Sunday, May 26, 2013

বিদেশের ৩০ ব্যাংকে সুদীপ্ত সেনের হিসাব!

ভারতের বিতর্কিত সারদা গ্রুপের প্রধান সুদীপ্ত সেনের বিদেশের ৩০টি ব্যাংকে হিসাবের সন্ধান পেয়েছে তদন্তকারী বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট। তাদের ধারণা, ওই ব্যাংক হিসাবগুলোতে সুদীপ্ত বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করেছেন। সারদা গ্রুপের প্রতারণাপূর্ণ বিনিয়োগের (পঞ্জি স্কিম) ওই অর্থ উদ্ধারে ভারতকে হয়তো সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের শরণাপন্ন হতে হবে। সুদীপ্ত সেন ও সারদা গ্রুপের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রিমান্ড থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে পুলিশ শিল্পগোষ্ঠীটির অনলাইনে লেনদেন যাচাই করে। এতে ওই ব্যাংক হিসাবগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ফাঁকি দিতে কয়েক লাখের ছোট ছোট অঙ্কে অর্থ পাচার করা হয়। পুলিশের বিধাননগর কমিশনারেট তদন্তের তথ্য ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক তদন্ত পরিষদের (ইআইসি) অধীনে পরিচালিত আর্থিক তদন্ত ইউনিটের (এফআইইউ) কাছে হস্তান্তর করেছে।

অবশেষে জানা গেল শরীর চুলকায় কেন!

শরীরে চুলকানির অনুভূতি তৈরির জন্য দায়ী অণুকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের এ আবিষ্কার চুলকানিজনিত রোগের চিকিৎসায় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত গবেষক সন্তোষ মিশ্র ও মার্ক হুন ইঁদুরের ওপর গবেষণা করে সাফল্য পেয়েছেন। উল্লেখ্য, ইঁদুর ও মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে মিল আছে। তাঁদের গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশ করেছে বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স। গবেষকেরা জানান, মানুষের শরীরে চর্মরোগের স্থান থেকে নিউট্রিওরটিক পলিপেপটাইড বি (সংক্ষেপে এনপিপিবি) নামের অত্যন্ত ছোট একটি অণু মেরুদণ্ডের মধ্যকার নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে প্রভাবিত করে। এতে ওই স্নায়ুকোষ মস্তিষ্কে চুলকানোর অনুভূতি তৈরি করে।  অণুটির কাজ বন্ধ করে দিতে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের চিন্তা করা হচ্ছে।

বিজেপিতে নেতৃত্বের লড়াই

ভারতের আগামী সাধারণ নির্বাচন আর বছর খানেক পরেই। ওই নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির প্রধান বিরোধী জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা বা এনডিএর নেতৃত্বাধীন দল ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) শুরু হয়েছে নেতৃত্বের লড়াই। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আগামী নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্ব দিতে পারেন—এমন আলোচনা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। কিছুদিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। এর আগে দলের সভাপতি রাজনাথ সিংকে এক চিঠি লিখে দলের শীর্ষ প্রভাবশালী নেতা এল কে আদভানি জানিয়েছেন, নির্বাচনে নেতৃত্বের দায়িত্ব নীতিন গড়কারিকেই দেওয়ার পক্ষে তিনি। তবে বিজেপির আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) নরেন্দ্র মোদিকে ওই দায়িত্বে দেখতে চায়। নীতিন গড়কারি দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপির সভাপতি হন—এটা যারা চাননি, আদভানি তাঁদের অন্যতম। তখন তাঁর যুক্তি ছিল, অনেক দুর্নীতির সঙ্গে নাম জড়িয়ে পড়া গড়কারিকে নেতৃত্বে বহাল রাখলে তা দলের জন্য ভালো হবে না। দলের নতুন সভাপতি হন রাজনাথ সিং। কিন্তু গত কয়েক মাসে অবস্থান আমূল পাল্টে ফেলে আদভানি। এখন বলছেন, রাজ্যের নির্বাচনগুলোতে জিততে হলে দলের নেতৃত্বে গড়কারির মতো লোককেই দরকার। নরেন্দ্র মোদিকে সম্প্রতি বিজেপির শীর্ষ নেতাদের প্যানেল সংসদীয় বোর্ডের সদস্য করা হয়। একই সঙ্গে দলের নির্বাচনী কমিটিতেও রাখা হয় তাঁকে। অনেকের ধারণা, মোদি যে আগামী লোকসভা নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছেন, এগুলো তারই প্রাথমিক পদক্ষেপ। তবে বিজেপির অনেক নেতা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রতিযোগিতা এখনো শুরুই হয়নি। সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ৮৫ বছর বয়স্ক আদভানিকেও এখনো ওই পদে জোর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হচ্ছে। তালিকায় আছেন লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেত্রী সুষমা স্বরাজও। চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকে সুষমা স্বরাজ জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নির্ধারণ করা হবে এনডিএ জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে। এনডিএ জোটের শরিক জনতা দল (ইউনাইটেড) জোটের নেতা হিসেবে মোদিকে মেনে নেবে না। এই দলটি মনে করে, ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গা মোদির সাম্প্রদায়িক অবস্থানকে বিতর্কিত করেছে। মোদিকে নিয়ে আপত্তি নেই জোটের অপর শরিক শিবসেনার। তবে জোটের নেতৃত্বে তাদের সবচেয়ে পছন্দ সুষমা স্বরাজ।

শান্তি সম্মেলনের ব্যাপারে ইতিবাচক বিদ্রোহীরাও

সিরিয়ায় রক্তপাত বন্ধে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে সিরিয়ার সরকার-বিরোধীরা। এর আগে এ ব্যাপারে সম্মতি জানায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকার। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তিন দিনের বৈঠকের মধ্যে বাশারবিরোধী প্রধান জোট সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়ালিশন (এসএনসি) আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তাদের ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানায়। গতকাল শনিবারই ওই বৈঠক শেষ হওয়ার কথা। তবে এসএনসির মুখপাত্র লুয়ে শফি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বাশার পদত্যাগে রাজি হলেই কেবল আমরা শান্তি সম্মেলনে যোগ দেব।’ আর রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমরা সিরিয়া সরকারের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ঘোষণা শুনতে চাই।’ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আগামী কাল সোমবার একান্ত বৈঠকে বসছেন কেরি ও লাভরভ। মার্কিন ও রুশ কর্মকর্তারা জানান, দুই নেতা সিরিয়ার বিভিন্ন পক্ষকে প্রস্তাবিত সম্মেলনে যুক্ত করা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন। প্রস্তাবিত শান্তি সম্মেলন নিয়ে অগ্রগতি হলেও উভয় পক্ষের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কুশায়ের শহরে গত শুক্রবারও ব্যাপক সংঘর্ষ চলে। এদিকে সিরিয়ায় অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে কাল সোমবার বৈঠকে বসছেন ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।

অস্ত্র চুক্তির ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখুন

ভারতের সঙ্গে সম্ভাব্য অস্ত্র চুক্তি সম্পাদনের আগে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তার’ বিষয়টি বিবেচনার জন্য আফগানিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্রসচিব জলিল আব্বাস জিলানি গত শুক্রবার ইসলামাবাদে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ আহ্বান জানান। আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারত সফরকালে নিজ দেশের সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র চেয়েছেন—এ মর্মে প্রকাশিত খবরের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন পাকিস্তানি পররাষ্ট্রসচিব। তিনি বলেন, ‘সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আফগানিস্তান নিজেদের নীতি বাস্তবায়ন করতে পারে। তবে তারা সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়টি বিবেচনা করবে, এমনটাই প্রত্যাশা।’ ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন কারজাই। তবে তাঁর চাহিদার তালিকায় কী পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। সংবাদমাধ্যম সূত্র জানায়, ভারতের কাছ থেকে কামান, বিমান, সামরিক ট্রাক ইত্যাদি অস্ত্র সরঞ্জাম পেতে চায় আফগানিস্তান। ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির আওতায় আফগান সেনাদের ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে ভারত। আফগানিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তির ব্যাপারে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান আগ্রহ প্রকাশ করলেও কাবুল সাড়া দেয়নি। এ অবস্থায় ভারতের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তির ব্যাপারে আফগানিস্তানের আগ্রহে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা নাখোশ হয়েছে পাকিস্তান। ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কে অগ্রগতির ব্যাপারে কিছুটা নির্বিকার ভাব দেখান পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রসচিব। চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং সম্প্রতি ভারত সফরকালে বিভিন্ন বিরোধ পেছনে ফেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অগ্রগতির ঘোষণা দেন। এ ব্যাপারে আব্বাস জিলানি বলেন, ভারত-চীন সম্পর্ক আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ভালো এবং এটি ভারত-চীন সম্পর্কের সঙ্গে তুলনীয় নয়। কাবুল-ইসলামাবাদ সম্পর্ক সাময়িক উষ্ণতার পর আবার শীতল, এমন এক সময়ে হামিদ কারজাই ভারতের কাছে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের অনুরোধ করলেন। আফগানিস্তান কয়েক মাস ধরে সীমান্তে গুলিবর্ষণ এবং ভূখণ্ড দখলের মতো বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে, সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে আফগানিস্তানের ব্যাপারে সরকারি বিবৃতি প্রদানসহ অন্যান্য বিষয়ে পাকিস্তান সংযত ভূমিকা পালন করছে। তবে আফগানিস্তানে পুনর্গঠনকাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের ব্যাপক উপস্থিতি নিয়ে দেশটি বিভিন্ন কারণে উদ্বিগ্ন।

‘দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছেমুখ্যমন্ত্রীর’

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সৌগত রায় বলেছেন, দলের কর্মীদের ওপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ আছে। নইলে দল চাইলে ২০১১ সালের ১৩ মের পর এ রাজ্যে সিপিএমের সব অফিস বন্ধ হয়ে যেত।  কলকাতার অদূরে বারাকপুরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক সমাবেশে সাংসদ সৌগত রায় এসব কথা বলেন।

স্টকহোমের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে

সুইডেনে চলমান দাঙ্গা রাজধানী স্টকহোমের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, স্টকহোমে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের ফলে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, শুক্রবারও স্টকহোমে বিক্ষুব্ধ যুবকেরা দুটি গাড়িতে আগুন দেন।স্টকহোমের বাইরে সুইডেনের মধ্যাঞ্চলীয় অরেবো নগরে ২৫ জনের মতো মুখোশ পরা যুবক তিনটি গাড়ি, একটি স্কুল ও একটি থানায় আগুন দিয়েছেন। সোদেটালিয়ায় একটি ভবনে আগুন দেওয়া হয়।

সৌদি থেকে ফিরছে ৭৫ হাজার ভারতীয়

সৌদি আরবে কাজের অনুমতিপত্র পেতে ব্যর্থ হওয়ায় কয়েক মাসের মধ্যে অন্তত ৭৫ হাজার নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনবে ভারত। এরই মধ্যে ২৭ হাজার নাগরিককে সৌদি আরব ত্যাগের অনুমতিপত্র বা জরুরি সনদ (ইসি) দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে দেশটি। সৌদি আরব শ্রমবিষয়ক একটি বিতর্কিত আইন (নিতাকাত) বলবৎ করতে যাচ্ছে। এ আইন অনুসারে যেসব সৌদি প্রতিষ্ঠান বিদেশি নাগরিকদের কাজ দেয়, তাদের প্রতিষ্ঠানে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে সৌদি নাগরিকদের জন্যও কাজের সুযোগ থাকতে হবে। ভারতীয় দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, দ্বিতীয় দফায় সৌদি আরব ছাড়ার জন্য রিয়াদে প্রায় ২৪ হাজার এবং পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে তিন হাজার ৭০০-রও বেশি নাগরিক আবেদন করেছেন। প্রথম দফায় ইসির জন্য সারা সৌদি আরব থেকে ১৫ হাজার ভারতীয় আবেদন করেন। বিতর্কিত শ্রম আইন কার্যকর হলে চাকরি চলে যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় ভারতের দূতাবাস প্রায় ৬০ হাজার আবেদনকারীর জন্য দেশে ফেরার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। কর্মহীন হয়ে পড়ার পর ওই ভারতীয় শ্রমিকেরা আগামী ৩ জুলাইয়ের মধ্যে সৌদি আরব ত্যাগ করতে না পারলে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ গত শুক্রবার চার দিনের সফরে সৌদি আরব গেছেন।

অভিযুক্তকে কাজের প্রস্তাব দিয়েছিল এমআই-ফাইভ!

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভ সেনাসদস্য লি রিগবির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মাইকেল আদেবোলাজোকে তাদের জন্য কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। আবু নুসাইবা (৩১) নামের আদেবোলাজোর ওই বন্ধু বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ দাবি করেন। বিবিসি কার্যালয় থেকে নুসাইবাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নুসাইবা সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভ তাঁর বন্ধু মাইকেল আদেবোলাজোকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছিল। এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরই নুসাইবাকে আটক করা হয়। বৃহত্তর লন্ডন পুলিশের সদর দপ্তর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ কর্মকর্তারা নুসাইবাকে সন্ত্রাসে উসকানি ও প্রস্তুতিতে সহায়তা দেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করেছে। শুক্রবার বিবিসি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নুসাইবা বলেন, এমআই-ফাইভ তাঁর বন্ধু আদেবোলাজোকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তিনি ওই সংস্থায় যোগ দিতে চান কি না। আদেবোলাজো তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নুসাইবা বলেন, ২০০২ সালে আদেবোলাজোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। মাস ছয়েক আগে আদেবোলাজো তাঁকে যেসব কথা বলেছেন, তা তাঁকে বিস্মিত করে।  নুসাইবা দাবি করেন, আদেবোলাজো তাঁকে বলেছিলেন, তিনি কেনিয়ায় থাকাকালে সেখানকার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে অকারণে তুলে নিয়ে যায় এবং আটকে রেখে নির্দয়ভাবে পেটায়। কেনিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে আসার পর এমআই-ফাইভের এজেন্টরা বারবার তাঁর বাড়িতে আসতে থাকে।  স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কর্মকর্তারা বলেছেন, নুসাইবাকে দক্ষিণ লন্ডনের একটি থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর দুটি আবাসিক ঠিকানা পাওয়া গেছে, সেখানে তল্লাশি চালানোর প্রস্তুতি চলছে। লন্ডনের উলউইচে এক সেনা ব্যারাকের কাছে গত বুধবার রিগবিকে কুপিয়ে হত্যা করেন আদেবোলাজোসহ দুই সন্দেহভাজন মুসলিম হামলাকারী।

পাকিস্তানে স্কুলবাসে আগুন, ১৭ শিশুর মৃত্যু

পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় গুজরাট শহরে  স্কুলবাসে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১৭ শিশু ও একজন শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবারের এ ঘটনায় আরও ১০ শিশু আহত হয়েছে। বিস্ফোরণ থেকে বাসটিতে আগুন ধরে যায়। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, হতাহত শিশুদের বয়স পাঁচ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। ঘটনার পরপরই উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁরা হতাহত শিশুদের উদ্ধার করে পাশের একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। আহত শিশুদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ৭০ মাইল দূরে অবস্থিত লাহোরে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছিল, বাসটির গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণের কারণে আগুনের ঘটনা ঘটে। অবশ্য পরে দেখা যায়, গ্যাস সিলিন্ডারটি অক্ষত রয়েছে। স্থানীয় পুলিশপ্রধান দার আলী খাটাক জানান, ঘটনার শিকার বাসটি স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলের। স্কুলটির কাছাকাছি পৌঁছানোর পর সেটিতে আগুন ধরে যায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে, দুই ধরনের জ্বালানিতে চলা বাসটি চলার সময় গ্যাস  থেকে পেট্রলে পরিবর্তন করতে গেলে আগুন লাগে। তবে গ্যাস সিলিন্ডারটি অক্ষত রয়েছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে একজন শিক্ষকও নিহত হয়েছেন। আরেক পুলিশ কর্মকর্তা আবিদ খান জানান, ঘটনার পর বাসটির চালক পালিয়ে গেছেন। গুজরাটের হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্কুলবাসটি থেকে উদ্ধার করা লাশগুলোর চেনার মতো অবস্থায় নেই। তাদের অভিভাবকেরা লাশগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করানোর দাবি জানিয়েছেন।

চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন

গতকাল চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর এবং আজ প্রার্থীদের প্রতীক বণ্টনের পর থেকে নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। আগামী ১৫ জুন নির্বাচনের আগের প্রায় তিন সপ্তাহ সময়কাল সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের জন্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং নির্বাচনে প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে না বলে সরকার যে সব সময় দাবি করে, তা কতটা বাস্তব, তার একটি নমুনা পাওয়া যাবে।
যদিও খাতা-কলমে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নির্দলীয় ও স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন, তা-ও এর ওপর দেশের রাজনীতির প্রভাব থাকে। দলীয় প্রতীক থাকে না, কিন্তু প্রার্থীদের দলীয় পরিচিতি প্রধান হয়ে ওঠে। রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশালে মেয়র পদে সরকারি ১৪-দলীয় ও বিরোধী ১৮-দলীয় জোটের সমর্থকেরা মূলত একক প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় নির্বাচনের প্রায় পূর্বক্ষণে এই চারটি নির্বাচন তাই বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। এই নির্বাচনগুলো যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হয়, যদি ভোটদাতারা স্বাধীনভাবে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারেন, যদি ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা সৃষ্টি হবে। প্রশাসন যদি নির্বাচন কমিশনের অধীনে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে এবং সরকার যদি নির্বাচন ও তার ফলাফল প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা না করে, তাহলে সরকার প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে।
ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে এর আগে চট্টগ্রামে ও কুমিল্লায় সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, সেখানে প্রশ্ন ওঠেনি। সরকার-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী পরাজিত হলেও সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকায় সরকার তার বাহবা নিতে চেষ্টা করেছে এবং মানুষ তা দিতে কার্পণ্য করেনি। কিন্তু এবারের চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটু ভিন্ন এ কারণে যে, সামনে জাতীয় নির্বাচন। যদি এ নির্বাচনে সরকার-সমর্থক প্রার্থীদের পক্ষে সরকার বা প্রশাসন হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর যদি ফলাফলের চিন্তা না করে সরকার ও প্রশাসন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ সহায়তা দেয়, তাহলে আগামী নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।
চারটি সিটি করপোরেশনেই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পর্কে মানুষ আশাবাদী। তবে সিলেটে মানুষের একটু সন্দেহ। কারণ, এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে যে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছিল এবং অতি সম্প্রতি সেই চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা যে আবার অস্ত্র হাতে সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি অথবা নিতে পারেনি। এরা সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের সন্ত্রাসী বলে পরিচিত। এদের যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, তাহলে সিলেটে নির্বাচনের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যার দায়দায়িত্ব এসে পড়বে সরকারের ওপর। তাই সিলেটসহ সব সিটি করপোরেশনে চিহ্নিত দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে সরকারকে সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে।

এবারের বাজেট হবে রাজনৈতিক ওউচ্চাভিলাষী by এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি নেন। এরপর তিনি অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (সিএসপি) যোগ দেন এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি জাতিসংঘের এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের পরিচালক, দেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান এবং ২০০৭-০৯ সময়কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। তাঁর অনেক গবেষণা প্রবন্ধ ও প্রকাশনা আছে।
l সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান ও সুজয় মহাজন
প্রথম আলোl শোনা যাচ্ছে, এবারের বাজেট হবে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকার। এত বড় বাজেটকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মির্জ্জা আজিজl অর্থায়নের বিষয়গুলো পরিষ্কার নয়। অর্থায়নের ক্ষেত্রেও উচ্চাভিলাষ রয়েছে। দেশের বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়নের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায়, বাইরের উৎস থেকে আমরা ১০০-১৫০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তা পাই না। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে অর্থ সংগ্রহের কথা বলা হচ্ছে, সেটিও অর্জন সম্ভব নয়। চলতি বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে সাত হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। কিন্তু আমরা দেখছি, সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আগামী বাজেটে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই রাজস্ব আয় সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। রাজস্ব প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এসব কারণে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকার বাজেটকে আমার বেশ উচ্চাভিলাষী বাজেটই মনে হচ্ছে।
প্রথম আলোl আগামী বাজেট হবে ক্ষমতাসীন দলের শেষ বাজেট। এ বিবেচনায় এতে রাজনীতি না অর্থনীতি—কোনটা প্রাধান্য পাবে বলে মনে করেন?
মির্জ্জা আজিজl যেকোনো বাজেট হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে। প্রবৃদ্ধির বিষয়টি বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সম্ভবত এবারের বাজেটে সেটা হবে না। ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়গুলো সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে অজনপ্রিয় সে রকম কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। কিছু কিছু বিষয় থাকে যেগুলো অজনপ্রিয় কিন্তু সুফল বেশি, সে রকম সিদ্ধান্তগুলো সরকারের মেয়াদকালের শুরুতেই নিতে হয়। যেমন: রাষ্ট্রায়ত্ত কিছু প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে আমরা বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে চলেছি। কিন্তু এগুলো থেকে কোনো সুফল পাওয়া যায় না। এ ছাড়া যেসব খাতে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, সেগুলোও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ভর্তুকিকে লক্ষ্যভিত্তিক করা উচিত। এখন বড়লোকদের ভর্তুকি-সুবিধা কমিয়ে সেটিকে অসচ্ছল ও গরিববান্ধব করা উচিত। দরিদ্রদের বেশি উপকার হয় এ রকম খাতে ভর্তুকি-সুবিধা রেখে অন্যান্য খাতের ভর্তুকি সমন্বয় করা উচিত।
প্রথম আলোl বর্তমান সরকারের চার বছরে এমন অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত কি দেখেছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো বলে মনে হয়েছে।
মির্জ্জা আজিজl এই সরকার ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো, হয়তো সাময়িকভাবে অজনপ্রিয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তেমনটি আমার চোখে পড়ছে না।
প্রথম আলোl যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে তাহলে নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করবে একাধিক সরকার। সে ক্ষেত্রে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখছেন কী?
মির্জ্জা আজিজl বর্তমান বাজেট কাঠামোতেই পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। তাই সরকার পরিবর্তন হলে বাজেটে পরিবর্তনের সুযোগ থাকছেই। তবে বাজেট এমন কোনো জিনিস নয়, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসা যাবে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, আমাদের মতো দেশে বাজেটের অগ্রাধিকার খাতগুলো একই থাকে। সব মিলিয়ে ছয়-সাতটি অগ্রাধিকার খাত রয়েছে। যদি আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি দেখি, তাহলে দেখব ঘুরেফিরে সব সরকারের আমলেই এসব খাতেই প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ থাকে। তাই সরকার পরিবর্তন হলে বাজেটে খুব বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে, এমনটা মনে হয় না।
অগ্রাধিকার খাত বাছাই ও বরাদ্দের বিষয়টি ঠিকই আছে। সমস্যা যেটা সেটা হলো রাজনৈতিক কারণে নতুন কিছু প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে করে প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে ১০ বছর সময় লাগে। তাতে করে খরচ বাড়ে আর প্রকল্পের সক্ষমতা কমে যায়।
প্রথম আলোl আগামী বাজেটে নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণে আলাদা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হচ্ছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু করার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মির্জ্জা আজিজl নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এ জন্য নতুন করে কোনো ব্যয় পর্যালোচনা (কস্ট অ্যানালাইসিস) করা হয়নি। পদ্মা সেতু করা নিয়ে আমার দ্বিমত নেই। কিন্তু এ সময়ে নিজস্ব অর্থে এটি করার প্রয়োজন রয়েছে কি না অর্থাৎ সময়টা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমার মনে হয়, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু না করেও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে অবকাঠামো, সুশাসন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন ইত্যাদি কাজ সঠিকভাবে করা হলে তা দিয়ে সাত থেকে সাড়ে সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। 
প্রথম আলোl আপনি কি মনে করেন নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়াবে।
মির্জ্জা আজিজl বর্তমান সরকার হোক বা অন্য কোনো দলের সরকার হোক—যারাই ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসুক, তাদের জন্য একধরনের চাপ তৈরি করবে। তবে একবার এ কাজ শুরু করা হলে তা থেকে কেউই বেরিয়ে আসতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সরকারকে সেতু নির্মাণের পরবর্তী কাজ এগিয়ে নিতে নতুন অর্থের উৎস সন্ধান করতে হবে। এমনকি বর্তমান সরকারও যদি আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারাও বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে বলে আমার ধারণা।
প্রথম আলোl আপনি উপদেষ্টা থাকাকালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মান রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এখনকার এডিপির মান নিয়ে আপনি কি সন্তুষ্ট?
মির্জ্জা আজিজl এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখন আমি দিতে পারব না। কারণ, আমার হাতে এখন মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদন নেই। সরকারে থাকার সময় সেই প্রতিবেদন ছিল। বর্তমান এডিপিতে ছয় মাস কাজ হয় আর ছয় মাস কাজ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণেও কাজের মান নষ্ট হয়।
এডিপি সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য অনেক সময় তহবিল অবমুক্ত না হওয়ার অভিযোগ করা হয়। কিন্তু এটি যৌক্তিক অভিযোগ নয়। কারণ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বরাদ্দ করা অর্থের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করতে পারে। পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায়ও আলাদা বরাদ্দ দেওয়া থাকে। তাই অর্থ ছাড়ের অভাবে কাজ হচ্ছে না—এটি যৌক্তিক অভিযোগ নয়। এ ছাড়া এডিপিতে অনুমোদিত অনেক প্রকল্প থাকে, যেগুলোয় বাজেট বরাদ্দও থাকে। সেগুলোর কাজেও ধীরগতি দেখা যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এমনটা হয়। বিশেষ করে, দায়বদ্ধতার অভাব। আমাদের আমলাতন্ত্রের যে ব্যবস্থা তাতে ভালো কাজ করলে পুরস্কার নেই, আবার কাজ না করলে শাস্তিরও বিধান নেই।
প্রথম আলোl এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আভাস দেওয়া হয়েছে, আগামী বাজেটে কালোটাকা সাদা করার বিধান থাকবে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মির্জ্জা আজিজl আমি সব সময় এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। কালোটাকা সাদা করার সুযোগ না দেওয়ার পক্ষপাতী আমি। এর পেছনে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। প্রথম কারণ হলো—বারবার এ ধরনের সুযোগ দিয়েও উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, এটি বৈষম্য সৃষ্টি করে। সৎ করদাতারা বৈষম্যের শিকার হন। তৃতীয়ত, আমি মনে করি—এটি একটি অনৈতিক কাজ। বারবার এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হলে তাতে একধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়ে যায়।
প্রথম আলোl সব সরকারের আমলে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েও এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না কেন?
মির্জ্জা আজিজl কালোটাকা অর্থনীতির কতটা অংশ, তার তো সঠিক হিসাব নেই। যদি সঠিক হিসাব থাকত তাহলে হয়তো এটিকে সাদা বানানো যেত। বারবার সুযোগ দেওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কালোটাকা সাদা না হওয়ার পেছনের অন্যতম কারণ ইমেজের সমস্যা। অনেকেই ইমেজ-সংকটে পড়তে পারেন ভেবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নেন না। আরেকটি কারণ হলো, মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম বা কানাডার বাড়ি কেনা ইত্যাদি নানাভাবে এসব টাকা বিদেশে চলে যায়।
প্রথম আলোl কী পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা নিলে কালোটাকার প্রভাব কমবে বলে মনে হয়?
মির্জ্জা আজিজl কালোটাকা তৈরির পথ বন্ধ করতে হলে সবার আগে দরকার এর উৎসগুলো খুঁজে বের করা এবং সেসব পথ বন্ধ করা। আমাদের জানামতে, কালোটাকার যেসব উৎস রয়েছে—তার মধ্যে একটি হলো চুরি, ডাকাতি অর্থাৎ সরাসরি আইনের লঙ্ঘনের মাধ্যমে কালোটাকার মালিক হওয়া। এ ছাড়া কর ফাঁকি, চোরাচালান ও নিয়ন্ত্রণমূলক নানা সিদ্ধান্তও কালো টাকার উৎস হিসেবে কাজ করে। তাই এসব উৎস বন্ধ করা গেলে কালোটাকার প্রভাবও কমে আসবে। যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকে, কর বিভাগ সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে এবং সীমান্তের নজরদারি ঠিকমতো করতে পারি, তাহলে হয়তো কালো টাকা তৈরি পথ কিছুটা হলেও সংকুচিত হয়ে আসবে। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে দেখা যায়, করবৈষম্যের কারণে প্রায় মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা হয়।
প্রথম আলোl বলা হয়ে থাকে, আমাদের মতো বিকাশমান অর্থনীতির দেশে কালোটাকা বন্ধ করা কঠিন। আপনি কি মনে করেন?
মির্জ্জা আজিজl কালোটাকা তৈরির পথ একবারে বন্ধ করা ফেলা হয়তো কঠিন। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নিলে সমাজে একধরনের বার্তা পৌঁছাবে। এতে করে ভবিষ্যতে এটি ধীরে ধীরে হয়তো কমে আসবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্তের কারণে কালোটাকা তৈরির পথ বন্ধে আইনি সংস্কার প্রয়োজন।
প্রথম আলোl হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ ব্যাংকিং খাতে নানা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। শেয়ারবাজারেও কেলেঙ্কারি ঘটে গেছে। এসব ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন? বাজেটে এর সরাসরি প্রভাব কি পড়বে?
মির্জ্জা আজিজl বাজেটে হয়তো এসব কেলেঙ্কারির ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়বে না। কিন্তু পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের নানা কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর প্রভাব ফেলছে। আর মুনাফা কমলে এসব ব্যাংকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ও কমে যাবে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সততার বড় অভাব রয়েছে। এসব অবস্থার উন্নতি দরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ গঠন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে এই সুশাসনের দাবি রাখে।
আর শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রে একই ঘটনা। সুশাসনের অভাব সেখানেও রয়েছে। আগামী বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের কথা শুনছি। স্থিতিশীলকরণ তহবিল নামে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের কথা শুনতে পাচ্ছি। ’৯৭-৯৮ সালে এশিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের পর এশিয়ার বেশ কিছু দেশ এ ধরনের তহবিল গঠন করেছিল। তাই আমাদের দেশেও এ ধরনের উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। তবে সার্বিক অর্থনীতির উন্নতি না হলে পুঁজিবাজারের উন্নতি হবে না। আর কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথম আলোl আপনাকে ধন্যবাদ।
মির্জ্জা আজিজlধন্যবাদ।

বেগম পাড়ার সাহেব ও দেশ বিক্রিরকচ্ছপেরা by ফারুকওয়াসিফ

যদি বলি কোন প্রাণী নিজের ঘর পিঠে নিয়ে চলে? এর উত্তর হবে ১. কচ্ছপ, ২. এক চীনা কৃষক এবং ৩. কয়েক হাজার বাংলাদেশি বড়লোক। রূপকথার সেই কচ্ছপের গায়ে আদিতে কোনো খোল ছিল না। ঘরের বাইরে বের হলেই শিয়াল, কুকুর, ইগল খেয়ে ফেলত। সে দেখল, ঘরেই সে নিরাপদ। তাই সে কচ্ছপ দেবতার কাছে প্রার্থনা করল, তার শক্ত খোলের ঘরটা যেন সে সব সময় বইতে পারে। সে যুগে দেবতারা সত্যমনে আরজি জানালে পূরণ করতেন। তো, এক সকালে কচ্ছপ দেখল শক্ত খোলের ঘরটা তার পিঠে ও পেটে লেগে গেছে। সেই থেকে কচ্ছপ ঘরসহ নিরাপদে চলাচল করে।
চীনের ৩৮ বছর বয়সী লিউ লিংচাও খুবই গরিব। একে তো নিজস্ব ঘর নেই, তার ওপর ঘুরে বেড়ানোর খুব শখ। এক জবর বুদ্ধি বের করলেন তিনি। বাঁশ আর প্লাস্টিক দিয়ে ছোট্ট একটা বহনযোগ্য ঘর বানালেন। এর ওজন ৬০ কেজি এবং এর সুবিধা হলো, এটা ঘাড়ে নিয়ে হাঁটাচলা করা যায়। সেই থেকে লিংচাও ভ্রাম্যমাণ আছেন। তবে গৃহ কাঁধে চলতে গিয়ে তাঁর গতি হয়েছে একদম শামুকের মতোই। তিন মাসে মাত্র ২০ কিলোমিটার অগ্রসর হতে পেরেছেন। গতি নেই তো কী হয়েছে, নিজের একটা ঘর তো আছে তাঁর।
বাংলাদেশি বড়লোকদের গল্পটাই বেশি দারুণ। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম এই গল্পটা বলেছেন ব্রিটেনের ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায়। কানাডার টরন্টোর একটি এলাকাকে স্থানীয় বাংলাদেশিরা ‘বেগম পাড়া’ ডাকে। এই বেগম পাড়ার বেগমদের সাহেবরা তাঁদের সঙ্গে থাকেন না। তাঁরা বাংলাদেশে থেকে কষ্ট করে টাকা বানান; টাকা বানাতে ক্লান্তি লাগলে পরে এসে সেখানে পরিবারের সঙ্গে ‘আরামের’ সময় কাটান। এই বাংলাদেশি ‘বেগম’দের আরাম-আয়েশ দেখলে মোগল বেগমরাও হিংসায় জ্বলতেন। তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টগুলো বিলাসসামগ্রীতে ভরা। তাঁদের সন্তানেরা সে দেশের ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে। ‘বেগম’দের একমাত্র কাজ হলো ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করা আর ‘আরাম’ করা। সারা কানাডায় এ রকম অনেকগুলো ‘বেগম পাড়া’ আছে।
বেগমদের সাহেবরা তো ধনীই হবেন; উপরন্তু বিদেশে তাঁরা ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়েছেন বিনিয়োগকারী কোটায়।  খরচ বেশি নয়; মাত্র দেড় লাখ কানাডীয় ডলার অর্থাৎ এক কোটি ১০ লাখ টাকা জমা দিলেই কানাডা আপনাকে নাগরিকত্ব দেবে। বেগমদেরও এই পরিমাণ টাকা দিতে হয়েছে। বিনিময়ে তাঁরা পেয়েছেন প্রবাসে নিরাপদ ঘর। এই ঘর কচ্ছপের বহন করা ঘরের থেকেও শক্তিশালী, চীনা লিংচাওয়ের ঘরের থেকেও হালকা। যখন আরাম চাইবেন, যখন বিপদের দিনে দেশ থেকে পালাতে চাইবেন; তখন সব সুবিধা আর নিরাপত্তা নিয়ে এই ঘর ‘বেগম সাহেবা’সহ অপেক্ষা করবে। এটা বয়ে বেড়াতে হয় না, বয়ে বেড়াতে হয় কেবল দেড় লাখ ডলার দিয়ে কেনা নাগরিকত্বের কার্ডটা। এই কার্ডটাই আপনাকে আপনার মাতৃভূমির বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করবে। সঙ্গে থাকতে হবে আরেকটি কার্ড, যা দিয়ে আপনি ব্যাংক থেকে খুশিমতো টাকা তুলবেন। একেবারে মোবাইল ব্যবস্থা।
দুদিকেই লাভ। উন্নত বিশ্বের সব নাগরিক সুবিধাও পাচ্ছেন, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগময় বাংলাদেশ থেকে সুরক্ষাও মিলছে। সুতরাং যে টাকা বিনিয়োগ করছেন, তা কোনো না-কোনোভাবে সুবিধা আকারে ফেরত পাবেন। আপনার খাতিরে নয়, এই ব্যবস্থা চালু করার পেছনে কানাডার নিজস্ব স্বার্থ আছে। কানাডীয় বাংলাদেশি সমাজে চালু একটা কৌতুক এমন যে, কানাডা ইউরোপ-আমেরিকার মতো অর্থনৈতিক ধসের স্বীকার হয়নি কেন? উত্তর হলো বাংলাদেশিদের ‘রেমিট্যান্স’। সত্যিই বাংলাদেশি সাহেবরা কত শত-হাজার কোটি টাকা কানাডায় পাচার করছেন, তা জানা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক জানাচ্ছে, ১৯৭৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এক লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে (প্রথম আলো)। ইউএনডিপি জানাচ্ছে, অবৈধ পুঁজি পাচারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষে। তারা আরও বলছে, কালোটাকাই এ দেশের অর্থনীতির ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশের চালক।
ঠিক কতজন বাংলাদেশি কত শত-হাজার কোটি টাকায় এভাবে নাগরিকত্ব কিনছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান জানা যায়নি। অবৈধ পথে ব্যয়িত অর্থও অবৈধভাবেই অর্জিত বলেই টাকাটা তাঁরা দেশে রাখা নিরাপদ মনে করেননি। রাজনীতিবিদেরা হরহামেশাই পরস্পরের বিরুদ্ধে দেশ বিক্রির অভিযোগ করেন। দেশের অর্থনীতিকে লুট করে বিদেশের নাগরিকত্ব কেনার এই ব্যবসাই হলো ‘দেশ বিক্রির’ আসল ব্যবসা। সম্প্রতি একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত ৪০ বছরের আদমশুমারির গোপনীয় ‘র-ডাটা’ বিদেশিদের কাছে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁর মতো অনেকেই আছেন। শেয়ার মার্কেট, হল-মার্ক, ডেসটিনি, সোনালী ব্যাংকের টাকা আর কোথায় যাবে? এভাবে স্বদেশে ঘুষ-দুর্নীতি-দখলবাজি করে অনেকেই বনে যাচ্ছেন বিদেশের ‘সম্মানিত’ নাগরিক।
তাঁদের জন্যই মালয়েশীয় সরকার ২০০২ সাল থেকে ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচি চালু করেছে। ২০০২ থেকে ২০১০ সাল অবধি কমপক্ষে এক হাজার ৮৬২ জন বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় নাগরিকত্ব কিনেছেন (ডেইলি স্টার, ২৭ এপ্রিল, ২০১২)। গত বছরের হিসাবে তাঁরা প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা মালয়েশিয়ায় নিয়ে গেছেন। বর্তমানে এসব ‘দেশ বিক্রেতা’র সংখ্যা এবং তাঁদের দেশ বিক্রির টাকার পরিমাণ আরও অনেক বেশিই হবে। এভাবে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ ধনী বিশ্বের অংশ হয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের অনেক ধনী পরিবার। বিশেষত, বিগত জরুরি অবস্থার সময়ে চলা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পর দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা ধনিকশ্রেণীর অনেকে একটা শিক্ষা নিয়েছেন: টাকা আর পরিবার দেশে রাখা যাবে না। বিশ্বের বহু দেশেই এভাবে ছড়িয়ে আছে তাঁদের সেকেন্ড হোম। বিশেষ করে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ই টাকা পাচার বেড়ে যায় বলে ইউএনডিপির পূর্বোক্ত সমীক্ষায় দেখা গেছে।
 ‘সেকেন্ড হোম’ সন্ধানীরা যখন অর্থনীতিকে রানা প্লাজা বানিয়ে ফেলছেন, তখন ওই সব রানা প্লাজার তলে চাপা পড়া পোশাকশ্রমিক আর প্রবাসী শ্রমিকেরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আর রপ্তানি-আয় জোগাতে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে চলেছেন। তাঁরাই আশির দশক থেকে বাংলাদেশকে গঠন করছেন, তাঁরাই জাতি গঠন প্রকল্পের প্রধান কারিগর। যখন গ্রাম থেকে সম্পদ ও টাকা শহরে চলে আসার হিড়িক লেগেছে, তখন এই দুই পেশার শ্রমিকেরাই গ্রামে বিপুল পরিমাণ পুঁজির জোগান দিয়ে চলেছেন। পোশাকশ্রমিক বা প্রবাসী শ্রমিক যেখানেই যান নিজের আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর কর্মসংস্থানের চেষ্টা করেন। আর একজন ‘দেশ বিক্রেতা’ যেখানেই যান, দেশের সম্পদ ও সম্ভাবনার সর্বনাশ ঘটান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সবচেয়ে দৃষ্টিগোচর অবদান হলো বাঙালি শাসক ও বাঙালি পুঁজিপতি ধনিকশ্রেণীর উত্থান। কিন্তু এই শাসক পুঁজিপতি শ্রেণীর বড় অংশের আচরণ ঔপনিবেশিক শাসকদের মতোই। ইংরেজরা থাকত এখানে, কিন্তু সম্পদ যেত ব্রিটেনে। পাঞ্জাবি শাসকেরাও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছিল। মধ্যকালে যেসব দেশীয় জমিদার ইংরেজের সুবাদে বাংলার যাবতীয় ভূমির মালিক হয়েছিলেন, তাঁরাও তাঁদের ঘরবিলাস, সন্তান-সঞ্চয় পাঠাতেন ঔপনিবেশিক নগর কলকাতায়। শাসক বাঙালি হলেও এখনো এই ধারা অব্যাহতই আছে। এখনো আমাদের সম্পদে মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর, ব্রিটেন থেকে কানাডা লাভবান হয়। কেবল নিঃস্ব ও নিহত হন বাংলার কৃষক আর তাঁদের বংশধর পোশাকশ্রমিকেরা।
সাভার ট্র্যাজেডির মাসপূর্তিতে সেখানকার কাঁটাতারের বেড়ায় ফুল গুঁজে কাঁদছিল নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা। তারা দেশে থেকেও দেশহীন। এরা অনেকেই ভূমিহীন, অনেকেই চীনা লিংচাওয়ের মতো ঘরহীন। এসব মায়েরা-বাবারা তাঁদের সন্তানদের কবরে শোয়ানোর জন্য লাশ চান, গোরের মাটি চান। তাঁদের বিশ্বাস, যেখানে জন্ম সেখানেই কবর হওয়া উচিত। জন্মমৃত্যুর সেই ভূমিই তাঁদের দেশ। ফুলবাড়ীর কৃষকদেরও খনির জন্য জমি ছাড়তে না চাওয়ার বড় যুক্তি ছিল, এই মাটিতেই বাপ-দাদার কবর আর শ্মশান; ‘এই মাটি হামরা ছাড়বেক লয়’। কিন্তু সেকেন্ড হোমওয়ালাদের মাটির দরকার নাই, তাঁদের দরকার দেশ ও মানুষকে লুটে বড়লোক হওয়ার সুযোগ। বেগম পাড়ার সাহেবরা তাই বছরের বেশির ভাগটা সাবেক ব্রিটিশদের মতো, সাবেক জমিদারদের মতো, সাবেক পাঞ্জাবি শাসকদের মতো দেশেই কাটান। টাকা বানাবার মেশিন চালু রাখেন। তাহলেও এই দেশ এখন আর তাঁদের শেষ ঠিকানা নয়, প্রয়োজন ফুরোলে তাঁরাও চলে যাবেন, যেমন চলে গেছে ব্রিটিশ আর পাকিস্তানিরা।
কিন্তু এই দেশ যাঁদের প্রথম ও শেষ ঠিকানা, দ্বিতীয়ঠিকানাধারীদের কবল থেকে দেশ বাঁচানো তাঁদের জন্যফরজ। সরকার ও বিরোধীদল উভয়ই যখন বিরাট জাতীয়তাবাদী, তখন শক্ত খোলের মধ্যে থাকা সুবিধাবাদী কচ্ছপেরা লাই পাচ্ছে কেন?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ওলেখক।
farukwasif@yahoo.com

ইইউরহুমকি

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রম অধিকারের পদ্ধতিগত লঙ্ঘনের অভিযোগে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা বাতিলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে হুমকি দিয়েছে, তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি খোলা দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। তবে এবার মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। এই আশঙ্কা অমূলক নয় যে ইউরোপীয় কমিশন তদন্তে নামলে তারা কেবল বিজিএমইএ নয়, শ্রম অধিকারের পদ্ধতিগত লঙ্ঘনে সরকারকেও অভিযুক্ত করতে পারে। তুলনামূলক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইইউর জিএসপি (অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা) সুবিধা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইইউতে রপ্তানি করা ৫৪ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যের সবটাই জিএসপিভুক্ত। সে কারণে ইইউ পার্লামেন্টের প্রস্তাবকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির আসন্ন ব্রাসেলস সফরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সময় বেঁধে দিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে ইউরোপীয় কমিশন তার পার্লামেন্টের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে শিগগিরই তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরেজমিন অনুসন্ধান ও তদন্তে আসবে। তাদের এটা ভালোই জানা আছে যে বাংলাদেশের পোশাকমালিক ও সরকারগুলো সংকটে পড়লে দ্রুত অঙ্গীকার উচ্চারণ করে, এরপর তারা দ্রুত বিস্মৃত হয়। অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, ভবনের নিরাপত্তা, সন্তোষজনক মজুরি ও মানসম্পন্ন কাজের পরিবেশ নিশ্চিতকারী পোশাকশিল্প কারখানার সংখ্যা এখনো উল্লেখযোগ্য নয়। আর এ বিষয়টি প্রধানত নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর। কিন্তু আমরা লক্ষ করি যে এই দুই সংগঠনের প্রভাবশালী সদস্যরা নানাভাবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঠেকায় পড়ে নিতান্ত দায়সারাভাবে তাঁরা কার্যত পরের ইচ্ছা মেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখান। তাঁদের এই মনোভঙ্গি বদলাতে হবে।
শ্রম আইন সংশোধনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ রানা প্লাজা ধসের এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ থাকছে। তবে ধারণা করা যায়, আগে বাংলাদেশ যত সহজে পার পেয়েছে, এবার ততটা ঢিলেঢালাভাবে পার না-ও হতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ইইউ পার্লামেন্টের প্লেনারি অধিবেশনের প্রস্তাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশ এখন আর পোশাকশিল্পে নবীন বা উঠতি কোনো দেশ নয়। তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী রাষ্ট্র। চীনের পরই তার স্থান। পাঁচ হাজারের বেশি কারখানায় প্রায় ৪০ লাখ লোক কর্মরত। উপরন্তু বাংলাদেশের রপ্তানির ৭৫ ভাগই পোশাকশিল্পসংক্রান্ত। তারা আরও স্মরণ করেছে যে, রানা প্লাজার বিয়োগান্ত ঘটনার আগে ২০০৫ সাল থেকে প্রায় ৬০০ পোশাকশিল্পকর্মী অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন।
 এটা লক্ষণীয়, ইইউ পার্লামেন্টের প্রস্তাবে নির্দিষ্টভাবে শ্রম অধিকারের পদ্ধতিগত লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, তারা কেবল রানা প্লাজাই নয়, প্রাণহানির অন্য পর্বগুলোকেও নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। এটা যে তারা শ্রম অধিকারের পদ্ধতিগত লঙ্ঘনের সঙ্গে একসূত্রে দেখছে, তাতে আর সন্দেহ কী।

বর্ষা মানেই জলাবদ্ধ ঢাকা

বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই অস্বাভাবিক আগাম বর্ষণের কবলে পড়েছে দেশ। তবে নিয়মমাফিক ‘স্বাভাবিক’ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রা। শহরের এই জলাবদ্ধতা দূর করতে নানা উদ্যোগের কথা শোনা যায়, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বর্ষায় একই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে নগরবাসী।
গত কয়েক দিনের বৃষ্টি-বাদলে শহরের যে স্থানগুলো তালিয়ে গিয়েছিল, সেই স্থানগুলো শুধু এবারের এই আগাম বর্ষণেই তলিয়ে গিয়েছে, এমন নয়। প্রতিবছরই বর্ষায় এ স্থানগুলো তলিয়ে যায়। পুরান ঢাকা, নতুন ঢাকা অথবা শহরের উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিম যেভাবেই শহরের বিভিন্ন অঞ্চলকে চিহ্নিত করা হোক না কেন, জলাবদ্ধতার কবল থেকে কোনো অঞ্চলই বাদ যাচ্ছে না।
আমরা দেখে আসছি, বৃষ্টি মানেই শান্তিনগর বা বেইলি রোড এলাকা তলিয়ে যাবে পানিতে, যা সহজে নামবেও না। এর কি আসলেই কোনো প্রতিকার নেই? পুরো ঢাকা শহরের পানিনিষ্কাশন-ব্যবস্থাকে একটি কার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত করা নিশ্চয়ই একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। কিন্তু কোনো অঞ্চল বা এলাকা ধরেও তো পরিস্থিতি উন্নতির জন্য কোনো পরিকল্পনা, উদ্যোগ বা লক্ষণ দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি, যা পর্যায়ক্রমে সমন্বিত পরিকল্পনা অংশে পরিণত হতে পারে। এটা স্পষ্ট যে বর্তমানে নগরের যে ড্রেনেজ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা রয়েছে, তা বর্ষার সময়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। পানিনিষ্কাশনের একটি ব্যাপক ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ছাড়া ঢাকা শহরকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত রাখা যাবে না। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এগোতে হবে।
দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের পরিকল্পনার পাশাপাশি সাময়িক উদ্যোগগুলোর ব্যাপারে আরও সক্রিয় হলে পরিস্থিতি সহনীয় রাখা সম্ভব। প্রতিবছর বর্ষার আগে নগরের ড্রেনগুলো পরিষ্কার করার উদ্যোগ দেখা যায়, কিন্তু এ ক্ষেত্রে গাফিলতি ও খামখেয়ালির বিষয়টি দৃশ্যমান। ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে যেসব ময়লা ওঠানো হয়, তা কখনো সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলা হয় না। বর্ষা শুরুর আগেই ড্রেনগুলো যথাযথভাবে পরিষ্কার করে বাধামুক্ত করা গেলে জলাবদ্ধতা এতটা শোচনীয় হোত না।

চি ঠি পত্র

ভোকেশনাল শিক্ষা
বাংলাদেশে যেসব কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ভোকেশনাল উল্লেখযোগ্য। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাক্রমে গত ৫২ বছরে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। শিক্ষকদের পাঠদানে অমনোযোগ, প্র্যাকটিক্যালে অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও সরকারের নজরদারির অভাবে এ প্রতিষ্ঠান থেকে দক্ষ কারিগরের বিপরীতে শুধু সনদধারী কারিগর বের হচ্ছেন। সেসব কারিগর বেকারত্ব দূর করার পরিবর্তে সমস্যা সৃষ্টি করছেন। দেশের উন্নতির জন্য কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু সেই শিক্ষা হতে হবে প্রকৃত কারিগর তৈরির শিক্ষা। এ প্রতিষ্ঠানের দিকে লক্ষ করলে আরও অনেক ধরনের ত্রুটি দেখা যায়। যেমন: উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বইয়ের সংকট, প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য, যন্ত্রপাতির অভাব, যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলো সেকেলের ইত্যাদি। সবকিছু বিবেচনা করলে এ প্রতিষ্ঠান সেকেলেরই মনে হয়। কিন্তু একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজন অপরিসীম। এ শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নসহ শূন্য পদগুলোয় খুব দ্রুত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই কর্তৃপক্ষের কাছে।
মো. জাকারিয়া রাফি, মেছড়া, সিরাজগঞ্জ।
ভূত এফএম
মানুষকে বিনোদন দেওয়া মানে এই নয় যে, তার জীবনটাকে একটা অন্ধবিশ্বাসের জায়গায় দাঁড় করানো। ইট, কাঠ, পাথর, বিদ্যুৎ আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে ভূত নামক কিছু আছে, এটা মেনে নেওয়া যতটা কঠিন একটা কোমলমতি হূদয়ে ভয় ও ভূত নামক একটা একটা বস্তুর অবস্থান তৈরি করা ততটা সহজ। আজ ভূত এফএম নামের যে অনুষ্ঠান রেডিওতে প্রচার করা হয়, তা দেশের অগণিত মানুষ শোনে, যার বেশির ভাগই শিশু-কিশোর। শুধু শুনলেই চলত, কিন্তু এর প্রতি অন্ধবিশ্বাস বাস্তব জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ভূত এফএম শুনে অনেকে তা বিশ্বাস করছে অন্ধভাবে।
ভূত এফএমে যেস ঘটনা শোনানো হয় তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো সুফল বয়ে আনবে না। বরং শিশু-কিশোরদের মধ্যে একধরনের ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
কাজী আসিফ মোস্তফা, ঢাকা।

অ্যাভন-তীরেতিনি

এযাবৎ ধর্মগ্রন্থ ছাড়া ইংরেজি ভাষায় সর্বাধিক যাঁর উদ্ধৃতি ব্যবহূত হয়েছে, তিনি শেক্সপিয়ার। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ। ইংরেজি ভাষার লেখকদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন ইনি আর বাংলা ভাষার তিনি। ব্যাপারটা এই যে, বিলেতের সাহিত্য বললেই মনে হয় শেক্সপিয়ারের কথা আর ভারতীয় সাহিত্য বললে রবীন্দ্রনাথ। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এই বিলেতের তীর্থ স্ট্র্যাটফোর্ড আপন অ্যাভন আর ভারতে শান্তিনিকেতন।
শেক্সপিয়ারের দেশে থাকি বলেই সেখানে যাওয়ার নানান ছুতো খুঁজি।  কিন্তু যাওয়া এত সোজা নয়। ট্রেনে লন্ডনের মার্লিবোন স্টেশন থেকে ব্রিটিশ রেলে উঠলে লাগে কেবল জার্নি টাইমই আড়াই ঘণ্টা। শেক্সপিয়ারের জন্মস্থান দেখতে গিয়েছি তিনবার। কিন্তু এখনো ঘোর কাটল না।
১৯৭৬ সালে প্রথমবার। সেবারই প্রথম বিলেতে বেড়াতে এসে বুশ হাউসে বিবিসি রেডিওর বাংলা বিভাগে কদিন ফ্রিল্যান্স কাজ করছিলাম, শ্যামল লোধের সঙ্গে। কঠিন কঠিন সব ঐতিহাসিক জিনিস অনুবাদ করে পড়তাম। সেবারই উইন্ডসর প্রাসাদের রাজকীয় খুনাবলি পড়তে পড়তে মন চলে যাচ্ছিল শেক্সপিয়ারের সময়ে! আর হাতের কাছেই অ্যাভন। আমরা দুই বোন তাদের স্বামী ও বাচ্চাদের পথে সড়কপথে চলে গেলাম শেক্সপিয়ারের জন্মগ্রামে। নদীর পাড় এমনভাবে বাঁধানো হয়েছে, যেন ঘাটলা। নিচু নিচু ছাদের চুনকাম করা কালো কাঠের বিমে আটকানো সাদা সাদা বাড়িগুলো দেখলাম, গা কাঁটা দিল। দূর থেকে মনে হচ্ছিল, সাদা সনেটগুচ্ছ। ওপর আর নিচতলা—আট আর ছয়ে ঠিক বসে আছে। ভাবাবেগের চূড়ান্ত আর কি!
তখন টিকিটের দাম বেশি ছিল না। ভিড়ও ছিল না ভয়ানক। দর্শনীয় সবকিছুরই খুব কাছে যাওয়া যেত। দেখা যেত শেক্সপিয়ারের আঁশ ও আঁচড়। এক জায়গায় দেখি, গুটি কয়েক পাগল দর্শনার্থী গার্ডের চোখ এড়িয়ে কাচের জানালায় চুলের কাঁটা ও ক্লিপ দিয়ে স্ক্র্যাচ করে নিজের নাম লিখে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। সেখানে অনেক আঁকিবুঁকি। কত বছর ধরে এ দুষ্টুমি চলছে, কে তা জানে!
দ্বিতীয়বার গিয়ে আর কাছে যেতে পারি না। কিন্তু যখন কাঠের বিছানার পাশ দিয়ে যাচ্ছি—যেটার নিচে টানা এক ট্রের মতো দড়ির খাটে তাঁর সঙ্গে অন্যান্য বাচ্চাকে বেঁধে শোয়ানো হতো—আমি আবার লুকিয়ে একটু ছুঁয়ে নিলাম। হে কবি, একবার শুধু একবার আমার মগজে ভর করো। একটি সনেট কবি শুধু একটি কালজয়ী কবিতা...। তবু গার্ড ছুটে এল। অচিরে এখানেও ব্যারিকেড দেওয়া হবে। এবার গেলাম মাত্র কদিন আগে, গত মাসে আবার শেক্সপিয়ার বার্থ প্লেস ট্রাস্ট আয়োজিত রবীন্দ্রনাথের নোবেল বিজয়ার্জনের শতবর্ষ উদ্যাপনে। সেই শতবর্ষ আগে ১৯১৩ সালে তিনি পেয়েছিলেন নোবেল। তিনি ছিলেন প্রথম এশিয়ান, যিনি এই বিরল সম্মান পান। তার মাত্র এক বছর আগে ১৯১২-তে গীতাঞ্জলিসহ আরও কিছু কবিতার নিজস্ব অনুবাদে ‘সং অফারিংস’ নামকরণ করে সে পাণ্ডুলিপি হাতে জোব্বা পরে কবি ঘুরেছেন লন্ডনের এ-মাথা থেকে ও-মাথা। একপর্যায়ে তো চ্যারিংক্রস স্টেশনে তা ট্রেনে হারিয়েও ফেলেন। ভাগ্যিস, তখনো বিলেতের ‘লস্ট লাগেজ’ ব্যবস্থাপনা ছিল! তাই তা আবার পাওয়া গেল। সেবারই কবি উইলিয়াম বার্টলার ইয়েটসের সঙ্গে তাঁর আলাপ-আলোচনা আর ইয়েটসের এ ভিনদেশি কবির প্রতি মুগ্ধতা গজায়। বোধ করি, সেবারই ম্যাকমিলান থেকে তাঁর কবিতা সংকলন বেরোয়। নোবেল পাওয়ার পর তাঁর পরিচিতি, খ্যাতি ও বিদেশভ্রমণ সব বিশ্বমাত্রা স্পর্শ করে। তাঁর সৃষ্টিকর্মে বিদেশি বিজ্ঞানী, লেখক, চিন্তাবিদ, কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের প্রণোদনা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। গীতাঞ্জলি বিভিন্ন সম্পাদনায় সারা বিশ্বে পৌঁছে যায়।
আমরা বসে ছিলাম বাগানে কাঠের বেঞ্চে জ্যোতি বসুর দেওয়া রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ স্থাপত্যের বাঁয়ে। বাতাসে চেরি ব্লসমের গোলাপি পাপড়িগুলো উড়ে উড়ে আমার চুল বেয়ে শাড়িতে পড়ছিল, আমি চোখ বুজে বাতাসে দুজনেরই দাগ দেখতে পাচ্ছিলাম।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক অপূর্ব সংশ্লেষ। কথাটা ২০১১ সালে লিখেছিলেন ইংল্যান্ডের দ্য গার্ডিয়ান-এর সাহিত্য সম্পাদক ইয়ান জ্যাক (রবীন্দ্রনাথ জানুয়ারি ২০১৩, সম্পাদক পূর্ণেন্দু মিত্র)। মনে হলো, বিশ্বকবি যেভাবে বৈশ্বিক চেতনা ধারণ করে তাঁর মর্মবাণী প্রতিনিয়ত বাংলায় প্রতিফলন করেছেন, তাতে একমাত্র শেক্সপিয়ারের কথাই মাথায় আসে। আবার রচনা ও ব্যক্তিত্বের বহুমাত্রিকতার কথা ভাবতে গেলে তখন তিনিই অনন্য হয়ে দাঁড়ান। তাঁর কর্ম ও সৃষ্টি ছিল সারা পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতির এক বিরল প্রমাণ, যা কিনা দেড় শ বছরেও এতটুকু ক্ষয় হলো না।
ভারতের হাইকমিশনার, বাংলাদেশের হাইকমিশনার এবং স্থানীয় মেয়র মিলেই তাঁর শুরুটা হলো বাগানে। ভারতের হাইকমিশনার উদ্বোধন করলেন অনুষ্ঠানের আর পরে ভেতরে উলফসন হলে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিজারুল কায়েস মোড়ক উন্মোচন করলেন চ্যানেল আই ও সুরের ধারার গীতবিতানের দুই হাজার ২২২টি গানের সিডির। বাগানে অভি ও কাবেরী চ্যাটার্জির ধারাবর্ণনার সঙ্গে সে সময়ের পোশাকে সজ্জিত শেক্সপিয়ার বার্থ প্লেস ট্রাস্টের শিল্পীরা পাঠ করছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ। তাঁদের পোশাক, চুল আটকানোর স্টাইল, পায়ের জুতা—সবই যেন সেই শতাব্দীর। তিনি জন্মেছিলেন ১৫৬৪ আর মারা যান ১৬১৬-তে কিন্তু একই দিনে ২৩ এপ্রিলে।
আজ যেখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ স্থাপত্য ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে, সেখানে তিনিও কি দাঁড়িয়েছেন হাতে জোড়াতালি দেওয়া নতুন নাটক নিয়ে! কিন্তু তিনি কি কখনো ভেবেছেন, কয়েক বছর নয়, কয়েক শতাব্দী পর এখানেই আরেক মহাকবির কবিতা পঠিত হবে! তাঁরই বাগানে, তাঁর কথা স্মরণ করে উদ্যাপিত হবে আরেক বিশ্বকবির নোবেল বিজয়ের শতবর্ষ অনুষ্ঠান!
আন্তর্জাতিক এ মোড়ক উন্মোচনের আগে সাহিত্যবোদ্ধা ও শিল্পরসিক বাংলাদেশের হাইকমিশনার রবীন্দ্রনাথ ও শেক্সপিয়ারের সৃষ্টি নিয়ে যে বক্তব্য দিলেন, তাতে হেনলি স্ট্রিটের সব অতিথি মুগ্ধতার আবেশে কিছুক্ষণ নিঃশব্দ হয়ে রইলেন। তিনি ট্রাস্টকে আরও উপহার দিলেন বাংলাদেশের চিত্রশিল্পীদের আঁকা অ্যাচিংয়ের এক শয়ের একটি।
কবিগুরুর সূত্র ধরে শেক্সপিয়ারের গ্রামে আঁকা হলো বাংলাদেশের নাম।
শামীম আজাদ: কবি ও কলাম লেখক।
shetuli@yahoo.com