Friday, July 31, 2026

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলের নতুন কৌশল by মারিয়াম বারঘুতি

পশ্চিম তীরে কয়েক দিন ধরে চলা সহিংসতার দৃশ্যগুলো অত্যন্ত বেদনার। সেটলাররা বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ, ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে পাশবিক হামলা, বন্দুকের মুখে পরিবারগুলোর কেবল পরনের পোশাকটুকু সম্বল করে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এবং ইসরায়েলি বাহিনীর প্রাণঘাতী অভিযান—সবই সেই চেনা ছকে বাঁধা।

সহিংসতার এই সাম্প্রতিক পর্বটিকে উত্তর পশ্চিম তীরের তাল গ্রামের একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরিণতি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সেখানে হামলাকারী ইসরায়েলি সেটলার বা বসতি স্থাপনকারীদের প্রতিরোধ করেছিলেন ফিলিস্তিনি পুরুষেরা। এতে দুই বসতি স্থাপনকারী নিহত হন।

পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা’ লক্ষ্য করে পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি ফাঁড়ি ও বসতি সম্প্রসারণ এখন ইসরায়েলের নিরাপত্তার একটি কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কথা শুনলে মনে হতে পারে পশ্চিম তীরে তাঁদের সামরিক অভিযান ও বসতি স্থাপন কেবলই একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটি প্রতিক্রিয়া নয়, এটি তাঁদের বসতি স্থাপনের এক গভীর কৌশল—উপনিবেশায়নের কৌশল।

বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতির অজুহাত দেওয়া হতো সেখানে বসবাসকারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষার কথা বলে। অতীতে হয়তো এতে কিছুটা সত্যতা ছিল, কিন্তু গত পাঁচ বছরে একজন সেনাসদস্য ও একজন সাধারণ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর মধ্যকার পার্থক্য প্রায় ঘুচে গেছে। ব্যবধান কেবল এতটুকু যে একজনের গায়ে থাকে সামরিক পোশাক আর সে একটি কাঠামোর অধীনে কাজ করে; অন্যজন জিনস প্যান্ট পরে ঘোরে এবং খেয়ালখুশিমতো গুলি চালাতে পারে।

দুই দলের মধ্যে পার্থক্য সামান্যই থাকতে পারে, তবে প্রত্যেকেই একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত ধাপে ভূমিকা পালন করে।

প্রথমত, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গ্রাম ও শহরে হামলা চালিয়ে, অবকাঠামো ধ্বংস করে, ফিলিস্তিনিদের আটক, নির্যাতন এমনকি হত্যা করে তাদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে। এরপর সেখানে বাড়ে বসতি স্থাপনকারীদের অনুপ্রবেশ। আর সবশেষে সরকারের প্রশাসনিক হাত সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে দখল স্থায়ী করে।

জেনিনে ঠিক এটিই ঘটেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেখানে একের পর এক প্রাণঘাতী অভিযান চালিয়েছে, যার সর্বশেষটি ছিল ২০২৫ সালের ‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’। এর পরপরই আগমন ঘটে বসতি স্থাপনকারীদের। আজ সেই শহরের কাছেই তিনটি নতুন ইসরায়েলি বসতি গড়ে উঠছে, আর তুলকারেমে আরও কয়েকটির কাজ চলছে।

ইসরায়েল সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী কেবল যে বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দেয় তা-ই নয়, উল্টোটাও সত্যি। বছরের পর বছর ধরে যেসব ইসরায়েলি সেনা ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে যুক্ত ছিল, বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোর লবিং ও সমর্থনের কারণে তারা বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে।

ঠিক এই কারণেই পশ্চিম তীরে ইসরায়েলিদের এই তাণ্ডবকে কেবল ‘বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হলে পুরো সত্যটা আড়ালেই থেকে যায়। এই পরিভাষাটি শুনলে মনে হয় এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা, যা একটি অবৈধভাবে দখল করা জমিতে সুপরিকল্পিতভাবে চালিয়ে যাওয়া উপনিবেশায়নের মূল কৌশলকে ঢেকে দেয়।

ফিলিস্তিনিরা বছরের পর বছর ধরে বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংসতার বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। গত এক দশকের প্রতিটি বছরই বসতি সম্প্রসারণ, জমি দখল, ইসরায়েলি সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর নতুন রেকর্ড গড়েছে।

প্রতিবছর জলপাই সংগ্রহের সময় বাধা দেওয়া কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় ফাঁড়িগুলোর বিস্তারকে ফিলিস্তিনিরা তাদের ওপর ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসা আগ্রাসন হিসেবেই দেখেছে।

আজ সেই আগ্রাসনের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে। ফিলিস্তিনিরা এখন এক স্থায়ী ঔপনিবেশিক সন্ত্রাসের মধ্যে অবরুদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের এমন এক পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, যেখানে নারীরা চেকপয়েন্টে আটকে থেকে গর্ভপাতের শিকার হচ্ছেন, স্কুলে সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে, আর বসতি স্থাপনকারীরা বাসে হামলা চালানোয় শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। প্রতিদিন নিরাপদে বেঁচে থাকার জায়গাটুকু সংকুচিত হয়ে আসছে।

একদিকে জমি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের ওপর জনসমক্ষে বারবার দমন–পীড়ন চালিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো হচ্ছে। উচ্ছেদ, নির্যাতন ও লাঞ্ছনার গল্পগুলো এখন ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

হয়তো এ কারণেই গত সপ্তাহে তালের বাসিন্দা ফারুক রমাদান এক হামলাকারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাঁকে গুলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সপ্তাহান্তে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের এই নৃশংস প্রতিক্রিয়া কোনো ইসরায়েলি নিহত হওয়ার জন্য ছিল না; বরং একজন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে—এই চিন্তাটাই তাঁদের ভয়ের মূল কারণ।

যাই হোক, এই সহিংস ঘটনাটিকে এখন উপনিবেশায়ন প্রকল্পকে আরও ত্বরান্বিত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই এটিকে কেবলই ঘটনার ‘ক্রমাবনতি’ বলা ঠিক নয়। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয়; এটি তাদের ভূখণ্ড দখলেরই মূল অংশ।

বৃহস্পতিবার তালে যা ঘটেছে এবং আজ পুরো পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, গণহত্যামূলক সামরিক অভিযান, পুরো সম্প্রদায়ের জন্য অবৈধ উচ্ছেদ আদেশ, গণগ্রেপ্তার—সবই একই কৌশলগত উদ্দেশ্যে পরিচালিত: ভূখণ্ড দখল। ইসরায়েল সব সময় একটা না একটা অজুহাত খুঁজবে এবং সেই পুরোনো ‘নিরাপত্তার গল্প’ আবার সামনে আনবে, যা বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা থেকে তাদের রক্ষা করে আসছে।

পশ্চিম তীরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কোনো ব্যতিক্রমী বিষয় নয়, বরং তা মূল বাস্তবতারই প্রতিফলন। বিশ্ব যতটুকু অনুধাবন করছে, তার চেয়েও দ্রুতগতিতে চলছে ভূখণ্ড দখল ও টুকরা টুকরা করার এই প্রক্রিয়া।

এটি কোনো নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি সরাসরি জমি দখলের একটি প্রকল্প। কৌশল ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ইসরায়েল গাজা, পশ্চিম তীর, জেরুজালেম এবং এমনকি সিরিয়া ও লেবাননেও একই ছকে মানচিত্র বদলে দিচ্ছে।

একসময় পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সীমানা বিস্তারকে বিশ্বের জন্য একটি সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হতো। আজ তা ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে এক চরম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। অথচ বিশ্ব আজও এটিকে ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তা’ ইস্যু হিসেবেই দেখে যাচ্ছে।

* মারিয়াম বারঘুতি, রামাল্লাহভিত্তিক একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক। আল–জাজিরা থেকে অনূদিত।

পশ্চিম তীরে একটি অবৈধ বসতিতে কয়েকজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী
পশ্চিম তীরে একটি অবৈধ বসতিতে কয়েকজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী। ছবি: এএফপি

ইরান সংকটে আটকে গেছেন ট্রাম্প, যুদ্ধ থেকে বের হতে ট্রাম্পের সামনে নতুন পথ কী

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত থেকে উত্তরণে নতুন করে চিন্তাভাবনা করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বুধবার নতুন করে ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আরও একবার ‘ভয়াবহ হামলা’র হুমকি দিয়েছেন। তবে হামলার মাধ্যমে তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার কোনো জোরালো লক্ষণ তিনি এখনো দেখাতে পারেননি।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তি ফিরিয়ে আনার যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ট্রাম্প সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, অস্পষ্ট ভাষায় লেখা সেই সমঝোতা স্মারক এখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

বর্তমান সমীকরণ পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সামনে যেসব বিকল্প রয়েছে, হোক তা স্থলযুদ্ধে শত শত মার্কিন সেনার জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কিংবা হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া—দুটোই তাঁর জন্য তিক্ত অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে। ‘উপযুক্ত কোনো পথ খোলা নেই’ কথাটি এখন গতানুগতিক বুলিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিস’-এর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টিন বলেন, ‘আমরা সত্যিই এক গভীর উভয় সংটের মধ্যে পড়েছি।’

ইরান যুদ্ধের প্রভাব কেবল এতে সরাসরি জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এর ফলে স্থবির হয়ে পড়া কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আবার সচল করতে বাইরের পক্ষগুলো ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে।

হরমুজ প্রণালি যদি অধিকাংশ বেসামরিক জাহাজের চলাচলের অনুপযোগী বা ‘নো-গো জোন’ হয়ে থাকে, তাহলে যুদ্ধের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হবে। এর ফলে একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত ফুরিয়ে আসবে, তেমনি ডিজেল ও সারের মতো জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের দামও আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে।

সেই সঙ্গে আসন্ন শীত মৌসুমে ইউরোপে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) তীব্র সংকটের আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে। বিলাসবহুল পর্যটন ও প্রবাসীদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল, এই যুদ্ধ তা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউরোপের নড়বড়ে সরকারগুলো এখন জনরোষ ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এ যুদ্ধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের গতিপথ নির্ধারণ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বুধবার প্রকাশিত সিএনএন/এসএসআরএসের এক নতুন জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরান পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের গৃহীত নীতিগুলোর প্রতি জনসমর্থন ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।

জনমত জরিপের এ পরিসংখ্যান আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি ২০২৪ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প যে ভোটারদের পক্ষে টেনেছিলেন, তাকেও অসার বা প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

চিরায়ত ধারা অনুযায়ী, কূটনৈতিক কৌশলের মূল সার্থকতা নিহিত থাকে নতুন সুযোগ তৈরি করা, বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া এবং ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চিহ্নিত করা ও প্রতিপক্ষকে সংঘাত থেকে পিছু হটতে রাজি করানোর মধ্যে। অন্য অনেক সংকটের মতো এখানেও লড়াই থামিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে যে ধরনের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রয়োজন, তা এখন কেবল কল্পনার মধ্যে আছে।

এ ক্ষেত্রে এমন একটি সমঝোতার পথ খোঁজা যেতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তত সরাসরি স্বীকার করতে হবে না যে হরমুজের ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ফলে তাদের বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় হয়েছে।

অন্যদিকে, ইরান প্রচার করার সুযোগ পাবে, তাদের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনী যুদ্ধে ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হলেও তারা তাদের প্রধান অর্জনগুলো রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে সে লক্ষ্য অর্জনে একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথ তৈরি করা হবে বেশ কঠিন। এ ছাড়া উত্তেজনা প্রশমনপ্রক্রিয়ার জন্য এ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা লাগবে। বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভবত বিভিন্ন বহিঃশক্তির সম্পৃক্ততারও প্রয়োজন হবে। চরম কূটনৈতিক বন্ধ্যত্বের এ মুহূর্তেও আশার দুটি ক্ষীণ আলো লক্ষ করা যাচ্ছে।

এর মধ্যে একটি হলো, আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের এক নতুন ধারণা। এর লক্ষ্য হলো, ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো যৌথভাবে এই বাণিজ্যিক রুট পরিচালনা করবে এবং এর বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করবে যাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়।

পরিহাসের বিষয় হলো, সংকটের এ সমাধান হয়তো বাতিল হয়ে যাওয়া সেই সমঝোতা স্মারকের মধ্যেই সোজাসুজি বিদ্যমান ছিল। ওই দলিলে ইরান ও ওমানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, তারা যেন পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ‘হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও নৌ-পরিষেবা’র রূপরেখা নির্ধারণ করে।

কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর অন্য সম্ভাব্য উপায়টি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকেও উন্মোচিত হতে পারে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে কূটনীতির পরিধি আরও বিস্তৃত করার এই মূল ভাবনা আবারও সামনে আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো, বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ফলে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মতো তৃতীয় পক্ষগুলোর অনেক কিছুই হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্রকাশ্যে আসা একমাত্র কূটনৈতিক তৎপরতাটি ছিল ইরান ও ওমানের মধ্যে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা। ওমানও এই প্রণালির উপকূলে অবস্থিত একটি দেশ। এ আলোচনায় মূলত প্রণালিটি আবার উন্মুক্ত করা হলে সেখানে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সিএনএন এ সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ট্রানজিট ফি বা পারাপার শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তেহরানের অবস্থানের বিরোধিতা করেছে ওমান। আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিগুলোয় অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াতের যে বিধান আন্তর্জাতিক আইনে রয়েছে, মূলত সে যুক্তি দেখিয়েই ওমান এ বিরোধিতা করে।

তবে এ অচলাবস্থা কাটাতে ওমান সরকার একটি সমঝোতামূলক প্রস্তাব তুলে ধরছে, যেখানে সরাসরি শুল্কের পরিবর্তে ‘সামুদ্রিক পরিষেবা’ (ম্যারিটাইম সার্ভিসেস) বাবদ ‘ফি’ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি বর্তমান জটিলতা নিরসনে একটি কৌশলগত বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।

লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘বোরসে অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন’ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই ‘হরমুজ ফি’র ধারণাটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য জলপথ ব্যবহারের ওপর কোনো সাধারণ টোল বা মাশুল আরোপ করা নয়, বরং পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে এ জলপথের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখা। এ মডেল অনেকটা ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযোগকারী ‘মালাক্কা প্রণালি’র ব্যবস্থার মতো হতে পারে, যেখানে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।

নিবন্ধটিতে নেদারল্যান্ডের রটারডাম বন্দরে প্রচলিত ফির উদাহরণ টেনে আয়ের একটি সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিশালাকার ট্যাংকারগুলোকে প্রতি গ্রস মেট্রিক টন পণ্যের জন্য প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৮ ডলার ‘সাসটেইনেবিলিটি ফি’ দিতে হয়। লেখকদের হিসাব অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরেও একই ধরনের ফি আরোপ করা হলে প্রস্তাবিত নতুন প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ (২৬ মিলিয়ন) ডলার আয় করতে পারবে।

ধারণাটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে, এমনকি ইরান যদি এর চেয়ে অনেক বেশি লভ্যাংশও দাবি করে। কারণ, প্রতি ব্যারেল তেলের দামের সঙ্গে অতিরিক্ত কয়েক ডলার যুক্ত হওয়াও তেলের বাজারের বর্তমান চরম অস্থিতিশীলতার চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। এ অস্থিতিশীলতার কারণে কেবল গত বুধবারেই তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

নিবন্ধের অন্যতম লেখক এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিদজ মনে করেন, এ ধরনের প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাবনার বিষয়ে তেহরান বাইরের অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি নমনীয় হতে পারে। তিনি বলেন, ইরান তার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, তাতে হরমুজ প্রণালিতে কেবল ফি আরোপের চেয়ে তাদের সামনে আরও অনেক বড় লক্ষ্য রয়েছে।

এসফান্দিয়ার বলেন, উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক পথ উন্মোচিত হলে তার ফলে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতে পারে কিংবা ইরানি তেল রপ্তানি আবার অবাধ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এসফান্দিয়ার আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ সমঝোতা তেহরানকে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দেবে। এর মাধ্যমে তারা এ বার্তাই দিতে পারবে যে হরমুজ প্রণালি আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাবে না। মূলত এর মধ্য দিয়ে ইরান এটাই প্রমাণ করতে চাইবে, তারা পরাজিত হয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেও তারা নিজস্ব কর্তৃত্ব ও শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে।

আরও বিস্তৃত পরিসরে বলতে গেলে, প্রণালিটি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বহুজাতিক একটি পরিকল্পনা উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠা এক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। প্রশ্নটি হলো, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা ইরানের চ্যালেঞ্জ ওই অঞ্চলের দেশগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে এবং যেকোনো সম্ভাব্য শান্তিকে কীভাবে সুসংহত করবে?

তবে ট্রাম্প আবার ইরান আক্রমণের পথ বেছে নেওয়ায় ফলপ্রসূ কোনো কূটনৈতিক আলোচনার পথ আপাতত রুদ্ধই থাকছে। হরমুজ প্রণালি স্থিতিশীল করার কোনো চুক্তি হলেও তা কেবল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট নতুন সংকটগুলোরই সমাধান দেবে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কোনো সুরাহা তাতে মিলবে না।

তবে লাইল গোল্ডস্টিন মনে করেন, ট্রাম্পের সামনে এখন বিকল্পের এতটাই সংকট যে শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি সমঝোতায় পৌঁছানোই হয়তো শেষ পর্যন্ত অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে।

গোল্ডস্টিন বলেন, ‘এটি সম্ভাব্য সব সমঝোতার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক হতে যাচ্ছে। ঠিক এ কারণেই রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শক্তি হিসেবে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘকাল ধরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে আমাদের অন্যতম মৌলিক আদর্শ হিসেবে দাবি করে এসেছি।’

অধিকাংশ আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক চাপ জোরালো করতে এত দিন মিত্র দেশগুলোর দ্বারস্থ হতেন। উদাহরণস্বরূপ, ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তির ক্ষেত্রে কূটনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি ছিল ইউরোপ। ইরানের সঙ্গে তাদের এমন কিছু কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ছিন্ন করে দিয়েছিল।

তবে আটলান্টিক পাড়ের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে ঐতিহাসিক মৈত্রী (ট্রান্স-আটলান্টিক অ্যালায়েন্স), তার ব্যাপক ক্ষতি করেছেন ট্রাম্প। একের পর এক বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ এবং কটু মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে প্রায় শত্রুর মতো আচরণ করেছেন।

এমনকি মিত্র দেশগুলো যে যুদ্ধকে ‘অবৈধ ও অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে মনে করে, তা শুরুর আগে ট্রাম্প তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আবার একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক অভিযানে যোগ না দেওয়ায় তিনি সেই মিত্রদেরই তীব্র তিরস্কার করতে ছাড়েননি।

এর ফলে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা ইউরোপীয় নেতাদের এখন ট্রাম্পকে সাহায্য করার খুব একটা তাগিদ বা অনুপ্রেরণা নেই। পাশাপাশি ন্যাটো মিত্রদেরও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণে সক্ষম নিজেদের শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তাব ইউরোপীয় দেশগুলো দিয়েছে ঠিকই। তবে তারা তা দিয়েছে সব শত্রুতা ও যুদ্ধংদেহী তৎপরতা বন্ধ করার শর্তে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপের যেকোনো উদ্যোগ ওমানের মতোই একই প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। আর তা হলো, একটি পরাশক্তির অস্থির ও বিভ্রান্তিকর কূটনৈতিক কৌশল, যা মূলত ট্রাম্পের মেজাজ-মর্জির ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

ব্রাসেলস-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো ইয়ান লেসার বলেন, ‘একটি সুনির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত কৌশল বাস্তবায়নে ইউরোপের সহযোগিতা চাওয়া এক বিষয়। কিন্তু বর্তমানে তেমন কোনো ঐকমত্যের কৌশলই নেই। প্রকৃতপক্ষে এ মুহূর্তে আমেরিকার কৌশল ঠিক কী, তা মোটেই স্পষ্ট নয়।’

মার্কিন উদ্দেশ্য নিয়ে একই ধরনের অবিশ্বাসও কূটনীতিতে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। এসফান্দিয়ার বলেন, ‘তেহরানের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আমার আলাপচারিতায় এমন ইঙ্গিত মিলেছে যে ওমান যে প্রস্তাব সামনে এনেছে, তারা তা নাকচ করে দিচ্ছে না।’

তবে এসফান্দিয়ার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছে, সেখানে এই মুহূর্তে প্রণালির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি ইরানকে ভাবিয়ে তুলছে। তাঁর মতে, ‘ইরান সম্ভবত কোনো এক সময় এ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দেবে। সেটি তাদের নিজেদের স্বার্থেই জরুরি। তারা সম্ভবত কোনো আঞ্চলিক কাঠামোর অধীনে এটি করবে। তবে মার্কিনরা তাদের ‘উচিত শিক্ষা’ পেয়েছে, এমনটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা সে পথে হাঁটবে না।’

ট্রাম্পের এ যুদ্ধ থামাতে না পারায় ওমানের মতো অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিকেও চরম মাশুল দিতে হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি দ্রুত এই পরস্পরকে উসকে দেওয়া ধ্বংসাত্মক আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তাহলে অন্যদের হস্তক্ষেপ করা বা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।

মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুসে এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৭ জুলাই ২০২৬
মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুসে এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৭ জুলাই ২০২৬ ছবি: এএফপি

হামাসের বার্তা- ইসরাইল গাজা না ছাড়লে কোনো অস্ত্র ত্যাগ নয়

গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত হামাস কোনো ধরনের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ নেতা গাজি হামাদ। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে গাজি হামাদ বলেন, হামাসের অস্ত্র হস্তান্তর বা নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় ইসরাইলের কোনো ভূমিকা থাকবে না। এ প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটি।

তার দাবি, গত বছরের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি হামাস মোটামুটি মেনে চললেও ইসরাইল তা লঙ্ঘন করে গাজায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

হামাসের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গাজা পরিচালনার জন্য বোর্ড অব পিস গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটিই হামাসের অস্ত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হবে।

রয়টার্সকে দেয়া পৃথক বক্তব্যে হামাস পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ও পণ্য প্রবেশ নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল অস্ত্র হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

গাজি হামাদ বলেন, আমরা মধ্যস্থতাকারীদের স্পষ্ট করে জানিয়েছি, ইসরাইলকে অবশ্যই চুক্তির সব শর্ত মেনে চলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গাজা পরিচালনার জন্য গঠিত টেকনোক্র্যাটিক কমিটি এবং একটি আন্তর্জাতিক বাহিনীকে গাজায় ইসরাইল সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়াও তদারক করতে হবে।

শুক্রবার বোর্ড অব পিস এক বিবৃতিতে জানায়, গাজায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের বিস্তারিত কাঠামোয় হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি দিয়েছে।

এনিয়ে এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, এই সমঝোতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের গাজায় নতুন শাসনব্যবস্থা, নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দীর্ঘ আলোচনার ফল। এতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৮০৩-এর কথাও উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিতে এটিকে “ঐতিহাসিক অগ্রগতি” হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়, হামাস নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়ায় যাবে এবং এরপর গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে।

এদিকে এ বিষয়ে ইসরাইলি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা একাধিকবার বলেছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজা ছেড়ে যাবে না।

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে নেতানিয়াহু এক ঘোষণায় জানান, গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় ইসরাইল।

তিনি সে সময় বলেন, বর্তমানে আমরা গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছি। আমার নির্দেশ হলো এই নিয়ন্ত্রণ ৭০ শতাংশে উন্নীত করা।

ইসরাইল গাজা না ছাড়লে কোনো অস্ত্র ত্যাগ নয়

ইরানকে ‘পঙ্গু’ করতে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর নতুন চাল - আসছে স্থল অবরোধ

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে দেশটির বিরুদ্ধে এবার স্থল অবরোধ আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। বৃটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

গত কয়েক মাস ধরে বিমান হামলা ও দীর্ঘ সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও তেহরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদারের নতুন কৌশল বিবেচনা করছেন।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই নেতা ‘সামরিক (কাইনেটিক) ও অসামরিক (নন-কাইনেটিক) উপায়ে’ ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে তারা সীমান্ত ক্রসিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ইরানের আমদানি-রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হতে পারে।

ইসরাইলের সিনিয়র এক কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ভাবুন তো, যদি স্থলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া যায়। ইরান যদি কিছুই আমদানি করতে না পারে এবং কিছুই রপ্তানি করতে না পারে, তাহলে কী হবে?

এনিয়ে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল শন ম্যাকফারল্যান্ড বলেন, বাস্তবে এমন অবরোধ কার্যকর করা ‘প্রায় অসম্ভব’ হলেও, যদি ইরানের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বন্ধ করা যায়, তবে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হবে।
তার ভাষায়, অর্থনৈতিক চাপই সবচেয়ে কার্যকর পথ, তবে এর সঙ্গে সামরিক উপাদানও থাকতে হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের স্থলসীমান্ত বহু দেশের সঙ্গে যুক্ত এবং বিশেষ করে ইরাক তেহরানের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

সাত প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন

সম্ভাব্য এই পরিকল্পনায় ইঞ্চেহ বরুন ও সারাখস সীমান্ত ক্রসিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, যা ইরানকে তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইরানের সঙ্গে ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের স্থলসীমান্ত রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে এসব দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। তবে প্রতিবেশী কোনো দেশ এ পরিকল্পনায় সহযোগিতা করলে তাদের নিজেদের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি ইরানের পাল্টা সামরিক হামলার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থল ও সমুদ্রপথে অবরোধের মাধ্যমে ইরানের নতুন অস্ত্র সংগ্রহের সক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে চীনের সঙ্গে নতুন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় বেইজিং থেকে শত শত রকেট লঞ্চার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান।

প্রায় ৭ কোটি ডলারের ওই চুক্তিতে কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ম্যানপ্যাডস) ও ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চীন থেকে আসা জাহাজগুলো সাধারণত দক্ষিণ ইরানের বান্দার আব্বাস ও চাবাহার বন্দরে নোঙর করে।
দ্য টেলিগ্রাফের এক সূত্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বর্তমান কৌশল থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নতুন বিকল্প খুঁজছেন। সূত্রটি জানায়, ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে উত্তেজনা আরও বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করছেন তিনি। এই পরিকল্পনা ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’নীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার লক্ষ্য তেহরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়া।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থল অবরোধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেয়ে এটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশল (রেড হেরিং) হিসেবেও সামনে আনা হয়ে থাকতে পারে, যাতে ইরান প্রকৃত পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়।

গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নেতৃত্বের ভেতরে মতভেদ রয়েছে। এক পক্ষ অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্য পক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে।

একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেন, ইরানে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। অনেক পেট্রোলপাম্পে ডিজেল শেষ হয়ে গেছে, দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বৈঠক ছিল ইতিবাচক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ।
ইসরাইলি এক কর্মকর্তার দাবি, বৈঠকে ইরানকে ঘিরে তিনটি সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়- কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো, নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখা, অথবা আবার সামরিক হামলা শুরু করা।

তবে নেতানিয়াহু কোনো একটি বিকল্পের পক্ষে জোর দেননি। তিনি বলেন, আমরা শুধু নিজেদের জীবন নয়, আপনাদের জীবনও রক্ষা করছি। আমরা বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার লড়াই করছি।

ইরানকে ‘পঙ্গু’ করতে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর নতুন চাল

মাওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ by আনু মুহাম্মদ

‘মাওলানা ভাসানী’ বলে যাঁকে আমরা চিনি, সেই ব্যক্তির প্রকৃত নাম তা নয়। তাঁর আসল নামে এ দুই শব্দের কোনোটিই ছিল না। ‘মাওলানা’ ও ‘ভাসানী’—দুটি শব্দই পরবর্তী সময়ে তাঁর অর্জিত পদবি বা বিশেষণ। ‘মাওলানা’ তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও চর্চার পরিচয়, আর ‘ভাসানী’ সংগ্রাম ও বিদ্রোহের স্মারক। তাঁর জীবন ও তৎপরতা এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল, যাতে পদবি ও বিশেষণের আড়ালে তাঁর আসল নামই হারিয়ে গেছে। আসলে তাঁর নাম ছিল আবদুল হামিদ খান। ডাকনাম ছিল চ্যাগা, শৈশবে এই নামই ছিল তাঁর পরিচয়।

প্রাচুর্য, বিত্তবৈভব, বংশের প্রভাব, যেগুলো রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠায় সাধারণত কাজে লাগে, সেগুলোর কোনোটিই তাঁর ছিল না। জীবনে তিনি যাত্রাদল থেকে শুরু করে দেওবন্দ মাদ্রাসা—সব অভিজ্ঞতাই ধারণ করেছিলেন। এসবের মধ্যে তাঁর সাধারণ যে প্রবণতা তাঁকে পরবর্তীকালে বিশিষ্ট করে তুলেছিল, তা হলো তাঁর গণসম্পৃক্ততা।

এই গণসম্পৃক্ততা তাঁকে নিজের ও চারপাশের সমষ্টির জীবনকে এক করে দেখার ক্ষমতা দান করেছিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদকে দেখেছিলেন ওপর থেকে নয়, চারপাশের পিষ্ট মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।

দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, মানবেতর জীবন যে নিয়তি নয়; নির্দিষ্ট কিছু কারণ, ব্যবস্থা ও ক্ষমতা এগুলোকে সৃজন করে, টিকিয়ে রাখে—এ উপলব্ধি তাঁকে আর সব মাওলানা-পীর থেকে ভিন্ন করে ফেলে। এই কপট জগতে তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ আর জনতার মধ্যে তিনি পরিণত হন মজলুম জননেতায়। তিনি শুধু মুসলমান নন, হয়ে উঠেছিলেন কথিত তৃতীয় বিশ্বের সব ধর্ম, জাতি ও লিঙ্গের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।

মাওলানা, পীর-মাশায়েখরা আমাদের সমাজে খুবই ক্ষমতাধর। শাসক ও শোষকেরা তাঁদের সব সময়ই পৃষ্ঠপোষকতা দেন নিজেদের ভিত্তি শক্ত রাখার জন্য। অন্যদিকে বহু মানুষ নিজেদের অসহনীয় জীবনকে সহনীয় করার জন্য এই ধর্মীয় নেতা বা পেশাজীবীদের কাছেই হাজির হন। দোয়া, ভরসা, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ দিয়ে অসহায় মানুষ শরীরের অসুখ সারাতে চান, সন্তানের নিরাপত্তা চান, বিপদে-আপদে আল্লাহর আশ্রয় চান, বিভিন্ন কায়দার জালেমের হাত থেকে বাঁচার জন্য কোনো অলৌকিক সহায়তার প্রার্থনা করেন। যেখানে চিকিৎসার পয়সা নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই; যেখানে মানুষের নিজেদের যে প্রবল শক্তি আছে, সেই বোধ স্পষ্ট নয়; যেখানে নদীভাঙন, জুলুমবাজ, ক্ষমতাধরদের অত্যাচার-শোষণে বর্তমান রক্তাক্ত, ভবিষ্যৎ ভীতিকর সেখানে এই পথ ছাড়া মানুষ আর কোনো উপায় দেখে না।

অধিকাংশ ধর্মীয় নেতা পয়সা নেন, এসব বিষয়ে দাওয়াই দেন এবং মানুষকে ধৈর্য ধরতে বলেন, সবুর করতে বলেন, কপাল আর বরাত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেন। কিন্তু নিজেরা নানাভাবে আটকে থাকেন তাঁদের সঙ্গেই, যাঁরা সংখ্যালঘু, কিন্তু জালেম ক্ষমতাধর। জালেমদের ওপর ধর্মীয় নেতাদের নির্ভরতা, আবার ধর্মীয় সার্টিফিকেটের ব্যাপারে তাঁদের ওপর জালেমদের নির্ভরতা এক দুষ্টচক্র তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা রক্ষা করেন পরস্পরকে।

এভাবেই নিপীড়িত মানুষের সামনে তৈরি হয় এক অচলায়তন। নানা ঝড়ঝাপটা আর আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত মানুষদের কাছে তাঁদের একমাত্র বক্তব্য থাকে ধর্মীয় আচার পালনে, পরকালের অসীম সুখ পাওয়ার জন্য ইহকালের বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করতে। এ ধরনের ধর্মীয় নেতাদের বয়ানে তাই ক্ষমতার তোয়াজ, নারীবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বিষ থাকে।

মাওলানা ভাসানীও পীর ছিলেন। লাখ লাখ মানুষ তাঁর মুরিদ ছিলেন। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গভেদ না থাকায় তাঁর কাছে কারও আসতে বাধা ছিল না। বিভিন্ন ধর্মের নারী-পুরুষ এবং বলাই বাহুল্য গরিব মানুষ, যাঁরা জমিদার, মহাজন আর মালিকশ্রেণির শোষণ-পীড়নে বিপর্যস্ত ও ক্লিষ্ট, তাঁর কাছে হাজির হতেন। অন্যান্য ধর্মজীবীর মতো এসব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা মাওলানা ভাসানীর আয়-উপার্জনের উৎস ছিল না। তিনি দোয়া, পানিপড়া, ঝাড়ফুঁক—সবই দিতেন, কিন্তু অসুখ বেশি হলে পরামর্শ দিতেন ডাক্তার দেখাতে, প্রয়োজনে ওষুধ কেনার জন্য টাকাও দিতেন।

আরও যে জায়গায় এসে মাওলানা ভাসানী অন্যদের চেয়ে শুধু আলাদা নয়, প্রায় বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন নিজেকে, সেটিই এক মাওলানাকে যুক্ত করেছিল এক ভাসানীর সঙ্গে। মানুষ তাঁর কাছে ভরসা চাইতেন আর বলতেন তাঁদের অবর্ণনীয় অন্যায় ও অবিচার ভরা জীবনের কথা।

এ ক্ষেত্রে ভাসানীর অবস্থান ছিল এ-ই যে এই নারকীয় অবস্থা নিয়তি নয়, এটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিধান নয় আর সর্বোপরি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে এ অবস্থা পরিবর্তন করা যায়। এই ভিন্ন অবস্থানের কারণেই তিনি জীবনের তরুণকাল থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছিলেন। ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত’, এটি তাঁর জীবনের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মাওলানা ভাসানীর জীবন, উচ্চারণ ও সংগ্রাম, ইসলাম ধর্মের মালিকানায় অধিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র, সামরিক শাসক, জোতদার, মহাজন, সামন্ত প্রভু এবং তাঁদের প্রিয় ধর্মীয় নেতাদের ক্ষিপ্ত করেছিল। তাঁকে অভিহিত করা হতো ‘ভারতের দালাল’, ‘লুঙ্গিসর্বস্ব মাওলানা’ এমনকি ‘মুরতাদ’ হিসেবে! শাসক-শোষকদের এই ক্ষিপ্ততা আসলে ছিল একটা শ্রেণিগত রোষ। পোশাক, জীবনযাপন, বয়ান, আওয়াজ—সব দিক থেকেই ভাসানী ছিলেন নিম্নবর্গের মানুষ। লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অভিজাত ইসলামের বিপরীতে তাঁর কাছে ইসলামের নিপীড়িত মানুষের ভাষা তৈরি হয়। ধর্ম যেখানে শাসক-জালেমদের একচেটিয়া মালিকানাধীন নিরাপদ অবলম্বন, সেখানে মাওলানা ভাসানী সেই নিরাপদ দুর্গকেই প্রশ্ন করেন।

অন্যায়-অবিচার তো বিমূর্ত নয়, দুঃখ-দুর্দশাও অজানা গ্রহ থেকে নেমে আসা ব্যাপার নয়। দায়িত্ব আর সংবেদনশীলতা দিয়ে মানুষের এসব অভিজ্ঞতা দেখলে উন্মোচিত হয় এক বিরাট রহস্য। আবিষ্কার করা যায় মানুষের মানবেতর জীবনের কারণ, শনাক্ত করা যায় এর পেছনের সামাজিক ব্যবস্থা, নিয়ম ও বিধি। পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করা যায় সেসব শ্রেণি-গোষ্ঠীকে, যারা এসব ব্যবস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে, এসব ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করে; ধর্মও যা থেকে বাদ যায় না।

এর থেকে সার্বিক মুক্তি লাভের লড়াই তাই অনির্দিষ্ট হতে পারে না, লক্ষ্যহীন হতে পারে না। এর জন্য দরকার এমন একটা সমাজ, এর চিন্তা করা, স্বপ্ন দেখা ও দেখানো, যার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানুষ এই নারকীয় অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করবে। তাই সৌদি আরবের রাজতন্ত্র নয়, ভাসানী লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন শোষণ-নিপীড়ন-বৈষম্য থেকে মুক্ত সমাজব্যবস্থা। যে সমাজ মানুষকে হাসি দিতে পারে, মানবিক জীবন দিতে পারে, কর্তৃত্ব দিতে পারে, সে রকম সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই-ই তিনি কর্তব্য হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থিত করেছিলেন।

সুতরাং অন্যায়-অবিচার আর দুঃখ-দুর্দশা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য দোয়া-দরুদ নয়, দরকার সমষ্টিগত লড়াইয়ের রাস্তা তৈরি—এ উপলব্ধি মাওলানাকে একই সঙ্গে সক্ষম করেছিল সংগ্রামের প্রতীক ভাসানী হয়ে উঠতে। যে ভাসানী সব রকম জালেমদের প্রবল দাপট আর আগ্রাসনের সামনে লাখো মানুষের স্বর নিজের কণ্ঠে ধারণ করে পাল্টা ক্ষমতার প্রবল শক্তিতে রুখে দাঁড়াতেন, এক কণ্ঠে জনতার ভেতর থেকে উঠে আসা অসীম শক্তিকে মূর্ত রূপ দিতেন। ক্লান্ত, বিবর্ণ, ক্লিষ্ট মানুষ শুধু নয়, প্রকৃতিকেও প্রাণবন্ত, তরতাজা করে তুলত জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের হুঁশিয়ারি—‘খামোশ’!

এই উচ্চারণ নিয়ে মাওলানা ভাসানী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তরকালে, স্বপ্নভঙ্গের কালে মানুষের হতাশা ও প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, ভারতের শাসকশ্রেণির পরাক্রমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ফারাক্কার অভিশাপের বিরুদ্ধে সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বামপন্থী নেতাদের ভ্রান্তি ও হঠকারিতায় ভাসানীর ক্ষমতা নানা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিনিও হতাশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তাঁর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই তাই আমাদের লড়াইয়ের শিক্ষা।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে, গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার বিপরীত যাত্রায়, বাংলাদেশের মানুষ যখন সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণির নানামুখী আগ্রাসনে বিপর্যস্ত, বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠীর দখল, লুণ্ঠন, জোরজবরদস্তিতে দিশাহারা, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্প্রসারণে বিভ্রান্ত, তখন নিপীড়িত মানুষের ধর্মের মুক্তির ভাষা নিয়ে মাওলানা ভাসানী দেশি-বিদেশি দানবের বিরুদ্ধে বিশ্বমানবের প্রবল আওয়াজ হয়ে বারবার হাজির হন—‘খামোশ’!

আনু মুহাম্মদ, শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2Fhcidyqo2%2FMotamot.jpg?rect=0%2C0%2C718%2C479&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আর্ট: মাসুক হেলাল

অস্ত্র ছাড়বে হামাস, গাজা ছাড়বে ইসরাইল

গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস। চুক্তি অনুযায়ী, গাজাবাসীকে রক্ষা করতে অস্ত্র ছাড়তে রাজি হয়েছে হামাস। অন্যদিকে, গাজা উপত্যকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করে নেবে ইসরাইলি বাহিনী।

ফিলিস্তিনি সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আজ শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গত অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। তবে এই চুক্তির অগ্রগতিতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বড় জটিলতা তৈরি করে রেখেছিল। এছাড়া যুদ্ধবিরতি চলাকালেও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই সহিংসতা চলছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

হামাসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘অস্ত্রের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো গেছে। পাশাপাশি গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলি সেনাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের বিষয়েও দুই পক্ষ একমত হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত বোর্ড অব পিস বা শান্তি পর্ষদের চুক্তির শর্তগুলো ইসরাইল ঠিকভাবে মেনে চলছে কি-না, তা নজরদারি ও নিশ্চিত করবে বলে হামাস আশা করছে।

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে থাকবে জাতীয় কমিটি

হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজী হামাদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, গাজার মানুষকে হত্যা ও বাস্তুচ্যুতি থেকে রক্ষা করতেই এই নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, হামাসের অস্ত্র সংক্রান্ত বিষয়টি মূলত তিনটি বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, জাতীয় কমিটি মোতায়েন এবং গাজার পুনর্গঠন কাজ।

এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরো স্পষ্ট করেন, ‘নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে ইসরাইল কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে না। এই দায়িত্ব পালন করবে কেবল জাতীয় কমিটি।’

তিনি জানান, ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) বা গাজা প্রশাসনবিষয়ক জাতীয় কমিটি পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী অস্ত্রের তালিকা তৈরি ও তা সংরক্ষণের বিষয়টি তদারকি করবে। গাজায় অস্ত্র রাখা, জমা নেওয়া ও নিয়ন্ত্রণের একক কর্তৃত্ব থাকবে কেবল এই কমিটির হাতে। তবে শান্তি পর্ষদের গঠিত এই জাতীয় কমিটি এখনো গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করেনি।

ট্রাম্পের দাবি ও চুক্তির শর্ত

এর আগে আল-জাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ গাজায় হামাসসহ সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এই সমঝোতা গাজার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে নতুন ফিলিস্তিনি সরকার গঠিত হবে, যা ফিলিস্তিনিদের কল্যাণে শান্তি পর্ষদের সঙ্গে মিলে কাজ করবে। একই সঙ্গে ইসরাইলও তার কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।’

ট্রাম্প জানান, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াটি গত অক্টোবরে তার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিরই অংশ।

তার দাবি, ওই চুক্তির মাধ্যমেই গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের অবসান ঘটেছে।

উল্লেখ্য, এ যুদ্ধে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গাজার বিস্তীর্ণ অঞ্চল সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

তবে চুক্তির বাস্তবায়নে সতর্ক বার্তা দিয়েছে হামাস। গাজী হামাদ আল-জাজিরাকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, গাজা শান্তি চুক্তির আওতায় ইসরাইল যদি নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তবে হামাসও চুক্তির কোনো ধাপ বা শর্ত কার্যকর করবে না।

অস্ত্র ছাড়বে হামাস, গাজা ছাড়বে ইসরাইল
ফিলিস্তিনের গাজায় হামাসের যোদ্ধারা। ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে বাজি ধরছে যুক্তরাষ্ট্র by এরিক অল্টার

২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধসংক্রান্ত প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বলে এসেছে, যে দেশগুলো রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি, তাদের নাগরিকদের ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ার নেই। এই তালিকায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র দুটিই রয়েছে।

কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাইডেন নিজের অবস্থান বদলে ফেলেন। তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। বাইডেন এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় তার মিত্র ইসরায়েলের পাশে থাকবে। এখানে বলা দরকার, ইসরায়েলও রোম সংবিধির স্বাক্ষরকারী দেশ নয়।

পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং তাঁদের সম্পদ জব্দ করেন। ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আদালতটিকে ‘আইনের অপব্যবহারের হাতিয়ার’ বলে আখ্যা দেন। একই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আদালতের ১১ জন বিচারক ও প্রসিকিউটরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আদালতটিকে দুর্বল করার একটি প্রচারণা শুরু করে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এমন আচরণ করছে যে শত্রুর বিরুদ্ধে হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ঠিক মনে করে, কিন্তু মিত্রদের ক্ষেত্রে তা মানতে চায় না। অথচ রোম সংবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘পরিপূরকতা’। সহজভাবে বললে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তখনই এগিয়ে আসেন, যখন কোনো দেশ নিজ থেকে সঠিকভাবে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করে না।

ইসরায়েল বলছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নয়, তাই আদালতের এখতিয়ার নেই। কিন্তু এই যুক্তি আসল সমস্যাকে আড়াল করে। সহজ ও সঠিক পথ হলো—যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ ও সত্যিকারের তদন্ত করা।

কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সে পথে না গিয়ে আদালতের কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তবে এভাবে অবজ্ঞা দেখিয়ে খুব বেশি লাভ হয় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের উদ্দেশ্য কাউকে সরাসরি গ্রেপ্তার করা নয়, কারণ তাদের নিজস্ব পুলিশ নেই। বরং তাদের ক্ষমতা হলো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলাফেরা কঠিন করে তোলা।

উদাহরণ হিসেবে, ভ্লাদিমির পুতিন রোম সংবিধি অনুমোদন করা ১২৫টি দেশে গেলে গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়বেন। এ কারণেই তিনি ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে সরাসরি না গিয়ে ভিডিওতে অংশ নেন। একইভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তাঁকে ভাবতে বাধ্য করে, বিদেশ সফরে গেলে অন্য দেশ কী ব্যবস্থা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এই উদ্বেগ কমাতে পারেনি।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিতে পারে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা—এক. এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে ভেতর থেকে প্রভাব বিস্তার করা; দুই. এই আদালতগুলো বর্জন করে নিজের প্রভাব ছেড়ে দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রগতি থামে না, বরং অন্য দেশগুলো নিয়ম লেখার সুযোগ পায়।

একদিকে আন্তর্জাতিক আইনকে অস্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ব ধীরে ধীরে বিভিন্ন শক্তির বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কে নিয়ম তৈরি করবে, সেই প্রশ্ন এখন উন্মুক্ত।

এরিক অল্টার, আবুধাবির আনোয়ার গারগাশ কূটনৈতিক একাডেমির ডিন এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সদস্য
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধ

ইরানে নতুন করে বড় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাঁচ দিন বিরতির পর বুধবার রাতে এ হামলায় ইরানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। জবাবে কুয়েত ও জর্ডানকে নিশানা বানিয়েছে ইরান। একই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন, সিরিয়া ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশজুড়ে এখন ছড়িয়ে পড়েছে সংঘাত। পরিস্থিতি আরও জটিল করছে পাল্টাপাল্টি হুমকি।

শুধু ওপরের দেশগুলোই নয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বুধবার দিনের বেলা প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার শিকার হচ্ছে সৌদিও। এদিন মিসরের বন্দরে আক্রান্ত হয়েছে দুটি জাহাজ। বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি পথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব আল–মানদেব প্রণালি ঘিরেও উত্তেজনা চলছে।

অথচ কয়েক দিন আগেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার দিকে যাচ্ছিল। দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া এ সংঘাত যে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে, তা বন্ধে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছিলেন, আলোচনা ‘ভালো’ চলছে। ইরানও আলোচনার কথা জানিয়েছিল। তবে সে প্রচেষ্টা যে ফলপ্রসূ হয়নি, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা।

এখন ট্রাম্পের কথায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বুধবার রাতে ইরানে মার্কিন হামলার আগে ফক্স নিউজকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ওদের (ইরান) ওপর কঠোর হামলা চালাব। ওরা কঠিন শাস্তি পাবে।’ আর হামলার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যত দিন মার্কিন হুমকি থাকবে, তত দিন নিজেদের রক্ষায় যা দরকার করবে তেহরান।

এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, গুতেরেস কিছুদিন ধরেই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে আলোচনায় না ফিরলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, সেটাই ঘটছে। এগুলো ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে না।

আইআরজিসির তিন সদস্য নিহত

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম যুদ্ধবিরতি হয় ৮ এপ্রিল। এরপর স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার কথা থাকলেও অগ্রগতি হয়নি। চলছিল উত্তেজনা। এরই মধ্যে ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে দুই দেশ। হরমুজ নিয়ে বিরোধের জেরে সেই স্মারকও কার্যত ভেঙে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ৭ জুলাই থেকে টানা ১৩ দিন পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। এরপর পাঁচ দিন বিরতি ছিল।

এ বিরতির মধ্যেই মূলত আবার আলোচনার আশা জেগেছিল। তবে জর্ডানে মার্কিন একটি ঘাঁটিতে হামলার পর বুধবার রাত থেকে নতুন করে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জর্ডানে হামলার প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা চালানো হয়েছে। আরও হামলার প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে।

হামলায় ক্ষয়ক্ষতির খবর উঠে এসেছে দেশটির গণমাধ্যমে। এর মধ্যে কেশম দ্বীপে হামলায় তিন বেসামরিক ইরানি নিহত হয়েছেন। জানজান প্রদেশে নিহত হয়েছেন আইআরজিসির তিন সদস্য। এ ছাড়া বুশেহর প্রদেশের বুশেহর, জাম ও খোরমোজ শহর, খুজেস্তান প্রদেশের আহভেজ শহর, ফারস প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা, হোরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাস এবং কিশ দ্বীপ আক্রান্ত হয়েছে।

নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার সমালোচনা করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক ট্রিটা পারসি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এ হামলায় ট্রাম্পের লক্ষ্য কী? হামলা চালিয়েও ইরানকে আলোচনায় ফেরাতে পারেননি তিনি। আমার মনে হয়, এ মুহূর্তে প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া তাঁর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাই এ যুদ্ধ আবার শুরু করা স্পষ্টতই একটি ভুল।’

মার্কিন এফ–৩৫ ধ্বংসের দাবি

বুধবার রাতের হামলার পর একটি হুমকি দিয়েছিল আইআরজিসি। তা হলো ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ সহায়তায় আজ আগ্রাসনকারীদের শাস্তি দেওয়া হবে।’ এর পর থেকে কুয়েত ও জর্ডানে ব্যাপক হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চলছিল হামলা। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ করপোরেশন কাউন্সিল (জিসিসি)।

আইআরজিসির ভাষ্য, কুয়েতের আলী–আল–সালেম সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তারা। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা থাকেন। এতে ড্রোন রাখার দুটি হ্যাঙ্গার ও একটি জ্বালানি ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। অপর দিকে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, ইরানের হামলায় একটি বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটি একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের। হামলায় ওই ভবনে থাকা এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া জর্ডানের আল–আজরাক বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। বাহিনীটির ভাষ্যমতে, হামলায় ঘাঁটিতে থাকা তিনটি মার্কিন এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। আরও তিনটি যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যদিও এ দাবি নাকচ করে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ–৩৫ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি।

রাতভর কেঁপেছে দক্ষিণ লেবানন

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির আগপর্যন্ত ইরানে হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। এর পর থেকে ইরানে হামলা বন্ধ করলেও লেবাননে ছাড় দেয়নি তারা। লেবাননে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নির্মূলের কথা বলে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। কয়েক দফায় যুদ্ধবিরতি হলেও কাজে আসেনি।

বুধবার রাতেও ইসরায়েলের হামলায় কেঁপে ওঠে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রাম। উপকূলবর্তী টায়ার শহর পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল বিস্ফোরণের শব্দ। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, ভোর পর্যন্ত আল–মানসুরি, মাজদাল জৌন ও মাজরাত বুয়ুত আল–সিয়াদ গ্রামে বোমায় বিস্ফোরণ ঘটায় ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল সিরিয়ার কুনেইতরা এলাকায়ও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

এদিকে ইরানের যুদ্ধের আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবারও ব্যতিক্রম ছিল না। এদিন উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার বাসিন্দাদের হাসপাতাল থেকে ছয়টি মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারজন আগের ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতায় মোট ৭৩ হাজার ৩৪১ জন নিহত হলেন।

তবু আলোচনার চেষ্টা

সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছালেও শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। জুনে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় আলোচনা শুরু করতে তৎপরতা চালানোর কথা জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি। তিনি বলেন, সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলাদা আলোচনা করছে ইরান। তেহরান চায়, এই নৌপথে তাদের নির্ধারিত পথে জাহাজ চলবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া—হরমুজের দক্ষিণে ওমান উপকূল–সংলগ্ন পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হবে। দুই পক্ষের এ বিরোধে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। ওমান উপকূল দিয়ে কোনো জাহাজ চললে ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরানে ওমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণেই বন্ধ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড হলো হরমুজে ইরানের জাহাজে হামলা এবং ইরানের বন্দরে অবরোধ। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিভিন্ন পক্ষ আলোচনা চলার কথা বললেও এখনো কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন গবেষক ট্রিটা পারসি। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই মনে করছে আরও সামরিক অভিযান চালানোর পর যুদ্ধে তারা ভালো অবস্থানে আসবে। এ কারণেই সমঝোতা হতে দেরি হচ্ছে। তবে শেষ কথা হলো আলোচনার ভিত্তিতেই যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান
যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। ফাইল ছবি: এএফপি

তেহরান থেকে রিয়াদ: যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমারেখা টেনে দেয় ইসরাইল

ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছে, আর নিজে দর্শকের আসনে বসে মার্কিন করদাতাদের সেই যুদ্ধের খরচ বহন করতে দেখছে। ধারের টাকায় কেনা বোমাগুলো পুড়ছে ছাই হয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেনিয়ামিনের নেতানিয়াহু উসকানিতে যুদ্ধে পা দেওয়ার আগে যে প্রণালীটি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল, তা পুনরায় চালুর অজুহাতে পেট্রোল পাম্পে পেট্রোলের দাম এবং মূল্যস্ফীতির চাপে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে। এখন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপদ দূরত্বে বসে মার্কিন বাহিনী ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের খেলা দেখে মুচকি হাসছেন—যে যুদ্ধের জন্য তিনি বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটনকে ঠেলে দিয়েছেন।

এদিকে দেশে মার্কিন সৈনিকদের কফিন এসে পৌঁছাচ্ছে—একটি যুদ্ধের বলি হয়ে, যার সূচনা করেছিল ইসরাইল আর তা বাস্তবায়ন করল মার্কিন সৈন্যরা। অন্যদিকে কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিষয়ক সচিব (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) পিট হেগসেথ সিনেটের কাছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আরো অর্থ বরাদ্দের আবেদন করছেন।

আইনপ্রণেতাদের এমন একটি যুদ্ধের চেক সই করতে বলা হচ্ছে, যা শুরু করার অনুমোদন তারা কখনো দেননি; যে যুদ্ধের লক্ষ্য ওয়াশিংটন নির্ধারণ করেনি এবং যার সমাপ্তি কখন বা কীভাবে হবে—তার কোনো হিসাবও কারো জানা নেই।

অন্যদিকে দখলকৃত ফিলিস্তিনে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এক আবাসন সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘ইসরাইলের এই অভিযানে যোগ দেওয়ার কোনো আগ্রহ নেই... ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই সীমাবদ্ধ সংঘাতটিই [পরিস্থিতি] আমাদের [ইসরাইলের] জন্য সবচেয়ে সঠিক ও লাভজনক।” সহজ ভাষায় বললে, আসুন আমরা বসে বসে দেখি আমেরিকানরা মরছে এবং আমাদের যুদ্ধের জন্য মূল্য দিচ্ছে।

সংগত প্রমাণ, যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলজুড়ে নিজের সামরিক ঘাঁটিগুলো রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ শেষ করে ফেলছে, তখন ইসরাইল তাদের নিজস্ব ইন্টারসেপ্টরগুলো জমিয়ে রাখছে। ইসরাইল তাদের মজুদ খরচ করছে না। তারা সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে যখন আমেরিকানদের ভাঁড়ার শূন্য হয়ে যাবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। আর ঠিক তখনই, ইসরাইলি ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হবে এক বহুমূল্য অস্ত্র—যা তারা বিশাল মূল্যের বিনিময়ে ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) এবং বাকি উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বিক্রি করবে।

গত রোববার ‘ফক্স নিউজ’-এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু আমেরিকার সামনে ইরান যুদ্ধের লক্ষ্যসমূহ তুলে ধরেন। একজন বিদেশি প্রধানমন্ত্রী আমেরিকান প্রচারমাধ্যমে এসে কার্যত একটি মার্কিন যুদ্ধের শর্ত ও শেষ মুহূর্তের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন—যে যুদ্ধ মার্কিন পাইলটরা লড়ছেন, মার্কিন করদাতারা অর্থায়ন করছেন এবং এখন দৃশ্যত তা ইসরাইলের ইচ্ছাতেই সমাপ্ত হবে। ট্রাম্প যাই চুক্তি করেন বা ওয়াশিংটন যাই সিদ্ধান্ত নিক না কেন, নেতানিয়াহু আগেই আমেরিকাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে সেগুলোর কোনো মূল্য নেই। তিনি ইসরাইলের শর্তে যুদ্ধ শেষ করার জন্য স্রেফ অপেক্ষা করছেন না, বরং তিনি সিদ্ধান্তটি চাপিয়ে দিচ্ছেন।

তবে কেবল আমেরিকার যুদ্ধ নীতিই নয়, কূটনীতি এবং বাণিজ্যও তেল আবিবের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন যখন সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করল এবং উভয় সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর চুক্তির কালি শুকানোর আগেই—একদিনের মাথায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে এলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, চুক্তিটি বাস্তবায়নের আগে সৌদি আরবকে অবশ্যই ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।

ওয়াশিংটনের নীতি তারা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তা নিয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তারা কোনো কূটনৈতিক রাখঢাকও করেন না। ট্রাম্প নতুন শর্ত যোগ করার আগেই ইসরাইলের সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহর ‘আর্মি রেডিও’-কে বলেছিলেন, ‘ইসরাইল তার রেড লাইনগুলো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট। এ এমন এক সরকারের কথা, যারা বোঝে যে তাদের হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা আছে, তারা রেড লাইন নির্ধারণ করে এবং আমেরিকা তাদের কথা শোনে।

‘ইসরাইল আমেরিকার কাছে তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। এগুলো এমন এক সরকারের বক্তব্য, যারা ভালো করেই জানে যে নীতি ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতেই রয়েছে এবং তারা নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দিলে আমেরিকা তা মেনে চলে।

একটু ভেবে দেখুন, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ, অর্থাৎ উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি দেশের সঙ্গে আমেরিকার একটি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চুক্তি নিয়ে একজন ইসরায়েলি মন্ত্রী প্রকাশ্যে রেড লাইনের কথা বলছেন। এই কাঠামোটি ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে গড়ে তুলেছে। সৌদি চুক্তিটি যে আমেরিকার জ্বালানি ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে, তাতে কিছু যায় আসেনি। গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুধু এই যে, তেল আবিব তখনও এতে স্বাক্ষর করেনি।

মূল প্রশ্ন এটি নয় যে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ কৌশল নির্ধারণের চেষ্টা করছে কি না, কিংবা তাদের নেতারা ওয়াশিংটনের জন্য কোনো সীমা বা শর্ত নির্ধারণ করছে কি না। আসল প্রশ্ন হলো—আমেরিকার সমস্ত রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা কেন বিশ্ব ক্ষমতার একমাত্র পরাশক্তি হয়েও একটি কৌশলগতভাবে নগণ্য দেশকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির ওপর এমন অসামান্য প্রভাব খাটাতে দিচ্ছেন?

ইসরাইলি ‘রেড লাইন’-এর কারণেই আমেরিকার ‘ইসরাইল-ফার্স্টপন্থী আনুগত্যকারীরা হঠাৎ করে আবিষ্কার করলেন যে এই চুক্তিটি নাকি পারমাণবিক অস্ত্র প্রসারের ঝুঁকি তৈরি করবে! বহু দশক ধরে তারা ইসরাইলের অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রাগারকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে, ক্ষমা করেছে বা উপেক্ষা করেছে।

অথচ একটি বেসামরিক সৌদি পারমাণবিক কর্মসূচির সম্ভাবনাই তাদের মনে নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। কারণ আসল বিষয়টি কখনোই পারমাণবিক সংঘাত রোধ ছিল না, ছিল কৌশলী ধারাবাহিকতা বা 'সিকোয়েন্সিং'। সৌদি আরব ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরদিনই তারা সেই বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচকে বৈধ' বা 'হালাল' বলে মেনে নিতে রাজি হতো, কিন্তু তার আগে নয়। অথচ সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির সম্ভাবনা হঠাৎ করেই নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। বিষয়টি কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা ছিল না। এটি ছিল পর্যায়ক্রমের বিষয়। সৌদি আরব ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরের দিনই তারা একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে বৈধতা দিতে রাজি হবে, তার আগে নয়।

আরব বিশ্বের রাজধানীগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক চায় যা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে, তবে তাদের সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতাকে ‘ক্ষমতা’ বা ‘প্রভাব’ বলে ভুল করা বন্ধ করতে হবে। বহু বছর ধরে তাদের কৌশল ছিল অর্থ দিয়ে ক্ষমতা কেনা—জারার্ড কুশনারের মতো শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারীদের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলে তাকে ওভাল অফিসের গোপন দরজা হিসেবে ব্যবহার করা।

কিন্তু কুশনার কোনো নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নন। তিনি ইসরাইল-প্রথম নীতির একজন প্রবক্তা, যিনি হোয়াইট হাউস-পরবর্তী সময়ে আরব পুঁজির ওপর ভিত্তি করে নিজের সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং ইসরায়েলের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নির্ধারণ করেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই নির্মম বাস্তবতার শিকার। কুশনার আবুধাবিকে ‘আব্রাহিম আকর্ডস’ -এ রাজি করিয়েছিলেন একটি প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে—ইসরাইলকে সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আমেরিকান যুদ্ধবিমান—২৩ বিলিয়ন ডলারে পঞ্চাশটি এফ-৩৫—পাওয়া যাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সঙ্গে সঙ্গেই তাদের অংশটুকু দিয়ে দেয়—স্বীকৃতি, দূতাবাস, উন্মুক্ত আকাশসীমা। ওয়াশিংটন ইসরাইলকে সেই চুক্তির প্রতিটি সুবিধাই দিয়েছে। কিন্তু সেই যুদ্ধবিমানগুলো কখনোই আসেনি। বছরের পর বছর ধরে ‘প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা’, আটকে থাকা পর্যালোচনা এবং নীরবে চুক্তি পরিবর্তনের পর অবশেষে তা এসেছে।

ট্রাম্প সৌদি আরবকে একটি বাণিজ্যিক চুক্তির প্রতিশ্রুতি বিক্রি করতে চান, কিন্তু ইসরাইলকে দিতে চান তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি। আরব গাভীটিকে পুঁজি, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সদিচ্ছার জন্য দোহন করা হয়, এবং যখন প্রতিদান দেওয়ার মুহূর্ত আসে, তখন তার বদলে ইসরায়েলের বেদীতে তা নিবেদন করা হয়। কুশনারকে তোষামোদ করতে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার, সরল বিশ্বাসে দেওয়া প্রতিটি ছাড়, প্রবেশাধিকার নয় বরং তার একটি বিভ্রম কিনেছে, যা আদায় করার জন্য কখনোই যথেষ্ট নয়।

আরব শাসকগোষ্ঠীগুলোকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, কুশনারের মতো ইসরাইল-ফার্স্টপন্থী অনুগতদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রবেশাধিকার কেনা, কিংবা তেল আবিবে পরিকল্পিত যুদ্ধ পরিচালনার জন্য আমেরিকান ঘাঁটিগুলোকে আশ্রয় দেওয়া—কোনোটিই মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আনবে না। কারণ ইসরাইল যতদিন পর্যন্ত তাদের ওপর এমন লবিং ক্ষমতা বজায় রাখবে, মার্কিন নেতারা তাদের টেনে দেওয়া ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার সাহস কোনোদিনই পাবে না।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

তেহরান থেকে রিয়াদ: যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমারেখা টেনে দেয় ইসরাইল
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠক। ছবি: সংগৃহীত।

এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ চাইল ‘ককরোচ’

ভারতে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি হামলায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশেই হয়েছিল বলে অভিযোগ করছেন ‘ককরোচ জনতা পার্ট সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগও দাবি করেন তিনি। দীপকে বলেন, ‘ছাত্রদের উপর যে ভাবে আক্রমণ হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের রক্ত ঝরেছে, তা অমিত শাহের নির্দেশ ছাড়া হতে পারে না।’

আগের দিন বুধবার প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধী বিল নিয়ে বিতর্কের সময় ভারতের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, গত ২০ জুলাই পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে ‘ককরোচ’দের সংসদ অভিযানের সময় ছাত্রদের ওপর পুলিশের ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ শাহের নির্দেশেই করা হয়েছিল। লাঠি চালানোর পাশাপাশি ছোড়া হয়েছিল কাঁদানে গ্যাস, পেলেট। এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইস্তফাও দাবি করেছিলেন রাহুল।

এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিরোধী দলনেতার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গেল সিজেপির প্রধানের মুখে। ২০ জুলাইয়ের পুলিশি কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিজেপি কর্মীদের দিকেও অভিযোগের তোলেন তিনি।

এসময় দীপকে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জন্য সিজেপি বিদেশি অর্থ-সাহায্য পেয়েছে বলে অভিযোগও খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, ‘যদি সত্যিই আমরা বিদেশি অর্থ পেয়ে থাকি, আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রলালয়ের দায়িত্বে থেকেও অমিত শাহ তা আটকাতে না পারেন, তবে সেটাও তারই ব্যর্থতা। তা হলে নিজেকে কি তিনি ‘চাণক্য’ বলবেন? সে ক্ষেত্রেও তো তার পদত্যাগ করা উচিত।’

সেই সঙ্গে দীপকে অভিযোগ করেন, ২০ জুলাই দিল্লি পুলিশ ইচ্ছাকৃত ভাবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অজুহাত তৈরি করেছিল। তিনি বলেন, ‘২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরের একটি ট্রাকে করে পাথর এবং একটি ভাঙাচোরা গাড়ি আনা হয়েছিল, যাতে পুলিশি অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরা যায়। তিনি আরো বলেন, পাথর নিক্ষেপের পুরো ঘটনাই দিল্লি পুলিশ পরিকল্পিত ভাবে ঘটিয়েছে। বিজেপির লোকজন এসে পাথর ছোড়ে, অথচ দোষ চাপানো হয় ছাত্রদের উপর।’

প্রসঙ্গত, প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের জেরে গত ২৫ জুলাই মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। আন্দোলনের সাফল্যের পর বুধবার নিজের মহারাষ্ট্রের বাড়িতে ফিরে দফায় দফায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হচ্ছেন দীপকে।

তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের দায়িত্ব সামলানোর বদলে নরেন্দ্র মোদী সমাজমাধ্যমে নিজেকে বেশি স্বচ্ছন্দ মনে করেন। দীপকের কথায়, “আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে যাওয়া উচিত। ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে তিনি ভাল কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার ছেড়ে অন্য কোনও নেতাকে দেশের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া উচিত।”

সেই সঙ্গে ‘ককরোচ’ প্রধানের অভিযোগ, বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরেও কেন্দ্র এবং বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের সরকার আন্দোলনকারীদের খুঁজে বার করে হয়রানি করছে।

তিনি বলেন, ‘সিজেপি আন্দোলন তুলে নেওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যের সরকার আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করে হয়রানি করছে। সরকার অবিলম্বে এই হয়রানি বন্ধ করুক। না হলে আগামী নির্বাচনে আন্দোলনকারীরাই এর জবাব দেবে।’

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করলেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কমেনি জানিয়ে দীপকে বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানকে যে ভাবে পদত্যাগ করানো হয়েছে, তেমনই প্রয়োজনে সরকারও বদলে দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বড় পরিসরে হবে।’

সূত্র: আনন্দবাজার

এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ চাইল ‘ককরোচ’
ছবি: সংগৃহীত।

মোদি সরকারকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতার হুঁশিয়ারি, ‘কথা না শুনলে সরকারই বদলে দেব’

‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। তিনি দাবি করেছেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে আরো বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে উঠবে।

দিল্লিতে মাসব্যাপী আন্দোলন শেষে মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দিপকে এসব কথা বলেন। তার অভিযোগ, ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘সংসদ অভিযান’ কর্মসূচিতে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ছররা গুলি ব্যবহার করে এবং এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।

ওই প্রবল গণআন্দোলনের জেরে ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা ও কর্মীদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে পুলিশ। দেওয়া হচ্ছে, গ্রেপ্তারির কড়া হুমকি। পরিবারের সদস্যদেরও অহেতুক হেনস্তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারের এ দমনপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা। আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানোর উদ্দেশে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

পুলিশি হেনস্তা অবিলম্বে বন্ধ না হলে দেশের যুবসমাজ আগামী দিনে সরকারকেই বদলে দেবে দাবি করে তিনি আরো বলেন, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ না করে সরকারের উচিত সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়েছে, এমনটা ভাবলে মস্ত বড় ভুল হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বলপ্রয়োগের নির্দেশ যেই দিয়ে থাকুন না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নামও উল্লেখ করেন।

তিনি মনে করিয়ে দেন, ছাত্ররোষের কারণেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। ঠিক একইভাবে সরকার যদি নিজেদের শুধরে না নেয়, তবে আগামীকাল তারা এ সরকারকেই বদলে দেবেন।

এদিকে আন্দোলন ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক ও আইনি মহলেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশটির সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে কড়া নির্দেশ দিয়ে জানিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া কোনোভাবেই ছররা গুলি ব্যবহার করা যাবে না। অন্যদিকে বিরোধী দল পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুললেও কেন্দ্রীয় সরকার তা অস্বীকার করেছে। শাসক দল বিজেপি পুলিশের পদক্ষেপকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ বলে দাবি করে। আর সিজেপি জানিয়েছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে এফআইআর প্রত্যাহার না হলে তারা দেশব্যাপী আরো বৃহত্তর ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথে হাঁটবে।

‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত এক মাস ধরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের এ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল করবে সরকার। অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে ভারতের শাসক দলকে হয়তো দীর্ঘমেয়াদে এর বড় রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হবে।

মোদি সরকারকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতার হুঁশিয়ারি, ‘কথা না শুনলে সরকারই বদলে দেব’
ছবি: সংগৃহীত

হামলায় গাজায় নিহতদের অর্ধেকই ‘নিরাপদ’ এলাকার (ছবি)

mzamin
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ঃ নিরাপদ বা বাফার জোন ঘোষণা দেয়া স্থানগুলোতেই নৃশংস হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। শনিবার গাজা উপত্যকাজুড়ে তাদের অব্যাহত হামলায় কমপক্ষে ৯২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল গাজা সিটিতেই কমপক্ষে ৪৫ জন মারা যান। সামরিক বাহিনী যখন বহুল সমালোচিত স্থল অভিযান তীব্রতর করছে, তখন এই হতাহতের ঘটনা ঘটল। এ খবর দিয়ে অনলাইন আল জাজিরা বলছে, গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস ইসরাইলকে অভিযুক্ত করেছে ফিলিস্তিনি জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য। ইসরাইল গাজা সিটি থেকে মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে সরিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়ে এসব জায়গাকে ‘নিরাপদ মানবিক অঞ্চল’ হিসেবে প্রচার করলেও বাস্তবে সেই এলাকাগুলোকেই তারা হামলার লক্ষ্যবস্তু করছে। শনিবার এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গাজা সিটি থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সূচনার পর ১১ আগস্ট থেকে মধ্য ও দক্ষিণ গাজায় মোট ১৩৩টি হামলায় ১৯০৩ জন নিহত হয়েছেন। যা ওই সময়ের মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৬ শতাংশ। অফিসটি জানায়, এ তথ্য প্রমাণ করে সাধারণ নাগরিকদেরই সরাসরি টার্গেট করা হচ্ছে। যদিও তাদের বলা হয়েছিল দক্ষিণে চলে যেতে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে তারা সতর্ক করেছে, নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা মানে ইসরাইলকে আরও হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য সবুজ সংকেত দেয়া। কেন্দ্রীয় গাজা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, শনিবার ভোর থেকে গাজা সিটিতে হামলা বেড়েছে এবং ক্রমাগত আহতদের আল-শিফা হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিল। তিনি বলেন, কয়েক মিনিট আগেই নিশ্চিত করা হয়েছে একটি পরিবার গাড়িতে করে সরে যাওয়ার পথে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। চারজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, শত শত মানুষ স্থানান্তরের চেষ্টা করছে। আর ড্রোন ও যুদ্ধবিমান এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তাদের পিছু ধাওয়া করছে। গাজা সিটির কয়েকটি হাসপাতাল ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ইসরাইলি হামলা তীব্র হওয়ার কারণে। প্রতিদিনই শহর দখল ও আরও বেশি মানুষকে উচ্ছেদের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শনিবার সকালে ভারী বোমাবর্ষণের পর শহরের অন্যতম প্রধান হাসপাতাল জর্ডান ফিল্ড হাসপাতাল থেকে ১০৭ জন রোগী ও সব কর্মীকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়। গাজার হাসপাতালগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অব্যাহত হামলার কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অধিকাংশই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চলছে- অ্যানেস্থেসিয়া, অ্যান্টিবায়োটিকের মতো প্রাথমিক ওষুধ পর্যন্ত নেই। ক্ষুধার্ত অবস্থায় ডাক্তাররা রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। মধ্য গাজার কিছু আংশিক কার্যকর হাসপাতাল এখন আহত ও অসুস্থ মানুষের ঢলে ভেঙে পড়েছে। অনেকেই উত্তর থেকে পালিয়ে এসে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। একজন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি আল জাজিরাকে বলেন, উচ্ছেদের কারণে দক্ষিণের হাসপাতালগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ। এখন এক বিছানায় একজনের বদলে দুইজন রোগীকে রাখার চেষ্টা করছে চিকিৎসকরা। আল-আকসা হাসপাতালের ডাক্তার খালিল দিগরান বলেন, ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে আল-রানতিসি শিশু হাসপাতালকে টার্গেট করেছে- যা গাজার একমাত্র শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল। তিনি বলেন, গাজা সিটি ও উত্তরাঞ্চলে এখন কার্যত দুটি হাসপাতাল চলছে- আল-শিফা ও আল-আহলি। বাকি যে হাসপাতালগুলো মধ্য ও দক্ষিণ গাজায় আছে, সেগুলোতেও চাপ বাড়ছে এবং এগুলো পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে।

Thursday, July 30, 2026

মুসলিম নেতার গড়া মোহাম্মদ আলী বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলতে কেন উঠেপড়ে লেগেছে বিজেপি সরকার

আল–জাজিরাঃ ভারতের উত্তর প্রদেশে একটি এলাকায় শতাধিক মানুষ মাটিতে বিছানো চাটাইয়ের ওপর পা গুটিয়ে বসে আছেন। জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন এবং জাতীয় পতাকা নাড়াচ্ছেন।

রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে ২০০ কিলোমিটার (১৩২ মাইল) দূরের ওই এলাকাটির নাম রামপুর। কয়েক দিন আগে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে নয়াদিল্লিতে হাজারো তরুণের বিক্ষোভের মুখে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর নয়াদিল্লির বিক্ষোভকারীরা ঘরে ফিরে গেলেও রামপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে।

সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি দল অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। তাদের দাবি, মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভেঙে ফেলার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা স্বাধীনতা সংগ্রামী মোহাম্মদ আলী জওহরের নামানুসারে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের রামপুর জেলায় বিশিষ্ট মুসলিম রাজনীতিক আজম খান এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

আজম খান ২০০৩ সালে মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্ট গঠন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫ জুলাই রামপুর জেলা প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিকাংশ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ জারি করেছে। অথচ সে সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের তুমুল বিক্ষোভ চলছিল।

রামপুর প্রশাসনের অভিযোগ, এ ভবনগুলো নির্মাণে প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা ও বিধিমালা ঠিকমতো মানা হয়নি।

কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ভবনসহ মাত্র দুটি স্থাপনা বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হয়েছে। এ দাবি তুলে তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে কথিত ‘অবৈধ’ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে।

প্রশাসন আরও জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনগুলো অপসারণে ব্যর্থ হলে তারা বুলডোজার নিয়ে অভিযান চালাবে এবং ভাঙার পুরো খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকেই আদায় করা হবে।

গত সোমবার রাজ্য প্রশাসন তাদের আদেশের ওপর একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ (ইন্টারিম স্টে) জারি করেছে। তবে এতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে ভবন ভাঙার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা হয়েছে কি না।

জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন আল–জাজিরাকে বলেন, এই স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।

উপাচার্য বলেন, ‘এর অর্থ হলো, আরডিএ (রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) নির্ধারিত ৫ আগস্টের সময়সীমার মধ্যে ভবন ভাঙার কাজ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন এমন একটি রায়ের চেষ্টা করছে, যাতে ভাঙার আদেশটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যায়।

‘ভাঙচুর বন্ধ করুন’

২৫০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। তাঁদের কাছে সরকারের এই পদক্ষেপ একেবারেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অপ্রত্যাশিত আঘাত হিসেবে এসেছে।

১৫ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রধান ফটকের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁদের দাবি, ভবন ভাঙার আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করা উসামা তাইয়্যাব প্রশ্ন তোলেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের ফলে যদি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা যায়, তাহলে এখানে এত শিক্ষার্থী আন্দোলন করার পরও উত্তর প্রদেশ সরকারকে কেন বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করা যাবে না?’

প্রায় ২৪ কোটি মানুষের আবাসস্থল উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসন চলছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী। তিনি মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতির জন্য পরিচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবনের চ্যান্সেলর ৭৭ বছর বয়সী আজম খান উত্তর প্রদেশে বিজেপির অন্যতম কড়া সমালোচক। তিনি সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।

এই রাজনৈতিক দলটি রাজ্যের ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলিমের মধ্যে জনপ্রিয়। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত হিন্দু জাতিভুক্ত ভোটারদের একটি বড় অংশও দলটিকে সমর্থন করে।

‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’

সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতা জাভেদ আলী খান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রায় সব ভবন) ভেঙে ফেলার নির্দেশটি শিক্ষাবিরোধী এবং মানুষকে অশিক্ষিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির অংশ।’

জাভেদ আলী খান আরও বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশানা করার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি আজম খান প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্বিতীয়ত, এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতা মুলায়ম সিং যাদব। তৃতীয়ত, এর উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। আর চতুর্থত, এটি একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়।’

সমাজবাদী পার্টির প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদব ২০২২ সালে মারা যান। তাঁর ছেলে অখিলেশ যাদব বর্তমানে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তিনি বিজেপিবিরোধী জোটের এক সদস্য। এই জোটে ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসও রয়েছে।

এ বিষয়ে বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, ভবন ভাঙার নির্দেশটি ‘অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’। তিনি সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে ‘তোষণমূলক রাজনীতি’ করার অভিযোগও তোলেন।

রাকেশ ত্রিপাঠী আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন, আজম খান অবৈধ জমির ওপর এই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছেন? সমাজবাদী পার্টির সরকার থাকাকালে তিনি নিজের পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে দখল করা জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেছেন এবং অবৈধ ভবনও তৈরি করেছেন। আমরা যা করছি, তা হলো অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। আর এর অর্থ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলা উচিত।’

‘মেয়েরা জীবনে আর দ্বিতীয় সুযোগ পাবে না’

রামপুরের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলার আশঙ্কায় জনমনে ক্ষোভ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সাক্ষরতার হারের দিক থেকে উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে রামপুরের অবস্থান নিচের দিক থেকে মাত্র চারটি জেলার চেয়ে ভালো।

এ ছাড়া জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রক্টর গুলরেজ নিজামী।

আইন বিষয়ের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ইকরা আল–জাজিরাকে বলেন, তিনি একটি নির্দিষ্ট কারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলেন। সেটা হলো নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ।

এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এখানকার পরিবেশ ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় নারী শিক্ষার্থীদের এখানে যে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাতে আমাদের অভিভাবকেরা সন্তুষ্ট। এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে আমাদের মতো মেয়েরা আর কোথাও পড়াশোনা করার সুযোগ পাব না। আমাদের অন্য কোথাও পড়ার জন্য পাঠাতে অভিভাবকদের রাজি করানো সম্ভব হবে না। তাঁরা এই জায়গা বেছে নিয়েছিলেন, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এখানে মুসলিম মেয়েরা নিরাপদে থাকতে পারবে।’

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অন্য কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিতে সরকার একটি কাউন্সেলিং ক্যাম্প পরিচালনা করছে বলে জানান ইকরা।

এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘কিন্তু আমরা সেখানে যেতে চাই না। আমরা একটি নির্দিষ্ট কারণেই এই প্রতিষ্ঠান বেছে নিয়েছিলাম।’

শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, এমনটি নয়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক–তৃতীয়াংশের বেশি হিন্দু।

প্যারামেডিক্যালে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর আল–জাজিরাকে বলেন, ‘তারা এটিকে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারে এবং হ্যাঁ, আইনি মর্যাদার দিক থেকে এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, এখানে অন্যরা পড়াশোনা করে না।’

চাঁদনি দিবাকরও বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। অবস্থান কর্মসূচির স্থানে তিনি বলেন, ‘আমি এক বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকেও একবারের জন্যও আমার নিজেকে অমুসলিম বলে মনে হয়নি। এখানকার সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ—শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, সবাই।’

আরডিএ বলছে, এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ওই কর্মকর্তা অনিয়মগুলোর বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ও আরডিএ—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা আইনজীবীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। সেদিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডিএর ভাইস চেয়ারম্যান অজয় কুমার দ্বিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং এরপর তারা লিখিত জবাবও দিয়েছে। জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত ৪০টি ভবনের মধ্যে মাত্র দুটিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবন অবৈধ বলে প্রমাণিত হয়েছে।’

কিন্তু উপাচার্য জহিরউদ্দিন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, রামপুরের সিঙ্গনখেড়া গ্রামে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান আরডিএর আওতায় আসে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থাৎ ভবনগুলো নির্মাণের বহু বছর পর। তাই নির্মাণের সময় সেসব অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না এবং এখন তা দাবি করা যেতে পারে না।

উপাচার্য আল–জাজিরাকে আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় সিঙ্গনখেড়া এলাকায় আরডিএর কোনো এখতিয়ার ছিল না। আমরা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদিত কোর্স পরিচালনা করছি, আর এসব সংস্থা তাদের সব শর্ত পূরণ করার পরই অনুমোদন দেয়।’

উপাচার্য জহিরউদ্দিন আরডিএর এই পদক্ষেপকে শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, তারা শুধু দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী আজম খানের বিরুদ্ধে এটিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নতির জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কথিত এ অনিয়মগুলোকে বৈধ করা সম্ভব নয়। ফলে আইনগতভাবে একমাত্র সমাধান হিসেবে ভবন ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

আল–জাজিরা রামপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিবেদীর বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, এমনকি রামপুরে তাঁর কার্যালয়েও গিয়েছে। কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ করতে বা সাক্ষাৎকারের অনুরোধের কোনো জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান।

‘পুলিশ আমাদের বাড়িতে আসছে’

ভবন ভেঙে ফেলার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরডিএর আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতক উসমান আলী আল–জাজিরাকে বলেন, ‘অন্যরা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দাবি আদায় করতে পারে, তাহলে আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীরা কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলা বন্ধ করার বৈধ দাবি পূরণ করতে পারব না? এর জন্য যদি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আমরা তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে এই অন্যায় আমরা আর মেনে নেব না।’

উসমান আলী অভিযোগ করেন, ধর্মঘটে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে পুলিশ পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে তারা আন্দোলন বন্ধ করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে।

উসমান বলেন, ‘পুলিশ আমাদের বাড়ি আসছে এবং আমাদের অভিভাবকদের পরিণতির হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু আমরা পিছু হটব না।’

গত শনিবার সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতাদের একটি প্রতিনিধিদল বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই দলে ছিলেন জাভেদ আলী খান, সাম্ভল আসনের জিয়া উর রহমান বার্ক ও কৈরানার ইকরা চৌধুরী।

বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসা ও নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, দোকান ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপের প্রভাব অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মুসলিমদের ওপরই বেশি পড়ছে।

তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা শুধু ‘অবৈধ দখল’ উচ্ছেদের লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এ নিয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি সাহিত্যের শিক্ষক অপূর্বানন্দ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টিকে (ভবন ভাঙার পদক্ষেপ) একাধিক দিক থেকে দেখা যায়। প্রথমত, এটি হিন্দু ভোটারদের সামনে মুসলিমদের প্রভাবকে দমন করার একটি প্রদর্শনী। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের মেয়াদজুড়ে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক প্রচার চালানো হয়েছে। আর তৃতীয়ত, তারা হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মেলামেশা চায় না, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এমন মেলবন্ধনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।’

জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আবদুল কালিম আনসারি যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সদ্য তিনি রামপুরে ফিরেছেন।

উভয় আন্দোলনে অংশ নেওয়া আনসারি বলেন, তিনি বিস্মিত যে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামা ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ আন্দোলনের কর্মসূচিতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলার আসন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আনসারি বলেন, ‘এটা বিস্ময়কর যে তারা শিক্ষা সংস্কারের কথা বলছে। কিন্তু দিল্লি থেকে মাত্র কয়েক শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জারি করা ভবন ভাঙার নোটিশ নিয়ে তারা কিছুই বলছে না।’

আনসারি আরও বলেন, ‘এর ফলে বর্তমান ও প্রাক্তন সব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এখন আমরা জানি না, এখান থেকে আমাদের কোথায় যেতে হবে।’

মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মুমতাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি
মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মুমতাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। ছবি: আসাদ আশরাফের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া।

ঝুঁকিতে বিশ্ব, এখন বাঁচার উপায় মাত্র একটি!

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ বুধবার (২৯ জুলাই) নতুন হামলার পরও পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।

এর আগে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করে যে সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) নিয়ে আশাবাদী ছিলেন, সেটিও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। ফলে এখন ওয়াশিংটনের সামনে দুটি কঠিন পথই যেন খোলা রয়েছে- একদিকে স্থলযুদ্ধে নেমে শত শত মার্কিন সেনার জীবন ঝুঁকিতে ফেলা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে “ভালো কোনো বিকল্প নেই”- এ কথাটি প্রায় ক্লিশে হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের এশিয়া এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টেইন বলেন, আমরা সত্যিই একটি কঠিন সংকটে পড়েছি।

যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব কেবল যুদ্ধরত দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ওপর নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়ার চাপও বাড়ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য অকার্যকর থাকে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে তেলের মজুত কমে আসবে, ডিজেল ও সারসহ তেলনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে এবং আগামী শীতে ইউরোপে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংকটও দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন ও প্রবাসী বিনিয়োগের পরিবেশও এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতিগুলোও যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন চাপের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও চাপে
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। বুধবার প্রকাশিত সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে দেখা গেছে, ইরান নীতি ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ৩০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প ভোটারদের সমর্থন পেয়েছিলেন, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সমাধানের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সংঘাতের অবসান সম্ভব। সম্ভাব্য একটি কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সমাধান চাইতে পারে যাতে তারা কৌশলগত পরাজয় স্বীকার না করেও সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে ইরানও দাবি করতে পারবে যে যুদ্ধের পরও তারা নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এমন অবস্থানে পৌঁছানো সহজ হবে না। এর জন্য হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে।

এই সংকটের মধ্যে নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো- ইরানসহ একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও এর অর্থনৈতিক সুবিধা ভাগাভাগি করতে পারে।
মজার বিষয় হলো, ভেস্তে যাওয়া সমঝোতা স্মারকেও ইরান ও ওমানকে অন্যান্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এদিকে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আবারও সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওমানের মধ্যস্থতা
বর্তমানে প্রকাশ্যে চলমান একমাত্র কূটনৈতিক উদ্যোগ হলো ইরান ও ওমানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা। সেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে কীভাবে জাহাজ চলাচল পরিচালিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জানা গেছে, ইরান যেখানে তেলবাহী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপ করতে চায়, সেখানে ওমান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রণালিতে অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে “সামুদ্রিক সেবা ফি” নামে একটি সমঝোতার পথও আলোচনায় রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে “হরমুজ ফি” ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। এটি সরাসরি টোল নয়; বরং উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি আর্থিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রস্তাবটি মালাক্কা প্রণালির যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেলের মতো হতে পারে, যেখানে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অংশ নেয়।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের রটারডাম বন্দরের মতো প্রতি গ্রস মেট্রিক টনে প্রায় ০.০৮ ডলার হারে ফি নেয়া হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় হতে পারে। এমনকি ব্যারেলপ্রতি কয়েক ডলার অতিরিক্ত খরচও বর্তমান অস্থিতিশীল বাজারের তুলনায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কারণ যুদ্ধের কারণে একদিনেই তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

এই বিশ্লেষণের অন্যতম লেখক এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজ বলেন, ইরানের জন্য মূল লক্ষ্য শুধু অতিরিক্ত অর্থ আয় নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তেল রপ্তানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারই তাদের বড় স্বার্থ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের মার্কিন প্রশাসনগুলো এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক সহায়তা চাইত। ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নেও ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, কঠোর ভাষা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে এখন সেই সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরুর আগে অনেক মিত্র দেশের সঙ্গে পরামর্শও করেনি।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ব্রাসেলসভিত্তিক বিশ্লেষক ইয়ান লেসার বলেন, ইউরোপকে কোনো কৌশলে সহায়তা করতে বলা এক বিষয়, কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলটাই স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজের মতে, তেহরান ওমানের প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সময় ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সহজে ছেড়ে দেবে না।
তার ভাষায়, ইরান শেষ পর্যন্ত প্রণালিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে। কারণ সেটি তাদেরও স্বার্থে। তবে তারা তখনই তা করবে, যখন তাদের মনে হবে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শিক্ষা পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কোনো সমঝোতা হলেও সেটি কেবল বর্তমান সংকটের একটি অংশের সমাধান করবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের সমাধান তখনও বাকি থাকবে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, সামরিক ও রাজনৈতিক বিকল্প সীমিত হয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরান- উভয় পক্ষকেই কোনো না কোনো সমঝোতার পথেই এগোতে হতে পারে। অন্যথায় এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য শুধু দুই দেশ নয়, গোটা বিশ্বকেই আরও দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হবে।

ঝুঁকিতে বিশ্ব, এখন বাঁচার উপায় মাত্র একটি!

ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পর ইরানে মার্কিন হামলা, উত্তেজনা নতুন মাত্রায়

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পর এই প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানো হয় বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে আলোচনার সুযোগ করে দিতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলেন, তার পর এটিই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি হামলা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে হামলা শুরু হয়।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানি হামলার জবাবে এটি একটি শক্তিশালী জবাব। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর জবাব দেয়ার ঘোষণা দেন। ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অশালীন শব্দ ব্যবহার করে বলেন, আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করব। এবার আমাদের পালা। তারা বড় ধরনের মূল্য দেবে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হামলার দায় স্বীকার করে ইরান কৌশলগত ভুল করেছে।

শুক্রবার ট্রাম্প সামরিক অভিযান স্থগিত করে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দেন। তবে পাঁচ দিন পর জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে সেই বিরতি ভেঙে যায়। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটি এবং একটি কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ছোড়া সব ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনোটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যতদিন হুমকি ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখবে, ততদিন তেহরানের প্রতিরোধও চলবে। একই সঙ্গে তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দিকে ইরানের অনুমোদনহীন পথ ব্যবহার করে এগিয়ে আসা তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারকে তারা লক্ষ্যবস্তু করেছে। সর্বশেষ এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পর ইরানে মার্কিন হামলা, উত্তেজনা নতুন মাত্রায়

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটে প্রতিদিন একই দৃশ্য। এক মুহূর্তের জন্যও থামে না ডায়ালাইসিস মেশিন। সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা রোগীদের শরীরে সংযুক্ত থাকে চিকিৎসা-যন্ত্রের নল। সীমিত সময়ের জন্য হলেও এসব মেশিনই তাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখছে। সেই সারির এক কোণে বসে আছে উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ১৪ বছর বয়সী রুওয়া মুনতাসির আবদুল করিম। ছোট্ট শরীরের মেয়েটি ভরা ওয়ার্ডেও আলাদা করে চোখে পড়ে। তার বাম হাত ডায়ালাইসিস মেশিনের সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসাকর্মীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও পুরো সময়টায় একটি কথাও বলে না সে। দীর্ঘ চিকিৎসা আর অসুস্থতা তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। পাশেই বসে আছেন পিতা মুনতাসির। তিনি বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে আমার মেয়ে হাঁটত, খেলত। অস্ত্রোপচার আর ডায়ালাইসিস শুরু হওয়ার পর তার পুরো জীবন বদলে গেছে। প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশনই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। একটি সেশন বাদ গেলেই সে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

রুওয়াকে বাঁচিয়ে রাখা হাসপাতালের এই বিভাগটিও এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে। ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বারবার হামলা এবং গাজায় চিকিৎসা-সরঞ্জাম প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে চিকিৎসাসেবা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোডিয়াম বাইকার্বোনেটের তীব্র সংকটের কারণে গাজার ৫০ শতাংশ ডায়ালাইসিস মেশিন সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে কিডনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য গাজায় সাতটি হাসপাতাল ছিল। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে চারটিতে।

নোরা আল-কাবি ডায়ালাইসিস সেন্টারের মতো কিছু কেন্দ্র যুদ্ধেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে কিডনি রোগীদের মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় কিডনি বিকল হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০। ফিলিস্তিন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ডায়ালাইসিস না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে ৪৭০ জনের বেশি রোগী মারা গেছেন। বর্তমানে বেঁচে আছেন প্রায় ৭০০ জন।
মধ্য গাজার আল-আকসা হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ওসামা আবু রাহমা জানান, তাদের হাসপাতালে ৫১টি ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও ২৫টি সম্পূর্ণ বিকল। তিনি বলেন, ২৪০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালকে সপ্তাহে ডায়ালাইসিসের সংখ্যা এবং প্রতিটি সেশনের সময় দুটিই কমিয়ে দিতে হয়েছে। এর ফলে রোগীদের মধ্যে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা এবং রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় পটাশিয়াম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। আবু রাহমার ভাষায়, এই পরিস্থিতি শত শত রোগীর জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
আল-শিফা হাসপাতালে রুওয়া চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ওয়ার্ডের অনেক বয়স্ক রোগী ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার পিতা মুনতাসির চিকিৎসা যন্ত্রের মনিটরের দিকে তাকিয়ে মেয়ের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করেন। তিনি জানান, একসময় রুওয়ার ওজন ছিল ৬৫ কেজি। এখন তা কমে ৩৫ কেজিতে নেমে এসেছে। আগে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস হতো, এখন মাত্র দু’বার করা সম্ভব হচ্ছে। রুওয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন। মুনতাসির বলেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। তার মা কিডনি দিতে রাজি। সব পরীক্ষাও মিলে গেছে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমতি এখনো দেয়নি ইসরাইল। ছয় মাস ধরে আবেদন ঝুলে আছে। গাজার বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়। তাই রুওয়াকে শুধু অপেক্ষা করেই থাকতে হচ্ছে।

ডায়ালাইসিসের সংকট গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার একমাত্র সমস্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, যুদ্ধে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ এমনভাবে আহত হয়েছেন, যা তাদের জীবন স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে। এদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। চিকিৎসার পরও তাদের সামনে নতুন সংকট পুনর্বাসন এবং কৃত্রিম অঙ্গের অভাব। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট আয়া আল-শালতুনি বলেন, কৃত্রিম অঙ্গ, হুইলচেয়ার এবং ক্রাচের ঘাটতি এখন রোগীদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তিনি বলেন, অনেক রোগী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কিছুই পান না। তার মতে, এটি শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানুষের পুরো জীবনই বদলে দিচ্ছে।

উত্তর গাজার ৬০ বছর বয়সী কৃষক জাকি জুমা সালেম আবু হারব ২০২৫ সালের মার্চে এক হামলায় একটি পা হারান। তিনি বলেন, এক মুহূর্তেই আমার পুরো জীবন বদলে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সম্প্রতি তিনি একটি কৃত্রিম পা পেয়েছেন। তবে তিনি জানান, হাজারো মানুষ এখনো সেই সুযোগ পাননি। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন। জাকি বলেন, অনেকের হুইলচেয়ার নেই, ক্রাচও নেই। তারা গাছের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরো ভর করে চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু তাদের হাত-পা হারিয়েছে। তাদের ঠিকমতো হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রও নেই। এটা দেখলে মনে হয়, তাদের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

যুদ্ধ ও সংকটে ভেঙে পড়ছে গাজার হাসপাতাল, চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে মৃত্যু

গাজায় সীমানা বাড়াচ্ছে ইসরাইল, ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার

বিবিসির অনুসন্ধানঃ গাজায় নিজেদের প্রভাব তৈরি করতে প্রতিনিয়ত নতুন মাটির দেয়াল ও কনক্রিটের বেড়া তৈরি করছে ইসরাইল। সামরিক বাহিনীর এমন পদক্ষেপের কারণে গাজা উপত্যকার শত শত পরিবার আবারও ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক শর্ত তোয়াক্কা না করে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ সীমানা গাজার ভেতরের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের স্থান দিন দিন আরও সংকুচিত হয়ে আসছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ক্রমান্বয়ে এলাকা দখলের নতুন কৌশল: উত্তর গাজার আল-তুফাহ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা দেখতে পান, তাদের চলাচলের প্রধান সড়ক সালাহ আল-দিনের ওপর আগের চেয়ে পশ্চিম দিকে সরিয়ে আনা হয়েছে হলুদ রঙের কনক্রিটের ব্লক। সেই সাথে প্রায় তিন মিটার উঁচু একটি বিশালাকার মাটির বাঁধ তৈরি করে তার ওপর উড়ানো হচ্ছে ইসরাইলি পতাকা। বাস্তুচ্যুত হওয়া মোহাম্মদ আল-শাওইশ আফসোস করে জানান, বোমার আঘাতে তাদের আসল বাড়িটি আগেই ধ্বংস হয়েছিল। এরপর তাঁবু টাঙিয়ে কোনোমতে পরিবার নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেও তাদের সরে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হয় এবং হামলায় সেই তাঁবুটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, সেখানে ইসরাইলি বাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট সীমানার পেছনে অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী গাজার ৫৩ ভাগ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রকাশ্যে দাবি করেন, তাদের বাহিনী বর্তমানে গাজার ৬০ ভাগেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি একে ৭০ ভাগে উন্নীত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত চিত্রে দেখা গেছে, গাজায় বর্তমানে ৪২ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে মাটির বাঁধ ও সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

ধ্বংসযজ্ঞ ও তীব্র মানবিক সংকট: নিরাপত্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্যই এসব স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলছে। এসব সীমান্ত ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের রাস্তা পরিষ্কার করতে খান ইউনূস, দেইর আল-বালাহ ও জেইতুন এলাকায় নিয়মিত বুলডোজার চালানো হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হচ্ছে হাজারো ঘরবাড়ি, গ্রিনহাউস ও শতবর্ষী জলপাই বাগান। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্থায়ী আশ্রয়ের অভাবে বর্তমানে গাজার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিত্যদিনের এই স্থানান্তরের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ ফিলিস্তিনিরা।

গাজায় সীমানা বাড়াচ্ছে ইসরাইল, ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার

তিন ফ্রন্টে হুমকি, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে গত পাঁচ মাস ধরে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। এমনকি ইরানি ড্রোন দেশটির তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল রিয়াদ।

কিন্তু এখন সৌদি আরব নিজেকে তিন দিক থেকে হুমকির মুখে দেখতে পাচ্ছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ইরান সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা।
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলা এবং তেহরানের নতুন হুমকির মুখে পড়েছে সৌদি আরব।
সর্বশেষ, রিয়াদের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদির এই সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি কম নয়।

গত এক দশকে সৌদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর নীতি গ্রহণ করে রিয়াদ। এর ফল হিসেবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি হয়।
কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই কৌশলকে কার্যত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, তিন দিক থেকে অসম যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়া যে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো।
সৌদি আরব অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক দশক ধরে কয়েক শ’ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। কিন্তু বিশাল ভূখণ্ড, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিস্তৃত তেল অবকাঠামো রক্ষা করা দেশটির জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

হুতিদের বাড়তে থাকা হুমকি
গত সপ্তাহান্তে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। স্যাটেলাইট ছবি ও ভূ-অবস্থানভিত্তিক ভিডিও বিশ্লেষণে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সৌদির জাজান অঞ্চলের একটি স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে।
এর আগে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজ অবরোধের ঘোষণা দিয়ে হুতিরা লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। পরবর্তীতে গত সোমবার তারা আরও একটি সৌদি জাহাজে হামলার দাবি করে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে সৌদি ইতোমধ্যে তেলের বড় অংশের রপ্তানি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে পরিচালনা করছে। ফলে বাব আল-মান্দেবে হুতিদের অবরোধ রিয়াদের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী তিন বছরে লোহিত সাগর হয়ে দৈনিক প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে সৌদি আরবের। তবে ইয়ানবু থেকে এশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা ট্যাংকারগুলোকে বাব আল-মান্দেব অতিক্রম করতে হয়, যা হুতিদের হামলার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০১৫ সালে হুতিদের উৎখাত করতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সৌদি। সাত বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না এলেও বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয় দেশটিতে।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অর্থনৈতিক ও আকাশপথে অবরোধ অব্যাহত রাখে সৌদি আরব।
চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা অভিযোগ করে, তেহরান থেকে সানায় আসা একটি বিমানকে অবতরণে বাধা দিতে রাজধানীর বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালিয়েছে সৌদি।

বিমানটিতে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির জানাজা শেষে ফেরা হুতিদের একটি প্রতিনিধিদল ছিল। তবে লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক গবেষক নাওয়াফ ওবেইদের মতে, বিমানটিতে আর কী কী আনা হচ্ছিল, সে বিষয়েও নজর ছিল।
বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল বাশার ভাষায়, হুতিরা সৌদি আরবের সব রেড লাইন অতিক্রম করেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে পূর্ব ইয়েমেনের মরুভূমিতে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি যোদ্ধাদের একটি বড় বাহিনী জড়ো হচ্ছে। তারা অগ্রসর হলে সৌদি বিমানবাহিনী, বিশেষ করে অ্যাপাচি যুদ্ধহেলিকপ্টারের সহায়তা পেতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত সৌদি আরবের জবাব মূলত বিমান হামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ইতোমধ্যে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন হোদেইদা বন্দরে সৌদি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে সরকারি কর্মচারী ও মিলিশিয়াদের বেতন দেয়ার জন্য হুতিরা বারবার অর্থ দাবি করেছে।
মোহাম্মদ আল বাশার বলেন, উত্তর কোরিয়ার মতো কৌশল অনুসরণ করছে হুতিরা। তারা বারবার উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। তবে সৌদি আরবের আর্থিক প্রস্তাবের বিনিময়ে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরাক থেকেও বাড়ছে হামলা
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা সোমবার ও মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে দুই দফায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব হামলায় হুতিরা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। এর পরই সৌদি আরবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। মঙ্গলবার ভোরে পূর্ব ইরাকে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার সঙ্গে জড়িত মিলিশিয়া ঘাঁটিগুলোতে “নির্ভুল ও লক্ষ্যভিত্তিক” বিমান হামলা চালায় দেশটি।

দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি আরব সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেবে। মিলিশিয়াদের জোট পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) জানিয়েছে, ওই হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নির্দেশনায় পরিচালিত ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে।
সৌদি কর্মকর্তারা এখনো ২০১৯ সালে তাদের আবকাইক তেল শোধনাগারে চালানো হামলার কথা ভুলে যাননি। ওই হামলায় দেশটির প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুতিরা।
তবে গোয়েন্দা সূত্রগুলো মনে করেছিল, হামলার উৎস ছিল ইরাক এবং এর পেছনে ছিল ইরানের ভূমিকা। সে সময় সৌদি সামরিক জবাব না দিলেও হামলার জন্য ইরানকেই দায়ী করেছিল।

সরাসরি হুমকি ইরানও
যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চ ও এপ্রিলে ইরানি শাহেদ ড্রোন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করলে দেশটি দ্রুত ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও রিয়াদ সফর করে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেয়ার প্রস্তাব দেন।
তবে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ফলে পারস্য উপসাগরের ওপার থেকে ইরানের ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি এখনো বহাল রয়েছে।

এপ্রিলের পর থেকে ইরান সরাসরি সৌদিতে হামলা চালায়নি। তবে চলতি সপ্তাহেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ স্বাধীনভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আবারও যদি ইরান সরাসরি সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালায়, তাহলে রিয়াদের সামনে দুটি কঠিন পথ থাকবে- সরাসরি পাল্টা আঘাত হেনে যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া, অথবা সংযম দেখিয়ে ইরানকে আরও সাহসী করে তোলা।
এদিকে ইতোমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব সৌদি অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে দেশটি। যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।

তেলের উচ্চমূল্যের কারণে কিছুটা রাজস্ব বাড়লেও উৎপাদন বা রপ্তানিতে নতুন কোনো বিঘ্ন ঘটলে সেই সুবিধাও ঝুঁকিতে পড়বে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের পরিসর কমিয়ে আনা হয়েছে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখন সৌদি অনেক বেশি অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবেশে অবস্থান করছে। ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান ও গাজা-সংক্রান্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতিও রিয়াদকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির সামরিক সহযোগিতা ঘনিষ্ঠ রয়েছে, তবু ওয়াশিংটনের আগ্রহ কমে গেলে আরও আক্রমণাত্মক ইরানের মুখোমুখি একা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে রিয়াদ।
এদিকে ইয়েমেন, ইরান ও জ্বালানি নীতিকে ঘিরে মতপার্থক্যের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতেও এখনো সময় লাগছে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরব এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে বারবার হামলার শিকার হওয়ার পর আর নীরব থাকা সম্ভব নয় বলে মনে করছে দেশটির নেতৃত্ব।
তাই রিয়াদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- প্রয়োজন হলে এবার তারা পাল্টা আঘাত হানবে। 

তিন ফ্রন্টে হুমকি, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি