Showing posts with label জাহিদ হোসাইন খান. Show all posts
Showing posts with label জাহিদ হোসাইন খান. Show all posts

Tuesday, July 21, 2026

জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারের খোঁজে বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানী by জাহিদ হোসাইন খান

মহাকাশের বিশালতায় পৃথিবী থেকে ১ হাজার ৩৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত টিওআই–২১৫৫ নামক একটি নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে এক রহস্যময় বস্তু, যা বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গবেষকদের মতে, টিওআই-২১৫৫বি নামের এই বস্তুটির অবস্থান এমন এক সন্ধিক্ষণে, যা নক্ষত্র ও ব্যর্থ নক্ষত্র বা ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যকার সীমানা নির্ধারণের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে নতুন এই রহস্যের উন্মোচন করেছে বাংলাদেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দল।

সম্প্রতি দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে টিওআই–২১৫৫বি নামক এক অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তুর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট মিশনের তথ্য ব্যবহার করে এবং পরবর্তী সময় বিভিন্ন স্থলভিত্তিক মানমন্দিরের সহায়তায় এই বস্তুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়। টিওআই–২১৫৫বির ভর ও গঠন একে মহাজাগতিক বিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। এর ভর প্রায় ৮০ দশমিক ৬ বৃহস্পতির সমান, যা এটিকে ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা বাদামি বামন এবং খুব কম ভরের নক্ষত্রের মধ্যবর্তী একটি সীমানায় স্থাপন করে। সাধারণত নক্ষত্র হতে গেলে কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের ফিউশন বা সংযোজনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার জন্য যে ন্যূনতম ভরের প্রয়োজন হয়, এই বস্তু ঠিক সেই সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এটিই মূলত এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক।

টিওআই–২১৫৫বির ব্যাসার্ধ প্রায় শূন্য দশমিক ৯৭ বৃহস্পতির সমান এবং ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, যা একে এক অনন্য মহাজাগতিক বস্তুতে পরিণত করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন মো. রেদোয়ান আহমেদ। একজন গবেষক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রম এই আবিষ্কারকে সম্ভব করেছে। মহাকাশ গবেষণার মতো জটিল ও সূক্ষ্ম একটি ক্ষেত্রে, যেখানে তথ্যের নিখুঁত বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি, সেখানে রেদোয়ানের নেতৃত্ব ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসনীয়। দীর্ঘ সময় ধরে সংগৃহীত তথ্য ও রেডিয়াল ভেলোসিটি পরিমাপের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর সহযোগী ব্যক্তিরা প্রমাণ করেছেন, টিওআই–২১৫৫বির মতো বস্তু নক্ষত্র ও উপ-নাক্ষত্রিক বস্তুর বিবর্তনীয় মডেলগুলো পরীক্ষা করার জন্য একটি চমৎকার বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করতে পারে। রেদোয়ানের এই কাজ কেবল একটি নতুন মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান নয়, নক্ষত্রের জন্মের সীমা ও উপাদানের গঠন সম্পর্কে ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

মো. রেদোয়ান আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, যেসব মহাজাগতিক বস্তুর ভর নক্ষত্রে পরিণত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় এবং তাই তাদের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন শুরু হয় না, সেগুলোকে ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা ‘ব্যর্থ নক্ষত্র’ বলা হয়। টিওআই–২১৫৫বির ভর বৃহস্পতির ভরের প্রায় ৮০ দশমিক ৬ গুণ। সাধারণত বৃহস্পতির ভরের ৭৫ থেকে ৮০ গুণ বেশি ভরের বস্তুকে নক্ষত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নতুন এই বস্তু সেই তত্ত্বের একেবারে কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর দল নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বস্তুটির আকার ও ভর নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী মো. রেদোয়ান আহমেদ জানান, কেবল ভরই শেষ কথা নয়, একটি বস্তুর বয়স, রাসায়নিক গঠন ও বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্যও নির্ধারণ করে সেটি নক্ষত্র হিসেবে জ্বলে উঠবে কি না। ফলে নক্ষত্র ও ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিভাজন রেখা টানা সম্ভব হচ্ছে না।

টিওআই–২১৫৫বি মহাকাশের অন্যতম বিরল একটি বস্তু। এটি নক্ষত্র ও ব্রাউন ডোয়ার্ফের মধ্যকার রূপান্তরকালীন অবস্থায় থাকায় বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। মো. রেদোয়ান আহমেদের মতে, এ ধরনের আরও মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, কীভাবে একটি বস্তু নক্ষত্রে পরিণত হয় এবং কোন সীমা অতিক্রম করলে তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন শুরু হয়।

মো. রেদোয়ান আহমেদ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিডনি ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের পিএইচডি গবেষক। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এক্সোপ্ল্যানেট, ব্রাউন ডোয়ার্ফ, নাক্ষত্রিক কার্যকলাপ ও রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার পার্কস রেডিও টেলিস্কোপের ক্রায়োপ্যাফ ম্যাসার পর্যবেক্ষণের ডেটা পাইপলাইন উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত। পাশাপাশি তিনি নক্ষত্র ও উপ–নাক্ষত্রিক বস্তুর মধ্যকার সীমানা নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের অ্যাস্ট্রোমিউজার্স গ্রুপ ও বাংলাদেশের ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসের অ্যাসোসিয়েট মেম্বার হিসেবে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে নতুন এক রহস্যের উন্মোচন করেছেন মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দল
মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে নতুন এক রহস্যের উন্মোচন করেছেন মো. রেদোয়ান আহমেদ ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা দল। সংগৃহীত

পাতালপুরীর খোঁজে বিজ্ঞানীরা by জাহিদ হোসাইন খান

পৃথিবীর কেন্দ্রে কী রয়েছে, তা জানতে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। সেই কৌতূহল মেটাতে অর্ধশতাব্দী আগে এক অবিশ্বাস্য ও দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানীরা। মাটির নিচে প্রায় ১২ কিলোমিটার গভীরে গর্ত তৈরি করেছিলেন তাঁরা, যা মানুষের তৈরি সবচেয়ে গভীর লম্বা গর্ত। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বিজ্ঞানের এই বিশাল অর্জন পৃথিবীর মোট ব্যাসার্ধের তুলনায় ছিল সমুদ্রে এক ফোঁটা শিশিরের মতো।

১৯৭০ সালে উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপে ভূ-পৃষ্ঠের গভীর রহস্য উন্মোচনে কাজ শুরু করেন সোভিয়েত ভূতাত্ত্বিকেরা। ১৯৮৯ সালে যখন এই খননকাজ শেষ হয়, তখন গর্তটির গভীরতা গিয়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ২৬২ মিটার (প্রায় ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার)। এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর উল্লম্ব গর্ত, যা কোলা সুপারদীপ বোরহোল নামে পরিচিত। তবে এই বিশালাকার অর্জনের পরও বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে মাত্র শূন্য দশমিক১৯ শতাংশ পথ পাড়ি দিতে পেরেছিলেন। কারণ, পৃথিবীর কেন্দ্র প্রায় ৬ হাজার ৩৭১ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত।

কোলা উপদ্বীপের প্রকল্পটি কোনো খনিজ তেল বা মূল্যবান ধাতু উত্তোলনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি। এর লক্ষ্য ছিল কেবল ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণা। ভূমিকম্পের তরঙ্গের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভেতরের স্তর সম্পর্কে যেসব ধারণা করেছিলেন, শিলাখণ্ড সরাসরি সংগ্রহ করে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানীদের ইচ্ছা ছিল ১৫ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছানো, যদিও তা সম্ভব হয়নি।

প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই খনন অভিযানে ভূপৃষ্ঠের নিচে প্রায় ৬ হাজার ৮৪২ মিটার পর্যন্ত আগ্নেয় ও পাললিক শিলা অতিক্রম করার পর পাওয়া যায় শতকোটি বছরের পুরোনো নাইস শিলা। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, গ্রানাইটসমৃদ্ধ এই শিলার নিচে কঠিন ব্যাসাল্ট শিলার একটি পরিষ্কার স্তর রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি; প্রাচীন কেলাসিত শিলার জটিল নেটওয়ার্ক দেখা গেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার ছিল গভীর পাথরের স্তরে পানির উপস্থিতি। মাটির প্রায় ১১ কিলোমিটার গভীরে শিলার সূক্ষ্ম ফাটলে এই পানির সন্ধান পাওয়া যায়।

১২ কিলোমিটারের বেশি গভীরে পৌঁছানোর পর বিজ্ঞানীরা বড় ধরনের কারিগরি ও প্রাকৃতিক বাধার মুখে পড়েন। ধারণার চেয়েও মাটির গভীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকায় (প্রায় ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) প্রচণ্ড তাপে ড্রিলিংয়ের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ নরম হয়ে কাজ করার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। ভূ-গর্ভের অতিরিক্ত চাপে গর্তের ভেতরের দেয়াল বারবার দুমড়েমুচড়ে ও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। প্রযুক্তিগত বাধার পাশাপাশি ১৯৯০ দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। ফলে এই প্রকল্পের অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৯২ সালে স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

কোলা উপদ্বীপে খনন করা এই গর্ত পৃথিবীর মহাদেশীয় ভূ-ত্বকের কেবল তিন ভাগের এক ভাগ। ফলে ভূ-ত্বকের নিচে থাকা হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত ম্যান্টল স্তরের ধারেকাছেও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ৫০ বছর অতিক্রম করার পরও আজ পর্যন্ত অন্য কোনো গবেষণা প্রকল্প এত গভীরে সরাসরি লম্বা গর্ত তৈরি করতে পারেনি।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

পৃথিবী
পৃথিবী। ফাইল ছবি: রয়টার্স