Tuesday, September 17, 2013

ঢাকার মান বাঁচান by ড. হারুন রশীদ

যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের ১৪০টি নগরীর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৯তম। অর্থাৎ বসবাসের অনুপযোগী শহরের মধ্যে ঢাকার পরে মাত্র একটি শহরের স্থান। সেটি হচ্ছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দামেস্ক। এ অবস্থা যে আমাদের জন্য কতটা লজ্জাজনক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দুর্নীতিতে আমাদের দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়। এখন দেখা যাচ্ছে বাস অনুযোগী শহরে বসবাসের ক্ষেত্রেও আমরা চ্যাম্পিয়ন! হায়রে অভাগা কপাল! জরিপকারী ওই প্রতিষ্ঠানটি একটি শহরের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এর মান নির্ণয় করে। এর মধ্যে রয়েছে নগরীতে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা, অপরাধের হার, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোর গুণগতমান, পানি সরবরাহের মান, খাদ্য, পানীয়, ভোক্তাপণ্য, সেবা, সরকারি বাসগৃহের প্রাপ্যতা ইত্যাদি। এসব দিক থেকে আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এছাড়া ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে অন্য জরিপে প্রকাশ পেয়েছে ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থায়ই এ জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। এছাড়া যানজট, যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া, ট্যানারি বর্জ্য, খাদ্যে ভেজাল, সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিুমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এ শহরে নেই পয়ঃনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল স্কুল-কলেজ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি নাগরিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে। এজন্য পরিকল্পিত নগরায়নের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এ শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। যত্রতত্র যে যেখানে পারছে, যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এক জগাখিচুরি অবস্থায় রাজধানীবাসী এখানে বাস করছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এ নগরী যেন নরকতুল্য। খেলার মাঠ নেই, নেই জলাশয়। সবুজ গাছগাছালির দেখা মেলাও ভার।
দুই
যানজট ঢাকা নগরীকে কার্যত এক অচল ও স্থবির নগরীতে পরিণত করেছে। এটি একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়ায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিনই অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তাই নয়, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণে নানা সংক্রামক ব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ। যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাÍকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রুটে যাত্রীদের চলাচলে কমপক্ষে ৩ কর্মঘণ্টা সময় অপচয় হয় প্রতিদিন। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময়ে নানামুখী কর্মসূচি-পরিকল্পনা হাতে নেয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। রাজধানীতে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি। সে তুলনায় রাস্তাঘাট বাড়ছে না। ফলে যানজট এক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফলাফল হবে ভয়াবহ।
তিন
শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য পানিতে মিশে ঢাকার পরিবেশকে করে তুলছে বিষাক্ত। বিশেষ করে ট্যানারি বর্জ্যরে দূষণ নগরবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার যেন কেউ নেই। হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও তা একযুগেও কার্যকর হয়নি। স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হলেও হাজারীবাগে এখনও আড়াইশ’রও বেশি ট্যানারি রয়েছে। ট্যানারির তরল বিষাক্ত বর্জ্য স্থানীয় জলাশয় থেকে হাজারীবাগ খাল হয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় বাঁধের ভেতরের স্লুুইসগেটসহ নানা পথে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মেশে। ট্যানারির বর্র্জ্য অত্যন্ত বিষাক্ত। এ বর্জ্য পানিতে মিশলে তা দেখে মনে হবে রঙ মেশানো পানির মতো। আর এ রঙিন পানিই দিনের পর দিন নদীতে গিয়ে পড়ে পানিকে দূষিত করছে। বুড়িগঙ্গাকে বলা হয় ঢাকার প্রাণ। কিন্তু দখল দূষণে এ নদীর অবস্থা এখন বড়ই করুণ। বিশেষ করে ট্যানারির বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে তাতে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য যাতে নদীতে আর না পড়তে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তরের কোনো বিকল্প নেই। এ নিয়ে অনেক গড়িমসি হয়েছে, আর নয়।
চার
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বুয়েটের মেধাবী ছাত্রী সনি হত্যার প্রতিবাদে যারা অনশন করছিলেন, কবি শামসুর রাহমান গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে। কবির বুয়েটে যাওয়ার ঘটনা ফলাও করে প্রচার হয় সবক’টি দৈনিকে। ফলে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা আরও প্রত্যয়ী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিয়ষটি ভালো ঠেকেনি বুয়েট ভিসির কাছে। তাই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘উনি কবি মানুষ, আমরা ইঞ্জিনিয়ার, কবিতার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ তৎকালীন ভিসির ওই অসার মন্তব্য দেশব্যাপী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। তখন তা হাসির খোরাক জুগিয়েছিল অনেকের। সত্যি কবিতার সঙ্গে মানুষের, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পর্ক না থাকলে তার পরিণতি যে কী ভয়াবহ হতে পারে তা যেন বলে দিচ্ছে রাজধানীর কংক্রিটের এ জঙ্গল।
প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীন ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘মান্দাই নৃ-গোষ্ঠী’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে এ জনগোষ্ঠীর মাটির ঘরের অপূর্ব সুন্দর স্থাপত্য রীতি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আধুনিক কালের স্থাপত্যকলায় পরিবেশের সঙ্গে গৃহনির্মাণের একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ মিলন প্রত্যাশিত। চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পাশ্চাত্যের গৃহ-স্থাপত্যের সাধারণ নকশাটা আমাদের দেশের স্থাপত্যকাররা গ্রহণ করেছিলেন নির্বিচারে। ঢাকা শহরের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, রুগ্ন গৃহ-স্থাপত্যের এক দিকচিহ্নহীন অভিযাত্রায় নেমেছি আমরা। সাদা চুনকাম করা দেয়ালের সঙ্গে ঢাকা শহরের মৃত্তিকার কোনো সামঞ্জস্য নেই। যে কাঠামোকলা ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন, তাই যেন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সর্বত্র। পাশ্চাত্যে গৃহ-স্থাপত্যের আঙ্গিক ও বৈচিত্র্য তাদের শিল্পায়ন ও বিজ্ঞানের ধারায় স্বাভাবিক। আমাদের প্রকৌশলীরা সেখানকার সেই নকশাই জুড়ে দিলেন এখানে। আমাদের চাঁদ সূর্য, শীত, বর্ষা আড়ালে চলে গেল। পুঁথিগত বিদ্যাটাকে ধ্র“বজ্ঞানে বিশ্বাস করার যে কী ফল, তা আমাদের শহরের নানা অংশের স্থাপত্যরীতি দেখলেই বোঝা যায় অবশ্য।’
রবীন্দ্রনাথ বলাকার একটি কবিতায় তাজমহল সম্পর্কে বলেছেন, ‘প্রেমের করুণ কোমলতা/ফুটিল তা/সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে’।
পাষাণে প্রাণ দেয়ার জন্য যে নান্দনিক বোধ থাকা প্রয়োজন তার জন্য বিষয়াতিরিক্ত জ্ঞানের অন্য শাখাগুলোরও অধ্যয়ন জরুরি। আমাদের স্থাপত্যকলায় যার তীব্র অভাব পরিস্ফুট। আমাদের নগরায়নে যেমন পরিকল্পনার অভাব, তেমনি সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণের অভাব। স্থাপত্যকলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সৌন্দর্যের অনুসন্ধান আমাদের ঐতিহ্যের কারণেই বড় বেশি প্রয়োজন। ঢাকাকে অসম্মান থেকে রক্ষার জন্য তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক, কলামিস্ট

নির্বাচন সমঝোতার ভিত্তিতেই হওয়া দরকার by ড. শরীফ মজুমদার

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের অধিবেশনে যেতে গড়িমসি করাটা কিছুটা নতুন চিন্তার খোরাক হয়ে দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলের সন্দেহ যদি সত্য হয় তাহলে এটা কিছুটা নিশ্চিত যে, প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়কহীন নির্বাচনের পক্ষে এ মুহূর্তে তেমন কোনো টেকসই যুক্তি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে তুলে ধরতে পারবেন না, সে কারণেই হয়তো এই গড়িমসি এবং তেমনটাই স্বাভাবিক। মুখে জোর দিয়ে বলাটা খুব একটা কঠিন নয় যে, জাতিসংঘের খবরদারি কাম্য নয়। কিন্তু জাতিসংঘের দিক থেকে চিন্তা করলে এটা নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ নিয়ে এ মুহূর্তে তাদের ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমাদের অগ্রগতিতে জাতিসংঘের ভূমিকা উপেক্ষা করার যৌক্তিকতা নিতান্তই প্রশ্নবিদ্ধ। হয়তো ক্ষমতাসীন উন্নত দেশগুলোকে জাতিসংঘ সব সময় বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত রাখতে পারে না কিন্তু অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নে জাতিসংঘের ভূমিকা খুব একটা বিতর্কিত নয়। সুতরাং ভবিষ্যৎ অগ্রগতিতেও জাতিসংঘকে পাশে পেতে আমাদের সব সময় সচেষ্ট থাকার প্রয়োজন রয়েছে। জাতিসংঘ সমঝোতার কথা বলেছে এবং তা অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ মনে হওয়ার তেমন কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। কারণ এ সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত না হলে জাতিসংঘের পক্ষে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে তার দায়িত্ব পালন করাটা কঠিন হয়ে পড়বে। তাছাড়া সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল- জাতিসংঘ বাংলাদেশকে ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার’ প্রবক্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং তৃতীয় বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা’ চালুর ব্যাপারে উৎসাহ জুগিয়েছে। সুতরাং ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার’ প্রচলন প্রশ্নবিদ্ধ না হওয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘকে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে। সমঝোতার নির্বাচন না হলে দেশ নিশ্চিতভাবে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় নিপতিত হবে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অর্জনগুলোও ভেস্তে যেতে পারে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীকে যতটা না নির্বাচনে তার দলের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে হবে তার চেয়ে বেশি ভাবতে হবে তার অর্জনগুলো ধরে রাখতে। সেখানেই তার জন্য দেশপ্রেমের কঠিন পরীক্ষা। তাছাড়া জাতিসংঘ নিশ্চিত করতে চাচ্ছে যে, গণতান্ত্রিক নির্বাচন গণতান্ত্রিক নিয়মেই হচ্ছে। ‘এ গণতান্ত্রিক নিয়মটি’ উন্নত দেশে যেভাবে সংজ্ঞায়িত হয় আমাদের পরিপ্রেক্ষিতে সেভাবে সংজ্ঞায়িত নাও হতে পারে এবং জাতিসংঘ তা জানে। জাতিসংঘের দায়িত্ব হল, অধিকাংশ জনগণ যে পদ্ধতিতে নির্বাচন চায় সে পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনা নিশ্চিত করা। হয়তো আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতে কখনও জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলে বুঝতে পারবেন জাতিসংঘ কেন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন।
সমঝোতার নির্বাচন না হলে জাতি আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়কার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা তার পুনরাবৃত্তি দেখতে বাধ্য হতে পারে, যা কোনো পরিপক্ব গণতন্ত্রের ভিত্তি হতে পারে না। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, জোর করে ‘তত্ত্বাবধায়কহীন নির্বাচন’ করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তার অর্জনগুলো ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার মধ্যে গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার নিদর্শন, না জনগণের পছন্দ অনুযায়ী নির্বাচন দিয়ে সুস্থ ধারার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা একই দলের পুনর্নির্বাচনের মধ্যে গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার নিদর্শন। তিনি যেভাবে বিলবোর্ড আর সভা-সমাবেশে তার সাফল্যের বর্ণনা করেছেন তা যদি সত্য হয় তাহলে তো তিনি নিজেই তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে থাকার কথা। কারণ একমাত্র তত্ত্বাবধায়কের মাধ্যমে নির্বাচন হলেই জনগণ তার সাফল্যের যথার্থ প্রতিদান দিয়ে তাকে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ছাড়াই আবার পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় বসাতে পারে! কিন্তু তিনি যদি মনে করেন যে কোনোভাবে একটি নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়াটাই উদ্দেশ্য, বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল কী করল না তা তার মাথাব্যথা নয়, তাহলে জনগণ বলবে তার মুখে অন্তত গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দোহাই মানায় না এবং জনগণ অবশ্যই সন্দেহ করবে তিনি যে গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়কহীন নির্বাচনের কথা বলছেন এর মধ্যে কোনো দুরভিসন্ধি লুকানো। হয়তো এ ব্যাপারগুলোই জাতিসংঘের মহাসচিব বা অন্য রাষ্ট্রপ্রধানরা তার কাছে যৌক্তিকভাবে তুলে ধরবেন বলেই তিনি জাতিসংঘের সমাবেশ এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। নিজের সুবিধা হলে জাতিসংঘের কার্যপ্রণালীর উদাহরণ দেয়া আর নিজের অসুবিধা হলে জাতিসংঘের খবরদারি বলে মন্তব্য করাটা রাষ্ট্রের পরিচালনা পর্ষদের জন্য নিতান্তই বেমানান।
যাহোক জনগণ অবশ্যই চাইবে জাতিসংঘ আমাদের এ চরম ক্রান্তিকালে আরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রী বা অন্য মন্ত্রীরা কী বলল না বলল তা জাতিসংঘ আমলে নেবে না। মূলত সদস্য দেশগুলোর ক্রান্তিকালে সহায়তা এবং পরামর্শ দেয়াটা জাতিসংঘের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে এবং সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন নিশ্চিত করে গণতন্ত্র সুসংহত রাখা বাংলাদেশে জাতিসংঘের কার্যপ্রণালী বাস্তবায়নেরই একটি অংশ। সুতরাং জাতিসংঘকে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাষা বুঝলেই চলবে না, আপামর জনসাধারণের ভাষা বুঝতে হবে। জাতিসংঘ একুশে আগস্টকে যেভাবে নিন্দা করেছে সেভাবেই নিন্দা করেছে নির্বাচনকালীন লগী-বৈঠা অধ্যায়কেও। অতএব জাতিসংঘের কাছে দুই দলের কেউই অতিমাত্রায় গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং জাতিসংঘ নিশ্চিত করবে, যে কোনো পরিস্থিতিতেই সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতা যেন এই সভ্য স্বাধীন দেশে আর স্থান না পায় এবং সেখানেই জাতিসংঘের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে হস্তক্ষেপ করার এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন নিশ্চিত করার নৈতিক বাধ্যবাধকতা। জাতিসংঘ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফল দেখেছে; সরকারের উন্নয়নের ব্যাপারে আপামর জনগণের মূল্যায়ন কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে। সুতরাং বিলবোর্ডের ভাষা, সভা-সমাবেশের বক্তব্য আর মানুষের মনের কথায় জাতিসংঘ মিল খুঁজে পাচ্ছে না। এই অমিলই জাতিসংঘকে সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে জোর তাগিদ দিতে বাধ্য করেছে। সেই তাগিদ কতটা সুন্দরভাবে প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করছেন তা বড় কথা নয়, বড় কথা হল সে তাগিদের ফলে বস্তুত কী পরিবর্তন হচ্ছে। জনগণ আশা করবে জাতিসংঘ প্রকৃত পরিবর্তন নিশ্চিত না করে বাংলদেশে কোনো নির্বাচন পরিচালনার ব্যাপারে তাদের দ্বিমতের কথা সরকারকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেবে।
অন্যদিকে জনগণ আশা করবে, জাতিসংঘ বিরোধীদলীয় নেতাকেও বোঝাবে যে একবারে তথাকথিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ না হলে নির্বাচনে যাবে না সে ধরনের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে। দলীয় সরকারের আধিপত্য থাকবে না এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হবে এ ধরনের সরকার হলেই বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই যায় এবং সে ধরনের একটি সরকার গঠনে জাতিসংঘের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়াটা অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বলে সাধারণ জনগণের কাছে কখনোই মনে হবে না। দায়িত্বশীলতার পরিচয় শুধু সরকারকে দিতে হবে তা নয়; বিরোধী দলেরও অনেক ছাড় দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের সরকার তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য যে কারও নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে তাদের আপত্তি করাটা কিছুটা মাত্রাতিরিক্ত মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর এ কথা কিছুটা হলেও সত্য যে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে কারও পক্ষে রাতারাতি ভোটের ফলাফল পাল্টে ফেলার চিন্তা করাটা অনেকটা অবাস্তবিকই বৈকি। শুধু তাই নয়, এ মিডিয়ার জগতে বর্তমান বাংলাদেশে ভোট কারচুপির চিন্তা করাটাও অনেকটা কঠিন। ছাড় দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাটা বিরোধী দলের জন্যও লাভজনক; কারণ তাতে দায়িত্বশীলতার যেমন পরিচয় দেয়া হবে, তেমনি পূর্ববর্তী তিক্ত অভিজ্ঞতা এড়িয়ে চলাও সম্ভব হবে।
জাতি ৯০ দিনের জন্য অগণতান্ত্রিক সরকারের ভয়ে তত্ত্বাবধায়কহীন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে পরে কয়েক বছরের জন্য অগণতান্ত্রিক সরকারের কাছে দেশটাকে তুলে দিতে চাইবে না। তাছাড়া যা বাস্তব সত্য তা হল তত্ত্বাবধায়ক সরকার খুব যে অগণতান্ত্রিক কিছু করেছে তা জোর দিয়ে বলার সুযোগ নেই। তাদেরও যদি বিলবোর্ড আর সভা-সমাবেশ করে নিজেদের সাফল্যের কথা তুলে ধরার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে হয়তো আমাদের অনেক তথাকথিত রাজনৈতিক দল রাজনীতির ময়দানে সমস্যায় পড়ে যেত। দুই নেত্রীকে কিছুটা কোণঠাসা করে তারা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছেন তা অসত্য নয়। আবার এটাও অসত্য নয় যে, তা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মধ্যেই পড়ে এবং আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও এখন যা করতে চেষ্টা করছেন তা সেই প্রবৃত্তির বাইরে কিছু নয়। গণতান্ত্রিক সরকারের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি বাইরের আর্থিক সাহায্য পেত তাহলেই বোঝা যেত তুলনামূলক বিবেচনায় রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চেয়ে কতটা ভালো বা খারাপ। কিন্তু দুঃখজনক হল, ‘গণতন্ত্রের’ নামে সেটি আর হয়ে ওঠে না। জাতিসংঘ এ বিষয়গুলো সার্বিক বিবেচনায় এনে এ ব্যাপারে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেবে এটাই সবার কামনা। তাতে কে ঠোঁট ফুলাল আর কে হেসে দিল তা জাতিসংঘের বিবেচনায় আনার সুযোগ নেই। তাদের বিবেচনা হবে একটাই, তা হল দাতাগোষ্ঠীর টাকায় যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে তা যেন কারও ঠোঁট ফুলানো বা কারও হাসির কারণে থেমে না যায়।
ড. শরীফ মজুমদার : সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অর্জনগুলো ধরে রাখতে হবে by কাজী ফারুক আহমেদ

একান্ন বছর আগে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনকারীদের অনেকেই এখন বেঁচে নেই। আজ ‘শিক্ষা দিবসে’ বিশেষভাবে স্মরণ করছি আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারী স্কুলছাত্র বাবুল, বাস কন্ডাক্টর মোস্তফা ও গৃহকর্মী ওয়াজিউল্লাহকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কয়টি মোটা দাগের ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর সাধারণ নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। এর মধ্যে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে ২১ ফেব্র“য়ারি সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ইতিহাস নির্ধারণকারী অন্য দিনগুলো এখনও প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি। গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষা দিবসের আলোচনায় দিনটির সরকারি স্বীকৃতির দাবি উঠছে। শিক্ষার ভিত্তিতে দেশের ষোল কোটি মানুষকে সম্পদে রূপান্তরের কথা আজ যখন সরকারি-বেসরকারি সবাই এক সুরে বলেন, তখন অর্ধশতকের বেশি সময় আগের দেশের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী, শিক্ষা উন্নয়ন, অর্থায়নের বিষয়কে ধারণ করে সূচিত ও বিস্তৃত আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি প্রাপ্তির দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার প্রস্তাব সমর্থন করতে হয়।
প্রতিবছর শিক্ষক, ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরে দিবসটি পালন করে থাকে। ২০০৯ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং ২০১০ সালে সংসদে তা অনুমোদিত হওয়ার পর থেকে দিবসটি পালিত হচ্ছে প্রধানত শিক্ষানীতিকে ঘিরে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এবং বাংলাদেশ দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১-এর প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০১৩, শিক্ষায় অর্থায়ন, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকের অধিকার এবং জাতীয় বাজেটে ন্যায়পরায়ণতা প্রসঙ্গ।
বর্তমানে শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় ‘শিক্ষা আইনের’ বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে শিক্ষা আইনের খসড়া প্রকাশের পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা গবেষণা ও শিক্ষা উন্নয়নে নিয়োজিত বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন, জাতীয় সংবাদ মাধ্যম ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরের জনগণের পক্ষ থেকে এ নিয়ে মতামত ব্যক্ত হয়েছে। সরকারিভাবে ৩৪টি, বেসরকারিভাবে ৯৪টি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ১০৬টিসহ মেটি ২৩৪টি মতামত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৫টি মতামত পূর্ণাঙ্গ। জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্ট খসড়া শিক্ষা আইনে কতিপয় নতুন ধারা সংযোজন এবং কয়েকটি সংশোধন ও প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে। সংযোজন প্রস্তাবে রয়েছে, সমযোগ্যতা ও সমঅভিজ্ঞতাসম্পন্ন, সমদায়িত্ব পালনকারী বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অনুরূপ বেতন-ভাতা, প্রবৃদ্ধি, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, এমপিও প্রাপ্তির জন্য যোগ্যতার শর্ত পূরণকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও প্রদান, শিক্ষকদের প্রচলিত চাকরিবিধি সংস্কার ও কর্মচারীদের চাকরিবিধি প্রবর্তনসহ শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য ইউনেস্কো/আইএলও কর্তৃক যৌথভাবে প্রণীত ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের সুপারিশমালা কার্যকর করাসহ পেশাগত বিভিন্ন দাবির সঙ্গে ১০টি প্রস্তাব : শিক্ষক নিয়োগ/নির্বাচন কমিশন গঠন, ২. শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষা, ৩. শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন, ৪. প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে পার্বত্য অঞ্চলসহ সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা, ৫. শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ এলাকাগুলোয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ দৃষ্টি প্রদান, ৬. দেশ-বিদেশের কর্ম বাজারের চাহিদার আলোকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পর্যায়ের সব কারিকুলাম নিয়মিত পরিবর্তন ও পরিমার্জন ৭. (১) শিক্ষক, (২) অভিভাবক, (৩) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটি, (৪) শিক্ষক সংগঠনের করণীয়, (৫) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আচরণ সংক্রান্ত মোট ৫টি স্বতন্ত্র কোড অব কন্ডাক্ট/আচরণবিধি প্রণয়ন, ৮. শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা, ৯. শিশু অধিকার সুরক্ষা জাতীয় কমিশন গঠন, যা প্রতিবন্ধী, অটিস্টিকসহ সব শিশুর বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা পরিবীক্ষণ করবে। প্রতিবন্ধী শিশুর বিশেষ চাহিদার ওপর নির্ভর করে পাঠ্যক্রম, পাঠদান, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে নমনীয়তার নীতি অবলম্বন করবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য প্রতিবন্ধী শিশুর অভিভাবক থাকবেন, ১০. প্রতিটি বিদ্যালয়ে ন্যূনতম একজন পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন শিক্ষক থাকবেন। তিনি প্রতিবন্ধীসহ বৈষম্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর শিশুর শিক্ষার বিষয়ে ন্যূনতম ৬ মাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবেন। খসড়া শিক্ষা আইনে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শাস্তি প্রসঙ্গে ফ্রন্টের সংশোধন প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ‘বর্ণিত অপরাধ সংঘটিত হইলে শিক্ষকদের চাকরিবিধিতে উল্লেখিত পেশাগত অসদাচরণের মধ্যে তাহা অন্তর্ভুক্ত করিয়া (যাহা শিক্ষকদের অধিকার ও করণীয় সংক্রান্ত ইউনেস্কো আইএলও সনদ ১৯৬৬ ও ১৯৭৭-এর সহিত সঙ্গতিপূর্ণ হইবে), দেশে প্রচলিত আইন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতে পারে। শুধু শিক্ষকদের কথা উল্লেখ না করিয়া সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তি/ ব্যক্তিবর্গকে (ব্যবস্থাপনা কমিটি/ কর্তৃপক্ষসহ) দেশে প্রচলিত আইনে প্রযোজ্য শাস্তির আওতায় আনিতে হইবে। বেসরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ অপরাধের/ অসদাচরণের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারী শিক্ষকদেরও একইভাবে একই ব্যবস্থায় শাস্তির আওতায় আনা হইবে।’ প্রত্যাহার প্রস্তাবে রয়েছে- ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়া একতরফা বেতন কর্তন অবৈধ, অনৈতিক ও অসাংবিধানিক বিধায় এ ধারা প্রত্যাহার করিতে হবে। সামারী ট্রায়ালে শিক্ষকদের শাস্তি বিধানের ধারা প্রত্যাহার করিতে হইবে।’
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় এডুকেশন ওয়াচের পক্ষ থেকে সহযোগী সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত সংকলিত করে ৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তা উপস্থাপন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তার উপস্থাপিত ২২টি বিশেষ সংযোজনী প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে : ষ আইনটির শিরোনাম শিক্ষা আইন ২০১৩-এর পরিবর্তে বাংলাদেশ শিক্ষা আইন ২০১৩ করা প্রয়োজন। ষ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সরকার সবার জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা লাভের ব্যবস্থা করবে। প্রাথমিক শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক এবং এই শিক্ষার যাবতীয় ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণভাবে ও ব্যাপকভাবে লভ্য থাকবে এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধাভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এছাড়াও শিক্ষা আইনে শিশু অধিকার সনদ এবং শিশু শিক্ষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন ধারা অনুসরণ করতে হবে। ষ প্রত্যেক বাক্যের শেষে ‘করা হবে’ এই শব্দ দুটির পরিবর্তে ‘করিতে হইবে’ লিখতে হবে। কোনো আইন অমান্য বা লংঘন করলে কী শাস্তি প্রদান করা হবে বা তার প্রতিকার কী হবে, তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ষ যৌন হয়রানির বিষয়ে হাইকোর্টের যে রায় রয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এ আইনে একটি ধারা সংযোজন করা প্রয়োজন। ষ শিক্ষায় শ্রমজীবী শিশুদের অন্তর্ভুক্তির জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করতে হবে। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে ক্যাডেট কলেজ ও মিলিটারি একাডেমি বিষয়ে কোনোরকম উল্লেখ নেই, এগুলোর সঙ্গে ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই আইনের আওতায় আনতে হবে। ষ শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো কমিশন গঠন করতে হবে। ষ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১-এর নির্দেশনা শিক্ষা আইনেও প্রতিফলিত হওয়া দরকার। ষ এ আইনের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতার নীতিমালা থাকতে হবে। ষ প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। ষ শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এসএমসি, উপজেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সরকারি প্রশাসন স্থানীয় সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও পরিদফতরের কার কী দায়িত্ব, কিভাবে, তা কোন সময়সীমার মধ্যে পালন করতে হবে এবং বাস্তবায়নের জন্য অর্থ ও পরিসম্পদের উৎস ইত্যাদি বিষয়ে নির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। ষ শিক্ষা কার্যক্রমকে হরতালের আওতামুক্ত রাখার জন্য একটি আইন থাকা উচিত। ষ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক, গ্রহণযোগ্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, যথাযথ শিক্ষা উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে স্কুলে এমনভাবে পাঠদান করতে হবে যাতে প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং পদ্ধতি নিরুৎসাহিত হয়।
এ কথা মানতে হবে, সরকারি-বেসরকারি উভয় উদ্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষা অনেক দূর এগিয়েছে। এখন এর গতি বৃদ্ধি ও সীমা সম্প্রসারণের জন্য সমন্বিত প্রয়াস ও উদ্যোগ দরকার। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষক সংগঠন, শিক্ষক-অভিভাবক ফোরাম ও সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশগ্রহণ ও সমর্থন শিক্ষার প্রসার ও মান উন্নয়নে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে শিক্ষানীতিতে বর্ণিত আইনের মাধ্যমে সংবিধিবদ্ধ একটি ‘স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন’ করা হলে সময়ের প্রয়োজনে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে শিক্ষানীতির পরিমার্জন ও প্রয়োজনে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলমান রাখা সম্ভব হবে। আশা করি, শিক্ষায় এরই মধ্যে অর্জিত সাফল্যগুলো ধরে রাখতে এবং শিক্ষার ভিত্তিতে জাতীয় অগ্রগতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় উপলব্ধি থেকে শিক্ষা আইন পাস হবে। তা বাস্তবায়নের সমবেত, সমন্বিত উদ্যোগও সফল হবে।
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক; চেয়ারম্যান, আইএইচডি

অনড় অবস্থান আর একগুঁয়েমি ভালো নয় by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

দেশ ও মানুষের সমস্যা আর সমাধান নিয়ে আবর্তিত হয় রাজনীতির দাবা খেলা। দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদরা এ খেলার মূল খেলোয়াড়। তারাই সাধারণ মানুষের সেবক। জনগণের সমস্যার সমাধান করে তাদের জীবনমান উন্নত করাই রাজনীতিবিদের স্বপ্ন। তবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে খেলোয়াড়ের সংখ্যা অনেক হওয়ায় তীব্র প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গণসেবার লক্ষ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারদের ম্যান্ডেট নিতে হয়। জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দলই সাংবিধান নিয়মানুযায়ী সরকার গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করে। তবে কোনো দলীয় সরকার প্রতিশ্র“ত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে জনগণ ওই দলকে ম্যান্ডেট না দিয়ে অন্য কোনো দলকে সরকার পরিচালনার জন্য পছন্দ করেন। এভাবে জনগণ সরকার পরিবর্তন করতে পারেন বলেই গণতন্ত্রে তাদের ‘কিং মেকার’ বলা হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণকে অসন্তুষ্ট করে, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হয় না। এসব জেনেও স্বৈরতন্ত্রের লেবাসধারী অনেক তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার জনমতের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতায় থাকার বা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার অপচেষ্টা করেন। এদের কেউ কেউ সাময়িক সাফল্য পেলেও পরে গণইচ্ছার কাছে এদের পরাজিত হতে হয়। জনগণের মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে একগুঁয়েমি করে দেশ পরিচালনা বা ক্ষমতায় থাকার চেষ্টার পরিণতি কখনও ভালো হয় না। যুগপৎ সামরিক ও বেসামরিক সরকারকে অনেক সময় জনমতকে প্রাধান্য না দিয়ে একক সিদ্ধান্তে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যর্থ হতে দেখা যায়। এ দেশে এমন উদাহরণ রয়েছে।
বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের (১৯৯১-১৯৯৬) সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রধান দুটি আসনে জয়লাভের পর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে সংসদ নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করে। বহুল আলোচিত মাগুরা উপনির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত হলেও ওই দুর্নীতিতে সরকারি দল বেশি বাড়াবাড়ি করায় আওয়ামী লীগ মাগুরা উপনির্বাচনকে অছিলা বানিয়ে বিএনপি সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করে ওই দাবি আদায়ে জামায়াত-জাপাকে সঙ্গে রেখে জোরালো আন্দোলন শুরু করে। বেগম জিয়া প্রথমে এই দাবি মানতে রাজি হননি। তার যুক্তি ছিল, বিএনপি সরকার একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। এ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ভালো হয়েছে এবং ওইসব নির্বাচনে বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা ভালো করেছেন। কাজেই সংবিধান অনুযায়ী এ সরকারের অধীনেই নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবে। অসাংবিধানিক কোনো দাবির কাছে মাথানত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি মেনে নেয়া যাবে না। এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে দীর্ঘ দুই বছরে দেশী-বিদেশী অনেক প্রচেষ্টা হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ব্যক্তি কে হবেন সে বিষয়ে দুই বড় দলের মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় সেসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
উল্লেখ্য, উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় ওই সময় শামিল হয়েছিলেন কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল এমেকা এনিওকু, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার লর্ড ওয়াডিরিল, আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট রবিন র‌্যাফেল এবং ঢাকাস্থ বিদেশী কূটনীতিকরা। এ ছাড়া দেশীয় প্রচেষ্টার মধ্যে জি-ফাইভ (যার সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ, সাবেক আমলা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমেদ এবং মুজিব সরকার আমলের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য রেহমান সোবহান) এ মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ওই রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে ২১টি ফর্মুলা প্রদত্ত হয়েছিল, যার মধ্যে ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদের ফর্মুলাটি কূটনীতিকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। বিএনপি প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ১০ সদস্যবিশিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তাব আওয়ামী লীগ এই বলে নাকচ করে দিয়েছিল যে, এর ফলে বিরোধীদলীয় নির্দলীয় সরকারের দাবি বাস্তবায়িত হবে না। আন্দোলনের এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদ থেকে সম্মিলিত পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি অধিকতর জটিলাকার ধারণ করে। জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বিএনপিকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য একটি যেনতেন নির্বাচন করে স্বল্পায়ুর ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে এককভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নিয়ে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজয়বরণ করতে হয়। ওই সময় বিএনপি যদি বিরোধী দলকে দুই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে না দিয়ে ওই আন্দোলন শুরু হওয়ার কিছু দিন পরই গণনাড়ির স্পন্দন অনুভব করে সংসদ থেকে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত পদত্যাগের আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে নির্বাচন দিত, তাহলে দলটি পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে আরও ভালো করতে পারত। বেগম জিয়া প্রথমে অনড় অবস্থান নিয়ে কিছুটা একগুঁয়েমি করে বিরোধী দলকে দুই বছর আন্দোলন ও দেড় শতাধিক হরতাল করিয়ে তারপর তাদের দাবি মানার কারণে ওই সময় সরকারের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার চরিত্র প্রায় একই রকম। তবে এ ক্ষেত্রে পূর্বেকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগের করা আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চলমান ১৮ দলীয় আন্দোলনের কিছুটা পার্থক্য আছে। প্রথম আন্দোলনটিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো যত বেশি আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল, বর্তমানের আন্দোলনটিতে ১৮ দলীয় জোট তত বেশি আন্দোলন-হরতাল-সংগ্রাম করেনি। আবার প্রথম আন্দোলন মোকাবেলায় সরকার যতটা কঠোরতা অবলম্বন করেছিল, বর্তমানে আন্দোলন কর্মসূচি মোকাবেলা করতে হামলা, মামলা, পুলিশ-র‌্যাব, দলীয় নেতাকর্মী ও ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহার করে সরকার তার চেয়ে অনেক বেশি কঠোরতা অবলম্বন করছে। আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোরনীতি অবলম্বন করার কারণে বিএনপির আন্দোলন কৌশলও হচ্ছে ভিন্ন রকম। এ ব্যাপারে বিএনপি অনেকটা দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছে বলা যায়। কারণ প্রথম থেকেই জোরালো আন্দোলন শুরু করলে সে আন্দোলনকে সরকারি কঠোর দমননীতি মোকাবেলা করে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রেখে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা কঠিন হবে মনে করে দলটি প্রথমে ধীরগতির আন্দোলন করে নিজ দাবির পক্ষে জনগণকে অধিকতর সম্পৃক্ত করার জন্য অহিংস রোডমার্চ, সভা-সমাবেশ, রাজনৈতিক ক্লাস, সেমিনার, আলোচনা সভা, মানববন্ধন প্রভৃতি ধরনের কর্মসূচি পালন করে নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখছে। পরে চূড়ান্ত অবস্থায় গিয়ে দলটি সর্বশক্তি নিয়ে কঠোর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দাবি আদায়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করার নীতি অবলম্বন করেছে। অন্যদিকে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখে বিরোধী দলগুলো তাদের দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট রয়েছে এবং এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই আলোচ্য অচলাবস্থা নিরসনে পরাশক্তিগুলোকে আগ্রহী করতে সমর্থ হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘ সেক্রেটারি জেনারেলকে পর্যন্ত এ ব্যাপারে ভূমিকা পালনে তৎপর দেখে মনে করা যায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের আলোচ্য সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট মাথা ঘামাচ্ছে। যেসব রাষ্ট্র কখনও স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত হতে আগ্রহী হতো না, যেমন- চীন, থাইল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রকেও বিরোধীদলীয় কূটনৈতিক তৎপরতায় এ ব্যাপারে জড়িত করা সম্ভব হয়েছে। আলোচ্য সমস্যার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর মনোযোগ দেখে ভাবা যায়, এ সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে গ্লোবাল ভিলেজে বাস করে সরকারের পক্ষে বিরাধী দলকে হামলা-মামলা ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে নাস্তানাবুদ করে অযৌক্তিকভাবে যা খুশি তাই করা খুব একটা সহজ হবে না।
সরকারের ভুলে না যাওয়া ভালো যে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিটি কেবল ১৮ দলীয় জোটের দাবি নয়, দেশের অধিকাংশ মানুষও এমনটিই চান। যেহেতু এ ব্যবস্থায় নির্বাচনী স্বচ্ছতা সুনিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সে কারণে এ ব্যবস্থাকে না মেনে আদালত বা সংবিধানের ওপর অনড় থাকার ‘একচুলও না নড়ার তত্ত্ব’ উপস্থাপন করে বিরোধী দলকে আন্দোলনে ঠেলে দিলে সরকারের জনসমর্থন বাড়বে না। প্রধানমন্ত্রী এর আগে কখনও বিরোধীদলীয় অংশগ্রহণযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলে, আবার কখনও সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে, এখন সেসব বক্তব্য থেকে সরে এসে সম্প্রতি সচিবদের সভায় ভিন্ন বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এ বক্তব্য অনুযায়ী তিনি সংসদ বহাল রেখে, মন্ত্রী-এমপি-প্রধানমন্ত্রিত্ব বজায় রেখে সাজানো প্রশাসনে স্বনিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেন। তার এ বক্তব্যের সঙ্গে না আছে তার প্রাসঙ্গিক পূর্বের বক্তব্যের কোনো সাদৃশ্য, না আছে বিরোধীদলীয় দাবির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রী এ বক্তব্যে যে অনড় থাকবেন এমনটি সরকারে শরিক দলগুলোর নেতা, সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রী, এমনকি নির্বাচন কমিশনও বিশ্বাস করছে না। এ কারণে সবচেয়ে কম কথা বলা ইসি কমিশনার আবু হাফিজ প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার বক্তব্যে বিশ্বাস না করে ৪ সেপ্টেম্বর, ‘এটা ওনার শেষ কথা কি-না, তা আমরা জানি না’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রী তার সংসদ-মন্ত্রী-এমপি বহাল রেখে নির্বাচন করার নীতিতে অটল থাকেন, নাকি সংসদ ভেঙে দিয়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আপসরফা করার দিকে অগ্রসর হন। দ্রুত আপসরফা করে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে সাফল্য দেখিয়ে নির্বাচনে গেলে সরকারি দলের জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, কিছুটা ভালো করার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু ‘যেভাবেই হোক না কেন নির্বাচন জিততেই হবে’ নীতিতে অটল থেকে চরম একগুঁয়েমি করে নির্বাচনকে অনিশ্চয়তা এবং দেশকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ঠেলে দিলে সরকারি দলকে একদিকে যেমন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে হতাশাব্যঞ্জক পরিণতি বরণ করতে হবে, তেমনি অন্যদিকে ভবিষ্যতে অনাকাক্সিক্ষত কারণে বিলম্বিত নির্বাচন হলে এবং সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। এখন দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রীকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি জনগণের পছন্দনীয় আপসরফায় মনোযোগী হয়ে হৃত জনপ্রিয়তা উদ্ধারে মনোযোগী হবেন, নাকি জনমতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজস্ব একগুঁয়েমিতে অনড় থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অসন্তুষ্ট ও জনমতকে উপেক্ষা করে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার পথ বেছে নেবেন। সরকারপ্রধান অবিবেচকের মতো ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে, সংসদ-মন্ত্রী-এমপি বহাল রেখে, বিরোধীদলীয় দাবি অগ্রাহ্য করে, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে, চরম একগুঁয়েমির পথ ধরে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাইলে যে তার পরিণতি ভালো হবে না সে বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয়া যায়।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নাইউজি মসজিদ ও রেডগার্ড by মঈনুস সুলতান

সাড়ে তিন বছরের কন্যা কাজরিকে নিয়ে আমরা সন্ধ্যের পর বসেছি বেইজিং শহরের একটি রেস্তোরাঁয়। এখানকার অত্যন্ত আন্তরিক বাবুর্চি আজ পরিবেশন করেছেন কুজয়াও ইউ বলে শির্কায় জারিত গোলমরিচের ফোঁড়ন দেয়া আস্ত একটি মাছ। কাজরির জননী হলেন চপস্টিকে এক টুকরা মাছ উঠাতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে চেয়ে আছে কাচের জানালায় লাগানো চীনের সিয়ন অঞ্চলের সপ্তম শতাব্দীতে কায়েম ঐতিহাসিক মসজিদের ছবির দিকে। সম্পূর্ণ চীনা স্থাপত্য রীতিতে টালির ঘেরা কার্নিশ দেয়া মসজিদটির ছবি সে অনেকবার দেখেছে, কারণ আমরা বেইজিংয়ে আছি সপ্তাহ দুয়েক হল এবং প্রায় প্রতিদিনই সপ্তায় ডিনার করছি এ রেস্তোরাঁয়। এখানকার বাবুর্চি (তিনিই একমাত্র কর্মচারী সম্ভবত মালিকও), সিয়ান থেকে আগত হুই সম্প্রদায়ের মুসলিম। সাদামাটা এ রেস্তোরাঁর বাইরের দিকের কাচে লাগানো আছে কাবা শরিফ ও মদিনা মনওয়ারার দুটি স্টিকার। হুই গোত্রের এ কুক দেখতে অনেকটা মিনিয়েচার চিত্রে আঁকা ছোট ছোট চোখের যৎসামান্য দাড়িওয়ালা মোগল সিপাহির মতো। চোখজোড়া আকারে বেজায় ছোট্ট হলেও তার হৃদয় অত্যন্ত দরাজ। স্টিকার দেখে তার ধর্ম নির্ণয় করে আমরা প্রথম যেদিন এখানে ঢুকি; স্লামালেকুম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাত বাড়িয়ে মোসাফা করে আমাদের বসতে দেন। কাজরি দুষ্টুমিতে বেসামাল হয়ে সয়-সসের কৌটা উল্টে দিলে তাকে টেনে নেন তার প্রশস্থ বুকে। তারপর তার সংকীর্ণ দুই চোখ আরেক প্রস্থ ছোট করে তার সঙ্গে খুনসুটিতে মাতলে এবং পরে তার খাবারের দাম চার্জ না করলে আমরা বুঝতে পারি তার আন্তরিকতা অশেষ এবং আমাদেরও এখানে আসতে হবে অনেকবার।

আজকের পারিবারিক ডিনার কিছুতেই জমে উঠছে না। আমরা বসেছি লেডি সুজান নামে পরিচিত একটি গোলটেবিলে, যাতে আলগা কাচের চাকতির উপর খাবারের বাটিগুলো রাখা। তার জননী হলেন নিশ্চুপ হয়ে আছে বলে সে চাকতি ঘোরালে তাতে রাখা সুয়ানালা টাং বা হট এন্ড সাওয়ার স্যুপের বাটি উপচে টেবিলক্লথ ছলকে পড়ে উষ্ণ তরল। হলেন তাতে ভ্রুকুটি করে কাঁধ হেলালে তার তাম্রবর্ণের ব্র“নেট চুলের বাঁকানো কার্লে এসে পড়ে লোহিত ট্যাসেল ঝোলা চীনা লণ্ঠনের আলো। বিকালের দিকে একটা বিষয়ে আমাদের দ্বন্দ্ব হয়েছে, সে থেকে বাতচিত প্রায় বন্ধ। আজকের সকাল কিন্তু আমাদের মোটমির্যা ভালোই কেটেছে। ৯টার দিকে বাজার বাও আরও ১০ জন পর্যটকের মতো আমরা ঢুকে পড়ি। নিষিদ্ধ নগরীর ঈশান কোনে ৬৯ হেক্টরে বিস্তৃত চীন সম্রাটদের দশম শতাব্দীতে তৈরি বাগিচা বিলাস বেইহাই পার্কে। এখানে সরোবরের ভেতর একটি কৃত্রিম দ্বীপে পাহাড়ের চূড়ায় অমিতাভ গৌতমের শ্বেত মর্মরের প্যাগোডা। সরোবরের পাড় ঘেঁষে জলের উপর ভাসমান জোড়া প্যাভেলিয়ন। আমরা তার চাতালে বসে ঘুরে তাকালে একটি ব্রিজের তিনটি দৃষ্টিনন্দন বৃত্ত ও পাহাড়ে মন্দিরের আকৃতি চলে আসে সমান্তরাল রেখায়। কাজরি অন্য চীনা বাচ্চাদের সঙ্গে ছোটাছুটি করে। তাদের মা-বাবা শ্বেতাঙ্গিনী রমণীর সঙ্গে জুটে যাওয়া বাঙালি পুরুষের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে আমাদের অত্যন্ত মশলাদার কুড়মুড়ে খাবার অফার করলে; তার সর্ষে-মরিচময় ঝাঁঝ শুঁকে আমাদের মেজাজ খুশ হয়ে যায়। হলেন সরোবরে ফোটা পদ্মের দিকে তাকিয়ে ইম্পিরিয়েল গার্ডেনের ম্যাজেস্টিক বিউটিতে মুগ্ধ হয়ে প্রিন্সেস অব চায়নার বিশুদ্ধ সুর শিস দিয়ে ভাঁজে।
বিকালের দিকে বেইজিং রেলওয়ে স্টেশনে যাই ট্রেনে চড়ে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটরে যাওয়ার খোঁজ নিতে। আমাদের আরও সপ্তাহ দুয়েকের সাবকাশ আছে সুতরাং অবকাশ যাপনের জন্য উলানবাটরে যাওয়া যায়। কিন্তু হলেন সহসা সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা নিয়ে মঙ্গোলিয়ায় যেতে চায় না। হঠাৎ মতান্তর দেখা দিলে আমি বেজায় আতান্তরে পড়ি। উলানবাটরে যাওয়ার আইডিয়া আদিতে তারই ছিল। এমনিতেই বেইজিংয়ের অলিগলিতে চীনা জবান বুঝতে আমাদের লবেজান হওয়ার দশা, তার উপর উলানবাটরে চলে মঙ্গোলিয়ান আর অল্পবিস্তর রুশ; দুটোই আমাদের আজানা। সুতরাং সে আরেকটি স্রেফ বেগানা ভাষা নিয়ে ডিল করতে চায় না। কিন্তু ভাষা না জেনে কি মানুষজন ভিন্ন দেশে যাচ্ছে না? পর্যটকরা তো ভাষাতত্ত্বের পয়লোয়ান না, তারা তো কেউ লবেজান হচ্ছে না, দিব্যি ট্রেন চড়ে পাড়ি দিচ্ছে মঙ্গোলিয়ার দিকে?
এ দ্বন্দ্ব বিস্তৃত হতে হতে এখন কথা বন্ধে দাঁড়িয়েছে। রেস্তোরাঁর গোলটেবিলে খাবার সামনে নিয়ে আমরা ডিনারের ভান করছি, এমন সময় বাবুর্চি এসে কিছু বলার চেষ্টা করেন। তার বাচনিকে আমরা কিছু না বুঝে আরও দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। তিনি কাজরিকে চীনা মিষ্টান্নের একটি প্যাকেট দিয়ে ডেসপারেট হয়ে কানে আঙ্গুল দিয়ে আজানের ভঙ্গি করে রুকু সেজদায় রীতিমতো নামাজের নিশানা করেন। বিষয় কি? মূকাভিনয়ে তার যে কিছু প্রতিভা আছে তার পরিচয় তিনি আগেও দিয়েছেন। প্রথম দিন আমাদের মাংস পরিবেশন করলে তা কীসের মাংস আমরা জানতে চাই। তার বক্তব্য, আমাদের বোধগম্য না হলে তিনি কুকরুকু ধ্বনিতে মোরগার মতো পাখা ঝাপটিয়ে তথ্য পরিবেশন করেন। এবার তার রুকু সেজদার সঙ্গে লা ঈদ লা ঈদ ধ্বনিত হলে হলেনের মুখে হাসি ফোটে। সে বাবুর্চির আচরণ থেকে আবিষ্কার করে আগামীকাল ঈদ। তিনি একটি চিরকুটে বেইজিংয়ের নাইউজি মসজিদের ঠিকানা লিখে দেন।
রেস্তোরাঁ থেকে অল্প দূরে বেইজিংয়ে ডংচেং ডিস্ট্রিক্টের একটি সস্তা হোটেলে আমরা বাস করছি। ওখানে ফেরার পথে বুঝতে পারি ঈদ শব্দটি সিসিম ফাঁকের ম্যাজিকের মতো খুলে দিয়েছে আমাদের মনের সিন্ধুক। নানা দেশে পারিবারিকভাবে ঈদ উদযাপনের কিছু মুখরোচক মেমোরি আমাদের আছে। সুতরাং হোটেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বেইজিংয়ে কীভাবে ঈদ পালন করা যায় তা নিয়ে হলেন পরিকল্পনা করতে শুরু করে। হোটেলে ঢুকতেই আমার মাথায় সংশয় চাগিয়ে ওঠে। বাবুর্চি তো লা ঈদ বলে সংবাদ দিলেন। শব্দটা আমরা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছি তো? সব কিছুতে থরোভাবে জেনেশুনে কাজে নামার প্রবণতা হলেনের আছে। তাই বিষয়টি কনফার্ম করার জন্য হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে সে কথা বলতে চায়। এ হোটেলে ম্যানেজারই একমাত্র ব্যক্তি যার চল্লিশটি মতান্তরে পচপান্নটি ইংরেজি শব্দের উপর দখল আছে। বেশ রাত হয়েছে, তার কামরার সামনের দুয়ার বন্ধ। হলেন ঠেলে পেছনের দুয়ার দিয়ে ঢুকে পড়ে। ভেতরে ভদ্রলোক তাড়তাড়া নোট ছড়িয়ে বসেছেন। রিসিপশনিস্ট তরুণী ডেক্সের উপর পা ঝুলিয়ে বসে গুনছে ভাংতি পয়সা। খোলা ক্যাশবক্সের পাশে রাখা তার সিল্কের স্টার্কিংস ও কাওলিয়াং জু বলে সরগম ওয়াইনের খোলা শিশি। মনে হয় আমরা তাদের প্রাইভেট মুহূর্তে ঢুকে পড়েছি। হলেনের মুখে ঈদ শব্দটি শুনে ম্যানেজার এমন তেড়ে ওঠেন যেন আমরা সিঁদ কেটে ঢুকে পড়েছি তার কক্ষে।
শেষ রাতের দিকে কাজরি জেগে উঠে-বাপি হোয়েন ইজ ঈদ... ঈদ করলে আমাদের ঘুমনিদ তেমন ভালো হয় না। মসজিদে যাওয়ার জন্য কি পরব তা নিয়েও একটু বিভ্রান্তি হয়। হলেন আমাকে মাও-জ্যাকেট বের করে দেয়। এ ছাড়া মসজিদে পরে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত পোশাক-আশাকও পাই না। বেইজিংয়ে আগমনের প্রথম সপ্তাহে আমি একটি পঞ্চতারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত সেমিনারে যোগ দেই। ক্যাজুয়েল পোশাকে ওখানে ঢুকতে গেলে দুয়ারে দাঁড়ানো মিলিটারি পোশাকের এক চৌকিদার পথ আটকে ফর্মাল ড্রেসকোড তথা স্যুট পরে আসতে বলে। উপায়ান্তর না দেখে হোটেলের শপিং আর্কেডের দোকান থেকে রেডিমেড স্যুট কেনার চেষ্টা করি। কিন্তু অনভ্যাসবশত টাই পরতে গিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ গলবন্ধ বাঁধাকে ধাঁধার চেয়েও জটিল মনে হয়। সুতরাং স্যুটের পরিবর্তে মাও-জ্যাকেট খরিদ করে তার সঙ্গে মাথায় কমরেড লিনপিয়াও স্টাইলের হ্যাট পরে রেডগার্ডের মতো বীরদর্পে সেমিনার কক্ষে প্রবেশ করি। মাও-জ্যাকেট দিয়ে সেমিনার জয় করলেও তা পরে মসজিদে যেতে কেমন যেন খুঁতখুঁত করে। আয়নায় তাকালে নিজের চেহারাকে কিরকম সাবেক আমলের ব্যর্থ বিপ্লবীর মতো দেখায়।
ট্যাক্সিতে নাইউজি মসজিদে আসতে আমাদের বিশেষ কোনো অসুবিধা হয় না। সম্পূর্ণ চীনা স্থাপত্য রীতিতে তৈরি এ মসজিদের লোহিত নীলে রঙিন কাঠের কাঠামোতে নানা কোনবিশিষ্ট টালির কাজ দেখে ভাবি- উপাসনার এ ইমারতটি তৈরি হয়েছে চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ইসলামী বিশ্বের মসজিদ স্থাপত্যের সনাতনী ধারার ব্যতিক্রম হিসেবে। তার সামনে ততক্ষণে মুসল্লিরা জমায়েত হতে শুরু করেছেন। রোয়াকে বিক্রি হচ্ছে টুপি, তসবিহ, হেজাব, মেয়েলি শাল ও ঊর্ণা। আমি চট করে কাজরিদের জন্য দুটি ঊর্ণার সঙ্গে জরির কাজ করা একটি টুপি কিনে নিলে আমাকে চীনা ভাষায় নামাজের নিওত ও তকবির লেখা ফ্রি প্যাম্ফলেট দেয়া হয়।
তোরণের পাশে ছোট্ট মিনারের তিন স্তরে পর পর রাখা মস্ত ঢাক, ঘণ্টা ও একদম উপরের থাকে ছোটখাটো বৃক্ষের মতো ডালপালায় প্রসারিত বিশাল মোমদান। নিচে মাও-জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে জনা চারেক প্রৌঢ়। তাদের লেবাস দেখতে পেয়ে আমার বদখত পোশাকের জন্য আর কোনো খেদ থাকে না। একজন এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা করেন। চীনা এ মুরব্বি গোছের বান্দার থুঁতনিতে আঙ্গুলে গোনা যায় এরকম তেরো কিংবা চৌদ্দটি দাড়ি। তিনি তা চুমরিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলেন, লিয়াও বংশের সম্রাটদের আমলে ৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মিত হয়। সে আমলে ইমামের পুত্র নজরুদ্দীন স্থপতি হিসেবে কাজ করেন। তখন তাবৎ চীন দেশে মুসলমানরা ছিলেন হাজার দশেকের মতো। হালফিল তাদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮ মিলিওন বা এক কোটি আশি লাখ। তিনি মিনারের পেছন দিকে রঙিন টাইলস বসানো কিছু পাথরের ভাঙা টুকরা ও একটি মিনারের অগ্রভাগ দেখিয়ে বলেন, এসব চেংগিস খানের কীর্তি। হলেন বিদ্রুপ করে বলে, গ্রেইট খান, যেখানে যা পান তা চুরমার করাই তো কারবার ছিল উনার। এগুলোর পাশেই একটি শিলালিপিতে চিইং বংশের সম্রাটের ১৬৯৪ সালে দেয়া ডিক্রি।
এ সনদের মর্মার্থ বোঝার আগে মসজিদের আঙিনায় এসে দাঁড়ান মাও-জ্যাকেটের সঙ্গে মাথায় পাগড়ি পরা এক দল বৃদ্ধ। সবাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন কানজোকা লাঠি। হলেন জানতে চায় এদের হাতে লাঠি কেন? মুসল্লিদের ভিড় বাড়ছে, ইংরেজিতে যিনি সব বুঝিয়ে বলছিলেন তিনি সরে গেছেন। ভিন দেশে রীতিনীতি ভিন্ন, চীনারা কেন কাঠি দিয়ে ভাত খায়, কেন লাঠি নিয়ে মসজিদে আসে, এসব ব্যাখ্যা করা কঠিন। হেজাব পরা এক মহিলা এসে কাজরি ও হলেনকে নিয়ে যান মহিলাদের জন্য নির্ধারিত জায়গায়।
মসজিদের ভেতরে কাঠের দেয়াল ও ছাদে লালনীলের জ্যামিতিক প্যাটার্নে হাল্কা সোনালি মেশানো চীনা নকশার সঙ্গে সুচারুভাবে মিশেছে ইসলামী ক্যালিওগ্রাফের আরবি বর্ণমালা। বারান্দায় কাগজের স্ক্রলে খাগের কলম দিয়ে চীনা ক্যালিওগ্রাফিতে কিছু লেখছেন চশমা চোখে সফেদ দাড়িওয়ালা এক অশীতিপর বৃদ্ধ। মুসল্লিদের একে তাকে জিজ্ঞেস করি, কি লিখছেন এ বুজুর্গ? খানিক খুঁজতেই একটু আগে ইংরেজি কথা বলনেওয়ালা মুরব্বিকে পেয়ে যাই। তিনি ব্যাখ্যা করেন- সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় রেডগার্ডদের হাতে মৃত্যু হয়েছিল বেশ কিছু মুসলমানের। তখন নিগৃহীত হয়েছিলেন এ বৃদ্ধ। তিনি এখন স্ক্রলে ক্যালিওগ্রাফ করে লিখছেন তাদের মাগফিরাতের জন্য প্রার্থনা। তার বক্তব্য থেকে আরও বুঝতে পারি, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উল্লেখ করে মাইক্রোফোনে মোনাজাত করা বা ছাপিয়ে কিছু প্রকাশ করা আজ ইস্তক বেআইনি। কিন্তু খাগের কলম দিয়ে স্ক্রলে লেখাজোকাতে আইনি কোনো বাধানিষেধ নেই। নামাজিদের সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকলে অনেকেই আঙিনায় জায়নামাজ বিছিয়ে কাতার বাঁধেন। খুতবার পর পর বড়সড় এক টুপির ভেতর স্ক্রল রেখে তা নামাজিদের হাতে হাতে চলে যায় কাতারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তারা হাত দিয়ে স্ক্রল স্পর্শ করে মৃদু আওয়াজে উচ্চারণ করেন আমিন।
নামাজ শেষ হতেই আঙ্গিনাতে বেরিয়ে আসি। কাজরি চমৎকার ঝালর দেয়া কালো পোশাকের ছোট্ট একটি চীনা বাচ্চার সঙ্গে মিনারের আশপাশে ছোটাছুটি করে খেলছে। ওখানে চেয়ার-টেবিল পেতে বসেছেন আমাদের অভ্যর্থনা করা মাও-জ্যাকেট পরা চার প্রৌঢ়। তাদের সামনে মস্ত মস্ত লেজার বুক, দোয়াতদানী ও কলম। লোকজন সারি বেঁধে সম্ভবত ফিতরা বা জাকাত জমা দিচ্ছে। তারা টাকা ক্যাশবাক্সে রেখে সিরিয়াসলি সিলছাপ্পড় মেরে রসিদ দিচ্ছেন। পুরো ব্যাপারটিকে তহসিল অফিসে খাজনা দেয়ার মতো দেখায়। কাজরি চীনা মেয়েটির সঙ্গে ছুটে যাচ্ছে তোরণ পেরিয়ে । আমরা পিছু পিছু ফুটপাতে এসে দেখি এক লোক নিয়ে এসেছেন ভাত, আলু, চানা ও মটরশুঁটির পাশে বৃত্তাকারে ডিম দিয়ে সাজানো খাবারের খুঞ্চা। তিনি ইশারায় ডেকে বাটিতে ধনেপাতা ছড়িয়ে তা ধরিয়ে দেন আমাদের হাতে। ঠিক তখনই অন্য মেয়েটির হাত ধরে কাজরি এসে বলে-বাপি, মিষ্টি... মিষ্টি। কী সৃষ্টি ছাড়া আবদার, চীনে মিষ্টি পাব কোথায়?
তখন মিনারের ঢোলে চাটি পড়লে রীতিমতো গোল বেঁধে যায়। নামাজিরা বড় বড় ঝাঁটা, শাবল, নিড়ানি, খন্তা, ঝাঁঝরি ও পানি দেয়ার হুজপাইপ নিয়ে সাজসাজ রবে কাতার বাঁধেন। তাদের সামনে মস্ত ডালায় তাজা ফুল নিয়ে সিল্কের সিয়োংসাম বা সনাতনী কেতার ফুলতোলা কামিজ পরা কয়েকটি তরুণী। জানা যায় যে, ঈদের নামাজের পর রীতি হচ্ছে গোরস্থানে গিয়ে পূর্বপুরুষদের কবর ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে তাতে ফুল ছড়িয়ে আগরবাতি জ্বালানো। কাজরি ততক্ষণে ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে চেপে বসেছে একটি রিকশায়। আমরা তাকে নামিয়ে আনতে গেলে মেয়েটি তাকে জিজি বা বড় বোন বলে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটির মা-বাবা আরেকটি রিকশা ডাকেন। পুরুষটি ইংরেজি বলেন মোটামুটি ভালোই। তারা বাস করেন পাশের একটি গলিতে। তো আমরা রিকশা চড়ে চলে আসি তাদের বাসায়।
তাদের বাসাবাড়ির অবস্থান নাইউজি মসজিদের পাশেই সিচিয়েং ডিস্ট্রিকটে। এ মহল্লায় প্রায় হাজার দশেক মুসলমান বাস করেন সনাতনী কেতার ঘরদুয়ারে। আমরা যে পরিবারে আজ ঈদের মেহমান হয়েছি তাদের পুরনো ধাঁচের বাড়িটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভেতরের স্কোয়ার শেইপের আঙ্গিনা। তা লতানো কুঞ্জে ঝুলানো পাখির পিঞ্জিরায় সজ্জিত। চারদিকে একাধিক কক্ষের টানা বারান্দা ঘেরা এ উঠানে সিরামিকের টবে রাখা বনসাই, সংগৃহীত পাথরে ঝরঝর করে ঝরছে জল, কাচের চৌবাচ্চায় রাখা গোল্ডফিস, পাশে বসে রোদ পোহাচ্ছে তুলতুলে পশমি বিড়াল। আমরা অর্কিডকুঞ্জের জালের চাঁদোয়ার নিচে বেতের চেয়ারে বসি। পাশেই ইজিচেয়ারে বসেছেন ছোট্ট মেয়েটির পিতামহ। তাকে আমরা মসজিদে কানজোকা লাঠি হাতে অন্য বৃদ্ধদের সঙ্গে দেখেছি। তিনি এখন তার হাঁটুতে পাগড়ি খুলে রেখে ফোকলা দাঁতে হেসে তসবিহ টিপেন। একটু দূরেই এ পরিবারের আরেক সদস্য গ্রিলে শিককাবাব চাপিয়ে পাখা দিয়ে অঙ্গারে বাতাস করছেন।
গ্রীন-টি পরিবেশিত হলে গোলটুপি মাথায় দিয়ে গৃহকর্তা আমাদের সঙ্গে চা-পানে যোগ দেন। আমি তাদের পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজ থেকে ৩২ বছর আগে তারা কোয়ানঝু অঞ্চলের লিয়াংসান পার্বত্য এলাকা থেকে বেইজিংয়ে আসেন। অনেক বছর আগে তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ, পেশায় জাহাজি আরব, বাণিজ্য করতে চীন দেশে এসে স্থানীয় নারীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থিতু হন এখানে। তার পিতা মাথায় পাগড়ি দিয়ে পুত্রকে চীনা ভাষায় কিছু বলেন। ছেলে উঠে ঘর থেকে নিয়ে আসেন বাঁধানো একটি ফটোগ্রাফ ও রেশমি কাপড়ে ঢাকা বেতের ঝুড়ি। ছবিতে গিলাফ মোড়া পাশাপাশি দুটি কবর। এ মাজার দুটির একটি হচ্ছে ইমাম হাশিম ও অন্যটি হচ্ছে ইমাম জাফর সাদেকের। এ ইমাম দুজন ইসলাম প্রচারে চীন দেশে এসেছিলেন। চীনা ভাষায় মুসলিম সম্প্রদায়ে তারা যথাক্রমে সা কে ঝু ও উ কো শান নামে পরিচিত। লিয়াংসান পর্বতের পাদদেশে যুগল-মাজারের পাশেই এ বৃদ্ধের ছিল আদি বসতবাড়ি।
১৯৬৫ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় রেডগার্ডের অত্যাচার তীব্র হলে পরিবারটি কোয়ানঝু এলাকা ছেড়ে বেইজিংয়ে চলে আসে স্থায়ীভাবে। পুত্র রেশমী ঢাকনা সরিয়ে ঝুড়ি খুলে একটি সিরামিকের আগরদানের ভাঙ্গাচোরা টুকরা দেখান। ঝুড়িতে আরো আছে একটি জায়নামাজের পোড়া অংশবিশেষ। পরিবারে রসুম ছিল ঈদেচান্দে যুগল-মাজারে গিয়ে আগরবাতি জ্বালানো। রেডগার্ডের ছেলেমেয়েরা ঈদের দিন তার বাড়িতে ঢুকে এসব জিনিস ভেঙেচুরে পুড়িয়ে তছনছ করে দেয়। তবে একটি জিনিস তারা পুড়াতে পারেনি। পুত্র এবার ঝুড়ি থেকে বের করেন সিরামিকের বয়াম। তার ভেতরে রাখা হাতে লেখা মিনিয়েচার অজিফা। রেডগার্ডরা যখন মুসলমান প্রতিবেশীদের ঘরদুয়ারের উপর তুলতবিল চালাচ্ছিল তখন তিনি বুদ্ধি করে তার আরব পূর্বপুরুষের স্মৃতি বয়ামের ভেতর ঢুকিয়ে তা পুঁতে ফেলেন মাটির নিচে। অনেক বছর পর বেইজিং থেকে কোয়ানঝু এলাকায় ফিরে গিয়ে তা উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।
রেডগার্ডের নিপীড়নের স্মৃতিতে বিষণ্নতা ও ক্ষোভ থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্য রঙিন ফুলে ছাওয়া পিওনি গাছের পাশে টেবিল পাতলে কথাবার্তায় আবার ঈদের আমেজ ফিরে আসে। ছোট্ট মেয়েটির মা খাবার সাজান। কাজরি সিল্কের সিয়োংসাম পরে চীনা বাচ্চা সেজে ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে ডেক ডেকচি দিয়ে পুতুলের জন্য খাবার রাঁধছে। বৃদ্ধ বাটিতে ভিজিয়ে রাখা দাঁত ব্রাশ দিয়ে মেজে মুখে দিয়ে হাসলে তার হাবভাবে মনে হয় তিনি কাবাব খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা টেবিলের চারপাশে টুলে বসি। পরিবেশিত হয় লামিয়ান বলে হাতে তৈরি নোডুলসের সঙ্গে শির্কায় জারিত সবজি। এ খাবারটির নাম সোয়ানচি, স্বাদে অপূর্ব। খানিক পর আরেক প্রস্ত সবুজ-চা খেয়ে আমরা সেসমি সিড ছড়ানো রুটির সঙ্গে কাবাব খাই। পিওনি ফুলের পুষ্পিত কুঞ্জের পাশেই ঝুলছে পোশা পাখিদের বেশ ক’টি পিঞ্জিরা। তাতে মৃদুমন্দ কাকলি ধ্বনিত হচ্ছে। আঙিনার সবুজ বাতাবরণে কুজন শুনতে শুনতে আমাদের ঈদের ভোজন মোটমির্যা ভালোই হয়। তবে সমস্যা বাঁধে এ পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময়। কাজরি কিছুতেই ছোট্ট মেয়েটিকে ছেড়ে আমাদের সঙ্গে আসতে চায় না। আর ছোট্ট মেয়েটিও জিজি বলে তাকে জড়িয়ে ধরে। Mainussultan@hotmail.com