Saturday, March 7, 2026

সৌদি আরব কেন তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে by বেতুল দোগান-আক্কাস

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সম্প্রতি সৌদি আরব সফর করেছেন। সফরটি এমন সময়ে হলো, যখন ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে বিরোধী স্বার্থের কারণে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান-সৌদি আরব সামরিক জোটে তুরস্ক যুক্ত হতে পারে, এমন গুঞ্জনও জোরালো হয়েছে। এসব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যু। তবে সৌদি আরব, যখন ইয়েমেনে আরও সক্রিয় হয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ফিরে আসছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের তথাকথিত ‘নতুন সৌদিয়ানা’ ধারণায় তুরস্কের অবস্থান কোথায়?

২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নীরব ছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ রূপান্তরে মনোযোগী ছিলেন। এটি ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ, ‘নতুন সৌদিয়ানা’ ধারণা শুধু সৌদি পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা। এটি আরব বিশ্বের দায়ভার নিতে আগ্রহী নয়। ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা এবং ফিলিস্তিনে কয়েক দশকব্যাপী সংঘাত এই শিক্ষাই দেয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর সৌদি পররাষ্ট্রনীতি আবার সক্রিয় হয়েছে। রিয়াদ এখন নতুন করে আঞ্চলিক অবস্থান ও কৌশল সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে।

নতুন সৌদিয়ানা ধারণা মূলত সৌদি আরবকেন্দ্রিক। প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে একাধিক বাস্তব কারণ। এক. সৌদি আরবের জনমিতিক পরিবর্তন—জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই ৩০ বছরের নিচে। দুই. তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে মুক্তি। তিন. মোহাম্মদ বিন সালমানের চেয়ারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। সর্বোপরি ‘সৌদিয়ানা’ ধারণার পুনর্নির্মাণ, যেখানে রাজতন্ত্র ও জাতীয় গৌরব গুরুত্ব পাচ্ছে আর ওয়াহাবি প্রভাব প্রান্তিক হচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সৌদি যুবরাজের মনোযোগ দেওয়ার ঘটনা কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং তা তাঁর কৌশলগত নীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জোরদার করতে হলে নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন।

ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় রিয়াদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও বর্তমানে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা অগ্রাধিকার পেয়েছে।

এই ‘নতুন সৌদিয়ানা’কে আগের সৌদি পররাষ্ট্রনীতি থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি, তা হলো রিয়াদ আর মধ্যপ্রাচ্যের সবার দায়িত্ব এককভাবে নিতে প্রস্তুত নয়। তবে ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে সৌদি আরবের মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীরাও বদলে গেছে।

এ বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বকে বিবেচনায় নিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে তাঁর কৌশল নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে। তাঁর শাসনকে নতুন আঞ্চলিক সক্রিয়তার পর্ব বলা যেতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন। তাহলেই সৌদি আরব আরও বহির্মুখী হতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে তুরস্কের আঞ্চলিক ভূমিকা (গাজায় সমঝোতা আলোচনায় সহায়তা, আফ্রিকা ও ইয়েমেনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা) রিয়াদ ও আঙ্কারাকে কাছাকাছি এনেছে। এটি মোহাম্মদ বিন সালমানকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আগ্রাসী নীতির বিপরীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করেছে।

তুরস্কের সম্ভাব্য সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নতুন ক্ষমতার অক্ষের ইঙ্গিত দেয়। আঙ্কারার জন্য এটি একটি ভারসাম্যের খেলা। কেননা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে দেশটিকে।

গত সপ্তাহে এরদোয়ানের রিয়াদ সফর শেষে সৌদি ও তুর্কি নেতারা যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েল কর্তৃক ‘সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি’ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন দেন। সৌদি আরব ও তুরস্ক সুদানের অখণ্ডতা রক্ষা, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সিরিয়া থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার প্রশ্নেও যৌথ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে। সিরিয়া বিষয়ে এরদোয়ান বলেন, তুরস্কের মানদণ্ড হলো, ‘এমন একটি সিরিয়া, যা প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হবে না, সন্ত্রাসী সংগঠনকে আশ্রয় দেবে না এবং সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সমাজের সব অংশকে অন্তর্ভুক্ত করবে।’

স্পষ্টতই সৌদি আরব আর অভ্যন্তরীণ কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্থবির নেই। তবে নতুন পরিচয় ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলার এই প্রয়াস কতটা টেকসই ও সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বেতুল দোগান-আক্কাস, তুরস্কের এই গবেষকের গবেষণার ক্ষেত্র হলো আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-14%2Fzkwpvw8c%2FMotamot-1.jpg?rect=0%2C0%2C600%2C400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

লেবাননে রাতভর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল

লেবাননে গত সোমবার থেকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, লেবাননের বিভিন্ন স্থানে গতকাল রাতভর হামলা চালানো হয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে আইডিএফ বলেছে, গতকাল রাতভর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং বেকা উপত্যকায় হিজবুল্লাহর রকেট লঞ্চার, অস্ত্র সংরক্ষণাগার এবং সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

আইডিএফ বলেছে যে হিজবুল্লাহর রাদওয়ান ফোর্সের কমান্ডারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের মাজদাল সেল এলাকায় দুটি রাদওয়ান কমান্ড সেন্টারেও আঘাত করা হয়েছে।

হিজবুল্লাহর এলিট কমান্ডো ইউনিট রাদওয়ান ফোর্স নামে পরিচিত।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত সোমবার থেকে দেশটিতে টানা হামলা চলছে
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত সোমবার থেকে দেশটিতে টানা হামলা চলছে। ছবি: রয়টার্স

ইরানের পাল্টা হামলায় বদলাচ্ছে সমীকরণ: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পথে মধ্যপ্রাচ্য

আল–জাজিরা ও রয়টার্সঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অব্যাহতভাবে রাজধানী তেহরানসহ ইরানজুড়ে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরাক ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে ইরানের ড্রোন। পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার কথা জানিয়েছে তেহরান।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হারানোর পরও ইরানের এমন পাল্টা আক্রমণ যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে দেশটি। একই সঙ্গে গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে পেন্টাগন। এ যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে—এমনটি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

ইরানে হামলা চালানো ও তেহরানের পাল্টা হামলা প্রতিহত করায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তারা ফ্লোরিডার টাম্পায় নিজেদের সদর দপ্তরে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনকে অনুরোধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে অন্তত ১০০ দিন বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করবেন ওই কর্মকর্তারা।

যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হেমিশ ফলকনারও এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা বলেছেন। গতকাল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি বলেন, ইরান সংকট আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে এ সংকট কয়েক দিন নয়; বরং কয়েক সপ্তাহ এবং সম্ভবত কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

যুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন নতুন করে কৌশল সাজাতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কাতারভিত্তিক জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে সঠিক বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে। সে কারণেই এমনটা হয়েছে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান গতকাল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, এমন একটি ধারণা কাজ করছিল যে এটি সম্ভবত গাদ্দাফির লিবিয়া বা সাদ্দামের ইরাকের মতো, যেখানে আপনি মূল নেতাকে সরিয়ে দেবেন এবং হঠাৎ পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে অথবা বিরোধীরা একজোট হয়ে মার্কিন বিমান হামলাকে সমর্থন জানাবে। এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই ঘটেনি। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অবিশ্বাস্য কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।’

পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত

গতকালও তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দিনভর তেহরানে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে। বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮০ শিশু রয়েছে।

হামলায় তেহরানে বহু বহুতল ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন অনেকগুলো চিত্র গতকাল বিবিসি প্রকাশ করেছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইরানের অন্তত ১৭৪টি শহরে হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় ৩ হাজার ৬৪৩টির বেশি বেসমারিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের অন্তত ১৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে।

হামলার মুখে বাসিন্দাদের তেহরান ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। রাজধানীর রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা পাঁচ দিন পর গতকাল ঘর থেকে বের হয়ে তেহরানের গাছপালায় ঘেরা নাফথ স্ট্রিট দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘যানজটের কারণে যে পথটুকু পাড়ি দিতে সাধারণত দুই ঘণ্টা সময় লাগত, আজ তা অস্বাভাবিক দ্রুত পার হওয়া গেছে।’
ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বুধবার রাতে তিন দফায় ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর গতকালও দেশটিতে হামলা চালিয়ে তেহরান। ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, গতকাল ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ১৯তম ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ইরাকের এরবিল ও কুয়েতের আরিফজানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে দাবি করা হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, এর আগেই মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় সেগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ইরানের পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ছয় সেনাসদস্য ও ইসরায়েলে ১১ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে ১১ জন নিহত হয়েছেন।

গতকালও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে। আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দেশ লক্ষ্য করে ইরান থেকে ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩১টি ড্রোন ছোড়া হয়। এর মধ্যে ১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬টি ড্রোন দেশের ভেতরে আঘাত হেনেছে। দেশটিতে আকাশে ধ্বংস করা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছয়জন আহত হয়েছেন।

কাতার ও বাহরাইনেও বিস্ফোরণ ঘটেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল ইরানের ছোড়া ১৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
ইরাক উপকূলে বাহামার পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরকভর্তি নৌযান দিয়ে ট্যাংকারে আঘাত হানা হয় বলে ইরাকের গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া গতকাল সকালে পারস্য উপসাগরের উত্তরে একটি মার্কিন তেল ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী।

এদিকে লেবাননে স্থল অভিযানের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ত্রিপোলি এলাকায় ফিলিস্তিনি শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলের বিমান হামলায় হামাস নেতা ওয়াসিম আতাল্লাহ আল আলী ও তাঁর স্ত্রী নিহত হয়েছেন। সোমবার থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ১০২ জন নিহত ও ৬৩৮ জন আহত হয়েছেন। এদিকে ইসরায়েলের হামলার জবাবে দেশটির বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে রকেট ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা বলেছে হিজবুল্লাহ। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ থেকে বাঁচতে লেবাননের রাজধানী বৈরুত ছাড়াও আক্রান্ত এলাকাগুলোয় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন মানুষ।

বিস্তৃত হচ্ছে যুদ্ধ, বাড়ছে পক্ষ

ইরানে হামলার ষষ্ঠ দিনে যুদ্ধ নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল ইরানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী দেশ আজারবাইজানের একটি বিমানবন্দরসহ দুটি জায়গায় ড্রোন হামলা হয়েছে। শিয়া–অধ্যুষিত আজারবাইজান দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। দেশটির নেতারা ড্রোন হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে চলমান এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ১৩টি দেশে ছড়িয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও মিত্রদেশগুলোর সহায়তায় এগিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে ন্যাটোর কয়েকটি সদস্যদেশ। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর কথা জানিয়েছে ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া। এর আগে এ যুদ্ধে মিত্রদের সুরক্ষায় সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। আর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সোমবার সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়। এখন সাইপ্রাসকে সুরক্ষা দিতে আগামী দিনগুলোতে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস নিজেদের নৌবাহিনী পাঠাবে বলে গতকাল পার্লামেন্টে জানান ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সুরক্ষায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।

এদিকে ফ্রান্স দেশটির সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দিয়েছে বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে তাদের ঘাঁটিগুলো ‘প্রতিরক্ষামূলক কাজে’ ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া কাতারে আরও চারটি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে দেশটি।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ‘সামরিক সরঞ্জাম’ পাঠিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ গতকাল পার্লামেন্টে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ছয়টি সংকট মোকাবিলা দল পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া জরুরি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে।

মিত্রদেশগুলোর সহায়তা পাওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কুর্দিদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তবে এরই মধ্যে কুর্দিদের সদর দপ্তরে হামলা করেছে তেহরান।

ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর এ সংকটে সম্পৃক্ত হওয়ার আভাসের মধ্যে গতকাল রাশিয়ার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। মস্কো বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা করছে। এ সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই উল্লেখ করে এক বিবৃতিতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, অন্যদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আরবদের একটি যুদ্ধের মধ্যে টেনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাশিয়ার মতে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার একমাত্র পথ হলো ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করা, কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

‘বিপাকে পড়তে পারেন ট্রাম্প’

ইরানে হামলার প্রথম দিনেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ৪০ জনের বেশি শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে হত্যার দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তাঁরা এ সামরিক অভিযানে কতটা সফলতা পেয়েছেন, তা কেউ ভাবতে পারে না বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলার মুখে তিনি বলেন, যুদ্ধ তিন–চার সপ্তাহ চলতে পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন না হওয়ায় এখন তাঁকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিষয়ে ভাবতে হচ্ছে।

এখন এ যুদ্ধ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় ট্রাম্প নিজ দেশে বেকায়দায় পড়তে পারেন বলে মনে করছেন তাঁর মিত্র ও উপদেষ্টারা। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় এড়ানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের বর্তমানে যে ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে, সেটি হুমকির মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা সিএনএনকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ধারণা দিয়েছেন এ যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের শুধু আশা করতে হবে যেন বড় ধরনের কোনো অঘটন না ঘটে। কারণ, তেমন কিছু ঘটলে তা বড় সমস্যায় রূপ নেবে।’

যুদ্ধ নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় ট্রাম্পের নিজ দলের মধ্যেও উদ্বেগ আছে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির কৌশলবিদ ম্যাথিউ বার্টলেট বলেন, কেউই মনে করে না যে এ যুদ্ধ জনসমর্থন পাবে। বড়জোর এটি অর্থনীতির মতো অগ্রাধিকারমূলক বিষয় থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দিতে পারে। তবে এর চরম পরিণতি হতে পারে একটি রাজনৈতিক বিপর্যয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি ইরানের সাধারণ মানুষ ও রিপাবলিকান পার্টির কয়েক প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কিছুটা দূরেই হয়েছে হামলা। বিকট বিস্ফোরণের পর উঠছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় ছুটছেন আতঙ্কিত মানুষজন। গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরানে
কিছুটা দূরেই হয়েছে হামলা। বিকট বিস্ফোরণের পর উঠছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় ছুটছেন আতঙ্কিত মানুষজন। গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরানে। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে রাশিয়া

চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে রাশিয়া। গোয়েন্দা কার্যক্রমের বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন তিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট এ দাবি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে হলেও অংশ নিচ্ছে কি না, এই প্রথম তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল।

এর আগে এ ধরনের সহযোগিতার বিষয়টি কখনো সামনে আসেনি। ফলে এই সহযোগিতা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, দ্রুত বিস্তার লাভ করা এই সংঘাতের সঙ্গে এখন আমেরিকার অন্যতম প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর ও উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতাসম্পন্ন এক প্রতিদ্বন্দ্বী জড়িয়ে পড়েছে।

সংবেদনশীল বিষয় হওয়ার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তিন কর্মকর্তা জানান, গত শনিবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার অবস্থান ইরানকে জানিয়ে দিচ্ছে রাশিয়া।

সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, ‘এটি বেশ বড় আকারের একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও ওয়াশিংটনে অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাস কোনো সাড়া দেয়নি। অবশ্য মস্কো এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একে ‘বিনা উসকানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে।

ইরানকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার সহায়তার ব্যাপ্তি ঠিক কতটা, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই মার্কিন বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ইরানি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

গত রোববার কুয়েতে ইরানের ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইরান এ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক অবস্থান, দূতাবাস ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক হাজার আত্মঘাতী ড্রোন এবং কয়েক শ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। অন্যদিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, যুদ্ধজাহাজ এবং দেশটির নেতৃত্বসহ ইরানের দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, ‘ইরান সরকার পুরোপুরি বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা প্রতিদিন কমছে, নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে এবং (অস্ত্র) উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা হচ্ছে। এমনকি তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোও সেভাবে লড়াই করতে পারছে না।’

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ইরানের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক রাশিয়া ও চীনকে কোনো বার্তা দিতে চান কি না—চলতি সপ্তাহে এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তাঁর দেওয়ার মতো কোনো বার্তা নেই এবং ‘তারা আসলে এখানে কোনো বড় প্রভাবক নয়।’

রুশ সহায়তা সম্পর্কে অবগত দুজন কর্মকর্তা জানান, চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও বেইজিং ইরানকে প্রতিরক্ষা কাজে সহায়তা করছে বলে মনে হচ্ছে না।

ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে বেইজিংও এই সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

নিখুঁত হামলার সক্ষমতা বেড়েছে ইরানের

বিশ্লেষকদের মতে, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল অবকাঠামো, রাডার এবং কুয়েতের অস্থায়ী সেনাছাউনির মতো জায়গায় (যেখানে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন) ইরানের সাম্প্রতিক হামলার ধরন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি গত কয়েক দিনের মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনটিও হামলার শিকার হয়েছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দারা ম্যাসিকট বলেন, ইরান আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী রাডার বা ‘ওভার-দ্য-হরাইজন’ রাডারগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে। খুবই সুনির্দিষ্টভাবে তারা এ কাজটি করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থাকে নিশানা বানাচ্ছে।

ম্যাসিকট আরও বলেন, ইরানের হাতে অল্প কিছু সামরিক স্যাটেলাইট রয়েছে এবং নিজস্ব কোনো সমন্বিত স্যাটেলাইট ব্যবস্থা (কনস্টেলেশন) নেই। এ অবস্থায় রাশিয়ার উন্নত মহাকাশ গবেষণা সক্ষমতা থেকে পাওয়া চিত্র ইরানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ক্রেমলিন এখন নিজেও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে অনেক বেশি দক্ষ।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারের গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি ইরান-রাশিয়া সহযোগিতা নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে একধরনের ‘প্রযুক্তিগত উন্নতি’ দেখা যাচ্ছে।

নিকোল আরও বলেন, ‘তারা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে পারছে।’ গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের হামলার মান অনেক উন্নত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ওয়াশিংটন পোস্টকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, পেন্টাগনের হাতে থাকা নিখুঁত অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র) দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই অভিযান অনুমোদনের বিষয়ে ভাবছিলেন, তখন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। তবে প্রশাসন কেইনের সেই মূল্যায়নকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাইছে না।

বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে বিভিন্ন দেশ যেভাবে ছায়াযুদ্ধে (প্রক্সি ওয়ার) জড়িয়েছে, রাশিয়ার এই সাম্প্রতিক সহায়তা সেই সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো রাশিয়াকে সরাসরি সামরিক সহায়তা অথবা দেশটির বিশাল প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে। অন্যদিকে ইউক্রেনকে শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার পাশাপাশি রুশ অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে কিয়েভকে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি ড্রোন থেকে সুরক্ষা পেতে ইউক্রেনের সহায়তা চেয়েছে এবং কিয়েভ এতে সাড়া দিয়ে ‘বিশেষজ্ঞ’ পাঠাবে।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে ইরান। তারা স্বল্পমূল্যের আত্মঘাতী ড্রোন তৈরির প্রযুক্তি রাশিয়াকে দিয়েছে। এসব ড্রোনকে কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে এবং ইউক্রেনের শহরগুলো রক্ষায় পশ্চিমাদের দেওয়া ইন্টারসেপ্টরের মজুত ফুরিয়ে ফেলতে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।

মস্কো-তেহরান সহযোগিতা সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ইউক্রেনীয়দের যে সহায়তা দিচ্ছি, সে সম্পর্কে রাশিয়া পুরোপুরি সচেতন। আমার মনে হয়, তারা এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে বেশ খুশি।’ তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মান আমেরিকার সমপর্যায়ের না হলেও তা বিশ্বের অন্যতম সেরাদের একটি।

ওয়াশিংটন পোস্ট এর আগে এক প্রতিবেদনে বলেছিল, নিজেদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কিছু সম্ভাব্য সুবিধা দেখছে ক্রেমলিন। এর মধ্যে রয়েছে তেল বিক্রি করে বাড়তি আয় এবং এমন একটি তীব্র সংকট তৈরি হওয়া, যা ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আমেরিকা ও ইউরোপের মনোযোগ সরিয়ে নেবে।

এই সংঘাতের শুরুর দিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদের পতন এবং গত জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার পর ইরান হতে পারে রাশিয়ার বন্ধুপ্রতিম সরকার হারানো সর্বশেষ দেশ।

তবে বিশ্লেষক ম্যাসিকট মনে করেন, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে রাশিয়ার অনীহা আসলে অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার গুরুত্বেরই লক্ষণ। তিনি বলেন, ক্রেমলিন এটাকে তাদের নিজস্ব সমস্যা বা যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করছে না। কৌশলগত হিসাব-নিকাশে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন এখনো সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

গত সপ্তাহান্তে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরের পাশের একটি ভবন ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাহরাইনের জুফাইর
গত সপ্তাহান্তে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরের পাশের একটি ভবন ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাহরাইনের জুফাইর। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ কোটি ডলার দামের থাড রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান। ৩০ কোটি ডলার মূল্যের এই রাডারটি ধ্বংস হওয়ায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মার্কিন এক কর্মকর্তা এমন তথ্য জানিয়েছেন।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিগুলো দেখাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি আরটিএক্স করপোরেশনের ‘এন/টিপিওয়াই–২’ রাডার এবং এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে। পরে একজন মার্কিন কর্মকর্তাও ‘থাড’–এর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ’–এর তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানে ইরানের দুটি হামলার খবর পাওয়া গেছে। একটি ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং অন্যটি ৩ মার্চ। দুটি হামলাই প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি কেন্দ্রের উপপরিচালক রায়ান ব্রবস্ট বলেন, ‘যদি ধ্বংসের বিষয়টি সত্যি হয়ে থাকে, তবে থাড রাডারের ওপর এই হামলা হবে ইরানের অন্যতম সফল আক্রমণ।’

তবে ব্রবস্ট আরও যোগ করেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের কাছে আরও রাডার রয়েছে, যা আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষা দিতে পারে। ফলে একক কোনো রাডার হারালে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।’

মার্কিন ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’–এর (থাড) কাজ হলো বায়ুমণ্ডলের একেবারে শেষ সীমানায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা। এর মাধ্যমে তারা প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও জটিল হুমকি মোকাবিলা করতে পারে। বর্তমানে এই ‘এন/টিপিওয়াই–২’ রাডারটি অকেজো হয়ে যাওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর দায়িত্ব পড়বে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ওপর। এটির ‘পিএসি–৩’ ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ইতিমধ্যেই অনেক কমে গেছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়া, গুয়ামসহ সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি ব্যবস্থার দাম প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যার মধ্যে শুধু রাডারটির দামই ৩০ কোটি ডলার।

সিএসআইএস–এর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ টম কারাকো বলেন, ‘এগুলো অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য কৌশলগত সম্পদ এবং এটি হারানো এক বিরাট ধাক্কা।’

টমক কারাকো আরও বলেন, ২০১২ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর নয়টি থাড ব্যাটারি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র আটটি। তাই হাতের কাছে বাড়তি কোনো ‘টিপিওয়াই–২’ রাডার নেই।

প্রতিটি ‘থাড’ প্রতিরক্ষা ব্যাটারিতে ৯০ জন সেনা, ট্রাকে বসানো ছয়টি লঞ্চার, ৪৮টি ইন্টারসেপ্টর (প্রতি লঞ্চারে ৮টি), একটি টিপিওয়াই–২ রাডার এবং একটি ফায়ার কন্ট্রোল ও যোগাযোগ ইউনিট থাকে। লকহিড মার্টিন করপোরেশনের তৈরি প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

প্যাসিফিক ফোরাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো উইলিয়াম অ্যালবার্ক বলেন, ‘আপনি যদি সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চান, তাহলে এটি এমন একটি সরঞ্জাম, যা আপনাকে অবশ্যই যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন রাখতে হবে।’

ক্যালিফোর্নিয়ার জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন–প্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর দিকে কাতারে মোতায়েন ‘এএন/এফপিএস–১৩২’ রাডারও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। থাড সিস্টেমের মতো এটি স্থানান্তরযোগ্য নয়, বরং একটি স্থায়ী স্থাপনা। এই রাডারটি মূলত অনেক দূর থেকে আগত হুমকি শনাক্ত করতে স্থাপন করা হয়েছে। তবে এটি নিশানায় নিখুঁতভাবে অস্ত্র নিক্ষেপের জন্য উপযুক্ত নয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা হামলায় চাপের মুখে রয়েছে। ফলে মাঝেমধ্যে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে থাড এবং প্যাট্রিয়টের (পিএসি–৩) মতো উন্নত ইন্টারসেপ্টরগুলোর মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে লকহিড ও আরটিএক্স-এর মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এক বৈঠকে বসেছে। পেন্টাগন এখন তাদের অস্ত্রের উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে চাপ দিচ্ছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-07%2Fzvtidknq%2Fthaad.jpg?rect=57%2C0%2C633%2C422&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দক্ষিণ কোরিয়া, গুয়ামসহ বিশ্বের মাত্র আটটি জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। ছবি: এএফপি

ইরানে হামলায় যেভাবে লাভ হচ্ছে রাশিয়ার by লিওনিদ রাগোজিন

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড মস্কোয় একধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। রাশিয়ার কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার থাকা সত্ত্বেও তাঁরা আর নিরাপদ নন। পশ্চিমা কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার রাশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যতে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে দেওয়া বেপরোয়া বক্তব্য এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে।

ইরানে হামলা মস্কোর জন্য উদ্বেগের কারণ হলেও রাশিয়ার শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি তাদের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক কৌশলের একধরনের বৈধতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনসহ ক্রেমলিনের দীর্ঘদিনের নীতিকে তারা এর মাধ্যমে সঠিক বলে মনে করছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধ সম্ভবত ২০১১ সালের লিবিয়ার ঘটনার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে বছর ন্যাটোর নেতৃত্বে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের সময় রাশিয়া বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ অনুমোদন করেছিলেন।

পুতিন পরে এই সিদ্ধান্তকে গুরুতর ভুল বলে আখ্যা দিয়েছেন। ওই ঘটনা পুতিনের নিরাপত্তা ধারণা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছিল। অনেকের মতে, সেটিই তাঁকে আবার প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে।

২০১১ সালের অক্টোবরে পুতিন আরেকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র এক মাস পরই গাদ্দাফিকে বিদ্রোহীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে।

সে সময় পশ্চিমা নেতারা এই ঘটনার প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় গণতন্ত্র বা স্থিতিশীলতা আসেনি, বরং দেশটি গৃহযুদ্ধ ও বিভক্তির দিকে চলে যায়।

পুতিনের কাছে এই ঘটনা ছিল স্পষ্ট সতর্কবার্তা। তাঁর ধারণা ছিল, পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বে পরিচালিত উদারপন্থী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচারণা যদি মেনে নেওয়া হয়, তবে একসময় একই ধরনের পরিণতি তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কিংবা রাশিয়ার জন্যও অপেক্ষা করতে পারে।

২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে মস্কোতে সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু হয়। ক্রেমলিন এই আন্দোলনকে পশ্চিমা–সমর্থিত শহুরে মধ্যবিত্তের উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিল। একই সঙ্গে সেটিকেও আরেকটি সতর্কসংকেত বলে মনে করেছিল।

কয়েক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর পুতিন ২০১২ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগমুহূর্তে কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করেন। এই সময়টিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের মাইদান আন্দোলনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ দেখা যায়।

বর্তমানে ইরানে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাগুলো দেখে পুতিন সম্ভবত মনে করছেন, ইউক্রেনে তাঁর পদক্ষেপগুলো সঠিক ছিল। একই সঙ্গে তিনি হয়তো সোভিয়েত আমলের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার তৈরি করেছিলেন। এই অস্ত্রভান্ডারই রাশিয়ার প্রকৃত সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থাকে নিরাপদ রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।

রাশিয়া নিজের প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও পুতিন নিজেকে এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একজন রক্ষক হিসেবে দেখাতে চান। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থার অবক্ষয়ের পেছনে দায়ী যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের বাড়তি আত্মবিশ্বাস, অহংকার ও বেপরোয়া নীতি।

ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ হামলার ধারণার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৩০-এর দশকের সোভিয়েত সামরিক নীতিতে, সেখানে শত্রুর ভূখণ্ডে গিয়ে যুদ্ধ করার ধারণা ছিল। ২০০৭ সালে ন্যাটো যখন ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ভবিষ্যতে সদস্য হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানায়, তখন থেকেই ক্রেমলিন তাদের ‘শত্রু ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই ধারণার প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধে।

২০১৪ সালে ইউক্রেনে প্রথম হামলা এবং ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন ক্রেমলিনের কাছে ছিল একধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। তাদের ধারণা ছিল, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার মতো কোনো এক সময় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের মুখে পড়তে পারে রাশিয়া বা তার মিত্ররা, আর এখন ইরানও সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।

ইউক্রেনকে পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাতের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র বানানোর মাধ্যমে ক্রেমলিন রাশিয়ার অধিকাংশ নাগরিককে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব থেকে দূরে রাখতে পেরেছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারণার মাধ্যমে এই যুদ্ধকে সমাজের কাছে অবশ্যম্ভাবী হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান অপ্রত্যাশিত এক মিত্র হিসেবে সামনে আসে। দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে জটিল হলেও ইরান রাশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে।

সে সময় পশ্চিমা বিশ্বে ধারণা ছিল, তুরস্কের তৈরি বায়রাক্তার ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেন প্রযুক্তিগত সুবিধা পেতে পারে। ইরানের সহায়তা অবশ্য নিছক বন্ধুত্বের কারণে ছিল না। এর বিনিময়ে তেহরান কয়েক বিলিয়ন ডলার পেয়েছে, যা তাদের দুর্বল অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করেছে।

তবে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক এতটা গভীর নয় যে এখন মস্কো সরাসরি ইরানের পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে। এর পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতাও রয়েছে। ইসরায়েল ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ করেনি এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাতেও যোগ দেয়নি। ফলে বহু রুশ ধনকুবেরের জন্য ইসরায়েল নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।

আরেকটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তিনি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন। মস্কো চায় না ইউরোপীয় নেতারা এই সম্পর্ককে নষ্ট করার সুযোগ পান।

বাস্তবে ইরানকে সহায়তা করার মতো সামরিক সক্ষমতাও এখন রাশিয়ার খুব বেশি নেই। ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরে যে নতুন সামরিক প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে, তা সরবরাহ করলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার ইরানেরও হয়তো এই প্রযুক্তি কেনার মতো অর্থ নেই।

অন্যদিকে স্বল্প মেয়াদে ইরানে যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য কিছু সুবিধাও এনে দিচ্ছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়বে। উচ্চ জ্বালানিমূল্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে, যারা বর্তমানে ইউক্রেনের প্রধান অর্থদাতা।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারও ক্ষয় হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, যা অন্যথায় ইউক্রেনে ব্যবহৃত হতো। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও বেশি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইউক্রেনকে ঘিরে চলমান আলোচনায় রাশিয়ার প্রভাবও বাড়তে পারে।

দেশের ভেতরেও পুতিন এর রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন। ইরানে ধ্বংস ও অস্থিরতার দৃশ্য রাশিয়ার মানুষের মধ্যে অবরুদ্ধ দুর্গের মানসিকতা আরও শক্ত করবে। এতে পুতিনের ভাবমূর্তি এমন এক নেতার হিসেবে আরও মজবুত হতে পারে, যার শাসনব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদী হলেও তিনি দেশকে রক্ষা করছেন।

* লিওনিদ রাগোজিন, লাতভিয়াভিত্তিক একজন সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইরানে হামলায় যেভাবে লাভ হচ্ছে রাশিয়ার

ইসরায়েলের হয়ে কোনো মার্কিন লড়তে চান না: সিনেট শুনানিতে প্রতিবাদ সাবেক মেরিন সেনার

প্রকাশ ০৬ মার্চ ২০২৬ঃ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে খোদ মার্কিন সিনেটের ভেতর আহত হয়েছেন ব্রায়ান ম্যাকগিনিস নামের এক সাবেক মেরিন সদস্য। গত বুধবার মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র পরিষেবা উপকমিটির শুনানিতে প্রতিবাদ জানাতে গেলে ক্যাপিটল পুলিশ ও এক রিপাবলিকান সিনেটরের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি হয়।

শুনানি চলাকালে ব্রায়ান চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এই যুদ্ধের মূল কারণ হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলের হয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করতে চায় না।’

মেরিন সেনার এই আকস্মিক প্রতিবাদে পুরো শুনানিতে বিঘ্ন ঘটে। একপর্যায়ে তাঁকে কক্ষ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় ক্যাপিটল পুলিশ ও রিপাবলিকান সিনেটর টিমোথি প্যাট্রিক শিহির সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ব্রায়ানের অভিযোগ, এ ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে দরজার সঙ্গে চাপে তাঁর হাত ভেঙে গেছে।

রয়টার্সের যাচাই করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, সামরিক পোশাক পরিহিত ব্রায়ানকে কক্ষের দরজা দিয়ে টেনে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন সিনেটর টিমোথি প্যাট্রিক শিহি ও ক্যাপিটল হিলের পুলিশ কর্মকর্তারা। সে সময় একটি খোলা দরজায় ব্রায়ানের হাত আটকে যায়।

তবে এ আঘাতের পরও দমে যাননি ব্রায়ান। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ব্রায়ান জানান, নর্থ ক্যারোলিনা থেকে গ্রিন পার্টির প্রার্থী হিসেবে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে নিজের প্রচার চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

ধস্তাধস্তির সময় ম্যাকগিনিস চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ইসরায়েলের হয়ে কেউ লড়তে চান না।’ এ সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁর হাতের দিকে তাকান। দেখা যায়, দরজার কবজায় তাঁর হাত আটকে গেছে এবং তখনই হাড় ভাঙার শব্দ শোনা যায়।

৪৪ বছর বয়সী ম্যাকগিনিসের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা, গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়া ও অবৈধ বিক্ষোভ চলাকালে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাকগিনিস বলেন, ‘আমি অনেক আগে থেকেই এ নিয়ে লড়ছি। নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে হাত ভাঙার পরও আমার এই যাত্রা থামেনি। এ ঘটনা আমাকে আরও সংকল্পবদ্ধ করেছে। মানুষের ক্ষোভ যেমন সত্য, সংকল্পও তেমনি বাস্তব।’

মন্টানার প্রতিনিধি টিমোথি প্যাট্রিক শিহি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানান, ওই হাতাহাতি থামাতে তিনি হস্তক্ষেপ করেছিলেন।

শিহি লিখেছেন, ‘ক্যাপিটল পুলিশ সশস্ত্র বাহিনী–বিষয়ক কমিটির (আর্মড সার্ভিসেস) শুনানি থেকে এক উন্মত্ত বিক্ষোভকারীকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। ওই ব্যক্তি পুলিশকে বাধা দিচ্ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমি সহায়তার সিদ্ধান্ত নিই। এই ভদ্রলোক ক্যাপিটলে এসেছিলেন সংঘাতের উদ্দেশ্য নিয়ে এবং তিনি তা-ই পেয়েছেন। আমি আশা করি, নতুন কোনো সহিংসতা না ঘটিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা সহায়তা পাবেন।’

সাবেক মেরিন সেনাসদস্য ও নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে গ্রিন পার্টির প্রার্থী ব্রায়ান ম্যাকগিনিসকে ওয়াশিংটন ডিসিতে সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী–বিষয়ক উপকমিটির শুনানি থেকে টেনে বের করে নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও থেকে এই স্থিরচিত্র নেওয়া হয়েছে। ৪ মার্চ ২০২৬
সাবেক মেরিন সেনাসদস্য ও নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে গ্রিন পার্টির প্রার্থী ব্রায়ান ম্যাকগিনিসকে ওয়াশিংটন ডিসিতে সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী–বিষয়ক উপকমিটির শুনানি থেকে টেনে বের করে নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও থেকে এই স্থিরচিত্র নেওয়া হয়েছে। ৪ মার্চ ২০২৬। রয়টার্স।

ট্রাম্প চাইলেই কি খামেনিকে হত্যা করতে পারেন, আন্তর্জাতিক আইন কী বলে? by মো. আবু নাসের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সমন্বিত সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে হত্যা করে, তখন বিশ্ব এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। এ এমন এক নতুন পৃথিবী, যেখানে সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করার পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করতে শুরু করেছে।

ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে কেউ বিপজ্জনক, দমনমূলক বা আধুনিক সভ্যতাবিরোধী হিসেবে দেখতেই পারেন। কিন্তু একতরফা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শাসক পরিবর্তনের এই রীতি কি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল? বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্বাসযোগ্য আইনি বিশ্লেষণ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলা বেআইনি। কেবল ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, ইরানের ওপর যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলার অবক্ষয়কে প্রতিনিধিত্ব করে।

কোনো দেশ সচেতনভাবে ও প্রকাশ্যে অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে হত্যা করেছে—এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল, এমনকি আইনগতভাবে বিতর্কহীন যুদ্ধের সময়ও।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই হামলার সমালোচনা করেছে। অনেকেই একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—যদি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সুবিধামতো আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে, তবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো কীভাবে নিরাপত্তা পাবে? আইনের ভিত্তিতে নির্মিত বিশ্বব্যবস্থা কি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে?

আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি জাতিসংঘ সনদ, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বহু দেশ অনুমোদন করেছে। এই সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যেকোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার’ বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে দুটি ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—

১. আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে, যখন কোনো দেশ সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে; অথবা ২. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকলে।

ইরানের ক্ষেত্রে এই দুটি শর্তের কোনোটিই স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য নয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা চালায়নি। এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও সামনে আসেনি যে তাৎক্ষণিক ও আসন্ন হামলার মুখে পড়ে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া দেশ দুটির আর কোনো উপায় ছিল না। বরং হামলার কয়েক দিন আগেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে ‘আত্মরক্ষার্থে’ ইরানের ওপর এই হামলা বৈধ। আইনি দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে বলেছে যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘এই অঞ্চলে মার্কিন সৈন্য ও ঘাঁটি রক্ষার জন্য সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেছেন।’ বিবৃতিতে ইরানের ‘কয়েক দশকের অপকর্মের’ কথা উল্লেখ করা হলেও, তাদের নেতাকে হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্য এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন যে ভবিষ্যৎ হুমকি প্রতিরোধে এই হামলা জরুরি ছিল। হামলার উদ্দেশ্য ছিল ‘ইরান থেকে আসন্ন হুমকি মুক্ত করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’ তবে তিনি এমন কোনো ইঙ্গিত দেননি যে হামলার আগে ইরান সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করার দ্বারপ্রান্তে ছিল।

‘প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ’ সমসাময়িক আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত না হলেও জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সশস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়ায় আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তবে আত্মরক্ষার দাবি করার জন্য একটি সশস্ত্র হামলা ঘটতে হবে।

প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন আগাম সশস্ত্র হামলার হুমকির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। তবে কোন পরিস্থিতিকে ‘আগাম’ হিসেবে গণ্য করা হবে, তা নির্ধারণ করা খুব জটিল। ‘আগাম’ বলতে আসলে কী বোঝায়, তা নিয়ে একাডেমিকরা বিভক্ত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ইরানের দ্বারা আগাম হুমকির কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

ইরান প্রায়শই ইসরায়েলকে ‘ধ্বংস’ করার কথা বলে। ইরানের এই আলঙ্কারিক বক্তব্যকে কি আগাম সশস্ত্র হামলার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা যায়? যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের অধ্যাপক ভিক্টর কাট্টান মনে করেন—‘রক্ত ঝরানো ভাষা বা সহিংসতার হুমকি নিজেই কোনো রাষ্ট্রকে আগাম বলপ্রয়োগ করার অধিকার দেয় না।’

ধরা যাক, কেউ বিতর্কিতভাবে আত্মরক্ষার যুক্তি মেনে নিলেন। তবু যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন প্রযোজ্য। এর দুটি মূল নীতি হলো—পার্থক্য ও আনুপাতিকতা। অর্থাৎ যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। আর সামরিক লাভের তুলনায় অতিরিক্ত বেসামরিক ক্ষতি করা যাবে না।

খামেনি কি বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন

যুদ্ধকালীন পরিস্থতিতে একটি দেশের সামরিক কমান্ডাররা বৈধ লক্ষ্য হিসেবে গণ্য হন। সাধারণভাবে যুদ্ধের সময় বেসামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তবু সশস্ত্র সংঘাতের আইন অনুযায়ী, একজন বেসামরিক নেতা যিনি সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি সম্ভবত একটি সক্রিয় যুদ্ধে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীর পোশাকধারী সদস্য ছিলেন না এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাঁর এই হাইব্রিড মর্যাদা জটিলতা তৈরি করে।

আইনি বিশ্লেষকরা সাধারণত বলেন যে সশস্ত্র সংঘাত সেদিনই শুরু হয় যেদিন প্রথম আক্রমণ হয়। খামেনিকে হত্যার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলার আগে সম্ভবত তিনি বৈধ সামরিক লক্ষ্য ছিলেন না। শান্তিকালীন সময়ে বিদেশি সামরিক সদস্য বা কোনো সরকারি কর্মকর্তা যিনি সরাসরি শত্রুতা চালাচ্ছেন না তাঁকে হত্যা করা যায় না।

যুদ্ধ শুরু করা কি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ ছিল

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা রয়েছে কেবল দেশটির আইনসভা কংগ্রেসের। ক্ষমতা না থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট মার্কিন সেনাদের একতরফাভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিয়োজিত করেছেন। ট্রাম্প ও অন্যান্য প্রেসিডেন্ট এ ক্ষেত্রে দেশটির সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন।

কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। এ অনুযায়ী তাঁরা যুক্তি দেন যে নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডে প্রেসিডেন্ট একপক্ষীয়ভাবে সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে পারেন, এমনকি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই। প্রেসিডেন্টের আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে যদি কোনো অভিযানের প্রত্যাশিত প্রকৃতি, ব্যাপ্তি ও সময়কাল সাংবিধানিক অর্থে ‘যুদ্ধ’-এর চেয়ে কম হয় তবে এটি বৈধ।

তবে ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশনের পর থেকে প্রেসিডেন্টরা বড় যুদ্ধ শুরু করার আগে সাধারণত কংগ্রেসের পূর্ব অনুমোদন চেয়েছেন। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০১ সালে আফগানিস্তানে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হয়। ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সর্বসাম্প্রতিক এই যুদ্ধ প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে হচ্ছে।

হত্যা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কী বলা যায়

সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শীতল যুদ্ধ চলার সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অনেক বিদেশি নেতাকে হত্যা করে। ১৯৭০-এর দশকে এ নিয়ে তদন্ত হয়, যা সার্চ কমিটি তদন্ত নামে পরিচিত। ওই কমিটির প্রতিবেদনে পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে এ ধরনের হত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

এই নিষেধাজ্ঞা এখন একটি নির্বাহী আদেশের অংশ, যেখানে বলা হয়েছে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দ্বারা নিযুক্ত বা সরকারের পক্ষে কাজ করা কোনো ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে জড়িত হতে পারবেন না বা হত্যায় জড়িত হওয়ার ষড়যন্ত্র করতে পারবেন না।’ আদেশে অবশ্য কোন ধরনের হত্যাকাণ্ডকে গণ্য করা হবে, তা সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।

খামেনিকে কোন দেশ হত্যা করেছে তা কি গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েল না যুক্তরাষ্টের হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে রাষ্ট্রের দায়বোধ নীতি অনুসারে, যদি কোনো দেশ জেনেশুনে অন্য কোনো দেশকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে সহায়তা করে, তাহলে উভয় দেশই অন্যায় কাজের জন্য দোষী বলে বিবেচিত হবে। সেই যুক্তিতে, যদি আয়াতুল্লাহকে হত্যা করা বেআইনি হয়, এবং যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানত যে ইসরায়েল খামেনিকে হত্যা করতে যাচ্ছে, তাহলে ইসরায়েলকে সহযোগিতা করে যুক্তরাষ্ট্রও আইনি দায় এড়াতে পারবে না।

ট্রাম্প প্রশাসন কি আন্তর্জাতিক আইনকে গুরুত্ব দেয়

এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি যত্নশীল নয়। কেননা জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনী যে আক্রমণ চালায় তা ছিল জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সেল একটি মেমোতে বলেছে যে সেই অভিযানের সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের কোনো সম্পর্ক নেই।

এই মেমোতে পূর্বের এমন কিছু অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে প্রেসিডেন্টের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে দেশের অভ্যন্তরীণ আইন অনুসারে প্রেসিডেন্ট অনেক কিছুই করতে পারেন, যা জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ইরানের প্রতিক্রিয়া কি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন

বেশির ভাগ আইনজ্ঞ মনে করেন যে আক্রমণের শিকার হওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ করার অধিকার ইরানের রয়েছে। তবে দুবাইতে একটি হোটেল ও বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইচ্ছাকৃত আক্রমণ অবৈধ। সংঘাতের পক্ষ নয়, এমন দেশগুলোর ওপর আক্রমণও নিষিদ্ধ।

শেষ কথা

আইন কেবল কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়। এটি এমন একটি কাঠামো, যা শক্তিশালী পক্ষকে সীমাবদ্ধ করে ও দুর্বলদের সুরক্ষা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা গড়ে উঠেছিল, তার লক্ষ্য ছিল অযাচিত আগ্রাসন রোধ করা। যদি প্রতিরোধমূলক যুদ্ধকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো রাষ্ট্র সম্ভাব্য হুমকির অজুহাতে আগাম হামলা চালাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলা কৌশলগতভাবে সফল বা ব্যর্থ হয়েছে কি না সেটি আলাদা বিতর্ক। কিন্তু আইনি বিচারে এই পদক্ষেপ গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন।

আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকেও একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। নইলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমে এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছাবে, যেখানে নীতির চেয়ে শক্তিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে।

আইনকে উপেক্ষা করা সহজ; কিন্তু তার পরিণতি বহন করা কঠিন। আজ যদি এই নজির প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আগামী দিনে আরও বড় সংঘাতের দ্বার উন্মুক্ত হবে। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো আইনের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

* ড. মো. আবু নাসের, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপারসন।
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যৌথ পরিকল্পনায় ইরানে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যৌথ পরিকল্পনায় ইরানে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। কোলাজ: প্রথম আলো