Monday, April 20, 2020

ভ্রমণ- সুলু সাগরের সান্দাকানে by জাকারিয়া মন্ডল

মেঘের ভেতর সেঁধিয়ে গেল বিশাল বপুর বাসটা। দু পাশের পাহাড়ের সারি হারিয়ে গেল তুলোর মতো মেঘের আড়ালে। গত মাসে চাঁদের গাড়িতে থানচি-আলীকদম সড়ক পাড়ি দেওয়ার কথা মনে পড়ল। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ওই রাস্তাটার উচ্চতা ছিল প্রায় দুই হাজার ৮০০ ফুট। এ রাস্তার উচ্চতা তার প্রায় দ্বিগুণ।

অলটিমিটারে রিডিং ঠেকেছে ৫ হাজার ৪৩৬ ফুটে। এত উঁচুতে কেমন অনায়াসে মেঘ ফুঁড়ে এগিয়ে যাচ্ছে স্ক্যানিয়ার চাকা! প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, মালবাহী ট্রাক, এমনকি মোটরসাইকেলও চলছে। মাউন্টেন বাইকে পেডেল চেপে পাহাড় পাড়ি দিচ্ছে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা।

আকাশছোঁয়া চূড়াগুলোকে জড়িয়ে রেখেছে কুয়াশার মতো মেঘ। উপত্যকার সবুজ ঢাকা পড়েছে মেঘের চাদরে। রাস্তার ওপরেও ভেসে আছে মেঘের ভেলা। গাড়িগুলোকে তাই ফগ লাইট জ্বালাতে হয়েছে। এর ভেতরেই গাড়িতে ঝোলানো স্ক্রিন কাঁপাচ্ছে জ্যাকি চান। মঙ্গোলিয়ার মরুভূমিতে বিশাল বপু এক পালোয়ানের সামনে পড়েছে। এ পথের নিয়মিত যাত্রীরা তাতেই মত্ত। পাশের ভারতীয় ইলেকট্রিশিয়ান অনবরত বাটন টিপছে মোবাইলে। গোটা বাসে কেবল এক ইউরোপীয় যুবক জানালার কাচ গলে পাহাড়, আকাশ, মেঘের কুয়াশা দেখছে গভীর মনোযোগে।

১৩ হাজার ফুট উঁচু কিনাবালু পাহাড় ছুঁয়ে এগিয়ে চলল গাড়ি। খানিক পর পাতলা হতে শুরু করল মেঘের ভেলা। হুট করে সূর্যটা উদয় হলো পশ্চিম পাহাড়ের মাথায়। যেন সুইস টিপে জ্বালিয়ে দিল কেউ। মেঘ ধোঁয়া ট্রান্স বোর্নিও এক্সপ্রেসওয়েতে তারই ঝিলিক।

এ রাস্তার দৈর্ঘ্য ১২৩৬ কিলোমিটার। জন্ম বোর্নিওর পশ্চিমপ্রান্ত সারাওয়াকের কুচিং শহরে। সেখান থেকে ব্রুনাই পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে সাবাহর রাজধানী কোটা কিনাবালুতে। তারপর কিনাবালু পাহাড় পেরিয়ে সান্দাকান হয়ে এগিয়েছে ইন্দোনেশিয়া সীমান্তের শহর সেমপরনার দিকে।

পাহাড়ের পাশে পাশে ঝুলেই এগিয়েছে রাস্তাটা। যেখানে জায়গা কম সেখানে পাহাড় না কেটে গড়া হয়েছে কংক্রিটের সেতু। লোহার জালে পাথর ভরে বসিয়ে রাখা হয়েছে পাহাড়ের গায়ে। প্লাস্টিকের মোড়কে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পাহাড়ি বন ছুঁয়ে এগিয়ে যাওয়া ইলেকট্রিক লাইন।

বোর্নিওর চায়ের রাজ্যখ্যাত রানাও এলাকা পাশ কাটাল স্ক্যানিয়া। পাহাড়ের শরীরে ঝুলে থাকা বৃক্ষলতার মধ্যে সেগুনগাছের সারি আবারো স্মৃতির পাতায় ফিরিয়ে আনল বান্দরবানের পাহাড়গুলোকে। তবে এখানকার পাহাড়গুলোতে জুম চাষের চিহ্নও নেই। জনবসতির ঘনত্বও কম। মাঝেমধ্যে দূরে দূরে পাহাড়ি গ্রাম চোখে পড়ে। ওসব গ্রাম লাগোয়া পাহাড়ে হিমালয়ের মতো ধাপ পদ্ধতির চাষাবাদ। এ পাহাড়ের কলাগাছগুলো বেশ ছোটই বটে। বাঁশগুলোতে পাতা কম। তবে আকাশছোঁয়া রেইনট্রি-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সটান উঠে গেছে আকাশ পানে। বাংলাদেশের পাহাড়ি পথের পাশে দেখা ঝাড়ু ফুলের গাছ চোখে পড়ল এখানেও। রক্তজবা অবশ্য দেখা গেল না, তবে ছোট ছোট নীল আর গোলাপি ফুল নয়ন জুড়িয়ে দিল।

হাইওয়ের পাশের রেস্তোরাঁয় গলাকাটা দাম হাঁকল না কেউ। রাজধানী শহরের মতো এক রিঙ্গিতই থাকল আধা লিটার পানির দাম।

ঘণ্টা দেড়েক পর শেষ হলো পাহাড়ের সঙ্গ। তবে সমতল ভূমিতে নামতেই শুরু হলো আর এক বিস্ময়! দুপাশে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পাম বন। তার ওপরে ঝুলে আছে গোধূলির আকাশ। বাস ছুটছে তো ছুটছেই। এ ছোটার বুঝি শেষ নেই। একসময় তো মনে হলো, পাম বন ছাড়া আর কিছুই নেই এদেশে।

টানা ঘণ্টা দেড়েক ছোটার পর শেষ হলো পাম বন। ততক্ষণে সাঁঝ নেমেছে। বনের পাশে ফুটতে শুরু করেছে একটা দুটা আলো জ্বলা বাড়ি, ফার্ম হাউস। সামনে সাবাহ রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সান্দাকান।

-----দুই-----

সহযাত্রী নবীন পাটনের টানা ঘুম শেষ হয়েছে। উড়িষ্যার এই যুবক একটা পাইভেট বিদ্যুত্ কোম্পানির ট্রান্সমিশনকর্মী। যাচ্ছেন নতুন কর্মস্থল সান্দাকানে। স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বড় তার সঙ্গের লাগেজটা। ওটাকে বক্সে ঢোকাতে গলদঘর্ম সুপারভাইজর খানিক ধাতানিই দিয়েছিল বেচারাকে। তখন থেকেই মুখ গোমড়া ছিল তার। মন খারাপ দেখে যাত্রাবিরতিতে যেচেই একটা বার্গার আর লাল চা সেধেছিলাম নবীনকে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে নবীন জানিয়েছিলেন, এবার দেশে গেলে বিয়ে হবে তার। হবু বউ ভুবনেশ্বরের একটা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কর্মী। যেমন রূপবতী, তেমনই গুণবতী। গাড়িতে ফেরার পর হবু বউ-এর গল্প করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নবীন। সান্দাকান টার্মিনালে ঢোকার খানিক আগে ঘুম ভাঙল তার।

এমনিতেই বাসটা আধাঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে। বছরের এ সময়টায় পর্যটক কম থাকে বলে দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমে যায় সাবাহতে। তুঙ মা এক্সপ্রেসের আজকের একমাত্র বাসটা ছেড়েছে বেলা ১টায়। সান্দাকান টার্মিনালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বেজে গেল। টাউন সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে সেই ছ টাতেই। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডটাও খাঁ খাঁ করছে।

এবার কিন্তু ভালোই খেল দেখালেন নবীন! তাঁকে নিতে আসা প্রুটন গাড়িটায় চড়ে হুঁশ করে টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার গন্তব্য সান্দাকান শহরেই যাবেন তিনি। এখান থেকে চার কিলোমিটার দূরে।

নিজেকে এবার বড় অসহায় মনে । অস্থির মনে টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে সামনের যাত্রী ছাউনিটায় এসে বসলাম। পাশেই পাইপ ফুঁকছেন এক মধ্যবয়সী মালয়। একটা পা পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ড ভ্যানের পাদানিতে। সান্দাকানের মানুষ যে কত অতিথিপরায়ণ তার যেন জলজ্যান্ত মূর্তি হয়ে উদয় হলেন তিনি।

পরিচয় পর্ব সেরে নিজেই ট্যাক্সি খুঁজলেন এদিক ওদিক। আজ আর দূরপাল্লার গাড়ি আসবে না বলে অপেক্ষারত ট্যাক্সিগুলো এরই মধ্যে চম্পট দিয়েছে। অগত্যা গাড়ির পেছনের দরোজা খুলে উঠতে বললেন দরাজ মালয়ী। সামনে তার পাশের সিটে তারই ছয় বছরের ছেলে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে।

এমনিতেই এ শহরে মানুষ কম। তার ওপর রাতের আঁধারে বড্ড বিপাকেই পড়া গিয়েছিল। এই মানুষটাকে তাই মনে হলো সাক্ষাত্ দেবদূত। জানতে চাইলেন, তুমি কি বুদ্ধিস্ট?

গত রাতে কোটা কিনাবালুতে মালয় তরুণী দিদ্দ ননয় আমাকে ভেবেছিলেন শিখ। কারণটা বোধগম্য হয়নি। ইনি কেন বুদ্ধিস্ট ভাবলেন সেটাও বোধগম্য হলো না। উত্তরের জন্য খানিক অপেক্ষা করে বললেন, আমি মুসলিম। তবে আমার অনেক বুদ্ধিস্ট বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে তোমার চেহারার মিল আছে।

দেখতে দেখতে শহরে ঢুকল গাড়ি। হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন দরাজ দিলের মানসুর মুরাদ। রাস্তা পেরুতেই হোটেলের রিসিপশন। ডেস্কে বসে থাকা মেয়েটা যেন সাক্ষাত্ এক পরী। নিখুঁত চেহারা। নরম আলোর রিসিপশন রুম যেন তার আলোতেই আলোকিত হয়ে আছে! এখানকার আদিবাসী কাদাজান মেয়েরা যে সুন্দরী হয় তা এক বন্ধু বলে রেখেছিলেন আগেই। কিন্তু তাই বলে এতটা! চোখে না দেখলে এ রূপের বর্ণনা করা মুশকিলই বটে!

সুন্দরীর কণ্ঠস্বরও সুরেলা। কিন্তু যে খবর দিলেন, তাতে রূপ উপভোগের তৃষ্ণা পুরোপুরিই উবে গেল। কাদাজান সুন্দরী বললেন, ভুল হোটেলে এসে পড়েছ ভাই। এ হোটেলটার নাম সিটি স্টার। তোমাকে যেতে হবে সিটি ভিউতে।

এরই মধ্যে আরো দুজন বোর্ডার হাজির তার সামনে। অতীব দক্ষতায় তাদের সামলে ম্যাপ এঁকে কোথায় যেতে হবে বুঝিয়ে দিলেন তিনি। বুক করা হোটেলটা খুঁজে পেতে খুব বেশি সময় লাগল না।

-----তিন-----

জঙ্গি হানার ভয়ে বছরের পর বছর ধরে এ শহরটা তাড়াতাড়িই ঘুমায়। আজও রাত নটাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে সান্দাকান। দোকানপাট সবই বন্ধ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চেক পোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। তবে গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। রোড ডিভাইডারে বসানো ল্যাম্পপোস্টগুলো যেন লণ্ঠনের মতো ধুঁকছে। গলি রাস্তাগুলো নিষিদ্ধপল্লীর মতো আলো-আঁধারিতে ঢুলুঢুলু। গোটা শহরের মধ্যে কেবল ওসব গলিতেই মানুষের আনাগোনা।

সেলুনের সাইনবোর্ডগুলোর নিচে অন্ধকার সিঁড়িতে আদিম রসের আহবান। সামনে দেহের ফাঁদ পেতে বসে আছে টিশার্ট-ট্রাউজারপরা তরুণীরা। চারতলার হোটেল রুমে বসেও ওদের হাসি-ঠাট্টার কোলাহল কানে আসছে। নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে খদ্দের খুঁজছে ওরা। ঘুমন্ত শহরটাকে যেন ওরাই জাগিয়ে রেখেছে।

------চার------

সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়া সান্দাকান জাগল পাখি ডাকা ভোরে। সাত সকালেই জমে উঠল রাস্তাঘাট। বাসস্ট্যান্ডে গলা হাঁকিয়ে যাত্রী ডাকছে হেলপাররা। ছাউনি লাগোয়া অস্থায়ী হোটেলগুলো গাবতলী বাস টার্মিনালের হোটেলগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল। ছাউনির ভেতরের হোটেলগুলো তুলনামূলক পরিষ্কার। নাস্তা খাওয়ার জন্য একটাতে ঢুকে পড়লাম। খিচুরি মতো দেখতে একটা খাবার আছে বটে, কিন্তু ওটা ঠিক খিচুরি নয়। আবার ভাতভাজাও নয়। খিচুরি আর ভাতভাজার মাঝামাঝি কিছু একটা। খেতে হবে টমেটো সস আর সিদ্ধ ডিম দিয়ে। অপরিসর খুপরির মতো দালান ঘরে দেয়ালে ঝোলানো তাকে প্লেট রেখে টুলে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। মাত্র দু-আড়াই রিঙ্গিতে উদোর পূর্তির সুলভ আয়োজন।

মা আর মেয়ে মিলে সামলাচ্ছে খুপড়ি দোকানটা। মায়ের পরনে স্কার্ফ আর বোরখা। মেয়ের কেবল স্কার্ফ বাঁধা মাথায়। কৌতূহলী চোখে বারবার আমাকে মাপছে। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক আলাপ চালালাম ওর সঙ্গে। জানাল, এ হোটেলে স্থানীয়রা খেতে আসে। পরিবহন শ্রমিকই বেশি। বিদেশিরা খুব একটা আসে না।

মায়ের তাগাদায় নতুন আসা খদ্দের সামলাতে ছুটল মেয়েটা। বিল মেটানোর সময়ে বলল, আমার দেখা তুমিই প্রথম বাংলাদেশি।

প্রাতরাশের পাট চুকিয়ে রাস্তায় নামতেই জোর ধাক্কা। ২৩ কিলোমিটার দূরের সেপিলক বনে যাওয়া আসার বিল শত রিঙ্গিত হাঁকছে ট্যাক্সিওয়ালা। তবে হতাশ হওয়ার আগেই সেপিলকের একটা পাবলিক মাইক্রোবাস পাওয়া গেল। যাওয়া-আসার খরচ ছয় দ্বিগুণে ১২ রিঙ্গিত। ১৪ সিটের আরামদায়ক আসন। ভেতরের একমাত্র যাত্রী গতকাল বাসে দেখা সেই ইউরোপীয়। চিনতে পেরে হাত বাড়াল ফিলিপ। প্রাণবন্ত এক সুইস তরুণ। জেনেভার এক সুপার শপে কাজ করে। টাকা জমিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে। এখান থেকে থাইল্যান্ড ঘুরে সুইজারল্যান্ড ফিরবে।

যে হোটেলে উঠেছি, সেটারই নিচের তলায় ডেরা বেঁধেছে ফিলিপও। এক বাস, এক হোটেল, আজকের এক যাত্রা। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই অচেনা মানুষ যেন পরস্পরের আপনজন বনে গেল অচেনা দেশে এসে।

গোটা বাসে কেবল আমরা দুুজনই যাত্রী। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্ধারিত সময়েই ছাড়ল গাড়ি। রাস্তায় আরো ক জন যাত্রী উঠল বটে, কিন্তু সেপিলক পর্যন্ত যাত্রী রইলাম আমরা দুজনই।

এক সময় শেষ হলো শহরের সীমানা। নির্জন বনের ভেতর দিয়ে পিচঢালা রাস্তাটা শেষ হলো ওরাংওটাং স্যাঙচুয়ারির সামনে। বেশ পরিপাটি করে সাজানো জায়গাটা। শখের ক্যামেরার জন্য বাড়তি ৩০ রিঙ্গিত গুনতে হলো ফিলিপকে। ছবি তোলার জন্য টাকাটা একটু বেশিই মনে হলো। ভাগ্যিস, মোবাইলে ছবি তোলার কোনো চার্জ নেই!

------পাঁচ-----

কানের কাছে বিকট চিত্কারে পা পিছলে উল্টে পড়ার দশা। ধুপধাড় করে ছুটে এল কজন দর্শনার্থী। কাছেই দাঁড়িয়ে এক নিরাপত্তাকর্মী হাসছে। তার হাসিতে অভয় পেয়ে শুরু হলো ক্যামেরার ক্লিক। এদিক-ওদিক মুখ ঘুরিয়ে কিছু হয়তো পর্যবেক্ষণ করল ওরাংওটাংটা। তারপর গাছের ঠিক মাঝখানটায় ডালে হেলান দিয়ে যেন ইজি চেয়ারে বসল। এমনিতেই এরা মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকে। কী করে যেন মানুষঘেঁষা হয়ে গেছে এটা।

একটু দূরেই একটার পর একটা গাছে ঝাঁকুনি শুরু হলো। বিশাল বপু নিয়ে কেমন অনায়াস ছন্দে গাছের শাখায় শাখায় লাফিয়ে লাফিয়ে আরেকটা ওরাংওটাং এসে বসল আগেরটার সামনে। শুরু হলো দুজনের গলাগলি। এ এক অদ্ভুত দৃশ্য! দুটোরই লালচে বাদামি চুল। লেজ নেই একটারও।

৪ হাজার ২৯৪ হেক্টর বিস্তৃত সংরক্ষিত এলাকার প্রবেশ মুখেই এমন দৃশ্যে তাক লেগে যাওয়ার জোগাড়। কানে হেডফোন লাগানো নিরাপত্তাকর্মী তখন বলছে—ইউ আর লাকি, লাকি, লাকি।

একটু পরই চার হাত পায়ে গাছের ডালে ডালে হারিয়ে গেল ওরা। ক্যানোপি স্টাইলে বনের ভূমি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে গড়া ওয়াকওয়েটা সামনে এগিয়ে ডানে বেঁকেছে। মাথার ওপরে রেইন ফরেস্টের সবুজ ছাদ। মোড় নিতেই অদ্ভুত দৃশ্যটা চোখে পড়ল।

উঁচু গাছের গোড়ায় গড়া ফ্লাটফর্মটায় ঝুড়ি হাতে এক বনকর্মী। ছুড়ে দিচ্ছে কলা, ডুমুর, ডুরিয়ান, কাটা পেঁপে। বিপরীতে রোমশ শরীরের বিশাল দেহী এক মানুষ বসে আয়েস করে ফল খাচ্ছে যেন! তাকে ঘিরে বাচ্চা ওরাংওটাং আর বিভিন্ন প্রজাতির বানরের মেলা বসেছে।

একটা দুষ্টু প্রজাতির বাচ্চা ছুঁ মেরে নিয়ে গেল বিশাল বপুর হাতের পেঁপের টুকরোটা। আর একটা এগিয়ে আসতেই দাঁত খিঁচে একটা ধমকানি দিল বিশাল বপু। ঠিক যেন কোনো মেজাজি মানুষ বসে ফল খাচ্ছে।

আসলেই তো মানুষের জাতভাই ওরা। মালয়েশিয়ান শব্দ ওরাং মানে মানুষ। আর ইন্দোনেশিয়ার শব্দ ওটাং মানে অরণ্য। দুয়ে মিলে হয় অরণ্যের মানুষ। জেনেটিক্যালি মানুষের খুব কাছের প্রজাতি এরা।

বনকর্মী ঝুড়ি উল্টিয়ে বিদায় নিতেই এক এক করে সটকে পড়তে থাকল বানরের দল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শূন্য হয়ে পড়া প্লাটফর্মটায় একটা কালো কাঠবিড়ালী এল দড়ি বেয়ে।

এখন আর কোনো ওরাংওটাং বা বানর দেখা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসছে বিকট চিত্কার।

এদের প্রিয় খাদ্য ডুমুর। আরো খায় গাছের ফুল, ফল, কচি পাতা, নরম বাকল। তাই বলে এদের নিরামিষাসী ভাবার কারণ নেই। পাখির ডিম আর কীটপতঙ্গও দারুণ পছন্দ তাদের। মাছ ধরে খায় অগভীর জলাশয় থেকে। অদ্ভুত কৌশলে ভেঙে খায় বাদাম জাতীয় ফল। ছাড়ে না মধু পেলেও।

পুরুষগুলোর গড় ওজন ৭৫ কেজি। স্ত্রী ওরাংওটাংয়ের গড় ওজন ৪০ কেজির নিচে। পুরুষদের উচ্চতা হয় সাড়ে চার ফুট, স্ত্রীদের চার ফুটের নিচে। অর্ধশত বছরেরও বেশি আয়ু পায় একেকটা ওরাংওটাং।

এখন ফলের মৌসুম নয় বলেই এত সহজে দর্শন মিলেছে তাদের। ফলের মৌসুমে নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করে ওরা। আসে না বিনে পয়সার খাবার খেতে। আবার ফলের মৌসুম না হলেই যে আসে তাও নয়। রুচি বদলাতে চাইলে খাবার খোঁজে গভীর বনেই।

ওরা বাসা বাঁধে প্রতিদিনই। ডাল, লতা, পাতা দিয়ে ছাতার মতোই ছাদ বানিয়ে নেয় নিজের মতো। দিনভর জঙ্গলের লতাপাতা আর মাটিতে দাপিয়ে রাতে ঘুমায় নিজের গড়া গাছের বাসায়। ওরাংওটাং তাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৃক্ষবাসী স্তন্যপায়ী।

এই ওরাংওটাংয়ের বসবাস কেবল এই বোর্নিও দ্বীপেই। এদের তাই বলা হয় বোর্নিয়ান ওরাংওটাং। তাদের জাতিভাই হিসেবে সুমাত্রান ওরাংওটাং নামে আরেকটি প্রজাতি কেবল আছে পাশের দ্বীপে। এছাড়া দুনিয়ার আর কোনো বনে ওরাংওটাং নেই। উল্লুক প্রজাতির মধ্যে আফ্রিকায় গরিলা, শিম্পাঞ্জি আর বেবুনের দেখা মিললেও ওরাংওটাং আছে কেবল এ এলাকাতেই। কিন্তু আশঙ্কার কথা, পাম চাষের কারণে এদের সংখ্যা দিন দিন কমছেই। এ দেশের মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পাম বাগান ওদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে। কাঁটা থাকায় পাম গাছে মোটেই চড়তে পারে না এরা।

------ছয়-----

মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে গাছের খোঁড়লে সেঁধিয়ে গেল রোমশ কালো শরীরটা। আহা! আর একটু সময় কেন থাকল না! আরে, ওই তো আরেকটা। দিঘল গাছগুলোর গোড়ায় জমিয়ে বসা গুল্মঝোপের ভেতর থেকে আরেকটা বেরিয়ে এল। গাট্টাগোট্টা শরীর। কালো রোমে ছাওয়া দেহ। ছোট্ট লেজ। হাঁটাচলা আয়েশি। দূর থেকেও বোর্নিয়ান সান বিয়ারের বোঁটকা গন্ধ নাকে এল।

একটু দূরে আরেকটা কালো শরীর উঁচু গাছ বেয়ে তরতরিয়ে নামছে। এদিকে আরেকটা এসে যোগ দিল আগেরটার সঙ্গে। অবজার্ভেশন টাওয়ারে দাঁড়ানো জনা ছয় মানুষের দিকে খেয়ালই নেই তাদের। আপনমনে মাটি শুঁকতে শুঁকতে গুটিগুটি পায়ে চরছে।

টাওয়ারে বসানো বায়নোকুলারটায় একটু আগেও চোখ গলিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছিল সবাই। লাইনে সিরিয়াল পাওয়াই মুশকিল ছিল। এখন আর ওতে আগ্রহ নেই কারো। চোখের সামনেই তো জ্যান্ত ভল্লুক আপনমনে চরে বেড়াচ্ছে। গাছের মাথাছোঁয়া প্লাটফর্মে দাঁড়ানো মানুষগুলোর দিকে মন নেই তাদের।

পড়ে থাকা একটা গাছের খোঁড়লে মাথা সেঁধিয়ে বোধহয় পোকা-মাকড় খুঁজল একটা। আরেকটা মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে মাথা চুলকালো কিছুক্ষণ। একটু পরই একটা ঝোপের ভেতর ঢুকে বিশ্রামে বসল বুঝি। আর বেরুল না।

বোর্নিয়ান সান বিয়ার নামে বিশেষ প্রজাতির এই ভল্লুকের বাস কেবল এই বোর্নিও মুলুকেই। ওরাংওটাংয়ের চেয়ে এদের দেখেই বেশি মজা পেল সুইস তরুণ ফিলিপ। সাবজেক্ট কাছে হওয়ায় অতিকায় লেন্সটা খুলে রেখেছে অনেক আগেই। শার্টারে ক্লিক করতে আরো বেশি মনোযোগী হলো সে।

বোর্নিয়ান এই সানবিয়ারের উচ্চতা ৪ থেকে ৫ ফুট। পুরুষগুলোর ওজন হয় ৩০ থেকে ৬০ কেজি। মেয়েগুলোর ২০ থেকে ৪০ কেজির মধ্যে। লেজের দৈর্ঘ্য ইঞ্চি দুয়েকের বেশি নয়। চাপ দিয়ে ধরতে পারলে নিমিষে মানুষ পিষে ফেলতে পারে এরা।

এদের আরেকটা প্রজাতি আছে মালয়ান সানবিয়ার নামে। ওদের দেখা মেলে পূর্ব ভারত, দক্ষিণ চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয় উপদ্বীপ আর সুমাত্রার উপকূলীয় বনে। ওদের তুলনায় বোর্নিয়ান সান বিয়ারের আকৃতি অর্ধেক। খাদ্য ঘাটতির কারণেই এদের আকার এমন ছোট হয়ে এসেছে বলে মতবাদ আছে।

অধিকাংশ সময়ে গাছে গাছে ঘুরতেই পছন্দ করে সানবিয়ার। পোকা-মাকড় ছাড়াও বিছা, শুয়োপোকা আর মধু ভীষণ পছন্দ তাদের। মাটি খোঁড়ে বলে ওরা বনের কৃষক। আবার পোকা-মাকড় খেয়ে বাঁচিয়ে দেয় অনেক গাছকে। মৌচাকে হানা দিয়ে মধু খেয়ে চাক ফেলে রাখে কাঠবিড়ালী বা আর কোনো বন্যপ্রাণীর জন্য। একটা পুরুষ সান বিয়ারের খাবার খুঁজে বেঁচে থাকার জন্য অন্তত ১৫ বর্গকিলোমিটার বন প্রয়োজন হয়। যদিও এই অভয়ারণ্যে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সানবিয়ারের খাবার খাওয়ার কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই। এরা নিজের ইচ্ছামতো সময়ে খায়।

------সাত------

শতবর্ষী মসজিদ জামেক থেকে শুরু হলো ঐতিহাসিক অতীতের পথে হাঁটা। মসজিদটা টিলার ওপরে। অষ্টভূজাকার ছাদের ওপরে পঞ্চভুজী গম্বুজ। নারীদের নামাজের জন্যও পৃথক কক্ষ। টিলার নিচে বিশাল এক সাইনবোর্ডে হেরিটেজ ট্রেইলের বিবরণসহ পুরো ম্যাপ। তার সামনে তামার পাতে মুড়ে পদচিহ্ন এঁকে ট্রেইলের দিক-নির্দেশনা।

নির্দেশনা মেনে সামনে পা বাড়াতেই সিটি কাউন্সিলের সামনে গ্রানাইট পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ। সান্দাকানের প্রতিষ্ঠাতা ইউলিয়াম বি প্রায়োরের নামাঙ্কিত পাতটা ক্ষয়ে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। পেছনে রাস্তার ওপাশে পাহাড়ের ওপরে উঠে গেছে বাঁধানো সিঁড়ি। বাঁশবনের ভেতর দিয়ে গড়া সিঁড়িটায় টিনের ছাদ। জায়গাটা নির্জন বলে কয়েক জোড়া টিনএজার প্রেমে মত্ত। ভিনদেশী এই আগন্তুককে দেখল বটে, সতর্ক হওয়ার গরজ দেখাল না। মনে পড়ল ক্রীতদাসের হাসির কথা। গ্রন্থটিতে কালজয়ী কথা সাহিত্যিক শওকত ওসমান অভিসারে মত্ত হয়ে ওঠা যুগলের বর্ণনায় হাল ছেড়ে দিয়ে বলেছেন, প্রেমিক প্রেমিকার কুহর শুনেছ কখনো? যদি না শুনে থাকো, লেখক তোমাকে আর কিছু বোঝাতে পারবে না।

শ দুই সিঁড়ি বাওয়ার পর ওই কুহর এলাকা শুরু হলো। পাহাড়ে উঠে বায়ে মোড় নিতেই শহর প্রশাসকের বাসভবন। বিপরীতে অর্ধবৃত্তাকার ফ্লাটফর্মটা ঝুলে আছে পাহাড়ের গায়ে। এবার পায়ের নিচে সান্দাকান শহর। চোখের সামনে সুলু সাগরের উন্মুক্ত পোতাশ্রয়।

সাগরটাকে এখানে বৃত্তের মতো বেড় দিয়ে রেখেছে মিন্দানাওয়ের বর্ধিত অংশ সুলু দ্বীপপুঞ্জ। আর প্রশান্ত মহাসাগরের অংশ এই সুলু সাগরের এখানটায় সৈকত ছুঁয়ে অর্ধবৃত্তাকারে গড়ে উঠেছে সান্দাকান শহর। উন্মুক্ত জলরাশির দৃষ্টিসীমায় ওই বড় দ্বীপটার নাম টার্টেল আউল্যান্ড। নানা প্রজাতির কচ্ছপ ওখানে এসে ডিম দেয়। কিন্তু সারি সারি দ্বীপ আর আশপাশের জলরাশিতে কারফিউ চলে সন্ধ্যা সাতটা থেকে ভোর পাঁচটা অবধি। দক্ষিণ ফিলিপাইনের জঙ্গি ঠেকাতেই এ আয়োজন সাবাহ সরকারের।

প্লাটফর্মের উল্টোদিকে আরেকটা উঁচু টিলার ওপরে বিখ্যাত মার্কিন লেখিকা অ্যাঙস কেইথের হাউস। বিশাল বিশাল গাছঘেরা বাড়িটা এখন সান্দাকান মিউজিয়াম।

পাহাড় বেয়ে আরেকটু নামতেই ক্লক টাওয়ারের উল্টোদিকে অনেকগুলো পাথর। ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকা এসব পাথর আসলে আরেক ঐতিহাসিক ভবনের ধ্বংসাবশেষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে সান্দাকান ছিল ব্রিটিশ চার্টারড নর্থ বোর্নিও কোম্পানির রাজধানী। জাপানিরা সে শহর গুঁড়িয়ে হত্যা করেছিল ২ হাজার ৪০০ অস্ট্রেলীয় ও ব্রিটিশ বন্দিকে। শহরের বাইরে সারি সারি কবর এখনো সেই গণহত্যার ইতিহাসের সাক্ষী।

ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে বিশাল এক গাছের গোড়ায় ছোট্ট এক চাইনিজ খুপরি। ওটাকে দেবীর দয়া বলে থাকে চাইনিজরা। একটু দূরে আরো একটা মন্দির আছে তাদের। তারপর একটা চার্চ।

শহরের একমাত্র স্টেডিয়ামে মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ চলছে। পুরনো অংশটায় মোটর গ্যারেজের মতো শার্টারের ভেতরে বোর্নিও পোস্টের আঞ্চলিক অফিস। আরেকটু এগুতেই সারি সারি তাঁবুতে রাতের বাজার বসেছে। মূলত নারীরাই দোকানি এখানে। পেছনে সৈকত ছুঁয়ে গড়া রানওয়ের মতো রাস্তাটায় ইয়ংস্টারদের মোটরবাইক মহড়া চলছে।

ফিলিপাইন সাগরের টাইফুন প্রায়ই আঘাত হানে এদিকটায়। জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে শহর রক্ষায় তাই সাগর তীরে বুক সমান উঁচু কংক্রিটের দেয়াল। ওপাশে পাথর ফেলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে সাগর তীর। এখানে তাই সমুদ্র সৈকত বলে কিছু নেই। কেউ এখানে সমুদ্র স্নানেও নামে না। বিশাল বিশাল বোল্ডারগুলোর ওপরে বসে ছিপ ফেলেছে শখের মাছ শিকারিরা।

সুলু সাগরের ওপরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চোখের সামনে অন্ধকারে হারিয়ে গেল টার্টেল আইল্যান্ড। কারফিউ বলে ওদিকটায় কোনো আলোও নেই। আজ রাতে আর এই সাগরে টহল বোট ছাড়া অন্য কোনো নৌযান ভাসবে না।

বন্দর হারবারে বিশাল এক জাহাজ নোঙর ফেলা। এখানে তীরের কাছেই গভীর পানি। সেই পানির পাড়ে সি ফুড রেস্টুরেন্ট। ওপাশের শপিংমলটাই সম্ভবত সান্দাকানের সবচেয়ে বড় ভবন। সারি সারি রেস্টুরেন্টগুলোতে ফিলিপিনো মেয়েদের মেলা। ডাটা রিচার্জের জন্য রাস্তার পাশের খুপড়ি দোকানে গিয়েও ফিলিপিনি সুন্দরীরই দেখা মিলল। এজন্যই বুঝি মিনি ফিলিপাইন বলা হয় সান্দাকানকে!

হারবার জেটির কাছে ফিলিপের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ফের। সাগরের পাড়ে বসে আমরা কফি খেলাম। ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলাটাকে ব্যয়বহুল শখ বলে হাসল ফিলিপ। যত ব্যয়বহুলই হোক, এই শখের তাড়ায় সে যে আরো অনেক দেশে দেশে উড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাঁধে হাত রেখে ফিলিপ বলল, বিদায় বন্ধু। এ ক দিনে তো বন্ধুই হয়ে গেছিলাম আমরা।

প্রতি ৫ মৃত্যুর একটি ডায়েটের কারণে

বিশ্বে প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর মধ্যে একটি মৃত্যু ঘটছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে। ২০১৭ সালে এ কারণে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানচেটে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, অধিক সুগার, লবণ বা প্রক্রিয়াজাতকৃত মাংস খাওয়ার কারণে দুনিয়াজুড়ে মানুষ হৃদরোগসহ ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিক  সময়ের আগেই তাদের আয়ু শেষ হচ্ছে। এমনকি ধূমপানের কারণে যত মানুষ মারা যায়, তার চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষের আয়ু শেষ হয় দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার কারণে। ল্যানচেটের গবেষণায় বিশ্বের ১৯৫টি দেশে এ ধরনের মৃত্যুর হার যাচাই করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ মারা যায় উজবেকিস্তানে।
আর ইসরাইলে এ ধরনের মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম। ঘনবসতিপূর্ণ শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে জাপানে খাদ্যাভ্যাসের কারণে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম।
বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, ‘দ্যা গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজেস স্টাডি’- শীর্ষক ওই গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের কারণে কিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ মারা যাচ্ছে। গবেষণা রিপোর্টে অতিরিক্ত লবণ ও কম দানাদার শস্য খাওয়া এবং ফলমূল কম খাওয়াকে স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার করণে বিশ্বে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। কম দানাদার শস্য খাওয়ার ফলে মৃত্যু ঘটেছে আরো ৩০ লাখ মানুষের। এছাড়া, ২০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ ফলমূল কম খাওয়া। একই সঙ্গে বাদাম, বীজ, শাক-সবজি, সমুদ্র থেকে পাওয়া ওমেগা-৩ এবং আঁশ জাতীয় খাবারের পরিমাণ কম হওয়াটাও মৃত্যুর বড় কারণগুলোর অন্যতম।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট ফর হেল্‌থ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ওই ইন্সটিটিউটের পরিচালক ক্রিস্টোফার মুরে বলেন, ডায়েটকেই (খাদ্যাভ্যাস) আমরা স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান পরিচালক হিসেবে পেয়েছি। এটা সত্যিই অনেক গভীর। কিভাবে মানুষকে হত্যা করছে? এক কোটি দশ লাখ ডায়েট সমপর্কিত মৃত্যুর মধ্যে এক কোটির মৃত্যু হচ্ছে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে যা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। হার্টে ও রক্ত বহনকারী ধমনীর ওপর লবণের প্রভাব পড়ে সরাসরি যা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধের ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি আরো বলেন, আমরা কি সঠিক খাবার সঠিক পরিমাণে খাচ্ছি- এটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন, বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবার দিনে ২৫ গ্রাম খাওয়ার কথা বলা হলেও গড়ে মানুষ খাচ্ছে মাত্র ৩ গ্রাম। আবার দুধ খাওয়া উচিত ৪৪৩ গ্রাম অথচ মানুষ গ্রহণ করছে ৭১ গ্রাম। একই ভাবে দানাদার শস্য জাতীয় খাবার ১২৬ গ্রামের জায়গায় ২৯ গ্রাম খাচ্ছে। অথচ লাল মাংস ২২ গ্রাম খাওয়া উচিত হলেও সেটি খাচ্ছে ২৭ গ্রাম, লবণ ৩.২ গ্রামের ওপর খাওয়া উচিত নয় কিন্তু সেটি গ্রহণ করছে ৬ গ্রাম আর প্রক্রিয়াজাত মাংস ২.১ গ্রামের স্থানে ৪ গ্রাম।
এ গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী যে স্বাস্থ্যকর খাবার খাদ্য তালিকা থেকে বেশি বাদ যাচ্ছে তা হলো- বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবার। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নিতা ফরোউহি বলছেন, ধারণা করা হয় যে, এসব খাবারের ছোট একটি প্যাকেট একজনকে মোটা বানাতে পারে অথচ এগুলো সব ভালো ফ্যাটে ভর্তি। আর বেশির ভাগ লোকই এটাকে প্রধান খাবার ভাবতে পারে না।
এছাড়া, রেড মিট বা লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত করা মাংসের সঙ্গে ক্যান্সারের সমপর্ক নিয়ে প্রতিবছর অনেক সংবাদ হয়। প্রফেসর মুরে  বলেন, এটা শস্য, দানাদার ও আঁশজাতীয় খাবার ও ফলমূল কম খাওয়ার চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষকরাও তাই মনে করেন, স্বাস্থ্য নিয়ে যারা সচেতনতা তৈরি করেন তাদের চর্বি কিংবা সুগারের কথা কম বলে স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা বেশি বলা উচিত।
বর্তমানে ফ্রান্স, স্পেন এবং ইসরায়েলের মতো কিছু দেশে ডায়েট সমপর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। আর দক্ষিণ পূর্ব, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার চিত্র উল্টো। ইসরাইলে যেখানে প্রতি এক লাখে এ ধরনের মৃত্যুর হার মাত্র ৮৯, সেখানে উজবেকিস্তানে ৪৯২ জন। তবে প্রফেসর মুরে বলছেন, জাপানে আগে ব্যাপক লবণ খাওয়ার প্রবণতা থাকলেও সেটি এখন নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে।
চীনারা প্রচুর পরিমাণে লবণ খায় এবং খাদ্য তালিকায় লবণ দিয়ে সস বেশি পছন্দ করে তারা।
আর যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে এখনো ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামের পেছনে আছে। তবে এজন্য ফলমূল বা দানাদার ও শস্যজাতীয় খাবারের স্বল্পতাও কম দায়ী নয়। দেশটিতে ডায়েট সমপর্কিত মৃত্যু প্রতি লাখে ১২৭ জন। প্রফেসর মুরে বলছেন, মানসম্মত খাবার হলো আসল কথা, আপনার ওজন কতো সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। তিনি সবজি, আঁশজাতীয় খাবার ও ফলমূল খাওয়া বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে বড় বিষয় হলো টাকা। প্রফেসর ফরউহি বলছেন, মানুষ জানলে ও সামর্র্থ্য থাকলে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে পারে।
তবে তারা দু’জনই একমত যে ফ্যাট, সুগার বা সল্ট, এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে মানুষের উচিত ভালো খাবারের দিকে মনোযোগ দেয়া।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা: কেন এখনো আস্থা বাংলাদেশের রোগীদের? by সায়েদুল ইসলাম

হোমিওপ্যাথিক ঔষধের দোকান
ঢাকার কলাবাগানের বাসিন্দা মনসুর আহমেদ প্রায় পনেরো বছর ধরে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও নিচ্ছেন।
তিনি বলছেন, কোন কোন রোগে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় ভালো উপকার পেয়েছেন।
''আঁচিল, চর্মরোগের মতো সমস্যাগুলোয় হোমিওপ্যাথি ওষুধে খুব ভালো উপকার পেয়েছি। হাসপাতালে গেলে এগুলোর জন্য সার্জারি বা লেজার করে।
কিন্তু হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেয়ে কিছুদিনের মধ্যে এগুলো ভালো হয়ে গেছে।'' তিনি বলছেন।
কিন্তু শারীরিক বড় সমস্যার জন্য তিনি বরাবরই অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
কারণ হিসাবে তিনি বলছেন, ''হোমিওপ্যাথি ওষুধে ভালো হতে কিছুদিন সময় লাগে। কিন্তু সার্জারি করার মতো বা বড় কোন সমস্যায় সেই দেরী করার ঝুঁকি নিতে চাইনা বলেই এ ধরণের সমস্যা হলে হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে যাই।''
বাংলাদেশে মিঃ আহমেদের মতো অনেক মানুষ নানা সমস্যায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই চিকিৎসা অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বরগুনার পাথরঘাটার হাসিনা বেগম বলছেন, ''হাসপাতালে গেলে অনেক টাকা লাগে, কিন্তু হোমিওপ্যাথিতে ডাক্তারের খরচ, ওষুধের অনেক কম।
হোমিওপ্যাথিক হাসপাতালের চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা
সময় লাগলেও রোগ ভালো হয়। আর তাতেও ভালো না হলে হাসপাতাল তো আছেই।''
তিনি বলছেন, তার বোনের পেটে একটি টিউমার হওয়ায় ডাক্তার অপারেশন করতে বলেছিলেন।
কিন্তু তাতে কয়েক লাখ টাকা লাগবে, যা তার নেই। তাই হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাচ্ছেন, যদি তাতে ভালো হয়ে যান।
তবে একেবারে আলাদা মতও রয়েছে।
ফরিদপুরের বাসিন্দা রফিকুল হক বলছেন, ''আমি কখনো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নেই না, কারণ এটা আমার কাছে বিজ্ঞান সম্মত মনে হয়না, তাই ঠিক বিশ্বাস হয়না।
শারীরিক যেকোনো সমস্যার জন্য আমি বা আমার পরিবারের সদস্যরা অ্যালিপ্যাথি চিকিৎসকের কাছেই যাই।''
বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথি বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এই বোর্ডে এখন পর্যন্ত ৩০ হাজারের বেশি তালিকাভুক্ত চিকিৎসক রয়েছেন।

হোমিওপ্যাথির উৎপত্তি

হোমিওপ্যাথির উৎপত্তি জার্মানিতে, প্রায় দু'শ বছর আগে।
যদিও ভারতীয় উপমহাদেশে এর ব্যবহার শুরু হয় প্রায় আশি বছর আগে; অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর।
এই চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ডা. স্যামুয়েল হ্যানিমেনের জন্মবার্ষিকীর দিনে আজ অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে আজ পালন করা হচ্ছে হোমিওপ্যাথি দিবস।

বাংলাদেশে কত মানুষ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিচ্ছেন?

বাংলাদেশে সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আব্দুল মজিদ বলছেন, ''আমরা একটি জরিপ করে দেখেছি যে, বাংলাদেশে এখন ২৮ শতাংশ মানুষ হোমিওপ্যাথি এবং ইউনানি চিকিৎসা নিচ্ছেন।''
তিনি জানান, ২০১৮ সালে তাদের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ৪৬ হাজার রোগী, যা আগের বছরের চেয়ে বেশি।
আর ভর্তি রোগী ছিলেন ৫১০জন, যাদের দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ রয়েছে।
দেশের বাকি ৬০টি কলেজ ও হাসপাতাল মিলিয়ে মোট চিকিৎসা পাওয়া রোগীর সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে তিনি জানান।
ঢাকায় একটি সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ
মিঃ মজিদ বলছেন, সহজলভ্য, কম খরচ আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হওয়ার কারণে অনেকেই তাদের চিকিৎসার জন্য হোমিওপ্যাথিও ওপর নির্ভর করেন।
একসময় নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের মধ্যে এই চিকিৎসার জনপ্রিয়তা থাকলেও, এখন উচ্চবিত্তরাও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য আসছেন বলে তিনি জানান।
কিন্তু অনেক চিকিৎসক অভিযোগ করেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় সময় ক্ষেপণের কারণে অনেক বড় বড় রোগ আরো ছড়িয়ে পড়ে, ফলে পরবর্তীতে অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসায় আরোগ্য করা সম্ভব হয়না।
ঢাকার একটি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক তৌফিক আহমেদ বলছেন, ''অনেক সময় আমরা এমন রোগী পাই, যারা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরেও এতদিন হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা নিয়েছেন।
আমাদের কাছে তারা এসেছেন একেবারে শেষ পর্যায়ে, যখন আমাদের কিছু করার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ''

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''অন্যান্য অনেক চিকিৎসা ব্যবস্থা যেমন আছে, হোমিওপ্যাথি তার মতোই একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা।
দুইশো বছর ধরে এটি চলে আসছে। এটি সফল বা কার্যকর না হলে এতো মানুষ তো এতদিন ধরে চিকিৎসা নিতো না, কোন ভিত্তিহীন বিষয় তো এতদিন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো না।''
তিনি বলছেন, ওষুধের দিক থেকে পার্থক্য না থাকলেও, চিকিৎসা পদ্ধতিতে পার্থক্য আছে। একটি রোগ কিভাবে সনাক্ত করবো, সেটির চিকিৎসা কীভাবে করা হবে, সে নিয়ে অ্যালোপ্যাথির সঙ্গে বড় পার্থক্য রয়েছে।
কারণ এই চিকিৎসাটি মূলত লক্ষণ ভিত্তিক আর এখানেই অ্যালোপ্যাথির সঙ্গে তার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে বলে তিনি বলছেন।
নানা অবহেলায় অব্যবহৃত রয়েছে দেশের একমাত্র সরকারি হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি

যমুনার বুকে ধান চাষ by কামাল হোসেন

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জের বুক চিরে গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরের গোয়ালন্দে পদ্মায় গিয়ে মিলিত হয়েছে যমুনা নদী। এক সময় যমুনা নদীতে চলতো বড় বড় স্টিমার, জাহাজ, লঞ্চসহ নৌ-পথের পরিবহন। কিন্তু কালের বিবর্তনে প্রমত্তা যমুনা তার যৌবন হারিয়ে এখন মৃতপ্রায়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন বাস্তুহারা করছে চরাঞ্চলের মানুষকে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে যমুনা মরা খালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, দুই যুগ আগেও যমুনার পূর্ণ যৌবন ছিল। কিন্তু দেশের সর্ববৃহৎ বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের পর যমুনা নদী অস্তিত্ব হারাচ্ছে। যে কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর তলদেশে এখন চাষাবাদ হচ্ছে বোরো ধান। শত শত একর জমিতে শোভা পাচ্ছে বোরো ধানের চাষ।
বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে নদী শাসনের কারণে তার স্বাভাবিক গতিপথ সেতুর পিলারের মাধ্যমে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় উজানে অতিরিক্ত ভাঙন দেখা দেয়। যার ফলে নদীর গভীরতা কমে চরের প্রবণতা বেড়ে গেছে। দীর্ঘকাল ধরে নদী শাসন না হওয়ায় গতিপথ পরিবর্তন হয়ে শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালু চরে রূপ নিয়েছে যমুনা। আর এসব জেগে উঠা চরগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ হচ্ছে তিল, তিসি, কাউন, ডাল, চিনাবাদাম ভুট্রাসহ নানা মৌসুমী ফসল। সেতুর উত্তরাংশ টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুরের অর্জুনা, গাবসারা, ফলদা, গোবিন্দাসী ও নিকরাইল ইউনিয়নের পশ্চিম সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী। এক কালে অথৈ পানিতে থৈ থৈ করা নদী আজ পৌষ মাস থেকেই পানি শুকিয়ে মাইলের পর মাইল ধু-ধু বালু চরে রূপ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির পূর্বে টাঙ্গাইল দিয়ে সিরাজগঞ্জ হয়ে উত্তরবঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদী। ফেরি, যন্ত্রচালিত নৌকার মাধ্যমে নদী পার হয়ে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের এটাই ছিল একমাত্র অবলম্বন। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাট গোবিন্দাসী গরুর হাট জমে উঠেছিল যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে নৌ-পথে গরু আসতো এ হাটে। এ হাটটির মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো। যমুনার নাব্য কমে যাওয়ায় এ হাটটিও যেন মরে গেছে। সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
যমুনার মাছ সারা দেশে সমাদৃত। এখানে পাওয়া যেত লোভনীয় ইলিশ, বোয়াল, চিংড়ি, পাবদা ও গোলসাসহ নানা প্রজাতির মাছ। নদীর নাব্য কমায়, অতি দ্রুত নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে মাছের আকাল। নদীতে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করতো তারা আজ অন্য পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে। জাল দিয়ে মাছ ধরা জেলে বাবলু হালদার বলেন ‘কি আর কমু খারি ভর্তি মাছ ধরতাম, আজ খালইয়ের তলাই ভরতে পারি না।’ নদীতে পানি থাকে না এবং সঠিক সময় পানি আসেও না, তাই মাছও আসে না। বর্তমানে এ নদীতে মাছের খুব আকাল।
যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দূরপাল্লার যাতায়াত সহজ হলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। নদী তীরবর্তী টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের লোকজন যেখানে নৌকায় চড়ে বাড়ির ঘাটে উঠা-নামা করতো, সেখানে আজ মাইলের পর মাইল হেঁটে চলাচল করতে হয় তাদের। বর্ষাকাল ছাড়াও যেখানে এ নদীতে সারা বছর পানি থাকতো সেখানে আজ ধু-ধু বালু চর। নৌকাযোগে অল্পসময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের যে সুবিধা মানুষ ভোগ করতো সেখানে আজ পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।
নৌকার মাঝি সবজাল বলেন ‘প্রমত্তা যমুনা আজ হাহাকার বালু চর। অতিরিক্ত স্রোতের কারণে এই নদীতে নৌকা বাইতে সাহস পাইতাম না, সেখানে আজ নৌকার হালও ধরতে হয় না, এমন অবস্থা যমুনার। কি নদী ছিল আজ কি হয়ে গেছে! যে ঘাটে বড় বড় ফেরি বাঁধা থাকতো সেখানে আজ বাঁধা থাকে গরু।’
যমুনা নদীর উপর ব্রিজ হওয়ায় ভূঞাপুরের গোবিন্দাসীর ফেরিঘাট উঠে গেছে অনেক আগেই। এখন আর আগের মতো নৌকাও চলে না। যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে যমুনার চরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে একমাত্র ভরসা ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল। যমুনার এ চরাঞ্চলে রাস্তা-ঘাট নেই বললেই চলে। কিন্তু ধু-ধু বালু চরে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েক’শ পরিবার।
ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী, নিকরাইল, গাবসারা ও অর্জূনা ইউনিয়নের চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, চর ও নদী এলাকার যেসব গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাতায়াত করতে হতো চরের মানুষকে। উৎপাদিত পণ্য আনা নেয়া করতে হতো হেঁটে। সেসব জায়গায় ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেলে যাতায়াত করছে লোকজন।
ভূঞাপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। স্কুল, মাদরাসা, হাসপাতাল, ব্যাংক-বিমা, কমিউনিটি সেন্টার ও এনজিও প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকজন প্রতিদিন চরাঞ্চলে যাতায়াত করে। এসব মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা মোটরসাইকেল। তবে, চরের অনেক মানুষ এখনো হেঁটেই বিশাল চর পাড়ি দেয়।
গাবসারা ইউনিয়নের পুংলীপাড়া মোটরসাইকেলচালক আইয়ুব বলেন, সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। মোটরসাইকেল চালানো তার পেশা। আগে তিনি ইটভাটায় কাজ করেছেন। এখন তিনি প্রতিদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে ৮-৯শ’ টাকা আয় করেন। চরাঞ্চলের অনেকেই জানান, চরে ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেল চলাচল করায় চরের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটা কমেছে।
যমুনার নাব্য কমে যাওয়ায় সেখানে এখন প্রায় পানি শূন্য। জেগে ওঠা চরগুলোতে চাষাবাদ করছে চরাঞ্চলের চাষিরা। ফলে এখানে মানুষের বসতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে। এর সঙ্গে সেখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু গবাদি পশুর খামার। এতে পাল্টে যাচ্ছে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলার চরাঞ্চলের অর্থনীতি। আজ থেকে ২০ বছর আগেও যমুনার তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। তখন কেউ চিন্তাও করতে পারেনি যমুনার বুকে এক সময় চাষাবাদ হবে। কিন্তু যমুনা নদীতে ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’ স্থাপিত হওয়ার পর থেকে এর নাব্য কমতে থাকে। যমুনার বুক এখন ফসলে ভরা। জেগে উঠা ধু-ধু বালুচরে এখন উঠতি বোরো ধান শোভা পাচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যমুনার হারানো গৌরব ফেরাতে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।