Thursday, April 3, 2025

ট্রাম্প কেন ইউরোপের মৃত্যু দেখতে চান by নাথালি টর্চি

ইউরোপীয়রা আগে যা জানতেন ‘সিগন্যাল অ্যাপ’ কেলেঙ্কারি সেটাই নিশ্চিত করেছে। ইউরোপের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের অবজ্ঞা গভীর এবং আটলান্টিকের এপার-ওপারের দেশগুলোর মধ্যে ফাটল এখন কাঠামোবদ্ধ রূপ পাচ্ছে। যদিও আশা এখনো জিইয়ে আছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক চূড়ান্ত ধরনের বাজে অবস্থায় যাওয়া ঠেকাতে পারবে ইউরোপ। গ্রিনল্যান্ডে আগ্রাসন, ইউরোপের ন্যাটো সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার অথবা সর্বাত্মক বাণিজ্যযুদ্ধ—সবকিছুই ঠেকানোর আশা করছেন ইউরোপের কোনো কোনো নেতা।

এ মুহূর্তে ইউরোপের নেতাদের সবচেয়ে জরুরি মনোযোগের বিষয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে ধাক্কা দিয়ে বাসের নিচে ফেলে চলেও যায়, তাহলে ইউরোপ যেকোনোভাবেই হোক সম্মিলিতভাবে মুক্ত, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক ইউক্রেনকে সুরক্ষা দিতে সফল হবে। এখানে কোনো বিভ্রমের অবকাশ নেই যে ইউরোপীয় নেতারা সেটা করতে চান যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়েই অথবা ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত অনুমোদন নিয়েই।

সিগন্যাল অ্যাপ কেলেঙ্কারির ঘটনাটি একই সঙ্গে প্রত্যাশিত ও বেদনাদায়ক। এটা প্রত্যাশিত এ কারণে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে যে ভাষায় কথা বলছেন, তার সঙ্গে সিগন্যাল অ্যাপে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা দলের সদস্যরা তাদের গোপন চ্যাট গ্রুপে যে ভাষায় কথা বলেছেন, দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

ফেব্রুয়ারি মাসে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে জেডি ভ্যান্সের বক্তব্য, টাকার কার্লসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সাক্ষাৎকার অথবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরতিহীন ঘোষণা ও তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো দেখুন। গোপন ও প্রকাশ্য—দুই জায়গাতেই স্মরণ করার মতো ধারাবাহিকতা রয়েছে। ওয়াশিংটন ইউরোপকে বাতিল, অহংকারী ও পরজীবী বলে মনে করে।

বেদনাদায়ক বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে ক্ষয়িষ্ণু মিত্র হিসেবেও দেখে না, ট্রাম্পের কর্মকর্তারা ইউরোপের মৃত্যুতে অবদান রাখতে চান। লোহিত সাগরে হুতির হুমকি সম্পর্কে যে যা-ই ভাবুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হলো তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থেই ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়। কিন্তু ভ্যান্স ও পিট হেগসেথ গ্রুপ চ্যাটে পরিষ্কার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে হুতির ওপর আক্রমণে ইউরোপীয়রাও লাভবান হবে। এটা যেকোনো আক্রমণকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট কারণ।

অন্য কথায় ইউরোপীয়দের সাহায্য করার বিষয়টিকে এমন একটা নেতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরে যেতে পারে। ইউরোপের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই যে অবজ্ঞা, তার ওপর দাঁড়িয়ে ইউরোপকে এখন তিনটি বড় নীতিগত জায়গায় কাজ করতে হবে। প্রথমত, বাণিজ্য। এ সপ্তাহে ট্রাম্প বেশ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে।

কোনো ধরনের সহানুভূতি কিংবা ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যযুদ্ধের মাত্রাকে প্রশমন করতে পারবে না। বরং যুদ্ধের মাত্রাটা তীব্র হবে। যা-ই হোক, ২৭টি সরকারের জন্য একটি বাণিজ্যনীতি পরিচালনা করা ইইউর আইনি দায়িত্ব এবং জোটের একটি সম্মিলিত অর্থনৈতিক ওজন রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র উপেক্ষা করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে যন্ত্রণা আসবেই। কিন্তু সংঘাতের ক্ষেত্রে ইটের বদলে পাটকেল থাকতে হবে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয়রা যদি সবাই মিলে কঠোর অবস্থানে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের লুণ্ঠক আচরণ করতে পারবে না।

দ্বিতীয়ত, গ্রিনল্যান্ড। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থামবে না। ট্রাম্প বারবার করে বলছেন গ্রিনল্যান্ড তাঁর হবে। আর্কটিক দ্বীপে ভ্যান্সের উসকানিমূলক ভ্রমণ এবং কয়েক দশক ধরে গ্রিনল্যান্ডের দেখভালের ক্ষেত্রে ‘ভালো কিছু করছে না’ বলে ডেনমার্ককে তাঁর তিরস্কার—এই ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটনের জবরদস্তি আরও তীব্র হবে। এখন ইউরোপের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের অবজ্ঞাকে মাথায় রেখে ডেনমার্কের সমর্থনে ইউরোপীয় নেতাদের কথা বলতে হবে। ইউরোপের নেতারা যদি দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চরম বাজে ধরনের চাপ আসবে।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইউক্রেন। এমানুয়েল মাখোঁ ও কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে ইউরোপের অন্য সক্ষম ও ইচ্ছুক নেতারা জেলেনস্কিকে সঙ্গে নিয়ে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু এটা ক্রমাগতভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে ইউরোপীয় নেতাদের সেটা করতে হবে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াই নয়, সম্ভবত দেশটির বিরুদ্ধেও। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করা যাবে না।

ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলো যেহেতু ইউক্রেনকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে এবং একই সঙ্গে তারা ইউক্রেনীয় বাহিনীগুলোকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটা তাদের এগিয়ে নিতে হবে, এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই যে তাদের পেছনে আর যুক্তরাষ্ট্র নেই।

গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সমর্থন আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ইউরোপের নেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন যদি অনাগ্রহী হয়, তাহলে ইউরোপ ও ইউক্রেনকে অবশ্যই বের করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়াই কীভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে ইউরোপকে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় সরকারগুলো দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির পূর্বশর্ত হিসেবে কৃষি-খাদ্য খাতে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার রাশিয়ার দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলায় ইউরোপকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

নাথালি টর্চি দ্য গার্ডিয়ান–এর কলাম লেখক। দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে ডেনমার্কের সমালোচনা করেন
জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে ডেনমার্কের সমালোচনা করেন। ছবি: রয়টার্স

বিএনপি এখন কী করবে? by কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে প্রায় আট মাস অতিবাহিত করছে। এই সরকারের সফলতা নিয়ে যত সমালোচনাই থাকুক না কেন, গণ–অভ্যুত্থান ও বিপ্লব–পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মধ্যেই এই সরকারের মূল সাফল্য ছিল।

এদিক থেকে মূল্যায়ন করলে দেখা যাচ্ছে, সরকার ক্রমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলার যে অবনতি হয়েছিল, আশানুরূপ না হলেও তার একটি ইতিবাচক পরিবর্তন কয়েক সপ্তাহ ধরে দেখা যাচ্ছে।
রমজানে দ্রব্যমূল্য এবং বিদ্যুতের সরবরাহের ক্ষেত্রে একধরনের শৃঙ্খলা সরকারের বিরুদ্ধে বিতর্ক দুর্বল করছে। এর ফলে সরকার কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় চলে এসেছে এবং আগে যে বিতর্কটা ছিল যে ‘অগ্রাধিকার সংস্কারের পর দ্রুত নির্বাচন’ নাকি ‘পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও বিচারের পর নির্বাচন’, সেই বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। তা ছাড়া স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের পর নির্বাচন প্রসঙ্গ আবার আলোচনায় এসেছে।  

সংস্কারের ক্ষেত্রে বিএনপিসহ পুরোনো কিছু রাজনৈতিক দলের যে অবস্থান, তার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী শক্তি, এনসিপি, জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলো, ঐকমত্য কমিশন এবং সরকারের মধ্যে মতপার্থক্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

এদিকে কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচনের আগে একটি ট্রানজিশনাল সরকারের প্রস্তাব করছেন। এটা বিএনপির যে জাতীয় সরকারের ধারণা, তার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। তবে বিএনপি জাতীয় সরকার প্রস্তাব করেছিল নির্বাচনের পর। দু–একজন আবার প্রধান উপদেষ্টাকে আগামী ৫ বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাচ্ছেন।

বৈষম্যবিরোধীদের নেতৃত্বে তারুণ্যনির্ভর একটি নতুন দল তৈরি হয়েছে। এখন তরুণ ভোটারদের নিয়ে বিএনপিকে আরও ভাবতে হবে। তা ছাড়া সেকেন্ড রিপাবলিকের ধারণা এবং ’৭১ ও ’২৪–কেন্দ্রিক বিতর্ক বিএনপির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এসেছে। জামায়াত ও শিবিরের সঙ্গে বিএনপি ও ছাত্রদলের একধরণের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন ৫ আগস্টের পর থেকেই শুরু হয়েছে।

সব মিলিয়ে বিএনপির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি কতটা প্রস্তুত?

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও পুরোনো রাজনৈতিক দল; যার বিস্তৃতি বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সব স্তরে রয়েছে।  বিএনপির আন্দোলন সরকার পতনে সক্ষম না হলেও কর্তৃত্ববাদকে যতটা মাঠপর্যায়ে (প্রেসক্লাব, পেশাজীবীদের কনফারেন্স হল বা ভার্চ্যুয়াল জগৎ নয়) চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সেটা অল্পবিস্তর পরিসরে, প্রকাশ্যে ও ধারাবাহিকভাবে বিএনপি করেছে।

বিএনপির পেশাজীবীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের পর প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী তর্ক ও বয়ান চালু রেখেছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রধানতম শক্তি হিসেবে গত ১৭ বছর বিএনপিই বিশেষভাবে কাজ করেছে, যা তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই অংশ ছিল। বিএনপির এই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছে ’৭৫–পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যেও আপসহীন নেতৃত্ব এবং তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার মধ্য দিয়ে।

বিএনপির বড় অর্জন হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বের আসনে থাকার লোভ ত্যাগ করে সর্বশক্তি দিয়ে অংশগ্রহণ এবং ’২৪–এর সাফল্যের পর তরুণদের প্রতিপক্ষ মনে না করে বিএনপির হাইকমান্ড বিশেষ করে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কর্তৃক তরুণদের প্রশংসা করা, তাঁদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করা, অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতাকাঠামোতে কম ভাগ পেয়েও নিঃশর্ত সমর্থন অব্যাহত রাখা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত বিএনপির এই অতীত অর্জন এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাওয়ার মধ্যেই কি ক্ষমতায় যাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষায় একক সত্তা হিসেবে থাকা বিএনপির জন্য যথেষ্ট? ৫ আগস্ট–পরবর্তী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনকেন্দ্রিক যে বিতর্ক, তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব, ’২৪ ও ’৭১–কেন্দ্রিক বিতর্ক এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির জন্য কি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে? এই অবস্থায় বিএনপি কী করতে পারে?

বিএনপির প্রথম কাজ হলো তার পেশাজীবী সংগঠনসহ সব পর্যায়ের সংগঠনকে পুনর্গঠন করা। এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে সেই নেতা-কর্মীদের; যাঁরা গত ১৭ বছর জেল, জরিমানা, গুম, খুন, মামলা-মোকদ্দমা সত্ত্বেও বিএনপি ত্যাগ করেননি বা বিএনপিকে বিভক্ত করেননি। তাঁরা যেন কোনো অভিমান করে নির্লিপ্ত না হয়ে যান, সেটা খেয়াল রাখা এবং ঐক্যবদ্ধ রাখা। আর যেসব বিএনপির সমর্থক আন্দোলনের ঝুঁকি নেননি; কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিএনপির কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন, তাঁদের অপেক্ষায় রাখা। কিন্তু যাঁরা হাইব্রিড বিএনপি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য ছিল এবং নিরপেক্ষতার ভান করে ফ্যসিবাদ থেকে সব সুবিধা নিয়েছেন, কিন্তু তাঁরা এখন বিএনপির নেতা–কর্মীদের সঙ্গে আত্মীয়তার সুযোগে অথবা উৎকোচ দিয়ে দলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন, তাঁদের সযত্ন পরিহার করা।

সংগঠন ঠিক করার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনের নির্ধারিত দিনক্ষণ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়ায় যাওয়া। ৩০০ আসনে কমপক্ষে ১০ জনের একটা তালিকা তৈরি করা।

ভবিষ্যৎ নির্বাচনে যেন দেশি-বিদেশি কোনো চক্র, পতিত শক্তি অথবা রাজনৈতিক সুবিধাবাদী গোষ্ঠী বিএনপিকে কোনো প্রকার বেকায়দায় না ফেলতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা। জনগণকে স্বপ্ন দেখাতে পারবে, এমন নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা ও ইশতেহারে পরিমার্জিত ৩১ দফাকে সামনে নিয়ে আসা এবং ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা। পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণে, পাচার করা টাকা উদ্ধার, শেয়ার মার্কেটের শৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহিমূলক সংসদ ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

’২৪ ও ’৭১–কেন্দ্রিক যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ভারসাম্যমূলক বয়ান তৈরি করতে হবে। তারেক রহমানের আহ্বানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতা–কর্মীদের অংশগ্রহণ ও নেতা-কর্মীর শাহাদাত বরণের ফলে এককভাবে ’২৪-ও বিএনপিরই বড় অর্জন। বিএনপি দুই অর্জনকেই প্রাধান্য দিয়ে বয়ান তৈরি করবে।
সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘অগ্রাধিকার সংস্কার’কে প্রাধান্য দিয়ে কথা বলতে হবে। সংস্কারের অনেক কাজ বিএনপি ক্ষমতায় এলে করবে, সেইটা সামনে নিয়ে আসতে হবে।

যেহেতু বিএনপি বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তক, সেহেতু ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে না চাইলেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে তরুণদের বিরোধিতা না করে, বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়া বা রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত বা গণভোটের মাধ্যমে নিষিদ্ধের বিষয়ে ফয়সালার বয়ান তৈরি করে তরুণদের পাশে রাখতে পারে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, গত ১৫ বছর তার নেতা–কর্মীরাই আওয়ামী লীগ দ্বারা সবচেয়ে বেশি এবং নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছে এবং জনগণের সহানুভূতি লাভের জন্য এটি প্রচারও করতে হবে।

প্রতিবেশী আঞ্চলিক শক্তি (ভারত), বিকাশমান বৈশ্বিক শক্তি (চীন) এবং বর্তমান বৈশ্বিক শক্তির (আমেরিকা) মধ্যে ভারসাম্যমূলক নীতি তৈরি করতে হবে। ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত–নির্ভরতা ও ’২৪–পরবর্তী তরুণদের ভারতবিরোধিতা উভয়কে আমলে নিয়ে কৌশলগত নীতি প্রণয়ন করতে হবে। চীন ও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা গভীরভাবে বুঝে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

২০১৪ সালে নির্বাচনের পর প্রথম আলোতে লিখে ছিলাম, ‘বিএনপি হেরে গেলে কী হবে’ (১৩ জানুয়ারি, ২০১৪)। গত এক দশকের রাজনীতিতে ও ৫ আগস্টের মাধ্যমে সেই লেখা অনেকটাই বাস্তব হয়েছে।

ওই লেখার শেষবাক্য ছিল, ‘বিশ্ববিলোপ বিমল আঁধার চিরকাল রবে সে কি? (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরদাসের প্রার্থনা, মানসী)।’ ১৮ বছরের আঁধারকে আলোতে রূপান্তর করতে হলে বিএনপিকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে হবে। সেই ক্ষমতাকে টেকসইও করতে হবে। এর জন্য বিএনপির প্রয়োজন স্ব–স্ব ফিল্ডে দক্ষ এক দল বুদ্ধিজীবীর প্যানেল তৈরি করা, যাঁরা নীতিনির্ধারণী পরামর্শ দেবেন এবং প্রয়োজনীয় বয়ান তৈরি করবেন। নিঃসন্দেহে বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দল। তার জনসমর্থনও বেশি।

যেহেতু বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপক গণসংযোগ এবং নতুন নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা ও কর্মসূচি দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছে, সেহেতু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপিকেও রাজনীতির নতুনধারা তৈরি করতে হবে।

নিঃসন্দেহ তারেক রহমানের ৩১ দফা একটি নতুনধারা তৈরি করেছে। তবে ৩১ দফাসহ গণমানুষের আবেগকে প্রভাবিত করবে, এমন আরও উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে এবং বিএনপির নাম ব্যবহার করে যাঁরা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিএনপিই যে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ভরসা, সেই বার্তা জনগণকে দিতে হবে।

* কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিএনপি এখন কী করবে?

ইসরায়েলি হামলায় আরও ৭৭ ফিলিস্তিনি নিহত

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ৭৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বুধবার (২ এপ্রিল) ইসরায়েলি হামলায় তারা নিহত হন। ফলে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজার ৪৭৬ জন ছাড়িয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। একই সময় বহু হতাহত হয়েছে। ইসরায়েলি বাধায় তাদের সবাইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

এর আগে মঙ্গলবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গাজায় আহত হওয়া আরও ১৮৩ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংঘাতের শুরু থেকে আহতের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৮৩ জনে পৌঁছেছে। অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং রাস্তায় পড়ে আছে। তাদের উদ্ধারে স্বেচ্ছাসেবকদের যেতে দিচ্ছে না ইসরায়েলি বাহিনী। ফলে নতুন করে বুধবার কতজন আহত হয়েছেন তা এখনও জানা যায়নি।

এর আগে ঈদের দ্বিতীয় দিনেও ব্যাপক হামলা হয়েছে। ওই দিন ৮০ ফিলিস্তিনি নিহত হন। ঈদের মতো বিশ্ব সমাদৃত উৎসবেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা না থামায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় বইছে।

এদিকে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। স্থানীয় সময় বুধবার (২ এপ্রিল) ইসরায়েলি সেনারা এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ব্যাপকভাবে জনগণকে সরিয়ে দিয়ে কিছু এলাকাকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ বিষয়ে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, যেসব স্থানে লড়াই চলছিল, সেখান থেকে জনগণকে সরিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য গাজা থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নির্মূল করা এবং নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু এলাকা দখলে নেওয়া। 

গাজার বেইট লাহিয়ার একটি এলাকা। ছবি : সংগৃহীত
গাজার বেইট লাহিয়ার একটি এলাকা। ছবি : সংগৃহীত

দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে মুখ খুললেন টিউলিপ

বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতির সঙ্গে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া টিউলিপ ব্যক্তিগতভাবেও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। সেসব দুর্নীতি মামলা মোকাবিলায় তার আইনজীবীরা প্রস্তুত, তিনি নিজেই এ ঘোষণা দিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে ব্রিটিশ মন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করার পর এটি তার প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্য।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে টিউলিপ সিদ্দিক জানান, তার আইনজীবীরা বাংলাদেশে দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ সম্পর্কে যেকোনো আনুষ্ঠানিক প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত। বুধবার (২ এপ্রিল) এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি।

টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে অভিযোগ আসছে এবং কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি।’

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের সাথে তার স্পষ্ট সংশ্লিষ্টতার জন্য তিনি অনুতপ্ত কিনা জানতে চাইলে টিউলিপ বলেন, ‘আপনি আমার আইনি চিঠিটি কেন দেখেন না? সেখানে আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আছে কি না... বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ একবারও আমার সাথে যোগাযোগ করেনি। আমি তাদের কাছ থেকে শোনার জন্য অপেক্ষা করছি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের দুর্নীতির সঙ্গে তার জড়িত থাকার প্রমাণ সামনে আসে। এতে দলের ভেতরে বাইরে চাপে পড়েন টিউলিপ। শেষমেশ বাধ্য হয়ে লেবার মন্ত্রিসভার ইকোনমিক সেক্রেটারি টু দি ট্রেজারি অ্যান্ড সিটি মিনিস্টারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

ওই পদে তার কাজ ছিল যুক্তরাজ্যের অর্থবাজারের ভেতরের দুর্নীতি সামাল দেওয়া। কিন্তু মন্ত্রী নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশ-বিদেশে কোণঠাসা হয়ে পড়েন টিউলিপ; পদত্যাগের পরও এর প্রভাব বিদ্যমান। সে সঙ্গে শেখ পরিবারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। সেসব তদন্তে নামে দুদক। প্রাথমিকভাবে যার প্রায় সব কটিরই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পায় সংস্থাটি। এখনও তদন্ত চলমান।

প্রসঙ্গত, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে প্রচার চালাচ্ছেন ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক। দেশটির ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ এ কাজ চাতুরতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে নিয়োগ করেছেন আইনজীবী। সেই আইনজীবীদের তরফে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদককে) একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এমন তথ্য মার্চের শেষ দিকেই জানিয়েছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। এবার আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন টিউলিপ। 

টিউলিপ সিদ্দিক। ছবি : সংগৃহীত

ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক: কবে নাগাদ বাড়ছে পণ্যের দাম, বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব কেমন হবে?

সকল দেশের পণ্যে গড়ে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনা হয়েছে। বুধবার তার অবসান ঘটালেন তিনি। ক্ষমতায় বসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়ে আসছিলেন এবার তারই বাস্তব রূপ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যাকে তিনি রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক বলে অভিহিত করেছেন। অন্যান্য দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর অন্যায্যভাবে যে শুল্ক আরোপ করে তার ব্যবধান কমাতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।

এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, ট্রাম্পের এই উচ্চ শুল্ক নীতি সেসব দেশকে বেশি ধাক্কা দেবে যারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির চেয়ে সেখানে অধিক পরিমাণে রপ্তানি করছে। তবে শুল্ক আরোপে ট্রাম্পের এই নীতিকে সমর্থন করছেন না অর্থনীতিবিদরা। মূলত এর মাধ্যমে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে ফেলা হচ্ছে। যার মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এর মাধ্যমে অন্যান্য দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারবে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপ করা শুল্ক কমাতে বাধ্য হবে অন্যান্য দেশ।

ট্রাম্পের শুল্ক নীতি নিয়ে বেশ কয়েকটি জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এখানে সেগুলো তুলে ধরা হলো।

সরকার কর্তৃক আদায় করা শুল্ক কি সাধারণ রাজস্ব তহবিলে যায়? আর ট্রাম্প কি তদারকি ছাড়াই সেই তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন?
মূলত বিদেশী কোনো পণ্য যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে তখন সেই পণ্যের শুল্ক সংগ্রহ করে দেশটির কাস্টমার অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন এজেন্সি। গত বছর ফেডারেল সরকারের ব্যয় মেটাতে মার্কিন কোষাগারে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার দেয়া হয়। এই অর্থ ব্যয়ে হস্তক্ষেপের এখতিয়ার রাখে মার্কিন কংগ্রেস। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়ন্ত্রণ করছে রিপাবলিকানরা। ট্রাম্প শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে ট্যাক্স কর্তন কার্যক্রমে সহায়তা করতে চান। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কর কর্তন ধনী মানুষদের সুবিধা দেবে। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক নিরপেক্ষ একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হচ্ছে ট্যাক্স ফাউন্ডেশন। তারা দেখেছে ট্রাম্পের কর কর্তনের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে ২০২৫ সাল থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত দেশটির ফেডারেল রাজস্ব ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হ্রাস পাবে। কর কমানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে অধিক শুল্ক আরোপ করে লাভবান হতে চান ট্রাম্প। ট্যাক্স পলিসি সেন্টার নামের আরেকটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কও একই কথা বলছে। প্রথম মেয়াদের মতো ট্রাম্প কর কর্তনের মেয়াদ বৃদ্ধি করলে সকল আমেরিকান লাভবান হবে ঠিকই, তবে ধনীরা আরও বেশি সুবিধা পাবে।

শুল্ক নীতির ফলে মূল্য বৃদ্ধিতে কেমন সময় লাগবে?
এ বিষয়টি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার অংশীদারদের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে শুল্ক আরোপের এক-দুই মাসের মধ্যে গ্রাহকরা সামগ্রিকভাবে মূল্য বৃদ্ধি দেখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মেক্সিকান পণ্যের ওপর শুল্ক কার্যকর হলেই পণ্যের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। কিছু মার্কিন খুচরা ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য আমদানিকারকরা শুল্কে ব্যয়ের একটি অংশ আদায় করতে পারে।  আর বিদেশি রপ্তানিকারকরা অতিরিক্ত শুল্ক পূরণের জন্য পণ্যের উৎপাদন মূল্য কমাতে পারে। তবে বেশ কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই নীতি বুমেরাং হতে পারে। যেমন ইউরোপীয়ান পণ্যে ট্রাম্প যে ২০ শতাংশ শুল্ক দিয়েছেন, তাতে এমনটা হতে পারে। এছাড়া পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে কোম্পানিগুলো শুল্ককে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন ওয়াশিং মেশিনের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন তখন খুচরা বিক্রেতারা এই পণ্যটির সঙ্গে ড্রায়ারেরও দাম বাড়িয়ে দেয়। যদিও ড্রায়ারের ওপর কোনো শুল্ক দেয়া হয়নি। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সামনের মাসগুলোতেও কি এমন কিছু ঘটবে। অর্থনীতিবিদরা এ বিষয়টি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। চার দশকের মধ্যে বড় মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তারা। এমনটা হলে আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং তারা পণ্য ক্রয়ের ইচ্ছা ত্যাগ করবে। ফলত ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শুল্ক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা কতটুক? এক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা কী?
সাংবিধানিকভাবেই কংগ্রেসকে শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কংগ্রেস বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের কাছে এই ক্ষমতাগুলো ছেড়ে রেখেছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউস শুল্ক আরোপ করতে পারে। যদি আমদানি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হয় তাহলে হোয়াইট হাউস এভাবে শুল্ক দিতে পারে। আগে প্রেসিডেন্টরা সাধারণত জনমতের ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করতেন। আমদানিতে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হচ্ছে কিনা তা নির্ধারণ করতে এমনটা করা হতো। ট্রাম্পও তার প্রথম মেয়াদে এসব পদক্ষেপ অনুসরণ করেছেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের এক আইনের ভিত্তিতে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করছেন। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে কানাডা এবং মেক্সিকো থেকে ফেন্টানাইল প্রবেশের অভিযোগে জরুরি অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। ফলে তিনি দেশ দুটির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক করেছেন। এক্ষেত্রে কাংগ্রেস প্রেসিডেন্টের জরুরি অবস্থার বিবেচনা বাতিল করতে পারে।

মার্কিন পণ্যের ওপর অন্যান্য দেশ কেমন শুল্ক আরোপ করছে?
সাধারণত অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ব্যবসায়িক পণ্যের প্রতিফলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। এক্ষেত্রে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের রয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। আর চীন এবং ভারতের যথাক্রমে রয়েছে ৩ ও ১২ শতাংশ। অন্যান্য দেশগুলোতেও কৃষকদের সুরক্ষার জন্য বিদেশি পণ্যে অধিক শুল্ক আরোপ করে। যেমন, কৃষিজাত পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য শুল্ক ৪ শতাংশ, যেখানে ইইউ এর ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, জাপানের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, চীনে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ভারতে ৬৫ শতাংশ। ডব্লিউটিও’র পরিসংখ্যান মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আমদানি শুল্কে ট্রাম্পের ঝড় তোলার বিষয়টি বিবেচনা না করেই করা হয়েছে।

mzamin

কোচবিহার: ‘কতো রবো আমি পন্থের দিকে’ by মাহমুদ হাফিজ

ভরদুপুরে হোটেল রয়েল প্যালেস থেকে বেরিয়ে অটোরিকশায় চেপে ‘বলরামপুর’ উচ্চারণ করতেই চোখ কপালে তুলে মিয়া বিবিকে দ্বিতীয় দফা দেখে নেয় তরুণ অটোচালক নুর জামাল হক। কেতাদুরস্ত আরোহীদের পোশাক আশাক জানান দিচ্ছে কোচবিহারের নয়া আগন্তুক এরা। মধ্যবৈশাখের চল্লিশ ছুঁই ছুঁই তাপাঙ্কের ঘর্মাক্ত দুপুর এদের গন্তব্যের সঙ্গে যায় না। যায় না বলে নুর জামাল হক হয়তো ভেবে নেয়, ভরদুপুরে পঁচিশ কিলোমিটার দূরগ্রাম বলরামপুরে এরা কেন যাবে, সেখানে কী কাজ এদের? শেষাবধি ভাড়ার টাকা পাওয়াই তার লক্ষ্য, তাই মনে যা-ই চলুক, চলা শুরু করে সে।

মাইন্ড রিড করে আমি বলি: নুর জামাল, আব্বাসউদ্দীন আহমদ নামে কারও নাম শুনেছো? তার বাড়িতে যাবো।
নুর জামালের বাড়ি বলরামপুর-তেরঙ্গির কাছেই। বাংলাদেশের রংপুরে অঞ্চল থেকে বেশি দূরে নয়। দেশ ভাগের রাজনৈতিক রেখাটি মনে মনে মুছে দিলে এ?ই আকাশ, বাতাস, মাটি একদম এক। তার মুখের ভাষা ও আচরণ নতুন আগন্তুকদের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। অটোরিকশার তৃতীয় গিয়ার দাবিয়ে সে বলতে থাকে, বাপ চাচার কাছে শুনেছি, ওই নামে গান বাজনা করতেন একজন বলরামপুরে। বহু আগে গত হয়েছেন, ঘরবাড়ির চিহ্নও এখন নাই।

মনে মনে বলি- নুর জামাল মিয়া, আছে কী নেই সেটা জানা তোমার কাজ না। এজন্য তোমার বাপ-চাচা বা দাদার প্রয়োজন।
কোচবিহার শহর থেকে কেশব সড়ক ধরে অটোরিকশা ছাত গুড়িয়াহাটি হয়ে শীল তোরশা নদীর ভাটিমুখো চলতে থাকে। ভাটিমুখো মানে বাংলাদেশের দিকে। যত এগিয়ে যাই, সীমান্ত তত কাছে আসে। হলে কী, সীমান্তরেখার সব জায়গা তো আর মানুষের যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত না। রাষ্ট্র এর জন্য নির্ধারিত জায়গা তৈরি করে রেখেছে। তাই বাংলাদেশের কাছাকাছি যেতে থাকলেও বাড়ি যেদিন ফিরবো, বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা রাস্তার ঘুরপথে শত কিলোমিটার দূরত্বের চেকপোস্টেই যেতে হবে।
গুগল দেখাচ্ছে সামনে ঘুঘুমারি সেতু। ওঠার সময় পুরো অটো রিজার্ভ করতে চাইলেও চালক রাজি হয়নি। রুটের গাড়ি।  যাত্রী ওঠা-নামা করানোই এখানে অলিখিত নিয়ম। এতে চারজনের আসন বাড়িয়ে দ্বিগুণের বেশি মানে এগারো করা হয়েছে। সামনে চালকের ডানে এক বামে দুই। পিছনে মূল চার আসনের সামনে পা রাখার জায়গায় চিকন বেঞ্চ পেতে বানানো হয়েছে আরও চার আসন। মুখোমুখি। আরোহীদের একজনের পা আরেকজনের দু’পায়ের ফাঁকে গলিয়ে বসতে হয়। আমরা দু’জন মূল চার আসনের দু’টি আর পা ছাড়িয়ে সামনের দু’টি আসনের দখল নিয়ে চারজনের ভাড়ায় চালককে রাজি করিয়েছি। যাতে অন্তত অন্য আরোহীর দুই পায়ের ফাঁকে পা গলিয়ে বসতে না হয়। আমাদের পাশে বসেছে অনুজকে নিয়ে এক তরুণীমাতা। তার কোলে বছর বয়সী বাচ্চা। তাদের উল্টো পাশে মধ্যবয়স্ক দম্পতি। গৃহবধূর পরনে ঘরের আলমারি থেকে নামানো ‘তোলা’ শাড়ি। স্বামীও তোলা প্যান্ট জামা পরে তেল দেয়া মাথায় সিঁথি কেটে পথে নেমেছে। চালকের দুইপাশেও আরোহী আছে, তারা দূরে আর কম দূরত্বের যাত্রী বলে সেদিকে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই।  

ঘুঘুমারিতে এসে শীল তোরশার সেতু পেরুলো নুর জামাল হক। তারপর গাড়ির সর্বোচ্চ গিয়ার দাবিয়ে ভট ভট করতে করতে দ্রুতই ধালিয়াবাড়ি, লাতকারপার, গারোপাড়া পার হতে লাগলো। চলন্ত গাড়ির বাতাসে বসে আমাদের চোখে ভাসলো দিগন্তপ্রসারী মাঠ, সবুজ ধান ক্ষেত, ভুট্টার আবাদ, ছোট ছোট নদী খাল, গ্রামীণ কাঁচা ঘরবাড়ি, রাস্তার পাশের দোকানপাট। এ ভিন্ন কোনো দেশ নয়, আমার দেশের মতোই একই আবহাওয়া ও ভূগোল। গাড়ি এসে দাঁড়ালো দোকানপাটে ভরা দেওয়ানহাট। এই দেওয়ানহাট জায়গাটা জংশনের মতো, ত্রিমোহণী। সোজা রাস্তা চলে গেছে দিনহাটা। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জন্মস্থান দিনহাটা বলে জানতাম, এই তাহলে দিনহাটার পথ। আমরা যাবো বামে, তুফানগঞ্জের দিকে। তুফানগঞ্জ কোচবিহারের সাব ডিভিশনাল শহর। দেওয়ানহাট তেমাথায় সব গাড়িই কিছুক্ষণ থামে। অটো থামতে কেউ কেউ টয়লেটে, কেউ দোকানের দিকে গেল। কম দূরত্বের রাস্তায় আমরা না নেমে অটোতে বসে চারপাশ দেখতে থাকি। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে থাকা স্বামীর উদ্দেশ্যে সামনের মধ্যবয়সী গৃহবধূ চেঁচালো: এ্যাই, ওই দ্যাখো মিষ্টির দোকান। দই মিষ্টি নিয়ে এসো, ওই অজগাঁয়ে তো আর কিছু পাওয়া যাবে না।
বোঝা গেল, এর কোচবিহার বা একটু সদর মতো জায়গায় থাকে, যাচ্ছে গ্রামীণ আত্মীয় বাড়ি।  

অটো চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর এক গাঁয়ের পথের মুখে দই মিষ্টির প্যাকেট হাতে দম্পতি নেমে গেল। আমরা এখন তুফানগঞ্জের পথে। গুগলে দেখছি, বলরামপুর আর বেশি দূরে নেই। গাড়ি অনেকটা ফাঁকা বলে বাচ্চা কোলে তরুণীমাতা ও তার ছোট ভাই এতক্ষণের গাদাগাদি অবস্থা থেকে আয়েশ করে বসেছে। আরাম আয়েশে মানুষের মনে বোধ হয় খোশগল্পের জজবা আসে। তারা আকস্মিক আমাদের নাম ধাম, ঘরবাড়ি, কোত্থেকে এলাম, কোথায় যাবো এসব জিজ্ঞেস করতে লাগলো। বিপুল প্রশ্নের উত্তরের পর পাল্টা চাপান হিসেবে আমি ও ভ্রমণসঙ্গী জলি তাদের ব্যাপারেও জানতে চাইলাম।

তরুণীমাতার নাম গীতশ্রী। চেহারা-গড়নে নামের সঙ্গে দিব্যি মানানসই। গ্রামে বেড়ে ওঠা সুন্দরী তরুণীর উচ্চতর ডিগ্রির নিতে ওপরে ওঠা হয়নি। হিসেবি অভিভাবকদের কল্যাণে মাধ্যমিক স্তরেই তার কপালে সিঁদুর আর কোলে বাচ্চা উঠেছে। তার কৌতুহলী জিজ্ঞাসা, বাংলাদেশ যেতে পাসপোর্ট লাগে কিনা, ভিসা কীভাবে পেতে হয় এসব। কারণ বাবার কাছে শুনেছে তাদের পূর্বপুরুষ বগুড়া বা রংপুরে ছিল, দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার পর তারা বাবা ঠাকুদ্দারা এইভাগে চলে আসে, ফেলে আসা ভাগের দেশে এখনো বাস করে আত্মীয়-স্বজন। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার একটি আকুল আকুতি সে সবসময় লালন করে মনে।

অনেকটা ফাঁকা একটি মাঠের প্রান্তে তরুণীমাতা গীতশ্রী চালককে অটো থামাতে বললো। নুর জামালের কাছে জিজ্ঞেস করে জানলাম কম বাড়িঘরবিশিষ্ট গ্রামটির নাম তেরঙ্গি। নেমে যেতে যেতে গীতশ্রী অতিথিসেবার মিনতি জানিয়ে বললো, ফিরতি পথে একবার আমাদের বাড়ি বেড়ায়ে যাইয়েন, রাস্তার পাশেই তো! সে হয়তো পূর্বপুরুষের ভাগ হয়ে যাওয়া দেশে একটা সুতোর বিনুনি তৈরি করতে চাইছিল, যাতে সেই সুতো ধরে চলে যাওয়া যায় অতীত-শেকড়ে। কিন্তু আমাদের জীবন ও সময় অনেক দৃঢ় বন্ধনকেও কোনো না কোনো কারণে ছিন্ন করে, কাটিয়ে দেয় পথের মায়া। আবার কোনো কোনো সম্ভাব্য বন্ধনকে বাঁধতে দেয় না। পৃথিবীতে এরকম বিপরীতমুখিতা আছে বলেই জীবন এত সুন্দর ও প্রার্থিত।  

পার হয়ে ভাইবোন রাস্তার ডানপাশে চলে গেল। আমাদের দৃষ্টি তাদের অনুসরণ করে দেখতে পেল, রাস্তা-লাগোয়া নবনির্মিত একটি তিনতলা ভবনে তারা প্রবেশ-উদ্যত। বাড়ির বন্ধ গেটমুখে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করা অটোরিকশার দিকে আরেকবার তাকালে আবারো আমাদের চোখাচোখি হলো। সাদা রংয়ের দৃষ্টিনন্দন বাড়িটি গীতশ্রীর শ্বশুরবাড়ি, নাকি সে বাপের বাড়ি বেড়াতে এলো-তা বোঝার আগেই সম্ভাব্য বন্ধনকে ছিন্ন করে আমাদের অটো উভয়ের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।

এই রাস্তায় শীল তোরশা আর কালজানি নদীর মিলিত রূপ কালজানি নামে আরেকবার দেখা দিয়েছে তুফানগঞ্জের এগার কিলোমিটার আগে। কালজানির এই সেতুর নাম ভাওয়াইয়া সেতু। নদী ও সেতুর চার কিলোমিটার আগে রাস্তার পাশে দোকানপাট নিয়ে বর্ধিষ্ণু গ্রাম-গঞ্জের রূপ নিচ্ছে। গ্রামের নাম বলরামপুর। এই গ্রামে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, কতো রবো আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে’, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’র মতো শত শত বহুশ্রুত ভাওয়াইয়া সংগীতের কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীন আহমেদের জন্ম। আমাদের গন্তব্য এই বলরামপুর আর কাজ বাংলাদেশের সংগীত কিংবদন্তির জন্ম ভিটের সন্ধান।

নুর জামাল হক বলরামপুরে আমাদের নামিয়ে সোজা ভাওইয়া সেতুর দিকে চলে গেল। মাথার ওপর গনগনে সূর্য আগুনের গোলা ঝরাচ্ছে। আল্লাহর দুনিয়ার মাটিও তেতে উঠেছে। এই কাঠফাটা রোদের তীব্র দাবদাহে আমরা নাকাল। কিন্তু এসে যখন পড়েছি, তখন আব্বাসউদ্দীন আহমেদের জন্ম ভিটে তো খুঁজতেই হবে। আর গ্রামের বাড়ি বাড়ি তালাশ করলে তা খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। দুই এক্সপ্লোরার বয়স্কগোছের মানুষ খোঁজ করি। চা দোকান, হোটেল, রেস্তরাঁ, ভ্যান অটোতে যাকেই দেখি, তার বয়সই মাত্র ত্রিশ চল্লিশের কোঠায়। জেনারেশন গ্যাপে আব্বাসউদ্দীন তো দূর তার নাতিপুতিদেরও চিনবে কিনা সন্দেহ! আমরা খুঁজছি, বৃটিশ না হোক ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান দেখেছে এমন বয়স্ক লোক। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেল গলায় রুদ্রাক্ষের মালা পরা এক বৃদ্ধকে। চুল দাড়ি পাকা, হাতে বাজারের থলে, পরনে ধুতি আর গায়ে পকেটওলা হাওয়াই শার্ট। তার নাম সদানন্দ। শিল্পী আব্বাসউদ্দীন নামটি উচ্চারণ করতেই তিনি মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, তিনি বলরামপুরেরই মানুষ, বাংলাদেশে থাকেন। বছরে বছরে এ গাঁয়ে আসেন, বছর দুই থেকে আর আসেন না।

ভাবলাম, ইনি হয় মতিভ্রষ্ট না হয় অন্য কোন আব্বাসউদ্দীনের কথা বলছেন। পরক্ষণে আমার সিক্‌থ সেন্স সক্রিয় হয়। ভাবি, ইনি হয়তো আব্বাসউদ্দীনকে দেখেননি। তার নাম শুনেছেন। আব্বাসউদ্দীন ও তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি সন্ধানে বছরান্তে তার পুত্র বিচারপতি মোস্তফা কামাল বা শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী এখানে আসতেন। তাদেরই বিশেষ করে মুস্তাফা জামান আব্বাসীকে আব্বাসউদ্দীন ভেবে নিয়েছেন বৃদ্ধ সদানন্দ। শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী বছর দুই শয্যাগত, তাই হয়তো এখন আর পিতৃভূমিতে যান না। শিল্পীর জন্মভিটেটি কোথায় জিজ্ঞেস করলে বৃদ্ধ সদানন্দ এক টোটো চালককে ডেকে বললেন- ইনাদের মিস্ত্রি খানায় নিয়ে যাও। বললাম, মিস্ত্রি খানায় নয়, বলরামপুরেই শিল্পী জন্মেছিলেন। বৃদ্ধ সে কথায় কান না দিয়ে অটোচালককে হাত ইশারা করে দেখিয়ে বললেন, এই রাস্তা দিয়ে সোজা গিয়ে ডানের রাস্তায় ঢুকলেই মিস্ত্রি খানা।

টোটোচালক যুবক সোমনাথ আমাদের মূল রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে ডানপাশের পাড়ায় নামিয়ে চলে গেল। স্থানীয় বেনেতি দোকানী যুবক আরিফ হোসেনের কাছে আব্বাসউদ্দীন শব্দটি উচ্চারণ করার পর আর কিছু বলতে হলো না। সে বললো, সামনের হলুদ একতলা বিল্ডিংটা জীবন কাকুর। কাকুর বাসার পাশের রাস্তা দিয়ে পিছনের দিকে চলে যান। দেখবেন পুকুর, কবর আর শিল্পীর জন্মভিটে। ভাবলাম, বেনেতি দোকানে বসলেও সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত আরিফের কাছে অনেক খোঁজখবর। আমাদের কথার সময় দুপুরের গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত পাশের বাড়ির সিঁদুরপরা গৃহবধূ উৎকর্ণ হয়ে কথাবার্তা শুনছিল, একইভাবে উৎকর্ণ হয়ে রইলো দোকানে সদাই নিতে আসা আরেক মুসলিম গৃহবধূ। আরিফ হোসেনের ইশারা অনুসারে হলুদ বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে পিছনে মাঠের দিকে নেমে যেতে উদ্যত হতেই পাড়ার মসজিদ থেকে জোহরের আজান ভেসে এলো। বুঝতে অসুবিধে হলো না, বলরামপুরের মিস্ত্রিখানায় মুসলমানের সংখ্যা নিদেন কম নয়।
--- ২ ---
রাস্তার একপাশে জীবন সরকারের বাড়ি, অন্যপাশে প্রতুল আচার্যের পাকা ঘরদোর। দুই বাড়ির মধ্যকার গলি দিয়ে একশ’ কদম এগুলেই কয়েক একর জায়গা জুড়ে উন্মুক্ত প্রান্তর, প্রান্তরের একপাশে বড় পুকুর। অন্যকোণে বাঁধানো দু’টি কবর, অযত্নে বেড়ে ওঠা ঝোপজঙ্গলে ভরা। বাঁধানো কবরের সামনে স্থানীয় বাসিন্দাদের খড়ের গাদা। প্রান্তর ও পুকুরপ্রান্তে পরিত্যক্ত চৌচালা টিনের ঘর। পুরনো ও জ্বরাজীর্ণ। ঘরটি বাঁশ-কাঠ-টিনের বেড়া। শালকাঠের দরজা জানালাগুলো পুরনো ডিজাইনের। ঘরের ভিতরে কিছু নেই। সামনে সদর দিকে টানা বারান্দা, ঘরের পিছন দিকে দিগন্তছোঁয়া মাঠ। মাঠের দিকে টিনছাওয়া পোর্টিকো। দীর্ঘ অযত্নে এ ঘর অবাসযোগ্য পোকামাকড়ের ঘরবসতিতে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেশী বাড়ির জিয়ারুল আর প্রতুল আচার্য পোর্টিকোয় পড়ে থাকা একটি গরুগাড়ির কাঠামোর ওপর বসে খৈনি খাওয়ার এন্তেজাম করছিল। আচানক আনজানপহচান কেতাদুরস্ত মিয়াবিবিকে দেখে প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেল। পরে আব্বাসউদ্দীন, আব্বাসদ্দীন শব্দ শুনে ধাতস্থ হয়ে উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বললো, এই ঘরেই তিনি গান-বাজনা করতেন। প্রায়ই লোকজন আসে খোঁজখবর করতে। ওইখানে তার বাপ-মায়ের কবর। জিয়ারুল আর প্রতুল দুইধর্মের অনুসারী হলেও একসঙ্গে খৈনির এন্তেজাম করছে প্রসঙ্গ তুললে সহাস্যে দু’জনই সমস্বরে বললো, আমরা ভাই ভাই।
বললাম, খৈনি ব্রাদার্স।
টিনের ঘরের সমাহার নিয়ে প্রান্তরলাগোয়া আরেকটি বাড়ি।
খৈনি ব্রাদার্স আমাদের জানালো, সরকার পরিবারের এক ভাই এই বাড়িতে থাকতেন। কয়েকদিন আগে স্বর্গবাসে গেছেন। গৃহকর্তার মৃত্যুশোককবলিত বাড়িটিতে এ মুহূর্তে কারও সাড়া পাওয়া যাবে না বলে প্রতুল ও জিয়ারুল জানালো- সামনের হলুদ বিল্ডিংয়ে জীবন সরকারের সঙ্গে কথা বলুন, সব অতীত ইতিহাস জেনে যাবেন। তারা জানালো,  আব্বাসউদ্দীনের আইনজীবী বাবা দেশভাগের সময় সরকার পরিবারের সঙ্গে জমিজিরাত বিনিময় করেছিলেন। সিনিয়র সরকারের পাঁচপুত্র বলরামপুরে বেড়ে উঠলেও এখন তিনজনই শহরে থাকে। গ্রামে থাকা দুই ভাইয়ের একজন সম্প্রতি স্বর্গবাসী হলেন। রইলো বাকি জীবন সরকার। হাইস্কুল থেকে অবসর নিয়ে তিনি বাড়ি পাকা করেছেন। খৈনি ব্রাদার্সের তথ্যমতে, বিস্তর পৈতৃক  জমিজমা ছিল আব্বাসউদ্দীনের। মাঠের বিস্তীর্ণ জমিজমা ভাইদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে। এখন বেচাকেনায় শেষ হতে চলেছে। পুকুরপাড়ের টিনের ঘরকে কেন্দ্র পুরো প্রান্তর পরিত্যক্ত থাকলেও সরকারের উন্নয়নের জন্য অপেক্ষমান। বাড়ির এ অংশটুকু নিয়ে সরকার আব্বাসউদ্দীনের স্মৃতিরক্ষায় প্রকল্প হাতে নিতে পারে বলে শুনেছি। এক নিঃশ্বাসে অনেক কথা বলে তারা খৈনি মুখে দেয়ার এন্তেজামে মশগুল হলো।

পরিত্যক্ত প্রান্তরের প্রবেশমুখে হলুদরঙা একতলা বিল্ডিং জীবন সরকারের। তার সঙ্গে আলাপ করতে পারলে ভাওইয়া কিংবদন্তির দেশভাগ, সম্পত্তি বিনিময়ের অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে। বাড়ির দরজায় গিয়ে দেখি- তালাবদ্ধ। দোকানি আরিফ জানালো, কিছুক্ষণ আগে জীবন কাকু বাড়ি থেকে কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে যোগাযোগের একটি নম্বর পাওয়া গেল। ফোন করে আব্বাসউদ্দীনের প্রসঙ্গ তুললে তিনি বাসের ভিড়ে আছেন, এখন কথা বলতে পারবেন না ইত্যাদি বলে কথা শেষ করলেন। আরও কয়েকদফা ফোন করেও তার সঙ্গে ঠিকঠাক কথাবার্তা বলা সম্ভব হলো না। তিনি কথা বলতে অনাগ্রাহী বলে মনে হলো।
বাংলার লোকজ গায়ক আব্বাসউদ্দীন আহমেদ এর অতীত জীবন নিয়ে জীবন সরকারের সঙ্গে আলাপ করতে না পেরে মন খারাপ হলো। কিন্তু প্রত্যাশা মনে জেগে রইলো যে, আগামীতে এসে এখানে দেখতে পাবো শিল্পীর জীবন ইতিহাসে সমৃদ্ধ জাদুঘর।
রোদে ভরা একটি তপ্ত দুপুরকে মাথায় করে বলরামপুর থেকে বেরিয়ে আসি, পিছনে পড়ে থাকে প্রখ্যাত গায়কের জন্ম ও বেড়ে ওঠার সুবর্ণস্মৃতির শেকড়। মনে বাজতে থাকে কালজয়ী এক লোকজ সুর। জলি গেয়ে ওঠে- ‘কতো রবো আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে’।
(মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০২৫ থেকে)

mzamin

ঢাকার ছাদ রেস্তোরাঁয় তাপপ্রবাহের বিপদ by মো. মাইদুল ইসলাম

* রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদে স্থাপিত রেস্তোরাঁর ৯৯ শতাংশই অননুমোদিত, রাজউকের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

* ভবনের ছাদে বাগান থাকলে তা আশপাশের এলাকার তাপমাত্রা কমাতে বড় ভূমিকা পালন করে।

পরিবার বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা কিংবা নিরিবিলি সময় কাটাতে কয়েক বছর ধরে খোলামেলা পরিবেশে ছাদ রেস্তোরাঁকে বেছে নিচ্ছেন নগরের বাসিন্দারা। বদ্ধ রাজধানীতে বিনোদন ও মনোরঞ্জনে এ ধরনের রেস্তোরাঁকে অনন্য বলছেন অনেকেই।

তবে ঢাকায় বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দুই শর মতো ছাদ রেস্তোরাঁর কোনোটিরই অনুমোদন নেই। এসব রেস্তোরাঁ নিয়ে চিন্তিত পরিবেশবাদীরা, এমনকি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (রাজউক)। ছাদে উচ্চ তাপে রান্না এবং প্লাস্টিক–জাতীয় দাহ্যবস্তু ব্যবহার করে সাজানোর কারণে সংশ্লিষ্ট ভবন ও এর আশপাশের ভবনে আগুন লাগা এবং তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ঝুঁকি ও অবৈধতার প্রশ্নে কয়েকটি ছাদ রেস্তোরাঁ ভেঙেও দিয়েছে রাজউক। তারপরও নিয়মনীতি ও অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিমালিকানাধীন এ ধরনের রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ছে। বাদ যায়নি সরকারি ভবনের ছাদও।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঢাকা শহরে যে তীব্র তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হয়, তা কমাতে ঢাকার বহুতল ভবনের ওপর ছাদবাগান হতে পারে অন্যতম বিকল্প। কিন্তু ছাদবাগানের পরিবর্তে ভবনের ছাদগুলো হয়ে উঠছে একেকটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। ফলে যে ছাদ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিরিক্ত তাপমাত্রা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারত, তা–ই বাড়িয়ে তুলছে তাপপ্রবাহ।

রাজউক বলছে, এসব রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গিয়ে চাপের মুখে পড়েছে সংস্থাটি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভাষ্য, মেগা সিটি ঢাকায় বহুতল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ এখন গোদের ওপর বিষফোড়া।

অনুমোদন দেয়নি রাজউক

গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কজি কটেজে আগুন লাগে। এ ঘটনার পর ৫ মার্চ রাজউকের একটি মতবিনিময় সভা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে রাজউকের আওতাধীন ৮টি জোনের ২৪টি সাবজোনের কর্মকর্তাদের ২১ মার্চের মধ্যে অনুমোদিত নকশা অনুসারে ও নকশার ব্যত৵য় করে পরিচালিত রেস্তোরাঁর তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

নির্দেশনা অনুসারে গত বছরের মে পর্যন্ত রাজউকের মোট ২৪টির মধ্যে ১২টি সাবজোনের কর্মকর্তারা রাজউকের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ–১–এর পরিচালকের কাছে রেস্তোরাঁর তালিকা পাঠান। সেই তালিকা প্রথম আলোর কাছে এসেছে। তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৮১৯টি রেস্তোরাঁ পরিদর্শন করতে পেরেছেন কর্মকর্তারা। এগুলোর মধ্যে ছাদ রেস্তোরাঁ আছে ২৫টি। সব কটিই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে এগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন কর্মকর্তারা।

রাজউকের তালিকা ধরে গুগল ম্যাপ এবং রেস্টুরেন্ট লোকেটর ব্যবহার করে ঢাকা শহরে ২০০টির বেশি ছাদ রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া গেছে। তালিকা হাতে পাওয়ার পর উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, আগারগাঁও, গুলশান ও সাভার এলাকার অন্তত ১৫টি ছাদ রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের বহুতল ভবনের ছাদগুলোকে রেস্তোরাঁ স্থাপনের জন্য বেছে নিয়েছেন মালিকেরা। ছাদগুলোর একাংশে রান্নার সরঞ্জাম বসিয়ে দিনের ১১–১২ ঘণ্টা উচ্চ তাপে বাংলা, থাই এবং চায়নিজ খাবার রান্না করা হচ্ছে। কোনো কোনো রেস্তোরাঁর এক পাশে টিন বা কৃত্রিম উপকরণ দিয়ে ছাউনি এবং কাচ দিয়ে ঘেরা ছোট কক্ষে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কয়েকজনের বসার ব্যবস্থা আছে। বাদবাকি ছাদে প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, কাঠ ও বাঁশের উপকরণ এবং টবে গাছ লাগিয়ে সাজানো হয়েছে। এসব রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনের রান্না হয়। ছুটির দিনগুলোতে রান্নার পরিমাণ বাড়ে দেড় থেকে তিন গুণ।

রাজউকের প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব) আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদে স্থাপিত রেস্তোরাঁর ৯৯ শতাংশই অননুমোদিত, রাজউকের পক্ষ থেকে এগুলোর কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। রেস্তোরাঁগুলো নিজেদের মতো করে তৈরি করা হয়েছে এবং সেভাবেই পরিচালিত হয়ে আসছে। আমরা বেশ কয়েকটি রুফটপ রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়েছি, সেগুলো বন্ধ করা হয়েছে। ধীরে ধীরে বাকিগুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অবৈধ এসব রেস্তোরাঁর ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে গেলে নানামুখী চাপের মধ্যে পড়তে হয় উল্লেখ করে আশরাফুল ইসলাম বলেন, এসব রেস্তোরাঁ পরিচালিত হওয়ার পেছনে রেস্তোরাঁ ও ভবনমালিকের পাশাপাশি যাঁরা সেখানে যান, সবার দায় আছে।

বিধিমালায় নেই

বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবনের ছাদে বড় কোনো স্থাপনা নির্মাণের নিয়ম নেই। বিধিমালায় ছাদে পতিত বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং তা ব্যবহারের উপযুক্ত ব্যবস্থা ইমারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মূল ভবন ৫০০ বর্গমিটারের বেশি হলে ছাদে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি পুনর্ব্যবহার এবং পানি ভূগর্ভে পাঠানোর ব্যবস্থা অবশ্যই রাখতে হবে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডেও (বিএনবিসি) বহুতল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ নির্মাণের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে ভবন ব্যবহারের জন্য ব্যবহার বা বসবাসযোগ্যের সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে।

এদিকে উন্মুক্ত স্থানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে ভবনের ছাদকে ব্যবহারের ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষ থেকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সরাসরি ছাদে পড়ার ব্যবস্থা, গাছ লাগানো বা ছাদবাগান, বসার স্থান, দোলনা, খোলা ছাউনির ব্যবস্থা করা হলে ১০ শতাংশ গৃহকর মওকুফ করার ব্যবস্থা করেছে ডিএনসিসি।

নগর–পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা বলছেন, বহুতল ভবনের ছাদগুলোকে দুর্যোগ–আশ্রয় এলাকা (ডিজাস্টার রিফিউজ এরিয়া) হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সেখান থেকে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনোভাবে বাসিন্দাদের উদ্ধার করা যায়। ফলে সেটি উন্মুক্ত রাখা কিংবা ছাদবাগান বানানোর জন্যই উপযুক্ত।

স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, ভবনে আগুন লাগলে বা ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে মানুষ ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে মই দিয়ে বা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা হয়। সেই ছাদে যদি রেস্তোরাঁ থাকে আর সেখানে চুলা থেকে আগুন ধরে, তাহলে ওই ভবনই শুধু নয়; আশপাশের ভবনগুলোর জন্যও বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বাড়ছে আগুন লাগার ঝুঁকি

কোনো ছাদ রেস্তোরাঁকে অগ্নিনিরাপত্তার সনদ দেয়নি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, কয়েক বছর আগে দু–তিনটি রেস্তোরাঁকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু ঝুঁকি বিবেচনায় সেগুলোরও নবায়ন আবেদন গ্রহণ করেনি ফায়ার সার্ভিস। বর্তমানে ছাদ রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তার সনদ দেওয়া বন্ধ আছে।

ফলে এসব রেস্তোরাঁ আগুনের ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভবনের ছাদ উন্মুক্ত রাখা খুব জরুরি। ঢাকার মতো জনবহুল শহরে খোলা ছাদ দুর্যোগের সময় মানুষকে আশ্রয় দেয়। সেখানে রেস্তোরাঁর মতো স্থাপনা নির্মাণে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছাদ রেস্তোরাঁয় আগুন লাগার ঘটনা অহরহই ঘটছে। গত বছরের ১৫ এপ্রিল ভারতের ইন্দোরে ‘মাচান’ নামের একটি ছাদ রেস্তোরাঁয় আগুন লেগে পুড়ে যায়। এর আগের বছরের ১৯ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ‘মাডপাইপ’ নামের একটি রেস্তোরাঁয় আগুন লাগে। ২০২২ সালে পুনেতে, তারও আগে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর মুম্বাইয়ের একটি ছাদ রেস্তোরাঁয় আগুন লেগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আর বাংলাদেশের রেস্তোরাঁগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা হারহামেশাই ঘটে থাকে।

বাংলাদেশের রেস্তোরাঁগুলোর রান্নাঘর মান্ধাতার আমলের বলে সেগুলোকে অগ্নিনিরাপত্তার সনদ দেওয়া হয় না উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহাম্মেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম ও আইন মেনে ছাদ রেস্তোরাঁগুলো নির্মিত হয় না বলে সেগুলোর ঝুঁকি বেশি। তবে আন্তর্জাতিক মান–কাঠামো অনুসরণ করে রেস্তোরাঁ গড়ে তোলা যেতে পারে।

রেস্তোরাঁর সংখ্যা ২ শতাধিক

রাজধানীতে মোট কতটি ছাদ রেস্তোরাঁ আছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোনো সরকারি–বেসরকারি সংস্থার কাছে পাওয়া যায়নি। তবে রাজউকের তালিকাটি ধরে ‘গুগল ম্যাপ’ ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ‘রেস্টুরেন্ট লোকেটর’ ব্যবহার করে ২০০টি ছাদ রেস্তোরাঁ খুঁজে পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতিও ছাদ রেস্তোরাঁর সংখ্যা ২০০টির বেশি নয় বলে জানিয়েছে। তবে নগরের বাসিন্দাদের চাহিদা থাকায় এ ধরনের রেস্তোরাঁর সংখ্যা আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছে সমিতি। সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান প্রথম আলোকে বলেন, সব ছাদ রেস্তোরাঁ তাদের সংগঠনের সদস্যভুক্ত নয়। কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারি ভবনেও ছাদ রেস্তোরাঁ

২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ছাদে রেস্তোরাঁ চালু হয়। সাড়ে ছয় হাজার বর্গফুটের রেস্তোরাঁটিতে একসঙ্গে ১৫০ জন মানুষ বসে খেতে পারেন। বুফে সিস্টেমে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের খাবারের বন্দোবস্ত আছে সেখানে।

অবশ্য পর্যটন করপোরেশন বলছে, তারা স্থাপত্য অধিদপ্তরের নকশা অনুসারেই ১৩ তলা ভবনটির ছাদে রেস্তোরাঁ নির্মাণ করেছে। করপোরেশনের পরিকল্পনা ও পূর্ত পরিচালক মাহমুদ কবির প্রথম আলোকে বলেন, এই রেস্তোরাঁটি পুরোপুরি খোলা ছাদে স্থাপন করা হয়নি। রেস্তোরাঁর বড় অংশই খোলা রাখা হয়েছে। সেখানে সব ধরনের নিরাপত্তা আছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে তাঁর দাবির সপক্ষে কাগজপত্র সরবরাহ করার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কয়েকবার তাগাদা দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ভেঙে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি

গত বছরের ৪ মার্চ বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ ছাদ রেস্তোরাঁগুলোর পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। হাইকোর্ট বলেন, ‘যেভাবে একের পর এক রুফটপ রেস্টুরেন্ট হচ্ছে, তাতে আমরা অবাক হচ্ছি। এসব রেস্টুরেন্টে একটা ফ্যান লাগিয়ে চালু করে দিচ্ছে।’

ওই দিনই (৪ মার্চ) ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের গাউসিয়া টুইন পিক ভবনের ছাদের রেট্রো রুফটপ রেস্টুরেন্ট ভেঙে দেয় রাজউক। রাজউকের নকশায় ভবনটির ছাদ খোলামেলা দেখানো হলেও বাস্তবে রেস্তোরাঁ গড়ে তোলায় তা ভেঙে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সাতমসজিদ রোডের টুইন পিক ভবনের দুটিসহ ৪০টির বেশি রেস্তোরাঁ বন্ধ করার পাশাপাশি ভেঙে দিয়েছে রাজউক, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থা।

গবেষণা কী বলছে

২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের যেসব বহুতল ভবনের ছাদে বাগান আছে, সেসব ভবন এবং এর আশপাশের তাপমাত্রা কমাতে বড় ভূমিকা পালন করছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, যে ছাদে গাছ আছে সেটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কম থাকে। ফলে ছাদের বাগান আশপাশের পরিবেশকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এটি বাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়, যা বিদ্যুৎ খরচ কমাতে এবং মানুষের আরামদায়ক জীবনযাত্রায় সাহায্য করে।

এই পরিস্থিতিতে গবেষকরা ঢাকা শহরের যেসব ছাদে বাগান করার সক্ষমতা আছে, সেখানে বাগান তৈরির ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ঢাকা শহরে যেভাবে তাপপ্রবাহ বাড়ছে সেটি মোকাবিলায় খোলা জায়গায় গ্রিন স্পেস (গাছপালা) ও ব্লু স্পেসের (জলাশয়) পাশাপাশি ছাদবাগানের বিকল্প নেই।

‘মিটিগেশন স্ট্রাটেজিস ফর দ্য আরবান মাইক্রোক্লাইমেট অব ঢাকা মেগাসিটি টু রিডিউস অ্যাডভার্স ক্লাইমেটিক চেঞ্জ ইমপ্যাক্ট’ বা ঢাকার শহুরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর মাইক্রোক্লাইমেট প্রশমন কৌশল শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেসের আশরাফ দেওয়ান। তাঁর সহযোগী ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রুহুল সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের তৌহিদা রশিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মাহফুজ কবির।

গবেষণাটিতে বলা হয়, ছাদে উদ্ভিদের উপস্থিতি বাইরে থেকে ভবনের ভেতরে তাপ প্রবেশে বাধা দেয়। তাই স্বল্প পরিমাণ তাপ ভবনে প্রবেশ করে। এ কারণে জ্বালানির (বিদ্যুৎ) ব্যবহার কমে এবং ভবনের বাসিন্দাদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়।

ছাদবাগান বাতাসের তাপমাত্রা কমাতেও কার্যকর বলে গবেষণাটিতে উঠে এসেছে। গবেষকেরা ভবনের ছাদের এক, দুই ও তিন মিটার উচ্চতায় গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতের বাগানবিহীন এবং বাগানসহ ছাদের তাপমাত্রা পরিমাপ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, শীতকালে এক মিটার উচ্চতায় বাগানসহ ছাদের তাপমাত্রা বাগানবিহীন ছাদের তুলনায় ৩ দশমিক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। অবশ্য দুই ও তিন মিটার উচ্চতায় দিনের সময়ের ভিত্তিতে তাপমাত্রার তারতম্য হয়। যেমন দুই মিটার উচ্চতায় বাগানসহ ছাদের বাতাসের তাপমাত্রা কমানোর হার অনেক বেশি। একই ছাদে তিন মিটার উচ্চতায় ভোর এবং সন্ধ্যার তাপমাত্রা কমানোর হার বেশি।

‘নিরাপত্তার বিকল্প বিনোদন নয়’

নিরাপত্তার প্রশ্ন উপেক্ষা করে নিছক বিনোদনের বিবেচনায় বহুতল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ নির্মাণ সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে মনে করছেন নগর–পরিকল্পনাবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বহুতল ভবনের ছাদে আগুন জ্বালানো কোনোভাবেই উচিত নয়। পাশাপাশি স্থাপনা নির্মাণ করে ছাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করা ঢাকার মতো শহরে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ছাদ রেস্তোরাঁগুলোর ব্যাপারে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ইন্ডিয়া টুডেকে মাহফুজ আনাম: ‘বিএনপি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, ছাত্রদের অনাগ্রহ, অস্পষ্টতায় জামায়াত’

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসার জন্য অপেক্ষা করছে, কারণ আওয়ামী লীগ এখন একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সুতরাং বিএনপি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, ছাত্ররা তেমন আগ্রহী নয় এবং জামায়াতে ইসলামী, যারা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ফ্যাক্টর, তারা দ্বিধাগ্রস্ত—তারা অপেক্ষা করতে রাজি, ১০-১৫ বছরও অপেক্ষা করতে রাজি। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে যদি হয়, কিন্তু স্থগিত হলেও তাদের তেমন সমস্যা নেই। এটাই এখন পরিস্থিতি।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের ‘নাথিং বাট ট্রু’ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বাংলাদেশের শীর্ষ ইংরেজি দৈনিকটির সম্পাদক মাহফুজ আনামকে। রাজ চেঙ্গাপ্পার উপস্থাপনায় ওই অনুষ্ঠানে মাহফুজ আনাম বাংলাদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এভাবে ব্যাখ্যা করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে রাজ চেঙ্গাপ্পা বলেন, গত বছরের আগস্টে বিশাল ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারিত হন। এরপর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ‘ভারত মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় নিপীড়ন প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ এনেছে এবং তাদের জীবন ও সম্পত্তির সুরক্ষা চেয়েছে। এ ছাড়া ভারত বাংলাদেশে ইসলামিকরণ বৃদ্ধি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে দেশটির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।’

‘এদিকে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কার্যক্রম মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে।’ এমন দাবি করেন তিনি।

রাজ চেঙ্গাপ্পা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইউনূস সরকার দাবি করছে, তারা অর্থনৈতিক পতন রোধ করতে সক্ষম হয়েছে এবং রাজনৈতিক, বিচার বিভাগীয় ও শাসন সংস্কার চালু করছে। তবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিদেশি বিনিয়োগের অভাব, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব সমস্যাগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।’

তিনি আরও দাবি করে বলেন, ‘এ ছাড়া অনেকের ধারণা যে ইউনূস মৌলবাদী ইসলামপন্থী ছাত্রগোষ্ঠীর হাতের পুতুল, যারা সরকারের মৌলিক নীতিগুলো পরিবর্তন করছে। এটি অন্যতম প্রধান সমালোচনার বিষয়।’

‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সতর্ক করে দিয়েছেন, দেশ “নৈরাজ্যের অবস্থায়” রয়েছে এবং যদি রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতা চলতে থাকে, তাহলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।’

রাজ সার্বিক বিষয়ে জানতে মাহফুজ আনামের কাছে জানতে চান, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব নেওয়ার সাত মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তাকে মনোনীত করা হয়েছিল এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শাসনব্যবস্থা, নিরাপত্তাসহ সব ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার আনবেন। আপনি এই বিষয়গুলোর ওপর ইউনূসের কর্মদক্ষতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?’

উত্তরে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘শুরুতেই আমি তাকে মিশ্র গ্রেড দেব। কিছু ক্ষেত্রে তিনি খুব ভালো করেছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম করেছেন। আর এটা বুঝতে হবে যে হাসিনা সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। তিনি ছিলেন খুব শক্তিশালী নেত্রী এবং তিনি চলে যাওয়ায় ক্ষমতার একটি শূন্যতা তৈরি হয়। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, ইউনূস প্যারিসে ছিলেন, তিনি ৮ আগস্ট দেশে ফিরেছিলেন এবং হাসিনা ৫ আগস্ট চলে যান দেশ ছেড়ে। মাঝের এই তিন দিন আমাদের দেশে কোনো সরকার ছিল না। এই তিন দিনই সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা এবং আক্রমণের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি।’

‘কিছু কারাগার থেকে বন্দিরা পালিয়েছিল, কিছু মৌলবাদী কারাগার থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। তাই এই প্রথম কয়েক দিনে অনেক বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। তারপর ইউনূস শপথ নেন, তার প্রাথমিক দলের সদস্যরা বেশ যথেচ্ছভাবে নির্বাচিত হয়েছিল। আমি জানি, তিনি অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে জানতেন না। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে তিনি তাদের মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন, যাদের তিনি ভালোভাবে জানেন না। এ নিয়ে অনেক অস্বস্তি ছিল, বলতে পারেন মিশ্র একটি দল। যারা একে অপরের সঙ্গে কখনো কাজ করেননি এবং তাদের অনেকেরই সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না।’

‘সুতরাং বলা যায়, শুরুতে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ভুল দিকনির্দেশনা এবং কিছু নীতির অভাব ছিল। সাত মাস পর এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল হয়েছে পরিস্থিতি। এ ছাড়া শুরুতে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল, যা এখন স্থিতিশীল। আমরা গত দুই মাসে মূল্যস্ফীতির হার কমতে দেখেছি এবং আমাদের রপ্তানি এখন আগের স্তরে ফিরে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর আমাদের রপ্তানি ছিল ১৯ বিলিয়ন, ১৯.৯ বিলিয়ন আর এখন এই বছরে একই স্তরে আছে। তাই টাকা ডলারের বিপরীতে স্থিতিশীল হয়েছে। আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে। সুতরাং অর্থনৈতিক পতনের অনুভূতি এখন দূর হয়েছে। বলতে পারেন, আমরা স্থিতিশীল অবস্থায় আছি।’

রাজ চেঙ্গাপ্পা বলেন, এবার আমরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আসি। তিনি জানতে চান, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম, যা যুব আন্দোলনের মধ্যে রূপ লাভ করেছে। গত মাসে ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র আন্দোলনের নেতারা, যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা করেছেন। এটি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপি নামে পরিচিত। আপনি জানেন যে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পারিবারিক নেতৃত্বাধীন দল হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং খালেদার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে।’

তিনি আরও প্রশ্ন রাখেন, ‘এখন এনসিপি কিছু দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, যা কয়েক দশক পর প্রথমবারের মতো বড় ধরনের একটি পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে। ঢাকায় একটি সমাবেশে এনসিপি নেতারা দ্বিতীয় একটি প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন এবং পুরনো ন্যারেটিভগুলো যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ইসলামপন্থী এবং ভারত বনাম পাকিস্তান সম্পর্কের থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। আবার, যা ঘটেছে তার একটি ধারণা দেওয়ার জন্য জুলাই আন্দোলনের ২৬ বছর বয়সী প্রতীক নাহিদ ইসলাম ইউনূস সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির আংশিক প্রধান বা কনভেনর হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। এই নতুন রাজনৈতিক দলের আগমন কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ কী?

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক দলের আগমন নিঃসন্দেহে এমন কিছু, যা আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব প্রত্যাশা করছি। কারণ যেমন আপনি বলেছেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে দ্বিদলীয় পরিস্থিতিতে ছিলাম— বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ। এটা সত্যিই পাঁচ বছরের নির্বাচনী সময়কালে দুলতে থাকত, যতক্ষণ না হাসিনা শেষ ১৫ বছর শাসন করলেন। তবে তার আগে ১৯৯১ সাল থেকে, যেটিকে আমরা ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ বলে জানি, যেটি জেনারেল আতাউর রহমানের পতনের বছর, তখন থেকে এই পাঁচ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তা ছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে, এরশাদের জাতীয় পার্টি আছে, আছে জামায়াতে ইসলামী, যা বাংলাদেশের পুরনো দলগুলোর একটি। এখন বর্তমান অবস্থায়, ছাত্রদলের আগমন একটি নতুন উপাদান। একবার তারা একটি রাজনৈতিক দল গঠন হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে প্রবাহিত হতে হবে। নতুন দলের নেতারা হাসিনাকে অপসারণ করেছিল, তাই তাদের মধ্যে একধরনের সফলতার অনুভূতি রয়েছে, এমন কিছু যা বিএনপি করতে পারেনি, এমন কিছু যা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করতে পারেনি, তারা কয়েক মাসের আন্দোলনে এটি করেছে। সুতরাং সেই আত্মবিশ্বাস এখনো তাদের মধ্যে আছে। তাদের মনে হয় তারা বাংলাদেশকে সেভাবে রূপান্তর করতে পারে, যেভাবে তারা আন্দোলনে জিতেছিল। তারা রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, বিশেষ করে নির্বাচনের ক্ষেত্রে। নির্বাচনের ব্যাপারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমরা সবাই এটি নিয়ে অধীর আগ্রহে আছি।’

‘প্রথমত, এটা এখন মোটামুটি নির্ধারিত যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর অথবা সর্বাধিক জানুয়ারি মাসে হবে নির্বাচন। তবে ছাত্র দলগুলো প্রকাশ্যে বলছে, তারা নির্বাচন অপেক্ষা বেশি সংস্কার চায়। কিন্তু তারা নতুন এবং নির্বাচনে যেতে কিছুটা ভীত। হয়তো তারা দেখবে জনগণের সমর্থন তেমন নেই।’

‘অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার জন্য অপেক্ষা করছে, কারণ আওয়ামী লীগ এখন একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সুতরাং বিএনপি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, ছাত্ররা তেমন আগ্রহী নয় এবং জামায়াতে ইসলামী এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ফ্যাক্টর, তারা দ্বিধাগ্রস্ত। তারা অপেক্ষা করতে রাজি ১০ থেকে ১৫ বছরও। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে যদি হয়, কিন্তু স্থগিত হলেও তাদের তেমন সমস্যা নেই। এটাই এখন পরিস্থিতি।’

‘তবে মূল কথা হলো, দেশবাসী নির্বাচন চায়। হাসিনার সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল, গত তিনটি নির্বাচনে— ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সবগুলোতে অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। সুতরাং বর্তমানে বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে প্রবল আগ্রহ রয়েছে এবং ভোটাররা তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেতে চান। এই পরিস্থিতি অনুযায়ী, আমরা ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি, যদি তা কোনো নাটকীয় কারণে স্থগিত না হয়।’

এ সময় রাজ বলেন, ‘আপনি দেখেছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা কীভাবে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছেন। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, নতুন এনসিপি দলটি ইসলামী উপাদানে আধিপত্য বিস্তার করছে এবং জামায়াতে ইসলামী দলটি ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ তার ধর্মনিরপেক্ষ মূলনীতিগুলো হারাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইউনূস সরকার যে সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, তা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মতো শব্দগুলোকে মৌলিক মূলনীতি হিসেবে বাদ দিয়ে তাদের স্থলে প্রস্তাব করেছে সমতা, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সম্ভবত বৈচিত্র্যের মতো বিষয়গুলো। সুতরাং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিগুলো কি বিপন্ন এবং এটি কি ইসলামি পথে চলে যাচ্ছে? অনেক ভারতীয় বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করছেন, যেমনটা আমরা পাকিস্তানে দেখেছি।’

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘এটি ভারতীয় এবং বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ, ভারতীয় সাংবাদিক ও বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছাত্ররা কিছু দাবি করেছে, সাংবিধানিক কমিশন এই সুপারিশগুলো করেছে। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি এর বিরোধিতা করেছে এবং তারা খুব জোরালোভাবে বলেছে, তারা পুরনো অগ্রাধিকার ফিরিয়ে আনতে চায়, যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র। সুতরাং এখানে আপনি একটি পরিষ্কার পরিস্থিতি দেখছেন। যেখানে সবচেয়ে বড় দল এই পরিবর্তনগুলোর বিরোধিতা করছে এবং ছাত্ররা এর সমর্থনে দাঁড়িয়েছে, আর নির্বাচনই এটি নির্ধারণ করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী দলটি অনেক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে, তবে তারা কখনোই ৫ থেকে ৬ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে তারা একসময় ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, সুতরাং এটি তাদের ঐতিহাসিক ভোটের সমর্থন। তারা হয়তো একটু বেশি, ১০ শতাংশ পর্যন্ত পেতে পারে। তবে আমি মনে করি এর বেশি হবে না।’

‘তবে বাংলাদেশের ইসলামীকরণ বা পাকিস্তানের মতো হওয়ার ব্যাপারের বড় প্রশ্নে আমি বলব, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং অন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ করব, তারা বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে বিবেচনা করুক। আপনি জানেন, পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং তেমনি বাংলাদেশও একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আমি আপনাকে বলতে চাই, আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও, আমরা পাকিস্তান ভেঙেছি।

‘আমরা সেই জাতি, যারা বাংলাদেশে নিয়ে গর্বিত এবং আমরা মুসলিম হিসেবে গর্বিত। তবে মুসলিম হওয়া মানে এই নয় যে আমরা ধর্মীয় মৌলবাদী। আমি আমার ভারতীয় বন্ধুদের অনুরোধ করব, আমাদের এই ফাঁদে ফেলবেন না, আমাদের পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করবেন না, আমাদের আলাদাভাবে ভাবুন।’

এরপর রাজ জানতে চান, ‘আমি আপনাকে নতুন সরকারের প্রথম কিছু মাসে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রসঙ্গে বলতে চাই, যে বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা এবং ভারত সরকারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি আরএসএস (ভারতের শাসক বিজেপি দলের আদর্শিক সংগঠন) বেঙ্গালুরুতে তাদের জাতীয় বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা করেছে। তারা এ বিষয়টিকে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছে, যার মধ্যে পাকিস্তান এবং ডিপ স্টেটের ভূমিকা রয়েছে। তারা বলছে, বর্তমান বাংলাদেশ প্রশাসন সমর্থিত মৌলবাদী ইসলামিক গ্রুপগুলো হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর এমন আক্রমণগুলো সংঘটিত করছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?’

মাহফুজ আনাম উত্তর দেন, ‘প্রথমে আমার অনুরোধ থাকবে, আমি বিষয়টি আরএসএসের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখতে চাই, ভারতীয়দের নয়। কারণ যদি এটি ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে, তবে আমরা সত্যিই বড় সমস্যায় পড়ব। আরএসএস একটি অত্যন্ত গতিশীল আদর্শিক দল। যদি আপনি আমাদের জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, তারাও একটি আদর্শিক দল। তাদের ভারতের প্রতি একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যা বাংলাদেশিদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিলবে না।’

‘তাই আমি এটিকে আরএসএসের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখতে চাই। আর আমি আশা করি, ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিন এবং ভারতীয় অন্য স্কলাররা আমাদের আরও স্বাধীনভাবে দেখবে। এখানে কোনো ইসলামিক ষড়যন্ত্র নেই। ভারতের মধ্যে এমন কিছু গ্রুপও থাকতে পারে, যারা ভারতকে কিছুটা অন্যভাবে দেখতে চায়। তারা আদর্শিকভাবে ভারতকে আরও গভীরভাবে একটি হিন্দু দেশ হিসেবে দেখতে চাইবে। বাংলাদেশেও কিছু গোষ্ঠি আছে যারা একটি ইসলামিক বাংলাদেশ দেখতে চায়, কিন্তু আমরা ১৮০ মিলিয়ন মানুষ, আপনি ডিসেম্বর মাসে আমাদের নির্বাচনেই দেখবেন, কীভাবে অসাম্প্রদায়িক দলগুলোই অধিকাংশ ভোট পায়।’

এরপর রাজ বলে, ‘আমি শুধু বলতে চাচ্ছি, ভারতীয় সরকার হিন্দুদের নির্যাতনের ব্যাপারে যে মন্তব্য করেছে, সেটা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?’

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমি মনে করি এটি আমাদের দুর্বলতা ছিল। এমন কিছু ঘটতে দেওয়া উচিত ছিল না। তবে এই সরকার তার দেখভাল করে থামিয়েছে। প্রথম দুই-তিন মাসের ঘটনা বাদ দিলে, আপনি বাংলাদেশের সঠিক চিত্র দেখতে পাবেন। কিন্তু হ্যাঁ, সংখ্যালঘুদের নিয়ে সমস্যা ভারতেও ফিরে আসছে। আপনাদের সব প্রচেষ্টার পরেও হিন্দু-মুসলিম সমস্যা ফিরে এসেছে। এখন আমি এটাও বলতে পারি না যে আমরা এই অভিশাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়েছি, আমরা সংগ্রাম করছি। দক্ষিণ এশীয় মহাদেশ সংগ্রাম করছে।’

তিনি বলেন, ‘ভারত সংগ্রাম করছে, আমরা সংগ্রাম করছি। আধুনিকীকরণের দৃষ্টিকোণে আমি মনে করি, আমাদের একে অপরকে সাহায্য করা উচিত এবং এগিয়ে যাওয়া উচিত। এটি আমার দৃষ্টিভঙ্গি। আমি বলব না যে, আমরা এটি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছি, কিন্তু আমরা এতটা নিষ্ঠুর সাম্প্রদায়িক দেশও নই।’

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিবন্ধকতা কী, রাজের এমন প্রশ্নে মাহফুজ বলেন, ‘আমি মনে করি, ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে বারবার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ভারতের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক, বোঝাপড়া এবং গভীর সহযোগিতার প্রয়োজন। এটাই বাংলাদেশের সরকারের অবস্থান, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান। তিনি এই বিষয়টি বহুবার উল্লেখ করেছেন এবং আমরা প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে একটি বৈঠকের প্রস্তাবও দিয়েছি। তবে এটি সত্যি আপনি বাংলাদেশের রাস্তায় হাঁটলে সেখানে ভারতের প্রতি একটি শক্তিশালী বিরূপ মনোভাব দেখবেন। এই বিরূপ মনোভাব আমি বলব ভারতের বিরুদ্ধে নয়, বরং ভারতের দীর্ঘদিনের হাসিনার সমর্থনের বিরুদ্ধে।’

‘আবারও বলব, যদি ভারত এবং হাসিনার সহযোগিতা থাকে, আমরা তা স্বাগত জানাই। তবে হাসিনা দিনে দিনে আরও স্বৈরাচারী হয়ে উঠছিলেন। হাসিনা আসলে গণতান্ত্রিক সমাজ এবং নির্বাচন সম্পর্কে মৌলিক ধারণাগুলো ভুলে গিয়েছিলেন। এবং বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এই সব ক্ষেত্রে ভারত তার সঙ্গী ছিল। কারণ হাসিনা ভারতের পন্থা অনুসরণ করতেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটি পরিবর্তনে সময়, এই মনোভাবটি কমবে এবং নির্বাচন আসার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি আরও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ফিরে আসবে।’

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সরকার অবশ্যই ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী এবং আমরা আশা করি, জয়শঙ্কর আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এবং সম্মানিত একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনি অবশ্যই আরেও ভালো দৃষ্টিভঙ্গি পাবেন। সরকারের পক্ষ থেকে কখনোই ভারতকে সব কিছুর জন্য দোষারোপ করা হয়নি, হয়তো কিছু মতামত বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এসব বলছেন, তবে সরকার এই ধরনের বক্তব্য দেয়নি।’

সাংবাদিক মাহফুজ আনাম ও রাজ চেঙ্গাপ্পা। ছবি : সংগৃহীত
সাংবাদিক মাহফুজ আনাম ও রাজ চেঙ্গাপ্পা। ছবি : সংগৃহীত



সেই সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের নির্দেশনায় চট্টগ্রামে ডাবল মার্ডার by জালাল রুমি

চট্টগ্রাম নগরে প্রাইভেটকারে ‘ব্রাশফায়ার’ করে দু’জনকে খুনের ঘটনায় ৭ জনের নাম উল্লেখপূর্বক ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলায় সমপ্রতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ও  তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নাকেও আসামি করা হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে সহযোগিতার অভিযোগে সন্ত্রাসী সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্নার নির্দেশনায় এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের ৩ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি। ১লা এপ্রিল সন্ধ্যায় নিহত বখতিয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম বাদী হয়ে নগরীর বাকলিয়া থানায় মামলাটি করেছেন। মামলায় সাজ্জাদ, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না ছাড়াও মোহাম্মদ হাছান, মোবারক হোসেন ইমন, খোরশেদ, রায়হান ও বোরহানকে আসামি করা হয়েছে। তা ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামি সাজ্জাদ এবং তার স্ত্রী তামান্নার পরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা সারোয়ার হোসেন বাবলা ও অন্যদের হত্যা করার জন্য নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে প্রাইভেটকারটির পিছু নেন।

এজাহারে বলা হয়, সারোয়ার হোসেন বাবলার গাড়িচালক ছিলেন গুলিতে নিহত মানিক। আর সারোয়ারের ব্যক্তিগত কাজকর্ম করতেন নিহত আবদুল্লাহ। গত ২৯শে মার্চ রাতে প্রাইভেটকারে করে নতুন ব্রিজ এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলেন মানিক, সারোয়ার, আবদুল্লাহ, রবিন, হৃদয় ও ইমন। নতুন ব্রিজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় রাত ২টার দিকে রাজাখালী ব্রিজে পৌঁছামাত্র ছয়-সাতটি মোটরসাইকেল থেকে প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিতে গাড়ির পেছনের গ্লাস ছিদ্র হয়ে যায়। তখন মানিক বহদ্দারহাটের দিকে না গিয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোড দিয়ে চকবাজারের দিকে যান। রাত সোয়া ২টার দিকে চকবাজার থানার নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কে মানিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ি থামানো হয়। গাড়ির পেছনে থাকা হাছান, ইমন, বোরহান, খোরশেদ, রায়হানসহ অজ্ঞাতপরিচয় ছয়-সাতজন তাদের হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করেন। গুলিতে মানিক ও আবদুল্লাহ জখম হন। গাড়িতে থাকা সারোয়ার এবং ইমন কৌশলে নেমে যান। এরপর গুলি ছুড়তে থাকা ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। মানিক ও আবদুল্লাহকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ব্যাপারে সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না বলেন, আমি ২ মাসের সন্তান সম্ভবা। আমার অপরাধ একজনকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। সবাই বলছে, আমার স্বামীকে ধরিয়ে দেয়ায় নাকি প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার স্বামীকে তো সরোয়ার ধরিয়ে দেয়নি। ধরিয়ে দিয়েছে সূচী নামে এক মেয়ে। বালুমহালে বড় সাজ্জাদ ও সরোয়ার ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তাদের আধিপত্য নিয়ে এই ঝামেলার সৃষ্টি হয় বলে আমি জানতে পারি। বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার উদ্দিন মানবজমিনকে  বলেন, প্রাইভেটকারে ব্রাশফায়ার করে দুইজনকে খুনের ঘটনায় ৭ জনের নাম উল্লেখ করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে নিহত চালক মানিকের মা একটি মামলা করেছেন। তবে এপর্যন্ত ওই মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে ওসি বলেন, ওইভাবে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে কয়েকটি বিষয় সামনে নিয়ে আমরা এগুচ্ছি। আশা করি, শিগগিরই আমরা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারবো। এর আগে গত রোববার ভোরে নগরীর বাকলিয়া নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে চন্দনপুরা এলাকা পর্যন্ত একটি প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে গুলি করতে করতে ধাওয়া করে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। এতে বখতিয়ার হোসেন মানিক ও মো. আব্দুল্লাহ নামের দুইজন গাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বখতিয়ার হোসেন মানিক ছিলেন ওই প্রাইভেটকারের  চালক। আর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলার দেহরক্ষী। ঘটনার সময় সন্ত্রাসী সারোয়ার ওই গাড়িতেই ছিলেন ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কৌশলে বেঁচে যান। মূলত তাকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়। এই ঘটনায় প্রাইভেটকারে থাকা আরও দুইজন আহত হয়েছেন।

এদের মধ্যে  চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রবিন নামের গুলিবিদ্ধ একজন জানিয়েছিলেন, সাজ্জাদের সঙ্গে সারোয়ারের আগে থেকে দ্বন্দ্ব ছিল। সমপ্রতি সাজ্জাদের গ্রেপ্তার এবং রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দু’জনের মধ্যে ঝামেলা বেড়েছে। তাই সাজ্জাদের লোকজন সারোয়ারকে খুন করতে এ হামলা চালাতে পারে।
নিহত আবদুল্লাহর মা রাশেদা বেগম জানিয়েছিলেন, মাস দু’য়েক আগে ছোট সাজ্জাদ রাউজানে তার ছেলের পায়ে গুলি করেছিল। তাই দুই মাস সে ঘর থেকে বের হতে পারেনি। ঈদের মার্কেট করার জন্য দুই মাস পর ওইদিন বের হয়েছিলেন আবদুল্লাহ।
নিহতদের সবাই  নগরীর অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী সারোয়ার বাবলার কর্মী। সন্ত্রাসী বাবলা বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী বলে পরিচিত। আসলাম চৌধুরীর বালুমহাল থেকে ফেরার পথেই তারা প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়েছেন। আর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা রাউজান-রাঙ্গুনিয়াকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী  খোরশেদ, হাসান ও রায়হানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের কর্মী।
এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বড়’ সাজ্জাদও জড়িত। সমপ্রতি বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছোট সাজ্জাদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ওই  গ্রেপ্তারে  সারোয়ার বাবলা পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন বলে কথিত আছে। সেই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। এছাড়া নতুন ব্রিজ এলাকায় একটি বিরোধপূর্ণ জায়গার দখল নিয়ে নগর বিএনপি’র সাবেক এক শীর্ষ নেতার অনুসারী বলে পরিচয় দেয়া ছাত্রদলের এক সহ-সম্পাদক এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছে।

mzamin

ভারতকে আরেকটি মিয়ানমার হতে দেওয়া ঠিক হবে না, ওয়াক্‌ফ বিল প্রসঙ্গে মেহবুবা মুফতি

ভারতে বিরোধী দলগুলোর তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও সংসদে ওয়াক্‌ফ (সংশোধনী) বিল উত্থাপন করেছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) এই বিলটিকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ আখ্যায়িত করেছে।

মেহবুবা মুফতি সতর্ক করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত ভারতকে মিয়ানমারের পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিলটি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ মুসলমানদের নিশানা করে করা হচ্ছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়কে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘এটা (ভারত) গান্ধীজির দেশ। বিজেপির এজেন্ডা নয়, সংবিধান অনুযায়ী দেশ চালানো উচিত। দেশের মানুষ যদি ভারতকে আরেকটি মিয়ানমার হিসেবে দেখতে না চায়, কাশ্মীরের পণ্ডিতদের সঙ্গে যা ঘটেছিল তা দেখতে না চায় (যে ঘটনার জন্য আমরা আজও দুঃখ প্রকাশ করি), যার জন্য দেশের মানুষ এখনো আমাদের ঠাট্টা করে, তাহলে তাদের এই সিদ্ধান্তের (ওয়াক্‌ফ বিলের) বিরোধিতা করা উচিত। যদি তারা নীরব থাকে, তাহলে এই দেশকে ভাঙনের হাত থেকে কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

ওয়াক্‌ফ বিলের প্রস্তাবিত সংশোধনীকে মুসলমানদের ক্ষমতা হ্রাস করার ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন মেহ্বুবা। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, দেশের মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করবে।

মেহবুবা মুফতি আরও বলেন, ‘বিজেপির কাছ থেকে আমি কোনো কিছু আশা করি না। ১০-১২ বছর ধরে আমরা দেখছি কীভাবে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, বুলডোজার দিয়ে তাদের মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং কবরস্থানের জায়গাগুলো দখল করা হচ্ছে। দেশের হিন্দুদের এসব ঘটনার প্রতিবাদ করা উচিত।’

ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি
ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি। ফাইল ছবি: এএনআই

একটি কাগজের নোট যেভাবে অস্ত্র হয়ে উঠল by জাভেদ হুসেন

অর্থনীতি এবং রাজনীতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য; কখনো শান্তিপূর্ণ, আবার কখনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে চতুর কৌশল বোধ হয় একটা কাগজের মুদ্রাকে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার প্রতীক বানানো। অথচ এই কাগজের টুকরার বিনিময়ে আপনি বাস্তব কিছু পাবেন তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ডলার হলো সেই মুদ্রা। ধীরে ধীরে সে গোটা পৃথিবীকে তার শিকলে জড়িয়েছে। এটি কীভাবে সম্ভব হলো? এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ পরিকল্পনা। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে যুদ্ধ, তেল, ঋণ এবং কূটনৈতিক চালবাজির গভীরে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডলারের রাজত্ব শুরু

ডলারের বিশ্বজয়ের শুরু হয় ১৯৪৪ সালে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। যুদ্ধে ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেন আর্থিক সংকটে জর্জরিত। জার্মানি ও জাপানের অর্থনীতি চূর্ণ–বিচূর্ণ। এমন অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারে ব্রেটন উডস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক লেনদেনের ভিত্তি হবে মার্কিন ডলার। আর তা সোনার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, প্রতিটি ডলার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার সমতুল্য হবে। আর বিশ্বের অন্যান্য মুদ্রাগুলো তাদের মান নির্ধারণের জন্য ডলারের ওপর নির্ভর করবে।

এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায়। কারণ, এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশকে নিজেদের মুদ্রার মান ঠিক রাখতে হলে ডলারের রিজার্ভ রাখতে হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ডলার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

নিক্সনের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এবং ডলারের মুক্তি

এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। যেহেতু ডলার স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত, তাই যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইচ্ছেমতো ডলার ছাপাতে পারত না। কারণ, প্রতিটি ডলারের বিপরীতে সমপরিমাণ স্বর্ণ মজুত রাখতে হতো।

কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে। পাশাপাশি দেশটির ভেতরেই সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করা হচ্ছিল। এসব কারণে বাজারে প্রচুর ডলার ছড়িয়ে পড়েছিল; কিন্তু সেই অনুপাতে স্বর্ণের মজুত ছিল না।

এরই মধ্যে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দাবি করে যে তারা তাদের হাতে থাকা ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ নিতে চায়। এটি ছিল ব্রেটন উডস চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী তাদের বৈধ অধিকার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারল, যদি সবাই স্বর্ণ দাবি করতে থাকে, তাহলে তাদের ভান্ডারে থাকা স্বর্ণে টান পড়বে। তৈরি হবে অর্থনৈতিক সংকট।

এই পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘এখন থেকে ডলার আর স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না।’ এর মানে দাঁড়াল, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ইচ্ছেমতো ডলার ছাপাতে পারবে, এবং এর কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকবে না। বিশ্ব অর্থনীতিতে এটি ছিল এক বিশাল ধাক্কা। এটি ইতিহাসে ‘নিক্সন শক’ নামে পরিচিত।

এই ঘোষণার মাধ্যমে ডলার এক সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবির্ভূত হলো। সে এখন শুধু একটি কাগজের মুদ্রা নয়। বরং এক প্রকার বিশ্বাসের প্রতীক। মানুষ যত দিন বিশ্বাস করবে যে ডলার মূল্যবান, তত দিন এটি চলবে।

পেট্রোডলারের সৃষ্টি এবং তেলের রাজনীতি

নিক্সন যখন ডলারকে সোনার মান থেকে মুক্ত করলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিল—বিশ্বের অন্যান্য দেশ কেন এখনো ডলার গ্রহণ করবে? কারণ, এখন এটি কেবল একটি কাগজ, যার পেছনে কোনো বাস্তব সম্পদ নেই।

এই সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর দিল। ১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে বলা হয়—সৌদি আরব তেল বিক্রির ক্ষেত্রে শুধু ডলার গ্রহণ করবে। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা দেবে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ওপেক (অর্গানাইজেশন ফর পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ) দেশগুলোও এই চুক্তির অনুসরণ করে।

ফলাফল হলো, বিশ্বের সব দেশকে তাদের প্রয়োজনীয় তেল কেনার জন্য ডলার সংগ্রহ করতে হলো। যারাই তেল কিনতে চাইল, তাদের ডলারের প্রয়োজন পড়ল। ফলে, দেশগুলো তাদের রিজার্ভে ডলার জমাতে বাধ্য হলো। এভাবেই ডলার স্বর্ণের পরিবর্তে ‘তেলের মানদণ্ডে’ পরিণত হলো। একে বলা হয় ‘পেট্রোডলার ব্যবস্থা’।

এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করল। কারণ, এখন তারা যত খুশি ডলার ছাপাতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে তা ব্যবহার করতে বাধ্যও করতে পারে।

আন্তর্জাতিক ঋণের ফাঁদ এবং ডলারের আধিপত্য

ডলার কেবল লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে বিশ্বকে শাসন করেনি, এটি একটি ভয়ংকর ঋণের ফাঁদও তৈরি করেছে।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ডলারে ঋণ দিতে শুরু করল। এই ঋণের সঙ্গে কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো, যেমন—সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণ, সামাজিক খাতের বাজেট কমানো, মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া ইত্যাদি।

অনেক দেশ এই ঋণের জালে আটকে পড়ে। তারা ডলার ঋণ নিয়েছে, কিন্তু যখন তারা এটি পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে তাদের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেই দেশগুলোর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে।

এভাবে ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠল।

ডলারের আধিপত্যের চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মার্কিন ডলার বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল মুদ্রা হিসেবে রাজত্ব করে আসছে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রপ্তানি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ, জ্বালানি লেনদেন—সবকিছুতেই ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দেশ ও জোট ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার দিকে এগোতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে ডলারের অব্যাহত আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

চীন ও ইউয়ানের উত্থান: ডলারের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী

বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের উত্থান গত দুই দশকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০০০ সালের দিকে চীনের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল। কিন্তু ২০২০-এর পর দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীন শুধু উৎপাদনশীলতার দিক থেকে নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তাদের নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়িয়ে ডলারের আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।

চীন এখন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নামে একটি বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সেখানে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু দেশ যুক্ত হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় চীন বিভিন্ন দেশে ট্রেনলাইন, বন্দর, সড়ক এবং শিল্প–কারখানা নির্মাণ করছে। এর বিনিময়ে চীন ওই দেশগুলোর সঙ্গে ইউয়ানে লেনদেন করছে। ফলে এসব দেশেও ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে এবং ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।

এ ছাড়া চীন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করেছে। এর ফলে দেশগুলো চাইলে ডলারের পরিবর্তে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন করতে পারে।

বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম রাশিয়া ও ইরান ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে তেল ও গ্যাস লেনদেনে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান গ্রহণ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন চীনের সঙ্গে ইউয়ানে বাণিজ্য করার পরিকল্পনা করছে।

রাশিয়া ও পেট্রোডলারের পতনের সূচনা

রাশিয়া ডলারের আধিপত্য ভাঙতে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম সুইফট সিস্টেম থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে রাশিয়া ডলারভিত্তিক লেনদেন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা শুরু করে।

রাশিয়া এখন তার প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে রুবল ও ইউয়ানভিত্তিক লেনদেন চালু করেছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে রাশিয়া তেলের দাম রুবল ও ইউয়ানে নিচ্ছে, যা ডলারের জন্য বড় একটি ধাক্কা। ফলে ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা, যেখানে এখন ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করেছে।

ব্রিকস জোটের বিকল্প মুদ্রা পরিকল্পনা

বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না, সাউথ আফ্রিকা) জোটের শক্তিশালী হয়ে ওঠা। এই দেশগুলো একত্রিত হয়ে ডলারের বিকল্প একটি মুদ্রা তৈরির চেষ্টা করছে।

২০২৩ সালে ব্রিকস সম্মেলনে নতুন সদস্য হিসেবে সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ইথিওপিয়া যোগ দেয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। তারা যদি ডলারের বদলে ব্রিকস মুদ্রা বা ইউয়ানে লেনদেন শুরু করে, তাহলে এটি ডলারের ওপর সরাসরি আঘাত হানবে।

ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক মুদ্রা বা ডিজিটাল মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা করছে। যদি তারা এটি বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে এটি ডলারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তন: সৌদি আরব কি ডলার ছেড়ে দেবে?

২০২৩ সালে চীন ও সৌদি আরবের মধ্যে ইউয়ানে তেল বিক্রির আলোচনা শুরু হয়। সৌদি আরব যদি চূড়ান্তভাবে ইউয়ানে তেল বিক্রি শুরু করে, তাহলে এটি পেট্রোডলার ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে ইউয়ানে লেনদেন শুরু করেছে। এ ছাড়া ইরান ও রাশিয়া আগেই ডলারের বিকল্প খুঁজে নিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এই পরিবর্তন ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ডিজিটাল মুদ্রার উত্থান: ডলার কি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে?

বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টোকারেন্সি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার উত্থান ডলারের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

চীন ইতোমধ্যেই ‘ডিজিটাল ইউয়ান’ চালু করেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইউরোপ, রাশিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলোও তাদের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রার উন্নয়ন করছে।

যদি এই ডিজিটাল মুদ্রাগুলো ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্বব্যাপী ডলারের ব্যবহার কমতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কি এই পরিবর্তন ঠেকাতে পারবে?

ডলারের আধিপত্য হারানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ধাক্কা হতে পারে। কারণ, মার্কিন সরকার এত দিন ধরে বিশাল পরিমাণ ঋণ নিয়ে চলেছে, যার বেশির ভাগই ডলার ছাপিয়ে পরিশোধ করা হয়। যদি বিশ্ব ডলারের বিকল্প ব্যবহার শুরু করে, তাহলে মার্কিন ডলারের চাহিদা কমে যাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বেশ কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করছে ডলারের প্রভাব ধরে রাখতে—যেমন, নতুন বাণিজ্য চুক্তি করা; বিশ্বব্যাপী সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করা ও চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়ে তাদের মুদ্রার উত্থান ঠেকানো।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই কৌশলগুলো কত দিন কার্যকর থাকবে?

ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। চীন, রাশিয়া, ব্রিকস দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।

রাতারাতি হয়তো কিছু ঘটবে না। তবে একসময় ব্রিটিশ পাউন্ডও বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এখন তার সেই দাপট আর নেই। ডলারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে চলেছে? উত্তর সময়ই দেবে।

* জাভেদ হুসেন প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী।

এক ডলারের নোট

ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানকে নিজেদের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ। দেশগুলো এরই মধ্যে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। গত রোববার (৩০ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে বোমা হামলা চালানোর ঘোষণার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে বলে দিয়েছে, ইরানে হামলা চালানোর জন্য তারা নিজেদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। ইরানে হামলা চালানোর সঙ্গে জড়িত কোনো মার্কিন উড়োজাহাজ এসব দেশ থেকে জ্বালানিও নিতে পারবে না। এমনকি হামলাসংশ্লিষ্ট উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানকে নিজেদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে (এমইই) এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁরা (উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা) এতে জড়াতে চাইছেন না।’

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেওয়াটা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের সহায়তাপুষ্ট ইয়েমেনের হুতিদের ওপর ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানকে আলোচনায় বাধ্য করতেই ট্রাম্প প্রশাসন তা করেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ মিত্রদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হামলায় সহযোগিতা না করাটা ইরানকে সাহস জোগাবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে তেহরানকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমইইকে বলেন, হুতিদের ওপর হামলা চালাতে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করেছে। দেশগুলোর নাম তিনি প্রকাশ করেননি।

হুতিদের ওপর হামলায় সহায়তা পাওয়া উপসাগরীয় মিত্রদের কাছ থেকে ইরানের বেলায়ও একই ধরনের সহযোগিতা পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে দেশগুলো জরুরি উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করবে, এমন ধারণা পোষণ করেছিল ওয়াশিংটন।

ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ তৈরিতে’ উপসাগরীয় দেশগুলোর সহায়তা কামনা করছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এ জন্য সম্প্রতি আনুষ্ঠানিক যোগাযোগও শুরু করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গত মার্চে আমিরাত ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনে বৈঠক করেছেন।

এই বৈঠকের পরপরই কাতার ও সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে এসব অনুমতি আটকে রাখা হয়েছিল। কাতার এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন কেনার অনুমতি পেয়েছে। সৌদি আরব এমন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার অনুমতি পেয়েছে, যা উড়োজাহাজ থেকে ভূমিতে ছোড়া রকেট প্রতিহত করতে পারবে।

গত সোমবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি মে মাসের শুরুর দিকে সৌদি আরব সফরের পরিকল্পনা করছেন। একই সফরে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশেও সফর করতে পারেন তিনি।

দিয়েগো গার্সিয়ায় মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্রের

ইসরায়েলে ২০২২ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে জর্ডান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যুদ্ধবিমান ও সামরিক মালবাহী উড়োজাহাজের উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফ্লাইট চলাচলের হিসাব রাখে এমন একটি উন্মুক্ত সূত্রের তথ্যমতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মালবাহী উড়োজাহাজের চলাচল আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এটা সর্বোচ্চ।

কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার পর ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটিতে বি-২ বোমারু বিমানের সংখ্যা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

উপসাগরীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে হামলা চালানোর জন্য দিয়েগো গার্সিয়া এর আগেও ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত এ দ্বীপটি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিজেদের ঘাঁটিগুলোর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন। ১৯৯০–এর দশকে ইরাকে হামলা চালানোর সময় নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সৌদি আরব। তখন চাগোস দ্বীপপুঞ্জের দিয়েগো গার্সিয়ার নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহকারী উন্মুক্ত সোর্স প্ল্যানেট ল্যাব চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে জানিয়েছে, দিয়েগো গার্সিয়ার ঘাঁটিতে তিনটি বি-২ বোমারু বিমান দেখা গেছে।

ইরান থেকে চাগোস দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির দূরত্ব ৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের মতো। বি-২ বোমারু বিমান ট্যাংক ভরে জ্বালানি নিলে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার যেতে পারে। বহন করতে পারে ৩০ হাজার পাউন্ডের বোমা। এসব বোমা ‘বাংকার দুমড়েমুচড়ে’ দিতে সক্ষম। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এসব বোমা দিয়ে ইরানের ভূপৃষ্ঠের গভীরে আঘাত হানা যাবে।

কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর সি-১৭ গ্লোবমাস্টার যুদ্ধবিমান। ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর
কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর সি-১৭ গ্লোবমাস্টার যুদ্ধবিমান। ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। ফাইল ছবি: এএফপি

মধ্যরাতে ওসির সঙ্গে মাতলামি, স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনজন গ্রেপ্তার, পরে বহিষ্কার

বগুড়ায় মধ্যরাতে পুলিশের একজন ওসির সঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি করার অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা এলাকায় শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলামের সঙ্গে এ ঘটনা ঘটে। তিনি পুলিশ সুপারের বাসায় ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সপরিবার যোগ দিতে এসেছিলেন। গ্রেপ্তারের আগে ওই তিন ব্যক্তি ওসির স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন বগুড়া শহর স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল আমিন (৩৬), স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আহসান হাবিব (১৮) ও নুরুল ইসলাম (১৮)। তাঁরা সবাই বগুড়া শহরের মালগ্রাম চাপড়পাড়ার বাসিন্দা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে দুইটার দিকে শেরপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম পুলিশের গাড়ি নিয়ে চা পান করতে সাতমাথায় আসেন। এ সময় গাড়িতে ওসির স্ত্রী-সন্তান বসে ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রুহুল আমিন কয়েকজন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে মধ্যরাতে সাতমাথা এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। পুলিশের গাড়িতে নারী দেখে স্বেচ্ছাসেবক দলের ওই নেতা গাড়িতে বসা নারীর পরিচয় জানতে চান। এ নিয়ে ওসির সঙ্গে রুহুল আমিনের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত সদর ফাঁড়ির পরিদর্শক সেরাজুল ইসলাম রুহুল আমিনসহ তিনজনকে আটক করেন।

জানতে চাইলে শেরপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে এসপি স্যারের বাংলোয় ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে সব থানার ওসিরা সপরিবার যোগ দেন। অনুষ্ঠান শেষে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে শেরপুরে ফেরার পথে সদর ফাঁড়ির পরিদর্শক সাতমাথায় চা পানের আমন্ত্রণ জানান। সাতমাথায় গাড়ি দাঁড় করানোর পর সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা কয়েকজন যুবক এগিয়ে এসে গাড়ির ভেতরে বসা আমার স্ত্রী-সন্তানের পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। সদর ফাঁড়ির পরিদর্শক সঙ্গেই ছিলেন। তিনি ওই যুবকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি গাড়ি নিয়ে শেরপুরে চলে এসেছি। পরে সেখানে কী হয়েছে সেটা বলতে পারব না।’

বগুড়া সদর থানার ওসি এস এম মঈনুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তি মধ্যরাতে সাতমাথায় মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি এবং সাধারণ মানুষকে উত্ত্যক্ত করছিলেন। এসপি স্যারের বাংলোয় অনুষ্ঠান শেষে শেরপুর থানার ওসি তাঁর গাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাতমাথায় চা খেতে এলে তাঁর সঙ্গেও ওই মদ্যপ ব্যক্তিরা মাতলামি ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ ছাড়া তাঁরা বেশ কয়েকজন ব্যক্তির ওপরও চড়াও হন। পরে তাঁদের আটক করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকের দেওয়া সনদ অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। মদ পানের অপরাধে ওই তিনজনের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ বুধবার তিনজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে রুহুল আমিন বা তাঁর সহযোগীদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সরকার মুকুল এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রুহুল আমিনকে বহিষ্কারের তথ্য জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার রুহুল আমিন বগুড়া শহর স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে থাকা দুজন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেউ নন। রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তারের পর ওসি আমাকে সদর থানায় ডেকেছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর চিকিৎসকের সনদ দেখিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, রুহুল আমিন মদ্যপ ছিলেন। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের কাছে বগুড়া মডেল জেলা। এখানে সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কেউ সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। মদ পান করে মাতলামি করায় রুহুল আমিনকে ইতিমধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ 

বগুড়ায় মদ্যপ অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তি। মঙ্গলবার গভীর রাতে সদর থানায়
বগুড়ায় মদ্যপ অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তি। মঙ্গলবার গভীর রাতে সদর থানায়। ছবি: প্রথম আলো

বেহুদা প্যাঁচাল: সকল দলের সরকার তত্ত্ব এবং কিছু কথা by শামীমুল হক

বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। এনসিপিসহ দুয়েকটি দল আওয়ামী লীগের বিচারের পর নির্বাচন দেয়ার পক্ষে। জামায়াত চায় যৌক্তিক সংস্কারের পর নির্বাচন। এখানে সব দল একমত হতে পারছেন না। একটি কথা ঠিক রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন দাবি করবেই- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিগত ষোল বছরের জঞ্জাল সাফ তো করতে হবে আগে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হয়ে সনদে স্বাক্ষর করতে হবে। ক্ষমতায় গেলে তারা এসব সংস্কার আইনে পরিণত করবেন। এর সংস্কার কোন কোন জায়গায় হবে, কেমন করে হবে- তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন ভাব ভালোবাসার ছিটে ফোঁটাও তো দেখা যাচ্ছে না। বরং একে অন্যকে প্রকাশ্যে গালমন্দ করতে ছাড়ছেন না। এতে করে বিগত ষোল বছরের স্বৈরাচার সুযোগ নিচ্ছে অবশ্যই। যার প্রতিফলন এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্বৈরাচার হাসিনা এখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ভাবছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাষণ দিচ্ছেন। তার দলের নেতাদের সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন দেশে অরাজকতার। হাসিনার নির্দেশে যে দুই হাজারেরও বেশি ছাত্র-জনতা...

ম্প্রতি রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক পিনাকি ভট্টাচার্য ফেসবুক লাইভে এসে নতুন একটি তত্ত্ব জাতির সামনে হাজির করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা ভাবছি- অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে একটা রাজনৈতিক সরকারে উন্নীত হবো। এখানে আমাদের একটা আউট অব দ্যা বক্স সলিউশন চিন্তা করতে হবে। সেটা হচ্ছে আমরা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে একটা ট্রানজিশনাল সরকার করবো। যা থেকে রাজনৈতিক সরকারের উত্তরণ করবো। তার মানে তিনটা স্টেপে। ধাপে ধাপে। এই ট্রানজিশনাল সরকার থাকবে হাসিনার টার্মটা যতদিন ছিল ততদিন। মানে হাসিনা যদি ক্ষমতায়  থেকে যেতো। তাহলে যতদিন পরে আরেকটা ইলেকশন হতো ততদিন। কারা থাকবে এই সরকারে? ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল। বিএনপি, জামায়াত, চরমোনাই, নুরের দল, এনসিপি এমনকি বাম সহ সবাই। তিনি আরও বলেন, ন্যাচারালি আমরা দলগুলোর শক্তি জানি। সে হিসেবে তারা মন্ত্রী পাবে। মন্ত্রিসভা পুরা হবে। আর উপ-প্রধান উপদেষ্টা হবেন তারেক রহমান। সে ফেসবুক লাইভে তিনি যা বলেছেন এর সারসংক্ষেপ এটা। তিনি একাধারে সরকারের মেয়াদ, সরকারের ধরন খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। সরকারে ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে রাখার কথাও বলেছেন। তার এ তত্ত্ব নিয়ে কে কি মন্তব্য করবে জানি না। তবে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে। বলতে গেলে আমাকে নাড়া দিয়েছে। এমনটি হলে আমার মতে ভালো হবে। সকল দলের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হবে। সরকারে থেকে সকল দলের প্রতিনিধিরা মিলে দেশ চালাবেন। নতুন করে উপ- প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টি করে তার দায়িত্ব দেয়া হবে তারেক রহমানকে। এতে করে বাকি সময়টুকু যারা সরকারে থাকবেন তাদের একটা অভিজ্ঞতা হবে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে যে দলই সরকার গঠন করুক অন্তত কিছু হলেও অভিজ্ঞ লোক সরকারে থাকবে। এ সরকার নিশ্চয় ব্যতিক্রম সরকার হবে। নোবেল বিজয়ী, বিশ্বনন্দিত ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এ সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন তরতর করে। কারণ সকল দলের অংশগ্রহণ থাকায় এখানে কেউ সরকারের কোনো কাজে বাধা দিতে আসবে না। বরং প্রত্যেকেই যার যার পারফরমেন্স দেখাতে ব্যস্ত থাকবেন। কার চেয়ে কে ভালো কাজ দেখাতে পারবেন সে প্রতিযোগিতা গড়ে উঠবে সরকারের মধ্যে।

এখন আসা যাক পিনাকি ভট্টাচার্যের নতুন এ তত্ত্বে কারা কারা সাড়া দেয়। কোন কোন রাজনৈতিক দল এ তত্ত্বকে সাদরে গ্রহণ করে। আর কারা এ তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে। তবে আমি যতটুকু বুঝি ষোল বছর জগদ্দল পাথরের মতো বসে থাকা নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচার হাসিনাকে যেভাবে সরকার থেকে উৎখাত করা হয়েছে তা ছিল সকল রাজনৈতিক দলের কাছে অকল্পনীয়। আর ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে যেতে পারবে কিনা তাও ছিল ভীষণ ভাবনার। কারণ স্বৈরাচার হাসিনা সংবিধানকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন নির্বাচন হলেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। হাসিনা ও  তার দল আওয়ামী লীগের কোনো চিন্তা ছিল না। পরপর তিনটি নির্বাচন এভাবে চিন্তাহীনভাবে হাসিনা ক্ষমতায় থেকে গেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই থাকতেন সরকার প্রধান। যদি না বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এভাবে ঝাঁপিয়ে না পড়তেন। হাসিনা সরকারও দিশাহারা হয়ে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ, বিজিবি, আনসার কোনো বাহিনীই বসে ছিলেন না। তাদের সাহস জুগিয়েছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী। ছাত্রলীগের গুণ্ডা বাহিনী।  জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। এভাবে দুই হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। কমপক্ষে ত্রিশ হাজার জনতার অঙ্গহানি হয়েছে। কেউ চোখ হারিয়ে অন্ধ হয়েছেন। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর পর সারা দেশের রাজপথ থেকে অলিগলি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে। অবশ্য ৫ই আগস্টের বীজ বপন হয়েছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে। বিএনপি, জামায়াতসহ সকল বিরোধী দলগুলো রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। হামলা, মামলা আর গায়েবি মামলায় দিনের পর দিন জেল খেটেছেন। কেউ বা নিজ বাড়ি ছেড়ে ধানক্ষেতে ঘুমিয়েছেন। এত নির্যাতনের পর এলো মাহিন্দ্রক্ষণ ৫ই আগস্ট। এরপর ভেবেছিলাম রাজনৈতিক দলগুলোর বোধোদয় হবে। তারা সবাই এক টেবিলে বসবেন। দেশ পরিচালনায় নতুন ফর্মুলা হাজির করবেন। এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দিনের পর দিন বৈঠক হবে। এরপর তারা এক হবেন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেবেন তারা। কিন্তু আমরা কি দেখলাম? কিংবা কি দেখছি? আমরা দেখছি এখনো সেই আগের মতোই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। সব দলই নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। দেশের স্বার্থ কারও কাছে মুখ্য হয়ে উঠছে না। বরং অন্তর্বর্র্তীকালীন সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে কোনো কোনো দল। গত আট মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সফলতা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। তবে হিসাব করলে সফলতার পাল্লাই ভারী। বর্তমান সরকার সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতেই। এ নিয়ে কমিশনও হয়েছে। ইতিমধ্যে কমিশনগুলো তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূসের কাছে। কমিশনের রিপোর্ট কিন্তু চূড়ান্ত নয়। বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন। তিনি বলেছেন সকল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে এটি চূড়ান্ত করা হবে। এ জন্য ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। যার প্রধান- প্রধান উপদেষ্টা নিজেই। ইতিমধ্যে কমিশনগুলোর রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে দলগুলোর মতামত চাওয়া হয়েছে। এখানে দেখা গেছে, একেক রাজনৈতিক দলের একেক মত। দলগুলোর ঐকমত্যে যাওয়ার লক্ষণ একেবারে নেই। বিএনপি আরও কয়েক বছর আগে ৩১ দফা দিয়েছে। যেখানে উল্লেখ রয়েছে দুই বারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কিন্তু সংস্কার কমিশনের দেয়া এই দুইবারেও আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। বলেছে এখানে তিনবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। তবে বিরতি দিয়ে আবার হতে পারবেন। বিএনপি’র  এ মতামতে দেখা গেছে তারা ৩১ দফায় দেয়া দুইবার থেকে সরে এসেছেন। আরও এমন অনেক বিষয়ে একদলের সঙ্গে আরেক দলের মতামতে ভিন্নতা দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন মনোভাবে মানুষ কিন্তু ক্ষুব্ধ হচ্ছে। মানুষের এ ক্ষুব্ধতা দলগুলোর জন্য কতোটুকু সুফল বয়ে আনবে? এ বিষয়টি কি রাজনৈতিক দলগুলো ভেবে দেখেছেন।

এবার আসা যাক নির্বাচন নিয়ে। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। এনসিপিসহ দুয়েকটি দল আওয়ামী লীগের বিচারের পর নির্বাচন দেয়ার পক্ষে। জামায়াত চায় যৌক্তিক সংস্কারের পর নির্বাচন। এখানে সব দল একমত হতে পারছেন না। একটি কথা ঠিক রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন দাবি করবেই- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিগত ষোল বছরের জঞ্জাল সাফ তো করতে হবে আগে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হয়ে সনদে স্বাক্ষর করতে হবে। ক্ষমতায় গেলে তারা এসব সংস্কার আইনে পরিণত করবেন। এর সংস্কার কোন কোন জায়গায় হবে, কেমন করে হবে- তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন ভাব ভালোবাসার ছিটে ফোঁটাও তো দেখা যাচ্ছে না। বরং একে অন্যকে প্রকাশ্যে গালমন্দ করতে ছাড়ছেন না। এতে করে বিগত ষোল বছরের স্বৈরাচার সুযোগ নিচ্ছে অবশ্যই। যার প্রতিফলন এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্বৈরাচার হাসিনা এখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ভাবছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাষণ দিচ্ছেন। তার দলের নেতাদের সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন দেশে অরাজকতার। হাসিনার নির্দেশে যে দুই হাজারেরও বেশি ছাত্র-জনতা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এর দায় দিচ্ছেন সমন্বয়কদের ওপর। প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়েও নানা কুমন্তব্য করছেন। জোর গলায় বলছেন, এসবের বিচার কড়ায় গণ্ডায় হিসাব করে করা হবে। এজন্য দায়ী কে? এই আট মাসে কেন আমরা পারলাম না একটি বিষয়ে সংস্কার করে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে? রাজনৈতিক দলগুলো কি মুখে মুখেই সংস্কার সংস্কার করছে? এমনটা হলে জুলাই বিপ্লব মাঠে মারা যাবে। এটা সবার মনে রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্নমত দিতেই পারে। কিন্তু সবাই এক টেবিলে বসে দীর্ঘ আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে দ্রুত। তা না হলে দেশের বিপর্যয় অনিবার্য।

এ অবস্থায় পিনাকি ভট্টাচার্যের সকল দলের সরকার তত্ত্বকে আমার কাছে যথাযথ মনে হয়েছে। এমনটা হলে সকল দল সরকারও চালাবে আবার সংস্কার নিয়ে কাজ করবে। তাদের মধ্যে আলাদা একটা ভালোবাসা জন্ম নিবে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সবার মাঝে এটা সত্য। সকল দলের সরকার হতে পারে নতুন বাংলাদেশ গড়ার একটা প্ল্যাটফরম।

mzamin

ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকের ঢল

ঈদের প্রথম দিন থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে ভ্রমণপিয়াসীদের ঢল নেমেছে। তবে প্রথম দিনে স্থানীয়দের আধিক্য থাকলেও দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার সকাল থেকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখো পর্যটক কক্সবাজার এসে ভিড় জমিয়েছেন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ৯ দিনের টানা ছুটি কাটাতে ভ্রমণপিপাসুরা বরাবরের মতো এবারো কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছেন। সকাল থেকে সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি বিনোদন কেন্দ্রগুলোয় পর্যটকের ভিড় দেখা গেছে।

পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২রা এপ্রিল থেকে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউসগুলোর কক্ষ বুকিং ছিল। তবে এবার রোজা ২৯টি হওয়ায় ঈদ একদিন আগে চলে এসেছে। এতে অনেকেই মঙ্গলবার থেকে কক্সবাজার ছুটে এসেছেন। কক্সবাজার শহরের ডায়াবেটিস পয়েন্ট, লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট ও কলাতলী পয়েন্ট সৈকতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাখো পর্যটক ও স্থানীয়রা সমুদ্র স্নানে মেতে ওঠেন। পর্যটকরা সমুদ্র স্নানের পাশাপাশি বিচ বাইক, ঘোড়া ও ওয়াটার বাইকে চড়ে আনন্দ উপভোগ করছেন।
পাশাপাশি সৈকতের এই পয়েন্টগুলো ছাড়াও মেরিন ড্রাইভ ধরে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক, টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, রামু বৌদ্ধপল্লী, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া, চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বিপুল সংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, লাইফ গার্ড ও বিচকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। সিলেট থেকে সপরিবারে বেড়াতে এসেছেন ব্যাংকার আরিয়ান শাহ। তিনি বলেন, এবারের লম্বা ছুটি কাটাতে কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছেন তারা। সৈকতে বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখে তিনি অভিভূত বলে জানান। বাচ্চারাও বেশ উপভোগ করছে। কক্সবাজার শৈবাল ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, কক্সবাজার শহর ও আশপাশের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউজে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের বাড়তি চাপে কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতি। পর্যটন ব্যবসায়ী নেতা রাসেদুল ইসলাম ডালিম বলেন, পর্যটকদের থাকা-খাওয়ায় অতিরিক্ত আদায় করতে না পারে তার জন্য তদারকি করা হচ্ছে। হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ছুটি বা বিশেষ দিনে কক্সবাজারে বরাবরই চাপ থাকে। এজন্য ভ্রমণে আসা পর্যটকদের অনলাইন বা ফোনে কক্ষ বুকিং দিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান বলেন, পর্যটকরা অবকাশে এসে যাতে স্বস্তির ভ্রমণ করতে পারেন তার জন্য সজাগ রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এ ছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তায় বাড়তি টহল বাড়ানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, পর্যটকদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী রয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের হয়রানি রোধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে।

mzamin

মিয়ানমারে ভূমিকম্প: মসজিদে নামাজ পড়ার সময় নিহত ৫০০ মুসল্লি, চারদিকে স্বজন হারানোর বেদনা

শুক্রবার সাগাইং-এ আজানের সাথে সাথে শত শত মুসলিম মধ্য মিয়ানমারের পাঁচটি মসজিদে ছুটে যান। পবিত্র রমজান মাসের শেষ হয়ে এসেছে। ঈদ উৎসবের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। তাই তারা রমজানের শেষ জুমার নামাজ আদায় করতে ছুটে যান মসজিদে। তারপর স্থানীয় সময় দুপুর ১২ টা ৫১ মিনিটে মারাত্মক ভূমিকম্প আঘাত হানে। তিনটি মসজিদ ধসে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ছিল মায়োমা’তে। এর ভেতরে থাকা প্রায় সবাই মারা যান। শত শত কিলোমিটার দূরে থাই সীমান্তবর্তী শহর মায়ে সোতে মায়োমা মসজিদের সাবেক ইমাম সোয়ে নাইও ভূমিকম্পটি অনুভব করেন। পরের দিনগুলোতে তিনি জানতে পারেন যে, তার প্রায় ১৭০ জন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং তার প্রিয় সদস্য মারা গেছেন। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন মসজিদে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ শহরে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ছিলেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, আমি প্রাণ হারানো সব মানুষের কথা ভাবি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সন্তানদের কথাও। তাদের মধ্যে কিছু ছোট শিশুও আছে। এ বিষয়ে কথা বলতে বলতে আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারি না।

মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সাগাইং এবং মান্দালয়ের কাছে সংঘটিত ভূমিকম্পে ২,৭১৯ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃতদেহ উদ্ধার অব্যাহত রাখার সাথে সাথে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও এ অঞ্চলটি তার প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের জন্য পরিচিত ছিল, শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীও বাস করতেন।

সোমবার দেশটির সামরিক জান্তা মিন অং হ্লাইং-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মসজিদে নামাজ পড়ার সময় আনুমানিক ৫০০ মুসলিম মারা গেছেন। সাগাইংয়ের প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, শহরের যে রাস্তায় মসজিদগুলো ছিল, সেই রাস্তা, মায়োমা স্ট্রিট, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তার আরও অনেক বাড়িঘরও ধসে পড়েছে। শত শত মানুষ রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছে। হয় তারা এখন গৃহহীন অথবা ভূমিকম্পের পরে তারা বাড়িতে ফিরে যেতে ভয় পায়। রয়েছে খাদ্য সরবরাহের অভাব।

শুধুমাত্র মায়োমাতেই ধসে ৬০ জনেরও বেশি লোক চাপা পড়েন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে মায়োডাও এবং মোয়েকিয়া মসজিদে আরও অনেক লোক মারা গেছেন। মঙ্গলবারও আরও মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। সোয়ে নাই ও-এর মতে, মুসল্লিরা ভূমিকম্পের সময় পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। ২০২১ সালে সংঘটিত এক অভ্যুত্থানের পরপরই পালিয়ে এসে তিনি বর্তমানে স্ত্রী এবং কন্যার সাথে থাই শহর মে সোটে থাকেন।

তিনি বলেন, প্রধান প্রার্থনা কক্ষের বাইরে, যেখানে মুসল্লিরা নিজেরা ওযু-গোসল করেন, সেখানে কিছু মৃতদেহ পাওয়া গেছে। কিছু মৃতদেহ অন্যদের হাত ধরে থাকতে দেখা গেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে ভেঙে পড়া ভবন থেকে তাদের টেনে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সোয়ে নাই ও যেসব প্রিয়জনকে হারিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন তার স্ত্রীর একজন চাচাতো ভাই।

তিনি বলেন, তার মৃত্যু ছিল ইমাম হিসেবে ১৩ বছরের জীবনে ‘আমার সহ্য করা সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। তিনিই আমাদের প্রতি তার সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন। পরিবারের সবাই তাকে ভালোবাসতেন। এই ক্ষতি আমাদের জন্য অসহনীয়।

তার স্ত্রীর আরেক চাচাতো ভাই ব্যবসায়ী। তিনি মক্কায় হজ্জ পালন করেন। তিনিও মারা যান। সোয়ে নাই ও বলেন, তিনি সবসময় আমাকে নি লে (বর্মী ভাষায় ছোট ভাই) বলে ডাকতেন। যখন আমি বিয়ে করি, তখন তিনি বলেছিলেন যে- আমরা এখন পরিবার এবং তিনি সবসময় আমাকে তার নিজের ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন। আমাদের যখনই তার প্রয়োজন হতো, তখনই তিনি আমাদের পাশে দাঁড়াতেন। আমি যাদের ভালোবাসি, তার মতো ভাইদেরও হারিয়েছি।

মারা যাওয়া ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে সোয়ে নে ও-এর সাবেক একজন সহকারী ইমামও আছেন। তাকে তিনি তার দৃঢ় কর্মনীতি এবং কুরআন তেলাওয়াতে অসাধারণ প্রতিভার জন্য স্মরণ করেন। স্থানীয় পাবলিক স্কুলের অধ্যক্ষ, যিনি মায়োমা মসজিদের একমাত্র মহিলা ট্রাস্টি ছিলেন, তিনিও মারা যান। সোয়ে নাই ও’ও তাকে একজন উদার মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন। তিনি প্রায়ই নিজের পকেট থেকে মসজিদের কর্মসূচির জন্য অর্থ প্রদান করতেন। তিনি বলেন, যখনই তিনি সম্প্রদায়ের অন্য কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর কথা শোনেন, তখনই তিনি শোকের এক নতুন ঢেউ অনুভব করেন।

রমজান মাসে তাদের মৃত্যু হয়েছে, এই বিষয়টি তিনি ভুলে যাননি। বলেন, আমি বলব, সকলেই আল্লাহর ঘরে ফিরে গেছেন। সে অনুযায়ী তাদের শহীদ হিসেবে স্মরণ করা হবে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমারের অন্যান্য অংশের মতো, এই সম্প্রদায়টি বিপুল সংখ্যক মৃতদেহের পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে।

সামরিক জান্তা এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান লড়াইয়ের কারণে এটি জটিল হয়ে উঠেছে। সাগাইংয়ের মুসলিম কবরস্থানটি বিদ্রোহী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকার কাছাকাছি এবং বেশ কয়েক বছর ধরে তা জনসাধারণের জন্য বন্ধ রয়েছে। ভূমিকম্পের পর থেকে সেনাবাহিনী বৃহত্তর সাগাইং অঞ্চলের কিছু অংশে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে।

সোয়ে নাই ও-এর মতে, সাগাইং শহরের মুসলিম সম্প্রদায়কে তাদের মৃতদেহ মান্দালয়ে স্থানান্তর করতে হয়েছে, দুই শহরের সংযোগকারী একমাত্র সেতু ব্যবহার করে ইরাবতী নদী পার হতে হয়েছে। তাদের মৃতদেহ মান্দালয়ের বৃহত্তম মসজিদে দাফনের জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে। ইসলামিক রীতি অনুসারে মৃত্যু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও তাদের দাফন করা হয়নি।