কার কাছে জবাব চাইব? এই যুদ্ধে যারা আমাদের ওপর হামলা করেছে, সেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে? নাকি যে শাসকগোষ্ঠী এই যুদ্ধকে আমাদের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে, তাদের কাছে?’

‘অকল্পনীয় শোকে’ কাঁদছে ইরানের পুরো শহর

ইয়েমেনের তায়েজে ফের লড়াই, দু’দিনে প্রায় ১৮০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত

দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) আপডেট এ তথ্যে এ কথা জানিয়েছে। তায়েজ গভর্নরেটের মাকবানাহ ও জাবাল হাবাশি জেলায় সংঘাতের সম্মুখসারিতে গোলাবর্ষণের কারণে বাস্তুচ্যুতদের বেশ কয়েকটি আশ্রয়স্থল পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে পড়ে। অধিকাংশ বাসিন্দা ওই দুই জেলার অন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। অন্যরা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে পালিয়ে গেছে।

ত্রাণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সম্মুখসারির এলাকায় এখনো কিছু পরিবার আটকা রয়েছে এবং তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো খাবার ও আশ্রয়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তীব্র সংকট নিয়ে নতুন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে। সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুতর বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এখনো ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে জরুরি ত্রাণের মজুতও ‘গুরুতরভাবে কমে গেছে’। ফলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে সংস্থাগুলোর।

ইয়েমেনের তায়েজে ফের লড়াই, দু’দিনে প্রায় ১৮০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত

লিবিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন পরিকল্পনা

লিবিয়াকে নিয়ে গোপন পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা দেশটিতে সচল দুই সরকারকে এক করে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে। লিবিয়ার সংকট সমাধানে এই প্রচেষ্টা উল্টো ফল দিতে পারে বলে এক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন লিবিয়ার শিক্ষাবিদ, পুরষ্কার বিজয়ী সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মুস্তাফা ফেতুরি। অনলাইন আরটি’তে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তিনি লিখেছেন, প্রায় এক বছর ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বৌলস ত্রিপোলি, বেনগাজি, প্যারিস, রোম ও আবুধাবিকে যুক্ত করে একটি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরালোভাবে চালিয়ে আসছেন। তার প্রধান লক্ষ্য হলো এমন একটি লেনদেনভিত্তিক রাজনৈতিক সমঝোতা এগিয়ে নেয়া, যার মাধ্যমে লিবিয়ার প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ পশ্চিম-পূর্ব বিভাজনের অবসান ঘটাতে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক জোট প্রতিষ্ঠা করা যায়।

গত সেপ্টেম্বর থেকে প্রথমে রোমে এবং পরে বিভিন্ন রাজধানীতে গোপনে যে পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, তার মূল বিষয় হলো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট কাঠামোর পুনর্গঠন। এর আওতায় পূর্ব লিবিয়ার স্থলবাহিনীর কমান্ডার খলিফা হাফতারের উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সাদ্দাম হাফতারকে পুনর্গঠিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের নেতৃত্বে বসানোর কথা রয়েছে। একই সঙ্গে আবদুল হামিদ দাবাইবাহকে প্রধানমন্ত্রী পদে রাখা হবে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ তৈরি করার পরিবর্তে এই কাঠামো রাষ্ট্রের বিভক্তিকে একটি স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিচ্ছে।

এর মাধ্যমে পশ্চিমে দাবাইবাহ প্রশাসন এবং পূর্বে হাফতার পরিবারের নেটওয়ার্ককে কার্যত একটি বংশানুক্রমিক দ্বৈত ক্ষমতাকাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে।
এ ধরনের উদ্যোগের পথ তৈরি করতে ওয়াশিংটন প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপকে কাজে লাগিয়েছে। এপ্রিলে বৌলসের মধ্যস্থতায় ১৯০ বিলিয়ন দিনারের একটি রেকর্ড পরিমাণ ঐক্যবদ্ধ বাজেট চুক্তি হয়- ২০১৪ সালের পর লিবিয়ায় এটাই ছিল এ ধরনের প্রথম চুক্তি। একই সময়ে আফ্রিকমের ফ্লিন্টলক মহড়ার আওতায় সির্তেতে যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূর্ব ও পশ্চিম লিবিয়ার বাহিনীর পাশাপাশি ইতালি এবং এক ডজনেরও বেশি আফ্রিকান দেশ অংশ নেয়। তবে এই লিখিত না থাকা লেনদেনভিত্তিক নকশাকে জাতীয় সমঝোতা হিসেবে বিবেচনা করা সংকটটির প্রকৃত চরিত্রকে ভুলভাবে বোঝা।

সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো কাঠামো তৈরি করা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা মিলিশিয়া নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে এই ব্যবস্থা একটি অভিজাত দ্বৈত ক্ষমতাকাঠামোকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। সাময়িক আর্থিক বণ্টন এবং তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত ঐক্যবদ্ধ সামরিক মহড়াকে কাজে লাগিয়ে ওপর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। এতে প্রকৃত রাষ্ট্র গঠন না করে ক্ষমতাসীন দুই পরিবারের মধ্যে একটি ভঙ্গুর সমঝোতাকেই রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে লিবিয়ার তেল ও গ্যাসসম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ জনগণের বদলে একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর হাতেই যেতে থাকবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বৌলসের উদ্যোগটি কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই পরিচালিত একটি অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক তৎপরতা। বহিরাগত মধ্যস্থতার আইনি ভিত্তি প্রদানকারী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মৌলিক প্রস্তাবগুলো উপেক্ষা করায় ওয়াশিংটনের এই তাৎক্ষণিক উদ্যোগ স্থানীয় পক্ষগুলোকে সমঝোতায় আবদ্ধ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন থেকে বঞ্চিত।

এ ছাড়া পরিকল্পনাটিতে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থাও নেই। এটি বর্তমান মার্কিন রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। প্রস্তাবিত দুই থেকে তিন বছরের অন্তর্বর্তী সময় শেষে নবনিযুক্ত নির্বাহী নেতারা ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে কী করা হবে, সে বিষয়েও কোনো প্রটোকল নেই। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো মধ্যস্থতাকারী না থাকলে, যিনি পক্ষগুলোকে সমঝোতা মানতে বাধ্য করতে পারেন, এই উদ্যোগ একটি বিপজ্জনক ক্ষমতার ফাঁদে পরিণত হতে পারে। ফলে বাইরের শক্তিগুলোর অগ্রাধিকার বদলে গেলেই লিবিয়া আবারও সংঘাতের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগটি জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন চলমান মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক। জাতিসংঘের লিবিয়া সহায়তা মিশন বা ইউএনএসএমআইএলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতিসংঘের ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়াটি নিঃসন্দেহে ধীরগতির এবং এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।

তবে এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে এবং স্বীকৃত, যদিও ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিনিধি পরিষদ এবং স্টেটের উচ্চ পরিষদ।
ওয়াশিংটন এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে অভিজাতদের মধ্যে দ্রুত একটি সমঝোতার পথ বেছে নেয়ার চেষ্টা করছে। এতে ইউএনএসএমআইএল বছরের পর বছর ধরে যে নাজুক প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, তা পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

লিবিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন পরিকল্পনা

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ইরান যুদ্ধ

আগামী ৩রা নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ এতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের প্রভাব নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা চাইছেন নির্বাচনের আগে সংঘাত যেন আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ না নেয়। নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই অল্প ব্যবধানে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে নামবে বর্তমান ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি।

এমন এক প্রেক্ষাপটে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন তথাকথিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ ঘোষণা করে। এর আওতায় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে তেল থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রবাহ সহজতর করে এমন ৬০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা অন্যান্য দেশকেও ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’র হুমকি দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তেহরানের তেল রপ্তানির ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুদ্ধের গুরুত্ব কম করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। এখন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী জনমত নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সংযম দেখানোরও স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং মার্কিন নেতারা বলছেন, আরও সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা খোলা রয়েছে। ভ্যান্স চলতি সপ্তাহে বলেছেন, যা কিছু ঘটতে পারে, সবই বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক ও গোপন চাপও রয়েছে। ফলে আগামী দুই মাস ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত কঠিন সময় হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইবে, অন্যদিকে ইরানের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ রয়েছে। তেহরান সামরিকভাবে জবাব দিতে পারে, যা নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা ওয়াশিংটন এড়াতে চাইছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে তাদের অল্প ব্যবধানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না।

এর আগে যুদ্ধ আবার বড় আকারে ছড়িয়ে পড়লে আরও বেশি মানুষ ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন। তাই নভেম্বর পর্যন্ত লড়াই নিয়ন্ত্রণে রাখা ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা যুদ্ধকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকাতে পারে। আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধকে সমর্থন করেন। বিপরীতে ৬৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেন। রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের অনুমোদনের হারও ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ইরান যুদ্ধ

লংমার্চে বাধা এলে ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে :-নাহিদ ইসলাম

চট্টগ্রামের লংমার্চে কোনো বাধা আসলে ছয় দফা দাবি এক দফা দাবিতে পরিণত হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শনিবার রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১১ দলীয় জোটের চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এ লংমার্চ আপামর জনতার। সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেয় তাহলে সব বাধা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে এবং ১১ দলের ৬ দফা দাবি এক দফা রূপ নেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক এক দফার জন্য সারাদেশের মানুষ লংমার্চ টু ঢাকায় এসে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগে লংমার্চে যাচ্ছি নতুন করে যারা স্বৈরাচার হচ্ছে, সেই পথ বন্ধ করার জন্য।’

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমাদের এই লংমার্চ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। যারা সিন্ডিকেট করে তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে—তাদের বিরুদ্ধে। এই লংমার্চ যারা ৭০ শতাংশ মানুষের ভোটের সঙ্গে প্রতারণা করেছে তাদের বিরুদ্ধে।’

এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, ‘১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বানে আজ এতো ভোরে যেভাবে নেতাকর্মীরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক দল এতো ভোরে রাজপথে আসতে পারবে না।’ তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজনে তারেক রহমান সাহেব একটা সমাবেশ এতো ভোরে আহ্বান করে দেখতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজ-মাস্তানদের ভোট দিলে দেশ ভালো চলবে না তার দৃষ্টান্ত বর্তমান সরকার। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায় করা হবে, ইনশাআল্লাহ।’

সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক বলেন, ‘সরকার জাতির সাথে প্রতারণা করেছে। ক্ষমতার মসনদে বসে যদি জাতিকে ভুলপথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে তাহলে টেনে নামাতে আমাদের হাত এক চুলও কাঁপবে না।’

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সরকার জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে ব্যর্থ হয়েছে। দিনে দিনে দুর্ভোগ বাড়ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। জনগণকে দেয়া সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সরকারকে সংসদে ভুল স্বীকার করে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে চাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের এই লংমার্চ। যারা গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি এই লংমার্চ তাদের বিরুদ্ধে।

তিনি দেশবাসীকে লংমার্চে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘লংমার্চে বাধা আসলে ছয় দফা থেকে একদফা দাবিতে আন্দোলন দুর্বার গতিতে শুরু হবে।’

লংমার্চে বাধা এলে ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে

সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে :-নারায়ণগঞ্জে লংমার্চে শফিকুর রহমান

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঘোষিত ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে পথসভা করেছে। শনিবার সকাল ৯ টায় লংমার্চ সেখানে পৌঁছায়।

পথসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা রাজপথে নেমেছি গণভোট বাস্তবায়ন করার জন্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের জন্য। এই সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে, ভাঁওতাবাজি করছে। জনগণ তাদেরকে ক্ষমা করবে না।’

১১ দলীয় জোট জনগণের পাশে আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস, এই চেষ্টা আল্লাহ কবুল করবেন। আমরা ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ গড়বো। আপনারা বিজয়ের শেষ হাসি হেসে ঘরে ফিরবেন।’

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লংমার্চ সফল হবে। তেল ও গ্যাসের দাম না কমালে এই সরকারকে গদি ছাড়তে হবে।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য আমরা কঠিন মুহূর্তেও প্রস্তুত আছি। সরকার প্রধানকে বলবো—এই জাতির পালস বুঝার চেষ্টা করেন, শেখ হাসিনা ৩ বার মানুষের ভোট নিয়ে খেলেছেন, তাই তাকে এই দেশের মানুষ ছক্কা মেরে বিদায় করেছে। ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে প্রতারণা করলে এই দেশের মানুষ লাল কার্ড দেখাবে।’

এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন, এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমেদ ও এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমিন এমপি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা, জুলাই গণহত্যার বিচার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবি সামনে রেখে ঢাকা-চট্টগ্রামমুখি লংমার্চ করছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে

পর্তুগিজ এক জলদস্যু যেভাবে হয়েছিলেন সন্দ্বীপের রাজা by ইফতেখার উদ্দিন

চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। একসময় পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের দুর্গ ছিল মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপ। দ্বীপটি প্রায় এক দশক শাসন করেছেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু। সন্দ্বীপের ফিরিঙ্গি এই ‘রাজা’ ভারতে এসে প্রথমে সৈনিকের জীবন বেছে নেন। গোয়ায় একটি বাহিনীতে সৈনিকের কাজ নিয়েছিলেন তিনি। তবে তিনি খুব দ্রুত সৈনিকের পেশা ছাড়েন, বেছে নেন বণিকের জীবন।

চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। একসময় পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের দুর্গ ছিল মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপ। দ্বীপটি প্রায় এক দশক শাসন করেছেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু। সন্দ্বীপের ফিরিঙ্গি এই ‘রাজা’র বিষয় নিয়ে জানা যাক।

জোয়াকিম জোসেফ এ ক্যাম্পোস-এর ‘হিস্ট্রি অব দ্য পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থে তিবাউর উত্থান নিয়ে একটি অধ্যায় আছে। সেখানে তিবাউর পরিচয় লেখা হয়েছে—তিবাউ অখ্যাত বংশোদ্ভূত এক পর্তুগিজ, যার জন্ম হয়েছিল ‘সান্তো আন্তোনিও দে তোজালে’। তিনি ১৬০৫ সালে ভারতবর্ষে এসেছেন। এরপর খুব দ্রুত বাংলায় চলে আসেন।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারতে এসে প্রথমে সৈনিকের জীবন বেছে নেন তিবাউ। গোয়ায় একটি বাহিনীতে সৈনিকের কাজ নিয়েছিলেন তিনি। তবে তিনি খুব দ্রুত সৈনিকের পেশা ছাড়েন, বেছে নেন বণিকের জীবন। একটি জাহাজ কিনে লবণের ব্যবসা শুরু করেন। এই লবণ ব্যবসার সূত্রে ১৬০৭ সালে ‘দেয়াং’ এলাকায় গিয়ে তাঁকে ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হতে হয়, যা তাঁর পরবর্তী জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, দেয়াং এলাকাটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত, তখন এটি আরাকানের অংশ ছিল। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার লিখেছেন, তখন আরাকান রাজ্যে ফিরিঙ্গিদের দুটি প্রধান পল্লীর একটি ছিল ‘ডিয়াঙ্গা’ (দেয়াং)।

দেয়াং এলাকায় আরাকানরাজের নির্দেশে পর্তুগিজদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল ১৬০৭ সালে। সেই ঘটনায় বহু পর্তুগিজ প্রাণ হারালেও তিবাউ প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর মতো বেঁচে যাওয়া আরও কিছু পর্তুগিজকে নিয়ে তিনি ‘গঙ্গার মুখে’ বসতি স্থাপন করেন এবং জীবিকা হিসেবে বেঁচে নেন জলদস্যুতার পথ। আরাকান রাজার ওপর প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ওই রাজ্যের বিভিন্ন উপকূলে লুট করে তিবাউর দলটি তৎকালীন ‘বকলার’ (বরিশাল) বন্দরে নিয়ে যেত। বকলার ‘রাজা’ পর্তুগিজদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ সন্দ্বীপ দখল করেন ১৬০৯ সালে। এর আগেও অবশ্য পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণ দ্বীপটিতে ছিল। পর্তুগিজ যোদ্ধা ‘ডমিঙ্গো কারভালহো’ এবং ‘ম্যানোয়েল দা মাত্তোস’ দ্বীপটি শাসন করেছেন। ১৬০৫ সালে কারভালহোর মৃত্যু হয়।

গবেষক ও ইতিহাসবিদ রিলা মুখার্জি লিখেছেন, ১৬০৭ সালে দেয়াংয়ে পর্তুগিজদের ওপর আরাকানরাজের নির্দেশে আক্রমণ হলে ম্যানোয়েল দা মাত্তোস পর্তুগিজদের সহায়তায় সন্দ্বীপ থেকে সেখানে যান। দেয়াংয়ের আক্রমণে মাত্তোস প্রাণ হারান। মাত্তোসের অনুপস্থিতিতে দ্বীপের দায়িত্ব ছিল পেরো গোমেজ নামের একজনের হাতে। গোমেজ ব্যর্থ প্রশাসক হওয়ায় তাঁর অদক্ষতার সুযোগে সন্দ্বীপে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই গোমেজের অধীনস্থ কর্মকর্তা ফতেহ খান দ্বীপটি দখলে নিয়ে নিজেকে শাসক ঘোষণা করেন।

ফতেহ খানের বাহিনীকে ১৬০৯ সালে পরাজিত করে সন্দ্বীপের দখল নেন তিবাউ। বেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সেটি হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। প্রায় ৪০টি পালতোলা জাহাজ ও ৮০০ সৈন্য নিয়ে ফতেহ খান তিবাউর দলের ওপর আক্রমণ করেন। তবে নৌ চালনার দক্ষতায় সংখ্যায় কম হলেও জয়ী হয় তিবাউর দল। যুদ্ধে নিহত হন ফতেহ খান। তাঁর অনুসারীদের কেউ নিহত, কেউ বন্দী হন তিবাউর দলের হাতে।

তিবাউর সন্দ্বীপ অভিযানে সামরিক সহায়তা দিয়েছিলেন বকলার শাসক ‘রাজা’ প্রতাপাদিত্য। দ্বীপের রাজস্ব ভাগাভাগি করবেন, এই শর্তে তিবাউকে ২০০ অশ্বারোহীর পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজও দেন তিনি। সন্দ্বীপ দখলের পর তিবাউর দল আরাকানি জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করতে শুরু করে। লুট করা মালামাল রাজা প্রতাপাদিত্যের বন্দরগুলোতে বিক্রি করা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় ধনসম্পদের সঙ্গে সামরিক শক্তি বাড়তে থাকে তিবাউর।

তিবাউ সন্দ্বীপের রাজস্বের অর্ধেক প্রতাপাদিত্যকে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা রাখেননি। বরং প্রতাপাদিত্যের দখলে থাকা দক্ষিণ শাহবাজপুর (ভোলা) দখলে নেন। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় তাঁর। তিবাউর বাহিনীতে তখন এক হাজারের বেশি পর্তুগিজ, দুই হাজার স্থানীয় সৈন্য, ২০০ অশ্বারোহী। এর সঙ্গে বেড়েছে যুদ্ধজাহাজ, বাণিজ্যিক নৌকা ও সমরাস্ত্র, যা বেশ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল তিবাউকে।

তিবাউ ছিলেন স্বাধীন রাজা। গোয়া থেকে পরিচালিত প্রাতিষ্ঠানিক পর্তুগিজ শাসন ‘এস্তাদো দা ইন্ডিয়ার’ অধীন ছিলেন না তিনি। গোয়ার নিয়ন্ত্রণহীন এ ধরনের অঞ্চলকে ইতিহাসবিদেরা পর্তুগিজদের ‘ছায়া সাম্রাজ্য’ কিংবা ‘অনানুষ্ঠানিক সাম্রাজ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গোয়ার নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও বেশ কিছু সময় এস্তাদো দা ইন্ডিয়ার সহায়তা তিবাউ চেয়েছেন। ১৬১৫ সালের দিকে গোয়ার একটি সরকারি বহরের সঙ্গে লেম্রো নদী বেয়ে আরাকানের রাজধানী ‘ম্রাউক ইউ’ আক্রমণ করে তিবাউর দল। এ সময় নদীতে নোঙর করা আরাকানের ও বিদেশি বেশ কিছু জাহাজ ধ্বংস করে দলটি। তবে ডাচদের সহায়তায় তাদের বাহিনীকে পরাজয় বরণ করতে হয়।

১৬১৭ সাল পর্যন্ত সন্দ্বীপের তিবাউর শাসন অব্যাহত ছিল। ১৬১৭ সালে আরাকানরাজ মিন রাজাগির ছেলে ও উত্তরসূরি মিন খামাউং তাঁকে পরাজিত করেন।

সপ্তদশ শতকের এই সময়টাতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও কৌশলগত কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল সন্দ্বীপ। সন্দ্বীপ তখন লবণ উৎপাদনের জন্য বেশ খ্যাত। এই দ্বীপে উৎপাদিত লবণ বাইরের অঞ্চলগুলোতে রপ্তানি হতো। চাল, শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি সুতির কাপড় উৎপাদনের জন্যও পরিচিত ছিল দ্বীপটি। এ ছাড়া এই সন্দ্বীপে নৌযান মেরামত কেন্দ্রও ছিল।

শিল্পীর তুলিতে আঁকা বাংলায় পর্তুগীজ জাহাজ
শিল্পীর তুলিতে আঁকা বাংলায় পর্তুগীজ জাহাজ। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ার হামলায় জ্বলছে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তর

সিএনএনঃ ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর কিয়েভ সদর দপ্তরে রাশিয়ার একটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। শুক্রবার গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি ভবনে সরাসরি আঘাতের এই বিরল ঘটনাটি ঘটেছে। এটি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মারাত্মক ঘাটতিকে ফুটিয়ে তুলেছে।

কিয়েভে টানা কয়েক দিন ধরে আকাশপথে আক্রমণ চালিয়ে আসছিল রাশিয়া। এরই মধ্যে দিনের আলোতেই এসবিইউ ভবনে আঘাত হানল ড্রোনটি। সাড়ে চার বছরের যুদ্ধে এ ভবন আগে কখনো এমন সরাসরি নিশানায় পরিণত হয়নি।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলায় ১২ জন আহত হয়েছেন। জরুরি সেবাদানকারী কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ করছেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ওই ভবনে থাকা এসবিইউপ্রধান ওলেকসান্দ্র পোকলাদের কার্যালয় লক্ষ্য করেই সরাসরি ড্রোনটি ছোড়া হয়েছিল।

তবে এসবিইউ পরে জানিয়েছে, পোকলাদ নিরাপদে আছেন এবং হামলায় তিনি আহত হননি।

জেলেনস্কি বলেন, ‘সবকিছু প্রস্তুত হওয়ার পর আমি পোকলাদকে নির্দেশ দিয়েছি রুশদের এর একটি উপযুক্ত ও মোক্ষম জবাব দিতে। সম্ভব হলে ঠিক এভাবেই পাল্টা হামলা চালাতে বলেছি। আমাদের সেনাবাহিনী এই কাজে তাঁকে সহায়তা করবে।’

কিয়েভ শহরে টানা আট দিন ধরে হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। শহরের কেন্দ্রস্থলের একাধিক ভবনের পাশাপাশি শহরতলির গুদাম ও কারখানাগুলোতেও হামলা হয়েছে। এর মধ্যে শহরে উপকণ্ঠে কোকা–কোলা তৈরির একটি কারখানাও রয়েছে।

গত মাসে শুরু হওয়া প্রায় বিরতিহীন এসব হামলায় কিয়েভ শহর ও এর আশপাশের অঞ্চলে কমপক্ষে ৫৩ জন নিহত ও ১৩৪ জন আহত হয়েছেন।

তবে এসবিইউর ওপর হামলাটি এই সংঘাতের একটি বড় ঘটনা। এটি প্রমাণ করে, কিয়েভ রাশিয়ার হামলা থেকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলো রক্ষা করতে ক্রমে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ, তাদের কাছে হামলা ঠেকানোর ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের (ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র) চরম সংকট রয়েছে।

গত কয়েক দিনের বেশির ভাগ হামলাই চালানো হয়েছে জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন দিয়ে। এই খুনে যন্ত্রগুলো ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটার বেগে পর্যন্ত ছুটতে পারে।

এই ড্রোনগুলোর গতি এতই বেশি যে কিয়েভের ভ্রাম্যমাণ ড্রোনবিধ্বংসী ব্যবস্থা দিয়েও এগুলোকে নিশানা করা কঠিন। তাই এগুলোকে ভূপাতিত করার একমাত্র উপায় হলো ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র অথবা যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা। আর ইউক্রেনে এই দুটি জিনিসেরই চরম সংকট রয়েছে।

অতীতে রাশিয়া গুটি কয় সরকারি ভবনে আঘাত হানতে পারলেও দিনের বেলায় এত গুরুত্বপূর্ণ কোনো লক্ষ্যবস্তুতে এর আগে কখনো হামলা চালাতে পারেনি। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, এই হামলার ‘কঠিন জবাব দেওয়া প্রয়োজন’।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মস্কো ও কিয়েভ সফরের পরিকল্পনা করছেন। সেদিকে ইঙ্গিত করে সিবিহা বলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন উদ্যোগের মধ্যেই মস্কো এই হামলা চালিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করল যে তারা আসলে কূটনীতি চায় না।’

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউর সদর দপ্তরে রুশ ড্রোন আঘাত হানার পর আগুন নেভাতে কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী। ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউর সদর দপ্তরে রুশ ড্রোন আঘাত হানার পর আগুন নেভাতে কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী। ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

তিন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে যেভাবে শেষ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত

বিবিসিঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত অবসানে দ্রুত কোনো চুক্তির সম্ভাবনা আবারও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। বিবদমান দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে এবং কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলছে না।

কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের নতুন ধাপে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর আওতায় তারা ইরান এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। এই ঘোষণার পরপরই নতুন করে হামলা শুরু হলো।

ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধ করাও ছিল উদ্দেশ্য।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই সংঘাত শুরু করে। এর পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক নৌপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।

গত জুনে দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও চুক্তিতে পৌঁছানো। তবে সেই সময়সীমা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

সংঘাতটি এখন সপ্তম মাসে গড়িয়েছে। এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তা নিয়ে বিবিসি তিনজন বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়েছে।

ইরানকে দুর্বল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

জেসন ক্যাম্পবেল, সিনিয়র ফেলো, মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট, ওয়াশিংটন ডিসি

আসল সমস্যা হলো ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য ঠিক কী, তা আমরা এখনো স্পষ্টভাবে জানি না। রাজনৈতিক দিক থেকে কতটুকু ছাড় দেওয়া সম্ভব, হোয়াইট হাউস তা বারবার পর্যালোচনা করছে। শুরুতে ভাবা হয়েছিল, সামরিক শক্তি দিয়েই দ্রুত জয় পাওয়া যাবে; কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশিত ফল আসেনি।

এখন আমরা যা দেখছি, ওয়াশিংটন সামরিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন প্রভাব কাজে লাগিয়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।

এই মুহূর্তে মার্কিন প্রশাসন পরিস্থিতি একরকম স্থবির রাখতেই আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তারা অর্থনৈতিক অবরোধ বহাল রাখছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টির মতো ইরানি সক্ষমতাগুলোতে মাঝেমধ্যে আক্রমণ চালিয়েই সন্তুষ্ট থাকছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের আশা, নতুন এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে নতি স্বীকার করে তারা দুর্বল অবস্থানে থেকে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। উদ্দেশ্য, বিশ্ববাজারে তেলের দামে যাতে বড় ধাক্কা না লাগে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো। তবে যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল এটুকুই ছিল না।

আমার ধারণা, সংকট সমাধানের বিনিময়ে ইরান বড় ধরনের সুবিধা দাবি করবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে সেই দাবি মেনে নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের অপেক্ষায় থাকবে ইরান

আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি, অ্যাসোসিয়েট ফেলো, চ্যাথাম হাউস, লন্ডন

সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার ফলে যুদ্ধের ব্যাপারে ইরানের মূল কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি না। তেহরান তাদের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি গত কয়েক মাসের মতো বিচ্ছিন্ন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতিও তাদের আছে। বড় ধরনের যুদ্ধ এড়াতে প্রতিটি হামলার আনুপাতিক জবাব দেওয়াটা হবে তাদের কৌশল।

অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, এসব নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টত দেশটির অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যুদ্ধের কারণে তাদের অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত। এ ছাড়া দেশটিতে কাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে, যা আমরা গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির বিক্ষোভের সময়ে দেখেছি।

অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ইরান শিগগিরই তাদের অবস্থান বদলাবে কিংবা আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত আমি ইরানের দিক থেকে দেখছি না।

এর অর্থ এই নয় যে ইরান সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে না। আমার মতে, আমরা যেটা দেখছি, ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র আগের সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) ফিরে যাক অথবা কোনো ধরনের ছাড় দিক। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। নতুন নিষেধাজ্ঞা বা আরও বেশি হামলার মুখেও তারা নিজেদের নীতি বদলাবে না।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ফিরতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

নিকোলাস হপটন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ইরানে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত

সাম্প্রতিক ইরানে হামলা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এভাবে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। এটি আসলে চলমান সংকটের আরেকটি নতুন অধ্যায়মাত্র। অর্থনৈতিক চাপ কাজ করবে বলে মনে হয় না। কারণ, চীন, রাশিয়াসহ যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করবে না।

ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা অব্যাহত রাখতে পারে। কারণ, তারা বিশ্ব অর্থনীতির মূল নাড়ি চেপে ধরে বসে আছে।

এই সংঘাত থেকে বের হতে হোয়াইট হাউসের কৌশল কী হতে পারে?

আসলে যুক্তরাষ্ট্র পথটি ইতিমধ্যে খুঁজে পেয়েছে। ট্রাম্প যদি গত জুনের সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে আলোচনার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিতেন, তবে সেটাই হতো সংঘাত থেকে বের হওয়ার মোক্ষম উপায়।

এই চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্রের একরকম বিজয় অর্জিত হতো। একই সঙ্গে ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থীরা দুর্বল হতো। পাশাপাশি ইরান যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না, সেই নিশ্চয়তাও মিলত।

ওই সমঝোতা স্মারকে একটি বড় ধরনের জাদুকরি সমাধান ছিল। সেটি হলো ইরানের ওপর থেকে সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।

নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ধীরে ধীরে ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ক্ষমতা কমে যেত। বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়লে দেশটিতে ধীরে ধীরে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আসত। ফলে ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলেও তার চরিত্র হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ইরানের অর্থনীতিতে আইআরজিসির আধিপত্য অনেক বেশি। তাই বিষয়টি সহজে অর্জন করা যেত না। তবে পর্যাপ্ত সময় দিলে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কৌশলগত ধৈর্য দেখালে এই কৌশল কাজ করত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই মুহূর্তে সেই ধৈর্যের বড়ই অভাব।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, আমরা একটি বিশৃঙ্খল ও অমীমাংসিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই চলব। আর এই পরিস্থিতি সবার জন্যই ক্ষতিকর।

একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের কাছে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। কুহেস্তাক, সিরিক, ইরান। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের কাছে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। কুহেস্তাক, সিরিক, ইরান। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে শিগগির হামলার হুমকি দিলেন ট্রাম্প

আনাদুলো, ইস্তাম্বুলঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে খুব শিগগির হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিরতি দিয়ে দিয়ে ইরানে হামলা চালাচ্ছে।

এই সংঘাতকে যুদ্ধ বলা যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি একে ‘সামরিক সংঘাত’ বলতে পছন্দ করেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘অনেকেই এটিকে যুদ্ধ বলেন না। আমিও এটিকে সামরিক সংঘাত বলি। কারণ এটি আমাদের জন্য ছোটখাটো বিষয়। এটি বড় কোনো ব্যাপার নয়।’

মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ‘বিরতি দিয়ে দিয়ে হামলা’ চালাচ্ছে। তাঁর দাবি, সম্প্রতি ইরানের রাডারব্যবস্থায় হামলার আগে কয়েক দিন সেখানে সক্রিয় কোনো লড়াই হয়নি।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখন লড়াই করছি না। কোনো লড়াই হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর হামলা চালাচ্ছে।

ট্রাম্পের দাবি, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের সুরক্ষায় থাকা ইরানের রাডার, উড়োজাহাজ ও অন্যান্য ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া মাইন অপসারণকারী জাহাজ দিয়ে হরমুজ প্রণালির মাইনও সরানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রেখেছে। তাঁর ভাষ্যমতে, এতে ইসরায়েল ও পুরো মধ্যপ্রাচ্য সুরক্ষিত হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। আমরা সেটিই করেছি। ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। কারণ, তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে আপনারা হয়তো আর এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না।’

ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খুব শিগগির পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, পিকঅ্যাক্সসহ ইরানের বিভিন্ন জায়গায় কারা চলাফেরা করছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্য রয়েছে।

আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পিকঅ্যাক্স পর্বত ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা। পাহাড়ের শত শত মিটার পুরু গ্রানাইটের নিচে এখানে দুটি টানেল কমপ্লেক্স রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের ধারণা, সেখানে গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা থাকতে পারে। তবে ইরানের দাবি, এটি উন্নত সেন্ট্রিফিউজ তৈরি ও সংযোজনের জন্য ব্যবহৃত হয়। গভীর ভূগর্ভে থাকায় স্থাপনাটি ধ্বংস করা কঠিন। এ কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

চলমান সংঘাত কবে শেষ হবে, তা জানতে চাইলে ট্রাম্প কোনো সময়সীমা বলেননি। তবে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের প্রধান লক্ষ্য অর্জন করেছে।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা ইতিমধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয়টি অর্জন করেছি—ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরান থেকে সরে গেলেও দেশটির অবকাঠামো ও সক্ষমতা পুনর্গঠনে তেহরানের ২৫ বছর সময় লাগবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন। ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন। ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে। ছবি: এএফপি

অনলাইনে জেন্ডার সহিংসতার সংস্কৃতি, প্রতিকার ছাড়া পথ নেই by সানজীদা আখতার

দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে নিত্যনতুন মাত্রায়। এসব সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘ডিজিটাল ভায়োলেন্স’। ‘ডিজিটাল ভায়োলেন্স’ হলো তুলনামূলক নতুন শব্দ। এটি অনলাইন সহিংসতা, প্রযুক্তির সাহায্যে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বা সাইবার সহিংসতা ইত্যাদি বলেও পরিচিত। বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যার দেশ, এখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য—উভয়ই বেশি। তাই এখানে ঝুঁকিও বেশি।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নানা কায়দায় অপরাধীরা ডিজিটাল সহিংসতা ঘটিয়ে থাকে। অনলাইনে সহিংসতার মাত্রা ও ব্যাপ্তি অনেক হলেও আন্তর্জাতিকভাবে এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা যায়নি। ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বলছে, কোনো কোনো দেশে জেন্ডারভিত্তিক ডিজিটাল ভায়োলেন্সের পরিমাণ ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত।

বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রকাশিত ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন জরিপ থেকে জানা যায়, ৮ দশমিক ২ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময় এবং ৫ শতাংশ নারী গত এক বছরে ডিজিটাল ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছেন। বয়সভেদে এই হারে বেশ পার্থক্যও আছে। দেশে ডিজিটাল সহিংসতার বেশি শিকার হচ্ছেন ২০-২৪ এবং ১৫-১৯ বছর বয়সী নারীরা। সামাজিক ও বৈবাহিক অবস্থানভেদেও এ সহিংসতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। বিত্তশালী নারীরা অনলাইন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। এদিকে যাঁদের স্বামী দূরে অবস্থান করেন, এমন স্ত্রীদের প্রতি সহিংসতার হারও বেশি। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারীরাও তুলনামূলক বেশি মাত্রায় অনলাইন সহিংসতার শিকার হন।

যে কারণগুলোর জন্য নারীর প্রতি ডিজিটাল সহিংসতা হয়, সেগুলো অফলাইনে সংঘটিত সহিংসতার কারণের চেয়ে তেমন আলাদা কিছু নয়। অফলাইনের মতোই সমাজে বিরাজমান অমর্যাদাকর দৃষ্টিভঙ্গি, সাংস্কৃতিক সীমা ও নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ।

তথাকথিত ‘পছন্দনীয়’ কায়দায় কোনো নারীর অনলাইন উপস্থাপন বা কাজকর্ম না হলে, তার ওপর নেমে আসে নানা রকম হয়রানি ও সহিংসতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো হয়রানিমূলক পোস্টের বিপরীতে মানুষের প্রতিক্রিয়া, মন্তব্যই আমাদের বলে দেয়, কারও প্রতি সহিংসতামূলক আচরণকে তারা কীভাবে স্বাভাবিকীকরণ করে। ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, উঠতি বয়সীরা এই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার কারণে একসময় সহিংসতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন।

কানাডীয়-আমেরিকান মনোবিদ আলবার্ট বান্দুরা তাঁর সামাজিক শিক্ষা তত্ত্বে (১৯৭৭) বলেছিলেন, শিশুরা অন্যকে দেখে সামাজিক আচরণ শেখে। যখন সে সহিংসতা দেখে, নারীকে ভুক্তভোগী হতে দেখে এবং যথাযথ প্রতিকার বা প্রতিরোধে দেখে না, তখন তারা সহিংসতাকে স্বাভাবিক ঘটনা অথবা একটি সামাজিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করে ফেলতে পারে।

অনলাইন সহিংসতার ব্যাপ্তির তুলনায় বিষয়টি পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অবশ্য ইতিমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জরিপ চালিয়েছে এর মাত্রা ও হার নিয়ে। ওই সব জরিপের ওপর ভিত্তি করে ডিজিটাল সহিংসতার কারণ, গভীরতা, নিকট ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল, পটভূমি অনুযায়ী সমাধানের উপায়, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সঠিক সংজ্ঞায়নের বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতাবিষয়ক আলোচনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শহর ও নির্দিষ্ট শ্রেণিকেন্দ্রিক। এসব আলোচনা ও সচেতনতার পরিধি যেমন বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।

বাংলাদেশে নারীরা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা রকম বৈষম্য ও অসমতার শিকার হন। এ দেশে আইন, অর্থনীতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, জনপরিসর ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী যে বৈষম্যের শিকার, তা আদতে নারীর প্রতি সহিংসতাকে একটা ব্যবস্থার অংশ বানিয়ে ফেলে, যা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সহিংসতার সংস্কৃতির ব্যাপ্তি ঘরে, বাইরে, অফলাইনে বা অনলাইনে—সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে।

অনলাইনে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা। ২০২৪ সালের সাইবার সুরক্ষা আইনের ডিজিটাল জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা করার সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। বাংলাদেশ সহিংসতা রিপোর্টিংয়ের হার খুব কম।

ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে নিবিড় সঙ্গী দ্বারা সহিংসতার ঘটনায় মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী কাউকে ঘটনা সম্পর্কে জানান এবং মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করেন। সঙ্গী ছাড়া অন্য কারও দ্বারা ঘটিত সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের হার ১৩ দশমিক ২। এই হার বিবেচনায় বোঝা যায়, শুধু শুধু আইনি নীতিমালা থাকা যথেষ্ট নয়। সহিংসতা রিপোর্ট করার প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করতে হবে। আর ভয়ভীতি কমানোর জন্য সহায়তা প্রদান ব্যবস্থা ও সুরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সব স্তরের মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রান্তিক, উঠতি বয়সী, একা থাকা ও অনলাইনভিত্তিক কাজ বা ব্যবসা করা নারীরা অনলাইন সহিংসতার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব অবস্থান ও অবস্থা বিবেচনা করে সচেতনতা, সহিংসতার ক্ষেত্রে করণীয় ও অন্যান্য সহায়তাব্যবস্থা সম্পর্কে নারীদের সচেতন করতে হবে। যারা অনলাইন সহিংসতা করে, তাদের চিহ্নিত করে প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে নিবৃতকরণ ও সচেতন করা প্রয়োজন। অনলাইনে যেসব প্ল্যাটফর্মে নারী হয়রানির এর শিকার হচ্ছেন, সেই প্ল্যাটফর্মেই অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সার্বিকভাবে নারীকে হেয় বা হয়রানি করার এবং সহিংসতাকে স্বভাবিকীকরণের যে বিরাজমান মানসিকতা রয়েছে, তা ভেঙে ফেলার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।

• সানজীদা আখতার
- অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- মতামত লেখকের নিজস্ব

নারী ও শিশু নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ
নারী ও শিশু নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ। ফাইল: প্রথম আলো