Showing posts with label মাহমুদুজ্জামান বাবু. Show all posts
Showing posts with label মাহমুদুজ্জামান বাবু. Show all posts
Monday, November 9, 2015
এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার? by মাহমুদুজ্জামান বাবু
![]() |
| নিরাপত্তাহীনতার কথা জানানোর পরও ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা এবং আহমেদুর রশীদ টুটুল ও তার দুই বন্ধুক কীভাবে হামলার শিকার হন |
খুব
ভয় পেয়েছি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর লালমাটিয়ায় ও শাহবাগের
আজিজ সুপার মার্কেটে দুটি প্রকাশনা সংস্থায় হামলা চালিয়ে তিনজনকে গুরুতর
আহত ও একজনকে খুন করার প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ
সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ শনিবার সন্ধ্যায় বলেছেন, হামলাকারীরা
জামায়াত-বিএনপির অংশ (বিডিনিউজ ২৪ ডটকম, ৩১ অক্টোবর, ২০১৫)। কুষ্টিয়ায়
জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কার্যালয় উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি আরও বলেছেন,
‘ব্লগারদের বা মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর হামলাকারীরা দেশ ও সরকারকে
অস্থিতিশীল করতে চায়, যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করতে চায়।...কেউ
আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, কেউ হরকাতুল জিহাদ, কেউ হুজি—বিভিন্ন নাম দিয়ে
নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করছে। এরা জামায়াত-শিবির-বিএনপির খণ্ডিত অংশ,
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। আজকে
ব্লগারদের ওপর হামলা হয়েছে, এটা তাদেরই অংশ।’
দেশের একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা জনাব হানিফের এই বক্তব্যের মধ্যেই আছে আমার ভয় পাওয়ার উৎস। লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর অফিসে হামলা হয়েছে শনিবার বেলা আড়াইটায়। হামলাকারীরা তিনজনকে কুপিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা মেরে চলে যায়। বন্ধু ও স্বজনেরা আহত ব্যক্তিদের টেলিফোন পেয়ে পুলিশকে জানালে পুলিশ তালা ভেঙে যখন তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে, তার কিছুক্ষণ পরেই আজিজ মার্কেটের জাগৃতি প্রকাশনীতে প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। গণমাধ্যমকে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দীপনের মৃত্যু আঘাতজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই হয়েছে। অর্থাৎ দীপন ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কর্ণধার টুটুল এবং অন্য দুজনকে কাছাকাছি সময়েই আক্রমণ করা হয়েছিল।
চাপাতির ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় হত্যা করা হয়েছিল মঞ্চের সংগঠক ও ব্লগার রাজীবকে। রাজীব বিজ্ঞান নিয়ে ব্লগে লিখতেন। বিজ্ঞানচর্চা করলে কুসংস্কার প্রতিপক্ষ হবেই। সে কারণেই বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখক অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী বন্যা আক্রান্ত হয়েছিলেন, অভিজিৎ খুন হয়ে বেঁচে গেছেন আর বন্যা অঙ্গহানির বাহ্যিক ক্ষত এবং আরও বেশি অন্তর্গত বেদনা নিয়ে দূর প্রবাসে জীবন্মৃত হয়ে আছেন। একে একে খুন হয়েছেন ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নিলয়। ৩১ অক্টোবর খুন হলেন প্রকাশক ও বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখক দীপন। আর এক প্রকাশক গুরুতর আহত টুটুলসহ মোট তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
৩১ অক্টোবরের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন প্রকাশক সম্প্রদায়। শুদ্ধস্বর ও জাগৃতি—এই দুই সংস্থা থেকেই অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশিত হয়েছিল। তাহলে কী দাঁড়াল? দাঁড়াল না, চলতে থাকল। বিজ্ঞান লেখক-ব্লগার অ্যাকটিভিস্টদের যেহেতু হত্যা করে, হুমকি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, সুতরাং যাঁরা তাঁদের বইয়ের প্রকাশক, এবার তাঁদের হত্যা করা হোক, সর্বব্যাপক একটি ভয়ের বিস্তার ঘটানো হোক। মৌলবাদী গোষ্ঠী, জঙ্গি বা জামায়াত-শিবির চক্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে, রাষ্ট্রকে, অস্থিতিশীল করার চেষ্টা যে করছে, সেটা তো আমজনতার চেয়েও বেশি জানে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহ। জানেন রাষ্ট্র পরিচালনাকারী ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব। এটা জানার পরও সেই সব অন্ধকারের খুনে শক্তি কীভাবে একের পর এক রক্তাক্ত ও ছিন্নভিন্ন করতে পারছে আলোকিত স্বপ্নে বিভোর বিজ্ঞানমনস্ক মন ও শরীরকে?
যাঁরা খুন হয়েছেন, তাঁরা হুমকি পেয়ে আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার কথা যথাযথ জায়গায় জানানোর পরও তাঁদের অরক্ষিত রাখা হয়েছিল বা হয় কেন? আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। জনগণ ও তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধুত্বের। নির্ভয়ের। দুই দিক থেকেই। কিন্তু তাঁরা যখন কোনো অনুষ্ঠানে আসেন বা যান, অথবা দাপ্তরিক কাজে চলাচল করেন, গাড়িবহরে নিরাপত্তার বলয় এত বজ্রকঠিন করতে হয় কেন? কিসের ভয়? তার মানে কি আমরা একটা ভয়ের বাংলাদেশে বেঁচে থাকার অভিনয় করছি? ভয়হীনতার অভিনয়?
আমার কয়েকজন স্বনামখ্যাত লেখক-বন্ধু বেশ কিছুদিন থেকেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলাচল করছেন। তাঁদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করেন। বাসা থেকে গাড়িতে চড়ে বের হন। অফিসের দোরগোড়ায় গাড়ি থামলে নিরাপত্তারক্ষীসহ লিফটের সামনে দাঁড়ান। তারপর সারা দিন নিরাপদ বহুতল ভবনে প্রাত্যহিক কাজ শেষে আবার একইভাবে ঘরে ফেরা। এটা কি স্বাধীন দেশের জীবন? এ রকম সকাল-দুপুর-রাত নিয়ে লেখক ও শিল্পীসত্তা বাঁচে? সৃজনশীল নির্মাণ হয়? অচলায়তন টিকিয়ে রেখে, স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞার খাঁচায় বন্দী থেকে মুক্তির কবিতা লেখা যায়? গান গাওয়া যায়? তার ওপরে যদি ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’র মতো রাষ্ট্রের ঔদাসীন্য ভেংচি কাটে নিত্য প্রহর? প্রশ্নগুলো সহজ। কিন্তু উত্তর আসে না। তাঁরাই বেশি মৌন, যাঁরা বাঙ্ময় ছিলেন সেদিনও। যাঁরা বলেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কেন মৌন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা, সংগঠক ও সংস্কৃতিজন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ ৩১ অক্টোবর ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘মর্মাহত! বাকরুদ্ধ! কে কার কাছে কিসের প্রতিবাদ করবে? কে কার কাছে কিসের বিচার চাইবে? কে চিহ্নিত করবে আততায়ীকে? রক্তের এই স্রোত, মৃত্যুর এই ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? কতটা অন্ধকার নামলে আমরা বুঝব যে আলো নেই? কে জেগে আছে এই রাত্রির গুহায়? জীবনের এই অপচয়, এই অপঘাত, এই মৃত্যু, এই রক্তের স্রোত কি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাবে আমি কী ভূমিকা পালন করেছিলাম? আজ পথে দাঁড়ানোর আগে আসুন, নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াই সবাই। আজ উচ্চকণ্ঠে ক্ষোভের আগে নিজেকে প্রশ্ন করি, এই মৃত্যুর দায় আমারও কি না—প্রশ্ন করুন, আসুন আমরা সবাই প্রশ্ন করি।’ অধ্যাপক আলী রীয়াজ আজ পড়ন্ত বিকেল থেকে রাতের প্রথম প্রহর অবধি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে না দাঁড়াতে পারলেও সবার অনুভূতির পক্ষে উচ্চকিত হয়েছেন।
৩১ অক্টোবরের আগমনী সন্ধ্যায় যখন পুলিশের গাড়িতে করে দীপনের ক্ষতবিক্ষত নিষ্প্রাণ শরীরটা আনা হলো জরুরি বিভাগে, শত শত তরুণ-তরুণী, গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরার লাইট, বিশিষ্টজনদের বক্তব্য প্রদান, মন্ত্রী, নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর শোকার্ত মুখাবয়ব আর চারপাশের উপায়হীনতার মধ্যে আমি ভাবছিলাম, আমার লেখার কলমটি এখনো স্বাধীন। কারণ, এটা ভাষা আন্দোলনের ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। শহীদুল্লা কায়সার, মুনীর চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, ড. জি সি দেব, জহির রায়হানের উত্তরাধিকার। আমার গান ও সুর এখনো স্বাধীন। কারণ, তা মুকুন্দ দাস, লালন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, আলতাফ মাহমুদের উত্তরাধিকার। তাঁরা অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি কে হে? আর আমার কানে এই মুহূর্তে বাজছে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সেই গান.—‘এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার?’
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzamanbubu71@gmail.com
দেশের একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা জনাব হানিফের এই বক্তব্যের মধ্যেই আছে আমার ভয় পাওয়ার উৎস। লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর অফিসে হামলা হয়েছে শনিবার বেলা আড়াইটায়। হামলাকারীরা তিনজনকে কুপিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা মেরে চলে যায়। বন্ধু ও স্বজনেরা আহত ব্যক্তিদের টেলিফোন পেয়ে পুলিশকে জানালে পুলিশ তালা ভেঙে যখন তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে, তার কিছুক্ষণ পরেই আজিজ মার্কেটের জাগৃতি প্রকাশনীতে প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। গণমাধ্যমকে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দীপনের মৃত্যু আঘাতজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই হয়েছে। অর্থাৎ দীপন ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কর্ণধার টুটুল এবং অন্য দুজনকে কাছাকাছি সময়েই আক্রমণ করা হয়েছিল।
চাপাতির ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় হত্যা করা হয়েছিল মঞ্চের সংগঠক ও ব্লগার রাজীবকে। রাজীব বিজ্ঞান নিয়ে ব্লগে লিখতেন। বিজ্ঞানচর্চা করলে কুসংস্কার প্রতিপক্ষ হবেই। সে কারণেই বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখক অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী বন্যা আক্রান্ত হয়েছিলেন, অভিজিৎ খুন হয়ে বেঁচে গেছেন আর বন্যা অঙ্গহানির বাহ্যিক ক্ষত এবং আরও বেশি অন্তর্গত বেদনা নিয়ে দূর প্রবাসে জীবন্মৃত হয়ে আছেন। একে একে খুন হয়েছেন ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নিলয়। ৩১ অক্টোবর খুন হলেন প্রকাশক ও বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখক দীপন। আর এক প্রকাশক গুরুতর আহত টুটুলসহ মোট তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
৩১ অক্টোবরের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন প্রকাশক সম্প্রদায়। শুদ্ধস্বর ও জাগৃতি—এই দুই সংস্থা থেকেই অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশিত হয়েছিল। তাহলে কী দাঁড়াল? দাঁড়াল না, চলতে থাকল। বিজ্ঞান লেখক-ব্লগার অ্যাকটিভিস্টদের যেহেতু হত্যা করে, হুমকি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, সুতরাং যাঁরা তাঁদের বইয়ের প্রকাশক, এবার তাঁদের হত্যা করা হোক, সর্বব্যাপক একটি ভয়ের বিস্তার ঘটানো হোক। মৌলবাদী গোষ্ঠী, জঙ্গি বা জামায়াত-শিবির চক্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে, রাষ্ট্রকে, অস্থিতিশীল করার চেষ্টা যে করছে, সেটা তো আমজনতার চেয়েও বেশি জানে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহ। জানেন রাষ্ট্র পরিচালনাকারী ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব। এটা জানার পরও সেই সব অন্ধকারের খুনে শক্তি কীভাবে একের পর এক রক্তাক্ত ও ছিন্নভিন্ন করতে পারছে আলোকিত স্বপ্নে বিভোর বিজ্ঞানমনস্ক মন ও শরীরকে?
যাঁরা খুন হয়েছেন, তাঁরা হুমকি পেয়ে আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার কথা যথাযথ জায়গায় জানানোর পরও তাঁদের অরক্ষিত রাখা হয়েছিল বা হয় কেন? আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। জনগণ ও তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধুত্বের। নির্ভয়ের। দুই দিক থেকেই। কিন্তু তাঁরা যখন কোনো অনুষ্ঠানে আসেন বা যান, অথবা দাপ্তরিক কাজে চলাচল করেন, গাড়িবহরে নিরাপত্তার বলয় এত বজ্রকঠিন করতে হয় কেন? কিসের ভয়? তার মানে কি আমরা একটা ভয়ের বাংলাদেশে বেঁচে থাকার অভিনয় করছি? ভয়হীনতার অভিনয়?
আমার কয়েকজন স্বনামখ্যাত লেখক-বন্ধু বেশ কিছুদিন থেকেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলাচল করছেন। তাঁদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করেন। বাসা থেকে গাড়িতে চড়ে বের হন। অফিসের দোরগোড়ায় গাড়ি থামলে নিরাপত্তারক্ষীসহ লিফটের সামনে দাঁড়ান। তারপর সারা দিন নিরাপদ বহুতল ভবনে প্রাত্যহিক কাজ শেষে আবার একইভাবে ঘরে ফেরা। এটা কি স্বাধীন দেশের জীবন? এ রকম সকাল-দুপুর-রাত নিয়ে লেখক ও শিল্পীসত্তা বাঁচে? সৃজনশীল নির্মাণ হয়? অচলায়তন টিকিয়ে রেখে, স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞার খাঁচায় বন্দী থেকে মুক্তির কবিতা লেখা যায়? গান গাওয়া যায়? তার ওপরে যদি ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’র মতো রাষ্ট্রের ঔদাসীন্য ভেংচি কাটে নিত্য প্রহর? প্রশ্নগুলো সহজ। কিন্তু উত্তর আসে না। তাঁরাই বেশি মৌন, যাঁরা বাঙ্ময় ছিলেন সেদিনও। যাঁরা বলেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কেন মৌন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা, সংগঠক ও সংস্কৃতিজন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ ৩১ অক্টোবর ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘মর্মাহত! বাকরুদ্ধ! কে কার কাছে কিসের প্রতিবাদ করবে? কে কার কাছে কিসের বিচার চাইবে? কে চিহ্নিত করবে আততায়ীকে? রক্তের এই স্রোত, মৃত্যুর এই ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? কতটা অন্ধকার নামলে আমরা বুঝব যে আলো নেই? কে জেগে আছে এই রাত্রির গুহায়? জীবনের এই অপচয়, এই অপঘাত, এই মৃত্যু, এই রক্তের স্রোত কি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাবে আমি কী ভূমিকা পালন করেছিলাম? আজ পথে দাঁড়ানোর আগে আসুন, নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াই সবাই। আজ উচ্চকণ্ঠে ক্ষোভের আগে নিজেকে প্রশ্ন করি, এই মৃত্যুর দায় আমারও কি না—প্রশ্ন করুন, আসুন আমরা সবাই প্রশ্ন করি।’ অধ্যাপক আলী রীয়াজ আজ পড়ন্ত বিকেল থেকে রাতের প্রথম প্রহর অবধি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে না দাঁড়াতে পারলেও সবার অনুভূতির পক্ষে উচ্চকিত হয়েছেন।
৩১ অক্টোবরের আগমনী সন্ধ্যায় যখন পুলিশের গাড়িতে করে দীপনের ক্ষতবিক্ষত নিষ্প্রাণ শরীরটা আনা হলো জরুরি বিভাগে, শত শত তরুণ-তরুণী, গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরার লাইট, বিশিষ্টজনদের বক্তব্য প্রদান, মন্ত্রী, নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর শোকার্ত মুখাবয়ব আর চারপাশের উপায়হীনতার মধ্যে আমি ভাবছিলাম, আমার লেখার কলমটি এখনো স্বাধীন। কারণ, এটা ভাষা আন্দোলনের ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। শহীদুল্লা কায়সার, মুনীর চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, ড. জি সি দেব, জহির রায়হানের উত্তরাধিকার। আমার গান ও সুর এখনো স্বাধীন। কারণ, তা মুকুন্দ দাস, লালন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, আলতাফ মাহমুদের উত্তরাধিকার। তাঁরা অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি কে হে? আর আমার কানে এই মুহূর্তে বাজছে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সেই গান.—‘এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার?’
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzamanbubu71@gmail.com
Saturday, November 7, 2015
লাঙলের ঋজুভাব ও মোতালেব by মাহমুদুজ্জামান বাবু
এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে দেখা। আমার কংক্রিট মন ও চোখ তাঁকে মনে রাখেনি। রাখার কথাও নয়। কিন্তু তাঁর মাটিমাখা স্মৃতি ভীষণ উর্বর। রাজধানীর শাহবাগ মোড় থেকে তিনি আমাকে এক সন্ধ্যায় রিকশা চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের সামনে। বরাবর আমি সেখানেই নামি। সড়ক বিভাজক টপকে গলি দিয়ে ঢুকে যাই ভাড়াবাসায়। আজও সন্ধ্যায় ফেরার পথে রিকশাভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি করতে গিয়ে অসহায় লাগছিল। ৫০ টাকার অভ্যস্ত ভাড়া এক লাফে ৭০ টাকা হয়ে গেছে। কিন্তু রিকশাচালকের যুক্তি অকাট্য। জ্যামের কারণে প্রলম্বিত সময়ক্ষেপণ; এই সময়ে হয়তো তাঁরা আরও দুই-তিনটা ‘খ্যাপ’ মারতে পারতেন বা পারবেন। আবার জীবনযাপনে উচ্চ ব্যয়ভার; মাছ-মাংস বাদ। সরবরাহ থাকার পরও সবজির দাম রহস্যজনকভাবে চড়া। তাঁদের সমস্বর বেদনার্ত যুক্তিতে আমারও মনে পড়ে যায়, মাস খানেক আগেই আমিও কাঁচা মরিচ কিনেছিলাম কেজিপ্রতি ২৬০ টাকায়। তাঁদের এসব অকাট্য যুক্তি আর আমার মধ্যবিত্ত কপট অহম যখন অমীমাংসিত, তখন তিনি রিকশাটা টেনে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ওঠেন বাহে।’
উঠে পড়লাম রিকশায়। আমার নিশ্চিন্ত বোধ আমাকে জানাল রোদপোড়া মুখের এই প্রবীণ মানুষটি ‘বাহে’ উত্তরবঙ্গের অঞ্চলের। গাইবান্ধা অথবা রংপুরের। নিষ্ফলা জমি যাদের সরল ও প্রত্যয়ী শ্রমে ফসল ফলায়। যারা রোদে পোড়ে। বৃষ্টিতে ভেজে। ফসল কাটে। আহার উপযোগী করে তোলে প্রগাঢ় মমতায়। তারপর বাজারে বিক্রি করতে গেলে সেই ফসলের লাভ দূরে থাক, উৎপাদন খরচও পায় না। না পেয়ে বাজারের উঠোনে অথবা মহাসড়কের কালচে বুকে অভিমানগুলো ছড়িয়ে দিয়ে যায়। রাগে না। সংঘবদ্ধ হয় না। দায়হীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আঘাতও করে না। আমরা শহর ও নগরের বাসাবাড়ির রান্নাঘরে কিংবা নামী কোনো রেস্তোরাঁয় সুবাসিত গরম ভাতের গন্ধ নিয়ে মগ্ন হব এই স্বপ্নে যে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
কিন্তু আমি আর প্রবীণ মানুষটি অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যেতে পারছিলাম না। হাতিরপুল-ইস্টার্ন প্লাজার সামনে রাস্তাটির দুই পাশের দোকানগুলোতে ঝলমলে আলোয় ভরা ‘বাথরুম ফিটিংস’ সামগ্রী। বিত্তবান ক্রেতারা তাঁদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ম ভেঙে বিপরীত দিকে চালিয়ে এসে পার্ক করছেন তেরছা ভঙ্গিতে। পছন্দের দোকানে ঢুকে যাচ্ছেন। জ্যাম এই রাস্তার নিয়তি। নিয়তির গালে থাপ্পড় না মেরে আমরা বাঁ দিকে ঢুকে যাই, সেন্ট্রাল রোডে। তারপর আঁকাবাঁকা আলো-আঁধারির পর গ্রিন রোড। সরল মানুষটি সরল নিয়ম মেনে জটিল রাজধানী শহরের জটিল রাস্তায় রিকশার প্যাডেলে পা ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁপিয়ে ওঠেন।
‘মা বেডিং স্টোর’-এর সামনে এসে চতুর্দিকে প্যাঁচ লাগানো জ্যাম আমাদের স্থির করে দিলে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার বাড়ি রংপুরে?’ চালকের আসনে বসেই তিনি ত্রিকোণ ভঙ্গিতে আমার মুখোমুখি হয়ে বললেন, ‘না বাহে, গাইবান্ধাত’। আমি বলি, গাইবান্ধার কোথায়? কাঁধের মলিন গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে বললেন, ‘গাইবান্ধা চিনেন? গেছিলেন তোমরা?’ আমি মাথা নাড়লে তিনি মুখ ঘুরিয়ে সামনের জ্যামের অনড় শরীরটা দেখলেন। বললেন, ‘শহর থাকি যদি পুবদিক যান, মদনের পাড়া। ওটা ছাড়ি গেলে হোসেনপুর। ওটি মোর বাড়ি।’ জিজ্ঞাসা করি, জমি-জিরাত আছে? আবাদ করেন? আমার প্রশ্নে শিশুর মতো হাসলেন এবার। ‘আবাদ করি বাহে। নিজের জমিত নয়। জমি ভাড়া নেওয়া লাগে।’ আমি চমকাই। ভাড়া মানে? কৃষিতে বর্গাপ্রথার কথা জানি। সেটা কি ভাড়া নেওয়া? একসময় তেভাগা ছিল। তেভাগা নিয়ে কৃষকদের বীরোচিত লড়াইও হয়েছিল।
কোথাও কোনো মানবিক ধ্বনি নেই। ভুলে যাচ্ছি, সুন্দরকে ধ্বংস করা সব সময়ই পাপ। দীনতা আসতেই পারে দুঃসময়ে। কিন্তু দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমদের যে সামান্য সম্পদ অবশিষ্ট আছে, তা হরণ করা সবচেয়ে বড় শয়তানি। মোদ্দা কথা, আমাদের কোনো ঋজুভাব নেই। আছে কি?
আমার উৎসুক জিজ্ঞাসায় যেটা উত্তর এল তা হলো, হোসেনপুরের ধনী জমির মালিকেরা দুই ফসলি চাষের জন্য এখন ভূমিহীন চাষির কাছে জমি ভাড়া দেন। বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই দর ওঠানামা করে। দলিলপত্রে স্বাক্ষর করে চুক্তি সম্পাদিত হয়। বাকির কারবার নেই। টাকা দিতে হয় অগ্রিম। ফসল তো তখনো স্বপ্নে। ঘুমিয়ে থাকা বীজের বুকে। জমানো টাকা যদি না থাকে, চড়া সুদগ্রহীতা এনজিও আছে। ব্যাংক আছে। এবার লাঙল-বলদ-সার-কীটনাশক জোগাড় করো। পাওয়ার পাম্পের পানি আনো নালা কেটে। বুঝলাম সব হলো নিরাপদে, কিন্তু যদি ধেয়ে আসে অকাল প্লাবন অথবা ঝরে পড়ে অতিবৃষ্টি? যদি ফসল মার খায়? এমন প্রশ্নে তিনি হাসেন আবার। ‘মার খালে মার। কপালত থাকলে কী করা যাবে?’
জ্যামটা চলছে এবার। তিনি বলেন, ‘হামার দুই বেটা। মেলা বুদ্ধি। বুদ্ধি বেচি খায়। গাইবান্ধা শহরত থাকে। ছোট বেটার একটা বেটি। সেটাক হামার কাছত দিয়া গেইছে। ক্লাস সিক্সত পড়ে। নাতনিটাক নিয়াই চিন্তা বাহে।’ পান্থপথের নির্দিষ্ট স্থানে রিকশাটা থেমে গেলে আমার অবাক চোখে চোখ রেখে হাসেন তিনি। ‘তোমাক আর একদিন নিয়া আচ্চিলাম।’ বুকপকেট থেকে পলিথিন মোড়ানো প্যাকেট বের করে ভাঙতি টাকা ফেরত দেন আমাকে। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে এবার বড় করে নিশ্বাস নেন। ‘নাতনিটাক নিয়া চিন্তা বাহে।’ চিন্তিত তবু ঋজু মোতালেব।
মোতালেব যখন তাঁর নাতনির নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাজীবন নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা করছিলেন, তখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের লেখক-শিল্পীরা তাঁদের দেশের সহনশীলতার পরিবেশ কলুষিত হওয়ার অভিযোগ এনে মোদি সরকারকে দায়ী করে তাঁদের পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন। আবার এসব মানবিক বোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক নির্বাহী চেয়ারম্যান প্রবীণ তোগাড়িয়া বিবৃতি দিয়ে বলছেন, গরু জবাইকারীকে প্রধানমন্ত্রী মোদিও রক্ষা করতে পারবেন না। গরু জবাই করে কেউ ভারতে থাকতে পারে না। এই বিবৃতির এক দিন আগে রাজধানী ঢাকার হোসেনি দালান এলাকায় মহররম পালন ও তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি সমাবেশে জীবনবিনাশী গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর মাতম হয়েছে। কিছুদিন আগে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাত্রীদের গলায় পা চেপে দাঁড়িয়েছে। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক অস্বীকারের পরও সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কপি ফেসবুক, ভাইবারসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ওই হুল্লোড়কালীন সারা দেশে ৪২ জনকে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের একজন র্যাবের হেফাজতে থাকার সময় রাতের অন্ধকারে হৃদ্রোগে (?) আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
সুন্দরবন রক্ষার্থে সিপিবি-বাসদের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র-বিরোধী প্রতিবাদী যাত্রা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা লাঠিপেটা খেয়েছে পুলিশের। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া চলে গেছেন বিলেতে। একাধিপত্যে, আসন্ন শীতের কুয়াশায় ঝাপসা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। প্রতিবাদহীনতার গণস্নায়ুবিকার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে জিজ্ঞাসার সাবলীল জিব-তালু-টাকরাকে। তাই কোথাও কোনো মানবিক ধ্বনি নেই। ভুলে যাচ্ছি, সুন্দরকে ধ্বংস করা সব সময়ই পাপ। দীনতা আসতেই পারে দুঃসময়ে। কিন্তু দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমদের যে সামান্য সম্পদ অবশিষ্ট আছে, তা হরণ করা সবচেয়ে বড় শয়তানি। আমরা যারা মোতালেবের ‘বেটা’র মতো বুদ্ধি বেচে খাই, তারা কিছুতেই এখন আর বলতে পারছি না ‘...আমার শিয়রে কোন অদীন দণ্ডাজ্ঞা জেগে নেই,/ আমি ইচ্ছে হলে পাখিদের, শাপলাপাতার নিচে মৌরালার/ ফুল ফোটানো বা ঝরানোর ছলে আমি/ এনে দিতে পারি বাগানের প্রয়োজনীয় বাতাস,/ —আমার জীবনে মনে কোনো জেল নেই।’ ...(সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত)।
মোদ্দা কথা, আমাদের কোনো ঋজুভাব নেই। আছে কি?
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
Mzamanbabu71@gmail.com
উঠে পড়লাম রিকশায়। আমার নিশ্চিন্ত বোধ আমাকে জানাল রোদপোড়া মুখের এই প্রবীণ মানুষটি ‘বাহে’ উত্তরবঙ্গের অঞ্চলের। গাইবান্ধা অথবা রংপুরের। নিষ্ফলা জমি যাদের সরল ও প্রত্যয়ী শ্রমে ফসল ফলায়। যারা রোদে পোড়ে। বৃষ্টিতে ভেজে। ফসল কাটে। আহার উপযোগী করে তোলে প্রগাঢ় মমতায়। তারপর বাজারে বিক্রি করতে গেলে সেই ফসলের লাভ দূরে থাক, উৎপাদন খরচও পায় না। না পেয়ে বাজারের উঠোনে অথবা মহাসড়কের কালচে বুকে অভিমানগুলো ছড়িয়ে দিয়ে যায়। রাগে না। সংঘবদ্ধ হয় না। দায়হীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আঘাতও করে না। আমরা শহর ও নগরের বাসাবাড়ির রান্নাঘরে কিংবা নামী কোনো রেস্তোরাঁয় সুবাসিত গরম ভাতের গন্ধ নিয়ে মগ্ন হব এই স্বপ্নে যে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
কিন্তু আমি আর প্রবীণ মানুষটি অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যেতে পারছিলাম না। হাতিরপুল-ইস্টার্ন প্লাজার সামনে রাস্তাটির দুই পাশের দোকানগুলোতে ঝলমলে আলোয় ভরা ‘বাথরুম ফিটিংস’ সামগ্রী। বিত্তবান ক্রেতারা তাঁদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ম ভেঙে বিপরীত দিকে চালিয়ে এসে পার্ক করছেন তেরছা ভঙ্গিতে। পছন্দের দোকানে ঢুকে যাচ্ছেন। জ্যাম এই রাস্তার নিয়তি। নিয়তির গালে থাপ্পড় না মেরে আমরা বাঁ দিকে ঢুকে যাই, সেন্ট্রাল রোডে। তারপর আঁকাবাঁকা আলো-আঁধারির পর গ্রিন রোড। সরল মানুষটি সরল নিয়ম মেনে জটিল রাজধানী শহরের জটিল রাস্তায় রিকশার প্যাডেলে পা ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁপিয়ে ওঠেন।
‘মা বেডিং স্টোর’-এর সামনে এসে চতুর্দিকে প্যাঁচ লাগানো জ্যাম আমাদের স্থির করে দিলে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার বাড়ি রংপুরে?’ চালকের আসনে বসেই তিনি ত্রিকোণ ভঙ্গিতে আমার মুখোমুখি হয়ে বললেন, ‘না বাহে, গাইবান্ধাত’। আমি বলি, গাইবান্ধার কোথায়? কাঁধের মলিন গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে বললেন, ‘গাইবান্ধা চিনেন? গেছিলেন তোমরা?’ আমি মাথা নাড়লে তিনি মুখ ঘুরিয়ে সামনের জ্যামের অনড় শরীরটা দেখলেন। বললেন, ‘শহর থাকি যদি পুবদিক যান, মদনের পাড়া। ওটা ছাড়ি গেলে হোসেনপুর। ওটি মোর বাড়ি।’ জিজ্ঞাসা করি, জমি-জিরাত আছে? আবাদ করেন? আমার প্রশ্নে শিশুর মতো হাসলেন এবার। ‘আবাদ করি বাহে। নিজের জমিত নয়। জমি ভাড়া নেওয়া লাগে।’ আমি চমকাই। ভাড়া মানে? কৃষিতে বর্গাপ্রথার কথা জানি। সেটা কি ভাড়া নেওয়া? একসময় তেভাগা ছিল। তেভাগা নিয়ে কৃষকদের বীরোচিত লড়াইও হয়েছিল।
কোথাও কোনো মানবিক ধ্বনি নেই। ভুলে যাচ্ছি, সুন্দরকে ধ্বংস করা সব সময়ই পাপ। দীনতা আসতেই পারে দুঃসময়ে। কিন্তু দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমদের যে সামান্য সম্পদ অবশিষ্ট আছে, তা হরণ করা সবচেয়ে বড় শয়তানি। মোদ্দা কথা, আমাদের কোনো ঋজুভাব নেই। আছে কি?
আমার উৎসুক জিজ্ঞাসায় যেটা উত্তর এল তা হলো, হোসেনপুরের ধনী জমির মালিকেরা দুই ফসলি চাষের জন্য এখন ভূমিহীন চাষির কাছে জমি ভাড়া দেন। বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই দর ওঠানামা করে। দলিলপত্রে স্বাক্ষর করে চুক্তি সম্পাদিত হয়। বাকির কারবার নেই। টাকা দিতে হয় অগ্রিম। ফসল তো তখনো স্বপ্নে। ঘুমিয়ে থাকা বীজের বুকে। জমানো টাকা যদি না থাকে, চড়া সুদগ্রহীতা এনজিও আছে। ব্যাংক আছে। এবার লাঙল-বলদ-সার-কীটনাশক জোগাড় করো। পাওয়ার পাম্পের পানি আনো নালা কেটে। বুঝলাম সব হলো নিরাপদে, কিন্তু যদি ধেয়ে আসে অকাল প্লাবন অথবা ঝরে পড়ে অতিবৃষ্টি? যদি ফসল মার খায়? এমন প্রশ্নে তিনি হাসেন আবার। ‘মার খালে মার। কপালত থাকলে কী করা যাবে?’
জ্যামটা চলছে এবার। তিনি বলেন, ‘হামার দুই বেটা। মেলা বুদ্ধি। বুদ্ধি বেচি খায়। গাইবান্ধা শহরত থাকে। ছোট বেটার একটা বেটি। সেটাক হামার কাছত দিয়া গেইছে। ক্লাস সিক্সত পড়ে। নাতনিটাক নিয়াই চিন্তা বাহে।’ পান্থপথের নির্দিষ্ট স্থানে রিকশাটা থেমে গেলে আমার অবাক চোখে চোখ রেখে হাসেন তিনি। ‘তোমাক আর একদিন নিয়া আচ্চিলাম।’ বুকপকেট থেকে পলিথিন মোড়ানো প্যাকেট বের করে ভাঙতি টাকা ফেরত দেন আমাকে। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে এবার বড় করে নিশ্বাস নেন। ‘নাতনিটাক নিয়া চিন্তা বাহে।’ চিন্তিত তবু ঋজু মোতালেব।
মোতালেব যখন তাঁর নাতনির নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাজীবন নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা করছিলেন, তখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের লেখক-শিল্পীরা তাঁদের দেশের সহনশীলতার পরিবেশ কলুষিত হওয়ার অভিযোগ এনে মোদি সরকারকে দায়ী করে তাঁদের পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন। আবার এসব মানবিক বোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক নির্বাহী চেয়ারম্যান প্রবীণ তোগাড়িয়া বিবৃতি দিয়ে বলছেন, গরু জবাইকারীকে প্রধানমন্ত্রী মোদিও রক্ষা করতে পারবেন না। গরু জবাই করে কেউ ভারতে থাকতে পারে না। এই বিবৃতির এক দিন আগে রাজধানী ঢাকার হোসেনি দালান এলাকায় মহররম পালন ও তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি সমাবেশে জীবনবিনাশী গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর মাতম হয়েছে। কিছুদিন আগে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাত্রীদের গলায় পা চেপে দাঁড়িয়েছে। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক অস্বীকারের পরও সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কপি ফেসবুক, ভাইবারসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ওই হুল্লোড়কালীন সারা দেশে ৪২ জনকে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের একজন র্যাবের হেফাজতে থাকার সময় রাতের অন্ধকারে হৃদ্রোগে (?) আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
সুন্দরবন রক্ষার্থে সিপিবি-বাসদের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র-বিরোধী প্রতিবাদী যাত্রা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা লাঠিপেটা খেয়েছে পুলিশের। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া চলে গেছেন বিলেতে। একাধিপত্যে, আসন্ন শীতের কুয়াশায় ঝাপসা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। প্রতিবাদহীনতার গণস্নায়ুবিকার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে জিজ্ঞাসার সাবলীল জিব-তালু-টাকরাকে। তাই কোথাও কোনো মানবিক ধ্বনি নেই। ভুলে যাচ্ছি, সুন্দরকে ধ্বংস করা সব সময়ই পাপ। দীনতা আসতেই পারে দুঃসময়ে। কিন্তু দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমদের যে সামান্য সম্পদ অবশিষ্ট আছে, তা হরণ করা সবচেয়ে বড় শয়তানি। আমরা যারা মোতালেবের ‘বেটা’র মতো বুদ্ধি বেচে খাই, তারা কিছুতেই এখন আর বলতে পারছি না ‘...আমার শিয়রে কোন অদীন দণ্ডাজ্ঞা জেগে নেই,/ আমি ইচ্ছে হলে পাখিদের, শাপলাপাতার নিচে মৌরালার/ ফুল ফোটানো বা ঝরানোর ছলে আমি/ এনে দিতে পারি বাগানের প্রয়োজনীয় বাতাস,/ —আমার জীবনে মনে কোনো জেল নেই।’ ...(সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত)।
মোদ্দা কথা, আমাদের কোনো ঋজুভাব নেই। আছে কি?
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
Mzamanbabu71@gmail.com
Saturday, October 10, 2015
চে গুয়েভারা: বিশ্ববিপ্লবের নিঃসঙ্গ শেরপা by মাহমুদুজ্জামান বাবু
বাংলাদেশের
স্বাধীনতা অর্জনের সশস্ত্র যুদ্ধ ১৯৭১ সালে শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল মাত্র
সাড়ে নয় মাসে। আর এর্নেস্তো চে গুয়েভারা বন্ধু আলবের্তো গ্রানাদোকে
সঙ্গী করে প্রিয় মোটরসাইকেল ‘লা পেদেরোসা’য় চড়ে নয় মাস ধরে ঘুরে
বেড়িয়েছিলেন লাতিন আমেরিকার প্রান্তে প্রান্তে। ব্যথিত হৃদয়ে, সজল চোখে
তিনি দেখতে পেয়েছিলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী থাবার বিস্তার।
শোষণ-নিষ্পেষণে বঞ্চিত মানুষের সরব ও নীরব কান্না গুমরে উঠছে তখন
আর্জেন্টিনা, পেরু, চিলি, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলায়। মোটরসাইকেল ডায়েরি পাঠ
করে করে পরে পৃথিবী জানতে পারে যে চে’র এই ভ্রমণ প্রমোদভ্রমণ ছিল না। চে
নিজে বলেছেন, ‘এ ভ্রমণকাহিনি অবিশ্বাস্য কোনো নায়িকপনার নয়।’ আসলে তিনি
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে ভেতর থেকে বুঝতে চেয়েছিলেন। সংকটের উপাদানগুলো
ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে চেয়েছিলেন। কিংবা কে জানে, তিনি হয়তো মানুষ হিসেবে
সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য-দায়বদ্ধতা অনুসন্ধানে
নেমেছিলেন। দুই বন্ধুর যাত্রা শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার আটলান্টিক তীরভূমি
বরাবর, গন্তব্য মিরানার সমুদ্রসৈকত রিসোর্ট। সেখানে অপেক্ষা করে আছেন
বান্ধবী চিচিনা। বিদায় নিতে হবে তাঁর কাছ থেকে। ১৯৫২ সালের ৪ জানুয়ারি
যাত্রা শুরুর আগেই চে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন।
চে যখন লাতিন আমেরিকা ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, তখন তিনি তরুণ। তখনো তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। ভ্রমণকালে যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতার ঝকঝকে আলো তাঁকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করেছিল যে অঞ্চলব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূল কারণ হলো মুনাফালোভী একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পররাজ্যগ্রাসী নিষ্ঠুর মনোভাব। চুলচেরা না হোক, সময়ের ঘণ্টাধ্বনি কান পেতে শুনে বিশ্লেষণের পথে হেঁটে চে পৌঁছেছিলেন সেই উপলব্ধিতে, যা তাঁকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বিশ্ববিপ্লবের। এই স্বপ্নমগ্নতায় চে জড়িয়ে পড়েন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেনক গুজমানকে যখন সিআইএর চক্রান্তে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো, তখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চে’র বিপ্লবের চেতনা নিশ্চয়ই আরও শাণিত হয়েছিল। তারপর আমরা তাঁকে দেখি মেক্সিকো সিটিতে। এই মেক্সিকো সিটিতেই ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল চের। ফিদেল ও রাউল তখন কিউবায় বিপ্লব করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা গোছাতে মেক্সিকো সিটিতে বাস করছিলেন।
১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই ফিদেলের নেতৃত্বে কিউবান গেরিলাদের একটি দল কিউবার মনকাদা আর্মি গ্যারিসনে আক্রমণ পরিচালনা করে। আক্রমণটি ব্যর্থ হলে প্রায় ৩০ জন সহযোদ্ধাসহ ফিদেল বন্দী হন। মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই ব্যর্থ আক্রমণের সময় এবং পরে প্রায় ৬০ জন গেরিলাকে হত্যা করেছিল স্বৈরশাসক বাতিস্তার সেনারা। প্রবল জনজাগরণের পর গণ-আন্দোলনের মুখে ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর সহযোদ্ধারা মুক্তি পেলেন ২২ মাস পর, ১৯৫৫ সালের মে মাসে। ৭ জুলাই কাস্ত্রো এসে পৌঁছালেন মেক্সিকো সিটিতে। এই জুলাই মাসেই রাউল কাস্ত্রোর মাধ্যমে ফিদেল ও চে’র দেখা হলো সেখানে এবং সূচনা হলো সফল কিউবা বিপ্লবের শুভদিনের।
কাস্ত্রোর গেরিলা দলে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন চে। কিউবান গেরিলারাই এর্নেস্তো গেভারা দেলা সের্নার নামটি ভালোবেসে পাল্টে দিলেন। ১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর কিউবার উদ্দেশে যাত্রা করল গেরিলাদের যুদ্ধজাহাজ গ্রানমা। গেরিলাদের সঙ্গী হিসেবে চে যাত্রাকালে ছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু ১৯৫৭ সালের জুলাইয়ে তিনি প্রথম রেবেল আর্মি কমান্ডার নির্বাচিত হলেন। ২ ডিসেম্বর তীরে ভিড়ল যুদ্ধজাহাজ গ্রানমা। ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে চে এবং কামিলো সিয়েরা মায়েস্ত্রার পশ্চিম ভাগ থেকে দ্বীপটির কেন্দ্রের দিকে আক্রমণ তীব্র করলেন। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সান্তাক্লারার যুদ্ধে রেবেল আর্মি জয়ী হলো চে গুয়েভারার নেতৃত্বে। এই জয়ই সমগ্র যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছিল হাজার গুণ। ১ জানুয়ারি, ১৯৫৯। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট স্বৈরশাসক বাতিস্তা খুব গোপনে, খুব ভোরে সপরিবারে কিউবা ছেড়ে পালালেন। বিপ্লব আপাতত সফল হলো।
বিপ্লব-পরবর্তী কিউবার পুনর্গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন চে। কখনো জাতীয় কৃষি সংস্কার বিভাগের প্রধান, কখনো ন্যাশনাল ব্যাংকের সভাপতি আবার কখনো বা শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। ১৯৬৪ সালে কিউবার পক্ষে জাতিসংঘে ভাষণ দেন চে গুয়েভারা। কিউবা তখন নব আনন্দে জাগছে। জেগে উঠলেন এবার চে গুয়েভারাও আর এক নতুন প্রত্যয়ে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে তখনো সাম্রাজ্যবাদের স্বৈরতন্ত্রের সর্বনাশা সভ্যতাবিনাশী পীড়ন ও দুঃশাসন চলছে। চে ছুটে গেলেন আফ্রিকার কঙ্গোতে। অপ্রস্তুত কঙ্গো থেকে ১৯৬৫–এর ডিসেম্বরে আবার কিউবায় ফিরলেন। এবার তাঁর গন্তব্য লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়া। কাস্ত্রো জানলেন। আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ কমরেড জানলেন। ছদ্মবেশ নিয়ে, বেনামি পাসপোর্ট করে বিশ্ববিপ্লবের স্বপ্নব্যাকুল চে গুয়েভারা কিউবা ছাড়লেন অকুতোভয়ে। চে ছিলেন একজন আর্জেন্টিনীয় মার্ক্সবাদী। ছিলেন বিপ্লবী, লেখক, গেরিলা নেতা, বুদ্ধিজীবী, সামরিক তত্ত্ববিদ, কূটনীতিবিদ আর কিউবা বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর, বলিভিয়ার দুর্গম অরণ্যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি লড়েছেন সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে। খাবার ফুরিয়ে গেছে, কার্তুজ ও গুলি শেষ, আজন্ম সঙ্গী হাঁপানির ওষুধ নেই, সেই অবস্থায় গুরুতর আহত হলেন প্রতিপক্ষের গুলিতে এবং বন্দী হলেন। বন্দী অবস্থাতেই নির্জন এক স্কুলঘরে একাধিক গুলি চালিয়ে খুন করা হলো তাঁকে। তারিখটি ছিল ৯ অক্টোবর, ১৯৬৭।
চে’র মৃত্যুতে সেদিন নিশ্চয়ই হাঁফ ছেড়েছিল সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী। ভেবেছিল, বিপ্লবের মৃত্যু হলো। আদতে, মৃত্যুর ৪৮ বছর পর জীবিত চে গুয়েভারার চেয়ে মৃত চে গুয়েভারা এখন আরও অনেক শক্তিশালী। আলোকচিত্রী আলবের্তো কোর্দার তোলা তাঁর মুখাবয়বের প্রতিকৃতি এখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব প্রতিবাদে-জমায়েতে আপসহীনতার প্রতীক। পৃথিবীর সেরা কবিরা তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, লিখছেন। গায়ক-গীতিকার কার্লোস পাবেলো ১৯৬৫ সালেই ‘আস্তা সিয়েম্প্রে কমানদান্তে চে গুয়েভারা’ শিরোনামের যে গানটি গেয়েছিলেন, তা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে, হচ্ছে বিশ্বব্যাপী শিল্পীদের কণ্ঠে কণ্ঠে। কারণ, চে বিশ্ববিপ্লবের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। বিপ্লবীর কোনো স্বদেশ থাকতে নেই। বিপ্লবেরও স্বদেশ থাকে না। চে এখনো, এখানেও, বিজয়ের পথে হাঁটছেন। হাঁটবেন অনাদিকাল। কারণ, বিশ্ববিপ্লব হয়নি আজও। আজও তমস কাটেনি। মানুষের মুক্তি, স্বপ্ন, সভ্যতা নিয়ে তামাশাও শেষ হয়নি।
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzamanbabu71@gmail.com
চে যখন লাতিন আমেরিকা ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, তখন তিনি তরুণ। তখনো তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। ভ্রমণকালে যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতার ঝকঝকে আলো তাঁকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করেছিল যে অঞ্চলব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূল কারণ হলো মুনাফালোভী একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পররাজ্যগ্রাসী নিষ্ঠুর মনোভাব। চুলচেরা না হোক, সময়ের ঘণ্টাধ্বনি কান পেতে শুনে বিশ্লেষণের পথে হেঁটে চে পৌঁছেছিলেন সেই উপলব্ধিতে, যা তাঁকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বিশ্ববিপ্লবের। এই স্বপ্নমগ্নতায় চে জড়িয়ে পড়েন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেনক গুজমানকে যখন সিআইএর চক্রান্তে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো, তখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চে’র বিপ্লবের চেতনা নিশ্চয়ই আরও শাণিত হয়েছিল। তারপর আমরা তাঁকে দেখি মেক্সিকো সিটিতে। এই মেক্সিকো সিটিতেই ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল চের। ফিদেল ও রাউল তখন কিউবায় বিপ্লব করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা গোছাতে মেক্সিকো সিটিতে বাস করছিলেন।
১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই ফিদেলের নেতৃত্বে কিউবান গেরিলাদের একটি দল কিউবার মনকাদা আর্মি গ্যারিসনে আক্রমণ পরিচালনা করে। আক্রমণটি ব্যর্থ হলে প্রায় ৩০ জন সহযোদ্ধাসহ ফিদেল বন্দী হন। মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই ব্যর্থ আক্রমণের সময় এবং পরে প্রায় ৬০ জন গেরিলাকে হত্যা করেছিল স্বৈরশাসক বাতিস্তার সেনারা। প্রবল জনজাগরণের পর গণ-আন্দোলনের মুখে ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর সহযোদ্ধারা মুক্তি পেলেন ২২ মাস পর, ১৯৫৫ সালের মে মাসে। ৭ জুলাই কাস্ত্রো এসে পৌঁছালেন মেক্সিকো সিটিতে। এই জুলাই মাসেই রাউল কাস্ত্রোর মাধ্যমে ফিদেল ও চে’র দেখা হলো সেখানে এবং সূচনা হলো সফল কিউবা বিপ্লবের শুভদিনের।
কাস্ত্রোর গেরিলা দলে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন চে। কিউবান গেরিলারাই এর্নেস্তো গেভারা দেলা সের্নার নামটি ভালোবেসে পাল্টে দিলেন। ১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর কিউবার উদ্দেশে যাত্রা করল গেরিলাদের যুদ্ধজাহাজ গ্রানমা। গেরিলাদের সঙ্গী হিসেবে চে যাত্রাকালে ছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু ১৯৫৭ সালের জুলাইয়ে তিনি প্রথম রেবেল আর্মি কমান্ডার নির্বাচিত হলেন। ২ ডিসেম্বর তীরে ভিড়ল যুদ্ধজাহাজ গ্রানমা। ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে চে এবং কামিলো সিয়েরা মায়েস্ত্রার পশ্চিম ভাগ থেকে দ্বীপটির কেন্দ্রের দিকে আক্রমণ তীব্র করলেন। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সান্তাক্লারার যুদ্ধে রেবেল আর্মি জয়ী হলো চে গুয়েভারার নেতৃত্বে। এই জয়ই সমগ্র যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছিল হাজার গুণ। ১ জানুয়ারি, ১৯৫৯। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট স্বৈরশাসক বাতিস্তা খুব গোপনে, খুব ভোরে সপরিবারে কিউবা ছেড়ে পালালেন। বিপ্লব আপাতত সফল হলো।
বিপ্লব-পরবর্তী কিউবার পুনর্গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন চে। কখনো জাতীয় কৃষি সংস্কার বিভাগের প্রধান, কখনো ন্যাশনাল ব্যাংকের সভাপতি আবার কখনো বা শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। ১৯৬৪ সালে কিউবার পক্ষে জাতিসংঘে ভাষণ দেন চে গুয়েভারা। কিউবা তখন নব আনন্দে জাগছে। জেগে উঠলেন এবার চে গুয়েভারাও আর এক নতুন প্রত্যয়ে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে তখনো সাম্রাজ্যবাদের স্বৈরতন্ত্রের সর্বনাশা সভ্যতাবিনাশী পীড়ন ও দুঃশাসন চলছে। চে ছুটে গেলেন আফ্রিকার কঙ্গোতে। অপ্রস্তুত কঙ্গো থেকে ১৯৬৫–এর ডিসেম্বরে আবার কিউবায় ফিরলেন। এবার তাঁর গন্তব্য লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়া। কাস্ত্রো জানলেন। আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ কমরেড জানলেন। ছদ্মবেশ নিয়ে, বেনামি পাসপোর্ট করে বিশ্ববিপ্লবের স্বপ্নব্যাকুল চে গুয়েভারা কিউবা ছাড়লেন অকুতোভয়ে। চে ছিলেন একজন আর্জেন্টিনীয় মার্ক্সবাদী। ছিলেন বিপ্লবী, লেখক, গেরিলা নেতা, বুদ্ধিজীবী, সামরিক তত্ত্ববিদ, কূটনীতিবিদ আর কিউবা বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর, বলিভিয়ার দুর্গম অরণ্যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি লড়েছেন সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে। খাবার ফুরিয়ে গেছে, কার্তুজ ও গুলি শেষ, আজন্ম সঙ্গী হাঁপানির ওষুধ নেই, সেই অবস্থায় গুরুতর আহত হলেন প্রতিপক্ষের গুলিতে এবং বন্দী হলেন। বন্দী অবস্থাতেই নির্জন এক স্কুলঘরে একাধিক গুলি চালিয়ে খুন করা হলো তাঁকে। তারিখটি ছিল ৯ অক্টোবর, ১৯৬৭।
চে’র মৃত্যুতে সেদিন নিশ্চয়ই হাঁফ ছেড়েছিল সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী। ভেবেছিল, বিপ্লবের মৃত্যু হলো। আদতে, মৃত্যুর ৪৮ বছর পর জীবিত চে গুয়েভারার চেয়ে মৃত চে গুয়েভারা এখন আরও অনেক শক্তিশালী। আলোকচিত্রী আলবের্তো কোর্দার তোলা তাঁর মুখাবয়বের প্রতিকৃতি এখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব প্রতিবাদে-জমায়েতে আপসহীনতার প্রতীক। পৃথিবীর সেরা কবিরা তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, লিখছেন। গায়ক-গীতিকার কার্লোস পাবেলো ১৯৬৫ সালেই ‘আস্তা সিয়েম্প্রে কমানদান্তে চে গুয়েভারা’ শিরোনামের যে গানটি গেয়েছিলেন, তা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে, হচ্ছে বিশ্বব্যাপী শিল্পীদের কণ্ঠে কণ্ঠে। কারণ, চে বিশ্ববিপ্লবের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। বিপ্লবীর কোনো স্বদেশ থাকতে নেই। বিপ্লবেরও স্বদেশ থাকে না। চে এখনো, এখানেও, বিজয়ের পথে হাঁটছেন। হাঁটবেন অনাদিকাল। কারণ, বিশ্ববিপ্লব হয়নি আজও। আজও তমস কাটেনি। মানুষের মুক্তি, স্বপ্ন, সভ্যতা নিয়ে তামাশাও শেষ হয়নি।
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzamanbabu71@gmail.com
Tuesday, April 14, 2015
জীর্ণ-পুরাতন কবে ভেসে যাবে? by মাহমুদুজ্জামান বাবু
![]() |
| নতুন বছর, তাকে বরণ করে নিতে কত প্রস্তুতিই না থাকে তরুণদের |
মোগল
সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং
তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি
চান্দ্র সন ও বাংলা সৌর সনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। এটি
প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত থাকলেও পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।
বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় আকবরের আমল থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকেরা
চৈত্র মাসের শেষ দিনের সময় পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য
ভূ-স্বামীর বকেয়া খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ
করাতেন, মেলা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। ক্রমান্বয়ে পয়লা বৈশাখ
হয়ে ওঠে সর্বজনীন এক মহোৎসব। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে সাংস্কৃতিক
আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনেও পয়লা বৈশাখ এক নতুন মাত্রা যোগ
করেছিল। তৎকালীন আইয়ুব সরকার ‘রবীন্দ্রচর্চা’র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে,
তার প্রতিবাদে বৈশাখের প্রথম দিনে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ঢাকার রমনা
বটমূলে নববর্ষ পালনের আয়োজন করে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই অনুষ্ঠান
ক্রমান্বয়ে বিপুল জনসমর্থন পেতে থাকে এবং স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনায়
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠে।
তারপর ক্রমে সাংস্কৃতিক উৎসবের সংখ্যা কমেছে, প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা বেড়েছে। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবন থেকে উৎসারিত পয়লা বৈশাখ এখন নাগরিক উৎসবের ঝলমলে আয়োজন। কৃষকের জীবনের ‘হালখাতা’ খোলা হোক বা না হোক, শহুরে ব্যবসায়ীদের মুনাফার ঢোল বাজতে থাকে। নানা চটকদার বিজ্ঞাপনে বাজার ছেয়ে যায়। কোনো কোনো ফ্যাশন হাউস বলে, ‘এই শাড়ি/পাঞ্জাবি/অলংকার শুধু একটাই করা হয়েছে। এ কেবল আপনারই জন্য। দ্রুত অর্ডার করুন।’ আবার কেউ কেউ বিজ্ঞাপনে লিখেছেন, ‘প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ আমরা কারিগরদের দেব।’ কত অংশ দেবেন তা সুস্পষ্ট নয় যদিও, তবু ভাবখানা এমন যে এতে তাঁদের বদান্যতার সীমা নেই।
মাত্র কিছুদিন আগে, যখন পেট্রলবোমায় পুড়ে সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছিলেন, বার্ন ইউনিটে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, সেই সব অগ্নিদগ্ধ আলোকচিত্র দিয়ে ঢাকার একটি বিখ্যাত ফ্যাশন হাউস নারী-পুরুষের পোশাক তৈরি করে বিক্রি করেছেন। মুনাফার লোভ কতটা লকলকে হয়ে উঠলে এ ধরনের কাজ করা যায়!
তবু চাই, উৎসব হোক। এত আত্মবলিদানের এই দেশে চারদিক যখন অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন খুব ইচ্ছে করে নব আনন্দে জাগতে। প্রতিক্রিয়ার শক্তির অভয়ারণ্য যখন চারপাশ, তখন একটি দীর্ঘ মঙ্গল শোভাযাত্রা অশুভের বিনাশের দিকে ধাবিত হোক। রাজনীতিতে হিংস্র কপটতা, সংস্কৃতিতে আপস, পরিবার ও ব্যক্তিমানসে চূড়ান্ত নৈরাজ্য—সবকিছু প্রবল বাতাসে উড়িয়ে, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে বজ্র-বিদ্যুৎ নিয়ে বৈশাখী ঝড় আসুক, বছরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক, জীর্ণ-পুরাতন যাক ভেসে যাক। নববর্ষের নব আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সব প্রাণে।
কিন্তু, সব সময় জয় হয় না চাইলেই। একদা যা ছিল মূল্যবোধের প্রতীক, এখন তা উপহাসের ফিসফাস। এখানে রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করে যারা, তারা বুক চিতিয়ে হাঁটে, কখনো কখনো জনপ্রতিনিধিও হয়। চুরি সমাজে আছে, প্রতিকারহীনতাও আছে, সুতরাং চুরির অভ্যাসও আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক তরুণ কূটনীতিক নেদারল্যান্ডসের একটি ইলেকট্রনিক দোকান থেকে চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। তিনি স্বীকার করে বলেছেন, তাঁর কয়েকজন সহকর্মী এর আগে এ ধরনের কাজ করেছেন এবং তাঁরা কেউই ধরা পড়েননি। তাতেই তিনি উৎসাহিত হয়েছেন। ওই কূটনীতিক ও তাঁর নয়জন সহকর্মী ডাচ সরকারের খরচে ও তাদের আমন্ত্রণে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে নেদারল্যান্ডসে যান। ৩৫০ ইউরো জরিমানা দিয়ে ওই কূটনীতিক রেহাই পেলেও ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত ডাচ সরকার বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেছে।
মানুষের মানুষ হিসেবে বেঁচেবর্তে থাকার লড়াইটা এখন বৈশ্বিক। দুই মাসের কাছাকাছি সময় হলো কানাডার মন্ট্রিয়লে এসেছি। অভিবাসী বাঙালিদের আয়োজিত কয়েকটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে এসেছি এখানে। আমার স্ত্রী, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরীর সঙ্গে এখানে যে বাসায় থাকছি, ৩১ মার্চ রাতে আকাশে ওড়া হেলিকপ্টারের শব্দে সেই ঘরে টেকা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, ঘরের ছাদেই হেলিকপ্টার নেমেছে। পরদিন অনলাইনে সংবাদ দেখে কারণটা বোঝা গেল। শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছিল সেই রাতে। তাদের দিকে সন্ধানী আলো ফেলে আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল পুলিশের হেলিকপ্টার। ২ এপ্রিল সেই বিক্ষোভ পুরো মন্ট্রিয়ল শহরকে অচল করে দিল। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলে নামল মাঝারি আয়ের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরদিন মন্ট্রিয়ল গেজেট-এ লেখা হলো, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ২ হাজারেরও বেশি মানুষ। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সেই বিক্ষোভ মিছিল দেখেছি। কুইবেক প্রদেশের মেয়রের বিশাল বিশাল সব ব্যঙ্গাত্মক মুখোশ, রংবেরঙের প্ল্যাকার্ড আর হরেক রকমের প্যারেড সংগীত। এক দলের বাজানো সুরে উৎকর্ণ হয়ে উঠলাম। খুব পরিচিত সুর। কোন গান এটা? হঠাৎ শিহরিত হলাম: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সোভিয়েত রেড আর্মি যখন ফ্যাসিস্ট হিটলার বাহিনীকে হটাচ্ছে পেছনের দিকে, তখনকার একটি গান, বাংলা অনুবাদ করে গেয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস: ‘ভেদি অনশন মৃত্যু তুষার ও তুফান/ প্রতি নগর হতে গ্রামাঞ্চল/ কমরেড লেনিনের আহ্বান/ চলে মুক্তি সেনাদল...।’
চারুকলা অনুষদ থেকে এবার যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে পয়লা বৈশাখের সকালে, কৃষকের জমি ও অধিকার কেড়ে নেওয়া জোতদার এবং জোতদারি রাষ্ট্রের একটা মুখোশ কি সেখানে থাকবে? ঐতিহ্যের নামে এসব জীর্ণ-পুরাতন আর কত? অনেক তো হলো!
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzamanbabu71@gmail.com
তারপর ক্রমে সাংস্কৃতিক উৎসবের সংখ্যা কমেছে, প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা বেড়েছে। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবন থেকে উৎসারিত পয়লা বৈশাখ এখন নাগরিক উৎসবের ঝলমলে আয়োজন। কৃষকের জীবনের ‘হালখাতা’ খোলা হোক বা না হোক, শহুরে ব্যবসায়ীদের মুনাফার ঢোল বাজতে থাকে। নানা চটকদার বিজ্ঞাপনে বাজার ছেয়ে যায়। কোনো কোনো ফ্যাশন হাউস বলে, ‘এই শাড়ি/পাঞ্জাবি/অলংকার শুধু একটাই করা হয়েছে। এ কেবল আপনারই জন্য। দ্রুত অর্ডার করুন।’ আবার কেউ কেউ বিজ্ঞাপনে লিখেছেন, ‘প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ আমরা কারিগরদের দেব।’ কত অংশ দেবেন তা সুস্পষ্ট নয় যদিও, তবু ভাবখানা এমন যে এতে তাঁদের বদান্যতার সীমা নেই।
মাত্র কিছুদিন আগে, যখন পেট্রলবোমায় পুড়ে সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছিলেন, বার্ন ইউনিটে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, সেই সব অগ্নিদগ্ধ আলোকচিত্র দিয়ে ঢাকার একটি বিখ্যাত ফ্যাশন হাউস নারী-পুরুষের পোশাক তৈরি করে বিক্রি করেছেন। মুনাফার লোভ কতটা লকলকে হয়ে উঠলে এ ধরনের কাজ করা যায়!
তবু চাই, উৎসব হোক। এত আত্মবলিদানের এই দেশে চারদিক যখন অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন খুব ইচ্ছে করে নব আনন্দে জাগতে। প্রতিক্রিয়ার শক্তির অভয়ারণ্য যখন চারপাশ, তখন একটি দীর্ঘ মঙ্গল শোভাযাত্রা অশুভের বিনাশের দিকে ধাবিত হোক। রাজনীতিতে হিংস্র কপটতা, সংস্কৃতিতে আপস, পরিবার ও ব্যক্তিমানসে চূড়ান্ত নৈরাজ্য—সবকিছু প্রবল বাতাসে উড়িয়ে, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে বজ্র-বিদ্যুৎ নিয়ে বৈশাখী ঝড় আসুক, বছরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক, জীর্ণ-পুরাতন যাক ভেসে যাক। নববর্ষের নব আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সব প্রাণে।
কিন্তু, সব সময় জয় হয় না চাইলেই। একদা যা ছিল মূল্যবোধের প্রতীক, এখন তা উপহাসের ফিসফাস। এখানে রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করে যারা, তারা বুক চিতিয়ে হাঁটে, কখনো কখনো জনপ্রতিনিধিও হয়। চুরি সমাজে আছে, প্রতিকারহীনতাও আছে, সুতরাং চুরির অভ্যাসও আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক তরুণ কূটনীতিক নেদারল্যান্ডসের একটি ইলেকট্রনিক দোকান থেকে চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। তিনি স্বীকার করে বলেছেন, তাঁর কয়েকজন সহকর্মী এর আগে এ ধরনের কাজ করেছেন এবং তাঁরা কেউই ধরা পড়েননি। তাতেই তিনি উৎসাহিত হয়েছেন। ওই কূটনীতিক ও তাঁর নয়জন সহকর্মী ডাচ সরকারের খরচে ও তাদের আমন্ত্রণে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে নেদারল্যান্ডসে যান। ৩৫০ ইউরো জরিমানা দিয়ে ওই কূটনীতিক রেহাই পেলেও ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত ডাচ সরকার বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেছে।
মানুষের মানুষ হিসেবে বেঁচেবর্তে থাকার লড়াইটা এখন বৈশ্বিক। দুই মাসের কাছাকাছি সময় হলো কানাডার মন্ট্রিয়লে এসেছি। অভিবাসী বাঙালিদের আয়োজিত কয়েকটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে এসেছি এখানে। আমার স্ত্রী, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরীর সঙ্গে এখানে যে বাসায় থাকছি, ৩১ মার্চ রাতে আকাশে ওড়া হেলিকপ্টারের শব্দে সেই ঘরে টেকা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, ঘরের ছাদেই হেলিকপ্টার নেমেছে। পরদিন অনলাইনে সংবাদ দেখে কারণটা বোঝা গেল। শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছিল সেই রাতে। তাদের দিকে সন্ধানী আলো ফেলে আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল পুলিশের হেলিকপ্টার। ২ এপ্রিল সেই বিক্ষোভ পুরো মন্ট্রিয়ল শহরকে অচল করে দিল। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলে নামল মাঝারি আয়ের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরদিন মন্ট্রিয়ল গেজেট-এ লেখা হলো, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ২ হাজারেরও বেশি মানুষ। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সেই বিক্ষোভ মিছিল দেখেছি। কুইবেক প্রদেশের মেয়রের বিশাল বিশাল সব ব্যঙ্গাত্মক মুখোশ, রংবেরঙের প্ল্যাকার্ড আর হরেক রকমের প্যারেড সংগীত। এক দলের বাজানো সুরে উৎকর্ণ হয়ে উঠলাম। খুব পরিচিত সুর। কোন গান এটা? হঠাৎ শিহরিত হলাম: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সোভিয়েত রেড আর্মি যখন ফ্যাসিস্ট হিটলার বাহিনীকে হটাচ্ছে পেছনের দিকে, তখনকার একটি গান, বাংলা অনুবাদ করে গেয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস: ‘ভেদি অনশন মৃত্যু তুষার ও তুফান/ প্রতি নগর হতে গ্রামাঞ্চল/ কমরেড লেনিনের আহ্বান/ চলে মুক্তি সেনাদল...।’
চারুকলা অনুষদ থেকে এবার যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে পয়লা বৈশাখের সকালে, কৃষকের জমি ও অধিকার কেড়ে নেওয়া জোতদার এবং জোতদারি রাষ্ট্রের একটা মুখোশ কি সেখানে থাকবে? ঐতিহ্যের নামে এসব জীর্ণ-পুরাতন আর কত? অনেক তো হলো!
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzamanbabu71@gmail.com
Sunday, March 15, 2015
‘ইতরপনা কার্য আমার’ by মাহমুদুজ্জামান বাবু
![]() |
| পেট্রলবোমায় নিহত স্বজনদের এই কান্না আর কত দিন? |
![]() |
| পেট্রলবোমায় নিহত স্বজনদের এই কান্না আর কত দিন? |
আরও
অনেকের মতোই আমারও ইচ্ছা করে সারাক্ষণ প্রচণ্ড চিৎকারে ভেঙে খান খান করি
এই সময়ের চারপাশ। প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়ে অচলায়তন ভাঙি। তীব্র কশাঘাতে
ক্ষতবিক্ষত করে দিই সমাজ ও রাষ্ট্রের নাদুসনুদুস রাক্ষসমতো চেহারাটাকে। সব
গিলে খেয়েছে সে, খাচ্ছে অবিরাম। আমাদের শুভবোধ, মানসিকতা, যুক্তিবাদ,
সৃজনশীল উদ্যম, ভালোবাসা—সবকিছু উদগ্র উল্লাসে গিলে গিলে তৃপ্তির ঢেকুর
তুলছে এই দুঃসময়। কালো রাত কাটছে না। কালো কালো রাতে যাঁরা দেশের এ
প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য ওত পেতে থাকছে পেট্রলবোমার
আগুনে মৃত্যু ও শঙ্কা, নিম্ন আয়ের মানুষের আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
প্রায়, শিক্ষার্থীরা জিম্মি হয়ে অবসাদগ্রস্ততায় ডুবিয়েছে তাদের রংধনু
মস্তিষ্কের কোষ; গৃহবাসীর অপেক্ষা প্রতিদিনের শুধু নয়, প্রতিক্ষণের। তার
ভাবনা, যে আছে বাইরে, সে ফিরবে তো ঠিকঠাক? নিরাপদে?
এর নাম জীবনযাপন? এর নাম সমাজ? স্বদেশ?
মোটেও নয়। এটা তৈরি করা হয়েছে। আমাদের মতোই দেখতে কিন্তু ভাবনায় ভিন্ন কিছু মানুষ এই সর্বনাশা সময় তৈরি করেছে। জানুয়ারির শেষ দিকে একদিন কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে, চারপাশের বহমান সময় নিয়ে। তিনি বলছিলেন, ‘যে বাংলাদেশ আমরা এখন দেখছি, এটা প্রকৃত বাংলাদেশ নয়। রাজনীতি করে যারা নিজেদের সম্পদশালী ও ধনী করতে চায়, এ রকম কয়েক হাজার মানুষ তাদের অপকর্ম দিয়ে দেশকে এত নিচে টেনে নামিয়েছে।’
হরেক রকম অপকর্ম, যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য; সবাই চলছে প্রতিরোধহীন। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি তার ২০-দলীয় জোটের সর্বস্তরের মানুষের ‘না-চাওয়া’ হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা চালাচ্ছে। আর ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোট, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব থেকে উদ্ভূত দমন-পীড়নের নানামুখী পদক্ষেপ অচলাবস্থাকে করছে দীর্ঘায়িত। জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। তা এখন শূন্যের কোঠায় পৌঁছে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে হাসছে। তবু আমরা কেউ জ্বলছি না। টলছি না। দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে যাঁরা প্রায়ই গম্ভীর মুখ করে টেলিভিশনের ‘টক শো’তে গিয়ে মিষ্টি মিষ্টি আশাবাদের কথা বলেন, তাঁদের বিশ্লেষণে চারপাশের এই নির্লিপ্ততার কোনো কার্যকারণ জানা যাচ্ছে না। দেশটা কি তবে মেধাহীন পোশাকি কপট মানুষে ভরে গেল? কবে হলো এই সর্বনাশ? কীভাবে হলো? কেন হলো?
ভাবনাহীনতা ও প্রশ্নহীনতার এই কালে কয়েকটি প্রশ্ন খুবই সহজ ও সরল। সবারই জানা। যেন ঠোঁটের ডগায় ঝুলে আছে। কিন্তু উত্তর? জানা নেই। তা-ই কি? নাকি জানা আছে, বলা বারণ? বারণ কেন? বললে কী হবে? সরল উত্তর, অসুবিধা হবে। কী অসুবিধা? ব্যক্তিগত অসুবিধা। ধর্ম নয়, ধর্মতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে যুক্তিহীন মৌলবাদের রোষে লেখক তসলিমা নাসরিন অনিচ্ছুক পরবাসী হয়েছেন। তখন যদি আমরা প্রশ্ন তুলতাম, তাহলে পরবর্তী সময়ে কবি শামসুর রাহমানের বাসা আক্রান্ত হতো না। ধারাবাহিকভাবে মৌলবাদের চাপাতি একে একে ঝাঁপিয়ে পড়ত না হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়সহ আরও অনেকের ওপর। আমাদের ফিসফিস কথাগুলো মৌনতার নামান্তর। মৌনতা বিজ্ঞানমনস্ক করে না মানুষকে।
দেশের বিবদমান হিংসুটে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য কেউ কেউ উদ্যোগ নিলেও আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিকেরা ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে মানছেন। দেখেশুনে যে কেউই বুঝবেন যে তাঁদের কাছে দেশ বা দেশের উন্নয়ন এমনকি মানুষের জীবনও কোনো দাবি তৈরি করছে না। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে চিরবিনাশ করতে চাইছে, নির্মূল করতে চাইছে। যারা ক্ষমতায় আছে, তারা একাধিপত্য বিস্তার করছে। প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতির বাসনায় স্বৈরতান্ত্রিক মন গড়ে তুলছে নিজেদের ভাবনার জগতে। এটা একটা অশনিসংকেত। সবার জন্যই। এটা বুর্জোয়া রাজনীতির দৌরাত্ম্য ও দেউলিয়াত্বও বটে। আর এই দেউলিয়াপনার উৎকট চেহারা দেখে দেশের সার্বভৌমত্বের গালে চপেটাঘাত করে নাক গলাচ্ছেন জাতিসংঘ ও ভিনদেশি কূটনীতিকেরা। প্রতিষ্ঠান ও দেশ হিসেবে যাদের নিজস্ব চেহারা বিশ্বময় খুবই লজ্জার, সেসব স্বার্থান্বেষী মহলকে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মতামত দেওয়ার অবস্থাটা আমাদের লোভী রাজনীতিকেরাই তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁদের ‘লজ্জা’তে ফরমালিন দেওয়া কি?
আমরা যে স্বৈরতন্ত্র ও সন্ত্রাসী সময়ে বেঁচে থাকছি, এমন মন্তব্যে কেউ কেউ রুষ্ট হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে কি তা-ই নয়? দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি-জামায়াত জোটের পাশবিক পেট্রলবোমা-মার্কা ক্ষমতায় যেতে চাওয়ার আন্দোলনে যারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে পুড়তে পুড়তে মারা যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই, তাদের কাছে কি রাজনীতি কোনো গণতান্ত্রিক বার্তা পৌঁছাচ্ছে? এই আন্দোলনের কোনো কর্মসূচিতে কি দেশের অধিকারহীন ব্যাপকসংখ্যক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে? মীমাংসিত অপরাধী মানবতাবিরোধী অপশক্তি প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াত-শিবিরকে এখনো বিএনপি ছাড়তে পারল না। পারে না, কারণ নিজেদের নীতিহীন, আদর্শহীন লুটেরা রাজনীতির বর্ম হিসেবে এদের ধর্মকে ব্যবহার করতে হয়। দুর্ভাগা ও গরিব সাধারণ মানুষকে মানবেতর জীবনের জন্য অদৃষ্টনির্ভর বানাতে হয়। অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারগ্রস্ত, ব্যক্তিগত জীবনযাপনে তুমুল বিলাসী ও লোভী এসব নানা পরিচয়ের ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আশ্রয় করে জোট বেঁধেছে বিএনপি। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও সমানভাবে পাল্লা দিচ্ছে। কখনো হেফাজতকে প্রশ্রয়, কখনো নিজেদের ওলামা সংগঠনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিজেদের ধার্মিক পরিচয়টি উজ্জ্বল করতে চেয়েছে। যে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে তারা নিজেদের দাবি করে, সেই ধর্মে নিষেধ থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিল সিলেটের হজরত শাহজালালের মাজার থেকে। নির্বাচনী স্লোগানে আল্লাহকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, ‘নৌকার মালিক তুমি আল্লাহ’। ‘ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’ বলেছে বিএনপি। আর জামায়াতের সব খুনি গোষ্ঠী বলেছে, ‘ভোট দিলে পাল্লায়, খুশি হবে আল্লায়’। ধর্মকে এরা নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছে। এই জায়গায় এরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে এককাট্টা। শুধু দলের নাম আলাদা। উদ্দেশ্য এক।
যত দিন যাচ্ছে, রাষ্ট্রের অকার্যকর ও স্বৈরতান্ত্রিক চেহারা উৎকট হয়ে উঠছে। অভিজিৎ রায়কে খুন করার প্রতিবাদে ৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মিছিলে ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীদের হুমকি দিয়ে মতিহার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেছেন, ‘ক্যাম্পাসে শুধুই ছাত্রলীগ মিছিল করতে পারবে, আর কেউ না (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম, ৪ মার্চ)। বোঝা যাচ্ছে, পুলিশও যেন আওয়ামী লীগ করছে এখন।
কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস সম্ভবত বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাতা চীনা প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান সেতুর পাইলিংয়ের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার দিনে কালো রঙের গরু-ছাগল বলি দিয়ে এদের রক্ত পদ্মা নদীতে ঢালল এই প্রত্যাশায়, নির্মাণকাজ যেন নির্বিঘ্নে শেষ হয়। হায় কমরেড মাও সে তুং! আপনি বেঁচে থাকলে কি এদের কুৎসিত গালে কষে থাপড় মারতেন? কিছুদিন আগে পবিত্র হজ পালন করে আসা বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির শীর্ষ নেতা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ছাত্রমৈত্রীর সম্মেলনে ভাষণ দিয়ে বলেছেন, ‘ছাত্রসমাজের সংগ্রামী রূপ ম্লান হয়ে গেছে।...ছাত্রসমাজ আগের মতো জাগ্রত থাকলে অভিজিৎ হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না। ভেবেছিলাম অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর অন্তত ছাত্রসমাজ ফুঁসে উঠবে। কিন্তু সেখানেও ঘাটতি রয়ে গেল’ (প্রথম আলো, ৪ মার্চ)।
কেন এমন হলো মেনন ভাই? আপনিও জানেন না?
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzaamanbabu71@gmail.com
এর নাম জীবনযাপন? এর নাম সমাজ? স্বদেশ?
মোটেও নয়। এটা তৈরি করা হয়েছে। আমাদের মতোই দেখতে কিন্তু ভাবনায় ভিন্ন কিছু মানুষ এই সর্বনাশা সময় তৈরি করেছে। জানুয়ারির শেষ দিকে একদিন কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে, চারপাশের বহমান সময় নিয়ে। তিনি বলছিলেন, ‘যে বাংলাদেশ আমরা এখন দেখছি, এটা প্রকৃত বাংলাদেশ নয়। রাজনীতি করে যারা নিজেদের সম্পদশালী ও ধনী করতে চায়, এ রকম কয়েক হাজার মানুষ তাদের অপকর্ম দিয়ে দেশকে এত নিচে টেনে নামিয়েছে।’
হরেক রকম অপকর্ম, যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য; সবাই চলছে প্রতিরোধহীন। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি তার ২০-দলীয় জোটের সর্বস্তরের মানুষের ‘না-চাওয়া’ হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা চালাচ্ছে। আর ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোট, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব থেকে উদ্ভূত দমন-পীড়নের নানামুখী পদক্ষেপ অচলাবস্থাকে করছে দীর্ঘায়িত। জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। তা এখন শূন্যের কোঠায় পৌঁছে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে হাসছে। তবু আমরা কেউ জ্বলছি না। টলছি না। দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে যাঁরা প্রায়ই গম্ভীর মুখ করে টেলিভিশনের ‘টক শো’তে গিয়ে মিষ্টি মিষ্টি আশাবাদের কথা বলেন, তাঁদের বিশ্লেষণে চারপাশের এই নির্লিপ্ততার কোনো কার্যকারণ জানা যাচ্ছে না। দেশটা কি তবে মেধাহীন পোশাকি কপট মানুষে ভরে গেল? কবে হলো এই সর্বনাশ? কীভাবে হলো? কেন হলো?
ভাবনাহীনতা ও প্রশ্নহীনতার এই কালে কয়েকটি প্রশ্ন খুবই সহজ ও সরল। সবারই জানা। যেন ঠোঁটের ডগায় ঝুলে আছে। কিন্তু উত্তর? জানা নেই। তা-ই কি? নাকি জানা আছে, বলা বারণ? বারণ কেন? বললে কী হবে? সরল উত্তর, অসুবিধা হবে। কী অসুবিধা? ব্যক্তিগত অসুবিধা। ধর্ম নয়, ধর্মতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে যুক্তিহীন মৌলবাদের রোষে লেখক তসলিমা নাসরিন অনিচ্ছুক পরবাসী হয়েছেন। তখন যদি আমরা প্রশ্ন তুলতাম, তাহলে পরবর্তী সময়ে কবি শামসুর রাহমানের বাসা আক্রান্ত হতো না। ধারাবাহিকভাবে মৌলবাদের চাপাতি একে একে ঝাঁপিয়ে পড়ত না হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়সহ আরও অনেকের ওপর। আমাদের ফিসফিস কথাগুলো মৌনতার নামান্তর। মৌনতা বিজ্ঞানমনস্ক করে না মানুষকে।
দেশের বিবদমান হিংসুটে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য কেউ কেউ উদ্যোগ নিলেও আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিকেরা ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে মানছেন। দেখেশুনে যে কেউই বুঝবেন যে তাঁদের কাছে দেশ বা দেশের উন্নয়ন এমনকি মানুষের জীবনও কোনো দাবি তৈরি করছে না। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে চিরবিনাশ করতে চাইছে, নির্মূল করতে চাইছে। যারা ক্ষমতায় আছে, তারা একাধিপত্য বিস্তার করছে। প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতির বাসনায় স্বৈরতান্ত্রিক মন গড়ে তুলছে নিজেদের ভাবনার জগতে। এটা একটা অশনিসংকেত। সবার জন্যই। এটা বুর্জোয়া রাজনীতির দৌরাত্ম্য ও দেউলিয়াত্বও বটে। আর এই দেউলিয়াপনার উৎকট চেহারা দেখে দেশের সার্বভৌমত্বের গালে চপেটাঘাত করে নাক গলাচ্ছেন জাতিসংঘ ও ভিনদেশি কূটনীতিকেরা। প্রতিষ্ঠান ও দেশ হিসেবে যাদের নিজস্ব চেহারা বিশ্বময় খুবই লজ্জার, সেসব স্বার্থান্বেষী মহলকে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মতামত দেওয়ার অবস্থাটা আমাদের লোভী রাজনীতিকেরাই তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁদের ‘লজ্জা’তে ফরমালিন দেওয়া কি?
আমরা যে স্বৈরতন্ত্র ও সন্ত্রাসী সময়ে বেঁচে থাকছি, এমন মন্তব্যে কেউ কেউ রুষ্ট হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে কি তা-ই নয়? দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি-জামায়াত জোটের পাশবিক পেট্রলবোমা-মার্কা ক্ষমতায় যেতে চাওয়ার আন্দোলনে যারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে পুড়তে পুড়তে মারা যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই, তাদের কাছে কি রাজনীতি কোনো গণতান্ত্রিক বার্তা পৌঁছাচ্ছে? এই আন্দোলনের কোনো কর্মসূচিতে কি দেশের অধিকারহীন ব্যাপকসংখ্যক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে? মীমাংসিত অপরাধী মানবতাবিরোধী অপশক্তি প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াত-শিবিরকে এখনো বিএনপি ছাড়তে পারল না। পারে না, কারণ নিজেদের নীতিহীন, আদর্শহীন লুটেরা রাজনীতির বর্ম হিসেবে এদের ধর্মকে ব্যবহার করতে হয়। দুর্ভাগা ও গরিব সাধারণ মানুষকে মানবেতর জীবনের জন্য অদৃষ্টনির্ভর বানাতে হয়। অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারগ্রস্ত, ব্যক্তিগত জীবনযাপনে তুমুল বিলাসী ও লোভী এসব নানা পরিচয়ের ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আশ্রয় করে জোট বেঁধেছে বিএনপি। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও সমানভাবে পাল্লা দিচ্ছে। কখনো হেফাজতকে প্রশ্রয়, কখনো নিজেদের ওলামা সংগঠনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিজেদের ধার্মিক পরিচয়টি উজ্জ্বল করতে চেয়েছে। যে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে তারা নিজেদের দাবি করে, সেই ধর্মে নিষেধ থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিল সিলেটের হজরত শাহজালালের মাজার থেকে। নির্বাচনী স্লোগানে আল্লাহকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, ‘নৌকার মালিক তুমি আল্লাহ’। ‘ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’ বলেছে বিএনপি। আর জামায়াতের সব খুনি গোষ্ঠী বলেছে, ‘ভোট দিলে পাল্লায়, খুশি হবে আল্লায়’। ধর্মকে এরা নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছে। এই জায়গায় এরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে এককাট্টা। শুধু দলের নাম আলাদা। উদ্দেশ্য এক।
যত দিন যাচ্ছে, রাষ্ট্রের অকার্যকর ও স্বৈরতান্ত্রিক চেহারা উৎকট হয়ে উঠছে। অভিজিৎ রায়কে খুন করার প্রতিবাদে ৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মিছিলে ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীদের হুমকি দিয়ে মতিহার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেছেন, ‘ক্যাম্পাসে শুধুই ছাত্রলীগ মিছিল করতে পারবে, আর কেউ না (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম, ৪ মার্চ)। বোঝা যাচ্ছে, পুলিশও যেন আওয়ামী লীগ করছে এখন।
কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস সম্ভবত বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাতা চীনা প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান সেতুর পাইলিংয়ের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার দিনে কালো রঙের গরু-ছাগল বলি দিয়ে এদের রক্ত পদ্মা নদীতে ঢালল এই প্রত্যাশায়, নির্মাণকাজ যেন নির্বিঘ্নে শেষ হয়। হায় কমরেড মাও সে তুং! আপনি বেঁচে থাকলে কি এদের কুৎসিত গালে কষে থাপড় মারতেন? কিছুদিন আগে পবিত্র হজ পালন করে আসা বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির শীর্ষ নেতা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ছাত্রমৈত্রীর সম্মেলনে ভাষণ দিয়ে বলেছেন, ‘ছাত্রসমাজের সংগ্রামী রূপ ম্লান হয়ে গেছে।...ছাত্রসমাজ আগের মতো জাগ্রত থাকলে অভিজিৎ হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না। ভেবেছিলাম অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর অন্তত ছাত্রসমাজ ফুঁসে উঠবে। কিন্তু সেখানেও ঘাটতি রয়ে গেল’ (প্রথম আলো, ৪ মার্চ)।
কেন এমন হলো মেনন ভাই? আপনিও জানেন না?
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzaamanbabu71@gmail.com
Tuesday, March 3, 2015
অভিজিৎ ও জোনাকি by মাহমুদুজ্জামান বাবু
২০০৪
সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে, বাংলা একাডেমির দেয়াল ঘেঁষে
ওত পেতে থাকা গাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের।
না, কোনো কুশল বিনিময় হয়নি পরস্পরের। অন্ধকারের সঙ্গে কুশল বিনিময় হয়
না কখনো। অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেদিন প্রথাবিরোধী শিক্ষক, গবেষক,
প্রাবন্ধিক ও কবি মানুষটির ওপর। সেদিনের চাপাতি হুমায়ুন আজাদের মাথার
নাগাল পায়নি। কারণ, ঘাতকেরা বা আক্রমণকারীরা তাঁর তুলনায় নিশ্চয়ই
বামনাকৃতির ছিল। হুমায়ুন বরাবর দীর্ঘকায় ছিলেন। মন ও শরীরের উচ্চতায়।
উদ্যমে। সাহসে। মনে পড়ছে, ১৯৯৯ সালে পণ্ডিত ও বয়স্ক বিদ্রোহী ড. আহমদ
শরীফের মৃত্যুর পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাগরিক শোকসভা আয়োজিত
হয়েছিল। আহমদ শরীফের একসময়ের ছাত্র ও পরে সহকর্মী হুমায়ুন আজাদ বক্তৃতা
দিতে এসে বলেছিলেন, কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়াশীলতা ও দৈন্যের বিরুদ্ধে তিনি
ছিলেন মাথা উঁচু করা সাহসী মানুষ। তাঁর মাথা উঁচু হতে হতে আকাশ স্পর্শ
করেছিল। এই মাথা উঁচু করা মানুষটি চলে যাওয়ার পর আমাদের চারপাশে বামন
ছাড়া আর কিছু থাকল না। আমরা সবাই সেদিন হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যে কটাক্ষ
বোধ করেছিলাম, আহত হয়েছিলাম। কিন্তু যত দিন গেছে, তারপর চারপাশ দেখে দেখে
আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, হুমায়ুন আজাদ ‘বামন’ বলতে আমাদের মানসিক দৈন্যকেই
চিহ্নিত করেছিলেন। যদিও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এখন প্রধানত হীনতা ও দীনতার
ধারক ও বাহক। তাই হুমায়ুন আজাদও রক্তাক্ত হয়েছিলেন এবং যদিও সেদিন তাঁর
মাথায় আঘাত করতে পারেনি ঘাতকের চাপাতি, কিন্তু তিনি অকালে মৃত্যুবরণ
করেছেন। অন্ধকার তাঁর মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছে।
বিশ্বাস করি, অভিজিৎ রায় এসব ঘটনার পূর্বাপর জানতেন। তাঁর বিশ্বাসের জগৎ ছিল মানুষমুখী। যাতে মানুষের কল্যাণ হয়, সমাজ থেকে কূপমণ্ডূকতা দূর হয়, বিজ্ঞানমনস্ক বোধ নিয়ে আমরা যেন আমাদের চারপাশকে ব্যাখ্যা করতে পারি, কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কার করতে পারি, নিজের লেখাসমূহে, নিজের ব্লগ ‘মুক্তমনা’য় অভিজিৎ তা–ই করে যাচ্ছিলেন। ইতিহাসসচেতন হিসেবে তিনি আমাদের অতীত সংগ্রামের গৌরব ও বেদনার পদাবলি পাঠ করে করে নিজ ভাষ্যে শুনিয়েছেন বারবার। একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তাই অভিজিতের কাছে নিতান্তই একটি তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ড নয়। অভিজিৎ এই উপলব্ধি প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন যে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীসমূহ এবং জামায়াত-শিবির চক্র নির্বিষ ঢেঁাড়া সাপ নয়, ওরা প্রত্যেকেই এক একটি কাল কেউটে, ছোবলভরা যাদের নীল বিষ। ওরা একটি ভয়ের নাম। সেই ভয়কে রাষ্ট্র লালন করে। ক্ষমতার পালাবদলে কাজে লাগায়। সমাজে পুনর্বাসিত করে। অভিজিৎ ভয়ের রাষ্ট্রকে অচলায়তন হিসেবে চিনেছিলেন এবং তাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যা দরকার, তা–ই তিনি করেছিলেন, নিজেকে ভয়ের বৃত্তের বাইরে এনেছিলেন সবটুকু। ভয়ের বৃত্ত ভাঙতে হলে সাহস প্রয়োজন হয় অনেক বেশি, নতুন জীবন নির্মাণে ভালোবাসতে হয় অনেক জীবনকে। অভিজিৎ দুটোই করেছিলেন। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় অভিজিৎ কখনো পরাজিত হবেন না।
যতবার সমাজে মুক্তচিন্তার ওপর আঘাত এসেছে, প্রতিবাদও হয়েছে এবং প্রতিবাদও করেছে মুক্তচিন্তার মানুষেরাই। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ থেকেছে নিশ্চুপ। হয়েছে পর্যবেক্ষক। তাহলে কি যাঁরা কুবুদ্ধি ও কুসংস্কার থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করার লড়াই করছেন, তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠের নিকটজন হতে পারছেন না? তার মানে কি এই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রতিক্রিয়াশীল? প্রগতিপন্থী নন? দিনে দিনে মানবেতর জীবনযাপনে অনিচ্ছুক ডুবে যাওয়া এই বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদহীনতা, নির্লিপ্তি, আস্থাহীনতা আমাদের মৌলিক পরিচয়ের সামনে বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো করে দাঁড়িয়েছে। সাহসী জাতি হিসেবে যাদের বিশ্ব চেনে ও জানে, অসাম্প্রদায়িক চেতনা যাদের সংস্কৃতির মূল সুর, প্রগতির পথে জাতি হিসেবে যাদের পা অগ্রগামী, সেই মানচিত্রের এই মৌনতা অস্বাভাবিকই শুধু নয়, সীমাহীন দৈন্যেরও। আমরা কি তবে দীনতার অতলে ডুবেছি? কে ডোবাল আমাদের? লোভ? ভয়?
অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুসংবাদ যখন জেনেছি, তার কিছুক্ষণ আগে একটি বইয়ের অসমাপ্ত পাঠ শেষে বইটির মলাট বন্ধ করেছিলাম। বইয়ের নাম ভয়ের সংস্কৃতি। লেখক আলী রীয়াজ। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে খুঁজতেই তাঁকে পেয়ে যাই। অসহায়ত্ব নিয়ে জানতে চাই তাঁর কাছে, ‘শুনেছেন তো?’ আলী রীয়াজ উত্তর করেন, ‘এই সংস্কৃতি আমরা সবাই মিলে তৈরি করেছি এবং তার জন্য অনেক চড়া মূল্য দিচ্ছি।’ ‘কীভাবে এর শেষ হবে? শেষের লড়াইটা কোথা থেকে শুরু হবে? কারা শুরু করবে?’—আমার পরের প্রশ্ন। উত্তর করেন আলী রীয়াজ, ‘কোটি টাকার প্রশ্ন। আসলে কি এটা লড়াই, যেটা অধিকতর খারাপ হচ্ছে? এখন কি নিজেদের খতিয়ে দেখার সময় না? আমরা তো এক দিনে এখানে আসিনি।’
ঠিক। খুব সত্যি কথা। আমরা, মানে বাংলাদেশ এক দিনে এখানে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর যখন যাঁরা যেমন পেরেছেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় যেতে চাওয়ার জন্য মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির সহযোগিতা নিয়েছেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। বিনিময়ে সব অপশক্তিকে রাষ্ট্র ও সমাজে ধারাবাহিকভাবে পুনর্বাসিত করেছেন। সংবিধানে প্রগতিবিরোধী সংশোধনী এনেছেন। দমন ও পীড়নের হাত শক্তিশালী করেছেন লুটেরা সম্প্রদায়ের শ্রেণিস্বার্থে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ছিন্নভিন্ন হয়েছে সমাজে। কর্তৃত্বপরায়ণ মনস্তত্ত্ব ঘুণপোকার মতো সামাজিক বোধের মগজকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছে।
যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রগতিশীলতা এভাবেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে মৌলবাদের, কুসংস্কারের ও অন্ধকারের। কিন্তু অন্ধকারের ভাবাদর্শ রাষ্ট্রে ছড়িয়ে গেছে তত দিনে অনেকখানি। প্রতিরোধহীন প্রতিকারহীন অন্ধকারে হুমায়ুন আজাদ, রাজীব ও অভিজিৎ জোনাকির মতো মিটিমিটি জ্বলে ওঠেন যখন, তখন আমরা বুঝতে পারি অন্ধকার কতটা গাঢ়! আমাদের ভয়ের অন্ধকার, নির্লিপ্তির অন্ধকার, কুৎসিত লোভের অন্ধকার। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ শিরোনামে কবে নবারুণ ভট্টাচার্য একটি অসাধারণ কবিতা লিখেছেন। সেই কবিতা থেকে একটি লাইন উদ্ধৃত করছি, ‘যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে, আমি তাকে ঘৃণা করি।’
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
che21c@yahoo.com
বিশ্বাস করি, অভিজিৎ রায় এসব ঘটনার পূর্বাপর জানতেন। তাঁর বিশ্বাসের জগৎ ছিল মানুষমুখী। যাতে মানুষের কল্যাণ হয়, সমাজ থেকে কূপমণ্ডূকতা দূর হয়, বিজ্ঞানমনস্ক বোধ নিয়ে আমরা যেন আমাদের চারপাশকে ব্যাখ্যা করতে পারি, কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কার করতে পারি, নিজের লেখাসমূহে, নিজের ব্লগ ‘মুক্তমনা’য় অভিজিৎ তা–ই করে যাচ্ছিলেন। ইতিহাসসচেতন হিসেবে তিনি আমাদের অতীত সংগ্রামের গৌরব ও বেদনার পদাবলি পাঠ করে করে নিজ ভাষ্যে শুনিয়েছেন বারবার। একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তাই অভিজিতের কাছে নিতান্তই একটি তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ড নয়। অভিজিৎ এই উপলব্ধি প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন যে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীসমূহ এবং জামায়াত-শিবির চক্র নির্বিষ ঢেঁাড়া সাপ নয়, ওরা প্রত্যেকেই এক একটি কাল কেউটে, ছোবলভরা যাদের নীল বিষ। ওরা একটি ভয়ের নাম। সেই ভয়কে রাষ্ট্র লালন করে। ক্ষমতার পালাবদলে কাজে লাগায়। সমাজে পুনর্বাসিত করে। অভিজিৎ ভয়ের রাষ্ট্রকে অচলায়তন হিসেবে চিনেছিলেন এবং তাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যা দরকার, তা–ই তিনি করেছিলেন, নিজেকে ভয়ের বৃত্তের বাইরে এনেছিলেন সবটুকু। ভয়ের বৃত্ত ভাঙতে হলে সাহস প্রয়োজন হয় অনেক বেশি, নতুন জীবন নির্মাণে ভালোবাসতে হয় অনেক জীবনকে। অভিজিৎ দুটোই করেছিলেন। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় অভিজিৎ কখনো পরাজিত হবেন না।
যতবার সমাজে মুক্তচিন্তার ওপর আঘাত এসেছে, প্রতিবাদও হয়েছে এবং প্রতিবাদও করেছে মুক্তচিন্তার মানুষেরাই। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ থেকেছে নিশ্চুপ। হয়েছে পর্যবেক্ষক। তাহলে কি যাঁরা কুবুদ্ধি ও কুসংস্কার থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করার লড়াই করছেন, তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠের নিকটজন হতে পারছেন না? তার মানে কি এই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রতিক্রিয়াশীল? প্রগতিপন্থী নন? দিনে দিনে মানবেতর জীবনযাপনে অনিচ্ছুক ডুবে যাওয়া এই বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদহীনতা, নির্লিপ্তি, আস্থাহীনতা আমাদের মৌলিক পরিচয়ের সামনে বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো করে দাঁড়িয়েছে। সাহসী জাতি হিসেবে যাদের বিশ্ব চেনে ও জানে, অসাম্প্রদায়িক চেতনা যাদের সংস্কৃতির মূল সুর, প্রগতির পথে জাতি হিসেবে যাদের পা অগ্রগামী, সেই মানচিত্রের এই মৌনতা অস্বাভাবিকই শুধু নয়, সীমাহীন দৈন্যেরও। আমরা কি তবে দীনতার অতলে ডুবেছি? কে ডোবাল আমাদের? লোভ? ভয়?
অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুসংবাদ যখন জেনেছি, তার কিছুক্ষণ আগে একটি বইয়ের অসমাপ্ত পাঠ শেষে বইটির মলাট বন্ধ করেছিলাম। বইয়ের নাম ভয়ের সংস্কৃতি। লেখক আলী রীয়াজ। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে খুঁজতেই তাঁকে পেয়ে যাই। অসহায়ত্ব নিয়ে জানতে চাই তাঁর কাছে, ‘শুনেছেন তো?’ আলী রীয়াজ উত্তর করেন, ‘এই সংস্কৃতি আমরা সবাই মিলে তৈরি করেছি এবং তার জন্য অনেক চড়া মূল্য দিচ্ছি।’ ‘কীভাবে এর শেষ হবে? শেষের লড়াইটা কোথা থেকে শুরু হবে? কারা শুরু করবে?’—আমার পরের প্রশ্ন। উত্তর করেন আলী রীয়াজ, ‘কোটি টাকার প্রশ্ন। আসলে কি এটা লড়াই, যেটা অধিকতর খারাপ হচ্ছে? এখন কি নিজেদের খতিয়ে দেখার সময় না? আমরা তো এক দিনে এখানে আসিনি।’
ঠিক। খুব সত্যি কথা। আমরা, মানে বাংলাদেশ এক দিনে এখানে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর যখন যাঁরা যেমন পেরেছেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় যেতে চাওয়ার জন্য মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির সহযোগিতা নিয়েছেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। বিনিময়ে সব অপশক্তিকে রাষ্ট্র ও সমাজে ধারাবাহিকভাবে পুনর্বাসিত করেছেন। সংবিধানে প্রগতিবিরোধী সংশোধনী এনেছেন। দমন ও পীড়নের হাত শক্তিশালী করেছেন লুটেরা সম্প্রদায়ের শ্রেণিস্বার্থে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ছিন্নভিন্ন হয়েছে সমাজে। কর্তৃত্বপরায়ণ মনস্তত্ত্ব ঘুণপোকার মতো সামাজিক বোধের মগজকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছে।
যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রগতিশীলতা এভাবেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে মৌলবাদের, কুসংস্কারের ও অন্ধকারের। কিন্তু অন্ধকারের ভাবাদর্শ রাষ্ট্রে ছড়িয়ে গেছে তত দিনে অনেকখানি। প্রতিরোধহীন প্রতিকারহীন অন্ধকারে হুমায়ুন আজাদ, রাজীব ও অভিজিৎ জোনাকির মতো মিটিমিটি জ্বলে ওঠেন যখন, তখন আমরা বুঝতে পারি অন্ধকার কতটা গাঢ়! আমাদের ভয়ের অন্ধকার, নির্লিপ্তির অন্ধকার, কুৎসিত লোভের অন্ধকার। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ শিরোনামে কবে নবারুণ ভট্টাচার্য একটি অসাধারণ কবিতা লিখেছেন। সেই কবিতা থেকে একটি লাইন উদ্ধৃত করছি, ‘যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে, আমি তাকে ঘৃণা করি।’
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
che21c@yahoo.com
Sunday, November 10, 2013
দাহকালের কথা- প্রিয় নাগরিকবৃন্দ, শুনুন... by মাহমুদুজ্জামান বাবু
গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস জন্মেছিলেন
খ্রিষ্টের জন্মেরও ৪৯৫ বছর আগে এথেন্সের কাছাকাছি কলোনাস গ্রামে। পিতার নাম
সফিলাস, যিনি যুদ্ধের বর্ম তৈরির কারিগর ছিলেন।
Wednesday, October 9, 2013
দাহকালের কথা- চে: হৃদয় যাঁর পৃথিবীসমান by মাহমুদুজ্জামান বাবু
২০০৩ সালে অক্টোবর বিপ্লবের ৮৫তম
বার্ষিকীতে আমন্ত্রিত হয়ে মস্কো গিয়েছিলেন চে গুয়েভারার মেয়ে আলেইদা
গুয়েভারা। ইজভেস্তিয়া পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন,
স্বদেশে তিনি শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।
Monday, June 3, 2013
দাহকালের কথা আবু সায়েদ by মাহমুদুজ্জামান বাবু
১৮-দলীয় জোটের ডাকা বুধবারের হরতালের দুই
দিন আগে রাজধানীর তোপখানা রোডে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের গানের দলের সঙ্গে
মহড়া শেষ করে প্রেসক্লাবের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি।
Saturday, June 23, 2012
দাহকালের কথা-বেহুলা by মাহমুদুজ্জামান বাবু
চাঁদ সওদাগরের ছেলে লখিন্দর বিবাহিত জীবনের প্রথম রাতেই সর্পদংশনে মারা গিয়েছিলেন লোহার বাসরঘরে। তাঁকে ছোবল দিয়েছিল সুতানলি সাপ। নিয়তি নির্দিষ্ট ছিল যে স্ত্রী বেহুলাকে নিয়ে লখিন্দরের বাসর সম্পন্ন হবে না। নিয়তিকে পরাস্ত করা যায় কি না, এই ভেবে বাসরঘর বানানো হয়েছিল ধাতব বেষ্টনীর।
দাহকালের কথা-বেহুলা by মাহমুদুজ্জামান বাবু
চাঁদ সওদাগরের ছেলে লখিন্দর বিবাহিত জীবনের প্রথম রাতেই সর্পদংশনে মারা গিয়েছিলেন লোহার বাসরঘরে। তাঁকে ছোবল দিয়েছিল সুতানলি সাপ। নিয়তি নির্দিষ্ট ছিল যে স্ত্রী বেহুলাকে নিয়ে লখিন্দরের বাসর সম্পন্ন হবে না। নিয়তিকে পরাস্ত করা যায় কি না, এই ভেবে বাসরঘর বানানো হয়েছিল ধাতব বেষ্টনীর।
Monday, June 18, 2012
দাহকালের কথা-সার্কাস by মাহমুদুজ্জামান বাবু
বেসরকারি টেলিভিশনের মধ্যরাতের সংবাদে নাটোরের উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার দৃশ্যটি কয়েক সেকেন্ড দেখার পর রাতের বাকি সময়টা কেটেছে দুঃস্বপ্নে, আধো ঘুম ও জাগরণে। দৃশ্যটা খুব স্পষ্ট নয়; বোঝা যাচ্ছিল, অনেক দূর থেকে তোলা। খুব সাধারণ ভিডিও ক্যামেরায়,
Friday, June 15, 2012
দাহকালের কথা-পরবাস by মাহমুদুজ্জামান বাবু
পূর্ণিমা রাত। শরীরে জোছনা মেখে ১৫ জন মানুষ উবু হয়ে বসে আছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে। অরণ্যের মাঝখানেই সীমান্ত। ও পাশে আমেরিকা। এ পাশে মেক্সিকো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানব পাচারকারী দালালের হাত ধরে তারা সাত দিন আগে এই এলাকায় জড়ো হয়েছে। তাদের সবারই গন্তব্য তথাকথিত স্বর্গরাজ্য আমেরিকায়।
Saturday, June 9, 2012
দাহকালের কথা-ছিন্নপত্র by মাহমুদুজ্জামান বাবু
পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগের কথা। সামরিক আদালতের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে ঢাকায় এসেছি কেবল। সক্রিয় রাজনীতি করি। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এরশাদ সরকারের দমন-পীড়ন চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সকাল-বিকাল গর্জে ওঠে প্রতিদিন। এমন কোনো সকাল ছিল না তখন, যেদিন মিছিলের বিরতি পড়ত।
Thursday, May 24, 2012
দাহকালের কথা-সংকেত by মাহমুদুজ্জামান বাবু
১৭ মে। বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোটের হরতাল। সেদিন বরিশাল থেকে লঞ্চে ঢাকা ফিরে সদরঘাটে নেমেছিলাম ভোর সাড়ে পাঁচটায়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কেবিনে সারা রাত ঘুমের দেখা পাওয়া যায়নি। কেবিনের যাত্রীদের ঘুমোতে দেয়নি ছাত্রলীগ।
Friday, May 4, 2012
দাহকালের কথা-ভানুমতী by মাহমুদুজ্জামান বাবু
খুব শৈশবের দিনগুলো কেটেছে মহকুমা শহর গাইবান্ধায়। শীতের শুরুতে যখন নতুন ফসল উঠতে শুরু করত, তখন তাঁবু ফেলত সার্কাসের দল। বুড়ো হাতি, রুগ্ণ ঘোড়া, গাধা, শরীরী কসরত দেখানোয় পটু কিশোর-কিশোরী আর কতিপয় বামন পুরুষ। সন্ধ্যা নামলেই বাদ্যবাজনা শুরু হতো মাইকে।
Monday, April 30, 2012
দাহকালের কথা-সূচক by মাহমুদুজ্জামান বাবু
দৃশ্যগুলো অস্বাভাবিক। কয়েক দিন ধরে দেশের গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত শেয়ারবাজারের সূচক ওঠানামার জুয়াখেলার নানা রঙের কাণ্ডকীর্তি দেখতে দেখতে আমাদের চোখ সেসব সয়েও নিল সম্ভবত নিজে নিজেই। নিয়মও তাই; প্রথম প্রথম খারাপ লাগবে। অস্বস্তি হবে।
Monday, April 23, 2012
দাহকালের কথা-খেলা by মাহমুদুজ্জামান বাবু
আমাদের কি মনে পড়ছে, সেই যে কিশোর বয়সে পাঠ করা গল্পটির কথা? একদল বালক খেলার আমোদে এক পুকুরে ঢিল ছুড়ছিল বিরামহীন। পুকুরে, জলের গভীরে শান্তিতে জীবন যাপন করা নানা রকমের মাছ ও ব্যাঙের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল কিছুক্ষণ পরই। শেষে ব্যাঙের দলনেতা জলের ওপর মাথা তুলে বলেছিল, হে বালকবৃন্দ!
Saturday, April 14, 2012
দাহকালের কথা-মুক্তি by মাহমুদুজ্জামান বাবু
‘কৃষ্ণকলি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখের যতই লাবণ্যমাখা বর্ণনা দেন না কেন, কালো ত্বকের যাতনা আমাদের পশ্চাৎপদ সামাজিক মনকে অবশেষে ব্যথিতই করে। গাঁয়ের লোকের নানা রকমের অকথা-কুকথা রবীন্দ্রনাথকেও ব্যথিত করেছিল, তাই বুঝি তিনি কালো মেয়ের পক্ষ নিয়ে লিখলেন, ‘আর যা বলে বলুক অন্য লোক’।...
তরুণের জয়গান: সংগীত-প্রিয়াংকা গোপ সুরের সাধন by মাহমুদুজ্জামান বাবু
বাবা বাসুদেব চন্দ্র গোপের খুব চাওয়া ছিল, দুই মেয়েই শিল্পসংস্কৃতির সঙ্গে জীবনের মিতালি করুক। প্রিয়াংকাকে ভর্তি করা হলো নাচ শেখার ক্লাসে আর বড় বোন গাইতে শুরু করলেন। কিন্তু প্রিয়াংকার ঝোঁক ছিল গানের দিকেই বেশি। ঝোঁক বেশি হলেই তো হবে না, গানটা তো গেয়ে দেখাতেও হবে যে আমিও পারি।
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1997)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
বিনোদন
শেষের পাতা
ক্রিকেট খেলা
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
দেশে দেশে
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
আমার দেশ
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
ইরান
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
কালবেলা
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
মুসলিম
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
জাতিসংঘ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
রাশিয়া
মুক্তিযুদ্ধ
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
ইউরোপ
খেলা ধুলা
সৌদি আরব
ছাত্রলীগ
ইতিহাস
প্রতিবেদন
জামায়াতে ইসলামী
সোহরাব হাসান
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
জাতীয় সংসদ
নারী ধর্ষণ
আনন্দ
খেলাধুলা
বিজ্ঞান ও গবেষণা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
আফ্রিকা
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
সংখ্যালঘু
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সৈয়দ আবুল মকসুদ
তুরস্ক
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
আফগানিস্তান
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
ইউক্রেন
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
স্বাস্থ্য
ফূটবল খেলা
হিন্দু
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
শিল্প ও সাহিত্য
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
Exclusive
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
গবেষণা
বাংলাদেশ
মিসর
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ইয়েমেন
জীবনযাপন
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
লেবানন
আবদুল মান্নান
জাপান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
কুমিল্লা
শিল্প
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
চিকিৎসা
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
তথ্য প্রযুক্তি
বরগুনা
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
ব্রাজিল
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
মসজিদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
রোকনুজ্জামান পিয়াস
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
উত্তর কোরিয়া
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
তুহিন ওয়াদুদ
কালি ও কলম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জনস্বাস্থ্য
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
নিবন্ধ
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
প্রযুক্তি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কাতার
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জার্মানি
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
লাতিন আমেরিকা
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
আরব আমিরাত বা দুবাই
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
দক্ষিণ কোরিয়া
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
লিবিয়া
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
ইসলাম
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
মহাকাশচারী
জোহরান মামদানি
নিয়ন আলোয়
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
ইতালি
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
নরসিংদী
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
কিশোর আলো
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
ইহুদি
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
চুয়াডাঙ্গা
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গণমাধ্যম
গদ্যকার্টুন
পিরোজপুর
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
প্রবাসী শ্রমিক
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
সোমালিয়া
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কুয়েত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুজন সুপান্থ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
ওমান
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
জঙ্গি
জর্দান
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সিঙ্গাপুর
সুইডেন
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আলজেরিয়া
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রিস
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নীহারুল ইসলাম
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রকিব হাসান
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট





