Tuesday, June 16, 2026

নয়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও বড়, নির্ভুল, ধ্বংসাত্মক, গতিশীল ও অপ্রতিরোধ্য: ইসরায়েলি-মার্কিন সূত্র

পার্সটুডে: রমজান যুদ্ধের পর বিভিন্ন সূত্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার দ্রুত উন্নয়নের খবর প্রকাশিত হয়। দুই মাস পর পরিচালিত “নাসর” অভিযানে তেহরানের আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতার উন্নতি প্রদর্শনের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়।

ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও ধ্বংসাত্মক, দ্রুত-গতির, বড় ও অপ্রতিরোধ্য। এদিকে একজন মার্কিন বিশেষজ্ঞ স্বীকার করেছেন যে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো “প্রতিরোধ বা ভূপাতিত করা অসম্ভব”।

গত ৮ জুন সন্ধ্যায় শুরু হয়ে ২৪ ঘণ্টারও কম সময় স্থায়ী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান ইসরায়েল-অধিকৃত ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় এবং বিশ্ব গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই অনন্য অভিযান শুধু আগাম হামলা হওয়ার কারণেই নয়, একইসঙ্গে স্বল্প সময়ে ইসরায়েলের ওপর ব্যাপক আঘাত হানার কারণেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মার্কিন নৌবাহিনীর অপারেশন বিভাগের সাবেক উপদেষ্টা এবং এমআইটির অধ্যাপক থিওডর পোস্টল ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা স্বীকার করে বলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো “প্রত্যাশার তুলনায় আরও বেশি নির্ভুল ও ধ্বংসাত্মক” হয়ে উঠেছে।

পোস্টল বলেন, “ইরানিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা অসাধারণভাবে উন্নত হয়েছে। আমি প্রথমে যা দেখেছিলাম, এমনকি ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধেও (১২ দিনের যুদ্ধ) যা দেখেছিলাম, তার চেয়েও এগুলো অনেক বেশি কার্যকর। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করছে।”

হিব্রু ও পশ্চিমা সূত্রে দাবির সমর্থন

এই মার্কিন বিশেষজ্ঞের দাবি আরও গুরুত্ব পায়, যখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্র ১২ ঘণ্টার ক্ষয়ক্ষতির কিছু তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর অধিকৃত ভূখণ্ডে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

হিব্রু দৈনিক ইসরায়েল হাইয়োম জানায়, মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের হামলায় অধিকৃত ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ আনুমানিক ৫০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

একই সময়ে সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকৃত ভূখণ্ডের দিকে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র “কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি”। যদিও এই নিষ্ক্রিয়তার কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তবে সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হতে পারে এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে অক্ষমতা।

নাসর অভিযানে ইরান তিন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ছিল ৩০টির কিছু বেশি, যার উল্লেখযোগ্য অংশ ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

অজানা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চ গতি

প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত উচ্চ গতিতে তাদের লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।

এর কিছুক্ষণ পর একটি অবহিত সামরিক সূত্র জানায়, অধিকৃত ভূখণ্ডের উত্তরে হামলায় ইরান “খেইবারশেকান” ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বশেষ প্রজন্ম ব্যবহার করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর দিকে ডাইভ দেওয়ার সময় প্রায় ৯ মাখ গতিতে পৌঁছায় এবং থাড (THAAD) ও অ্যারো (Arrow)-এর মতো ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও এটিকে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।

চলতি বছরের অরদিবেহেশ্ত মাসে তথা এপ্রিল-মে মাসে (২১ এপ্রিল-২১ মে) যুদ্ধবিরতির কিছুদিন পর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ বিভাগের কমান্ডার জেনারেল মুসাভি জানান যে যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম পুনরায় সক্রিয় করা এবং হালনাগাদের গতি বেড়েছে।

অন্যদিকে আইআরজিসি কমান্ডারের উপদেষ্টা জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি “অরদিবেহেশ্ত মাসে (২১ এপ্রিল-২১ মে) তৈরি” নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনের কথাও উল্লেখ করেন।

যদিও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি যে নাসর অভিযানে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয়েছিল কি না, তবে এগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এমন ছিল যে অধিকৃত ভূখণ্ডে তা এক ধরনের ধাক্কার সৃষ্টি করেছে।

ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষার “বোকামিপূর্ণ” চেষ্টা

অধিকৃত ভূখণ্ডের উত্তরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একদিন পর এবং ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট আহত ইসরায়েলির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯,১২০ জনে পৌঁছেছে।

এছাড়া ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করেই জানায় যে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৭ জন নতুন আহতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

আহতের সংখ্যা রহস্যজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, ইসরায়েল হাইয়োমের উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির স্বীকারোক্তি এবং পরবর্তীতে টেল নোফ ও নেভাতিম ঘাঁটির কিছু অংশে ক্ষয়ক্ষতির স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ— এ সবকিছুই ইঙ্গিত দেয় যে নাসর অভিযানে ব্যবহৃত দ্রুতগতির ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছে।

থিওডর পোস্টলও জোর দিয়ে বলেন:

“এসব (নতুন ইরানি) ক্ষেপণাস্ত্র কোনোভাবেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়। এগুলো আরও বড় এবং অধিক ধ্বংসাত্মক ওয়ারহেড বহন করে।”

তবে এই মার্কিন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো, তিনি নিজে ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের কথা বলছেন তা নিশ্চিতভাবে না জানলেও, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রচেষ্টাকে “বোকামিপূর্ণ” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তার ভাষায়: “এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর বাস্তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা নেই।”

নয়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও বড়, নির্ভুল, ধ্বংসাত্মক, গতিশীল ও অপ্রতিরোধ্য: ইসরায়েলি-মার্কিন সূত্র

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ হয়ে এসেছে by লুসি উইলিয়ামসন

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন হয়ে এসেছে। এই চুক্তি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের তিনটি মূল ভিত্তিকে ভেঙেচুরে দিয়েছে এবং তাঁকে একটি নতুন নিরাপত্তা সংকটে ফেলে দিয়েছে।

যে ব্যক্তি নিজেকে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবে উপস্থাপন করতেন এবং আমেরিকান রাজনীতিবিদদের ওপর যাঁর প্রকৃত প্রভাব ছিল বলে মনে করা হতো, তিনি কীভাবে তাঁর প্রধান মার্কিন মিত্রের দ্বারা এতটা উপেক্ষিত এবং প্রকাশ্যে এত অপমানিত হতে পারেন?

যে ব্যক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে ইরানকে মোকাবিলার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শেষ করেন, যেখানে অনেকের মতে ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে?

এবং ইসরায়েলের ‘মি. সিকিউরিটি’ (নিরাপত্তার প্রতীক) হিসেবে তাঁর যে পুরোনো রাজনৈতিক পরিচিতি, তা ইতিমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ। এখন ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চাপের মুখে যদি ইসরায়েলকে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করতে হয়, তাহলে তাঁর সেই ভাবমূর্তি কীভাবে টিকবে?

এখন নেতানিয়াহুর সামনে যেসব পথ খোলা রয়েছে, সেগুলো তাঁর জন্য সুখকর নয়। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ গতকাল সোমবার নেসেটে (পার্লামেন্ট) সংক্ষেপে সেই পথগুলো তুলে ধরেছেন। আর তা হলো, হয় ইসরায়েলের সর্বশ্রেষ্ঠ মিত্রের (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক বিরোধে যাওয়া অথবা নতমস্তকে ইসরায়েলের স্বার্থগুলোকে বিসর্জন দেওয়া।

গত রোববার বৈরুতে হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু কোনো বিবেচনার পরিচয় দেননি বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কটূক্তিপূর্ণ মূল্যায়নকে ইতিমধ্যে হাতিয়ার করেছেন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা। আগামী অক্টোরের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে এটাকে ইতিমধ্যে সামনে নিয়ে আসছেন তাঁরা।

সেই সঙ্গে নেতানিয়াহুর নিজের দল লিকুদ পার্টির সদস্য এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের বক্তব্যেও নিজের শিবির থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর চাপে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে লেবাননসহ সব জায়গায় সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে যে দাবি করা হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টরপন্থীরা।

ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি মানতে আমরা বাধ্য নই। আমরা এই চুক্তির অংশীজন নই, যে চুক্তি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।’

লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য অ্যারিয়েল কালনার বিবিসিকে বলেছেন, ‘ইসরায়েল নিজেকে সুরক্ষিত করে যাবে।’ তবে এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রাখবে তা বোঝানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেননি।

নেতানিয়াহুর দলের এই নেতা বলেন, ‘আমাদের যেটা করা দরকার, সেটা আমরা করব। আমরা আশা করি, আমাদের বন্ধুরা আমাদের বুঝতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, কখনো কখনো মিত্রদের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি হতে পারে এবং মিত্রদেরও তাদের সেই মিত্রদের বোঝা উচিত, যখন তারা বিপদে থাকে।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শিনে বলেন, মার্কিনরা কেন এটা মেনে নিচ্ছেন, সেটা বোঝা কঠিন হচ্ছে। লেবাননে কী ঘটবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানকে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হিজবুল্লাহকে সমর্থন অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে লেবানিজ অঙ্গনে হিজবুল্লাহ যে একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, সেটা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল এটা নিয়ে খুশি নয়, সেটা নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক যেকোনো ক্ষেত্রের জন্যই।

রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পক্ষ থেকে সমালোচনা ও ক্ষোভের তীব্র কোলাহলের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নিজে এখন পর্যন্ত নীরব রয়েছেন। সাধারণত কোনো সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে তিনি দ্রুত এগিয়ে আসেন। কিন্তু এবার তাঁর এই নীরবতাকে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে তিনি যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, সেটারই ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে।

নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে ভোটারদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন, সেগুলোর কেন্দ্রে থাকে নিরাপত্তা। কিন্তু এবার তাঁর জন্য সেই বার্তা নিয়ে যাওয়াটা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হামলার পর নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া ছিল ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিকে আরও আক্রমণাত্মক পথে নিয়ে যাওয়া—হুমকি সৃষ্টি হওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আগেভাগেই সম্ভাব্য হুমকিকে প্রতিহত করার কৌশল গ্রহণ করা।

ইসরায়েলের সামনে থাকা হুমকিগুলো নির্মূল করে মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দেওয়াকেই নেতানিয়াহু সেই সংকটের সমাধান হিসেবে দেখেছিলেন।

তবে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা উপত্যকার অনেক এলাকা ধ্বংস এবং ৭৩ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করলেও হামাস এখনো ভূখণ্ডটির প্রায় অর্ধেক অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং সেখানে আবার নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তা ছাড়া ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার আট মাস পরও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এবং গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-নিযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাও এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রয়েছে।

নেতানিয়াহুর নতুন নিরাপত্তা কৌশলের কারণে ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রেখেছে। অনেক ইসরায়েলি এই দখলদারিকে ভালোভাবে দেখছেন এবং নির্বাচনের আগে এর অবসান হওয়ার সম্ভাবনাও কম। তবে একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও রিজার্ভ বাহিনীর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কোনো সুস্পষ্ট কূটনৈতিক পথও এখনো দৃশ্যমান নয়।

হিজবুল্লাহ ও ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে বারবার সংঘাতের পরও ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষগুলো নির্মূল হয়নি; বরং তেহরানের ক্ষমতা আরও কঠোরপন্থী নেতাদের হাতে চলে গেছে, যারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক শক্তিকে আগের তুলনায় কম ভয় পায় এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে আরও বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে।

বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে ইসরায়েলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকেই ইসরায়েলের প্রধান মিত্রের ওপর প্রভাবশালী অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) জ্যেষ্ঠ ইরান-বিষয়ক গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেছেন, ইসরায়েলের এই ব্যর্থতা তেহরান বিষয়ে তার কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তাঁর মতে, ইসরায়েলকে আরও বাস্তববাদী ও সংযমী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

ইসরায়েল হায়োম নামের একটি পত্রিকায় ড্যানি সিট্রিনোভিচ লিখেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যেকোনো পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনে চুক্তি ভন্ডুলের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর কঠোর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ওবামা প্রশাসনের সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কংগ্রেস ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে সমর্থন আদায় করে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এখন সেই সুযোগ তাঁর নেই বললেই চলে।

* লুসি উইলিয়ামসন, বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এখনো গাজার প্রায় অর্ধেক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এখনো গাজার প্রায় অর্ধেক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতক’ যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তি মানবে না ইসরায়েল, ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান গত রোববার গভীর রাতে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার পরদিন গতকাল সোমবার সকালে ইসরায়েলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ঘোষণা করেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি সই হয়েছে।’

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন শাহবাজ শরিফ। তিনি জানান, এ চুক্তিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ–সংক্রান্ত আলোচনায় সহযোগিতা করার জন্য ইসরায়েলের চিরবৈরী দেশ তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।

পাকিস্তানের এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি ‘সম্পূর্ণ’ হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি জানান, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এ চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।

‘মানতে বাধ্য নই’

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এই চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত তাঁরা মানবেন না।

নেতানিয়াহুর এ বক্তব্যের সুর ধরে গতকাল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো সময়সীমা ছাড়াই লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অবস্থান করবে।

কাৎজ আরও বলেন, ইসরায়েলের দখলে থাকা এলাকাগুলো থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হবে। ওই এলাকার বেসামরিক বাড়িঘরগুলো ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

চুক্তিটি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেছেন চরম কট্টরপন্থী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।

স্মোট্রিচ লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এ চুক্তি ইসরায়েল এবং পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর।’ তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলকে এখন একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

সম্প্রতি লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে বৈরুতের ভবনগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন স্মোট্রিচ। এখন এই চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও লেবাননে সেনাবাহিনীকে ‘পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করার’ অনুমতি দেওয়া অব্যাহত রাখবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীন রাষ্ট্র নয়, আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।’ এই উগ্রপন্থী মন্ত্রী আরও দাবি করেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে না। ইসরায়েল কোনো ‘বানানা রিপাবলিক (দুর্বল বা পুতুল রাষ্ট্র) নয় উল্লেখ করে বেন গভির বলেন, ‘এ চুক্তি আমাদের কোনোভাবেই বেঁধে রাখতে পারে না।’

ইসরায়েল সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাও চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইরানে হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর ওয়াইনেটকে বলেন, তাঁদের সরকার শুধু একটি বিষয়েই আগ্রহী—ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, কি নেই।

জোহর দাবি করেন, ‘ইসরায়েল যদি দেখে যে তার নিরাপত্তা বিপন্ন, তবে সে ইরানের ওপর তীব্র আঘাত হানবে।’ তিনি আরও বলেন, এ আঘাতের ফলে ইরানিরা ‘শুধু হাঁটু গেড়েই বসবেন না, বরং তাঁদের মাথাও নত করতে হবে।’

‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’

ইসরায়েলের মন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেলেও, বিরোধী দল ও ডানপন্থী শিবিরের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এমনকি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১৪ নিউজ’-এর সাংবাদিক ইনন মাগাল, যাঁকে ইসরায়েলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধে ইসরায়েলকে একা ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে পরাজিত ব্যক্তি এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ঘৃণ্য ব্যক্তি বলে আখ্যা দেন।

ইনন মাগাল মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ইঙ্গিত করে একটি সাধারণ ইহুদিবিদ্বেষী গালি ব্যবহার করে ‘লিটল জিউস’ (ছোট ইহুদি) বলে উল্লেখ করেন।

একই টেলিভিশন চ্যানেলের আরেক সাংবাদিক শিমন রিকলিন গতকাল বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো নিজের সার্বভৌমত্ব।’ তিনি বলেন, ইসরায়েলের যে নিজস্ব স্বার্থ আছে, তা এই ‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’কে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই সার্বভৌমত্ব প্রয়োজন।

ইসরায়েলের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইসরায়েল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরাম’ (আইডিএসএফ) গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইরানের “সন্ত্রাসী” সরকারের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং বর্তমান চুক্তিটির পরিণতিও ভিন্ন কিছু হবে না।’

আইডিএসএফ আরও বলেছে, ‘এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, সামনে কী আসছে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার এবং লেবানন ও ইরান থেকে হুমকি দূর করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস না করার উপযুক্ত সময়।’

অন্যদিকে অনেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপরও চড়াও হয়েছেন। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই সুযোগে তাঁর নেতৃত্ব ও যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।

মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল, অসুস্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও প্রভাবহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।

গোলানের মতে, এ নতুন চুক্তি ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর বহু বছরের ভুল নীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন। এর ফলে ইসরায়েল এখন আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট বলেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কোনো সমাধান করতে পারেনি। তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের ‘মহাবিপর্যয়ের’ (ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলা) পর গত প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ (গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন) একটি ব্যর্থ সরকারের নির্মম ফলাফল বয়ে এনেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘এ সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম এবং আমাদের একটি ক্ষয়িষ্ণু ও স্থবির যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।’

বেনেট আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়ার এবং তাঁর ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করার জন্য তাঁর কাছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌

লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তাঁদের সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে অবস্থান করবে। ১৫ জুন, ২০২৬
লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তাঁদের সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে অবস্থান করবে। ১৫ জুন, ২০২৬ ছবি: এএফপি

গানের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাদিয়া আফরীন by ছিদরাতুল মুনতাহা

ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে সখ্য। প্রথমবার মঞ্চে যখন গান করেন, তখন তাঁর বয়স পাঁচ বছর। বলছিলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়া আফরীনের কথা। মাটির গান গেয়ে মঞ্চ থেকে অনলাইন—দুই জগৎই জয় করেছেন যিনি।

ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে সখ্য। প্রথমবার মঞ্চে যখন গান করেন, তখন তাঁর বয়স পাঁচ বছর। ‘সোনাদানা, দামি গহনা’ গেয়ে জয় করেছিলেন সবার মন। সেই শুরু। এই গানই তাঁকে এনে দিয়েছে লাখো মানুষের ভালোবাসা।

বলছিলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়া আফরীনের কথা। ফেসবুক তাঁর বর্তমান ফলোয়ার সংখ্যা চার লাখেরও বেশি।

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর থানায় কেটেছে নাদিয়া আফরীনের ছোটবেলা। মা গান ভালোবাসতেন। নাদিয়ার আগ্রহ দেখে তাঁকে গানের স্কুলে ভর্তি করে দেন। গুরু মৃনাল কান্তি রায়ের কাছে গানের হাতেখড়ি। গ্রামবাংলার গান, মাটির গান তাঁকে বেশি টানে। লোকসংগীতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য।

মাটির গান গেয়ে মঞ্চ থেকে অনলাইন—দুই জগৎই জয় করেছেন নাদিয়া। বরিশাল, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্টেজ শো করে পেয়েছেন বহু মানুষের ভালোবাসা।

নাদিয়া আফরীন বলেন, ‘ইউটিউব, ফেসবুক এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আমার গান শুনে মানুষ আমায় এত ভালোবাসবে, এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। এই ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ, ধন্য। এমন ভালোবাসা আমি মৃত্যুর আগপর্যন্ত পেতে চাই। আমি চাই গানের মাধ্যমেই মানুষ আমাকে আজীবন মনে রাখুক।’

পরিবারের সমর্থন থাকলেও গান গাওয়া নিয়ে আশপাশ থেকে শুনতে হয়েছে নানা মন্তব্য ও কটু কথা। শুরুর দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছিল নেতিবাচক মন্তব্যের ছড়াছড়ি। তবে সেসবকে পাত্তা দেননি নাদিয়া।

গানকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে নাদিয়া যে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে গেছেন, তা–ও কিন্তু না। কষ্ট হলেও দুটো কাজই একসঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে জনপ্রিয়তা পাওয়া নাদিয়া কখনো রিচ, ভিউ বা ফলোয়ার নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তিনি এগিয়ে যেতে চান নিজের মতো। তাঁর লক্ষ্য এখন নিজের একটি অ্যালবাম।

নাদিয়ার মতে, সব দুঃখ, কষ্ট, চিন্তা থেকে তাঁকে দূরে রাখে গান। যখন খুব খুশি থাকেন, খুশিকে উদ্‌যাপন করতে গানকে বেছে নেন। আবার মন খারাপের সময়ও গানই হয় তাঁর সঙ্গী। ভবিষ্যতে অন্য কোনো পেশায় নিয়োজিত হলেও গানকে কখনো ছাড়বেন না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-15%2Fqtkridpy%2FIMG20251007162357.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গানের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাদিয়া আফরীন। ছবি: নাদিয়া আফরীনের সৌজন্যে

মাদাগাস্কারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসের জীর্ণ দশাই কি বিক্ষোভ উসকে দিয়েছিল

এএফপি- ১৫ অক্টোবর ২০২৫ঃ মাদাগাস্কারে এখনো বর্ষা মৌসুম শুরু হয়নি, তবুও সেখানকার আন্তানানারিভো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের করিডরে পানি জমেছে। দুই বছর আগে ছাত্রাবাসটি তৈরি হয়।

শিক্ষার্থী উলরিক সাম্বিজাফি এএফপির সংবাদকর্মীদের ছাত্রাবাসের অবস্থা দেখানোর জন্য ডাকেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের থাকার জায়গাগুলো দেখে যান।’ গত ২৫ সেপ্টেম্বর মাদাগাস্কারে শুরু হওয়া যে বিক্ষোভ ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাতে অংশ নেন এই শিক্ষার্থীও।

সাম্বিজাফির থাকার কক্ষের পেছনের দরজায় গিয়ে দেখা গেল, মাত্র দুই মিটার (৬ দশমিক ৫ ফুট) দূরের একটি খোলা নর্দমা দিয়ে আবর্জনা ভেসে যাচ্ছে।

২৪ বছর বয়সী সাম্বিজাফি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। এএফপিকে তিনি তাঁর পায়ের গোড়ালি ও হাঁটুর মাঝ বরাবর দেখিয়ে বলেন, ‘বর্ষায় নর্দমার পানি এই পর্যন্ত উঠে আসে। এগুলোই প্রমাণ করে যে আমাদের বিদ্রোহ ন্যায্য।’

সাম্বিজাফির বাড়ি মাদাগাস্কারের পূর্বাঞ্চলে। তিনি দেশটির সেসব শিক্ষিত তরুণের একজন; যাঁরা দেশটিতে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন দেশে হওয়া ‘জেন–জি’ আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার মাদাগাস্কারের পার্লামেন্টে ভোটাভুটি হয়েছে। এতে প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা অভিশংসিত হয়েছেন। এরপর সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

রাজধানী আন্তানানারিভোর আঙ্কাতসো এলাকায় অবস্থিত এ ভবনটি ২০২৩ সালে চালু হয়েছে। তবে এখনই সেখানে ফাটল দেখা দেওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, এটির নির্মাণে বড় ত্রুটি রয়েছে।

‘তাঁরা তরুণদের কথা ভাবেননি’

সাম্বিজাফি বলেন, ‘মাদাগাস্কারের তরুণদের কথা কেউ ভাবেন না। কারণ, এই দেশের নেতাদের সন্তানেরা আন্তানানারিভো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন না। তাঁরা বর্দো, এমআইটি, হার্ভার্ড ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েন।’

বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ মাদাগাস্কারে বিদ্যুৎ ও পানির সংকটকে কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল। পরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

গত সপ্তাহে রাজোয়েলিনা তাঁর দেশের তরুণ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও তাঁদের আবাসন পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেজর জেনারেল রুফিন ফরচুনাত দিম্বিসোয়া জাফিসাম্বোর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করবেন, যা সব শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণ করবে।

এ নিয়ে সাম্বিজাফি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। তিনি বলেন, মাদাগাস্কারে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, ‘নিজের থালার খাবার শেষ হওয়ার খবর নেই, পাত্রে কী রাখা আছে তার খোঁজ’।

ছাত্রাবাসের এ ভবন ও কক্ষগুলোই যে আঙ্কাতসো এলাকায় শিক্ষার্থীদের থাকার সবচেয়ে খারাপ জায়গা, তা নয়। পাশের হলুদ চারতলা ভবনেরও একই দশা। ৪০০ জনকে রাখার উপযোগী করে এটি বানানো হয়েছে। তবে সেখানে অনেক বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকেন। প্রায় ১০ বছর আগে ভবনটিতে শিক্ষার্থীরা থাকতে শুরু করেন। পুরোনো বাসিন্দাদের কেউই মনে করতে পারেন না যে কমিউনিটি কিচেনের প্লাগ বা নল কখনো কাজ করত কি না।

৩০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ানদোহারিলালা রাকোতন্দ্রিনা নিচতলার একটি কক্ষে রাখা দুটি দুই চাকার যান দেখিয়ে বলেন, এটি স্কুটারের জন্য গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
তৃতীয় তলার বাথরুম ও লন্ড্রিতে দেখা গেল ট্যাপ থেকে অল্প অল্প করে পানি পড়ছে। পানির চাপ নেই সেখানে।

দেয়ালে একটি কাগজ সাঁটানো। কোন শিক্ষার্থী কোন দিন এগুলো পরিষ্কার করবেন, তার রুটিন দেওয়া। তবে কিছু শৌচাগারের অবস্থা এতটাই খারাপ যে তার স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। পানির সংকটের কারণে এগুলো আরও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রাকোতন্দ্রিনা বলেন, ‘আমরা আক্ষরিক অর্থে আবর্জনার মধ্যে বসবাস করছি।’ তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন আশপাশ থেকে প্রস্রাবের তীব্র দুর্গন্ধ আসছিল।

মেঝেতে বিছানা

ইজেকিয়েল লেডি নামের ওই ছাত্রাবাসে রাজধানীর বাইরে থেকে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। চারজনের জন্য তৈরি কক্ষে ছয়জনকে থাকতে হচ্ছে।

১৮ বর্গমিটার (১৯৪ বর্গফুট) মাপের ছোট কক্ষে ছাত্রদের কয়েকজনকে মিলে এক বিছানায় বা মেঝেতে তোশক বিছিয়ে ঘুমাতে দেখা যায়।

এক শিক্ষার্থীকে দেখা গেল ভাঙা আয়নার সামনে চুল কাটার সেবা দিচ্ছেন। চুল কাটার জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে দুই হাজার আরিয়ারি (দশমিক ৪০ ইউরোর কম) নিচ্ছেন তিনি, যা শহরে চুল কাটার খরচের অর্ধেক।

লেডি নামে এক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী বলেন, ‘মাদাগাস্কারের তরুণেরা সব পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে পারদর্শী। সম্ভবত এ জন্যই নেতারা মনে করেন, তাঁদের সাহায্য করার প্রয়োজন নেই।’

আঙ্কাতসো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসের দৃশ্য
আঙ্কাতসো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসের দৃশ্য। ছবি: এএফপি