Sunday, September 20, 2026
সেই যে আমার নানা রঙের উলগুলি by সুজন সুপান্থ
ক্যালেন্ডারে শীত আসার আগেই প্রকৃতিতে শীতের রং লেগেছে। ঝুপ করে নেমে আসছে সন্ধ্যা, হিমের চাদর জড়িয়ে নিচ্ছে আকাশ। মাঠ, ঘাস আর রাতে ফোটা শিউলি ফুল সকালের শিশিরে জবুথবু। জবুথবু হয়ে আছে পথের ধারে ফোটা ছোট্ট নীল ফুলের হাসি, তার নাম জেনেছি কানাইবাঁশি। আসলে ফুল ফোটাবে বলেই বৃষ্টিহীন দিনে বুনো গাছ ভিজিয়ে দিয়ে যায় শিশিরের কণা।
আচ্ছা এই যে কুয়াশা, শিশির আর শিরশিরানি—এসবই কি হেমন্তের নিজস্ব? শীতের কাছে কি তার কোনো ঋণই নেই? আবার এ কথাও তো ঠিক, হেমন্ত আছে বলেই না শীতের এত আড়ম্বর। আর তা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
ধুলা ঝেরে বাইরে এসেছে তোরঙ্গ। রাগ-অভিমান নয়, তবু এত দিন যাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল, এই হিম দিনে ‘সমারোহে এসো’ বলে বের করা হচ্ছে শীতের নানা রঙের পোশাক। গায়ে জড়ানোর আগে বাড়ির ছাদ ও উঠানগুলোতে রোদ পোহাচ্ছে নানা রঙের উল।
আমার মায়ের ছিল টিনের তোরঙ্গ। এই তোরঙ্গ বাইরে এলেই বোঝা যেত, শীত সমাসন্ন। তোরঙ্গ খুলতেই বেরিয়ে আসত ন্যাপথলিনের গন্ধমাখা ছোটবেলার সোয়েটার, গায়ে দেওয়ার জন্য পরে আর কোনো দিন যার ডাক পড়েনি। বেরিয়ে আসত ঠাকুরমার বোনা পুরোনো কাঁথা। ঠাকুরমা নেই, তবু প্রতি শীতে একবার কাঁথায় মা ছুঁয়ে নিতেন তাঁর মায়ের আঙুল।
তোরঙ্গের একদম নিচে পাট করা থাকত বাবার তরুণ বয়সের মাফলার আর চাদর। ওই মাফলার ও চাদর কখনো রোদ পেত না, পেত আদর। তোরঙ্গ থেকে বের করে গলা ও গায়ে জড়িয়ে আবার গুছিয়ে রেখে দিতেন পরের শীতে নেড়ে দেখার জন্য। এমনই প্রেম আর ম্যাজিক নিয়ে আসত শীতকাল।
ছোটোবেলায় শীতকাল আসত ভয় সঙ্গে নিয়ে। পরীক্ষার ভয়। ভয় কাটিয়ে স্কুলফেরত পথে হঠাৎ ফাঁকা জমিতে দেখা যেত বিশাল তাঁবু। জোড়া হাতি ও জোকারের ছবি আঁকা গেটে লেখা, ‘দ্য রওশন সার্কাস’ বা ‘বুলবুল সার্কাস’।
এই তাঁবুই বুঝিয়ে দিত, ‘এসেছে শীতের দূত,/ এ লগন রোদ পোহাবার।’ ভোরে শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটলে ঠান্ডায় লাল হয়ে যেত নাক। তাই মনে হতো, সার্কাসের জোকার লাল বলের নাকে করে বয়ে এনেছে শীতের রসদ। এবার ম্যাজিক করে তা ছড়িয়ে দেবে পুরো মফস্সলে।
অন্য সব মফস্সলের মতোই আমাদের মফস্সলে আকাশে ধোঁয়ার চাদর বিছিয়ে বিষণ্নতা নিয়ে আসত ক্ষণস্থায়ী বিকেল। ঠান্ডার অজুহাতে চিকলির বিলে গা ঘেঁষে বসে থাকত প্রেমিক-প্রেমিকা। কেউ আবার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যেত ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যায়, সাদা কুয়াশায় ভরে যেত চারপাশ। এ রকম বহু প্রেম ও বিচ্ছেদের স্মৃতি হয়ে আসত শীত।
দুই
‘হরেক রঙের বাহারে,/ সকাল হলো আহারে’ গানের মতোই হাজির হতো নব্বইয়ের দশকের শীতের সকাল। অচেনা কোনো আরোহীর সাইকেলের বেল বাজাতে বাজাতে ঘন কুয়াশা পেরিয়ে যাওয়ার শব্দে শুরু হতো সকাল; কিংবা লেপ-তোশক তৈরির ধুনকারের হাঁকে। খেজুরগাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামিয়ে আলপথ পেরিয়ে আসতেন গাছি।
কুয়াশা রঙের এই ঠান্ডা রস খাওয়ার পর নিজেকে উষ্ণ করার একমাত্র উপায় ছিল ‘পোড় পোহানো’। এ জন্য আগের দিন বিকেলেই প্রস্তুতি নিতে হতো। খড়, জমির কোণে পড়ে থাকা শুকনা ঘাস-পাতা ও ঘুঁটে কুড়িয়ে এনে ঢেকে রাখতে হতো।
সকালে ওই স্তূপে আগুন জ্বালানো হতো। চারপাশে গোল হয়ে বসে আগুন পোহাত জাড়ে জবুথবু কয়েক বাড়ির মানুষ। এরই মধে৵ হয়তো কেউ ‘গিলিগিলি ছুঁ’ বলে আগুনজ্বলা ছাইয়ের ভেতর থেকে বের করে আনত পাতলা খোসার নতুন আলু। আগুন ও আলু পোড়ার ঘ্রাণে ভেসে যেত সকালের কুয়াশা।
তিন
বেলা বাড়তে থাকলে উঠানের কোণে নরম রোদ এসে পড়ে। রোদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উঠানে পাটি পেতে বই-খাতা নিয়ে বসে পড়তাম। রোদ পোহানো আর পড়াশোনা একসঙ্গে চলত। পাশে রোদ পোহাত পাখিরাও; রোদ পোহাত আচারের বয়াম, মায়ের নারকেল তেলের শিশি। এই রোদের লোভে পাশের বাড়ি থেকে ছুটে আসত সহপাঠী ববি। এমনই মায়া আর আরাম নিয়ে আসত সকালবেলার মখমলি রোদ।
যার ঘরে দেয়াল নেই, এমনকি শীতের পোশাকও নেই; যে শিশুটি বাবার লুঙ্গি গলা থেকে পা পর্যন্ত মুড়ে এসেছে আগুন পোহাতে, তার ঘরে, তার গায়েও লুটিয়ে পড়ে এই শীতের নরম রোদ। মানুষে মানুষে বিভেদ করার কোনো ষড় নেই রোদের। এমনই রোদের মাঝে বসে খোসা ছাড়িয়ে কমলালেবুর কোয়া খেতে দিতেন বাবা।
উঠানজুড়ে ভেসে বেড়াত সেই কমলালেবুর ঘ্রাণ। মনে হতো, এই উঠান যেন এক বিষণ্ন কমলালেবুর দেশ, যে দেশের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত অমৃতের ঘ্রাণ। মায়ের হাতে বানানো ভাপা, চিতই পিঠা, দুধ-পুলি কিংবা খেজুর রসের পায়েসের এই ঘ্রাণ পাওয়া যেত বেশ দূর থেকে; এমন ঘ্রাণ ভেসে আসত পাড়ার আর সব বাড়ি থেকেও। কী স্বাদ সেসব পিঠার!
বেলা আরেকটু বাড়লে ঝিমধরা রোদ পোহাতে আসতেন মা ও পাশের বাড়ির দিদিরা। পিঁড়ি পেতে বসে গল্প করতে করতে আশ্চর্য রঙের আলুশাক বেছে সুপারির খোলে রাখতেন তাঁরা।
কাঁচা টমেটোর সালাদ আর মাটি ফুঁড়ে কিছুদিন আগে বের হওয়া রসুন-পেঁয়াজের পাতা ও চিংড়ি দিয়ে সামান্য মুলার ঝোলে ভাত মেখে খেতে কী যে তৃপ্তি ছিল সে সময়! রান্নাঘর ভরে থাকত আচারের জন্য পাকা চালতা আর পেঁয়াজ-রসুন ও ধনেপাতার সুঘ্রাণ। এই ঘ্রাণ কি শুধুই চালতা আর পাতার! শীতের নিজস্ব ঘ্রাণ নয়?
চার
দুপুরের খাওয়া শেষে টুলে বসে ‘আদর’ বুনে রাখতেন মা। নানা রঙের উলের বল নিয়ে ক্রুশকাঁটায় বুনতেন এই আদর। এই উলের বল গড়াতে গড়াতে চলে যেত পরের বছর শীতে। কখনো পুরোনো শাড়িতে বুনে রাখতেন নতুন কাঁথা। এখন কি কেউ অমন যত্ন করে কাঁথা বা উল বোনেন? এই ‘ব্রেন রট’-এর যুগে মানুষের কি মনে থাকে বহু আগামীর কথা!
সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব গোথেনবার্গের তিন গবেষক জোয়ানা নর্ডস্ট্র্যান্ড, বিরজিতা গানারসন ও গ্রেটা হেগব্লুম-ক্রোনলফ ‘প্রোমোটিং হেলথ থ্রু ইয়ার্নক্র্যাফট: এক্সপেরিয়েন্সেস অব অ্যান অনলাইন নিটিং গ্রুপ লিভিং উইথ মেন্টাল ইলনেস’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছেন, উল বুনলে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য বুনন খুবই উপকারী। জার্নাল অব অকুপেশনাল সায়েন্সে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, সুই-সুতা আর ক্রুশকাঁটা অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
পাঁচ
‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের বৃদ্ধা ইন্দির ঠাকরুনের কথা মনে আছে? যিনি গায়ের ছেঁড়া চাদরের ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে হরিকে বলেন, ‘বুড়ো মানুষকে কে দেখে বল? এই দেখ না, এই চাদরখানা! এই সন্ধ্যাবেলায় গায়ে দিয়ে বসি।’
হরি জানায়, ‘তা বেশ তো, এবার পূজোয় একখানা নতুন চাদর কিনে দেব।’
জবাবে বয়সের ভারে ন্যুব্জ ইন্দির এক গাল হেসে আকুতি জানিয়েছেন, ‘হ্যাঁ, দিবি তো! হ্যাঁ, দিবি তো! ও হরি, হ্যাঁ, দিবি তো! ও হরি…।’
মফস্সলে এমন অসংখ্য ইন্দির আছেন। শীতের কুয়াশা আর নরম রোদ যেমন সবাই দেখে, তেমনি এই ইন্দিরের মতো বয়স্ক মানুষকেও সবাই দেখুক। একটি চাদরের উষ্ণতা নিয়ে হাসিমুখে শরৎ আর বসন্তের মাঝে এই নাতিদীর্ঘ হিমসেতু পেরিয়ে যাক তাঁরাও।
ছয়
রোদ পোহাতে বসা সেই বিষণ্ন কমলালেবুর দেশ পেরিয়ে এক নির্জন প্রান্তরে এসে পড়েছি। এখানে হেমন্ত আসে, শীত আসে; কিন্তু মখমলি রোদ আসে না। এখানে সঙ্গ দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)।
মানুষ হয়তো আর বুনবে না, এআইয়ের কোনো ভার্সন একদিন বুনে দেবে উল। জেমিনিকে প্রম্পট দিয়েছি, কিশোর বয়সের ফেলে আসা সেই বিষণ্ন কমলালেবুর দেশে নিয়ে যাও? অমনি দেখি, হুবহু কিশোর আমি পাটি পেতে বসে আছি বাড়ির রোদজ্বলা উঠানে!
বলেছি আবার, ভোরবেলা এই মুখের ওপর টুপ করে ফেলে দিয়ো টিনের চালা বেয়ে নামা শিশিরের ফোঁটা বা উঠানের কোণ থেকে এনে দাও কিছু নরম রোদ্দুর। দেবে বলে বাফার করছে জেমিনি। দীর্ঘ বাফারিংয়ের সামনে বসে শিশিরের হিমে ভিজে জবুথবু কানাইবাঁশি ফুলের মতো কেবলই শীত করতে থাকে…।
![]() |
| গরমকাপড় আর মায়ের কোল—শীতে ওম পেতে আর কী লাগে! ছবি: মঈনুল ইসলাম |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তকে নিয়ে ভুক্তভোগীর ক্ষোভ: ‘চোর তুহিন থেকে খুনি তুহিন’ by এম হাসান
তার অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের এক প্রভাবশালী নেতার হাত থাকায় অতীতে একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও পুলিশ তুহিনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আসাদ উল্লাহ সোহাগ জানান, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি তুহিনের প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। তাকে একই কৌশলে ডেকে নিয়ে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি হাতিয়ে নেয় তুহিন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে আসাদ উল্লাহ সোহাগ তার পোস্টে লেখেন, সেদিন আমাকে কৌশলে ডেকে এনে আমার বাইকটি নিয়ে যায় তুহিন। এ ঘটনায় মামলা করতে যখন আমি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় যাই, তখন পুলিশ মামলা না নিয়ে কেবল একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করেছিল।
তিনি পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে লেখেন, তুহিনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে থানা পুলিশ আমাদের জানিয়েছিল, তার মাথার ওপর একটি রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত রয়েছে। তাই তাকে যেন কিছু না করা হয়—এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। সেদিন আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি—দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র বদলায়নি! অর্থ ছাড়া এই দেশে সহজ বিচারে সুবিচার পাওয়া যায় না।
মোটরসাইকেল খোয়ানোর চেয়ে সামাজিক অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়াকে দায়ী করে তিনি আরও লেখেন, আমার বাইকটি চুরির বিষয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু ছোট ছোট অপরাধের সঠিক বিচার না হলে অপরাধীরা পরবর্তী সময়ে কত বড় ও ভয়ানক অপরাধ ঘটানোর সাহস পায়, তা আজকের এই ঘটনা প্রমাণ করে। সেদিন যেসব নেতা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাকে আইন ও বিচার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজকে তারা তাকে কীভাবে বাঁচাবেন?
উল্লেখ্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করেছে। আটককৃতদের মধ্যে এই তুহিন অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সোয়া হাতের জুতার গল্প, ২০০ বছরের কুঠিবাড়িতে যত রহস্য
স্থানীয়দের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় কুঠিবাড়ির ‘সোয়া হাতের জুতা’র গল্প। কথিত আছে, খাজনা বকেয়া রাখা কিংবা অপরাধের অভিযোগে প্রজাদের শাস্তি দিতে সোয়া হাত মাপের একজোড়া জুতা ব্যবহার করা হতো। ওই জুতা দিয়ে অপরাধী প্রজাদের পেটানো হতো বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজ জমিদার এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। সাপলেজায় আসার পর স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি ফরাজউল্লাহ তাকে জমি উপহার দেন বলে প্রচলিত আছে। পরে সেখানে ক্যাসপারের জমিদারি বিস্তৃত হয়।
একসময় পৌষ মাসের শেষদিকে এই কুঠিবাড়িতে আয়োজন করা হতো পুণ্যাহ উৎসব। খাজনা আদায়ের পাশাপাশি উৎসবে জাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রাপালা ও নিমাই সন্ন্যাস পালার আয়োজন করা হতো। এসব দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের সমাগম ঘটত।
কুঠিবাড়ির মূল ভবনটি ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। চৌকোণাকৃতির ১৮টি খিলানের ওপর নির্মিত ভবনটি দোতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর সঙ্গে ছিল আরও কয়েকটি স্থাপনা এবং বড় একটি পুকুর। স্থানীয়দের দাবি, ভবনের ওপরের তলায় ক্যাসপারের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ও তৈজসপত্র সংরক্ষিত থাকত।
কুঠিবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘শিলারগঞ্জ’ নামটিও। স্থানীয়দের ভাষ্য, ব্রিটিশ আমলের জমিদার শিলার সাহেবের নাম থেকেই এলাকার নাম হয়েছিল শিলারগঞ্জ। তার ছেলে এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। পরে এলাকার নাম সাপলেজা হলেও ডাকঘরের নাম পরিবর্তন হয়নি। এখনো ‘শিলারগঞ্জ পোস্ট অফিস’ নামটি চালু রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুঠিবাড়িতে নায়েব ও পাইক-পেয়াদাদের থাকার জন্য আলাদা ভবন ছিল। একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলায় অফিসে বসে খাজনা আদায় ও বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো। ক্যাসপারের একটি বড় বোটও ছিল বলে জানান তারা। শীত মৌসুমে তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ, বর্তমান বরিশাল, থেকে তিনি ওই বোটে করে কুঠিবাড়িতে আসতেন বলে প্রচলিত আছে।
শীতকালে থাকার উপযোগী রাখতে ভবনটি উষ্ণ রাখার বিশেষ ব্যবস্থাও ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, মূল ভবনের নিচের চার কোণে কয়লার আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল।
তবে কুঠিবাড়ির ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত লিখিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ফলে ক্যাসপারের ব্যক্তিজীবন, তার জমিদারি পরিচালনা এবং কুঠিবাড়ি নির্মাণের নানা বিষয় এখনো অনেকটাই অজানা। স্থানীয়দের কাছে থাকা ক্যাসপারের ব্যবহৃত দুটি তরবারিসহ বেশ কিছু পুরোনো তৈজসপত্রও এখন আর দেখা যায় না।
বর্তমানে কুঠিবাড়ির তিনটি ভবনই সংস্কারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটও হারিয়েছে আগের জৌলুশ। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ক্ষয়ের চিহ্ন। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে স্থাপনাটির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি মালিকানায় গেলেও ঐতিহাসিক এই স্থাপনা সংরক্ষণে এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অল্প কিছু বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। তা দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে আরও ভালোভাবে সংস্কার করা হবে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতে পারেন।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কুঠিবাড়িটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি মঠবাড়িয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে এর ইতিহাস অনুসন্ধান, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও যথাযথ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তা না হলে অযত্নে হারিয়ে যেতে পারে দুই শতকের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা গল্প ও স্মৃতি।
![]() |
| ২০০ বছরের পুরোনো কুঠিবাড়ি। ছবি: কালবেলা |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সব খাবারে কি কারও অ্যালার্জি হতে পারে?
প্রশ্ন: আমার একেক সময় একেক খাবারে অ্যালার্জি হয়। দীর্ঘদিন ধরে কোনো খাবারই ঠিকমতো খেতে পারি না। অ্যালার্জিতে ত্বকের বিভিন্ন স্থানে র্যাশ ওঠে। আমি একজন নারী, বয়স ২৩। আমি কি খেয়ে বাঁচব?
- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
পরামর্শ: আপনার বর্ণনা শুনেই ভোগান্তির মাত্রাটা অনুভব করতে পারছি। কিন্তু আপনি নির্দিষ্ট সময়ের কথা উল্লেখ করেননি। ঠিক কত মাস বা বছর ধরে আপনার এই সমস্যা হচ্ছে? আপনি কি ছোটবেলা থেকেই অ্যালার্জিতে আক্রান্ত? সে ক্ষেত্রে আগে কোনো চিকিৎসা নিয়েছেন কি না, তা–ও জানা প্রয়োজন।
নানা কারণে হতে পারে অ্যালার্জি। কখনো এটি বংশগত। আবার পরিবেশগত কিছু কারণও থাকতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু খাবার থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। কিন্তু সব খাবারেই আপনার অ্যালার্জি হচ্ছে বলে যেটা মনে করছেন, তা ঠিক নয়। কিছু কিছু খাবার থেকে অ্যালার্জি হতে পারে, কিন্তু সব খাবারেই অ্যালার্জি নেই।
আপনি একজন অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সরাসরি পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যালার্জি প্যানেল টেস্ট করিয়ে নিন। এই টেস্টের মাধ্যমে কোন কোন খাবারে আপনার অ্যালার্জি রয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারবেন।
এ ছাড়া বাসাবাড়ির ধুলাবালু, পুরোনো শীতের কাপড়, লেপতোশকে জমা হওয়া মাইট কিংবা পোষাপ্রাণীর পশম নাকে গেলেও অ্যালার্জি হতে পারে। আপনার ক্ষেত্রে কোনটি বেশি দায়ী, এই পরীক্ষার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা যাবে।
বর্তমানে অ্যালার্জির কারণে আপনার ত্বকে যে র্যাশ উঠেছে, তা–ও সরাসরি না দেখে ওষুধপথ্য দেওয়া সম্ভব না। র্যাশের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। আপনি সমস্যাটিকে আর অবহেলা করবেন না। আশা করি সুচিকিৎসায় উপকার পাবেন।
![]() |
| কিছু কিছু খাবার থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। ছবি: পেক্সেলস |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2198)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...


