Tuesday, July 21, 2026

বাঁধনের ১৭ কেজি ওজন কমানোর পেছনের গল্প

প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০২৫ঃ অভিনয়শিল্পী ও মডেল আজমেরী হক বাঁধন হঠাৎ খেয়াল করেন, তাঁর ওজন বেড়ে ৭৮ কেজিতে গিয়ে ঠেকেছে। ওজন বাড়ার কারণে চিন্তা বাড়ে। এরপর সিদ্ধান্ত নেন, ওজন আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। শুরু হয় মিশন। সেই মিশনে মোটামুটি সফল হয়েছেন বাঁধন। তবে সময় লেগেছে ছয় মাস। এই ছয় মাসের পরিশ্রমে বাঁধনের ওজন এখন ৬১ কেজি। এতে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন এই অভিনয়শিল্পী।

মাশরুর সিদ্দিকী ও আজমেরী হক বাঁধনের সংসারে একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। কয়েক বছর আগে তাঁদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর বাঁধন তাঁর মেয়েকে নিয়ে মিরপুরে তাঁর বাবার বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।

বাঁধন জানালেন, মাঝে চার বছর একটি প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের শুরুতে সেই প্রেমের সম্পর্কটা ভেঙে যায়। এরপর সে বছরের আগস্টে ছাত্র–জনতার আন্দোলনে বাঁধনকে বেশ সোচ্চার দেখা যায়। প্রেমের সম্পর্কে ভাঙন এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে বাঁধন মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়েন। ওই সময়টায় তাঁর ওজন বাড়তে থাকে।

সেই সময়ের কথা মনে করে বাঁধন বললেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও আমার ব্রেকআপ—সব মিলিয়ে অন্য রকম একটা জীবন। আমার আবার ওভার ইটিং ডিজঅর্ডার আছে। যখন খাই, প্রচুর খাই। এই প্রচুর খাওয়ার কারণে ওজন বাড়তে থাকল। প্রায় ১৭ কেজি ওজন বেড়ে যায়। অনেক দিন ধরেই বাড়ছিল, কিন্তু কমাতে পারছিলাম না। খেয়েই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো যে আসলে ওজনটা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। কারণ, কাজও ছিল না। সামনের নির্বাচনের পর কয়েকটা কাজের ব্যাপারে কথাবার্তা হচ্ছে, যেগুলোর প্রস্তুতি নেওয়ারও একটা ব্যাপার আছে। তাই ওজন কমানোটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।’

বাঁধন জানালেন, প্রায় ছয় মাসে ১৭ কেজি ওজন কমিয়েছেন। এই সময়টায় চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়েছেন। নিয়ম মেনে ব্যায়ামও করছেন। বাঁধন বললেন, ‘আমাকে এক্সারসাইজ করতে হয়েছে। খাবার নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, ৪০ বছরের পর ওজন কমানো খুব কষ্ট হয়ে যাবে—যেহেতু এখন আমার ৪৩, তাই এই ভয়টাও কাজ করছিল। তারপরও কমাতে পেরেছি।’

বাঁধন জানালেন, দুটি কাজ শেষ হয়ে আছে। আগামী বছরে এই দুটি কাজ দর্শকের কাছে পৌঁছাবে। বললেন, ‘নির্বাচনের পর সিনেমার কাজ শুরু করব। দুটো কাজ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। সময়মতো আমি জানাব।’

ঢাকার মিরপুরে মা-বাবার সঙ্গে থাকেন বাঁধন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে তেমন কথা হয় না। কেউ তাঁকে বিয়ে নিয়ে কোনো বাড়তি চাপ দেন না। এ ক্ষেত্রে তাঁর পুরো স্বাধীনতা রয়েছে। তবে বাঁধন মাঝে একবার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, যদি মনের মতো জীবনসঙ্গী পান, মনে হয় পথচলাটা একসঙ্গে চলতে পারে, এমন ছেলে পেলে তাহলে হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মনের মতো জীবনসঙ্গী খুঁজছেন। বাঁধন বললেন, ‘বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো জানি না, কীভাবে বিয়েটা হবে। কারণ, বিয়ে নিয়ে আমার এত ট্রমা কাজ করে, বিয়েটা আমার জন্য কতটা সুখকর হবে।’

বিয়ে নিয়ে ট্রমা কাজ করলেও জীবনের সুন্দর সময় পার করছেন বলে জানালেন বাঁধন। প্রেমের সম্পর্কে আছেন এমনটাও শোনা যাচ্ছে। বললেন, ‘আমি এখন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা সময় কাটাচ্ছি। কাজ, জীবন ও আমার সন্তান নিয়ে—একটা সুন্দর সময় কাটাচ্ছি। আমার মা–বাবার সঙ্গে সম্পর্ক, আমার ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক—অনেক সুন্দর। আমি সেটা খুবই উপভোগ করছি। প্রেম সুন্দর। আমি প্রেমের সম্পর্কে থাকতে চাই। মাত্র তো প্রেমে পড়লাম, এখন এই সম্পর্ককে যত্ন করতে হবে। খুব শিগগির প্রেমের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনব।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2Faamemdnz%2F0a00d07d-0ce8-41e7-8b0c-ef8ad51bfb47.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আগের ও পরের ছবিতে বাঁধন। কোলাজ

ইরান কোন ভয় থেকে আবার যুদ্ধ করল by সানাম ভাকিল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বেধে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। দুই দেশ একের পর এক সামরিক হামলা চালাচ্ছে। মাত্র এক মাস আগেই যে সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, তা ভেঙে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা তুলে নিয়েছে। আবার ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি করেছে। দেশের ভেতরে এক শরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরান আমেরিকার মিত্রদেশ—কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে আঘাত হেনেছে। এত দ্রুত এই ভাঙন দেখিয়ে দিল, শুরুতেই দুই দেশ আসলে ঠিক করেনি এই সমঝোতার লক্ষ্য কী।

ওয়াশিংটনের কাছে এই চুক্তি ছিল একটি বড় প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। তাদের লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা, অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং ধীরে ধীরে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু তেহরানের কাছে এটি ছিল এক বিরতি। তারা দেখতে চেয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন কতটা আন্তরিক এবং বড় চুক্তিতে যেতে কতটা প্রস্তুত। ইরান কখনোই মানেনি যে এই চুক্তির মানে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব ছেড়ে দেওয়া বা বাধাহীন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা।

এই ব্যাখ্যার ফারাক দ্রুত অবিশ্বাসে পরিণত হয়। ইরানের কর্মকর্তারা মনে করতে শুরু করেন, আমেরিকা এই বিরতিকে ব্যবহার করছে তাদের ধীরে ধীরে দুর্বল করার জন্য।

তেহরানের দৃষ্টিতে এই চুক্তি ছাড় আদায়ের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। তাই তারা আবার জাহাজে হামলা শুরু করে এবং সামুদ্রিক পথ বিঘ্নিত করে। ওয়াশিংটন এটিকে চুক্তি ভঙ্গ হিসেবে দেখে আবার সামরিক অভিযান শুরু করে।

এই সংঘাত শুধু হরমুজ প্রণালি নিয়ে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা বৃহত্তর কূটনীতির শর্ত। আর ইরানের কাছে সেটাই দর-কষাকষির অস্ত্র, যা কেবল বড় কোনো সমঝোতার বিনিময়ে ছাড়া সম্ভব। ফলে দুই দেশ আসলে একই বিষয়ে আলোচনা করছিল না।

ইরানের এই সংঘাতে ফেরার সিদ্ধান্তকে অনেকেই হিসেবি ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তাঁদের ধারণা, ধীরে ধীরে শক্তি ক্ষয় হওয়ার চেয়ে সরাসরি সংঘর্ষ কম বিপজ্জনক। বিশেষ করে ইসরায়েলের একতরফা হামলার সম্ভাবনাও এই হিসাবের অংশ।

ইরানের সবচেয়ে বড় ভয় হলো, ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব কমে যাবে। তারা যদি এখনই জাহাজে হামলা বন্ধ করে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই শক্তি আবার ফিরে পাওয়া কঠিন হবে। তাই তারা ইচ্ছা করেই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, যাতে আমেরিকাকে বড় শর্তে আবার আলোচনায় বসতে বাধ্য করা যায়।

এই কৌশল অনেকটাই ট্রাম্পকে ঘিরে। ইরান মনে করে, তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, আমেরিকান সেনাদের মৃত্যু এবং দীর্ঘ যুদ্ধ—এসব ট্রাম্প এড়াতে চাইবেন। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে থাকায় তিনি বড় ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। তাই ইরান এখনই চাপ বাড়াতে চাইছে।

কিন্তু এখানে ভুলও হতে পারে। ট্রাম্প শক্তি দেখাতে পছন্দ করেন। তিনি ভাবতে পারেন, বেশি চাপ দিলে ইরান নতি স্বীকার করবে—যেমনটা তিনি অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভেবেছিলেন। কিন্তু ইরানকে তিনি যতটা দুর্বল ভাবছেন, আসলে ততটা নয়। আর ট্রাম্প অপমান মেনে নেওয়ার মানুষ নন। তাই চাপ কাজ না করলে তিনি আরও আক্রমণাত্মক হতে পারেন।

ইরানের ভেতরের রাজনীতিও পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। পুরোনো নেতার মৃত্যুর পর বাইরে থেকে স্থিতিশীলতা দেখালেও ভেতরে অনিশ্চয়তা আছে। নতুন নেতৃত্ব পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়, আর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন আছে।

আগে সীমিতভাবে সবাই মিলে সমঝোতায় রাজি হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ঐকমত্য নেই। কেউই আগে এগোতে চায় না, কারণ এতে তাদের দুর্বল মনে হতে পারে বা ট্রাম্পকে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠতে পারে।

ধর্মীয় নেতাদের কঠোর অবস্থানও পরিস্থিতি কঠিন করেছে। এতে ট্রাম্পকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, ধর্মীয় শত্রু হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে সমঝোতা করা আরও কঠিন হয়ে গেছে।

এই অবস্থায় সবচেয়ে লাভবান হচ্ছে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। তারা যত বেশি সংঘাত থাকবে, তত বেশি প্রভাবশালী থাকবে।

তবে এই কৌশল ঝুঁকিপূর্ণ। এখন হয়তো লাভ হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি হতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো বারবার হামলা সহ্য করবে না। তারা এত দিন ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বারবার আঘাত পেলে তারা আমেরিকার দিকেই বেশি ঝুঁকবে। ইতিমধ্যেই কিছু দেশ বিকল্প পথ তৈরি করছে, যাতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমে।

এতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকাও কমে যাচ্ছে। আগে কাতার, ওমান বা পাকিস্তান দুই পক্ষকে আলোচনায় আনতে পারত। কিন্তু সংঘাত বাড়লে সেই সুযোগও কমে যায়। ফলে ইরানের নিজেরই বেরিয়ে আসার পথ কঠিন হয়ে পড়ে।

ইরান আসলে পুরোনো কৌশল ব্যবহার করছে—সংঘাত বাড়িয়ে পরে সমঝোতা করা। তারা দেখাতে চায়, তাদের ছাড়া এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। কিন্তু এই কৌশল তখনই কাজ করে, যখন আলোচনায় ফেরার পথ খোলা থাকে। যদি সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শুধু সংঘাতই বাড়বে। কঠোর অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে, আর সমঝোতা করা আরও কঠিন হয়ে যাবে।

বাস্তবতা হলো—ইরান আমেরিকাকে পুরোপুরি হটাতে পারবে না। আবার আমেরিকাও বড় যুদ্ধ ছাড়া ইরানকে পুরোপুরি থামাতে পারবে না।

তাই একমাত্র সমাধান হলো নতুন করে স্পষ্ট চুক্তি করা। সেখানে জাহাজ চলাচল, নিষেধাজ্ঞা, পরমাণু কর্মসূচি এবং সামরিক আচরণ—সবকিছু পরিষ্কারভাবে ঠিক করতে হবে। নিয়ম মানা হচ্ছে কি না তা দেখার ব্যবস্থা থাকতে হবে, আর সমস্যা হলে দ্রুত কথা বলার পথও থাকতে হবে।

নাহলে একই ঘটনা বারবার ঘটবে—সংঘাত, যুদ্ধবিরতি, আবার সংঘাত। কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না।

* সানাম ভাকিল, চ্যাটাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক গবেষণা কর্মসূচির পরিচালক।
- টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।

ইরানের ড্রোন হামলার পর কুয়েত বিমানবন্দরে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে
ইরানের ড্রোন হামলার পর কুয়েত বিমানবন্দরে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা হুতিদের

রয়টার্সঃ ইরান–যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। আজ সোমবার ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটির এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ নতুন মাত্রা পেল। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যেও নতুন ঝুঁকি তৈরি হলো।

এক বিবৃতিতে হুতিদের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরব ‘অন্যায্য ও নিপীড়নমূলক অবরোধ’ আরোপ করেছে। এর জবাবে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির ভিত্তিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সমুদ্রপথে অবরোধ কার্যকর করা হচ্ছে। হুতিদের এ ঘোষণার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি আরবের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

টানা নবম দিনের মতো গতকাল রোববার দিবাগত রাতে ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে মার্কিন স্বার্থ–সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে তেহরান। নতুন করে শুরু হওয়া এই পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের মধ্যে গত মাসে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক কার্যত ভেঙে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে হুতিরা এই ঘোষণা দিল, যখন পাল্টাপাল্টি হামলা সত্ত্বেও কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। হুতিদের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছু সময়ের জন্য বেড়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তা আবার কমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে গেলে আরব সাগর থেকে লোহিত সাগরে প্রবেশের পথ বাব–এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য হুতিদের ওপর চাপ দিচ্ছিল তেহরান। প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ হলে বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ প্রায় ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে। উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে বিশ্বে তেল সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

আরব সাগর থেকে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব–এল-মান্দেব প্রণালি। স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবি। ১২ জুলাই ২০২৬
আরব সাগর থেকে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব–এল-মান্দেব প্রণালি। স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবি। ১২ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স।

ভারতের রাজনীতিতে নতুন ঝড় by উদয় চন্দ্র

ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঠিক দুই মাস পর এর অনুসারীরা এখন এক চরম পরিস্থিতির মুখোমুখি। দিল্লির যন্তর মন্তর মানমন্দিরে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচি থেকে শিক্ষাবিদ ও আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। অনির্দিষ্টকালের অনশনের ২১তম দিনে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ঘটনার পর বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও অনশন শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে যাত্রা করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর এ মন্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপরই জন্ম নেয় সিজেপি। ভারতের তরুণদের মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁরা একের পর এক বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে তোলেন।

গত শনিবারের এ সংঘাতের আগে সরকারের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা কঠোর দমন–পীড়নও করেনি, আবার আন্দোলন মেনেও নেয়নি। সরকারের নীতি ছিল বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা। আন্দোলনকে একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখা এবং জোট ভেঙে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সিজেপির এই উত্থান শাসকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

সিজেপিকে এখন আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক ভাইরাল ঝড় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন কোনো ব্যঙ্গাত্মক তরুণ সংগঠন নয়, যা রাস্তায় অল্প কিছুদিন দৃশ্যমান থেকে মিলিয়ে যাবে। এই ‘তেলাপোকা’ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কারণ, এটি সমাজের এক গভীর ক্ষোভের নাম দিয়েছে।

কাউকে তেলাপোকা বলার অর্থ হলো তাকে নোংরা, অপ্রয়োজনীয় ও চোখের আড়ালে রাখার যোগ্য মনে করা। তেলাপোকাকে সবাই ঘৃণা করে, কিন্তু এটি সহজে মরে না। এটি সমাজের অন্ধকার কোণে টিকে থাকে। বিষ, অন্ধকার আর ঘৃণা সহ্য করেও এটি বেঁচে থাকে। ঘরের মালিকেরা ঘর যতই পরিষ্কার দাবি করুক না কেন, ময়লা থাকলেই তেলাপোকা বেরিয়ে আসে।

ভারতের বহু তরুণ এখন বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মুখোমুখি। এই অপমানজনক শব্দটি তাঁদের ভেতরের কষ্টকেই যেন ফুটিয়ে তুলেছে। সিজেপি তরুণদের এই অপমানকে দৃশ্যমান করেছে। তাঁরা বলতে চাইছেন, ক্ষমতা যদি আমাদের এই চোখেই দেখে, তবে এ নামেই আমরা আমাদের কথা বলব। ফলে একটি গালি এখন তাঁদের গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি কোনো বিপ্লবী রাজনীতি নয়। এই তেলাপোকা আসলে সেই ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে লাখো তরুণের ওপরমুখী হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

এমন এক সময়ে এই ‘তেলাপোকা রাজনীতি’র উদয় হলো, যখন নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এক অপরাজেয় নির্বাচনী যন্ত্র চালাচ্ছে। তাদের রয়েছে বিপুল অর্থবল, আদর্শিক শৃঙ্খলা ও কল্যাণমুখী প্রকল্প। তারা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও বিরোধীদের বিভাজনকে ভোটে রূপান্তর করতে পারদর্শী।

তবু ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি জাতীয়ভাবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। অর্থাৎ ভোট দেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে সমর্থন করেননি। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা কোনো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি টিকে আছে আঞ্চলিক ও জাতিগত জোট, বিরোধী দলের ভাঙন এবং দুই প্রধান দলের বাইরে তৃতীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে।

বর্তমানে ওপর থেকে নির্বাচনী রাজনীতি গোছানো মনে হলেও নিচ থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে। তরুণেরা চাকরিহীনতা ও পরীক্ষা বাতিলের কারণে ক্ষুব্ধ। তাঁরা এমন এক সময়ে রাজনীতিতে আসছেন, যখন ক্ষোভ প্রকাশের গণতান্ত্রিক মাধ্যমগুলো—যেমন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন, গণমাধ্যম ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান—দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

কোভিড-১৯ মহামারির পর ভারতের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। বর্তমানে ৮০ কোটির বেশি ভারতীয় সরকারের দেওয়া ফ্রি রেশনের ওপর নির্ভরশীল। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এই খাদ্যসহায়তা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে তারা কোনোমতে বেঁচে আছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এই খাদ্যসহায়তা সমাজের আসল উন্নয়নকে বোঝায় না; বরং এটি মহামারি–যুগের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে।

অন্যদিকে দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে চলে গেছে। ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী এখন দেশের মোট আয়ের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা গত এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটাই বর্তমানের রাজনৈতিক অর্থনীতি—নিচে খয়রাতি সাহায্য, ওপরে একচেটিয়া ব্যবসা আর মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্ত সমাজ। এই মধ্যবিত্ত এখন চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি আর অবরুদ্ধ আকাঙ্ক্ষার শিকার।

ভারত স্কুল ও উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছে, কিন্তু তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। শিক্ষিত তরুণেরাই এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে বড় শিকার। তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন, ডিগ্রি থাকলেই জীবনে উন্নতি করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি তাঁদের কেবল হতাশাই দিচ্ছে।

এ কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষা বাতিল তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে একটি পরীক্ষা মানে কেবলই একটি পরীক্ষা নয়। এটি জীবন পরিবর্তনের এক জুয়া খেলা। সন্তান যাতে একটি সম্মানজনক চাকরি পায়, সে জন্য মা-বাবা সঞ্চয় করেন, ঋণ নেন, এমনকি জমিও বিক্রি করে দেন। কোচিং সেন্টারে দেন চড়া ফি।

যখন একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তখন সেই পরিবারের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়। রাষ্ট্র কেবল পরীক্ষা নিতেই ব্যর্থ হয় না, বরং লাখ লাখ পরিবারের ত্যাগকে উপহাস করে।

তেলাপোকা প্রতীকটি তাই আজ অনেক ভারী অর্থ বহন করছে। এটি এমন এক নাগরিকের কথা বলে, যে কোনো সম্মান ছাড়াই বেঁচে থাকে। মোদি–আমল ভোট জিততে পারলেও সামাজিক অসন্তোষ দূর করতে পারেনি। ভারতের লাখ লাখ তরুণ আজ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—যাঁদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ বা বৈশ্বিক যোগাযোগ নেই, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী?

সিজেপি নিজেও এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। এই দল অত্যন্ত ভঙ্গুর ও দুর্বল। এর অসংলগ্নতাই এর আসল সত্য। এটি নতুন কোনো দলের আগমনবার্তা নয়, বরং পুরোনো রাজনীতির ব্যর্থতার প্রতীক।

কোনো ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এত দূর এলে সমাজ পরিবর্তনের জন্য তার পুরোপুরি রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার প্রয়োজন পড়ে না। সাধারণ ভাষায় কথা বলা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ ব্যঙ্গের আশ্রয় নেয়। সংগঠিত রাজনীতি যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তখন মানুষ মিমের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। অন্ধকার সময়ে হাসতে পারাটাই হলো সাহসের শেষ রূপ।

তেলাপোকা কোনো বিপ্লবী নায়ক নয়। এটি এক সাধারণ জীব, যা ঘরের মালিকদের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে।

* উদয় চন্দ্র, অশোকা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি অনূদিত।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে যাত্রা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে যাত্রা করেন। ছবি : রয়টার্স

জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারের খোঁজে বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানী by জাহিদ হোসাইন খান

মহাকাশের বিশালতায় পৃথিবী থেকে ১ হাজার ৩৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত টিওআই–২১৫৫ নামক একটি নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে এক রহস্যময় বস্তু, যা বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গবেষকদের মতে, টিওআই-২১৫৫বি নামের এই বস্তুটির অবস্থান এমন এক সন্ধিক্ষণে, যা নক্ষত্র ও ব্যর্থ নক্ষত্র বা ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যকার সীমানা নির্ধারণের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে নতুন এই রহস্যের উন্মোচন করেছে বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দল।

সম্প্রতি দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে টিওআই–২১৫৫বি নামক এক অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তুর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট মিশনের তথ্য ব্যবহার করে এবং পরবর্তী সময় বিভিন্ন স্থলভিত্তিক মানমন্দিরের সহায়তায় এই বস্তুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়। টিওআই–২১৫৫বির ভর ও গঠন একে মহাজাগতিক বিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। এর ভর প্রায় ৮০ দশমিক ৬ বৃহস্পতির সমান, যা এটিকে ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা বাদামি বামন এবং খুব কম ভরের নক্ষত্রের মধ্যবর্তী একটি সীমানায় স্থাপন করে। সাধারণত নক্ষত্র হতে গেলে কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের ফিউশন বা সংযোজনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার জন্য যে ন্যূনতম ভরের প্রয়োজন হয়, এই বস্তু ঠিক সেই সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এটিই মূলত এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক।

টিওআই–২১৫৫বির ব্যাসার্ধ প্রায় শূন্য দশমিক ৯৭ বৃহস্পতির সমান এবং ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, যা একে এক অনন্য মহাজাগতিক বস্তুতে পরিণত করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন মো. রেদোয়ান আহমেদ। একজন গবেষক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রম এই আবিষ্কারকে সম্ভব করেছে। মহাকাশ গবেষণার মতো জটিল ও সূক্ষ্ম একটি ক্ষেত্রে, যেখানে তথ্যের নিখুঁত বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি, সেখানে রেদোয়ানের নেতৃত্ব ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসনীয়। দীর্ঘ সময় ধরে সংগৃহীত তথ্য ও রেডিয়াল ভেলোসিটি পরিমাপের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর সহযোগী ব্যক্তিরা প্রমাণ করেছেন, টিওআই–২১৫৫বির মতো বস্তু নক্ষত্র ও উপ-নাক্ষত্রিক বস্তুর বিবর্তনীয় মডেলগুলো পরীক্ষা করার জন্য একটি চমৎকার বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করতে পারে। রেদোয়ানের এই কাজ কেবল একটি নতুন মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান নয়, নক্ষত্রের জন্মের সীমা ও উপাদানের গঠন সম্পর্কে ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

মো. রেদোয়ান আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, যেসব মহাজাগতিক বস্তুর ভর নক্ষত্রে পরিণত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় এবং তাই তাদের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন শুরু হয় না, সেগুলোকে ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা ‘ব্যর্থ নক্ষত্র’ বলা হয়। টিওআই–২১৫৫বির ভর বৃহস্পতির ভরের প্রায় ৮০ দশমিক ৬ গুণ। সাধারণত বৃহস্পতির ভরের ৭৫ থেকে ৮০ গুণ বেশি ভরের বস্তুকে নক্ষত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নতুন এই বস্তু সেই তত্ত্বের একেবারে কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর দল নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বস্তুটির আকার ও ভর নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী মো. রেদোয়ান আহমেদ জানান, কেবল ভরই শেষ কথা নয়, একটি বস্তুর বয়স, রাসায়নিক গঠন ও বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্যও নির্ধারণ করে সেটি নক্ষত্র হিসেবে জ্বলে উঠবে কি না। ফলে নক্ষত্র ও ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিভাজন রেখা টানা সম্ভব হচ্ছে না।

টিওআই–২১৫৫বি মহাকাশের অন্যতম বিরল একটি বস্তু। এটি নক্ষত্র ও ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যকার রূপান্তরকালীন অবস্থায় থাকায় বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। মো. রেদোয়ান আহমেদের মতে, এ ধরনের আরও মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, কীভাবে একটি বস্তু নক্ষত্রে পরিণত হয় এবং কোন সীমা অতিক্রম করলে তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন শুরু হয়।

মো. রেদোয়ান আহমেদ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিডনি ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের পিএইচডি গবেষক। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এক্সোপ্ল্যানেট, ব্রাউন ডোয়ার্ফ, নাক্ষত্রিক কার্যকলাপ ও রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার পার্কস রেডিও টেলিস্কোপের ক্রায়োপ্যাফ ম্যাসার পর্যবেক্ষণের ডেটা পাইপলাইন উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত। পাশাপাশি তিনি নক্ষত্র ও উপ–নাক্ষত্রিক বস্তুর মধ্যকার সীমানা নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের অ্যাস্ট্রোমিউজার্স গ্রুপ ও বাংলাদেশের ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসের অ্যাসোসিয়েট মেম্বার হিসেবে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে নতুন এক রহস্যের উন্মোচন করেছেন মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দল
মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে নতুন এক রহস্যের উন্মোচন করেছেন মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দল। সংগৃহীত

মহাকাশে আকারে বড় বিরল গ্রহের সন্ধান

মহাবিশ্বের অসীম অন্ধকারের গভীরে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি অচেনা গ্রহ। পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে থাকা তেমনই এক দানবীয় গ্রহের সন্ধান পেয়েছে নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট। নাসার তথ্যমতে, স্থান–কালের তরঙ্গ ব্যবহার করে দূরবর্তী নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা গ্রহটি শনাক্ত করা হয়েছে। চেনা নিয়মের বাইরে গিয়ে এবারই প্রথম নতুন গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে।

ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট সাধারণত নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি থাকা গ্রহগুলো আবিষ্কার করে থাকে। তবে নতুন আবিষ্কৃত এই গ্রহ নিজের নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী বৃহস্পতি গ্রহের মতো দূরবর্তী কক্ষপথে ঘুরছে। নতুন গ্রহটির বিষয়ে নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডায়ানা ড্রাগোমির বলেন, ‘সার্ভে স্যাটেলাইট যখন মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, তখন কেউ ভাবেনি যে এটি কখনো এ ধরনের গ্রহ খুঁজে পেতে সক্ষম হবে। নতুন গ্রহটির ভর আমাদের বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে ১ দশমিক ৬ গুণ বেশি এবং এর কক্ষপথের দূরত্বও প্রায় এক। এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে স্যাটেলাইটে ধারণ করা পুরোনো তথ্যের মধ্যে সম্ভবত আরও অনেক মাইক্রোলেনসিং গ্রহ লুকিয়ে আছে, যা গবেষকেরা আগে খোঁজার কথা ভাবেননি।’

২০২৩ সালে প্রথম গ্রহটির অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিয়েছিল ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির গায়া স্পেস টেলিস্কোপ। সে সময় গায়া টেলিস্কোপের অ্যালার্ট সিস্টেমে দেখা গিয়েছিল একটি নক্ষত্র হঠাৎ অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মহাকাশে যখন একটি নক্ষত্র অন্য একটি দূরবর্তী নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নিজের মহাকর্ষ বলয়ের কারণে পেছনের নক্ষত্রের আলোকে বিবর্ধিত বা বড় করে দেখায়, তখন এ ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেনসিং বলা হয়। আর তাই পরবর্তী সময় বিজ্ঞানীরা টেস স্যাটেলাইটের আর্কাইভে থাকা পুরোনো তথ্য পরীক্ষা করে দেখেন। তাঁরা দেখতে পান টেস স্যাটেলাইটটিও একই মহাজাগতিক ঘটনা রেকর্ড করে রেখেছিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, গায়া২৩ব্রা বি’ নামের গ্রহটি একটি কমলা রঙের বামন নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। এই নক্ষত্রের ভর আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় ৮০ শতাংশ। গ্রহটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। টেস স্যাটেলাইটটি সাধারণত পৃথিবীর কাছাকাছি মাত্র ১৫০ আলোকবর্ষের মধ্যে গ্রহ অনুসন্ধান করে। সে তুলনায় এই গ্রহের দূরত্ব অনেক বেশি।

সূত্র: এনডিটিভি

মহাকাশ
মহাকাশ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

পাতালপুরীর খোঁজে বিজ্ঞানীরা by জাহিদ হোসাইন খান

পৃথিবীর কেন্দ্রে কী রয়েছে, তা জানতে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। সেই কৌতূহল মেটাতে অর্ধশতাব্দী আগে এক অবিশ্বাস্য ও দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানীরা। মাটির নিচে প্রায় ১২ কিলোমিটার গভীরে গর্ত তৈরি করেছিলেন তাঁরা, যা মানুষের তৈরি সবচেয়ে গভীর লম্বা গর্ত। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বিজ্ঞানের এই বিশাল অর্জন পৃথিবীর মোট ব্যাসার্ধের তুলনায় ছিল সমুদ্রে এক ফোঁটা শিশিরের মতো।

১৯৭০ সালে উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপে ভূ-পৃষ্ঠের গভীর রহস্য উন্মোচনে কাজ শুরু করেন সোভিয়েত ভূতাত্ত্বিকেরা। ১৯৮৯ সালে যখন এই খননকাজ শেষ হয়, তখন গর্তটির গভীরতা গিয়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ২৬২ মিটার (প্রায় ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার)। এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর উল্লম্ব গর্ত, যা কোলা সুপারদীপ বোরহোল নামে পরিচিত। তবে এই বিশালাকার অর্জনের পরও বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে মাত্র শূন্য দশমিক১৯ শতাংশ পথ পাড়ি দিতে পেরেছিলেন। কারণ, পৃথিবীর কেন্দ্র প্রায় ৬ হাজার ৩৭১ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত।

কোলা উপদ্বীপের প্রকল্পটি কোনো খনিজ তেল বা মূল্যবান ধাতু উত্তোলনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি। এর লক্ষ্য ছিল কেবল ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণা। ভূমিকম্পের তরঙ্গের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভেতরের স্তর সম্পর্কে যেসব ধারণা করেছিলেন, শিলাখণ্ড সরাসরি সংগ্রহ করে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানীদের ইচ্ছা ছিল ১৫ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছানো, যদিও তা সম্ভব হয়নি।

প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই খনন অভিযানে ভূপৃষ্ঠের নিচে প্রায় ৬ হাজার ৮৪২ মিটার পর্যন্ত আগ্নেয় ও পাললিক শিলা অতিক্রম করার পর পাওয়া যায় শতকোটি বছরের পুরোনো নাইস শিলা। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, গ্রানাইটসমৃদ্ধ এই শিলার নিচে কঠিন ব্যাসাল্ট শিলার একটি পরিষ্কার স্তর রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি; প্রাচীন কেলাসিত শিলার জটিল নেটওয়ার্ক দেখা গেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার ছিল গভীর পাথরের স্তরে পানির উপস্থিতি। মাটির প্রায় ১১ কিলোমিটার গভীরে শিলার সূক্ষ্ম ফাটলে এই পানির সন্ধান পাওয়া যায়।

১২ কিলোমিটারের বেশি গভীরে পৌঁছানোর পর বিজ্ঞানীরা বড় ধরনের কারিগরি ও প্রাকৃতিক বাধার মুখে পড়েন। ধারণার চেয়েও মাটির গভীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকায় (প্রায় ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) প্রচণ্ড তাপে ড্রিলিংয়ের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ নরম হয়ে কাজ করার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। ভূ-গর্ভের অতিরিক্ত চাপে গর্তের ভেতরের দেয়াল বারবার দুমড়েমুচড়ে ও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। প্রযুক্তিগত বাধার পাশাপাশি ১৯৯০ দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। ফলে এই প্রকল্পের অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৯২ সালে স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

কোলা উপদ্বীপে খনন করা এই গর্ত পৃথিবীর মহাদেশীয় ভূ-ত্বকের কেবল তিন ভাগের এক ভাগ। ফলে ভূ-ত্বকের নিচে থাকা হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত ম্যান্টল স্তরের ধারেকাছেও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ৫০ বছর অতিক্রম করার পরও আজ পর্যন্ত অন্য কোনো গবেষণা প্রকল্প এত গভীরে সরাসরি লম্বা গর্ত তৈরি করতে পারেনি।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

পৃথিবী
পৃথিবী। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Monday, July 20, 2026

যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনে ৪৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ইসরাইলের

যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করা এবং জনমত প্রভাবিত করার লক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ৪৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ের একটি ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে ইসরাইল। এমন দাবি করেছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

শনিবার প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জানায়, গত কয়েক মাসে ‘এমা’, ‘সারা’ ও ‘জন’-এর মতো সাধারণ নাম ব্যবহার করে লাখ লাখ এআই-নির্ভর বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এসব বার্তায় প্রেরক হিসেবে ‘ফ্রেন্ডস ফর পিস’ নামে একটি সংগঠনের পরিচয় দেওয়া হলেও, এ নামে নিবন্ধিত কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি সংবাদপত্রটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বার্তাগুলোতে প্রাপকদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, যেমন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শান্তি আলোচনা বৈশ্বিক নিরাপত্তায় কী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি মনে করেন? এসব বার্তার মাধ্যমে ইসরাইলপন্থি জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রচারণা ৪৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের একটি চুক্তির অংশ, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক নির্বাচনি প্রচার ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেল। এআইভিত্তিক বার্তা প্রচারের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান স্পার্কফায়ার মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পারস্কেলের দল ইসরাইলপন্থী বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও অনলাইন কনটেন্টও তৈরি করেছে, যাতে চ্যাটজিপিটি ও ক্লদের মতো এআই প্ল্যাটফর্মে ইসরাইল সম্পর্কে আরও ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়।

এর আগে, গত বছর ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’র জানান, ২০২৬ সালের বাজেটে বিশ্বব্যাপী ইসরাইলের ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং ‘জনমত গঠন’-এর জন্য ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্তত ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইলের পক্ষে কাজ করার জন্য প্রায় তিন ডজন ব্যক্তি বিদেশি এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধন করেছেন।

প্রচারণার অংশ হিসেবে রক্ষণশীল সম্প্রচারমাধ্যম সালেম মিডিয়ার মাধ্যমে ৫ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বিজ্ঞাপনও প্রচার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান প্রচারের জন্য তারা তাদের উপস্থাপকদের অর্থ প্রদান করেনি।

এদিকে, গত বুধবার প্রকাশিত পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স অভিযোগ করেন, ইসরাইল সরকারের কিছু সদস্য ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত দীর্ঘায়িত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।

তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে করা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অনুরোধের কোনো জবাব দেয়নি ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সূত্র: আরটি 

যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনে ৪৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ইসরাইলের

৫০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেন মুসলিমরা, জেনে নিন সেই ইতিহাস

আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠার অনেক আগেই দেশটির ইতিহাসের অংশ ছিলেন মুসলমানরা। ১৬০৭ সালে ইংরেজদের জেমিটাউন প্রতিষ্ঠা এবং ১৬২০ সালে পিলগ্রিমদের প্লাইমাউথে পৌঁছানোর কয়েক দশক আগেই ১৫২০ ও ১৫৩০-এর দশকে মরক্কোর এস্তেবান দে দোরান্তেস (এস্তেভানিকো নামে পরিচিত) বর্তমান টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনার মরুভূমিতে পা রেখেছিলেন।

মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলের আজেমমুরে জন্মগ্রহণকারী এস্তেভানিকোকে দাস হিসেবে স্পেনে এবং পরে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। এক মর্মান্তিক অভিযানে অধিকাংশ মানুষ মারা গেলেও তিনি বেঁচে যান। তিনি বিভিন্ন নেটিভ আমেরিকান ভাষা শেখেন এবং ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল পাড়ি দেওয়া প্রথম প্রাচীন পৃথিবীর অধিবাসীদের একজন হয়ে ওঠেন। তার মরক্কোয় জন্ম ও জীবনীসংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করে যে তিনি একজন মুসলিম ছিলেন।

অধিকাংশ মুসলিম যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ক্রীতদাস হিসেবে। তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাম্বিয়ান ও সাহেলিয়ান অঞ্চলের, যেখানে শতাব্দী ধরে ইসলামিক চর্চা বিদ্যমান ছিল।

ধারণামতে, তাদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারেরও বেশি। দাস হিসেবে বন্দি হওয়ার আগেই তাদের অনেকে আরবিতে শিক্ষিত এবং কোরআন ও ইসলামী আইনে দক্ষ ছিলেন। দাসত্ব করা ওমর ইবনে সাইদের আত্মজীবনীর মতো কিছু লিখিত রেকর্ডও রেখে গেছেন তারা।

তাদের গভীর প্রভাব দেখা যায় আমেরিকান সংস্কৃতি ও সংগীতে। গবেষকদের মতে, আমেরিকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ‘জ্যাজ’ সংগীতের বিকাশে মুসলিম আমেরিকানরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে শ্যিক্ষেতে কাজ করার সময় দাসদের গাওয়া ‘ফিল্ড হলার’ গান জনপ্রিয় আমেরিকান সংগীতের অন্যতম ভিত্তি ছিল।

অনেক গবেষক এই গানের সুরের মূল খুঁজে পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দাসদের মধ্যে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ইসলামি প্রার্থনার ঐতিহ্য ক্ষেতে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ‘ফিল্ড হলার’, আজান ও কোরআন তিলাওয়াতের সুর ও ভঙ্গির মধ্যে স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়। ১৬৪০-এর দশকে মিসিসিপির একটি কাজের গানের সঙ্গে আজানের সুরগত মিলের বিষয়টি ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একজন আমেরিকান মুসলিম বড় ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৪ সালে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ক্যাসিয়াস ক্লে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মদ আলি রাখেন। তিন বছর পর ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে বলা হলে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এর জবাবে তার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়, রিংয়ে নামা নিষিদ্ধ করা হয় এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। টানা তিন বছর (২৫ থেকে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত) এই সেরা বক্সারকে রিংয়ে লড়তে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীকালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন। ১৯৭১ সালে ‘ক্লে বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ মামলায় বিচারকেরা সর্বসম্মতিক্রমে তার সাজা বাতিল করেন। আদালত স্বীকার করে যে, অলির এই সিদ্ধান্ত খাঁটি ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে আমেরিকার সাংবিধানিক ধর্মীয় সুরক্ষা কেবল খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের জন্য নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

যুক্তরাষ্ট্র গঠনে মুসলমানদের তৃতীয় অবদান হলো তাদের নাগরিক সম্পৃক্ততা ও দানশীলতা। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হলো জাকাত, যেখানে নিজের সঞ্চিত সম্পদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্রদের দান করার নিয়ম রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে স্বেচ্ছায় দান বা সদকা।

ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুসলিম ফিলানথ্রপি ইনিশিয়েটিভ’-এর গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ হলেও ২০২০ সালে আমেরিকান মুসলমানরা দানকার্যে প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার (৪.৩ বিলিয়ন) দিয়েছেন। গড়ে প্রতি দাতা দান করেছেন প্রায় ৩ হাজার ২০০ ডলার, যা তাদের অমুসলিম প্রতিবেশীদের (১ হাজার ৯০০ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি।

এই অনুদানের প্রায় ৮৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই থাকে। এর বড় অংশ মসজিদ বা মুসলিম প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে দারিদ্র্যবিমোচন, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যয় হয়। ২০২১ সালে প্রদত্ত প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের জাকাতের বড় একটি অংশ আত্মীয় বা উপাসনালয়ের বদলে দাতব্য অলাভজনক সংস্থায় দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের এই সময়ে জানা যায়, মুসলমানরা কেবল অতিথি নন, বরং দেশটির ইতিহাস গড়ার অন্যতম অংশীদার ছিলেন।

সূত্র: দ্য কনভারসেশন

৫০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেন মুসলিমরা, জেনে নিন সেই ইতিহাস
ছবি: দ্য কনভারসেশন

মার্কিন হামলা প্রতিহত ও পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম ইরান

সিএনএন-এর বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা নবম রাতের মতো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলতে থাকলেও, তেহরান দেখিয়ে দিচ্ছে, তারা মার্কিন সামরিক শক্তির আঘাত প্রতিহত করার পাশাপাশি কার্যকর ও প্রাণঘাতী পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জর্ডান ও ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর অন্তত তিন সদস্য নিহত, একজন নিখোঁজ এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

পেন্টাগন এখন পর্যন্ত নিজেদের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে তেহরানের দাবি, তাদের হামলায় বহু মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে এবং বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গারসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সেতু, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে, তখন কুয়েত ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতির মুখে পড়ছে। এসব দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রতিদিনের বিবৃতিতে জানিয়ে আসছে যে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই হামলা অব্যাহত রয়েছে।

তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোতে এখনো প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র এবং কয়েক হাজার ড্রোন মজুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও স্বীকার করেছেন যে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা সম্ভব হবে না।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আপনি তাদের ওপর বোমা ফেলতে পারেন, রাডার ধ্বংস করতে পারেন, কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো তাদের জন্য এখনো খুবই সহজ।

সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনারাও ইরানের হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং সেই ঝুঁকি ইতোমধ্যেই প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।

এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দেশটির স্থলবাহিনী আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং ক্রমাগত অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো অনুপ্রবেশ তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম।

আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত সতর্কতা এবং সর্বক্ষণিক প্রস্তুতিই দেশের টেকসই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এই প্রস্তুতি সব ধরনের অপারেশনাল খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বজায় রাখা হচ্ছে।

আইআরজিসির স্থলবাহিনীর উপ-কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুহুল্লাহ নুরি বলেন, ইরানি বাহিনী এমন অবস্থানে রয়েছে যে শত্রুপক্ষের যেকোনো অনুপ্রবেশ মুহূর্তের মধ্যেই নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারবে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘন করায় ইরান আর ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না বলেও জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেন, অন্য পক্ষ শুধু চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থই হয়নি, বরং এর শর্ত ও মূল চেতনারও লঙ্ঘন করেছে। আমরাও ঘোষণা করেছি যে আমরা আর এটি বাস্তবায়ন করব না। বিষয়টি সম্পূর্ণ পরিষ্কার।

তিনি বলেন, চুক্তিটি ইরানের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য পারস্পরিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করায় তেহরানের পক্ষে চুক্তি বাস্তবায়ন বাস্তবিক অর্থেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র আবার আলোচনার প্রস্তাব দিলে ইরান কী করবে এমন প্রশ্নের জবাবে বাঘায়ি ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

তিনি বলেন, যেভাবে যুদ্ধ ইরানের স্বার্থ রক্ষার একটি উপায়, ঠিক সেভাবেই আলোচনা-আলোচনাও সেই লক্ষ্য অর্জনের আরেকটি মাধ্যম। 

হরমুজ প্রণালিতে ইরানি সেনাদের নজরদারি। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে ইরানি সেনাদের নজরদারি। ছবি: সংগৃহীত

স্পেনের জয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী মানুষকে আনন্দিত করেছে, বলল ইরান

বিশ্বকাপে স্পেনের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ে দেশটিকে অভিনন্দন জানিয়েছে ইরান। সোমবার এক বিবৃতিতে তেহরান জানায়, স্পেনের এই জয় বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্বাধীনতাকামী মানুষকে আনন্দিত করেছে।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর নিন্দা ও ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতের সমালোচনা করায় সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল সমর্থন কুড়ায় স্পেন সরকার ও তাদের জাতীয় ফুটবল দল। কয়েক মাস ধরেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ছিল দেশটি।

আরেক দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রকাশ্যে ইসরায়েলের নীতিগুলোকে সমর্থন করেন। আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ও সমর্থকও। রোববার নিউইয়র্ক–নিউ জার্সিতে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন।

এরপর ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের পক্ষে খেলোয়াড়দের অবস্থান এবং ইরানের প্রতি স্পেনের সমর্থন প্রমাণ করে যে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা সেই (স্পেন) বুদ্ধিমান ও সম্মানীয় জাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’

বাঘের গালিবাফ আরও বলেন, ‘এই জয় কেবল স্পেনের জনগণের হৃদয়কেই স্পর্শ করেনি, বরং বিশ্বের বহু স্বাধীন, সার্বভৌম ও ন্যায়বিচারকামী মানুষের হৃদয়কেও আনন্দিত করেছে।’

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও স্পেনকে সমর্থনের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আগ্রাসন, গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পেনের সার্বিক অবস্থান এবং তাদের জাতীয় ফুটবল দলের আচরণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও মূল্যবান ছিল।’

স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল
স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল। রয়টার্স

শতবর্ষের ২০৩০ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে ছয় দেশ

২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা নামতেই ফুটবল বিশ্বের নজর এখন ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে। কারণ, এবারের আসর শুধু নতুন চ্যাম্পিয়ন খোঁজার নয়, উদযাপন করবে বিশ্বকাপের শতবর্ষও। সেই বিশেষ উপলক্ষে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন মহাদেশের ছয়টি দেশে অনুষ্ঠিত হবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।

ফিফার অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে বিশ্বকাপের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। এরপর টুর্নামেন্টের বাকি অংশ ইউরোপ ও আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে ছয়টি দেশই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার ছয়টি স্বাগতিক দল সরাসরি চূড়ান্ত পর্বে খেলবে।

ফিফা জানিয়েছে, ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপ। শতবর্ষ উপলক্ষে সেই ইতিহাসকে সম্মান জানাতেই উদ্বোধনী ম্যাচ ও বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে রাজধানী মন্টেভিডিওতে।

অন্যদিকে, ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের রানার্সআপ ছিল আর্জেন্টিনা। আর দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল)-এর সদর দপ্তর হওয়ায় প্যারাগুয়েকেও শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে একটি করে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই পরিকল্পনাকে ‘ফুটবলকে একত্রিত করার প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপন হবে অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা, বর্তমানের উদযাপন এবং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা।

২০৩০ বিশ্বকাপে অংশ নেবে ৪৮টি দল। ২০২৬ সালের মতোই এই আসরেও ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রথমবারের মতো তিনটি মহাদেশ—ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের নজির গড়তে যাচ্ছে ফিফা।

ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে ছয় দলের অংশগ্রহণ। তারা হলো—স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। বাকি ৪২টি দল বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেবে।

বিশ্বকাপের শতবর্ষকে ঘিরে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ইতোমধ্যেই ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ফিফার সবচেয়ে প্রতীকী আসরগুলোর একটি।

বিশ্বকাপ মাতালেন এমবাপ্পে, রদ্রি আর স্পেন; ব্যক্তিগত পুরস্কারে কার ঝুলিতে কী?
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা নেমেছে স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে। তবে দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা পারফর্মাররাও। বিশ্বকাপ শেষে ফিফা ঘোষণা করেছে বিভিন্ন ব্যক্তিগত পুরস্কার, যেখানে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখিয়েছে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে স্পেন। সেই সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের (গোল্ডেন বল) স্বীকৃতি পান দলের মিডফিল্ডার রদ্রি। পুরো আসরজুড়ে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, বলের দখল ধরে রাখা এবং ম্যাচের গতি নির্ধারণে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন তিনি। গোল করার লড়াইয়ে আবারও সবার ওপরে ছিলেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেমিফাইনালে ফ্রান্স বিদায় নিলেও ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। এর সুবাদে নিজের ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জেতেন ফরাসি অধিনায়ক। স্পেনের আরেক নায়ক উনাই সিমন জিতেছেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার (গোল্ডেন গ্লাভস)। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রেখে তিনি স্পেনের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা ছিলেন। অন্যদিকে স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবারসি জিতেছেন সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের (বেস্ট ইয়াং প্লেয়ার) পুরস্কার। ফলে বিশ্বকাপের চারটি প্রধান ব্যক্তিগত পুরস্কারের মধ্যে তিনটিই জিতে নিয়েছে স্পেন। শুধু গোল্ডেন বুট গেছে ফ্রান্সের এমবাপ্পের হাতে।

মার্কিন অনুপ্রবেশ ‘তাৎক্ষণিক’ মোকাবিলার অঙ্গীকার আইআরজিসির

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দেশটির স্থলবাহিনী আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত অপারেশনাল সক্ষমতার নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতির অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে দাবি করেছে তারা।

তাসনিম বার্তা সংস্থার উদ্ধৃত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত সতর্কতা ও নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতিই দেশের টেকসই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সব ধরনের অপারেশনাল খাতে এই প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বজায় রাখা হচ্ছে।’

আইআরজিসির স্থলবাহিনীর উপ-কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুহোল্লাহ নুরি বলেন, ইরানি বাহিনী এমন অবস্থায় রয়েছে যে, শত্রুপক্ষের যেকোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা মুহূর্তের মধ্যেই প্রতিহত ও নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হবে।

তবে আইআরজিসির এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

মার্কিন অনুপ্রবেশ ‘তাৎক্ষণিক’ মোকাবিলার অঙ্গীকার আইআরজিসির
ছবি: সংগৃহীত।

হামাসের নতুন প্রধান খলিল আল-হাইয়া

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস তাদের রাজনৈতিক ব্যুরোর নতুন প্রধানের নাম ঘোষণা করেছে। খবর আলজাজিরার

ফিলিস্তিনি দলটি জানিয়েছে, খলিল আল-হায়া হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ইয়াহিয়া সিনওয়ারের স্থলাভিষিক্ত হবেন, যিনি ২০২৪ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন।

গত বছর হামাসের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া তেহরানে, ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজায় এবং সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফ নিহত হওয়ার পর সংগঠনের নেতৃত্বে খলিল আল-হাইয়ার গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

১৯৬০ সালে গাজা উপত্যকায় জন্ম নেওয়া খলিল আল-হাইয়া ১৯৮৭ সালে হামাস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে এর রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

হামাসের নতুন প্রধান খলিল আল-হাইয়া
খলিল আল-হায়া

ইরান দেখিয়ে দিচ্ছে, মার্কিন হামলা সামলে পাল্টা প্রাণঘাতী হামলা চালাতে পারে তারা

ইরানে আমেরিকা টানা নবম রাতের মতো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। আজ সোমবার ভোররাতে তারা নবম রাতের হামলা শেষ করেছে বলে জানিয়েছে। জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তেহরান প্রমাণ করছে, ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি তারা সহ্য করতে সক্ষম। তারা এমন প্রাণঘাতী জবাব দিতে পারে, যা যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর পর মার্কিন সামরিক বাহিনী আর দেখেনি।

জর্ডান ও ইরাকে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত তিন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া একজন নিখোঁজ এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

পেন্টাগন তাদের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতির কথা প্রকাশ করছে না। তবে তেহরানের দাবি, তাদের একাধিক দিনের হামলায় প্রচুর সংখ্যায় মার্কিন ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে। এয়ারক্রাফট হ্যাঙ্গারের মতো ঘাঁটির মূল অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সেতু, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে, তখন কুয়েত ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের চালিয়ে যাচ্ছে ইরান, যাতে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কুয়েত ও বাইরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরানে হামলায় এসব দেশের ঘাঁটি ব্যবহার করছে বলে ইরান অভিযোগ করে আসছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রতিদিনের বক্তব্যগুলো আগের দিনের বক্তব্যগুলোর হুবহু কপি-পেস্ট বলে মনে হচ্ছে। গতকাল রোববার গভীর রাতে তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও সাধারণ নাবিকদের ওপর হামলায় ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে এ হামলা অব্যাহত থাকবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে ইরানের এই সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনতে পেরেছে, এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নতুর করে শুরু হওয়া লড়াই শেষ করতে পারবে, তারও কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না; বরং ইরান সমানতালে মার্কিন হামলার জবাব দিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মে মাসে সিএনএনকে বলেছিলেন, ভূগর্ভস্থ গুদামগুলোতে ইরানের কাছে এখনো অন্তত ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন মজুত রয়েছে।

এমনকি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ‘হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা’ কেবল মার্কিন বিমান হামলার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘দ্য জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স’ পডকাস্টের এক পর্বে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আপনি তাদের ওপর বোমা ফেলতে পারেন, তাদের রাডার ধ্বংস করতে পারেন, তাদের কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু প্রণালিতে যাতায়াতকারী জাহাজে আঘাত করা তাদের জন্য অত্যন্ত সহজ।’

আর এখন ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সেনাদেরও একই ধরনের প্রাণঘাতী বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি। ছবি: কোলাজ

ফরিদপুর থেকে বম্বে, গীতা দত্ত মানে ‘তুমি যে আমার’ by মাসুম অপু

প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০২৩ঃ ‘তুমি যে আমার’, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়’, ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশ’, ‘মেরা নাম চিনচিন চু’ ও ‘বাবুজি ধীরে চল না’র মতো অনেক জনপ্রিয় গানের কালজয়ী শিল্পী তিনি। তবে তিনি যে বাংলাদেশেরই মাটির কন্যা, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। মুম্বাই চলচ্চিত্রজগতের প্রবাদপ্রতিম গায়িকা গীতা দত্ত। নায়ক, পরিচালক গুরু দত্তের জীবনসঙ্গী। ২৩ নভেম্বর তার জন্মদিন।

শিরোনাম আর শুরুর তথ্যের পর তাঁকে নিয়ে লেখার কোনো ভূমিকা দরকার হয় না। এই বাংলার কন্যা গীতা দত্তের নামের আগে জুতসই বিশেষণ পাওয়াও মুশকিল। যেমন মুশকিলে পড়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ‘হারানো সুর’ সিনেমার গান করছেন। ‘তুমি যে আমার’ গানটি রেকর্ড হবে। সুচিত্রা মানেই তো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। সবাই সে কথা বলেছিলেন, কিন্তু সুরকার হেমন্ত ঠিক আস্থা রাখতে পারছিলেন না। অন্য রকম ভাবছেন, এই গান গীতা ছাড়া আর কেউ গাইতে পারবে না! হেমন্তের কথামতোই ঠিক হলো, গীতা দত্তই গাইবেন। মুম্বাই (তৎকালীন বম্বে) গিয়ে গানের রেকর্ডিং করা হলো। এরপর যা হওয়ার তাই হলো। আজও সুচিত্রা সেনকে নিয়ে প্রতিবেদন বা গল্প তৈরি করতে গেলে শুরুতে এই গানের উল্লেখ এসেই পড়ে। যেন সুচিত্রাই গাইছেন, গভীর থেকে। কী অদ্ভুত টান, কী দারুণ গায়কি! এই গানের মতোই উজ্জ্বল ছিলেন গীতা দত্ত, আর এমনই ছিল তাঁর গান। ভারতের সংগীতজগতে একটা কথা খুব প্রচলিত ছিল—লতাকণ্ঠী, আশাকণ্ঠী হওয়া যায়, কিন্তু গীতাকণ্ঠী হওয়া যায় না।

ফরিদপুরের কন্যা
১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর জীবনের উন্মেষ বাংলাদেশের ফরিদপুরে। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ রায়চৌধুরী ছিলেন জমিদার। তাঁর ১০ সন্তানের মধ্যে গীতা ছিলেন পঞ্চম৷ তখন তিনি গীতা ঘোষ রায়চৌধুরী। ছোট থেকেই গানের প্রতি কন্যার আগ্রহ আর সুরেলা কণ্ঠ মা-বাবার নজরে আসে। স্থানীয় গুরু হরেন্দ্রনাথ নন্দীর কাছে তালিমের ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁরা। এর মধ্যে কলকাতায় পাড়ি দেয় চৌধুরী পরিবার। কিছুদিন আসাম এবং কলকাতা থাকেন ঘোষ রায়চৌধুরীরা।

পরে ১৯৪২ সালে মুম্বাই পাড়ি দেন তাঁরা। ফরিদপুরের জমিদারি হারানোর পর আসাম, কলকাতা ঘুরে মুম্বাইয়ে থিতু হওয়া অত সহজ ছিল না। আর্থিক টানাপোড়েন পড়ে পরিবার। সেখানে আর কিশোরী গীতার জন্য সংগীতের তালিমের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি মা-বাবার। তাতে থেমে যান গীতা। সংগীত তো তাঁর আত্মায়, নিজের মতো করে চর্চা করে যেতেন। পাশাপাশি গানের টিউশনিও করাতেন। এবাড়ি–ওবাড়ি ছুটতেন টিউশনি করতে। বাসের ভাড়ার পয়সা বাঁচাতে হাঁটতেন মাইলের পর মাইল। যে বাড়িতে গান শেখাতেন, সেখানে গরিব বলে তাঁকে মাটিতে বসতে দেওয়া হতো। সংগীতের প্রতি দরদ ছিল বলেই হয়তো নিয়তি তাঁকে কাকতালীয়ভাবে সেদিকেই নিয়ে যায়। একদিন হঠাৎ পণ্ডিত হনুমান প্রসাদের নজরে পড়ে যান। শোনা যায়, মুম্বাইয়ে তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন পণ্ডিতজি। বারান্দায় বসে চর্চা করছিলেন কিশোরী গীতা। তাঁর কিন্নর কণ্ঠ ভেসে আসে পণ্ডিত হনুমান প্রসাদের কানে। দাঁড়ালেন, খোঁজ নিলেন। জহুরির মতো চিনে ফেললেন খাঁটি হীরা। ১৯৪৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গীতার যাত্রা শুরু হয় হনুমান প্রসাদের হাত ধরে ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’ ছবিতে। এই ছবিতে গীতা কোরাসে মাত্র দুই লাইন গান গাওয়ার সুযোগ পান।

শুরু হলো পথচলা

হাসনাহেনা জঙ্গলে ফুটলেও ঘ্রাণ ছড়ায় চারপাশ। একটি গানের কোরাসে অংশগ্রহণই গীতার পথচলার রাস্তা তৈরি করে। ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’ ছবিতে গীতার কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে শচীন দেববর্মন তাঁর পরের ছবি ‘দো ভাই’তে গীতাকে মূল শিল্পী হিসেবে গাওয়ার দায়িত্ব দেন। ঠিক দেশ ভাগের বছরে; সে সময় নাকি অনেকে বারণ করেছিলেন শচীন দেববর্মনকে, এমন নতুন ‘অপরিপক্ব’ শিল্পীকে এত বড় দায়িত্ব না দিতে।

কিন্তু তিনি পরের পরামর্শে কান না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। হয়তো বাঙালি বলে কিংবা এপারের মানুষ বলে বাড়তি স্নেহ দিয়েছিলেন গীতাকে। শচীন দেবের আস্থার প্রতি ষোলো আনা সম্মান দেখিয়েছিলেন গীতা, ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বিত গ্যায়া’র গানের সুর নাড়া দিয়েছিল শ্রোতাদের। মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে বুকভরা যন্ত্রণা নিয়ে নায়িকার হাহাকারের পুরোটাই ছিল গীতার গায়কিতে। এ সিনেমার ৯টি গানের ৬টিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ১৬ বছরের সেই নবীন গায়িকা। আর কি চেনাতে হয়? শুধু মুম্বাই না, সারা ভারতের বিনোদন দুনিয়ায় তোলপাড় ঘটে যায়। কে এই গায়িকা? দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বাঙালি সেই গায়িকার নাম। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯—তিন বছরের মধ্যে শুধু প্রতিষ্ঠা না, গায়িকা হিসেবে শীর্ষে পৌঁছে যান গীতা। শীর্ষ তিনজনের তিনি একজন। জোহরাবাই অম্বালেওয়ালি বা নুরজাহান থেকে গীতার আলাদা গায়কির কদর বাড়তে থাকে।সেই সময়ে ভক্তিগীতির খুব চল ছিল। আর ভক্তিগীতিতে গীতা ছিলেন অনন্য। করুণ গলায় সমর্পণ, আকুতিতে সেই গানগুলো একদম বুকের গভীরে নাড়া দিত। আবার আধুনিক রোমান্টিক গানে তাঁর কণ্ঠ এবং গায়কিতে আস্থা রাখতেন নির্মাতারা। গরিব বলে গান শেখাতে গিয়ে তাঁকে যেসব বাড়িতে একসময় মাটিতে বসতে বলা হতো, তাঁকে নামডাক হতেই সেসব বাড়ি থেকেই নিমন্ত্রণ আসত। তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন না।  সেখানে গিয়ে জোর করে মাটিতেই বসতেন। হয়তো সেই অভিমানই সমকালীন ফর্মুলা গল্পের নায়িকার নেপথ্য কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়ে পর্দায় দারুণ ফুটে উঠত।শচীন দেববর্মনের সংগীত পরিচালনায় ১৯৫১ সালের ‘বাজি’ সিনেমা নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় গীতাকে।

পরপর বেশ কিছু গানে যেন শ্রোতারা নতুন আরেক শিল্পী খুঁজে পান। কে জানত পদ্মাপারের সেই কিন্নরী কণ্ঠে পাশ্চাত্য সুর এভাবে মানিয়ে যাবে। সহজে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার জন্য ১৯৫০–এর দশকে লাস্যময়ী এবং ডান্স ক্লাবের গানে তিনি প্রথম পছন্দরূপে গণ্য হতে শুরু করেন। গীতার তীক্ষ্ণ বাঙালি টানকে কাজে লাগিয়ে ‘দেবদাস’ (১৯৫৫) এবং ‘পেয়াসা’ (১৯৫৭) ছবিতে তাঁর লোকসংগীতের ধার বাড়িয়েছিলেন শচীন দেববর্মন। ‘পেয়াসা’ ছবিতে ‘আজ সাজন মুঝে অঙ্গ লাগা লে’ বাংলা কীর্তন গানকে গীতা সফলভাবে হিন্দিতে গেয়েছিলেন। এরপর ও পি নাইয়ারের সুরে সব ধরনের গানেই তিনি সাবলীলতার ছাপ রেখে গেছেন।

গীতা ঘোষ থেকে দত্ত

‘তাদবির সে বিগরি হুই তাকদির বানা লে’ দেব আনন্দ আর নায়িকা গীতা বালি অভিনীত ‘বাজি’ সিনেমা গানটি হয়তো অনেকে শোনা। ১৯৫১ সালে এস ডি বর্মনের সংগীত পরিচালনায় এই গানটি রেকর্ড হয় মুম্বাইয়ের বিখ্যাত মহালক্ষ্মী স্টুডিওতে। সেদিন স্টুডিওতে এসেছিলেন ছবির পরিচালক গুরু দত্ত। গানে, গল্পে প্রেমে পড়ে যান গুরু দত্ত। টানা তিন বছরের প্রেমপর্বের পর বিয়ে করেন তাঁরা। সালটা ১৯৫৩। বাড়ির অমতে ২৬ মে বিয়েও করেন তাঁরা। গীতা ঘোষ হয়ে যান গীতা দত্ত। গীতা-গুরুর বিয়ের ছবি পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিয়ের দিন বাংলার শিকড়ের কথা ভোলেননি গায়িকা। নিজে লাল বেনারসি ও গয়নায় সেজেছিলেন। আর ধুতি-সিল্কের পাঞ্জাবি পরেছিলেন গুরু দত্ত।গুরু দত্তের ছবিতে গান সব সময় প্রাধান্য পেত। যেন গানটাও ছবির অন্য আরেকটা গল্প, একটা চরিত্র। গীতার বিয়ের কিছুদিন পরেই গুরু দত্ত নিজের প্রযোজনা ছাড়া স্ত্রীর অন্যত্র গাওয়া নিয়ে আপত্তি করতে থাকেন।

যার ফলে গীতার গান গাওয়ার সীমানা কিছুটা সংকীর্ণ হয়ে যায়। অবশ্য এর মধ্যেও ‘পেয়াসা’ সিনেমার ‘আজ সাজান মুঝে আঙ্গ লাগালো’, ‘সিআইডি’র  ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল জিনা ইহা, ‘আর পার’–এর ‘বাবুজি ধীরে চল না’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটি ফাইভ’–এর  ‘থান্ডি হাওয়া কালি ঘটা’, ‘সাহেব বিবি গুলাম’–এর ‘না যাও সাইয়া ছুড়াকে বাইয়া’–এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গান উপহার দেন তিনি।

গুজরাটি ও বাংলা গানের গীতা

পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে গুরু দত্তের শর্ত মেনেও সুরকারেরা গীতার জন্য একটা গান তুলে রেখেছিলেন তাঁদের ছবির জন্য। এ পাশাপাশি গুজরাটি ছবিতেও দাপটের সঙ্গে গেয়েছিলেন তিনি। শুধু তা–ই নয়, গুজরাটি ছবিতেও প্রধান নেপথ্য গায়িকা ছিলেন তিনি। গুজরাটি ভাষায় বিখ্যাত সুরকার অবিনাশ ব্যাসের সুরে বেশ কিছু গান গেয়েছিলেন। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে গীতা বেশ কিছু বিখ্যাত বাংলা গান গেয়েছেন।

তাঁর বেশির ভাগ বাংলা গানেরই সুরকার ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গেয়েছিলেন নচিকেতা ঘোষ এবং সুধীন দাশগুপ্তের সুরেও।

জীবনে নেমে এল ঝড়

অমিতাভ-জয়ার ‘অভিমান’ ছবিটির কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। অনেকেই এ ছবির গল্প বলতে গিয়ে গীতা-গুরু জুটির কথা তোলেন। বিয়ের তিন বছর কাটতে না কাটতেই জীবন ঘুরে যায় তাঁদের। দুজনই ছিলেন স্বাধীনচেতা, জেদি। এমনিতে গীতার খ্যাতি শিখরে, সে তুলনায় গুরু দত্ত তখনো যশপ্রার্থী বললে বাড়াবাড়ি হবে না। হয়তো এখানে কোথাও ব্যক্তিত্বের টানাপোড়েন তৈরি করে। শুরু থেকে গুরু দত্ত চাইতেন তাঁর ব্যানার ছাড়া অন্য কোনো ব্যানারের জন্য গান করবেন না গীতা।

এটা মেনে নিয়েও যেন ঠিক মেনে নিতে পারেননি গীতা। শোনা যায়, লুকিয়ে টুকটাক গাইতেন তিনি। তবে ‘সিআইডি’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় থেকে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও জটিল হয়। এ সময় ওয়াহিদা রহমানকে সামনে এনেছিলেন গুরু দত্ত। গুরু দত্তের ‘সিআইডি’ ছবিতে খলনায়িকা ওয়াহিদা; পরপর গুরু দত্তের ছবিতে অভিনয় করে চলেছেন ওয়াহিদা।

‘পিয়াসা’ ছবিতে নায়িকা। ‘চৌধভি কা চাঁদ’ ছবিতে ওয়াহিদা রহমানের বিপরীতে গুরু দত্তের অভিনয় সাড়া ফেলে। পর্দার প্রেম জীবনে ঢুকে পড়ছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। গুরু দত্ত-ওয়াহিদা রহমান হয়ে ওঠেন ‘টক অব দ্য টাউন’। তবে শুধু কথার কথাই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও ওয়াহিদার প্রেমে পড়েন গুরু দত্ত। ওয়াহিদা রহমানকে কেন্দ্র করে নাকি মাঝেমধ্যে ঝগড়াও হতো। এর মধ্যে ‘কাগজ কা ফুল’ ছবিটি  ফ্লপ হয়। গুরু–গীতার বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন। অবসাদে ভুগতে থাকা গুরু দত্ত  দুবার আত্মঘাতীও হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৬৩ সালে আলাদা হয়ে যান পরিচালক, নায়ক-গায়িকা। গীতা থাকতে শুরু করেন মুম্বাইয়ের সান্তাক্রুজে। গুরু দত্ত ছিলেন পেডার রোডের ফ্ল্যাটে। বছরখানেক পর সেই ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হলো। মারা যাওয়ার আগের দিনও স্ত্রী গীতা দত্তের কাছেও যান গুরু দত্ত। দুই ছেলের সঙ্গে থাকতে চাইলে গীতা দত্ত রাজি হননি। গুরু দত্তের অপমৃত্যুর পর গীতা দত্তের জীবনেও সেই সময়ে নেমে আসে আরও বিপর্যয়। শোনা যায়, ঘোর পানাসক্ত হয়ে ওঠেন তিনিও।

আর্থিকভাবেও সংকটে পড়েন। অনেক চেষ্টা করছিলেন। সামলে উঠতে এমনকি বাংলা ছবি ‘বধূবরণ’-এ অভিনয়ও করেন। ওদিকে লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলে গানের বাজার দখল করে নেন। যদিও ‘অনুভব’ ছবিতে গীতার কণ্ঠে গাওয়া সব কটি গান হিট। কিন্তু ততক্ষণে নিয়তিই যেন সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে তাঁর। ফিরবেন ফিরবেন করছেন, তখনই ধরা পড়ে যকৃতের জটিল রোগ, সিরোসিস।

অর্থের অনটন দূর করতে সেই সময়ে কলকাতার মঞ্চে গীতা অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। গীতা পুরোদমে গানের তথা চলচ্চিত্রজগতে ফিরতে চাইলেও বম্বের ফিল্মি দুনিয়ার রাজনীতির সমীকরণ তাঁকে আর সেই সুযোগ দেয়নি। শেষের দিকে হাসপাতালে প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার ফাঁকেই সিনেমার চটুল গানে যথাযথ আবেদন ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে, নিজ প্রতিভার গুণে। সকালে হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা নিয়ে বিকেলে স্টুডিওতে গিয়েছেন ‘মুঝে জান না কাহো মেরি জান’! প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়েও রেকর্ডিংয়ে তিনি কীভাবে একের পর এক গান গেয়ে গেছেন, তা নিয়ে সমালোচকেরা এখনো আলোচনা করেন। গীতা দত্তের শেষের দিনগুলো শারীরিক যন্ত্রণায় কেটেছে। নাকেমুখে নল গোঁজা। কখনো কান বা নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হতো। বেশির ভাগ সময়ই অজ্ঞান থাকতেন গায়িকা ও অভিনেত্রী। সালটা ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই, কোনো চিকিৎসাই গীতাকে আর সুরের জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। শেষ হয় গীতার জীবনযাত্রা। অবসান হয় সব যন্ত্রণার।

শোনা যায়, শচীন দেববর্মন তাঁর পছন্দের গীতার জন্য আলাদা করে রেখেছিলেন ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ গানটি! শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। শচীন কর্তা নিজেই গানটি গেয়েছেন বটে, তবে এই গানটি আমাদের পদ্মাপারের মেয়ের কণ্ঠে শুনতে না পাওয়ার আফসোস থেকে যাবে সংগীতানুরাগী শ্রোতাদের।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-11%2F95f69d07-fa40-4017-aabe-cbae3f4a0a71%2FWhatsApp_Image_2023_11_23_at_7_19_25_PM.jpeg?rect=146%2C0%2C1080%2C720&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর জীবনের উন্মেষ বাংলাদেশের ফরিদপুরে। ফেসবুক থেকে

ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় রাজপথ, দুর্গন্ধে আটকে যায় নিঃশ্বাস by মাহমুদা ডলি

ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে ঢাকা মহানগর। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিকদের দায়িত্বহীনতা এবং দুই সিটি করপোরেশনের তদারকির ঘাটতিতে নগরজীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। খোলা ট্রাকে বর্জ্য পরিবহনের সময় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে আবর্জনা। এতে একদিকে যেমন দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

এর মধ্যে দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, ড্রেন ও খানাখন্দে জমে থাকা পানি ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে মিশে পুরো নগরকে আরো নোংরা ও দুর্গন্ধময় করে তুলেছে। কোথাও হাঁটার জায়গা নেই, কোথাও আবার তীব্র দুর্গন্ধে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

একদিকে টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ এবং জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ চরমে। শুধু পথচারী নন, রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীরাও সমান ভোগান্তিতে পড়ছেন। খোলা ম্যানহোল জলাবদ্ধ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় প্রায়ই রিকশার চাকা আটকে যাচ্ছে। আবার বাস, ট্রাক, পিকআপ বা সিএনজি দ্রুতগতিতে চলাচলের সময় নোংরা পানি ছিটকে পথচারী ও যাত্রীদের গায়ে পড়ছে। এমন চিত্র রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটিতেই।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বছরের পর বছর ধরে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে মগবাজার ওয়্যারলেস গেট, মালিবাগ চৌরাস্তা, শান্তিনগরের বিভিন্ন অংশ, মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইন এলাকা এবং কারওয়ান বাজার ও তার আশপাশ।

রেললাইন এখন বর্জ্যের ভাগাড়

সরেজমিনে দেখা যায়, কমলাপুর স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তা, টিটিপাড়া থেকে আর কে মিশন রোড পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে জমে আছে বর্জ্যের স্তূপ। দীর্ঘদিন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

এদিকে মালিবাগ রেলগেট থেকে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পাশে পশু জবাইয়ের বর্জ্য, পশুর মাথা, কান ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব থেকেও ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভাসমান মানুষের বসতি এবং হকারদের দখলের কারণে নাজেহাল অবস্থা। মালিবাগ রেলগেট থেকে শুরু করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ মানিকনগর বিশ্বরোডের পুরোটা ময়লা-আর্বজনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও আশপাশের বাজারের বর্জ্য বছরের পর বছর রেললাইনের পাশে ফেলতে ফেলতে ছোট-বড় অসংখ্য ময়লার ভাগাড় তৈরি হয়েছে। ফুটপাতজুড়ে মলমূত্র, অন্যদিকে হকারদের দখল—পথচারীদের চলাচলের সুযোগই প্রায় নেই। খোলা জায়গায় জমে থাকা এসব বর্জ্য থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

মালিবাগ-শান্তিনগরেও একই চিত্র

মালিবাগ-শান্তিনগর মোড়ে রিকশার জন্য অপেক্ষমাণ এক কর্মজীবী নারী মুখে ওড়না চেপে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, চারপাশের ময়লা নোংরা দুর্গন্ধ আমি পাই আপনি পান না?

মালিবাগ চৌরাস্তার ফুটপাত, আইল্যান্ড ও ওভারব্রিজের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বর্জ্য। মালিবাগ পাবলিক টয়লেটের সামনের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চামেলিবাগ, সিদ্ধেশ্বরী ও মৌচাকমুখী সড়কের দুই পাশজুড়েও একই অবস্থা। ফ্লাইওভারের নিচে টোকাই ও ভাঙারি ব্যবসায়ীদের দখলে তৈরি হয়েছে ময়লার স্তূপ।

রাজধানীর ভেতরে ও তার আশপাশের এলাকাতেও একই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে বাতাসে ধুলাবালুর সঙ্গে উড়তে থাকে পলিথিনসহ ময়লা-আবর্জনা। যত্রতত্র বর্জ্যের স্তূপে চাপা পড়ে যাচ্ছে রাস্তার অর্ধেক অংশ। ফুটপাতের অধিকাংশই প্রস্রাবের কারণে হাঁটার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপরও।

দক্ষিণ ঢাকায়ও ভয়াবহ অবস্থা

দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ডেমরা সড়কের কাজলারপাড় থেকে কোনাপাড়া পর্যন্ত ওয়াসার ড্রেন বর্জ্যে ভরে গেছে। টানা বৃষ্টিতে তা এখন খালের রূপ নিয়েছে। সায়েদাবাদ, ধলপুর, টিকাটুলি, গুলিস্তান, নাজিরাবাজার, শাখারীবাজার, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, জুরাইন ও দোলাইরপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। বহু এলাকায় বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা ও বর্জ্যের কারণে দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

উত্তর ঢাকায়ও সংকট

উত্তর সিটির মেরাদিয়া থেকে রামপুরা পর্যন্ত কয়েকটি এসটিএস থাকলেও অনেক জায়গায় খোলা জায়গায় ভেজা ও শুকনা বর্জ্য আলাদা করার সময় ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা পরিমল বাবু প্রতিদিন মালিবাগ হয়ে কারওয়ান বাজারে অফিসে যান। তিনি বলেন, মালিবাগ রেলগেট এলাকায় রাস্তার ওপর পর্যন্ত ময়লা ছড়িয়ে আছে। তার ওপর উন্নয়ন কাজের জন্য বড় বড় গর্তে বৃষ্টির পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে মিরপুর, শেওড়াপাড়া, উত্তরা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও বনানী এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বাসাবাড়ি ও রেস্টুরেন্টের সামনেই বর্জ্য ফেলে রাখা হচ্ছে।

গত ১০ জুলাই মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ায় জলাবদ্ধতা পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম ড্রেনেজ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং দোকানদারদের যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানান। পরে মিরপুর-১২-এর ৬ নম্বর কাঁচাবাজার পরিদর্শন করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি এবং দোকানদার, বাজার কমিটি ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয়, তবুও নেই সমাধান

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, রাজধানীর ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ছয় হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর ৫৫ শতাংশই যথাযথভাবে সংগ্রহ করা যায় না।

জানা গেছে, গত সাত বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করেছে প্রায় তিন হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। তবু শহরজুড়ে রয়ে গেছে ২৫০টিরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত ভাগাড়। ফলে বিপুল বর্জ্য খাল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানে জমে থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চারটি ধাপ রয়েছে— বাড়ি থেকে প্রাথমিক সংগ্রহ, এসটিএসে জমা, ট্রাকে করে ল্যান্ডফিলে পরিবহন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। কিন্তু এর প্রতিটি ধাপেই দুর্বলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ ধাপ অর্থাৎ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যত নেই। ফলে অধিকাংশ বর্জ্য শেষ পর্যন্ত খোলা জায়গায় ফেলা হয়।

কারওয়ান বাজারে কার্যত নেই নিয়ন্ত্রণ

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বাজারের ভেতরের ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দখল, অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্যের কারণে কোথাও কোথাও ছয় ফুটে নেমে এসেছে। কিচেন মার্কেটের সামনে মুরগি জবাই ও সবজির বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলায় পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে যায়।

ফুটপাত দখল, উন্মুক্ত ড্রেন, বর্জ্যের স্তূপ, জলাবদ্ধতা ও যানজট—সব মিলিয়ে কারওয়ান বাজারে নগরবাসীর দুর্ভোগ নিত্যদিনের ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পণ্য খালাসের পর ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রেখে যান। নিয়ম অনুযায়ী কনটেইনারে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে পুরো বাজারই আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়।

বর্জ্য থেকে পলিথিন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহকারী সালাম মিয়া বলেন, পুরো বাজারের ময়লা এখানে ফেলা হয়। সিটি করপোরেশনের গাড়ি মাঝে মাঝে কিছু নিয়ে গেলেও অধিকাংশই পড়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞের মত

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এমনিতেই দুর্বল। এর সঙ্গে যদি সময়মতো এলাকা থেকে বর্জ্য অপসারণ না করা হয়, তাহলে রাস্তাজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হবে। সেখান থেকে মশা-মাছিসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়বে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনকে আরো কঠোর হতে হবে।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার আমার দেশকে বলেন, রেললাইন ও রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা রেলওয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। সেসব এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য তাদের নিজস্ব জনবল রয়েছে। তবে নগরীর অন্যান্য এলাকায় টেকসই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নতুন জনবল নিয়োগ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তিনি আরো বলেন, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কোথাও অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো, কোনো বর্জ্য যেন ২৪ ঘণ্টার বেশি খোলা জায়গায় পড়ে না থাকে।

ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় রাজপথ, দুর্গন্ধে আটকে যায় নিঃশ্বাস
রাজধানীতে ময়লা অপসারণের অব্যবস্থাপনায় ভুক্তভোগী নগরবাসী। শুক্রবার ফকিরাপুলের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম রোড থেকে তোলা। ছবি: জসীম উদ্দীন

পায়েলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ দৃশ্য, নায়ক বললেন, ‘সবটাই শিল্পের জন্য’

প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০২৫ঃ ‘দ্য একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ সিনেমাটি মুক্তির আগে থেকেই চর্চায় রয়েছে। কলকাতার বাংলা ছবিটিকে ‘অ্যাডাল্ট’ সনদ দিয়েছে ভারতের সার্টিফিকেশন বোর্ড। সম্প্রতি অ্যাডাল্ট সনদ পাওয়ার ঘটনা কলকাতার সিনেমায় দেখা যায়নি। ফেডারেশনের সঙ্গে বিরোধের জেরে মুক্তি পিছিয়ে যাওয়ার পর অবশেষ গত শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি। এতে পায়েল সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে দেখা গেছে ঋষভ বসুকে। আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন অভিনেতা।

‘দ্য একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ ছবিতে এক সাহসী দৃশ্যে দেখা গেছে ঋষভ বসুতে। শুধু নগ্ন দৃশ্যই নয়, ঋষভকে দেখা গিয়েছে পায়েল সরকারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ দৃশ্যে, কখনো চুম্বনের দৃশ্যে। এমন দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি নেন অভিনেতা?
বাণিজ্যিক ছবির নায়ক হয়ে এ ধরনের দৃশ্যে অনেকেরই অস্বস্তি থাকে। কিন্তু ঋষভ সে ধারণায় বিশ্বাসী নন।

তাঁর কথায়, ‘আসলে এ ধরনের কাজ হলিউডে প্রতিনিয়ত হয়। শাহরুখ খান তাঁর প্রথম দিকে ছবিতে এমন দৃশ্যে কাজ করেছেন। সবটাই শিল্পের জন্য করা। একজন ফাইন আর্টিস্ট হয়ে ফাইন আর্টসের জন্য এটা আনন্দ দিয়েছে।’ যদিও এ দৃশ্যে ঋষভকে একা নয়, পায়েল সরকারকেও দেখা গিয়েছে। বলিউডে এখন এ ধরনের অন্তরঙ্গ দৃশ্য শুট করার পরিচালক আলাদা রয়েছেন। এ ছবির ক্ষেত্রে অবশ্য তেমন সুযোগ হয়নি বলেই জানান ঋষভ; বরং এই দৃশ্যায়নের পুরোটাই তাঁর নিজের ভাবনা বলেই দাবি অভিনেতার।

ঋষভের কথায়, ‘আসলে আমি “শ্রীকান্ত” করেছিলাম বলে একটা অভিজ্ঞতা ছিল এ ধরনের দৃশ্য কীভাবে শুট করা হয়, সেটা সম্পর্কে। আর প্রস্তুতি বলতে এই শরীর প্রদর্শনের জন্য চেহারাটা সুঠাম রাখতে সাহায্য করেছিল কোভিড।’ ঋষভ জানান, দর্শক আগেও তাঁকে অন্য অভিনেত্রীদের সঙ্গে পর্দায় অন্তরঙ্গ দৃশ্যে দেখেছেন। তিনি কাজটা সুচারুভাবে পারেন বলেই হয়তো প্রস্তাব পান। তাই চরিত্রের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এমন দৃশ্যে অভিনয় করতে আপত্তি নেই তাঁর।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-23%2Fotwk3a5v%2F06199aa4-c5a0-4fbc-8b7b-bc5f03af839f.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পায়েল সরকার ও ঋষভ বসু। কোলাজ

Sunday, July 19, 2026

ইরানের গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকাতে মাঠে নামানো হলো ইহুদি ধর্মগুরুদের

ইসরাইলের ভেতরে ইরানের গুপ্তচরবৃত্তি ও নাগরিক নিয়োগের প্রক্রিয়া ঠেকাতে এবার মাঠে নেমেছেন দেশটির প্রভাবশালী ইহুদি ধর্মগুরু বা রাব্বিরা। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে ইরানি এজেন্টরা যেভাবে ইসরাইলিদের ফাঁদে ফেলছে, তা রুখতে রাব্বিদের সম্পৃক্ত করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।

রাব্বিদের মাধ্যমে সচেতনতা

ইসরাইলের প্রধান রাব্বিনিকাল কাউন্সিলের সদস্য ও প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রাব্বি ইগ্যাল কোহেন অনুসারীদের সতর্ক করে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, ইরানি এজেন্টরা ছবি তোলা, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা বা হত্যার মতো কাজের জন্য ইসরাইলের ভেতরে লোক নিয়োগের চেষ্টা করছে।

তিনি অনুসারীদের এই ফাঁদে পা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এটি চরম ধর্মদ্রোহিতা এবং এর পরিণতি হবে জেল ও জীবন ধ্বংস।

নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অনুরোধেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। এছাড়া কট্টর রক্ষণশীল (হারিদি) সম্প্রদায়ের পরিচিত মুখ ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ইসরাইল কোহেনও রাব্বিদের সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে এই প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। জুলাইয়ের শুরুতে হারিদি সম্প্রদায়ের আরেক সাংবাদিক উইদ্দিশ ভাষায় এই সতর্কবার্তা প্রচার করেছেন।

৬০টির বেশি মামলা

ইসরাইলি পুলিশ ও প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেনা, বেসামরিক নাগরিক, ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি এবং আরবদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ৬০টিরও বেশি মামলা করা হয়েছে।

পুলিশ তদন্তকারী আমিচাই প্যানেট্টা জানান, সন্দেহভাজনদের অনেকেই যুদ্ধের সময়েও শত্রুকে সাহায্য করেছেন।

টেলিগ্রাম ও এসএমএসের ফাঁদ


২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলা এবং ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর ইসরাইলের প্রথম হামলার পর তেহরান এই তৎপরতা বাড়িয়েছে। মূলত টেলিগ্রাম অ্যাপ ও ভুয়া নামে এসএমএস পাঠিয়ে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করা হয়। প্রথমে নিজের এলাকার সাধারণ ছবি বা ভিডিওর বিনিময়ে সহজ উপায়ে টাকা দেওয়ার লোভ দেখানো হয়। পরে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল তথ্য চাওয়া হয়।

সাবেক শিন বেত কর্মকর্তা শালোম বেন হানান জানান, তার স্ত্রীও প্রতিনিয়ত বড় পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে ইরানি গোয়েন্দাদের কাছ থেকে এমন বার্তা পান। হাজারো চেষ্টার মধ্যে দু-একটি সফল হওয়াই ইরানের জন্য বড় সাফল্য।

উল্লেখযোগ্য কিছু গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা

মার্কিন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার

গত ৯ জুন জেরুজালেমের একটি ধর্মীয় শিক্ষালয় থেকে এক মার্কিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। টাকার বিনিময়ে সংবেদনশীল ছবি তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে মার্কিন দূতাবাস কোনো মন্তব্য করেনি।

সেনার কারাদণ্ড

২০২৫ সালের সংঘাতের সময় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ভিডিও ইরানি এজেন্টের কাছে পাঠানোর দায়ে চলতি মাসে এক ইসরাইলি সেনাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে সামরিক আদালত।

আয়রন ডোম ও বিমানবাহিনীর তথ্য ফাঁস

আইরন ডোম ইউনিটের এক রিজার্ভ সেনা ব্যাটারির অবস্থান, ৭টি বিমান ঘাঁটি ও পরিচালনা পদ্ধতির ভিডিও পাচারের অভিযোগে আটক হয়েছেন। এছাড়া বিমানবাহিনীর দুই টেকনিশিয়ান সার্জেন্ট টেলিগ্রামে তথ্য পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন।

নেতা হত্যার ষড়যন্ত্র

হাইফা থেকে ২২ বছর বয়সি এক যুবককে রাজনৈতিক নেতা হত্যা ও বিস্ফোরক তৈরির প্লটে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি হাইফা বন্দর ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের স্থানের ছবি তুলেছিলেন।

চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে জালিয়াতি

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মামলাটি ঘটেছে ২৪ বছর বয়সি হারিদি শিক্ষার্থী মেইর নাহুম ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে। তিনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে ইসরাইলের বিশেষ '৮২০০' গোয়েন্দা ইউনিটের ভুয়া নথিপত্র তৈরি করেন।

তিনি ইরানি এজেন্টকে জানান, ২০২৪ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পেছনে ইসরাইল জড়িত ছিল।

এছাড়া এক সাধারণ ইরানি নাগরিকের নাম ইসরাইলি তথ্যদাতা হিসেবে দেন, যাকে পরে ইরান জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। এই কাজের জন্য তারা ডিজিটাল কারেন্সিতে ১ লাখ শেকেল (৩৫ হাজার ডলারের বেশি) নেন।

তাদের আইনজীবী আরিয়েল আতারি দাবি করেছেন, তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইরানকে ঠকিয়ে টাকা নিয়েছেন এবং ইসরাইলকে ঝুঁকিতে ফেলেননি।

তবে পুলিশ বলছে, রাইসিকে নিয়ে করা মিথ্যা দাবি যুদ্ধ লাগিয়ে দিতে পারত। আজ রোববার আদালতে এই দুই ভাইয়ের শুনানি রয়েছে।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ইরানের গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকাতে মাঠে নামানো হলো ইহুদি ধর্মগুরুদের
ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্পের একগুঁয়েমির কারণে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক মাস পার হতে না হতেই দেশটিতে পুনরায় বিমান হামলা শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া ও চুক্তির পতন

গত ১৭ জুন ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে স্থায়ী শান্তি ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল দুই দেশ। তবে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তিটিকে ‘কার্যকারিতাহীন’ দাবি করে গত সপ্তাহে পুনরায় ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে।

এর জবাবে ইরানও পারস্য উপসাগরে মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

সমালোচকদের মতে, চুক্তিটি ছিল ট্রাম্পের একটি সাময়িক কৌশল।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে জানা যায়, মূলত কৌশলগত তেল রিজার্ভ গড়ে তোলার সময় পেতেই ওয়াশিংটন এই চুক্তি করেছিল, যাতে ইরানের ওপর চাপ বজায় রেখে সাময়িকভাবে জ্বালানি তেলের দাম কমানো যায়।

নির্বাচনী ও অর্থনৈতিক প্রভাব

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মরিয়া। এমন সময়ে ভোটারদের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয় এই যুদ্ধ নতুন করে শুরু করায় ট্রাম্প নিজের দলের জন্যই রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনছেন। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে।

মার্কিন সাময়িকী ‘আমেরিকান কনজারভেটিভ’-এর নির্বাহী সম্পাদক কার্ট মিলস এটিকে ট্রাম্পের একটি ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা’ এবং নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য একটি সম্পূর্ণ পরাজয়ের কারণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ

এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি এই সমুদ্রপথ দিয়ে রপ্তানি হতো। ইরান এই প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী দেশগুলোকে এক প্রকার জিম্মি করে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই বিমান হামলা শেষ পর্যন্ত ইরানে স্থল অভিযানের রূপ নিতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, যা ট্রাম্প নিজেই অতীতে এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কূটনৈতিক ব্যর্থতা

হোয়াইট হাউসের সাবেক ইরান বিষয়ক উপদেষ্টা নেট সোয়ানসন এবং মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেন ভাটানকা জানান, ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনে অভিজ্ঞ ইরান বিশেষজ্ঞদের চরম অভাব রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়েছেন। এর পরিবর্তে ট্রাম্প তার পুরোনো ব্যবসায়ী দল ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের ওপর ভরসা করছেন। ফলে তারা ইরানি ব্যবস্থার মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোটেল মনে করেন, এই সংঘাত সপ্তাহের পর সপ্তাহ বা মাসব্যাপী চলতে পারে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তার অপমানিত ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে কূটনৈতিকভাবে এগোতে হবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

ট্রাম্পের একগুঁয়েমির কারণে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি

যুক্তরাষ্ট্রকে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে, যা তারা ভুলতে পারবে না: মোজতবা খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তেহরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের হাতে যুক্তরাষ্ট্র এমন শিক্ষা পাবে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন।

গতকাল শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মোজতবা খামেনির নামে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করা হয়। সেখানে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, গত মাসের সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে লঙ্ঘন করেছে, তা প্রমাণ করে যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর ‘সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অবৈধ’।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘চুক্তির ক্ষেত্রে মহাশয়তান বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আবারও সবার কাছে প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর এখন সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অবৈধ। আর জুলুম, আধিপত্যবাদ ও বর্বরতা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস ও নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।’

মোজতবা খামেনি লিখিত ওই বিবৃতিতে হুঁশিয়ার করে আরও বলেন, ‘এখন যখন মার্কিন শত্রু যুদ্ধ উসকে দিতে চাইছে এবং আরও বড় মূল্য ও অপমানের মুখোমুখি হতে চলেছে, তখন তাদের জানা উচিত যে প্রিয় ইরানি জাতি ও প্রতিরোধ ফ্রন্ট তাদের জন্য এমন শিক্ষা প্রস্তুত রেখেছে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না।’

যুক্তরাষ্ট্র এ সপ্তাহে ইরানের ওপর তাদের আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। তারা ইরানের সেতু, রেলপথ, সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কারখানাসহ বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে।

জবাবে বাহরাইন, কাতার, কুয়েতসহ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোয় হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে তেহরান। সেই সঙ্গে তেহরান ভারত মহাসাগরের উত্তরে অবস্থানরত একটি মার্কিন জাহাজে হামলার দাবি করেছে।

কুয়েত কর্তৃপক্ষ বলেছে, দেশটির একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও একটি পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির কর্তৃপক্ষ সবাইকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মোজতবা খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ‘আসল চেহারা’ উন্মোচন করেছে। আর এর মাধ্যমে তাদের ‘প্রতারণাপূর্ণ চরিত্র, অযৌক্তিকতা, অবিশ্বস্ততা ও কু-অভিপ্রায়’ প্রকাশ পেয়েছে।

দেশকে রক্ষা করার জন্য নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখার এবং সংঘাত চলমান থাকায় জনগণকে ‘সতর্ক’ ও ‘সক্রিয়’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন মোজতবা খামেনি।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় এমন খবর সামনে এসেছে যে ইয়েমেনের হুতিরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ইরানের সমর্থনে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং হামলা বন্ধ করতে ট্রাম্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় এবং এটি মার্কিনদের ওপর অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে এনেছে।

গত মাসে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা।

কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটন একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ওই সমঝোতাকে ‘সমাপ্ত’ বলে ঘোষণা করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি হাতে মিছিল
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি হাতে মিছিল। ছবি: এএফপি

নিউইয়র্কে এলে গ্রেপ্তার হতে পারেন নেতানিয়াহু, আবারও বললেন মামদানি

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে শহরটিতে এলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তাঁর কার্যালয় থেকে এখনো বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান মামদানি।

নিউইয়র্ক টাইমসের ‘দ্য ইন্টারভিউ’ পডকাস্টে কথা বলতে গিয়ে নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, তাঁর প্রশাসনের আইন বিভাগ সক্রিয়ভাবে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে।

নির্বাচনী প্রচারের সময় মামদানি এমন পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

মামদানি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর স্থান দ্য হেগে। তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত অভিযোগ গঠন করেছেন। আর আপনি দেখবেন, অনেক মানুষই শুধু কয়েক বছর ধরে তাঁর কর্মকাণ্ডের ফলে যা ঘটেছে, সে কারণেই এর সঙ্গে একমত পোষণ করেন।’

আইন তাঁকে এমন কিছু করার অনুমতি দেয় কি না, প্রশ্নের জবাবে মামদানি বলেন, ‘এ নিয়ে আমাদের আইন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলমান। তবে আমরা জাতীয় পর্যায়ে যা দেখেছি, তা হলো, কখনো কখনো নিজের মতো করে আইন তৈরি করা এবং আইনের সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবণতা। তবে এমন কিছুতে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালে নেতানিয়াহু ও অন্য ইসরায়েলি নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আইসিসির এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নিন্দা জানিয়েছেন।

মামদানি ইসরায়েল সরকারের একজন কঠোর সমালোচক। তিনি বারবার গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধকে জাতিগত নিধন বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তবে ইসরায়েল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গতকাল শনিবার জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ মেয়র মামদানির মন্তব্যকে ‘নিছক রাজনৈতিক নাটক’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়।

সপ্তাহের শুরুতে ডব্লিউএবিসি রেডিওর উপস্থাপক সিড রোজেনবার্গের সঙ্গে কথা বলার সময় নেতানিয়াহু বলেন, নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সেখানে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করার সম্ভাবনা নিয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা নিয়ে তিনি একেবারেই উদ্বিগ্ন নন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যাননও বলেন, ‘নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে আসবেন, গর্বের সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন এবং বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলের সত্য ও নিজের নাগরিকদের রক্ষা করার অটুট অধিকার তুলে ধরবেন।’

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: এএফপি

ইরান নয়, ট্রাম্পই এখন বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ by সায়মন টিসডাল

হঠকারী এবং দিশাহারা ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে নিজের শুরু করা এই বিপর্যয়কর যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। মার্কিন সামরিক বাহিনী আবারও দেশটিতে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। আগের মতোই, এই বেআইনি হামলাগুলো কট্টরপন্থী একটি সরকারের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।

এই সপ্তাহেও প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে তিনি ‘বিশাল জয়’ পাচ্ছেন। ট্রাম্প এবং পেন্টাগনের যুদ্ধবাজ প্রধান পিট হেগসেথ কতবার এমন ভুয়া বিজয়ের দাবি করেছেন? কেউ তাঁকে বিশ্বাস করে না।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন হোয়াইট হাউসের একটি সীমিত ও অধরা লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহি মনোভাবের কারণেই প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৃহত্তর যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো এখন আগের চেয়ে আরও বেশি অলীক মনে হচ্ছে।

মার্কিন বাহিনী যে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, তার কারণ ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শক্তি নয়, ট্রাম্পের কাপুরুষোচিত নেতৃত্ব। ইরান যদি সত্যিই তাদের দাবি অনুযায়ী এতটা বিপজ্জনক হতো, তবে যৌক্তিক পথ ছিল পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ চালানো। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাককে বিপজ্জনক মনে করেছিলেন, তখন তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। সেটিও এক বিপর্যয় ছিল।

ট্রাম্প ইরানে তেমন কিছু করার সাহস দেখাবেন না। এই সামান্য স্বস্তির জন্য বিশ্ববাসীর অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু ট্রাম্প নিজের ভুল স্বীকার করবেন না। তিনি একটি অসমাপ্ত যুদ্ধ অবলীলায় শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প বরং বেসামরিক মানুষ ও মার্কিন সৈন্যদের একটি অন্তহীন ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পছন্দ করেন।

ট্রাম্প উপসাগরীয় আরব মিত্রদের বিপদে ফেলছেন, বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করছেন, অনুন্নত দেশগুলোতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন এবং মস্কো থেকে বেইজিংয়ের স্বৈরশাসকদের আনন্দ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছেন এবং তাঁর নিজের রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী সম্ভাবনা নষ্ট করছেন। এত কিছুর পরও তিনি নিজের ভুল মেনে নিয়ে ‘শান্তি আলোচনা’র মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটবেন না।

ইরান নয়, ট্রাম্পের আত্ম–অহংকারই এখন বিশ্বের এক নম্বর শত্রু। এই যুদ্ধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ তিনিই। তিনি একাই একটি জীবন্ত গণবিধ্বংসী অস্ত্র।

এখানে একটি চেনা চিত্র দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প কংগ্রেস, মার্কিন মিত্র বা আমেরিকার জনগণের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। তাঁর কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল না। তিনি ইসরায়েলের বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বিজয়ের ভুয়া আশ্বাস সহজে বিশ্বাস করেছিলেন।

সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাম্পের যে অগাধ অজ্ঞতা ছিল, তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন দিয়েও দূর করা যায়নি। কারণ, তিনি সেই প্রতিবেদনগুলো পাত্তাই দেননি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প ভেবেছিলেন, প্রণালিটি বন্ধ করার আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টাহামলায় ট্রাম্প ‘হতবাক’ হয়েছিলেন। কিন্তু বাকি কেউ অবাক হয়নি। এখন তিনি অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন।

গত বছরের গাজার উচ্চাভিলাষী ২০ দফার ‘শান্তি পরিকল্পনা’তেও একই ধরনের অহংকার ও দায়িত্বহীনতা দেখা গিয়েছিল। পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠন বা নিরস্ত্রীকরণের মতো প্রধান বিষয়গুলোর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ট্রাম্প নিজেই এখন এর ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

হামাস অস্ত্র সমর্পণ করেনি, ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, মানবিক সহায়তা এখনো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও একই সমালোচনা প্রযোজ্য। তিনি কখনোই যুদ্ধের মূল কারণ বা ভ্লাদিমির পুতিনের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মাথা ঘামাননি। তিনি শক্তিশালী পক্ষকে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আধা-আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য চাপ দিয়েছেন। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কিয়েভের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।

ট্রাম্পের সেই বোকামি, অধৈর্য ও দায়িত্বহীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ইরানে।

এই পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে ট্রাম্প এখন ছটফট করছেন। চলতি সপ্তাহের উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে জুনের একটি ‘পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক’। এই চুক্তির মাধ্যমে মূল আলোচনার স্বার্থে ৬০ দিনের জন্য সংঘর্ষ স্থগিত রাখার কথা ছিল। ট্রাম্প এই চুক্তিকে নিজের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে প্রচার করেছিলেন।

কিন্তু ট্রাম্পের অন্য সব চুক্তির মতো এটিও ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এখন এর পরিণতি স্পষ্ট হতে শুরু করায় তিনি পিছুটান দিচ্ছেন। তেহরান যে তাঁকে বিশ্বাস করে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে তাঁকে কে বিশ্বাস করে?

ট্রাম্পের ইরান বিপর্যয়ের কারণে হওয়া ক্ষতি এখন সীমাহীন বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ব খুব কমই এমন দৃশ্য দেখেছে। একজন মদ্যপায়ী যেমন প্রতিবার নতুন করে মদ্যপান করার সময় ভাবে যে এবার ফলাফল ভিন্ন হবে, ট্রাম্পও তেমনি প্রতিদিন বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আগের কোনো হামলাই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারেনি। তিনি যত বেশি বোমা ফেলছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী তত বেশি অনড় হচ্ছে। সংঘাত তত বেশি তীব্র ও বিস্তৃত হচ্ছে।

এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-টোল আরোপের ঘোষণা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করে নেন। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার তদারকি করছেন, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগর অবরোধের মতো মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই গভীর জলাভূমি থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন, তা ট্রাম্পের জানা নেই।

ইউরোপীয় মিত্ররা সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, ওয়াশিংটনের শত্রুরা আনন্দে হাসছে, বিশ্ববাজার আতঙ্কিত এবং তেলের দাম আবার বাড়ছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে আমেরিকার সুনাম ও প্রভাব কমছে। যখন কেউ আপনাকে সম্মান করে না, তখন পরাশক্তি হওয়া বেশ কঠিন।

ট্রাম্পকে কে থামাবে? কংগ্রেস তাকে যুদ্ধ বন্ধ করতে অথবা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে বলেছে। তিনি তা উপেক্ষা করছেন। জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টিকারী সংকটের বিরুদ্ধে। তবু ট্রাম্প শুনছেন না।

ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলনে ট্রাম্পের তিরস্কারের শিকার হয়ে ব্যথিত মিত্ররা স্থায়ী ফাটলের ভয়ে তাঁকে থামাতে সাহস পাচ্ছে না। পোপ লিও তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এখন হয়তো কেবল প্রার্থনাই বাকি আছে।

নিজের সামরিক বিভ্রান্তির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্রেমলিনে বসে পুতিন আনন্দের সঙ্গে দেখছেন যে কীভাবে আমেরিকানরা ইউক্রেন থেকে দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে তাদের মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, অর্থ ও শক্তি অপচয় করছে।

পশ্চিমা জোটের মধ্যে ফাটল যত বাড়বে, পুতিন তত বেশি খুশি হবেন। আর চীনের মনোভাব নিয়ে যদি কারও সন্দেহ থাকে, তবে গত সপ্তাহে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দিকে তাকানো উচিত। চীন ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক ও নরম শক্তির দিক থেকে বিশাল সুবিধা পাচ্ছে। আজ হোক বা কাল, সি চিন পিং সামরিকভাবে এর ফায়দা তুলবেন।

ট্রাম্পের এই জটিল ধাঁধার সমাধান শেষ পর্যন্ত আমেরিকার জনগণকেই করতে হবে। তাঁরা তাঁকে নির্বাচিত করেছেন। তাঁরা এই বিপজ্জনক দানবকে বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হতে পারে।

* সায়মন টিসডাল, গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স