Showing posts with label পরিতোষ পাল. Show all posts
Showing posts with label পরিতোষ পাল. Show all posts

Wednesday, August 20, 2025

কলকাতার নিউমার্কেট থেকে বলছি by পরিতোষ পাল

কলকাতার হগ মার্কেট। সবার কাছে পরিচিত নিউমার্কেট হিসেবে। গত সপ্তাহে এই নিউমার্কেটের আইকনিক ক্লক টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম চারদিকের পরিস্থিতি। গত বছরের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা এসেছে তা সর্বগ্রাসী হয়েছে। বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি মানুষে মানুষে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আর তাই এক সময় নিউমার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট-যেখানে বাংলাদেশি মানুষের ভিড়ে গমগম করতো তা এক রকম উধাও। এখানকার দোকান বা মলে, এমনকি রেস্টুরেন্টগুলো যেভাবে ভিড়ে ঠাসা থাকতো এখন তা চোখে পড়ে না।

সারাদিন নিউমার্কেট ও সংলগ্ন এলাকা ঘুরেও সেই পুরনো জমজমাট ভিড়ের ছবিটি পাইনি। আগে যেখানে প্রতি একশ’ জনের মধ্যে ৬০-৭০ জন বাংলাদেশির দেখা পাওয়া যেতো, এবার সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন বাংলাদেশির দেখা পেলাম। এরা কেউই পর্যটক নন। মেডিকেল ভিসায় চিকিৎসা করাতে এসেছেন। এরই ফাঁকে নিউমার্কেটে সামান্য কেনাকাটা করছেন। আগের মতো বিশাল বিশাল সুটকেস বা পেটি ভর্তি করার মতো কেউ বাজার করছেন না।

ঢাকার বাসিন্দা আসিফ হোসেনের সঙ্গে দেখা হতেই জানালেন, তিনি মায়ের ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ভারতে এসেছেন। বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এই নিয়ে পরপর তিনবার এলাম। কিন্তু এবার দেখছি বাংলাদেশিদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। মেডিকেল ভিসার সংখ্যা বাড়ায় কলকাতায় বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়েছে।’

মারকুইস স্ট্রিটের এক নামকরা পরিবহন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথায় উঠে এসেছে নিউমার্কেট অঞ্চলের হতাশার ছবিটি। জানালেন, বাংলাদেশে পরিবর্তনের পর থেকে ভারত সরকার পর্যটক ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে যে হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রতিদিন কলকাতায় আসতেন তা এখন বন্ধ। আগে থেকে যারা মেডিকেল ভিসা নিয়ে রেখেছিলেন, তারাই শুধু আসছিলেন। মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রে ভারত সরকার নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার ফলে বাংলাদেশিদের আসা এক রকম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অতি সম্প্রতি মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রে উদার মনোভাব নেয়ায় আবার বাংলাদেশিদের কলকাতায় আসা বাড়ছে বলে তিনি জানান।

নিউমার্কেটের একটি শাড়ির দোকানের কর্মী শ্যামল দত্ত জানালেন, গত এক বছর ভীষণ খারাপ অবস্থায় কাটিয়েছি। আগে যেখানে বাংলাদেশি ক্রেতার সংখ্যা নিয়ে আমরা খুশি ছিলাম, সেখানে গত এক বছরে ৫০ জন বাংলাদেশি ক্রেতা পাইনি।
তিনি বলেন, ‘শুধু আমরাই নই, নিউমার্কেট সংলগ্ন সব ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টে কাটিয়েছেন। সবচেয়ে করুণ অবস্থা ফুটপাথের ব্যবসায়ীদের।’

নিউমার্কেটের উল্টোদিকের ফুটপাথে জাঙ্ক জুয়েলারির ব্যবসা করেন শেখ জামির। তিনি জানালেন, বাংলাদেশি ক্রেতাই ছিল আমাদের বড় ভরসা। কিন্তু গত এক বছরে তারা কেউ না আসায় বিক্রিবাট্টা ৭০ শতাংশ কমে গেছে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।’
নিউমার্কেট অঞ্চলের শ্রী লেদার্স, খাদিমের মতো জুতার বিপণিগুলোতে এখন স্থানীয় মানুষের ভিড় ছাড়া বাংলাদেশিদের ভিড় নেই। আগে দোকানের ভেতরে ভিড়ের জন্য প্রবেশ করা যেতো না। কিন্তু এখন একরকম ফাঁকা।
শ্রী লেদার্সের এক কর্মী জানান, বাংলাদেশিরা আমাদের এই অঞ্চলের দোকানগুলোর বড় ক্রেতা ছিলেন। কিন্তু গত এক বছরে তাদের অনুপস্থিতি আমাদেরও আর্থিক সংকটে ফেলেছে। এখন অবশ্য কিছু বাংলাদেশির দেখা পাওয়া যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের অভিমত, গত এক বছরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিউমার্কেট অঞ্চলের আর্থিক পরিস্থিতি। মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর ভিত্তি করে এই অঞ্চলের অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশি পর্যটকের অভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মুদ্রা বিনিময়ের কারবারিরা।
কস্তুরি, ধানসিঁড়ি, প্রিন্স-এর মতো রেস্টুরেন্টগুলোতে ঢুঁ দিয়ে দেখা গেল আগের মতো বসার জায়গার অভাব নেই। বাংলাদেশিদেরও দেখা নেই। কর্তৃপক্ষ জানালেন, বাংলাদেশিদের লক্ষ্য রেখেই আমরা আমাদের খাবারের পদ তৈরি করতাম। কিন্তু এখন  রান্নার পরিমাণ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছি। স্থানীয়দের ভরসায় চলছি।  

পরিবহন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এখন পেট্রাপোল থেকে প্রতিদিন কয়েকশ’ যাত্রী আসছেন। কলকাতা থেকেও অনেকে বাংলাদেশে যাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা আবার বাড়ছে। আরএনটেগোর হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাদের হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা কিছুদিন আগের থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একই মত, টাটা ক্যান্সার, মেডিকা, পিয়ারলেসের মতো হাসপাতালগুলোর।
চিকিৎসা নিতে আসা শামিমা ও তার পরিবার জানালেন, শহর কলকাতা আগের মতোই নিরাপদ আছে। তবে বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যম এমন রটনা করছে, তাতে কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু এসে দেখতে পাচ্ছি সবকিছু আগের মতোই আছে।

তবে মেডিকেল ভিসায় যে পরিমাণে বাংলাদেশি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আসছেন, তার একটি বড় অংশ আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ বা উত্তর ভারতমুখী হচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশিরা আগের তুলনায় বেশি আসছেন ঠিকই, আর তাতে পরিবহন সংস্থা এবং কলকাতা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালগুলো নতুন করে লাভের মুখ দেখলেও সেভাবে খুশি নন নিউমার্কেট, সদর স্ট্রিট, মারকুইস স্ট্রিটের মানি এক্সচেঞ্জ, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট এবং ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিমত, যতদিন পর্যটক ভিসা স্বাভাবিক না হবে, ততদিন নিউমার্কেটও স্বাভাবিক হবে না।

mzamin

Tuesday, April 1, 2025

মরুভূমির মাঝে তাঁবুতে একরাত by পরিতোষ পাল

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম, মরুভূমির মাঝে একরাত তাঁবুতে কাটালে কেমন হয়? কেমন রোমাঞ্চ হবে সেই রাত কাটানোয়? অভিজ্ঞতার সেই মায়াময় দিনগুলো কি কোনোদিন ভোলা যাবে? ভাবতে ভাবতেই ঠিক করে ফেললাম। ভারতের একমাত্র মরুভূমি হলো থর মরুভূমি। সেখানকার জয়সলমিরে ডেজার্ট ক্যাম্পের তাঁবুতে একরাত কাটাবো। সঙ্গে বালিয়াড়িতে জিপের দুরন্ত গতিতে ছুটে যাওয়া এবং মন্থর গতিতে চলা উট সফারির দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবো। 

বিশ্বের সবচেয়ে জনসংখ্যাবহুল মরুভূমি হচ্ছে থর মরুভূমি। প্রতি কিলোমিটারে ৮৩ জন মানুষের বসবাস। হিন্দু, জৈন, শিখ ও মুসলিমরাই এখানকার বাসিন্দাদের অন্যতম। রাজস্থানের ৪০ শতাংশ জনসংখ্যার বাস মরুভূমিতেই।  থর মরুভূমি ভারত ও পাকিস্তানে বিস্তৃত হলেও ভারতেই এই মরুভূমির ৮০ শতাংশের অবস্থান। আর এই মরুভূমির ৬০ শতাংশই রয়েছে রাজস্থানে। পাশাপাশি পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কিছু অংশ এবং গুজরাটের কচ্ছের উপকূল বরাবর অঞ্চলে বিস্তৃত এই মরুভূমি।
সময়টা ছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। আমি, আমার সহধর্মিণী ও আমার ৮২ বছরের উৎসাহী শ্যালিকাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাজস্থান সফরের উদ্দেশ্যে। সকলের মধ্যেই চরম উত্তেজনা। বিশেষ করে মরুভূমিতে আমাদের দিন-রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতা কেমন হবে তাই নিয়েই যত আলোচনা।

অসাধারণ স্থাপত্য সমৃদ্ধ প্রাসাদ, হাভেলি আর দুর্গের রাজ্য হলো রাজস্থান। রয়েছে অনেক মনোরম হ্রদ। শৌর্য আর বীর্যের ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। মীরাবাঈয়ের ভজন যেমন এর আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়, তেমনি রাণাদের অস্ত্রের ঝনঝনানি এর ইতিহাসকে করেছে রক্তাক্ত। আবার এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জহরব্রতের ইতিহাস। বহু হানাহানি আর রক্তপাতের সাক্ষী এই রাজস্থান।
রাজপুতানাদের বাসস্থান থেকেই নাম হয়েছে রাজস্থান। কথিত রয়েছে রাজপুতরা আবু পাহাড়ে দেবতাদের হোমাগ্নি থেকে জাত। আবার এমনও বলা হয় ভারতে আসা হূণদের উত্তরপুরুষ এরা। কারও মতে, আরয বংশীয়  তথা সূরয ও চন্দ্রের বংশোদ্ভূত এরা।  স্বাধীনতার পর রাজপুতানা নামে পরিচিত রাজপুত শাসিত দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতে যোগ দেয়। এই রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে ১৯৪৯ সালের ৩০শে মার্চ রাজস্থান রাজ্যটি গঠিত হয়। আরাবল্লী পর্বতমালা ও মরুভূমির যুগলবন্দি রাজস্থানকে করেছে অনবদ্য। আর জয়সলমির ব্যারিকেড গড়েছে গ্রেট গ্লোবাল ডেজার্ট বেল্টের বিস্তীর্ণ মরুভূমিকে।

রাজস্থান সফরের মাঝপথেই হাজির হয়েছিলাম জয়সলমিরে। এই জয়সলমিরেই রয়েছে সোনার কেল্লা। বিশ্বের জীবন্ত কেল্লাগুলোর অন্যতম এই হলুদ বেলেপাথরে তৈরি কেল্লা। এই কেল্লাতে রয়েছে তিন চার হাজার মানুষের বাস। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লা ছবি করেছিলেন এই কেল্লাকে ঘিরে। তারপর থেকেই এই কেল্লার নাম মুখে মুখে ছড়িয়েছে সোনার কেল্লা হিসেবে। স্থানীয় গাইড হরিপ্রসাদ বলছিলেন, আগে এই কেল্লায় খুব বেশি পর্যটকের সমাগম হতো না। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা ছবির বদৌলতে এখন এই কেল্লায় পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। 

অতীতের ভাটি রাজপুতদের রাজধানী ছিল এই জয়সলমির। একসময় দেয়াল ঘেরা ছিল এই শহর। এখন আর সেই দেয়ালের চিহ্ন নেই। জয়সলমিরের সব মন্দির, প্রাসাদ, দুর্গ সবই মধুরঙা হলুদ বেলেপাথরে তৈরি। জয়সলমিরের চারপাশে রয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ বালুকারাশি। সূর্যের আলোতে তা সোনালী রূপ ধারণ করে। সূর্যাস্তে সোনারঙ আর সূর্যাস্তের ঠিক আগে হলুদ রঙা বালিয়াড়ি গোলাপি রূপে মায়াময় হয়ে ওঠে।

জয়সলমির থেকে পশ্চিমে প্রায় ৪০ কিলোমিটার গেলেই সাম স্যান্ড ডিউনস। ৩ কিলোমিটার ব্যাপ্ত টিলা টিলা আকারে দিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়ি। সেই বালিয়াড়ির একপাশে তৈরি হয়েছে অনেক ডেজার্ট ক্যাম্প। এমনই একটি ক্যাম্পে আমরা উঠেছিলাম।
সুন্দর এক আপ্যায়ন পেলাম। ক্যাম্পের প্রবেশপথে। কুমকুম, আবীর আর চন্দনের ফোঁটা দিয়ে হাতে কিছু ফুলের পাপড়ি দিয়ে আমাদের প্রদীপের আলোয় লিটারারি বরণ করে নেয়া হলো। এর সঙ্গেই দেয়া হলো শরবত। এই আন্তরিক আহ্বানে আমরা আপ্লুত, ধূ-ধূ মরুভূমিতে এটা আমাদের প্রত্যাশার মধ্যেও ছিল না। আধুনিক পর্যটন যে কোথায় পৌঁছে গিয়েছে এসবই তার নমুনা। ক্যাম্পের মধ্যে তিনদিক ঘিরে রয়েছে একাধিক তাঁবু। অবশ্য পাথরের তৈরি উঁচু ভিতের উপর তৈরি এই সব তাঁবু। আধুনিক সব রকম ব্যবস্থাই রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো তাঁবুতে রয়েছে শীতাতপ যন্ত্রেরও ব্যবস্থা। পরিপাটি করে সাজানো খাটের উপর সুসজ্জিত বিছানা। তাঁবুর ভেতরে অন্দরসজ্জায় রয়েছে রাজস্থানি সংস্কৃতির ছাপ।  আমরা এমনি একটি তাঁবুতে মালপত্র রেখে জিপে করে মরুভূমির আরও কিছুটা ভেতরে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলাম। বেলা দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে। সামনেই অপেক্ষা করছে হুড খোলা জিপ। আমরা তিনজন ছাড়াও আরেকটি পরিবারের দুজন আমাদের সঙ্গী হলেন। বালিয়াড়ি দিয়ে জিপ দুরন্তগতিতে ছুটে চলেছে। আমরা রীতিমতো রোমাঞ্চিত। ঢেউয়ের পর ঢেউ পেরিয়ে আমরা চলেছি বালিয়াড়ি দিয়ে। জিপের মধ্যে আমাদের টালমাটাল অবস্থা। মনে হচ্ছে আমরা চলেছি কোনো অ্যাডভেঞ্চারে। এইভাবে প্রায় ৯-১০ কিলোমিটার যাবার পর জিপ থামলো এক জায়গায়। সেখানে রয়েছে মরুবাহন উটের দল। সুন্দরভাবে সাজানো অনেক উট। পর্যটকদের জন্যই তাদের অপেক্ষা। এই মরুবাহনের পিঠের উপরে বসে এবার আমাদের উট সফারি শুরু হবে। প্রতিটি উটের পিঠে দুইজনের বসার জায়গা। উটগুলোকে নিয়ে যাবার জন্য রয়েছে উটের মালিক কিংবা তাদের পরিবারের লোকজন। বেশ কিছু নাবালকও রয়েছে তাদের মধ্যে। তারাই দড়ি ধরে পর্যটক সহ উটগুলোকে নিয়ে চলেছে বালিয়াড়ির এদিক সেদিক। আমরা এবার উঠবো একটি বেশ বড় মাপের উটের পিঠে। কিন্তু এখানে উটের পিঠে ওঠার জন্য কোনো মইয়ের ব্যবস্থা নেই। উটগুলো মালিক বা পরিচালকের নির্দেশ পেয়ে নিচে হামাগুড়ির মতো বসে পড়ে। আমরা গিয়ে উঠে বসি। সামনে যে বসছে তার ধরার জন্য কুজের কাছে ছোট্ট একটি লোহার দণ্ড আড়াআড়িভাবে দেয়া। আর পেছনের জনের ভরসা সামনের সঙ্গী। কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো উটের ঝাঁকুনি দিয়ে সামনের পায়ে ভর দিয়ে খাঁড়া হয়ে দাঁড়ানো। সেই সময় শক্ত করে ধরে বসে থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। যাক কোনো অঘটন না ঘটিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে উটের পিঠে অভিনব সফারিতে বেরোলাম। আমাদের পেছন  পেছন চলছিল লাইন ধরে আরও অনেক উট। সকলেরই পিঠে পর্যটক। তবে মজার ঘটনা হলো, আমাদের পেছনের উটের সঙ্গে কোনো পরিচালনা করার মতো লোক ছিল না। আমাদের উটের পরিচালক সেই উঠটির দড়িটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, আপনি ধরে বসে থাকুন। কিচ্ছু হবে না। এবার আমিই হলাম পেছনের উটের পরিচালক। চরাই উতরাই পেরিয়ে  দুলতে দুলতে চলেছি। প্রায় এক কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর আমরা ফিরে আসি। সত্যিই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছে এই উট সফারিতে। তাও খোদ মরুভূমির বুকে। চারদিকে  শুধুই ধু ধু বালিরাশি। কোনো ওয়েসিসের দেখা পাইনি ঠিকই তবে ঢেউয়ের মতো চরাই-উতরাই ডিঙিয়েছি ছন্দে ছন্দে।

আমরা উট সফারি শেষ করে নির্ধারিত জায়গায় ফিরে এলেও দেখি আমাদের সঙ্গী ৮২ বছরের বৃদ্ধার কোনো খোঁজ নেই। মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেল নাকি? দূরের উটের সারির দিকে তাকিয়ে দেখি একটি ছোটখাটো উটের পিঠে বসে তিনি, একাই। দুলকি চালে হাত নাড়তে নাড়তে ফিরে এলেন। আমাদেরও ধড়ে প্রাণ এলো।

ততক্ষণে সন্ধ্যা প্রায় নামতে চলেছে। পশ্চিম দিকে কাঁটাগাছের ঝোপের ফাঁক দিয়ে সূর্যাস্তের সে এক মোহনীয় দৃশ্য। চারদিকে রঙ বদল হচ্ছে। সোনালি হলুদ বালুকারাশি গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছে। অনেক উট বাড়ির পথ ধরেছে। একজন উটের মালিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তার নাম ইসমাইল। জানালেন তার রয়েছে প্রায় পঞ্চাশটির বেশি উট। পর্যটনই তার প্রধান ব্যবসা।
এদিকে আকাশে নীড়ে ফেরা বিহঙ্গদের সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি ড্রোন। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেল, পাকিস্তান সীমান্ত খুব কাছেই। তাই বিএসএফের নজরদারি চলছে এই সব ড্রোনের মাধ্যমে।

এবার আবার সেই বিপজ্জনকভাবে টালমাটাল খেতে খেতে বালিয়াড়ির  ঢেউয়ের  পর ঢেউ ডিঙিয়ে জিপে করে ফিরে এলাম ক্যাম্পে। সামান্য ফ্রেশ হয়ে চলে আসি ক্যাম্পের প্রবেশ পথের কাছে বিরাট উঠোনে। সেখানে সাজানো বর্ণময় মঞ্চে অপেক্ষায় লোকসংস্কৃতির আসরের কুশিলবরা। চারদিকে গ্যালারির মতো চেয়ারে বসার জায়গা। সন্ধ্যা নেমে এলেও অন্ধকার নেমে আসেনি। আসলে কয়েকদিন পরেই ছিল পূর্ণিমা। তাই আকাশ পরিষ্কার। ঠান্ডা বাতাসের আমেজ। বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কারে জেগে উঠলো বর্ণময় নর্তকির দল। শুরু হলো রাজস্থানী লোকসংগীতের সঙ্গে নানা মুদ্রায় নৃত্য। শুরুতেই প্রত্যক্ষ করলাম, বলা ভালো অনুভব করলাম, এক অসাধারণ শৈলি। কি নেই তাতে। নাচ, অভিনয়, জিমন্যাস্টিক্সের এমন সম্মিলন আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছিল। দু’চোখ ভরে দেখেছি রূপকথার মায়াজাল। এক কথায় আমরা খোলা আকাশের নিচে এক মনোরম পরিবেশে বসে রাজস্থানী সংস্কৃতির রূপ-রস-গন্ধ আমাদের মাতিয়ে রেখেছিল  কয়েক ঘণ্টা। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল আগুনের খেলা দিয়ে। অসাধারণ স্কিলের নৈপুণ্য ভোলার নয়। অনুষ্ঠানের  মাঝে আসছিল পকোড়া ও চা-কফি। এই দুইয়ের আমেজে আমরাও ততক্ষণে মাতোয়ারা। চারদিকের নিস্তব্ধতার মাঝে বানজারা ধুন মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

এরপর রাতের খাবার খেয়ে পুলকিত মনে শুতে গিয়েছিলাম। আমরা শহুরে মানুষ এমন নিস্তব্ধতায় অভ্যস্ত নই। এক অদ্ভুত নৈঃশব্দের মাঝে তাঁবুতে আমরা তিন জন। তবে খানিকটা সময় যেতেই সব আবেগ, তন্ময়তা একেবারে উধাও। আতঙ্কে নয়, মরুভূমির কনকনে ঠান্ডায় আমাদের তখন কাহিল অবস্থা। সমস্ত কাঁথা-কম্বল জড়ো করেও শীতকে আড়াল করা যাচ্ছে না। একরকম ঠকঠক করে কাঁপুনির মধ্যদিয়ে রাত কাটালাম।
মরুভূমির ঠান্ডা গায়ে মেখে গিয়ে হাজির হলাম রাজস্থানের একমাত্র শৈল শহর আবু পাহাড়ে। আরাবল্লী পর্বতমালার দক্ষিণে ১২১৯ মিটার উচ্চতায় এই আবু পাহাড়। গ্রানাইট পাথর আর সবুজ বনানী হাত ধরাধরি করে হাজির। মধ্যযুগীয় মন্দির ভাস্কর্য এই আবুর অন্যতম আকর্ষণ। আবু পৌঁছেই গেলাম এখানকার বিস্ময় ভাস্কর্যের রূপ দর্শনে। দিলওয়ারা জৈন মন্দির এবং একলিংজি মন্দিরের মতো আকর্ষণীয়  জৈন ও হিন্দু মন্দির রয়েছে এই আবুতে। গাছে ছাওয়া দিলওয়ারা মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে আদিনাথ, নেমিনাথ, মহাবীর, ঋষভদেব ও পারশ্বনাথের মন্দির। প্রথম জৈন তীরথঙ্কর আদিনাথের মন্দির বিমল বাসাহি তৈরি হয়েছিল ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে। গুজরাটের প্রথম সোলাঙ্কি রাজা ভীম দেবের মন্ত্রী বিমল শাহ এটি তৈরি করেছিলেন। ১৫০০ শিল্পী আর ১২০০ শ্রমিকের মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে  ১৪ বছরে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির। খরচ হয়েছিল ১৮ কোটি  ৫৩ লাখ টাকা। সোলাঙ্কি স্থাপত্য  শৈলিতে  সম্পূর্ণ শ্বেত পাথরে তৈরি এই মন্দিরে প্রবেশ করেই থমকে গিয়েছিলাম। কি অপূর্র সৃষ্টি। যেদিকে তাকাই সেদিকেই বিস্ময়কর কারুকাজের উপস্থিতি। শিল্পীদের দক্ষতা আর নিপুণ খোদাই করে গড়ে তোলা প্রতিটি ভাস্কর্য দেখতে দেখতে বারে বারে স্যালুট জানিয়েছি মনে মনে। ৪৮টি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভের উপর অষ্টভূজাকার গম্বুজ। যূথবদ্ধ হাতির দল। অনন্য কারভিংয়ের কাজ।  রয়েছে ৫২টি দেব কুঠরি। প্রতিটিতেই অলঙ্করণ ও ভাস্কর্য চুম্বকের মতো আকর্ষণে দাঁড় করিয়েছে বারে বারে। অলিন্দের ভাস্কর্য বা সিলিংয়ের কারুকার্য মোহিত করে রেখেছিল। এ এক মর্মরের কাব্য কথা। বারে বারে একটি কথাই ভাবছিলাম, ভাস্কর্যের এই মর্মর রূপ দান কি সম্ভব মানুষের পক্ষে। কিন্তু হাজার বছর আগের শিল্পীরা সেই দক্ষতার নজির রেখে গিয়েছেন সারা বিশ্বের কাছে। আর তাই ভারত সহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন এই মর্মর মন্দির স্থাপত্যকে দেখার পাশাপাশি অনুধাবন করতে।
দিলওয়ারা ছাড়াও আরাবল্লীর সর্বোচ্চ শিখরে ১৭৭২ মিটার উচ্চতায় রয়েছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের মন্দির। আবুতে ছড়িয়ে রয়েছে আরও অনেক মন্দির।

এবার আমাদের গন্তব্য নক্কি লেক। শহরের প্রাণকেন্দ্রে চারপাশ পাহাড় ঘেরা এই কৃত্রিম লেক। নক্কি লেক থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। পাহাড়ের গাছের ফাঁক দিয়ে লাল সূর্য আস্তে আস্তে দিগন্ত রেখায় বিলীন হচ্ছে। জলে তার প্রতিফলন অন্য এক রূপ নিয়েছে। প্রবাদ আছে রাক্ষসদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতারা ব্রহ্মার পরামর্শে দেবলোক ছেড়ে আবু পাহাড়ে আসেন যজ্ঞ করতে। আর যজ্ঞের জলের জন্য দেবতারা নখ দিয়ে খনন করেছিলেন এই লেক। সেই থেকেই এর নাম নক্কি লেক। লেক দেখে এসে আমাদের তাড়াতাড়িই আশ্রয়স্থলে ঢুকে পড়তে হয়েছিল। তাপমাত্রা ততক্ষণে নেমে এসেছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হাড় হিম করা কাঁপুনি দিয়ে ঠাণ্ডা যাকে বলে। সেই ঠাণ্ডায় কোনোরকমে রাত কাটিয়ে পরের দিন চলছিলাম রাজস্থানের অন্য শহরগুলোর উদ্দেশ্যে।
রাজস্থানের শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম যোধপুর, বিকানীর, জয়পুর, চিতোর, জয়সলমির, উদয়পুর ও আজমীর। রাজস্থানীদের পোশাকের মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্য। ছেলেরা পরেন ধুতির সঙ্গে বোতামহীন ফতুয়ার মতো ফুলহাতা জামা আর মাথায় থাকে ১৬ মিটার কাপড়ের তৈরি পাগড়ি। মেয়েরা পরেন ঘাঘরা, কাঁচুলি আর ওড়না। চোখে সুরমা, গায়ে মেহেন্দি, নাকে নোলক, কানে ঝুমকো, গলায় হাঁসুলি ও পায়ে মল।
রাজস্থানের তিনটি শহরকে রঙিন শহর বলা হয়। একটি হলো সোনালী শহর জয়সলমির, দ্বিতীয়টি রাজধানী জয়পুর, গোলাপি শহর নামেই পরিচিত। অন্যটি নীল শহর বলে পরিচিত যোধপুর। এই শহরের পুরনো অংশের সব বাড়িঘর নীল রঙে রঙিন। শহরের ব্রাহ্মণরা নিজেদের আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করতে তাদের বাড়িঘরে নীল রঙ করিয়েছিলেন। সেই ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে। মার্বেল স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নির্দশন রয়েছে এই শহরে।
জয়পুরের সমস্ত প্রাসাদ ও বাড়িঘর গোলাপি রঙে রাঙানো। ১৮৭৬ সালের রানী ভিক্টোরিয়ার সফর উপলক্ষে মহারাজা রাম সিং আতিথেয়তার রঙ হিসেবে গোটা শহরের সব প্রাসাদ ও বাড়িঘর পোলাপি রঙে রাঙিয়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই একই পরম্পরায় সব বাড়িঘর গোলাপি। গোটা শহরটি ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র মেনে তৈরি করেছিলেন রাজা দ্বিতীয় জয় সিংহ। জয়পুরে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত হাওয়া মহল, আমের দুর্গ, চোখি ধানি, সিটি প্যালেস, অ্যালবার্ট হল মিউজিয়াম, মশলা চক এবং আরও অনেক কিছু।
উদয়পুরকে বলা হয় দ্য সিটি অব সানরাইজ। অনেকে বলেন, এটি প্রাচ্যের ভেনিস বা হ্রদের শহর। মনোরম হ্রদ, মর্মর প্রাসাদ, কারুকার্যময় হাভেলি ও মন্দির নিয়ে এই উদয়পুর। এটি মেবার রাজ্যের রাজধানী ছিল। তাই এটিকে মেবারের রত্নও বলা হয়।       
রাজস্থানের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং দর্শনীয়  দুর্গগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চিত্তোরগড়, মেহরানগড়, জয়সলমির, জয়গড় এবং জুনাগড় দুর্গ। এর মধ্যে যোধপুরের মেহরানগড় দুর্গটি ৫ কিলোমিটার  বিস্তৃত এবং প্রায় ১২৫ মিটার উঁচু একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে। চিত্তোরগড় দুর্গটি এশিয়ার বৃহত্তম দুর্গ। এটি ৭০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১৩ কিলোমিটার। চমৎকার স্থাপত্যের ছাপ সর্বত্র।
রাজস্থানের প্রতিটি শহরে এখনো রয়েছে রাজকীয় ঐশ্বর্যের নানা নিদর্শন। প্রাসাদ আর হাভেলির অসাধারণ স্থাপত্যের পাশাপাশি রাজস্থানী শিল্প ও সংস্কৃতির নানা ঐতিহ্য।

আমাদের সফরে অন্তর্ভুক্ত ছিল আজমিরও। আজমিরের খাজা মইনুদ্দিন চিশতির দরগাহ হল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সুফিবাদের মিলনস্থল। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি হিন্দু দর্শনাথীও আজমিরের এই দরগাহে হাজির হন মনস্কামনা পূরণের জন্য। নারীদের প্রবেশ যেহেতু অবাধ তাই আমার সঙ্গীরা চাদর চড়াতে গিয়েছিলেন। আমাদের মতো বহু মানুষ এসেছিলেন দরগাহে। তাদের মধ্যে একটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে আলাপ হলো। তারা কয়েক বছর পরপর দরগাহে আসেন।
এবার রাজস্থান সফর শেষ করি এক অভিনব মন্দিরের সন্ধানে। বিকানির থেকে প্রায় ৩১ কিলোমিটার দূরে দেশনোকে রয়েছে এই কার্নি মাতা মন্দির। এটি ইঁদুরের মন্দির নামে পরিচিত। কয়েক হাজার ইঁদুরের বাস এই মন্দিরে। কাবা নামে পরিচিত এই ইঁদুরদের পবিত্র বলে মনে করা হয়। আমরা যখন মন্দিরে পৌঁছেছিলাম তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামতে চলেছে। মন্দিরে প্রবেশ করেই অজস্র ইঁদুরের ছুটোছুটি দেখে চমকে গিয়েছিলাম। মন্দিরের সর্বত্র এদের দৗড়াদৌড়ি। পায়ের উপর দিয়ে কখনো গায়েও উঠে পড়ছে। পূণ্যার্থীরা কেউই আপত্তি করছেন না।
মন্দিরের মেঝেতে রয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। তার মধ্যদিয়ে এরা যাতায়াত করছে। এমনকি বিগ্রহের গর্ভগৃহেও এদের অবাধ প্রবেশ। মন্দিরের কর্মীদের কাছ থেকে জানা গেল, প্রায় ২০ হাজার কাবা বাস করে মন্দির চত্বরে। মন্দিরের কর্মীরাই এদের দেখাশোনা করেন। খাওয়া দাওয়াও দেয়া হয় মন্দির থেকেই। এক বিচিত্র দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম যখন দেখলাম ইঁদুরগুলো দর্শনার্থীদের থালা থেকে বা রান্নাঘরে চরণ কর্মীদের একই থালা থেকে তারা খুটে খুটে খাবার খাচ্ছে। শুনলাম, ভক্তরা নাকি কাবা দ্বারা খাওয়া দাওয়াকে সম্মান হিসেবে মনে করেন। আধুনিক যুগেও এমন বিশ্বাস নিয়ে কিছু মানুষ বেঁচে রযেছেন।

mzamin

Tuesday, December 3, 2024

সীমান্তে অচলাবস্থা বাণিজ্য ব্যাহত by পরিতোষ পাল ও ওয়েছ খছরু

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে এবং গ্রেপ্তার হওয়া সন্ন্যাসীদের মুক্তির দাবিতে গতকাল পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাংলাদেশ সীমান্তে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ওদিকে সিলেটের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার পেট্রাপোলে এদিন প্রায় হাজার খানেক সন্ন্যাসী ও বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের সমর্থকরা সীমান্ত অবরুদ্ধ করে রাখেন। সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ সীমান্তে সমবেত হয়েছিলেন। পুলিশ অবশ্য সতর্কতা হিসেবে তাদের সীমান্তের জিরো পয়েন্টের ৮০০ মিটার আগেই আটকে দিয়েছে। অবশ্য আন্দোলনকারীরা মানববন্ধন করে জিরো পয়েন্টে গিয়ে বাংলাদেশকে বার্তা দিতে চলেছেন। অখিল ভারতীয় সন্ত সমিতির আয়োজনে এই অবরোধ কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

সন্ত সমিতির বাংলা কমিটির সভাপতি স্বামী পরমাত্মানন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নির্যাতন বন্ধ এবং ধৃত  সন্ন্যাসীদের মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত সীমান্ত অবরোধ কর্মসূচি চলবে। তিনি বলেন, আমরা সব রকমের বাণিজ্য বন্ধ করে দেবো। কোচবিহারের চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্তেও এদিন কয়েক শ’ মানুষ প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। সীমান্তে এই অবরোধের ফলে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীদের আনাগোনা এক প্রকার ছিল না বললেই চলে।
বিজেপি’র নেতা ও রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী আগামী বুধবার পেট্রাপোল সীমান্ত অবরুদ্ধ করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে আসামের সীমান্তেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, সনাতনী ঐক্যমঞ্চ’র ডাকে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। শিবসাগর জেলার সুতারকান্দি সীমান্তে চলো বাংলাদেশ নামের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

এদিকে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এক বিবৃতিতে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশে হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং তাদের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, নারী ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর ইসলামী মৌলবাদীদের হামলা, হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও অমানবিক নৃশংসতার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হিন্দু মহাসভার পশ্চিমবঙ্গ কমিটির  সভাপতি ডক্টর চন্দ্রচূড় গোস্বামী  বলেছেন, আমরা প্রতিবাদ করছি। তবে প্রতিশোধ নেয়া প্রয়োজন।
ওদিকে সিলেট সীমান্তে ভারতের ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র বাংলাদেশ অভিমুখে মার্চের পর দুই পোর্টে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ কারণে গতকাল বিয়ানীবাজারের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে মালামাল আসা-যাওয়া করেনি। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন; ভারত অংশে উত্তেজনার কারণে আপাতত বন্ধ রয়েছে দুই পোর্ট। বাংলাদেশে কথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ এলাকায় বিক্ষোভ চলছে। ভারতের হিন্দু ঐক্যমঞ্চ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে রোববার কয়েকশ’ সনাতনী মানুষ ‘বাংলাদেশ চলো’ কর্মসূচি নিয়ে বিয়ানীবাজারের শ্যাওলা স্থলবন্দর অভিমুখে আসতে থাকে। বাংলাদেশ সীমান্তের অদূরে একটি স্থানে প্রথমে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। কিন্তু পুলিশের বাধা ডিঙিয়ে তারা এগুতে থাকলে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কাঁটা তার দিয়ে ব্যারিকেড দেয়। এই ব্যারিকেড ভাঙতে চাইলে ভারতের উগ্রপন্থি সনাতনীদের সঙ্গে বিএসএফ ও ওখানকার পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে- সংঘর্ষে  বেশ কয়েকজন আহত হন। তবে ব্যারিকেড ভেঙে শেষ পর্যন্ত আরএসএ’র নেতৃত্বে থাকা ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র নেতারা সীমান্ত এলাকায় আসতে পারেননি। তবে; তাদের এই মুভমেন্টের পর বাংলাদেশের শ্যাওলা সীমান্ত বন্দর দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। পোর্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- নিরাপত্তা বিবেচনায় কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গতকালও  পোর্টের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ‘বাংলাদেশ চলো’ মুভমেন্টে স্থানীয় ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র নেতারা বলছিলেন; ‘জীবন গেলে যাবে, তবুও তারা বাংলাদেশে যাবেন।’ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের প্রতিবাদে তারা এই মার্চ কর্মসূচি পালন করছেন বলে জানান। এদিকে- আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জের সুতারকান্দি সীমান্তে যখন মুভমেন্ট নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল তখন রোববার পার্শ্ববর্তী করিমগঞ্জ স্টিমারঘাটের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানি- রপ্তানি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। করিমগঞ্জের মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া খবরে জানা গেছে; ভারত অংশের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় বাংলাদেশে কঠিন পরিস্থিতি চলছে বলে ব্যবসায়ী নেতারা উল্লেখ করেন। তবে; ব্যবসায়ীদের এই সিদ্ধান্ত না মেনে গতকাল সকালে করিমগঞ্জ পোর্ট দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলে করিমগঞ্জ এলাকার স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে করিমগঞ্জের কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী পোর্টে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও গতকাল দুপুরের পর জকিগঞ্জে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে; বিধায়ক কমলাক্ষ চক্রবর্তী কিছু সংখ্যক কর্মী নিয়ে এসে নদী তীরবর্তী স্টিমারঘাটের পোর্টে আসেন। এ সময় ওই পোর্ট দিয়ে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কিছু মালামাল ঢুকছিল। তিনি মালামালের একটি চালান আটক করে প্রকাশ্যে আগুন ধরিয়ে দেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেই বাঁশ এনে পোর্ট এলাকায় ব্যারিকেড দেন। একই সঙ্গে ঘোষণা দেন; বাংলাদেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পোর্ট দিয়ে আমদানি- রপ্তানি বন্ধ থাকবে। তবে এই মুভমেন্টের আগে দু’দেশের মধ্যে কয়েক গাড়ি মালামাল আসা-যাওয়া করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের জকিগঞ্জ পোর্টের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- সকালে করিমগঞ্জ থেকে নদীপথে দুই ট্রাক পণ্য এসেছিল। ওই অংশে কিছু বিশৃঙ্খলার কারণে বিকাল পর্যন্ত মালামাল আসেনি ও বাংলাদেশ থেকে যায়নি। সিলেটের ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন; ভারত অংশের সমস্যার কারণে বিয়ানীবাজারের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে যখনই সম্মতি আসবে তখনই ফের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। সিলেট আমদানিকারক গ্রুপের যুগ্ম সম্পাদক ও শ্যাওলা বন্দরের ব্যবসায়ী জয়ন্ত চক্রবর্তী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- করিমগঞ্জের সুতারকান্দি স্থল বন্দরের ঝামেলার কারণে  রোববার থেকে সিলেটের শ্যাওলা ও জকিগঞ্জ পোর্ট দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। করিমগঞ্জের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমদানি-রপ্তানি শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি। শ্যাওলা পোর্টের সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক নিয়াজ উদ্দিন জানিয়েছেন- ‘হিন্দু ঐক্যমঞ্চ’র মুভমেন্টের আগে আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক ছিল। এজন্য  পোর্টে মালামাল লোড করা ট্রাক অপেক্ষমাণ ছিল। বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কারণে ওই ট্রাকগুলো আটকা পড়ে। আপাতত লোড করা ট্রাকগুলো খালাস করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে; বাংলাদেশ অংশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যেও এ নিয়ে কোনো উত্তেজনা নেই। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বিজিবি’র ১৯ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মেহেদী হাসান জানিয়েছেন- বাংলাদেশ অংশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সীমান্তে পূর্বের মতো বিজিবি’র পক্ষ থেকে টহল জোরদার রয়েছে। জকিগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আফসানা তাসনিম জানিয়েছেন- সীমান্তে নজরদারি চলছে। একই সঙ্গে বিজিবি’র পক্ষ থেকে অতিরিক্ত লোকবল নিয়ে টহল বাড়ানো হয়েছে।

mzamin

Sunday, November 24, 2024

কলকাতায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মন্দা, বইমেলা ও চলচ্চিত্র উৎসব থেকে বাদ by পরিতোষ পাল

ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত কলকাতায় বাংলাদেশের নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হয়ে এসেছে এতদিন। সেই কর্মকাণ্ড ঘিরে দুই বাংলা মিলনমঞ্চে পরিণত হতো। সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের গুণীজনদের আনাগোনায় প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠতো সংস্কৃতির শহর কলকাতা। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলাতেও বাংলাদেশের সগৌরব উপস্থিতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে উৎসাহের জোয়ার দেখা যেতো। কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি  সুবিশাল প্যাভিলিয়ন থাকতো সকলের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী ও নাট্যকার অভিনেতা ব্রাত্য বসু গত বছর বইয়ের স্বর্গ কলেজ স্ট্রিটে আয়োজিত বাংলাদেশ বইমেলার উদ্বোধন মঞ্চে দাঁড়িয়ে গর্বের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, দুই বাংলাকে জুড়ে রেখেছে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি এবং অবশ্যই বই। যা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রাখা যাবে না।

কিন্তু এ বছর একটা মন্দার ছবি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর একটা পরিবর্তন এসেছে ঠিকই। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও শীতলতা দেখা দিয়েছে। দূতাবাস ও উপদূতাবাসগুলোতেও একটা আপাত স্থবিরতা বিরাজ করছে। ফলে বাংলাদেশের তরফে সাংস্কৃতিক কোনো কর্মকাণ্ডের চঞ্চলতা এখন পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে যে ‘বাংলাদেশ বইমেলা’ ও ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবে'র আয়োজন করা হতো তার ইঙ্গিত কোনও সূত্র থেকেই মেলেনি। অবশ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে একটি সূত্রে দাবি করা হয়েছে। আর কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণও এক প্রকার অনিশ্চিত। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকেও বাদ রাখা হয়েছে বাংলাদেশকে।

ইতিমধ্যেই এই সব খবর মিডিয়ার কল্যাণে জানাজানি হওয়ার পর থেকে কলকাতার বাংলাদেশ অনুরাগীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সাহিত্যের এক নিবিষ্ট পাঠক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের স্নাতকোত্তর ছাত্র নীলাঞ্জন সেন তার হতাশার কথা কোনওরকম গোপন না রেখেই বলছিলেন, সাহিত্য -সংস্কৃতির অঙ্গনে রাজনীতির প্রবেশ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি প্রতিবছর বাংলাদেশের নতুন নতুন লেখকদের সাহিত্য পড়ার জন্য বইমেলায় বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকতেন জানিয়ে বলেন, আমার মতো বহু সাহিত্য অনুরাগীই এ বছর বঞ্চিত হতে চলেছেন। অবশ্য শেষ মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা আলাদা কথা।

কলকাতা বইমেলার বয়স ৪৮ বছর হলেও গত ২৮ বছর ধরে এই বইমেলায় বাংলাদেশ অন্যতম অতিথি দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়ে এসেছে। বাংলাদেশ থিম কান্ট্রি হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে একাধিকবার। বইমেলার ১২ দিনের মধ্যে একটি দিন পালন করা হতো বাংলাদেশ দিবস হিসেবে। সারাদিন ধরে মেলা প্রাঙ্গনে বাজতো বাংলাদেশের নানা সঙ্গীত। আর সেমিনার হতো বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা অভিমুখ নিয়ে।
সম্প্রতি কলকাতা বইমেলার আয়োজক সংস্থা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের তরফে বইমেলায় অংশগ্রহণের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স থেকে লাতিন আমেরিকার দেশের নাম থাকলেও নাম নেই প্রতিবেশী বাংলাদেশের।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণেই এই সিদ্ধান্ত। গিল্ডের সভাপতি ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় সব দায়ভার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের ডিরেক্টার আফসানা বেগম অবশ্য সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেছেন, কলকাতা বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ প্রবলভাবে আগ্রহী ছিল। আগ্রহী ছিলেন বাংলাদেশের প্রকাশকরাও। সরকারিভাবে কলকাতা বইমেলায় অংশগ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে তারা আয়োজক সংস্থার কাছে ই-মেইল এবং একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে কথা বললেও কোনও উত্তর পান নি। আর তাই হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

আগামী ২৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে কলকাতা বইমেলা। গত বছর এই বইমেলায় ২৬ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল। বই বিক্রি হয়েছিল ২০ কোটি রুপির বেশি। বইমেলার বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে প্রবশের জন্য বইপ্রেমীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতো হতো।  
তবে এবারের পরিস্থিতি নিয়ে  আয়োজক সংস্থা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সভাপতি ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতের ভিসা কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ থাকার কারণে গিল্ডের পক্ষে নিজের থেকে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের পরামর্শ চেয়েছি। সেইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছি।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে ভারত সরকারের নীরব থাকার নীতি নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও একই পথ নিয়েছে। আর তাই রাজ্য সরকার আয়োজিত আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশকে এ বছর বাদ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উৎসব কমিটির প্রধান চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ।

চলচ্চিত্র সংক্রান্ত কোনও আলোচনাতেও বাংলাদেশের কাউকে রাখা হয়নি বলে জানা গিয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই সহজ অজুহাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত, বাংলাদেশে পট পরিবর্তন ও ভারত বিরোধীতার দিকে লক্ষ্য রেখেই সম্ভবত ভারতের প্রশাসনিক মহল একরকম নীরব থাকার পথ নিয়েছে। ফলে ভারতের কোনও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে দূরে রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, কলকাতা বইমেলা বা চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের উপস্থিতি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের  হিন্দু মৌলবাদীরা ইতিমধ্যেই বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছেন। ইতিমধ্যেই তারা কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের অদূরে বিক্ষোভ করেছে। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন ও উপাসনালয় ভাঙার প্রতিবাদে দূতাবাসে স্মারকলিপিও দিয়েছে। তাই বইমেলা বা চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কোনওরকম বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ হলে নতুন করে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অবশ্য বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের মতে, কোনও আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঘেরাটোপের মধ্যে রাখা ঠিক নয়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পবিত্র সরকার কলকাতা বইমেলা ও চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশকে যোগ দিতে না দেয়াকে অন্যায় সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, বাংলাদেশে পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই।  কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এইভাবে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে বাধা তৈরির নীতি মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।

তবে সাফটা চুক্তি অনুযায়ী দুদেশের মধ্যে চলচ্চিত্র বিনিময় হতে চলেছে। ভারতের দুটি ছবি বহুরূপি ও পুষ্পা ২ বাংলাদেশে মুক্তি পাচ্ছে ডিসেম্বরেই। তেমনি ভারতে মুক্তি পেতে চলেছে বাংলাদেশের ছবি রায়হান রাফির দামাল। রহুরূপির পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই খবর জানিয়ে বলেছেন, প্রক্রিয়াকরণের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। শুধু সরকারি স্তরে চূড়ান্ত অনুমতির অপেক্ষা। প্রশ্ন থেকেই যায়, অনুমতি আসবে তো?

mzamin

Thursday, April 22, 2021

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আট দিন by পরিতোষ পাল

বিমানের জানালা দিয়ে নিচে তাকাতেই বিস্ময়ের ঘোর। নিচে নীল জলরাশির মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু ভুখন্ড। সকালের রোদের আলো এসে পড়েছে গোটা ভুখন্ডে। চারিদিকে ঝিকমিক করছে সমুদ্রের জল। পৃথিবীর আদিম আদিবাসীদের দেশ আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে যাবার ইচ্ছে অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে ছিল। কিন্তু সুযোগ হচ্ছিল না। সেই সুযোগ আসতেই একদিন ভোরে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে উঠে বসেছিলাম। ঠিক দু ঘন্টায় বিমান কলকাতা থেকে ১২৫৫ কিলোমিটার দূরে পোর্ট ব্লেয়ারে বীর সাভারকার বিমান বন্দর পৌঁছে গিয়েছিল। ছোট্ট বিমানবন্দরে নেমেও ঘোর কাটছে না অবশেষে তাহলে আসা সম্ভব হল এক সময়ের পরিচিত কালাপানির দেশ, দ্বীপান্তরের দেশ আর আদিমতম মানুষের দেশ আন্দামানে।
হাজার হাজার বছর আগে এই আন্দামানে এসেছিল একদল মানুষ। প্রথমে ভাবা গিয়েছিল এরা এসেছিল দক্ষিণ এশিয়া থেকে। কিন্তু পরে জানা যায় আসলে এদের অধিকাংশ এসেছিল আফ্রিকা থেকে। তাই আদিবাসী এই মানুষগুলোর মধ্যে নিগ্রো প্রভাব স্পষ্ট। তবে একাংশের মধ্যে রয়েছে মঙ্গোলয়েড প্রভাব। আন্দামানের এই আদিবাসিন্দারাই পৃথিবীর আদিমতম অধিবাসী। জারোয়া, ওঙ্গি, সেন্টিনেলিজ, শম্পেন, গ্রেট আন্দামানিজ ও নিকোবরিজ, এই কটি উপজাতির বাস এই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। সভ্যতা থেকে যোজন দূরে গভীর জঙ্গলে এদের বাস। আজো এরা নগ্ন থাকে। এদের ভাষা এবং সংস্কৃতি একান্তই নিজস্ব। সভ্য সমাজের মানুষকে এরা দেখতে পারে না। মধ্য ও দক্ষিণ আন্দামান ও আরো কয়েকটি দ্বীপে নির্জনতায় এদের বসবাস। এক সময় সংখ্যায় এরা কয়েক হাজার থাকলেও আজ সব মিলিয়ে সংখ্যায় এরা হাজারেরও কম। এদের মধ্যে আবার গ্রেট আন্দানিজদের সংখ্যা নেমে এসেছে ৪৫ জনের কাছাকাছি। আদিমতম এই মানুষগুলোকে রক্ষা করাই এখন প্রধান কাজ হয়ে উঠেছে।
আদিবাসীন্দারা ছাড়াও আন্দামানে এখন বাঙালি, তামিল ও অন্যান্য আরো অনেক জাতির মানুষ বসবাস করেন। আসলে এক সময় ব্রিটিশরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেবার অপরাধে যাদের দ্বীপান্তর দিয়ে পাঠিয়েছিল আন্দামানে তাদের বংশধররা রয়ে গিয়েছেন এই দ্বীপে। আর পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ভারত সরকার পুনর্বাসন দিয়ে পাঠিয়েছিল এখানকার নানা দ্বীপে। তারাই সংখ্যায় এখন বেশি। আন্দামানের নানা প্রান্তে এখন ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোরের মানুষের বসবাস। কয়েকটি জায়গায় তো ৯০ শতাংশের বেশিই বাংলাদেশি। সরকার এদের সকলকে ৩০ বিঘা করে উর্বর জমি দিয়েছিল চাষের জন্য। সেই জমি থেকে উৎপাদিত পণ্যে শুধু দিনই চলে যায় তা নয়। উদ্বৃত্ত ফসল বিক্রি করে আয়ও হয় যথেষ্ট। এছাড়া সকলেই নানা ব্যবসায় জড়িত। দক্ষিণ আন্দামানের প্রান্তে দিগলিপুরে ফরিদপুরের দীপকদের হীরা হোটেলে বাঙালি খাবার খেতে পর্যটকদের ভিড় সারা বছরেই লেগে থাকে। তেমনি পোর্ট ব্লেয়ারের উপকন্ঠে জলিবয় জেটিতে যশোরের হরির শ্রীহরি হোটেলেও বাঙালি পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই রয়েছে।
আন্দামানের রঙ্গতে আমকুঞ্জ সমুদ্র সৈকতেই আলাপ বন বিভাগের পদস্থ অফিসার অজয় কুমার দাসের সঙ্গে। তিনি সৈকতের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজের তদারকি করছিলেন। এগিয়ে গিয়ে কথা শুরু করার আগেই উনি নিজেই পূর্ববঙ্গীয় বাংলায় স্বাগত জানিয়ে বললেন, বেড়াতে এসেছেন বুঝি ! জানালেন, বাংলাদেশের খুলনায় ছিল তাদের বাড়ি। তবে ১৯৬৫ সালে ক্লাস ফাইভে পড়তে পড়তেই ভিটে ছেড়ে এসেছিলেন কলকাতায়। পরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দিগলিপুরে। আন্দামানের নানা প্রান্তেই এই বাংলাদেশিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়া যায়। রঙ্গতের হীরেন বিশ্বাসের কাছেই জেনেছিলাম, আন্দামানে চিকিৎসার জন্য এক পয়সা খরচ করতে হয় না। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দিনরাত খোলা। গেলে বিনা পয়সায় ওষুধও মেলে। তেমনি পড়াশোনাও বিনা খরচে। এমনকি কলেজে পড়তে রাজধানিতে গেলে সেখানে থাকা খাওয়াও বিনা খরচে। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ সুবিধা। এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যেতে যেখানে স্থানীয়দের ৫০ রুপি দিলেই চলে সেখানে পর্যটকদের দিতে হয় ১৯৫ রুপি। প্রবীণদের জন্য রয়েছে আরো নানা সুযোগ সুবিধা। তাই তারা এখন বেশ সুখে স্বচ্ছন্দেই রয়েছেন সেখানে।

অপার কৌতূহল নিয়েই পা দিয়েছিলাম ৫৭২ দ্বীপ সমন্বয়ে গঠিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। অবশ্য মাত্র ৩৮টিতেই বসতি রয়েছে। আর এর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দ্বীপেই পর্যটকদের যাওয়া আসা অনুমোদিত। সমুদ্র আর জঙ্গলের সহাবস্থান এই আন্দামানে। বারাটাংয়ের ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট দেখবার মত। রয়েছে ছোট খাটো পাহাড়। আর আগ্নেয়গিরি। জীবন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে ব্যারেন দ্বীপে। অন্যদিকে দিগলিপুরের অদূরে রয়েছে কাদার আগ্নেয়গিরি। আবার বারাটাং দ্বীপের আশ্চর্য্য লাইম স্টোন কেভ দেখার অনুভূতিটাই আলাদা। ম্যানগোভ অরণ্যকে পাশে রেখে সমুদ্রের মাঝ থেকে হঠাৎ খাড়িতে প্রবেশ করতে হয়। আর সেখান থেকে আড়াই কিলোমিটার পায়ে হেঁটে তবেই দেখা পাওয়া যায় এই কেভের। তবে রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারে পৌঁছেই গিয়েছিলাম অবশ্য দ্রষ্টব্য সেলুলার জেলে। কয়েক বছর আগেই এটিকে জাতীয় স্মারক হিসেবে ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। এই সেই জেল যেখানে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাঠিয়েছিল দ্বীপান্তরে। ৬৯৩টি সেল বিশিষ্ট এই জেলের মাঝখানে টাওয়ার। আর চারদিকে ছড়ানো সাতটি বাহু এখন মাত্র কয়েকটি অংশ টিকে রয়েছে । তিনতলার এই জেল ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ে যায় বিপ্লবীদের কথা, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ দিয়েছিলেন। বহু শহীদের রক্তে রাঙা এই জেলের প্রাঙ্গণে বসে সন্ধ্যায় লাইট এন্ড সাউন্ডে জেনেছিলাম সেলুলার জেল আর বিপ্লবীদের সংগ্রামের কাহিনী। বেরিয়ে আসার পথে সকলেই শিহরিত হয়েছিলেন সেদিনের কথা ভেবে। পোর্ট ব্লেয়ারে কয়েকটি মিউজিয়ামও রয়েছে। আর পোর্ট ব্লেয়ারের অদূরে রয়েছে এশিয়ার প্রাচীনতম চাথাম শ’ মিল।
পোর্টব্লেয়ার থেকে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম নানা দ্বীপের উদ্দেশ্যে। সমুদ্র আমাদের সব সময়ের সঙ্গী ছিল। এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যেতে হয়েছে ছোট ছোট জাহাজে করে। আর এই জাহাজে করে যাবার পথে সমুদ্রের সৌন্দর্যকে নানাভাবে আবিষ্কার করেছি। সমুদ্রের জলের রঙের পরিবর্তন দেখে অবাক হয়েছি। কখনো জলের রঙ ঘন নীল হতে হতে প্রায় কালো। কোথাও একেবারেই নীল। কোথাও সবুজ। আবার তীরের দিকে হাল্কা নীল। আন্দামানের হ্যাভলক দ্বীপের সৌন্দর্যের কথা আগেই জেনেছিলাম। সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মত দ্বীপ। সমুদ্রের ধারে কটেজে কয়েকদিনের অবস্থান মনে রাখার মত। তেমনি ১৫ বর্গ মাইলের ছোট্ট নীল দ্বীপে পৌঁছেও অবাক হয়েছি এর সৌন্দর্য দেখে। এই ছোট্ট নীল দ্বীপকে বলা হয় ভেজিটেবল বোল অব আন্দামান। নানা ধরনের সবজি উৎপাদন হয় প্রচুর পরিমাণে। আর এই দ্বীপের ৯৯ শতাংশই বাঙালি। চারদিকে মোট ৫টি সৈকত। আন্দামানের বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরে দেখার মত এক ডজনেরও বেশি সমুদ্র সৈকত রয়েছে। প্রতিটি সৈকতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দিগলিপুরের কাছে রস এন্ড স্মীথ দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে সাঁতার কেটে আর স্নান করে মন তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। এখানে সমুদ্রের গর্জন নেই, কিন্তু আমেজ রয়েছে। একই রকম সমুদ্র স্নানের আনন্দ পেয়েছিলাম রাধানগর সমুদ্র সৈকতে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দর সৈকত হিসেবে চিহ্নিত রাধানগর-এ গর্জনও রয়েছে সমুদ্রে উদ্দামতা। আর পোর্ট ব্লেয়ারের অদূরে জলিবয় দ্বীপে সমুদ্র স্নানের মজাটাই আলাদা। অনেকটা হেঁটে চলে যাওয়া যায় সমুদ্রের গভীরে।
আন্দামোনের আরেকটি বড় আকর্ষণ হল কোরাল। সামুদ্রিক এই উদ্ভিদটির বৈশিষ্ট্যই আলাদা। মরে গিয়ে এগুলোই শক্ত পাথরের আকার নেয়। আন্দামানকে কোরাল সা¤্রাজ্য বলা যায়। বিভিন্ন দ্বীপের উপকূলে প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে এই বিস্ময়কর কোরাল। তবে ১৫ বছর আগের সুনামি এদের উপর বিপর্যয়ের ছাপ রেখে গিয়েছে। বহু জায়গাতেই কোরালের অপমৃত্যু ঘটেছে। অবশ্য মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যায় না। আবার নতুন নতুন কোরোলের জন্ম হচ্ছে। তবে কোরালকে রক্ষা করার জন্য আন্দামান প্রশাসন যথেষ্ট তৎপর। তাই কোরাল সংগ্রহ করে স্মৃতি হিসেবেও নিয়ে যাওয়া চলে না। আন্দামানের অনেক জায়গাতেই সমুদ্রের নিচের এই কোরাল দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। হ্যাভলক দ্বীপের এলিফ্যান্ট বিচে, ভরতপুর বিচে এবং জলিবয় বিচে কোরাল দেখানো হয় দু’ভাবে। কোরাল দেখানোর জন্য রয়েছে গ্লাস বোট। ছোটো ছোটো এই বোটের নিচটা ফাইবার গ্লাস দিয়ে তৈরি। বোটের নিচের কাঁচের স্বচ্ছতা আমাদের চোখকে সহজেই পৌঁছে দিয়েছিল সমুদ্রের তলদেশে। তাকিয়ে দেখি কত ধরনের কোরাল। নানা রঙের, নানা আয়তনের। কোনটি হলুদ, কোনটি লাল, কোনটি বেগুনি। আর এই কোরালের সম্রাজ্যে  দেখা যায় নানা জাতের, নানা রঙের মাছ। মন ভরে যাওয়ার মত দৃশ্য। ঠিক যেন বিশাল একটি প্রাকৃতিক অ্যাকোরিয়াম। মনে মনে শুধুই ভাবি, সমুদ্রের নিচে কত যে সম্পদ তার কতটুকুই বা জানি। তবে সমুদ্রে নেমে কোরাল ও মাছের জগতে প্রবেশেরও সুযোগ রয়েছে। তবে সকলেই এর সুযোগ নিতে পারে না। জল-চশমা পড়ে আর লাইফ রিং হাতের নিচে চেপে ধরে রওনা দিয়েছিলাম সমুদ্রের গভীরে। একে স্নোরকেলিং বলে। গাইড সঙ্গী হাত ধরে নিয়ে গেল যেখানে রয়েছে কোরালের বেশি বেশি উপস্থিতি সেখানে। জলের নিচে মাথা ডুবিয়ে দেখি এক বিস্ময়কর জগত। রঙের কি বাহার। মৃত কোরালের মাঝে জীবন্ত কোরালগুলিকে চেনা যাচ্ছিল সহজেই। আমাদের চারিদিকে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা রঙের মাছ। মনে হয় যেন চুমু খাবে এসে। দেখতে পেলাম একটি স্টার ফিশকেও। রঙের এমন বিস্ফোরণ ও বিচ্ছুরণ আগে কখনো দেখিনি। দেখতে দেখতে আধঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে সহজেই। মনে হচ্ছে আরো দেখি। আশ আর মিটছে না। শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতেই হয়েছে। জলিবয় দ্বীপের সমুদ্র সৈকতেও মেতে উঠেছিলাম স্নোরকেলিং-এ। অনেক সৈকতেই স্কুবা ডাইভের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যবস্থা রয়েছে আরও অনেক রকম অ্যাডভেঞ্চার জলক্রীড়ার। কিন্তু খরচ ও সময়ের কথা বিবেচনা করে সেগুলো আর পরখ করা হয় নি।
তবে রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারের ২৭ কিলোমিটার দূরের মাউন্ট হ্যারিয়েটে যেতে গিয়ে সুনামি বিধ্বস্ত অঞ্চল দেখে মনটা খারাপই হয়ে গিয়েছে। সুনামি আন্দামানের বহু অঞ্চলেই ছোবলের চিহ্ন রেখে গিয়েছে। সেগুলো এখনো পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় নি। তবে মাউন্ট হ্যারিয়েটের শীর্ষে উঠে চারিদিকের দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতাটাও মনে রাখার মত। তেমনি মনে রাখার মত পোর্ট ব্লেয়ারের নিকটবর্তী রস দ্বীপটিকেও। ব্রিটিশরা পোর্ট ব্লেয়ারে রাজধানী করার আগে রস দ্বীপেই তৈরি করেছিল রাজধানী। এখন সেই দ্বীপটি নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এখনও সেখানে রয়েছে ব্রিটিশদের ঘরবাড়ি, ছাপাখানা, জলশোধন কেন্দ্র, বেকারি, মেস ও কবরস্থানের নানা চিহ্ন। দ্বীপে পর্যটকদের যেতে অবশ্য বাধা নেই।
আন্দামানে আটদিন কিভাবে যে কেটে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারিনি। দেখার আনন্দে কোন ক্লান্তিকেই ক্লান্তি মনে হয়নি। বরং ফিরে আসার দিনে বারে বারে ভেবেছি সকলে মালদ্বীপ বা মরিশাসে ছোটেন সমুদ্র সৈকতের আনন্দ পেতে। তারা একবার ঘুরে যান আন্দামান। ফেরার বিমানে উঠে একটিই কথা মনে হয়েছে, আবার আসিব ফিরে এই দ্বীপটির তীরে।
জরুরি তথ্য : আন্দামান ভ্রমণে কোনও বাধা নেই। তবে সব দ্বীপে যাওয়া যায় না। নিকোবরের একটা বড় অংশেই যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। বিদেশিরা পোর্ট ব্লেয়ারে বীর সাভারকার বিমান বন্দরে নেমেই আন্দামানে প্রবেশের অনুমতি সংগ্রহ করে নিতে পারবেন। তবে আন্দামানে ঘুরতে হলে আগে থেকেই একটি ট্যুর অপারেটর সংস্থার সাহায্য নিতে হবে। তারাই বিভিন্ন দ্বীপে যাওয়া এবং থাকার অগ্রিম ব্যবস্থা করে রাখবে। কলকাতা থেকে প্রতিদিন দুটি বিমান যাতায়াত করে। জাহাজেও কলকাতা, বিশাখাপত্তম ও চেন্নাই থেকে যাওয়া যায়। তবে প্রতিমাসে মাত্র কয়েক দিনই জাহাজ যায় আন্দামানে। প্রায় আড়াই দিন লাগে যেতে বা আসতে। তবে অনেক আগে থেকে না কাটলে টিকিট পাবার সমস্যা রয়েছে।

Tuesday, December 10, 2019

নগ্ন জারোয়া দেখানোর ‘হিউমেন সফারি’ by পরিতোষ পাল

দেশে বিদেশে ‘হিউমেন সফারি’র কথাটা প্রবল আলোড়ন তৈরি করেছে। আন্দামানে পর্যটকদের নাকি বিজ্ঞাপন দিয়ে এই ‘হিউমেন সফারি’তে নিয়ে যাওয়া হয়। আসলে জঙ্গলে বন্যপ্রাণী দেখার চেষ্টা থাকে, এক্ষেত্রে প্রাণী নয়, সভ্যতার আলো থেকে যোজন দূরে থাকা বিশ্বের আদিমতম নগ্ন মানুষগুলিকে দেখার আকাঙ্ক্ষা থাকে বলেই একে বলা হচ্ছে হিউমেন সফারি।
বিদেশি পর্যটকরাই ব্যাপারে আগ্রহী বেশি। কয়েক বছর আগে বৃটেনে প্রচারিত একটি ফুটেজে দেখানো হয়েছে বিদেশি পর্যটকদের সামনে এক জারোয়া যুবতীকে নাচতে বাধ্য করা হচ্ছে। এরপরই প্রবল বিতর্কের ঝড় ওঠে।
তবে অভিযোগ শোনা গেছে, পর্যটকদের এই আকাঙক্ষা তৈরি করেছে আন্দামান প্রশাসনের তৈরি একটি সিদ্ধান্ত। বিতর্ক সত্ত্বেও প্রশাসন জারোয়াদের সংরক্ষিত অঞ্চল ফুঁড়ে নিয়ে গিয়েছে আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড নামের হাইওয়েকে। সড়ক পথে দক্ষিণ আন্দামান থেকে মধ্য হয়ে উত্তর আন্দামানে যাওয়ার এই হাইওয়ের ফলে জারোয়ারা অনেকটাই বেআব্রু হয়ে পড়েছে। ফলে তারা মাঝে মধ্যেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে চলে আসছে হাইওয়ের উপরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সভ্য মানুষের স্পর্শ পেয়ে তাদের চাহিদাও বেড়েছে নানা কিছুর।
এই প্রতিবেদক কিছুদিন আগে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে রওনা হয়েছিল উত্তর আন্দামানের দিগলিপুরের বাঙালিরা কেমন আছে তা অনুসন্ধান করতে। পথেই জারোয়া সংরক্ষিত অঞ্চলের প্রবেশ পথে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ‘হিউমেন সফারি’ নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রবল বিতর্কের পর এখন আইনের কড়াকড়ি যথেষ্ট। কোনও গাড়িকেই এই সংরক্ষিত এলাকায় সকাল নটা থেকে বিকেল তিনটের পর আর যেতে দেওয়া হয় না। ফলে সংরক্ষিত অঞ্চলে প্রবেশের মুখে চেকপোস্টে আটকে পড়েছিলাম। বিশাল গাড়ির লাইন। তখনও নটা বাজেনি।
ঠিক নটায় চেকপোস্টে নথিবদ্ধ করে গাড়ির কনভয় রওনা দিল। সঙ্গে তিনটি মোটর সাইকেলে মোবাইল পুলিশ। গোটা সংরক্ষিত আঞ্চলের পথ এরা পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তবে চেকপোস্টেই কঠোরভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সংরক্ষিত অঞ্চলে কোনও গাড়ি থামানো চলবে না। গতিও ৪০ কিলোমিটারের নীচে রাখা চলবে না। আর ছবি তোলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে বিশাল জরিমানা। সঙ্গে হুজ্জোতি।
রওনা দেবার পর কয়েক কিলোমিটার যাবার পরই হঠাৎ আমাদের সঙ্গের নজরদারি পুলিশ মোটর সাইকেলটি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়তেই দেখি একটি জারোয়া পরিবার উঠে এসেছে রাস্তায়। স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান। সকলেই নগ্ন। মহিলার উর্দ্ধাঙ্গে কোনও কিছু নেই। নীচে লজ্জা নিবারণের জন্য সামান্য কিছু লতা-পাতা। তবে গলায় সামুদ্রিক জিনিষ দিয়ে তৈরি হার। পুরুষটির হাতে তীর, ধনুক।
পুলিশ এগিয়ে গিয়ে তাদের জঙ্গলে ফিরে যেতে ধমক দেওয়া মাত্র পুরুষ জারোয়াটি পুলিশের প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে কি যেন খুঁজতে লাগল। আমাদের গাড়ির চালক রাকেশ জানালো, কাঁচা সুপারি জাতীয় জিনিষের খোঁজ করছে। আন্দামানের অধিকাংশ মানুষই কাঁচা সুপারির খুব ভক্ত। আর এদের কাছ থেকেই এই নেশার হদিস পেয়ে জারোয়াদেরও এর চাহিদা বেড়েছে।
গাড়ি এগিয়ে চলল, এবার দেখা এক ষোল-সতের বছরের জারোয়া যুবকের সঙ্গে। রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে। এর পরণে অবশ্য একটি হাফফ্যান্ট। হাতে তীর, ধনুক। ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে যুবকটি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এর খানিক পরেই ফের মোবাইল পুলিশের তৎপরতা দেখে সচকিত হয়ে তাকাতেই দেখি উল্টোদিক থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে একটি গাড়ি বোঝাই পুরুষ ও মহিলা জারোয়াদের একটি দলকে। বেশ কয়েকজন মেয়ে জারোয়া গাড়িতে জায়গা না পেয়ে পেছনে ঝুলছে। পরণে কিছু না থাকলেও গলায় ও কোমরে সামুদ্রিক জিনিষের তৈরি অলঙ্কারের বাহার দেখার মত।
আমাদের গাড়ির চালকই জানালো, জঙ্গল থেকে এরা বেরিয়ে আসায় প্রশাসন এদের নিয়ে গিয়ে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসছে। এটা নাকি মাঝে মাঝেই করা হয়। এর খানিক পরে ফের দেখা একজোড়া জারোয়া যুবকেরও । এদেরও হাতে তীরধনুক। তবে পরণে হাফ প্যান্ট। এই ভাবেই কথিত ‘হিউমেন সফারি’ পেরিয়ে আমরা পৌঁছে যাই বারাটাং।
সেখান থেকে কমলাপুরে আরেকটি জারোয়া সংরক্ষিত অঞ্চল পেরিয়ে যেতে হবে আমাদের। এখানে পুলিশের পাহারা না থাকলেও সংরক্ষিত অঞ্চলের প্রবেশ পথে সতর্কতার বিধি-নিষেধ একই রকম।
তবে আমরা এখানেও একজোড়া বয়স্ক জারোয়া রমণীর দেখা পেয়েছিলাম। এইভাবে জারোয়া দেখানোর কৃতীত্বটাকেই পুঁজি করে অনেক ভ্রমণ সংস্থা। তবে বিদেশিদেরই এই প্রলোভন দেখানো হয় বেশি করে। এমন অভিযোগ আদিবাসীদের নিযে যারা কাজ করেন তাদের।
আসলে একুশ শতকে পৌঁছেও আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের আদি বাসিন্দা জারোয়া, সম্পেন, ওঙ্গি, সেন্টিনেল প্রভৃতি উপজাতির মানুষরা সভ্যতাকে বরণ করে নেয়নি। বরং সভ্য মানুষকে ঘৃণাই করে। জঙ্গলে তাদের বাসস্থান। আর নগ্নতাই আশ্রয়। হাতে লড়াইয়ের অস্ত্র তীর ধনুক। খাবার বলতে ফলমূল, বুনো শূয়র আর সামুদ্রিক মাছ।
তবে আন্দামানে আসা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে জারোয়া দেখানোর কথা প্রচার করার একটা প্রবণতা দেখতে পেয়েছি। এ ব্যাপারে পর্যটকরাও যথেষ্ট আগ্রহ দেখান।
জারোয়া ছাড়া অন্য আদিম বাসিন্দরা থাকে প্রত্যন্ত দ্বীপগুলিতে, যার অধিকাংশতেই পর্যটকদের যাওয়া বারণ। নৃতত্বের এক অধ্যাপক জানিয়েছেন, কয়েক শ বছর আগে এই সব মানুষ আফ্রিকা থেকে আন্দামানে এসেছিল। এদের চেহারায় নিগ্রোদের প্রভাব স্পষ্ট। তবে একটি অংশের মধ্যে স্পষ্ট মঙ্গোলয়েড প্রভাব। এখনও তারা যেসব জায়গায় থাকে সেখানে মানুষকে প্রবেশ করতে দেয় না তারা। এদের তীরের বিষ স্পর্শে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবে এরা এক একটি আলাদা অঞ্চলে বা দ্বীপে থাকে।
অন্যান্য উপজাতির মধ্যে হিংস্রতা এখনও প্রবল হলেও জারোয়াদের একাংশ সভ্যতার ছোঁয়া পেতে আগ্রহী হয়েছে। তবে গভীর জঙ্গলে যেসব জারোয়া থাকে তাদের কাছে পৌঁছানো এখনও সম্ভব হয়নি। তেমনি সম্ভব হয়নি সেন্টিনেলদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন। নৃতত্ত্ববিদদের চিন্তার কারণ হল এদের সংখ্যা কমতির দিকে।
সাম্প্রতিক এক তথ্য থেকে জানা গেছে, জারোয়ারা সংখ্যায় মাত্র তিনশোর কাছাকাছি। ওঙ্গিদের সংখ্যা ১০৫, সেন্টিনেলদের সংখ্যা ২৫০, সোম্পেনদের সংখ্যা ২০০ থেকে ২৫০। সবচেয়ে কম হল গ্রেট আন্দামানিজরা। এদের সংখ্যা সাকুল্যে ৪৫ জন। এই সব আদিমতম মানুষগুলিকে টিকিয়ে রাখাই একটা বড় চ্যালেঞ্চ হয়ে উঠেছে।
তবে ১৯৯৮ সাল থেকে জারোয়ারা গভীর জঙ্গল ছেড়ে বাইরে আসা শুরু করে। এর পেছনে অবশ্য রয়েছে একটি ছোট্ট ঘটনা। এনমাই নামে এক জারোয়া যুবক পা ভেঙ্গে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। প্রশাসন খবর জানতে পেরে তাকে বুঝিয়ে নিয়ে এসেছিল পোর্ট ব্লেয়ারে। সেখানে তার দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। জারোয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সূত্র খুঁজে যায় প্রশাসনও। এনমাইকে সভ্য সমাজের মাঝে বেশ কিছুদিন রেখে পরে ফেরত পাঠানো হয়েছিল জঙ্গলে। সে জঙ্গলে গিয়েই প্রথম প্রবল উৎসাহে সভ্য সমাজের কথা, আর তার সুফলের কথা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিল তার সমাজকে। তখন থেকেই বাইরের জগতের মানুষ সম্পর্কে বিদ্বেষ ছেড়ে জারোয়াদের একটি অংশ আসতে শুরু করে হাইওয়েতে নানা জিনিষ পাবার আকর্ষনে।
প্রশাসনের কর্তারাও এটিকে সভ্য সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মনে করলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে ধরা পড়ে যে, জারোয়ারা ক্রমশ বিভিন্ন নেশা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তেমনি বর্হিজগতের সংস্পর্শে এসে জারোয়ারা মিজলস, মামস, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি নানা রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করে। যেসব রোগ আগে তাদের মধ্যে দেখা যায়নি।
অভিযোগ উঠেছে, জারোয়া যুবতীদের নিয়ে যৌনতায় উৎসাহ দিচ্ছে একশ্রেণীর অসাধু মানুষ। তাই বর্তমানে আদিবাসীদের কল্যাণের কাজে যুক্তরা মনে করছেন, জারোয়াদের মত আদিম মানুষগুলিকে যতদিন সভ্য সমাজের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা যাবে ততই ভাল।
এনথ্রোপলোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার আন্দামান শাখার প্রধানের মতে, জারোয়াদের মত আদিমতম মানুষগুলোকে জোর করে সভ্য সমাজের সঙ্গে সহাবস্থানের চেষ্টা করা হলে তা হবে তাদের গণহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া।

Monday, October 14, 2019

কলকাতার দ্বিতীয় মেট্রোরেল আংশিকভাবে চালু হচ্ছে এ মাসেই by পরিতোষ পাল

ভারতের প্রথম মেট্রোরেল (পাতাল রেল হিসেবে বেশি পরিচিত) যাত্রা শুরু করেছিল কলকাতাতেই। উত্তর ও দক্ষিণের সংযোগকারী এই মেট্রোরেলের প্রথম পর্যায়ের যাত্রার উদ্বোধন হয়েছিল ১৯৮৪ সালের ২৪শে অক্টোবর। এবার সেই দিনটিকেই সামনে রেখে কলকাতার দ্বিতীয় মেট্রোরেল ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর প্রথম পর্যায়ে যাত্রী পরিবহনের উদ্বোধন করার সব ব্যবস্থা পাকা করা হয়েছে। কলকাতার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের সঙ্গে গঙ্গার ওপারে হাওড়া ময়দানের সঙ্গে সংযোগকারী নতুন এই মেট্রোরেলের নাম ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো। এর দৈর্ঘ্য ১৬.৫৫ কিলোমিটার। মোট স্টেশন থাকবে ১২টি। এর মধ্যে ৬টি স্টেশন থাকবে উপরে আর বাকি ৬টি স্টেশন থাকবে মাটির নিচে। দীর্ঘ এই মেট্রোরেলের কাজ ধর্মতলা-শিয়ালদহ অংশের মাত্র কয়েক শ’ মিটার টানেল তৈরির কাজ মাটি ও বাড়ি ধসে যাওয়ার বিপর্যয়ের জন্য বন্ধ রয়েছে।
বাকি অংশের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে  গেছে। ভারতে প্রথম পানির নিচ দিয়ে টানেলের মধ্যদিয়ে যাবে এই ট্রেন।  এজন্য গঙ্গার নিচে ৫২০ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল তৈরি হয়েছে। মাত্র দেড় মাসের মধ্যে এই টানেল তৈরি করা হয়েছে আধুনিকতম প্রযুক্তির সহায়তায়। সাম্প্রতিক ধস বিপর্যয়ের ফলে গোটা পথে মেট্রোরেল কবে চালু করা যাবে তা বলতে পারেন নি কলকাতা মেট্রোর রেল করপোরেশনের কর্তারা। আসলে জমি অধিগ্রহণ, পথের পুনর্বিন্যাস এবং লোকালয় সরানোর কাজে নানা বাধার জন্য এই দ্বিতীয় মেট্রো তৈরির কাজ বারে বারে পিছিয়েছে। তবে বার বার তারিখ পরিবর্তনের পর এবার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভ থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার পথে প্রথম পর্যায়ে মেট্রোর দ্বিতীয় পথে যাত্রা শুরু হবে বলে ঠিক হয়েছে।  এই পথে থাকছে ৬টি স্টেশন। এজন্য একাধিকবার ট্রায়াল রান হয়ে  গেছে। আরেক দফা ট্রায়াল রান হবে আগামী সপ্তাহেই। এসে গেছে আধুনিক রেক। স্টেশনে স্টেশনে আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় গেট, যেগুলো গাড়ি এসে স্টেশনে দাঁড়ানোর পর খুলবে। আগামী ২৪শে অক্টোবর কলকাতার দ্বিতীয় এই মেট্রোরেলের প্রথম পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী চলাচলের সূচনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতেই হবে বলে জানা গেছে। প্রথম পর্যায়ের পর স্টেডিয়াম থেকে ফুলবাগান পর্যন্ত ট্রেন চলাচল চালু হবে আরো কিছুদিনের মধ্যে। এই পর্যায়ের কাজও শেষ হয়ে  গেছে। এর পরের পর্যায়ের ট্রেন চলবে শিয়ালদহ পর্যন্ত। বাকি অংশে ট্রেন চলবে শেষ পর্যায়ে। মেট্রোরেল সূত্রে জানা গেছে, দুই প্রান্তেই পরবর্তী সময়ে আরো কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত হবে এই ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো। পূর্বদিকে বিমানবন্দরের কাছে তেঘরিয়া পর্যন্ত এবং পশ্চিম প্রান্তে সাতরাগাছি পর্যন্ত এই রেলপথের বিস্তার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুর্গাপূজা বাণিজ্যে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান: বিশ্বের বৃহত্তম পথ উৎসব বলে পরিচিতি পেয়েছে বাঙালির দুর্গোৎসব। আসলে বারোয়ারি দুর্গাপূজা মানেই রাস্তায় বা রাস্তার ধারে প্যান্ডেল। আর তাই এর পরিচিতি স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল হিসেবে। তবে এই উৎসবকে ঘিরে যে খরচের মাতামাতি তা নিয়ে অনেকের আপত্তি রয়েছে। কলকাতার পুজোতে কত খরচ হয় তা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো পূজা কমিটিই মুখ খুলতে চান না। তবে কলকাতার শতাধিক মেগা পূজার বাজেট যে কয়েক কোটির কাছাকাছি তা এই সব পূজার জাঁকজমক দেখলেই বোঝা যায়। তবে পূজা কমিটির কর্তারা এই উৎসব উপলক্ষে আড়ম্বরের জন্য অর্থ ব্যয়কে অপচয় বলতে রাজি নন। বরং তারা মনে করেন, এই অর্থ প্যান্ডেল তৈরির কারিগর, শিল্পী, পুরোহিত, ঢাকি, বিদ্যুৎ সজ্জার কারিগর, মৃৎশিল্পী সহ নানা ক্ষেত্রের এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বছরের ছয় মাস ধরে। পশ্চিমবঙ্গে এ বছর ৩১ হাজারের বেশি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর অধিকাংশই বারোয়ারি পূজা। তবে বৃহত্তর কলকাতাতে এ বছর প্রায় ৪৫০০ বারোয়ারি পূজা হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক পূজা মেগা পূজা হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় ৪০০ পূজা কমিটিকে নিয়ে তৈরি ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের প্রেসিডেন্ট কাজল সরকারের মতে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে কলকাতাকেন্দ্রিক পূজাগুলোতে প্রায় ৪৫০০ কোটি রুপির লেনদেন হয়। আর গোটা রাজ্যে এর পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি রুপি। এই অর্থের অনেকটাই আসে করপোরেট সংস্থাগুলো থেকে। কলকাতার প্রায় ১০০০ পূজা কমিটি বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে করপোরেট সংস্থার বিশাল পরিমাণ অর্থ  পেয়ে থাকে। তিনি বলেছেন, কলকাতার ৪৫০০ পূজার মধ্যে প্রায় ২০০ পূজার প্রত্যেকটিতে ৫০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়। বাকিগুলোতে ২০ জন করে। ফলে আর্থিকভাবে প্রকৃত উপকৃত হন এমন মানুষের পরিবারের সদস্যদের ধরে সংখ্যাটি কয়েক লাখ। এদিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে তৈরি হচ্ছে গত ছয় দশকে দুর্গাপূজার বাণিজ্যিক বিবর্তনের ধারা নিয়ে একটি আর্কাইভস। যার নেতৃত্বে এই আর্কাইভস তৈরির কাজ চলছে সেই অধ্যাপিকা সুদেষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ১৯৬০-এর দশক থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিজ্ঞাপনী উপস্থাপনার বিবর্তন এবং ব্যান্ডিংকেই সংগ্রহ করার কাজ চলছে। বাংলার সেরা উৎসবের পরিবর্তনগুলোকে এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা হচ্ছে। এর ফলে গবেষকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও পূজার বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন।
বীরাষ্টমী উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমানঃ
পরাধীন ভারতে যুবকদের দেশসেবায় আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সরলা দেবী চৌধুরাণীর ঐতিহাসিক প্রচেষ্টায় শুরু হয়েছিল বীরাষ্টমী উৎসবের। পরবর্তী সময়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্যোগে তা নতুন মাত্রা পেয়েছিল। কলকাতার পরে ঢাকাতেও জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে আয়োজিত দুর্গাপূজায় ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাস  বীরাষ্টমী উৎসব করেছিলেন। তিনি নিজেই তার আত্মকথায় বলেছেন, ‘অষ্টমীর দিন বীরাষ্টমী উৎসব হইলো। কতিপয় স্বদেশি সংগীত হইলো,  হেমচন্দ্রের ভারত সংগীত কবিতাটি আবৃত্তি হইলো। লাঠিখেলা ও ছুরি খেলা হইলো। ঢাকায় সেটিই ছিল প্রথম বীরাষ্টমী উৎসব। ওপার বাংলা থেকে কলকাতায় চলে আসার পর তিনি বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবে নিয়মিত উপস্থিত থেকে বীরাষ্টমী উৎসবে যুবকদের আত্মরক্ষার প্রয়োজনে নানা ধরনের অস্ত্র শিক্ষার কথা বলতেন। শতবর্ষ পার করে আসা বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবে অষ্টমীর সকালে এই বীরাষ্টমী উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমান। বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবের অন্যতম কর্ত্রী শিক্ষিকা দেবযানী মুন্সী কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, বর্তমান সময়ে এই উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু আজও আমরা স্বাধীনতা আন্দোলনের বীরদের স্মরণে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে চলেছি। এখনো অষ্টমীর সকালে পুরনো দিনের মতোই পূজা প্রাঙ্গণে লাঠিখেলা, তরোয়াল খেলাসহ নানা আত্মরক্ষামূলক খেলার প্রদর্শনী হচ্ছে। শুধুই কি ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই বীরাষ্টমী উৎসবের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাসের পৌত্র বিশ্বরঞ্জন দাস জানিয়েছেন, বর্তমান সময়েও নানা অনাচার ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বীরের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু আমরা কি প্রকৃত বীরের সন্ধান  পেয়েছি? বা প্রকৃত বীরকে চিনতে  পেরেছি? এটা ঠিক যে, স্বদেশি আমলে আমাদের সামনে বীরের যে ধারণা ছিল তা আজ প্রযোজ্য হতে পারে না। তখন  দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার লক্ষ্যই ছিল প্রধান। এখন প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। তবে এখনো যুবকদের সামনে বীরের কর্তব্য রয়ে গেছে। তাই তিনি মনে করেন, বীরাষ্টমী উৎসবের মঞ্চ থেকেই বিপথগামী, আত্মকেন্দ্রিক ও অসহিষ্ণু যুব সমাজকে উদ্ধারের ব্রত নিতে হবে আমাদেরই।
নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা ভাসান নিয়ে বিতর্কঃ
গত কয়েক বছর ধরেই পরিবেশবিদরা নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। আদালতে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। তবে এবার ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা’র নির্দেশ ঘিরে প্রতিমার বিসর্জন বা ভাসান নিয়ে তৈরি হয়েছে ফের বিতর্ক। গঙ্গা যে ১১টি রাজ্যের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত সেই রাজ্যগুলোকে এক নির্দেশে গঙ্গা ও তার শাখা-প্রশাখায় প্রতিমা বিসর্জন নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছিল, নদী বা জলাশয়ের কাছে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে তার মধ্যে প্লাস্টিকের আস্তরণ দিয়ে প্রতিমা ভাসান দেয়া হোক। পরে প্লাস্টিকের মধ্যে জমা বর্জ্য তুলে নিয়ে নষ্ট করে দেয়া হোক। এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে দিল্লিতে যমুনায় এ বছর কোনো প্রতিমা বিসর্জন হয়নি। কিন্তু কলকাতায় গঙ্গায় বিসর্জন এবারও হয়েছে। সরকারি মদতেই হয়েছে এই বিসর্জন। এবারও প্রায় ৫ হাজার দুর্গা প্রতিমা (দুর্গার সন্তানদের ধরে ২০ হাজার) গঙ্গায় বিসর্জন দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন বন্ধে যিনি জাতীয় পরিবেশ আদালতে মামলা করেছিলেন, সেই সাবেক বিজ্ঞানী অম্বরনাথ সেনগুপ্ত বলেছেন, প্রতিমায় যে রঙ করা হয় তাতে ক্রোমিয়াম, সিসাসহ ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। এগুলো পানিতে মিশে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি করে। ফলে ক্ষতি হয় জীব বৈচিত্র্যের। অবশ্য নদী বা জলাশয়ে বিসর্জনের বিকল্প নিয়ে পরিবেশবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কলকাতার এক সরকারি স্কুলের সাবেক শিক্ষিকা তনুশ্রী সেনগুপ্ত বলেছেন, হিন্দু প্রথা অনুযায়ী, আমরা পুজোর প্রতিমা থেকে উপকরণ সবকিছুই পানিতে ফেলি। তবে নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা ভাসান কোনো শাস্ত্রের বিষয় নয়। কেননা, দশমীর দিন পুরোহিত মন্ত্র পাঠের মধ্যদিয়ে নিরঞ্জন করার পর সেই প্রতিমা আর চিন্মমী থাকে না। আর প্রকৃত বিসর্জন তো প্রতিমার সামনে থাকা ঘটের পানিতে দর্পণের মাধ্যমে  মুখ ও পায়ের প্রতিফলনের মধ্যদিয়েই সমাপ্ত হয়ে যায়। তাই মৃন্ময়ী প্রতিমার নদী বা জলাশয়ে বিসর্জনে বিতর্কের অবকাশ  নেই। বিষয়টি আসলে বিবেচনার পরিসরে নির্ধারিত হতে পারে প্রতিমা কীভাবে বিলীন করে দেয়া যায়।

ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করছে বামরা by পরিতোষ পাল

একসময় বামদলগুলো পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটে জয়ী হয়ে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকলেও ২০১১ সালের পর  পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বামদের জনভিত্তিতে ধস নেমে এসেছে। সেই ধসকে গত আট বছরে সামাল দেয়া যায় নি। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি গোটা দেশেই বামদের একই পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে বামদের ভোট নেমে এসেছে ৭-৮ শতাংশে। এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআইএম) ডিজিটাল প্ল্যাটফরমকে আশ্রয় করেছে। অবশ্য ইতিমধ্যে বিজেপি সোস্যাল মিডিয়াকে দারুণভাবে ব্যবহার করেছে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। এমনকি বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসও ডিজিটাল যোদ্ধা নিয়োগ করে সোস্যাল মিডিয়াতে বিজেপির সঙ্গে লড়াই জারি রেখেছে।
এবার  বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিআইএম একই পথ নিয়েছে। অবশ্য রাজ্য ও কেন্দ্র স্তরে সিপিআইএমের নিজস্ব সাইবার টিম রয়েছে। তবে তাদের দিয়ে এই যুদ্ধ সামাল দেয়া কঠিন। এই বিবেচনায় ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের আহ্বান জানিয়ে সিপিআইএম বিপুল সাড়া পেয়েছে। এই ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরির প্রধান দায়িত্বে থাকা সাবেক এমপি ও পলিটব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ সেলিম জানিয়েছেন, বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল অর্থ খরচ করে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচার করছে। কিন্তু বামদের সেই অর্থবল নেই। তাই সোস্যাল মিডিয়ার বাইরে যারা ডিজিটাল দুনিয়ায় সক্রিয়, স্বাধীনভাবে সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত, তাদের একসূত্রে বাধার জন্যই এই উদ্যোগ।

মশা চর্র্চায় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ: পতঙ্গবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবে মানুষ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া মোকাবিলা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গুর নতুন নতুন জীবাণুর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। এসব নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে। তবে এবার আর আলাদা আলাদাভাবে না করে মশা নিয়ে চর্চা করার জন্য জোটবদ্ধ হয়েছেন পতঙ্গবিদেরা। তৈরি করা হয়েছে  হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপ। সেই গ্রুপেই দিনরাত আলোচনা চলছে। ঠিক করা হচ্ছে ডেঙ্গু নিয়ে ‘রণকৌশল’। এই গ্রুপের নাম দেয়া হয়েছে ‘মশামুক্ত বাংলা’। এই হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপের প্রধান কারিগর পতঙ্গবিদ গৌতম চন্দ্র বলেছেন, আমরা মশা সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষকরা আলাদা আলাদাভাবে এতদিন কাজ করছিলাম। কিন্তু  ডেঙ্গুর চরিত্র গত কয়েক বছরে অনেকটাই বদলেছে। তাই সে সম্পর্কে জ্ঞান ও তথ্যের আদান-প্রদান জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই এই গ্রুপ  তৈরি করা হয়েছে। পতঙ্গবিদদের মতে, দিন দিন  ডেঙ্গুর চরিত্র যত জটিল হচ্ছে, তাতে এককভাবে এ নিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। বিচ্ছিন্নভাবে মশা-গবেষকরা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া নিয়ে কী করছেন, তা এক মঞ্চে এনে আলোচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া মশা নিয়ে কোনো জার্নালে কারও গবেষণাপত্র প্রকাশ হলে তা নিয়েও সার্বিকভাবে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের মশা নিয়ে গবেষণা ও চর্চায় যুক্তদের বড় অংশই এই গ্রুপের সদস্য হয়েছেন। আগামী দিনে সাধারণ মানুষকেও ওই গ্রুপের সদস্য করার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে তারাও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন।

বিশ্বে প্রথম শ্রীচৈতন্যকে নিয়ে মিউজিয়াম
ষোড়শ শতাব্দীতে বৈষ্ণব ধর্মের প্রধান প্রবক্তা ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু্‌ । তার সময়কালেই তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে অনেকক’টি জীবন চরিত। জাতপাতের বিরুদ্ধে তার লড়াই সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল। পাশাপাশি বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে তিনি অনন্য ভূমিকা রেখে গিয়েছেন। প্রায় ৪০০ বছর পরে এই মানুষটিকে নিয়ে প্রথম সংগ্রহশালা বা মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে। বৈষ্ণব গবেষকদের মতে, এটাই বিশ্বে প্রথম শ্রীচৈতন্য সংগ্রহশালা। উত্তর কলকাতার বাগবাজারের ১৬ এ, কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী স্ট্রিটের গৌড়ীয় মঠ ও মিশনে তৈরি হয়েছে এই মিউজিয়ামটি।  টেরাকোটার কারুকার্যে সাজানো এই মিউজিয়াম ভবনের  প্রধান আকর্ষণ শ্রীচৈতন্যের নিজের হাতে লেখা একটি তালপাতা। এ ছাড়াও থাকছে শ্রীচৈতন্যের ব্যবহৃত জিনিস, পাদুকা প্রভৃতি। শ্রীচৈতন্যের জীবন ও চিন্তাধারা নিয়ে আলো ও ধ্বনির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকবে। গৌড়ীয় মিশনের সন্ন্যাসীদের মতে, দেশ-বিদেশের চৈতন্য অনুরাগী এবং গবেষকদের অবশ্য গন্তব্য হবে এই মিউজিয়ামটি। এটি ধর্মীয় পর্যটন মানচিত্রেও জায়গা নেবে বলে তারা আশাবাদী। ১৩ই আগস্ট এটির উদ্বোধন করবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।  এই মিউজিয়াম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলাদেশ, লন্ডন, আমেরিকা থেকে ভক্ত ও অনুরাগীরা আসছেন বলে জানা গেছে।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নিয়ে কলকাতায় সংগ্রহশালা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবনে কলকাতায় কাটিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। এই সময় তিনি ইসলামিয়া কলেজের (বর্তমান নাম  মৌলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ছিলেন। এই সময় তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এমনকি জাতীয় মুসলিম নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগও হয়েছিল এই সময়ই। তবে মাত্র দু’বছর ৮ স্মীথ লেনের বেকার  হোস্টেলে থাকলেও বাকি সময় নানা জায়গায় থেকেছেন। ফলে কলকাতার নানা জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে মুজিবের নানা স্মৃতি। এক শীর্ষ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা একসময় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মুজিবের কলকাতার জীবন নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। তবে মুজিবের স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া হলে সেটা হবে বড় কাজ। এ ব্যাপারে আশার কথা শুনিয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি কলকাতায় বেকার হলে মুজিবের নতুন আবক্ষ মূর্তি প্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠানে এসে বলেছেন, কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন অংশে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বহু স্মৃতি। সেই সব স্মৃতি সংরক্ষণ করে একটি সংগ্রহশালা গড়ে  তোলা হবে। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করে দ্রুত উদ্যোগ নেবেন বলেও জানিয়েছেন। জানা গেছে, সম্মতি পেলে কলকাতারই কোনো জায়গায় এটি গড়ে তোলা হতে পারে। উল্লেখ্য, ছাত্র হিসেবে ইসলামিয়া কলেজের বেকার হোস্টেলে যে ঘরটিতে তিনি থাকতেন সেটির সঙ্গে পাশের ঘরটি যুক্ত করে একটি স্মৃতিকক্ষ আগেই তৈরি করা হয়েছে। সেই কক্ষে রয়েছে শেখ মুজিবের ব্যবহৃত ঘাট, টেবিল ও চেয়ার।

অভিবাসনের নেপথ্যে বিবাহ: পশ্চিমবঙ্গে বহুদিন সব ধর্ম, সব জাতের মানুষের বাস। তবে এর পেছনে রয়েছে অভিবাসনের ভূমিকা। এই রাজ্যে অভিবাসনের প্রক্রিয়া চলছে বহুযুগ ধরে। তবে সর্বশেষ জন গণনার রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, রাজ্যের বাইরে থেকে যে অধিবাসীরা রাজ্যে আসছেন তাদের অধিকাংশই আসছেন বিবাহসূত্রে। বিবাহের সূত্রে ১ কোটি ৬৫ লাখেরও বেশি মানুষ এই রাজ্যে অভিবাসী হয়ে এসেছেন। তবে এর মধ্যে বড় অংশই নারী। এদেরই সংখ্যা ১ কোটি ৬২ লাখ। পুরুষ অভিবাসী হয়ে এসেছেন মাত্র ১ লাখ ৬৫ হাজার।  তবে বিবাহ সূত্রে যারা রাজ্যে অভিবাসী হয়ে এসেছেন তাদের অধিকাংশই এসেছেন গ্রাম এলাকায়। গ্রামে এই অভিবাসীর সংখ্যা প্রায়  ১ কোটি ৩০ লাখ। সেখানে শহুরে এলাকায় অভিবাসী হয়ে এসেছেন মাত্র ১৯ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। বিবাহ সূত্রে আসা এই সব অভিবাসীরা প্রধানত এসেছেন উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর ও মুর্শিদাবাদে। কলকাতায় বিবাহ সূত্রে এসেছেন দেড় লাখ মানুষ।  এর মধ্যে মাত্র ৪০০০ পুরুষ। বাকিরা নারী। পরিসংখ্যান থেকে আরো জানা গেছে, বাইরে থেকে যারা অভিবাসী হয়ে রাজ্যে এসেছেন তাদের বেশিরভাগই এসেছেন বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে। এশিয়ার দেশগুলো থেকেও অনেক মানুষ অভিবাসী হয়ে এসেছেন। তবে সঠিক কোন দেশ থেকে এসেছে তা জন গণনায় উল্লেখ করা হয় নি।

Wednesday, October 9, 2019

দিদিকে বলো বনাম দিদিকেই বলছি by পরিতোষ পাল

সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়য়ের জনপ্রিয়তায় ভাটার টান শুরু হয়েছে। এজন্য যে দলের নেতা ও কর্মীদের সার্বিক ব্যর্থতা দায়ী সেটাও তিনি অনুধাবন করেছেন। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, জনবিচ্ছিন্নতার ধাক্কা লেগেছে দলে। আর তাই দলের সাংগঠনিক শুদ্ধিকরণের দায়িত্ব নিয়েই মমতা দেশের অন্যতম ভোট কৌশলী বলে পরিচিত প্রশান্ত কিশোরের সক্রিয় সহযোগিতা নিচ্ছেন। প্রশান্ত কিশোরই এখন ঠিক করে দিচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি দিদির নির্দেশ। দিদি নিজেও প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে পাল্টাতে শুরু করেছেন। কিছুদিন আগেই যিনি দলের নেতা ও কর্মীদের এক ঝটকা দিয়ে কাটমানি (ঘুষ) ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরেই দলে জনসংযোগের ফাঁক ভরাট করতে কর্মী ও নেতাদের গ্রামে গিয়ে খাটিয়ায় বসে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা জানতে বলেছেন।
সেই কর্মসূচিকে আরো এগিয়ে নিয়ে গিয়ে মমতা মন্ত্রী ও নেতাদের গ্রামে গিয়ে মানুষজনের সঙ্গে একত্রে খাওয়া-দাওয়া করারও নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, এলাকায় রাতও কাটাতে হবে নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের। এরই পাশাপাশি মমতা মানুষের মনের ক্ষোভের আন্দাজ করতে নতুন এক ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছেন। তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে অভিযোগ বা মতামত জানানোর জন্য একটি ফোন নম্বর এবং ওয়েবসাইট চালু করেছেন। নাম দেয়া হয়েছে ‘দিদিকে বলো’। মমতা বলেছেন, যেকোনো সমস্যার কথা জানালে যতটা পারবেন সমাধানের চেষ্টা করবেন। এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার একদিনের মধ্যে লক্ষাধিক মানুষ দিদির শরণাপন্ন হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে দিদির এই উদ্যোগকে হাতিয়ার করে পাল্টা প্রচারে নেমেছে সিপিআইএম। ‘দিদিকেই বলছি’ নাম দিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলে ধরা হচ্ছে। দলের নেতা কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দিদির উদ্দেশ্যে করা প্রশ্নগুলো ছড়িয়ে দিতে। কালীঘাটে গিয়ে তৃণমূল কর্মী প্রসূন দত্তের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা থেকে রাজ্যের ঋণ বৃদ্ধি বা পঞ্চায়েতে ভোট লুট, সব প্রসঙ্গই রয়েছে প্রশ্নমালায়। সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে সেসব প্রশ্ন।
বিজেপির টার্গেট ১ কোটি সদস্য
সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যে দলটি এ বছর ১ কোটি সদস্য সংগ্রহ অভিযানে নেমেছে। গত বছর বিজেপি ৪২ লাখ সদস্যকে তালিকাভুক্ত করেছিল। এ বছর এদের নবীকরণের পাশাপাশি নতুন সদস্য সংগ্রহের উপর জোর দিয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মনে করেন, সমপ্রতি অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই রাজ্যে যে ২.৩০ কোটি ভোট পেয়েছে, সেই ভোট দাতাদের অর্ধেককে দলের সদস্য হিসাবে তালিকাভুক্ত করা উচিৎ। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৮৬ লাখ ভোট পেয়েছিল। গোটা ভারতে ২০ কোটি মানুষকে সদস্য করার লক্ষ্য ঠিক করা হলেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। রাজ্য বিজেপি নেতাদের মতে, এই রাজ্যই এখন দেশের সমস্ত ভাবনার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। গত ৬ই জুলাই থেকে শুরু হয়েছে সদস্য সংগ্রহ অভিযান। ইতিমধ্যেই ৫০ লাখের বেশি মানুষ সদস্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন। আগামী দিনে লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি সহজেই ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিজেপি নেতারা। পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী ২০২১ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে বিজেপি সবরকম প্রস্ততি শুরু করেছে। গত নির্বাচনে বিজেপি সব বুথে কর্মী দিতে পারেনি। আগামী নির্বাচনে যাতে সব বুথে কর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই ১ কোটির বেশি সদস্য সংগ্রহে জোর দেওয়া হয়েছে।
রাস্তার নামকরণে সুনীল ঘরণী খুশি নন
সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার রাস্তার নাম পরিবর্তনের বিরোধিতাই করে গিয়েছেন সবসময়। এবার তার নামেই রাস্তার নামকরণ করা হচ্ছে। কলকাতা পৌরসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সুনীল আমৃত্যু যে ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনসে ছিলেন সেই রাস্তার নাম পাল্টে করা হচ্ছে. ‘কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সরণি’। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনসের ‘পারিজাত’ অ্যাপার্টমেন্টের ৯তলা ফ্ল্যাটটি ছিল সকল কবি-সাহিত্যিকের আড্ডাস্থল। বাংলা কবিতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। সেই ঠিকানা থেকেই সুনীলের মৃত্যুর পর নব পর্যায়ে প্রকাশিত হচ্ছে কবিদের কাগজ ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা। তবে রাস্তার নামকরণের খবরে সুনীল ঘরণী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় যতটা না খুশি তার চেয়ে বেশি হতাশ হয়েছেন। স্বাতী বলেছেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নামটুকুই যথেষ্ট। নামের আগে শুধুমাত্র ‘কথাসাহিত্যিক’ যোগ করা হবে কেন? আর যদি যোগ করতেই হয় তবে ‘সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সরণি’ হলেই বোধ হয় যথার্থ হতো। ‘কথাসাহিত্যিক’ শব্দটিতে শুধুমাত্র সুনীলের গদ্য সাহিত্যকে স্বীকার করা হয়েছে। অথচ সকলেই জানেন সুনীল একই সঙ্গে একজন কবিও। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলতেন, গদ্য-পদ্যে সুনীলের সমান প্রতিভা। কলকাতা পৌরসভার ‘রোড রিনেমিং কমিটি’র চেয়ারম্যান কবি জয় গোস্বামী। একজন কবির উপস্থিতিতে কী করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো একজন সাহিত্যিককে শুধুমাত্র ‘কথাসাহিত্যিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে রাস্তার নামকরণ করা হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অটিজম নিয়ে বাংলা পত্রিকা
গোটা বিশ্বে প্রতি ১৬০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন অটিজমে আক্রান্ত। আর ভারতে প্রতি ৬৮ জন শিশুর মধ্যে ১ জন অটিজমের শিকার। পশ্চিমবঙ্গেও সংখ্যাটা খুব কম নয়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ও সচেনতা এখনও খুব নিচু স্তরে। চিকিৎসকদেরও অটিজম সম্পর্কে ধারণা খুবই কম। পশ্চিমবঙ্গ অটিজম সোসাইটির অধ্যক্ষ ইন্দ্রনী বসু জানিয়েছেন, অটিজম কোনও রোগ বা অসুখ নয়। এটি একটা জেনেটিক কন্ডিশন। আটিস্টিক শিশুদের জন্য সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন মানবিক স্পর্শ। অটিজম মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন অটিস্টিক শিশুদের মা-বাবাকে সচেতন করা এবং সমাজকে বাস্তব অবস্থা বোঝানো। ঠিক এ কাজটি করার লক্ষ্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বাংলায় অটিজম পত্রিকা অটিজম স্পর্শ। এটি প্রকাশ করেছে হাওড়া অটিজম সোসাইটি। পত্রিকাটির সম্পাদিকা ঝিমলি দত্ত পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, অটিজম বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে পশ্চিমবঙ্গে অনেক সময়ই ভাষা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আসলে অটিজম সংক্রান্ত সব তথ্যই ইংরেজিতে। স্বাভাবিকভাই এেই উদ্যোগের লক্ষ্য পরিষ্কার। পত্রিকাটিতে অটিজম নিয়ে নানা দিক থেকে আলোচনা করা হয়েছে। রয়েছে অটিস্টিক শিশুদের মা-বাবর লড়াইয়ের কথাও। অটিজম নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর ধারণার মূলেও আঘাত করার চেষ্টা হয়েছে। অটিজম স্পর্শ সকলের মধ্যে মানবিকতার স্পর্শ ছড়িয়ে দিক এটাই সকলের প্রত্যাশা।
মেশিনের বিদায় সম্বর্ধনা
এ মানুষের বিদায় সংবর্ধনার কথা আমরা জানি। কিন্তু মেশিনের বিদায় সংবর্ধনার কথা এই প্রথম জানা গিয়েছে। সম্প্রতি ধর্মতলায় দুটি টানেল খননকারী মেশিনকে বিদায় জানানো হলো। ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর নির্মাণকারী সংস্থা আফকনের প্রকৌশীলরা গেরুয়া চ্যাকেট ও মাথায় হলুদ হেলমেট পড়ে লাইন করে দাঁড়িয়ে ভিট্রি নাইনের মাধ্যমে বিদায় জানালো রচনা ও প্রেরণাকে। আফকনের প্রজেক্ট ম্যানেজার সত্যনারায়ণ কানোয়ার বরেছেন, কোনো মেশিনকে বিদায় জানানোর কথা শোনা যায়নি। তবে রচনা ও প্রেরণা আমাদের কাছে ছিল স্পেশাল। কলকাতার সল্টলেক থেকে হাওড়ার ময়দান পর্যন্ত মেট্রোর কাজের জন্য জার্মানি থেকে আনা হয়েছিল সুবিশাল দুটি টানেল বোরার মেশিনকে। আফকনের এক পদাধিকারীর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরে তার দুই মেয়ে রচনা ও প্রেরণার নামে মেশিন দুটির নামকরণ করা হয়েছিল। সেই রচনা ও প্রেরণা হাওড়া থেকে হুগলি নদীর নিচ দিয়ে টানেল খনন করার কাজটি করেছে। এর পরও হুগলির এপারে প্রাচীন বাড়ির পাশ দিয়ে টানেল তৈরির কাজও সাফল্যের সঙ্গে করেছে এই মেশিন দুটি। ধর্মতলায় গিয়ে তাদের কাজের সমাপ্তি ঘটে। তবে এই মেশিন দুটি ২০১১ সালে জার্মানি থেকে কলকাতায় আনা হলেও প্রথম ৫ বছর এদের কাজে লাগানো যায়নি। কোন পথে যাবে মেট্রো তাই নিয়েই ছিল বিতর্ক। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে এপ্রিলে হুগলি নদীর নিচে খননের কাজ শুরু হয়। ৫২০ মিটার দীর্ঘ টানেল খনন করতে বেশিদিন সময় লাগেনি। ২০১৮ সালের মে মাসে মেশিন দুটি নিরাপদে এসে পৌঁছেছিল ধর্মতলায়। এখানে এসেও এক বছরের অপেক্ষা। দৈত্যাকায় মেশিন দুটিকে উপরে তোলার জন্য ক্রেন পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত কিছুদিন আগে বিশালাকায় ক্রেন দিয়ে মাটির নিচ থেকে উপরে তুলে আনা হযেছে মেশিন দুটির বিভিন্ন অংশকে।

Monday, October 7, 2019

মৈত্রী ও বন্ধন ট্রেনের সংখ্যা বাড়ছে by পরিতোষ পাল

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে ভালো পাওনা বলতে দুই দেশের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত। শনিবার এই সিদ্ধান্তের কথা ছড়িয়ে পড়া মাত্র কলকাতায় বেড়াতে বাংলাদেশিরা যেমন খুশি তেমনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এপারের মানুষও। দক্ষিণ কলকাতার কসবার বাসিন্দা অমরেশ মজুমদার বলেছেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে যাতায়াত এর ফলে আরো বাড়বে। মৈত্রী এক্সপ্রেস বর্তমানে সপ্তাহে চারদিন চলে। সেখানে এবার থেকে সপ্তাহে পাঁচদিন চলবে এই ট্রেন। কলকাতা স্টেশন থেকে ছেড়ে সরাসরি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছায় ট্রেনটি। আগে সীমান্তের দু’পারে শুল্ক ও অভিবাসন পরীক্ষার জন্য তিন ঘণ্টার বেশি সময় নষ্ট হতো। অনেক আলোচনার পর গত নভেম্বর থেকে শুল্ক ও অভিবাসন পরীক্ষার কাজ প্রান্তিক স্টেশনে হওয়ায় যাত্রার সময় ১১ ঘণ্টা থেকে কমে ৮ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।
সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেনটি ইতিমধ্যেই দুই দেশের মানুষের কাছে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছে। তবে সপ্তাহে চারদিন চলার ফলে টিকিটের জন্য যাত্রীদের প্রবল দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল। বেশি অর্থ দিয়ে নিরুপায় হয়ে বাসের কষ্টকর যাত্রায় আসা-যাওয়া করতে হচ্ছিল। মৈত্রী এক্সপ্রেসের পাশাপাশি  গত বছর চালু হওয়া কলকাতা ও খুলনার মধ্যে বন্ধন এক্সপ্রেস সপ্তাহে একদিন চলছিল। ফলে ট্রেনটি যাত্রীদের কাছে তেমন সমাদর পায়নি। এবার ট্রেন সংখ্যা আরো একটি বাড়ানোর ফলে যাত্রীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কলকাতায় পূর্ব রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, খুব শিগগিরই সাপ্তাহিক ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। ইতিমধ্যেই বেশকিছু প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। যাত্রীদের দাবি, ফেয়ারলি প্লেসের রেল কাউন্টার ছাড়াও রিটার্ন টিকিট কাটার সুযোগ সহ টিকিট কলকাতা স্টেশন থেকে দেয়ার ব্যবস্থা করলে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমবে।

মহিষাসুরের বংশধররা শোক ভুলে পুজোর আনন্দে
বাঙালির অন্যতম প্রধান শারদোৎসব শুরু হয়েছে। চারদিকে আলোকচ্ছটার বর্ণিল আয়োজন, শিল্পের সুষমামণ্ডিত মণ্ডপ ও মূর্তি দুর্গাপুজোর বিবর্তনের ইতিহাসই বহন করে চলেছে। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথায়, কলকাতায় পুজোয় নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। অনেক ছোটখাটো পুজোর পরিকল্পনাও আমাদের বিস্মিত করে তুলছে। তবে দেবী আরাধনার বিচারে মহিষাসুরকে বধ করার মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশেরই তারিফ করা হয়। আর তাই দুর্গাকে বলা হয়. অসুরদলনী বা মহিষাসুরমর্দিনী। কিন্তু মহিষাসুররা আজও রয়েছেন আমাদের মধ্যে। বাস্তবেই মহিষাসরের বংশধররা রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের চা বাগান এলাকায়। এদের সকলেরই পদবি অসুর। জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটার ক্যারন, গুরুজংঝোরার চা বাগান, আলিপুরদুয়ার জেলার মাঝেরভাবরি, নিমাতিঝোরা ও দার্জিলিংয়ের নকশালবাড়ি চা বাগানে মোট ৬০০টি অসুর পরিবার বাস করেন। তবে ক্যারন চা বাগানেই থাকেন ৫০০ পরিবার। এরা চা বাগানের সাদরি ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা ভালো বোঝেন না। অসুরদের ৫২.৭২ শতাংশ চা বাগানের শ্রমিক। ১৫.৬৫ শতাংশ কৃষক আর ১৩.৬ শতাংশ ক্ষেতমজুর। পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, অসুরদের ৪৮.৬ শতাংশ মানুষ হিন্দু, ১৫.০৫ শতাংশ খ্রিষ্টান, ৪.৭৮  শতাংশ বৌদ্ধ এবং ১ শতাংশ মুসলমান। শহুরে মানুষকে এরা এড়িয়েই চলেন। অসুর জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, মহিষাসুর তাদের পূর্বপুরুষ। তাই পূর্বপুরুষের হত্যাকারিণী দুর্গার মুখ দর্শন করা তাদের নিষেধ। আর তাই শারদোৎসবের সময় এরা শোকের চিহ্ন হিসেবে বাড়ির চারপাশ কালোকাপড়ে ঢেকে রাখেন। প্রবীণেরা আজও এই সময়ে নিজেদের গৃহবন্দি করেই রাখেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন অসুর প্রজন্মের ভাবনা-চিন্তাও বদলেছে। আর তাই মহিষাসুরকে দেবতা বলে গণ্য করেও তারা দুর্গামণ্ডপে গিয়ে দুর্গাকে পুষ্পাঞ্জলিও দেন। সংস্কারকে মনে না রেখে অন্যদের সঙ্গে আনন্দ উৎসবে শামিল হয়। প্রবীণ অসুরদের অনেকেই মেনে নিয়েছেন, এখন সময় বদলেছে। অসুর সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন কাজে বাইরে যাচ্ছে। লেখাপড়া শিখে তারা আধুনিক মনস্ক হয়ে উঠেছে। ফলে ভেঙে গিয়েছে পুরনো সংস্কারের সব বাঁধ।

পুজোও রাজনৈতিক সাহিত্যের জায়গা
পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত কলকাতার দুর্গাপুজোর মণ্ডপের ধারে কাছে দর্শনার্থীদের সঙ্গে জনসংযোগ তৈরি করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের সাহিত্য সংক্রান্ত বইয়ের স্টল দেয়ার প্রতিযোগিতা এ বছর তীব্র হয়েছে। শারদীয় বইয়ের স্টল দেয়ার রেওয়াজ বামফ্রন্ট আমল থেকে চালু হয়েছিল। সেই সময়ে বামপন্থিরাই  প্র্রগতিশীল সাহিত্য ও রাজনৈতিক বইয়ের সম্ভার নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় পুজোমণ্ডপের কাছে স্টল দিতো। সেই সব স্টলে আগ্রহী মানুষের ভিড়ও লেগে থাকতো। বিক্রি হতো ভালোই। কিন্তু বামরা রাজনৈতিক জমি হারানোর পর থেকে সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। গত কয়েক বছরে তারাই সবচেয়ে বেশি বইয়ের স্টল দিয়েছে। এবারও তারা তিনশ’র বেশি স্টল দিয়েছে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের সাহিত্য সম্ভার বলতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ৮৮টি বই। সেই সঙ্গে দলীয় মুখপত্র ‘জাগো বাংলার’ কিছু বিশেষ সংখ্যা নিয়ে তারা স্টল সাজায়। অবশ্য আজকাল কিছু সাহিত্যিকের বইও এই সব স্টলে দেখা যায়। তবে রাজনৈতিক দলের বইয়ের স্টল দেয়ার প্রতিযোগিতায় বিজেপি এখন এগিয়ে এসেছে।

কলকাতার সব বড় পুজোমণ্ডপে বিজেপি স্টল দিয়েছে। রাজনৈতিক বাধায় কিছু ক্ষেত্রে তাদের পিছু হটতে হলেও স্টলের সংখ্যায় তারাই দ্বিতীয়। প্রধানত শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা বই এবং বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর ভাষণ এবং কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ  ও এনআরসি সংক্রান্ত বই নিয়েই তারা স্টল সাজিয়েছে। তাদের সেই স্টলে জায়গা পেয়েছে আরএসএসেরও কিছু বই। এই দুই দলের প্রতিযোগিতার মধ্যেই বামরা হারানো জমি ফিরে পেতে আগের মতোই রাজনৈতিক সাহিত্য ও রাজনীতির বই নিয়ে স্টল সাজিয়েছে বেশকিছু জায়গায়। তাদের বইয়ের স্টলের এবারের প্রধান আকর্ষণ চীন নিয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের লেখা বই। দলীয় পত্রপত্রিকার শারদ সংখ্যা নিয়েও এরা বেশ আগ্রহী। প্রধান এই তিন রাজনৈতিক দলের স্টল ছাড়াও বিভিন্ন হিন্দুবাদী সংগঠন এবার পুজোয় অনেক স্টল দিয়েছে। আর ছোট দল হলেও এসইউসিআই প্রতিবারের মতোই এবার তারা তাদের দলীয় সাহিত্য নিয়ে স্টল দিয়েছে বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে।

বিসর্জনেও লাল ফিতার ব্যারিকেড
দুই বাংলার সীমান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতী নদীর টাকি অংশে দুই বাংলার প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনে প্রতি বছর এপার বাংলা ওপার বাংলা একাকার হয়ে যেত। প্রতিমা নিয়ে আসা দুই  দেশের নৌকায় থাকা মানুষ একে অপরকে আলিঙ্গন করতেন। বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতেন। এই মিলন, আনন্দঘন মুহূর্ত দেখতে ইছামতীর দুই পাড়ে দুই দেশের লাখ লাখ মানুষ জড়ো হন। কিন্তু এখন আর ইছামতীতে প্রতিমা বিসর্জনের সুযোগে দুই বাংলার মানুষের মিলন হয় না। দু’পার থেকে স্বজনেরা চোখের পানিতে ভাসিয়ে দেন নিজেদের মধ্যেকার আত্মীয়তাকে। কয়েক বছর ধরেই দু’পারের মানুষের মেলামেশায় আপত্তি জানিয়ে নানা কড়া ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছিল। তবে এবার তা আরো কঠোর হয়েছে। ঠিক হয়েছে, মাঝনদী বরাবর থাকবে লাল সুতোর সীমানা ব্যারিকেড। অনুপ্রবেশ আটকাতে এই সিদ্ধান্ত বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। আরো ঠিক হয়েছে, দুই দেশের নৌকার মাঝে থাকবে প্রায় ১০০ ফুটের দূরত্ব। তবে এই কড়াকড়ি সত্ত্বেও টাকিতে ইছামতী নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসছে বলে স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে। টাকির সবক’টি সরকারি, বেসরকারি হোটেল, লজ,  গেস্ট হাউস ‘হাউসফুল’। ইছামতীর বিসর্জন ঘিরে টাকিতে কড়া নিরাপত্তাও জারি করা হয়েছে।

Monday, September 30, 2019

বাংলাদেশের ইলিশ আসার খবরে আমজনতা খুশি by পরিতোষ পাল

গত দু’দিন ধরে কলকাতার মাছের বাজারে ক্রেতাদের একটাই প্রশ্ন, কবে আসছে বাংলাদেশের ইলিশ? শুধু কলকাতাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র এখন বাংলাদেশের ইলিশ নিয়ে চলছে নানা নস্টালজিক আলোচনা। সাময়িক সময়ের জন্য হলেও দীর্ঘদিন বাদে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ ভারতে আসছে খবরে খুশি আমজনতা। অনেকে দু’হাত তুলে প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আসলে এ বছর জামাইষষ্ঠি বা রান্নাপুজোর মতো অনুষ্ঠানে ইলিশ বাঙালির পাতে পড়েনি। বর্ষার মৌসুমেও ইলিশ ছিল অধরা।

তবে দুর্গাপুজোয় অনেক বাড়ির পুজোর ভোগে ইলিশ গুরুত্বপূর্ণ। বিজয়া দশমী পর্যন্ত ইলিশভোজের নানা আচার এপার বাংলায় প্রচলিত। অথচ গঙ্গায় এখন ইলিশের দেখা মেলে না বললেই চলে। সাগর থেকে কিছু ইলিশ ধরা পড়লেও তার স্বাদ তেমনভাবে বাঙালির রসনা তৃপ্তি মেটায় না। আর তাই বাংলাদেশের ইলিশের উপর একটা বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে মাছে-ভাতে বাঙালির। ২০১২ সালের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের ইলিশ পাওয়া যেতো রাজ্যের বাজারে।

কিন্তু সেই বছরেই ইলিশ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিকবার ইলিশ দেয়ার অনুরোধের প্রত্যুত্তরে শেখ হাসিনা শুনিয়েছেন তিস্তার পানি দেয়ার কথা। অবশ্য শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার উদার সিদ্ধান্তে সাময়িকভাবে হলেও এপারের বাঙালি খুশি। ৫০০ টন ইলিশে বাঙালির চাহিদা হয়তো মিটবে না তবে কিছু মানুষের পাতে যে পড়বে তা নিশ্চিত। রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ শুক্রবার বলেছেন, পুজোয় বাঙালির ইলিশ-ভাগ্য প্রসন্ন হতে চলেছে। শনিবার মহালয়ার সকালেই পদ্মার ‘রুপোলি শস্য’ ফের আইনসিদ্ধ পথে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বেঙ্গল ফিশ ইমপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকস জানিয়েছেন, বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে আসবে এই ইলিশ। তবে এই ইলিশ আসতে আসতে সোমবার গড়িয়ে যাবে।

কলকাতার পাশাপাশি শিলিগুড়িতেও যাবে সেই ইলিশ। তবে ইলিশের দাম কত হবে তা নিয়েও চলছে জোর চর্চা। মাছ ব্যবসায়ীদের মতে, বিভিন্ন পাইকারি বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের দাম ঠিক হবে নিলামে। তবে দাম যে বেশ চড়া হবে তা নিয়ে নিশ্চিত ক্রেতারা। তবুও বাংলাদেশের একটি ইলিশ যোগাড়ের জন্য বাজারে রোববারই ঢুঁ মারার জন্য তৈরি হয়ে রয়েছেন মানিকতলার অরুণ মুখোপাধ্যায়, গড়িয়াহাটের দীপেন সরকার, যাদবপুরের মিনাক্ষী বিশ্বাসরা। বারাসাত, পাতিপুকুর ও হাওড়ার পাইকারি মাছের বাজারেও আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে ইলিশ প্রিয় বাঙালির।

কংগ্রেস ও বামদের হাত ধরাধরি
কংগ্রেস ও বামদলগুলো পশ্চিমবঙ্গে অস্তিত্বের সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। এই অবস্থায় মাটি ফিরে পেতে কংগ্রেস ও বামদলগুলো অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলনে নামার কথা ভাবছে। অবশ্য ২০০৪ সালেই বামদলগুলো অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে দিল্লিতে কংগ্রেস সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। এরপরেও রাজ্যে বামরা কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করেছে। কিন্তু গত লোকসভা নির্বাচনে পরস্পরের হাত ধরাধরি সম্ভব হয়নি। বরং আলাদা আলাদাভাবে নির্বাচনে লড়াই করতে গিয়ে বামদের যেমন ভরাডুবি হয়েছে তেমনি কংগ্রেসেরও। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামদের অভিযোগ ছিল, তারা অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস মুখ ফিরিয়ে নেয়াতেই সমঝোতা সম্ভব হয়নি। তবে এবার কংগ্রেসই এগিয়ে এসে বামদের সঙ্গে পথে নামার কথা ঘোষণা করেছে। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি সোমেন মিত্র জানিয়েছেন, অভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করে পুজোর পরেই কংগ্রেস বামদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে সোমেন মিত্র বলেছেন, আমরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছি। পশ্চিমবঙ্গে আমরা একা লড়াই করতে পারবো না।

লড়াইয়ের সঙ্গী দরকার। আর এ ব্যাপারে যে বামরাই একমাত্র সঙ্গী হতে পারে সেটাও জানিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, জাতপাতের ভিত্তিতে, ধর্মীয় বিভাজনের লক্ষ্যে রাজ্যে আগে কখনো ভোট হয়নি। আমরা ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছি, বামরা পেয়েছে ৭ শতাংশ। আমাদের ওপর মানুষ আস্থা রাখেনি। কিন্তু দুইপক্ষ মিলে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব। কংগ্রেসের এই মনোভাবে বামরাও আশান্বিত। বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তী মনে করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে। আর বিজেপি কী সর্বনাশা শক্তি সেটাও মানুষ বুঝতে পারছেন। তাই এই পরিস্থিতিতে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিই একমাত্র বিকল্প। তবে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করা নিয়ে বামদলগুলোর মধ্যে বিতর্ক ছিল।

তবে এতদিনে ফরওয়ার্ড ব্লক পার্টি স্বীকার করেছে, গত নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো ভাবেই সমঝোতায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ‘বাস্তবোচিত’ ছিল না। এক সময় দলটি কংগ্রেসের সঙ্গ এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফরওয়ার্ড ব্লকের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মূল্যায়ন হলো যে, তৃণমূল কংগ্রেসের মতো ‘লুম্পেন’ শক্তি এবং অন্যদিকে বিজেপির মতো সামপ্রদায়িক শক্তির মোকাবিলায় ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সব দলকে নিয়ে মঞ্চ গড়া দরকার। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বামদলগুলোর মধ্যে বোধোদয় হওয়ার পাশাপাশি কংগ্রেসের মনোভাবের পরিবর্তনে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে বিকল্প হিসেবে গণতান্ত্রিক শক্তির উঠে আসা কোনো অসম্ভব কিছু নয়।

বাংলার সঙ্গে শব্দ জুড়ুক কেন্দ্র
পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের চেষ্টা চলছে বামফ্রন্ট আমল থেকে। সর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার রাজ্য বিধানসভায় নাম পাল্টে বাংলা করার প্রস্তাব পাঠিয়েছে ভারত সরকারের কাছে। তারাই বিল আনবে এবং পরে তা রাজ্যের বিধানসভায় গৃহীত হলে তবেই রাষ্ট্রপতির অনুমোদন চাওয়া হবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টাতে মোটেই আগ্রহী নয়। তবে কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে বলেছেন। এমনকি বাংলা শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দ জুড়তেও যে রাজ্যের আপত্তি নেই সে কথাও জানিয়ে এসেছেন। মমতা সাংবাদিকদেরও বলেছেন, বাংলাকে সামনে রেখে কিছু পরিবর্তন করতে চাইলে রাজি আছি। তবুও নাম পরিবর্তন হোক এই দাবিই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আসলে রাজ্যের যুক্তি, বিভিন্ন আন্তঃরাজ্য বৈঠকে ইংরেজিতে রাজ্যের নাম ওয়েস্ট বেঙ্গল হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ডাক পড়ে একেবারে শেষে। তখন আর কারও কথা শোনার ধৈর্য থাকে না।

সেই কারণেই নাম পরিবর্তনের ভাবনার শুরু। পশ্চিমবঙ্গের নাম কি হওয়া উচিত তা নিয়ে বিশিষ্টজনদের নানা মত রয়েছে। একদল মনে করেন, দেশ ভাগের ইতিহাসের স্বার্থেই পশ্চিমবঙ্গ নামটি রাখাই বাঞ্ছনীয়। তবে অন্যরা রাজ্যের নাম হিসেবে বঙ্গ, বঙ্গদেশ ও বাংলা এই সব নামের কথা বলেছেন। ২০১৬ সালে রাজ্য বিধানসভায় সর্বসম্মতিতে বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় যথাক্রমে বাংলা, বেঙ্গল ও বঙ্গাল, এই তিনটি নামের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। তখন ভারত সরকার জানিয়েছিল, তিন ভাষাতে একই নাম হতে হবে। এর পরেই নতুন করে বিধানসভা বাংলা নামের প্রস্তাব এনে তা পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। তবে এবার পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে এই নামের মিল থাকায় এটি নাম হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এরপর থেকে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই রাজ্য বাংলা নামের সঙ্গে শব্দ জোড়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

স্বর্গের নিচে মহাবিশৃঙ্খলা
চীনের রাজনীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়নের মডেল নিয়ে বিতর্ক গোটা বিশ্বজুড়েই। ভারতেও কমিউনিস্টদের মধ্যে নানা প্রশ্নে মতান্তর রয়েছে। সমাজতন্ত্রের স্বর্গ হিসেবে কমিউনিস্টদের কাছে পরিচিত চীনে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব সত্ত্বেও চীনের প্রতি ভারতীয় কমিউনিস্টদের সহানুভূতি প্রশ্নাতীত। ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআইএমের নেতারাও এই দলে। ফলে চীন নিয়ে কোনো বিরূপ আলোচনায় সিপিআইএম নেতাদের সায় দিতে দেখা যায়নি। তবে এতদিন পরে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিআইএমের পলিটব্যুরোর সদস্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য কলম ধরেছেন চীনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। লিখেছেন একটি বই। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই গোটা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, কোনো চরিত্রের পক্ষে বা বিপক্ষে আমি দাঁড়াইনি।

যে বিষয়টি বাস্তবে প্রমাণিত, সেটিই সত্য। শুধু তত্ত্বে নয়, এই মার্ক্সীয় ধারণাকেই আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেছি।’’ অবশ্য তিনি বইয়ের নামকরণ করেছেন, ‘স্বর্গের নিচে মহাবিশৃঙ্খলা’। অবশ্য শিরোনামটি তিনি ধার করেছেন চীনের মহান নেতা মাও সেতুংয়ের কাছ থেকে। স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে মাও সেতুং এই কথাটি লিখেছিলেন। জানা গেছে, সাধারণ মানুষের মনে ওঠা নানা প্রশ্নকে তিনি চীনের সাফল্যের মাঝেই সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। তার বইয়ের একটি অনুচ্ছেদের নাম ‘চাঁদেরও কলঙ্ক আছে’।

বুদ্ধবাবু চীনের অভাবনীয় সাফল্যের কথা লেখার পাশাপাশি দুর্নীতি, উন্নয়নের জন্য বহুসংখ্যক মানুষের উচ্ছেদ, সকল নাগরিকের জন্য বিচারব্যবস্থার নাগাল পাওয়ার সমান সুযোগ না থাকা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিদ্ধ আধুনিক চীন নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে এসব ক্ষেত্রে চীন সরকারের দেয়া ব্যাখ্যার পরও যে তার কাছে বহু প্রশ্নের উত্তর নেই- সেকথাও বলেছেন বুদ্ধবাবু। বুদ্ধবাবু লিখেছেন, চীনের নেতারা আমাকে বলেছিলেন, পার্টিই শেষ পর্যন্ত রক্ষা করবে, যদি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বজায় থাকে। আর যদি না থাকে? ব্যক্তিপুজোয় বিলীন হয়ে যায়? এখনো উত্তর মেলেনি। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি এই বইটি লেখার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। নিজে লিখতে না পারলেও বছরখানেক ধরে ওঁর কথা শুনে শুনে বইটা তৈরি করা হয়েছে।

Wednesday, September 25, 2019

নির্বাচিত ছাত্র সংসদের দাবি সব ছাত্র সংগঠনের by পরিতোষ পাল

নির্বাচিত ছাত্র সংসদ তুলে দিয়ে অরাজনৈতিক ছাত্র কাউন্সিলের বন্দোবস্ত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দু’বছর আগে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন কলেজে অশান্তির ঘটনার প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের মডেলে অরাজনৈতিক ছাত্র কাউন্সিল গঠন করা হবে। পরে বিধানসভায় বিল এনে অরাজনৈতিক ছাত্র কাউন্সিলের সিদ্ধান্তও নিয়েছিল রাজ্য সরকার। তখনই প্রবল শোরগোল উঠেছিল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে। অভিযোগ ছিল, ছাত্র ইউনিয়নগুলোকে রাজনীতির প্রভাব মুক্ত করতেই এটা ভাবা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এই ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনকে শক্তির অপচয় বলেও বর্ণনা করেছিলেন। অথচ সব রাজনৈতিক দলেরই ছাত্র সংগঠন রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে এসব ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে নানা আন্দোলনও হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্যও রয়েছে। এই ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়েই উঠে এসেছেন অনেক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতা। এমনকি ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে এসেছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের প্রেসিডেন্ট মধুজা সেনরায় বলেন, ১৮ বছর বয়স হয়ে গেলে আমরা যদি ভোট দিতে পারি তাহলে কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবো না কেন। অরাজনৈতিক বলে কিছু হয় না, এটাই সব ছাত্র সংগঠনের তরফে বার বার বলা হয়েছে। আর এর ফলেই দু’বছর পরে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে ছাত্র ইউনিয়ন নিয়ে কি করা হবে তা নিয়ে মত জানতে সব ছাত্র সংগঠনকে ডেকে আলোচনায় বসেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। এই বৈঠকে সব ছাত্র সংগঠনই নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষেই সওয়াল করেছে। এমনকি, শিক্ষামন্ত্রীর নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন টিএমসিপি ও অন্য সংগঠনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, চাই ছাত্র নির্বাচন, চাই নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়নই। প্রেসিডেন্সি ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও নির্বাচনের পক্ষে মত জানিয়ে বলেছে, কাউন্সিল তৈরি করলে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা অনেকটাই ক্ষুণ্ন হবে। তবে টিএমসিপির ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচনের পক্ষে সওয়াল করা নিয়ে কিছুটা বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য টিএমসিপির পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীকে জানানো হয়েছে, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতো নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষেই। সরকারের দোলাচলের ফলেই প্রায় আড়াই বছর ধরে রাজ্যে ছাত্র ভোট হয়নি। স্বভাবতই সব ছাত্র সংগঠন অবিলম্বে ছাত্র ভোটের দাবি জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত পুরনো মত পাল্টে শিক্ষামন্ত্রীও বলেছেন, তিনিও ছাত্র ভোট করতে আগ্রহী। তবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজ আছে আর যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজ নেই, সব ক্ষেত্রে ছাত্র ভোট একইভাবে হবে কি না, সেই বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা চলছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে তিনটি ফ্যাকাল্টির ছাত্র সংসদ তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে তিনটি ছাত্র সংসদ থাকবে, নাকি একটি হবে, সেটাও ভাবা হচ্ছে। তবে এখনই ছাত্র নির্বাচন হচ্ছে না জানিয়ে বিষয়টি আপাতত ঝুলিয়েই রাখা হলো বলে পর্যবেক্ষদের অভিমত।

রবীন্দ্র সদন-নন্দন ঘিরে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
কলকাতার কেন্দ্রে রবীন্দ্র সদন-নন্দন চত্বরে গোটা বছর ধরে চলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কলকাতায় ঘুরতে আসা সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ এক পাক ঘুরে যান রবীন্দ্র সদন, নন্দন, বাংলা একাডেমি, শিশির মঞ্চ ও কলকাতা তথ্যকেন্দ্র ঘিরে থাকা এই চত্বর। নানা ধরনের মানুষের মেলা থাকে প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত। কবি, গায়ক থেকে সব ধরনের শিল্পী সাহিত্যিকদের আনাগোনা ও আলাপচারিতায় গোটা এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আর এই জন্যই কলকাতায় আসা অনেক দেশি-বিদেশি সেলিব্রিটি বলে থাকেন, কলকাতার প্রাণ উপলব্ধি করতে হলে এই চত্বরে ঢু মারতেই হবে। এবার সেই চত্বরকেই নবরূপে বিশ্বমানে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির আবহকে বজায় রেখেই এই কাজ করতে হবে। উদ্দেশ্য হলো, এই চত্বরকে দেশের সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম গন্তব্য করে তোলা। যাতে এই চত্বরে পা রাখলেই বাংলার সমাজ, শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি পলকে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

পরিকাঠামোগতভাবে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে দেশের প্রথম সারির স্থপতিদের কাছ থেকে প্রস্তাব চেয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই সব প্রস্তাব নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে। সেরা স্থাপত্য প্রস্তাবকে দেয়া হবে ৫ লাখ রূপির আর্থিক পুরস্কার। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা স্থপতি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ভাবনা চিন্তা চলছে এখন যেখানে বইঘর রয়েছে, সেখানে চারতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হবে। তবে এলাকার হেরিটেজ ঐতিহ্য বজায় রেখেই। প্রথম ধাপে বাড়িটি হবে দোতলা। দোতলায় থাকবে কাফেটেরিয়া। এই চত্বরে আসা মানুষজন কাচে ঘেরা কাফেটেরিয়ায় বসে কফি খেতে খেতে দু’পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। নিচে বইঘর, শিশু-কিশোর আকাদেমিসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বই বিক্রির কেন্দ্র থাকবে। থাকবে লাইব্রেরি ও রিডিং রুম। এ ছাড়াও তৈরি হবে পর্যটন তথ্যকেন্দ্র। এই কিয়স্ক থেকে এ রাজ্যের পর্যটন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। এলাকা সৌন্দর্যায়নের কাজ পুজোর আগেই সম্পূর্ণ হবে।

সুরের জাদুতে সজ্ঞানে অপারেশন
সুরের জাদুতে চলছে সজ্ঞানে অপারেশন। রোগীর শরীরে  চিকিৎসকের হাতের স্কালপেল চলছে ব্যস্ততার সঙ্গে। চলছে কাটাছেঁড়া। কিন্তু রোগীর কোনো বিকার নেই। তিনি তখন মগ্ন গানের সুরে। এমনকি নিজে গেয়ে চলেছেন রবি ঠাকুরের গান। এনেসথেসিয়াকে দূরে সরিয়ে রেখে স্থানীয়ভাবে অবশ করে সুরের জাদুতে অপারেশনের সাফল্য দেখিয়ে নজর কেড়েছেন কলকাতার এক চিকিৎসক। মিউজিক থেরাপিতে চিকিৎসা বিভিন্ন দেশেই এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে অস্থিশল্য চিকিৎসক সুমন্ত ঠাকুর সুরের জাদুকে এনেসথেসিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, ব্যাপারটা এমন নয় যে, আচমকা গান বাজাতে শুরু করলাম, আর এনেসথেসিয়া ছাড়া অপারেশন করে  ফেললাম। তার কথায়, প্রথাগত ওষুধের পাশাপাশি রোগীর কাউন্সেলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর রোগীকেও গান ভালোবাসতে হবে। তবেই সুরের জাদুতে অপারেশন করা সম্ভব। ডা. ঠাকুর ব্যাখ্যা করে বলেচেন,  আসলে গানের সুরের পাশাপাশি রোগী যখন নিজে গান গাইতে শুরু করেন তখন তার শরীরে হরমোন ক্ষরণের ধারাটি এমন গতিতে হয় যে, এনেসথেসিয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু অপারেশনের জায়গাটি অবশ করলেই চলে। সেই সঙ্গে তিনি আরো জানিয়েছেন গান বাছাই করাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাছাই করতে হয় মধ্য মাত্রার উদ্দীপক ও ইতিবাচক সুরের গান বা সুর। বেহালা, সরোদ, গিটারের মতো যন্ত্রের সুর খুব ভালো কাজ করে। শব্দ মাত্রা থাকতে হবে ৪৮-৬৮ ডেসিবেলের মধ্যে। আর এসবের সমন্বয়েই অপারেশনে কাজ সারা হয়ে যায়। তিনি আরো জানিয়েছেন, এই পদ্ধতির ফলে এড়ানো যায় মাথাব্যথা, গা বমিভাব, রক্তচাপের তারতম্যের মতো এনেসথেসিয়া সংক্রান্ত জটিলতা। ড. ঠাকুর শতাধিক অপারেশন করেছেন এই সুরের জাদু প্রয়োগ করে। গত পাঁচবছর ধরে চলা তার এই সাফল্যের স্বীকৃতিতে শনিবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে আন্তর্জাতিক ইউনিভার্সাল রেকর্ড ফোরামের পক্ষ থেকে ডা. ঠাকুরের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ইউআরএফ গ্লোবাল এশিয়ান অ্যান্ড ইন্ডিয়ান পুরস্কার।

হেরিটেজ দেব সাহিত্য কুটির
কলকাতার বইপাড়া বলে পরিচিত কলেজস্ট্রিট এলাকার ঝামাপুকুর লেনে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দীর্ঘ ৯০ বছর ধরে প্রকাশনা চালিয়ে যাচ্ছে দেব সাহিত্য কুটির। হাঁদাভোঁদা, বাটুল দি গ্রেট, ছবিতে রামায়ণ, মহাভারত এবং গোলাপি মলাটের বর্ণপরিচয় বেরিয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান থেকেই। এখনো বেরোয়। বেরোয় দুটি জনপ্রিয় পত্রিকা এবং অসংখ্য নানা ধরনের বই। শিশু ও কিশোরদের জন্য উৎসব সংকলন প্রকাশের কৃতিত্ব এদেরই। ১৯২৮ সালে আশুতোষ দেব তৈরি করেছিলেন এই প্রকাশনা সংস্থাটি। আর মাত্র ১০ বছর পরেই শতবর্ষ পালন করবে বইপাড়ার এই অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটি। ২১ নম্বর ঝামাপুকুর লেনে দেব সাহিত্য কুটিরের বাড়ি। গোলাপি রঙের সাবেকি বাড়ি। উত্তর কলকাতার প্রথা মেনে সামনে লম্বা টানা রক। সবুজ রঙের খড়খড়ি আর দরজা। এই বাড়িতেই এক সময় নিয়মিত আনাগোনা ছিল বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের খ্যাতনামা লেখক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিদের। এই বাড়িতেই নিজস্ব প্রেস। জমিদার বরদাপ্রসাদ মজুমদারের হাতে বীজ বপন হয়েছিল দেব সাহিত্য কুটিরের। ১৮৬০ সালের আগেই তৈরি করেছিলেন প্রেস। তবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক পরে ১৯২৮ সালে পুত্র আশুতোষের হাতে। আশুতোষ দেবের অভিধান খুব জনপ্রিয় ছিল সে সময়ে। তবে ঝামাপুকুরের এই ঐতিহ্য সম্পন্ন বাড়িটি প্রমোটারের থাবায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগেই দেব সাহিত্য কুটিরের স্বত্বাধিকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন ঝামাপুকুরের বাড়ি ও প্রেসটিকে হেরিটেজ মর্যাদা দেয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। গত ২১শে আগস্টেই এই বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান শিল্পী শুভাপ্রসন্ন কমিশন জানিয়েছেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রমোটারের থাবা থেকে রক্ষা করতেই হেরিটেজ সিলমোহর দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাছাড়া এর ফলে সম্পত্তি বিক্রি বা অদলবদল করা যাবে না। লাগানো যাবে না পোস্টার। কোনোভাবেই বিকৃতি ঘটানো চলবে না। হেরিটেজ কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক জগতের সবাই। ঐতিহ্য রক। সায় এগিয়ে আসার জন্য হেরিটেজ কমিশনকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন অনেকে।

Tuesday, September 24, 2019

দুর্গা পুজো নিয়ে রাজনীতির দড়ি টানাটানি by পরিতোষ পাল

এ বছরে কলকাতায় দুর্গা পুজো নিয়ে রাজনীতির দড়ি টানাটানি বেশ প্রবল হয়ে  উঠেছে। সাধারণভাবে  কলকাতা শহরের প্রায় সব পুজোর কর্তৃত্ব থাকে শাসক রাজনৈতিক দলের নেতা ও মন্ত্রীদের হাতে। এবার অবশ্য রাজনৈতিকভাবে উজ্জীবিত বিজেপি শুরুতেই চেষ্টা করেছে বেশকিছু পুজো কমিটির কর্তৃত্ব হাতে নিতে। সে ক্ষেত্রে সফল তারা হন নি। তবে একটি দুটি কমিটিকে বাগে আনার ব্যবস্থা তারা করে ফেলেছে। আর এই সব পুজোর উদ্বোধনে দলের সভাপতি অমিত শাহকে আনা হচ্ছে। আনা হচ্ছে দলের কার্যকরী সভাপতি জে পি নাড্ডাকে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুজোর এক সপ্তাহ আগে থেকেই পুজোর উদ্বোধন শুরু করে দেন। এবারো তার কোনো ব্যতিক্রম হবে না বলে দলীয় সূত্রের খবর। বরং এবার কলকাতা ছাড়িয়ে শহরতলির পুজো উদ্বোধনেও দেখা যাবে মমতাকে। কিন্তু বিজেপির রাজ্য নেতারা চাইছেন, দুর্গা পুজোকে অবলম্বন করে তাদের রাজনৈতিক উপস্থিতিকে আরো তীব্র করে তুলতে। এবার তাই তারা পুজোকে পুরস্কার দেবার ব্যবস্থাও করেছে। এমনিতেই সরকারি ও বেসরকারিভাবে শ্রেষ্ঠ পুজো থেকে শ্রেষ্ঠ বারোয়ারি পুজো, মূর্তি থেকে মণ্ডপ সজ্জা নিয়ে বিস্তর পুরস্কার দেয়া হয়। কিন্তু বিজেপি হেঁটেছে অন্যপথে। ভারতীয় জনতা শাদ সম্মান প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেয়া হবে সেরা অর্চনা, সেরা মহাভোগ, সেরা আরতি ও সেরা সিঁদুর খেলার জন্য। সব সংগঠনকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে বিজেপির পক্ষ থেকে। সিঁদুর খেলার পুরস্কার বাদে বাকি সব প্রতিযোগিতার পুরস্কার দেয়া হবে নবমীতে। প্যান্ডেলে গিয়ে পুরস্কার তুলে দেয়া হবে। এই প্রতিযোগিতার জন্য জুরি কমিটি বাছাই করা হয়েছে। তারা যেমন মণ্ডপে ঘুরবেন তেমনি ভিডিও ফুটেজ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। ইতিমধ্যেই ৭০টির বেশি ক্লাব প্রতিযোগিতায় অংশ নেবার জন্য আবেদন করেছে। 

একটি গাছের পুনর্জন্ম
গাছের মৃত্যু যেখানে নগর সভ্যতার প্রসারে অবধারিত ধরে নিয়ে যখন তখন কেটে ফেলা হচ্ছে ঠিক তখনই কলকাতার বুকে একটি শতাব্দী প্রাচীন গাছের পুনর্জন্ম হয়েছে। গাছটি একটি ঔষধিগুণ সম্পন্ন হরিতকি গাছ। এশিয়ার প্রথম মেডিকেল কলেজ স্ট্রিটের কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে একশ’ বছর আগে গাছটি লাগানো হয়েছিল। এখন সেই গাছটি ২৫ ফুট উঁচু হয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে চারদিকে। কিন্তু হাসপাতালের একটি অংশ সম্প্রসারণের জন্য গাছটিকে নিয়ে পড়েছিলেন কর্তৃপক্ষ বেজায় মুশকিলে। শেষ পর্যন্ত গাছটিকে অন্যত্র সরিয়ে বসানো যায় কিনা তা নিয়ে কলকাতা পুরসভার উদ্যান বিভাগের পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল। তাদের  পরামর্শে গাছটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। গত ১৪ই জুন সেই কাজটি করা হয়েছে। তবে সতর্কতা নেয়া হয়েছিল যাতে গাছটি মরে না যায়। প্রথমেই গাছটির শিকড়কে পোক্ত করতে দেয়া হয়েছিল অক্সিন দ্রবণ। গাছটির ডালপালা ছেঁটে দেয়ার ফলে যাতে কোনো সংক্রমণ না হয় সেজন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ব্লিটক্স দ্রবণ। কলকাতা পুরসভার উদ্যান বিভাগের এক আধিকারিকের মতে, একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছকে সরানোর কাজটি ছিল কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। তবে গাছটি সরিয়ে অন্যত্র বসানোর পর দিন রাত নজর রাখা হয়েছিল কোনো সংক্রমণ যাতে না হয়। তবে তিন সপ্তাহ পর পাওয়া গিয়েছে খুশির খবর। গাছটি বেঁচে তো রয়েছেই, সেই সঙ্গে নতুন পাতা ছেড়েছে। এই ভাবে একটি গাছের পুনর্জন্মে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেমন খুশি তেমনি খুশি উদ্যান বিভাগের আধিকারিকরাও। এর আগে উত্তর কলকাতার আরজিকর হাসপাতালে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছকে এই ভাবে অন্যত্র সরানো হয়েছিল। গত এক বছরে এই নিয়ে দুটি পূর্ণবয়স্ক গাছকে হত্যা না করে অন্যত্র সরিয়ে পুনর্জন্ম দানের ঘটনায় সকলেই খুশি।

কলকাতা নিয়ে ভোটাভুটির ব্যবস্থা
নাগরিকরা কেমন দেখতে চান নিজের শহরকে, কোন ক্ষেত্রে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত, ঘাটতি রয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে-এমনই কিছু প্রশ্ন নিয়ে নাগরিকদের কাছে সরাসরি হাজির হতে চলেছে কলকাতা পুরসভা। এক কথায় কলকাতা নিয়ে নাগরিকদের ভোটাভুটির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পুর পরিষেবাকে উন্নত ও আধুনিক মানের করে তুলতেই এমন পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একটি বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা সরাসরি নিজেরাই জানাতে পারবেন পছন্দ-অপছন্দের কথা।  পুরসভার মতে, এটা এক ধরনের অনলাইন ভোটাভুটি। এক পুরকর্তা জানিয়েছেন, নাগরিকদের কাছে সরাসরি পৌঁছানো না-গেলে তাদের সমস্যা, তারা কী চাইছেন, সেই সব ব্যাপারে দিশা পাওয়া সম্ভব নয়। সেই জন্যই কম সময়ে নাগরিকদের কাছে পৌঁছতে এই পরিকল্পনার কথা ভাবা হয়েছে। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে প্রথমে একটি অ্যাপ তৈরি করা হবে। যে অ্যাপ ডাউনলোড করলেই নাগরিকেরা পুরসভার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবেন। তবে ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করতে যারা আগ্রহী, তাদের নাম রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। অনলাইনেই এই রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। তবে কত জন এই ভোটে অংশ নিতে পারবেন, সেই ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে, কলকাতা পুরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডের নাগরিকদের এই ভোটাভুটিতে শামিল করা হবে। পুর পরিষেবার উন্নতিতে এবং কলকাতার সামগ্রিক উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ভাবে এই প্রথম নাগরিকদের যুক্ত করা হচ্ছে।

বাংলা শব্দের ঐতিহাসিক অভিধান
প্রতিটি বাংলা শব্দের উদ্ভব এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তৈরি হচ্ছে বাংলা শব্দের একটি ঐতিহাসিক অভিধান। তবে অনলাইনে তৈরি হওয়া এই অভিধানের নাম দেয়া হয়েছে শব্দকল্প। এই প্রথম ভারতের মধ্যে কোনো ভাষা নিয়ে এই ধরনের অনলাইন অভিধান তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞে হাত দিয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য স্কুল অব কালচারাল টেক্সট এন্ড রেকর্ডস। এটি পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষ বাংলা নিয়ে সহজেই গবেষণা করতে পারবেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরীর মস্তিষ্কপ্রসূত এই অভিধান তৈরির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, বাংলা এমন একটি ভাষা যার প্রতিটি শব্দ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়। তাই প্রতিটি শব্দের প্রথম উদ্ভব, তার ব্যবহার, তার ক্রম অগ্রগতি এবং বিবর্তন বর্ণনা রাখা হবে। ইতিমধ্যে এক ডজনের বেশি অধ্যাপক, ছাত্র ও গভেষক শব্দ সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। জানা গেছে, টেক্সট থেকে শব্দ বাছাই করে তা উদ্ভবের তারিখ অনুযায়ী সাজানোর জন্য বিশেষ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সিস্টেমের ব্যবহার হচ্ছে। শব্দের ক্ষেত্রে কোনো বাছবিচার করা হবে না। বড়লোকদের ভাষা, মধ্যবিত্তের ভাষা থেকে শুরু করে স্ল্যাং ভাষাও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই অনলাইন অভিধান তৈরির কাজ শেষ হলে যে কেউ এই অভিধান ব্যবহার করতে পারবেন। এজন্য কোনো অর্থ খরচ করতে হবে না। অভিধান প্রস্তুতের সঙ্গে যুক্তরা জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে শব্দের উচ্চারণ ও ধ্বনিবিন্যাস অভিধানে যুক্ত করা হবে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ এই অভিধান তৈরির প্রাথমিক কাজ শেষ হবে। এই ধরনের একটি উদ্যোগের প্রশংসায় পঞ্চমুখভাষা বিশেষজ্ঞরা। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশিষ্ট ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলেছেন, এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। বাংলা ভাষার যে কোনো শাখার উচ্চশিক্ষার্থীরা এটি থেকে বিশেষভাবে উপকৃত হবেন।

চালু হয়েছে মানবতার কাফে
অভিনবত্বে কলকাতার জুড়ি মেলা ভার। এবার কলকাতার বুকে চালু হয়েছে মানবতার ক্যাফে। তবে এটি আসলে একটি ভেগান কমিউনিটি ক্যাফে। আর এটি যারা চালু করেছেন তারা হলেন উবানটু কমিউনিটির সদস্য। খটমট এই শব্দটির অর্থ কি, কোন ভাষার শব্দ এটি সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। আসলে উবানটু জুলুভাষার শব্দ। এর অর্থ মানবতা। একসঙ্গে থাকার প্রেরণায় একদল তরুণ-তরুণী মিলে দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়াতে তৈরি করেছে এই উবানটু কমিউনিটি ক্যাফেটি। পরিবেশবান্ধব এই ক্যাফেতে দূষণকে শতহাত দূরে রাখা হয়েছে। নারিকেলের খোলে তৈরি বাসনে এবং কাঠের থালায় পরিবেশন করা হচ্ছে খাবার। টেবিলে প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে কাচের বোতলে দেয়া হচ্ছে পানীয়। এই ক্যাফেতে দূষণের কথা ভেবেই রাখা হয় নি কোনো এসি। চলছে পাখা। পুরনো ফেলে দেয়া আসবাবকে সাজিয়ে গুছিয়ে করা হয়েছে ক্যাফের টেবিল চেয়ার। মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে রান্নার লোভে এর শেফের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এক অবাঙালি। পাওয়া যায় পিৎজা, শাহি বড়া, বড়িওলি পাস্তা থেকে গো গ্রিন স্মুদি পর্যন্ত। উবানটু কমিউনিটির মতাদর্শ হল, ইট, লিভ এন্ড শেয়ার। সেদিকে লক্ষ্য রেখে  তিনতলা বাড়িটির নিচ তলায় হয়েছে ক্যাফে। দোতলায় হোস্টেল। আরতিন তলায় ইভেন্টের জায়গা। পর্যটকরা কলকাতায় এসে উবানটুর হোস্টেলে থাকতেও পারবেন। তবে খেতে হবে ভেগান খাবার।