Saturday, June 18, 2016

একেই বলে গণতন্ত্র by সাজেদুল হক

খুব খারাপ একটা সময় কাটাচ্ছে পৃথিবী। রক্তপাতের খবর ছাড়া বের হচ্ছে না পত্রিকা।  মৃত্যু যেন এখন একমাত্র সত্য। বেঁচে থাকাটাই বিস্ময়। ইরাক-সিরিয়া-লিবিয়া কোথায় নেই যুদ্ধ? অরল্যান্ডোতে রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও রক্তপাতের বাইরে নেই। এরমধ্যে বৃটেনে গুলি করে হত্যা করা হলো লেবার পার্টির এমপি জো কক্সকে।
জো কক্সের হত্যাকা- বৃটেনের রাজনীতিতে এক বিস্ময়কর ঘটনা। গত ২৫ বছরে এ প্রথম বৃটেনে কোন এমপিকে গুলি করে হত্যা করা হলো। তার মৃত্যুর ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি বৃটেন। শোকে স্তব্ধ পুরো জাতি। দলমত নির্বিশেষে শোকের মিছিলে শামিল হয়েছেন সবাই। এমনিতে বৃটেন সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় দেশ। লন্ডনের কথাই চিন্তা করুন না কেন। পৃথিবীর কত জাতি আর ধর্মের মানুষ বাস করে এ একটি শহরের। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মেনে নিলে বৈচিত্র্যময় জীবন যে অসম্ভব নয় তার একটি প্রমাণ এ শহর।
জো কক্সের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বৃটেনের গণতন্ত্র পৃথিবীর সামনে আরও একবার উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়েছে। দুটি ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৃটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে দেশটিতে এমনিতে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। ২৩শে জুন এ নিয়ে ভোটাভুটির কথা রয়েছে। এমপি জো কক্স ইইউ গণভোট নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন এবং বৃটেনের ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য তার নির্বাচনী এলাকা ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। জো কক্সকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে টমি মেয়ার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তির সঙ্গে কট্টর ডানপন্থি মতাদর্শের দলের যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
খেয়াল করে থাকবেন হয়তো, এ হত্যাকা- নিয়ে বৃটেনের রাজনৈতিক দলগুলো কোন দোষারোপের খেলা খেলছে না। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী প্রধান দুজনই নিহতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কাজ করছে। কেউ তাদের ওপর কোন হস্তক্ষেপ করছে না। আর বৃটেনের রাজনৈতিক দলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে দুটি সিদ্ধান্ত নেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে গণভোটের প্রচারণা স্থগিত করা হয়। আর জো কক্সের নির্বাচনী আসনে প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কনজারভেটিব পার্টিসহ অন্য দলগুলো। এই দুটি সিদ্ধান্ত গণতন্ত্র আর মানবতার বিজয়ই ঘোষণা করছে। গভীরভাবে খেয়াল করলে বুঝা যায়, জো কক্সের হত্যাকা-ের রাজনৈতিক সুবিধাও কোন পক্ষ নিতে চায়নি। যে কারণে তারা ভোটের প্রচারণাই স্থগিত করেছে। আর জো কক্সের আসনে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রার্থী না দেয়ার ঘোষণা গভীর রাজনৈতিক মানবতারই প্রমাণ দেয়।

ব্রিটিশ পুলিশের ব্যর্থতায় এমপির প্রাণ গেল!

খুন হওয়ার তিনমাস আগে থেকেই ইমেইলে হত্যার হুমকি পেয়ে আসছিলেন ব্রিস্টলের ব্রিটিশ এমপি জো কক্স। পুলিশকে অভিহিতও করেছিলেন তিনি তা। ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাসও দিয়েছিল পুলিশ। তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ সক্রিয় হওয়ার আগেই আততায়ীরা তাকে খুন করে ফেলল। বারবার অভিযোগ জানানোর পর পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সহযোগিতাই করেনি তারা। শুক্রবারে ডেইলি এক্সপ্রেস জানিয়েছে এ কথা। পত্রিকাটি বলছে, এমপিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ বাহিনী। ইন্টারনেটে নিয়মিত হেট ম্যাসেজ দিয়ে একরকম বলেকয়েই জো কক্সকে হত্যা করেছে এখন পর্যন্ত অজ্ঞাত ব্যক্তিটি অথবা ব্যক্তিরা। তবে এ ব্যাপারে পুলিশ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।
জো কক্সের কাছের এক সূত্রের বরাত দিয়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছে দ্য টাইমস। শোক প্রকাশের জন্য সংসদ অধিবেশন ডেকেছেন ক্যামেরন : জো কক্সের অকাল মৃত্যুতে শোক প্রকাশের জন্য সোমবার সংসদ অধিবেশন ডেকেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। জো কক্সের আক্রান্ত হওয়ার স্থান ব্রিস্টলে শুক্রবারের জনসমাগমে বক্তব্য দেন ক্যামেরন। এ সময় তিনি বলেন, ‘ঘৃণা, বিভাজন এবং অসহনশীলতাকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে।’ এ সময় তার পাশে ছিলেন লেবার দলের প্রধান জেরেমি করবিন। তিনি ক্যামেরনের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, ‘থমাস মার বা স্থানীয়ভাবে টমি নামে পরিচিত এক সন্দেহভাজনকে ধরেছে পুলিশ। তার বাড়ি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। তল্লাশি চালানো হচ্ছে বাগানে।’
বেক্সিট গণভোটের প্রচারণা স্থগিত : ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে ব্রিটেনের থাকা না থাকার ব্যাপারে গণভোটের এক সপ্তাহ আগে কক্সের মৃত্যুতে থেকে গেছে পক্ষে-বিপক্ষের প্রচারণা। জো কক্স এতদিন ধরে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। কক্সের সমর্থক ও নির্বাচনী প্রচারণা কর্মী হিসেম বিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘১৯৯০ সালে আইরিশ আর্মির গাড়ি বোমা হামলায় কোনো ব্রিটিশ এমপির মৃত্যুর পর এটাই প্রথম এ ধরনের ঘটনা। এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক হতে পারছে না কেউ।’ বিশপ জোনাথন গিবস বলেন, ‘তার দুই সন্তানের জন্য আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে।’ এদিকে ব্রিস্টলের ইয়র্কশায়ার গ্রামের মানুষরা বৃহস্পতিবার রাতে তাদের নির্বাচিত এমপির কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। জাতীয়তাবাদীদের হাতে খুন হতে পারেন এই মানবতাকর্মী : গার্ডিয়ানের বিশেষ সম্পাদকীয়তে উঠে এসেছে জো কক্সের জীবনের দাতব্য সহায়তামূলক কর্মগুলো। নারী, অভিবাসী ও শরণার্থী ইস্যুতে বৈষম্যদূরীকরণে প্রচারণা চালাতেন তিনি। এ কারণে কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদীদের আক্রোশের শিকার হতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তাকে হত্যার সময় ব্রিটেন ফার্স্ট বলে খুনি চিৎকার করে ওঠে বলে জানায় পত্রিকাটি।

ব্রিটিশ এমপি জো কক্সের মৃত্যুর আগের মূর্হুত

খুন হওয়ার দুই দিন আগে নিজ সংসদীয় এলাকা পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের বাটলি প্যারিস স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কথা বলছেন লেবার এমপি জো কক্স। গণতন্ত্র এবং সুনাগরিকত্ব বিষয়ে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করেন তিনি। (ডানে) আগামী সপ্তাহের গণভোটকে প্রভাবিত করতে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে ব্যস্ত ছিলেন জো ফক্স। লন্ডনের টেমস নদীতে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ক্যাম্প করেছিলেন তিনি। শুক্রবারের ছবি ডেইলি মেইল