Thursday, August 6, 2015

‘সভ্যতা’ শেখাচ্ছেন সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ! by সোহরাব হাসান

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(১) ধারায় আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’
অথচ সেই সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ একের পর এক সংবিধানবিরোধী কাজ করে যাচ্ছেন। এত দিন তিনি দেশের ভেতরে এসব তৎপরতা চালালেও এখন বিদেশে গিয়েও দেশকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন।
জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে ইলিয়াস মোল্লাহ কঙ্গো গিয়েছিলেন সে দেশের ‘কালো’ মানুষদের সভ্যতা শেখাতে! তিনি সেখানে কী শিখে এসেছেন, সেই শিক্ষা দেশের জনগণের কী উপকারে লাগবে, সে সম্পর্কে কোনো আভাস না দিলেও একটি কথা জোর দিয়ে বলেছেন, ‘সেখানকার কালো মানুষগুলো সভ্যতা পায়নি। আমাদের আর্মি তাদের সভ্য করার জন্য সেখানে গিয়েছে।...আমি মনে করি, আর্মি তাদের সভ্য করতে সহযোগিতা করছে। তারা সেই কাজটি করেই আসবে।’ (প্রথম আলো, ৫ আগস্ট ২০১৫)
এর মাধ্যমে ইলিয়াস মোল্লাহ নিজেকেই কেবল চরম বর্ণবাদী হিসেবে প্রমাণ করেননি, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর গায়েও বর্ণবাদের কালি লেপ্টে দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য মানবতাবিরোধী, সভ্যতাবিরোধী। কোনো মানুষকে বর্ণের পরিচয়ে চিহ্নিত করা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গত ২৫ থেকে ৩১ জুলাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির দুটি প্রতিনিধিদল আফ্রিকার কঙ্গো ও আইভরি কোস্ট সফর করে। তারা সেখানে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী দলের সদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে। ফারুক খানের নেতৃত্বে কঙ্গো যাওয়া প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন ইলিয়াস মোল্লাহ। সফর-অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গত বুধবার সংসদ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস মোল্লাহ এই বর্ণবাদী মন্তব্য করেন। আফ্রিকার মানুষেরা কীভাবে সভ্যতার আলো পায়নি—সাংবাদিকদের এ রকম প্রশ্নের জবাবে সাংসদ বলেছেন, ‘কঙ্গোর মানুষ ১৫ দিন পর এক দিন গোসল করে এবং গায়ে সাবান মেখে পানি দেয় না।’
এটাই নাকি সভ্যতাহীনতার প্রমাণ। যে ব্যক্তির শান্তিরক্ষা দলের কার্যক্রম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে, সেই ব্যক্তি এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন না। তবে ইলিয়াস মোল্লাহর তা জানার কথা নয়, কেননা তিনি তো দখলবাজি সভ্যতা গড়ে তুলতেই ব্যস্ত।
তবে তাঁর জানা উচিত যে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী দল সেখানকার মানুষকে কথিত সংস্কৃতি বা আচরণ শেখাতেও যায় না। তারা যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। তাদের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করতে। আর ইলিয়াস মোল্লাহ সভ্যতা বলতেই বা কী বোঝেন? তাঁর নির্বাচনী এলাকা মিরপুর-১৬–এ তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের যে ‘সভ্যতা’ গড়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে সেখানে নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় মানুষের থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাঠক, এবার ইলিয়াস মোল্লাহর কাণ্ডকীর্তির কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। তিনি কঙ্গোতে সেখানকার মানুষকে সভ্যতা শেখাতে গেলেও তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকায় গত বছর বিহারি বস্তিতে আগুন দিয়ে যে ১০ জন মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো, তার মধ্যে অসভ্যতার কিছু দেখেননি। ঘটনার আগে তিনি বিহারিপল্লিতে গিয়ে এই বলে হুমকি দিয়ে এসেছিলেন যে দুই দিন সময় দেওয়া হলো। এর মধ্যে পাশের বাঙালি বস্তিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ না দেওয়া হলে খবর আছে।
হ্যাঁ, দুদিন পরই খবর পেয়ে গেলেন সেখানকার বিহারি সম্প্রদায়ের মানুষ।
শবে বরাতের রাতেই ১০ জন মানবসন্তানকে পুড়িয়ে মারা হলো। তালাবদ্ধ ঘরে কারা আগুন দিয়েছে? অভিযোগ আছে, সাংসদের অনুসারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা এই আগুন দিয়েছে। গায়ে সাবান মেখে পানি না দিলে সেটি সাংসদ ইলিয়াস মোল্লার কাছে অসভ্যতা হয়, আর আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা সভ্যতা!
১৫ জুন ২০১৪–এ প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি ছিল এ রকম, ‘রাজধানীর পল্লবীর কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে গতকাল শনিবার ভোরে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে ঘুমন্ত অবস্থায় একই পরিবারের নয়জন মারা গেছে। এ নিয়ে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে পুলিশ ও আশপাশের যুবকদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে একজন তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন৷ ভোর সাড়ে ৫টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সাত ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।
‘পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন ক্যাম্পের বাসিন্দা ইয়াছিন আলীর স্ত্রী বেবি আক্তার (৪০), তাঁদের যমজ সন্তান লালু হোসেন ও ভুলু হোসেন (১৪), তিন মেয়ে শাহানা আক্তার (২৪), রোকসানা বেগম (১৮), আফসানা আক্তার (২০) ও ইয়াছিনের নাতি দুই বছর বয়সী মারুফ। আর ১৮ বছর বয়সী আজাদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে বলে স্বজনদের দাবি। কুর্মিটোলা ক্যাম্পের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় সাংসদের কথামতো নিউ কুর্মিটোলা ক্যাম্প থেকে পাশের রাজি বস্তিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ না দেওয়ায় সাংসদের নির্দেশে যুবলীগের কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। তাঁরা পুলিশের সামনে অগ্নিসংযোগও করেছেন।
‘জানতে চাইলে সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ জানান, কোনো বস্তির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। বস্তিবাসী বিদ্যুৎ-সংযোগের দাবিতে সড়ক অবরোধ করায় তিনি সংযোগ দিতে চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি ক্যাম্পের চেয়ারম্যানকে সংযোগ দিতে বলেছিলেন। এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। তাঁর কোনো লোক কিংবা যুবলীগের কেউ বিহারিদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান সাংসদ।’ (প্রথম আলো, ১৫ জুন ২০১৪)
সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ মানুষের গায়ের রং ও সাবানের ফেনায় সভ্যতা খোঁজেন। কিন্তু নিজের নির্বাচনী এলাকায় আগুনে পুড়িয়ে যে দুর্বৃত্তরা ১০ জন মানুষকে হত্যা করল, তাদের অসভ্যতা আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না

আগুন লাগানোর সময় আটটি ঘরে তালা লাগানো ছিল। প্রতিবেশীরা ভেতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে গেলে হামলাকারীরা বাধা দেয়। বাইরে তালা দিয়ে কেউ ঘরের ভেতরে ঘুমান না। যারা বিহারি বস্তিতে আগুন দিয়েছে, তারাই আগুন দেওয়ার আগে ঘরগুলো তালাবদ্ধ করে দিয়েছিল।
১৬ জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত শনিবারের ওই ঘটনার জন্য ক্যাম্পের বাসিন্দারা ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহকে দায়ী করেছেন৷ তবে সাংসদ এ ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন৷ বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা এই ঘটনায় ইলিয়াস মোল্লাহকে দায়ী করে গ্রেপ্তার দাবি করে। এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ ঘরগুলো আর নির্মিত হয়নি। আগুন-সন্ত্রাসীদেরও বিচার হয়নি। বরং উল্টো বিহারিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।’
কিন্তু ঘটনার ১৪ মাস পার হলেও বিচার দূরের কথা, কোনো সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি। তাহলে কি সেখানে ভূত এসে আগুন লাগিয়েছিল? বিহারি নামের এই উন্মূল ও উদ্বাস্তু মানুষগুলোর প্রতি বাংলাদেশ রােষ্ট্রর অবহেলা সীমাহীন। পূর্বসূরিরা অপরাধ করে থাকলে তার দায় কেন উত্তর প্রজন্মের মানুষগুলোকে বইতে হবে? উচ্চ আদালতের রায়ে বিহারিরা ভোটাধিকার পেলেও সব ধরনের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারবঞ্চিত। যে বাংলাদেশ অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই বাংলাদেশ সম্প্রদায়বিশেষের ওপর এ রকম বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে না।
সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ মানুষের গায়ের রং ও সাবানের ফেনায় সভ্যতা খোঁজেন। কিন্তু নিজের নির্বাচনী এলাকায় আগুনে পুড়িয়ে যে দুর্বৃত্তরা ১০ জন মানুষকে হত্যা করল, তাদের অসভ্যতা আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তিনি নিজেকে সভ্যতার ধারকবাহক ভাবেন, আবার তাঁরই সাঙ্গপাঙ্গরা বিহারি বস্তিতে আগুন লাগিয়ে, গরিব বিহারিদের ওপর সদলবলে হামলা চালিয়ে উল্লাস করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে বিহারিদের তাড়িয়ে জমি দখল করা। কেবল কি ছাত্রলীগ, যুবলীগ? স্বয়ং সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহর বিরুদ্ধে মিরপুরে সরকারি প্লট, জলাশয় দখল, স্কুলের মাঠে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ করে বিদ্যালয়ের মাঠে মেলার আয়োজন ইত্যাদি অভিযোগ আছে। আমরা জানি না, এগুলোকেও তিনি সভ্যতা শেখানোর প্রাথমিক তালিম বলে চালিয়ে দেবেন কি না?
সাংসদ ফারুক খান সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস মোল্লাহর মন্তব্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যাঁর মন্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না প্রতিনিধিদলের প্রধান, তাঁকে কেন জনগণের অর্থ খরচ করে বিদেশে পাঠানো হলো? চরম বর্ণবাদী মন্তব্য করে সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ সারা বিশ্বে বাঙালিদের মানবতাবাদী হিসেবে যে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে, সেটি ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন।
তাঁর এই জঘন্য মন্তব্যের প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। তাই রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতার পঙ্ক্তি ধার করে বর্ণবাদী সাংসদের ঘৃণ্য মন্তবে্যর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:
হায় ছায়াবৃতা,
কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে,
নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে,
এল মানুষ-ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।
তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে
পঙ্কিল হল ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে;
দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়
বীভৎস কাদার পিণ্ড
চিরচিহ্ন দিয়ে গেল, তোমার অপমানিত ইতিহাসে।।
আজ সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহর জিবে দেখি সেই ‘সভ্যের বর্বর লোভ ও নির্লজ্জ অমানুষতা’। হায় সাংসদ, হায় সভ্যতা!
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

বিভক্তির কবলে বিশ্বাস ৬: সিভিল সোসাইটি নিঃশেষ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক by মনির হায়দার

দেশে সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজের অস্তিত্ব ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ায় বিশেষ উদ্বিগ্ন উত্তর আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করছেন, নাগরিক সমাজের তৎপরতার পরিসর সংকুচিত করে দেয়ার চলমান ধারা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। আর তাই নানামুখী বৈরিতার মধ্যেও যারা ঝুঁকি নিয়ে এখনও সিভিল সোসাইটির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাদের উচিত হবে যে করেই হোক নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়ে নাগরিকদের অধিকার প্রশ্নে একটা কার্যকর অবস্থান গ্রহণ করা। মানবজমিন প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, বাস্তবতা হলো আশির দশকে  দেশে যখন গণতন্ত্র ছিলনা,  সেই সময় নাগরিক সমাজ  বেশ  সোচ্চার ছিল। কিন্তু নব্বই দশকের  গোড়ার দিকে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই অপ্রত্যাশিত ভাবে নাগরিক সমাজ ধ্বংসের ধারা শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে ক্ষমতায় বসে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে সিভিল সোসাইটির কার্যক্রম ধ্বংস করেছে। সব সরকারই সিভিল সোসাইটির সদস্যদের কোনরকম সুযোগ-সুবিধা ও পদ-পদবি দিয়ে নিজেদের পক্ষে টানার  চেষ্টা করেছে, এখনও করছে। রাজনীতিকরা হয়তো মনে করছেন যে, দেশে সিভিল সোসাইটি থাকার দরকার নেই, সবাই তাদের পক্ষে চলে আসুক। রাজনৈতিক দলগুলো প্রাথমিকভাবে এটাকে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক মনে করলেও অনিবার্য বাস্তবতা হলো, সিভিল সোসাইটির অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়াটা আদতে রাজনৈতিক দলের জন্যও মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে। তারা বলেন, এখন  কেবল সিভিল সোসাইটিকে পুনরুজ্জীবিত করাই নয়,  দেশে একটা কার্যকর নাগরিক অধিকার আন্দোলন তথা সিভিল রাইটস মুভমেন্ট গড়ে তোলাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রফেসর জিল্লুর আর খান বলেন, গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল যেমন দরকার,  তেমনি সক্রিয় নাগরিক সমাজও অত্যাবশ্যক। তা না হলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভারসাম্য থাকে না। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এই চিত্রটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। যদিও কিছু কিছু থিংকট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটি সংগঠন কাজ করছে, তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে অন্যান্য উন্নয়নশীল  দেশের মতোই বাংলাদেশেও সরকার তথা রাষ্ট্র এসব তৎপরতাকে উৎসাহিত করে না। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের  নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এ কারণে এখানে নাগরিক সমাজের টিকে থাকা খুব সহজ কাজ নয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্র চাইলে বিরোধীদল ও ভিন্নমতকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু আমরা দেখলাম যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিরোধী দলকে সংসদে  ডেপুটি স্পিকারের পদটি দেওয়া হয়নি। এর মধ্য দিয়ে পরস্পরের প্রতি আস্থার সংকট আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অবশ্য তিনি আশা ছেড়ে না দেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের অবস্থাতো অন্তত সে সব দেশের চেয়ে ভাল,  যেখানে নাগরিক সমাজের তৎপরতা এবং থিংকট্যাঙ্কের কর্মকাণ্ড এক্কেবারে শূন্যের কোঠায়। রাশিয়াতো সামপ্রতিক সময়ে নতুন করে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন বন্ধ করে দিচ্ছে। আর চীনে এগুলোর অস্বিত্বকেই শিকার করা হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হলো এখানে প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল নাগরিক সমাজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মানতে নারাজ। তারা উভয়েই চেষ্টা করে যেন নাগরিক সমাজের  নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের পক্ষে কথা বলে। অথচ আশির দশকে এরশাদ শাসনামলে নাগরিক সমাজ তথা সিভিল সোসাইটি বেশ জোরালোভাবে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু নব্বইয়ে গণতন্ত্রে পুনর্যাত্রার পর থেকে নাগরিক সমাজের অস্তিত্ব ক্রমশ: ধ্বংস হয়েছে। সাংবাদিকদেরকে দুই ভাগ করে দেয়া হলো।  এরপর একে একে ডাক্তার, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ সবাইকেই দুইভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। গোটা দেশটাই এখন যেন দুই ভাগে বিভিক্ত।  যারাই যখন ক্ষমতায় বসেছে তারাই সিভিল সোসাইটির অংশবিশেষকে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করেছে। এটা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই কার্যত ধীরে ধীরে সিভিল সোসাইটির ধারণাটাকেই রীতিমতো নিঃশেষ করে দিয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমন দলীয়করণ দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর হবে, যা হয়তো তারা এখন বুঝতে পারছেন না।
আলী রীয়াজ বলেন, এমন বৈরী পরিস্থিতি সত্ত্বেও এখনও কিছু লোক ঝুঁকি নিয়ে কথাবার্তা বলছেন। তাদের উচিত হবে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূলে চলে যাওয়ার আগেই নিজেরা নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়ে নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে একটা কার্যকর অবস্থান গ্রহণ করা। এটা অত্যন্ত দুরূহ কাজ, কিন্তু এর কোন বিকল্পও নেই।  সুতরাং যারা করবেন, তাদেরকে ঝুঁকি নিয়েই কাজটি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মূলত নাগরিকদের অধিকার নিয়ে সে রকম কোন আন্দোলন কখনই হয়নি। ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক লড়াইয়ের বাইরে আর কোন লড়াই নেই। অথচ দেশে এখন ব্যাপকভিত্তিক একটি নাগরিক অধিকার আন্দোলন তথা সিভিল রাইটস মুভমেন্ট গড়ে ওঠাটাই বেশি জরুরি। কারণ নির্বাচনের নামে  ১৫৩টি আসনে কোন ভোট ছাড়াই এমপি নির্বাচিত হয়ে গেল, কিন্তু সেখানে নাগরিকদের ভোটের অধিকার নিয়ে কোন কথা হচ্ছে না।  এটা তো কেবল বিরোধী রাজনৈতিক দলের একটি ইস্যু মাত্র নয়। জীবিকার আশায় শ’ শ’ তরুণ নৌকায় করে বিদেশ যেতে গিয়ে সমুদ্রে জীবন দিয়েছে। এটাও নাগরিক অধিকারের গুরুতর ইস্যু। অথচ এ নিয়ে কোন আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না। কেবলমাত্র বক্তৃতা- বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে বড় কথা হলো, একটি সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ শুরুর সময় একটি জাতীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র হিসাবে সংবিধানে সন্নিবেশিত রয়েছে। সেখানে সুস্পষ্টভাবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা রয়েছে। অথচ আমাদের আজকের রাষ্ট্রব্যবস্থা অব্যাহতভাবে সেই চুক্তিভঙ্গ করে চলেছে।  কিন্তু সেটার বিরুদ্ধে আমরা কোন নাগরিক আন্দোলন দেখছি না।
সিনিয়র সাংবাদিক মনজুর আহমদ বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের পুরো সমাজটাই আজ বিভক্ত। খুব স্থূলভাবে এখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ বলে দু’টি ভাগ করা হচ্ছে। অথচ আমরা দেখেছি যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় খুব সামান্য সংখ্যক মানুষই সেটার বিরোধিতা করেছিল। দেশের প্রায় সকল মানুষ ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে যে, বিরাট জনগোষ্ঠীকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শিবিরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কেউ আওয়ামী লীগের বিপক্ষে কথা বললেই তাকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বড় অংশটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ায় সিভিল সোসাইটির অস্তিত্ব এখন রীতিমতো হুমকির মুখে। দৃষ্টান্ত টেনে তিনি বলেন, এখন যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবী, তারা এমনকি বিরোধী দল তথা যে কোন ভিন্নমতের শক্তিকে নিষ্ঠুরভাবে নির্মূল বা দমনের প্রক্রিয়াকে নির্দ্বিধায় সমর্থন জানিয়ে দিচ্ছেন এবং সেটার পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তৃতা করছেন। তাদের কাছে নাগরিক অধিকার বা মানবাধিকারের প্রসঙ্গে আজ নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। মনজুর আহমদ বলেন, তবে এ অবস্থা আর বেশি দিন চলতে পারে না। দেয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া বলে একটা কথা আছে। মানুষ বিএনপি বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের জন্য অপেক্ষা নাও করতে পারে। নাগরিক সমাজের বহু মানুষ এখনও কোন পক্ষ নেননি। পরিস্থিতির কারণে তারা হয়ত নির্লিপ্ত বা চুপচাপ আছেন। কিন্তু দমবন্ধ অবস্থা ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সংগঠিত হয়ে মাঠে নেমে আসতে পারেন এবং তখন দেখা যাবে যে, জনগণ তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
টরন্টো প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট এম শহিদুল ইসলাম বলেন, সিভিল  সোসাইটির আজকের করুণ দশার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বড় দুই দলের নেতৃত্বের স্বেচ্ছাচারিতা। কারণ, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কারও ওপর নাখোশ হলেই তার অসম্মানিত হওয়া ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। বর্তমান পর্যায়ে এসে নাগরিক সমাজের অনেকেই আপাতত  সেই ঝুঁকিটা হয়তো নিতে চাইছেন না। সকলেই এখন নিজের মান-সম্মান ও পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টিকে  বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অথচ সিভিল সোসাইটি আন্দোলনের জন্য কিছু নির্মোহ ও নির্লোভ মানুষ দরকার, যারা শাসকচক্রের রোষানলে পড়ার সাহস দেখাবে। দুর্ভাগ্য হলো, বাংলাদেশের বর্তমান সমাজে সাহসী  লোকের সংখ্যা অস্বাভাবিক কমে গেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলের  নেতারা মনে করছেন যে,  নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের  কোন প্রয়োজন নেই। কোন কারণে বুদ্ধিজীবী দরকার হলে তাদের কিনতে পাওয়া যায়। পরিতাপের বিষয় হলো, একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীকে সত্যিই কিনতে পাওয়া যায়। কারণ মূল্যবোধ ও নীতি- নৈতিকতার অবক্ষয় চরম পর্যায়ে গিয়ে  ঠেকেছে। তবে এটাই আসার কথা যে, আমরা এখন পচনের শেষ ধাপে আছি এবং এখান থেকেই হয়তো ঘুরে দাঁড়াবার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।

৪৫ সেকেন্ডে ঝরে গেল ৭০ হাজার প্রাণ

মাত্র ৪৪.৪ সেকেন্ডের মধ্যে ঝরে গিয়েছিল ৬০ থেকে ৮০ হাজার তাজা প্রাণ। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অমানবিক এবং নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পরিণামে সৃষ্টি হয়েছিল এ দৃশ্যপট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গন তখন চরমে পৌঁছে গেছে। মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল জাপান।
দেশটিকে দমাতে মরিয়া হয়ে ওঠে আমেরিকা। বিশ্ব মনবতা পায়ে ঠেলে ১৯৪৫ সালের আগস্টে পরমাণু বোমা ‘লিটল বয়’ হিরোশিয়ার প্রাণ কেন্দ্রে ছুড়ে দেয় দেশটি। মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সবকিছু। তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হয় ৬০-৮০ হাজার মানুষ। আর পরবর্তী পরিণাম হিসেবে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ২ লক্ষাধিক নাগরিক প্রাণ হারায় হিরোশিমায়।

হড়পা বানে ভেসে জোড়া ট্রেন নদীতে

নদীতে পড়ে জোড়া রেল দুর্ঘটনায় ভারতের মধ্যপ্রদেশের হড়দায়। মঙ্গলবার গভীর রাতে হড়দায় একটি সেতু ভেঙে মাচক নদীতে তলিয়ে যায় (১১০৭২ আপ) কামায়নী এক্সপ্রেসের অন্তত ৬টি কামরা। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই এ একই জয়গায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মুম্বাইগামী জনতা এক্সপ্রেস। বুধবার দুপুর পর্যন্ত খবর, মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে পাঁচ শিশুসহ কমপক্ষে ৩২ জনের। গুরুতর আহত ৭২ জন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। বুধবার হড়দার এসপি প্রেমবাবু শর্মা জানিয়েছেন, হড়পা বান ও প্রবল বৃষ্টির জন্য সেতু ভেঙে যাওয়ায় ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। মুম্বাই থেকে বারানসীগামী কামায়নী এক্সপ্রেস রাতে অন্ধকারে সেতু পার হওয়ার সময় ভেঙে পড়ে সেতুটি। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধার করে ৩০০ জনকে। মৃতদের মধ্যে ১২ পুরুষ, ১১ মহিলা ও পাঁচ শিশুর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও বেশকিছু দেহ কামরার ভেতরে আটকা রয়েছে। রেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃতদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা সাহায্য করা হবে। গুরুতর জখমদের ৫০ হাজার ও কম আহতদের ২৫ হাজার টাকা দেয়া হবে। মধ্যপ্রদেশে রেল দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং,
কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। মোদি বলেন, ‘কামায়নী ও জনতা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবরে গভীর মর্মাহত। সবরকম সাহায্যের জন্য তৈরি প্রশাসন।’ এদিন রেলমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলেছে কংগ্রেস। পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে হড়দা ও খিরকিয়ার মাঝে কুড়াওয়া স্টেশনের কাছে। হড়দা-কালিমাচ সেতু ও রেল লাইন জলমগ্ন থাকায় চালক সেতুর ভেঙে যাওয়া অংশ দেখতে পাননি। যার জেরে দ্রুতগামী ট্রেনটি সেতু পার হওয়ার সময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে সেতু। কামায়নীর ৬টি কামরা তলিয়ে যায় মাচক নদীতে। এর কিছুক্ষণ পরেই ওই একই জায়গায় উল্টোদিক থেকে আসছিল জব্বলপুর-মুম্বাই রুটের আরও একটি যাত্রীবাহী ট্রেন। একইভাবে দুর্ঘটনায় পড়ে সেটিও।

কাশ্মীরে বিএসএফ বহরে হামলা

পাঞ্জাবের গুরদাসপুরে হামলার পরে জঙ্গিরা এবার হামলা চালাল জম্মু-কাশ্মীরের উধামপুরে। বুধবার ভোরে বিএসএফের একটি কনভয় লক্ষ্য করে হামলা চালায় জঙ্গিরা। বিএসএফ-জঙ্গি সংঘর্ষে নিহত হয়েছে দুই জওয়ান ও এক জঙ্গি। আরও ১১ বিএসএফ আহত। হামলাকারী পাকিস্তানি নাগরিক বলেও দাবি করেছে তারা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, উধামপুর শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে সামরুলি এলাকার কাছের একটি মহাসড়কে এ হামলা চালানো হয়। সামরিক পোশাকে দুই ‘সন্ত্রাসী’ বিএসএফ সদস্যদের বহনকারী বাসটিকে থামতে বলে। এরপর গুলি ছুড়তে শুরু করে তারা। ওই হামলায় নিহত হন দুই সেনাসদস্য। তাদের লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালায় বিএসএফ।   সেসময় এক হামলাকারী নিহত হয় বলে জানায় এনডিটিভি। পরে স্থানীয় তিনজনকে জিম্মি করে জঙ্গলে পালিয়ে যায় আরেক হামলাকারী। চার ঘণ্টা পর প্রামবাসীদের সহায়তায় আটক করা হয় তাকে।
জম্মুর পুলিশের আইজি দানীশ রানা এনডিটিভিকে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে আটক হওয়া উসমান পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের নাগরিক। হিন্দু মারার জন্য এসেছি উধামপুরের বিএসএফ কনভয় হামলার তিন জঙ্গির মধ্যে হাতেনাতে ধরাপড়া জঙ্গির নাম মোহাম্মদ নাভেদ। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে তার নাম বলেছিল কাশিম খান ওরফে উসমান। জিজ্ঞাসাবাদে নাভেদ জানায়, সে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের বাসিন্দা। বাবা মোহাম্মদ ইয়াকুব। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে একভাই মোজা ব্যবসায়ী, অন্যভাই জেসি ইউনিভার্সিটির প্রভাষক। বারো দিন আগে দলবলসহ সে জম্মুতে ঢুকেছে। নাভেদ বলেন, ভারতের হিন্দুদের মারার জন্যই আমি এখানে এসেছি। এর ভেতরে আনন্দ আছে। নাভেদ আরও বলে, আমি লস্করই তায়্যৈবার সদস্য। পাকিস্তান থেকেই আমি জঙ্গি হামলার প্রশিক্ষণ নিয়েছি। উল্লেখ্য, মুম্বাই হামলার (২০০৮) জঙ্গি আজমল কাসাভের পর এই প্রথম কোনো জঙ্গিকে জীবিত ধরল ভারত।
পাকিস্তানে হামলা করুক ভারত
-সাবেক আইএসআই প্রধান
ক্রমেই উত্তেজনার পারদ চড়ছে পাক-ভারত সীমান্তে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হয় কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান করা হোক, নয়তো পাকিস্তানের ওপর হামলা করুক ভারত। সীমান্তে শান্তি ফেরানোর এটাই একমাত্র উপায়।’- বুধবার এমনই মন্তব্য করলেন পাক গুয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সাবেক ডিরেক্টর হামিদ গুল। এদিন বিএসএফের বহরে পাক জঙ্গিদের হামলার ঘটনার পরই ভারতের এক প্রথমসারির টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইন্দো-পাক সীমান্তের অস্থিরতা নিয়ে এ কথা বলেন গুল। এ সময় বিএসএফের ওপর হামলায় হাতেনাতে ধরা পড়া পাকিস্তানি নাগরিক পরিচয় দেয়া নাভেদের ‘পাকিস্তানি জাতীয়তা’ অস্বীকার করেন গুল।ফাস্টপোস্ট, আইবিএন।

গন্তব্যহীন অবরোধ কর্মসূচি এবং... by কাফি কামাল

কেন হঠাৎ করে খালেদা জিয়া অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিলেন তা আজও এক রহস্য। সহিংস এ আন্দোলন থেকে কি পেলো বিএনপি। কেনইবা দলটি পাল্টা চাল দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে বারবার। একই দলের রাজনীতি করেও বিএনপি নেতাদের ভাগ্য কেন আলাদা। এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে বিএনপির ময়নাতদন্তের এবারের পর্বে। লিখেছেন আমাদের রাজনৈতিক সংবাদদাতা কাফি কামাল-
২০১৪ সালে একাধিক অনুষ্ঠানে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলেছিলেন, ভুল সংশোধন করে ফের আন্দোলনে যাবে বিএনপি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল উল্টো। ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের এক বছর পূর্তির দিনে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। কিন্তু সরকার ও বিরোধী দলের পরস্পরবিরোধী কঠোর অবস্থানের মুখে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে মারমুখো।
বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচিস্থলে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে প্রশাসনকে দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে শুরু করে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ-সংগঠনগুলো। মূলত গাজীপুর থেকেই শুরু হয় এ প্রতিবন্ধকতা। ৫ই জানুয়ারি ঘোষিত প্রতিবাদ সমাবেশকে কেন্দ্র করে ৩রা জানুয়ারি রাতেই বিএনপির দপ্তর সম্পাদককে কার্যালয় থেকে উঠিয়ে পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি এবং খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলে। তখন দেখা গেছে বিএনপি উপযুক্ত বিকল্প কৌশল দিতে পারেনি। সরকারের তরফে এরকম অন্যায্য বাধা যে আসতেই পারে, তা কারও অনুমানের বাইরে থাকার কথা নয়। কিন্তু বিএনপিকে চৌকসভাবে পা ফেলতে দেখা যায়নি। বরং পদে পদে তাদের ভীরুতা ফুটে উঠেছে। ৫ই জানুয়ারিতে নির্দিষ্টভাবে সমাবেশ করতে না চেয়ে ওই একই আবেদনে কয়েকটি তারিখ তারা দিতে পারত। এর ফলে প্রশাসন বিপাকে পড়ত। কিন্তু কেবল ৫ই জানুয়ারিতেই সভা করতে চেয়ে ‘পাল্টাপাল্টি’ অবস্থা সৃষ্টিতে সহযোগিতা দিয়েছে বিএনপি। প্রশাসন এর সুযোগ নিয়েছে। মানুষ দেখেছে একদিনে দুই কর্মসূচি হলে সহিংসতা বাড়ত। 
৫ই জানুয়ারি অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে মূল কর্মসূচিতে যেতে চাইলে পুলিশের বাধা বিস্ময়কর ছিল না। একপর্যায়ে পেপার স্প্রে ছোড়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময় গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের মুখে পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে ‘অনির্দিষ্টকালের অবরোধ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন খালেদা জিয়া। যখন এটা ঘোষণা করা হয়, তখনও বিএনপির অনেক বড় নেতারই জানা ছিল না, কোথাকার পানি কোথায় গড়াতে পারে। পরিণাম কি হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো হোমওয়ার্ক ছাড়াই ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘতম অবরোধ ডাকা হয়।  
কিন্তু এবার বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে বিএনপির রাজনীতি। দিনের পর দিন কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয় খালেদা জিয়াকেই। গণগ্রেপ্তার শুরু হয় সারা দেশে। ঢাকায় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ ডজন ডজন সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আত্মগোপনে থেকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালনকালে যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয় একটি দল। বিএনপির যে দু-একজন নেতা কোনভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন, তাদের কাছে এ ঘটনা ছিল এক ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা।
অন্যদিকে অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে প্রতিদিনই একের পর এক নাশকতার ঘটনা ঘটতে থাকে। এসব ঘটনায় বিএনপির বিরুদ্ধে উগ্রবাদী প্রচারণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বিএনপির আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও আইনি জালে বিএনপি নেতৃত্বকে আটকে ফেলে সরকার।
কিন্তু দ্রুত ভুল না শুধরে অপরিণামদর্শী কর্মসূচিটি গন্তব্যহীনভাবে চালিয়ে নিতে থাকে বিএনপি। এ সময় বিশ্ব ইজতেমা ও পাবলিক পরীক্ষার মতো ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলন থেকে সরে আসা বা বিকল্প কর্মসূচির দিকে যেতে ব্যর্থ হয় তারা। হঠাৎ ঘোষিত অদূরদর্শী ও গন্তব্যহীন এ কর্মসূচিকে তিনমাস টেনে নেয়ার বিষয়টি বিএনপির ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। টানা কর্মসূচি চলাকালে বিএনপি চেয়ারপারসন নিজেই বলেছেন, ‘যৌক্তিক পরিণতি’ না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। কিন্তু ভুল চালের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে টানা অবরোধ ও হরতালের কর্মসূচি কোন প্রাপ্তি দেয়নি বিএনপিকে। এরপর সিটি নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আন্দোলন থেকে সরে আসতে হয়েছে বিএনপিকে। শেষ পর্যন্ত গন্তব্যহীন এ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বিরোধী জোট কিন্তু তাতে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়েনি। বরং ‘জঙ্গি শক্তি’ এবং ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করার আন্দোলন’ এর তকমা নুতন করে তারা ললাটে লিখেছে।
নাইন ইলেভেনের পরে বিএনপির জামায়াতকে নেয়া ‘অসময়ের’ বলে চিহ্নিত ছিল। ভারত-মার্কিন সম্পর্কের রসায়ন বুঝতে তো পারেইনি, বরং চীনকে চটিয়েছে। এরপর বিএনপির ভুল সবই ভুল। ফারুকের ভায়রা ভাইকে প্রধান উপদেষ্টা পদে যোগ্য করেও তারা তাকে দায়িত্ব নেয়াতে পারেনি। তিনি দায়িত্ব নিয়ে ফেললে আরও ক্ষতিকর ইয়াজউদ্দিন উপাখ্যান হয়তো সৃষ্টি হতো না। কারণ একজন অধ্যাপকের বিরুদ্ধে এদেশে যা করা যায়, তা একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে করা সম্ভব হয় না। বিএনপি এটা ঠেকাতে পারেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচন তারা বয়কটও করতে পারেনি। আবার ৫ বছর পরে ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবে তারা নির্বাচনে যেতে পারেনি। ততদিনে গোটা বিশ্ব বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ঠেকাতে একাট্টা হয়েছে। আর তখন বিএনপি আর জামায়াতে ইসলামী ছাড়তে পারছে না। বরং, তখন তারা পশ্চিমা বিশ্বের মিত্রদের স্তব্ধ করে দিয়ে হেফাজতে ইসলাম উদ্ধারে নেমেছে। অথচ তারা গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলায় বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপির ঐতিহাসিক আইনি লড়াইকে তারা পুঁজি করতে পারতো। জিয়া, খালেদা জিয়া কেউ গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দেননি। যুদ্ধারাধের বিচার ইস্যুতে বিএনপির ক্ষতি সামান্য। কিন্তু জামায়াতের  কাছে প্রশ্ন তার অস্তিত্ব রক্ষার। জামায়াত রাজপথে অরাজনৈতিক পথে বিএনপিকে এড়িয়ে জয়ী হতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। ওই পর্বের পরে জামায়াতকে আর  ব্যাপকভিত্তিক প্রকাশ্য সহিংসতায় দেখা যায়নি। বিএনপির ডাকা কোনো আন্দোলনেই জামায়াত তার পেশি শক্তি ব্যবহার করেনি। এখন তার বড় ঢাল বিএনপির সঙ্গে লেপ্টে থাকা। জামায়াতের নতুন প্রজন্ম হয়তো একদিন দলের কলঙ্ক ঘোচাতে নাম পাল্টাবে, জাতির কাছে ক্ষমাও চাইবে, কিন্তু তখন তা আর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির কাজে লাগবে না।
বিএনপিকে অবরোধ চালিয়ে নিতে শরিকদের মধ্যে কারা মদত যুগিয়েছিল তা এখনও পরিষ্কার নয়। জামায়াত নেতারা কি করেছিলেন, তা একদিন নিশ্চয় জানা যাবে। আন্দোলন থেকে সরে আসার পথ তৈরি করতেই দ্রুত অংশ নিতে হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি সিটি নির্বাচনে। এর মধ্যদিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতে জামিন পেয়ে ঘরে ফিরতে পেরেছেন। কিছু কিছু নেতাকর্মীও কারাগার থেকে পর্যায়ক্রমে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু আন্দোলন চলাকালে নাশকতার ঘটনায় একাধিক হত্যা মামলায় হুকুমের আসামি হয়েছেন খালেদা জিয়া। গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে দলের ভবিষ্যৎ নেতা তারেক রহমানের বক্তব্য-বিবৃতি। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতৃত্ব। বেশির ভাগ নেতাকর্মীর গলায় এখন মামলার ফাঁস। একের পর এক মামলায় চার্জশিট হচ্ছে।
বিএনপি নেতারা ঘরোয়া আলোচনায় এখন আত্মসমালোচনা করেন। যে জনগণের জন্য আন্দোলন, সে জনগণের তরফে তাদের প্রতি বিরাগ তৈরি হয়েছে পাবলিক পরীক্ষার সময় কর্মসূচি স্থগিত না করায়। টানা অবরোধ ও সপ্তাহে পাঁচ দিন হরতালের কর্মসূচি কোন যুক্তিতেই বাস্তবসম্মত নয় এবং জনগণের পক্ষে সেটা মানা সম্ভব ছিল না। মাসের পর মাস আন্দোলনকে সমর্থন করার সামর্থ্য রাখে না বাংলাদেশের কর্মজীবী মানুষ। এ বিষয়টি অনুধাবনই করতে পারেনি দলটি। সরকার ৫ই জানুয়ারি বিএনপিকে জনসভা করতে না দেয়া ও তাকে অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়গুলো জনগণ ভালভাবে নেয়নি। তেমনি মাসের পর মাস কর্মসূচির মাধ্যমে দেশবাসীকে অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়টিও সমর্থন করতে পারেনি। বিএনপির সমর্থক বা দলটির প্রতি সহানুভূতিশীলদের পক্ষেও তা মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি পেট্রলবোমা ও নানাবিধ সহিংসতায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির কারণে এ আন্দোলন বিভিন্ন মহলে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনোমতেই এরকম সহিংসতার মধ্যে ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচনের আওয়াজ তুলতে পারেনি। অথচ সেটাই ছিল বিএনপির চূড়ান্ত লক্ষ্য। পরিস্থিতি উপলব্ধি করে  জামায়াতের সঙ্গে জোট ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেনি দলটি। এ ধরনের ভুল কৌশল বিএনপি নির্মূলে সরকারের লক্ষ্য পূরণকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও চলতি শতকের প্রথম দশকে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনগুলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক হলেও তাতে জনগণের সমর্থন ও সম্পৃক্ততা ছিল। জেল-জুলুম, হামলা-মামলা উপেক্ষা করে আন্দোলনরত দলগুলোর নেতাকর্মীরা মাঠে তৎপর ছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালের আন্দোলনের চেহারাটি ছিল অনেকটাই ভিন্ন। নেতারা সব আত্মগোপনে, কর্মীদের মিছিলও হাতেগোনা। পৌনে দুমাস ধরে আন্দোলন চলাকালে ঘটেছে একের পর এক নাশকতা। একদিকে যানবাহনে পেট্রলবোমায় মরেছে সাধারণ মানুষ অন্যদিকে ক্রসফায়ারে মরেছে রাজনৈতিক কর্মী। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে- কড়া আন্দোলনের মাধ্যমে দেশ অচল করা ও বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের নজরে এনে তাদের মধ্যস্থতায় নির্বাচনের পথ বের করাই ছিল বিএনপির লক্ষ্য। কিন্তু উপর্যুপরি নাশকতা সে সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিয়েছে। নাশকতা বিএনপির কাজ নয় বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে দলটির ভাবমূর্তির।
২০১৫ সালের ৫ই জানুয়ারির আন্দোলনের আগে তার সমর্থনে রাজধানীতে নব্বইয়ের দশকের ছাত্রনেতাদের সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সাবেক ছাত্রনেতারা খালেদা জিয়াকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের দেখা যায়নি আন্দোলনের মাঠে। কর্মসূচি চলাকালে নেতাদের একাংশ যখন আত্মগোপনে আরেক অংশের নেতারা তখন ছেলেমেয়েদের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনে ছিলেন ব্যস্ত। নেতৃত্বের একাংশ যখন কারাগারে ধুঁকে মরেছেন, তখন আরেক অংশ সরকারের সঙ্গে সমঝে চলে করেছেন নিরাপদ দিনযাপন। সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক বিষয়ে তাদের আঁতাতের কথা ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
বড় কথা হচ্ছে- বিএনপির বিশাল জাতীয় নির্বাহী কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ নেতৃত্বের বসবাস ঢাকায়। কিন্তু আন্দোলনে তাদের কোন ধরনের ভূমিকা দৃশ্যমান ছিল না। ৪ঠা মার্চ ১৬ জন কূটনীতিক খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করতে যান। পরদিন খালেদাকে গ্রেপ্তার করার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। এই ঘটনার পরও পরদিন বিএনপির ১০ জন কর্মীকেও গুলশান এলাকায় দেখা যায়নি। অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নেতৃত্বও ছিলেন অলিখিত সমঝোতায় নিরাপদে। এছাড়া সরকারবিরোধী বিগত কয়েক বছরের আন্দোলনে চূড়ান্ত রকমের সমন্বয়হীন ছিল বিএনপির নেতৃত্ব। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বলতে গেলে যোগাযোগই করতে পারেনি তৃণমূল। কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতারা নিজেরাও নামেননি, মাঠে নামতে দেননি তৃণমূলকেও। অবশ্য তখন পরিস্থিতিও ছিল অভাবনীয় রকমের প্রতিকূল। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের উপর যে দীর্ঘমেয়াদে, যে ব্যাপকতায় দেশব্যাপী টানা নিপীড়ন চালিয়েছে তার নজির ১৯৯০ সালের পরের বাংলাদেশে নেই। অনেকের মতে দমন-পীড়নের কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে পারেননি এটা যেমন সত্য, তেমনি বিএনপির কিছু কেন্দ্রীয় নেতাকে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংবর্ধনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে দ্বিধাহীন চিত্তে খোশালাপে দেখা গেছে।
দৃশ্যত বিএনপির ভেতরেও একা খালেদা জিয়া। গুলশানের আলোচনা সরকারের কানে পৌঁছতে সময় লাগছে খুবই কম। দলের বেশির ভাগ শীর্ষ নেতার বিশ্বাসযোগ্যতাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। নিজেরাই নিজেদের সরকারের, কখনও বিদেশের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ সুযোগে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করেছেন সুবিধাবাদীরা। ফলে দলটির অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা প্রায় সীমিত।
রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টির পাশাপাশি আত্মসমালোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন পথচলার সুযোগ করে দিয়েছিল ওয়ান-ইলেভেন। তৈরি করে দিয়েছিল দুর্নীতিসহ নানাক্ষেত্রে নেতিবাচক ইমেজের নেতৃত্বকে সরিয়ে নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনার পথ। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কাজে লাগাতে পারেনি সে সুযোগ। বিশেষ করে বিএনপিকে দেখা গেছে, চরম অদূরদর্শী ভূমিকায়। ওয়ান-ইলেভেনের পর দলের জাতীয় কাউন্সিলে নেতিবাচক ইমেজের নেতারা কেবল তথাকথিত আনুগত্যের জোরে বহাল তবিয়তে থাকার পাশাপাশি পেয়েছেন পদোন্নতি। নেতাকর্মীদের মধ্যে সাধারণত ‘স্যার’ সম্বোধনের রেওয়াজ নেই রাজনীতিতে। কিন্তু বিএনপির রাজনীতিতে ঘনিষ্ঠ এ সম্বোধনের চর্চা সীমিত। বাকিদের বেশির ভাগই স্যার সম্বোধন না করলে রাগ করেন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একের পর এক সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা ও ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্তি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করা হয়।
রাজনীতির কৌশলের মতো জাতীয় নির্বাচনে দলীয় নমিনেশন দেয়ার ক্ষেত্রেও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত দেখা গেছে বিএনপিতে। চরম সংকটকালেও রাজনীতিকদের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে ব্যবসায়ী ও আমলাসহ দলের নবাগতরা। দলটি এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, একজন ব্যবসায়ীকে ধানের শীষ প্রতীক উপহার দিতে ছাত্রদলের একজন শীর্ষ নেতাকে আসন ছাড়তে হয়েছে।
৩৬ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার ষড়যন্ত্রমূলক ভাঙা-গড়া ও উত্থান-পতনের শিকার হয়েছে বিএনপি। জিয়াউর রহমানের জাগোদল ও বিএনপিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন বহুদলীয় ও বহুমতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। সেই সঙ্গে রাজনীতি সচেতন বিগ্ধজনদের সমাবেশ। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ষড়যন্ত্রকারী ইঁদুর কাটতে থাকে বিএনপির ঐক্যের জাল। তবে বিএনপির সবচেয়ে বড় ধরনের ভাঙনটি ঘটে অষ্টম সংসদ ও ওয়ান-ইলেভেনের সময়। রাজনৈতিক মতদ্বৈততাকে কেন্দ্র করে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব প্রফেসর ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের মতো সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে দল ছাড়েন অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তারা কেবল দলই ছাড়েননি, বিএনপির বিরুদ্ধে নানা প্র্রচারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, দল ছেড়ে যাওয়ার পর তাদের নানা বক্তব্যে। সর্বশেষ আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে দলের একটি সংস্কারপন্থি গ্রুপ আলাদা তৎপরতা চালান। এসবের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠাকালীন বহু প্রভাবশালী ও সম্ভাবনাময় নেতা বিভিন্ন সময়ে বিএনপি ছেড়েছেন। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বারবার ভাঙা-গড়ার খেলায় জড়িত হলেও তৃণমূল নেতৃত্ব ছিল সবসময় ঐক্যবদ্ধ। বর্তমান রাজনৈতিক দুঃসময়েও সরকারের বিরুদ্ধে দল ভাঙার অপচেষ্টা চালানোর অভিযোগ করছে বিএনপি। দলীয় মহলে গুঞ্জন চলছে দলের ভেতরও কেউ কেউ যুক্ত হয়েছে সে ভাঙনের প্রক্রিয়ায়।

সাক্ষ্য আইন যুগোপযোগী হওয়া প্রয়োজন by নাওমী নাজ চৌধুরী

যদি একজন ধর্ষিতার ধর্ষণের পরবর্তী সময়ের মানসিক যন্ত্রণা ও বিড়ম্বনা নিয়ে আপনার মনঃকষ্ট হয়, তবে চিন্তা করে দেখুন যে সেই মেয়েটির কী অবস্থা হয় যখন আদালতে তাঁরই চরিত্র নিয়ে তাঁকে অপ্রাসঙ্গিক নানা প্রশ্নের জালে আটকা পড়তে হয়?
যেকোনো মামলায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের প্রমাণের ওপরেই জোর দেওয়া হয় বেশি। অন্তত স্বাভাবিক একটি বিচারপ্রক্রিয়ায় তা-ই হওয়া উচিত। কিন্তু একটি ধর্ষণের মামলায় বিচারকার্য ভিন্নভাবে হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে আসামি পক্ষের আইনজীবী ধর্ষিতাকে তাঁর চরিত্র ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন, যার কারণে ওই মামলার সম্পূর্ণ মনোযোগ আসামি থেকে সরে যেতে বাধ্য। আইন যে শুধু এই ধরনের জিজ্ঞাসাবাদের ফলাফল মামলায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দেয় তা নয়, এর ওপরে ভিত্তি করে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা সাজাপ্রাপ্ত হওয়া থেকেও তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে থাকে।
ঔপনিবেশিক সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারায় ‘চরিত্র বিশ্লেষণ’ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘একটি ধর্ষণ মামলার বাদী যদি সাধারণভাবেই একজন অনৈতিক চরিত্রের অধিকারিণী হন, তাহলে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তাঁর ধর্ষণকারীর বা হরণকারীর পক্ষে আদালতে ব্যবহার করা যাবে’, অন্যভাবে বলা যায়, ওই বিধানে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে বিচারকার্যে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ওই বিধান অনুযায়ী ‘বিচারকার্যকে’ অভিযোগকারিণীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
উচ্চ আদালতে ‘চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করতে সম্প্রতি বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) একটি গবেষণা করেছে। ঢাকা ল রিপোর্টস এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল ডিসিশনে গত ১০ বছরে (২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত) প্রকাশিত সব সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বৈবাহিক অবস্থান থেকে শুরু করে একজন ধর্ষিতার অতীত সম্পর্কের ইতিহাস আসামি দ্বারা নিজকে রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেসব বিবৃতি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আবদুল মজিদ বনাম রাষ্ট্র [১৩ বিএলসি ২০০৮[ মামলায় একজন তালাকপ্রাপ্ত মা, যিনি তাঁর শিশুসহ তাঁর কুঁড়েঘরে ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় ধর্ষিত হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। পালানোর সময় অভিযুক্ত ধর্ষক গ্রামবাসীর কাছে ধরা পড়েন এবং অপরাধ স্বীকার করেন। আদালতে অভিযোগকারীর বৈবাহিক অবস্থা এবং যৌন সম্পর্কের ইতিহাসকে তাঁর ‘চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’ বিবেচনায় তাঁকে ‘যৌন কার্যকলাপে অভ্যস্ত’ বলে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয়, ‘...ধর্ষিতা একজন হালকা নৈতিক চরিত্রের অধিকারিণী এবং তিনি অসামাজিক ও অনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত রয়েছেন...।’
রাষ্ট্র বনাম শাহীন এবং অন্যান্য [২৮ বিএলডি (হাইকোর্ট ডিভিশন) ২০০৮ মামলায় ধর্ষণের অভিযোগকারীর দুবার বিয়ে হয়েছিল। তাঁকে তাঁর নানির কাছ থেকে ছিনিয়ে একটি হোটেলের কক্ষে সদলবলে ধর্ষণ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও আদালতের রায়ে বলা হয় যে ‘এটি এমন একজন নারীর ধর্ষণের মামলা, যার আগে দুবার বিয়ে হয়েছিল...’ এবং ‘এই মামলাটি এমন একটি উদাহরণ, যেখানে উল্লিখিত কারণে বাদীর একার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না...’।
সোহেল রানা বনাম রাষ্ট্র ৫৭ ডিএলআর (এডি) (২০০৫) মামলায় আগের সম্পর্কের ইতিহাস টেনে আনা এবং ধর্ষিতার দ্বারা শারীরিক প্রতিরোধ প্রদর্শন করতে না পারার বিষয়ে দেওয়া অভিমতটি প্রণিধানযোগ্য। এ ক্ষেত্রে আদালত আসামিকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন এবং অভিযোগকারীকে সম্মানের সঙ্গে এই বলেন যে ‘...যদি একজন নারী সহজেই একজন পুরুষের লালসার শিকার হন এবং নিজের সম্ভ্রম রক্ষায় সামান্যতম বাধাও না দেন, যা তাঁর কাছে তাঁর জীবনের থেকেও মূল্যবান, তবে তা ধর্ষণ নয়...।’ এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী তাঁরই নিজ বাসায় তাঁর প্রতিবেশী দ্বারা ধর্ষিত হন, যিনি তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে বিয়ে করার মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
শ্রী দিনটা পাল বনাম রাষ্ট্রের মামলায় ৩০ বিএলডি (এডি) ২০১০ দেখা যায় যে আদালত অভিযোগকারীর গাছ বেয়ে ওঠাকেই তাঁর ‘খারাপ চরিত্র বা দুশ্চরিত্র’ হিসেবে প্রমাণ করেন এবং তাঁর সাক্ষ্যকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরে নেন। অভিযোগকারী ছিলেন একজন অল্প বয়সী গৃহপরিচারিকা, যিনি তাঁর চাকরিদাতা দ্বারা ধর্ষিত হন। আদালত এ ক্ষেত্রে মন্তব্য করেন যে ‘...যেহেতু অভিযোগকারী অভিযুক্তের বাড়ির সদর দরজা বন্ধ থাকার সময় একটি পেঁপেগাছ বেয়ে উঠে ঢুকেছিলেন, এতে প্রমাণ হয় যে বাদী একজন হালকা সম্ভ্রমের নারী। তাই তাঁর দেওয়া প্রমাণ বিশ্বাসযোগ্য হবে না, যতক্ষণ না আরও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেশ করা হবে...।’
অবশ্য আদালতের এমন রায়ও রয়েছে যেখানে একজন ধর্ষিতার সৎ চরিত্রের প্রমাণকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ফাতেমা বেগম বনাম আমিনুর রহমান ২৫ বিএলডি (এডি) (২০০৫) মামলায় আদালত বলেছিলেন, ‘...বিজ্ঞ উকিল উপস্থাপন করেছেন যে মামলার বাদী একটি সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারের একজন অবিবাহিতা কলেজপড়ুয়া ছাত্রী...এ ক্ষেত্রে প্রশ্নই ওঠে না যে বাদীর চরিত্র সন্দেহজনক হতে পারে।’
‘চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’ ধারণাটি আইনে আছে বলেই আদালত ধর্ষণের মামলাকারীর চরিত্র এবং তাঁর আগের যৌন সম্পর্কের ইতিহাসকে প্রাসঙ্গিক বলে ধরে নেন এ পর্যন্ত যে মামলাগুলো উল্লিখিত হয়েছে তার মধ্যে সব মামলাতেই দণ্ডাদেশ উচ্চ আদালতে খারিজ করা হয়েছিল শুধু একটি বাদে, যা ছিল ওই ফাতেমা বেগম বনাম আমিনুর রহমান মামলাটি। এখানে গণধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত আট পুরুষের মধ্যে পাঁচজনকেই সাজা দেওয়া হয়। তিনজনকে খালাস দেওয়া হয়; তদুপরি আদালত উপলব্ধি করেন যে অভিযোগকারী একজন সুচরিত্রের অধিকারিণী। ‘চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’ ধারণাটি আইনে আছে বলেই আদালত ধর্ষণের মামলাকারীর চরিত্র এবং তাঁর আগের যৌন সম্পর্কের ইতিহাসকে প্রাসঙ্গিক বলে ধরে নেন। এখানে খেয়াল করা অত্যন্ত জরুরি যে একটি ধর্ষণের মামলায় সাধারণত ধর্ষিতাই একমাত্র সাক্ষী এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি তাঁর চরিত্র নিয়ে কোনো ইঙ্গিত করেন, তাতে তাঁর একান্ত সাক্ষ্য সহজেই আক্রান্ত হতে পারে। একজন ধর্ষিতার বিচার পাওয়ার পথে এসব আইন বাস্তবে পর্বত প্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ধর্ষণের পরবর্তীকালে একজন ধর্ষিতা যে ধরনের সামাজিক চাপের সম্মুখীন হন, তা প্রায় সময়েই তাঁকে চুপ থাকতে এবং বিচার না চাইতে বাধ্য করে। পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায় যে ২০১৪ সালে ‘নারী ও শিশু নিপীড়নের’ (যাতে ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন অপরাধও অন্তর্ভুক্ত) ২১ হাজার ২৯১টি মামলা দায়ের করা হয়, যা ২০১৩ সালে দায়ের করা ১৯ হাজার ৬০১টি মামলা হতে সংখ্যায় অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। এর মধ্যে কতগুলো মামলার ফলাফল হিসেবে দণ্ড প্রদান করা হয়েছিল সে ব্যাপারটি অস্পষ্ট। ধর্ষণের শিকার যাঁরা হয়ে থাকেন বা হয়েছেন, তাঁদের প্রতিকারে এ ধরনের ১৪৩ বছর আগে অন্তর্ভুক্ত প্রাচীন এই আইনটির কতিপয় বিধানের সংশোধন অতি জরুরি। একটি ধর্ষণের মামলায় ধর্ষিতার চরিত্রের প্রতি আঘাত করা এবং তাঁর আগেরযৌন সম্পর্কের ইতিহাস টেনে আনা যে তাঁর প্রতি কতটা অনুভূতিহীন এবং অপ্রাসঙ্গিকই শুধু নয়, তাঁকে একটি অগ্নিপরীক্ষায় পুনরায় ঠেলে দেওয়া এবং তাঁর প্রতি ন্যায়বিচার অস্বীকার করার নামান্তরও বটে। এশিয়ার অনেক দেশের মতো তা উপলব্ধি করার সময় এখন বাংলাদেশেরও এসেছে।
নাওমী নাজ চৌধুরী: বার অ্যাট ল, আইনজীবী, ব্লাস্ট।

সাংস্কৃতিক জাগরণই সব অন্ধকার দূর করতে পারে by ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে শেখ হাসিনার সরকার এবং দায়িত্বশীল কিছু পত্রপত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার দায়িত্বশীলরা যতটা সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছেন বৃহত্তর জনসাধারণের মধ্যে ততটা সচেতনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিষয়টি মনে হয় আরো তলিয়ে দেখার দাবি রাখে। এই লেখায় সেই চেষ্টা কিছুটা করা হলো। তবে শুরুতে দেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় জিহাদি গোষ্ঠী কিংবা দল নানা নামে বেশকিছু সংগঠন সক্রিয় রয়েছে কিংবা সক্রিয় হচ্ছে, প্রায়শ তাদের আক্রমণ, হত্যা ও ধরপাকড়ের সংবাদ মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পারছে এবং এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরই মধ্যে জঙ্গিরা বেশ ক’জন মুক্তমনা লেখককে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, কয়েকজন জঙ্গি ধরা পড়েছে, তাতে উঠতি বয়সের তরুণদের যুক্ত হওয়া, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া ইত্যাদি নানা বিবরণ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ নানা নামের জঙ্গি সংগঠনগুলো দেশীয় তরুণদের ওপর শুধু নয়, বিদেশি জঙ্গিবাদী বেশকিছু সংগঠনের মতাদর্শগত চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ, আর্থিক এবং সামরিক প্রশিক্ষণসহ নানা সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের আর্থিকসহ নানা ধরনের সহযোগিতার ধরন-ধারণগুলো এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে উদ্ঘাটিত হয়নি। তবে এরা যন্ত্রপ্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, অনলাইনের ব্যবহার ইত্যাদিতে যথেষ্ট প্রশিক্ষিত। কেননা, এদের সঙ্গে আমাদের দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসাপড়ুয়া কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী যেমন রয়েছে, অনেক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষজনও জড়িত রয়েছে বলে তথ্যে প্রকাশ। তারা দেশের বাইরে কোনো দেশে গিয়ে অথবা বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য নিজেদের উৎসর্গীকৃত করছেন। তবে উৎসর্গের পথটি তাদের মোটেও মানবিক বা যুক্তিসঙ্গত নয় বরং নির্মম এবং পৈশাচিক। নৃশংসতার প্রতীক হতেও তাদের মানা নেই। নিজেদের বিশ্বাসকে নিরঙ্কুশভাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করতে গিয়ে এসব সংগঠনের কর্মীরা সমাজের উদারবাদী ও যুুক্তিবাদী মানুষ যারা কাউকে জোর করে নয় বরং নিজেদের লেখালেখির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করছেন, চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করছেন তাদের হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করছে না। এরা মানুষ হত্যা করাকে তাদের ‘পবিত্র ধর্মীয় দায়িত্ব’ বলে বিশ্বাস করছে। এমন পর্যায়ে চিন্তা করতে শেখা, অমানবিক এবং নৃশংসতাকে বাস্তবায়ন করতে দ্বিধা না করা মোটেও সহজ কাজ নয়। ধর্মীয়ভাবে এসব অপকাণ্ড সমর্থিত হতে পারে না। ইসলাম এমন অপকাণ্ডে কখনোই সায় দেয় না। বিষয়গুলো নিয়ে মিডিয়ায় অনেক কিছু লেখা হচ্ছে, বলা বলিও হচ্ছে। তারপরও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ-তরুণী ধর্মীয় উগ্রপন্থির অবস্থান থেকে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে একাত্ম হচ্ছে, নিজেদের বিলিয়ে দিতে চাচ্ছে এবং পরকালে এর প্রতিদান পেতে প্রয়োজনে আত্মঘাতী হামলায়ও অংশ নিচ্ছে। নিজের জীবনকে এতখানি পর্যন্ত সঁপে দেয়ার জন্য যেসব তরুণ জঙ্গিবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, সংগঠনের নেতার সিদ্ধান্ত মানতে তৎপর রয়েছে, সেসব তরুণের মনোজগতের গঠনকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।
সাংস্কৃতিক জাগরণই সব অন্ধকার দূর করতে পারেবাংলাদেশে জঙ্গিবাদী সংগঠনের উত্থান আশির দশকে শুরু হয়েছে। মূলত আফগান সংকটকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উগ্রধর্মীয় গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যখন তালেবানসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান শুরু করে তখন বেশকিছু মাদ্রাসা ছাত্র, শিক্ষক, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে এক সময় সক্রিয় ছিল এমন কিছু নেতাকর্মী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও যুদ্ধে অংশ নেয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও জামায়াতের নেতাকর্মীরা বদর ও শামস বাহিনীতে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অংশ নিয়ে গণহত্যাসহ বুদ্ধিজীবী হত্যায় অংশ নেয় যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এখানেও উগ্র, হঠকারী, মানবতাবিরোধী মানসিকতার স্ফুরণ ঘটতে দেখা যায়। সত্তর দশকে ভিন্ন বাস্তবতায় এদের উত্থানের শুরুতে ওই দশকের মাঝামাঝি থেকে একত্রিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্যের অবতরণের বিষয়টিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুনভাবে ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এতে বিভিন্ন দেশ থেকে বেশকিছু তরুণ পাকিস্তানে অস্ত্র প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে সরকার উৎখাত এবং সোভিয়েত বাহিনীকে বিতাড়নে যুক্ত হয়। বিষয়টিকে তাদের কাছে ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে তখন দেখানো হয়। এক সময় সোভিয়েত বাহিনী চলে গেলেও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে সরকার উৎখাতে অংশ নেয়ার তরুণরা দেশে বা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন স্থানে নানা সংঘাতকে তাদের মতো করে দেখাতে শুরু করে। এদের মাধ্যমে জন্ম নিতে থাকে নানা ধরনের জঙ্গিবাদী সংগঠন। আন্তর্জাতিকভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের সংগঠনও গড়ে ওঠে। তালেবান-আলকায়দা সংগঠন নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রে আর্থিক, সামরিক এবং আদর্শিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। এরই মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পতন মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় উগ্রজঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোকে বিশ্ব মতাদর্শের বিরোধ ও দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ বিগ্রহের অবস্থানে একটি নতুন জায়গা দেখিয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন যেভাবে প্রলেতারিয়েত আন্তর্জাতিকবাদের নামে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে প্রণোদনা জুগিয়েছিল তা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো নিয়মতান্ত্রিক ধারায় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেও মাঠপর্যায়ে অনেক তথাকথিত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সংগঠন তা ধারণ করার ক্ষেত্রে সশস্ত্র পন্থায় বিপ্লব সংঘটিত করার ধারায় পরিচালিত হয়। তখন এমন কাজ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক দেশেই নানা ধরনের উগ্র হঠকারী বিপ্লবী ছোট ছোট সংগঠন গড়ে ওঠে যেগুলো শেষ পর্যন্ত মার্কসবাদী রাজনীতির বুকে ছুরিকাঘাত করেছিল। এটি মূলত মার্কসবাদী তত্ত্ব বোঝা এবং প্রয়োগ ঘটানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাকর্মীদের জ্ঞানগত অভাবের কারণেই বেশি ঘটেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সর্বত্র সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার বিষয়টি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সেই সময় অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশে আদর্শিক জায়গায় স্থান করে নেয়ার জন্য আল কায়েদাসহ এসব ধর্মীয় নামধারী সংগঠনের উদ্যোগ ও আবির্ভাব ঘটে। যদিও ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে একটি বিজয় ঘটেছিল, কিন্তু যেহেতু ইরান একটি শিয়া অধ্যুষিত দেশ তাই ইরানের প্রভাব এসব সংগঠনে খুব বেশি ঘটানো সম্ভব হয়নি। সৌদি আরব প্রত্যক্ষভাবে কোনো সংগঠনকে আন্তর্জাতিকভাবে মদদ না দিলেও তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠী মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, তুরস্কসহ অপেক্ষাকৃত দুর্বল মুসলিম দেশগুলোর নানা গোষ্ঠী আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামি বিপ্লব সংঘটনে বিভিন্ন তাত্ত্বিক, আর্থিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইসলামের মূল্যবোধ ও চেতনায় যদি প্রকৃতই শানিত হওয়া যায় তাহলে বর্বরতা পৈশাচিকতা-নৃশংসতার সব শিকড় উপড়ে ফেলা সহজ হবে। কারণ ইসলাম মানবিক হতে শিক্ষা দেয়। উগ্রবাদের স্থান ইসলামে নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম মহানুভবতার শিক্ষা দেয়।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এসব সংগঠনে নানা ভাঙাগড়া যেমন ঘটেছে, আবার নতুন নতুন শক্তির আবির্ভাবও ঘটেছে। অর্থ, সাংগঠনিক সংযোগ এবং জনবল সংগ্রহ করার দিক থেকে তালেবান-আল কায়েদা বাহিনী অনেক বেশি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর প্রভাব পড়ে আমাদের মতো দেশগুলোর তরুণদের একটি অংশের ওপর। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রচুর অর্থ মিডিয়ায় লগ্নি করে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তারা দেশে দেশে তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিতটাকে এমনভাবে পোক্ত করার চেষ্টা করেছে যে, তাতে অন্য কোনো ধর্মের সঙ্গে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ক রয়েছে এমনটি প্রতিভাত হয় না। এর ফলে উঠতি বয়সের তরুণ মানসের গঠন এক রৈখিকভাবে হতে বাধ্য হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের একাংশ এসব প্রচার-প্রচারণায় ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছে। এরা সর্বজনীন ধারণা গড়ার শিক্ষা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়। অনেকের পক্ষেই এসব জটিল ধর্মীয় কথাবার্তার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা, ভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিতর্কের যুক্তি বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিষয়গুলো বুঝতে হয় জ্ঞানবিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণকে হাজির করে। বিভিন্ন ধর্মের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও জনপদের মানুষকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার সুমহান সৃষ্টি হিসেবে দেখার শিক্ষাই হচ্ছে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা। সব সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা প্রদর্শনপূর্বক সৃষ্টিকর্তার অসীমতাকে বোঝার চেষ্টা করব, তেমন শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার বিষয়টি ১৫ থেকে ২০-২৫ বছরের তরুণ-তরুণীর পক্ষে বোঝা খুব বেশি সম্ভব হয়নি। এসব কিছু জানা এবং বোঝার বিষয়টি হতে হয় জীবনভর। আমি ২০ বছর বয়সে যা বুঝব না নিশ্চয়ই ৩০ বছরে তা অনেক বেশি বুঝব। ৪০, ৫০ বা ৬০ বছর বয়সে আরো অনেক বেশি গভীরতাকে স্পর্শ করা যেতে পারে। আসলে ধর্মের নানা দিক বোঝার জন্যও যে কোনো মানুষের পর্যাপ্ত সময়, অধ্যবসায়, জ্ঞান, গবেষণা ও ধৈর্যের যথেষ্ট প্রয়োজন। একজন ১৫-২০ বছরের তরুণের মন অনেক বেশি অপরিপক্ব, বিশ্বাসকেন্দ্রিক এবং সরল, আবেগনির্ভর থাকে। তাকে চরমপন্থায় ঠেলে দেয়া যত সহজ একজন অভিজ্ঞ বয়স্ক, অনেক বেশি পড়াশোনা জানা মানুষকে উগ্র, হঠকারী পথে ঠেলে দেয়া মোটেও তত সহজ কাজ নয়।
আমাদের দেশে যেসব তরুণ এসব উগ্র, হঠকারী, জঙ্গিবাদী সংগঠনে যুক্ত হচ্ছে তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ২০-এর নিচে কিংবা ৩০-এর মধ্যে। এরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের নানা অগভীর, যুক্তি ও তথ্য প্রমাণহীন ধর্মীয় আলোচনায় অনেক বেশি আকৃষ্ট হয়। তাদের মধ্যে তখন যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এটি তাদের কোনো জঙ্গি সংগঠনের ভেতরে আবদ্ধ করে দেয়া খুবই সহজ। এককালে সর্বহারা মতবাদ গরিব, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের অনেক তরুণকে যেভাবে আকৃষ্ট করেছিল, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবে একত্রিত হয়েছিল এবং গুপ্ত হত্যা সংঘটনে লিপ্ত হয়েছিল। যারা একজন ধনীর গলা কেটে ‘সমাজ বিপ্লব’ তথা সাম্যবাদ কায়েম করার মন্ত্রে পা বাড়িয়েছিল, তাদের পথ হারানোর বিষয়টি ছিল আবেগ এবং অজ্ঞানতা দ্বারা বিপ্লবীতত্ত্বকে বুঝতে যাওয়া, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সমাজ বিপ্লবের জটিল জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারণা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না লাভ করেই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য ‘শ্রেণীশত্রু খতম’ করার হিংস্র অমানবিক পথে যুক্ত হওয়া তাদের দর্শন হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক একইভাবে ইসলাম ধর্মের পবিত্র শিক্ষাকে ঠিকভাবে বোঝার পরিবর্তে অল্প কিছু বিষয় শুনে আবেগ, অজ্ঞানতায় ও উগ্রতায় যুক্ত হয়ে অনেক তরুণই জঙ্গিবাদী সংগঠনে যুক্ত হচ্ছে। ‘নাস্তিক খতম’ করার নামে তারা মানুষ হত্যার অপরাধ ও পাপকে অবজ্ঞা করছে। নিজের মানবিকতাকে বিকশিত না করে জলাঞ্জলি দিয়ে বেড়ে উঠেছে। যে কোনো উগ্রবাদী চিন্তায় বেড়ে ওঠা যে কোনো তরুণের পরিণতি শেষ পর্যন্ত ক্ষতিকরই হয়। মানুষের মধ্যে যারা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও শিক্ষা, সংস্কৃতির বিষয়গুলো জীবনভর শেখার চিরন্তন ধারায় যুক্ত করতে সচেষ্ট থাকেন তারা সত্যিকার জ্ঞান এবং সমস্যা ও সমাধানের পথের সন্ধান করতে পারেন। যারা বিপ্লব ঘটানোর মতো অবাস্তব কল্পনায় নেমে পড়েন নিজের জীবনের মূল্য তখন তার কাছে যেমন কানাকড়ির চাইতেও কম মনে হয়, অন্যের জীবনও তেমন মূল্যহীনভাবে দেখা হয়। মানুষের বেড়ে ওঠার এমন সংকট যে কোনো জঙ্গি বা উগ্রবাদী সংগঠনের কারণে বহুগুণ বাড়তে পারে। এ কারণেই দরকার সাংস্কৃতিক জাগরণ। এই জাগরণই সব অন্ধকার দূর করতে পারে। এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে আল কায়েদার জায়গা অনেকটাই আইএস নামক আরেক উগ্রবাদী সংগঠন নিতে পেরেছে। একটি খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ওই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আইএসের সঙ্গে যুক্ত হতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে বলে সংবাদে প্রকাশ। ব্রিটেনে বসবাসকারী তিনজন তরুণী এমন উন্মাদনায় মত্ত হয়ে ব্রিটেন ছেড়ে আইএসেতে যোগদান করেছিল। তাদের ‘গণিমতের মালের মতো’ ব্যবহার করার সংবাদ শুনে দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু সেই তরুণী তিনজনের বিশ্বাসের জগতে এখন বাস্তব অভিজ্ঞতা কতখানি কার্যকর তা বোঝা দরকার। তবে আমাদের মানসে খিলাফত সম্পর্কে যে ধারণা বিরাজ করছে তার সঙ্গে আইএস কর্তৃক দাবিকৃত ভবিষ্যৎ খিলাফত রাষ্ট্রের কতটা মিল রয়েছে, বাস্তবে তেমন রাষ্ট্র গঠিত হবে কিনা, এসব জটিল বিষয় অনেকেই গভীরভাবে না ভেবে সরল বিশ্বাসেই জঙ্গি সংগঠনের ফাঁদে পা দিচ্ছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন জায়গায় যেসব জঙ্গিবাদী সংগঠনের হামলা ও তৎপরতা চলছে এগুলোতে প্রতি দেশের তরুণদের ছোট একটি অংশের সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবস্থান এক্ষেত্রে খুব স্পষ্ট। তারা স্পষ্টতই এমন পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে। এসব সংগঠন এবং জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। আমাদের দেশের যেসব মানুষ এসব জঙ্গিবাদী সংগঠনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জানায় তাদের প্রতি ঘৃণা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করতে হবে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো জনমত তৈরি করতে হবে। আমাদের নিজ নিজ পরিবারের কোনো তরুণই যেন এতে বিভ্রান্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে জঙ্গিবাদী সংগঠনের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেই। চরমপন্থি দলগুলো যেমন হারিয়ে গেছে পবিত্র ধর্মের নামে উগ্রপন্থির, রাজনীতিও পৃথিবীতে কিছু ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যাকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতিসাধন করা ব্যতীত আদর্শিক কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। তারাও একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু এরই মধ্যে ধ্বংসাত্মক অনেক কিছুই তারা করে ফেলবে। সুতরাং বাস্তবতা আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এখনই নিতে হবে। সেভাবে ধর্ম শিক্ষা ও রাজনীতির শিক্ষা এবং প্রচার সর্বত্র সেভাবেই পরিচালিত করতে হবে। সরকার ও বেশকিছু গণমাধ্যম উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ-প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যেভাবে সজাগ রয়েছে, সতর্কতার সঙ্গে এর নেতিবাচক দিক তুলে ধরছে এই কাজটি আরো বেগবান করতে হবে এবং সংস্কৃতি মনষ্ক সবাইকে এ জন্য দাঁড়াতে হবে এক কাতারে। এ কাজগুলো করতে হবে খুব দ্রুততার সঙ্গে। কারণ জঙ্গিবাদ কিংবা উগ্রবাদ যেভাবে বিস্তার লাভ করছে এখনই তা গোটানোর সব উদ্যোগ-আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তা না হলে গভীর অন্ধকারে সব তলিয়ে যাবে এমনটি তো কাম্য হতে পারে না।
লেখক : ইতিহাসতত্ত্ব ও শিক্ষাবিদ

স্পর্শের আলোয় ঘুচল আঁধার

গাড়ির ইঞ্জিন মেরামত করছেন আসিফ। ছবি: এএফপি
খেলনা বা বেতার যন্ত্রের যন্ত্রাংশ সব আলাদা করে আবার জোড়া লাগানো আসিফ প্যাটেলের জন্য সহজ কথা নয়। কারণ, তাঁর চোখের আলো নেই। জন্ম থেকে তিনি দৃষ্টিহীন। যা কিছু করেন, সবই স্পর্শের অনুভূতি থেকে। এই স্পর্শই তাঁর চোখের আলো। এই আলোই তাঁকে দেখিয়েছে সাফল্যের সিঁড়ি। যে সিঁড়িতে আরোহণ করে আসিফ উদাহরণ হয়েছেন বিরল ঘটনার।
আসিফ (৪৪) পাকিস্তানের করাচি নগরের লাসবেলা এলাকার একজন নামকরা মেকানিক। যে দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে, সেখানে আসিফের এ সাফল্য এককথায় বিরল।
আসিফের ছোট মেরামতের প্রতিষ্ঠানটিতে আরও সাতজন কাজ করেন। লোকজন সেখানে তাঁদের গাড়িগুলোকে মেরামত করতে বিশ্বস্ত মেকানিক আসিফের হাতে রেখে যান।
চোখের সামনে অসিফ পুরোনো একটি টয়োটা গাড়ির ইঞ্জিনের ওপরের ঢাকনাটি খোলেন। এরপর হাত দিয়ে গাড়ির ইঞ্জিনের ত্রুটি শনাক্ত করে তা ঠিক করে ফেলেন। তিনি বলেন, শৈশব থেকে তিনি যন্ত্রের তৈরি বিভিন্ন খেলনা নিয়ে খেলতেন। শুরুতে প্রায়ই ভেঙে ফেলতেন। তাঁর কথা, ‘যখন বাবা খেলনা গাড়িগুলো নিয়ে আসতেন, আমি সেগুলো খুলতাম। সেগুলো আবার আগের মতো জোড়া লাগাতাম। দেখতাম, সেগুলো কীভাবে কাজ করে।’
ফ্রেড হ্যালোস ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, পাকিস্তানে প্রায় ২০ লাখ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রয়েছেন। তাঁদের অর্ধেকের বেশি মানুষের চোখে ছানি পড়েছে, যা চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। কিন্তু সেখানে অন্যান্য প্রতিবন্ধীর তুলনায় দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক ব্যবধান। অনেক ব্যক্তিকে জীবিকার জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয়। বাধা রয়েছে নানা সামাজিক কুসংস্কারের। দেশটির রাস্তাঘাটে অন্ধ ব্যক্তিদের নিরাপদ চলাচলের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তেমন ব্যবস্থা করা হয়নি। অনেকে আবার পরিবার থেকে বিতাড়িত। কিন্তু আসিফকে তাঁর পরিবার দূরে ঠেলে দেয়নি, বরং উৎসাহিত করেছে।
নিজের স্পর্শের প্রখর শক্তিই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি—এমনটা জানিয়ে আসিফ বলেন, ‘স্পর্শ আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্পর্শের মাধ্যমেই জিনিসটি কী ও কেমন, তা বুঝে ফেলি।’
১৫ বছর বয়সে আসিফ স্কুলের পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলেন। এরপর একটি অটো-গ্যারেজে কাজ শুরু করেন। শুরুতে সেখানে গাড়ির বিভিন্ন প্লেটগুলো আটকানো তাঁর কাজ ছিল। এ কাজে তাঁর আত্মবিশ্বাস দেখে সেখানকার লোকজন অবাক হয়ে যায়। একদিন গাড়ির ইঞ্জিনের গিয়ার বক্স খোলার প্রস্তাব পেলেন। সানন্দে সায় দিলেন আসিফ। গাড়ির নিচে ঢুকে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে গিয়ার বক্সটিকে খুলে নিয়ে আসেন।
এতে আসিফের ওপর তাঁর মনিবের আস্থা বেড়ে গেল। একের পর এক অন্যান্য দায়িত্বও পেতে লাগলেন। বাড়তে লাগল অভিজ্ঞতার ঝুলি। এভাবে একপর্যায়ে দক্ষ মেকানিক হয়ে উঠলেন তিনি।
আসিফ বলেন, তিনি আসলে একজন দক্ষ মেকানিকই হতে চেয়েছেন। মেকানিকের কাজ সমস্যা খুঁজে বের করা। যন্ত্রাংশ চেষ্টা করলেই জুড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু প্রকৃত কাজটি হলো সমস্যা চিহ্নিত করা।
আসিফের মেরামত কারখানা থেকে নিয়মিত সেবা নেন ফাহাদ ইউনিস। তিনি পেশায় আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ী। আসিফের মেরামত কারখানার সেবায় মুগ্ধ ফাহাদ বললেন, ‘শুধু ভালো কাজের জন্য লোকজন এখানে আসে। তিনি গাড়ির ইঞ্জিনের যেকোনো ত্রুটি ধরতে পারেন। আমাদের ছোট-বড় সব গাড়ি মেরামতের জন্য তাঁর কাছে দেওয়া হয়।’
আসিফ বলেন, ‘আমি যদি কখনো নিজেকে প্রতিবন্ধী মনে করতাম, তাহলে এখন আমি যা করছি, তা কখনো করা সম্ভব হতো না। যদি জন্ম থেকে আপনার কিছু না থাকে, আপনি কিছু হারিয়েছেন—এমনটা কখনোই মনে হবে না। বরং থাকা জিনিস হারালে অনেক বেশি কষ্ট।’ এএফপি অবলম্বনে

বিবেক মারা গেছে by সাজেদুল হক

এমন মৃত্যু সংবাদ বাংলাদেশ অতীতে কখনও পায়নি। এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস খুব বেশি গৌরবের নয়। যদিও অনেক পরাবাস্তববাদী ইতিহাসবিদ নানা রঙ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। পরাধীনতার শিকলে দীর্ঘদিন বন্দি ছিলাম আমরা। দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনারও কোন অভাব ছিল না। ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে দীর্ঘসময়। তবে এ অঞ্চলের মানুষের বিবেকের এমন মৃত্যু অতীতে আর কখনোই হয়নি। মানুষের বিপদে মানুষের এগিয়ে আসাÑ এই ছিল আমাদের ট্রেডমার্ক। হয়তো শত্রুতা ছিল, হয়তো প্রতিবেশীর অমঙ্গলও অনেকে দেখতে চাইতেন। তাই বলে মানুষ কখনও এতটা নিষ্ঠুর হয়নি। সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজনের হত্যাকা- দেখে শিউরে উঠেছিলাম আমরা। মানুষ এতটা বর্বর হয়? এভাবে একটা শিশুকে পিটিয়ে কেউ হত্যা করে। সে দৃশ্য আবার ধারণ করে মোবাইল ক্যামেরায়। ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশাল বিশাল বাহিনী, বড় বড় ইমারত আমাদের মানবিকতাকে কী ক্রমশ মুছে ফেলছে। নিষ্ঠুর এ হত্যার সময় কেউই বাধা দেয়নি। যদিও পরে আসামিদের ধরতে এগিয়ে আসে আমজনতা। তারাই মূলত আসামিদের ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। প্রধান অভিযুক্ত সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েও রেহাই পায়নি। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাকে ধরে পুলিশে দেয়।
সামিউল আলম রাজনের নিষ্ঠুরতাকেও ছাপিয়ে গেছে খুলনার বর্বরতা। যেভাবে ১২ বছরের একটি ছেলেকে কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে পেটে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা করা হলো তার বিবরণ দেয়াও অসাধ্য। ইতিহাসে এমন বর্বরতার ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। ‘মা আর দিয়েন না, মরে যাবো’- একথা শুনেও খুনিদের মন একটুও গলেনি।
সাম্প্রতিক এ নিষ্ঠুরতা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখেছেন, ‘সীমাহীন নিষ্ঠুরতার খবর পড়ছি আমরা সবাই। একেকটি মর্মান্তিক ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে চরিত্রে, প্রকৃতিতে। গতকাল এ নিষ্ঠুরতার খবর দেখে মনে হয়েছে ‘এও কি সম্ভব?’ আজ আরেক ঘটনায় তাকে মনে হচ্ছে শিশুতোষ। অথচ দেখুন যারা এসব পৈশাচিক ঘটনা ঘটাচ্ছে এরা কিন্তু অতি সাধারণ মানুষ; আপনার চারপাশে যে মানুষগুলোকে আপনি প্রতিদিন দেখেন, চেনেন, এরা তার চেয়ে ভিন্ন নয়। ফেসবুকে যার কথা আপনি ‘পছন্দ’ করেন এরা কী তার চেয়ে খুব বেশি আলাদা? আপনি ভাবেন- কী করে মানুষের মধ্যে এই সীমাহীন বিকারগ্রস্ততার জন্ম হয়েছে? কিন্তু আসলে এ প্রশ্নের উত্তর আপনি জানেন, চাইলেই বুঝতে পারবেন। এসব ঘটনায় যেসব প্রতিক্রিয়া সেগুলো দেখুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন। ক্ষোভ ও ক্রোধের প্রকাশ হিসেবে আমার-আপনার বন্ধুর প্রতিক্রিয়ার ভাষা লক্ষ্য করুন, তাহলেই স্পষ্ট হবে। নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আমি-আপনি যে ভাষায় আক্রমণ করছি, এসব অপরাধীর যেসব শাস্তির পরামর্শ দিচ্ছি সেগুলোই আসলে বলে দেয় এ মনোভাবের শেকড় কত গভীরে। মানুষকে কতভাবে শাস্তি  দেয়া যায় বলে যে পরামর্শ দেয়া হয় তার যদি একটি তালিকা করার চেষ্টা করেন তাহলে দেখবেন এগুলোর মধ্যে নির্মমতার কত নগ্ন প্রকাশ আছে। আর যারা প্রতিক্রিয়া দেখালেন না তাদের মধ্যে আছেন সেসব মানুষ, যাদের নির্লিপ্ততা সীমাহীন। আমার গায়ে এসে লাগেনি, সেটা ধর্ষণের ঘটনাই হোক কী হত্যার ঘটনাই হোক। অতএব, এ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা নেই। এই দুই-ই বলে দেয় মানুষের মনের কোণে যে অন্ধকার তা দূর তো হয়ইনি, বরং আরও বেশি করে গেড়ে বসেছে। বাইরের উজ্জ্বল চোখ ধাঁধানো আলোয় আমরা তা দেখতে পাই না বটে, কিন্তু আরেক অন্ধকারের দেখা পাওয়া গেলে সেই অন্ধকার আমাদের গ্রাস করে। গত কয়েক বছরে কথা বলার ভাষায়, আলোচনার ভাষায়, ভিন্নমত প্রকাশের ভাষায় কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন? এই যে ফেসবুক, কিংবা ধরুন অন্য সোশ্যাল মিডিয়া, সেটা একার্থে এই সময়ের এক অনন্য দলিল, সমাজ বদলে যাওয়ার একটি দলিল শুধু এই কারণে নয় যে, সেটা প্রযুক্তির উৎকর্ষের প্রমাণ, এই কারণেও নয় যে, তা দূরকে কাছে এনেছে। আমার কাছে মনে হয় এই কারণে যে আমার-আপনার  ভেতরের মানুষকে এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করেছে। ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে আমরা যখন কথা বলি তখন আসলে কথা বলি একা একা, যে কথাটা যে ভাষায় আর দশজনের সামনে বলতে আমাদের দ্বিধা হতো এখন তা নির্বিবাদেই বলি। ফলে যতটুকু মানসিক বাধা; সামাজিকতার যতটুকু লেশ আমাদের আটকে রাখতো এখন সেই বাধা নেই। একান্তে আমরা আমি যে কী রকম মানুষ তারই প্রকাশ ঘটে এসব নির্মমতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিক্রিয়ায়। শুধু তাই নয়, অন্যের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় না। অন্ধকারকে অন্ধকার দিয়ে দূরে ঠেলতে পারা যাবে এমন আশা বাতুলতা মাত্র; আমাদের ভেতরের অন্ধকার বিষয়ে আত্মোপলব্ধি দেখতে পাই না। মনের সেই অন্ধকারের মধ্যে যে আলো প্রবেশ করছে না, সে কথা বলার সময় কোথায়? বিত্ত, প্রাচুর্যের অহংকার আর আপাত সাফল্যের ঘোর কী আমাদের অন্ধ করে দিচ্ছে?’
কিন্তু কেন মানুষের বিবেক মারা গেল? ক্রমশ কেন বর্বর হয়ে গেলাম আমি, আপনি, তুমি, সে। এ কী সভ্যতার অভিশাপ? বিশাল বিশাল বাহিনী তৈরি করলেই যে রাষ্ট্র মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না তারও কী প্রমাণ নয় এসব ঘটনা। একসময় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বেডরুমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। এখন দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্র মায়ের পেটের সন্তানের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারছে না। ছোট্ট সুমাইয়া পৃথিবীতে আসার আগেই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এমন ঘটনা কী পৃথিবীতে আগে কখনও ঘটেছিল?
ক্ষমতার লোভ কী আমাদের বিবেক অন্ধ করে দিয়েছে। আইনের শাসন কখন ভেঙে পড়ে? অপরাধীরা যখন নিশ্চিত হয়, নিরপরাধী যখন আতঙ্কে থাকেন, তখনই তো আইনের শাসন ভেঙে পড়ে। সীমাহীন লোভের কাছে মানুষ নিজেই কী হেরে গেছে। না যন্ত্রসভ্যতা মুছে দিয়েছে মানুষের সব আবেগ, সব মানবিকতা। অন্যের বিনাশেই কী এখন মুক্তি খুঁজছে মানুষ। নৈতিকতার জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে মেকি নৈতিকতা। আদিম সমাজে যখন কোন রাষ্ট্র ছিল না, কোন বাহিনী ছিল না, সেই অর্থে কোন নৈতিকতাও ছিল না। তখনও কী মানুষ এতটা নিষ্ঠুর ছিল?
মানবিকতার সঙ্কটের এই সময়ে প্রার্থনা করি, মৃত বিবেক জেগে ওঠুক। বন্ধ হোক এই হত্যা, এই বর্বরতা।

পিরোজপুরের শাঁখাশিল্প by এ কে এম ফয়সাল

পিরোজপুর শহরের রাজারহাট এলাকায় নিজ কারখানায়
শাঁখায় নকশা তুলছেন শিবনারায়ণ দত্ত নামের এক
কারিগর। সম্প্রতি ছবিটি তোলা l প্রথম আলো
সামুদ্রিক শঙ্খ দিয়ে তৈরি হাতের অলংকার শাঁখা হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের প্রধান অনুষঙ্গ। হিন্দু নারীদের সধবার প্রতীক এই শাঁখা। পিরোজপুর শহরে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী শাঁখাশিল্প। বর্তমানে শাঁখাসহ শঙ্খের তৈরি অলংকারের ব্যবহার কমে যাওয়ায় এ শিল্প প্রায় ধ্বংসের পথে। শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের চাহিদা মেটাতে কয়েকজন শাঁখারি এখনো এ পেশা ধরে রেখেছেন।
পিরোজপুর শহরের রাজারহাট এলাকার শিবনারায়ণ দত্তের (৭০) পরিবারের সদস্যরা বংশপরম্পরায় শাঁখা তৈরি করে আসছেন। তাঁর পরিবারের আরও দুই সদস্য এ পেশায় রয়েছেন।
শিবনারায়ণ দত্ত বলছিলেন, একসময় আশপাশের এলাকা থেকেও লোকজন এখানে শাঁখা কিনতে আসতেন। এখন শাঁখা তৈরির কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা, দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে হাজার বছরের পুরোনো এ শিল্পকে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন শাঁখাশিল্পীরা। ফলে ঐতিহ্যবাহী শাঁখাশিল্পে বর্তমানে বিরাজ করছে চরম দুর্দিন। জীবন-জীবিকার তাগিদে নয়, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁরা এ শিল্পকে ধরে রেখেছেন বলে জানালেন তিনি। পিরোজপুরের রায়েরকাঠি রাজপরিবারের গৌতম রায় চৌধুরী বলেন, পিরোজপুরের শাঁখাশিল্পের রয়েছে চার শ বছরের ঐতিহ্য। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এ শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে।
পিরোজপুরে তৈরি হওয়া কিছু শাঁখা
শাঁখাশিল্পীরা জানান, শাঁখাশিল্পের প্রধান উপকরণ সমুদ্রের বিশেষ কয়েক প্রজাতির শঙ্খ আসে শ্রীলঙ্কা থেকে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার কয়েকজন এই শঙ্খ আমদানি করে থাকেন। ঢাকার শাঁখারীবাজার, খুলনার ধর্মসভা সড়ক ও দোলখোলার শঙ্খের মোকাম থেকে শঙ্খ কিনে এনে নিজস্ব কারখানায় অলংকার তৈরি করেন শিল্পীরা। ঢাকার শাঁখারীবাজার শঙ্খের অলংকার কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র হলেও চট্টগ্রাম, খুলনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে শঙ্খব্যবসার প্রচলন আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে, পূজা-পার্বণ উপলক্ষে শাঁখার অলংকার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মুসলিম নারীরাও শখের বসে শঙ্খের অলংকার পরেন। ভালো আকৃতির একটি শঙ্খ দিয়ে দুই থেকে তিন জোড়া শাঁখা তৈরি হয়। ছয় শ থেকে সাত শ টাকা করে একটি শঙ্খের দাম। শঙ্খ বিশেষ ধরনের করাত দিয়ে গোলাকার করে কেটে বিভিন্ন আকারের বলয় তৈরি করা হয়। এরপর সেটিকে শিলে ঘষে মসৃণ করা হয় এবং বিভিন্ন নকশা আঁকা হয়। প্রতিটি শাঁখার জোড়া অংশ নিখুঁতভাবে লাগিয়ে তাতে ফুল, লতা, মাছ, পাখির নকশা তোলা হয়। এসব শাঁখা প্রতি জোড়া ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। পাশাপাশি গলার হার চার হাজার ও আংটি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া সোনা দিয়ে বাঁধাই করা শাঁখা পাওয়া যায়। এগুলোর দাম সোনার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
পিরোজপুর শহরের মা শঙ্খ ভান্ডারের মালিক সুমন কুমার দত্ত বলেন, তিন দশক আগেও পিরোজপুর শহরে আটটি শাঁখা তৈরির কারখানা ছিল। এখন আছে মাত্র দুটি। এভাবে চলতে থাকলে দেশের শাঁখাশিল্প একদিন অস্তিত্ব হারাবে। শাঁখাশিল্পীরা চান, তাঁদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হোক। শঙ্খ আমদানি শুল্কমুক্ত করা হোক, আর দেওয়া হোক সরকারি সহযোগিতা।
শিব নারায়ণ দত্ত বললেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এ শিল্পের জৌলুশ ধরে রাখতে দেশের প্রত্যেক শাঁখাশিল্পী পরিবারকে ১০০টি করে শঙ্খ দিয়েছিলেন। এরপর আর কোনো সরকার এ শিল্পের দিকে নজর দেয়নি। এ বিষয়ে পিরোজপুর-১ আসনের (সদর) সাংসদ এ কে এম এ আউয়াল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘শাঁখাশিল্প টিকিয়ে রাখতে আমি সংসদে কথা বলব। এ শিল্পের জন্য সরকারি সহায়তা যাতে পাওয়া যায় সেই চেষ্টা করব।’

‘বাস ধইর‍্যা লাভ নাই, কিচ্ছু করতে পারব না’ by কমল জোহা খান

বাস থামানোর জন্য পুলিশের দেওয়া সংকেত অমান্য
করলে বাসটির এই চালককে ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের
কাছে নিয়ে যায় পুলিশ। ছবি: জাহিদুল করিম
‘ভাই, আমাগো বাস ধইর‍্যা লাভ নাই। কিচ্ছু করতে পারব না। খুব বেশি এক দিন, পরেই বাস ছাড়তে হইব। আমাগো বাস রুটের ম্যানেজারের অনেক পাওয়ার।’ আজ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর বনানী ফাঁড়ির সামনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অভিযানে বাস আটকের পর প্রথম আলোর কাছে এভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানান বাসচালক রফিকুল ইসলাম।
রফিকুলের ২৭ নম্বর রুটের বাসটি নিউমার্কেট থেকে গাজীপুরে চলাচল করে। শুধু রফিকুলের বাস নয়, এক ঘণ্টার অভিযানে আরও নয়টি বাস আটক করেন ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালত। বেশির ভাগ বাসই ২৭ নম্বর রুটের ভিআইপি পরিবহনের। ছিল সায়েদাবাদ-গাজীপুর রুটে বলাকা পরিবহন ও একটি কাভার্ড ভ্যান। এসব বাসের কোনোটির ছিল না নম্বর প্লেট, বাতি। আসনগুলো ছিল ভাঙা। রং চটে যাওয়া এবং জানালা ও উইন্ডশিল্ডের কাচ ভাঙা।
তবে বাস আটক হলেও চালক ও তাঁদের সহযোগীরা বেশ খোশমেজাজেই আড্ডা জমিয়ে তোলেন। তাঁদের সাত-আটজন আটক হওয়া একটি বাসের ভেতর থেকে মোবাইল ফোনে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কেউবা বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাসচালকদের সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছিলেন। বাস চলাচলও কমে যায়।
বাসটির ভেতরে যাওয়ার পর চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার নামটা ভালো কইর‍্যা লেখেন। বাস আটকাইয়া কী করব? খুব বেশি হইলে আমাগো কামাই আইজ বন্ধ থাকব। ক্ষতি হইব যাত্রী আর আমাগো। মালিকের তো কিছুই হইব না।’
রাজধানীর বনানী পুলিশ বক্সের সামনে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কাগজপত্র দেখছেন পুলিশ সদস্যরা। ছবিটি আজ দুপুরে তোলা। ছবি: জাহিদুল করিম
ভিআইপি পরিবহনের একটি বাস আটক করা হলে এর মালিক মনসুর আলী নিজেই ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। মনসুর আলীর দাবি, কেবল রং ঠিক না থাকায় তাঁর বাসটি আটক করা হয়। তিনি বলেন, ‘সব দেখতাছে আমার রুটের ম্যানেজার নাসির আর শাহজাহান মোল্লা। এঁরা রুটও দেখেন, আবার আওয়ামী লীগও করেন।’
মনসুর আলীর বাসের চালক মো. রিপন বলেন, ‘মালিকের লগে দিনে ২৮০০ টাকায় আমরা বাসের চুক্তি করি। বাস আটক করনে আইজ কামাই বন্ধ। কাল আবার অন্য বাস নিয়া চালামু। একদিন পেটে লাথি মারল আর কি!’
নম্বর প্লেটবিহীন আটক একটি বাস । ছবি : জাহিদুল করিম
এদিকে ২৭ নম্বর রুটের ম্যানেজার শাহজাহান মোল্লা নিজের রাজনৈতিক পরিচয় না জানালেও দাবি করেন, সব বাসই ঠিক আছে। তিনি মোবাইল ফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার রুটে ৮০টি বাস আছে। এর মধ্যে ৭৫ ভাগ বাসের ফিটনেস আছে।’
বাস আটকের অভিযানে ধকল পোহাতে হয় অসংখ্য যাত্রীকে। এ সময় তাদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। মজিবর রহমান নামে এক যাত্রী বলেন, ‘আমার বিমানবন্দর যাওয়া কথা। এইখানে নামাইছে। এখন যাব কীভাবে? আমার মতো লোকদের তো গাড়ি নাই, টাকাও নাই। ৩০০-৪০০ টাকা খরচের ক্ষমতাও নাই। শুধু বাস আটক করছে, গাড়ি (প্রাইভেট কার) ধরল না কেন?’
অভিযানের নেতৃত্বে থাকা ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ মশিউর রহমান বলেন, ‘আমরা ব্যক্তিগত গাড়িও আটক করব। যাত্রীদের দুর্ভোগের বিষয়টি দেখছি। তাঁদের ভাড়া ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’ তিনি বলেন, পরিস্থিতি সহনশীল না হওয়া পর্যন্ত ফিটনেসবিহীন যানবাহন আটকের অভিযান চলবে।

একটি মেহেদি গ্রামের কথা by মানসুরা হোসাইন

ব্যবসায়ী মোখলেছ কাজে ব্যস্ত। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
হলদি বাটো, মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ, বিয়ের সাজে সাজবে কন্যা...গানের কথাগুলোর সেই দিন আর নেই বললেই চলে। এখন আর বিয়েতে কষ্ট করে কেউ কন্যার দুহাত রাঙানোর জন্য মেহেদি বাটে না। হাতের কাছেই আছে বিভিন্ন কোম্পানির কৃত্রিম মেহেদির টিউব। কিন্তু তাই বলে কি বাটা মেহেদির কদর শেষ? না তা নয়। এখন বিভিন্ন বয়সী নারী এমনকি পুরুষের কাছেও বাটা মেহেদির কদর বেড়েছে। হাত আর পা রাঙানোর পাশাপাশি মেহেদি এখন ব্যবহার হচ্ছে মাথায়, অনেকটা ওষুধের মতো। কারও চুলে পাক ধরেছে তাই একটু কায়দা করে মেহেদি লাগিয়ে মাথার চুলটা রাঙিয়ে নেন। এ ছাড়া মাথার খুশকি দূর করতে, রাজ্যের চাপে মাথা গরম হয়ে গেলে মাথাটা একটু ঠান্ডা করতেও এটি ব্যবহার করছেন অনেকে।
শিশুরাও কাজে হাত লাগিয়েছে। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
শহরে ভ্যানে ভ্যানে সবজি বিক্রেতাদের কাছে পাওয়া যায় মেহেদির আঁটি। সবজি কেনার ফাঁকে অনেকে কিনে নিচ্ছেন তা। কিন্তু তাজা মেহেদি পাতার এই আঁটি শহরে এল কোত্থেকে? এর উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে ঢাকার কেরানিগঞ্জ থানার পূর্ব আকছাইল, সলমাছি, কলাতিয়া ও মানিকনগরসহ কয়েকটি গ্রামে। এই গ্রামগুলোতে অন্যান্য শাকসবজি ও ফসলের মতোই সারা বছর বাড়ির আশপাশে অনেক এলাকা নিয়ে চাষ হচ্ছে মেহেদির। এর ব্যবসা চলছে বহু বছর ধরে। আর এ ব্যবসায় হাত লাগান পরিবারের নারী, পুরুষ এমনকি স্কুল পড়ুয়া শিশুও। জমির মালিকরা বিভিন্ন চুক্তিতে ভাড়া দিচ্ছেন অন্যদের কাছে। মেয়াদ শেষ হলে তিনি আবার অন্য জনের কাছে ভাড়া দেন সে জমি।
সালমা বেগম সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি মেহেদির আঁটি বাঁধছেন। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
শনিবার দুপুরের দিকে কেরানিগঞ্জের পূর্ব আকছাইল গ্রামে ঢুকতেই দেখা গেল, প্রস্তুতি চলছে মেহেদির ডাল শহরে পাঠানোর। বাড়ির ভেতর উঠান আর রান্না ঘরের পাশে বসে নারীরা মেহেদি পাতা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ঘরের বাইরে পুরুষরা ব্যস্ত। গ্রামের হিন্দু পরিবারের সদস্যরা মেহেদির চাষ করেন না। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি অনেক নারী ও শিশু মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছেন। এরা সবাই অভাবী তা বলা যাবে না।
তিন ছেলে ও এক মেয়ের মা রাশিদা জানালেন, মেহেদির দুই তিনটি ডাল দিয়ে ছোট ছোট আঁটি ১০০টি বাঁধলে পান ছয় টাকা। কোনো কোনো দিন দিনে ২০০ টাকাও পান এ কাজ করে। রাশিদা বলেন,‘ সংসারে যে খুব অভাব তা না। খালি খালি বইস্যা না থাইক্যা এই কাজ করি। যে টাকা পাই তা দিয়া সংসারের কাজে লাগাই। এ কাজ না করলে তো বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম, এর কথা ওর কথা নিয়া লাগালাগি করতাম। এখন আর তা হয় না।’ গ্রামটিতে বয়স্ক ব্যক্তিদের কারও কারও সাদা চুল এবং দাড়িতে মেহেদির কমলা রং।
নিজের মোদির দোকানের সামনে বসে মেহেদির আঁটি বাঁধার কাজ করছিলেন মহিউদ্দিন ও তাঁর বাবা। মহিউদ্দিন এবার দ্বিতীয় রোজায় মেহেদি বনের মালিকের কাছ থেকে ৫ পাখি জমি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছেন। এক বছরের জন্য তিনি জমিটি নিয়েছেন। বছরে পাঁচবার মেহেদি কাটা হবে। তিনি একবার কেটেছেন। এ ছাড়া তাঁর নিজস্ব ২ পাখি জমিতেও মেহেদি চাষ করেছেন। রাজধানীতে রায়েরবাজার আড়তদারের কাছে দিন শেষে মেহেদি বিক্রি করবেন। ২০ মুঠা বা আঁটি বিক্রি করবেন ১০০ টাকায়। শহরের বিক্রেতারা পরে তা যখন যা পাবেন সেই দামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করবেন। শীতে মেহেদির চাহিদা কম থাকে। চাহিদা বাড়ে বছরের এ সময়টাতেই। বাজারে যখন মেহেদির চাহিদা খুব বেশি থাকে না তখন মহিউদ্দিনসহ গ্রামের অন্যরা মোদি দোকান, গৃহস্থ বা অন্যান্য কাজ করেন। তবে মেহেদির ব্যবসা বলতে গেলে ১২ মাসের ব্যবসা।|
মেহেদি বন। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
বেশিদূর পড়াশোনা করেননি মহিউদ্দিন। তিনি জানালেন, বাজারের টিউব মেহেদির কারণে তাঁদের ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। আগে নারীরা বাটা মেহেদিতে হাত রাঙানোর জন্য নিতেন। এখন আর নিচ্ছেন না। টিউবে আসলে মেহেদির পাতার ব্যবহার থাকে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুললেন তিনি। তবে যাঁরা মাথায় মেহেদি দেন তাঁরা নিয়মিতই কেনেন মেহেদির তাজা পাতা।
মহিউদ্দিন মেহেদি এবার খেত ভাড়া নিয়েছেন আফাজউদ্দিনের কাছ থেকে। আফাজউদ্দিন গত দুই থেকে তিন বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তিনি জানালেন, তিনি প্রায় ১৩ পাখি জমিতে মেহেদি চাষ করেছেন। তাঁর সব জমি ভাড়া দেওয়া। কৃত্রিম মেহেদি টিউবের ওপর আফাজউদ্দিনের ক্ষোভ। এতে মেহেদি পাতার দাম কমে গেছে বলে জানালেন।
আইয়ুব আলীর বয়স ৬০ বা ৬৫ বছর। তাঁর ভাষায়-‘বুদ্ধি হইছে তখন থেইক্যাই মেহেদির কাজ করি। এখন নাতি ইস্কুলে যায়, ও ইস্কুলের পাশাপাশি কাজে হাত লাগায়।’
আইয়ুব আলী মেহেদির ব্যবসা করে ইট সিমেন্টের মেঝে এবং টিন দিয়ে বড় ঘর তুলেছেন। দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলেকে চার লাখ টাকা খরচ করে সিঙ্গাপুর পাঠিয়েছিলেন। ছেলে সেখানে ১৮ মাস থেকে চলে এসেছে। কোরবানি ঈদের পর ওই ছেলেকেই আবার সাত থেকে আট লাখ টাকা খরচ করে সিঙ্গাপুর পাঠানোর চেষ্টা করবেন। আরেক ছেলে কাঁচামাল বিক্রির ব্যবসা করছে।
মোখলেছ নামে আরেকজন এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্যের জমি বন্ধক নিয়ে মেহেদির ব্যবসা করছেন। সকালে মেহেদির ডাল কাটা, আঁটি বাঁধা, শহরে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে তাঁর স্ত্রী তাঁকে সাহায্য করেন। জমি থেকে মেহেদির ডাল কেটে তিনি আবার তাঁর নিজস্ব জমিতে লাগিয়েছেন। সেখান থেকে নতুন খেত হচ্ছে। এ ব্যবসায় লাভ হয় প্রশ্ন করতেই এক গাল হেসে মোখলেছ বলেন, ‘লাভ না হইলে কি আর ব্যবসা করি?’

সচেতনতা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ দুই-ই জরুরি by আফতাব চৌধুরী

আফতাব চৌধুরী
মাদকাসক্তি একটি অন্যতম জীবনবিধ্বংসী নেশা যা আসক্ত ব্যক্তিকে দৈহিক, মানসিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিকভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকদ্রব্য যে কোনো পরিমাণেই হোক তা মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিসাধন করে এবং মাদকাসক্তির ফলে মানুষ মারাও যেতে পারে। আজ বিশ্বের অনেক দেশই মাদকাসক্তির এমন চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে যা সে সব দেশের আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামো দুর্বল করে দিচ্ছে, ঠেলে দিচ্ছে ক্রমশ অবলুপ্তির পথে। ফলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্য, হানাহানি ও অস্থিতিশীলতা যেমন স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও শান্তি স্থিতিশীলতা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্যগুলো : হেরোইন, প্যাথিডিন, মরফিন, ক্রুড আফিম, কোকেন, মারিজুয়ানা, গাঁজা, ভাং, চরস, হাশিম, এলএসডি প্রভৃতি মাদকদ্রব্য বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ঘুমের বিভিন্ন রকমের ওষুধও এক ধরনের মাদক বিশেষ। সম্প্রতি কোকেনের সঙ্গে বভাকাম মিশিয়ে এক ধরনের মাদকদ্রব্য তৈরি করা হচ্ছে, যা ‘বাজুকো’ নামে পরিচিত। পশ্চিমা দুনিয়ায়, বিশেষত ইউরাপে এর ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীর কোনো কিছুই কারণবিহীন ঘটে না তেমনি মাদকাসক্তির পেছনেও রয়েছে অনেক কারণ। সেসব কারণকে নিম্নলিখিত উপায়ে চিহ্নিত করা যায়।
মাদকাসক্তির কারণ : ধর্মবিমুখতা ও ভ্রান্ত জীবন দর্শন। অপসংস্কৃতি ও অসৎসঙ্গের প্রভাব প্রধানত বেকারত্বজনিত কারণে হতাশা। কলহ, বিচ্ছেদ ও বিরহ। ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তার অভাব। অত্যাধুনিক সাজগোজের প্রবণতা ও স্মার্ট হওয়া সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা। পিতামাতা বা অভিভাবক কর্তৃক অতিরিক্ত শাসন বা অবহেলা। কৌতূহল নিবারণের ইচ্ছা এবং আকাক্সক্ষা। মানসিক ব্যাধি। মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা। অবসাদগ্রস্ততা ও সুস্থ বিনোদনের অভাব। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মাদকাসক্তি রোধ করা। প্রাথমিক পর্যায়ের মাদকাসক্তি চিহ্নিতকরণ এবং কেউ এই মরণ নেশায় আক্রান্ত হলে যথেষ্ট ও যথাযথ চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিত করা।
মাদকদ্রব্যের উৎস : বর্তমান বিশ্বে গাঁজা, চরসের চাইতে অধিক ব্যবহৃত হচ্ছে প্যাথিডিন, মরফিন ও কোকেন জাতীয় মাদকদ্রব্য। তবে বাংলাদেশে ফেনসিডিলের ব্যবহারই হচ্ছে বর্তমানে বেশি। ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট,’ ‘গোল্ডেন ওয়েজ’ এবং গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল-এশিয়ার এই তিনটি এলাকা মাদকদ্রব্যের প্রধান উৎসস্থল। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের অন্তর্গত মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে মূলত পপি উৎপন্ন হয়। আর পপি থেকেই আফিম পাওয়া যায়। তাছাড়া পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্কের সীমানাজুড়ে ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্টে’র পরিসীমা। এর মধ্যে আফগানিস্তানে সিংহভাগ পপি উৎপাদিত হয়ে থাকে।
গোল্ডেন ওয়েজ অঞ্চলটি ভারত-নেপাল সীমান্তে অবস্থিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া, গুয়েতেমালা, জ্যামাইকা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, ঘানা, নাইজেরিয়া, কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও থাইল্যান্ডে প্রধানত মারিজুয়ানা উৎপন্ন হয়। কোকেনের উৎপত্তি স্থল মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা, কলম্বিয়া, পেরু, ব্রাজিল ও বলিভিয়া।’ মেস্কিকো, যুগোস্লাভিয়া, হাঙ্গেরি, সাইপ্রাস, অস্ট্রেলিয়া, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজ এলাকায় হেরোইন উৎপাদিত হচ্ছে। জ্যামাইকা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, নেপাল, মরক্কো ও জর্দান হাশিস উৎপাদনের জন্য বিশেষ পরিচিত।
মাদকদ্রব্য সেবনের ক্ষতিকর দিক : স্নায়ুতন্ত্রের অস্বাভাবিক পরিবর্তন যথা স্বাভাবিক চেতনা লোপ, স্মৃতি বৈকল্য, ভ্রম ইত্যাদি। বুদ্ধিবৃদ্ধি ও চিন্তাশক্তির ক্রমাবনতি। অবসাদ, উদ্যমহীনতা, বিষন্নতা এবং জগৎ সম্পর্কে ক্রমশ উদাসীনতা ও নিরুৎসাহিতা। সামাজিক ও মানসিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। চরম স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক নির্দয় হয়ে পড়া। সব দায়িত্ব ও কর্তব্য হতে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নির্লিপ্ত, নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের আকাক্সক্ষা। মানসিক একাগ্রতা, স্থিতিশীলতা ও ধৈর্যের আশংকাজনক হ্রাস। কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তার আংশিক অথবা সার্বিক অবনতি। খিটখিটে মেজাজ, আচরণে রুক্ষতা, অস্বাভাবিক ব্যবহার। বিভিন্ন প্রকার জটিল মানসিক ব্যাধির প্রকোপবৃদ্ধি। শরীরে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস। যৌন ক্ষমতা হ্রাস এবং এ ব্যাপারে স্বাভাবিক আগ্রহের অভাব। আকস্মিকভাবে অচেতন হয়ে পড়া। অত্যধিক মাত্রায় মাদক সেবনের ফলে শক বা অ্যালর্জি প্রতিক্রিয়াজনিত শ্বাসরোধ হয়ে আকস্মিক মৃত্যু। নেশার টাকার জোগাড় করতে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া, সমাজে গঠনমূলক ভূমিকার পরিবর্তে দেশ ও জাতি বিধ্বংসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন : মাদকাসক্তির চিকিৎসার পদ্ধতি তিনটি ধাপে বিভক্ত। যেমন মোটিভেশন, বিভিন্ন ডকুমেন্টরি ফিল্ম ও নাটকে মাদক ব্যবহারকারীর চরম অবনতির বাস্তবচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যম। ওষুধ ব্যবহারে সংশোধন ও পুনর্বাসন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।