Thursday, March 5, 2020
সর্বত্রই শিক্ষা বঞ্চিত রোহিঙ্গা শিশুরা by ফিলিপ্পা এইচ স্টিওয়ার্ট ও বিল ভ্যান এসভেল্ড

এসব শিশু ও তাদের পরিবারগুলো বাংলাদেশী পরিচয় সংগ্রহের চেষ্টা করেছে। কারণ, এটিই হলো মাধ্যমিক স্কুলের পড়াশোনা ও তাদের ভবিষ্যত গড়ে তোলার এখন একমাত্র উপায়।
কিন্তু এ উপায়ে যারাই স্কুলে গিয়েছে সেইসব শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে বহিষ্কার করছে কর্তৃপক্ষ। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়েছে এমন কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক বিল ভ্যান এসভেল্ড। এখানে তাদের শুধু দু’জনের কাহিনী তুলে ধরা হলো।
রহিম আর
কান্না চেপে রাখলো রহিম। দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে চেষ্টা করলো তার কাছ থেকে শিক্ষা হারিয়ে যাওয়ার অর্থ কি তা বোঝাতে। সে বললো- আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে যে, আমি রোহিঙ্গা। আমি জানি না এ বছর কি ঘটেছে।
রহিম আর-এর বয়স খুব বেশি হলেও ১৮ বছর। সাক্ষাতকার দেয়ার সময় পরা ছিল তার স্কুলের নির্ধারিত পোশাকÑ একটি সাদা কলারের শার্ট আর নেভি ট্রাউজার। গোঁড়ালির কাছে তা কিছুটা ভাঁজ করা। জানুয়ারিতে একটি দিন ছিল তার কাছে বেদনার। মাত্র কয়েকটি দিন গেলেই সে শেষ করতে পারতো স্কুলে পড়ার শেষ দিনটি কাটাতে। তার আগেই একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক সরকারের কাছ থেকে একটি চিঠি পান। তাতে বলা হয় রোহিঙ্গা সব শিশুকে বহিষ্কার করতে হবে। রহিম বলেছে, ওই চিঠিটি প্রতিটি ক্লাসে জোরে পড়ে শোনানো হয়েছিল। সহপাঠীদের সামনে সব রোহিঙ্গা শিশুকে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। রহিম বলে- এতে আমি ওই মুহূর্তে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গিেিয়ছিলাম। আমি লুকিয়ে ছিলাম এবং কেঁদেছি।
মিয়ানমার থেকে পিতামাতা পালিয়ে বাংলাদেশে আসার ১০ বছর পরে ২০০১ সালে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে রহিম। চার বছর বয়সে সে আশ্রয় শিবিরের ভিতরেই পড়াশোনা শুরু করে। তখন পিতামাতা ও ভাইবোনদের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস করতো। কিন্তু ৫ম শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করার পর সে দেখতে পায় ওই আশ্রয়শিবিরের ভিতরে উপরের শ্রেণিগুলোতে পড়ার আর কোনো সুযোগ নেই। আরো বলা যায়, ওই আশ্রয় শিবিরের ভিতরে শিক্ষার বিষয়টি অনুমোদিত নয়। এর অর্থ হলো আশ্রয়শিবিরের ভিতরে শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারবে। সনদ পাবে। কিন্তু তারা মাধ্যমিক পর্যায়ের কোনো শিক্ষার সুযোগ পাবে না।
রহিমের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই। যখন সে আশ্রয় শিবিরের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এলো, বুঝতে পারলো আশ্রয় শিবিরের বাইরে বাংলাদেশী স্কুলগুলোর কোনোটিতেই তার ৫ বছরের শিক্ষাকে বৈধতা দিচ্ছে না। থমকে গেল রহিম। সে বলেছে, যতদিন আমার মধ্যে স্বপ্ন ছিল যে আমি একজন ডাক্তার হয়ে আমার সম্প্রদায়ের মানুষের সেবা করবো, ততদিন আমি অন্য স্কুলে পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি।
এমনকি যখন তার বয়স ৯ বছর, তখনও তার ভিতর বড় হওয়ার জিদ ছিল। সে বাংলাদেশী স্কুলের শিক্ষায় ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে। এর ফলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার একটি সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে অনুমোদন দেয়া হয়। সে পরীক্ষায় এ-প্লাস স্কোর করে। ভর্তি হয় একটি জুনিয়র হাই স্কুলে। আরো তিন বছর পরে সে অষ্টম শ্রেণির পড়া শেষ করে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায়ও এ-প্লাস স্কোর করে। এরপরে তাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হলো, যাতে সে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারে।
রহিম বলে, আমাদের ওই স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে মাত্র ৫ জন ছাত্র এ-প্লাস পেয়েছে। তাই আরেকটি স্কুলের শিক্ষকরা আমাকে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি করতে রাজি হলেন।
আবার শুরু হয় তার লড়াই। ভাল করার অব্যাহত চাপ তার মধ্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার লক্ষ্য ফাঁদে আটকে গেল। ২৮ শে জানুয়ারি তার আশা থমকে গেল। এখন সে তার ছোট ভাইবোনকে পড়ায়। পড়ায় আশ্রয় শিবিরের একটি স্কুলে আরো প্রায় ২০টি শিশুকে। তবুও সে এখনও একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কেন এমন বাসনা তার? সে বলেছে, তার দাদা মারা গিয়েছেন। তার যতটুকু চিকিৎসা দেয়া দরকার ছিল তা তারা দিতে পারে নি। রহিম বলেছে, দাদা মারা যাওয়ার সময় আমি অনেক ছোট। মা আমাকে শিখিয়েছেন, জাতির সেবা করা হলো তোমার দায়িত্ব।
ইউসেফ ওয়াই
কঠোর শ্রমে নিযুক্ত থাকার কারণে হাতে কড়া পড়ে গেছে ইউসেফের। রোদে পুড়ে শরীর গেছে কালো হয়েছে। তবে তার ভিতর যে সুপ্ত বাসনা আছে তার সঙ্গে এসবের মিল নেই। মিল নেই তার ‘হার্ট’ আকৃতির মুখের সঙ্গেও। হাতের তালুতে সেই কড়ার দিকে তাকিয়ে সে বলল, এগুলো অনেক শক্ত। সব সময়ই আমাকে কাজ করতে হয়।
ইউসেফ ইটের ভাটায় কাজ করে। সেখান থেকে তার শারীরিক এই পরিবর্তন। ওই ইটভাটায় সে কাজ করে যাতে স্কুলে পড়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু এখন তাকে আর ক্লাসে যেতে দেয়া হয় না। তাই কাজ করেই যায় সে। তার হাতের ওই কড়া আরো শক্ত হচ্ছে।
তার পরিবারও পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এখানে ১৯৯১ সালে জন্ম তার। সে পড়াশোনা করতো বার্মিজ, ইংরেজি ও গণিত। আশ্রয় শিবিরের ভিতরে পড়াশোনার কেন্দ্রে তার জন্য এ বিষয়গুলোই ছিল। সেখানে চার বছর সে পড়াশোনা করেছে। তারপর ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সরকার শিবিরে নতুন কারিকুলাম চাপিয়ে দেয়। আগে এটা রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।
ক্যাম্পে কি অনুমোদন করা হবে তা সরকার উল্টেপাল্টে ফেলে। এর ফলে শিবিরের ভিতরকার স্কুলগুলোর বহু শিশু পড়াশোনা বাদ দেয়। ক্লাসে বাধ্য করানো থেকে হতাশার জন্য তারা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কারণ, নতুন যে কারিকুলাম দেয়া হয়েছে সে জন্য অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু ইউসেফের পরিবারের পক্ষে তাকে স্কুলে রাখা সম্ভব হয় নি। তাই তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে। সে বলেছে, আমি এখন আশ্রয়শিবিরের পাশেই একটি স্থানীয় ইটভাটায় কাজ করি। সেখান থেকে কিছু অর্থ পাই। তা দিয়ে বাংলাদেশী একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছি।
৯ বছর বয়সে পরীক্ষা পাস করার পর জমানো অর্থ দিয়ে নিজেই একটি স্কুলের ভর্তি ফি পরিশোধ করেছে। যখন সে কাজ করতে পারে না বা কাজ থাকে না, তখন সে নিজে নিজেই পড়াশোনা করে। দু’বছর এভাবে চলার পর সে পড়াশোনা বাদ দিয়েছে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর সে প্রতিদিন হেঁটে যেতো এবং হেঁটে ফিরতো।
ইউসেফ বলেছে, অন্য ছাত্রছাত্রীরা আমার কাছে জানতে চাইতো কেন আমি হেঁটে স্কুলে যাই। জবাবে আমি বলতাম আমি শরীরচর্চা করি তো, তাই। কিন্তু এই কথাটি সত্য ছিল না। বলতে বলতে চোখ ভরে ওঠে তার অশ্রুতে। তা মুছে ইউসেফ বলে, গাড়িতে চড়ার মতো অর্থ ছিল না আমার।
সব পরীক্ষায়ই ভালো করেছে ইউসেফ। একের পর এক ক্লাস উতরে যাচ্ছিল। কিন্তু জানুয়ারিতে সরকারের তরফ থেকে নোট আসে। তাতে বলা হয়, স্কুলে রোহিঙ্গা কোনো শিশু এলে তাকে বহিষ্কার করতে হবে। তাকেও তাই করা হলো। তার পূর্ব পর্যন্ত ইউসেফ মানবিকতার ওপর পড়াশোনা করতে চেয়েছিল যাতে সে তার মূল দেশ মিয়ানমারের মানুষদের সহায়তা করতে পারে, যে মিয়ানমারকে সে কখনোই জানতেই পারে নি। ইউসেফ বলেছে, যদিও আমি কখনো মিয়ানমার যেতে পারি নি, দেখি নি, তবু আমরা মিয়ানমারের নাগরিক। আমি মনে করি একদিন আমার সম্প্রদায়ের একজন নেতা হবো।
এখনও ইউসেফ সেই ধারণাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। যখন সে জানতে পারে অন্য রোহিঙ্গা শিশুদেরও বহিষ্কার করা হয়েছে তখন সে জাতিসংঘের স্থানীয় শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সি অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেছে। দাবি তুলেছে, শিবিরে শিক্ষা ফিরিয়ে দেয়ার। সে বলেছে, আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মনে করেছি ঠিক আছে। কিন্তু এখন দেখি স্কুল থেকে সব রোহিঙ্গা শিশুকে বের করে দেয়া হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশে অনেক স্কুল পরিদর্শন করেছে। সেখানে দেখা গেছে ভগ্নদশা এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীতে পূর্ণ। তাই দেশের সব শিশুর জন্য পরিস্থিতির বাস্তব উন্নতি প্রয়োজন। কিন্তু রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষায় বিধিনিষেধ দিয়ে সরকার তাদের শিক্ষার অধিকার ও ভবিষ্যতকে প্রত্যাখ্যান করছে।
ইউসেফ ফিরে গেছে ইটভাটায়। কাজ করছে শ্রমিক হিসেবে কৃষিকাজে এবং মাছ ধরার কাজে। যখনই সে সময়, সুযোগ পায় সে মোবাইল ফোনে বাংলায় বই পড়ে তার পড়াশোনাকে নিজে নিজে চালিয়ে নেয়ার জন্য। চার ভাই ও তিন বোনের জন্য তার চিন্তার শেষ নেই। তারা অশিক্ষিতই রয়ে গেছে।
তার দাবি, আমরা বাংলাদেশ সরকারকে সব সময়ই ধন্যবাদ জানাই। তারা আমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। আমরা এখন আমাদের শিক্ষার অধিকারটুকু চাই।
(ফিলিপ্পা এইচ স্টিওয়ার্ট হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সিনিয়র মিডিয়া অফিসার এবং বিল ভ্যান এসভেল্ড সিনিয়র রিচার্সার, মেনা, শিশু অধিকার বিভাগ। তাদের এই লেখাটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। সেখান থেকে অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
পাটকেলঘাটা গণহত্যা সাগরদাঁড়ি রাজাকার ঘাঁটির পতন by সৈয়দ দীদার বখ্ত

মোহর আলী ও শহর আলী যমজ ভাই। সুদর্শন, সুন্দর সুঠাম দেহ সৌষ্ঠব। একই রকম দেখতে। আলাদা করে চেনা যায় না। দুজনই অত্যন্ত সাহসী নির্ভীক। পারিবারিক ভাবে ওরা আমাদের পরিবারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করে। দুই ভাই একদিন এসে আমাকে ও কামেলকে বললো যে, তারা যুদ্ধে যাবে। বড় ভাই মোহর একটু নির্ঝঞ্ঝাট প্রকৃতির, ৫ মিনিট পরে জন্মানো ছোট ভাই শহর দুরন্ত, দুর্দান্ত ও ডানপিটে ধরনের। আমরা সানন্দে ওদের মুক্তিযুদ্ধে টেনে নিলাম। শহর আলী একদিন বললো- সে সাতক্ষীরায় যেতে চায় তার কিছু কেনাকাটা করতে হবে। আমি বললাম তোমরা এখন পরিচিত মুখ। সাতক্ষীরা শহরে মিলিটারি ঘাঁটি গেড়েছে। ওখানে অরক্ষিতভাবে যাওয়া চলবে না। ও শুনলো না। সাতক্ষীরা কলেজের ছাত্র সে- বললো, সাতক্ষীরার অলিগলি সে চেনে। তাকে মিলিটারিরা ধরতে পারবে না। সে কিছু কেনাকাটা করার জন্য সাতক্ষীরায় গেল। কেনাকাটা করে বাসে করে ফেরার পথে মিলিটারি চেকপোস্টে ধরা পড়লো। তাকে বাস থেকে নামিয়ে কোথায় নিয়ে গেল তার আর হদিস পাওয়া গেল না। যতদূর শুনেছি তাকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় এবং অকথ্য নির্যাতন করে মেরে ফেলে। এমন ভাবে আওয়ামী লীগের তালা থানার সভাপতি আলী আহমেদকে বিনেরপোতা চেকপোস্ট থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে আর পাওয়া যায় নি।
এই রকমভাবে মনতাজকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। মনতাজ ফিরে এসেছিল বিধ্বস্ত অবস্থায়। মনতাজের ভাষ্যমতে, ওদের যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে একটি গাড়ি করে কোনো এক বধ্যভূমিতে নিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল পাক আর্মি। মাঝপথে গাড়ি বিকল হওয়ায় মনতাজ কোনো এক ফাঁকে গাড়ি থেকে নেমে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সে দুদিন পর তালাতে ফিরে আসে। সে এখনো বেঁচে আছে। ওহাব বিশ্বাস একজন সাহসী
মুক্তিযোদ্ধা। শান্তি কমিটির লোকজন তাকে রাতের অন্ধকারে একা পেয়ে মেরে ফেলে। এভাবে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের একা পেলেই শান্তি কমিটির নেতারা ধরে নিয়ে মেরে ফেলতে থাকে। এর জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দিনের বেলায় এককভাবে কেউ চলাফেরা করবে না।
তালা থানার পাশেই কেশবপুর থানা। কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে রাজাকাররা শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে। ওখান থেকে রাজাকাররা কপোতাক্ষ নদ পার হয়ে কাশীপুরে হামলা করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা পাটকেলঘাটা পুলিশ ফাঁড়ি থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেয়ার প্রতিশোধ নেবার জন্য তারা কাশিপুরে মিলিটারিদের সহায়তায় অভিযান চালায়। মিলিটারিরা ২৫/৩০ জনকে ধরে নিয়ে নদীর পাড়ে হাত-পা বেঁধে দাঁড় করে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের পুণ্যভূমি সাগরদাঁড়িতে রাজাকারদের এই ঘাঁটি থেকে প্রায় প্রতিদিন অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি সম্পর্কে নানা সংবাদ আমাদের গোচরে আসতে লাগলো। এই ঘাঁটি উচ্ছেদের প্রয়োজন। নইলে নিরীহ গ্রামবাসী নির্মমভাবে অত্যাচারিত হতে থাকবে। সংবাদ নিয়ে জানলাম ঘাঁটিতে ৩০/৪০ জন রাজাকারদের একটি দল অবস্থান করছে। এই রকম একটি সুরক্ষিত ঘাঁটির পতন ঘটাতে হলে সাঁড়াশি আক্রমণ প্রয়োজন। সম্মুখভাগ- (কভারিং ফায়ার) এবং দু’পাশ থেকে আক্রমণ- এ ভাবে আক্রমণ রচনা করতে পারলেই এ ধরনের সুরক্ষিত ঘাঁটির পতন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের এত শক্তি নেই। আমার অভিমত এ ধরনের অভিযান স্রেফ আত্মহত্যার শামিল। কামেল এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা আমার যুক্তি মানলো না। তাদের অভিমত- রাজাকাররা ভীতু। ওরা অর্থের বিনিময়ে লুটপাটের জন্য ধর্ষণ এবং অপকর্মের জন্য রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। আসলে নৈতিকভাবে তারা দুর্বল। ওদের সামনে কোনো আদর্শ বা নীতি নেই। মানসিক ভাবে দুর্বলরা কখনও যুদ্ধ করতে পারে না। আক্রমণ করলেই ওরা পালাবে। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সম্প্রসারিত করার জন্য আমি খুলনার মংলা এলাকায় যাই। কয়েকদিন পর ফিরে এসে জানতে পারি মুক্তিযোদ্ধারা সাগরদাঁড়ি রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণ করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের দৃঢ় মনোবল এবং প্রত্যয়ে সেদিন সাগরদাঁড়ি রাজাকার ঘাঁটির পতন হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে জানলাম তারা সাগরদাঁড়িতে আক্রমণ করার সঙ্গে সঙ্গে রাজাকার ঘাঁটি থেকে বৃষ্টির মতো এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু হয়। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের মুখে ওরা ভয়ে ভীতু হয়ে ঘাঁটি পরিত্যাগ করে পালাতে থাকে। পরে জানলাম, পলায়নপর রাজাকাররা তাদের রাইফেল পুকুর, খানা-খন্দকের মধ্যে ফেলে পালিয়ে যায়। ঐ সময়ে পুকুর এবং খানা-খন্দক থেকে ১৮/২০টি রাইফেল মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামবাসীদের সহায়তায় সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল।
এই ঘটনার কয়েক দিন পর পাক আর্মির একটি বিশালবহর নদীপথে তালাতে উপস্থিত হয়। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার তেঁতুলিয়া বাড়ি ঘিরে ফেলে। আমি তখন গ্রামের অভ্যন্তরেই। ছোটবেলার খেলার সাথী ছোটবাবুর শেল্টারে ছিলাম। মিলিটারিরা যখন তেঁতুলিয়াতে অভিযান চালায় আমি তখন গ্রামের অভ্যন্তরে ঐ বাড়িতে গভীর রাতে এসে ঘুমিয়ে ছিলাম। অতর্কিতভাবে মিলিটারি অভিযানে ভীতু হয়ে গ্রামের লোকজন পালাতে থাকে। এ সময়ে আমি যে বাড়িতে ছিলাম তার পাশের বাড়ির মেয়ে সাহানা বানু দৌড়াতে দৌড়াতে এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলে জানালো মিলিটারিরা বাড়ি ঘিরে ফেলেছে- শিগগির পালান।
আমি ঘটনার গুরুত্ব অনুভব করে ওখান থেকে দ্রুত পালালাম। ঐ বাড়ির পাশেই খাল। খাল সাঁতরিয়ে আমি মদনপুর গ্রামে এসে পৌঁছালাম। ওখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সহযোদ্ধা আনছার মাহমুদের বাড়িতে আশ্রয় নেই। আমার পায়ের একটি আঙুল কেটে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আনছার মাহমুদ ভাইয়ের স্ত্রী অবস্থার গুরুত্ব অনুভব করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে পাহারায় নিজে বসে থাকলেন। আমার পায়ের মারাত্মক জখম দেখে তিনি নিজে গাছগাছড়ার একটি ওষুধ তৈরি করে পা ব্যান্ডেজ করে দিলেন। বললেন- দু’দিনেই সেরে যাবে। আনছার মাহমুদ আমার বড় ভাইয়ের মতো। বর্তমানে তার বড় ছেলে আলিম মাহমুদ রংপুরের মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডি.আই.জি)।
মাহমুদ ভাইয়ের বাড়ি থেকে লোক পাঠিয়ে তেঁতুলিয়ায় খবর নিলাম। জানলাম সাহানা বানু আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে পালাতে সাহায্য করেছে ঠিকই কিন্তু সে নিজে পাক হানাদার বাহিনীর সেপাইদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে। সে এবং আরো একটি মেয়ে নাম “মানু” দুজন সেপাইয়ের দ্বারা নির্যাতিত। তারা দুজনেই চিকিৎসাধীন। গ্রামের এই দুটি মেয়ের বলিদান আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং সার্বিকভাবে আমার প্রিয় মাতৃভূমি কখনো পরিশোধ করতে পারবো কিনা জানি না। এর মধ্যে মানু মারা গেছে- সাহানা এখনো ধুঁকে ধুঁকে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আরো জানলাম পাক আর্মিরা আমাকে না পেয়ে আমাদের বাড়িটা তৃতীয়বারের মতো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। যথারীতি গ্রামের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা গ্রামবাসীরা দ্রুত এসে আগুন নেভায়।
আমি আনছার মাহমুদ ভাইয়ের বাসায় নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারিনি। ভাবিকে বললাম- আমি সন্ধ্যার পর পর অন্য জায়গায় আশ্রয় নেব। এখানে থাকলে আপনাদের সকলের বিপদ। আমাকে কিছুতেই যেতে দেবেন না তিনি আমার পায়ের অবস্থা বিবেচনা করে। মাহমুদ ভাইকে বললাম আমাকে একটি গামবুট জোগাড় করে দিন। আমি ঠিকই যেতে পারবো। আমি এখানে থাকলে আপনাদের বিপদ আরো বাড়বে। মাহমুদ ভাই জুতা যোগাড় করে দিলেন। আমি সন্ধ্যার পর পরই ভাবীর সকল বাধা পেরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
এই ঘটনার দুইদিন পর পাক আর্মির একটি বাহিনী মাহমুদ ভাইয়ের বাড়ি আক্রমণ করে। এবং আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়, লুটপাট করে। আমাকে যারা এভাবে আশ্রয় এবং সেবা করেছেন তাদের ঋণ কখনও শোধ করতে পারবো না। ওখান থেকে বেরিয়ে আমি ঐ রাত্রে হাত বাঁশের মাধ্যমে মাহতাব মোড়লের বাড়িতে আশ্রয় নেই। ওরা আমাকে দুদিন সেবা শুশ্রূষা করে সারিয়ে তোলে। এভাবেই আমরা আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে হানাদার মুক্ত করার জন্য প্রাণবাজি রেখে দেশমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছি। জানি জয় আমাদের হবেই- আল্লাহ আমাদের সহায়।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1406)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ▼ 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...