Wednesday, August 28, 2024

মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে: গ্রহণযোগ্য বিচারের জন্য আইসিটি আইনের সংশোধন প্রয়োজন by সাজেদুল হক

জুলাই ‘গণহত্যার’ বিচার কোন আইনে? এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। এসব ঘটনায় সারা দেশে বেশ কিছু মামলাও দায়ের হয়েছে। গ্রেপ্তারও করা হয়েছে  কয়েকজনকে। তবে এসব মামলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এরইমধ্যে জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে (আইসিটি) এসব ঘটনার বিচার হবে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বিস্তারিত কিছু এখনো জানানো হয়নি। তবে আইনবিদরা বলছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্ক রয়েছে। অতীতে এ আইন সংশোধনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান আইনজীবীরা কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন। তাই গ্রহণযোগ্য বিচারের জন্য এ আইনে কিছু সংশোধন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির।

ফৌজদারি মামলায় বিশেষজ্ঞ এ আইনজীবী মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালের আইনে এসব অপরাধের বিচার সম্ভব। শুধুমাত্র কিছু হত্যা মামলা দিয়ে এসব জঘন্য ঘটনার ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। এসব অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে বিচারই যথাযথ। কারণ এ আইনে নির্দেশদাতা, সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি যাদের তাদের বিচারের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আইনে কিছু সংশোধন আনতে হবে। কী ধরনের সংশোধন করতে হবে সে ব্যাপারে একাধিক পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বিদেশি আইনজীবী আনার সুযোগ দিতে হবে। বিচার কার্যক্রম লাইভ সম্প্রচার করতে হবে। যাতে সারা দুনিয়া দেখতে পায় কী ধরনের বিচার হচ্ছে।

শিশির মনির বলেন, আমাদের ফৌজদারি আইনের মূল আইন হচ্ছে দণ্ডবিধি। দণ্ডবিধিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো কনসেপ্ট নেই। বাকি আইনগুলোতেও এ ধরনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা নেই। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে যেসব অপরাধের বিচারের বিধান রয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালগুলোর রায়ে একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে হলে অপরাধ ব্যাপক বিস্তৃত এবং পদ্ধতিগতভাবে হয়েছে এটা দেখাতে হবে। এরপর যদি দেখানো যায় এখানে মার্ডার হয়েছে কিংবা টর্চার হয়েছে, কিংবা এখানে অপহরণ হয়েছে, ডিজাইন করে হয়েছে, একটা ঘটনা নয় শত শত ঘটনা হয়েছে, শত শত হত্যা হয়েছে, রাষ্ট্রের বাহিনী করেছে, রাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, কোন দলের লোক করেছে তাহলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। বাংলাদেশে যেটা হয়েছে পুলিশ গুলি করেছে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছে, বিভিন্ন রিপোর্টে আমরা দেখছি যারা নিহত হয়েছেন তারা গুলিতে নিহত হয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে গুম, খুন সংঘটিত হয়েছে এসবকে আমি মানবতাবিরোধী অপরাধ মনে করি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ৩ ধারার ২ এর ১ উপধারায় এসব অপরাধের বিচার করা সম্ভব। এ আইনে বলা আছে, আইন কার্যকর হওয়ার আগের এবং পরের অপরাধের বিচার করা যাবে। সে হিসেবেও জুলাই এবং আগস্টে সংঘটিত অপরাধের বিচার এ আইনে করা সম্ভব।

এ আইনের আওতায় কারা কারা আসবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যিনি সরাসরি গুলি করেননি, নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা দূর থেকে বসে মনিটরিং করেছেন কিংবা কমান্ড দিয়েছেন তাকেও এ আইনের অধীনে আনা যাবে। ফিল্ডে যদি কেউ অংশ নেন তার সাজার কথা আইনে আছে। পাশাপাশি যিনি আদেশ দিয়েছেন, সুপিরিয়র অফিসার ছিলেন, সুপিরিয়র অফিসারের পদে থেকে অর্ডার দিয়েছেন, অথবা পারমিট করেছেন কিংবা মৌন সম্মতি দিয়েছেন তারাও এ আইনের অধীনে সংজ্ঞার মধ্যে পড়বেন। ফিল্ড লেভেলে যে পুলিশ সদস্য গুলি করেছেন তাকে আদেশ দিলো কে? এটা যদি লিংক খোঁজা হয় তাহলে যেতে যেতে ডিএমপি কমিশনার, তার উপরে আইজিপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তখন কমান্ড, কন্ট্রোল, সুপিরিয়র অফিসার, সুপিরিয়র কমান্ড এগুলো হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবেই সঠিক বিচার হবে। এটা না করে যদি একেক জায়গায় একেকটা মামলা হয় তাহলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধের বিচার হবে না। শুধু খুনের বিচার হবে।

সরকার প্রধানকে কি এ আইনের অধীনে বিচারের আওতায় আনা যাবে- এ প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, হাইয়েস্ট কমান্ডের সোর্স কি? একজন রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের কমান্ড দেয়ার কতোগুলো মেকানিজম আছে। তার এ মেকানিজমগুলো কোর্টে যদি এভিডেন্স আকারে আসে তাহলে সর্বোচ্চ কমান্ডে যিনি ছিলেন তাকেও বিচারের আওতায় আনা যাবে, তিনিও অপরাধে দায়ী থাকবেন। আন্তর্জাতিকভাবে এমনও ডিসিশন আছে যে, তিনি করতে বলেননি কিন্তু তার অধীনস্থদের বিরত রাখেননি। এই যে বিরত রাখেননি সেটিও অপরাধ।

তবে আইনটি বর্তমানে যেভাবে আছে সেভাবে বিচার হলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে বলে মনে করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, বর্তমানে আইনটি যেভাবে আছে এভাবে বিচার করা হলে যার বিচারই করা হোক না কেন সেটি দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়বে। কারণ এ আইনের মধ্যে কয়েকটি মৌলিক গলদ রয়েছে। এ গলদগুলো সংশোধন প্রয়োজন। আপনি যারই বিচার করেন না কেন আসামির যে অধিকার সে অধিকার তাকে দিতে হবে। আসামির অধিকার নিশ্চিত না করে আপনি হাত-পা  বেঁধে কারও বিচার করলে সে বিচার গ্রহণযোগ্য হবে না। এটা দেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না, বিদেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না।

তিনি বলেন, এ আইনে একটি বিধান আছে যে, সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে না। সাক্ষ্য আইন যদি প্রযোজ্য না হয় তাহলে সাক্ষ্য-প্রমাণ কীভাবে হবে, জেরা কী করে হবে, যে সাক্ষীকে রাষ্ট্রপক্ষ হাজির করবে তাকে ক্রস এক্সামিনেশন কী করে হবে। সাক্ষ্য আইনকে বাদ দিয়ে কেউ যদি নিজেদের মতো করে সাক্ষ্যের রুলস করে বিচার করে, যেটা আগে করা হয়েছে সেটা তো গ্রহণযোগ্য হবে না। যেমন এ আইনে বলা আছে, একজন ব্যক্তি যদি পুলিশের কাছে একটি স্টেটমেন্ট দেয়, পরে যদি কোর্টে হাজির না হয়, তারপরও তার সেই জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে। এটা পৃথিবীর কোন স্ট্যান্ডার্ডেই গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্য ম্যাকানিজম হলো যেটা সে পুলিশের কাছে বলবে তাই আদালতে এসে বলবে, তাকে ক্রস এক্সামিনেশন করা হবে, তারপরই কেবল তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু অতীতে কী হয়েছে, মাওলানা সাঈদীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, সাক্ষীরা পুলিশের কাছে স্টেটমেন্ট দিয়েছে কিন্তু আদালতে আসেনি তা আদালত জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে এটা হাস্যকর বিচার হয়ে গেছে। কারণ সাক্ষী তো আসেনি, তাকে তো ক্রসচেক করা যায়নি। সুতরাং এ বিধান পরিবর্তন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের কিছু রুলস অফ এভিডেন্সেস আছে। এ রুলস অফ এভিডেন্সের যতগুলো সুযোগ আছে তার সবগুলো এখানে প্রযোজ্য করে দেয়া উচিত। যাতে স্বাধীনভাবে একজন ব্যক্তির এভিডেন্স উপস্থাপনের সবধরনের সুযোগ থাকে। এখানে আরেকটা বিধান আছে পত্রিকার রিপোর্ট, ফটোগ্রাফস, ম্যাগাজিন, ফিল্ম এভিডেন্স হবে। কিন্তু এটি এভিডেন্সের সর্বজনীন বিধান নয়। আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমানে ডিজিটাল এভিডেন্সের বিধান চালু হয়েছে যেটায় বলা হচ্ছে ভিডিওর সোর্স প্রকাশ করতে হবে, কনটেন্ট সম্পর্কে ক্রস এক্সামিনেশন করতে হবে, বিশেষজ্ঞ মতামত নিতে হবে।

বিদেশি আইনজীবী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশি আইনজীবী আনতে গেলে এখন বার কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হয়। এটি উচিত নয়। কেউ যদি বিদেশি আইনজীবী আনতে চান তাকে তার সুযোগ দিতে হবে। অতীতে আমরা দেখেছি বিদেশি আইনজীবী আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের অনুমোদন দেয়া হয়নি। এটা সারা দুনিয়াতেই সমালোচনা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, আমাদের অন্য আইনে ডেথ পেনাল্টি আছে। সুতরাং এ আইনেও ডেথ পেনাল্টি থাকতে পারে।
তিনি বলেন, এসব সংশোধন আনার পর যথাযথ তদন্তে সক্ষম তদন্ত সংস্থা নিয়োগ দিতে হবে। যোগ্য আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে। যারা আইনের যথাযথ আলোচনা করতে পারেন। একইসঙ্গে এই বিচারের লাইভ সম্প্রচার করা উচিত। যেন সারা পৃথিবীর মানুষ এ বিচার দেখতে পায়। অতীতে আমরা এ ব্যাপারে বলেছি কিন্তু ভ্রূক্ষেপ করা হয়নি। আইসিসিতে যে বিচার হয় আমরা দেখছি লাইভ সম্প্রচার করা হয়।

শিশির মনির বলেন, সব জড়তার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যিকারের বিচার হলে মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ হয়েছে তার প্রতি জাস্টিস হবে। সবাই দেখেছেন হাজার হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে, হাজার হাজার লোক আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। এই অপরাধের বিচার কি সাধারণ আদালতে সম্ভব? সম্ভব নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট এখন যেভাবে আছে সেভাবে সম্ভব? সম্ভব নয়। এ আইনের মান ঠিক করে যদি বিচার করা হয় তাহলে এ বিচার দেশে এবং বিদেশে শত বছর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।  কিন্তু তাড়াহুড়া করে আইন সংশোধন না করে যদি বিচার শুরু হয় বা চলে একসময় তা নিয়ে মারাত্মক সমালোচনা হবে। তিনি বলেন, অপরাধী যেন পার না পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আসামির অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। এটাই আইন ও ধর্মের কথা।

ড. ইউনূস বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার সক্ষমতা রাখেন : সৌদি রাষ্ট্রদূত

ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ইসা ইউসুফ ইসা আল দুহাইলান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখেন। রাষ্ট্রদূত মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় ড. ইউনূসের প্রশংসা করে তিনি একথা বলেন। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা সৌদি আরবকে  ‘বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেন।  তিনি গত বছর ওয়ার্ল্ড ফুটবল সামিটে সৌদি আরব সফরের কথা স্মরণ করেন যেখানে তিনি সৌদি মহিলা ফুটবল দলের উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং বিশ্ব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খেলাধুলার অসাধারণ ক্ষমতার বিষয়ে আলোচনা করেন।

রাষ্ট্রদূত জানান, বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩২ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন যারা তার দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তিনি জানান, সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকরা বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বৈধ  চ্যানেলে পাঠান এবং আরও ৫ বিলিয়ন ডলার অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠান। রাষ্ট্রদূত বলেন, অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের অর্থ বৈধ পথে পাঠানো সম্ভব হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তারা কঠোর পরিশ্রমী এবং অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। ১৯৭০ সাল থেকে সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার অনিবন্ধিত বাংলাদেশীর পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়টি তিনি উত্থাপন করেন।

রাষ্ট্রদূত দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, সৌদি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে লজিস্টিকস, পরিষেবা খাত এবং আরএসজিটি ইন্টারন্যাশনাল ও আকওয়া পাওয়ারের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তিনি আরো উল্লেখ করেন, হজ ও উমরাহ পালনের সুবিধার্থে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য মক্কা রোড ইনিশিয়েটিভ চালু করা হয়েছে। রাষ্ট্রদূত প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেন যে, গত বছর প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশী উমরাহ পালন করেছেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য সৌদি নেতৃত্বের প্রশংসা করে ড. ইউনূস সৌদি আরবের চলমান সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহবান জানান।

আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান ড. ইউনূসের: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সৈয়দ আহমদ মারুফ মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা পাকিস্তান সরকারের প্রতি এই আহ্বান জানান।   

আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সার্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি মডেল হতে পারে উল্লেখ করে  ড. ইউনূস বলেন, আমাদের পারস্পরিক সুবিধার জন্য একসাথে কাজ করতে হবে। বৈঠকে পাকিস্তানের হাইকমিশনার দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে সহযোগিতা বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। হাইকমিশনার জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির জনগণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। পাকিস্তান বাংলাদেশকে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আহমদ মারুফ পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ এবং উভয় দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর আহ্বান জানান।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়া বাংলাদেশের পাশে থাকবে : রাষ্ট্রদূত
বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মান্টিটস্কি বলেছেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়া বাংলাদেশের পাশে থাকবে। মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্ন্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠকে তিনি রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি অনুসন্ধান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সহায়তা বাড়ানোসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষযাদি আলোচনা করেন।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন অপসারণের কথা স্মরণ করেন। তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যান্য পণ্যও আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানান। বর্তমানে রাশিয়ায় বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশ তৈরি পোশাক। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্যশস্য এবং সারের বড় একটি অংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। গত বছর রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন টনেরও বেশি গম আমদানি করেছে এবং চলতি বছর আমদানির পরিমাণ ইতোমধ্যে ২ মিলিয়ন টন অতিক্রম করেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত জানান, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রম ভোলা দ্বীপে এবং দেশের অভ্যন্তরে আরো পাঁচটি গ্যাস কূপ অনুসন্ধান করতে আগ্রহী।

তিনি আরো জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নির্মাণ কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি আগামী বছর চালু হতে পারে। তিনি বলেন, রাশিয়া বাংলাদেশে এলএনজি রপ্তানিতে আগ্রহী। প্রধান উপদেষ্টা অর্থনৈতিক ও শিক্ষা সহযোগিতা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন।

সরকারকে যৌক্তিক সময় দিবে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় জামায়াত

ভারতের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায় জামায়াত? তা খোলাসা করলেন দলটির শীর্ষ নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সেই সঙ্গে ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে কতোটা সময় দিবে জামায়াত? তাও স্পষ্ট করলেন আমীর। মঙ্গলবার ভারতীয় মিডিয়ার ঢাকাস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপে ডা. শফিক বলেন, নতুন সরকারের বয়স মাত্র ১৯ দিন। এই সময়ে আমরা তাদের মেয়াদ নিয়ে কোনো টাইমফ্রেম বেঁধে দিতে পারি না। তবে অবশ্যই আমরা আশা করি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তারা প্রয়োজনীয় সংস্কারকর্ম সম্পন্ন করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হবেন। এই সময়টি বেশ দীর্ঘ হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা পরস্পর প্রতিবেশী। চাইলেই প্রতিবেশী বদল করা যায় না। এটা আমরা তো বটেই কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। অতীতে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের সুসম্পর্ক ছিল দাবি করে দলটির আমীর বলেন, শেখ হাসিনার গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এটি শীতল ছিল। সম্পর্ক যে একেবারে ছিল না তা কিন্তু নয়। তবে আমরা আশা করি এখন ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বাড়বে। এ ক্ষেত্রে আমরা উদার। আশা করি ভারতও ইতিবাচক থাকবে। ইন্ডিয়ান মিডিয়া করেসপন্ডেন্টস এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইমক্যাব)-এর নেতৃবৃন্দ, সংগঠনের সদস্য, ভারতীয় মিডিয়ার সংবাদদাতারা ছাড়াও কলকাতা থেকে আগত এনডিটিভি’র একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিক বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হতে হবে সৎ প্রতিবেশীসুলভ। যেখানে কোনো দাদাগিরি থাকবে না। থাকবে পরস্পরের প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা। বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা বিষয়ক এক প্রশ্নে তিনি বলেন, যেকোনো সম্পর্কে সমালোচনা থাকে কিন্তু অগ্রাধিকার পায় সহযোগিতা। এটাই কাম্য হওয়া উচিত। জামায়াত উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভারত বা কারও সমালোচনার রাজনীতি করে না দাবি করে তিনি বলেন, ভারত কষ্ট পাক এমন কিছু আমরা করিনি, করতেও চাই না। ভারত তার স্বার্থের প্রশ্নে সরব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সরকারগুলোকে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট থাকতে হবে। এসবের ব্যত্যয় ঘটলে আমরা সমালোচনা করি। রাজনৈতিক দল আমার দেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখার প্রশ্নে সমালোচনামুখর হওয়া আমার দায়িত্ব। কারণ আমি মানুষের জন্য রাজনীতি করি। এটাকে ভারতের বিরুদ্ধে সমালোচনা বা অবস্থান বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। জামায়াতের আমীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল, আর জামায়াত অন্য দেশের দালাল’ এমন কথা অনেকে বলেন। কিন্তু কাউকেই কোনো দেশের দালাল বলে ট্যাগ দেয়ার রাজনীতি আমি অন্তত করি না। কাউকে দালাল বলার ফতোয়া দেয়ার আমি বা আমরা কে? জামায়াত-শিবির মানেই আতঙ্ক, ‘জঙ্গি’, ‘সন্ত্রাসী’- উদ্দেশ্যমূলক এমন প্রচারণা দেশীয় ও বিদেশি মিডিয়ায় চালানো হয় অভিযোগ করে জামায়াতের আমীর বলেন, দায়িত্ব নিয়ে বলছি জামায়াত কখনো ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত ছিল না, এখনো নেই। তিনি বলেন, আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলছি, যদি কোথাও প্রমাণিত হয় যে, আমাদের একজন কর্মী সন্ত্রাস করেছে, তা হলে আমরা জাতির কাছে ক্ষমা চাইবো এবং নিজেরা নিজেদের আইনের হাতে সোপর্দ করবো। ৫ই আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণে জামায়াতের সম্পৃক্ততা নাকচ করে দিয়ে আমীর বলেন, জামায়াতের লোকজন মন্দির ও হিন্দু বাড়ি-ঘর পাহারা দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু। এই বিভাজন মানি না। সবাই বাংলাদেশি। নাগরিক হিসেবে সবার মর্যাদা সমান হবে। বর্তমান সরকারের কাছে এই মুহূর্তে জামায়াতের প্রত্যাশা এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চাই দেশে দ্রুত শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসুক। দেশের সংবিধান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার হওয়া দরকার। দল বা ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন করা যাবে না। আমরা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা দল হিসেবে সকলের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা অসত্য বা বানোয়াট অভিযোগ দিয়ে কাউকে হয়রানি করা পছন্দ করি না। জামায়াত কখনো কোনো হয়রানিমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না, এখনো নেই। মতবিনিময় সভায় ইমক্যাবের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক মাছুম বিল্লাহ, প্রবীণ সাংবাদিক বাসুদেব ধর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সহ-সভাপতি রাজীব খান, কোষাধ্যক্ষ আবু আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, নির্বাহী কমিটির সদস্য সিয়াম সরোয়ার জামিল, জাকির হোসেন, কাউসার আযম, তারিকুল ইসলাম, শাহীন পারভেজ, মো. মনির হোসেন প্রমুখ। অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ফরিদ হোসেন, সাংবাদিক মিজানুর রহমান ও রাশেদুল ইসলাম এবং এনডিটিভির কলকাতা ব্যুরো প্রদীপ্ত নারায়ণ। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রাক্তন এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ। এক প্রশ্নের জবাবে আমীরে জামায়াত বলেন, বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। দেশে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন সিস্টেম বলতে কিছু নেই। পুলিশ বাহিনী জনগণের বন্ধু না হয়ে শত্রুতে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের জন্য সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে হবে। দেশকে সংস্কার করতে হবে। এই মুহূর্তে জামায়াতের প্রধান কাজ হলো ছাত্র-জনতার বিপ্লবে নিহত, আহত ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। কিন্তু তারা তাদের অর্জন ধরে রাখতে পারেনি। জনগণ আওয়ামী লীগকে কীভাবে দেখে, তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো আওয়ামী লীগ নিজেদেরকে কীভাবে দেখে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে জামায়াতের আমীর বলেন, সাড়ে পনেরো বছর দেশ শাসন করে লক্ষণ সেনের মতো দেশ ত্যাগ করা উনার জন্য মানানসই হয় নাই। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে জামায়াতের ওপর ক্র্যাকডাউন চলেছে। কিন্তু কোনো নেতা কখনো দেশ ত্যাগ করেনি বরং দেশে থেকেই আইনি এবং রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের নেতৃবৃন্দ জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু কখনো দেশ ত্যাগ করার চিন্তা করেননি।



সিলেটে মামলা বিভ্রান্তি, দলীয় কর্মীরাও আসামি by ওয়েছ খছরু

সিলেটে দায়ের করা মামলা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এসব মামলায় অনেক নির্দোষ ব্যক্তিদেরও আসামি করা হচ্ছে। বাদ যাচ্ছেন না সাংবাদিকরা। এমনকি বিএনপিদলীয় নেতাকর্মীদেরও আসামি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ব্যক্তি আক্রোশের কারণে মামলায় আসামি করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে; মামলা দায়ের নিয়ে বাণিজ্যেও নেমেছে কেউ কেউ। ফলে বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন সিলেট বিএনপি’র নেতারা। তারা জানিয়েছেন;  কেউ আক্রান্ত হলে মামলা দিতে পারেন। কিন্তু এই মামলা নিয়ে বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ নিলে কোনো বিতর্ক থাকবে না। এ কারণে মামলা দায়েরকারী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের নিজ নিজ ইউনিটের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত সিলেটে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ১৮ জন নিহত ছাড়াও আহত হয়েছে হাজারো নেতাকর্মী। অনেকেই আহত হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। এখন সুস্থ হয়ে এসে মামলা দায়ের করছেন। আদালত সূত্র জানিয়েছে; ইতিমধ্যে জেলা ও নগর মিলিয়ে ২০টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে চ্যানেল আই ও রেডিও টুডে’র  সিলেট প্রতিনিধি সাদিকুর রহমান সাকীকে। বৃহস্পতিবার সিলেটের আদালতে এ মামলা দায়ের করেন খোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তি। নগরের ৫নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি সাদিকুর রহমান সাদিক জানিয়েছেন- এ মামলা দায়েরে ওয়ার্ড বিএনপি’র কেউ সম্পৃক্ত নন। আমরা মামলা সম্পর্কে জানি না। মামলার বাদীকে আমি চিনি না। ২০শে আগস্ট সিলেট জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জুবের আহমদ বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় ৫নং ওয়ার্ডের যুবদলকর্মী রেদোয়ান আহমদকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় তার বড় ভাই আলমাছ আহমদ শুকুরকেও আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আরও দু’টি মামলায় আলমাছ আহমদ শুকুরকে আসামি করা হয়। যুবদলকর্মী রেদোয়ান আহমদ গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- তার ভাই শুকুর বিগত ২০১৮ সালে দায়ের করা আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক মামলায় আসামি হয়েছিলেন। অথচ এবার তাকে বিএনপি’র মামলার আসামি করা হলো। আর আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখলেও কেবল মাত্র ব্যক্তি আক্রোশে তার ওপর মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বলেন- তার এক ভাই ওয়ার্ড বিএনপি’র ক্রীড়া সম্পাদক আর পিতা আব্দুস সামাদ ছিলেন বিউবো’র শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক। তাদের গোটা পরিবার বিএনপি ঘরানার হওয়ার পরও তারা এখন আসামি। স্থানীয় যুবদল নেতা রায়হান আহমদ জানিয়েছেন; রেদোয়ান যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সে বিগত আন্দোলনেও সক্রিয় ছিল। এছাড়া তার ভাই শুকুর অতীতে আওয়ামী লীগের দায়ের করা দু’টি মামলায় আমাদের সঙ্গে আসামি ছিলন। তাদের পরিবার বিএনপি পরিবার। ব্যক্তি আক্রোশের কারণে তাদের ওপর মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি। নগরীর টুকেরবাজারের একটি মামলায় সাংবাদিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব অলিউর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এ নিয়ে সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিফতাহ সিদ্দিকী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আন্দোলনে আহত হলে যে কারো মামলা দেওয়ার অধিকার আছে। তবে আমাদের নির্দেশনা হলো যারা প্রকৃত আসামি এবং সন্ত্রাসী তাদেরকে যেন আসামি করা হয়। কোনো নির্দোষ, নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করলে দল থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এটি ইতিমধ্যে সিলেট বিএনপি’র সিনিয়র নেতারা দলীয় নেতাকর্মীদের জানিয়ে দিয়েছেন। এদিকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রেজিমের সময় আওয়ামী লীগ ও সরকারি বাহিনীর হাতে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা সমূহে কোনো নিরীহ কর্মকর্তা ও ব্যক্তিকে আসামি এবং হয়রানি না করার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ বলেন- যারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর বর্বর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তাদের বিচার অবশ্যই হবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো নির্দোষ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত বা হয়রানির শিকার না হন। সিলেট জেলা বিএনপি’র পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা হচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে কাউকে আসামি করা যাবে না। যদি এই ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় তবে সিলেট জেলা বিএনপি সংশ্লিষ্ট দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

সরজমিন পঙ্গু হাসপাতাল: গুলিতে হাত-পা হারিয়ে স্বপ্ন ভেঙেছে ওদের by ফাহিমা আক্তার সুমি

চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ আতিকুল ইসলামের। গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছেন   হাসপাতালের বেডে। ৫ই আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেমে গুলিবিদ্ধ হন আতিকুল। বর্তমানে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) ক্যাজুয়ালিটি-২ এর জি-৩১ নম্বর বেডে ভর্তি রয়েছেন তিনি। জীবন বাঁচিয়ে রাখতে কাটতে হয়েছে তার ক্ষতিগ্রস্ত হাত। আতিকুল একটি ফ্যাশন হাউজের বিক্রয়কর্মী ছিলেন। স্বপ্ন ছিল বিদেশ যাওয়ার। কিন্তু হাত কাটার পর সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কিনা তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। আবার কখনো কখনো দুশ্চিন্তার ছাপ সরিয়ে আন্দোলন সফল হওয়ায় আতিকুলের মুখে ফুটে উঠছে হাসি।

তিনি মানবজমিনকে বলেন, নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। এরপর একটি ফ্যাশন হাউজের বিক্রয়কর্মী ছিলাম। ৫ই আগস্ট উত্তরা আজমপুরে আন্দোলনে নেমে গুলিবিদ্ধ হই। বিকাল ৪টার দিকে ঘটনাটি ঘটে। ডান হাতের কনুইয়ের উপরে গুলি লাগে। হাতের রক্তনালী ছিঁড়ে গেছে। গুলি হাতের ভেতর থেকে যায়। এর পর প্রথমে হৃদরোগ হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। সেখান থেকে পঙ্গু হাসপাতালে। তিনি বলেন, ৭ই আগস্ট রাতে আমার হাত কেটে ফেলতে হয়। চিকিৎসকরা বলেন, হাত বাঁচাতে হলে নিজে বাঁচবো না, একটা সময় হাতে ইনফেকশন হয়ে যাবে। আমার পিতা আলাল উদ্দিনের ফার্নিচারের দোকান আছে। পরিবারের সবাই আজমপুরে থাকে। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। তিনি বলেন, ছাত্ররা আমার ভাই, ভাইদের জন্য আন্দোলনে নেমেছিলাম। দেশের জন্য আমার শরীরের অঙ্গ দিয়েছি, এটা নিয়ে আমি গর্বিত। তবে শরীরের প্রতিটি অঙ্গই গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে তো দুশ্চিন্তা হয় মাঝে মাঝে। জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখন কোনো স্বপ্ন দেখছি না। জীবনটা এখন আর আগের মতো নেই, নতুন করে স্বপ্ন সাজাতে হবে। আগে স্বপ্ন ছিল বিদেশ যাওয়ার সেটি তো আর হলো না।

শুধু আতিকুল নয়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন অনেকে। গুলির আঘাতে ছিন্নভিন্ন হওয়ায় কাটতে হয়েছে অনেকের হাত-পা। কারও পায়ে আবার লাগানো হয়েছে রড। পঙ্গু হাসপাতালের তথ্য মতে, ছাত্র আন্দোলনে আহত ১১২ জন ভর্তি রয়েছেন। এরমধ্যে ৫২ জন শিক্ষার্থী। আহত ২১ জনের হাত-পা কাটা হয়েছে। এরমধ্যে ১৭ জনের পা কেটে ফেলা হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৭০০ জন। গতকাল সরজমিন দেখা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ছাত্র ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অনেকে পঙ্গু হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায়। কারও রড লাগানো, কারও হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ। চিকিৎসক-নার্সরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। স্বজনদেরও রয়েছে সারিয়ে তোলার প্রচেষ্টা।

১৯ বছর বয়সী রাকিবের হাঁটুর উপরে গুলি লাগে। তিনি হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি-১ এর জি-২৪ নম্বর বেডে ভর্তি। রাকিবের বাম পায়ের হাঁটুর উপর পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। মা রিনা বেগম বলেন, ২০শে জুলাই আন্দোলনে গিয়ে রাকিবের পায়ে গুলি লাগে। আমার ছেলে সেলুনে কাজ করতো। ২১ তারিখে হাসপাতালে নিয়ে আসি। অবস্থা খারাপ হওয়ায় ২২ তারিখে রাকিবের পা কাটতে হয়। আমরা চিটাগাং রোডে ভাড়া থাকি। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা। ১৩ ব্যাগের মতো রক্ত লেগেছে রাকিবের। ওর বাবা মুদি ব্যবসা করতো তাতেও আগুন লাগে। রাকিবকে একটি সেলুনে দিয়েছিলাম কাজ শেখার জন্য। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। ভেবেছিলাম সেলুনে কাজ শেখা হলে বিদেশ পাঠিয়ে দিবো। কিন্তু সে স্বপ্ন তো স্বপ্নই থেকে গেল। দুই ছেলের মধ্যে রাকিব বড়। তিনি বলেন, আমার ছেলেটা অনেক কান্নাকাটি করে পা হারিয়ে। গুলি লাগার পর ওর ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারিনি ভয়ে। চিকিৎসক বলেছেন, যদি ছয় ঘণ্টার মধ্যে ভালো চিকিৎসা হতো তাহলে পা রক্ষা পেত। ঘটনার পর মদনপুর হাসপাতালে নিয়ে যায় ওর সঙ্গীরা। এরপর ঢাকা মেডিকেলে। সেখান থেকে হৃদরোগে পাঠানো হয়। আমার ছেলের পা কি আর ফিরে পাবো।

মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আহমাদ। পুলিশ-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় রাস্তায় পড়ে যায়। এ সময় পুলিশের গাড়ি তার পায়ের উপর দিয়ে চলে যায়। আব্দুল্লাহ জি-৩৬ নম্বর বেডে ভর্তি। তিনি বলেন, জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার। বাবা-মায়েরও সম্মতি ছিল। এখন সিএসইতে পড়ার চিন্তা করছি। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করি। ৪ঠা আগস্ট সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হলে দৌড়াতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যাই। এ সময় পুলিশের একটি গাড়ি আমার পায়ের উপর থেকে চলে যায়। আমার ডান পায়ের হাড় ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায়। রক্তনালী ছিঁড়ে যায়। ডান হাতের কনুই ও মাথায় আঘাত লাগে। এখন সুস্থ হতে এক বছরের বেশি সময় লাগবে। আগমী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবো। কিন্তু পায়ের যে অবস্থা তাতে আমার কি হবে? আগের মতো আর স্বাভাবিক হতে পারবো না। আমাদের বাড়ি মাদারীপুরে। মিরপুর-১৪ নম্বরে ভাড়া থাকি। বাবার কাপড়ের দোকান রয়েছে। আব্দুল্লাহর মা বিলকিস বলেন, আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় আছি। আমাদের ইচ্ছা ছিল আর্মিতে দেয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন তো আমার পায়ের সঙ্গে ভেঙে গেছে। পড়াশোনা এখন যদি বন্ধ করি তাহলে আমার ছেলের ভবিষ্যৎ আরও খারাপ হবে।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) উপ-পরিচালক ডা. মো. বদিউজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, আমাদের হাসপাতালে যারা চিকিৎসাধীন আছেন তাদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ ও অন্যান্য ইনজুরি। এখানে যত রোগী এসেছেন তারা সবাই গুরুতর ছিলেন। আহতদের সুস্থতার একটা লেভেলে যাওয়ার পর তাদেরকে ছাড়পত্র দিচ্ছি। হাড় ভাঙার ক্ষেত্রে সুস্থ হতে অনেক সময়ের ব্যাপার। শুধু হাড় ভাঙেনি অনেকের মাংস ইনজুরিও হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেকের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে। রোগীদের সব সেবা আমরা বিনামূল্যে দিচ্ছি। রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমরা কোনো ভাবেই অবহেলা করছি না। আমরা চেষ্টা করছি আহতদের চিকিৎসা সর্বোচ্চটা দিতে।   

ফেনীতে বন্যা: দুর্গত এলাকায় মিলছে না চিকিৎসাসেবা by সুজয় চৌধুরী

মো. আলমগীরের তিন সন্তান দুই দিন ধরে জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত। পানিতে ভেজার কারণে এমনটা হয়েছে বলে ধারণা তাঁর। সাত দিন আগে তাঁরা সবাই আশ্রয় নেন ফেনী সদরের লেমুয়া ইউনিয়নের নেয়ামতপুর গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে।

ওই বিদ্যালয়ের আশপাশ ও রাস্তায় আজ মঙ্গলবারও বুকসমান পানি ছিল। কোথাও হাঁটুপানি। তাই সন্তানদের নিয়ে বের হননি আলমগীর। চল্লিশোর্ধ্ব এই অটোরিকশাচালক বছর পাঁচেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারান। তাই পানি মাড়িয়ে দূরে গিয়ে ওষুধ আনার ব্যবস্থাও নেই।

আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের স্কুলে আরও ১০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। শিশু আছে ৫–৬ জন। কমবেশি সবাই অসুস্থ। কিন্তু কোনো চিকিৎসাসেবা তারা পায়নি। কমিউনিটি হাসপাতালও পানিতে ডুবে গেছে। ওষুধপত্র নষ্ট হয়েছে।

আক্ষেপ করে আলমগীর বলেন, তাঁর দুই পা সচল থাকলে পানিতে সাঁতার কেটে হলেও ওষুধ নিয়ে আসতেন। কিন্তু সে সুযোগও নেই। পা কেটে ফেলতে হয়েছে অনেক আগেই।

শুধু আলমগীর নন, দুর্গম গ্রামের বিভিন্ন স্থায়ী-অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া দুর্গত মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না। পানির কারণে গ্রামে গ্রামে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ফেনী জেলার সিভিল সার্জন শিহাব উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, পানি বেশি হওয়ার কারণে গ্রামে গ্রামে চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ইতিমধ্যে ছয় উপজেলায় ছয়টি জরুরি দল গঠন করা হয়েছে। ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বিশেষজ্ঞ দল ফেনীতে এসেছে। পানি নেমে গেলে স্থায়ী ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে সেবা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে ফেনী সদর হাসপাতালে সেবা দেওয়া হচ্ছে। পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর সেবা চালু হয়েছে। কিন্তু গ্রামগুলোতে কোনো চিকিৎসক দল যায়নি।

গত দুই দিন ফেনী সদরের ফাজিলপুর, লেমুয়া এলাকার চারটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, বেশ কিছু শিশু জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়েছে।

ফাজিলপুর ইউনিয়নের পুর্বালী গ্রামের একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন ফারজানা আক্তার ও তাঁর তিন সন্তান। তাঁর পানিতে ভিজে ১৩ মাস বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আপ্পানের দুই দিন ধরে জ্বর। সাড়ে চার বছরের মেয়ে সাদিয়া আক্তারের সর্দি। আশ্রয়কেন্দ্রের চারপাশে বুকসমান পানি হওয়ায় বেরই হতে পারেননি তাঁরা। চিকিৎসকের পরামর্শও পাননি।

ফারজানা বলেন, কোনো জামা-কাপড় বের করতে পারেননি। এক কাপড়ে বের হতে হয়েছে। ভেজা কাপড় গায়ে থাকায় দুই সন্তান জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছে।

সদর উপজেলার ১০ নম্বর ছনুয়া ইউনিয়নের উত্তর টংগিরপাড় হাজী বাড়ি মসজিদ এলাকার বাসিন্দা তানিয়া আক্তার জীবন বাঁচাতে স্থানীয় একটি মসজিদে আশ্রয় নেন এক সপ্তাহ আগে। তাঁর চার বছরের শিশুও জ্বর–সর্দিতে আক্রান্ত। তানিয়া জানান, গ্রামের রাস্তাঘাট এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। এ কারণে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী গ্রামে যাননি। সেবাও পাননি।

তুলাবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয়ে ১৫৫ পরিবারের কয়েক শ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। নৌকাযোগে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা ও দোতলার দুটি ভবনে গাদাগাদি করে মানুষ থাকছে। মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে ছিল একাদশের ছাত্রী অর্পিতা দাশ। গত দুই দিন তার জ্বর ওঠানামা করছে। আজ জ্বর ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়। পাশে মা প্রিয়াঙ্কা রানি দাশ বসে মেয়েকে জলপট্টি দিচ্ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্কুলের আশপাশে পানি আর পানি। মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জ্বরের কারণে সে মাথা তুলতে পারছে না। সাত দিন ধরে তাঁরা আছেন সেখানে।

ত্রাণ কেউ পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না

ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরাম, ফেনী সদর, দাগনভূঞা, সোনাগাজী—এই ছয় উপজেলা পুরোপুরি বন্যাকবলিত। পাঁচ দিন ধরে গ্রামগুলো পানিতে তলিয়ে ছিল। গত দুই দিনে পানি কিছুটা সরেছে। বুকসমান পানি নেমে এখন হাঁটুতে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যায় আট লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দেড় লাখ মানুষ জেলার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। আবার অনেকেই প্রতিবেশীর দোতলা ও তিনতলার বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। এসব জায়গায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ত্রাণ এসেছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে দুর্গত সবার কাছে ত্রাণ পৌঁছায়নি।

জানা গেছে, গত পাঁচ দিনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারে ৩৮ হাজার খাবার প্যাকেট বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিয়েছেন। আবার স্বেচ্ছাসেবকেরাও ট্রাকে ট্রাকে ত্রাণ এনেছেন।

গত পাঁচ দিন সরেজমিন ঘুরে, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনী সদরের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক লাগোয়া গ্রামগুলোতে বেশি পরিমাণে ত্রাণ গেছে। কিন্তু ভেতরের দুর্গম গ্রামে ত্রাণ গেছে খুব কম। নৌকার অভাবে ত্রাণ নিয়ে ভেতরে যেতে পারেননি স্বেচ্ছাসেবকেরা। লালপোল, বড় বাজার, কসকা, খাইয়ারা রাস্তার মাথা, ফাজিলপুর, মুহুরীগঞ্জ, নতুন মুহুরী গঞ্জ, নিজকুনজরা, ধুমঘাট সেতু এলাকার অনেকেই কয়েকবার করে ত্রাণ পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ একবারও পাননি।

মহাসড়ক লাগোয়া ছনুয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল বাছিম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের গ্রামে পাঁচ-ছয় ট্রাক ত্রাণ গেছে। কিন্তু ভেতরের লস্করহাটের দিকে এক–দুই ট্রাকের বেশি যায়নি।

লেমুয়া ইউনিয়নের নেয়ামতপুর গ্রামে গিয়ে কথা হয় বয়োবৃদ্ধ কালাম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, তাঁদের গ্রামে দুই দিন ত্রাণ পৌঁছেছে। তবে সবাই পাননি। কেউ কেউ দুবার পেয়েছেন।

জেলা প্রশাসক মোছাম্মৎ শাহীন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তালিকা করে সরকারি ত্রাণ সহযোগিতা দেওয়া হবে। অনেক স্বেচ্ছাসেবককে জেলা প্রশাসন সহযোগীতা করেছে। কিন্তু অসংখ্য মানুষ নিজেদের মতো করে ত্রাণ দিচ্ছেন।

পানি নামছে ধীরে

ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর, সোনাগাজী, পরশুরামের বেশির ভাগ গ্রাম থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। গত দুই দিনে বুকসমান পানি নেমে এখন হাঁটুপানিতে। কোথাও কোথাও সড়কের ওপর থেকে পানি পুরোপুরি সরে গেছে।

অবশ্য বন্যার পানি নামতে দেরি হচ্ছে। ভারী বৃষ্টি ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে এক সপ্তাহ ধরে কহুয়া, মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি উপচে গ্রামে গ্রামে ঢুকে পড়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহরিয়ার হাসান প্রথম আলোকে বলেন, নদী ও খাল পানিতে টইটম্বুর। এ কারণে পানি নামতে দেরি হচ্ছে।

বিস্কিটের টিন খুলে শফিক রেহমান আমাকে বললেন: লন্ডন থেকে এসেছে, তোমার ভালো লাগবে by শায়ের খান

কিংবদন্তী সাংবাদিক শফিক রেহমানের সাথে আমার পরিচয়টা মজার । ২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রথম টেরেস্টেরিয়াল টিভি স্টেশন ইটিভি বা একুশে টেলিভিশনের বাণিজ্যিক উদ্বোধন হয় আমার  নির্বাক কমেডি ' হাবার স্বপ্ন ' দিয়ে । পরের সপ্তাহের সাপ্তাহিক যায় যায় দিন পত্রিকায়  'দিনের পর দিন' কলামে উদ্বোধনী দিনের অনুষ্ঠানের পুরো রিভিউটা দেন শফিক রেহমান । কড়াকড়ি ।  আমার সাইলেন্ট কমেডি ' হাবার স্বপ্ন 'কে  বলেন বোরিং । চান্দি গরম হয়ে যায় আমার । যে প্রোডাকশনটা প্রশংসায় ভাসছে , সেটা বোরিং?

ফোন দেই  যায় যায় দিন অফিসে। সালাম দিয়ে শফিক রেহমান'কে সরাসরি বলি - ' আপনি যে লিখলেন আমার ' হাবার স্বপ্ন ' বোরিং , কোথায় ও কেন বোরিং প্লিজ বলবেন ? ' তিনি বিব্রত হলেন ।  সরাসরি এ প্রশ্নের  উত্তর তাঁর মাথায় ছিলো না । হোল্ড অন । আমি যেই শফিক রেহমানকে এই কথাটা বলছি , তখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগতের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট আর আমি মিডিয়ায় পিচ্চি এক ওয়েস্টার্ন কাউবয় । আমার সাহসে বিব্রত হলেও খুশি হলেন শফিক রেহমান । অফিসে  আসতে বললেন ।

আমি গেলাম অনেক পরে । ২০০১ সালে । হাতে একটা লেখা নিয়ে । শফিক রেহমান ছাপলেন । আমাদের সম্পর্ক হয়ে গেলো চমৎকার । বেইলি রোডের সাপ্তাহিক যায় যায় দিন পত্রিকা অফিস হয়ে গেলো আমার প্রায়ই আড্ডা মারা আর লেখার জায়গা ।

এই অফিসে শফিক ভাইয়ের অধীনস্থ তিনজন জেনারেল ছিলো । এরা একটা রুমে পাশাপাশি টেবিলে বসে কাজ করতো । সজীব ওনাসিস , সায়ন্থ সাখাওয়াত ( এনাকে অনেকেই এখন টক শো'র সুবাদে চেনে ) ও মাহমুদুজ্জামান । আমি শফিক ভাইয়ের সাথে কাজ সেরে এদের রুমে একটু আড্ডা মেরে যেতাম । আমি মনে মনে এদের ডাকতাম থ্রি স্টুজেস । এতোদিন তারা এটা জানতো না , আজ জানলো । এদের মধ্যে সজীব ওনাসিস হচ্ছে শফিক রেহমানের রক সলিড ভক্ত । সজীব ওনাসিসের বাবা হচ্ছেন বিখ্যাত গীতিকার ফজল - এ - খোদা । উনার লেখা কালজয়ী গান হচ্ছে - ' সালাম সালাম হাজার সালাম , লাখো শহীদ স্মরণে -। '

এক বিকেলের এক মজার কথা । একটা লেখা নিয়ে শফিক ভাইয়ের অফিস রুমে ঢুকলাম । তিনি আমাকে চোখ দিয়ে মাপলেন । ভূমিকা না করেই পরাজয়ের সুরে বললেন, 'তুমি তো আমাকে হারিয়ে দিলে । '  ভাবলাম আমার গত সংখ্যার লেখাটা বেশ প্রশংসিত হয়েছে । সম্ভবত উনার 'দিনের পর দিন'কে হারিয়েছি ।  ভুল ভাঙলো পরের লাইনে । বললেন -' শায়ের , আমি এতোদিন ভাবতাম আমিই সবচেয়ে কালারফুল । তুমি আমাকে আজ হারিয়ে দিলে । ' আমি সেদিন হ্যাজার্ড ব্র্যান্ডের এক সিঁদুরি লাল টকটকে শার্ট পরেছিলাম । হাওয়াই মিঠাই শার্টে শফিক রেহমানের চোখেমুখে স্পষ্ট পরাজয়ের ছাপ দেখেছিলাম  । লাল উনার প্রিয় ।  

বাংলা লেখায় শফিক রেহমানের নিজস্ব একটা স্টাইল আছে । যেমন ক্রিয়া'কে লিখেন কৃয়া , সুশীল'কে সুশিল , প্রি-কে পৃ , শ্রী-কে শৃ ।  এই বানান আমার মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছিলো ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিডিয়ায় আমার ঘনিষ্ঠ মানুষদের অনেকেই আমার উপর কড়া নজর রাখতে শুরু করে । আমি বিএনপিপন্থী বা রাজাকার টাইপ কি না এসব ।  পাখির ছবির লোগো-ওয়ালা টিভি চ্যানেলের কমিশনিং এডিটর 'লীগ আদর্শের' ভদ্রলোক তো আমাকে মোটামুটি ধমকের সুরেই জিজ্ঞেস করলো , আমি শফিক রেহমানের মতো বানানে লিখি কেনো ? এই চ্যানেলে আমার কোনো অনুষ্ঠান যায়নি । ইন ফ্যাক্ট ২০০৮ সালের পর কোনো টিভি চ্যানেলেই আমার নাটক প্রচার হয়নি ।

একটা নামকরা টিভি চ্যানেলে নাকি ওয়ান ইলেভেনের সময় মিটিং করে কিছু মিডিয়া দুর্বৃত্ত বলেছিলো - আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তারা আমাকে দেখে নেবে । যাদুর মতো ওদের কথায় কাজ হয়েছিলো । আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন চ্যানেলে প্রি-প্ল্যানড অপদস্ত ও হয়রানি করা হয় আমাকে । সুসংগঠিতভাবে মিডিয়ায় আমার সম্পর্কে ' নেগেটিভ ন্যারেটিভ ' তৈরি করা হয় । ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন বা চরিত্র হনন করার চেষ্টা করা হয় একাধিকবার । হানি ট্র্যাপে বিফল হয়ে মানি ট্র্যাপ করা হয়েছিলো । একটা টিভি চ্যানেল আমাকে অপহরণ করে আটকে রেখেছিলো ।

স্বৈরাচারের প্রোপ্যাগান্ডা মেশিনের প্রধান দু'টোর একটা সেই চ্যানেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে নাকি জনতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা  করেছে । শুনেছি সেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক এখন তার ' গম মন্ত্রী ' মালিকসহ পলাতক আছে । সম্প্রতি ছাত্র জনতার সফল অভ্যুত্থানের পর উত্তেজিত জনতা জ্বালিয়ে দেয় সেই লাল রঙের লোগোর চ্যানেল ।          

শফিক রেহমান যখন সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক যায় যায় দিন প্রকাশ করেন , সেটা ছিলো একটা ইতিহাস । এ নিয়ে গুঞ্জন ছিলো - কি নিয়ে যেন আসছেন শফিক রেহমান । আমাকে তিনি তা বললেন ।   বললেন - ' শোনো শায়ের , আমি এমন এক জিনিস বানাচ্ছি যেখানে আমার কট্টর বিরোধীরাও আসবে । আবার আমাকে ওরা রাজাকার বলে গালি দেবে । আবার আসবে । আসতে ওদের হবেই । '   

এখনকার তরুণ তরুণীরা যারা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিস্কার করে উদাহরণ তৈরি করছো , শুনে রাখো - আজ থেকে ২ দশক আগে তেজগাঁও শিল্প এলাকার এক গাঁজা - ফেনসিডিল - পকেটমারের  রাস্তাকে শফিক রেহমান ঝকঝকে পরিস্কার করে নাম দিয়েছিলেন - লাভ রোড । ভালোবাসার রাস্তা । আর সেই রাস্তায়ই ছিলো দৈনিক যায় যায় দিনের অফিস ।  আরো শুনে রাখো - এখন তোমরা যে ভ্যালেন্টাইন'স ডে বা ভালোবাসা দিবস পালন করো , বাংলাদেশে এটা এনেছেন এই লিভিং লেজেন্ড শফিক রেহমান ।

দেখি এক এলাহী অফিস দৈনিক যায় যায় দিনের । লাইব্রেরি থেকে থিয়েটার সবই আছে । কনফারেন্স রুম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের নামে , ক্যাফে'র নাম চে' ( গুয়েভারা ) ক্যাফে , থিয়েটার হল আলফ্রেড হিচককের নামে । গ্রাউন্ড ফ্লোর অলমোস্ট পুরোটাই কাঁচের । দুষ্টুমি করে বললাম -' হাসিনার পোংটা পোলাপান ইট মারলে ভেঙে যাবেনা ? ' বললেন -' এটা বুলেট প্রুফ । হাসিনার পোলাপান গ্রেনেড মারলেও কিছু হবেনা । '

লিখতে শুরু করলাম দৈনিক যায় যায় দিনে ।

পরের সন্ধ্যায়  শফিক ভাইকে ফোন দিলাম ।  অনেক আবেগঘন হয়ে বললেন তাঁর ৫০ বছরের লালিত স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আনন্দের কথা ।  

তথাকথিত ওয়ান ইলেভেন হওয়ার আগে আগে শফিক রেহমান  তাঁর ' বিশেষ প্রতিপক্ষ ' অফিস কর্মচারীদের ট্র্যাপে পড়েছিলেন । ব্রিটিশ নাগরিক তিনি লন্ডন যাওয়ার উদ্দেশ্যে জিয়া এয়ারপোর্টে ( এখনকার হজরত শাহজালাল ) গেলে এমিরেটসের এক অফিসারের ইশারায় উনাকে আটকে দেয়া হয় । যেতে দেয়া হয়নি । ফিরে আসেন  শফিক রেহমান । আর তাঁর  ' বিশেষ প্রতিপক্ষ '   কর্মচারীরা মিছিল করে করে বলে , তিনি নাকি তাদের বেতন না দিয়ে পালাচ্ছিলেন । সব্বোনাশ । বলে কি ?     

আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো শুনে যে কে বা কারা তাঁকে নাকি হত্যার পরিকল্পনা করেছিলো । তাই অফিসের ভার মিস তালেয়া রেহমানের ( উনার স্ত্রী ) হাতে দিয়ে নীরবে তিনি জীবনের নিরাপত্তায় দেশ ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন । সব শুনে বললাম -' আপনি চিন্তা করবেন না । আমি আপনার পাশে আছি। '

২০০৮ সালের নির্বাচনে  শফিক রেহমান তাঁর ইস্কাটনের পৈতৃক বাড়িটা বিএনপি তথা বেগম খালেদা জিয়া'র অস্থায়ী অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন । এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলো -' এটা কি আরেক হাওয়া ভবন ? ' শফিক রেহমান উচ্চস্বরে বলেছিলেন -' হাওয়া ভবনও না বাতাস ভবনও না , এটা আমার বাবার ভবন । '

২০১২ সালের দিকে হবে । হাসিনা বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে । তখন শফিক রেহমানের যায় যায় দিন ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে । ' মৌচাকে ঢিল ' নামে একটা ম্যাগাজিন বের করেন । বাসার নিচতলায়ই এর অফিস ।  টিভির খবরে দেখলাম শফিক রেহমানের এই বাসায়  সরকারি গুন্ডারা ককটেল হামলা করেছে । সন্ধ্যায় একাই তাঁর বাসায় গেলাম । ভূতুড়ে আলো আঁধার আর থমথমে পরিবেশ । বাসার গেইটে নক করতেই খুব ভয়ে ভয়ে সিকিউরিটি গার্ড উঁকি দিলো । পরিচয় দিয়ে খুলতে বললাম । খুললো । ঘুরে ঘুরে এফবিআই তদন্তকারীদের মতো দেখে বললাম - ' ডেঞ্জারাস কিছুনা । শব্দ করে ভয় দেখাতে এসেছিলো । '

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস স্যার যখন নোবেল প্রাইজ পান , তখন শফিক রেহমান সরাসরি ইউনূস স্যারের পাশে গিয়ে দাঁড়ান । শফিক ভাইয়ের সুখী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এমন ছিলো , যেন উনিই নোবেল জিতেছেন । হ্যালো ইউনূস স্যার , আপনার মনে আছে তো , আপনাদের জেনারেশনের জাহাঙ্গীর ভাই ছাড়া ( মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর - আপনার প্রয়াত ছোটো ভাই ) শফিক রেহমানই একমাত্র সাংবাদিক যে আপনার গর্বে গর্বিত হয়ে বিদ্যুৎ গতিতে আপনার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ? নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে ।   এদেশে শফিক রেহমানই একমাত্র টিভি উপস্থাপক যিনি সাধারণ ক্যামেরা ফ্রেমের এক নন-ফিকশন ইনফোটেইনমেন্ট ' লাল গোলাপ 'কে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান করে তুলেছিলেন । জিনিয়াস এই শফিক রেহমানকেই একটি টিভি চ্যানেলের পরিচয়ের ছদ্মাবরণে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।  আপনি কি একজন বাংলাদেশি ? আপনি কি নিজেকে কখনো প্রশ্ন করেছেন , একজন সিনিয়র সিটিজেন ও জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শফিক রেহমানকে কেনো মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে অমানুষিক নির্যাতন করে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয় এবং কেনো তিনি দেশান্তরী হন ? আপনি সেই প্রশ্ন তুলবেন না , কারণ আপনাকে পাশের দেশের স্ক্রিপ্টে তাদের এদেশীয় দালালরা ব্রেইনে ঢুকিয়েছে যে , হলিউডের গ্রেগরি পেক হচ্ছে হিরো আলম আর  দুর্বৃত্ত শাসক রাজনীতিবিদের রক্ষিতাদের ভাইরাল ভিডিও হচ্ছে ক্ল্যাসিক মুভি ।  

জিনিয়াস শফিক রেহমানকে নিয়ে এতো কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই , তিনি দীর্ঘ নির্বাসনের পরে লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন । আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম যে উনাকে অন্যায়ভাবে নির্যাতনকারীর পতন তিনি দেখে যান কিনা । হ্যাঁ , উনি দেখলেন ।

প্রিয় শফিক রেহমান , আপনাকে আপনার ভূমিতে স্বাগত । আপনি বেশ টায়ার্ড । আপনার ককটেল বম্ব খাওয়া ইস্কাটন গার্ডেনের বাসায় বসে রিল্যাক্স করে একটা ককটেল ড্রিংক্স নিন । সেটা যদি টনিক ওয়াটার দিয়ে একেবারে ট্রান্সপারেন্ট কিছু হয় , তবে এলাচ লেবুর স্লাইস আর আইস কিউব মাস্ট । চিয়ার্স ।  

লেখক - নাট্যকার - ফিল্মমেকার  

সরজমিন ফেনী: ত্রাণের অপেক্ষায় by মারুফ কিবরিয়া

লিজু আক্তার। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথুলিয়ায় বাড়ি। সাতদিন আগে গভীর রাতে ভয়াবহ পানির স্রোতে ঘরবাড়ি সবই হারান। উজান থেকে আসা ঢলে সব হারিয়ে সাঁতরে আশ্রয় নেন চিথুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত সাতদিন এখানেই বাস করছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে লিজু বললেন, ‘বাড়িত কিছুই নাই। আঁর বা‌ড়ির টি‌নের চালও নাই। বেক হা‌নি‌তে ভা‌সি গে‌ছে।’

চ‌ল্লি‌শোর্ধ্ব এই নারী গত বুধবার রাতে আচমকা পানির তো‌ড়ে সর্বস্ব হা‌রি‌য়ে চলে আসেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ভয়াবহ সেই রা‌তের স্মৃ‌তি ম‌নে পড়লেই অ‌ঝো‌রে কাঁ‌দেন তি‌নি। লিজু আরও জ‌ানান, এক বা‌ড়িতে তারা ১৫ সদ‌স্যের প‌রিবার। তারা সবাই একস‌ঙ্গে বা‌ড়ি ছা‌ড়েন। শুধু লিজু আক্তার নয়, চিথু‌লিয়া গ্রা‌মের এমন শতা‌ধিক মানুষ সেই রা‌তে স্কুলে স্থা‌পিত আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে এসে ও‌ঠেন।

চিথু‌লিয়ার রিকশাচালক সুমন মিয়া। তি‌নিও দুই ছেলে তিন মে‌য়ে নি‌য়ে আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে আসেন। বুধবার রাতের বা‌নের স্রো‌তে বা‌ড়ি ছা‌ড়েন। জী‌বিকার একমাত্র সম্বল রিকশাটাও হা‌রি‌য়ে ফে‌লেন সুমন মিয়া। তি‌নি ব‌লেন, সংসার চল‌তো রিকশা চালি‌য়ে। এখন সেটাও নাই। কীভা‌বে চলবো বুঝ‌তে পার‌ছি না। আবার কবে রিকশা পা‌বো। ক‌বে বউ বাচ্চার পেটে ভাত দি‌বে‌া।
চিথু‌লিয়া সরকা‌রি প্রাথ‌মিক বিদ‌্যালয় আশ্রয়কে‌ন্দ্রে সাত দিন ধরে অবস্থান কর‌ছেন হোস‌নে আরা বেগম না‌মের আরেক না‌রী। দুই বছ‌রের শিশু‌কে ঘা‌ড়ে তু‌লে বৃহস্পতিবার ভোরে দুই কি‌লো‌মিটার পথ সাঁ‌তরে আসেন তি‌নি।

হোস‌নে আরা ব‌লেন, আমা‌দের এদি‌কে পা‌নি আসে প্রতি বছর। কিন্তু ঘর ত‌লি‌য়ে যায় না কখনো। এবার যেটা হইছে আমার দাদার বাবাও দে‌খে‌নি। এই বন্যায় সব চ‌লে গে‌ছে। কিছুই নাই আমার। কো‌নো ম‌তে বাচ্চাটা নি‌য়ে বের হইছি।
পশুরাম উপ‌জেলার আরেক আশ্রয়‌কেন্দ্র পশুরাম মডেল সরকারি উচ্চ বিদ‌্যালয়। বন‌্যার শুরুর দি‌কে এখা‌নে অন্তত ৪শ’ মানুষ আশ্রয় নেন। পা‌নি কমায় এখন অ‌নে‌কে ফি‌রে গে‌ছেন। ত‌বে যা‌দের বা‌ড়িঘ‌রে এখনো পা‌নি আছে তারা আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রেই অবস্থান করছেন।
সেখা‌নে গত ছয়‌ দিন ধ‌রে আছেন রিকশাচালক হানিফ। তি‌নি ব‌লেন, এখা‌নে ম‌নে হ‌চ্ছে জে‌লের মধ্যে আছি। বা‌ড়িতে তো সব ভা‌সি‌য়ে নি‌ছে। আমার ঘ‌রের টিনগু‌লো কই আছে জা‌নি না। এখন টিন পাবো কই?

আরেক নারী শরীফা খাতুন ব‌লেন, আমার মে‌য়েটার বয়স সাত বছর। ভোররা‌তে ঘু‌মের ম‌ধ্যেই ঘ‌রে গলা সমান পা‌নি। মে‌য়েটা তো ডু‌বেই গে‌ছিলো। প‌রে খুঁজে বের ক‌রে সব ফে‌লে চ‌লে আস‌ছি। এত ভয় কখনো পাইনি।
বন্যার পানির তীব্র স্রোতের বিপরীতে তিনদিন টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে পরশুরামের সাতকুচিয়া গ্রামের ষা‌টোর্ধ্ব নারী আসমা বেগম। চোখে মুখে তার এখনো আতঙ্ক।
তিনি জানান, প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালায় মাছের খাবারের ড্রামে করে ভাসতে ভাসতে তারা ওঠেন পরশুরাম পাইলট হাইস্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে। সেখানে যাওয়ার পর খাবার পান।

শুক‌নো খাবা‌রে কাটছে দিন:
আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে আসা মানুষগু‌লো গত সাত দিন ধ‌রেই কাটা‌চ্ছেন দু‌র্বিষহ জীবন। শুক‌নো খাবা‌র ছাড়া ভাতের দেখা পা‌চ্ছেন না। কেউ ব‌্যক্তি উদ্যো‌গে রান্না করা খিচু‌ড়ি দি‌লে ত‌বেই এক‌বেলা খে‌তে পার‌ছেন।
পশুরা‌মের চিথু‌লিয়ার আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে আশ্রয় নেয়া বন্যাক‌বলিত‌রা জানান, সবাই চিঁড়া-মু‌ড়ি দি‌য়ে যায়। কেউ চাল-ডাল দি‌লে রান্না ক‌রে খে‌তে পার‌তেন।

সীমা রানী না‌মের এক নারী জানান, আমা‌দের এখানে শুধু চিঁড়া-মু‌ড়ি আসে। প্রতি‌দিন প্রতি বেলায় এসব খাওয়া যায়? য‌দি চাল-ডাল দি‌তো তাহ‌লে রান্নার ব‌্যবস্থা করতাম। বা‌ড়ি‌তে পা‌নি কতো‌দি‌নে কমবে কে জা‌নে!
আলাউদ্দিন না‌সিম চৌধুরী ক‌লে‌জে আশ্রয় নেয়া শাকেরা বেগম ব‌লেন, চিঁড়া-গুড় দি‌য়ে তিন বেলা খাওয়া কষ্ট। আল্লাহ খাওয়াইতে‌ছে খাইতে‌ছি। বাড়িতে তো ঘরটা আবার ক‌বে তুল‌বো কে তু‌লে দিবো জা‌নি না। সব অন্ধকার লা‌গে।
একই আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রের সাইফু‌ল ইসলাম ব‌লেন, এই জেল থে‌কে ক‌বে মু‌ক্তি পাবো জা‌নি না। বা‌ড়ির পা‌নি এখনো কোমর সমান। শুকনা খাবার আর কতো ভালো লা‌গে।

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার পুরনো মুন্সির হাটের উত্তর শ্রীপুরে পাটোয়ারী টাওয়ারে আশ্রয় নিয়েছেন নারী-শিশুসহ আড়াইশরও বেশি মানুষ। তাদের অনেকে জানান, যারা খাবার দি‌চ্ছেন বে‌শির ভাগই শুক‌নো। চাল-ডালসহ মু‌দি পণ‌্য দি‌লে নি‌জে‌রা রান্নার ব‌্যবস্থা কর‌তে পার‌তেন।

পথে প‌থে খাবার পে‌তে হাত তুল‌ছেন শত মানুষ:
ফেনীর ফুলগাজীর আনন্দপুর থে‌কে পশুরাম সদর পর্যন্ত পু‌রো সড়ক‌টি প্রায় ২০ কি‌লো‌মি‌টার। এই সড়কের উপর শত শত মানুষ দাঁ‌ড়ি‌য়ে থা‌কেন খাবারের জন‌্য। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সবাই ত্রা‌ণের গা‌ড়ি দেখ‌লেই থামা‌চ্ছেন। স্বেচ্ছা‌সেবীরা গাড়ি থামিয়ে বিতরণ কর‌ছেন খাবার। ত‌বে অ‌নেক গা‌ড়িই থামে না। তারা জানায় নি‌র্দিষ্ট আশ্রয়কে‌ন্দ্রে গে‌লে মিল‌বে খাবার।

জীবন শঙ্কায় গুলিবিদ্ধ মামুন by মরিয়ম চম্পা

৫ই আগস্ট দুপুর ২টা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর বনানী থেকে বিজয় মিছিলের সঙ্গে গণভবনে যান মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন।  বিকাল সাড়ে ৫টায় বনানী হয়ে উত্তরা থানা এলাকায় জসিমউদ্দিন পৌঁছলে হঠাৎ একটি গুলি এসে মামুনের ডান পাশের গাল দিয়ে ঢুকে বাম গাল দিয়ে বেরিয়ে যায়। তিন-চার টুকরো হয়ে যায় তার জিহ্বা। এক তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে কেটে বাদ দেয়া হয়েছে। বাকি অংশে সংক্রমণ হওয়ায় কালো হয়ে যাওয়া জিহ্বার সামনের পুরো অংশ কেটে বাদ দিতে হতে পারে বলে জানিয়েছে চিকিৎসক। গুলিতে মামুনের নিচের চোয়াল এবং দাঁতের মাড়িসহ পুরোটা ভেঙে গেছে। নিচের চোয়ালে কোনো দাঁত নেই। রক্তে ইতিমধ্যে ইনফেকশন ধরা পড়েছে। এতে করে মুখসহ শরীরের অন্যান্য অংশে পচন ধরতে পারে বলে দাবি মামুনের পরিবার এবং চিকিৎসকদের। এদিন একদল অস্ত্রধারী লোক এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে বিমানবন্দর এলাকায় প্রবেশ করে বলে দাবি করেন মামুনের পরিবার। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের উইমেন্স হাসপাতালে ভর্তি করে। এ বিষয়ে মামুনের পরিবারের সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের। তার স্ত্রী বলেন, মামুনের জিহ্বায় সেলাই দেয়া হলে দুই চোয়ালের মাংস পচে গিয়ে সেলাই খুলে গেছে। এখন পর্যন্ত খোলা অবস্থায় আছে। রোববার হঠাৎ করে তার ব্লাডে ইনফেকশন ধরা পড়ে। বর্তমানে তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। এর আগে দুই দিন ভেন্টিলেশন এবং ৭ দিন আইসিইউতে ছিলেন। পরে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হলে হঠাৎ করে রোববার অজ্ঞান হয়ে যায়। শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়। ব্লাড সার্কুলেশন ও পালস শূন্যতে চলে আসে। বর্তমানে মামুনের জীবন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইতিমধ্যে মামুনের চিকিৎসায় প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। মামুনের গ্রামের বাড়ি মাগুরা। আহত মামুন মাগুরার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ছিলেন। বনানীতে একটি মেসে ভাড়া থাকতেন। গুলি লাগার পর থেকে মামুন আর কথা বলতে পারেনি। পরবর্তীতে তিনি কথা বলতে পারবেন কি না সেটা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। গত ৬ মাস আগে মামুন বিয়ে করেন। গ্রামের বাড়ি মাগুরাতে দুই ভাই-বোন মা-বাবা এবং স্ত্রী থাকেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মামুন। ছোট ভাই অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাবা কৃষক। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলছে মামুনের চিকিৎসা। এ বিষয়ে মামলা করেছেন কিনা জানতে চাইলে মামুনের স্ত্রী বলেন, আমরা কার বিরুদ্ধে মামলা করবো। এখন পর্যন্ত মামুনের পরিবার তার চিকিৎসার জন্য কোনো আর্থিক সাহায্য কিংবা অনুদান পাননি। মামুনের স্ত্রী বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকে মাঠে থাকলেও মামুনের খোঁজ নেয়নি কেউ। আমরা ঢাকা শহরে কাউকে চিনি না। কার মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের কাছে পৌঁছবো সেটা বুঝে উঠতে পারছি না। আমাদের একটিই চাওয়া মামুন আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠুক। তার পরিবার এবং দেশের জন্য কাজ করার অনেক স্বপ্ন ছিল। এভাবে তাকে আমরা কতোদিন চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারবো জানি না।     

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে মুসলিম ফ্যাক্টর

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম আমেরিকানরা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালে গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেটগুলোতে ডেমোক্রেটরা খুব কম ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। এবারের নির্বাচনে মুসলিম আমেরিকানরা উল্লেখযোগ্য ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন। তাদের  ভোটের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ই অগ্রাধিকার পেতে পারে। তাহলো- গাজা যুদ্ধ। এ বিষয়ে অনলাইন আল জাজিরায় একটি নিবন্ধ লিখেছেন মোগাদেহ কনসাল্টিং-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর সাবেক রিসার্স ডিরেক্টর ডালিয়া মোগাহেদ এবং ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর ডিরেক্টর অব রিসার্স সাহের সেলোদ। এতে তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় একভাগ হলেন মুসলিম। তবে তারা ভোটিং ব্লক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারা সুইং স্টেটগুলোতেই বেশি বসবাস করেন। এসব সুইং স্টেটের হিসাবনিকাশ সামান্য এদিক ওদিক হলেই ফল গড়বড় হয়ে যেতে পারে।

আগের চেয়ে এবারের নির্বাচনে মুসলিম সম্প্রদায় দৃশ্যত একটি বিষয়ে একাট্টা হয়েছে। তাহলো গাজা যুদ্ধ। মুসলিম ভোটারদের সবচেয়ে বেশি সমর্থন যে প্রার্থী পাবেন তিনি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিশি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যার্ন্ডি-এর প্রকাশিত নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। তারা এই গবেষণা করেছে এমগাজে অ্যান্ড চেঞ্জ রিসার্সের সঙ্গে। জুনে এবং জুলাইয়ের শুরুতে তিনটি সুইং স্টেট- জর্জিয়া, পেনসিলভ্যানিয়া এবং মিশিগানের মুসলিমরা কেমন সাড়া দেবেন এবারের নির্বাচনে তার ওপর ভিত্তি করে একটি জরিপ চালানো হয়েছে। ২০২০ সালে এসব রাজ্যের মুসলিমরা ছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সবচেয়ে বড় সমর্থক। কিন্তু গাজা যুদ্ধের ফলে তারা কোনদিকে মোড় নেবেন তা জানতে গবেষণা করা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, ২০২০ সালে মুসলিমদের শতকরা প্রায় ৬৫ ভাগ মুসলিম ভোটার ভোট দিয়েছেন জো বাইডেনের পক্ষে। ওই রাজ্যগুলোতে তিনি খুব কম মার্জিনে জয়ী হয়েছেন। ফলে এটা পরিষ্কার যে, জো বাইডেনের জয়ে মুসলিম ভোটারদের বড় অবদান ছিল। তিনি জর্জিয়াতে ১২০০০ ভোটে জিতেছেন। এ রাজ্যে মোট কমপক্ষে ৬১ হাজার মুসলিম ভোট দিয়েছেন। বাইডেন পেনসিলভ্যানিয়ায় জিতেছেন ৮১ হাজার ভোটে। এই রাজ্যে মুসলিমদের মধ্যে এক লাখ ২৫ হাজার জন ভোট দিয়েছেন। জরিপে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে যাওয়ার আগে শতকরা মাত্র ১২ ভাগ মুসলিম বলেছেন, তারা বাইডেনকে ভোট দেবেন। ফলে তার প্রতি সমর্থনে এটা এক নাটকীয় পরিবর্তন। তবে বাইডেন সরে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পদে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন কমালা হ্যারিস। গাজা যুদ্ধ মুসলিম ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। তারা এটাকে বড় একটি ইস্যু হিসেবে দেখছেন।