Friday, December 19, 2025

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত যেভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়াচ্ছে by উমর বিন জামাল

ভারত দক্ষিণ এশিয়ার ‘নিরাপত্তার রক্ষাকর্তা’ হিসেবে পরিচিত হতে চায়। দেশটি ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ প্রতিবেশী অঞ্চলের স্বাভাবিক নেতা হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে হিমালয় পর্যন্ত ভারতের হস্তক্ষেপ ও নীতির কারণে বিভিন্ন দেশে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানিচুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করা, নেপালের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপানো এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের মতো কঠোর চাপ সৃষ্টির কৌশল ছোট দেশগুলোর মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়াচ্ছে।

ভারতের আধিপত্যবাদ এবং তার বিপরীতে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, তার সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে।

জটিল সম্পর্ক

দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশ ও ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরত নয়াদিল্লি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারত সহযোগিতা করে। জনপ্রিয় আওয়ামী লীগকে তারা রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণেও ভারতের বড় প্রভাব ছিল।

কিন্তু ২০২৪ সালে সেই ‘কৌশলগত সম্পর্ক’ ভেঙে পড়ে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (যাঁকে এই অঞ্চলে ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখা হতো) একটি ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। সেই আন্দোলন ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ও দমনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন।

বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর বদলে নয়াদিল্লি বাংলাদেশিদের ভিসা স্থগিত করে, কূটনৈতিক তৎপরতা কমিয়ে দেয় এবং শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়। আন্দোলনের সময় মানুষ হত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে পরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. নাজমুস সাকিব এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেন, ‘বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে প্রকাশ্য স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে ভারতই ভূমিকা রেখেছে।’ তাঁর মতে, এর ফলে বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত আরও শক্ত হয়েছে।

সাকিব আরও বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন পলাতককে আশ্রয় দিয়ে রাখায় ভারতের ওপর দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে আবেদন জানিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৪ সালের সেই অভ্যুত্থান দমনে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

অতীতে বাংলাদেশ ভারতের কিছু স্পর্শকাতর অনুরোধ মেনে নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল—ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ২০১৫ সালে ভারতে হস্তান্তর করা। তখন এটিকে দুই দেশের মধ্যে একটি বড় ‘সদিচ্ছার নিদর্শন’ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু সাকিব মনে করেন, ভারত এখন শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে একই রকম সদিচ্ছা দেখাবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বলেন, ‘ভারত যদি এই চুক্তির শর্ত মানতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি প্রমাণ করবে যে ভারত একটি অবিশ্বাসযোগ্য মিত্র।’

এর ফলে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও তিনি মনে করেন। সাকিব বলেন, ‘বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ অংশীদার দেশগুলো ভারতের এই আচরণ দেখবে এবং সেই অনুযায়ী তাদের অবস্থান ঠিক করবে।’

পশ্চিম সীমান্তেও পরিস্থিতি ভালো নয়

ভারত ও পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এই দুই পরমাণু শক্তিধর দেশ কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত তিনটি বড় যুদ্ধ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদিও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই উত্তপ্ত ও অচল, তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে।

২০২৫ সালে নয়াদিল্লি সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে। এই চুক্তিটি ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি যুদ্ধ হলেও এই চুক্তি কখনো ভাঙা হয়নি। তাই এটি স্থগিত হওয়ার সিদ্ধান্ত দুই দেশের বিশেষজ্ঞদেরই চমকে দেয়।

ভারতের দিক থেকে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় কাশ্মীরের পেহেলগামে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর। ভারতের অভিযোগ, এই হামলার পেছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে। এরপর ভারত সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক স্থানে হামলা চালায়। ভারত দাবি করে, তারা সেখানকার জঙ্গি ঘাঁটি টার্গেট করেছে।

পাকিস্তান অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তারা ভারতের এই হামলার নিন্দা জানায় এবং পাল্টা হামলা চালায়। পাকিস্তান কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করে। এর মধ্যে একটি ছিল রাফাল। পাকিস্তানের দাবি ছিল—এটি তারা আত্মরক্ষার স্বার্থেই করেছে।

উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হামলায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি করাতে পেরেছেন।

এই ঘটনার পর কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দুই দেশের বাণিজ্যও থেমে পড়ে। এমনকি ‘ভদ্রলোকের খেলা’ হিসেবে পরিচিত ক্রিকেট সম্পর্কও স্থগিত হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো তাগিদ অনুভব করছে না।

সীমান্ত বিরোধের জটিলতা

ভারতের প্রতিবেশী প্রভাবের ওঠানামা সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় নেপালের ক্ষেত্রে। ইতিহাসে নেপাল ছিল একটি হিন্দুরাষ্ট্র এবং ভারতের সঙ্গে তাদের সীমান্ত খোলা ছিল। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্কও ছিল গভীর। কিন্তু ১৯৯৬-২০০৬ সালের গৃহযুদ্ধ, মাওবাদী শক্তির উত্থান এবং ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার পর এই সম্পর্ক বদলে যায়। এর পর থেকে নেপাল আরও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে থাকে, যা নয়াদিল্লির জন্য বিরক্তির কারণ হয়।

২০১৫ সালে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তখন নেপালের দক্ষিণ সীমান্তে বসবাসকারী মাধেসি জনগোষ্ঠী নতুন সংবিধান নিয়ে আন্দোলন করছিল। তাদের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সময় ভারত একটি ‘অঘোষিত অবরোধ’ সৃষ্টি করেছে বলে নেপাল অভিযোগ করেছিল।

এই অবরোধের কারণে নেপালে জ্বালানি, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। ভারত বলে, তারা কোনো অবরোধ দেয়নি। কিন্তু নেপালে ভারতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতি আজও কাটেনি।

২০২৫ সালে নেপালে নতুন করে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হলে সেই পুরোনো ক্ষোভ আবার জেগে ওঠে। যেসব নেতা ভারতের খুব কাছের বলে মনে করা হতো, তাঁরা ক্ষমতাচ্যুত হন। নতুন সরকার আবারও চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর প্রকল্পগুলো চালু করে, যেগুলো আগে বন্ধ ছিল।

একই সঙ্গে নেপাল কালাপানি অঞ্চল ও লিপুলেখ গিরিপথ নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে বিরোধের বিষয়টি সামনে আনে।

বিশেষ করে লিপুলেখ গিরিপথ পর্যন্ত ভারতের তৈরি ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নিয়ে নেপালের ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি। এই পথটি হিমালয়ের একটি কৌশলগত রুট। এটি ভারত-চীন-নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি। এটি বাণিজ্য ও কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রার জন্য ব্যবহৃত হয়।

নেপালের দাবি, এই রাস্তা ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি লঙ্ঘন করে এবং তাদের ভূখণ্ডে ভারতের অনুপ্রবেশের শামিল।

এই বিরোধ থেকেই নেপালে ‘#BackOffIndia’ নামে একটি অনলাইন প্রচারণা শুরু হয়। এটিকে পরে মালদ্বীপে দেখা দেওয়া ‘#IndiaOut’ আন্দোলনের পূর্বাভাস হিসেবেই ধরা হয়।

‘#IndiaOut’ আন্দোলনের প্রতিধ্বনি

ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে চিত্র বদলে যায়। সে বছর মালদ্বীপে মোহাম্মদ মুইজ্জু নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মূল বার্তা ছিল—মালদ্বীপকে ভারতের প্রভাববলয় থেকে সরিয়ে আনতে হবে।

মালদ্বীপে ‘#IndiaOut’ আন্দোলন ২০২২-২৩ সালের দিকে সবচেয়ে জোরালো হয় এবং মুইজ্জুর ক্ষমতায় আসার পর আবার গতি পায়। এই আন্দোলনের মূল অভিযোগ ছিল—মালদ্বীপের মাটিতে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাদের মাধ্যমে ভারত দেশটির প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অযথা প্রভাব বিস্তার করছে।

বাস্তবে মালদ্বীপে ভারতীয় সেনাসদস্যের সংখ্যা খুব কম ছিল। তাদের বেশির ভাগই ছিল হেলিকপ্টার ও বিমান রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা টেকনিশিয়ান। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অনেক বড়।

মুইজ্জু এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগান। তিনি প্রকাশ্যে মালদ্বীপ থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলেন।

রাজনৈতিক ভারসাম্যের খেলা

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচন সামনে থাকলে জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী রাজনীতিবিদেরা প্রায়ই ভারতবিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করেন। এর ফলে অতীতেও ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। দেশজুড়ে জ্বালানি ও ওষুধের সংকট দেখা দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে পদ ছেড়ে পালাতে হয়। এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে ধরা হয়।

এই পরিস্থিতিতে ভারত প্রথম দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়ায়। ভারত প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণসুবিধা দেয়। জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্য পাঠায়।

কলম্বোর ভেরিতে রিসার্চের সিনিয়র প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মালিন্দা মিগোদা বলেন, ‘সেই কঠিন সময়ে মানুষ ভারতকে প্রথম সাড়া দেওয়া দেশ হিসেবে দেখেছে। তাদের ভূমিকা কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।’ তবে কিছুদিনের মধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়।

আদানি প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় মান্নার ও পুনেরিন এলাকায় আদানির উইন্ড পাওয়ার (বায়ুবিদ্যুৎ) প্রকল্প নিয়ে। শ্রীলঙ্কার সমালোচকদের অভিযোগ, এই চুক্তির জন্য নয়াদিল্লি অনেক চাপ দিয়েছে। তাঁরা আরও বলেন, এই প্রকল্পের বিদ্যুৎমূল্য স্থানীয় বিকল্পগুলোর তুলনায় অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরোধীরা অভিযোগ করেন, গৌতম আদানির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রায় ২০ বছরের পুরোনো। মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন থেকেই এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গুজরাটই তাঁদের দুজনের রাজ্য।

আরও অভিযোগ করা হয়, মোদি সরকার আদানি ও তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে ঘুষ ও জালিয়াতির অভিযোগ থেকে রক্ষা করেছে। তবে মোদি ও আদানি—দুজনই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আরও একটি অভিযোগ উঠে আসে। সেটি হলো, শ্রীলঙ্কা আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার আগে ভারতের কাছ থেকে পাওয়া কিছু ঋণ ব্যবহার করে ভারতেরই কিছু প্রতিষ্ঠানের আগের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কলম্বো সরকার কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেনি।

মিগোদা বলেন, এসব ঘটনা মানুষের মনে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ তৈরি করেছে। তবে তিনি এটাও বলেন, আদানির প্রকল্প নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে শুধু ভারতবিরোধিতা কাজ করেনি, স্বচ্ছতার অভাব ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও বড় কারণ ছিল।

মিগোদার ভাষায়, ‘ভারত ও চীন—দুই দেশই শ্রীলঙ্কায় স্বচ্ছতা ছাড়া অর্থায়ন, নিজেরাই প্রস্তাব চাপিয়ে দেওয়া এবং দুর্বল তদারকির জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছে। এর ফলে অনেক প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে বা মাঝপথে আটকে গেছে, আর জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছে।’

ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের অতীত

ভারত ও শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো আবার টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল। তবে গৃহযুদ্ধ এই সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ছায়া ফেলেছে।

আশির দশকের শেষ দিকে, তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে একটি চুক্তি করিয়ে দিয়ে ভারত শ্রীলঙ্কায় শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠায়। কিন্তু এতে ভারত নিজেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার বড় ক্ষতি হয়।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, মাহিন্দা রাজাপক্ষে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়।

২০০৬ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে শ্রীলঙ্কা যখন গৃহযুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করে, তখন ভারত গোপনে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে এবং কূটনৈতিকভাবে সাহায্য করে। তবে একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্ষতির বিষয়ে সতর্কও করে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শ্রীলঙ্কা যখন চীনের অর্থায়নে বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিতে শুরু করে, তখন ভারত আবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ভারত মনে করে, এতে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বাড়ছে।

এখনো দড়ির ওপর হাঁটছে শ্রীলঙ্কা

এখনো শ্রীলঙ্কা খুব সতর্কভাবে চলার চেষ্টা করছে।

ভারত-শ্রীলঙ্কা স্থল সেতু (ল্যান্ড ব্রিজ) প্রকল্প বাতিল করা এবং আবার আদানির উইন্ড পাওয়ার প্রকল্প পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, কলম্বো তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে চায়।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা নীরবে চীনের গবেষণা জাহাজ আসার সংখ্যা সীমিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে প্রশমিত করার কৌশল।

মিগোদা বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা কোনো পক্ষ নিতে চায় না। কিন্তু তাদের সক্ষমতা সীমিত, অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা বেশি এবং কূটনৈতিক বার্তায় একধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। তাই তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান অনেক সময় দুর্বল ও বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে।’

‘ধসে পড়া ট্রেনের মতো অবস্থা’

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু, কলম্বো থেকে মালেতে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট। সেটি হলো, ভারত যত বেশি চাপ দিচ্ছে, তার প্রতিবেশী দেশগুলো তত দ্রুত বিকল্প কোনো শক্তির দিকে ঝুঁকছে।

এই প্রতিক্রিয়া আসছে এমন একসময়, যখন ভারত বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব বাড়াতে চাচ্ছে।

ভারত নিজেকে বেইজিংয়ের (চীনের) বিপরীতে একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সেই সঙ্গে জি-২০, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বড় ভূমিকা নিতে চায়।

ভারত বিদেশে মানবিক সহায়তা, সমুদ্র টহল এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে। কিন্তু দেশটির ভেতরের সমালোচকেরা বলেন, নিজের প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে ভারত একটি দাদাগিরিমূলক শক্তির মতো আচরণ করে। তারা ছোট দেশগুলোর রাজনীতি, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

ড. সাকিব বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবেশী অঞ্চলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি একটি “ট্রেন রেক” বা রেল দুর্ঘটনার মতো হয়ে গেছে।’

* উমর বিন জামাল, টিআরটি ওয়ার্ল্ড–এর প্রযোজক
- টিআরটি ওয়ার্ল্ড থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2019%2F12%2F30%2F6a85e365940402941027aa8d8912b44a-5e099bd34b062.jpg?rect=153%2C0%2C1031%2C687&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনের ফুটবল যেভাবে মুছে ফেলছে রাজনীতির বিভাজন by খালেদ হরুব

সীমাহীন যন্ত্রণার ভেতরেই কাতারে আরব ফুটবল কাপে জাতীয় দলের টানা জয় ফিলিস্তিনিদের ভেতর জাগিয়ে তুলেছে এক বিরল ঐক্যের অনুভূতি। ফিলিস্তিনের জয়ের উচ্ছ্বাস গাজায় বৃষ্টিভেজা বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু থেকে শুরু করে পৌঁছে যায় লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরে। একই সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বের ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ে।

ফিলিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের কোচ ইহাব আবু জাজার নিবাস রাফায়। কোচের পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, তাঁর মা আশ্রয় নিয়েছেন মাওয়াসি এলাকার একটি তাঁবুতে। তিনিই হয়ে উঠেছেন ফিলিস্তিনের আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। সব বাস্তবতার বিপরীতে তাঁর দল মাঠে এনে দিয়েছে বিজয়ের স্বাদ, উত্তীর্ণ হয়েছে পরের রাউন্ডে। এই জয় তাঁরা প্রথমেই উৎসর্গ করেছেন গাজাকে। এরপর পৃথিবীর পুরো ফিলিস্তিনকে।

‘ফিদায়ি’ নামে পরিচিত এ দলের পেছনে তৈরি হয়েছে এক যৌথ মনোভাব। এ নামের অর্থ যোদ্ধা। এটি শুধু খেলা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যেখানে তারা বিভক্তি ও হতাশার দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আবারও এক অখণ্ড পরিচয় ফিরে পেতে চায়।

ক্যামেরার ফ্রেমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোয় দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের নারী, গৃহিণী, প্রবীণ—সবাই সীমাহীন উচ্ছ্বাসে উল্লাস করছেন। কেউ স্টেডিয়ামে, কেউ ক্যাফেতে, কেউবা নিজের ঘরে।

ফুটবল বিশ্বজোড়া এক নেশা, কিন্তু আজ ফিলিস্তিনিদের জন্য এর অর্থ সাধারণ খেলার চেয়ে অনেক বেশি। এ দলের প্রতিটি জয় প্রতিরোধের মতো, গাজায় চলমান গণবিধ্বংসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী ওঠে দাঁড়ানো। প্রতিটি গোল যেন ঘোষণা দেয়, ‘আমরা এখনো আছি।’ অনেক ফিলিস্তিনের কাছেই এটা ঠিক ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো ফিনিক্স পাখির মতো বিষয়।

ইসরায়েল যখন মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনকে মুছে দিতে চায়, তখন এই খেলোয়াড়দের পায়ের জবাব যেন বলে দেয়, ফিলিস্তিনিরা বিরাজমান এবং অটল। এটি তাদের জন্য একধরনের প্রতীকী চপেটাঘাত। প্রতীকের এই শক্তি গভীর। বহুদিন পর ফিলিস্তিনের নাম ও পতাকা ভেসে উঠছে এমন এক রূপে, যেখানে কোনো দলীয় রং বা রাজনৈতিক বোঝা নেই।

আরব বিশ্বজুড়ে সমর্থক ও খেলোয়াড়েরা ফিদায়ি দলের পাশে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিতে যে সংহতি বহুদিন চাপা রাখা হয়েছিল, তা এখন উন্মোচিত হয়েছে খেলার ময়দানে।

এটি একভাবে আরব ঐক্যের পুনরুত্থানও বটে, যা রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে আরবদের একত্র করে। কাতারের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপেও আমরা এমন অনুভূতির প্রকাশ দেখেছি।

তিউনিসিয়ার এক খেলোয়াড় ফিলিস্তিনের বিপক্ষে গোল করার পর দৌড়ে গিয়ে ফিলিস্তিনি কোচকে জড়িয়ে ধরেন, যেন ক্ষমা চান। আরব দর্শকেরা নিজেদের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি পতাকাও উড়িয়ে সমর্থন জানান।

এক ফিলিস্তিনি খেলোয়াড় মাঠ ঘুরে বেড়ান হাতে জড়ানো সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো দৃশ্যটিকে একসূত্রে বেঁধে রাখে কেফিয়াহ।

অনেকের কাছে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে সেই একমাত্র জায়গা, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে এমন কিছু প্রকাশ করতে পারে, যা কিছু আরব দেশে কর্তৃপক্ষ নিষিদ্ধ করে রেখেছে। স্টেডিয়ামে পতাকা আর ফিলিস্তিনের ধ্বনি অবাধে প্রবাহিত হয়। আর সেখানেই অগণিত প্রতিকূলতার পরও ফিলিস্তিনি দল উপহার দেয় দুর্দান্ত মানের ফুটবল।

অথচ ফিলিস্তিনের দল গঠন করা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। অনুশীলনের সুযোগ ছিল খুবই কম, আর সম্পদ প্রায় ছিল না বললেই চলে। দেশের ঘরোয়া লিগ বহু বছর ধরে বন্ধ। ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়েছে স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া–সুবিধা। এই বাস্তবতা তাদের সাফল্যকে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে। মনে হয় শুধু ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় মনোভাব এবং ফিদার আত্মা প্রতিটি প্রযুক্তিগত ঘাটতিকে পুষিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর সহায়তায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে দুই বছরের নির্মম গণহত্যার ভয়াবহতার পরও কীভাবে এই দল আবার একত্র হয়ে এমন পারফরম্যান্স দেখাল! এই প্রশ্নটাই নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়।

ফিলিস্তিনি সমাজতাত্ত্বিক জামিল হিলাল দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন যে সংস্কৃতি একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি পরিচয় রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পরিচয় রাজনীতি, দল এবং গোষ্ঠীর সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাহিত্য, কবিতা, শিল্প, সংগীত, নৃত্য, লোকগীতি, রান্না, সূচিশিল্প, প্রতীক, ঐতিহ্য, পুরোনো এবং আধুনিক সব মিলেই গড়ে ওঠে একটি সম্মিলিত চেতনার ভিত্তি। এই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে রক্ষা করাই ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

আমরা জানি কীভাবে বারবার ফিলিস্তিনির সংস্কৃতি, প্রতীক, সূচিশিল্প এমনকি কুনাফা এবং খাবার পর্যন্ত ইসরায়েলের বলে দাবি করা হয়েছে। একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভিত্তি ভেঙে গেলে তারা দিগ্‌বিদিক ছড়িয়ে যায়, তাদের জাতীয় পরিচয় এবং সামাজিক সংহতি বিপদের মুখে পড়ে।

ফিলিস্তিনের জাতীয় ক্রীড়াক্ষেত্র এখন সম্মিলিত সচেতনতা এবং পরিচয়ের একটি স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। এটি এমন এক দিকনির্দেশনা দেয়, যা মাতৃভূমির একত্বর দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে সবাই রাজনৈতিক পরিচয় ঝেড়ে ফেলে এক জায়গায় মিলিত হতে পারে। দলটির খেলাগুলোয় সারা বিশ্বের কোটি ফিলিস্তিনি শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়কে দেখছিল না। তারা দেখছিল ফিদাইয়িনদের, যোদ্ধাদের। তারা দেখছিল ইতিহাসের বাহকদের, যারা শুধু একটি খেলা জেতার ইচ্ছার চেয়ে অনেক বড় বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।

* খালেদ হরুব, শিক্ষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ফিলিস্তিনের জয়ের উচ্ছ্বাস গাজায় বৃষ্টিভেজা বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু থেকে শুরু করে পৌঁছে যায় লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরে।
ফিলিস্তিনের জয়ের উচ্ছ্বাস গাজায় বৃষ্টিভেজা বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু থেকে শুরু করে পৌঁছে যায় লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরে। ছবি: এএফপি

স্বৈরাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব এক জাগরণ by মাহরুফ চৌধুরী

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক সচেতনতার ফল নয়; এটি এক গভীর নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রতিফলন। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে লিখেছেন মাহরুফ চৌধুরী

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘকাল ধরে সমাজে জমে ওঠা বঞ্চনা, বৈষম্য ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এক বিশাল গণবিস্ফোরণ।

এ সময় দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ, নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল প্রতিবাদের স্লোগান, চোখেমুখে ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রত্যয় আর হৃদয়ে বহমান ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন;একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা।

-----২.

এই আন্দোলনের মর্মমূলে নিহিত ছিল দুটি শব্দ: ‘বৈষম্যহীন’ ও ‘স্বৈরাচারমুক্ত’। শব্দ দুটি নিছক স্লোগানের শব্দ ছিল না; বরং তার পেছনে ছিল দশকের পর দশক ধরে জমা হওয়া এক নিঃশব্দ আর্তনাদ, যা এ প্রজন্মের মুখে এসে উচ্চারিত হলো বিদ্রোহের ভাষায়। এই দ্বৈত দাবির মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেই জনমানস, যাদের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল বৈষম্যমূলক অর্থনীতি, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং ন্যায়বিচারহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মমতার শিকার হওয়া।

বিখ্যাত চিন্তাবিদ ফ্রানৎস ফানোঁ ভাষায়, যখন উপনিবেশ বা দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি জনগোষ্ঠীর আশা ও স্বপ্নকে দাবিয়ে রাখে, তখন সেই জনগোষ্ঠী বিদ্রোহকেই জীবনের স্বাভাবিক পথ হিসেবে বেছে নেয়। চব্বিশের বাংলাদেশ যেন ফানোঁর সেই কথারই প্রতিফলন।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণ–আন্দোলনকে প্রায়ই রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের সূচক হিসেবে দেখা হয়। এই প্রেক্ষাপটে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান ছিল একপ্রকার নৈতিক প্রতিরোধ, যা শুধুই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং তা ছিল একটি নতুন ধরনের সমাজ গঠনের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা। এ গণ–অভ্যুত্থান প্রশ্ন তোলে পূর্ববর্তী শাসকদের বৈধতা নিয়ে, তেমনি নতুন ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতাও সৃষ্টি করে।

এই আন্দোলন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনাই ছিল না; এটি ছিল একটি সমাজ-সাংস্কৃতিক গতিধারার নতুন বাঁক; যেখানে একটি নতুন প্রজন্ম তার অতীতের সব ব্যর্থতার দায়ভার ঝেড়ে ফেলে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মমর্যাদার দাবিতে আত্মপ্রকাশ করে। এটি ছিল ইতিহাসের সেই ক্ষণ, যখন বহু শোষিত, নিঃস্ব ও ‘অপমানিত’ মানুষ একযোগে বলেছিলেন, ‘আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে’।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম দৃশ্যমান প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে; বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন এই আন্দোলনের সূচক ও চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রায়ই ছাত্রসমাজই প্রথম আওয়াজ তোলে; এমনটা আমরা দেখেছি ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থান এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। চব্বিশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

এবারের গণ-অভ্যুত্থানের ভিত্তিভূমি ছিল পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক। এটা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রশ্ন ছিল না; বরং এর গভীরে ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক আনুগত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৈষম্য, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মানবিক মর্যাদাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করছিল।

সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ, উচ্চশিক্ষায় রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া, কোটা ব্যবস্থার নামে একপক্ষীয় সুবিধা বণ্টন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারকে অবহেলা করার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছিল একটি পক্ষপাতদুষ্ট ও অনৈতিক রাষ্ট্রকাঠামো।

মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকা স্বাভাবিক হলেও যখন সেই দায়িত্ব কৃতজ্ঞতার গণ্ডি পেরিয়ে একচোখা সুযোগসন্ধানী ব্যবস্থায় পরিণত হয়, তখন তা বৈষম্যের রূপ পরিগ্রহ করে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—যদি রাষ্ট্রের প্রতে৵ক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী হন, তবে কেন জন্মপরিচয়, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী তাঁর শিক্ষার অধিকার বা চাকরির সুযোগ নির্ধারিত হবে?

জন রলসের ন্যায়বিচারের তত্ত্বের (থিওরি অব জাস্টিস) কথা স্মরণ করতে পারি; তিনি বলেন, একটি ন্যায্য সমাজ গঠনের জন্য সবচেয়ে দুর্বল এবং সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে; কিন্তু তা হতে হবে সর্বজনীন নীতির আলোকে, পক্ষপাতহীনভাবে। চব্বিশের ছাত্ররা যেন রলসের এই নৈতিক দর্শনকেই বাস্তবে প্রতিফলিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা শুধু নিজেদের স্বার্থে নয়; বরং পুরো সমাজব্যবস্থার ভেতরকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে উৎসারিত এই বিদ্রোহ তাই নিছক রাজনৈতিক নয়; এটি ছিল একধরনের নৈতিক অভ্যুত্থান। এখানে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন প্রাধান্য পেয়েছে। তরুণদের চোখে ধরা পড়েছে যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ছাড়া উন্নয়ন কেবল একটি পরিসংখ্যানগত ছলনা। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁরা নিজেদের ক্লাসরুমের সীমানা ছাড়িয়ে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিলেন; মানবিক মর্যাদা, সমতা ও সুবিচারের দাবিতে দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘এই বৈষম্য করা চলবে না।’

-----৩.

ছাত্রদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে সরকার যখন কঠোর ও দমনমূলক অবস্থান নেয়, তখন আন্দোলন একটি নতুন মোড় নেয়। এটি হয়ে ওঠে কেবল একটি দাবিদাওয়া–নির্ভর প্রতিবাদ নয়; বরং এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের সুতীব্র প্রতিরোধ। এ আন্দোলনের গন্তব্য ছিল না কেবল আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের অবসান; বরং এর লক্ষ্য ছিল সেই রাষ্ট্রীয় মানসিকতা ও কাঠামোর বিরুদ্ধাচরণ, যেখানে জনতার চেয়ে ক্ষমতাই মুখ্য, যেখানে নাগরিক অধিকার নয়; বরং আনুগত্যই একমাত্র গ্রহণযোগ্যতা।

স্বৈরাচার এখানে কোনো ব্যক্তিনির্ভর ‘অভিশাপ’ নয়; বরং একটি প্রতিষ্ঠানিক রূপান্তর, একপ্রকার শাসনতান্ত্রিক অন্ধকার, যার মূল চিহ্ন হলো ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা, ভিন্নমতের দমন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্থলে কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ। প্লেটোর ‘দ্য রিপাবলিক’-এ স্বৈরতন্ত্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, যখন জনগণের নিরাপত্তার নামে একটি শাসক ক্রমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে, তখন ধীরে ধীরে গণতন্ত্র সরে গিয়ে জন্ম নেয় স্বৈরাচার। চব্বিশের আন্দোলন যেন এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে বুঝে নিয়ে তার বিরুদ্ধে সময়োচিত ও নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।

তরুণদের প্রতিরোধে ফুটে উঠেছিল প্রতীকী ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের এক নতুন ভাষা। কখনো তা ছিল দেয়ালে আঁকা কবিতায়, কখনো তা ছিল হাতে লেখা পোস্টারে, কখনো প্ল্যাকার্ডে লেখা একটিমাত্র বাক্যে ধরা পড়ত গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের গণবিচ্ছিন্নতার ছবি।

এসব অভিব্যক্তি ছিল সরাসরি রাষ্ট্রের ছায়াতলে শাসক শ্রেণির দমননীতি ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অস্ত্র। তরুণদের একেকটি প্রশ্ন যেন রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সংকটকে উন্মোচন করছিল; কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে? কেন সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে হয়? কেন মুক্তবুদ্ধির চর্চা রাষ্ট্রের কাছে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়? এ প্রশ্নগুলো শুধু প্রশাসনকে নয়; বরং গোটা সমাজকেই আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছিল।

সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে নবপ্রজন্ম যে আত্মদায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছে, তা নিছক নৈতিক অবস্থান নয়; বরং ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এসে রক্তাক্ত প্রতিরোধের মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতের পথচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। চব্বিশের আন্দোলন তাই কেবল একটি রাজনৈতিক মোড় নয়, এটি ছিল

এক গণজাগরণ, যা তরুণদের বিবেক ও চেতনার গভীরতম স্তর থেকে উৎসারিত। ‘স্বৈরাচার পতনের এক দফা’—এই উচ্চারণ ছাত্র-জনতার মুখে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছিল এক সম্মিলিত সংগ্রামের শপথে। এ ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের আড়ালে বাসা বাঁধা স্বৈরশাসক ও জনগণের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের বিরুদ্ধে একটি মৌলিক প্রতিবাদ, যেখানে তরুণেরা হয়ে উঠেছিলেন পরিবর্তনের কারিগর।

-----৪.

এই অভ্যুত্থান আমাদের এক গভীর উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করায়, এই প্রজন্ম আর আগের মতো কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তাঁরা বইয়ের পাতার বাইরে সমাজের বাস্তবতা দেখেন, অন্যায়ের মধ্যে সত্যকে খুঁজে পেতে চান এবং যখন দেখেন যে তাঁদের চারপাশের কাঠামো ন্যায় থেকে বিচ্যুত, তখন তাঁরা নীরব থাকতে অস্বীকার করেন। ‘নীরব দর্শক’ হিসেবে বসে থাকা তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং তাঁরা এখন ইতিহাসকে নিজেদের হাতে রচনা করতে চান নিজেদের রক্ত, স্বপ্ন ও সংগ্রামের ভাষায়।

নতুন প্রজন্মের এই জাগরণ শুধু রাজনৈতিক সচেতনতার ফল নয়; এটি এক গভীর নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রতিফলন। ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি যেমন ‘অর্গানিক ইনটেলেকচুয়াল’–এর কথা বলেছিলেন, যাঁরা সমাজের ভেতর থেকে উঠে এসে বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সেই অর্থে বাংলাদেশের এই তরুণেরা এখন আর কেবল সুবিধাভোগী শ্রেণির মুখপাত্র নন; বরং হয়ে উঠেছেন সমাজ-রূপান্তরের চেতনাপ্রসূত প্রজ্ঞার বাহক।

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান একটি সাময়িক বিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসনির্মাণের এক সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার অনিবার্য প্রকাশ। বহু বছর ধরে সমাজের গহিনে জমে থাকা ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও ন্যায়বোধ একসময় আন্দোলনের রূপ নেয়; যেখানে কেবল ক্ষণিকের প্রতিবাদ নয়; বরং একটি বৃহত্তর নৈতিক-রাজনৈতিক চেতনার বিস্তার পরিলক্ষিত হয়। এই চেতনা অতীতের নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে থেমে থাকেনি; বরং তা আমাদের ভবিষ্যতের দিকে নতুনভাবে তাকাতে শিখিয়েছে; একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের কল্পনা সামনে এনেছে।

-----৫.

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান তাই কেবল একটি সমকালীন ঘটনা নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে ইতিহাসের একটি মাইলফলক। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, যে জাতি নিজের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও চেতনার উত্তরাধিকার ভুলে যায়, সে জাতি স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে না।

রোমান দার্শনিক সিসেরো একবার বলেছিলেন, ‘জন্মের আগে যা ঘটেছিল, সে সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা মানে সর্বদা শিশু থাকা।’ তেমনি ইতিহাসের জ্ঞান ছাড়াও কোনো জাতিই পরিপক্ব হয়ে উঠতে পারে না। এই আন্দোলনের শিক্ষা তাই শুধু আবেগ নয়; বরং একটি বোধের আহ্বান—নাগরিকত্বের নৈতিক দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করা।

এই উত্তরাধিকার শুধু কিছু রাজনৈতিক নেতার হাতে তুলে দিয়ে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং এই দায় সমাজের প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের, বিশেষত তরুণদের, যাঁরা ভবিষ্যতের নির্মাতা। আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই এই আন্দোলনের চেতনা স্থায়ী রূপ পেতে পারে। আজ যখন আমরা আবার নানা ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক দমননীতি, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মুখোমুখি হচ্ছি, তখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে এই আন্দোলনের শিক্ষা ও প্রেরণাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করা।

সমাজ বদলের দায়িত্ব কিছু নির্বাচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি আমাদের সবার, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের, যাঁদের কণ্ঠে ভবিষ্যতের স্বর ধ্বনিত হয়। তাঁদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনার চোখে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে দেখার, নৈতিক উপলব্ধিকে কাজে লাগানোর এবং যেখানেই অন্যায়-অবিচার দেখা যায়, সেখানে নির্ভয়ে, দৃঢ়তায় ও মানবিক দায়িত্ব নিয়ে রুখে দাঁড়ানোর; কারণ সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই একটি বিবেকবান প্রজন্মের প্রথম এবং অপরিহার্য দায়িত্ব।

আলবেয়ার কামু বলেছিলেন, ‘একটি শৃঙ্খলিত বিশ্বের সঙ্গে মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় হলো এতটাই সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া যে তোমার অস্তিত্বই বিদ্রোহের ঘটনার মতো হয়ে উঠবে।’ চব্বিশের চেতনা আমাদের সেই স্বাধীন সত্তা হয়ে ওঠারই ডাক দেয়। এটি এক প্রজন্মের বিবেক, এক জাতির আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক প্রতিশ্রুতি, যেখানে কেউই যেন নীরব দর্শক না থাকেন; বরং সবাই হয়ে উঠুক অন্যায়ের বিরুদ্ধে একেকটি জীবন্ত প্রতিবাদ।

আজ যখন আমরা ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করি, তখন এই স্মরণ যেন কেবল একটি অতীত অধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নয়; বরং হয়ে উঠুক ভবিষ্যতের প্রতি এক দৃপ্ত অঙ্গীকার। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন এ গণ–অভ্যুত্থান আমাদের দেখিয়েছে, সেই স্বপ্ন যেন প্রতে৵ক মানুষের হৃদয়ে, চিন্তায় ও প্রয়াসে বাঁচিয়ে রাখা হয়। এই স্মৃতি হোক আমাদের বিবেকের জাগরণ, চেতনার দীপ্তি এবং সামষ্টিক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার পাথেয়।

* ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য। ই–মেইল: mahruf@ymail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

স্বৈরাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব এক জাগরণ

সংকীর্ণ রশির ওপর ভারসাম্য রক্ষা: কেন পুতিনের সফর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এক মহাশিক্ষা by শশী থারুর

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নয়াদিল্লি সফর এবং ২৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন কেবল আরেকটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়; এটি একটি ভাঙনমুখী বিশ্বের ভেতরে ধারাবাহিকতার এক শক্তিশালী বার্তা। তীব্র ভূরাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যেও এই বৈঠক আবার প্রমাণ করল- দুই দেশের ‘বিশেষ ও সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ প্রকৃতই পারস্পরিক লাভজনক এবং ভারত তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় অটল।

শীর্ষ বৈঠকে বিস্তৃত পরিধিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে- বাণিজ্য ও প্রযুক্তির জন্য ভিশন ২০৩০ রোডম্যাপ, জ্বালানি ও পারমাণবিক সহযোগিতায় নতুন উদ্যোগ, বহুল আলোচিত রিলোস প্রতিরক্ষা লজিস্টিকস চুক্তি, পাশাপাশি শ্রমিক চলাচল, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক প্রশিক্ষণ বিষয়ে সমঝোতা ইস্যুতে। কিন্তু প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি ছিল দৃশ্যপটের আড়ালে।

অপ্রত্যাশিত ফলাফল

ওয়াশিংটন যখন রাশিয়ার ওপর ব্যাপক শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। তাহলো মস্কোকে বিচ্ছিন্ন করা, তাদের অর্থনীতি দুর্বল করা এবং পশ্চিমা দাবিতে (দুই দেশকেই) বাধ্য করা। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি নীতিনির্ধারকদের ইচ্ছে অনুযায়ী চলে না। রাশিয়াকে বিপর্যস্ত করার বদলে নিষেধাজ্ঞা তাকে পূর্বমুখী হতে বাধ্য করেছে। সেখানে ভারত তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা হলো মার্কিন শুল্ক রাশিয়ার পথ বন্ধ করেনি; বরং ভারতের বৈশ্বিক প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন এসেছে জ্বালানি বাণিজ্যে। পশ্চিমা ক্রেতারা দূরে সরে গেলে রাশিয়া ছাড়কৃত মূল্যে তেল দিতে শুরু করে। বিশাল জ্বালানি-চাহিদাসম্পন্ন ভারত সুযোগ লুফে নেয়। রুশ তেল আমদানি বেড়ে যায়, ভারতের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। রাশিয়ার জন্য ভারত হয় প্রধান বাজার; ভারতের জন্য রাশিয়া হয় বাস্তববাদী সহযোগী। উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে শাস্তি দেয়া; ফল দাঁড়াল দুই দেশের মধ্যে লাভজনক বাণিজ্য করিডর গঠন। সাম্প্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভারতীয় আমদানিকারকদের রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে বাধ্য করলেও সম্পর্কের এই করিডর এখন আরও বহু ক্ষেত্রে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

স্বাভাবিক অংশীদার

এটি শুধু তেলের লেনদেন নয়; বরং এর চেয়েও গভীর বাস্তবতা আছে। পশ্চিমা অর্থায়ন ও প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন রাশিয়ার প্রয়োজন এমন অংশীদার, যারা তার থেকে আমদানি করবে, তার রপ্তানি গ্রহণ করবে এবং কূটনৈতিক বৈধতাও দেবে। এই তিন ক্ষেত্রেই ভারত যথার্থ অংশীদার। ভারতের জন্য এ সম্পর্ক কৌশলগত স্বাধীনতাকে আরও শক্তিশালী করে। নিষেধাজ্ঞা মস্কোর কাছে নয়াদিল্লির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে এবং এশিয়াকেন্দ্রিক এক নতুন সংহতির পথ খুলেছে। শীতল যুদ্ধ থেকে ভারত নিজের পররাষ্ট্রনীতিকে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড় করিয়েছে- অপর পক্ষকে অসন্তুষ্ট না করে বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আজও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করছে ভারত, পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গেও ঐতিহাসিক সখ্য রক্ষা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এ ভারসাম্যকে আরও কঠিন করে তুলেছে, কিন্তু একই সঙ্গে আরও দৃশ্যমান করেছে। ভারত জাতিসংঘে রাশিয়াকে নিন্দা জানানো প্রস্তাবে বিরত থাকে, রুশ তেল আমদানি করে, আবার একই সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব আরও বাড়ায়। এটি ভণ্ডামি নয়, এটাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, বা বহুমুখী অংশীদারিত্বের বাস্তব প্রয়োগ।

চাপের মুখে স্থির থাকা

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতকে রাশিয়ার সহায়ক বলে দেখানো হতে পারে, যা কূটনৈতিক চাপ আনতে পারে। তাই এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন সাবধানী কূটনীতি, স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সামঞ্জস্য করার ক্ষমতা। তবু সম্ভাবনাগুলো বড়। পশ্চিম ও রাশিয়া- উভয় পক্ষের কাছেই ভারত অপরিহার্য দেশ হিসেবে উঠে আসে। বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত হয়ে ওঠে এক ‘সুইং স্টেট’- ভারসাম্য বদলে দিতে এক সক্ষম শক্তি। ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের তিনটি স্তম্ভ আছে। তা হলো-
১. প্রতিরক্ষা- সম্পর্কের মেরুদণ্ড:
ভারতের সামরিক সরঞ্জামের ৬০-৭০ ভাগ রুশ বা সোভিয়েত উৎস থেকে সংগৃহীত। তাই অতিরিক্ত কোনো চুক্তি না হলেও খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ আপগ্রেড নিশ্চিত করতে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ অপরিহার্য। রিলোস চুক্তি দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে- বিশেষত রাশিয়ার আর্কটিক সুবিধাগুলোতে ভারতের প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং স্পষ্ট বলেছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা ‘স্থিতিশীল’।
২. বাণিজ্য ও অর্থনীতি-সম্পর্কের পুনর্গঠন
দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক বাণিজ্য লক্ষ্য করেছে। ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি হয়েছে। রুপি-রুবল লেনদেন সম্প্রসারণ, ডলার-বহির্ভূত পেমেন্ট সিস্টেম, রুপে-মির সংযোগ, ব্রিকস পেমেন্ট করিডর- সবই চলমান আলোচনায়। রাশিয়ার জন্য ভারতীয় বাজার নতুন সুযোগ; কারণ পশ্চিমা দরজা বন্ধ হওয়ায় রাশিয়া আবার ভারতের দিকে তাকাচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, ক্ষুদ্র পারমাণবিক রিয়্যাক্টর ও ভাসমান নিউক্লিয়ার প্লান্টে সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজে অংশীদারিত্ব- এগুলো বৈঠকের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এছাড়া ‘শ্রম গতিশীলতা’ চুক্তি এসেছে, যা বৈধ শ্রমিক নিয়োগ ও অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
৩. বহুমাত্রিক স্বায়ত্তশাসন-ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র
এই সফর দেখিয়ে দিয়েছে ভারত কারও চাপের কাছে নতি স্বীকার করে না। পশ্চিমা আপত্তিকে উপেক্ষা করে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা ভারতের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণক্ষমতার প্রকাশ।
উপসংহার: সম্পর্ক লেনদেনভিত্তিক নয়, কৌশলগত
পুতিনের সফর প্রমাণ করেছে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক কেবল প্রতীকী নয়, কার্যকরী। ভারতের নিরাপত্তা ও জ্বালানি স্থিতি বজায় রাখতে রাশিয়াকে প্রয়োজন; রাশিয়ার জন্য পশ্চিমা অবরোধ ভেদ করে এশিয়ায় শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে ভারত অপরিহার্য। ৮০ বছরের পুরোনো অংশীদারিত্ব আবারও শক্তিশালী হলো প্রতীক নয়, বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে। বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও দুই দেশ জানিয়ে দিল- তাদের সম্পর্ক টিকে থাকবে, কারণ এটি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট, গভীর এবং পারস্পরিক উপকারী।
* শশী থারুর, ভারতের প্রভাবশালী একজন রাজনীতিক। ২০০৯ সাল থেকে তিনি কেরালার তিরুবনন্তপুরম থেকে সংসদ সদস্য। তিনি একজন লেখক এবং সাবেক কূটনীতিক। এনডিটিভি থেকে তার লেখার অনুবাদ

mzamin

স্বৈরতন্ত্র উত্থানের দায় আসলে কাদের by ইসরাত জাহান

প্রাচীন গ্রিসে ক্ষুদ্র অসংখ্য নগররাষ্ট্র ছিল। সেখানে নগরের অধিবাসীকেই বলা হতো নাগরিক, যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক অ্যারিস্টটল নাগরিকের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা সেই সব ব্যক্তিকে নাগরিক বলব, যাদের আইন প্রণয়ন ও বিচারিক কার্যাবলিতে অংশগ্রহণের ক্ষমতা আছে।’ তাঁর মতে, যে ব্যক্তি নগররাষ্ট্রের শাসনকাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে অক্ষম, তিনি প্রকৃত নাগরিক নন।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নাগরিককে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে—যেকোনো রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, রাষ্ট্র প্রদত্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করেন এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য ন্যায়ের সঙ্গে পালন করেন, তাঁকেই নাগরিক বলা যায়। একই সঙ্গে নাগরিককে অবশ্যই অন্য মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন না করার ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে।

প্রতিটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সৎ, যোগ্য ও নীতিবান নাগরিক। রাষ্ট্রের কাঠামো ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে নাগরিকের চরিত্র ও আচরণের ওপর। তাই রাষ্ট্রের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিক—যিনি নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত। এ জ্ঞান ও সচেতনতাই রাষ্ট্রকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে বলা হয় জনগণের অংশগ্রহণে, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের কল্যাণে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা; কিন্তু প্রশ্ন হলো যদি জনগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অসচেতন থাকেন, তবে কি গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বরূপ অক্ষুণ্ণ থাকে? বাস্তবতা হলো নাগরিকের অজ্ঞতা ও উদাসীনতাই স্বৈরতন্ত্রকে জন্ম দেয়।

প্রথমত, যেখানে মানুষ নিজের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞ, সেখানে শাসকগোষ্ঠী সহজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন—এসব বিষয়ে নাগরিক উদাসীন থাকলে শাসকের জবাবদিহি বিলীন হয়ে যায়, তখন গণতান্ত্রিক কাঠামো টিকে থাকলেও এর প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, নাগরিকেরা ভয়, অজ্ঞতা বা উদাসীনতার কারণে যখন অন্যায় ও অনিয়ম মেনে নেন, তখনই স্বৈরতন্ত্র শিকড় গাড়ে। শাসকের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত তারা অন্ধভাবে মেনে নিলে সরকার জবাবদিহি এড়িয়ে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে; কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—শক্তিশালী শাসকের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় কেবল তখনই, যখন জনগণ ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। জার্মানি থেকে পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের অতীত—সবখানেই দেখা যায়, নাগরিক–সচেতনতার অভাবেই স্বৈরতন্ত্রের বিস্তার ঘটেছিল।

তৃতীয়ত, নাগরিক সমাজ দুর্বল হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন কিংবা নাগরিক সংগঠনগুলোও কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। তখন শাসকেরা সহজেই বিকল্প কণ্ঠরোধ করে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অর্থাৎ, নাগরিকের নীরবতাই শাসকের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়।

অতএব, স্বৈরতন্ত্রের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নাগরিক শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা। পরিবার থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মানুষকে জানতে হবে তাদের অধিকার, কর্তব্য ও রাষ্ট্রের কাছে দাবি করার উপায়। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হতে হবে সত্য প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম, তোষণ বা প্রোপাগান্ডার যন্ত্র নয়। মনে রাখতে হবে—অধিকার চর্চা না করলে অধিকার হারিয়ে যায়। তাই প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য হলো নিজের অধিকার সম্পর্কে জানা ও তা প্রয়োগ করা।

সবশেষে বলা যায়, নাগরিকের অধিকার বিষয়ে অসচেতনতা কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; বরং তা রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর। সচেতন নাগরিক সমাজই পারে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র গড়ে তুলতে আর অসচেতন নাগরিক সমাজই সৃষ্টি করে স্বৈরতন্ত্রের জন্মভূমি।

* ইসরাত জাহান
- শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বৈরতন্ত্র উত্থানের দায় আসলে কাদের

মস্কোয় কেমন আছেন বাশার আল আসাদ

রাজা আসে, রাজা যায়। কিন্তু প্রজার ভাগ্য কখনো বদলায় না। সিরিয়ায়ও তেমনটা ঘটেছে। এক বছরের বেশি সময় আগে সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে গেছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। সিরিয়াকে দেনায় ডুবিয়ে আর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এখন শান্তির জীবনযাপন করছেন তিনি। পরিবার নিয়ে রাশিয়া আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাটাচ্ছেন সুখের জীবন। এমনকি চক্ষু চিকিৎসার পড়াশোনাও করছেন বাশার আল আসাদ। সিরিয়া এক সময়ের প্রভাবশালী এই পরিবারের নিরিবিলি জীবন নিয়ে বিস্তারিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

লন্ডনে চক্ষু চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন আসাদ। এখন নিজের পুরোনো সেই শিক্ষার আলো আবারও জ্বালাতে চাইছেন তিনি। রাশিয়ায় বসে নতুন করে শুরু করেছেন চক্ষু চিকিৎসার পড়াশোনা। আসাদ পরিবারের একজন বন্ধুর বরাতে এমন খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হাত পাকিয়ে তিনি রাশিয়ার এলিটদের ক্লায়েন্ট বানাবেন। তবে টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে নয় বরং নিজের প্রবল আগ্রহ থেকেই এই পেশায় ফিরতে চান আসাদ। এমনকি সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর আগেও নাকি দামেস্কে নিয়মিত চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাকটিস চালিয়ে গেছেন তিনি।

সাবেক এই স্বৈরশাসকের স্ত্রী আসমা আল আসাদ লিউকেমিয়ার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। তবে মস্কোয় তিনি এক্সপেরিমেন্টাল চিকিৎসা নিয়েছেন। সুস্থ হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে। স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতেই নতুন প্লট নিয়ে হাজির হয়েছেন আসাদ। এখন নিজের সাইড স্টোরি দিয়ে গণমাধ্যমে শিরোনাম হতে চাইছেন তিনি। এমনকি তিনি এখন স্বেচ্ছায় মার্কিন ও রুশ মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। যদিও বিষয়টা এতটা সরল নয়। রুশ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের সাক্ষাৎকারই দিতে পারবেন না তিনি।

১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত হন আসাদ। দীর্ঘ আর রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। জানা গেছে, একেবারে শেষ মুহূর্তে রাশিয়া পালিয়ে যান আসাদ। কিন্তু তাকে নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে, যেসব নেতারা ক্ষমতা হারান, তাদের ব্যাপারে পুতিনের ধৈর্য নেই বললেই চলে। তাই আসাদকে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিত্ব কিংবা তাকে ডিনারে দাওয়াত দেওয়ার মতো অতিথিও মনে করেন না পুতিন।

ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক প্রভাবও কমে গেছে আসাদ পরিবারের। তাই মস্কো ও আমিরাতে নিরিবিলি ও একান্ত সময় কাটাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে আমিরাত তো আসাদের সন্তানদের দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে উঠেছে। তারা সেখানে প্রায়ই ঘুরতে যান। বহির্বিশ্বের সঙ্গে আসাদের খুব একটা যোগাযোগ নেই। বরং তার প্রাসাদে থাকা হাতেগোনা কয়েকজনের সঙ্গেই তার যোগাযোগ রয়েছে। একাকী সময় কাটালেও বিলাসিতায় কোনো কমতি নেই আসাদ কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের। 

ছবি : সংগৃহীত

যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের পরীক্ষা করতেন, এবার নিজের মেয়ের সেই পরীক্ষা করতে হলো মাকে by মানসুরা হোসাইন

মেয়ের বয়স এখনো ছয় বছরে পা দেয়নি। তার প্যান্টে রক্ত দেখে বুক কেঁপে উঠেছিল মায়ের। তিনি মনে মনে চাচ্ছিলেন, যা ভাবছেন—তা যেন সত্যি না হয়।

এই মা নিজে একজন চিকিৎসক, সার্জন। বর্তমানে বগুড়ায় কর্মরত। আগে রাজধানীর একটি হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে কাজ করার সময় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) অধীনে ভর্তি শিশুদের পরীক্ষা করেছেন, ক্ষতবিক্ষত যোনিপথ অস্ত্রোপচার করে ঠিক করেছেন। এবার তাঁকে নিজের মেয়ের একই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হলো। এরপর থানায় বসে তাঁর মেয়ে নারী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে বলে, ‘দাদু আমাকে ব্যথা দিয়েছে।’

বগুড়া থেকে এই মা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলছিলেন নিজের এই অভিজ্ঞতার কথা; শুনিয়েছেন তার একাকী লড়াইয়ের গল্প।

আশঙ্কা সত্যি হলো

শিশুটির দাদার বয়স প্রায় ৮০ বছর। মেয়ের বক্তব্য শোনার পর এই মা প্রথমে কিছুটা নিশ্চিত হন, মেয়ের প্যান্টে রক্ত দেখে তিনি যে আশঙ্কা করেছিলেন, তা হয়তো সত্যি।

এ ঘটনার পর মেয়ের যোনিপথ খালি চোখে পরীক্ষা করে যা দেখেছেন, তা তিনি মামলার এজাহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

তবে একদিকে নিজের মেয়ে, অন্যদিকে যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি শ্বশুর। এ কারণে স্বামীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা কেউই মামলা করতে চাননি। কিন্তু মা তা মানতে পারেননি। তাই তিনি একাই থানায় গিয়ে মামলা করেন।

একার লড়াই

মেয়েকে সরকারি হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করে চিকিৎসা করিয়েছেন। এখনো একাই সব পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন এই মা।

মেয়েটি অনেক ছোট হওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়ার সময় পুলিশ মাকে কাছে থাকতে দেয়নি। ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি। আর বয়সসহ অন্যান্য বিবেচনায় আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন অভিযুক্ত শ্বশুর।

মামলা সঠিক ধারায় হয়েছে কি না—এসব নিয়ে এই মা এখন চরম সংশয়ে ভুগছেন। এ ছাড়া পরিবার-পরিজনের বিরোধিতার পরও মেয়ের জন্য তাঁকেই ন্যায়বিচারের লড়াই একা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

‘আমি যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য লড়ে যাব’—এভাবেই বলেছেন ওই মা।

ঘটনার দিন

এই মা বলেন, তাঁর স্বামীও একজন চিকিৎসক। গত ২৮ নভেম্বর ব্যক্তিগত কাজে তিনি ঢাকায় ছিলেন। সেদিন মেয়ে তার বাবার সঙ্গে বগুড়া শহরের বাসা থেকে পাশের উপজেলায় দাদার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। রাতে বগুড়ায় ফিরে তিনি বাসার গৃহকর্মীর কাছ থেকে মেয়ের রক্তাক্ত প্যান্ট দেখতে পান।

পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে মেয়ের যোনিপথ পরীক্ষা করে তাঁর মনে হয়েছে, বয়স অনুযায়ী জায়গাটি অস্বাভাবিকভাবে প্রশস্ত। জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে যাওয়ার লক্ষণ, লালচে ভাব—সবই আঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত

এই মা যে হাসপাতালে বর্তমানে কর্মরত, সেখানকার আরেকজন সংশ্লিষ্ট নারী চিকিৎসককে বিষয়টি জানান তিনি। ওই চিকিৎসক বাসায় এসে মেয়েটিকে খালি চোখে পরীক্ষা করেন এবং প্রায় একই পর্যবেক্ষণের কথা বলেন। মেয়ের বাবার উপস্থিতিতেই এই পরীক্ষা করা হয়।

এর পরদিন মেয়েকে একটি হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা চলে। দায়িত্বরত চিকিৎসকদের মৌখিক বক্তব্যও শিশুটির মায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়।

মামলা ও সন্দেহ

শ্বশুরের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে এই মা বলেন, ঘটনার পরপরই তিনি মামলা করেননি। মেয়ের বাবার কাছে বারবার জানতে চেয়েছেন কীভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে? কিন্তু তাকে একবার বলা হয়, বালুতে খেলতে গিয়ে জোঁক ঢুকেছে। আবার বলা হয়, লাঠি দিয়ে খেলতে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। এমনকি মাসিক হওয়ার কথাও বলা হয়।

এই মা বলেন, ‘মেয়ের এ অবস্থার জন্য তার বাবার কোনো উদ্বেগ কাজ করেনি। এ কারণে আমি একা প্রথমে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে মামলা করতে থানায় যাই। সে সময় মেয়ে নারী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে বলেছে, ওর দাদু তাকে ব্যথা দিয়েছে। এরপর ৩ ডিসেম্বর শ্বশুরকে আসামি করে মামলা করি।’

শিশুটির বাবার সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। তাঁকে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো জবাব আসেনি।

যে ধারায় মামলা হয়েছে

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া থানায় ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ নম্বর ধারা এবং ১৮৬০ দণ্ডবিধির ৩২৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে তাঁর যৌন কামনা চরিতার্থ করার জন্য তাঁর শরীরের যেকোনো অঙ্গ বা কোনো বস্তু দিয়ে কোনো নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন, তাহলে তাঁর এই কাজ হবে যৌনপীড়ন। এ অপরাধের শাস্তি অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।

অন্যদিকে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩২৪ ধারা বলছে, বিপজ্জনক অস্ত্র বা উপায় (যেমন ধারালো অস্ত্র) ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আঘাত করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান আছে।

শিশুটির মা বলেন, ‘আমি মামলার এজাহারে সবকিছু স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছি। আমি একজন সার্জন। মেয়ের শারীরিক অবস্থা বুঝতে পারলেও মামলার ধারা তো বুঝি না।’

নাতনিকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় দাদাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরে তিনি জামিন পেয়েছেন।

শিশুটির মা প্রথম আলোকে বলেন, এজাহারে ঘটনার বিস্তারিত উপাদান যথেষ্ট স্পষ্ট নয়—এই যুক্তিতে এবং আসামির বয়স বিবেচনায় জামিন আদালত আসামির জামিন মঞ্জুর করেন।

হারিয়ে যাওয়া প্রমাণ

ঘটনার দিন মেয়ের রক্তমাখা প্যান্ট প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন মা। সকালে উঠে দেখেন, সেটি নেই। বাসার সিসি ক্যামেরাও কাজ করছিল না।

মা বলেন, ‘বাসায় আমার স্বামী, একজন অবিবাহিত ননদ ও চারজন কাজের মানুষ ছাড়া কেউ নেই। তাহলে প্যান্টটা কে নিল? বাসার সিসিটিভি কেন কাজ করছে না, তার উত্তরও স্বামীর কাছ থেকে পাইনি। সব মিলে আমার সন্দেহটা বাড়ছেই।’

স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভিন্ন কারণে আগে থেকেই মনোমালিন্য চলছে বলে জানান এই মা। তিনি বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সংসার করতে চাচ্ছি না বলেই মিথ্যা অভিযোগ করেছি।’

এই মা বলেন, ‘আমি যদি সংসার না চাইতাম, তালাক দিতে পারতাম। স্বামীর বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ করতে পারতাম। আমি কেন আমার শ্বশুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করব?’

শিশুটির বর্তমান অবস্থা ও তদন্ত

ঘটনার পর শিশুটি মানসিক ট্রমায় ছিল উল্লেখ করে তার মা বলেন, ‘মেয়ে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে এসব নিয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলে সে বিরক্ত হচ্ছে।

মামলাটির তদন্ত করছেন দুপচাঁচিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান সরকার। তিনি মুঠোফোন প্রথম আলোকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। এর বাইরে কিছু বলা সম্ভব নয়।’

শিশু ধর্ষণ
শিশু ধর্ষণ। প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো

বিতর্কের জবাব দিলেন শুভশ্রী

প্রকাশ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ কলকাতায় যুবভারতীতে বিশ্বখ্যাত ফুটবলার লিওনেল মেসিকে দেখতে না পাওয়ার ঘটনায় মেসিভক্তরা দায় চাপাচ্ছেন অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলির ওপর। কারণ মেসি যে হোটেলে ছিলেন, সেখানে গিয়ে ছবি তোলেন অভিনেত্রী। আর সেই ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই সমালোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের শিকার হতে হয় তাকে। শুধু তাই নয়, শুভশ্রীর স্বামী পরিচালক রাজ চক্রবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিতেও বাধ্য হন। এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওবার্তার মাধ্যমে সমস্ত বিতর্কের জবাব দিলেন শুভশ্রী। তিনি বলেন, জি.ও.এ.টি ইভেন্টে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বিনোদন জগতের প্রতিনিধি হিসেবে আমি এবং কৌশিক গাঙ্গুলী সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম। আমন্ত্রণ পেয়েই আমরা মেসির হোটেলে যাই। নির্ধারিত সময়ে আমরা মেসির সঙ্গে দেখা করি এবং ছবিও তুলি। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় ওদের পিআর টিমের পক্ষ থেকে আমাকে যুবভারতীতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। বলা হয়, আমি গেলে ওদের সুবিধা হবে। মাঠে আমাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট তাঁবুর ব্যবস্থা ছিল, আমরা সেখানেই অপেক্ষা করছিলাম। তিনি আরও বলেন, যে সময়ে ছবিগুলো পোস্ট করা হয়েছে, নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য সেই মুহূর্তে তা পোস্ট হয়নি। কারণ, ক্রীড়াঙ্গনে জ্যামার লাগানো ছিল। মেসি ক্রীড়াঙ্গনে ঢোকেন সাড়ে ১১টা নাগাদ। তাকে নিয়ে যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছিল, সেটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে আমার ছবিগুলো কিছু সময় পর দেরিতে পোস্ট হয়। আর সেটাই দুরন্ত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই আমাকে নিয়ে ট্রোলিং শুরু হয়। আমাকে প্রোপাগান্ডা এবং অবজেক্ট বানিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে। কেউ কি বলতে পারবেন যে, আমার ছবি তোলার জন্যই আপনারা মেসিকে দেখতে পাননি? আমি কি মাঠের কোথাও ছিলাম?
mzamin