Showing posts with label নজরুল ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label নজরুল ইসলাম. Show all posts

Wednesday, June 11, 2025

মাথায় কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন খুনি by নজরুল ইসলাম

জামালপুরের বকশীগঞ্জের বান্দেপাড়া এলাকার পাটখেত থেকে গত ১৬ মে এক নারীর পোড়া লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। মুখমণ্ডল পুড়ে যাওয়ায় ওই নারীর নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। ওই ঘটনায় জড়িতদেরও শনাক্ত করতে পারছিল না পুলিশ। শেষ পর্যন্ত ওই নারীর মাথায় আগের কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে তাঁর নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হয়ে হত্যায় জড়িত অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ওই নারীর নাম নবিরন খাতুন (৫২)। বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের চেংটিমারী পূর্ব এলাকায়। পেশায় পোশাকশ্রমিক এই নারী থাকতেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায়।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত জামালপুরের পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার দুই সন্ত্রাসীকে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করে নবিরনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন তাঁর জামাতা আবু তালেব মণ্ডল (৪৭)। লাশ যাতে চেনা না যায়, সে জন্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় লাশটি পাওয়া যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ৪ জুন রাতে ঢাকার সাভারের একটি এলাকা থেকে আবু তালেবকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জামালপুরের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানায়।

কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে যেভাবে পরিচয় শনাক্ত

পাটখেত থেকে উদ্ধার নবিরনের লাশটির মুখ, গলা ও বুক পোড়া ছিল। ওই ঘটনায় বকশীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আনিছুর রহমান বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, ১৫ মে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীরা পূর্বশত্রুতার জের ধরে ওই নারীকে হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করেছেন।

মামলার তদন্ত তদারকের সঙ্গে যুক্ত জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আঙুলের ছাপ মিলিয়েও নিহত নারীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। হত্যাকাণ্ডের তেমন কোনো সূত্র ছিল না পুলিশের কাছে।

তদন্তের এক পর্যায়ে স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক পুলিশকে জানান, গত মে দিবসের দিন এক নারীর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন আবু তালেব। আর পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, নিহত নারীর মাথায় ছয় ইঞ্চি গভীর কাটা চিহ্ন রয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওই নারী বকশীগঞ্জের একটি ওষুধের দোকান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু আবু তালেবকে এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁর ছেলের কাছ থেকে আবু তালেবের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পুলিশ অনুসন্ধান করে জানতে পারে, নবিরনের একমাত্র মেয়ে বিলকিস বেগম রাজধানীর খিলগাঁওয়ে থাকেন। তাঁর মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করে পুলিশ জানতে পারে, অনেক দিন ধরে তাঁর মা নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগে তাঁর মায়ের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিলেন আবু তালেব। তখন পুলিশের কাছে বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তখন বিলকিসের কাছ থেকে আবু তালেবের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যায় অংশ নেওয়া অপর দুজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে যাওয়ায় হত্যার পরিকল্পনা

জিজ্ঞাসাবাদে নবিরনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার কথা স্বীকার করে আবু তালেব পুলিশকে বলেন, এ জন্য তিনি ঢাকা থেকে দুজন সন্ত্রাসী ভাড়া করেন। ভাড়া করা দুজনসহ মিলে তাঁরা নবিরনকে ছুরিকাঘাত হত্যা করেন। লাশ যাতে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি সাভারে গিয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। কিন্তু সেটি কাউকে জানাতেন না।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আবু তালেব বলেন, ‘আমার স্ত্রী বিলকিসকে নিয়ে যাতে সংসার করতে না পারি, সে জন্য যা যা করার দরকার, সবই শাশুড়ি (নবিরন) করতেন। আর আমার স্ত্রীও তাঁর মায়ের কথা শুনতেন। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে আমার সন্তানদেরও আমার শাশুড়ি ঢাকায় নিয়ে যান। এতে আমি ক্ষুব্ধ হয়ে অমার শাশুড়িকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিই। আমার শাশুড়িকে মেরে ফেলার জন্য ঢাকায় দু্ই সন্ত্রাসীকে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করি।’

আবু তালেব আদালতকে বলেন, ‘গত ১৫ মে আমার শাশুড়ি ঢাকা থেকে জামালপুর আসেন। এই খবর পেয়ে ভাড়া করা দুই সন্ত্রাসীও জামালপুরে আসেন। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমার শাশুড়ি স্থানীয় বাজারে মুঠোফোন কিনতে যাচ্ছিলেন। তখন আমি তাঁকে বলি, চলেন আমি আপনাকে সোজা পথে নিয়ে যাব। এ কথা বলে ভাড়া করা দুই সন্ত্রাসীসহ আমি এবং আমার শাশুড়ি একটি রিকশায় (রিকশাভ্যান) উঠি। কিছু দূর যাওয়ার পর ভ্যান থেকে নেমে পড়ি এবং চালককে ভ্যান নিয়ে চলে যেতে বলি।’

আবু তালেব জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘এরপর তাঁকে (শাশুড়ি) একটি প্লটে নিয়ে যাই। তখন আমরা তাঁকে ঘিরে ধরি। তখন শাশুড়ি বলেন, তাঁর কাছে টাকা ও চেক আছে। এগুলো নিয়ে যেতে অনুরোধ করে বলা হয়, তাঁকে যেন মেরে না ফেলা হয়। তখন দুই সন্ত্রাসী আমার শাশুড়ির গলায় ওড়না লাগিয়ে পেঁচিয়ে ধরেন। এঁদের একজন মাথা, হাত ও পায়ে ছুরিকাঘাত করেন। তাঁরা টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেন। তখন আমার শাশুড়ির মুখ চেপে ধরি আমি।’

আবু তালেব আরও বলেন, ‘এ সময় আমি দুজনকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দিই। বাকি টাকা পরে দিতে চাই। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ পাটখেতে নিয়ে আগুন ধরিয়ে আমরা চলে যাই।’

তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, নবিরনকে ধর্ষণের আলামতও পাওয়া গেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বকশীগঞ্জের কামালের বাত্তি তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, নবিরনকে হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি

Tuesday, April 1, 2025

নজরুল-প্রমীলার প্রেমের সাক্ষী যে বাড়ি by রিপন আনসারী

যমুনা নদীর তীরঘেঁষা মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ি। জমিদারি প্রথা ও প্রজা নিপীড়নের জ্বলন্ত সাক্ষী, নানা রহস্য ভরা এই জমিদার বাড়িটি অযত্ন আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। একই সঙ্গে মুছে যাচ্ছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রিয়তম পত্নী প্রমীলা দেবীর প্রেমের ইতিহাস।

জমিদার বাড়ির সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক স্মৃতি বিজড়িত থাকলেও তা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। এ জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল নজরুলের প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দেবীর বাড়ি। প্রমীলা দেবীর বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেনের সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে এবং তাদের বন্ধুত্বের সৃষ্টি হলে নজরুল মাঝে মধ্যেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীরেন সেনের সঙ্গে তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। এরই মাধ্যমে বসন্ত সেনের পরমা সুন্দরী কন্যা প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে আলাপ পরিচয়ে এক পর্যায়ে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। প্রমীলা নজরুলকে কবিদা বলে ডাকতেন।

জনশ্রুতি রয়েছে, নজরুল যখন প্রমীলা অনুরক্ত, তখন একদিন জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের পুকুরে স্নানরত প্রমীলার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমিক নজরুল গান গেয়ে ওঠেন, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ। এরপর প্রেম প্রণয়ের অনেকটা জায়গা জুড়েই আছে জমিদার বাড়ি, পুকুর ঘাট, নাটমন্দির ও নবরত্ন মঠ।
এক সময়কার  সৌন্দর্যমণ্ডিত তেওতা জমিদার বাড়িটি সম্পর্কে এলাকার বয়োবৃদ্ধের মুখে মুখে এখনো  কিংবদন্তির মতো অনেক অজানা কাহিনী, যা এক সময় মানুষকে অবলীলায় বিস্ময়ের আবর্তে টেনে নেয়।

জানা গেছে, পঞ্চদশ শতকের প্রারম্ভে পাচুসেন নামক এক পিতৃহীন যুবক তার সততা ও আন্তরিক চেষ্টায় তামাকের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ-সম্পদের মালিক হন। পাচুসেন দিনাজপুর অঞ্চলে প্রথম জমিদারী ক্রয় করে তার পাচু নাম পরিবর্তন করে পঞ্চনন্দ সেন নাম গ্রহণ করেন। পঞ্চনন্দ সেনের পুত্র শঙ্কর রায় বাহাদুর ১৬৭০;এর দশকে (বাংলা ১০৮০) তৎকালীন নাগপুরের নীলকুঠির ম্যানেজার উডীন সাহেবের কাছ থেকে কিনে নিয়ে তেওতা জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

সৌন্দর্যমণ্ডিত এ জমিদার বাড়ির নবরত্ন মঠটির শিলালিপি থেকে জানা যায়, এ মঠটি ১৭০২-১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত। এই হিসাবে প্রায় ৩০০ বছর পূর্ব থেকে তেওতা জমিদার বাড়ি সমৃদ্ধিশীল ছিল। জমিদার বাড়ির উত্তর দিকের ভবনগুলো নিয়ে হেম শংকর এস্টেট এবং দক্ষিণ দিকের ভবনগুলো নিয়ে জয় শংকর এস্টেট গঠিত। প্রতিটি এস্টেটের সামনের অংশে যে অট্টালিকা আছে তা বর্গাকৃতির এবং এর মাঝখানে আছে দৃষ্টিনন্দন নাট মন্দির। এ মন্দিরে পূজা ও নাচ গানের আসর হতো। এস্টেটের পূর্ব দিকে ছিল অন্দরমহল। দক্ষিণ দিকে ভবনের নিচে ভূগর্ভে আজও একটি চোরা কুঠি রয়েছে। যা এ এলাকার অন্ধকূপ নামে পরিচিত ছিল। এটি ক্রমান্বয়ে ভরে গেছে। সেখানে বর্তমানে সাপ বিচ্ছুদের আস্তানা। জমিদার বাড়ির সামনের একটি ভবনে রয়েছে দুটি কয়েদখানা। সাধারণ প্রজারা খাজনা দিতে বিলম্ব  করলে তাদের কয়েকখানার ভেতরে বন্দি করে নির্যাতন চালানো হতো। কয়েদখানাটি এখন আর নেই। সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। জমিদার বাড়ির সামনে টলমলে দিঘিতে ছিল বাঁধানো ঘাট। ঘাট সংলগ্ন প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সেই নবরত্ন মঠ। চারতলাবিশিষ্ট এই নবরত্নের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার চারদিকে ক্ষুদ্রাকৃতির মঠ বা রত্ন এবং মাথার মঠ বা রত্ন নিয়ে মোট আটটি মঠ থাকায় একে নবরত্ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল বলে সেখানকার মানুষজনের কাছ থেকে শোনা গেছে।
এ নবরত্ন মঠটিতে সে সময় জাঁকজমকপূর্ণ দোল পূজা অনুষ্ঠিত হতো।
তেওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শরৎচন্দ্র জমিদার বাড়ি প্রসঙ্গে বলেন, তেওতা জমিদার বাড়ি মূলত জমিদারদের সময় থেকেই ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এরপর আমরা ছোট থেকে আস্তে আস্তে জেনেছি এখানে প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমাদের এলাকার আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলা দেবীর একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রমীলা দেবীর বাড়ি জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল। আমরা যতটুকু জেনেছি প্রমীলা দেবীর সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ের যে ব্যাপারটা ছিল সেটা মূলত তার বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেন। বীরেন সেনের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা সখ্যতা ছিল। তিনিও সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন এবং কবিতা ভালোবাসতেন। এই সূত্রে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকবার তেওতা জমিদার বাড়িতে আসা। এখানে প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে নজরুলের পরিচয় ঘটে। বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি বিশেষ করে ছোট হিটলার কবিতায় তেওতার কথাটা নজরুল তার কবিতায় লিখেছিলেন। সেখানে তিনি একটা লাইন লিখেছিলেন, ভয় করি না পুলিশদের, জার্মানির ওই ভাঁওতাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামার বাড়ি তেওতাকে।’ এ ছাড়া লোকমুখে শোনা গেছে আরও বেশ কয়েকটি গান, আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী  এ কোন সোনার গাঁয় অথবা তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ। এটা শুনেছি প্রমীলা দেবীকে দেখেই নজরুলের গান লেখা।

এই শিক্ষক জানান, প্রতিনিয়তই দেশি-বিদেশি অনেক দর্শনার্থী আসেন, দেখেন- তাদের ভালো লাগে। এটা আসলেই ভালোলাগার একটা জায়গা। কারণ এটা কাজী নজরুল ও প্রমীলার স্মৃতি বিজড়িত এলাকা। যত দিন যাচ্ছে আর দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে-বিদেশে পর্যন্ত তেওতা জমিদার বাড়ির নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে এখানকার জমিদাররা পরবর্তীতে ইন্ডিয়া চলে যায়। ইন্ডিয়া থেকে অনেকেই মায়ার টানে, নাড়ির টানে এখানে ছুটে আসেন।
এদিকে, বিপন্নপ্রায় তেওতা জমিদার বাড়ির কিছু অংশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা গবেষণার জন্য ব্যবহার করছেন। জমিদার বাড়ির প্রায় আট একর জমির বেশির ভাগ অবৈধ দখলদারদের কব্জায়। ইটপাথরে গাঁথা অতি প্রাচীন অট্টালিকাগুলো আজ রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ধসে পড়ছে।
তবে জমিদার বাড়ির সম্মুখ রাস্তার পাশে নজরুল এবং প্রমীলার স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ইট পাথরে গাঁথা ছবি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে। দর্শনার্থীরা জমিদার বাড়ির প্রবেশের আগেই নিজেদের সঙ্গে নজরুল-প্রমীলার ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন।  বিভিন্ন দিবসের মধ্যে বিশেষ করে ঈদের আগে-পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে জমিদার বাড়িটি। 

mzamin

Friday, January 3, 2025

জাতীয় কবির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেন কাজী নজরুল ইসলাম

অবশেষে বাংলাদেশের জাতীয় কবির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৭২ সালের ৪ঠা মে বাংলাদেশে আসার তারিখ থেকে তাকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ ঘোষণা করে গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান স্বাক্ষরিত এক গেজেট প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, গত ডিসেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদের এক সভায় অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়েছে। এবং এটি সকলের অবগতির জন্য গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৫ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি ঘোষণা করে গেজেট প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের জাতীয় কবির মর্যাদার বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও স্বীকৃত। বাংলাদেশের জনগণ তার ঢাকায় আগমনের তারিখ থেকে তাকে জাতীয় কবি ঘোষণা করে সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রত্যাশা করে আসছিল। উপদেষ্টা পরিষদ এ প্রত্যাশা অনুযায়ী এ প্রস্তাব অনুমোদন করে। কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ১৯৭২ সালের ২৪ঠা মে কলকাতা থেকে সরকারি উদ্যোগে সপরিবারে ঢাকায় আনা হয় এবং তার বসবাসের জন্য ধানমন্ডির ২৮ নম্বর (পুরাতন) সড়কের ৩৩০-বি বাড়িটি বরাদ্দ প্রদান করা হয়।

এরপর ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১শে ফেব্রুয়ারি তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। একুশে পদক বাংলাদেশের দ্বিতীয় বেসামরিক সম্মানসূচক পদক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৭৪ সালের ৯ই ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে (টিএসসি) এক সমাবর্তন উৎসবে এই উপাধি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অসুস্থতার জন্য নজরুলকে এ উৎসবে আনা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি বঙ্গভবনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহ নজরুলকে ডি. লিট উপাধিতে ভূষিত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী নজরুলের উদ্দেশে একটি মানপত্রও পাঠ করেন। কবি নজরুল ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট ইন্তেকাল করেন। নজরুল তার একটি গানে লিখেছেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই, যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’। এই ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তার নামাজে জানাজায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ শরিক হন। জানাজার পর রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকা-মোড়ানো নজরুলের মরদেহ বহন করে সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যান। বাংলাদেশে তার মৃত্যু উপলক্ষে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয়।

পরবর্তীকালে তাকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্বোধন করে কবি নজরুল ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৮ জারি করা হয়। ১৯২৯ সালের ১০ই ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের কলকাতার এলবার্ট হলে সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু, বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, এস, ওয়াজেদ আলী, দীনেশ চন্দ্র দাশসহ বহু বরণ্যে ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কাণ্ডারী’ এবং ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশে কবির জন্ম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে প্রদত্ত বাণীতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান উপদেষ্টাগণও কবিকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত হলেও কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করে ইতোপূর্বে সরকারিভাবে কোনো গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।

mzamin

Monday, November 4, 2024

‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধের শতবর্ষ by এমরান কবির

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দুই কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে। সে হিসাবে এখন বই দুটি নিষিদ্ধের শতবর্ষ...

‘কোনো বইয়ের প্রচার নিষিদ্ধ না করে তাকে বরং জনমতের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া উচিত,’ বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারক কুটিক রক। ১৯৪৮ সালে অশ্লীলতার প্রশ্নে একটি মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ালে রায় দিতে গিয়ে কথাটি উল্লেখ করেন তিনি। কথা সত্যও বটে! বই আসলে জনমতের সঙ্গে সংগ্রাম করেই টিকে থাকে। যেমন আজ থেকে শতবর্ষ আগে কাজী নজরুল ইসলামের বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান বই দুটি নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। বই ও লেখালেখি নিয়ে ব্রিটিশদের মনোভাব ছিল কঠোর। ব্রিটিশ শাসনামলে বাজেয়াপ্ত বই নিয়ে গবেষণা করেছেন বিষ্ণু বসু, অশোক কুমার মিত্র প্রমুখ। শিশির কর এ ক্ষেত্রে এক কিংবদন্তি। নিষিদ্ধ নজরুল আর ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই নামের দুই গ্রন্থ লিখে সাহিত্যের ইতিহাসে প্রণম্য হয়ে আছেন তিনি। ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বইয়ে তিনি জানাচ্ছেন, ‘ইংরেজ আমলে ভারতের প্রায় সব প্রাদেশিক ভাষার গ্রন্থই রাজরোষে পড়েছে।’ এ কথা থেকে প্রমাণিত হয় যে ব্রিটিশ সরকার বই ও তার প্রভাব নিয়ে কতটা চিন্তিত ছিল। বই আর লেখালেখি নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা প্রণয়ন করেছিল কয়েকটি আইন। ইন্ডিয়ান প্রেস অ্যাক্ট ১৯১০, নিউজপেপার অ্যাক্ট ১৯০৮, সেডিশিয়াস পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট ১৮৮২, ইন্ডিয়ান প্রেস ইমার্জেন্সি পাওয়ার অ্যাক্ট ১৯৩০ প্রভৃতি।

এই বাস্তবতায় ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হয় নজরুলের দুটি বই বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান। বই দুটি নিষিদ্ধও হয়েছিল একই বছর ফৌজদারি বিধির ৯৯-এ ধারা অনুসারে। বিষের বাঁশী নিষিদ্ধ হয় ২২ অক্টোবর আর ভাঙার গান এর তিন সপ্তাহের মধ্যেই—১১ নভেম্বর ১৯২৪। সেই হিসাবে নজরুলের বই দুটি নিষিদ্ধের এখন শতবর্ষ। তবে শতাব্দী পেরিয়ে জনতার মধ্যে আদৃত হতে হতে কালজয়ী হয়ে গেছে এসব বই। বই দুটি শুধু প্রভাব বিস্তারকারীই নয়, প্রবল আলোচিতও। আর এই ১০০ বছরেও বই দুটির প্রাসঙ্গিকতা একবিন্দু কমেনি। কিন্তু গোরা আমলে বই দুটিকে কেন নিষিদ্ধ করেছিল শাসক? কী ছিল তার পরিপ্রক্ষিত?

‘বিষের বাঁশী’র বিষ

কাজী নজরুল ইসলামের বাজেয়াপ্ত পাঁচটি বইয়ের মধ্যে অন্যতম বিষের বাঁশী। বইটি ১৯২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন স্বয়ং কবি। প্রচ্ছদ করেছিলেন কল্লোল–এর সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ। নজরুল তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমার ঝড়ের রাতের বন্ধু।’ এ বইয়ের ‘কৈফিয়ত’ শিরোনামে ভূমিকায় কবি জানান, ‘“অগ্নিবীণা দ্বিতীয় খণ্ড” নাম দিয়ে তাতে যেসব কবিতা ও গান দেব বলে এতকাল ধরে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলাম, সেই সব কবিতা ও গান দিয়ে এই বিষের বাঁশী প্রকাশ করলাম। নানা কারণে “অগ্নিবীণা দ্বিতীয় খণ্ড” নাম বদলে বিষের বাঁশী নামকরণ করলাম। এ বিষের বাঁশীর বিষ জুগিয়েছেন আমার নিপীড়িতা দেশমাতা আর আমার ওপর বিধাতার সকল রকম আঘাতের অত্যাচার।’

ভূমিকার এ অংশ থেকে জানা যাচ্ছে, অগ্নিবীণার পরিবর্ধিত রূপ বিষের বাঁশী। আর কবির স্বীকারোক্তির মধ্যেই রয়েছে এই কাব্যের বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ শিল্পিত মনোভাব। বইটি প্রকাশের পর প্রভাবশালী সাময়িকী প্রবাসীতে বলা হয়েছিল, ‘কবিতাগুলি যেন আগ্নেয়গিরি, প্লাবন ও ঝড়ে রূদ্ররূপ ধরিয়া বিদ্রোহী কবির মর্মজ্বালা প্রকটিত করিয়াছে। জাতির এই দুর্দিনে মুমূর্ষু নিপীড়িত দেশবাসীকে মৃত্যুঞ্জয়ী নবীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করিবে।’

এই যে ‘নবীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ’ করা, এটি আমাদের দেশমাতার জন্য শুভকর হলেও ব্রিটিশ শাসকের জন্য মোটেও শুভকর ছিল না। দেশবাসী লুফে নিলেও কেউ কেউ বৈরী হয়ে উঠলেন। এমন একজন অক্ষয় কুমার দত্ত গুপ্ত। পেশায় তিনি ছিলেন বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। ১৯২৪ সালের ২১ আগস্ট বইটি নিয়ে সরকারের পাবলিক ইনস্ট্রাকশন বিভাগকে চিঠি লেখেন তিনি। সে চিঠির কিছু অংশ এ রকম, ‘অস্বচ্ছ ধারণার ওপর ভয়াবহ উদ্দেশ্য সাধন করতে বারংবার যেসব উত্তেজক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে রক্ত, স্বৈরাচার, মৃত্যু, আগুন, নরক, দানব ও ব্রজের মতো শব্দ।’ অক্ষয়বাবুর আবেদন বিফলে যায়নি। কয়েক দফা চিঠি–চালাচালির পর একই বছরের ২২ অক্টোবর চিফ সেক্রেটারি এ এস মোবারলের স্বাক্ষরে বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত করার আদেশ জারি হয় এবং তা প্রজ্ঞাপন আকারে ছাপা হয়।

এ আদেশের পর বই আটকাতে নেমে পড়ে পুলিশ। কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নজরুল ইসলামকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।

তবে কী আছে বইটিতে, যে জন্য প্রবাসী থেকে লাইব্রেরিয়ান হয়ে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা মারফত শেষ পর্যন্ত এটি বাজেয়াপ্ত হলো? বিষের বাঁশীর প্রথম কবিতা ‘অভিশাপ’-এর  প্রথম লাইন ‘আমি বিধির বিধান ভাঙিয়াছি, আমি এমনি শক্তিমান!’ বলা ভালো, নজরুলের ‘বিধি’ কোনো একক অর্থের প্রতিনিধি নয়। শব্দটি নানান অর্থ তুলে ধরে। ব্রিটিশরাজের কাছে এই ‘বিধি’ নিশ্চয়ই তাদের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। বিধির বিধান ভাঙতে যে নিজের শক্তিমত্তার প্রকাশ করবে, সে তো আসলেই ভয়ানক! একই কাব্যগ্রন্থের ‘চরকার গান’-এ কবি লিখেছেন, ‘ঘোর রে ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর/ ওই স্বরাজ রথের আগমনী শুনি চাকার শব্দে তোর।’ নজরুল চরকার শব্দে স্বরাজ রথের আগমনী  শুনতে পান বলেই এ কবিতায় বলেন— ‘ঘুচুক ঘুমের ঘোর’। আবার ‘ঝড়’ নামের দীর্ঘ কবিতার এক জায়গায় আছে— ‘ঝড় কোথা? কই?—/ বিপ্লবের লাল-ঘোড়া ওই ডাকে ওই—’।

বিপ্লবের লাল-ঘোড়া ডাকার কথা যিনি বলেন, তিনি আর যা–ই হোন, নিরাপদ হবেন না।

‘ভাঙার গান’–এর ভয়াল সুর

ভাঙার গান প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে (১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে)। প্রকাশক ছিলেন কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি এবং যুগবাণী পত্রিকার আর্য পাবলিশিং হাউস। একই বছর ১১ নভেম্বর তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ থাকলেও বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে।

ভাঙার গান–এর সবচেয়ে বিখ্যাত গান—‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’। এই গান রচনার প্রেক্ষাপটও ঐতিহাসিক। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় বের হয় বাঙ্গালার কথা পত্রিকা। এ সময় মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে একের পর এক কারারুদ্ধ হচ্ছেন ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামীরা। চিত্তরঞ্জন দাশও কারারুদ্ধ হলেন। তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী দ্বারস্থ হলেন ২২ বছর বয়সী কাজী নজরুল ইসলামের। এ বিষয়ে নজরুলের বাল্যবন্ধু কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদ তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা বইয়ে লিখেছেন, ‘আমার সামনেই দাশ পরিবারের শ্রী সুকুমাররঞ্জন দাশ বাঙ্গালার কথার জন্য একটি কবিতা চাইতে এসেছিলেন। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নজরুল তখনই কবিতা লেখা শুরু করে দিল। সুকুমাররঞ্জন ও আমি আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে নজরুল আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তার সেই মুহূর্তে রচিত কবিতাটি পড়ে শোনাতে লাগল।’ হুগলির জেলে দেশবন্ধুর সঙ্গে অন্য বন্দীরাও গাইতেন এই ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’।

ব্রিটিশ শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে তখন আন্দোলন শুরু হয়েছে দিকে দিকে। বিপ্লবীদের বন্দী করে পাঠানো হচ্ছে জেলে। এভাবে পুরো দেশটাই যেন হয়ে উঠেছিল কারাগার। এমন এক সময় বের হয় নজরুলের ভাঙার গান। বইটি ব্রিটিশ শাসনের মর্মমূলে আঘাত হেনেছিল। এই কাব্যগ্রন্থে কবি যখন বলেন, ‘বাঙলার শের বাঙলার শির/ বাঙলার বাণী বাঙলার বীর’ কিংবা ‘দুঃশাসনের রক্ত চাই।/ দুঃশাসনের রক্ত চাই।/ অত্যাচারী সে দুঃশাসন/ চাই খুন তার চাই শাসন’ কিংবা ‘আয় ভীম আয় হিংস্র বীর’, তখন ব্রিটিশরাজের সিংহাসন কি টলে ওঠে না? বাংলা তো শোষণের ক্ষেত্র, তারা বীর হবে কেন? এরা দুঃশাসনের রক্ত চায় কীভাবে! আবার ভীমকে ডাকে! পাগলা ভোলাকে আহ্বান করে প্রলয়ের টানে সব গারদের আগল ভেঙে দেওয়ার জন্য! সবচেয়ে বড় কথা, সবকিছুকে পায়ের ভৃত্য করে বন্দী বিপ্লবীদের সব কারাগারের তালা লাথি মেরে ভেঙে ফেলার কথা বলা হয় এখানে।

স্বভাবতই ব্রিটিশরা এগুলো ভালোভাবে নেয়নি। ভাঙার গান–এর প্রভাব ছিল গভীরতর। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর বন্ধু দিলীপকুমার রায়কে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘জেলে যখন ওয়ার্ডাররা লোহার দরজা বন্ধ করে, তখন মন যে কী আকুলি-বিকুলি করে, কী বলব। তখন বারবার মনে পড়ে কাজীর সেই গান—“কারার ঐ লোহ-কবাট”।’

পরাধীন ভারতে গানটির প্রভাব বুঝতে ওপরের ঘটনাটিই যথেষ্ট।

‘কারার ঐ লোহ-কবাট’–এর বহিরাঙ্গিকে কবাট ভাঙার কথা থাকলেও আদতে এতে বলা হয়েছে বৈষম্য ভাঙার কথা। সাম্প্রতিক কালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও এই গানের প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। গ্রাফিতিতে এখনো গানটির কথা ও ভাব-চিত্র দৃশ্যমান। শতবর্ষ পরে বৈষম্যহীন সমাজের জন্য ছাত্র-জনতা আজ যে নিজের রক্ত ঝরাচ্ছে, জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, তার শুরুটা তো করেছিলেন নজরুল নিজেই। কারাবন্দী অবস্থায় কবি যখন গানটি গাইতেন, তখন বন্দীদের জমানো ক্ষোভ গর্জে উঠত। একই দৃশ্য যেন দৃশ্যায়িত হলো শতবর্ষ পর। সেখানে কেবল শারীরিকভাবেই নজরুল অনুপস্থিত। বাকি সব আগের মতোই। আদতে ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। হয়তো সে কারণেই নজরুলকে দিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যে সূচনা, শতবর্ষ পরেও তা চলমান।

ভাঙার গান মূলত গানের বই। এসব গানে আছে সব ধরনের অচলায়তন-দুর্বৃত্তপনা ও বৈষম্য ভাঙার কথা। ব্রিটিশরাজের ভয় ছিল যে এসব ভাঙলে তাদের সিংহাসনও ভেঙে যাবে। তাই তো আটকে দেওয়া হয়েছিল এ গানের সুর। কিন্তু যা শাশ্বত অধিকারের অংশ, তাকে কি নিষেধের বাধা দিয়ে আটকানো যায়! আটকানো যায়নি ভাঙার গান–এর সুরকেও। কোথাও কোনো অন্যায়–নিপীড়ন হলেই ওই সুর এখন আরও তীব্রভাবে বাজে।

বই কি কখনো নিষিদ্ধ করা যায়? এই প্রশ্নের এক জুতসই উত্তর দিয়েছেন রুশ লেখক মিখাইল বুলগাকভ তাঁর বই মাস্টার অ্যান্ড মার্গেরিটার মধ্যে, ‘পাণ্ডুলিপি কখনোই পোড়ে না।’ বই নিষিদ্ধ নিয়ে এর চেয়ে সত্য আর নেই।

বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ গ্রন্থের ইতিহাস ও পরিণতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেগুলোর প্রচার, প্রসার, পঠন, সংরক্ষণ কোনোটাই শেষ পর্যন্ত রহিত করা যায়নি; বরং নিষিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর বেশির ভাগই পেয়েছে ব্যাপক প্রচার। বিষের বাঁশী বা ভাঙার গান–এর ক্ষেত্রেও এটি সমসত্য। আর এই দুই বইয়ের মধ্যে শৈল্পীর সৌকর্যের পাশাপাশি বিদ্রোহ ও বিপ্লবের যে চিরায়ত উপাদান, সেটিই একে কালোত্তীর্ণ করে তুলেছে। শিকল পরে শিকলকে বিকল করার কথা আছে নজরুলের গানে। এই বই দুটিও যেন নিষিদ্ধ হওয়ার ‘শিকল’ পরে প্রকারান্তরে কর্তৃত্ববাদী শাসকের ‘শিকল’ ভেঙে ফেলতে উৎসাহ জুগিয়েছে কালে কালে, বারবার।

নিষিদ্ধের শতবর্ষ

Sunday, August 25, 2019

মেডিকেল ভর্তি নীতিমালায় বিপাকে শিক্ষার্থীরা by নজরুল ইসলাম

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় বিপাকে পড়েছেন মেডিকেল কলেজের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অনেকে। মন্ত্রণালয়টি তাদের প্রণীত নীতিমালা ২০১১ পাল্টে নীতিমালা ২০১৭-এ ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম করলে তখন থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই নীতিমালার ফলে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে কমপক্ষে জিপিএ দরকার ৯। অন্যদিকে নীতিমালা ২০১১ এর ক্ষেত্রে কম পক্ষে জিপিএ ৮ হলেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যেত।
জিপিএ ০৮ থেকে ০৯ করায় গত বছরে আট শিক্ষার্থী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর যৌথ বেঞ্চ গত মে মাসে রিটকারীদের পক্ষে রায় দেন। আদেশে বলা হয়, নীতিমালা ২০১৭ এর ২.২ অনুচ্ছেদ অবৈধ। অনুচ্ছেদটিতে ভর্তির ক্ষেত্রে জিপিএ ০৯ লাগবে বলে নিয়ম করেছিল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে বিএমডিসি। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ১৪ আগস্টেও রায় স্থগিত করে।
চলতি মাসের ২৫ তারিখ এই আপিলের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
কিন্তু বিএমডিসি তড়িঘড়ি করে ইতিমধ্যে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য ভর্তির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। আর তাতে জিপিএ ০৯ এর কম কিন্তু ৮ এর বেশি পেয়েছে বিজ্ঞান বিভাগের এমন শিক্ষার্থীরা বেকায়দায় পড়েছেন। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলে বেকায়দায় পড়া শিক্ষার্থীরা কীভাবে পরীক্ষা দেবেন এবং দিতে পারলেও প্রস্তুতির ঘাটতির কথা বলছেন অনেকে।
এছাড়া বাংলাদেশে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মেডিকেল কলেজে পড়তে জিপিএ দরকার ০৭ বা সমান নম্বর। দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দুই নিয়মকে বৈষম্য হিসেবে দেখছেন অনেকে। অথচ বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস পড়ে গিয়ে নিজ দেশে চিকিৎসক নিবন্ধন পরীক্ষায় প্রথম ধাপেই পাস করছেন।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে জিপিএ ০৬ বা ৫০ শতাংশ নম্বর হলেই মেডিকেল কলেজে পড়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। আর পাকিস্তানে দরকার হয় জিপিএ ৮ বা ৭০ শতাংশ নম্বর।
গত বছর ভারতে ১৪ লাখ শিক্ষার্থী এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পান। তা থেকে ৮ লাখ জনকে নির্বাচিত করা হয় এবং ১ লক্ষ ভর্তির সুযোগ পান।
এছাড়া ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদেরও দরকার হয় জিপিএ ০৯। যেটা খুবই দুরূহ ব্যাপার। বিএমডিসি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তে দেশের অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে এমবিবিএস পড়তে চলে যাচ্ছেন।
দেশের তৃণমূল পর্যায়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অনেকে ভালো শিক্ষকের কাছে পড়ার বা কোচিং করার সুযোগ পান না। শহরে বসবাস করা শিক্ষার্র্থীরা ভালো কোচিং এবং টিচারের কাছে পড়ার সুযোগ পাওয়ার ফলে তারা অপেক্ষাকৃত ভাল করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের তুলনায় শহরের ছেলেমেয়েরা জিপিএ ০৯ বেশি পান।
এমতাবস্থায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা জিপিএ ৮ পেলে মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় যেন অংশ নিতে পারেন এজন্য আট শিক্ষার্থী এ রিট করেন। তাতে অধিকসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীদের যাচাই বাছাইয়েরও সুযোগ হবে। অন্যথায় জিপিএ ০৯ হওয়াতে বিদেশে মেধাবীদের চলে যাওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থও দেশ থেকে চলে যাবে।
উক্ত পরিস্থিতিতে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জিপিএ ০৮ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
উন্নত স্বাস্থ্য সেবায় বিশ্বে ভারতের অনেক সুনাম। এই ৫০ শতাংশ নম্বর প্রাপ্তরাই গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিয়ে সুনামের সাথে সর্বোন্নত চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাই তারা যদি ৫০ শতাংশ নম্বর প্রাপ্তদের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশ কেন দেবে না, এমন প্রশ্ন অনেক শিক্ষার্থীর।

Tuesday, May 28, 2019

‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ খুলছে আবার by মাসুম আলী

দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতির ধারক বাংলা একাডেমির ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ অব্যবস্থাপনা আর অযত্নের শিকার। কক্ষের ভেতরে ময়লার স্তূপ। নষ্ট হওয়ার পথে বইপত্র, শিল্পীর আঁকা নজরুলের মুখচ্ছবি। স্মৃতিকক্ষ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শকের জন্য খোলা থাকার কথা। অথচ সেটিও তালাবদ্ধ থাকে সব সময়। এই অবস্থায় একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানাল, শিগগিরই কক্ষটি সংস্কার করে নতুন করে খুলে দেওয়া হবে।
১৯২৬ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে নজরুল অনেকবার ঢাকায় এসেছেন। নজরুলবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থে পাওয়া গেছে, বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে আছে নজরুলের অনেক দিনের স্মৃতি। মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় এসে তিনি প্রায় আড়াই সপ্তাহ ছিলেন। তখন প্রথম দিকে আবুল হোসেনের বাসায় উঠলেও পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের বাসা বর্ধমান হাউসে (১৯৫৫ সাল থেকে বাংলা একাডেমি) ওঠেন। কয়েক মাস পর হঠাৎ করে বন্ধুদের সঙ্গে আবার আসেন। তখন তিনি হাউস বাউন্ডারির মধ্যে অবস্থিত বড় একটি পুকুরে নিয়মিত সাঁতার কাটতেন। অবসর সময় পুকুরঘাটে বসে আড্ডা দিতেন।
বর্ধমান হাউসে কবি কয়েকটি কালজয়ী রচনা লেখেন। বর্ধমান হাউসে কবি নজরুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক এবং কবি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে। কাজী মোতাহার হোসেন দুজনকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী ফজিলতুন্নেসা নামে এক নারীর সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। ফজিলতুন্নেসা ছিলেন প্রথম মুসলিম ছাত্রী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেনের দূর সম্পর্কের বোন। সেই সুবাদে তাঁর বাসায় ফজিলতুন্নেসার আসা-যাওয়া ছিল।
বর্ধমান হাউসে কবির স্মৃতি ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’। ১৯৭৮ সালের ২৯ আগস্ট বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকীকে উপলক্ষ করে বাংলা একাডেমি ব্যতিক্রমী এবং ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই দিন ছিল বর্ধমান হাউসের দোতলায় পশ্চিম দিকে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি করা হয় জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনকে। সেদিন অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে কাজী মোতাহার হোসেন দর্শকদের মন্তব্যের খাতায় লিখেছিলেন, ‘আজ ২৯/৮/৭৮ তারিখে নজরুল স্মৃতিকক্ষ উদ্বোধন করা হলো। এটা আমার পক্ষে অতিশয় সুখের দিন; অবশ্য সে আমার নিজের গুণে নয়, নজরুল যে আমার সমসাময়িক কালের বন্ধু ছিলেন।’ আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের নজরুলবিষয়ক একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল উদ্বোধনী দিনে।
ঘটা করে উদ্বোধন হলেও পরবর্তী সময় ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’টি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারেনি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। রোববার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কক্ষটি তালাবদ্ধ। সামনে পড়ে আছে নজরুলের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য। একসময় খোলা হয়। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল ধুলাবালির স্তর জমেছে আসবাবপত্রে। পলেস্তারা খসে পড়েছে দেয়াল থেকে। এ কোনায় ঝুলিয়ে রাখা বীণা হাতে নজরুলের ওপর আঁকা একটি চিত্রকর্ম প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। একাডেমির বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এর আগে কক্ষটি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হতো। বসতেন একাডেমির কর্মকর্তারা। একসময় এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’টি নতুন করে খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই একুশে বইমেলার ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। এরপরই আমি কক্ষটি সংস্কার করে দর্শনার্থী এবং গবেষকদের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। যেহেতু মূল ভবনটি খুব পুরোনো, বয়সের ভারে কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। তাই খুব সাবধানে ধীরে-সুস্থে কাজ করতে হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, একাডেমি কর্তৃক বিশিষ্ট গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রণীত নজরুলের কয়েক খণ্ডের প্রামাণ্য জীবনী প্রকাশিত হবে।

Thursday, January 14, 2016

আলোচনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, সক্রিয়তা by নজরুল ইসলাম

গত মঙ্গলবারের সহিংসতার একপর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শহরের হালদার পাড়া এলাকায় কাপড় ও
পর্দার দোকানে অগ্নিসংযোগ করা হয় l প্রথম আলো
তিন দিন আগেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ছিল অন্য যেকোনো শহরের মতো শান্ত। সোমবার হঠাৎ করে মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে কিছু ব্যবসায়ী, স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সংঘর্ষ থেকে মঙ্গলবার শহরজুড়ে যে ভয়াবহ সহিংসতা হয়েছে, তাতে শহরবাসী হতভম্ব, বিষ্মিত।
এই বিস্ময় কাটিয়ে উঠে সবাই একবাক্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য স্থানীয় পুলিশের ওপর দায় চাপিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে দুই রকম মত পাওয়া গেছে। কেউ কেউ বলছেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। আরেক পক্ষের অভিযোগ, পুলিশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে।
তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন দাবি করেছে, তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। কারও পক্ষে অবস্থান নেয়নি। যদিও ইতিমধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল, হালদারপাড়া এলাকায় সৌখিন পর্দা বিতান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় মোট আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬ হাজার ৯৪ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের মাস্টার মইদুর রহমান বাদী হয়ে করা মামলায় বলা হয়, অজ্ঞাতনামা ৬০০-৭০০ ব্যক্তি রেলস্টেশনের আড়াই কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করেছে।
এদিকে মঙ্গলবার রাতে মাদ্রাসার ছাত্র মাসুদুর রহমানের লাশ শহরের ভাদুঘরে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। যে মাদ্রাসার ছাত্রের মৃত্যু নিয়ে এই তাণ্ডব, সেই জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি মোবারকউল্লাহ ও মাদ্রাসার ছাত্ররা বলেছেন, পুলিশ মাদ্রাসায় ঢুকে মাসুদকে গুলি ও মারধর করে তিনতলা থেকে ফেলে দিয়েছে। আরও অনেক ছাত্র গুলিতে আহত হয়েছে। মাসুদ পরে হাসপাতালে মারা যায়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক সার্জন হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বললেন, নিহত মাসুদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে গুলির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
পুলিশের ভাষ্য, গত সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের টিএ রোডে জেলা পরিষদ মার্কেট এলাকায় একজন বয়স্ক ইজিবাইকচালকের সঙ্গে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্রের বাগ্বিতণ্ডা হয়। তা দেখে মার্কেটের দোকানি রনি আহমেদ ইজিবাইকচালকের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। এর কিছুক্ষণ পর ওই মাদ্রাসার ছাত্ররা এসে ওই দোকান ভাঙচুর করে। রনি আহমেদের সঙ্গে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাদের ঘনিষ্ঠতা থাকায় তারা মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। সংঘর্ষে আহত হাফিজির ছাত্র মাসুদুর রহমান সোমবার দিবাগত রাত পৌনে তিনটার দিকে মারা যায়। এর জের ধরে মঙ্গলবার মাদ্রাসার ছাত্ররা শহরজুড়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা রেলস্টেশনে হামলা চালায়। রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে পুলিশের প্রসঙ্গই বারবার সামনে আসে। শহরের দক্ষিণ মোড়াইলের বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এত বড় ঘটনা ঘটল।
জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার এম এ মাসুদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় চট্টগ্রাম রেঞ্জের পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক তদন্ত করছেন। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে জানা যাবে। তিনি বলেন, পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। কারও পক্ষে অবস্থান নেয়নি।
গতকাল শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তাণ্ডবের চিহ্ন পাওয়া গেলেও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল। দোকানপাট খুলেছে। তবে রেলওয়ে স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) মো. মাহাবুবর রহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান। গতকাল তদন্ত কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত রেলস্টেশন পরিদর্শন করে।
মাহাবুবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের দায়িত্বে কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা দেখার পাশাপাশি সহিংস ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের দাবি মেনে নেওয়ায় তারা আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। দাবি অনুযায়ী পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। নাসিরনগর উপজেলার ‘হযরত শাহজালাল (রা.) মসজিদ ও কওমি মাদ্রাসা কমপ্লেক্স খুলে দিয়ে সেখানে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিপর্যস্ত রেলস্টেশন: গতকাল সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে নেমে দেখা যায় ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। সেখানে উত্সুক মানুষ ভিড় করেছে। কেউ আবার মুঠোফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলেছেন। দেখা যায়, রেলওয়ে স্টেশনের একটি কক্ষে প্যানেল বোর্ডটি চুরমার হয়ে পড়ে আছে। এটি দিয়ে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও অবস্থান জানা যেত।
ভিআইপি যাত্রীদের বসার ঘরসহ রেলওয়ে স্টেশনের একের পর এক কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। এসব কক্ষের সামনে কাচের টুকরা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে আছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রেল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও টিকিট দিতে ব্যবহৃত কম্পিউটারটি।
প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা বলেন, তাঁরা দুর্ভোগে আছেন। ট্রেনের অবস্থান ও তথ্য জানতে পারছেন না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার এস এম মইদুর রহমান বলেন, প্যানেল বোর্ডটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন তিনি ট্রেনের অবস্থান এবং সে সম্পর্কে যাত্রীদের তথ্য দিতে পারছেন না। এ কারণে যাত্রীদের সঙ্গে রেলওয়ে কর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে। কম্পিউটার না থাকায় হাতে লিখে টিকিট দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হামলার সময় পুলিশ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাহায্য চেয়ে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কেউ আসেনি। স্বল্পসংখ্যক রেলওয়ে থানার পুলিশ ৬০০-৭০০ হামলাকারী মাদ্রাসার ছাত্রের কাছে যেতে সাহস পায়নি।
দাফন: মাসুদুর রহমানের লাশ শহরের ভাদুঘরে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। গতকাল বিকেলে ওই বাড়িতে গেলে মাসুদুরের মা মোছাম্মৎ তায়িবা বেগম বলেন, তিনি পুত্র হত্যার বিচার চান। তবে মাদ্রাসার শিক্ষকেরা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটাই তিনি মেনে নেবেন।
আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন: গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে জেলা আওয়ামী লীগ সংবাদ সম্মেলন করে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডবে ৭০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দাবি করে বলেন, মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে মিশে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডব চালিয়েছে।
আল মামুন সরকার বলেন, সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনের যে ক্ষতি হলো, তা অপূরণীয়। সেখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রসহ দুর্লভ জিনিসপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মাদ্রাসায় জেলা ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে এবং সোমবার রাতে জেলা পরিষদ মার্কেটের ব্যবসায়ী একদল যুবককে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুনেছেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাত-আটজন মুখোশধারী ছাত্রলীগকে দায়ী করতে জামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় হামলা করেছে। বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মী ও জঙ্গিবাদীরা এসব তাণ্ডব চালিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগ জড়িত নয়।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি পৌর মেয়র হেলাল উদ্দিন, সহসভাপতি তাজ মোহাম্মদ ইয়াছিনসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যুর জের ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গত মঙ্গলবার পুড়িয়ে দেওয়া হয় সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনও। সেখানে থাকা সুরসাধকের অধিকাংশ স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস হয়ে গেছে। গতকাল বিকেলে তোলা ছবি l সাইফুল ইসলাম

Thursday, November 5, 2015

ইতালীয় নাগরিক হত্যা: তিন সন্দেহভাজনের বাসায় দূতাবাসের কর্মকর্তারা by নজরুল ইসলাম

ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যায় তিন সন্দেহভাজনের বাসায় গিয়ে তাঁদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা। এঁদের মধ্যে বিএনপির নেতা সাবেক কমিশনার এম এ কাইয়ুমের ছোট ভাই এম এ মতিনও রয়েছেন।
গতকাল বুধবার মধ্যরাতে ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় গতকাল বেনাপোল থেকে মতিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিনহাজুল আরেফিন রাসেলের জবানবন্দিতে মতিনের নাম এসেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।
সিজার তাবেলা হত্যা মামলায় গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। এঁদের মধ্যে যে দুজনের বাসায় ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা গিয়েছেন, তাঁরা হলেন তামজিদ আহম্মেদ রুবেল (৩৫) ও শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরিফ (৩৫)। গ্রেপ্তার বাকি দুজন হলেন মিনহাজুল আরেফিন রাসেল (৪০) ও রাসেল চৌধুরী (৩৫)। এঁদের মধ্যে রাসেল চৌধুরী ছাড়া বাকি তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। রাসেল চৌধুরীকে গত মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে তামজিদের বাসায় গেলে তাঁর মামা মাইনউদ্দিন আহমেদ ওরফে তৌহিদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৭ অক্টোবর বেলা তিনটার দিকে দুজন বিদেশি তাঁদের বাসায় যান। তাঁরা নিজেদের ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। এঁদের একজন ইংরেজিতে কথা বলেন, আরেকজন ছিলেন দোভাষী। দোভাষী ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে কথা বলে তা ইংরেজিতে রূপান্তর করে সঙ্গী কর্মকর্তাকে বলেছেন এবং তিনি ল্যাপটপে তা লিখে নিয়েছেন।
মাইনউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তামজিদকে কবে, কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁর বিষয়ে কেন বাড্ডা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে, তা জানতে চান কর্মকর্তারা। জবাবে তিনি বলেছেন, তামজিদ ১২ অক্টোবর নিখোঁজ হন। ২১ অক্টোবর তাঁরা বাড্ডা থানায় জিডি করেন। ২৬ অক্টোবর টিভি দেখে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁকে ইতালির নাগরিক হত্যায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ তাঁকে কয়েক ঘণ্টা আগে ধরেছিল বলে দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে।
মাইনউদ্দিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বলেছেন, তামজিদের বিরুদ্ধে আগে থানায় কোনো মামলা কিংবা জিডি ছিল না। তাঁর বাসায় এর আগে কখনো পুলিশও আসেনি। তামজিদ তাঁদের কিছু বলেছেন কি না—ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের এই প্রশ্নের জবাবে মাইনউদ্দিন বলেছেন, ডিবি পুলিশের চাপের মুখে তামজিদ হত্যার দায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন বলে তাঁদের জানিয়েছেন। এ ছাড়া কারাগারে দেখা করতে গেলে তামজিদকে তাঁরা খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখেছেন।
শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরিফের মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটের বাড়িতে ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা গিয়েছেন গত ১৬ অক্টোবর বেলা তিনটায়। বাড়ির তত্ত্বাবধানকারী মো. রিপন গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, দুজনের একজন ইংরেজিতে কথা বলেছেন, আরেকজন বাংলায়। কর্মকর্তারা জানতে চেয়েছেন, শাখাওয়াত কবে, কোথা থেকে, কীভাবে ধরা পড়লেন? জবাবে তিনি বলেছেন, ১৪ অক্টোবর মধ্যরাতে সাদা পোশাকের ১৪-১৫ জন এসে নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিলে তিনি বাড়ির প্রধান ফটক খুলে দেন। এরপর তাঁরা সরাসরি ছয়তলায় শাখাওয়াতের ঘর থেকে তাঁকে আটক করেন। ওই সময় শাখাওয়াতকে হাতুড়িপেটাও করা হয়। ওই সময় তাঁরা গ্যারেজে থাকা শাখাওয়াতের মোটরসাইকেলটি টেনে রাস্তায় নিয়ে তালা ভেঙে ফেলেন এবং সেটি নিয়ে যান। এই মোটরসাইকেলটি হত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। ২৬ অক্টোবর ডিবি পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে শাখাওয়াতকে গ্রেপ্তার ও মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানায়।
ইতালীয় দূতাবাসের কর্মীরা বাড়ির তত্ত্বাবধানকারী মো. রিপনের কাছে জানতে চান শাখাওয়াতের বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা আছে কি না। তিনি তাঁদের জানিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। শাখাওয়াতের বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়া এই কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামির পরিবারের সঙ্গে ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা কথা বলেছেন কি না, জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মো. জিহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দূতাবাস চাইলে আসামিদের বিষয়ে নিজেদের মতো করে খোঁজখবর নিতে তাঁদের বাসায় যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে তাঁকে তারা কিছু জানায়নি।
অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে গতকাল দুপুরে জানতে চাইলে ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে দূতাবাসের সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা ও দূতাবাসের কনসুলার বিভাগের প্রধান জভানি চিয়ানি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরাসরি খোঁজ-খবর রাখছেন।
দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যায় জড়িত হিসেবে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এম এ কাইয়ুমের ছোট ভাই এম এ মতিনের নাম এসেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। তাঁর বাসাও মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে। দিন তিনেক আগে ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয়ে দুজন তাঁদের বাসায়ও যান।
মতিনের স্ত্রী মুসাররাত জাহান দিলরুবা প্রথম আলোকে বলেন, দুই ব্যক্তি তাঁদের ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাঁদের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা নিরাপত্তাকর্মীর কাছে জানতে চান মতিন কোথায় আছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কি না। জবাবে নিরাপত্তাকর্মী তাঁদের বলেছেন, ২০ অক্টোবর এশার নামাজে যাওয়ার সময় বাসার কাছ থেকে সাদা পোশাকের কিছু ব্যক্তি ডিবি পরিচয়ে মতিনকে তুলে নিয়ে গেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর খোঁজ মেলেনি। নিরাপত্তাকর্মী তাঁদের জানিয়েছেন, মতিনের বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা কিংবা জিডি নেই।

Saturday, October 31, 2015

নানা চাপে পদত্যাগ শমসের মবিনের by হাবিবুর রহমান খান ও নজরুল ইসলাম

হঠাৎ করেই আলোচনায় শমসের মবিন চৌধুরী। বিএনপির এ ভাইস চেয়ারম্যান দলের সব পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি রাজনীতি থেকেই অবসরের ঘোষণা দেয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। দলের ভেতরে এ নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। তার অবসরের নেপথ্য কারণ খোঁজার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দলের একটি অংশ বিষয়টিকে সরকারের ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে। এই সিদ্ধান্ত নিতে সরকার তাকে বাধ্য করেছে বলে মনে করেন ওই অংশটি। তবে দলের কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে হইচই করার কিছু নেই। তিনি দলে না থাকলে মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হতাশা এবং নানামুখী চাপ সামলাতে না পেরেই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন শমসের মবিন।
অবসর ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার শমসের মবিন চৌধুরীর বনানী ডিওএইচএসের বাসায় সারা দিন বিএনপির কোনো নেতাকে যেতে দেখা যায়নি। সকালে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা বললেও দুপুরের পর থেকে তিনি আর কারও সঙ্গে দেখা করেননি। শমসের মবিনের পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, ‘উনি তো আমাদের মতো তৃণমূল থেকে রাজনীতি করেননি। সারা জীবন সরকারি চাকরি করেছেন। অসুস্থ হলেও আমাদের মতো তো পারবেন না। জেল-মিথ্যা মামলায় মানসিক চাপের মধ্যে আছেন। চাপ ও অসুস্থতার জন্য হয় তো এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার (শমসের মবিন) যোগাযোগও ছিল না। তার এ ঘোষণা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। আমাদের নেতাকর্মীরাও এজন্য প্রস্তুত ছিলেন। এটা শকড না, বিস্ময়কর কিছুও না।’
তবে অবসরের কারণ সম্পর্কে শমসের মবিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, কারও চাপে নয়, একান্ত স্বাস্থ্যগত কারণে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। দুপুরে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে চিন্তাধারা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটা গঠনমূলক রাজনীতির কথা ভেবেছিলেন, অনেকের মতো আমার মনেও প্রশ্ন বিএনপি সেখানে কতটুকু রয়েছে। তবে যেটা বড় দাগের কথা, রাজনীতির অবক্ষয় অবশ্যই বাংলাদেশে ঘটেছে। এটা আমাদের কারও জন্য কাম্য নয়। দল থেকে পদত্যাগ ও রাজনীতি ছাড়ার কারণ নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়েও যান।
বিএনপির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, যারা দলের কূটনৈতিক দিকগুলো দেখভাল করতেন, তাদের অন্যতম ছিলেন শমসের মবিন চৌধুরী। তারা বিভিন্ন সময়ে দলের হাইকমান্ডকে নানা আশা দেখিয়েছেন। নানা স্বপ্ন দেখিয়ে বিএনপিকে বিদেশনির্ভর দলে পরিণত করেন। আন্দোলন থেকে শুরু করে সবকিছুই চলে বিদেশী প্রেসক্রিপশনে। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন বা প্রত্যাশা সফল না হওয়ায় দলের হাইকমান্ডসহ তৃণমূলও চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়। চলতি বছরে সর্বশেষ বিএনপি জোটের আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর কূটনৈতিক বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্ব নেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি নতুনদের দায়িত্ব দেন। এতে করে যারা কূটনৈতিক বিষয়গুলো দেখাভাল করতেন দলে তাদের গুরুত্ব কমে যায়। শুধু রুটিন কাজগুলো করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। এছাড়াও বিএনপির হয়ে যারা কূটনৈতিক বিষয়গুলো দেখভাল করতেন তাদের কারও কারও বিষয়ে চীন ও ভারতের আপত্তিও রয়েছে। যার কারণে গত বছর এক বিএনপি নেতার বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে শমসের মবিনকে ডাকা হয়নি। ওই বৈঠকে ভারতের বিজেপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সর্বশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করেন তাতেও ছিলেন না শমসের মবিন।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আন্দোলন স্থগিত করার পেছনেও শমসের মবিনের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে খালেদা জিয়া স্বীকার করেন, ওই সময় আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। এ নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানও ফোনে শমসের মবিনকে ভর্ৎসনা করেন বলে জানা যায়।
বিএনপি সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি খালেদা জিয়া। এ নিয়ে দলের একটি অংশ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়। অভিযোগ ওঠে শমসেরের পরামর্শেই ওই সাক্ষাৎ হয়নি। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ না করার ঘটনায় ভারত বিএনপির ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়। মনে করা হয়, এ কারণেই রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে প্রভাবশালী দেশগুলো সরকারকে চাপ দিলেও এখনও ভারত নীরব রয়েছে। এছাড়া ২০১১ সালে খালেদা জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র সফরেও শমসের মবিন ব্যর্থতার পরিচয় দেন। ওই সফরে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত হিলারির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হন তিনি। এ অবস্থায় দলে তার গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। এ ছাড়া আগামী দিনে দল ঢেলে সাজানোর ঘোষণায় দল থেকে তার বাদ পড়ার আশংকাও ছিল। এসব কারণে আগেই তিনি দল ও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বলে দলের এক নীতিনির্ধারক জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ২২ মে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে নীরবে বাসায় সময় কাটাচ্ছেন তিনি। দলের নেতারা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার রেওয়াজ থাকলেও শমসের তা করেননি। দলের চেয়ারপারসনও তাকে দেখা করতে কোনো বার্তা পাঠাননি। এ নিয়ে আরও হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। দলে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাচ্ছে- এমনটাই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। অন্যদিকে কারগার থেকে বের হওয়ার পর সরকারের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করেন বলেও খালেদা জিয়ার কাছে অভিযোগ আসে।
সূত্র জানায়, নানা ব্যর্থতার কারণে তার প্রতি দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভের পাশাপাশি ছিল সরকারের নানামুখী চাপ। মামলার জালে বন্দি করা হয় তাকে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে তিনি জামিন লাভ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ থাকলেও চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে পারেননি। এমআরপি (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট) করতে দিলেও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তা দিচ্ছে না বলে বিশ্বস্ত একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিএনপির ওই সূত্রের মতে, সরকারের চাপের মুখে দলের আরও কয়েকজন নেতাও যে কোনো সময় শমসের মবিনের পথে হাঁটতে পারেন।
এদিকে শমসের মবিন সাংবাদিকদের বলেন, তিনি প্রোস্টেট ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া জরুরি। এমআরপি করার জন্য জুলাইয়ে আবেদন জমা দিয়েছি। কিন্তু এখনও আমাকে তা দেয়া হয়নি। কেন দিচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারকে জিজ্ঞাসা করুন। তারা (সরকার) বড় ভাই খুঁজবে, না আমার পাসপোর্ট দেবে- কে জানে।’
সূত্র জানায়, সরকারের নানা চাপের কারণে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করেন শমসের মবিন। তারা তাকে আপাতত রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়ে নিরিবিলি অবস্থান করতে বলেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তারাও একই কথা বলেন। সবকিছু বিবেচনা করে শেষপর্যন্ত রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ারই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে এ সিদ্ধান্তের কথা দলের চেয়ারপারসন দেশে ফেরার পর জানাতে কয়েকজন অনুরোধ করলেও তিনি তা রাখেননি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তার অবসর নিয়ে হইচই করার কিছু দেখছি না। এটা স্বাভাবিক। তার বয়স হয়েছে। স্বাস্থ্যগত কারণে হয় তো রাজনীতি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটাকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর পেছনে সরকারের কোনো চাপ আছে বলে মনে করি না। তবে সরকার তার এ অবসরের ঘোষণা নিয়ে রাজনীতি করতে পারে।
এদিকে দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শমসের মবিন বলেন, কেউ পদত্যাগ করবে বা অবসর নেবে কি নেবে না এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার এ পদত্যাগ বিএনপিতে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপি একটা বড় দল। আমার চলে যাওয়াতে ক্ষতি হবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি তেমন কোনো ব্যক্তি না যে, আমার সিদ্ধান্তে এতবড় একটা দলের বিরাট ক্ষতি হবে। সুস্থ হলে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কিনা জানতে চাইলে শমসের মবিন বলেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার প্রয়াস আমার থাকবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীকে ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দিযেছে আদালত। শমসের মবিনকে শমশের মবিনকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে শাহবাগ থানায় দায়ের করা ছবি বিশ্বাস হত্যা চেষ্টা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড চান তদন্ত কর্মকর্তা একেএম সাইদুল হক ভুইয়া। শুনানি শেষে ম্যাজিস্ট্রেট এমদাদুল হক ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শমসের মবিনের পক্ষে আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল পূর্বক জামিনের আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে জামিন আবেদন নাকচ করে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে এ মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। যদিও এজাহারে তার নাম নেই। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের ১ নম্বর রোডের ৯২ নং বাসা থেকে শমসের মবিনকে ধরে নিয়ে যায় ডিবি।
উল্লেখ্য, গত ২৪ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে বকশিবাজারে বিএনপি ও ছাত্রলীগকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও হামলা চালানো হয়। এ সময় নেত্রোকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের ওপর হামলা চালান। এতে এমপি ও তার গাড়িচালক আহত হন। পরে হামলাকারীরা এমপির গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। ওই ঘটনায় শাহবাগ থানায় ছবি বিশ্বাসকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করে পুলিশ। শনিবার 10 January 2015

Saturday, October 24, 2015

মধ্যরাতে হোসনি দালানে বোমা হামলায় নিহত ১, আহত শতাধিক by নজরুল ইসলাম ও গোলাম মর্তুজা

পুরান ঢাকার হোসনি দালান এলাকায় গতকাল
গভীর রাতে বোমা হামলায় আহত ব্যক্তিদের
চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
রাত তিনটার সময় ছবিটি তুলেছেন সাজিদ হোসেন
রাজধানীর পুরান ঢাকার হোসনি দালান এলাকায় গভীর রাতে বোমা হামলায় এক কিশোর নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ১০০ জনের বেশি। এদের মধ্যে ৫৭ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ১৭ জন মিটফোর্ড হাসপাতালে ও ১৬ জন মগবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতরা জানান, গতকাল শুক্রবার দিবগত রাত পৌনে দুইটার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার জন্য পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকে নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা এ সময় ওই এলাকায় মোতায়েন ছিলেন। নিহত কিশোরের নাম সাজ্জাদ হোসেন। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে পুরান ঢাকার হোসনি দালানে আসেন নগরীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ। এদের অধিকাংশই শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) শহীদ হওয়ার দিনকে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে পালন করে থাকে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রাত দেড়টা থেকে হোসনি দালানের মূল ফটকে একটি তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি চলছিল। মিছিলটি পল্টনে যাওয়ার কথা ছিল। মিছিলে যোগ দিতে এসেছিলেন তরুণ, বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। এর মধ্যেই রাত পৌনে দুইটার দিকে মুহুর্মহু বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। কারও কারও মতে পরপর ১০-১৫টি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কেউবা দৌড় দিতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পায়ের তলায় পড়েছেন। কান্না-চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আশপাশের বাসিন্দারা যে যেভাবে পারেন মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ভ্যান, লেগুনায় করে আহতদের ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও আশপাশের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনার পরে হোসনি দালান এলাকায় অনেককে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা চেয়ার, স্যান্ডেল, তাজিয়া মিছিলের সজ্জার সরঞ্জামাদি। বিভিন্ন স্থানে ছিল ছোপ ছোপ রক্ত। ঘটনাস্থলে কালো স্কচটেপ মোড়ানো একাধিক অবিস্ফোরিত বোমা পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
হোসনি দালান এলাকায় পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত
একটি বোমা। রাত পৌনে তিনটার সময় তোলা
রনি নামের এক যুবক জানান, ঘটনার সময় তিনি দুলদুল ঘোড়ার কাছে ছিলেন। সবাই মোনাজাত করছিলেন। হঠাৎ আগুনের হলকার মতো কিছু ছুটে আসতে দেখেন। এরপর শুরু হয় হুড়োহুড়ি। তিনি ৮/১০টি আওয়াজ শুনেছেন বলে জানান।
আমলিগোলার বাসিন্দা আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মিছিলটি হোসনি দালান থেকে শুরু হয়ে পল্টন ঘুরে আবার হোসনি দালানে এসে হওয়ার কথা ছিল। এ জন্য মিছিলের আগে মোনাজাত করছিলেন সবাই। মোনাজাতের সময়ই বোমা হামলা হয়। রাবেয়া আক্তার নামের এক নারী বলেন, বোমায় তার হাত ও পা ঝলছে গেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেখা যায়, কেউ কোঁকাচ্ছেন, কেউ ব্যথায় কাঁদছেন। কেউ চিৎকার করে ফোনে বলছেন, ‘ভাইরে পাইতাছি না’। কারও গলা থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। কারও মাথায়, কারও বা পায়ে ব্যান্ডেজ।। কারও সারা শরীরেই রক্তাক্ত জখম। কেউ চিৎকার করছেন ‘ডাক্তার কই’ বলে। কেউ আবার অন্য হাসপাতালে রোগী নিতে যানবাহনের জন্য ছোটাছুটি করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে ৫৭ জন চিকিৎসাধীন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, রাতে কোনো ধরনের মিছিল না করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল। কিন্তু তা কেউ শোনেনি।

Wednesday, July 29, 2015

থেমে গেছে সোনা চোরাচালান তদন্ত by নজরুল ইসলাম

বহুল আলোচিত সোনা চোরাচালান মামলার তদন্ত নিয়ে চুপ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত নভেম্বরে আলোচিত এই সোনা চোরাচালানের জন্য বাংলাদেশ বিমানের পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যানের কথিত ধর্মপুত্রসহ প্রতিষ্ঠানটির চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং একজন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। জবানবন্দিতে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ৬৯ জনের নাম আসে। তাঁদের মধ্যে ৬৪ জন বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাকিরা মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী। এরপর আট মাস পার হলেও এসব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই।
অথচ সে সময়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারোরই শাস্তি হয়নি। বরং একজন এরই মধ্যে জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেছেন। এদিকে, জবানবন্দিতে নাম আসার বিষয়টিকে পুঁজি করে সংশ্লিষ্ট বিমানকর্মীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে বলেও বিমানে প্রচার রয়েছে।
ডিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না পাওয়ায় বাকিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তাই তদন্ত স্থবির হয়ে আছে।
যোগাযোগ করা হলে গতকাল শনিবার রাতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নূরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি দরকার হয় না।
নূরুল হুদা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৈথিল্য ও গাফিলতির কারণে অনেক সময় আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আবার দুর্বল পুলিশি প্রতিবেদনের কারণেও আসামি জামিনে বেরিয়ে যায়। অথচ সোনা চোরাচালান মামলায় সাজা হলে চোরাচালান কমে আসতে পারে।
গত ১২ নভেম্বর শুল্ক গোয়েন্দারা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২ কেজি ৬০০ গ্রাম সোনাসহ বিমানের ক্রু মাজহারুল আবছারকে গ্রেপ্তার করে। মাজহারুল আবছার বিমানের ৬১ জন, সিভিল এভিয়েশনের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একজন মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী জড়িত বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর জবানবন্দির ভিত্তিতে সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮ নভেম্বর বিমানের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমেদের ‘কথিত ধর্মপুত্র’ মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ, চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মো. আসলাম শহিদ, ফ্লাইট সেবা শাখার উপমহাব্যবস্থাপক মো. এমদাদ হোসেন, ম্যানেজার সিকিউরিটি শিডিউলিং মো. তোজাম্মেল হোসেন এবং উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক মো. হারুন অর রশীদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার ওই পাঁচজন সোনা চোরাচালানে বিমানের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৩ জন জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ ঘটনায় হওয়া মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিতে যেসব নাম এসেছে, তাঁদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঈদের আগে তিনি এ কথা বলেছিলেন। বর্তমানে শেখ নাজমুল আলম দেশের বাইরে আছেন।
গতকাল শনিবার যোগাযোগ করা হলে মামলার আরেক তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার শফিক আলম বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সহকারী কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি বদলি হয়ে গেছেন। এই মামলার তদন্তভার অন্য কাউকে দেওয়া হয়েছে কি না, তিনি তা জানেন না।
মামলার তদন্ত ও আদালত সূত্র জানায়, কথিত ধর্মপুত্র মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ আদালতকে জানান, ২০১০ সালে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমেদের ধর্মপুত্র পরিচয় দিয়ে মাহমুদুল হক ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পান। বিমানের চেয়ারম্যানকে তিনি বাবা ডাকতেন। বিমানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ যাতায়াত এবং তাঁর স্ত্রী কেবিন ক্রু নূরজাহানের মাধ্যমে অন্য ক্রুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
বিমানে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন মাহমুদুল হক পলাশ। তিনি আদালতকে আরও বলেন, তাঁর পছন্দের ক্রুদের বাছাই করে বিভিন্ন ফ্লাইটে সোনার চালান আনা হতো। পাচারের ৩০ শতাংশ সোনার চালান ধরা পড়ে। আর বেশির ভাগ ভারতে পাচার হয়ে যায়।
বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক মো. এমদাদ হোসেন জবানবন্দিতে আদালতকে বলেন, পলাশ সোনা-মুদ্রা চোরাচালানের একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী হারুন অর রশীদ আদালতকে বলেন, তাঁর মতো উত্তরার চারটি মানি এক্সচেঞ্জে পরিচালনকারী আরও ছয়জন সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত।
বিমানের ব্যবস্থাপক (শিডিউলিং) তোজাম্মেল হোসেন আদালতকে জানান, পলাশ সোনা পাচারের সঙ্গে জড়িত তা তিনি আগে জানতেন না। তিনি জবানবন্দিতে ক্যাপ্টেন শহীদসহ বিমানের কয়েকজন কর্মচারীর নাম উল্লেখ করে বলেন, তাঁরা সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁদের মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন মাহমুদুল হক পলাশ।
সোনা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ ও বিমানের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কারাগারে আছেন। কারাবন্দী অন্যরা হলেন আবু মো. আসলাম শহিদ, মো. এমদাদ হোসেন ও মো. তোজাম্মেল হোসেন। তবে ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক মো. হারুন অর রশীদ সম্প্রতি জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেছেন।
সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার বাংলাদেশ বিমানের ডিজিএমসহ পাঁচজনের চার দিনের রিমান্ড আদালত মঞ্জুর করেছেন। ছবি: ফোকাস বাংলা নভেম্বর ১৯, ২০১৪ #ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) দাবি করেছে, গত ১৮ নভেম্বর ২০১৪ মঙ্গলবার রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, উত্তরা ও বসুন্ধরা এলাকা থেকে সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবি পুলিশ আজ এই পাঁচজনকে আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে। আদালত তাঁদের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন বাংলাদেশ বিমানের ডিজিএম এমদাদ হোসেন, চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ, ব্যবস্থাপক (শিডিউলিং) তোজাম্মেল হোসেন, বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক ও মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ।

Saturday, July 18, 2015

ইস্কাটনে জোড়া খুন: সাংসদপুত্রের এলোপাতাড়ি গুলির ঘটনায় অভিযোগপত্র চূড়ান্ত একমাত্র আসামি সাংসদপুত্র বখতিয়ার by নজরুল ইসলাম

বখতিয়ার আলম রনি
রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে জোড়া খুনের মামলায় সাংসদপুত্র বখতিয়ার আলম রনিকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র তৈরি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আগামী সোম বা মঙ্গলবার আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হতে পারে। বখতিয়ারের মা পিনু খান সংরক্ষিত আসনের সাংসদ ও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগপত্রে বখতিয়ারের ব্যবহার করা প্রাডো গাড়ির চালক ইমরান ফকিরসহ তিনজনকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এই মামলায় সাক্ষী করা হচ্ছে। আদালতে দেওয়া ইমরানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে সাক্ষীর জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণের জন্য আদালতে আবেদন করবেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ গত বুধবার অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করার এবং বখতিয়ারকে একমাত্র আসামি করার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ইমরান ফকির ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এতে তিনি জড়িত নন। তাই তাঁকে মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বখতিয়ারকে (৪২) তিন দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। ডিবি সূত্র বলেছে, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি গুলি করার কথা জানালেও আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হননি। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সূত্রবিহীন ও আলোচিত এই মামলার খুঁটিনাটি ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তিন মাসেরও কম সময়ে তদন্ত শেষ করা হয়েছে। সোম বা মঙ্গলবার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া গাড়িচালক ইমরান ফকির গত ১ মে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে (পৌনে দুইটা) বখতিয়ারকে বহন করা প্রাডো গাড়িটি নিউ ইস্কাটন রোডে যানজটে আটকে পড়ে। এতে চালকের পাশের আসনে বসা নেশাগ্রস্ত বখতিয়ার বিরক্ত হয়ে তাঁর লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে চার-পাঁচটি গুলি করেন। বখতিয়ারের বন্ধু আবাসন ব্যবসায়ী কামাল মাহমুদ ও মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল ঘটনার সময় গাড়িটির পেছনের আসনে বসা ছিলেন। তাঁরা আদালতে জবানবন্দিতে বলেছেন, বখতিয়ার তাঁর পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছেন। এ ছাড়া ঘটনার আগে বখতিয়ারের সঙ্গে থাকা তাঁর আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের আদালতে জবানবন্দি, বস্তুগত প্রমাণ, তদন্ত ও অন্যান্য সূত্র থেকে ডিবি পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, বখতিয়ারের এলোপাতাড়ি গুলিতে দৈনিক জনকণ্ঠ-এর সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী (৪০) ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম (২৫) আহত হন। পরে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
হাকিম মারা যান ১৫ এপ্রিল বিকেলে। সেদিন রাতে হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, গাড়ির জানালা খুলে একজন লোক এলোপাতাড়ি চার-পাঁচটি গুলি ছুড়েছে।
ইয়াকুব মারা যান ২৩ এপ্রিল রাতে। ইয়াকুবের বুকে গুলি বিদ্ধ হয় এবং হাকিমের পেছনের অংশে গুলি ঢুকে নাভির নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। নির্মাণাধীন ভবন এলএমজি টাওয়ারের সামনে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, জোড়া খুনের এই মামলার তদন্তভার রমনা থানার পুলিশের কাছ থেকে ২৪ মে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে ন্যস্ত হয়। সূত্রবিহীন এ মামলা তদন্তের একপর্যায়ে ডিবি জনকণ্ঠ ভবনে স্থাপিত ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ হওয়া ফুটেজে ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে ওই সড়কে দুবার কালো রঙের একটি প্রাডো গাড়ির (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৬২৩৯) বেপরোয়া চলাচল দেখে। ডিবি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথিপত্র দেখে নিশ্চিত হয়, ওই গাড়িটি সাংসদ পিনু খানের। একই সঙ্গে ডিবি তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও অন্য সূত্রের মাধ্যমে নিউ ইস্কাটনে ঘটনার আগে ও পরে বখতিয়ার ও ইমরানের অবস্থানও নিশ্চিত হয়। বখতিয়ার তাঁর মায়ের ওই গাড়িটি ব্যবহার করতেন।
পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা গাড়িচালক ইমরানকে শনাক্ত করেন এবং তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হন। ডিবি ৩১ মে ইমরানকে আটক করে। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে ধানমন্ডির বাসা থেকে বখতিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিনই বখতিয়ারের লাইসেন্স করা পিস্তলটি জব্দ করা হয়। ৪ জুন ডিবি ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য পিস্তলটি সিআইডির আগ্নেয়াস্ত্র পরীক্ষা শাখায় পাঠায়। এই পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই পিস্তল থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে এবং নিহত ইয়াকুবের শরীরে পাওয়া গুলি ও ওই পিস্তলের গুলির ধরন এক, পয়েন্ট ৩২ বোরের। ১৪ জুন প্রাডো গাড়িটি জব্দ করা হয়। ৫ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে বখতিয়ারের পিস্তলের লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করেন।
সাংসদপুত্র বখতিয়ারকে আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে—এ কথা জানালে নিহত রিকশাচালক হাকিমের মা ও মামলার বাদী মনোয়ারা বেগম বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘জানি ছেলে ফেরত পামু না, তবুও হত্যার বিচার হইলে মনে কিছুটা শান্তি পামু।’ তিনি বলেন, ‘বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছাইড়া দিছিলাম। এত দিন মনে করছিলাম গরিবের জন্য বিচার নাই, কিন্তু এহন দেখলাম গরিবের পাশেও মানুষ দাঁড়ায়।’ তিনি ডিবি পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

Wednesday, July 1, 2015

সাঁওতাল বিদ্রোহের উত্তরাধিকার by নজরুল ইসলাম

আজ মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০তম বার্ষিকী। ১৬০ বছর আগে ১৮৫৫-৫৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভগনাডিহি গ্রামে বীর সিধু-কানুর নেতৃত্বে এ বিদ্রোহ হয়েছিল। ইতিহাসে যা সাঁওতালি ‘হুল’ বা সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। শাসনব্যবস্থার িভত শক্ত করতেই ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল, তাদের আক্রমণ থেকে আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীও বাদ যায়নি।
সেদিনের সাঁওতালি হুল ছিল ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী ও তাদের দালাল জমিদার শ্রেণি, সুদখোর মহাজন, নিপীড়ক প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রথম শক্তিশালী সশস্ত্র প্রতিবাদ। সিপাহি বিদ্রোহের কিছুদিন আগেই এটি সংঘটিত হয়। সাঁওতালি জাতি তার নিজ ভূমিতে স্বাধীন সাঁওতালি রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে সেদিন গর্জে উঠেছিল। সিধু-কানুর গ্রাম ভগনাডিহিতে ২০-২৫ হাজার সমবেত সাঁওতালি প্রকাশ্য সমাবেশে এ বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। বিদ্রোহ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। নিম্নবর্গের হিন্দু, ডোম, তেলীসহ অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষেরাও শোষণ থেকে মুক্তির আশায় এ বিদ্রোহে অংশ নেয়। ১৮৫৫-৫৬ সালে সাঁওতালি ‘হুল’ ইংরেজ শাসনের শক্ত ভিত্তিমূলে আঘাত হানে।
ইংরেজ নীলকুঠিতে ও জমিদারদের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজ বাহিনীর আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে সাঁওতালি তির-ধনুক, বর্শা, টাঙ্গি বেশি দিন টিকতে পারেনি। বিদ্রোহের নেতা সিধু-কানু গ্রেপ্তার হলে বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। ইংরেজদের নথি থেকে জানা যায়, সেদিন বিদ্রোহ দমনের নামে বহু গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার সাঁওতালকে গ্রেপ্তার করে জেলে পোরা হয়। বিদ্রোহের মহান নেতা সিধু-কানুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে এ বিদ্রোহে অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, এটা গণহত্যার শামিল।
সেদিনের সাঁওতাল বিদ্রোহের রক্তাক্ত পথ ধরে মুণ্ডা বিদ্রোহ, তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ, টংক আন্দোলন, তেভাগা ও পরবর্তীকালের ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ আরও অনেক আন্দোলন হয়েছে। সে কারণে মহাশ্বেতা দেবীর সেই উক্তি যেন এখনো সত্য ‘আদিবাসীরা আজও যেখানে হকের লড়াই লড়ছে, সে লড়াই সিধু-কানু ও বিরসা মুণ্ডাদের ফেলে যাওয়া লড়াই। শালবনে ফুল ফোটার যেমন শেষ নেই, আদিবাসীদের লড়াই সংগ্রামের তেমন শেষ নেই।’
লেখক: চেয়ারম্যান, আদিবাসী গবেষণা পর্ষদ।

Friday, June 19, 2015

সাংসদপুত্রই তাঁর পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন by নজরুল ইসলাম

বখতিয়ার আলম রনি
সাংসদপুত্র বখতিয়ার আলম রনির লাইসেন্স করা পিস্তল থেকেই গুলি বেরিয়েছিল। অটোরিকশাচালক ইয়াকুবের শরীর থেকে উদ্ধার হওয়া গুলিটির ধরন পয়েন্ট ৩২ বোরের, যা সাংসদপুত্র কিনেছিলেন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ব্যালাস্টিক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। তবে এই গুলিতেই ইয়াকুব নিহত হয়েছিলেন কি না, সেটি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
সিআইডি গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। জব্দ করা অস্ত্র থেকে গুলি বের হয়েছে কি না, সেই গুলিতেই কেউ মারা গেছে কি না, সেগুলো নিশ্চিত হওয়ার পরীক্ষাকে ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন বলে।
প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নিহত অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলীর শরীর থেকে উদ্ধার করার সময় গুলিটি ভেঙে যায়। তাই ব্যালাস্টিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে ভাঙা গুলিটি পয়েন্ট ৩২ বোরের। বখতিয়ার আলমের কেনা গুলিও একই বোরের। আর রিকশাচালক হাকিমের পেট দিয়ে গুলি ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তাঁর শরীরে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি।
গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর ইস্কাটনে রিকশাচালক আবদুল হাকিম ও অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী গুলিবিদ্ধ হন। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ডিবি পুলিশ বখতিয়ার আলম ও গাড়িচালক ইমরান ফকিরকে ৩১ মে গ্রেপ্তার করা হয়। ইমরান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, ১৩ এপ্রিল রাতে যানজটে আটকা পড়ে বখতিয়ার এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েন। ৪ জুন বখতিয়ারের লাইসেন্স করা পিস্তল ও ২১টি গুলি জব্দ করা হয়। এরপর পিস্তলের ব্যালাস্টিক প্রতিবেদনের জন্য পিস্তলটি সিআইডিতে পাঠানো হয়। বখতিয়ারের মা সাংসদ ও মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পিনু খান। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে বখতিয়ার বলেন, তাঁর ছোড়া গুলিতে দুই শ্রমজীবী হাকিম ও ইয়াকুব মারা যান।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বখতিয়ার তুরস্কের কেনা লাইসেন্স করা পিস্তল (৭.৬৫) দিয়ে গুলি ছুড়লেও নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেননি। ১৩ এপ্রিল রাতে বখতিয়ার তাঁর মায়ের প্রাডো গাড়ির ভেতর থেকে গুলি ছোড়ার সময় দুই বন্ধু কামাল মাহমুদ ও মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল গাড়িতে ছিলেন। তাঁরা সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমও এ ঘটনায় সাক্ষ্য দিয়েছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, সাংসদপুত্রকে রিমান্ডে নিতে আবারও আবেদন করা হবে। পরে তাঁকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার জন্য আদালতে পাঠানো হবে।
দুই বন্ধুর জবানবন্দি: নিউ ইস্কাটনে ১৩ এপ্রিল রাতে যানজটে পড়ে বিরক্ত হয়ে বখতিয়ার পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে দুজন মানুষ মারা যান। গতকাল বখতিয়ারের দুই বন্ধু মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল এবং জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
গুলি ছোড়ার সময় বখতিয়ারের গাড়িতে তাঁর বন্ধু মো. কামাল ও জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন। এর আগের দিন গত বুধবার বখতিয়ার আলমের আরেক বন্ধু আবাসন ব্যবসায়ী কামাল মাহমুদ সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন।
আদালত সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীর ও কামালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এসআই দীপক কুমার দাস তাঁদের ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে নিয়ে যান। জবানবন্দি দিয়ে পরে তাঁরা বাসায় ফিরে যান।
মামলার তদন্ত ও আদালত-সংলিষ্ট সূত্র জানায়, সাক্ষী জাহাঙ্গীর ও কামাল জবানবন্দিতে বলেন, কল্যাণপুরে একটি জমির বেচাকেনা নিয়ে কথা বলতে তাঁদের বাংলামোটরে শ্যালে বারে ডেকে পাঠান সাংসদপুত্র বখতিয়ার। সেখানে তাঁরা মদপান করেন। তখন বখতিয়ারের সঙ্গে তাঁদের আরেক বন্ধু কামাল মাহমুদ ছিলেন। রাত ১১টায় শ্যালে বার বন্ধ হয়ে যায়। তখন বখতিয়ার তাঁকে সোনারগাঁও হোটেলে মদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে বন্ধু জাহাঙ্গীরকে বলেন। এতে জাহাঙ্গীর রাজি হলে তাঁরা চারজন (কামাল মাহমুদসহ) বখতিয়ারের প্রাডো গাড়িতে করে সোনারগাঁও হোটেলে আসেন। সেখানে বখতিয়ারের সঙ্গে আবার মদপান করেন।
জবানবন্দিতে তাঁরা বলেন, রাত দেড়টার দিকে তাঁরা সোনারগাঁও হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠেন। চালক ইমরান গাড়ি চালাচ্ছিলেন। বখতিয়ার বসেন চালকের পাশের আসনে। কামাল মাহমুদসহ তিন বন্ধু পেছনে। প্রথমে জাহাঙ্গীরকে মগবাজার ডাক্তার গলির সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়।
কামাল আদালতকে বলেন, রাত পৌনে দুইটার দিকে নিউ ইস্কাটনে এলএমজি টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে গাড়ি যানজটে আটকে যায়। এতে অসহ্য হয়ে বখতিয়ার পিস্তল দিয়ে চার-পাঁচটি গুলি ছোড়েন। গুলি করতে দেখে তাঁরা বখতিয়ারকে বলেন, এটা কী করলা? জবাবে বখতিয়ার বলেন, কিছু হবে না, চুপ থাক।

Thursday, June 18, 2015

কাঁঠালেও রাসায়নিক প্রয়োগ by নজরুল ইসলাম

জাতীয় ফল কাঁঠাল পাকাতে এখন আর প্রকৃতির উপর নির্ভর করছে না কেউ। কাঁঠাল পাকাতে অহরহ ব্যবহার হচ্ছে এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক। বেশি লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা কচি কাঁঠালে নির্বিচারে প্রয়োগ করছে বিষাক্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথ্রায়েল, কপার সালফাইড, পটাশের তরল দ্রবণ, কার্বাইড, কার্বনের ধোয়া, কপার সালফেট, রাইপেন ও ইথিফন জাতীয় বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ।
ঘাটাইল উপজেলার প্রায় ১৫টি কাঁঠালের বাজার রয়েছে। গারো বাজার, সাগরদিঘী, জোড়দিঘী, আষাড়িয়া চালা, রামদেবপুর, শহর গোপিনপুর, ধলাপাড়া, দেওপাড়া, দেলুটিয়া, ছোনখোলা, চাপড়ি, পেচারহাট, মাকড়াই, কুশারিয়া উপজেলার বড় কাঁঠালের বাজার। এসব বাজার থেকে প্রতি হাটবার এক শ থেকে দেড় শতাধিক ট্রাক কাঁঠাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের  বিভিন্ন অঞ্চলে  যায়। এ ছাড়াও ঘাটাইলের পার্শ্ববর্তী উপজেলা মধুপুর-সখিপুরেও উৎপাদন হয় প্রচুর কাঁঠাল। এবার ঘাটাইলে কাঁঠালের ফলন অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কাঁঠালের আকারও হয়েছে বেশ বড়। প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত কারণে এবারের কাঁঠাল একটু আগেই নামতে শুরু করেছে। মওসুমের শুরুতে এসব এলাকায় শুরু হয়েছে কাঁঠালে রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগের প্রতিযোগিতা। স্থানীয় ভাষায় রাসানিক প্রয়োগের এ পদ্ধতিকে ‘ শিক মারা’ বলে। প্রায় দেড় ফুট লম্বা লোহার শিক কাঁঠালের বোটা বরাবর ঢুকিয়ে দিয়ে ছিদ্র পথে সিরিঞ্জ দিয়ে বিষাক্ত কার্বাইড, ইথ্রায়েল, ইথিফন ও রাইপেন জাতীয় পদার্থ প্রয়োগ করা হয়। পরে স্তূপাকারে সাজিয়ে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে চাপা দিয়ে রাখলেই ২৪ ঘণ্টায় একটি কচি কাঁঠালও পেকে যায়। মেশিনে সেপ্র করেও রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে থাকেন কেউ কেউ। রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে কাঁঠাল পাকানোর ফলে নষ্ট হতে চলেছে ঘাটাইলের কাঁঠালের সুনাম। পাশাপাশি কাঁঠালের বজার হচ্ছে মন্দা এবং ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক ড. উজ্জ্বল কুমার নাথ বলেন, কচি কাঁঠাল পাকাতে এসব রাসায়নিক পদার্থ বেশি মাত্রায় ব্যবহার হয়ে থাকে। ফলে ভোক্তাদের মাঝে বিরূপ প্রভাব পড়ে। পরিপক্ব কাঁঠাল স্তুপাকারে পলিথিনে মোড়িয়ে ২৪ ঘণ্টা রাখলে এমনিতেই পেকে যায় সেক্ষেত্রে রাসায়নিক প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী এসব রাসানিক দ্রব্য মিশ্রিত কাঁঠাল খেলে  আমাশয়,  লিভারের রোগ, রাতকানা, শ্বাসকষ্ট, লিভার নষ্ট হওয়া, অ্যাজমা ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগ হতে পারে ঘাটাইল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অন্য বছরের তুলনায় এবার কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। লক্ষিন্দর গ্রামের স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, আমার কাঁঠাল বাগানে অন্যান্য বছরের তুলনায় ফলন বেশি হয়েছে। গারোবাজার অঞ্চলের মুরাইদ গ্রামের কাঁঠাল চাষি মীর ফজলুল হক জানান, তার বাগানে গত বছরের তুলনায় কাঁঠালের ফলন ভাল, কিন্তু দাম কম। সে জানায় গত বছর কাঁঠালের যে বাগান বিক্রি করা হয়েছে এক লাখ  টাকা সেই বাগান এবার বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা।
উপজেলার গারোবাজারের  ব্যবসায়ী মো. জামাল হোসেন বলেন, বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক প্রয়োগ করে কাঁঠালের প্রাকৃতিক স্বাধ নষ্ট করায় স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ এখন আর কাঁঠাল খেতে চায় না। শালিয়াবহ গ্রামের কাঁঠাল ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন মিয়া বলেন, কাঁঠালে রাসায়নিক দ্রব্য মিশানোর কারণে আমরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এর প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন।

Sunday, June 14, 2015

শনাক্তই হয়নি কেউ, আতঙ্কে ক্যাম্পবাসী by নজরুল ইসলাম

হামলার ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়েছে রাজধানীর কালশীতে
বিহারি ক্যাম্পের ঘরের দেয়ালে l ছবি: প্রথম আলো
পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও একই পরিবারের নয়জনকে পুড়িয়ে মারাসহ ১০ হত্যার এক বছরেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। কাউকে শনাক্তই করতে পারেনি পুলিশ। উপরন্তু হামলার শিকার ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে মামলায় থাকায় তাঁরা আতঙ্কে ভুগছেন। সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ থাকায় আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পুলিশের কোনো আগ্রহ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। আজ রোববার এ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। আতঙ্কের কারণ হিসেবে পল্লবীর কালশী-সংলগ্ন কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ড, ক্যাম্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হলেও তখন পুলিশ তাঁদের মামলা নেয়নি। এসব ঘটনায় পুলিশ চারটি ও তাদের পছন্দের দুই ব্যক্তিকে দিয়ে দুটি মামলা করায়। মামলায় মোট ৩ হাজার ৭১৪ জন ক্যাম্পবাসীকে আসামি করা হয়েছে। সরকারদলীয় সাংসদ ইলিয়াসউদ্দিন মোল্লাহ্র মদদে জুয়েল রানার সমর্থক ও পুলিশ যৌথভাবে হামলা চালায় বলে অভিযোগ আছে। জুয়েল রানা পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। জুয়েল রানাকে ফোন করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
অবশ্য সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্ তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। তিনি একাধিকবার প্রথম আলোকে বলেছেন, ওই হামলায় তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল না। তাঁর কোনো লোকের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গতকাল তাঁর মুঠোফোন ও বাসার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
‘বিহারি’ হিসেবে পরিচিত আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ওই ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে গত বছরের ১৩ জুন গভীর রাত থেকে পাশের বাউনিয়াবাদের যুবলীগের নেতা জুয়েল রানার সমর্থক ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়৷ সংঘর্ষের একপর্যায়ে পরদিন ১৪ জুন সকালে ক্যাম্পের আটটি ঘরে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে অগ্নিসংযোগ করলে ইয়াসিন আলীর পরিবারের নারী-শিশুসহ নয়জন দগ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর এক মেয়ে ফারজানা দগ্ধ হলেও কাটা বেড়া দিয়ে সেদিন কোনোমতে সে বেরিয়ে আসে। আর পুলিশের গুলিতে নিহত হন ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. আজাদ। ইয়াসিন সেদিন বাইরে থাকায় বেঁচে গেলেও গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পল্লবীর পূরবী সিনেমা হলের সামনে বাসের ধাক্কায় মারা যান। পরদিন তাঁর ফুফাতো ভাই মো. আলমের করা মামলার বিবরণে লেখা হয়েছে, ইয়াসিনের মৃত্যুতে ওই দুর্বৃত্তদের হাত থাকতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে টিনের যে ঘরটি পুড়ে ইয়াসিনের পরিবারের নয়জন মারা গেছেন, সেখানে একতলা পাকা ঘর গড়ে তুলে মাদ্রাসা করা হয়েছে। মাদ্রাসার চারদিকের দেয়ালে টিনের ছাউনি দিয়ে কয়েকটি দোকানঘর তোলা হয়েছে। ক্যাম্পের পশ্চিমে বিহারিদের সংগঠন স্ট্রান্ড্রেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির (এসপিজিআরসি) দপ্তরের দেয়ালে ১০ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে একটি পোস্টার ঝুলছিল।
এসপিজিআরসির কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন বলেন, ‘মামলা করতে আদালতে যাওয়ার দুই দিন আগে গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর ইয়াসিনকে বাসের ধাক্কায় মেরা ফেলা হলো। ইয়াসিনের মতো পরিণতির আশঙ্কায় এখন ক্যাম্পের অন্যরা ১০ হত্যার ঘটনায় আদালতে মামলা করতে ভয় পাচ্ছেন। হামলাকারী সরকারদলীয় নেতা-কর্মী ও পুলিশ। তাই পুলিশ মামলার কোনো তদন্ত করছে না। তাদের গ্রেপ্তার করা তো দূরের কথা, কাউকে শনাক্তই করতে পারেনি। আজ ১০ হত্যার বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের সামনে মানববন্ধন করবে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা।’ তিনি বলেন, পুলিশ তাঁদের ওপর যে হামলা চালিয়েছে সেই কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেডের শেল, রাবার বুলেটে সংগ্রহ করে চাদরের পোঁটলা বেঁধে রেখেছেন। সেগুলো এই প্রতিবেদকে দেখিয়ে বলেন, এসব আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
ক্যাম্পবাসী ও আশপাশের লোকজন জানান, কালশী সড়কসংলগ্ন উড়ালসড়ক নির্মাণ এবং এলাকার উন্নতি ঘটায় জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে। এখান থেকে বিহারিদের উচ্ছেদ করে বিপণিবিতান নির্মাণ করাই লক্ষ্য ছিল সাংসদের। বস্তিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে সাংসদের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর বিরোধের বিষয়টি একটি অজুহাত মাত্র। হামলার পরদিন তাঁরা সড়ক অবরোধ করেন এবং সাংসদের কুশপুত্তলিকা পোড়ান। সরকারের পক্ষ থেকে বর্বর এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো উদ্যোগও নেই।
এসপিজিআরসি কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের প্রচার সম্পাদক খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে দেওয়া হয়েছিল। অথচ অভিযোগ ওঠা যুবলীগের নেতাকে পুলিশ আটক করল না।
নিহত আজাদের কুর্মিটোলা ক্যাম্পের ছোট্ট ছাপড়া ঘরে গেলে তাঁর মা বৃদ্ধা মা সাইদা বেগম বিলাপ করে বলেন, ‘পুত্র হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করতে গেলে আমাদেরও ইয়াসিনের মতো পরিণতি হবে। তাই বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।’
ক্যাম্পের বাসিন্দারা ক্যাম্পের ওপর হামলার ছবি দেখান। এতে দেখা যায়, পুলিশের সামনেই একদল যুবক ক্যাম্পে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। বিহারিরা মুঠোফোনে ধারণ করা বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ ও ছবি দেখান, যেগুলোতে পুলিশের সঙ্গে থেকে বস্তির দোকানে হামলা চালাতে, কোপাতে দেখা যায়।
যোগাযোগ করা হলে গতকাল এসপিজিআরসি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শওকত খান বলেন, গত ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ১০ হত্যার বিচার দাবি ও কুর্মিটোলা ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে ছয়টি মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী ঢাকার জেলা প্রশাসককে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।
সরকারি কাজে বাধাদান, লুটপাট, ভাঙচুর ও ১০ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে হওয়া ছয়টি মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলাগুলোর তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ছয় মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। তাঁরা অগ্নিসংযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। আসামি শনাক্ত হলে ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় জুয়েল রানাসহ শতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে শত শত ব্যক্তিকে বিক্ষোভ করতে দেখা গেলেও হামলাকারীর কোনো ছবি পাওয়া যায়নি।
গত ডিসেম্বরের আগে এই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধাদান, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। শিগগিরই এসব মামলায় ক্যাম্পবাসীকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

Thursday, June 11, 2015

নেশাগ্রস্ত যুবকের গুলিতে ঢাকায় জোড়া খুন by নজরুল ইসলাম ও প্রশান্ত কর্মকার

গভীর রাতে রাজধানীর রাজপথে নেশাগ্রস্ত যুবকের এলোপাতাড়ি গুলিতে দুজন নিহত হয়েছিলেন প্রায় দুই মাস আগে। অভিযুক্ত যুবক নয় দিন আগে গ্রেপ্তার হলেও পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি সাংসদের ছেলে বলে।
গত ১৩ এপ্রিল রাত পৌনে দুইটায় নিউ ইস্কাটনে এ ঘটনা ঘটে। এতে একজন অটোরিকশাচালক এবং একজন রিকশাচালক নিহত হন। বখতিয়ার আলম রনি নামের এই যুবকের বয়স ৪২, মা মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের সাংসদ পিনু খান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, ঘটনার সময় বখতিয়ার নেশাগ্রস্ত ছিলেন।
ডিবি পুলিশ বলেছে, বখতিয়ার ও তাঁর গাড়ির চালক ইমরান ফকিরকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইমরান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দুজনকেই গত ৩১ মে গ্রেপ্তার করা হয়। বখতিয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল মঙ্গলবার চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। ১ জুন তাঁর রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর হলেও ‘অসুস্থতার’ কারণে তাঁকে হেফাজতে নিতে পারেনি ডিবি।
ওই রাতের গুলিতে অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম প্রথমে আহত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাকিম ১৫ এপ্রিল বিকেলে এবং ২৩ এপ্রিল ইয়াকুব মারা যান। ইয়াকুব দৈনিক জনকণ্ঠর অটোরিকশাচালক। এ ঘটনায় ১৫ এপ্রিল রাতে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম। এজাহারে তিনি গাড়ি থেকে একজন ব্যক্তি গুলি চালিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন, তবে গুলিবর্ষণকারীর নাম-বর্ণনা বা গাড়ির বর্ণনা উল্লেখ করেননি।
ঘটনা দুই মাস আগের, গ্রেপ্তার হন নয় দিন আগে, মা সাংসদ বলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি ডিবির দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি-অপরাধ) যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় এই মামলায় বখতিয়ার ও ইমরানকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল বেলা ১টা ১৯ মিনিটে সাংসদ পিনু খানের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন বলে জানান। তিনি বিকেল চারটায় ফোন করতে বলেন। চারটায় তাঁর মোবাইলে চারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। তিনি থাকেন নাখালপাড়ায় এমপি হোস্টেলে। বখতিয়ার ধানমন্ডিতে থাকেন এবং শেয়ার ব্যবসা করেন বলে জানা গেছে।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে রমনা থানার পুলিশ। থানার পুলিশের পাশাপাশি ডিবি ছায়া তদন্ত করে। ডিবির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা গুলিবর্ষণকারীর ও তাঁর গাড়ির বর্ণনা পান। ২৪ মে মামলার তদন্তভার পায় ডিবি। এরপর ডিবি পুরোপুরি মাঠে নামে। তদন্তকারীরা গুলিবর্ষণকারী ও তাঁর গাড়ি শনাক্ত করতে তথ্যদাতা নিয়োগ করেন এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেন। তাঁরা বখতিয়ারের প্রাডো গাড়িটি শনাক্ত করেন এবং গাড়িটির চালকের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। ৩১ মে দুপুরে ধানমন্ডিতে বখতিয়ারের বাসার কাছ থেকে গাড়ির চালক ইমরান ফকিরকে আটক করা হয়। তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইমরান জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য দেন, ১৩ এপ্রিল রাতে নেশাগ্রস্ত বখতিয়ার তাঁর লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছিলেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ৩১ মে রাতে ধানমন্ডির বাসা থেকে বখতিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তল, পিস্তলের ২১টি গুলি ও দুটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বখতিয়ার জানান, ঘটনার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন। এক বন্ধুকে মগবাজার মোড়ে নামিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে বাংলামোটরের দিকে যাচ্ছিলেন। নির্মাণাধীন এলএমজি টাওয়ারের সামনে যানজটে আটকা পড়ে গাড়ি। এতে বিরক্ত হয়ে তিনি গাড়ির জানালা খুলে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করেন। পিস্তলটির ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এখনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। বখতিয়ারের প্রাডো গাড়িটি জব্দ করার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে।
ডিবি সূত্র জানায়, ১ জুন আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ইমরানও একই ধরনের কথা বলেছেন। জবানবন্দি দেওয়ার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেদিন বখতিয়ারকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানালে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর ১ জুন সন্ধ্যায় তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করার কথা জানান। প্রথমে তাঁকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে এবং সেদিনই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৩ জুন পাঠানো হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৬ জুন তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরে আদালতে নেওয়া হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতের অনুমতি নিয়ে গতকাল বিকেলে বখতিয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কারাগার থেকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেন, বখতিয়ারের বিরুদ্ধে জোড়া খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি ও তাঁর গাড়িচালক দুজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছেন। বখতিয়ার অসুস্থতার ভান করে কালক্ষেপণ করেছেন। হাসপাতালে পরীক্ষা করে তাঁর কোনো রোগ পাওয়া যায়নি। তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় জামিনে মুক্ত হলে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে, চাপ সৃষ্টি করে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিহত হাকিমের মা ও মামলার বাদী মনোয়ারা বেগম গৃহকর্মী। গতকাল সকালে মধুবাগ ঝিলপাড়ে তাঁর বস্তিঘরে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীরা জানান, তিনি কাজে গেছেন। ছেলে জীবিত থাকাকালে মনোয়ারা কাজ করতেন না। ছেলের আয়েই চলতেন। কিন্তু এখন পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে কাজ করছেন। ছেলের জন্য তিনি রোজই কাঁদেন।
হাকিম যে গ্যারেজের রিকশা চালাতেন, তার মালিক বাবু মিয়া জানান, মামলার খোঁজ নিতে মনোয়ারা দুই-তিন দিন পরপর তাঁর কাছে আসেন। তিনি নিজেই তেমন কিছু জানেন না বলে কিছু জানাতে পারেন না।