Saturday, June 29, 2024

মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আইজেনহাওয়ার কেন পালিয়ে গেল? -পার্সটুডের বিশ্লেষণ

মার্কিন সরকার এখনো ফিলিস্তিনের আলআকসা তুফান নামক অভিযানের পরিণতিতে জড়িয়ে আছে। গাজা থেকে পরিচালিত হামাস ও ইসলামী জিহাদের ওই অভিযানের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিমানবাহী রণতরী আইজেনহাওয়ার ছুটে এসেছিল লোহিত সাগরে। কিন্তু এখন জলদানবটি এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

ইয়েমেনিরা মার্কিন বিমানবাহী বিশাল রণতরী ‘ইউএসএস আইজেনহাওয়ার’-এর ওপর হামলা করেছে বলে খবর প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বিশাল সাগর-দানবের ওপর ইয়েমেনি হামলার খবরকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পেন্টাগন। কিন্তু ইয়েমেনিরা এই খবরের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করলে পেন্টাগনের বিশেষজ্ঞরা ইজ্জত বাঁচানোর জন্য ঘোষণা করেন যে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লোহিত সাগরে এই রণতরীর মিশন শেষ করা হয়েছে!

এই ঘটনার পর অনেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে যে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রতি পাশ্চাত্যের অস্ত্র সাহায্য অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের অবস্থা এখনো নাজুক ও তা দৃশ্যমান এবং বিখ্যাত মার্কিন রণতরীর এখনো সেখানে থাকা উচিত। কিন্তু ইয়েমেনিদের নতুন হামলার পর অস্টিন ঘোষণা করেন যে, আইজেনহাওয়ারের পিছু হটা দরকার এবং সম্ভবত ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ রণতরী সেখানে যাবে।

আইজেনহাওয়ারের পিছু হটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিমিৎজ শ্রেণির দশটি বড় রণতরীর অন্যতম যা মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহুর অন্যতম বা গোটা মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান পেশিশক্তি। পারমানবিক শক্তিচালিত এই রণতরী চালু করা হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ১৮ অক্টোবর। ৩৩৩ মিটার দীর্ঘ এই জাহাজের ওজন ১১৪ হাজার টন। এটি সবচেয়ে শক্তিশালী রাডার-ব্যবস্থা ও ন্যাভিগেশন সহায়ক যন্ত্রপাতিতে সুসজ্জিত। এর নৌ-কর্মী বা ক্রু ও মেরিন সেনার মোট সংখ্যা ৫ হাজার ৬৮০। এই রণতরী সাবমেরিনগুলোর সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে সেসবের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে সক্ষম এবং আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ‘স্পেরো’ ক্ষেপণাস্ত্রের নৌ ও স্থল সংস্করণেরও অধিকারী। এতে রয়েছে ১০০'রও বেশি জঙ্গি বিমান ও হেলিকপ্টার যেগুলো এই বিশাল জাহাজ থেকে উড্ডয়ন করতে সক্ষম।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের নজিরবিহীন হামলায় দখলদার ইসরায়েল বিপর্যস্ত হলে এ অঞ্চলে পাঠানো হয় আইজেনহাওয়ার। জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তার কথা বলে এ অঞ্চলে এলেও আসলে এর মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের আশপাশে একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি হিসেবে কাজ করা যাতে কখনো দরকার হলে এর যুদ্ধবিমানগুলো খুব অল্প সময়ে নানা ধরনের অভিযান চালাতে পারে।

কিন্তু ইয়েমেনিদের উপর্যুপরি হামলার মুখে বিমানবাহী রণতরী আইজেনহাওয়ার এমন সময় লোহিত সাগর ছেড়ে চলে যাচ্ছে যখন কৌশলগত এই অঞ্চল ছাড়তে এ রণতরীর বাধ্য হওয়াটা মার্কিন সরকারের জন্য মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহর হাতে ইসরায়েল যখন ব্যাপক মার খাচ্ছে ও ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার এ সংক্রান্ত উদ্বেগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে তখন আইজেনহাওয়ারের পলায়নের ঘটনা প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তরকারী ঘটনা। ইসরায়েলের এই কঠিন সময়ে তাকে সহায়তা দিতে আইজেনহাওয়ারের ব্যর্থতার গ্লানি তেলআবিব ও ওয়াশিংটনের জন্য হজম করা বেশ কঠিন হলেও বাস্তবতা হল এ রণতরী ইয়েমেনের ও হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতগুলো খেতে থাকলে জো বাইডেনের নির্বাচনী আশাভরসার তরী এগিয়ে চলাও হয়ে পড়ত অত্যন্ত শোচনীয় ও জটিল অবস্থার শিকার।

লোহিত সাগর বেশ কয়েকটি সাগরের ও সাগর পথের সংযোগ-পথ হিসেবে বিভিন্ন পণ্য বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ সাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও মার্কিন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও মিশরের নিরাপত্তা রক্ষা ও ইয়েমেনের বিপ্লবীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের জন্যও এ অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপ জরুরি। আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক কমান্ড কেন্দ্রের এতদিনের বক্তব্য অনুযায়ী আইজেনহাওয়ারের উপস্থিতি ছাড়া এসব বিষয় তত্ত্বাবধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু আজ বিশ্ববাসী স্পষ্টভাবে দেখছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিজের ঘাঁটিগুলোরই নিরাপত্তা রক্ষায় অক্ষম। আর এটাও নতুন বিশ্বপরিস্থিতির এক স্মরণীয় দিক।

গাজায় আট মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়েও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল কেবল বেসামরিক ফিলিস্তিনি নারী ও শিশু এবং নিরস্ত্র জনগণকে হত্যা ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারেনি। ফলে ইসরায়েল ও তার প্রধান সহযোগী মার্কিন সরকার উভয়ই এক কৌশলগত অচলাবস্থার শিকার। ইহুদি লবিগুলোর চাপ ও নির্বাচনী আর রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে মার্কিন সরকার নেতানিয়াহুর ওপর তেমন চাপও দিতে পারছে না। ইসরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়ার প্রতিরোধ যোদ্ধারা। এই শক্তিগুলো ইসরায়েলকে তার অপরাধযজ্ঞের যথাযথ শাস্তি দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

গাজার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৩৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ ও প্রায় এক লাখ ব্যক্তি আহত হয়েছে যাদের বেশিরভাগই শিশু ও নারী। আহত হয়েছে আরও প্রায় এক লাখ মানুষ।

মার্কিন বিমানবাহী রণতরী। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন বিমানবাহী রণতরী। ছবি : সংগৃহীত



Thursday, June 20, 2024

হিন্দু , ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মে পশু উৎসর্গের রীতি নিয়ে কী আছে? by অর্চি অতন্দ্রিলা

বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন ধর্ম কিংবা লোককাহিনীতে প্রথম মানব হিসেবে আদম-হাওয়া বা ইংরেজিতে অ্যাডাম-ইভের নাম আসে। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গের একদম প্রথমদিকের সূত্রও আছে সেখানে।

বলা হয়, তাদের দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল (কুরআন), ইংরেজিতে Able & Cain (পুরাতন বাইবেল) ছিল যথাক্রমে রাখাল ও কৃষক। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে দুই ভাই একটি করে কুরবানি হাজির করেছিল যার একজনেরটা কবুল হয় বলে উল্লেখ রয়েছে কুরআনে।

ইহুদি ধর্মগ্রন্থ বা আদি বাইবেল অনুযায়ী এবল তার পালের শ্রেষ্ঠ মেষ নিয়ে যায়, আর কেইন নিয়ে যায় নিজ ক্ষেতের কিছু শস্য। এর মাঝে এবলেরটা গ্রহণ করা হয়, কেইনেরটা নয়। কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, এবল যেমন শ্রেষ্ঠ উপকরণ বেছে নিয়েছিল, কেইন তেমনটি করেনি।

পরবর্তীতে প্রতিহিংসায় এবলকে হত্যা করে কেইন। তবে পশু কোরবানি নিয়ে ইসলামে যে ব্যাপক প্রচলন সেটি অবশ্য এসেছে আরও অনেক পরে ভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে।

কিন্তু অন্য ধর্মে বিষয়গুলো কীভাবে রয়েছে? বিশেষত হিন্দু ধর্ম, ইহুদি ধর্ম ও খ্রিষ্টধর্মে পশু উৎসর্গের রীতি বা প্রচলন সম্পর্কে কেমন ব্যাখ্যা রয়েছে?

হিন্দু বা সনাতন ধর্ম

হিন্দু ধর্মে পশু বলি বিষয়টা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মতভেদ থাকলেও এর চর্চা যে নেই তেমনটাও নয়। যেমন বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই দুর্গাপূজা বা কালিপূজা ছাড়াও অনেক ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে পশু বলি দেয়া হয়।

বিশেষত ‘শাক্ত’ মতাবলম্বী, অর্থাৎ ‘শক্তি’ বা দেবীকেন্দ্রিক উপাসনায় এই প্রথার প্রচলনের কথা উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী।

“বিবিধ শাস্ত্রে এই পশু বলির কথা উল্লেখ রয়েছে, যেমন রামায়ণ, মহাভারত, বিবিধ পুরাণ; পশু বলি বিষয়টি সনাতন ধর্মে বৈদিক যুগ থেকেই আছে। ঋগ্বেদের প্রথম মন্ডলে ১৬২ নম্বর সূক্তে অথবা যজুর্বেদের মধ্যেও আছে, সেখানে বলির যে পশু আছে সে মুক্তি লাভ করে, বন্ধন থেকে মুক্ত হয়” এমন উদাহরণ দেন তিনি।

এমন ক্ষেত্রে ছাগল অথবা মহিষ উৎসর্গের প্রচলনটাই বেশি।

বেদ থেকে সনাতন ধর্মের দুই ধরনের উপাসনা পদ্ধতি আসে, সাকার ও নিরাকার। সাকারের মধ্যে পাঁচটি মতের একটি শাক্ত। আর বাঙ্গালিদের মধ্যে শাক্ত মতাবলম্বী বেশি থাকায় দুর্গাপূজা বা কালীপূজার প্রাধান্য দেখা যায়।

বাঙ্গালিদের অনেক প্রাচীন মন্দিরগুলোতে এখনও বলির প্রচলন দেখা যায়।

যেমন বাংলাদেশে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির, চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দির, ভারতের ত্রিপুরার বড় মন্দির ত্রিপুরা সুন্দরী, আসামের কামাখ্যা, কোলকাতার কালীঘাট এমন বেশ কিছু মন্দিরের কথা উল্লেখ করেন ড. চক্রবর্তী।

ঐতিহাসিক দিক বিবেচনায় হিন্দু ধর্মে যেটি বহুল আলোচিত সেটি অশ্বমেধ যজ্ঞ। ভারতের পৌরাণিক বিষয়ক লেখক ড. রোহিণী ধর্মপাল রামায়ণ ও মহাভারতের উদাহরণ দিয়ে বিবিসিকে বলেন, সেই যজ্ঞের নিয়মটাই ছিল যে ঘোড়া ছেড়ে দেয়া হতো, এবং যিনি সম্রাট হবেন তার প্রতিনিধিরা সেই ঘোড়ার সঙ্গে থাকতেন।

সেই ঘোড়া যে যে রাজ্য ঘুরবে, সেই রাজ্যগুলির লোক যদি ঘোড়াকে আটকাতো তাহলে যুদ্ধ হতো ঐ রাজার প্রতিনিধির সঙ্গে। কোনও রাজ্যে যদি ঘোড়াকে না আটকানো হতো তাহলে ধরে নেয়া হতো এই ঘোড়াটি বা সেই রাজা এই রাজ্যটিকে জয় করে নিচ্ছে।

পরিক্রমা করে সেই ঘোড়াটি যখন ফিরতো, সেই ঘোড়াটিকে কিন্তু যজ্ঞের আগুনে দেয়া হতো এবং সেই মাংস সবাই খেতেন।

এছাড়া, “মহাভারতের সময়ও ব্রাহ্মণরাও মাংস খেতেন, রাম নিজেই রীতিমত ননভেজ মানুষ ছিলেন এবং মাংস ছাড়া থাকতে পারতেন না। যখন সীতাকে রাবণ নিয়ে চলে গেছিল তখন বিরহে মদ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল,” উল্লেখ করেন ড. ধর্মপাল।

যদিও তিনি নিজে পশু বলি না বরং মানুষের ভেতরকার নেতিবাচক দিকগুলো বলির বিষয়ে জোর দেন এবং বর্তমানে ভারতে তেমন প্রকাশ্য পশু বলির প্রচলনও তিনি লক্ষ্য করেন না বলে জানান।

শ্রীলঙ্কা এবং নেপালে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পশু বলি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সেটা যে একেবারেই পালন হয় না তেমনটাও নয়।

অবশ্য এক্ষেত্রে মিঃ চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। বাংলাদেশে বড় পরিসরে বেশিরভাগ পূজাতেই বলির প্রচলন দেখেছেন তিনি।

এর মাঝে কালী পূজা, দুর্গাপূজা তো আছেই, এছাড়াও কাত্যায়নী পূজা বা কার্ত্তিক মাসের দুর্গাপূজা, বাসন্তী পূজা বা বসন্তের দুর্গাপূজা, মনসাপূজা, এমনকি বৈষ্ণবরা - যারা সাধারণত পশু বলির পক্ষে না তাদের জগন্নাথ মন্দিরেও সীমিত পরিসরে বা উৎসবে পশু বলির উদাহরণ রয়েছে।

যদিও ইদানিংকার ক্ষেত্রে যেভাবে মাংস খাওয়ার আয়োজন বা বছরব্যাপি ফ্রিজে তুলে রাখতে, সমর্পণ বা দরিদ্রদের দানের দিকে জোর না দিয়ে অনেকটাই আত্মতুষ্টি, প্রতিযোগিতা বা ভোগের প্রবণতা লক্ষ্য করছেন সেটাতে বলির আধ্যাত্মিক মাহাত্মের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মনে করছেন তিনি।

ইহুদি ধর্ম

ইসলামের ইতিহাসের সাথে অনেকটাই মিল আছে ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের। তবে পশু উৎসর্গ বা কোরবানির দিকটা ইহুদিদের উৎসবেই ছিলো বেশি।

ইহুদি ধর্মে মূলত ৩টি তীর্থযাত্রার উৎসব পেসাহ (Passover), শাভুওয়াত (Feast of Weeks, সপ্তাহের উৎসব), এবং সুখট (Feast of Tabernacles, কৃষি সংক্রান্ত উৎসব) এর সাথে পশু উৎসর্গের রীতির মাহাত্ম রয়েছে।

আর এর বাইরে ‘রশ হাশানাহ’ বা ইহুদি নববর্ষ এবং ‘ইয়ম কিপুর’ (Day of Atonement, প্রায়শ্চিত্তের দিন), এমন সব উৎসবেই পশু উৎসর্গের রীতি থাকার কথা উল্লেখ করেন যুক্তরাজ্যের একজন ইহুদী পণ্ডিত বা র‍্যাবাই গ্যারি সমারস, যিনি লিও বিক কলেজের একাডেমিক সার্ভিসের প্রধান।

মুসলিমদের কোরবানির ইতিহাসের সাথে যে নবী ইবরাহীমের ঘটনা আসে, সে ইতিহাস ইহুদি ধর্মগ্রন্থেও রয়েছে। তবে ইহুদিদের জন্য পশু উৎসর্গের নির্দেশ আসে আরও পরে একটু ভিন্নভাবে।

প্রাথমিক ইতিহাসের দিকে দেখলে যেমনটা তোরাহ বা তাওরাতে উল্লেখ রয়েছে, ৩০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে মিশরের ফারাও বা ফেরাঊন রাজারা ইসরায়েলাইটস নামে একদল ইহুদিকে দাস করে রেখেছিল।

ইহুদি ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ নবী মোশি (আরবীতে মূসা, গ্রীক মোসেস) ফারাওদের কাছে বেশ কয়েকবার দাসকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেন।

এরপর বলেন যদি তাদের মুক্তি না দেয়া হলে ঈশ্বর মিশরীয়দের উপর মহামারী ঘটাবেন। ফেরাউনরা না মানায় মহামারী আসে। সে সময়ের দশটি মহামারীর একটি ছিল মিশরীয় পরিবারে প্রথম জন্ম নেওয়া শিশুটিকে মৃত্যুর দেবদূতের হাতে হত্যা।

সেসময় “ভেড়া কোরবানি দিয়ে তার রক্তচিহ্ন দরজার বাইরে এঁকে দিতে নির্দেশ দেয়া হয়, যেন মৃত্যুর দূত মিশরের প্রথমজাত সন্তানকে নিতে আসলে তারা সেই চিহ্ন দেখে ইসরায়েলিদের চিনে তাদেরকে বাদ দিতে পারে,” এভাবেই প্রথমবারের মতো পশু উৎসর্গের নির্দেশ আসে যেটা ‘পেসাহ’ বা ‘পাসওভার’ হিসেবে পরিচিত বলে জানান মিঃ সমারস।

বলা হয় এই শেষ মহামারিতে ফেরাউনের নিজ সন্তানের মৃত্যুর পর মূসাকে ডেকে ইহুদি দাসদের নিয়ে মিশর থেকে চলে যেতে বলেন এবং ইহুদিদের ২০০ বছরের বেশি সময়ের দাসত্বের অবসান হয়।

কিতাব অনুসারে ইহুদিদের বেশিরভাগ উৎসবেই নিজস্ব ধরনের উৎসর্গ বা বিসর্জনের উল্লেখ রয়েছে যার নির্দিষ্ট সময় এবং স্থানের নিয়ম রয়েছে বলে উল্লেখ করেন র‍্যাবাই সমারস।

“এখন অবশ্য আমাদের এমন উৎসর্গের রেওয়াজ নেই কারণ আমাদের সেই মন্দিরটি নেই যেখানে গিয়ে প্রাণী উৎসর্গ করার নিয়ম ছিল। এখন প্রার্থনায় এই উৎসর্গের দিকটা উঠে আসে যেন আমরা সেটা মনে রাখি যে এটা ইহুদি ধর্মের অপরিহার্য অংশ,” বলছিলেন তিনি।

সেই মন্দির বলতে টেম্পল মাউন্টকে বোঝানো হচ্ছে যেখানে এখনকার আল আকসা মসজিদ রয়েছে। ইহুদিরা সেই মন্দির পুনর্গঠনের জন্য প্রার্থনা করেন এবং বিশ্বাস করেন সেই মন্দির পুনর্গঠন হলে তারা ধর্মীয়ভাবে পশু উৎসর্গের রীতিতে ফেরত যেতে পারবেন।

মন্দির না থাকায় বেশির ভাগ ইহুদি পশু উৎসর্গ না করলেও জেরুজালেমে কিছু গোষ্ঠী আছে যারা এখনও পশু উৎসর্গ করেন। যেমন সামারিটান গোষ্ঠী পাসওভারে পশু উৎসর্গ করে থাকেন।

আবার অনেকে আছেন যারা একটি প্রাণী উৎসর্গ করতে যে খরচ হতো সেটা দান করে থাকেন।

আর মেষ, মহিষ, গরু, ভেড়া যেই প্রাণীই হোক না কেন, উৎসর্গের জন্য প্রাণী ধর্মীয়ভাবে নির্দেশিত সুস্থ, নিখুঁত ধরনের বা উপযুক্ত হতে হবে যেটাকে ‘কোশার’ বলা হয়। আর ঠিক উৎসর্গ না করা হলেও অনেক উতসবেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ মাংস খাওয়া।

ইহুদি ধর্মে পশু উৎসর্গের অনেক ধরনের রীতিনীতি এবং নিয়মকানুন রয়েছে যেগুলো উদ্দেশ্যভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়।

খ্রিষ্টধর্ম

ইহুদি ধর্মের সূত্র ধরে খ্রিস্টধর্ম আসায় খ্রিষ্টধর্মের যে পুরনো বাইবেল রয়েছে তার সাথে অনেকটাই মিল রয়েছে ইহুদি ধর্মগ্রন্থের। ইহুদিদের যে 'পাসওভার' রীতি সেটার জায়গা খ্রিস্টধর্মেও রয়েছে, যদিও এর ব্যাখ্যা বা পালনের ধরন ভিন্ন। সময়টা কাছাকাছি হলেও খ্রিষ্ট পাসওভার বলতে নিস্তারপর্ব বা যিশুখ্রিষ্টের পুনরুত্থানের মাহাত্ম্য থেকে দেখা হয়।

“পুরাতন নিয়মের মধ্যে যে কয়েকটা বই আছে বিশেষত লেবীয় পুস্তকের ১৭ অধ্যায় এবং দ্বিতীয় বিবরণে এ বিষয়গুলো উল্লেখ আছে যে, কী রকম পশু বলি দিতে হবে। ওটা দেয়া হতো সকালে এবং বিকেলে, বিভিন্ন উৎসবে এবং অনেক পশু দেয়া হতো” উল্লেখ করেন ড. প্রশান্ত টি রিবেরু যিনি ঢাকায় কাফরুল ক্যাথলিক চার্চের যাজক।

সেসময় ঐ পশু বলি দিয়ে নেতিবাচক প্রবণতার বিপরীতে অনুতাপ প্রকাশ এবং ক্ষমার আশায় এমনটা করা হতো।

তবে সেই রীতির প্রচলন এখন আর ধর্মীয়ভাবে নেই কারণ যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুকেই মূলত সবচেয়ে বড় উৎসর্গ হিসেবে দেখা হয়। যিশু খ্রিষ্টকেই খ্রিষ্টধর্মে 'ল্যাম্ব অফ গড' বা ঈশ্বরের মেষশাবক হিসেবে দেখা হয়।

ধর্মীয়ভাবে বলির বিধান না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই "কেউ যদি মানতি করে (মানত), কোনও প্রতিশ্রুতি দেয় ঈশ্বরের কাছে সেটা অন্যভাবে দেয়া হয়। কিন্তু আগের মতো সেটা বেদিতে নিয়ে যজ্ঞ উৎসর্গ করে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করা হয়না," বলছিলেন মিঃ রিবেরু।

ইহুদি ধর্মের যোগসূত্র বাদ দিয়ে শুধু খ্রিষ্ট ধর্ম বিবেচনায় নিলে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গের রীতি কখনও ছিলই না বলে জানান মিঃ রিবেরু।

তবে মাংস খাওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ নেই। অনেক দেশে উৎসবের অংশ হিসেবে পাসওভারে মেষের মাংস খাওয়ার রীতিও রয়েছে। যেমন মিঃ রিবেরুর ইতালি থাকার অভিজ্ঞতায় ইস্টারের আগে পাসওভার মেষের মাংস খাওয়াটা অনেকটা বাধ্যতামূলক মনে হয়েছে।

তবে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোরবান বা পশু বলিদানের রীতি খ্রিষ্টধর্মে নেই।

পশু উৎসর্গের রীতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সমাজে ছিল।
পশু উৎসর্গের রীতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সমাজে ছিল।

Tuesday, June 18, 2024

যুক্তরাষ্ট্রের বিপদে শঙ্কিত কানাডা

নিজের ঘর রেখে পরের ঘর নিয়ে টানাটানি। এবার নাকি নিজের ঘর বাঁচাতেই দৌঁড়াতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী রাষ্ট্র কানাডা।

দেশটির সরকারের একটি থিংক ট্যাংকের ধারণা, বড় বিপদ ঘনিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্ভাব্য এই বিপদ দেখে জাস্টিন ট্রুডোর সরকারকে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে ওই থিংক ট্যাংক।

বিপদ যখন আসে তখন চারদিক থেকে আসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে। এক মামলায় ছেলে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। আবার সামনে নির্বাচনেও নিজের অবস্থান অনেকটা নড়বড়ে।

এবার প্রতিবেশী দেশের একটি থিংক ট্যাংক বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশের ঝড়ের মেঘ জমেছে। সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক মতামত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

থিংক ট্যাংক পলিসি হরাইজন কানাডা ‘ডিসরাপশন অন দ্য হরাইজন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ বাঁধতে পারে। আর এ জন্য অটোয়ার সম্ভাব্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

তারা বলছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ হতে পারে। ৩৭ পৃষ্ঠার ওই নথি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতাদর্শগত বিভাজন, গণতন্ত্রের ক্ষয় এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় গৃহযুদ্ধে পতিত হতে পারে দেশটি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকার সময় যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে কম ভবিষ্যতবাণী করা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত মার্কিনিরাই নিজ দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছে।

কিন্তু পলিসি হরাইজনের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের যে ধরনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা দেশটির রাজনীতি নিয়ে কানাডার গভীর উদ্বেগের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ হবে এটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যদি এমনটা ঘটে, তাহলে তা হবে খুবই প্রভাব বিস্তারকারী একটি ঘটনা।

আসলে ট্রাম্পের সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। তখন কানাডার সঙ্গে কয়েক দশকের পুরোনো সম্পর্কে ছেদ পড়েছিল।

আবার কানাডার প্রতি ট্রাম্পের নীতি এবং ব্যক্তিগত আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে অটোয়া মনোভাব বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে কিউবেকে জি-সেভেনের বিগত সম্মেলনে ট্রুডোকে রীতিমতো ধুঁয়ে দেন ট্রাম্প, যা অটোয়ার কর্মকর্তাদের গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

নিকট অতীতে নিজ দেশেই গৃহযুদ্ধের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে কানাডার, সেটিও সুখকর নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে যদি এমন কিছু সত্যিই ঘটে তাহলে কানাডার চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

কেননা, কানাডার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। অটোয়ার কাজও এটা নয়। তবে প্রতিবেশী দেশে ঝড় হলে তার প্রভাব কিছু হলেও কানাডার ওপর পড়বে। আর সেই শঙ্কাতেই আছে অটোয়া। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ছবি : সংগৃহীত

পুনরায় হৃদয়ং by রাজর্ষি দাশ ভৌমিক

দ্বিতীয়বার বিবাহ করে সুদেব ভাবলো এইবার সংসারী হবে। প্রথম বউয়ের সবকিছু একদম ভুলে গেছে সে। আসলে যতদিন না ভুলতে পারছে ততদিন দ্বিতীয় বিয়ে করবে না বলেই ঠিক করেছিল। ততদিন যথেচ্ছ মদ খাবে, রোববার বেলা অবধি ঘুমোবে, এক জামাকাপড় পরে দিনের পর দিন অফিস করবে, বন্ধুদের সোম-শুক্র যেদিন খুশি নেমন্তন্ন করে খাওয়াবে আর মধ্যরাতে ইংরেজি টিভি চ্যানেল তারস্বরে চালিয়ে তারিয়ে তারিয়ে দেখবে। এই জীবন সুদেব কয়েকবছর যাপন করার পর পেটে আলসার ধরা পড়লো। মধ্যরাতে প্রবল পেট ব্যথা। জল গড়িয়ে দেওয়ার কেউ নেই। মায়ের ফটোর দিকে তাকাতে গিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। বউকে ডিভোর্স দেওয়াটা কি বেজায় ভুল হয়েছে ভাবতে গিয়ে প্রথম বউয়ের নাম আর মনে পড়লো না। সুদেব এইভাবে ভুলে গেল প্রথম বউয়ের কথা। আলসারের অপারেশনের ধাক্কাটা সামলে দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে প্রথম বিয়ে নিয়ে ভাবলো। মনে হল, সে একা ছাদনাতলায় যাচ্ছে, একা হনিমুনে, একা খেলা করে উঠে একঢোক জল খেয়ে একা ঘুমিয়ে পড়ছে। বিয়ে, প্রেম, ঝগড়া, ইস্যু এবং ডিভোর্স আর সর্বোপরি জ্বলজ্যান্ত একটা মেয়ে ঝাপসা হয়ে গেছে।
বিয়েটা কেনো টিকলো না ভাবার চেষ্টা করলে সুদেব আর মেয়েটির কোনো দোষ দেখতে পায় না। মেয়েটিই যেখানে ঝাপসা হয়ে গেছে, সেখানে মেয়েটির আর কী দোষই বা স্পষ্ট থাকবে। সুদেব বরং নিজের দোষ দেখতে পায়। প্রচুর দোষ, অসংখ্য দোষ। গুছিয়ে সংসার করার বয়সে সে সংসারে প্রবেশ করেনি। অল্পবয়সে বিয়েটা করেছিল। কলেজের লাস্ট ইয়ারে। আর গুছিয়ে সংসার করার বয়সে পৌঁছে অগোছালোভাবটা তার সর্বাঙ্গ ঢেকে দিয়েছে। সুদেব তাই এবার সাতটায় উঠে বাজারে যাবে, দরকারি কোনো জিনিস কিনতে ভুল করবে না, সংসারের মানুষদের প্রয়োজন মেটাবে, বছরে একবার পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়াও যেতে পারে। আলসারের অপারেশনের পর এমনিতেই মদ খাওয়া কমে গেছে, সপ্তাহে দু’একদিন, এক-দু পেগ, তাও পুরনো বন্ধুদের চাপে। সুদেবের স্কুলবেলার কথা মনে পড়ে—এনুয়াল পরীক্ষায় মাঝারি ফল করার পর প্রতিবার প্রতিজ্ঞা করতো নতুন ক্লাসে ভালোভাবে পড়াশুনা করবে। মধ্যমেধার ছাত্র সে, মধ্যমেধাকে অজুহাত বানিয়ে ইস্কুলের অসাফল্যগুলোকে সান্ত্বনা দেয়। সংসারে তার অক্ষমতাগুলো স্পষ্ট, সেগুলো ঝেড়ে ফেলাও কঠিন নয়, সুদেব ভাবে দ্বিতীয়বার বিবাহ করে এবার সংসারী হবে।
প্রথমবার বিয়ের থেকে সুদেব ও সেই মেয়েটির কোনো ছেলেপুলে হয়নি। সুদেবের দ্বিতীয় বউয়ের প্রথম পক্ষ থেকে একটি মেয়ে ছিলই। বন্ধুদের আসরে সুদেবের সঙ্গে দ্বিতীয় বউয়ের প্রথম পরিচয় হয়। তখনও সুদেবের প্রথম ডিভোর্সটি হয়নি। দুজনের সম্পর্কটা কেবলমাত্র পরিচিতির স্তরেই ছিল। দ্বিতীয় বউয়ের ততদিনে প্রথম ডিভোর্সটি হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সুদেব তাই আর বেশি ছোঁকছোঁক করেনি, উদ্দেশ্য যখন সংসারী হওয়া তখন আর প্রেমে মজে বৃথা সময় নষ্ট করা কেনো!
দ্বিতীয় বউটি ভালোই, নিঃসন্দেহে। বিয়াল্লিশ বছরের মদ্যপ, চাকুরিজীবীকে বিবাহ করার মানসিকতা নিয়েই সে সুদেবের বাগুইহাটির ফ্ল্যাটে প্রবেশ করলো। বিয়ে হল অনাড়ম্বরভাবে। এ জীবনে, সুদেব হাঁপ ছেড়ে ভাবলো, দু’দুটি বিবাহের পিছনে লোক খাইয়ে তাকে আর পয়সা নষ্ট করতে হল না। গেজেটেড অফিসার বাপ প্রথম বিয়েটি টাকা পয়সা উড়িয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিয়েতে, সইসাবুদের পর বন্ধুদের আপবিট বেঙ্গলি ফিউশন রেস্তোরাঁতে বাফে খাইয়ে দেওয়া হল, বিল হল হাজার আঠারো—এবাদে বউ আর মেয়ের ট্যাক্সিভাড়া বাবদ আরো হাজার। দ্বিতীয় বউ যখন সুদেবের ফ্ল্যাটে ঢুকছে তার ডানহাত শক্ত করে চেপে ধরে আছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মেয়ে। সুদেব স্যুটকেশ নামিয়ে ফ্ল্যাটের তালাচাবি খুললো। পাশের ফ্ল্যাটের মজুমদাররা এসে বউ দেখে গেলেন। মজুমদার গিন্নি একটা হালকা নথ উপহার দিলেন। রাত্রি দশটার দিকে বন্ধুবান্ধব গানবাজনা করে বিদায় নিলে, মেয়েও ঘুমের অজুহাতে ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। দ্বিতীয় বউ যেন মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও পারলো না। সুদেব দ্বিতীয়বারের জন্য ফুলশয্যায় প্রবেশ করলো। দ্বিতীয় বউয়ের মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। সে প্রথমবার লক্ষ্য করল তার দ্বিতীয় স্বামীর বুকময় সাদা চুল। পরদিন সকালে উঠে বাজার নামিয়েই সুদেব ছুটলো ফার্নিচারের দোকানে মেয়ের জন্য একখানি সস্তার সিঙ্গল খাট কিনতে, নিদেনপক্ষে একটি ক্যাম্পখাট। এইভাবে সুদেব তার দ্বিতীয় সংসার শুরু করলো।
দ্বিতীয় বউ এককালে চাকুরি করতো, মেয়ে জন্মানোর পর ছেড়ে দেয়। ডিভোর্সের পর মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। চাকরিতে আর ফেরা হয়নি, মৃত বাবার পেনশন, অল্প সঞ্চয় আর খোরপোশে মেয়েকে পড়াচ্ছিলো, নিজেকে সামলাচ্ছিলো। ডিভোর্সের পর দু’একবার পুরুষের প্রেমাসিক্ত হতে হতেও নিজেকে সামলেছে। পরনির্ভরশীল একট ডিভোর্সি মেয়েকে ফুঁসলে নেওয়ার মতো দুর্জনের অভাব কলকাতা শহরে নেই। অতপর সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, মেয়ের পড়াশোনায় নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে। ময়লা ঝেড়ে ফের হারমোনিয়ামে রেওয়াজ শুরু করেছে, মাঝেমধ্যে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছে ও মেয়েকে কোলে নিয়ে অনির্বচনীয় আনন্দে মেতে উঠেছে। মা চাকরির কথা তুললে, ওসব ভুলে গেছি বলে দায় ঠেলেছে। মায়ের শরীর ভাঙতে শুরু করার পর, মা ‘ঈশ্বর যা করেন ভালোর জন্যেই করেন’ এই দিকটা বুঝতে পেরেছেন। সংসারে তাকে দেখার বলতে একমাত্র এই ডিভোর্সি মেয়ে। সুদেবের দ্বিতীয় বউটি কিন্তু বিবাহিত সুদেবের দিকে একবারটির জন্যও হাত বাড়ায়নি, বন্ধুদের গ্রুপের অনেককে নিয়ে রাতজাগা-চিন্তায় রমণ করলেও সুদেব ছাড় পেয়েছিল। নিতান্ত সাধারন, নিতান্ত মদ্যপ, নিতান্ত চাকুরিজীবি সুদেব। আর সেকারণেই ডিভোর্সি সুদেবকে ভারি নির্ঝঞ্ঝাট মনে হল। এতগুলো বছর একা থাকার পর একটি পুরুষের জীবনে ফের জায়গা নেওয়ার মতো যথেষ্ট মনের জোর অবশিষ্ট ছিল না। পুরুষের দাবিগুলো কতটা মেটাতে সে সক্ষম হবে তা নিয়ে সংশয় ছিল এবং তার মেয়ের জীবনেও জ্ঞান হওয়ার পর প্রথম পুরুষের উপস্থিতি, সেই শঙ্কা! সুদেবের দ্বিতীয় বউ মায়ের পরামর্শ নিয়ে, মায়ের জন্য একটি আয়ার ব্যাবস্থা করে, বিয়েতে সম্মতি দিল।
দু’জনের দ্বিতীয় সংসারটিই দু’জনের জন্য অনেকটা বিস্ময়ের ও স্বস্তির হল। সুদেব কয়েকদিন সংসার করেই বুঝলো এইবার তার সংসারী হওয়ার ইচ্ছে রয়েছে কিন্তু অপরপক্ষের সুদেবের কাছে সংসারী হওয়ার জন্য কোনো প্রত্যাশা নেই। আর দ্বিতীয় বউটি দেখল—পুরুষের দাবিদাওয়া নিয়ে তার মনে যতই শঙ্কা থাক, সুদেবের কোনো দাবিই নেই। সুদেব বরং রোজ সকালে একব্যাগ বাজার নামিয়ে রাখছে, ফ্রিজে ডিম-দুধ ফুরিয়ে গেলে নিজেই দেখেশুনে কিনে আনছে। মেয়ের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে সুদেব সদাতত্পর। মেয়ের জন্য একটি খাট, পড়ার টেবিল আর সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপ বিয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কিনে এনেছে। এবং প্রথম দু’একদিনের পর সুদেব নিজে খাওয়াদাওয়া হলে এসি চালিয়ে হালকা চাদর টেনে ঘুমিয়ে পড়ছে। সুদেবের দ্বিতীয় বউ নিশ্চিন্ত হয়ে মেয়ের সঙ্গে মাধ্যমিকের পড়াশুনা চালাচ্ছে। সংসার করতে গিয়ে সুদেব দেখছে তবু যেন ছোটখাটো ভুল সে করেই ফেলছে, এই যেমন সেদিন কালোজিরের প্যাকেট শেষ, তবু বাজার থেকে আনতে ভুলে গেল, মাংসের জন্য দই আনতে দু’বার দোকানে যেতে হল। এজন্য সংসারে কোনো অশান্তি নেই, দ্বিতীয় বউটি অফিসের জামাকাপড় ইস্ত্রি করে রাখছে, টিফিনবাক্স গুছিয়ে রাখছে।
দ্বিতীয় বিয়ের তিনমাসের মাথায় সুদেবের চাকরিটা চলে গেল। সুদেব ছিল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। মাঝারি মাপের একটি ফার্মে সিনিয়ার ম্যানেজার। তাদের মাঝারি কোম্পানিটিকে একটি বড় আমেরিকান ফার্ম কিনে নিল এবং টপ ম্যানেজমেন্টের সবাইকে একদিনে রেজিগনেশন দিতে অনুরোধ করলো। সুদেব যদি জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার বা নিদেনপক্ষে করণিক হত হয়ত চাকরিটা যেত না, হাজার পনের মাইনেতে সংসার চালিয়ে দিতে পারতো। নিচুতলার ছাঁটাই হলে কাজ করার লোক পাওয়া যাবে না, উপরতলার বদলি ইন্ডাস্ট্রিতে অঢেল, পিএফ আর ছাঁটাইয়ের ভয়ে সব বাবুরা রেজিগনেশন জমা করে দিল। সুদেব সেদিন অঢেল মদ খেলো, আলসারের পুরনো ব্যথায় কাতরালো, বমি আর খিস্তি করতে করতে বাড়ি ঢুকলো। সুদেবের অবস্থা দেখে মেয়ে ভয় পেয়ে গেল, দ্বিতীয় বউ তাড়াতাড়ি মেয়েকে বইখাতা সমেত—মেয়ের সামনে মাধ্যমিক—বেডরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে সুদেবকে মেয়ের খাটে শুইয়ে দিল। পরদিন সকালে এ নিয়ে কোনো কথা হল না, সংসারী সুদেব এক কিলোর ইলিশ নিয়ে এলো। মেয়ের সঙ্গে অনেকটা গল্প করে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। বউ জিজ্ঞেস করলো—অফিস যাবে না, শরীর ঠিক আছে? সুদেব বললো, একটু অম্বল। সুদেবের দ্বিতীয় বউ আর কোনো কথা না বলে ইলিশ রাঁধতে গেল।  
মধ্যরাতে সুদেব তার দ্বিতীয় বউকে বললো—তার আর চাকরি নেই। বউ বললো—মেয়েকে বোলো না, সামনে মাধ্যমিক, চিন্তা করবে। মায়ের পেনশন তো আছে। আমারও কিছু গয়না আছে। এতগুলো বছরতো দুটো মানুষের চললোই। পরদিন এগারোটার মধ্যে সংসারের সব কাজ সেরে সুদেব বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কফিহাউসে দশ কাপ কফি খেয়ে চারঘণ্টা কাটালো, বিকালে ময়দানে গিয়ে ঘাসে তন্দ্রা দিল। মেয়ের যতদিন না মাধ্যমিক হলো সুদেবের এইভাবেই চললো। পাছে মেয়ে জানতে পেরে যায়, সুদেব তাই সারাদুপুর বন্ধুবান্ধবের অফিসে ঢুঁ মারে, নাটকের দলের রিহার্সাল দেখে, ময়দানে ঘাস চিবোয়, কফিহাউসে আর কফি খাওয়া হয় না, বরং সন্ধে নামলে সে টাকায় খালাসিটোলায় গিয়ে সস্তায় বাংলা খায়। একদিন পিএফের টাকা পেতে পুরনো অফিসে গেল, প্রথম বিয়ের পর সে এই অফিসে চাকরিতে ঢুকেছিলো, এখানে শেষ ষোলটা বছর আটঘণ্টা করে সপ্তাহের দিনগুলো কাটিয়েছে। নতুন একাউটেন্ট মেয়েটি বললো লাখ চারেকের মতো পিএফ পাওনা আছে সুদেবের। একগুচ্ছ ফর্মফিলাপ করতে হবে, বছরের শেষ দিকে হয়ত টাকাটা পেতে পারে। সুদেব ফর্মটর্ম পূরণ করে খালাসিটোলায় গেল। এক বাল্যবন্ধুর কাছে হাজার খানেক টাকা ধার নিয়েছে। তাতেই মদ, তাতেই বাসভাড়া। সকালে বাজারের পয়সা দ্বিতীয় বউ তার মায়ের পেনশন থেকে দিচ্ছে। হিসেব চাইছে না, সুদেব তবু বাজার থেকে ফিরে খুচরো টাকা, দশটাকার নোট ড্রেসিংটেবিলের সামনে রেখে দিচ্ছে। দু’একটা চাকরির খোঁজ আছে, কিন্তু সেসব কাজ চব্বিশ ছাব্বিশ বছরের তরুণ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার করতে পারে। পেটে আলসার, ব্লাডপ্রেসার নিয়ে আর সুদেব সাইটে দাঁড়াতে পারবে না। টাকার প্রয়োজন থাকলেও সুদেব তাই অফার ফিরিয়ে দিচ্ছে। একটা অফিসজব পেলে অবশ্যই নেবে, মিষ্টির দোকানে খাতা দেখার কাজ থাকলেও নেবে। কিন্তু সুদেব সংসারী। সকালবেলাটা তার সংসারের কাজে বেরিয়ে যায়, মেয়ের সামনে মাধ্যমিক, মেয়েকে তাই অংক দেখায়, দুপুরটা কাটে বন্ধুদের পয়সায় চা-কফি খেয়ে আর সন্ধেটা নিজের পয়সায় বাংলা খেয়ে। ওয়েলিংটন থেকে দুবার বাস পালটে সুদেব বাড়ি ফেরে, কন্ডাকটাররা মুখচেনা হয়ে গেছে, দু’একদিনের বাসভাড়া বাকি রাখা যায়।
মেয়ের মাধ্যমিকের পর সুদেবের আর বাড়িতে মদ খাওয়ায় কোনো বাধা রইলো না। সে জন্তু না, সে মদ খেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে না আর তার দ্বিতীয় পক্ষের বউটাও ভালো। সুদেব তাই রাত্রে খাওয়ার টেবিলে বসে বরফঠাণ্ডা জলে বাংলা মেশায়। বউ আর মেয়ে শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে। সুদেব ভালো সংসারী হতে চেয়েছিল। দ্বিতীয়বারের সংসারে সে যে জিনিসটা প্রথম কিনেছিল তা হল মেয়ের জন্য খাট। অল্প টলতে টলতে এসে সেই খাটে এখন বেঘোরে ঘুমায় সুদেব। বউ-মেয়ে তার মদ্যপানে বাধা দেয় না, সুদেবও তাদের কাছে কিছুর দাবি করে না তবু তার বউ কালো জিরে দিয়ে কাটাপোনা রাঁধে। মাসে একবার করে গিয়ে সুদেবের দ্বিতীয় বউ মায়ের পেনশনের টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে আনে। সুদেব যে টাকা বন্ধুদের থেকে ধার নিয়েছিল সে টাকা ফুরিয়েছে, মদ খেয়ে আর সংসারের টুকটাক কাজে ফুরিয়েছে। মদ খেতে খেতে সুদেব নিজের ক্রমক্ষীয়মাণ শরীরের দিকে তাকায়। প্রথম বউয়ের কথা মনে করার চেষ্টা করে। মনে করার চেষ্টা করে বিয়েতে কী কী মেনু ছিল আর বউ চলে যাওয়ার পর প্রথম মাসটা সে কেমন বিছানায় ছটফট করত। ভাবতে ভাবতে সুদেব লুঙ্গির মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে নিজেকে খোঁজে। ভাবে একটা চাকরি পেলে পুজোয় ঘু্রতে যাবে। ভাবতে ভাবতে দ্বিতীয় সংসারের জন্য কেনা সিঙ্গল খাটে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে উঠে সুদেব আজকাল আর বাজারে যাচ্ছে না। বিগত কয়েকদিন ড্রেসিংটেবিলের উপর বাজারফেরতা খুচরো রাখেনি। ইচ্ছে করেই; মদের সঙ্গে চাট কেনার টাকাটাও বন্ধুদের থেকে হাত পেতে নিতে হাত কাঁপে। সুদেব বাজার ফেরতা দশ-বারো টাকার চানাচুর কিনে সিঙ্গল খাটের ম্যাট্রেসের নিচে রেখে দেয়। সুদেবের দ্বিতীয় স্ত্রীটি কোনো অশান্তি করেনি, নির্দ্বিধায় সুদেবের এলোমেলো বেডকভার গুছিয়ে দেয়। তার চোখে চানাচুরের খালি-ভর্তি প্যাকেট পড়েছে। অথর্ব মায়ের পেনশনের টাকা, সংসারের জন্য ঐ কটি টাকাই। সুদেবকে কিছু বলেনি। সুদেবের দ্বিতীয় স্ত্রী নিজেই চটের থলি নিয়ে বাজার করে আনে, সংসারের এটা ওটা দরকারের জিনিস কিনে আনেন। ঘুমচোখে সুদেব দেখে তার দ্বিতীয় বউ ফ্ল্যাটের দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে গেল।

Saturday, June 15, 2024

মসজিদে নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের তালাবন্দি করে আগুন, নিহত ১১

নাইজেরিয়ায় নৃশংস এক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে একটি নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের মসজিদে তালাবন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এক ব্যক্তি। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১১ জন মুসল্লি। আহত হয়েছেন কয়েক ডজন মুসল্লি। পুলিশ বলেছে, উত্তরের কানো রাজ্যের একটি  মসজিদে এক ব্যক্তি এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ওই ব্যক্তি মসজিদটির চারপাশে পেট্রোল ছিটিয়ে দিয়ে মসজিদের তালা আটকে দেয়। এরপর আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে আটকা পড়েন প্রায় ৪০ জন মুসল্লি। জমির উত্তরাধিকার নিয়ে একটি পরিবারের মধ্যে রেষারেষি থেকে এই হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে ৩৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, কানো রাজ্যে জেজাওয়া এলাকায় বুধবার ফজরের নামাজের সময় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লোকজন বলেছেন, আগুন ধরিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে আগুন। মসজিদের ভিতরে আটকা পড়ে আর্ত চিৎকার করতে থাকেন মুসল্লিরা। তারা বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাইরে থেকে তালা দেয়া থাকায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এক সময় প্রতিবেশীরা দৌড়ে ছুটে আসেন। তারা আটকে পড়া মুসল্লিদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন।

পুলিশ বলেছে, কানো শহর থেকে দ্রুত সেকানে বোমা বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মোতায়েন করা হয়েছে। পরে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, কোনো বোমা ব্যবহার করা হয়নি। ফায়ার সার্ভিস বলেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদেরকে কল করা হয়নি। তবে জানার পর তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। পরে পুলিশ বলেছে, উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের কারণে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ঘটনার সময় একটি পরিবারের কিছু সদস্য মসজিদে নামাজ আদায় করছিলেন। এটাকে সুযোগ হিসেবে বেছে নেয় হামলাকারী। উদ্ধার করা ব্যক্তিদের কানো রাজ্যের মুরতালা মুহাম্মদ স্পেশালিস্ট হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ইসলাম ধর্মীয় নেতা শেখ দাউদা সুলাইমান বলেছেন, নামাজ আদায়রত মানুষের ওপর এমন আচরণ সবচেয়ে বড় পাপ। এখন পুরো গ্রামবাসী শোকে স্তব্ধ।



মাইলের পর মাইলজুড়ে পচছে মরা মাছ

খরার কারণে শুকিয়ে গেছে একটি হ্রদ। এতে মারা গেছে হাজারো মাছ। সেসব সেখানেই পচে নষ্ট হচ্ছে। ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের তলদেশ পরীক্ষা করছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। হ্রদের তলদেশে এ সময় প্রচুর সংখ্যক আটকে থাকা মাছ দেখা যাচ্ছিল। ঘটনাটিকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক প্রভাব বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

প্রচণ্ড খরায় হ্রদ শুকিয়ে হাজারো মাছ মরে যাওয়ার এমন ঘটনা ঘটেছে উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, যে হ্রদটির পানি শুকিয়ে গেছে সেটির নাম বুস্টিলোস।

বর্তমানে এটির কিছু অংশে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ পানি কম রয়েছে। আর বাকি অংশ একেবারেই শুকিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এই হ্রদের তথ্য জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা সিনহুয়া।

মূলত এক সপ্তাহ আগে প্রচণ্ড রোদে হ্রদের পানি গরম হয়ে লেকের নিচে ফাটল তৈরি হয়। এরপর সেই ফাটল এবং কাদায় মরা মাছ স্তূপ হতে শুরু করে। বুধবার নাগাদ সেই মরা মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।

মরা মাছের আধিক্যের কারণে এলাকায় মাছি ও মশার উপদ্রবও বেড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কায় এসব মরা মাছ পরিষ্কার করতে শ্রমিক নিয়োগ করে কর্তৃপক্ষ।

সামগ্রিকভাবে মেক্সিকোতে তাপমাত্রা সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক দিন ধরে উচ্চ তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে দেশটির রাজধানীসহ বেশ কয়েকটি শহরে।

এই অঞ্চলে বর্তমান তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে। উত্তর আমেরিকার এই দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া চলতি উষ্ণ মৌসুমে গরমের কারণে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১২৫ জনের। 

বুস্টিলোস লেকে মরা মাছ। ছবি : সংগৃহীত
বুস্টিলোস লেকে মরা মাছ। ছবি : সংগৃহীত

গল্প- অন্তরঙ্গ দূরত্ব by ওয়াসি আহমেদ

অনেকক্ষণ বসে আছি। বাইরে বৃষ্টি, সঙ্গে বাতাস। উঠে যে পড়ব, উপায় নেই। অসময়ে নভেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎ বৃষ্টি কেন এ নিয়ে হাবিজাবি ভেবে সময় যখন আর কাটে না, ঘড়িতে দেখি বেলা দুটো। অচেনা মানুষের বাড়িতে ভরদুপুরে এভাবে বসে থাকা নিজের কাছে যেমন অস্বস্তির, বাড়ির লোকজনের জন্যও বিরক্তিকর। এদের সম্ভবত এখনো খাওয়া হয়নি, হতে পারে আমার কারণেই। এদিকে একটু পরপর জানালার ওপারে চোখ ফেলে আকাশ দেখা না গেলেও বৃষ্টি-বাতাসের দিকে তাকিয়ে আমি যেন একটা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছি। আসলে তো অজুহাত নয়। বৃষ্টি না হলে কি এতক্ষণ বসে থাকি? বাড়ির লোকজনও হয়তো তা-ই ভাবছে, ভাববারই কথা। তারপরও আমি যে বারবার জানালার দিকে চোখ ফিরিয়ে অজুহাতটাকে পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তমালের জন্য এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকবো আজ সকালেও কি ভেবেছি? আর এখন যখন তা-ই করছি, ভিতরে ভিতরে একধরনের হতাশা জমছে। তমালের অপেক্ষায় বসে আছি বলে, না বাড়ির লোকজন আমার কারণে খেতে পারছে না এ দুশ্চিন্তায়, ঠিক ধরতে পারছি না। হতে পারে দুটোর কোনোটাই নয়, কারণ পাগলাটে বৃষ্টি।

দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনের এই বাড়ির হোল্ডিং নম্বর ৫-৪-এ পেরেক দিয়ে মাথায় গাঁথা থাকলেও সহজে খুঁজে পাব আশা করিনি। ভয় ছিল, বাড়িটা চিনতে পারব না। এত বছরে সিটি করপোরেশন হয়তো বাড়ির নম্বর বদলে ফেলেছে, বা বাড়িটাই নেই, ডেভেলপার ভেঙে মাল্টিস্টোরিড করেছে। তবে ভরসা একটা ছিল। যে ঘিঞ্জি এলাকায় বাড়ি – তাও কুড়ি-একুশ বছর আগে যেমন দেখেছি – ডেভেলপার ঢুকবে কী করে! এছাড়া বাড়িটা বড়ও ছিল না, গা ঘেঁষাঘেঁষি অনেক বাড়িঘরের মধ্যে ছোটখাটো দোতলা। গাঢ় সবুজ রঙের পুরু কাঠের দুই পাল্লা দরজা রাস্তার কিনারে, এ দিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ, কয়েক পা এগোলে ডানপাশে সিঁড়ি, সিঁড়ির মুখে আবার দরজা, দুই পাল্লারই, রং হয়তো সবুজই ছিল। এতদূর পর্যন্ত ভালোই মনে ছিল। পরেরটুকু কিছুটা ঝাপসা। ঢোকার পর ছোট বাড়ির তুলনায় মোটামুটি বড়সড়ো বসার ঘর, হ্যাঁ, শুধু বসার-ই, খাট বা পড়ার টেবিল এরকম কিছুর স্মৃতি মাথায় ছিল না। পাশে সম্ভবত পরপর দুটো ঘর। কখনো ওদিকে যাওয়া পড়েনি। এর পরেরটুকু আবার মাথায় গোছগাছ করে সাজানো। রং-মরা রেড অক্সাইডের সরু খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই সিঁড়ির মুখে তমালের ঘর। আশপাশে আর কটা ঘর, এসব কি আর এত বছরে মাথায় থাকে!

সকালে একটা কাজে এসেছিলাম সূত্রাপুর। অকাজ বলাই ভালো। এক আত্মীয় টরন্টো থেকে একজনের হাতে একটা প্যাকেট পাঠিয়েছে। বাঙালিদের যা স্বভাব, কেউ দেশে যাচ্ছে শুনলেই কিছু না কিছু গছানো চাই। খুব প্রয়োজনের কিছু হলে বা যে আসছে সে চেনাজানা কেউ হলে আপত্তির কারণ থাকে না, কিন্তু যাকে-তাকে দিয়ে এটা-ওটা পাঠানো, আবার সেই জিনিস আনতে নিজে যাও বা লোক পাঠাও – গোটা ব্যাপারটাই ঝঞ্ঝাটের। এতে একধরনের গ্রাম্যতা থাকলেও থাকতে পারে। আমি জানি, রুবির কাজিন যে প্যাকেটটা তসলিম নামের টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সপড়া ছেলেটার হাতে পাঠিয়েছে ওতে হয়তো একটা মেয়েদের মিনি পার্টি ব্যাগ বা অ্যান্টি রিনকেল ক্রিম বা ওভার দ্য কাউন্টার কেনা যায় এমন কোনো গাঁজাখুরি ওষুধ-টষুদ রয়েছে। রুবি হয়তো নেড়েচেড়ে সেটা কাউকে দিয়ে দেবে, আবার এই তসলিম ছেলেটা ফিরে যাওয়ার সময় বদলা কিছু আড়ং বা পিংক সিটি থেকে কিনে গছাবে। যা-ই হোক, তসলিমের সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগেছে। মায়ের অসুখের খবর পেয়ে এসেছে, আসার পর তার ধারণা তাকে দেখেই মায়ের অসুখ ভালো হয়ে গেছে। বাসায় যেতে বলায় মাথা নেড়ে জানাল যাবে।

প্যাকেটটা নিয়ে বেরিয়েছি, রাস্তায় ভিড়-ভাট্টা, গাড়ি আনিনি ইচ্ছা করেই। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম কতকাল পর এলাম! পুরান ঢাকা খুব একটা বদলায়নি, আর রাস্তায় আগে যেমন একটা পাঁচমিশেলি গন্ধ পেতাম, সে-গন্ধটা পাচ্ছিলাম। এই গন্ধটা সম্ভবত আর কোথাও পাওয়া যাবে না। হরেকরকম দোকানপাটে হরেকরকম জিনিসের মাদকতাময় গন্ধ। আশ্চর্য লাগছিল গন্ধটা সেরকমই আছে। আবার এও ভাবছিলাম, সত্যি কি গন্ধটা একই রয়ে গেছে, না কল্পনা করে নিচ্ছি।

সত্যি হোক বা কল্পনা, মাদকতা যে একটা আছে পরিষ্কার টের পাচ্ছিলাম, আর তখনই মনে পড়েছিল তমালের কথা। হেঁটে রাস্তা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়েছিলাম। আশ্চর্য হচ্ছিলাম ভেবে দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনে যাচ্ছি এত বছর পর। খুব যে খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছে তা নয়। ভেবে রেখেছিলাম খুঁজে যদি না পাই, মহল্লার লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে তমালের খবর অন্তত পাওয়া যাবে, এমনকি তমাল বা তার পরিবার যদি দেশে ছেড়ে চলে গিয়েও থাকে।

তেমন কিছুর দরকার পড়ল না। বাড়িটা শুধু পেলামই না, অবাক হলাম এত বছরেও সিটি করপোরেশন আগের নম্বরটা বদলায়নি। তবে সবুজ রঙের দুই পাল্লা কাঠের দরজা-টরজা কিছু নেই, সে-জায়গায় ইটের উঁচু দেয়াল। বাড়িতে ঢোকার পথ বলতে এখন সরাসরি রাস্তা থেকে দুটো খাড়া সিঁড়ি। অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর দরজা খুলতে তমাল কি আছে জিজ্ঞেস না করে যা করা উচিত তা-ই করলাম। দরজা খুলেছিলেন এক বৃদ্ধ, জানতে চাইলাম তমালদের বাড়ি কি না। বৃদ্ধ মাথা নাড়তে আমি তমালের বন্ধু বলে ভেতরে ঢোকার ভঙ্গি করতে তিনি পথ করে দিয়ে বললেন, নাই।

ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে থেকে নাই-এর প্রতিক্রিয়ায় কী বলব ভেবে পেলাম না। আবার এ নিয়ে সোজাসাপটা কিছু জিজ্ঞেস করব কি না ভাবছি, তিনি বললেন, ‘আপনের নাম?’ জবাবে আমার মুখ ছিটকে তার আগের কথাটাই অন্যভাবে, হয়তো কোলাহল তুলে বেরোল, ‘নাই?’

বয়স হলেও ভদ্রলোকের রিফ্লেক্স ভালো, নাই-এর মানে চট করে পরিষ্কার করে বললেন, ‘আমি তো কইতে পারি না কই গ্যাছে, ভিত্রে গিয়া জিগাই, আপনে বহেন। নামটা কন নাই।’

নাম সাজ্জাদ শুনে তিনি একঝলক চোখ তুলে ডানপাশের দরজা ঠেলে সরে গেলেন। ফিরলেন পরপরই। অনেকটা নিজের মনে গজগজ করে বললেন, ‘মোবাইল ফালাইয়া যে ক্যান যায়, অহন হেরে কই বিছরাই!’

ভাবলাম এসেছি যখন, পাঁচ মিনিট বসি বা একটা চিরকুট রেখে যাই, কার্ডও রেখে যেতে পারি। তখনই এই বৃষ্টিটা।

এ তবে সেই বসার ঘর – ছোট বাড়ির তুলনায় বড়সড়ো! কী করে বলি, এ-ঘরে আগে কোনোদিন এসেছি। গাদাগাদি জিনিসপত্র চারদিকে। দুপাশে দুটো খাট, একটা তো একাই ঘরের প্রায় অর্ধেকটা  জুড়ে আছে। খাটের ওপরে রাজ্যের বালিশ, গোটানো তোশক, ভাঁজ করা কাঁথা-চাদর, রংজ্বলা ওয়াড়ের পাশবালিশ। মনে হলো রাতে মেঝেতেও বিছানা পাতা হয়। এছাড়া এক পাশের দেয়ালে পেরেকে ঝোলানো অন্তত ডজনখানেক হ্যাংগার। তাতে শার্ট, পাজামা-পাঞ্জাবি বাদেও কীসব জামাকাপড়। মাঝখানে একটা সেন্টার টেবিলের ওপর এ-ঘরের জন্য বেমানান কারুকাজময় মুরাদাবাদি ফুলদানিতে একতোড়া কাগজের ফ্যাকাশে গোলাপ। আর ধুলো। দুটোমাত্র বেতের চেয়ারের একটায় আমি, অন্যটায় বৃদ্ধ। এদিকে ঘরে একটু পরপর লোকজন ঢুকছে, কোনো দিকে না তাকিয়ে হ্যাংগার থেকে জামা টেনে পরছে, লুঙ্গির তলায় পাজামা টেনে ওঠাচ্ছে, খালি গায়ে শার্ট বা পাঞ্জাবি চড়াচ্ছে। এসবের ফাঁকে চোখে পড়ল বাঁপাশের দেয়ালে মরা গাঁদা ফুলের মালা ঝোলানো ছবিটা। তমালের বড়দা। একনজর তাকিয়ে ধরতে অসুবিধা হলো না। কী যেন নাম, বয়সে তমালের অন্তত দশ বছরের বড়, তমালের অনুপস্থিতিতে আমি এলে সমাদর করে এ-ঘরেই বসাতেন। ঢাকাইয়া না বলে শুদ্ধ বাংলায় জানতে চাইতেন, ‘কী খাবে বলো।’ মনে পড়ছে, নাম ছিল হিজল, তমাল সমাদ্দারের বড়দা হিজল সমাদ্দার। কাঠের ওই দুই পাট দরজার গায়ে নামটা কত দেখেছি।

বসে আছি তো আছিই। কথা নেই। বলতে ইচ্ছা করছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে বৃদ্ধ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চান। আমি মুখে খিল এঁটে রয়েছি দেখে নিজে থেকে উদ্যোগী হতে পারছেন না। শুধু এক ফাঁকে জানিয়েছেন তিনি তমালের জ্যাঠা, পরিবার নিয়ে এখন এখানে থাকেন। জবাবে কিছু না বলে আমি ঘাড় ফিরিয়ে বৃষ্টি দেখেছি, থামছে না বলে মনে মনে গালাগাল দিয়েছি।

দুটো পঁচিশ। আর বসা যায় না। বৃষ্টি ধরার লক্ষণ নেই। ঠিক করলাম রাস্তা পার হয়ে ওপারে গিয়ে কোনো দোকানের ছাউনিতে দাঁড়াব। সিএনজি অটোরিকশা যদি পাই ভালো, না হলে রিকশা করে যতটা যাওয়া যায়। ‘আসি তাহলে’ বলে উঠে দাঁড়াতে তমালের জ্যাঠাও ওঠার ভঙ্গি করলেন, উঠলেন না, বসে বসেই বললেন, ‘তমালরে কিছু কওয়া লাগব?’ আগে ভেবেছিলাম একটা চিরকুট বা কার্ড রেখে যাব, কিন্তু হঠাৎ উঠে পড়তে গিয়ে ইচ্ছাটা বাতিল করে বললাম, ‘নাহ্।’

বাইরের দরজাটা নিজে নিজেই খুললাম, তখনই ডানপাশের দরজা ঠেলে, ‘আপনি যাবেন না’ বলে বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশের যে মেয়ে বা মহিলা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল তাকে আগে দেখেছি বলে মনে পড়ল না।

এতক্ষণ ঠায় বসে থাকার বিপরীত চিত্র। এত সময়ে এক কাপ চা পর্যন্ত এলো না, আর এখন এ কোথা থেকে উড়ে এসে যেতে মানা করছে? তাকিয়ে আছি, মেয়ে বা মহিলাটা আমাকে অবাক করে বলল, ‘সাজুদা না? বদলাননি একটুও। আশ্চর্য, এত বছরে একটুও বদলাননি। আমি বাইরে ছিলাম, এসে শুনি কে একজন মেজদার জন্য বসে আছে, নাম বলল সাজ্জাদ, আপনার এ-নাম তা তো জানতাম না। আমি খুকি, খুকি। আপনি  বসেন, আমি কাপড় চেঞ্জ করে আসছি, একদম ভিজে গেছি।’

তমালের বোনের নাম ছিল খুকি। তাই তো। বছর দশ-বারোর খুকিকে এ-বাড়িতে এলে প্রায়ই দেখতাম সাড়া নেই শব্দ নেই, মাথা ঝুঁকিয়ে বসে কারো না কারো সঙ্গে দাবা খেলছে। সে-সময় এক ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্টে নাকি ফার্স্ট হয়েছিল। সেই খুকি এত বড় হবে এ-ই স্বাভাবিক – বিশ-একুশ বছর কম করে হলেও। চিনতে পারব না, এও খুব স্বাভাবিক, তবে ও যে এখন কথাবার্তায় চটপটে তা হয়তো বয়স বাড়ার কারণে।

খুকির কথায় খোলা দরজা বন্ধ করব কি না ভাবছি, এদিকে বৃষ্টির ছাঁটও লাগছে গায়ে, এমন সময় রিকশা থেকে যে নামল তাকে তমাল বলে চেনা বেশ কঠিন। ওর বাড়িতে ওর জন্য অপেক্ষা করছি বলেই হয়তো পারলাম। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে ও অযথাই কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজল, জামাকাপড়ের যেটুকু শুকনো ছিল তাও ভিজিয়ে একশেষ করে বলল, ‘সাজু!’

আবার সেই চেয়ারে। তমালের জ্যাঠা উঠে গেছেন। একটু পর তমাল জামাকাপড় বদলে মাথায় তোয়ালে ঘষতে ঘষতে ফিরে এলো, পেছন পেছন খুকি। খুকির হাতে রেকাবিতে ম্যালা খাবারদাবার। ঘরের খাবারের বদলে খুকিই নিশ্চয় এসব আনিয়েছে – নানরুটি, খাসির চাপ, কাবাব, দই। খুকি রেকাবিটা কাগজের গোলাপওয়ালা সেন্টার টেবিলে রাখল।

প্রচ- খিদা পেয়েছিল। ‘নে শুরু কর’ বলে তমাল পেস্নট এগিয়ে দিতে গোগ্রাসে শুরু করলাম। খেতে খেতে কতক্ষণ এসেছি, বাড়ি চিনলাম কী করে, এত বছরেও একই রকম কী করে আছি এসব নানা ফালতু প্রশ্ন করল তমাল, যেসবের জবাব দেওয়ার দরকার পড়ে না। রিকশা থেকে নামার সময়ই খেয়াল করেছিলাম তমালের বেশ একটা উপচানো ভুঁড়ি হয়েছে। খেতে খেতে দেখলাম, গায়ের রং আগে যেমন ফর্সার দিকে ছিল, তেমনি আছে, মাথাভরতি কোঁকড়ানো চুল ছিল, খুব একটা কমেনি; পাক ধরেছে কান ঘিরে। তবে আগে যা ছিল না, তা দুই চোয়াল ঘিরে ঘোর কালো মেচেতার দাগ, চোখের নিচটাও কালচে।

খেয়ে উঠে আবার সেই প্রশ্নগুলোই। বিশেষ করে বাড়ি খুঁজে পেলাম কী করে? এ যেন প্রশ্ন না, একটা ধাঁধা। বুঝলাম ও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। তবে মনে হলো যে-কথাটা সরাসরি বলতে পারছে না তা এই – কেন এসেছি? বা নরম করে বললে, এতো বছর পর কী মনে করে? যেভাবেই করুক, ও হয়তো ভাবছে প্রশ্নটা অভব্য। আর তাই অপেক্ষা করছে আমিই যেন মুখ খুলি। নিজে থেকে বলে কি ওর দুশ্চিন্তা দূর করব, না অপেক্ষা করব ও কীভাবে শুরু করে?

এত বড় ভুঁড়ি বানালি কী করে? – আমি বলি।

আর বলিস না, একশ একটা অসুখবিসুখ।

অসুখবিসুখে শরীর রোগা হয়, তোর তো উলটো, ভালো হয়েছে।

এর নাম ভালো? থাইরয়েডের গোলমালে শরীর ফুলে গেছে।

অসুখবিসুখ বাদ দে, অন্য খবর বল। বিয়ে তো করেছিস, ছেলেমেয়ে কী? তোর বউকে ডাক।

তমাল হাসল। বলল, এত বছর বাদে তোর সঙ্গে দেখা, আর আমরা কার কী নাম এও যেন ভুলে গেছি। কেউ কারো কোনো খোঁজ রাখিনি। তুই দেশে থাকলে বিয়ের সময় অন্তত খবর দিতাম। ছেলেমেয়ে দুইজন, মেয়ে ছোট, ক্লাস সিক্সে; ছেলে সামনে মাধ্যমিক মানে এখানকার এসএসসি দেবে।

এখানকার মানে?

ওরা তো ইন্ডিয়ায়।

বউ?

ওখানেই।

কলকাতায়?

শিলিগুড়ি। বউয়ের মামা-কাকারা ওখানে।

বউ-ছেলেমেয়ে কাছে নেই, তোর তো স্বাধীন জীবন।

মজা করার জন্য বললাম, তমাল মজায় যোগ দিলো না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তোর খবর কিছু কিছু জানি। জার্মানি থেকে ফিরে বড় ফ্যাক্টরি দিয়েছিস, মহাবড়লোক। একসময় ভেবেছি দেখা করতে যাই, হয়ে ওঠেনি রে। কিসের ফ্যাক্টরি?’

স্পিনিং।

তুই না লেদার টেকনোলজি পড়তে জার্মানি গেলি!

তোর মনে আছে?

ফ্যাক্টরি কোথায়, আশুলিয়ায়?

সাভার ইপিজেডে। খবরাখবর কিছু যখন জানতি খোঁজ করলে পারতি। আমি অবশ্য তোর কোনো খবর না জেনেই এলাম। বন্ধুবান্ধবও তোর ব্যাপারে কিছু জানে না। কার কাছে যেন শুনেছিলাম তোরা ইন্ডিয়ায় চলে গেছিস। আজ এখানে এসে তোর দেখা পাবো  ভাবিনি, আর বাড়িটা পেলেও এটা যে এখনো তোদেরই এ নিয়ে সন্দেহ ছিল।

কথা শেষ না করতেই তমাল বলল, ‘সন্দেহ কেন বলছিস, বল অনুমান, তোর অনুমান ঠিক। এটা শরিকি বাড়ি, আমার জ্যাঠা থাকেন পরিবার নিয়ে, এক কাকা ছিলেন, মারা গেছেন, তার ছেলেরা থাকে। আর আমি আর খুকি।’

খুকি কি এখনো দাবা খেলে? ওর তো এতদিনে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার কথা।

ওকে দেখে তোর কী মনে হলো? ও নিজেই মনে করতে পারবে না একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাবা নিয়ে পড়ে থাকত। বিয়েটা ভালোই হয়েছিল, ওর নিজের পছন্দে, টিকল না। একটা আট বছরের মেয়ে আছে, খুব সুন্দর, ওর বর মেয়েকে নিয়ে চলে গেছে, শুনেছি ব্যাঙ্গালোরে থাকে। খুকি এখানে একটা চাকরি করে, মন্দ না, ব্যাংকে, আজ মনে হয় ছুটি নিয়েছে।

কতক্ষণ চুপচাপ কাটে। বাইরে বৃষ্টি ধরে এসেছে। তমাল হঠাৎ বলে, ‘সিগারেট খাচ্ছিস না এতক্ষণ হয়ে গেল?’

খাই না। খাওয়ার পরিবেশ নাই।

কলেজে থাকতেই তো চেইন স্মোকার ছিলি।

তোকে কি ঘনঘন শিলিগুড়ি যেতে হয়? ওরা আসে না?

আমিই যাই। কী করব, প্রথমদিকে ভাবতাম এক পা এখানে, আরেক পা ওখানে, আর এখন ভাবি পা এখানে, মু-ুটা ওখানে।

এ নিয়ে আর কথা তুলি না। নতুন করে কিছু জানতেও ইচ্ছা করে না।

তবে তমাল হয়তো ভাবে কিছু তথ্য দেওয়া দরকার। বলে, ‘বড়দাকে তো মনে আছে? ইন্ডেন্টিংয়ের ব্যবসা করত, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের সোল ডিস্ট্রিবিউটার ছিল, এছাড়া নবাবগঞ্জে মেশিন-টুলসের দোকান। পনেরো বছর আগে বড়দা মারা গেল, আর আমরাও ডুবলাম। ইন্ডেন্টিংয়ের ব্যবসাটা পার্টনার দখল করল। মেশিন-টুলসের দোকান আমিই অল্প দামে ছেড়ে দিলাম। এরপর এটা-ওটা অনেক কিছু করলাম। বড়দার ছিল বিজনেস ব্রেন, আমি এ-জায়গায় ফাঁকা, তাও বড়দার দেখাদেখি কিছু যা শিখেছিলাম কোনো কাজে লাগল না। বড়দা মারা গেল একচলিস্নশ বছর বয়সে। এটা একটা বয়স মরার! বড়দা যদি থাকত এ-অবস্থা হতো না। ঘরের হাল তো দেখছিস, ওই যে সিঙ্গেল খাট, কোণের দিকে একটা পায়ার বদলে ইট, ওতে আমি রাতে ঘুমাই, খুকি ওপরতলায় বারান্দা ঘের দেওয়া হাতচারেক জায়গায় জেঠির মেয়ের সঙ্গে শোয়। এইটুকু বাড়ি, মানুষ কতজন ভাবতে পারবি না। বড়দা থাকলে …’

এতক্ষণে একটা জরুরি কথা জানতে ইচ্ছা জাগে। বলি, ‘বউদি এখন এখানে থাকে না, আর ছেলেমেয়েরা?’

‘নাই রে। সবাই একটা পথই চেনে। বউদি ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাইদের কাছে কলকাতায়। একটা মানুষ মরে যাওয়ায় কী অবস্থা চিন্তা কর। বড়দা যদি থাকত, এসব কিছু হতো না, হতে দিত না। বড়দার ব্রেনটা যদি আমার থাকত, আমিও হতে দিতাম না। কত কিছু করলাম, দাঁড়াতেই পারলাম না। কিছু করতে গেলে শক্তি তো দরকার, আমার শক্তি দ্যাখ’, বলে নাটুকে ভঙ্গিতে ঘাড়-মাথা পিছিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল।

খুকি চা নিয়ে ঢুকল। ভাবলাম পরিস্থিতি হালকা করতে ওর দাবা খেলার কথা তুলি। কিন্তু চায়ের কাপ নিতে গিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। খুকি পারল। ‘কেন আসেননি এতদিন?’ বলে যেন জেদ ধরল, কারণ জানা চাই। নিজের কাপ নিয়ে সে বড় খাটের এক কোণে সাবধানে বসল। পরিষ্কার বুঝতে পারছি ও আমাকে দেখছে, খুঁটিয়েই যেন। ওর নিজের ব্যাপারে যে কিছু জানতে চাচ্ছি না, এও হয়তো খুঁটিয়ে দেখার কারণ। হঠাৎ খুকি বলে উঠল, ‘মেজদাকে আজ আপনি নিয়ে যান। আপনার সঙ্গে থাকবে, অনেক রাত পর্যন্ত দুজন গল্প করবেন। নেবেন না?’

‘যাবি, চল।’ খুকির কথায় তমালের দিকে তাকিয়ে কথাটা না বলে পারি না। তবে বলার পরপরই টের পাই গা শিরশির করছে, ভালো লাগছে। সেই দুপুর বারোটা থেকে এখানে – এই বদ্ধ, দম-আটকানো চারকোনা গুদামের মতো ঘরের বাসি গন্ধে এই প্রথম একটা টাটকা ঘ্রাণ আমাকে চমকে দিলো।

চল, আজ আমরা একসঙ্গে থাকব।

তমাল সেদিকে গেল না। মেচেতা-ছিটানো চোয়াল আর কালি লেপ্টানো মরা, সাদা চোখে আমার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই থাকল। তারপর মেঝেতে বারকয়েক স্যান্ডেল ঘষে অনেকটা যেন নিজেকে চাঙ্গা করে বলল, ‘বলছিলাম না বড়দা বেঁচে থাকলে আমাদের এ দশা হতো না। বড়দা ছিল সিংহ রাশির, বল তো এ আমার দেশ, যুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, কোন শালা আমাকে কী বলে দেখি। জান দিয়ে দেবো, তবু আমার দাবি আমি ছাড়ব না। কোন সুখে বিদেশে থাকতে যাব, জাতভাইদের সঙ্গে উঠবস করলেই জনম ধন্য! কে কার জাতভাই?’

চল আমার সঙ্গে। খুকি ঠিক বলেছে আজ অনেক রাত পর্যন্ত তোর সঙ্গে আড্ডা দেবো।

বড়দার এক ফোঁটা জোর যদি আমার থাকত! একবার এরশাদ আমলে একটা রায়ট সাজানো হয়েছিল না? সরকারের স্পন্সার্ড রায়ট, ওই যে কালাচান্দ আর মরণচান্দের মিষ্টির দোকান লুট হলো, বড়দা একা একা গিয়ে চিৎকার করে বলল, তোরা মিষ্টিই খাবি তো খালি হিন্দুর দোকান লুট করে খাবি কেন, আলাউদ্দিনের দোকানও লুট কর, মুসলমান ময়রাও আজকাল মিষ্টি ভালো বানায়। কার বুকের পাটায় এমন শক্তি যে সামনে দাঁড়ায়।

খালি চায়ের কাপ ট্রেতে নিতে নিতে খুকি চোখেমুখে বিরক্তি ঝরিয়ে বলল, ‘বেশি বড়দা বড়দা করো না। সাহসে সব হয় না।’

কিসে হয়?

তুমি জানো না, আমাকে জিজ্ঞেস করো? কিসে হয়! আদিখ্যেতা। সাজুদা, আরেক কাপ চা?

মাথা নেড়ে মানা করে ওর দিকে তাকিয়ে বোকার মতো, গাধার মতো বলি, ‘তুমি কেমন আছ খুকি?’

একবার বলে ফেলে কথাটাকে ঠেকা দিতে অন্য কথাও বলতে হয়, ‘ব্যাংকের কাজ কেমন লাগে? এখান থেকে কত দূরে?’

এতটুকুতে থেমে গেলেও হতো। কিন্তু কী এক পাগলামিতে বলি, ‘তোমার মেয়ে নাকি খুব সুন্দর?’

মেজদা বলেছে? ভাগ্যিস, মেয়ে আমার মতো হয়নি, চোখমুখ অবিকল আমাদের মায়ের, গায়ের রংও। আপনি তো মাকে দেখেননি, না দেখেছেন?

মাথা নেড়ে জানাই দেখেছি। মুখে বলি, ‘চেহারা ঠিক মনে নাই।’  ‘দেখাই’, বলে সে চট করে তার মোবাইল ফোন খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরতে ভাবি ওর মায়ের ছবি, না দেখি পাঁচ-ছয় বছরের হাসিখুশি মেয়ের ছবি। সুন্দরই না, অপরূপা বললে মানায়। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবি, ভুলচুক যা করে ফেলেছি, আর নয়।

আমার মেয়ের নাম রূপকথা। কার রাখা জানেন? মেজদার। মেজদা যে এমন একটা নাম দিতে পারে ভাবা যায়?

খা না আরেক কাপ চা? তমাল জোরের ওপর বলে।

হ্যাঁ-না কিছু না বলে ভাইবোন দুজনকে দেখি। দুজন দুই জায়গায় বসা, একসঙ্গে এক ফ্রেমে দুজনকে ধরা যায় না। একবার একে, একবার ওকে দেখি। আবার শিরশির টের পাই, আবার একটা টাটকা সুবাস।

খুকি উঠে যায়। বুঝতে পারি চা আনতে।

বাইরে বৃষ্টি শুকিয়ে জানালায় কাঠের পাল্লায় আঠার মতো শেষ বিকেলের পাতলা আলো।

নরেন্দ্র মোদি কি এবারো জিতবে?

তমালের আচমকা প্রশ্নে ধাক্কা খাই। সে বলে চলে, ‘ইউপিতে কংগ্রেসই যাবে, মধ্যপ্রদেশেও মনে হয়, তাহলে কিন্তু বিজেপির কেস খারাপ। পশ্চিম বাংলায় তৃণমূল যত নষ্টামিই করুক, এক মমতার জোরেই বিজেপি-কংগ্রেস টিকতে পারবে না। ত্রিপুরার গতবারের ঘটনাটা আশ্চর্যের না? মানিক সরকার তো জানতাম ভালোই পপুলার, অনেস্টও।’

মনে হয় কথাগুলো সে হয়ত আনমনে বলছে। এমনও হতে পারে … কী হতে পারে ভাবতে গিয়ে মনে হয় তমাল হয়তো সবসময় ঠিক বুঝতে পারে না সে কোথায়?

দ্বিতীয় কাপ চা খেয়ে উঠি। খুকির দিকে তাকিয়ে ‘আসি’ বলে দরজামুখো হই। দরজা খোলে তমাল। সিঁড়িদুটো ভেঙে রাস্তায় নামতে দেখি সে আমার পাশাপাশি হাঁটছে। ওকে কি আবার বলব আমার সঙ্গে যেতে? মনে হয় না রাজি হবে। তারপরও কি বলব, যদি রাজি হয়?

একটা মোড় পেরোতে তমাল তড়বড় করে বলে ওঠে, ‘এই যে-গলিটা, সামনে ডানদিকে চলে গেছে এটা না আমাকে বিপদে ফেলে, শিলিগুড়িতে মালারা যেখানে থাকে সেখানে ঠিক এরকম একটা গলি, না দেখলে বিশ্বাস করবি না।’

বউয়ের নাম মালা? কোন মালা?

তমাল পা চালিয়ে পাশের ঘুপচি দোকান থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এসে বলে, ‘খাই না, আজ ইচ্ছা হলো, মনে কর তোর কারণে। কী সিগারেট না খেতি রে! মালাকে তোর মনে আছে? সেই মালা-ই, মালা আবার কয়টা, অভয় দাশ লেনের মালা, ওর দাদা বিমল পড়ত আমাদের এক ক্লাস নিচে।’

মালার কথা এতক্ষণে বললি!

আরে এ-মালা কি আর সে-মালা আছে! ওকে তোর মনে আছে ভাবিনি।

তমাল হঠাৎ থেমে পড়ে। সিগারেট-ধরা হাত মুখের কাছে এনেও নামিয়ে ফেলে। বলে, ‘একটা কথা বলি, মনে কিছু করবি না তো?’

মনে করব মানে?

তুই কি এমনি এমনি, মানে আমার খোঁজ করতেই …

মিথ্যা বলতে ইচ্ছা করে না। বলি, ‘এসেছিলাম সূত্রাপুরে, এই প্যাকেটটা আমার বউয়ের কাজিন কানাডা থেকে একজনের হাতে পাঠিয়েছে, এটা কালেক্ট করতেই এদিকে আসা। তো ভাবলাম, দেখি দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনের ৫/৪/এ বাড়িটা খুঁজে পাই কি না।’

স্যান্ডেলের তলায় জোরে জোরে আধখাওয়া সিগারেট ঘষে তমাল মুখ তুলে অপ্রস্ত্তত হাসে। দিনশেষের বিলীয়মান আলোয় তার মুখ বীভৎস দেখায়। কয়েক পা এগিয়ে বলে, ‘কত হাঁটবি, এখান থেকেই একটা কিছু ধর, আমি এই ডানপাশের গলিতে একটু ঘুরব। বলেছিলাম না গলিটা আমাকে বিপদে ফেলে? প্রায় দিনই এক পাক ঘুরি।’

এর নাম কি ফর্কিং পাথ্স? তমাল ডানদিকে এগোয়, আমি এদিকে-ওদিকে চোখ ফেলে রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁজি। যাব সোজা, কিছুদূর গিয়ে গলিটা বাঁয়ে ঘুরে গেছে।

মিথ্যা যদি বলতাম, যদি বলতাম ওর খোঁজ করতেই, ওকে দেখতেই এত বছর বাদে …

Thursday, June 13, 2024

বদরের যুদ্ধকে কেন বিশ্বের ইতিহাস নির্ধারক যুদ্ধের একটি মনে করা হয়? by ড. আকিল আব্বাস জাফরি

সৌদি আরবের মদিনা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে বদর হুনাইন প্রান্তর অবস্থিত। প্রায় ১৪০০ বছর আগে এই প্রান্তরে এক যুদ্ধ হয়, যাকে বিবেচনা করা হয় বিশ্বের অন্যতম ‘ইতিহাস-নির্ণায়ক’ যুদ্ধ হিসেবে।

আশ্চর্যের বিষয়, সামরিক দিক থেকে এই যুদ্ধে অংশ নেয়া মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু এই যুদ্ধের গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে, মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনেও এই দিনটিকে আল-ফুরকান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার মানে, সিদ্ধান্ত বা রায়ের দিন।

মদিনার নবজাতক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই যুদ্ধের গুরুত্ব বুঝতে হলে, আগে জানতে হবে কেন বদরের ময়দানটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এর নামকরণ হয়েছিল কীভাবে?

মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে পাহাড়ে ঘেরা এক প্রান্তর। ডিম্বাকৃতির সুবিশাল সেই প্রান্তরের প্রস্থ প্রায় সাড়ে চার মাইল।

আগে থেকেই একটি ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা ছিল এর। ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বাণিজ্য পথ গেছে এই পাহাড় ঘেরা জায়গাটির ওপর দিয়েই।

বণিকদের কাফেলা যাওয়ার সেই স্থানেই আবার মিলেছে মক্কা ও মদিনা থেকে আসা দুটি পথ।

এখান থেকে লোহিত সাগরও নিকটবর্তী। মোটে মাইল দশেকের দূরত্ব।

স্থানটির নামকরণ ‘বদর’ করার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা জানা যায়।

তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্যটি হলো, বদর বিন ইয়াখলাদ নামে এক ব্যক্তি এখানে একটি কূয়া খনন করেছিলেন।

কূয়ার পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ।

কথিত আছে, সেখানকার পানিতে চাঁদের প্রতিফলন ঘটতো। যেহেতু চাঁদকে আরবিতে বদরও বলা হয়, তাই উভয় দিকের সূত্র মিলিয়ে এই স্থানের নাম বদর রাখা হয়েছিল।

মা’আরিফ ইসলাম নামক বই থেকে জানা যায়, প্রাক-ইসলামী ‘জাহিলিয়া’ যুগে প্রতি বছর পহেলা জ্বিলকদ থেকে আটই জ্বিলকদ পর্যন্ত এই স্থানে একটি বড় উৎসব অনুষ্ঠিত হতো।

বদর যুদ্ধের কারণ

মদিনায় হিজরতের আগে মক্কার নেতৃস্থানীয়দের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল মুসলমানদের। তবে, পরবর্তীতে মক্কা ও মদিনার মধ্যে যুদ্ধের নেপথ্যে এটাই একমাত্র কারণ নয়।

দ্বিতীয় হিজরি বর্ষের রজব মাসের ১১ তারিখে মক্কার একজন গোত্র প্রধান আমর বিন আল-হাদরামি দুর্ঘটনাবশত মুসলমানদের হাতে নিহত হন। ইসলামের নবী স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে এই হত্যার জন্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করেন।

কিন্তু মক্কায় কুরাইশদের প্রধানরা এই ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়।

ইবনে খালদুন লিখেছেন, আমর ইবনে আল-হাদরামির মৃত্যুতেই বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট সূচিত হয়।

শা'বান মাসে ঘটে আরেকটি ঘটনা।

কুরাইশদের সম্পদ বোঝাই একটি কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় আসছিল। তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মুসলমানরা সেই বহরকে আক্রমণ করতে চায়।

আবু সুফিয়ান ছিলেন কাফেলার নেতা। তিনি সহায়তার জন্য মক্কায় দূত মারফত খবর পাঠান।

বার্তা পেয়ে মক্কা থেকে কুরাইশদের একটি দল আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে সাহায্য করার জন্য মদিনার উদ্দেশে রওনা হয়।

মা’আরিফ ইসলামির অনুসারে, সিরিয়া থেকে আগত কাফেলা মক্কায় পৌঁছে গিয়েছিল ঠিকই। অর্থাৎ, কুরাইশদের উচিত ছিল মদিনার দিকে যাওয়া কাফেলাকে ফেরত আনা।

কিন্তু, আবু জাহলের পীড়াপীড়িতে তারা মদিনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

১৬ই রমজান তারা বদর নামক স্থানটিতে শিবির স্থাপন করে। বলা হয়ে থাকে, এই পক্ষে লোক সংখ্যা ছিল নয়শো থেকে এক হাজার। তারা সবাই ছিল সশস্ত্র।

সংবাদ পেয়ে ১২ই রমজান ইসলামের নবীও বদরের উদ্দেশে অগ্রসর হন। ১৭ই রমজান ৩১৩ জন সঙ্গী নিয়ে তিনি ময়দানের কাছাকাছি পৌঁছান। খ্রিস্টাব্দে নিরিখে তারিখটা ৬২৪ সালের ১৩ই মার্চ।

তখন পর্যন্তও কুরাইশদের মধ্যে শান্তিপ্রিয় কিছু ব্যক্তি যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু, আবু জাহেলের একগুঁয়েমির কারণে তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

ফলে, যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে।

যুদ্ধের শুরু ও শেষ

যুদ্ধকৌশল অনুযায়ী মুসলমানদের সেনাদের দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল।

জুবায়ের বিন আল-আওয়ামকে একটি দলের অধিনায়ক মনোনীত করা হয়। কুদ বিন আমরকে নির্দেশ দেয়া হয় মাসরায় অবস্থান নিতে। মূল নেতৃত্বে ছিলেন নবী স্বয়ং।

বাহিনীর পেছনের অংশে থাকা কমান্ড অব সাকাহ’র দায়িত্ব কায়েস ইবনে সা’সা-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়।

যোদ্ধা দলটির সবচেয়ে বড় প্রতীক নিশানটি বহন করছিলেন মুসআব বিন উমাইর। মুসলমানদের পরিচয় ছিল ‘ইয়া মনসুর উম্মাহ’।

আরব ঐতিহ্য মেনে, একক লড়াইয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের শুরু হয়। এতে তিনজন কুরাইশ যোদ্ধা নিহত হন। তারপরে শুরু হয় মল্লযুদ্ধ।

যুদ্ধে, দুই তরুণ আনসার(যোদ্ধাদের সহায়তাকারী) মু’য়াওজ এবং মু’য়াজ মক্কার আবু জাহলকেও হত্যা করে।

এতে, মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধের পাল্লা ভারী হতে শুরু করে।

কুরাইশরা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল ঠিকই, তারপরও মল্লযুদ্ধের পর নবী মোহাম্মদের নির্দেশে মুসলমান যোদ্ধারা অতর্কিত কুরাইশদের উপর আক্রমণ করে।

এই অতর্কিত আক্রমণ যুদ্ধের চেহারা পাল্টে দেয়। আর কুরাইশ বাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে।

যুদ্ধে ৭০ জন গুরুত্বপূর্ণ কুরাইশ নেতা মারা পড়েন। ৭০ জনকে আটক করা হয়।

সিদ্ধান্ত হয়, চার হাজার চারশো দিরহাম মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেয়া হবে। আর, যারা লেখাপড়া জানতেন তারা দশ জন আনসারের সন্তানকে লিখতে ও পড়তে শেখাবেন।

বদর যুদ্ধের গুরুত্ব

এই যুদ্ধ ছিল নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

সম্ভবত সে কারণেই এটিকে বিশ্বের কয়েকটি ‘নির্ধারক যুদ্ধের’ অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও সংখ্যাগত দিক থেকে এটি বড় কোন যুদ্ধ নয়।

কেমব্রিজ হিস্ট্রি অব ইসলামের অনুসারে, এই যুদ্ধের রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় দুই ধরনের প্রভাবই ছিল। বইটি থেকে জানা যায়, মক্কার যেসব গুরুত্বপূর্ণ নেতা মারা যান, তাদের ছিল দৃঢ় প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক দক্ষতা।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও মক্কার যোদ্ধাদের পরাজয়ের ফলে একদিকে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং মর্যাদাহানি হয়। অন্যদিকে, এই যুদ্ধের পরে বদরের ওই বাণিজ্য পথ ব্যবহারের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।

মক্কার অর্থনীতি এই পথে পরিচালিত ব্যবসার উপর নির্ভরশীল ছিল, কেমব্রিজ’র হিস্ট্রি অব ইসলাম থেকে এমন তথ্যই মিলছে।

অর্থাৎ, কুরাইশদের দিক থেকে দেখলে, সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সিরিয়ায় তাদের বাণিজ্যের পথও অনিরাপদ হয়ে পড়ে। ফলে, অন্যান্য গোত্রের কাছে তাদের গুরুত্ব কমে যায়।

এই যুদ্ধে মক্কাবাসীরাই সর্বক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঠিকই। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায় সম্মান ও মর্যাদাহানি।

আরব অঞ্চলে কুরাইশদের মক্কার একটি বিশিষ্ট অবস্থান ছিল। একে অনেকটা আরবের রক্ষাকর্তার মতো বিবেচনা করা হতো।

কিন্তু একটি ছোট দলের হাতে সেই মক্কাবাসীদের পরাজয় আরবদের একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়।

হাদিস অনুসারে, সমগ্র অঞ্চলে এই পরাজয়ে কথা রটে যায়। অসম্মানের গ্লানি এড়াতে মক্কার লোকেরা কোনোরকম উচ্চবাচ্য ছাড়া নীরবে শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। বলে দেয়া হয়, কেউ যেন কোনো কবিতায়ও নিহতদের স্মরণ না করে।

এই নীরব শোকের পাশাপাশি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার তাড়নাও ছিল তাদের।

কেমব্রিজের তথ্যমতে, অন্যপক্ষে, বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তাদের ধর্মবোধ প্রবল হয়। নিজেদের এবং ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারেও উপলব্ধি জাগে তাদের মনে।

এই যুদ্ধের পর মুসলিমরা ওই অঞ্চলে একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। যা রাষ্ট্র হিসেবে মদিনাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

এমনকি এই বিজয় মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিদেরও বিমোহিত করে।

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বদরের যুদ্ধ। কারণ, এই প্রথমবার মুসলমানরা নবীর নেতৃত্বে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

মুসলমানরা পরাজিত হলে ইসলাম অস্তিত্ব সংকটে পড়তো। এমনকি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াও অসম্ভব ছিল না।

তাই এ দিনটিকে কোরআনে বিচার দিবস বলা হয়েছে।

মা’আরিফ ইসলামির বিশ্লেষণ বলছে, মুসলমানরা যুদ্ধের ময়দানে প্রথমবারের মতো নিজেদের শক্তি পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছিল, সেই দিক থেকে এটি ছিল ‘নির্ণায়ক’ যুদ্ধ।

শত্রুপক্ষের প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও জনবল থাকা সত্ত্বেও বিজয় তাদের সাহস বাড়িয়ে দেয়।

এর প্রভাবে উপদ্বীপের অন্যান্য গোত্রের মানুষদের মধ্যেও মুসলমানদের সামর্থের প্রতি সমীহ জাগে। তাদের আস্থা তৈরি হয় মুসলমানদের ওপর।

ড. আকিল আব্বাস জাফরি
ইতিহাসবিদ ও গবেষক, করাচি
২৯ মার্চ ২০২৪



কাতারে ব্লিঙ্কেনের বৈঠক, শঙ্কার মুখে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের প্রস্তাব

চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের হামাস-ইসরাইলের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র হামাসের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে হামাস তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু হামাসের এসব প্রস্তাব পর্যালোচনার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন জানিয়েছেন, হামাসের বেশ কিছু প্রস্তাব ‘অকার্যকর’ অর্থাৎ মেনে নেয়া সম্ভব নয়। এতে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে ফের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও মধ্যস্থতাকারী দশেগুলোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বুধবার কাতারের দোহায় হামাস-ইসরাইল যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অংশ নেন ব্লিঙ্কেন। এসময় কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান বিন জাসিম আল থানির সঙ্গে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে দীর্ঘ আলোচনা করেন তিনি। ব্লিঙ্কেন কাতারের প্রধানমন্ত্রীকে হামাসের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন বলে খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়েছে, হামাস এবার বেশ পরিবর্তনীয় একটি প্রস্তাব পেশ করেছে। এ বিষয়ে ব্লিঙ্কেন বলেছেন, আমরা বুধবার মিশর এবং কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে হামাসের পরিবর্তনগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। হামাসের প্রস্তাবে বেশ কিছু শর্ত রয়েছে যার কিছু কার্যকরী আবার এমন কিছু শর্ত রয়েছে তা মানা যাবে না।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গাজায় তিন পর্বের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে গত সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি ভোট হয় এবং প্রস্তাবটি পাস হয়।
জাতিসংঘে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর ওয়াশিংটন হামাসের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। পরে হামাস মার্কিন প্রশাসনের কাছে তাদের প্রস্তাবের খসড়া দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবে গাজায় স্থায়ী একটি যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও এ মুহূর্তে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা পরিষ্কার নয়।

হামাস বরাবরই স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে। এক্ষেত্রে অস্থায়ী কোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মানতে নারাজ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী ওই সংগঠনটি। হামাস বলছে, কোনো ধরনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর আগে তারা ইসরাইলের কাছে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা চায়। এছাড়া জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরাইলের কারাগার থেকে সকল ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে হামাস। যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপেই গাজার পুনর্গঠনে কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছে যোদ্ধা গোষ্ঠীটি।



Saturday, June 8, 2024

গাজায় ১৫ হাজার ৫০০ শিশুকে হত্যা: ইসরাইল বাহিনীকে কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবে জাতিসংঘ

গাজা যুদ্ধে সাড়ে ১৫ হাজারের বেশি শিশুকে হত্যা করেছে ইসরাইল বাহিনী। এজন্য জাতিসংঘ দেশটির সেনাবাহিনীকে কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়েছে। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকার সংস্থা বলছে, শিশুদের অধিকার রক্ষা না করার বিষয়টি সত্যিই লজ্জাজনক। গাজা যুদ্ধে ইসরাইল বাহিনী যেভাবে শিশুদের হত্যা করেছে তাতে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসে যে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন তা যথোপযুক্ত।

অ্যামিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, ১৫ হাজার শিশুকে হত্যা করা ইসরাইলের উচিত হয়নি। শিশুদের হত্যার এ তালিকা অত্যন্ত লজ্জার।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছরের অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের চলমান আক্রমণে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা কমপক্ষে ৩৬ হাজার ৭৩১ জনে পৌঁছেছে। হামলায় আরও ৮৩ হাজার ৫৩০ জন আহত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর হামাসের আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরাইল গাজা উপত্যকায় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি এই হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।



গাজায় ভারতের তৈরি বোমা দিয়ে হামলা ইসরাইলের

গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ভারতের তৈরি বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সম্প্রতি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় জাতিসংঘ পরিচালিত ওই শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলের যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়া বোমার ধ্বংসাবশেষে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ লেখা পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে গাজায় বোমাবর্ষণে ভারতীয় তৈরি সামরিক সরঞ্জামের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হল।

এ খবর দিয়েছে অনলাইন প্রেস টিভি। বৃহস্পতিবার ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে হামলার পরের চিত্র তুলে ধরা হয়। গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের ইসরাইলের যুদ্ধবিমান থেকে যে বোমা ফেলা হয়েছে সেই বোমার ধ্বংসাবশেষে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ লেখা পাওয়া গেছে। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ইউএনআরডব্লিউএ এর একটি বিদ্যালয়ে বিমান চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। এছাড়া ওই হামলায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অন্তত ৬ হাজার শরণার্থী তাদের আশ্রয় হারিয়েছেন।

প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলি নৃশংস হামলায় ভারতীয় অস্ত্রের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে উদ্বেগের বিষয়। কারণ গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালিয়ে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে তাতে ইসরাইলের সাথে ভারতের অংশগ্রহণের অতিরিক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। মে মাসের অফিসিয়াল রেকর্ডে দেখা গেছে ভারতের মিউনিশন ইন্ডিয়া লিমিটেড (এমআইএল) ইসরাইলে অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে।
এমআইএল ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি রাষ্ট্রয়াত্ত প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার এক্সপ্লোসিভ লিমিটেডও (পিইএল) ইসরাইলে অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে বলে জানিয়েছে প্রেসি টিভি।



অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে প্রতিদিন ১৬ লাখ মানুষ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন

অনিরাপদ খাদ্য গ্রহনে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে তথ্য দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শুক্রবার জেনেভায় জাতিসংঘের প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য উপস্থাপন করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ফ্রান্সেস্কো ব্রাঙ্ক। তিনি বলেছেন, খাদ্যবাহিত রোগাক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের জরিপ মতে বিশ্বে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি। এছাড়া ক্রমবর্ধমান এ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্য বিপর্যেয়ের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, এখনও অনেকেই খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে বিশ্বে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহন বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি জরুরি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অনিরাপদ খাদ্য বর্জনে সচেতন না হলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ও সৃষ্টি হতে পারে সতর্ক করেছেন ফ্রান্সেস্কো ব্রাঙ্ক। এ খবর দিয়েছে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে নিরাপদ খাদ্যকে মৌলিক বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে। সেক্ষেত্রে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহনে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় খাদ্য পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষকে নিরাপদ খাদ্য গ্রহনে উৎসাহিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
এছাড়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

এফএও এর কর্মকর্তা মার্কাস লিপ বলেছেন, নিরাপদ খাদ্য ভল উৎপাদন, পুষ্টি, পরিবেশ এবং জীবনকে সক্ষম করার এফএও’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অন্যতম পূর্বশর্ত। এক্ষেত্রে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপদ খাদ্য কর্মসূচি শতভাগ বাস্তবায়নে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Friday, June 7, 2024

জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে হামলার বিষয়ে ইসরাইলের কাছে স্বচ্ছতা দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

গাজায় জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে ইসরাইলের হামলার স্বচ্ছতা দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলের দাবি, ওই স্কুলে হামাস নেতারা অবস্থান করছিলেন। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নিহত হামাস নেতাদের পরিচয় প্রকাশ করতে বলেছে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার সকালে গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষদের ওই আশ্রয়স্থালে ইসরাইল বিমান থেকে হামলা চালায়। এতে কমপক্ষে ৩৫ জন নিহত জন।

স্থানীয় সাংবাদিকরা বলেছেন, একটি যুদ্ধবিমান থেকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে ওই স্কুলের উপরের তলায়। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের ওই স্কুলে আশ্রয় নেয়া মানুষদের রক্তে তখন ভেসে যায় স্কুল ক্যাম্পাস। ওই স্কুলে হামাসের কোনো সদস্য থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস। এর প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ওই আহ্বান জানিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

গাজায় এমন হামলা ঘন ঘন চালিয়েছে ইসরাইল।
কিন্তু তাদেরকে এমন স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মার্কিন দাবি খুব বিরল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেছেন, ইসরাইল বলেছে ওই স্কুলে ২০ থেকে ৩০ জন হামাস সদস্য ছিলেন। তাদেরকে টার্গেট করেছে তারা। এসব হামাস সদস্য, যাদেরকে তারা হত্যা করেছে, তাদের নাম প্রকাশ করতে হবে। নাম প্রকাশ করতে চেয়েছে ইসরাইল। আমরাও তাই চাই। একই সঙ্গে এই ঘটনার  অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কেও বিস্তারিত জানাতে হবে।

ওদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ডানিয়েল হাগারি হামাস ও ইসলামিক জিহাদ যোদ্ধাদের ৯ জনের নাম প্রকাশ করেছে। বলেছে, তারা হামলায় নিহত হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আরও তথ্য পাওয়ার পর তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করা হবে। ম্যাথিউ মিলার বলেন, ওই হামলায় ১৪টি শিশু নিহত হয়েছে বলে রিপোর্ট দেখতে পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা কোনো সন্ত্রাসী নয়।


 

জেলে ইমরান খানকে যে সুবিধা দেয়া হচ্ছে

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নিঃসঙ্গ কারাভোগের দাবির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে তথ্যপ্রমাণ জমা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। জাতীয় জবাবদিহিতা ব্যুরোর (এনএবি) আইন সংশোধনকে চ্যালেঞ্জ করে আপিলের শুনানিকালে বৃহস্পতিবার এসব তথ্যপ্রমাণ সুপ্রিম কোর্টে জমা দেয় সরকার। ইমরান খান বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বন্দি আছেন। পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ প্রধানও তিনি। তাকে ওই জেলখানায় কি কি সুবিধা দেয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে তার কারাকক্ষের ছবি। ইমরান খান দাবি করেছেন তাকে নিঃসঙ্গ কারাগারে রাখা হয়েছে। তিনি ডিভিশন পাচ্ছেন না। এর জবাবে সরকার তাকে দেয়া সুবিধাগুলোর ছবি জমা দিয়েছে। তাতে দেখা যায় তাকে শরীরচর্চা করার জন্য একই এক্সারসাইজ বাইক, একটি  স্ট্রেচিং বেল্ট দেয়া হয়েছে।
আছে বই, একটি আলাদা রান্নাঘর, একটি বিশেষ মেন্যু, হাঁটার জন্য আছে একটি এক্সক্লুসিভ গ্যালারি, একটি রুম কুলার এবং একটি পড়ার টেবিল। জেলকক্ষে দেয়া সুবিধার শুধু ছবি এবং নামই আদালতে জমা দেয়নি সরকার, একই সঙ্গে তার সঙ্গে জেলে কে কে তার সাক্ষাৎ করতে গেছেন- তাদেরও নাম জমা দিয়েছে। এ শুনানির সময় জেল থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে যুক্ত হন ইমরান খানও। বৃহস্পতিবার আপিলের শুনানি করেন প্রধান বিচারপতি কাজী ফয়েজ ইসার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বড় একটি বেঞ্চ। শুনানিকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী খাজা হারিসকে তার মক্কেল ইমরান খানকে সাক্ষাৎ করাতে বলেন। ইমরান খান এনএবি’র আইন সংশোধনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার আবেদনের বিষয়ে এর আগে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ এনএবি’র আইন সংশোধনকে বাতিল করে দেয়। তাদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে কেন্দ্রীয় সরকার। শুনানিকালে গতকাল পাকিস্তান পিপলস পার্টির আইনজীবী ফারুক এইচ নায়েক সুপ্রিম কোর্টকে বলেন, ওই রায়ের বিভিন্ন পয়েন্ট লিখিতভাবে জমা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের ওপর আমার যুক্তি লিপিবদ্ধ করেছি। প্রধান বিচারপতি ইসা জানতে চান ওই আইনজীবীর কাছে যে, তিনি কি জমা দেয়া ডকুমেন্টে আদালতের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন। জবাবে নায়েক বলেন, তিনি বিচারক মানসুর আলি শাহের নোটকে সমর্থন করেন।


 

ভারতে লোকসভার এমপিরা এত্ত সুবিধা পান!

ভারতে লোকসভা নির্বাচন শেষ। জোটবদ্ধভাবে এগিয়ে থাকা এনডিএ সরকার গঠনের পথে রয়েছে। পথ একেবারে ছেড়ে দেয়নি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটও। তারা এখনও পরাজয় স্বীকার করেনি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে কিংমেকারদের সঙ্গে উভয় পক্ষের চলছে প্রকাশ্যে এবং গোপনে দেনদরবার, দর কষাকষি। এ লক্ষ্যে তারা এরই মধ্যে দিল্লি পৌঁছেছেন। চলছে দরদাম। কিংমেকাররা যেদিকে ঝুঁকবেন, সেই পাল্লাই ভারি হবে এবং সরকার গঠন করবে। তবে সব মিলে ২৯৩ আসনে এগিয়ে থাকায় এনডিএ জোট সরকার গঠনের ডাক দিয়েছে। সে লক্ষ্যে শনিবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার কথা ছিল নরেন্দ্র মোদির।
কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা একদিন পিছিয়ে রোববার সন্ধ্যা করা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, মিত্রদের সঙ্গে দর কষাকষির জন্য এই সময়ক্ষেপণ। সে যা-ই হোক। নির্বাচিত এমপিরা কত বেতন পান এবং আনুষঙ্গিক আর কি কি ভাতা পান, তা এক নজরে দেখে নেয়া যাক। ভারতে লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচিত একজন এমপি বেসিক হিসেবে এক লাখ রুপি পান। ২০১৮ সালে মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবন ধারনের খরচ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে প্রতিটি আসনের জন্য একজন এমপি পান ৭০ হাজার রুপি। এই খরচ দিয়ে তিনি এলাকায় অফিস এবং অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করেন। অফিস খরচ হিসেবে মাসে ৬০ হাজার রুপি পান একজন এমপি। এর মধ্যে আছে স্টেশনারি, টেলিযোগাযোগ স্টাফ বেতন ইত্যাদি। পার্লামেন্ট অধিবেশন চলাকালে এবং কমিটির মিটিংয়ের সময় একজন এমপি প্রতিদিন দুই হাজার রুপি এলাউন্স হিসেবে পান। অবস্থান, খাদ্য ও অন্য খরচ বাবদ এই অর্থ দেয়া হয়। একজন এমপি প্রতি বছর নিজের এবং তার পরিবারের সদস্যদের জন্য দেশের ভিতর বিনা ভাড়ায় ৩৪টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে সফর করতে পারেন। সরকারি কাজ ও ব্যক্তিগত সফরের জন্য তারা ট্রেনে বিনামূল্যে ফার্স্ট ক্লাস সফরের সুযোগ পান। নিজের সংসদীয় এলাকার ভিতরে সফর করার জন্য তারা মাইলেজ হিসেবে এলাউন্স পান। ক্ষমতায় থাকা ৫ বছর সময়ের জন্য তাদেরকে উন্নত এলাকায় বিনামূল্যে আবাসন সুবিধা দেয়া হয়। সিনিয়রিটির ভিত্তিতে তারা বাংলো, ফ্লাট বা হোস্টেল রুম পান। যারা এসব সুবিধা নেবেন না তারা গৃহায়ন বাবদ মাসে দুই লাখ রুপি দাবি করতে পারেন। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হেলথ স্কিমের অধীনে তারা এবং পরিবারের সদস্যরা বিনামূল্যে চিকিৎসা নিতে পারেন। এর আওতায় থাকা বেসরকারি হাসপাতাল এবং সরকারি হাসপাতালে তারা এ সুবিধা নিতে পারেন। পার্লামেন্টের সাবেক একজন এমপি প্রতি মাসে পেনশন হিসেবে পান ২৫ হাজার রুপি। অতিরিক্ত সময় দায়িত্বে থাকলে মাসে দুই হাজার রুপি করে ইনক্রিমেন্ট পান। বছরে একজন  এমপি বিনামূল্যে এক লাখ ৫০ হাজার টেলিফোন কল করতে পারেন। অফিস এবং বাসায় উচ্চ গতির ইন্টারনেট সংযোগ পান বিনামূল্যে। ৫০ হাজার ইউনিট বিদ্যুত এবং চার হাজার কিলোলিটার পানি বছরে দেয়া হয় বিনামূল্যে।

Thursday, June 6, 2024

জাতিসংঘের স্কুলে ইসরাইলের বিমান হামলা, নিহত ২০

গাজার মধ্যাঞ্চলে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে কমপক্ষে ২০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামাস-ইসরাইল সংঘাতের পর থেকে স্কুলের ভবনটি শরণার্থীদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। স্থানীয় সূত্রের বরাতে এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

স্কুলটিতে কয়েকশ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে ইসরাইলের দাবি হামাসের যোদ্ধারা নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছিলেন স্কুলের ওই ভবন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা জাতিসংঘের একটি স্কুলে হামলা চালিয়েছে যেখানে কয়েকশ হামাস যোদ্ধারা লুকিয়ে ছিল।

তবে ইসরাইলের ওই হামলায় নিহতের সংখ্যা ২৭ বলে দাবি করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এক বিবৃতিতে ওই হামলাকে ‘ভয়াবহ গণহত্যা’ বলেও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। এছাড়া স্থানীয় সংবাদদাতার মাধ্যমেও এই হামলার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি। ওই প্রতিনিধি জানিয়েছে জাতিসংঘের ওই স্কুলের উপরের তলায় দুটি শ্রেণিকক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে ইসরাইলের বিমান বাহিনী। এতে শ্রেণীকক্ষ দুটি গুড়িয়ে গেছে।

হামলার পর সেখানে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে ফিলিস্তিনিদের সহায়তা কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার কর্মীরা।
তারা সেখান থেকে আহতদের হাসপাতালে সরিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে আহতদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।

উল্লেখ্য, গত আট মাসে ইসরাইলের হামলায় গাজায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৫৮০ ফিলিস্তিনি। আহতের সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি। জাতিসংঘ বলছে হতাহতের বেশির ভাগ নারী ও শিশু।



Wednesday, June 5, 2024

জেনারেল আজিজের তেলেসমাতি by শরিফ রুবেল

 আজিজ আহমেদ। ডাক নাম ফারুক। এক সময়ের মহাপরাক্রমশালী জেনারেল। কাজ করতেন খেয়াল-খুশিমতো। তিনি একজন আদর্শ ভাইও বটে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ভাইদের বাঁচাতে আজিজ আহমেদের ভূমিকা ছিল অভাবনীয়। সন্ত্রাসী ভাইদের নানা সুবিধা, ফাঁসি থেকে বাঁচানো, ব্যবসায়িক সহায়তা, অনৈতিক সুবিধা, সন্ত্রাসীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ গায়েব, নাম পরিবর্তন, ভুয়া এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা, ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি, গাড়ি, হোটেল-রিসোর্ট এমনকি বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনে ভাইদের সহায়তা করেছেন এই দাপুটে জেনারেল। আলোচিত ছিলেন নিজের কর্মগুণেও। শুধু ভাইদের জন্য নয়। নিজেও রিসোর্ট, বাংলোবাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, শত বিঘা জমি কিনে তেলেসমাতি দেখিয়েছেন।
অনিয়ম ও পদ ব্যবহার করে দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন আজিজ। দেশ জুড়ে তাকে নিয়ে চলছে নানা আলোচনা- সমালোচনা।

নামে-বেনামে যত সম্পদ: মানবজমিনের অনুসন্ধানে আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে। রাজধানীর তুরাগ নদ ঘেঁষা আমিনবাজার বড় বরদেশী মৌজায় সিলিকন সিটি হাউজিংয়ে আরএস ১৩০৩ নং দাগে ৭৫ কাঠা, ১৩১১ নং দাগে ৩০.৬ কাঠা, ১৭৬১ দাগে ৮০ কাঠা জমি রয়েছে আজিজ আহমেদের। ওই জমিতে তার একটি বাংলো বাড়ি রয়েছে। উঁচু দেয়ালে ঘেরা বাড়িতে হরেক রকম গাছ ও পশুপাখি লালনপালন করা হয়। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন আনসার সদস্যরা। সময় পেলেই এই বাড়িতে ছুটে যান আজিজ আহমেদ। মাঝেমধ্যেই স্কুল- কলেজের বন্ধুদের নিয়ে এই বাড়িতে আড্ডা দেন। এমন কয়েকটি ছবিও মানবজমিনের হাতে রয়েছে। সিলিকন সিটি হাউজিংয়ে আজিজ আহমেদের বড় ছেলে ইরফান আহমেদ সাদিব পরিচালক পদে রয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্ট সিলিকন সিটির সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া সিলিকন সিটিতে আজিজ আহমেদের ছোটভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফের নামে প্রায় ২০০ কাঠা জমি আছে। অভিযোগ রয়েছে, জেনারেল আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় সিলিকন সিটি হাউজিংয়ের এমডি সরোয়ার খালেদকে জমি দখলে সহায়তা করায় আজিজ ও তার পরিবারকে এই সম্পত্তি উপহার দেয়া হয়।

সিলিকনের ম্যাপেও আজিজ পরিবারের সম্পত্তির নির্দেশিকা দেখা গেছে। এ ছাড়া আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের মনোসন্তোষপুর মৌজায় পূর্ণিমারচালা এলাকায় আরএস ১৭১ ও ১৭২ নং দাগে আজিজ আহমেদের প্রায় ২১ বিঘা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের স্থানীয় ঈমান আলী, আব্বাস উদ্দিন, খোরশেদ আলম ও ফারুকের মাধ্যমে এই জমি কেনেন আজিজ আহমেদ। ১৭১ দাগের জমিতে উঁচু প্রাচীরঘেরা একটি বাংলোবাড়ি আছে। পাশের ১৭২ দাগে ইটের রাস্তার পাশে প্রায় ৫ বিঘা জমি বাউন্ডারি করে রাখা আছে। ভেতরে ছোট্ট একটি ঘরে আজিজ আহমেদের বাসার কাজের লোক সাবেক সৈনিক মাইন উদ্দিন সুমন তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তিনি প্রায় ২ বছর ধরে এই সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে আছেন। সরজমিন গিয়ে আজিজ আহমেদের জমির নিরাপত্তারক্ষী মাইন উদ্দিন সুমনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমার বাড়ি বছিলা ঘাটারচর। আমি আজিজ স্যারের বাসায় কাজ করতাম। অবসরে যাওয়ার পরে আমারও চাকরির মেয়াদ শেষ হয়। পরে আমি এখানে চলে আসছি। এই জমির মালিক কে জানি না। তারা (আজিজ) আমাকে এখানে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি দায়িত্ব পালন করছি। আমার কাজ শুধু দেখাশোনা করা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, আজিজ আহমেদ প্রায়ই এই জমি দেখতে আসেন। আশুলিয়া জিরাবোর ফারুক হোসেন তাকে এই জমি কিনে দিয়েছেন। ২০১৮ সালে  সেনাবাহিনীর গাড়ি নিয়েই তিনি এখানে আসতেন। এখন কম আসেন। তার ভাই জোসেফ ২  থেকে ৩ মাস পর পর আসেন। কয়েকটি গাড়ি নিয়ে আসেন। জমি দেখে আবার চলে যান। শুনেছি আজিজ আহমেদ জমিগুলো ফারুক হোসেন ব্যাপারীর নামে কিনেছেন। পরে তার কাছ থেকে পাওয়ার নিয়ে রেখেছেন।

তার মনোসন্তোষপুর মৌজায় ৫০ বিঘার উপরে জমি আছে। ফারুকের যত জমি সবগুলোই আজিজ আহমেদের। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর রামচন্দ্রপুর মৌজায় জাকের ডেইরি ফার্মের অপর পাশে আরএস ৫৮২ নং দাগে আজিজ আহমেদের ৪ কাঠার দুটি প্লট আছে। প্লট দুটির দাম আনুমানিক ৬ কোটি টাকা। ওই প্লটে আজিজ আহমেদের নামে সাইনবোর্ড ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পরদিন ওই সাইনবোর্ড সরিয়ে নেয়া হয়। একই মৌজায় মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড ৪ নং রোডে কুবা মসজিদের গলিতে ৯৯ নং বাসায় আজিজ আহমেদ ও তার ভাইদের নামে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বাড়িটি নির্মাণ করা ইউনিক হোল্ডিংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৫ সালে বাড়িটি নির্মাণের সময় আজিজ আহমেদের ভাইয়েরা নির্মাণে বাধা দেন। প্রায় ৫ মাস নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। পরে তাদের ফ্ল্যাট দেয়ার শর্তে নির্মাণকাজ শেষ করা হয়। ওই বিল্ডিংয়ে তাদের নামে কয়েকটি ‘দানের’ ফ্ল্যাট রয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের ওই ফ্ল্যাট দিতে হয়েছে। তাই দানের ফ্ল্যাট বললাম। এ ছাড়া ভাকুর্তা ইউনিয়নের বাহেরচর এলাকায় শ্যামলাপুর মৌজায় আজিজ আহমেদের নামে বেশ কিছু প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শ্যামলাসি কলাতিয়া পাড়ার পেছনে জমজম হাউজিংয়ের রাস্তার ডান পাশে ৮০ শতাংশের প্লট, এর একটু দূরেই ৫০ শতাংশের আরেকটি প্লট আছে আজিজ আহমেদের। এ ছাড়া শ্যামলাসি দুদু মার্কেট এলাকায় অ্যাকটিভ প্রিক্যাডেট স্কুলের পাশে ১৭ শতাংশের একটি প্লট রয়েছে তার। ওই জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। ভাকুর্তা ইউনিয়নের শ্যামলাপুর মৌজার বাহেরচর ও লুটেরচর এলাকায় আজিজ আহমেদের সহায়তায় বিপুল পরিমাণ জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বড় ভাই আনিস আহমেদের ছেলে আসিফ আহমেদের বিরুদ্ধে। সিএস ৩৪৩ ও ৩৪৪, আরএস ২৫০২ দাগে ৭৮ শতাংশ। জমিটি আগে সেজান জুসের মালিকানায় ছিল।

 এ ছাড়া শ্যামলাপুর মৌজায় আরএস ২৬৬৪ দাগে ৯৮ শতাংশ জমি আছে। জমিটি আগে ছিল লুটেরচর বড় মসজিদ ও বছিলা মসজিদের। এই জমিতে ৩৮টি প্লট তৈরি করে চারদিকে প্রাচীর দিয়ে রাখা হয়েছে। পাশের প্লটেই এসএ ৮২৫, আরএস ২৫০০ ও ২৫০১ দাগে আজিজ আহমেদের বোন জামাই নুরুল ইসলামের ৩৯ শতাংশ জমি রয়েছে। এই জমির মালিক ছিলেন খোরশেদ আলম। পুরো জায়গাটি ইটের প্রাচীর তৈরি করে জিনি পাওয়ার টেকনোলজি লিমিটেডের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া চরওয়াশপুরে আসিফের নামে ৫২ শতাংশ জমি আছে। এই জমির একটি সাইনবোর্ড প্রতিবেদকের কাছে আছে। শ্যামলাসি স্কুলের পাশে রাস্তা থেকে নেমে আরএস ২৮৮৬ দাগে ৫ কাঠা জমিতে আজিজ আহমেদের একটি একতলা বাড়ি আছে। ওই বাড়িটি তিনি তার বোনকে লিখে দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আজিজ পরিবারের যত বাড়ি: মিরপুর ১২ নম্বরের সিরামিক ৪ নং গেইটের পাশে বঙ্গবন্ধু কলেজ রোডে ৫ কাঠার প্লটে আজিজ আহমেদের একটি ১০তলা বাড়ি রয়েছে। বাউনিয়া মৌজায় বাড়ি নং ১৩/১৪ ব্লক ডি, এভিনিউ-২, মিরপুর-১২, পল্লবী। ওই বিল্ডিংয়ে ২১টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ২০১৮ সালে বাড়ি নির্মাণের পরে হাউজিং কোম্পানির কাছ থেকে বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নেন আজিজ আহমেদ। গত ২৫শে মে বাড়িটির নামফলক মুছে ফেলা হয়। ভবনের অধিকাংশ ফ্ল্যাট ফাঁকা আছে।

এলাকাবাসী জানান- আজিজ আহমেদের ম্যানেজার বাড়িটি বিক্রির জন্য স্থানীয় জমি কেনাবেচাকারীদের কাছে দৌড়ঝাঁপ করছেন। অনেকে বাড়ি দেখেও গেছেন। তবে বিক্রি হয়েছে কিনা তা কেউ বলতে পারছে না। মিরপুর সিরামিক ৪নং গেইটের ঠিক উল্টোপাশে বাউনিয়া মৌজায় ৩ কাঠা প্লটে আজিজ আহমেদের টিনশেডের আরেকটি বাড়ি রয়েছে। বাড়ির সম্মুখভাগে ৪ থেকে ৫টি দোকান রয়েছে। যা ভাড়া দেয়া আছে। সিরামিক রোডের ১০তলা ভবনের বিষয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা হলে তারা মানবজমিনকে বলেন, আজিজ আহমেদের এখানে বাড়ি আছে, এটা জানে না, এই এলাকার এমন কোনো মানুষ নেই। ২০১৮ সালে বাড়িটি নির্মাণের সময় তিনি নিজে এসে দেখভাল করতেন। প্রায় প্রতিদিন আসতেন। পাশের চা দোকানি আলামিন মিয়া মানবজমিনকে বলেন, এই রোডে ১০ তলা একমাত্র বিল্ডিংই আজিজ আহমেদের। সেনাপ্রধানের লাল বিল্ডিং বললেই যে কেউ দেখিয়ে দিবে। রিকশাওয়ালাকে বলতেই নিয়ে আসবে। এই রোডে তার আরও একটি প্লট আছে। সামনে গিয়ে দেখেন তার নাম লেখা সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে। ওই সাইনবোর্ডে আরেকজন অফিসারের নামও আছে। মনে হয় শেয়ারে জমি কিনেছেন। মিরপুর ডিওএইচএসে আজিজ আহমেদের ১টি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। রোড নং ১৩, প্লট নং ১৩২০, এভিনিউ-২, মিরপুর ঢাকা। ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল আজিজ আহমেদের একটি বিশাল বাংলোবাড়ি রয়েছে। হাউজ নং-০৩ (পথিকৃৎ) ঢাকা সেনানিবাস। এই বাড়িতে তিনি দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখি পালন করেন। এ ছাড়া কুর্মিটোলা গল্‌ফ ক্লাবের পাশে নিকুঞ্জ-১ এর ৬ নম্বর রোডের মাথায় আজিজ আহমেদের একটি আলিশান বাড়ি রয়েছে। বাড়ি নং- RCF9+F5P, বাড়ির নাম আজিজ রেসিডেন্স। মিরপুর সিরামিক গেইটে আজিজ আহমেদের টিনশেড বাড়ির পাশের ৩০ নং প্লটের মালিকানা নিয়েও স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধ চলছে। মো. হোসেন ফারুক লিটন নামের এক ব্যক্তি বর্তমানে ওই জমির ভোগদখলে আছে। স্থানীয় এক ফার্মেসি দোকানি মানবজমিনকে বলেন, এই জমি যার দখলে আছে সেই লিটন সাবেক সেনাপ্রধানের লোক। তার বলেই তিনি এই জমিতে আছেন। আজিজ আহমেদ মাঝেমধ্যে এখানে এসে জমির সামনে দাঁড়িয়ে লিটনের সঙ্গে কথা বলেন। তখন এলাকার কেউই এখানে আসার সাহস পান না।

পরিবারের সদস্যদের বাড়ি দখল: আদাবরের বাইতুল আমান হাউজিংয়ের ৮ নম্বর রোডের মাথায় জমি দখল করে বিলাসবহুল একটি ১০ তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন আজিজ আহমেদের ভাই জোসেফ আহমেদ। বাড়ি নং ৫৪/১৯ এ, ব্লক#ক# ১২। বাড়ির নাম মায়ের আঁচল। এ ছাড়া পাশেই আজিজের ভাতিজা আসিফ আহমেদেরও একটি বাড়ি রয়েছে। বাড়ি নং ৫৪/১৯ বি, ব্লক # ক # ১২। বাড়ির নাম ডায়মন্ড রিজেন্সি। বাড়িটি নির্মাণে প্রায় ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ ছাড়া আদাবর নবোদয় হাউজিংয়ের ৫ নং রোডের এ ব্লকে ৭ নং বাড়িটিও আজিজ আহমেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে দখল করে নেন জোসেফ। পরে ওই বাড়িটি জোসেফের বোন জামাই নুরুল ইসলামকে দেয়া হয়। মাস চারেক আগে  মোহাম্মদপুর নুরজাহান রোডের ফিলবার্ড ক্যাবল অফিসের উল্টো পাশে একটি টিনশেড বাড়ি দখলে নেন জোসেফ।

হারিছের হাউজিং দখল: বাড্ডার সাতারকুলে মগারদিয়ার পূর্ব হাররদিয়া মৌজায় প্রায় ২৩৫ বিঘা জমি দখলে রয়েছে আজিজ আহমেদের ভাই হারিছ আহমেদ ও স্থানীয় এমপি’র ছেলে হেদায়েতউল্লাহ রন’র। আজিজ আহমেদ, শাহজাহান (যিনি আগে ওই জমির মালিক ছিলেন বলে অনেকের দাবি), হেদায়েতউল্লাহ রন ও হারিছ আহমেদের বৈঠকের একটি ছবিও প্রকাশ পায়। সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বাড্ডা মডেল টাউনের ২৩৫ বিঘা জমির বড় বড় খণ্ডগুলোতে বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কালো রংয়ের সাইনবোর্ডে সাদা কালিতে লেখা রয়েছে এই সম্পত্তির মালিক হাসান হারিছ আহমেদ ও হেদায়েত উল্লাহ রন। পুরো প্রকল্প জুড়ে প্রায় ১৭টি সাইনবোর্ড দেখা গেছে। তবে সাইনবোর্ডে জমির পরিমাণ ও দাগ খতিয়ান কিছুই লেখা নেই। কিছু কিছু সাইনবোর্ডে আবার হারিছ আহমেদের সঙ্গে এপেক্স প্রপ্রার্টিস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের নাম রয়েছে। স্থানীয় হালিম শেখ নামের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, একজনের দখল করা জমি, আবার আরেকজন দখল করছে। এতে আমাদের কোনো লাভ-ক্ষতি হয়নি। প্রথমে শাহজাহান এক পাকি কিনে ১০ পাকি ভরাট করছে। তখন এলাকাবাসী বাধা দিয়েও কিছু করতে পারেনি। এখন তার দল ক্ষমতায় নেই তার জমিই অন্যরা দখল করে নিচ্ছে। এ ছাড়া হাজারীবাগ মডেল টাউনেও আজিজ আহমেদের ভাই হাসান হারিছ আহমেদ ও হেদায়েতউল্লাহ রন’র নামে ১১টি প্লট রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ’২১ সাল পর্যন্ত তারা এই প্লটগুলো দখলে নেন। এ ছাড়া হেমায়েতপুর আলিপুর ব্রিজের পাশে মাকান রিভারভিউ হাউজিংয়ে হাসান হারিছ আহমেদ ও জোসেফের নামে ২১টি প্লট আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

হ্যারিটেজ রিসোর্টে শেয়ার: আজিজ আহমেদের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র মানবজমিনকে জানিয়েছেন নরসিংদীর মাধবদী রাইনাদী দিঘিরপাড় আজিজ আহমেদের আংশিক শেয়ারে একটি রিসোর্ট রয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই রিসোর্টের নাম হ্যারিটেজ রিসোর্ট। এর মালিকানায় আছেন মিনহাজুর রহমান রাজু ভুঁইয়া। তিনি জেনারেল আজিজ আহমেদের ছোট ভাই জোসেফের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ২০২০ সালে জেনারেল আজিজ আহমেদ ওই রিসোর্ট পরিদর্শনে যান। এমন বেশ কয়েকটি ছবিও মানবজমিনের হাতে রয়েছে। আজিজ তখন ঘুরে ঘুরে রিসোর্টের নির্মাণকাজের খুঁটিনাটি দেখেন। রিসোর্টের আশপাশের লোকজন বলেন, অনেকটা জোরজবরদস্তি করে পুলিশের ভয় দেখিয়ে রিসোর্টের জমি কিনে নেয়া হয়। এক বিঘা কিনে ৩ বিঘা ভরাট করা হয়। প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে এই রিসোর্ট। নির্মাণের সময় প্রায় প্রতিদিনই সেখানে পুলিশ পাহারা চলতো। মাঝেমধ্যে একটি বিশেষ বাহিনীর লোকজনকেও সেখানে যাতায়াত করতে দেখেছে এলাকাবাসী। তবে ওই রিসোর্টে আজিজ আহমেদের মালিকানার  বিষয়ে দালিলিক কোন তথ্য মিলেনি।
প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে দফায় দফায় কল দেয়া হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ইথিওপিয়ায় বেসামরিকদের ওপর গণহত্যার প্রমাণের দাবি মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের

টাইগ্রে যুদ্ধের সময় বেসামরিকদের ওপর গণহত্যা এবং ব্যাপক লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য নিউ লাইনস ইন্সটিটিউট। মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটিকে উদ্বৃত করে এ বিষয়ে খবর প্রকাশ করেছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী এবং টাইগ্রে বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধ টানা দুই বছর চলে। এতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পরে ওই গৃহযুদ্ধটিকে টাইগ্রে যুদ্ধ নামে উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি ওই গৃহযুদ্ধে বেসামরিকদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা এবং লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন ওই প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ১২০ পাতা সম্বলিত ওই প্রতিবেদনে ইথিওপিয়ায় ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বেসামরিকদের ওপর যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো অভিযোগের প্রমাণ হাজির করা হয়েছে।

দ্য নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স, ইরিত্রিয়ার ডিফেন্স ফোর্স এবং স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ চলে। পরে সমঝোতার মাধ্যমে ভয়ঙ্কর ওই সংঘাতের ইতি টানে তারা। কিন্তু ২০২২ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ এক প্রতিবেদনে সেখানে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তোলে। তার ভিত্তিতে প্রমাণাদি সংগ্রহ করা শুরু করে দ্য নিউ লাইনস ইন্সটিটিউট।
ইথিওপিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় বেসামরিকদের ওপর গণহত্যা, নারীদের ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্য প্রমাণাদি হাজির করার দাবি করেছে মার্কিন ওই প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হাজির করার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।



যেখানে তাজউদ্দীনের কাছে শেখার আছে অনেক by গওহার নঈম ওয়ারা

আগামী বছর তাজউদ্দীন আহমদের জন্মশতবার্ষিকী। নিশ্চয় দেশবাসী যথাযথ মর্যাদায় তাঁকে স্মরণ করবে। স্মরণ করবে রাষ্ট্র, তাঁর পরিবার, সংবাদমাধ্যম।

সম্প্রতি এসব নিয়ে আলাপ হচ্ছিল জুলিয়ান ফ্রান্সিসের সঙ্গে। জুলিয়ান এখন বাংলাদেশের নাগরিক। এ বছর তিনি আশিতে পৌঁছালেন। ২৯ এপ্রিল ছিল তাঁর জন্মদিন। একানব্বইয়ের মহাপ্লাবন এসেছিল ২৯ এপ্রিল। সে কারণেই জুলিয়ানের জন্মদিনটা মনে থাকে সব সময়।

কানাডাভিত্তিক এক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার তখন তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি। উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়ে সে বছর নিহত হয়েছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৬ জন মানুষ। কয়েক লাখ পরিবার হয়েছিল বাস্তুচ্যুত। নতুন সরকারের নতুন গণতন্ত্র নিয়ে সেই সংকট সামলানো বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু একাত্তরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে থাকা জুলিয়ান ঢাকায় বসেই বলে দিচ্ছিলেন কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে। উন্নয়ন সংগঠনগুলোর সভায় অনেকেই অপেক্ষা করতেন জুলিয়ানের বক্তব্যের জন্য।

একাত্তরে জুলিয়ান ছিলেন অক্সফামের কলকাতা কার্যালয়ের প্রধান সমন্বয়ক। বিহারের দুর্ভিক্ষের (১৯৬৬-৬৭) পর ১৯৬৮ সালে ত্রাণকর্মী হিসেবে কাজ করতে এসে আর দেশে ফেরা হয়নি জুলিয়ানের। একাত্তরের এপ্রিলে ত্রাণ সংস্থা অক্সফামের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল পূর্ব ভারতের অফিস রাঁচিতে বসে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ লাখ লাখ শরণার্থী সামলানো সম্ভব হবে না। অফিস ঠিক করে কলকাতায় নতুন দপ্তর খোলা হলো।

বিহার থেকে জিপগাড়ি চালিয়ে কলকাতায় চলে আসেন জুলিয়ান। রাসেল স্ট্রিটের এক হোটেলে খোলা হয় অস্থায়ী দপ্তর। কাছেই থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। সেখানে জুলিয়ান গেছেন ত্রাণকাজে বুদ্ধি–পরামর্শের জন্য। দেখা হয়েছে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। জুলিয়ানের চেয়ে কমপক্ষে ১৯ বছরের বড় প্রবল ব্যস্ত যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে তাঁর সব সময় বন্ধু বলেই মনে হতো। ত্রাণের অনেক খুঁটিনাটি তরুণ জুলিয়ান শিখেছিলেন তাজউদ্দীনের কাছে।

একবার অক্সফাম কানাডা একটা বড় খাদ্যসামগ্রীর চালান পাঠায় জুলিয়ানদের কাছে। শর্ত ছিল বিতরণ করতে হবে বাংলাদেশের মুক্ত অঞ্চলে। কলকাতার অক্সফাম অফিস তখন কাজ করছে শরণার্থী ক্যাম্পে। ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, কোচবিহারসহ পশ্চিম বাংলার প্রায় ৫০টি ক্যাম্পে ছয় লাখ শরণার্থীর সেবা দিতে তখন অক্সফামের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এর মধ্যে মুক্তাঞ্চলে বিতরণের অনুরোধ!

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা না বলে এগোনো সম্ভব নয়। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের দিনক্ষণ ঠিক করে কাগজপত্র নিয়ে সময়মতো থিয়েটার রোডে গিয়েও প্রথম দিন তাজউদ্দীনকে পাননি জুলিয়ান। অনির্ধারিত বিশেষ জরুরি এক মিটিংয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে জুলিয়ানের মন খারাপ হয়ে যায়। নানা ভিটামিন, খনিজ আর গুঁড়া দুধ মেশানো ৫০ টন আলুর পাউডার নিয়ে তখন মহাবিপাকে অক্সফাম। পরদিন সকালে জুলিয়ানের কাছে হাতে লেখা এক চিঠি আসে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন।

জুলিয়ান দেরি করেননি। তিনি অন্য এক তাজউদ্দীনকে সেদিন আবিষ্কার করেন তাঁর রান্নাঘরে। আমরা জানি, তাজউদ্দীন দীর্ঘ ৯ মাস রান্নাবান্না, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে সব কাজ নিজে করতেন। তিনি বললেন, এটা খাবার, তার ওপর প্রধানত শিশুদের খাবার, আমাকে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এসব খাবার আগে আমি রান্না করে দেখব, টেস্ট করব, তারপর বিতরণের ব্যবস্থা হবে। রাতে সবজি রান্নার সময় এটা মেশাব আর কাল ডালে দিয়ে দেখব খেতে কেমন হয়। তাজউদ্দীন শুধু পরীক্ষা করেননি, রাত জেগে সেই আলু পাউডার কীভাবে শিশুদের জন্য খাবারে পরিণত করতে হবে, তার নির্দেশিকা তৈরি করেছিলেন সহজ বাংলায়।

এখানেই অন্যদের থেকে তাজউদ্দীনের তফাত। এই গল্প প্রথম শুনি ১৯৯১ সালে ত্রাণ তৎপরতা চালানোর সময় যখন অনেক কোম্পানি বাজার দখলের জন্য নানা ব্র্যান্ডের ‘শিশুখাদ্য’ নিয়ে ছোটাছুটি করছিল আর অনেকেই তাদের ফাঁদে পা দিয়ে ফটোসেশনে সময় পার করছিল।

আমরা ভাবি, দুর্গত মানুষের খাবারদাবার, মশারি, বালিশ–কম্বল, থালাবাসন দিলেই চলবে। তরুণ ত্রাণকর্মী জুলিয়ান শুনলেন অন্য কথা তাজউদ্দীনের কাছে। তিনি বলেছিলেন, ‘শরণার্থীশিবিরে খাবার দিচ্ছেন ঠিক আছে। কিন্তু তাদের সব সময় মনমরা অবস্থায় দেখেন না! তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। আমার মনে হয় শিবিরগুলোতে কিছু নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। আপনারা কি কিছু বাদ্যযন্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারেন?’

ত্রাণের তালিকায় চাল, ডাল, নুন, মশারি, ওষুধ থাকলেও তবলা, হারমোনিয়াম নেই। অক্সফামের মতো একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা গাছ থেকে পড়ল এসব শুনে।

তাজউদ্দীন জানিয়েছিলেন, ‘আমি বলছি বলে নই, আপনারা ত্রাণশিবিরে কর্মরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁরা সব বয়সের মানুষের মধ্যে ট্রমা লক্ষ করছেন। ট্রমায় থাকলে তারা দিন দিন আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। কোনো ওষুধ কাজে আসবে না।’ তাজউদ্দীনের মধ্যে একটা সম্মোহনী শক্তি ছিল। কোনো বাজেট লাইন না থাকলেও জুলিয়ান রাজি হয়ে যান। কেনা হয় নানা বাদ্যযন্ত্র। বিতরণ করা হয় শিবিরে শিবিরে। গড়ে ওঠে শিল্পীদল।

কিন্তু হিসাব নিরীক্ষকদের কে মানাবে? তবলা, ঢোল, গিটার, হারমোনিয়াম কেনা হয়েছিল স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে। ওষুধ না কিনে গানবাজনার যন্ত্রপাতি কেনা ছিল তাদের কাছে গর্হিত অপরাধ। এবার শিবিরের চিকিৎসকেরা এগিয়ে আসেন। তাঁরা লিখিতভাবে জানান, এসব সামগ্রী ব্যবহারের পর স্বাস্থ্য পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, কত গভীর চিন্তার চর্চা থাকলে একজন আগাপাছতলা রাজনীতিবিদ এমনভাবে ভাবতে পারেন। শেখাতে পারেন পেশাদার ত্রাণকর্মীদের।

দেশ শত্রুমুক্ত হলে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে জুলিয়ান ঢাকায় এসে তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করেন। তাজউদ্দীনের দপ্তরে তখন ত্রাণের দায়িত্বে থাকা কামারুজ্জামানের সঙ্গেও তাঁর দেখা হয়। তাঁরা তাঁকে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর কাছে। জুলিয়ানের কাছে সেটাও এক স্মরণীয় মুহূর্ত। সেটা অন্য গল্প। অন্য একদিন সে ঝাঁপি খোলা যাবে। তাজউদ্দীন জন্মশতবর্ষ যথাযথ মর্যাদায় উদ্‌যাপিত হোক।

গওহার নঈম ওয়ারা গবেষক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অর্জন গ্রন্থের প্রণেতা।
nayeem5508@gmail.com

যেখানে তাজউদ্দীনের কাছে শেখার আছে অনেক

Saturday, June 1, 2024

‘প্রেমকাতর’ যুবরাজের হাতে এক রাতেই শেষ পুরো নেপালি রাজপরিবার by সাইফুল সামিন

২০০১ সালের ১ জুন রাতে নেপালের রাজপ্রাসাদে রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। শেষপর্যন্ত এই নৈশভোজ এক রক্তাক্ত ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়। সেদিনের ঘটনায় রাজা-রানি-যুবরাজসহ রাজপরিবারের মোট ১০ সদস্য নিহত হন। আমাদের বিশেষ আয়োজনে আজ থাকছে নেপালের প্রাসাদ-হত্যাযজ্ঞের আদ্যোপান্ত।

এমনই এক গ্রীষ্মের রাত। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদে রাজপরিবারের সদস্যরা নৈশভোজ সারতে একসঙ্গে বসেছেন।

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নৈশভোজ স্থলে অতর্কিতে শুরু হয় মুহুর্মুহু গুলি। নিহত হন নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব, রানি ঐশ্বরিয়া রাজ্য লক্ষ্মী দেবীসহ রাজপরিবারের ৯ সদস্য।

এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত অন্যরা হলেন বীরেন্দ্রর ছেলে নিরাজন, মেয়ে শ্রুতি, ভাই ধীরেন্দ্র, বোন শান্তি ও শারদা, শারদার স্বামী কুমার খড়গা ও বীরেন্দ্রর আত্মীয় জয়ন্তী।

বীরেন্দ্রর বড় ছেলে যুবরাজ (ক্রাউন প্রিন্স) দীপেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেবের গুলিতে রাজপরিবারের এই সদস্যরা নিহত হন। পরে দীপেন্দ্র নিজেই নিজেকে গুলি করেন বলে বলা হয়। গুলিতে আহত হয়ে তিনি কোমায় চলে যান।

বাবার মৃত্যুর পর কোমায় থাকা দীপেন্দ্রকে নেপালের রাজা ঘোষণা করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর তিনি হাসপাতালে মারা যান। নিয়ম অনুসারে, নেপালের রাজা হন তাঁর চাচা জ্ঞানেন্দ্র (বীরেন্দ্রর ভাই)।

বলতে গেলে এক রাতে নেপালের পুরো রাজপরিবার শেষ হয়ে যায়। হিমালয়–কন্যা হিসেবে পরিচিত নেপালের রাজপরিবারে এই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি ঘটে আজ থেকে ২৩ বছর আগে, ২০০১ সালের ১ জুন।

বীরেন্দ্র পরিবার

বীরেন্দ্রর জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর। কাঠমান্ডুর এই রাজপ্রাসাদেই জন্ম নেন তিনি। তাঁরা বাবা রাজা মহেন্দ্র।

যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ইটন কলেজে পড়েছেন বীরেন্দ্র। পড়েছেন জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঐশ্বরিয়াকে বিয়ে করেন বীরেন্দ্র। এই দম্পতির প্রথম ছেলে দীপেন্দ্র। তাঁর জন্ম ১৯৭১ সালে।

বাবার মতো দীপেন্দ্রও পড়েছেন ইটন কলেজে। তিনি নেপালের মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন। রয়্যাল নেপালিজ গুর্খা আর্মির একাডেমি থেকে নিয়েছিলেন সামরিক প্রশিক্ষণ।

পরে বীরেন্দ্র-ঐশ্বরিয়ার আরও দুই সন্তান হয়। মেয়ে শ্রুতি, জন্ম ১৯৭৬ সালে। ছেলে নিরাজনের জন্ম ১৯৭৮ সালে।

রাজা মহেন্দ্রর মৃত্যুর পর ১৯৭২ সালে নেপালের সিংহাসনে বসেন বীরেন্দ্র। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ণ রাজা হিসেবে নেপাল শাসন করেন। ১৯৯০ সালে দেশটিতে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়। নতুন এই ব্যবস্থায় রাজার পদ হয়ে পড়ে পুরোপুরি সাংবিধানিক।

নৈশভোজে রক্তগঙ্গা

নৈশভোজ স্থলে সবার আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় হাজির হয়েছিলেন যুবরাজ দীপেন্দ্র। তিনি সেখানে মদ্যপান করতে থাকেন। মাতাল হয়ে টলতে থাকেন। এমনকি তিনি বাজে আচরণও করেন। নৈশভোজ থেকে তাঁকে চলে যেতে বলেন রাজা বীরেন্দ্র।

রাত ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে দীপেন্দ্রকে ধরাধরি করে তাঁর শোবার ঘরে নিয়ে যান ছোট ভাই নিরাজন, চাচাতো ভাই পরসসহ অন্যরা।

শোবার ঘরে যাওয়ার পর দীপেন্দ্র তাঁর প্রেমিকা দেবযানী রানাকে তিনবার ফোন করেন। শেষবার তিনি দেবযানীকে ‘শুভরাত্রি’ জানিয়ে নিজে ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলেছিলেন।

দীপেন্দ্র হাসিস দিয়ে তৈরি সিগারেট পান করে। পরে শৌচাগারে গিয়ে বমি করেন। এবার তিনি সামরিক পোশাক পরেন। একটি এম-১৬ অ্যাসল্ট রাইফেলসহ একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তিনি তাঁর শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।

রাজপ্রাসাদের এক সহকারী দীপেন্দ্রকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ সিঁড়িতে দেখেছিলেন। কিন্তু দীপেন্দ্র যে ভয়ংকর কিছু ঘটাতে যাচ্ছেন, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। কারণ, আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করাটা দীপেন্দ্রর শখ ছিল।

রাত ৯টার দিকে নৈশভোজ স্থলে ফিরে আসেন দীপেন্দ্র। তিনি প্রথমে ছাদের দিকে গুলি ছোড়েন। এরপর মেতে ওঠেন হত্যাযজ্ঞে।

দীপেন্দ্র প্রথমেই তাঁর বাবা বীরেন্দ্রকে গুলি করেন। তারপর একে একে অন্যদের। সেখানে বেশ কয়েকজনকে হত্যার পর তিনি রাজপ্রাসাদের বাগানে যান তাঁর মায়ের খোঁজে।

ছোট ভাই নিরাজন মাকে রক্ষায় এগিয়ে আসেন। সেখানে ছোট ভাই ও মা দুজনকেই গুলি করে হত্যা করেন দীপেন্দ্র।

মা–বাবা, ভাই-বোনসহ মোট ৯ জনকে হত্যার পর দীপেন্দ্র নিজেই নিজেকে গুলি করেন বলে কথিত আছে।

এ ছাড়া সেদিন দীপেন্দ্রর গুলিতে রাজপরিবারের চার সদস্য আহত হন। ঘটনার ১৬ ঘণ্টা পর রাজপ্রাসাদে হত্যাযজ্ঞের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।

নেপথ্যের কারণ আজও অজানা

রাজপ্রাসাদে হত্যাযজ্ঞের ঘটনা তদন্তে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করা হয়। মাত্র এক সপ্তাহের তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দেয় কমিটি। তারা এই হত্যাযজ্ঞের জন্য দীপেন্দ্রকে দায়ী করে। তবে তিনি কেন এই হত্যাযজ্ঞ ঘটালেন, সে বিষয়ে কমিটি কিছু বলেনি। কমিটির প্রতিবেদন নেপালের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।

নেপালের রাজপরিবারে সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের কারণ নিয়ে নানা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ ছড়ায়। বহুল চর্চিত ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি’ হচ্ছে দীপেন্দ্রর প্রেম-ভালোবাসা-বিয়েঘটিত।

ইটন কলেজে পড়ার সময় দীপেন্দ্রর সঙ্গে দেবযানীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে সময় দেবযানীও যুক্তরাজ্যে পড়ছিলেন।

দেবযানী নেপালের একসময়ের সাবেক শাসক জঙ্গ বাহাদুর রানা পরিবারের মেয়ে। তাঁর বাবা পশুপতি রানা। তিনি নেপালের একজন নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ। তিনি মন্ত্রীও ছিলেন। দেবযানীর মা ঊষা রাজে সিন্ধিয়া। তিনি ভারতের সিন্ধিয়া রাজপরিবারের মেয়ে।

এমন কথা বলা হয়ে থাকে, দীপেন্দ্র-দেবযানীর সম্পর্ক মানতে চাইছিলেন না বীরেন্দ্র-ঐশ্বরিয়া। বিশেষ করে ঐশ্বরিয়া তাঁর ছেলের এই সম্পর্ক ভেঙে দিতে অনড় ছিলেন। এ নিয়ে মা–বাবার সঙ্গে দীপেন্দ্রর ঝগড়াবিবাদ পর্যন্ত হয়েছিল।

মা–বাবার আপত্তি সত্ত্বেও দীপেন্দ্র তাঁর প্রেমিকা দেবযানীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যান। তাঁরা গোপনে পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ অব্যাহত রাখেন।

দেবযানীকে বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন দীপেন্দ্র। একপর্যায়ে তিনি মা–বাবার কাছে এই পরিকল্পনার কথা বলেন। এতে ঘোর আপত্তি জানান বীরেন্দ্র-ঐশ্বরিয়া। তাঁরা কোনোমতেই দেবযানীকে রাজবধূ করতে চাইছিলেন না। তাঁরা চেয়েছিলেন, দীপেন্দ্র শাহ পরিবারের ভেতরের কাউকে বিয়ে করুক।

দেবযানী ইস্যুতে ২০০১ সাল নাগাদ রাজা-রানির সঙ্গে দীপেন্দ্রর সম্পর্ক চরম তিক্ত পর্যায়ে চলে যায়। বলা হয়, দীপেন্দ্র যদি দেবযানীকে বিয়ের পরিকল্পনায় অনড় থাকেন, তাহলে তাঁকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল, দেবযানীকে নিয়ে দীপেন্দ্র বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাঁর ছোট ভাইকে ক্রাউন প্রিন্স (সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার) করা হবে। দেবযানীকে বিয়ে করার বিষয়ে মা–বাবার কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় ‘প্রণয়কাতর’ যুবরাজ দীপেন্দ্র রাজ-নৈশভোজের আসরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন।

দীপেন্দ্রকে বিয়ে করার বিষয়টি নিয়ে দেবযানীদের পরিবারেরও ‘দ্বিধাদ্বন্দ্ব’ ছিল বলে বলা হয়। দেবযানী স্থানীয় অভিজাত, ধনি পরিবারের মেয়ে। তিনি বিপুল বিত্তবৈভবের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত দেবযানীর মা এই বিষয়ে মেয়েকে সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, দীপেন্দ্রর সঙ্গে বিয়ে হলে দেবযানী নেপালের ভবিষ্যৎ রানি হবেন ঠিকই, কিন্তু রানা পরিবারের তুলনায় নেপালি রাজপরিবার ‘গরিব’। দেবযানী বিয়ে করে এমন ঘরে গেলে তিনি টিকতে পারবেন কি না, তা তাঁর গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার।

হত্যাযজ্ঞ নিয়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কথাও চাউর হয়েছিল। সন্দেহের তীর যায় দীপেন্দ্রর চাচা জ্ঞানেন্দ্রর দিকে। হত্যাযজ্ঞের রাতে তিনি রাজপ্রাসাদে ছিলেন না। আর দীপেন্দ্রর মৃত্যুর পর তিনিই হন নেপালের রাজা।

ব্যাপক গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে জ্ঞানেন্দ্র ও তাঁর ছেলে পরসের যোগসাজশে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটে। এই সন্দেহের কারণ হিসেবে বলা হয়, নৈশভোজে জ্ঞানেন্দ্র ছিলেন না। তাঁর ছেলে পরস নৈশভোজে থাকলেও তিনি ঠিকই বেঁচে যান। কাজেই তাঁরা এই হত্যাযজ্ঞের মূল হোতা, সুবিধাভোগী। তাঁরা দীপেন্দ্রকে ফাঁসিয়েছেন।

বীরেন্দ্র-দীপেন্দ্রদের চিরতরে সরিয়ে দিয়ে সিংহাসন দখল করেন জ্ঞানেন্দ্র। আর তাঁর ছেলে হন সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী। যদিও জ্ঞানেন্দ্র ও পরস এই অভিযোগ নাকচ করেন।

বলা হয়, সবাইকে মেরে দীপেন্দ্র নিজেই নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তবে এ নিয়েও নেপালিদের মধ্যে বিস্তর সন্দেহ আছে।

কেউ কেউ বলেন, গণতন্ত্রের জন্য গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৯০ সালে নেপালে বহুদলীয় গণতন্ত্র শুরু হয়। দেশটিতে পূর্ণ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। আসে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। রাজা বীরেন্দ্রর এই সিদ্ধান্ত তাঁর ছেলে দীপেন্দ্রকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তাঁর মনে হয়েছিলে, উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি যে ক্ষমতা পাবেন, তা হবে নামমাত্র। এই ক্ষোভ থেকে তিনি হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে থাকতে পারেন।

হত্যাযজ্ঞের ঘটনার পর নেপালের মাওবাদী নেতা বাবুরাম ভট্টরাই এক নিবন্ধে রাজপরিবারে এই হত্যাযজ্ঞকে একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল বলে ইঙ্গিত দেন। নেপালের সাবেক এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, রাজপরিবারকে শেষ করে দেওয়াটা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ চক্রান্তের অংশ ছিল।

তবে কারও কারও মতে, এই হত্যাযজ্ঞ ছিল স্রেফ নিয়তি।

ঘটনার এত বছর পরও নেপালের প্রাসাদ-হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের কারণ অজানা রয়ে গেছে। এই হত্যাযজ্ঞের সাত বছর পর ২০০৮ সালে নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়। দেশটিকে একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাজপ্রাসাদকে করা হয় জাদুঘর।

তথ্যসূত্র: নেপালি টাইমস, নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, এবিসি নিউজ (অস্ট্রেলিয়া), নেপাল রিসার্স ডটকম।

রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেবসহ নেপালের রাজপরিবারের সদস্যরা
রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেবসহ নেপালের রাজপরিবারের সদস্যরা ছবি: নেপালের নারায়ণহিতি প্যালেস মিউজিয়ামের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া