Friday, August 30, 2013

শান্তিতে থাকতে হলে নৌকায় ভোট দিতে হবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শান্তিতে থাকতে হলে নৌকায় ভোট দিতে হবে। যদি দেশের উন্নয়ন চান তাহলে এখনই ভোটের সিদ্ধান্ত নিন। শেখ হাসিনা গতকাল সকালে এক সফরে চট্টগ্রাম আসেন।

আক্রান্ত হলে জবাব দেবে সিরিয়া - সিরিয়া পরিস্থিতি: সর্বশেষ

সিরিয়ায় আগ্রাসী হামলা চালানো হলে তার যথোপযুক্ত জবাব দেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডন থেকে পাওয়া সব তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সিরিয়ায় সামরিক হামলা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

‘যার পুরোটাই নকল তারই উড়ে যাওয়ার ভয়’ - শেখ হাসিনা

আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আবারও নৌকা মার্কায় ভোট চাইলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমার বাবা (বঙ্গবন্ধু) মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেভাবে জীবন দিয়েছেন ঠিক সেভাবে আমাকে যদি বুকের রক্ত দিতে হয় তাহলেও পিছপা হব না।

শিগগিরই শেখ হাসিনার গণেশ উল্টে যাবে- বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, জনগণ রাস্তায় নামলে শিগগিরই শেখ হাসিনার গণেশ উল্টে যাবে। এমনকি সংসদে নাম লেখানোর মতো কেউ না-ও থাকতে পারে।

সিরিয়া: একটি সংকট ফিরিস্তি by কামরুল হাসান কাইউম

২১ আগস্ট ২০১৩ সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের উপকন্ঠে রাসায়নিক অস্ত্র হামলায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটে বলে দাবি করে বসে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বিরোধীরা।

সিরিয়ার সেনা সামর্থ্য

পশ্চিমাদের হামলা প্রতিহত করার ঘোষণা দৃঢ়ভাবেই দিয়েছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়ালিদ মুয়াল্লেমও বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চমকে দেওয়ার মতো।’

প্রাপ্তবয়স্ক কমেডিতে মুগ্ধ জেনেলিয়া!

আগামী মাসেই মুক্তি পেতে যাচ্ছে রিতেশ দেশমুখ, বিবের ওবেরয় এবং আফতাব অভিনীত ছবি ‘গ্র্যান্ড মাস্তি’। এটি মূলত ‘মাস্তি’ ছবির সিক্যুয়াল। এ তিন অভিনেতা অভিনীত কমেডি ছবি ‘মাস্তি’ ছিল সুপারহিট।

৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রের হাত ধরে পালালো ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী, অতঃপর বিয়ে

গোপালপুরে ডুবাইল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র নুর আলম (১২)-এর হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় ডুবাইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী খাদিজা আক্তার।

পররাষ্ট্রনীতি ও দেশের ভাবমূর্তি by মুহাম্মদ রুহুল আমীন

অদক্ষ জনবল, ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, ভ্রান্ত কূটনীতি, অপর্যাপ্ত গবেষণা, লক্ষ্যহীন প্রাধিকার, সর্বোপরি বিপর্যস্ত ভাবমূর্তি ইত্যাদি নানা কারণে বাংলাদেশে বৈদেশিক সম্পর্কের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে উঠতে পারেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর প্রায় অর্ধশতাব্দী হতে চললেও এখনও আমরা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ও ক্রিয়াশীল উপাদানগুলোকে (ধপঃড়ৎং) যেমন চিহ্নিত করতে পারিনি, তেমনি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নির্ধারণ করতেও ব্যর্থ হয়েছি। কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি বা বৈদেশিক সম্পর্কের মূল লক্ষ্য হল, দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো দেশ তার রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ অর্জনের জন্য বজ্র পররাষ্ট্রনীতি (হার্ড ফরেন পলিসি) গ্রহণ করে থাকে। আবার অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ অর্জনের জন্য ওই দেশই নম্র পররাষ্ট্রনীতি (সফ্ট ফরেন পলিসি) অনুসরণ করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নম্র বিষয়গুলো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ নম্র পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জিত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বজ্র পররাষ্ট্রনীতি অর্জিত হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের ওপর সমধিক গুরুত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পররাষ্ট্রনীতি প্রণীত হয়। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক দৈন্যের কারণে সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক উৎস থেকে প্রত্যাশিত ও প্রতিশ্র“ত সাহায্য প্রাপ্তিতে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। এমন এক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী, মুসলিম বিশ্বসহ অন্যান্য বৈদেশিক উৎস থেকে সাহায্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
সামরিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের যুগসন্ধিক্ষণে সরকার ও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি রক্ষণশীলতার পরিবর্তে পররাষ্ট্রনীতির বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়া প্রণয়ন করেন। সমাজতান্ত্রিক সূত্রসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দাতা দেশ থেকে বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। ফলে স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের অন্তর্মুখী দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা নিয়ে এসেছিল, তা বিদূরিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ বহির্মুখী উন্নয়নকেন্দ্রিক শিল্পায়নের পথে অগ্রসর হয়। জিয়ার বৈশ্বিক অন্তর্দর্শন পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় জিয়া উপলব্ধি করেন, নিছক স্নায়ুযুদ্ধকালীন সামরিক-রাজনৈতিক শত্র“তার উপলব্ধি থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের খণ্ডিত কোনো অংশের সঙ্গে সম্পর্ক রচনা করলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে শক্তিশালী করা দুরূহ হবে। সেজন্য তিনি উদীয়মান বৈশ্বিকতার (এমার্জিং গ্লোবালিটি) প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্নিহিত কাঠামোতে তা অন্তর্ভুক্তির কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রগতিমুখী ধারা প্রবর্তন করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এরপর আর বৈদেশিক সাহায্যের ওপর স্থবির হয়ে পড়ে না থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করতে থাকে। শিল্প-কারখানা ব্যাপকভাবে বিরাষ্ট্রীয়করণ করে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তিনি উন্মুক্ত কূটনীতি শুরু করেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে যে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়, তা জিয়ার বহুমুখীকরণ নীতির কারণে দূর হতে থাকে। ধীরে ধীরে বিদেশে দেশের সুউচ্চ ভাবমূর্তি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করে। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বে আমাদের নব-অর্জিত মর্যাদা সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক কূটনীতির নবদিগন্তের সূচনা করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরলস পরিশ্রম করে এমনভাবে বৈদেশিক শ্রমবাজারের সম্ভাবনা জাগরিত করে, যা পরে বাংলাদেশের জিডিপির সিংহভাগ দখল করে নেয়।
জিয়া-পরবর্তী শাসনকালে আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারা চালু রাখার নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও বিভিন্ন কারণে আমাদের বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদার হয়নি। এক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি বারবার সামনে চলে এসেছে। আশির দশকের সামরিক শাসনের পর নব্বইয়ের দশক থেকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নবতর যাত্রা শুরু হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন গতিময়তা পরিলক্ষিত হয়নি। রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক আদর্শের মতভিন্নতা আমাদের জাতীয় ঐক্যকে ঠুনকো ও নড়বড়ে করে দেয়, যে কারণে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঐক্য ধরে রাখতে আমরা ব্যর্থ হই। পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ঐক্য ও অবিভাজনের ধারণা ও প্রত্যয়ের প্রয়োজন ছিল, তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নিপুণতার চেয়ে দলীয় বিবেচনার অগ্রাধিকারই লক্ষ্য করা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোও হীন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। ফলে পররাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলাদলি পররাষ্ট্রনীতিকে গ্রাস করার ফলে বিদেশে এক ধরনের নেতিবাচক ভাবমূর্তির সৃষ্টি হয়। তাছাড়া গণতন্ত্রায়ন, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু প্রভৃতি ইস্যুতে আমাদের ক্রমক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ ও হঠকারী নীতি বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে মারাত্মকভাবে। আমাদের ভাবমূর্তি বিপর্যয়ে পড়ার নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে। পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতি-ষড়যন্ত্র, শেয়ারবাজার ও ব্যাংক কেলেংকারি, তাজরিন গার্মেন্ট ও রানা প্লাজার ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জিএসপি বাতিল, রাজনৈতিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বিচারবহির্ভূত খুন-গুম, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক দলন-পীড়ন প্রভৃতি অভ্যন্তরীণ ইস্যু আন্তর্জাতিক বলয়ে আলোড়িত-আন্দোলিত হয়ে বাংলাদেশের এমন এক ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের বৈদেশিক লক্ষ্যগুলো অর্জনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে পুনঃশক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আমাদের বৈদেশিক ইস্যু এবং পররাষ্ট্র সম্পর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলোর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। এ ব্যাপারে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হল, আমাদের বিপর্যস্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। সব ধরনের দলাদলি ও মতপার্থক্য সত্ত্বেও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা সময়ের দাবি। পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিনিয়ত গবেষণা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক, অধ্যাপক, পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সংঘ (অ্যাডভাইজারি সেল) গঠন করা যেতে পারে। পররাষ্ট্রিক ইস্যুগুলোতে প্রতিনিয়ত সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে আলোচনা-পর্যালোচনা করে যোগ্য, ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ উন্মুক্ত রাখা উচিত। বিশ্বায়নের এ যুগে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার অবারিত সম্ভাবনা জাগরিত রাখতে প্রত্যেক নাগরিক বিশেষ করে বৈদেশিক বলয়ের সবাইকেই শুভেচ্ছাদূতের ভূমিকায় সর্বদা তৈরি থাকতে হবে। আমাদের সঙ্গীতশিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, অধ্যাপক, সাংবাদিক, সর্বোপরি সব নাগরিককে নিজ নিজ স্থানে থেকে এমন শুভেচ্ছাদূতের ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে আমরা ভাবমূর্তি বিপর্যয় কাটিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিনিয়ত সাফল্য অর্জন করতে পারি।
মুহাম্মদ রুহুল আমীন : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সিরিয়ায় যুদ্ধের ভেতর যুদ্ধ by মিজান মল্লিক

সিরিয়ার সরকারবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) অন্যতম শীর্ষ নেতা কামাল হামামিকে সম্প্রতি হত্যা করেছে জিহাদিরা।

গৃহযুদ্ধের পথে যাচ্ছে মিসর? by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

তাহলে কি সত্যিই আরব বসন্তের কবর রচিত হলো মিসরে? মাত্র বছর দুয়েক আগে গণবিক্ষোভের মুখে পতন হয়েছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের।

সোনারামের ঢোল by জাহেদ মোতালেব

সোনারাম ঢোল বাজায়। আঙুল দিয়ে সুর তোলে। ঢোলের চামড়ায় তার দুঃখগুলো মিশিয়ে দেয়: ‘টাগ ডুমা ডুম ডুম/চোখজুড়ে আয় ঘুম।’

নজরুলের বিচার আমাদের ভ্রান্তি by কুদরত-ই-হুদা

বাংলাভাষী মানুষ কবি নজরুল বলতে যে নজরুলকে সাধারণভাবে বুঝে থাকেন, সেই নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২২ সালে অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে।

সাক্ষাৎকার- আমার কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হলো সবার ওপরে ভারত: নরেন্দ্র মোদি

আগামী বছর অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দলীয় প্রচারাভিযানের প্রধান করেছে বিতর্কিত নেতা নরেন্দ্র মোদিকে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন আলোচনা- সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রেখা? by আশিস আচার্য

ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক বৈঠকের শুরুতে ইসরায়েলের বিচারমন্ত্রী সিপি লিভনি বলেছিলেন, ‘আসুন, আমরা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় না, এমন মানুষে পরিণত হই।’

টুটুলের অ্যাংরি বার্ডস by মাহফুজ রহমান

টুটুলের বড় আপুর নাম শিলা। টুটুল ডাকে চিলা! ‘চিল’-এর সঙ্গে ‘আ’-কার যোগ করে চিলা। শিলা যখন সামনে থাকে না, টুটুল তখন ওকে ডাকে চিলাপু বলে।

সিরিয়া সংকট- চ্যালেঞ্জের নাম রাসায়নিক অস্ত্র by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাষায়, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছেন।

সিরিয়া অভিযানে ক্যামেরনকে বিমুখ করলেন এমপিরা

সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের প্রস্তাবে সায় দেয়নি দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্স।

কেন সিরিয়ার পক্ষে রাশিয়া, চীন by শরিফুল ইসলাম

সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে স্নায়ু যুদ্ধের কবর রচিত হলেও আসলে স্নায়ু যুদ্ধের আসল মৃত্যু ঘটেনি।

রতিসুখসারলীলা

বয়ঃসন্ধি কালে ছেলেরা কি শুধু শরীর দিয়ে, মন দিয়ে সন্ধিমুহূর্তের কথাই ভাবে? তখন কি বয়সে বড় রমণীদের সঙ্গেও চলে তাদের আদরসুখ-উদযাপন?

ম্যারাডোনার ‘অতিরিক্ত’ নারী প্রীতিতে বিরক্ত দুবাইবাসী

অতিরিক্ত নারী প্রীতির কারণে দুবাইবাসীদের নিকট সমালোচিত হচ্ছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ডিয়াগো ম্যারাডোনা।

ক্যাটের জন্মদিনে রণবীরের নিবেদন!

রণবীর ও ক্যাটরিনার প্রেমের খবর বলিউড পাড়ার সর্বশেষ আলোচিত গুঞ্জণ। আর সম্প্রতি ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমের খবরে সবাই নড়েচড়ে বসেছেন।

কে জানাবে সিরিয়ার প্রকৃত চিত্র?

ইরাক-আফগানিস্তানের মতো সম্ভবত আরেকটি যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী। বরাবরের মতো এবারও আলোচনায় মিডিয়া।

নজরুলের বিচার আমাদের ভ্রান্তি by কুদরত-ই-হু

নজরুল
বাংলাভাষী মানুষ কবি নজরুল বলতে যে নজরুলকে সাধারণভাবে বুঝে থাকেন, সেই নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২২ সালে অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। তখন তাঁর বয়স তেইশ বছর। তেইশ বছর বয়সী এই কবির আবির্ভাব বাংলা কাব্যজগতে বেশ একটা অস্বস্তি তৈরি করে। এই অস্বস্তির কারণ কেবল তাঁর কবিতা নয়, স্বয়ং তাঁর কবিতার নন্দনতত্ত্ব। এতকাল বাঙালি কাব্যপাঠক কবিতা বলতে যা বুঝতেন, সেই ধারণার সঙ্গে নজরুলের কবিতা ঠিক খাপ খাচ্ছিল না—না বিষয়গত দিক থেকে, না প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে। ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর যে ইতিহাস, সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নজরুলের কবিতা রক্ষা করেনি। নজরুলের যে কাব্যসাধনা, তা নিঃসন্দেহে দাবি করে এক নতুন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনা। কিন্তু নজরুলের সমকালীন এবং পরকালীন অধিকাংশ সমালোচকই নতুন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনায় যাননি। তাঁরা অধিকাংশ সময় নজরুলকে প্রথাগত নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠিতে মেপে হয় তাঁকে খাটো করেছেন, নয়তো বলেছেন, নজরুল বাংলা কাব্যে এক নতুন সুর ও স্বরের বার্তা ধ্বনিত করেছেন। নজরুল-মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রায় সব সমালোচকই ‘আধুনিক’ বাংলা কাব্য-বিবেচনার যে মাপকাঠি বা নন্দনতত্ত্ব তাকেই প্রয়োগ করেছেন।
এই ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের ধারণা উপনিবেশের হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি ‘পশ্চিমি আধুনিক’ সাহিত্যের রুচি ও চেতনা নিয়ে বাংলা সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ফলে এর নন্দনতত্ত্বও ইউরোপ থেকে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। এই নন্দনতত্ত্বের প্রধান শর্তই হচ্ছে সাহিত্যকে বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা। শৈল্পিক সুষমা তৈরি, মানসিক আনন্দ প্রদান আর মহৎ মনের প্রতিফলন ঘটানোই সাহিত্য-বিবেচনার এবং সাহিত্য রচনার মূল উদ্দেশ্য। বুর্জোয়া জীবনের ফিটফাট ‘আধুনিক’ বুর্জোয়া সাহিত্যের শর্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের এই ধারণার মধ্য দিয়েই উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ের বাংলা সাহিত্য এবং সাহিত্য-সমালোচনা বেড়ে উঠেছে। ফলে, এই প্রথাগত ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠি যখনই নজরুলের মূলধারার কাব্য-কবিতার মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন, তখনই তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ করেছেন যে, নজরুলের কাব্য-সাহিত্য সেই মানদণ্ডের একদম নিচে পড়ে থাকে। এ রকম কাজ অনেকেই করেছেন। কাজী আবদুল ওদুদ, বুদ্ধদেব বসু, এমনকি হালের হুমায়ুন আজাদ। ওদুদ ১৯৪১-এ লিখিত তাঁর ‘নজরুল ইসলাম’ শিরোনামের প্রবন্ধে বললেন, ‘নজরুলের কবিতায় যে তারুণ্য রূপ পেয়েছে তার সাহিত্যিক মর্যাদা কেমন, সেটিও একটি বড় অনুধাবনের বিষয়। একটু মনোযোগী হলেই চোখে পড়ে, নজরুলের রচনা, বিশেষ করে তাঁর বিদ্রোহী যুগের রচনা অনবদ্য নয়। শ্রেষ্ঠ কবিদের বিশেষ বিশেষ কবিতায় কবি-কল্পনার যে পূর্ণাঙ্গতা প্রকাশ পায়, নজরুলের রচনায় সেটির অভাব মাঝে মাঝে প্রায় বেদনাদায়ক হয়েছে।’
নজরুলের মধ্যে ওদুদ ‘বুর্জোয়া ফিটফাট’-এর খোঁজ করেছেন। নজরুলবিষয়ক তাঁর লেখা তিনটি প্রবন্ধেই তিনি মহৎ কবির উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ। বারবার তিনি নজরুলের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। অনেকে এ জন্য ওদুদকে দোষারোপ করেন। যেমন, আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর নজরুল: কালজ কালোত্তর গ্রন্থে ওদুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এটি ওদুদের সমস্যা নয়। এটি মূলত নন্দনতত্ত্বের সমস্যা। ওদুদ-ঘরানা ছাড়াও নজরুলের আরও একধরনের মূল্যায়ন চালু আছে। সেটিকে আমরা বলতে পারি দায়হীন মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন নজরুলের নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যায়নের দায়িত্ব নেয় না; বরং নজরুলের স্বর ও সুরের ভিন্নতা বিষয়ে উচ্ছ্বসিত হয়, কিন্তু সেই ভিন্নতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্মাণ করে না। নজরুলের জন্য যে ভিন্ন কাব্যপাঠ-ব্যাকরণের প্রয়োজন, সেই ব্যাকরণিক সূত্র নির্দেশ করে না। অথচ ভিন্ন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনা ছাড়া নজরুলকে সম্যকভাবে পাঠ সম্ভব নয়। সেই নন্দনতত্ত্বটি কী—কবির নিজের ভাষ্য এবং তাঁর কাব্যপ্রবণতা পর্যালোচনা করে তার একটি রূপরেখা হাজির করা যেতে পারে। নজরুল সাহিত্যকে নিছক আনন্দ আর সৌন্দর্য সৃষ্টির ক্ষেত্র মনে করতেন না। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব হয়েছে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল’ বন্ধ করার দায়িত্ব নিয়ে। নজরুলের আগের প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর কাব্য তার মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর মর্মে পশ্চিম থেকে আগত রোমান্টিক আনন্দ-বেদনা আবিষ্কারের ও প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিল। ওই কবিতা তার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর গ্লানিময় ইতিহাসকে, অবমাননাকে রুখে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়নি।
দায়িত্ব নিয়েছিল ইউরোপীয় নতুন ভাব-কল্পনাকে ভাষা দেওয়ার। এ কারণে এসব কবিকে আবিষ্কার করতে হয়েছিল বাংলা শব্দের ছদ্মাবরণে ইউরোপীয় অর্থে মার্জিত ভাষাকাঠামো। কিন্তু নজরুল তো সে পথের পথিক ছিলেন না। দীর্ঘকাল থেকে জমে ওঠা জঞ্জাল সাফ করতে যেমন বহু মানুষের সমবায়ী প্রচেষ্টা দরকার হয়, তিনিও তেমনি বহু মানুষের মুখের ভাষাকে আশ্রয় করে কোলাহল-মুখরিত এক কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতা মানেই বহু মানুষের শোরগোল, অসভ্য-অমার্জিত অট্টহাস্য, ধসে পড়ার শব্দ, আসুরিক চিৎকার। সর্বৈব ধ্বংস আর সম্মিলিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃজনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি কাব্যরচনা করেছেন। তাঁর কাব্যবিচারের নন্দনতত্ত্ব সৌন্দর্য ও আনন্দ-সৃজননির্ভর ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা ভাষা যে এত ধারালো, তা তো নজরুলই আবিষ্কার করলেন। সাহিত্য যে প্রতিরোধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, তার উদাহরণও প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। নজরুলের স্বতন্ত্র জীবনদৃষ্টি এবং জীবনবোধের তীব্রতাই তাঁকে স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্বের অনুসন্ধানী করেছে। ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া/ ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া’—এই বাকভঙ্গি এবং শব্দচয়নকে তো বাংলা গদ্য এবং কবিতা ঊনবিংশ শতাব্দীতেই কবর দিয়েছে। বাংলায় ‘আধুনিকতা’ যেমন এর জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক যাপনের ধারাবাহিকতায় দেখা দেয়নি, তেমনি বাংলা কাব্য-সাহিত্যও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিদের হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে গড়াপেটা করা একটা চাপানো ভাষার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে।
নজরুল সেই কাব্য এবং ভাষার মহান আদর্শকে হেঁচকা টানে সদর রাস্তায় নিয়ে এলেন। তিনি কাব্যে আরবি-ফারসি শব্দের বহুল প্রয়োগ করেছেন—এটি তাঁর ভাষাবিচারের ক্ষেত্রে আক্ষরিক কথা। কিন্তু ভাবার্থের কথা হচ্ছে, নজরুল ভাষাকে উদার, মুক্ত এবং গণতান্ত্রিক করে দিলেন; জনবিচ্ছিন্নতার কেটে যাওয়া সূত্র লাগিয়ে জনসম্পৃক্ত করলেন। আহমদ ছফা তাঁর ভাষার মধ্যে এই জনসম্পৃক্তি লক্ষ করেই বলেছেন, ‘নজরুল তার কাব্যভাষা নির্মাণে চলতি ভাষারীতির...দ্বারস্থ হয়েছেন।’ আর ভাষায় গণতান্ত্রিকতার বিষয়ে বলেছেন, ‘নজরুলের কাছে সমগ্র বাঙালী সমাজের ঋণ এই যে, নজরুল বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে বাঙলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে নব বিকাশধারায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে অনেক দূর পর্যন্ত গাঁথুনি নির্মাণ করেছিলেন।’ এর মানে এই নয় যে, নজরুল সংস্কৃত শব্দকে তাঁর কাব্যভাষা থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। তাঁর কাব্যভাষায় প্রচুর সংস্কৃত শব্দ ব্যবহূত হয়েছে, কিন্তু ভাষার ভেতরের আকাশটাকে উদারীকরণ করে, যে-সে-শব্দের প্রবেশ অনুমোদন দিয়ে এবং মৌখিক বাকভঙ্গি ব্যবহার করে তিনি বাংলা কবিতা থেকে চোখ ও কানের দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক সাহিত্য কবিতাকে দৃষ্টি-ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। কবিতাকে শ্রুতির সম্পর্ক থেকে বিচ্যুত করেছিল। নজরুল সেই শ্রুতি-ইন্দ্রিয়কে বাংলা কবিতায় ফিরিয়ে আনলেন। এ কারণে নজরুলের অনেক কবিতা পড়ার সময় সংস্কৃত শব্দের প্রচুরতা একধরনের কাঠিন্য তৈরি করলেও সেই কবিতা যখন কানের কাছে আসে, তখন তা বেশি বোধগম্য ও সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে ছন্দও এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে তাঁর কবিতায়। দেখা যাবে, তাঁর মূলধারার অধিকাংশ কবিতা স্বরবৃত্ত অথবা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। এই ছন্দ গ্রহণের ক্ষেত্রে নজরুলের সঙ্গে আরেক গণসম্পৃক্ত কবি জসীমউদ্দীনের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
কবিতাকে সহজ ও গণগ্রাহ্য করে তোলার জন্য জসীমউদ্দীনও এই সহজবোধ্য ও আরামপাঠ্য স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের পিঠে সওয়ার হয়েছিলেন। যদিও নজরুলের কাব্যে বিষয়ের ও ভাবের ওচড়-মোচড়ের কারণেই স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্য ও নিরীক্ষা অনেক বেশি, যা জসীমউদ্দীন-এ নেই। তবু অক্ষরবৃত্তের নানা নিরীক্ষা এবং তার প্রয়োগ উপেক্ষা করে নজরুল মধ্যযুগের পয়ারের মতোই বোধগম্য ও জনসম্পৃক্ত স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। নজরুল স্পষ্ট কথা বলার পক্ষের লোক। তিনি মনে করেন, ‘স্পষ্ট কথা বলায় একটি অবিনয় নিশ্চয় থাকে; কিন্তু তাতে কষ্ট পাওয়াটা দুর্বলতা।’ বেশি বিনয় ‘মানুষকে ক্রমেই ছোট করে ফেলে, মাথা নীচু করে আনে’—নজরুল এই বিনয়ের বিপক্ষের লোক ছিলেন। তিনি মনে করতেন ‘দেশের যারা শত্রু, দেশের যা-কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি, মেকি তা সব দূর করতে হবে।’ এই কাজ কবির, এই কাজ নজরুলের। জীবনে এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি ‘মেকি’র বিরুদ্ধে। তাঁর নিজের লেখার ভেতরবাড়ির স্বরূপ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার লেখায় ফুটে উঠেছে সত্য, তেজ আর প্রাণ।’ নিজেকে তিনি মনে করতেন ‘সত্য প্রকাশের যন্ত্র’। ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’ই নজরুল-নন্দনতত্ত্বের অন্যতম নিয়ামক। এ ছাড়া ‘যে ভাষা-শৃঙ্খলে আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তাতেই আছে অসংখ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো—জ্ঞানের, শৃঙ্খলার, সংযমের, সভ্যতার। এগুলোই আমাদের সংকোচে বিহ্বল করে রাখে। আমরা এগুলোকেই নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ করতে থাকি, কদাচ ভেঙে তৈরি করি নতুন কাঠামো।
জন্মসূত্রে, শিক্ষাসূত্রে, জীবনযাপনসূত্রে, আর মনের বিশিষ্ট গড়নের কারণে নজরুল নিয়ন্ত্রক-কাঠামোগুলোর বাইরে থেকেছেন।’ (মোহম্মদ আজম, সাহিত্য পত্রিকা, বাংলা বিভাগ, ঢা.বি, বর্ষ-৫০, সংখ্যা-২-৩) উপর্যুক্ত জীবনচেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, বেড়ে ওঠা, ঘোষণা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলা কবিতায় আর কেউ আবির্ভূত হননি। এসব কারণে নজরুলের নন্দনতত্ত্বের মধ্যে বহু মানুষের সমাগম এবং তাদের কল্যাণের মতো মাপকাঠি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিগত ভোগ-উপভোগের যে সাহিত্যতত্ত্ব, তার বদলে নজরুলে প্রযুক্ত হয়েছে সম্মিলিত ভোগ-উপভোগ এবং জাগরণের তত্ত্ব। ভাবে-ভাষায়-প্রকাশে এই নন্দনতত্ত্ব অকৃত্রিমতার পক্ষপাতী। বুর্জোয়া-জীবনের মতো সাহিত্যে ‘বুর্জোয়া ফিটফাট’ তাঁর নন্দনতত্ত্বের আওতায় সম্পূর্ণভাবে আঁটে না। এ কারণেই নজরুলের কাব্যপ্রবাহ তৈরি করেছে উপনিবেশবিরোধী এক নতুন নন্দনতত্ত্ব। নন্দনতত্ত্বের এই ভিন্নতা লক্ষ করে আল মাহমুদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘র্যাঁবো যেমন গল জাতির কাব্যবিচার ও সৌন্দর্যতত্ত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি নজরুলও বাংলা ভাষাভাষী দ্রাবিড় ভেড্ডিড রক্তমিশ্রিত একটি বিরাট মানবগোষ্ঠীর প্রচলিত উপমা পদ্ধতির শৃঙ্খলাকে তোলপাড় করে দিয়েছিলেন।’ আল মাহমুদ কথিত ‘প্রচলিত উপমা পদ্ধতি’-ই হচ্ছে ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে আসা ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্ব। নজরুল এই ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের বাইরে গিয়ে ‘দ্রাবিড় ভেড্ডিড রক্তমিশ্রিত একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর’ জন্য তার নিজস্ব একটি নন্দনতত্ত্ব হাজির করেছেন, যার নামকরণ করা যায় বাঙালিয়ানা নন্দনতত্ত্ব।

চির উন্নত শির তুর্কি দৃষ্টান্ত by শান্তনু কায়সার

নজরুলকে যদি একক কোনো অভিধায় চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁকে বলতে হবে ‘উন্নত, চির উন্নত শির’। ‘বিদ্রোহী’র শুরুতেই কবি বলছেন: ‘বল বীর—/বল উন্নত মম শির!’ নতজানু না হওয়ার অনমনীয় দৃঢ়তার নামই কাজী নজরুল ইসলাম। ঔপনিবেশিক ভারত ও বাংলায় যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে যাঁর আবির্ভাব ও বিকাশ, তিনি সেই বাস্তবতাকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন যে তা তাঁকে একই সঙ্গে স্বদেশের মৃত্তিকায় গভীরভাবে প্রোথিত ও আন্তর্জাতিক চেতনায় ঋদ্ধ করেছে। এ ক্ষেত্রে তুরস্ক, তার প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর এবং কামাল পাশা—এই ত্রয়ী উপাদান কবির কাব্য ও সাহিত্যরচনা, তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা এবং উপলব্ধিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি যেমন ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার’-এর মতো কবিতা লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ‘কামাল’-এর মতো প্রবন্ধ। লিখেছেন ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা।’পৌরুষ ও দার্ঢ্যের যোগফল কামাল পাশাকে কবির কাছে মনে হয়েছে ‘একটা ছেলের মতো বেটাছেলে।’ কাপুরুষতা ও ভিরুতা দিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শৃঙ্খলমুক্ত করা যে সম্ভব নয়, সেটা কবি ভালোভাবেই জানতেন। বিশ্বের যেদিকেই তাকান ‘মাদিই দেখি’ বাস্তবতায় ‘মদ্দা পুরুষ’ কামাল যখন তাঁর ‘বিশ্বত্রাস মহা তরবারি’ নিয়ে সামাল সামাল করে ‘রোজ কেয়ামতের ঝঙ্কার, রুদ্রের মহারোষের মত’ এসে হাজির হন, নজরুলের তখন তাঁকে স্বাগত না জানিয়ে উপায় থাকে না।
বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের শুরুতে নজরুল যেমন ‘বিদ্রোহী’ লিখে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা করেন, তেমনি কামাল পাশাও তুরস্কে তাঁর ঝড়ের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে নিজের দেশের বাস্তব ও মনোজাগতিক পরিবর্তনে এক প্রবল অভিঘাতের সৃষ্টি করেন। নজরুলের মনে হয়, এ হচ্ছে বাপের সেই সুপুত্তুর ছেলে, ইংরেজের অধীনে নির্যাতিত ভারতবর্ষের জন্য যে খুবই প্রাসঙ্গিক: ‘ইচ্ছে করছে খুশির চোটে তার পায়ের কাছে বসে পড়ে নিজের বুকে নিজেই খঞ্জর বসিয়ে দিই।’ ‘আল্লার আরশ কাঁপাতে হলে হাইদরি হাঁক চাই, মারের চোটে স্রষ্টারও পিলে চমকিয়ে দেওয়া চাই,’—‘ইসলামের বিশেষত্ব তলোয়ার।’ কবির মনে হয়, স্কন্ধে হল নিয়ে বলরাম বেরিয়ে পড়েছেন। কামাল যেন ‘বিদ্রোহী’তে উল্লিখিত সেই ভৃগু—যে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতেও দ্বিধা করে না। ফলে তুরস্কে কামালের আবির্ভাব ভারতবর্ষকেও আন্দোলিত করে, যার প্রধান নকিব অথবা তূর্যবাদক হয়ে ওঠেন নজরুল। সে কারণে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণায় ‘বিদ্রোহী’র সঙ্গে ‘কামাল পাশা’ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবিতা হয়ে ওঠে। ‘কামাল পাশা’য় কবি বলেন: ‘সাব্বাস ভাই! সাব্বাস দিই, সাব্বাস তোর সমসেরে।/পাঠিয়ে দিলে দুশমন সব যম-ঘর একদম সে রে।/বল দেখি ভাই, বল হ্যাঁরে/দুনিয়ায় কে ডর করে না তুর্কির তেজ তলোয়ারে!’ কিন্তু এর অধিকতর তাৎপর্য অন্যত্র, যেখানে ঔপনিবেশিক স্বদেশে তার বিরুদ্ধে লড়ার অন্যতম প্রধান প্রেরণা তুর্কি পরিবর্তন ও তার নেতা। কবিতার দুটি অংশে তা খুবই সোচ্চার ও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক: ‘পরের মুলুক লুট করে খায়, ডাকাত তারা ডাকাত।/তাদের তরে বরাদ্দ ভাই, আঘাত শুধু আঘাত।/আজাদ মুলুক বন্দী করে, অধীন করে স্বাধীন দেশ,/কুল মুলুকের কুষ্টি করে জোর দেখালে কদিন বেশ/মোদের হাতে তুর্কি নাচন নাচলে তাধিন তাধিন শেষ!’ 
সত্যবাণী’ প্রবন্ধে তিনি যেমন ‘নব্য তুর্কি তরুণদের দেখে’ তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার কথা বলেছেন, বলেছেন ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’-এর দীক্ষা নিতে, সেই প্রেরণাই যেন তাঁর কবিতায় ভাষা পেয়েছে, ‘থাকলে স্বাধীন সবাই আছি, নেই তো নাই, নেই তো নাই।/এই তো চাই!!’ তাই তিনি এ প্রবন্ধে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করে বলেছেন, ‘যদিও তুমি সর্বস্বহারা হও, কোথাও তোমার মাথা গুঁজিবার ঠাঁই না থাকে, কুছ পরোয়া নেই, তোমার মাথা নত করিও না।’ দেশ যখন স্বাধীন নয়, অত্যাচারীর হাতে বন্দী; তখন ‘ধূমকেতু’তে কবি যেমন বলেছেন, নরককে ফুঁ দিয়ে নেভাতে ও মৃত্যুর মুখে থুতু দিতে হবে—তেমনি বিধি ও বিধানে লাথি মেরে বিধাতার বুকে হাতুড়ি চালাতেও বাধা নেই। পরাধীনতার জ্বালায় সত্য কবির পক্ষেই তাই বলা সম্ভব: ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু—ওই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।’ তুর্কি বিপ্লব ও কামালের মধ্যে নজরুল সেই উদাহরণ খুঁজে পেয়েছিলেন। সে কারণে ‘ভাববার কথা’য় তিনি মায়ের ‘ভুবনেশ্বরী মূর্তি’ নয়, তার ‘মৃত্যুরূপা কালী’ রূপ দর্শন করেছেন। এ জন্য ‘ধূমকেতুর আদি-উদয় স্মৃতি’তে তিনি এর অকল্যাণকেই প্রধান করে তুলেছেন, “ধূমকেতু” তাহাদের বাণী লইয়া আসিয়াছিল—যাহাদের গৃহী আশ্রয় দিতে ভয় পায়, গ্রহণ বলে ব্যাঘ্র যাহাদের পথ দেখায়, ফণি তাহার মণি জ্বালাইয়া যাহাদের পথের দিশারী হয়, পিতামাতার স্নেহ যাহাদের দেখিয়া ভয়ে তুহিন-শীতল হইয়া যায়।’ স্বাধীন হওয়ার জন্য কঠিনের এই সাধনা ছাড়া কোনো পথ নেই। আর যিনি নিজে স্বাধীন নন, তার পক্ষে অন্যকে কিংবা জাতিকে স্বাধীন করা সম্ভব নয়। ঔপনিবেশিক দেশে তো নয়ই, ‘স্বাধীন’ দেশেও নয়, যেখানে উপনিবেশের নানা শৃঙ্খল অথবা লক্ষণ সক্রিয় অথবা প্রচ্ছন্ন রয়েছে।
২. কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুর পর ১৩৪৫-এর ৬ অগ্রহায়ণ আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর চরিত্রবৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে ওই নামাঙ্কিত প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তাতে কামালের ভূমিকার অন্য অনন্যবৈশিষ্ট্যটি বোঝা যায়: ‘তুর্কিকে তিনি যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছেন, সেইটেই সবচেয়ে বড় কথা নয়, তিনি তুর্কিকে তার অন্তর্নিহিত বিপন্নতা থেকে মুক্ত করেছেন। মুসলমান ধর্মের প্রচণ্ড আবেগের আবর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে ধর্মের অন্ধতাকে প্রবলভাবে তিনি অস্বীকার করেছেন। যে অন্ধতা ধর্মেরই সবচেয়ে বড় শত্রু, তাকে পরাভূত করে তিনি কী করে অক্ষত ছিলেন, আমরা আশ্চর্য হয়ে তাই ভাবি। তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছেন, সে বীরত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্লভ। বুদ্ধির গৌরবে অন্ধতাকে দমন করা তাঁর সবচাইতে বড় মহত্ত্ব, বড় দৃষ্টান্ত।’ তিনি কখনো তাঁর ‘সংকল্পকে বিচলিত হতে দেন না।’ আমাদের ক্ষেত্রে তাঁর প্রাসঙ্গিকতাকে উল্লেখ করে কবি লিখেছেন, ‘তিনি যে কেবল তুর্কিকে শক্তি দিয়েছেন তা তো নয়, সেই শক্তিরথের চক্রঘর্ঘর ভারতবর্ষের ভূমিকেও কাঁপিয়ে তুলছেন।’ নজরুল যে বলেছেন ‘কামাল! তুনে কামাল কিয়া ভাই’ তা তিনি শুধু বাস্তবেই করেননি, বৌদ্ধিক ও মনোজগতেও কামাল করে দেখিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। তুরস্কে একবার একটি ভজনালয় নিয়ে সেটি গির্জা না মসজিদ, সে বিতর্ক দেখা দিলে কামাল আতাতুর্ক তাকে জাদুঘরে পরিণত করেন। রামমন্দির-বাবরি মসজিদকে রাজনৈতিক বা অন্যভাবে ব্যবহারের ভুল দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, কামাল পাশা কতটা বাস্তবতাবোধসম্পন্ন পরিচ্ছন্ন দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন।  এর মর্ম অনুসরণে নজরুল ‘উমর ফারুক’ কবিতায় যা লেখেন, তা থেকে বোঝা যায়, সামন্ত মানসিকতার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে কবি এ ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন: ‘সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করি শত্রু-গির্জা ঘরে/বলিলে, “বাহিরে যাইতে হইবে, এবার নামাজ তরে।”/কহে পুরোহিত, “আমাদের এই আঙিনায় গির্জায়/পড়িলে নামাজ হবে না কবুল আল্লার দরগায়?”/ হাসিয়া বলিলে, “তার তরে নয়, আমি যদি হেথা আজ/নামাজ আদায় করি তবে কাল অন্ধ লোক-সমাজ/ ভাবিবে,—খলিফা করেছে ইশারা হেথায় নামাজ পড়ি/আজ হতে যেন এই গির্জারে মোরা মসজিদ করি। ইসলামের এ নহেক ধর্ম, নহে খোদার বিধান/কারু মন্দির-গির্জারে করে মজিদ মুসলমান।”’
৩. রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্বোক্ত প্রবন্ধে আরও বলেছিলেন, ‘এশিয়ার পাশ্চাত্যতম ভূখণ্ডে দেখলুম তুর্কি—যাকে য়ূরোপে Sick-man of Europe বলে অবজ্ঞা করত, সে কীরকম প্রবল শক্তিতে অসম্মানের বাঁধন ছিন্ন করে ফেলল।’ কিন্তু এ তো সহজে হওয়ার কথা নয়। ক্রুসেডের তিক্ত স্মৃতি ইউরোপ অথবা খ্রিষ্টান জগৎ খুব সহজে মেনে নেয়নি অথবা ভুলতে পারেনি। সে কারণে শেকসিপয়ার কিংবা আমাদের শওকত আলীর নাট্য অথবা উপন্যাসে এর স্বাক্ষর রয়েছে। শেকসিপয়ার ও শওকত আলী উভয়ই নেতিবাচক দিক থেকে নয়, বাস্তবতা হিসেবেই বিষয়টির উল্লেখ ও তার ব্যবহার করেছেন। তবু সত্য, পাশ্চাত্য দৃষ্টি ও তার উপনিবেশ। শেকসিপয়ারের ওথেলোয় ইয়াগো যে বলে—‘বিলিভ ইট, অর এলস আই অ্যাম এ টার্ক’ অথবা হ্যামলেট যে বলে—‘ইফ মাই ফরচুনস টার্ন টার্ক’—এই দুই দৃষ্টান্ত এবং শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর চরিত্র যে বলে—‘এরা হচ্ছে তুর্ক, কখন যে তোমার বউটিকে তুলে নিয়ে যাবে, টেরও পাবে না’—তা থেকে ওই দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর নজরুল-বিদ্বেষ তাঁর গুরু মোহিতলাল মজুমদারের সূত্রে ছিল যথেষ্ট দৃঢ়। কিন্তু তিনি যখন তাঁর বই দাই হ্যান্ড গ্রেট অ্যানার্ক! ইন্ডিয়া ১৯২১-১৯৫২-এর বর্ণনানুসারে কলকাতায় তাঁর ৪৯ নম্বর মির্জাপুর স্ট্রিটের বাসায় বসে কিছু লোকের কণ্ঠে ‘কামাল পাশা’ শুনে বিরক্ত বোধ করেন, তখন সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁর দাস্য মনোভাবের সঙ্গে উপনিবেশের মোহ ও তার প্রতি তাঁর অতিভক্তিও টের পাওয়া যায়। এই মনোভাব তাঁকে যেমন ১৯৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের তোষামোদ করতে প্ররোচিত করেছে, তেমনি বিপরীতভাবে নিজে মূক হলেও নজরুলের রচনা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আমাদের ন্যায়ের যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মূঢ়তা থেকে মুক্তির মন্ত্রে যে কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুতে ছিল সমগ্র এশিয়ার শোক, বাংলাদেশের জন্মের চার দশক এবং নজরুলের মৃত্যুর তিন দশকের পর বেশ সময় পেরিয়ে আমরা কোথায় এসে পৌঁছেছি? এই জিজ্ঞাসার সৎ ও সঠিক জবাব দিতে না পারলে কোনো কবিই কি আমাদের ক্ষমা করবেন?