Friday, May 31, 2013

শাপলা চত্ত্বরের শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে দিব নাঃ আল্লামা শফী by আবু তালেব

যেভাবে সারা দেশের মানুষ আল্লাহর দ্বীনের ইজ্জত রাক্ষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, শহীদ হয়েছেন, আঘাত পেয়েছেন, আল্লাহ তাআলা নিশ্চয় দেখেছেন। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে আইন-শৃংঙ্খলা বাহীনির হাতে এদেশের উলামায়ে কেরাম ও তৌহিদী জনতা দেশের জন্য শহীদ হয়েছে,

রাজশাহীতে চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ২০ এমপির দিনভর বৈঠক by জিয়াউল গনি সেলিম

রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে শুক্রবার দিনভর রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন সরকারের চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ অন্তত ২০ এমপি। দুপুরে নগরীর অদূরে হরিয়ানে অবস্থিত রাজশাহী চিনিকলে রাজশাহী বিভাগীয় আওয়ামী লীগের যৌথসভার ব্যানারে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

আইন লঙ্ঘন করে প্রচারণা: তামাক কোম্পানিগুলোর শাস্তি দাবি

তরুণ প্রজন্মকে মরণঘাতী নেশা থেকে দূরে রাখতে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রতারণামূলক প্রচারণা বন্ধ ও তাদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন দেশের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবিদগণ। শুক্রবার বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত গোলটেবিল সভায় বক্তারা উপরোক্ত দাবি জানান।

বিএনপির আটক এমপিদের মুক্তি দেওয়া উচিত: নাসিম

আটক থাকা বিএনপির সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ না থাকলে তাদের মুক্তি দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম।

প্রসঙ্গ তারেক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাইলো বিএনপি

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান কখন কোথায় কি মুচলেকা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের কাছে তার ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএনপি। শুক্রবার সন্ধ্যায় দলের এক সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ব্যাখ‍া দাবি করেন।

খোঁড়াখুঁড়ি, নগরজুড়ে দুর্ভোগ by উৎপল রায়

বর্ষার শুরুতে নগরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি। জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ। এটি যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছরই বর্ষার শুরুতে এমন চিত্র দেখা যায় রাজধানীতে। সর্বশেষ কয়েক দিনের বৃষ্টিতে রাজধানীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার মূলেও অনেকটা দায়ী ছিল এমন খোঁড়াখুঁড়ি।

যা ভাবছে হেফাজত by আহমেদ জামাল ও মহিউদ্দিন জুয়েল

৫ই মের ক্র্যাকডাউনের পর থেকেই নীরব আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ওই ঘটনার পর থেকে বক্তব্য-বিবৃতি ছাড়া কোন কর্মসূচি দেয়নি সংগঠনটি। ৬ই এপ্রিল ঢাকায় লংমার্চ পরবর্তী সমাবেশে ব্যাপক সমাগমের পর আলোচনায় আসে এই সংগঠনটি।

কেমন আছেন বাবুনগরী by নূরুজ্জামান

বারডেম হাসপাতালের আইসিইউতেই চিকিৎসাধীন আছেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী। তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

মহাজোট যেন কাগুজে! by মহিউদ্দিন মাহমুদ

কাগজ-কলমে সীমিত হয়ে পড়েছে মহাজোটের কার্যক্রম। সরকারের শরিক হয়ে থাকলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ও  জোটগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মহাজোটে জাতীয় পার্টিকে (জাপা) এখন অদৃশ্যই বলা চলে।

সিটি নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করছে বিএনপি-জামায়াত: ১৪ দল

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বিএনপি জামায়াত ধর্মকে ব্যবহার করেছ বলে অভিযোগ করেছে ১৪ দল। আজ বিকালে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন ১৪ দল নেতারা।

তামাকের রাস্তায় আমাদের নারী by মোমিন মেহেদী

৩১ মে বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস,তবে দিবসটি পালিত হবে ১১ জুন। তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিশ্বের ১৭৬টি  দেশে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালিত হবে। অন্যসব দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হবে। তবে তামাকমুক্ত দিবস শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় বাংলাদেশে ১১ জুন এই দিবস উদযাপন করা হবে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো 'তামাকের সব বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ।

তামাক হলো মাদকের প্রথম স্তর। আমরা দেখি যে, সিগারেট অথবা বিড়ি দিয়ে মাদকদ্রব্যের সাথে পরিচিতি ঘটে মানুষের। এরপর ধারাবাহিকভাবে গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবা, মদ, হেরোইন, প্যাথোডিন, মরফিনসহ বিভিন্ন স্তরের মাদকে আশক্ত হয় আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এক্ষেত্রে সবার আগে সবচেয়ে যে বিষয়টি ক্ষতি বেশি করে, সে বিষয়টি হলো- পরিবারের বাবা, বড় ভাই, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক, ছাত্র রাজনীতির নেতা বা বখাটে অগ্রজ, পাড়া বা মহল্লায় এলাকার মুরুব্বীদের তামাকদ্রব্য ব্যবহার। তারা যখন ৮ থেকে ১৮ বা ২০ বছর বয়সী একজন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধির সামনে নির্বিঘে ধুমপান করেন, তখন নতুন প্রজন্মের ঐ প্রতিনিধি ভাবে যে, আমার বাবা, বড় ভাই, শিক্ষক বা মুরুব্বীরা যেহেতু ধুমপান করছে, আমিও একটু দেখিতো কেমন এর স্বাদ।
খেলে কি হয়? আর সেই যে স্বাদ নেয়ার জন্য শুরু হয়; আর থামে না মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন প্রচারও একটা বড় ক্ষতির দিক বলে মনে করি আমি। পাশাপাশি সরকারের উদাসিনতাতো রয়েছেই। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, একটা বিল পাশ করে। তারপর সেই পাশ করা বিল সংশ্লিষ্ট আইনগুলো পরবর্তী সরকার এসে বাতিল করে।
বিশেষ করে বললে বলা যায় ‘প্রকাশ্যে ধুমপান করলে জরিমানা’ আদায়ের কথাই। এই আইন চালু হওয়ার পর দেশে প্রকাশ্যে ধুমপান কমেছিলো। কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার এসে সেই আইনকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। যে কারনে বেড়ে যায় ধুমপান, মদপানসহ বিভিন্ন নেশাদ্রব্য প্রকাশে সেবনের রীতি।
এভাবে বাংলাদেশকে কোন সরকার খেলার পুতুল হিসেবে ব্যবহার করবে বলে দেশ স্বাধীন করেনি বাংলার দামাল ছেলেরা। তারা চেয়েছিলেন নতুন করে দেশ গড়তে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সেই দেশ গড়ার প্রতি লক্ষ্য না দিয়ে নিজেদের আখেড় গোছানোর জন্য নিবেদিত থাকেন সবসময়।
এমতবস্থায় আমাদেরকে, সাধারন মানুষদেরকে কষ্ট করে হলেও কাজ করতে হবে। কেননা, সবার আগে দেশ । দেশের জন্য নিবেদিত থাকলে তামাকমুক্তই শুধু নয়; দেশ হবে মাদকমুক্ত, ধর্ষণমুক্ত, খুনমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত। কেননা, একটি জরিপে দেখা গেছে যে, মাদক-ই হলো সকল সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের উৎস।
বলা হয়ে থাকে যেখানে উন্নত বিশ্বে তামাক সেবনকারীদের সংখ্যা দিন দিন কমছে, সেখানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে।
কারন হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি ও সমাজনীতি নিয়ে এগিয়ে চলার সূত্র ধরে আমার কাছে যে বিষয়টি বারবার ধরা পড়েছে, সে বিষয়টি হলো- তামাকজাতদ্রব্য থেকে শুরু করে প্রায় সকল মাদকদ্রব্যই বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে সুলভে পাওয়া যায় আমাদের এই বাংলাদেশে। সুলভে তামাকদ্রব্য-মাদকদ্রব্য এজন্য পাওয়া যায় যে, আমাদের রাজস্বখাতে তামাক ও মাদকদ্রব্যের ভ্যাট সবচেয়ে কম।  যে কারনে নতুন করে যখন গবেষণা করা হয়, তখন গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সারভে (গ্যাটস) ২০০৯-এ প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠী শতকরা ৪৩.৩ ভাগ লোক তামাক ব্যবহার করে।
শতকরা ২৩ ভাগ লোক ধোঁয়ামুক্ত এবং ২৭.৩ ভাগ লোক ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো শতকরা ৬৩ ভাগ লোক কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৪ সালের এক গবেষণা মতে, তামাক ব্যবহারের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫৭ হাজার মৃত্যুবরণ করে এবং ৩ লাখ ৮২ হাজার লোক পঙ্গুত্ববরণ করে। 'জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বর্তমান সরকার ২০০৫ সালে প্রণীত আইনকে আরো শক্তিশালী করেছে। ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ২০১৩ আইন সংশোধন করা হয়।
বর্তমান সরকার পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জন্য জরিমানা ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করেছে। এই যে আইন করা হয়েছে, সেই আইন মানার মত লোক না সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে পাওয়া যাবে, না প্রশাসনে।
যদিও তামাক নিয়ন্ত্রণে জেলা-উপজেলায় টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে সিভিল সার্জন এবং জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এমন একটি সময়ে আমরা এসে উপনীত হয়েছি, যেই সময়ে আমাদের জীবনের নিরাপত্তাই সরকারের কাছে নেই। সেখানে মাদকমুক্ত করতে হলে দেশে যে শক্তিশালী প্রশাসনিক কঠোরতা তৈরি করতে হবে, তা অন্তত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের শাসনামলে সম্ভব নয় বলেই আমার বিশ্বাস।
অবশ্য এক্ষেত্রে আমরা সাধারন জনতা যদি সচেতন হই, গড়ে তুলি সচেতনতার রাস্তা; সেক্ষেত্রে একটা রেজাল্ট পাওয়া যেতে পারে।  যতদূর মনে পড়ে এর আগে এক বছরের তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল জেন্ডার এবং তামাক। তখন নারীদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তামাক-বাজার থেকে এবং তামাক পান থেকে নারীদের বিরত রাখা ও সুরক্ষার জন্য জোর তাগিদ জানানো হয়।
তামাকের ব্যবসায়ীরা অবিরাম সন্ধান করছেন নতুন তামাক-ব্যবহারকারীদের, যাঁরা তামাক পান ও সেবন ছেড়ে দিচ্ছেন তাঁদের স্থান পূরণের জন্যই এই আগ্রাসী অনুসন্ধান। এসব তামাকসেবী অকালে মৃত্যুবরণ করতে পারেন হার্ট অ্যাটাক, ক্যানসার, স্ট্রোক, এমফিসিমা ও তামাক সেবন থেকে উদ্ভূত অনেক রোগে; অথচ ব্যবসায়ীদের বাজার সম্প্রসারণের আগ্রহ মোটেও কমেনি। নানা প্রলোভনের জাল বিস্তার করে তাঁরা বাজারকে আরও বাড়াতে চাইছেন।
তামাকশিল্পের মালিকেরা খুঁজছেন নতুন সুযোগ, তাঁদের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো নারী। কারণ, পুরুষের চেয়ে অনেক কম নারী ধূমপান করেন বা তামাক চেবান। যেখানে তামাক সেবন করে ৪০ শতাংশ পুরুষ, সেখানে নয়শতাংশ নারী তামাক সেবন করে।
বিশ্বের ১০০ কোটি তামাকসেবীর মধ্যে মাত্র ২০০ মিলিয়ন নারী। তাই তামাক-বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকদের নতুন লক্ষ্য নারী-ধূমপায়ী তৈরি করা।
আরেকটি কথা, কোনো কোনো দেশে যখন পুরুষ-ধূমপায়ীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে, সেখানে তখন বাড়ছে নারী-তামাকসেবীর সংখ্যা। বিশ্বজুড়ে তামাক সেবনের যে চিত্র, এর মধ্যে নারী-তামাকসেবীদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠছে।
১৫১টি দেশে তরুণদের মধ্যে তামাক সেবনের যে সমীক্ষণ করা হয়েছে, এর মধ্যে অর্ধেকই তরুণী। কোনো কোনো দেশে তরুণদের চেয়ে তরুণীরা বেশি ধূমপান করে।
যেমন টিনএজাররা ধূমপান শুরু করে, পূর্ণবয়স্ক হলে চেইন স্মোকারে পরিণত হয়।
প্রতিবছর তামাক ব্যবহারের জন্য পৃথিবীতে মৃত্যুবরণ করে ৫০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে নারী ১৫ লাখ। জরুরি ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালে তামাক সেবনের কারণে মৃত্যুবরণ করবে ৮০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ২৫ লাখ নারী। এ কারণে নারীমৃত্যুর আনুমানিক তিন-চতুর্থাংশ ঘটবে নিম্ন-আয় ও মধ্য-আয়ের দেশগুলোতে। এসব অকালমৃত্যুর প্রতিটিই প্রতিরোধযোগ্য।
কোনো কোনো দেশে, অন্যদের ধূমপান, বিশেষ করে পুরুষ-ধূমপায়ীর সিগারেটের ধোঁয়া সেবন করে বেশির ভাগ নারী ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। যেমন, চীন দেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রায় সবাই পুরুষ-ধূমপায়ী, নারীরা এদের সিগারেটের ধোঁয়া সেবন করে পরোক্ষভাবে, অথচ চীনে তিন শতাংশের কম নারী ধূমপান করে। এই সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোক বা অন্যের ধূমপানের জন্য ধোঁয়া সেবন করে পৃথিবীজুড়ে ছয় লাখ লোকের মৃত্যু ঘটছে, এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ নারী।
বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০১০, তামাক বাজারজাতকরণ ও তামাক সেবন নারীদের যে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে সেদিকে দৃষ্টিপাত করেছে। একই সঙ্গে যেসব নারীর সঙ্গে তাঁরা থাকেন বা বসবাস করেন, সেসব পুরুষকে নারীদের সামনে ধূমপান থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত বিশ্ব জনগোষ্ঠীর মাত্র নয় শতাংশ তামাকের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধের আওতায় রয়েছে। নারীরা এখন বড় ঝুঁকিতে। এখন সময় কাজ করার। নারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনের জাল বিস্তারে রত তামাকের ব্যবসায়ীরা। নারীরা ক্রমেই অর্থনৈতিকভাবে সবল ও মুক্ত-স্বাধীন হচ্ছে, এতে তামাক সেবনে অর্থ ব্যয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, এও একটি কারণ।
তামাক কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো নিম্ন-আয় ও মধ্য-আয়ের দেশগুলো। সেখানে নতুন নারী-ধূমপায়ী বেশি। অনেক দেশে ‘সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোক’ থেকে জনগণের সুরক্ষার বিধিবিধান নেই। অনেক নারী এই ক্ষতিকর দিকের কথা জানেও না। নারীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের প্রভাবও পুরুষের চেয়ে একটু ভিন্ন। এমনও দেখা গেছে, তামাকের বিজ্ঞাপনে ধূমপান করাকে নারী মুক্তির উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা অথবা ক্ষীণাঙ্গী থাকার উপায় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
এ ধরনের বিজ্ঞাপন বা প্রচার অনেক সময় প্রলুব্ধ করে নারীকে। ধূমপায়ী বা তামাকসেবী নারীদের মধ্যে বন্ধ্যত্ব এবং দেরিতে সন্তানসম্ভবা হওয়ার আশঙ্কা বেশি। গর্ভধারণকালে ধূমপান করলে অকালপ্রসব, মৃতশিশু প্রসবের ঘটনা ঘটে বেশি। কমে যায় স্তনের দুধক্ষরণও। ধূমপানে নারীদের সার্ভিক্সের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, বাড়ে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও। অনেক তামাক-নিয়ন্ত্রণ কৌশলের মধ্যে যেসব নারী তামাকপাতা, গুল, জর্দা চেবান, তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ধূমপায়ীর মতো তাঁরাও সমভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
অতএব, বাংলাদেশের আগামীকে কালো থেকে আলোকিত করতে তৈরি হতে হবে সবাইকে। তৈরি হতে হবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে। যারা শাহবাগ থেকে সারাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, তারা অবশ্যই চাইলেই পারবে বাংলাদেশ থেকে তামাক এবং মাদকদ্রব্যের অবাধ ব্যবহার বন্ধের জন্য নিবেদিত থেকে সচেতনতা তৈরি করতে। এই কাজটি যদি নতুন প্রজন্ম প্রত্যয়ের রাস্তায় এগিয়ে এসে করে, তাহলে এখন যেমন যুদ্ধাপরাধীমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ চলছে, ঠিক তেমন তামাক ও মাদকমুক্ত দেশ গড়ার কাজ চলবে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত।
শ্লোগান উঠবে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া/তামাক-মাদক দে তুলিয়া/ দেশ হবে নেশামুক্ত/ সমাজ হবে পেশাযুক্ত/ সবাই হবে কাজের লোক/ দেশটা নেশা মুক্ত হোক।

কাঠমিস্ত্রি থেকে মেয়র কামরান! by আহমেদ রাজু

সিলেটের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের উত্থান রূপকথার মতোই। কর্মজীবনের শুরুতে ভাগ্যান্বেষণে তিনি মধ্যপ্রাচ্য গিয়েছিলেন। মুরগির খামারে শ্রমিক ও কাঠমিস্তির কাজ করতেন।

চার সিটি নির্বাচনে ১১২ গিন্নি মাঠে by মাজেদুল নয়ন

বাংলায় বধূ শব্দের প্রতিশব্দ স্ত্রী, পত্নী, অর্ধাঙ্গিনী, দার, জায়া, গৃহিণী, গিন্নি। আর বাংলার এই বধূ আর গিন্নিরাও এবার জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আসন্ন চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে।

বিষয় পুরনো by সাজেদুল হক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিই তিনি ব্যতিক্রম। সমালোচিত-আলোচিত। তার বই নিয়েও বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ‘এ স্টাডি অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ’ নামের বইটি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে এই যা নতুন।

মা-মেয়ের এক স্বামী

মা ও মেয়ের একজনই স্বামী! তা-ও এই বাংলাদেশে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই খবরটি এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বহুল প্রচারিত। মা’র নাম মিত্তামোনি। তিনি এখন ৫১ বছর বয়সী। তার মেয়ে ওরোলা ডালবোট।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি কথা রাখবেন?

রাজধানীতে সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা কত দিন চলবে, সে ব্যাপারে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে বিষয়টি আলোচিত হলেও কোনো সুপারিশ করা হয়নি। সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯ মে ঢাকা শহরে এক মাস সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকবে বলে ঘোষণা করেছেন। সংঘাত-সহিংসতা ও নাশকতা রোধ করতেই এ ধরনের ব্যবস্থা বলে জানানো হয়েছে। এক মাসের জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হলে আগামী ১৯ জুন এই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু সংসদীয় কমিটির সভার পর মনে হচ্ছে, অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এটা ঠিক যে সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী দলগুলোর সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে নজিরবিহীন সন্ত্রাস ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ঘোষিত কর্মসূচির সময় যেমন এ সহিংসতা ঘটেছে, তেমনি কর্মসূচির বাইরেও চোরাগোপ্তা হামলা ও সহিংসতা হয়েছে। সভা-সমাবেশ বা কর্মসূচি আহ্বানকারী দলগুলো এসব সংঘাত ও সহিংসতার দায় এড়াতে পারে না। যে রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী সভা-সমাবেশ বা কর্মসূচি দিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে তা পালন করা এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সেই দল বা গোষ্ঠীর দায়িত্ব। গত কয়েক মাসে দেখা গেছে, রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই সংঘাত-সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা। হরতালের ঘোষণা দেওয়ার পর গাড়িতে আগুন লাগানো বা হরতাল পালনে বাধ্য করার জন্য হরতালের দিন যানবাহনের ওপর আক্রমণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের সংঘাত-সহিংসতা বন্ধ করার পথ কি সভা-সমাবেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে রাখা? আমরা মনে করি, এ ধরনের সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক এবং এভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে। সরকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু হরতালের মতো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে সেই একই রকম সহিংস কায়দায়। রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক বা যারাই সংঘাত-সহিংসতা করুক, তা ফৌজদারি অপরাধ। যারা এ ধরনের অপরাধ করছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির মুখোমুখি করাই সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ। এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের উচিত রাজনৈতিক বিচার-বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর হাতে এ ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কোনো নাশকতা হবে না, এমন প্রতিশ্রুতি দিলে যে কাউকে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি তাঁর কথা রাখবেন কি না? তাঁকে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র এবং সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা একসঙ্গে চলতে পারে না। আমরা আশা করব, সরকার অবিলম্বে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে এবং যেকোনো সংঘাত-সহিংসতা প্রয়োজনীয় আইনি পথেই সামাল দেবে। অন্যদিকে, সংঘাত-সহিংসতার পথ ছেড়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধী পক্ষ তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সভা-সমাবেশ করবে, সেটাই প্রত্যাশিত।

তৃণমূলে শাস্তির বিধান

তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রসারিত করা না গেলেও দুর্নীতির তৃণ-মূল্যায়ন মোটামুটি সম্পন্ন। প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ৩০ জন জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন আর অর্থবরাদ্দ বন্ধ হয়েছে ১১২টি ইউনিয়নে। প্রমাণিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সব সময়ই ইতিবাচক ঘটনা। কিন্তু তৃণমূলের প্রতিনিধিদের দুর্নীতি প্রমাণ করা যত সহজ, যাঁরা ক্ষমতার মগডালে বিচরণ করেন তাঁদের কিছু করা ততটাই কঠিন। স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প (এলজিএসপি) স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি মাত্র প্রকল্প। অথচ এই প্রকল্পেই জনপ্রতিনিধিরা প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কেবল ৩০ জন বরখাস্তই হননি, পাশাপাশি ১১২টি ইউনিয়নে অর্থবরাদ্দ বন্ধ করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতি এতই প্রকট যে সেগুলো লুকিয়ে রাখা যায় না। ইউনিয়ন পরিষদ এলাকাটি এতই ছোট যে কাজ বা অকাজ উভয়ই জনগণের নজরের মধ্যে থেকেই করতে হয়।  কিন্তু যেখানে পরিসর আরও বড়, সংসদীয় আসন বা জেলা বা দেশ; সেখানে অনেক প্রকল্পের ধরন, অর্থের ব্যবহার, প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার আয়োজনের মধ্যে পদে পদে দুর্নীতি ঘটে, কিন্তু সেগুলো প্রায়ই ধামাচাপা পড়ে যায়। পদের ক্ষমতা যত বেশি, সেই পদের দুর্নীতি আলোচিত হওয়ার সুযোগ ততই কম। জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির বিষয়ে প্রথম আলোর গত বুধবারের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন তাঁদেরই সহকর্মী ইউপি সদস্যরা। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে অভিযুক্ত দুর্নীতির ভাগ না দেওয়া কিংবা আরও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কারও দুর্নীতিতে সায় না দেওয়ায় প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বলে অনুযোগ করেছেন। সুতরাং ব্যাপারটা যাতে বড় মাছের ছোট মাছ ভক্ষণ না হয়ে যায়, সেটা দেখতে হবে। ছোট-বড় কোনো দুর্নীতিকেই ছাড় দেওয়া যাবে না। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এই পদক্ষেপ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ অর্থাৎ সরকারের নির্বাহী বিভাগ। এ ঘটনাকে যাতে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে তৃণমূল জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে ব্যবহার করা না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ ও পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ by এম হুমায়ূন কবির

২৬-২৭ মে ঢাকায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় অংশীদারি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স ওয়েনডি শারমেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। অপর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। মার্কিন প্রতিনিধিদলে লক্ষণীয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র দপ্তরের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট (আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়াবলি) হোজে ফার্নান্দেজ, ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট (গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রমবিষয়ক) ক্যারেন হ্যানবেহান ও একই দপ্তরের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট (জ্বালানি) রিচার্ড আইকড। এ ছাড়া ছিল ৩০ জনের একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল। মার্কিন প্রতিনিধিদলের চেহারা দেখলেই বোঝা যাবে এ সংলাপে তাদের নজর কোন দিকে ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একসময় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনের সুবাদে ঢাকায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক চেম্বার আমাকে বিভিন্ন সময় তাদের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। বলা বাহুল্য, আমি সাগ্রহেই তাদের এসব আমন্ত্রণে সাড়া দিই। এবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য হিসেবে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করে অংশীদারি সংলাপের বিজনেস টু বিজনেস অংশে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। এ ছাড়া আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ  (অ্যামচেম) চেম্বারের নেতারা তাঁদের অনুষ্ঠানে যোগদানের আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। এসব সুবিধার কারণে আমি সংলাপের বেশ কয়েকটি সেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ লাভ করি এবং দুই পক্ষের আলোচনার প্রাধান্যের দিকগুলো বুঝে নিতে চেষ্টা করি।
এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা চলে যে তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজা ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি ছিল এবারের সংলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রায় দুই মাসে বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাব নিয়ে বহির্বিশ্বে যে পরিমাণ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা বহু বছরেও দেখা যায়নি। এমন দিন খুব কমই গেছে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো না কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশনে বাংলাদেশের প্রাণহানি ও শ্রমিকদের দুর্দশার কথা প্রচার পাচ্ছে না। এর আগেও মাঝেমধ্যে তেমনটি লক্ষ করা যায়নি তা কিন্তু নয়, তবে এবার যে ব্যাপ্তি ও গভীরতা নিয়ে বিষয়টি আবির্ভূত হচ্ছে, তা অভাবিতই বলা চলে। যাঁরা বাইরের পৃথিবীর খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা বিষয়টির গুরুত্ব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছেন, যদিও দেশে অনেকেই এ ধরনের ঘটনাকে নিয়মিত বা রুটিন প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন।
কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, যার বেশির ভাগ মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেত্রী ওয়েনডি শারমেন ও অন্যরাও জোরালোভাবে উপস্থাপন করে গেছেন। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এমন একটি ধারণা দানা বেঁধে উঠেছে যে আমরা বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি না। হয়তোবা আমাদের কারও কারও বক্তব্য এতে ইন্ধন জুগিয়ে থাকতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, যেকোনো ধারণা তৈরি হতে পারে নানা প্রেক্ষাপট থেকে এবং এর সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের তফাত থাকতেও পারে। যেমন সরকারিভাবে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এমন ধারণাও দানা বেঁধে উঠেছে যে বাংলাদেশে আইন প্রয়োগের বিষয়ে ব্যাপক গাফিলতি রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ অবস্থার উন্নতি হবে তেমন আশা ক্ষীণ। এমনটাও শোনা গেছে যে প্রতিনিধিদল রানা প্লাজার মতো আরও দুর্ঘটনার আশঙ্কাও করেছে, যদিও আমরা কেউই তা চাই না। তৃতীয় যে বিষয়টি তাদের সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে তা হলো নিজেদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও কল্যাণের ব্যাপারে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মতামত প্রদানের সুযোগ না থাকা। বরং তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত তাঁদের মৃত্যুর গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। চতুর্থ বিষয়টি হচ্ছে বিশ্বাসের ঘাটতি। বিভিন্ন উপলক্ষে আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমমান, কর্মপরিবেশ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। তাতে আমাদের বক্তব্যের ওপর তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিটা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন ও ইউরোপীয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে এসেছে এবং পাশ্চাত্য জগতে ভোক্তারা এসব প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য পরিচালনার কৌশল নিয়েও কঠিন কঠিন প্রশ্ন তুলে তাদের তুলাধোনা করছেন। প্রকৃতপক্ষে এ ভোক্তাশ্রেণীর চাপেই এখন বড় বড় ক্রেতা সংস্থাসহ সেসব দেশের সরকারগুলো নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে। আমার বন্ধুদের কাছেই শুনেছি যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বড় বড় ক্রেতা সংস্থাকে ডেকে তাদের কর্মপরিকল্পনা ও কৌশলে আমূল পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে। এটি আমাদের জন্য একটি ভালো খবর এবং একটি যথার্থ ইঙ্গিতও বটে। অন্যদিকে, ক্রেতা সংস্থাগুলোও নিজেদের মতো করে পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা ও শ্রমমান রক্ষার জন্য সচেষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়ালের আওতায় ইউরোপীয় ক্রেতারা এবং অপর দিকে মার্কিন ক্রেতা সংস্থাগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশেও আমরা কিছু কিছু উদ্যোগ লক্ষ করছি। যেমন সম্প্রতি ২০০৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং মন্ত্রিপরিষদ ইতিমধ্যেই খসড়া অনুমোদন করেছে। খসড়াটি এখন জাতীয় সংসদের বিবেচনার জন্য যাবে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির অব্যাহত দাবির মুখে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, অতি দ্রুত এ বোর্ডের সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে এবং তারা যত দ্রুত সম্ভব তাদের রিপোর্ট সরকারের বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করবে। এটিও আশা করা হচ্ছে যে তারা শ্রমিকদের স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখে একটি সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরিকাঠামো প্রস্তাব করবে। রানা প্লাজায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের জন্য সরকার এবং বিজিএমইএ থেকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহ নেই, এতে সাময়িক সহায়তা হয়তো মিলবে কিন্তু পোশাকশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির বিবেচনার আরও একটু গভীর চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। আশার কথা হচ্ছে, এ নিয়ে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন। সে ভাবনাকে শাণিত করার লক্ষ্যে কয়েকটি প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
ক. বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সম্ভাবনা অনেক। গত বছর ম্যাকেঞ্জি রিপোর্টে এ সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পোশাক রপ্তানি করতে পারবে এবং এতে করে আরও তিন মিলিয়ন নারীশ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। সম্ভাবনাটি নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। তবে তা অর্জন করতে হলে অনেক কাজ আমাদের করতে হবে। প্রথমত, শ্রম আইন আধুনিকীকরণ করতে হবে, যাতে ইতিমধ্যেই হাত দেওয়া হয়েছে। তবে এ আইন এখন শুধু আমাদের দেশীয় প্রয়োজনের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকেও দেখতে হবে। কারণ অনেক। যেমন এতে শ্রমিকের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ ও তাঁদের সংগঠনকেও কথা বলার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে এবং তা করতে হবে আন্তর্জাতিক চাহিদার কথা মনে রেখে। এখানে বাধ্যবাধকতাটা আসবে আইএলও এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে। আমরা চেষ্টা করছি আইএলও পরিচালিত বেটার ওয়ার্ক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য। সপ্তাহ দেড়েক আগে আইএলও ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছে শ্রম আইন করার পরই এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণে আবেদন করতে।  মনে হচ্ছে, শ্রম আইনের যথাযথ আধুনিকীকরণ বেটার ওয়ার্ক প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্তির প্রায় পূর্বশর্তের মতো। অতএব শ্রম আইন যথাযথভাবে আধুনিকায়ন না হলে এ পথে অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। তাতে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এর বাইরেও দেশের শ্রমিক ভাই ও বোনদের এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব শ্রমিক সংগঠনগুলোর চোখ তো থাকছেই। অতএব আমরা আশা করছি, জাতীয় সংসদ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবে। আইন বাস্তবায়নের বিষয়টি তো রইলই। এ নিয়ে আমাদের রেকর্ড যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
খ. পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে বিতর্ক চলছেই। কয়েক সপ্তাহ ধরেই পোশাক শিল্পাঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে এ বিষয়কে ঘিরে। যদিও সরকার ইতিমধ্যেই মজুরি বোর্ডের ঘোষণা দিয়েছে, তবুও বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিশ্ব পোশাক বাজারে মোটামুটি কম মূল্যমানের পোশাক সরবরাহকারী দেশ। শ্রমিকের কম মজুরিকে ভিত্তি করেই আমরা এ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু মজুরি বাড়লে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। প্রশ্ন হলো, তাতে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কতটুকু থাকবে। অনেকেই বলেন, আমাদের এ সুবিধা কমে যাবে। কথাটি অনেকাংশেই সত্য। কিন্তু এরই সঙ্গে যা বিবেচ্য বিষয় তা হলো কী করে আমরা আমাদের এ সুবিধা ধরে রাখতে পারব। চীন আমাদের দৃষ্টান্ত হতে পারে। তারা তাদের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে বেশি মূল্যমানের দিকে উঠে এসেছে। আমাদের সে পথেই হাঁটতে হবে। অর্থাৎ কম মূল্য থেকে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে বেশি মূল্যের পোশাক স্তরে উঠে আসতে হবে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে বলা চলে, এটি সম্ভব। তবে এর জন্য যা প্রয়োজন তা হলো আমাদের শ্রমিকের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। এর জন্য প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে শ্রমিকদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ।
গ. প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। শিল্পের প্রয়োজনেই আমাদের তা করতে হবে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী যে সমবেদনা আমরা পাচ্ছি, তা এখনই কাজে লাগানো প্রয়োজন। মার্কিন সরকারসহ অন্য ইউরোপীয় সরকারসমূহ পোশাকশিল্পের উন্নয়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তেমনি আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন: বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, জাইকার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও। ক্রেতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলছে। যদিও তাদের তাৎক্ষণিক মনোযোগ কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ও শ্রম পরিবেশ নিয়ে, তবুও শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আমরা উদ্যোগী হলে তাদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যাবে আশা করি। এ ছাড়া আমরাও আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধির নীতিমালার আওতায় তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুধু যা দরকার তা হলো উদ্যোগ নিয়ে কাজে নেমে পড়া। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে বিজিএমইএ এ কাজে নেতৃত্ব দিতে পারে। প্রয়োজন হলে সুশীল সমাজভিত্তিক বা বেসরকারি খাতে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে।
ঘ. রানা প্লাজা-উত্তর প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক উদ্যোগ তৈরি হয়েছে। এসব নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রশ্ন হলো, যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ঘিরে এত সব উদ্যোগ, সে ক্ষেত্রে আমাদের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু? এটি মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে যে খুব শিগগিরই পোশাকশিল্পের জন্য নিরাপত্তা ও শ্রমমানের বিষয়ে নতুন কাঠামো ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হলো ক্রেতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সরকারের সংশ্লিষ্টতা। তা না হলে আমরা যা পেতে পারি, তাতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি সংরক্ষিত নাও থাকতে পারে। কাজেই দেরি না করে আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতা ও কাঠামোকে ব্যবহার করে প্রয়োজনে সত্বর দর-কষাকষিতে লেগে যাওয়া দরকার। কারণ, পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অংশীদারি সংলাপের আলোকে আমরা বুঝতে পারছি, এ কাজে আমাদের পাশে আমাদের বন্ধুরা আছেন। প্রয়োজনে আমরা তাঁদের সাহায্যও নিতে পারি। যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স ওয়েনডি শারমেন সে ইঙ্গিতই দিয়ে গেলেন কয়েক দিন আগে।
এম হুমায়ূন কবির: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব। বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরসহসভাপতি।

কর্মপ্রত্যাশীর চাপ ও বিসিএসের সোনার হরিণ by মুনির হাসান

দুই হাজার ৫২টি সরকারি কর্মকর্তার পদের জন্য লড়াই শুরু করেছেন মাত্র দুই লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন তরুণ-তরুণী! ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৪ মে। শুধু সংখ্যাধিক্য নয়, পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব, বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অভিযান ইত্যাদি মনে করিয়ে দেয়, সরকারি চাকরি এখন কতটা সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। গেল কয়েক দিন সামাজিক যোগাযোগের সাইটে এই সোনার হরিণের পেছনে ধাওয়ারতদের আক্ষেপ, আকাঙ্ক্ষা আর হতাশার চিত্র দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কয়েকবার করে এই বৈতরণি পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিসিএস পরীক্ষায় কর্মপ্রত্যাশীদের চাপ প্রায় গুণোত্তর হারে বেড়ে চলেছে। ৩৩তম বিসিএসে চার হাজার ২০৬টি পদের জন্য লড়েছেন মাত্র এক লাখ ৯৩ হাজার ৫৯ জন। ৩২তম বিশেষ বিসিএসের আগে ৩১তম বিসিএসে অংশ নিয়েছেন এক লাখ ৬৪ হাজার ১৬৭ জন প্রার্থী আর পদ ছিল দুই হাজার ৭২টি। তারও আগে ৩০তম বিসিএসে দুই হাজার ৩৬৭টি পদের জন্য লড়েছেন এক লাখ ৪৭ হাজার ৯৮৮ জন!
আগামী দিনগুলোয় এই সংখ্যা হ্রাস পাবে, এমন আশা করা বোকামি হবে। গত এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বেকারত্বের হার বেড়েই চলেছে। ২০০০ সালের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১০ বছরে এটি বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ১০ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিবেচনা করলে শতাংশ বৃদ্ধির শতকরা হার চোখে পড়বেই। এর বাইরে রয়েছে ছদ্মবেকারের সংখ্যা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে এই হার ২০ দশমিক ৩ শতাংশ; যদিও ২০০৬ সালে এটি ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং যথারীতি এই হার মেয়েদের মধ্যে (৩১%) ছেলেদের (১৪.৪%) তুলনায় অনেক বেশি। আগামী এক দশক ধরে প্রতিবছর প্রায় ২১ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন। তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের যথাযথ উদ্যোগ নিতে না পারলে আমাদের ‘জনসংখ্যা ডিভিডেন্ড’ শেষ পর্যন্ত ‘জনসংখ্যা হাহাকারে’ পরিণত হতে পারে। বছরওয়ারি সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তার শূন্য পদের পাশাপাশি অন্য শূন্য পদগুলো বিবেচনা করলে প্রতিবছর গড়ে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার সরকারি চাকরির সুযোগ থাকবে। তার মানে, এই বিশালসংখ্যক কর্মপ্রত্যাশীর কর্মসংস্থানের দায়ভার নিতে হবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরই। বিগত সময়জুড়ে বাংলাদেশের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়; যদিও কিছু বদলোকের কারণে যথাযথ স্বীকৃতি পান না আমাদের উদ্যোক্তারা।
অন্যদিকে, আমাদের দেশের কর্মপ্রত্যাশীদের একটি বড় অংশ বিদেশে পাড়ি জমান। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ রেমিট্যান্স পাওয়া দেশ। কিন্তু ভবিষ্যতে এই খাতে আমাদের সব সম্ভাবনা মাঠে মারা যেতে পারে, যদি ঠিকমতো নজর দেওয়া না হয়। কারণ, তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সে দেশের কর্মপ্রত্যাশীদের চাপ। আরব বিশ্বের দেশগুলো তিউনিসিয়ার আরব বসন্তের কারণ ও ফলাফল বিশ্লেষণে সচেতন হয়েছে। তেলসমৃদ্ধ তিউনিসিয়ার আরব বসন্তের মূল কারণ বেকারত্ব। ৩৫ বছরের একজন সৃষ্টিশীল তরুণকে যখন তাঁর চুল কাটার টাকা বাবা বা ভাইয়ের কাছ থেকে নিতে হয়, তখন সেখানে কেবল মনুষ্যত্বের মৃত্যু হয় না, মৃত্যু হয় আবেগপ্রবণ রাষ্ট্রকাঠামোরও। একই কারণে আমেরিকার মতো দেশও দেশের বাইরে কাজ পাঠিয়ে দেওয়ার (আউটসোর্সিং) বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সচেষ্ট হয়ে উঠছে। এ কারণে ভবিষ্যতে অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর যে রেওয়াজ আমরা গত সাড়ে তিন দশকে গড়ে তুলেছি, সেটির মৃত্যু হবে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের কারণে কেবল কায়িক পরিশ্রমভিত্তিক কাজের বাজার ক্রমেই সংকুচিত হবে। অন্যদিকে, ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে জ্ঞানকর্মীর বাজার। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের মূল দুর্বলতা তাঁদের ভাষাজ্ঞানের অদক্ষতা এবং কর্মদক্ষতার সনদ। এই দুই বিষয়ে আমাদের বড় ধরনের নজর দেওয়া দরকার।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের নজর দিতে হবে বেসরকারি পর্যায়ে স্বতন্ত্র ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য। সাধারণভাবে কর্মপ্রত্যাশীদের ৫ থেকে ১৫ শতাংশকে উদ্যোক্তা বানিয়ে ফেলতে পারলেই কর্মসংস্থানের সমীকরণের একধরনের সমাধান করে ফেলা যায়। আমেরিকার মতো বিশ্বের সবচেয়ে উদ্যোক্তাবান্ধব দেশও তাই সব সময় নানাভাবে উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সচেষ্ট থাকে। ওবামা প্রশাসনের চলতি বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য প্রেসিডেন্ট নিজেই উঠেপড়ে লেগেছেন। যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নতুন লোককে চাকরি দেবেন তাঁদের ১০ শতাংশ কর রেয়াত, দেড় লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যাংকঋণের সব ফি প্রত্যাহারসহ এর দালিলিক চাহিদা কমিয়ে ফেলা, পুনঃ অর্থায়নের সহজ সুযোগ সৃষ্টিসহ উদ্যোক্তাদের পরিচর্যা করার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তা পরিচর্যাকেন্দ্রের (ইনকিউবেশন সেন্টার) জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ ইত্যাদি এবারের মার্কিন বাজেটের বৈশিষ্ট্য। কেবল তা-ই নয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তাদানের সরকারি প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানোরও নানা উদ্যোগ সেখানে রয়েছে।
আমাদের দেশেও সরকারি বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নানা ধরনের প্রণোদনা থাকা দরকার। বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৯ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উদ্যমী ব্যাংকারকেই উদ্যোক্তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বানিয়ে দিতে হয়! এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করতে পারে যে প্রতিষ্ঠানটি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন (এসএমই ফাউন্ডেশন), সেটির শীর্ষ নির্বাহী পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের পদটি শিল্পমন্ত্রী নিজেই অলংকৃত করে বসে আছেন। আর ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটিও পূরণের কোনো দৌড়ঝাঁপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১০ বছরে কেবল চীনেই প্রায় সাড়ে আট কোটি চাকরি উদ্বৃত্ত হবে। উদ্যোগ নিলে তার মধ্যে দেড় কোটিই বাংলাদেশে নিয়ে আসা সম্ভব। আর সে জন্য দরকার সরকারি-বেসরকারি নানামুখী উদ্যোগ। এর মধ্যে বাজেটে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য যেমন অনেক প্রণোদনা থাকতে হবে, তেমনি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের একটি উদ্যোগ ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’ নামের ফেসবুকভিত্তিক একটি ভার্চুয়াল গ্রুপ আগ্রহী অনেক তরুণ-তরুণীকে তাঁদের পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আমার সামান্য বুদ্ধিতে বুঝতে পারছি, ব্রডব্যান্ড সংযোগ, সামান্য জ্ঞান-সহায়তা, আর্থিক সহায়তা ও নেটওয়ার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের যুবাদের বড় একটি অংশকেই আত্মকর্মসংস্থানে উদ্যমী হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এ রকম হাজারো যুবাকে আত্মকর্মসংস্থানে সহায়তা করবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসএমই পল্লি ও এসএমই পরিচর্যাকেন্দ্র গড়ে তুলে এই ক্ষুদ্র সহায়তা প্রদান শুরু করা যায়। মনে রাখা দরকার, সব দূরের যাত্রাই ঘর থেকে দুই পা ফেলে শুরু করতে হয়।
মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডকমিটি।

ধূমপান বর্জনে ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন অগ্রাহ্য করে জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও নেশাজাতীয় বিভিন্ন প্রকারের বর্জনীয় বস্তু গ্রহণ করে, যা ধীরে ধীরে উগ্র নেশায় পরিণত হয়। এর মধ্যে বিড়ি, সিগারেট, তামাক, চুরুট, হুক্কা—এসব ধূমপানের সামগ্রী অন্যতম। ধূমপানে নেশা যদিও কম হয়, তবে যে ব্যক্তি প্রথমবারের মতো ধূমপান শুরু করেন তিনি এর নেশা তীব্রভাবে অনুভব করেন। ইসলামি শরিয়তের বিধানমতে, ‘যে জিনিস নেশার উদ্রেক করে সে জিনিসের পরিমাণ কম হলেও তা হারাম।’ এ নীতিমালার আলোকে ধূমপানে নেশা কম হলেও এটা নিষিদ্ধ। কারণ, ধূমপানের বদভ্যাস মানুষকে আসক্ত করে আর সব ধরনের আসক্তিই হারাম। তাই ধূমপান নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নেশাজাতীয় বস্তু নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলেছেন, ‘যাবতীয় নেশার বস্তু হারাম।’ (মুসলিম) ইসলামের দৃষ্টিতে সব ধরনের অপব্যয় ও অপচয় পরিত্যাজ্য। আর্থিক অপচয়ের দিক বিবেচনায় ধূমপানজনিত ব্যয় একজন ব্যক্তির জন্য বড় ধরনের অপচয়। ধূমপানজনিত রোগের চিকিৎসার পেছনে ব্যয় আরও কয়েক গুণ বেশি। ধূমপানে অহেতুক প্রচুর অর্থ-সম্পদ অপব্যয় হয়। নেশার খরচ জোগাতে অনেক সময় ধূমপায়ীকে পরিবার থেকে জোরপূর্বক অথবা অন্য কারও কাছ থেকে ছিনতাই-চাঁদাবাজির মাধ্যমে অন্যায়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। নেশাগ্রস্ত হয়ে তারা ধর্মকর্ম ভুলে থাকে এবং নানা ধরনের অপকর্ম করে নিজের ও পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষতি, দুঃখ ও দারিদ্র্য ডেকে আনে। অনর্থক অপব্যয় অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। পবিত্র কোরআনে অপচয় করতে নিষেধবাণী ঘোষিত হয়েছে, ‘তোমরা কিছুতেই অপব্যয় করবে না। নিশ্চয়ই যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৬-২৭)
ধূমপানের দুর্গন্ধ মুখে নিয়ে ইবাদত করলে তা কবুল হয় না। যেহেতু সিগারেটের তামাক পাতায় বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, সেহেতু ধূমপায়ীদের মুখের দুর্গন্ধ বিশেষত ওই ধরনের তামাকজাত দ্রব্য থেকেই সৃষ্টি হয়। এমন অসহনীয় দুর্গন্ধ নিয়ে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি করা যায় না। তাই নবী করিম (সা.) সাবধানতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুর্গন্ধময় দ্রব্য খায়, সে যেন ওই অবস্থায় মসজিদের নিকটবর্তী না হয়।’ ধূমপায়ীর মুখের দুর্গন্ধে পার্শ্ববর্তী ধর্মপ্রাণ মুসল্লির কষ্ট হয়, যা ইসলাম-পরিপন্থী অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এভাবে নামাজ আদায়কারীর একাগ্রতা বিনষ্ট করার জন্য ধূমপায়ী দায়ী। সুতরাং ধূমপান আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্তরায়।
ধূমপান যে মারাত্মক বিষাক্ত ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ, এর সঙ্গে খোদ সেবনকারী, উৎপাদক, বিপণনকারীসহ সবাই একমত পোষণ করেন। এমনকি সিগারেটের বিজ্ঞাপনেও লেখা থাকে ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।’ ধূমপান ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর, তেমনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও অমঙ্গলজনক। যেকোনো রোগীকে সর্বাগ্রে ধূমপান না করার চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হয়। একখণ্ড পরিচ্ছন্ন কাগজে মোড়া সিগারেট সুদৃশ্য হলেও তা জনস্বাস্থ্যের জন্য এমন ক্ষতিকর উগ্র নিকোটিনের বিষে ভরা, যা ইনজেকশনের মাধ্যমে কোনো সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করালে তার মৃত্যু অনিবার্য।
ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা মহাপাপ। ধূমপানে যেহেতু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়, সেহেতু জেনেশুনে ধূমপান আত্মহত্যার শামিল। ধূমপান ও তামাককে বিষপানের সমকক্ষ বললেই যথার্থ হয় না, বরং ধূমপান বিষপানের চেয়েও মারাত্মক। কেননা বিষপানে শুধু পানকারীরই ক্ষতি হয় আর ধূমপানে তার পরিবেশে অধূমপায়ী এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও সর্বনাশ হয়ে থাকে। প্রত্যেক নাগরিকেরই নির্মল পরিবেশে সুস্থ-সুন্দরভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। একজন ধূমপায়ী নিজেকে নিঃশেষ করার পাশাপাশি অন্যদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে না। ধূমপানে নিরুৎসাহিত করার জন্য সমাজের মানুষকে বোঝাতে হবে যে ‘ধূমপান নিষিদ্ধ সামগ্রী’। ধূমপানের আসক্তি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং দেশ ও জাতির অনেক ক্ষতি করে। জনগণকে বেশি করে ধূমপানের কুফল সম্পর্কে সচেতন ও তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসতে পারে। ধূমপানকে ‘না’ বলার সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা দরকার। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে ধূমপানের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারণা ও গণসচেতনতা চালিয়ে ধূমপান প্রতিরোধ করা যায়। তা ছাড়া ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সুস্থ জীবন যাপন করলে এবং ধূমপান ও তামাকমুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখলে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক সমাজ ও মসজিদের ইমাম-খতিবরা ধূমপান ও তামাকমুক্ত সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা যেহেতু তামাক ও মাদকের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে তাই ধর্মীয় শিক্ষকেরা যদি ছাত্রদের ধূমপান ও মাদকের কুফল সম্পর্কে অবহিত করেন, তাহলে অনেকেই এ ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হবে। কাজেই শিক্ষক সমাজ যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে, সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং তাদের তামাক, ধূমপান ও মাদকের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সতর্ক করে তাহলে ছাত্রসমাজের মধ্যে তামাক ও মাদক সেবনের প্রবণতা কমে যাবে। মসজিদের ইমাম বা ধর্মীয় নেতারা জুমার খুতবাসহ বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নেশার অপকারিতা তুলে ধরে মানুষকে ধূমপান করা থেকে বিরত রেখে তাদের হেদায়েত করতে পারেন।
 সর্বোপরি, ধূমপান বর্জনের জন্য ধূমপায়ীর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ (৩১ মে) অথবা পবিত্র মাহে রমজান মুসলমানদের ধূমপান বর্জনের উপযুক্ত সময়। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ইচ্ছাই বেশি প্রয়োজন। যেহেতু ধূমপান কোনো উপকারে আসে না, বরং এতে মানুষের অনেক ক্ষতি হয়, তাই ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী সবারই স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে ধূমপানের বদভ্যাস অবশ্যই পরিত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

চাকরিতে প্রবেশের বয়স by মো. মহিউদ্দিন

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। দেশের হাজার হাজার সমস্যার মধ্যে শিক্ষাঙ্গনে সেশনজট অন্যতম। সেশনজটের কবলে পড়ে একজন শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তর পাস করতে বয়স ৩০-এর কাছাকাছি চলে যায়। আবার আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে কয়েক বছর বিরতির পর আবার পড়াশোনা শুরু করে স্নাতকোত্তর পাস করেন। তাই অনেকেরই সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়স থাকে না। চাকরিতে প্রতিযোগী বেশি হওয়ার কারণে অনেকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ছোট চাকরি করেন। তাঁদের মনে আশা থাকে, ভবিষ্যতে ভালো কোনো চাকরি পাবেন। কিন্তু সাধারণ কোটার প্রার্থীদের বয়স ৩০ বছর পর্যন্ত হওয়ায় তাঁরা আর ভালো চাকরিতে আবেদন করতে পারেন না। এতে করে দেশে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, বেকার ও তাঁদের অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করা তরুণ প্রজন্মের একটি অতি জরুরি ও প্রয়োজনীয় দাবি।
আর তাই প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান মহাজোট সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, অবিলম্বে বেকার তরুণ প্রজন্মকে হতাশার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বর্তমান সরকারের মেয়াদেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সাধারণ কোটার প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর পর্যন্ত করা হোক।
মো. মহিউদ্দিন
উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা।

রাস্তা সংস্কার by লাবণ্য

মিরপুর থানার ১১ ও সাড়ে ১১ এলাকায় হাজার হাজার লোকের বসবাস। এ এলাকার কাঁচাবাজার করতে যাওয়ার রাস্তাটি এত খারাপ যে এখান দিয়ে কোনো যানবাহনই সুষ্ঠুভাবে চলাচল করতে পারে না। রাস্তাটি আর চলাচলের উপযোগী নেই। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে যাঁরা এখানে বাজার করতে আসেন তাঁদের অসহনীয় ও চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অবিরাম বর্ষণের ফলে এ রাস্তায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং এতে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে।
এ রাস্তা আশু সংস্কার করা হলে জনগণকেই এর চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন, অবিলম্বে রাস্তাটি সংস্কার করা হোক এবং জনগণকে ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই দেওয়া হোক, যাতে জনগণ এ রাস্তা দিয়ে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে চলাচল করতে পারে।
লাবণ্য
মিরপুর। 

পরীক্ষার সময়সূচি

২০১০ সালের মাস্টার্স (শেষ পর্ব) পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু আমরা যারা পরীক্ষার্থী, এই সময়সূচির ব্যাপারে আমাদের আপত্তি রয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যে তিন-চার দিন অবকাশ রাখা হয়েছে। এই অবকাশের সময় বাড়ানো হলে প্রতিটি পরীক্ষা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেওয়া সম্ভব হবে। অপর দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরীক্ষা পরিবর্তনেরও আশঙ্কা থেকে যায়। সুতরাং, আমাদের পক্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, প্রথম দিনের পরীক্ষার মতো প্রতি শনিবার সময়সূচি প্রণয়ন করলে আমাদের ছাত্রদেরও পরীক্ষা দেওয়া সহজ হবে; পক্ষান্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কবলেও আমাদের পড়তে হবে না।
২০১০ সালের মাস্টার্সের (শেষ পর্ব)
সব পরীক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

Thursday, May 30, 2013

কেন এই বিতর্ক? by সাজেদুল হক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিই তিনি ব্যতিক্রম। সমালোচিত-আলোচিত। তার বই নিয়েও বিতর্ক নতুন কিছু নয়।

ভাবের ঘরে চুরি by সাযযাদ কাদির

কিছু-কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা মেলে না বুদ্ধিতে। অনেক ভেবেচিন্তেও কূলকিনারা করতে পারি না সেগুলোর।  বিশ্বাস হতে চায় না, কিন্তু সত্য।

মঞ্জুর হত্যা মামলায় আদালতে এরশাদ by মবিনুল ইসলাম

বহুল আলোচিত মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার বিচার বিলম্বিত করার অভিযোগ করেছেন মামলার প্রধান আসামি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলাম।

বাংলাদেশ কোন পথে? by আলী রীয়াজ

জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এতে ভারতীয় উপমহাদেশে কীভাবে ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রসার লাভ করেছে এবং গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার দলগুলো কী ভূমিকা রেখেছে, তারও ব্যাখ্যা রয়েছে। তিন পর্বের নিবন্ধের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসঙ্গটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তা এর আগে আমরা কখনোই প্রত্যক্ষ করিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তো নয়ই, এমনকি সম্ভবত গত প্রায় এক শ বছরেও আমরা এই আকারে এই প্রপঞ্চের মুখোমুখি হইনি। এর কারণ কী? এই পরিস্থিতিকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের করণীয় কী? আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখায় তার কী প্রভাব পড়বে? এ ধরনের প্রশ্ন আমাদের সবার মনের ভেতরেই যে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে তা নয়, আমরা সবাই কমবেশি এ নিয়ে আলোচনা করছি। আমরা এ বিষয়ে বেশি করে উৎসাহী হয়েছি সাম্প্রতিক কালে জামায়াতে ইসলামীর সহিংস আচরণ ও তার নিষিদ্ধকরণের দাবির পটভূমিকায়, পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম বলে একটি সংগঠনের উত্থানের কারণে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয়, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বিষয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আপসমুখী অবস্থান, এই সব দলকে আশু স্বার্থে ব্যবহারের জন্য মরিয়া ভাব, ধর্মভিত্তিক দলের আড়ালে ও নামে সহিংসতার ব্যাপক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির চেহারা বিষয়ে উদ্বেগ নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বুঝতে চাইলে, তার বর্তমান অবস্থাকে উপলব্ধি করতে চাইলে কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪২ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয় বলে আমার ধারণা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি যখন তৎকালীন বাংলার সমাজজীবনে আলোড়ন তুলেছিল, তখনো আমরা রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের বিষয় নিয়ে কোনো রকম বিতর্ক দেখতে পাই না। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তখনো এই বিবেচনার মধ্যে আসেনি। কেননা সমাজে ধর্মের উপস্থিতি, ব্যক্তিজীবনে ধর্মাচরণের সঙ্গে রাজনীতির একটা দূরত্ব বজায় থেকেছে। আর তা ছাড়া বিষয়টি বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় একভাবে নিষ্পত্তিও হয়ে গিয়েছিল; বাঙালির ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে পাকিস্তান দাবির পেছনে ধর্মের বিবেচনা সত্ত্বেও এবং এ বিষয়ে চল্লিশের দশকে বাঙালি মুসলমানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও মনে রাখা দরকার, মুসলিম লিগকে কখনোই ধর্মভিত্তিক দল বলে বিবেচনা করা হয়নি, বাঙালি মুসলমান ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ২৫ বছরের ইতিহাসেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্ন কখনোই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল প্রশ্ন হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক দল গঠনের সুযোগ ছিল না; সাংবিধানিকভাবেই বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্ন ওঠেনি।
কিন্তু ইতিহাস হচ্ছে একটা কূপের মতো, আপনি কতটা গভীর পর্যন্ত খুঁড়তে চান তার ওপর নির্ভর করবে আপনি শেষ পর্যন্ত কী ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছেন। ধর্মভিত্তিক দল ও রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান প্রশ্ন ছিল না মানে কি এই যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কখনোই আমাদের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেনি?
১৯৪৭ সালে বাংলা প্রদেশ ভাগ হবে কি না সে প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে সংগঠনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো হিন্দু মহাসভা। ইতিহাসের সনিষ্ঠ পাঠকেরা জানেন যে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, আবুল হাশিম এবং শরৎ বসু স্বাধীন-সার্বভৌম যুক্তবাংলা গঠনের যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের কাছে তীব্র প্রতিবাদ করেন। ২ মে ১৯৪৭ সালে একটি চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘একটি স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা সম্বন্ধে কিছু এলোমেলো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। এর ভাবার্থ আমাদের কাছে একেবারেই বোধগম্য নয় এবং আমরা এর সমর্থন কোনোভাবেই করি না। হিন্দুদের কাছে এই পরিকল্পনা কোনো উপকারে আসবে না। স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা প্রকৃতপক্ষে একটি পাকিস্তানের রূপ নেবে... আমরা কোনোভাবেই ভারতের অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না (দেখুন, মাউন্ট ব্যাটেন পেপারস, নিকোলাস মানসার্গ ও অন্যান্য, দ্য ট্রান্সফার অব পাওয়ার, ১৯৪২-৪৭, ভলিউম ১০, পৃ. ৫৫৭। তা ছাড়া হিন্দু মহাসভার ভূমিকা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে)। বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই যে হিন্দু মহাসভাই কালক্রমে ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বলে পরিচিত ভূখণ্ডে ইসলামপন্থী রাজনীতির উপস্থিতি আরও পুরোনো। কার্যত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে, বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের মধ্যেই তার উদ্ভব। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় হাজী শরীয়তউল্লাহ্র নেতৃত্বে সংঘটিত ফারায়েজি আন্দোলন, বিশেষত দুদু মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন এবং তিতুমীরের নেতৃত্বে তারিক-ই-মুহাম্মাদিয়ার প্রভাবে ‘বাঁশের কেল্লা’ বলে পরিচিত আন্দোলন এই ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। সমাজসংস্কারের এসব আন্দোলন কালক্রমে রাজনৈতিক রূপ লাভ করেছিল। পরে কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের শক্তি সঞ্চয় হলে, তারাই প্রধান দলে পরিণত হলে এসব আন্দোলন হারিয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ মানসে, প্রচলিত লোককথায়, সংস্কৃতিতে তার প্রভাব একেবারে অবসিত হয়ে যায়নি। এখানে এটাও জোর দিয়ে বলতে চাই যে এই ধারার সঙ্গে অতিসমপ্রতি জামায়াতে ইসলামীর যোগাযোগ এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেও জামায়াত এই ধারার রাজনীতির প্রতিনিধি নয়। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তা হলো—আমরা কি এখন বহুধা বিভক্ত ইসলামপন্থী রাজনীতিকে একটি কেন্দ্রে সম্মিলিত হতে দেখছি?
আমরা এখানে এলাম কীভাবে?
ইসলামি রাজনীতির ধারা যদি মুসলিম লিগ আর কংগ্রেসের সাফল্যের কারণে ১৯৪৭ সালে নাগাদ দুর্বল ও প্রায়-নিঃশেষিত হয়ে গিয়ে থাকে, তবে আমরা আজকে কেন তার এই শক্তি দেখতে পাই—এ বিষয়টি বোঝা খুব জরুরি। বাংলাদেশের লোককথায় যে ইসলামি আন্দোলন, সেই ধারাটি পাকিস্তানি শাসনামলে (১৯৪৭-১৯৭১) আর বেগ লাভ করতে পারেনি, তার কারণ বহুবিধ। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জামায়াতে ইসলামীর আবির্ভাব। জামায়াতের নেতারা, এমনকি তাঁদের দীক্ষাগুরু আবুল আলা মওদুদী, প্রচলিত অর্থে মাদ্রাসায় শিক্ষিত নয়। পাকিস্তান আমলে জামায়াতে ইসলামী ইসলামপন্থীদের নতুন রাজনীতির জন্ম দেয়, যা নগরকেন্দ্রিক, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের নেতৃত্বাধীন এবং যার লক্ষ্য মানুষের আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়, এমনকি সমাজে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত নয়, কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। পাকিস্তান আমলে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর আধিপত্য ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে ও রাজনীতির প্রধান ধারায় তারা কোনো আবেদন রাখতে পারেনি; তার অন্যতম কারণ হলো সাধারণ শিক্ষার প্রসার, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ, নগরায়ণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব এবং পাকিস্তানিদের শোষণ।
বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালের পর জামায়াতে ইসলামী এবং ১৯৮১ সালে মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহর (হাফেজ্জি হুজুর) রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইসলামপন্থীরা রাজনীতিতে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করেছে। জিয়া ও এরশাদের আমলে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান, রাষ্ট্রধর্মের ঘোষণা এবং একই সময়ে প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আশ্রয়-প্রশ্রয় যেমন জামায়াতে ইসলামীকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি কওমি মাদ্রাসার প্রসারের কারণে মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামপন্থী দলগুলোর ভিত্তি জোরালো হয়েছে। সামরিক শাসকেরা তাঁদের অবৈধ শাসনকে বৈধতা দিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির শরণাপন্ন হয়েছেন, অন্যদিকে ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতির অতিসরলীকৃত অঙ্কের বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছে। দলগুলোর আচরণ থেকে মনে হয়, তাদের এই ধারণা হয়েছে যে সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার প্রমাণ দিতে হলে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে সব সময় তাদের সঙ্গে রাখা দরকার।
দেশের ইতিহাস এবং অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসারের কারণ সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়; কিন্তু তা সম্পূর্ণ চিত্রটি তুলে ধরে না। কেননা দেশের বাইরের ঘটনাপ্রবাহও এর পেছনে কাজ করেছে। তা ছাড়া প্রশ্ন থাকছে ধর্মভিত্তিক দল শক্তিশালী হয়ে উঠলে তার ফল কী।
l আগামীকাল পড়ুন: ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব বোঝার অক্ষমতা
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগেরঅধ্যাপক।

সংলাপ, তত্ত্বাবধায়ক ও একদলীয় নির্বাচন by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বর্তমান সরকার সম্প্রতি কিছুটা বেদিশা হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়। সরকারের ভেতরে নীতিগত সমন্বয় আছে বলেও মনে হয় না। একেক জন একেক কথা বলছেন। সম্প্রতি ঢাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার কথাই ধরা যাক। তিনি বললেন, ঢাকায় সভা-সমাবেশ এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ। তাঁর আইজিপি বললেন, ‘তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না।’ আওয়ামী লীগের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বললেন, ‘রিলিফের কাজের জন্য (ঢাকা কিন্তু পটুয়াখালী নয়) সভা-সমাবেশ বন্ধ করতে বলেছে।’ সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম ও আরও অনেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করে এ জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। (সূত্র: সংবাদপত্র)
সরকার কে চালাচ্ছে? কীভাবে চালাচ্ছে? মন্ত্রীরা কেন এত বেদিশা হয়ে উঠেছেন, তা অনুমান করা কঠিন নয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নির্বাচন হবেই—এমন নিশ্চয়তা মন্ত্রীরা পাচ্ছেন না। তাহলে? যদি অন্য রকমভাবে নির্বাচন হয়, তাহলে কি তাঁদের দল জিততে পারবে? জিততে না পারলে কী হবে, তা অনুমান করতে মন্ত্রীদের বেশি সময় লাগার কথা নয়। এ মুহূর্তে রাজনীতির অঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সংলাপ। অথচ সেই সংলাপ নিয়েও নানা রকম কথা বলছেন মন্ত্রীরা। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক পরিবেশ সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত করেছেন পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। এক মানববন্ধনে তিনি এসে ঘোষণা করেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা ছাড়া নির্বাচনকালীন কোনো সরকার হবে না। শেখ হাসিনার প্রশ্নে আপস নেই।’ এর মাধ্যমে তিনি তাঁর নেত্রীকে তাঁর ব্যক্তিগত আনুগত্যের বার্তাও দিয়ে দিলেন। বেচারা! সরকার একদিকে শর্তহীন সংলাপের কথা বলছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রেখেই অন্তর্বর্তী সরকার হবে।’ সর্বশেষ আবার সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রাখতে হবে এমন কোনো শর্ত তাঁরা দেননি। এই পদ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছেন, ‘যেকোনো স্থানে আলোচনা হতে পারে।’ এখন বলছেন, ‘যা কিছু বলার শুধু সংসদে এসে বলতে হবে।’
বিগত সাড়ে চার বছরের শাসনকালের কথা মনে পড়লে মন্ত্রীদের উল্টাপাল্টা কথা বলাই স্বাভাবিক। কারণ, তাঁরা জানেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাঁদের পরিণতি কী হবে। এক পার্সেন্ট ঝুঁকি নিতেও তাঁরা রাজি নন। কিন্তু মনে হয় নিজেদের ব্লুপ্রিন্ট মতো নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। দেশে তো বটেই, বিদেশিদেরও ধারণা, নির্দলীয় সরকার ছাড়া উপায় নেই। সরকার এ কথা বুঝতে পেরেছে যে দেশের বেশির ভাগ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির পক্ষে তারা সবাই বিএনপির সমর্থক, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রথম আলো সম্প্রতি যে মতামত জরিপ প্রকাশ করেছে (পরিচালনা করেছে একটি পেশাদারি সংস্থা), সেখানেও ৯০ শতাংশ লোকের মত তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে। অনেকে এই মতামত জরিপ নিয়ে নানা সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সারা বিশ্বে যে পদ্ধতিতে মতামত জরিপ পরিচালিত হয়, এখানেও তাই হয়েছে। ব্যতিক্রম কিছু নয়। প্রথম আলোর মতামত জরিপের পদ্ধতি নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেননি। সাধারণ আলোচনায়ও দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ মানুষ এবং ১৪ দলের বাইরে সব রাজনৈতিক দলই তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে। আমাদের ধারণা, সবাই নির্বাচনে একটা লেভেল প্লেয়িং মাঠ চায়। দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে সেই লেভেল প্লেয়িং মাঠটি পাওয়া যাবে না।
আওয়ামী লীগের কিছু নেতা শেখ হাসিনাকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান রাখার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ। নেত্রীকে খুশি করার এটা কৌশল। তাঁরা ভালোই জানেন, তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না। তবু নেত্রী তো জানতে পারলেন, তিনি (ওই নেতা) নেত্রীর কত অনুগত! আমাদের বড় দুই দলে নেত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রদর্শনের লড়াই রাজনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। আমাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতেও এই আনুগত্যের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রেখে সংসদ নির্বাচনের যে বক্তব্য আওয়ামী লীগ দিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় আলোচ্য ইস্যু নিয়ে কোনো গঠনমূলক আলোচনায় তারা আগ্রহী নয়। আমাদের মনে হয়, আওয়ামী লীগ ও সরকার ধারণা করছে, বিএনপির ওপর জেলজুলুম চালানোর পর তারা এত দুর্বল হয়ে পড়েছে যে তাদের পক্ষে বড় মাপের কোনো আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। এই ধারণা খুব ভুল, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। বর্তমান সরকার নানা কৌশলে বিএনপির প্রথম সারির অনেক নেতাকে কারাবন্দী করে রেখেছে। অনেকের নামে মামলা ঝুলছে। সব মিলিয়ে বিএনপি প্রায় কোণঠাসা অবস্থায়। তবু একটা কথা আছে, ‘হাতি মরলেও লাখ টাকা।’ বিএনপি বড় একটি দল। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে তাদের কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। নয়াপল্টনে তাদের সমাবেশ দেখলে বোঝা যায় তাদের শক্তি কত। সরকার বিএনপিকে ছোট করে দেখলে ভুল করবে।
কাজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি বড় মাপের আন্দোলন করতে পারবে না, এমন মনে করা ঠিক হবে না। তবে আন্দোলনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হোক, তা আমরা চাই না। তাতে দেশের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি হবে। অনেক মানুষের প্রাণহানিও হতে পারে। আমরা আশা করব, সরকার বিলম্বে হলেও সংলাপের জন্য এজেন্ডাসহ চিঠি দেবে সব বিরোধী দলকে। এজেন্ডাসহ চিঠি না দেওয়া পর্যন্ত বল কিন্তু সরকারের কোর্টেই থেকে যাচ্ছে। চিঠি না দিয়ে সরকারের মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগ নেতারা সংলাপ নিয়ে যত কথাই বলুন, তাতে সরকারের আন্তরিকতার প্রতিফলন হয় না।
অনেকে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন। এটা একেবারেই অসার কথা। সংবিধান জনগণের জন্য। সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। সরকার জনগণের ইচ্ছাকেই সব সময় অগ্রাধিকার দেবে। এটাই বাস্তবতা। সরকার যদি জনগণের মনের কথা পড়তে পারেন, তাহলে সংবিধান সংশোধন করে ‘যা জনগণের দাবি’ সেটাই সংবিধানে সংযোজন করবে। এটা এক ঘণ্টার কাজ। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে সংবিধানের দোহাই যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁরা জনগণকে ‘হাইকোর্ট’ দেখানোর চেষ্টা করছেন।
ইদানীং আরেক রকম চালাকির কথা শোনা যাচ্ছে। সরকারপন্থী কেউ কেউ বলছেন, ‘নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনার বদলে স্পিকারকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিতে পারেন।’ এই কথার মধ্যে একটা আপাত-নিরপেক্ষতার কৃত্রিম আভাসও পাওয়া যায়। এটা আরেক ধরনের চালাকি। ভাবটা এ রকম, ‘শেখ হাসিনার ব্যাপারে তোমাদের আপত্তি তো, ঠিক আছে স্পিকারকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলো। এবার রাজি হও।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল দর্শনটা হলো নির্দলীয় সরকার। স্পিকার কি নির্দলীয় ব্যক্তি? সরকার পরিচালনায় তিনি নেপথ্যে কার কাছ থেকে নির্দেশ বা পরামর্শ গ্রহণ করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। কাজেই দলীয় কোনো ব্যক্তিই নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতে পারবেন না—এটাই বিরোধী দলের দাবি। শেখ হাসিনার বদলে স্পিকারের প্রস্তাব তারা মানবে না।
একটা কথা বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মনে রাখা দরকার। নির্বাচনের সময় এমন একটা সরকার থাকতে হবে, যে সরকার ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে অসংখ্য সরকারি পদে রদবদল ঘটাতে পারেন। আগের সরকারের কোনো ছক যেন নির্বাচনের সময় বাস্তবায়িত না হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে এভাবেই কাজ শুরু করতে হবে। এই রদবদল কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষের জন্য নয়। আগের সরকারের ছক নষ্ট করার জন্য এটা খুবই প্রয়োজন। অনেকে এমনও মনে করছেন, ‘বিএনপিসহ বেশির ভাগ বিরোধী দল অংশ না নিলেও বর্তমান সরকার নির্বাচন করে ফেলবে।’ হ্যাঁ, করে ফেলতে পারে। এটা কষ্টকর, কিন্তু অসম্ভব কাজ নয়। এ ধরনের নির্বাচনে একটি গৃহপালিত বিরোধী দলও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু জেনারেল এরশাদ বলেছেন, তিনি এ ধরনের নির্বাচনে যাবেন না। তাহলে তো এই পার্লামেন্টে বিরোধী দলই পাওয়া যাবে না। ৩০০ আসনেই ১৪-দলীয় জোট জয়ী হবে। এটা বিশ্ব রেকর্ড হতে পারে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ রকম একদলীয় নির্বাচনের সরকার টিকতে পারে না। দেশে বা বিদেশে কারও সমর্থন পায় না। সরকার কাজ করতে পারে না। বিরোধী দল প্রথম দিন থেকে শুরু করবে আন্দোলন। সেই আন্দোলনে একদলীয় নির্বাচনের সরকার টিকতে পারবে কি? টিকতে না পারলে এক বছরের মাথায় আবার সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ১৪-দলীয় জোটের অবস্থা কী হতে পারে, তা কি শেখ হাসিনা একবার ভেবে দেখেছেন?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ওউন্নয়নকর্মী।

লিটলম্যাগের সেই তরুণ by মফিদুল হক

পয়লা বৈশাখ থেকে কয়েক দিন দেশের বাইরে ছিলাম, খবরটি নিশ্চয় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ছোট খবর হবে হয়তো, তবে উপেক্ষা করার মতো সংবাদ তো নয়। ছাপা হলেও আমার চোখ তা এড়িয়ে গেছে। এখন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের মধ্যে সুমুদ্রিত একটি খামের ওপর চোখ আটকে গেল, স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম একবার-দুবার বারবার। নাগরিক শোকসভা কথাটা বড় করে লেখা, পাশে ছাপা হয়েছে ‘জাহিদ আনোয়ার-এর অকালপ্রয়াণে’, বিশ্বাস করা কঠিন এই বার্তা। বৈশাখেই তাঁর জন্ম, ২৮ এপ্রিল, ১৯৫৮ এবং লোকান্তরিত হলেন আরেক বৈশাখে, ১৬ এপ্রিল, ২০১৩। প্রাণবন্ত তরুণ জাহিদকে চিনি অনেককাল, দেখা-সাক্ষাৎ হতো কম, ওর দিক থেকে উদ্যোগ থাকলেই হতো সাক্ষাৎ, তবে যখনই দেখা হতো, জানতে পারতাম কোনো একটা কিছু নিয়ে মেতে আছে জাহিদ আনোয়ার। বলিষ্ঠ শক্তপোক্ত শরীর, ঘুরে বেড়ায় নানা কাজের পেছনে, হুঁশিয়ার মানুষেরা বলবেন অকাজের পিছু পিছু, কিন্তু জাহিদ প্রাণের আনন্দ খুঁজে পান এসব অকাজেই। তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নওগাঁর সংগঠক এবং দেশজুড়ে যেসব পাগলপ্রাণ তরুণকে একত্র করতে পেরেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বেশ বোঝা যায় সেখানে জাহিদের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। নওগাঁর আরও নানা কাজে জাহিদের সম্পৃক্তি, অমন এক ছোট মফস্বল শহর, যা পূর্বতন সৌন্দর্য ও গুরুত্ব হারিয়েছে অনেক আগে, সেখানে আবার সাহিত্যের ও শিল্পের দীপশিখা জ্বালাতে যাঁরা মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন জাহিদ আনোয়ার। তাঁর প্রাণোচ্ছ্বাস আবর্তিত হতো লিটল ম্যাগাজিন অঞ্জলি লহ মোর ঘিরে, সম্পাদক-প্রকাশক তিনি নিজেই, কোনোভাবেই পত্রিকার কোনো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ছিল না, ছিল আকাশচুম্বী স্বপ্ন।
এই স্বপ্নই জাহিদ আনোয়ারকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল, আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল নিঃস্বার্থ শুভব্রতী কর্মতাড়িত এক যুবকের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে নিজের মনের জোর আরেকটু বাড়িয়ে তোলা। সামান্য এক অনুরোধ ছিল জাহিদ আনোয়ারের, কলকাতা বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে তিনি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে হাজির হতে চান। আমি ভালোভাবেই বুঝি এই প্রস্তাবে বাণিজ্যিক কোনো সুবিধা অর্জিত হওয়ার নেই, লিটল ম্যাগাজিন যাঁরা প্রকাশ ও ফেরি করে বেড়ান, তাঁদের সঙ্গে বাণিজ্য-লক্ষ্মীর যোগও বিশেষ নেই। আমার দিক থেকে দু-একটি মামুলি সুপারিশপত্র দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। পরে দেখা গেল, কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে জাহিদ আনোয়ার নিজের জন্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসন করে নিতে পেরেছেন, তাঁর মতো আরও অনেক সমমনা মানুষ তিনি সেখানে পেয়েছিলেন এবং এঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশ নিবিড় হয়ে ওঠে। একবার বইমেলায় দেখি, জাহিদ আনোয়ার সস্ত্রীক মেলা আলো করে বসে আছেন। পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন ছোট শহর থেকে উঠে আসা তাৎপর্যময় লিটল ম্যাগাজিনের যাঁরা সম্পাদক-প্রকাশক, তাঁরাও জাহিদ আনোয়ারের মধ্যে নিজ সত্তার প্রতিরূপ খুঁজে পেয়েছিলেন এবং পরস্পরের জন্য আনন্দদায়ক হয়েছিল এই যোগ।
জাহিদ আনোয়ারকে দুই বাংলার লিটল ম্যাগাজিনের সেতুবন্ধ হিসেবে আমি দেখেছি, জেনেছি। জানি না তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজ ও অবদানের কোনো ধরনের স্বীকৃতি তিনি কখনো পেয়েছেন কি না, কিন্তু মনের আনন্দে এমন কাজ করে গেছেন জাহিদ আনোয়ার, যদিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় জীবনে ও সংসারে সফলতা পাওয়ার জন্য এসব মোটেই অনুকূল ছিল না। তাঁর কাছ থেকে অনেকবারই উপহার পেয়েছি অঞ্জলি লহ মোর, যখনই হাতে নিয়েছি সেই লিটল ম্যাগাজিন, আমার মনে পড়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নওগাঁর কথা, যার শ্রীমন্ত রূপ ধরা আছে ‘কাল মধুমাস’ কবিতায়। মনে হতো হারিয়ে যাওয়া পুরোনো সেই নওগাঁ তার সৌন্দর্য ও শক্তিময়তা নিয়ে আবার বুঝি জেগে উঠতে চাইছে নতুনভাবে। সেই নতুনের প্রতীক এই তরুণকে যে আমি ভালোবেসেছিলাম, সেটা কবুল করতে দ্বিধা নেই। আজ এ-কথা ভাবতে গিয়ে মন আরও বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে যায়, স্ব-সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নাম জাহিদ আনোয়ার কেন রেখেছিল অঞ্জলি লহ মোর, যে নাম-পরিচয়ে কেবল নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার আকুতি আছে, বিনিময়ে কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই। ওর কি কোনো তাড়া ছিল, আর তাই সবটুকু এমন উজাড় করে দিয়ে চলে গেল, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে, কারও কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি না রেখে।
কিন্তু ঋণ তো আমাদের রয়ে গেল অপরিশোধ্য।
মফিদুল হক: লেখক ও সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব।

জনস্বার্থে..by সঞ্জয় কুমার ভৌমিক

আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হরতাল’। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতার উত্তাপ অনেকটাই বেগবান হয়। ভোগান্তি বাড়ে সাধারণ মানুষের। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি। যার কম-বেশি প্রভাব পড়ে প্রত্যেক ক্ষেত্রে। শিক্ষাজীবনে এসএসসির পরই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাফল্য লাভের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যায় তার লক্ষ্যে। হরতালের কারণে বারবার সময়সূচি পরিবর্তনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি অনেকটাই ছিল দোদুল্যমান। সেই সঙ্গে বাড়ল উৎকণ্ঠা। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে যে দুশ্চিন্তা থাকে শিক্ষার্থীদের মনে, তার চেয়েও বেশি চিন্তিত হতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের সময়সূচি নিয়ে। যা পরীক্ষার্থীদের মানসিকভাবে অসহায় করেছে। পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যা দুঃখজনক। অতীত ও বর্তমান পরিবেশকে যদি খতিয়ে দেখা হয় নিখুঁতভাবে, তবে দেখা যাবে আন্দোলনকে চাঙা করতে কিংবা দাবি আদায়ের পথ ধরে অথবা কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো হরতালকে বেছে নিয়েছে বারবার। হয়তো প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে হরতালের বিকল্প তারা খুঁজে পায়নি। হতে পারে এটা ব্যর্থতা। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, সবার আগে দেশ, দেশের জনগণ। যা হতে হবে জনস্বার্থে, জনগণের কল্যাণে।
আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। প্রয়োজন দেশকে নিয়ে ভাবার। আর দেশের জন্য কাজ করতে হলে সাইনবোর্ড লাগানোর প্রয়োজন হয় না। রানা প্লাজা ধসে চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমাদের দেশের পোশাকশিল্পের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি অনেকটাই ক্ষুণ্ন হয়েছে সাভার ট্র্যাজেডির কারণে। হরতালে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাহত হচ্ছে অর্থনীতির সচলতা। নানা সময়ে নানা দুর্নীতি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে উন্নয়নের পথে।  প্রয়োজন দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে এক হয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করা।
সঞ্জয় কুমার ভৌমিক
বসুন্ধরা আ/এ, শ্রীমঙ্গল।

বিসিএসের প্রশ্নপত্র by মো. আবদুর রহমান

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ‘ইনসুলিন নিঃসৃত হয় কোথা থেকে?’ প্রশ্নটির উত্তর হিসেবে প্রদত্ত চারটি অপশনের মধ্যে দুটি অপশন দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে ‘অগ্ন্যাশয়’ ও ‘প্যানক্রিয়াস’। উল্লেখ্য, অগ্ন্যাশয় ও প্যানক্রিয়াস একই জিনিস এবং সমার্থক। সে হিসেবে দুটি উত্তরই সঠিক। ফলে অনেক পরীক্ষার্থী অগ্ন্যাশয় ও প্যানক্রিয়াস দুটি অপশনকেই সঠিক হিসেবে উত্তরপত্রে উল্লেখ করেছেন। এ অবস্থায় পিএসসি কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে এ উত্তরটিকে সঠিক হিসেবে বিবেচনা করবে কি না, সে বিষয়ে পরীক্ষার্থীরা বেশ চিন্তিত। দুটি অপশনই সঠিক বিধায় এ ক্ষেত্রে একটি অপশন চিহ্নিতকারী এবং দুটি অপশন চিহ্নিতকারী উভয়ের ক্ষেত্রেই নম্বর দেওয়া বাঞ্ছনীয়। নতুবা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হবে। এ ধরনের জটিলতা এড়াতে প্রশ্নপত্রে উত্তর হিসেবে সমার্থক দুটি অপশন রেখে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কাম্য নয়। এ বিষয়ে পিএসসি কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
মো. আবদুর রহমান
মালিবাগ, ঢাকা।

ডিএসসিসির গাড়িবিলাস

চার মিনিটে চার শ বছরের ঢাকা ভাগ হয়েছিল। তখনই শঙ্কা ছিল, বহু ক্ষেত্রে জনগণের অর্থের অহেতুক শ্রাদ্ধ হতে পারে। ২৬টি অতিরিক্ত গাড়ি থাকার পরও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রস্তাবিত জনবলের দোহাই দিয়ে পৌনে আট কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ১৬টি নতুন গাড়ি ক্রয়ের উদ্যোগ তারই নমুনা। রাজউকের প্রস্তাবিত দুই হাজার ৭০০ জনবলের ৫০০ ছেঁটে ফেলে গত তিন বছরেও সরকার তা চূড়ান্ত করেনি। উপরন্তু, ডিএসসিসির বিদ্যমান গাড়ির অপব্যবহারের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা ‘ওলট-পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’ কথাটিই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে নতুন গাড়ি কিনতে ডিএসসিসিকে দেওয়া চাহিদাপত্র বাতিল করা। আর তদন্ত করে দেখা যে কী করে গাড়িবিষয়ক দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে ডিএসসিসির তদন্ত কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে ওই চাহিদাপত্র অনুমোদন লাভ করল। এই প্রক্রিয়াও দুর্নীতিগ্রস্ত। সুতরাং, মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী ও মুখ্য হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তারও জবাবদিহি দরকার। প্রতীয়মান হচ্ছে যে সরকারি গাড়ি ব্যবহারে নিয়মনীতি সব লাটে উঠেছে। প্রভাবশালী কর্মকর্তারা পদ-পদবিনির্বিশেষে খেয়ালখুশিমতো গাড়ি ব্যবহার করছেন। এমনিতেই জনপ্রশাসনের বেহাল অবস্থা। শুধু খবরের কাগজে প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার কারণে এসব কর্মকর্তার কিছুই আসবে-যাবে না। পদাধিকারবলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়টা চালান ক্ষমতাসীন দলের দ্বিতীয় শক্তিশালী ব্যক্তি। কিন্তু গত সাড়ে চার বছরে এই মন্ত্রণালয় তার নিজের প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যায় না। গত ফেব্রুয়ারিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করার মুখ্য দায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর। গাড়িবিষয়ক ওই তদন্ত কমিটি বলেছিল, বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী গাড়ি থাকবে ৩৯টি, ব্যবহূত হচ্ছে ৬৫টি। ঢাকা দুই টুকরো হওয়ার আগের আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার জ্বালানি তেল খরচ দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে মন্ত্রী-সচিব নির্বিকার। আশা করব, এবারে অন্তত গাড়ি দুর্নীতির রাশ টানতে কুম্ভকর্ণদের ঘুম ভাঙবে। অবিলম্বে ডিএসসিসির গাড়ি কেনার চাহিদাপত্র বাতিলের পাশাপাশি গাড়ি অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হোক।

শরীরচর্চা শিক্ষক

সরকারি-বেসরকারি কলেজের শরীরচর্চার শিক্ষকেরা নানা পেশাগত বৈষম্যের শিকার। উপযুক্ত যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা থাকলেও পদোন্নতির সুযোগ নেই। নিম্ন পদমর্যাদার এই শিক্ষক ক্রীড়া বিষয়ের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও কলেজের ক্রীড়া কমিটির সম্পাদক হতে পারেন না। নিজের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বিস্তার না করলে স্বাভাবিক নিয়মে শরীরচর্চা শিক্ষককে কলেজ পরিচালনা পরিষদের শিক্ষক প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগও দেওয়া হয় না, শিক্ষক পরিষদের সদস্য হয়ে অন্যদের নির্বাচিত করা সুযোগ থাকলেও অন্য শিক্ষকেরা শরীরচর্চা শিক্ষককে নির্বাচিত করার ঔদার্য দেখান না। কেননা, বরাবরের মতো কলেজের সব কমিটিতে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকের জ্যেষ্ঠতা বিচার করা হয়। কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলা স্তিমিত হওয়ার অন্যতম কারণ প্রভাষক থেকে নিচের পদমর্যাদার শরীরচর্চা শিক্ষকের মতামত যেখানে উপেক্ষিত, অগ্রাহ্য ও গুরুত্বহীন। ফলে ক্রীড়ার ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহী শিক্ষকটিও একসময় চোখ-কান বুজে কোনোরকমে চাকরিজীবন পার করতে ব্যস্ত হন। খেলাধুলাকে সবাই ভালোবাসলেও খেলাধুলাবিষয়ক শিক্ষকের অবস্থান সবার নিচে। উচ্চতর যোগ্যতায় ডিগ্রি কলেজের লাইব্রেরিয়ানদের প্রভাষকের সমমর্যাদা থাকলেও শারীরিক শিক্ষায় মাস্টার্স (এমপিএড) বা অন্য বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রির শর্ত নিয়োগবিধিতে না থাকায় শরীরচর্চা শিক্ষকেরা প্রভাষকের অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে শারীরিক শিক্ষায় অনার্স-মাস্টার্স চালু হওয়ায় সত্ত্বেও উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ের এই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা পরিবর্তন হচ্ছে না। তাই শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আবেদন, কলেজের ক্রীড়া উন্নয়নে শারীরিক শিক্ষা পাঠক্রম চালু ও শরীরচর্চা শিক্ষকদের পেশাগত বৈষম্য অবসানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলা-বঞ্চনার অবসান ঘটানো হোক।
চঞ্চল কুমার কর্মকার
শরীরচর্চা শিক্ষক, কুমারখালী কলেজ, কুষ্টিয়া।

Wednesday, May 29, 2013

সংঘাতের রাজনীতি

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে তা আজ স্বীকৃত একটি বিষয়। বাংলাদেশ সফরে এসে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারিও আবার সে কথাই স্বীকার করে গেলেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা এই সম্ভাবনাকে নিজ গতিতে চলতে দিচ্ছে না। এটা আজ সত্যিই এক আক্ষেপের বিষয় যে এসব পরিহার করতে পারলে বাংলাদেশ আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াত! মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি আর শারমেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হয়েই দেশটির সম্ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, নারীশিক্ষায় অগ্রগতি, দ্বিতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উঠে আসাসহ বিভিন্ন সাফল্যের কথা উল্লেখ করে এ দেশের গতিশীল গণতন্ত্রেরও প্রশংসা করেছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশে এসেই হরতালের মুখে পড়তে হয়েছে শারমেনকে। যে দেশটি সামনের দিকে এগোচ্ছে, রয়েছে সম্ভাবনা, সে দেশটিতে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা সংগত কারণেই তাঁকে হতাশ করেছে। বলেছেন, অসংখ্য বাংলাদেশির মতো আমি আর আমার সহকর্মীরা নিরাশার সঙ্গে একের পর এক হরতাল, রাজপথে সহিংসতার পর সহিংসতা অবলোকন করেছি। হরতাল কর্মসূচির কারণে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেছেন মার্কিন সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি। কূটনৈতিক সূত্রে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর এই সফরের সময় হরতাল না দেওয়ার জন্য মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল। এ ধরনের অনুরোধ রক্ষা করা শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে, কিন্তু দলটি তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। হরতালের কারণে ‘বিরক্ত’ হয়ে যদি তিনি বৈঠকটি বাতিল করে থাকেন, তবে বিএনপির হরতাল ডাকার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকভাবে ভুল হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
শারমেন বাংলাদেশের যে সম্ভাবনার কথা বলেছেন আর যে বিষয়গুলো নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন, তা নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের জনগণও নিজেদের এই সমস্যা আর সম্ভাবনা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। বাংলাদেশের আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের বিদ্যমান ধারার রাজনীতি। দেশের বাইরে থেকে এসে কেউ তা শুধরে দিতে পারবে না, যতক্ষণ না দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজ থেকেই তা শোধরানোর উদ্যোগ নেয়।
দেশের বর্তমান সংঘাত ও সহিংসতার মূলে রয়েছে আগামী নির্বাচন। শারমেনের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেছেন যে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেবে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান দেশবাসীরও চাওয়া। এ নিয়ে বর্তমানে যে অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা দূর করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। আমরা আশা করব, বিরোধী দল হরতালের মতো কর্মসূচি ও সহিংসতা পরিহার করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথ বেছে নেবে। তা না হলে সম্ভাবনাময় এই দেশটির সম্ভাবনাকে নষ্ট করার দায় তাদের নিতে হবে।

সভা-সমাবেশ বন্ধ করা যায়, কিন্তু হরতাল? by আলী ইমাম মজুমদার

যে তিমিরে ছিলাম, সেখানেই রইলাম। আবার হরতাল ডাকা হলো। একটু পেছনে তাকালে স্মরণে আসবে এর প্রেক্ষাপট। অতিসম্প্রতি প্রধান বিরোধী দল তাদের অফিসের সামনে একটি সমাবেশ করার জন্য দু-দুটি দিন ধার্য করেও ঢাকা মহানগর পুলিশের অনুমতি পায়নি। প্রতিবাদে তারা একটি হরতাল ডেকেছিল। তখন উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল ঘূর্ণিঝড় মহাসেন। হরতাল আহ্বানকারীরা তখনকার মতো তা প্রত্যাহার করলেন। বন্যার কিছু উপকারিতা সম্পর্কে জানা যায়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের কোনো উপকারিতার কথা এত দিন জানা ছিল না। এযাত্রায় অন্তত দেখা গেল, মহাসেনের হুংকারে জাতি অন্তত একটি আসন্ন হরতালের হাত থেকে রেহাই পেল। এক দিনের হরতাল কোনো না কোনো অজুহাতে একাধিক দিনের হয়ে যায়, এমনটিও অনেকবার দেখা গেছে। তবে তখনকার মতো প্রত্যাহার করা হলেও ২৪ মে ঘোষণা দিয়ে ২৬ মে আবার তারা হরতাল ডাকল। কারণ বলা হলো একটাই, নিয়মতান্ত্রিক সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে এ হরতাল।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হয়ে জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। জনশৃঙ্খলার স্বার্থে সে বাধানিষেধ আরোপের ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও মহানগর পুলিশ আইনসমূহে রয়েছে। সময়ে সময়ে তার প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগও হয়। বাধানিষেধের অপপ্রয়োগ যদি জনজীবনে অধিক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তার দায়িত্ব আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেউ নেয় না। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষ দিতে থাকে। আর বারবার এ ধরনের পরিস্থিতি ঘটে চলেছে। এর মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এটা দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করা যায় যে হরতাল দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছে একটি অগ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও যখন যাঁরা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা সময়ে সময়ে হরতাল ডাকেন; কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে। এতে ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। তবে বরাবর সব সরকারই নির্বিকার থাকে। আর বিরোধী দলও তাদের সিদ্ধান্তে রয়ে যায় অবিচল। এখন উভয় পক্ষের মধ্যে আগামী নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে একটি সংলাপের প্রচেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় হরতালটি সে উদ্যোগে প্রতিকূলতা সৃষ্টিতেই ভূমিকা রাখার কথা। আর হরতাল ডাকার যত যুক্তিই থাক; বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেগুলো অগ্রহণযোগ্য। তবে বিস্ময়করভাবে এখানে প্ররোচনা দিয়ে চলেছে সরকারের এ-জাতীয় সিদ্ধান্ত। ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া হবে—এটাই বিজ্ঞানের সূত্র। সমাজবিজ্ঞানও প্রায় ক্ষেত্রেই সে সূত্র অনুসরণ করছে। এমনটাই আমরা দেখছি।
এসব সমাবেশ ক্ষেত্রবিশেষে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় গড়ায়। অবনতি ঘটায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। তবে বিষয়টি কিন্তু অভিনব নয়। এখন যাঁরা সরকারি দলে আছেন, তাঁরাও বিরোধী দলে ছিলেন। তখনো কি সভা-সমাবেশে একই উপসর্গ দেখা দিত না? অবশ্য তখনো এগুলোতে বাধাদানের ঘটনা ঘটেছে হরহামেশাই। এসবই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। বেদনাদায়ক হলেও বিষয়টি সত্য।
তবে এবার একটা নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। সরকার ঢাকায় সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দিয়েছে। ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকের ২০ মে ২০১৩-এর প্রধান শিরোনাম ছিল ‘ব্যান অর নো ব্যান?’ এতে চারজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নৈরাজ্য ঠেকাতে ঢাকায় সভা-সমাবেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী যিনি ক্ষমতাসীন দলটির মহাসচিবও বটে, তিনি বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় মহাসেন-পরবর্তী ত্রাণতৎপরতা সুচারুভাবে পরিচালনা করতে সারা দেশে এক মাসের জন্য রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রসচিব বললেন, এ বিষয়ে কোনো সরকারি পরিপত্র জারি হয়নি। আবার পুলিশের মহাপরিদর্শক জানালেন, তিনি এসবের কিছুই জানেন না। বিষয়টি নিয়ে একটি গোলকধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে। এটা কোন আইনের ভিত্তিতে কীভাবে করা হলো, তা দেশবাসীর কাছে অস্পষ্ট। তা স্পষ্ট করার উদ্যোগও কেউ নেয়নি। তবে কার্যত দেখা গেল, রাজধানী ঢাকায় কোনো সভা-সমাবেশ হতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি রাজনৈতিক দলের মিলাদ মাহফিলেও পুলিশ বাধা দিচ্ছে। কোনো বৈধ রাজনৈতিক দলের সমাবেশ করার অধিকার বন্ধ করতে যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে। এমনিতেই যখন যাঁরা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা সুযোগ পেলেই হরতাল-অবরোধ ডেকে বসেন। আর সভা-সমাবেশ বন্ধ করার সিদ্ধান্তটি নিয়ে তাঁদের হরতাল ডাকার অজুহাত সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে। হরতালেও সহিংসতা ও নৈরাজ্যের আশঙ্কা সমাবেশ-শোভাযাত্রার চেয়ে কিছু অংশে কম নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। আর হরতালটি ডাকা হয়েছে দেশজুড়ে। এমনিতেই গত নভেম্বর থেকে হরতাল অনেকটা প্রাত্যহিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অন্য সব কাজ উপেক্ষা করে হরতালের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দায় পড়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর। আর সেটা শুধু হরতালের দিনই নয়। এর আগের দিন থেকে হরতাল শেষ হওয়ার পরও কয়েক ঘণ্টা। এভাবে দিনের পর দিন চাপের মুখে থাকলে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যাঁরা সরকারে থাকেন তাঁরা প্রায়ই বলতে চান, হরতাল চলাকালে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক আছে আর অর্থনীতির চাকাও সঠিকভাবে ঘুরছে। সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগে পিকেটিং সমাবেশ হয়তো বন্ধ করা যায়। কিন্তু অন্য সব উপসর্গ? এটি সত্যি কথা, ঘন ঘন হরতালে অতিষ্ঠ জনগণ এখন সুযোগ পেলেই হরতালকে উপেক্ষা করে। কিন্তু কতটুকু করা যায়? ঢাকা শহরে সরকারি-বেসরকারি কিছু বাস ছাড়াও জীবিকার তাগিদে ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ইত্যাদি চলে। তবে বড় বিপণিবিতানগুলো খোলে বেলা দুইটার পর। কেননা, খুলে বসে থাকলেই তো হবে না; ক্রেতাও তো আসতে হবে। ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগের ভয়ে প্রাইভেট কার বের করার ঝুঁকি নেন খুব কম লোক। আর মহাসড়কগুলো কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। ফলে পণ্য পরিবহনব্যবস্থা অচল হয়ে অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এমনটাই দাবি করছেন দেশের সব দলমতের শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে নেতাদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিতে শুরু করেছেন। কিন্তু বিষয়টি সুরাহা না হয়ে বরং আবার উল্টো পথেই যাত্রা করল।
সভা-শোভাযাত্রার নামে যারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করে, তাদের বিরুদ্ধে তো হামেশাই মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাস করতে হচ্ছে অনেককেই। রিমান্ডের প্রয়োগ আর ডান্ডাবেড়ির ব্যবহারও তো আমরা দেখলাম। অবশ্য এখানে উল্লেখ করা যথার্থ হবে যে, রাজনৈতিক নেতাদের রিমান্ডে নেওয়া ও নির্যাতনের সংস্কৃতি চালু হয় গত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে। এগুলো আদৌ ঠিক হয়নি, এমনটা কি এখন তাঁরা ভাবেন? ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে এসব কোনো অবস্থাতেই করা হবে না—এমন আলাপ-আলোচনাও কি তাঁদের মাঝে হয়? এ ধরনের শুভবুদ্ধির উদয় সহজে ঘটবে—এমনটা ভাবতে ইচ্ছা করে কিন্তু ভরসা হয় না। মনে হয়, প্রত্যেকেই মারমুখী হয়ে আছেন। আর যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরাও তো চিরদিন সেখানে থাকবেন না। কেউ থাকেননি। তখন একই সংস্কৃতি চালু থাকলে তাঁদেরও এরূপ হেনস্তা হতে হবে, এটা ভেবেও তো প্রতিপক্ষের প্রতি কিছুটা সহনশীল হতে পারেন। জরাজীর্ণ অতীতকে ভুলে তাঁরাও তো নতুনভাবে পথ চলতে শুরু করতে পারেন। সৃষ্টি করতে পারেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মানবোধ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে। মূল সমস্যাটা এখানেই। অথচ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কথা বলেন তাঁরাই। আর সেটা চাইলে যা করার দরকার, করছেন তার উল্টোটা। বারবার আমাদের বিশ্বাসের ভিতে তাঁরা ফাটল সৃষ্টি করে চলেছেন। এক-দুটি সভা-সমাবেশে কিছু নৈরাজ্য হলে ক্ষতি হয় বটে। তবে সে ক্ষতি যাতে যথেষ্ট কম হয়, তার সক্ষমতা তো আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর রয়েছে। অন্তত ঢাকা মহানগরে তা আছে পর্যাপ্ত মাত্রায়। কিন্তু দেশব্যাপী একটি হরতালে যে ক্ষতি হয়, জনজীবনে যে দুর্ভোগ নেমে আসে, তা বন্ধ করার সুযোগ কিন্তু তেমন নেই। আদেশ দিয়ে সভা-সমাবেশ ঠিকই বন্ধ করা হয়েছে, কিন্তু হরতাল বন্ধ করা যায়নি। যাবেও না। তাহলে ভুক্তভোগী জনগণ প্রশ্ন রাখতে পারে—ক্ষতি কোনটাতে বেশি হলো? অবশ্য আমাদের দেশটিতে একটি সুবিধা আছে। তা হলো এ ধরনের সিদ্ধান্তের পরিণামের দায়দায়িত্ব কখনো কাউকে নিতে হয়নি।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

লিমনের অন্তহীন সংগ্রাম

যে পৃথিবীতে পা হারানো মানুষও এভারেস্ট জয় করছে, সেই পৃথিবীর এক দুর্ভাগা তরুণ লিমনকে বাকি এক পায়ে লড়াই করতে হয় প্রতাপশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। র‌্যাবের গুলিতে হারানো পা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না; কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় তিনি ফিরে পেতে চেয়েছিলেন ভয়হীন একটা জীবন। দুই বছর পার হলেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হুমকি এখনো তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। পা হারানো লিমন আমাদের পঙ্গু মানবাধিকারের এক মর্মান্তিক প্রতীক। যে কথিত সন্ত্রাসী মোরশেদ জমাদ্দারের লোক বলে র‌্যাব লিমনকে ফাঁসাতে চাইছে, পরিহাস হচ্ছে ঘটনার দুই বছর পরও সেই সন্ত্রাসীকে বা তাদের বাহিনীর কাউকে র‌্যাব গ্রেপ্তার দেখাতে পারেনি। অথচ গুলিতে পা চলে গেল সে সময়ের ১৬ বছর বয়সী কিশোর লিমনের। লিমনের মায়ের করা মামলার অপমৃত্যুর ব্যবস্থা করেছে পুলিশ। ঘটনার পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা লিমনকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দেন। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, লিমন ও তাঁর বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই সন্ত্রাসী। লিমনদের মতো দরিদ্র অসহায় নিরীহ পরিবারটি যদি সন্ত্রাসী হয়, তাহলে বাংলাদেশের সব মানুষকেই সন্ত্রাসী বলতে হবে। একটি অপরাধ ঢাকতে এভাবে সমগ্র রাষ্ট্রশক্তি লিমনের বিরুদ্ধে, ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে, আইন ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে ‘অপরাধ’ করে চলছে। পঙ্গু লিমন ও তাঁর পরিবারকে মামলার পর মামলায় নাজেহাল করা হচ্ছে, আবার সেই পঙ্গু দেহ নিয়েই লিমন চালিয়ে যাচ্ছেন পড়ালেখার সংগ্রাম। প্রতি মাসে ২০ মাইল দূরে ঝালকাঠি আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হয় লিমনকে। পাশাপাশি সামলাতে হচ্ছে র‌্যাবের সোর্স ও মাস্তানদের হুমকি। গত ঈদের আগে র‌্যাবের ‘সোর্সদের’ হামলায় তাঁর একটি কানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরীক্ষার আগে আগে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় ২০১১ সালে এইএসএসসি পরীক্ষা আর দিতে পারেননি। এবারে তিনি পরীক্ষা দিয়েও বিপন্ন।
লিমন যেন এক সংশপ্তক, যিনি অঙ্গহারা হয়েও এক পায়েই চালাচ্ছেন জীবন ও অধিকারের সংগ্রাম। লিমনের এই সংগ্রাম এক পায়ে এভারেস্ট জয়ের থেকেও কঠিন। র‌্যাব-পুলিশের মামলা চলছে তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে রাষ্ট্র-প্রশাসন। লিমন যেন বিপন্ন বাংলাদেশের মুমূর্ষু মানবতা। লিমন জিতলে মানবতা জিতবে, লিমন হারলে হারবে বাংলাদেশ।

অরণ্যের পুত্র হয়ে by দেবী শর্মা

ষাটের দশকে বরিশালে আমাদের বাড়ির সামনের খোলা বারান্দাটির এক পাশ সবুজ রঙের নেটে ঘিরে দ্বিজেন শর্মা (বাড়ির জামাই) চমৎকার একটি পড়ার ঘর বানিয়ে ফেলল। কিন্তু না, কিসের যেন অভাব। বাইরের দিক থেকে নেটের লাগোয়া বড়সড় একটি পাখির বাসা তৈরি করে মুনিয়া, লাভ বার্ডস—এমন কয়েক জোড়া পাখি পুরতেই যেন একটা সামঞ্জস্য এল। নারকেলগাছের ছায়ায় পাখির বাসার ওপরের কোনায় ছোট এক বোতল কার্বোলিক অ্যাসিড ঝুলিয়ে সাপখোপের হাত থেকে পাখিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা হলো। প্রাকৃতিক পরিবেশে এবার লেখার সব আয়োজন পূর্ণ।
শ্রাবণ মাস, ঝেঁপে বৃষ্টি এল। নারকেলগাছ চুইয়ে জল গড়াচ্ছে, বৃষ্টির ছাটে পাখিদের ডানা ঝাপটানি। বাড়ির সামনের মোটামুটি বড়সড় লনটিকে সে জীবনের প্রথম গার্ডেন ডিজাইনের লক্ষ্য স্থির করল। কুরচি, নীল জবা, মাধবী, মালতী, অশোক। চাঁড়িতে নীল শাপলা, সবুজ লন—একটু একটু করে যেন অপরূপা হয়ে ওঠা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় গাছের প্রায় নাভিশ্বাস, আজ এখানে তো কাল ওখানে। আমার আইনজীবী বাবা সন্ধ্যায় কোর্ট থেকে ফিরে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, ‘সে কী করে, গাছগুলো এখনো এখানে?’
হয়তো তার মানসে তখন পাহাড়ি প্রকৃতির উজ্জ্বল, ঋজু, ধ্যানমগ্ন পৌরুষময় রূপের সঙ্গে নদীনালা-সমৃদ্ধ সমতলের উচ্ছল, নমনীয় নারী প্রকৃতির সংশ্লেষের প্রক্রিয়া চলছে। আমার ধারণায় মানুষটি পাহাড়ে অরণ্যের বেপরোয়া শৈশব, কৈশোরের অপার সম্ভারে জীবনের প্রারম্ভেই অলৌকিক সৌন্দর্যবোধে দীক্ষিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সমস্ত জীবনের কঠোর সাধনায় সেই রহস্যময়ীর নৈকট্য লাভে ধন্য হয়েছে। ঝকঝকে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া সেই লনে বন্ধুবান্ধবসমেত আমরা বাঁধভাঙা আনন্দে ভাসতাম। কখনো লক্ষ্মীপূজা, দোল পূর্ণিমায় এর পরিধি আরও বাড়িয়ে তুলত। ইউসুফ ভাই, দুলু, গফুর ভাই, বীণা, নিখিলদা, নূরজাহান, রানীদি, সিদ্দিক ভাই, মা—সব মিলিয়ে যেন চাঁদের হাট।
দিন যায়, ষাটের দশকের শেষে এই ভূখণ্ডে অস্তিত্বের লড়াইয়ের চরম পর্যায়ে ছত্রখান হয়ে একদিন সব ভেঙে পড়ে। আমরা দুজন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। অস্তিত্ব রক্ষা ও জীবনধারণ প্রাথমিক পর্যায়ে নেমে আসে। ঘৃণার লক্ষ্য এড়িয়ে পশুর জীবন হিঁচড়ে স্বাধীনতার দ্বারে পৌঁছালাম। আবার পরিবার একত্র হলাম, তবে নয় মাসের যন্ত্রণায় দ্বিজেন শর্মাও ঝলসে গেছে।
বছর তিনেক পরে বিদেশের এক অভাবিত ডাক এল, সোভিয়েত ইউনিয়নে, অনুবাদের কাজে। এই গরম থেকে প্রচণ্ড শীতের দেশে গিয়ে পড়লাম। টুপি, ওভারকোট, হাতমোজা, বুটজুতা—মানুষ চেনা দায়। তার ওপর হাঁটুসমান বরফে ধুপধাপ আছাড় খাওয়া। হাত ধরাধরি করে এলাকা চষে বেড়াই, একসময় সবই স্বাভাবিক হয়ে আসে; প্রকৃতি, কুকুর, মানুষ এবার নতুন মাত্রায় মন-মানসে যুক্ত হতে থাকে। শীতের রাতের তুষারবৃষ্টির পর শুদ্ধ, শুভ্র প্রকৃতি, পত্রহীন ন্যাড়া গাছগুলো রাতারাতি বরফে সজ্জিত রূপকথার মতো মনভোলানো। শীতের প্রথম বরফ মানেই মহোৎসব, বাচ্চারা বরফে খেলছে, বৃদ্ধারা ঠেলছেন, স্কি, স্কেটিং কী না, একমাত্র ফারগাছই তার দেহসৌষ্ঠব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, বরফ তার খাঁজে খাঁজে। বসন্তের শুরুতেই মুখিয়ে থাকা ঘাস, গাছপালা তরতরিয়ে মাথা তুললে রাতারাতি সবুজে ভরে যায় প্রকৃতি। এবার দ্বিজেন নিচে বাড়ির লাগোয়া বড়সড় ত্রিকোণ জায়গাটুকুতে বাগান করতে প্রস্তুত। এবারও সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা—পপলার, বার্চ, সিরিন, লাইলাক, ভেতরে ছোট্ট একটি লন, বর্ডারে পপি কসমস। রুশি বৃদ্ধারা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গ্রীষ্মের দীর্ঘ সন্ধ্যায় আমাদের অষ্টম তলার ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের টেবিলে বিভিন্ন সালাদ, মাংসের রোল, পানীয়, বন্ধুবান্ধব নিয়ে জমাট আসর। নিশ্চিন্ত জীবন। এর মধ্যে দ্বিজেন বন্ধুবান্ধব পেলেই নটর ডেম কলেজ ও সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজের নারীদের কাছে নতুন গাছের বীজ পাঠাত। গাছ হোক না হোক, বীজ পাঠাতে সে ক্ষান্ত হয়নি কখনো।
বন্ধু বিশুদা তাঁর পাঁচ-ছয় বছরের মা-মরা ছেলে ইয়ানকে অপারগ হয়ে রেখে যেতেন আমাদের বাড়ি। ছেলে, মেয়ে, আমি বাইরে, দ্বিজেন জেঠুই সব। অনুবাদের ফাঁকে ফাঁকে অনেক সময় ছোট কাচের বয়াম দিয়ে পোকা ধরতে তাকে বাগানে পাঠানো হতো। পোকামাকড়-পাগল ইয়ান বেশ কতগুলো বয়ামে পুরত। একবার পর পর দুটি রঙিন পোকা পাওয়ায় একটা মুখে পুরে ও দুটোকেই জেঠুর জন্য নিয়ে আসে, যাক কিছু হয়নি। আর ধবধবে সুন্দর ইয়ান যখন তার প্রিয় কালো কুচকুচে কুকুরটাকে জড়িয়ে লাল কার্পেটে শুয়ে থাকত— যেন পটে আঁকা ছবি।
গ্রীষ্মে মস্কোর বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়ানো ছিল আমাদের বার্ষিক প্রোগ্রামের অংশ আর তার পাশেই প্রদর্শনী কেন্দ্র ‘ভেদেনখা’ একটি প্যাভিলিয়নে ছিল শিল্পসম্মত ছোট ছোট বাগানের অপূর্ব নমুনা। রাশিয়ার বাইরে প্যারিস, বার্লিন, লন্ডন, হেলসিংকি—সর্বত্রই ফুল, প্রকৃতি, বাগানে অসাধারণ উৎকর্ষে মুগ্ধ মানুষটির দেশের জন্য খেদোক্তি উঠে আসত। লিভারপুলে একবারের ‘টুকরো বাগানের প্রদর্শনী’ তাকে প্রচণ্ড আলোড়িত করে।
ফরাসি গার্ডেন, জাপানি গার্ডেন, মোগল গার্ডেন—টুকরো একেকটি শিল্পকর্ম যেন। গ্রীষ্মকালীন গ্রামের বাড়ির একটি নমুনা মনে পড়ে: খড়ের ঘরের পাশ দিয়ে নুড়ির একটি নালা, কুলকুল শব্দে স্বচ্ছ জল গড়াচ্ছে, উঠানের মতো বাগান, লতাপাতার ঝাঁকা—প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক টুকরো ল্যান্ডস্কেপ। শতবর্ষের ঐতিহ্য, বৈশিষ্ট্য, ঋতুর রং পরিবর্তন—সব যেন শিল্পীর মনোভূমির রংতুলিতে রূপ নেয় এমন একেকটি শিল্পকর্মের।
মগ্নময়ী দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র দ্বিজেন ওরফে খোকার আজ ৮৪তম দেশ-বিদেশ উজাড় করে অপার সম্ভার নিয়ে তরি ভিড়িয়েছে, এখন তৈরি হবে সেই আশ্চর্য বাগান, যেখানে নিকষ কালো আঁধারে নগরের শৃঙ্খলিত কিশোর কেঁদে উঠবে না: ‘হারিয়ে গেছি আমি’; যেখানে উজ্জীবিত, মন্ত্রমুগ্ধ প্রজন্ম বেঁচে থাকবে অরণ্যের পুত্র হয়ে।
দেবী শর্মা: দ্বিজেন শর্মার জীবনসঙ্গিনী।

তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের পরিণতি by শাহাদুজ্জামান

বিশেষ সামরিক আদালতে কর্নেলতাহেরের মৃত্যুদণ্ডের রায় চ্যালেঞ্জ করে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাটি ফের আলোচনায় এসেছে। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের লেখায় এই ঘটনার প্রধান দুই কুশীলব আবু তাহের ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার ওপর আলো ফেলা হয়েছে। সম্প্রতি তাহেরের ফাঁসিকে একটি হত্যাকাণ্ড এবং তাঁর পেছনে জেনারেল জিয়ার সংশ্লিষ্টতার ঘোষণা দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের প্রেক্ষাপটটি বর্ণনা করেছি। আজ সেই সম্পর্কের পরিণতির ওপর আলোকপাত করতে চাই। আগেই উল্লেখ করেছি, স্বাধীনতা-উত্তরকালের মুজিব সরকারের প্রকাশ্যে বিরোধিতাকারী শক্তিশালী বামধারার রাজনৈতিক দল জাসদের নানা তৎপরতার ব্যাপারে জিয়া অবহিত হতেন তাহেরের মাধ্যমে, অন্যদিকে গোপনে মুজিব সরকারকে উৎখাতে মোশতাক চক্রের ডানপন্থী ধারার ষড়যন্ত্রের খবর তিনি পেতেন ফারুক, রশীদের মাধ্যমে। সরকারবিরোধী দুটি শক্তিই সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেনাবাহিনীর কৌশলগত সহায়তা পেতে অসন্তুষ্ট উপসামরিক প্রধান জিয়াকে তাদের সম্ভাব্য মিত্র বলে বিবেচনা করেছিল। জিয়া দুটি তুরুপের তাসই নিজের হাতে রেখেছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির অস্ট্রেলীয় গবেষক ডেনিস রাইটকে উদ্ধৃত করে গতকাল লিখেছিলাম, যখন ফলাফল অস্পষ্ট, তখন খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সব রকম পথ খোলা রাখা জিয়ার স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য। (হাবীব জাফারুল্লাহ সম্পাদিত দ্য জিয়া এপিসোড ইন বাংলাদেশ পলিটিকস, সাউথ এশিয়ান পাবলিশার, ১৯৯৬)। বলা বাহুল্য, ফলাফল স্পষ্ট হয় ১৯৭৫ সালের আগস্টে যখন মোশতাক চক্রের ডানপন্থী ষড়যন্ত্রমূলক শক্তিটি শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে সরকার উৎখাতে সফল হয়। তুরুপের দুটি তাস হাতে রাখার সুফলও পান জিয়া। নতুন সরকারপ্রধান মোশতাক বিদ্যমান সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে সরিয়ে সেনাপ্রধান করেন জিয়াকে। বাংলাদেশের ইতিহাস এরপর এক গভীর নাটকীয়তার দিকে ধাবিত হয়। জুনিয়র অফিসারদের হাতে সংঘটিত এই রক্তাক্ত অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে খালেদ মোশাররফ ২ নভেম্বর মাঝরাতে আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থান করেন এবং জিয়াকে গৃহবন্দী করেন। এই সময় আওয়ামী লীগের ব্যানার নিয়ে খালেদ মোশারফের ভাই ও মায়ের মিছিল, ভারতীয় রেডিও-টিভিতে খালেদের ক্ষমতা দখল নিয়ে উচ্ছ্বসিত সংবাদ ভুলভাবে এই অভ্যুত্থানের পেছনে ভারতীয় মদদ এবং আওয়ামী লীগের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা তৈরি করে। আওয়ামী সরকারের পুনরুত্থানের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে মোশতাক চক্র গোপনে এ সময় জেলে আওয়ামী লীগের প্রধান চারজন নেতাকে হত্যা করে।    পরিস্থিতির জটিলতায় বন্দী জিয়া এ সময় নিজেকে পুরো দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে নিজের বেতন-ভাতা ইত্যাদির জন্য আবেদন করেন। কিন্তু জিয়া এও টের পান যে সেই রক্তাক্ত কাল পর্বে বন্দী অবস্থায় তাঁর জীবনও মোটেই নিরাপদ নয়। তাই শেষরক্ষা হিসেবে তিনি এ সময় তাঁর তুরুপের দ্বিতীয় তাসটি ব্যবহার করেন। তিনি টেলিফোনের মাধ্যমে গোপনে তাঁর জীবন বাঁচানোর জন্য অনুরোধ করেন তাহেরকে।
আগেই উল্লেখ করেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডারদের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে তাহেরের সঙ্গে জিয়ার যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ঘটে, তা অব্যাহত ছিল স্বাধীনতার পরও। জিয়াকে যারা সেনাপ্রধান করেছে সেই মোশতাক চক্র সেই মুহূর্তে খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিজেদের জীবন রক্ষায় ব্যস্ত। ফলে তাদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, জিয়া তা জানতেন। জিয়া এও জানতেন যে সে সময়ের বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ধারা জাসদ এবং ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের গোপন শক্তি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে আছেন তাহের। নিরবলম্ব জিয়া তাই টের পেয়েছিলেন, সেই মৃত্যুকূপ থেকে তাঁকে রক্ষা করার একমাত্র চাবিটি তখন রয়েছে তাহেরের হাতে। সেই ভরসাতেই তাহেরের কাছে জীবন বাঁচানোর আকুতি করেছিলেন তিনি। এবং বাস্তবিক বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমেই ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাহের জিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। কেন তাহের তা করলেন, সংক্ষেপে ইতিহাসের সেই মুহূর্তটিকে বুঝে নেওয়া যেতে পারে। 
সে মুহূর্তে ক্যান্টনমেন্টে বিরাজ করছিল চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। কারণ, খালেদের অনুগত, ফারুক, রশীদের অনুগত এবং জিয়ার অনুগত সেনারা তখন পরস্পরের মুখোমুখি। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সিপাহিরা জেনারেলদের ক্ষমতায় লড়াইয়ের গুটি হিসেবে আর ব্যবহূত হতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা তাদের নেতা তাহেরকে অবিলম্বে একটি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেয়, নইলে তারা নিজেরাই রুখে দাঁড়াবে বলে ঘোষণা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৫ নভেম্বর রাতে জাসদের নেতারা জরুরি বৈঠকে বসেন। জাসদের প্রধান নেতারাসহ হাজার হাজার কর্মী তখন জেলে। ফলে একটা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে দ্বিধান্বিত ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই আগ্নেয় পরিস্থিতি থেকে ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। একটা ঐতিহাসিক চাপের মুখে তাঁরা তাঁদের বিপ্লব পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করেন এবং জাসদের গণবাহিনীসহ বেসামরিক শক্তি ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সামরিক শক্তির সমন্বয়ে ৭ নভেম্বর একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় বাংলাদেশের রাজনীতি চালিত হচ্ছিল ক্যান্টনমেন্ট থেকে। অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে আপাতত ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের সাংগঠনিকভাবে সংহত করার একটা অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা করেন তাহের।
আগেই উল্লেখ করেছি, তাহের খুব ভালোভাবেই জানতেন যে জিয়া মোটেও তাঁদের আদর্শিক সঙ্গী নন। কিন্তু যে মানুষ বন্দী অবস্থায় আছেন, যিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেছেন, যিনি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য আবেদন জানিয়েছেন, তেমন একজন নাজুক ব্যক্তিকে মুক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবেন বলেই ভেবেছিলেন তাহের। বিপ্লবী পরিস্থিতিতে বিপরীত মেরুর মানুষের সঙ্গে কৌশলগত আঁতাত তৈরির বহু নজির পৃথিবীতে আছে। একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ কিউবার বিপ্লব। কিউবার বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটানোর পরও সেই বিপ্লবের কিংবদন্তি নেতা কাস্ত্রো বা চে গুয়েভারা কেউই সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নেননি। গেরিলা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সদ্য আসা কাস্ত্রো এবং চে নিজেদের গুছিয়ে নিতে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান করেছিলেন মধ্যপন্থী আইনজীবী মানুয়েল আরুটিয়াকে। সেই আরুটিয়া ক্ষমতা পেয়ে প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কাস্ত্রো তাঁকে উৎখাত করতে সক্ষম হন।
কাস্ত্রো পারলেও তাহের তাঁর আপাতমিত্রের প্রতিবিপ্লবী তৎপরতাকে উৎখাত করতে পারেননি। লক্ষণীয়, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের দুটি মাত্রা ছিল। একটি সামরিক, অন্যটি বেসামরিক। তাহেরের নেতৃত্বে সামরিক মাত্রাটি সফল হলেও, জনতাকে সংগঠিত করার বেসামরিক মাত্রাটি ব্যর্থ হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান প্রমুখ। ফলে অভ্যুত্থানের ভরকেন্দ্রটি জনতার ভেতর না এসে রয়ে যায় ক্যান্টনমেন্টে। কথা ছিল বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে জিয়া ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এসে তাহেরের সঙ্গে যৌথভাবে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসবেন। কিন্তু জিয়া তাঁর জীবন রক্ষার জন্য তাহেরকে ধন্যবাদ জানালেও প্রতিশ্রুত সাক্ষাতের জন্য ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আসেননি বরং অন্যান্য সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে অতিদ্রুত পুরো পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে খালেদ মোশাররফসহ আরও কয়েকজন সেনাকর্তা সৈনিকদের হাতে নিহত হন। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দ্বিতীয় জীবন পেয়ে জিয়া দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ক্যান্টনমেন্টে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে তিনি একে একে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তার হন তাহেরও এবং একপর্যায়ে গোপন সেই অবৈধ বিচারের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করেন। তাহের বিচারের সময় তাঁর জবানবন্দিতে জিয়াকে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের এই পরিণতিকে আমাদের বুঝতে হবে সে সময়ের বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে। তখন  পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের জোর ঠান্ডা লড়াইয়ের কাল। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ দেশে প্রথমবারের মতো একটি সমাজতান্ত্রিক ধারার শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার অত্যন্ত নিকটবর্তী হয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন তাহের। দেশের ভেতর ক্রিয়াশীল মার্কিনপন্থী, পাকিস্তানপন্থী, ধর্মীয় মৌলবাদী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যাবতীয় সামরিক, বেসামরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল যেকোনো মূল্যে এই সমাজতান্ত্রিক স্রোতটিকে ঠেকানো। তারা সামনে পেয়েছিল অনিশ্চিত সাঁতারু কিন্তু ক্ষমতায় আগ্রহী জিয়াকে। এই পুরো শক্তিটি তাই জিয়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিবিপ্লবী এই শক্তি বিপ্লবী শক্তির মূলকেন্দ্র তাহেরকে হত্যা করে তাই সমাজতন্ত্রের ধারাটিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। জিয়া কর্তৃক তাহেরের ফাঁসির এই আয়োজনকে তাই নেহাত ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয় ভাবার কারণ নেই। এটি দুটি বিপরীতমুখী আদর্শ ও শক্তির সংঘাতের অনিবার্য পরিণতি। জিয়া ও তাহের ছিলেন দুটি ভিন্ন শক্তির প্রতিভূ, যাঁরা পরস্পরকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাসের বিশেষ মুহূর্তের ভুলভ্রান্তির মিথস্ক্রিয়ায় পরাজয় ঘটেছিল তাহেরের, জয়ী হয়েছিলেন জিয়া। ফলে স্বভাবতই আমরা তাহেরের প্রত্যাশিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত সমাজতান্ত্রিক ধারার কোনো বাংলাদেশকে পাইনি বরং জিয়ার হাত ধরে পরবর্তীকালে এখানে বিকশিত হতে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের, ধর্মীয় মৌলবাদীদের এবং মুক্তবাজারের লুটেরা পুঁজির ধারকদের। কিন্তু ইতিহাসের গতি পাল্টায়, তাহের নিশ্চিহ্ন হননি, ফিরে এসেছেন। এখন দেখার বিষয় তাহেরের আদর্শটি ফিরে আসে কি না। (শেষ)
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com

বেসিসের প্রতি by মো. আরিফুর রহমান

শুরুতেই ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসকে (বেসিস)। কারণ, তারা আউটসোর্সিংয়ে কাজের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১০০টি পুরস্কার দিয়েছেন। এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। কারণ, আমাদের দেশের জন্য আউটসোর্সিং হচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় খাত। যেকোনো পর্যায়ের মানুষ এই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত পর্যায়ের উন্নতি সাধন করতে পারেন। আউটসোর্সিংয়ে অপার ও সীমাহীন সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে যেকোনো ব্যক্তি তাঁর ভাগ্যকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে এবং অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিতে পারে এই আউটসোর্সিং। বেসিসের কাছে আমার বিশেষ আবেদন, এ দেশে আউটসোর্সিং যাতে দ্রুত প্রসারিত হতে পারে, সে জন্য তারা বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। এ দেশের মানুষের মধ্যে আউটসোর্সিংয়ের ধারণা পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের সেমিনার ও ট্রেনিংয়ের আয়োজন করতে হবে। এসব সেমিনার ও ট্রেনিং শুধু শহরকেন্দ্রিক না করে গ্রামপর্যায়েও আয়োজন করা যেতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় বা সময়ে করতে হয় না। এর ফলে এটা শহর কিংবা গ্রাম—সব জায়গায় করা যাবে। প্রয়োজন শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও ব্যক্তির আউটসোর্সিং সম্পর্কে ধারণা ও আগ্রহ।
গ্রামাঞ্চলে নারী-পুরুষকে আউটসোর্সিংয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলতে গ্রাম এলাকায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তাদের প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে সমর্থন জুগিয়ে যেতে হবে। কারণ, তারা শহর এলাকার মতো সুযোগ-সুবিধা পায় না। বাংলাদেশের সব এলাকায় যেসব ব্যক্তি আউটসোর্সিং সম্পর্কে আগ্রহী, তাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের আগ্রহে যাতে কোনোক্রমেই অনাগ্রহের সৃষ্টি না হয়, সে জন্য অত্যন্ত সহজ কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। মোট কথা, বাংলাদেশে আউটসোর্সিংয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করতে বেসিস কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস। এই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একদিন এ দেশের প্রতিটি ঘর একেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান হবে—এই প্রত্যাশায় বেসিসকে এগিয়ে আসতে হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হবে, এ আশা আমরা করতেই পারি।
মো. আরিফুর রহমান
ঢাকা।

ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন by মীর মাহফুজুর রহমান

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন বিল, ২০১৩’ পাস হয়েছে। ফলে ‘জনবহুল’ বা ‘প্রকাশ্যে’ ধূমপানের জন্য ৩০০ টাকার জরিমানার বিধান করা হলেও এতে রয়েছে বড় ধরনের ফাঁকি। এতে ‘জনবহুল স্থান’ বা ‘পাবলিক প্লেস’ বলতে অনেক কিছুর উল্লেখ করা হলেও এর সংজ্ঞায় সুকৌশলে ফুটপাত, পার্কসহ কোনো উন্মুক্ত স্থান অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিন্তু আমরা জানি, বর্তমানে বাংলাদেশের সব শহরের রাজপথ বা ফুটপাত জনবহুল। এসব রাজপথ বা ফুটপাতে সাধারণত অনেকটা ঠেলাঠেলি বা ধাক্কাধাক্কি করে চলাফেরা করতে হয় এবং প্রায়ই লক্ষ করা যায়, এতে বয়স্ক লোক ছাড়াও অল্প বয়সী তরুণেরা চলমান অবস্থায় অবজ্ঞাভরে বা তোয়াক্কা না করে ধূমপান করে ধোঁয়া ছাড়ছেন। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সতর্কবাণী লিপিবদ্ধকরণ নতুন কোনো কিছু নয়। নতুন সংশোধিত আইন প্রণয়নে আমাদের মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করতেই হয়!
সংশোধিত আইনে ধূমপানের জন্য ৩০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হলেও যখন আমরা দেখি যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য প্রকাশ্যে ধূমপান করছেন, তখন এরূপ একটি ত্রুটিযুক্ত ‘সংশোধিত’ আইনের আদৌ বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহই জাগে। তা ছাড়া যেসব আবদ্ধ স্থান বা প্রতিষ্ঠানে ধূমপান নিষিদ্ধ হয়েছে, সেসব আবদ্ধ স্থান বা প্রতিষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কমই গিয়ে থাকেন।
মীর মাহফুজুর রহমান
কাঁঠালবাগান, ঢাকা।

Tuesday, May 28, 2013

দাস-প্রভূ চিন্তার বিদঘুটে পরিণতি by সারওয়ার চৌধুরী

রাজনীতি সচেতন থাকা আর দলীয় রাজনীতি করা এক নয়। এই ব্যাপারটা দাস-প্রভূ-চিন্তা-বলয়ে আটকে থাকা মানুষদের মাথায় সহজে ঢুকে না। তাদের সহজ বুঝ হল, কোনো-না-কোনো পক্ষে থাকতেই হয় বা আছে সকল মানুষ।

দেশে কি একদলীয় শাসন? by আমীর খসরু

সরকার সভা-সমাবেশের উপরে বিধি-নিষেধ আরোপ করার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অবশ্য নজিরবিহীন বলাটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে সঠিক শব্দ প্রয়োগ বলে মনে হয় না। এ ধরণের বিধি-নিষেধের কঠিন এবং শক্ত বেড়াজালে ইতোপূর্বেও আমরা বার বার পড়েছি।

এটা হাসিনার পথ নয় by মতিউর রহমান চৌধুরী

এটা কি শেখ হাসিনার পথ? যদি কেউ তার অতীত নিয়ে গবেষণা করেন তাহলে চটজলদি জবাব দেবেন এটা তার পথ নয়। আমরা সবাই জানি, হাসিনার পথ লড়াইয়ের পথ। লড়াই-লড়াই-লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।

যুদ্ধোন্মাদনা ও যৌন অনাচার by ড. মাহফুজ পারভেজ

যুদ্ধের উন্মাদনা ও যৌন অনাচারের মধ্যে কি কোনও কার্যকর সম্পর্ক আছে? থাকাটাই স্বাভাবিক। সাইকোলজির বিশেষজ্ঞরা বিশদে ভাল বলতে পারবেন। সাধারণ চোখে আমরা দেখি, যুদ্ধের মাঠে সৈন্যরা উন্মাদনায় প্রতিপক্ষ নিধনের সঙ্গে সঙ্গে যৌন অপরাধেও জড়িত হয়।

সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে আবছা আলো by আলী ইদ্‌রিস

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে প্রধান দু’দলের মধ্যে মতানৈক্য, বাগবিতণ্ডা, সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটাকে ক্রান্তিকাল বা সুড়ঙ্গ পারাপার বল্লে ভুল হবে না। সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তের আলোটি কখনও জ্বলে উঠে, আবার কখনও নিভে যায়।

কঠোর আইন সংকটকে ঘনীভূত করতে পারে

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নভি পিল্লাই গতকাল সোমবার বলেছেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স কঠোর সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন করার চিন্তাভাবনা করছে। তবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সম্প্রতি লন্ডন ও প্যারিসে দুই সেনার হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স কঠোর সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন প্রণয়ন ও নজরদারির ব্যবস্থা জোরালো করার কথা বিবেচনা করছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিউবায় অবস্থিত গুয়ানতানামো বে আটক কেন্দ্র বন্ধ করার অভিপ্রায় পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বসন্তকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনকালে নভি পিল্লাই এসব কথা বলেন। ওই অধিবেশনে পিল্লাই বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতাবিরোধী অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে আমি অভিযোগ পেয়েছি।’ তিনি বলেন, এ ধরনের অনুশীলন আত্মশৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। এ ধরনের পদক্ষেপ সন্ত্রাসবাদকে সমূলে উৎপাটন করতে পারবে না, বরং আরও উসকে দেবে। লন্ডন ও প্যারিসে সেনা হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের অনেক রাজনীতিবিদ কঠোর সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া কিছু গণমাধ্যম প্রতিবেদনে এমন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা বাকস্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।নভি পিল্লাই বলেন, গুয়ানতানামো আটক কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধ করতে না পারার ব্যর্থতা এমন একটি উদাহরণ যেখানে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই মানবাধিকারের মৌলিক নীতি মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে’। গুয়ানতানামোয় ২৩টি দেশের ১৬৬ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককেই কোনো অভিযোগ ছাড়াই এক দশকের বেশি সময় ধরে আটক রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ওবামা গুয়ানতানামো আটক কেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন উল্লেখ করে নভি পিল্লাই বলেন, গুয়ানতানামো থেকে বন্দী হস্তান্তরের বিষয়টি অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনেই নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য অনেক কংগ্রেস সদস্যই ওবামার পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।