Friday, June 27, 2014

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পুরো পরিবার খুনি: শেখ হাসিনা

সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পুরো পরিবারকে খুনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ মন্তব্য করেন। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর মোশতাকের রাষ্ট্রপ্রধান ও জিয়াউর রহমানের সেনাপ্রধান হওয়া; ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে খালেদা জিয়ার ‘জ্বালাও-পোড়াও’ কর্মসূচি; সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার, আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাসসহ তাঁর শাসনামলের নানা বর্ণনা তুলে ধরে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার ও গত পরশু বুধবার একই স্থানে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান কর্মীশূন্য ছিল। তবে আজ শেষ দিনের অনুষ্ঠানস্থলে লোক সমাগম ছিল ব্যাপক।

>>প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ আলোচনা সভা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের পুরো পরিবার খুনি। অন্যকে সরিয়ে বন্দুকের নলে ক্ষমতায় গিয়ে সে পথেই ক্ষমতা হারান জিয়াউর রহমান।’ তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে খুন হন জিয়া, এর ৯ বছর পর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান হত্যার জন্য এরশাদকে দায়ী করেন। কিন্তু জিয়া হত্যার পর এরশাদের কাছ থেকেই তিনি দুটি বাড়ি নিয়েছেন। জিয়ার খুনের সুফল ভোগ করছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া তাঁকেও (শেখ হাসিনাকে) হত্যা করার চেষ্টা করেছেন। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানও একজন খুনি।

মোশতাক আ.লীগের কুলাঙ্গার
বক্তব্যে খন্দকার মোশতাককে আওয়ামী লীগের ‘কুলাঙ্গার’ আখ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর ‘কুলাঙ্গার’ মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিলেন। এরপর তিনি জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিলেন।

আ.লীগ হীরার খণ্ড, কাটলেই দ্যুতি ছড়াবে
১৯৭৫-এর পর থেকেই আওয়ামী লীগ ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ হীরার খণ্ড, তাকে যতই কাটা হবে, ততই দ্যুতি ছড়াবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোশতাক এসে আওয়ামী লীগকে ভেঙে নতুন নামে দল গঠন করতে চেয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সভাপতি হওয়ার আগে আওয়ামী লীগকে ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়েছে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

বঙ্গবন্ধু হত্যায় ফারুকদের সফলতা চেয়েছিল জিয়া
বিবিসি বাংলায় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুকের এক সাক্ষাত্কারের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাদের (ফারুকদের) সম্পর্ক ছিল। জিয়াও তাদের এ কাজে সফলতা চেয়েছিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ইতিহাস বিশাল ইতিহাস, এত কম সময়ে বলে শেষ করা যাবে না। বাঙালির সব অর্জনের পেছনে আছে আওয়ামী লীগের অবদান।’

পাচার করা টাকা এনেছি, সুইস ব্যাংকেরও আনব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সম্প্রতি সুইস ব্যাংকে রাখা দেশের টাকা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আমরা ক্ষমতায় থাকলে সুইস ব্যাংকে কে কত টাকা রেখেছে, তা বের করব। শুধু বেরই করব না, দেশে ফিরিয়ে আনব। অতীতে যেমন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলের পাচার করা টাকা বিদেশ থেকে ফেরত এনেছি। সুইস ব্যাংকে রাখা টাকাও আমরা ফেরত আনব।’

অন্যরা ক্ষমতায় আসে খেতে, আমরা কাজ করতে
১৯৭১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আসা দলগুলোর নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অন্য দলগুলো খেতে ক্ষমতায় আসে। আর আওয়ামী লীগ আসে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে। আমরা কাজ করি মনের টানে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘দেশের ৪ কোটি ৮০ লক্ষ লোক এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আমাদের শাসনে দেশের ৫ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে।’

আ.লীগ বিদেশের প্রভুদের পায়ে ধরে না
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রেললাইন তুলে ফেলে, জ্বালাও পোড়াও করে, মানুষ খুন করে খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে পারেননি। নির্বাচন ঠেকাতে না পেরে তিনি বিদেশি প্রভুদের পায়ে কান্না করছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনো বিদেশের প্রভুদের পায়ে ধরে না। আওয়ামী লীগের শক্তি এ দেশের মানুষ।’

বঙ্গবন্ধুর সময়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই প্রবৃদ্ধি যারা চায় নাই, তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। এরপরও ক্ষান্ত হয়নি, জেলে ঢুকে ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকেও তারা হত্যা করেছে।’

বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত: সুষমাকে খালেদা

ঢাকা সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোটেল সোনারগাঁওয়ে এ সৌজন্য সাক্ষাত শুরু হয়। এসময় সুষমাকে খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদে জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত হচ্ছে না। মতবিনিময়ে সুষমা স্বরাজ বলেছেন- সরকার বা কোনো দলের সাথে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সাথে সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় ভারত। এর আগে ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন শেষে সকাল ১০টার দিকে হোটেল সোনারগাঁওয়ে পৌঁছান সুষমা। এসময় সুষমাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান বিএনপি নেতারা।

আধাঘন্টাব্যাপী বৈঠকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসরাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে প্রায় ১০ মিনিট একান্তে বৈঠক করেন সুষমা স্বরাজ ও খালেদা জিয়া। তবে কি কথা হয়েছে তা জানা যায়নি।
মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান বলেন, যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো—বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতন্ত্রের দেশ তার প্রতিবেশী দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না, তা আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে। এসময় সুষমা স্বরাজ বলেন, এশিয়ার সব দেশে গণতন্ত্র দেখতে চায় ভারত।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মঈন খান বলেন, এ অঞ্চলে ভারত বিশ্বের বৃহত্ গণতন্ত্র। প্রতিবেশী দেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিত থাকলে এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত করবে।
সুষমা স্বরাজকে জামদানি শাড়িসহ বেশ কিছু মূল্যবান উপহার সামগ্রী দিয়েছেন খালেদা জিয়া। এ ব্যাপারে মঈন খান জানান, বৈঠকের আগেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে পাঁচটি জামদানি শাড়িসহ বেশ কিছু মূল্যবান উপহার সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে ভারত সফরকালে দেশটির তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা সুষমা স্বরাজও খালেদা জিয়াকে বেশ কিছু উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন- ভারতের নতুন সরকার কোনো দল বা ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় না। সরকার দেশের জনগণের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, সংবাদ মাধ্যমে আপনারা জানতে পেরেছেন সরকার চায়নি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হোক। তবে ভারতের বর্তমান সরকার বিশেষ কোনো দল নয় বরং বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বলেই ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অগ্রহে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। তিনি সাংবাদিকদের জানান, বেগম খালেদা জিয়া ভারতের নতুন সরকারকে পুনরায় অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সার্কের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ঐকমত্য গড়ে তুলতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে উদ্যোগ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তাকে স্বাগত জানান।
বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান শমসের মবিন চৌধুরী। বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
বুধবার রাতে তিন দিনের সফরে ঢাকা আসেন সুষমা স্বরাজ। গত মাসে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর নতুন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর এটায় তার প্রথম বিদেশ সফর। সুষমা স্বরাজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। ভারত সফরের জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ পত্র তুলে দেন শেখ হাসিনার হাতে। এছাড়া তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। আজ দুপুরে সুষমা স্বরাজ ঢাকা ত্যাগ করবেন।

এএসপিকে হুমকি- জাত চেনালেন শামীম ওসমান

‘ভোটকেন্দ্র দখলের সুযোগ না দেওয়ায়’ নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. বশিরউদ্দীনকে মুঠোফোনে হুমকি ও গালিগালাজ করেছেন সরকারদলীয় সাংসদ শামীম ওসমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করে পুলিশ কর্মকর্তাকে কাবু করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। এ আসনে শামীম ওসমানের ভাই সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মদনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম দলবল নিয়ে মদনপুর কেওঢালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র দখল করতে যান। তিনি সেলিম ওসমানের পক্ষে কাজ করছিলেন। সালাম চেয়ারম্যান ওই কেন্দ্রে গিয়ে হুমকি দিয়ে বলেন, ভোটকেন্দ্রটি তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে৷ অন্যথায় সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ মাথা নিয়ে ফিরে যেতে পারবেন না। এর কিছুক্ষণের মধ্যে এএসপি বশিরউদ্দীন ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে বিষয়টি জানতে পারেন এবং তা জেলা পুলিশ সুপারকে (এসপি) জানান। এসপি সালাম চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। এরপরই শামীম ওসমান এএসপি বশিরের মুঠোফোনে কল করেন।
পরে ঘটনার বিবরণ দিয়ে এএসপি বশির সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এ উপনির্বাচনে মদনপুর ইউনিয়ন ও ধামকর ইউনিয়নের দায়িত্বে ছিলেন। বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে তিনি কেওঢালা কেন্দ্রে গেলে সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ভ্রাম্যমাণ সহায়ক দলের (মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্স) কর্মকর্তারা তাঁকে জানান, মদনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করেছেন। তিনি হুমকি দিয়েছেন, তাঁকে কেন্দ্র ছেড়ে না দিলে পুলিশ, আনসার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ মাথা নিয়ে যেতে পারবেন না।
এএসপি বশির বলেন, ‘অভিযোগ পেয়ে আমি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে চাই৷ খবর দেওয়ার পরও চেয়ারম্যান আসেননি৷ তিনি একজনের মুঠোফোনে আমার সঙ্গে কথা বলেন৷ আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি ভোট দিয়েছেন?” উনি বললেন, “হ্যাঁ দিয়েছি”। আমি বললাম, আজকের জন্য আপনি শুধু একজন ভোটার, এর বেশি কিছু নন। আপনি ভোট দিলে ভোট দিয়ে চলে যান, আপনি কারও ভোটে ডিস্টার্ব করবেন না, আপনার ভোটেও কেউ ডিস্টার্ব করবে না। উনি বললেন, “আপনি কি আমাকে থ্রেট দিচ্ছেন?” আমি বললাম, থ্রেট তো আপনি দিলেন আমার লোকজনকে। আপনি বলছেন, পুলিশের কেউ মাথা নিয়ে যেতে পারবে না। এরপর চেয়ারম্যান বললেন, “আপনি কে, আপনার নাম কী, পরিচয় কী? আপনি থাকেন ওখানে, আমি দেখাচ্ছি।”’
এএসপি জানান, সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিষয়টি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জেলা পুলিশ সুপারকে জানান। পুলিশ সুপার ওই চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন।
এএসপি বশির জানান, নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি র্যাব ও বিজিবির টহল দল ডেকে পাঠান এবং সালাম চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর মুঠোফোনে একটি কল আসে। তিনি বলেন, ‘ওই প্রান্ত থেকে বলা হয়, “আমি সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলছি।” আমি বললাম, আপনি কেমন আছেন? উনি বললেন, “তুমি আমার চেয়ারম্যানকে অ্যারেস্ট করার প্রিপারেশন নিচ্ছ কেন?” আমি বলি, কেন্দ্র দখল করতে এলে আমি অ্যারেস্ট করব না? আর আপনার চেয়ারম্যান কি না, এটা তো দেখার বিষয় না।’
বশির সাংবাদিকদের বলেন, ‘...এরপর তিনি বলেন, “প্লিজ, আমি শামীম ওসমান বলছি, আমি কাউকে প্লিজ বলি না। আমি বলছি, গিভ হিম দ্য ক্লিয়ারেন্স। তুমি কেন্দ্রটা ছেড়ে দাও, তুমি তোমার মতো করে চলে যাও। সময় দ্রুত ফুরাইয়ে যাচ্ছে, চারটার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ পারসেন্ট ভোট কাস্ট করতে হবে, তুমি কেন্দ্রটা ছেড়ে দাও এবং চলে যাও।” আমি বললাম, আমি পারব না। এখন আমার চাকরি ইলেকশন কমিশনের আন্ডারে। আমি এখানে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে এসেছি, প্রজাতন্ত্রের চাকরি করতে এসেছি।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এরপর শামীম ওসমান আবার ফোন করেন। তিনি আমাকে ফোনে লাইনে রেখে আরেক ফোনে প্রধানমন্ত্রীর পিএস-ওয়ান মালেক সাহেবের সঙ্গে কথা বললেন। ওই ফোনে তিনি বললেন, “তুমি প্রধানমন্ত্রীকে বলো, আমি রাজনীতি করব কি করব না।” তিনি এ কথা আমাকে শোনালেন ফোনে। তখন আমি বললাম, আপনি কার সঙ্গে কথা বলছেন, সেটা দেখার বিষয় না, আমি খুব ছোট অফিসার। আমি এখানে দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। আমার দায়িত্বটা আমাকে পালন করতে দিন। এরপর তিনি “কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা, বাস্টার্ড” গালি দিয়ে বলেন, “তুই কী পারবি কর। তোরে আমি দেইখা নিব।”’
শামীম ওসমানের এই হুমকির কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কি না—সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে এএসপি বশির বলেন, ‘আমি আমার ঊর্ধ্বতন অফিসারকে জানিয়েছি এবং মোবাইলে যখন উনি (শামীম ওসমান) কথা বলছিলেন, র্যাবের মেজর সোহেল সাহেবও তা শুনেছেন, আমি লাউড িস্পকারে কথা বলেছি৷ আমার বডিগার্ড, আমার ড্রাইভার, তারাও শুনেছে। আমি পুলিশের কন্ট্রোলকে জানিয়েছি, কন্ট্রোল এটা নোট নিয়েছে।’ এ ঘটনায় শঙ্কিত বলেও জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উিদ্দন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটের সময় এ ধরনের টুকটাক কথাবার্তা হয়। এগুলো এমন কিছু নয়, এগুলোকে তেমন বড় করে দেখারও কিছু নেই। তার পরেও বশিরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।’
শামীম ওসমানের সঙ্গে ফোনালাপের সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এএসপি বশিরের কাছাকাছি ছিলেন। তাঁকে সে সময় বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল বলে জানান সাংবাদিকেরা। তিনি হাত নাড়িয়ে কথা বলছিলেন। পরে সাংবাদিকেরা এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি শামীম ওসমানের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন বিষয়টি বলেন।
এ পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত সালাম চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বরং এরপর সালামের অনুসারীরা কেওঢালা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে পুলিশের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিছিল করেন। বিকেলে পার্শ্ববর্তী আরেকটি কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে সেখানেও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিছিল করেন এবং অঙ্গুলি নির্দেশ করে আজেবাজে কথাও বলেন শামীম ওসমানের অনুসারীরা।
ভোট নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শামীম ওসমান। পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি ও গালিগালাজের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে শামীম ওসমান বলেন, ‘এটা হান্ড্রেড পারসেন্ট মিথ্যা কথা। আমার নাম করে শুধু তাঁকে (এএসপি বশির) নয়, আরও অনেককে টেলিফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে।’
সাংবাদিকেরা বলেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করে বলেছেন, শামীম ওসমানই তাঁকে ফোন করে হুমকি দিয়েছেন। এটা ঠিক কি না? জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘তাঁর (এএসপি) ব্যাপারে স্থানীয় একজন চেয়ারম্যান একটা অনৈতিক কাজের অভিযোগ তুলেছেন। সেই অভিযোগটি নির্বাচন কমিশন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে জানানো হয়েছে।’
‘তার মানে আপনার সঙ্গে ওই এএসপির কোনো কথা হয়নি?’ সাংবাদিকেরা আবার এ প্রশ্ন করার পর শামীম ওসমান কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর কিছুটা ইতস্তত করে টেলিফোন করার কথা স্বীকার করেন এবং বলেন, ‘অনৈতিক কাজের বিষয়ে তাঁকে (এএসপি) আমি প্রশ্ন করেছি, তুমি িক এটা করেছ? এর উত্তরে সে তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় আমার সামনে তুলে ধরে। তখন আমি বলি, তোমার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় কী, সেটা আমার জানার দরকার নেই।’ শামীম ওসমান দাবি করেন, ‘আমি সেই পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েছি। তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ডিপার্টমেন্টাল ইনকোয়ারি শুরু হয়েছে এবং তারা মনে হয় কিছু প্রমাণও পেয়েছে।’
কেওঢালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান আবদুস সালাম সকালে লোকজন নিয়ে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করেন এটা সত্য। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সফল হননি।
অবশ্য গত বুধবার রাতেই স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরাম (প্রতীক আনারস) সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, ওই রাতে কেওঢালা কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালটে সেলিম ওসমানের প্রতীকে (লাঙ্গল) সিল মারছেন চেয়ারম্যান আবদুস সালামের লোকজন। অভিযোগ পেয়ে ওই রাতেই প্রথম আলো মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেছিলেন, ব্যালটে সিল মারার প্রশ্নই ওঠে না।
তবে গতকাল ভোট শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই কেওঢালা কেন্দ্রের ফলাফল দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হয়। তাতে দেখা যায়, সেলিম ওসমান পেয়েছেন এক হাজার ২৬৯ ভোট এবং এস এম আকরাম পেয়েছেন ১৬৮ ভোট।
কেন্দ্র দখলের চেষ্টা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম আকরামের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আইনজীবী মাহবুবুর রহমান মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকে নির্বাচন কমিশনের অধীন৷ তাদের কোনোরকম অনৈতিক কাজে প্রলুব্ধ করা বা হুমকি দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ৷ শামীম ওসমান একজন আইনপ্রণেতা হয়ে বিসিএস ক্যাডারের একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে যে ভাষায় গালিগালাজ করেছেন, তা কোনো সভ্য মানুষ করতে পারেন না৷

সংসদে এরশাদ ‘মুক্তি চাই, মুক্তি দিন’

সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বলেছেন, দেশের মানুষ মুক্তি চায়। দুঃশাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, খুন, গুম, অপহরণের, গডফাদার, মাফিয়া আর সংঘাতের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু মুক্তি অবরুদ্ধ। কে এনে দেবে এই মুক্তি। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের জনসভায় বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। কিন্তু মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। বেঁচে থাকলে হয়তো মুক্তিও দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি যে সময় পাননি। এই মুক্তি দেয়ার দায়িত্ব এখন তার সন্তান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিতে হবে। কারণ, আমরা এই বাংলাদেশ চাইনি। আমরা শান্তি ও অগ্রগতির বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। গতকাল সংসদে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এরশাদ আরও বলেন, বাংলাদেশ আজ মৃত্যুকূপ। দেশে চলছে মৃত্যুর মিছিল। খুন-গুম-অপহরণ চলছেই। ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। শিল্প-কলকারখানা বন্ধ। ব্যাংক লুট হচ্ছে। লুটেরারা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেয়ারবাজার থেকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তাদের বিচার হলো না। তিনি বলেন, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে চাকরি পায় না। অর্থমন্ত্রীকে বলবো- রাত ১১টায় কমলাপুর যান। মানুষ বসে আছে, কাজ নেই। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কোদাল নিয়ে শ্রমিকরা বসে থাকে, কাজ নেই। পেটে খাবার নেই। তারা রিজার্ভ বোঝে না, প্রবৃদ্ধি বোঝে না। তারা কাজ চায়, বাঁচতে চায়। এরশাদ বলেন, এক দেশে এখন দুই আইন। ধনীর জন্য এক রকম। আর গরিবের জন্য অন্যরকম। সবার জন্য আইন সমান হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের দেশে এক রকম নয়। গডফাদার নামে নতুন আলামতের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের অঢেল অর্থ, অস্ত্রের ভা-ার তারা কি আইনের ঊর্ধ্বে? এক মন্ত্রী নাকি ৩০০০ একর জমি কিনেছেন। আমরা এ সব মাফিয়া, গডফাদার চাই না। শান্তি চাই। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের ঘটনা ঘটলো। মিরপুরের বিহারি পল্লীতে ১০টি মানুষ পুড়ে মারা গেল। বিচার নেই। মানুষ হত্যা হচ্ছে, আমাদের মনে দুঃখ নেই। আমাদের জীবন থেকে প্রেম-ভালবাসা চলে গেছে। আমাদের জীবন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। অর্থ ও ক্ষমতার লোভে সবাই পাগল হয়ে গেছি। মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। কবে ফিরে আসবে পরিবারের সদস্যরা কেউ জানে না। সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, শেয়ারবাজারে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে তারা সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ব্যাংক লুট করে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। মেয়ার বাজারের কেলেঙ্কারীর রিপোর্ট আলোর মুখ দেখছে না। অর্থমন্ত্রী বলছেন, তাদের হাত অনেক লম্বা। জানতে চাই- কত লম্বা? তাদের হাত কি সরকার, প্রশাসন ও আইনের চেয়েও লম্বা? অনেকে অর্থ পাচার করে আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়ায় বাড়ি করছেন। এরা এত টাকা কোথায় পেলো? কিভাবে টাকা গেল? এদের ধরা কি খুবই কঠিন কাজ। দেশে নিরাপত্তা নেই। আগে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপত্তা থাকলে বিদেশে অর্থ পাচার হবে না। এরশাদ বলেন, মানুষ আজ মুক্তি চায়। গডফাদার, দুর্নীতি, দুঃশাসন, সংঘাতের রাজনীতি, টেন্ডারবাজি, শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাস, অশিক্ষা-কুশিক্ষা থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু মুক্তি অবরুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। কিন্তু মুক্তি দিয়ে যাওয়ার সময় পাননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তার সন্তান প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি এ জন্য যে পদক্ষেপ নেবেন আমরা সর্বাত্মকভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করবো। সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু হৃদয়ে আছেন। থাকবেনও। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হলে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, মাছ ও ফলে ফরমালিন, দুধে পর্যন্ত বিষ। রোজা আসছে, মুড়ি খাবো। সেখানেও ইউরিয়া। সমস্ত দেশ আজ বিষাক্ত হয়ে গেছে। এর হাত থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। উপজেলা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে হবে। প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে।

সংসদে এরশাদ ‘মুক্তি চাই, মুক্তি দিন’

সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বলেছেন, দেশের মানুষ মুক্তি চায়। দুঃশাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, খুন, গুম, অপহরণের, গডফাদার, মাফিয়া আর সংঘাতের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু মুক্তি অবরুদ্ধ। কে এনে দেবে এই মুক্তি। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের জনসভায় বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। কিন্তু মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। বেঁচে থাকলে হয়তো মুক্তিও দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি যে সময় পাননি। এই মুক্তি দেয়ার দায়িত্ব এখন তার সন্তান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিতে হবে। কারণ, আমরা এই বাংলাদেশ চাইনি। আমরা শান্তি ও অগ্রগতির বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। গতকাল সংসদে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এরশাদ আরও বলেন, বাংলাদেশ আজ মৃত্যুকূপ। দেশে চলছে মৃত্যুর মিছিল। খুন-গুম-অপহরণ চলছেই। ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। শিল্প-কলকারখানা বন্ধ। ব্যাংক লুট হচ্ছে। লুটেরারা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেয়ারবাজার থেকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তাদের বিচার হলো না। তিনি বলেন, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে চাকরি পায় না। অর্থমন্ত্রীকে বলবো- রাত ১১টায় কমলাপুর যান। মানুষ বসে আছে, কাজ নেই। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কোদাল নিয়ে শ্রমিকরা বসে থাকে, কাজ নেই। পেটে খাবার নেই। তারা রিজার্ভ বোঝে না, প্রবৃদ্ধি বোঝে না। তারা কাজ চায়, বাঁচতে চায়। এরশাদ বলেন, এক দেশে এখন দুই আইন। ধনীর জন্য এক রকম। আর গরিবের জন্য অন্যরকম। সবার জন্য আইন সমান হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের দেশে এক রকম নয়। গডফাদার নামে নতুন আলামতের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের অঢেল অর্থ, অস্ত্রের ভা-ার তারা কি আইনের ঊর্ধ্বে? এক মন্ত্রী নাকি ৩০০০ একর জমি কিনেছেন। আমরা এ সব মাফিয়া, গডফাদার চাই না। শান্তি চাই। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের ঘটনা ঘটলো। মিরপুরের বিহারি পল্লীতে ১০টি মানুষ পুড়ে মারা গেল। বিচার নেই। মানুষ হত্যা হচ্ছে, আমাদের মনে দুঃখ নেই। আমাদের জীবন থেকে প্রেম-ভালবাসা চলে গেছে। আমাদের জীবন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। অর্থ ও ক্ষমতার লোভে সবাই পাগল হয়ে গেছি। মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। কবে ফিরে আসবে পরিবারের সদস্যরা কেউ জানে না। সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, শেয়ারবাজারে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে তারা সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ব্যাংক লুট করে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। মেয়ার বাজারের কেলেঙ্কারীর রিপোর্ট আলোর মুখ দেখছে না। অর্থমন্ত্রী বলছেন, তাদের হাত অনেক লম্বা। জানতে চাই- কত লম্বা? তাদের হাত কি সরকার, প্রশাসন ও আইনের চেয়েও লম্বা? অনেকে অর্থ পাচার করে আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়ায় বাড়ি করছেন। এরা এত টাকা কোথায় পেলো? কিভাবে টাকা গেল? এদের ধরা কি খুবই কঠিন কাজ। দেশে নিরাপত্তা নেই। আগে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপত্তা থাকলে বিদেশে অর্থ পাচার হবে না। এরশাদ বলেন, মানুষ আজ মুক্তি চায়। গডফাদার, দুর্নীতি, দুঃশাসন, সংঘাতের রাজনীতি, টেন্ডারবাজি, শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাস, অশিক্ষা-কুশিক্ষা থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু মুক্তি অবরুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। কিন্তু মুক্তি দিয়ে যাওয়ার সময় পাননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তার সন্তান প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি এ জন্য যে পদক্ষেপ নেবেন আমরা সর্বাত্মকভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করবো। সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু হৃদয়ে আছেন। থাকবেনও। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হলে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, মাছ ও ফলে ফরমালিন, দুধে পর্যন্ত বিষ। রোজা আসছে, মুড়ি খাবো। সেখানেও ইউরিয়া। সমস্ত দেশ আজ বিষাক্ত হয়ে গেছে। এর হাত থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। উপজেলা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে হবে। প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে।

অগ্রজ কবি নির্মলেন্দু গুণ

অগ্রজ কবি নির্মলেন্দু গুণ যে কবিতাটি লিখে তার পাঠকদের অন্তর জয় করেছেন, সেই ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’কে এবার চলচ্চিত্রায়ণ করেছেন অনুজ কবি মাসুদ পথিক। তরুণ নির্মাতা মাসুদ পথিকের ভাষায় এটি তার একটি র-রিয়ালিজম প্রচেষ্টা। প্রকৃতি, প্রেম, গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের প্রবাহমান সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, বিরহ-মিলন বাংলার ষাটের দশকের গ্রামীণ সমাজের শ্রেণী বৈষম্যের চিরায়ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বন্ধুতা-শত্র“তা, বিদ্রোহ-আন্দোলন, ঘাত-প্রতিঘাত, শ্রেণী শত্র“তা, ধনি-গরিব অন্তর্কলহ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ ছবির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র নেকাব্বর একজন ভূমিহীন অভাগা কৃষক। প্রচলিত সমাজের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যুবক নেকাব্বর একাধারে প্রকৃতিপ্রেমী ও প্রেমিক অন্যদিকে বিপ্লবী। গাছপালা, জীব-জন্তু, পরিবেশ-প্রতিবেশ, এমনকি মানুষ- সবই যেমন প্রকৃতির দান, তেমনি প্রকৃতির বুকে সবারই আত্মপরিচয় ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ন্যায্য অধিকার রয়েছে- এমন এক চিরায়ত সত্যের প্রলম্বিত আদর্শ নেকাব্বর সারাক্ষণ অন্তরে লালন করেন। প্রকৃতির উদ্ভিদ ও প্রাণী, নানান কিসিমের জীব-জন্তুর প্রতি তার যেমন সীমাহীন মায়া, অন্তরে সুগভীর দরদ, প্রেয়সী ফাতেমার প্রতি প্রগাঢ় প্রেমাস্পন্দন তেমনি তীব্র তার। জীবনের হাজারো চড়াই-উৎড়াইয়ের ভেতরেও নেকাব্বর তাই তিলে তিলে গড়া হৃদয়ের সীলমোহর প্রিয়তমা ফাতেমাকে ভুলতে পারে না।
প্রচলিত সামন্তবাদী সমাজের রাষ্ট্রীয় দুঃশাসকের স্থানীয় প্রতিনিধি তালুকদার সাহেবের রোষানলের শিকার হয়ে নেকাব্বর এক সময় গ্রামছাড়া হতে বাধ্য হয়। পেছনে পড়ে থাকে মায়ের কবর। ঘরের দাওয়ায় মায়ের কবরের নির্যাস থেকে জন্ম নেওয়া মায়ের প্রতিচ্ছবি প্রিয় লেবুগাছের পাতার মাতৃঘ্রাণ, প্রাণের প্রেমাশ্বরী ফাতেমা, অমর বাল্যকাল, গ্রামীণ প্রিয় মেঠো জনপদ, অন্তরে লালিত স্বাদ-আহ্লাদ কত কিছু! তবুও বিপ্লবী নেকাব্বর মানবতার জয়গানকে হৃদয়ে ধারণ করে ব্যক্তি স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে স্মৃতির চোরাবালিতে ডুবসাঁতার না কেটে জাতীয় চেতনায় একাত্ম হয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। নেকাব্বর একজন বিপ্লবী, একজন অকুতভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা। শত্র“র বিরুদ্ধে চূড়ান্ত মোকাবিলায় সামগ্রিক জয় ছিনিয়ে আনতে গিয়ে যুদ্ধে যদিও অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে তিনি একটি পা হারান। জীর্ণ বাড়িঘর, যৌবনবতী প্রেয়সী আর ফেলে আসা জীবন হারিয়ে যুদ্ধ শেষে স্মৃতিভ্রষ্ট নেকাব্বরের জায়গা হয় পাগলাগারদে। কিন্তু ৪২ বছর পর নেকাব্বর যখন পাগলাগারদ থেকে মুক্তি পান- তখন ফেলে আসা জীবনের মধুর স্মৃতির অলিগলি নতুন করে আবার ক্র্যাচে ভর দিয়ে অবশিষ্ট জীবনময় নেকাব্বরকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
একজন পরিবেশবাদী, প্রকৃতি প্রেমী, তুখোড় প্রেমিক, বিপ্লবী ও বিজয়ী যোদ্ধার রুদ্র মূর্তির বলিষ্ঠ চরিত্রে বলিয়ান শৌর্যপুরুষ নেকাব্বর এক সময় বয়সের ভারে রোগে শোকে দুঃখে অভিমানে এই বাংলার পরম মমতাময়ী মাটির কাছেই চিরায়ত নিয়মে জমিন খুঁজে পান।
এমনি প্রতিবাদী এক বীরত্বগাঁথা চরিত্র নেকাব্বরের জীবনের ঘটনা প্রবাহকে ক্যামেরাবন্দি করতে গিয়ে তরুণ নির্মাতা মাসুদ পথিক দর্শকদের কাছে সত্যি সত্যিই মানবতার জয়গানকে প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি জীবনের দর্শন, সমাজের প্রচলিত মিথ, দৈনন্দিন হাসি-আনন্দ, ঠাট্টা-তামাশা, বিরহ-দুঃখের ক্যানভাসের ভেতরে আন্দোলন সংগ্রাম যুদ্ধের পরে পরিবর্তিত নতুন চেতনায় নতুন পতাকাতলে নতুন দেশেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের যে তেমন কোন আমূল পরিবর্তন ঘটেনি- সেই সত্যটি উপলব্ধি করার জন্য অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সঙ্গে দর্শকদের দিকে মাসুদ পথিক একটি চৈতন্যের তীর ছুড়ে দেন।
ছবিতে ষাটের দশক থেকে শুরু করে কয়েক দশকের ঘটনা প্রবাহ ফ্রেমে ফ্রেমে প্রদর্শিত হয়। কবিতার লাইনে লাইনে যেমন নানান চড়াই-উৎড়াই থাকে, মাসুদের ছবিতেও সেই কালের টানাপড়েন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যের চিরায়ত নিসর্গকে স্পর্শ করার আগেই হয়তো দিগন্তে গোধূলী নামে। এটা প্রথম ছবি হওয়ায় দৃশ্যায়নের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় হয়তো মাসুদ কিছুটা হাঁপিয়ে ওঠেন। নতুবা ছবির সম্পাদনা, কস্টিউম ব্যবস্থাপনা, আবহসঙ্গীত স্থাপনা এবং টানটান উত্তেজনা সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় তিনি আরো যতœবান হতে পারতেন।
তবুও বাংলা সিনেমার জগতে ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ একটি নতুন দর্শনের ছবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
ছবির ব্যাপ্তিকাল ১৩১ মিনিট। থার্টি ফাইভ, এইচডি, এফপি ও রেড-ওয়ান ক্যামেরায় ধারণ করা ডিজিটাল ফরম্যাটের ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ ছবিতে মোট ৬টি গান ব্যবহার করা হয়েছে। গানের কথা লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি অসীম সাহা, কবি মাসুদ পথিক, গীতিকার সাইম রানা ও কবি অতনু তিয়াস। গানের সুর ও আবহসঙ্গীত নির্মাণ করেছেন সঙ্গীত ভুবনের নতুন অ্যাপ্রোচার সাইম রানা। ক্যামেরায় ছিলেন অপু লরেন্স রোজারিও ও বায়জীদ কামাল। সম্পাদনা করেছেন জুনায়েদ হালিম ও জুয়েল তালুকদার। নেকাব্বর চরিত্রে অভিনয় করেছেন জহির জুয়েল (যুবক) ও বাদল শহীদ (বৃদ্ধ), ফাতেমা চরিত্রে সিমলা, তালুকদার সাহেবের চরিত্রে মামুনুর রশিদ, ফাতেমার বাবা আইনুদ্দিনের চরিত্রে প্রবীর মিত্র, মুন্সী চরিত্রে এহসানুর রহমান, নির্মল চরিত্রে সৈয়দ জুবায়ের (যুবক) ও স্বনামে কবি নির্মলেন্দু গুণ, কৃষক নেতার চরিত্রে কবি অসীম সাহা, বিউটি বোর্ডিংয়ে শ্রমিক নেতা মামুনের চরিত্রে শেইখ শাহেদসহ প্রায় ১৫ জন কবি ও ১০০০ গ্রামবাসী ছবিতে অভিনয় করেছেন।
বৃষ্টির আশায় গ্রামবাসী প্রচলিত মিথের উপর অগাধ বিশ্বাস রেখে যে উৎসবটি করে- ছবির এই অংশের দৃশ্যায়ণটি বেশ মুগ্ধকর। প্রচলিত বাংলা ছবির উঠোনে মাসুদের এই ছবির দর্শনগত শক্তিমত্তা কিছু কিছু নির্মাণগত দুর্বলতাকে কাটিয়ে দর্শকদের হৃদয় জয় করবে- এমন আশাবাদ রইল। মাসুদের ছবিতে বাঁকে বাঁকে কবিতা লুকিয়ে আছে, দর্শনের পক্ষ ও বিপক্ষের যুক্তি ছাপিয়ে আছে, আর আছে বাংলার গ্রামীণ জনপদের চিরায়ত সৌন্দর্য। মাসুদের লেখার কলমটি ক্যামেরায় পুরোপুরি রূপান্তরিত করতে পারলেই ভবিষ্যতে হয়তো বাংলা সিনেমার সেই শূন্যস্থান পূরণ হবে। সিনেমা জগতে তরুণ নির্মাতা মাসুদ পথিককে অভিনন্দন জানাই।

আহমদ ছফার জল্লাদ সময় by সিদ্দিকুর রহমান খান

দুঃসময়, জল্লাদ সময় ও আমাদের সময় শিরোনামের কবিতা তিনটির ঠিকানা ‘আহমদ ছফার কবিতা’ গ্রন্থের ১৪৩, ১৪২ ও ১৪১ পৃষ্ঠায়। জল্লাদ সময় কবিতার শুরু এমন : খড়গ হস্তে নৃত্য কর জল্লাদ সময়/তোমার সুস্থির হওয়া বড় প্রয়োজন/সকলে বিশদ জানে তবু হয় অন্ধকারে খুন/অস্ত্রহীন তাই কেউ বিনা খুনে দায়ভাগী হয়। সময়ের জানু চিরে বেরিয়েছো জারজ সময়/টাটকা মনষ্য প্রাণ মনে করো খেলার পুতুল/ইচ্ছেমতো ভাঙ্গো তুমি মর্জি মতো বসাও মাশুল/তোমার গর্ভের পাপে বঙ্গদেশে জেগেছে প্রলয়। আমাদের সময়’র শুরু : আমাদের এ সময় সুসময় নয়/জোয়ারে হিন্দোল দোলা, ভাটায় মন্থর/চেনাজানা ভদ্র নদী ভেবে/যেজন ভাসাবে ডিঙ্গা পৈতৃক বিশ্বাসে/জেনে রাখ সর্বনাশ সম্মুখে তোমার। পাঠক, ‘দুঃসময়’ কবিতার দুটি লাইন উল্লেখের আগেই বলে নিচ্ছি আজকের এ লেখায় মনীষী লেখক ও কবি আহমদ ছফার কবিতার কাব্যমূল্য বিশ্লেষণ বা আলোচনা করার ধৃষ্টতা দেখানের চিন্তাও করবো না। বরং ছফার সান্নিধ্য পাওয়ার সুবাদে তাঁর কবিতা সম্পর্কে তাঁর পোষণ করা ধারণা এবং কবিতায় সমকালীন সমাজ বাস্তবতার কিঞ্চিৎ চিত্রালোচনা করবো।
গা গতরে চিকন ‘জল্লাদ সময়’ কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৯৭৫ খৃস্টাব্দ। জল্লাদ সময় ও আমাদের সময় কবিতা দুটির রচনাকালও এ সময়। ব্যক্তিগত জীবনে শিরা-উপশিরায় প্রতিবাদী কবি তাঁর কাব্যে চিত্রায়ন করেন ‘জল্লাদ সময়’ আর প্রবন্ধে ‘চন্ডশাসন’। ‘চন্ডশাসনের’ এ নিষ্ঠুর দিনগুলোতে তিনি জ্বলে উঠতে পেরেছিলেন এবং এর প্রায় দুই দশক পরে এ নিয়ে গর্ববোধ করেন, রচনা করেন সম্প্রসারিত প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস : সাম্প্রতিক বিবেচনা’।
সারা জীবনে মোট চারটি কবিতার সংকলন প্রকাশ হয়েছে ছফার। ‘দুঃসময়’ কবিতার রচনাকাল অজানা। তবে এটা জানা, ‘আহমদ ছফার কবিতা’-ই তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থ। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা-খ্যাত ও ছফার বন্ধু বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা শিব নারায়ণ দাশ এ বইয়ের প্রকাশক ও প্রচ্ছদ শিল্পী। ২০০০ খৃস্টাব্দের একুশে ফেব্র“য়ারি প্রকাশিত বইটিতে ‘দুঃসময়’ কবিতাটি পাই। এখানে কবি বলছেন : নদীতে বইছে বেগে খরতর খলস্রোত/দুকূলে নামছে ধ্বস, অবিরত চলছে ভাঙ্গন/ভাঙ্গন ভাঙ্গন শুধু চারদিকে ভাঙনের ক্ষণ। দুঃসময় শিকারী বাজের মতো চঞ্চু মেলে গুনছে প্রহর/গ্রামগুলো সর্বস্বান্ত বৃক্ষপত্রে জাগে আর্তস্বর/বলির পাঁঠার মতো চোখ মেলে কাঁপছে শহর। আবার এ কাব্যগ্রন্থেই ঠাঁই হয়েছে, ১৯৯৬ খৃস্টাব্দে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় প্রথম প্রকাশিত ‘কবি ও সম্রাট’ নামের দীর্ঘ কবিতাটি। ছফা একে নাট্যসংলাপ আখ্যা দিয়ে কৈফিয়ত দিচ্ছেন, ‘পৃথিবীতে জন্মানো রক্তমাংসের আসল মানুষের সঙ্গে কবির হৃদয়ে জন্মনো মানুষের ফারাক তো অবশ্যই থাকবে’। আবার বলছেন, ‘রাজকবি পেশাগত ঈর্ষা থেকে মুক্ত নন/তবে মীর তকি মীর এক বাহাদুর কবি। খাসলতে অপদার্থ, আত্ম কিংবা পর, সকলের প্রতি তার সম অবিচার। তাহলে তো ভাড়া করে আনতে হয় আরো এক কবি, স্বভাবে কবিতা লেখে পেশায় কসাই/প্রতি বাক্যে হানে যেনো মুগুরের ঘাই’। নিজের কাব্য নিয়ে কালেভদ্রে উচ্ছসিত কবি ছফা এ লেখককে যা বলেন তার সারমর্ম এরকম : পত্রিকায় এ কবিতাটি প্রকাশের পর বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর বংশধর যিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকও তিনি ছফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন, ‘গত ২৫ বছরেও তিনি এমন কবিতা পাঠ করেননি। কবিতা পাঠ করেই ছুটে এসেছেন কবি ছফাকে ধন্যবাদ জানাতে’। ছফা আরো বলেন, পত্রিকাওয়ালারা অনেক প্রধান/অপ্রধান কবির কবিতা প্রকাশের বছর পেরিয়ে গেলেও সম্মানী দেন না। কিন্তু ছফার সব কবিতার সম্মানীই প্রকাশমাত্র হাতে পেয়েছেন। কবি ও সম্রাটের ক্ষেত্রেও তার ব্যতয় ঘটেনি। শিব নারায়ণ প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় কবি লেখেন, ‘কবিতা দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু। কিন্তু অনবিচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখার অভ্যাসটি আমার দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কৈফিয়ত স্বরূপ আমি একটা কথাই বলতে পারি, জীবনের দায় কবিতার দায়ের চাইতে অনেক বেশি নিষ্ঠুর। ...তারপরেও আমার কবিতা সম্পর্কে কিছু কথা অবশ্যই আমাকে বলতে হবে। কবিতা ভয়ঙ্কর জিনিস। প্রাণে কবিতার বীজ প্রবিষ্ট হলে অবশ্যই কবিতা লিখতে হয়। আমার জীবনে এমন অনেক সময় এসেছে অন্যবিধ রচনার মাধ্যমে মনের তৎকালীন অনুভবটি প্রকাশ করা যখন অসম্ভব মনে হয়েছে তখনই কবিতা লিখেছি। কবি হিসেবে পরিচিত হওয়ার আকাক্সক্ষার চাইতে তাৎক্ষণিক মনের ভাব লাঘব করার প্রয়োজনেই আমাকে কবিতা লিখতে হয়েছে।
কে কবি, কে কবি নয়, কার কবিতা যথার্থ অর্থে কবিতা, কে ভনিতা লিখেই জীবন অপচয় করে, এ নিয়ে কবিদের মধ্যেই বিতর্কের অন্ত নেই। এমন পটভূমিতে ছফার মুখে শুনি, ‘যেহেতু আমার আত্মপ্রকাশের অন্যবিধ মাধ্যম ছিলো তাই বুক ঠুকে নিজেকে কবি হিসেবে জাহির করার দুরাকাক্সক্ষা আমার হয়নি। তবু কোনো ব্যক্তি যখন আমাকে কবি শনাক্ত করতে চেষ্টা করেছেন, সেটাকে আমি নেহায়েত সৌজন্যের প্রকাশ বলে ধরে নিয়েছি’। সমকালীন অনেক নাম-ডাকওয়ালা কবিরা যখন প্রধান, অপ্রধান, শ্রেষ্ঠ কবি, কবিশ্রেষ্ঠ ইত্যাদি তকমা ছিনতাই করতে ব্যস্ত কিংবা কবি হিসেবে পুরস্কার-টুরুস্কারের পেছনে নিরন্তর ছুটছেন তখন স্পষ্টবাদী ছফা লেখেন, ‘কবি হিসেবে পরিচয় অপরিচয়ের ব্যাপারটি কখনো আমার চিত্তদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। বরঞ্চ উল্টো আমি মনকে এই বলে শান্ত করতে চেষ্টা করেছি, তোমাকে সবকিছু হয়ে উঠতে হবে কেনো?’
অমৃতসমান শিশুতোষ ছড়া ‘গো হাকিম’ প্রকাশের পরপরই আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় হয়েছেন। গো হাকিম’র শুরুটা এরকম : একদিন এক মাস্টার বুড়ো/দুপুর বেলা ইসকুলে/মনের ভিতর জমে থাকা/পিত্তথলির বিষ তুলে/দাঁত খিচিয়ে বেত উঁচিয়ে করতে গিয়ে গালমন্দ/গরু ডাকেন গাধা ডাকেন/যখন যেমন পছন্দ। একটি ছড়াই শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক ও শিক্ষণীয় একটি বই হতে পারে। ২০০০ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত ছফার কাব্যগ্রন্থে এ ছড়াটি ঠাঁই পেয়েছে।
হিন্দুস্তান কিংবা পাকিস্তান নয় ছফার শুভজন্ম পরাক্রমশালী ব্রিটিশ শাসনামলের অস্থির সময়ে অর্থাৎ ১৯৪৩ খৃস্টাব্দের ৩০ জুন। চাটগাঁর গাছবাড়িয়ায়। জন্মেই দেখেছেন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহের ডামাডোল আর নিজ দেশ স্বাধীনতা লাভের আন্দোলনে ভেতরে বাইরে অস্থির। ‘জল্লাদ সময়’ আর ‘আমাদের সময়’ কবিতাদুটির রচনাকাল ১৯৭৫ খৃস্টাব্দের অস্থির সময়ে। ২০০১ খৃস্টাব্দের ২৮ জুলাই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে শ্রাবণের এক ঘন বৃষ্টিরদিনে বাংলামোটরের ছায়াঘেরা, পাখিডাকা বাড়িতে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করলেও কমিউনিটি হাসপাতালের কমরেড কাজী কামরুজ্জামানের জবানীতে ভক্তকুলকে শুনতে হয়েছে কবির গত হওয়ার দুঃসংবাদ। ইহলোকত্যাগকালটাও ছফার জন্য ছিল অসময় বা দুঃসময়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসে প্রকাশিত স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ’কার ছফা। নাম ‘জাগ্রত বাংলা’। ভক্তরা ছফার মৃতদেহ দাফনের আগে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন বা রাষ্ট্রীয় সম্মান পেতে সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধা হতে হয়। ওই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট দেওয়ার একমাত্র ঠিকাদার ছিলেন অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী। ছফা কোন সেক্টরে কার অধীনে যুদ্ধ করেছেন তার ঠিকুজি-কূলজি ঠাওরাতে পারেননি চৌধুরী সাহেব। ফলাফল রাষ্ট্রীয় সম্মান জোটেনি ছফার কফিনের ভাগ্যে। কবি হিসেবে পুরস্কার কিংবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেটের পাত্তা না দেওয়া ছফা কবরে গিয়ে হয়তো লিখছেন, ‘রাজাদের দিন গ্যাছে/ ভজাদের ধন যাবে/বাবুদের গিরি যাবে/স্বর্গের পিড়ি যাবে/সময়ের চাবি যাবে/জল্লাদেরও কল্লা যাবে!

নির্মলেন্দু গুণের কবিতা by সিদ্দিকুর রহমান খান

আমার গর্ভধারিণী মাতার নাম বীণাপাণি। আমার চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই উনি লোকান্তরিত হন।
ফলে তাঁর কোনো সুখস্মৃতি আমার মনে নেই। শুধু একটি আবছা ছবি আছে আমার চোখে।
মা বিছানায় শুয়ে আছেন। আমার বাবা বালতি থেকে জল ঢালছেন তাঁর মাথায়। আমি আমার মাকে কখনও
কোথাও দাঁড়ানো অবস্থায় বা বসে থাকতে বা ঘরে ভিতরে বা বাইরে উঠানে হেঁটে বেড়াতে দেখিনি।
আমার প্রিয় রাবারের বলটি বুকে জড়িয়ে নিয়ে আমি ঘরের বাইরে চলে যাচ্ছিলাম। তখন আমার বাবা
আমাকে মায়ের পাশে এসে একটু বসতে বললেন। কিন্তু আমি তাঁর প্রস্তাবে রাজি হইনি। আমি দ্রুত দৌড়ে
ঘর ছেড়ে আমার বাবা-মার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাই।
পরে একটু বড় হয়ে জেনেছি- ঐ দিনই অল্প-সময়ের ব্যবধানে আমাকে কাছে পাবার সঙ্গতসাধ অপূর্ণ
রেখেই আমার মায়ের জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হয়। শুনেছি বড় ভাইয়ের সঙ্গে মিলে, আমাদের গ্রামের ধনাই
নদীতীরবর্তী পারিবারিক-শশ্মানে আমি তাঁর মুখাগ্নি করেছিলাম। কিন্তু সেরকম কোনো কঠিন দৃশ্য আমার
মনে পড়ে না।
মা, তুমি কি সেদিন বুকে জড়িয়ে ধরে আমাকে আদর করতে চেয়েছিলে? তোমার খেলাপাগল এই দুরন্ত
পুত্রটিকে ক্ষমা করো। তোমার শেষ-আদর আমার ভাগ্যে ছিলো না।
দেশকে মাতৃজ্ঞান করাটা এই দিক থেকে ভালো যে, সে আমাদের গর্ভধারিণী মায়েদের মতো
মরণশীলা নয়। আমাদের অন্তরের ভালোবাসা দিয়ে আমরা তাঁকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারি।

ব্লগাররা কি সাংবাদিকদের চেয়ে প্রভাবশালী? by কাজী আলিম-উজ-জামান

জনগণকে তথ্য ও মতামত দিয়ে সহায়তা করার বিষয়ে সাংবাদিকদের ভূমিকা বরাবরই অগ্রগণ্য।  প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ব ক্রমেই এগিয়ে চলেছে। এতে সাংবাদিকদের তথ্য সরবরাহ ও সাধারণ মানুষে তথ্য আহরণের ক্ষেত্র বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে তথ্যদাতা এমন কিছু মানুষের সংখ্যা, যাঁরা সরাসরি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত নন, কিন্তু তথ্য দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের ভূমিকা প্রবল। এর মধ্যে প্রভাবশালী হচ্ছেন ব্লগাররা। এক দশকের বেশি সময় ধরে সামাজিক গণমাধ্যমভিত্তিক ব্লগাররা এ কাজটি প্রায় সমানভাবে করে আসছেন। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় সর্বশেষ তথ্য প্রদানে ব্লগাররা কৃতিত্ব দেখাচ্ছেন।

ব্লগারদের জোটবদ্ধ মতামত ভূমিকা রাখছে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পরিবর্তনে। মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে ব্লগারদের তথ্য দেওয়ার কর্মকাণ্ডকে এখন আর অসম বলা যায় না। তাই সাংবাদিক না ব্লগার, কে বেশি প্রভাবশালী, কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি কে বেশি জনপ্রিয়—এসব প্রশ্ন জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে সর্বত্র। একই সঙ্গে এ প্রশ্নও আসছে, তবে কি ব্লগারও সাংবাদিক? সময় কি এসেছে ‘সাংবাদিকতা’ শব্দটির আরও বৃহত্তর অর্থ খোঁজার?

২.

শিল্প-সাহিত্য থেকে শুরু করে জীবনের হাসি-কান্না—সবকিছুই একটি ব্লগে থাকে। সাংবাদিকতা এর বাইরের কোনো বিষয় নয়। আর ব্লগ তো ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক গণমাধ্যম। প্রশ্নটা হচ্ছে, সামাজিক গণমাধ্যম আর মূলধারার গণমাধ্যম নিয়ে। শত বছর ধরে যা মূল ধারা ছিল, সেটিই মূল ধারা থাকবে, সে নিশ্চয়তা দিচ্ছে কে? তবে ব্লগের এখনকার প্রতিযোগিতাটা মূল ধারার সঙ্গে।

এর পরও ‘ব্লগের সাংবাদিকতা’কে ঠিক সাংবাদিকতা বলে মানতে চান না অভিজ্ঞজনেরা। রক্ষণশীল অনেক সংবাদপত্র ব্লগকে সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে দেখে। তাদের মতে, ব্লগে যাচাই না করে ভুল তথ্য দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। অসত্ রাজনীতিকেরা ব্লগ ব্যবহার করে জনগণের মতামতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।

পুলিত্জার বিজয়ী মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড এস ব্রডার মনে করেন, ব্লগিং একেবারেই সাংবাদিকতা নয়। কারণ আপনি সারা দিন কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে পারবেন না। বাইরে গিয়ে সোর্সের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বিষয়গুলো নিজের মতো করে অনুসন্ধান করতে হবে। তার পর যা জানলেন, বুঝলেন, তা লিখবেন, প্রতিবেদকেরা সাধারণত যেভাবে কাজ করেন। ওয়াশিংটন পোস্টের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা ব্রডার এই কথার ভেতর দিয়ে বলতে চাইছেন, ব্লগাররা সাধারণত মতামতধর্মী লেখা লেখেন। আর মতামত সাংবাদিকতা হতে পারে না।

এস ব্রডার যা বলেছেন, সেটাই কি সবকিছু? প্রখ্যাত ব্লগার অ্যালেক্স উইলহেম এ কথার জবাব দিয়েছেন প্রভাবশালী ব্লগ টিএনডব্লিউর সঙ্গে সাক্ষাত্কারে। তিনি বলছেন, এটা সত্য যে মানুষ নির্জলা তথ্য জানতে চায়। একই সঙ্গে তারা এটাও জানতে চায়, নির্জলা তথ্যের অর্থসহ বিশ্লেষণ। এখানেই ব্লগিংয়ের উত্পত্তি। কারণ ব্লগাররা পাঠকের সামনে কোনো একটি বিষয়ের তথ্যসহ পরিপ্রেক্ষিতও হাজির করেন।

উইলহেম বলছেন, ক্ষেত্রবিশেষে ব্লগাররা রিপোর্টারদের আগেই সর্বশেষ তথ্যটি দিতে পারেন। কেবল তা-ই নয়, তাঁদের লেখা কপি এডিটররা ঠিক করে দেন। ব্লগারদের লেখার ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। তিনি ব্লগিংকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার পক্ষে মত দেন। তাঁর ভাষায় ব্লগিং=সাংবাদিকতা+ মতামত।

৩.

ব্লগার না সাংবাদিক, কে বেশি শক্তিশালী—সেই তর্কে না গিয়ে গণমাধ্যম পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, সাংবাদিক হওয়ার জন্য ব্লগিং হলো প্রথম ধাপ। ব্লগে লিখে হাত পাকিয়ে তবেই না সাংবাদিক হওয়া। ধরা যাক, আপনি কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রাপ্ত সাংবাদিক। আপনার পদবিসহ পরিচয়পত্র আছে। এই নিয়োগ বা পদবি কিন্তু আপনাকে ভালো রিপোর্টার বা সুলেখক বানাতে পারবে না।

আজকের তথ্যপ্রধান যুগে যারা সাংবাদিক বা লেখক হতে চান, আগে তাঁদের নিজস্ব ব্লগ খোলা দরকার। সেখানে তাঁরা নিজের ধারণাগুলো লিখবেন। এরপর সেই লেখা যদি পাঠকের নজর কাড়ে, লাখো ‘হিট’ পায়, হাজারো ‘ফলোআর’ তৈরি হয়, তবেই সাংবাদিক হওয়ার কথা তাঁরা মাথায় নিতে পারেন। এই মতের অনুসারীরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে প্রমাণ করতে হবে সাংবাদিক হিসেবে আপনি কতটা যোগ্য, সেই দিন শেষ হয়ে গেছে।

৪.

এবিসি নাইটলাইনের জন বার্মান মনে করেন, ব্লগেও ভালো মানের রিপোর্টিং হতে পারে। কিন্তু সব ব্লগেই ভালো রিপোর্টিং হওয়ার দরকার নেই। অনেক প্রখ্যাত সাংবাদিক আছেন, যাঁরা নামী ব্লগার হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক তুখোড় রিপোর্টার আছেন, যিনি ব্রেকিং নিউজটি ব্লগে ব্রেক করে থাকেন। এঁদের একজন এবিসি টেলিভিশনের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা জেইক ট্যাপার। তিনি প্রায়ই ব্লগে নিউজ ব্রেক করেন, পরে সেটা এবিসিতে সম্প্রচার হয়। কেবল তা-ই নয়, তিনি হামেশা এমন এমন খবর ব্লগে ব্রেক করেন, যা একান্তই ব্লগ এক্সক্লুসিভ, কখনোই টেলিভিশনে দেখানো হয় না।

প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে জন বার্মান বলছেন, ‘এ অবস্থায় হোয়াইট হাউসে কী ঘটছে, তা জানতে আপনি যদি ট্যাপারের ব্লগ না পড়েন, তবে আপনি আস্ত আহাম্মক। একইভাবে আপনি গাড়লই থেকে যাবেন, যদি তাঁর টেলিভিশন রিপোর্টিং না দেখেন।’

তাই ভালো মানের প্রতিবেদন হতে পারে যেকোনো জায়গায়, একখণ্ড খবরের কাগজে, কম্পিউটারের পর্দায় বা টেলিভিশন চ্যানেলে। সঠিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করা হয় একটি প্রতিবেদন। কিছু কিছু ব্লগ সে চেষ্টা করে বটে, কিন্তু বেশির ভাগ নামী ব্লগও তা পেরে ওঠে না। বার্মান বলছেন, তাই ব্লগের সাংবাদিকতাকে ঠিক সাংবাদিকতা বলা যায় না।

৫.

আমাদের দেশেও এ বিতর্কটি বেশ জোরেশোরেই আছে। ব্লগারদের দাবি, এখনকার সাংবাদিকতায় যে বৈচিত্র্যপূর্ণ ধারণার সমাহার, এতে তাঁদের অবদান আছে।

ব্লগারদের দাবি, গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে প্রথম সমস্বরে প্রতিবাদ তাঁরাই করেছেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। ছাত্রী নির্যাতনকাণ্ডে অভিযুক্ত পরিমল জয়ধরকে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড প্রদানে তাঁদের লেখালেখির ভূমিকা আছে। অথচ মূল ধারার গণমাধ্যম তখন চুপ ছিল। ইন্টারনেটের গতি কমানোর সরকারি পদক্ষেপকে থামিয়েছেন তাঁরাই।

সম্প্রতি লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা অনুষ্ঠানে ইসলামি ব্যাংকের টাকা গ্রহণের বিরুদ্ধে প্রথমে তাঁরাই সোচ্চার হয়েছেন। ব্লগারদের দাবির বিষয়ে অবশ্য সাংবাদিকদের মধ্যে জোরালো দ্বিমত আছে। সন্দেহ নেই, ব্লগ নাগরিকের অধিকারবোধ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তার পরও ব্লগিং বনাম সাংবাদিকতা, বিতর্কটিকে চলতে দেওয়া ভালো। কে প্রথম স্থান পেল, এখনই তা নির্ধারণ করতে গেলে জুরিবোর্ডের শাস্তির দাবিতে লেখালেখি শুরু হয়ে যেতে পারে!

কাজী আলিম-উজ-জামান: সাংবাদিক

ইমেইল: alimkzaman@gmail.com

বেশি করে ভালো কাজ করলেই তো হয় by আনিসুল হক

কথাটা শোনা গিয়েছিল নির্বাচনের আগে আগে। যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বিএনপি ও তার জোট নির্বাচনে আসছে না, আওয়ামী লীগ তার সঙ্গীদের নিয়ে একটা একতরফা নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে চলেছে। তখন আমরা এই রকম একটা কথা শুনলাম, আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসবে, তারপর খুব ভালো ভালো কাজ করবে, এতসব ভালো কাজ যে জনগণের হৃদয় তারা জয় করে ফেলবে, এতটাই জয় করবে যে তারপর নির্বাচন হলে সেই নির্বাচনে যত শক্তিশালী প্রতিপক্ষই অংশ নিক না কেন, নৌকা মার্কারই জয় হবে। শুনে দেয়ালবিহারী টিকটিকি টিক টিক করে উঠেছিল, আর ত্রিকালদর্শী হীরামন পাখি বলে উঠেছিল, হায়, জনচিত্ত জয় করার জন্য ভালো কাজ করার সদিচ্ছা ও ক্ষমতা যদি তাদের থেকেই থাকে, তাহলে তারা এই পাঁচটা বছর করল না কেন? তাদের একটা একতরফা নির্বাচনের দিকে যেতে হচ্ছে কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ সেই তেপান্তরের মাঠে ছিলেন না। কিন্তু আজকে, ওই নির্বাচনের এতটা দিন পরে, বারবার মনে হচ্ছে, সরকার ভালো কাজগুলো করুক, জনচিত্ত জয় করুক। এমন ভালো ভালো কাজ যেন তারপর নির্বাচন এলে জনগণ ভালোবেসে ফুলের মালা নিয়ে তাদের আবারও বরণ করে নেয়! হায়, বিড়াল সাদা না কালো, সেটা যে বড় কথা নয়, বড় কথা বিড়াল ইঁদুর মারে কি না। গাছ নির্বাচিত নাকি অনির্বাচিত, তা বড় কথা বটে, তারও চেয়ে বড় কথা, গাছ সুফল দেয় কি না!

প্রসঙ্গটা এসেছে সম্প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতির একটা উক্তিতে, যিনি কি না স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের অনেক মানুষেরই প্রিয় একজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন প্রধানত তাঁর সুমিষ্ট ও সুরসিক বচনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, দেশের মানুষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মেনে নিয়েছে। ফলে দেশে এখন স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। সেই পটভূমিতে বেজে উঠেছে বিবেকের কণ্ঠস্বর, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাকস্ফূর্তি—রাষ্ট্রপতি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।
জাতিসংঘ একটা বিবৃতিও দিয়েছে, তাতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, সংসদে নেই, এমন বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু করার। এই বিবৃতির অভিপ্রায় আমরা সম্ভবত বুঝেছি। আর বিএনপি, তার নেতা–নেত্রীরা, এমনকি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আওয়াজ তুলেছেন—সরকার যদি সংলাপ শুরু না করে, তাহলে আন্দোলন, তাহলে হরতাল। তাদের এই হুমকিকে আমরা মোটেও ফাঁপা ও ফাঁকা আওয়াজ বলে ধরছি না৷ কারণ, বাংলাদেশে হরতাল করতে পয়সা লাগে না, মোটা পেট ও ভারী পা নিয়ে রাজপথে নামতে হয় না নেতাদের, একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়ে বললেই হয়, অমুক দিন হরতাল, জনগণ নিজ দায়িত্বে পিতৃদত্ত প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে নিজের মতো করে দিনটা পার করে, তাকে আমরা বলি হরতাল পালিত হওয়া। কিন্তু পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা কেঁচো গণ্ডূষ ভাব আছে। যাকে বলা যায়, পুনঃমূষিক ভবঃ।
আসুন, পুরো ব্যাপারটা একবার রিক্যাপ করি—ধারাবাহিক নাটকের শুরুর ‘এর আগে যা ঘটেছিল’ অংশটির মতো। উচ্চ আদালতের আদেশ ছিল, দুটো টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলতে পারে। কিন্তু আমরা বড়ই গণতন্ত্রপ্রেমী, সংবিধানের শুদ্ধতায় বিশ্বাসী। আমরা এক মুহূর্তের জন্যও অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে পারি না। সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠিত হলো, তারা দফায় দফায় বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করল এবং একটা প্রস্তাব মোটামুটি সবাই করলেন, আপাতত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাপারটা থাকুক। তবু ওই অনির্বাচিত, সুতরাং অসাংবিধানিক ক্যানসারটুকুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংবিধান থেকে কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। সে অনেক দিন আগের কথা। তার পর থেকেই বিএনপির জোট মানি না, মানব না করে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। তারা অন্তত দুবার দিল ‘আলিটমেটাম’। এত তারিখের মধ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানা হলে সরকার উচ্ছেদের এক দফার আন্দোলন। দিন যায়, আলটিমেটামের তারিখ পার হয়, সরকার আর উচ্ছেদ হয় না। তারপর এল সরকারের মেয়াদপূর্তির আগে ৯০তম দিবসের দিনটা। ওই তারিখের পর ‘সরকার’ অবৈধ, কাজেই তখনই হবে দুর্বার সর্বব্যাপী আন্দোলন। তার আগে সরকারের একজন-দুজন নেতা, একজন-দুজন সচিব বিমানবন্দর পেরোলেন বা পেরোতে গিয়ে ধরাও পড়লেন। সেই তারিখ গেল। আন্দোলনও হলো। শুধু সরকার পড়ল না। একটা নির্বাচন পরিচালনাকারী সর্বদলীয় সরকারের ডাক এল। তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী আরেকটা আলটিমেটাম দিলেন। বললেন, এত তারিখের মধ্যে সংলাপ শুরু না করা হলে হরতাল৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই সময় পেরোনোর আগেই বললেন, হরতাল প্রত্যাহার করুন৷ আসুন, সংলাপে বসুন। তখন খালেদা জিয়া ও বিএনপি হরতাল প্রত্যাহার করল না, সংলাপেও গেল না। কেউ কেউ মনে করেন, ওইটাই ছিল ‘ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট’। বিএনপি যদি সংলাপে অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নিয়ে নির্বাচনে যেত, তাহলে তখনই হাওয়া পাল্টে যেত, হাওয়া বুঝে সুবিধাবাদী সিদ্ধান্তপ্রণেতারা বিএনপির হাওয়া নিজেদের পালে লাগিয়ে নিত এবং বিএনপি আজকে ক্ষমতায় থাকত। ওই নির্বাচনে বিএনপির জোট যায়নি, তা প্রতিরোধ করার জন্য পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করেছে, বহু স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ভবন পুড়ে গেছে, বহু ট্রেন লাইনচ্যুত করা হয়েছে, বহু মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের দিনটি অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ, রওশন এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ আমাদের গণতন্ত্র এখন ইস্পাতদৃঢ়। এখন খালেদা জিয়া এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন, সংলাপ দাও। এত দিন পরে সংলাপ!
আচ্ছা মানলাম, সংলাপ হলো, সরকার বলল, আসুন, আপনারা নির্বাচনে আসুন, আবার নির্বাচন হবে। তখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচন যে হবে, কোন পদ্ধতিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে, নাকি বর্তমান সংবিধানের আলোকে। বর্তমান সংবিধানের আলোকেই যদি হবে, তাহলে বিএনপি আগের নির্বাচনে অংশ নিল না কেন? মধ্যখানের এত হানাহানি, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি, এত আগুন, এত রক্তপাতের দায় কে নেবে?
কেউ কেউ বলেন, বিএনপির জোট আশায় আশায় ছিল, ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের বড় সুবিধা হবে। কারণ, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গলায় গলায় প্রীতি। শুনে আমি হাসি, অাঁখিজলে ভাসি। বিজেপি যদি অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেসের তুলনায় বেশি হিন্দুত্ববাদী হয়ে থাকে, তাহলে তারা কেন আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির বদলে বিএনপি-জামায়াত-জাগপার জোটকে বেছে নেবে। সুষমা স্বরাজ এসেছেন, বার্তা এই যে হাকিম নড়লেও হুকুম নড়ে না। সুসম্পর্ক অটুট থাকবে। তাই বলে, জাতিসংঘের বিবৃতির তাৎপর্য বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না। বিড়াল সাদা না কালো, তাতে বিড়ালের মালিকের হয়তো কিছু যায় আসে না৷ কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বড়ই গণতন্ত্রপ্রিয়, নিজেদের ভোটাধিকার তারা নিজেরা প্রয়োগ করতে চায়। সেই চাওয়ার একটা প্রতিফলনও আমরা একদিন না একদিন ঘটতে দেখব। তবে কথা হচ্ছে বর্তমান নিয়ে। অতীত না হয় আপাতত একটু ব্রাকেটবন্দী করে রাখি। সেই যে কথাটা ছিল, আওয়ামী লীগের সরকার একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে এমন সব ভালো ভালো কাজ করবে যে জনগণ সব দুঃখ ভুলে গিয়ে ধন্য ধন্য করবে এবং ভোট এলেই দলে দলে গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেবে। এটারও একটা নাম পণ্ডিতেরা দিয়েছেন, মাহািথর পদ্ধতি। অর্থাৎ ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশকে উন্নতির সোপান বেয়ে নিয়ে যেতে পারলে তা ভালো ছাড়া খারাপ কিছু নয়। আমরা সেই কথার কথাটাকেই আপাতত কাজে দেখতে চাই।
সরকার ভালো ভালো কাজ করুক না কেন? ২০০৮-এর নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরে সত্যিকারের দিনবদলের সুবর্ণ সুযোগ মোটামুটি হেলায় এবং নিজেদের আখের গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় অপচয়িত হয়ে গেছে। এবারের সুযোগটা সুবর্ণ না হলেও একটা বাস্তব সুযোগ এবং সম্ভবত শেষ সুযোগ। এটাকে এই সরকার কাজে লাগাক। সুশাসনের নহর বইয়ে দিক। গডফাদারদের নির্মূল করুক। গুন্ডাপান্ডাদের শায়েস্তা করুক। কালো দাগগুলো সাফ করুক। আর দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম না করে উন্নয়ন, অগ্রগতির ধারা প্রতিষ্ঠিত করুক। দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রাখুক।
সরকারের লোকজন কিন্তু খুব বলেন, আমরা কত ভালো ভালো কাজ করি, গণমাধ্যম তো সেসব নিয়ে কথা বলে না। খালি খারাপ দিকগুলো কেন তুলে ধরে৷ উত্তরে বলব, ভালো কাজ করাই সরকারের কাজ। কোনো বিমান ঠিকসময়ে যাত্রা করে ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাত্রীদের ঠিকঠাক পৌঁছে দিলে সেটা খবর হয় না, বিমানটা ভেঙে পড়লে সেই খবর না ছাপালে আপনারাই সেই কাগজটাকে ছি ছি করবেন। আর বাস্তবের জগৎটা চলে পারসেপশন দিয়ে, জনগণ কী মনে করে, তা দিয়ে, আপনি আসলে কী করেছেন, তা দিয়ে নয়। জনগণ মনে করে, নারায়ণগঞ্জের এই পরিবারটি একটা গডফাদারের পরিবার। আপনি দুধে ধুয়েও সেই পারসেপশন বদলাতে পারবেন না। সে েক্ষত্রে জনচিত্ত জয় করার উপায় হলো, তাদের বর্জন করা।
আমি জানি, অনেকেরই এই লেখা পছন্দ হবে না। তাঁরা বলবেন, অনির্বাচিত গাছের ফল আমরা খাব না। বা আরেক দল বলবেন, অরণ্যে রোদন করেন কেন? আপনার কথা কে শুনবে?
জানি শুনবে না। কিন্তু বলতে তো হবেই। যদি শোনে। যদি একটা ভালো কাজও সরকার করে, সেটা কিন্তু দেশের লাভ, জনগণের লাভ। তাই আমি বারবার করে বলব, ভালো ভালো কাজ করুন। জনগণের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করুন। বেশি বেশি করে ভালো কাজ করুন। জনগণের মনের ভাষাটা পড়ার চেষ্টা করুন।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

দরিদ্র শিশুদের দিয়ে সেক্স- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিশু যৌন পর্যটন

শিশু যৌন পর্যটনের প্রক্রিয়া অনেকটা এরকম- ধনী দেশের একজন শিকারী মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দরিদ্র কোন দেশে সফর করবে। ওই মধ্যস্থতাকারী হতে পারে একজন দালাল এমনকি সে হতে পারে হতভাগ্য কোন শিশুর পরিবারের সদস্য। তেমনটা হলে ওই শিকারী- শিশুটির পরিবারকে নানা উপহার আর অর্থ দিয়ে ভাসিয়ে দেবে। বিনিময়ে পরিস্থিতির শিকার শিশুর সঙ্গে একান্তে সময় যাপন। শেষ পর্যন্ত ওই অপরাধী আকাশ পথে উড়াল দিয়ে ঠিকই দেশে ফিরে যায়। তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চলতে থাকে, যেন কোন কিছুই ঘটেনি। এদিকে, দরিদ্র দেশগুলোতে সস্তা ইন্টারনেট সংযোগের দ্রুত প্রসারের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জঘন্য এ গল্পে নতুন মোড় যুক্ত হয়েছে। এর নাম ‘ভার্চুয়াল ট্রাফিকিং’। এখানে, ভিডিও চ্যাট রুমে শিকারীদের সঙ্গে শিশুদের সাক্ষাৎ হয়। জাতিসংঘ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই’র তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ৭ লাখ ৫০ হাজার সম্ভাব্য শিকারী দিনের যে কোন সময় অনলাইনে থাকে। এফবিআই’র অনুমান এ ধরনের কমপক্ষে ৪০ হাজার চ্যাট রুম রয়েছে। নতুন এ প্রযুক্তির সুবাদে বিবৃত যৌন চাহিদার এসব লোকজন ভ্রমণ ব্যয় থেকে রেহাই পাচ্ছে। তারপরও বিশ্বের অপর প্রান্ত থেকে দুর্ভাগা শিশুদেরকে নিয়ে আসছে নিজেদের বেডরুমে। চলতি বছরের শুরুতে টানা কয়েকটি যৌথ পুলিশ অভিযানে কিছু কটেজ ইন্ডাস্ট্রি আর ওয়েব স্ট্রিমিং সেক্সের আস্তানার খোলনলচে উন্মোচিত হয়েছে। যেখানে যৌন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে শিশুদের আটকে রাখা হয়। এগুলোর বেশকিছু পরিচালনা করছে দরিদ্র পরিবার। শিশুদেরকে দিয়ে অর্থ উপার্জন করার চেষ্টায় আছে তারা। তেরে দ্য হোমেস (টিডিএইস) নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটি এনজিও। সংস্থাটি শিশু হয়রানি রোধে কাজ করে চলেছে। গত নভেম্বরে তাদের প্রকাশিত একটি রিপোর্টে উঠে এসেছে, বিকৃত যৌন মানসিকতার এসব ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা কতটা সহজ। তারা ফিলিপাইনের ১০ বছরের এক বাচ্চা মেয়ের ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করে মাত্র ১০ সপ্তাহের ব্যবধানে ৭১টি ভিন্ন দেশের ২০ হাজার পেডোফাইলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা সহজেই তাদের পরিচয়-ঠিকানা প্রকাশ করে দেয়। টিডিএইচ এমন ১০০০ ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে তাদের বিস্তারিত ইন্টারপোলের কাছে হস্তান্তর করেছে। এরপর থেকে কয়েকটি দেশের পুলিশ বাহিনী ওইসব চ্যাটরুম শিকারীদের খুঁজে বের করতে ব্যস্ত সময় পার করেছে। এখন পর্যন্ত শতাধিক বৃটিশ আর অস্ট্রেলিয়ান তদন্তাধীন রয়েছে। আমেরিকা ও কানাডা সহ কয়েকটি দেশের আইনে এসব শিশু যৌন অপরাধীদেরকে এমনভাবে বিচার করা হয় যেন অপরাধটি তাদের নিজ দেশে সংঘটিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ দেশের আইন এমন শক্ত নয়। টিডিএইচ বলছে অপরাধীদের ধরতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।

বেশি করে ভালো কাজ করলেই তো হয়

কথাটা শোনা গিয়েছিল নির্বাচনের আগে আগে। যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বিএনপি ও তার জোট নির্বাচনে আসছে না, আওয়ামী লীগ তার সঙ্গীদের নিয়ে একটা একতরফা নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে চলেছে। তখন আমরা এই রকম একটা কথা শুনলাম, আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসবে, তারপর খুব ভালো ভালো কাজ করবে, এতসব ভালো কাজ যে জনগণের হৃদয় তারা জয় করে ফেলবে, এতটাই জয় করবে যে তারপর নির্বাচন হলে সেই নির্বাচনে যত শক্তিশালী প্রতিপক্ষই অংশ নিক না কেন, নৌকা মার্কারই জয় হবে।
শুনে দেয়ালবিহারী টিকটিকি টিক টিক করে উঠেছিল, আর ত্রিকালদর্শী হীরামন পাখি বলে উঠেছিল, হায়, জনচিত্ত জয় করার জন্য ভালো কাজ করার সদিচ্ছা ও ক্ষমতা যদি তাদের থেকেই থাকে, তাহলে তারা এই পাঁচটা বছর করল না কেন? তাদের একটা একতরফা নির্বাচনের দিকে যেতে হচ্ছে কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ সেই তেপান্তরের মাঠে ছিলেন না। কিন্তু আজকে, ওই নির্বাচনের এতটা দিন পরে, বারবার মনে হচ্ছে, সরকার ভালো কাজগুলো করুক, জনচিত্ত জয় করুক। এমন ভালো ভালো কাজ যেন তারপর নির্বাচন এলে জনগণ ভালোবেসে ফুলের মালা নিয়ে তাদের আবারও বরণ করে নেয়! হায়, বিড়াল সাদা না কালো, সেটা যে বড় কথা নয়, বড় কথা বিড়াল ইঁদুর মারে কি না। গাছ নির্বাচিত নাকি অনির্বাচিত, তা বড় কথা বটে, তারও চেয়ে বড় কথা, গাছ সুফল দেয় কি না! প্রসঙ্গটা এসেছে সম্প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতির একটা উক্তিতে, যিনি কি না স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের অনেক মানুষেরই প্রিয় একজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন প্রধানত তাঁর সুমিষ্ট ও সুরসিক বচনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, দেশের মানুষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মেনে নিয়েছে। ফলে দেশে এখন স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। সেই পটভূমিতে বেজে উঠেছে বিবেকের কণ্ঠস্বর, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাকস্ফূর্তি—রাষ্ট্রপতি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। জাতিসংঘ একটা বিবৃতিও দিয়েছে, তাতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, সংসদে নেই, এমন বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু করার। এই বিবৃতির অভিপ্রায় আমরা সম্ভবত বুঝেছি। আর বিএনপি, তার নেতা–নেত্রীরা, এমনকি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আওয়াজ তুলেছেন—সরকার যদি সংলাপ শুরু না করে, তাহলে আন্দোলন, তাহলে হরতাল।
তাদের এই হুমকিকে আমরা মোটেও ফাঁপা ও ফাঁকা আওয়াজ বলে ধরছি না৷ কারণ, বাংলাদেশে হরতাল করতে পয়সা লাগে না, মোটা পেট ও ভারী পা নিয়ে রাজপথে নামতে হয় না নেতাদের, একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়ে বললেই হয়, অমুক দিন হরতাল, জনগণ নিজ দায়িত্বে পিতৃদত্ত প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে নিজের মতো করে দিনটা পার করে, তাকে আমরা বলি হরতাল পালিত হওয়া। কিন্তু পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা কেঁচো গণ্ডূষ ভাব আছে। যাকে বলা যায়, পুনঃমূষিক ভবঃ। আসুন, পুরো ব্যাপারটা একবার রিক্যাপ করি—ধারাবাহিক নাটকের শুরুর ‘এর আগে যা ঘটেছিল’ অংশটির মতো। উচ্চ আদালতের আদেশ ছিল, দুটো টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলতে পারে। কিন্তু আমরা বড়ই গণতন্ত্রপ্রেমী, সংবিধানের শুদ্ধতায় বিশ্বাসী। আমরা এক মুহূর্তের জন্যও অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে পারি না। সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠিত হলো, তারা দফায় দফায় বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করল এবং একটা প্রস্তাব মোটামুটি সবাই করলেন, আপাতত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাপারটা থাকুক। তবু ওই অনির্বাচিত, সুতরাং অসাংবিধানিক ক্যানসারটুকুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংবিধান থেকে কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। সে অনেক দিন আগের কথা। তার পর থেকেই বিএনপির জোট মানি না, মানব না করে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। তারা অন্তত দুবার দিল ‘আলিটমেটাম’। এত তারিখের মধ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানা হলে সরকার উচ্ছেদের এক দফার আন্দোলন। দিন যায়, আলটিমেটামের তারিখ পার হয়, সরকার আর উচ্ছেদ হয় না।
তারপর এল সরকারের মেয়াদপূর্তির আগে ৯০তম দিবসের দিনটা। ওই তারিখের পর ‘সরকার’ অবৈধ, কাজেই তখনই হবে দুর্বার সর্বব্যাপী আন্দোলন। তার আগে সরকারের একজন-দুজন নেতা, একজন-দুজন সচিব বিমানবন্দর পেরোলেন বা পেরোতে গিয়ে ধরাও পড়লেন। সেই তারিখ গেল। আন্দোলনও হলো। শুধু সরকার পড়ল না। একটা নির্বাচন পরিচালনাকারী সর্বদলীয় সরকারের ডাক এল। তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী আরেকটা আলটিমেটাম দিলেন। বললেন, এত তারিখের মধ্যে সংলাপ শুরু না করা হলে হরতাল৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই সময় পেরোনোর আগেই বললেন, হরতাল প্রত্যাহার করুন৷ আসুন, সংলাপে বসুন। তখন খালেদা জিয়া ও বিএনপি হরতাল প্রত্যাহার করল না, সংলাপেও গেল না। কেউ কেউ মনে করেন, ওইটাই ছিল ‘ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট’। বিএনপি যদি সংলাপে অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নিয়ে নির্বাচনে যেত, তাহলে তখনই হাওয়া পাল্টে যেত, হাওয়া বুঝে সুবিধাবাদী সিদ্ধান্তপ্রণেতারা বিএনপির হাওয়া নিজেদের পালে লাগিয়ে নিত এবং বিএনপি আজকে ক্ষমতায় থাকত। ওই নির্বাচনে বিএনপির জোট যায়নি, তা প্রতিরোধ করার জন্য পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করেছে, বহু স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ভবন পুড়ে গেছে, বহু ট্রেন লাইনচ্যুত করা হয়েছে, বহু মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের দিনটি অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ, রওশন এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ আমাদের গণতন্ত্র এখন ইস্পাতদৃঢ়।
এখন খালেদা জিয়া এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন, সংলাপ দাও। এত দিন পরে সংলাপ! আচ্ছা মানলাম, সংলাপ হলো, সরকার বলল, আসুন, আপনারা নির্বাচনে আসুন, আবার নির্বাচন হবে। তখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচন যে হবে, কোন পদ্ধতিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে, নাকি বর্তমান সংবিধানের আলোকে। বর্তমান সংবিধানের আলোকেই যদি হবে, তাহলে বিএনপি আগের নির্বাচনে অংশ নিল না কেন? মধ্যখানের এত হানাহানি, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি, এত আগুন, এত রক্তপাতের দায় কে নেবে? কেউ কেউ বলেন, বিএনপির জোট আশায় আশায় ছিল, ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের বড় সুবিধা হবে। কারণ, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গলায় গলায় প্রীতি। শুনে আমি হাসি, অাঁখিজলে ভাসি। বিজেপি যদি অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেসের তুলনায় বেশি হিন্দুত্ববাদী হয়ে থাকে, তাহলে তারা কেন আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির বদলে বিএনপি-জামায়াত-জাগপার জোটকে বেছে নেবে। সুষমা স্বরাজ এসেছেন, বার্তা এই যে হাকিম নড়লেও হুকুম নড়ে না। সুসম্পর্ক অটুট থাকবে। তাই বলে, জাতিসংঘের বিবৃতির তাৎপর্য বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না। বিড়াল সাদা না কালো, তাতে বিড়ালের মালিকের হয়তো কিছু যায় আসে না৷ কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বড়ই গণতন্ত্রপ্রিয়, নিজেদের ভোটাধিকার তারা নিজেরা প্রয়োগ করতে চায়। সেই চাওয়ার একটা প্রতিফলনও আমরা একদিন না একদিন ঘটতে দেখব। তবে কথা হচ্ছে বর্তমান নিয়ে। অতীত না হয় আপাতত একটু ব্রাকেটবন্দী করে রাখি। সেই যে কথাটা ছিল, আওয়ামী লীগের সরকার একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে এমন সব ভালো ভালো কাজ করবে যে জনগণ সব দুঃখ ভুলে গিয়ে ধন্য ধন্য করবে এবং ভোট এলেই দলে দলে গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেবে। এটারও একটা নাম পণ্ডিতেরা দিয়েছেন, মাহািথর পদ্ধতি। অর্থাৎ ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশকে উন্নতির সোপান বেয়ে নিয়ে যেতে পারলে তা ভালো ছাড়া খারাপ কিছু নয়।
আমরা সেই কথার কথাটাকেই আপাতত কাজে দেখতে চাই। সরকার ভালো ভালো কাজ করুক না কেন? ২০০৮-এর নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরে সত্যিকারের দিনবদলের সুবর্ণ সুযোগ মোটামুটি হেলায় এবং নিজেদের আখের গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় অপচয়িত হয়ে গেছে। এবারের সুযোগটা সুবর্ণ না হলেও একটা বাস্তব সুযোগ এবং সম্ভবত শেষ সুযোগ। এটাকে এই সরকার কাজে লাগাক। সুশাসনের নহর বইয়ে দিক। গডফাদারদের নির্মূল করুক। গুন্ডাপান্ডাদের শায়েস্তা করুক। কালো দাগগুলো সাফ করুক। আর দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম না করে উন্নয়ন, অগ্রগতির ধারা প্রতিষ্ঠিত করুক। দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রাখুক। সরকারের লোকজন কিন্তু খুব বলেন, আমরা কত ভালো ভালো কাজ করি, গণমাধ্যম তো সেসব নিয়ে কথা বলে না। খালি খারাপ দিকগুলো কেন তুলে ধরে৷ উত্তরে বলব, ভালো কাজ করাই সরকারের কাজ। কোনো বিমান ঠিকসময়ে যাত্রা করে ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাত্রীদের ঠিকঠাক পৌঁছে দিলে সেটা খবর হয় না, বিমানটা ভেঙে পড়লে সেই খবর না ছাপালে আপনারাই সেই কাগজটাকে ছি ছি করবেন। আর বাস্তবের জগৎটা চলে পারসেপশন দিয়ে, জনগণ কী মনে করে, তা দিয়ে, আপনি আসলে কী করেছেন, তা দিয়ে নয়। জনগণ মনে করে, নারায়ণগঞ্জের এই পরিবারটি একটা গডফাদারের পরিবার। আপনি দুধে ধুয়েও সেই পারসেপশন বদলাতে পারবেন না। সে েক্ষত্রে জনচিত্ত জয় করার উপায় হলো, তাদের বর্জন করা। আমি জানি, অনেকেরই এই লেখা পছন্দ হবে না। তাঁরা বলবেন, অনির্বাচিত গাছের ফল আমরা খাব না। বা আরেক দল বলবেন, অরণ্যে রোদন করেন কেন? আপনার কথা কে শুনবে? জানি শুনবে না। কিন্তু বলতে তো হবেই। যদি শোনে। যদি একটা ভালো কাজও সরকার করে, সেটা কিন্তু দেশের লাভ, জনগণের লাভ। তাই আমি বারবার করে বলব, ভালো ভালো কাজ করুন। জনগণের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করুন। বেশি বেশি করে ভালো কাজ করুন। জনগণের মনের ভাষাটা পড়ার চেষ্টা করুন।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

মাহে রমজানের রোজার প্রস্তুতি

খোশ আমদেদ মাহে রমজান! আরবি বর্ষপঞ্জি তথা হিজরি সালের শাবান চান্দ্রমাসের সমাপ্তির পরই প্রতিবছর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে অাসে ইবাদতের মাস রমজানুল মোবারক। এ গুরুত্ববহ তাৎপর্যময় মাসের আগমন সারা বিশ্বের মুসলমানদের সুদীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মুসলমানদের জীবনে সারা বছরের মধ্যে রমজান মাসে আল্লাহর অসীম দয়া, ক্ষমা ও পাপমুক্তির এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয় বলেই এ পুণ্যময় মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা এত বেশি। তাই বলা হয়, রমজান মাস হচ্ছে ইবাদত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকর, শোকর তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ মৌসুম। মাহে রমজান এমনই এক বরকতময় মাস, যার আগমনে পুলকিত হয়ে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কিরামকে মোবারকবাদ দিয়ে সুসংবাদ প্রদান করেছেন, ‘তোমাদের সামনে রমজানের পবিত্র মাস এসেছে, যে মাসে আল্লাহ তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন।’ (মুসলিম) ‘রামাদান’ শব্দটি আরবি ‘রাম্দ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দহন, প্রজ্বলন, জ্বালানো বা পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ নিজের সমুদয় জাগতিক কামনা-বাসনা পরিহার করে আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্রপূর্ণ জীবন যাপন করে এবং ষড়্রিপুকে দমন করে আল্লাহর একনিষ্ঠ অনুগত বান্দা হওয়ার সামর্থ্য অর্জন করে। রোজা মানুষের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় অহংকার, কুপ্রবৃত্তি, নফসের দাসত্ব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বলে এ মহিমান্বিত মাসের নাম ‘রমজান’।
রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতেন এবং রজব মাসের চাঁদ দেখে মাহে রমজান প্রাপ্তির আশায় বিভোর থাকতেন। শাবান মাসকে রমজান মাসের প্রস্তুতি ও সোপান মনে করে তিনি বিশেষ দোয়া করতেন এবং অন্যদের তা শিক্ষা দিতেন। সাহাবায়ে কিরাম শাবান মাসে আসন্ন রমজান মাসকে নির্দেশনা অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে অতিবাহিত করার পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। শাবান মাসের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাহািবরা অধিক পরিমাণে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত শুরু করতেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যক্তিরা হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত করে জাকাত প্রদানের প্রস্তুতি নিতেন। প্রশাসকেরা কারাবন্দী লোকদের মুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন শাবান মাসে উপনীত হতেন, তখন মাহে রমজানকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে আবেগভরে আল্লাহর দরবারে এ প্রার্থনা করতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসের বিশেষ বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন।’ (মুসনাদে আহমাদ) তাই মাহে রমজানের অসীম কল্যাণ ও বরকত লাভের প্রত্যাশার জন্য দৈহিক ও মানসিকভাবে ইবাদতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) একদা শাবান মাসের শেষ দিনে সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ করে মাহে রমজানের রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতি একটি মহান মোবারক মাস ছায়া ফেলেছে। এ মাসে সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম একটি রজনী আছে। যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো নেক আমল দ্বারা আল্লাহর সান্নিধ্য কামনা করে, সে যেন অন্য সময়ে কোনো ফরজ আদায় করার মতো কাজ করল। আর এ মাসে যে ব্যক্তি কোনো ফরজ আদায় করে, সে যেন অন্য সময়ের ৭০টি ফরজ আদায়ের নেকি লাভ করার সমতুল্য কাজ করল। এটি সংযমের মাস আর সংযমের ফল হচ্ছে জান্নাত।’
(মিশকাত) নৈতিক পরিশুদ্ধি ও আত্মগঠনের মাস হিসেবে মাহে রমজানের আগমনে সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমান নামাজ-রোজার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা, টুপি কেনেন অথবা ধুয়ে-মুছে পাক-পবিত্র করে রাখেন। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বাভাবিক কাজকর্ম সম্পাদন করে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়সহ রমজান মাসের বিশেষ খতমে তারাবি নামাজ জামাতে পড়ার জন্য মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, নফল ইবাদত, জিকর-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তেগফার, দান-সাদকা করে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে সচেষ্ট হন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত প্রদান করে এবং যারা প্রতিশ্রুতি সম্পাদনকারী এবং অর্থসংকটে দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যপরায়ণ এবং এরাই মুত্তাকি।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭৭) রমজান মাস মুসলমানদের নিয়মতান্ত্রিক পানাহার, চলাফেরা, ঘুমসহ নানা ইবাদত-বন্দেগিতে আধ্যাত্মিক জীবনে নবজাগরণ সৃষ্টি করে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র রমজান মাস ভালোভাবে যাপন করবে, তার সমগ্র বছর ভালোভাবে যাপিত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন রমজান মাসের প্রথম রজনী আগমন করে, তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করেন, ‘হে কল্যাণকামী, এগিয়ে যাও! হে মন্দান্বেষী, স্তব্ধ হও!।’ (তিরমিজি) সুতরাং এ পবিত্র মাসে নামাজ-রোজা পালন তথা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি তথা সেহ্রি, ইফতার, তারাবি, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, ইতিকাফ, তাহাজ্জুদ, জিকর-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তেগফার, জাকাত-ফিতরা, দান-সাদকা প্রভৃতি আদায় প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যকর্তব্য।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

এক মহিলার দুই ধরনের যৌনাঙ্গ! যুবতীকে ধর্ষণ করলো এক মহিলা

একজন মহিলাকে অপর মহিলাকে ধর্ষণ করতে পারে? উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ের কস্বা খের এলাকার এক যুবতী এক মহিলার বিরুদ্ধেই ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছে৷ সকলেই জানত ওই যুবতী তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু ওই যুবতী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিজের বয়ানে বলেছে, সে প্রমিকের সঙ্গে পালায়নি, গ্রামেরই এক মহিলা তাকে নিয়ে গিয়েছিল৷ওই মহিলা যুবতীকে নিজের সঙ্গেই রেখেছিল এবং তাকে ধর্ষণ করেছিল৷

পুলিশ যখন জিজ্ঞেস করে যে একজন মহিলা কিভাবে ধর্ষণ করতে পারে? সে প্রশ্নের উত্তরে যুবতী যা জানায় তা সত্যিই আশ্চর্যজনক৷ যুবতী বলে ওই মহিলার দুই ধরনের যৌনাঙ্গই ছিল৷ খের থানার পুলিশ প্রধান রজনেশ তিওয়ারি জানিয়েছে, অভিযুক্ত মহিলাকে গ্রেফতার করে তার মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়েছে৷ রিপোর্ট আসার পর নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত করা হবে৷
গত ১৬ জুন বিশনপুরী গ্রাম থেকে এক যুবতী নিখোঁজ হয়ে যায়৷ সেসময় সকলে ভেবেছিলেন সে তার প্রেমিকার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছে৷ যুবতীর বাড়ির লোকেরা খের থানা এলাকার এক মহিলা ও তার দুই মেয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বিয়ের উদ্দেশ্যে যুবতীকে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার রিপোর্ট দায়ের করেছিল৷ এরপর পুলিশের চাপ সৃষ্টি হলে যুবতী বাড়িতে ফিরে আসে৷ এরপর পুলিশ যুবতীর মেডিকেল টেস্ট করিয়ে কোর্টে তার বয়ান দাখিল করে৷ যুবতী পুলিশ ও অন্যদের কাছে যে বয়ান দেয় তাতে সকলেই অবাক হয়ে যায়৷ যুবতী গ্রামের এক মহিলার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করে৷ কিন্তু অভিযুক্ত মহিলার মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট আসার পরই গোটা ঘটনার সত্যতা জানা যাবে৷

পারমাণবিক বিদ্যুৎ- সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বিদ্যুতের ছয় দশক by আবদুল মতিন

আজ ২৭ জুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ১৯৫৪ সালের এই দিনে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বর্তমান রাশিয়ার ওবনিনসক নামক স্থানে পাঁচ মেগাওয়াট ই ক্ষমতাসম্পন্ন এপিএস-১ প্লান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন রাতারাতি শুরু হয়নি।

বিশ শতকের শুরুতে রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার হওয়ার পর আইনস্টাইনের ভর-শক্তির সূত্র E = mc2 অনুসারে ভর থেকে শক্তি উৎপাদনের কলাকৌশল আবিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এদিকে ১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক নিউট্রন নামক এক ক্ষুদ্র পরমাণু আবিষ্কার করেন।এটা দিয়ে ইউরেনিয়াম পরমাণুতে ফিশন ঘটানো সম্ভব হয়। আর ১৯৪২ সালের ২ ডিসেম্বর এনরিকো ফারমি শিকাগোতে প্রথম পরমাণু শৃঙ্খল বিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম হন।
তারপর ১৯৩০-এর দশকে পরমাণুশক্তিবিষয়ক গবেষণার লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পর পর দুটি পরমাণু বোমা ফেলা হলে বিশ্ববাসী পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহতা দেখে থমকে যায়। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরমাণুশক্তির ওপর গবেষণা হয়েছে মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে, একই সঙ্গে নৌশক্তি বৃদ্ধিতেও তা ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইদাহোর পরীক্ষামূলক ইবিআর-১ স্টেশনে ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর পরীক্ষাগারে পরমাণু রি-অ্যাক্টরের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। পরমাণু শক্তিধর সাবমেরিন ইউএসএস নটিলাস উদ্বোধন করা হয় ১৯৫৪ সালের ২১ জানুয়ারি।
এপিএস-১-এর নিরাপত্তায় মডারেটর হিসেবে গ্রাফাইট ব্যবহার করা হয়েছে, আর তা ঠান্ডা রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে পানি। মডারেটরের কাজ হচ্ছে মূলত নিউট্রনের গতি কমিয়ে দেওয়া এবং রি-অ্যাক্টরের ভেতরে পরমাণুর ফিশনের হার বাড়িয়ে দেওয়া। আর শীতলকারক রি-অ্যাক্টর ঠান্ডা রাখে, তাপ কমিয়ে দেয়, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। ইংল্যান্ডের উইন্ডস্কেলে ক্যাল্ডার হলে মডারেটর হিসেবে গ্রাফাইট ব্যবহার করা হয়, শীতলকারক হিসেবে ব্যবহার করা হয় কার্বন ডাই-অক্সাইড৷ এটি ১৯৫৬ সালে উৎপাদনে আসে। আর যুক্তরাষ্ট্রের শিপিং পোর্টে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রথম পারমাণবিক রি-অ্যাক্টর স্থাপন করা হয় ১৯৫৭ সালে, সেখানে মডারেটর ও শীতলকারক হিসেবে পানি ব্যবহার করা হয়েছে।
কানাডার ওনটারিওর রলফটনে ২২ মেগাওয়াট ই ক্ষমতাসম্পন্ন নিউক্লিয়ার পাওয়ার ডেমোনস্ট্রেশন (এনডিপি) রি-অ্যাক্টর স্থাপন করা হয় ১৯৬২ সালে। এতে মডারেটর ও শীতলকারক হিসেবে ভারী পানি ব্যবহৃত হয়েছে।
এগুলো হচ্ছে প্রথম প্রজন্মের পারমাণবিক রি-অ্যাক্টরের আদিরূপ। বর্তমানে যেসব রি-অ্যাক্টর ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোর জন্ম হয়েছে এই আদিরূপ থেকেই। বর্তমানে যেসব পারমাণবিক রি-অ্যাক্টর ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো হলো: প্রেশারাইজড ওয়াটার রি-অ্যাক্টর (পিডব্লিউআর), বয়লিং ওয়াটার রি-অ্যাক্টর (বিডব্লিউআর), প্রেশারাইজড হেভি ওয়াটার রি-অ্যাক্টর (পিডব্লিউএইচআর) প্রভৃতি। রি-অ্যাক্টরের মডারেটর হিসেবে গ্রাফাইটের (ইউকে ও রাশিয়া যেগুলো আলাদা আলাদভাবে তৈরি করেছিল: এজিআর ও আরবিএমকে) ব্যবহার এখন আর নেই বললেই চলে।
এখন মূলত দ্বিতীয় প্রজন্মের রি-অ্যাক্টর ব্যবহৃত হচ্ছে, এগুলোও আবার ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। এর জায়গায় আসবে তৃতীয় প্রজন্মের রি-অ্যাক্টর, যার ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এই তৃতীয় প্রজন্মের হালকা পানির রি-অ্যাক্টরের মধ্যে আছে অ্যাডভান্সড বয়লিং ওয়াটার রি-অ্যাক্টর (এবিডব্লিউআর) এবং অ্যাডভান্সড প্রেশারাইজড ওয়াটার রি-অ্যাক্টর (এপিডব্লিউআর)। দ্বিতীয় প্রজন্মের রি-অ্যাক্টরগুলোর তুলনায় এগুলো অধিক নিরাপদ। আবার চতুর্থ প্রজন্মের রি-অ্যাক্টরগুলো আরও ছোট, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা যায়। এটা এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে আছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এগুলো বাজারে আসতে পারে।
কিছু কিছু রি-অ্যাক্টরে দ্রুতগতির নিউট্রনের কারণে পারমাণবিক ফিশন হয়। এসব রি-অ্যাক্টরকে দ্রুত রি-অ্যাক্টর বলা হয়৷ এগুলো থেকে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন হয়। কিছু কিছু দ্রুতগতির রি-অ্যাক্টর যে পরিমাণ জ্বালানি খায়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ফিসাইল জ্বালানি উৎপাদন করে, এগুলোকে বলা হয় ফাস্ট ব্রিডার রি-অ্যাক্টর (এফবিআর)। বিভিন্ন দেশেই এখন এগুলো নির্মাণে গবেষণা হচ্ছে।
পারমাণবিক রি-অ্যাক্টরের নিরাপত্তা বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও এই শিল্প শুরু থেকেই নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। তিনটি বড় দুর্ঘটনায় এই িশল্প বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছে: যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৯ সালে থ্রি মাইল দ্বীপের দুর্ঘটনা, ১৯৮৬ সালের সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বর্তমান ইউক্রেনের চেরনোবিল দুর্ঘটনা এবং জাপানে ২০১১ সালে ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা। ইউরোপের অনেক দেশ যেমন জার্মানি, সুইডেন, ইতালি, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়াম পরমাণু বিদ্যুৎ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাপান তার সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, পারমাণবিক রি-অ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা না করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাণহানির নিরিখে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্য উৎসগুলোর তুলনায়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতে প্রাণহানির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, কয়লা থেকে প্রতি ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট বা ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপদানে ১৭০ জন মানুষ মারা যায়। তেলের ক্ষেত্রে তা ৩৬ হাজার। আর পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তা ৯০ জন।
বর্তমানে বিশ্বের ৩১টি দেশে ৪৩৬টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সম্মিলিতভাবে তিন লাখ ৭৪ হাজার মেগাওয়াট ই বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১১ শতাংশের বেশি। সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিলে অন্যান্য জ্বালানি যেমন কয়লা, তেল প্রভৃতির মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। শুধু জার্মানিতেই পারমাণবিক বিদ্যুতের জায়গায় নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে এক ট্রিলিয়ন ইউরোর দরকার হবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের আগস্ট ২০১২ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘জাপানের সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিলে সে দেশের পরিষেবা খাতের চারটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাবে।’ জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহারের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাবে, এগুলোর অতিরিক্ত দামের কারণে অর্থনৈতিক মন্দাও সৃষ্টি হতে পারে।
ফ্রান্সের ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় পারমাণবিক শক্তি থেকে। সেখানে তৃতীয় প্রজন্মের একটি রি-অ্যাক্টরও নির্মীয়মাণ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৬টি রি-অ্যাক্টর আছে, সেখানকার মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১৮ শতাংশই আসে এই পারমাণবিক শক্তি থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা আরও ১৬ জিডব্লিউই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। সেখানে বর্তমানে ১০৪টি রি-অ্যাক্টর রয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে আরও পাঁচটি নতুন রি-অ্যাক্টর সেখানে স্থাপন করা হবে। এদিকে রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির ক্রমসম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে চারটি রি-অ্যাক্টর নির্মীয়মাণ আছে। তুরস্ক, বেলারুশ, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ তাদের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় না। জীবাশ্ম জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে এটা সাশ্রয়ী। এর নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্রমেই উন্নত হচ্ছে। আর এর সাশ্রয়ী চরিত্র ও উন্নত রি-অ্যাক্টরগুলোর নির্ভরযোগ্যতার কারণে পারমাণুশক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ আরও বহুকাল মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
আবদুল মতিন: বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী৷

মতৈক্যের সরকার নাকচ মালিকির

নুরি আল-মালিকি
ইরাকে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের আহ্বান নাকচ করে দিয়েছেন শিয়াপন্থী প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকি। গতকাল বুধবার টেলিভিশনে দেওয়া সাপ্তাহিক ভাষণে মালিিক তাঁর এ অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেন। মালিকি যখন মতৈক্যের সরকারের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন তখন ইরাকের জঙ্গিরা যেন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। দেশটির অন্যতম তেল শোধনাগার বাইজিতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় গতকাল নতুন করে হামলা চালিয়েছে সুন্নিপন্থী সংগঠন ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (আইএসআইএল) জঙ্গিরা। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে তারা পিছু হটেছে বলে দাবি করছে সরকার। খবর বিবিসি, এএফপি ও এপির। ইরাকের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির সব পক্ষকে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। যে সরকারে সব ধর্ম ও জাতিগত পক্ষগুলোর প্রতিনিধিত্ব থাকবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও ইরাক সফরের সময় মালিকিকে এই বার্তা দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক সামরিক উপদেষ্টা ইরাকে পেঁৗছে নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা দিতে গতকাল কাজ শুরু করছেন। ঠিক সেই দিনই প্রধানমন্ত্রী মালিকি যুক্তরাষ্ট্রের মতৈক্যের সরকারের আহ্বান নাকচ করে দিলেন। বললেন, ঐকমত্যের সরকার গঠনের আহ্বান ‘সংবিধানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের’ পক্ষে যায় এবং এটা ইরাকের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে শেষ করে দেওয়ারও অপচেষ্টা।
আইএসআইএলের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র বাগদাদে মোট ৩০০ সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রথম দলটি গত মঙ্গলবার বাগদাদে পেঁৗছেছে। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে অন্যতম তেল শোধনাগারে গতকাল সকালে নতুন করে হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। ১০ জুন জঙ্গিরা ওই তেল শোধনাগারের একটি বড় অংশ দখলে নেয়। এর পর থেকে সেখানে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সরকারি বাহিনী হেলিকপ্টার গানশিপের সহায়তা নিয়ে জঙ্গিদের হটাতে অভিযান চালাচ্ছে। ইরাকের সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীর অধিনায়ক কর্নেল আলী আল-কোরায়শি দাবি করেন, জঙ্গিরা হামলা চালালেও সরকারি বাহিনীর পাল্টা হামলায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা: ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক জোট ন্যাটোর ভূমিকা কী হতে পারে, তা নিয়ে জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গতকাল মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গেছেন। ন্যাটোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাস্টন ও ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করেন কেরি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি সবার সঙ্গে ‘ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা’ করেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা জানান, কেরি আজ বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে উপসাগরীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সউদ আল-ফয়সাল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের জুদেহ উপস্থিত থাকবেন। সেখানেও আলোচনার মূলে থাকবে ইরাক পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে মসুলসহ ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি শহর দখল করে নেয় আইএসআইএলের জঙ্গিরা৷ চলতি বছরের শুরুতে তারা ফালুজা শহরও দখল করে৷ এই লড়াইয়ে ইরাকে ১০ লাখের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছে৷ জাতিসংঘ মঙ্গলবার জানিয়েছে, মাত্র ১৭ দিনের লড়াইয়ে ইরাকে এক হাজার ৭৫ জন নিহত হয়েছে, যার অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত সপ্তাহে ইরাকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সার্বিক পরিস্থিতি ওই ঘোষণাকে দেশটিতে শিগগির মার্কিন বিমান হামলা চালানোর ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অনেকে৷

এবার পেশোয়ারে অবতরণকালে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে গুলি

করাচির পর এবার পাকিস্তানের পেশোয়ার বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করল অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা৷ গত মঙ্গলবার রাতে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ অবতরণকালে গুলি চালায় তারা৷ এতে এক নারী যাত্রী নিহত হয়েছেন৷ আহত হয়েছেন দুজন বিমানবালা৷ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে জঙ্গিবিরোধী সেনা অভিযানের মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটল৷ খবর এএফপি ও ডনের৷ পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) ওই ফ্লাইটটি গত মঙ্গলবার রাতে সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ১৭০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে দেশে ফেরে৷ পেশোয়ারের বাচা খান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় সেটি হামলার শিকার হয়৷ এ ঘটনার পর বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠা-নামা বন্ধ হয়ে যায়৷ তবে গতকাল বুধবার বিমানবন্দরটিতে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরুর ঘোষণা দেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ৷ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীরা যখন উড়োজাহাজটিকে লক্ষ্য করে গুলি করে, তখন সেটি ভূপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার ফুট ওপরে ছিল৷ উড়োজাহাজে আটটি গুলি লেগেছে। এর মধ্যে অন্তত একটি গুলি উড়োজাহাজের ইঞ্জিনে আঘাত করেছে৷ পাইলট অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন৷ কারা এই হামলা চালিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়৷ পিআইএর মুখপাত্র মাসুদ তাজওয়ার বলেন, ‘বিমানবন্দরের বাইরে থেকে গুলি করা হয়েছে৷
এ ঘটনায় একজন নারী যাত্রী ও উড়োজাহাজের দুই বিমানবালা আহত হন৷ পরে নারী যাত্রী হাসপাতালে মারা যান৷’ পেশোয়ারের জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফয়সাল জানান, বিমানবন্দর থেকে কমবেশি পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে একে-৪৭ রাইফেল থেকে ওই আটটি গুিল ছোড়া হয় বলে ফরেনসিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে৷ গুলিগুলো উড়োজাহাজটির পেছনের দিকে লেগেছে৷ পুলিশ হামলাকারীদের খোঁজে বিমানবন্দরটির বাইরের একটি এলাকা ঘিরে রেখেছে৷ পাইলটের দক্ষতার প্রশংসা করেছে তারা৷ জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা নাজিব উর রহমান বলেন, ‘উড়োজাহাজটির পাইলট নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছেন৷ এটা তাঁর কৃতিত্ব৷’ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেউ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি৷ তবে বন্দর নগর করাচিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) রক্তাক্ত হামলার দুই সপ্তাহের মাথায় এ ঘটনা ঘটল৷ ৮ জুনের ওই হামলায় ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে৷ করাচি বিমানবন্দরে হামলার পর গত ১৫ জুন দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকা উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তালেবানবিরোধী অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী৷ যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও কামানের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন তিন শতাধিক জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে সেনাবাহিনী৷ এর মধ্যে সর্বশেষ বিমান হামলায় নিহত হয়েছে ৪৭ যোদ্ধা৷ তালেবানের পাল্টা আক্রমণ শুরু: উত্তর ওয়াজিরিস্তানের স্পিনওয়াম গ্রামে মঙ্গলবার আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে তালেবান৷ এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে সেনা অভিযানের জবাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করল জঙ্গি সংগঠনটি৷ কর্মকর্তারা জানান, স্পিনওয়াম গ্রামের কাছে তল্লাশিচৌকির দিকে আসতে থাকা একটি গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করেন নিরাপত্তাকর্মীরা৷ এ সময় হামলাকারী গাড়িতে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে দুজন নিরাপত্তাকর্মী ও একজন বেসামরিক লোক নিহত হন৷ এ নিয়ে সেনা অভিযান শুরুর পর ১২ জন নিরাপত্তাকর্মীর প্রাণহানি ঘটল৷

অর্থ ছাড়াই এক বছর

গ্রেটা টর্বাট
আমাদের ভোগবাদী সমাজকে অগ্রাহ্য করে দিব্যি এক বছর কাটিয়ে দিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী জার্মান নারী গ্রেটা টবার্ট৷ খাওয়া-দাওয়া, পান করা ও পোশাক-আশাক সংস্থানের মতো কাজগুলো তিনি করে যাচ্ছেন কোনো অর্থ খরচ না করেই৷ খবর এএফপির৷ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়লে আমাদের জীবন কেমন হবে, সেটাই দেখতে চান টবার্ট৷ কেনাকাটা বাদ দিলে কোন কোন জিনিসের প্রয়োজনীয়তা তিনি খুব বেশি অনুভব করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে লিপজিগের বাসিন্দা টবার্ট বলেন, অঁাটসাঁট পোশাক আর প্রসাধনসামগ্রী৷ এখন টবার্ট ঘরে বসে নিজেই তৈরি করেন সুগিন্ধ বা ডিওডোরেন্ট, মুখমণ্ডলে লাগানোর ক্রিম আর টুথপেস্ট৷ এসব শতভাগ জৈব উপাদান (অর্গানিক) দিয়ে তৈরি৷ টবার্ট বলেন, ‘নিজের শ্যাম্পুও আমি তৈরি করতে পারি৷ কিন্তু আমাকে এক সময় নিয়ানডার্থালের (মানুষের আদি বংশধর) মতো দেখাচ্ছিল। বন্ধুরা বলল, আমি নাকি অনেক দূরে চলে যাচ্ছি৷’ ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক টবার্ট পুরো এক বছর ধরে বাগানে গাজর ও আলুর চাষাবাদ করছেন৷ ছুটিতে তিনি দূরপাল্লার ভ্রমণে স্পেনের বার্সেলোনা পর্যন্ত গেছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি অ্যাপোক্যালিপস নাউ নামের একটি বইও লিখেছেন৷এতে তিনি লিখেছেন পোশাকের দোকানের আকর্ষণ, বিপণিবিতানের মূল্যছাড় আর অাধুনিক জীবনযাত্রায় নানা অপচয় এড়িয়ে জীবন কাটানোর কাহিনি৷দাদির বাড়িতে এক রোববার জম্পেশ খাওয়া-দাওয়ার পর টবার্ট আকস্মিক অর্থ ছাড়াই জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন৷ সেই থেকে শুরু৷ তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অসীম প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে৷ কিন্তু আমাদের বৈশ্বিক পরিবেশের উপাদানগুলো সীমাবদ্ধ৷ কাজেই “আরও চাই, আরও চাই” বলে প্রচলিত মন্ত্র আমাদের বেশি দূর নিয়ে যেতে পারবে না৷’ জার্মানিতে কেবল ২০১২ সালে প্রায় ৭০ লাখ টন খাবার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে৷ সেই হিসাবে দেশের প্রত্যেক মানুষ গড়ে ৮১ কেজি ৬০ গ্রাম খাবার নষ্ট করেছে৷ টবার্ট বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণেই ইউরোপে মন্দা নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে৷ জনগণ বুঝতে পেরেছে, ঋণসহায়তা ও ইউরোপীয় স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীলতা—কোনো কিছুই স্থায়ী নয়৷ অতীতের মতো দিন কেটে গেলেও গোটা ব্যবস্থাটির মজবুত ভিত্তি নেই৷ টবার্ট বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে অর্জিত শিক্ষা আমি নিজের জীবনে প্রয়োগ করছি৷ অন্যদের মতো জীবন যাপন করছি না৷’