Wednesday, February 12, 2014

সুস্থ বিবেকের বিদ্রোহ by উইলিয়াম বি মাইলাম

মন্দের জয়ের জন্য শুধু যা প্রয়োজন তা হলো ভাল মানুষের নীরব ভূমিকা। কথাটি এডমান্ড বার্কের মুখনিঃসৃত বলে বহুল প্রচলিত হলেও তিনি আদৌ এমন কিছু বলেছেন তেমন সম্ভাবনা কম। তবে চরম সত্য হলো, এ শব্দগুলো গত ৩২৫ বছরের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানকে ঘিরে রেখেছে।
এ সময়ের মধ্যে, কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে উত্থান হয়েছে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থার। মানব ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়ই প্রচলিত ছিল কর্তৃত্ববাদী শাসন। ১৬৮৮ সালে ইংল্যান্ডের প্রসিদ্ধ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ রাজনৈতিক রূপান্তরের সূত্রপাত হয়েছে বলে ঐতিহাসিকরা স্বীকৃতি দিয়েছেন। রাজা ও দেশের কর্তৃত্বের ওপর ওই বছর সংসদীয় সীমারেখা দেয়ার অবধারিত কারণ ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা। সমাজের অভিজাতরাই ছিলেন তার রূপকার। কিন্তু বৃহৎ কিছুর সূত্রপাত হয় ক্ষুদ্র। ক্ষমতার ওপর অভিজাতদের শক্ত হাতকে নড়বড়ে করার জন্য আর তাদের ক্ষমতাকে ভাগাভাগি করার জন্য শতকের পর শতক ধরে নানা দেশের ভাল মানুষরা শাসক দলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তাদের সফলতার সঙ্গে রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সার্বিকভাবে সমগ্র সমাজের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বমূলক ভূমিকা পালন করেছে। অন্য কথায়, প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা অভিজাত সমপ্রদায়ের প্রতিনিধিই নয়, অন্তর্ভুক্ত থেকেছেন সমাজের অন্য অংশের প্রতিনিধিরা। যারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মতপ্রকাশের দাবি করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক ঐক্যবদ্ধতা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। ১৬৮৮ সালের পর রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের ঘটনা অনেকটা নিয়মিত হয়ে যায়। বার্ক ১৭৬৫-১৭৮৩ সালের মার্কিন অভ্যুত্থানকে পছন্দ করেছিলেন। এর ফলস্বরূপ পরিশেষে অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক এক সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পক্ষান্তরে, তিনি ফরাসি অভ্যুত্থান পছন্দ করেননি। একভাবে বা অন্যভাবে সেখানে কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত ছিল। এটাই হয়তো তার অপছন্দের কারণ। প্রায় ৮০ বছর শোষণমূলক শাসনব্যবস্থা থাকার পর ফ্রান্সে অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বার্কের লেখায় বুদ্ধিবৃত্তিক নানা বিসদৃশের আধিক্য থাকলেও আমি মোটামুটি নিশ্চিত, তিনি বিংশ শতাব্দীর তথাকথিত অভ্যুত্থানকে তিরষ্কার করতেন। ১৯১৭ সালের রাশিয়ান অভ্যুত্থান এবং ২০ ও ৩০-এর দশকে নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট অভ্যুত্থানগুলো ধীরে ধীরে ঘটেছিল পর্দার অন্তরালে। এসব অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করে সংখ্যালঘুরা। সেটা কখনও নির্বাচনের পর হয়েছে, কখনও বা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রাচীন শাসনব্যবস্থার পতনের পর। আর জনপ্রিয় সমর্থনের অভাবে তারা তাদের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেছে বক্তৃতাবাজি, দমননীতি, ভাবাদর্শিক অনুশাসন এবং বিকৃত ইতিহাস দিয়ে। প্রায়ই এ প্রক্রিয়ায় বলির পাঁঠা হয়েছে নির্দিষ্ট কোন গ্রুপ। তাদের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তারা প্রায়ই গণহত্যা পরিচালনা করতো। গণতন্ত্র নিয়ে বার্কের দ্ব্যর্থকতা সত্ত্বেও তার রাজনৈতিক লেখার মধ্যে অন্তর্নিহিত একটি ধারা বিদ্যমান- সব অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে তিনি সর্বাধিক বিপজ্জনক যে দিকটি লক্ষ্য করেছেন, সেটা হলো বেপরোয়া ক্ষমতার অধিকারী কর্তৃত্ববাদী, দমনমূলক কোন সরকার উত্থানের আশঙ্কা। ১৭৭০ সালে বার্কের একটি গবেষণামূলক আলোচনা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল, ‘আমাদের বর্তমান অসন্তোষের কারণগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা’ (থটস অন দ্য কজেস অব আওয়ার প্রেজেন্ট ডিসকনটেন্ট)। এতে তিনি রাজা বা রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতার বিষয়ে শক্ত সীমারেখা নির্দিষ্ট করার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন এবং সরকারের ক্ষমতা অপব্যবহার প্রতিহত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাকে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, যখন অসাধু ব্যক্তিরা একত্রিত হয়, তখন সততাপরায়ণ ব্যক্তিদের মধ্যেও ঐক্য গড়ে ওঠা উচিত। তা না হলে তারা সবাই একের পর এক ঝরে পড়বে, যা হবে অবজ্ঞার এক সংগ্রামে করুণার অযোগ্য ত্যাগ। এ শতাব্দীতে বিপ্লব ঘটেছে প্রধানত ইসলামি দুনিয়ায়। এসব বিষয়ে বার্ক-এর অনুভূতি কেমন হতো তা বলা কঠিন। তবে আমাকে এটা আহত করে, নিচু স্তর থেকে উঠে আসা এসব মানুষকে প্রথমেই তিনি অনুমোদন দিয়েছেন। যখন গণজাগরণ শুরুর বিষয়টিকে দৃশ্যত কিছু সুসংগঠিত, আদর্শপুষ্ট গ্রুপ নিয়ন্ত্রণে নিতে চেষ্টা করে তখন নিশ্চিতভাবে তাকে উদ্বিগ্ন হতে হয়। পাশাপাশি দেখা দেয় অভিজাত শ্রেণীর কিছু থারমিডোরিয়ান প্রতিক্রিয়া। (সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফরাসি বিপ্লবে এ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল)। সুসংগঠিত গ্রুপগুলো প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে রয়েছে।
পর্দার আড়ালে বিপ্লব ঘটানোর বিষয়ে তিনি অধিক উদ্বিগ্ন হতেন- এটা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। এ ক্যাটিগরিতে বাংলাদেশ সবচেয়ে নিকৃষ্ট পর্যায়ে। দৃঢ়ভাবে বলা যায়, এটি একটি নিখুঁত কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। একদলীয় একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে একদলীয় রাষ্ট্র। প্রধান বিরোধী দল একই সঙ্গে বিচক্ষণতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় বিশৃঙ্খল। তাদের বিশৃঙ্খল করতে ভূমিকা রেখেছে বিরোধী দল, ভিন্নমতাবলম্বী ও বলির পাঁঠা হওয়া ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়ন। সুশীল সমাজ বিভক্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত। সংঘাতের মধ্য দিয়ে জন্ম হওয়া এ দেশটির ইতিহাস নতুন করে লিপিবদ্ধ করেছে সরকার নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। অবশ্যই এটা একটি বার্কিয়ান পরিস্থিতি। সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিরা যদি একজনের পর একজন ঝরে পড়তে না চান, তাদের অবশ্যই একত্রিত খারাপ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিদের থামাতে একত্রিত, সংগঠিত হতে হবে। ইসলামিক বিশ্বে একসময় রাজনীতি ও সামাজিকতাকে আধুনিকায়ন করার জন্য ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু সেই বাংলাদেশ এখন দুর্নীতি, বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিয়ে কর্তৃত্ববাদী একদলীয় রাষ্ট্রের তালিকায় যোগ হবে। এমন কর্তৃত্ববাদী একদলীয় রাষ্ট্রের তালিকায় স্থান পাওয়া দেশ অনেক। যদি সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ অলস থাকেন তাহলে বাস্তবিকই আধুনিকায়ন হারিয়ে যেতে থাকবে।
উইলিয়াম বি মাইলাম বাংলাদেশ, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তিনি ওয়াশিংটনে উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলার-এর সিনিয়র পলিসি স্কলার। তিনি ক্যারিয়ারের দিক থেকে একজন কূটনীতিক। ২০০১ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে তিনি অবসরে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে। ফের ১১ই সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানে পুনর্গঠনে তার ডাক পড়ে। তিনি লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।

 (নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাকিস্তানি সংস্করণ দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে প্রকাশিত উইলিয়াম বি মাইলামের লেখা ‘দ্য গুড ওয়ানস রিভোলটেড’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ। গতকাল এটি প্রকাশিত হয়।)

সরল গরল- কমনসের বাংলাদেশ বিতর্ক by মিজানুর রহমান খান

বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নির্বাচন ইতিবাচক বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দাবি সংসদে করেছেন, তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশে যখনই বৈধতার সংকট নিয়ে কেউ সরকারে বসেন, তখন তাঁরাই বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়ে সচেষ্ট হন।

বৈশ্বিক অর্থনীতি- অধিকাংশ মানুষের স্থায়ী দুর্দশা by জোসেফ স্টিগলিৎস

২০০৮ সালে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেওয়ার পরপরই আমি সতর্ক করে বলেছিলাম, সঠিক নীতি গ্রহণ করা না হলে জাপানের মতো বছরের পর বছর ধরে ধীর প্রবৃদ্ধি ও আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রে প্রায়-স্থবিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

অজানা গন্তব্যের পথে বাংলাদেশ by কাউসার মুমিন

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দেশটির গত দু’ দশকের অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অর্জনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে এক অজানা গন্তব্যের পথে হাঁটছে। বাংলাদেশ নিয়ে যথেষ্ট শংকিত হওয়ার কারণ রয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন  ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ, বিতর্কিত।

সরল গরল- কমনসের বাংলাদেশ বিতর্ক by মিজানুর রহমান খান

বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নির্বাচন ইতিবাচক বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দাবি সংসদে করেছেন, তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশে যখনই বৈধতার সংকট নিয়ে কেউ সরকারে বসেন, তখন তাঁরাই বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়ে সচেষ্ট হন।

বিভিন্ন সরকারের আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন বার্তাবিষয়ক তথ্য এবং সেসব দেশের পার্লামেন্টের নির্বাচিত রাজনীতিবিদেরা নির্বাচন ও সরকার সম্পর্কে যে অভিমত দিচ্ছেন, তার মধ্যে পার্থক্য আসমান ও জমিনের। বিদেশি সাংসদেরা সংসদের ফ্লোরে কীভাবে দেখছেন তা আজ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হবে এই নিবন্ধে। আজ হাউস অব কমনস। কাল ইইউ পার্লামেন্টের ভাষ্য।
হাউস অব কমনসে তিন সপ্তাহের কম সময়ের ব্যবধানে তিন দফা আলোচনা হয়েছে। মার্কিন সিনেটেও অল্পসময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের ওপর তৃতীয় শুনানি হচ্ছে। বাংলাদেশবিষয়ক প্রস্তাব আনার কারণটা চিহ্নিত করে সাইমন ড্যানজুক বলেন, অবশ্যই এমন উদ্বেগ রয়েছে যে বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে এবং কালক্রমে উগ্রপন্থার উত্থান ঘটতে পারে। মিসেস মেইন বলেন, আমাদের ভাবতে হবে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ব্রিটিশ সাহায্য দেশটিতে কী কাজে লাগবে। প্রকৃত সুফল দেবে কি দেবে না। আমার মনে হয় মার্কিন সিনেটে ১১ ফেব্রুয়ারির শুনানিতে একই প্রশ্ন আলোচিত হবে।
১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নতুন ইউএসএইড প্রধান ইয়ানিনা ইয়ারুজেলস্কি বলেছেন, ‘মার্কিন সহায়তা চলতে থাকবে।’ আমরাও তা চাই। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখব, বহু দেশের ঘোর অমানিশাতেও তারা এমনটাই বলে থাকে। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রকারান্তরে গণতন্ত্র ও সুশাসন কর্মসূচির অর্থ প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছেন। ইয়ানিনা সৌজন্য করে বলেছেন, ওই কর্মসূচির টাকা না কমিয়ে অন্য কর্মসূচিতে সমন্বয় করবেন। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের চেয়ারম্যান চিঠি লিখে সরকারের প্রতি পরোক্ষ অথচ স্পষ্ট অনাস্থা ব্যক্ত করেছিলেন।
বাংলাদেশ নিয়ে ব্রিটেনের দুই প্রধান দলের প্রতিনিধি মিসেস মেইন ও সাইমন কমনসে যৌথভাবে প্রস্তাব আনেন। রানা প্লাজা ধসের পরে তাঁরা সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছিলেন। ১৪ জানুয়ারিতে ঠিক হয়, ১৬ জানুয়ারির ব্যাকবেঞ্চ প্রহরে বাংলাদেশ আলোচিত হবে। এই আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বেশ ভালোই তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে একা মিসেস মেইনই যুক্তি দিয়েছিলেন। তবু তাঁর মন্তব্য, ‘দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশ একধরনের তলাবিহীন ঝুড়িতে রূপান্তরিত হতে চলেছে।’ বহু বছর বাদে কিসিঞ্জারের এই বিষাদগ্রস্ত উক্তিটির প্রতিধ্বনি কানে এল।
এই যখন অবস্থা তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ ফেব্রুয়ারি সংসদে বলেন, ‘অনেক দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান দশম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমাকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন।’ আমরা সংসদ ও সরকারের পার্থক্য রাখি না, বুঝতেও চাই না। কিন্তু গণতান্ত্রিক বিশ্ব তো পার্থক্য বজায় রাখে। এটাই ওদের গৌরব। দীর্ঘকাল ধরে দেশে দেশে চোখে পড়ে অগণতান্ত্রিক বা জবরদখলকারী সরকারের তোয়াজকারী আমলারা ‘অভিনন্দন’ জোগাড় করতে উতলা হন। দেখলাম ওআইসির মতো অগণতান্ত্রিক ক্লাবের মহাসচিবের অভিনন্দনও ঘটা করে রটানো হচ্ছে।
বিশ্বের তিনটি বিশিষ্ট পার্লামেন্টের (মার্কিন কংগ্রেস, ব্রিটেনের হাউস অব কমনস ও ইইউ) পক্ষ থেকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে না বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীন দল ও তার মিত্ররা ‘হাই হ্যালো’ ধরনের কূটনৈতিক শিষ্টাচারমণ্ডিত অভিনন্দনে পুলকিত হবেন নাকি জনগণের নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের দ্বারা সংসদের ফ্লোরে সরাসরি তিরস্কারের বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।
১৬ জানুয়ারি মিসেস মেইন অকপটে বলেন, আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি যে ২০০৬ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ের বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কোনো উন্নতি ঘটেনি। কিন্তু তিনি বা তাদের কেউ সেদিনের বিতর্কে ভেঙে বলেননি, ’৯০-এ সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পরে কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ার চেষ্টা করা হয়নি। প্রায় সব কটি প্রতিষ্ঠান সুনামি কি সিডরের শিকার।
গত ১১ জানুয়ারি গণতন্ত্র খাতে ৬৭ মিলিয়ন পাউন্ডের সাহায্য বন্ধের খবর দিয়েছিল টেলিগ্রাফ। একে অযথাযথ খবর চিহ্নিত করে মেইন বলেন, প্রায় ৭০ ভাগ ব্রিটিশ সাহায্য এনজিওর মাধ্যমে খরচ হয়। তবে বাকি যে ৩০ ভাগ সরকারের হাতে দেওয়া হয়, সেটা ‘যে সরকার জনগণের সব অংশকে আস্থায় নেয় না, তাকে ওই সাহায্য দেওয়া উচিত নয়’ বলে তিনি সাফ সুপারিশ করেন। এ ধরনের মন্তব্যে বিএনপি খুশি হবে। কারণ, তারা বিদেশিদের কাছে কেবল তেমন চাপই আশা করে। বিরোধী দল এতে অপমান দেখে না, সার্বভৌমত্বের হানি দেখে না, কমনস যদি বাংলাদেশ শাসকদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক অপশাসনের জাঁতাকলটি ভাগাড়ে ফেলার শর্ত দিত, তাতে তাদের মন ভরত না।
১৬ জানুয়ারি রক্ষণশীল এমপি মার্ক ফিল্ড সোজা কথা সোজা করে বললেন, সাত বছর ধরে দেশটিতে এই লক্ষণই ফুটে উঠেছিল যে এটি সামরিক শাসনের কবলে পড়ে কি না। একাত্তরে পাকিস্তান ভাগ থেকে এ পর্যন্ত অস্থিতিশীলতার জন্য ‘বর্তমানের বাংলাদেশি রাজনীতিকদের দায়দায়িত্ব’ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত প্রকাশ পেলেও মিশ্র মতামতও এসেছে। রক্ষণশীল এমপি রেহমান চিশতী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রতি গভীর আস্থা ব্যক্ত করে বলেন যে, পাকিস্তানসহ আরও অনেক দেশে এটা ভালোভাবে কাজ করছে। এটা বাতিল করা ‘সম্পূর্ণ ও গুরুতর ভুল’। মিসেস মেইন অবশ্য মনে করেন, এটা সঠিক পদ্ধতি ছিল না। তাঁর যুক্তি, এটা বদলে ফেলতে সংবিধানের আওতায় আওয়ামী সরকারের অধিকার ছিল এবং তারা সেটা করেছে। আমরা মেইনের কোনটা নেব? ম্যান্ডেট তত্ত্ব নাকি তলাবিহীন ঝুড়ি বলাটা?
কমনস কার্যবিবরণীতে লেখা আছে, বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় গ্রুপকে বলেছেন, ‘আমি এটাকে মর্মভেদী মনে করেছি। একটাই বড় সত্য যে রক্তপাত ও বিরোধ ছাড়া বাংলাদেশ কখনো নির্বাচন দেখেনি।’ তার মানে কি ওটা ফেলে দেওয়ার দর্শন ছিল এই যে, রক্তই যখন ঝরবে তখন ঝরুক! ওই প্রশ্নে বাংলাদেশি রুশনারা আলী সতর্কতার সঙ্গে বলেছেন, কমনসের উভয় পক্ষের সদস্যরা সুষ্ঠু নির্বাচনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলেছেন। অনেকেই বলেছেন, এই ব্যবস্থা অতীতে সুফল দিয়েছে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটদলীয় মার্টিন হরউড উল্লেখ করেছেন, শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপই নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বহু বিষয়ে আওয়ামী লীগের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার রয়েছে। তবে তিনি নিরেট সত্যটা বলেননি যে, যুদ্ধাপরাধ ইস্যু দিয়ে ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের কৈফিয়তের ঊর্ধ্বে তুলেছে।
মার্টিনের কথায়, ওই ব্যবস্থা বাতিল টেকনিক্যালি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কারণ, সেখানে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থিত একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওটা বাতিল করায় স্পষ্টতই নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবাধ নির্বাচনে আস্থা নষ্ট হয়েছে। মার্টিনের এই মন্তব্য খুবই যুক্তিসংগত। কারণ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট নিরঙ্কুশভাবে টেকনিক্যালটির ওপর দাঁড়িয়ে ওটা বাতিল করেন। কিন্তু রাজনীতি টেকনিক্যাল নয়।
রেহমান চিশতী মার্টিনকে প্রশ্ন করেছিলেন, ওই ব্যবস্থা যদি পাকিস্তানে চলে, বাংলাদেশেও চলতে পারে? তখন মার্টিন যথার্থ মন্তব্য করেন, এটা ‘টেকনিক্যাল মেরিটের’ প্রশ্ন নয়। অথচ আমাদের সরকার ও তার মিত্ররা ওই ব্যবস্থা বাতিল প্রশ্নে যে আদর্শগত ভুয়োদর্শন তুলেছেন, তা শতকরা ১০০ ভাগই টেকনিক্যাল মেরিটের। মার্টিন চমৎকার যুক্তি দেন, এটা হলো রাজনৈতিক দলব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি ও মতৈক্য সৃষ্টি করার বিষয়। একজন বাংলাদেশি আজ সকালেই আমাকে একটি মিষ্টি উপমা দিলেন। বললেন, ওই ব্যবস্থা থাকল বা গেল, তা কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দুই নারীর হাতেই বাঁধা। সাইমন ড্যানজুক এ সময় বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকা উচিত। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এটা বলেছিলাম। কিন্তু স্পষ্টতই তিনি এটাতে বিশ্বাসী ছিলেন না। গত ২৩ বছরের মধ্যে এই প্রথম দেশটির সংসদে কোনো রাজনৈতিক বিরোধী দল নেই।’
রক্ষণশীল রিচার্ড ফুলারের কাণ্ডজ্ঞান প্রখর। কমনসের উচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া, এই মন্তব্যের পর তিনি বলেন, এটা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য যথার্থই বৈধ যে, তারাই ঠিক করবে কীভাবে তারা তাদের নির্বাচন করবে। তাই কমনসের এটা অন্য কোনো দেশকে বলা উচিত হবে না। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি যা বলেন, সেটা বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বুঝতে হবে। ফুলারের কথায়, ‘এ কথা বলা হাউস অব কমনসের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যে গণতন্ত্র উন্নয়নে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কতটা কার্যকর। কারণ, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী আমাদের স্বার্থ রয়েছে।’
বাংলাদেশ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহাল হোক—এ রকম প্রস্তাব কমনসে পাস হয়নি, পাস হওয়ার কথা নয়। তবে ফুলার তথ্য প্রকাশ করেন যে ব্রিটেনের সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারকে বলেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল করতে। কিন্তু একগুঁয়েভাবে সরকারি দল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফুলারের সঙ্গে দ্বিমত করা যায় না, যখন তিনি বলেন, দুই বছর আগেই বোঝা গেছে, বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে। সুতরাং দায়টা বর্তমান সরকারের কাঁধেই বর্তায়।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট জন হ্যামিং ফুলারের কাছে প্রশ্ন রাখেন, তাহলে আপনি একমত যে অবাধ নির্বাচন চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার লাগবেই? এর উত্তরে জিম ফিটজপ্যাটরিক বলেন, নতুন নির্বাচনের কথা বলা এখন অপরিপক্ব। তাড়াতাড়ি নির্বাচন হওয়া মানেই গত নির্বাচনে যারা নাশকতা করেছে, তাদের হাত লম্বা করা। তবে জিমের মতো অনেকেই বলবেন, ‘আমি মনে করি আওয়ামী লীগ পুরো পাঁচ বছর মেয়াদে সরকারে থাকতে পারবে না। কারণ, সেটা হবে কমনসের উচ্চারিত গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধাচরণ।’
কমনস যা কিছু আলোচনা করেছে তা আমার বিচারে বাংলাদেশিদের প্রয়োজনের তুলনায় অন্তঃসারশূন্য না হলেও গতানুগতিক ও আনুষ্ঠানিক। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যে ভেঙে পড়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচনই তা নিরাময়ের একমাত্র ধনন্তরি চিকিৎসা নয়, কমনসের, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সেটা স্বীকার করা।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

সুস্থ বিবেকের বিদ্রোহ by উইলিয়াম বি মাইলাম

মন্দের জয়ের জন্য শুধু যা প্রয়োজন তা হলো ভাল মানুষের নীরব ভূমিকা। কথাটি এডমান্ড বার্কের মুখনিঃসৃত বলে বহুল প্রচলিত হলেও তিনি আদৌ এমন কিছু বলেছেন তেমন সম্ভাবনা কম। তবে চরম সত্য হলো, এ শব্দগুলো গত ৩২৫ বছরের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানকে ঘিরে রেখেছে।

অজানা গন্তব্যের পথে বাংলাদেশ by কাউসার মুমিন

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দেশটির গত দু’ দশকের অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অর্জনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে এক অজানা গন্তব্যের পথে হাঁটছে। বাংলাদেশ নিয়ে যথেষ্ট শংকিত হওয়ার কারণ রয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন  ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ, বিতর্কিত।
এখানে গণতন্ত্র ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় যতদ্রুত সম্ভব একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন নির্বাচন প্রয়োজন। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশের ওপর শুনানিতে এসব কথা বলা হয়েছে। পাঁচ ইস্যুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে শুনানি। এগুলো হলো: একটি নতুন নির্বাচন, জিএসপি প্রসঙ্গ, বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গ্রামীণ ব্যাংক ও ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস। পররাষ্ট্র বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট কমিটিতে ওই শুনানি অনুষ্ঠিত হয় সিনেটর মেনেন্দেজের সভাপতিত্বে। এতে প্যানেল সদস্যরা বলেন, বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নতুন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতাপূর্ণ সংলাপ আয়োজনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে আরও বেশী চাপ দিতে ওবামা প্রশাসনকে আহ্বান জানায় সিনেট। জিএসপি সুবিধা প্রসঙ্গে বলা হয়, জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে বাংলাদেশকে যেসব শর্ত পূরণ করতে দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে কিছুটা অর্জিত হয়েছে। তবে তাদেরকে এখনও অনেক কিছু করতে হবে। শ্রমিকের অবস্থা উন্নয়নে প্রতিশ্রুতির অনেকটাই এখনও পূরণ হয় নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরিয়ে দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটা লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়ার শামিল। সিনেটর ডারবিন বলেন, আমরা জানি এ সরকার মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীন ব্যাংকের সঙ্গে কি করেছে। এটা যে অন্যায় সেটা প্রধানমন্ত্রীকে বুঝানোর জন্য আমরা কি করতে পারি? এটা তার দেশের জন্য ভুল, ওই মানুষটির প্রতি অন্যায়, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যকার পারস্পরিক সুসম্পর্কের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

শুনানিতে বলা হয়, বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। তবে তাদের হারানোরও আছে অনেক। গতকালের শুনানি প্রসঙ্গে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বলেন, বাংলাদেশ একটি সঙ্কটজনক অবস্থানে। তাই এই শুনানি সময়োপযোগী এবং এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়া হবে যে, বাংলাদেশ যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ১০টায় এ শুনানি হয়। দু’পর্বে শুনানি হয়। প্রথম পর্বে প্যানেল সদস্য ছিলেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক এসোসিয়েট ডেপুটি আন্ডারসেক্রেটারি এরিক আর বিয়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিষয়ক বাণিজ্য সহকারী লুইস কারেশ। এছাড়া শুনানিতে অংশ নেন সিনেটর ডারবিন। নিশা দেশাই তার শুনানিতে বলেন, আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছি। বাংলাদেশের রয়েছে একটি সাফল্যের কাহিনী। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যে মূল তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন তা হলো বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের খাদ্য। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, উন্নয়ন করেছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কাজ করেছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এক কান্তিদায়ক রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ৫ই জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে তা ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এতে প্রধান দু’ রাজনৈতিক দলের একটি অংশ নেয় নি। ফলে জাতীয় সংসদে ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকিরা নামমাত্র বিরোধিতা মোকাবিলা করেছেন। এ নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছার বিশ্বাসযোগ্য প্রকাশ ঘটেনি। এতে বাংলাদেশ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। নিশা দেশাই বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যরা কড়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সরকারি বিবৃতি দিয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে সরকারি ও বিরোধী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে আমি প্রথম ওই অঞ্চল সফরে যাই নভেম্বরে। তখন আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের পন্থা বের করার আহ্বান জানাই। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ যে ভূমিকা গ্রহণ করে তাতে আমরা সমর্থন দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলো সে উদ্যোগ সফল হয় নি। নির্বাচনের পর পরই আমরা কড়া বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিই যে, এ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, এতে জনগণের মতের কোন প্রতিফলন ঘটেনি। একই সঙ্গে নতুন একটি নির্বাচনের জন্য সংলাপের আহ্বান জানাই। তিনি বলেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে সমপ্রতি বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড ও গুমের যেসব রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। অবিলম্বে এসব নির্যাতন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমরা সহিংসতার নিন্দা জানাই। গণতন্ত্রে এটা কোন কৌশল হতে পারে না। ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তা, স্টাফ, নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার তদারক করছে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সঠিক পদক্ষেপ নেবেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃবৃন্দ। শুনানিতে সিনেটর ডারবিন বলেন, ২০ বছর আগে আমি প্রথম বাংলাদেশ সফর করি। তারপর অনেকবার গেছি। আমি যা দেখেছি তাতে আমি অভিভুত হয়েছি। আমি এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হই যিনি আমার ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে ওঠেন। আমার দেখা মতে তিনি সব থেকে বেশি অনুপ্রেরণা সঞ্চারকারী ব্যক্তিত্ব। আমি বলছি মুহাম্মদ ইউনুসের কথা, যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। ুদ্র ঋণ তার প্রাথমিক ধারণা ছিল না। কিন্তু তিনি দরিদ্র থেকে হত দরিদ্রদের মাঝে ঋণ পৌঁছে দিয়েছেন। তার এ প্রচেষ্টাকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তা বিশ্বে কোথাও দেখা যায়নি। তিনি তার এ উদ্যোগের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পান।  সিনেটের পক্ষ থেকে তাকে কংগ্রেশনাল মেডেল প্রদানের অংশ হতে পেরে আমি খুশি। আমার বিশ্বাস এ পদক পাওয়া তিনি প্রথম মুসলিম। পদক দেয়ার সময় হলভর্তি সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। নানা ধর্ম বর্ণের। গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে আমি উদ্বিগ্ন। তাকে গ্রামীণ ব্যাংকের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া এবং গ্রামীণ ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আমার কাছে মনে হয়, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাকে কোন না কোনভাবে শাস্তি দেয়া- দুঃখজনক হলেও যা লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়ার সামিল। যারা জীবনধারনের জন্য এ ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল। আশাহত নারীদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক।
এ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন নিশা দেশাইয়ের কাছে। জবাবে নিশা দেশাই বলেন, আপনি যেভাবে আপনার স্পষ্ট অনুভূতি উপস্থাপন করেছেন আমি তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে চাই। যতবারই আমার তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছে, এটা সত্যিকার অর্থে অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল। মানবতার প্রতি তার নিষ্ঠা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে গেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।  এটা বাংলাদেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ অর্জন। তারপরও বাংলাদেশে এটা এখন হুমকির মুখে। বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ ব্যাংকের পরিসর দিনে দিনে বৃদ্ধি এবং আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউএসএআইডি প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে একযোগে কাজ করেছে। এর আগে ইউএসএআইডিতে কর্মরত থাকাকালীন আমার ড. ইউনূসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। গ্রামীণ সামাজিক ব্যবসা প্রকল্প আরও শক্তিশালী করে এবং বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ নারীদের কাছে গ্রামীণ ব্যাংকের সেবা পৌছে দেয়ার সক্ষমতা দৃঢ় করে তোলার লক্ষ্যে আমরা কাজ করেছিলাম। আমি মনে করি গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আমরা গ্রামীণ ব্যাংককে সমর্থন এবং তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করা অব্যাহত রেখেছি। যেটা আমার কাছে হুমকিস্বরূপ মনে হয় সেটা হলো, গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী নারীদের সাহায্য অব্যাহত রাখার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলবিহীন ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন এবং নির্বাচনোত্তর চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের ল্যে গতকাল মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চক সিনেটের ‘সিনেট কমিটি অন ফরেন রিলেশনস’ আয়োজিত বাংলাদেশ বিষয়ক এক শুনানিতে অংশ নিয়ে বিভিন্ন যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ফরেন রিলেশনস কমিটির সদস্যগণ তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এতে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সীমাবদ্ধ সুযোগ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম, শ্রমিক অধিকার ও শ্রমিক নিরাপত্তার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। এই সকল ইস্যুতে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত নীতি কতটা কার্যকর এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রাখার পরও এখনও কেন বাংলাদেশে এই সকল ইস্যুতে গ্রহণযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না, এতে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে সিনেট সদস্যগণ শুনানিতে অংশ নেয়া প্রত্যেকের নিকট পৃথক পৃথকভাবে বিস্তারিত জানতে চান। এ ছাড়া শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের পথে বাংলাদেশকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের জিএসপি ইস্যুতে আগামী মে মাসে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। সিনেটর মেনেন্দেজ বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তার ব্যক্তিগত ভূমিকা, বাংলাদেশের উভয় নেত্রীর নিকট সংলাপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চিঠি, সংলাপ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপর্যুপরি আহ্বান ইত্যাদি উল্লেখ করে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাইয়ের কাছে জানতে চান ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের গন্তব্য কোথায়?’ সিনেট শুনানির দ্বিতীয় প্যানেলে আলোচনায় অংশ নেন ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম মি. স্কট নোভা, বাংলাদেশ শ্রমিক নিরাপত্তা জোট-এর বোর্ড অব ডিরেক্টর্স-এর চেয়ারম্যান এলেন ট্যাশার এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার।

খালেদা, প্রণব এবং ওরা তিন জন by অমিত রহমান

খালেদা জিয়া জানার চেষ্টা করছেন। কেন তার ঘনিষ্ঠ ‘তিনজন’ প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাতে বারণ করেছিলেন। কি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তারা কি দলের স্বার্থে না অন্যদের স্বার্থে খেলছিলেন তা-ও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
সময় যত যাচ্ছে ততই তার মধ্যে সন্দেহ জাগছে, এটা হয়তো কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। দলের লোক, দেশী-বিদেশী শুভার্থীরা বলছেন, এটা ছিল অশোভন, অগ্রহণযোগ্য। শিষ্টাচারবহির্ভূত। তাদের যুক্তি হচ্ছে, খালেদা ভারত সফরে গেলেন। সম্পর্ক উন্নয়নের নয়া দিগন্তের সূচনা হলো। নজিরবিহীন না হলেও অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেয়া হলো। খালেদা নিজেও বিস্মিত হলেন। ঘনিষ্ঠদের বললেন, তার ধারণার বাইরে সৌজন্য দেখালো ভারত। তিনি নিজেই ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জিকে আমন্ত্রণ জানালেন ঢাকা সফরের জন্য। প্রণব এলেন। কিন্তু খালেদা নেই। অকার্যকর এক হরতালের অজুহাতে নির্ধারিত সৌজন্য বৈঠক বাতিল করলেন এক ই-মেইল বার্তা পাঠিয়ে। কি কারণ ছিল তা নিয়ে অনেকদিন গবেষণা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ঝুঁটি বাঁধেন এমন দু’জন তাত্ত্বিক এবং একজন পেশাজীবী এক সকালে গিয়ে বললেন, ম্যাডাম সর্বনাশ হয়ে যাবে। প্রণব বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবেন না। গেলেই বিপদে পড়বেন। হরতালের মধ্যে অন্য কোন শক্তি হামলা চালিয়ে আপনার যাত্রাপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। তাছাড়া ১৮ দলের শরিক জামায়াতের হরতালের মধ্যে আপনি যদি সোনারগাঁও হোটেলে যান তখন সরকার বলবে হরতাল ভঙ্গ করে আপনি ভারতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের আরও যুক্তি, ভারত আপনাকে চায় না। এর পেছনে যে মানুষটি সক্রিয় ভূমিকায় তিনি হচ্ছেন প্রণব মুখার্জি। বাংলাদেশ বিষয়ে সব নীতি তিনিই গ্রহণ করেন। সুতরাং, তাকে বোঝানো উচিত বাংলাদেশ একচেটিয়া তার বা তাদের পক্ষে নয়। এখানেও ভিন্নমত রয়েছে। খালেদা গিলে ফেললেন প্রস্তাবটি। উল্লিখিত তিনজন এমনভাবে কথা বলেন, মনে হবে তারা ছাড়া বিএনপির পক্ষে আর কেউ নেই। যুক্তিতে তারা পারদর্শী। এর মধ্যে একজন তাত্ত্বিক। হালে চরম দক্ষিণপন্থি। নানা লেনদেনের সঙ্গেও জড়িত। টেলিভিশন টকশোর একটি মন্তব্য নিয়ে মাঝখানে তাকে নিয়ে শোরগোল তুললেন শাসক সমর্থিত নাগরিক সমাজের কেউ কেউ। গ্রেপ্তারের দাবিও তুললেন। কিন্তু এক রহস্যজনক কারণে তা থেমে গেল। হেফাজতের সমাবেশের আগে খালেদা জিয়ার আলটিমেটাম দেয়ার ক্ষেত্রেও এই ভদ্রলোকের অবদান ছিল। ভিন্ন এক বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়ে খালেদাকে দিয়ে বাজিমাত করতে চেয়েছিলেন তিনি। বিএনপি মহলেই এ নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন চালু আছে মেলাকাল থেকে। আরেক ভদ্রলোক অপেক্ষাকৃত তরুণ। বামপন্থি ছিলেন শুরুতে। এখন জাতীয়তাবাদী ভূমিকায়। চাঞ্চল্যকর সব খবর দেন ঘনিষ্ঠ মহলে। বলেন, তার সঙ্গে নাকি ‘উত্তরে’র ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। কাল হবে, পরশু হবে, দিন-তারিখও বলেন এমনভাবে শুনে যে কেউ চমকে উঠতে পারেন। খালেদা জিয়ার কাছেও মাঝেমধ্যে পৌঁছে যান। অথবা দূত মারফত এমন খবর দেন, দরকার নেই আন্দোলন বেগবান করার। এমনিতেই আন্দোলন গতি পেয়ে যাবে। শাসকেরা হাওয়ায় মিইয়ে যাবে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন দু’দিন কর্মীদের সহায়তা বন্ধ করেছিলেন খালেদা জিয়া। তাকে বলা হয়েছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এখন খালেদা নিজেই ঘনিষ্ঠদের বলছেন, ওরা আসলে অনুপ্রবেশকারী। হেফাজতের সঙ্গেও ওরা যোগাযোগ স্থাপন করে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। যে কারণে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার আর মাদরাসার আর্থিক সহায়তার টোপ দিয়ে সরকার মাঝপথে থামিয়ে দেয় হেফাজতের কাফেলা। হেফাজত প্রধানের ছেলের ভূমিকাও বেশ রহস্যজনক। খালেদার তৃতীয় ব্যক্তি বেশ শক্তিশালী। চার দেয়ালে বন্দি থাকার পরও প্রভাব অনেক বেশি। তিনি কিছু বললে বারণ করতে পারেন না খালেদা। এমনকি নিজের স্বার্থও না। উল্লিখিত তিনজন কাদের পরামর্শে খালেদা জিয়াকে সোনারগাঁও হোটেলে না যেতে বলেছিলেন তা নিয়ে দলের মধ্যে নানারকম মুখরোচক খবর চালু আছে। পাঠকদের মনে রাখার কথা, যে সময়টায় প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদার সাক্ষাৎ করতে আসার কথা ছিল, প্রায় একই সময় হোটেলের উত্তর পাশে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছিল। যে খবর ভারতীয় মিডিয়া দ্রুত প্রচার করেছিল। এটা যে পূর্ব পরিকল্পিত ছিল এখন বিএনপি নেতারা বুঝলেও তখন আমলেই নেননি। এমন কি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শমসের মবিন চৌধুরীও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন না তুলে ই-মেইল বার্তা টাইপ করেছিলেন। সম্পর্ক মেরামতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দিল্লি গিয়েছিল প্রণবকে বোঝাতে। দুঃখ প্রকাশও করা হয় তাদের পক্ষ থেকে। তখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। প্রণব বাবু সহজে নিলেও ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এটাকে অপমান বলেই দেখেছেন। ভারতীয় প্রেসিডেন্ট যখন দিল্লিগামী প্লেনে ওঠেন তখন সফরসঙ্গী ভারতীয় সাংবাদিকরা তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন। বলেন, প্রণব বাবুকে নয়- গোটা ভারতবাসীকে অপমান করলেন বিরোধী নেত্রী। ধীরস্থির প্রণব বাবু কূটনৈতিক জবাব দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি নিজেও উপলব্ধি করেন এটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বরাবরই বিএনপির ঘোর বিরোধী। তারা সুযোগ খুঁজছিলেন। তাদের হাতে অস্ত্রটা তুলে দেন খালেদা নিজেই। জামায়াতের সঙ্গে প্রেম দেখাতে গিয়ে নিজেকে অসহায় করে তোলেন। তার ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপরও সুযোগ এসেছিল। সময়মতো পদক্ষেপ নেননি। যে কারণে ভারত একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যায়। অনেকে অবশ্য বলেন, খালেদা সাক্ষাৎ করলেও ক্ষমতা পেতেন না। নানা কারণে ভারত খালেদাকে আস্থায় নিতে পারে না। তারপরও সাধারণ ভদ্রতা বলে কথা। খালেদা সব সময় সিদ্ধান্ত নেন বিলম্বে। পেট্রল বোমা আর গানপাউডার দিয়ে মানুষ কতল করা হচ্ছে অথচ খালেদা নীরব। একবারও নিন্দা জানালেন না। পাগলও জানে কারা এগুলো করেছে। যখন বিএনপি মহাসচিব কথা বললেন, এটা তাদের কাজ নয়, তখন দুনিয়াব্যাপী চাউর হয়ে গেছে আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। মনে রাখতে হবে এটা হাসিনার শাসন। তিনি ফুলটাইম রাজনীতি করেন। আর খালেদা করেন মাত্র চার ঘণ্টা। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় কাজ হয়েছে সকাল আটটা থেকে বেলা ২টার মধ্যে। এই সময়টা ঘুমিয়ে কাটালে ফল যা পাওয়ার তা-ই পাওয়া যাবে। বাড়তি যা পাওয়ার তা বোনাস। মানুষ সরকারের ওপর বিরক্ত। শত ভুলের মধ্যেও মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এখনও আকুতি করছে। তাছাড়া সবাইকে অবিশ্বাসের পাল্লায় তুলে বিচার করলে কোনকালেই ভাল কিছু পাওয়া যায় না। শেখ হাসিনা একদিন যাদের অবিশ্বাস করতেন, দল ও মন্ত্রিসভায় স্থান দেননি, তারা এখন মূল শক্তি। মতিয়া চৌধুরীরা দূরে বসে ভাবছেন এ কি হলো। এটাই তো রাজনীতির খেলা। ভারতও এক সময় সংস্কারপন্থিদের সমর্থন দিয়েছিল জরুরি জমানায়। পরিণতিতে শেখ হাসিনা বিরক্ত হয়ে সংস্কারপন্থিদের ক্ষমতার বাইরে রেখেছিলেন। প্রণব বাবু নিজে অন্তত তিনবার অনুরোধ করে হাসিনার মন গলাতে পারেননি। বিরোধীদের আন্দোলনে শেখ হাসিনার সাজানো সংসার যখন ভেঙে পড়ছিল তখন প্রণব বাবুর পরামর্শে চিহ্নিত সংস্কারপন্থি আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, মোহাম্মদ নাসিম, আসাদুজ্জামান নূরকে দলে ফিরিয়ে নেন। এরাই এখন হাসিনার প্রথম সারির সৈনিক। আর খালেদা এখনও সন্দেহ আর অবিশ্বাস থেকে বের হতে পারেননি। রাজনীতি কি এতটাই সহজ!

খালেদা, প্রণব এবং ওরা তিন জন by অমিত রহমান

খালেদা জিয়া জানার চেষ্টা করছেন। কেন তার ঘনিষ্ঠ ‘তিনজন’ প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাতে বারণ করেছিলেন। কি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তারা কি দলের স্বার্থে না অন্যদের স্বার্থে খেলছিলেন তা-ও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।

সাগর-রুনি হত্যার বিচার দাবিতে ৩১শে মার্চ অনশন

দু’বছর পার হলেও উদ্ঘাটন হয়নি সাংবাদিক সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য। হত্যাকাণ্ডের বিচারে কোন প্রকার কিনারা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাংবাদিক সমাজ। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে চাওয়ার অনুরোধ করেছেন সাগর সারোয়ারের মা সালেহা মুনীর। অপরদিকে অপরাধী শনাক্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণে লজ্জা ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
গতকাল সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে পরিবার, সাংবাদিক সমাজের পক্ষ প্রয়াত সাগর-রুনিকে স্মরণ করা হয়। প্রকৃত খুনিদের বিচারের আওতায় আনার দাবিতে ৩১শে মার্চ অনশন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন সাংবাদিক নেতারা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা দাবি করেন, সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে একটি মহল সরকারকে বিভ্রান্ত করেছে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ সাংবাদিকদের সকল সমস্যায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সমাবেশে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই অংশের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠন যোগ দেয়।

সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে বিএফইউজের একাংশের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সাগর-রুনির পরিবার অভিমান থেকে আজ বলছে আমরা তাদের ভুলে যাই। এতে সরকারের লজ্জা হওয়া উচিত। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না করে সরকার তিন ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথমত, দেশের সাধারণ নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। তৃতীয়ত, জনগণ যাদের বেতন দেয় সে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। তিনি সরকারের কাছে প্রশ্ন রাখেন, খুনিরা এতটাই প্রভাবশালী, এতটাই দক্ষ যে সরকার তাদের স্পর্শ করতে পারছে না। তিনি তথ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমের ওয়েজবোর্ড নিয়ে যে অসত্য তথ্য দিয়েছেন তার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এ বিষয় নিয়ে তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাংবাদিক নেতারা দেখা করবেন। বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়া, জেলে থাকা সাংবাদিকদের মুক্তি ও সাংবাদিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণাও দেন তিনি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সেক্রেটারি সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, সকল ভেদাভেদ ভুলে সাংবাদিকদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। ডিইউজে এক অংশের সভাপতি আলতাফ মাহমুদ বলেন, প্রশাসন চাইলে খুনিদের সহজেই ধরতে পারে। বিভিন্ন ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রশাসনের ব্যর্থতা মানে সরকারের ব্যর্থতা। বিএফইউজে একাংশের মহাসচিব ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, সাগর-রুনির বিচার নিয়ে সাংবাদিকদের মাঝে একটা ভয় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। সাংবাদিকদের মাঝে যে ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছে তা যেন কোন বেঈমানির বিনিময়ে বিক্রি না হয়ে যায়। কেউ যেন সরাকরের কাছ থেকে সুবিধার বিনিময়ে বিপথগামী না হয়।

বিএফইউজে একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদ্ঘাটনে ব্যর্থতা স্বীকার করেছে। ফলে তারা কিভাবে চাকরিতে বহাল থাকেন? এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা রকম ছলচাতুরি ও প্রতারণা চলছে। বিচারহীনতার কারণে সাগরের মা সাংবাদিকদের যে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তা থেকে কেউ মুক্তি পাবে না বলে  মন্তব্য করেন তিনি। সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএফইউজে মহাসচিব আবদুল জলিল ভূঁইয়া, ডিইউজে মহাসচিব কুদ্দুস আফ্রাদ, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান প্রমুখ।

এদিকে সাগর-রুনির দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণসভায় সাগর সারোয়ারের মা সালেহা মুনীর হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বললেন, আন্দোলন থামিও না, যত সাংবাদিক মারা গেছে, সবার বিচারের দাবিতে তোমরা আন্দোলন চালিয়ে যাও। আমি বিচার চাই, আমার মেঘের জন্য আমি বিচার চাই। তিনি বলেন, সরকারের বহু আশ্বাসের পরেও এ হত্যাকাণ্ডের কোন কিনারা হয়নি। বিচার প্রক্রিয়া ধামাচাপা দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি শাহেদ চৌধুরী বলেন, সাগর-রুনির হত্যার বিচার নিয়ে ইতিপূর্বে সরকার ও স্বরাষ্টমন্ত্রী জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছিল। এখন আমরা এটা হতে দেবো না। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আপনি বলেছিলেন দারোয়ানকে ধরলেই হত্যাকারীদের কূল-কিনারা পাওয়া যাবে। আপনি তা করতে পারেননি। এর মানে কি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কি তাহলে আপনিও আছেন? দুর্নীতি করার কারণে এবার মন্ত্রিসভায় আপনি ঠাঁই পাননি। স্মরণসভায় ৩১শে মার্চ ডিআরইউর সামনে দিনব্যাপী প্রতীকী অনশনের কর্মসূচি ঘোষণা করে তিনি বলেন, কেউ পাশে থাক আর না থাক, সাগর-রুনির হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে ডিআরইউ আন্দোলন চালিয়ে যাবে। ৩১শে মার্চের মধ্যে দাবি আদায় না হলে কাফনের কাপড় পরে মিছিল, আমরণ অনশন ও রাজপথ অবরোধের মতো কর্মসূচি দিতে আমরা বাধ্য হবো। এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে সাগর-রুনিকে স্মরণ করার পর শেষ হয় এ স্মরণসভা। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-র সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খানের সঞ্চালনায় স্মরণসভায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)-র সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ, ডিআরইউ সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু, সাংগঠনিক সম্পাদক মুরসালিন নোমানী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এদিকে দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে সাগর-রুনির কবরে ফুল দিয়ে তাদের স্মরণ করেন স্বজনরা।

সাগর-রুনি হত্যার বিচার দাবিতে ৩১শে মার্চ অনশন

দু’বছর পার হলেও উদ্ঘাটন হয়নি সাংবাদিক সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য। হত্যাকাণ্ডের বিচারে কোন প্রকার কিনারা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাংবাদিক সমাজ। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে চাওয়ার অনুরোধ করেছেন সাগর সারোয়ারের মা সালেহা মুনীর। অপরদিকে অপরাধী শনাক্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণে লজ্জা ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

বৈশ্বিক অর্থনীতি- অধিকাংশ মানুষের স্থায়ী দুর্দশা by জোসেফ স্টিগলিৎস

২০০৮ সালে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেওয়ার পরপরই আমি সতর্ক করে বলেছিলাম, সঠিক নীতি গ্রহণ করা না হলে জাপানের মতো বছরের পর বছর ধরে ধীর প্রবৃদ্ধি ও আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রে প্রায়-স্থবিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
তখন আটলান্টিকের উভয় তীরের নেতারা দাবি করেছিলেন যে তাঁরা জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, কিন্তু কার্যত দ্রুতই তাঁরা একই ধরনের ভুলভ্রান্তির পুনরাবৃত্তির দিকে অগ্রসর হন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাবেক কর্মকর্তা অর্থনীতিবিদ ল্যারি সামার্স পর্যন্ত এমন সতর্কতা উচ্চারণ করছেন যে একটা দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।

আধা দশক আগে আমি যে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলাম, তার মূল কথাটি ছিল মৌলিক অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি রুগ্ণ হয়ে পড়েছিল, এমনকি সংকট শুরু হওয়ার আগেই। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হয়ে উঠেছিল একটা সম্পদ-মূল্যের বুদ্বুদ, যা সৃষ্টি হয়েছিল শিথিল ব্যবস্থাপনা/নিয়ন্ত্রণ ও সুদের নিম্ন হারের কারণে। এ দুয়ের ফলে অর্থনীতিটাকে বেশ হূষ্টপুষ্ট দেখাচ্ছিল। কিন্তু উপরিতলের নিচে, ভেতরে ভেতরে অসংখ্যা সমস্যা ঘনিয়ে উঠছিল। যেমন, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য আরও বেড়ে চলেছিল, কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছিল না (কলকারখানায় উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সেবামুখী অর্থনীতির দিকে যাওয়া, বৈশ্বিক পরিসরে তুলনামূলক সুযোগ-সুবিধাগুলোর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা); দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা; এমন এক আর্থিক ব্যবস্থা, যেখানে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং সামাজিক কল্যাণ বাড়ানোর লক্ষ্যে উদ্বৃত্ত সম্পদের পুনর্ব্যবহার করার পরিবর্তে ফাটকা বাজারি অধিকতর সুবিধাজনক।
সেসব সংকটের ব্যাপারে নীতিনির্ধারকেরা যা করেছেন, তাতে সংকট মেটেনি। আরও খারাপ কথা হলো, তাঁদের কৃতকর্মের ফলে কিছু সংকট তীব্রতর হয়েছে, নতুন আরও কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফলে, অনেক দেশের জিডিপিতে ধস নেমে সরকারের রাজস্ব আয় কমে গিয়েছে এবং তাদের ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। উপরন্তু, সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে এমন এক তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টি হয়েছে, যারা বছরের পর বছর কর্মহীন অলস দিন পার করেছে এবং জীবনের একটা পর্যায়ে উৎপাদনক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে; অথচ তাদের তখন দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কাজে লাগানোর সময়।
আটলান্টিকের উভয় পারে ২০১৩ সালের তুলনায় সামনের দিনগুলোতে জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেসব নেতা কৃচ্ছ্রসাধনের নীতিকে আলিঙ্গন করেছিলেন, তাঁরা এবার উল্লাসে শ্যাম্পেনের বোতল খুলতে পারেন। কিন্তু সেটা করতে যাওয়ার আগে তাঁদের ভালো করে খতিয়ে দেখা উচিত এখন আমাদের অবস্থা কী; তাঁদের গৃহীত সেসব নীতির ফলে যে প্রায়-অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
প্রত্যেক নিম্নমুখী প্রবণতাই একটা পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়। এ রকম ক্ষেত্রে একটা ভালো নীতি হয় সেটাই, যা গ্রহণের ফলে সেই নিম্নমুখী প্রবণতা বেশি গভীরে যেতে পারে না এবং বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে না। যেসব দেশের সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করেছিল, সেসব দেশে অর্থনীতির নিম্নমুখী প্রবণতা অনেক গভীর পর্যন্ত গেছে এবং বেশি দীর্ঘ হয়েছে, যার পরিণতিগুলো হবে দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু এ রকম হওয়া অনিবার্য ছিল না।
উত্তর আটলান্টিকের অধিকাংশ দেশে ২০০৭ সালে মাথাপিছু প্রকৃত (মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়কৃত) জিডিপি ছিল বেশ কম; গ্রিসে অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে সফল অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে ছয় বছর ধরে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সংকটের আগে যে সামান্য হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছিল, তা অব্যাহত থাকলে আজ এ অর্থনীতির যে আকার দাঁড়াতে পারত, এখন তার থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ ছোট এ অর্থনীতি।
কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে এসব পরিসংখ্যানে প্রকৃত চিত্রটা ফুটে ওঠে না; কারণ সাফল্য পরিমাপের ভালো সূচক জিডিপি নয়। গৃহস্থালির আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রে কী ঘটছে, সেটা বরং অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। সিকি শতক আগে, ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৃত গৃহস্থালি আয় (মিডিয়ান রিয়্যাল ইনকাম) যা ছিল, এখন তার থেকে কম; আর আজ থেকে ৪০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে একজন সার্বক্ষণিক পুরুষ শ্রমিকের আয় (মিডিয়ান ইনকাম) যা ছিল, এখন তার থেকে কম।
অর্থনীতিবিদ রবার্ট গর্ডনের মতো কেউ কেউ বলেছেন, বিগত শতাব্দীজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন প্রবৃদ্ধির যে হার ছিল, তার থেকে যথেষ্ট কম প্রবৃদ্ধি হবে—এমন এক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। অর্থনীতিবিদদের কর্মকাণ্ডের শোচনীয় রেকর্ড—যা কিনা ২০০৮ সালের সংকটের প্রাক্কালে ফুটে উঠেছিল—তিন বছরের পূর্বাভাস সত্ত্বেও এমন আস্থা বোধ করা উচিত হবে না যে, কেউ বলতে পারেন ভবিষ্যতের দশকগুলোতে কী ঘটবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার বলেই মনে হয়: সরকারের নীতিগুলো পরিবর্তন করা না হলে আমরা সুদীর্ঘ সময় ধরে নৈরাশ্যব্যঞ্জক পরিস্থিতির মধ্যেই থেকে যাব।
বাজারের এমন শক্তি আছে যে তা নিজেই নিজেকে শুধরে নিতে পারে। কিন্তু আমি ওপরে যে অন্তর্নিহিত মৌলিক সমস্যাগুলোর কথা বললাম, সেগুলো খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। অনেক সমস্যার ইতিমধ্যে আরও অবনতি ঘটে গেছে। অসমতার ফলে চাহিদা দুর্বল হয়ে যায়; অসমতার বিস্তার ঘটলে চাহিদা আরও বেশি দুর্বল হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশে অর্থনৈতিক সংকটের ফলে অসমতা শুধুই বেড়েছে।
উত্তর ইউরোপে বাণিজ্যিক উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, এমনকি চীনেরও কিছুটা বেড়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজারগুলোর অবস্থা কখনোই এত ভালো হয়নি যে সেগুলো আপনা থেকেই কাঠামোগত রূপান্তর দ্রুত অর্জন করতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কৃষি থেকে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে যাত্রা কখনোই মসৃণ হয়নি। উল্টো বরং এই রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সামাজিক স্থানচ্যুতি ও মহা মন্দা ঘটেছে।
এবারও ভিন্ন কিছু ঘটছে না; বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা আরও খারাপ হতে পারে। যেসব খাতে প্রবৃদ্ধি ঘটা উচিত, যেগুলোতে নাগরিকদের চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে, সেগুলো হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সেবা খাত। এই সেবা খাতগুলো ঐতিহ্যগতভাবে অর্থ বরাদ্দ পেয়ে এসেছে রাষ্ট্রের কাছ থেকে এবং তা যুক্তিসংগত কারণেই। কিন্তু সরকার এসব খাতে রূপান্তরকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করছে।
অর্থনীতিতে পশ্চাদপসরণ বা মন্দনের থেকে রুগ্ণতা বা ব্যাধি বরং ভালো। কিন্তু আমরা এখন যেসব সমস্যার মুখোমুখি, সেগুলো অর্থনীতির অনিবার্য, অমোঘ নিয়মকানুনের ফল নয়। ভূমিকম্প বা সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর সঙ্গে আমরা যেভাবে খাপ খাইয়ে চলি, এই সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রেও আমাদের তা-ই করা উচিত। এগুলো মোকাবিলা করা অতীতের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার মতোও নয়; যদিও নিশ্চিত করে বলতে গেলে, গত তিন দশকজুড়ে যে নয়া-উদারপন্থী নীতিগুলো প্রাধান্য চলে এসেছে, আজকের অবস্থার জন্য সেগুলোর দায় বিরাট।
আমাদের চলমান সমস্যাগুলো ভুল নীতিমালার ফল। বিকল্প আছে। কিন্তু যেসব অভিজাত লোকের আয় বেড়ে চলেছে, যারা আবার শেয়ারমার্কেটে ফুলেফেঁপে উঠছে, তাদের আত্মতুষ্টির মধ্যে আমরা সেই বিকল্পগুলো খুঁজে পাব না। শুধু যা ঘটবে তা হলো, জীবনযাত্রার আরও নিম্নমানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হবে কিছু মানুষকে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই কিছু মানুষই হলো অধিকাংশ মানুষ।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জোসেফ স্টিগলিৎস: নোবেল পুরস্কারে ভূষিত মার্কিন অর্থনীতিবিদ; যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক।

বিশেষ সাক্ষাৎকার- আফগানিস্তানে তালেবানের প্রভাব আর নেই: নাজেস আফরোজ by মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

নাজেস আফরোজের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে, ১৯৫৮ সালে। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর এক বছর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। ১৯৮১ সালে কলকাতার দৈনিক আজকাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।
১৯৯৮ সালে বিবিসি বাংলা বিভাগে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ শুরু করেন প্রযোজক হিসেবে। ২০০৬ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ডের সাউথ এশিয়া ব্যুরোর এক্সিকিউটিভ এডিটর হন। ২০১১-১২-তে তিনি এডিটর ইন্টারন্যাশনাল অপারেশন্স-এর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। নাজেস আফরোজ একজন আফগানিস্তান বিশেষজ্ঞ।

প্রথম আলো  আপনি তো দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তানে যাওয়া-আসা করেছেন এবং সাংবাদিক হিসেবে সে দেশের খোঁজখবর রাখেন। দেশটির অবস্থা এখন কেমন?
নাজেস আফরোজ  ২০০১ সালে তালেবানের পতনের পর আফগানিস্তানের যে চেহারা ছিল, এখন তার সঙ্গে আকাশ-পাতাল তফাত।
প্রথম আলো  ভালো না খারাপ?
নাজেস আফরোজ  অনেক ভালো। ২০০২ সালে গোটা কাবুল শহরের যে ভগ্নদশা ছিল, আজকে সেই জায়গাগুলো ঘুরেফিরে দেখলে শহরটাকে চেনাই যায় না। জমির দাম, বাড়িভাড়া অনেক বেড়েছে। অবশ্য এর একটা কারণ, অনেক আন্তর্জাতিক এনজিও সেখানে কাজ করছে, প্রচুর বিদেশি লোক থাকে। এসব কারণে একটা ফলস ইকোনমি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটাকে যদি বাদও দিই, তবু কাবুলের অনেক উন্নতি হয়েছে। শুধু কাবুল নয়, আমি হেরাত, মাজারে শরিফ, জালালাবাদ, কান্দাহার—যেখানেই গেছি, সবখানেই অনেক উন্নতি চোখে পড়েছে।
কাবুল শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে একটা ছোট্ট গঞ্জমতো আছে চারিকার নামে। চারিকার মানে চৌরাস্তা, চারটি প্রধান সড়ক সেখানে মিলিত হয়েছে। ২০০৩ সালে সেই চারিকারে দেখেছিলাম খুব দীন দশা, দু-চারটি দোকানপাট ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। প্রায় ১০ বছর বাদে আমি আবার সেই চারিকারে গেলাম। দেখলাম, গমগম করছে প্রাণবন্ত একটা শহর। বোঝা গেল যে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য দেখতে পাবেন। চাষবাস হচ্ছে।
প্রথম আলো  নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন?
নাজেস আফরোজ  নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, এ কারণে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সেটার প্রতিফলন একদমই চোখে পড়ে না। কারণ, তালেবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী, জঙ্গিগোষ্ঠী আক্রমণ চালায় সরকারি লোকজন ও স্থাপনার ওপর এবং বিদেশিদের ওপর। সাধারণ মানুষ তাদের আক্রমণের শিকার হয় না। সেই কারণে নিরাপত্তার উদ্বেগটা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান নয়।
প্রথম আলো  কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তানের যে চিত্র পাই, সেটা তো একেবারেই উল্টো।
নাজেস আফরোজ  আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করতে যাঁরা আফগানিস্তানে যান, তাঁদের বেশির ভাগই ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ। গায়ের রঙেই তাঁদের আলাদা করে চেনা যায়। তাঁদের যাতায়াতের ওপর অনেক বিধিনিষেধ থাকে, তাঁদের প্রতিষ্ঠানই সেটা তাঁদের নিরাপত্তার স্বার্থে করে। আমি নিজেও বিবিসিতে কাজ করার সময় সেটা দেখেছি। তাঁরা যদি রাস্তাঘাটে না বেরোন, গ্রামগঞ্জে না যান, তাহলে প্রকৃত চিত্রটা পাবেন কী করে? সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পড়ছে না, সেটা তো তাঁদের দেখতে হবে। বছর দেড়েক আগে আমি আমার আফগান বন্ধু-সহকর্মীর বাড়িতে গিয়ে থেকেছি—মাজারে শরিফে। সেখান থেকে একটা ছোট্ট ভাঙা গাড়িতে করে বাল্ক শহর পর্যন্ত গেছি, সেখানে রাস্তার মধ্যে ছবি তুলেছি। আমার সহকর্মীরা গাড়িতে করে মাজারে শরিফ চলে যায়, ১২ ঘণ্টা লাগে। অবশ্য কান্দাহারের সড়কটা নিরাপদ নয়; এ রকম আরও কিছু রাস্তা আছে, যেগুলো নিরাপদ নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তান নিয়ে যাঁরা লেখেন, তাঁদের সিংহভাগই পশ্চিমা; সেখানে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কাটা খুব বেশি। সেই শঙ্কা তাঁদের লেখালেখিতে প্রতিফলিত হয়।
প্রথম আলো  আফগানিস্তান থেকে ন্যাটোর সেনাবাহিনী এ বছর চলে গেলে দেশটিতে আবার তালেবান ফিরে আসতে পারে বলে উদ্বেগের খবর আমরা পাই। আপনার কী মনে হয়?
নাজেস আফরোজ  তিন ধরনের সম্ভাবনা আছে। একটা হচ্ছে, এই সরকারের পতন ঘটবে, তালেবান ক্ষমতা নিয়ে নেবে। দুই নম্বর হচ্ছে, আলোচনা হবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিন নম্বর হচ্ছে, একটা মাঝামাঝি অবস্থা থাকবে। অর্থাৎ, একটা সরকার থাকবে এবং মাঝারি থেকে নিম্ন মাত্রায় বিদ্রোহ চলতে থাকবে। আমার ধারণা, এই শেষের সম্ভাবনাটাই বেশি।
প্রথম আলো  সে অবস্থায় বাইরের শক্তিগুলোর ভূমিকা কেমন হতে পারে? বিশেষত পাকিস্তানের?
নাজেস আফরোজ  আফগানরা মনে করে, পাকিস্তানের ভূমিকা নেতিবাচক; তাদের কাছে পাকিস্তানের প্রভাব, তাদের উপস্থিতি কাম্য নয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাত পর্যন্ত, গোত্রনির্বিশেষে আফগানিস্তানের সব মানুষ এটা মনে করে। আর পাকিস্তান যে আফগানিস্তানে প্রভাব রাখতে চায়, সেটা খুব পরিষ্কার। পাকিস্তান খোলাখুলি সেটা বলেছেও। পাকিস্তানের আশঙ্কা হচ্ছে, আফগানিস্তানে ভারতীয় প্রভাব খুব বেশি। ভারত খুব বুদ্ধি করে সেখানে প্রভাব বাড়িয়েছে। ভারত আফগানিস্তানের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় দাতাদেশ। ভারত আফগানিস্তানকে দুই বিলিয়ন ডলার দিয়েছে; রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল বানিয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বানিয়ে দিচ্ছে, চিশত শহরের কাছে একটা বড় হাইড্রোইলেকট্রিক বাঁধ তৈরি করছে। আফগান পার্লামেন্টের নতুন ভবন তৈরির পুরো ব্যয় দিয়েছে ভারতীয় সরকার। এখন আফগান সরকার ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চাইছে। এটা পাকিস্তানকে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। আর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে তার সেনাবাহিনী, যার অনেক বড় বড় অফিসার একাত্তর সালকে ভুলতে পারেননি। এমনিতেই পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা আছে, কাশ্মীর নিয়ে তারা কিছু করতে পারেনি। এর ওপর আফগানিস্তানে যদি ভারতের প্রভাব বাড়ে এবং সামরিক সহযোগিতাও যুক্ত হয়—এটা নিয়ে তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন।
প্রথম আলো  আমেরিকার ভূমিকাও তো নেতিবাচক হতে পারে। কারণ, আমরা দেখেছি, আফগান সরকারকে এড়িয়ে তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
নাজেস আফরোজ  আমার ধারণা, আমেরিকানরা খুব ভেবেচিন্তে তালেবানের সঙ্গে কথা বলেছে, তা নয়। আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধ আমেরিকার জনগণের কাছে ভীষণ অজনপ্রিয় হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো অত সেনা মারা না গেলেও গত ১২ বছরে চার-পাঁচ হাজার সেনা মারা গেছে, আট-দশ হাজার আহত হয়েছে, প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে ২০০৮ সাল থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। ফলে, এ প্রশ্ন আমেরিকার ভেতরেই উঠছে যে আমরা ওখানে কী করছি? আবার সব ছেড়েছুড়ে চলেও যেতে পারছে না, কারণ তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আফগানিস্তানে তারা একটা স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করে দিয়ে যাবে। সে জন্য তারা সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে একটা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সম্প্রতি তারা কাতারে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আমেরিকানরা আশা করেছিল, তালেবান অন্তত তিনটি জিনিস করবে: আফগানিস্তানে যে সংবিধান তৈরি করা হয়েছে, সেটি মেনে নেবে, হামিদ কারজাইয়ের সরকারকে স্বীকৃতি দেবে এবং তালেবান বলবে যে আফগানিস্তানের ভূমিতে তারা কোনো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে জায়গা দেবে না। কিন্তু তালেবান এই তিনটির কোনোটিতেই রাজি হয়নি। সে জন্য আমেরিকার সঙ্গে তালেবানের আলোচনা ভেঙে গেছে।
প্রথম আলো  সামাজিক দিক থেকে আফগানিস্তানে গত ১০-১২ বছরে আপনি কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করেছেন?
নাজেস আফরোজ  পরিবর্তন হচ্ছে খুব ধীরে। কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। যারা লেখাপড়া করছে, তাদের মধ্যে নতুন ভাবনাচিন্তা আছে। প্রায় ৫০ লাখ আফগান বহু বছর শরণার্থী হিসেবে অন্যান্য দেশে বাস করেছে, তারা এখন ফিরে আসছে। কিছু নতুন ভাবনা তারাও নিয়ে আসছে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে, তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মেয়ে। হেরাত খুবই ছোট শহর, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী মেয়ে। আফগানিস্তানে আট-দশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে বেশ কয়েকটা। কাবুল শহরে কারদান ইউনিভার্সিটি নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১০ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাদের অনেকে পেশাজীবী; সারা দিন কাজ করে, রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করে। ফলে, সামাজিক দিক থেকেও পরিবর্তন আসছে।
প্রথম আলো  সমাজে, সাধারণ মানুষের মধ্যে তালেবানের প্রভাব কেমন?
নাজেস আফরোজ  ১৯৯৪ সালের দিকে তালেবান যখন আসে, যখন জনগণ তাদের সমর্থন করেছিল। কিন্তু আজকে তাদের প্রতি সমর্থন ১ শতাংশও নেই। যেসব জায়গা তারা এখনো নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোতে তাদের অস্ত্র হচ্ছে ভীতি। ১৯৯৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান জনসাধারণের ওপর যে অকথ্য অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে, সেটা মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। এ কারণে একটা আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু তালেবানের প্রভাব তেমন নেই। মানুষের মন থেকে ভীতিটা কেটে গেলে তালেবানের মিথ ভেঙে যাবে। গণতন্ত্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি হলে তালেবানের ভীতিটা দূর হবে। গজনি শহর ও উত্তরের কয়েকটা জায়গায় স্থানীয় জনগণ তালেবানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে; মেরে বের করে দিয়েছে। আফগানিস্তানের লোকসংখ্যা তিন কোটি, এর ১ শতাংশও যদি তালেবানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তালেবানের কিছু করার থাকবে না।
প্রথম আলো  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নাজেস আফরোজ  ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

বিশেষ সাক্ষাৎকার- আফগানিস্তানে তালেবানের প্রভাব আর নেই: নাজেস আফরোজ by মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

নাজেস আফরোজের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে, ১৯৫৮ সালে। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর এক বছর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। ১৯৮১ সালে কলকাতার দৈনিক আজকাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- ফজল শাহাবুদ্দীন: অকালে হঠাৎ by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

কবি ও সাংবাদিক ফজল শাহাবুদ্দীন চলে গেলেন পরপারে। অকালমৃত্যু বলা যাবে না, তবে কিছুদিন আগে পর্যন্ত বেশ সক্রিয় ছিলেন। আরও কিছু অবদান রাখার সুযোগ ছিল তাঁর। যেটুকু অবদান রেখে গেছেন, তাও অমূল্য।

বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে যাঁরা পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে অবদান রেখে যাচ্ছেন, ফজল শাহাবুদ্দীন তাঁদের অন্যতম। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হকদের সাহিত্যসঙ্গী ফজল শাহাবুদ্দীন তাঁর অনবদ্য কবিতা দিয়ে সাহিত্য অঙ্গনে একটি আসন করে নিতে পেরেছিলেন ষাটের দশকেই। ফজল শাহাবুদ্দীন শুধু কবি ছিলেন না, একজন সাহিত্যকর্মীও ছিলেন। তাই দেখি কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে যৌথ সম্পাদনায় কবিতা পত্রিকা কবিকণ্ঠ প্রকাশ করেছিলেন। পত্রিকাটি নিয়মিত হয়নি। কয়েকটি সংখ্যা মাত্র প্রকাশিত হয়েছে। কবি ও কবিতা নিয়ে নানা সংগঠন, অনুষ্ঠান, সম্মেলন আয়োজন করেছিলেন। পতিত শাসক রাষ্ট্রপতি এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে ‘এশীয় কবিতা উৎসবের’ আয়োজন করে বিতর্কিত হয়েছিলেন। এখন এরশাদ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিত্র। ইতিহাস ও ব্যাখ্যা কত দ্রুত বদলে যায়।
ফজল শাহাবুদ্দীন বিশ্বাস করতেন, কবিতা পাঠ বা কবিদের অনুষ্ঠান গরিবি হালে হবে না। তাই তিনি তাঁর সব সাহিত্য অনুষ্ঠান তিন বা পাঁচতারকা হোটেলে জাঁকজমকভাবে আয়োজন করতেন। তাঁর সাহিত্য বা সংগঠন-ভাবনা অন্যদের চেয়ে পৃথক ছিল। এরশাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু কখনো রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহ নেননি। কবিতা রচনা, আড্ডা ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গলাভেই ছিল তাঁর অপার আনন্দ। দিলখোলা মজলিসি মানুষ। কৌতুকপ্রিয়তা তাঁর স্বভাবের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। আড্ডাতে তিনিই থাকতেন মধ্যমণি হয়ে। মজার মজার কথা বলে আড্ডা জমিয়ে রাখতেন।
ফজল শাহাবুদ্দীনের জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে সক্রিয় বিনোদন সাংবাদিকতায়। দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক চিত্রালীতে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক বাংলায় (পরে পরিবর্তিত নাম) তিনি দীর্ঘদিন ‘ছায়ামঞ্চ’ ফিচার পাতার সম্পাদক ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রতি সপ্তাহে দুই পৃষ্ঠার ‘ছায়ামঞ্চে’ চলচ্চিত্র, টিভি, তারকা ইত্যাদি বিষয়ে বৈচিত্র্যময় লেখা প্রকাশিত হতো। সেকালে (১৯৭০-১৯৮০) ঢাকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক ছিল দৈনিক বাংলা। আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, তোয়াব খান, আহমেদ হুমায়ুন, নির্মল সেন, ফওজুল করিম, ফজল শাহাবুদ্দীন, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, আফলাতুন, কালাম মাহমুদ ও আরও অনেক প্রতিভাবান সাংবাদিক, শিল্পী ও সাহিত্যিকের যৌথ সৃষ্টিতে দৈনিক বাংলা একটি পাঠকনন্দিত পত্রিকা হয়ে উঠেছিল। এখনকার বহু প্রতিষ্ঠিত কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক তখন দৈনিক বাংলাকে ঘিরে তাঁদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন। ফজল শাহাবুদ্দীনও অনেক তরুণকে সাংবাদিকতা ও কবিতা রচনায় নানাভাবে সহায়তা করেছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় ‘ছায়ামঞ্চ’ পাতাটি বিনোদন সাংবাদিকতার উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থাকবে।
১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলা গ্রুপ থেকে সাপ্তাহিক বিচিত্রা প্রকাশনা শুরু হলে ফজল শাহাবুদ্দীনকে তার সম্পাদক করা হয়। কিন্তু বেশি দিন তিনি সেই পদে থাকেননি। শাহাদত চৌধুরী সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। শাহাদত চৌধুরীর সম্পাদনায় বিচিত্রা এ দেশে সংবাদ ম্যাগাজিনের একটি সার্থক মডেল হয়ে ওঠে। বিচিত্রা একটি ইতিহাস।
জীবনের বিভিন্ন সময়ে ফজল শাহাবুদ্দীন নানা ধরনের বিনোদন ম্যাগাজিন পরিকল্পনা ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখ্য: পাক্ষিক চিত্রিতা, মাসিক বিনোদন, নান্দনিক ইত্যাদি। এসব বিনোদন পত্রিকা সত্তর দশকে এক বর্ণাঢ্য ও উজ্জ্বল সাংবাদিকতা উপহার দিয়েছে। তখন এ দেশের সাংবাদিকতা, মুদ্রণ প্রযুক্তি এখনকার মতো এত আধুনিক ছিল না। কিন্তু ফজল শাহাবুদ্দীন ছিলেন সময়ের তুলনায় অগ্রসর মানুষ। তাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল সেকালেই এত উন্নত মানের মননশীল বিনোদন পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করা। তিনি বিনোদন সাংবাদিকতায় কখনো গ্রাম্যতা, স্থূলতা ও সস্তা বিষয়কে স্থান দেননি (যা অনেকেই করেন)। তাঁর প্রতিটি বিনোদন পত্রিকা ছিল আধুনিক ও অভিজাত। আমার ধারণা, পাক্ষিক চিত্রিতা এ দেশের বিনোদন পত্রিকায় শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দাবি করতে পারবে। সেই মানের বিনোদন পত্রিকা আজ অবধি আর প্রকাশিত হয়নি।
ফজল শাহাবুদ্দীন তাঁর সময়ের একজন সফল মানুষ ছিলেন। কবিতা রচনায়, সাংবাদিকতাধর্মী রচনায় (দৈনিক বাংলায় কলাম লিখতেন), বিনোদন সাংবাদিকতায়, সম্পাদনা ও প্রকাশনায় তিনি সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। ব্যর্থ হয়েছেন শুধু একটা জায়গায়। কবিদের নিয়ে নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশ ও নিয়মিত নানা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। নানা অসহযোগিতায় তা পারেননি। এই নিয়ে তাঁর মনে হয়তো দুঃখ ছিল। কিন্তু তাঁর সাফল্যের মূল্যও কম নয়।
এ দেশের কাব্যজগৎ ও বিনোদন সাংবাদিকতা জগৎ তাঁকে মনে রাখবে। এই দুটি ক্ষেত্রে তিনি জীবনের একটা বড় সময় দান করেছেন। তবে জীবিতকালে ফজল শাহাবুদ্দীনের যতটা স্বীকৃতি ও সম্মান পাওয়া উচিত ছিল, তা পাননি। এটা আমাদের দূষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফল। ষাট ও সত্তরের দশক থেকে অনেক তরুণ কবি ও সাংবাদিক তাঁকে ঘিরে বিকশিত হয়েছেন। তিনি অনেকের কাছে অভিভাবক ও শিক্ষকতুল্য ছিলেন। তাঁরা আজ শোকার্ত। দৈনিক পাকিস্তানে সাংবাদিকতা সূত্রে আমিও তাঁর স্নেহ ও সাহচর্য লাভ করেছি ১৯৭০ সাল থেকে। সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও মেকআপের অনেক কিছু শিখেছি তাঁর কাছ থেকে। দৈনিক বাংলায় ‘ছায়ামঞ্চ’ সম্পাদনাকালে একজন নবীন রিপোর্টার হিসেবে তাঁর কাজ দেখেছি ঘনিষ্ঠভাবে। নানা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে গল্প করে অনেক কিছু জেনেছি। আমৃত্যু তাঁর স্নেহধন্য ছিলাম। রয়েছে ব্যক্তিগত অনেক স্মৃতি। তা পত্রিকার পাতার জন্য নয়।
ফজল শাহাবুদ্দীনের প্রতি আমাদের অনেকের অনেক ঋণ। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তাঁর আত্মা শান্তিলাভ করুক।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- ফজল শাহাবুদ্দীন: অকালে হঠাৎ by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

কবি ও সাংবাদিক ফজল শাহাবুদ্দীন চলে গেলেন পরপারে। অকালমৃত্যু বলা যাবে না, তবে কিছুদিন আগে পর্যন্ত বেশ সক্রিয় ছিলেন। আরও কিছু অবদান রাখার সুযোগ ছিল তাঁর। যেটুকু অবদান রেখে গেছেন, তাও অমূল্য।

সাক্ষাৎকার- মঞ্জুরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে by ব্যারিস্টার আবুল মনসুর

‘আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বিচারের জন্যও তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক। ইতিহাসের এসব শূন্যস্থান বা ক্ষতগুলো সম্পর্কে সত্যি কথা দেশবাসীর জানার অধিকার রয়েছে।’
১৯৯৫ সালের মার্চে ভোরের কাগজ-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথাগুলো বলেছেন ব্যারিস্টার আবুল মনসুর। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সামরিক বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকাকালে নিহত মেজর জেনারেল এম আবুল মঞ্জুরের বড় ভাই তিনি। ভাইকে হত্যার বিচার চেয়ে ১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। ওই সময় রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় ব্যারিস্টার মনসুরের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ভোরের কাগজ-এর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সানাউল্লাহ। ১৯৯৫ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি পাঠক চাহিদার কথা বিবেচনা করে প্রথম আলোতে ছাপা হলো।

ভোরের কাগজ  মেজর জেনারেল এম আবুল মঞ্জুর নিহত হয়েছিলেন ১৯৮১ সালের ১ জুন। প্রায় ১৪ বছর পর মামলা করলেন কেন?
আবুল মনসুর  আসলে আমি সব সময় চেষ্টা করেছি মামলা করার জন্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, তথ্য-প্রমাণাদি আমার কাছে ছিল না। এমনকি জেনারেল মঞ্জুরের ময়নাতদন্ত রিপোর্টও খুঁজে পাইনি। গত মাসে ময়নাতদন্ত রিপোর্টটি পাওয়ার পরপরই আমি পাঁচলাইশ থানায় এফআইআর করেছি। আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক। আমার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক। আইন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হোক।
কাগজ  কিন্তু এ রকম একটা কথা শোনা যাচ্ছে যে, আপনি মামলা করেছেন সরকারের পরামর্শে বা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে?
মনসুর  এটা সত্যি নয়। আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বিচারের জন্যও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। জেনারেল মঞ্জুর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য তিনি লড়াই করেছেন। কিন্তু এত বছরেও তাঁর হত্যার মতো একটি জঘন্য ঘটনার তদন্ত বা বিচার হয়নি। আমি বা আমাদের পরিবার সব সময়ই এ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়েছি। এ নিয়ে আমার নিজের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বা লক্ষ্য নেই।
কাগজ  কিন্তু এ রকম একটি ধারণা সহজেই করা যায় যে, মঞ্জুর হত্যার বিচার জিয়া হত্যার বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মনসুর  দেখুন, আমি বা আমাদের পরিবারও চায় জিয়া হত্যারও সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার হোক। মঞ্জুর হত্যার বিচার হলে অনেক সত্যি কথা বেরিয়ে আসবে। জিয়া হত্যার জন্য আমার ভাইকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এটাও সত্যি কি না সেটা বের হয়ে আসবে। কারণ সে সময় বিচারের কোনো সুযোগ না দিয়ে জেনারেল মঞ্জুর এবং আরও কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরে জেনারেল কোর্ট মার্শালে গোপন বিচার করে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ফাঁসি হয়েছিল।
সে সময় সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল আজ তথ্য-প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, সেটি সত্যি কথা বলেনি। তাই আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সঠিক ইতিহাস বেরিয়ে আসুক। ইতিহাসের এসব শূন্যস্থান বা ক্ষতগুলো সম্পর্কে সত্যি কথা দেশবাসীর জানার অধিকার রয়েছে।
কাগজ  কিন্তু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড তো আরও হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, হায়দার...
মনসুর  খালেদ মোশাররফ ব্যক্তিগতভাবে আমার বন্ধু ছিল। সে সত্যিকার অর্থে একজন দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী ছিল। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তার হত্যার বিচার আজও হয়নি। বিচার হয়নি কর্নেল হুদা, হায়দার এদের হত্যার। হুদা মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল মঞ্জুরের একজন সঙ্গী ছিলেন। তাঁদের সবার অবদান, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গেও আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁর হত্যার ব্যাপারে জেনারেল কোর্ট মার্শালে যে গোপন বিচার হয়েছিল, সে সম্পর্কে এখনো দেশবাসী সন্দেহমুক্ত নন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর এবং তাঁর পরিবারবর্গের হত্যার ব্যাপারেও কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার আজও হলো না।
আসলে সব হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হওয়া উচিত। জাতি হিসেবে আমাদের এর জন্য দাবি করা উচিত, ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ বিচার না হওয়ায় অনেকেই হত্যা করে পার পেয়ে গেছে। যা পরবর্তী সময়ে অন্যদেরও এ ধরনের অপকর্মে উৎসাহিত করেছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এবং প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসার জন্য এসব ঘটনার বিচার হওয়া প্রয়োজন।
কাগজ  এ মামলার ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার লেখালেখি হচ্ছে। নানা কথা শোনা যাচ্ছে।
মনসুর  হ্যাঁ, পত্রপত্রিকায় অনেক কথাই বলা হচ্ছে। কোনোটা সত্য, কোনোটা মিথ্যা। নানা রকম তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। আমি মিডিয়ার কাছে অনুরোধ জানাব, তারা যাতে এমন কিছু না করে যাতে মামলার কোনো ক্ষতি হয়। আমাদের সবার চেষ্টা করা প্রয়োজন যাতে সত্য প্রকাশিত হয়। প্রকৃত দোষীদের বিচার হয়।

সাক্ষাৎকার- মঞ্জুরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে by ব্যারিস্টার আবুল মনসুর

‘আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বিচারের জন্যও তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক। ইতিহাসের এসব শূন্যস্থান বা ক্ষতগুলো সম্পর্কে সত্যি কথা দেশবাসীর জানার অধিকার রয়েছে।’

ভালোবাসার স্ট্যাটাস by আনিসুল হক

ভালোবাসা কি এখন এসে ঠেকল এক দিনের ব্যাপারে? ভালোবাসার স্ট্যাটাস কি এখন পরিণত হয়েছে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে? জানা যাক সাহিত্যিক আনিসুল হকের লেখায়। সেই সঙ্গে রইল তাঁর দেওয়া ভালোবাসার কিছু নমুনা স্ট্যাটাস।

‘আমি বললাম, ‘ফুল।’ তুমি বললে, ‘ও তো কাগজের।’ আমি বললাম, ‘তবু তো ফুল। লোকটা তো কাগজ দিয়ে বন্দুকও বানাতে পারত।’ কবি সমুদ্র গুপ্তর কবিতা, স্মৃতি থেকে আওড়াতে হচ্ছে।
ভালোবাসা জিনিসটা কি এখন এসে ঠেকল এক দিনের ব্যাপারে? ১৪ ফেব্রুয়ারিতেই শুধু ভালোবাসা হবে। বাকি ৩৬৪ দিন কি তবে মন্দবাসা?
পণ্যবাদী সময়ে বাস করছি আমরা, বিপণিবিতানগুলোয় থরে থরে সাজানো নানা পণ্য, ওসব বিক্রি করতে তো হবে। তাই চাই দিবস! বাবা দিবস, মা দিবস, বন্ধু দিবস, শিক্ষক দিবস। পশ্চিমের দেশগুলোয় এসব দিবসের আগে মার্কেটগুলো সাজানো থাকে উদ্দেশ্যমূলক পণ্যে, বাবাকে কী দেবেন, মাকেই বা কী, তা ওরাই ভেবে রেখেছে, কী বলবেন, সেটা আগেভাগেই রেখেছে লিখে। পয়সা দিলে সেসব আপনার বাবা, মা, বন্ধু, প্রেমিকা, শিক্ষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও ওদেরই।

তবু ভালো যে একটা দিন ভালোবাসা দিবস পালন করা হচ্ছে। ওরা তো ঘৃণা দিবসও পালন করতে পারত।
এই জগৎ চলছেই ভালোবাসার টানে, নীল আকাশ, অগণন নক্ষত্র, চাঁদের আলো, সবুজ পাতা, রঙিন ফুলে ভালোবাসাই প্রকাশিত হচ্ছে দিবস-রজনী। তবু এই নিখিল ভালোবাসা এখন কি এসে আশ্রয় নিল মুঠোফোনে, বুড়ো আঙুলে লিখে চলা এসএমএসে কিংবা স্ট্যাটাসে, আইপ্যাডে, ল্যাপটপে, ডেস্কটপের ১৪ ইঞ্চিতে! ভালোবাসার স্ট্যাটাস কি এখন পরিণত হয়েছে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে?
নারী-পুরুষের মধ্যে কী যে এক দুর্নিবার টান, তার ব্যাখ্যারও কোনো শেষ নেই। কবিরা কবিতা লিখে, শিল্পীরা ছবি এঁকে, গায়কেরা গান গেয়ে, বিজ্ঞানীরা নিরীক্ষা করে কোটি কোটি পাতা লিখলেন। তবু কি ব্যাখ্যা পাওয়া গেল?
প্রেম বা ভালোবাসা জিনিসটা আসলে ব্যাখ্যা করার নয়। এমনকি প্রেম করারও নয়, এটা হয়ে যায়। সবারই জীবনে প্রেম আসে। প্রেম আসুক বা না আসুক, ভালোবাসাকে জগতের সবাই ভালোবাসে। তাই তো যেকোনো গানেই শুধু তুমি আর আমি... তুমি আর আমি ছাড়া নাকি গান হয় না, কবিতা হয় না, শিল্প-সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে প্রেম ছিল, আছে, থাকবেও হয়তো।
ফেসবুকের স্ট্যাটাসের বড় অংশ জুড়ে তাই ভালোবাসা। আমার তরুণতর বন্ধুরা, সহকর্মীরা, ভ্রাতুষ্পুত্রীরা অর্ডার দিয়ে রেখেছে, আপনি প্রেমের কবিতা দেবেন স্ট্যাটাসে। আমরা সেটা শেয়ার করব। উৎসাহ পেয়ে লেগে যাই।
সকালবেলা লিখি:
বারান্দাতে অলকানন্দাগুচ্ছ,
জানান দিল এখনো তুমি ঘুমুচ্ছ।
আকাশে চাঁদ উঠেছে, পূর্ণিমায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। আমাকে বসে বসে স্ট্যাটাস লিখতে হচ্ছে:
আমি যখন চাঁদের নিচে দাঁড়াই,
মুগ্ধ, কাঁপি, তোমাকে খুব হারাই।
তারপর চাঁদ দেখব কী, একটু পর পর ফেসবুকেতে নোটিশ দেখি, কটা লাইক পড়ল। গবেষকেরা বলছেন, ফেসবুক হলো আত্মপ্রেমের চূড়ান্ত কারখানা, যে বেশি ফেসবুকিং করে সে নার্সিসিজমে ভোগে। হবেই হয়তো। আমার মতো আত্মপ্রেমিক তো আমি কাউকে দেখি না। আমাদের এক বন্ধু বইমেলা উপলক্ষে নিজের বইসংক্রান্ত স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, ভাইরে, বই কিনতে হবে না, আমি চাই লাইক। এই স্ট্যাটাসে একটা লাইক দিন।
তবু বলি, দিন যতই পাল্টাক, নারীপুরুষের যোগাযোগের মাধ্যম যতই সহজ হোক, যত সহজেই ছেলেটি মেয়েটির হোস্টেলে ঢুকে পড়তে পারছে মোবাইলে-ফেসবুকে, ভালোবাসার রহস্যটা তত উন্মোচিত হয়ে পড়েনি। এখনো রবীন্দ্রনাথই ভরসা:
সখী ভালোবাসা কারে কয়?
সে কি কেবলই যাতনাময়?
সে কি কেবলই চোখের জল
সে কি কেবলই দুখের শ্বাস
লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ?
কিংবা তারাশঙ্করের কবি থেকে যখন কেউ স্ট্যাটাস দেয়, যে যাহারে ভালোবাসে, সে তাহারে পায় না কেনে, বুকটা কেন যে মোচড় দিয়ে ওঠে।
এই ভালোবাসা দিবসে ‘একজন বন্ধু চাই’ জাতীয় বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন, এ রকম দু-চারটা স্ট্যাটাস আমি রচনা করে দিই।
১. একা আছি ভালোই আছি,
বকছি কত আবোল তাবল,
তোমায় পেলে ভালোই হতো!
জোছনা গোলাপ সবই ডাবল।
২. তোমার জন্য জন্মেছিলাম
তোমার জন্য হলাম বড়,
তোমার জন্য মরছি আমি,
ইনবক্সে মেসেজ করো।
৩. ভালোবাসা দিবসে
একা থাকবে কি বসে?
৪. আজ সারা দিন তোমায় নিয়ে ভাবব
আজ সকালে এটাই আমার কাব্য
একবার একেবারেই রোমান্টিক কয়েকটা পঙিক্ত লিখে বেশ লাইক পেয়েছিলাম:
যদি কাউকে না বলিস
তোকে একদিন দেখাতে নিয়ে যাব
কাউকে বলবি না
আমি একটা সমুদ্র গড়ছি
একটু একটু করে
অনেকটা হয়ে গেছে খোঁড়া...
যদি কাউকে না বলিস একদিন তোকে ওই দ্বীপেও নিয়ে যাব...
মাত্র দুদিন আগের ঘটনা। বইমেলায় এক ভদ্রলোক দুটো বাচ্চা নিয়ে এসেছেন। অহনা আর মোহনা। দুটো বই নিলেন। দুটো অটোগ্রাফ দুই মেয়ের জন্য। তারপর ‘ফাঁদ’ বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা শেলীর জন্য। ওদের মা। তিনি আমাকে এই বইটা উপহার দিয়েছিলেন অনেক বছর আগে।’
আমি বললাম, তিনি কই?
‘তিনি মারা গেছেন। ক্যানসারে।’
আমি কী লিখব? আমি কী লিখব? শেলী আপা! শেলী ভাবি! আপনি কোথায় আছেন? কেমন আছেন? আপনার স্বামী আজও আপনাকে মনে রেখেছেন। ‘ফাঁদ’ বইটা দেখলে আপনার কথা তাঁর মনে পড়ে। বইমেলা দেখলে আপনার কথা মনে পড়ে। আহা রে, বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে আমি তাকাতে পারি না। আমরা কিছুই লিখিনি, তারাশঙ্করের কবি নিতাই যা লিখেছেন,
ভালোবেসে মিটিল না সাধ
কুলাল না এক জীবনে।
হায়রে জীবন এত ছোট কেনে?
আমি পাষাণ, আমি বুক বেঁধে রেখেছি, আমাদের বন্ধু তাপসের কথা আমি বলতে পারব না, আহা রে আগামী সোনা, ফুলের মতো বাচ্চাটা, তোমার মামণি নীতা গান গাইত, ও তোতাপাখি রে, শেকল খুলে দিতে পারি আমার মাকে যদি এনে দাও... তোমার মামণি আকাশের তারা হয়ে গেছেন, গত বছর এমনি সময়ে তোমরা এসেছিলে ঢাকায়, বইমেলা করতে, শাহবাগ করতে, তোমরা বাবা-ছেলে ফিরে গেলে, মা ফিরলেন না, বাংলাদেশের আকাশে তারা হয়ে রইলেন...গত মে মাসটা আমি তোমাদের বাসায় আমেরিকায় ছিলাম, সেদিনও তুমি ফোন করে বললে, ‘আনিশ চাচ্চু, তুমি কই, আই ওয়ান্ট টু সি ইউ...।’ তাপস ফেসবুকে নীতার ছবিগুলো দিচ্ছেন, আজ ইনবক্সে পাঠিয়েছেন নীতার জন্য গানের সিডির প্রচ্ছদ...
আমার চোখ ভেসে যায়, আমার বুক ভেঙে যায়। জীবন এত ছোট কেনে? জীবন এত ছোট কেনে?

ভালোবাসার স্ট্যাটাস by আনিসুল হক

ভালোবাসা কি এখন এসে ঠেকল এক দিনের ব্যাপারে? ভালোবাসার স্ট্যাটাস কি এখন পরিণত হয়েছে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে? জানা যাক সাহিত্যিক আনিসুল হকের লেখায়। সেই সঙ্গে রইল তাঁর দেওয়া ভালোবাসার কিছু নমুনা স্ট্যাটাস।

সম্মেলনে অংশ নিতে দুই পক্ষ জেনেভায়

দুই পক্ষের দীর্ঘ লড়াইয়ে বিপর্যস্ত সিরিয়ার হোমস শহর।
সেখানে আটকা পড়ে আছে বেসামরিক লোকজন। বাইরে থেকে
যাচ্ছে না পর্যাপ্ত ত্রাণ। অবরুদ্ধ লোকজনকে সরিয়ে আনতে
কয়েক দিন ধরে চলছে যুদ্ধবিরতি। এই সুযোগে রোববার
শহর ছেড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে কিছু মানুষ। ছবি: রয়টার্স
সিরিয়ায় রক্তপাত বন্ধের পথ খুঁজতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় গতকাল সোমবার দ্বিতীয় পর্বের শান্তি সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহী পক্ষের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশ নিতে জেনেভায় পৌঁছেছেন। এদিকে সিরিয়ার অবরুদ্ধ হোমস শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নিতে ও ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ দিতে যুদ্ধবিরতি আরও তিন দিন বৃদ্ধি করতে রাজি হয়েছে উভয় পক্ষ। গত রোববার হোমস থেকে আরও ৬১১ জন বেসামরিক নাগরিককে বের করে আনা হয়েছে। জেনেভায় অনুষ্ঠিত সিরিয়া শান্তি সম্মেলনের প্রথম পর্ব গত ৩১ জানুয়ারি শেষ হয়।
যদিও ওই সম্মেলন থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা পাওয়া যায়নি। তখন বিদ্রোহীরা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে অনড় ছিল। অন্যদিকে সরকারি প্রতিনিধিরা বাশারের পদত্যাগের দাবি সরাসরি নাকচ করে চলমান ‘সন্ত্রাসবাদ’ বন্ধের বিষয়ে আলোচনার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। যদিও সম্মেলন শেষে জাতিসংঘ ও আরব লিগের দূত লাখদার ব্রাহিমি বলেছিলেন, দুই পক্ষই বেশ কিছু বিষয়ে ‘একমত হয়েছে’। প্রথম পর্বের সম্মেলনে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন বিদ্রোহীদের জোট ন্যাশনাল কোয়ালিশনের প্রধান আহমেদ জাবরা। তবে তিনি দ্বিতীয় পর্বের সম্মেলনেও বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। সিরিয়ার সরকারের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ মুয়াল্লেম। দ্বিতীয় পর্বের সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই দুই পক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করার কথা ছিল লাখদার ব্রাহিমির। এরপর মঙ্গলবার দুই পক্ষকে নিয়ে যৌথ অধিবেশন বসার কথা। এদিকে হোমস শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের বের করে আনা ও ত্রাণ সরবরাহের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে জাতিসংঘ ও রেড ক্রিসেন্ট। রেড ক্রিসেন্টের সিরিয়া কার্যালয় থেকে জানানো হয়,
রোববার ৬০০ জনের মতো অবরুদ্ধ মানুষকে বের করে আনা হয়েছে। ত্রাণ হিসেবে ৬০ প্যাকেট খাবার ও দেড় হাজার কিলোগ্রাম ময়দা বিতরণ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, হোমস শহর থেকে ৬১১ জনকে বের করে আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২১০ জন নারী, ১৮০টি শিশু, ৯১ জন বৃদ্ধ ও ১৩০ জন তরুণ রয়েছেন। গত শুক্রবার ৮৩ জন মানুষ অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পান। হোমসে বিচ্ছিন্নভাবে গোলাগুলি ও ত্রাণের বহরে হামলার ঘটনা ঘটলেও সরকার ও বিদ্রোহীরা যুদ্ধবিরতি তিন দিন বাড়িয়েছে। এ সময় হোমস থেকে অবরুদ্ধদের বের করে আনা ও ত্রাণ তৎপরতা চলবে। প্রথম তিন দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ গত রোববার শেষ হয়। জাতিসংঘে প্রস্তাব তুলবে ফ্রান্স: সিরিয়ার অবরুদ্ধ শহরগুলোতে ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রবেশপথের ব্যবস্থা চেয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তুলবে ফ্রান্স। গতকাল সোমবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবিয়াস বলেন, প্রস্তাবে জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ ও খাদ্য সহায়তা পাঠানোর জন্য এ ধরনের প্রবেশপথের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হবে। বিবিসি, আল-জাজিরা ও এএফপি।

এবার পদত্যাগের হুমকি দিলেন কেজরিওয়াল

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
দিল্লি বিধানসভায় দুর্নীতিবিরোধী জন লোকপাল বিল পাস না হলে পদত্যাগ করার হুমকি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গত রোববার তিনি এক হুমকি দিয়েছেন। আগামী বৃহস্পতিবার বিধানসভায় ওই বিল উত্থাপন করার কথা রয়েছে। বিল পাস হলে ‘জন লোকপাল’ নামে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। ওই প্রতিষ্ঠান সন্দেহভাজন যেকোনো রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দুর্নীতি তদন্ত করতে পারবে। তবে জন লোকপাল বিল কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লি বিধানসভায় উত্থাপন করা যাবে কি না, তা নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট একটি আইন প্রত্যাহার করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধের কাছে চিঠিও লিখেছেন কেজরিওয়াল। আম আদমি পার্টির (এএপি) প্রধান মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল বলেন, ‘জন লোকপাল বিল আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিল বিধানসভায় পাস না হলে আমি পদত্যাগ করব।’
তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার ওই বিল বিধানসভায় তোলা হবে। আইনি জটিলতার বিষটি নিয়ে কথা বলতে গতকাল সোমবার দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জংয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন কেজরিওয়াল। পরে লে. গভর্নরের কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। লে. গভর্নর সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধে মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের সঙ্গে একমত। কিন্তু যেকোনো প্রক্রিয়া ভারতের সংবিধানের আওতায় হতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছেন। কংগ্রেসও মনে করে, জন লোকপাল বিল বিধানসভায় তোলার আগে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি নিতে হবে। আর দিল্লি বিধানসভার বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টিও (বিজেপি) জন লোকপাল বিল কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন নেওয়ার পরই বিধানসভায় তোলার পক্ষে নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়েছে। বিবিসি ও এনডিটিভি।

সুশীল কৈরালা নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী

সুশীল কৈরালা
নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ সুশীল কৈরালা। দেশটির আইনপ্রণেতারা পার্লামেন্টে গতকাল সোমবার তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেন। দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে চলমান অচলাবস্থা থেকে উত্তরণে সুশীলকে এখন নেতৃত্ব দিতে হবে।
সাধারণ নির্বাচনের দুই মাসেরও বেশি সময় পর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হলো। ৭৫ বছর বয়সী সুশীল কৈরালা দেশটির মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসের প্রধান। প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচনে তিনি পার্লামেন্টে ৫৫৩ ভোটের মধ্যে ৪০৫টি ভোট পেয়েছেন। এএফপি।

সৃষ্টিতে সফল, অতিষ্ঠ জীবন

ফ্ল্যাপি বার্ড
‘ফ্ল্যাপি বার্ড’ নামের অনলাইনভিত্তিক জনপ্রিয় কম্পিউটার গেমটির স্রষ্টা এনগুয়েন হা দং ইন্টারনেট থেকে তাঁর ওই গেম সরিয়ে নিয়েছেন। কারণ হিসেবে ভিয়েতনামের ওই নাগরিক বলেছেন, ফ্ল্যাপি বার্ডের তুমুল সাফল্যে তাঁর ‘সাদামাটা জীবন’ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্ল্যাপি বার্ড গেমটি খেলা বেশ কঠিন এবং একধরনের আসক্তি তৈরি করে। সম্ভবত দুর্বোধ্যতার কারণেই এটি গত মে মাসে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর ও গুগলের প্লে স্টোর থেকে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা বিনা মূল্যের মোবাইল গেমসের তালিকায় প্রথম সারিতে চলে আসে ফ্ল্যাপি বার্ড। অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে এক বার্তায় হা দং লিখেছেন,
ফ্ল্যাপি বার্ড তাঁর একটি সাফল্য। তবে এটি তাঁর সাদামাটা জীবনযাপনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায়। তাই এখন তিনি গেমটিকে ঘৃণা করেন। ফ্ল্যাপি বার্ড ব্যবহারকারীদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করে হা দং গত শনিবার লিখেছেন, ‘আমি এখন থেকে ২২ ঘণ্টার মধ্যে গেমটি বন্ধ করে দেব। এটি আর চালাতে পারছি না। এর সঙ্গে আইনি কোনো ব্যাপার যুক্ত নেই।’ হা দং একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অনলাইন বিজ্ঞাপন থেকে তিনি গেমটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার আয় করতেন। এএফপি।

চাই দুদকের দৃপ্ত পদচারণ

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে তাদের ক্ষমতায় কিছু সীমাবদ্ধতা এনে একটি সংশোধনী বিল সংসদে যায় বছর তিনেক আগে। দুদকের ক্ষমতা সীমিতকরণ-সংক্রান্ত প্রস্তাবটিতে দেশের সুশীল সমাজ ব্যাপক আপত্তি জানায়। আপত্তি জানায় দুদক। তদানীন্তন দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, এ সংশোধনী আনা হলে সংস্থাটি একটি নখ, দন্তহীন ব্যাঘ্রে পরিণত হবে। আইনটি দীর্ঘকাল পড়ে ছিল সংসদে। দুদকের নখ, দাঁত ছিল অক্ষত। কিন্তু সেগুলো কতটুকু, কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে, দেশবাসীর তা জানা। হঠাৎ করে গত নভেম্বরে সংশোধনী বিলটি পাস হয়ে যায়। দুদক আইনে নতুন সংযোজিত ৩২ ধারায় বিধান করা হয়, এ আইনে কোনো জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা পাবলিক সার্ভেন্টকে অভিযুক্ত করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসরণ করতে হবে।
সে বিধি অনুসারে আবশ্যক রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। এতে দুদকের স্বাধীন সত্তা সীমিত হয়। কার্যকারিতা কমে যাবে বলে আশঙ্কা করেন অনেকেই। সুশীল সমাজ এবারও তীব্র আপত্তি করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এ বছরের জানুয়ারি মাসে এক জনস্বার্থ মামলার রিটে হাইকোর্ট বিভাগ বিধানটি বেআইনি ও বৈষম্যমূলক বলে বাতিল করে দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তাদের নখ আর দাঁত অক্ষতই রইল। দেশবাসী আশা করতে পারে, এ নখ আর দাঁতের ব্যবহার তারা করবে মনুষ্য রূপধারী হিংস্র কিছু দানবের প্রতি। যে দানবেরা ঘুষ, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি আর ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে জনস্বার্থ বিপন্ন করে নিজেরা লাভবান হচ্ছে। এখানে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের পটভূমিকা কিছুটা আলোচনার দাবি রাখে। আমরা অনেক চড়া মূল্যে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনাগুলোর মধ্যে ছিল আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করলে দেখা যাবে, শাসনব্যবস্থা কার্যকর হলে অর্জন আরও বেশি হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার আমাদের শাসনব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়েছে—এমনটাই দেখা যায়। এ বিষয়ে আমাদের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অকার্যকর বলেই প্রতিপন্ন হয়। দাবি ওঠে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার। দাবি ওঠায় সুশীল সমাজ। পাশাপাশি দাবিটির প্রতি সমর্থন দেয় উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো। এর মাঝে বাংলাদেশ জাতিসংঘের দুর্নীতি দমন কনভেনশন অনুসমর্থন করে। এসব কিছুর ফলে ২০০৪ সালে সংসদে গৃহীত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন আইন।
আইন প্রণয়নের পর কয়েক দফায় কমিশন গঠন-পুনর্গঠন হয়েছে। চারদলীয় জোট সরকারের সময়কার প্রথম কমিশন তো নিজদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে দিব্যি দুই বছর কাটিয়ে দিয়েছিল। নিষ্ফলা ছিল সে কমিশনটি। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুনভাবে আরেকটি কমিশন গঠিত হয়। এটার ওপর আবার তখনকার সরকারের একটি অংশের প্রবল নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে অতি সক্রিয় ছিল সে সময়কার কমিশন। অভিযোগ আছে পক্ষপাতিত্বসহ আরও অনেক কিছুর। কিছু অভিযোগের সত্যতা থাকতেও পারে। তবে দুর্নীতি করলে কোনো না কোনো সময় আইনের আওতায় আসতে হবে—এ চরম বার্তাটি সে কমিশন সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাফল্যের সঙ্গে দেশবাসীকে দেয়। দুর্ভাগ্যজনক হলো, তবে বিভিন্ন কারণে তাদের সে প্রয়াস স্থায়ী রূপ পায়নি। বরং ২০০৯ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর একশ্রেণীর লোক দলবল নিয়ে নেমে পড়লেন দুর্নীতির মহোৎসবে। এটাই আমরা দেখলাম। আগেকার জোট সরকার থেকে ভিন্ন কিছু ঘটল—এমন দেখা গেল না। ফলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে তাঁদের কারও কারও সম্পদের নিট স্ফীতি ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক সহস্র গুণ হওয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনা আমাদের সামনে এল। আর তা এল নির্বাচন কমিশনে ২০০৮ ও ২০১৩ সালে তাঁদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করেই। প্রথমত, দুদক এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই বলে এড়িয়ে যেতে চাইল। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে জানাল, তারা এই জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্ত করবে। দু-একটি ক্ষেত্রে তা শুরু হয়েছে বলেও মনে হয়। তবে এ ‘কৃষ্ণগহ্বর’ থেকে দুদক উল্লেখযোগ্য কিছু বের করতে পারবে—এমনটা বিশ্বাস করতে ভরসা হয় না। তাদের বরাবরের মতো সরকারের সন্তুষ্টি বিধান করেই চলতে হবে।
অন্তত নিকট অতীতের ঐতিহ্য তারা ভাঙতে সক্ষম হবে—এমন মনে হয় না। এ আশঙ্কা করলে আমাদের সংশয়বাদী বলে গাল দিতে পারে। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা সামনে চোখ রাঙাচ্ছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রথমত আগের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। নিযুক্ত হন নতুন চেয়ারম্যান। মেয়াদ সম্পন্ন হলে কমিশনার দুজনও নতুনদের দ্বারা স্থলাভিষিক্ত হলেন। এ নতুন কমিশন সরকারের বিরুদ্ধে যাঁরা আছেন, তাঁদের মামলাগুলো গুরুত্ব দিয়ে করার চেষ্টা করছে। এর বেশি কিছু নয়। ২৭০ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পটি আটকে যায় মূলত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। এ অভিযোগের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই দুদক জাতির কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করেনি। বরং দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকারের যে বক্তব্য, তার আগ বাড়িয়ে আরও জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন তদানীন্তন দুদক চেয়ারম্যান। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে অকারণে ফাঁসিয়ে দিতে কেউ বলবে না। তবে সম্ভাব্য সন্দেহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান, মামলা দায়ের আর তদন্ত দোষের কিছু নয়। বিষয়টি নিয়ে কানাডার আদালতে কিন্তু একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পদ্মা সেতু নিশ্চয়ই একদিন হবে। স্বাভাবিকভাবেই এর ব্যয় বৃদ্ধি পাবে দুই-তিন গুণ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে অবশিষ্টাংশের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রয়াসও পিছিয়ে গেল। এখানে মূল দায় যাদেরই হোক, স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দুদকের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দেশবাসীর কাম্য ছিল। এমন আশা করছিল উন্নয়ন সহযোগীরাও। এতে ঋণ চুক্তিটি হয়তো বা রক্ষা পেত। আইন ও অবয়বে ভিন্ন রূপ নিলেও কাজেকর্মে দুদক কিন্তু তার পূর্বসূরি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর ছায়াই অনুসরণ করে চলছে। অথচ কমিশনারদের নিয়োগ-প্রক্রিয়া অনেক মর্যাদাসম্পন্ন।
তাঁদের অপসারণও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো একটি জটিল প্রক্রিয়াসাপেক্ষ। দায়িত্ব পালনে তাঁদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। সামান্য সময়ের জন্য যেটুকু আইনি জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তা-ও অপসারিত। তা সত্ত্বেও সংস্থাটি তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষতার ছাপ রাখতে কিছুমাত্র সক্ষম হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না। আমাদের দেশে এ-জাতীয় অবস্থা শুধু দুদকেই, তা নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানেই এ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার কিসে তুষ্ট হবে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে চায় অনেকে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ভেঙে পড়েছে। জাতীয় প্রয়োজনে তারা সাড়া দিতে সক্ষম হচ্ছে না। দুদক প্রসঙ্গ এখানে বারবার আসবে। দুর্নীতির ব্যাধি আজ গোটা জাতিকে গ্রাস করে ফেলছে। সংবর্ধনা সভায় সরকারের উচ্চ পদাধিকারী ‘ঠাট্টা করে’ আজ মাইক্রোফোনে ক্রেস্টের পরিবর্তে ক্যাশ চাইছেন। এ ধরনের ‘ঠাট্টা’ ক্ষমতার অপব্যবহার তথা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে কি না, তা দুদকেরই দেখার কথা। তারা কিছুটা সক্রিয় হলে এর আংশিক নিরাময়ও সম্ভব। আইনি সমর্থন, অবকাঠামো ও লোকবল সবই আছে তাদের। কোথাও অপূর্ণতা থাকলে এটা মেটাতে দাবি জানাতে পারেন। একটু নড়েচড়ে উঠলেই সতর্ক হতে শুরু করবেন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা।
তবে জানা যায়, দুদকের নিম্নপদস্থ ব্যক্তিদের হাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনাবশ্যক হয়রানির শিকার হয় কিছু ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’। প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও নিবিড় তদারকির ব্যবস্থা থাকলে এ-জাতীয় অবস্থার অবসান ঘটাতে সহায়ক হবে। আর যেসব ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ দুর্নীতি করে না, তারা কোনো স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির দ্বারা সাময়িক হয়রানি হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কমিশনের অনুমোদন ব্যতীত এ আইনে কোনো মামলা রুজু করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। তবে নিজে লোভের বশীভূত হয়ে বা অন্যের চাপে বেআইনি কাজ করলে যথাযথ ফল ভোগ করতেই হবে। পরিশেষে থাকছে, প্রতিষ্ঠানটিকে সবাই স্বাধীন ও সক্রিয় দেখতে চায়। আশা করে, সব জড়তা কাটিয়ে এরা আইনের বাতাবরণে এ-জাতীয় দায়িত্ব পালনে তৎপর হবে। এখন কিন্তু নখ, দাঁত সবই রয়ে গেল তাদের। তাই অক্ষমতার কোনো অজুহাত দেওয়া যাবে না। অবশ্য নখ-দন্তধারী কিছু হিংস্র প্রাণীও পোষা থাকতেই পছন্দ করে। দুদক অন্তত নিজেদের এ ধরনের সন্দিহান অবস্থা থেকে বাইরে আনতে সচেষ্ট হবে—এ প্রত্যাশা রইল।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

আমরা শপথ রাখতে পারিনি

রুনি ও সাগর
কী ঘটেছিল সেদিন? যে ঘটনার পর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার? যে ঘটনার পর পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির আশ্বাস দিয়েছিলেন? মামলার প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির জন্য তদন্তের ভার গোয়েন্দা বিভাগের কাছ থেকে সরিয়ে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। র‌্যাবের দায়িত্ব গ্রহণের পর কবর থেকে ঘটা করে লাশ ওঠানো হয়, ডিএনএ সংগ্রহের নামে বয়ে গেল দুটি বছর। লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান তদন্ত কর্মকর্তারা। আরও একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, যিনি সেই ঘটনা উদ্ঘাটন করতে না পারলেও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পিছপা হননি। সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছিলেন একজন সাংবাদিক নেতা। শেষ ভরসা ছিল সরকারপ্রধানের কাছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বলেছিলেন, সবার বেডরুমে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কি বিচারের বাণী নিভৃতেই কেঁদে যাবে? যে ঘটনা নিয়ে এত নাটকীয়তা, আসলে কী ঘটেছিল সেদিন?
আজও জানা হলো না। প্রতিদিন কত ঘটনাই তো ঘটে, সব খবর কি আমরা জানতে পারি? তবে সাংবাদিক হিসেবে সহকর্মীর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর অন্তরালে লুকিয়ে আছে কোন রহস্য, তা জানতে আজও উদ্গ্রীব আমরা। মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন সব সময় ঘুরপাক খায়, সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ দম্পতি, ফটোসাংবাদিক আফতাব হত্যা, পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজ দম্পতির মতো অনেক হত্যার জট খুলতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কারণ, এসব হত্যার পেছনে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল না। তাহলে কি ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যার পেছনে কোনো স্বার্থ লুকিয়ে আছে? সাগর-রুনি হত্যার পর সাংবাদিকেরা এক হয়ে লাগাতার আন্দোলনে রাস্তায় নামেন। একের পর এক কর্মসূচি দেওয়া হয় হত্যার নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনে, যেসব কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন সাধারণ সংবাদকর্মীরা। প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন মতাদর্শের সাংবাদিকেরা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সাগর-রুনি, তোমাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। এই ঐক্য অটুট থাকবে। তখনকার একটি শপথের কথা খুব বেশি কানে বাজে আজও—যারা সাংবাদিকদের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে, ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবে, তারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
কিন্তু সেই সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নেওয়া ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ ভঙ্গ করেছেন নেতৃত্বে থাকা সাংবাদিকেরা। খোলস পাল্টিয়েই ক্ষান্ত হননি, সেই সঙ্গে বোল পাল্টাতেও দেরি করেননি। নিঃস্বার্থভাবে আমরা যারা সাগর-রুনিসহ সব সাংবাদিক হত্যার বিচার চেয়েছি, একই দাবিতে অটল রয়েছি। নিজেদের অধিকার আদায়ে আমরা এক থাকতে পারি না, নিজেদের গুণের প্রকট অভাব থাকলেও দোষের ছড়াছড়ি, তাহলে অন্যের কথা তুলে ধরব কীভাবে আমরা? সাগর-রুনির একমাত্র বংশধর ‘মেঘ’ আজ সবার মধ্যেও একা। আলোচিত এই সাংবাদিক দম্পতির হত্যার নেপথ্য নায়কদের পর্দার আড়াল থেকে বের করে আনা হবে কি না, জানি না মেঘ মা-বাবার হত্যার বিচার পাবে কি পাবে না। তাতে কারও কোনো ক্ষতি না হলেও সাংবাদিকতার জগতে যে এক বিশাল ক্ষতি হলো, তা নিশ্চিত। সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা নেই, এটা সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার। শুধু মেঘের জন্য বলতে চাই, অনিশ্চিত এই পেশা থেকে শত মাইল দূরে থাকো। ঝড়ের আকাশে কালো মেঘ নয়, তুমি এক ফালি সাদা মেঘ হয়ে ভেসে থেকো বিশাল আকাশে।
দিপন দেওয়ান: স্টাফ রিপোর্টার, বাংলাভিশন।

মানুষের পেটে গ্যাস বিস্ফোরণ

গ্যাসে চীনে এক নারীর (৫৮) পেট ফুলে বিস্ফোরণ ঘটে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তিনি পানাহার করেছিলেন মাত্রা ছাড়া। ক্রমেই গ্যাস জমে ফুলে উঠছিল তার পেট। নিরুপায় হয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন আর চিকিৎসকরাও অস্ত্রোপচারের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু অগ্নিঝরা এক বিস্ফোরণ দিল সব ভণ্ডুল করে। সম্প্রতি চীনের একটি হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে।
সূত্র পিটিআই। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা চীনা নিউজ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সোমবার পিটিআইয়ের খবরে জানানো হয়, জিয়াংসু প্রদেশে এই ব্যতিক্রমী ঘটনাটি ঘটে। তবে বিস্ফোরণ-পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে খবরে সুস্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। প্রৌঢ় ওই চীনা নারী শুধু অতি ভোজই করেননি, মদও পান করেছিলেন মাত্রাতিরিক্ত। এতে তার পেট ফুলে ওঠে। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় তার পাকস্থলীতে থাকা গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। চিকিৎসকরা জানান, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই নারীর পুরো পাকস্থলীই অপসারণ করা হয়েছে। রোগীর পাকস্থলীতে থাকা ইথাইল অ্যালকোহল অস্ত্রোপচারের বৈদ্যুতিক ছুরির সংস্পর্শে আসার পর এ বিস্ফোরণ ঘটে।

বাঘা তেঁতুল- ক্যাশ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

পারস্যের কবি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওমর খৈয়াম বলে গেছেন: ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকির খাতায় শূন্য থাক...’।
ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাইগুলো লিখেছিলেন এই ভেবে যে তাঁর মৃত্যুর হাজার বছর পরেও কোনো কোনো দেশের মন্ত্রী-সাংসদের এই উপদেশের প্রয়োজন হবে। নগদ টাকাকেই বলা হয় ক্যাশ। ইংরেজি শব্দ ক্যাশের অর্থ হলো ধাতব মুদ্রায় বা কাগজের নোটে বিনিময়যোগ্য টাকা।
বহুকাল থেকেই এই উপমহাদেশে কৃতী ব্যক্তিদের সংবর্ধনা দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সেই ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রবল বেগে আজকাল সরকারি দলের কৃতীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। সংসদের চিফ হুইপকেও তাঁর এলাকার মানুষ গণসংবর্ধনা দেন। সংবর্ধনায় উপঢৌকন গ্রহণ করতে করতে ক্লান্ত মাননীয় চিফ হুইপ মাইকে ঘোষণা দেন: ‘আগামীকাল দলীয় কার্যালয়ে সকাল নয়টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত বসব। যদি কেউ [কারও] উপঢৌকন দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে আর এই ক্রেস্ট না, ক্যাশ চাই, ক্যাশ। বোঝেন নাই? নির্বাচন করতে গেলে অনেক টাকা লাগে। কাজেই ক্যাশ দিয়েন, খুব ভালো হইবে। কাল দেখা হবে সবার সঙ্গে। আজ আর কোনো ক্রেস্ট নেব না। সমস্ত ক্রেস্ট আমি পরে নেব।’ [সমকাল]
সংবর্ধনার শুভসংবাদ কাগজে ছাপা হওয়ার পর তিনি নাখোশ হন। বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে বলেন: ‘সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ২৫-৩০ হাজার লোক জমায়েত হয়েছিল। উন্মুক্ত ময়দানে আয়োজিত অনুষ্ঠানটিতে কেবল ফুল ও ক্রেস্ট গ্রহণ করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। অন্ধকার নেমে এলে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে—এই তাগাদা থেকে...গল্পচ্ছলে ফুল ও ক্রেস্টের পেছনে অর্থ খরচ না করে দলের কাজে অর্থ ব্যয়ের পরামর্শ দিই।’ তিনি বলতে চেয়েছেন, দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংবাদিকেরা এই রিপোর্ট করায় তাঁর সম্পর্কে ‘মিস ধারণা’-র সৃষ্টি হয়েছে ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে’।
মানবেতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচনের পরে মন্ত্রী-সাংসদদের সংবর্ধনার জ্বরে সমগ্র দেশ ভুগছে। এর একটি সমাজতাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। ক্রেস্ট-প্রত্যাশীদের সমালোচনা করছে মিডিয়া, কিন্তু ক্রেস্ট প্রদানকারীরা থেকে যাচ্ছেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে। সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টির বিচার-বিশ্লেষণ না করলে মাননীয়দের প্রতিও করা হবে অবিচার, আর যে ভক্তকুল ফুল, ক্রেস্ট ও ক্যাশ নিয়ে ছুটছেন সংবর্ধনাস্থলে, তাঁদের প্রতিও করা হবে না সুবিচার।
এই যে ২৫-৩০ হাজার মানুষ গভীর ভালোবাসা থেকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা দিতে সভাস্থলে ছুটে যান, তাঁদের কি কোনো কাজকাম নেই? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী ও তালেবেলেমরা গেল। তাদের শিক্ষকেরা মহান পেশা ফেলে ছুটলেন। কৃষকেরা তাঁদের খেতখামার ফেলে গেলেন। কৃষিশ্রমিকেরা—যাঁদের ক্যাশ ও কাইন্ড কোনো কিছুই দেওয়ার সামর্থ্য নেই—তাঁরাও জমিতে মই বা নিড়ানি দেওয়া বাদ দিয়ে গেলেন। কামারের হাপরে সেদিন জ্বলেনি আগুন, কারণ তাকেও যেতে হয়। কুমার তার হাঁড়ি-পাতিল বানানো বাদ দিয়ে গেলেন ওই মহতী অনুষ্ঠানে। তাঁতিদের বাড়িতে সেদিন মাকুর খটখট শব্দ হয়নি। জেলেরা যাননি বিল-বাঁওড় ও নদীতে মাছ ধরতে। এলাকার সৎ ও কর্মঠ সরকারি-আধা সরকারি কর্মকর্তাদের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। অফিসের কাজ ফেলে গণসংবর্ধনায় না গেলে পক্ষকালের মধ্যে সোজা বান্দরবান বা খাগড়াছড়ি।
এ ধরনের আয়োজনে যাওয়া না-যাওয়ারও তাৎপর্য বিরাট। ওই দিনই কারও বিয়াইবাড়ি পিঠা নিয়ে যাওয়ার কথা। সারা রাত গিন্নি পিঠা বানিয়েছেন। গৃহকর্তা সংবর্ধনায় না গিয়ে পিঠার পাত্র নিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যান। যৌতুকের ব্যাপারে এমনিতেই ঝামেলায় আছেন।
কিন্তু জমির সীমানা নিয়ে তাঁর সঙ্গে যাঁর বিবাদ চলছে, তিনি তাঁর এই অনুপস্থিতির সুযোগের সদ্ব্যবহার করবেন। পরদিনই বাজারে গিয়ে নেতার কোনো চামচাকে বলবেন, ওই লোকটি বা তার বাবা একাত্তরে খানসেনাদের ক্যাম্পে ভুনা খিচুড়ি আর মুরগির ছালুন সাপ্লাই দিত। আর একটু নির্মম হলে বলবেন, মেয়েলোক সাপ্লাই দিত। সুতরাং এ-জাতীয় সভায় না যাওয়ার স্পর্ধা কার?
আখেরি জামানা বা কলিকালে সবকিছুই উল্টে গেছে। আগের দিনে কেউ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে তিনি এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতেন। যিনি তাঁকে ভোট দেননি, তা জানা সত্ত্বেও, তাঁকে দেখে বলতেন, চাচা, আপনাদের ভোটেই আজ আমি এমপি। দোয়া করবেন। এখন মাননীয়রা নির্বাচনের পর ভোটারদের হুকুম করেন, নির্বাচন করতে এত্ত টাকা লাগে। ব্যাটা ভোট দিয়েছিস তো কী হয়েছে? ক্যাশ দে। বঙ্গীয় গণতন্ত্রের মর্মবাণীই: ক্যাশ।
মধ্যযুগের বাঙালি কবি বলেছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। বঙ্গীয় গণতন্ত্রের মর্মবাণী: সবার উপরে ক্যাশ
সত্য তাহার বাইরে নাই। গত নির্বাচনের প্রার্থীদের ক্যাশের ও সম্পদের কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া গেছে। এখন মাইক থেকে ঘোষণা হচ্ছে: ক্যাশ চাই, ক্যাশ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।