Saturday, July 9, 2016

জঙ্গি হামলা মোকাবিলায় সতর্ক নিউইয়র্ক নগর

সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে গঠন করা হয়েছে বিশেষ ইউনিট। স্থল, জল বা আকাশ পথের যে কোনো হামলা দ্রুত সামাল দেওয়ার জন্য নিউইয়র্ক প্রস্তুত। নিরাপত্তা প্রস্তুতির এসব তথ্য দিয়েছেন নিউইয়র্ক পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ব্যুরোর প্রধান জেমস ওয়াটার্স। এনবিসি নিউজকে জেমস ওয়াটার্স বলেছেন, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো জঙ্গিগোষ্ঠী যে কোনো সময় যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে পারে। পরবর্তী হামলার জন্য নিউইয়র্ক খুবই ঝুঁকিপূর্ণ নগরী। জেমস ওয়াটার্স জানান, নিউইয়র্কে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৫২৫ জনের একটি পৃথক দল সার্বক্ষণিক কর্মরত। জঙ্গি হামলা ঠেকাবার জন্য ৫২৫ জনের এ দলের সঙ্গে ১০০ জনের আরেকটি বিশেষায়িত চৌকস দল ভারী অস্ত্র নিয়ে সব সময় দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। বোমা, বিস্ফোরক বা মারাত্মক রাসায়নিক অস্ত্র শনাক্ত এবং সামাল দেওয়া চৌকস দলের কাজ। ম্যানহাটানের কমান্ড সেন্টার থেকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে পুরো নগরীতে। নগরীর সড়ক, জনপথ, নৌবন্দর, বিমান বন্দর, বাস টার্মিনাল, রেলপথসহ জন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আছে নয় হাজার সি সি ক্যামেরা। সড়ক পথ, ব্রিজ, টানেল দিয়ে নিত্য চলা গাড়ির বহরের নম্বর প্লেট স্ক্যান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নগরীতে আইএস বা অন্য জঙ্গি গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হামলা নিয়ে আগাম কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা সতর্কবার্তা নেই সরকারের কাছে। তবে কাউন্টার টেররিজম ব্যুরো প্রধান জেমস ওয়াটার্স মনে করেন,
নিউইয়র্ক সব সময়ই জঙ্গিদের হামলার অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশের কাউন্টার টেররিজম গোয়েন্দা বিশ্লেষক মেগান টেউবনার বলেছেন, ‘প্রতি মুহূর্তে আমরা খবর রাখছি সারা বিশ্বে কী ঘটছে। জঙ্গিরা নতুন কোন কৌশল অবলম্বন করছে।’ সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিরা বিভিন্ন দেশে যে সব হামলা পরিচালনা করেছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে জানান টেউবনার। হামলার ধরন, পুরোনো-নতুন কৌশল বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধের জন্য নিউইয়র্কের পুলিশ বিভাগকে (এনওয়াইপিডি) সব সময় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিউইয়র্কের কমান্ড সেন্টারে রয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুর। মাত্র একটি কুকুর পুরো একটি ট্রেন বা বিমানবন্দরে কোনো বিস্ফোরক আছে কি না, তা মুহূর্তে পরখ করার ক্ষমতা রাখে। নিউইয়র্ক নগরীর কমান্ড সেন্টারে প্রতিদিন ৩০ লাখ চলমান গাড়ির প্লেট নম্বর, গাড়ির গতিবিধি পরখ করা হচ্ছে। সি সি ক্যামেরায় বা স্ক্যানারে ধারণ করা এসব তথ্য আবার পাঁচ বছরের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে এনওয়াইপিডি’র কাউন্টার টেররিজম কমান্ড সেন্টারে। গতকাল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। এ উপলক্ষে নিউইয়র্কে উপচে পড়া ভিড়। মেসিসের বিখ্যাত চার জুলাইয়ের আতশবাজির খেলা দেখার জন্য বিভিন্ন রাজ্য থেকে লোকজন ছুটে আসে এখানে। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার পর্যটকেরাও এ সময়ে নিউইয়র্কে এসে জড়ো হয়। মেসিসের আতশবাজি দেখতে নগরীতে ২০ লাখ লোকের সমাগম হয় বলে মনে করা হয়। এ সময়টিতে পর্যটকসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ক’দিন থেকেই এন ওয়াই পি ডি’র বাড়তি তৎপরতা দৃশ্যমান ছিল।

জঙ্গির মুখ, জঙ্গির মন

বুকের ওপর ভারী পাথর চেপে আছে। শব্দ খুঁজে পাই না। চিন্তা গুছিয়ে আসে না। নিজেকে নিঃস্ব মনে হয়। মেকি মনে হয়। দায়ী মনে হয়। গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারির রেস্তোরাঁয় গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত চলা জিম্মি সংকট ও হত্যাযজ্ঞ কোনো ভয়ের কল্পনা না। এটা সিনেমা না, খেলা না, বিনা মেঘে বজ্রপাত না। এটা শুরুও না, শেষও না। প্রায় দুই বছর ধরে, তারও অনেক কটা বছর আগে থেকে, দেশে জঙ্গি হামলায় হত্যার ঘটনা ঘটছে। আর্টিজান বেকারির হত্যাযজ্ঞ যেন সেই সব ঘটনার চাপ ধারণ করে এক ধাক্কায় মনকে একটা অতল খাদে ফেলে দিয়েছে। ঘটনাগুলো দেশি ষড়যন্ত্র, দেশি জঙ্গিবাদ নাকি আইএস অথবা আল-কায়েদার জঙ্গিবাদের ফসল—তা নিয়ে এখন বিতর্ক করা বেকার। সত্য হচ্ছে, ধর্মীয় আর সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার বৈশ্বিক রাজনীতি আমাদের ঘরও তছনছ করে দিচ্ছে। আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজ পাঁচজন হামলাকারীর যে ছবি ছাপিয়েছে, সেটা দেখতে গেলে তাদের লেবাস আর হাতের অস্ত্র ছাপিয়ে চোখে পড়ে হাসিমাখা মুখগুলো। মুখ থেকে কৈশোরের ছাপ মোছেনি। হাসি অমলিন। জিম্মি উদ্ধার অভিযানের সময় তারা নিহত হয়। ছবিগুলো দেখে কিছুতেই তাদের দানব ভাবতে পারছি না। কিন্তু এটা তো ঠিক যে আদর্শের নামে, ধর্মের নামে এরা ২০ জন মানুষকে নির্যাতন করে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে।
ময়নাতদন্তকারী একজন চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেছেন, নিহত দেশি-বিদেশি ১০ নারীকে বেশি নির্যাতন করা হয়েছে। আমাদের ছেলেদের বয়সী এই ছেলেরা এতটা সময় ধরে, এত রক্তপাত ঘটিয়ে, এত নির্যাতন চালিয়ে এতগুলো নরহত্যা করতে পারল? এরা কেন এমন হলো? ঘৃণা, হিংসা, প্রতিহিংসা? কার প্রতি? কেন? কীভাবে, কত দিনে প্রশিক্ষিত হলো? কারা কীভাবে এদের মধ্যে এই উন্মাদনার বীজ বুনল আর লালন করল? কীভাবে তাদের এমন অধর্ম, অন্ধবিশ্বাস আর আদর্শ গেলানো সম্ভব হলো? এরা নির্বিকার নিষ্ঠুরতায় যাঁদের হত্যা করেছে, তাঁদের প্রিয়জনদের কথা ভাবলে মন স্থবির হয়ে যায়। আর এদের বাবা-মায়ের কথা ভাবলে বুকটা হিম হয়ে আসে। ঠিক যেমন আমি বা আমার প্রিয়জন কেউ যেকোনো দিন এমন কারও হাতে নিহত হতে পারি, তেমনি যেকোনো সময় আমারই ঘরের কোনো ছেলেমেয়ে এমন হয়ে উঠতে পারে। কোন ভয়টা আমার বেশি হচ্ছে, আমি সত্যিই তা জানি না। নিহত জঙ্গিদের যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে, তাদের একজন দরিদ্র পরিবারের মাদ্রাসায় পড়া ছেলে। বাকিরা উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে, ঢাকার নামকরা বড় স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। ইংরেজি শিক্ষা আর কেতায় চৌকস। অর্থাৎ জঙ্গি বলতে যে ছকবাঁধা ছবি আমাদের চোখে ভাসে, এ তিনজন তা নয়। এদের দুজন অনেক দিন হলো নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। একজন যুদ্ধে যাওয়ার কথা বলে বাড়িতে চিঠি লিখে গিয়েছিল বলে শুনতে পেয়েছি।
তারুণ্য আদর্শ খোঁজে, বিশ্বাস আঁকড়ে ধরতে চায়, রোমাঞ্চ খোঁজে। রাগে-ক্ষোভে-বঞ্চনায় সহিংসও হয়তো হতে পারে। ইসলামের নামে কিশোর-তরুণদের ভুল বুঝিয়ে প্রভাবিত করা হয়, এমন মোটা দাগের ব্যাখ্যা দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু আমি মনে করি, এদের মন তলিয়ে বুঝতে এবং এদের সঙ্গে কথা বলতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা বিশ্ববিদ্যালয়ে, গণমাধ্যমে, সামাজিক পরিসরে, পরিবারের মধ্যে। ঘরে ঘরে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মসংস্কার আর মতবিশ্বাসের নানান সংকীর্ণ খাপের মধ্যে আমরা বাস করি। ‘আমরা’ আর ‘অন্যরা’—এই ভাগগুলো অনেক বেশি। আছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আছে মত, বিশ্বাস আর চিন্তার উগ্র দখলদারি। ধর্মের উদার মানবতাবাদী ব্যাখ্যার জন্য জায়গা কি আমরা তৈরি করতে পারব? আমরা কি একেবারে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে,
তার কথা শুনতে বা বুঝতে এখনো চেষ্টা করব না? পুলিশ বলছে, একজন জঙ্গিকে জীবিত আটক করা হয়েছে। কিন্তু তার সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পুলিশ জানায়নি। যদি সত্যিই কেউ ধরা পড়ে থাকে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, সে কি ফারাজ আইয়াজ হোসেনের অতুলনীয় সাহস আর সমমর্মিতা-মানবতা লক্ষ করেছিল? সে আর তার সঙ্গীরা কি ফারাজকে নিয়ে কোনো কথা বলেছিল? তাদের উন্মাদনার শিকার ওই মানুষদের কথা এখন কি তার মনে পড়ে? মানুষের মধ্যেই মানবতা বাস করে। মানবতা আর সমমর্মিতা ছাড়া ভরসা করার জায়গা কোথায়? হলি আর্টিজান বেকারির ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষের প্রাণের নিরাপত্তা দিতে আমাদের রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কত আনাড়ি, ক্ষমতা কত অপ্রতুল। তা ছাড়া, যে বিপদের মধ্যে আমরা আছি বিশ্বের খুব দক্ষ রাষ্ট্রশক্তিও তার মোকাবিলা করতে পারছে না। মন থেকে মনে যে শত্রুর বিস্তার ও বিকাশ, বাইরের যুদ্ধ তাকে শেষ করবে কী করে?
কুররাতুল-আইন-তাহমিনা: সাংবাদিক।

ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরে ২ ‘আইএস জঙ্গি’ আটক

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সন্দেহভাজন সদস্য দুই কিরগিজ নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। বিমানবন্দরটিতে রক্তক্ষয়ী আত্মঘাতী গুলি ও বোমা হামলার ঘটনার এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে সেখান থেকেই এ দুজনকে ধরা হলো। ২৮ জুনের হামলায় জড়িত বলে তিন সন্দেহভাজনের একজনও কিরগিজ বলে উল্লেখ করেছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা। তুর্কি বার্তা সংস্থা দোগান জানায়, আতাতুর্ক বিমানবন্দর থেকে রোববার রাতে আটক দুই কিরগিজ নাগরিকের পুরো নাম প্রকাশ করা হয়নি। শুধু নামের আদ্যক্ষর হিসেবে কে ভি এবং এফ এম আই উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বয়স যথাক্রমে ২৫ ও ৩৫ বছর। আটকের পর এ দুজনের স্যুটকেস থেকে রাতে দেখার উপযোগী দুরবিন, সামরিক ধাঁচের পোশাক ও ভিন্ন নামের দুটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। ইস্তাম্বুলের সন্ত্রাস দমন পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাঁরা বিমানবন্দর ছাড়ছিলেন,
নাকি বিমানবন্দর হয়ে তুরস্কে ঢুকছিলেন সেটি স্পষ্ট নয়। এদিকে আতাতুর্ক বিমানবন্দরে গত ২৮ জুনের গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলার ঘটনায় তিন বিদেশিসহ সন্দেহভাজন ১৩ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ওই হামলায় ৪৫ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ১৯ জন বিদেশি। হামলায় আহত হন ২০০ জন। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম রোববার বলেন, বিমানবন্দরে হত্যাযজ্ঞ চালানোর ঘটনায় পুলিশ বিদেশিসহ ২৯ জনকে আটক করেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই ঘটনার জন্য আইএস দায়ী। তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলে এ বছর যেসব সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী। তুর্কি কর্তৃপক্ষের ধারণা, রাশিয়া, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানের তিন নাগরিক ওই হামলা চালান। ইতিমধ্যেই তাঁদের সিসিটিভি থেকে পাওয়া ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। দুজনের নাম প্রকাশ করেছে তুর্কি সরকারি বার্তা সংস্থা আনাদোলু।
এঁরা হলেন, রাকিম বুলগারভ ও ভাদিম ওসমানভ। তুরস্কের গণমাধ্যম ওই হামলার সংগঠক হিসেবে আখমেদ চাতায়েভ নামে এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে খবর প্রকাশ করেছে। তিনি আইএসের ইস্তাম্বুলে শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। মালয়েশিয়ার নাইট ক্লাবে হামলায় আইএস জড়িত: রয়টার্স জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ গতকাল সোমবার নিশ্চিত করেছে যে গত সপ্তাহে দেশটির একটি নাইট ক্লাবে গ্রেনেড হামলায় আইএস জড়িত। এটি দেশটিতে এই গোষ্ঠীর প্রথম সফল হামলা বলে মনে করা হচ্ছে। মালয়েশীয় পুলিশের মহাপরিদর্শক খালিদ আবু বকর গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, হামলায় সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা আইএসের মালয়েশীয় যোদ্ধা বলে পরিচিত মোহাম্মদ ওয়ান্ডি মোহাম্মদ জেদির সরাসরি নির্দেশনা পেয়েছিলেন।