Saturday, May 18, 2013

ফিরে এল লাক্ষার সোনালি দিন by আনোয়ার হোসেন

একসময় লাক্ষার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী বর্ধিষ্ণু গ্রাম বিনোদপুরকে বলা হতো ‘সোনার বিনোদপুর’। সেখানকার লাক্ষাচাষিদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ঈর্ষা করত আশপাশের গ্রামের লোকজন। নানা গল্প প্রচলিত ছিল বিনোদপুরের লাক্ষাচাষিদের ‘টাকার গরম’ নিয়ে। বিনোদপুরে চাষিদের দেখাদেখি পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে ছড়াতে থাকে লাক্ষার চাষ। চাহিদা বৃদ্ধি ও লাক্ষার অপার সম্ভাবনা দেখে ১৯৬১ সালে কৃষি বিভাগ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ১০০ বিঘা জমির ওপর লাক্ষা বীজের খামার স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৮৫ সালে স্থাপন করে দেশের একমাত্র লাক্ষা গবেষণা কেন্দ্র। কিন্তু চারপাশে আমবাগানে কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি ও লাক্ষা বিপণনের ক্ষেত্রে চোরাচালানের অজুহাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে চাষি হয়রানির কারণে ক্রমে লাক্ষা হারিয়ে যায় বিনোদপুর থেকে। হারিয়ে যায় লাক্ষার সোনালি দিন। অন্যদিকে বরেন্দ্রভূমির রুক্ষ কঠিন মাটিতে নীরবে-নিভৃতে বাড়তে থাকে লাক্ষার চাষ। নাচোলের মাক্তাপুরে বেলাল উদ্দীন, সাদিকুল ইসলাম ও রবিউল ইসলাম এবং কাজলা গ্রামের জহুরুল ইসলাম ও তাঁর সাত ভাই, মজিবুর রহমানসহ আরও কয়েকজনের লাক্ষা চাষে সাফল্যের হাত ধরে আবারও ফিরে আসে লাক্ষা। দুটি গ্রামের ৪০০-৫০০ চাষি এখন সম্পূর্ণভাবে লাক্ষার ওপর নির্ভরশীল। তিন বছর আগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট নাচোলের মাক্তাপুর ও কাজলাকে ‘লাক্ষা গ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
লাক্ষা গ্রামে একদিন:
নাচোল উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে লাক্ষা গ্রাম মাক্তাপুর। গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো ও সফল লাক্ষাচাষি বেলাল উদ্দীন। তাঁর ছেলে মো. ইসরাইলও (২৩) বাবার হাত ধরে একজন লাক্ষাচাষি।
লাক্ষা চাষ নিয়ে ইসরাইল বলেন, ‘আগেরবার এক কেজি লাক্ষা বেচ্যা দুই মণের বেশি ধান কিনেছি। এক কেজি লাক্ষার দাম ৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। এবারও এক কেজি লাক্ষার দাম ৫০০ টাকা দিয়্যা শুরু হয়েছে। হামার বাপ একদিন পরের দুয়ারে কাম করতোক। সেই বাপ হামার দোতালা বাড়ি কর‌্যাছে।’বেলাল উদ্দিন জানালেন, এখন নাচোলের ৯০-৯৫ ভাগ বরইগাছেই লাক্ষা চাষ হচ্ছে। টানা ২৫ বছর ধরে লাক্ষা চাষ করলেও কখনো ক্ষতির মুখে পড়েননি। ছিলেন গৃহস্থবাড়ির কামলা। এখন নিজেই সচ্ছল গৃহস্থ। আরেক চাষি সাদেকুল ইসলাম আড়াই বিঘা জমি কিনেছেন, বাড়ি করেছেন।মাক্তাপুরে ছিলেন আগে ৫০ জন লাক্ষাচাষি। এ বছরই আরও ৫০ জন বেড়েছে।নাচোলের আরেকটি লাক্ষা গ্রাম কাজলা। এই গ্রামের প্রায় ২০০ পরিবার লাক্ষা চাষের সঙ্গে জড়িত।
পরিচয় ও চাষ: লাক্ষা একপ্রকার অতি ক্ষুদ্র পোকা ক্যারিয়া লাক্ষা নিঃসৃত রজনজাতীয় পদার্থ। লাক্ষা পোকার ত্বকের নিচে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা একপ্রকার গ্রন্থি থেকে আঠালো রস নিঃসৃত হয়, যা ক্রমান্বয়ে শক্ত ও পুরু হয়ে পোষক গাছের ডালকে আচ্ছাদিত করে ফেলে। পোষক গাছের ডালের এই আবরণই লাক্ষা বা লাহা নামে পরিচিত।
বরইগাছেই লাক্ষা চাষ সবচেয়ে লাভজনক। প্রতিবছর দুটি মৌসুমে চাষ হয়। একটি কার্তিক মৌসুম অন্যটি বৈশাখ। তবে বৈশাখ মৌসুমে ফলন বেশি। বৈশাখ মৌসুমে চাষ করার জন্য ১৬০ থেকে ১৮০ দিন আগে বরইগাছ ছাঁটাই করতে হয়। ছাঁটাই করা গাছ থেকে বের হওয়া কচি ডালে বীজলাক্ষা কাঠি বেঁধে দিতে হয়। সাত দিনের মধ্যে সেই কাঠি থেকে বীজ ছড়িয়ে পড়ে গোটা গাছে। বৈশাখ মৌসুমে চাষ করার জন্য কার্তিক মাসে বীজ গাছে বাঁধতে হয়। বৈশাখে লাক্ষা তোলার সময় কিছু ডাল রেখে দেওয়া হয় বীজ করার জন্য। এসব ডাল থেকে আষাঢ় মাসে (মধ্য জুনের পরে) লাখ লাখ বাচ্চা লাক্ষা বের হয়। এক ফুট করে বীজ লাক্ষার ডাল কাটা হয়। ৫০টি বীজলাক্ষার ডালকে এক তুড়ি বলে। এক তুড়ি ডাল এক থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয় লাক্ষা গবেষণাকেন্দ্র থেকে। তবে চাষিরাই বীজলাক্ষা সংরক্ষণ করেন। 
ব্যবহার: লাক্ষার আছে বহুবিধ ব্যবহার। কাঠের আসবাব বার্নিশ করা এবং বিভিন্ন ধরনের পেইন্ট তৈরির কাজে ব্যবহূত হয়। অস্ত্র ও রেলওয়ে কারখানায়, বৈদ্যুতিক শিল্প-কারখানায় অপরিবাহী বার্নিশ পদার্থ হিসেবে, ডাকঘরের চিঠি, পার্সেল ইত্যাদি সিলমোহর করার কাজে, চামড়া রং করা ও স্বর্ণালংকারের ফাঁপা অংশ পূরণে লাক্ষা ব্যবহূত হয়।
লাক্ষা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান জানালেন, সাম্প্রতিককালে ওষুধশিল্পের ক্যাপসুলের আবরণ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। লেবুজাতীয় ফলের সংরক্ষণ গুণ বাড়ানোর জন্য আবরণ হিসেবে, চুইংগাম ও চকলেটের আবরণ হিসেবেও এর ব্যবহার রয়েছে।
বিপণন: ডাল থেকে ছাড়ানো কাঁচা লাক্ষা ভালোভাবে পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে দানা লাক্ষা তৈরি করা হয়। এই দানা লাক্ষাকে কাপড়ের তৈরি পাইপের মধ্যে ঢুকিয়ে আগুনে তাপ দিয়ে বানানো হয় টিকিয়া। এ টিকিয়া বিক্রি হয় বাজারে। কাঁচা লাক্ষা থেকে টিকিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা রয়েছে রাজশাহী ও নাচোলে। কারখানার মালিকেরা চাষিদের কাছ থেকে কাঁচা লাক্ষা কিনে নেন।
যে যা বলেন: বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপপরিচালক আবুল কালাম আযাদ জানান, বর্তমানে লাক্ষা থেকে যে আয় হয়, তা অন্য কৃষিপণ্যের চেয়ে অনেক বেশি। এক বিঘা জমির ধানে যে আয় হবে, তার চেয়ে বেশি আয় হবে দু-তিনটি বড় বরইগাছে লাক্ষা চাষ করে। এ বছর নাচোলের ৮০ হাজার বরইগাছে লাক্ষা চাষ হয়েছে। ভবিষ্যতে নাচোলসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে লাক্ষা চাষ আরও বাড়বে।
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের লাক্ষার বার্ষিক চাহিদা ১০ হাজার মেট্রিক টন। অথচ উৎপাদন মাত্র এক হাজার মেট্রিক টন। এর ৪৫ ভাগই উৎপন্ন হয় নাচোলে। বাকি লাক্ষা আসে ভারত থেকে বৈধ ও অবৈধ পথে। লাক্ষার বহুল ব্যবহারের কারণে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বিশ্বে চাহিদার ৭০ ভাগ উৎপাদিত হয় ভারতে। বাকি ৩০ ভাগ লাক্ষা হয় বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ডে।
মোখলেসুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া লাক্ষা চাষের উপযোগী। কেবল অতিবৃষ্টি আর অনাবৃষ্টি লাক্ষা চাষে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ বরইগাছ আছে, তাতে লাক্ষা চাষ করলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।

দুই হাজার কোটি ডলারের পোশাক খাত এখনো সরকারনির্ভর by শওকত হোসেন

দেশে তৈরি পোশাক খাত গড়ে উঠেছে মূলত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে। শুরু থেকেই সরকার এই শিল্পকে সব ধরনের নীতি-সহায়তা দিয়ে আসছে। মূলত, প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারের এই পোশাক খাত এখনো পুরোপুরি সরকারের ওপরই নির্ভরশীল।দেশে পোশাক খাতের যাত্রা শুরু হয়েছিল বেসরকারি উদ্যোগেই। উন্নত দেশ থেকে পঞ্চাশের দশকের দিকে পোশাক কারখানা মেক্সিকো হয়ে অন্যান্য দেশে সরে আসতে শুরু করে। সত্তর দশকের শেষের দিকে তা বাংলাদেশেও আসতে থাকে। উন্নত দেশ থেকে সরে আসার বড় কারণ ছিল উচ্চ শ্রম মজুরি। ফলে সস্তা মজুরি ও অতিরিক্ত শ্রমশক্তি থাকায় বাংলাদেশ খুব সহজে সুযোগটি গ্রহণ করে। সে সময়ে সরকারও নানা ধরনের নীতি-সহায়তা দেয়। আর্থিক দায় অনেকটাই গ্রহণ করে ব্যাংকগুলো। আবার স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ পায় নানা ধরনের অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা।বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এখানে এই খাতের উত্থানের দুটি পর্যায় আছে। যেমন, ২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত কোটাসুবিধা ভোগ করত বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশের জন্য একটি নিশ্চিত বাজার ছিল। ২০০৫ সাল থেকে কোটাব্যবস্থা উঠে গেলে প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এই পর্বেই বাংলাদেশের সাফল্য বেশি। ২০০৫ সালের পর বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা বেড়েছে ৩০ শতাংশ।
শুরুর কথা: ১৯৭৮ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস ফ্রান্সে ১০ হাজার ছেলেদের শার্ট রপ্তানি করেছিল। সেটাই ছিল বেসরকারি খাতের সরাসরি প্রথম রপ্তানি। তবে শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রথম প্রতিষ্ঠান ছিল দেশ গার্মেন্টস। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে সাবেক আমলা নুরুল কাদের খান প্রতিষ্ঠিত এই দেশ গার্মেন্টস ১৯৭৯ সালে ১২ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। যদিও ১৯৭৪ সালে সরকারি সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে কিছু পোশাক রপ্তানি করা হয়েছিল।
পোশাক তৈরির কারখানার ধারণা নুরুল কাদের খান পেয়েছিলেন কোরিয়া থেকে। তিনি কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির কারিগরি সহায়তাও নিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, কাজ শেখানোর জন্য দেশ গার্মেন্টসের ১৩০ জনকে সে সময়ে পাঠানো হয় কোরিয়ায়। তাঁরা দাইয়ুতে হাতে-কলমে কাজ শিখেছিলেন। সেই ১৩০ জনের অনেকেই পরে পোশাক কারখানার মালিক হন। তাঁদের বড় অংশই আজ পোশাক খাতের বড় বড় উদ্যোক্তা। এরপর বাংলাদেশে পোশাক খাতে বড় আকারে বিনিয়োগ করে কোরিয়ার ইয়াংগুন। তারা ১৯৮০ সালে সুইডেনে প্রথম জ্যাকেট রপ্তানি করে।
আন্তর্জাতিক নানা সুবিধা: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠার আগে গ্যাট আলোচনার সময় থেকেই মাল্টি ফাইবার এগ্রিমেন্টের (এমএফএন) আওতায় বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে কোটাসুবিধা পেয়েছে ২০০৪ সাল পর্যন্ত। শুরুতে এটাই ছিল এখানে পোশাক কারখানা তৈরির প্রধান প্রণোদনা।
২০০৫ সালে কোটা ব্যবস্থা উঠে গেলেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েনি বাংলাদেশ। কারণ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা (জিএসপি) পায় বাংলাদেশ। কানাডার বাজারেও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। আরও কয়েকটি দেশও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ায় পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি এখনো বাড়ছে।
সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা: ১৯৮২ সালের শিল্পনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এ সময়ে আমদানি বিকল্প শিল্প থেকে সরে এসে বেসরকারি খাত নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পকে প্রধান লক্ষ্য বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপরই দুটি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুরুতে ছিল ডেডো বা ডিউটি ড্র ব্যাক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা কাঁচামাল আমদানির সময় শুল্ক দিলেও রপ্তানি করার পর তা ফেরত পেত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিলম্ব, দুর্নীতি ও প্রক্রিয়াগত সমস্যা হওয়ায় এর পরিবর্তে বন্ড-সুবিধা চালু করা হয়। এর মাধ্যমে পোশাক মালিকেরা বিনা শুল্কে পোশাক তৈরির সব ধরনের কাঁচামাল আমদানি করতে পারতেন। শুরুতে এই সুবিধা কেবল পোশাক খাতই পেত। পরে তা বিশেষায়িত বস্ত্র ও চামড়া খাতকেও দেওয়া হয়।
১৯৮৬-৮৭ সময়ে আরেকটি বড় সুবিধা দেওয়া হয় পোশাক খাতকে। সরকার চালু করে স্থানীয় ঋণপত্র বা ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সব ধরনের কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক পণ্য আনতে উদ্যোক্তার কোনো ধরনের অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না। উদ্যোক্তাকে কেবল রপ্তানির আদেশ আনতে হয়। বাকি সব অর্থায়নের দায়িত্ব ব্যাংকের। পোশাক খাতের ব্যাপক অগ্রগতির পেছনে বন্ড-সুবিধা এবং স্থানীয় এলসির ভূমিকাই প্রধান বলে মনে করেন গবেষকেরা।
১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে আরেকটি বড় প্রণোদনা দেয় সরকার। বস্ত্র ও পোশাক খাতকে এ সময় ২৫ শতাংশ নগদ সুবিধা দেওয়া হয়। পরে অবশ্য ২০০২-০৩ অর্থবছরে তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ এবং এখন তা দেওয়া হচ্ছে ৫ শতাংশ হারে। আবার ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে তৈরি পোশাক খাতকে কোনো ধরনের মূল্য সংযোজন কর দিতে হয় না।
ধনী হওয়ার সহজ উপায়: ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আলী রশীদ পোশাক খাত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে পোশাক মালিকদের একটি বড় অংশ রপ্তানির নামে কাপড় আমদানি করে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মুনাফা করেছিলেন। আশির দশকে কাপড় আমদানিতে ১৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। একই সময়ে বন্ড-সুবিধা ব্যবহার করে বিনা শুল্কে কাপড় আনতেন পোশাক মালিকেরা। সে সময়ে নিয়ম ছিল চাহিদার অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি কাপড় আনা যাবে। তৈরির সময় কাপড় নষ্ট হয়—এই কারণে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
অধ্যাপক আলী রশীদ বলছেন, অনেক মালিক সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ দিয়ে ১৫ শতাংশের অনেক বেশি কাপড় এনে তা বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন। কাপড় বিক্রির একটি বড় জায়গা ছিল পুরান ঢাকার ইসলামপুর। নব্বইয়ের দশকে এসে বাণিজ্য ব্যবস্থা উদার করা হলে কাপড়ের আমদানি শুল্ক কমানো হয়। এর ফলে খোলা বাজারে পোশাক মালিকেদের কাপড় বিক্রি কমে যায়। তবে এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, দেশে সে সময় ব্যবসা-বাণিজ্য করার ব্যয় অনেক বেশি হলেও অবৈধভাবে কাপড় বিক্রি করে পোশাক মালিকেরা অতিরিক্ত মুনাফা করেছেন।
বিজিএমইএসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এখনকার অনেক বড় বড় উদ্যোক্তাই বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছিলেন সে সময়ে খোলা বাজারে কাপড় বিক্রি করে। তাঁরা কারা তা-ও সবাই জানে। পাশাপাশি কোটাব্যবস্থা চালু থাকার সময় ছোট পোশাক মালিকদের কাছে কোটা বিক্রি করেও অবৈধভাবে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলেন এখনকার অনেক বিখ্যাত পোশাক মালিক।
সব শেষে অধ্যাপক আলী রশীদ প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতের উত্থানের পেছনে কারণ কী? এটা কী উদ্যোক্তোদের দক্ষতা, নাকি সরকারের নীতি-সহায়তা। তিনি মনে করেন, অনেক ভালো উদ্যোক্তা আছেন। তা সত্ত্বেও সরকারের নীতি-সহায়তাই এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) এবং বিশ্বব্যাংকের জন্য তৈরি এই গবেষণাপত্রটির নামই ছিল ‘বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের উত্থান: উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনকুশলতা অথবা সরকারি নীতি।

‘ক্রীতদাসের জীবন ছিল বাংলাদেশিদের’

ব্রাজিলে অবৈধভাবে অবস্থান করা ৮০ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছে সে দেশের পুলিশ। তবে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। পাচারকারীদের মাধ্যমে তাঁরা ব্রাজিলে গিয়েছিলেন।ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার কাছে সামামবাইয়া শহরে অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশিদের উদ্ধার করা হয়। সেখানকার আটটি বাড়িতে তাঁরা ছিলেন। তাঁদের দিয়ে ক্রীতদাসের মতো বিভিন্ন কাজ করাত পাচারকারীরা। পাচারকারীদের একটি আন্তর্জাতিক চক্রের সন্ধানও পেয়েছে পুলিশ। এদের মধ্যে বাংলাদেশিও আছে।বিবিসির খবরে বলা হয়, পাচারকারীরা মাসে দেড় হাজার মার্কিন ডলার আয় করার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের ব্রাজিলে নিয়ে আসে। এ জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে তারা নেয় ১০ হাজার ডলার। ব্রাজিলের প্রতিবেশী দেশ পেরু, বলিভিয়া ও গায়ানা হয়ে তাঁরা ব্রাজিলে ঢোকেন।বাংলাদেশিদের উদ্ধারের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছে ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে ঘটনা তদন্তে সে দেশের কর্তৃপক্ষকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে দূতাবাসের পক্ষ থেকে।ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক খবরে বলা হয়েছে, উদ্ধার করা বাংলাদেশিদের গ্রেপ্তার না করে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্রাজিলের শরণার্থীবিষয়ক জাতীয় পরিষদ এখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।ব্রাজিলের বিচারবিষয়কমন্ত্রী পল আবরাম জানান, ব্রাজিলের আইন অনুযায়ী মানব পাচারের শিকার এবং দুর্বিষহ পরিবেশে কাজ করছেন এমন মানুষকে মানবিক বিবেচনায় ব্রাজিলে আবাসিক ভিসা দেওয়া হয়। যাঁরা সব মেনে কোনো কোম্পানিতে কাজ করছেন তাঁদের কাজের ভিসা দেওয়া হবে এবং মানবিক কারণে অন্যদের দেশে থাকতে দেওয়া হবে।
ব্রাজিলে সম্প্রতি বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গত বুধবার ‘ফ্রিডম’ নামে অভিযান শুরু করে দেশটির কেন্দ্রীয় পুলিশ। ২০১০ সালে দেশটিতে আশ্রয় চেয়েছিলেন ৩৯ জন বাংলাদেশি। পরের বছর এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১১। আর গত বছর এই সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে সংখ্যার দিক ব্রাজিলে আশ্রয় প্রার্থনা মানুষের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে চলে যায় বাংলাদেশ। পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা লোকজনের প্রায় সবাই মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। এর মধ্যে ২০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি কক্ষ থেকে। তাঁদের কারও কোনো কাজ ছিল না, নির্মাণ খাতে কাজ খুঁজছিলেন। তাঁদের একজন মিলাদ আহমেদ। ব্রাজিলের স্থানীয় একটি পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমি দেশে ফিরে যাব না। সেখানে আমার কোনো কাজ ছিল না। এখানে আমি নির্মাণ খাতে, কসাইখানায় বা ভারতীয় রেস্তোরাঁয় কাজ করতে পারি। আমি যেকোনো কাজ করতে পারব। কিন্তু আমি যদি দেশে ফিরে যাই, পুলিশ আমার সমস্যা করবে।’

সরকার আগের অবস্থানে অনড়

নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি এবং তা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের ব্যাপারে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। এই অবস্থান হচ্ছে, নির্বাচন হবে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই। আর এ নিয়ে বিরোধী দলের কোনো আলোচনা থাকলে তা সংসদেই হবে। ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের এই অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বলে সভার একাধিক সূত্রে জানা গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রায় চার ঘণ্টা স্থায়ী ওই সভা হয়। সভার সূত্রগুলো জানায়, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন স্থির হয়ে আছে নির্বাচনকালীন সরকারে অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তিকে রাখা না-রাখার বিষয়ে। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের পক্ষে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে, নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের নীতি ও অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। সভায় শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারে অনির্বাচিত কাউকে তাঁরা মানবেন না।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা ১৪ দলের সভায় বলেছেন, বিচারের প্রক্রিয়া চলবে। বিচারের রায় কার্যকরও হবে। এটা নির্বাচনী অঙ্গীকার। এ থেকে কোনোভাবেই তিনি সরে যাবেন না।
সভায় চারটি সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে ১৪ দলকে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী দিতে এবং একসঙ্গে নির্বাচন করার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারের চাপ ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় দিশেহারা বিএনপি by টিপু সুলতান ও তানভীর মাহমুদ

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনের দুই বছরের মাথায় এসে অনেকটাই দিশেহারা অবস্থায় পড়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটি দাবি আদায়ে কয়েক দফা সময় বেঁধে দিলেও সরকারের ওপর কার্যকর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। উল্টো একের পর এক মামলা ও ধরপাকড়ের কারণে বিএনপি নিজেই এখন চাপে পড়েছে।এ অবস্থায় অনেকটা পথহারা পথিকের মতো বিএনপি কখনো বিদেশি কূটনীতিকদের পেছনে দৌড়ঝাঁপ, কখনো জোটের শরিক জামায়াতের ওপর ভরসা করে আন্দোলন, আবার কখনো ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ওপর ভর করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছে। কিন্তু কোনোটাতেই সুবিধা করতে পারেনি।এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, পুলিশ অনুমতি না দেওয়ায় দলীয় কার্যালয়ের সামনেও সমাবেশ করতে পারছে না। পুলিশের অনুমতি উপেক্ষা করে সভা-সমাবেশ করার মতো সাংগঠনিক শক্তি-সামর্থ্যও দেখাতে পারছে না দলটি। নতুন কোনো পথও খুঁজে পাচ্ছে না তারা। সাংগঠনিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠায় বিএনপির সঙ্গে সরকারও কঠোর আচরণ শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে চলেছে। এমনকি জামিনে মুক্তির পর কারা ফটক থেকে আবার আটক করা হচ্ছে।বিএনপির পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য সরকারকে বাধ্য করতে পারছে না বিএনপি। এটা দলটির জন্য একটা সংকট ও সমস্যা। এ জন্য বিএনপিকে পুরোপুরি দায়ী করা যাবে না। কেননা, ক্ষমতাসীনদের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন। তা ছাড়া সরকার প্রচণ্ড বেপরোয়া। তারা হয়তো যেকোনো সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করতেও পিছপা হবে না।
তিন দফা সময় বেঁধে দেওয়া: বিএনপির রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেন এমন একজন বিশ্লেষক বলেন, বিএনপির অনেক সাধারণ সমর্থক রয়েছেন। তার প্রমাণ, খালেদা জিয়া সমাবেশ ডাকলে যানবাহন বন্ধ করাসহ সরকারের অনেক বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও বিপুল মানুষ জমায়েত হয়। কিন্তু সেই জনতা কী নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়? সেটা হলো ‘আলটিমেটাম’। এ পর্যন্ত নির্দলীয় সরকারের দাবি মানতে সরকারকে তিন দফা আলটিমেটাম (সময় বেঁধে দেওয়া) দিয়েছেন খালেদা জিয়া। প্রথম দফায় ২০১২ সালের মার্চে ৯০ দিন সময় বেঁধে দেন। এ সময় শেষ হওয়ার পর ১১ জুন দাবি আদায়ে আবারও সময় দিয়ে বলেন, রোজার ঈদের (২০১২) পর কঠোর আন্দোলন করা হবে। সর্বশেষ ৪ মে শাপলা চত্বরে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছিলেন। সে সময়সীমা অতিক্রম করে আরও ১১ দিন পার হয়েছে। এরপর নতুন কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি দলটি।
এর আগে গত মার্চে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও এখনো একটি কমিটিও গঠিত হয়নি। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জেলা, উপজেলায় ১৮ দলের শরিকদের নিয়ে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হলেও শুধু খুলনা জেলায় তা করা হয়।
কেন সংসদ বর্জন: যেকোনো সংকটে জনগণকে দলের সঠিক অবস্থান জানাতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। দলটি কেন সংসদে যাচ্ছে না, তা মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। একেকবার একেক দাবি বা অজুহাতের কথা বলা হয়েছে। কোনোটাই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। অথচ সাংসদ হিসেবে তাঁরা সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। আর সদস্যপদ রক্ষায় মাঝে মাঝে সংসদে যান। একই কারণে আগামী ৩ জুন শুরু হওয়া বাজেট অধিবেশনে দলটি যে সংসদে যাবে, সেটা কয়েক দিন ধরেই গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছিল। বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ গতকাল শুক্রবার সংসদে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন।
সাংগঠনিক ব্যর্থতা: এক-এগারোর ধাক্কায় বিপর্যস্ত বিএনপি গত চার বছরেও সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি। অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও দলের কাউন্সিল পর্যন্ত করতে পারেনি। মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করতে জেলা সদরে কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরসহ অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে চার বছরে। কিন্তু কোনোটাই ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ১৮-দলীয় জোটে রূপান্তরিত হলেও সাংগঠনিকভাবে এর শক্তি-সামর্থ্য সামান্যতম বাড়েনি। কারণ, এ জোটের শরিকদের বেশির ভাগই নামসর্বস্ব দল। বিএনপির বাইরে একমাত্র জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত জনবল বা রাজনৈতিক পেশিশক্তি রয়েছে। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখে জামায়াত নিজেই বেকায়দায় আছে।
নেতৃত্বের আস্থাহীনতা: বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার এ মুহূর্তে বড় সমস্যা হলো, নিজ দলের কোন কোন নেতাকে তিনি বিশ্বাস করবেন বা করবেন না, সেটা ঠিক করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক মাস ধরে তিনি যেভাবে রাজপথে সর্বাত্মক আন্দোলনে নামার চেষ্টা করেছেন, দলের নেতা-কর্মীদের সেভাবে নামাতে পারেননি। ওই সূত্রটি বলছে, সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির এক সভার শুরুতে খালেদা জিয়া সব নেতার মঠোফোন জব্দ করেন, যাতে সভার তথ্য পাচার না হয়। কিন্তু ফোন জব্দ করার এ খবরও সভা শেষে ফাঁস হয়ে যায়। নেতৃত্বের মধ্যে আস্থাহীনতার এটা একটা উদাহরণ। হরতালনির্ভর রাজনীতি: বিএনপি এ অবস্থায় অনেকটা সহজ কর্মসূচি হিসেবে বেছে নিয়েছে ‘হরতাল’। সংবাদ সম্মেলন করে হরতাল ডেকেই শেষ। আগের দিন সন্ধ্যায় দু-চারটা গাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক ছড়ানো হয়। কিন্তু হরতালে নেতা-কর্মীরা কেউ আর মাঠে থাকেন না। এ অবস্থার জন্য দলটির সাংগঠনিক ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, বিভিন্ন সময়ের ভুল সিদ্ধান্ত, জনসম্পৃক্ত সমস্যা-সংকটকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে কাজে না লাগাতে পারাকে বড় কারণ বলে মনে করেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
বিএনপি ও ১৮-দলীয় জোট এ আমলে এখন পর্যন্ত ৩১ দিন হরতাল করেছে। এতে বিএনপির কোনো লাভ বা সরকারি দলের কোনো ক্ষতি হয়নি। ক্ষতি হয়েছে দেশের ও সাধারণ মানুষের।
অবশ্য দলটির নেতাদের অভিযোগ, সরকারের দমন-পীড়নের কারণে তাঁরা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও তৎপরতা চালাতে পারছেন না। সমাবেশ ডাকলে অনুমতি হবে কি না, আগের দিন বিকেল পর্যন্ত জানা যায় না। মিছিল করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। এম ইলিয়াস আলীকে গুম এবং সর্বশেষ কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করায় বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতার মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে
বিচক্ষণতার অভাব: বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতাদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য ও স্ববিরোধিতা নিয়েও বিরূপ আলোচনা আছে। শাহবাগের আন্দোলন নিয়েও একেক সময় একেক বক্তব্য ও দলীয় অবস্থান জানিয়েছে বিএনপি। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েও বিএনপি তাদের অবস্থান মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে পারেনি।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়েও নানা মত আছে দলের মধ্যে। কোনো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, কখনো নিচ্ছে না। এতে তৃণমূলের নেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
সম্প্রতি নতুন রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হলেন। এই দুই পদে নিয়োগকে বিএনপি সমর্থন করে কি না, এ ব্যাপারে বিএনপির মনোভাব কী, দলীয় কর্মী-সমর্থক ও জনগণ জানে না। যদি এ দুটি পদে নির্বাচন সঠিক বলে বিএনপি মনে করে, সেটিও পরিষ্কার করে বলা উচিত। সঠিক মনে না করলে, সে যুক্তিও তুলে ধরা উচিত।
দলের নির্দিষ্ট কোনো মুখপাত্র নেই। কোনো বিষয়ে কার কাছ থেকে দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা যাবে, সেটাও পরিষ্কার নয়। এ সরকারের শুরুর দিকে একবার নজরুল ইসলাম খানকে মুখপাত্র করা হয়েছিল। এরপর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেন। তিনি তিন দফায় কারাগারে যান। প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তরিকুল ইসলাম। তৃতীয় দফায় ফখরুল কারাগারে গেলে তরিকুল আর সমন্বয়ক হতে রাজি হননি। এরপর অগত্যা গণমাধ্যমের কাছে দলের বক্তব্য তুলে ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামানকে। তিনি এখন অঘোষিত মুখপাত্র। উপদেষ্টাকে দিয়ে দলের মুখপাত্রের কাজ করানো বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকটের আরেকটি উদাহরণ।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, মহাসচিব হওয়ার জন্য বিএনপিতে অনেকেই আগ্রহী। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব গ্রেপ্তার হলে তখন দলের সমন্বয়কারী হতে কেউ রাজি হন না মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায়।
ছাত্রদল ও যুবদলের অবস্থা আরও খারাপ। সম্প্রতি বিবাহিত, বয়স্ক ও অছাত্রদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করার পর ছাত্রদলের বিভক্তি আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে কয়েকবার ছাত্রদল আলোচনায় এসেছে, তা এসেছে নিজেরা নিজেরা মারামারি করে। যুবদলেও নেতৃত্বের মধ্যে বিভক্তি ও অবিশ্বাস প্রকট।
এ অবস্থায় খালেদা জিয়া আন্দোলনের ক্ষেত্রে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এ কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দেওয়ার কথাও বলেছিল বিএনপি। সর্বশেষ বিএনপি ভরসা করেছিল হেফাজতে ইসলামের ওপর। হেফাজতের লংমার্চ ও সর্বশেষ ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে সমর্থন দেন খালেদা জিয়া। হেফাজতের ৫ মে ঢাকা অবরোধের দিন দুপুর থেকেই স্রোতের মতো হেফাজতের কর্মীরা নগরে ঢুকছিলেন। রাজধানীর কেন্দ্রস্থল জ্বলছিল। সংঘর্ষে মারা যাচ্ছিল মানুষ। সারা দেশের মানুষ ছিল উদ্বেগের মধ্যে। ওই রকম পরিস্থিতিতেও দলের করণীয় ঠিক করতে সারা দিন বৈঠক করতে পারেনি বিএনপি। সারা দিন এ নিয়ে বিএনপির কোনো বক্তব্যও ছিল না। খালেদা জিয়া রাত সাড়ে আটটায় দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকেন। রাত সাড়ে নয়টায় তিনি ঢাকাবাসী ও দলের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন হেফাজতকে সহায়তা করা হয়।
যে হেফাজতের কর্মসূচিকে সামনে রেখে আগের দিন মতিঝিলের সমাবেশে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া, সেদিন রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত তিনি ও তাঁর দল করণীয় ঠিক করতে একসঙ্গে বসতেও পারেনি। এটাও বিএনপির সাংগঠনিক এক বিরাট সংকট। ওই রকম পরিস্থিতিতেও অন্য ৮-১০ দিনের মতোই সন্ধ্যার পর দলীয় নেত্রীর কর্মদিবস শুরু হয়। এমনকি দলটিতে কোনো ‘কোর কমিটি’ নেই, যারা এমন জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বসে করণীয় ঠিক করবে। সর্বশেষ ১৫ মে হরতাল ডাকা নিয়েও বিএনপির লেজে গোবরে অবস্থার সৃষ্টি করে। সমাবেশ করার অনুমতি না পেয়ে ওই দিন বেলা ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করে ১৯ মে হরতাল ডাকা হয়। একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। বল হয়, ঘূর্ণিঝড় মহাসেন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এ কারণে জোট নেত্রী খালেদা জিয়া হরতাল প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ এর দুই দিন আগে থেকে ঘূর্ণিঝড়ের আগাম খবর দেশবাসী জানে। গণমাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে এর গতিপথ ও সম্ভাব্য আঘাত হানা নিয়ে খবর প্রচার হচ্ছিল। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এটা প্রতীয়মান হয় যে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি রাজনৈতিক কার্যক্রমে কোনো প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-পরিকল্পনার ছাপ রাখতে পারেনি। অবশ্য এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু সীমাবদ্ধাতা হয়তো আছে। তবে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে প্রজ্ঞা বা বিচক্ষণতা দেখাতে পারেনি, এটা বলা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে এখন দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু সরকার কাউকে কেয়ার করছে না। তারা প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক।’ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভ্রান্তি: বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক চিন্তা কী, সেটাও পরিষ্কার নয়। আবার ক্ষমতায় গেলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নীতি কী হবে? চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের মতো তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে কি না? এ দেশে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ নিয়ে পশ্চিমাদের উৎকণ্ঠা আছে। এ ক্ষেত্রে আগামী দিনে বিএনপির ভূমিকা কী হবে? বিএনপি দাবি করে, তারাই জঙ্গিবাদ দমন এবং শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ শীর্ষ জঙ্গিনেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পন্ন করেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার যেভাবে জঙ্গিগোষ্ঠীকে দমন করেছে, সেটা নিয়ে বিএনপির মূল্যায়ন কী, এ নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। বরং ৪ মের সমাবেশে খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, দেশে কোনো জঙ্গি নেই। অতীতের মতো আবার এই যে অস্বীকার, সেটাও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
হেফাজতের ১৩ দফা বিএনপির সমর্থন করা নিয়েও পশ্চিমা কূটনীতিকেরা নানা মহলে বুঝতে চাইছেন। যদিও কোনো কোনো নেতা বলেছেন, তাঁরা ১৩ দফা নয়, আল্লাহ ও মহানবীর (সা.) অবমাননার বিরুদ্ধে হেফাজতের আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। আবার ৭ মে গায়েবানা জানাজায় সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এসে হেফাজতকে ঢাকায় ডেকে ১৩ দফা বাস্তবায়ন করে খুশিমনে ফেরত পাঠাব।’ বিএনপির অবস্থান কোনটা, তা পরিষ্কার নয়।
খালেদা জিয়া গত বছরের অক্টোবরে ভারত সফর করেন। সেখান থেকে ফিরে এসে চিরাচরিত ভারত বিরোধিতা থেকে সরে আসেন। তখন বিএনপির নেতারাও বলেন, ভারত বিরোধিতা বলে কোনো অবস্থান তাঁদের নেই।
ওই সফরে প্রণব মুখার্জিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এর কয়েক মাস পর ঢাকায় আসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। কিন্তু খালেদা জিয়া একপক্ষীয়ভাবে তাঁর সাক্ষাৎ বাতিল করলেন। এটাকে খালেদা জিয়ার ‘গুরুতর রাজনৈতিক বোকামি’ এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কারণ খালেদা জিয়ার সম্মতিতেই প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হয়েছিল।
নেতৃত্ব সংকট: খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মামলা নিয়েও আছে নানা শঙ্কা। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা-ও নির্ধারণ করা নেই। দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান পাঁচ বছর বেশি সময় ধরে লন্ডনে। সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। কবে দেশে ফিরবেন, তা কেউই জানে না।
খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় জাতীয় সংসদে কাউকে উপনেতা করতে পারেননি। এখন বিরোধী দলে গিয়েও সংসদ উপনেতা করতে পারেননি কাউকে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, শুধু চেয়ারপারসন স্থায়ী কমিটির সভা ডাকতে পারেন। খালেদা জিয়া কোনো কারণে গ্রেপ্তার হলে (ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তেমন ইঙ্গিত আছে) দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভাও কেউ ডাকতে পারবেন না। মাঠপর্যায়ে রয়েছে নেতৃত্বের সংকট ও বিভাজন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিএনপি কঠিন অবস্থার মধ্যে আছে। নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে দলটি এ অবস্থার মধ্যে পড়েছে। আরেকটি বড় সংকট হলো, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ঠিক করার জন্য সময় আছে খুব কম। যা করার তা হয়তো চার-পাঁচ মাসের মধ্যে করতে হবে। এ জন্য দুই পক্ষকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে। যেটা বিএনপি ও সরকার কেউই দেখাচ্ছে না।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মার্কিন আইন প্রণেতাদের আহ্বান

বাংলাদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্রেটিক পার্টির ২৪ জনের বেশি সদস্য। গতকাল শুক্রবার পিটিআইয়ের প্রকাশিত এক খবরে এ কথা জানা গেছে। সাভারে রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১০০-এর বেশি পোশাককর্মী নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা এক চিঠিতে আইনপ্রণেতারা ওই আহ্বান জানান। চিঠিতে বলা হয়, ‘শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং আরও দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে কঠোর, সমন্বিত ও আপসহীন সরকারি সমর্থনের কোনো বিকল্প নেই বলে আমরা সরল কথায় বিশ্বাস করি।’ চিঠিতে স্বাক্ষরকারী আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বাংলাদেশবিষয়ক কংগ্রেশনাল ককাসের প্রতিষ্ঠাতা ও কো-চেয়ার এবং ডেমোক্রেটিক ককাসের ভাইস চেয়ার জো ক্রাউলিও রয়েছেন। মার্কিন আইনপ্রণেতারা চিঠিতে রানা প্লাজা বিপর্যয়ের পাশাপাশি গত বছরের নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাশনসের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডসহ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক বিভিন্ন দুর্ঘটনা এবং শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের অমীমাংসিত রহস্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পিটিআই আরও জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের ওই চিঠি ছাড়াও আটজন প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটরের একটি দল বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনে—বিশ্বের এমন প্রধান কয়েকটি রিটেইলার (খুচরা বিক্রেতা) প্রতিষ্ঠানকে এক চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে সিনেটররা বাংলাদেশের পোশাক কারখানার অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে চুক্তি সই করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ক্যাটো করপোরেশন, ওয়াল-মার্ট, সিয়ারস, কোলস, টার্গেট, ম্যাকিস, জেসি পেনি, গ্যাপ, ম্যাংগো, জর্জ ওয়েস্টন লিমিটেড, ভিএফ করপোরেশন, দ্য চিলড্রেনস প্লেস স্টোরস ও কোর্ট ইংগেলস। চিঠিতে তাঁরা যুক্তি দিয়ে বলেন, নিজস্ব পর্যবেক্ষণ বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত পদক্ষেপ নয়, বরং মার্কিন ও ইউরোপীয় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে—এমন বৈশ্বিক চুক্তিই বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি কেবল নিশ্চিত করতে পারে। ডেমোক্রেটিক পার্টির এসব সিনেটর বলেন, এখন থেকে ১০০ বছর আগে ট্রায়াঙ্গল শার্ট ওয়েস্ট প্রতিষ্ঠানটিতে অগ্নিকাণ্ডে রানা প্লাজার মতোই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে পোশাককর্মীদের অবস্থার উন্নয়ন ও তাঁদের নিরাপত্তায় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। তাঁরা বলেন, এখন রানা প্লাজার ঘটনাটি বিশ্ববাসী দেখার পর বাংলাদেশ এবং গোটা বিশ্বের শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে স্পষ্ট, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। পোশাক আমদানিতে সুযোগ-সুবিধা কমাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র: পোশাকশিল্প খাতে ভয়াবহ কয়েকটি দুর্ঘটনার জের ধরে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে সুযোগ-সুবিধা কমাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করার জন্য চাপ সৃষ্টির প্রয়াস হিসেবে এ পদক্ষেপ নিতে পারে প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রশাসন। গতকাল ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্ক বা কোটার কোনো সুবিধা ২০০৪ সাল থেকে নেই বলে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এ সুবিধা পেতে বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সফরকারী একটি দল এ সুবিধা দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে।

সবকিছুই পোশাকমালিকদের জন্য by মনজুর আহমেদ ও জাহাঙ্গীর শাহ

বস্ত্র ও পোশাক খাতের মালিকেরা সরকারকে কর দেন অল্পই, কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি টাকার নগদ সহায়তা নিয়ে যান সরকার থেকে। অন্যরা সরকারকে যে পরিমাণ কর দেন, তার দশ ভাগের এক ভাগও পোশাক খাত থেকে সরকার পায় না।পোশাকমালিকদের কাছ থেকে সরকার আয়করও পায় সামান্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথি অনুযায়ী, অধিকাংশ পোশাকমালিক অল্পই আয় করেন। আয়করও দেন অনেক কম। পোশাকমালিকদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকিরও নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে এনবিআরে।পোশাক খাতের জন্য রয়েছে সরকারের নানা ধরনের সুবিধা। কাঁচামাল আনা থেকে শুরু করে রপ্তানি পর্যন্ত, প্রতিটি পর্যায়েই এই খাতকে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বার্থে পোশাক খাত যা চায়, ঠিক তা-ই পায়।অথচ বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক খাতে যেসব বড় ও দেশ জুড়ে আলোড়িত অনিয়ম-জালিয়াতি হয়েছে, তার বেশির ভাগই করা হয়েছে পোশাক খাতকে দেওয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা অপব্যবহার করে। আর সব ক্ষেত্রেই পোশাক খাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা হল-মার্ক গ্রুপও এভাবেই অর্থ জালিয়াতি করেছে। যদিও রপ্তানিতে দ্রুত প্রসারের কারণে হল-মার্ককে পুরস্কারও দিয়েছে বিজিএমইএ। জালিয়াতি ছাড়াও রয়েছে মালিকদের অবহেলায় ভবনধস, আগুনে পুড়ে বা পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা। এ কারণে বাংলাদেশও বারবার চরম ভাবমূর্তির সংকটে পড়ছে।কর্মসংস্থান তৈরি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় বলে পোশাকমালিকদের সব ধরনের নীতি ও কর সহায়তা সরকার দিচ্ছে মূলত জনগণের করের টাকায়। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এ কারণেই দেশ ও জনগণের প্রতি পোশাকমালিকদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নত এবং জীবন ধারণের উপযোগী মজুরি দিয়ে মালিকদের এই দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটে পোশাকমালিকদের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, ‘অধুনা আমাদের দেশে একটি লক্ষণীয় বিত্তশালী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সরকার সব সময় তাদের কাছ থেকে যথাযথ রাজস্ব বা কর আদায় করতে পারে না।’বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে রপ্তানির কাজ পেলে এখন আর তেমন কোনো অর্থেরই প্রয়োজন হয় না পোশাকশিল্পের মালিকদের। ব্যাংকই সব ব্যবস্থা করে দেয়। যেমন বিদেশ থেকে কাপড় বা সুতা আনতে অথবা দেশের মধ্য থেকে তা সংগ্রহ করতে ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসি’ অথবা স্থানীয় ঋণপত্রের অর্থ ব্যাংকই জোগায়। আনুষঙ্গিক উপকরণ (এক্সেসরিজ) আনতে মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ পান পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। আবার ইসিসি বা এক্সপোর্ট ক্যাশ ক্রেডিটের (রপ্তানির জন্য নগদ ঋণ) নামে এলে শ্রমিকের মজুরির অর্থও দেয় ব্যাংক। ব্যাক টু ব্যাক ও ইসিসির সুদের হার ১৩ শতাংশ। দেশের অন্য কোনো খাতের উদ্যোক্তাদের এই ঋণ নিতে সুদ দিতে হয় অনেক বেশি। উৎপাদন খাতের বাইরে সুদ দিতে হয়ে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। এর বাইরে বন্ড-সুবিধা তো রয়েছেই।  একমাত্র পোশাক খাতের জন্যই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে কোনো এককালীন জমা (ডাউন পেমেন্ট) নেওয়া হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ছাড় দিয়েছে। কেবল তা-ই নয়, পোশাক খাতের ২৭০টি রুগ্ণ শিল্পের আসল ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং ঋণকে ব্লক (একটি হিসাবে রেখে) করে রেখে নতুন সুবিধা দেওয়া হয়েছে।  বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সরকার উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিয়েছে বলেই তৈরি পোশাক খাত দেশের অর্থনীতিতে যথেষ্ট অবদান রাখছে। পোশাকমালিকেরা নিজেরাই সব করেছেন, তাঁদের এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তাঁরা বিপুল ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছেন। কিন্তু শ্রমিকদের সেভাবে মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম মজুরি পান এ দেশের তৈরি পোশাকশ্রমিকেরা। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, পোশাকমালিকেরা দাবি করেন, তাঁদের মুনাফা কম থাকে। কিন্তু তাঁরা ‘জিরো ক্যাপিটাল’ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যাংক ঋণ দিয়েছে, সরকার নানা সুবিধা দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাঁরা ৮-১০ তলা ভবন তৈরি করেছেন, দামি যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, মালিকেরা যথেষ্ট মুনাফা না করলে এসব কীভাবে করেছেন?  সর্বোচ্চ করসুবিধা: উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকেরাই সবচেয়ে বেশি করসুবিধা পেয়ে থাকেন। রপ্তানির সময় উৎসে কর হিসেবে মাত্র দশমিক ৮০ শতাংশ (০.৮০%) দিলেই সব ধরনের কর থেকে দায়মুক্তি পায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি। উৎসে করই চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হয়। গত অর্থবছর পর্যন্ত এই কর হার ছিল দশমিক ৬০ শতাংশ। তিন বছর আগে এই হার ১ দশমিক ২০ শতাংশ করার ঘোষণা থাকলেও পোশাকমালিকদের চাপের মুখে তা কমাতে হয়েছিল। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের মার্চ মাস পর্যন্ত রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকপ্রতিষ্ঠান থেকে এক হাজার ২৭৬ কোটি টাকা কর পেয়েছে এনবিআর। আগের পুরো অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৮৮৬ কোটি টাকা। কিন্তু ওই অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে নগদ সহায়তা নিয়েছে এক হাজার ৪১২ কোটি সাত লাখ ৬০ হাজার টাকা।পোশাকশিল্প মালিকেরা পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যত টাকা সম্মানী পান, সেই হিসেবে তিনি তাঁর ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর দেন। অবশ্য বেশির ভাগ পরিচালক বা মালিক প্রতিষ্ঠানের গাড়িসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করেন। সে জন্য এই সম্পদের উৎস দেখাতে হয় না। করবৈষম্য: পোশাকশিল্পগুলো নামমাত্র কর দেয়। দেশের বড় বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ কর দেয়, তার দশ ভাগের এক ভাগ করও পাওয়া যায় না তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের কাছ থেকে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে বার্ষিক আয়ের ওপর সর্বোচ্চ সাড়ে ৪২ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটে (এলটিইউ) নিবন্ধিত দেশের শীর্ষ ও বড় ৩৫০টি প্রতিষ্ঠান ও এদের পরিচালকেরা গত অর্থবছরে (২০১১-১২) মোট নয় হাজার ৭৩১ কোটি টাকা কর দিয়েছেন। এর আগের অর্থবছরে দিয়েছে সাত হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। এলটিইউয়ের মোট রাজস্ব আদায়ের ৯৭ শতাংশ করই আদায় হয় করপোরেট কর হিসেবে। আর ৭০০ জন পরিচালকের কাছ থেকে ৩ শতাংশের মতো আদায় হয়। এ ছাড়া দেশের ৩১টি কর অঞ্চলে আরও শতাধিক প্রতিষ্ঠান করপোরেট কর হিসেবে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কর দেয়। এই এলটিইউয়ের মধ্যে বড় গ্রুপ প্রতিষ্ঠানগুলোর দু-একটি সহযোগী কোম্পানি আছে পোশাক ও বস্ত্র খাতে। এর বাইরে হাতে গোনা দু-চারটি পোশাক-বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠান আছে এলটিইউতে। পোশাক খাত এই ইউনিটে কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা করে মাত্র, কিন্তু কর দেয় না। তারা যে উৎসে কর দিয়ে এসেছে, ওটাই চূড়ান্ত দায়। কর ও ঋণসুবিধাসহ বিভিন্ন প্রণোদনা সম্পর্কে তৈরি পোশাকশিল্প মালিক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা এসব সুবিধা নিয়েছি। এর বিনিময়ে আমরা কি দেশকে কিছুই দেইনি? আমরা তো টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছি না। এ দেশেই বিনিয়োগ করেছি। প্রতিবছর ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি-আয় করছি। ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করেছি। দরিদ্র নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে।’  বন্ড-সুবিধায় ক্ষতি: শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা বন্ড-সুবিধা পায়। অর্থাৎ এই সুবিধার আওতায় প্রয়োজনীয় সুতা, কাপড়সহ কাঁচামাল আনতে কোনো শুল্ক দেন না মালিকেরা। এমনকি তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রচ্ছন্ন রপ্তানি খাতগুলোও (প্যাকেজিং, এক্সেসরিজ ইত্যাদি) এই সুবিধা পায়। রপ্তানি-প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) ছাড়া অন্য এলাকায় প্রতিষ্ঠিত শিল্প খাত এ ধরনের সুবিধা পায় না। গত বছর থেকে শুধু রপ্তানিমুখী চামড়াশিল্পকে বন্ড-সুবিধা দেওয়া শুরু হয়েছে। এনবিআরের নিজস্ব এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০০৭-০৮ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরের মোট এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বন্ড-সুবিধা নিয়েছে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকেরা। বন্ড-সুবিধা না থাকলে তৈরি পোশাকমালিকদের সমপরিমাণ অর্থ শুল্ক-কর হিসেবে দিতে হতো। নীতিবৈষম্য: ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা তৈরি পোশাকশিল্পসহ রপ্তানি খাতের মালিকেরা পান। পোশাক খাতে রপ্তানি এলসি (রপ্তানির কার্যাদেশ) পাওয়ার পর প্যাকেজিং পর্যন্ত নিজের কোনো বিনিয়োগের টাকার দরকার হয় না। সবই করে ব্যাংক। এর বাইরে গত তিন দশক ধরেই তৈরি পোশাক খাতকে কর অবকাশ সুবিধা (ট্যাক্স হলিডে) দিয়ে এই শিল্পটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতের মূলধনী যন্ত্রপাতি আনতে মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক দেন উদ্যাক্তারা। আর অন্য খাতের যন্ত্রপাতি আনতে ৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকেরা রপ্তানি ঋণ হিসাবে ৭ শতাংশ হারে ব্যাংকের অর্থায়ন পান। আবার ‘এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটায়’ রপ্তানি করে যত ডলার আয় করেন, তার ১০ শতাংশ নিজের ব্যাংক হিসাবে রাখতে পারেন তাঁরা। এই অর্থ বিদেশে গিয়ে যথেচ্ছা খরচও করেন তাঁরা। তৈরি পোশাকসহ অন্য রপ্তানিমুখী খাতগুলো রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে বর্তমানে মাত্র ৩ শতাংশ হারে ঋণ পায়। এ ক্ষেত্রে সুদের হিসাবটি নির্ধারণ হয় লন্ডনের আন্তব্যাংক লেনদেন হারের (লাইবর) সঙ্গে আরও আড়াই শতাংশ যোগ করে। বর্তমানে লন্ডনের আন্তব্যাংক সুদের হার দশমিক ৫ শতাংশ। নগদ সহায়তা: স্থানীয়ভাবে সহযোগী শিল্প গড়ে ওঠা ও রপ্তানিকে উৎসাহ দিতে বর্তমানে ১৮টি খাতকে রপ্তানির ওপর বিভিন্ন হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিগত পাঁচ বছরে রপ্তানিমুখী বস্ত্র খাতের মালিকেরা সরকারি কোষাগার থেকে চার হাজার ২১৫ কোটি টাকার নগদ সহায়তা নিয়েছেন। চলতি অর্থবছরের ১৯ মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, ৯২৩ কোটি দুই লাখ টাকার নগদ সহায়তা নিয়েছেন বস্ত্র ও পোশাক খাতের মালিকেরা। গত অর্থবছরে (২০১১-১২) এ খাতে এক হাজার ৪১২ কোটি সাত লাখ ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। এর আগের বছর এ পরিমাণ ছিল  ৮৭৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে ৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে পোশাক ও বস্ত্র খাতে। রপ্তানি প্রত্যবসানের বিপরীতে এই অর্থ দওয়া হয় রপ্তানিকারক পোশাকশিল্প মালিকদের। পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবি এ অর্থ পান আসলে সহযোগী উৎপাদকেরা। দেশের অন্য কোনো রপ্তানিমুখী খাতের ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাক খাতের তিন ভাগের এক ভাগও নগদ সহায়তা পান না। পোশাক খাতের নানা ধরনের কর ও আর্থিক সুবিধার বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (রপ্তানি ও বন্ড) নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত বন্ডসহ শুল্কসুবিধা দেওয়া হয় একটি বিকাশমান শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। একটি শিল্প বিকাশের সুবিধার সুফল শুধু উদ্যোক্তাদের কাছে যাওয়া ঠিক নয়। এই শিল্পের সুবিধা শ্রমিকদের কাছে যাওয়া উচিত।

শুল্ক সুবিধা তুলে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র!

যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ শুল্ক সুবিধা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার আভাস দিয়েছে ওবামা প্রশাসন। নাজুক কর্ম পরিবেশের কারণে অব্যাহতভাবে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রয়াস হিসেবেই শুল্ক সুবিধা হ্রাসের বিষয়টি ওবামা প্রশাসন সক্রিয়ভাবে চিন্তা করছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানানো হয়।