Showing posts with label কাদের সিদ্দিকী. Show all posts
Showing posts with label কাদের সিদ্দিকী. Show all posts

Wednesday, December 11, 2024

স্বাধীনতা কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয় by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

কখনো খুব একটা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছিল না। মুসলমানের ছেলের হিন্দু মাস্টার, কতো বড় বড় মুসলমানের কায়কারবারে হিন্দু প্রধান। জন্ম আমার মুসলিম পরিবারে। কিন্তু গুরু আমার নিম্ন বর্ণের হিন্দু দুঃখীরাম রাজবংশী। তাই এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চাইতে বৃহৎ দেশ হিসেবে ভারতকেই ভাবতে হবে, বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। যদিও এখনকার অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেই ভালো করে চিনি না, জানি না। আমাদের সময়ের অনেকেই চলে গেছেন, অবসরে গেছেন। তবু দীর্ঘ সময় ভারতে থেকে ভারতের যে প্রাণ খুঁজে পেয়েছি তাতে এক সময় সত্যিকার অর্থেই দু’দেশের সম্পর্ক হবে দেশের জনগণের উপর ভিত্তি করে, কোনো ব্যক্তি বা দলের উপর নয়।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের আরাধ্য স্বাধীনতার মাস ডিসেম্বর। প্রবল পরাক্রমশালী পৃথিবীর এক দারুণ শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করে আমরা স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছিলাম। ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তান হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়লে আমরা যেমন দিশাহারা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম, ’৭১- এর ডিসেম্বরের দিকে পাকিস্তানি হানাদাররা তেমন দিশাহারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। ৬ই ডিসেম্বর ভুটান এবং ভারত আমাদের স্বীকৃতি দেয়। মহান ভারত বিরাট দেশ। তাদের স্বীকৃতি নিয়েই আলোচনা হয় বেশি। কিন্তু সবার আগে ভুটান স্বীকৃতি দিয়েছিল। যদিও সেই ভারত নিয়ে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নিয়ে ইদানীং বড় টানাটানি। কোনোক্রমেই এমনটা হওয়া উচিত ছিল না। রাজনৈতিক সখ্যতা বা দূরত্ব অনেক কিছুই থাকবে। কিন্তু তাই বলে এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে চরম শত্রুতা করবো, মর্যাদাহানি করবো- এটা হতে পারে না। কিন্তু আদতে তাই হচ্ছে। সুপরিকল্পিতভাবে অনেক জায়গায় স্কুল- কলেজের সামনে ভারতীয় পতাকার অবমাননা করা হচ্ছে। আবার এদিক থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধুয়ো তুলে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই আমরা হাজার বছর একসঙ্গে বাস করছি- কখনো খুব একটা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছিল না। মুসলমানের ছেলের হিন্দু মাস্টার, কতো বড় বড় মুসলমানের কায়কারবারে হিন্দু প্রধান। জন্ম আমার মুসলিম পরিবারে। কিন্তু গুরু আমার নিম্ন বর্ণের হিন্দু দুঃখীরাম রাজবংশী। তাই এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চাইতে বৃহৎ দেশ হিসেবে ভারতকেই ভাবতে হবে, বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। যদিও এখনকার অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেই ভালো করে চিনি না, জানি না। আমাদের সময়ের অনেকেই চলে গেছেন, অবসরে গেছেন। তবু দীর্ঘ সময় ভারতে থেকে ভারতের যে প্রাণ খুঁজে পেয়েছি তাতে এক সময় সত্যিকার অর্থেই দু’দেশের সম্পর্ক হবে দেশের জনগণের উপর ভিত্তি করে, কোনো ব্যক্তি বা দলের উপর নয়।

মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছিলাম। ৬ই ডিসেম্বর নিকরাইলে কাদেরিয়া বাহিনীর উদ্যোগে এক বিশাল সভা হয়েছিল। যুদ্ধের মধ্যে ওরকম বিশাল ‘সভা’ একমাত্র সখিপুরের কচুয়ায় ৫ই আগস্ট হয়েছিল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকায় এমনিই টেকা যায় না, তার উপর সমাবেশ করা সাংঘাতিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। যেকোনো মুহূর্তে বিমান বাহিনী বোমা ফেলে তছনছ করে দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ৫ই আগস্ট সখিপুরের কচুয়ায় এবং ৬ই ডিসেম্বর কালিহাতীর নিকরাইলে কোনো আক্রমণ হয়নি। আকাশ পথে আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও জমিনে কিছুই করার সম্ভাবনা ছিল না। ডিসেম্বরের ১-২ তারিখ ভারত থেকে ক্যাপ্টেন পিটার নামে একজন ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তা এসেছিলেন। আমার এখনো মনে হয় তার নাম পিটার নয়, সেটা ছিল ছদ্মনাম। আর তিনি ক্যাপ্টেনও ছিলেন না, তিনি ছিলেন মেজর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের অত গভীরে আর কোনো ভারতীয় কর্মকর্তা আসেনি। তিনি দু’টি মহান দায়িত্ব নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন। তার একটি কাদেরিয়া বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন কোথাও নিরাপদে ছত্রীসেনা নামানো, অন্যটি যখন যেখানে প্রয়োজন সেখানে এয়ার সাপোর্ট দেয়া। ক্যাপ্টেন পিটার অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাংলাদেশের একমাত্র টাঙ্গাইলের পুংলী, চিনামুড়া, চমুড়া, সহদেবপুর, বানিরায় সফলভাবে ছত্রীসেনা নামানো হয়েছিল। মনে হয় পৃথিবীর ইতিহাসে অত নিরাপদে আর কোথাও ছত্রীসেনা অবতরণ করেনি। ১০ই ডিসেম্বর আমরা কালিদাসপাড়া সেতু দখল করে বানিয়াপাড়া সেতুতে আক্রমণ করেছিলাম এবং দুটো সেতুই ভেঙে দিয়েছিলাম। ঘাটাইল থানা আক্রমণ করা হয়েছিল ভোর ৪টার দিকে। ৬-৭টার মধ্যেই থানা মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। থানার মূল টিনের ঘর কমান্ডার আব্দুল হাকিম, বীরপ্রতিকের  ছোড়া থ্রি ইঞ্চ মর্টারের গোলায় তছনছ হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে হানাদাররা থানা ছেড়ে পালিয়ে ছিল। অন্যদিকে থানা দখল করে মেজর হাবিব, বীরবিক্রম তার কোম্পানি নিয়ে মধুপুরের দিকে এগিয়ে বানিয়াপাড়া সেতুর উত্তর অংশ ভেঙে দিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। ঘাটাইল থানা মুক্ত হওয়ার পর গোপালপুরের উপর আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু গোপালপুর থানা দখল করা যাচ্ছিল না। তাই আমরা এয়ার সাপোর্ট চেয়েছিলাম। সেই প্রথম মিত্র বাহিনীর কাদেরিয়া বাহিনীকে এয়ার সাপোর্ট দেয়া। বেলা দুই-আড়াইটার দিকে এমন নিখুঁত নিশানায় গোপালপুরে মিত্রবাহিনী বিমান হামলা করে যেটা অতুলনীয়। অন্যদিকে ময়মনসিংহ এবং জামালপুর থেকে পালিয়ে আসা হানাদাররা বানিয়াপাড়া সেতুতে বাধা পায়। পাকিস্তান হানাদাররা পাগলপারা হয়ে তাদের সর্বশক্তি নিয়ে রাস্তা মুক্ত করার জন্য আঘাত হানে। ময়মনসিংহ এবং জামালপুর থেকে প্রায় দুই ব্রিগেড মনোবলহারা সৈন্য ঢাকার দিকে পিছিয়ে যাচ্ছিল। অত বড় একটা বাহিনীকে খুব ভালো প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি না করলে বা না করতে পারলে থামিয়ে রাখা যায় না। আমাদের উদ্দেশ্য অত বড় বাহিনীকে আটকে দেয়া ছিল না, আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শত্রুকে পদে পদে বাধা দেয়া। মেজর হাবিব, বীরবিক্রম তার প্রতিরক্ষা তুলে নিলে পাকিস্তান হানাদাররা ভাঙা বানিয়াপাড়া সেতুতে কিছুটা মাটি ফেলে ঠিকঠাক করে পালিয়ে যাবার রাস্তা প্রশস্ত করে। এক্ষেত্রে আমাদের ছোট্ট একটা ভুল হানাদারদের কিছুটা সাহায্য করেছিল। আমাদের ভুলটা ছিল বানিয়াপাড়া সেতুর পাশে হাজার-বারো’শ মণ পাট ছিল। আমরা জ্বালিয়ে দিলে অথবা সরিয়ে ফেললে হানাদারদের পিছিয়ে যেতে আরও অনেক সময় লাগতো। সেতুর পাশে অত বিপুল পরিমাণ পাট থাকায় সেগুলো নিচে ফেলে তার উপর মাটি দিয়ে হানাদাররা সেদিন পিছিয়ে গিয়েছিল।

৩রা এপ্রিল ’৭১ সন্ধ্যার দিকে টাঙ্গাইলে হানাদার বাহিনী ঢুকেছিল। ২০শে এপ্রিলের পর তারা দারুণ প্রতাপে রাস্তার দুইপাশে কামান-বন্দুক চালিয়ে ঘর-দুয়ার জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মধুপুর হয়ে ময়মনসিংহ, মধুপুর হয়ে জামালপুর। সেখান থেকে সীমান্তে গিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদারদের জন্য ডিসেম্বরে ঢাকা ফেরা ছিল দারুণ বিপদের। অসহায় বাঙালি রিফিউজিরা যতটা কষ্ট করে সীমান্তে গিয়েছিল, তার চাইতে অনেক বেশি অসহায়ের মতো পাকিস্তান হানাদাররা লেজ গুটিয়ে ঢাকার পথে ফিরছিল। এতকিছুর পরও তাদের অনেকেরই সেদিন প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেনি। তারা কেউ কেউ ধরা পড়েছে, কেউ কেউ রাস্তায় রাস্তায় জীবন দিয়েছে। ১০ই ডিসেম্বর সকাল থেকেই যুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল আমাদের অনুকূলে। সকালে আমরা ঘাটাইল থানা দখল করে নিলেও দুপুরে ময়মনসিংহ-জামালপুর থেকে পিছিয়ে আসা হানাদার বাহিনীর হাতে চলে গিয়েছিল। কারণ ঘাটাইল থানা একেবারে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রাস্তার গা-ঘেঁষে। তাই তখন আর আমাদের থানা দখল রাখা সম্ভব ছিল না। থানা থেকে সরে এসে মিত্র বাহিনীর কাছে বিমান সহায়তা চাইলে তখন তারা নিখুঁত নিশানায় বিমান সহায়তা করলে বিকাল ৫টার দিকে ঘাটাইল- গোপালপুর-মধুপুর-ধনবাড়ি মুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে ১০ তারিখ ৪টার পর প্রায় ঘণ্টা জুড়ে ছত্রীসেনা অবতরণ করে। ১০ তারিখ রাতের মধ্যেই প্রায় এক হাজার হানাদার কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। অন্যদিকে অবতরণ করা ছত্রীসেনা প্রবল বাতাসের কারণে কেউ কেউ মূল দল থেকে অনেকটা এদিক ওদিক ছিটকে পড়েছিল। ১০ তারিখ সারা রাত চলে তাদের একত্র করার কাজ। ৮০০ ছত্রীসেনার মধ্যে একটি গাড়ি এবং দুইজন সেনা গাছের ডালে লেগে মাটিতে পড়ায় আহত ও নিহত হয়। এরকম সামান্য ক্ষতি কোনো ছত্রীসেনা অবতরণে হয় না। এর চাইতে অনেক বেশি ক্ষতি হয়। ১০ই ডিসেম্বরের মধ্যে টাঙ্গাইল এলাকার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণই কাদেরিয়া বাহিনীর অনুকূলে। ঢাকা-টাঙ্গাইল, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ এই একটি মহাসড়ক ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানির দখল ছিল না। টাঙ্গাইলের উত্তরে ময়মনসিংহ-জামালপুর তখন মিত্র বাহিনীর দখলে। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা মহাসড়ক পাকিস্তানি হানাদারদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ১১ই ডিসেম্বর দুপুরের পর টাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত হলে আর ঢাকার দিকে কালিয়াকৈরের উত্তরে কোনো জায়গাতেই পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সম্পূর্ণ টাঙ্গাইল মুক্ত হয় ১১ই ডিসেম্বর। ১১ই ডিসেম্বর টাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত করতে ছোটখাটো যুদ্ধ হয় মাত্র দু’টি। একটি ইছাপুরে, আরেকটি টাঙ্গাইল জেলা সদরের পানির ট্যাংকের উপরে মেশিনগান নিয়ে বসে থাকা হানাদারদের বিরুদ্ধে। আমরা যারা উত্তর দিক থেকে টাঙ্গাইলের দিকে এগিয়ে ছিলাম তখন পুংলী ব্রিজের নিচে ছত্রীবাহিনীর অনেক সৈন্য অবস্থান নিয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার ক্লেরের পুরো ব্রিগেড এবং এক ব্যাটালিয়ান ছত্রীবাহিনী তারা যখন একে একে মহাসড়কে অবস্থান নিচ্ছিল সে এক দেখবার মতো দৃশ্য। এতদিন মানুষ পাকিস্তান হানাদারদের যুদ্ধযান দেখেছে, সাঁজোয়া বহর দেখেছে, এখন দেখছে মিত্র বাহিনীর সাঁজোয়া বহর। এ ব্যাপারে সব থেকে মজার হলো, ১০ তারিখ যখন ঝাঁকে ঝাঁকে ছত্রীসেনা নামছিল তখন টাঙ্গাইল শহরে অনেক দালালেরা তাদের সমর্থকদের সাহস দিতে বলে বেড়াচ্ছিল এই তো চীন সৈন্য পাঠিয়েছে। তারা নামছে আর ভয় নেই। এমনকি টাঙ্গাইল জামে মসজিদ থেকে মাইকে প্রচার করা হয়েছিল পাকিস্তানের আর কোনো ভয় নেই, চীনের সৈন্য এসে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা চীনের ছিল না, সেটা ছিল মিত্র বাহিনীর।

Sunday, December 8, 2024

যারা ভাবেন বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলবেন, তারা আহাম্মকের স্বর্গে : কাদের সিদ্দিকী

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, যারা ভাবেন বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলবেন, কাদের সিদ্দিকীকে মুছে ফেলবেন তারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করেন। স্বাধীনতা থাকলে, আমরা থাকবো।

শনিবার (৭ ডিসেম্বর) বিকেলে টাঙ্গাইলের সখীপুরে নিজ বাসভবনের সামনে কৃষক শ্রমিক জনতালীগ উপজেলা শাখার বর্ধিত সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

এসময় কাদের সিদ্দিকী বলেন, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ হলে চলবে না, আওয়ামী লীগ হতে হবে মাওলানা ভাসানীর। আওয়ামী লীগ হতে হবে বঙ্গবন্ধুর, শেখ হাসিনার না। এত অত্যাচার করলে, মানুষকে এত অবহেলা করলে আল্লাহর তরফ থেকে গজব পড়ে। সেটাই হাসিনার ওপরে হয়েছে। কিন্তু হাসিনার জন্য অন্য মানুষ যে কষ্ট করছে, সেটাও আল্লাহকে দেখতে হবে। আমি নিশ্চিত আল্লাহ সেটাও দেখবেন। তিনি আরও বলেন, যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এটাও ভালো না। ভারত যেটা করছে আমাদের ওপরে, সেটাও ভালো না। আমরা আমেরিকা না, বাংলাদেশ। আমরা বিজয় অর্জন করেছি।

এছাড়া কাদের সিদ্দিকী আরও বলেন, আওয়ামী লীগ যে দোষে সর্বহারা হয়েছে, সরকার পতনের পর বিএনপি কিন্তু ওই দোষই করছে। জামায়াত বেবি-টেম্পু স্ট্যান্ড, বাজার দখল করে চাঁদা উঠায় নাই। এটা কিন্তু বিএনপি করছে।

তিনি বলেন, আগে আওয়ামী লীগ যেখান থেকে চাঁদা নিত, এখন বিএনপি সেখান থেকে চাঁদা নেয়। বন থেকে যেটুকু নেওয়ার নেয়, থানা থেকে যে ভাগ নেওয়ার নেয়। যেখানে যে ভাগ পাওয়া যায় সব নেয়। কিন্তু জামায়াত নেয়নি।

সখীপুর উপজেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আব্দুস ছবুর খানের সভাপতিত্বে এ সভায় উপস্থিত ছিলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ বীর প্রতীক, টাঙ্গাইল জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ হিটলু, সখীপুর উপজেলা কৃষক শ্রমিক জনতালীগের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন সজীব প্রমুখ।
টাঙ্গাইলের সখীপুরে কৃষক শ্রমিক জনতালীগের বর্ধিত সভায় বক্তব্য দেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। ছবি : কালবেলা
টাঙ্গাইলের সখীপুরে কৃষক শ্রমিক জনতালীগের বর্ধিত সভায় বক্তব্য দেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। ছবি : কালবেলা

Tuesday, December 3, 2024

দেশবাসী ড. ইউনূসকে আরও সক্রিয় দেখতে চায় by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

শেখ হাসিনাকে ফেলে দেয়ার জন্য জো বাইডেন নানা রকম নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছিলেন। এখন শুনছি নবনির্বাচিত ট্রাম্প শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাবেন। সেখানে ভারত সরকারেরও সহযোগিতা থাকবে। এসবের কোনো কিছুই ভালো না। আমাদের দেশ, আমাদের জনগণ কাকে ক্ষমতায় বসাবে আর কাকে বসাবে না সেটা ঠিক করবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি নয়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নয়। এসব খুবই বাজে কথা। পরাজিতরা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে- এটাই শাশ্বত সত্য। চাল ডাল লবণ তেল প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া...

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। মাসটি মুক্তিযুদ্ধের বড় বেশি স্মরণীয় মাস। ৩০শে নভেম্বর ’৭১ নাগরপুর থানা আক্রমণ করেছিলাম। সারা মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনী কখনো কোথাও অত শক্তি প্রয়োগ করেনি। প্রায় পাঁচ হাজার যোদ্ধার ১৫টা কোম্পানি নিয়ে নাগরপুর থানা আক্রমণ করা হয়েছিল। আমি ছিলাম পূর্বদিকে, উত্তরে ছিল হুমায়ুন বাঙ্গাল, আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি, রবিউল আলম গেরিলা, মোস্তফা, সবুর খান, মকবুল হোসেন খোকা, সাইদুর, ফজলু শামসুল হক দক্ষিণেও চেপে ধরেছিল। শুধু খোলা ছিল পশ্চিম দিক। নাগরপুর থানা মাটির নিচ দিয়ে সব জায়গায় সীমানা বাঙ্কার করা হয়েছিল। তাই আমাদের প্রথম আক্রমণে পাকিস্তান হানাদাররা থানা ছেড়ে সামান্য একটু পেছনে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হয়েছিল হনুমান কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুনকে নিয়ে। সে তার প্রায় ৪০০ যোদ্ধা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা কোনো দিশা না পেয়ে আবার এসে থানার বাঙ্কারে লুকায়। সারাদিন যুদ্ধ চলে। কমান্ডার আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি, বীরপ্রতীক, হনুমান কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বাঙ্গাল এবং একেবারে আমার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে চর পাকুল্লার শামসুল হক সারাদিন পড়ে থাকে। এ ছাড়া আরও ৬-৭ জন আহত হয়। সেই সময় কেবলই ভারত থেকে ফিরে আসা কাদেরিয়া বাহিনীর স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. শাহজাদা চৌধুরী কেদারপুরে অবস্থান করছিল। যার কারণে নাগরপুর যুদ্ধে আহত কেউ মারা যায়নি, শহীদ হয়নি। এপ্রিল থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা দখল পর্যন্ত একত্র কোথাও কাদেরিয়া বাহিনী অত শক্তি প্রয়োগ করেনি। অত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেও নাগরপুর থানার পতন ঘটানো যায়নি। নাগরপুরের যুদ্ধে আমি নিজেও সামান্য আহত হয়েছিলাম। গুলি লেগেছিল আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ আর পহেলা ডিসেম্বর ’৭১ নাগরপুর থানা দখলে। এইটটি থ্রি ব্লান্ডার সাইটের গোলা ছুড়তে গিয়ে সামান্য আঘাত লেগেছিল। সে যুদ্ধ ছিল এক মারাত্মক কঠিন ব্যাপার। সারাদিনে হানাদার ঘাঁটির পতন ঘটাতে না পেরে আমরা সবাই এক কিলোমিটারের মতো যার যার দিকে থানা থেকে সরে গিয়ে রাত কাটিয়ে ছিলাম। পরদিন বেলা ওঠার আগে থেকেই আবার যতদূর এগুনো যায়, যতদূর কেন আমরা থানা বাউন্ডারির কোন জায়গায় ১০০, কোন জায়গায় ৭০-৮০ গজের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের প্রচণ্ড গোলাগুলিতেও হানাদারদের ঘাঁটির পতন ঘটানো যায়নি। থানার একেবারে কাছে পৌঁছে যাওয়ায় থ্রি ইঞ্চ মর্টার ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। কারণ নিজেদের গোলা নিজেদের উপর পড়তে পারে। ৭২ আর আর ছিল, ৪-৫টা রকেট লাঞ্চার, ব্যালেন্ডার সাইট মিলে প্রায় ১৫টা, হেভি মেশিনগান ৫টা, মিডিয়াম মেশিনগান ৬টা, লাইট মেশিনগান মানে খগএ প্রায় ৩০টা আর সবই স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। কিন্তু এত প্রচণ্ড শক্তির পরও হানাদারদের জন্য অনুকূল, আমাদের জন্য প্রতিকূল হওয়ায় নাগরপুর ঘাঁটির পতন ঘটাতে পারিনি। ২ তারিখ দুইটা-আড়াইটার দিকে খবর আসে নাগরপুরের হানাদারদের উদ্ধার করতে টাঙ্গাইল থেকে এক ব্যাটালিয়ান সৈন্য আসছে। তাদেরকে এলাসিন ঘাটে বাধা দেয়া হয় এবং আমরা আক্রমণ প্রত্যাহার করে সবক’টি দল নিয়ে এলাসিন ঘাটে পৌঁছে যাই। আমরা এলাসিন নদীর দক্ষিণ পাড়ে, হানাদাররা উত্তর-পূর্ব পাড়ে। তখনো তারা নদী পেরুতে পারেনি। কিন্তু হানাদাররা অনেকটা উত্তর-পশ্চিমে সরে গিয়ে নদীর বিশাল চরের মধ্যদিয়ে প্রায় দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে চলে এসেছিল। আমরা ছিলাম ভাররা বাজারের পাশে। আমাদের হাতে ১৫-২০ জন হানাদার আহত ও নিহত হয়েছিল। সেখানে আমাদের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা কামুটিয়ার সানোয়ার মারাত্মকভাবে আহত হয়। আল্লাহ’র দয়ায় সাহসী যোদ্ধাটি এখনো বেঁচে আছে। যখনই ভগ্ন স্বাস্থ্য সানোয়ারকে দেখি তখনই সেই এলাসিনের যুদ্ধের কথা মনে হয়। আল্লাহ আয়ু দিয়েছেন; তাই এখনো সানোয়ার বেঁচে আছে। এমন আরও কতো যোদ্ধা বেঁচে আছে। কিন্তু তাদের স্বস্তি নেই, শান্তি নেই, সম্মান নেই।

এবার নতুন অবস্থা, নতুন আঙ্গিকে, নতুন প্রেক্ষাপট। কিন্তু কেন যেন ভালো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। অধ্যাপক ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের দুঃসময়ে প্রায় ২-৩ বছর তাকে ছায়ার মতো সাহস দিয়েছি। একজন রাজনৈতিক মানুষের যা কিছু করা সম্ভব করার চেষ্টা করেছি। এসবের মধ্যে ছিলেন ড. কামাল হোসেন। তার উৎসাহেই ওসব করেছি। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। সাধারণ মানুষ তার কাছ থেকে যতটা যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধের আশা করেছিল উপদেষ্টা পরিষদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের তেমন আশা পূরণ হয়নি। যে কারণে তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। ইদানীং সমন্বয়কদের কথা শুনছি। বিশেষ করে সারজিস, তার কথাবার্তা অনেকটাই শেখ হাসিনার মতো। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা যাদের পরাজিত করে মহা বিজয় অর্জন করেছেন, পরাজিতরা নাকে সরিষার তেল দিয়ে মোটেই ঘুমিয়ে থাকবে না- এটাই সত্য কথা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলতেন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সরকারকে অস্থিতিশীল করা, তাকে সরিয়ে অন্যেরা সরকারে আসা- এটাই শতসিদ্ধ সত্য। এর কোনো কোনো জায়গায় নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র হয়। কিন্তু সবটুকু নয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারিয়েছে। তার প্রধান কাজ ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করা। সেটা তিনি বা তারা সদা সর্বদা করবেন। এ সরকারকে অস্থিতিশীল করার যত রকমের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে তা করবেন। এতে ক্ষোভ প্রকাশের কোনো কারণ নেই। এ তো খুবই সত্য। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কয়েক হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আহত-নিহত হয়েছে। এটা তো বুকে হাত দিয়ে অবশ্যই বলা যায়- আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তরাও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতা পায়নি। এমনকি যথাযথ চিকিৎসা সেবাও পায়নি। তাই শুধু কথার ফুলঝুরি ঝরালেই চলবে না, বাস্তবের সঙ্গেও কিছু না কিছু মিল থাকতে হবে। পতিতদের কাজ কি? হারানো স্থান দখল করা বা ফিরে পাওয়া। সেক্ষেত্রে হাসিনা আর আওয়ামী লীগকে এক করে ফেললে নিশ্চয়ই তার শক্তি সামর্থ্য বাড়বে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর বঙ্গবন্ধু এক কথা নয়। শেখ হাসিনা প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধাও না। এ জিনিসগুলো আন্দোলনকারীদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

শেখ হাসিনাকে ফেলে দেয়ার জন্য জো বাইডেন নানা রকম নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছিলেন। এখন শুনছি নবনির্বাচিত ট্রাম্প শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাবেন। সেখানে ভারত সরকারেরও সহযোগিতা থাকবে। এসবের কোনো কিছুই ভালো না। আমাদের দেশ, আমাদের জনগণ কাকে ক্ষমতায় বসাবে আর কাকে বসাবে না সেটা ঠিক করবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি নয়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নয়। এসব খুবই বাজে কথা। পরাজিতরা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে- এটাই শাশ্বত সত্য। চাল ডাল লবণ তেল প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া। তাতে সত্যিই দেশবাসী বিরক্ত হতাশ। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বিবেচনার মধ্যেই নেই। অতি সম্প্রতি ইসকন থেকে বিতাড়িত চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের চট্টগ্রামের হুজ্জতি সারা দেশকে এক চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে। ৩-৪ ঘণ্টা আদালতে দাঙ্গা- হাঙ্গামা ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সেখানে ইসকনের বহিষ্কৃত নেতা চিন্ময়ের অনুসারীদের হাতে এড. সাইফুল ইসলাম আলিফের প্রাণনাশ এক মারাত্মক অশনিসংকেত। এটা সত্যিই আমাদের জন্য চরম উৎকণ্ঠার বিষয়। আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থে হিন্দু-মুসলমানের তেমন রেষারেষি নেই। আমরা পাশাপাশি জন্মেছি, পাশাপাশি মরি। আমাদের কবরস্থান আর শ্মশানঘাট অনেক সময় পাশাপাশি দেখা যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কতো শত হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান আলেম-ওলামা হিন্দুদের বাড়িঘর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরম যত্নে পাহারা দিয়েছে। তাই এসব দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। কেন যেন অধ্যাপক ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সে দক্ষতা খুঁজে পাচ্ছি না। যখন সবাইকে একযোগে কাজ করা উচিত সেখানে নিজেদের মধ্যেই অনেক বিভাজন, অনৈক্য দেখতে পাচ্ছি।

গ্রামীণ ব্যাংকের উপর শেখ হাসিনার সর্বগ্রাসী আক্রমণে সময় ড. কামাল হোসেনের অনুরোধে প্রায় ২-৩ বছর একনাগাড়ে অধ্যাপক ইউনূসকে যখন যেভাবে যতটা সহযোগিতা করা দরকার করার চেষ্টা করেছি। দলীয় এবং পারিবারিকভাবে অনেকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। তাকে যে উচ্চ মার্গের মানুষ হিসেবে মনে হয়েছে কেন যেন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর তাকে তেমন দেখছি না। কোথায় যেন তার দক্ষতা-যোগ্যতার অল্প বিস্তর খাদ দেখতে পাচ্ছি। এক’শ কয়েকদিন তিনি ক্ষমতায়, কতো দলের সঙ্গে একাধিকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, অনেক কথা হয়েছে। আমাদের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি নিবন্ধিত দল। আমাদের সঙ্গে কেন যে একবারও কথা বা আলাপ আলোচনার প্রয়োজন মনে করছেন না কেন বুঝতে পারছি না। এরমধ্যে কিছু লোকজনের সঙ্গে তো দেখা- সাক্ষাৎ, কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু তাদের খুব একটা সক্রিয় এবং যোগ্যও মনে হচ্ছে না। কেন যেন সবাই গা এলিয়ে আছেন। এখান থেকে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে দেশ ও জাতির মারাত্মক ক্ষতি হবে। একবার সে ক্ষতি হয়ে গেলে শত চেষ্টা করেও আমরা তা পূরণ করতে পারবো না।

Saturday, November 16, 2024

আসিফ নজরুলকে হেনস্তা জাতির কলঙ্ক, রাখাল চন্দ্র নাহা’র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

চারদিকে কেমন যেন এক গুমোট পরিবেশ। স্বস্তি সুন্দরের কোনো আভাস নেই। আমাদের আইন উপদেষ্টা জনাব আসিফ নজরুল একজন শিক্ষক মানুষ। দোষ-ত্রুটি সবারই থাকে। কমবেশি তারও হয়তো আছে। কিন্তু একজন পোড় খাওয়া মানুষ হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে মোটেই ফেলনা নন। হিংসা করবার মতো তার একটা সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। বেশ কিছু বছর তাকে নানাভাবে দেখেছি। অনেক সভা-সমাবেশে তার কথাবার্তার মধ্যে মারাত্মক একটা সাবলীলতা এবং চিন্তার খোরাক পেয়েছি। সেই মানুষ বৈষম্যবিরোধী সফল আন্দোলনে বিশ্বখ্যাত অধ্যাপক ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। ভালোই করছেন। অন্তত এটা বলা যায়, প্রাক্তন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের চাইতে হাজার গুণ ভালো করছেন। সেই মানুষটি সেদিন জেনেভা গিয়েছিলেন। সেখানে গুটিকয়েক বাঙালি অথবা হাসিনা সমর্থক তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে। এই সময় তাকে অপমান অপদস্থ করা দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করার শামিল। আমি খুবই অবাক হয়েছি, জেনেভায় আমাদের দূতাবাস কী করছে, কী করেছে? এ ব্যাপারে তাদের যথাযথ ভূমিকা আদৌ পালন করেছে কিনা? নাকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নাজেহাল করতে সর্বত্রই কেউ না কেউ ওত পেতে বসে আছে? কথাটা বলতে চাইনি তবু বাস্তবতা বলতে বাধ্য করছে। আজ যখন যেখানে যাকেই নিয়োগ দেয়া হয় বা হচ্ছে তার অধিকাংশই বিগত সরকারের তল্পিবাহক, পা-চাটা দালাল। এই একই রকম অবস্থা আমরা দেখেছি স্বাধীনতার পরপর ১৫ই ডিসেম্বর ’৭১ পর্যন্ত যারা পাকিস্তানের যে পদে ছিল ১৬ই ডিসেম্বর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর প্রায় সেই পদেই তারা ছিল। মাত্র ২-৪ জনকে এখানে ওখানে অদল বদল করা হয়েছিল।

কক্সবাজারের ডিসি টাঙ্গাইলে, নোয়াখালীর ডিসি হয়তো ফরিদপুর, ফরিদপুরের জনকে যশোর কিংবা দিনাজপুর। এখনো তাই হচ্ছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা আর স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। শেখ হাসিনা আর বঙ্গবন্ধু যেমন এক না, শেখ হাসিনা আর প্রকৃত আওয়ামী লীগও এক না। আমরা অনেক ডিক্টেটর দেখেছি, তার মধ্যে বিশেষ করে সামরিক ডিক্টেটর, অনেক রাজতন্ত্রও দেখেছি। কিন্তু হাসিনাতন্ত্র যারা দেখেনি তারা এক ব্যক্তি কীভাবে রাষ্ট্র চালায় বা চালাতে পারে সেটা ভাবতেও পারবে না। গত ১০ তারিখ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে শেখ হাসিনার তল্পিবাহকরা যা করেছে বা করলো তা অভাবনীয়। রাখালের ‘বাঘ এসেছে বাঘ এসেছে’ করতে করতে যেদিন বাঘে গিলে খাবে সেদিন কেউ ফিরাতে আসবে না। অসুবিধা হলো ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই শেখ হাসিনার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। একজন সাধারণ মানুষের যতটা জ্ঞান গরিমা শিক্ষা দীক্ষা মেধা থাকে নেত্রী শেখ হাসিনা, বোন হাসিনার মধ্যে তার বিন্দুবিসর্গও খুঁজে পাওয়া যাবে না।  আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে এক লেখাতে লিখেছিলাম, ড. ওয়াজেদ মিয়া যদি যথাযথ সেবাযত্ন পেতেন তাহলে তিনি পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন হতে পারতেন কিনা বলতে পারবো না, তবে আমাদের দেশে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু অবশ্যই হতেন। ১০ তারিখ নূর হোসেন দিবসে কি প্রয়োজন ছিল এই নকশা করার? মানুষকে একটু শান্তিতে স্বস্তিতে থাকতে দিলে কি এমন ক্ষতি? কিন্তু না, তা তিনি থাকতে দিবেন না। তিনি সকালে আসেন, বিকালে আসেন- এটা সত্য নয়, অত সহজও নয়। শেখ হাসিনাকে নিয়ে অনেকেই হয়তো ভবিষ্যদ্বাণী করবেন। আমার তেমনটার কোনো ইচ্ছা নেই। কিন্তু তার যে বয়স, তার যে বিচার বিবেচনা, মেধা তাতে কোনোমতেই এক যুগের আগে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। হ্যাঁ, কিছুটা যন্ত্রণা দিতে পারবেন, গোলমাল করতে পারবেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ছবি পদদলিত করে সিনক্রিয়েট করতে পারবেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। হ্যাঁ এটা ঠিক, মানুষ বড় কষ্টে আছে। সেই কষ্ট দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যতটা সাফল্য আশা করা গিয়েছিল কেন যেন ততটা হচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া, মানুষ কোনোমতেই সংসার চালাতে পারছে না।

অন্যদিকে অতি সম্প্রতি নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ অনেকের কাছেই পছন্দ হয়নি। আওয়ামী লীগ বাদ দিয়ে মানুষ পাবে কই? ক্ষমতার আওয়ামী লীগ, অর্থবিত্তের আওয়ামী লীগ- সে তো দেশব্যাপী। যার কারণে প্রকৃত দেশপ্রেমিক দীর্ঘদিন কোণঠাসা হয়েছিল। এখনো তারা কোণঠাসা। বিত্তশালী আওয়ামী লীগ সব জায়গায়। বিশেষ করে শেখ হাসিনার পাল্লায় পড়ে রাজনীতির এমন অধোগতি প্রকৃত রাজনীতিকরা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি। তাই যখন যাকে যেখানেই বসানো হচ্ছে হাসিনার নেশপেশ অবশ্যই থাকছে। যা নিয়ে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। দেশের মানুষ সব সময়ই চায় সুস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হোক, মানুষ শান্তিতে থাকুক, বিচার ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসুক। এসব ক্ষেত্রে আর সামান্য একটু গতি এলে সাধারণ মানুষ আশান্বিত হতো। আর একবার মানুষ আশান্বিত হলে কেমন কি হয়, কতোটা হয় স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাক্রমশালী পাকিস্তানি হানাদার পশু শক্তিকে পরাজিত করে আমরা দেখিয়েছি, ’৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাংলার ছাত্র-জনতা স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে দেখিয়েছে আর এই সেদিন যে অধ্যাপক ড. ইউনূসকে সকাল বিকাল কোর্ট- কাচারির বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি করতে হতো তাকে মসনদে বসিয়েছেন দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। এসবই আল্লাহর ইচ্ছা, সাধারণ ছাত্র-জনতার কর্মকাণ্ড। দুর্ভাগ্য আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না। এরপরও যারা অমনটা করবেন তাদের পরিণতি দু’দিন আগে আর দু’দিন পরে একই হবে। উপদেষ্টা নির্বাচনে বেশ অসন্তোষ আছে। যার বহিঃপ্রকাশ কয়েকদিন থেকে শুরু হয়েছে। তবে একটা জিনিস বলবো নেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার চাইতে কাউকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর দক্ষতা-যোগ্যতা অনেক বেশি। তা না হলে সদ্য নির্বাচিত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবি পদদলিত করে তার কাছে পাঠানোর চিন্তা অনেকের মধ্যে হওয়ার কথা নয়। তা তিনি চিন্তা করেছেন এবং আমার বিশ্বাস তিনি অবশ্যই ওসব করে ছাড়বেন। কারণ টাকা দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। অনেকেই করেছেন।

শেখ হাসিনার কাছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আছে। শুধু শেখ হাসিনা কেন, যারাই গত ১৫-১৬ বছর ক্ষমতার আশপাশে ছিলেন সবার কাছে অচিন্তনীয় অর্থ সম্পদ রয়েছে। সেইসব সম্পদ ব্যয় করে কতোটা কাজের কাজ করতে পারবেন হলফ করে বলতে পারি না। কিন্তু অকাজ-কুকাজ অনেকটাই করতে পারবেন। এটা বিগত দিনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া। তাই সফল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আরামে গা এলিয়ে দিলে চলবে না। তাদের সফলতা নির্ভর করে তাদের সচেতনতার উপর। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ৫-১০ জনে মিলে জেনেভার মতো জায়গায় অপমান অপদস্থ হেরাজ করা গেলে পৃথিবীর বহু দেশ পড়ে আছে আমাদের দেড় কোটির উপর বাঙালি প্রবাসে বাস করে। তারা বিএনপি, জামায়াত যেমন করে তেমনি আওয়ামী লীগও করে। তাই অশান্তি সৃষ্টিতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। এক সময় দেখতাম দেশের ভেতরে যত দলাদলিই থাকুক দেশের বাইরে আমরা এক দল, এক মত। কিন্তু এখন দেশের বাইরেও মারামারি কাটাকাটি হানাহানি করি। এটা খুব ভালো লক্ষণ নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এ ব্যাপারে যথাযথ সক্রিয় হতে আন্তরিক অনুরোধ জানাচ্ছি।

জন্মের পর মৃত্যু অবধারিত সত্য। মৃত্যুর স্বাদ সবাইকে গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যু থেকে কারও মুক্তি নেই। সময় এলে সবাইকে এপার থেকে ওপার যেতে হবে। তেমন একটি মৃত্যু রাখাল চন্দ্র নাহার। আমার জন্ম টাঙ্গাইল, নাহারের জন্ম কুমিল্লার দেবিদ্বার। সে হিন্দু, আমি মুসলমান। মিল শুধু একটা ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, রাখাল চন্দ্র নাহারও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের দেশে দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিষয় সম্পত্তি নিয়ে যা হয় এখানেও তাই হয়েছে। সামান্য জমিজমা নিয়ে বিরোধে ২৬/০২/১৯৯৯ সালে দীনেশ চন্দ্র দত্তের সঙ্গে রাখাল চন্দ্র নাহার পরিবার পরিজনের ঝগড়াঝাটি হয়। লাঠিসোটা নিয়ে মারামারিও হয়। রাখাল সেদিন ঘটনাস্থলে ছিল কিনা আদৌ তার প্রমাণ হয়নি। অথচ প্রথমে তার ফাঁসি, পরে যাবজ্জীবন, সবশেষে গত ২রা জুলাই ২০২৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল। গত ৯/১১/২০২৪ এ ধরাধামের সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে পরপারে চলে গেছে। আমি এসবের কিছুই জানতাম না। হঠাৎই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য জায়গার ১০-১২ জন ছেলেমেয়ে ও কয়েকজন বয়সী মানুষ এসে হাজির।

রাখাল চন্দ্র নাহা নামে একজন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হচ্ছে। আপনি একটা কিছু করুন। সাধারণত নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে এতটা পথ এসেছি। তাই কোনো কিছুই খুব একটা বিচলিত করে না। একদিন যে চলে যাবো সেটা সব সময় বুকের মধ্যে লালন করি। সেই রাতেই গিয়েছিলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সব শুনে বলেছিলেন, আপনি একজন সরল সোজা মানুষ। আপনি মনে করেন আমি সব করতে পারি। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারি না। সরকারের কাছে যান। তখনকার সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন আহমেদের কাছে গেলে তিনিও খুব সরল সোজা ভাবে বলেছিলেন, আমার কিছু করার নেই। যা কিছু করার ক্যান্টনমেন্ট থেকে করা হয়। আপনি সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদকে বলুন। সেনাপ্রধানের কার্যালয়েও গিয়েছিলাম। কারণ কার্যালয়টা আমার বহুদিনের চেনা। কারণ ১৬ই ডিসেম্বর ’৭১ ভারতীয় তিন সেনাপতির সঙ্গে নিয়াজির গুহায় গিয়েছিলাম। সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাখাল চন্দ্র নাহার জীবন রক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিলেন। দিনটা ছিল ৭ই এপ্রিল ২০০৮। সারাদিন মারাত্মক উত্তেজনায় কেটেছিল। রাত ১১টার পর বীর মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হবে রাত ১০টা পর্যন্ত তেমন কিছুই জানি না। হঠাৎ রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ফোন আসে, রাখাল চন্দ্র নাহার ফাঁসির আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। বড় একটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নির্বাচিত সরকার এলে রাখাল চন্দ্র নাহা মুক্তি পেয়ে যাবে। এরপর নির্বাচিত সরকার আসে। নেত্রী শেখ হাসিনার সরকার। এক আজব সরকার। আইনমন্ত্রী হন আনিসুল হক। আনিসুল হকের বাবা সিরাজুল হক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী।

কলকাতার বেকার হোস্টেলে থাকতেন। তুই তুমি সম্পর্ক ছিল তাদের। একটা সোনার মানুষ সিরাজুল হক। তারই ঘরে এমন একটি মানুষ কী করে জন্মেছিল আমি কোনো কূলকিনারা পাই না।
আগে যাবজ্জীবন ছিল ২০ বছর। রেয়াত মুরীদ বাদে জেল খাটতে হতো ১৪ বছর। ’৯০-এর গণআন্দোলনে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়ে এক কলমের খোঁচায় ২০ বছরকে ৩০ বছর করে দিয়েছিলেন। একটা মানুষের জীবন থেকে একটা দিন চলে গেলে কেমন হয়- এ সমস্ত লোকেরা তা ভেবেও দেখে না। আমি অন্ততপক্ষে ১০ বার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একেবারে হতদরিদ্র নিরীহ মানুষ হিসেবে রাখাল চন্দ্র নাহাকে মুক্তি দিতে। কিন্তু মুক্তি হয়নি। অনুরোধ করেছি বিশেষ বিশেষ দিনে মুক্তি দিতে- সে মুক্ত হয়নি। নাহাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২৬/০২/১৯৯৯ সালে। তার যে মামলা এবং যখন সাজা হয় তখন যাবজ্জীবন ছিল ২০ বছর। সেই অনুসারে ২০১৪ সালে তার মুক্তি পাবার কথা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সে যদি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো রকম রেয়াত মুরীদ পায় তাহলে জেলের সময় আরও কমার কথা।

অন্যদিকে ৩০ বছরের জেল হলেও ২০ বছরের একদিন বেশিও কারও জেল খাটার বিধান নেই। জেলে নতুন কোনো অপরাধ না করলে ৩০ বছরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগীরা ২০ বছর একদিনের মাথায় জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মুক্ত আকাশের নিচে আসে। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাখাল চন্দ্র নাহার ক্ষেত্রে তা হয়নি একমাত্র আনিসুল হকের মতো একজন বিচার বিবেচনাহীন আইনমন্ত্রীর কল্যাণে। সে যদি আরও কিছুদিন বাইরে থাকতো, সন্তান সন্ততি স্ত্রী আত্মীয়স্বজনের মধ্যে থাকতো তাহলে যেদিন চলে গেছে ঐদিনই চলে যেতো কিন্তু একটা শান্তি ও স্বস্তি থাকতো। কিন্তু কাউকে নাকি একবারের বেশি কোনোক্ষেত্রে ক্ষমা করা যায় না বলে রাখাল চন্দ্র নাহাকে মুক্ত হতে দেননি। আজ আনিসুল হকের দুর্গতি তো মাঝে মধ্যেই মনে হয় সেখানে রাখাল চন্দ্র নাহারও হুতাশ অনেকাংশে কাজ করেছে। রাখাল চন্দ্র নাহার জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়কে একটি বীরনিবাস বরাদ্দের অনুরোধ করেছিলাম। মাননীয় মন্ত্রী যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সে নিবাসটি ৪/১০/২০২৩ এ প্রদানের আদেশও করেছিলেন। কিন্তু সেটা কেমন কি হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনই জানেন। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন তার সৃষ্টি রাখাল চন্দ্র নাহাকে ক্ষমা করেন।

Wednesday, November 6, 2024

এক যুগ আগে ড. ইউনূসকে যা বলেছিলাম by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

আলাপ-আলোচনার মাঝে বলেছিলাম, শুধু গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে না ভেবে আপনি যদি বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে পারেন, ৮৪ লাখের জায়গায় ১৬ কোটি নিয়ে ভাবতে পারেন তাহলেই আমাদেরকে পেতে পারেন এবং দেশবাসীকে পাবেন। আমার কথায় তিনি পুলকিত হয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আগামী দিনে তিনি তেমনটাই করবেন...

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-যুবকদের সঙ্গে আপামর জনসাধারণ ঝাঁপিয়ে পড়ায় শেখ হাসিনার পতন হয়। দেশের মানুষ আশায় বুক বাঁধে অনেক কিছুর পরিবর্তন হবে। বিশেষ করে ঘুষ-দুর্নীতি, জোর-জবরদস্তি থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। খুব একটা তেমন হয়নি। মন্দের ভালো যা হওয়ার মোটামুটি তা হয়েছে। গত ১৫-১৬ বছর কোনোখানে কোনো যোগ্য মানুষের স্থান ছিল না, তা এখন পদে পদে দেখা যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতি যা বলেছেন, যেভাবে বলেছেন তাতে তার যোগ্যতার কোনো প্রমাণ হয় না। তিনি তার বেতার ভাষণে বললেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি। এরপর মরে গেলেও রাষ্ট্রপতি এ নিয়ে যা বলছেন তার কানাকড়িও বলার কথা না। যোগ্যতা না থাকলে যা হয় তাই হয়েছে। আর কুকর্মের সঙ্গে সারাজীবন জড়িত থাকলে সে কখনো সুস্থির হতে পারে না। তাকে কম বেশি সব সময় অস্থির থাকতে হয়। সেটাই মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে পদে পদে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বর্তমান প্রধান উপদেষ্টাকে আমি ভালো জানি, সম্মান করি, বিশ্বাস করি। ২০১২’র দিকে যখন তার গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি’র পদ নিয়ে ঝড় বইছিল তখন একদিন ড. কামাল হোসেন কথায় কথায় বলেছিলেন, সিদ্দিকী সাহেব, আপনি একটু ড. ইউনূসের কাছে যান। আপনি গেলে সে সাহস পাবে, জোর পাবে। তার কথায় আমি গিয়েছিলাম। তার আগে প্রধানমন্ত্রী বারবার অধ্যাপক ইউনূসকে সুদখোর বলায় আমার মধ্যেও নানা রকম প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল। আমি যাবার পথে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে, গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৪ লাখ গ্রাহককে নিয়ে তার ভাবনা নামে একটি পুস্তিকা ড. কামাল হোসেন আমার হাতে দিয়েছিলেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে তার ভাবনা পুস্তিকাটি নিয়ে গিয়েছিলাম। শুধু গ্রামীণ ব্যাংকের স্থলে বাংলাদেশ আর ৮৪ লাখের জায়গায় একটা পেন্সিলে ১৬ কোটি লিখে নিয়েছিলাম। অনেক আলাপ-আলোচনার মাঝে বলেছিলাম, শুধু গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে না ভেবে আপনি যদি বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে পারেন, ৮৪ লাখের জায়গায় ১৬ কোটি নিয়ে ভাবতে পারেন তাহলেই আমাদেরকে পেতে পারেন এবং দেশবাসীকে পাবেন। আমার কথায় তিনি পুলকিত হয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আগামী দিনে তিনি তেমনটাই করবেন। আজ যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান তখন কথাগুলো ভাবি। বয়স একেবারে কম হয়নি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কী হয়, কীভাবে হয়, কেন হয় এসবের কিছুই যে বুঝি না তাও নয়। অধ্যাপক ড. ইউনূসের এই সময় রাষ্ট্র চালানো বেশ কঠিন। কিন্তু মোটেই অসম্ভব নয়। তার দৃঢ়তা অনেক সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে। তাকে আওয়ামী কিছু লোক একেবারেই পছন্দ করে না এটা যেমন সত্য তেমনি অসংখ্য মানুষের আস্থা তার প্রতি আছে- এটাও এক চরম সত্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দক্ষতা ও যোগ্যতার। আমার ভুল হতে পারে। কিন্তু আমি এখনো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাকেই প্রধান দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে মনে করি। কে তাকে অনুরোধ করলো, কে অনুনয় বিনয় করে প্রধান উপদেষ্টা বানালো এটা বড় কথা নয়। এটা বড় কথা, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন, আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা তার প্রতি রয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সংগঠকরা এক অসাধ্য সাধন করেছে। বাংলাদেশ সত্যিই অসাধ্য সাধনের দেশ, দুঃসাধ্য বাস্তবায়নের দেশ। সেক্ষেত্রে ছাত্র-যুবক, অসন্তুষ্ট জনসাধারণের অংশগ্রহণে বিগত সরকারের পতন ঘটেছে। বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের, যুবকদের সারা দেশব্যাপী কখনো কোনো দৃঢ় সংগঠন ছিল না, এখনো হয়তো নেই। কিন্তু তারা যদি অহংকারী না হয়, তারা যদি বাস্তব বুঝতে চেষ্টা করে এবং তারাই দেশের মালিক-মোক্তার না ভাবে তাহলে তাদের সফলতা কেউ ঠেকাতে পারবে না। এটা খুবই সত্যি- দেশে বড় বড় দল বহু আছে। দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো আছে। কিন্তু সব থেকে বড় কথা কোনো দলের প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও নিবিড় আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না, এখনো অনেকেই তা অর্জন করতে পারেনি। যতক্ষণ জাতীয় দলগুলো মানুষের আস্থা অর্জন করতে না পারবে ততক্ষণ নিশ্চয়ই দলীয় কাঠামো একটা শক্তি তাদের থাকবেই, কিন্তু কোনো লক্ষ্যেই পৌঁছতে, কোনো বিজয় অর্জন করতে যে পরিমাণ জনসম্পৃক্ততার প্রয়োজন সেটা না পেলে তারা মোটেই সফলকাম হবে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে কাজ করা দরকার ঠিক তেমনি সফল আন্দোলনকারীদেরও সাধারণ মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি গুরুত্ব এবং তাদের কষ্ট বোঝা উচিত।

দেশবাসী নানা কষ্টে আছে। আইনশৃঙ্খলা ভালো নেই, ঘুষ মোটেই বন্ধ হয়নি, দুর্নীতি একই পরিমাণ আছে। পুলিশের নিচু পর্যায়ে অনেকটা দরদী হলেও উঁচু পর্যায়ে আগের চাইতে খারাপ হয়েছে। এতদিন যারা নিগৃহীত ছিল তারা মনে করছে দেশটা এখন তাদের জন্য অবারিত, লুটপাট ও দাঙ্গাবাজি, কাজ না করা সে এক বেপরোয়া ভাব। ২-৪ জন পুলিশ কর্মকর্তা এখনো ভালো আছে বলে চলছে। না হলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতাম বলতে পারি না। বিশেষ করে সেনাবাহিনী খুবই প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে। তাদেরকে বিচারিক ক্ষমতা দেয়ার পরও কোনোরকম উত্তেজনাকর তেমন বড়সড় ঘটনার কথা শোনা যায়নি। দেশে এরকম গৌরবান্বিত সেনাবাহিনীই আমাদের দরকার। সেনাবাহিনী যদি এমন সুন্দর নিয়ন্ত্রিত থাকে তাহলে ভবিষ্যতে আমরা গর্ব করার মতো অনেক কিছু পাবো। সেনাবাহিনীকে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা উচিত না। সেনাবাহিনীকে দক্ষ, যোগ্য ও গৌরবান্বিত বাহিনীতে পরিণত করা উচিত। ব্যাপারটা শুধু সেনাবাহিনী নয়, ব্যাপারটা সমস্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী নিয়ে। সেটা সেনা, নৌ, বিমান, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব, প্যারা মিলিশিয়া, গ্রামরক্ষী যত রকমের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে তারা যেন সম্মানের হয়, গৌরবের হয়- সেদিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত।

একটা বিষয় বেশ কিছুদিন আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে তা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সবকিছু সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। নুন, তেল, মরিচ, পিয়াজ, আদা, রসুন, লাউ, কুমড়া সবজি কোনো কিছু নাগালের মধ্যে নেই। আমি ’৬০-’৬২ সাল থেকে ’৬৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত বাজার করেছি। বাবা তখন টাঙ্গাইল মহকুমা কোর্টে মোক্তার ছিলেন। আমি প্রতিদিন সকালে মোক্তার বারে আসতাম; অনেকক্ষণ বসে থাকতাম। বাবা এক সময় টাকা দিতেন টাঙ্গাইল ছয়আনি বাজারে গিয়ে বাজার করতাম। মা লিখে দিতেন মাছ, মরিচ, পিয়াজ, আদা, রসুন, পান-সুপারি, সজ মসলা কতো কি। আমার বাজারের বরাদ্দ ছিল ৩-৪ টাকা। যেদিন চাল কিনতাম সেদিন ১৪-১৫ টাকা। আধা মণ চাল। আর আমি এত ভালো লোক ছিলাম ২০ কেজির জায়গায় ১৮ কেজির বেশি কখনো আমার আধা মণ হতো না। বিরই, কাটাবারি ও অন্যান্য ভালো চাল ছিল ২০ টাকা মণ। আমার আধা মণ ছিল ১৮ সেরে। কখনো সখনো ১৭ সেরেও আনতাম। মা মাঝেসাজে বলতেন, ‘বজ্র রে, চাল কেন যেন কম কম লাগছে। পাথরটার ওজন কমে গেল নাকি?’ মা যে বুঝতেন এটা তখন অতটা বুঝতাম না। একটু বড় হয়ে বুঝতাম। কারণ মা তো কৌটায় মেপে ভাত চড়াতেন। কিন্তু কী করবেন। আর মা আমাকে অসম্ভব আদর করতেন। কারণ আমি ছিলাম তার একেবারে নাদান ছেলে। কি বেকুবই যে ছিলাম- আমাদের বাড়ি বোঝাই সুপারি গাছ ছিল। ঘরের কাঁড়ে সুপারি রাখা হতো। সেখান থেকে চুরি করে আট আনা সের বিক্রি করে এক বা দু’দিন পর ২ টাকা সের কিনে আনতাম। প্রতিদিনের বাজারে ২ আনার পান থাকতো, ২ আনার সুপারি, ১ আনার জর্দা- এ ছিল অবধারিত। কোনোদিন বাদ পড়তো না। তখন লবণ ছিল ২ আনা সের। বেগুন কখনো ২ আনা, তারপর ১ আনা, একেবারে শেষ পর্যায়ে ২ পয়সা সের। কাঁচা মরিচ ২ আনা থেকে ১ আনা। পিয়াজ ১ আনা, আলু ১ আনা, ঢেঁড়স, শিম, ধুন্দল- এ জাতীয় প্রায় সব সবজি ১ আনা সেরের বেশি নয়। ২ আনার লাউ না হলেও ৩ সের হবে। লাউ, কুমড়া একই দাম। দুধ ছিল শহরে ২ আনা সের, গ্রামের বাজারে ২ পয়সা সের। তখন ছিল ৬৪ পয়সায় এক টাকা। একটা বড় ইলিশ মাছ যার ওজন হবে সোয়া কেজি- দেড় কেজি তা ছিল ১ টাকা চার আনা। গরুর মাংস ১ টাকা, খাসির মাংস ১ টাকা চার আনা। একটা মোরগ- মুরগি ৮-১০ আনা থেকে ১২ আনা। আমরা যাই বলি না কেন মানুষের উপার্জন আর ব্যয়ের মধ্যে তখনো একটা সঙ্গতি ছিল। একজন দিনমজুর তখন ১ টাকা মজুরি পেতো। তবে তার সংসার ভালোই চলতো। কিন্তু এখন যে ৫০০-৬০০ টাকা মজুরি পায় সে কিন্তু ১ টাকার মজুরির অর্ধেক জিনিসপত্রও কিনতে পারে না। বড় কষ্টে আছে মানুষ। এখন সরিষার তেল বা সয়াবিন যে দাম। আমি যখনকার কথা বলছি তখন চিনি ছিল আট আনা, সরিষার তেল ছিল ১০ আনা। সোনার ভরি ছিল ১২০ টাকা। স্বাধীনতার পর পর আমার ছোটবোন রহিমার বিয়ে হয়। মা তাকে ২৫ ভরি সোনার গহনা দিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। তার বিয়েতে আমাদের ১০-১২ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়নি। আমি বর্ধমানে বিয়ে করেছিলাম। বউকে ১৫ ভরি সোনার গহনা দিয়েছিলাম। আর ১০-১২ ভরি গহনা লোকজনের কাছ থেকে পেয়েছিল। তখন সোনার দাম ছিল ৭০০ টাকা। আমি খুবই নাদান ছিলাম বলে, দুষ্ট ছিলাম বলে এক সময় গ্রামের স্কুল মির্জাপুর বরাটি নরদানা পাকিস্তান হাইস্কুলে ভর্র্তি করে দিয়েছিল। আমার গুরু দুখীরাম রাজবংশী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি বেতন পেতেন ২৮০ টাকা। অন্য শিক্ষকরা ১৩০-১৫০-১৬০ টাকা। দুখীরাম রাজবংশী এবং তার স্ত্রী দু’জনই শিক্ষক ছিলেন। দুখীরাম স্যার বরাটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, দুখীরাম স্যারের স্ত্রী সাটিয়াচরা গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। দু’জনে মিলে কম করে ৪০০-৪৫০ টাকা পেতেন। তাদের ৫০ টাকার বেশি মাসে খরচ হতো না। তখন সাটিয়াচরা থেকে মির্জাপুরে সর্বোচ্চ এক পাখি জমির দাম ছিল ১০০-১৫০ টাকা। তারা দু’জনে মিলে মাসে দুই পাখি জমি কিনতে পারতেন। যে জমির দাম এখন না হলেও ৪০ লাখ টাকা। তাহলে এটা তো বিবেচনা করতেই হবে। একজন শিক্ষকের তখনকার বাজার মূল্যে সম্মানী ছিল ৩০-৪০ লাখের মতো। শুধু আর্থিকভাবে তারা সম্মানী ছিলেন না, সামাজিকভাবেও ছিলেন। কোনো শিক্ষক বাজারে গেলে তাকে সম্মান করা হতো। কোনো জিনিস কেনার সময় গুরুজনের উপর দিয়ে কোনো পয়সাওয়ালা এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যেতো না। কিন্তু এখন তেমনটাই হয়। কারও কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই। শিক্ষা আর শিক্ষা নেই। শিক্ষা কেমন যেন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আগে শিক্ষকরা ছিল পিতার মতো, এখন শিক্ষকরা অনেকটা তেমন নেই। কতো খারাপ শব্দ ব্যবহার করবো? কোনো শব্দই তাদের পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা যাবে না। কবে যে এইসব অসঙ্গতি থেকে মুক্তি পাবো- সদা সর্বদা শুধু তাই ভাবি।

Saturday, October 26, 2024

চাই ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

আজ ক’দিন থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে মারাত্মক তোলপাড় চলছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আগাগোড়াই একজন বিতর্কিত মানুষ। কখনো তিনি নামিদামি ছিলেন না, কখনো নিষ্কলুষ ছিলেন না। পাবনায় কলেজে পড়ার সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তখনো শাস্তি ভোগ করেছেন। তার মূল নেতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের প্রবাদপুরুষ নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, অন্যদিকে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। তাই তার অতীত খুব একটা সমুজ্জ্বল নয়। ইদানীং তিনি যা করছেন- যা বলছেন- তা সম্পূর্ণই সংবিধান লঙ্ঘন, নীতি-নৈতিকতাবিরোধী মিথ্যাচার। ৫ই আগস্টের পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে তার বেতার ভাষণে স্পষ্ট করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তিনি সে পদত্যাগ গ্রহণ করেছেন। তারপর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। যথারীতি অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা পরিষদের তিনি শপথ পড়িয়েছেন। রাষ্ট্র কাঠামো চলছে।

তার মধ্যে তিনি কেন, কি উদ্দেশ্যে নানা অগ্রহণযোগ্য অপ্রীতিকর কথা বলে চলেছেন। হ্যাঁ এটা ঠিক, যারা বিগত সরকারকে উৎখাত করেছে তাদের পক্ষে যেমন জনমত আছে, ঠিক তেমনি তাদের বিপক্ষে অনেক শক্তিধররা রয়েছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার সফল আন্দোলনকে ব্যর্থ করার। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা করবেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব এবং আসমানসমান মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা করবেন- এসব একেবারে অতি সাধারণ ব্যাপার। ক’দিন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চাচ্ছে। হয়ে যাবে। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সবার আগে গেছেন প্রাক্তন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, তার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই যাবেন। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। কারও হায়াত মওত তো বলা যায় না। তাকে হত্যা করা না হোক- আল্লাহ যদি আজরাইল পাঠিয়ে দেন- তাহলে কে ফেরাবে? তখন কী হবে? সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যদি পরপারে চলে যান তার জন্য কি দেশ বসে থাকবে? কখনো না। মাননীয় স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। মাননীয় স্পিকারের পদত্যাগের কোনো সুযোগই নেই। পরবর্তী সংসদ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তিনি স্পিকার। কিন্তু পণ্ডিতি করে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তাতে কী হবে? সংসদীয় ধারাবাহিকতা রাখতে গেলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য দিয়ে শপথ পড়িয়ে নিলেই সমস্ত লেঠা চুকে যাবে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মরে গেছেন ধরে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিলে কী তেমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে? কে এলো, কে গেল- এটা তেমন বড় কথা নয়। বড় কথা সত্যিই রাষ্ট্র ভালোভাবে চলছে কিনা, মানুষ স্বস্তিতে-শান্তিতে আছে কিনা। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন আছে এবং এটা ধ্রুব সত্য, এক চোখে তেল, আরেক চোখে নুন বেচাকেনা করলে চলবে না। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই দুর্যোগের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। তার জন্য জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

জন্মেছিলাম ’৪৭-এর ১৪ই জুন একেবারে এক পশ্চাৎপদ পল্লী কালিহাতীর ছাতিহাটিতে। তারপর পদ্মা মেঘনা যমুনার পানি বহু গড়িয়েছে। একটা সময় ছিল- কিছুই বুঝতাম না। লাল বিল্লাওয়ালার হাওয়ালদার গ্রামে গেলে গোলাঘরের মাচার উপর সরিষা, কালাই, ধান রাখা ঢোলের মধ্যে পালাতাম। সেই মানুষ আজও বেঁচে আছি। রাজনীতিতে এসেছিলাম বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীকে অবলম্বন করে বা তাকে দেখে দেখে। যে সময় পুলিশ দেখে কাঁপতাম তখন লতিফ ভাই আইয়ুব-মোনায়েমের বিরুদ্ধে তারস্বরে বক্তৃতা করতেন। নিজে কাঁপতেন, শ্রোতাদেরও উতালা করে তুলতেন। আর দুনিয়ার ভীরু কাপুরুষ আমি ভাবতাম একই বাবার ঔরসজাত একই মায়ের সন্তান, একজনের অত সাহস, আরেকজন আমি এত ভীতু কেন? এভাবেই এক সময় ’৬২-র শিক্ষা কমিশন বাতিলের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সেই হয়তো প্রথম টাঙ্গাইলের ছাত্র-জনতার মিছিল। তখন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুমুদিনী মহিলা কলেজ এবং টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলের মেয়েরা রাস্তায় বেরিয়ে ছিল। পুরনো বাসস্ট্যান্ড থেকে কুমুদিনী কলেজ এবং আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে আগ্নেয়গিরির মতো গর্জন করে ছাত্র-জনতার মিছিল সিএন্ডবি’র মোড় হয়ে বটতলা, সেখান থেকে টাঙ্গাইল পার্কের পাশে আনসার ক্যাম্পের সামনে আমতলে এক অভাবনীয় সভা হয়েছিল। সেখানে অনেকেই বক্তৃতা করেছিলেন। কিন্তু আজও আমার কানে বাজে কুমুদিনী কলেজের এক নেত্রীর গলা। নাম মনে নেই। গত ৫-১০ বছর অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু কেউ তার নাম বলতে পারেননি। যারা দু’একজন বলেছেন- আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তখন টাঙ্গাইলে জাতীয় নেতা হুজুর মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মুসলিম লীগের বেশ কিছু নেতা ছিলেন। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহের বাইরে তাদের তেমন বিচরণ ও পরিচিতি ছিল না। আওয়ামী লীগের কয়েকজন ছিলেন। তাদের মধ্যে সর্বজনাব আব্দুল মান্নান, শামসুর রহমান খান শাজাহান, বদিউজ্জামান, হাতেম আলী তালুকদার, ছাত্রনেতাদের মধ্যে ফজলুল করীম মিঠু, আল মুজাহিদী, ফজলুর রহমান খান ফারুক, শওকত আলী তালুকদার, লতিফ সিদ্দিকী, আতিকুর রহমান সালু, বুলবুল খান মাহবুব, এম এ রেজা, আনোয়ার বক্‌শ, দাউদ খান, আলমগীর খান মেনু আরও অনেকেই। সেই যে ’৬২তে রাজপথে পা মিলিয়ে ছিলাম আজও চলছি তো চলছি। জীবনে কতো উত্থাল-পাথাল দেখলাম। মোনায়েম খানের সৃষ্ট এনএসএফ, তার দাপটে রাস্তায় চলা যেতো না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কথা বলা যেতো না। তারাও এক সময় ’৬৯-এর আগে আগে একেবারে সুতার মতো সোজা হয়ে গিয়েছিল। তাই গত জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে এক অখ্যাত প্রাক্তন বিচারপতি যখন বলেছিলেন, আন্দোলন দমাতে ছাত্র-যুবলীগই যথেষ্ট। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সে কি হামবড়া ভাব! শেখ হাসিনাও খুব একটা কম যান না। কীসব অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন যা সুস্থ মস্তিষ্কে ভাবাই দুষ্কর। তবু করেছেন। তার ফলও ভোগ করেছেন। যতকাল রাষ্ট্র থাকবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকবে- ততকাল সরকারে যাওয়া-আসা থাকবে। সরকারে গিয়েই কেউ যদি ভাবে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেন তাহলে সেটা যে ভ্রান্ত তার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। এক সময়ের ইরাকের বাদশাহ নুর-ই সাঈদ। তাকে জনগণ উৎখাত করেছিল। কর্নেল গাদ্দাফি, কি তেজই না ছিল তার। জনপ্রিয়তাও ছিল হিংসা করার মতো। হোসনি মোবারক, কতো দেশ কতো নেতা এক সময় ইরানের বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভী, খোমেনির হাতে পরাজিত হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। এরকমই হয়। ’৬০-’৬২ তে মনে হতো আইয়ুবের বুঝি শেষ নেই, অজেয় অমর হয়ে এসেছেন। কিন্তু তা সত্য নয়। লৌহমানব আইয়ুব খানকে আমরাই তামা-কাঁসা করেছিলাম। একটা সময় শেখ হাসিনা এবং তার চাটুকাররা ভেবেছিলেন, শত বছর ক্ষমতায় থাকবেন। শেখ হাসিনার পর উত্তরাধিকার কে- সে নিয়েও চিন্তা করছিলেন। মানুষ ভাবে এক, আল্লাহ করেন আরেক। এক গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছেড়েছিলেন, জেলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পালাননি, তাকে পালাতে হয়নি। কিন্তু নিদারুণভাবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে ছেড়ে বিপদের মুখে ফেলে পালিয়েছেন। শুধু পালিয়েই ক্ষান্ত হননি, ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর আমিও দেড় যুগের বেশি ভারতে নির্বাসনে ছিলাম। বারবার সরকার পরিবর্তন হলেও তারা আমাকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও মর্যাদা দিয়েছে। এখনকার অনেক নেতাদেরই চিনি না, জানি না। কিন্তু ভারতকে জানি, চিনি এবং বুঝি। মহান ভারত খুব একটা কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলে না। চলে জাতীয় স্বার্থনির্ভর করে চাণক্য নীতিতে। তাই ভারত তার স্বার্থে শেখ হাসিনাকে যেভাবে রাখা দরকার সেভাবেই রাখবে- তার বেশি নয়, কমও নয়। ভারতে তার যে সুবিধা-অসুবিধা হওয়ার পুরোটাই হবে। তবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মুখ সামলাতে না পারলে সামনে তার প্রচুর বিপদ আছে।

আমাদের দেশে অনেক বছর থেকেই সর্বক্ষেত্রেই পণ্ডিতের ছড়াছড়ি। যে পরিমাণ জ্ঞানী পণ্ডিত বাস করে সারা পৃথিবীর সব পণ্ডিত জ্ঞানী-গুণী বিদ্বান একত্র করলেও বিশ্ব জোড়া বিদ্বান পণ্ডিতের সংখ্যা কম হবে। আজ কিছুদিন থেকেই বৈধ-অবৈধ সংবিধান-অসংবিধান এসব নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ক’দিন থেকেই শুনছি, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। কি শূন্যতা হবে? আমরা বুঝতে পারছি না, দেশের মানুষ বুঝতে পারছে না। যে অধ্যাপক ইউনূসকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চোখের কাঁটা ভাবছিলেন গণেশ উল্টে যাওয়ায় তিনিই প্রধান নিয়ামক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এটা কোন সংবিধানে, কোন পাতায় লেখা ছিল? কিন্তু আন্দোলনের রায়ে যে সময় তিনি প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন তার মতো বৈধ শাসক অতীত সরকারে কেউ ছিলেন না। হ্যাঁ এটা ঠিক, অনভিজ্ঞ লোকজনদের নিয়ে তেমন খুব ভালো একটা কিছু করতে পারছেন না। কিন্তু হাসিনার দুঃশাসনের চাইতে খুব খারাপ অবস্থায় আমরা নেই। দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি- এটা খুবই স্বাভাবিক। এমন দুর্যোগের মধ্যদিয়ে দেশ বা জাতি যখন যায় তখন এমন অনেক কিছুই ঘটে যা অল্প আগেও কল্পনা করা যায় না। তেমনটাই হচ্ছে। কম বেশি আরও হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সবার দেশপ্রেমিক হওয়া দরকার, দেশের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। ব্যক্তি স্বার্থ ত্যাগ করে সমষ্টির স্বার্থের প্রতি নজর দেয়া উচিত।

আজ ক’দিন থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে মারাত্মক তোলপাড় চলছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আগাগোড়াই একজন বিতর্কিত মানুষ। কখনো তিনি নামিদামি ছিলেন না, কখনো নিষ্কলুষ ছিলেন না। পাবনায় কলেজে পড়ার সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তখনো শাস্তি ভোগ করেছেন। তার মূল নেতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের প্রবাদপুরুষ নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, অন্যদিকে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। তাই তার অতীত খুব একটা সমুজ্জ্বল নয়। ইদানীং তিনি যা করছেন- যা বলছেন- তা সম্পূর্ণই সংবিধান লঙ্ঘন, নীতি-নৈতিকতাবিরোধী মিথ্যাচার। ৫ই আগস্টের পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে তার বেতার ভাষণে স্পষ্ট করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তিনি সে পদত্যাগ গ্রহণ করেছেন। তারপর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। যথারীতি অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা পরিষদের তিনি শপথ পড়িয়েছেন। রাষ্ট্র কাঠামো চলছে। তার মধ্যে তিনি কেন, কি উদ্দেশ্যে নানা অগ্রহণযোগ্য অপ্রীতিকর কথা বলে চলেছেন। হ্যাঁ এটা ঠিক, যারা বিগত সরকারকে উৎখাত করেছে তাদের পক্ষে যেমন জনমত আছে, ঠিক তেমনি তাদের বিপক্ষে অনেক শক্তিধররা রয়েছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার সফল আন্দোলনকে ব্যর্থ করার। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা করবেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব এবং আসমানসমান মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা করবেন- এসব একেবারে অতি সাধারণ ব্যাপার। ক’দিন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চাচ্ছে। হয়ে যাবে। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সবার আগে গেছেন প্রাক্তন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, তার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই যাবেন। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। কারও হায়াত মওত তো বলা যায় না। তাকে হত্যা করা না হোক- আল্লাহ যদি আজরাইল পাঠিয়ে দেন- তাহলে কে ফেরাবে? তখন কী হবে? সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যদি পরপারে চলে যান তার জন্য কি দেশ বসে থাকবে? কখনো না। মাননীয় স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। মাননীয় স্পিকারের পদত্যাগের কোনো সুযোগই নেই। পরবর্তী সংসদ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তিনি স্পিকার। কিন্তু পণ্ডিতি করে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তাতে কী হবে? সংসদীয় ধারাবাহিকতা রাখতে গেলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য দিয়ে শপথ পড়িয়ে নিলেই সমস্ত লেঠা চুকে যাবে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মরে গেছেন ধরে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিলে কী তেমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে? কে এলো, কে গেল- এটা তেমন বড় কথা নয়। বড় কথা সত্যিই রাষ্ট্র ভালোভাবে চলছে কিনা, মানুষ স্বস্তিতে-শান্তিতে আছে কিনা। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন আছে এবং এটা ধ্রুব সত্য, এক চোখে তেল, আরেক চোখে নুন বেচাকেনা করলে চলবে না। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই দুর্যোগের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। তার জন্য জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

mzamin
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

Friday, October 18, 2024

চাকরিতে থেকে ওসব করার সুযোগ নেই by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

একজন নিম্নস্তরের সরকারি কর্মকর্তা সরকারি কর্মে বহাল থেকে কোনোমতেই একজন স্বাধীন নাগরিকের মতো মতামত ব্যক্ত করতে পারে না। ভদ্র মহিলা তাপসী তাবাসসুম ঊর্মি তাই করেছেন। চাকরির শর্ত অনুসারে তিনি বিরোধিতা তো নয়ই, তার সমর্থনেরও কোনো সুযোগ নেই। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতনের কাউন্টডাউন শুরু করেছেন। একেবারে নিম্ন পদে প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তার যদি এ মনোভাব হয় তাহলে তিনি যখন বড় হবেন, উচ্চ পদে যাবেন তখন তো সবকিছু গ্রাস করে ফেলবেন। তিনি পতনের কাউন্টডাউন বলে যেমন ভালো করেননি, ঠিক তেমনি শতকণ্ঠে অধ্যাপক ইউনূসের প্রশংসা করলেও সেটা ভালো হতো না। চাকরিতে থেকে তার ওসব করার কোনো সুযোগ নেই।

নির্বিঘ্নে নিরাপদে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় পরম প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রায় আড়াই মাস পার হতে চলেছে। এখনো রাষ্ট্রযন্ত্রের অনেক জায়গায় তেমন মেরামত হয়নি। আবার কোনো কোনো জায়গায় অতি পণ্ডিতিও চলছে। এটা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হবে কিনা ঠিক নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি না। তবে জিনিসটা খুবই খারাপ এবং গর্হিতকর। একজন নিম্নস্তরের সরকারি কর্মকর্তা সরকারি কর্মে বহাল থেকে কোনোমতেই একজন স্বাধীন নাগরিকের মতো মতামত ব্যক্ত করতে পারে না। ভদ্র মহিলা তাপসী তাবাসসুম উর্মি তাই করেছেন। চাকরির শর্ত অনুসারে তিনি বিরোধিতা তো নয়ই, তার সমর্থনেরও কোনো সুযোগ নেই। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পতনের কাউন্টডাউন শুরু করেছেন। একেবারে নিম্ন পদে প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তার যদি এ মনোভাব হয় তাহলে তিনি যখন বড় হবেন উচ্চ পদে যাবেন তখন তো সবকিছু গ্রাস করে ফেলবেন। তিনি পতনের কাউন্টডাউন বলে যেমন ভালো করেননি, ঠিক তেমনি শতকণ্ঠে অধ্যাপক ইউনূসের প্রশংসা করলেও সেটা ভালো হতো না। চাকরিতে থেকে তার ওসব করার কোনো সুযোগ নেই। এই মহিলাই আন্দোলন চলার সময় বর্তমান সময়ের সবচাইতে আলোচিত ব্যক্তি আবু সাঈদকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেছেন। আবু সাঈদের যে কর্মকাণ্ড সেটাকে কোনোক্রমেই সমাজদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী এসব ভাবার উপায় নেই। তার কর্মই তাকে মহান করে তুলেছে।

আমরা কতো জায়গায় কতো সময় শিনা টান করে দাঁড়াই। কিন্তু ওইরকম অবস্থায় তার শিনা টান করে দাঁড়ানো বাঙালিকে, বাঙালি জাতিকে, বাংলাদেশকে কতোটা মর্যাদার আসন দিয়েছে তা এই ধরনের ক্ষয়িষ্ণু মনোবৃত্তির কারও পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব না। তাই তিনি বিষয়টা অনুভব করতে পারেননি। হ্যাঁ, সত্যিই কিছুটা অক্ষর জ্ঞান অর্জন করেছেন। কালো অক্ষর হৃদয়ে ধারণ করেছেন। কিন্তু শিক্ষার মর্মবাণী তাকে স্পর্শ করেনি। তাই অমনটা করেছেন। তার সবলতা সাহসিকতার জন্যে ইতিমধ্যেই কেউ কেউ সাবাসী দিয়েছেন। সাবাসী দেয়া সহজ। ন্যায় ও সত্য বিচার করে বের করা সাবাসীর মতো সহজ নয়। এর আগেও বলেছি, গোলাম মওলা রনি একজন পাঠক সমাদ্রিত লেখক, শ্রোতাদের আকুল করা একজন বক্তা বা আলোচক। তিনি খুব সহজেই উর্মিকে সমর্থন করেছেন, সাবাসী দিয়েছেন। বহু বছর আগে তিনি একবার লিখেছিলেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনা মোটা চালের ভাত খেয়ে পয়সা বাঁচিয়ে আওয়ামী লীগ সংগঠনের জন্যে আমাদের নেতা আব্দুর রাজ্জাক ভাইয়ের হাতে তুলে দিতেন। সেই লেখা পড়ে লিখেছিলাম, তখন আমিও ইল্লি-দিল্লি করতাম। মাসে অন্তত এক-দু’বার যেতাম। দিল্লি থাকলে দিনে একবেলা ডি/১৬ পান্ডারা রোডের বাড়িতে অবশ্য অবশ্যই খাওয়া হতো। বোনের বাড়িতে সব মিলিয়ে মাসে চাল লাগতো ২০-২৫ কেজি। তখন চালের দাম ছিল ৩- সাড়ে ৩ টাকা। আর দিল্লিতে চালের তেমন মোটা চিকন ছিল না। সাড়ে ৩ টাকা চিকন চাল হলে মোটা চালের দাম হতো ৩ টাকা। শুধু যদি মাননীয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মোটা চালের ভাত খেয়ে টাকা বাঁচাতেন তাহলে ৬-৭ কেজি চালের ৩-৪ টাকা বাঁচতো। সঙ্গে এও লিখেছিলেন, পুরান শাড়ি সেলাই করে নেত্রী শেখ হাসিনা তখন পড়েছেন। এর একটি কথাও বাস্তবচিত ছিল না। তিনি একদিনের জন্যেও কোনো ছেড়া শাড়ি সেলাই করে পড়েননি। পশ্চিমবঙ্গের ফুলিয়া এবং সমুদ্রগড় বলে দু’টি জায়গায় টাঙ্গাইলের প্রায় ৪০-৫০ হাজার তাঁতী বাস করে। তারা সারা ভারতে তাদের উৎপাদিত শাড়ি টাঙ্গাইল শাড়ি বলে চালিয়ে থাকে। টাঙ্গাইলের জগদীশ বলে এক বসাক হঠাৎই সমুদ্রগড় গিয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যতে ভালো উন্নতি করেছে। ফুলিয়া ও সমুদ্রগড়ের যত রকমের শাড়ি আছে সে আমার কাছে নিয়ে আসতো। এখন হয়তো অতটা মান-মর্যাদা আছে কিনা বলতে পারবো না। কিন্তু তখন টাঙ্গাইলের যে কেউ আমাকে তাদের গুরুজন মুরুব্বি বলে মনে করতো। তাই জগদীশের দেয়া যে শাড়ি আমি মাননীয় নেত্রীর জন্যে নিয়ে গেছি সেগুলোই হয়তো তার দুইবার পড়তে হয়নি। আশেপাশের বাড়িতে যেসব বউরা থাকতেন তাদের একজন মহিলাও ছিলেন না যাকে শেখ হাসিনা কোনো না কোনো সময় শাড়ি দেননি। যেখানে থাকতেন সেই পান্ডারা রোডের আশেপাশে উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব মর্যাদার অফিসাররা থাকতেন। আমি যে কাকা নগরে থাকতাম তার আশেপাশে সচিবরা থাকতেন। নেত্রীর বাড়ির এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে এমন কোনো কর্মকর্তার স্ত্রী ছিলেন না যে শেখ হাসিনার কাছ থেকে ২-৪টা শাড়ি পাননি। তা যাইহোক গোলাম মওলা রনিকে আমি অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখি। তিনি কেন কোন উদ্দেশ্যে উর্মির রাষ্ট্র বিরোধী, সমাজ বিরোধী, মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজে পেয়েছেন তা তিনিই জানেন।

অন্যদিকে আমার হৃদয় স্পর্শ করা ব্যক্তিত্ব জেড আই খান পান্না, তিনিও উর্মিকে খুব সাবাসী দিয়েছেন, তার সাহসী পরিচয় খুঁজেছেন। খুঁজতে পারেন। কিন্তু এই বিষয়ে আমি তার কোনো সাহসিকতার, নৈতিকতার স্পর্শও খুঁজে পাচ্ছি না। হ্যাঁ, তিনি পদত্যাগ করে এই বক্তব্য দিলে হয়তো আমিও তার পাশে দাঁড়াতাম। কিন্তু অধ্যাপক ইউনুসের পতন, অধ্যাপক ইউনুস বৈধ, না অবৈধ এই প্রশ্ন করার সুযোগ একজন একেবারে নিম্ন পদস্থ সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তার অধিকারে পড়ে না। ঘুরাফেরা না করে এক কথায় বিচার করলে বলতেই হবে সাধারণ মানুষের সম্মতিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চাইতে বৈধ কোনো প্রশাসন হতে পারে না। এ রকম বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পর বিপ্লব যা নির্দেশ করে সেটাই বৈধ। সেই অর্থে বরং গত ৩ বার জালিয়াতি করে হাসিনা লীগ নেত্রী যে ক্ষমতায় বসেছিলেন তার ক্ষমতাই ছিল অবৈধ। তাই এটা বলতেই হবে তাপসী তাবাসসুম উর্মিকে এ ঔদ্ধতের জন্যে যথাযথ আইনের সামনে দাঁড় করা না হলে জাতির জন্যে দেশের জন্যে মারাত্মক অশুভ হবে। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি বিশেষ করে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, বিষয়টি একেবারে নিরাসক্তভাবে দেখে যথাযথ বিচার করা। অন্যদিকে জেড আই খান পান্নার প্রতিও অনুরোধ থাকবে বিষয়টা আরেকটু ভালো করে দেখবেন, বিবেচনা করবেন।

জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে ঢাকার যাত্রীদের জন্যে সবচাইতে আরাধ্য পরিবহন মেট্রোরেলের যে ক্ষতি হয়েছিল ধ্বংসাবশেষ দেখতে গিয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জারজার হয়ে কেঁদেছিলেন। আন্দোলনে নিহত একজনকেও তিনি দেখতে যাননি। যেহেতু দেখতে যাননি সেইহেতু কান্নাকাটিরও কোনো প্রশ্ন আসে না। কিন্তু মেট্রোরেলের ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি আকুল হয়ে কেঁদেছিলেন। তার কান্না সঠিক হলে নোবেল পুরস্কার দেয়া যেতে পারতো। কিন্তু কুমিরের কান্না হলে সেসব করার সুযোগ কোথায়? মেট্রোরেলের ক্ষয়-ক্ষতি নিয়ে হাসিনা সরকার বেশ কয়েকটি কথা বলেছিল। এক. স্টেশন দুটো চালু করতে বছরের উপর সময় লাগবে। তাদের সেই ভবিষ্যত বাণী ব্যর্থ করে দিয়ে ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচে ২০ দিনের মধ্যে প্রথম স্টেশনটি চালু করা হয়েছিল। দ্বিতীয়টি ৮০-৯০ দিনের মধ্যে এক কোটি পঁচিশ লাখ টাকা খরচ করে চালু করা হলো। বিগত সরকারের ৫০০-৭০০ কোটির জায়গায় যদি এই সামান্য টাকায় এখান ওখান থেকে এটা ওটা এনে স্টেশন চালু করা হয়েছে। যেখানে মেট্রোরেল চালু করতে শেখ হাসিনা সরকার ৫শ’-৭শ’ কোটি টাকা খরচের কথা বলেছিল সেখানে ২-৪ কোটিতে কাজটি হলো। তাহলে এতগুলো বছর এই যে উন্নয়নের নামে অতিরিক্ত টাকা খরচ করা হয়েছে এ টাকা কার? আমাদের যে ঋণের বোঝায় জর্জরিত করা হয়েছে এর জবাব কে দেবে? এইতো ২-৩ মাস আগে আমার এলাকায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার ছেলে ব্যাংক থেকে কয়েক লাখ টাকা নিয়েছিল, সময়মতো দিতে পারেনি ব্যাংক তার নামে ডিক্রী করে তাকে জেলে পুরেছিল। রাষ্ট্রের এই যে বেসুমার অর্থ লোপাট হলো এসবের কি কোনো বিচার হবে না? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিন্তু এসব ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেননি।

বিগত সরকারের সমর্থক শত শত নেতাকর্মী এমপি মন্ত্রী গ্রেপ্তার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তারা কিন্তু কেউ তহবিল তসরূপ অথবা সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হননি। সব অভিযোগ দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-খারাবি, খুনের সঙ্গে জড়িত থাকা বা দাঙ্গায় হুকুম দেয়া। সেদিন প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এবং বিমানমন্ত্রী ফারুক খান গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফারুক খান কেমন রাজা-বাদশার সন্তান ছিলেন জানি না। কিন্তু ড. আব্দুর রাজ্জাক মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর খুবই সাধারণ একজন যোদ্ধা ছিলেন। বাবা মরে যাওয়ায় নানার বাড়ি মানুষ। নাইন-টেনে পড়ার সময় কোনো এক সভায় লতিফ ভাইয়ের সঙ্গে তার পরিচয়। আমরা আমাদের কর্মীদের সব সময় টেনে তোলার চেষ্টা করতাম। লতিফ ভাই সেই থেকে তার পড়ার জন্যে একজন পিতা, একজন সন্তানের জন্যে যা করে তিনি তা করেছেন। স্বাধীনতার পর রাজ্জাক যতবার টাঙ্গাইল গেছে আমি ইনভেলাপে ভরে যা দিয়েছি প্রতিবার টাঙ্গাইল শহরে রাজ্জাক ইচ্ছে করলে একটা করে বাড়ি কিনতে পারতো। কারণ ’৪৮ সালে আমাদের টাঙ্গাইলে আকুরটাকুর পাড়ার প্রথম বাড়ি ৮০১ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন। তারপর পুব-পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিণে আরও ৭০-৮০ ডিসিমেল জায়গা কিনেছিলেন। আমার জানামতে বাবা মরে যাওয়ায় দুইজন নানার বাড়িতে মানুষ। তার একজন ড. আব্দুর রাজ্জাক মধুপুর-ধনবাড়ি, অন্যজন এইচটি ইমাম বাসাইলের সুন্না। বাবা মারা গেলে মা চলে গিয়েছিলেন উল্লাপাড়া বাবার বাড়ি। সেখানে এইচটি ইমাম নানার বাড়িতে মানুষ। আমি যা দেখেছি দু’জনের চাল-চলন আচার-ব্যাবহার প্রায় একই রকম।

mzamin
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম
তাবাসসুম ঊর্মি

 

Thursday, October 10, 2024

এই সাফল্য ধরে রাখতে হবে by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান অধ্যাপক মো. ইউনূসকে নিয়ে অনেক বড় বড় পণ্ডিতের অনেক বড় বড় কথা শুনছি। আমি যখন যা বলার বলেছি, সম্পূর্ণ নিজস্ব উপলব্ধি থেকে বলেছি। এক্ষেত্রেও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার স্তাবকেরা অধ্যাপক ইউনূসকে যত ছোট করেই দেখুন, বিবেচনা করুন, গালি দিন, কিন্তু আমার চোখে অধ্যাপক ইউনূসই বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তি যিনি দেশে-বিদেশে সমানভাবে সমাদৃত, গ্রহণযোগ্য। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হয়েছেন, অনেক সংস্কারে হাত দিয়েছেন, আরও দিবেন। কিন্তু সব কিছু করতে পারবেন না। তিনি যদি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ভালো পুলিশি ব্যবস্থা করতে পারেন, অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থায় অযোগ্যদের ঝেটিয়ে বিদায় এবং বিবেকবান যোগ্যদের দিয়ে বিচার কাঠামো দাঁড় করাতে পারেন তাহলে ইতিহাসে স্থান করে নিবেন।

অতি সমপ্রতি টাঙ্গাইলের এক সামরিক সদস্য নিহত হওয়ায় তার আত্মীয়স্বজনকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলাম। সেখানে বলেছিলাম, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের নয়, শাসন ছিল শেখ হাসিনার। অন্যায়- উৎপীড়ন যা হয়েছে তার ৯০ ভাগ দায়ী শেখ হাসিনা। কিছু কিছু স্তাবকের গায়ে জ্বালা ধরেছে- তারা বলেছে, আমি নাকি শেখ হাসিনাকে আরও ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার কথা বলেছিলাম। সেদিন ইত্তেফাকে লিখেছিলাম, ‘এখানে পেশাব করিবেন না, করিলে ১০ টাকা জরিমানা’। একই জিনিস যদি আবার লেখা হয় ‘এখানে পেশাব করিবেন, না করিলে ১০ টাকা জরিমানা।’ একটা কমাতে বাক্যের কতোটা হেরফের। নিশ্চয় আমি বলেছিলাম, দশ বছর কেন, কেয়ামত পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে আমার আপত্তি কোথায়? ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ভোট চুরি করে ক্ষমতা নয়। দেশ সবার, সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিরোধী দল কোনো কিছু করলেই সেটা ষড়যন্ত্র- এমন মনোভাব নিয়ে আর যা কিছু হোক দেশ চালানো যায় না। নেত্রী শেখ হাসিনা তেমনটাই করেছেন। সতী নারীর পতি যেমন একজন, একজন রাজনৈতিক কর্মীর নেতাও একজন। আমার রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শেখ হাসিনা কখনো আমার নেতা ছিলেন না। তিনি দলীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব করেছেন। দলের নেতা বহু হয় কিন্তু একজন প্রকৃত কর্মীর নেতা একজনই। তাই আমার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি হাসিনা লীগ করি না। আমি করি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। আমাদের প্রতীক নৌকা নয়, গামছা। যতক্ষণ সম্ভব এটাকেই বুকে লালন করবো। জীবন শুরু করেছিলাম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। যেটুকু এসেছি আর কতোই বা বাকি। তাকে হৃদয়ে ধারণ করে, লালন করে পরপারে যেতে চাই। তাই দেশবাসীর কাছে সবসময়ই আমার আন্তরিক অনুরোধ হাসিনা লীগ আর আওয়ামী লীগ এক করে বিচার করবেন না। বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনা এক না। শেখ হাসিনার সন্তানরা এক না। আল্লাহ্‌-রাসুল বাবা-মা’র পরেই যারা রাজনীতি করে তাদের জনতার প্রতি আস্থা থাকতে হয়। তা যারা রাখতে পারে না- তারা আর যাই হোক রাজনৈতিক নেতাকর্মী হতে পারেন না, দেশপ্রেমিক হতে পারেন না। তাই বিষয়গুলো একটু গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
নানা জনের নানা মত, তেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। নির্বিঘ্নে সবাই সবার মত ব্যক্ত করতে পারলে আর কিছু না হোক আমাদের কোথায় কোনদিকে যেতে হবে বা যাচ্ছি- তার একটা রাস্তা সহজ হয়।

চাপা দেয়া আগুন খুব একটা নিরাপদ নয়। আগুন যত চাপা দেয়াই হোক এক সময় সেটা বেরিয়ে আসবেই। তাই সবাই মিলে চেষ্টা করে যেকোনো আগুন নিভিয়ে ফেলা উত্তম। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান অধ্যাপক মো. ইউনূসকে নিয়ে অনেক বড় বড় পণ্ডিতের অনেক বড় বড় কথা শুনছি। আমি যখন যা বলার বলেছি, সম্পূর্ণ নিজস্ব উপলব্ধি থেকে বলেছি। এক্ষেত্রেও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার স্তাবকেরা অধ্যাপক ইউনূসকে যত ছোট করেই দেখুন, বিবেচনা করুন, গালি দিন, কিন্তু আমার চোখে অধ্যাপক ইউনূসই বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তি যিনি দেশে-বিদেশে সমানভাবে সমাদৃত, গ্রহণযোগ্য। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হয়েছেন, অনেক সংস্কারে হাত দিয়েছেন, আরও দিবেন। কিন্তু সব কিছু করতে পারবেন না। তিনি যদি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ভালো পুলিশি ব্যবস্থা করতে পারেন, অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থায় অযোগ্যদের ঝেটিয়ে বিদায় এবং বিবেকবান যোগ্যদের দিয়ে বিচার কাঠামো দাঁড় করাতে পারেন তাহলে ইতিহাসে স্থান করে নিবেন। এসব কিছুর জন্য অবশ্য অবশ্যই একটি নির্ভেজাল সরকারি প্রভাবমুক্ত পক্ষপাতহীন জাতীয় নির্বাচনের প্রয়োজন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শেষ পর্যন্ত সব ক’টি নির্বাচনে ১০-১৫ শতাংশ ভোটারের বেশি অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু আমার দৃঢ়বিশ্বাস অধ্যাপক মো. ইউনূসের আহ্বানে ঠিক উপযুক্ত সময়ে নির্বাচন হলে তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ৭০-৮০ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করবে। ব্যাপক ভোটারের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে ভোট চোরদের সম্পূর্ণভাবে বিরত করবে। তেমন একটা উৎসবমুখর পরিবেশে অনেকের নির্বাচনে দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না। ভোটারের অংশগ্রহণই ভোটে অর্ধেক কারচুপি আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যাবে।

নানাদিকে নানা আলোচনা। স্বাধীনতার এই ৫৩-৫৪ বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক মহান কর্ম সাধন করেছে। ধীরে ধীরে তারা যেমন মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল, সেটা পুরো মাত্রায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমান সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে নানা জন নানা কথা বলেছে। কিন্তু তিনি জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে যে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন- জনতার কণ্ঠে ‘এই মুহূর্তে দরকার-সেনাবাহিনীর সরকার’। এটা খুব সহজ কথা নয়। সত্যিই আমাদের সামরিক বাহিনীর সরকার দরকার নেই। কিন্তু দুর্যোগ-দুর্বিপাকের সময় মানুষ যে তাদের অতটা ভরসা করেছে এসব স্লোগান তারই প্রমাণ। মানুষের অন্তর থেকে পতিত সেনাবাহিনী বুকের ঠিক মধ্যখানে-যে অন্তরে স্রষ্টার বাস সেইখানে জায়গা করে নিয়েছে। তার স্বজন বংশধরবৃন্দ ভবিষ্যতে এর সুফল পাবে। জানি খুব উতলা হওয়ার কারণ নেই। সময় সব সমস্যা সমাধানে মস্ত বড় নিয়ামক।

অন্য একটা প্রসঙ্গ নিয়ে দু’কথা বলি। ইদানীং যেখানে সেখানে যে অসঙ্গতি দেখি তা আমাকে আহত করে। প্রায় ১ যুগ পর টাঙ্গাইল কোর্টে গিয়েছিলাম। সেটা এক জর্জ কোর্ট। জেলা জজের পরই কেউ হবেন। সওয়াল জবাবের শেষে মাননীয় জজ সাহেবের অনুমতি নিয়ে দু’কথা বলেছিলাম। প্রায় ১ ঘণ্টা তার সাক্ষ্য শুনছিলাম তিনি একটি প্রতিষ্ঠিত নামকরা কলেজের অধ্যক্ষ। ১০-১২ ফুট দূর থেকে তার সাক্ষ্য শুনছি। ও রকম একটা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যে সাক্ষী তিনি দিলেন তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি। তার যদি অক্ষর জ্ঞান না থাকতো, তিনি যদি অতি সাধারণ হতেন, তাহলে তার ঐ সাক্ষ্য মানাতো। ওরকম একজন অনুপযুক্ত ব্যক্তি যদি অমন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়, তাহলে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা বের হবেন, তারা জাতি ও সমাজের জন্য কিছু করতে পারবেন না। জজ সাহেবের সামনে আমার নিবেদন তুলে ধরে ভালো লেগেছে। জজ সাহেবের ধারণ ক্ষমতা, বাচন ভঙ্গি আমার কাছে অতুলনীয় মনে হয়েছে। কিন্তু কোর্ট কাচারির পরিবেশ একেবারেই ভালো লাগেনি। মনে হয় জেলা জজের পরেই তিনি। তার বিচারালয়টি খুবই অপরিষ্কার, দেয়ালে রঙ নেই, মেঝেতে ঝাড়ু পড়েনি। যে আসনে বসেছিলেন, সে আসনেরও রঙ চটা। উকিল বার থেকে জর্জ কোর্ট পর্যন্ত কোনো মাছের বাজারের চাইতে সুন্দর দেখিনি। আশেপাশে যে নোংরা আবর্জনা পড়ে আছে আমাকে বললে তা পরিষ্কার করতে বড়জোড় একদিনের প্রয়োজন হবে। জেলা সদরের ফৌজদারি আদালতের আশপাশ দেখে বড় হতাশ হয়েছি। জেলা সদরে আমার তেমন যাতায়াত নেই। একদিকে ডিসির, অন্যদিকে এসপি’র অফিস। দু’চার- ছ’মাসে দু’একবার গেছি। কিন্তু কোর্ট কাচারিতে তেমন যাওয়া হয়নি। নোংরা দেখে বড় হতাশ হয়েছি। বেঁচে থাকলে জায়গাগুলো পয়-পরিষ্কার পবিত্র দেখলে আনন্দে হৃদয় ভরে যেতো।

mzamin

Friday, October 4, 2024

জাতিসংঘে আমাদের ৫০ বছরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

তেমন অনেক কিছু বলা যায় না, বলা ঠিকও না। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর লন্ডন থেকে তারেক রহমান যা বলেছেন বা বলছেন দেশবাসী তাতে অনেকটাই খুশি। আমিও অভিভূত। কিন্তু তার অনুরোধ নির্দেশ আহ্বান তার দলীয় নেতাকর্মীদের উপর তেমন প্রভাব ফেলছে বলে মনে হয় না। তা না হলে হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে কেন এমন করবেন? এতদিন আওয়ামী লীগ খেয়েছে এখন আমরা খাবো। বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মীর এমন জোর জবরদস্তির কারণে আন্দোলন পরবর্তী বিএনপি’র জনপ্রিয়তা যতটা সাবলীল শক্তিশালী ছিল সেটা অনেকটা কমে গেছে। এটা জানি, সমালোচনা কারোরই ভালো লাগে না।

জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যভুক্তির ৫০ বছর উদ্‌যাপন উপলক্ষে বিশ্বখ্যাত নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিসংঘের আঙিনায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলাপ- আলোচনা এবং জাতিসংঘে ভাষণ আমার চোখে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এজন্য বিশ্বনন্দিত নাগরিক, বাংলার সম্পদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশবাসী এবং আমার, আমার দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।

স্বাধীনতার পর আমরা যখন জাতিসংঘের সদস্য হই তখন বাংলাদেশের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন সেদিন তার ভাষণ তর্জমা করে শুনাবার বা ট্রান্সলেট করার ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু এখন জাতিসংঘে যে নেতাই ভাষণ দেন না কেন বেশ কয়েকটি ভাষায় সে ভাষণটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভাষান্তরিত হয়ে থাকে। বাঙালির গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব অধ্যাপক ইউনূস যখন ‘বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে ভাষণ শুরু করেন আমি তার শেষ শব্দ পর্যন্ত হৃদয়াঙ্গম করার চেষ্টা করেছি। অনেক সময় অনেক শব্দ বলার মধ্যদিয়ে অর্থ পরিবর্তন হয়, শব্দার্থের গভীরতা বাড়ে বা কমে। যৌবনে ৫০ বছর আগে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে যত খুশি হয়েছিলাম জীবনের শেষ প্রান্তে বাংলাদেশ দলের প্রধান হিসেবে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ শুনে ততটাই খুশি হয়েছি। বলতে গেলে এই অবক্ষয়ের জামানায় তার চাইতেও হয়তো কিছুটা বেশি খুশি হয়েছি। দেশ চলবে জনগণের সম্মতিতে। কিন্তু গত ১৫-১৬ বছর শেখ হাসিনা যেভাবে নির্বাচনের নামে গণতন্ত্র হত্যা করেছেন ঐ ধরনের গণতন্ত্র দেশের মানুষ খুব একটা চায় না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকাল দুই মাসও হয়নি। এ যাবৎকাল সরকার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার কথা বলে যাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন সেখানে আমাদের অনেককে মনে হয় খরচের খাতায় রেখে দিয়েছেন। এটা কোনো গণতন্ত্র নয়। উপদেষ্টাদের শপথ অনুষ্ঠানে গভীর আন্তরিকতা নিয়ে দাওয়াত করা হয়েছিল। তাই গিয়েছিলাম। এতে লক্ষ কোটি মানুষ খুশি হলেও ২-৪ জন নির্বোধ অখুশিও হয়েছে। সারাজীবন কারও খুশি-অখুশি বিবেচনা করে কাজ করিনি। নিজের অন্তরাত্মাকে খুশি করার কামনা-বাসনা নিয়ে কাজ করেছি। বাকি সময়টুকুও তাই করে যাবো। কারও দিকে ঝোল টেনে অথবা কারও দিকে বিদ্বেষপ্রসূত কোনো কাজ করবো না।

বহুদিন পর মানবজমিনের প্রাণ ভোমরা জনাব মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং কথা হলো। কিছু কিছু জিনিস আমি মেনে নিতে পারি না। যেই রাষ্ট্র চালান তারই বা কর্তৃপক্ষের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ নিয়ে প্রতি বছর অন্তত দুইবার জাতীয় সম্মেলন করা উচিত। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজকে ডাকা উচিত। সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী- সবাইকে অন্তত বছরে একবার আনুষ্ঠানিকভাবে ডেকে মতামত নেয়া উচিত। বিগত সরকার যেমন তার ১৫-১৬ বছরে জাতীয় কোনো সমস্যা নিয়ে একবারের জন্যও বিরোধী দলের মতামত গ্রহণ বা সাধারণ আলোচনা করেনি। মাননীয় নেত্রী বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে মাঝেমধ্যেই তালিকা করা দালাল সাংবাদিক বা সম্পাদকদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতেন। প্রশ্নগুলো মনে হয় আগে থেকেই তৈরি করা থাকতো। যা থেকে প্রধানমন্ত্রী নিজেও লাভবান হতেন না, দেশও হতো না। আলাপের এক পর্যায়ে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছিলেন, শেখ হাসিনার পুরো আমল জুড়ে একবারের জন্যও সাংবাদিক হিসেবে আমন্ত্রণ পাইনি। এটাই স্বাভাবিক। তিনি যা করেছেন তার ফলও পেয়েছেন। এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমার মাথাব্যথা তার কর্মকাণ্ডে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে সেটার প্রতিকার কি করে হবে। সর্বত্র ঘুষ-দুর্নীতিতে দেশটা একেবারে ছেয়ে গেছে। যে লেখক বা সংবাদপত্র তেমন লেজুড়ভিত্তি করতে চায়নি তাদের খরচের খাতায় ফেলতেন। এটা কোনো ভালো কথা নয়। অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।’ বাংলাদেশের পিতা বঙ্গবন্ধু এক সময় ছিলেন সারা জাতির শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতীক, ভালোবাসার আরাধ্য ধন। ১৬ বছর শেখ হাসিনার শাসনামল বঙ্গবন্ধুকে আরও বেশি জাতির আপনজনে পরিণত করার চেষ্টা করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে তাকে একেবারে দলীয় করা হয়েছিল। অমনটা করা মোটেই ভালো হয়নি। যেমন করেছেন তেমন ফল পেয়েছেন। কতোবার বলেছি, সংযত আচরণ করুন, সংযত হয়ে কথা বলুন। না, উনি ওনার জন্মগত স্বভাব কখনো বদলাননি বা বদলাবার চেষ্টা করেননি। এ নিয়ে শেখ রেহানাও ২-৪ বার বলেছে, ভাই আপনি জানেনই তো হাসু আপা অমনই। তাকে বলে কয়ে বুঝানো যায় না। কি বলবো, রাষ্ট্রে ‘অমনই তো’ চলে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় সব সময় মেপেজোখে কথা বলতে হয়। কিন্তু সেদিকে কোনোদিন তিনি পা মাড়াননি। আমার তো তেমন বিদ্যা-বুদ্ধি নেই। আমি রাস্তাঘাটে যা দেখি তা থেকেই শিখি। পাকিস্তান আমলে অনেক সময় দেখতাম পাড়ায় পাড়ায় নাটক-থিয়েটার হতো। নাটক মঞ্চায়নের জন্য মাসের পর মাস রিহার্সেল হতো। যেদিন মঞ্চায়ন হতো সেদিন হয়তো ২-১ হাজার দর্শকশ্রোতা একত্র হতো। তাদের সামনে শিল্পীদের উপস্থাপনের কতো রকমের প্রস্তুতি, কতো যত্ন কথাবার্তা বলার, কতো সাবলীলতা কতোটা উঠানামা হবে দিনের পর দিন শিখানো হতো, দেখানো হতো। কিন্তু আজ জাতীয় নেতারা লক্ষ কোটি মানুষের সামনে কথা বলেন কিন্তু সংযত হন না। একবারের জন্যও ভাবেন না কীভাবে কতোটা গভীরতা নিয়ে, কতোটা দরদ দিয়ে কোন বাক্যটা কীভাবে উচ্চারণ করা উচিত। এবার জাতিসংঘে ভাষণের সময় আমাদের গুণী সন্তান অধ্যাপক ইউনূস যে দরদ দিয়ে প্যালেস্টাইনের কথা তুলে ধরেছেন, ইসরাইলের বর্বরতাকে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে আমাদের সকলের অন্তর ছুঁয়ে গেছে। এর আগে অনেকবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু সেখানে অতটা দরদ খুঁজে পাওয়া যায়নি যতটা সেদিন অধ্যাপক ইউনূসের কণ্ঠে পাওয়া গেছে। বাংলা ভাষায় একই শব্দ শুধু উচ্চারণের হেরফেরে হ্যাঁ না হয়ে যায়। কিন্তু অবাক কাণ্ড তেমন কারোরই সাধারণ মানুষ সম্পর্কে খুব একটা গুরুত্ব নেই। এ ব্যাপারে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সাধারণ মানুষের মর্যাদা হিমালয়সম সুদৃঢ় করবে। যদিও এখনো অনেকের হুঁশ নেই। এখনো কাজ করার সময় অনেক কর্মকর্তা টাকা-পয়সার জন্য হা হয়ে থাকেন। এখনো যদি শিক্ষা না হয় তাহলে অনেকেই ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
দু’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে না বলে পারছি না। একটি হলো- সাগর-রুনি যখন নিহত হয় তখন বাংলাদেশের সবচাইতে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সাহারা খাতুন। তিনি বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। কেন যেন সে সময় বলেছিলাম, ৪৮ ঘণ্টা তো দূরের কথা ৪৮ সপ্তাহ অথবা ৪৮ মাসেও অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের হাতে সোপর্দ করা যাবে না। কারণ সাগর-রুনি হত্যার সঙ্গে অনেক শক্তিমানরা জড়িত। জানি না, এ হত্যাকাণ্ডটির বিচার ৪৮ মাস তো হয়েই গেল, ৪৮ বছর লাগবে কিনা।

অন্যটি ক’দিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫, অবসর ৬৫। এখন দেখছি- সবই হাওয়া থেকে পাওয়া। বাস্তবের কোনো চিহ্ন নেই। কতোবার বলার চেষ্টা করেছি, সময়ের কাজ সময়ে করেন। কিন্তু কেউ সময়ের কাজ সময়ে করে না বা ভাবে না। সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ৩৫ বছর এ খুবই যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য দাবি। এর জন্য আবার কমিটি কি? ছাত্র-যুবকদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে টানাটানি, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দরকষাকষি এর কোনোটাই ভালো না। আমি খোলা মনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানকে এসব সমাধানের জোর দাবি জানাচ্ছি।

তেমন অনেক কিছু বলা যায় না, বলা ঠিকও না। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর লন্ডন থেকে তারেক রহমান যা বলেছেন বা বলছেন দেশবাসী তাতে অনেকটাই খুশি। আমিও অভিভূত। কিন্তু তার অনুরোধ নির্দেশ আহ্বান তার দলীয় নেতাকর্মীদের উপর তেমন প্রভাব ফেলছে বলে মনে হয় না। তা না হলে হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে কেন এমন করবেন? এতদিন আওয়ামী লীগ খেয়েছে এখন আমরা খাবো। বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মীর এমন জোর জবরদস্তির কারণে আন্দোলন পরবর্তী বিএনপি’র জনপ্রিয়তা যতটা সাবলীল শক্তিশালী ছিল সেটা অনেকটা কমে গেছে। এটা জানি, সমালোচনা কারোরই ভালো লাগে না। সত্য কথা এত কঠিন যা হজম করা খুব একটা সহজ নয়। আওয়ামী লীগ যেমন সব দোষ দিতো বিএনপি-জামায়াতকে, এখন সব দোষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দিলে কোনো শুভ ফল হবে না। অতীতে কোনো গণআন্দোলনে এত জীবন বিসর্জন দেয়নি। এই আত্মত্যাগ ব্যর্থ হলে জাতিকে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হবে। তাই স্বাধীনতা ভোগ করতে কিছুটা দায়িত্ববোধেরও পরিচয় দিতে হবে। রাস্তাঘাটে মানুষের মধ্যে যা দেখছি তাতে তারা খুবই আশাবাদী। তারা তাদের প্রকৃত অধিকার চায়- সম্মান চায় এবং জনতা তাদের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব চায়।

mzamin

Saturday, August 3, 2024

সাক্ষাৎকার: ছাত্র-যুবকরা মরে যায়নি, আন্দোলনে প্রমাণিত -বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

সাধারণ ছাত্ররা কোটার সংস্কার চেয়ে আন্দোলন শুরু করেছে। যেটি খুব স্বাভাবিক। আমার এতদিন মনে হয়েছিল যে এ দেশে ছাত্র-যুবক মরে গেছে। এ আন্দোলনে প্রমাণ হয়েছে যে ছাত্র-যুবক কখনো মরে না। তারা হয়তো স্তিমিত হয়ে থাকে, ঝিমিয়ে থাকে, নুয়ে থাকে কিন্তু তারা কখনো মরে না। নির্লোভ ছাত্ররা মরে গেলে জাতি-দেশ বেঁচে থাকে না। দেশে চলমান ছাত্র আন্দোলন নিয়ে মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনই মন্তব্য করেছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। রণাঙ্গণের এ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, যে নেতার নেতৃত্বে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, তার-ই কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে ২০০ হোক আর দুইজন হোক- একটা প্রাণও ঝরা উচিত না। বাংলাদেশের অর্ধেক ধ্বংস কিংবা পুরো ছারখার হয়ে গেলে- বাড়িঘর, গাড়ি, স্থাপনা সবই করা যাবে কিন্তু এ পৃথিবীতে একটি মানুষও জন্মায়নি যিনি একটা মৃত মানুষকে জীবিত করে দিতে পারে। তাই আমি মনে করি একটা কেন দশটা দেশ ধ্বংসের চেয়ে একটা প্রাণ ধ্বংস অনেক বড় জিনিস। সেটা করা বা হওয়া উচিত না।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেকের কানে পানি যায় না। এ যে শিক্ষকদের আন্দোলনের দাবিও যৌক্তিক। এ জিনিসগুলো খুব তলিয়ে দেখা হয় না। রাষ্ট্রের যেভাবে গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার সেভাবে দেখা হয় না। সেটাই হচ্ছে অসুবিধা। ছাত্রদের আন্দোলনটা গোড়াতেই মনযোগ দেয়া উচিত ছিল। ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।
বঙ্গবীর বলেন, আমি ছাত্রলীগ করা মানুষ। আমাদের সময় ছাত্রদের প্রতি দেশের মানুষের যে আস্থা, ভালোবাসা, ভরসা ছিল- এখন তার বিন্দুমাত্রও নেই। ইতিহাস ঘুরে ফিরেই আসে। ষাটের দশকে মোনায়েম খান বলে আইয়ুব খানের একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন। মোনায়েম খানের ছাত্র সংগঠন ছিল এনএসএফ। আমাদের বিরুদ্ধে লাঠিসোটা নিয়ে অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছে। পুলিশ আজকের দিনের মতো সাহায্য করেছে। একটা সময় সমস্ত দেশের ছাত্ররা একজোট এক প্রাণ হয়ে গেছে তখন তুলার থেকেও হালকা হয়ে উড়ে গেছে।

শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রীর রাজাকার বলার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা খুবই ভালো কাজ হয়নি। আমি আমার বোনকে বলেছি। কখনো কখনো শোনেন কখনো শোনেন না। উনি যদি পরদিন ক্ষমা চাইতেন যে আমি এভাবে বলিনি। তখন দশ ভাগের একভাগ আন্দোলন হতো না।

পুলিশের গুলিতে নয়, সহিংসতায় ছাত্র-জনতা নিহত হয়েছেন বলে সরকারের দাবির বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, তারা সহিংসতায় নয়, ঘরের বারান্দায় যে গুলিতে নিহত হয়েছেন। সেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুঁড়ছেন মারা গেছে। মিথ্যা অজুহাত দিয়ে কেউ পার পেতে পারে না। সরকারকে বলবো এখনো সময় আছে সত্য বলার সাহস দেখানো উচিত। যার সত্য বলার সাহস নেই তার কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই। হয়তো সাময়িক কিছু হতে পারে। আন্দোলনকারীদের হাতে ইটপাটকেল, লাঠি, ছুরি থাকতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে ছররা গুলি নেই। ন্যায়বিচার নাই বলে এত অশান্তি। তিনি বলেন, ভুল স্বীকার করার মতো শক্তিশালী অস্ত্র দুনিয়াতে আর কিছু নেই। ভুল স্বীকার করলে সাময়িক একটা চাপ হতে পারে। কোনো কোনো সময় মাপ চাওয়ার ফলে দুই-তিন কিংবা দশগুণও শক্তি বৃদ্ধি পায়। সে সময় আমার বোন শেখ হাসিনা হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু তিনি করতে পারতেন এখনো করতে পারেন। কিন্তু ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়ার মতো জঘন্যতম অপরাধ আর হতে পারে না। আমার তো ধারণা ছিল যে ছাত্রলীগও এ আন্দোলনের পক্ষে গিয়ে এ আন্দোলনকে জোরদার করে সফলকাম করবে। এবং সেই আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দেবে। এখন তো নেতৃত্ব দেয়ার চাইতে বিরুদ্ধে চলে গেছে। আজকে ছাত্রলীগের কোনো সম্মান নেই। আমি কখনো ভাবিনি ছাত্রলীগের সভাপতির কক্ষ তছনছ করা হবে। মানুষের শক্তির কাছে কোনো শক্তির টিকবার ক্ষমতা নেই। এটা আনবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী। তিনি বলেন, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। আগেও ১৬ কি ২১ বছর বিএনপি ক্ষমতায় ছিল- সবাই বিএনপি হয়ে গেছে। এটা একটা জাতির জন্য শুভ না। বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা ১৪ দল দেশ না। ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে দেশ।

ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে ডিবিতে আটকে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ৬ সমন্বয়ককে নিরাপত্তার জন্য ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এটা কী কোনো আইনের কথা? নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে। ডিবির উপ-কমিশনারের (হারুন-অর-রশিদ) দেখবার কী আছে? এর জন্য ওই পুলিশ কর্মকর্তার জেল হওয়া উচিত। রাষ্ট্র আইন ও সংবিধান অনুযায়ী চললে একজন নাগরিককে আটকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। আজ হারুন যেটা করছে, বেনজীর আহমেদ (সাবেক আইজিপি) কী সেটা করেনি ৫-৭ বছর আগে। বেনজীরের যে অবস্থা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছর পর কী হারুনের তার থেকে খারাপ অবস্থা হতে পারে না? আমি বলবো, এত বাড়াবাড়ি ভালো না।

কোটার বিষয়ে তিনি বলেন, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন ৭ শতাংশ। ছাত্ররাও ৯৩ শতাংশ চায়নি। পিছিয়ে পড়া বহু মানুষ আছে তাদের জন্য কোটা থাকা উচিত। মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচ শতাংশও সম্মানজনকভাবে দিলে এতেই মুক্তিযোদ্ধারা খুশি। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলেরা ভিক্ষা চায়নি। এখানে অনেক প্রশ্ন আছে। মেধাহীনদের জন্য কোনো কোটা নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা ভোগাস, মশকারি। আমরা দেখেছি স্বাধীনতার পর থেকে কখনো কোটার থেকে ১৩ শতাংশের ওপরে নেয়া যায়নি। কারণ কোটায় পাশ করার লোক নেই। কোটার সুবিধা এর বেশি নয়। ছাত্রদের আন্দোলন করা উচিত ছিল যে ছাত্রলীগের কোটা বন্ধ করতে হবে। অথচ যারা স্বাধীনতা এনেছেন, রক্ত দিয়েছেন, যাদের সম্মান থাকার কথা- সেই মুক্তিযোদ্ধরাই আজকে কিন্তু বিতর্কিত হয়েছে। অসম্মানিত হচ্ছেন। আজ বঙ্গবন্ধুর গায়ে ঢিল ছুঁড়ছে, শাবল মারছে, লাথি মারছে- এত মনে হয় আমার গায়ে মারছে। মুসলমান হিসেবে কোনো প্রতিমা-মূর্তি পছন্দ করি না। কিন্তু যারা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বানিয়েছেন তারা যদি সেই ম্যুরালের সম্মান রাখতে না পারেন তখন এটা বানিয়ে কী করেছেন। মোটেই ভালো কাজ করেননি। সাধারণ ছাত্রদের বলবো- সরকারি কোটা বন্ধের দাবি করতে হবে। যে যখন সরকার তখন সেই সরকার তার লোককে যোগ্য হোক অযোগ্য হোক নিয়োগ দেয়। কাদের সিদ্দিকী বলেন, পাকিস্তান বৈষম্য না করলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হতো না, এত রক্ত-জীবন দিতে হতো না। আরও বৈষম্য ছিল ৯৮ শতাংশ আসন পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। সে সময় ভোটের রায় মানা হয়নি সে জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।

কাদের সিদ্দিকী বলেন, এক সময় ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের নেতৃত্ব করতেন। তার নেতৃত্বের প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু এখন তিনি সেই প্রশংসার কাজ করেন না। যত অঘটন তার অনেক বেশি দায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা এবং গুলির নির্দেশ দেয়া। তার গুলির নির্দেশ দেয়ার সুযোগ নেই। যদি দিতে হয় যারা আইনানুগ ক্ষমতাপ্রাপ্ত তারা বলবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশ অসম্ভব। যদি সরকার গুলির নির্দেশ দিলো আবার শোক পালনের মানে কী হয়? এটা সাংঘর্ষিক। হ্যাঁ, যদি সরকার না দিতেন তাহলে ভিন্ন কথা। এ যেমন কারফিউ জারি হয়েছে- সেখানে গুলি হলে সেখানে সরকার করতে পারতেন। সরকারি দলের সরকার হওয়া উচিত না, সরকার দেশের মানুষের হওয়া উচিত। যারা আন্দোলন করছে তাদের কিংবা যারা ফিরাচ্ছে তাদের সবার হওয়া উচিত। এবার দেখা যাচ্ছে সরকার আন্দোলনকারীদের পক্ষে না। আন্দোলনকারীদের প্রতিও যে তাদের দায় দায়িত্ব আছে সেটার পরিচয়ও দিতে পারেনি।

ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে তিনি বলেন, সব সময় সব মানুষের কার্যক্ষমতা এক থাকে না। আমি মুক্তিযুদ্ধে একটা ভয়াবহ অবস্থায় রুখে দাঁড়াতে পেরেছিলাম। আজকেও যে পারবো সেটাতো সত্য নয়। ওবায়দুল কাদের একটা সময় সত্যিই ছাত্রদের উদ্দীপ্ত ও সংগঠিত করেছেন। এখন তার সেই ভাবমূর্তি নেই। আরেকটা বিষয় হচ্ছে তিনি প্রচণ্ড রকম অসুস্থ। কয়েকদিন আগেও বলেছিলাম তাকে ডাক্তারের পরীক্ষা করে দেখা উচিত। তিনি এবার সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তার কথাগুলো বাস্তবের সঙ্গে মিলছে না। মানুষকে টানছে না। আকৃষ্ট করছে না। রাজনৈতিক নেতার কথায় মানুষকে আকৃষ্ট করতে হয়। বন্দুক কামান দিয়ে তিনি সবকিছু দখল করে নেবেন এটা হবে না। জয় করতে হবে কথা ব্যবহারের মাধ্যমে। সেখানে ত্রুটি হচ্ছে। এমনকি আমি একটি লেখায় তাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথাও বলেছি। সাধারণ মানুষ থেকেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ২০-৩০ গুণ বেশি ক্ষুব্ধ ওবায়দুল কাদেরর প্রতি। এটা কী করবেন- যখন কেউ পিছিয়ে আসে বা তাকে পছন্দ না হয় তাহলে তাকে তো সরিয়ে দিতে হবে, বা পিছনে দিতে হবে।
সরকারি স্থাপনায় হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, সেতু ভবনের জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভিডিও দেখলাম। এটা দেখে মনে হয়েছে যে তারা কী আগ থেকেই এটা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল। ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে ২০-২৫ জন লোক সেটি করেছে। কিন্তু ওই ভবন পাহারা দেয়ার জন্য কম করে ৫০ জন আনসার ছিল, পাহারাদার ছিল। গাড়িগুলোর ড্রাইভার ও সহযোগী ছিল। একটা মানুষও তো বাধা দেয়নি। তাহলে এটা কী? যারা ওখানে আছেন তারা তো রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার কোনো চেষ্টা করেননি। আবার ওটার জন্য আন্দালিব রহমান পার্থকে (বিজিপির চেয়ারম্যান) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ জ্বালাও পোড়াওয়ের সঙ্গে ওর যে চরিত্র আমরা দেখেছি এ কুকাম করার মতো অবস্থা ওর নেই। তাহলে দেশটা কোন ভাবে চলছে।

গণহারে গ্রেপ্তারের বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, বড় কিছু হলে ছোট জিনিস দেখতে নেই। এ রকম একটা বড় ঘটনায় একটা মানুষকেও আর গ্রেপ্তার করা সরকারের জন্য উচিত না। এটার পরিণতি ভয়াবহ হবে। আজকে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হয়তো এ আন্দোলনের সঙ্গেও নেই। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিরোধীদের পক্ষে যাবে। এটা ক্ষতির কারণ হবে। নিজে চোখে দেখেছি অনেক মা-বাবা তাদের সন্তান নিয়ে রাস্তায় এসেছেন। ১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব খানের পতন হলো তখন আমি জেলে ছিলাম। আমাদের কারও কারও নামে ৮০-৯০টা মামলা ছিল। আইয়ুব খান যখন চলে গেলেন তখন সবকিছু কিন্তু বাতিল হয়ে গেল। এ আন্দোলনের জন্য একজন মানুষকেও আর গ্রেপ্তার করা উচিত না। বিএনপি, জামায়াত, শিবির- আন্দোলনের জন্য তাদেরও গ্রেপ্তার করা উচিত না। যদি দেশে শান্তি, সমৃদ্ধি চান। বলতে পারেন- যারা এসব করেছে তাদের শাস্তি দিতে হবে না? হবে। তবে যখন হাজার মানুষ মিলে কোনো ঘটনা ঘটায় তখন ওই ঘটনায় হাজার মানুষকে আর বিব্রত করা হয় না।

তিনি বলেন, বিরোধী মত প্রকাশ করলেই ট্যাগ দিয়ে দেয়া ভালো না। বাংলাদেশটা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের বা রাজাকারের না। বাংলাদেশটা বাংলাদেশের মানুষের। নিশ্চয় মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা সম্মান থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে রাজাকার বলে কেউ নেই। রাজাকারের মানসিকতা থাকতে পারে। চিন্তা চেতনা ধারণ করতে পারে।

আন্দোলন নিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনটি অল্প সময়ে গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু এখন আন্দোলনটি যারা রিয়েল আন্দোলন করছে তাদের হাতে নেই। সরকার যেমন বলছে বিএনপি-জামায়াত, শিবির এটা করছে। তাদের যদি এত শক্তি থাকতো তাহলে আমাদের আওয়ামী লীগের সরকার থাকার কথা ছিল না। তাদের একটা নেতাকর্মীরও ঘুমানোর কথা ছিল না। এতটা শক্তি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে নেই। মানুষের মধ্যে একটা বিক্ষোভ-জ্বালা, এ আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে। এখন যদি ছাত্রবন্ধুরা এটা এগিয়ে নিতে চায় তাহলে তারা ফেইল করবে। তাদের সঙ্গে মানুষ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। এ সরকারকে যা খুশি করা বা বলা যায় এটা যে ঠিক না এটাকে বুঝানোর জন্য কিন্তু মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। যদি সরকারই সমন্বয়কদের ধরে নিয়ে না যেতো, বাচ্চাদের গ্রেপ্তার না করতো।

সমাধানের বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, স্পষ্ট বলতে হয়- রাজনীতির মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার বোন প্রথমে ডেকেছেন ব্যবসায়ীদের। তারা কি সরকারকে রাখতে পারবে? তারা নাকি সর্বস্ব দিয়ে এ সরকারকে রাখবে। তাহলে এটা কি ব্যবসায়ীর সরকার। আমরাতো জনগণের সরকার চাই। তাহলে আমরা ভুল করছি। তিনি যত তাড়াতাড়ি সবাইকে ডাকবেন তিনি একটা শ্বাস নেয়ার সুযোগ পাবেন। সবাই তার ডাকে সাড়া দিক আর না দিক। সব কাজে সবাইকে যেতে হয় না, যায়ও না। কিন্তু ডাকতে হয়। দেশ যখন সবার তাহলে সবাইকে নিয়ে সংলাপে যেতে হবে। দেশ আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলের না কেবল। আওয়ামী লীগ ছাড়া ১৪ দল ১৪ ভোটও পাবে না। এখন যে অবস্থা আওয়ামী লীগের নৌকাও পার পাবে না। হাঁটু পানিতে পড়ে যাবে। তাই বাস্তবকে স্বীকার করতে হবে। বঙ্গবন্ধু যত প্রিয় ছিলেন তার জন্য মানুষ নামাজ পড়েছেন। সেই বঙ্গবন্ধুকে আজ গালি দিচ্ছে। এটা কি তার কারণে না আমাদের কর্মকাণ্ডের জন্য দিচ্ছে। আমরা আমাদের দোষে এ রকম একজন মহান নেতাকে দোষী করছি। এটাতো ভালো কাজ না।
জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়াত নামের একটি দলকে নিষিদ্ধ করবেন। কিন্তু তাদের বিদ্যা, বুদ্ধি, অর্থ, সামর্থ- এগুলোকে কি আটকাতে পারবেন? ওকে নিষিদ্ধ করলেইতো হবে না। জামায়াত দলকে নিষিদ্ধ করবেন, অন্য নামে তারা দল চালাবে। মূল কথা হলো তাদের সামর্থ। সামাজিক ছত্রছায়ায় জামায়াতের যেসব সংগঠন গড়ে উঠেছে সেগুলো যতদিন থাকবে ততদিন জামায়াতের পশম পর্যন্ত আপনি স্পর্শ করতে পারবেন না। জামায়াতের যে হাসপাতালগুলো রয়েছে সেটা বন্ধ হলেতো চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে। ইবনে সিনার যত টাকা আছে তা দিয়ে জামায়াতের সব কর্মীদের দুই চার বছর চালানো যাবে। তাই এ রকম নিষিদ্ধ করলে হবে না। নিষিদ্ধ করার মতো ক্ষমতা থাকতে হবে। সুযোগ, জ্ঞান, বুদ্ধি থাকতে হবে। জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী তাদের এত দূরে আসতে দিলেন কেন।

নিজের জীবনে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব নিয়ে বলতে গিয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর কর্মী। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের প্রেম হয়েছে। তাকে পেয়েছি বলেই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছি। তা না হলে রাজাকারও হতাম কিনা বলা যায় না। বোধ জাগতো না। বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি রাজনীতিতে এসে। রাজনীতিতে না এলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানুষ হতাম। হয়তো রিকশা চালাতাম, নয়তো গরুর রাখাল হতাম। আমি জানি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষের কষ্ট কোথায়? আমার বড় ভাইকে দেখে আমি রাজনীতিতে এসেছি। তার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয়। বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে দেশকে চিনতে পেরেছি। আমার মধ্যে দেশের জন্য কোনো কিছু থেকে থাকলে সেটি বঙ্গবন্ধুর কল্যাণে।

Tuesday, September 24, 2019

বড় ভয় হয় :-বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

বিজোড় বছর নিয়ে ভয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর। সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেছেন, বিজোড় বছর বাঙালি জাতির জন্য সব সময় একটা ঝঞ্ঝা-বিক্ষোভের। আজ জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে ‘এসবের শেষ কোথায়?’ শিরোনামে লেখা এক কলামে তিনি তার এই শঙ্কার কথা তুলে ধরেন।
ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় উল্লেখ করে কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম লিখেছেন, ব্রিটিশ গেছে ’৪৭-এ, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি ’৭১-এ, বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি ’৭৫-এ। কলামে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর প্রতি তার দুশ্চিন্তার কথাও উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, একটা অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। বড় তুফানের আগে গুমোট ভাব।
তিনি লিখেছেন, যখন জি কে শামীমের মায়ের নামে ১৬৫ কোটি, বাড়িতে নগদ ২ কোটি, ১০ হাজার কোটির চলতি কাজ তার মধ্যে ৫৫০ কোটি র‌্যাব সদর দপ্তরে, ৪৫০ কোটি পূর্তভবনে, ৫০০-৭০০ কোটি রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে তখন বিস্মিত না হয়ে পারি না। পত্রিকায় দেখলাম, তিনি নাকি ২-৩ হাজার কোটি টাকা লোকজনকে ঘুষ দিয়েছেন। পূর্ত বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীকেই দিয়েছেন ৪০০ কোটি। ৪ কোটি হলে আমরা উতরে যাই। অথচ স্বাধীনতা না এলে যারা পায়ে জুতা পরতে পারত না, তারা আজকাল হাজার কোটি ঘুষ দেয়।
রাজনীতির শত্রুতায় পড়ে কত কথা শুনেছি, এখনো শুনি। ভরসা করি একমাত্র আল্লাহকে। তিনিই এসবের বিচার করবেন। করছেন না যে তেমনও নয়। এই জগৎ সংসারে তিনি অনেক কিছুর বিচার করেন, করছেন। তবে বর্তমান এই উত্তেজনায় বড় অস্বস্তিতে পড়েছি। আওয়ামী লীগ করি না প্রায় ২০-২২ বছর। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ছাড়তে পারিনি, পারবও না। কারণ তিনিই আমার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা।
সেদিন আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘ক্যাসিনো চালু করেছে জিয়াউর রহমান।’ জিয়াউর রহমান করেছেন তাতে মাহবুব-উল আলম হানিফের কী। জিয়াউর রহমানের খারাপ কাজ কি তাকে বয়ে বেড়াতে হবে? জনাব হানিফের বড় ভাই আমাদের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। বেশ ভালো মানুষ ছিলেন। তার ভাই হিসেবে মাহবুব-উল আলম হানিফকে অবশ্যই ভালো চোখে দেখি। কিন্তু এসব কথায় তো গুরুত্ব দিতে পারি না। মাহবুব-উল আলম হানিফ তো বিএনপি করেন না, জিয়াউর রহমানের অনুসারী নন; তাহলে তার কাজ কেন বয়ে বেড়াবেন?
ক্যাসিনো অপরাধের কাজ এটা কি পুলিশ জানে না, তারা সহযোগিতা করেনি, সহযোগিতা নেয়নি? যুবলীগ-ছাত্রলীগ কতল হলে কিছু পুলিশেরও তো কতল হওয়া উচিত। অন্তত: ঢাকার ২০-২৫টি থানার ওসির গ্রেপ্তার হওয়া উচিত। যে যাই বলুক, পুলিশের সহযোগিতা ছাড়া এখন আর তেমন কোনো কুকাজ হয় না বা করা যায় না। ছোট হোক বড় হোক, সব কাজেই পুলিশের সহায়তা লাগে। কিছু পুলিশ রাস্তাঘাটে যে অমানুষিক কষ্ট করে তার রহমতেই হয়তো এখনো পুলিশ বিভাগ টিকে আছে। ব্যক্তিপর্যায়ে পুলিশরা হাজার কোটির মালিক হতে পারে। কিন্তু মানুষের আস্থার মূল্য তার চেয়ে বেশি। তাই তাদের সুনামের কথা মনে রাখতে হবে। পুলিশ বাহিনীর সুনাম একেবারে শেষ হয়ে গেলে তারা রাস্তায় দাঁড়াতে পারবে না।
যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক এক দিনেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলেন এটা কেন? দুর্নীতিবাজ খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া-জি কে শামীমদের পক্ষ নেয়া যেমন ঠিক হয়নি, এখন ঘুরে যাওয়াও ঠিক হয়নি। সম্রাট আকবর-শাহজাহান-হুমায়ুন-বাবরের মতো ঢাকা সিটির ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট যদি এ রকম হাজার হাজার কোটি টাকার অপরাধ করতে পারেন তাহলে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী লোকেরা কত করেছেন? আর এটা তো এখন ওপেন সিক্রেট। ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের পর দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কোনো মর্যাদা নেই। সিভিল প্রশাসনের কথা অতটা বলতে পারব না, কিন্তু পুলিশ প্রশাসন কোনো আওয়ামী লীগ নেতা-এমপি-মন্ত্রীর কথা শোনে না। মন্ত্রীদেরও তেমন গুরুত্ব ও সম্মান নেই। সত্যিই একটা অস্বস্তিকর অবস্থা। বড় তুফানের আগে গুমোট ভাব।
অন্যদের জন্য তেমন ভাবী না, সভানেত্রীর জন্য ভাবী। তাদের কষ্ট, দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাই বড় বেশি বুকে বাজে। আমরা কোথায় যাচ্ছি আর দু-চার দিনের মধ্যে কোথায় যাব। বিজোড় বছর বাঙালি জাতির জন্য সব সময় একটা ঝঞ্ঝা-বিক্ষোভের। ব্রিটিশ গেছে ’৪৭-এ, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি ’৭১-এ, বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি ’৭৫-এ। তাই বিজোড় বছরে আমার বড় ভয় হয়।

Thursday, March 29, 2018

জনগণের মালিকানা দখল করেছে ক্ষমতাশালীরা

সংবিধান অনুযায়ী দেশের মালিকানা মানুষের- একথা লেখা থাকলেও ভূমিদস্যু ও লুটেরারা যেভাবে অন্যের জমি দখল করে রাখে, সেভাবে  বাংলাদেশের জনগণের মালিকানা ক্ষমতাশালীরা দখল করে রেখেছে। সরকারি অফিস আদালতে গেলেই টের পাওয়া যায় দেশের মালিক কারা। কৃষক-শ্রমিক জনতালীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম গতকাল সকালে ইকবাল সিদ্দিকী কলেজের নতুন একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেছেন। তিনি আরো বলেন, বড় বড় মানুষেরা বাংলাদেশের মাথা বিশ্ব দরবারে নিচু করেছে, আর ছোট ছোট ছেলেরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে, স্বাধীনতা সম্মাননা পদক থেকেও সরকারি লোকেরা চুরি করে। শিক্ষামন্ত্রী নিজে বলেছেন, তিনি চোর, তার সহকর্মী মন্ত্রীরাও চোর। ভোট ছাড়া যারা সরকারে থাকে, আমি সেই দল করি না, আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করি। যৌবনে আমার প্রেম হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে, এই দেশের সঙ্গে। সভাপতির বক্তব্যে ইকবাল সিদ্দিকী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, যে হাত একাত্তরে দেশ মাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে হানাদারদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ট্রিগারে ছিলো, যে হাত বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ও প্রতিরোধ করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে ছিল মুষ্টিবদ্ধ, যে হাত পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজীর সম্প্রসারিত হাতকে প্রত্যাখ্যান করেছিল ঘৃণাভরে, সেই হাতে, সেই পবিত্র হাতের ছোঁয়া আজ আমাদের প্রতিষ্ঠান পেয়েছে এবং সে কারণে আজকে আমরা আনন্দে উদ্বেলিত, উজ্জীবিত ও শিহরিত। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনীষা দেবনাথের সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-এর সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এ. কে. এম. বদরুল আলম লিটন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ছবদের হাসান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম হেলাল, মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মো. ফিরোজ মিয়া।

Saturday, September 19, 2015

পাবলিক মরার জন্য দেশ স্বাধীন করি নাই : কাদের সিদ্দিকী

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বলেছেন, পাবলিকের রক্ত ঘাম করা পয়সায় বেতন নেয়, সেই পুলিশই পাবলিকের বুকে গুলি করে আবার পাবলিকের নামেই মামলা দেয়, এটা হতে পারে না। নারী নির্যাতনের বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেয়ে পাবলিক মরার জন্য যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করি নাই।
ঘাটাইলের সাবেক পৌর মেয়র আব্দুর রশিদের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগে যোগদান উপলক্ষে আজ শনিবার বিকেলে কালিহাতী উপজেলা সংলগ্ন হামিদপুরে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন বঙ্গবীর।
গত শুক্রবার নারী নির্যাতনের বিচারের দাবিতে সমবেত জনতার উপর কালিহাতী পুলিশের গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বঙ্গবীর সরকারের উদ্দেশে বলেন, অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং আজকের মধ্যে দায়ী পুলিশদের কালিহাতী থেকে সরিয়ে নেয়া না হলে এবং এই ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের ঈদের আগেই মুক্তি না দিলে পরিণাম ভালো হবে না। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি শুক্রবার নিহত তিনজনের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।
সরকারের উদ্দেশে বঙ্গবীর আরো বলেন, আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ না করলে এই আওয়ামী লীগ কবরে থাকতো। সরকার গঠন করতে পারতো না। তাই নারী নির্যাতনকারীদের এবং মানুষকে খুন করার বিচার করতে হবে।
অ্যাভোকেট মিয়া মোহাম্মদ হাসান আলী রেজার সভাপতিত্বে এই সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বীর প্রতীক, যুগ্ম-সম্পাদক প্রিন্সিপাল ইকবাল সিদ্দিকী, আব্দুর রশিদ, শামীম আল মনসুর আজাদ সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম আবদুল হালিম সরকার লাল, অধ্যাপক জুলফিকার শামীম, হাবিবুননবী সোহেল প্রমুখ।
জনসভা শেষে মিছিল নিয়ে কিছুক্ষণ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে অবস্থান করেন কাদের সিদ্দিকী।

Thursday, April 23, 2015

খালেদা জিয়ার ওপর আক্রমণ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব নয় : কাদের সিদ্দিকী

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জনসংযোগকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে একেরপর এক হামলার ঘটনায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির উপর বারবার এরকম আক্রমণের ঘটনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ঘটানো সম্ভব নয়। শান্তির দাবি নিয়ে বর্তমানে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থান করছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।
কাদের সিদ্দিকী আরো বলেন, একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে প্রকাশ্য দিবালোকে বেগম খালেদা জিয়ার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির উপর বারবার এরকম আক্রমণের ঘটনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ঘটানো সম্ভব নয়। এধরনের ঘৃণ্য কাজে ইন্ধন যুগিয়ে সরকার সন্ত্রাসবাদ ও নৈরাজ্যকে জাতীয়করণ করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বঙ্গবীর বলেন, জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে রাখার পর থেকে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ এই সরকরের কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে আশা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে এমন ছেলেখেলা কারোর জন্যই মঙ্গলময় হবে না। তাই অবিলম্বে খালেদা জিয়া এবং তার লোকজনের উপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।’
ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন : এদিকে সফররত পাকিস্তান দলকে ওয়ানডে ক্রিকেটে হোয়াইট ওয়াশ করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। তিনি বলেন, ‘সঠিক নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশনা পেলে বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা ক্রিকেটের মতোই সকল ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।’

Monday, March 30, 2015

‘ভারতের গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের কোঠায়’ -বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা এখন শূন্যেও কোঠায় বলে মন্তব্য করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের কাছে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা হিমালয়ের চেয়েও উঁচুতে গিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাদের কর্মকান্ডে ভারতবিরোধী মনোভাব প্রবল হয়েছে। বাংলাদেশের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ভোটারবিহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ নির্বাচনে তারা যেভাবে সরকারকে সমর্থন দিয়েছে, তা বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। দেশের চলমান  সঙ্কট উত্তরণে উদ্যোগ নেয়ার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচির ৬২তম দিনে গতকাল এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানাতে আসা বিভিন্ন শ্রেণী পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে কাদের সিদ্দিকী এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ভারতের প্রতি মানুষের মনোভাব কোন পর্যায়ে নেমে এসেছে তা ভারত-অস্ট্রেলিয়া সেমিফাইনাল খেলার দিনে স্পষ্ট হয়েছে। ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিজয়ে এদেশের মানুষ যে বিজয়োল্লাস করেছে তা গিনেসবুকে স্থান পাওয়ার মতো। অথচ অস্ট্রেলিয়া চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বাংলাদেশের কোথাও একটা পটকাও ফোটেনি।

Saturday, March 28, 2015

রিকশা চালালেন কাদের সিদ্দিকী

দেশের চলমান সংকট উত্তরণের দাবিতে দুই নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে দিন-রাত ফুটপাথে অবস্থান করছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। টানা অবস্থানের আজ ৬০ দিন। গতকাল অবস্থানের ৫৯তম দিনে রাজধানীর পল্টনে বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ আদায় করে রিকশা চালিয়ে অবস্থানস্থলে ফেরেন তিনি। অবস্থান কর্মসূচির পর থেকে তিনি আজ পর্যন্ত কোথাও যাননি। তবে তার বড় ভাই সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর গুরুতর অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। ৬০ দিনে ওই দিনই শুধু গাড়িতে আরোহণ করেন তিনি। তা ছাড়া প্রতি শুক্রবারেই হেঁটে জুমার নামাজ পড়তে গেছেন বায়তুল মোকাররম মসজিদে। ফিরেছেনও একইভাবে। কিন্তু গতকাল নামাজ শেষ করে হঠাৎ একজন রিকশাওয়ালাকে যাত্রীর আসনে বসিয়ে তিনি চালকের আসনে বসে পড়েন। এ সময় তিনি রিকশা চালিয়ে তার অবস্থানস্থলে ফেরেন। কাদের সিদ্দিকীকে রিকশা চালাতে দেখে উৎসুক জনতা তার রিকশার কাছে ভিড় জমান। এদিকে আজ অবস্থানের ৬০তম দিনে কর্মসূচির শুরু থেকে যেসব দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ সংহতি প্রকাশ করেছেন তাদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। যারা নানা কারণে আসতে না পারলেও সাফল্য কামনা করেছেন তাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সকাল ১১টায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, ২০ দলের ডাকা অব্যাহত হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং আলোচলায় বসে দেশের চলমান সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে গত ২৮শে জানুয়ারি থেকে কাদের সিদ্দিকী মতিঝিলের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ফুটপাথে অবস্থান করছেন।

Friday, March 27, 2015

যে কারণে মোদির না আসাই ভালো by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

বাংলাদেশ প্রতিদিনের শুরু থেকে প্রিয় নঈম নিজাম যেমন জড়িত, ঠিক তেমনি আমিও শুরু থেকেই লিখে চলেছি। দু-একবার মনে হয়েছে এ পত্রিকায় আর না লেখাই উচিত। একবার কোনো লেখা না ছাপার কারণে কয়েক মাসের জন্য বন্ধ রেখেছিলাম। নিয়মিত লিখলেই যে পত্রিকা কারও পক্ষে যাবে তা নয়, স্বার্থহানি হলে পক্ষে থাকে না- এটা পাঠকদের বোঝানো যায় না। রাজনীতি, মিটিং-মিছিল করি তাই কোনো কোনো পত্রিকায় প্রায়ই খবর ছাপা হয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনে সে খবর কেউ খুঁজে না পেলেই প্রশ্ন করে, কী ব্যাপার প্রতিদিনে খবর নেই কেন? সাপ্তাহিক লেখা আর আমাদের কর্মকাণ্ডের খবর এক জিনিস নয়- এটা অনেককে বোঝানো যায় না। মঙ্গলবারে দু-এক সপ্তাহ নিয়মিত না লিখলে দু-চারশ পাঠক তো কমবে। কিন্তু তারপরেও কেন তারা আমাদের খবর ছাপে না বা গুরুত্ব দেয় না তা আমি জানব কী করে? গত ৪২ দিন মতিঝিলের ফুটপাতে আছি। কোনো দিন নাই যে কোনো না কোনো পত্র-পত্রিকা, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খবর বের হয়নি। কেউ ছোট কেউ বড় কোনো না কোনো আকারে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনও করেছে, হয়তো অন্যদের চেয়ে কম করেছে। কিন্তু ৮ মার্চ অবস্থানের ৪০ দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ ও নেতা-কর্মীরা বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যে অমূল্য মতামত দিয়েছে যা অনেক পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে। অথচ বাংলাদেশ প্রতিদিনে সে খবর স্থান পায়নি। কতজনের কত প্রশ্ন, কিন্তু জবাব দিতে পারি না।
দু-কথা লিখতে চেয়েছিলাম এক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও টকশো উপস্থাপক বা উপস্থাপিকা মুন্নী সাহা সম্পর্কে। আমরা কুয়োর ব্যাঙ জাহাজের খবর রাখি না, কার খোটার জোর কত তাও জানি না। জীবনে কত সাংবাদিক দেখেছি, ভারতের প্রখ্যাত কলামিস্ট খুশবন্ত সিং, কুলদীপ নায়ার, সম্পাদক রাজেন্দ্র সারীন, হিরণ্ময় কার্লেকার, আনন্দ বাজারের বরুণ সেনগুপ্ত, অভীক সরকার, তার বাবা অশোক সরকার, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ওপর গবেষক প্রবীণ সাংবাদিক-সাহিত্যিক অমিতাভ চক্রবর্তী, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদা শংকর রায়, মনোজ বোস, প্রবোধ কুমার সান্যাল, সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত। আমাদের দেশের কত কত বিখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় উঠাবসা, কত উপস্থাপককে চিনি জানি। কিন্তু মুন্নী সাহার মতো কড়কড়ে কণ্ঠের রাগঢাক না করা কোনো উপস্থাপক দেখিনি। একদিন তিনি জনাব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে বলেছিলেন, আপনাকে তো লোকে বিশ্ব বেহায়া বলে। একটা রাজনৈতিক নেতাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষিপ্ত লোকজন কত কথাই তো বলে। শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীনের বলা আর কোনো অনুষ্ঠান উপস্থাপকের সরাসরি বিব্রতকর অশ্লীল কথা বলা এক কথা নয়। কিন্তু তাকে বুঝাবে কে? খেয়াল নেই, কয়েক মাস আগে সরাসরি প্রচারে তার এক ক্যামেরাম্যান আমার বাসায় গিয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন। তিনি বিএনপির এক ইফতার মাহফিলে যাওয়ায় মুন্নী সাহা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি তো তাদের ইফতার মাহফিলের শিরোমণি, মধ্যমণি ছিলেন। আপনি বিএনপি সম্পর্কে বলুন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কম করে আমার থেকে ১০-১২ বছরের বড়। আমরাও খুব সংযত হয়ে তার সঙ্গে কথা বলি। অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমাকে সংযুক্ত করলে বলেছিলাম, মুন্নী সাহা আপনি কি জানেন, শিরোমণি আর মধ্যমণির আভিধানিক পার্থক্য কি? দুষ্টের শিরোমণি আর ভালোবাসার অাঁধার মধ্যমণি জানি না তার বোধোদয় হবে কিনা। কিছু দিন আগে কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীককে প্রসঙ্গ ছাড়াই বলে বসেছিলেন, আপনি তো ওয়ানম্যান পার্টি। ক্ষুব্ধ জেনারেল ইবরাহিম প্রতিবাদ করেছিলেন, অনুষ্ঠান থেকে চলে যেতে চেয়েছিলেন। মুন্নী সাহা তার বক্তব্য প্রত্যাহার করায় সে যাত্রায় বেঁচে যান। জাতির শ্রেষ্ঠ গৌরব একজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে কতখানি সম্মান করা উচিত সে বোধও খুব একটা নেই। শুনেছি, অনেককেই তিনি তাচ্ছিল্য করে এটা ওটা বলেন, কেন বলেন, কীভাবে বলেন- এসবের কোথায় অন্তর্নিহিত শক্তি কিছুই জানি না। যে চ্যানেলের তিনি সর্বেসর্বা, তার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান একটা ভালো পরিবারের সন্তান ও জনাব ফিরোজ কবির অসাধারণ সজ্জন ব্যক্তি। তার ভাই সরকার কবির উদ্দিন রেডিও পাকিস্তান এবং টিভিতে খবর পড়তেন। অমন নামকরা খবর পাঠক আমাদের দেশে খুব বেশি ছিল না। ঢাকা রেডিওতে ২৫ শে মার্চ রাতের শেষ খবর পড়তে গিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান রেডিওতে আমার জীবনের শেষ খবর পড়া হলো। যদিও এসব ত্যাগী মানুষের কোনো কোনো কথায় স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠার ঘটনাকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা হয় না। তবু তারা আছেন, তাদের এসব ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতির হৃদয়পটে থাকবে চিরদিন। রাজনীতি করা মানুষ তাই বর্তমান ঘটনা প্রবাহের চাপে অনেক কিছু করতে চাইলেও করতে পারি না, লিখতে চাইলেও লিখতে পারি না। আজ ভারতের বিস্ময় জাগানো রাজনীতিবিদ, প্রায় ৩২-৩৩ বছর পর একক দল নিয়ে ক্ষমতায় আসার প্রাণপুরুষ শ্রী নরেন্দ্র দামাদোর দাস মোদির বাংলাদেশ সফরের বিষয় দু-চার কথা আলোচনা করি।
প্রায় সবাই জানেন, মহান ভারতের অনেক নেতা-নেত্রীর সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। সেক্ষেত্রে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, জনতা পার্টি, ভারতীয় জনতা পার্টি ও আরও অনেক দলের সঙ্গে কমবেশি উঠাবসা ছিল, এখনো যতটা সম্ভব চিঠিপত্র এবং দূরালাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ আছে। গত বছর যখন ভারতের লোকসভার নির্বাচন হয়, নির্বাচনের আগে ভারতের অনেক পণ্ডিতের ধারণা ছিল অবশ্যই বিজেপি লোকসভায় বেশি সিট পাবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কারণ সরকার গঠন করতে যেহেতু অন্য দলের সমর্থন লাগবে, সেহেতু তারা গুজরাটের দাঙ্গার অভিযোগে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদিকে সমর্থন করবে না। তাই বিজেপির সরকার হলেও শ্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন না। তাদের যুক্তি খুব একটা ফেলনা ছিল না। এ নিয়ে ভারতীয় অনেক কূটনীতিকও আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। কিন্তু কেন যেন আমার সব সময় মনে হয়েছে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের দিন ১৫ আগেও বিজেপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ উচ্চ পর্যায়ের একজন ঢাকায় এসেছিলেন। তার ধারণাও তেমনই ছিল। যেহেতু আমার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল তাই তাকে আমি আমার মতো জানিয়েছিলাম। সেই কবে ভারতীয় একক দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রায় লুপ্তির পথে ছিল যেটা আবার ফিরে এসেছে। তবে ইলেকশনের আগে কথা উঠেছিল যে কোনো নারী নেতৃত্বে ভারতে মিলঝুল সরকার হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিল নাড়ুর জয়ললিতা, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতি এরা মিলে শতাধিক সিট পেলে তাদের মধ্যে কেউ একজন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু কেন যেন আমার তেমন মনে হয়নি। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেস খুবই ভালো করেছিল। ৪২ আসনের ৩৮ আসন পেয়েছিল তারা। ২টি কংগ্রেস, ১টি বিজেপি, ১টি সিপিএম। অন্যদিকে তামিলনাড়ুর ৩৯ সিটের মধ্যে ৩৭টি পেয়েছিলেন জয়ললিতা। কিন্তু উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর দল লোকসভায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সোয়াশ বছরের প্রবীণ দল কংগ্রেসের সিট নেমেছে ৫০ এর নিচে। পৃথিবীর এক আশ্চর্য ঘটনা। শ্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম লোকসভায় প্রবেশ করে এক অসাধারণ বক্তব্য দিয়েছিলেন। কারণ ওর আগে তিনি কখনো লোকসভার সদস্য ছিলেন না। লোকসভায় প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই নেতা হয়েছেন। তাই তিনি বলেছিলেন, আমি এখানে সম্পূর্ণ নতুন। কিছুই জানি না। ভুল হলে প্রবীণরা ক্ষমা করবেন। আপনাদের কাছ থেকে জেনেশুনে আস্তে আস্তে আমি শিখে নেব। সেই সময়টুকু আপনারা আমাকে দেবেন। গত সেপ্টেম্বরে ভারতের নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদি প্রথম জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে দেওয়া এক সম্বর্ধনায় প্রায় ২৪ হাজার লোকের মধ্যে এমন এক অসাধারণ বক্তব্য দিয়েছিলেন যা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। একপর্যায়ে তিনি এও বলেছিলেন, 'ম্যায়নে চা বেস্তা বেস্তা ইহাতক পৌঁছ গিয়া। হাম পিছে নেহি দেখ্তা, হাম সিধা দেখ্তা।' শ্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে প্রায় ১৮-২০ বছরের প্রবীণ আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী সেই আমেরিকাতেই ১৪-১৫ জনের সামনে এক বক্তৃতা করে জীবনের সব কিছু খুইয়েছেন। মুসলমান হিসেবে তাকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছিলাম। তার জন্যও আমাকে নিদারুণ গালাগাল করেছেন। তা করুন, বড় ভাই হিসেবে জন্মেছেন, গালাগাল বা তিরস্কার করার তার জন্মগত অধিকার। তাই এসব নিয়ে কিছু ভাবি না। সারা জীবন আওয়ামী লীগ করেছেন। আওয়ামী লীগ তাকে ত্যাগ করেছে। মুসলমান হিসেবে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তার জন্য এখনো আমি আমার জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করব না।
গত আগস্টে ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতির এডিশনাল সেক্রেটারি প্রদ্যুৎ গুহের একমাত্র ছেলের বিয়ে ছিল। আমি যখন ভারতে নির্বাসনে তখন প্রদ্যুৎ গুহ পশ্চিমবঙ্গ যুব কংগ্রেসের জনপ্রিয় সভাপতি ছিলেন। অনেক বছর মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির সঙ্গে আছেন। বাঘা দা বলতে অজ্ঞান। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার কারণে আগস্ট মাসে কোনো অনুষ্ঠানে যাই নাই। ৩ বা ৪ আগস্ট ছিল প্রদ্যুৎ গুহের ছেলের বিয়ে। সেখানে থাকা-খাওয়া সব ব্যবস্থা তারাই করেছিলেন। কিন্তু তারপরও তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকতে পারিনি। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষ মানুষের কতটা আপন হতে পারে তা শর্মিলা বকশী মিলুকে না দেখলে বোঝা যায় না। আগে দিলি্লর এয়ারপোর্ট পালামে ছিল। এখন হারিয়ানার গোরগাওয়ে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তার পাশেই মিলুর বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ি। মিলু বাপ-মায়ের এক সন্তান। একই ভবনের একতলা নিচে মিলুর মা ড. অরুণা চক্রবর্তী থাকেন। সেটাও ৪-৫ হাজার স্কয়ার ফুটের বাড়ি। আমার ছোট ভাইয়েরা কয়েকবার লটবহর নিয়ে মিলুর বাড়িতে থেকেছে। তাই এবার শক্ত করে ধরেছিল, দাদা তোমাকে এবার আমাদের বাড়িতে থাকতে হবে। মেয়েটাকে না করতে পারিনি। তাই সরকারি গাড়িতেই ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সে যে কি অসাধারণ যত্ন করেছে বলতে পারব না। শরীয়তপুরের ডিঙ্গামানিক মিলুর পূর্ব পুরুষের বাড়ি। ওর ইচ্ছে ওর বাপ-দাদার ভিটায় একবার সে যাবে। আজ ১৫-২০ বছর ধরে বলছি, যখন খুশি এসে ঘুরে যা। মাঝে একবার এসেছিল। কিন্তু সময় হয়নি। এক ছেলে এক মেয়ে স্বামী নিয়ে ছোট সংসার। কলেজে পড়িয়ে সময় পায় না। মজার ব্যাপার, যখন ওর বাড়িতে ছিলাম, আসার আগের দিন ছিল ভাইফোঁটা। ১৮ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা কমর মহসীনের গুজরাটে বিয়ে হয়। তাকে গুজরাটের গভর্নর শ্রী স্বরূপ সিং বিদায়ের সময় তার মেয়ে পরিচয় দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে ভাই বানিয়ে এসেছিলেন।
সেই থেকে সে প্রতি বছর তাকে ভাইফোঁটা দেয়। সেবারও সে ফোঁটা দেবে কিনা বা দিতে পারবেন কিনা- এ নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা চলছিল। ৮ আগস্ট ছিল সেই শুভ দিন। আমি ছিলাম মিলুর গোরগাওয়ের বাড়িতে। হিসেব করে দেখলাম ১৮ বছর ধরে এক মুসলমান বোন হিন্দু ভাই নরেন্দ্র মোদিকে ভাইফোঁটা দিচ্ছে আর ৩৬ বছর ধরে এক হিন্দু বোন মিলু তার মুসলমান ভাই কাদের সিদ্দিকীকে ভাইফোঁটা দিয়ে চলেছে। কি আশ্চর্য মিল। আগের দিন নরেন্দ্র মোদি নেপাল সফরে ছিলেন। ঢাকায় ফিরে খবর পেয়েছিলাম শ্রী নরেন্দ্র মোদি তার মুসলমান বোনের ভাইফোঁটা ঠিকই নিয়েছেন। সত্যিই তিনি এক আশ্চর্য মানুষ। একেবারে নিজের দক্ষতা যোগ্যতায় এতদূর এসেছেন। তাই আমাদের দেশ সফরে এসে সাধারণ মানুষের কোনো ভালোবাসা পাবেন না। বরং বিনা ভোটে জবরদখলকারী সরকারের আহ্বানে এসে বিব্রতকর অবস্থায় পড়লে তা হবে আমাদের জন্য মর্মবেদনার কারণ।
তার পূর্ববতী সরকারের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং অবৈধ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এ সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। এই অপ্রিয় সরকার দেশ চালাতে সম্পূর্ণই ব্যর্থ। তাদের আহ্বানে বা আমন্ত্রণে বিপুল ভোটে নির্বাচিত একজন মহান নেতার আমাদের দেশে আসা উচিত না। বিশেষ করে আমাদের স্বাধীনতার জন্যে যে দেশের ১৪ হাজার বীর সেনার রক্ত আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। আমরা সেই দেশের নেতাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ১৬ কোটি মানুষ দুই হাত প্রসারিত করে উন্মুখ হয়ে আছি। তাই আমরা আশা করি, আমাদের উষ্ণ বুক তার সানি্নধ্য থেকে বঞ্চিত হবে না। আমরা ১৬ কোটি জনগণ তাকে হৃদয়ের সমগ্র উত্তাপ দিয়ে গ্রহণ করতে চাই- এ জন্য একটি জনপ্রিয় নির্বাচিত সরকারের আমন্ত্রণের অপেক্ষায় তাকে থাকতেই হবে। এই সরকারের দেশের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই শ্রী মোদির সফরে কেউ যদি রাস্তায় নেমে নিন্দাবাদ জানায় আমরা মুখ দেখাতে পারব না, বড় লজ্জায় পড়ব। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আশা করব ভারতের একজন সফল নেতা আমার দেশবাসীকে তেমন লজ্জায় ফেলবেন না।
লেখক : রাজনীতিক।