Saturday, April 18, 2015

‘প্রচারণায় ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি’ -তাবিথের পক্ষে মাঠে খালেদা জিয়া

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত
মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে আজ বিকেলে গুলশান
এলাকায় প্রচারণা চালান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আজ রাতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে প্রচারণাকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিকাল ৪টা ২০ মিনিটের  দিকে হঠাৎ গুলশানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। সঙ্গে দলের কয়েকজন মহিলা নেত্রী। কয়েক মিনিট পথ পেরিয়ে তার গাড়ি থামে গুলশান-২ নম্বর পিংক সিটির সামনে। গাড়ি থেকে নেমে মার্কেটের নিচতলার ঢুকে পড়েন তিনি। খালেদা জিয়া নিজেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে প্রচারপত্র বিতরণ করেন। প্রতিটি দোকানে গিয়ে ব্যবসায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতা ও দোকান মালিকদের কাছে বাস মার্কায় ভোট চান তিনি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অনেকে তার সঙ্গে হাত মেলান, ছবি তোলেন। অনেকে আবার সেলফি তোলার আবদার করলে খালেদা জিয়া তাও পূরণ করেন। ৪টা ৪০ মিনিটে ওই মার্কেট থেকে বেরিয়ে সামনের রাস্তায় উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে লিফলেট বিলি করেন খালেদা জিয়া। এরপর তিনি গুলশান-১ নম্বরের ডিসিসি মার্কেটে চলে যান। ওই মার্কেটের নিচতলায় ঘুরে ঘুরে তাবিথ আউয়ালের লিফলেট বিতরণ করেন এবং বাস মার্কায় ভোট চান। প্রায় ১৫ মিনিট ওই মার্কেটে প্রচারণা চালিয়ে চলে আসেন গুলশান-১ নম্বর মোড়ের নাভানা শপিং কমপ্লেক্সে। ওই মার্কেটের নিচতলার ওয়েস্টার্ন ভিশন, জিইএমএস ওয়ার্ল্ড, জুয়েল অপটিকসহ বিভিন্ন দোকানে লিফলেট বিলি করেন। প্রায় ১০ মিনিট প্রচারণা চালিয়ে নাভানা শপিং কমপ্লেক্সে সামনে দাঁড়ান। এসময় গুলশান-১ নম্বর মোড়ে প্রায় সহস্রাধিক লোক জড়ো হয়ে যান। খালেদা জিয়া হাত নেড়ে তাদের অভিবাদন জানান। সেখান থেকে ধীর গতিতে তার গাড়িবহর বাড্ডা লিংক রোডের পথ ধরে এগিয়ে যায়। এসময় গাড়িতে বসেই রাস্তার দুই পাশে পথচারীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। পেছনে পেছন দলের নেতাকর্মীরা হ্যান্ডমাইকে নানা সেøাগান দেন। এসময় মহিলা নেত্রীরাও পথচারীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেন। খালেদা জিয়ার গাড়িবহর লিংক রোড ঘুরে শাহজাদপুর, উত্তর বাড্ডা হয়ে আমেরিকান দূতাবাসের সামনে দিয়ে ফের গুলশান-২ নম্বরস্থ উত্তর ডিসিসি মার্কেটের সামনে থামে। ওই মার্কেটের নিচতলায় প্রচারণা চালান খালেদা জিয়া। ২০ মিনিট ওই মার্কেটে প্রচারণা চালিয়ে বনানী সুপার মার্কেটে চলে আসেন। বনানী সুপার মার্কেটে প্রায় ১০ মিনিট প্রচারণা চালান। এসময় তিনি বনানী মসজিদের সামনেও মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং কুশলাদি বিনিময় করে তাবিথ আউয়ালের পক্ষে ভোট চান। সন্ধ্যা ৭টার পর বনানী ১১ নম্বর রোডে গণসংযোগ করেন খালেদা জিয়া। এসময় উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী তাবিথ যোগ দেন তার গণসংযোগে। এসময় তিনি তাবিথ আউয়ালকে তার নিজের মতো করে প্রচারণায় মনোসংযোগ দেয়ার পরামর্শ দেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের পরামর্শ ও দোয়া নিয়ে নিজের গণসংযোগে চলে যান তাবিথ। এখান থেকে খালেদা জিয়া চলে আসেন মহাখালী এলাকায়। আমতলী ও কাঁচাবাজার এলাকায় তিনি গাড়ি থেকেই হাত নেড়ে বাস মার্কায় ভোট চান এবং লিফলেট বিলি করেন। এরপর তিনি মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে প্রবেশ করেন। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে খালেদা জিয়া তেজগাঁও কলোনি বাজার হকার্স মার্কেটে গণসংযোগ করেন। এরপর হাতিরঝিল এলাকায় গণসংযোগকালে সংবাদিক ও পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে খালেদা জিয়া।  কেমন সাড়া পাচ্ছেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আর আপনারা তো দেখতেই পাচ্ছেন কেমন সাড়া পাচ্ছি। এসময় একজন পথচারী খালেদা জিয়াকে বলেন,  ম্যাডাম, এখন তো আর পজিটিভ পলিটিকস নেই। আমরা  নেগেটিভ পলিটিকস চাই না। আমরা চাই পজিটিভ পলিটিকস। জবাবে  খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি নেগেটিভ পলিটিকস করে না। আমরাও পজিটিভ রাজনীতি করি। যারা নেগেটিভ রাজনীতি করে তাদের প্রতিহত করুন। তরুণ এই তাবিথকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টার প্রচারণা শেষে রাত ৯টার দিকে বাসায় ফিরে যান তিনি। এসময় দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ১৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থ ফারুক হোসেন, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, মহিলা নেত্রী, সুলতানা জামান, বিলকিস ইসলামসহ কয়েক শতাধিক নেতাকর্মী তার সঙ্গে ছিলেন।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি টিকবে তো?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আনুষ্ঠানিক বৈঠক। ছবি: এএফপি
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরান ও ছয় বিশ্বশক্তির (জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও জার্মানি) মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। এ ব্যাপারে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি হবে। কোন পক্ষকে কী করতে হবে, এর বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে চুক্তিতে। সমঝোতা অনুযায়ী ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে।
চুক্তি তো হলো, প্রশ্নটা হচ্ছে-এ চুক্তি আসলে কতটা টেকসই হবে?
ছয় পরাশক্তির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দেশ ইরানের সমঝোতার ঘটনাটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে এটাকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে অভিহিত করছেন। এ নিয়ে পশ্চিমাদের মধ্যেই মতভেদ রয়েছে।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির চুক্তিকে ‘এক জীবনে একটাই সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তবে চুক্তিটির ওপর ভোটাভুটির দাবি তুলেছেন তাঁর বিরোধী রিপাবলিকানরা। এটিকে ‘খারাপ চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এত কিছুর পর এ চুক্তির ফলে ইরান-মার্কিন সম্পর্ক ভবিষ্যতে কেমন হবে, তা এখন দেখার বিষয়। কারণ ইরানের পরমাণু অস্ত্রভান্ডার নিয়ে বিপদের কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে এত দিন প্রচার করেছে ওয়াশিংটন। সেই ইরানের সঙ্গেই পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতার পথে এক ধাপ এগোল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো। বিশ্লেষকেরা অনেকে মনে করছেন, সমঝোতার বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এএফপির বিশ্লেষণে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতায় আছেন কয়েকটি মাস। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি অন্তত একটি বিরোধের সমাধানে আগ্রহী। তা হলো ইরানের সঙ্গে পুনরায় মার্কিন সম্পর্ক স্থাপন। তিনি যদি তা করতে পারেন, তবে এটা হবে বিদায় নেওয়ার আগে তাঁর একটি বড় কাজ।
আলোচনার পর সুইজারল্যান্ডের লুজানে হওয়া চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন পথ খুলে গেল। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এ চুক্তির ফলে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মার্কিন শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে পুনঃস্থাপনের আশা ক্ষীণ। কার্নেগি সেন্টারের ভিজিটিং ফেলো জোসেফ বাহুত বলেন, ‘বারাক ওবামা হয়তো ভাবছেন অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের ফলে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে বোধ হয় নতুন দরজা খুলল। এটা ওবামা প্রশাসনেরও কল্পনা। তবে তিনি (ওবামা) জানেন, এটা কখনোই ঘটবে না। কারণ ইরানের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের স্বরূপটি এত দিন ধরে যেভাবে চলে এসেছে তা থেকে খুব বেশি পরিবর্তন হবে না।’ ইরান এই চুক্তি গ্রহণ করবে, কিন্তু সবকিছু তারা আগের মতো চালাবে বলে মনে করেন জোফেস বাহুত।
১৯৫৩ সালের এক অভ্যুত্থানে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে হটিয়ে শাহের শাসন শুরু হয়। এর পেছনে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জড়িত ছিল। এর পর থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনিপন্থীরা মার্কিনপন্থী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সরকারকে হটিয়ে ইরানের ক্ষমতায় বসে। এরপর থেকে এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে চলছে। ইরানের নেতারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মহা শয়তান’ রাষ্ট্র বলে অভিযুক্ত করে থাকে। অপরদিকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটন তেহরানকে ‘মন্দ অক্ষ’ বলে থাকেন।
এই সমঝোতাকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের’ ভিত্তিতেই ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। তবে তিনি ইরানকে সতর্কও করে দিয়ে বলেছেন, ‘এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হলেও ইরান ও মার্কিনের দুই দেশের মধ্যেকার গভীর বিভাজন ও অবিশ্বাস শেষ হবে না।’ ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ আখ্যা দিয়ে ওবামা আরও বলেন, এবার কোন ভুল করা চলবে না। আমরা ইরানের কাজের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছি।
বড় ঝুঁকি
২০১১ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফের মধ্যে সাক্ষাতের পর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলা শুরু। গত দেড় বছর ধরে ইরান ও ছয় বিশ্বশক্তির মধ্যে আলোচনার ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দুয়ার খুলে একটি সমঝোতা হলো। তবে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুই পক্ষই বড় ঝুঁকি ও সংশয়ের মধ্যে আছে। এ চুক্তির ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির রাশ টেনে ধরটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটা ‘জয়’ বলা যেতে পারে। এ চুক্তির ফলে ইরানের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দেশটির অর্থনীতি বের হয়ে আসবে।
২০১৩ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে ফোন করেছিলেন বারাক ওবামা। গত তিন দশকের মধ্যে এই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এই ফোনালাপের ঘটনাটি ঐতিহাসিক। গত বছরের অক্টোবরে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপে সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনিকে একটি চিঠি দেন। গত মাসে ইরান পার্সিয়ান নতুন বছর উদ্‌যাপন করে। এ সময় ‘ঐতিহাসিক’ সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে ফার্সি ভাষায় এক ভিডিও বার্তায় বারাক ওবামা ইরানের প্রতি ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ শুরুর আহ্বান জানান। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পর বারাক আবার সতর্ক বলে জানিয়েছেন মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান ব্রুকিং ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো সুজানে মেলোনি। তিনি এক ব্লগে লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে কূটনীতির ক্ষেত্রে ওবামা বাজি ধরেছে। ওবামা প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের নীতির ক্ষেত্রে চুক্তির ব্যাপারে আগে একগুঁয়েই ছিল।’
সহযোগিতা হবে কৌশলী
গত মার্চে ৪৭ জন রিপাবলিকান সিনেটর এক খোলা চিঠিতে দাবি করেন, কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হলে তা হবে কেবল বারাক ওবামা ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মধ্যে একটি সমঝোতা মাত্র। এর জবাব দিতে গিয়ে তাঁদের রীতিমতো একহাত নিয়েছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এখন সম্পর্ক এগিয়ে নিতে দুই দেশকে কৌশলী ভূমিকা নিতে হবে। এ ব্যাপারে মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান র‍্যান্ড করপোরেশনের আন্তর্জাতিক নীতি পর্যবেক্ষক আলী রেজা নাদের এএফপিকে বলেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকুক ইরানের প্রভাবশালীরা এটা চায়, আমি তা বিশ্বাস করি না। সম্ভবত রুহানি ও তার সরকার ভালো কূটনৈতিক সম্পর্কই চায় কিন্তু দেশটির সর্বোচ্চ নেতা এবং তার সমর্থকেরা এর বিরুদ্ধে।’
পারমাণবিক সমঝোতার সময় ইরাক ও সিরিয়ার সংগঠিত আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়েও আলোচনা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে জন কেরি ‘পারস্পরিক স্বার্থে’ আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানের সহযোগিতা চান। আফগানিস্তানের তালেবান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি বলে মনে করেন তিনি। এত কিছুর পরও আলী রেজা নাদের মনে করেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বীই থেকে যাবে। তাঁর মতে, ‘ইরানের ভেতর বড় কোনো পরিবর্তন না এলে দুদেশ একে অপরের প্রতিপক্ষই থাকবে।’

ফের বেপরোয়া ছাত্রলীগ

ফের বেপরোয়া ছাত্রলীগ। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটছে একের পর এক ঘটনা। সপ্তাহের ব্যবধানে দিনাজপুর ও কুমিল্লায় নিহত হয়েছেন ৩ জন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে ২ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় ছাত্র-শিক্ষকসহ প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। একের পর এক ঘটনায় বিব্রত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হলেও গ্রুপিং এর কারণে কিছুতেই সংঘাত সংঘর্ষ থামছে না। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এই ঘটনার ঘটেছে। আমরা দ্রুত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। প্রয়োজনে সংগঠনের পক্ষ থেকেও করা হবে।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ই এপ্রিল ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বন্ধ হয়ে গেছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ। গেল সপ্তাহ কুমিল্লায় জেলা ছাত্রলীগের কর্মীসভায় দু’গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে কোতোয়ালি থানা ছাত্রলীগ সভাপতি এম. সাইফুল ইসলাম চিকিৎসধীন অবস্থায় মারা যান। গত শনিবার নগরীর টাউন হল মিলনায়তনে ছাত্রলীগের এ কর্মীসভায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের উপস্থিতিতে এ সংঘর্ষে জড়ায় দুটি গ্রুপ।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) একজন শিক্ষককে ক্যাম্পাসে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডকে নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্যের জেরে তাকে পেটানো হয়। গতকাল ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেছে ছাত্রলীগ সমর্থিত এক কর্মী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক সমিতি ও ছাত্রলীগ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে এক সপ্তাহ ধরে অচল রয়েছে বুয়েট ক্যাম্পাস।  এদিকে পহেলা বৈশাখে ছাত্রলীগের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে রেহায় পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে নারীরা। জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার দায়ে ৬ ছাত্রলীগ কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে সংগঠন থেকে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
পহেলা বৈশাখে এক ছাত্রীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে ৫ নেতাকর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। বহিষ্কৃতরা হলেন- জাবি ছাত্রলীগের কার্যকরী সদস্য নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়, শহীদ সালাম বরকত হল শাখা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক নাফিস ইমতিয়াজ, ছাত্রলীগ কর্মী আবদুর রহমান ইফতি, রাকিব হাসান ও নুরুল কবির। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় হলে ফেরার পথে তাদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। এই সময় তার মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তার শাড়ি ধরে টান দেয় ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি গেটে এক ছাত্রদল নেতাকে পিটিয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। শহীদ রফিক জব্বার হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আশরাফুলকে বেধড়ক পেটায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রলীগ সভাপতির নেতৃত্বে ১০-১২ জন।  
এদিকে ছিনতাই এর অভিযোগে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) দুই ছাত্রলীগ নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগ। বহিষ্কৃত নেতারা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আবদুল মতিন এবং এহসানুল হক। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা এক বিবৃতিতে তাদের বহিষ্কার করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় ছাত্রলীগের নামে অন্তত ১৫ জন ক্যাডার নানা অপকর্ম করে আসছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বিতাড়িত সভাপতি ইফতেখারুল ইসলাম ও বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক অরুণ কান্তি রায়ের অনুগত বলে জানা গেছে।

‘বখাটেরা তরুণীকে নগ্ন করে উল্লাস করছিল’ by রুদ্র মিজান

প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলায় আহত লিটন নন্দী
বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে পুলিশের সামনে নারীদের যৌন নির্যাতনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি লিটন নন্দী। তিনি ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং নির্যাতিতা নারীকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। লিটন বলেন, এ ঘটনার ছবি রয়েছে ঢাবি সংশ্লিষ্ট একজনের কাছে। কিন্তু ঢাবি প্রশাসন নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য ওই ছবিটি প্রকাশ না করতে তাকে চাপ দিচ্ছে। ওই ছবিটি প্রকাশ হলে ঘটনার অনেক কিছুই প্রমাণিত হবে।
লিটন নন্দী জানান, যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারের চেয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় ব্যস্ত আছে পুলিশ ও ঢাবি প্রশাসন। যে কারণে ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও বখাটেদের কাউকে আটক করা যায়নি। তিনি বলেন, ঢাবি কর্তৃপক্ষের ভাব এ রকম যে এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি। ঢাবির প্রক্টর ড. এ এম আমজাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রক্টর বিভিন্ন মাধ্যমে বলেছেন যৌন হয়রানির ঘটনা শুধু লিটনই জানে আর কেউ জানে না। তিনি বলেন, ঘটনার সময় আমি তাকে ফোনে জানিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন,  এতে আমার কি করার আছে। তিনি তখন আমাকে বলেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঢাবি এলাকার দুই নম্বর গেইটতো বন্ধ থাকার কথা। এ ছাড়া ঢাবি এলাকায়তো গাড়ি চলাচল করার কথা না। প্রক্টর আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, গাড়ি কি চলছে ওই এলাকায়। লিটন নন্দী বলেন, বর্ষবরণ উপলক্ষে ঢাবি এলাকায় গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও ওই দিন গাড়ি চলাচল করেছে। উদ্যানের গেইট খোলা ছিলো। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো প্রক্টর তা জানেন না।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
প্রক্টরের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করে লিটন নন্দী বলেন, আমার হাত ভেঙে যাওয়ার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাই আমি। তখন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবির সাধারণ সম্পাদক তুহিন কান্তি দাশসহ কয়েকজন প্রক্টরের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তারা দেখতে পান প্রক্টর দাবা খেলছেন। লিটন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এতো বড় একটা ন্যক্কারজনক ঘটনা জানার পরও তিনি কোন ভূমিকা রাখেননি। বরং অফিসে বসে তিনি দাবা খেলছিলেন। এর চেয়ে নির্মম পরিহাস কি হতে পারে। পুলিশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ঘটনার সময় মিলন চত্বরে, ঘটনাস্থল থেকে ২৫ গজ দূরে ডাচ বাংলা ব্যাংকের বুথের পাশে অনেক পুলিশ ছিলো। ঘটনাস্থলে দুইজন পুলিশ ছিলো। তিনি ও তার সঙ্গী অমিত এবং সুজনসেন নারীদের কান্না শুনে এগিয়ে যান। লিটন বলেন, স্যাটেলাইট চ্যানেলে হায়েনাদের তাণ্ডব দেখেছি। তারা কিভাবে শিকার করে সেই দৃশ্য দেখেছি। ঠিক হায়েনাদের মতোই নারীদের বস্ত্রহরণ ও শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে নির্যাতন করছিলো তারা। বখাটেদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন তখন লিটন, সুজন ও অমিত। লিটন বলেন, আমি চিৎকার করে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছি। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে বারবার অনুনয় করেছেন অমিত। কিন্তু তারা প্রথমে নীরব ছিলো। ঘটনার একপর্যায়ে তারা দুইজন লাঠি চার্জ করলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। পাশে মিলন চত্বরে থাকা পুলিশের কাছে এ বিষয়ে সহযোগিতা চাইলে তারা বলে স্পট ভাগ করা। ওই স্পটের দায়িত্ব তাদের না। ওই সময়েই ফোনে ঢাবি প্রক্টরের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন লিটন। লিটন বলেন, একটা কিশোরী মেয়েকে যৌন নির্যাতন করে অজ্ঞান করে ফেলেছে বখাটেরা। তখন বখাটেদের কাছে হাত জোড় করে বলেছেন ভাই মেয়েটাকে মারবেন না। ওই মেয়েটি মারা যাবে। তাকে ছেড়ে দিন। কিন্তু তাদের কথা শুনেনি বখাটেরা। একপর্যায়ে জোর করেই সরিয়ে দিয়ে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করেন তারা। ওই কিশোরীর সঙ্গে এক তরুণ ছিলেন। তাকেও বখাটেরা মারধর করেছে বলে জানান লিটন। লিটন জানান, ১০-১২ বছরের একটি মেয়েকে তার মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েও নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি পাঁচ-ছয় বছরের সন্তান নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে এসেছিলেন এক নারী। সন্তানকে কেড়ে নিয়ে শাড়ি খুলে যখন তাকে নির্যাতন করা হচ্ছিল। তখন তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, আমার বাচ্চাকে দিন। আমার বাচ্চার সামনে আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। ওই নারীকেও তারা উদ্ধার করেন। ওই সন্তানসহ ওই নারী তার সঙ্গীকে রিকশায় তোলে দিলে তারা প্রেস ক্লাবের দিকে যান।
এভাবে একের পর এক নারীদের নির্যাতন করা হচ্ছিল। লিটন বলেন, যেন যৌন নির্যাতনের মহোৎসবে পরিণত হয়েছিল ঢাবির ওই এলাকার বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। তিনি বলেন, শাড়ি-ব্লাউজ খুলে এক তরুণীকে নগ্ন করা হয়েছিল। বখাটেরা তাকে ঘিরে উল্লাস করছিল। যে যেভাবে পারে যৌন নির্যাতন করছিল তাকে। তখন তার সঙ্গী যুবক তাকে জড়িয়ে ধরে রক্ষার চেষ্টা করছিল। ওই সময়ে নিজের পাঞ্জাবি খুলে ওই তরুণীকে পরিয়ে দেন তিনি। পরে রিকশায় করে তারা ধানমন্ডির শঙ্কর এলাকায় যান। লিটন অভিযোগ করে বলেন, আমরা অন্তত পাঁচজন নির্যাতনকারীকে ধরে এসআই আশরাফের কাছে দিয়েছিলাম। কিন্তু ৭টার পর তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের ছেড়ে দিয়েছেন।
ঘটনার শুরু সম্পর্কে লিটন নন্দী জানান, তারা মেয়র প্রার্থী কাফি রতনের পক্ষে লিফলেট বিতরণ করে শাহবাগ থেকে রাজু ভাস্কর্যের দিকে যাচ্ছিলেন। রাজু ভাস্কর্য এলাকায় পৌঁছলে নারীদের আর্তনাদ কানে আসে। আর্তনাদ শুনে ছাত্র ইউনিয়নের মহানগর নেতা সুজনসেন, রমনা থানার সাধারণ সম্পাদক অমিত দে ও তিনি এগিয়ে যান। লিটন বলেন, বখাটেরা তিনটি গ্রুপে ছিলো। প্রতিটি গ্রুপ গোল হয়ে নারীদের যৌন নির্যাতন করছিল। তারা অনেকেই বাঁশি বাজাচ্ছিল। বাঁশির শব্দে নারীদের চিৎকার প্রথমে বুঝা যায়নি। কৌতূহলবশত এগিয়ে গেলে নারী নির্যাতনের দৃশ্য চোখে পড়ে। তারপরই নির্যাতিতাদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন তারা। একপর্যায়ে সংগঠনের আরও কর্মী এবং আশপাশের কয়েকজন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। লিটন বলেন, সাধারণ মানুষ কার সাহায্য চাইবে বুঝতে পারেনি। কারণ, উপস্থিত প্রায় সবাইকে তখন নির্যাতনকারী মনে হচ্ছিল। লিটন বলেন, উদ্ধার করার একপর্যায়ে তারা ক্লান্ত হয়ে যান। এ সময় তার হাতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন। হাতটা ফুলে যায়। একই অবস্থা হয় অমিত দে’র। সময় তখন প্রায় ৭টা। তখন পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা পুলিশ ও ঢাবি প্রশাসনের

ঢাবিতে যৌন হয়রানির দায়ে দুই ছাত্রলীগ নেতা আটক
বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে পুলিশ। এজন্য যৌন নির্যাতনকারীদের চিহ্নিত ও আটক করার চেয়েও বস্ত্রহরণের ঘটনা ঘটেনি প্রমাণ করতে তৎপর তারা। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বস্ত্রহরণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তৎপর ঢাবি প্রশাসনও। পুলিশ ও ঢাবি কর্তৃপক্ষ ঘটনা ধামচাপা দিতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারীরা। পুলিশ দাবি করছে, ঘটনার পর থেকে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে বস্ত্রহরণের কোন দৃশ্য পাওয়া যায়নি। তবে নারীদের ঠেলা-ধাক্কা ও জড়িয়ে ধরার দৃশ্য এতে রয়েছে। এসব দৃশ্য থেকে ছবি প্রিন্ট করা হয়েছে। ওইসব ছবিকে অবলম্বন করে বখাটেদের শনাক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বখাটেদের শনাক্ত করতে ঢাবি কর্তৃপক্ষও সহযোগিতা করছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। ইতিমধ্যে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে প্রাপ্ত ছবি ঢাবি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে বখাটেদের ছবি প্রিন্ট ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে ডিবিসহ পুলিশের একাধিক টিম। তবে গতকাল পর্যন্ত বখাটেদের কারও পরিচয় পাওয়া যায়নি। আজ-কালের মধ্যেই বখাটেদের পরিচয় পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। পুলিশের রমনা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার ইব্রাহিম খান জানান, ১লা বৈশাখ উপলক্ষে টিএসসি এলাকায় ১৯টি সিসি ক্যামেরা ছিল। এসব ক্যামেরার ফুটেজগুলো বারবার দেখা হয়েছে। এর কোথাও বস্ত্রহরণের কোন দৃশ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি ঘটনার সময় টিএসসি এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তারাও বস্ত্রহরণের বিষয়ে কিছু জানেন না। ঘটনাস্থল থেকে ২৫ গজ দূরে দায়িত্ব পালন করছিলেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইদুল হক ভূঁইয়া। তিনি জানিয়েছেন, এ ধরনের কোন অভিযোগ তার কাছে তখন কেউ করেনি। বস্ত্র হরণের মতো ঘটনা তার চোখে পড়েনি।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
এ ঘটনায় নির্যাতিতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে আহত অমিত দে জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দুই নম্বর গেট ও রাজু ভাস্কর্যসংলগ্ন এলাকায় বস্ত্রহরণের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি তিনটি স্থানে তিনটি গ্রুপ চারদিক ঘেরাও করে নারীদের বস্ত্র হরণ ও যৌন নির্যাতন করছিল। তখন পাশেই দুজন পুলিশ সদস্য ছিল। অমিত বলেন, তাদের পা ধরতে শুধু বাকি ছিলো। নারীদের উদ্ধার করার জন্য শুরুতেই বারবার তাদের অনুরোধ করেছি আমি। কিন্তু তারা তখন সাড়া দেয়নি। এমনকি রাজু ভাস্কর্যের অন্য পাশে থাকা পুলিশকেও অনুরোধ করেছিলেন অমিত। তারা তখন জানিয়েছে, একেকটি স্পটের দায়িত্ব একেকটি গ্রুপের। উদ্যানের দুই নম্বর গেটের দায়িত্ব তাদের না। ভিডিও ফুটেজে বস্ত্রহরণের দৃশ্য না থাকা প্রসঙ্গে অমিত জানান, বস্ত্রহরণের সময় ওই স্থানে লাইটের অভাবে অন্ধকার ছিল। চারদিকে বখাটেরা ঘেরাও করে রেখেছিল। এটি ফুটেজে দেখা না গেলেও আলামত নিশ্চয়ই আছে বলে মনে করেন তিনি।
একইভাবে ওই ঘটনায় নির্যাতিতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে আহত ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সভাপতি লিটন নন্দী অভিযোগ করেন, ঢাবির ভিসি ও প্রক্টর এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য ওই বস্ত্রহরণের ঘটনা আড়াল করতে চাইছেন। তিনি জানান, বস্ত্রহরণের ঘটনা তদন্ত শুরু হলে বিপাকে পড়েন ঘটনাস্থলের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা। একইভাবে ঢাবি এলাকায় এ ধরনের ঘটনায় সমালোচিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পুলিশ ও ঢাবি প্রশাসন নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য বস্ত্রহরণের বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) এম এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার জানান, বখাটেদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে ডিবিসহ পুলিশের কয়েকটি টিম কাজ শুরু করেছে। শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
‘প্রক্টর ও পুলিশ যৌন নিপীড়ক ও অপরাধীদের সহযোগী’
এদিকে ছাত্র ইউনিয়ন আয়োজিত সংহতি সমাবেশে অংশ নিয়ে অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেছেন, পুলিশ ও প্রক্টর নাকি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে শ্লীলতাহানির কোন কিছুই দেখেনি। তারা সত্য ও যৌন নিপীড়নকে অস্বীকার করেছে। বলতে বাধ্য হচ্ছি, তারা যৌন নিপীড়ক ও অপরাধীদের সহযোগী। যৌন সন্ত্রাসদের দেশের অসুস্থ রাজনীতি, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পৃষ্ঠপোষকতা করছে। মিথ্যা বলে তাদেরকে রক্ষায় ব্যস্ত হয়েছে। পুলিশের উপর ভরসা করে না থেকে উৎসবের দিন সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এসময় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এ ঘটনায় মুখে ও চোখে কুলুপ এঁটে ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সত্যকে ঢাকার চেষ্টা করবেন না। সঠিক দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সরে দাঁড়ান নতুবা দুর্বৃত্তের সহযোগী হিসেবে সকলের কাছে আখ্যায়িত হবেন। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান তারেকের সভাপতিত্বে এতে আরও বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, সাংবাদিক কামাল লোহানী, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লাকী আক্তার, ঢাবি শাখার সভাপতি লিটন নন্দী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, যে কোন উৎসবে নারীরা বলতে পারবে না অবাঞ্ছিত হাত শরীরে আঘাত করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও দায়ভার কেউ নেয় না। পুলিশকে দায়িত্ব দেয়া হলেও তারা দায়িত্ব পালন করেনি। সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ঘৃণা উচ্চারণ করছি। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্র্থীরাই ৫২, ৬২, ৬৯ ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ করেছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে এ ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোন প্রতিবাদ নেই। পুলিশ উপস্থিত থাকলেও ব্যবস্থা নেয়নি, আর প্রক্টর দাবা খেলায় ব্যস্ত ছিল। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পাড়া-মহল্লায় প্রতিবাদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া সমাবেশ থেকে ছয় দফা দাবি ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ছয়দফা দাবিগুলো হলো অবিলম্বে ঢাবি প্রক্টরের অপসারণ, যৌন নিপীড়নকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা, কর্তব্যরত পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার তদন্ত করে বিচার, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীতিমালা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সর্বক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আজ দুপুর ১২টায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন, আগামীকাল সারা দেশে বিক্ষোভ ও সংহতি সমাবেশ, ২০শে এপ্রিল সকাল ১১টায় অপরাজেয় বাংলা থেকে কার্জন হল পর্যন্ত মানববন্ধন, ২১শে এপ্রিল সকাল ১১টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি পেশ। এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এদিকে এ ঘটনায় গতকালও উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস। দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। এসব কর্মসূচি থেকে দায়িত্বে অবহেলা ও মিথ্যাচার করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এ এম আমজাদ ও পুলিশ সদস্যদের শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। এদিকে সিসি ক্যামরার ফুটেজে কয়েকজন দোষীকে শনাক্ত করা গেলেও পরিচয় না জানায় তাদের এখনও আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল সকালে ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘প্রতিবাদ কার্টুন’ প্রদর্শন করে। টিএসসি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। কার্টুনে নারী নির্যাতন বিরোধী বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। নারী উত্ত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্ল্লোগানসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুনও প্রদর্শন করা হয়। পরে একই স্থানে মানববন্ধন করে ‘এঙ্গেজ ম্যান অ্যান্ড বয়েজ নেটওয়ার্ক’। তারা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ, ব্যথিত এবং লজ্জিত’ লেখা সম্বলিত ব্যানার নিয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন। বিকালে টিএসসির সামনের চত্বরে দোষীদের গেপ্তার এবং শাস্তির দাবিতে সমাবেশ করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সংগঠনের সভাপতি গোলাম কুদ্দুসের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, হাসান আরিফ প্রমুখ। রামেন্দু মজুমদার বলেন, এমন লজ্জাজনক ঘটনার পর নিজেকে পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে। গৌরবের জায়গাগুলোতে আজ কালিমা লিপ্ত হচ্ছে। এদেরকে পশু বললে পশুরাও লজ্জা পাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, অনেক সঙ্কট পার করতে পারলেও আমাদের রুচি, ভাবনা এবং চেতনায় পরিবর্তন আসেনি। পুলিশ প্রধান সর্বত্র শান্তি স্থাপনের কথা বলছেন। কিন্তু কোথায় শান্তি? এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। আগের ঘটনাগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যর্থতা এগুলো উস্কে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস তার বক্তব্যে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গৌরবের ইতিহাস রয়েছে। এই স্থানেই হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আবার একই স্থানেই নারীদের হয়রানি করা হয়েছে। সমাবেশ থেকে আগামী ২১শে এপ্রিল মানববন্ধন করার ঘোষণা দেন তিনি।
ছাত্রদলের কর্মসূচি: এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নববর্ষে ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ছাত্রলীগের অব্যহত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদল। গতকাল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। দেশের সকল জেলা, মহানগর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে এ কর্মসূচি পালন করা হবে।

মন্তিয়েলের বিধবা বউ by গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

হোসে মন্তিয়েল যখন মারা গেল, একটা বিহিত হয়েছে সবাই এমন অনুভব করল শুধু তার বিধবা বউ ছাড়া; তবে সে যে আসলেই মারা গেছে এটা বিশ্বাস করতে শহরবাসীর কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে গেল। অনেকেই সন্দেহ করতে লাগল, গুমোট ঘরে মৃতদেহটা দেখার পর বালিশগুলো আর লিলেনের চাদরের সঙ্গে গাদাগাদি করে রাখা হলুদ কফিনের ভেতর, যেটার দুপাশ তরমুজের মতো গোলাকার। বেশ সুন্দর করে শেভ করা, গায়ে সাদা পোশাক, পেটেন্ট-চামড়ার বুট পায়ে এবং তাকে এত সুন্দর দেখাচ্ছিল যে সে সময়ের মতো এত প্রাণবন্ত কখনোই মনে হয়নি তাকে। প্রতি রোববারের আটটার নৈশভোজে উপস্থিত হওয়া সেই একই দোন চেপে মন্তিয়েল, কেবল পার্থক্য এই যে ঘোড়া দাবড়ানোর চাবুকের পরিবর্তে তার হাতের ভেতর ক্রুশবিদ্ধ যিশুর প্রতিকৃতি। কফিনের ঢাকনায় পেরেক ঠোকা এবং পারিবারিক জাঁকাল সমাধিস্তম্ভের ভেতর কবরের দেয়াল ঘিরে ফেলার ঘটনাগুলো দেখে গোটা শহরবাসী বিশ্বাস করল যে, লোকটা মৃতের ভূমিকায় অভিনয় করছে না।
দাফনের পর, শুধু এই ব্যাপারটা তার বিধবা বউ ছাড়া অন্য সবার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলো যে হোসে মন্তিয়েলের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। সবাই যখন ধারণা করছিল ওত পেতে থাকা কেউ পেছন থেকে তাকে গুলি করবে, তার বিধবা বউ নিশ্চিত ছিল যে তাকে বৃদ্ধাবস্থায় বিছানায় শুয়ে মরতে দেখবে, পাপ স্বীকার করার পর, কোনো যন্ত্রণাভোগ ছাড়াই, আধুনিক কালের কোনো সন্তের মতো। কিন্তু তার বর্ণনায় কিছু ভুল হয়েছিল। হোসে মন্তিয়েল মরেছে তার দোল-বিছানায়, ১৯৫১ সালে, আগস্টের ২ তারিখ বেলা দুইটার সময়, তার মৃত্যু হয়েছিল আক্রোশজনিত মূর্ছার ঘটনায়—যে ব্যাপারে চিকিৎসকের নিষেধ ছিল। তবে সে আশা করছিল সমস্ত শহর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেবে এবং সবাই এত ফুল আনবে যে আঁটবে না ঘরে। তবু কেবল তার নিজের দলের লোকেরা এবং সমধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভাইয়েরাই উপস্থিত থাকল এবং একমাত্র ফুলের ডালা তারা পেল পৌর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। তার ছেলে, জার্মানিতে তার বাণিজ্যদূতের পদ থেকে এবং তার দুই মেয়ে প্যারিস থেকে তিন পাতার টেলিগ্রাম পাঠাল। কেউ দেখলেই বুঝবে খসড়াটা লেখা হয়েছে দাঁড়ানোর ওপর, টেলিগ্রাফ অফিসের পর্যাপ্ত কালি ব্যবহার করে এবং ২০ ডলার মূল্যের শব্দসংখ্যা খুঁজে পাওয়ার আগে তাদের অনেকগুলো টেলিগ্রাম ফরম ছিঁড়তে হয়েছে। তাদের কেউই ফিরে আসার আশ্বাস দেয়নি। সেই রাতে, ৬২ বছর বয়সে সেই বালিশে অশ্রুপাত করতে করতে, যাতে শুয়ে শেষ বিশ্রাম নিয়েছিল লোকটা যে তাকে সুখী করতে চেয়েছে, মন্তিয়েলের বিধবা বউ প্রথমবারের মতো অপমানবোধের স্বাদ বুঝতে পারল। ‘আমি চিরকালের মতো বন্দী করে রাখব নিজেকে’, সে ভাবল। ‘আমাকে যেন তারা হোসে মন্তিয়েলের সঙ্গে একই কফিনে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এ দুনিয়া সম্পর্কে আমি আর বেশি কিছুই জানতে চাই না।’
সে ছিল আলাভোলা, দুর্বল নারী, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, বাবা-মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছে কুড়ি বছর বয়সে, চেয়েছে কেবল তাকেই যে ছিল তার পাণিপ্রার্থী, যার সঙ্গে কুড়ি ফিটের কম দূরত্ব থেকে দেখা করার অনুমতি ছিল তাদের। বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তার কখনোই ছিল না। তারা তার স্বামীর মৃতদেহ বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর, সে নিজের অশ্রুর ভেতর দিয়ে বুঝেছে তার নিজেকেও একই সঙ্গে টেনে নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তার নতুন জীবনকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সেই অভিমুখ সে খুঁজে পেল না। তাকে শুরু করতে হলো একদম গোড়া থেকে।
অসংখ্য রহস্যের ভেতর হোসে মন্তিয়েলকে নিজের সঙ্গে কবরে নিয়ে যেতে হলো একটি ভারী সিন্দুক। মেয়র সমস্যাটির দায়িত্বভার নিয়েছিলেন। তিনি সিন্দুকটাকে প্রাঙ্গণে রাখার নির্দেশ দিলেন, দেয়ালের বিপরীতে এবং দুজন পুলিশ তালা লক্ষ করে গুলিবর্ষণ করল। সমস্ত সকাল ধরে মন্তিয়েলের বিধবা বউ শুনতে পাচ্ছিল ভারী অগ্নিবর্ষণের শব্দ এবং পর্যায়ক্রমিক নির্দেশ, যা চিৎকার করে করে বলে যাচ্ছিলেন মেয়র।
‘ওটা হলো শেষ খড়কুটো’, সে ভাবল। ‘ঈশ্বরের কাছে পাঁচ বছর ধরে প্রার্থনা করেছি যাতে গোলাগুলি শেষ হয়, আর এখন আমাকে তাদের ধন্যবাদ জানাতে হচ্ছে আমার বাড়িতে গোলাগুলির জন্য।’ সেদিন সে সমন্বিত চেষ্টা চালাল মৃত্যুকে ডাকার। কিন্তু কারও প্রত্যুত্তর পেল না। সে ঘুমিয়ে পড়তে শুরু করেছিল যখন একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ বাড়ির ভিত নাড়িয়ে দিল। ভারী সিন্দুকটাকে ভাঙতে তাদের ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়েছে।
মন্তিয়েলের বিধবা বউ সজোরে দীর্ঘশ্বাস টানল। অক্টোবর মাসটা ছিল বিলুয়া বৃষ্টিতে অন্তহীন, মন্তিয়েলের অগোছালো ও প্রকাণ্ড খামারবাড়িতে গন্তব্যহীনভাবে চলতে শুরু করে সে নিঃশেষিত বোধ করল। পরিবারের বয়োবৃদ্ধ এবং নিরলস বন্ধু কারমিকায়েল সাহেব ভূসম্পত্তির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অবশেষে সে যখন তার স্বামীর মৃত্যুর অকাট্য সত্যের মুখোমুখি হলো, মন্তিয়েলের বিধবা বউ বাড়ি দেখাশোনা করতে বেরিয়ে এল শোবার ঘর থেকে। সমস্ত সাজসজ্জা সে খুলে ফেলল, আসবাবপত্রগুলো ঢেকে দিল শোকের রঙে এবং দেয়ালে টাঙানো মৃত লোকটার প্রতিকৃতিতে অন্ত্যেষ্টির রিবন জুড়ে দিল। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দুমাস পর, সে ফিরে পেল তার নখ কামড়ানোর অভ্যাস। একদিন অতিরিক্ত কান্নায় তার দুচোখ লাল এবং উদ্বেল হলো যখন সে দেখল যে কারমিকায়েল সাহেব ছাতা খুলে বাড়ির ভেতর ঢুকছেন।
‘ছাতা বন্ধ করেন, কারমিকায়েল সাহেব’, সে তাকে বলল। ‘এত দুর্ভাগ্য পোহানোর পর, আপনার কাছে আমাদের এটাই চাইবার ছিল যে, আপনি ছাতা খুলে বাড়ির ভেতর ঢুকবেন।’
কারমিকায়েল সাহেব ছাতাটা এক কোনায় রাখলেন। তিনি ছিলেন এক বুড়ো কালো মানুষ—উজ্জ্বল ত্বক, সাদা জামা গায়ে এবং বুড়ো আঙুলের গিঁটের ফুলে ওঠা গেঁজে যাতে চাপ না লাগে তাই চাকু দিয়ে জুতোটা চেরা।
‘শুকিয়ে যাওয়ার সময়ই শুধু এইটা হয়।’
তার স্বামীর মৃত্যুর পর এই প্রথম মন্তিয়েলের বিধবা বউ জানালা খুলল। এত দুর্দশা, তার ওপর এই শীতকাল, সে বিড়বিড় করল, তার নখ কামড়াতে কামড়াতে। ‘মনে হচ্ছে, কখনোই আর পরিষ্কার হবে না।’
‘আইজ কিংবা কালকের মধ্যে হইতেছে না’, নির্বাহী লোকটি বললেন। ‘গত রাইতে আমার পায়ের গেঁজ আমাকে ঘুমাইতে দেয় নাই।’
কারমিকায়েল সাহেবের গেঁজের বায়ুমণ্ডলীয় ভবিষ্যদ্বাণীকে সে বিশ্বাস করে। নিবিড়ভাবে সে দেখল জনহীন চত্বরটাকে, নিশ্চুপ বাড়িগুলোকে যার কোনো দরজাই খোলা হয়নি হোসে মন্তিয়েলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সাক্ষ্য হিসেবে, অতঃপর হতাশবোধ করল সে, তার নখগুলো নিয়ে, অপরিসীম জমিজমা নিয়ে, এবং অনন্তসংখ্যক বাধ্যবাধকতা নিয়ে যা সে উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছিল তার স্বামীর কাছ থেকে এবং যেসব কিছুকে সে কখনোই বুঝে উঠতে পারবে না।
‘এ জগতের সবটাই ভুল’, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল সে।
সেই দিনগুলোতে যারা তাকে দেখেছে তাদের এমন ভাবার কারণ ছিল যে, সে পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু তখনকার চেয়ে অত প্রাঞ্জল সে কখনোই ছিল না। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার আগে থেকে অক্টোবরের বিষণ্ণ² সকালগুলোতে সে তার ঘরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছে, মৃতদের প্রতি সমবেদনা নিয়ে এবং এই চিন্তা করে যে ঈশ্বর যদি রোববারে বিশ্রাম না নিতেন জগৎটাকে তিনি ঠিকঠাকমতো তৈরি করে উঠতে পারতেন।
সেই দিনটাকে তিনি ব্যবহার করতে পারতেন কিছু শিথিল লক্ষ্যকে ভালো করে বেঁধেছেঁদে নেওয়ার কাজে, মন্তিয়েলের বিধবা বউ এমনটাই বলত। সর্বোপরি, ঈশ্বরের তো অনন্তকালের সবটা ছিলই বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।
তার স্বামীর মৃত্যুর পর, যে একমাত্র পার্থক্যটা ঘটেছে তা হলো এরপর তার অকাট্য কারণ ছিল এমন তমসাবৃত ভাবনায় নোঙর করার।
এভাবে, মন্তিয়েলের বিধবা বউ যখন নিজেকে হতাশাগ্রস্ত করে ফেলল, কারমিকায়েল সাহেব জাহাজডুবি আটকানোর চেষ্টা করলেন। কিছুই ভালো যাচ্ছিল না। হোসে মন্তিয়েল যে সন্ত্রাসের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল, সেই হুমকি আর না থাকায় শহরবাসী প্রতিশোধ নিয়ে যাচ্ছিল। কখনো না আসা গ্রাহকের অপেক্ষা করতে করতে প্রাঙ্গণে সার করে রাখা জগের দুধ টক হয়ে গেল, এবং চাকের মধু চাকেই নষ্ট হলো, এবং পনির বানানোর ঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পোকা জন্মে স্ফীত হয়ে উঠল পনির। বৈদ্যুতিক আলোর বাতি এবং নকল-মার্বেলের দেবদূতখচিত সমাধিসৌধের ভেতর থেকে হোসে মন্তিয়েল ছয় বছরের হত্যা ও জবরদস্তির মূল্য দিয়ে যাচ্ছিল। দেশের ইতিহাসে কেউই এত অল্প সময়ে এত ধনসম্পদ অর্জন করেনি। একনায়কতন্ত্রের সময়ের প্রথম মেয়র যখন শহরে এলেন, তখন হোসে মন্তিয়েল ছিল সব সরকারের আমলের সতর্ক দলীয় কর্মী, যে তার জীবনের অর্ধেক সময় নিজের অন্তর্বাসের ভেতর কাটিয়েছে তার চালকলের সামনে বসে থেকে। একটা সময় সে সুখী মানুষ ও একজন বিশ্বাসী হিসেবে বিশেষ সুখ্যাতি উপভোগ করেছিল, কারণ সে প্রকাশ্যে জোরেশোরে প্রতিজ্ঞা করেছিল, যদি সে লটারি জেতে একটা মানুষ-সমান আকারের সেন্ট জোসেফের মূর্তি গির্জায় দেবে, এবং সপ্তাহ দুয়েক পর সে মোটা অঙ্কের পুরস্কার জিতে যায় এবং তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। প্রথমবারের মতো সে জুতা পরে, যখন নিষ্ঠুর নতুন মেয়র যিনি ভেতরে ভেতরে পুলিশ সার্জেন্টদের হাতে রাখেন, প্রতিপক্ষকে দমন করার ত্বরিত আদেশ নিয়ে এলেন। হোসে মন্তিয়েল তার বিশ্বস্ত গুপ্তচর হিসেবে কাজ শুরু করল। সেই আদর্শ ব্যবসায়ী, তার শত্রুদের ধনী ও গরিবে পৃথক করতে যার মোটা মানুষের মেজাজে এতটুকুও অস্বস্তি জাগেনি। পাবলিক স্কয়ারে পুলিশ গরিব লোকগুলোকে গুলি করল। ধনী লোকদের শহর ছেড়ে চলে যেতে ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হলো। গণহত্যার পরিকল্পনা করে হোসে মন্তিয়েল মেয়রের সঙ্গে তার শ্বাসরোধী অফিস কক্ষে একসঙ্গে আটকা থাকল দিনগুলো শেষ হওয়া অব্দি, যখন তার স্ত্রী মৃতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে যাচ্ছিল। মেয়র অফিস ছেড়ে যখন চলে যাবে, সে তার স্বামীর পথ আটকাবে।
‘ওই লোকটা একটা খুনি’, সে তাকে বলবে। ‘সরকারের ওপর তোমার প্রভাবকে তুমি ব্যবহার করো যাতে তারা ওই পশুটাকে তাড়াতে পারে; শহরের কোনো মানুষকেই সে জীবিত রাখবে না।’
আর হোসে মন্তিয়েল, কত ব্যস্ত সেই দিনগুলোতে, তার দিকে না তাকিয়েই তাকে পাশে সরিয়ে দিয়েছে, এ কথা বলতে বলতে, ‘এ রকম বোকামি কোরো না।’ প্রকৃত প্রস্তাবে গরিবদের হত্যা করাটা তার কাজ ছিল না, তার কাজটা ছিল বরং শহর থেকে ধনীদের বিতাড়ন করা। মেয়র তাদের দরজাগুলোতে গুলিবর্ষণ করে ঝাঁঝরি বানিয়ে ফেলার পর এবং যখন তাদের শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হলো হোসে মন্তিয়েল তাদের জমিজমা ও গবাদিপশুগুলো তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল এমন দামে যে দাম সে নিজেই নির্ধারণ করেছিল।
‘মূর্খতা কোরো না’, তার স্ত্রী তাকে বলল। ‘তুমি তোমারই সর্বনাশ করছে তাদের সাহায্য করতে গিয়ে, যাতে তারা অন্যত্র গিয়ে অনাহারে না মরে, আর তারা কখনোই তোমাকে ধন্যবাদ জানাবে না।’
এবং হোসে মন্তিয়েল যার এখন হাসারও সময় নেই, তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলতে লাগল, ‘তুমি তোমার রান্নাঘরে যাও, আমাকে এত জ্বালাতন কোরো না।’
এভাবে এক বছরের কম সময়ে বিরোধী দল পদানত হয়ে পড়ল এবং হোসে মন্তিয়েল হয়ে উঠল শহরের সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি। সে তার কন্যাদের পাঠাল প্যারিসে। পুত্রের জন্য জার্মানিতে বাণিজ্যদূতের একটা পদ জোগাড় করল এবং নিজেকে তার সাম্রাজ্য সুদৃঢ় করার কাজে নিয়োজিত করল। কিন্তু সে তার অঢেল সম্পত্তি উপভোগের জন্য এমনকি ছয়টি বছর সময়ও বেঁচে থাকতে পারল না।
তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর পর, মন্তিয়েলের বিধবা বউ সিঁড়িতে ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ শুনছিল কেবলই খারাপ খবর আসার। সব সময় গোধূলিতে কেউ আসে। ‘আবারও দস্যুরা’, তারা বলত। ‘গতকাল ওরা ৫০টি বকনা বাছুরের একটি দলকে নিয়ে চম্পট দিয়েছে।’ তার দোলনার ভেতর স্থির হয়ে বসে থেকে, নখ কামড়ে, মন্তিয়েলের বিধবা বউ তার অপমানবোধকেই হজম করেছে।
‘হোসে মন্তিয়েল, আমি তোমাকে বলেছিলাম’, নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে বলেছিল। ‘এটা একটা অকৃতজ্ঞ শহর। কবরে তোমার শরীর এখনো উষ্ণ অথচ জগৎ তোমার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।’
বাড়িতে ফিরে এল না কেউই। এই বৃষ্টিশূন্য অন্তহীন মাসগুলোতে একমাত্র যে মানবসত্তাকে সে দেখেছে তিনি হলেন অনলস কারমিকায়েল সাহেব, ছাতা বন্ধ করে যিনি কখনোই বাড়িতে ঢুকতেন না। অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না। কারমিকায়েল সাহেব মন্তিয়েলের ছেলেকে অনেকগুলো চিঠি লিখেছেন। তিনি তাকে সমঝোতার অগ্রভাগে থাকা এবং বিধবার কল্যাণ-সম্পর্কিত বিবেচনার অনুমতি থাকার সুবিধার ব্যাপারগুলো ইঙ্গিত করেছিলেন। তিনি সব সময়ই ছলনাপূর্ণ জবাব পেতেন। অবশেষে, হোসে মন্তিয়েলের ছেলে খোলাখুলিভাবে জানাল যে, সে ফিরতে চায় না এই ভয়ে যে তাকে গুলি করে হত্যা করা হতে পারে। কাজেই, কারমিকায়েল সাহেব বিধবার ঘরে গেলেন এমন স্বীকারোক্তি করতে যে তিনি তাকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন।
‘ভালো’, সে বলল। ‘আমি আছি পনির আর মাছির মুকুট যতক্ষণ আছে। যদি আপনি চান, চলে যান শিগগির আর আমাকে শান্তিতে মরতে দেন।’
তখন থেকে জগতের সঙ্গে তার একমাত্র সংযোগ হবে কিছু চিঠিপত্র, যেগুলো মাসের শেষে সে তার মেয়েকে লিখবে। ‘এটা একটা অভিশপ্ত শহর’, সে বলবে। ‘চিরদিন ওখানে থাকো আর আমার জন্য দুঃখ কোরো না। তোমরা সুখে আছ জেনেই আমি সুখী।’ তার মেয়েরা ছাড়া ছাড়াভাবে উত্তর দেবে। তাদের চিঠিগুলো সব সময় সুখী এবং সে বুঝতে পারত সেগুলো লেখা হয়েছে কোনো উষ্ণ আর খুব উদ্ভাসিত কোনো স্থানে এবং মেয়েরা যখন তাদের ভাবনা থামাত নিজেদের দেখতে পেত অনেকগুলো আয়নার ভেতর পুনরাবৃত্ত হতে। তাদের কেউই ফিরে আসতে রাজি হলো না। ‘এখানে রয়েছে সভ্যতা’, তারা বলবে। ‘তা ছাড়া ওখানে আমাদের জন্য কোনো ভালো উপায়ও নেই। এমন একটা অসভ্য দেশে বাস করা অসম্ভব, যেখানে রাজনীতির প্রশ্নে মানুষ হত্যা করা হয়।’ চিঠিগুলো পড়ে মন্তিয়েলের বিধবা বউ ভালো বোধ করবে এবং মাথার ভেতর এর প্রতিটি বাক্যকে সমর্থন করবে।
কোনো এক উপলক্ষে, তার মেয়েরা প্যারিসের মাংসের বাজারে কথা বললে দোকানিরা তাদের বলবে যে, ফ্যাকাশে লাল শূকর জবাই করা হয়েছে এবং পুরোটাই ঝোলানো আছে ফুলের মালা আর মুকুটশোভিত দরজায়। শেষে তার মেয়েদের তরফ থেকে পৃথক একটি চিঠি যুক্ত হবে: ‘ভাবো তো, তারা সবচেয়ে বড় আর সুন্দর কার্নেশনটা রেখেছে শুয়োরের গোয়ার ভেতর।’ বাক্যটা পড়ে দুই বছরের মধ্যে এই প্রথম মন্তিয়েলের বিধবা বউ হাসল। সে তার শোবার ঘরে ঢুকল বাড়ির আলো না নিভিয়েই এবং শুয়ে পড়ার আগে বৈদ্যুতিক শীতপাখাটা ঘুরিয়ে দিল দেয়ালের দিকে। তারপর রাত্রির টেবিলের দেরাজ থেকে কিছু কাঁচি, ব্যান্ডেজ সরঞ্জামের পাত্র এবং একটি জপমালা নিল; সে তার ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নখে ব্যান্ডেজ বাঁধল, কামড়ানোর কারণে যাতে জ্বালাপোড়া করছিল। তারপর প্রার্থনা শুরু করল, তবে দ্বিতীয় রহস্যটি ছিল এই যে, সে জপমালাটি রেখেছিল তার বাম হাতে, কেননা ব্যান্ডেজের ওপর দিয়ে জপমালার গুটিগুলোকে সে অনুভব করতে পারছিল না। এক মুহূর্তের জন্য দূরাগত মেঘগর্জনের কম্পন শুনতে পেল সে। তারপর তার মাথা বুকের দিকে আনত করে ঘুমিয়ে পড়ল। জপমালাসহ তার হাতটি পড়ে থাকল পাশে, তারপর সে প্রাঙ্গণে দেখতে পেল বড় মাকে, কোলের ওপর একটা সাদা চাদর আর একটি চিরুনিসহ, বুড়ো আঙুলে চাপ দিয়ে উকুন মারছেন। সে তাকে জিগ্যেস করল:
‘আমি কখন মরব?’
বড় মা তার মাথা তুললেন।
‘যখন তোমার বাহুতে ক্লান্তি শুরু হবে।’
গল্পটি অনূদিত হয়েছে ১৯৮৪ সালে হার্পার পেরেনিয়াল প্রকাশিত গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কালেক্টেড স্টোরিজ থেকে। বইটি এসপানিওল থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন গ্রেগরি রাবাসা ও জে এস বার্নস্টেইন। অনুবাদ: রায়হান রাইন

হিলারির বাবার সমাধিস্তম্ভ ভাঙল দুর্বৃত্তরা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সাবেক ফার্স্টলেডি হিলারি ক্লিনটনের বাবার সমাধিস্তম্ভ ভেঙে দিয়েছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণার কয়েকদিন পর এ খবর এল। বৃহস্পতিবার এএফপি এক প্রতিবেদনে জানায়, হিলারির প্রয়াত বাবা হিউ রোদামের সমাধিতে মাথার দিকে একটি পাথর উল্টিয়ে দেয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার পুলিশ এ কথা জানিয়েছে। হিলারির বাবা হিউ রোদাম পেশায় একজন টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ছিলেন।
১৯৯৩ সালে হিলারি ফার্স্টলেডি হওয়ার চার মাস পর তিনি পরলোকগমন করেন। স্ক্রানটন শহরের ওয়াশবার্ন স্ট্রিট সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাহিত করা হয়। সমাধিক্ষেত্রের তত্ত্বাবধায়ক ও হিলারির বন্ধু ম্যাকগোলিন জানান, মঙ্গলবার তিনি হিলারির বাবার সমাধিস্তম্ভ ভাঙা দেখতে পান। কে বা কারা এ কাজ করেছে তা জানা যায়নি। পরে ওই সমাধি মেরামত করে সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ প্রধান গেলেন থমাস বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তবে ম্যাকগোলিন মনে করেন, এ ঘটনা ইচ্ছাকৃত নয়, এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই।

আড়াল থেকে প্রকাশ্যে রাহুল

‘নিরুদ্দেশ’ থেকে অবশেষে দেশে ফিরেছেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী। ৫৭ দিন অজ্ঞাত স্থানে থেকে ঘরের ছেলে ঘরেই এলেন। রাহুলের এই অজ্ঞাতবাস নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। অজ্ঞাতবাসে গিয়ে রাহুল গান্ধী মেডিটেশন কোর্স করেছেন। লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর রাহুলের নেতৃত্বের গুণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমন পরাজয় কংগ্রেসের আর কখনও হয়নি। এক প্রকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কংগ্রেস। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে দিল্লিতে পৌঁছান রাহুল গান্ধী। তিনি ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমানযোগে দিল্লি পৌঁছান। ব্যাংকক থেকে এলেও ৫৭ দিন প্রকৃতপক্ষে তিনি কোথায় ছিলেন, তা এখনও জানা যায়নি। রাহুল গান্ধীর বোন প্রিয়াংকা গান্ধী জানিয়েছেন, বাড়িতে পৌঁছানোর পর কংগ্রেস সভাপতি ও তার মা সোনিয়া গান্ধী রাহুলকে বরণ করে নেন। রাহুল গান্ধীর আগমনকে ঘিরে দিল্লির তুঘলক লেনের বাড়িতে বুধবার রাত থেকে ভিড় জমাতে থাকেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
ভোর থেকে সেখানে কংগ্রেসের নেতাকর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীরা জড়ো হতে থাকে। রাহুল পৌঁছানোর পর আতশবাজি ফুটিয়ে নেতাকর্মীরা তাদের নেতাকে অভ্যর্থনা জানায়। রোববার রাহুলকে জনসমক্ষে দেখা যাবে বলে কংগ্রেস সূত্রে জানা গেছে। এ দিন তিনি বিজেপি সরকারের বিতর্কিত ভূমি অধিগ্রহণ বিলের বিরোধিতা করে আয়োজিত কৃষক সমাবেশে যোগ দেবেন। দলীয় সূত্র জানায়, গত বছরের মে মাসে লোকসভা নির্বাচনে কট্টরপন্থী বিজেপির কাছে নাকানি-চুবানি খাওয়ার পর থেকেই উদারপন্থী কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান নিুগামী হয়ে চলেছে। মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর সর্বশেষ দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনেও বিধ্বস্ত হতে হয় কংগ্রেসকে, এখানে উপরুন্তু কোনো আসন ছাড়াই থাকতে হয়েছে তাদের। কংগ্রেসের এই টালমাটাল অবস্থায় বর্তমান ও পরবর্তী করণীয় কী হবে- তা নিয়ে নিগূঢ় বিশ্লেষণ করে দলের শীর্ষ পরিষদ অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির আসন্ন বৈঠকে যোগ দিতেই এ ছুটিতে যান রাহুল। কিন্তু ছুটি অনেক বেশি লম্বা হয়ে যাওয়ার কারণেই গুঞ্জনের ডালপালা মেলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরে এই গুঞ্জনের লাগাম টানলেন কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কর্তা। টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি।

প্রশ্নে প্রশ্নে পেরেশান পুতিন!

টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত বার্ষিক ‘ফোন-ইন’ অনুষ্ঠানে জনগণের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সরকারি সেবা, বিদেশনীতি, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায় ২০ লাখ রুশ তাদের প্রশ্ন আগেই লিখে পাঠিয়েছিলেন। চার ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠানে কঠিন কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পুতিনকে বেশ খাটাখাটনি করে আসতে হয়েছে। বৃহস্পতিবারের ছবি এএফপি

ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগ by মুসতাক আহমদ ও মাহমুদুল হাসান নয়ন

বেপরোয়া ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ
ছাত্রলীগ কি ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে? এমন প্রশ্ন এখন সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ঐতিহ্যবাহী এ ছাত্র সংগঠটির এক শ্রেণীর নেতাকর্মী খুনাখুনির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছেন। আবার প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া এসব সংঘাত-সহিসংতায় ব্যবহৃত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র, যা কোনো বৈধ অস্ত্রও নয়। আর এসব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে তা আরও উদ্বেগজনক। প্রাপ্ত তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভর্তি বাণিজ্যের মতো উল্লেখযোগ্য বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, সারা দেশে এখন অন্য দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ নয়। নিজেরাই একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে প্রায়ই সংঘাত-সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। অপরদিকে ছাত্রলীগকে শিক্ষক লাঞ্ছিত করাসহ মেয়েদের যৌন হয়রানির মতো ঘৃণিত অপরাধের দায় নিতে হচ্ছে। সম্প্রতি এ রকম কিছু নিন্দনীয় ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত জড়িত কয়েকজনকে বহিষ্কারও করা হয়। তারা মনে করেন, এতে করে ছাত্রলীগ নামধারী এসব দুর্বৃত্তকে শক্ত হাতে শাস্তি দিতে না পারলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঐতিহ্যবাহী এ ছাত্র সংগঠনটি। এতে করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের সম্পর্কে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যাবে।
গত ১৬ দিনের এক হিসাবে দেখা গেছে, কয়েকটি স্থানে ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী নিজেদের মধ্যে পাঁচটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এসব ঘটনায় প্রাণ গেছে তিনজনের। আহত হয়েছেন ৪৯ জন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে রংপুর মেডিকেল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। অপরদিকে শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে বুয়েট শিক্ষকরা ধর্মঘটে আছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিও কার্যত অচল রয়েছে। আড়াই মাস বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি খুলেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের বিষয়ে যুগান্তরে প্রকাশিত গত ৬ বছরের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে খুন হন ৪২ জন। এর মধ্যে গত বছরই খুন হন ৬ জন। আর প্রতিটি খুনের ঘটনার পেছনে হয় চাঁদাবাজি, না হয় টেন্ডার নিয়ে বিরোধ অথবা ভর্তি বাণিজ্য নিয়ে দ্বন্দ্ব ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ দৃষ্টান্ত দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বৃহস্পতিবার এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষে মাহমুদুল হাসান ও মো. জাকারিয়া নামে দুই ছাত্র নিহত হন। যারা সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে হল দখলের বিষয়টি উঠে এলেও নেপথ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব উন্নয়ন ও কেনাকাটার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা ও ভর্তি বাণিজ্য।
এর আগে ১১ এপ্রিল কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কর্মী সম্মেলনে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জেলা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাইফুল ইসলাম নামের এক ছাত্রলীগ নেতা খুন হন। সেখানে প্রকাশ্য কারণ ছিল কমিটি দখল। অর্থাৎ যারা কমিটিতে থাকবে তারা সব কিছুর হিস্যা পাবে। অগত্যা কমিটি দখলের জন্য রক্তপাত ছিল অনিবার্য।
এদিকে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদযাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনা বড় কেলেংকারির জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে এখন দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
গোয়েন্দা সূত্র ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তার, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বর্তমান এবং সাবেক নেতাদের হস্তক্ষেপে সৃষ্ট গ্র“পিং, ভালো পদ পেতে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া, দলে ‘চেইন অব কমান্ড’ না থাকা, শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব, অনিয়মিত কাউন্সিল ইত্যাদি এ ধরনের সংঘাত সহিসংতার প্রধান কারণ। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, সবকিছুর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে অবৈধ অর্থ উপার্জনের নেশা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের কয়েকজন ত্যাগী নেতা যুগান্তরকে বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ কেউ এখন চাকরিতে, কিছু নেতা দ্রুত বড় লোক হতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিয়েছেন ঠিকাদারি লাইসেন্স। কেউ আবার টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসার মতো নানা অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কার্যত দেখা যাচ্ছে, ছাত্রলীগের অনেক নেতার কাছে সাংগঠনিক কার্যক্রমের পরিবর্তে সংগঠনকে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনই প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। আর এ কারণে বাড়ছে সংঘাত-সংঘর্ষ।
এদিকে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ যুগান্তরকে বলেন, সংগঠনে চেইন অব কমান্ডের কোনো সমস্যা নেই। বিচ্ছিন্ন ঘটনা দৃষ্টান্ত হতে পারে না। তবে যখনই কোনো ঘটনা ঘটেছে তখনই আমরা নানা ব্যবস্থা নিয়েছি। এমনকি পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। সংগঠনের নামে যারা নানা অঘটন ঘটাচ্ছে তারা আসলে ছাত্রলীগের কেউ নয়। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে তা শুধুই অপপ্রচার। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ঘটনাটি আমরা তদন্ত করছি। দোষীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর ফৌজদারি অপরাধে কেউ দায়ী হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমরা পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানাব।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রলীগে নিজেদের মধ্যে এ ধরনের অব্যাহত সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনায় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডসহ অনেক সিনিয়র নেতাও ক্ষুব্ধ। যে কারণে গত বছর তিন দফায় প্রধানমন্ত্রীকে ছাত্রলীগের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এর আগে ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের ‘সাংগঠনিক নেত্রী’র পদ থেকে পদত্যাগও করেন। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একাধিকবার বলেছেন ‘ছাত্রলীগে শিবির ঢুকেছে’।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, একের পর এক সংগঠনের এক শ্রেণীর নেতাকর্মীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে, অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে প্রশ্রয় দেয়ার ঘটনা। বিগত ৬ বছরে ঢাকায় বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছাড়া আর কোনো ঘটনায় কাউকে তেমন একটা বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। কোনো নেতা বা কর্মী অপরাধে লিপ্ত হলে সংগঠন তাকে সর্বোচ্চ ‘বহিষ্কারে’র সাজা দিয়ে থাকে। বিগত ৬ বছরে প্রায় ১২শ’ নেতাকর্মী এভাবে বহিষ্কারের শাস্তি পেলেও তার বেশিরভাগই লোক দেখানো বলে জানা গেছে। রাজধানীর ঢাকা কলেজে দু’গ্রুপের সংঘর্ষে এক ছাত্র নিহতের ঘটনায় কমিটি স্থগিত করলেও পরবর্তী সময় সভাপতি ফুয়াদ হাসান পল্লব ও সাধারণ সম্পাদক সাকিব হাসান সুইমকে কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। ইডেন কলেজের কমিটি স্থগিত থাকলেও সভাপতি নিপা ও সাধারণ সম্পাদক অর্চিকে বেশকিছু কর্মসূচিতে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে ৯ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় সূর্যসেন হল ছাত্রলীগের কমিটি স্থগিত করা হয়। কিন্তু ওই কমিটির নেতারা সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিফ আহমেদ নামে একজনকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলেও তিনি এখন বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগের সেই মূল নিয়ন্ত্রক। ভাসানী হলে সম্প্রতি এক সংঘর্ষের ঘটনায় নূরনবী ও অনিন্দ বাড়ৈকে আজীবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলেও তারা ক্যাম্পাসে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তম কুমার নামে একজন কেন্দ্রীয় নেতা সেখানকার ছাত্রলীগের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক। অথচ তাকে বহু আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠন থেকে অর্ধশতাধিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শতাধিক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হলেও তারাই এখনও ক্যাম্পাসের মূল ত্রাস। এদের মধ্যে জালাল, রুপম বিশ্বাস, তুষার, আরাফাত প্রমুখ হল ও ক্যাম্পাসে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে তুহিন-জাহাঙ্গীর কমিটির সঙ্গে আবুজর গিফারী গাফফার এবং আলি মুর্তজা খসরু গ্রুপের সংঘর্ষে ২৫ জন আহত হয়। কিন্তু এ সংঘর্ষের হোতা আবুজার গিফারি গাফফার বহিষ্কার হলেও পরবর্তী সময় তাকে সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
(রিপোর্টটি তৈরিতে যুগান্তরের রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, সিলেট শাহজালাল ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেন)

ডাক্তাররাই কি মেরে ফেললেন অহনাকে? by রাশেদ রাব্বি

‘মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে অহনাকে স্কুলে ভর্তি করি। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরেই কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। এখনও আমি প্রতিদিন অপেক্ষা করি, কিন্তু অহনা আসে না, বাবা-বাবা বলে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে না।’- কথাগুলো ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করা শিশু অহনার বাবা স্থপতি মির্জা শাহপার জলিলের।
তিনি অভিযোগ করেন, মাথাব্যথাসহ কিছু উপসর্গ দেখা দিলে প্রথম থেকেই দু’জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে অহনার চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে অহনার ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে সাড়ে চার মাস কেটে যায়। চিকিৎসকদের বাণিজ্যিক মনোভাবের বলি হয়ে মাত্র সাড়ে চার বছর বয়সে নিভে যায় ছোট্ট মেয়েটির জীবন। মেয়ের মৃত্যুর জন্য চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে কয়েকজন চিকিৎসক এবং স্কয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মির্জা শাহপার জলিল। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- ডা. নওশাদ-উন-নবী, চিফ কনসালটেন্ট, শিশু বিভাগ ও নিওন্যাটোলজি, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল; ডা. মো. মাসুদুর রহমান, কনসালটেন্ট শিশু বিভাগ এবং পিআইসিইউ, স্কয়ার হাসপাতাল; অধ্যাপক ডা. সানোয়ার হোসেন, পরিচালক (চিকিৎসাসেবা) স্কয়ার হাসপাতাল; এবং তপন চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্কয়ার হাসপাতাল। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্তদের একজন এসব নিয়ে নাক না গলানোর পরামর্শ দেন। বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-৩৩ ঢাকা, বিগত ১৪ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে নালিশি দরখাস্তে বর্ণিত অভিযোগের প্রকৃত ও অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল বিষয় উল্লেখ করে সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) তৎকালীন ভিসিকে নির্দেশ দেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. শহিদুল্লাকে আহ্বায়ক এবং নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেনকে সদস্যসচিব করে এ কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কাজ কতটা এগিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে বিষয়ে আমি বলতে পারছি না। তবে তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই অতিরিক্ত সময়ের জন্য আবেদন করে।
তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব বিএসএমএমইউ’র নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন তদন্তাধীন বিষয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত এখনও চলছে। এটি একটি জাটিল অভিযোগ। এ জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন।
মামলার বিষয়ে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে ল্যাবএইড গ্রুপের এজিএম সাইফুর রহমান লেলিন যুগান্তরকে বলেন, মামলাটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ল্যাবএইডের বিরুদ্ধে নয়। তাই এ বিষয়ে হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেয়া হবে না। ডা. নওশাদ-উন-নবীর সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
স্কয়ার হাসপাতালে যোগাযোগ করলে শিফট ইনচার্জ সুপ্রকাশ চাকমা অভিযুক্তদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে বলেন। স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক চিকিৎসাসেবা অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আদালতের নির্দেশে তদন্তকাজ এখনও চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার বা হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হবে না। একই হাসপাতালের কনসালটেন্ট শিশু বিভাগ এবং পিআইসিইউ ডা. মো. মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেন এবং প্রতিবেদককে এ বিষয়ে নাক না গলানোর জন্য বলেন।
পরিবারের অভিযোগ : অহনার জন্ম ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি। সাড়ে তিন বছর বয়সে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসিমাখা মুখটি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে। ঝাপসা হতে থাকে চোখ। মেয়ের অসুস্থতায় দিশেহারা বাবা-মা রাজধানীর নামি-দামি ডাক্তারদের কাছে ছুটে যান। কিন্তু কোথাও সঠিক রোগ নির্ণয় হয়নি। ‘ওর (অহনার) কিছু হয়নি’ বলে বিদায় করে দেয়।
পারিবারিক তথ্যমতে, ২০১৩ সালের এপ্রিলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে অহনা। কোনো কারণ ছাড়াই বমি, কিছুই খেতে না পারা, খেলেই বমি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। এ সময় একদিন রাজধানীর কাজীপাড়ার আল হেলাল স্পেশালাইজড হসপিটালের সিইও ডা. আবু শামীমের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে ডিহাইড্রেশন হয়েছে এমন আশংকায় রাতেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেন। ভর্তির পর অহনার ইলেকট্রোলাইট, সিবিসি টেস্ট করা হলেও নেগেটিভ কিছু না পাওয়ায় অহনাকে ডিসচার্জ করা হয়। তবে ডিসচার্জ লেটারে ডায়াগনসিসের জায়গায় প্রশ্নবোধক (??) চিহ্ন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এটা কিছু নয় সব ঠিক হয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন ডা. আবু শামীম।
প্রায় দেড় মাস একই সমস্যায় ভুগে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে অহনা। খাওয়া-দাওয়া কমতে থাকে। ১৮ মে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হসপিটালের চিকিৎসক ডা. নওশাদ-উন-নবীর কাছে নিয়ে গেলে তিনি জানান, অহনা ভারটিগো/মাইগ্রেনে ভুগছে। কোনো প্যাথলজিক্যাল টেস্ট ছাড়াই ডা. নওশাদ-উন-নবী অহনাকে বমির ওষুধ, কিছু ভিটামিন এবং বমি হলে একটি বিদেশী এনার্জি ড্রিংক খাওয়ানোর পরামর্শ দেন।
মির্জা শাহপার জলিল বলেন, দু’জন বড় পেডিয়াট্রিক স্পেশালিস্টের কাছ থেকে কিছু হয়নি শুনে আশ্বস্ত হই। কিন্তু অহনা আরও দুর্বল হতে থাকে। এ অবস্থায় আবার নওশাদ-উন-নবীর কাছে গেলে তিনি কিছু ওষুধ দেন এবং দু’দিন পর যেতে বলেন। কিন্তু ওই দু’দিনে অহনার শারীরিক অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ে। ঘাড় শক্ত হয়ে যায় এবং বারবার মাথাব্যথার কথা বলতে থাকে। এ অবস্থায় ডা. নওশাদ-উন-নবীর কাছে গেলে তিনি ওষুধ চালিয়ে যেতে বলেন এবং অবস্থার অবনতি হলে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। ওই দিনই অহনা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বেলা সাড়ে ১১টায় ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হসপিটালের আইপিডিতে ভর্তি করা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর একজন ডিউটি ডাক্তার এসে এমআরআই করতে হবে বলে চলে যান। বিকাল ৫টায় এমআরআই শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় ডিউটি ডাক্তার জানান, পরীক্ষায় অহনার ব্রেনে একটা টিউমার পাওয়া গেছে, যেটা বেশ খারাপ অবস্থায় পৌঁছে গেছে।
অহনার বাবা বলেন, এটা শোনার পর আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। কারণ ওর উপসর্গগুলো প্রকাশ করার প্রথম দিন থেকে দু’জন স্পেশালিস্টের কাছে চিকিৎসা শুরু করি। তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে সাড়ে চার মাস পর বিষয়টি আমরা জানতে পারি। তিনি বলেন, এর পরই ডা. নওশাদের কাছে গেলে, ‘এটি নিউরোলজিস্টদের বিষয়’- এ কথা বলে আমাকে বিদায় করেন।
নিউরোলজিস্ট ডা. মিজানুর রহমান সন্ধ্যা ৭টায় অহনাকে দেখে তার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ বলে মন্তব্য করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে অহনার ব্রেনে আটকে পড়া ঈঝঋ রিলিজ করাতে হবে বলে জানান। ডা. মিজান তাদের আরও বলেন, টিউমারটি অপসারণ (VP Shunt operation with tumor removal) না করালে প্রথমত সে অন্ধ হয়ে যাবে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়বে। এ বিষয়ে তিনি একই হাসপাতালের চিকিৎসক নিউরোসার্জন ডা. জিল্লুর রহমানের পরামর্শ নিতে বলেন। তাৎক্ষণিকভাবে ডা. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত জানান মির্জা শাহপার জলিল। প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি অহনাকে দেখেন এবং অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কারণ হিসেবে ডা. জিল্লুর বলেন, ল্যাবএইড স্পেশালাইজডে এ ধরনের অপারেশনের পর শিশুদের রাখার কোনো পিআইসিইউ সুবিধা নেই।
অহনার বাবার অভিযোগ, বেলা ১১টায় মেয়েকে ল্যাবএইডে ভর্তি করি আর রাত সাড়ে ১১টায় হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুবিধা নেই বলে স্থানান্তর করতে বলা হয়। আসলে পুরো দিনের টাকা পাওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর জীবন-মরণের বিষয়টি তুচ্ছ করে এ ধরনের আচরণ করেছে। পরে ল্যাবএইডের একজন ডিউটি ডাক্তারের পরামর্শে অহনাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই।
মির্জা শাহপার জলিল জানান, স্কয়ার হাসপাতালে নেয়ার পরে জরুরি বিভাগের ডাক্তাররা দ্রুত টাকা জমা দিয়ে অহনাকে ভর্তি করার তাগাদা দেন। সে অনুযায়ী ভর্তি করার পর রোগীর বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তারা ‘রোগী এখন আমাদের অধীনে, কি করতে হবে আমরাই সিদ্ধান্ত নেব’- এ কথা বলে দ্রুত অহনাকে পিআইসিইউতে নিয়ে যায়। পরদিন সকাল ৯টায় নিউরোসার্জন ডা. পার্থ প্রতিম বিষ্ণু অহনার বাবা-মা’কে ডেকে জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে বলে জানান।
স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে মির্জা শাহপার জলিল বলেন, এ সিদ্ধান্ত আরও আগেই নেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু ভর্তির সময় ডিউটি ডাক্তাররা আমাদের কথা না শোনায় অহনার জীবন থেকে মূল্যবান ১৬টি ঘণ্টা নষ্ট হয়ে যায়। এটাও তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
তিনি জানান, এরপর বেলা সাড়ে ১১টায় ডা. পার্থ প্রতিম বিষ্ণু ওটি থেকে বেরিয়ে অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে বলে জানান। তবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও মেয়ের দেখা না পেয়ে আবার ডা. পার্থের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি পোস্ট অপারেটিভে নিয়ে অহনাকে দেখান। এরপর অহনা জ্ঞান হারালে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশংকাজনক বলে ঘোষণা করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে এর কারণ জানতে চাইলে ওই চিকিৎসকরা তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন।
এ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য মেয়েকে বিদেশে নিতে চাইলেও স্কয়ার হাসপাতালের পক্ষ থেকে অশোভন আচরণ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যাংককের সামিতিভেজ শ্রীনাকারিন চিলড্রেন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় অহনাকে। সেখানকার চিকিৎসকরা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করে তার টিউমারের ৯৯ ভাগ অপসারণ করেন। অপারেশনের পর অহনার জ্ঞান ফেরে এবং সে তার বাবা-মা’কে চিনতে পারে। তবে ধীরে ধীরে তার শরীর খারাপ হতে থাকে। অহনা এরপর আরও প্রায় দেড় মাস বেঁচে ছিল।
অহনার বাবা যুগান্তরকে বলেন, সামিতিভেজের সার্জনরা তাকে জানিয়েছেন, ব্রেন হেমরেজের রিকভারি করার গোল্ডেন টাইম হল ৬ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা করা। কিন্তু অহনার হেমরেজের স্থায়িত্ব ৪৮ ঘণ্টার বেশি। তাদের তথ্যমতে, স্থানীয় চিকিৎসকদের অবহেলায় অহনার বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যায়।

বিএনপির প্রার্থীরা এখনও মাঠছাড়া by হাবিবুর রহমান খান, মতিন আব্দুল্লাহ ও বকুল আহমেদ

আপডেটঃ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকাল ৩টা। কামরাঙ্গীরচরে ঝাউচর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল হক। এলাকার বাসিন্দারাও তার প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। জমে ওঠেছিল নির্বাচনী আড্ডা। কিন্ত বিধিবাম। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী প্রচার চালাচ্ছেন এমন খবরে নড়েচড়ে বসে থানা পুলিশ। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ২০-২৫ জন পুলিশের একটি দল। অতঃপর একযোগে ধাওয়া। গ্রেফতারের ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় সবাই। নির্বাচনী মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন প্রার্থী শহিদুল হকও।
একইদিন সন্ধ্যা ৭টায় কামরাঙ্গীরচর করিমাবাদ এলাকায় প্রচারণায় নামেন ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী অ্যাডভোকেট রাশেদ আলম খোকন। খবর পেয়ে গ্রেফতারের জন্য সেখানেও তড়িঘড়ি উপস্থিত হয় কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশের একটি টিম। গ্রেফতার এড়াতে কাউন্সিলর প্রার্থী খোকনসহ অন্যারা নৌকায় বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে দ্রুত কেরানীগঞ্জে চলে যান।
এভাবে শুধু কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল হক আর খোকন নয়, তিন সিটিতে বিএনপি সমর্থিত বেশিরভাগ প্রার্থী এখন নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারছেন না। প্রতিনিয়ত পুলিশের তাড়া খেয়ে তাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। উপরন্তু গ্রেফতারের নামে বাসায় গিয়েও প্রতি রাতে পুলিশ হানা দিচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে পরিবারের সদস্যদেরও নানাভাবে শাসানো হচ্ছে। এমনকি ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে অনেক প্রার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। গত কয়েকদিনে যুগান্তর টিমের সরেজমিন অনুসন্ধান এবং বিএনপি ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রার্থীদের হয়রানি ও ভয়-ভীতি দেখানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘কোনো প্রার্থী যদি আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করে বলতে পারেন অমুকে আমাকে হয়রানি করেছে বা ভয় দেখিয়েছে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা থাকার কারণে বিএনপি সমর্থিত বেশিরভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে পারছেন না। মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে রাত-দিন পার করতে হচ্ছে আত্মগোপনে। গোপনে যাতে কেউ বাসায়ও আসতে না পারেন সেজন্য প্রার্থীর বাড়ির সামনে ও আশপাশে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। নিজে নামতে না পেরে বাধ্য হয়েই আত্মীয়-স্বজন আর নিজ সমর্থকদের দিয়ে প্রচারণার কাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার সরকারদলীয় ক্যাডার ও ভীতি সৃষ্টি করার জন্য পুলিশ সদস্যরা পিছু নেয়ায় পরিবারের সদস্যরা সেভাবে নির্বিঘ্নে জোরেশোরে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে প্রচারে সরকার সমর্থক প্রার্থীদের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়ছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে- ‘প্রার্থীদের হাত-পা বেঁধে পানিতে নামিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে সাঁতার কাটো।’ নির্বাচন কমিশন মুখে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখাতে পারেনি। এতে প্রমাণিত হয়, নির্বাচন কমিশনের কথা হয় পুলিশ শুনছে না, না হয় নির্বাচন কমিশন আইওয়াশ স্টাইলে এভাবে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে নিতে চাইছে।
৫৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল হকের ভাগ্নে চকবাজারের ডালপট্টি রোডের কসমেটিকস ব্যবসায়ী মো. সায়েম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিন বিকাল, রাতে পুলিশ মামাকে বাসায় খুঁজতে আসে। কোথাও প্রচারণায় গেলে সেখানেও মামাকে ধরতে পুলিশ হানা দেয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে স্বতন্ত্র থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সদস্য সচিব মো. নাঈম। যদিও বিএনপির সমর্থনপ্রাপ্ত প্রার্থী এমএ বাতেন ৯ তারিখে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। দলীয় সমর্থন না পেলেও এখন বিএনপির প্রার্থী মো. নাঈমই। অথচ তিনিও এলাকায় কোনো ধরনের প্রকাশ্য নির্বাচনী প্রচারণা করতে পারছেন না। প্রতিদিনই তার বাসায় পুলিশ তল্লাশি চালায়। তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করতে পারছেন না। ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি তাকে সবসময় বন্ধ রাখতে হয়। গোপনে ভিন্ন নম্বর ব্যবহার করে কিছুটা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
নাঈমের স্ত্রী (নাম বলতে চাননি) সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিন দুই-তিন বার করে বাসায় পুলিশ হানা দিচ্ছে। সে বাসায়ই আসতে পারছে না। কতদিন হয়ে গেল তার চেহারা দেখিনি। সবসময়ই বাসার আশপাশে পুলিশের আনাগোনা লেগে থাকে।
এসব ব্যাপারে জানতে কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মহসিন আলম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, কামরাঙ্গীরচর ৫৫ ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কাউন্সিলর প্রার্থীর নামে একাধিক মামলা রয়েছে। তারা পলাতক আসামি। তাদের ধরতে পুলিশ নিয়মিত বাসায় যাচ্ছে। যেখানে তাদের অবস্থান জানতে পারছে সেখানে যাচ্ছে। কেননা, এটা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তার বাসায় বা তার কোনো কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন।
বাড্ডা থানার বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা উত্তরের ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী এজিএম শামসুল হক। রাজনৈতিক ৮ মামলা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ৫ মামলায় জামিনে আছেন, তিনটিতে জামিন পাননি। তিনি বলেন, তার বাড়িতে প্রতিদিন কয়েকবার করে পুলিশ হানা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে গেটের সামনেই বসে থাকে পুলিশ।
২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্র্থী এজিএম শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার কর্মী-সমর্থকদের বাড়িতে গিয়েও পুলিশ হয়রানি করছে। রোববার বিকালে মোল্লাপাড়ার আমার কর্মী ফারুক, আমান ও আফসারের বাসায় গিয়ে ওদের খোঁজাখুঁজি করেছে পুলিশ। জাতীয়তাবাদী চালক দলের নেতা জুয়েলকে রোববার গাড়িতে করে উঠিয়ে নিয়ে যায়। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এজিএম শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘কর্মী-সমর্থকদের বাড়ির সামনে গিয়ে যদি পুলিশ মহড়া দেয় তাহলে তারা নির্বাচনী প্রচারণা চালাবে কী করে?’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তাদের আতংকগ্রস্ত করতেই পুলিশ এই কৌশল নিয়েছে।’ তবে হয়রানির বিষয়টি অস্বীকার করেন বাড্ডা থানার ওসি এমএ জলিল। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘গত ১৫ দিনে ওনাদের (কাউন্সিলর প্রার্থী) কোনো লোকজনকে হয়রানি কিংবা গ্রেফতার করা হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে মামলা ও ওয়ারেন্ট আছে পুলিশ তাদের তো খুঁজবেই। যাদের বিরুদ্ধে মামলা নেই তাদের বাড়িতে অভিযান চালানো হয় না। হয়রানিও করা হয় না।’ ঢাকা উত্তরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবুল মেছেরের বাড়ির সামনে ও আশপাশে পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে। বাড়ির ভেতরে গিয়ে অভিযান না চালালেও বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় পুলিশের গাড়ি। এতে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে সংশ্লিষ্টরা ওই বাড়িতে ব্যানার-ফেস্টুন আনতে গিয়েও আতংকে থাকেন। আবুল মেছের যুগান্তরকে জানান, রাজনৈতিক মামলা জালে আটকে তিনি এখনও প্রকাশ্যে প্রচারণায় নামতে পারেননি। শুধু তার বাড়ির সামনেই নয়, কর্মী-সমর্থকদের অনেকের বাড়ির সামনেও পুলিশ মহড়া বাড়িয়ে আতংক সৃষ্টি করছে। ঢাকা উত্তরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ফয়েজ আহমেদ রাজনৈতিক মামলায় আত্মগোপনে থাকায় স্ত্রী আলপনা আহমেদ নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন। তবে তার বাড়ির সামনেও পুলিশের মহড়া। এজন্য কর্মীরা তার বাড়ি যেতে ভয় পাচ্ছেন।
ঢাকা দক্ষিণের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী গোলাম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, তার বিরুদ্ধে ১২টি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টিতে তিনি জামিনে আছেন। একটিতে জামিন না পাওয়ায় তিনি গ্রেফতারের ভয়ে নির্বাচনী এলাকায় ঢুকতে পারছেন না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি এলাকায় নেই। কর্র্মীরা প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে বাড়িতে গিয়ে পুলিশ তাকে খুঁজছে। গ্রেফতার আতংকে তিনিসহ তার কর্মী-সমর্থকরা প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে ভয় পাচ্ছেন।’
দক্ষিণের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শামসুল হুদা কাজলের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা বর্তমানে বিচারাধীন আছে। তার বিরুদ্ধে মোট মামলার সংখ্যা ১৬। এতগুলো মামলা মাথায় নিয়ে তিনি আত্মগোপনে আছেন। তার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগের চেষ্টা করলে মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। এজন্য তার মন্তব্য জানা যায়নি। ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল ইসলামের মামলা আছে ২১টি। দক্ষিণের ২১ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী খাজা হাবিবুল্লাহ হাবিবের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাসহ তিনটি মামলা আছে। এভাবে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৯৩টি ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থী মো. মীর হোসেন মীরু। তার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি মামলা বিচারাধীন, ৩টি তদন্তাধীন। তবে গাড়ি ও মানুষ পোড়ানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি আরও অন্তত ৬টি মামলা দেয়া হয়। এসব মামলায় যে কোনো সময় তিনি গ্রেফতার হতে পারেন। এ আশংকায় এলাকায় আসতে পারছেন না মীরু। প্রচার-প্রচারণাও অংশ নিতে পারছেন না। এ বিষয়ে মীর হোসেন মীরু সোমবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশি হয়রানির কারণে এলাকায় যেতে পারছি না। মীরুকে গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সালাম যুগান্তরকে সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘মীর হোসেন মীরুকে আমরা খুঁজছি। এলাকায় না থাকায় গ্রেফতার করতে পারছি না। তাকে পাওয়ামাত্র গ্রেফতার করা হবে। তবে যাদের বিরুদ্ধে মামলা নেই- তাদের কোনো ভয় নেই।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে জাতীয় পার্টি সমর্থিত হাজী মো. মাসুম চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিপক্ষ প্রার্থী আমার লোকজনকে প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। আমার পোস্টার কে বা কারা সরিয়ে ফেলছে। অথচ ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীরা আচরণবিধি লংঘন করে দেয়ালে পোস্টার লাগাচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো নির্বাচনের প্রথমদিকে আমার বিরুদ্ধে দেয়ালে পোস্টার লাগানোর অভিযোগে শোকজ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি বাধা মুক্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রচারণা চালাতে চাই।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শিরিন জাহান বলেন, ‘নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে কে বা কারা প্রতিনিয়ত ফোনে হুমকি দিচ্ছে। হুমকিদাতারা আমাকে বলেছে নির্বাচন থেকে সরে যান, নইলে খবর আছে। প্রায় হুমকি দেয়ায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দিয়েছি।’ এ বিষয়ে থানায় কোনো ডায়েরি করেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভয়ে জিডি করিনি। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে আছি।’
৩১ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি থেকে সমর্থন নিয়ে মাঠে প্রচারণায় নেমেছেন হাজী মো. আবদুর রাজ্জাক। এই প্রার্থী অভিযোগ করেন, ওয়ার্ডের যেসব ভোটার আমার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের বাসায় গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। বলছেন, বিএনপি প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নিও না। ফলে ওয়ার্ডে নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, পুলিশ বিএনপি কর্মীদের ধরে বিভিন্ন মামলার অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে চালান দিয়ে দিচ্ছে। এই কারণে সাধারণ মানুষ সমর্থন জানালেও প্রচারণায় নামতে ভয় পাচ্ছেন।
এমএ সাহেদ মন্টু দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। তিনি এই ওয়ার্ডের বিগত দুই টার্মে ১৭ বছর কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করেছেন। গত জানুয়ারির ১৪ তারিখে নাশকতার মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে তিনি জেলহাজতে আছেন। তার পক্ষে মাঠে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তার স্ত্রী নাসিম বানু। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের পরিচালক সালেহ জামান সেলিম তাদের নেতাকর্মীদের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছেন। তিনি বলেন, ‘সেলিম বলছেন প্রশাসন আমরা টাকা দিয়ে কিনে ফেলেছি। বিজয় আমাদেরই হবে। আমার সঙ্গে ওয়ার্ডের যারা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন তাদেরও তার লোকজন নানাভাবে হয়রানি করছেন। হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।’
এদিকে এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সালেহ জামান সেলিম বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। বরং বিএনপি প্রার্থীসহ তাদের কর্মীরা আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে।’
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে চট্রগ্রামেও গ্রেফতার আতংক মাঠে নেই ১৫ কাউন্সিলর প্রার্থী :
কেস স্টাডি ১ : ৩১ নম্বর আলকরণ ওয়ার্ডে বিএনপির সমর্থন নিয়ে পুনরায় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি ও বর্তমান কাউন্সিলর দিদারুর রহমান লাবু (রেডিও)। তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে পুলিশের দায়ের করা দুটি মামলা রয়েছে। দীর্ঘ ২ মাস ধরে তিনি আÍগোপনে রয়েছেন। রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘দিনে তো নয়, পুলিশের ভয়ে রাতে প্রচারে নেমেও রেহাই পাচ্ছি না। এ অবস্থায় কিভাবে যে ভোটারের কাছে যাব তা বুঝতে পারছি না।’
কেস স্টাডি ২ : ৩৭ নম্বর হালিশহর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড বিএনপি নেতা হাসান মুরাদ। তিনি এবারও ওই ওয়ার্ড থেকে টিফিন ক্যারিয়ার প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তার বিরুদ্ধে বন্দর ও ইপিজেড থানায় রয়েছে তিনটি মামলা। হাসান মুরাদ যুগান্তরকে বলেন, ‘বন্দর থানায় যেন আমি ছাড়া আর কোনো মামলার আসামি নেই। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর থেকে পুলিশ আমার বাসা-বাড়িতে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়েছে। ফলে ঠিকভাবে ভোটারদের কাছে গিয়ে প্রচারণা চালাতে পারছি না।’
দিদারুর রহমান লাবু কিংবা হাসান মুরাদই শুধু নন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত অন্তত ১৫ কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে ৭৮টি মামলা। এসব মামলায় গ্রেফতার আতংকে ভুগছেন তারা। দিনের বেলায় প্রচারণা চালাতে না পেরে রাতের বেলায় নামছেন। প্রচারণা চালিয়ে নিজের বাসায় না ফিরে তাদের থাকতে হচ্ছে আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের বাসায়। শুধু এসব প্রার্থীরাই নন, তাদের কর্মী-সমর্থকদেরও হয়রানি করা হচ্ছে। নানা অজুহাতে তাদের আটক করছে পুলিশ। এমন অভিযোগ করে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা বলেন, তাদের সমর্থকদেরও সরকারি দলের নেতাকর্র্মী এবং পুলিশ প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে। দিনে প্রচারণা চালালে রাতে ওইসব কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ গ্রেফতারে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।
বিএনপির ৮ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৪২ মামলা : ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহ আলমের (ঘুড়ি) বিরুদ্ধে চকবাজার, খুলশী ও কোতোয়ালি থানায় বিস্ফোরক এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ বিভিন্ন ধারায় ১৮টি মামলা রয়েছে। ১১ জানুয়ারি তিনি গ্রেফতার হন। তিনি কারাগারে থাকায় তার পক্ষে এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন তার স্ত্রী, ছেলে এবং আত্মীয়-স্বজন। ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার সেলিমের (রেডিও) বিরুদ্ধে কোতোয়ালি এবং আকবর শাহ থানাসহ বিভিন্ন থানায় রয়েছে ৮টি মামলা। দীর্ঘদিন ধরে গ্রেফতারের ভয়ে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ আমাকে তো প্রচারণা চালাতে দিচ্ছেই না, আমার নেতাকর্মী যারা প্রচারণা চালাচ্ছে তাদেরও প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে। পুলিশ আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিজয়ী করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এ ওয়ার্ডে বিএনপির অপর প্রার্থী জমির আহমদের (ঠেলাগাড়ি) বিরুদ্ধে আকবর শাহ থানায় দায়ের করা বিস্ফোরক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৫টি মামলা সিএমএম আদালত এবং মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল বালি (লাটিম)। তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে পুলিশের দায়ের করা তিনটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে তিনি ভোটারদের কাছে গিয়ে প্রচারণা চালাতে পারছেন না। রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘মামলার কারণে আমি প্রচারণা চালাতে পারছি না। আমার পক্ষে যারা এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছে তাদের পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের হাসান লিটনের (রেডিও) বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে পুলিশের করা একটি মামলা রয়েছে। তিনিও আত্মগোপনে আছেন।
জামায়াতের ৭ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৩৬ মামলা : চসিক নির্বাচনে ৮টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের ৮ প্রার্থী। ৮ প্রার্থীর মধ্যে ৭ জনই মামলার আসামি। জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের অধিকাংশই মামলায় জামিনে থাকলেও পুলিশ তাদের নতুন মামলা দিয়ে গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে প্রচারণা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ব্যাপারে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে এলাকায় প্রচারণায় পুলিশ এবং সরকারি দল মিলেমিশে বাধা দিচ্ছে।
নগর পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো মামলার আসামি হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতারে অভিযান চালাবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি কোন দলের নেতা, কি পদে নির্বাচন করছেন এসব বিষয় পুলিশের দেখার সুযোগ নেই। তবে অহেতুক বিএনপি-জামায়াতের কোনো নেতাকর্মীকে হয়রানি, বাসায় অভিযান বা নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ সঠিক নয়।

নীরোর বাঁশি ও প্রক্টর by কাজল ঘোষ

রোম যখন পুড়ছে নীরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছে। টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেয়েদের কাপড় খামচে ধরেছে একদল নরপশু, তখন সব শুনেও প্রক্টর কম্পিউটারে দাবা খেলছেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী লিটন নন্দী প্রক্টরকে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। প্রক্টর শুধু দেখি দেখছি করেই সময় নষ্ট করেছেন। ঘটনাস্থলের অদূরে দুজন পুলিশ সদস্য দায়িত্বরত ছিলেন। তাদের জানানো হলে তারাও ছুটে যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ বখাটেকে ধরে পুলিশে দিলেও তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। কোন বিবেকের তাড়নায় পুলিশ তাদের ছেড়ে দিল? কি বিচিত্র দেশ। সন্তানের চোখের সামনেই মাকে বিবস্ত্র করছে প্রকাশ্যে আর পার্কের ভেতরে হাজারো মানুষ তা অবলোকন করছে। স্বামীর সামনেই স্ত্রীকে টানাহেঁচড়া করা হলো। একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক নারীদের ওপর নির্বিচারে ঝাঁপিয়ে পড়লো। আর একজন লিটন নন্দী প্রতিবাদ করায় তার হাত ভেঙে দেয়া হলো। প্রশ্ন জাগে, প্রক্টর কিংবা দায়িত্বরত পুলিশের অবহেলার কোন কৈফিয়ত এখনও তলব করা হয়নি কেন? যারা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের এখনও চিহ্নিত করা হয়নি? যে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছিল পুলিশ কেন তাদের ছেড়ে দিল? তাহলে কি এটা বলা যায়, পুলিশ বা প্রক্টর সবাই কোন না কোন ভাবে এই ঘটনাটি নীরবে মিলিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। লিটন নন্দী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ দৃশ্য বর্ণনা করা যায় না। আমি আমার পাঞ্জাবি খুলে এক নারীকে দিয়েছিলাম। আরেকটি মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। ওই যুবকেরা ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে এই ঘটনা ঘটাচ্ছে। ছাত্র ইউনিয়নের ক’জন কর্মী এগিয়ে না গেলে বখাটেদের অসভ্যতার মাত্রা হয়তো আর বহুদূর গড়াতে পারতো। কারণ, পুলিশ বরাবরের মতো কিছু না দেখেও দায়িত্বে শিথিলতার পরিচয় দিয়েছে। কিছুদিন আগেই ফেব্রুয়ারির বই মেলা থেকে ফেরার পথে একই স্থানে প্রকাশ্যে ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। অদূরে পুলিশ থাকলেও এগিয়ে আসেনি। হত্যাকারীরা নিরাপদে পালিয়েছে। পরে পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনে কোন গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্ষবরণ ঘিরে এতো সিসিটিভি আর নানান স্তরের নিরাপত্তা বলয় উপেক্ষা করে বখাটেদের থাবা নিরাপদে তাদের কু-কর্ম সারতে পেরেছে। যারা সিসিটিভি ফুটেজ মনিটরিং করছিলেন তারাই বা কি দায়িত্ব পালন করলেন?
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে সাপ্তাহিক সম্পদাক গোলাম মোর্তোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তিনি লিখেছেন, গত কয়েক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একক নিয়ন্ত্রক ছাত্রলীগ, সঙ্গে পুলিশ নিয়ে। কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন নেই। বাম ছাত্র সংগঠন আছে, শক্তির বিচারে ছাত্রলীগের তুলনায় তারা নগণ্য। তারা ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী  নয়। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের নীতি-আদর্শের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদ মিছিল-মিটিং করে। সংখ্যা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগের সমকক্ষ বা আর এক ধাপ এগিয়ে ছাত্রদল। ছাত্রলীগ এবং পুলিশের কারণে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে পারে না। ফলে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র রাজত্ব বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। প্রতিদ্বন্দ্বী না পেয়ে মাঝেমধ্যে নিজেরা নিজেরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, দু-একটি হত্যাকাণ্ডও ঘটায়। বর্ষবরণের দিনে মেয়েদের লাঞ্ছিত করার এই ঘটনায় বাধা দিতে গিয়ে হাত ভেঙেছে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দীর। নিজের গায়ের পাঞ্জাবি খুলে একটি মেয়ের সম্মান তিনি বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। প্রতিবাদ, মিছিল- মিটিংও করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। রাজত্বের মালিক ছাত্রলীগ কোথায়?
বর্ষবরণে রমনা বটমূলে বোমা হামলার পর থেকে প্রতিবছর এ দিনটি এক উদ্বেগ নিয়ে কাটাই। কখন কি ঘটে। ঘটনার একযুগ পরও এখনও বোমা হামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি। ঘৃণ্য সে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। ১৯৯৯ সালের থার্টিফার্স্ট নাইটে টিএসসিতে একদল বখাটে বাঁধনকে টেনেহিঁচড়ে বিবস্ত্র করেছিল। সেই ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। দেশজুড়ে সে ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল। যারা চারপাশ ঘিরে বাঁধনকে নিয়ে উল্লাস করেছে তাদেরও চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাঁধন একটি মামলা করলে দশ বছর পর সেই মামলার আসামিদের খালাস দেয়া হয়েছিল। বিচার তো বাঁধন পাননি উল্টো দেশ ছাড়তে হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বাদী সাক্ষী না দেয়ায় তা প্রমাণিত হয়নি। কথা থাকে, ছবিটিতে স্পষ্ট থাকার পরও অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় শাস্তি পায়নি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি সেদিন সেই ঘটনায় যুক্তদের দৃষ্টান্ত্তমূলক সাজা হলে আজ আর এ ধরনের ঘটনা হয়তো ঘটতো না।
আসুন, প্রতিবাদে শামিল হই। প্রতিরোধ গড়ে তুলি, যেন এ ধরনের ঘটনা আর একটিও না ঘটে।
লিখেছেন কাজল ঘোষ

যৌন হয়রানির প্রতিবাদে নানা কর্মসূচিতে উত্তাল ঢাবি : শনাক্ত হলেও আটক নেই

পয়লা বৈশাখের উৎসবে নারীদেরকে লাঞ্চিত করা এবং যৌন হয়রানির সাথে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আজ শুক্রবার সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠন অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে। এসময় বক্তারা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের অপসারণ এবং দোষী পুলিশ সদস্যদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া দোষীদের শাস্তির দাবিতে আল্টিমেটাম দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে একাধিক সংগঠন।
ওদিকে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গেলেও তাদের নাম পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় আটক করতে পারেনি পুলিশ। তাদেরকে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ভিডিও ফুটেজের বেশ কিছু অংশ আজ বিভিন্ন বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলেও প্রচার করতে দেখা গেছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে নারীদেরকে যৌন হয়রানি এবং লাঞ্চিত করার কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ এ বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে কিছু ঘটনা চিহ্নিত করা গেছে। এ বিষয়ে আরো তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে এখনো কেউ আটক হয়নি। আজকের মধ্যে এ বিষয়ে কিছু ফলাফল পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি জানান।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) সাইদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, কিছু মানুষকে ভিডিওতে শনাক্ত করা গেলেও তাদের নাম পরিচয় এখনো মেলেনি। ভিডিওগুলো দেখে বাকী দোষীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে এখনো কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।
মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পয়লা বৈশাখের উৎসবে অংশ নিতে এসে ১৫-২০জন নারী বস্ত্রহরণের স্বীকার হন। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বহিরাগত প্রায় ৩০-৩৫ জন যুবক এ ঘটনায় জড়িত ছিল। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও এ ধরণের ঘটনা কীভাবে ঘটল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এজন্য পুলিশ প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভও হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
প্রতিবাদে উত্তাল ঢাবি : নববর্ষের অনুষ্ঠানে নারীর বস্ত্রহরণের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা আজ সকালে ‘প্রতিবাদ কার্টুন’ প্রদর্শন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। কার্টুনে নারী নির্যাতন বিরোধী বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। নারী উত্তক্তকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুনও কর্মসূচিতে বহন করা হয়।
একইস্থানে কিছুক্ষণ পরে মানববন্ধন করে ‘এঙ্গেজ ম্যান অ্যান্ড বয়েজ নেটওয়ার্ক’। তারা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ, ব্যথিত এবং লজ্জিত’ লেখা সম্বলিত ব্যানার নিয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন। এসময় ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি জানান।
দোষীদের গ্রেফতার এবং শাস্তির দাবিতে বিকেলে টিএসসির সামনের চত্বরে সমাবেশ করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সংগঠনের সভাপতি গোলাম কুদ্দুসের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ, হাসান আরিফ প্রমুখ। জোটের কেন্দ্রীয় সদস্য মানজার চৌধুরী সুইট সমাবেশ পরিচালনা করেন।
রামেন্দু মজুমদার বলেন, এমন লজ্জাজনক ঘটনার পর নিজেকে পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে। গৌরবের জায়গাগুলো আজ কালিমা লিপ্ত হচ্ছে। এদেরকে পশু বললে পশুরাও লজ্জা পাবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। দায়িত্বে অবহেলার কারণে কোনো পুলিশের শাস্তি হয়েছে কি না আজ জানতে ইচ্ছা করে। শুধু আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর দায় না চাপিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগুলো রোধে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, এ ধরণের ঘটনায় লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে। অনেক সঙ্কট পার করতে পারলেও আমাদের রুচি, ভাবনা এবং চেতনায় পরিবর্তন আসেনি। পুলিশ প্রধান সর্বত্র শান্তি স্থাপনের কথা বলছেন। কিন্তু কোথায় শান্তি? এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। আগের ঘটনাগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যর্থতা এগুলো উস্কে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আগামী ২১ এপ্রিল নারীদের ওপর যৌন হয়রানি করার স্থানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়ে জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বলেন, যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। এখানে অনেক গৌরবের ইতিহাস রয়েছে। একই স্থানে হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব বিষয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না তা দেখতে চাই। পাশাপাশি গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়েছে তাদেরকে এবং অন্যান্য জড়িতদের আটক করার আহবান জানান তিনি।
বিকেলে একই সময়ে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবি সংহতি সমাবেশের আয়োজন করে ছাত্র ইউনিয়ন। কর্মসূচি থেকে ঢাবি প্রক্টরের অপসারণ দাবি করেন বক্তারা। এসময় ছয়দফা দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিও ঘোষণা করে সংগঠনটি। দাবিগুলো হলো- অবিলম্বে প্রক্টরের অপসারণ, যৌন নিপিড়নকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনা, কর্তব্যরত পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার তদন্ত করে বিচার, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীতিমালা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সর্বক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যৌন নিপিড়ন বিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
এসব দাবিতে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, শনিবার দুপুর ১২টায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন, রোববার সারাদেশে বিক্ষোভ ও সংহতি সমাবেশ, ২০ এপ্রিল সকাল ১১টায় অপরাজেয় বাংলা থেকে কার্জন হল পর্যন্ত মানববন্ধন, ২১ এপ্রিল সকাল ১১টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি পেশ। এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
সমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুঁজলে অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে অপরাধীদের সহযোগী আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশ ও প্রক্টর নাকি সিসিটিভির ফুটেজে শ্লীলতাহানীর কোনো কিছুই দেখেনি। তারা সত্য ও যৌন নিপীড়নকে অস্বীকার করেছে। বলতে বাধ্য হচ্ছি, তারা যৌন নিপীড়ক ও অপরাধীদের সহযোগী। যৌন সন্ত্রাসদের দেশের অসুস্থ রাজনীতি, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পৃষ্টপোষকতা করছে। মিথ্যা বলে তাদেরকে রক্ষায় ব্যস্ত হয়েছে।’ পুলিশের উপর ভরসা করে না থেকে উৎসবের দিন সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এ ঘটনায় মুখে ও চোখে কুলুপ এঁটে ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সত্যকে ঢাকার চেষ্টা থাকবেন না। সঠিক দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সরে দাঁড়ান নতুবা দুর্বৃত্তের সহযোগী হিসেবে সকলের কাছে আখ্যায়িত হবেন।’
শিক্ষাবার্তার সম্পাদক এ এন রাশেদা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য থাকার সময়ে একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, রাজনীতি, আত্মীয়-স্বজনদের কারণে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃজনশীলতা ও জ্ঞানচর্চার জায়গা। কিন্তু সেই জয়গায় এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, যেকোনো উৎসবে নারীরা বলতে পারবে না অবাঞ্চিত হাত তাদের শরীরে আঘাত করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও দায়ভার কেউ নেয় না। পুলিশকে দায়িত্ব দেয়া হলেও তারা দায়িত্ব পালন করেনি। তবে জনগণের টাকা খরচ করে পুলিশ পোষার দরকার কী? প্রশ্ন রাখেন তিনি।
সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ঘৃণা উচ্চারণ করছি। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ৫২, ৬২, ৬৯ ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ করেছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে এ ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো প্রতিবাদ নেই। পুলিশ উপস্থিত থাকলেও ব্যবস্থা নেয়নি, আর প্রক্টর দাবা খেলায় ব্যস্ত ছিলেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পাড়া-মহল্লায় প্রতিবাদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান তারেকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক লাকী আক্তারের পরিচালনায় ঢাবি শাখা সভাপতি লিটন নন্দীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র নেতা এবং বুদ্ধিজীবিরা এতে বক্তব্য রাখেন। এছাড়া ছাত্র ফেডারেশন দোষীদের শাস্তির দাবিতে বিকেলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে।