Thursday, January 8, 2026

ইয়েমেনের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ, সৌদি হামলা অব্যাহত

সৌদি নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সামরিক জোট আজ বুধবার ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমের ঢালে প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। ১৫টির বেশি বিমান হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। ঢালে প্রদেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আইদারোস আল-জুবাইদির জন্মস্থান। এর আগে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক মহল স্বীকৃত সরকার প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি) আল-জুবাইদিকে বরখাস্ত করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনে।

আমিরাত একটা সময় পর্যন্ত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অংশ ছিল। কিন্তু পরে আমিরাত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের শরিক সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি) আলাদা করা সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহ দিতে শুরু করে। এটা নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে আমিরাতের দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে (এসটিসি) গত মাসে সৌদি সীমান্তবর্তী হাজরামাওত এবং এর পার্শ্ববর্তী মাহারা প্রদেশের কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। অবশ্য পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও ইয়েমেনের মিত্র বাহিনী এসটিসির অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দেয়।

এই পরিস্থিতিতে বুধবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এক শান্তি আলোচনায় আইদারুস আল-জুবাইদির উপস্থিত থাকার কথা ছিল; কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত সেখানে যাননি।

সৌদি জোট জানায়, আল–জুবাইদি আলোচনায় যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ঢালে প্রদেশে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়। একই সময়ে বড় ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে আল–জুবাইদিকে বরখাস্তের ঘোষণা দেয় পিএলসি।

কয়েক সপ্তাহ ধরে এডেন এবং এর আশপাশের অঞ্চলে এসটিসি এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে সহিংসতা বেড়েছে। এডেন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সদর দপ্তর। ২০১৪ সালে বিদ্রোহী হুতিদের কাছে রাজধানী সানা হারানোর পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকার এডেনে নিজেদের সদর দপ্তর সরিয়ে নেয়।

সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালিকি দাবি করেন, আল–জুবাইদি ‘অজানা স্থানে পালিয়ে গেছেন। এর আগে তিনি এডেনে নিজের অনুগত কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিতরণ করেছেন।’ জোটের দাবি, আল-জুবাইদি যাতে সংঘাত বাড়াতে না পারেন এবং সংঘাত ঢালে প্রদেশে ছড়িয়ে না পড়ে, এ জন্য সেখানে হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে ২০১৫ সালে গঠিত সামরিক জোটটি থেকে আমিরাত নিজেদের প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এসটিসির একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, আল-জুবাইদি রিয়াদে যাওয়া প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যোগ দিতে চাননি। কারণ, তিনি জানেন, তাঁকে তাঁর সংগঠন ভেঙে ফেলতে বলা হবে, যা পিএলসির অংশ।

পরে এসটিসি জানায়, রিয়াদে যাওয়া প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এটা নিয়ে তাঁরা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। তারা বলেছে, আল-জুবাইদি ‘তাঁর দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন’ এবং সৌদি জোটকে বিমান হামলা বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাঁরা আলোচনা চালু চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। প্রসঙ্গত, আল-জুবাইদি এসটিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট। বরখাস্ত করার আগে তিনি পিএলসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন।

সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈঠকে ৫৪তম বার্ষিক সম্মেলনে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ১৭ জানুয়ারি ২০২৪
সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈঠকে ৫৪তম বার্ষিক সম্মেলনে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ১৭ জানুয়ারি ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

তালেবান শাসিত আফগানিস্তান রাষ্ট্রহীন একক্ষমতা ব্যবস্থা

কাবুলে তালেবানের পুনরাগমনের চার বছরেরও বেশি সময় পর আফগানিস্তান আজ এক অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরীক্ষা মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এটি এমন এক শাসনব্যবস্থা, যা ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। কিন্তু এখনো কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামোয় রূপ নিতে পারেনি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিমের সর্বশেষ মূল্যায়ন তালেবান শাসনের এই কেন্দ্রীয় বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। সম্পূর্ণ আদর্শগত নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস শীর্ষ স্তরে কর্তৃত্বকে শক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিয়েছে। অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন দূরদানা নাজম। তিনি আরও লিখেছেন, এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। তার হাতে ক্ষমতার নজিরবিহীন কেন্দ্রীভবন ঘটেছে। আধুনিক স্বৈরশাসকদের মতো তিনি রাজনৈতিক দল, সেনাবাহিনী বা প্রযুক্তিবিদকেন্দ্রিক আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করেন না; বরং তার শাসন টিকে আছে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ওপর। তার নেতৃত্বের ধরন হলো সচেতনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করা। কাবুল নয়, কান্দাহারই শাসনকেন্দ্র- যেখানে বৈধতা আসে প্রশাসনিক দক্ষতা বা গণসমর্থন থেকে নয়, বরং ধর্মীয় ফতোয়া থেকে।

এই পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদে ঐক্য এনেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তৈরি করেছে ভঙ্গুরতা। কেন্দ্রীভবন প্রকাশ্য বিরোধিতা কমিয়েছে ঠিকই। কিন্তু নীতি উদ্ভাবনকে করে তুলেছে পঙ্গু। মন্ত্রণালয়গুলো নীতিনির্মাতা নয়, বরং আদেশ বাস্তবায়নকারী দপ্তর। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এমন এক পরিবেশে বন্দি, যেখানে বিতর্ক মানে অবাধ্যতা, আর ভিন্নমত মানে ধর্মচ্যুতি। ফলে শাসনব্যবস্থা হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল, কাঠিন্যপূর্ণ ও অস্বচ্ছ। তালেবানের অভ্যন্তরীণ কাঠামো এই চিত্রকে আরও জটিল করে। উপরিতলে ঐক্যের প্রদর্শন থাকলেও, বাস্তবে ক্ষমতা বিভক্ত। কান্দাহারকেন্দ্রিক আলেমেরা আদর্শিক দিকনির্দেশনা দেন, অন্যদিকে হাক্কানি নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা ইস্যুতে স্বাধীন প্রভাব বজায় রেখেছে। এতে আপাত ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হলেও, একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে দ্বৈত ব্যবস্থা- কাগজে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, বাস্তবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। উত্তরাধিকারী ঠিক করার সুস্পষ্ট কাঠামো না থাকায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব টিকে থাকে যতদিন সেই ব্যক্তি আছেন। কিন্তু পরিবর্তনের মুহূর্তে এমন আন্দোলনগুলোই সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়।
তালেবান শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখা যায় নিজেদের ভেতর মতভিন্নতা মোকাবিলায়। ধর্মীয় আলেম ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষাবিষয়ক নীতিতে প্রশ্ন তুললে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি শুধু রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা নয়; বরং ধর্মীয় ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্য পরিসরকেও সংকুচিত করা। এভাবে অভ্যন্তরীণ ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক অপরাধে রূপ নিলে আফগান ধর্মীয় ঐতিহ্যের বহুত্ববাদই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। সবচেয়ে বড় আদর্শিক কার্যকারিতা সংঘর্ষ ঘটছে শিক্ষা খাতে। শিক্ষাকে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনে নেয়া হয়েছে। কারণ তালেবান বোঝে, ক্ষমতা গড়ে ওঠে শুধু ভূখণ্ড নয়, ধারণা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও। তবে পাঠ্যসূচি থেকে নাগরিক, আইন, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান সরিয়ে ফেলা হলো এক ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে ভবিষ্যৎ প্রশাসন, বাজার ও কূটনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাই ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। মেয়েদের শিক্ষাবঞ্চিত রাখা শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংকট। দুর্বল অর্থনীতির দেশে উৎপাদনশক্তির এমন ক্ষতি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকেই ক্ষয় করে। এটি তালেবানের অভ্যন্তরেও মতভেদের রেখা তৈরি করেছে- আদর্শিক কঠোরতা ও সামাজিক বাস্তবতার সংঘাতে।

mzamin

পার্থক্যটা বুঝুন স্যারজি: ট্রাম্পের আক্রমণের পর নিশ্চুপ মোদিকে রাহুলের কটাক্ষ

ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তিনি মোদির বিরুদ্ধে ‘চাপের মুখে আত্মসমর্পণের’ অভিযোগ আনেন। কংগ্রেসের এই নেতা মোদির নেতৃত্বের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বেরও তুলনা করেন।

রাহুল গান্ধীর এমন সময় মোদিকে আক্রমণ করলেন, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, বলেছিলেন—“স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?” আমি বললাম, “হ্যাঁ”।’

ট্রাম্প ভারতের ওপর আরোপিত বিশাল শুল্ক আরোপের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ভারত এখন ‘প্রচুর শুল্ক দিচ্ছে’ এবং রাশিয়ার তেল কেনা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে’।

রাহুল গান্ধী সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক ভিডিও বার্তা শেয়ার করেন, যার ক্যাপশন ছিল—‘ফারাক সমঝিয়ে স্যারজি’ (পার্থক্যটা বুঝুন স্যারজি)।

রাহুল গান্ধী পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি এই বিজেপি-আরএসএসের লোকদের এখন খুব ভালো করে চিনি। এঁদের ওপর সামান্য চাপ দিন, একটু ধাক্কা দিন, অমনি এঁরা ভয়ে পালিয়ে যান। ওখান থেকে ট্রাম্প সংকেত দেওয়া মাত্রই তারা ফোন তুলে বলল, “মোদিজি আপনি কী করছেন?” অমনি নরেন্দ্র মোদি আত্মসমর্পণ করলেন এবং “ইয়েস স্যার” বলে ট্রাম্পের সংকেত অনুসরণ করলেন।’

১৯৭১ সালের যুদ্ধের (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যদিও গান্ধী সেটা উল্লেখ করেননি) সঙ্গে তুলনা করে রাহুল গান্ধী লিখেছেন, একসময় মার্কিন চাপ সত্ত্বেও ভারত মাথা নত করেনি।

পোস্টে রাহুল আরও লিখেছেন, ‘আপনাদের হয়তো সেই সময়ের কথা মনে আছে, যখন কোনো ফোন আসেনি—বরং সপ্তম নৌবহর এসেছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে সপ্তম নৌবহর এল, অস্ত্রশস্ত্র এল, রণতরি এল। ইন্দিরা গান্ধীজি তখন বলেছিলেন, “আমাকে যা করতে হবে আমি তা–ই করব।” এটাই হলো আসল পার্থক্য।’

ট্রাম্প ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের ওপর মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক সরাসরি রাশিয়ার তেল কেনার শাস্তি হিসেবে আরোপ করা হয়েছে।

ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘মোদির সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। তিনি আমার ওপর খুব একটা খুশি নন। কারণ, তারা এখন প্রচুর শুল্ক দিচ্ছে। তারা এখন আগের মতো তেল কিনছে না—আসলে তারা তেল কেনার পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিয়েছে।’

আগস্ট মাসে আরোপিত এই শুল্কের কারণে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা বাণিজ্য আলোচনা এবং দুই নেতার মধ্যে অন্তত চারবার কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো চূড়ান্ত বাণিজ্যচুক্তি হয়নি।

আলাদাভাবে ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, ভারত অ্যাপাচি হেলিকপ্টার সরবরাহে বিলম্বের বিষয়টি তুলেছে। তিনি বলেছেন, ভারত পাঁচ বছর ধরে এই হেলিকপ্টারগুলোর জন্য অপেক্ষা করছে।

নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী
নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী। ফাইল ছবি: এএফপি

ভারতে ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতি: এবার টার্গেট তাজমহল by সালেহ উদ্দিন আহমদ

মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ১২০৪ সালে লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলা জয় করেন। স্কুলে আমার পাশে বসত আমার বন্ধু নারায়ণ। আমার মনে আছে ইতিহাস শিক্ষক এই বিষয়টা যখন পড়াচ্ছিলেন, নারায়ণ খুব মন খারাপ করেছিল।

ইতিহাসের ক্লাসে আমাদের আরেক দিন পড়ানো হলো পলাশীর যুদ্ধ। নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর বিরাট বাহিনী নিয়েও হেরে গেলেন রবার্ট ক্লাইভের অল্প কয়জন সৈন্যের কাছে, অস্তমিত হলো বাংলার স্বধীনতা। এবার আমি ও নারায়ণ দুজনেই ক্লাসে খুব মন খারাপ করলাম।

ক্লাস থেকে বের হয়ে আবার আমরা স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করলাম। কী আর আমরা করতে পারতাম? নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে তো আর ফিরিয়ে আনা যেত না!

ইতিহাসের এসব দুঃখবোধ সবার থাকবে, যার যেমন আবেগ। কিন্তু ইতিহাসের ঘড়ি ও ঘটনা তো পাল্টানো যাবে না, সবাইকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হয়। পুরোনো ইতিহাসকে টেনে এনে নিজের মনে ও অন্যদের মনে জ্বালা সৃষ্টি করা কোনো কাজের কাজ নয়। আর সমাজে প্রতিহিংসা সৃষ্টি করা তো আরও জঘন্য কাজ।

ঠিক এই জিনিসটাই হচ্ছে আজকের ভারতে। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন নিয়ে কিছু লোক এমনিতেই অন্তর্জ্বালায় ভুগছেন, নরেন্দ্র মোদির উত্থানের পর তাঁরা ক্রমান্বয়ে প্রতিহিংসার বারুদ ছড়াচ্ছেন। এই প্রতিহিংসা ভারতের হিন্দু উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে মিশে ধ্বংসাত্মক আকার ধারণ করছে। ইতিহাসের প্রতিহিংসার প্রথম বড় বলি ছিল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ, যেটাকে ভেঙে গড়া হলো রামমন্দির।

ভারতের অসাম্প্রদায়িক ও উদারপন্থী জনগণ অবশ্য সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কার্যক্রমকে নিন্দা জানিয়ে আসছে। এমনকি গত সাধারণ নির্বাচনে রামমন্দির এলাকার সংখ্যাগুরু হিন্দু জনগণ ভোট দিয়ে বিজেপির লোকসভা প্রার্থীকে হারিয়ে জানান দেন—তারা এসব উগ্রতার বিরুদ্ধে।

তাই বলে কি উগ্রবাদীদের দমানো যায়? তাঁরা মুসলমান বিদ্বেষ ছড়াবার জন্য নতুন নতুন কৌশল বের করা শুরু করলেন।

এইসব ‘সংশোধনবাদী ইতিহাসবিদেরা’, কেউ কেউ ‘স্থপতিবিদ’ সেজে মোগল স্থাপত্যের সমালোচনা করছেন। আবার কেউবা ‘প্রত্নতাত্ত্বিক’ সেজে কোন মসজিদের নিচে কয়টা মন্দির আছে এবং তাজমহল কোন মন্দির দখল করে গড়া হয়েছে, এসব নিয়ে ‘ইতিহাস’ গড়ছেন। এই উগ্রবাদীরা রাজনৈতিক কারণে ইতিহাসকে টেনেহিঁচড়ে অপ-ইতিহাস তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন এবং সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ছড়াচ্ছেন।

তাঁরা এসব অপ-ইতিহাস প্রচার করতে বিভিন্ন উপায় বের করছেন এবং আরও বেশি লোককে ক্রুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে এই ইতিহাসের বিকৃতি আরও বড় আকারে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দক্ষিণপন্থী চিত্র প্রযোজক-পরিচালক ও সিনেমাকর্মীদের একটা গ্রুপ ইতিহাসকে বিকৃত করে নতুন নতুন চলচ্চিত্র তৈরি করছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন মিঠুন চক্রবর্তী, অনুপম খের ও পরেশ রাওয়ালের মতো নামকরা অভিনেতারা।

২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’, যাতে অভিনয় করেছেন মিঠুন চক্রবর্তী ও অনুপম খের; এই ছবিতে দেখানো হয়েছে কাশ্মীর সমস্যার মূল ভিত্তি হলো মুসলমানদের হাতে হিন্দুদের নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা। এটা ছিল একটা মিথ্যাচার প্রচারমূলক ছবি, যা কাশ্মীরের আলাদা রাজ্যের মর্যাদা হরণে মোদির চক্রান্তের একটা সাফাই ছিল। এই ছবির সাফল্যের কারণ বলা যায়, বিজেপি–শাসিত রাজ্যগুলোতে এর টিকিট করমুক্ত ছিল এবং এটা ব্যাপক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল।

এর আগে ২০১৮ সালে নির্মিত হয়েছিল ‘পদ্মাবত’ সিনেমা। রাজকুমারী পদ্মাবতী এবং আলাউদ্দিন খিলজিকে নিয়ে সিনেমা। পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি। এই ছবি নিয়ে বানসালিকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। অনেক জায়গায় এই সিনেমার শুটিংয়ে বাধা দেওয়া হয়, সেট পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বানসালি একজন উদারপন্থী সৃজনশীল পরিচালক, কিন্তু ডানপন্থী ও সেন্সর বোর্ডের চাপে তাঁকে ছবির স্ক্রিপ্টে অনেক পরিবর্তন করতে হয়েছিল।

এবার কল্পকাহিনির ভিত্তিতে সিনেমা বানানো হয়েছে তাজমহলকে নিয়ে, নাম—‘দ্য তাজ স্টোরি’। ‘দ্য তাজ স্টোরি’তে তাজমহলের পেছনের ‘সত্য’ উন্মোচনের দাবি করা হয়েছে। ছবিটিতে বলা হয়েছে, মোগল সম্রাট শাহজাহান ‘দখল’ করার আগে, স্মৃতিস্তম্ভটি একসময় ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি হিন্দু মন্দির ছিল। এই কল্পকাহিনি বহু বছর ধরে নানাভাবে হিন্দু উগ্রবাদীরা প্রচার করে আসছিল, খুব কম লোকই এটাকে বিশ্বাসে স্থান দিয়েছিল। এখন ছবি করে এই কল্পকথা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এতে অভিনয়ে যোগ দিয়েছেন খ্যাতনামা ভারতীয় অভিনেতা পরেশ রাওয়াল ।

ছবিটি সম্প্রীতি মুক্তি পেয়েছ। ছবিটি নিয়ে এর মধ্যে ভারত ও ভারতের বাইরে দারুণ হইচই হচ্ছে। কারণ, তাজমহল পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের একটি, ভারতের সবচেয়ে স্বীকৃত স্মৃতিস্তম্ভ, ভারতের পর্যটন দপ্তরের ইশতেহারের প্রথম পাতায় থাকে এর ছবি এবং এটা ইউনেসকোর একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম কড়া ভাষায় এই সিনেমা নিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে।

এই সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর, ভারতের নামকরা ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’তে লেখা হয়েছে, ‘চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি অংশ আমাদের ইতিহাসের ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে ব্যস্ত। কয়েক মাস আগে মুক্তি পেল “হিজ স্টোরি অব ইতিহাস” সিনেমা, যা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই সপ্তাহে, আমরা দেখলাম চলচিত্র “দ্য তাজ স্টোরি”, যা আমাদের অতীতের আরেকটি সংশোধনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা প্রচুর মনোযোগ আকর্ষণ করছে—কারণ, এটি তাজমহলকে একটি হিন্দু মন্দির বলে দাবি করা হয়েছে এবং পরেশ রাওয়ালের মতো অভিনেতা এর মূল চরিত্রে রয়েছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকা এক নিবন্ধে লিখেছে—‘“দ্য তাজ স্টোরি” হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বাগাড়ম্বরের একটা বৃহত্তর পরিবেশের সঙ্গে মিলে যায় এবং যা ভারতের প্রভাবশালী জনপ্রিয় বলিউড সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রসারিত হচ্ছে। বলিউড “ছাভা”, “দ্য কাশ্মীর ফাইলস” এবং “পদ্মাবত”সহ ধারাবাহিকভাবে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর একটি ধারা তৈরি করেছে, যা ইতিহাসকে পুনর্কল্পনা করে, প্রায়ই মধ্যযুগীয় মুসলিম শাসকদের রক্তপিপাসু অত্যাচারী হিসেবে চিত্রিত করছে এবং ঐতিহ্যবাহী ভারতীয়-মুসলিম স্থাপত্য, সংগীত, সাহিত্য এবং রন্ধনপ্রণালির অবদানকে নিপীড়নের একক আখ্যানে পরিণত করছে।’

তুরস্কের অনলাইন সংবাদমাধ্যম টিআরটি-ওয়ার্ল্ডও তাজমহল নিয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে—‘তাজমহলের উৎপত্তি মোগল ইতিহাসে নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত পর্বগুলোর মধ্যে একটি। সম্রাটের সরকারি ইতিহাসগ্রন্থ “বাদশাহনামা”য় এই প্রকল্পের প্রতিটি পর্যায় লিপিবদ্ধ করা আছে—স্থপতি, ব্যয় এবং এমনকি জমির দলিল, যা পশ্চিম ভারতীয় রাজ্য রাজস্থানের আম্বরের রাজা জয় সিংহের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। শিলালিপিতে ওস্তাদ আহমেদ লাহোরিকে মোগল সাম্রাজ্যের প্রধান স্থপতি এবং আমানত খান শিরাজিকে ক্যালিগ্রাফার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো ফারসি, সংস্কৃত বা ঔপনিবেশিক যুগের উৎসে “তেজো মহালয়া” নামে কোনো মন্দিরের উল্লেখ নেই। কাঠামোর ফারসি, তৈমুরি এবং ভারতীয় নকশার মিশ্রণই মোগল নান্দনিকতাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।’

একজন স্বঘোষিত ‘সংশোধনবাদী ইতিহাসবিদ’ পুরুষোত্তম নাগেশ এই মন্দির তত্ত্বটি ১৯৮০ সালে লিখিত এক বইতে প্রথম প্রকাশ করেন। তাজমহল নিয়ে এই কল্পকাহিনি এত দিন খুব কম লোকই বিশ্বাস করেছে।

এখন ‘দ্য তাজ স্টোরি’ মুক্তি পাওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। ভারতে পৌরাণিক ও মন্দির নিয়ে ছবিগুলোর নায়কদের দেবতুল্য শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরেশ রাওয়ালের মতো অভিনেতার উপস্থিতি এই ছবিকে অনেকের মনে ইতিহাসের প্রকৃত কাহিনি হিসেবে দাগ কাটাতে পারে।

ভারতের একজন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, এত দিন তাজমহলকে অভারতীয় শিল্প ও ঐতিহ্য বলে অচ্ছুত ভাবতেন। এখন তিনি বলছেন, তাজমহল ভারতেরই ঐতিহ্য এবং কয়েক দিন আগে তিনি স্বহস্তে তাজমহলকে ঝাড়ু দিয়ে আসলেন। একটা সিনেমা মানুষের মনে কত যে পরিবর্তন আনতে পারে!

এই সিনেমার সমর্থন ও জনপ্রিয়তা যদি তুঙ্গে ওঠে, তাহলে একসময় হয়তো ‘ষড়যন্ত্র বিশ্বাসী’ অনেক কট্টরপন্থী লোক তির–ধনুক ও হিন্দু দেবতার প্রতিমা নিয়ে ধেয়ে আসবে তাজমহলকে ‘তেজো মহালয়া’ বানাতে। তাতে ক্ষতি হবে কার? সম্রাট শাহজাহানের? মোগল সাম্রাজ্যের? সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের? তাঁরা তো এখন ইতিহাস।

ক্ষতি হবে ভারতের। সারা দুনিয়ার লোক ছি ছি করবে। ক্ষতি হবে ভারত সরকারের—পর্যটন থেকে ওদের আয় কমে যাবে। আর ক্ষতি হবে ভারতীয় মুসলমানদের। তাদের মোগলদের আরেকটা ‘অপকর্মের’ জন্য কাঁচুমাচু করে অপদস্থ হয়ে থাকতে হবে!

লাভ হতে পারে ভারতীয় ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের এবং মোদির দল বিজেপির। তারা আশা করবে তাদের ভোটব্যাংকে যোগ হবে আরও অনেক বেশি হিন্দু ভোট। সংখ্যালঘুদের অপদস্থ করে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ভোট বাড়ানোই এসব প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মূল উদ্দেশ্য। তবে হিতে বিপরীতও হতে পারে, যেমন করে মোদির দল গত নির্বাচনে হারিয়েছিল রামমন্দির এলাকার লোকসভা আসনটি।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-07%2Fycolz78k%2Ftajmohaljj.JPG?rect=0%2C2%2C573%2C382&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নতুন টার্গেট এখন বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য হিসাবে পরিচিত তাজমহল। ছবি : রয়টার্স

একপাক্ষিক নির্বাচনের শঙ্কা জামায়াত- এনসিপির, কী বলছে ইসি? by সজল দাস

সিলেটে 'দ্বৈত নাগরিকত্ব' ইস্যুতে এনসিপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলেও একই ইস্যুতে বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কুড়িগ্রামে মনোনয়ন বাতিল করায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতের প্রার্থী।

মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তে আরও বেশ কয়েকটি জেলার রিটার্নিং অফিসারের প্রতি ক্ষোভ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, এবি পার্টিসহ বেশ কিছু দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

যাদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, সামান্য ভুলের জন্য তাদের মনোনয়ন বাতিল করা হলেও প্রশাসনের 'পছন্দের' প্রার্থীদের একই ভুল এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দিতে প্রশাসন একপক্ষীয় আচরণ করছে বলেও দাবি করেছেন তারা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দিয়ে এসেছে এনসিপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।

যদিও মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, স্থগিত কিংবা বাতিল করার ক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে না বলে দাবি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের। বরং, নির্বাচনের আগে প্রশাসনকে চাপে রাখতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলেই মনে করেন তাদের কেউ কেউ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসি সচিব আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, প্রশাসনের কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, মনোনয়ন বাতিল হওয়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করতে পারবেন। এরপরও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

যদিও প্রার্থী ও ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে কমিশনকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত–– বলছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০০ আসনে মোট দুই হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এক হাজার ৮৪২টি মনোনয়ন।

বাতিল হওয়া ৭২৩ জনের মধ্যে জাতীয় পার্টির অন্তত ৫০ জন, বিএনপির ২৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ১০ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির তিন জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯ জন রয়েছেন। বাতিলদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীই বেশি।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন?

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে সিলেটের তিনটি আসনে বিএনপি, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদের তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম।

জানা গেছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে পুনরায় যাচাই-বাছাই করে সিলেট- ৩ সংসদীয় আসনের বিএনপি প্রার্থী এম এ মালেক এবং সিলেট- ৬ সংসদীয় আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমানের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও বাতিল হয় যুক্তরাজ্যের নাগরিক ও সিলেট-১ আসনে এনসিপি প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্র।

সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম বলছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের প্রয়োজনীয় কাগজ জমা না দেওয়ায় এনসিপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, ডুয়েল সিটিজেনশিপ বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি এমপি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। এক্ষেত্রে তাকে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করতে হয় এবং তিনি যে এটি বাতিল করেছেন তার কাগজপত্র কমিশনে জমা দিতে হয়।

"যেহেতু নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ, এই কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে ওই দেশের নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য আবেদন করেছেন তার রিসিট বা ডকুমেন্ট মনোনয়নের সঙ্গে জমা দিলেই ধরে নেওয়া হয় যে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন," বলেন তিনি।

মি. আলম জানান, সিলেটে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে যে তিনজন প্রার্থীর মনোনয়ন দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে স্থগিত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে দুই জন প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন।

কিন্তু "একজন প্রার্থী এনসিপির তিনি কোনো ডকুমেন্ট জমা দিতে পারেননি। তিনি যে সাবমিট করেছেন এমন কোনো কিছুও তিনি দিতে পারেননি। এ কারণেই তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে," মি. আলম বলেন।

নাগরিকত্ব বাতিলের এই বিষয়টি ওই দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমেও যাচাই করা হয়, এক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

রিটার্নিং কর্মকর্তার এই সিদ্ধান্তকেই পক্ষপাতিত্বমূলক বলে অভিযোগ তুলেছেন এনসিপি প্রার্থী এহতেশামুল হক। তার দাবি, একই পরিস্থিতিতে প্রার্থী ভেদে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের প্রয়োজনীয় কাগজ জমা না দেওয়ায় তার সঙ্গে বিএনপি এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মনোনয়নও স্থগিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে বাকি দুজনেরটা বৈধ হলেও তার মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

তিনি দাবি করেন, ক্রিসমাস উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বন্ধ থাকায় কেউই সেখানকার কাগজ আনতে পারেনি।

মি. হক বলেন, "প্রোপার কাগজ দিতে পারিনি, উনি (রিটার্নিং কর্মকর্তা) আমার মনোনয়ন বাতিল করলেন এটা ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক একই ইস্যুতে (দ্বৈত নাগরিকত্ব) বিএনপি প্রার্থীর ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা বললেন যেহেতু যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বন্ধ, যেহেতু আজকে লাস্ট ডেইট সেহেতু আমি কন্ডিশনালি ওনাকে দিচ্ছি।"

"আমি নাগরিক হিসেবে কেন এই কনসিডারেশন পেলাম না, আমার জন্যও তো যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বন্ধ। এটা দ্বিচারিতা," বলেন তিনি।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে, মনগড়াভাবে মনোনয়ন বাতিলের অভিযোগ তুলেছেন কুড়িগ্রাম- ৩ সংসদীয় আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীও।

তার দাবি, বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বাতিল করেছেন।

যদিও এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "আমি বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনেই সব কাজ করেছি, তার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র কোনোকিছুই ছিল না। সংক্ষুব্ধ হলে উনারা নির্বাচন কমিশনে আপিলের সুযোগ নিতে পারেন।"

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অভিযোগ প্রশাসনকে চাপে রাখার কৌশল হতে পারে বলেও মনে করেন মিজ দেবনাথ।

নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে একাধিক রাজনৈতিক দল। আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রসঙ্গও সামনে আনছেন তারা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা।

প্রশাসনের একতরফা আচরণের অন্তত একশটি উদাহরণ রয়েছে বলে দাবি করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি'র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলছেন, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসন পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে দাবি করে তিনি বলেন, "সম্প্রতি একটি দলের চেয়ারপার্সন দেশে আসার পর বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ একটি পার্টি অফিসের দিকে তাদের কেবলা ঠিক করে ফেলেছেন। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ"।

প্রশাসনের এমন আচরণের কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অতীতের মতো পক্ষপাতিত্ব এবং একতরফা হওয়ার শঙ্কা মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনিয়ম চলতে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে মাঠের কর্মসূচি দেওয়া হবে।

একই দিনে, কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিতের দাবি জানায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। নির্বাচনের সামগ্রিক আলোচনা থেকে গণভোটের বিষয়টি হারিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি।

ইসলামী আন্দোলনের যুগ্মমহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, তুচ্ছ কারণে মনোনয়ন বাতিল ও প্রশাসনের একপক্ষীয় আচরণের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানিয়েছেন তারা।

বুধবার ইসির সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াত অভিযোগ করেছে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, "গত কয়েক দিনের সরকারের আচরণে এবং প্রটেকশনের নামে যে বাড়াবাড়িটা চলছে সেসব আচরণে এই আশঙ্কা তো শুধু আমাদের মনেই তো নয়, আপনাদের মনেও এটা স্বাভাবিকভাবে জাগার কথা যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা নাই।"

দেশের অনেক জায়গায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অনেকের প্রার্থিতা বাতিল নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "বৈষম্য হয়েছে ওই সমস্ত জায়গার ডিসিদের মানসিকতার কারণে। যারা একটা পলিটিক্যাল পার্টিকে বিলং করে এবং অন্য কাউকে পছন্দ করতে চায় না, তারা চেষ্টা করছে এটা করার জন্য," বলেন মি. তাহের।

ডিসি-এসপিদের ভেতরে বৈষম্যমূলক আচরণ হচ্ছে এবং তাদের বিষয়ে তালিকা তৈরি করবেন বলেও জানান জামায়াতের এই নেতা।

অভিযোগ নিয়ে কমিশন যা বলছে

নির্বাচনের আগে প্রশাসনের 'বিতর্কিত' ভূমিকা ইসির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলবে বলে মন্তব্য করেছে অভিযোগকারী রাজনৈতিক দলগুলো।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলির মতে, নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নির্বাচন কমিশনের।

অবশ্য পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের দরজা খোলা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, আপিলের পর নির্বাচন কমিশন কী করে সেটাও দেখা জরুরি।

"সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনে আপিল করবে, সেখানেও না হলে আদালত আছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনে একাধিক রাজনৈতিক দলের এমন অভিযোগ, প্রশাসনকে চাপে রাখার কৌশল কি না–– এমন প্রশ্নের জবাবে মিজ টুলি বলছেন, "রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক কৌশল থাকে, এটিও তার একটি হতে পারে। কিন্তু যদি কোনো অভিযোগ থাকে নির্বাচন কমিশনের সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।"

নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ অবশ্য বলছেন, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল কিছু অভিযোগ দিয়ে গেছেন, "বিষয়গুলো আমরা দেখবো।"

"যদি প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের বিষয়টা ঘটে থেকে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রশাসনিকভাবে যেটা আছে। কিন্তু যাচাই বাছাই না করে তো কোনো কমেন্ট করা ঠিক না," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহমেদ।

সংবাদিকদের সামনে কথা বলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযোগ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিও

শত্রু মোকাবিলায় ইরানের অভিনব কৌশল by হামিদ বহরামি

নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—সরাসরি এমন যুদ্ধে না জড়িয়ে কীভাবে ইসরায়েল ও পশ্চিমা চাপ প্রতিহত করা যায়! এই প্রশ্নে এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের আঞ্চলিক কৌশল ছিল বাস্তববাদী উত্তর। এর উত্তরে ইরান অংশীদার গড়ে তুলেছে এবং উত্তেজনা বাড়ানো বা না বাড়ানোর বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রেখেছে।

তবে সেই কৌশল এখন ক্ষতিগ্রস্ত। যেসব উপায়ের মাধ্যমে ইরান সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলত, টানা দুই বছর একের পর এক ধাক্কা সেগুলোকেও দুর্বল করেছে। এ নতুন বাস্তবতায় ইরানের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত স্বল্পমেয়াদি পথ আর চরমপন্থায় নেই। বরং দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ায় নিহিত হয়েছে। এই কৌশল অনুযায়ী যৌথ হুমকি মোকাবিলার খরচ অন্যদের বহন করতে দেওয়া হয়, যারা নিজেদের কারণেই ক্রমে ইসরায়েলের মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছে।

দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মানে নিষ্ক্রিয় থাকা নয়। এটি একটি সচেতন সিদ্ধান্ত, যেখানে কেউ নিজে প্রধান প্রতিরোধকারী না হয়েই ধরে নেয় যে, অন্যরা সামনে থেকে সেই দায়িত্ব বহন করবে। এ দায় শুধু সামরিক সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ নয়।

তা হতে পারে কূটনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া, চাপ সৃষ্টির সংকেত দেওয়া, আকাশ প্রতিরক্ষা মোতায়েন, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেওয়া কিংবা রাজনৈতিক ঝুঁকি বহন করা। যুক্তিটা সহজ। যখন কৌশলগত পরিবেশ এমনভাবে বদলায় যে অন্যদের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রণোদনা বেড়ে যায়, তখন নিজের শক্তি ও সম্পদ সংরক্ষণ করাই হয়ে ওঠে যুক্তিসংগত।

এ যুক্তি তেহরানের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে তিনটি বড় ঘটনা কাজ করেছে। প্রথমত, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হন, যা ইরানের প্রতিরোধকাঠামোর জন্য বাস্তব ও প্রতীকী দুই দিক থেকেই বড় আঘাত ছিল।

দ্বিতীয়ত, হিজবুল্লাহর দুর্বলতা, আস্তানাকাঠামোর ক্ষয় এবং বদলে যাওয়া আঞ্চলিক সমীকরণের মধ্যে ২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরীয় বিদ্রোহীরা দামেস্ক দখল করে নেন। ফলে বাসার আল–আসাদ রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং আহমেদ আল শারার সঙ্গে যুক্ত নতুন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ খুলে যায়।

তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে টানা ১২ দিনের সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, যা ২৪ জুন একটি যুদ্ধবিরতিতে গিয়ে থামে। এ সংঘাতে ইরানে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালায়।

এগুলো তেহরানের সেই সক্ষমতা স্পষ্টভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা আরেকটি সরাসরি মোকাবিলার ধাক্কা সামাল দিতে পারত। নাসরাল্লাহর মৃত্যুর ফলে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং সিরিয়ায় ইরানের অবস্থান যে ধাক্কা খেয়েছে, তা ইরানের পরোক্ষ প্রভাবের হাতিয়ারগুলোকে দুর্বল করেছে।

ঠিক সেই সময়ই ২০২৫ সালের যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, সরাসরি সংঘাতে জড়ালে কতটা বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ইরানের এখন মূল লক্ষ্য সময় কেনা। নিজেদের সক্ষমতা পুনর্গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত নেটওয়ার্ক ঠিক করা এবং উত্তেজনার সীমা নতুন করে নির্ধারণ করার জন্য সময়, যাতে এ সময়টায় অন্যরা সংঘাতের খরচ বহন করে।

এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উল্টো চিত্র সামনে আসে। বহু বছর ধরে ইরানই মূলত ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার খরচ বহন করেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো সেই চাপ নিজের কাঁধে না নিয়েই সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে, যেখানে এই দেশগুলোকেই ইসরায়েলের বিস্তারমুখী নীতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মানে এই নয় যে আঙ্কারা বা রিয়াদ ইরানের পক্ষে চলে গেছে; বরং তাদের হুমকি উপলব্ধি এমনভাবে বদলাচ্ছে, যা ইরানের ওপর থাকা চাপ কিছুটা হলেও কমিয়ে দিচ্ছে।

এ বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে সিরিয়ায়, যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্র তুরস্ক ও ইসরায়েলের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। আঙ্কারার দৃষ্টিতে আসাদ-পরবর্তী সিরিয়া সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং কুর্দি প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছে এ একই ভূখণ্ডের গুরুত্ব ভিন্ন। তাদের লক্ষ্য হলো নিজেদের সীমান্তের কাছে শত্রুভাবাপন্ন সামরিক সক্ষমতা গড়ে ওঠা ঠেকানো এবং সম্ভাব্য হুমকিগুলোকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুর্বল অবস্থায় রাখা।

এ দুই ভিন্ন স্বার্থের কারণে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে স্পষ্ট টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তুর্কি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে সিরিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়াতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে কারিগরি পর্যায়ে যোগাযোগ রাখছেন। এতে বোঝা যায়, দুই দেশের সেনাবাহিনী এখন কতটা কাছাকাছি ও একই এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে।

ইরানের জন্য এই তুরস্ক ও ইসরায়েলের টানাপোড়েন একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তুরস্ক যদি এমনিতেই ইসরায়েলের কার্যক্রম সীমিত করতে এবং সিরিয়ার ভবিষ্যৎ গঠনে প্রভাব রাখতে সম্পদ ও শক্তি বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়, তাহলে তেহরান নিজে সামনে না এসে ধৈর্যশীল পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকতে পারে। এর জন্য ইরান ও তুরস্কের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতার প্রয়োজন নেই।

পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সাম্প্রতিক সামরিক সমীকরণ তুরস্কের এ প্রবণতাকে আরও জোরালো করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে গ্রিস, ইসরায়েল ও সাইপ্রাস ২০২৬ সালে যৌথ বিমান ও নৌ মহড়ার পরিসর বাড়াতে চায়।

তুরস্কে এই তিন দেশের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতাকে এমন এক প্রতিরক্ষাকাঠামো হিসেবে দেখা হয়, যা আঙ্কারার জন্য প্রতিকূল কৌশলগত পরিবেশ তৈরি করছে। এ ব্যবস্থার অংশ না হয়েও ইরান এর সুফল পেতে পারে। তুরস্কের এ অনুভূতি যত বাড়বে, আঙ্কারার পক্ষে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

এর ফলে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার কিছু বোঝা স্বাভাবিকভাবেই ইরানের কাঁধ থেকে সরে যাবে। তুর্কি নীতিনির্ধারকেরা যদি ইসরায়েলকে শুধু সিরিয়ার একটি পক্ষ হিসেবে দেখার বদলে তুরস্ককে চাপে রাখার একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখে, তাহলে তাঁরা এমন খরচ বহনে রাজি হবেন, যা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের কার্যপরিধি সীমিত করবে।

দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেকটি ক্ষেত্র গড়ে উঠছে লোহিত সাগর, বাব আল মান্দাব ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলজুড়ে, যেখানে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকাশ্য ভাঙন তৈরি করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিষয়ে সৌদি আরব কড়া বার্তা দেয়।

মুকাল্লা বন্দরে সৌদি হামলার পর এ উত্তেজনা চরমে ওঠে এবং দীর্ঘদিনের দুই মিত্রের মধ্যে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়। কারণ, তারা ইয়েমেনের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে।

ইরানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দ্বন্দ্ব সেই জোটগুলোর ঐক্য ও মনোযোগ দুর্বল করে দেয়, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে ইরান ও তার মিত্রদের বিরোধিতা করে এসেছে। যখন রিয়াদ ও আবুধাবি একে অপরের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তখন ইরানের ওপর চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

হর্ন অব আফ্রিকা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। ইসরায়েল সোমালি ল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে লোহিত সাগর অঞ্চলে একটি নতুন ও সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন সামুদ্রিক নিরাপত্তা আগেই চ্যালেঞ্জের মুখে।

সেখানে সামরিক ঘাঁটি হবে কি না বা ইসরায়েলের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, সে বিতর্ক যাই থাকুক, এ সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। হুতিরা প্রকাশ্যেই সতর্ক করেছে যে সোমালি ল্যান্ডে ইসরায়েলের যেকোনো উপস্থিতিকে তারা সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করবে।

এ অঞ্চল যত বেশি আন্তর্জাতিক শক্তির সম্পৃক্ততায় জড়িয়ে পড়ছে, তত বেশি অস্থিরতার খরচ নানা পক্ষের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ইরানের জন্য সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আরও কমে যাচ্ছে।

এর কোনোটিই স্থায়ী বা টেকসই ভারসাম্যের নিশ্চয়তা দেয় না। দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল অনেক সময়ই সাময়িক হয়। এটি তত দিন কাজ করে, যত দিন বোঝা বহনকারী পক্ষ মনে করে যে খরচ সহনীয়। একসময় সেই পক্ষ খরচ বেশি মনে করলে উত্তেজনা বাড়ানো, দর–কষাকষি করা কিংবা নতুন জোট গঠনের মাধ্যমে সেই চাপ আবার অন্যের ওপর ঠেলে দিতে চায়।

তুরস্ক শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনার পথ বেছে নিতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার উত্তেজনাও কমে যেতে পারে, আর ইয়েমেনের ভেতরের পরিস্থিতি নতুনভাবে আঞ্চলিক হিসাব–নিকাশ বদলে দিতে পারে।

* হামিদ বহরামি, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক–বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর একটি অনুষ্ঠানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইমাম আলী একাডেমি, তেহরান, ইরান, ১০ অক্টোবর ২০২৩
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর একটি অনুষ্ঠানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইমাম আলী একাডেমি, তেহরান, ইরান, ১০ অক্টোবর ২০২৩ ছবি: ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওয়েবসাইট

বিশ্বজুড়ে জেন–জিদের বিক্ষোভ কীভাবে সরকারগুলোকে নাড়িয়ে দিয়েছে by ক্লারা ফং

বিগত এক বছরের কিছু বেশি সময়ে বাংলাদেশ, নেপাল, মাদাগাস্কার, মরক্কো, পেরুসহ বিভিন্ন দেশে জেনারেশন জেডের (১৯৯০-এর দশকের শেষ ভাগ থেকে ২০০০-এর শুরুর দিকে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম) তরুণেরা রাস্তায় নেমেছেন। দুর্নীতি, পুলিশি নির্যাতন, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতির কারণে সৃষ্ট হতাশা তাঁদের ক্ষোভের কারণ। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাঁরা সংগঠিত হয়েছেন, পরিকল্পনা করেছেন, বার্তা ছড়িয়েছেন এবং নিজেদের আন্দোলনকে বৈশ্বিক আলোচনায় তুলে ধরেছেন।

সম্প্রতি মেক্সিকোয় তরুণ সংগঠকেরা ‘গ্লোবাল জেন জেড’ আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে নভেম্বরের মাঝামাঝিতে বিক্ষোভে নেমেছিলেন। একজন মেয়র নিহত হওয়ার পর তাঁরা সরকার ও মাদক চক্রবিরোধী কর্মসূচি হাতে নেন। ওই মেয়র প্রকাশ্যে মাদক চক্র ও সরকারের নিরাপত্তানীতির সমালোচনা করেছিলেন।

তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত এমন বিক্ষোভের ফলাফল হয়েছে একেক দেশে একেক রকম। কোথাও (যেমন বাংলাদেশ ও নেপালে) বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো সফলভাবে ভেঙে গেছে। কোথাও (যেমন ইন্দোনেশিয়ায়) দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীনেরা প্রভাবশালীই থেকেছে। আবার অনেক সরকার বিতর্কিত নীতি প্রত্যাহার, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু কর্মকর্তাকে অপসারণ ও একই সঙ্গে বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এসব আন্দোলনের জেরে কিছু দেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, নতুন সরকারগুলো কি সত্যিই তরুণদের চাওয়া দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে পারবে?

বড় ধরনের জেন-জি বিক্ষোভ হয়েছে কোন কোন দেশে

তরুণদের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো প্রকৃতপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক রাজনৈতিক ঢেউয়েরই ধারাবাহিকতা। এর শুরু অন্তত ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ থেকে। সময়ের সঙ্গে অনলাইন প্রতিবাদ বাস্তবে রাস্তায় নেমে আন্দোলনে গড়িয়েছে।

২০২০ সালে হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রবিরোধী বা রাজতন্ত্রের সমালোচনা–সংক্রান্ত আইন নিয়ে বড় বিক্ষোভ ছড়ায়। থাইল্যান্ডের এ আইনে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ায় বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার আরাগালায়া আন্দোলনেও শিক্ষার্থীরাই ছিলেন মূল চালিকা শক্তি। এ আন্দোলন ছিল সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালে বাংলাদেশ, কেনিয়া, সার্বিয়াসহ কয়েকটি দেশে বড় রকমের সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়। পরের বছর (বিদায়ী ২০২৫ সাল) ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, মেক্সিকো, মরক্কো, নেপাল, পেরু, ফিলিপাইন ও তিমুর-লেস্তেতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মরক্কো ও মাদাগাস্কারে তরুণদের সংগঠনের জন্য আলাদা নাম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মরক্কোয় নাম হয় ‘জেন জেড ২১২’ (দেশের ডায়ালিং কোড), আর মাদাগাস্কারে ‘জেন জেড মাদা’। সম্প্রতি মেক্সিকোয় যুব নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ বয়স্ক প্রজন্ম ও বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পেয়েছে।

এসব বিক্ষোভের পেছনে কারণ


বিক্ষোভের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো, দুর্নীতির অভিযোগ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। অনেক দেশের তরুণ বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতরা রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করছেন। তাঁরা আবাসন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নিচ্ছেন। অথচ সাধারণ মানুষ বাড়তি ব্যয় ও সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের চাপে জীবন কাটাচ্ছেন। ইন্দোনেশিয়ায় আগস্টের আন্দোলনের সূত্র ছিল, সংসদ সদস্যদের বেতনের বাইরে বাড়িভাড়া বাবদ বাড়তি তিন হাজার ডলারের ভাতা। সাকল্যে এটি রাজধানী জাকার্তার মানুষের ন্যূনতম বার্ষিক মজুরির ১০ গুণের বেশি।

ইতিমধ্যে নেপালে সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভ শুরু হয় রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের বিলাসী ছুটি কাটানো, বিলাসবহুল বাড়ি বা ম্যানশনে জীবনযাপন ও দামি উপহার গ্রহণ করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে।

অবকাঠামোগত দুর্বল ব্যবস্থাপনা থেকে তৈরি হওয়া দুর্নীতি ও সরকারের অবহেলাও বিক্ষোভের বড় কারণ। সার্বিয়ায় ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চলা বিক্ষোভের শুরু নোভি সাদ শহরের রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে। অভিযোগ ওঠে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে দেশটির প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নির্মিত ওই স্টেশনের কাজ ছিল নিম্নমানের।

মরক্কোয় একটি হাসপাতালে আটজন নারী প্রসবকালে মারা যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ও শত কোটিপতি আজিজ আখানুশের পদত্যাগের দাবি তোলেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকার ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলারের বেশি ব্যয় করছে। অথচ স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নেই।

বিক্ষোভের আরেকটি কারণ, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও তরুণদের বেকারত্ব। তরুণদের হতাশার একটি বড় উৎস অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থান অনেক প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি কমিয়ে এ ক্ষেত্রে (অসন্তোষে) উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) ডিজিটাল ও সাইবারস্পেস পলিসির বিশেষজ্ঞ ক্যাট ডাফি বলেন, ‘এআই ও অটোমেশন চাকরির বাজারে আরও চাপ তৈরি করবে। এতে তরুণেরা যে উন্নতির আশা করেছিলেন, তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।’

কয়েকটি দেশে তরুণদের বেকারত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। মরক্কোতে ২০২৪ সালে এ হার ছিল ২২ শতাংশ, সার্বিয়াতেও ছিল ২২ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশ (দেশটিতে ১৬-৪০ বছর বয়সীদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ)।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিক্ষোভের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশও আংশিক দায়ী। সিএফআরের আফ্রিকা নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মিশেল গ্যাভিন বলেন, ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, বড় অর্থনৈতিক কাঠামোগত ইস্যুগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, যা অনেক দেশেই কাজ করছে না।’ ফলে মানুষ রাস্তায় নামছে।

প্রচলিত রাজনৈতিক দল থেকে তরুণদের দূরত্বও একটি কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণেরা মূলধারার দলগুলোর সঙ্গে কম সংযুক্ত হচ্ছেন। তাঁরা ভিন্ন উপায়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা বেশি রাখছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নপুষ্ট গবেষণা গোষ্ঠী ‘দ্য ২০২৫ গ্লোবাল ইয়ুথ পার্টিসিপেশন ইনডেক্স’ বলেছে, ৩০ বছরের কম বয়সীরা অনলাইন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে বেশি সক্রিয়; যদিও নির্বাচনে ভোটদানে তাঁদের অনীহা বেশি।

সাম্প্রতিক কিছু আন্দোলনে লোকজন দুর্নীতির কারণে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং ক্ষোভের আঙুল ক্ষমতাসীন সরকার ও নেতাদের দিকে তুলছেন। এসব নেতা ও সরকারের কোনো কোনোটি দশকের পর দশক ক্ষমতা আঁকড়ে আছে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালে তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের পর আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন শেষ হয়। শান্তিতে নোবেলজয়ী ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আসে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। শিক্ষার্থীরা একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে নিজস্ব দলও (এনসিপি) গঠন করেছেন।

সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা

সামাজিকমাধ্যম সাম্প্রতিক আন্দোলনে প্রধান সাংগঠনিক ভূমিকা রেখেছে। এটি মানুষকে সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে, সাধারণ সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে, পরস্পরের মধ্যে একতার অনুভূতি তৈরি করতে ও অন্যান্য আন্দোলন থেকে কৌশলগত শিক্ষা নিতে সাহায্য করেছে।

তরুণেরা পপ কালচার, হ্যাশট্যাগ, নাচের ট্রেন্ড, ছবি ও মিম ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের বিক্ষোভের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপানি কমিকস ও অ্যানিমেশন সিরিজ ‘ওয়ান পিস’-এর জলদস্যু পতাকা ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, নেপাল, পেরু ও তিমুর-লেস্তের বিক্ষোভে দেখা গেছে। এ পতাকায় অন্যায় ও নিপীড়ক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা রয়েছে।

ডিসকর্ডের মতো বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্কের কিছু প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের ফলে সরকারগুলোর পক্ষে এসবের ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করা বা তাঁদের ওপর দমন–পীড়ন চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। মরক্কো ও নেপালের তরুণেরা ডিসকর্ড ব্যবহার করে আন্দোলনের পরিকল্পনা করেছেন। ডিসকর্ড একটি ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন ইউজার নেম ব্যবহার করে তাঁদের অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক পাবলিক সার্ভারে যুক্ত থাকতে পারেন। ফলে নিজেদের কিছুটা আড়ালে রাখতে পারেন।

মরক্কোর ‘জেন জেড ২১২’-এর ডিসকর্ড সার্ভারে সদস্যসংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। আন্দোলনকারীরা জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে বলেন, পুলিশ এখনো প্ল্যাটফর্মটি বুঝে উঠতে পারেনি। তাই এটি ব্যবহারকারীদের কাছে ‘নিরাপদ’ মনে হয়।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জার্মান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যান্ড এরিয়া স্টাডিসের গবেষক জানজিরা সোমবাতপুনসিরি বলেন, ‘বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ক আন্দোলনকে সমতার পরিবেশ দেয় ঠিকই, কিন্তু তাতে টেকসই সাংগঠনিক কাঠামোর আন্দোলন তৈরি হয় না। এটি আন্দোলনকারীদের সহজেই তাঁদের প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে।’

নেপালের সংসদে অগ্নিসংযোগ করার পর ‘ইয়ুথ এগেইনস্ট করাপশন’ ডিসকর্ড চ্যানেলে ১০ হাজারের বেশি তরুণ অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে অনলাইনে ভোট দেন। তাঁরা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে বেছে নেন এবং এক সপ্তাহ পর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। তবে ১ লাখ ৬০ হাজার সদস্যের এ চ্যানেল নেপালের ৩ কোটি মানুষের তুলনায় খুবই ছোট অংশ।

সিএফআরের ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালিসা আইয়ার্স বলেছেন, ‘সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া এ পরিবর্তন (এভাবে ভোট প্রদান) ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হলো, সংবিধান অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা।’

সরকারগুলোর তরফে প্রতিক্রিয়া

অনেক সরকার অতিরিক্ত পুলিশি শক্তি প্রয়োগ, হামলা-সহিংসতা, গণগ্রেপ্তারের মতো দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে, যেমন সার্বিয়ায় আন্দোলনের অষ্টম মাসে (গত জুলাই) বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের পেটানোর ঘটনা ঘটে। মরক্কোয় দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হতেই দাঙ্গা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাদাপোশাকধারী সদস্যরা ব্যাপক গ্রেপ্তার শুরু করেন।

অনলাইনে সংগঠিত হওয়া ঠেকাতে অনেক সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ বা ইন্টারনেট বন্ধ করে। ফলাফল হয়েছে উল্টো। বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়েছে। বাংলাদেশে আন্দোলনকে আরও ত্বরান্বিত করে ২০২৪-এর ব্ল্যাকআউট। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। নেপালে ২৬টির বেশি প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করা হয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ঠেকানোর পদক্ষেপ হিসেবে। কিন্তু মানুষ তা সেন্সরশিপ হিসেবে দেখেছে, ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে।

কিছু সরকার উত্তেজনা থামাতে বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো দ্রুত মেনে নেয়। ইন্দোনেশিয়া আইনপ্রণেতাদের বেতন বৃদ্ধি বাতিল করে। ২০২৪ সালে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার কিছুদিনের মধ্যে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট বিতর্কিত আর্থিক বিল প্রত্যাহার করেন। ফিলিপাইন ও পেরুতে বিক্ষোভের পর উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।

অনেক দেশে আন্দোলনগুলো এখন কিছুটা শান্ত হয়ে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতিবাদগুলোতে সংস্কারের যে মূল দাবি তোলা হয়েছিল, তা বাস্তবে হয়নি।

এসব বিক্ষোভের ফলাফল

বাংলাদেশ, নেপাল ও মাদাগাস্কারে সরকার পুরোপুরি ভেঙে গেছে। তরুণদের অভিযোগ, তাঁদের অন্তর্বর্তী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়ন করা। ডিজিটাল আন্দোলন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, কিন্তু সিএফআরের গ্যাভিন মনে করিয়ে দিয়েছেন যে এ ধরনের সফল ডিজিটালি সংগঠিত সামাজিক আন্দোলন সাধারণত বেশি স্তরবিন্যাসনির্ভর নয়। তাই একবার দেশের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে গেলেও খুব নির্দিষ্ট পরিবর্তনের দিকে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে।

সিএফআরের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো জোশুয়া কারলানৎসিক ‘ওয়ার্ল্ড পলিটিকস রিভিউ’কে বলেছেন, এমন আন্দোলনে প্রায়ই ‘স্পষ্ট কৌশলের অভাব থাকে; যে কৌশলে আন্দোলনের দাবিগুলোকে আইন প্রণয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে রূপ দেওয়া যায়, সরকার গঠনের পথ বের করা যায়, শাসনব্যবস্থা চালানো যায় এবং নেতৃত্বের দক্ষতা দেখানো যায়।’

এই গবেষক আরও বলেন, নাগরিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারলে জেন-জিদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। থাইল্যান্ডে ২০২০-এর বিক্ষোভের পর তরুণদের নেতৃত্বে নতুন ‘পিপলস পার্টি’ গড়ে ওঠে। দলটি ২০২৩ সালের সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। নতুন বছরে (২০২৬) বাংলাদেশ, মরক্কো, নেপাল, পেরুসহ কয়েকটি দেশে নির্বাচন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জেন-জিদের দুর্নীতিবিরোধী, বৈষম্যবিরোধী ও রাজনৈতিক অসন্তোষ মোকাবিলার দাবি সম্ভাব্য নতুন সরকার প্রতিষ্ঠায় বড় প্রভাব ফেলবে।

[প্রতিবেদনটি কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে (সিএফআর) প্রকাশিত হয়েছে। ক্লারা ফং প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে এশিয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সংবাদ তৈরি ও বিশ্লেষণ করেন।]

* অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হাজারো মানুষ
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হাজারো মানুষ। ফাইল ছবি প্রথম আলো

ওয়াশিংটন ‘ভারত প্রথম’ নীতি ছেড়ে কেন হঠাৎ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ল

দ্য ওয়াশিংটন টাইমসঃ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেও চলতি বছরের মে মাসের পর থেকে হঠাৎ পাকিস্তানকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হঠাৎ কেন ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মার্কিন প্রশাসন—এসব নিয়ে দ্য ওয়াশিংটন টাইমসে লিখেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিট। মার্কিন এই সংবাদমাধ্যমের ২১ ডিসেম্বরের অনলাইন সংস্করণে লেখাটি প্রকাশ করা হয়।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্ক মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। তখন ইসলামাবাদকে দেখা হতো তালেবানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে; রাজনৈতিকভাবে তাদের অবস্থান ছিল প্রশ্নবিদ্ধ এবং কূটনৈতিকভাবে তারা ছিল প্রায় বিচ্ছিন্ন। ২০২২-২৩ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে জিডিপিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি এলেও পাকিস্তানের অর্থনীতি তখনো বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

ওয়াশিংটন পাকিস্তানকে অবিশ্বস্ত এবং কম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হিসেবে মনে করত। দেশটির শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্থাকে দেখা হতো রহস্যময় হিসেবে, যারা একই সঙ্গে দুই পক্ষের সঙ্গে চলে এবং সন্ত্রাস দমনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চায় না। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, পাকিস্তান এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাসংকটে পড়তে যাচ্ছে।

অথচ ২০২৫ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান ব্রাত্য দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। খুব কম দেশের ক্ষেত্রেই এত দ্রুত বা নাটকীয়ভাবে ভাবমূর্তির পরিবর্তন ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তান এখন প্রধান এক স্তম্ভ।

শুরুতে ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারাও পাকিস্তানকে নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁদের চিন্তার কারণ ছিল। পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ প্রায়ই গর্ব করে বলত, চীনের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ‘সমুদ্রের চেয়ে গভীর আর পাহাড়ের চেয়ে উঁচু’।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি–সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট—ভারতকে দ্বিগুণ সমর্থন দাও, ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে ‘কোয়াড’কে শক্তিশালী করো এবং ভারতের স্বার্থরক্ষায় ইসলামাবাদকে এক পাশে সরিয়ে রাখো।

কিন্তু ওয়াশিংটন যখন ভারতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিতে ঝুঁকে পড়ছিল, তখনই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং সামরিক শক্তির অকার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া হলেও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে থাকে।

বরফ গলতে শুরু করার প্রথম লক্ষণ ছিল সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের মধ্যে কিছু গোপন তথ্য বিনিময়। এতে বোঝা যাচ্ছিল, ইসলামাবাদ অবশেষে কার্যকর সহযোগিতা দিতে ইচ্ছুক। এরপর গত মার্চ মাসে যখন ট্রাম্প হঠাৎ করেই এক ভাষণে পাকিস্তানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন, তখন ওয়াশিংটন অবাক হয়ে যায়।

দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নীতির বাইরে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্য ‘ডিসি ব্লব’কে (ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক মহল) এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করে দেয়। ট্রাম্পের নতুন নীতিতে পাকিস্তানকে নতুন ও শক্তিশালী এক মিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসলামাবাদ এই সুযোগ হাতছাড়া করেনি। পাকিস্তানের প্রতিটি ছোট সহযোগিতার বিপরীতে ওয়াশিংটন থেকে অপ্রত্যাশিত সমর্থন মিলছে, যা তাদের আরও উৎসাহিত করছে। দীর্ঘদিনের লেনদেনভিত্তিক নড়বড়ে সম্পর্ক এক গভীর গুরুত্বের দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা একসময় পাকিস্তানকে অবজ্ঞা করতেন, এখন তাঁরা পাকিস্তানকে দায়িত্বশীল ও নমনীয় বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করছেন।

সম্পর্কের মোড় ঘুরে যাওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্তটি ছিল মে মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র সামরিক সংঘাত। এই সংঘাতে পাকিস্তানের দক্ষতা দেখে ট্রাম্প স্তম্ভিত হয়ে যান। পাকিস্তানের সামরিক শৃঙ্খলা এবং কৌশলগত ক্ষমতা ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবাতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের যাঁরা পাকিস্তানকে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন, তাঁরা আবারও দেশটিকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেন। ট্রাম্পের কাছে পাকিস্তান এখন তাঁর দক্ষিণ এশিয়া কৌশলের একটি বড় সম্পদে পরিণত হয়েছে।

এই নতুন গুরুত্বের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়নও গতি পেয়েছে। সামরিক কমান্ড কাঠামো সংস্কার করে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ নামে নতুন একটি পদ তৈরি করা হয়েছে, যাতে এখন আসীন আছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও তিনি।

আরেকটি বড় বিষয় ছিল ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি। ট্রাম্প যখন মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন, তখন ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু পাকিস্তান কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ‘যুদ্ধ শুরু নয়, শেষ করায়’ বিশ্বাসী—ট্রাম্পের মতো একজন নেতার প্রস্তাবের পর ভারতের আচরণ সম্ভবত তাঁকে আহত করেছে। এতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে এখন উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের রসায়নকে উপদেষ্টারা ঠাট্টা করে ‘ব্রোমান্স’ বা গভীর বন্ধুত্ব হিসেবে অভিহিত করছেন। ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে আসিম মুনির এখন এক রহস্যময় ও সুশৃঙ্খল ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তান সরকারও এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের মন জয় করতে নানা কৌশলী পদক্ষেপ নিচ্ছে।

পুরস্কার হিসেবে আসিম মুনির হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ পান, যা পাকিস্তানের কোনো সামরিক প্রধানের ইতিহাসে প্রথম। ক্যামেরা এই দৃশ্য দারুণভাবে লুফে নেয়। আর ট্রাম্প নিজে এটিকে আরও বেশি উপভোগ করেন। রাতারাতি পাকিস্তানের প্রতি সন্দেহ ও সতর্কতার বদলে মুগ্ধতা ও উদ্‌যাপনের বাতাবরণ তৈরি হয়।

২০২৬ সালের শুরুতে পাকিস্তান ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্য কৌশলের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে পাকিস্তানের গুরুত্ব এখন অনেক—সেটি হতে পারে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের গোপন পথ হিসেবে, গাজা সংকট সমাধানে অথবা এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে।

এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রায় প্রতিটি আলোচনায় পাকিস্তান এখন এক অপরিহার্য নাম। ওয়াশিংটনের ‘ভারত প্রথম’ যুগের আপাতত অবসান ঘটেছে। যদিও পরিস্থিতি ভবিষ্যতে দিল্লি ও ইসলামাবাদের আচরণের ওপর নির্ভর করবে।

২০২৫ সালে পাকিস্তানের এই রূপান্তর ভূরাজনীতিতে এক অনস্বীকার্য প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন প্রশাসনের কাছে পাকিস্তান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-26%2Fgs9cxrnn%2Ftrump-shahbaz-01.webp?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ওভাল অফিস, হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটন ডিসি, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়/ ডনের সৌজন্যে

এক বছরে বাংলাদেশে ২৫৬টি মসজিদ নির্মাণ করেছে কাতার চ্যারিটি

এক বছরে বাংলাদেশে ২৫৬টি মসজিদ নির্মাণ করেছে কাতার চ্যারিটি। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে দেয়া হয়েছে পূর্ণাঙ্গ সরঞ্জাম। এর ফলে দেশের গ্রামীণ ও উপশহরগুলোতে মুসলিমদের জন্য নামাজ আদায়ের নিরাপদ স্থান সংকুলান করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছে শান্তির আবহ ও ধর্মীয় স্বস্তি। এ খবর দিয়ে অনলাইন গালফ টাইমস বলেছে, রোববার কাতার চ্যারিটি এক বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছে।

তারা বলেছে টার্গেট করা এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদগুলো। সেখানে আগে মুসল্লিরা টিন অথবা কাদামাটি দিয়ে তৈরি অবকাঠামোতে নামাজ আদায় করতেন। তাতে তাদের মৌলিক নিরাপত্তা ও স্বস্তি থাকতো না। বর্ষার সময় বৃষ্টিতে সয়লাব হয়ে যেত মেঝে। অন্যদিকে গ্রীষ্মে ফ্যানের অভাবে গাদাগাদি করে নামাজ আদায় করাও হয়ে উঠতো মারাত্মক কঠিন। তাই ৫ বছর ধরে কাতার চ্যারিটি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৬০০ মসজিদ নির্মাণ করেছে।

mzamin

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী দিলেন তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা, সুরভী জানালেন কারা অভিজ্ঞতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আজ বুধবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ‘জুলাই যোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী ও সংগঠনটির হবিগঞ্জ জেলার সদস্যসচিব মাহদী হাসান।

সেখানে মাহদী হাসান সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে ব্যাখ্যা দেন। অন্যদিকে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

চাঁদাবাজির একটি মামলায় গত ২৫ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গী পূর্ব থানার গোপালপুরের টেকপাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে তাহরিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ জানুয়ারি তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেওয়া  হয়েছিল। এর দুই ঘণ্টা পর তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়।

আজ নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তাহরিমা বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের না। আমি একদমই অরাজনৈতিক, আমি অরাজনৈতিকভাবেই সব সময় আন্দোলন করেছি। দেশের জন্য এতটুকু করার পরও আমাকে এই ১১ দিন যে পরিমাণ নির্যাতন করা হইছে…আমার ফ্যামিলির (পরিবার) সঙ্গে আমি একটা মিনিটের জন্য কথা বলতে পারতাম না। আমার সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হইছে। আমি বাইরে কী হইতেছে, আমার মা কার কাছে যাইতেছে, কিচ্ছু জানি না।’
একজনকে অনেক অনুরোধ করে মায়ের দেখা পেয়েছিলেন জানিয়ে তাহরিমা বলেন, ‘ওইখানে একজন স্যার আছে, উনার পায়েটায়ে ধরে আমার মার সাথে আমি এক দিন দেখা করতে পারছি। সেদিন আমার মাকে আমি একটা কথা বলছিলাম, “আম্মু, এটা দুনিয়ার জাহান্নাম।”’

‘আমরা’ মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব অংশীজন

সুরভীর অভিজ্ঞতা শোনে মাহদী হাসান এ ঘটনার কুশীলবদের জাতির কাছে উন্মোচন করার আহ্বান জানান। তিনি সুরভীর কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৭ বছরের মেয়েকে ২১ বছর বানিয়ে নিকৃষ্টতম অন্যায় করা হয়েছে। সুরভীকে মুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু তার পেছনে যারা এই ১৭ বছরকে ২১ বছর বানিয়েছিল, যারা ৫০ হাজারকে ৫০ কোটি বানিয়েছিল, এই কুশীলবদের বাংলাদেশের জাতির কাছে উন্মোচন করতে হবে।

হবিগঞ্জে ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম’ বলে আলোচনায় আসেন মাহদী হাসান। ৩ জানুয়ারি তাঁকে আটক করা হয়েছিল। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক এবং হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদৈ এলাকায়। ৪ জানুয়ারি তিনি জামিন পান।

মাহদী নিজের আলোচিত বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ৫ আগস্ট সারা দেশে যে বিধ্বস্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা নিহত বা শহীদ হয়েছিলেন, সেই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে মানুষ ১৭ বছরের নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। সেই ক্ষোভই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি থানা ও জেলায় আমরা তার স্ফুলিঙ্গ ও বিস্ফোরণ দেখতে পাই।’

মাহদী আরও বলেন, ‘ওই জায়গা থেকে আমি একটা কথা বারবার বলেছি, একবারও আমি বলি নাই যে আমি করেছি। এই কথার মাধ্যমে আমি “আমরা” দ্বারা সমস্ত আন্দোলনকারী সত্তাকে বুঝিয়েছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই আমাদের অস্তিত্ব। এখানে আমি মাহদী কিংবা আমাদের ব্যক্তিগত কোনো পারপাস (উদ্দেশ্য) ছিল না। “আমরা” মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব অংশীজন, সব জুলাই যোদ্ধা যাঁরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁরা আমাদের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।’  
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৭ জানুয়ারি
সংবাদ সম্মেলনে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৭ জানুয়ারি। ছবি: প্রথম আলো

হ্যারি-মেগানের সংসার টানাপোড়েনের মুখে

জিও নিউজঃ যুক্তরাষ্ট্র থেকে শিগগিরই নিজ দেশ যুক্তরাজ্য সফরে যাচ্ছেন প্রিন্স হ্যারি। তবে এ সফর তিনি একাই করবেন, থাকবেন না স্ত্রী মেগান মার্কেল বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পুলিশি সুরক্ষার জন্য আবেদনের পর সবুজ সংকেত পেয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হ্যারি।

ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ছেলে হ্যারির সফরে মেগান থাকছেন না কেন? সূত্র জানিয়েছে, মেগান যুক্তরাষ্ট্রে নিজের মতো জীবন কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। চলতি বছরেই হ্যারি দেশে ফেরার পর স্বামীর থেকে আলাদা থাকার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। হ্যারির দেশে ফেরার জন্য মরিয়া মনোভাব এখন তাঁর দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে বড় টানাপোড়েনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বহু দিন ধরেই ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে হ্যারির সম্পর্কে ভাঙন চলছিল। তবে বাবা চার্লস ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর সেই ফাটল আবার জোড়া লাগতে শুরু করে। এরই মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে লন্ডনের ক্লারেন্স হাউসে বাবার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ এবং যুক্তরাজ্যে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনার প্রেক্ষাপটে পরিবারের সঙ্গে আবার সম্পর্ক মজবুত করার দিকে নজর দিয়েছেন হ্যারি।

হ্যারি ও মেগানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রাডারকে বলেন, হ্যারির যুক্তরাজ্যে ফেরার তাগিদের কারণে দুজনের সম্পর্কে সত্যিকার অর্থেই ভাঙনের মুখে পড়তে পারে। মানসিক ও ভৌগোলিক—দুভাবেই তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। তবে এই ভাঙন তাঁদের মধ্যে ভালোবাসার অভাব বা কোনো অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে নয়।

সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যে থাকাকালে নিজের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সময়গুলো নিয়ে সচেতন মেগান। হ্যারির সঙ্গে যুক্তরাজ্যে ফেরার চিন্তা করলে তাঁর সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। সে কারণে তিনি স্বামীর সঙ্গে ফিরতে অনিচ্ছুক। অপরদিকে হ্যারি তাঁর বাবার ক্রমেই অবনতি হওয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কিত। তিনি মনে করেন, বাবার সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগ দ্রুত হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল
প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল। ফাইল ছবি: রয়টার্স