Sunday, May 25, 2025

ফিলিস্তিনের কান্না শুনছে না বিশ্ব, মালয়েশিয়ার তীব্র প্রতিবাদ

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় চলমান রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয়ের নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘দ্বিচারিতা’ ও ‘নীরবতা’-কে চরমভাবে আক্রমণ করেছেন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান।

আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ বিশ্ব সমাজের দ্বিমুখী আচরণের নগ্ন উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

রবিবার (২৫ মে) কুয়ালালামপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ হাসান বলেন, গাজায় চলমান বর্বরতা আন্তর্জাতিক আইনের পবিত্রতা লঙ্ঘনের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। বিশ্ববাসীর এই নীরবতা কেবল উদ্বেগজনক নয়, তা মানবিক মূল্যবোধেরও অবমাননা।

তিনি আরও বলেন, আসিয়ান চুপ থাকতে পারে না। আমরা যারা শান্তি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক ন্যায়ের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- আমাদের স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল গাজায় আগের চেয়েও আরও ভয়াবহ অভিযান শুরু করেছে। যদিও গত ২ মার্চ আরোপিত পূর্ণ অবরোধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে, তবে তা মানবিক সহায়তার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানালেও, ইসরায়েলের আগ্রাসন কমেনি। বরং ‘চূড়ান্ত ধাপের’ নামে ইসরায়েল পুরো গাজা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই মালয়েশিয়া তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করল- যেখানে বর্বরতার প্রতিবাদ করার পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো।

মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। বরং সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে সরব।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুর থেকে একাধিকবার সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।

ইতোমধ্যে দেশটি গাজায় ১ কোটিরও বেশি মার্কিন ডলারের মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। খাদ্য, ওষুধ, ও জরুরি চিকিৎসা উপকরণ বহনকারী বেশ কয়েকটি চালান এরই মধ্যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পৌঁছেছে।

বর্তমানে আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্বে থাকা মালয়েশিয়া সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

ফেব্রুয়ারিতে আসিয়ানের ১০টি সদস্য রাষ্ট্রই এক যৌথ বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি তাদের ‘দীর্ঘদিনের সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করেছিল। তবে মোহাম্মদ হাসানের মতে, কেবল বিবৃতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণও এখন সময়ের দাবি।

বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তি যখন এই সংকটে কার্যত চুপ, তখন মালয়েশিয়ার মতো একটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি শুধু রাজনৈতিক বার্তাই নয়, বরং এটি এক ধরনের নৈতিক প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিবৃতি একদিকে যেমন মুসলিম বিশ্বের সংহতির প্রতীক, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে- কোন মানুষের জীবনকে আমরা মূল্য দিই, আর কোন জীবন আমাদের কাছে অদৃশ্য?

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান। ছবি : সংগৃহীত
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান। ছবি : সংগৃহীত


গাজায় এক নারী চিকিৎসকের ৯ সন্তানকে হত্যা করেছে ইসরাইল

গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের এক নারী চিকিৎসকের নয় সন্তানকে হত্যা করেছে ইসরাইল। গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালটির শিশু বিভাগের প্রধান আহমেদ আল-ফাররা। গাজার দাক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে অবস্থিত নাসের হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ওই চিকিৎসক। যার নাম আল নাজ্জার। শুক্রবার তার বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে গোটা বাড়িতে আগুন লেগে যায় এবং ওই চিকিৎসকের ১০ সন্তানের মধ্যে নয় জনই নিহত হয়েছে। বিলম্বে পাওয়া এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, যারা নিহত হয়েছে তাদের বয়স সাত মাস থেকে ১২ বছর। অর্থাৎ সকলেই শিশু। নিহত শিশুদের নাম- সিদার, লুকমান, সাদিন, রেভাল, রুসলান, জুবরান, ইভ, রাকান এবং ইয়াহিয়া। ইসরাইলের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন আল নাজ্জারের স্বামী। বুকে ও মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। বোমার প্রবল আঘাতে নাজ্জারের স্বামীর মাথার খুলি ভেঙে গেছে। বর্তমানে তাকে নাসের হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এই দম্পতির বেঁচে থাকা একমাত্র শিশুটির নাম আদম। যার বয়স ১১ বছর। তাকেও নাসের হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আহমেদ আল-ফাররা। আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন, এমন হামলা অকল্পনীয়। এতে নাজ্জার কতটা ব্যাথিত হয়েছেন আপনারা তা কোনোভাবেই কল্পনা করতে পারবেন না। তবুও তিনি বেঁচে থাকা স্বামী ও সন্তানের কাছে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতি গাজার মানবতার পক্ষে আওয়াজ তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ওই চিকিৎসক। এমন বোমা হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। আহমেদ আল-ফাররা বলেছেন, সন্তান হারিয়ে এখন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন নাজ্জার। তাই আমি বলব দয়া করে পৃথিবীবাসী যেন তার সন্তানদের পক্ষে আওয়াজ তোলে।

নাজ্জারের বাড়ি লক্ষ্য করে ভয়াবহ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনে নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানেসসকা আলবানিজ। বলেছেন, অবরুদ্ধ উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের নতুন গণহত্যার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে, যা দুঃখজনক। হামাসের অভিযোগ, নতুন করে আবারও হাসপাতালের কর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে ইসরাইল। ইচ্ছাকৃতভাবে এসব হামলা চালাচ্ছে তারা। যাতে উপত্যকার বেসামরিক এবং তাদের পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। যদিও বরাবরের মতো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেল আবিবের বাহিনী। দাবি করেছে, সন্দেহজনক একটি স্থানে হামলা চালিয়েছে তাদের সৈন্যরা। হামলার আগে সেখান থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর বেসামরিকদের নিহতের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বিভাগ। 

mzamin

‘নিষ্ঠুরতম পর্যায়ে’ প্রবেশ করছে গাজা সংঘাত: তীব্র অপুষ্টিতে ৭০ হাজারের বেশি -জাতিসংঘের মহাসচিব

ইসরায়েলের নৃশংস হামলা ও খাবারের অভাবে চরম দুর্দশায় রয়েছেন ফিলিস্তিনের গাজার বাসিন্দারা। প্রতিদিনই বাড়ছে লাশের সারি, থামছে না ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না। এমন পরিস্থিতিতে গাজা সংঘাত ‘নিষ্ঠুরতম পর্যায়ে’ প্রবেশ করতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ইসরায়েল গাজাবাসীদের দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। সম্প্রতি ‘অপারেশন গিডেয়নস চ্যারিয়টস’ নামের অভিযান শুরুর পর হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে তারা। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১১ সপ্তাহ অবরোধের পর গাজায় প্রতিদিন ১০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেয় ইসরায়েল। তবে এর চেয়ে কম ত্রাণ গাজায় পৌঁছাচ্ছে বলে অভিযোগ জাতিসংঘের।

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের গুতেরেস বলেন, প্রায় ৮০ দিন ধরে প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। এতে উপত্যকাটির বাসিন্দারা দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছেন। ‘বন্যার মতো’ বিপুল তোড়ে এখন গাজায় ত্রাণ সরবরাহ প্রয়োজন। তবে যে পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা ‘এক চামচ’ পানির মতো।

গাজায় মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ যখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন ইসরায়েল হামলায় ব্যাপকতা বাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব। তিনি বলেন, গাজার ৮০ শতাংশ এলাকাকে সামরিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। সেখান থেকে বাসিন্দাদের সরে যেতে বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত এবং দীর্ঘ মেয়াদে ত্রাণ না পেলে আরও মানুষের মৃত্যু হবে।

জাতিসংঘের হিসাবে, গাজায় প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ ট্রাক ত্রাণ সরবরাহ করা দরকার। ইসরায়েলের হিসাবে, গত সোমবার থেকে কারেম আবু সালেম ক্রসিং দিয়ে উপত্যকাটিতে মাত্র ৩০০ ট্রাক ত্রাণ পৌঁছেছে। তবে জাতিসংঘ বলছে, নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলার কারণে এই ত্রাণের তিন ভাগের মাত্র এক ভাগ গাজার ভেতরে বিভিন্ন গুদামে পৌঁছাতে পেরেছে।

গাজায় ত্রাণসংকটের কারণে অনেক ত্রাণ সরবরাহ কেন্দ্র ও দাতব্য রান্নাঘর বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলোয় সামান্য খাবার রয়েছে, সেখানে খাবার ও পানির জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। গাজা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, গত দুই দিনে গাজায় যে খাবার পৌঁছেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। এর মাধ্যমে উপত্যকাটির মানবিক সংকটের কোনো সমাধান হবে না।

জাতিসংঘের হিসাবে, গাজায় প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ ট্রাক ত্রাণ সরবরাহ করা দরকার। ইসরায়েলের হিসাবে, গত সোমবার থেকে কারেম আবু সালেম ক্রসিং দিয়ে উপত্যকাটিতে মাত্র ৩০০ ট্রাক ত্রাণ পৌঁছেছে। তবে জাতিসংঘ বলছে, নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলার কারণে এই ত্রাণের তিন ভাগের মাত্র এক ভাগ গাজার ভেতরে বিভিন্ন গুদামে পৌঁছাতে পেরেছে।

গাজায় ত্রাণসংকটের কারণে অনেক ত্রাণ সরবরাহ কেন্দ্র ও দাতব্য রান্নাঘর বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলোয় সামান্য খাবার রয়েছে, সেখানে খাবার ও পানির জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। গাজা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, গত দুই দিনে গাজায় যে খাবার পৌঁছেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। এর মাধ্যমে উপত্যকাটির মানবিক সংকটের কোনো সমাধান হবে না।

গাজায় অনাহারে ৪ বছরের শিশুর মৃত্যু, তীব্র অপুষ্টিতে ৭০ হাজারের বেশি

গাজা উপত্যকায় অনাহারে ভুগে চার বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর নাম মোহাম্মদ ইয়াসিন। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে গাজায় ইসরায়েলের অবরোধ শুরুর পর থেকে অনাহারে মৃত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে ৫৮-তে দাঁড়াল।

গাজার চিকিৎসক ইজ্জেদিন শাহিন বলেন, এখন উপত্যকাটির সুস্থ শিশুদের ওপরও খাদ্যাভাবের প্রভাব পড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর প্রবণতা এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা বা বিশেষ যত্ন প্রয়োজন এমন শিশুদের ক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যুর ঘটনা দেখা যেত। তবে এখন এমন শিশুদের ওপরও দুর্ভিক্ষের প্রভাব পড়ছে, যারা আগে প্রায় সুস্থই ছিল—অপুষ্টি ছাড়া যাদের কোনো পূর্ববর্তী শারীরিক সমস্যা ছিল না।’

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, গাজায় ৭০ হাজারের বেশি শিশু তীব্র মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছে।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, গাজার খান ইউনিসে এক হামলায় নারী চিকিৎসকের ৯ সন্তান নিহত হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে তারা পর্যালোচনা করছে। ওই হামলায় চিকিৎসক আলা আল-নাজ্জারের ১০ সন্তানের মধ্যে ৯ জনই নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বড়টির বয়স ১২ বছর এবং ছোটটির বয়স মাত্র কয়েক মাস।

গাজার কর্মকর্তারা বলছেন, নিরপরাধ শিশুদের হত্যা এখন ইসরায়েলি সেনাদের জন্য যেন একটি বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ত্রাণের অভাবে গাজাজুড়ে এখন হাহাকার। একটু খাবারের আশায় ত্রাণ বিতরণের স্থানগুলোয় ভিড় করছেন অসহায় ফিলিস্তিনিরা। এমনই এক বিতরণকেন্দ্রে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে এক শিশু। আজ মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে
ত্রাণের অভাবে গাজাজুড়ে এখন হাহাকার। একটু খাবারের আশায় ত্রাণ বিতরণের স্থানগুলোয় ভিড় করছেন অসহায় ফিলিস্তিনিরা। এমনই এক বিতরণকেন্দ্রে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে এক শিশু। আজ মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে। ছবি: এএফপি

গাজায় নৃশংসতার পর ইউরোপ কি ইসরায়েলকে পরিত্যাগ করছে

ইসরায়েলের উদারপন্থী দৈনিক হারেৎজ চলতি সপ্তাহে এক শিরোনামে স্পষ্টভাবে বলেছে: ‘কূটনৈতিক সুনামি আসছে’। এই শিরোনামে সংবাদমাধ্যমটি মূলত সতর্ক করেছে। কারণ, গাজায় ইসরায়েলের ‘চূড়ান্ত উন্মত্ততা’র বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে ইউরোপ।

চলতি সপ্তাহে নানা রূপে কূটনৈতিক আক্রমণ এসেছে, যার সবগুলো সম্পর্কে আগাম অনুমানও করা যায়নি।

গাজায় ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনে দুই তরুণ ইসরায়েলি দূতাবাসকর্মীর হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে দেশটি একটি উত্তাল সপ্তাহ পার করেছে।

গত সোমবার সন্ধ্যায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা গাজায় ইসরায়েলের ‘ভয়াবহ’ কার্যকলাপের নিন্দা জানিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার পর থেকেই এই আক্রমণের ঢেউ ইসরায়েলের উপকূলে আছড়ে পড়তে শুরু করে।

ওই তিন দেশ সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েল যদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যায় এবং মানবিক সহায়তার ওপর বিধিনিষেধ তুলে না নেয়, তাহলে তারা ‘আরও কঠোর পদক্ষেপ’ নিতে পারে। এ ছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় ‘নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা’ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে দেশগুলো।

এরপর ২৪টি দাতাদেশের একটি বিবৃতি আসে। এতে গাজার জন্য ইসরায়েল-সমর্থিত নতুন ত্রাণ সরবরাহ ব্যবস্থার নিন্দা জানানো হয়।
কিন্তু এটি ছিল কেবল শুরু।

পরদিন মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করে এবং জানায়, ২০২৩ সালের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথনকশা পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পশ্চিম তীরের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ড্যানিয়েলা ওয়েইসও ওই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। তিনি লুই থেরুর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র দ্য সেটলার্স-এ স্থান পেয়েছিলেন।

লন্ডনে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত তসিপি হোটোভেলিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরে তলব করা হয়েছে—এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণত রাশিয়া বা ইরানের মতো দেশের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়ে থাকে।

ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাসের বক্তব্য। তিনি বলেন, ইইউর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদেশ ইসরায়েলের সঙ্গে ২৫ বছরের পুরোনো সহযোগিতা চুক্তি পর্যালোচনা করার পক্ষে।

‘অনেক হয়েছে আর নয়’

ইসরায়েলের প্রতি অব্যাহত কূটনৈতিক নিন্দার কারণ অনেকটাই স্পষ্ট।
ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে গাজার বাসিন্দারা গণ-অনাহারের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যার প্রমাণ বিশ্বজুড়ে ভীতিকর প্রতিক্রিয়া ছড়াচ্ছে।  
ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং চারপাশের কথাবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিপর্যস্ত এই ভূখণ্ডে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে চলেছে।

গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টের সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের একটি মন্তব্য উল্লেখ করেন। এই মন্ত্রী গাজায় ‘নিধন চালানো’, ‘যা বাকি আছে তা ধ্বংস করা’ এবং সেখানকার বেসামরিক জনগণকে অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরের কথা বলেছিলেন।

ল্যামি বলেন, ‘যা বলা দরকার, আমাদের সেটাই বলতে হবে। এটি উগ্রপন্থা। এটি বিপজ্জনক, জঘন্য ও বিকৃত। তীব্র ভাষায় আমি এর নিন্দা জানাই।’

গাজায় যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে স্মোত্রিচ নীতিনির্ধারক নন। এর আগে হলে তাঁর উসকানিমূলক মন্তব্য উপেক্ষা করা যেত। কিন্তু এখন সেই সময় আর নেই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এখন তাঁর কট্টর-ডানপন্থী সহকর্মীদের প্রভাবাধীন বলেই মনে হচ্ছে। তবে এ কথা সঠিক হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে।

সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন, নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের বেসামরিক মানুষের জীবন বা গাজায় এখনো আটক ইসরায়েলি জিম্মিদের কথা না ভেবেই অব্যাহতভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

যেসব দেশ এত দিন ধরে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে ছিল, তারাও এখন বলতে শুরু করেছে, ‘অনেক হয়েছে, আর নয়।’

এই সপ্তাহটি স্পষ্টতই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ইসরায়েলের একজন দৃঢ় সমর্থক (তিনি একবার বলেছিলেন ‘আমি নিঃশর্তভাবে ইহুদিবাদকে সমর্থন করি’) এবং গত বছর গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে দ্বিধা করায় নিজ দল লেবার পার্টির ভেতর থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু তিনিই গত মঙ্গলবার বলেছেন, গাজায় নিরীহ শিশুদের দুর্ভোগ ‘কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।’

অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর দেশের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের এমন ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের মুখে নেতানিয়াহু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে।

নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, ‘যদি গণহত্যাকারী, ধর্ষক, শিশু হত্যাকারী ও অপহরণকারীরা আপনাকে ধন্যবাদ জানায়, তবে আপনি ন্যায়ের পথে নেই। আপনি মানবতার বিপরীতে এবং ইতিহাসের ভুল পাশে অবস্থান করছেন।’

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, গত বুধবার রাতে ওয়াশিংটনে জুইশ মিউজিয়ামের বাইরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ইসরায়েলি দূতাবাসকর্মী ইয়ারন লিসচিনস্কি ও সারা লিন মিলগ্রিমের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচকদের ‘সরাসরি সংযোগ’ রয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বজুড়ে সহানুভূতির ঢল নামলেও ইসরায়েলি সরকার ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে। কারণ, পশ্চিমা মিত্রদেশ ও ইহুদি জাতিগোষ্ঠীর বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও গাজা যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক দূত ও টনি ব্লেয়ারের উপদেষ্টা ছিলেন লর্ড লেভি। তিনি বলেন, বর্তমান ইসরায়েল সরকারের সমালোচনাকে সমর্থন করেন। এমনকি এসব সমালোচনা আগে করা দরকার ছিল বলে মনে করছেন তিনি।

লর্ড লেভি নিজেকে একজন গর্বিত ইহুদি দাবি করেন এবং ইসরায়েলের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসাও প্রকাশ করেন। তিনি বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট ওয়ান’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘গাজায় যা ঘটছে, তার বিরুদ্ধে শুধু আমাদের নয়, আন্তর্জাতিকভাবে সবাইকে অবস্থান নিতে হবে।’

তবে সবকিছুর মধ্যেও একজন মানুষ সম্পূর্ণ নীরব—যিনি চাইলে এই যুদ্ধ থামাতে পারতেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চল সফর শেষে ট্রাম্প শুধু বলেছেন, ‘অনেক মানুষ অনাহারে আছেন।’

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধ নিয়ে হতাশ এবং ইসরায়েল সরকারকে যুদ্ধ ‘শেষ করতে’ বলছেন।
কিন্তু যখন অন্য পশ্চিমা নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, তখন ট্রাম্প প্রায় কিছুই বলছেন না।

ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজায় বিধ্বস্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ফিলিস্তিনি। ২৪ মে, মধ্যগাজা
ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজায় বিধ্বস্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ফিলিস্তিনি। ২৪ মে, মধ্যগাজা। ছবি: এএফপি

গাজা এখন ‘কসাইখানা’

গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে দায়িত্ব পালনরত বৃটিশ চিকিৎসকরা অঞ্চলটিকে একটি ‘কসাইখানা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে তাদের সামনে আসা প্রতিটি রোগীই মারাত্মক অপুষ্টির শিকার এবং বোমা বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত। ডা. টম পটোকার বিশেষায়িত একজন প্লাস্টিক সার্জন। তিনি দগ্ধ রোগীদের নিয়ে কাজ করেন। ১৬ বার গাজায় গিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন।

এবারকার অভিজ্ঞতাকে তার জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আরব নিউজ। তিনি স্কাই নিউজকে বলেন, এটা ভয়াবহ, এটি একটি কসাইখানা। আমি এমন ধ্বংস আগে দেখিনি। ডা. পটোকারের মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরের তুলনায় এবার ধ্বংস অনেক বেশি ব্যাপক। তিনি এখন আমাল হাসপাতালে কাজ করছেন। কারণ এর আগে যে ইউরোপিয়ান হাসপাতালে তিনি ছিলেন সেটি ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, খান ইউনিস এখন স্তালিনগ্রাদের মতো দেখাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, মার্চ থেকে আরোপিত মানবিক অবরোধের ফলে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে গাজায়। অনেকেই ক্ষুধার্ত অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন।

সম্প্রতি অবরোধ তুলে নিলেও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ত্রাণ যাচ্ছে। তবে তা একেবারেই সামান্য। ফলে শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। একটি শিশুর পিঠ ও বুকে পুড়ে গেছে। তাকে ভর্তি করা হয়েছে। আরেক শিশু চোখে ছররা গুলির আঘাতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। ডা. ভিক্টোরিয়া রোজ আরেকজন বৃটিশ প্লাস্টিক সার্জন। তিনি জানালেন কীভাবে ইসরাইলি হামলার ফলে হাসপাতালের বার্ন ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তাদের সহকর্মীরা মাঝপথে রোগী রেখে নিজেদের পরিবারকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ভিক্টোরিয়া রোজ বলেন, আমার অ্যানেসথেটিস্ট নার্স এবং গ্রেইমের অর্থোপেডিক সহযোগী অপারেশন চালু রেখেই চলে যেতে বাধ্য হন, পরিবারকে নিরাপদ স্থানে নিতে।

ডা. গ্রেইম গ্রুপ আরেক বৃটিশ সার্জন। তিনি বলেন, এরা আমাদের মতোই মানুষ, কিন্তু প্রতিদিন বাঁচার যুদ্ধে লড়ছে। এই ফিলিস্তিনি সহকর্মীরা আমাদের মতোই মানুষ। তাদেরও পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে। অথচ প্রতিদিন খাবার, পানি, আশ্রয় খুঁজে বের করেই তারা হাসপাতালে হাজির হন। এটাই তাদের জীবন। ইসরাইল সম্প্রতি খান ইউনিস থেকে মানুষদের সরে যেতে বলেছে। চিকিৎসকরা শঙ্কা করছেন, সেনা অভিযানের সম্প্রসারণের ফলে হাসপাতালগুলোও হয়তো সরিয়ে নিতে হতে পারে। ডা. পটোকার বলেন, বিশ্বনেতারা আর কত কথা বলবেন? কিছু করুন। নিরপরাধ মানুষ হত্যা হচ্ছে, শিশুদের চোখে সান্ত্বনা নেই, খাবার নেই। এটি সভ্যতার লজ্জা। বৃটিশ চিকিৎসকদের এ বিবরণ গাজা উপত্যকার মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা ও ইসরাইলি আক্রমণের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। 

mzamin

মাওবাদীদের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের এই ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ কেন by অলোক পুতুল

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে মাওবাদী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দেশটির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার যে সামরিক অভিযান শুরু করেছে, তা কার্যত এক রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের করিগাট্টা পাহাড়ি জঙ্গলে মোতায়েন করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি সেনা। হেলিকপ্টারসহ তল্লাশি চলছে গভীর বনাঞ্চলে। ‘অপারেশন জিরো’ বা ‘অপারেশন কাগার’ নামে পরিচিত এই অভিযানকে মাওবাদী দমনের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ অভিযান সরাসরি পরিচালনা করছে ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। তারা ছত্তিশগড়ের রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র—উভয় স্তরেই ক্ষমতায় রয়েছে। এ বছরের শুরু থেকেই সরকার মাওবাদীদের ওপর দমন–পীড়ন জোরদার করেছে। নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০১ জন বিদ্রোহী। নিহত ব্যক্তিদের অনেকেই আদিবাসী। শুধু গত বুধবারেই মারা গেছেন ২৭ জন, যাঁদের মধ্যে মাওবাদী সংগঠনের সর্বশেষ সাধারণ সম্পাদক নম্বালা কেশবা রাও রয়েছেন।

তবে মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো এই অভিযানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, ‘মাওবাদী’ আখ্যায় অনেক নিরীহ আদিবাসীকেও হত্যা করা হচ্ছে। তারা সরকারের কাছে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাওবাদী সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ, যাঁদের মধ্যে রয়েছে সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও। এর মধ্যে নিহত বিদ্রোহীর সংখ্যা অন্তত ৬ হাজার ১৬০ জন।

মাওবাদীরা কারা, কী চায় তারা

ভারতে সশস্ত্র মাওবাদী আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে কৃষকদের এক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। এই ‘নকশাল’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন চারু মজুমদার, কানু সান্যাল প্রমুখ। তাঁদের দাবি ছিল—ভূমিহীন কৃষকদের জমি দিতে হবে এবং জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই আন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী), যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহে বিশ্বাস করত। চীনা নেতা মাও সে–তুংয়ের বিপ্লবী দর্শন ছিল তাদের মূল অনুপ্রেরণা। তবে সময়ের সঙ্গে এই দল ভেঙে যায় বহু অংশে। মূল সিপিআই (এমএল) এখন একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। তারা নির্বাচনে অংশ নেয়।

অন্যদিকে ২০০৪ সালে দুটি বড় সশস্ত্র সংগঠন—পিপলস সেন্টার ও মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার এক হয়ে তৈরি করে বর্তমানের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদ্রোহী সংগঠন—সিপিআই (মাওয়িস্ট)। ভারত রাষ্ট্র এই দলকে বর্তমানে ভারতের ‘সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে মনে করে।

বহু বছর ধরে ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও মহারাষ্ট্রে এদের প্রভাব ছিল ব্যাপক। একসময় প্রায় ১২৬টি জেলায় সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে তাদের উপস্থিতি ৩৮টি জেলায় সীমিত হয়েছে।

বস্তার সংঘাত: মাওবাদ বনাম খনিজ লোভের রাজনীতি

২০০০ সালে পৃথক রাজ্য হিসেবে ছত্তিশগড় গঠনের পর থেকেই বস্তারে সংঘাত তীব্রতর হয়েছে। সালওয়া জুদুম নামের বিতর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনীর মাধ্যমে শুরু হয় আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদের অভিযান। আদিবাসীদের অভিযোগ, খনিজসমৃদ্ধ এই অঞ্চলে সেনা ক্যাম্প বসিয়ে সরকার আসলে করপোরেট খনন কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করছে।

দেশের ১৯ শতাংশ লৌহ আকরিক মজুত রয়েছে ছত্তিশগড়ে, যার অধিকাংশই বস্তারে। আদিবাসী নেতা মনীষ কুঞ্জম বলছেন, ২০০৫ সালে টাটা ও এসার কোম্পানি খনিজ উত্তোলনের চেষ্টা শুরু করলে অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়। তবে প্রবল প্রতিরোধের মুখে কোম্পানিগুলো পিছিয়ে যায়। আইনে বলা আছে, গ্রাম পরিষদের সম্মতি ছাড়া খননকাজ শুরু করা যায় না। যাঁরা প্রতিবাদ করেন, তাঁদের মাওবাদী বা তাঁদের সমর্থক হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বস্তারে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৮০ শতাংশ।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বস্তারে সংঘাত কি আদৌ মাওবাদ দমনের লড়াই, নাকি তা আদিবাসীদের মাটি ও অধিকার বাঁচানোর এক মরিয়া প্রতিরোধ, যার মুখে লেবেল সেঁটে দেওয়া হচ্ছে ‘নকশাল’?

বিজেপির আগ্রাসী রণকৌশল

ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস সরকার থাকাকালীন (২০২০-২০২৩) ১৪১ জন বিদ্রোহী নিহত হন। কিন্তু বিজেপি সরকার আসার পর ২০২৪ সালেই নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৩ জনে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেব সাই বলছেন, ‘এখন চূড়ান্ত পর্ব চলছে, আমরা দ্রুত নকশালমুক্ত ভারতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এই অভিযান ঘিরে নিয়মিত মাঠে যাচ্ছেন, সেনা শিবিরে রাত কাটাচ্ছেন। তাঁর ঘোষণা—২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ভারতকে ‘নকশালমুক্ত’ করে তোলা হবে।

বর্তমানে শুধু বস্তার অঞ্চলেই রয়েছে সরকারের ৩২০টি নিরাপত্তা শিবির। শিবিরগুলোতে সব মিলিয়ে আছে প্রায় ৩০ লাখ নিরাপত্তাকর্মী। গোটা ছত্তিশগড়ে মোতায়েন রয়েছে ৬৬ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী। ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং, উপগ্রহ-নিরীক্ষণসহ নানা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি চলছে ঘন জঙ্গলে।

অভিযোগ: আদিবাসীদের ভুয়া এনকাউন্টারে হত্যা

তবে এ অভিযান নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে। ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ’-এর মতে, গত দেড় বছরে অন্তত ১১টি ভুয়া এনকাউন্টারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেমন মার্চে বিজাপুর জেলার বর্ডগা গ্রামে তিনজন বিদ্রোহীকে গুলি করে হত্যার দাবি করে পুলিশ। কিন্তু স্থানীয় লোকজন বলেন, ওই তিনজনকে রাতে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে গুলি করে ‘মাওবাদী’ তকমা দেওয়া হয়।

২০১২ সালে সাড়েকে গুডা গ্রামে ১৭ আদিবাসী এবং ২০১৩ সালে ৮ জন আদিবাসী নিহত হন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। পরবর্তী তদন্তে উচ্চ আদালতের বিচারকেরা জানান, নিহত সবাই নিরপরাধ ছিলেন। অথচ আজও কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।

মাওবাদীদের সক্ষমতা কি কমে আসছে

২০১১ সালে ছত্তিশগড়ের তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক বিশ্বরঞ্জন অনুমান করেছিলেন যে বস্তার অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার সশস্ত্র মাওবাদী এবং ৪০ হাজার জন মিলিশিয়া সদস্য সক্রিয় ছিল। যদিও এই সংখ্যাগুলো নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। সেই সময় মাওবাদীরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ভয়াবহ হামলা চালাতে সক্ষম ছিল। ২০১০ সালে তারা ছত্তিশগড়ের এক বনাঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ৭৬ জন আধাসামরিক সদস্যকে হত্যা করে। তিন বছর পর আরেকটি হামলায় বহু মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে কংগ্রেস নেতাও ছিলেন।

বর্তমানে বস্তারের আইজিপি সুন্দররাজ পি জানাচ্ছেন, এখন প্রায় এক হাজার সশস্ত্র মাওবাদী এবং তাদের সঙ্গে জড়িত আরও ১৫ হাজার ব্যক্তি সক্রিয় আছেন।

মাওবাদীদের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে তাদের সদস্য সংগ্রহ কমে গেছে। ইউনিটগুলো ছোট হয়ে গেছে এবং গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। একসময় যে কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোতে ৪০ জন সদস্য ছিল, এখন তার মধ্যে কেবল ১৮ জন মুক্ত আছেন। বাকি সবাই গ্রেপ্তার হয়েছেন বা নিহত।

ছত্তিশগড়ে মাওবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তারা পাশের রাজ্য মধ্যপ্রদেশে আবার প্রভাব বিস্তার করছে। মাওবাদ হচ্ছে একটি আদর্শ—একে কেবল শক্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। যত দিন না অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন সমাজ গড়া যায়, তত দিন এই আদর্শ নতুনরূপে ফিরে আসতে পারে।

সাবেক মাওবাদীদের নিয়োগ: সরকারের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’?

বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও দমন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘মূলবাসি বাঁচাও মঞ্চ’ নামের একটি আদিবাসী সংগঠনকে গত বছর নিষিদ্ধ করা হয়েছে ‘উন্নয়নবিরোধিতা’ ও ‘সেনাবিরোধিতা’র অভিযোগে। এর সদস্য বহু তরুণ এখন কারাবন্দী।

সরকার ২০০৮ সাল থেকে সাবেক মাওবাদীদের জেলা রিজার্ভ গার্ডে (ডিআরসি) নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল—এদের স্থানীয় বন ও ভূগোল ভালোভাবে চেনা। তারা মাওবাদীদের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত। কিন্তু মানবাধিকারকর্মীদের শঙ্কা, এই প্রক্রিয়া আদিবাসী সমাজে বিভাজন তৈরি করছে এবং ভবিষ্যতে সহিংসতা আরও বাড়াতে পারে।

শান্তি না গভীরতর সংকট

সরকার বলছে, তারা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মাওবাদীদের দমন করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু যারা কয়েক যুগ ধরে ভারতীয় রাষ্ট্রের উন্নয়ননীতি, ভূমি অধিগ্রহণ ও আদিবাসী শোষণের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান কি স্থায়ী শান্তি আনবে? নাকি আরও ভীত, বিচ্ছিন্ন ও নিপীড়িত হবে ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠী?

এই প্রশ্নই এখন বস্তারের গভীর বন থেকে দিল্লির উচ্চপদস্থ মহলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

* অলোক পুতুল সাংবাদিক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া ইংরেজির সংক্ষেপিত অনুবাদ

প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মাওবাদী যোদ্ধা।
প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মাওবাদী যোদ্ধা। ফাইল ছবি: এএফপি