Tuesday, November 6, 2018

অন্তর্জালে উন্মুক্ত হলো জলির ‘ফোন এক্স’

সবার জন্য উন্মুক্ত হলো চিত্রনায়িকা জলির প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘ফোন এক্স’।
সিনেস্পট অ্যাপের মাধ্যমে দর্শকরা এই ওয়েব সিরিজটির প্রথম পর্ব ফ্রি দেখতে পাবেন বলে জানিয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইনোভেট সলিউশন।
অনন্য মামুনের পরিচালনায় বড় বাজেটের এই সিরিজে আরও অভিনয় করেছেন সানজু জন, ইমতু, লামিয়া, কাজী উজ্জ্বল এবং ভারতের সিব ট্রামবাক, মধুমিতা, শ্রাবন্তী ও মুসকান।
এতে দেখা যাবে, সময়ের আলোচিত পরিচালক ও একজন সুপার স্টারের খুন হওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি চাঞ্চল্যকর গল্প।
নির্মাতা অনন্য মামুন বলেন, ‘আমি সব সময় নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। আশা করি, দর্শকদের ভালো লাগবে।’
এদিকে জলি বলেন, ‘এটা আমার প্রথম ওয়েব সিরিজ। যদিও পুরো কাজটি ফিল্মিক। শুটিংয়ের সময় মনে হয়নি আমরা সিনেমার বাইরে কিছু করছি। গল্পটা মিডিয়ারই। ফলে দর্শকরা দেখে আরাম পাবেন।’
প্রসঙ্গত, জলি অভিনীত অন্যতম চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নিয়তি’, ‘অঙ্গার’, ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’ প্রভৃতি।

‘কওমি জননী’ এবং কওমি-আওয়ামী মৈত্রী by আনিস আলমগীর

দৃশ্যটি ভাবা যায় না। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে যখন ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা ঢাকার শাহবাগে আন্দোলনে নেমেছিলেন, তখন আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। সরকারের বিরুদ্ধে ঢাকা অবরোধের ডাক দিয়ে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল তারা। এতে সমর্থন জানিয়েছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সঙ্গে ছিলেন এইচ এম এরশাদ। এছাড়া আরও ছিল কওমিদের দুশমন মওদুদিবাদী জামায়াতে ইসলাম। সরকারকে পদত্যাগে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। সর্বশেষ ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা চত্বর’-এর মাধ্যমে তাদের কান ধরিয়ে বিদায় দেওয়া হয়েছিল।
মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দৃশ্যপট উল্টো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বড় সমাবেশে সংবর্ধনা দিয়েছেন সেই কওমি মাদ্রাসাগুলোর হাজার হাজার শিক্ষক-ছাত্র। তার সঙ্গে একইমঞ্চে এই অনুষ্ঠানে ছিলেন হেফাজতে ইসলামের আমিরআল্লামা আহমদ শফী।অনেকে বলেছেন, সমাবেশটা আকারে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সমাবেশের প্রায় সমান ছিল।
শুধু তাই নয়, যারা সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দিয়েছেন, তারা এসে ৪ তারিখ সেসব ভাস্কর্যের সঙ্গে ছবি তুলেছেন, ঘুরে ঘুরে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। আপনি হয়তো বলবেন, এটি এমন কী! গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা মানুষ জীবনে প্রথম যখন এসব দেখছে, ছবি তুলতেই পারে। ভাস্কর্য সম্পর্কে তাদের মনোভাব এখনও আগের মতোই আছে। সুযোগ পেলে ভাঙবে। আমি খুব দ্বিমত করি না কিন্তু এই বিবর্তনে মুগ্ধ না হয়েও পারি না।
তারা নাকি সুযোগ পেলে ফণা তুলবে? তুলতেই পারে। কিন্তু ৫ বছর তারা ১৩ দফা উদ্ভট দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেনি। সরকারের সঙ্গে কোনও সংঘর্ষে যায়নি, কোনও কওমি মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্র বড় কোনও জঙ্গি অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছে শুনিনি–এটাকে ইতিবাচক হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি কোথায়?
২০১৭ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল একই মাঠে। মদিনা-মক্কার খতিবরা এসেছিলেন। ছিলেন হাজার হাজার মাদ্রাসাছাত্র-শিক্ষক। কিন্তু ৪ নভেম্বরের সভা ছিল ভিন্ন। সেদিনের সভায় বসা লোকদের চেহারায় কোনও স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল না কিন্তু এবারের সভায় তারা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং ক্ষণে ক্ষণে বক্তার বক্তৃতায় তারা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এই সংবর্ধনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা-বিতর্ক চলছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দেখলাম, তাদের আফসোস প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ধর্মচ্যুতি নিয়ে। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করেছেন। সন্দেহ নেই, এটি নির্বাচনের আগে কট্টরপন্থী ধর্মীয় দলগুলোর কাছ থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি চেষ্টা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি কোনও ভোট চাইতে দেখিনি তাদের কাছে। অনেকটা তাদের বিবেকের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন। বরং তারাই প্রধানমন্ত্রীকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছেন। তাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দিয়েছেন।
ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতা আজকের পর্যায়ে এসেছে। ক্রমবিবর্তনে সভ্যতার যে উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, তাতে ধর্মেরও বড় অবদান রয়েছে। সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে যার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখা নিশ্চয়ই গর্হিত কাজ। আওয়ামী লীগ যে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে, তা কখনও ধর্মহীনতা বলে দেখিনি আমরা। সব ধর্মের সঙ্গে সহ-অবস্থানকে আওয়ামী লীগ উৎসাহিত করে। দেশে বহু ধর্মের লোক থাকবে, যে যার ধর্ম পালন করবে বাধাহীনভাবে, নির্ভয়ে। এটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ। এখানে ধর্মহীনতার কোনও অবকাশ নেই। ধর্ম ও ধার্মিকের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার কোনও বৈরিতা নেই।
আমরা কাঠ মোল্লাদের অবজ্ঞা করি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অনেকের স্ট্যাটাস দেখে বোঝা যায়, প্রগতিওয়ালাদের মধ্যেও রয়েছে চরম অজ্ঞতা। কওমিদের সম্পর্কেও তাদের ব্যাপক একটা অজ্ঞতা রয়েছে অথচ তারা শিক্ষিত লোক। কওমিদের সম্পর্কে জামায়াত-শিবির যেমন অপবাদ ছড়ায়, ওরাও তাই  করে। তারা জানে না, কওমিরা স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও মওদুদিবাদীদের ঘৃণা করে।
অন্ধকারে পড়ে থাকা কাউকে অন্ধকারে রেখে আপনার এগিয়ে যাওয়াকে প্রগতিশীলতা বলে না। অন্ধকারে পড়ে থাকা মানুষকে আলোয় আনা প্রগতিশীলদের কাজ। সারা দেশে ১৪ হাজার কওমি মাদ্রাসায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। এই কর্মঠ জনগোষ্ঠীকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার না করে দূরে ঠেলে সমাজকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন তারা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ছিলেন, দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি তাদের সেই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস দূর করবে। আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকেই মানুষ অনেক সময় চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। শেখ হাসিনা সেটা ঠিকই উপলব্ধি করেছেন। এখন কওমিদের দায়িত্ব নিজেদের তাগিদেই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আমাদের প্রগতিশীল দাবিদাররা কওমিদের ইতিহাসও জানেন না অনেকে। ১৭৫৭ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা নিয়ে ভারতে ব্রিটিশের রাজত্ব শুরু। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত কওমিদের পূর্বসুরিরাই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করেছেন। নারিকেল বাড়িয়ার যুদ্ধ, বালাকোটের যুদ্ধ–সব যুদ্ধেরই নেতৃত্বে ছিলেন কওমিদের পূর্বসুরি আলেমরা। সর্বশেষ থানাবনের যুদ্ধে হযরত এমদাদুল্লাহ্ মহাজ্জের মক্কী পরাজিত হলে ৫০ হাজার আলেমকে আন্দামানের গাছে গাছে ব্রিটিশরা ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। হজরত এমদাদুল্ল্যাহ্ সরকারও গঠন করেছিলেন। দীনেশ ভট্টকে রাষ্ট্রপতি করে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
থানাবনের যুদ্ধে পরাজয় ও ৫০ হাজার আলেম শাহাদাৎ বরণ করার পর মওলানা কাসেম নানুতুবী ১৮৬৬ সালে দেউবন্দে মাদ্রাসা স্থাপন করেছিলেন, যেন বিপ্লবী ধারার মৃত্যু না হয়। কারণ তিনি মনে করেছিলেন, ৫০ হাজার আলেমের মৃত্যুর পর বিপ্লবী ধারার মৃত্যু হবে। দেওবন্দিরা অসম্প্রদায়িক ছিলেন। তাই তারা ভারতের লোকজনের ধর্মের কথা চিন্তা করে একজন হিন্দুকেরাষ্ট্রপতি  করেছিলেন আর প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন একজন মুসলমানকে। অথচ সিপাহীরা বিদ্রোহ করে সরকার প্রধান করেছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে।
হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯০১ সালে। হাটহাজারী মাদ্রাসা সংলগ্ন দক্ষিণ পাশে একটা কালি মন্দির রয়েছে, তাও গত ১১৭ বছর ধরে। অথচ কখনও কালি মন্দির আর মাদ্রাসার মাঝে কোনও সংঘাত হয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে উভয়ে উভয়ের ধর্ম-কর্ম করে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মন্দিরটি যখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল, তখনও তারা মন্দিরটি বিনাশ করেনি। কারও বিরুদ্ধে মনগড়া কথা বলা উচিত নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাস যখন ডিজিটাল যুগের একটা বহুল প্রচলিত সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন সেটা সত্যনিষ্ঠ ও জ্ঞানগর্ভ হওয়া চাই।
বড় কওমি আলেমরা শোকরানা সভায় যে বক্তৃতা করেছেন, তাতে বুঝলাম কওমি সনদের স্বীকৃতি তারা ব্রিটিশের সময় থেকে চেয়েছিলেন। ব্রিটিশ হয়ে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সময় পর্যন্ত প্রায় দীর্ঘ ১৫০ বছর তারা স্বীকৃতি পায়নি। তবে অনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সময় সনদের স্বীকৃতি পাওয়ায় তারা খুবই খুশি হয়েছেন এবং সে আনন্দের কারণে তারা শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। মতিঝিলের ঘটনার পরে ‘কওমি জননী’ উপাধি কওমিদের কাছ থেকে পাওয়া এটা শেখ হাসিনার কর্মের স্বীকৃতি। একইসঙ্গে তার দূরদর্শিতার বিজয়ও বলা যায়।
শেখ হাসিনা সুদীর্ঘ সময় ধরে দেশের শাসন ক্ষমতায় আছেন। কওমিরা সুদীর্ঘকালব্যাপী একটা পৃথক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সমাজে অবস্থান করেছেন। তার সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক না থাকা কখনও সমীচীন নয়। কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা কওমিদের সঙ্গে সরকারের, সমাজের মূলস্রোতের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটালেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা এখন ইসলাম ধর্মের প্রচুর খেদমত করে আসছে। সব ধর্মের জন্য পৃথক ফাউন্ডেশন করা উচিত। 
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল শোকরানা মাহফিলে ওলামা-মাশায়েকরা প্রত্যেক মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিমের ৫০০০ টাকা ও ৩০০০ টাকা করে বেতন ভাতা নির্ধারণ করার দাবিও উত্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে সরকারের উচিত একটা কমিশন করে সামগ্রিক বিষয়টা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে একটা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। প্রত্যেক মসজিদের কিছু কিছু ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। অবশ্য প্রায় মসজিদে তা দিয়ে ইমাম-মোয়াজ্জিমের বেতন  দেওয়া সম্ভব হয় না।
পরিশেষে বলবো, ওলামা-মাশায়েকরা এ শোকরানা মাহফিলে একটা কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন, যদিও তাদের ক্ষুদ্র একটি অংশ রাজনীতির গন্ধ থাকার অজুহাত দিয়ে সেখানে আসেনি। দুই-এক মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে। তারা কেউ তাদের বক্তব্য দেওয়ার সময় মাহফিলটাকে শেখ হাসিনার নির্বাচনি প্রচারের মাহফিল করার চেষ্টা করেননি। অবশ্য শেখ হাসিনা নির্বাচিত হলে মসজিদে উলুধ্বনি হবে, এ অপবাদ থেকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ অব্যাহতি পেলো। একইসঙ্গে বিরাট একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় শেখ হাসিনার পক্ষে রয়েছে, তা দেশবাসী ভালোভাবে জানলো এই মাহফিলের মাধ্যমে। জামায়াতিরা যদি বিএনপির পক্ষে, তবে কওমিরাও আওয়ামীর পক্ষে–এটাও বলতে পারেন কেউ কেউ।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
anisalamgir@gmail.com

নতুন রপ্তানি নীতি: পোশাক শিল্পের মতো চামড়া খাত সুবিধা পাবে by দীন ইসলাম

রপ্তানিমুখী শিল্পকে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে আগামী তিন বছরের জন্য নতুন রপ্তানি নীতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে রপ্তানির দ্বিতীয় শীর্ষ চামড়া খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মতো সুবিধা পাবে। নতুন রপ্তানি নীতি ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পেয়েছে। আজ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে রপ্তানি নীতি ২০১৮-২১ এর খসড়া অনুমোদনের জন্য উঠবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনে নতুন রপ্তানি নীতির খসড়া (২০১৮-২১) তৈরি করা হয়েছে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নীতির খসড়ায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে নতুন তিনটি খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৫ ধরনের পণ্যকে বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে নতুন যে পণ্যগুলো ঢুকছে তার মধ্যে রয়েছে ডেনিম, ওষুধ উপকরণ (একটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস এবং  বিকারক) ও জুতা (চামড়া, অচামড়াজাত ও সিনথেটিক)।
আর বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত পণ্যগুলো হচ্ছে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারি, ফটোভোলটিক মডিউল, কাজুবাদাম, প্রক্রিয়াজাত কাঁকড়া এবং খেলনা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান রপ্তানি নীতিতে অগ্রাধিকার পণ্য হিসেবে অধিক মূল্যে সংযোজিত তৈরি পোশাক ও গার্মেন্ট এক্সেসরিজের নাম উল্লেখ ছিল। এবার সেখানে নতুন করে ডেনিম পণ্য সংযোজন করা হচ্ছে। একইভাবে পুরনো রপ্তানি নীতিতে অগ্রাধিকার তালিকায় শুধু ওষুধ ও চামড়াজাত জুতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন নীতিতে ওষুধের উপকরণ এবং অচামড়াজাত জুতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিন বছর পর পর রপ্তানি নীতি পরিবর্তন করে সরকার। বর্তমান রপ্তানি নীতিটি তৈরি করা হয়েছিল ২০১৫ সালে, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছর। পরবর্তী তিন বছরের জন্য রপ্তানি নীতির খসড়াটি তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত রপ্তানি নীতির সঙ্গে বাণিজ্যনীতি ও শিল্পনীতির সংশ্লিষ্টতা থাকায় এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খসড়া রপ্তানি নীতিতে শর্ত সাপেক্ষে বেশ কিছু পণ্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে সয়াবিন তেল ও পামঅয়েল, বাংলাদেশে চাহিদা নেই এমন মোটা দানার মুগডাল এবং গবেষণার উদ্দেশ্যে রক্তের প্লাজমা। বর্তমানে সয়াবিন ও পামতেল রপ্তানি নিষিদ্ধ পণ্য হিসেবে  অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে পার্শ্ববর্তী ভারত, নেপাল ও ভুটানে কিছু কিছু ভোজ্যতেল রপ্তানির অনুমতি পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের অনুরোধে তাই নিষিদ্ধ পণ্য তালিকা থেকে স্থানান্তর হচ্ছে ভোজ্যতেল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিশ্ব বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের সুপারিশ আমলে নিয়ে পরবর্তী তিন বছরের জন্য কিছু সংযোজন ও বিয়োজন এনে নতুন রপ্তানি নীতির খসড়া তৈরি হয়েছে। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি সম্প্রসারণ, রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনে সহজ শর্তে ঋণসহ নতুন নীতিতে রপ্তানি পণ্যে উৎসাহব্যঞ্জক সুবিধা দেওয়ার জন্য মূল্য সংযোজন হার ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে গত ৩০ জুন ২০১৫-১৮ মেয়াদের রপ্তানি নীতির মেয়াদ শেষ হয়। নতুন রপ্তানি নীতি ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে রপ্তানি নীতি ২০১৮-২১ এখনও প্রণীত না হওয়ায় আগের নীতিই কার্যকর রয়েছে।

সুন্দরী স্ত্রীকে দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ by রুদ্র মিজান

ফেসবুকের টাইম লাইনে নানা অ্যাঙ্গেলের ছবি। ভিডিও। দেখতে খুবই সুন্দরী। প্রতিদিনই একাধিক স্ট্যাটাস লিখে পোস্ট করেন। বেশিরভাগ স্ট্যাটাসই থাকে রোমান্টিক। সুন্দরী তরুণীর ছবি দেখে সহজেই আকৃষ্ট হন অনেকে। তারপর বন্ধুতা, চ্যাট। টাইম লাইনে যত রোমান্টিক চ্যাটে তার চেয়ে বেশি।
রোমান্টিকতার সঙ্গে ব্যবহার করেন শারীরিক প্রসঙ্গ। আকর্ষণ করেন ভিন্ন জগতে। সরাসারি জানিয়ে দেন অর্থের বিনিময়ে সঙ্গী হন তিনি। এভাবেই শুরু। মূলত এটি একটি চক্র। নানা কৌশলে ফাঁদ পাতা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফাঁদে পা দিলে একটার পর একটা প্রলোভন। প্রলোভনে পড়ে সর্বস্ব খুঁইয়েছেন অনেকে।
অনুসন্ধানে এরকমই একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ে এই চক্রের সদস্যদের বাস। চক্রে জড়িত করা হয়েছিল এক তরুণীকে। শেষ পর্যন্ত চক্র থেকে বের হয়েছেন ওই তরুণী। তবে, অপকর্ম থেকে থেমে নেই চক্রটি। চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন কলেজ পড়ুয়া ওই তরুণী।
মূলত অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার জন্যই বিভিন্ন নামে ফেসবুকে আইডি খুলে এই চক্র। আইডিতে নিজ স্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে ছদ্মনাম দিতো। চক্রের মূল হোতা ওই তরুণীর স্বামী তৌহিদুল ইসলাম আকাশ। তরুণীর তথ্যানুসারে, স্বামীর কথায় বাধ্য হয়েই এই অপকর্মে লিপ্ত হন তিনি। তার ফোনে কল দিতো অচেনা পুরুষরা। কথা বলতো। দীর্ঘসময় কথা বলা ছাড়াও তারা ইমো, ভাইবারে ওই তরুণীকে দেখতে চাইতো। তরুণী ক্যামেরার সামনে যেতে সম্মত না হলে মারধর করা হতো। বাধ্য হয়েই স্বামীর কথায় সেজেগুজে ক্যামেরার সামনে বসতে হতো তাকে। ওপাশে থাকা পুরুষ লোকটির নানা কথার উত্তর দিতে হতো। অভিনয় করে হাসতে হতো। আকর্ষণীয় একটা ভাব প্রকাশ করে ক্যামেরার সামনে বসতেন তিনি।
শুরুতে কথা বলেই আয় করতেন। তরুণী জানান, প্রবাসীরা কথা বলার জন্য টাকা পাঠাতো। এক ঘণ্টা কথা বললে ১০০০ টাকা পাঠাতো। কথা বলার আগেই টাকা পাঠাতো। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আগে ফোনে কল দিয়ে হাই-হ্যালো করতো। তারপর প্রবাসীদের প্রত্যাশা বেড়ে যেতো। ভিডিও কলে তরুণীকে দেখতে চাইতো তারা। তখন আরো রেট বাড়িয়ে দেয়া হতো। কিন্তু মূল কাহিনী ঘটতো সরাসরি। ফেসবুকের মাধ্যমে চ্যাট করে, ফোনে কথা বলে নিশ্চিত হওয়ার পর সরাসরি ফূর্তি করতে আগ্রহীদের ডাকা হতো ধামরাইয়ের নির্জন স্থানে। উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে পুরুষ ব্যক্তি আসতো ঠিকানা অনুসারে। তাকে রিসিভ করতেন ওই তরুণী। এজন্য তাকে নানাভাবে সাজতে হতো। কখনো থ্রি পিস, টু পিস, কখনো জিন্সের প্যান্ট, টিশার্ট বা গেঞ্জি পড়তে হতো। নির্ধারিত স্থান থেকে রিসিভ করে পুরুষ ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়া হতো নির্দিষ্ট স্থানে।
সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হতো চক্রের কয়েক জনকে। দেশীয় অস্ত্র, ক্যামেরা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতো তারা। স্বামী আকাশের কথানুসারে নেয়া হতো নির্জন ঘরে। নদীর ওপাড়ে একটি খামার বাড়িতে। ঘরে ঢোকা মাত্রই ঘটতো মূল ঘটনা। আকাশ ও তার সঙ্গীরা ওই ঘরে ঢুকে যুবককে আটক করতো। প্রথমে মোবাইলফোন, মানিব্যাগ কেড়ে নিতো। মারধর করতো। তারা এটিএম কার্ড চাইতো। তা পেলে জেনে নিতো পিন নম্বর। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিকাশ নম্বরে টাকা আদায় করতো। এভাবে এক-একজনের কাছ থেকে ৩০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করতো এই চক্র। তরুণী জানান, এই অপকর্মে কোনোভাবেই জড়িত হতে চাননি তিনি। এ নিয়ে আকাশ ও তার মধ্যে প্রায়ই কলহ হতো। কিন্তু পালিয়ে বিয়ে করেছেন। সংসার চলছিল না কিছুতেই। না খেয়েও থাকতে হয়েছে তাদের। তবু এভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে রাজি হননি। রাজি না হলে তাকে বেদম প্রহার করা হয়। বাধ্য হয়েই আকাশের কথামতো কাজ করে যেতে হতো। ক্রমেই আকাশের অত্যাচার বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত অন্য পুরুষের শয্যাসঙ্গী হতেও প্রস্তাব দেয়া হয় তাকে। এতে ক্ষুব্ধ হন তরুণী। তখনই আকাশ পাঁচলাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন।এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা   হয়। একপর্যায়ে মারধর করা হয় তাকে।
শেষপর্যন্ত আইনের আশ্রয় নিয়েছেন নির্যাতিতা। বিষয়টি তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পলাতক রয়েছে আকাশসহ এই চক্রের সদস্যরা। সিটিটিসি’র সাইবার ইউনিটের উপ-কমিশনার মো. আলীমুজ্জামান বলেন, সাইবার ক্রাইমের বেশিরভাগ অভিযোগই ব্যক্তিগত বিষয়। বিশেষ করে প্রেম ভালোবাসা থেকে ব্ল্যাকমেইল কেন্দ্রিক। এ রকম অভিযোগ পেলে সাইবার ক্রাইম দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে বলে জানান তিনি।

গোয়েন্দাজাল-৬: গুরুত্বপূর্ণ মস্তিষ্ক সরিয়ে দেয়ার প্রশংসা মোসাদের by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

১৯৭৮-৭৯ সময়ের ইরান বিপ্লবের আগে ১৯৫৭ সালে অর্গানাইজেশন অব ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফরমেশন (সাভাক) নামে ইরানে গোপন পুলিশ ও গোয়েন্দা সার্ভিস সৃষ্টি করা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নির্দেশনায়। ১৯৬০ এর দশকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এই দূরত্বের কারণে ইরান ছাড়তে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্টের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। এ সময়ে ইরানে খুব বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে মোসাদ। তারা সাভাক-এর বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। সাভাক-এর সঙ্গে বিভিন্ন যৌথ অপারেশন পরিচালনা চালাতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন যে, ২০০৭ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি স্বপক্ষ ত্যাগ করেন ইরানের জেনারেল আলী রেজা আসকারি। তার এই পক্ষত্যাগে ভূমিকা রেখেছে ইসরাইল।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইসরাইলের মুখপাত্র মার্ক রেগেভ। দ্য সানডে টাইমস রিপোর্টে বলে যে, ২০০৩ সাল থেকে মোসাদের একজন এজেন্ট ছিলেন আসকারি। যখন এই গোপন কথা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখনই তিনি মোসাদ ছেড়ে দেন।
ফ্রান্সের লা ফিগারো পত্রিকা রিপোর্ট করে যে, ২০১০ সালের ১২ই অক্টোবরে ইরানিয়ান রেভ্যুলুশনারি গার্ডের ইমাম আলী সামরিক ঘাঁটিতে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এর জন্য দায়ী সম্ভবত মোসাদ। ওই বিস্ফোরণে কমপক্ষে ১৮ জন নিহত ও ১০ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল হাসান তেহরান মোগাদ্দাম। তিনি তখন ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কমান্ডার ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। যে ঘাঁটিতে ওই বিস্ফোরণ ঘটানো হয় তা ব্যবহার করা হতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র জমা রাখার জন্য। সেখানে জমা রাখা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ছিল শাবাব-৩। ইরানের সবচেয়ে নিরাপদ সামরিক ঘাঁটিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
২০১০ সালে ইরানের পদার্থবিজ্ঞানীদের হত্যার ষড়যন্ত্র ও তাদেরকে হত্যার জন্য মোসাদকে দায়ী করেন ওই সময় ইরানের গোয়েন্দা বিষয়ক মন্ত্রী হায়দার মোসলেহি। তবে বিভিন্ন রিপোর্টে যা বলা হয়েছে, তাতে এমন দাবির পক্ষে প্রমাণ মেলে নি। ইরানের একজন ইমাম মজিদ জামালি ফাসি এ বিষয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্বীকারোক্তি দেন। তিনি বলেন, তিনি ইসরাইল সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে মোসাদ।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানী মাসুদ আলী মোহাম্মদী, আরদেশির হোসেইপুর, মজিদ শাহরিয়ার, দারিশ রেজাইনেজাদ ও মোস্তাফা আহমাদি-রোশানকে হত্যার জন্য দায়ী করা হয় মোসাদকে। ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ফেরেইদুন আব্বাসীকে হত্যা চেষ্টার জন্যও দায়ী করা হয় মোসাদকে। ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোসাদের পরিচালক ছিলেন মেয়ার দাগান। তিনি ওইসব হত্যাকা-ের কৃতিত্ব দাবি করেন নি। তবে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এসব হত্যার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ মস্তিষ্কগুলো’ সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে পক্ষত্যাগীদের।

মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম: সম্পদ কেনায় তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশিরা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের আওতায় সম্পত্তি কেনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশিরা। এ তালিকায় চীন ও বৃটেনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। দেশটির স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রী  দাতুক রাজা কামারুল বাহরিন জানিয়েছেন, ২০০৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যকার সময় থেকে নেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করেছে মালয়েশিয়ার পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
এতে দেখা গেছে, ২০০৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৯৯টি ইউনিট সেকেন্ড হোম প্রকল্পের আওতায় বিক্রি হয়। এরমধ্যে চীনের নাগরিকরা কিনেছে সবথেকে বেশি ১৬৬৪টি। বাংলাদেশি নাগরিকরা কিনেছেন তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৫০ ইউনিট। এছাড়া ইরানিদের ২১৭টি, পাকিস্তানের ১৯২টি, সিঙ্গাপুরের ১৭৫টি ও যুক্তরাষ্ট্রের ১১৫টি ইউনিট কিনেছে। ২০০২ সালে প্রথম মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম প্রকল্প চালু হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশিদের মধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় বিনিয়োগের মাত্রা বেড়েই চলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়া টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন না করায় অনেক বাংলাদেশি এই সুযোগ নিচ্ছেন। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম নিয়ে আলোচনা এর আগেও বাংলাদেশে হয়েছে।
যেসব সাংবাদিক মালয়েশিয়ায় সরজমিনে গিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন তারা জানিয়েছে, মাত্র দু’বছরেই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বাংলাদেশি রাজনীতিবিদরাই বেশি সেকেন্ড হোম বানিয়েছেন, এর পরেই আছেন ব্যবসায়ীরা। মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোমের জন্য ব্যবসায়ীদের অনেক সুবিধা দেয়। আবার কেউ তার সম্পদ সরাতে সেকেন্ড হোমের আশ্রয় নিচ্ছেন। ওখানে একজন বাংলাদেশি ব্যক্তি গড়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা খরচ করলেই সেকেন্ড হোমের সুবিধা পান। মালয়েশিয়ায় এখন বাংলাদেশি অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি এলাকা গড়ে উঠেছে। সেখানকার অধিবাসীরা ফ্ল্যাট কিনে থাকছেন। আর ফ্ল্যাটের দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়েও কম। মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোমের ব্যাপারে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করে না, বিনিয়োগের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করে না। তবে কেউ কেউ আছেন যারা বৈধভাবেও এটা করছেন। কিন্তু এতে অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। দেশের টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। যা দেশে বিনিয়োগ হতে পারতো, তা বিদেশে বিনিয়োগ হচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অব্যাহত উদ্বেগ ইস্যু না বানানোর অনুরোধ সরকারের

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত উদ্বেগের প্রেক্ষিতে সরকারের তরফে এটাকে বাংলাদেশের জন্য কোনো ইস্যু না বানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। গতকাল ঢাকায় এক সেমিনারে জাতিসংঘ দূত ও ইউএইচসিআরের আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক এ অনুরোধ জানান। বিদেশিদের উদ্দেশ্যে সচিব বলেন- রোহিঙ্গারা যাবে কি যাবে না এটা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নয়। এটা মিয়ামারের সিদ্ধান্তও নয়। এ সিদ্ধান্ত ইউএনএইচসিআরও নিতে পারবে না। এ সিদ্ধান্ত নেবে একান্ত রোহিঙ্গারাই। সচিব বলেন, আমরা তাদের স্বাগত জানিয়েছি, আশ্রয় দিয়েছি। তাদের সুরক্ষায় যা প্রয়োজন তা করছি।
কিন্তু এটাই হওয়া উচিত যে তারা তাদের নিজ দেশে ফিরে যাবে। এটাই সমাধান। আমি আপনাদের প্রতি অনুরোধ করছি, এটাকে আপনারা বাংলাদেশের জন্য কোনো ইস্যু করবেন না।
আমরা বাস্তুচ্যুতদের ফিরে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার জন্য যা করণীয় তাই করছি। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে তারাই সিদ্ধান্ত নিবে কখন যাবে। গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড ইউনাইডেট নেশন্স: রোড এহেড’ শীর্ষক গতকালের ওই সেমিনারে অন্যদের মধ্যে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধি জেমস লিন্‌চ বক্তৃতা করেন। পরে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ দূত মিয়া সেপ্পো প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের মধ্যে কোনো মত-পার্থক্য নেই দাবি করে বলেন, আমরা নিবিড়ভাবে বিষয়টি সমন্বয় করছি। উল্লেখ্য, আগামী ১৫ই নভেম্বর প্রত্যাবাসনের প্রথম ব্যাচ পাঠানোর প্রস্তুতির খবরে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রশ্ন তুলেছে- রোহিঙ্গারা কি স্বেচ্ছায় ফিরছে? রাখাইন কি প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত? তড়িঘড়ি করতে গিয়ে জাতিসংঘকে বাইপাস করে রোহিঙ্গাদের ফেরানো হচ্ছে কি-না সেই প্রশ্নও তুলে বিশ্ব সম্প্রদায়। তবে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক উদ্বেগ হচ্ছে- ফিরে যেতে রাজি হওয়া রোহিঙ্গারা রাখাইনে কতটা নিরাপত্তায় থাকবেন। মিয়ানমার আদৌ কি তাদের নিরাপত্তা দেবে, নাকি ফের তারা নির্যাতনের শিকার হবেন। বৈশ্বিক এসব উদ্বেগের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র সচিব এটা স্পষ্ট করেন যে বাংলাদেশ ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আমলে নিয়েই প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় বাংলাদেশ। প্রত্যাবাসন চুক্তি মতে ইউএনএইচসিআরের মাধ্যমেই আগামী ১৫ই নভেম্বর প্রথম ব্যাচ পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। একদিন আগেই সচিব বলেন, নিউইয়র্কের প্রতিক্রিয়া দেখার পর আমরা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিকে ডেকেছিলাম। তার সঙ্গে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। আমরা তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো শুনেছি। এ নিয়ে যে মতানৈক্য সেটি দূরীকরণের চেষ্টা করেছি।
মিয়ানমারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্রিফ করছে জানিয়ে সচিব বলেন, জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের তৃতীয় বৈঠকে প্রত্যাবাসন শুরুর যে ডেটলাইন ঠিক হয়েছে আশা করি ওই দিনে প্রথম ব্যাচকে পাঠানো যাবে। সেদিন পররাষ্ট্র সচিব জানান, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব ও স্থানীয় প্রশাসনের যারা গেল সপ্তাহে বাংলাদেশ সফর করেছেন তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা ফিরে যেতে প্রস্তুত এবং যারা এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় সেই রোহিঙ্গাদের উদ্বেগের কথা শুনেছেন। তারা তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার বিষয়ে আশ্বস্ত করে গেছেন। জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সচিব গতকালও বলেন, আমরা জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি করার চেষ্টায় রয়েছি। বরাবরের মতো পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রত্যাবাসন একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটা শুরু করাটা জরুরি। তাই বাংলাদেশ এটা শুরু করতে চায়। এটাকে টেস্ট কেস হিসাবেও বিবেচনায় নেয়া যায় বলে মন্তব্য কর্মকর্তাদের। সেমিনারে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে অনেকটা এক সুরেই বলেন, ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আসলেই রোহিঙ্গারা নিবেন। এটা প্রত্যেকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
এটা অবশ্যই স্বেচ্ছায় হতে হবে। এটা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে হতে হবে। প্রত্যাবাসনটি অবশ্যই টেকসই হতে হবে। রোহিঙ্গারা তাদের অরিজিন রাখাইনে ফিরতে চায়, তবে সেখানে তাদের বড় ইস্যু হচ্ছে নাগরিকত্ব এবং নিরাপত্তা। সেখানে তাদের শারীরিকভাবে নিরাপদ থাকা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে জাতিসংঘ দূত বলেন, রাখাইনে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর কার্যকর এবং বাধাহীন প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। তাছাড়া রাখাইনে শান্তি ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নও চান তিনি। বলেন, উপদ্রুত এলাকার অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং সেখানকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে আমরা মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছি।
উল্লেখ্য, কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৫ শতাধিক সদস্য ছাড়া মাত্র ৬৬ জন বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফিরতে রাজি। বাকিরা এখনো সিদ্ধান্তহীনতায়। এ অবস্থায় সরকারের তরফে তাদের মোটিভেশন এবং আস্থা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। প্রত্যাবাসনের প্রথম ব্যাচে মধ্য নভেম্বরে ২২১৬ জন রোহিঙ্গাকে ফেরানোর একটি তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। নির্বাচনের আগে প্রত্যাবাসনের জট খুলতে এবং প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করতে চীনের সহায়তা নিচ্ছে বাংলাদেশ। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যস্থতা এবং তার উপস্থিতিতে বেইজিং ও নিউ ইয়র্কে এ নিয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে দু’দফা আলোচনাও হয়েছে। সামনে তৃতীয় দফায় তারা আলোচনায় বসছেন বলে ঢাকায় চীনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গেল মাসের সফরে জানানো হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করবে নাগরিক প্ল্যাটফরম

এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির আগে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করবে নাগরিক প্ল্যাটফরম। নির্ধারিত সময়ে তা করা না গেলে, ভোটের পর সারা দেশে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে সুশীল সমাজের সঙ্গেও আলোচনা হবে। কারণ ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে আগামী সংসদ নির্বাচনে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছে দেশের যুব সমাজ।
গতকাল সিরডাপ মিলনায়তনে ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরম, বাংলাদেশ-এর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ড. দেবপ্রিয়। গত ১৪ই অক্টোবর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘যুব সম্মেলন ২০১৮: বাংলাদেশ ও এজেন্ডা ২০৩০ তারুণ্যের প্রত্যাশা’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সংগঠনটি। সেখানে দুই হাজারের বেশি যুবক অংশগ্রহণ এবং তাদের মতামত প্রকাশ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ছিল যুবক, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
তাদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
যুব সম্মেলনে উল্লিখিত দাবিগুলো উপস্থাপন করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমানে মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ যুব সমাজের অন্তর্ভুক্ত। মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি ও কর্মোপযোগী দক্ষতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনছে না। নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তোলার মতো আর্থিক সহায়তাও পাচ্ছে না যুব সমাজ।
যথাযথ সুযোগের অভাবে যুব সমাজের একাংশ এখন হতাশ। পরিণতিতে তাদের কেউ কেউ হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত এবং কেউ বা জড়িয়ে পড়ছে চরম পন্থায়। ফলে তাদের অপার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। তারা দেশের বোঝা ও সমাজের জন্য দুশ্চিন্তার কারণে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু যুবসমাজ দক্ষ, জ্ঞানবান নাগরিক হিসেবে এসডিজির অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ গড়ার ও দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করবে। উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যুব সমাজের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিতে নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ জানায় যুবসমাজ।
যুবকদের দাবির মধ্যে আরো রয়েছে- মানসম্মত শিক্ষা, যুব সমাজের কর্মসংস্থান, মেধার ভিত্তিতে কর্মে নিয়োগ, যুব সমাজের উদ্ভাবনী শিক্ষার বিকাশ, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার, উগ্রবাদের মোকাবিলা, মাদকাসক্তি প্রতিরোধ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাক স্বাধীনতার অধিকার, যুববান্ধব শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুব সমাজের অন্তর্ভুক্তি ইত্যাদি।
এ সময় আসন্ন নির্বাচনে যুবসমাজকে সংযুক্ত করার বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন তিনি। দাবিগুলো হলো- নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে যুব সমাজের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং তাদের মতামত বিবেচনায় নিতে হবে; যুব সমাজের দাবি নির্বাচনী ইশতেহারে রাখতে হবে; যুব সমাজের প্রাধিকারগুলো প্রচারণায় আনতে হবে; নাগরিক ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে যুবসমাজ ভোট পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবে; নির্বাচনের পর সরকারের কর্মপরিকল্পনায় যুবসমাজের প্রত্যাশা ও প্রাধিকারের প্রতিফলন থাকতে হবে এবং নতুন সরকারের নীতিতে যুব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যুবসমাজকে অপব্যবহার করছে। এটি রোধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করতে হবে। দেবপ্রিয় বলেন, সুশীল সমাজের সঙ্গে সরকার সংলাপ করবে কিনা আমাদের জানা নেই। এখন যে পরিস্থিতি, এ সময়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের সংলাপ করার কোনো আগ্রহ নেই। তবে নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমরা আলোচনা করতে চাই। এটি হবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে আলোচনা।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে বর্তমানে মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় সাড়ে তিন কোটি) ভোটার যুব সমাজ। এর মধ্যে প্রায় দুই কোটি নতুন ভোটার। আগামী সংসদ নির্বাচনে যুব সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে যুব সমাজের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মতামত গ্রহণ করা নির্বাচনের জন্য ফলপ্রসূ হবে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সম্মেলনে যুবসমাজ কোটা সংস্কারের বিষয় তুলেছিল। তারা স্পষ্ট করে বলেছে, আমরা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চেয়েছি, কোটা বাতিল চাইনি। কওমি মাদরাসার ডিগ্রিকে স্নাতকোত্তর মানের স্বীকৃতি দেয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, তাদের একটি ডিগ্রিকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, আমার কাছে স্পষ্ট নয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইক্যুভ্যালেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক করা দরকার, সেটা করা হয়নি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, দেখা যায়, একটা যুবক বাবা-মায়ের টাকা খরচ করে পড়েছে, কিন্তু চাকরি পাচ্ছে না। এই বেকার যুবকদের একটা অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। আর এদেরকে দলে ভেড়ানোর জন্য ওত পেতে থাকে জঙ্গিরা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের যে রূপকল্প নিয়ে এসডিজির বৈশ্বিক এজেন্ডার যাত্রা। সেখানে বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও অগ্রাভিমুখী রূপান্তর একই সূত্রে গাঁথা। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় কাউকে পেছনে রাখা যাবে না। এই প্রত্যয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে এসডিজি’র বৈশ্বিক অভীষ্ট বাস্তবায়নে সারাবিশ্বেই আজ তরুণরা বহুমুখী আন্দোলনের মাধ্যমে সক্রিয়। বাংলাদেশের যুবসমাজ নিজেকে এ পরিবর্তনমুখী বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে মনে করে।
অনুষ্ঠানে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের সমন্বয়ক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, শিক্ষাবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

মাটির সঙ্গে দেহ পুড়ে যাদের by জীবন আহমেদ

চারদিকে তাকালেই অট্টালিকা আর অট্টালিকা। উপরতলার মানুষের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করার প্রয়োজনীয় উপকরন ইট। দেশে হাজারো ইট মিলে কাজ করছেন নারী পুরষ এক সঙ্গে। মাটিপুড়ে তৈরি করা ইটের সঙ্গে ওদেরও দেহ পুড়ে। মন পুড়ে। তারপর ও দিন শেষে যখন হাতে মজুরি পান তখন এক গাল হাসি দিয়ে বাড়ি ফেরেন তারা। মাটির সঙ্গে মিতালি করেই পার হচ্ছে এসব শ্রমিকের দিনকাল। কাজ শেষে ভাটার পাশেই বসবাসের জায়গাতাদের। সেখানেই রান্না, খাওয়া, রাত যাপন। ভোর থেকে আবার শুরুতাদের শ্রম দেয়া। কোন কোন ভাটায় তাদের মজুরিও দেয়া হয়না ঠিক সময়। আবার কোন ভাটা তাদের মজুরি সহ সকল সুযোগ সুবিধা দেয়। সুখদুখের জীবনের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদপুর বসিলা তাহা ইটমিলের শ্রমিক আয়শা বলেন, সারা দিন মাটি পুড়াই। এর সঙ্গে পুড়াই নিজ দেহ। বেঁচে থাকার জন্যই সব। তারপরও দুবেলা দুমুটো খেয়ে আছি এটাই বেশ।

টার্নিং পয়েন্টে রাজনীতি

এতদিন যারা সিট বেল্ট বেঁধে ছিলেন তাদের অপেক্ষার শেষ হয়েছে। উত্তেজনাময়, শ্বাসরুদ্ধকর এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশের রাজনীতি। এটা একেবারে অভিনব কোনো দৃশ্যপট নয়। অতীতের সঙ্গে মিল আছে, আবার নেইও। প্রতিটি মুহূর্তই ঘটনাবহুল। কিছু না কিছু ঘটছে। প্রকাশ্যে, পর্দার আড়ালে। একদিকে সমঝোতার চেষ্টা।
অন্যদিকে, সংঘাতের শঙ্কা। কেমন হবে সামনের দিনগুলো? আগামী ৪৮ ঘণ্টাতেই বহুকিছু পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে।
আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বড় ধরনের শোডাউনের চেষ্টা করছে ঐক্যফ্রন্ট। কে না জানে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে হলেও জনসমাগমের বিষয়টি বিএনপির ওপরই নির্ভর করছে। এ সমাবেশ থেকে   সরকার এবং তৃণমূলের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত বার্তা দেবেন ফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। পরদিন বুধবার সকালে গণভবনে ফের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসবে ঐক্যফ্রন্ট। ছোট পরিসরের ওই সংলাপে চূড়ান্ত ফয়সালার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি রূপরেখা হাজির করা হতে পারে।
সংসদ ভেঙে দেয়া, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন সরকারের বিকল্প প্রস্তাব থাকতে পারে রূপরেখায়। ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতা মনে করেন, বর্তমান সংবিধানের মধ্যে থেকেও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। এ জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দেয়ার বিকল্প নেই। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মত দিয়েছেন, সংবিধানের অন্তত ১০ জায়গায় সংসদ ভেঙে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রোববার বলেছেন, এ নিয়ে আলোচনার দরজা খোলা আছে। তবে গতকাল তিনি বলেছেন, বিএনপি কি প্যারোলে মুক্তি চেয়েছে? আপনারা কেন প্রশ্ন করছেন? প্যারোলে কি ইলেকশন করা যায়? স্বল্প সময়ের জন্য যেমন আত্মীয় মারা গেলে বা দেশে না হলে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য সে ধরনের দাবি তো বিএনপি করেনি। আমরা গায়ে পড়ে কেন প্যারোলে মুক্তি দেয়ার কথা বলবো? একটি সূত্র অবশ্য বলছে, পর্দার আড়ালে খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে একধরনের আলোচনা হয়েছে। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন এ বিষয়ে সায় দেননি।
বাংলাদেশে সংলাপের ইতিহাস সুখকর নয়। অতীতে কোনো সংলাপই সফল হয়নি। তবে এবারের সংলাপ নানা কারণেই ব্যতিক্রম। এবারই প্রথম বিরোধী পক্ষ থেকে লিখিতভাবে সংলাপের প্রস্তাব দেয়া হয়। আর সরকার পক্ষ এতে সাড়া দেয় খুবই দ্রুত। দ্বিতীয়ত, শীর্ষ নেতৃত্ব প্রথমবারের মতো সংলাপে অংশ নিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বরফ এরই মধ্যে গলতে শুরু করেছে। তবে কতটুকু গলবে তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই শঙ্কা আছে। আশার কথা হচ্ছে, দুই পক্ষই এরই মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। শুরুতে সরকার পক্ষ বলেছিল, সাত দফার এক দফাও মানা হবে না। কিন্তু এখন তারাই বলছেন, কিছু কিছু দাবি এরই মধ্যে আংশিক মানা হয়েছে। একাধিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, ঐক্যফ্রন্টও সাত দফায় ছাড় দিতে পারে। সংসদ ভেঙে দেয়া, গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয় বিরোধী দল বা নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দেয়া, খালেদা জিয়ার মুক্তি, মামলা, ধরপাকড় বন্ধের মতো দাবিগুলো মেনে নিলে ঐক্যফ্রন্ট সমঝোতায় যেতে পারে।
সে যাই হোক সরকার ও বিরোধীপক্ষ  এক সপ্তাহের মধ্যে দুইবার বৈঠকে বসাও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। খালেদা জিয়া বিএসএমএমইউতে বন্দি থাকলেও এটা অস্বীকার করার জো নেই, তার অনুমতিতে বিএনপি সংলাপে অংশ নিচ্ছে। আর ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নিয়ামক শক্তি যে বিএনপি সে কথা আগেই একবার বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দুই পক্ষ কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিলেও ক্ষমতার প্রশ্নে এখনো তারা অনড়। আর এ বিষয়টিই বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টকে বিকল্প চিন্তার পথেও নিয়ে যাচ্ছে। এমনিতে রাজনীতিতে এখনো সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ একশ’ ভাগ। ভোটের জোয়ারে পোস্টারে ঢেকে গেছে রাজধানীর দেয়াল। কিন্তু সেখানে সবই ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছবি।
বিরোধীদের কোনো ছবি দেখা যায় না। দেশের চলমান রাজনীতির এটি একটি প্রতীকী চিত্রও বটে। এই অবস্থায় বিকল্প চিন্তাও রয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের। তাদের কেউ কেউ বলছেন, সমঝোতা ছাড়াই নির্বাচন কমিশন যদি তফসিল ঘোষণা করে দেয় তবে কঠোর আন্দোলনে নামা ছাড়া বিএনপির সামনে কোনো বিকল্প থাকবে না।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করে সংলাপের ফল জানাবেন। কিন্তু সংলাপের ফল কী হবে তার দৃশ্যপট আসলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এমনকি বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির দৃশ্যপটও। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই- এ কথাটিও শেষ কথা নয়। নাটকীয়ভাবে উভয়পক্ষ যদি সমঝোতায় পৌঁছায় তবে নির্বাচনী ট্রেনে উঠে যাবে বাংলাদেশ। আবার তৈরি হবে ভোট উৎসবের পরিবেশ। যে উৎসবে অপেক্ষায় বহুদিন ধরে মানুষ। আর সমঝোতা না হলে পুরনো দিনের রাজনীতি হয়তো আবার ফিরে আসবে। যা আসলে জনগণের জন্য সুখকর নয়।

ইসি-ঐক্যফ্রন্ট বৈঠকে উত্তাপ: সংলাপ শেষ হওয়ার আগে তফসিল না দেয়ার দাবি

সরকারের সঙ্গে সংলাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল নির্বাচন ভবনে ঐক্যফ্রন্টের একটি প্রতিনিধি দল ইসি’র সঙ্গে বৈঠক করে এ আহ্বান জানায়। জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের অপর সদস্যরা হলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বরকতউল্লাহ বুলু, ডাকসু’র সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। অপরদিকে ইসি’র পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা।
এ সময় অপর চার  কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, শাহাদত হোসেন চৌধুরী ও কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সরকারের সঙ্গে সংলাপের ফল দেখে তফসিল ঘোষণার দাবি জানান ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। এছাড়া নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ সেনা মোতায়েন করার দাবি ও ইভিএম ব্যবহার থেকে বিরত থাকার দাবি জানানো হয়। ঐক্যফ্রন্টের এসব দাবির প্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট কোনো আশ্বাস দেয়নি ইসি।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসি জানিয়েছে, পরবর্তীতে ইসি সিদ্ধান্ত নেবে। যদিও বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা জানিয়েছেন আলোচনা ভালো হলেও তাদের নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি অব্যাহত রয়েছে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকের একপর্যায়ে ইসি’র ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা থাকা না থাকা নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
ইসি’র ওপর আস্থা বিষয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, তারা ইসি’র ওপর অনাস্থা জানাতে আসেননি। তবে এই নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা নেই। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে আস্থা নেই। নেতারা শুধু বড় বড় কথা বলেন। সিইসি’র এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান মান্না। তিনি সিইসিকে সংযতভাবে বক্তব্য দেয়ার জন্য আহ্বান জানান। বৈঠকে তিন সিটি নির্বাচনে ইসি’র ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলেন, দেশের মানুষ দেখেছে রাজশাহী সিটিতে কীভাবে নির্বাচন হয়েছে। একটি কেন্দ্রেও বিএনপি’র এজেন্টরা ঢুকতে পারেননি। নির্বাচন কমিশন এক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়েও পাল্টাপাল্টি কথা হয় ইসি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মধ্যে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, আইনে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে সেনা মোতায়েনের সুযোগ নেই। অতীতে যেভাবে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েন হয়েছে সেভাবে হয়তো হতে পারে। কিন্তু সেটা তফসিল ঘোষণার পর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তার এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেন, ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন রয়েছে।
দুর্বৃত্তদের দমন করার জন্য সেনাবাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও দেয়া প্রয়োজন। প্রতিনিধিদলের অপর সদস্য সুলতান মনসুর বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে এক দলের নেতা আরেক জেলায় জেলে। এভাবে চলতে পারে না। তিনি ইসিকে সতর্ক করে বলেন, ৫ই জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর করা যাবে না। বৈঠকে ইভিএম নিয়েও পাল্টাপাল্টি চ্যালেঞ্জ ছোড়া হয়। ইভিএম’র ম্যানিপুলেট করা যায় এমন দাবি করেন মাহমুদুর রহমান মান্না।
এ সময় নির্বাচন কমিশনাররা চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ইভিএম’র ফল ম্যানিপুুলেট করা সম্ভব না। প্রতিউত্তরে মান্না বলেন, তিনি দেখিয়ে দেবেন কীভাবে ইভিএম’র ফল ম্যানিপুলেট করা সম্ভব। বৈঠকে একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, রাজনৈতিক দল হচ্ছে ইসি’র মূল স্টেকহোল্ডার। ইসি যেন বিতর্কিত না হয় রাজনৈতিক দলগুলোর সেভাবেই সহযোগিতা করা উচিত। বৈঠকে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বুধবার সরকারের সঙ্গে সংলাপের ফল দেখে ইসিকে তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার আগে বৃহস্পতিবার সকালে বৈঠক করবে কমিশন। সেখানে সিদ্ধান্ত হবে তফসিল পেছাবে কি-না। বৈঠক শেষে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও জেএসডি সভাপতি আ স ম রব সাংবাদিকদের বলেন, সাত দফা কর্মসূচির আলোকে আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে ও সরকারের কাছে যে দাবিগুলো জানিয়েছি তার কিছু কিছু বিষয় উনারা কথা দিয়েছেন আজকেই রক্ষা করবেন। বাকি দুই একটি বিষয় উনারা চূড়ান্ত করতে পারেননি। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৭ই নভেম্বর আমাদের সংলাপের ফলাফল না জেনে নির্বাচন কমিশন যেন কোনো তফসিল ঘোষণা না করেন। ২৮শে জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদের মেয়াদ আছে। অনেক সময় এখনো রয়েছে।
ইতিপূর্বে বহুবার তফসিল পরিবর্তনের রেকর্ড আছে। অতএব এবারও ৮ তারিখে তফসিল ঘোষণা করতেই হবে- না হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে, এমন না। বরং নির্বাচন প্রশ্নের সম্মুখীন হবে যদি রাজনৈতিক দলগুলো যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে তফসিল ঘোষণা করলে। তিনি বলেন, পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা দেয়া হবে ইসি বলেছে। প্রতিটি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট যাতে সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থিত থেকে ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকতে পারে এর ব্যবস্থা করবে। ভোট শেষে ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার স্বাক্ষরিত ফলাফল তৃণমূলে এবং সকল দলের এজেন্টকে সরবরাহ করবে।
ফল গণনার আগে কারচুপির জন্য এজেন্টদের কাছ থেকে কোনো ফরমে বা সাদা কাগজে আগেই স্বাক্ষর নেয়া হবে না। জেএসডি সভাপতি বলেন, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চেষ্টা করবে বলে ইসি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্র পরিচালনা করে না নির্বাচন করায়। আপনারা এদেশের জনগণ আমরাও এদেশের জনগণ, ভোটাররাও এদেশের জনগণ। নির্বাচনের পরেও আমাদের মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি এদেশে থাকতে হবে। আমরা বলেছি, আপনারা ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে এদেশে থাকবেন সেভাবেই কাজ করবেন।
আ স ম রব আরো বলেন, ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএম চায় না এজন্য আমরা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার দাবি জানিয়েছি। তারা ইভিএম ব্যবহারের বিভিন্ন যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে। কিন্তু ব্যবহার করবে না এমন নিশ্চয়তা দেয়নি। সেনাবাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েনের দাবি জানিয়েছি। সিইসি বলেছেন, অতীতে সব নির্বাচনে সেনাবাহিনী ছিল। এবার থাকবে না এমন কথা আমি বলিনি। ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির মধ্যে নির্বাচন পুনর্গঠনের বিষয়টি ছিল। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমাদের এ দাবি অব্যাহত থাকবে।
ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৭ তারিখে একটি আলোচনা আছে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা সেখানে নজর রাখতে বলেছেন। তফসিল ঘোষণার এখতিয়ার একমাত্র নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। ৮ তারিখে তফসিলের বিষয়ে যেহেতু সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। ৭ তারিখের বৈঠকের ফলাফল ৮ তারিখে প্রতিফলিত হবে। ৮ তারিখ সকাল ১০ টায় কমিশন সভায় সংলাপের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ইসি’র ওপর ঐক্যফ্রন্টের আস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, নির্বাচন কমিশন একমাত্র সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যারা নির্বাচন পরিচালনা করবে। উনারা বলেছেন ইসি’র প্রতি আমাদের আস্থা আছে এজন্য আলোচনা করতে এসেছেন এবং আন্তরিকভাবে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে দু’পক্ষে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে কি-না জানতে চাইলে হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় নয়, ওনারা রাজনৈতিক নেতা। ভেতরে গলার আওয়াজ এমনই ছিল।

যে কারণে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হবে -রয়টার্সের বিশ্লেষণ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিষেধাজ্ঞা আজ থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রধানত ইরানের তেল ও গ্যাস শিল্পকে টার্গেট করে এসব নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় ইরান এসব নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ছয় মাস আগে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন, সংক্ষেপে জেসিপিওএ নামে পরিচিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আবারো পূর্বের নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতি অনুসরণ করতে শুরু করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ার পরেও চীন, রাশিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলো জেসিপিওএ চুক্তি বহাল রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত জেসিপিওএ চুক্তিকে পুরোপুরি অকার্যকর করতে চাচ্ছেন। এ ছাড়াও তিনি ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস করতে চান, আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোতে ইরানের সংশ্লিষ্টতা কমিয়ে আনা ও সে দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন উদ্‌যাপন করতে চান।
যদিও এ ধরনের বক্তব্য হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। প্রকাশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দপ্তরের অবস্থান হলো, তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে চান। যেখানে জেসিপিওএ’র পরিবর্তে নতুন একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হবে, যাতে ট্রাম্পের নাম থাকবে। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ট্রাম্পের অনুসৃত নীতি ব্যর্থ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনতে চান। কিন্তু এটা এখন পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্রের এ চাওয়া অবাস্তব। কেননা, ইরান প্রতিদিন যে ২৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে, বাজারে এর টেকসই কোনো প্রতিস্থাপক নেই। যদিও সৌদি আরব বলেছে, ইরানের তেল বিক্রি বন্ধ করা হলে বাজারে যে ঘাটতি দেখা দেবে, রিয়াদ অতিরিক্ত তেল রপ্তানি করে তা পুষিয়ে দেবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানি তেলের চাহিদা পূরণ করার সামর্থ্য রিয়াদ ও এর মিত্রদের নেই। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে যদি ইরানের তেল রপ্তানি ২৫ লাখ ব্যারেল থেকে ১৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে, বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১০০ ডলারেও পৌঁছতে পারে, যার বর্তমান মূল্য ৭৬ ডলার। এমন অবস্থায় ইরান যদি তাদের তেল রপ্তানি ১০ লাখ ডলারেও নামিয়ে নিয়ে আসে, তার পরেও মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে ইরান তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর কার্যত তেমন প্রভাব ফেলবে না।
দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ ও রুশ অর্থনীতির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে ইরান ইস্যুতে মস্কো ও বেইজিং ওয়াশিংটনের পক্ষে কাজ করতে অপেক্ষাকৃত কম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাবে না যুক্তরাষ্ট্র। কেননা, ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্প বেরিয়ে যাওয়ার পরেও জেসিপিওএ চুক্তি কার্যকর রাখার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া, ইউরোপের দেশগুলো বাইরের কোনো দেশের নিষেধাজ্ঞাকে নিজেদের আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি বলে মনে করে। সম্প্রতি ফরাসি অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লি মাইরে বলেছেন, ইরান সংকটের ফলে ইউরোপের সামনে স্বনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেন আমরা পছন্দ মতো যে কারো সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারি। ইইউ’র প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্সের এমন অবস্থান স্পষ্টই বুঝিয়ে দেয়, তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে ইরানের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
তৃতীয়ত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। দশকের পর দশক ধরে, মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক বাজারে কর্তৃত্ব করেছে। এখন জেসিপিওএ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ার ফলে রাশিয়া, চীন, ভারত ও তুরস্কের মতো দেশগুলো নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন করতে উৎসাহিত হয়েছে। ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে রেখে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে সফল হয়, তাহলে অন্য দেশগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে ডলারের পরিবর্তে ইউরো ব্যবহার করবে। এর ফলে বিশ্ব বাজারে মার্কিন ডলার কর্তৃত্ব হারাবে।
চতুর্থত, জেসিপিওএ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অবশিষ্ট দেশগুলো এই চুক্তিকে একতরফা মার্কিন কর্তৃত্ববাদ প্রতিহত করার অন্যতম উপায় হিসেবে দেখছে। কেননা, জেসিপিওএ জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিল রিজল্যুশন-২২৩১ অনুসারে স্বাক্ষরিত একটি বহুপক্ষীয় চুক্তি। যে চুক্তি থেকে ট্রাম্প একতরফাভাবে বেরিয়ে গেছেন। শুধু তাই না, যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই জেসিপিওএ চুক্তি এগিয়ে নিতে চাচ্ছে, ট্রাম্প তাদের শাস্তি দেয়ার চেষ্টা করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তা এড়ানোর জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবেই ইরান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জেসিপিওএ চুক্তি বহাল রাখার চেষ্টা করবে।
পঞ্চমত, ইইউ ও জাপানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোও জেসিপিওএ চুক্তির প্রতি সমর্থন দেয়া অব্যাহত রেখেছে। সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও ইসরাইলের মতো গুটিকয়েক আঞ্চলিক মিত্র দেশ ট্রাম্পের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। অন্যদিকে, তুরস্ক, ওমান ও ইরাক চুক্তি বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমন অবস্থায় আঞ্চলিক সংকটগুলো যেভাবে মোড় নিচ্ছে, তা কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইরান ও রাশিয়াসমর্থিত বাশার আল আসাদ বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছেন। আফগানিস্তানে মার্কিন মিশন ব্যর্থ হয়েছে। ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। এ ছাড়া, সৌদি জোটের অবরোধ সত্ত্বেও কাতার বেশ উন্নতি করেছে। এমন বিশ্ব পরিস্থিতি ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় সহায়তা করবে। এসব অঞ্চল প্রায় ছয় দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কিন্তু ট্রাম্পের একতরফা কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ট্রান্স আটলান্টিক মিত্র দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করতে পারে। যার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের হিসাব-নিকাশ বদলে যাবে। ইস্টার্ন ব্লক ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে ইরান, তুরস্ক ও ইরাকের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ঘনিষ্ঠতা বাড়বে।
যাহোক, জেসিপিওএ চুক্তি অন্য বিশ্বশক্তিগুলোকে পথ দেখিয়ে দিয়েছে যে, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই আন্তর্জাতিক সমঝোতা চুক্তি বহাল রাখা যায়। বিশ্ব পরিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক শক্তির রাজনীতি বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে। যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে।