Friday, June 13, 2014

তারেক বিএনপির ভরসা, না বোঝা? by সোহরাব হাসান

শেখ হাসিনার সরকার দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতি যে আচরণ করছে, তাকে কোনোভাবেই ন্যায় বলা যাবে না। ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে আইনের দৃষ্টিতে বৈধ দাবি করা হলেও বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিংবা রাস্তায় বোমা-ককটেল হামলার মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের থানা-আদালত-জেলখানায় টানাহেঁচড়া করার বৈধতা দাবি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির বড় সমস্যা হলো সরকার ও প্রধান বিরোধী দল পরস্পরের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না। এই অস্বীকারের সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক রাজনীতির যেমন বারোটা বাজিয়েছে, তেমনি পরস্পরের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিষয়টি এক পক্ষের হলে তাকে নিবৃত্ত করা সহজ হতো। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে বিরোধী দলের প্রতি যেসব দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে তার চেয়ে কোনো অংশে কম করেনি৷
আওয়ামী লীগ নেতাদের যখনই সভা-সমাবেশ করা বিএনপির গণতান্ত্রিক অধিকার বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করি, তখনই তারা ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার অপচেষ্টার উদাহরণ টানেন। একটি অন্যায় দিয়ে আরেকটি অন্যায়কে জায়েজ করা যায় না। কিন্তু এ কথাও সত্য যে অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত ইতিহাসের মীমাংসা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুস্থিরতা আশা করা যায় না।
সম্প্রতি বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কয়েকটি উক্তি প্রধান দুই দলের মধ্যকার রাজনৈতিক বিদ্বেষ খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। লন্ডনপ্রবাসী বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের এই রাজনীতিক প্রথম বোমা ফাটালেন এই বলে যে জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি।
কীভাবে প্রথম রাষ্ট্রপতি? জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বেলাল মোহাম্মদ প্রমুখের প্ররোচনায় স্বাধীনতার পক্ষে একটি ঘোষণা দিয়েছেন এটি সত্য। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা বেলাল মোহাম্মদ ও তঁার সহযোগীরা এর আগেই আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানকে দিয়ে ঘোষণা প্রচার করিয়েছেন। পরে তাঁরা ভাবলেন, একজন সামরিক বাহিনীর সদস্যের কণ্ঠে ঘোষণাটি দেওয়া গেলে দেশবাসী আরও বেশি উৎসাহিত হবেন।
সেই দৃষ্টিতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটির গুরুত্ব আছে। তিনি প্রথম ঘোষণায় নিজেকে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান দাবি করলেও পরবর্তী ঘোষণায় সেটি সংশোধন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই ঘোষণা দেন।
পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান সাড়ে পাঁচ বছর এবং খালেদা জিয়া ১০ বছর দেশ শাসন করেছেন। এই সাড়ে ১৫ বছরে তাঁদের কেউই জিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি দাবি করেননি। এমনকি জিয়া নিজেকে কখনো স্বাধীনতার ঘোষক বলেও প্রচার করেননি।
কিন্তু হঠাৎ করেই স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর তাঁদের লন্ডনপ্রবাসী পুত্র তারেক রহমান জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করলেন। আর ঢাকায় বসে বিএনপির একশ্রেণির কর্তাভজা নেতা আহ! বেশ বেশ বলে জিগির তুললেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বাকপটু নেতারা বিএনপির এই ঢিলটি মাটিতে পড়ার আগেই পাটকেল ছুড়ে বসলেন। কয়েক দিন ধরে ঢাকায় আর কোনো আওয়াজ ছিল না, নয়াপল্টন ও ধানমন্ডিতে দুই পক্ষ প্রত্যহ সাংবাদিকদের ডেকে নিজেদের পক্ষে শাণিত যুক্তি খাড়া
করতে গলদঘর্ম হলেন। যেন দেশে আর কোনো সমস্যা নেই।
এরপর মে মাসের শেষে জিয়াতনয় আরও একটি গুরুতর বোমা ফাটালেন। এবার তিনি জিয়াউর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি বলেই ক্ষান্ত হলেন না; বললেন, ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন, সেটি ছিল অবৈধ। তাঁর যুক্তি হলো ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ঘোষণায় বলা হয়েছিল, সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারই বহাল থাকবে।
১৯৭০ সালে জনগণ যাঁদের নির্বাচিত করেছিলেন, তাঁরা শেখ মুজিবুর রহমানকেই সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করেছিলেন। সেই নেতার নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্রপতিপদ্ধতির সরকার বৈধতা পেতে পারে, তাহলে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সংসদীয় সরকার বৈধতা পাবে না কেন?
একই যুক্তি কিন্তু খন্দকার মোশতাকরা দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে৷ একেই বলে খলের ছলের অভাব হয় না৷
এখানে উল্লেখ করা দরকার, দুই শ্রেণির মানুষ ১৯৭১ সালের ও ১৯৭২ সালের সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। এক. স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, যাঁরা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই মানতে পারেননি। তাঁরা কুযুক্তি দিয়ে থাকেন যে ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল পািকস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয়। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ বা পরিষদ স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করতে পারে না৷
আরেক শ্রেণির বিপ্লবী পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা গঠিত সরকারের পরিবর্তে একটি বিপ্লবী পরিষদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। সেই বিপ্লবীদের কেউ কেউ পরবর্তীকালে সামরিক সরকারের পায়রবি করেছেন, কেউ কেউ এখন পিতার আমলের ভুল শুধরে নিচ্ছেন কন্যার মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়ে।
৪৩ বছর পর তারেক রহমানের নতুন ইতিহাস বিচার প্রথম পক্ষকে খুশি করবে৷ তবে তিনি তাঁর ভাষণে শেখ মুিজবুর রহমানকে ব্যর্থ রাজনীতিক ও জিয়াউর রহমানকে সফল রাজনীতিক বলে যে মূল্যায়ন করেছেন, সেটি বিতর্কের বিষয় হলেও এতে দোষের কিছু দেখি না। বিএনপির কোনো নেতা নিশ্চয়ই জিয়াকে ব্যর্থ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বলবেন না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই হলো প্রতিপক্ষকে হেয় করে নিজের মাহাত্ম্য প্রচার করা৷ জিয়াউর রহমানকে সফল প্রমাণ করতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ব্যর্থ বলার দরকার পড়ে না। আবার শেখ মজিবুর রহমানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে জিয়াকে গালাগাল করারও প্রয়োজন হয় না।
তারেক রহমান জিয়াকে সফল রাজনীতিক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলে দাবি করেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনি ততটুকু বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছেন, যতটুকু তাঁর ক্ষমতার জন্য প্রয়োজন। জনগণের মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না বলে চরম বাম ও ডানদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক ভিত্তিও তৈরি করেছেন।
কিন্তু তাঁর মূল ক্ষমতাকেন্দ্র সামরিক বাহিনীর ভেতরে যে অসন্তোষ ও বিদ্রাহ ছিল তা তিনি থামাতে পারেননি এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হাতেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে। তাহলে তাঁকে সফল রাজনীতিক বলা যায় কীভাবে?
শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান দুজনই ইতিহাসের অংশ। ইতিহাসে যাঁর যেটুকু ভূমিকা ও অবদান, সেটুকু স্বীকার করতে হবে। ভেবেছিলাম, বিএনপির নতুন প্রজন্মের এই নেতা ইতিহাসের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে সামনে চলার চেষ্টা করবেন। এখন মনে হচ্ছে, পেছনে চলতেই তিনি বেশি পছন্দ করেন।
তারেক রহমান রাজনীতিতে আসেন শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে৷ তখন বিএনপির অবস্থা ছিল নড়বড়ে৷ তিনি দলকে সংগঠিত করতে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন৷ ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির অভাবিত বিজয়ে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ৷ বিএনপির প্রবীণ নেতারাও তাঁকে দলের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্ব মেনেও নিয়েছিলেন৷ কিন্তু বিএনপির পাঁচ বছরের শাসনামলে তারেক রহমান যেভাবে হাওয়া ভবনকে বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, তাতে দেশের মানুষ যেমন বিএনপির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছে, তেমনি দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল চরম হতাশা ও অসন্তোষ৷ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা মনে করতেন, তারেক ও তাঁর সহযোগীদের কারণেই দল ও নেত্রী ডুবেছেন৷
এখন সেই ডুবন্ত দলকে তীরে তোলার দায়িত্বটি কে নেবেন? দলের চেয়ারপারসন, সম্মিলিতভাবে জে্যষ্ঠ নেতারা, না লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমান? বিভিন্ন বিষয়ে দলের মধে্য আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত হয় না৷ সিদ্ধান্তের জন্য লন্ডনের গ্রিন সিগন্যাল প্রয়োজন হয়৷
ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নেতা–কর্মীরা জেলজুলুমের শিকার হচ্ছেন৷ কিন্তু দল পরিচালনায় তাঁদের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ছে৷ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও টেপের মাধ্যমে যেভাবে দেশবাসীকে সরকারের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন, তাতে দলের অনেকেই মনে করেছিলেন, নাটকীয় কিছু ঘটবে৷ শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি৷
বরং তিনি যেভাবে জ্যেষ্ঠ নেতাদের অভিযুক্ত ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন, তাতে অনেকেই হতাশ৷ ক্ষমতায় থাকতে যেমন দলের ভেতরে তারেক একটি কোটারি গড়ে তুলেছিলেন, এখনো সেই ধারা বহাল রেখেছেন৷ দলের যেসব জ্যেষ্ঠ নেতা কিছুটা উদার মনোভাব পোষণ করেন, তাঁদের কোণঠাসা করে রাখতে সব সময় সচেষ্ট থাকেন এই তরুণ নেতা৷ তাঁদের মতে, তারেকের উগ্র চিন্তাভাবনা জনগণ থেকে দলকে আরও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে৷ অনেকের মনেই প্রশ্ন: তারেক রহমান বিএনপির ভরসা, না দলের জন্য বোঝা হয়ে দঁাড়িয়েছেন?
বিএনপির নেতারা ফের সংলাপ নিয়ে কথাবার্তা শুরু করেছেন৷ কয়েকদিন আগে খালেদা জিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি দলক জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী নির্বাচন নিয়ে তাঁরা সরকারের সঙ্গে আগ্রহী৷ আমরাও মনে করি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার বিকল্প নেই৷ কিন্তু সেই আলোচনাটি কীভাবে হবে?
সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে বিষয়টি তুলে ধরতেই তিনি বললেন, বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় তারেক রহমানই প্রধান বাধা৷ কীভাবে— তাকে জিজ্ঞেস করি৷ জবাবে তিনি বললেন, যে দল ১৯৭২ সালে গঠিত বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অবৈধ মনে করে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয় কী করে? বিএনপি নেতারা কী বলেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

বাইরে ঠিকঠাক ভেতরটা ফাঁপা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

একটি ছোট খবরে চোখ পড়ল। দেশ ছাড়ছেন উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবী তরুণেরা। গত পাঁচ বছরে এক হাজার ৫৮৩ জন বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে ২০১২-১৩ অর্থবছরেই ত্যাগ করেছেন ২৯৯ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত বিশেষ করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও আইটি দক্ষতাসম্পন্ন বাংলাদেশিরা দেশ ত্যাগ করছেন। নাগরিকত্ব ত্যাগের হার দিন দিন বাড়ছে। [বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ জুন]
একজন মানুষের কাছে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় দু-তিনটি জিনিসের একটি তাঁর জন্মভূমি। অতীতের বাঙালি মনীষীরা বলেছেন: জননী জন্ম ভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। মা ও মাতৃভূমির মর্যাদা স্বর্গের চেয়েও বেশি। সেই জন্মভূমি যখন কেউ চিরদিনের জন্য ছেড়ে যান, তখন তিনি সুখের হাতছানিতেই যে যান তা-ই নয়—গভীরতর দুঃখ ও হতাশা থেকেই যান।

অনেক দিন আগে আমি এক হতভাগিনী মাকে তাঁর এক সন্তান বিক্রি করতে দেখেছিলাম। কিছু টাকার বিনিময়ে—ছেলে খেয়ে-পরে ভালো থাকবে, এই আশায়—এক অবস্থাপন্ন নিঃসন্তানের কাছে তিনি ছেলেকে বিক্রি করেছিলেন। মা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে নৌকায় তুলে দেন। নৌকা কিছু দূর মাঝনদীতে যেতেই মা হঠাৎ চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন। তাঁকে আমরা সান্ত্বনা দিয়ে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিই। আজ যে প্রায় ষোলো শ মানুষ তাঁদের মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে গেছেন, বাংলা মায়ের যদি ওই দুঃখিনী মায়ের মতো মুখ ও ভাষা থাকত, তাঁদের বিমান আকাশে উড়াল দেওয়ার পরই আর্তনাদ করে উঠত।
ওই প্রতিবেদনে আরও জানা গেছে, বহু বছর ধরে যাঁরা বাংলাদেশে চাকরি করছেন বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং এ দেশেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান, এমন ৩৯ জনকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে গত পাঁচ বছরে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ ও এশিয়ার টাইগার হওয়ার আশায় রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। নাগরিকত্ব ত্যাগ ও প্রদানসংক্রান্ত ফি হিসেবে গত পাঁচ বছরে দুই কোটি ৯৭ লাখ ৪৬ হাজার ৮৫০ টাকা রাজস্ব আয় করেছে। প্রায় ষোলো শ যাওয়াতেই যখন এত আয়, লাখ পঞ্চাশেক বাদে বাংলাদেশ থেকে যদি ১৬ কোটি মানুষ নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয় , তাহলে এই খাত থেকে যে রাজস্ব পাওয়া যাবে তাতে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। তখন একটি নয়, ১০টি পদ্মা সেতুও নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, নাগরিকত্ব ত্যাগের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। যাঁরা গেছেন এবং যাঁরা যাবেন—হতে পারেন তাঁরা স্বার্থপর। তাঁরা তাঁদের নিজেদের এবং তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু যে সাড়ে ১৬ কোটি নাগরিক জন্মভূমি ত্যাগ করেননি এবং করবেন না, তাঁদের উপায় কী? আড়াই লাখ কোটি টাকার মস্তবড় একখানা বাজেট কি একটি দেশের জনগণকে সুখ, শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারে? মাথাপিছু আয় বাড়াই কি একটি দেশের চরম প্রাপ্তি? গ্রস ডোমেস্টিক হ্যাপিনেসের ওপরে আর কী আছে? গ্রস ডোমেস্টিক হ্যাপিনেসের বিপরীতে হলো গ্রস ডোমেস্টিক আনহ্যাপিনেস—সমষ্টিগত জাতীয় অশান্তি।
যাঁরা দেশ ত্যাগ করেছেন, তাঁরা ভেবে দেখেছেন এ দেশে থাকলে তাঁদের সন্তানদের মেধার কোনো মূল্যায়ন হবে না। যাদের ফেল করার কথা তারাও পাবে জিপিএ–৫; তার সন্তান গোল্ডেন জিপিএ–৫ পাওয়ার উপযুক্ত, সে পাবে কোনোরকমে জিপিএ–৫। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর ছেলেমেয়ে ৭৭ ভাগ নম্বর পেয়ে ভালো বিষয়ে ভর্তি হতে পারবে না। ৪৪ বছর আগের কোনো কৃতীর নাতি-নাতনি অথবা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক-কর্মচারীর অমেধাবী পোষ্য ৪২ ভাগ নম্বর পেয়ে বাগিয়ে নেবে একটি ভালো বিষয়। এমন সামাজিক অবস্থায় কেন কেউ দেশ ছাড়বে না? খুব বেশি রকম শারীরিক প্রতিবন্ধী ছাড়া আর যে কারও ক্ষেত্রে কোটার সুবিধা দেওয়া সংবিধান ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
পরীক্ষায় ভালো করে পাস করলেই যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে, সে নিশ্চয়তা নেই। চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের সন্তানসন্ততি, আত্মীয়স্বজন এবং দলীয় ক্যাডাররা পাবে অগ্রাধিকার। তাদের যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক। ক্ষমতাসীনদের পদলেহনকারী না হলে পদোন্নতির সম্ভাবনা নেই। তার নিচের লোকটি তরতর করে ওপরে উঠে যাবে, তাকে বহন করতে হবে তার ব্যাগ।
অপমানের চেয়ে বড় শাস্তি আর হয় না। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে অপমান করা। কত কর্মকর্তা, কত হেডমাস্টার, অধ্যক্ষ, উপাচার্য যে লাঞ্ছিত হয়েছেন যুবনেতা বা ছাত্রনেতাদের হাতে! ছাত্রের ঘুষিতে কতজন খুইয়েছেন তাঁদের দাঁত। ছাত্রনেতার পদাঘাতে কারও পাঁজরের হাড় চূর্ণ হয়েছে। কত সম্মানিতকে তাঁর অফিসকক্ষে তালা দিয়ে না-খাইয়ে রাখা হয়েছে কত দিন ও কত রাত। তবে এসব অসদাচরণ ও অপরাধ তো নস্যি। শুধু দিনদুপুরে কেউ নিহত হলে সাময়িক বহিষ্কার অথবা অতি অল্প সময়ের জন্য লোক দেখানো গ্রেপ্তার।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুষ, দুর্নীতির দায়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা জেল খাটেন। ইসরায়েল হোক, ইতালি হোক, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া হোক, রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদেরও মাফ নেই। উচ্চশিক্ষার ডিগ্রির তথ্য নিয়ে সামান্য কারচুপিতে এক প্রধানমন্ত্রীর সাজা হয়েছে পূর্ব ইউরোপে কিছুদিন আগে। বাংলাদেশে যে ঘুষ-দুর্নীতি আছে তার কোনো প্রমাণ নেই। সরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের চেয়ার-টেবিলের যদি প্রাণ থাকত, তারা বিদ্রোহ করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেত চুরির মাত্রা দেখে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি ইটে দুর্নীতির চিহ্ন। কিন্তু কতজন মন্ত্রী, সাংসদ, পদস্থ কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান আজ জেল খাটছেন? আজ যদি ৭১ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা জেলের ভাত খেতেন, একাত্তরের শহীদদের আত্মা শান্তি পেত। মাঝেমধ্যে ভিন্নমতাবলম্বী সাবেক মন্ত্রী বা আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়, তদন্ত শুরু হয়ে শেষ হয় না, হলেও গোঁজামিল দেওয়া হয়, কোমরে দড়ি পড়ে না কারও। যত বড় দুর্নীতিই হোক বা অপরাধ হোক, যদি ব্যক্তিটি কোনো চেতনাপন্থী হন বা কোনো প্রয়াত নেতার আদর্শের সৈনিক হন, তাঁর বিচার করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। অপরাধীর পাশে থাকে রাষ্ট্র।
বিদেিশদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদক দেওয়া হলো। অতি ভালো কাজ। তাঁদের মেডেলে সোনার বদলে তামা, পিতল, দস্তা, কাঁসা কি সব দেওয়া হলো। কোটি কোটি টাকা চুরি। সেই চুরি যাঁরা ধরলেন, গালাগাল খাচ্ছেন তাঁরা। যেন দেশদ্রোহিতামূলক কাজ করেছেন। অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা। কত ফিকির চলছে। অথচ এই হাতেনাতে ধরা অপকর্মটিতে অপরাধীদের শাস্তি দিতে রাষ্ট্রের সাত কর্মদিবসের বেশি লাগার কথা নয়।
একাত্তর—যা একদিন ছিল আমাদের কাছে একটি চেতনার নাম, আজ তা একশ্রেণির কপটের কাছে বিশাল পুঁজি। কোনো দেশে যখন কোনো মুক্তিসংগ্রাম হয়, তা হয় সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ম্ভর হওয়ার জন্য। আরও বেশি আর্থসামাজিকভাবে সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য। ক্ষমতাসীন ও তাদের অনুগ্রহভাজনদের বিরামহীন ও সীমাহীন লুটপাটের জন্য নয়।
মনে আছে, একাত্তরের সেপ্টেম্বরে একটি গ্রামের হাটে গ্যান্ডারি কিনে আমরা কয়েকজন চিবোচ্ছিলাম। ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী বললেন, আমাদের দেশের ইন্ডিয়ান ভ্যারাইটি আখ উন্নতমানের। এর রসে শর্করার পরিমাণ বেশি। প্রতি ১০ টন ইক্ষুতে এক টন চিনি হয়। দেশ স্বাধীন হলে আমরা চিনিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব। রপ্তানিও করতে পারব। দানা বাঁধে না যে গুড়ের অংশ তা থেকে হবে অ্যালকোহল। তাও রপ্তানি করতে পারব। ক্যাপ্টেন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের অল্প আগে কুষ্টিয়ার একটি চিনিকলের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। এই শিল্প সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল। আখের ছোবড়া থেকে কাগজ হতে পারে।
আমার আরও মনে পড়ে, সেদিন তিনি বলছিলেন স্বাধীন হলে বাংলাদেশ নিউজপ্রিন্ট ও সাধারণ ব্যবহারের কাগজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। এমনকি আমরা পশ্চিমবঙ্গে নিউজপ্রিন্ট রপ্তানি করতে পারব। সেখানে নিউজপ্রিন্টের ঘাটতি আছে। স্বাধীনতার পরে পাটকল গেছে, বস্ত্রকল গেছে, কাগজকল গেছে, চিনিকলের উৎপাদিত চিনি মিলের গুদামে পড়ে থাকে। শত শত কোটি টাকার এলসি খুলে ব্রাজিল থেকে বা অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে চিনি। একাত্তরের শহীদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দেবে না তো কাকে অভিসম্পাত করবে?
সত্তরের দশকে নয়া সাম্রাজ্যবাদীরা নতুন স্বাধীন দেশগুলোতে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক জেনারেলদের ক্ষমতায় বসাত। একুশ শতকে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। তারা কৌশল বদলেছে। এখন কারচুপি অথবা ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানো হয়। তাতে গণতন্ত্রের একটা গন্ধ (দুর্গন্ধ বটে) থাকে। নামকাওয়াস্তে একটা পার্লামেন্ট থাকে। সেই সংসদের সদস্যদের দেওয়া হয় সীমাহীন সুযোগসুবিধা শুধু নয়, দুর্নীতি করার অপার সুযোগ। এই ধরনের সাক্ষীগোপাল সরকার ও সংসদের মাধ্যমে দেশের কয়লা, গ্যাস প্রভৃতি খনিজ সম্পদ, বন্দর ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। কোন দেশে কে ক্ষমতায় রইলেন না রইলেন, তাঁরা জনসমর্থিত কি না—তা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। স্বার্থসিদ্ধি যাঁকে দিয়ে হবে, তাঁকেই ক্ষমতায় রাখা হবে।
যেসব রাষ্ট্র মহাজিন কারবার করে উন্নয়নশীল দেশে সুদে টাকা খাটায়, সেসব দেশের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র-টনতন্ত্র কোনো ব্যাপার নয়। তারা দেখতে চায় কোনো রকম একটি সরকার। সে সরকার জনপ্রিয় না জনবিচ্ছিন্ন, গণতান্ত্রিক না স্বৈরাচারী—তা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। কোন দেশে প্রতি আড়াই ঘণ্টায় একজন রাজনৈতিক কোন্দলে খুন হয়, সেটা সে দেশের ব্যাপার। মহাজনি দেশগুলো ঋণচুক্তি করে দেশের সঙ্গে—সরকারি দল বা জোটের সঙ্গে নয়। রাষ্ট্রকে কঠিন চুক্তির মাধ্যমে ঋণ দিলে টাকাটা মারা যাবে না, কারণ, কোনো দেশই মালয়েশিয়ার বিমানের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না।
গত ৪৩ বছরে মহাজনি দেশগুলো বাংলাদেশকে যেসব ঋণ দিয়েছে, তা কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোটকে দেয়নি। দেশকে দিয়েছে। সুদে-আসলে সে টাকা তুলেও নিয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ১৪ দলীয় মহাজোট বা ১৮-১৯-২০ দলীয় কোনো জোটকে চীন-জাপান একটি পয়সাও হাওলাত দেবে না, কারণ, তারা জানে ওই টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। কিন্তু সরকার যদি চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের বা শফিউল আলম প্রধান বা জুনায়েদ বাবুনগরী বা মাইজভান্ডারীরও হয়, তার সঙ্গে চুক্তি করতে মহাজনি দেশের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। বরং অজনপ্রিয় সরকারকে দিয়ে তারা এমন কিছু কাজ করিয়ে নেয়, যা কোনো শক্ত গণতান্ত্রিক সরকারকে দিয়ে সম্ভব নয়।
অনেক দেশকেই কোনো কোনো সময় বাইরে থেকে দেখে মনে হয় সব ঠিকঠাক আছে, স্থিতিশীল। কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম নেই; রাস্তায় বিরোধী দলের অফিসের বিড়ালটিও বেরোতে পারে না। আসলে সেটা ভুল। যখন ভেতর থেকে দেশটা ফাঁপা হয়ে যায়, অন্তরাত্মা বলে কিছুই থাকে না, তখন শুভশক্তি হোক বা অপশক্তি হোক, শূন্যতার মধ্যেই একটা কিছু তৈরি হতে থাকে। শিগগির হোক, দেরিতে হোক, সেই শক্তি আত্মপ্রকাশ করবেই। তখন সবচেয়ে বিপন্ন হন অব্যবহিত আগের সরকারের লোকেরা। উনসত্তরে আমি কালো শেরওয়ানি পরে খালি গায়ে খেতের আল দিয়ে দৌড়াতে দেখেছি লীগের এক নেতাকে। বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্যায় অতিক্রম করছে। এই পর্যায়টির সমাপ্তি শান্তিপূর্ণভাবে ঘটুক, সেটাই আশা করে সাধারণ মানুষ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

ব্রাজিল, বান্ধবী এবং ম্যারাডোনা

ফুটবলের নন্দিত-তর্কিত মহানায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা। তিনি এখন ব্রাজিলেই আছেন। খেলার মাঠে না থেকেও তাকে ঘিরে বিশ্বময় আকর্ষণ দুর্নিবার। ব্রাজিল তার ফেভারিট। তবে একেবারেই ষোলো আনা বিশ্বাসী নন। আবার বান্ধবীকে নিয়েও অশান্তিতে আছেন। এবারের বিশ্বকাপ জুড়ে ভেনিজুয়েলার একটি টিভি টকশোর উপস্থাপক হিসেবে দেখা যাবে তাকে। কিন্তু ফুটবল বাদ দিয়ে এ মুহূর্তে হুলুস্থূল বাঁধিয়েছেন অন্য কারণে। তিনি তার ২৩ বছর বয়সী বান্ধবীকে চুরির দায়ে পুলিশে ধরিয়ে দিতে চান। গত ফেব্রুয়ারিতে দিয়েগো ম্যারাডোনা একটি টিভি অনুষ্ঠানের জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময় তাকে অবশ্য ‘নিরপেক্ষ’ দেখা যায়নি। তিনি টেলিসুর নামের ভেনিজুয়েলা সরকারের একটি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে বিশ্বকাপের বাসর কাটাতে চুক্তিবদ্ধ। হুগো শাভেজের শিষ্য নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বাধীন সরকার এখন ভেনিজুয়েলা শাসন করছেন। ম্যারাডোনা বলেন, আমি ভেনিজুয়েলায় বিশ্বাস করি। তার কণ্ঠে ভেনিজুয়েলার জয়গান এতটাই প্রকাশ পেয়েছে যে, ওই টিভি কোম্পানি মোহিত।

গত ৯ই জুন থেকে ‘জুর্দা থেকে’ নামের প্রোগ্রাম সম্প্রচার শুরু হয়। রিওডি জেনেরোর ইন্টারন্যাশনাল ব্রডকাস্ট সেন্টার থেকে ভেনিজুয়েলায় সরাসরি লাইভ দেখানো হবে। সরকারি টেলিভিশন প্রতিদিন ২২ থেকে ২৩ ঘণ্টা টানা সম্প্রচার করবে আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনা এতে বলেন, ‘আমার প্রার্থী ব্রাজিল। তবে সেটা এটা মনে রেখে যে, প্রার্থীরা সব সময় পতন ডেকে আনে।’  ম্যারাডোনা ওই অনুষ্ঠানের প্রথম কয়েক মিনিট আধা কৌতুক, আধা সিরিয়াস মেজাজে দর্শক শ্রোতাদের উদ্দেশে একথা বলেন। তার সঙ্গে এই অনুষ্ঠানে তার যুগল হিসাবে যাকে দেখা যাবে তিনি উরুগুয়ের ব্রডকাস্টার ভিক্টর হুগো মোরালেস। ১৯৮১ সাল থেকে আর্জেন্টিনায় বসবাসরত মোরালেস ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবল ভাষ্যকারীদের অন্যতম। তার ধারাবিবরণীর  বিখ্যাত গল্প হচ্ছে ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোলটি। আর ম্যারাডোনার ভাষ্যে ফুটবল, রাজনীতি, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ আর পুরনো গল্প বলা প্রত্যাশিত।
ফিফা বিশ্বকাপ থেকে চার বিলিয়ন ডলার নিয়েছে। ম্যারাডোনা কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবল ‘কেলেঙ্কারি’র জন্য ফিফার সভাপতি যোশেপ ব্লাটারের সমালোচনায় উচ্চকিত। ওই টিভি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আপনি ব্লাটার সাহেব মাইক্রোসফটের মালিক বিল গেটসের মতো ধনী হচ্ছেন অথচ আপনি কোন কাজই করছেন না।
আশা করা হচ্ছে যে, ম্যারাডোনা যে টকশোটি উপস্থাপনা করবেন, তাতে রাজনৈতিক ঝাঁঝ তীব্রই হবে। অনুষ্ঠানের নামকরণ থেকেই বুঝা যায়। ‘ফ্রম জুর্দা’ কথাটির মানে হলো ‘বাঁ-হাতি’। এই সাবেক ফুটবল তারকা মহানায়কের বামপন্থা হচ্ছে আদর্শ। ম্যারাডোনা টিভি টকশোর প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার কমান্ডারের উদ্দেশ্যে চুমু পাঠান। তার এই কমান্ডার কিউবার বিশ্বখ্যাত নেতা ফিদেল কাস্ট্রো।
‘আমি কিউবায় বিশ্বকাপ দেখাবো।’ ম্যারাডোনার উচ্চারণ। এটা লক্ষণীয় যে, ম্যারাডোনা ও মোরালেস উভয়ে গত সোমবার বিশ্বকাপে কিউবার একমাত্র বিজয়ের বার্ষিকী স্মরণ করেছেন। কিউবার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব বিশ্ববাসী ভুলতে বসেছে। পারতপক্ষে এ কথা কেউ স্মরণ করে না। ১৯৩৮ সালে রোমানিয়ার বিরুদ্ধে কিউবা ২-১ গোলে বিশ্বকাপ জিতেছিল। অবশ্য এবারে বিশ্বকাপ এলেও কিউবা নেই।
ম্যারাডোনা নিজের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯০ সালের প্রতিযোগিতায় তিনি ইটালিতে এসেছিলেন, পায়ের আঙুলে ক্ষত নিয়ে। আর খেলতে এসে হাতের আঙুলের জখম পেয়েছিলেন। আর এরকমের পরিস্থিতিতে কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি ব্রাজিলের মুখোমুখি হন এবং তার জাতীয় দলকে বিজয়ের শিরোপা এনে দেন। ১৯৮২ সালের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ওই বছরটিতে আমি বাজপাখি ধরাশায়ী করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হই। আর তাতে প্রচুর হৈচৈ ঘটে। তিনি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ঈশ্বরের হাত প্রসঙ্গ না তুলেও স্মরণ করেন যে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় পেতে তাকে কত বেগ পেতে হয়েছে।
ম্যারাডোনা মনে করেন চলতি বছরের বিশ্বকাপের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ফিফা। ম্যারাডোনার কথায় ‘আমার কোন সন্দেহ নেই যে, ব্রাজিল একটি মহান বিশ্বকাপের জন্ম দেবে। কিন্তু ফিফার লোকজনদের যেন আমরা ভুলে না যাই। তাদের ক্ষমতার কত খায়েশ। ক্ষমতা কত কুৎসিত! অপ্রিয় সত্য হচ্ছে তাদের জন্য বিশ্বের কোন শ্রদ্ধা নেই। দিলমা নামটি নিয়ে আমি আনন্দ প্রকাশ করি ঠিকই। কিন্তু এই খেলাকে কেন্দ্র করে কিছু বাজে লোক জড়ো হয়েছে।’
টিভি টকশোতে এটাই ম্যারাডোনার প্রথম অভিজ্ঞতা নয়। স্পেনের ফোর স্ট্রিং টিভির জন্য ২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ভাষ্যকার হয়েছিলেন। এক বছর আগেই ‘দ্য নাইট অব ট্রেন’ নামে একটি আর্জেন্টিনীয় টিভি ধারাবাহিকে যুগ্ম উপস্থাপকের ভূমিকায় ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি পেলে, মাইক টাইসন ও ফিদেল কাস্ট্রো’র সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।
বান্ধবী সমাচার: ডেইলি মেইল খবর দিয়েছে, দিয়েগো ম্যারাডোনা ইন্টারপোলের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি তার সাবেক গার্লফ্রেন্ড, তার ভাষায়, যাকে তিনি তার দুবাইয়ের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন সে স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে নিয়ে গেছে।
ম্যারাডোনা দুবাইয়ের আদালতেও বান্ধবী রসিও অলিভারের ডিটেনশন চেয়েছেন। ৫৩ বছর বয়স্ক ম্যারাডোনা ২৩ বছরের রসিও’র সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন এ বছর গোড়ায়। এর আগে তারা স্পেনের গোলরক্ষক ডেভিড ডি গিয়ার সঙ্গে বিরোধ পাকিয়েছিলেন। ম্যারাডোনা এখন ব্রাজিলে রয়েছেন। তিনি দুবাইয়ের একটি আদালতে এর প্রতিকার চেয়েছেন।
ম্যারাডোনার নতুন ঠিকানা হলো দুবাই। ম্যারাডোনা চান, রসিওকে উপসাগরীয় দেশে এনে  জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। ম্যারাডোনার অভিযোগ, তার সাবেক বান্ধবী তার হাতঘড়ি এবং আড়াই লাখ পাউন্ডের বেশি দামের স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে গেছে।
পরশু রাতে একটি আর্জেন্টেনীয় টিভিকে ম্যারাডোনা বলেছেন, তিনি ইতিপূর্বে শর্ত দিয়েছিলেন যে, রসিও তাকে একটি চুমু খাবেন এবং কি ঘটেছিল তা আর্জেন্টিনা টিভিতে খুলে বলবেন। কিন্তু তা সে করেনি।
ম্যারাডোনা বলেন, আমি তিন মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করেছি, আশা করেছি সে এগুলো ফেরত দেয় কিনা এবং গল্পটা পরিবর্তন করে কিনা। কিন্তু সে এটা করেনি। তাই ইন্টারপোলের কাছে তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ চেয়ে দরখাস্ত করেছি। ম্যারাডোনা বলেন, দুবাইয়ের বিচার ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠিন। সত্য বটে তারা আপনার হাত কেটে দেয়, আপনি যদি চুরি করা জিনিস ফেরত না দেন, তাহলে আপনার দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল হয়ে যেতে পারে। আমি দুবাইয়ের আইন এখানে আনতে চাই না। আমি কাউকে সর্বস্বান্ত করতে চাই না। আমি কোন ভুল করিনি। এবং আমি আশা করি যে, ন্যায় বিচার পাবো।
১০ই জুন লন্ডনের দি মেইল লিখেছে, ম্যারাডোনা বর্তমানে ভাষ্য দেয়ার কাজে ব্রাজিলে অবস্থান করছেন। কিন্তু তিনি ভুলভাবে নারী ফুটবল খেলোয়াড় রসিওকে অভিযুক্ত করেন। অভিযোগ হলো, গত ফেব্রুয়ারিতে দুবাইয়ে শীতকালীন প্রশিক্ষণ চলাকালে গোলরক্ষক ডেভিড ডি গিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।
ম্যারাডোনা রসিও’র সঙ্গে ডেটিং শুরু করেছিলেন যখন ৩৭ বছর বয়সী ওজেদার সঙ্গে রসিও’র ছাড়াছাড়ি হয়েছিল। পেটে সাড়ে চার মাসের বাচ্চা নিয়ে ওজেদার সঙ্গে রসিও’র সম্পর্ক ভেঙে যায়। তবে রসিও’র সঙ্গে ম্যারাডোনার সম্পর্ক অশান্তই ছিল। আর্জেন্টিনাগামী একটি বিমানে রসিও’র সঙ্গে তীব্র বাকবিত-ায় লিপ্ত হতে দেখেছিলেন বিমানের যাত্রীরা। একজন রাজনীতিকের স্ত্রী এবং এয়ার হোস্টেস দু’জনকে শান্ত করতে উদ্যোগ পর্যন্ত নিয়েছিলেন। কারণ, তারা দেখতে পান যে, ম্যারাডোনা তার নাক দিয়ে রসিওকে গুঁতো মারছিলেন। রসিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোন মন্তব্য করেননি এবং তিনি দাবি করেছেন, তিনি কোন ভুল করেননি।

ঝাঁঝালো গ্যাসে বিশ্বকাপের বিবর্ণ সূচনা

দুনিয়াজুড়ে যখন সাম্বার তালে তাল মেলানোর অপেক্ষা, ঠিক তখনই ব্রাজিলের সাও পাওলোতে ঘটে গেছে এক অঘটন। পুলিশের ছোড়া ঝাঁঝালো গ্যাসে অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেল বিশ্বকাপের জৌলুস। বিশ্বকাপ আয়োজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভে কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে পুলিশ। এ সময় সাও পাওলোতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যে এরিনা করিন্থিয়াস স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধন হয় তার কাছেই এমন অবস্থায় সৃষ্টি হয় এক ভীতিকর পরিস্থিতি। কাঁদানে গ্যাসে রাস্তা অন্ধকার হয়ে যায়। সিএনএন-এর এক সাংবাদিককে দেখা যায়, আহত হয়েও সরাসরি সংবাদ দিচ্ছেন। ওই শহরে সমবেত বিদেশী দর্শক, পর্যটকদের মধ্যে এ সময় ছড়িয়ে পড়ে ভীতি। বিশ্বকাপ উদ্বোধন ও উদ্বোধনী ম্যাচের আগে এমন পরিস্থিতিতে এবারের বিশ্বকাপের গায়ে লাগলো এক কলঙ্ক।

এরিনা করিন্থিয়াস স্টেডিয়ামেই গত রাতে স্বাগতিক ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে হয় উদ্বোধনী ম্যাচ। কিন্তু তার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই বিশ্বকাপের প্রতিবাদে ওই স্টেডিয়ামের কাছে বিক্ষোভ করে বেশ কিছু মানুষ। তারা এ সময় বিশ্বকাপ বিরোধী স্লোগান দেয়। তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে একজনকে। ভেঙে গেছে এক সাংবাদিকের পা। তবে বিক্ষোভকারীরা বলেছে, বিক্ষোভ চলতেই থাকবে। শহরে শহরে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে তা। তাদের কথায়, ব্রাজিলে এখনও কয়েক লাখ নারীকে দেহ বিক্রি করে বাঁচতে হয়। তার সন্তানের দুধ কিনতে হয়। নিজেকে টিকে থাকতে দেহ দান করতে হয় অজানা পুরুষের কাছে। বিশ্বকাপের দর্শকদের জন্য তারা বাড়তি আয়ের জন্য মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার ইজ্জত, তা ফেরি করে বেড়াচ্ছে। এছাড়া রয়েছে দুর্নীতি চরমে। এমন একটি দেশে এত বিপুল অর্থ খরচ করে বিশ্বকাপ আয়োজনের কি অর্থ থাকতে পারে! বিশ্বকাপ আয়োজনে শুধু ব্রাজিলই খরচ করছে ১১৭০ কোটি ডলার। এ অর্থে স্টেডিয়াম নির্মাণ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এই অর্থের বেশির ভাগই লোপাট করেছেন রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তারা। শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে নির্মাণ করা হয় স্টেডিয়াম, রাস্তাঘাট। গত সপ্তাহেও এমন নির্মাণ কাজ করা হয়। এতে এর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এরই প্রতিবাদে গতকাল যে করিন্থিয়াস স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ম্যাচ হওয়ার কথা তার কাছাকাছি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তারা। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। লাঠিপেটা করে। টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে পুলিশ। একপর্যায়ে তারা এলোপাতাড়ি কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। গতকাল সারাবিশ্ব যখন জমকালো উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখার অপেক্ষায় ঠিক তখনই এমন খবরে হতবিহ্বল হয়ে যান তারা। অনেকেরই মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ভাবতে বসে যান, এ অবস্থায় সেখানে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ম্যাচ হবে তো! গতকাল ঘটনাস্থল থেকে সিএনএন-এর সাংবাদিক সাস্তা ডারলিংটন জানান, এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আহত হয়েছেন তিনি ও প্রযোজক বারবারা আরভানিতিডিস। তারা মনে করছেন বারবারার পা ভেঙে গেছে। সাস্তা বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের কোনমতেই স্টেডিয়ামের ধারেকাছে ঘেষতে দেয়া হয়নি। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘দেয়ার ওন্ট বি এ কাপ’ অর্থাৎ এখানে কোন বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা হতে পারে না বলে স্লোগান দেয়। আগে থেকেই এমন বিক্ষোভের পরিকল্পনা নিয়েছিল তারা। গত বছর ৫ লাখেরও বেশি মানুষ দেশজুড়ে বিক্ষোভ করেছে। তারা উন্নত সরকারি সুবিধার দাবি তুলেছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যে দুর্নীতি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছে। তখন তাদের কথায়, এমন বিশ্বকাপ আয়োজন করে কি লাভ। তারপর থেকেই ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরে হয়েছে বিক্ষোভ। এর মধ্যে কোন কোনটিতে হয়েছে সংঘর্ষ।
বর্ণিল উদ্বোধন
নাচে-গানে ভরপুর, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বর্ণিল উপস্থাপনা। বিশ্বসেরা পপ গায়িকা জেনিফার লোপেজের নয়ন-মনোহরী গানে উন্মাতাল মাঠের প্রায় ৭০০০০ দর্শক। সাও পাওলোর করিন্থিয়ান্স এরেনায় ১২টি দেশের প্রধান ও জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও ছিলেন অপলক। সুরের মূর্ছনায় বিমোহিত আবালবৃদ্ধবণিতা। লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ওলে ওলা। যার অর্থ আমরা সবাই সমান। জেনিফার লোপেজের সঙ্গে এই মহা-আয়োজনে পারফর্ম করেন আরেক জগৎখ্যাত র‌্যাপার পিটবুল। বাদ্যযন্ত্রে ছিল ব্রাজিলের ‘ওলোদাম’। তাদের একদিকে বিক্ষোভ আরেক দিকে বিশ্বকাপ ফুটবল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দেড় ঘণ্টা বাদেই স্বাগতিক ব্রাজিল তাদের হেক্সা মিশনে প্রথম মাঠে নামে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে।
গতকাল স্থানীয় সময় বিকাল সোয়া তিনটায় জমকালো আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পর্দা ওঠে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের। ৭ বছরের প্রস্তুতির পর আরাধনার এই ফুটবলোৎসব। অবাক বিস্ময়ে কোটি কোটি দর্শক। সময় মাত্র ২৫ মিনিট। মন ভরে তো চোখ ভরে না। কয়েক শ’ নৃত্যশিল্পী, বাদক, জিমন্যাস্ট অংশ নেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ব্রাজিলিয়ান গায়িকা ক্লদিয়া লিত্তেও গান পরিবেশন করেন। বেলজিয়ান শিল্প নির্দেশক ডাফিন করনাজ পুরো অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন। ৬ শতাধিক পারফরমার ব্রাজিলের কৃষ্টি-কালচার, ফুটবল প্রকৃতি সব ফুটিয়ে তোলেন নিখুঁতভাবে। মোট ১২০০ জন জড়িত ছিলেন এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে। জানা গেছে, প্রতি মিনিটের পারফরমেন্স নিখুঁত করার জন্য অন্তত ২০ কর্মঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছে। এত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় মহড়াতে যে পারফরমারদের মোবাইল ফোনও নিতে দেয়া হয়নি।
এর আগে গত রোববার খবর বেরোয় জেনিফার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসছেন না। গুঞ্জন ছড়ায় বয়ফ্রেন্ড ও ব্যাকআপ ড্যান্সার ক্যাসপার স্মার্টের সঙ্গে বিরোধের জেরে মন খারাপ লোপেজের। ফিফাও প্রচার করে নিজের প্রোডাকশন নিয়ে ব্যস্ততার কারণে তিনি আসতে পারবেন না। কিন্তু দু’দিন পরেই অবস্থান বদল। লোপেজ এমন বিশ্বমঞ্চ উপেক্ষা করতে পারছেন না। তিনি আসবেন এবং গাইবেন। কারণ তার গানটি এতটা জনপ্রিয়তা পাবে ভাবতে পারেননি। বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৭৫ মিলিয়ন বার ইউটিউবে দর্শক এটি দেখেছেন। যদিও অনেকে বলেন যে, ১৯৯৮ সালে রিকি মার্টিনের কাপ অব লাইফ এবং শাকিরার ওয়াকা ওয়াকা এরচেয়ে অনেক ভাল ও বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এক বার্তায় লোপেজ বলেন, ভক্তদের আমি হতাশ করতে চাই না। আমার জন্ম এমন এক পরিবারে যেখানে সবাই ফুটবল ভালবাসে। সুতরাং এমন আসরে থাকার সুযোগ হারাতে চাই না। আমি এই সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত গর্বিত ও অধীর হয়ে আছি। বিশ্বজুড়ে এ এক অসাধারণ উৎসব।

এভাবে চলতে থাকলে দেশ হবে অগ্নিগর্ভ: ড. আকবর আলি খান

দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট গণবিস্ফোরণের সৃষ্টি করতে পারে এমন ইঙ্গিত দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, বর্তমানে যে অবস্থা, এ অবস্থাতে স্বস্তির কোন কারণ নেই। গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি কখনও বাংলাদেশের জনগণ গ্রহণ করেনি। অদূর ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত করার চেষ্টা করা না হয়, তাহলে বাংলাদেশে অগ্নিগর্ভ সৃষ্টি হতে পারে। সেটা আজকে হবে না কালকে হবে জানি না। কিন্তু এটা এক সময় হবেই। গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পরিস্থিতি: কিছু ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। জনগণের মতামতের ওপর ভিত্তি করে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা অনেক জটিল। এ সঙ্কটের কোন সমাধান নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গিয়েছে এবং এ নির্বাচনকে সকলের নিকট কিভাবে গ্রহণযোগ্য করা যায় সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের সংবিধানে দুর্বলতা রয়েছে, গলদ রয়েছে আমাদের শাসনব্যবস্থায়। রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করা যেতে পারে সংবিধানে ‘রেফারেন্ডাম’ ও ‘রিকল’ পদ্ধতির ব্যবস্থা করে। এ পদ্ধতির প্রবর্তন বিরোধী দলকে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি পরিহারে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।  আরেকটি নির্বাচনের মাধ্যমে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবেই- তা নিশ্চিত নয়। যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলই প্রভাব খাটায়। তাই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। গণভোটের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এছাড়া কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেও তাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা জনগণকে দিতে হবে। তিনি বলেন, আজকে বাংলাদেশের রাজনীতি হালুয়া-রুটির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এখানে কোন আদর্শবাদী লোকজন যান না। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক দলে যেমন পরিবর্তন হয়, আমাদের দেশে সেরকম পরিবর্তনের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। আমাদের দেশের আদর্শবাদী লোকেরা রাজনীতি থেকে অনেক দূরে থাকেন। গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান। প্রবন্ধে তিনি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনভাবে সত্য কথা বলা একটি ভীষণ ঝুঁকির কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি বা অপরাধ উন্মোচন অথবা ভিন্নমতাবলম্বীর কথা বলার কারণে মিডিয়া বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের হুমকি বা হয়রানির বিভিন্ন ঘটনাও আমরা লক্ষ্য করছি। আমাদের যদি স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার না থাকে তাহলে দেশের গণতন্ত্রের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বৈকি। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশের শাসনব্যবস্থায় নাকি সরকার অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। এই ‘সরকার অব্যাহত রাখার’ কথাটি কিন্তু উদ্বেগজনক। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য নীতি কাঠামোর ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষ করে যেসব নীতি সুফল বয়ে আনে, তবে আমাদের মনে রাখতে হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই ভোটের মাধ্যমে ঠিক করবে তারা কোন সরকারকে অব্যাহত রাখবে না পরিবর্তিত করবে। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গুণগত উন্নতি সাধনে একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। যদিও সকল দলের গঠনতন্ত্রে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা-নেত্রী নির্বাচনের কথা আছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে পরামর্শ সংক্রান্ত বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে নির্বাচন হয় অনিয়মিত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের হাতেই রয়ে গেছে। তিনি এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, দেশে পুরোপুরি একনায়কতন্ত্র চলছে, গণতন্ত্র নেই বললেই চলে। রাজনীতি আজ কলুষিত। এ থেকে উত্তরণ অতীব জরুরি। তিনি জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি স্বার্থ দেখে, দলীয় স্বার্থ দেখে কিন্তু দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ দেখে না। প্রধানমন্ত্রীর ঊদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, দেশে এক মুহূর্তের জন্য অনির্বাচিত সরকার রাখতে চান না প্রধানমন্ত্রী। অথচ অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে ঢাকা মহানগরীর দু’টি খ- চলছে দীর্ঘদিন। ক্ষমতাসীনরা সবসময় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণতন্ত্র আজ বিপন্ন। আপাতদৃষ্টিতে দেশে স্থিতিশীলতা বিরাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে অনেকগুলো সমস্যা রয়েছে। গণতন্ত্র মানে সম্মতির শাসন। এ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। আর এ নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু, অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক। কিন্তু গত ৫ই জানুযারি যে নির্বাচন হয়েছে সে নির্বাচনে এসব উপাদান অনুপস্থিত। সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে এ নির্বাচন হয়নি। ৪১টি দলের মধ্যে ১২টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে মাত্র ১৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে। তাই এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে নাগরিকদের মনে প্রশ্ন রয়েছে। এ সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে আইন আছে। কিন্তু আইন থেকে বাঁচার জন্য বিচারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। যারা দুর্বল চিত্ত তারা প্রভাবিত হয়। গণতন্ত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা গণতন্ত্রের অপব্যবহার করি। আমাদের মধ্যে পরম সহিষ্ণুতা নেই। প্রত্যেকটি মানুষকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে। সাবেক মন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে কোন দুর্বলতা নেই। দোষ গঠনতন্ত্রে নয়, দোষ রাজনীতিবিদদের। আমাদের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল ও নাজুক। আমাদের দেশে যে গণতন্ত্র রয়েছে তার ওপরে আমরা চড়াও হয়েছি। আমরা আজ দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির কবলে পড়েছি। সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, হুমায়ূন কবীর হিরু, রেহানা সিদ্দিকী, ইঞ্জিনিয়ার মুসবাহ আলীম, এম এ সিদ্দিকী, আবদুল হাই প্রমুখ গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন।

কখনও ভাবিনি ফেরা হবে by রোকনুজ্জামান পিয়াস ও উৎপল রায়

একটি রুটি আর এক লিটার পানি। এ খেয়েই দিন পার। কখনও কখনও তা-ও জুটতো না। তার ওপর চলতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, করানো হতো অমানুষিক পরিশ্রম। মুক্তিপণের দাবিতে নিত্য দিন ছিল মেরে ফেলার হুমকি। সোমালিয়ায় জলদস্যুদের হাতে আটক হওয়া বাংলাদেশী ৭ নাবিকের এভাবেই কেটেছে ১৩০০ দিন। তাদের ভাষ্যমতে, ওই সময়ে পুরোটাই ছিল মৃত্যু আতঙ্কের। ঘুম থেকে উঠেই দেখতেন মুখের সামনে অস্ত্র তাক করা। কখনও স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবেন কল্পনাও করেননি তারা। চোখের সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় একই সঙ্গে অপহৃত হওয়া ভারতীয় নাগরিককে। তখন থেকেই ধরে নেন মৃত্যুই অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। বন্দিদশা মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এভাবেই বর্ণনা দেন তাদের ওপর দস্যুদের চালানো বর্বর নির্যাতনের। কেনিয়ার নাইরোবি থেকে দুবাই হয়ে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের (ইকে-৫৮২) ফ্লাইটে দেশে ফেরেন অপহৃত নাবিকরা। গতকাল সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে হযরত শাহ জালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমানটি। ফিরে আসা নাবিকরা হলেন চাঁদপুরের জাকির হোসেন, সাতক্ষীরার হাবিবুর রহমান, আবুল কাশেম, নুরুল হক, লিমন সরকার, ও গোলাম মোস্তফা এবং কুমিল্লার আমিনুল ইসলাম। দেশে ফিরে আসার আনন্দে এদের অনেকেই বিমানবন্দরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। এ সময় তাদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ সময় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সাংবাদিকদের বলেন, সোমালীয় জলদস্যুদের কবল থেকে বাংলাদেশের সাত নাবিককে এভাবে এত দীর্ঘ সময় পর জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করাটা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনারোধে কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানো দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা করা হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, আমরা কোন রকম মুক্তিপণ ছাড়াই অপহৃতদের দেশে ফিরিয়ে এনেছি। ঘটনার পর থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করেছে। এজন্য তাদেরকে ধন্যবাদ দেন তিনি। ২০১০ সালের ২৬শে নভেম্বর  সোমালিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ৯০০ মাইল দূরে অপহরণ করা হয় মালয়েশিয়ার পণ্যবাহী জাহাজ এমভি আলবেডো। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে কেনিয়া যাওয়ার পথে অপহৃত জাহাজটিতে বাংলাদেশের ৭ জন, ভারতের ১ জন, পাকিস্তানের ৭ জন, শ্রীলঙ্কার ৬ জন ও ইরানের ১ জনসহ ২৩ জন নাবিক ছিলেন। এর মধ্যে ৪ জন পানিতে ডুবে মারা যান। অপহরণের ৬ মাস পর ভারতীয় ১ নাবিককে গুলি করে হত্যা করে জলদস্যুরা। এদিকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশীরা দেশে ফিরলেও গতকাল বিমানবন্দরে তাদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি। বিমানবন্দর থেকে তাদের উত্তরার একটি হোটেলে নেয়া হয়। সেখানেই অপেক্ষারত স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারা। আজ ওই হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। একই সঙ্গে তারা অপহৃত হওয়ার পর তাদের দুঃসহ জীবনের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন মুক্ত করে আনার কাজে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে উদ্ধারকারী সংস্থা মেরিটাইম পাইরেসি অ্যান্ড হিউমেনিটারিয়ান রেসপন্স প্রোগ্রাম (এমপিএইচআরপি)-এর রিজিওনাল ডিরেক্টর চিরাগ বাহরি বলেন, প্রায় ১৩০০ দিন পর তাদের মুক্ত করা হয়েছে। এ দীর্ঘ দিনের প্রায় দিনই তারা অভুক্ত থেকেছেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। এখন তারা কিছুটা সুস্থ্য হলেও মানসিক চাপ রয়ে গেছে। এজন্য কিছুটা কাউন্সিলিং ও চিকিৎসা প্রয়োজন। তাদের পরিবারের সদস্যরাও সাক্ষাতের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছেন। আগামীকাল (আজ) হোটেল মেরিনোতে প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে সব কিছু অবগত করা হবে। তিনি বলেন, নাবিকরা সুস্থ হলে তারা পুনরায় শিপিং লাইনে ফিরে যাবেন না কি অন্য পেশায় নিযুক্ত হবেন, সেটি পরবর্তীকালে নির্ধারণ করা হবে। ফিরে আসা কুমিল্লার মো. আমিনুল ইসলাম বিমানবন্দরে বলেন, সেসব দিনের কাহিনী অল্প সময়ে বলা সম্ভব নয়। একটানা সাড়ে তিন বছর ধরে নির্যাতন সয়েছি। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তের সে কাহিনী। প্রতিটি দিন মনে হতো, মারা যাচ্ছি। আজই মনে হয় শেষ দিন। কিন্তু আল্লাহর রহমত ও সংশ্লিষ্টদের চেষ্টায় দেশে পরিবারের কাছে আসতে পেরেছি। তার জন্য সবার কাছে কৃতজ্ঞ।  আমিনুল বলেন, প্রতিদিন আমাদের ওপর নির্যাতন চালাতো সোমালীয় জলদস্যুরা। তাদের হাতে থাকতো অত্যাধুুনিক অস্ত্র। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে রাতের অন্ধকারে বনের ভেতরে নিয়ে হাত-পা বেঁধে বেদম প্রহার করতো। এছাড়া তাদের বাঙ্কারের কন্টেইনার বহনের কাজে আমাদের ব্যবহার করতো। এ সময় চাল ও গমসহ অন্যান্য দ্রব্যের বস্তা মাথায় ও পিঠে করে কন্টেইনার থেকে বাঙ্কারে নিয়ে যেতে হতো। যদি একটু এদিক সেদিক হলেই মারধর করতো। তাছাড়া প্রতিনিয়ত বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে পরিবারকে ফোন করে মুক্তিপণের টাকা চাইতে চাপ দিতো জলদস্যুরা। তখন মনে হতো, এক্ষুণি হয়তো হত্যা করা হবে আমাদের। কারণ, মুক্তিপণ দিতে অস্বীকার করায় আমাদের সামনেই একজন ভারতীয় নাগরিককে গুলি করে মেরে ফেলেছে। পরে তার লাশ প্রায় দেড় বছর সোমালিয়া জলদস্যুদের আস্তানায় সংরক্ষিত ডিপ ফ্রিজে রেখে দেয়। মুক্তিপণের আশায় তারা এ কাজটি করে বলে জানান আমিনুল। ফিরে আসা আরেক নাবিক সাতক্ষীরার লিমন সরকার বলেন, মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছি। ঘটনার দিন (২০১০ সালের ১০ই নভেম্বর) ওরা (সোমালিয়া জলদস্যুরা) ছিল ১১ জনের মতো। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল একে-৪৭ রাইফেল ও ছোট নৌকায় ছিল রকেট লাঞ্চার। ছোট একটি শিপিং বোট নিয়ে আমাদের জাহাজে আক্রমণ করে তারা। জাহাজে উঠেই ক্যাপ্টেন ও ক্রুসহ সবাইকে বেঁধে ফেলে। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে আমাদের বহনকারী জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। এ সময় ৪ জন শ্রীলঙ্কান নাবিক মারা যান। ভয়ঙ্কর এসব দৃশ্য দেখে আমরা ভড়কে যায়। প্রতিনিয়ত ভাবতাম আর বোধহয় দেশে এসে প্রিয়জনদের মুখ দেখা হবে না। লিমন বলেন, জাহাজডুবির পর দস্যুরা আরেকটি জাহাজে করে হাত, পা ও চোখ বেঁধে আমাদের অজানা স্থানে নিয়ে যায়। এরপর প্রায়ই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আমাদের আনা নেয়া করা হয়েছে। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার আরেক দুর্বিষহ চিত্র তুলে  ধরেন নাবিক জাকির হোসেন? এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন? জাকির হোসেন বলেন, ‘ভারতীয় একজন নাবিককে আমাদের চোখের সামনেই নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলে জলদস্যুরা? তখন ওরা বলছিল মুক্তিপণ না দিলে একে একে সবাইকেই ওই (ভারতীয়) নাবিকের মতো ভাগ্য বরণ করতে হবে? বন্দি প্রত্যেককেই পালাক্রমে নির্যাতন করা হতো? পেটাতে পেটাতে অচেতন করে ফেলত? জ্ঞান ফিরলেও পানি বা খাবার দেয়া হতো না। নাবিকরা আরও জানান, শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনও করতো জলদস্যুরা। এমনও হয়েছে ঘুমের মধ্যে থাকলে ঘুম থেকে ডেকে তুলে এনে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কাজে লাগাতো। কোনদিন ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও খাওয়া জুটতো না। সাতক্ষীরার ধুলিহার ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের নুরল হক বলেন, সাড়ে তিন বছর প্রচ- মানসিক ও যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হয়েছি এখন ভাল আছি। শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেকটাই সুস্থবোধ করছি। পরিবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছি। দেশে ফিরে আসতে পারায় সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
বাবা তুমি কেমন আছো? ভাল আছি। তুমি কেমন আছো? আমাকে চিনতে পেরেছো। পেরেছি বাবা। প্রায় সাড়ে তিন বছর পর প্রথম সাক্ষাতে এভাবেই কথপোকথন বাবা-ছেলের সঙ্গে। এরপর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। ছেলে বাবাকে আর বাবা ছেলেকে পেয়ে কাঁদলেন। ভাসলেন আনন্দ অশ্রুতে। উপস্থিত সকলকেও কাঁদালেন। এমনই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় গতকাল উত্তরার হোটেল মেরিনোতে। সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে গতকাল ছেলে নাইমুলের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে সাতক্ষীরার বাসিন্দা নাবিক আবুল কাশেমের। কাশেম যখন আটক হন তখন নাইমুলের বয়স ছিল ৫ বছর। আটক থাকাকালেও ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে বেশ কয়েকবার। নাইমুল জানায়, এখন সে ৫ম শ্রেণীতে পড়ে। বাবার সঙ্গে যখনই কথা হতো তখনই তিনি কাঁদতেন। গতকাল মা হাসি ও দাদাকে সঙ্গে করে বাবাকে নিতে এসেছে সে। কাশেমের মতো আরও ৬ জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটে। হোটেল মেরিনোতে আসে ওই ৭ পরিবারের ১৮ জন সদস্য। প্রিয় মানুষের কাছে পাওয়ার আনন্দে আবেগাপ্লুত পরিবারের স্বজনদের চোখে তখন পানি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত, পাকিস্তান ও ইরানের নাবিকদের সঙ্গে বাংলাদেশের ওই সাত নাবিক অপহরণের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের উদ্ধারে কাজ শুরু করে। নাবিকদের উদ্ধারে প্রাথমিকভাবে মেরিটাইম পাইরেসি ও মানবিক রেসপন্স কর্মসূচি (এমপিএইপআরপি)-র মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাত বাংলাদেশী ক্রু জীবিত আছেন বলে সরকারকে নিশ্চিত করে। এরপর যোগাযোগ করা হয় জাহাজের মালিকের সঙ্গে। মালয়েশিয়ান হওয়ায় প্রথমে তার কাছ থেকে মুক্তিপণের অর্থ আদায়ের জন্য কূটনৈতিক লবিং চালায় সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু জাহাজের দামের চেয়ে মুক্তিপণের অর্থ বেশি মনে করে এমভি আলবেডো’র মালিক ক্ষতিপূরণ দিতে অপরাগতা প্রকাশ করে পালিয়ে যান। এছাড়া নাবিকদের পরিবারের পক্ষ থেকে সোমালিয়ার মুসলমানদের কাছে মানবিক আবেদনও করা হয়। কিন্তু জলদস্যুরা সাফ জানিয়ে দেয় মুক্তিপণ ছাড়া জলদস্যুদের হাত থেকে কারও মুক্তি মেলে না। বিকল্প উপায় না থাকায় তিন বছরের মাথায় মুক্তিপণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয় সরকার। জলদস্যুদের দাবি করা ৬ লাখ ডলার বা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রের তিনটি তহবিল থেকে যোগান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাতে অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে নীতিগত ও আন্তর্জাতিকভাবে জলদস্যুদের মুক্তিপণের টাকা সরকারের পক্ষ থেকে দেয়াটা স্বীকৃত না হওয়ায় ভিন্ন পন্থায় এর ব্যবস্থার কথা বলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা করে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক অফিস ইউএনওডিসি ও লন্ডন ভিত্তিক মেরিটাইম পাইরেসি অ্যান্ড হিউমেনিটারিয়ান রেসপন্স প্রোগ্রাম (এমপিএইচআরপি)। এস কে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চেয়ারম্যান এম এ মান্নান বলেন, আমার নিকত্মায়ীয় লিমন সরকার আটক থাকায় আমার সঙ্গে নিয়মিত তার ফোনে যোগাযোগ হতো। পরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে তাদের ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়। তিনি এক্ষেত্রে কিছু সোমালিয়ান মানুষ সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান। এছাড়া শিপিং ম্যানিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জানান, নৌ-মন্ত্রণালয়ের ডিজি জাকিউল ইসলাম ভুঁইয়া এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। সার্বিক তত্ত্বাবধান করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রিয়ার এডমিরাল খোরশেদ আলম। এছাড়া শিপিং ম্যানিং এজেন্ট এসোসিয়েশন, শিপিং ওনার্স এসাসিয়েশন, নাবিক ওয়েলফেয়ার ফান্ড আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছে। এরপর জাতিসংঘের ‘পলিটিক্যাল অফিস ফর সোমালিয়া’র সহায়তায় গত ৬ই জুন মুক্তি পান সাত নাবিক। পরদিন ৭ই জুন জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (ইউএনওডিসি) একটি উড়োজাহাজযোগে তাদেরকে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে নেয়া হয়। সেখানে ইউএনওডিসি কর্তৃপক্ষ ও নাইরোবিতে বাংলাদেশী দূতাবাস কর্মকর্তারা তাদের গ্রহণ করেন। নাইরোবিতে আগা খান হাসপাতালে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা হয়। সেখানে থেকে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে ফেরেন তারা।
@ রোকনুজ্জামান পিয়াস ও উৎপল রায়

শান্তি, সমৃদ্ধি ও মৈত্রীর সন্ধানে চীন by ফারুক চৌধুরী

গত মে মাসের মাঝামাঝিতে চীনা কর্তৃপক্ষ একটি সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের লক্ষ্য ছিল, চীনের পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর ফ্রেন্ডশিপ উইথ ফরেন কান্ট্রিসের ষষ্ঠ দশক পূর্তি উদ্‌যাপন করা। প্রতিটি দশক পূর্তিতে এই সংস্থাটি এই উৎসবের আয়োজন করে থাকে। এই বছরের এই উদ্‌যাপন উৎসবে বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশ অংশ নিয়েছিল। সম্মেলনে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনওয়ারুল আমিন আর আমি আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। আনওয়ারুল আমিন প্রায় সাত বছর একজন ব্যাংকার হিসেবে চীনে অবস্থান করেন এবং তার পর থেকেই চীন বাংলাদেশ মৈত্রীর উন্নয়নে পরিশ্রম করছেন।

আমার ৩৬ বছরের কর্মজীবনের একটি বিরাট অংশ কেটেছে চীনে এবং চীন-সম্পর্কিত বিষয়াদিতে৷ সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আমি চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বকে প্রসারতর করার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছি। তাই আমরা দুজনই এই আমন্ত্রণটি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলাম। বিদেশি প্রতিনিধিদের মধ্যে ভারতীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একটি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে ছিল ইতিহাসখ্যাত ভারতীয় চিকিৎ​সক কুটনিসের পরিবারের অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের ছয়জন সদস্য। তাঁদের মধ্যে একজন ডা. কুটনিসের ভাতিজা, ৯১ বছর বয়সে আমাকে বয়োজ্যেষ্ঠতার প্রতিযোগিতায় অনায়াসে পরাজিত করেন। শুধু তা-ই নয়। চীনের ‘গ্রেট হল অব ফি পিপলসের’ সুদীর্ঘ বারান্দা ও করিডর অতিক্রম করতে তাঁর জন্য রক্ষিত হুইলচেয়ারটি আমার সুবিধার্থে আমার জন্য ছেড়ে দেন! বয়স্ক পাঠকদের কাছে ভারতীয় চিকিৎ​সক কুটনিস সুপরিচিত হওয়ার কথা। চীন-জাপান যুদ্ধে তিনি চীনের পক্ষে বিশেষ অবদান রাখেন এবং চীনাদের সেবারত অবস্থায় সেখানেই চল্লিশের দশকে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর জীবনের ওপর ভি. শান্তারাম ডা. কুটনিসকি অমর কাহানি শীর্ষক একটি জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। অতএব ভারতীয় প্রতিনিধিদলে ছিলেন কুটনিস পরিবারেরই ছয়জন সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের নেতা ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নাতি, ক্রিস্টোফার কক্স নিক্সন। বলাই বাহুল্য যে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কোন্নয়নে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিশাল অবদানের স্বীকৃতি ছিল অনুষ্ঠানটিতে তাঁর নাতির উপস্থিতি।

এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, তাঁর অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ১৫ মিনিটের ভাষণ। ২০১৪ সালের ১৫ মে এই ভাষণটি এই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ যে বিশ্বসম্পর্ক, বিশ্বশান্তি ও চীনের উন্নয়ন নিয়ে চীনের বর্তমান চিন্তাধারা তাতে প্রতিফলিত হয়েছে। চীনের নেতাদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে, শব্দের বিন্যাস এবং চয়ন কোনো বিষয় তুলে ধরতে উপমার প্রয়োগ এবং ভাবনার অলংকরণ চিত্তাকর্ষক। এই ভাষণটি তার ব্যতিক্রম ছিল না।

চীনের দুই হাজার বছরের দার্শনিক গুরু কনফুসিয়াসের (যদিও ষাট ও সত্তরের দশকের কট্টর কমিউনিস্ট শাসনের সময়ে তাঁর নাম উচ্চারিত হতো না) উদ্ধৃতি দিয়েই শুরু হয় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভাষণ। দুই হাজার বছর আগে কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘সুদূরের বন্ধুদের আগমন সদাই আনন্দদায়ক।’ এই কথাটি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্মরণ করলেন। তারপর বললেন, ‘জাতি হিসেবে চীন একফোঁটা পরিমাণ পানির দয়ারও প্রতিদান দিতে চায় কৃতজ্ঞতার ঝরনাধারায়। চীনারা তাদের বন্ধুদের কখনো ভুলবে না।’ তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন সেসব আন্তর্জাতিক বন্ধুকে, যারা চীনের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বের মূল্য প্রদানে চীনের বিপ্লব, সংস্কার আর উন্নয়নের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন জানিয়েছে৷’ তিনি বললেন, ‘বিশ্বাস ও সমতাই হচ্ছে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্কের পূর্বশর্ত।’

তাঁর কথায় আমরা যতই ‘বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব, অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও তথ্যবিপ্লবের প্রয়োগের পানে ধাবিত হচ্ছি; জাতীয় স্বার্থ, ভাগ্য ও নিরাপত্তার নিরিখে পৃথিবীর দেশগুলো পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা এবং একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তারা আজ সম্মিলিত ভাগ্যোন্নয়নে একটি সুসংঘবদ্ধ পরিবারের সদস্য’।

চীনের কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বললেন, চীন এখন ‘উন্নয়ন সংস্কার ও প্রগতির’ সংগ্রামে লিপ্ত। চীনের শতাব্দীর লক্ষ্য দুটি—যথা একটি উন্নয়নশীল সমাজ নির্মাণের

সম্পূর্ণকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ২০১০ সালের তুলনায় চীনের শহর ও গ্রামাঞ্চলে মানুষের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করা৷ এভাবেই চীন এই শতাব্দীর মাঝামাঝিতে একটি আধুনিক সমাজবাদী দেশে পরিণত হবে; যা বিত্তশীল, ক্ষমতাবান, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগুয়ান দেশ হিসেবে চীনের জাতীয় নবায়নের স্বপ্ন সার্থক করবে।

এই স্বপ্ন শুধু চীনাদের নয়, অন্যান্য দেশের মানুষের স্বপ্নেরই প্রতিফলন। তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নে চীন তাদের হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাবে। চীনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন পৃথিবীতে একটি বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। শি জিনপিং বলেন, ‘শত শত নদনদী বরণ করেই সাগর বিশাল আকার ধারণ করে।’ চীন নিজেকে বহির্বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করবে, পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং ‘সিল্ক রোডের’ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং একবিংশ শতাব্দীর জলপথের ‘সিল্ক রোডের’ উন্নয়ন করবে, যাতে দেশগুলো তাদের উন্নয়ন সম্ভাবনা ভাগ করে নিতে পারে। অধিকতর উন্মুক্ততা নিয়ে চীন সাংস্কৃতিক দেওয়া-নেওয়া করবে, যাতে বিশ্বসভ্যতা পারস্পরিক শিক্ষালাভের ভিত্তিতে এগিয়ে যায়।

তারপর শি জিনপিংয়ের কথা হলো চীনের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রগতিতে কিছু মানুষ চীনের আধিপত্য বিস্তারের ভীতি পোষণ করছেন। তাঁদের এই মনোভাব ভ্রান্ত ধারণা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনের প্রতি বিরূপ মনোভাবেরই প্রতিফলন। কিন্তু চীন মনে করে, শান্তি হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান এবং অন্যদের প্রতি প্রীতি ও বন্ধুত্ব প্রদর্শন করা এবং ‘কারও বিরুদ্ধে এমন কিছু না করা, যা চীনারা চাইবে না যে তারা চীনের বিরুদ্ধে করুক। এই ধারণাটি চীনের মানুষের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বিদ্যমান রয়েছে এবং চীনের ব্যবহার আর মানসিকতায় তারই প্রতিফলন ঘটে। চীনের পূর্ববর্তী প্রজন্ম বিশ্বাস করত যে যুদ্ধভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো ক্রমে ক্রমে বিলীন হয়ে যাবে, তা যত বড় রাষ্ট্রই হোক না কেন।

আদিকাল থেকেই চীন বাণিজ্য আর যোগাযোগ বাড়ানোতে বিশ্বাসী, আক্রমণ আর আধিপত্য বিস্তারে নয়। চীন নিজের দেশকে দেশপ্রেমের মাধ্যমে রক্ষা করার প্রয়াস নিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদ বিস্তার করতে চায়নি।

দুই হাজার ১০০ বছর আগে চীনারা সিল্ক রোড সৃষ্টি করেছিল, যার মাধ্যমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার লেনদেন হয়েছে এবং যা সেই অঞ্চলের মানুষকে গভীরভাবে লাভবান করেছে। ৬০০ বছর আগে চীনের নাবিক জেংহি প্রশান্ত মহাসাগর আর পশ্চিম ভারত সাগরে একটি শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে সাতবার সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। তিনি যে ৩০টি দেশ সফর করেছিলেন, তার এক ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও তিনি দখল করেননি। তাঁরা শান্তি ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এবং সেসব দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েরই বীজ বপন করে এসেছিলেন। শি জিনপিংয়ের কথায় গণচীন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত চীনের আধুনিক কালের ইতিহাস ছিল অবমাননা, পরাজয় আর বিপর্যয়ের। কিন্তু তা চীনের মানুষের বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং জাতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামেরও মহান ইতিহাস। চীনের মানুষ, যারা বহু বাধাবিপত্তির অভিজ্ঞতা অতিক্রম করেছে, তারা শান্তির কামনা করে এবং তাদের দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা তারা কোনো দেশের ওপর চাপিয়ে দেবে না।

শি জিনপিং তাঁর ভাষণের সমাপনী অংশে বললেন যে চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের প্রচেষ্টায় লিপ্ত রইবে এবং অন্যান্য দেশকেও সেই পথ অনুসরণ করতে উৎসাহিত করবে। চীন অধিকতর আন্তর্জাতিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে, মানবতা ও আন্তর্জাতিক সুবিচারের জন্য অন্যদের সঙ্গে কাজ করে যাবে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়াদিতে ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখবে এবং বিরোধ সমাধানে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা নেবে। বিশ্বশান্তি বজায় রেখে চীন উন্নয়নে লিপ্ত রইবে এবং উন্নয়নের মাধ্যমেই বিশ্বশান্তি আনয়নের পক্ষে রইবে। চীন সমতার ভিত্তিতে, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা ও মতানৈক্য সমাধানে সচেষ্টা রইবে এবং তাতে আন্তরিকতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেবে।

শি জিনপিং বলেন, চীনে একটি কথা আছে যে মানুষের মধ্যে সম্পর্কই আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের চাবিকাঠি এবং পারস্পরিক সমঝোতাই হলো মানুষের মধ্যে সম্পর্কের চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, ইউনেসকোর সদর দপ্তরে বিভিন্ন ভাষায় লিখিত একটি বাণী তিনি পাঠ করেছেন। তা হলো, যেহেতু সংঘাতের সূচনা মানুষের মনে ঘটে, মানুষের মনেই নির্মাণ করতে হবে শান্তিরক্ষার কবচ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই ভাষণটি প্রাসঙ্গিক মনে হলো। এখানে অবশ্য বলার প্রয়োজন রয়েছে, চীনা ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বাংলায় আমার ভাষান্তরের প্রচেষ্টায় অনেক ভুলভ্রান্তি ও অসম্পূর্ণতা নিশ্চয় রয়েছে—তবে এই ভাষণটি থেকে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে চীনের চিন্তাধারার একটি আভাস পাওয়া যায়। আমার এই দুর্বল প্রচেষ্টার কৈফিয়ত সেখানেই।

ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব। কলাম লেখক।

zaaf@bdmail.net

তেল-গ্যাস অনুসন্ধান- বাপেক্সের দোষ খুঁজছেন যাঁরা by মুহাম্মদ জামালুদ্দীন ও মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম

বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (আইওসি) শেভরন ও তাল্লো চারটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উৎপাদন করছে। শেভরন তিনটি গ্যাসক্ষেত্র—বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার থেকে এবং তাল্লো বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করছে। দেশের দৈনিক উৎপাদনের ৫৪ শতাংশ আইওসি দুটির চারটি গ্যাসক্ষেত্র জোগান দিচ্ছে। অবশিষ্ট ৪৬ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন করছে তিনটি দেশীয় গ্যাস কোম্পানি—বিজিএফসিএল, এসজিএফএল এবং বাপেক্সের মোট ১৫টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে। (সূত্র: পেট্রোবাংলার ডেইলি গ্যাস প্রোডাকশন রিপোর্ট, ২১, ২২ মে, ২০১৪)।

আইওসি দুটির সব কটি গ্যাসক্ষেত্র থেকেই উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় বেশি গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে গ্যাসসংবলিত স্তরের কাঠামোবিন্যাসে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের অকালমৃত্যু এবং বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাসের অন্যতম কারণ উৎপাদনক্ষমতার ​চেয়ে অধিক গ্যাস উত্তোলন। সরকার স্বয়ং এ বিষয়ে সচেতন। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক প্রণীত ‘পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি সেক্টর রোডম্যাপ এন আপডেট ২০১১’–এ   জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্য আশু করণীয় যে কয়টি কাজের উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) আওতায় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগ দ্রুত নগদায়নের লক্ষ্যে অধিক হারে গ্যাস উত্তোলনের আগ্রহে অনতিবিলম্বে লাগাম টেনে ধরা৷ কিন্তু আশু করণীয় কাজটির পরিবর্তে দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাস-চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শেভরনকে তাদের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে আরও কূপ খনন করে অধিক হারে গ্যাস উৎপাদনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ছয়টি আইওসির সঙ্গে পিএসসি স্বাক্ষরিত হয়। আইওসিগুলো তাদের জন্য বরাদ্দকৃত এলাকায় ৩১ হাজার লাইন কিলোমিটার ​িসসমিক জরিপ করেছে। সব কটি আইওসির কার্যক্রম প্রধানত দেশের অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। বিভিন্ন কোম্পানি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে মোট আটটি কূপ খনন করে।

স্বাধীনতার পর পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান পরিদপ্তর দেশের স্থলভাগে অনুসন্ধানকাজ পরিচালনা করত। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে পেট্রোবাংলার অব্যাহত অনুসন্ধান কার্যক্রমের ফলে বেগমগঞ্জ, ফেনী, বিয়ানীবাজার, কামতা, ফেঞ্চুগঞ্জ, মেঘনা এবং নরসিংদী গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। পেট্রোবাংলা পুনর্গঠন-প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১ জুলাই ১৯৮৯ তারিখে অনুসন্ধান পরিদপ্তরকে পেট্রোবাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি (বাপেক্স) নামে পেট্রোবাংলার অধীনে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়। কিন্তু নবগঠিত কোম্পানির কোনো আয়ের উৎস বা তহবিল ছিল না। সীমিত আকারের এডিপি অর্থায়ন ও সৌ​িদ উন্নয়ন তহবিলের  ঋণ ব্যবহার করে বাপেক্স উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ​িসসমিক জরিপ এবং পাথারিয়া ও শাহবাজপুরে দুটি কূপ খনন করে পরেরটিতে গ্যাস আবিষ্কার করে।

ইতিমধ্যে সারা দেশকে ২৩টি অনুসন্ধান ব্লকে বিভক্ত করে ১৯৯৩ সালে পিএসসি করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। উল্লেখ্য, এ সময় বাপেক্সের জন্য নির্দিষ্ট ব্লক বরাদ্দ রাখা হয়নি। বাপেক্সের কর্মপরিসর ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে দেশে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম কোনো প্রতিষ্ঠান যেন না থাকে, সে লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত শুরু হয়। ফলে বাপেক্স ১৯৯৬ সালে তদানীন্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার শরণাপন্ন হয়ে একটি ব্লক এবং শ্রীকাইলসহ কয়েকটি ভূগঠন বাপেক্সের নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। উপদেষ্টার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে পেট্রোবাংলা তখন কেবল ৯ নম্বর ব্লকের শ্রীকাইল ভূগঠনের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বাপেক্সকে বরাদ্দ দেয়। ইতিপূর্বে বাপেক্স পরিচালিত জরিপে স্পষ্ট হয়েছিল, লালমাই ভূগঠনটি উত্তর-দক্ষিণে শ্রীকাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং লালমাইয়ের অভ্যন্তরে বাঙ্গুরা ও শ্রীকাইল এলাকায় আরও দুটি ভূগঠন আছে। তখনকার জরিপে বাঙ্গুরার চেয়ে শ্রীকাইল অধিকতর সম্ভাবনাময় প্রতীয়মান হয়েছিল বলে বিশেষভাবে শ্রীকাইল ভূগঠনটি বাপেক্সের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল।

১৯৯৩ সালের ব্লকবিডিং-এ বৃহত্তর সিলেট জেলার অন্তর্গত ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লক বরাদ্দ দেওয়া হয় অক্সিডেন্টালকে (অক্সি)। শেল ও কেয়ার্ন যৌথভাবে নোয়াখালী জেলার অংশবিশেষ এবং সমুদ্রাঞ্চল পরিবেষ্টিত ১৫ ও ১৬ নম্বর ব্লক এবং ওকল্যান্ড ও তাল্লো যৌথভাবে ১৭ ও ১৮ নম্বর সামুদ্রিক ব্লক বরাদ্দ পায়। বাড়তি হিসেবে অক্সিকে তিনটি ব্লকের সঙ্গে ইতিপূর্বে আবিষ্কৃত জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র প্রদান করা হয়। তা ছাড়া তিনটি ব্লকে ইতিপূর্বে পরিচালিত সব ​িসসমিক ও গ্রেভিটি উপাত্ত তারা লাভ করে, যেখানে মৌলভীবাজার ও বিবিয়ানার ভূগঠনের চিত্র ছিল। অক্সিডেন্টাল ১৯৯৮ সালে ১২ নম্বর ব্লকে

অনুসন্ধান কূপ খনন করে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র নিশ্চিত করে। ১৯৯৭ সালের ব্লক বিডিংয়ে ইউনিকল ৭, শেভরন-তাল্লো জোট ৯ ও শেল-কেয়ার্ন জোট ৫ ও ১০ নম্বর ব্লকের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়৷

অক্সিডেন্টাল ১৯৯৮ সালে ১২ নম্বর ব্লকে অনুসন্ধান করে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র নিশ্চিত করে৷ মৌলভীবাজার ভূগঠনে অনুসন্ধানকালে ১৯৯৭ সালে ​ব্লোআউট হয় এবং পরে ১৯৯৯ সালে আবার সেখানে অনুসন্ধান করে বাণিজ্যিক গ্যাস পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চত করে৷  শেল-কেয়ার্ন ১৯৯৬ সালে ১৬ নম্বর অগভীর সামুদ্রিক ব্লকে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। তাল্লো ২০০৪ সালে রসুলপুর, লালমাই ও বাঙ্গুরায় অনুসন্ধান কূপ খনন করে এবং বাঙ্গুরায় গ্যাস আবিষ্কার করে। ৭ নম্বর ব্লকে শেভরন বিস্তারিত ​িসসমিক জরিপ পরিচালনা করে চর কাজল ভূগঠন আবিষ্কার করে। কিন্তু কূপ খনন করে গ্যাস না পাওয়ায় ২০১১ সালে তারা ব্লকটি পেট্রোবাংলার কাছে প্রত্যর্পণ করে। অনুরূপভাবে কেয়ার্ন ১০ নম্বর ব্লকে চর জব্বার ভূগঠন আবিষ্কার করে, কিন্তু সম্ভাবনাময় বিবেচিত না হওয়ায় তারাও ব্লক প্রত্যর্পণ করে। সুন্দরবন পরিবেষ্টিত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৫ নম্বর ব্লকে সম্ভাবনাময় কোনো ভূগঠন পাওয়া না যাওয়ায় এটিও কেয়ার্ন প্রত্যর্পণ করে। বর্তমানে দুটি আইসির পরিচালনাধীন চারটি গ্যাসক্ষেত্র সন্নিহিত এলাকা ব্যতীত সব কটি ব্লকই পেট্রোবাংলার কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন আইওসির তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ওপরে তুলে ধরা হলো। উদ্ধৃত যেসব ব্লকে বিভিন্ন কোম্পানি অনুসন্ধান কার্যক্রম

পরিচালনা করেছে, বাংলাদেশের মানচিত্রে সেগুলোর অবস্থান পর্যালোচনা করলে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় পরিলক্ষিত হবে। বাংলাদেশের মানচিত্রে রাজধানী ঢাকার অবস্থানের ওপর যদি উত্তর-দক্ষিণে ৯০ দশমিক ৩৭ ডি​িগ্র দ্রাঘিমাংশ বরাবর একটি কাল্পনিক সরলরেখা টানা হয়, তাহলে দেখা যাবে ৫ ও ৭ নম্বর ব্লক ছাড়া বাকি ১০টি ব্লক ওই সরলরেখার পূর্ব পাশে অবস্থিত। এমনকি ২০০৩ সালে বাপেক্সকে প্রদত্ত ১১ নম্বর ব্লকও কাল্পনিক সরলরেখার পূর্ব পাশে অবস্থিত।

আবিষ্কৃত গ্যাস মজুতের পাশাপাশি আরও কী পরিমাণ গ্যাস ভবিষ্যতে আবিষ্ক​ারের সম্ভাবনা আছে (গ্যাস রিসোর্স), তা নিরূপণের জন্য আমেরিকার সরকা​ির প্রতিষ্ঠান ইউএসজিএস পেট্রোবাংলার সঙ্গে ২০০১ সালে একটি যৌথ সমীক্ষা চালায়। ওই সমীক্ষায় বলা হয়, বাংলাদেশে আরও ৩২ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা বিদ্যমান। সম্ভাব্য ৩২ টিসিএফ গ্যাসের ২৯ টিসিএফই উল্লিখিত কাল্পনিক সরলরেখার পূর্ব দিকে অবস্থিত৷ পার্বত্য জেলাগুলো সম্ভাবনাহীন বিবেচিত হয়৷ একই বছর নরওয়ের সরকা​ির প্রতিষ্ঠান এনপিডি বাংলাদেশের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের সঙ্গে যৌথভাবে গ্যাস রিসোর্স স্টাডি পরিচালনা করে। তাদের সমীক্ষা অনুযায়ী ৩২ নয়, বরং আরও ৪২ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। তারা পার্বত্য অঞ্চলকে সম্ভাবনাময় এবং সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানায়। সব মিলিয়ে তারা উত্তর-দক্ষিণ কাল্পনিক সরলরেখার পূর্ব দিকে ৩৬ টিসিএফ এবং পশ্চিমে অবশিষ্ট ৬ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানায়৷

লক্ষ‍ণীয়, সমীক্ষা দুটি পরিচালিত হয় ২০০১ সালে, আর আইওসিগুলোকে দুই দফায় বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৯৯৩ ও ১৯৯৭ সালে৷  আইওসিগুলোর নিজস্ব সমীক্ষায় যেসব ব্লক সম্ভাবনাময় বলে বিবেচনা করেছিল, সেগুলোর জন্যই পিএসসি স্বাক্ষরে আগ্রহী হয়েছিল। ২০০১ সালে এসে দেখা গেল, সেই ব্লকগুলোই সবচেয়ে সম্ভাবনাময়৷ বাংলাদেশের গ্যাস রপ্তানির পক্ষে একটি যুক্তি তুলে ধরতেই এই  প্রচারণা চালানো হয়৷ এই সমীক্ষা দুটি আগে যেমন আইওসিগুলো পশ্চিমাঞ্চলে অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়নি, ভবিষ্যতেও দেখাবে বলে মনে হয় না৷ অনুসন্ধান-ব্যয় এত বেশি যে, কোনো কোম্পা​িনই ব্যর্থতার ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

দুটি সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের সর্বাধিক সম্ভাবনাময় ১২টি ব্লকে বিভিন্ন আইওসি অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে সমুদ্রাঞ্চলে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। এ ক্ষেত্রটিতে ১ টিসিএফ গ্যাস মজুত আছে—এমন ধারণা দেওয়া হলেও ২০১৩-এর অক্টোবরে অর্ধ টিসিএফের কম গ্যাস উৎপাদন শেষে গ্যাসক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। স্থলভাগে শেভরনের বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার এবং তাল্লোর (বর্তমানে ক্রিস এনার্জি) বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। এগুলো ছাড়া  উল্লিখিত দুটি সমীক্ষার পর কেবল বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রই আইওসি কর্তৃক আবিষ্কৃত হয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র শেভরনের পূর্বসূ​ির অক্সিকে উপঢৌকন দেওয়া হয়েছিল। আর মৌলভীবাজার ভূগঠন ছিল একেবারে খননের জন্য প্রস্তুত সুচিহ্নিত ভূগঠন। এমনকি বিবিয়ানা ভূগঠনও গ্রেভিটি চিত্রে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল। সুতরাং স্থলভাগের একটি গ্যাসক্ষেত্রও কোনো আইওসির নিজস্ব আবিষ্কার নয়। বরং এগুলো আবিষ্কারের কৃতিত্বের একমাত্র দা​িবদার হতে পারে বাপেক্স। আইওসিগুলোর কাছে বিক্রীত তথ্য-উপাত্তে ভূগঠনগুলোর সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল বলেই তারা তখন ওই ব্লকগুলোর জন্য পিএসসি স্বাক্ষরে আগ্রহী হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব ​বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করেছে তাদের ‘কৃতিত্বের’ মধ্যে আছে সমুদ্রবক্ষে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্রে ব্লোআউটের মাধ্যমে গ্যাসসম্পদের বিপুল অপচয় এবং উৎপাদনক্ষমতার অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে নীরবে গ্যাসক্ষেত্রের ধ্বংসসাধন (পিএসসির পরিবর্তে পেছনের দরজা দিয়ে আসা আর এক আইওসি নাইকো কর্তৃক ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালে পর পর দুবার ব্লোআউটের বিষয়টি আলোচনায় আনা হলো না)।

পক্ষান্তরে বাপেক্স এবং এর পূর্বসূরি পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান পরিদপ্তর অনুসন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে সেমুতাং, বেগমগঞ্জ, ফেনী, বিয়ানীবাজার, কামতা, ফেঞ্চুগঞ্জ, মেঘনা, নরসিংদী, শাহবাজপুর, সালদা নদী, সুন্দলপুর এবং শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে (সবগুলো গ্যাসক্ষেত্রই কাল্পনিক সরলরেখার পূর্ব পাশে অবস্থিত)। অনুসন্ধানকাজে নিয়োজিত বাপেক্স ও এর পূর্বসূ​ির প্রতিষ্ঠান এযাবৎ ১২টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের কৃতিত্বের দাবিদার। কিন্তু কোনো বোধগম্য কারণ ছাড়াই বাপেক্স কেন এককভাবে দেশের স্থলভাগে অনুসন্ধানকাজ করবে, সে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আমরা দেখছি, নানাভাবে বাপেক্সের অক্ষমতা চিহ্নিত করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, বাপেক্স আজ পর্যন্ত ব্লোআউটের মাধ্যমে কোনো গ্যাসক্ষেত্র ধ্বংস করতে পারেনি। দুর্যোগের সময় সেফটি ফার্স্ট নীতি অনুসরণ করে আইওসির ঠিকাদার কোম্পা​িনর ড্রিলাররা রিগ ফেলে যখন পালিয়ে যায়, তখন বাপেক্সের প্রকৌশলীরা ১০ নম্বর বিপৎ​সংকেতের ঝড়ঝঞ্ঝা মাথায় নিয়ে বুক পেতে রিগ আগলে দাঁড়িয়ে থাকেন।

মুহাম্মদ জামালুদ্দীন: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাপেক্স৷ মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম: সাবেক অধ্যাপক, বুয়েট।

কাপুরুষই মেয়েদের ওপর হামলা করে by হাসান ফেরদৌস

সম্প্রতি পর পর কয়েকটি উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে গেছে৷
নাইজেরিয়ার একটি উগ্র ধর্মীয় দল প্রায় ৩০০ স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখেছে৷ অপহরণের কারণ, মেয়েগুলো স্কুলে শিক্ষা গ্রহণ করছিল৷ সন্দেহ করা হচ্ছে, বোকো হারাম নামের এই দল অপহরণকৃত মেয়েদের দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছে এবং জোর করে তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে৷
পাকিস্তানে পাঞ্জাবের একটি গ্রামে ২৫ বছর বয়স্ক ফারজানা পারভিন নামের সন্তানসম্ভবা একটি মেয়েকে তাঁর বাবা, চাচা ও নিকট আত্মীয়রা পালাক্রমে পাথর ছুড়ে সর্বসমক্ষে হত্যা করেছে৷ মেয়েটির অপরাধ, পরিবারের সম্মতি ছাড়া প্রেম করে বিয়ে করেছিল৷ বলা হচ্ছে, পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে এই খুন৷
ভারতের উত্তর প্রদেশে একই পরিবারের দুই জ্ঞাতিবোন প্রতিবেশী উচ্চবর্ণের যুবকদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর ধর্ষণের শিকার হয়৷ ধর্ষণ শেষে মেয়ে দুটিকে হত্যা করে তারা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখে৷ এ নিয়ে অভিযোগ নথিবদ্ধ করতে গেলে স্থানীয় পুলিশ প্রথমে ব্যাপারটা হেসেই উড়িয়ে দেয়৷
মেয়েদের বিরুদ্ধে এই সন্ত্রাস শুধু তৃতীয় বিশ্বের দেশেই ঘটে তা নয়, আমেরিকার মতো দেশে মেয়েদের ওপর হামলা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা৷ যেমন: এ দেশে কলেজপড়ুয়া প্রতি চারজনের একজন তাদের ছাত্রজীবনে অন্ততপক্ষে একবার হয় ধর্ষিত হয় অথবা ধর্ষণের সম্মুখীন হয়৷ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়, এমন কলেজপড়ুয়া মেয়েদের সংখ্যা, অতি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, কমপক্ষে ২০ শতাংশ৷ সব বয়সে মার্কিন নারীদের মধ্যে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়—তাদের সংখ্যা প্রতি ২৮ মিনিটে একজন৷

পৃথিবীর অন্যত্র এই ছবি সম্ভবত আরও নির্মম৷ আমাদের মতো দেশে গার্হস্থ্য সহিংসতার খবর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গোপন রাখা হয়৷ খুন পর্যন্ত না গড়ালে এ নিয়ে কথা ওঠে না৷ ফলে, পরিসংখ্যানের অঙ্ক দেখে সমস্যার মাত্রা বোঝা যাবে না৷ রাষ্ট্রপ্রধান থেকে পাড়ার দারোগা, সবাই ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেন, নয়তো ধামাচাপা দিতে পারলে বাঁচেন৷ ভারতের যে দরিদ্র মেয়ে দুটি খুন হলো, তাদের কথা ধরুন৷ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এ নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে তাঁর উত্তর ছিল, ‘বাপু, তোমাদের এ নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? তোমরা তো বেশ নিরাপদে আছ৷’ একই রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, হামলা থেকে বাঁচার জন্য মেয়েদের উচিত আরও শালীনভাবে পোশাক-আশাক পরা৷ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান রঞ্জিত সিনহা আরও এক কদম এগিয়ে এসে বলেছেন, ধর্ষণ যদি ঠেকানো না যায়, তাহলে বুদ্ধিমানের কাজ হবে সেটা উপভোগ করা৷ জুয়া খেলার সঙ্গে তুলনা করে ভদ্রলোক (লোকটাকে ভদ্র বলা যায় কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে) বলেন, জুয়া যদি বন্ধ না-ই করা যায়, তাহলে দেখতে হবে তা থেকে মুনাফা আদায় করা যায় কি না৷ জুয়া নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক সভায় তাঁর এই মন্তব্য শুনে ঘরভর্তি লোক সম্ভবত হেসে গড়াগড়ি খেয়েছিল৷
এই যে মাথামোটা ও মেদবহুল মানুষগুলো মূর্খের মতো এমন সব কথা বললেন, তাঁদের কাছে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, নিজের কন্যা বা স্ত্রী যদি ধর্ষণের শিকার হন, তাহলেও কি তাঁরা নির্দ্বিধায় উপভোগের পরামর্শ দেবেন?
কী জানি, তাও দিতে পারেন৷ মেয়েদের ব্যাপারে, তা সে কন্যা হোক বা স্ত্রী, অনেক পুরুষেরই কোনো বাড়তি দায়িত্ববোধ নেই৷ পাকিস্তানে যে গর্ভবতী নারী প্রকাশ্যে খুন হলেন, তা ঘটেছে দিনদুপুরে, সারা পাড়ার লোকের চোখের সম্মুখে, আর কাজটা করেছে তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজনই৷ এই পরিবারের পুরুষদের দাবি, পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্যই মেয়েটিকে কোরবানি দেওয়া হলো৷ একটি মেয়েকে, তঁার নিজের স্বাদ-আহ্লাদ বিবেচনায় না এনে, পরিবারের এক কল্পিত সম্মানের কথা মাথা রেখে হত্যার মতো দণ্ড দিতে হলো৷ এমন হত্যাকাণ্ডে সম্মানের কী আছে?
অবাক কাণ্ড হলো, এমন একটা বর্বর কাণ্ডের পরেও তার সাফাই গাওয়ার লোকের অভাব নেই৷ পুলিশ বলেছে, পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়নি, কেউ একজন রাগের বশে একটা ইট ছুড়ে মারে৷ পুরো ব্যাপারটাই ঘটে খুব দ্রুত ও আকস্মিকভাবে৷ কেউ কেউ আবার উপজাতীয় আচার-আচরণের কথা বলে এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে৷ এমন ব্যাখ্যার অর্থ ঘটনাটি মেনে নেওয়া এবং হাজার বছর ধরে যাতে সে জগদ্দল পাথর মেয়েদের বুকের ওপর বসে থাকে, তা নিশ্চিত করা৷ অপরাধটা মেয়ের, এমন কথাও শোনা গেছে৷ কোনো কোনো পত্রিকা পুলিশের বরাত দিয়ে বলেছে, মেয়েটির নাকি অন্য এক পুরুষের সঙ্গে আগে বিয়ে হয়েছিল৷ সেই বিয়ে বাতিলের আগেই মেয়েটি অন্য এক পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন৷
সোজা কথা, যে যা-ই বলুক, সব দোষ ওই মেয়েরই৷ আমাদের মধ্যযুগীয় মূল্যবোধে মেয়েদের তরফ থেকে পান থেকে চুল খসলেই সম্মানহানি হয়৷ ছেলেদের বেলায় এর চেয়ে ১০ গুণ বেশি অপরাধ করলেও সাত খুন মাফ৷ ফারজানা যে কারণে খুন হলেন, সেই একই কারণে তাঁদের পুত্রসন্তানটিকে বলি দেওয়ার কথা কি কেউ ভাববেন?
মেয়েদের ব্যাপারটা আমরা কতটা উপেক্ষার সঙ্গে দেখি, তার ভালো প্রমাণ নাইজেরিয়ার স্কুলছাত্রী অপহরণের ঘটনাটি৷ দুই মাস হয়ে গেল, এ নিয়ে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া দেশের সরকার খুব একটা কিছু করেনি৷ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সাহায্যের প্রস্তাব করলে প্রথমে তা নিতে অস্বীকার করা হয়৷ এমন একটা বর্বর ঘটনা ঘটে গেল, অথচ অন্য কোনো আফ্রিকান বা মুসলিম দেশে এ নিয়ে উচ্চবাচ্য ওঠেনি৷ সালমান রুশদি একখানা বই লিখলে সে বই না পড়েই কেউ কেউ দাঙ্গা বাধাতে প্রস্তুত, অথচ এমন একটা অপরাধ হয়ে গেল, তা নিয়ে রা নেই৷
এই মুখ বুজে মেনে নেওয়া শুধু অনগ্রসর দেশের সমস্যা নয়৷ ১৯৯০ সালের আগে আমেরিকায় মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিরোধে কোনো ভিন্ন আইন ছিল না৷ আমেরিকার চলতি ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, তখন তিনি সিনেটর বাইডেন, গার্হস্থ্য নিগ্রহসহ মেয়েদের বিরুদ্ধে সব রকম সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি আইন প্রস্তাব করলে তাঁর নিজের দলের লোকেরাই তঁাকে নিরস্ত করতে চেয়েছেন৷ বাইডেনকে এই আইন পাস করতে চার বছর একটানা লড়াই করতে হয়েছে৷ শেষ পর্যন্ত সেই আইন গৃহীত হয় আপসরফার মাধ্যমে৷ সে সময় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘প্রতিবছর কোনো একটা ব্যাধিতে ৩০-৪০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, এমন কথা জানাজানি হলে তা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড হবে৷ আশু ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ আসবে৷ অথচ প্রতিবছর ৩০-৪০ লাখ মেয়ে সহিংসতার শিকার, তাদের ব্যাপারে আমরা বিনা দ্বিধায় মুখ বুজে থাকতে প্রস্তুত৷’
পুরুষেরা মুখ বুজে থাকবে, সেটা স্বাভাবিক৷ মেয়েদের ওপর মালিকানা খাটানো তাদের জন্মসূত্রে পাওয়া অধিকার৷ তাদের বাধ্য না করা হলে সে অধিকার তারা ছাড়বে কেন! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে—ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান তাদের অন্তর্গত—ইতিমধ্যে মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে কঠোর আইন হয়েছে৷ এটা অবশ্যই অগ্রগতি, কিন্তু সে অগ্রগতির কারণ এই নয় যে আমাদের মাতবর পুরুষেরা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠিক করল, না, আজ থেকে আর বউ পেটাব না৷ বস্তুত, এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে মেয়েদের দাবির কারণেই৷ অর্ধশতক ধরে বিশ্বজুড়ে নারী অধিকারের পক্ষে অভাবনীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছে৷ মেয়েরা নিজেরাই সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ভীতির বাতাবরণ উপেক্ষা করে তাতে শরিক হয়েছেন৷ এ থেকেই বোঝা যায়, পরিবর্তন আসে পরিবর্তনের দাবি উঠলে, অন্যথায় নয়৷
অস্বীকার করার উপায় নেই, নারীর সামাজিক মর্যাদার আইনগত স্বীকৃতি মিলেছে৷ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে নারীর সম-অধিকার স্বীকৃত হয়েছে৷ কিন্তু আইন প্রতিপালন না হলে সে আইন বড়জোর এক টুকরা কাগজ, তার বেশি কিছু নয়৷ আমাদের মতো দেশে এখনো যে অহরহ মেয়েদের ওপর হামলা চলছে, তার কারণ সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন থাকলেও সে আইনের প্রতিপালন নেই৷ সে কারণে মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনো বিশ্বজুড়ে একটি সংক্রামক ব্যাধি হয়ে রয়েছে৷
শুধু কাগুজে আইনে মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঠেকানো যাবে না; যে মূল্যবোধের কারণে আমরা মেয়েদের যোগ্য সামাজিক মর্যাদা দিতে অস্বীকার করি অথবা মুখে কুলুপ এঁটে থাকি, আসল লড়াই হলো সেই মূল্যবোধের বিরুদ্ধে৷
১০ জুন ২০১৪, নিউইয়র্ক

হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

মিসর- সকল প্রশংসা নতুন সম্রাটের by রবার্ট ফিস্ক

সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য! ৯৩ শতাংশ। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ। দারুণ, একদম আক্ষরিকভাবে। মিসরের সাধারণ নির্বাচনে এই পরিমাণ ভোট পেয়ে সাবেক ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি আধুনিক আরবের অন্য অবিনাশী দানবদের সঙ্গে একই কাতারে উঠে এলেন: নাসের, সাদাত, মুবারক, হাফেজ আল আসাদ প্রমুখ। ব্যাপারটা এমন হলো যে সিসি আরবের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে অদম্য, সাদ্দাম হোসেনের চেয়ে মাত্র ৭ শতাংশ ভোট কম পেয়েছেন। সাদ্দাম হোসেন ২০০২ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গণভোটে ১০০ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সব প্রশংসা মিসরের সম্রাটের, তিনি যদি বাগদাদের নিষ্ঠুর শাসকের সমকক্ষ নাও হন। কিন্তু পরিসংখ্যান কে অস্বীকার করবেন? কেন মাত্র ৯৩ বছর আগে ব্রিটিশদের আয়োজিত গণভোটে (অবশ্যই জাল ভোট) ফয়সাল ৯৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ইরাকের রাজা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন? তার পর থেকে জনতার সমর্থন পাওয়া আরব নেতাদের জন্য ডালভাতে পরিণত হয়।
মুবারক ২১ বছর আগে ৯৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। সরকারি খাতে সংস্কারের জন্য সাদাত ৯৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোট পান। সাদ্দাম ২০০২ সালে ১০০ শতাংশ ভোট পাওয়ার আগে ১৯৯৩ সালে ৯৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, আর হাফেজ আল আসাদ ১৯৯৯ সালে ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ ভোট পান।
মিসরীয় কর্তৃপক্ষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে এই নির্বাচনে ৪৬ ভাগের কমসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন। যদিও এই মহান ব্যক্তি ভেবেছিলেন ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দেবেন—তার পরও এতে কিছু যায়-আসে না। সিসি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, ৮০ মিলিয়ন ভোটার ভোট দেবেন। সিসির প্রতিদ্বন্দ্বী হামদিন সাবাহি সত্যিকার অর্থেই একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত ব্যক্তি। তিনি মাত্র ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, এটা আসলেই হাস্যকর। সাবাহি প্রকৃত অর্থেই একজন সাহসী ব্যক্তি, তিনি মুবারকের গুন্ডাদের হাতে মার খেয়েছিলেন। তাঁকে জেলেও পোরা হয়েছিল। এটা এক অর্থে সম্মানেরই বিষয়। কিন্তু তিনি কেন ভোটে দাঁড়ালেন, সেটাই ভেবে পাই না।
মোহাম্মদ মুরসির ভাগ্যে কী আছে? তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, ২০১২ সালের নির্বাচনে তিনি ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁকে অনেক বছর কারাভোগ করতে হতে পারে, এমনকি তাঁকে ফাঁসিতেও ঝোলানো হতে পারে। ব্রাদারহুড যদি সব ‘সন্ত্রাসের’ উৎস হয়, তাহলে পশ্চিমারা তাঁর মৃত্যুতে অঝোরধারায় অশ্রু বর্ষণ করবে, যা বাস্তবে কুম্ভীরাশ্রুকেও ছাড়িয়ে যাবে। বিরোধী পক্ষকে দমন করতে নাসেরের কোনো সংশয় ছিল না। আর আজ তাঁর চেয়ে কম ভোট পাওয়া একজন প্রেসিডেন্ট ক্ষমা দাবি করতে পারেন? কিন্তু ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেলে কী ঘটবে?
সৌদি বাদশা ফোন করে সিসিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। হ্যাঁ, সৌদি আরব সারা দুনিয়ায় গণতন্ত্রের এক মূর্ত প্রতীকই বটে। সিসি আবার আবদুল্লাহকে ‘আরবের রাজা’ বলে সম্বোধন করেছেন, একজন মিসরীয়র পক্ষে সৌদি রাজাকে এভাবে প্রশংসা করা সত্যিই অভূতপূর্ব। কিন্তু সৌদি আরবের ডলারে মিসর (ও তাঁর নতুন রাষ্ট্রপতি) যখন ভেসে যাবে, তখন আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তারপর নিশ্চয়ই আরব উপসাগরের অন্য রাজা-বাদশারা সৌদি বাদশার পেছনে দাঁড়িয়ে গাঁইগুঁই করতে থাকবেন। তবে এ কাতারে অবশ্যই কাতার থাকবে না, কারণ এই দেশটি এখনো কারাবন্দী মুরসির পক্ষে।
সিসির সবচেয়ে বড় পশ্চিমা গুণগ্রাহী টনি ব্লেয়ারও তাঁর মন ভোলানো কথা নিয়ে পেছনে পড়ে থাকবেন না। আর ওবামাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবেন না। যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আফগানিস্তানের গত প্রতারণামূলক নির্বাচনে জয়ী হামিদ কারজাইকে অভিনন্দন জানাতে পারেন, তাঁর পক্ষে সিসির ক্ষমতায় আরোহণে মুখে হাসি নিয়ে মিসরের গণতন্ত্রে উত্তরণপর্বকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেওয়া তো কোনো ব্যাপারই না। সিসি ইতিমধ্যে বলেছেন, মিসরীয়দের আরও ২০ বছর গণতন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ফলে এই ‘উত্তরণ’প্রক্রিয়া চোখে পড়ে না। তার পরও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে এসব আজগুবি আশ্বাসবাণীর কমতি নেই।
যেসব তরুণ ও উদারনীতিক ২০১১ সালের বিপ্লবে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এই নির্বাচনে ভোট দেননি। যে ৫০ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি, তাঁরা এঁদেরই অংশ। কিন্তু তাঁদের পরিচয় কেউ ঘেঁটে দেখবেন না। এই মানুষেরা ২০১৩ সালে সিসির ক্যু-তেও সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু সিসির অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, সেটা ভেবে দেখেননি। জনপ্রিয়তা আসলেই একটি পরিবর্তনশীল ব্যাপার।
কায়রোর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নিষ্প্রভ ময়দান তাহরির স্কয়ারে জড়ো হয়ে সিসি–সমর্থকেরা তাঁর বিজয় উদ্যাপন করেছেন। এই সিসি তাঁর পূর্বসূিরকে সামরিক উভ্যুত্থান করে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিয়েছেন। অথচ সিসির নীতি খুবই আবছা: কঠোরতা ও দেশপ্রেম। বিক্ষোভকারীদের বলা হয়েছে, আপনারা পরিবারবর্গকে নিয়ে আসুন। কাজ, পরিবার, পিতৃভূমি—বর্গগুলো কি পরিচিত মনে হয় না?
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন

রবার্ট ফিস্ক: ইংল্যান্ডের দি ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা।

কেন ব্রাজিল কেন আর্জেন্টিনা: কেন নয় by আনিসুল হক

‘মানুষের কাজের দুটো ক্ষেত্র আছে৷ একটা প্রয়োজনের, আর একটা লীলার৷ প্রয়োজনের তাগিদ সমস্তই বাইরের থেকে, অভাবের থেকে; লীলার তাগিদ ভিতর থেকে, ভাবের থেকে৷ বাইরের ফরমাশে এই প্রয়োজনের আসর সরগরম হয়ে ওঠে, ভিতরের ফরমাশে লীলার আসর জমে৷’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, যাত্রীতে৷
রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন, অনেকটা এই রকম একটা কথা—মানুষের উচ্চতা সাড়ে তিন হাত, কিন্তু ঘরবাড়ি সে সাড়ে তিন হাত উঁচু করে বানায় না, আরও বড় করে বানায়৷
তার গানের মধ্যে পাই:
‘রাতের বাসা হয়নি বাঁধা দিনের কাজে ত্রুটি
বিনা কাজের সেবার মাঝে পাইনে আমি ছুটি৷’

মানুষ একটা আশ্চর্য প্রাণী৷ সে কেবল খেয়ে-পরে বাঁচতে চায় না, বিচিত্রভাবে, দারুণভাবে বাঁচে, বর্ণিলভাবে জীবন যাপন করে৷ ‘বিনা কাজে’ ব্যস্ত থাকে, তাই ছুটি পায় না৷ যার সবটা ব্যাখ্যাও হয়তো করা যায় না৷ তেমনি একটা অব্যাখ্যাত ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের মানুষের ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা-ভক্তি৷ প্রতি বিশ্বকাপের সময় পত্রিকায় খবর বের হয়, খেলা দেখতে গিয়ে উত্তেজনায় হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে কোনো ফুটবল-ভক্ত মারা গেছেন, এই বাংলাদেশে৷ প্রিয় দলের পরাজয়ে আত্মহত্যার খবরও আসে৷ ধরা যাক, বাংলাদেশের একজন মানুষ খুলনায় বা যশোরে, টেকনাফে বা তেঁতুলিয়ায় বসে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা, স্পেন কিংবা জার্মানিকে সমর্থন করছেন৷ তাঁর সমর্থিত দলটি জয়লাভ করলে তাঁর কী লাভ? তাঁর বেতন বাড়বে? তাঁর ব্যবসায় মুনাফা হবে? তাঁর ছেলেমেয়ের পরীক্ষার ফল ভালো হবে? কোনোই স্বার্থ নেই৷ কোনো বৈষয়িক লাভ নেই৷ তবু প্রিয় দলটি ভালো করলে মনে হয় এ যেন নিজেরই জয়৷ প্রিয় খেলোয়াড়টি গোল করলে মনে হয় যেন আমিই গোল করে ফেললাম৷ এটা কেন হয়?
একটা ব্যাখ্যা তো নিশ্চয়ই আছে যে বাংলাদেশের মানুষ জয়ের তেষ্টায় আঁকুপাঁকু করছে৷ জীবনের নানা ক্ষেত্রে মার খেতে খেতে আমরা খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরি তাকে, যে আমাদের জয় এনে দিতে পারবে৷ কিন্তু কথাটি কি সর্বক্ষেত্রে সত্য? বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে এই উপমহাদেশের অন্যত্র মাতামাতি দেখা যায়, যেমন দেখা যায় ভারতেও৷ ভারত তো ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জেতা দল৷ তারা কেন বিশ্বকাপ ফুটবল এলে আমাদেরই মতো ঘুম হারাম করে৷ পরের দিন সকালে অফিসে কিংবা ক্লাসে গিয়ে ঝিমায়৷
অন্যের পরিশ্রমে আনা জয় বিনা শ্রমে নিজের ঘরে তুলতে আমরা বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি করি, কথাটা বোধ হয় ঠিক নয়৷ তা না হলে কেন শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া আর রওশন এরশাদ তিনজনই ভক্ত ব্রাজিলের৷ কেন সাকিব আল হাসান আর্জেন্টিনা-অন্তঃপ্রাণ৷ এই দলগুলো তাদের জয় এনে দিতে পারবে বলে? আমার তা মনে হয় না৷ আমরা আসলে ফুটবল-ভক্ত জাতি৷ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যে এই একটা ক্ষেত্রে দারুণ মিল, বিশ্বকাপ ফুটবল এলে এপার বাংলা-ওপার বাংলার মানুষ দিওয়ানা হয়ে যায় এবং ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা এই দুভাগে ভাগ হয়ে পড়ে৷ বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গে যত আর্জেন্টিনা-ভক্ত আছে, আর্জেন্টিনা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নাকি তেমনটা নেই!
বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস ছেয়ে গেছে প্রধানত আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকায়, ব্রাজিলের হলুদে-সবুজে, কোথাও বা উঁকি দিচ্ছে জার্মানির তিনরঙা পতাকা, স্পেন-ইতালির লাল বা নীল৷ কোথাও বা মহাসড়কের ধারে মাইলের পর মাইল নীল-সাদা, কেউ বা তাঁর গোটা বাড়িই রাঙিয়েছেন নীল-সাদায় বা সবুজ-হলুদে৷ একটা মাস কোটি কোটি মানুষ ভুলে থাকবে জাগতিক অন্য সব দুঃখ-বেদনা, চাওয়া-পাওয়া৷ আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের বিদায় নেওয়া মানে বহু বাংলাদেশির বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়া৷
বাংলাদেশ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৬৭৷ আমাদের জীবদ্দশায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে খেলতে পারবে, এই আশা আমি করি না৷ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কাজী সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে এই স্বপ্ন দেখছে৷ ভিশন ২০২২৷ কাতারে বাংলাদেশ খেলবে৷ স্বপ্ন দেখা ভালো৷ ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়৷’ গাছের মগডাল লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়লে অন্তত মাঝ বরাবর ঢিল তো পৌঁছাবেই৷ বাংলাদেশ খেলবে ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপে, এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করা হলে তা হবে খুবই ভালো ব্যাপার৷ আর মাত্র আট বছর৷ হাতে হয়তো পাওয়া যাবে ছয় বছর৷ আমাদের ডাচ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ ২০২২-এর স্বপ্নকে ইতিবাচক বলেই মনে করেন৷ আমার নিজের ধারণা, এখন যাদের বয়স ১০ থেকে ১৬, তাদের নিয়ে কাজ করলে ২০২৬-এ আমরা তার সুফল পেতে পারি৷ তবে সেটা কেবল ১১ জন বা ২২ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে করলে হবে না, জাতি হিসেবেই আমাদের খেলোয়াড়সুলভ হয়ে উঠতে হবে৷ সারা দেশে খেলাধুলার অবকাঠামো দরকার হবে৷ আমাদের অ্যাথলেটিকসে ভালো করতে হবে৷ সে ক্ষেত্রে আমাদের স্কুল-কলেজগুলোয় মাঠ দরকার হবে, পাড়ায় পাড়ায় খোলা জায়গাগুলো ফিরে পেতে হবে৷ দৌড়, ঝাঁপ, সাঁতারে আমাদের চৌকস হয়ে উঠতে হবে৷ আনন্দের জন্য খেলার দিনও ফিরিয়ে আনতে হবে জনপদে জনপদে৷ লাগবে দেশজোড়া খেলোয়াড় উঠে আসার মতো প্রতিযোগিতা৷ স্কুলভিত্তিক প্রতিযোগিতা৷ ক্লাবভিত্তিক প্রতিযোগিতা৷ প্রশিক্ষণ আর প্রণোদনা৷
সেসবের জন্য ভিশন চাই—চাই স্বপ্ন, চাই দূরবর্তী লক্ষ্য আর চাই তা পূরণ করার মতো উদ্যোগ৷ আমরা আসলে খেলুড়ে জাতি নই৷ অপুষ্টি আর স্বাস্থ্যহীনতায় আমাদের শারীরিক বৃদ্ধি ঘটেনি সেইভাবে৷ আমরা হাঁটি না, ঘর হতে আঙিনা যেতে আমাদের দরকার হয় রিকশা৷ যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিকশায় বসে থাকি, রিকশা থেকে নেমে পাঁচ মিনিট হেঁটে গন্তব্যে যাই না৷ আমাদের বাতাসে সিসা, খাদ্যে ফরমালিন, কার্বাইড আর বিষ৷ কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি ৩০ মিলিলিটার ফরমালিন ইনজেকশন হিসেবে নেয়, যাতে শতকরা ৩৭ ভাগ ফরমালডিহাইড আছে, তাহলে তার মৃত্যু হতে পারে৷ তার মানে, মাত্র ১১ মিলিলিটার ফরমালডিহাইডই একজন মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট৷ আর আমরা আমাদের ফলে, মাছে, দুধে, সবজিতে, বরফে নির্বিচারে এই বিষ মেশাচ্ছি৷ এবং তা আমাদের অনন্যোপায়ভাবে গিলতেই হচ্ছে৷ এই দেশ থেকে লড়াকু খেলোয়াড় বেরোবে কোত্থেকে?
তবে আশার কথা হলো, আমাদের সামর্থ্য বাড়ছে৷ আমরা এখন এই দেশে আর্জেন্টিনার মতো দলকে আনার খরচ নির্বাহ করতে পারি৷ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বহু সুযোগ সৃষ্টি করে৷ তবে এর সঙ্গে লাগে ঐতিহ্য, যেটা ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আছে এই উপমহাদেশের৷ আমাদের ফুটবলের ঐতিহ্যও খারাপ নয়৷ ১৯৫০ সালে ভারত জুলে রিমে খেলার জন্য ব্রাজিলে যাওয়ার ডাক পেয়েছিল৷ ‘সি’ গ্রুপে খেলবে তারা, ইতালি, প্যারাগুয়ে, সুইডেনের সঙ্গে৷ ভারত যায়নি৷ প্রচলিত আছে, এবং ওই দলের একজন খেলোয়াড় সাক্ষ্যও দিয়েছেন যে, ভারত যায়নি, কারণ তারা খালি পায়ে খেলার অনুমতি পায়নি৷ হঠাৎ করে জুতা-পায়ে খেললে তারা পারবে না, এই ছিল আশঙ্কা৷ যদিও আনুষ্ঠানিক কারণ ছিল, ব্রাজিলে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলাটা তাদের কাছে খুব বড় কিছু মনে হয়নি, তার চেয়ে বড় মনে হয়েছিল সেখানে যাওয়ার খরচটা জোগাড় করার ঝক্কি৷ বুঝুন তাহলে অবস্থাটা৷ ১৯৫০ সালে ভারত ব্রাজিলে বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি যাতায়াত খরচ জোগাড়ের ঝামেলার কারণে৷ আর আজকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ দিনের কোন সময়টায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নির্ধারণ করার সময় মাথায় রাখা হয়, ভারতের মানুষ কখন টেলিভিশনের সামনে বসতে পারবে৷ কারণ, ভারতের ক্রিকেটের পেছনে আছে টাকা৷
বাংলাদেশ নানা দিক দিয়েই এগোচ্ছে৷ পঁুজি গড়ে ওঠার কালে যে নৈরাজ্য, যে লুটপাট দেখা যায় দেশে দেশে, ঐতিহাসিক কারণেই, তার ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি৷ আমাদের গণতন্ত্র দুর্বল, বিরোধী দলকে নাকি ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, আমাদের জবাবদিহির সংস্কৃতি নেই, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছে৷ ভাঙা হাঁড়িকুড়ি বেচতেন যাঁর বাবা, তিনি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে লোপাট করে দেন৷ আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্য ভাড়ায় খুন করেন এবং একজনকে মারতে গিয়ে সাতজনকে মেরে ফেলেন৷ আমাদের নেতারা প্রকাশ্য ঘোষণা দেন তার পাশে দাঁড়ানোর, যার নাম শুনলে মানুষের কলজে কেঁপে ওঠে৷ কিন্তু তার পরও দেশের উন্নতি অব্যাহত আছে, মানুষ তার সৃজনশীলতা দিয়ে জীবনের নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তার মাধ্যমে এগিয়ে নিচ্ছে দেশকেই৷ আমাদের আর্থিক সংগতি বাড়ছে৷ ১৯৭২-৭৩ সালে তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিলেন, সেখান থেকে এবারের বাজেট দুই লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা৷ কাজেই আমরা কেবল খেয়ে-পরে বাঁচব তা-ই নয়, আমরা আনন্দের সঙ্গে বাঁচব, আমরা গাইব, খেলব, আঁকব, রচনা করব, নির্মাণ করব, সুন্দর করে তুলব নিজেকে ও চারপাশকে৷
বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের সেই সুন্দরভাবে, আনন্দপূর্ণভাবে বাঁচার একটা উপলক্ষ দেয়৷ যা কোনো কাজে লাগে না, তা-ই তো শিল্প৷ বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রিয় দলের বিজয়ের আনন্দ, পরাজয়ের দুঃখ আমাদের কোনো পার্থিব প্রয়োজনে লাগে না, সে কারণেই ফুটবল সম্ভোগ হলো শিল্পের সম্ভোগ৷ শিল্প হলো মানুষের মহত্তম আচার, মহত্তম প্রকাশ৷ শিল্পের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নাকি কবিতা৷ আর বলা হয়, শিল্পের সঙ্গে যদি খেলাকে তুলনা করা যায়, তাহলে ফুটবল হলো কবিতা৷
ফুটবলকে আমরা গণতান্ত্রিক খেলাও বলি৷ ফুটবল খেলতে সরঞ্জাম কিছুই লাগে না, একটা কাঠের টুকরা, একটা দেশলাইয়ের বাক্স হলেই হলো৷ কিন্তু ফুটবলে প্রতিপক্ষ লাগে৷ গণতন্ত্রেও বিরোধী দল লাগে৷ সেই কথাটা যেন আমরা ভুলে না যাই, ঘরে এবং বাইরে৷ আমাদের ঘরে-বাইরে ব্রাজিল থাকলে তাই আর্জেন্টিনা লাগে, মোহামেডান থাকলে লাগে আবাহনী, বার্সেলোনা থাকলে এসে পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ৷ তেমনি সরকার থাকলে বিরোধী দল লাগবে৷ একইভাবে আমরা যখন নিজের ঘরে বসে বিশ্বকাপ দেখি, তখন ব্রাজিল-ভক্তটি পাশের আর্জেন্টিনা-ভক্তটির সঙ্গে মনে মনে হলেও লড়াইয়ে মাতেন৷ এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো দোষ নেই৷ এটা খেলারই অংশ মাত্র৷ কিন্তু ফুটবলে যেমন প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করতে চাওয়ার নিয়ম নেই, দরকার হয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এবং নিয়মকানুন মানানোর জন্য রেফারি, গণতন্ত্রেও দরকার আইনের শাসন, দরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ, দক্ষ প্রশাসন, অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম৷ কিন্তু সবার আগে দরকার খেলোয়াড়ি মনোভাব, কিংবা গণতান্ত্রিক মানসিকতা৷ আমাদের যে সেটারই বড় অভাব৷

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

প্রেসিডেন্ট সিসির বন্ধু সমাচার! by কামাল আহমেদ

কায়রোতে আমার এক বন্ধুর গাড়িচালক, ইসমাতের বিবেচনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ একজন ভালো মানুষ৷ ইসমাত রাষ্ট্রপতি হামিদকে চেনেন না, দেখেননি, তাঁর সম্পর্কে যে খুব একটা জানেন, সেই সম্ভাবনাও শূন্য৷ গত শনিবার তিনি যে রাষ্ট্রপতি হামিদের প্রশংসা করলেন, তার একমাত্র কারণ ফিল্ড মার্শাল আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসিকে পাঠানো তাঁর অভিনন্দনবার্তা৷ মাত্র বছর খানেক আগে পূর্বসূরি ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উৎখাতকারী সাবেক এই সেনাপ্রধান গণতান্ত্রিক বিশ্বকে এতটাই অপ্রস্তুত ও বিব্রত করেছিলেন যে মিসরের পরীিক্ষত বন্ধু পাশ্চাত্যের দেশগুলো সেই পালাবদলকে সেনা-অভ্যুত্থান হিসেবেই চিহ্নিত করেছিল৷ ফলে কূটনৈতিক পরিসরে সিসি কিছুটা একঘরে হয়ে ছিলেন৷ সুতরাং, তাঁর নির্বাচনী সাফল্যেও গণতান্ত্রিক বিশ্বে বন্ধু খুঁজে পেতে তাঁকে কিছুটা যে বেগ পেতে হবে, সেটা মোটামুটি সবাই জানেন৷ বাংলাদেশ এ রকম একজন বিপন্ন নেতার পাশে এগিয়ে আসায় স্বভাবতই তাঁর সমর্থকেরা খুশি৷ আর সেই উচ্ছ্বাসের প্রতিফলনই হলো রাষ্ট্রপতি হামিদের প্রশংসা৷

ষাটোর্ধ্ব ইসমাত কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং ফিল্ড মার্শাল সিসি এখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হননি বা কোনো দলের সঙ্গে প্রকাশ্য কোনো বোঝাপড়ায় পেঁৗছাননি৷ ইসমাত ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন সাবেক সৈনিক৷ মিসরের বিশাল সেনাবাহিনী এবং অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তাঁর কয়েক দশকের প্রাধান্যের প্রত্যক্ষ প্রভাব হচ্ছে, প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত৷ সিসির প্রতি ইসমাতের অগাধ আস্থা৷ তাঁর বিশ্বাস, মিসরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতিকে সচল করার কাজটি একমাত্র সিসির পক্ষেই সম্ভব৷
ইসমাতের এই মতামত মোটেও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়৷ টুর গাইডের কাজ করেন চটপটে এক তরুণী ইমান৷ তিনি হিজাব পরেন, নামাজের সময় হলে একটু বিরতি চেয়ে নিয়ে সময়মতো নামাজ পড়েন৷ ইমানের কথায়ও পাওয়া গেল আল-সিসির প্রতি আস্থার প্রতিফলন৷ রাজনীতিকদের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ এই তরুণী৷ তাঁর বিশ্বাস, মিসরের প্রয়োজন দৃঢ় নেতৃত্ব৷ আসলে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যেই এই আশাবাদের আভাস দেখা গেল৷ পর্যটকদের কাছে প্রিয় কায়রোর আল-আজহার মসজিদের কাছে খান এ খলিলি নামের বাণিজ্যিক এলাকায় এক দোকানি আহমদের কথায়, পর্যটনশিল্পে কিছুদিন ধরে যে ধস নেমেছে, তা অনেককেই পথে বসিয়েছে৷ সুতরাং, সিসির ক্ষমতারোহণে তাঁরা দিনবদলের সম্ভাবনা দেখছেন৷ মানুষ যে শক্তির পূজারি, সে কথারই এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত সাধারণ মিসরীয়দের সিসিপ্রীতি৷
নিতান্তই ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১ জুন আমি নয় দিনের জন্য মিসরে আসি৷ ৪ জুন নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর রাত ১২টার সময়ও মানুষকে সপরিবারে রাজপথে উল্লাস করতে দেখে আমি যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি৷ এর পর থেকে যাঁর কাছেই এর ব্যাখ্যা চেয়েছি, তাঁরাই বলেছেন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কথা৷ তাঁদের বিশ্বাস, সেনাবাহিনী ও সাবেক সেনাপতি আল-সিসি ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না৷
মোবারক-উত্তর মিসরের সবচেয়ে সংগঠিত রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ১১ মাসে আনুমানিক এক হাজার ৪০০ বিক্ষোভকারীকে হত্যা এবং প্রায় ১৫ হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে কারান্তরীণ করার মাধ্যমে তিনি তাঁর বেপরোয়া দৃঢ়তার প্রমাণ রেখেছেন৷ পরীক্ষিত বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা স্থগিতের সিদ্ধান্ত এবং পাশ্চাত্যের আরও শতকোটি ডলারের অনুদান ও ঋণ আটকে যাওয়ার পরও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে একটুও পিছপা হননি৷ সেনাপ্রধান হিসেবে যে অঙ্ক কষে রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এগিয়েছেন, তাতে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন না পেলেও সেনাবাহিনীর আনুগত্য অটুট রেখেছেন৷ প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অসম নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহী করতে ব্যর্থ হলেও প্রেসিডেন্ট সিসির অভিষেক উদ্যাপনে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ইঙ্গিত মেলে, একনায়কতান্ত্রিক শাসনে মিসরীয়দের অভ্যস্ততা এখনো কাটেনি৷ রাস্তায় রাস্তায় তাই নানা ব্যানারে গামাল আবদেল নাসের ও আনোয়ার সাদাতের পাশে সিসির ছবি টাঙানো হয়েছে৷ তাঁরা হয়তো নাসের ও সাদাতের মতো একনায়কই দেখতে চান সিসির মধ্যে৷ কেননা, নাসের ও সাদাত তাঁদের কাছে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক৷
অন্যদিকে, সিসি বিশ্বরাজনীতিতে আরব অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছেন শতকরা ১০০ ভাগ৷ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের কাছ থেকে প্রায় নিঃশর্ত সমর্থন আদায় করে নিয়েছেন৷ শতকোটি ডলারের ঋণ, অনুদান ও অবিশ্বাস্য রকম সস্তা দরে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন৷ ফলে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক মোড়লদের চাপ কোনো কাজে আসেনি৷ সিসির শপথ অনুষ্ঠানে তাই অংশ নিতে এসেছেন সৌদি যুবরাজ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতসহ আরব ও আফ্রিকার মিত্র রাজনীতিকেরা৷ বিপরীতে মুরসি ও ব্রাদারহুডের নির্বাচিত সরকারকে সমর্থনের কারণে কাতারকে আমন্ত্রণ পর্যন্ত করা হয়নি৷ যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো নিম্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি বা কূটনীতিক পাঠিয়ে মুখরক্ষা করেছে৷ সে কারণেই ইসমাতের কাছে সৌদি বাদশা ভালো মানুষ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হামিদ ভালো মানুষ৷ তাঁর কাছে প্রেসিডেন্ট ওবামা বা কাতারের আমির আল থানি মিসরের বন্ধু নন৷
তবে নির্বাচনের পর এখন পাশ্চাত্যের নেতাদের সুর বদলাতে শুরু করেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে৷ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান প্রেসিডেন্ট সিসিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন৷ উইলিয়াম হেগ অবশ্য তাঁর বিবৃতিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিসরের সংবিধানে বিধৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন৷ তবে এতে করে ক্ষুব্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডের আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রধান ইব্রাহিম মুনির অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাজ্য এই অভিনন্দনবার্তার মাধ্যমে সামরিক অভ্যুত্থানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে৷ প্রেসিডেন্ট সিসির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির ইঙ্গিতটি এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তরফ থেকে৷ তারা মিসরের অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ঋণ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে৷ এরও আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিসরের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়৷ এমনকি, এ বছরের আরও আগের দিকে নতুন সংবিধান গণভোটে গৃহীত হওয়ার বিষয়টিকে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছে৷ নতুন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করে পার্লামেন্টের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টাই ইউরোপীয়দের উৎসাহের কারণ৷ এগুলোকে আলামত হিসেবে গণ্য করলে এই অনুমান অন্যায় হবে না যে গণতন্ত্রের প্রবক্তা পাশ্চাত্যের দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশে রাজনৈতিক দলাদলি বা সংঘাতে পীড়িত কোনো রাষ্ট্রে সামরিক হস্তক্ষেপকে মেনে নেওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে৷ আর দলাদলিপীড়িত দেশটিতে যদি ইসলামি জঙ্গিবাদের হুমকির কোনো আছর থাকে, তাহলে তো কথাই নেই৷
অনেকের অবশ্য আশঙ্কা যে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট আল-সিসি ডিক্রি জারির মাধ্যমে নিজের হাতে বাড়তি ক্ষমতা তুলে নেবেন এবং ভবিষ্যৎ পার্লামেন্টের ক্ষমতা খর্ব করবেন (বাংলাদেশের সাবেক দুই সেনাশাসকের অভিজ্ঞতা থেকে সিসি অবশ্য কোনো শিক্ষা নিয়ে থাকলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না)৷ এ ধরনের ডিক্রি জারির ক্ষেত্রে তাঁর সামনে কোনো বাধা নেই৷ বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তিগুলো সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ জোরদার করলেই তিনি এ ধরনের কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারেন৷ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসকে তিনি কঠোর হাতে দমন করবেন এবং যঁারা অতীতে সহিংসতার জন্য দায়ী, তাঁদের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংলাপ হবে না৷ দেশটিতে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতার অভিযোগ অনেক দিনের; বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সমালোচনা প্রায় নিষিদ্ধ বললেও খুব একটা ভুল হবে না৷
একদিকে পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাবে ক্ষরণ, অন্যদিকে আরব রাজনীতির মেরুকরণের কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন ধনী দেশগুলোর উদার সমর্থন প্রেসিডেন্ট আল-সিসির সরকারের অবস্থানকে যে অনেকটাই সংহত করবে, তাতে সন্দেহ নেই৷ ফলে বিশ্বকে হয়তো আরও একজন মিসরীয় একনায়কের উত্থান প্রত্যক্ষ করতে হবে৷ তবে, মিসরে একজন সেনাপতির রাজনৈতিক উত্থানের এই দৃষ্টান্ত যেন তৃতীয় বিশ্বের অন্য কোনো দেশে অনুসৃত না হয়; যদিও ইতিমধ্যে রাজনীতিকদের লাগামছাড়া বিবাদ আর দলাদলির বলি হয়েছে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্র এবং সেখানেও মুক্তবিশ্বের নেতারা তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম কি না, সন্দেহ৷
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

করাচি হামলার পেছনে কী? by ইমতিয়াজ গুল

রোববার মধ্যরাতে পাকিস্তানের বৃহত্তম করাচি বিমানবন্দরে দুঃসাহসী জঙ্গি হামলায় সবাই স্তব্ধ হয়ে গেছে৷ হতাহতের সংখ্যার দিক থেকে এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যূহের ওপর তালেবানদের সবচেয়ে বড় হামলা। আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠনগুলোই যে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, এই ঘটনা সেটা আবারও প্রমাণ করে দিল। এ হামলায় ১০ জন আক্রমণকারীসহ মোট ৩৬ জন নিহত হয়েছে। যথারীতি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এই হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে। সংগঠনটি বলেছে, তাদের নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ওয়াজিরিস্তানের নির্দোষ ও অসহায় আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে।

সংগঠনটি বলেছে, এই হামলা সেই সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণের বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা। সংগঠনটির নিজস্ব ফেসবুক পাতায় এই হামলার প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে টিটিপি: প্রথমত, এই বিমানবন্দর থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মুজাহিদদের যুদ্ধে রসদ সরবরাহ করা হয় আর দ্বিতীয়ত, করাচি বন্দর থেকে আফগানিস্তান অভিমুখী মার্কিন-ন্যাটো কার্গো পরিচালনা করা হয়৷
সম্প্রতি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় সংগঠনটি নতুন করে নিরাপত্তা ও কৌশলগত ক্ষেত্রে হামলা চালানো শুরু করেছে। পাকিস্তানের সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের শর্তগুলো গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় এই আলোচনা ভেস্তে যায়। সংগঠনটি দাবি করে, সর্বস্তরে শরিয়াহ আইন প্রবর্তন ও আদিবাসী অঞ্চল থেকে নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে। আর তাদের নিজেদের জন্য একটি শান্তি অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে। আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ওয়াজিরিস্তানের আইএমইউ ও চীনা উইঘুরদের গোপন ডেরায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। অথচ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান সেখানে এদের সামাজিক নিরাপত্তা দিয়েছিল।
ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম) উইঘুর মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। তারা স্বাধীন ঝিনজিয়াংয়ের দাবিতে আন্দোলন করছে। সংগঠনটি পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে চীনা স্বার্থের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
পাকিস্তানের অনেকেই মনে করেন, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের নেতৃত্বে পরিচালিত জঙ্গি হামলা ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার চলমান প্রক্সি যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার তেহরিক-ই-তালেবানকে ভারতের প্রক্সি হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, ভারত ও আফগানিস্তানের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে পাকিস্তানের প্রক্সি মনে করে।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান সে দেশে জঙ্গি হামলার পেছনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করছে। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দলের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে ২০০৯ সালে দুঃসাহসী জঙ্গি হামলা হয়৷ এরপর দুনিয়ার সব জাতীয় ক্রিকেট দলই পাকিস্তান সফরে আপত্তি জানায়। ফলে, পাকিস্তানের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়ে যায়। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল তালাত মাসুদের মতে, এর মানে হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোকে এই বার্তা দেওয়া যে তোমরা এখানে এসো না।
কথা হচ্ছে, এরূপ ঘটনা পাকিস্তানেই এটাই প্রথম নয়। এর আগে এই সংগঠনটি ২০১১ সালে করাচির নৌবাহিনীর বিমানঘাঁটি পিএনএস মেহরানে হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করে। তারপর ২০১২ সালে রাজধানী ইসলামাবাদের ৭০ কিলোমিটার উত্তরে কামরা বিমানঘাঁটিতে হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে। সংগঠনটি বলেছে, এসব হামলা ছিল অ্যাবোটাবাদে মার্কিন হামলায় ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর প্রতিশোধ।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান এই হামলা একা একা করেনি। ঘরের শত্রুর সহায়তা ছাড়া এ ধরনের পরিকল্পিত হামলা চালানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমোডর জামাল হুসেন। এটা পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। একই সঙ্গে এ হামলায় এটা প্রমাণিত হলো যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ফাঁক রয়ে গেছে। এত সংখ্যক আক্রমণকারী কীভাবে জড়ো হয়ে হামলা করল, এটা সত্যি বিস্ময়ের ব্যাপার। ফলে, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের সমন্বয় আরও দৃঢ় হওয়া উচিত বলে মনে করছেন পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
এমনকি এ হামলার সঙ্গে উজবেক জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে মনে করছেন আধা সামরিক বাহিনী রেঞ্জারের প্রধান মেজর জেনারেল রিজওয়ান আখতার। মৃত জঙ্গিদের চেহারা দেখে তিনি সে রকমই মনে করছেন। তবে ডিএনএ পরীক্ষার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না।
ইসলামিক মুভমেন্ট অব উজবেকিস্তানের (আইএমইউ) সঙ্গে টিটিপির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এরা উজবেকিস্তানে সাজা এড়িয়ে পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকা ওয়াজিরিস্তানে ঘাঁটি গেড়েছে, ২০১১ সালে তালেবানরা পরাজিত হওয়ার পর তারা সেখানে আসে। বিশেষ করে, দলটির নেতা তাহরির ইউলদাসেভ ২০০৯ সালে ড্রোন হামলায় নিহত হলে এরা তালেবানদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার পর থেকে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, আর তারা এদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে। পাকিস্তানে বসবাস করার ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা বাহিনীই তাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা, এতে কোনোই সন্দেহ নেই।
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
ইমতিয়াজ গুল: পাকিস্তানের ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক।

মিসরের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিসি by কামাল গাবালা

মিসরের সাবেক সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি গত সপ্তাহের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তাহরির ও ইত্তেহাদায় জনতার সঙ্গে উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা বোধ করছি না। ২৫ জানুয়ারির অভ্যুত্থানের পর এবারই প্রথম এরূপ অনুভূতি হচ্ছে। প্রথমত, এটা পরিষ্কার করতে চাই যে ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর আমি আমার দেশবাসীর সঙ্গে তাহরির স্কয়ারে জড়ো হয়ে তাঁর পতন উদ্যাপন করেছি। মোবারকের পর যে সামরিক কাউন্সিল দেশ শাসন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছি। আমি মুরসিকে ভোট দিইনি। কিন্তু তিনি ২০১২ সালের নির্বাচনে মোবারকের শেষ প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিককে পরাজিত করলে আমি তাহরির স্কয়ারে তাঁর বিজয় উদ্যাপন করেছি। আশা ছিল, মুরসি একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন। শফিক মূলত আগের জামানারই প্রতিনিধি ছিলেন। মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর আমি আবার তাহরির স্কয়ারে তাঁর পতনের দাবিতে আন্দোলন করেছি। গত বছর জুনে যে আন্দোলনের ফলে তাঁর পতন হয়, সেখানেও আমি ছিলাম।
এবার উদযাপনে অংশ নিতে আমি এতটা আগ্রহী নই কেন? পরাজিত প্রার্থী হামদিন সাবাহির সমর্থক ছিলাম বলে? অথবা সিসির বিজয় যাঁরা উদযাপন করছেন, তাঁরা কালো তালিকাভুক্ত ছিলেন এবং এই বিপ্লবী চত্বরে তাঁদের প্রবেশ নিষেধ ছিল এবং তাঁরাও মোবারকের অপরাধের ভাগীদার ছিলেন, এ কারণে।

মিসরে মোবারকের জামানার নীতি ফিরে আসবে না, এটা বোঝাতে সিসি একটি কুয়েতি পত্রিকাকে বলেছেন, ঘড়ির কাঁটা কখনোই পেছনের দিকে যাবে না আর জনগণের সব অংশ, বিশেষ করে তরুণদের তিনি তাঁর পাশে দেখতে চান। কিন্তু নেহাত এ রকম একটি বক্তব্য আমার মতো মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে না। আর আমিও তাঁর বিজয় উদযাপন করতে পারি না।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ফারুক গোয়েদা এই বিজয় উদ্যাপনের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে তাঁর সাপ্তাহিক কলামে বলেছেন, ‘দুর্নীতিবাজ ও নিপীড়ক হোসনি মোবারকের জামানার সহযোগীরা ফেরত আসুক, এটা কাম্য নয়। রাজপথের আন্দোলন ও সংবাদমাধ্যম, কোথাও এমন ভাব দেখালে চলবে না যে কিছুই হয়নি। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখন সম্মান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলছেন।’
গোয়েদা আরও বলেছেন, পুরোনো উপাদানসমূহের এই বিরক্তিকর প্রত্যাবর্তনের জন্য দুটি বিপ্লব বা দুজন প্রেসিডেন্টের পতনের প্রয়োজন ছিল কী—এই প্রশ্ন এখন মানুষের মনে সৃষ্টি হয়েছে।
এই বহুল পঠিত কলামে এই বিশিষ্ট চিন্তক বলেছেন, মোবারকের প্রতীকধারী মানুষদের উচিত ছিল লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলা। কিন্তু দেখা গেল, তাঁরা নির্বাচনের আগের কয়েকটা দিনে সংবাদমাধ্যম ও জনতার মধ্যে স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। মিসরের জনগণ দুবার রাস্তায় নেমে দুজন স্বৈরশাসককে হটিয়েছেন। মোবারকের এই সহযোগীদের প্রত্যাবর্তন মিসরের এই লড়াকু মানুষদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বিদেশি সংবাদমাধ্যমও গত সপ্তাহের নির্বাচনের ব্যাপারে খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। জাপানি ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো মিসরে স্বৈরতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনবিষয়ক উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছে। দ্য গার্ডিয়ান ভালো কথা বলেছে, তাদের ভাষ্য মতে, ২০১১ সাল থেকে কয়েক দফা বিদ্রোহের পর মিসরে আবার একজন জেনারেল ক্ষমতায় এসেছেন, এতে মিসর আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ রবার্ট ফিস্ক বলেছেন, মিসরীয়রা মোবারকের দস্যুদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে নিজেদের আত্মমর্যাদার জন্য লড়াই করেছেন, কিন্তু এখন তাঁরা মোবারকের মতোই একজন স্বৈরশাসককে ফিরিয়ে আনার দাবি করছেন।
ফিস্ক বলেছেন, সিসির একজন সমর্থকের হাতে একটি ব্যানারে লেখা ছিল এ রকম: মিসর রাষ্ট্রের পুনরুদ্ধারের পথ। তিনি বলেছেন, এই ব্যানার ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবোত্তর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভাষণ ও তাঁর পরবর্তীকালের রক্তস্নানের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সিসির বিজয়ের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যে নেতিবাচক মন্তব্য করছে, দি ইকোনমিস্ট-এর একটি নিবন্ধ থেকে এর সারাংশ নেওয়া যায়। পত্রিকাটিতে বলা হয়েছে, মিসর স্বৈরতান্ত্রিক একনায়ককে বেসামরিক মোড়কে ঢেকে দিচ্ছে। অন্য বিদেশি পত্রিকাগুলোতেও একই রকম কথা বলা হচ্ছে। অনেক পত্রিকা এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয় অবস্থানের সমালোচনা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি মোবারকের আমল ফিরে আসুক, এমনটা প্রত্যাশা করছে বলে বলা হয়েছে।
এসব সত্ত্বেও এটা ঠিক যে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে সাবেক সেনাপ্রধানের বিজয় উদ্যাপন করছে। নির্বাচনে সিসির ভূমিধস
বিজয় হয়েছে, যেখানে তিনি ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন।
সিসির নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ২০১৩ সালে গণবিক্ষোভের মুখে মুরসির সরকারকে উৎখাত করে। সে সময়ই সিসি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
মুরসির উৎখাতের পর সিসি মিসরীয়দের স্কয়ারে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাঁর ও সেনাবাহিনীর ওপর দেশটির শাসনভার অর্পণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। লক্ষ্য হচ্ছে, ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা’। তারপর ইসলামি প্রেসিডেন্টের সমর্থনে আয়োজিত দুটি অবস্থান ধর্মঘট ছত্রভঙ্গ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
যদিও সিসি বলেছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন না, তিনি শেষ পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বলেন, জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা উচিত। তাঁর ঘোষণার পর নতুন সংবিধানের প্রতি ব্যাপক সমর্থন গড়ে
ওঠে। মুরসির সংবিধানকে বাতিল করে যেটা প্রণয়ন করা হয়েছিল।
জনমতের দাবির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে তিনি যখন সামরিক উর্দি ছেড়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন, তখন অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীও তাঁকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন। হামদিন সাবাহি না থাকলে সাবেক এই সেনাপ্রধান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেন।
সাবাহি শুরুতে নির্বাচন করতে ইতস্তত করেছিলেন, তাঁর অনেক সাবেক সমর্থক সিসির প্রতি সমর্থন জানালে তিনি নির্বাচন করতে অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু বিপ্লবী তরুণেরা তাঁকে সমর্থন দেন এবং তাঁদের পছন্দের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে নির্বাচন করতে উৎসাহ দেন।
সাবাহিকে ব্যবসায়ীরা সমর্থন করেননি। সরকারি ও বেসরকারি সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমর্থনও তিনি পাননি। আর অন্য বিরোধীরাও সিসিকে সমর্থন দেন। এসব কারণে সাবাহির পরাজয় প্রত্যাশিত ছিল, সেটা অবশ্যম্ভাবী না হলেও।
সাবাহি বলেছেন, জনমতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে, এ প্রত্যয় তিনি বারবার ব্যক্ত করেছেন। এমনকি তিনি সিসিকে বিজয় অভিনন্দনও জানিয়েছেন। তবে নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশ আইন লঙ্ঘন করেছে বলে তাঁর প্রচারণায় অভিযোগ করা হয়।
শেষ বিচারে, সিসি প্রেসিডেন্টের আসন অলংকৃত করতে এগিয়ে গেলেও তাঁর জন্য ফুলের শয্যা সাজিয়ে কেউ বসে নেই। তাঁর সামনে বন্ধুর পথ। বিশেষত, তাঁর দুজন পূর্বসূরি জেলে থাকায় একই ভাগ্যবরণ এড়াতে তাঁকে সচেষ্ট হতে হবে।
সিসি কি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তাঁর লক্ষ্যে কামিয়াব হতে পারবেন, গামাল আবদুল নাসেরের মতো ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারবেন? নাকি তাঁর পূর্বসূরিদের মতো শোচনীয় ভাগ্য বরণ করবেন? ঈশ্বর ক্ষমা করুন।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট; ইংরেজি থেকে অনূদিত

কামাল গাবালা: মিসরের আল আহরাম পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক৷