Sunday, June 14, 2015

শনাক্তই হয়নি কেউ, আতঙ্কে ক্যাম্পবাসী by নজরুল ইসলাম

হামলার ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়েছে রাজধানীর কালশীতে
বিহারি ক্যাম্পের ঘরের দেয়ালে l ছবি: প্রথম আলো
পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও একই পরিবারের নয়জনকে পুড়িয়ে মারাসহ ১০ হত্যার এক বছরেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। কাউকে শনাক্তই করতে পারেনি পুলিশ। উপরন্তু হামলার শিকার ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে মামলায় থাকায় তাঁরা আতঙ্কে ভুগছেন। সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ থাকায় আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পুলিশের কোনো আগ্রহ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। আজ রোববার এ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। আতঙ্কের কারণ হিসেবে পল্লবীর কালশী-সংলগ্ন কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ড, ক্যাম্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হলেও তখন পুলিশ তাঁদের মামলা নেয়নি। এসব ঘটনায় পুলিশ চারটি ও তাদের পছন্দের দুই ব্যক্তিকে দিয়ে দুটি মামলা করায়। মামলায় মোট ৩ হাজার ৭১৪ জন ক্যাম্পবাসীকে আসামি করা হয়েছে। সরকারদলীয় সাংসদ ইলিয়াসউদ্দিন মোল্লাহ্র মদদে জুয়েল রানার সমর্থক ও পুলিশ যৌথভাবে হামলা চালায় বলে অভিযোগ আছে। জুয়েল রানা পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। জুয়েল রানাকে ফোন করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
অবশ্য সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্ তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। তিনি একাধিকবার প্রথম আলোকে বলেছেন, ওই হামলায় তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল না। তাঁর কোনো লোকের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গতকাল তাঁর মুঠোফোন ও বাসার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
‘বিহারি’ হিসেবে পরিচিত আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ওই ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে গত বছরের ১৩ জুন গভীর রাত থেকে পাশের বাউনিয়াবাদের যুবলীগের নেতা জুয়েল রানার সমর্থক ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়৷ সংঘর্ষের একপর্যায়ে পরদিন ১৪ জুন সকালে ক্যাম্পের আটটি ঘরে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে অগ্নিসংযোগ করলে ইয়াসিন আলীর পরিবারের নারী-শিশুসহ নয়জন দগ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর এক মেয়ে ফারজানা দগ্ধ হলেও কাটা বেড়া দিয়ে সেদিন কোনোমতে সে বেরিয়ে আসে। আর পুলিশের গুলিতে নিহত হন ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. আজাদ। ইয়াসিন সেদিন বাইরে থাকায় বেঁচে গেলেও গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পল্লবীর পূরবী সিনেমা হলের সামনে বাসের ধাক্কায় মারা যান। পরদিন তাঁর ফুফাতো ভাই মো. আলমের করা মামলার বিবরণে লেখা হয়েছে, ইয়াসিনের মৃত্যুতে ওই দুর্বৃত্তদের হাত থাকতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে টিনের যে ঘরটি পুড়ে ইয়াসিনের পরিবারের নয়জন মারা গেছেন, সেখানে একতলা পাকা ঘর গড়ে তুলে মাদ্রাসা করা হয়েছে। মাদ্রাসার চারদিকের দেয়ালে টিনের ছাউনি দিয়ে কয়েকটি দোকানঘর তোলা হয়েছে। ক্যাম্পের পশ্চিমে বিহারিদের সংগঠন স্ট্রান্ড্রেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির (এসপিজিআরসি) দপ্তরের দেয়ালে ১০ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে একটি পোস্টার ঝুলছিল।
এসপিজিআরসির কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন বলেন, ‘মামলা করতে আদালতে যাওয়ার দুই দিন আগে গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর ইয়াসিনকে বাসের ধাক্কায় মেরা ফেলা হলো। ইয়াসিনের মতো পরিণতির আশঙ্কায় এখন ক্যাম্পের অন্যরা ১০ হত্যার ঘটনায় আদালতে মামলা করতে ভয় পাচ্ছেন। হামলাকারী সরকারদলীয় নেতা-কর্মী ও পুলিশ। তাই পুলিশ মামলার কোনো তদন্ত করছে না। তাদের গ্রেপ্তার করা তো দূরের কথা, কাউকে শনাক্তই করতে পারেনি। আজ ১০ হত্যার বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের সামনে মানববন্ধন করবে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা।’ তিনি বলেন, পুলিশ তাঁদের ওপর যে হামলা চালিয়েছে সেই কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেডের শেল, রাবার বুলেটে সংগ্রহ করে চাদরের পোঁটলা বেঁধে রেখেছেন। সেগুলো এই প্রতিবেদকে দেখিয়ে বলেন, এসব আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
ক্যাম্পবাসী ও আশপাশের লোকজন জানান, কালশী সড়কসংলগ্ন উড়ালসড়ক নির্মাণ এবং এলাকার উন্নতি ঘটায় জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে। এখান থেকে বিহারিদের উচ্ছেদ করে বিপণিবিতান নির্মাণ করাই লক্ষ্য ছিল সাংসদের। বস্তিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে সাংসদের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর বিরোধের বিষয়টি একটি অজুহাত মাত্র। হামলার পরদিন তাঁরা সড়ক অবরোধ করেন এবং সাংসদের কুশপুত্তলিকা পোড়ান। সরকারের পক্ষ থেকে বর্বর এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো উদ্যোগও নেই।
এসপিজিআরসি কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের প্রচার সম্পাদক খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে দেওয়া হয়েছিল। অথচ অভিযোগ ওঠা যুবলীগের নেতাকে পুলিশ আটক করল না।
নিহত আজাদের কুর্মিটোলা ক্যাম্পের ছোট্ট ছাপড়া ঘরে গেলে তাঁর মা বৃদ্ধা মা সাইদা বেগম বিলাপ করে বলেন, ‘পুত্র হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করতে গেলে আমাদেরও ইয়াসিনের মতো পরিণতি হবে। তাই বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।’
ক্যাম্পের বাসিন্দারা ক্যাম্পের ওপর হামলার ছবি দেখান। এতে দেখা যায়, পুলিশের সামনেই একদল যুবক ক্যাম্পে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। বিহারিরা মুঠোফোনে ধারণ করা বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ ও ছবি দেখান, যেগুলোতে পুলিশের সঙ্গে থেকে বস্তির দোকানে হামলা চালাতে, কোপাতে দেখা যায়।
যোগাযোগ করা হলে গতকাল এসপিজিআরসি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শওকত খান বলেন, গত ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ১০ হত্যার বিচার দাবি ও কুর্মিটোলা ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে ছয়টি মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী ঢাকার জেলা প্রশাসককে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।
সরকারি কাজে বাধাদান, লুটপাট, ভাঙচুর ও ১০ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে হওয়া ছয়টি মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলাগুলোর তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ছয় মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। তাঁরা অগ্নিসংযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। আসামি শনাক্ত হলে ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় জুয়েল রানাসহ শতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে শত শত ব্যক্তিকে বিক্ষোভ করতে দেখা গেলেও হামলাকারীর কোনো ছবি পাওয়া যায়নি।
গত ডিসেম্বরের আগে এই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধাদান, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। শিগগিরই এসব মামলায় ক্যাম্পবাসীকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কীসের বন্ধুত্ব? প্রশ্ন খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভারতের সঙ্গে ট্রানজিটের বিষয়টি ইঙ্গিত করে বলেছেন, বন্ধুত্ব ভালো। কিন্তু নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বন্ধুত্ব? এ রকম বন্ধুত্ব কেউ চায় না। সমানে সমান হলে সেটাকে বন্ধুত্ব বলে। না হলে সেটা হয় দাসত্ব।
আজ রোববার রাতে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ময়মনসিংহ জেলা বার ইউনিটের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। তবে এসব কথা বলার সময় তিনি একবারও ভারতের নাম উল্লেখ করেননি।
খালেদা জিয়া কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘যমুনা সেতু দিয়ে যেতে বাংলাদেশের জনগণকে টোল দিতে হয়। কিন্তু অন্য অনেক দেশ সেতু ব্যবহার করে টাকা-পয়সা দেবে না, কিছু দেবে না। হেভি হেভি গাড়ি যাবে, টোল দেবে না। এ রাস্তা কি লোড নিতে পারবে? তিনি আরও বলেন, যাতায়াতে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু টাকা দিয়ে যাবে।’
রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার বিরোধিতা করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হলে সুন্দরবন শেষ হয়ে যাবে। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি অন্য কোনো জায়গায় এ বিদ্যুৎকেন্দ্র করার আহ্বান জানান।

গত ২৫ মে জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের ১৯টি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সেদিকে ইঙ্গিত করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘দেশে এখন রাজতন্ত্র চলছে। একটা পরিবারের শাসন। সব করবে, সব পাবে। মানুষ পাক, না পাক; এই পরিবারের সব সুবিধা থাকবে।’
পুলিশের সমালোচনা করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, পুলিশ এখন সরকারের চেয়েও বড় হয়ে গেছে। তারা এখন বড় সরকার। পুলিশ বলে, তারাই সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। তাই গুম-খুন অত্যাচার করছে। কিন্তু পুলিশ র‍্যাব দিয়ে বেশিদিন ক্ষমতায় যায় না।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, সরকার অন্যায়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত নির্বাচিত মেয়রদের বরখাস্ত করছে। কিন্তু তারা এটা করতে পারে না। তিনি বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে কোর্টের রায় আমাদের পক্ষে আসার কথা। কিন্তু কোর্টও নিরপেক্ষতা রাখছে না। আমরা চাচ্ছি সুবিচার, তা পাচ্ছি না।’
সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, গত ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধা ছিল। কিন্তু সিটি নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ সরকারের অধীনে কোনো ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি বলেন, তারা তদন্ত করছে না। তদন্ত করলে চোর ধরা পড়বে।
এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চান হিলারি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর
গতকাল নিউ ইয়র্কে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের প্রচার
চালিয়েছেন হিলারি ক্লিনটন। সেখানে তিনি সাধারণ
আমেরিকানদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর প্রথমবারের মতো বড় ধরনের প্রচার চালিয়েছেন হিলারি ক্লিনটন। ডেমোক্রেটিক প্রার্থী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি গতকাল শনিবার বিরাট এক জনসভায় বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে চান। তাঁদের সাহায্য করতে চান।
বিবিসির এক খবরে জানা যায়, নিউ ইয়র্কের রুজভেল্ট আইল্যান্ডে কয়েক হাজার সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় হিলারি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, সাধারণ জনগণের উন্নতি না হলে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতি হবে না। এই সভার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নের লড়াইয়ে নামলেন সাবেক ফার্স্টলেডি হিলারি ক্লিনটন।
হিলারির বক্তব্যের মধ্যে ঘন ঘন হর্ষধ্বনি দিয়ে সমর্থন জানান তাঁরা। ৬৭ বছর বয়সী হিলারির এটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। সভায় হিলারির সঙ্গে তাঁর মেয়ে চেলসি ও স্বামী সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দেন হিলারি। এতে করে কেবলমাত্র শীর্ষ পর্যায়ে নয় যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণও কাজের সুযোগ পাবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল কেবল প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা ভোগ করবেন না। গণতন্ত্র কেবলমাত্র কোটিপতি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়।
জনগণের উদ্দেশে হিলারি বলেন, তাঁদের দর কষাকষির সময় এসেছে। যদি তাঁরা গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় তাহলে তাঁদের উন্নতি হবে। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে।
এ পর্যন্ত হিলারি ছোট ছোট কিছু প্রচার চালিয়েছেন। গতকালই তিনি প্রথম জনসম্মুখে বড় ধরনের নির্বাচনী প্রচার করলেন। হিলারি আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি ইতিহাস রচনা করতে পারবেন।

তিস্তার পানি বিপদ সীমার ওপর, দুর্ভোগে ১০ হাজার মানুষ

তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে ডিমলা উপজেলার কয়েকটি গ্রামের
বাসিন্দা পানিবন্দী হয়ে পড়েন। ১৪ জুন তোলা ছবি: -প্রথম আলো
নীলফামারীতে ভারী বৃষ্টির সঙ্গে উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার থেকে এরই মধ্যে ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলায় নদীর দুই পাড়ের এবং চর ও নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২৫টি গ্রামের ১০ হাজারের বেশি মানুষ বন্যা কবলিত হয়েছে।
নীলফামারী জেলার ডালিয়ায় অবস্থিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য মতে, আজ রোববার সকালে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, যা গতকাল সন্ধ্যায় ছিল ১০ সেন্টিমিটার। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যারাজের ৪৪টি জল কপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে বেলা তিনটার দিকে পানি কিছুটা নেমে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে বইছিল।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে এই প্রতিবেদক দুই উপজেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদেরই একজন ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ খান। তাঁর ভাষ্য, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ইউনিয়নের ঝাড়শিংহেরশ্বর ও পূর্বছাতনাই গ্রামের ৫০০ শ’র বেশি বাড়ি-ঘর নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত দুই হাজার মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েন।
টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, তিস্তার পানি বাড়ায় টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ি, উত্তর খড়িবাড়ি, দক্ষিণ খড়িবাড়ি, পূর্বখড়িবাড়িসহ আরও কয়েকটি গ্রামের ৭০০ শ’ বেশি বাড়ি-ঘর প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত তিন হাজারের লোক বন্যাকবলিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিস্তায় পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। উজানের ঢল নেমে আসা অব্যাহত থাকায় ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি বলেও তাঁর দাবি।

এলোপাতাড়ি গুলি করে জোড়া খুন ঘটনায় সাংসদপুত্রকে রক্ষা করার চেষ্টা!

তোয়ালে দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা
বখতিয়ার আলমের। গতকাল মহানগর
গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয় থেকে তাঁকে
আদালতে নেওয়ার সময় তোলা ছবি
গভীর রাতে রাজধানীর রাজপথে এলোপাতাড়ি গুলি করে দুজনকে খুন করার ঘটনায় সাংসদপুত্র বখতিয়ার আলম রনিকে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। গতকাল শনিবার তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে নতুন করে রিমান্ডের আবেদনও করা হয়নি। জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দীপক কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেন, বখতিয়ার স্বীকারোক্তি না দিলেও পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। জবানবন্দি না দিলেও মামলার ক্ষতি হবে না। কারণ, গাড়িচালক এই মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বলেছেন যে বখতিয়ারের ছোড়া গুলিতে দুজন নিহত হয়েছেন। তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল বিবিসিকে বলেন, ‘ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে এবং কীভাবে ঘটিয়েছে, তা নিয়ে আমরা এখনো স্পষ্ট ধারণা পাইনি। তিনি (বখতিয়ার) স্বীকার করেননি, তাঁর ড্রাইভার স্বীকারোক্তি দিয়েছে, আমি যতটুকু শুনেছি।’ ঘটনার পর পুলিশ আসলেই তদন্ত করেছে কি না কিংবা কাউকে ধরতে চেয়েছিল কি না অথবা ঘটনাটা ধামাচাপা পড়ে যাক, সে রকম চেয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ব্যাপারটা তা নয়। পুলিশ আইনি পথেই এগোচ্ছিল। পরে আরও কিছু বিষয়ে তাদের সন্দেহ হলে বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে সমর্পণ করা হয়। কাউকে রক্ষা করার জন্য, ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বা আড়াল করার জন্য বিলম্বিত করা হয়নি। সাংসদের পুত্র বা আওয়ামী লীগ, যুবলীগের কেউ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
পুলিশ জানায়, গত ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন এলাকায় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি থেকে গুলি ছোড়েন আওয়ামী লীগের সাংসদ পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার। ওই গুলিতে অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম নিহত হন।
হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম ১৫ এপ্রিল এ ঘটনায় রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই দীপক কুমার দাস মামলাটি তদন্ত করছেন।
মামলা করার পর পুলিশ গত ৩১ মে বখতিয়ার ও তাঁর গাড়িচালক ইমরান ফকিরকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বখতিয়ারকে ৯ জুন চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়।
আদালত সূত্র জানায়, পুলিশ বখতিয়ারকে আদালতে হাজির করে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে। এ সময় বখতিয়ারের পক্ষে জামিন চেয়ে ও চিকিৎসার জন্য দুটি আলাদা আবেদন করেন আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ। তবে শুনানির সময় বখতিয়ারকে আদালতে হাজির করা হয়নি। তাঁকে হাজতখানাতেই রাখা হয়।
আদালতে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, খুনের মামলায় গাড়িচালক ইমরান ফকিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, বখতিয়ার এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। যে গাড়ি থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়েছে, সেটির মালিক তাঁর মা। ওই গাড়িটি জব্দ করার চেষ্টা চলছে।
বখতিয়ারের আইনজীবী আদালতকে বলেন, এ মামলার আসামি বখতিয়ার অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন। তিনি জামিনের বিষয়ে শুনানির জন্য সময় চাইলে আদালত ১৬ জুন তারিখ নির্ধারণ করেন। আসামির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত চিকিৎসার জন্য কারাবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলেন।

মঞ্জুর হত্যায় এরশাদের আশ্চর্য জবানবন্দি -মার্কিন নথি :জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড by মিজানুর রহমান খান

জেনারেল এরশাদ, জেনারেল মঞ্জুর
জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড : ৩০ মে জিয়া হত্যাকাণ্ডের ৩৪ বছর পূর্তি। দীর্ঘ সময় পরে মার্কিন গোপন দলিলে উদ্ঘাটিত হলো জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি। এ বিষয়ে প্রথম আলোর বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজনের চতুর্থ ও শেষ কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ।
সেনাবাহিনীর চিকিৎসক কর্নেল এ জেড তোফায়েল সাক্ষ্য দিয়েছেন, ‘মাথায় একটি গুলি লেগেই জেনারেল মঞ্জুর মারা যান; “অনেকগুলো গুলি” তাঁর শরীরে লাগেনি। “ক্ষুব্ধ মানুষ” বা তাঁর গার্ডদের সঙ্গে এঁদের বন্দুকযুদ্ধের সময় তাঁর শরীরে একাধিক গুলিবিদ্ধ হয়নি।’
মঞ্জুর হত্যা মামলা দায়েরকারী ও মঞ্জুর-ভ্রাতা আইনজীবী আবুল মনসুর ২৯ মে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মৃত্যুসনদে একটি বুলেটের কথাই আছে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ ২০১৪ সালের ২০ এপ্রিল প্রথম আলোয় লিখেছেন, ‘দাবার এই ছকে ঘোড়া (ব্রিগেডিয়ার ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল) ও হাতিরা (মেজর ও ক্যাপ্টেন) তাঁদের বড়েগুলো (সুবেদার ও নায়েক) অঙ্গুলি হেলনে চালনা করেছেন। কিন্তু আরও বড় একটি দাবার ছকে আবার এই ঘোড়া ও হাতিরা যাঁদের অঙ্গুলি হেলনে কাজ করেছেন, তাঁরা সেনাবাহিনীর “ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা” (মেজর জেনারেল) এবং সিআইডির অভিযোগপত্র অনুযায়ী এরশাদ নামক একজন “লেফটেন্যান্ট জেনারেল”। এই “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ” প্রথম দিন থেকেই এক অবিশ্বাস্য গল্প ফেঁদে বসে, “ক্ষুব্ধ সৈনিকেরা” নাকি উত্তেজিত হয়ে মঞ্জুরকে হত্যা করেছেন।’
জেনারেল এরশাদ এই ‘গল্প’ তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি স্নাইডারকেও বলেছিলেন। এ বিষয়ে স্নাইডার ১৯৮১ সালের ২৫ জুন ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন, এরশাদ তাঁদের কাছে সামরিক বাহিনীর তদন্তের ফলাফল এবং গ্রেপ্তার হওয়া জেনারেল মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ড এবং অভ্যুত্থান পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। তবে রাষ্ট্রদূতের এই তারবার্তায় উল্লেখ আছে যে তাঁদের কাছে এরশাদের দেওয়া এই জবানবন্দি মার্কিন সামরিক অ্যাটাশে আলাদাভাবে ওয়াশিংটনে প্রেরণ করেছিলেন। এটি আমাদের হাতে আসেনি। এটুকু আশা করা যায়, কোনো একদিন হয়তো এর হদিস মিলবে। তবে স্নাইডার তারবার্তায় এরশাদের বক্তব্যের যে অংশটুকু উল্লেখ করেছিলেন, তা নতুন করে এরশাদের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওই তারবার্তায় বলেছিলেন, ‘এরশাদ আমাদের বলেন, অভ্যুত্থানচেষ্টা সম্পর্কে সামরিক তদন্ত শেষ হয়েছে। আর তাতে জেনারেল মঞ্জুরকে সম্পূর্ণরূপে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।’ উল্লেখ্য, জিয়া হত্যার বিচারের জন্য গঠিত তদন্ত আদালত–সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা ২৯ মে এক প্রশ্নের জবাবে এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন যে, ‘ওই সামরিক তদন্ত প্রতিবেদনের কোনো কপি সেনা হেফাজতে নেই। সবই ধ্বংস করা হয়েছে।’
জেনারেল এরশাদ স্নাইডারকে বলেন, ‘মঞ্জুর অনেক দিন ধরেই জিয়ার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করে আসছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে তিনি ওই দিনই যে ঘটনা ঘটাবেন, সে বিষয়ে মঞ্জুর তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ৩০ মে ১৯৮১ সন্ধ্যাকালীন প্রার্থনার (বাদ মাগরিব) পরেই।’ স্নাইডারের এই বিবরণ সত্য হলে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে এরশাদ কী করে এত নির্দিষ্টভাবে মঞ্জুরের অভ্যুত্থান পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছিলেন?
স্নাইডারের কাছে এরশাদ এই দাবিও করেন, ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকেও হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। স্নাইডার এরশাদের বরাতে আরও ইঙ্গিত করেন যে অভ্যুত্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্থান কেবল চট্টগ্রাম নয়, ‘ঢাকা এবং অন্যত্রও’ ছিল।
মঞ্জুর হত্যা সম্পর্কে স্নাইডার লেখেন, ‘মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এরশাদ বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে উল্লেখ করেন যে, “চট্টগ্রাম সেনানিবাসে কোনো কমান্ড কাঠামো না থাকার ফলে একদল ক্রুদ্ধ সৈনিক (অ্যান অ্যাংগ্রি মব) তাঁকে প্রথমে মারধর এবং পরে গুলি করে হত্যা করে।”
তবে এরশাদের এই বিবরণ মার্কিন দূতাবাস মেনে নেয়নি, তার প্রমাণ ৫ জুনের আরেকটি তারবার্তা। এতে ওয়াশিংটনকে আগেই জানানো হয়েছিল, “কী প্রেক্ষাপটে মঞ্জুর খুন হলেন তা অস্পষ্ট।’ রেডিও বাংলাদেশ বলেছে, তিনি “ক্রুদ্ধ সেপাই”দের হাতে নিহত হয়েছেন। আবার ৩ জুন সরকারি প্রেসে বলা হয়েছে: “কতিপয় উত্তেজিত সশস্ত্র ব্যক্তি” এবং মঞ্জুরের দেহরক্ষীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে আহত হয়ে মঞ্জুরের মৃত্যু ঘটেছে। এই যুদ্ধ হয় মঞ্জুর ও তাঁর সহযোগীদের “ছিনিয়ে” নেওয়ার চেষ্টাকালে। তাঁর দুই সহযোগী লে. কর্নেল মতিউর রহমান ও লে. কর্নেল মেহবুবুর রহমান কথিতমতে “ঘটনাস্থলেই” নিহত হয়েছেন।’
স্নাইডার তাঁর ওই তারবার্তায় (৫ জুন, ১৯৮১) মঞ্জুরকে কেন হত্যা করা হয়েছে সে সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে জানান: ‘মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড বিরাট সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করেছে। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে বহু ধরনের গল্প চালু আছে। অনেকেই সন্দেহ করেন যে, তাঁকে সেসব মহল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে যাঁরা শঙ্কিত ছিলেন যে মঞ্জুর যদি তাঁর অভ্যুত্থানের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মঞ্জুর হত্যা সম্পর্কে দুই ধরনের ভাষ্য এই সংশয়কে তীব্রতা দিয়েছে।’
তবে জেনারেল এরশাদের ভাষ্য ওয়াশিংটনকে জানানোর বার্তায় এরশাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে স্নাইডার মন্তব্য করেননি, কিন্তু এরশাদের ওই ভাষ্য কার্যত স্নাইডার নাকচ করেন, আর সেটা এই বিবেচনায় যে, ৫ জুন ১৯৮১ স্নাইডার তাঁর তারবার্তার মন্তব্য অংশে বলেন, ‘মঞ্জুর হত্যা সম্পর্কে সরকারের প্রচারিত ভাষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষয় ঘটেছে।’
উল্লেখ্য, জেনারেল মঞ্জুরের ভাই আবুল মনসুর ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ একটি মামলা করেন। সে বছরের ২৭ জুন সিআইডি এ মামলার অভিযোগপত্র দেয়। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় তাঁরা হলেন জেনারেল এইচ এম এরশাদ, মেজর জেনারেল আবদুল লতিফ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর রহমান শামস, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তফা কামালউদ্দীন ভূঁইয়া ও মেজর কাজী এমদাদুল হক। এই মামলা দায়েরের পরে জেনারেল মঞ্জুরের পরিবারের সদস্যরা দুবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। তৎকালীন আইন ও বিচারমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু দুজন প্রসিকিউটর দিয়েও সহায়তা করেছিলেন। এ সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও মঞ্জুর পরিবার যোগাযোগ করে। জিয়া ও মঞ্জুরের পরিবার ১৯৭২ সাল থেকে পরিচিত। জানা যায়, খালেদা জিয়াও মঞ্জুর হত্যা মামলা দায়েরে সহায়তা প্রদান করেন। যদিও পরে দেখা গেছে মওদুদ আহমদ এই মামলায় এরশাদের আইনজীবী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।
চট্টগ্রামের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দিন তাঁর বইয়ে যদিও মন্তব্য করেছেন যে ওই সময়ের ডিআইজি (পরে আইজিপি) শাহজাহান মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত। কিন্তু মো. শাহজাহান তা অস্বীকার করেছেন। এরশাদের ‘ক্রুদ্ধ সেপাই’ তত্ত্বেও তাঁর সায় নেই। তবে এটা পরিষ্কার যে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পরে মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত বৈধ ছিল না।
এই বিষয়টির আইনি দিক ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা করেছেন আইন কমিশনের সাবেক সদস্য ও ঢাকার সাবেক ডিসি মোহাম্মদ আবদুল মোবারক (বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার)। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৯ ধারা এবং ১৯৭০ সালের মিলিটারি অফেন্ডার্স রুলস মতে, পুলিশের তরফে মঞ্জুরকে সরাসরি সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দেওয়া ছিল বেআইনি। পুলিশের উচিত ছিল মঞ্জুরকে সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করা। তখন তিনি তাঁকে জেলখানায় রাখতেন। এই জেল থেকে তাঁকে নিতে হলে সেনাপ্রধানের অনুমোদিত চিঠির দরকার পড়ত। সবকিছু রেকর্ডে এসে যেত। তাই মঞ্জুরের বেআইনি হস্তান্তরের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা মঞ্জুর হত্যায় সহায়তা দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩ জুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আওয়ামী লীগ ও জাসদের সাংসদদের উপস্থিতিতে মঞ্জুর হত্যা আলোচিত হয়েছিল। এদিন বেশ কয়েকজন সাংসদ জেনারেল মঞ্জুর হত্যার তদন্ত দাবি করে বক্তব্য দেন। মঞ্জুর হত্যাসহ সামগ্রিক ঘটনাবলি খতিয়ে দেখতে সামরিক ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত হিসেবে একটি পার্লামেন্টারি কমিশন গঠনেরও দাবি জানানো হয়। কিন্তু বিএনপি কখনো তা করেনি।
১৯৯৫ থেকে দুই ডজনবার মঞ্জুর হত্যা মামলার বিচারক বদলের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর মামলাটির গতি হঠাৎ রুদ্ধ হয়ে যায়।
লিফশুলজ লিখেছেন, জিয়াউদ্দীন চৌধুরী তাঁর নিজের বইয়ে এবং পরে আমার সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন যে সেনাপ্রধান এরশাদ ও অন্য ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা মঞ্জুরকে ফাঁসিয়ে দিয়ে একটি মিথ্যা আখ্যান বাজারে ছড়িয়ে দেন। ১ জুন ১৯৮১ হাটহাজারী থানা থেকে নিয়ে আসার পর মঞ্জুর নাকি ‘ক্ষুব্ধ’ সৈনিকদের হাতে মারা পড়েন। মঞ্জুর যে ঘরে বন্দী ছিলেন, কীভাবে সেই কর্মকর্তা সেখানে প্রবেশ করেন, জিয়াউদ্দীন সেটি তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন। জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘তিনি (ঢাকা থেকে আগত) মঞ্জুরের ঘরে প্রবেশ করেন। মঞ্জুরের দিকে পিস্তল তাক করে গুলি করেন ও এরপর বেরিয়ে যান। সবকিছু ঘটে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক ৷

‘প্রাণনাশের হুমকির কারণে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারিনি’ -সানডে গার্ডিয়ানকে খালেদা জিয়া

আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছিল। তাই আমি ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জীর ঢাকা সফরের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে পারিনি। পাশাপাশি এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আমার সাক্ষাত বানচালের চেষ্টা করেছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। দ্য সানডে গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ৭ই জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাত শেষে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন সাংবাদিক সৌরভ স্যানাল। এতে খালেদা জিয়া মোদির সঙ্গে তার সাক্ষাতের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তার দলকে ভারতবিরোধী বলে আখ্যায়িত করে যে প্রচারণা হয় তার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেন। ওই সাক্ষাতকারে মোদির সঙ্গে বৈঠককে তিনি অতি সন্তোষজনক বলে অভিহিত করেন। বলেন, মোদিজির সঙ্গে সাক্ষাৎকার ছিল চমৎকার। আমি অবশ্যই বলবো যে, ওই সাক্ষাতকার অনুষ্ঠিত হয়েছে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে। এতে আমি সন্তুষ্ট। খালেদা জিয়া বলেন, আপনারা জানেন যে ওই বৈঠক হয়েছিল ওয়ান-টু-ওয়ান। আমি আসলে পুরোটা বলতে পারবো না যে, আমরা আসলে কি কি বিষয়ে কথা বলেছি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে এটা ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক বৈঠক। মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ হবে কি হবে না এমন একটি দোলাচল যখন সৃষ্টি হয় সে সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি কি কখনও বলেছি মোদিজির সঙ্গে আমি বৈঠক করব না। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানিয়েছি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আপনি কি আমার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন নেতাকর্মীর মুখ থেকে শুনেছেন যে, আমি মোদিজির সঙ্গে বৈঠক করব না। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের নেতা মোদিজি। তিনি দু’দেশের মধ্যকার বন্ধন শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন।

হকার থেকে জিনের বাদশা by নুরুল আমিন ও শাহ মোস্তফা কামাল

জিনের বাদশা বাবুলের সঙ্গে দেখা করতে হলে প্রথমেই পাগলা ডেকচিতে ঢালতে হয় ৩৬১ টাকার নজরানা। এরপর সংগ্রহ করতে হয় সিরিয়াল টোকেন। সিরিয়ালম্যান নাম হাঁকানোর পর পাওয়া যায় জিনের বাদশা বাবুল দর্শনের অনুমতি। সেই অনুমতি পেলেই দর্শানার্থীরা লাভ করেন নতুন অভিজ্ঞতা। জিনের বাদশা বাবুল মিয়া (৩০)কে পুলিশ একটি ধর্ষণ মামলায় আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর বেরিয়ে আসে তার বিচিত্র কায়দায় প্রতারণার বিষয়। সে জীবনের শুরুতে ছিল হকার। সেখান থেকে এখন সে জিনের বাদশাহ। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের বহুল আলোচিত-সমালোচিত বাবুল মিয়া। বাড়ি জগন্নাথপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মৃত নিজাম উদ্দিন। বখাটে বাবুল প্রথমে সিনেমার টিকিট কালোবাজারি করতো। এর সঙ্গে রেলস্টেশন এলাকায় চুরি-ছিনতাইও করতো। কিছুদিন পর এ ব্যবসা বদল করে হকারি ব্যবসায় মনোনিবেশ করে বাবুল। এতে আয় কম থাকায় নামের সঙ্গে শাহ এবং চিশতী লাগিয়ে ঝাঁড়-ফুক, তাবিজ-কবজ বিক্রি শুরু করে। এ ব্যবসা আলোর মুখ দেখতে শুরু করলে বাবুল কিছুদিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। ৩ মাস পর এলাকায় এসে নিজেকে তান্ত্রিক জগতের সাধক বলে প্রচার চালায়। সে এবং তার লোকজন প্রচার করে, বাবুলকে জিনে কামরূপ কামাখ্যা নিয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে তিনি (বাবুল) জিনের বাদশাহী হাসিল করেছেন। এ অবস্থা চলার পর বাবুল নিজস্ব লোক দিয়ে গঠন করে প্রচার ও লাঠিয়ালবাহিনী। স্থানীয় মানুষ জনকে গরু জবাই করে খাওয়ানো পর সমাজে বাবুলের বিষয়ে নমনীয়তা দেখা দেয়। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজ গ্রামে বহুতল ভবনে বাবুল গড়ে তুলে প্রতারণার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাবুলের আধ্যাত্মিকতার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নারী-পুরুষ হুমড়ি খেয়ে পড়তে থাকেন তার আস্তানায়। এখানেই সূচিত হয় বাবুলের নতুন ব্যবসা। বর্তমানে বাবুল কোটিপতি। ভুক্তভোগীরা জানান, ৩৬১ টাকা পাগলা ডেকে সর্মপণ করে জিনের বাদশা বাবুলের কাছে যাওয়ার পর পুরুষ রোগীকে কামরূপ কামাখ্যার তাবিজ-কবজ, পানিপড়া দিয়ে বিদায় করা হয়। এর জন্য ব্যক্তি বিশেষের কাছ থেকে আদায় করা হয় ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। মহিলা রোগী হলে প্রথমে তার ওপর জিনের আছর ফেলা হয়। দাবিকৃত টাকা না দিলে জোর করে ক্যামেরায় বন্দি করা হয় ওই নারীর নগ্ন ছবি। ইন্টারনেটে ছবি ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে নারীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা,স্বর্ণালংকার আদায় করে সে। বাবুলের এসব ব্যবসায় প্রধান কাঁচামাল হিসেবে প্রবাসীর স্ত্রী, স্বামী পরিত্যক্তা ও স্কুল-কলেজের যুবক-যুবতী উল্লেখযোগ্য। গত ১০ই জুন ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর থানার চরকালিবাড়ি গ্রামের মেহেদী হাসানের স্ত্রী সুবর্ণা দাশ (ধর্মান্তরিত) বাবুলের আস্তানায় গিয়ে যথারীতি ধর্ষিত হন। জিনের বাদশা বাবুল কর্তৃক ধর্ষিতা সুবর্ণা দাশ শায়েস্তাগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০০০ এর সংশোধিত ৩ এর ৯(১) মামলা করেন। এ মামলায় বাবুলকে ১১ই জুন আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, বাবুল প্রতারক ও ঠকবাজ। এলাকায় সে জিনের বাদশা বলে পরিচিত। প্রতারক বাবুলের প্রতারণার নানা কাহিনীর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে পুলিশ।

আবাসিক হোটেলে খুন- কিনারা করতে পারে নি পুলিশ by রুদ্র মিজান

রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলো থেকে প্রায়ই লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু রহস্যময় এসব মৃত্যুর কোন কূলকিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হোটেল কর্তৃপক্ষের অনিয়মের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই নিহতের সঠিক নাম-ঠিকানা পর্যন্ত উদ্ঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে না। বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয় লাশ। এসব রহস্যময় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকে সংঘবদ্ধ একাধিক চক্র। নারীদের ক্ষেত্রে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা আর পুরুষের ক্ষেত্রে মানব পাচার ও মাদক ব্যবসা নিয়ে নানা রকম দ্বন্দ্বের কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে।
সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে রয়েছে তিন শতাধিক আবাসিক হোটেল। অনেক হোটেলই কক্ষ ভাড়া দেয়ার বদলে মাদকসহ অবৈধ নানা রকম বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। সন্ত্রাসী, মাদকসেবী, মানব পাচারকারীদের আস্তানা যেন এসব হোটেল। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে প্রায়ই ঘটছে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা। গত নয় বছরে আবাসিক হোটেলগুলো থেকে দেড় শতাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক লাশেরই কোন পরিচয় উদ্ঘাটন করতে পারে নি পুলিশ। হোটেল কর্তৃপক্ষের খাতায় যে ঠিকানা দেয়া হয় তা সঠিক থাকে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় বলেই দুর্বৃত্তরা প্রকৃত নাম-ঠিকানা গোপন করে। নিয়ম অনুসারে হোটেল বোর্ডারদের নাম-ঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্যসংবলিত ফরম পূরণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি প্রদান ও আলোকচিত্র ধারণের নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ হোটেলগুলোই এসব নিয়ম মেনে বোর্ডারদের কক্ষ ভাড়া দেয় না। ২০১০ সালের ১৬ই আগস্ট গুলশানের নিউ এয়ারপোর্ট রোডের হোটেল লর্ডস ইন থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তরুণীকে হত্যা করার অভিযোগে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর নুরুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে সিএমএম আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে পুলিশ, পরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করলেও এ ঘটনার কোন ক্লু উদ্ধার করতে পারে নি। এমনকি ওই তরুণীর সঠিক নাম-ঠিকানাও পাওয়া যায়নি। সূত্রে জানা গেছে, হোটেলের বোর্ডার খাতায় ওই তরুণীর নাম লেখা ছিল সীমা আক্তার। তার সঙ্গী যুবকটির নাম রফিকুল ইসলাম। তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ওই হোটেলের ৫০৩ নম্বর কক্ষে উঠেছিল। ঠিকানা হিসেবে নরসিংদী উল্লেখ করা হলেও সূত্রে জানা গেছে, রফিকুল ইসলামের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর থানার ঘিলারচালা গ্রামে। সূত্র মতে, নারী পাচারকারী চক্রের একজন হচ্ছে এই রফিকুল ইসলাম। প্রেমের অভিনয়, বিয়ে, চাকরিসহ নানা প্রলোভন দিয়ে কিশোরী, তরুণীদের ঢাকায় এনে দেশের বাইরে পাচার করা ও পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করাই হচ্ছে এ চক্রের কাজ। সীমা পরিচয় দেয়া ওই তরুণীকে সেভাবেই ঢাকায় আনা হয়েছিল। হোটেল লর্ডস ইনে তোলার পর তাকে ধর্ষণ করে রফিকুল। পরে কয়েক দালাল ও খদ্দের তাকে ধর্ষণ করে। ওই তরুণীকে পতিতা ব্যবসায় বাধ্য করানোর জন্য নানাভাবে নির্যাতন করা হয় বলে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে। উপর্যুপরি নির্যাতনের কারণে মধ্যরাতে জ্ঞান হারায় ওই তরুণী। ভোরে তাকে ওই কক্ষে ফেলে দালাল ও খদ্দেররা পালিয়ে যায়। পরে তরুণীকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় হোটেলের কর্মচারী আবু তাহের ও শহীদ। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তাকে। এ সময় শহীদ ও তাহের পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের আটক করে পুলিশ। ঘটনা শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নেই। এ ঘটনা থেকে হত্যাকারীদের রক্ষা করার জন্য আরও নাটকীয় ঘটনা ঘটানো হয়। ঢামেক হাসপাতালের মর্গ থেকে লাশ নিয়ে যায় বাগেরহাটের চিতলমারী থানা সদরের লাভলু নামের এক ব্যক্তি। সে ওই তরুণীকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দেয়। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে তিন দিন পর রহস্যজনকভাবে লাশটি আবার গুলশান থানায় দিয়ে যায় লাভলু। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এ ঘটনায় কাউকেই আটক করেনি পুলিশ। ওই মামলার বাদী নুরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, প্রতিটি তারিখেই আদালতে উপস্থিত ছিলেন তিনি। কিন্তু গত মে মাসে একটি তারিখে হাজির না হলে মামলাটি খারিজ করে দেন আদালত। তার আগে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে মামলার কোন ক্লু উদ্ঘাটন করতে পারেন নি তিনি। এমনকি নিহতের সঠিক নাম-ঠিকানাও পাওয়া যায়নি।
একইভাবে ২০১২ সালে রামপুরার হোটেল মিরাজ থেকে সুমির নামের এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায়ও আদালতে মামলা করা হয়। মামলা করার পর সুমির নাম-পরিচয় পাওয়া যায়। সূত্র মতে, একই উদ্দেশ্যে তাকে ওই হোটেলে নিয়ে তোলে দুর্বৃত্তরা। পতিতাবৃত্তিতে রাজি না হলে গণধর্ষণ করা হয় তাকে। প্রতিবাদ করলে একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা যায়নি।
গত বছরের ৯ই নভেম্বর বড় মগবাজারের গ্রিন টাওয়ার আবাসিক হোটেল থেকে আসাদুজ্জামান নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই বছরে শাহবাগের উত্তরবঙ্গ আবাসিক হোটেলের ২১১ নম্বর কক্ষ থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার আগে ২০১৩ সালের ২৫শে নভেম্বর মহাখালীর আল-মদিনা হোটেল থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তার নাম মো. হেলাল উদ্দিন। একই বছরে দক্ষিণখান থানার হোটেল ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১২ সালে মহাখালীর যমুনা হোটেল থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। একই বছরে হোটেল মতিঝিল থেকে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়। তার আগের বছর শিল্পাঞ্চল থানার হোটেল মহাখালী থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২০১০ সালে ফকিরাপুলের হোটেল রাকীবের চতুর্থ তলার একটি কক্ষ থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০০৯ সালে ফকিরাপুলের হোটেল জোনাকী (বর্তমানে আল-আকসা) থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার আগের বছর ওই এলাকার হোটেল আতিক থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। একই বছরে আরামবাগের হোটেল আল-ফয়সলের দ্বিতীয় তলার কক্ষ থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২০০৭ সালে নবাবপুরের মর্ডান আবাসিক হোটেল থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০০৬ সালে ফকিরাপুলের হোটেল আল-হেলাল থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছর মতিঝিলের কাজী জসিম উদ্দিন রোডের হোটেল টাওয়ারের পঞ্চম তলা থেকে এক তরুণীর বিবস্ত্র লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশটি ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল।
এ বিষয়ে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আলমগীর সেলিম জানান, হত্যাকাণ্ডগুলো নানা কারণে ঘটে। একটি অংশ নিজেদের শারীরিক চাহিদার জন্য ভুল তথ্য দিয়ে হোটেলের কক্ষ ভাড়া করে। এ ক্ষেত্রেও তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বোর্ডার পরিচিত হওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষ কোন তথ্যই লিপিবদ্ধ করে না। পরে যে কোন বিষয় নিয়ে নারী-পুরুষের দ্বন্দ্বের জের ধরে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটে। দুষ্কৃতকারীদের আরেক অংশ মিথ্যা প্রেমের অভিনয় করে, বিয়ে, চাকরি ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে হোটেলে নিয়ে যায় তরুণীদের। পরে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার জন্য নির্যাতন করা হয়। গণধর্ষণ, মারধর কোন নির্যাতন থেকেই রেহাই দেয় না দুর্বৃত্তরা। এসব কারণেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া অর্থ লুটসহ শত্রুতার জের ধরেও ঘটে হত্যাকাণ্ড। এসব হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হত্যার পর লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এজন্য হোটেল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের দায়ী করেন আলমগীর সেলিম। তিনি জানান, নানা তথ্যসংবলিত ফরম পূরণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি গ্রহণ ও আলোকচিত্র ধারণের নিয়ম থাকলেও হোটেলগুলো তা না মেনেই বোর্ডারদের কক্ষ ভাড়া দিয়ে থাকে। যে কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও সঠিক তথ্যের অভাবে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।
হোটেলগুলো থেকে গত কয়েক বছরে কতগুলো লাশ উদ্ধার করা হয়েছে আলাদাভাবে এর কোন হিসাব পাওয়া যায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, অতীতে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও সঠিক তথ্যের অভাবে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে এখন কড়া নজরদারিতে রয়েছে হোটেলগুলো। আইন ভঙ্গ করলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

কারখানা সংস্কারে ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ চায় বিজিএমইএ by এমএম মাসুদ

তাজরীন ফ্যাশন্সে আগুন ও রানা প্লাজা ধসের পর দেশের পোশাক কারখানাগুলো সংস্কারে বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। সেই সংস্কারে সরকারের কাছে সহজ শর্তে ১৬ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সুবিধা চেয়েছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমএই। কারখানা সংস্কারের ব্যয়ের একটি খসড়া হিসাব অর্থমন্ত্রীর কাছে দিয়েছে সংগঠনটি। তাতে কারখানাপ্রতি ৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ৩ হাজার ২০০ কারখানা সংস্কারে ১৬ হাজার কোটি টাকার দরকার পড়বে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জানা যায়, কারখানা সংস্কারের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা থেকে শুরু করে দূর করতে হচ্ছে স্থাপত্য দুর্বলতা। নিশ্চিত করতে হচ্ছে অগ্নি নিরাপত্তাও। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সদস্যভুক্ত সচল কারখানা রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০টি। উত্তর আমেরিকার ক্রেতাজোট অ্যালায়েন্সের মূল্যায়নে কারখানাগুলোয় ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। এর মধ্যে অগ্নি ও বৈদ্যুতিক ত্রুটিই সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি রয়েছে অবকাঠামো ত্রুটিও। অন্যদিকে ইউরোপীয় ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড কারখানাগুলোর ত্রুটি চিহ্নিত করেছে ৫০ হাজারের বেশি। এসব ত্রুটি সংশোধনে প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যই আমদানি করতে হবে কারখানা কর্তৃপক্ষকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সংস্কার কার্যক্রমে ব্যয় করতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, একেকটি কারখানা সংস্কারে উদ্যোক্তাদের ন্যূনতম আড়াই থেকে ৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এ কারণে সরকারের কাছে আমরা বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রত্যাশা করছি। সূত্র জানায়, এ বিষয়টি ক্রেতাজোটগুলোর হিসাবেও উঠে এসেছে। অ্যালায়েন্স তাদের তালিকায় থাকা কারখানার প্রাথমিক পরিদর্শন শেষে সংস্কারে সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি ধারণা দিয়েছে। তাদের দাবি, ত্রুটি সংশোধনে কারখানাপ্রতি খরচ হবে গড়ে ২ কোটি টাকা। এ হিসাবে সক্রিয় ৩ হাজার ২০০ কারখানা সংস্কারে প্রয়োজন হবে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠার ফলেই দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় রয়েছে প্রাণঘাতী ত্রুটি। স্থাপত্য দুর্বলতার কারণে ভাড়াবাড়িতে গড়ে তোলা কারখানা স্থানান্তরে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। আবার নিজস্ব ভবন হলে সংস্কারের মাধ্যমে সব ধরনের ত্রুটি দূর করতে হচ্ছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈদ্যুতিক তার পরিবর্তন থেকে শুরু করে অগ্নি প্রতিরোধক ও মজবুত স্থাপত্য ব্যবস্থার জন্য বিপুল অঙ্ক ব্যয় করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। নতুন করে নিজস্ব জমিতে পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তুলতেও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন।
এদিকে ক্রেতারা কারখানার ত্রুটি চিহ্নিত করলেও প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানে এগিয়ে আসছে না বলে অভিযোগ পোশাক শিল্প মালিকদের। এ বিষয়ে বিজিএমইএ সহ-সভাপতি আজিম বলেন, ক্রেতাদের পক্ষ থেকে দুই-একজন পেলেও, সার্বিকভাবে কোন ঋণ বা অর্থসহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রেতাজোট তাদের প্রতিশ্রুতি যত দ্রুত বাস্তবায়ন করবে, ততই ভাল। কারণ এরই মধ্যে উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কোন উৎস থেকে কম সুদে এ ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতাজোট ঋণ সুবিধার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি শর্তও জুড়ে দিচ্ছে। সংস্কার কার্যক্রমের সরঞ্জাম কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কিনতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে। অন্যদিকে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) একটি বিশেষ ঋণ সুবিধার ঘোষণা দিলেও কঠিন শর্তের কারণে অনেকেই তাতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
রপ্তানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, তৈরী পোশাক কারখানা কমপ্লায়েন্ট করতে স্বল্প সুদে ঋণ এখন সময়ের দাবি। কারণ আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্ট কারখানা গড়তে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। অনেক কারখানা মালিকই অর্থাভাবে এ কার্যক্রম হাতে নিতে পারছেন না। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সরকারি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৫৫৫টি কারখানার পরিদর্শন শেষ হয়েছে। অর্থাৎ আরও প্রায় ১ হাজার কারখানা পরিদর্শন বাকি রয়েছে।

বিমানবন্দর রেলস্টেশন- দুর্ভোগ থেকে যাত্রীদের মুক্তি নেই by সামছুর রহমান

বিমানবন্দর রেলস্টেশনে যাত্রীদের বসার চেয়ার ভাঙা।
দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের l ছবি: প্রথম আলো
সামনের ভাঙাচোরা সড়ক, বেদখল হওয়া ফুটপাত, ময়লা-আবর্জনা, ভবঘুরে-মাদকাসক্তদের উৎপাত, নারীদের পৃথক শৌচাগার না থাকাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশন। তাই স্টেশনে প্রবেশের সময় থেকে পদে পদে যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানবন্দর গোলচত্বর থেকে স্টেশনের সামনের প্রায় ২০০ গজ সড়ক ভাঙাচোরা, এবড়োখেবড়ো। সড়কে জমে থাকা হাঁটু পরিমাণ পানি না মাড়িয়ে স্টেশন চত্বরে ঢোকার উপায় নেই। কয়েকজন যাত্রী বেশ কসরত করে লোহার গ্রিলের ওপর দিয়ে স্টেশন চত্বরে ঢোকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। ওই সড়ক দিয়ে যানবাহন পার হলেই জমে থাকা পানিতে ঢেউ উঠছে। তা দেখে এক পথচারীর সরস মন্তব্য, ‘পদ্মা সেতু তো আগে এখানে দরকার!’
পরিবার নিয়ে রাজশাহীতে যাওয়ার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন খালেদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাসা উত্তরায় বলে বাধ্য হয়ে এই স্টেশন ব্যবহার করি। না হলে পরিবার নিয়ে এখানে আসতাম না।’
দেখা গেল, স্টেশনের সামনের সড়ক দিয়ে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা যাওয়ার সময় পানি ঢুকে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে সড়কের মাঝে থেমে আছে। আর সড়কের ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে গাড়ি মেরামতের দোকান, খাবারের দোকান, বিভিন্ন রুটে চলা বাসের টিকিট কাউন্টার।
স্টেশন চত্বরের আঙিনায় কয়েক জায়গায় ময়লা স্তূপ করে রাখা। ময়লার পাশে লোকজন প্রকাশ্যে মূত্র ত্যাগ করছে। ময়লা ও বৃষ্টির পানি মিলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। স্টেশনের ভেতরেও ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় ময়লার স্তূপ। স্টেশনের সামনের দিকের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় নোংরা পানি জমে আছে।
মূল স্টেশনে প্রবেশের ফটকের সামনে দীর্ঘ সারি। প্রবেশমুখ প্রায় বন্ধ। কারণ, স্টেশনের বাইরেই জামালপুরগামী কমিউটার ট্রেনের টিকিট কাউন্টার। যাত্রীরা টিকিট কেনার জন্য এমনভাবে দাঁড়িয়েছেন, অন্য যাত্রীদের স্টেশনে ঢুকতে-বেরোতে কষ্ট করতে হচ্ছে।
রেলস্টেশনের ভেতরে শৌচাগারে জায়গা ফাঁকা নেই বলে সারিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন সাত-আটজন। তাঁদের মধ্যে একজন নারীও আছেন। কারণ নারীদের জন্য পৃথক কোনো শৌচাগার নেই। চট্টগ্রামগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেসের এক নারী যাত্রী শৌচাগারে যেতে এভাবে পুরুষদের সঙ্গে সারিতে দাঁড়াতে হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি বলেন, ‘এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি লজ্জিত।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনের যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করছিলেন তিনজন চেকার। তাঁদের একজন টিকিটবিহীন দুই যাত্রীকে টেনে নিয়ে গেলেন টিসি কার্যালয়ের সামনে। কিছুক্ষণ কথা বলে চেকারের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে চলে গেলেন দুই যাত্রী। কোনো রসিদ ছাড়া এভাবে টাকা নিলেন কেন, জানতে চাইলে তিনি উদ্ধত হয়ে ওঠেন। নাম জানতে চাইলে বলেন, ‘নাম দিয়ে কী হবে? টাকা দিছে, নিছি।’
এক প্ল্যাটফর্ম থেকে আরেকটিতে যাওয়ার জন্য পদচারী সেতু থাকলেও সীমিতসংখ্যক যাত্রীকেই তা ব্যবহার করতে দেখা যায়। সবাই ঝুঁকি নিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়েই পার হচ্ছে। পদচারী সেতুতে ওঠার পথেই বিপত্তি। পদচারী সেতুর সিঁড়িতে পরে আছে মনুষ্য বর্জ্য। কোনো যাত্রী তা পা দিয়ে মাড়ানোয় ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ।
স্টেশনের এ অবস্থা নিয়ে কথা বলতে স্টেশনমাস্টার হরি গোপাল সেনের কক্ষে গেলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘এখন কোনো কথা নেই। আপনি পরে আসেন।’ পরে কখন জানতে চাইলে তিনি কোনো সময় উল্লেখ করেননি। এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর খোঁজ করলে তাঁকে আর কক্ষে পাওয়া যায়নি।

১৫ বছরেই নতুন গ্রহ আবিষ্কার

মাত্র ১৫ বছর বয়সে নতুন গ্রহ আবিষ্কার করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে ইংল্যান্ডের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টার্ন টম ওয়্যাগ। নয়া গ্রহের নাম খুঁজতে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্ম অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্লাস করতে গিয়ে আস্ত একটি গ্রহই খুঁজে বের করেছিল ব্রিটিশ কিশোর টম ওয়্যাগ। দু’বছর পর তার আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে জিনিভা ও লিজ বিশ্ববিদ্যালয়। মাপ ও ভরের প্রয়োজনীয় মানদণ্ড বজায় থাকার কারণে ভিন্ন সৌরমণ্ডলের গ্রহ পর্যায়ভুক্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। টম জানিয়েছে,
কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াস্প প্রকল্প (ওয়াইড অ্যাঙ্গেল সার্চ ফর প্ল্যানেটস) মারফত পাওয়া সব তথ্য তল্লাশি করেই নতুন গ্রহের খোঁজ পাওয়া যায়। রাতের আকাশে লাখ-কোটি তারা, গ্রহ, উপগ্রহ ও অন্যান্য মহাজাগতিক চরিত্র স্ক্যান করে ওয়াস্প। সেই ছবি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার নজর পড়ে প্রায় ১০০০ আলোক বর্ষ দূরত্বের এক নক্ষত্রের আলো সেকেন্ডে কয়েক হাজার ভগ্নাংশ সময়ের জন্য স্তিমিত হচ্ছে। অর্থাৎ তারার আলো আড়াল করেছে তার সামনে চলমান কোনো বস্তু। লক্ষণ দেখে গ্রহের অস্তিত্বের সম্ভাবনা সম্পর্কে সন্দিহান হয় সে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে আর কারও চোখে বিষয়টি ধরা পড়েনি। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টমের আবিষ্কৃত গ্রহটির মাপ বৃহস্পতির কাছাকাছি। মাত্র দু’দিনে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে এই গ্রহ। আপাতত বেনামি গ্রহটিকে ওয়াস্প-১৪২বি নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তার নামকরণের জন্য কিছু দিনের মধ্যে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে চলেছে কিল বিশ্ববিদ্যালয়। স্বভাবতই গোটা বিষয় নিয়ে উত্তেজিত টম। এক সাক্ষাৎকারে সে জানিয়েছে, ‘এত দূরের নতুন এক গ্রহ খুঁজে পেয়ে আমি খুব উত্তেজিত।’

হিলারির সাক্ষাৎ ফি ২৭০০ ডলার!

যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সাক্ষাৎ ফি ২৭০০ ডলার! নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে তিনি নিজেই এ ফি নির্ধারণ করেছেন। তবে যে আসবে সেই সাক্ষাৎ পাবে- এত সোজা নয়। কেবল তার নির্বাচিত ব্যক্তিদের সঙ্গেই মন খুলে কথা বলবেন বিনিময়ে তার কাছ থেকে নেবেন ২৭০০ ডলার। নির্বাচনী প্রচারণায় চমক সৃষ্টি করতে সম্প্রতি ‘কনভার্সেশন উইথ হিলারি’ নামে এক সুপার প্যাকের আয়োজন করছেন হিলারি। এদিকে তহবিল সংগ্রহে পিছিয়ে নেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী জেব বুশ। তিনি তার সুপার প্যাকে প্রত্যেক সমর্থকের কাছ থেকে নিচ্ছে ১০০০০ ডলার। তবে মোট অংকের দিক দিয়ে এগিয়ে হিলারি। খবর এএফপি। তহবিল সংগ্রহ করার জন্য ২০১০ সালে তৈরি হয়েছে নতুন আইন। আর এ আইনের আওতায় তহবিল সংগ্রহে কোনো সীমা নির্ধারিত হয়নি। তাই নির্বাচনী প্রচারণায় চলছে ডলারের ছড়াছড়ি।
হিলারি ক্লিনটন তার নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে ‘লাঞ্চ ডিনার সুপার প্যাক’ বাদ দিয়ে ‘কনভার্সেশন সুপার প্যাকে’র আয়োজন করেছেন। এ আয়োজনে সমার্থকরা তার সঙ্গে করমর্দন ও সংক্ষিপ্ত সময় আলোচনার সুযোগ পাবেন। বিনিময়ে পকেট থেকে খসাতে হবে ২৭০০ ডলার। সপ্তাহে এমন আয়োজনের মাধ্যমে হিলারি অন্তত চার থেকে ছয়বার ধন কুবেরদের সঙ্গে দেখা করছেন। হিলারি ক্লিনটন এ যাবত ৪০টি তহবিল সংগ্রহের ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছেন। তার নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী মহল, বন্ধু আত্মীয়স্বজন, প্রভাবশালী ডেমোক্রেটস, কার্যনির্বাহী, এক সহযোগী ফেসবকু প্রতিষ্ঠাতা, স্বামী বিল ক্লিনটন, ক্লিন এনার্জি বিলিওনিয়র টম স্টেফারসহ আরও অনেকে। এমনকি, তার তহবিল সংগ্রহ করতে ২৯ জুন গান গাইবেন বিখ্যাত রকার বন জোভি। অন্যদিকে তাকে টেক্কা দিতে একের পর এক কৌশল আবিষ্কার করে যাচ্ছেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী জেব বুশ।
জেব তার সমর্থকদের কাছ থেকে প্রতি ইভেন্টে তুলছেন ১০০০০ ডলার। প্রসঙ্গত, নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করতে সুপার প্যাক পদ্ধতি প্রথম বারের মতো ব্যবহার করেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১২ সালের নির্বাচনে তিনি সর্বমোট ১০০ কোটি ডলার তুলেছিলেন। তবে হিলারি ও জেব ওবামার চেয়েও বহুগুণ বেশি তহবিল তুলছেন। নির্বাচনী তহবিলের মোটা অংকটি আসছে পুঁজিপতিদের কাছ থেকে। আর এ জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই তাদের কাছ থেকে তহবিল আদায়ের এ প্রতিযোগিতার নিন্দা জানিয়েছে অনেকেই। হিলারি ক্লিনটন নির্বাচনে জয়ী হলে আনপেইড স্পিস অর্থাৎ বিনা পারিশ্রমিকে ভাষণ দেয়ার ঘোষণা দেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। তিনি সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতে বক্তৃতার জন্য কোনো সম্মানী নেবেন না।

মানব পাচার- নৌপথে মর্মন্তুদ অভিবাসন ও দাসপ্রথা by জহির আহমেদ

অজানা গন্তব্যের খোঁজে সাগরে ভাসছে মানুষ
২০১৫ সালের শুরুতে ১০১তম বিশ্ব অভিবাসন দিবস উপলক্ষে ভ্যাটিকানের পোপের বাণীটি তাৎপর্যপূর্ণ। বাইবেলকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন যে, ‘আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে খাবার দিয়েছিলে; আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে সুপেয় পানীয় দিয়েছিলে; আমি আগন্তুক ছিলাম, তুমি আমাকে স্বাগত জানিয়েছিলে; আমি নগ্ন ছিলাম, তুমি আমাকে বস্ত্র পরিধান করিয়েছিলে; আমি যখন অসুস্থ ছিলাম, তখন তুমি আমাকে দেখতে এসেছিলে; আবার আমি যখন কারাগারে ছিলাম, তুমি তখনো আমার কাছে এসেছিলে।’ অভিবাসী ও শরণার্থীকে ভালোবাসা খ্রিষ্টধর্মের প্রাণভোমরা। কারণ, যিশুখ্রিষ্টের বাণী সর্বপ্রথম পৌঁছেছিল বেথলেহেমের গরিব আর উদ্বাস্তু মানুষের কাছে। এই বাণীর একপর্যায়ে পোপ বলেছেন যে, বর্তমান যুগ অভিবাসনের যুগ, বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে যাচ্ছে, ভয় আর আকাঙ্ক্ষায় ভরপুর তাদের স্যুটকেসগুলো। একটি অনিশ্চিত ও বিপৎসংকুল অথচ আশাবাদী মানুষগুলো জীবনধারণের খোঁজে ঘর থেকে বের হয়েছে। কিন্তু তাতে কী?
বাংলাদেশের নাগরিকদের ব্যাংকক, ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জীবিকার সন্ধানে যে বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে এবং গহিন অরণ্যে তাদের গণকবরের যে নিরন্তর সন্ধান মিলছে, তা আমাদের হতবিহ্বল করে, অভিসম্পাত দেয়। আফ্রিকার দাসদের করুণ মৃত্যুর যে বয়ান ইতিহাসের কাছ থেকে আমরা পাই, বাংলাদেশের অভিবাসীদের সাম্প্রতিক ঘটনা সে কথা আর একবার মনে করিয়ে দেয়।
২০০৬ সালে আফ্রিকার অভিবাসন-সংক্রান্ত গবেষণায় অংশ নিতে আমি ঘানায় তিন সপ্তাহের জন্য যাই। অন্য সতীর্থদের সঙ্গে আমিও আলমিনা ক্যাসেলে যাই। এটা হচ্ছে আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো এবং বৃহদাকার দাসের কেন্দ্র। গাইডের বয়ান, খোদাই করা লিখিত বার্তা আর মনোজগতে আফ্রিকার উপনিবেশবাদের যে প্রবল বঞ্চনার কথা আমি পরিচিত ছিলাম, তার চাক্ষুষ প্রমাণ আমাকে মানুষ হিসেবে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। এই ক্যাসলটি বর্তমানে একটা জাদুঘর। গাইডের বয়ানে আলমিনার স্থানীয় ইতিহাস এবং দুই শ বছরের ট্রান্স-আটলান্টিক দাস ব্যবসার যে মর্মন্তুদ ইতিহাস ছিল, সেটি কিঞ্চিৎ হলেও অনুধাবন করা যায়।
ক্যাসলের ভেতরে শুরুতেই কতগুলো সেল/প্রকোষ্ঠ পাশাপাশি অবস্থিত। প্রথম সেলগুলোতে সাদা চামড়ার সৈনিকের কথা লেখা রয়েছে। তারা যদি নারী দাসদের ধর্ষণ করত, তাহলে শাস্তিস্বরূপ তাদের কিছু সময়ের জন্য এই সেলগুলোতে রাখা হতো। পরের সেলগুলোতে স্থান হতো বিদ্রোহী দাসদের, যাদের মৃত্যু পরোয়ানার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। কিছু সেলে নারী দাসদের শিকল পরিয়ে উপুড় করে রাখা হতো। তাদের রক্তস্রাব, মূত্র ও মলের মধ্যেই থাকতে হতো। এই সেলগুলোর পরেই একটা বারান্দা রয়েছে, যেখানে কমান্ডিং অফিসার দাঁড়িয়ে থাকত। তির্যক দৃষ্টি রাখত কোন নারী দাসকে সে শয্যাসঙ্গিনী করবে, কাকে ধর্ষণ করবে, তা এখান থেকে সে সিদ্ধান্ত নিত। এই সাদা চামড়ার অফিসাররা প্রথমে ছিল পর্তুগিজ এবং পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ।
এরপর দোতলায় রয়েছে অনেকগুলো কক্ষ, যেখানে কমান্ডিং অফিসার বিশাল একটি রুমে থাকত। রয়েছে দুটি রান্নাঘর। গাইড জানিয়েছে যে বিজিত পর্তুগিজদের রান্নাঘর বিজয়ী ইংরেজরা ব্যবহার করতে চায়নি। এ কারণে যে পর্তুগিজরা হয়তো শত্রুতাবশে রান্নাঘরে বিষ রেখে যেতে পারে এবং তাদের মৃত্যু হতে পারে। দোতলার পশ্চিম প্রান্তের ঠিক নিচতলায়, যেখানে বিদ্রোহী দাসদের পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়। যে সেলটির সামনে লেখা আছে ‘ডোর অব নো রিটার্ন’। খোদাই করা বার্তা থেকে আমি উদ্ধার করলাম যে ওই সেলে অপর প্রান্তটি ঠিক মেঝে বরাবর একটি খোলা ছোট সুড়ঙ্গ রয়েছে, যেখানে দাসদের প্রস্তুত রাখা হতো। কারণ, ওপাশে জাহাজের পাটাতন তার জন্য অপেক্ষা করছে। ঠিক এভাবেই দাসদের জাহাজে করে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাচার করত।
দুই...
বিদেশে চাকরি দেওয়ার কথা বলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের নৌকায় তুলে নেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে তারা নৌপথে মালয়েশিয়ার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এজেন্টদের কথা অনুযায়ী তারা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে মালয়েশিয়ার ভূখণ্ডে পৌঁছাতে চেয়েছিল। ঠিকমতো খাবার পাচ্ছিল না যারা, তারা নৌকার মধ্যে অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে যায়। গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, ১২৩ বাংলাদেশির সন্ধান মিলেছে ওই গহিন অরণ্যে। আর একের পর এক গণকবরের সন্ধান মিলছে। থাইল্যান্ডের পুলিশের সূত্রে জানা যায়, পাচারের উদ্দেশ্যে এসব মানুষকে জঙ্গলে নিয়ে আটকে রাখা হয়। তারপর তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। বেশির ভাগেরই মৃত্যু ঘটে। তাদের স্থান হয় অগভীর গণকবরে।
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় থেকেও জানা যায় যে আচেহ প্রদেশের উত্তরে সমুদ্রের মাঝ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৬৯ জন অভিবাসীকে। জেলেরা জানিয়েছে যে আচেহর উত্তরে সমুদ্রের মধ্যে একটি নৌকায় আটকে রয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। পুলিশ এসব অভিবাসীকে উদ্ধার করে; যাদের সবাই বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা এবং যার অর্ধেকই শিশু ও নারী। এই মানব পাচারের এজেন্টরা প্রথমে মিয়ানমার থেকে থাইল্যান্ডের দক্ষিণে পৌঁছায়। সেখানে তাদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। যারা মুক্তিপণ দিতে পারে না, তাদের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু। একইভাবে থাইল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয় মানুষকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে। তারা ছুটতে থাকে প্রবল ঝুঁকি নিয়ে। পাচারের সময়ে মানুষকে গাদাগাদি করে নৌকায় কিংবা জঙ্গলে রাখা হয় এবং তাদের বিক্রি করা হয়। আলমিনা থেকে যেভাবে জাহাজে করে দাসদের নিয়ে যাওয়া হতো ইউরোপে, একইভাবে নৌকায় বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন ভূখণ্ডে যেভাবে পাচার করা হচ্ছে, তা আমাদের আতঙ্কিত করে তোলে।
তিন...
পোপের মর্মবাণী দিয়ে আমি শুরু করেছিলাম যে, অভিবাসন মানুষের মৌলিক অধিকার, সেটি বড় প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলমিনায় ‘ডোর অব নো রিটার্ন’ সম্পর্কে যে বিষাদময় বর্ণনা আমরা ওপরে লক্ষ করি, সেটি রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, শ্রম ও প্রবাসী—এই চারটি মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে ব্যয়বহুল মিশনের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও নাগরিকের মর্মান্তিক অন্তর্যাত্রা আমাদের কি আলোড়িত করে না? আলমিনার শেষ সেলে যেখানে দাসদের আর পেছনে ফেরার সুযোগ থাকত না, তাদের চলে যেতে হতো জাহাজে করে পণ্য হিসেবে। দরজায় খোদাই করা উক্তিটি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হতে পারে: ‘আমাদের পূর্বসূরিদের উদ্দেশে, যারা মৃত্যুকে বরণ করেছ; তোমরা শান্তিতে ঘুমাও, এখানে মানবতা আর কখনোই পরাজিত হবে না; এখানে অন্যায় মানবতার বিরুদ্ধে আর দাঁড়াবে না, আমরা চিরদিন তোমাদের স্মরণ করব।’
ওপরের বচনগুলো পড়তে পড়তে চোখে জল চলে আসে। আমি গেটের বাইরে চলে আসি। মাটিতে স্থাপিত একটি বড় দিগ্দর্শনযন্ত্র সচল থাকতে লক্ষ করি। লেখা আছে: ‘বিজ্ঞানের আলোকময়তা এই দিগ্দর্শনযন্ত্র’। বিজ্ঞানকে সাধুবাদ জানাই, কিন্তু এই বিজ্ঞানের আবিষ্কার যে কত মর্মস্পর্শী এবং শোষণের যন্ত্র, সেটি ঘানাসহ আফ্রিকার দাসদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশিদের নৌপথে অভিবাসনের দিগ্দর্শন কে ঠিক করবে? অকূল সাগরে নিগৃহীত ভাসমান এই পরিচিতিহীন অভিবাসীদের দায়ভার কে নেবে? মানব পাচারকারী, রাষ্ট্র, সরকার, জাতিসংঘ কিংবা মুনাফালোভী গোষ্ঠী? আলমিনা ক্যাসলের দৃশ্যমান কম্পাস পর্তুগিজ আর ইংরেজ বেনিয়াদের দিকনির্দেশক আর মানব পাচারকারীদের দিকনির্দেশক হচ্ছে রাষ্ট্র ও তার উচ্ছিষ্টভোগীদের নয়া ঔপনিবেশিক মুনাফা, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে অভিবাসীদের শবযাত্রা।
ড. জহির আহমেদ: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
zahmed69@hotmail.com

কালসী হত্যাকাণ্ডের ১ বছর- গ্রেপ্তার হয়নি একজনও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে by আল-আমিন

ঢাকার পল্লবীর কালসীর বিহারি পল্লীতে একই পরিবারের ৯ জনসহ ১০ জনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় এক বছর হতে চলছে। ওই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়নি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পল্লবী থানায় বাদী হয়ে ২টি ও বিহারীদের পক্ষ থেকে ৪টিসহ ৬টি মামলা দায়ের হয়েছিল। ঘটনার দুইদিন পর ওই মামলাগুলো তদন্তের জন্য থানা পুলিশ ডিবি পুলিশের  কাছে হস্তান্তর করেছিল। কিন্তু, ডিবি পুলিশও কার্যত ওই মামলার কোন রহস্যের কিনারা করতে পারছেন না। তবে ডিবি পুলিশ বলছে, মামলাটি সংবেদনশীল হওয়ার কারণে ধীরগতিতে তদন্ত করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই ঘটনার মূল কারণ ও প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু, নিহতের পরিবার ও কুর্মিটোলা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই  পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত স্থানীয় ও প্রভাবশালীরা। পুলিশের ছত্রছায়াই তারা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরছে। অথচ পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না। শুধু তাই নয়। তারা মামলার তদন্তে পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ করেন। ওই ঘটনার মদদ দেয়ার অভিযোগ উঠে স্থানীয় সরকারি দলীয় এমপি ইলিয়াস আলী মোল্লার দিকে। কিন্তু, ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। ২০১৪ সালের ১৪ই জুন রাত সাড়ে ৩টায় গভীর রাতে শবেবরাতের রাতে আতশবাজিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পল্লবীর কালসীতে বিহারীদের সঙ্গে পুলিশ ও স্থানীয় জনতার সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ দুপুর সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলতে থাকে। এতে দুর্বৃত্তরা কালসীর রাস্তার ধারে কয়েকটি ঘরে তালা লাগিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে একটি ঘরে আটকা পড়ে একই পরিবারের ৯ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন। আর রাতের বেলায় পুলিশের গুলিতে স্থানীয় এক যুবক নিহত হন। নিহতরা হলেন, নিহতরা হলেন- সাহানী বেগম (২৩), তার ছেলে মারুফ (৩), তার মা বেবি (৪০), সাহানির বোন আফসানা (২২)।  অপর একটি পরিবারের নিহত সদস্যরা হচ্ছেন রুচি (১০), রুচির ভাই আশিক (২২) এবং আশিকের স্ত্রী শিখা (১৯)। লালু (১১) ও ভুলু (১১) নামের দুই যমজ ভাইও ছিল। এ ছাড়াও আজাদ (৩৫) নামে একজন অবাঙালি যুবকও নিহতের তালিকায় ছিল। এ ঘটনায় প্রায় উভয় পক্ষের প্রায় ৫০ জন আহত হন। সূত্র জানায়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার স্থাপিত রাজু বস্তিতে পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে বিদ্যুৎ  লাইনের সংযোগ স্থাপন নিয়ে আগে থেকেই স্থানীয়দের সঙ্গে বিহারীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল। ওই দ্বন্দ্বের জেরে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। ওই ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্থানীয় ও বিহারীসহ ৭ জনকে পুলিশ আটক করেছিল। পুলিশ তাদের দুইদিনের রিমান্ডেও নেয়। কিন্তু, তাদের কাছে কোন তথ্য না পাওয়া যাওয়ায় তাদের কারাগারে পাঠায় আদালত। তারা সবাই কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বের হয়ে এসেছেন। এ ঘটনার পরের দিন পল্লবী থানায় ৬টি মামলা করা হয়। স্থানীয় ও ক্ষতিগ্রস্তরা বাদী হয়ে ৪টি মামলা করেন। তাদের মামলা নম্বর- ২৭ থেকে ৩০। পুলিশ বাদী হয়ে ২টি মামলা করেন। মামলা নম্বর-৩১ ও ৩২। ওই ৬টি মামলা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা গ্রহণ করেন ওই সময়ের ডিবি পশ্চিমের ডিসি শেখ নাজমুল আলম। পল্লবী থানার ওসি দাদন ফকির জানান, ঘটনার দুইদিন পরেই মামলাগুলো ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা বিষয়টি এখন তদন্ত করছে। ওই মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এডিসি (পশ্চিম) সাইফুল ইসলাম জানান, কালসীর ঘটনার প্রায় ১ বছর হয়ে আসছে। ওই ঘটনার মামলার দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়নি। কেউ গ্রেপ্তারও নেই। তিনি আরও জানান, ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। খুব শিগগিরই ওই হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটন ও খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে।  তবে মামলা তদন্তের সঙ্গে জড়িত এক ডিবি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বিদ্যুৎ লাইনের সংক্রান্তের বিরোধ এবং বিহারীদের মধ্যে তীব্র পুলিশ বিদ্বেষী মনোভাবের কারণেই ওই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রাজু বস্তির লোকজন কুর্মিটোলা ক্যাম্প থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার জন্য চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু, এতে বাধা প্রদান করেন কুর্মিটোলার বাসিন্দারা। ঘটনার আগের ১১ই জুন রাতে বিহারীদের সঙ্গে রাজু বস্তির লোকজনের কথা কাটাকাটি হয়। ওই বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে ডিবি পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। গতকাল সকালে সরজমিনে কুর্মিটোলা বিহারী ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ওই লোমহর্ষক ঘটনায় এখন বিক্ষুব্ধ স্থানীয় ও ক্ষতিগ্রস্তরা। তারা হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি করেছেন। নিহত সাহানি বেগমের চাচাতো বোন আসমা বেগম বলেন, দুর্বৃত্তদের আগুনে আমাদের আত্মীয়স্বজনদের হারিয়েছে। যারা ওই হামলার সঙ্গে জড়িত তারা কেউ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি। কারা সেদিন ওই নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে সব পুলিশ জানে। কিন্তু, পুলিশ তাদের  গ্রেপ্তার করছে না। নিহত আজাদের বন্ধু আসলাম হোসেন জানান, ওই ঘটনার পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ ছিল স্থানীয় এমপির। হামলার সঙ্গে জড়িত তারা সবাই এমপির লোক। পুলিশ তাদের ধরছে না। এ বিষয়ে বিহারীদের সংগঠন উর্দু স্পিকিং পিপলস ইউথ রিহ্যাবিলিট্যাশন মুভমেন্টের সভাপতি সাদাকাত হোসেন খান জানান, ঘটনার পর পুলিশ দাবি করেছিল ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও খুনিদের গ্রেপ্তার করার জন্য। কিন্তু, ১ বছর হয়ে যাচ্ছে কোন অগ্রগতি হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হামলার সময় আমাদের লোকজন স্টিল ক্যামেরায় কিছু ফুটেজ সংগ্রহ করেছিল। ওই ফুটেজগুলো পুলিশকে আমরা দিয়েছিলাম। ওই ফুটেজে স্পট দেখা যাচ্ছে যে, হামলায় পুলিশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উস্কানি আছে। এখন যদি ওই মামলায় পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে তাহলে পল্লবী জোনের কিছু ঊর্ধ্বতন পুলিশের কর্মকর্তারা ওই হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারবেন না। এজন্য পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করছে না। উর্দুভাষী ছাত্র আন্দোলনের সেক্রেটারি ইমরান আহমেদ বলেন, কার কাছে বিচার চাইবো? হামলার সঙ্গে তো পুলিশ নিজেই জড়িত। এদিকে, ওই ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থানীয়দের সমঝোতায় আনতে স্থানীয় সরকারদলীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দীন মোল্লা একাধিক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থানীয়রা তাতে রাজি হননি। তারা ওই ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।

সন্তানকে আইসিইউতে রেখে বারে যান এমপিপুত্র রনি

৪০ দিন বয়সী শিশু সন্তান হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। আর বাবা এমপিপুত্র বখতিয়ার আলম রনি রাতভর সময় কাটাতেন রাজধানীর বিভিন্ন বারে। মধ্যরাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরতেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে এসব কথা নিজ মুখেই স্বীকার করেছেন তিনি। মদ্যপ অবস্থায় নিউ ইস্কাটন রোডে দুই নিরীহ রিকশা ও সিএনজি চালককে গুলি করে হত্যার পরও এনিয়ে কোন অনুশোচনাও ছিল না তার। নিজের মুখেই জানান, গুলির ঘটনার দুদিনের মাথায় তার সেই নবজাতক সন্তান মারা যায়। তারপরও মদের নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। প্রায় প্রত্যেক রাতেই গভীর রাত পর্যন্ত বারে বসে সময় কাটাতেন। জোড়া খুনের ঘটনায় রনিকে গ্রেপ্তারের পর ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। রনির নিজ মুখে এমন বিবরণ শুনে রীতিমতো থ’ বনে গিয়েছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও।
গত ১৩ই এপ্রিল রাত পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে একটি কালো প্রাডো গাড়ি থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েন মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের এমপি পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি। তার গুলিতে দৈনিক জনকণ্ঠের অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম নিহত হন। এ ঘটনায় নিহত হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে ১৫ই এপ্রিল রাতে অজ্ঞাতদের আসামি করে রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে স্থানান্তর করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে প্রথমে রনির গাড়িচালক ইমরান ফকির ও পরে রনিকে গ্রেপ্তার করে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গতকাল ৪ দিনের রিমান্ড শেষে রনিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়ার চেষ্টা করা হলেও সে তা দেয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রনি মাদকাসক্ত হলেও ধূর্ত প্রকৃতির। এ কারণে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়নি। তবে এতে কোন সমস্যা হবে না। পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় সবকিছু স্বীকার করেছে। একই সঙ্গে তার লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও গুলির সঙ্গে নিহত দুই জনের শরীর থেকে উদ্ধার করা গুলির ব্যালাস্টিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। রনির ব্যবহৃত প্রাডো গাড়িটি জব্দ করার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া, বস্তুগত আরও অনেক প্রমাণ রয়েছে। রনির পার পাওয়ার কোন উপায় নেই।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১০ সালে রনি তার নামে একটি পিস্তলের লাইসেন্সের আবেদন করেন। মা আওয়ামী লীগ নেতা বলে তদবির করে সহজেই পিস্তলের লাইসেন্স পেয়ে যান। তাকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে ২১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে তার কাছ থেকে যে গুলির খাপ উদ্ধার করা হয়েছে তাতে ৩০ রাউন্ড গুলি ধরতো। ইস্কাটনের ঘটনায় তিনি ৪ থেকে ৫ রাউন্ড গুলি করেছিলেন। বাকি গুলি কী কাজে ব্যবহৃত হয়েছে তা অবশ্য তিনি এড়িয়ে গেছেন। গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে তার পিস্তলের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশসহ জেলা প্রশাসকের কাছে তাকে বরাদ্দ দেয়া গুলির বিষয়টি জানতে চিঠি দেয়া হয়েছে।
রনিকে জিজ্ঞাসাবাদকারী এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন রনি তার তিন বন্ধুকে নিয়ে বাংলামোটরের একটি বারে মদ্যপান করে। পরে বাংলামোটর থেকে মগবাজারে এক বন্ধুকে নামিয়ে দেয়ার জন্য যায়। ফ্লাইওভারের কাজের জন্য একপাশের রাস্তা বন্ধ থাকায় বামের লেনে জট লেগে যায়। সেসময় কয়েকটি বালুর ট্রাকও রাস্তায় ছিল। রাস্তায় এই যানজটের কারণে বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকেই এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে রনি। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তা ফাঁকা হলে সে মগবাজার চলে যায়। পরে আবার একই রাস্তায় ফিরে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনাটি অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা জনকণ্ঠ ভবনের লাগানো সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেন। সেই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় কালো একটি প্রাডো গাড়ি বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও জানায়, কালো গাড়ি থেকে গুলি করা হয়েছিল। পরে গাড়ির সূত্র ধরেই গাড়িচালককে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক দীপক কুমার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রনিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে আদালত সূত্র জানায়, রনিকে গতকাল আদালতে হাজির করা হলে তার পক্ষে জামিন ও চিকিৎসার পৃথক দুটি আবেদন করা হয়। রনির পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ। মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূর আগামী ১৬ই জুন শুনানির দিন ধার্য করে রনিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে জেল বিধি অনুযায়ী তার চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

উড়ালসড়কের চেয়ে বেশি জরুরি জলাবদ্ধতা নিরসন -চট্টগ্রামে বেলার গণশুনানিতে সুশীল সমাজ

উড়ালসড়ক নির্মাণের চেয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা চট্টগ্রামের জন্য বেশি জরুরি। কিন্তু জনস্বার্থের কথা না ভেবে উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। মহাপরিকল্পনাকে (মাস্টারপ্ল্যান) পাশ কাটিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে নগরে উন্নয়ন হওয়ায় জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হয়েছে।
‘চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক এক গণশুনানিতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও প্রকৌশলীদের বক্তব্যে এসব মতামত উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) গতকাল শনিবার সকালে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
চট্টগ্রাম নগরের লর্ডস ইন হোটেলের সম্মেলনকক্ষে এই গণশুনানি হয়। এতে নগরের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সাধারণ মানুষও জলাবদ্ধতা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। অনেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেয়রকে পরামর্শও দেন।
অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা ও এখতিয়ার দিয়ে জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন করা সম্ভব নয়। করপোরেশনের প্রধান তিনটি কাজ হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা, রাস্তাঘাট মেরামত ও নগর আলোকিত করা। যন্ত্রপাতিসহ নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করতে হয়।
গণশুনানি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল আজিম আরিফ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের নির্বাহী সদস্য দেলোয়ার হোসেন মজুমদার। বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মুহাম্মদ সিকান্দর খান, স্থপতি জেরিনা হোসাইন, প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া, অধ্যাপক মো. মহিউদ্দিন, অধ্যাপক শফিক হায়দার চৌধুরী, কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার, মনোয়ারা বেগম প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১২টি করণীয় বিষয় উল্লেখ করেন দেলোয়ার হোসেন মজুমদার। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নালা-খাল খননের পাশপাশি সেখানে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। জোয়ারের পানি ঠেকাতে স্লুইসগেট নির্মাণ করতে হবে। পুকুর ভরাট বন্ধ করার পাশাপাশি পাহাড় কাটা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে একেক বিশেষজ্ঞ একেক ধরনের পরামর্শ দেন। নগরে ৩৩টি খাল রয়েছে। অনেকগুলোর অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি। চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের সমালোচনা করে মেয়র বলেন, গণমাধ্যম শুধু নেতিবাচক বিষয় তুলে আনে। সমালোচনা করে। ভালো কাজকে গুরুত্ব দেয় না। তিনি বলেন, যিনি যত বড় প্রভাবশালী, তিনি তত বেশি আইন অমান্য করেন। বিলবোর্ড উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি বলেন, দলীয় অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও করপোরেশনের লোকজন বিলবোর্ড ব্যবসায় জড়িত। কিন্তু কাউকে ছাড় না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ বলেন, জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা নিরসনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। জনগণকেও সচেতন হতে হবে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, কোনো মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন হয় না। মাস্টারকার্ডের আলোকে নতুন করে কার্যকর পরিকল্পনা করা যায় কি না, ভেবে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।
অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দর খান বলেন, অনেকেই নালায় ময়লা ফেলে। জলাবদ্ধতা নিরসনে অন্য কাজের পাশাপাশি মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
স্থপতি জেরিনা হোসাইন বলেন, উড়ালসড়কের চেয়ে বেশি জরুরি ছিল জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা। সেটি না হওয়ায় এখন জ্যৈষ্ঠ মাসের বৃষ্টিতেও মানুষের বাসাবাড়িতে পানি ওঠে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া।
শুনানিতে অধ্যাপক সিকান্দর খান, স্থপতি জেরিনা হোসাইন ও প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন উড়ালসড়কের সমালোচনা করেন। এসব উড়ালসড়ক জনস্বার্থে কার্যকর হচ্ছে না বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।

বাংলার বাজেট বক্তৃতার বৃত্তান্ত by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চা হয় চুটিয়ে। মানববন্ধনে ইতিহাস, গোলটেবিলে ইতিহাস, পাবলিক টয়লেট উদ্বোধন উপলক্ষে ফিতা কাটার সময় ইতিহাস, ফজলি বা ল্যাংড়া আমের ফলনের প্রসঙ্গ উঠলেও ইতিহাস। তবে সে ইতিহাস বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, একাত্তরের ইতিহাস। বাংলার বাজেটেরও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এ ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতার ইতিহাসের মতোই বাংলার বাজেটের ইতিহাসেরও সূচনা ইংরেজ শাসনামলে। বাহাদুর শাহ জাফরের সময় এভাবে বাজেট ঘোষিত হতো না। লাখো বাঙালিকে ফাঁসির মঞ্চে উঠিয়ে, আন্দামানে দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে, কারাগারের নির্জন কক্ষে তিলে তিলে হত্যা করে, ইংরেজ প্রভুরা ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট সকালে বিদায় নেয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশের প্রথম বাজেট মুসলিম লীগ সরকার উপস্থাপন করে ১৯৪৮ সালের মার্চে। সেকালে অর্থবছর এপ্রিল থেকে শুরু হতো। ষড়ঋতুর কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে অর্থবছর ১ বৈশাখ বা ১৪ এপ্রিল থেকেই শুরু হওয়া যুক্তিযুক্ত।
পূর্ব বাংলার পলিমাটি অতি উর্বর। কৃষকেরা পরিশ্রমী। পূর্ব বাংলার ধান-পাট বিক্রি করা টাকায় হিন্দু ও মুসলমান জমিদার-ব্যবসায়ীরা কলকাতায় প্রকাণ্ড সব বাড়ি বানিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন কলকাতা মহানগর। বাংলার জনগণের অধিকাংশই কৃষক ও কৃষিশ্রমিক। তাঁদের শরীরের ওপরটা উদোম এবং কোমর থেকে নিচের দিকে নেংটি। তাঁরা ভেবেছিলেন, ইংরেজরা চলে গেলে, দেশটা স্বশাসিত হলে, তাঁদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু বাংলার মাটি উর্বর হলেও বাঙালির আড়াই ইঞ্চি কপালটা বড়ই অনুর্বর। বারবার সে হোঁচট খায় এবং তার কপাল ভাঙে। নানা বিপর্যয় সত্ত্বেও এ দেশের মানুষের অনেক উন্নতি হয়েছে। এতটাই উন্নতি হয়েছে, যা ১৯৪৮-এ বা ১৯৭২-এ অনেকে ভাবতেও পারেননি।
অতি সুরম্য ভবনে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাসহ প্রায় সব সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও গিয়েছিলেন বাজেট বক্তৃতা শুনতে। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর আমন্ত্রণে আমিও দর্শক গ্যালারিতে বসে অর্থমন্ত্রীর বাজেট উপস্থাপনা উপভোগ করেছি। ওখানে বসে সেদিন মনে পড়ে স্বাধীনতার পর ’৭২-এ অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাজেট ঘোষণার স্মৃতি।
১৯৭৩-এ ছিল নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট। এখনকার তুলনায় সংক্ষিপ্ত বাজেট বক্তৃতার পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ক্যানটিনে ঢুকলেন। আমরা সবাই তাঁদের পিছে পিছে। বঙ্গবন্ধু হাস্যরস করছিলেন। তিনি ফয়েজ আহমদ ও বার্তা সংস্থা এনার গোলাম রসুল মল্লিককে দেখিয়ে অর্থমন্ত্রীকে বললেন, ‘তাজউদ্দীন, তুমি যত ভালো বাজেটই দাও না কেন, ওরা মন্দ বলবেই। যদি কিছু প্রশংসা চাও তো ওদের বেশি বেশি বিরিয়ানি-টিরিয়ানি খাওয়াও।’ চা-নাশতা খাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু সব সাংবাদিকের সঙ্গেই হাস্যরস করলেন। ছোট ঘর। সাংসদদের ও সংবাদমাধ্যমের লোকজনের মধ্যে একটি অন্তরঙ্গ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
আমরা সবকিছুর মহিমা খুইয়েছি। অবশ্য যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই মূল্যহীন, সেখানে অন্যান্য বিষয় কী গুরুত্ব বহন করবে! একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বাজেট অধিবেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেখানে জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠে বাজেট বিতর্কে জাতির আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ পায়। একটি প্রশ্নে আমার বালুকণা পরিমাণ সন্দেহ নেই। তা হলো বর্তমান মহাজোট সরকার যেসব উন্নয়নমূলক ভালো কাজ করেছে, ২০৪১ সালে যাঁরা দেশ শাসন করবেন, তাঁরা তা স্বীকার করবেন না। তার কারণ হলো সাধারণ বাঙালি অতটা না হলেও বিদ্বান বাঙালিরা কারও কোনো কাজের স্বীকৃতি দেন না।
যমুনা সেতু নির্মাণের কৃতিত্ব বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ তিন দলের নেতারাই ষোলো আনা নেওয়ার জন্য কামড়াকামড়ি করেছেন, তা আমরা দেখেছি। কারণ, সবাই একাত্তরের ওপাশে যাওয়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন। যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রস্তাব কে কোন জনসভায় প্রথম উচ্চারণ করেন, সে প্রসঙ্গে আমি যাব না। কারণ, তা খবরের কাগজে লেখা আছে। ষাটের দশকের মধ্যভাগে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশনে যমুনা সেতু নির্মাণের প্রশ্নে আলোচনা হয়। আবদুল আলিম ‘যমুনা নদীর ওপর ফুলছড়ি ঘাট ও উত্তরবঙ্গের বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনকারী সেতু নির্মাণের একটি প্রস্তাব’ উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি নিয়ে ‘সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা...তুমুল বিতর্ক’ করেন।
বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সদস্যরাও ছিলেন।
‘প্রস্তাবে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে প্রদেশের বাকি অংশের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে সরকারের প্রতি উক্ত সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। প্রস্তাবটি গ্রহণ করে প্রাদেশিক সড়ক ও পরিবহন দপ্তরের মন্ত্রী সুলতান আহমদ পরিষদকে জানান যে কেন্দ্রীয় সরকার এই সেতু নির্মাণের ব্যাপারে সব রকম সাহায্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তবে এটি একটি বিরাট প্রকল্প এবং এতে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে।’ আড়াই শ কোটি টাকায় প্রমত্ত যমুনার ওপর সেতু! অকল্পনীয়। এখন তো অনেক যুবনেতার একটি মাত্র অ্যাকাউন্টেই আড়াই শ কোটি টাকা আছে।
সড়ক ও পরিবহনমন্ত্রী সেদিন জানিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সরকার জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ‘কতিপয় বিদেশি রাষ্ট্রের’ সঙ্গে ‘এই পরিকল্পনায় সহায়তার জন্য রিপোর্ট প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা প্রদানের জন্য অনুরোধ’ করেছে। ১৫ জুন ১৯৬৭, অর্থমন্ত্রী এম এন হুদা পরিষদে জানান, যমুনা সেতু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকার কাজ দ্রুত শেষ করতে আগ্রহী। পরিকল্পনাটি তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। পরদিন সড়ক নির্মাণ দপ্তরের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি (পদটি এখন নেই) আলতাফ হোসেন পরিষদকে জানান, যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান ও রাশিয়াকে যুক্ত করা হয়েছে।
একদিন পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে যখন গাড়ি ও রেলগাড়ি চলবে, সেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী মুহিত ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথা ভুলে গেলে হবে অকৃতজ্ঞতা। এখন যমুনা সেতুর দুই পাশে যখন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যায়, তখন নিহত ব্যক্তিদের আত্মা আবদুল আলিম, সুলতান আহমদ, ড. এম এন হুদাকে শুধু নয়, আইয়ুব খানকেও অভিশাপ দেয়।
লুই কানের নকশা করা ভবনে বসে বাজেট বক্তৃতা উপভোগের সময় আমার মনে এল, এ দেশের প্রথম বাজেট কবে কোন ঘরে ঘোষিত হয়েছিল। এবং স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বাজেটই-বা কোন কক্ষে ঘোষিত হয়। সেই ঘর দুটির সঙ্গে এই অধিবেশনকক্ষের পার্থক্য কতটা?
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর চির-অবহেলিত পূর্ব বাংলা প্রদেশে কোনো পরিষদ ভবন ছিল না। এমনকি প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাতে কোনো বড় হলঘরও ছিল না। প্রথম প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সেই হলঘরে, যেটি ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ধসে পড়ে। নিহত হন বহু ছাত্র। ওই ঘরেই দেশের প্রথম বাজেট অধিবেশন বসে মার্চ ১৯৪৮-এ। মাওলানা ভাসানী ছিলেন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের টিকিটে টাঙ্গাইল থেকে নির্বাচিত সদস্য। সরকারি দলের হলেও তিনি বাজেটের তীব্র সমালোচনা করেন। সেদিন তিনি দুটি ঐতিহাসিক কাজ করেছিলেন, যা বাংলাদেশের পরবর্তী ২৩ বছরের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রিত করেছে। বাজেট পরিবেশিত হয়েছিল ইংরেজিতে। মাওলানা রেগে যান। তিনি দাবি করেন, পরিষদে সব আলোচনা বাংলায় করতে হবে। ১৭ মার্চ আলোচনাকালে ভাসানী বলেন: ‘এটা বাংলা ভাষাভাষীদের দেশ, এই অ্যাসেমব্লির যিনি সদর (স্পিকার), তিনিও নিশ্চয়ই বাংলাতেই বলবেন।’ প্রত্যুত্তরে স্পিকার বলেন, ‘যিনি যে ভাষা জানেন, তিনি সেই ভাষায় বলবেন।’ মাওলানা বলেন, ‘তা হবে না, আপনি রুলিং দেন বাংলায় বলতে।’ ১৯ মার্চ বক্তৃতায় ভাসানী বলেন, ‘...আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম? ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের গোলামি করি নাই, ন্যায়সংগত অধিকারের জন্য চিরকাল লড়াই করেছি, আজও করব। আমরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে পাট উৎপাদন করব আর...ট্যাক্স নিয়ে যাবে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট। এই সব ট্যাক্স শতকরা ৭৫ ভাগ প্রদেশের জন্য রেখে বাকি অংশ সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টকে দেওয়া হোক।’ সেদিনই ছিল ভাসানীর জীবনের শেষ সংসদে যোগদান। চক্রান্ত করে সরকার তাঁর সদস্যপদ বাতিল করে।
১৯৪৯ সালে দ্বিতীয় বাজেটও জগন্নাথ হলেই ঘোষিত হয়। সেখানে একটি বিষেয় তুমুল বিতর্ক হয়। তা হলো নোয়াখালীতে গান্ধী ক্যাম্পের কার্যক্রম ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা। মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন বাজেট পেশ করেছিলেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন। পুলিশের খাতে ২ কোটি ৯৭ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বরাদ্দ চাইলে বিরোধী কংগ্রেস দলের সদস্যরা আপত্তি করেন। তাঁদের মধ্যে মণীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, গোবিন্দলাল, ভোলানাথ বিশ্বাস, অমূল্য অধিকারী, হারাণচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ বলেন, যে পুলিশ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তাদের জন্য এত টাকা কেন?
বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের বাজেট ১৯৭৩-এ ঘোষিত হয় পুরোনো সংসদকক্ষে, এখন যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। বাজেট ও বাজেট নিয়ে আলোচনায় দেশবাসীর অনেক কিছু শেখার­ থাকে, ব্লেডের দাম বাড়ল কি না, তা নিয়ে হাহাকার বাজেট আলোচনা নয়।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান নিম্নগামী। উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা কিছু ফটোকপি মুখস্থ করে সার্টিফিকেট পাচ্ছে। জীবন গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে যুবসমাজকে শিখতে হবে জীবন থেকে। আজ যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৫, তারাই ১৫ বছর পরে দেশ চালাবে।
কেউ এমপি হবে, কেউ পদস্থ আমলা, কেউ বিচারক, কেউ বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ। তারা কী শিখছে? অর্থমন্ত্রীদের বাজেট ঘোষণা ও তার প্রতিক্রিয়া ৪৩ বছর যাবৎ যা হচ্ছে, তাতে যুবসমাজের শেখার কিছু নেই। যা শিখছে তা ফালতু কথা বলা।
আমি শতভাগ নিশ্চিত, বিএনপি নেতারা বাজেট না পড়েই দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাষায় সমালোচনা করছেন। অথচ তাঁদের দলেও বহু ভালো অর্থনীতিবিদ আছেন। বাম দলের নেতারা অগ্রাধিকার দেন বাজেটের চেয়ে বিপ্লবকে। জাতির চৈতন্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ডিসকোর্সের অবকাশ কম। একটি জাতিকে চারদিক থেকে প্রথার মধ্যে বন্দী করে ফেলা হয়েছে। সৃষ্টিশীলতা নেই। যুক্তিশীলতা নেই। যাদের মধ্যে তা আছে, তা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে। বাজেটের অঙ্কটা কত বড়, তাতেই সবাই মুগ্ধ। বেশি টাকার চেয়ে প্রয়োজন বেশি মানুষের কল্যাণ ও কর্মসংস্থান। জাতির উজ্জ্বল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা। তা নিয়ে বিতর্ক–বাজে কথা নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷