Tuesday, September 4, 2018

লিভারের জটিল রোগসমূহ, লক্ষণ ও চিকিৎসায় করণীয়

মানব দেহের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল লিভার (যকৃত)। দেহকে সুস্থ্য ভাবে কার্যক্ষম রাখার জন্য এই লিভারকে অনেক কাজ করতে হয় যেমন খাদ্য হজম করতে, গ্লাইকোজেনের সঞ্চয়, প্লাজমা প্রোটিন সংশ্লেষণ, ঔষুধ বা অন্যান্য রাসায়নিক নির্বিষকরণ, পিত্তরস উৎপাদন, রক্ত পরিস্রুত করণ ইত্যাদি। উল্লেখিত কাজ ছাড়াও লিভার দেহের আরও কিছু জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এক কথায় বলতে গেলে লিভার হলো মানব দেহের একটি পাওয়ার স্টেশন যার সুস্থতার উপর আমাদের দেহের অন্যান্য অনেক কিছুই নির্ভর করে।
লিভার সুস্থ্য রাখতে লিভারের জটিল রোগসমূহ সম্পর্কে আমাদের সবার সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন কারন লিভারের রোগের লক্ষণাদি সহসাই প্রকাশ পায় না এমন কি লিভারের এগারো ভাগের একভাগ অংশ ও যদি ভালো থাকে তবে সে অবস্থাতেও লিভারের রোগ প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তাই আমাদের খুব ভাল করে এর যত্ন, রোগ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার। তাই এর গুরুত্ব অনুধাবন করে আমাদের দেশে যে সব লিভারের জটিল রোগ হয়ে থাকে সেই সব রোগ এর লক্ষণ, প্রতিরোধে ও চিকিৎসায় করণীয় সম্পর্কে বর্ননা করা হলো।
ভাইরাল হেপাটাইটিস
হেপাটাইটিস হলো লিভারে প্রদাহ, সাধারনত হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাস দ্ধারা স্বল্প মেয়াদী প্রদাহ কে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলে। আমরা অনেকেই এই ধরনের রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে তাকে জন্ডিস বলি। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস ছড়ায় এবং স্বল্প মেয়াদী লিভার প্রদাহ করে থাকে।
ভাইরাল হেপাটাইটিস এর লক্ষণ
একিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস বা স্বল্পমেয়াদী লিভার প্রদাহের প্রধান লক্ষণগুলো হলো— জন্ডিস, খাবারে অরুচি, উপরের পেটের ডান দিকে বা মাঝখানে ব্যথা, বমি বমি ভাব ও বমি, দুর্বলতা ও জ্বর।
ভাইরাল হেপাটাইটিস হলে করণীয়
রোগীকে হলুদ, মরিচ, তরিতরকারি, মাছ-মাংস ইত্যাদি স্বাভাবিক খাবার খেতে দিন। ফল, ডাবের পানি, আখের রস ইত্যাদি খাওয়াবেন না। ঘন ঘন গোসল করাবেন না। ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে যদি রোগের লক্ষণ ভালো না হয়, তবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। রোগ ধরা পরার পর কেউ অস্থিরতা, অস্বাভাবিক আচরণ করলে বা অজ্ঞান হলে, এটা মারাত্মক জরুরি অবস্থা। তাকে অনতিবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
ক্রনিক হেপাটাইটিস
লিভারের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের ফলে যেসব রোগ হয়ে থাকে তাকে ক্রনিক হেপাটাইটিস বলে। হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি ভাইরাস রক্ত কিংবা দূষিত সিরিঞ্জ বা সুচের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে হেপাটাইটিস ই-ভাইরাস রক্তের মাধ্যমেও ছড়ায়। বাংলাদেশে ক্রনিক হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস। রোগী প্রাথমিক অবস্থায় বুঝতেই পারেন না কখন তিনি বি অথবা সি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসাবিহীন থাকলে এই সংক্রমণ মাসের পর মাস লিভার এর ক্ষতি করে। এমনকি লিভার সিরোসিসে রূপ নেয় এবং পরে লিভার ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে। উল্লেখ্য, হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস আমাদের দেশে যথাক্রমে ৬০ ও ৩০ শতাংশ লিভার সিরোসিস এবং যথাক্রমে ৬৪ ও ১৭ শতাংশ হেপাটোসেলুলার কারসিনোমা বা লিভার ক্যান্সার এর জন্য দায়ী।
ক্রনিক হেপাটাইটিসের লক্ষণসমূহ
ক্রনিক ভাইরাল হেপাটাইটিস তথা দীর্ঘ মেয়াদী লিভার প্রদাহে ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় লিভারের কোষে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। ফলে কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া যায় না। কারও কারও ক্ষেত্রে দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা ও পেটে হালকা ব্যথা অনুভূত হতে পারে। রোগের লক্ষণ দেখে পরীক্ষা ছাড়া বোঝার উপায় নেই কোন ভাইরাস হয়েছে। কিন্তু যাদের ক্রনিক ভাইরাল হেপাটাইটিস থেকে লিভার সিরোসিস হয়ে যায় তাদের ক্ষুধামন্দা, পেটের অসুখ, শরীর শুকিয়ে যাওয়া, জন্ডিস, পেটে পানি আসা ও চেতনালোপ জাতীয় লক্ষণ দেখা দেয়।
ক্রনিক হেপাটাইটিস হলে করণীয় ও চিকিৎসা
এমতাবস্থায় অনতিবিলম্বে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে পরিক্ষা করাতে হবে যে এই ভাইরাসের প্রাণ HBV DNA বা HBeAg রক্তে বহমান কিনা? এবং তা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে পজেটিভ কিনা? ভাইরাসটা লিভারে সংক্রামিত হয়ে লিভারের ক্ষতি করে লিভার এনজায়েম ALT(SGPT) বাড়িয়ে দিয়েছে কিনা? যদি রোগীর রক্তে HBV DNA বা HBeAg ছয় মাসের বেশি সময় পরেও বিদ্যমান থাকে, রক্তে ALT (SGPT) দুই বা আড়াই গুণেরও বেশি থাকে তখন মানুষটি রোগী বলে বিবেচিত হবেন। কিন্তু ALT (SGPT) পরিমাণ যদি স্বাভাবিক থাকে, HBV DNA ও HBeAg নেগেটিভ থাকে তবে কিন্তু তিনি রোগী নন, HBsAg বহনকারী সুস্থ Carrier, তার চিকিৎসা অনাবশ্যক, তিনি এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাহীন এবং এর প্রতিষেধকও নিতে পারবেন না।
লিভার সিরোসিস
লিভার সিরোসিস একটি মারাত্মক ও অনিরাময়যোগ্য রোগ। তবে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে লিভার সিরোসিস থেকে অনেকটা দূরে থাকা যায়। এতে যকৃৎ বা লিভারের কোষকলা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে যায় যে তা সম্পূর্ণ বিকৃত ও অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং প্রদাহ এর কারণে লিভারে ফাইব্রোসিস এবং নুডিউল বা গুটি গুটি জিনিস তৈরি হয় ফলে লিভার এর যেসব স্বাভাবিক কাজ আছে, যেমন বিপাক ক্রিয়া, পুষ্টি উপাদান সঞ্চয়, ওষুধ ও নানা রাসায়নিকের শোষণ, রক্ত জমাট বাঁধার উপকরণ তৈরি ইত্যাদি কাজ ব্যাহত হয়। দেখা দেয় নানাবিধ সমস্যা। এ ছাড়া কিছু জন্মগত অসুখের কারণেও এই সমস্যা হয়ে থাকে যেমন, ওইলসন ডিজিজ, হেমোক্রোমেটাসিস ইত্যাদি। ধীরে ধীরে এই রোগ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। তাই সকলের আগে থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন।
লিভার সিরোসিসের লক্ষণ
প্রাথমিক লক্ষণ ধরা পড়তে দেরি হয় তবে সাধারনত রক্তস্বল্পতা, রক্ত জমাট বাঁধার অস্বাভাবিকতা, যকৃতে বেশি পরিমাণে জৈব রসায়ন, বেশি বিলুরুবিন, কম সিরাম অ্যালবুমিন ইত্যাদি সমস্যা ধরা পড়তে পারে। সিরোসিস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম ও যকৃতের বায়োপসি করতে হয়। সাধারণত খাদ্যে অরুচি, ওজন হ্রাস, বমি ভাব বা বমি, বমি বা মলের সঙ্গে রক্তপাত, শরীরে পানি আসা ইত্যাদি হলো মূল উপসর্গ। পরে যকৃতের অকার্যকারিতার সঙ্গে কিডনির অকার্যকারিতা, রক্তবমি, রক্তে আমিষ ও লবণের অসামঞ্জস্য ইত্যাদি জটিলতা দেখা দেয়।
লিভার সিরোসিস হলে করণীয় ও চিকিৎসা
লিভার সিরোসিস চিকিৎসার মূল বিষয় হচ্ছে প্রতিরোধ। যেসব কারণে লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে, বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-এর যেহেতু প্রতিশেধক আছে। তাই আমাদের উচিত প্রত্যেকেরই এই প্রতিশেধক নেওয়া। পাশাপাশি কিছু সচেতনতা জরুরি। দূষিত কোনো সূঁচ বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা, কোনো দূষিত রক্ত পরিসঞ্চালন না করা পাশাপাশি সেলুনে সেভ করাসহ যেকোনো কাটাকাটি বা সেলাইয়ের সময় এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। রোগীদের কাছ থেকে সরাসরি এই ভাইরাস সংক্রমিত হয় না।
লিভার ক্যান্সার
ক্যান্সার মানেই তো আতঙ্ক আর তা যদি হয় লিভারের মত দেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে তাহলেতো কথাই নেই। গবেষনায় প্রমানিত, এদেশে ক্যান্সারে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ লিভার ক্যান্সার। বিশ্বব্যাপি লিভার ক্যান্সারের মূল কারণ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস আর এ্যালকোহল। আমাদের দেশে অবশ্য হেপাটাইটিস বি আসল খলনায়ক, কারণ এদেশে প্রায় ৮০ লক্ষ লোক এ ভাইরাসের বাহক বা HBsAg পজেটিভ। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত ৫ থেকে ১০ শতাংশ লোক জীবনের কোন এক পর্যায়ে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ
যে কোন বয়সের লোকই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। লিভার ক্যান্সারের ঝুকি পুরুষদের ক্ষেত্রে মহিলাদের চেয়ে ৪ থেকে ৬ গুণ বেশী। সাধারণতঃ ক্যান্সার হওয়ার আগে লিভারে সিরোসিস দেখা দেয়, তবে এর ব্যতিক্রম হওয়াটাও অস্বাভাবিক না। লিভার ক্যান্সারের রোগীরা প্রায়ই পেটের ডান পাশে উপরের দিকে অথবা বুকের ঠিক নীচে মাঝ বরাবর ব্যথা অনুভব করেন যার তীব্রতা রোগী ভেদে বিভিন্ন রকম। সহজেই ক্লান্ত হয়ে পরা, পেট ফাপা, ওজন কমে যাওয়া আর হালকা জ্বর জ্বর ভাব এ রোগের অন্যতম লক্ষণ। লিভার ক্যান্সার রোগীদের প্রায়ই জন্ডিস থাকে না, আর থাকলেও তা খুবই অল্প। রোগীদের খাওয়ায় অরুচি, অতিরিক্ত গ্যাস কিংবা কষা পায়খানার উপসর্গ থাকতে পারে- আবার কখনো দেখা দেয় ডায়রিয়া। পেটে পানি থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে।
লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা ও করণীয়
লিভার ক্যান্সার নির্ণয়ে সহজ উপায় একটি নির্ভরযোগ্য আল্ট্রাসনোগ্রাম। তবে কখনো কখনো সিটি-স্ক্যানেরও দরকার পরে। রক্তের AFP পরীক্ষাটি লিভার ক্যান্সারের একটি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য টিউমার মার্কার। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত যে কোন ব্যক্তিরই উচিত প্রতি ৬ মাসে একবার AFR ও আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করা। তবে লিভার ক্যান্সারের ডায়াগনোসিস কনফার্ম করতে হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডেড FNAC অত্যন্ত জরুরি আর অভিজ্ঞ হাতের সাফল্যের হারও প্রায় শতভাগ। এখানেই শেষ নয়, বরং শুরু। শুরুতে ধরা পরলে আর আকারে ছোট থাকলে অপারেশনের মাধ্যমে এই টিউমার লিভার থেকে কেটে বাদ দেয়া যায়। আর এর জন্য প্রয়োজনীয় কুসা মেশিন ও দক্ষ হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন এদেশেই বিদ্যমান। পাশাপাশি আছে বিনা অপারেশনে টিউমার অ্যাবলেশন বা টিউমারকে পুরিয়ে দেয়া। নামমাত্র খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডে আমাদের দেশে এখন অহরহই লিভার ক্যান্সারের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন করা হয়। পাশাপাশি আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডে সস্তায় অ্যালকোহল দিয়েও অ্যাবলেশন বা টিউমার পুড়িয়ে ছোট করে দেয়া সম্ভব। আছে আরও কিছু আশা। যেমন এসেছে আগের চেয়ে অনেক বেশী কার্যকর, কিন্তু অনেক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কেমোথেরাপি জেলোডা ও সুরাফিনেব। এই দুটি ওষুধ আমাদের দেশে তৈরিও হচ্ছে। লিভার ক্যান্সারের রোগীদের চিকিৎসা এদেশে নিয়মিত হচ্ছে। আর তাই লিভারের ক্যান্সারে শেষ হয়নি আশা।
ফ্যাটি লিভার
লিভার কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা হলে যা তার গাঠনিক উপাদানের ৫ থেকে ১০ শতাংশ তাকে ফ্যাটি লিভার বলে। যখন কোনো মানুষ তার দেহের প্রয়োজনের অতিরিক্ত চর্বি খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করে, তখন এ চর্বি ধীরে ধীরে তার কলা বা টিসুতে জমতে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা মদ্যপানের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যাঁরা মদ্যপানের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদেরও এই রোগ হতে পারে। সাধারণত মধ্যবয়সী মহিলাদের দেখা দেয়। স্থূলতা ফ্যাটি লিভারের একটি প্রধান কারণ। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি (হাইপার লিপিডেমিয়া), বংশগত, ওষুধ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য যেমন, মদ বা অ্যালকোহল, স্টেরয়েড, টেট্রাসাইক্লিন এবং কার্বন টেট্রাক্লোরাইড ইত্যাদি কারণে ফ্যাটি লিভার হতে পারে। যাদের ওজন আদর্শ ওজনের ১০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি, তাদের ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। মুটিয়ে গেলে শিশুদেরও এ রোগ হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার রোগের লক্ষণ
রোগীরা সাধারণত ক্লান্তি, অবসাদ, ওপরের পেটের ডান দিকে ব্যথা নিয়ে ডাক্তারদের কাছে আসেন। পরীক্ষা করলে দেখা যায়, রোগীদের এসজিপিটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এদের বিলুরুবিনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে। কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, লিভারে অ্যানজাইমের মাত্রা স্বাভাবিক অথচ লিভারের আল্ট্রাসনোগ্রামে চর্বির মাত্রা বেশি।
ফ্যাটি লিভার হলে করণীয় ও চিকিৎসা
পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম, লিভার বায়োপসি পরীক্ষা করলে রোগটি নির্ণয় করা যায়। যদি লিভারের এনজাইমগুলো বেড়ে যায়, তখন বুঝতে হবে, তার ক্ষেত্রে এই ফ্যাটি লিভারের কারণে দীর্ঘমেয়াদি অসুখ হওয়া আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রোগির জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করতে হবে, ওজন কমাতে হবে এবং কিছু ওষুধ খেতে হবে। আর যদি শুধু ফ্যাটি লিভার থাকে, পাশাপাশি লিভারের অন্যান্য কার্যক্রম যদি ভালো থাকে, যদি খুব বেশি স্থূলকায় না হোন, তাহলে শুধু একটু জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করলে হয়। সুষম খাবার, কায়িক পরিশ্রম, নিয়মিত ব্যায়াম—এগুলো করলে ভালো থাকবেন।
লিভার অ্যাবসেস
লিভার অ্যাবসেস বা লিভারের ফোঁড়া মানব দেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ একটি রোগ। লিভারে দুধরনের ফোঁড়া হয়, পায়োজেনিক ও অ্যামিবিক। ইকোলাই, স্টাফাইলোকক্কাই, স্ট্রেপ্টোকক্কাই, ক্লেবসিয়েলা ইত্যাদি ব্যাকটেরিয়া পায়োজেনিক লিভার অ্যাবসেসের জন্য দায়ী, আর অ্যামিবিক লিভার অ্যাবসেস হয় অ্যামিবা থেকে। তবে এসব জীবাণু ঠিক কী কারণে লিভারে ফোঁড়া তৈরি করে তা সব সময় জানা যায় না। তবে ডায়াবেটিস, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, গ্যাস্ট্রোএন্টাররাইটিস, রক্তের ইনফেকশন, নবজাত শিশুর নাভির ইনফেকশন, অতিরিক্ত মদ্যপান, পেটে আঘাত পাওয়া ইত্যাদি নানা কারণে লিভারে ফোঁড়া হতে পারে। একজন রোগীর লিভারে একটি বা একাধিক ফোঁড়া থাকতে পারে।
লিভার অ্যাবসেস রোগের লক্ষণ
লিভারের ফোঁড়ার কোনো বিশেষ লক্ষণ নেই। রোগীদের সাধারণত খাবারে অরুচি, জ্বর ও পেটে ব্যথা থাকে। অনেক সময় কাশি কিংবা ডান কাঁধে ব্যথা থাকতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে রোগীর জন্ডিস হতে পারে।
লিভার অ্যাবসেস হলে করণীয় ও চিকিৎসা
লিভার অ্যাবসেসের জন্য মূল পরীক্ষা হলো পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগের শুরুতে আল্ট্রাসনোগ্রামে অ্যাবসেস ধরা পড়ে না। এ জন্য ৭ থেকে ১০ দিন পর আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপিট করলে ভালো। লিভার অ্যাবসেস সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকেই সেরে যায়। তবে লিভার থেকে পুঁজ বের করে দেয়াটা জরুরি। বিশেষ করে লিভারে যদি বড় বা একাধিক অ্যাবসেস থাকে। এক সময় এর জন্য অপারেশনের প্রয়োজন পড়লেও আজ আর তার দরকার পড়ে না। এখন লোকাল অ্যানেসথেসিয়া করে খুব অল্প খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাফি গাইডেনসে লিভার থেকে পুঁজ বের করা সম্ভব। এরপর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে লিভারের ফোঁড়া সেরে যায়।
আসলে আমাদের লিভার সুস্থ রাখতে হলে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। যেহেতু লিভারকে বলা হয় শরীরের পাওয়ার হাউস তাই লিভারের অসুস্থতার ফলাফল ক্ষেত্রবিশেষে হতে পারে ব্যাপক ও ভয়াবহ। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময় এবং জটিলতামুক্ত থাকা যায়। আশাকরি উল্লেখিত লিভারের জটিল রোগসমূহ, লক্ষণ ও চিকিৎসায় করণীয় বিষয় গুলো আপনাকে লিভারের যত্ন নিতে আরও আগ্রহী করবে।

প্লিজ, মৃত্যুর এই কাফেলা থামান

মৃত্যুর মিছিল চলছে। মারা যাচ্ছে মানুষ। প্রতিদিন শিরোনাম। আন্দোলন, প্রতিবাদ। নানা আওয়াজ। কিন্তু কিছুতেই ছোট হচ্ছে না লাশের সারি। সড়কে হত্যা থামছেই না। গতকাল সাভারে ট্রাকের সঙ্গে পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে এক  প্রকৌশলীসহ নিহত হয়েছে তিন জন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরো দুইজন।
আহতদেরকে উদ্ধার করে ঢাকা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বলিয়াপুর এসএন সিএনজি পাম্পের সামনে এ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহতরা হলেন- ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আকতার লিমিটেডের প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম (৫৪), নুরুন্নবি (৩৮) এবং দুর্ঘটনাকবলিত পিকআপের চালক খলিলুর রহমান (৫৪)।
থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোর রাতে মীর আকতার গ্রুপের একটি হাইলাইটস ডাবল পিকআপে করে নিহতরা সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। একপর্যায়ে পিকআপটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বলিয়াপুর এসএন সিএনজি পাম্পের সামনে পৌঁছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা একটি ট্রাকের পিছনে সজোরে ধাক্কা মারে। এ সময় পিকআপটি দুমড়েমুচড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই এক প্রকৌশলীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে সাভার মডেল থানা পুলিশ নিহতদের মরদেহগুলো উদ্ধার করে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে নিহতের স্বজনসহ উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে যান। সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজগর আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, নিহতের মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে।
সেনবাগে মা-ছেলে সহ নিহত ৩
সেনবাগ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান,: নোয়াখালী-ফেনী মহাসড়কের সেনবাগ রাস্তার মাথায় যাত্রীবাহী সিএনজি ও মালবাহী পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মা ছেলেসহ ৩ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছে। সোমবার সকাল পৌনে ৯টায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হচ্ছেন- সেনবাগ উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের উত্তর রাজারামপুর গ্রামের খান পাড়া ইমান আলী খানের স্ত্রী ফিরোজা খানম রত্না (৬০) তার ছেলে কুয়েত প্রবাসী মোহন খান (৩৫) ও সিএনজি চালক দক্ষিণ মোহাম্মদপুর গ্রামের আবু তাহের (২৫)। গুরুতর আহতরা হচ্ছেন- নিহত মোহন খানের স্ত্রী বিবি মর্জিনা আক্তার (৩০), তার ছেলে মিরান খান (৭) ও পিকআপ যাত্রী ডমুরুয়া ইউপি সাতবাড়ীয়া গ্রামের সফি উল্যার পুত্র মো. মাসুদ (৩৫) পিকআপ চালক ও হেলপার। এদের মধ্যে শিশু মিরান ও তার মায়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদেরকে নোয়াখালীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা  হয়েছে। খবর পেয়ে সেনবাগ থানার ওসি মঈন উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশ নিহত আহতদের উদ্ধার করেন।
সেনবাগ থানার ওসি মো. মঈন উদ্দিন আহমেদ জানান, দুর্ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি।
বাসচাপায় এসআই নিহত: ঈগল পরিবহনের চালক বেলাল কারাগারে 
রাজধানীর মিরপুরে রাইনখোলায় ঈগল পরিবহনের বাসেরচাপায় পুলিশের এসআই (উপপরিদর্শক) উত্তম কুমার সরকার নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় বাসটির চালক মো. বেলাল হোসেনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল চালক বেলালকে আদালতে হাজির করলে ঢাকা মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাস আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ প্রদান করেন। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলী থানার এসআই খোকন চন্দ্র দেবনাথ গতকাল আসামিকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। তবে, চালক বেলালের পক্ষে কোনো আইনজীবী শুনানি করেননি।

একদিন না পড়িয়েও অধ্যাপক হওয়ার দৌড়ঝাঁপ: ১০৯১ জনের খসড়া তালিকা by নূর মোহাম্মদ

ড. মাহবুবা ইসলাম। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সহযোগী অধ্যাপক। মূল পদ সরকারি কলেজ হলেও মাউশির (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর) মনিটরিং-উইং-এ উপ-পরিচালক পদে বর্তমানে কর্মরত। উদ্ভিদবিদ্যার এই শিক্ষক চাকরি জীবনে এক বছরের কম সময় কলেজে থাকলেও ক্লাসে যাননি একদিনও। তবুও সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির তালিকায় (গ্রেডেশন লিস্ট) তার  নাম ২য় স্থানে রয়েছে। ১৪তম বিসিএস ব্যাচের এ শিক্ষক চাকরির শুরুর দিকে কিছু দিন একটি সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করলেও ১৯৯৮ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি হয়ে আসেন। এর মাঝখানে পিএইচডি ডিগ্রির ডেপুটেশন নেন। আর ২০০১ সালের পর মাউশির সহকারী পরিচালক পদ দিয়ে শুরু করে বর্তমানে উপ-পরিচালক। একই উইংয়ে ১৭ বছর চাকরি করে শিক্ষা প্রশাসনে রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
একই অবস্থা মাউশির আরেক উপ-পরিচালক খুরশেদ আলমের। তিনিও চাকরি জীবনে কলেজে না পড়িয়ে ২০০৩ সাল থেকে শিক্ষা ভবনে আছেন। অর্থনীতির এ শিক্ষক অধ্যাপক পদে পদোন্নতি তালিকায় ২৫ নম্বরে আছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী। তিনি ২০০৯ সাল থেকে শিক্ষা বোর্ডের আগে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে ঘুরে ফিরে চাকরি করছেন। অর্থনীতির সহযোগী এই অধ্যাপক পদোন্নতির তালিকায় ৯ নম্বরে রয়েছেন। একই ভাবে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক বাংলার শিক্ষক মো. আবুল বাশার ১১ নম্বরে, দর্শনের শিক্ষক নায়েমের কাল চাঁদ শীল ১১ নম্বরে, অর্থনীতির শিক্ষক ইমরুল হাসান ৫ নম্বরে, ডিআইএ থেকে সম্প্রতি বদলি হওয়া ব্যবস্থাপনার শিক্ষক রাশেদুজ্জামান ১১ নম্বরে।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুল (বিএসআর) ১৯৮১ এর ৫, ৬ ও ৭ বিধি অনুযায়ী, শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতির জন্য পাঁচ বছর, সহযোগী অধ্যাপকের জন্য ৩ বছর এবং অধ্যাপক পদের জন্য ২ বছর অর্থাৎ ফিডার পদে ১০ বছর থাকতে হবে। ফিডার সার্ভিস বলতে শিক্ষা ক্যাডারের মূল পদ সরকারি কলেজে কর্মরত থাকতে হবে। এছাড়াও সব ক্যাডার পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের শুরুতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস ও শিক্ষানবিশকাল শেষ করে চাকরি স্থায়ীকরণ বাধ্যতামূলক। পদোন্নতির জন্য পরীক্ষায় পাসও বাধ্যতামূলক। যারা এসব যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হবেন তাদের চাকরির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হলে পরীক্ষা প্রমার্জন সাপেক্ষে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হবেন। কিন্তু আইন ভঙ্গ করে ২০০৬ সাল থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষা ক্যাডারে চরম অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আদালতে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। তারপরও মাউশি আবারো বিধি লঙ্ঘন করে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির খসড়া তালিকা চূড়ান্ত করেছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে ‘বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি)’ সভা হয়েছে। তালিকা থেকে বিষয়ভিত্তিক ২০ শতাংশ সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তালিকায় পদার্থ বিদ্যার ৪৯ জন, পরিসংখ্যানের দুইজন, প্রাণিবিদ্যায় ৬৩ জন, বাংলায় ৮০ জন, ব্যবস্থাপনায় ৬৯ জন, ভূগোলে সাত জন, মৃত্তিকা বিজ্ঞানে তিনজন, মনোবিজ্ঞানে চার জন, রসায়নে ৪২ জন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৭৮ জন, সমাজবিজ্ঞানে ১৩ জন, সমাজকল্যাণে ২৯ জন, সংস্কৃতে একজন, হিসাব বিজ্ঞানে ৬৩ জন, অর্থনীতিতে ৮১ জন, আরবিতে আট জন, ইসলামী শিক্ষায় ২৭ জন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতে ৭২ জন, ইংরেজিতে ৭৯ জন, ইতিহাসে ৭৯ জন, উদ্ভিদবিদ্যায় ৭৮ জন, গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ছয় জন, গণিতে ৫৯ জন, দর্শনে ৮৫ জন। এছাড়া টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ইতিহাসে একজন, ভূগোলে একজন, বিজ্ঞানে একজন, শিক্ষায় নয় জন, গাইডেন্স অ্যান্ড কাউন্সেলিংয়ে একজন রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বর্তমানে তার নির্বাচনী এলাকায় রয়েছেন। তিনি ফিরলেই আবার ডিপিসির সভা করে পদোন্নতির তালিকা প্রকাশ করা হবে।
মাউশির দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অধ্যাপকদের অবসরে যাওয়ার হিসাব করে ১৯টি বিষয়ের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য ১০৯১ জনের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সারা দেশের সরকারি কলেজের বর্তমানে ৯৮টি অধ্যাপক পদ শূন্য রয়েছে। আর ডিসেম্বরে ৮০ জন অবসরে যাবেন। মাউশির হিসাব মতে ১৭৮টি পদে অধ্যাপকের পদোন্নতি যোগ্য। তবে গত বছরের ১০ই নভেম্বর ২৭৪ জনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৫৮ জন গতকাল পর্যন্ত আগের পদে বহাল আছেন। 
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষা ক্যাডারটি পার্শ্ব (লেটারাল এন্ট্রি) প্রবেশের। অর্থাৎ বিসিএস পরীক্ষায় পাস না করেও আত্তীকৃত শিক্ষক, পরিদর্শক থেকে পদোন্নতিসহ বিভিন্ন ভাবে এ ক্যাডারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। বিধি অনুযায়ী শিক্ষা ক্যাডারের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদে যোগদানের তারিখ থেকে। পদোন্নতির খসড়া তালিকা করার ক্ষেত্রে এ বিধানও মানা হয়নি। নিয়ম মেনে পদোন্নতি না দেয়ায় ৭ম থেকে ১৪তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। এবারের পদোন্নতির তালিকায় বিভাগীয় পরীক্ষায় পাসসহ নিয়মিত পদোন্নতিপ্রাপ্ত ও মেধাবীদের নাম রয়েছে অপেক্ষাকৃত নিচের দিকে। এতে করে তারা পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। মাউশির এক শ্রেণির কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের তালিকার শীর্ষে রাখার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
এ ব্যাপারে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এখনো কিছুই হয়নি। শুধু এসিআর (বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন) যাচাই বাছাই হয়েছে। কোনো চূড়ান্ত তালিকাও করা হয়নি। কিছু ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। পদোন্নতির যোগ্যতায় কারো ঘাটতি থাকলে তাকে পদোন্নতি দেয়া হবে না। পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো রকম অনিয়ম হবে না।
চাকরি বিধি ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে গত সাত বছরে প্রায় এক হাজার বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় ফেল করেছেন। কারো আবার চাকরিই স্থায়ী হয়নি। তবুও অধ্যাপক হয়েছেন। এরমধ্যে আছেন অধ্যাপক ফারহানা হক। তিনি টানা ১৮ বছর শিক্ষা প্রশাসনে ছিলেন। গত বছর সর্বশেষ পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে ১০% কোটায় উপ-সচিব হয়েছেন। মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যুলয়েশন উইং ২০০৮ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পরিচালক ছিলেন প্রফেসর দিদারুল আলম। তিনি ৩৩ বছর চাকরি জীবনের মাত্র ৬ মাস ক্লাসে পড়িয়েছেন। সেসিপের উপ-পরিচালক ড. শামসুন নাহার ২০০১ সাল থেকে টানা মাউশিতে বিভিন্ন পদে আছেন।
সেসিপের আরেক উপ-পরিচালক সাইফুদ্দিন চৌধুরী ১৯৯৮ সাল থেকে টানা মাউশিতে আছেন। মাউশির সাবেক উপ-পরিচালক মেজবাহ উদ্দিন সরকার মাউশিতে ছিলেন ১০ বছর আর প্রশিক্ষণ শাখার উপ-পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন টানা ১৩ বছর। সম্প্রতি তাদের অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক এপিএস মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈ ১৯৯১-৯৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন শিক্ষা প্রশাসনে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ছিলেন তৎকালীন সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পিএস। আর ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন এপিএস। ২০১৫ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক হিসেবে ছিলেন। কিছুদিন আগে তাকে রাজশাহীতে বদলি করা হলেও বেশির ভাগ সময় পার করেন ঢাকায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাউশির একটি সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কলকাঠি নেড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে অবৈধভাবে পদোন্নতি দিতে গিয়ে বলি দেয়া হয়েছে পদোন্নতি যোগ্য প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তাকে।
২০০৬ সাল থেকে ২০১৭ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা তালিকা, ফিট লিস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর ও ২৩শে অক্টোবর দুই দফায় ৫৮৭ জন পদোন্নতিপ্রাপ্ত অধ্যাপকের মধ্যে ১৫৪ জন বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় ফেল করা। ২০১৪ সালের ১৪ই অক্টোবর পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৩৬৭ জন অধ্যাপকের মধ্যে দুই শতাধিক ফেল করা ও ১৪৮ জন পদোন্নতির অযোগ্য ছিলেন। শর্ত পূরণ না করায় তাদের চাকরিও স্থায়ী হয়নি। তবুও তারা অধ্যাপক হয়েছেন।

এই মুহূর্তের রাজনীতি

এসি রুম থেকে বের হওয়ার চেষ্টায় রাজনীতি। নয়া পল্টনে বিপুল উপস্থিতি থেকে রসদ খুঁজছে বিএনপি। সর্বদলীয় ঐক্যের প্রচেষ্টা অবশ্য এখনো বেশিদূর এগোয়নি। সাবেক এক প্রেসিডেন্ট পরিবারের ভূমিকা এক্ষেত্রে নিয়ামক হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় দৃশ্যত বিরোধী শিবিরের প্রতি পুনরায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ম্যাসেজ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না। তবে ইতিহাস কখনো কখনো একই সুরে পুনরায় বাজে। মার্ক টোয়েনের নামে প্রচলিত উক্তিটির অনুবাদ চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কাছ থেকে ধার করা। তার এক নাটকের সমালোচনার পটভূমিতে তিনি এই উক্তি স্মরণ করেছেন। কিছুদিন আগে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটক বারবার আলোচনায় এসেছে। শাস্তি, ক্ষমা, সমঝোতা-এ সবই ঘটে গেছে সেখানে। বাংলাদেশে আপাত এর কোনো সম্ভাবনা নেই। বহু আগে এই পত্রিকাতেই শিরোনাম হয়েছে, আমরা নড়িব না। এখনো তারা অনড়। যদিও দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়েছে। এক নেত্রী বন্দি নাজিম উদ্দিন রোডে।
কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে সব কিছু। ক্যালেন্ডারে সময় ১১৮ দিন। সবকিছু ঠিক থাকলে এ সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে আগামী সংসদ নির্বাচন। ২৭শে ডিসেম্বর হতে পারে ভোটের দিন এমন একটি গুঞ্জনও রয়েছে। কী হবে এই সময়ের মধ্যে। আরেকটি ৫ই জানুয়ারি? এই প্রেক্ষাপটেই মার্ক টোয়েনকে স্মরণ করা। বাংলাদেশেও কোনো কোনো পর্যবেক্ষক বলে থাকেন, একই ঘটনা বারবার ঘটে না। তাহলে কী একই সুরে বাজা ঘটনা ঘটবে। সরকারি শিবির তাদের অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট করে দিয়েছে। নির্বাচন হবে চলতি সংবিধানের তরিকাতেই। কোনো সংলাপ হবে না, সমঝোতাও হবে না। বিএনপি নির্বাচনে আসতে চাইলে আসতে পারে। তবে তাদের কোনো দাওয়াত দেয়া হবে না। বাধাও দেয়া হবে না। সরকারের এই অবস্থান স্পষ্ট করার আগে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের সংলাপ-সমঝোতার আওয়াজ ছিল। বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেয়ার মাধ্যমে এক ধরনের নমনীয়তার বার্তাও ছিল। তবে এইসব মিইয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনি। এখন যথারীতি হার্ডলাইনেই থাকবে সরকার। মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এরই মধ্যে বার্তা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। প্রশাসনের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় থাকবেন সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও। যদিও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দেশি-বিদেশি নানা হিসাবও মাথায় রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি কী করবে? প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনে নয়া পল্টনে নেতাকর্মীদের স্রোত দলটির নেতাদের আশ্বস্ত করেছে। আন্দোলন ও নির্বাচন দুই প্রস্তুতিই জোরদার করার চেষ্টা করছে বিএনপি। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি বিএনপি শেষ পর্যন্ত কতদূর এগুতে পারে তা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। গ্রেপ্তার অভিযান এরই মধ্যে গতি পেয়েছে। আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির পথ দীর্ঘ হতে পারে। একটি মন্ত্রকের বিশেষ নির্দেশনা কার্যকর হলে রাজনীতির চালচিত্র পাল্টে যেতে পারে। তবে এবার একইসঙ্গে নির্বাচন ও আন্দোলন দুটি বিষয়ই এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে বিএনপি সূত্রে এমনটাই আভাস।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ২০০৬ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছে আবার আন্দোলনও চালিয়ে গেছে। পরে তারা একসঙ্গে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছে। খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া, না যাওয়া প্রসঙ্গে বিএনপির আরেক নেতা বলেন, খালেদা জিয়াকে নিয়েই আমরা নির্বাচনে যাবো। শিগগিরই একটি বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা। এক্ষেত্রে ২০ দলীয় জোট ঠিক রেখে এগিয়ে যেতে চান তারা। এ নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তি রয়েছে। মূলত ওই দলের আপত্তির কারণেই সর্বদলীয় ঐক্য প্রক্রিয়া শ্লথ গতিতে এগুচ্ছে। ওই দলের প্রধান এখন জামায়াতের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে থাকলেও চারদলীয় জোটের রাজনীতি করতে তার কোনো সমস্যা হয়নি।
ওই জোটের সমর্থনেই তিনি রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে পৌঁছেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বৃহৎ জোট কোনো কারণে না হলেও যুগপৎ আন্দোলন যেন হয় এ নিয়ে বিএনপি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ প্রচেষ্টার ফলাফল শিগগিরই পরিষ্কার হবে বলে বিএনপি মনে করে। বৃহৎ ঐক্য প্রক্রিয়ায় জাতীয় পার্টিকে সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টাও রয়েছে বিএনপির একটি অংশের পক্ষ থেকে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বৃহৎ ঐক্যে আসলে সমস্যা দেখছেন না গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনও। খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে সহসাই বিএনপির পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। যদিও সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে দলটি যুগপৎ আন্দোলনে যেতে চায়।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ভাগ্য নির্ধারক সময়ের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। এই ১১৮ দিনেই ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে রাজনৈতিক শক্তিগুলো। এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাই অবশ্য একমাত্র নিয়ামক হবে না। খেলার আড়ালেও নানা খেলা থাকে। ঢাকার একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, এখন প্রতিটি দিনই হবে ইন্টারেস্টিং।

কালো দিন: মিয়ানমারে রয়টার্সের ২ সাংবাদিকের কারাদণ্ড

মিয়ানমারে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোন এবং কাইওয়া সোয়ে ও’কে জেল দেয়ার প্রতিবাদ উঠছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। বিভিন্ন দেশ ও অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো একে ক্ষোভ থেকে অবিচার বলে আখ্যায়িত করেছে। এ খবর দিয়েছে  অনলাইন আল-জাজিরা। এতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যার রিপোর্ট করার কারণে ওই দুই সাংবাদিককে ৭ বছর করে জেল দিয়েছেন আদালত। এতে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের সোমবার শাস্তি দেয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন মিয়ানমারে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের রাষ্ট্রদূতরা। তারা এমন রায়কে মিয়ানমারের গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে একটি বড় আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন। মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত স্কট মারসিয়েল। তিনি বলেছেন, ওয়া লোন, কাইওয়া সোয়ে ও এবং তাদের পরিবারের জন্য তিনি বেদনাহত। একই সঙ্গে মিয়ানমারের জন্যও। তিনি আরো বলেন, যারা মিডিয়ার স্বাধীনতার জন্য কঠোর লড়াই করছেন তাদের সবার কাছে এ বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক। এ রায়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে যে, মিয়ানমারের জনগণ তাদের বিচার ব্যবস্থার ওপর কতটা আস্থা রাখেন।
মিয়ানমারে বৃটিশ রাষ্ট্রদূত ড্যান চাগ। তিনি বৃটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই রায়ে আমরা গভীরভাবে হতাশ। বিচারক দৃশ্যত প্রমাণকে অবজ্ঞা করেছেন। মিয়ানমারের আইনকে তিনি অবজ্ঞা করেছেন। আইনের শাসনের বিরুদ্ধে এটি হাতুড়ির আঘাত।
ওদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী এ রায়ের কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা এখন ওপেন সিক্রেট যে, যেকোনো মিডিয়া বা যেকোনো ব্যক্তি যদি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংসতা প্রকাশ করতে চায় তাহলে মিয়ানমার সরকার তাদের বিচারের মুখোমুখি করবে।
উল্লেখ্য, রাখাইনের ইন ডিন গ্রামে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে তদন্ত করার অপরাধে রয়টার্সের ওই দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয় ১২ই ডিসেম্বর। কিন্তু মিয়ানমার বারবার তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে। কিন্তু রয়টার্সের ওই দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের পর সেনাবাহিনী স্বীকার করে নেয় ইন ডিন গ্রামের ওই ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যার অভিযোগ। ফলে ওয়া লোল ও কাইওয়া সোয়ে ও’র বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে একপেশে ও অবিচার বলে আখ্যায়িত করেছেন সাংবাদিক ওয়া লোন। তিনি বলেছেন, এই রায় মিয়ানমারের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এটা সরাসরি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি। কাইওয়া সোয়ে ও বলেছেন, তারা কোনো অপরাধ করেননি। তারা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকারের অধীনে কাজ করছিলেন। তিনি বলেন, আমি সরকারকে একটি কথা বলতে চাই। তা হলো, আপনারা আমাদেরকে জেলে দিতে পারেন। কিন্তু মানুষের চোখ ও কানকে বন্ধ করতে পারবেন না।
মিয়ানমারে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিয়ান শমিডট টুইটারে বলেছেন, এই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দেয়া শাস্তি পর্যালোচনা করা উচিত এবং তাদেরকে অনতিবিলম্বে শর্তহীন মুক্তি দেয়া উচিত। মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক ও মানবিক সহায়তা বিষয়ক সমন্বয়ক কুট ওস্টবি ওই সাংবাদিকদের মুক্তি দাবি করেছেন। তিনি এমন রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, জাতিসংঘ অব্যাহতভাবে রয়টার্সের সাংবাদিকদের মুক্তি দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশ ও তথ্যপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে জাতিসংঘ। সাংবাদিক ওয়া লোন ও কাইওয়া সোয়ে ও’কে তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে দেয়া উচিত এবং সাংবাদিক হিসেবে তাদের কাজকে অব্যাহত রাখতে দেয়া উচিত। ওদিকে এ শাস্তিকে অবিচার আখ্যায়িত করে তা বাতিল করতে মিয়ানমার সরকারের কাছে একটি বিবৃতি দিয়েছে ডেনমার্ক। মিয়ানমারে ডাচ দূতাবাসের একজন মুখপাত্র মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ওই দুই সাংবাদিককে যত দ্রুত সম্ভব মুক্তি দিতে। রয়টার্সের প্রধান সম্পাদক স্টিফেন জে আদলার এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পালাবদলকে এই রায় পশ্চাৎ দিকে নিয়ে যাবে।
জরুরি হিসেবে নিয়ে এ বিষয়টি ঠিক করতে হবে মিয়ানমার সরকারকে। তার ওই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেন তিনি। বলেন, এমন অভিযোগ এনে তাদের রিপোর্র্টিংকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং মিডিয়াকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে যাবো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক ফিল রবার্টসন এই রায়কে ক্ষোভ থেকে অবিচার বলে আখ্যায়িত করেছেন। নিন্দা জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার বিষয়ক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস। তারা বলেছে, এই রায় চিহ্নিত হয়ে থাকবে যে মিয়ানমার নতুন করে অবনতিতে।
সিজেপির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র প্রতিনিধি শাওন ক্রিসপিন এক বিবৃতিতে বলেছেন, যে প্রক্রিয়ায় এই রায় দেয়া হয়েছে তা ন্যায়বিচারের জন্য হাস্যকর। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তিরানা হাসান এই রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, এ রায়ের মধ্যদিয়ে অন্য সাংবাদিকদের কাছে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে যে, তারা সেনাবাহিনীর নির্যাতন নিয়ে কোনো রিপোর্ট করলে তাদের জন্যও একই রকম ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। এর ফলে আতঙ্কে অনেকেই সেন্সরশিপ আরোপ করবে। মিয়ানমারের ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার থান্ট মিন্ট-ইউ এ রায়কে মিডিয়ার স্বাধীনতার জন্য একটি ট্রাজেডি বলে আখ্যায়িত করেছেন। ওদিকে বাংলাদেশে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নেতা মোহিব উল্লাহ ওই দুই সাংবাদিকের দ্রুত মুক্তি দাবি করেছেন।

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড় চলছেই, আত্মগোপনে বহু বাংলাদেশি by রোকনুজ্জামান পিয়াস

মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গতকাল রোববার রাত পর্যন্ত আটক করা হয়েছে দেড় সহস্রাধিক বিদেশি নাগরিককে। যাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক। আটককৃতদের ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশিসহ অবৈধভাবে কর্মরত এসব বিদেশি নাগরিকদের বৈধ হওয়ার জন্য কয়েকদফা সুযোগ দেয় দেশটির সরকার। এরমধ্যে যারা এই সুযোগ গ্রহণ করেনি তাদের ধরতেই অভিযান চলছে। এদিকে এই ধরপাকড়ের ভয়ে প্রায় কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মক্ষত্রে যাচ্ছেন না। গ্রেপ্তার আতঙ্কে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অভিযানের মধ্যে গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে যেতে গিয়ে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহতও হয়েছেন। এদিকে মালয়েশিয়ার নির্মাণখাত ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি কমেছে। বিপাকে পড়েছেন কারখানার মালিকরাও। সূত্র জানায়, আটক বিদেশি নাগরিকদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। এসব ডিটেনশন ক্যাম্পের পরিবেশ অনেকটাই বসবাসের অযোগ্য।
সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় যারা পাচারকারীদের মাধ্যমে ট্রলারে বা পার্শ্ববর্তী দেশের বিভিন্ন রুট দিয়ে অবৈধ পথে এসেছেন তাদের বৈধতার আর কোনো সুযোগ নেই। মালয়েশিয়া সরকারও তাদের আর কোনো সুযোগ দিতে চায় না। মালয়েশিয়ায় কর্মরত এসব অবৈধ কর্মীদের বৈধ হওয়ার জন্য গত ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে যারা আবেদন করেছেন তারা ধরপাকড় থেকে রেহায় পাচ্ছেন। অন্যথায় যারা এই সুযোগ নেননি তারা পড়েছেন বিপাকে। এরপর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে পুলিশ। রাজধানীর কুয়ালালামপুর, পেরাক, জোহর বারু, কোতা বারু, কেলান্তান, কেদাহ, আলোর সেতার, মালাকাসহ দেশটির প্রত্যন্ত প্রদেশগুলোতেও ব্যাপক অভিযান অব্যাহত আছে।
সূত্রমতে, গত তিনদিনে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করতে ১২ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের পারমিট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। এরমধ্যে ১ হাজার ৫৪৭ জনই অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যাদেরকে ইমিগ্রেশন বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে।
যারা বৈধপথে অর্থাৎ পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে মালয়েশিয়ায় এসেছেন তাদেরকে রিহায়ারিং বা পুনঃনিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈধ হওয়ার সুযোগ দেয়া হয় আগামী ৩১শে আগষ্ট পর্যন্ত। কিন্তু যারা পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে আসেননি বা অন্য অবৈধ পথে গেছে তাদের আর বৈধতার সুযোগ নেই। এছাড়া যারা দেশটিতে ১০ বছরের বেশি সময় অবস্থান করছেন বা যাদের বয়স ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে তাদেরকে ৩১শে আগস্টের মধ্যে দেশ ছাড়তে আল্টিমেটাম দিয়েছিলো দেশটির সরকার। কিন্তু এই সুযোগ যারা গ্রহণ করেননি তারাও পাকড়াও হচ্ছেন। তাদেরও দেশটিতে অবস্থানের আর কোনো সুযোগ দেবে না বলে জানিয়েছিল।
সূত্র জানায়, দালাল চক্র ও একশ্রেণির মালিকদের অবহেলার কারণে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি বৈধ হওয়ার এই সুযোগ নিতে পারেননি। বৈধ প্রক্রিয়াকরণে জটিলতার কারণে অনেকেই দালালদের দ্বারস্থ হন। দালালরা তাদেরকে বৈধকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন। ফলে প্রতারিত কর্মীরা দালালদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে সময় পেরিয়ে যায়। তারা আর বৈধ হতে পারেন না। এমনই একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসির। তিনি দেশটিতে একটি গ্রিলের কারখানায় কাজ করেন। ৪ বছর আগে তিনি দেশটিতে গিয়েছিলেন। তার ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ ছিলো দুই বছরের। এরপর তিনি তার পারমিটের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য এক দালালের শরণাপন্ন হন। তাকে ৯ হাজার রিঙ্গিত দেন। কিন্তু ওই দালাল অর্থ পেয়েই কেটে পড়ে। এরপর থেকে নাসির দুই বছর ধরে অবৈধ হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছেন। নাসির বলেন, গত দুইবছর ধরে তিনি বিভিন্ন সময় পুলিশকে টাকা দিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন। বর্তমানে আবারো ধরপাকড় শুরু হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে আছেন। কাজেও যেতে পারছেন না। নাসিরের মতো লাখ লাখ বাংলাদেশি দেশটিতে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে কেউ কেউ অবস্থা বুঝে ঝুঁকি নিয়েই কাজে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় অনেক মালিক ও দালাল অবৈধ কর্মীদের বৈধ হতে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেন। তারা এসব কর্মীকে বোঝান মালয়েশিয়ান সরকার আবারো এই সুযোগ দেবে তাদের। কিছুদিন পর ধরপাকড়ও বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণেও অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়ে বৈধতার সুযোগ নিতে পারেননি বা দেশে ফিরে আসেননি।
দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মো. ইলিয়াস বলেন, মাঝে-মধ্যেই দেশটির সরকার অবৈধদের ধরতে এই ধরনের উদ্যোগ নেয়। তার আগে দেশত্যাগ বা বৈধ হওয়ার জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু কেউ কেউ সেই সুযোগ গ্রহণ করলেও বেশির ভাগই এর বাইরে থাকে। ফলে এই সময়টাতে আতঙ্কে থাকে অবৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকরা। কি কারণে বাংলাদেশিরা এই সুযোগ নিতে চান না এমন প্রশ্নের জবাবে এই ব্যবসায়ী বলেন, অভিযান চলার কিছুদিন পরই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনেকের ধারণা এমন হয়েছে, কিছুদিন পরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এই ভরসায় তারা সরকারের এই সুযোগ না নিয়ে অভিযানের কয়েকদিন আত্মগোপনে থাকে। এছাড়া তিনি বৈধকরণ প্রক্রিয়ার জটিলতার কথাও তুলে ধরেন। বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অধিক কার্যকর হতো। এছাড়া অভিবাসন ব্যয় কমানোর কথাও বলেন, ব্যবসায়ী মো. ইলিয়াস।

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবিতে মজুরি বোর্ড ঘেরাও

তৈরি পোশাক শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাবনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবিতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড ঘেরাও করেছে। গতকাল বেলা তিনটায় তারা নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করে। পরে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে শ্রমিক সংগঠনের নেতারা মজুরি বোর্ডের সঙ্গে আলোচনার পর ঘেরাও কর্মসূচি স্থগিত করে। ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের চতুর্থ বৈঠক মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বোর্ড কর্তৃপক্ষ শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ১২ই সেপ্টেম্বর পরবর্তী বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করেন। শ্রমিক নেতারা আশা করছেন ওই বৈঠকে তাদের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বৈঠকে শ্রমিক নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, শামছুন্নাহার ভূঁইয়া, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমই) সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান ও বোর্ডের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বোর্ডের তৃতীয় বৈঠকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি মালিকদের পক্ষ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা করার প্রস্তাবনা আসে। শ্রমিক নেতারা সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। পোশাক শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, ন্যূনতম মজুরির খসড়া প্রস্তাবনা ৩১শে জুলাইয়ের মধ্যে শ্রম মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার নির্দেশ ছিল। কিন্তু সেটি করা হয়নি। গত ৬ মাসে মাত্র তিনটি বৈঠক হয়েছে। শ্রমিকরা মনে করছেন যত দেরি করে খসড়া দেয়া হবে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে তত বিলম্ব হবে। টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তপন সাহা বলেন, পোশাক শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষিতে জানুয়ারির ৩০ তারিখে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে ছয় মাসের মধ্যে প্রস্তাবনা জমা দেয়ার নির্দেশনা ছিল। সংশ্লিষ্টরা সেই প্রস্তাবনা জমা দিতে ব্যর্থ হন। পরে জুলাই মাসে পুনরায় আরো তিন মাস সময় বাড়িয়ে নেয়া হয়।
আগামী ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন: এদিকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন হবে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তবে নতুন মজুরি কত হচ্ছে এখনও তা নির্ধারণ করতে পারেনি সরকার গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড। মজুরি নির্ধারণে বোর্ডের কাছে দেয়া প্রস্তাব থেকে কিছুটা ছাড় দিয়ে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষকে ভারসাম্যে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, মজুরি নির্ধারণে আগামী ১৭ই অক্টোবর বোর্ড থেকে সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রস্তাব পাঠানো হবে। পরে তা উঠবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে। আর আগামী ১২ই সেপ্টেম্বর বোর্ডের পঞ্চম সভা অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল রাজধানীর তোপখানা রোডে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চতুর্থ বৈঠকে সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য জানান। বৈঠকে চার সদস্য বিশিষ্ট স্থায়ী ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের  চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, মালিক পক্ষের প্রতিনিধি কাজী সাইফুদ্দীন আহমদ, শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি ফজলুল হক মন্টু ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অস্থায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি জাতীয় শ্রমিক লীগের নারী বিষয়ক সম্পাদক বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়া। এর আগে ১৬ই জুলাই তৃতীয় বৈঠকে মালিক ও শ্রমিক পক্ষ তাদের প্রস্তাবনা জমা দেয়। ওই বৈঠকে শ্রমিক পক্ষ সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ২০ টাকা করার দাবি করে। তবে মালিক পক্ষ ৬ হাজার ৩৬০ টাকার প্রস্তাব দেয়। মজুরি বোর্ডের বৈঠক শেষে এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, বৈঠকে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষকে আমরা অনুরোধ করেছি একটু বিবেচনা করে দেখার জন্য, তাদের প্রস্তাব থেকে কিছুটা ছাড় দেয়া যায় কি না। একটু কাছাকাছি আসা যায় কি না। এই বিষয়ে আমরা উভয় পক্ষের কাছে প্রস্তাব রেখেছি। উভয় পক্ষই এ ব্যাপারে আমাদের আশ্বস্ত করেছে। মালিক ও শ্রমিক পক্ষ উভয়ই তাদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করবে।
বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আলোচনা করে আমরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি বিধায় আবার আরেকটি মিটিং দেয়া হয়েছে। সেই মিটিংয়েই যে হয়ে যাবে সেটাও আমরা বলতে পারছি না। আমরা চেষ্টা করছি সবাই মিলে এমন একটা জায়গায় আসা যায় যাতে শিল্পের সক্ষমতা এবং শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা রক্ষা পায়। সেই চেষ্টাটাই আমরা করে যাচ্ছি। আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলেই ফাইনাল অ্যামাউন্ট (নতুন মজুরি) আমরা আপনাদের জানাতে পারবো।

২২শে সেপ্টেম্বরের পর ঐক্য প্রক্রিয়ার অভিন্ন কর্মসূচি

নির্বাচন সামনে রেখে বৃহৎ রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতারা। এ পর্যন্ত তিন দলের যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের মধ্যে ঐক্যের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। ঐক্যপ্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর নাগরিক সমাবেশের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ওই সমাবেশে সরকারের বাইরে থাকা প্রায় সব দলকেই আমন্ত্রণ জানানো হবে। দলের বাইরেও বিশিষ্ট ব্যক্তি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও সমাবেশে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। প্রত্যাশা অনুযায়ী সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে সমাবেশ থেকেই বৃহৎ জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা আসতে পারে। পরে জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও নির্বাচন ব্যবস্থার দাবিতে অভিন্ন কর্মসূচিও আসতে পারে বলে নেতারা আভাস দিয়েছেন।
জাতীয় ঐক্য গড়তে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে ২২শে সেপ্টেম্বরের সমাবেশ হবে। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকেই রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।
গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, জাতীয় ঐক্যকে সামনে নিয়ে আমরা কাজ করছি। বৃহৎ জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে ২২শে সেপ্টেম্বর আমরা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা এলে আমরা অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামব। নির্বাচন সামনে রেখে গণফোরাম দলীয় কর্মসূচি পালন করছে বলে জানান তিনি।
এদিকে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, ২২শে সেপ্টেম্বরের সমাবেশ নিয়ে গণফোরাম কাজ করছে। তারা আমন্ত্রণ জানাবে। জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের ঐকমত্য হয়েছে। এখনও জোটগত কর্মসূচি ঠিক হয়নি। তবে আমরা দলীয় কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছি। তিনি বলেন, জেএসডি বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কর্মসূচি পালন করছে। সভা-সমাবেশ করছে। সামনে কয়েকটি জেলায় কর্মসূচি রয়েছে। যুক্তফ্রন্টের শরিক বিকল্পধারা বাংলাদেশও দলীয় কর্মসূচি পালন করছে। অন্য শরিক নাগরিক ঐক্যের পক্ষ থেকেও সভা-মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নেতারা জানিয়েছেন, আপাতত সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার লক্ষ্য রয়েছে। কোনো কারণে অনুমতি না মিললে ভিন্ন ভেন্যুর চিন্তা করা হবে। সমাবেশে বিএনপিসহ সরকারের বাইরের সব দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। আওয়ামী লীগ ও সরকারের শরিক দলগুলোকে সৌজন্য হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হবে কি-না এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি উদ্যোক্তারা। বিএনপি ও ২০ দলের অন্য শরিকদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও জামায়াতকে এ ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় ঐক্য গড়তে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতারা। সর্বশেষ গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম ঐক্য প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে কাজ করতে একমত হয়। বৈঠকে নেতারা সামনের করণীয় ঠিক করতে একটি সাব-কমিটি গঠনের কথাও জানান। বৈঠকে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এ আগে বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর অব. আবদুল মান্নানের বাসায় বৈঠক করেন নেতারা। এ প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত যুক্ত না হলেও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতারা। কাদের সিদ্দিকী সম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য ও নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

চট্টগ্রামে আস্তানা উচ্ছেদে পতিতাদের কান্না

চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্দর টোল রোডের দু’পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলো পতিতা ও মাদকের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। আর এসব আস্তানা উচ্ছেদে দীর্ঘদিন ধরে আবেদন-নিবেদন করে আসলেও তা কোনো সময় নজরে আনেনি প্রশাসন।
কিন্তু সোমবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন হঠাৎ এসব আস্তানা উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে। এতে কান্নার রোল পড়ে পতিতাদের মধ্যে। আর মুখে হাসি ফুটে স্থানীয় লোকজনের। দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা এই উচ্ছেদ অভিযান চলে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোরাদ আলী অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি জানান, স্থানীয় লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্দর সংযোগ সড়ক টোল রোডের দু’পাশে প্রায় তিনটি ভাসমান পতিতাপল্লীর তিন শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে আস্তানার ঘরগুলোতে থাকা পতিতারা তুমুল বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। এমনকি প্রাচীর সৃষ্টি করে অভিযানে বাধা দেয়। বাধা ডিঙ্গিয়ে উচ্ছেদ শুরু করলে কান্নার রোল পড়ে যায়। এরমধ্যে হিজড়াও ছিল।
তিনি বলেন, অভিযানকে প্রভাবিত করতে আস্তানার একজন হিজড়া নিজেই ইট দিয়ে নিজের মাথা ফাটিয়ে রক্তপাত করেন। এমনকি তারা পুলিশের সঙ্গে দাঙ্গা-হাঙ্গামারও চেষ্টা চালান। তবে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় পতিতা ও মাদকের এসব আস্তানা উচ্ছেদ সম্ভব হয়। তিনি আরো জানান, পতিতা ও মাদকের আস্তানাগুলো উচ্ছেদের সময় স্থানীয় লোকজন আনন্দ মিছিল করে। অভিযানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্থানীয় লোকজন। শত শত স্থানীয় বাসিন্দা অভিযানে সহযোগিতা করেন বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোরাদ আলী। স্থানীয় বাসিন্দা মো. লিয়াকত, এমরান হোসেনসহ অনেকে জানান, টোল রোডের দু’পাশে দীর্ঘদিন ধরে পতিতাখানা গড়ে উঠলেও প্রশাসন কিছুই করেনি। এসব পতিতাখানা উচ্ছেদে স্থানীয়রা গত ৫-৬ বছর ধরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও থানায় একাধিক অভিযোগ করে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্দর থানার পুলিশ এসব পতিতা ও মাদকের আস্তানায় এসে মাসোহারা নিয়ে যেতেন। ফলে পতিতা ও মাদকসেবীরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা চালাচ্ছিল। তাদের উৎপাতে স্থানীয় লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। অভিযানে স্থানীয় কাউন্সিলর মো. শফিউল আলমও জনগণের সঙ্গে ছিলেন।
শফিউল আলম বলেন, বন্দর শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা এবং তাদের সহযোগীদের ছত্রছায়ায় গত ৭-৮ বছর ধরে টোল রোডের দু’পাশে পতিতা ও মাদকের আস্তানা গড়ে তোলা হয়। ফলে স্থানীয় লোকজন এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলে কিছু বলারও সাহস করতো না। তাই অতিষ্ঠ জনগণ পতিতা ও মাদকের আস্তানা উচ্ছেদে একের পর এক আবেদন জমা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সংস্থার কাছে। অবশেষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন অপরাধের স্বর্গরাজ্য এসব আস্তানা উচ্ছেদ করলো। এতে খুশি স্থানীয় লোকজন।

ফেঞ্চুগঞ্জে সুনাম হত্যা: সিসিটিভির ফুটেজে খুনি শনাক্ত by হাসান চৌধুরী

ফেঞ্চুগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সুনাম হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও ঘাতকরা ধরা পড়েনি। জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জের নাকি প্রেমঘটিত বিষয়ে নির্মম এই খুন, কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না খুনি গ্রেপ্তার না হওয়ায়। ঘটনাস্থলে বিদ্যমান  ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় খুনি শনাক্ত করা গেলেও ঘাতকরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঘোষণা  দিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড ফেঞ্চুগঞ্জে এই প্রথম। তাই ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী। ২৪শে আগস্ট রাতের এই ঘটনায় ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন নিহতের বাবা আব্দুল আহাদ লেচু মিয়া।
গত রোববার সরজমিন উপজেলার পিঠাইটিকর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, আব্দুল আহাদ লেচু মিয়ার একই গোষ্ঠী ও পাশাপাশি বাড়ির মৃত আব্দুর রউফের ছেলে শিব্বির আহমদ ওরফে শিব্বির মেম্বার গংদের সঙ্গে জায়গা জমির বিরোধ চলছিল। কিছুদিন পূর্বে এ নিয়ে তাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়। যা বর্তমানে আদালত পর্যন্ত  গড়িয়েছে।
শিব্বির আহমদ ফেঞ্চুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের প্রাক্তন মেম্বার। গত মার্চে অনুষ্ঠিত ফেঞ্চুগঞ্জে ইউপি নির্বাচনে সুনামের বড় ভাই আকসার মিয়া মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলে উভয়েই নির্বাচনে পরাজিত হন। ব্যাপারটি শিব্বির আহমদ মেনে নিতে পারেননি। নির্বাচনের পরদিনই শিব্বির আহমদ লেচু মিয়ার পরিবারের ২/১ জনকে হত্যা করবে বলে প্রকাশ্যে হুমকি প্রদান করে।
জায়গা জমি ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিব্বির মেম্বার ক্ষুব্ধ ছিল লেচু মিয়া তার ভাই এবং বড় ছেলেদের ওপর। কিন্তু আব্দুল আহাদ লেচু মিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র নম্‌্র-ভদ্র ২১ বছরের সুনামকে কেন খুন করা হলো। এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, নিহত সুনাম এবং শিব্বির মেম্বারের চাচাতো বোনের মধ্যকার গভীর প্রেমের সম্পর্কের কথা।
চির বৈরী প্রতিপক্ষের ছেলে সুনামের সাথে নিজেদের মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি শিব্বির মেম্বার ও তার নিকটজনেরা।  সুনাম হত্যার পেছনে এই প্রেমের বিষয়টি জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপজেলার ফরিজা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ‘ন’ অধ্যক্ষরের ওই মেয়েটির নিজ হাতের লেখা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে নিহত সুনামের বিছানায় বালিশের নিচে। ওই চিরকুটের লেখায় সুনামের সঙ্গে মেয়েটির গভীর ভালবাসার কথাই জানান দেয়া হয়েছে।
পারিবারিক অপর একটি সূত্র জানায়, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ফেঞ্চুগঞ্জ পূর্ব বাজারের ডাকবাংলো সংলগ্ন ভূমি অফিসের যে পরিত্যক্ত ঘরে সুনামকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয় সেখানকার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণকৃত ওই রাতের ফুটেজে ঘাতকদের একজনকে চেনা গেছে।
নিহত সুনামের মা কাজল বেগম জানান, আমার ছেলে সুনামকে শিব্বির মেম্বারসহ তার ভাই, ছেলেরা হত্যা করেছে। আমার ছেলের কোনো দুষমন ছিল না। এলাকার সবাই তাকে স্নেহ করতো। তিনি বলেন, অতীতে শিব্বির আমাদের বহুবার হত্যার হুমকি দিলেও ঘটনার সপ্তাহখানেক পূর্বে শিব্বির মেম্বার তাকে ডেকে নিয়ে বলেন, তোমার ছেলে সুনাম আমার আত্মসম্মানে আঘাতের চেষ্টা করছে। তাকে সামলে নিও, নইলে আমি তাকে ছাড়বো না। কাজল বেগম বলেন, ওই সময় আমি কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। কিন্ত মেম্বার আমার বুকের ধনকে মেরেই ফেলল।
নিহত সুনামের বড় ভাই আকসার মিয়া এই ঘটনায় শিব্বির মেম্বার সরাসরি জড়িত  রয়েছে বলে জানান। ঘাতকদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
ফেঞ্চুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী বদরুদ্দোজা জানান, সুনাম ছেলেটি অত্যন্ত ভাল ছিল। সবাই তাকে আদর স্নেহ করতো। কিন্তু তাকে এভাবে মেরে ফেলা মোটেই মেনে নেয়া যায় না। খুনি যেই হোক  গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানাই। একই গ্রামের মাওলানা মিনহাজ উদ্দিন জানান, সুনামের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। খুনি যতই প্রভাবশালীই হোক আইনের আওতায় এনে তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে, যাতে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আর কেউ না ঘটায়।
ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হক জানান, ঘাতকদের ধরতে অভিযান চলছে। ইতিমধ্যে সোর্স লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই ঘাতকরা ধরা পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সিসি টিভির ফুটেজের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি তদন্তের স্বার্থে এ ব্যাপারে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সুনাম হত্যা মামলার তদন্তকারী পুলিশ অফিসার এসআই নিযুশ কান্তি রায় জানান, মোবাইল কললিস্ট পরীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। ২/১ জনকে ধরতে পারলেই হত্যার মোটিভ এবং বাকিদেরও ধরা যাবে।
সুনাম হত্যার পরদিন ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় নিহতের বাবা ৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামিরা হলেন, পিঠাইটিকর গ্রামের মৃত আব্দুর রউফের পুত্র শিব্বির আহমদ (৫০) ও জুবায়ের আহমদ (৪৫)। শিব্বির আহমদের পুত্র টুনু মিয়া, নাসিম মিয়া (২২) তানিম মিয়া (১৮) এবং আব্দুশ শহীদ দুলু মিয়ার পুত্র রিমন মিয়া (২১)।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: শেষ মুহূর্তে বিরোধীদের ঐক্য চেষ্টা পাকিস্তানে

শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে। মঙ্গলবার সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের (পিটিআই) প্রার্থী ড. আরিফ আলভি। আগে থেকেই পিটিআইকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা চলছিল। তারা চাইছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সব বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তাদের একক প্রার্থী থাকবে। কিন্তু মাঝখানে তাতে ফাটল ধরে। ফলে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) তাদের প্রার্থী নির্ধারণ করে এজাজ আহসানকে। ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) ভর করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (জেইউআই-এফ)-এর ওপর। এ দল থেকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী করা হয় এর প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানকে।
তাকে সমর্থন করে পিএমএলএন। তার ওপর কোনো আস্থা রাখতে পারে নি পিপিপি। তাই তারা আলাদা প্রার্থী দেয়। কিন্তু বিরোধী দল এভাবে বিভক্ত হয়ে প্রার্থী দেয়ায় ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায়। তারা হেসে খেলে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে পারবেন। এ বিষয়টি শেষ মুহূর্তে মাথায় এসেছে পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে। ফলে তারা আবার একক প্রার্থী নির্ধারণের জন্য কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। রোববার পিএমএলএন নেতারা পিপিপির নেতৃত্বের কাছে আহ্বান জানিয়েছে তাদের প্রার্থী এজাজ আহসানকে প্রত্যাহার করে নিতে। একই সঙ্গে আহ্বান জানিয়েছে বিরোধীদলীয় প্রার্থী হিসেবে মাওলানা ফজলুর রহমানকে সমর্থন দিতে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সোমবার ইসলামাবাদে জবাবদিহিতা বিষয়ক আদালতে হাজির করার কথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে। এ সময় তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবেন পিপিপির কিছু নেতা। ওদিকে রোববারই মডেল টাউনে অবস্থিত পিএমএলএনের বর্তমান সভাপতি শাহবাজ শরীফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মাওলানা ফজলুর রহমান।
পিপিপির নেতৃবৃন্দকে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য অনুরোধ করতে তিনি আহ্বান জানান শাহবাজ শরীফকে। পরে মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, পিপিপির প্রার্থী এজাজ আহমেদকে প্রত্যাহার করে না নেয়ার অর্থ হলো পিটিআইয়ের প্রার্থী ড. আরিফ আলভিকে পথ ছেড়ে দেয়া, যেমনটা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে করেছিল পিপিপি। বিষয়টি পিপিপিও ভালো করে জানে। তারা জানে যদি বিরোধী দল থেকে দু’জন প্রার্থী থাকে তাহলে তাতে সুবিধা পাবে পিটিআই। পিপিপির একজন নেতা বলেছেন, আমাদেরকে পরিপক্বতা প্রদর্শন করতে হবে। আসিফ আলী জারদারি আশাবাদী যে, দিনশেষে বিরোধী দলগুলোর একক প্রার্থী হবেন এজাজ আহসান। তিনি আরো জানান, এখনো পিএমএলএন ও পিপিপি নেতারা এক হয়ে একজন যৌথ প্রার্থী দেয়ার সুযোগ আছে। তার কথায়, এ দুটি দল এখনো সমঝোতায় পৌঁছার আশা ছাড়ে নি। ওদিকে মাওলানা ফজলুর রহমানের বিষয়ে পিপিপি যে একমত নয় তাতে কিছুটা হতাশ পিএমএলএন। নওয়াজ শরীফ ও শাহবাজ শরীফ মনে করেন, পিপিপি নেতৃত্বের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে মাওলানা ফজলুর রহমানের। তাই আসিফ আলি জারদারি প্রেসিডেন্ট পদে তাকে সমর্থন করবেন বলে তারা বিশ্বাস করেন। কিন্তু দৃশ্যত, আসিফ আলি জারদারি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার নিজস্ব রাজনৈতিক কার্ড ছাড়বেন বলেই মনে হচ্ছে। এটা হতে পারে বিরোধী দলগুলোর কাছে এক বিস্ময়।
ওদিকে শাহবাজ শরীফের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মাওলানা ফজলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, তার ওপর আস্থা রাখায় ও পিপিপি বাদে অন্য বিরোধী দলগুলোর যৌথ প্রার্থী হিসেবে তাকে মনোনীত করায় তিনি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা পিএমএলএন ও অন্য ১০টি দল যৌথভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো। বিরোধী দলগুলোর একক প্রার্থী নির্ধারণে পিপিপি নেতৃত্বকে রাজি করাতে এবং তাদের প্রার্থী প্রত্যাহারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো আমরা। তবে মজার বিষয় হলো, সাংবাদিকদের সঙ্গে মাওলানা ফজলুর রহমান যখন কথা বলছিলেন তখন তার সঙ্গে ছিলেন না শাহবাজ শরীফ। এর পরিবর্তে তিনি তার ছেলে হামজা শাহবাজ ও পিএমএলএন-এর খাজা সাদ রফিককে পাঠিয়ে দেন। এ সময় মাওলানা ফজলুর রহমানের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, তিনি কেন পিপিপির প্রার্থীর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন না। জবাবে মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, এটা আমাদের জন্য খুব জটিল বিষয়। আমাদের সঙ্গে আছে পিএমএলএন, মুত্তাহিদা মজলিসে আমলের ৫টি দল ও অন্য ৫টি দল। সে হিসেবে পিপিপির পক্ষে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করাটা খুব সহজ।
প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচনে পিপিপি তার অবস্থানে অনড় ছিল। এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, এর ফলে পিটিআই প্রার্থীকে সুবিধা দিয়েছে পিপিপি। পিপিপির রাজনীতির জন্য এটা মোটেও ভালো নয়। আমি পিপিপির নেতৃত্বকে বলেছি, আমাকে একক প্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে। কারণ, এর মধ্য দিয়েই বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
হামজা শাহবাজ বলেন, বিরোধী দলগুলোর যৌথ প্রার্থী হলেন ফজলুর রহমান। এ জন্য পিপিপি ও অন্য দলগুলোকে আমাদের কাতারে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। সাদ রফিক বলেন, একজন একক প্রার্থীর বিষয়ে যদি বিরোধী দলগুলো বিভক্ত থাকে তাহলে তার জন্য দায়ী থাকবেন আসিফ আলি জারদারি ও পিপিপি।

যুক্তরাষ্ট্র বন্য নেকড়ের ন্যায়: এরদোগান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যে এরদোগান বলেছেন, তার দেশ বৈদেশিক বাণিজ্য ও লেনদেনের ক্ষেত্রে আর মার্কিন ডলার ব্যবহার করবে না। রোববার কিরগিস্তানে অনুষ্ঠিত এক ফোরামে তিনি এ কথা জানিয়েছেন। এ সময় এরদোগান যুক্তরাষ্ট্র বন্য নেকড়ের মতো আচরণ করছে বলে দাবি করেন। এ খবর দিয়েছে আল-জাজিরা।
খবরে বলা হয়েছে, চলমান বিবাদের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের উপরে ক্ষেপে আছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অতিরিক্ত শুল্কের জবাব দিতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। রোববারের ফোরামে এরদোগান জানিয়েছেন, নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনা করতে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটা চুক্তি হতে চলেছে। এ বিষয়ে দেশ দুটির মধ্যে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, ডলারের একচেটিয়া ব্যবহার বন্ধে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। এজন্য দরকার বৈদেশিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করা। এ সময় তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র বন্য নেকড়ের মতো। তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করবেন না। ডলার ব্যবহার করে আমরা শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছি। কিন্তু আমরা থেমে থাকবো না। আমাদের জয় সুনিশ্চিত।
এদিকে, বৃটেনে নার্ভ-এজেন্ট বিষ ব্যবহারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। গত দুই বছরের মধ্যে দেশটির মুদ্রা রুবলের মান সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। বৃটেনসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশ এর পেছনে মস্কোর হাত রয়েছে বলে দাবি করেছে। এ নিয়ে, তুরস্ক ও রাশিয়া উভয় দেশই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। গত মাসে নিষেধাজ্ঞার কারণে তুরস্কের মুদ্রা লিরার মান রেকর্ড পরিমাণ কমে যায়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানেই মুদ্রাটি তার ৪০ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। তাই বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, তুরস্ক ও রাশিয়ার ডলার বর্জন ও নতুন জোট গঠন এখন শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার।

নির্বাচন-আন্দোলন দুই প্রস্তুতি বিএনপিতে by কাফি কামাল

দুই চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে আগামী জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বিএনপি। সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যেই একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে তেমন ইঙ্গিতও দিয়েছে সরকার। দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করা ও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়কে কেন্দ্র করে কৌশল চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ক্ষমতাসীন মহাজোটের বাইরে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প নেই এমনটাই মনে করেন বিএনপির নীতি নির্ধারকরা। বিএনপিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি। ১লা সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশ থেকেও জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করেছেন দলটির নেতারা। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে এই প্রক্রিয়াটির একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্যণীয় হবে। আর সেটার উপর নির্ভর করছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম ও নির্বাচন মোকাবিলায় (অংশগ্রহণ কিংবা প্রতিরোধ) বিএনপি’র কৌশল ও সার্বিক প্রস্তুতি। অদূরদর্শী কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে এবার হুট করে রাজপথ উত্তপ্ত করবে না বিএনপি। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আলোচনার পথে হেঁটে প্রয়োজনে চারদিক গুছিয়ে কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি যাবে স্বল্পমেয়াদি আন্দোলনে। বিএনপি’র এমন মনোভাবের কথা জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা।
আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে কারাগারে সাক্ষাৎ করতে গেলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের কয়েকটি বার্তা দিয়েছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেখানে তিনি দল ও জোট ঠিক রাখা, আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি রাখা, সরকারের ফাঁদে পা না দেয়ার যে বার্তা দিয়েছেন তা মেনেই সবকিছু এগিয়ে নিচ্ছেন দলটির নেতারা।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিটি জোরদার করতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে বিএনপি। তাদের তরফে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে। তফসিল ঘোষণার আগে তাকে মুক্তি দেয়া না হলে রাজপথের কর্মসূচি দেবে বিএনপি।
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কয়েক বছর আগেই একাধিক সমাবেশ থেকে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন আহ্বানটির ব্যাপক সাড়া মেলেনি। কিন্তু বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির বেশ কয়েকজন নেতা এ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়াটি জোরদার হয় দুই বড় জোটের বাইরে। বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরাম একাধিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে একমত হয়ে বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দেন। বিএনপি এ ঐক্যপ্রক্রিয়াকে প্রথম থেকেই পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। ফলে ঐক্যের ডাক পেয়ে ১০ দফার মাধ্যমে দ্রুতই সাড়া দেয় বিএনপি।
অন্যদিকে সিপিবি’র নেতৃত্বে বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দলও একটি জোট গঠন করেছে। যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ প্রক্রিয়াটিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। ওদিকে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের শরিক জামায়াতসহ স্বাধীনতাবিরোধী কিছু রাজনৈতিক দলকে বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়া যুক্ত করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম। এ নিয়ে জোটের অভ্যন্তরে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনেও কাজ করছে বিএনপি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে গণফোরাম আয়োজিত সমাবেশটিতে বিএনপি’র অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের কৌশলেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। জোট ঠিক রেখেই এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি কদম ফেলবে দলটি। নেতারা জানান, ঐক্যপ্রক্রিয়ায় বিএনপি’র অবস্থান নিয়ে কিছু গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক মহলে। তবে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশটি সে গুঞ্জন উড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি দু’টি বার্তা দিয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বার্তা দু’টি হচ্ছে- প্রথমত, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত রয়েছে বিএনপি।
দ্বিতীয়ত, জাতীয়তাবাদের মূল শক্তিই হচ্ছে বিএনপি। নেতারা বলেন, দেশের মানুষের কাছে বিএনপি’র শক্ত জনভিত্তি রয়েছে আর সেটাকে কার্যকর করতে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের সহায়তা। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের বার্তা দিয়েই বৃহত্তর ঐক্য চাইছে বিএনপি। সেটা হলে- দাবি আদায়, নির্বাচন মোকাবিলা, সরকার গঠনের বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে সামনে আসবে। তাই বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়াকে জোরদার করবে সংশ্লিষ্ট দলগুলোসহ সমমনা রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাবে বিএনপি।
নেতারা জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বিএনপি’র কার্যক্রম। ইতিমধ্যে বিএনপি ও বেশির ভাগ অঙ্গসংগঠনের জেলা ও মহানগর কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই অঙ্গদলগুলোর পুনর্গঠন সম্পন্ন করা হবে। সেই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরে পদ-পদবি বা অন্যান্য কারণে সৃষ্ট দূরত্ব ও কোন্দল নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা এ নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়া বিগত এক দশকে নানা অভিযোগে দলের যেসব নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের একটি উদ্যোগও নিয়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ইতিমধ্যে তার নির্দেশনা অনুযায়ী বহিষ্কৃত নেতাদের ও একাধিক কমিটির ঝামেলাযুক্ত সাংগঠনিক ইউনিটগুলো দু’টি পৃথক তালিকা তার কাছে পাঠিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর। নেতারা জানান, দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের আলোচনা অনুযায়ী কাছাকাছি সময়ে একটি জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক ডাকার নীতিগত সিদ্ধান্তও রয়েছে। আর দলের সাংগঠনিক বিষয়াদি ও সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ধারাবাহিক বৈঠক করবেন। আন্দোলন ও নির্বাচন ইস্যুতে জোট নেতাদের সঙ্গেও ধারাবাহিক বৈঠক করবে বিএনপি। এছাড়া আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের দাবি জোরদার করতে বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গেও দফায় দফায় বৈঠকে বসবেন দলটির নেতারা।
বিএনপি নেতারা জানান, আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাবে সমান্তরালে। এজন্য সাবেক এমপি-মন্ত্রী ও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের এলাকায় সময় দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। যাতে নির্বাচন কিংবা আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘যিনি নির্বাচন করবেন, তাঁর তো বসে থাকার সুযোগ নেই। নির্বাচন করলে যেমন সম্ভাব্য প্রার্থীকে নিজের মাঠ গুছিয়ে রাখতে হবে, আবার না করলেও তাঁকে প্রতারণার নির্বাচন রুখে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি রাখতে হবে।’ পাশাপাশি দলের তরফে এবং শুভাকাঙক্ষীদের নিয়ে এলাকা এবং প্রার্থী জরিপও চালিয়ে যাবে বিএনপি। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে যেন প্রার্থী নির্বাচনে জটিলতা তৈরি না হয়। সেই সঙ্গে আগামীতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য হলে কোন কোন আসন ছাড় দিতে হতে পারে সেইসব বিষয়টি নিয়েও কাজ করছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন নেতা। তবে এর সবকিছুই হচ্ছে, গোপনে। নেতাদের যাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার বাইরে অন্য বিষয়ে খুব বেশি জানতে পারছেন না তিনি। আর সবকিছুই সমন্বয় করছেন লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়াকেও অবহিত করা হচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপ।
বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে কার্যকর আন্দোলন ছাড়া বর্তমান সরকারের কাছ থেকে কোনো দাবি আদায় হবে- এমনটা বিশ্বাস করেন না বিএনপি নেতারা। তারা বলেন, জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি একটি দৃশ্যমান রূপ পেলেই প্রথমে আলোচনা ও পরে আন্দোলনের পথে হাঁটবে বিএনপি। তবে আন্দোলনের পথযাত্রা শুরু হবে তফসিল ঘোষণার পরে। বিশেষ কোনো ইস্যুতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হলে যুগপৎ আন্দোলনের বিকল্প পথও খোলা রাখছে বিএনপি। নেতারা জানান, দিন-তারিখ নির্ধারণ করে নয়, সরকারের চেহারা ও আচরণের ওপর নির্ভর করবে আন্দোলনের ধরন ও কৌশল। তবে আন্দোলন হবে কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে জোরালো কিন্তু স্বল্পকালীন। জাতীয় নির্বাচনের তফসিলকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটতে পারে। সেটা হতে পারে অক্টোবরে। ফলে সেপ্টেম্বরকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের দৃশ্যমান পথচলার মাস ধরে অক্টোবরকে (সম্ভাব্য তফসিল ঘোষণার পর) টার্গেট রেখেই সব প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।

নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ by কাজী সোহাগ

সব ঠিক থাকলে অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরের শুরুতে ঘোষিত হতে পারে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল। তফসিল ঘোষণার দুই মাসের মাথায় হবে নির্বাচন। জোট-মহাজোটের জটিল সমীকরণ আর নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনায় সরব রাজনৈতিক দলগুলো। আলোচনা-বিতর্ক থাকলেও সংবিধানে বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচন আয়োজনে এগোচ্ছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী মাসের মাঝামাঝিতে গঠন হবে নির্বাচনকালীন সরকার। তখন মন্ত্রিসভা হবে ছোট আকারের। সংসদ বহাল থাকবে মেয়াদ পর্যন্ত। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হবে। এ কার্যক্রম শুরু হলে বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং জোটের পক্ষ থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে তা বিবেচনায় রেখেই দল ও জোটের করণীয় ঠিক করে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এখন থেকে তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন ও নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়ার বার্তা দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কর্মসূচি পালন করা হবে। লক্ষ্য থাকবে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের আয়ত্তে রাখা।
দল ও জোটের নেতারা বলছেন, এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার সময়। তাই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় যাওয়া শুরু করেছেন। তারা নির্বাচনকেন্দ্রিক কাজ করছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা দল ও জোটের প্রার্থীর সহায়ক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে কাজ করছেন। তৃণমূল পর্যায়ে বর্ধিত সভা, কমিটি গঠনকেন্দ্রিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে ইতিমধ্যে। গত শনিবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে আয়োজিত দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় সামনের করণীয় নিয়ে নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ওই বৈঠকে সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশনা দেয়া হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, যেসব জেলা, উপজেলায় কাউন্সিলের কাজ শেষ হয়নি তা দ্রুত শেষ করতে বলা হয়। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করে নেতাদের সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দেয়া হয় বৈঠকে। তফসিল ঘোষণার আগে কি ধরনের কর্মসূচি নিয়ে আওয়ামী লীগ মাঠে থাকবে জানতে চাইলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, এখন সামনে শুধু নির্বাচন। নেতারা ইতিমধ্যে যার যার এলাকায় নির্বাচনকেন্দ্রিক কাজ শুরু করেছেন। কেন্দ্রও সম্ভাব্য প্রার্থীর বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মসূচি নিয়েই এই মুহূর্তে নেতাকর্মীরা ব্যস্ত থাকবেন। নিজেও নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিশেষ কোনো কর্মসূচি না থাকলেও প্রয়োজন হলে যেকোনো কর্মসূচি দেয়া হবে। আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম জানিয়েছেন, নির্বাচন সামনে রেখে বরাবরই এক ধরনের ষড়যন্ত্রের পরিবেশ তৈরি হয়। একটি শ্রেণি নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু করে।
সফল নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে ১৪ দল। তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সারা দেশে কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান তিনি। দলের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দলীয় কর্মসূচির বিষয়ে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী তৃণমূল পর্যায়ে বর্ধিত সভা, কাউন্সিলর সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। তিনি বলেন, দলীয় কর্মসূচি এখন মূলত নির্বাচন সামনে রেখে হচ্ছে। দলীয় প্রার্থীদের সহায়ক কর্মসূচি নিয়েই আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল মাঠে থাকবে। নির্বাচন সামনে রেখে জোটের করণীয় ঠিক করতে শনিবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করেন ১৪ দলের নেতারা। বৈঠকে ঢাকাসহ সারা দেশে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম সাংবাদিকদের বলেন, সফল নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য সামনে রেখে ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে আমরা মাঠে নামবো। পর্যায়ক্রমে সারা বাংলাদেশে বিভাগীয় সমাবেশ করবো। এই সমাবেশ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর দল এবং জোটের নেতারা নির্বাচনী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনী কর্মকাণ্ড দেশব্যাপী শুরু হয়ে গেছে। যেহেতু সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে আগামী ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে, সেই কারণেই নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা রয়েছে, দলের প্রস্তুতিও আছে। জোটের পক্ষ থেকে কি ধরনের কর্মসূচি পালন করা হবে জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক বলেন, সামনে নির্বাচন।
এছাড়া ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় জোটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসূচি আসতে পারে আবার পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি পরিবর্তনও হতে পারে। জোট সূত্র জানায়, এই মুহূর্তে জোটের নেতারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন নিয়েও দর কষাকষি করছেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে নির্বাচনে ৬০ থেকে ৭০টি আসন শরিক দলের জন্য ছেড়ে দেয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে তাদের জন্য বড় সংখ্যায় আসন ছাড়তে হবে আওয়ামী লীগকে। এর বাইরে ১৪ দলের শরিকরাও চাইছেন আগের নির্বাচনের চেয়ে বেশি আসন। নেতারা বলছেন, দরকষাকষি করে দলীয় প্রার্থীদের জন্য আসন আদায় করা, প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে জোটবদ্ধ কর্মসূচি চালিয়ে নেয়া হবে।

জামায়াত তো এখন পার্টি হিসেবেই নেই

অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্বাচনী আইন মেনে চলার লক্ষ্যে যুক্তফ্রন্টসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের গঠিত ‘জাতীয় ঐক্যে’ জাতীয় পার্টির হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আসতে চাইলে তাতে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তবে আপত্তি রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী তো এখন পার্টি হিসেবেই নেই। গত ২রা সেপ্টেম্বর বেসরকারি টিভি চ্যানেল যমুনা টিভির এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এ কথা বলেন ড. কামাল।
তিনি বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যদি কমিটমেন্ট করেন তো আসবেন। যারাই ইলেকশন করছেন তারা আমাদের সঙ্গে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে অবদান রাখবেন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় ঐক্য গঠন প্রসঙ্গে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল বলেন, ওদের (যুক্তফ্রন্ট) সঙ্গে যে চুক্তি করেছি সেটা হলো অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করার লক্ষ্যে একবাক্যে কথাগুলো বলবো যেন এখানে আইন মেনে চলা হোক, নিরপেক্ষতা রক্ষা করা হোক। এ ঐকমত্য গঠন করার ক্ষেত্রে তারাও তাদের অবদান রাখবে। এটা একেবারে নির্বাচনকেন্দ্রিক ঐক্য কিনা জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, আমি তো বলবো সেটাই।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের যে চেষ্টা সেটা কি নির্বাচনের বছর বলেই কিনা জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমাদের জন্ম থেকেই আমরা এ প্রচেষ্টার মধ্যে আছি। সুষ্ঠু নির্বাচন, রুগ্‌ণ রাজনীতি থেকে সুস্থ রাজনীতি- এটা তো দল করার কারণ হিসেবে দিয়েছি। কেননা, সুস্থ রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছি- রাজনীতিতে কিছু রোগ ঢুকে গেছে। কালো টাকার প্রভাব, সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব, পেশিশক্তির প্রভাব। এগুলো থেকে মুক্ত করে সুস্থ রাজনীতিকে আমরা লালন করার জন্য নেমেছি।
আওয়ামী লীগ এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল গণতন্ত্র চান না বা নির্বাচন ছাড়া অন্য উপায়ে ক্ষমতায় যেতে চান বলে অভিযোগ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ড. কামাল বলেন, এটা উনাদের জিজ্ঞাসা করুন। আমি তো গত পঞ্চাশ বছর রাজনীতিতে আছি। আমার মূল সম্পর্ক হলো বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের একজন কর্মী হিসেবে। প্রথম নির্বাচনে (১৯৭০-এর নির্বাচন) আমি প্রতিনিধি হিসেবে ছিলাম। ওনার তো কাছের মানুষ ছিলাম। ওনার তো একটা মূল্যায়ন আছেই। এ মূল্যায়নের পর এসব হালকা মূল্যায়ন দেখে হাসি পায়।
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপ না করেও আলোচনা করা যায়। টেলিফোন করেও বলা যায়- এ ব্যাপারে এসে আমরা কথা বলবো। ঘন ঘন কথা বলা দরকার। কোনো রকমের প্রশ্ন থাকলে ওপেনলি বলা, মানুষের সামনে বলা। এসব নিয়ে কেন এত সংশয়?
দলগুলো কোনোভাবেই আলোচনায় আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরণের ক্ষেত্রে কি করণীয় জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে লালন করা। এই যে আপনারা (টিভি চ্যানেল) আলোচনা করছেন এটাও তো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে লালন করার একটা অংশ। আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলাতে তো কোনো বাধা নেই।

শাস্তি কমিয়ে শ্রম আইনের সংশোধনী মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শ্রমিকদের বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি কমলো। এছাড়া শিশু শ্রম বন্ধে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এসব বিধান যুক্ত করে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়া হয়।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের এই অনুমোদনের কথা জানিয়ে বলেন, আইএলও (বিশ্ব শ্রম সংস্থা)’র কনভেনশন অনুযায়ী এটাকে (শ্রম আইন) আপডেট করার জন্য অর্থাৎ শ্রমবান্ধব পলিসি সব জায়গায় যাতে নিশ্চিত হয় তার জন্য আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটার ন্যাচার অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
যেখানে শাস্তি বেশি ছিল সেখানে শাস্তি কমানো হয়েছে। শাস্তিগুলো মোটামুটি অর্ধেক কমানো হয়েছে। অনেক নতুন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। শফিউল আলম বলেন, প্রস্তাবিত আইনে মালিক ও শ্রমিকদের অসদাচরণ বা বিধান লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। আগে শাস্তি ছিল ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। তিনি বলেন, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ২০০৬ সালে প্রথম এই আইনটি করা হয়।
এরপর ২০১৩ সালে আইনটিতে বড় ধরনের সংশোধনী আনা হয়। ওই সময় প্রায় ৯০টি ধারা সংশোধন করা হয়। নতুন করে আরো অনেকগুলো ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান শ্রম আইনে ৩৫৪টি ধারা রয়েছে।
সংশোধিত আইনে নতুন দুটি ধারা, চারটি উপধারা ও আটটি দফা সংযোজন; ছয়টি উপধারা বিলুপ্তি এবং ৪১টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবিত আইনে মালিক ও শ্রমিকদের বিভিন্ন অসদাচরণের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বলপ্রয়োগ, হুমকি প্রদর্শন, কোনো স্থানে আটক বা উচ্ছেদ শারীরিক আঘাত এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করে মালিককে নিষ্পত্তিনামায় দস্তখত করতে বা কোনো দাবি গ্রহণ বা মেনে নিতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতে পারবেন না শ্রমিকরা। করলে এটা অসদাচরণ হবে।
শফিউল আলম বলেন, কোনো মালিক শ্রমিকের চাকরির চুক্তিতে ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান নিষেধাজ্ঞা, কোনো ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য পদ চালু রাখার অধিকারের ওপর কোনো বাধা সংবলিত কোনো শর্ত আরোপ করতে পারবেন না। মালিক এই বিধান লঙ্ঘন করলে শাস্তি পাবেন। বেআইনি ধর্মঘট ডাকার দণ্ড আগে এক বছর ছিল, এখন ৬ মাস করা হয়েছে।
জরিমানা আগের মতোই ৫ হাজার টাকা রয়েছে। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হলে তিনি আগে ৬ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতেন। এখন সেটা কমিয়ে এক মাস করা হয়েছে। নতুন আইনে ট্রেড ইউনিয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সমর্থনের হার কমানো হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে হলে মোট শ্রমিকদের ৩০ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়।
এখন সেটা কমে হচ্ছে ২০ শতাংশ। ধর্মঘট ডাকার ক্ষেত্রে আগে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকের সমর্থন লাগতো নতুন আইন অনুযায়ী সেটা ৫১ শতাংশ হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রস্তাবিত আইনে নতুন জিনিস উৎসবভাতা যুক্ত করা হয়েছে। যেটা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেয়ে থাকে। কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় উৎসবের প্রাক্কালে বিধির মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে উৎসবভাতা দিতে হবে। এতদিন শ্রম আইনে এ বিষয়ে কোনো বিধান ছিল না।
আগের আইনে থাকা প্রধান পরিদর্শকের পদটি মহাপরিদর্শক সহ আরো কিছু পদের নামে পরিবর্তন ও নতুন কিছু পদ যুক্ত করা হয়েছে সংশোধিত প্রস্তাবিত আইনে। শফিউল আলম বলেন, প্রতিবন্ধী শ্রমিককে বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির কাজে বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না। আগে এক্ষেত্রে শর্ত সাপেক্ষে শিশু শ্রমিককে বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ করার বিধান ছিল। তিনি বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ শব্দটি শ্রম আইন থেকে বাদ দিয়ে সেখানে ‘কিশোর’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে।
আগে ১২ বছর বয়সী শিশুরা কারখানায় হালকা কাজের সুযোগ পেতো। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ১৪-১৮ বছর বয়সী কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে। কোনো ব্যক্তি কোনো শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আগের আইনে বিশ্রাম কক্ষ রাখার বিধান ছিল জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, এখন খাবার কক্ষও যুক্ত হয়েছে।
২৫ জনের বেশি শ্রমিক নিযুক্ত থাকেন এমন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা যাতে সঙ্গে আনা খাবার খেতে ও বিশ্রাম করতে পারেন সেজন্য উপযুক্ত খাবার কক্ষ ও বিশ্রাম রুম রাখতে হবে। আগের আইনের বাধ্যতামূলক গ্রুপবীমা চালু করার জায়গায় বলা হয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় কল্যাণ ফান্ড থাকবে, সেখান থেকে যে শ্রমিকরা সুবিধা পাবে সেখানে আলাদা গ্রুপ বীমা করার দরকার নেই।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোনো নারী শ্রমিক মালিককে নোটিশ দেয়ার আগেই যদি সন্তান প্রসব করে থাকেন। তবে সন্তান প্রসবের প্রমাণ পেশ করার পরবর্তী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধাসহ প্রসব পরবর্তী ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকার অনুমতি দেবেন মালিক। মাতৃত্বকালীন ছুটির বিকল্প হিসেবে এটি যুক্ত করা হলো। কোনো মালিক কোনো নারী শ্রমিককে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে তিনি ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আগে এ ধরনের কোনো শাস্তি ছিল না। শফিউল আলম বলেন, সংশোধিত আইন অনুযায়ী শ্রমিকরা ইচ্ছা প্রকাশ করলে সিবিএ বা অংশগ্রহণকারী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে, উৎসব ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি যোগ করে তা ভোগ করতে পারবে। কোনো শ্রমিকের কাজের সময় এমনভাবে ব্যবস্থা করতে হবে যাতে আহার ও বিশ্রামের বিরতি ছাড়া ১০ ঘণ্টার বেশি না হয়। তবে সরকার কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করলে সেটা ভিন্ন কথা। ট্রেড ইউনিয়নে রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে একটি পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আগে যেটা পরিচালক করতেন এখন সেটা করবেন মহাপরিচালক।
রেজিস্ট্রেশনের দরখাস্ত পাওয়ার ৫৫ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। আগে এই সময় ছিল ৬০ দিন। আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে আপিল করতে পারবেন। রেজিস্ট্রেশন কাজ সম্পন্ন করার জন্য সরকার এসওপি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর তৈরি করে দেবে। এটা নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে।
শফিউল আলম বলেন, শ্রম আদালতগুলো মামলা দায়েরের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিয়ে দেবে। ৯০ দিনের মধ্যে কোনোভাবে দেয়া সম্ভব না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই রায় দিতে হবে। অর্থাৎ ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করতে হবে। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালকেও ৯০ দিন করে দুই দফায় ১৮০ দিনের মধ্যে অবশ্যই আপিল শেষ করতে হবে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে এক লাখ টাকার বদলে দুই লাখ টাকা এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সোয়া এক লাখ টাকার পরিবর্তে আড়াই লাখ টাকা পাবেন। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী শ্রমিক সংগঠনগুলো বিদেশ থেকে চাঁদা গ্রহণ করলে সরকারকে জানাতে হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, সংশোধিত শ্রম আইন ইপিজেড এলাকার কারখানার জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে বিদ্যমান আইনগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা হচ্ছে।