Sunday, April 29, 2018

বিশ্বের প্রথম ভাসমান পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করল রাশিয়া

বিশ্বের প্রথম ভাসমান পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছে রাশিয়া। গতকাল (শনিবার) আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সাগরের পানিতে ভাসানো হয়েছে। এ কেন্দ্র থেকে ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে এবং এক লাখের বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি শহরের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
শুধু তাই নয়, এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাহায্যে প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি পরিশোধন করা যাবে। ভাসমান এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নাম দেওয়া হয়েছে 'অ্যাকাডেমিক লমোনোসভ'।
সাধারণভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে হয়। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেখান থেকে তার টেনে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ পাঠানো হয়। কিন্তু এ বিদ্যুৎকেন্দ্র তেমন নয়। এটি নিজেই চলে যায় যেখানে বিদ্যুৎ প্রয়োজন- সেখানে।
ভাসমান এ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে রাশিয়া মোতায়েন করবে উত্তর মেরুর নিকটবর্তী অঞ্চলে। সেখানে পেভেক পোর্টে ২০১৯ সাল থেকে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাবে বলে জানা গেছে।  সেখানকার একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
ভাসমান এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি তিন বছরে একবার জ্বালানি ভরলেই চলবে। এতে ৩৫ জন নাবিক কাজ করবে।

প্রধানমন্ত্রী মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন: রাহুল গান্ধী

ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি আজ (রোববার) দিল্লির রামলীলা ময়দানে জন আক্রোশ র‍্যালিতে ভাষণ দেয়ার সময় ওই মন্তব্য করেন।
এসময় তিনি দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থা, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ, দলিত ও বিচার ব্যবস্থার উপরে আক্রমণ, সামাজিক অশান্তি প্রভৃতি ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।
রাহুল গান্ধী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাজে কেউ খুশি নন। গত ৭০ বছর ধরে কংগ্রেস দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার মিথ্যা প্রচার করছে। নীরব মোদী দেশে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরেও প্রধানমন্ত্রী চুপ করে আছেন। তিনি কঠুয়া, উন্নাওয়ের ঘটনা নিয়েও মুখ খোলেননি। কোনো এজেন্ডা ছাড়াই চীন সফরে গিয়েছেন। তিনি ডোকলাম ইস্যুতে কোনো কথাই বলেননি। বিগত চার বছরে মোদি সরকার কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করেনি।’
বক্তব্য রাখেন কংগ্রেসের সাবেক সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী
রাহুল বলেন, ‘দেশে জনবিরোধী সরকারের শাসন চলছে। আরএসএস- বিজেপি যখন হাত মিলিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে মোদি তখন চুপ করে দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। তিনি জনগণের উদ্দেশ্য যখন কিছু বলেন, তার মধ্যে সত্যি কতটা সেটা বের করাই কঠিন।’
তিনি বলেন, ‘আরএসএস ও বিজেপি’র লোকেরা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। আমরা এ দেশকে সংযুক্ত করার কাজ করেছি। আরএসএস ও বিজেপি’র মেশিনারি মিথ্যা ছড়িয়েছে। সব জায়গায় মোদিজি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলেছেন। এখন সত্য প্রকাশে আসছে। প্রত্যেক রাজ্যে কংগ্রেস কর্মীরা ক্ষমতার জন্য নয়, সত্যের জন্য জীবন দিয়েছেন।’
কংগ্রেসের সাবেক সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘চারিদিকে দুর্নীতি বেড়ে চলেছে। গণমাধ্যম নিজের কাজ করতে পারছে না। বিচারব্যবস্থা সংকটের মধ্যে রয়েছে।’
আজ কংগ্রেসের জন আক্রোশ সমাবেশে এক লাখেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে দলীয় কর্মীরা বিপুল উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ‘রাহুল গান্ধী জিন্দাবাদ’ এবং ‘মোদি সরকার হায় হায়’ স্লোগান দেন।

উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে: ড. রুহানি

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, শত্রুরা ইরানিদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে দিতে চায়। তারা বলতে চায় ইরানিদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কিন্তু ইরানি জাতি নতুন ফার্সি বছরেও নতুন নতুন সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। তেহরানে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকে সামনে রেখে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আজ (রোববার) তিনি এসব কথা বলেন।
ওই অনুষ্ঠানে দেশের শ্রেষ্ঠ শ্রমিকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রেসিডেন্ট রুহানি। আগামী ১ মে হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এ সময় তিনি দেশ গড়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং এজন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, শত্রুরা চায় না ইরানে উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক। কিন্তু তাদেরকে হতাশ করে ইসলামি ইরান অতীতের চেয়ে বেশি জাকজমকভাবে ৪১তম বিজয় বার্ষিকী উদযাপন করবে। চলতি বছরকে ইরানি পণ্যের প্রতি সহায়তার বছর হিসেবে নামকরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরানি পণ্যের প্রতি সহায়তার জন্য আমাদেরকে আরও বেশি চেষ্টা চালাতে হবে।
রুহানি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি গোটা মানবতার জন্যই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

ইরান কোনো শত্রুকেই ভয় পায় না: হাতামি

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানোর ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির হাতামি। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানি জাতি বিশেষ করে দেশের সামরিক বাহিনী কোনো শত্রুকেই ভয় পায় না।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হাতামি আজ (রোববার) বলেন, শত্রুদের বিরুদ্ধে ইরানি জাতি অত্যন্ত সাহসিকতা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দাড়িয়ে আছে। এসব শত্রু ইরানের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দাবিই আদায় করতে পারে নি।
ইরানের সেনাবাহিনীর কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রয়েছে-এ কথা উল্লেখ করে হাতামি বলেন, ইরান তরুণ এবং বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করে নিজের প্রতিরক্ষা শক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যে হুমকিই আসুক না কেন তা মোকাবেলার জন্য ইরান প্রস্তুত আছে।     
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেদের সামর্থের দিকটি উপভোগ করেছে সেনাবাহিনী। আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা একই সুতায় গাঁথা বলে উল্লেখ করে হাতামি বলেন, "নিজেদের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ অঞ্চলের সব দেশকে অবশ্যই এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। আঞ্চলিক দেশগুলোর স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য ইরানকে ডাকার জন্য আমরা সম্মানবোধ করছি।"

লিঙ্গ বৈষম্য-১: পাত্রীর জন্য হাহাকার

ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল, সরকারের ডিক্রি ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুটি দেশের চিত্র পাল্টে গেছে। সেখানে দেখা দিয়েছে লিঙ্গগত অসমতা। অর্থাৎ নারী ও পুরুষের সংখ্যায় মারাত্মক হেরফের হয়েছে। এ দুটি দেশ হলো চীন ও ভারত। এ দুটি দেশে নারীদের তুলনায় পুরুষের আনুপাতিক সংখ্যা ৭ কোটি বেশি। এত বেশি পুরুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে মারাত্মক এক সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। উঠতি যুবক বা বিয়ের বয়সী যুবক পাত্রী পাচ্ছেন না। এর ফলে তাদের অনেককে একাকীত্ব বরণ করতে হচ্ছে। পতিতাবৃত্তির হার ও স্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পরিণতি হিসেবে শুধু যে চীন বা ভারত ভুগছে তাই নয়। এর প্রভাব পড়ছে এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোতে। সিয়ান জিয়াওতোং ইউনিভার্সিটির জনসংখ্যা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ লি শুঝুউ বলেন, অদূর ভবিষ্যতে লাখ লাখ পুরুষকে অবিবাহিত জীবন কাটাতে হবে। এতে সমাজের ওপর বড় রকম একটি ঝুঁকি তৈরি হবে। চীনের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। এর মধ্যে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা কমপক্ষে ৩ কোটি ৪০ লাখ বেশি। এ সংখ্যা পুরো ক্যালিফোর্নিয়া বা পোল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান। এসব মানুষ অর্থাৎ ৩ কোটি ৪০ লাখ পুরুষ কোনোদিন বিয়ে করার জন্য মেয়ে খুঁজে পাবে না। আর শারীরিক ক্ষুধা মেটানো তো দূরের কথা। এর ফলে তারা খুঁজতে থাকে নিষিদ্ধ পল্লী। সেখানে শারীরিক ক্ষুধা মিটাতে গিয়ে তারা এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আবার প্রতিবেশী কোনো দেশে গিয়ে সেখানে মনের মানুষ খুঁজে নিতে পারে। কিন্তু ঝুঁকি সব ক্ষেত্রেই আছে। চীনে দ্রুতগতিতে বর্ধনশীল জনসংখ্যার রেশ টেনে ধরতে ১৯৭৯ সালে সেখানে ওয়ান চাইল্ড পলিসি বা এক শিশু নীতি গ্রহণ করা হয়। তা ১৯৭৯ সালে কার্যকর হয়ে অব্যাহত থাকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে কোনো দম্পতিকে একের অধিক সন্তান নিতে অনুমোদন দেয়া হয় নি। ফলে কোনো দম্পতি সন্তানের পিতামাতা হওয়ার আগে গর্ভস্থ শিশু ছেলে নাকি মেয়ে তা জেনে নেয়ার চেষ্টা করে। যদি তারা দেখতে পান গর্ভস্থ শিশু একটি কন্যা শিশু তাহলে গর্ভপাত করা হয়েছে। এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। কারণ, মেয়ে শিশুকে সেখানে ভাল চোখে দেখা হয় না। অভিভাবকরা মনে করেন, ছেলে শিশু হলে সে তাদের ভবিষ্যত দেখবে। এ জন্য কন্যা শিশুকে গর্ভপাত করে ফেলে দেয়া হয়। এর ফল হিসেবে সেখানে কন্যা শিশুর সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। বাড়তে থাকে ছেলে সন্তানের সংখ্যা। ভারতেও একই রকম প্রবণতা বিদ্যমান। সেখানেই মেয়ে শিশুর চেয়ে ছেলে শিশু বা সন্তানকে পছন্দ করা হয়। সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, ভারতে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৭০ লাখ বেশি। ছেলে সন্তানের চেয়ে মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়ার প্রবণতা একেবারেই কমে গেছে, যদিও ভারত অধিকতর উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ। এর ফলে ভারতেও অবিবাহিত পুরুষের সংখ্যা বাড়ছে। এর ফলে ঘটছে মানবপাচার। সেটা ঘটছে নারীর লোভ দেখিয়ে। আবার কখনো পতিতাবৃত্তির লোভ দেখিয়ে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিভাবকরা আগেই সন্তানের পরিচয় জেনে যান। এর ফলে তারা কন্যা শিশুর ভ্রুণকে হত্যা করেন। এই ধারা সেখানে ব্যাপকতা লাভ করেছে। ভারত ও চীন মিলে নারীর তুলনায় ২০ বছরের নিচে বয়সী পুরুষের সংখ্যা ৫ কোটিরও বেশি। ফলে তাদের কপালে মেয়ে জুটবে তো!

তিস্তা নদীর হাল খতিয়ে দেখতে ভারতের উদ্যোগ

তিস্তা নদীর বর্তমান অবস্থা দেখতে পশ্চিমবঙ্গে গেছে কেন্দ্রীয় জল সম্পদ মন্ত্রকের একটি দল৷ তিস্তার জল বাটোয়ারা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের যে টানাপোড়েন চলছে তার অবসানে এ উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল৷
তিস্তা নদীর জলবন্টন নিয়ে একটা সম্ভাব্য সমাধান নতুন করে খুঁজে দেখতে কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রকের একটি বিশেষজ্ঞ দল বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে গেছে৷ তিস্তার জলের পরিস্থিতি সরেজমিনে নতুন করে খতিয়ে দেখে একটা নতুন সমাধানসূত্র বের করাই এর লক্ষ্য৷ ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা চলেছে একটা সন্তোষজনক সমাধানের৷ কিন্তু তিস্তা চুক্তি সই হয় হয় করেও শেষ পর্যন্ত হয়নি৷ অচলাবস্থা অব্যাহত৷ কিন্তু কেন ? কোথায় আটকাচ্ছে?
কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে আটকায়নি৷ আটকেছে রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অনড় অবস্থানে৷ তাঁর মতে, রাজ্যের কৃষকদের সেচের স্বার্থে তিস্তার জল বাংলাদেশকে দেওয়া সম্ভব হবে না৷ গ্রীষ্মে তিস্তার জল থাকে মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ৷ পশ্চিমবঙ্গের ধানচাষীদের একমাত্র ভরসা তখন ঐ জল৷ উত্তরবঙ্গের অন্য নদীগুলিতে জল দিতে অবশ্য মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তি নেই৷
গত বছর নতুনদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের এক নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ও উপস্থিত ছিলেন৷ সেখানেই তিনি এই প্রস্তাব দেন৷ কিন্তু তা শেখ হাসিনার মনঃপুত হয়নি৷ তারপরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতার বক্তব্য,  ‘‘তিস্তার জলের ভাগ চাই৷'' এটা যেন একটা কূটনৈতিক, তথা রাজনৈতিক মর্যাদার ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ বাংলাদেশের মিডিয়া এবং নদী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিস্তার জল গজলডোবা বাঁধের দিকে ঘুরিয়ে সংযোগকারী খাল দিয়ে মহানন্দা নদীতে বইয়ে দেয়, যেটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে গঙ্গায়৷ মহানন্দা নদী পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়৷ বর্ষাকালে অবশ্য তিস্তার জল উপচে পার ভাসিয়ে দেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে৷ তখন জলের সমস্যার চেয়ে বন্যা সমস্যা প্রধান হয়ে ওঠে৷
এই বছরের শেষাশেষি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হবার কথা৷ দিল্লির সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্কের নিরিখে দেশবাসীকে খুশি রাখতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি সই-পর্ব শেষ করাটা শেখ হাসিনার পক্ষে ভোটের রাজনীতিতে জরুরি৷ অন্যদিকে আগামী বছর ভারতেও সাধারণ নির্বাচন৷ মোদী এবং শেখ হাসিনা উভয়েরই অগ্নিপরীক্ষা৷ তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি সে ক্ষেত্রে শাঁখের করাত হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
তাই দিল্লির ওপর নরমে গরমে ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছে ঢাকা৷ চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ানো তারই একটা ইঙ্গিত৷ প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে আর্থিক, বাণিজ্যিক সহযোগিতা মিলিয়ে সব ক্ষেত্রেই চীনের দিকে হাত বাড়াচ্ছে ঢাকা৷ তবে বিষয়টি খোলসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, এতে ভারতের উদ্বেগের কারণ নেই৷ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব ঐতিহাসিক৷ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত৷ সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ৷ কাজেই ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব তার নিজের জায়গাতেই থাকবে৷ চীনের বন্ধুত্ব থাকবে তার নিজের জায়গায়৷ ভারতীয় কূটনৈতিক মহল অবশ্য মনে করছে, তিস্তা চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কের একমাত্র মাপকাঠি নয়৷ অন্য সব ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পরিসর অনেক বিস্তৃত৷ তিস্তা নিয়ে জটিলতা স্রেফ একটা বাস্তবতা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ দ্বিতীয়ত, মৌলবাদ এবং জঙ্গিদমনে দু'দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য৷ জঙ্গি দমনে ভারত সব সময় পাশে পেয়েছে বাংলাদেশকে৷
ভারত ও বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি কতটা ভূমিকা রাখতে পারে সে সম্পর্কে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক কনক সরকারের অভিমত জানতে চাইলে ডয়চে ভেলেকে তিনি  বললেন, ‘‘ভারতের সাধারণ নির্বাচনে তিস্তা চুক্তির তেমন ভূমিকা নেই৷ পশ্চিমবঙ্গেও এর কোনো ছাপ পড়বে না৷ তিস্তা চুক্তি ছাড়াও অন্য অনেক নির্বাচনি ইস্যু আছে৷ তবে হ্যাঁ,  বাংলাদেশের নির্বাচনে তিস্তা চুক্তির বেশ বড় প্রভাব আছে৷বর্তমানে বাংলাদেশে জনগণের ওপর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্ণ আধিপত্যা আছে৷ তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্যতম অ্যাজেন্ডা৷ সব দলই তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে সেটাকে তুলে ধরে প্রচার চালাবে৷ সেটার ভিত্তিতে জনমতকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে৷ তবে এটা ছাড়াও বাংলাদেশের নির্বাচনে অন্যান্য আরও অনেক ফ্যাক্টর কাজ করবে৷''
ডয়চে ভেলের দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তি অগ্রাহ্য করে কেন্দ্র এই চুক্তি করতে পারে কিনা৷ উত্তরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক কনক সরকার বলেন, ‘‘সাংবিধানিক দিক থেকে বা আইনগত দিক থেকে কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্যি তা পারে৷ তবে গণতান্ত্রিক নৈতিকতায় কেন্দ্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না৷ পশ্চিমবঙ্গের জনমানসে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের যে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে, সেটাকে উপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত নয়৷ পূর্বতন মনমোহন সিংয়ের কংগ্রেস জোট সরকারও সেটা মেনে চলেছিলেন৷ কাজেই আইনগত দিক থেকে করতে পারলেও সার্বিক দিক থেকে কোনো কেন্দ্রীয় সরকারই তা করবে না৷''

বাংলাদেশকে পটাতে কেন লড়ছে ভারত ও চীন?

এ মাসের শুরুর দিকে ভারতের নতুন পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা থেকে শুরু করে পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা করা ছিল তার সফরের উদ্দেশ্য। এছাড়া এই সফরে ৮০ মাইল দীর্ঘ একটি পাইপলাইন নির্মাণেও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ। ওই পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তেল রপ্তানি করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘প্রথমে প্রতিবেশী’ (নেইবারহুড ফার্স্ট) শীর্ষক উচ্চাবিলাসী এক পররাষ্ট্র উদ্যোগের অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ওয়ার্ল্ড পলিটিকস রিভিউ এ নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছে মিশেল কুগেলম্যানের। তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার্স ফর স্কলার্সের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও এশিয়া প্রোগ্রামের উপ-পরিচালক। কুগেলম্যান ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ সম্পর্ক কীভাবে মোদির আঞ্চলিক এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত এবং কেন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে চীন বড় বাধা, তার ওপরও আলোকপাত করেছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকার হুবহু তুলে ধরা হলো মানবজমিন থেকে পাঠকদের জন্য।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা কী?
মিশেল কুগেলম্যান: বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভালো পর্যায়েই রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্কে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্কে একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু হলো সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ। দুই দেশই সন্ত্রাসবাদ নিয়ে খুবই কড়া। খুব কঠোরভাবে এই সন্ত্রাসবাদ দমন করতে তারা ভয় পায় না।
তবে উত্তেজক বিষয়-আসয়ও আছে। এর মধ্যে একটি হলো রোহিঙ্গা ইস্যু। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রচুর সংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ সীমান্তে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর ফলে যে নিরাপত্তাগত জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে অস্বস্তিতে আছে নয়া দিল্লী।
এছাড়া তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়েও উত্তেজনা আছে। এই নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। ঢাকা বেশ কয়েক বছর ধরে এই চুক্তি চূড়ান্ত করতে চাপ দিয়ে আসছে ভারতকে। নয়া দিল্লিও এতে রাজি। তবে ভারতে পানি ইস্যু হলো রাজ্য সংক্রান্ত বিষয়। এর মানে হলো, স্থানীয় রাজ্য সরকারকে অবশ্যই যে কোনো আন্তঃসীমান্ত নদী চুক্তিতে সই করতে হয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে যে সরকার অধিষ্ঠিত আছে, তারা এই চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত নয়।
তবে এগুলোকে ছাড়িয়ে দুই দেশের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় উত্তেজনার বিষয় হলো সম্ভবত বাংলাদেশে চীনের ঢুকে পড়াটা। কারণ, চীনকে নয়া দিল্লি নিজের মূল কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে।
প্রশ্ন: মোদির ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি এখন পর্যন্ত কতটা সফল? আর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলে তা ভারতের আঞ্চলিক উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হয় কীভাবে?
কুগেলম্যান: মোদির একটি বড় সমালোচনা হলো যে, তিনি তার নয়ানীতির সঙ্গে বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় স্লোগান যুক্ত করেছেন। কিন্তু এসব নীতি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি তিনি করতে পারেননি। ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির মানে হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নয়া দিল্লির সম্পর্ক গভীর করা।
এই নীতির কিছু মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তার সবচেয়ে বড় লক্ষণগুলোর একটি ছিল ২০১৪ সালে মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে আমন্ত্রণ জানানো। তবে এরপর থেকে ভারত ও পাকিস্তান সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
এমনকি ভারতের সঙ্গে দেশটির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কিছু প্রতিবেশীর সম্পর্কও ধাক্কা খেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নেপালের ক্ষেত্রে দুই দেশ বিচ্ছিরি এক বিতর্কে জড়িয়ে গিয়েছিল। একপর্যায়ে নেপাল অভিযোগ করে যে, ভারত দেশটির পণ্যের প্রবেশ আটকে দিচ্ছে। এছাড়া পাকিস্তান থেকে শ্রীলংকা ও মাঝের বহু এলাকায় চীনের পদচ্ছাপ পড়েছে, যা ভারত ঠেকাতে পারেনি।
তবে ‘প্রথমে প্রতিবেশী’ নীতি ব্যর্থ হওয়ার সবচেয়ে গুরুতর লক্ষণ হলো, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানতম আঞ্চলিক সংগঠন সার্ককে ব্যবহার করে পাকিস্তানকে খোঁচা দেয়ার যে সিদ্ধান্ত ভারত নিলো। ২০১৬ সালে ভারত বেশ কয়েকটি সার্কভুক্ত দেশকে তৎকালীন বার্ষিক সার্ক সম্মেলন বয়কট করতে রাজি করায়। ওই সম্মেলন পাকিস্তানের ইসলামাবাদে হওয়ার কথা ছিল। অগত্যা, পাকিস্তান ওই সম্মেলন বাতিল করতে বাধ্য হয়। সহযোগিতার জন্য যেই আঞ্চলিক ফোরামের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেই ফোরামকে ব্যবহার করে প্রতিবেশীদেরকে একে-অপরের বিরুদ্ধে ঠেলে দেয়ার মধ্যে ‘প্রতিবেশীসুলভ’ কিছু আসলে নেই।
তবে ‘প্রথমে প্রতিবেশী’ নীতি ব্যর্থ হলেও, বাংলাদেশই ছিল এই নীতির একমাত্র ব্যতিক্রম। এই একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরে নিতে সক্ষম হয়েছে মোদি সরকার। কেবলমাত্র সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেই দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারা বেশ কয়েকটি চুক্তিতেও সম্মত হয়েছেন।
ভারতের দুশ্চিন্তা হলো যে, চীন তাদেরকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে ফেলছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কোন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অর্জন।
প্রশ্ন: সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে কী কী সুযোগ রয়েছে? বাধাই বা কী?
কুগেলম্যান: সম্ভাব্য সহযোগিতার যেই ক্ষেত্রগুলো সবচেয়ে কম আলোচিত হয়, তার একটি হলো জ্বালানি। ভারত ও বাংলাদেশ নীরবে বেশ কয়েকটি জ্বালানি চুক্তি সই করেছে। এ থেকে দুই দেশেরই লাভ ঘরে তোলার সুযোগ রয়েছে। এসব চুক্তির একটি হলো বাংলাদেশের ট্রানজিট স্থাপনা ও বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দরিদ্র রাজ্যগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি। আরেকটি চুক্তি অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশকে জ্বালানি সরবরাহ করবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করবে।
এর বাইরেও ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে জ্বালানি ভাগাভাগির কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা চলছে। এসব জ্বালানি চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হলো চীন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও প্রভাব বৃদ্ধি করতে বেইজিং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আর ঢাকাও চীনকে তাড়িয়ে দেবে না। নয়া দিল্লির জন্য এটি উদ্বেগের কারণ।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক গভীর হওয়ার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও কী ঘনিষ্ঠতর হবে? চীন ফ্যাক্টর শেষ পর্যন্ত অনতিক্রম্য কোনো প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠার প্রয়োজন নেই।
নয়া দিল্লি সেসব দেশের সঙ্গে গভীর আংশীদারিত্ব করতে অভ্যস্ত যেসবের সঙ্গে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক এক্ষেত্রে উদাহরণ। দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে যেখানে ওয়াশিংটন পাকিস্তানের সঙ্গে মোটামুটি ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে।
এটি বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে নয়া দিল্লি এক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক হবে। নয়া দিল্লি এই বাস্তবতাও মেনে নেবে যে, চীনের কাছ থেকে পুঁজি ও বিনিয়োগ চাইবে ঢাকা। এটি মেনে নেয়ার পাশাপাশি ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করবে।
অবশ্যই, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা ভারতের জন্য মানতে সহজ হবে যদি দেশটি এই নিশ্চয়তা পায় যে, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাংলাদেশের উপকূলে কোনো নৌ স্থাপনা নির্মাণে চীনের কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারবে না। তবে আমি মনে করি না, ভারত এ ধরনের নিশ্চয়তা খুব শিগগিরই পাবে।

মালয়েশিয়ায় মোসাদের অভিযানের নেপথ্যে

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ইসরাইলের দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অভিযানে নিহত হয়েছেন ফিলিস্তিনের এক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ। শনিবার ভোরে স্থানীয় একটি মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার সময় তার মাথায় ও বুকে গুলি করে মোসাদ সদস্যরা। পুলিশ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। সন্দেহভাজন অপরাধীদের কম্পিউটারে তৈরি ছবিও প্রকাশ করেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে নি। পুলিশের ধারণা, হত্যাকারীরা এখনো মালয়েশিয়া ত্যাগ করে নি। হত্যাকা-ের ধরন ও প্রকৃতি দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলের গোয়েন্দারাই এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে। শনিবার মালয়েশিয়ার সহকারী প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি বলেন, সন্দেহভাজন অপরাধীরা ছিল ইউরোপীয়, যাদের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ছিল। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ ফিলিস্তিনের জন্য মঙ্গলজনক কোনো বিষয় ভুল করে দিতে যেকোনো কিছু করতে পারে। তারা ফিলিস্তিনের বিশেষজ্ঞদের টার্গেট করেছে। যেন ফিলিস্তিনে কোনো ইন্তিফাদা না ঘটতে পারে।
নিহত ফিলিস্তিনি বিজ্ঞানী ফাদি আল বাতশ মূলত একজন প্রকৌশলী ও প্রভাষক। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত ড্রোন তৈরিতে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। এই বিষয়ে তার লেখা অনেক গবেষণাপত্রও রয়েছে। তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের একজন সক্রিয় সদস্য। বলা হচ্ছে, অস্ত্রবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জনের জন্য হামাসই তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে। ফাদি আল বাতশ এর পরিবার হত্যাকা-ের জন্য মোসাদকে দায়ী করছে। মধ্যপ্রাচ্যের গোয়েন্দারা বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ ও পানিতে বিচরণযোগ্য ড্রোন তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি লাভ করেছিলেন ফাদি। এই অগ্রগতিই তাকে মোসাদের টার্গেটে পরিণত করেছে। তাদের দাবি, মোসাদ প্রধান ইয়োসি কোহেন নিজেই এই হত্যাকান্ডের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগদর লিবারম্যান ফাদি হত্যাকা-ের সঙ্গে তার দেশের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
ফাদি আল বাতশ এর হত্যাকান্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। বহু বছর ধরেই হামাসের কোনো সদস্য যেন বিশেষ দক্ষতা অর্জন না করতে পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে মোসাদ। এর আগে এ বছরের জানুয়ারি মাসে লেবাননে গাড়ি বোমা হামলার শিকার হন হামাস কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামদান। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। তাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ তৈরি দায়িত্ব দিয়েছিল হামাস। ২০১৬ সালে হামাসের আরেক ড্রোন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জাউরিকে হত্যা করা হয়। তিনি তিউনিসিয়ায় বসবাস করতেন। নিজের গাড়িতে উঠার পর অজ্ঞাত ব্যক্তি সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। ২০১১ সালে ইউক্রেনের একটি ট্রেন থেকে ফিলিস্তিনি প্রকৌশলী দিরার আবু সিসিকে অপহরণ করা হয়। পরে হামাসের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তা করার দায়ে তাকে ২১ বছরের কারাদ- দেয় ইসরাইল। বর্তমানে তিনি ইসরাইলে বন্দি রয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক বছর ধরেই হামাসের অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের টার্গেট করে হামলা চালাচ্ছে মোসাদ। ফাদি আল বাতশের হত্যাকা- তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। এদিকে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া থেকে অস্ত্র ক্রয় করার জন্য হামাসের পক্ষে মধ্যস্থতা করছিলেন ফাদি আল বাতশ। উত্তর কোরিয়ার তৈরি অস্ত্র গোপনে হামাসের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। এমনটিই জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে টাইমস ম্যাগাজিনের খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া থেকে রকেট তৈরির উপাদান কিনেছিল হামাস। গাজায় পাঠানোর সময় সেগুলো আটক করে মিসরীয় সেনারা। এগুলো কেনার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করেন ফাদি আল বাতশ। বিষয়টি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসে। অবধারিতভাবেই তিনি মোসাদের টার্গেটে পরিণত হন।
ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তুরস্কভিত্তিক একটি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফাদি। যারা হামাসের হয়ে বিভিন্ন গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতো। এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণার জন্য হামাসের পক্ষে বিদেশি বিজ্ঞানীও নিয়োগ দিত তারা। নিহত হওয়ার দিন তার ইস্তাম্বুলে যাওয়ার কথা ছিল।
গত বছর জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অস্ত্র বিক্রি করার জন্য উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কোম্পানি কুয়ালালামপুরকে অস্ত্র বিক্রির কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহার করে। আর মালয়েশিয়া গুটিকয়েক দেশের মধ্যে অন্যতম, যারা ‘হারমিট স্টেটের’ (আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বকভাবে বিচ্ছিন্ন দেশ) সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। এমনকি মালয়েশিয়া ও হারমিট স্টেটের মধ্যে ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধাও রয়েছে। ফাদি আল বাতশ উত্তর কোরিয়ার এই কোম্পানির সহায়তায় হামাসের জন্য অস্ত্র কেনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। বিষয়টি মোসাদের দৃষ্টিগোচর হয়। ঊর্ধ্বতন মহল থেকে ফাদিকে হত্যা করার নির্দেশ আসে।
মার্কিন সাপ্তাহিক নিউজউইকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে।

সর্বনিম্ন মজুরি: শ্রমিকরা চান ১৬ হাজার, মালিকরা ১০ by শফিকুল ইসলাম

ছয় শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা সর্বনিম্ন বেতন দাবি করছেন ১৬ হাজার টাকা। তবে গার্মেন্টস কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সর্বনিম্ন বেতনের ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকার ওপরে উঠতে চায় না। এ ব্যাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সরকার গঠিত সর্বনিম্ন মজুরি বোর্ড। জানা গেছে, এই বোর্ড এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সভা করতে পেরেছে। গত ২৫ এপ্রিল মজুর বোর্ডের সভা নির্ধারিত থাকলেও অনিবার্য কারণে তা হয়নি। বোর্ডের পরবর্তী সভা কবে হবে তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন মজুরি বোর্ডের একজন সদস্য। তবে বোর্ডের মালিক প্রতিনিধি তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, এ নিয়ে তাড়াহুড়ার কিছু নেই। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। এর মধ্যেই সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা যাবে। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস), গ্লাস অ্যান্ড সিলিকেট, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, বেকারি বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি, অ্যালুমিনিয়াম অ্যান্ড এনামেল এবং সিকিউরিটি সার্ভিস এই ছয় খাতের শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণে একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজের নেতৃত্বে সর্বনিম্ন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত অস্থায়ী কার্যালয়ে একটি সভাও করেছে নবগঠিত মজুরি বোর্ড। যদিও ওই সভায় বেতন বা মজুরি নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এরই মধ্যে ছয়টি শিল্প খাতের শ্রমিকদের বেতন কতো হবে, কী কী সুবিধা শ্রমিকরা পেতে পারেন তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন এসব খাতের মালিক ও শ্র্রমিক প্রতিনিধিরা।
জানা গেছে, শ্রমিকরা তাদের সর্বনিম্ন বেতন ১৬ হাজার টাকা দাবি করছেন। সঙ্গে অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। তবে সরকার বা মজুরি বোর্ড এই ছয় খাতের শিল্পের শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন বেতন সর্বমোট ১০ হাজার টাকার ওপরে ওঠাতে চায় না। এই লক্ষ্যেই কাজ করছে মজুরি বোর্ড। সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও সরকার গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ড সূত্রে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মজুরি বোর্ড আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট পাসের আগেই, অর্থাৎ ৩০ জুনের মধ্যে তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করে তা সরকারের কাছে জমা দিতে চাচ্ছে। তবে আপত্তি করছেন বিজিএমইএ নেতারা। তারা বলছেন, ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাতে সময় আছে। তাহলে কেনও এই তড়িঘড়ি। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিলেই হবে।
শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার নিম্নতম মজুরি ঘোষণা ও তা বাস্তবায়ন করতে চায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই। দেশের এই ছয় শিল্পে নিয়োজিত বিশাল সংখ্যক শ্রমিকদের সমর্থন আদায়ে সরকার এই কৌশল নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। 
সূত্র জানায়, ইতোমধ্যেই ছয় শিল্পের সংশ্লিষ্টরা নিজেদের শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নূন্যতম মজুরি কতো হবে, তাদের কী কী সুবিধা দেওয়া যায় বা সরকারের কাছে কী কী সুবিধা চাওয়া যায় তা নির্ধারণে বৈঠক করেছেন। এর অংশ হিসেবে গত ৩ মার্চ বৈঠক করেছেন বেকারি বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশানারি শিল্পের কর্মকর্তারা। ৪ মার্চ বৈঠক করেছেন গ্লাস অ্যান্ড সিলিকেট শিল্পের কর্মকর্তারা। ১৯ মার্চ বৈঠক করেছেন তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মকর্তারা। ২০ মার্চ বৈঠক করেছেন সিকিউরিটি সার্ভিস খাতের কর্মকর্তারা। ২১ মার্চ বুধবার বৈঠক করছেন অটোমোবাইল ওয়ার্কস শিল্পের কর্মকর্তারা। ২৭ মার্চ শেষ বৈঠক করেছেন অ্যালুমিনিয়াম অ্যান্ড এনামেল শিল্পের কর্মকর্তারা।
ইতোমধ্যেই সব শিল্পের শ্রমিক নেতারা একত্রিত হয়ে সর্বনিম্ন বেতন কতো হবে এবং কী কী সুযোগ-সুবিধা চাওয়া হবে তা মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছেন। ঠিক করে এর একটি প্রস্তাবও তারা মজুরি বোর্ডের কাছে পেশ করেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক সংগঠন উল্লেখযোগ্য। একাধিক সংগঠনের একটি জোট হয়ে তারা একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর। স্মারকলিপিতে তারা তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য মূল বেতন ১০ হাজার টাকাসহ মোট ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছেন। এর মধ্যে ন্যূনতম মজুরি হবে ১০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ১০ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট, স্থায়ীভাবে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ভেরিয়েবল ডিএ, কন্ট্রিবিউটর প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে এ জোটের বাইরে থাকা পৃথক সংগঠন গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (জি-স্কপ) শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১৮ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনমান বিবেচনায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য এটি নির্ধারণ করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।
উল্লেখ্য, দেশের পোশাক শিল্পের মজুরি কাঠামো সর্বশেষ পর্যালোচনা হয় ২০১৩ সালে। সেই বছর ন্যূনতম মজুরি হার নির্ধারণ হয় ৫ হাজার ৩০০ টাকা। ওই বছরের ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর পরপর মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করতে হবে বলে আইনে বলা হয়েছে। যা ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান (অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ) সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘যে সব দাবি আসবে তা একত্রিত করে পর্যালোচনা করা হবে। সব কিছু বিচার বিবেচনা করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হবে।’
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে চূড়ান্ত হবে সর্বনিম্ন বেতন কতো হবে। অবশ্যই যা ঘোষণা করা হবে তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও থাকতে হবে। শিল্প সক্ষমতা এবং শ্রমিকদের প্রয়োজনীয়তা এই দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা সে ধরনের একটি বেতন কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করছি।’
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি পোশাক খাতের মজুরি পর্যালোচনায় নিম্নতম মজুরি বোর্ড ঘোষণা করা হয়। বোর্ড গঠনের তিন মাস পর গত ১৯ মার্চ ওই বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বেতন কাঠামো নিয়ে ততটা গুরুত্ব দিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আমিনুল ইসলাম।
তিনি জানান, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে বিদ্যমান শ্রম আইন এবং বিধিতে যে সমস্ত বিধান আছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে মাত্র। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা ও অসুবিধা তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২৫ এপ্রিল নিম্নতম মজুরি বোর্ডের দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ওই বৈঠকের আগে সংশ্লিষ্টদের নিজেদের পক্ষে থাকা বিভিন্ন দাবি দাওয়া ও সুপারিশ, পরামর্শ, অনুরোধ কিছু থাকলে তা জানানোর জন্য বলা হয়েছিল। সেই মোতাবেক মালিক ও শ্রমিকরা তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কিছু দাবি ও সুপারিশ বোর্ডের কাছে জমাও দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বোর্ড সূত্র বরাবরই এ সম্পর্কে কিছু জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, গত ১৯ মার্চের সভায় জাতীয় শ্রমিক লীগের নারী বিষয়ক সম্পাদক বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ফজলুল হক মন্টু, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের শ্রম উপদেষ্টা কাজী সাইফুদ্দীন আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে সরকারের হাতে কিছু নাই। মজুরি বোর্ডের সপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন বেতন কাঠামো ঠিক করা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার বরাবরই শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়। তবে শিল্প না বাঁচলে মালিক বাঁচবে না, সেদিকটিও মনে রাখতে হবে। এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যা মালিকদের পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অপরদিকে এমন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করাও উচিত হবে না, যা দিয়ে একজন শ্রমিক তার পরিবার পরিজন নিয়ে নূন্যতম জীবনযাপন করাও কষ্টসাধ্য হয়।

বাংলাদেশকে নিয়ে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব: কী ঘটছে নেপথ্যে?

এশিয়ার সবচেয়ে বড় দুই শক্তি চীন এবং ভারত সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে, বাংলাদেশের গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে তার নজির সম্ভবত নেই।
এই দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত তীব্র রূপ নিয়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, এ বিষয়ে তাদের মধ্যেও ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
কেবল এ সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক দুটি প্রতিষ্ঠান এ এনিয়ে দুটি লেখা প্রকাশ করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইস্ট এশিয়া ফোরামে'র প্রকাশিত নিবন্ধটির শিরোণাম, "চায়না এন্ড ইন্ডিয়া'স জিওপলিটিক্যাল টাগ অব ওয়ার ফর বাংলাদেশ"। অর্থাৎ বাংলাদেশ নিয়ে চীন এবং ভারতের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যুদ্ধ।"
আর নিউইয়র্ক ভিত্তিক 'ওয়ার্ল্ড পলিসি রিভিউ' ঠিক এ বিষয়েই 'উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারসের' একজন গবেষকের অভিমত ছেপেছে। তাদের লেখাটির শিরোণাম, হোয়াই ইন্ডিয়া এন্ড চায়না আর কম্পিটিং ফর বেটার টাইস উইথ বাংলাদেশ।" অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে কেন ভারত আর চীনের মধ্যে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা?
দুটি লেখাতেই বাংলাদেশের সঙ্গে চীন এবং ভারতের সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাংলাদেশর রাজনীতি ও নির্বাচন এবং দেশটির ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য এই দুই বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বের বিষয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ রয়েছে।
কার অবস্থান কোথায়?ভারত এবং চীন, দুটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের রয়েছে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক এবং সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক।
তবে এর মধ্যে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণে ভারতের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্কটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
ইস্ট এশিয়া ফোরামে প্রকাশিত লেখায় ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় দুটি দেশই মূলত বাণিজ্যকেই ব্যবহার করতে চাইছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুটি দেশই সুবিধেজনক অবস্থানে আছে। দুটি দেশেরই বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে বাংলাদেশের সঙ্গে। দুই দেশের বাণিজ্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তারা তুলে ধরেছেন তাদের লেখায়।
চীন বাংলাদেশে রফতানি করে প্রায় ১৬ হতে ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ বাংলাদেশে থেকে আমদানি করে মাত্র ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশকে তারা বছরে একশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২৪ বিলিয়ন বা দুই হাজার চারশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়ার কথা ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশে রফতানি করে বছরে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু আমদানি করে মাত্র ২৬ কোটি ডলারের। কিন্তু দুদেশের মধ্যে অনেক 'ইনফরমাল ট্রেড' বা অবৈধ বাণিজ্য হয়, যা মূলত ভারতের অনুকুলে। এর পরিমাণ কমপক্ষে দুই হতে তিন বিলিয়ন ডলারের সমান হবে বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে যে ভারতীয়রা কাজ করেন তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও হবে দুই হতে চার বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশকে ভারত যে বৈদেশিক সহায়তা দেয় বছরে তার পরিমাণ পনের কোটি ডলারের মতো।
অবকাঠামো খাতে প্রতিযোগিতা
দুটি দেশই বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে ব্যাপক সাহায্যের প্রস্তাব দিচ্ছে। বাংলাদেশে বড় আকারে রেল প্রকল্পে আগ্রহী দুটি দেশই। গভীর সমূদ্র বন্দর স্থাপনেও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে উভয় দেশের। কিন্তু এসব প্রকল্প খুব বেশি আগাচ্ছে না। ভারত বাংলাদেশের সুন্দরবনের কাছে যে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ পেয়েছে সেটি বেশ কিছু বাস্তব এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, অবকাঠামো খাতে চীন-ভারতের এই প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ খুব একটা লাভবান হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ম্যানুফাকচারিং এবং জ্বালানি খাতে চীন বা ভারত, কেউই বড় কোন বিনিয়োগে যায়নি। যদিও তারা এধরণের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের সামরিক খাতে বড় সরবরাহকারী। ভারত এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল, এখন তারা দ্রুত চীনকে ধরতে চাইছে। কিন্তু ভারতের সামরিক সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে বাংলাদেশের।
চীনের তুলনায় ভারত যেদিকে এগিয়ে আছে, তা হলো বাংলাদেশের ওপর তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব। ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, এই প্রভাব খুবই ব্যাপক। দু্‌ই দেশের রয়েছে অভিন্ন ভাষা (বাংলা) এবং সংস্কৃতি, এবং এর একটি বড় কেন্দ্র এখনো কলকাতা। বাংলাদেশের অন্তত এক লাখ ছাত্র-ছাত্রী ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।
এর বিপরীতে চীনের সাংস্কৃতিক প্রভাব নগণ্য। ঢাকায় চীন একটি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে চীনা ভাষা শেখানো হয়।
আভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রশ্নে অবস্থান
ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে বর্ণনা করছেন একটি 'ইসলামপন্থী এবং পাকিস্তানপন্থী' দল হিসেবে। তাদের মতে, ২০০১ সাল হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দলটি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন যা ঘটেছিল, সেটা ভারতের মনে আছে এবং তাদের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি এবং ভাবনার গঠন সেটার ভিত্তিতেই। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসলে সেটা ভারতকে বিচলিত করবে।
তাঁরা আরও বলছেন, এ বিষয়ে দিল্লির কৌশল একেবারেই স্বলমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা তাড়িত। তাদের কৌশলটা হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখা, সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব ঠেকিয়ে দেয়া।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চীন খেলছে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য সামনে রেখে। তারা এক দিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে। অন্যদিকে, এই দুজনের ভাষায়, 'ভারত বিরোধী এবং সেনাপন্থী' বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তারা একটা ভারসাম্য রাখছে।বাংলাদেশ যেভাবে খেলছে
দুই বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে বাংলাদেশ কিভাবে তার সুবিধা নিচ্ছে?
ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ কোন নিস্ক্রিয় 'ভিক্টিম' নয়, বরং নিজের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এটি আরও উস্কে দিচ্ছে। তারা বলছেন, বাংলাদেশে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে যে দুটি দেশই আসলে বাংলাদেশকে যা দেয়, তার উল্টো অনেক বেশি নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের অবকাঠামো এবং ম্যানুফ্যাকচারিং প্রকল্পগুলি খুব নিম্নমানের (জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায়)।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিয়েছে চীন এবং ভারত আসলে কেবল 'সুদিনের বন্ধু। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যে কোন পদক্ষেপ চীন আটকে দিচ্ছে। এটাকে বাংলাদেশ বন্ধুত্বসুলভ কোন কাজ বলে মনে করে না। অন্যদিকে ভারতের অবস্থাও ভালো নয়। তারাও এই ইস্যুতে মিয়ানমারকে মদত দিয়ে যাচ্ছে।
ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক তাদের উপসংহারে বলছেন, চীন আর ভারত সর্বোতভাবে চেষ্টা করবে বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় কে কার আগে থাকতে পারে। কিন্তু তাদের উভয়েই ব্যর্থ হবে, কারণ বাংলাদেশও এখন এ নিয়ে এক দেশকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে খেলানোর মাধ্যমে এখান থেকে তাদের প্রাপ্য আদায়ের চেষ্টা করবে।
তাহলে বাংলাদেশকে নিয়ে চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ফল ভবিষ্যতে কী দাঁড়াবে?
তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে দুই দেশের বাণিজ্য নীতি। দুটি দেশের কোনটিই বাংলাদেশকে রফতানির ক্ষেত্রে কোন ছাড় এখনো পর্যন্ত দিচ্ছে না। দুটি দেশই বাংলাদেশে রফতানির ক্ষেত্রে ব্যাপক 'আন্ডার ইনভয়েসিং' এর সুযোগ দিচ্ছে, যেটি কীনা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম-নীতির লঙ্ঘন। যত অর্থ তারা বাংলাদেশকে ঋণ দেয়, তার চেয়ে আরও অনেক বেশি অর্থ তারা নিয়ে নেয় এভাবে।
কিন্তু এক্ষেত্রে চীন আছে সুবিধেজনক অবস্থানে। তাদের অর্থনীতি ভারতের তুলনায় অনেক বড়। বাণিজ্যেও তারা এগিয়ে। কাজেই বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের জন্য চীন যদি কোনদিন তাদের বাজার খুলে দেয়, এই চীন-ভারত দ্বন্দ্বে সুস্পষ্টভাবেই চীন জয়ী হবে, বাংলাদেশ ঝুঁকে পড়বে তাদের দিকেই।'প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শেষ কথা নয়'
যুক্তরাষ্ট্রের উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারসে'র মাইকেল কুগেলম্যান অবশ্য বিষয়টিকে দেখেন ভিন্নভাবে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশকে নিয়ে চীন এবং ভারতের এরকম প্রতিযোগিতার কোন প্রয়োজনই নেই। দুটি দেশই আসলে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে।
এক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদাহারণ টেনেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের ঘনিষ্ঠতা বহু বছর ধরেই বাড়ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বাধা হয়নি।
তিনি আশা করছেন, দিল্লির এক সময় এই বাস্তবতা মেনে নেবে যে, ঢাকা অবশ্যই চীনের পুঁজি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করবে। তাদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চাইবে। তবে এক্ষেত্রে ভারত শুধু চীনের কাছ থেকে একটা নিশ্চয়তা চাইতে পারে—এই সহযোগিতা যেন কেবল অর্থনৈতিক খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তারা যেন বঙ্গোপসাগরে কোন ধরণের নৌ স্থাপনা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর না হয়।
কিন্তু ভারতকে এরকম কোন নিশ্চয়তা চীন কি দেবে? সেটার কোন ইঙ্গিত কিন্তু এখনো নেই।
সূত্রঃ বিবিসি

ঢামেকে ‘ফ্রি বেড’ বাণিজ্য by শুভ্র দেব

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে পদে পদে গুনতে হয় বকশিশের নামে টাকা। বকশিশ না দিলে কাউকে খুশিও করা যায় না আবার কোনো কাজও আদায় করা যায় না। প্রতি বিভাগের প্রতি ওয়ার্ড ঘিরে রয়েছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট চক্র। তাদের ছাড়া সেবা পাওয়া দুষ্কর। হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, পরিচ্ছন্নকর্মী, স্পেশাল বয়, আয়া রোগী জিম্মি করে টাকা আদায় করে। অভিযোগ আছে রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে আদায়কৃত টাকার ভাগ পান ওয়ার্ড মাস্টাররা। তাই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে তেমন কোনো লাভ হয় না রোগী ও স্বজনদের। নামে বিনামূল্য চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও সাধারণ রোগীদের গুনতে হয় টাকা। এমনকি বিনামূল্যের সিট পেতে টাকা দিতে হয়। নতুবা রোগীদের ওয়ার্ডের কোনো সিটের নিচে ও বারান্দার চলাফেরার রাস্তায় পড়ে থাকতে হয়। যদি কোনো মুমূর্ষু রোগী হয় তাও তাদের মন গলে না। ৬ই মার্চ রাতের ঘটনা । খেলতে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় ৫ বছর বয়সী সূর্য। প্রচণ্ড বমি শুরু হলে স্বজনরা তাকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা অবজারভেশনের জন্য তাকে হাসপাতালের ২০৪ নম্বর মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। রাত ২টায় সূর্যের স্বজনরা ওই ওয়ার্ডে গিয়ে দেখেন সেখানকার সেবিকারা তাদের বিশ্রাম কক্ষের দরজা বন্ধ করে গভীর ঘুমে। আয়াদের অনেক ডাকাডাকির পর সেই সেবিকা স্যালাইন ও একটি ইনজেকশন দেন। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে সূর্যের জন্য নির্ধারিত ইউনিটে কোনো সিট পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ ওই ইউনিটের কিছু সিটে রোগী আর বাকি সব সিটে রোগীর আত্মীয়স্বজন ঘুমিয়ে আছেন। আবার এসব সিটের নিচে মেঝেতে আরো কিছু রোগী ঘুমিয়ে আছেন। ওয়ার্ডের সেবিকা, ওয়ার্ড বয়, আনসার সদস্য ও আয়াদের কাছে অনুরোধ করে কোনো সিটের ব্যবস্থা করা যায়নি। পরে কর্মরত এক সেবিকার পরামর্শে আয়াকে খুশি করার শর্তে একটি সিট পাওয়া যায়। বিনামূল্যের একটি সিটের জন্য সেদিন সূর্যের পরিবারকে গুনতে হয়েছিল ৫০০ টাকা।
একই ওয়ার্ডে ২৩শে জানুয়ারি নোয়াখালীর সুধারাম থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন রিকশাচালক মো. জামাল মিয়ার শিশুকন্যা হাসনা বেগম। গাছ থেকে পড়ে ব্যথা পাওয়ায় চিকিৎসক তাকে দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিতে বলেন। হাসনার নানী আমেনা খাতুন বলেন, জরুরি বিভাগ থেকে ট্রলি দিয়ে হাসনাকে দ্বিতীয় তলায় আনতে স্পেশাল বয়দের দিয়েছেন ৪০০ টাকা। তারপর ওয়ার্ডে এসে কোনো সিট না থাকায় তাদের ঝামেলায় পড়তে হয়। ওয়ার্ডের কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক দৌড়াদৌড়ি করে তিনি কোনো সিটের ব্যবস্থা করতে পারেননি। পরে ওয়ার্ডে লিপি নামের এক আয়াকে ৬০০ টাকা দিলে সিটের ব্যবস্থা হয়ে যায়। আমেনা বলেন, শুধু তাই নয়- হাসনাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা, অটি, ডেসিং করাতে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতে স্পেশাল বয়, আয়াসহ অনেককে প্রায় ২ হাজার টাকা বকশিশ দিতে হয়েছে। এই ওয়ার্ডের মাস্টার মো. রিয়াজ উদ্দিনের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। অভিযোগের বিষয়ে জানিয়ে ভালো করেছেন। দু’দিন আমাকে সময় দেন। এর মধ্যে আমি সব কিছু অন্তত ৮০ শতাংশ ঠিক করে নেবো।
৮ই এপ্রিলের ঘটনা। ঢামেকের নতুন ভবনের ৫ম তলার মেডিসিন বিভাগের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে (মহিলা) ভর্তি দেয়া হয় ভোলার তজমুউদ্দিনের মিলন বিবিকে (৫০)। তার ভাই আবদুল মতিন তাকে ঢামেকে নিয়ে আসেন। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে তার বোনের জন্য তিনি কোনো সিটের ব্যবস্থা করতে পারেননি। ওয়ার্ড বয়, আয়ারা সেদিন কোনো সিট নেই বলে জানান। পরে ওই ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজনের পরামর্শে সেখানকার একজনকে ২০০ টাকা দিয়ে একটি সিটের ব্যবস্থা করেন। মিলন বিবির ভাই আবদুল মতিন বলেন, হাসপাতালে প্রবেশের পর চিকিৎসা শুরুর আগেই অনেককে টাকা দিয়েছি। এখানে টাকা ছাড়া কেউ ভালোভাবে কথাও বলে না। আবার টাকা দিলে সব কিছু ঠিকঠাক মতো হয়ে যায়। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ। তাদেরকে খুশি করে সেবা নেয়ার মতো আমাদের এত টাকা নেই। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের মাস্টার আবুল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমি নতুন এসেছি। এখনো কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এ ধরনের কোনো ঘটনা হওয়ার কথা না। আমি খোঁজখবর নিচ্ছি যদি এ ধরনের ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায় তবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মেডিসিন ৬০২ (পুরুষ) ওয়ার্ডের একই অবস্থা। ৪ঠা এপ্রিল ওই ওয়ার্ডে আসেন মুন্সিগঞ্জের গাড়িচালক মুক্তার হোসেন। শ্বাসকষ্ট ও কফের সঙ্গে রক্তের কারণে তাকে বেশ কয়েকদিন চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তাই তার জন্য প্রয়োজন একটি বেডের। ওয়ার্ডে বেড ফাঁকা থাকলেও সেদিন মুক্তার হোসেনকে কোনো বেড দেয়া হচ্ছিল না। নানা অজুহাতে বেড ফাঁকা নেই বলে মুক্তার হোসেনের ছেলে ও তার স্ত্রীকে জানানো হয়। পরে ওই ওয়ার্ডের এক নারীকে ৩০০ টাকা দিয়ে একটি সিট পাওয়া যায়।
একই চিত্র অর্থপেডিকস ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে। গত মাসে ট্রাকের ধাক্কায় আহত হন কিশোরগঞ্জের সাগর হোসেন। ডান হাত ভেঙে যাওয়ায় ভালো চিকিৎসার জন্য তার স্বজনরা নিয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অর্থপেডিকস ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের ১৬ নম্বর বেডে তিনি বেশ কিছুদিন ভর্তি ছিলেন। যদিও ভর্তির হওয়ার পর পর তাকে ওই ওয়ার্ডের মেঝেতে জায়গা করে নিতে হয়। ৮ই এপ্রিল সাগর হোসেনকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছাড়পত্র দেয়। যাওয়ার সময় সাগর ও তার মা মীনা বেগম মানবজমিনকে বলেন, প্রথমে বেডের কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। কোনো বেড ফাঁকা হলে সেখানে ওই ওয়ার্ডের সংঘবদ্ধ কয়েকজন টাকার বিনিময়ে অন্য লোক উঠিয়ে দেয়। অনেক বলার পরও আমরা কোনো সিটের ব্যবস্থা করতে পারিনি। অথচ এ ধরনের রোগীকে বেডে রাখা খুবই জরুরি। পরে ওই সংঘবদ্ধ চক্রকে ৪৫০ টাকা দেয়ার পর বেডের ব্যবস্থা হয়। মীনা বেগম বলেন, আমার ছেলের হাত এখনো ভালো হয়নি। কিন্তু তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থপেডিকস ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের মাস্টার মো. জিল্লুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আগে যারা দায়িত্বে ছিল তারা কীভাবে পরিচালনা করতো জানি না। আমাকে কিছুদিন ধরে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাই কারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একে এম নাসির উদ্দিন এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২ হাজার ৬০০ বেডের মধ্যে ৭০ শতাংশ বেডই বিনামূল্যের আর ৩০ শতাংশ বেডে টাকা দিতে হয়। বিনামূল্যের বেডে আর্থিক লেনদেন শুধু অনিয়ম না এটা অপরাধ। বিনামূল্যের বেডে যদি কেউ টাকা নেয় আর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় তবে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। কাজী জাহাঙ্গীর আরো বলেন, হাসপাতালের ডাক্তার সেবিকাদের যেকোনো সময় বদলি করা যায়। তবে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের মধ্যে যারা চাকরি করে তাদের যেকোনো সময় বদলি করা যায় না। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলেই তবে করা যায়। এজন্য এসব স্থানে একটা বড় সিন্ডিকেট তৈরি হয়।

পঞ্চম সপ্তাহে গাজা বিক্ষোভ: ইসরাইলের গুলিতে ৪ ফিলিস্তিনি নিহত, আহত ৯৫০

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইল সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার বিক্ষোভের পঞ্চম সপ্তাহ শুরু হয়েছে। সপ্তাহের প্রথম দিনেই ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ৪ বিক্ষোভকারী। আর আহত হয়েছেন সাড়ে ৯শ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়, শুক্রবার আবারো বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালিয়েছে ইসরাইল। এতে এক হাজারেরও বেশি মানুষ হতাহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১৭৮ জন সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অন্যরা টিয়ার গ্যাস ও রাবারের তৈরি গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। নিজেদের ভূমির অধিকার ফিরে পেতে পাঁচ সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ করছে ফিলিস্তিনিরা। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনী। এতে এখন পর্যন্ত মোট ৪৫ ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী নিহত
হয়েছে। আহত হয়েছে ৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। অপর পক্ষে এখন পর্যন্ত ইসরাইলের কোনো নিরাপত্তাকর্মী বা নাগরিক হতাহত হয়নি। শুক্রবার নতুন করে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি গাজার ইসরাইল সীমান্তের কাছে জড়ো হয়। এদিন তারা ইসরাইলের সীমান্ত বেড়ার একেবারেই গোড়ায় পৌঁছে যান। ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনী।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল কিদরা বলেন, গাজার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তারা সেন্ট্রাল গাজার আল বুরেজি শরণার্থী শিবিরের একটি মেডিকেল সেন্টারে গ্যাস হামলা করেছে। এতে সেখানে চিকিৎসাধীনরা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। ইসরাইল ও মিসরের অবরোধের কারণে গাজা এক দশক ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘উন্মুক্ত কারাগারে’ পরিণত হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, তাদের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। মানুষ এখন আর কিছুতেই আতঙ্কিত হয় না। বছরের পর বছর গাজার অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মানে অবনতি ঘটছে। ৬০ শতাংশ যুবক বেকার। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় মাত্র ৪ ঘণ্টা। গাজার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে মিলছে না মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা। ফলে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে মারা যাচ্ছেন অনেক রোগী। এমনকি অবরোধের কারণে তারা অন্য কোনো জায়গায় উন্নত চিকিৎসাও নিতে পারছেন না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ এখন কিছুতেই আর ভয় পায় না। এজন্যই তারা ইসরাইলের অব্যাহত গোলাবর্ষণ সত্ত্বেও সীমান্ত বেড়ার কাছে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিক্ষোভ করছেন। তবে ইসরাইলের দাবি, বিক্ষোভকারীদের উস্কে দিচ্ছে হামাস।
এদিকে, গাজার উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে ইসরাইলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এজন্য সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ করেছে। এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি বলেছে, বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে ইসরাইল উচ্চ-মাত্রার সামরিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিনিরা কোনো ধরনের আক্রমণ না করা সত্ত্বেও ইসরাইল গুলিবর্ষণ করছে। বিক্ষোভকারীদের হত্যা করার জন্য ইসরাইল বেপরোয়া আচরণ করছে। এটা জেনেভা কনভেনশনের মৌলিক নীতির বিরোধী। একই সঙ্গে এটি পরিষ্কার যুদ্ধাপরাধ। এর আগে শুক্রবার সকালে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জেইদ রা’দ আল হোসেন ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ইসরাইলে নিরাপত্তা বাহিনীকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের দাবি, প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে নিজেদের ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদেরকে পৈত্রিক নিবাসে বসবাসের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু ইসরাইল এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফিলিস্তিনিদের এই বিক্ষোভ ১৫ই মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তবে বিক্ষোভকারীরা বলছেন, দাবি আদায় না হলে নির্ধারিত তারিখের পরও বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন তারা।

তারেক রহমানের প্রত্যর্পণ ব্রিটিশ আইনে জটিল by অদিতি খান্না

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এরইমধ্যে তাকে সাময়িকভাবে যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে তার জীবনের জন্য হুমকি বিবেচনায় নিয়ে মানবাধিকার বিষয়ক কনভেনশনের অধীনে তাকে এ অনুমতি দেওয়া হয়। পরে মানবাধিকার ইস্যু বিবেচনায় এই সাময়িক অনুমতি যুক্তরাজ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকার অনুমতিতে (আইএলআর) পরিণত হয়। কিছু ক্ষেত্রে এই অনুমতিকে রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে উল্লেখ করা যায়, যদি যুক্তরাজ্যের হোম অফিসে জমা দেওয়া নথিতে বলা হয়, রাজনৈতিক কারণে তার জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের একজন নামকরা আইনজীবী এবং ইউকে এক্সট্রাডিশন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য জাসভিন্দর নাখওয়াল। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘মৌলিক শর্তাবলী অনুযায়ী, রাজনৈতিক আশ্রয় মঞ্জুর করা হয়েছে এমন কাউকে সুনির্দিষ্ট কোনও রেফারেন্স ছাড়া হস্তান্তর করা যাবে না। জীবনের ঝুঁকির মতো কিছু বিষয় স্বীকার করে নিয়েই আশ্রয় বা শরণার্থীর মর্যাদা আসে।’
আইনজীবী জাসভিন্দর নাখওয়াল অবশ্য এটাও উল্লেখ করেন যে, এর অর্থ এই নয় যে, কোনও রাষ্ট্র কাউকে তার নিজ দেশে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি করার আইনি প্রচেষ্টা নেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে, কোনও রাষ্ট্র কারও প্রত্যবাসনের জন্য চেষ্টা করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তারপর আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। যদিও সেখানেই বিষয়টির পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে।’
স্ত্রী-সন্তান নিয়ে লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমের কিংস্টনে বসবাস করছেন ৫৩ বছরের তারেক রহমান। দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০০৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে আসার অনুমতি পান তারেক রহমান। এরপর থেকেই লন্ডনে বাস করছেন তিনি। গত ফেব্রুয়ারিতে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হন। তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর তারেক রহমানকে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের (সিএইচওজিএম) বৈঠকে অংশ নিতে চলতি মাসের গোড়ার দিকে যুক্তরাজ্য সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় লন্ডনে আওয়ামী লীগের এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, তারেক রহমানকে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের মুখোমুখি করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলছি। অবশ্যই একদিন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনবো। তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’
একজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ সরকারেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য একটি অবাধ স্বাধীনতার দেশ। এটা সত্যি যে, যে কোনও ব্যক্তি এখানে আশ্রয় নিতে এবং শরণার্থী হতে পারেন। তবে তারেক রহমান অপরাধের কারণে আদালত কর্তৃক একজন দণ্ডিত ব্যক্তি। আমি বুঝতে পারি না, একজন দন্ডিত ব্যক্তিকে কিভাবে যুক্তরাজ্য আশ্রয় দিয়েছে। তাদের অবশ্যই তাকে দ্রুত ফেরত পাঠানো উচিত।’
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তালিকায় ক্যাটাগরি দুই-এর আওতায় পড়েছে। এ ক্যাটাগরির দেশগুলোতে প্রত্যর্পণের বেলায় যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
তারেক রহমানের যুক্তরাজ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকার অনুমতির সঙ্গে মানবাধিকারের বিষয়টি যুক্ত রয়েছে। এটি এ ধরনের প্রত্যপর্ণের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
এদিকে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র তার জাতীয়তা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে। তারা বলছেন, এমন বিতর্ক ভিত্তিহীন।
সূত্রটি জানায়, ‘এমনকি কারও পাসপোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলেও এতে তার জাতীয়তায় কোনও প্রভাব পড়ে না। পাসপোর্ট হচ্ছে একটি ট্রাভেল ডকুমেন্ট। কারও জাতীয়তার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।’
সূত্রের কাছ থেকে পাল্টা যুক্তি আসে, বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ রয়েছেন। তবে তাদের সবার পাসপোর্ট নেই। এটি তাদের কোনও অংশে ক্ষুদ্রতর বাংলাদেশিতে পরিণত করেনি।

কী হবে যদি ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান ট্রাম্প?

তিন দিনের ওয়াশিংটন সফর শেষে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁন অনুমান করছেন, ‘ঘরোয়া কারণে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবেন। ২০১৫ সালে পাঁচ বিশ্বশক্তির করা ওই চুক্তি থেকে আগামী মাসেই প্রস্থানের ঘোষণা দিতে পারেন ট্রাম্প। সত্যিই যদি যুক্তরাষ্ট্র তা করে, তাহলে কী ঘটতে পারে? লন্ডন-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট এই উত্তরই দেয়ার চেষ্টা করেছে।
ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণীতে বলা হয়, তাত্ত্বিক দিক থেকে বলতে গেলে পূর্বসূরী বারাক ওবামার করে যাওয়া এই চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা ট্রাম্পের নেই। এই চুক্তি ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তি তথা বৃটেন, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সন্ধি। এই চুক্তি অনুযায়ী ইরানের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত যত আন্তর্জাতিক ও আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা প্রত্যাহার করা হয়। বিনিময়ে ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করা বা মজুদ করা থেকে বিরত থাকার কথা ইরানের। ইরান সত্যি সত্যি তা করছে কি না সেটি যাচাই করার সুযোগও চুক্তিতে রাখা হয়েছে।
চীন, রাশিয়াসহ ইউরোপিয়ান সরকারগুলো স্পষ্ট করেছে যে, তারা এই চুক্তিকে বাধ্যতামূলক মনে করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বলছেন, ইরান চুক্তির শর্ত ঠিকভাবে মেনে চলছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি চুক্তির শর্ত অমান্য করে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে, তাহলে কার্যত চুক্তি মাঠে মারা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে ইউরোপের ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে না। ট্রাম্প এই চুক্তিতে ‘সর্বকালের নিকৃষ্ট’ চুক্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন। অনেকদিন ধরেই এই চুক্তি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন তিনি। এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার অনেক সুযোগ আছে তার। এর একটি হলো কংগ্রেসের বেঁধে দেয়া সময়সীমা। নিষেধাজ্ঞা স্থগিত থাকবে না কি পুনর্বহাল করা হবে, তা আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে প্রতি কয়েক মাস অন্তর অন্তর এটি পর্যালোচনা করতে হয়। পরবর্তী সময়সীমা হলো ১২ই মে। তবে, এখনো ট্রাম্প সুস্পষ্টভাবে বলেননি তিনি ১২ই মে চুক্তি থেকে সরে আসবেন।
২৪শে এপ্রিল এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প সফররত ফরাসি প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করেন এই কারণে যে, তিনি ইরানকে সীমিত করতে বিদ্যমান চুক্তির ভিত্তিতে নতুন বহুজাতিক চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। এর ফলে পারমাণবিক চুক্তির পরিধি অনেক বিস্তৃত হবে। কিন্তু তারপরও মূল চুক্তিকে ‘পাগলামি’ বলে নিন্দা জানানো অব্যাহত রেখেছেন ট্রাম্প।
১২ই মে’র ওই সময়সীমা একেবারে চূড়ান্ত কিছু নয়। ওইদিন যেসব নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প পর্যালোচনা করবেন, তার আওতায় মূলত রয়েছে কেবল ইরানের তেল রপ্তানি ও ডলার-ভিত্তিক অন্যান্য বাণিজ্য। এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা হয় ইরানের ব্যাংকসমূহ ও তাদের সঙ্গে লেনদেনকারীদের টার্গেট করার মাধ্যমে। আগামী মধ্য-জুলাইয়ে আরেক ডেডলাইন আসছে। এই সময়সীমার মধ্যে ট্রাম্পকে অবশ্যই কিছু নিষেধাজ্ঞা পর্যালোচনা করতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি অনেক বিস্তৃত। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইরানের শিপিং থেকে বিমান পরিচালনার মতো খাতসমূহ।
ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, আমেরিকা যদি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে, তাহলে দেশটি চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। একটি সম্ভাবনা হলো যে, ইরানের কট্টরপন্থিরা ট্রাম্পের হুমকি অগ্রাহ্য করে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের কাজ ফের আরম্ভ করবে। এটি হবে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রকল্প। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, ইরান হয়তো আমেরিকার প্রস্থান সত্ত্বেও চুক্তিতে রয়ে যাবে। চেষ্টা করবে অন্য আংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করার। তবে সেক্ষেত্রেও, বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ আমেরিকার বাজারে নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় থাকবে। সবচেয়ে ভালো হবে যদি ট্রাম্প ইউরোপিয়দের সঙ্গে মিলে পার্শ্বচুক্তি তৈরিতে কাজ করেন। মূল চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, এই পার্শ্বচুক্তির আওতায় থাকতে পারে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প। আরো থাকতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নাক গলানো বন্ধ করার রূপরেখা। এ ছাড়া নতুন চুক্তিতে ইরানের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ১০-১৫ বছরের নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞায় রূপান্তর করা যেতে পারে। কিন্তু মূল চুক্তিকে যদি ভিত্তি হিসেবে না রাখা হয়, তাহলে পার্শ্বচুক্তিসমূহ যেকোনো সময় সাধারণ কারণেও ভেস্তে যেতে পারে।

লিচুর বাগানে মৌচাষ by শাহ্‌ আলম শাহী

দিনাজপুরে প্রকৃতির রসগোল্লাখ্যাত সুস্বাদু ও মিষ্টি লিচুর বাগানে এখন মৌচাষ হচ্ছে। লিচু বাগানে মৌ মাছির বাক্স বসিয়ে মধু আহরণ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন শতাধিক মৌ চাষি। এর ফলে একদিকে যেমন মৌ চাষিরা মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন অন্যদিকে মৌমাছির মাধ্যমে মুকুলে মুকুলে পরাগায়ন ঘটায় লিচুগাছ মালিকরা বাম্পার ফলনের আশা করছেন। এক কথায় বাগানে মৌ চাষ করে মৌচাষি এবং বাগান মালিক উভয়ে লাভবান হচ্ছে ।
ধানের জেলা দিনাজপুরে প্রকৃতির রসগোল্লা খ্যাত লিচুগাছে মৌ চাষে ধুম পড়েছে। ম-ম গন্ধে গাছে গাছে বাতাসে দোল খাচ্ছে লিচুর মুকুল। বেদন, বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না থ্রি, কাঠালীসহ দেশীয় লিচু গাছগুলোতে এবার প্রচুর মুকুল ধরেছে। তাই, লিচু চাষিরা এখন ব্যস্ত লিচু গাছ পরিচর্যায়। চাষিরা এখন কামনা করছে বৃষ্টির। আবহাওয়ার অনুকূলে থাকলে এবার কৃষিবিদরা লিচুর বাম্পার ফলনের আশা করছে।
গাছে থোকা থোকা লিচু মুকুল আগমনই বলে দিচ্ছে এবার লিচুর ভালো ফলন হবে এ জেলায়। তাই দিনাজপুরের লিচু চাষিরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন লিচু গাছের পরিচর্চায়। অনেকে ছত্রাক নাশক ও কীটনাশক সেপ্র করছে গাছে। লাভজনক ফল হওয়ায় অনেকে ধান ও অন্যান্য ফসলের জমিতে লিচু গাছ লাগিয়েছে। দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় ৩৩০০ হেক্টর জমিতে রয়েছে লিচুর বাগান। এছাড়াও বসতবাড়িতে ৫৪০ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে। ছোট-বড় মিলে সাড়ে ৪ হাজার বাগানে রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৪ হাজারের বেশি লিচুর গাছ। প্রতি বছর লিচু বিক্রি থেকে অর্জিত হয় অনুমানিক ৯০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার প্রায় ৮ লাখ ৫০২ টন লিচু উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. তৌহিদুল ইকবাল জানান, প্রকৃতি এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার দিনাজপুরে লিচুর ফলন হবে বাম্পার। বেদনা, বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না থ্রি, কাঠালীসহ দেশীয় লিচু গাছগুলোতে এবার রেকর্ড পরিমাণ ফলন আশা করা হচ্ছে। সদর, বিরল, কাহারোল চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জ পার্বতীপুর এলাকার লিচু বাগানগুলোতে প্রচুর মুকুল ধরেছে। লিচুর মুকুল রক্ষা ও রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখতে নিয়মিত লিচু চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। লিচু বাগান পরিচর্যা আর পাহারা দিয়ে ভালো ফলন পাবেন এই প্রত্যাশা বাগান মালিক এবং আগাম অর্থ দিয়ে কেনা লিচু বাগান ক্রেতাদের। এরমধ্যে সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌচাষি এসে বাগানে ছোট বড় বিভিন্ন আকৃতির মৌমাছির বাক্স বসিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৌ চাষ করে মধু সংগ্রহ করছেন। বাগানে তারা শতাধিক ব্রুড ও নিউক্লিয়াস নামের ছোট বড় কাঠের বাক্স স্থাপন করেছেন। প্রতিটি বাক্সে একটি রানী মৌমাছি, একটি পুরুষ মৌমাছি ও অসংখ্য এপিচ মেইলিফ্রা জাতের কর্মী মৌমাছি রয়েছে। কর্মী মৌমাছিরা ম-ম গন্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে যায় লিচুর মুকুলে। পরে মুকুল হতে মধু সংগ্রহ করে মৌমাছির দল নিজ নিজ কলোনিতে মৌচাকে এনে জমা করছে।
১০-১৫ দিন অন্তর প্রতিটি বাক্স হতে চাষিরা ৬-৭ মণ মধু সংগ্রহ করছেন। যে লিচু গাছে মৌমাছির আগমন বেশি হয় সে গাছের মুকুলে পরাগায়ন ভালো হয়। ফলে ওই গাছে বা বাগানে লিচুর যেমন বাম্পার ফলনের সম্ভবনা থাকে, তেমনি মৌ চাষিরা বেশি মধু সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারে। জেলার বিভিন্ন বাগান থেকে শতাধিক মৌ চাষি প্রতিদন ১৫ থেকে ২০ মণ মধু সংগ্রহ করে বাজারজাত করছে। কাঠের তৈরি শত শত বিশেষ বাক্সের মাধ্যমে মৌ চাষ মধু সংগ্রহ করা দৃশ্য দেখে এলাকাবাসীও উদগ্রীব হয়ে ছুটে আসছেন মধু কেনার জন্য লিচু বাগানে। ক্রেতা আবুল হোসেন জানান, বাজারে খাঁটি মধু পাওয়া যায় না। তাই নিজ চোখে নির্ভেজাল মধু সংগ্রহ করতে পেরে তারা নিজেকে ধন্য মনে করছেন। কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, চলতি বছর প্রতিটি লিচু বাগানে ভালো মুকুল এসেছে। আর এ কারণে প্রচুর মৌ মাছির আগমন দেখা দিয়েছে। লিচু গাছ থেকে মৌমাছি মধু আহরণের ফলে গাছে গাছে বেশি করে পরাগায়ন হয় এবং শতকরা ৩০-৪০ ভাগ লিচুর বেশি ফলন হয়। লিচু বাগানে মৌমাছিদের গুণগুণ শব্দে মুখরিত পুরো এলাকা। তবে কোনো বন্য মৌমাছি নয়, বাক্সে চাষ করা শিকারি মৌমাছিই এমন গুঞ্জনে মুখরিত। চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলে লিচুর মুকুলের ওপর নির্ভর করে মৌয়ালরা এসেছে বিভিন্ন জেলা থেকে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে বিরল প্রজাতির রাণী মৌমাছি। মৌয়ালরা নিজেদের সুবিধামতো আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন এলাকার লিচু বাগানে। সেখানে দিনরাত পরিশ্রম করে মধু সংগ্রহ করছে। সরেজমিনে বিরল উপজেলার চেতরা বাজার গেলে চোখে পড়ে মধু সংগ্রহের বাস্তব চিত্র। সেখানে ১০-১৫ জন মৌয়াল বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউবা মুখোশ পরে পুরনো বাক্স থেকে মৌচাক বের করে মধু সংগ্রহের জন্য প্রস্তত করছে। আবার কেউ পুরনো বাক্স বদলিয়ে নতুন বাক্সে মাছিদের জন্য নিরাপদ আবাস্থল তৈরি করছে। মৌয়ালদের মত কর্মী মাছিরাও বসে নেই। মৌমাছিরা দলবেধে ঝাঁকে উড়ে গিয়ে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে বাক্সের চাকে জমিয়ে রাখতে ব্যস্ত রয়েছে। সেখানে মৌমাছি ও মৌয়ালদের কর্ম ব্যস্ততায় উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে মধু মৌসুম। এ বিষয়ে কথা হয় সিরাজঞ্জ থেকে আসা মৌয়াল চান মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, এই লিচু বাগানে মৌমাছির বাক্স রয়েছে ২৫০। এখানে ৭-১০ দিনের মধ্যে বাক্সগুলো থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এই মধু সংগ্রহ অভিযান চলবে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাতে প্রায় ১২০০ মনেরও বেশি মধু সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে ফুলের উপর নির্ভর করে মধুর পরিমাণ। তিনি আরো জানান, চলতি মৌসুমে এই বাগান থেকে ৫৫ মণ মধু সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তাদের। প্রতি মণ মধুর বিক্রি করা হয় সাড়ে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই মধু দেশের বিভিন্ন কোম্পানির চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ভারতীয় কোস্পানি সস্তা দামে মধু ক্রয় করে বিদেশে রপ্তানি করছে। অথচ মধু কিনে নিচ্ছে আমাদের নিকট থেকে। এছাড়াও এই পেশার সঙ্গে যুব সমাজের একটি বড় অবদান রয়েছে। সরকারিভাবে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় সম্ভাবনাময় এই মধু চাষ শিল্পের কোনো অগ্রসর লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মধু চাষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এই শিল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব। তেমনি দূরীকরণ হতো বেকারত্ব সমস্যা।
লিচু এবং মধু দু’টি প্রাকৃতিক সম্পদ- এ দু’টি সম্পদ সংগ্রহ সঠিক প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হলে চাষিরা যেমন লাভবান হবে তেমনি দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে মনে করছেন দিনাজপুরবাসী।

চীনে মোদির চা-কূটনীতি

এশিয়ার দুই শক্তিধর দেশ ভারত ও চীন। তাদের মধ্যে সম্পর্ক যতই ভালো থাকুক ভেতরে ভেতরে প্রতিটি বিষয়েই নীরব লড়াই চলছে। তা হলো আঞ্চলিক প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে। শুধু তাই নয়, বিশ্ব দরবারেও কে কার চেয়ে এগিয়ে, কার প্রভাব বেশি তা প্রমাণে, তা প্রতিষ্ঠা করতে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে ভীষণ তৎপর। দোকলাম নিয়ে তো দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধই বেধে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কায় বিনিয়োগ করে ভারতকে টপকাতে চাইছে চীন। সেই চীন সফরে গিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুক্রবার তাকে ইস্ট লেকের পাড়ে দেখা গেছে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। তাদের হাতে চায়ের কাপ। চা পান করতে করতে হাঁটছেন প্রচ্ছদের আঁকা ছবির মতো সেই লেকের পাড়ে। আর তারা আলোচনা করছেন। একে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের চা-কূটনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ভারতের অনলাইন জি-নিউজ। এতে বলা হয়েছে, শুক্রবার এ দুই নেতাকে ওই লেকের পাড়ে দেখা গেছে নিরুদ্বিগ্ন হয়ে হাঁটতে। এ সময় তারা যে আলোচনা করেছেন বা কথা বলেছেন তা ছিল অনানুষ্ঠানিক। হয়তো তারা আলোচনার একটি ওয়ার্মআপ সেরে নিয়েছেন। এ আলোচনায় উঠে এসেছে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার বিষয়। আরো উঠে এসেছে  দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রভিশ কুমার দুই নেতার গতকালের বেশ কিছু ছবি টুইটে প্রকাশ করেছেন। ওই দিন দুই নেতা একে অন্যকে টেকসই বন্ধন গড়ে তোমার জন্য নিশ্চয়তা দিয়েছেন। শুক্রবারের এ আলোচনাকে নরেন্দ্র মোদি ঐতিহাসিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, শুক্রবার তাদের মধ্যে মূল যে আলোচনা হয়েছে তাতে পাঁচটি মূল পয়েন্ট ছিল। তাহলো অভিন্ন চিন্তাভাবনা, অভিন্ন সম্পর্ক, অভিন্ন সহযোগিতা, অভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অভিন্ন স্বপ্ন। এর মধ্যদিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। ওইদিন রাতে দুই নেতা একটি সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে চীনা মিউজিশিয়ানরা বলিউডের সংগীতের মূর্ছনা তোলেন।

খালেদা জিয়াকে নিয়ে চিকিৎসকদের শঙ্কা: কারাগারে তিন নেতার সাক্ষাৎ, সমস্যা হলে দায়-দায়িত্ব সরকারের

দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়া না হলে কারাবন্দি খালেদা জিয়া অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্বের শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, খালেদা জিয়ার কোমরের হাড়ে ক্ষয়  হয়ে স্পাইনাল কর্ডগুলো চাপা পড়ে গেছে। তার ‘স্পাইনাল কড’ নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে তিনি প্যারালাইজডের শিকার হতে পারেন। এছাড়া চোখের কর্নিয়া ড্রাই হয়ে যাচ্ছে। জরুরিভিত্তিতে চিকিৎসা না হলে কর্নিয়া স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে তিনি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। গতকাল সকালে বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কারাবন্দি খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে কারাকর্তৃপক্ষের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আটকে থাকায় চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটছে। পরে বিকালে কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দলের মহাসচিবসহ তিন সিনিয়র নেতা। সাক্ষাৎ শেষে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকে আমরা দেশনেত্রীকে যতদূর দেখেছি তাতে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। তার শরীর-স্বাস্থ্য আসলেই অত্যন্ত খারাপ। খালেদা জিয়া বলেছেন- তার বাঁ-হাত আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। বা হাতের ওজনও বেড়ে গেছে। বাম পা থেকে শুরু করে গোটা বাম দিক পেছনে পর্যন্ত ব্যথা বেড়ে গেছে। এখন সাধারণভাবে হাঁটাচলা করাও তার জন্য মুশকিল হয়ে গেছে। আমরাও মনে করি, ইউনাইটেড হাসপাতালে রেখে তার বিশেষভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এটা সরকারের দায়িত্ব। এর যদি কোনো ব্যত্যয় ঘটে, কোনো রকমের ক্ষতি হয় তার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে।
প্যারালাইজডের আশঙ্কা চিকিৎসকদের: চিকিৎসায় গাফিলতি ও বিলম্ব হলে খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে প্যারালাইজডের শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা। বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে খালেদা জিয়ার কয়েকজন ব্যক্তিগত চিকিৎসক এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। নিউরোসার্জন প্রফেসর ডা. ওয়াহিদুর রহমান বলেন, হাতের আঙুলগুলোতে রিউমারাইটিস আর্থরাইটিস আছে, আঙুলগুলো ফোলা ফোলা ও ব্যথা রয়েছে। নার্ভ চাপা পড়ার কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ডান হাতের চেয়ে বাম হাত বেশি দুর্বল। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার কোমরের হাড়গুলো ক্ষয় হয়ে স্পাইনাল কর্ডগুলো চাপা পড়ে গেছে। কোমরের হাড় ক্ষয় হয়ে সরু হয়ে গেছে। তাই তিনি হাঁটতে পারছেন না। তার ‘স্পাইনাল কড’ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তার শরীর আরো খারাপ হয়ে প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছি।
ডা. ওয়াহিদুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়ার এখন বেশি সমস্যা ঘাড়ে। ঘাড়ের হাড়গুলো ক্ষয় হয়ে নার্ভ চাপা পড়ে গেছে। ডান হাতে যত শক্তি পাচ্ছেন বাম হাতে ততটা শক্তি পাচ্ছেন না। তাই বাম হাতে কিছু ধরলে তা পড়ে যাচ্ছে। তবে খালেদা জিয়ার মানসিক জোর অনেক বেশি। তিনি বলেন, এসব সমস্যায় শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, প্যারালাইসিস হতে পারে, হাত-পা অবশ হয়ে যেতে পারে। তার এখন সুচিকিৎসা দরকার, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার ও ফিজিওথেরাপি দরকার। অর্থোপেডিক স্পেশালিস্ট প্রফেসর ডা. সিরাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, যতটুকু শুনেছি, ওনার হাত বাঁকা হয়ে গেছে। বাম হাতে কিছুই ধরতে বা করতে পারছেন না। ওনার হাঁটুর যে অবস্থা, চলাফেরাও করতে পারছেন না। হাঁটুর অবস্থা করুণ।
খালেদা জিয়ার ফিজিওথেরাপি দরকার জানিয়ে ডা. সিরাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, চিকিৎসা করতে হলে ভালো পরিবেশ দরকার। নইলে ওনার জীবনী শক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য ওয়েল ভেন্টিলেটেড এনভায়রনমেন্টের একটা কক্ষ ও পরিবেশ দরকার। পরিত্যক্ত ভবনের ওই স্যাঁতসেঁতে পুরনো কক্ষে থাকলে তার সমস্যাগুলো আরো বাড়তে থাকবে। চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আবদুল কুদ্দুস বলেন, ম্যাডাম চোখের নানা সমস্যায় ভুগছেন। তার চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। খালেদা জিয়ার অসুখগুলো আগে থেকেই ছিল। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে খালেদা জিয়ার চোখে অপারেশন করা হয়েছে। তার চোখের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। চোখের কর্নিয়া ড্রাই হয়ে যাচ্ছে। একবার যদি কর্নিয়া ড্রাই হয়ে যায়, তাহলে উনার এই কর্নিয়াকে ১৫ বছরেও ভালো করা যাবে না।
জরুরিভিত্তিতে যদি সুচিকিৎসা করা না হয় তাহলে তার চোখের কর্নিয়া স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে তিনি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। ওয়ান স্টপ সার্ভিস যেখানে দেয়া যায়, সেখানে স্থানান্তরের মাধ্যমে তার সুচিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আটকে আছে ফাইল: কারাবন্দি খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে কারাকর্তৃপক্ষের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আটকে থাকায় চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল সকালে দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা যতদূর শুনেছি, কারা কর্তৃপক্ষ অন্যান্য চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে খালেদা জিয়াকে একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করার জন্য সুপারিশ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা শুনেছি- প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই ফাইল পড়ে আছে। এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রতিদিন দেশনেত্রীর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা যখন আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছি, তখন তিনি এতটুকু অসুস্থবোধ করতেন না। তিনি নিচে নেমে আমাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু এখন তিনি নিচেও নামতে পারছেন না। এর ফলে তার আত্মীয়-স্বজন ও দলের নেতাদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, সবাই খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার দুটি হাঁটু প্রতিস্থাপন করা আছে। এসব যন্ত্রপাতি ইউনাইটেড ও এ্যাপোলোতে আছে। তাই আমরা বারবার ইউনাইটেড হাসপাতালের কথা বলছি। মির্জা আলমগীর সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, সরকারকে জোরের সঙ্গে বলবো, অবিলম্বে দেশনেত্রীকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় সকল দায়-দায়িত্ব এই সরকারকে বহন করতে হবে। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জেলে থাকাকালে চোখের সমস্যার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে তার পছন্দের স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, পরে বিদেশেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে চিকিৎসা না দিয়ে তার অবস্থার অবনতি ঘটানো হচ্ছে। আমরা বারবার বলছি, এর পেছনে একটি হীন উদ্দেশ্য ও নীলনকশা রয়েছে।
আমরা আশা করি, তার চিকিৎসাটা অন্তত হবে। কত ভয়ঙ্কর হলে তার চিকিৎসাও করানো হয় না। এই অনির্বাচিত সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে অসুস্থ রাখা- যাতে তাকে রাজনীতি ও নির্বাচনের বাইরে রাখা যায়। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আপনারা লক্ষ্য করেছেন- ইতিমধ্যে দলের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছে। সেখানে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একমত হয়েছেন যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে, বিশেষায়িত হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রয়োজন। সে জন্য মন্ত্রী বিএনপির প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে আইজি প্রিজনকে ডেকে নিয়ে আনেন। তিনি বলেন, মন্ত্রী বাইরে চলে যাচ্ছিলেন তাই তিনি আইজি প্রিজনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন- তার (খালেদা জিয়ার) চিকিৎসায় যা যা করা দরকার আপনারা করুন। তিনি বলেন, সাধারণভাবে একজন সাধারণ বন্দির অধিকার আছে সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার। এটা সরকারের দায়িত্ব, তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়া। সেই বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার কিছু হলে সব দায়দায়িত্ব সরকারকে বহন করতে হবে। দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
২২শে এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বিএনপি প্রতিনিধিদলের আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। যেখানে খালেদা জিয়ার ভালো চিকিৎসা হবে, সেখানে তার চিকিৎসা হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। ওই সময়ে আইজি প্রিজনও উপস্থিত ছিলেন। আজকে ২৮শে এপ্রিল (গতকাল) এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, সরকারের অবহেলা বা সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব কোনো মানবিক আচরণ হতে পারে না। এটা সম্ভবত অপরাজনৈতিক আচরণ। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করেন বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। রায়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন। রায় ঘোষণার পর থেকেই সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডে-কেয়ার সেন্টারে আছেন।

হুংকার ছেড়ে কেন আলোচনার পথে উত্তর কোরিয়া?

পিয়ংইয়ং-এর পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গত জানুয়ারিতে বাগ্‌যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। গত মার্চেও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া চালালে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নিজস্ব পদ্ধতিতে’ জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয় পিয়ংইয়ং। এর আগে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র নিজেদের হাতে থাকার দবি করে উত্তর কোরিয়া। পাল্টা হুমকি আসে ট্রাম্প প্রশাসনের তরফেও। তবে এমন হুমকি-পাল্টা হুমকির মধ্যেই চলে আলোচনার প্রস্তুতি। ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দেন দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট। দুই নেতার ঐতিহাসিক বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় উঠে আসে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকার। তৈরি হয় শান্তি ও ঐক্যের নতুন অধ্যায় রচনার এক দৃঢ় আশাবাদ। আর দুই নেতার এ ঐতিহাসিক বৈঠকের কৃতিত্ব দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু হুংকার ছেড়ে কেন আলোচনার পথে এগুলো পিয়ংইয়ং?
আলোচনার কারণ যাই হোক, শুক্রবার দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক বৈঠকের আগেই উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন পারমাণবিক পরীক্ষা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
উত্তর কোরিয়া বর্তমানে বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। পিয়ংইয়ং-এর নমনীয় অবস্থানের এটিও একটি কারণ হতে পারে। দেশটি হয়তো এখন দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুইটি ঐতিহাসিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে দেশটি সেই বিচ্ছিন্ন অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চীনা বিজ্ঞানীরা অবশ্য ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তারা বলছেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের অংশবিশেষ ধসে পড়ায় তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে থাকতে পারে। এই পুঙ্গি রি কেন্দ্র থেকে ২০০৬ সালের পর কমপক্ষে ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ পরীক্ষার পর পুঙ্গি রি কেন্দ্রে পরপর অনেকগুলো ঘাত বা পরাঘাত তৈরি হয়েছিল। ভূতাত্ত্বিকেরা বিশ্বাস করেন যে পরীক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে থাকা পাহাড়ের ভেতরের একাংশ ধসে পড়ায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার এটিই একমাত্র কারণ, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলার সুযোগ আসেনি। কেননা, এখানে পিয়ংইয়ং-এর অনেক কৌশলগত চিন্তাভাবনা বা সমীকারণ থাকতে পারে।
চীনা গবেষক দলের প্রধান ওয়েন লিয়ানজিং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, তাদের গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত নিবন্ধে উত্তর কোরিয়ার কেন্দ্রটির উপযোগিতা বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত তারা দেননি। তারা মনে করছেন, ধসের পর পরীক্ষা কেন্দ্রটি থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ছে কি-না, তা পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত।
শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন-এর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে কিম বলেন, ‘আমি আশা করছি আমাদের মধ্যে নতুন এক অধ্যায় রচিত হবে। এখানেই এর শুরু। এই মুহূর্তের জন্য আমাদের ১১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ভেবে অবাক হচ্ছি যে কেন এত সময় লাগলো।’
মুন জায়ে ইন বলেন, ‘কোরীয় উপদ্বীপে যে বসন্ত চলছে আমি আশা করি সেই বাতাস পুরো বিশ্বেই বইছে। আমাদের কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব। বিশ্ববাসী অনেক কিছু আশা করে আছে।’
এদিকে দুই কোরিয়ার আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস বলছে, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে আলোচনায় অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। এ বৈঠকের ধারাবাহিকতায় আগামী জুনের গোড়ার দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কিমের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে।
দুই কোরিয়ার পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়টি দৃশ্যমান হয় মূলত গত ফেব্রুয়ারিতে। ওই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় শীতকালীন অলিম্পিককে কেন্দ্র করে দেশটির প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরীয় নেতার সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি ট্রাম্প-কিম বৈঠকের ওপর জোর দেন। এখন দুই কোরিয়ার নেতার বৈঠকের যে সাফল্যের কথা বলা হচ্ছে তার ধারাবাহিকতায় জুনে ট্রাম্প-কিম বৈঠক থেকেও ইতিবাচক কিছুই বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা সবার। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।

খুলনায় এক মঞ্চে পাঁচ প্রার্থী

জলাবদ্ধতা, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও যানজটমুক্ত খুলনা গড়ার অঙ্গীকার করলেন খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫ মেয়র প্রার্থী। গতকাল দুপুরে নগরীর প্রাণকেন্দ্র শহীদ হাদিস পার্কে জনগণের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে হাত উঁচিয়ে এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক, বিএনপির  নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় পার্টির এস এম শফিকুর রহমান মুশফিক, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মোজাম্মেল হক ও কমিউনিস্ট পার্টির মেয়র প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সুজনের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরু হয় জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়ে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়। মঞ্চে উপস্থিত ৫ জন মেয়র প্রার্থীদের অঙ্গীকারপত্র পাঠ করানো হয়। এরপর শুরু হয় মেয়র প্রার্থীদের কাছে উপস্থিত জনতার প্রশ্ন। পুরো অনুষ্ঠানে প্রধান দু’দলের মেয়র প্রার্থীর প্রশ্নোত্তর পর্ব দেখতে অনুষ্ঠান স্থলে প্রচুর জনসমাগম হয়। তবে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে করতালির মাধ্যমে শো’ডাউন দিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেককে নগরীর যানজট নিরসনে কি উদ্যোগ নিবেন, একজন ভোটারের প্রথম প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি নগর পিতা নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনের মধ্যে ইজিবাইকসহ সকল গণপরিবহনের নির্দিষ্ট সংখ্যায় আনা হবে। নগরবাসীকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন একটি যানজটমুক্ত নগরী উপহার দেবো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মেয়র নির্বাচিত হলে নগরীতে মাদক বিক্রেতাসহ হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবো। খুলনাবাসীকে একটি মাদকমুক্ত নগরী উপহার দেয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র প্রশ্ন করেন মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আপনি কি চেয়ারে থাকতে পারবেন। তখন তিনি বলেন, মাদকের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এ মেয়র বলেন, বিগত দিনে আমি এ সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলাম। আমার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নগরবাসী অবগত। খুলনাকে একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলে উপস্থিত জনতার কাছে প্রতিজ্ঞা করেন।
বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, নগরীতে লাইসেন্সবিহীন অতিরিক্ত ইজিবাইকের কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে ব্যাপক চাঁদাবাজি হচ্ছে। এটি কারা করছে তা সবার জানা। নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজদের হাত থেকে ইজিবাইক চালকদের রক্ষা করা হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুলনা শহরে পর্যাপ্ত খেলাধুলার মাঠ না থাকায় কিশোর এবং যুবকরা বিপথগামী হচ্ছে। এদের জন্য খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা হবে। এরপরে খুলনার ঐতিহ্যবাহী সার্কিট হাউজ ময়দানের বাণিজ্য মেলা বন্ধ করে ক্রীড়ামোদীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। নজরুল ইসলাম মঞ্জুর প্রশ্নোত্তর পর্বের একপর্যায়ে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সার্বিকভাবে অনুষ্ঠানটি ভালোই হয়েছে। তবে, ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’। এ কথা বলায় মঞ্চের সামনে বসা মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে অনুষ্ঠানস্থলে হট্টগোল শুরু হয়। মঞ্জু দু’টি প্রশ্নের জবাব দেয়ার পর ৩য় প্রশ্ন করার সময় একপক্ষ হট্টগোল শুরু করেন। এ অবস্থায় অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দেন। জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান মুশফিক বলেন, নির্বাচিত হলে নগরীর ফুটপাথ দখলমুক্ত, মাদকমুক্ত ও বস্তিবাসীর উন্নয়নে কাজ করবো।
ইসলামী আন্দোলন মনোনীত মেয়র প্রার্থী মাওলানা মুজাম্মিল হক বলেন, নির্বাচিত হলে মশা, সন্ত্রাস, দুর্নীতিমুক্ত খুলনা গড়ে তুলবো। তিনি সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। সিপিবি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু বলেন, নির্বাচিত হলে মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও জলাবদ্ধমুক্ত খুলনা গড়ে তুলবো। বন্ধ শিল্প-কল কারখানা চালু ও বস্তির উন্নয়নে আন্তরিক হবো। তিনি ভাত কাপড়ের লড়াইয়ের সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এর আগে মেয়র প্রার্থীরা অঙ্গীকার করেন- নির্বাচিত হলে দুর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন, কর আদায়ে জোর প্রচেষ্টা, নির্বাচনে গণরায় মেনে নেয়া, নির্বাচিত মেয়রকে সহযোগিতা, পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা, সৌন্দর্য বৃদ্ধি, কেসিসির পরিধি বৃদ্ধি, প্রতি বছর নগরবাসীকে নিজের আয় ও ব্যয়ের হিসাব এবং যৌতুক ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবেন।
খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে তালুকদার খালেকের গণসংযোগ: শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে যা কিছু করা প্রয়োজন তাই করা হবে, এমন প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী আলহাজ তালুকদার আবদুল খালেক। একই সঙ্গে তিনি বকেয়া বেতন ভাতাসহ শ্রমিকের ন্যায্য সকল দাবির প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। মেয়র প্রার্থী বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শ্রমিকবান্ধব সরকার। তিনি বলেন, খুলনাঞ্চলের শ্রমিকের বকেয়া বেতন-ভাতা যাতে দ্রুত পরিশোধ করা হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক গতকাল সকাল ৮টায় নগরীর খালিশপুর থানাধীন ১০নং ওয়ার্ডে গণসংযোগ ও সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন। আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে খুলনাকে মৃত নগরীতে পরিণত করছিল। একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিকদের বেকার করেছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বন্ধ মিল-কল কারখানা চালুসহ শ্রমিকরা যাতে সুখে শান্তিতে থাকতে পারেন সে ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছেন। নির্বাচিত হলে খুলনা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও মাদকমুক্ত একটি আধুনিক পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তালুকদার আবদুল খালেক। তিনি খুলনার উন্নয়ন ও শ্রমিকের স্বার্থে নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নির্বাচনের সমন্বয়কারী এস এম কামাল হোসেনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর নগরীর ১০নং ওয়ার্ডের অবশিষ্ট অংশ ও ৭নং ওয়ার্ডে গণসংযোগে অংশ নেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক।
অবৈধ খাল দখলমুক্ত ও হকারদের লাইসেন্স দেয়ার অঙ্গীকার মঞ্জুর: দখল হয়ে যাওয়া খালসমূহ দখলমুক্ত করে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করার অঙ্গীকার করলেন কেসিসি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে ফুটপাথগুলো দখলমুক্ত করার পাশাপাশি হকারদের লাইসেন্স প্রদান এবং সপ্তাহে এক একদিন একটি করে সড়ক হকারদের ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার কথাও জানালেন তিনি। যাতে স্বল্প আয়ের নগরবাসী ন্যায্যমূল্যে কেনাকাটা করতে পারে। তিনি বলেন, শাসক দলীয় প্রার্থীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ রয়েছে। আমি দরিদ্র প্রার্থী হিসেবে এই নগরীর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষই আমার ভরসাস্থল।
নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে গতকাল সকাল ও দুপুরে দুই দফায় নগরীর বৈকালী মোড়-বাজার এলাকা এবং পরে হাদিস পার্ক, ডাকবাংলো, ফেরিঘাট, খানজাহান আলী রোড, শান্তিধাম, সিমেট্রি রোড, পিকচার প্যালেস মোড় এলাকায় গণসংযোগকালে এসব কথা বলেন তিনি।
সকাল ৯টায় বৈকালী বাজার ও দুপুর সাড়ে ১২টায় নগরীর প্রাণকেন্দ্রে গণসংযোগকালে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসী এতে অংশ নেন।
ধানের শীষের পক্ষে পিরোজপুর বিএনপির গণসংযোগ: কেসিসি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পক্ষে খুলনা মহানগরীর ২২নং ওয়ার্ড নতুন বাজারের চরে গতকাল সকাল থেকে ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন পিরোজপুর জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও পিরোজপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল এলাকার ভোটারদের মাঝে ধানের শীষের লিফলেট বিতরণ করেন এবং মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জন্য ভোট চান। এদিকে পাইকগাছা উপজেলা বিএনপির একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক টিম নগরীর ৩১নং ওয়ার্ডে ব্যাপক গণসংযোগ ও ধানের শীষের লিফলেট বিতরণ করেছে।
কেসিসিতে ভোট না দেয়ার ঘোষণা ২৫ হাজার শ্রমিকের: ‘পকেটে টাকা নাই, পেটে ভাত নাই, সংসার চলছে না। তিন মাস মজুরি পাই না। সাত পাটকলের শ্রমিকদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা বকেয়া। বার বার শুধু প্রতিশ্রুতিই পাই। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি নির্বাচনে ভোট দিতে যাবো না’। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে গতকাল সকালে পাটকল সিবিএ-ননসিবিএ শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক দ্বীন ইসলাম এ কথা বলেন। তিনি বলেন, মজুরি কমিশনসহ ১১ দফা দাবি না মানা হলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্য ভোট না দেয়ার।

প্রচারণার মাঠে ২০ দলের নেতারা by কাফি কামাল

গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে বিএনপি ও জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রচারণায় নেমেছেন। খুলনায়  ২৫শে এপ্রিল ও গাজীপুরে ২৭শে এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের এ আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। খুলনায় গণসংযোগের জন্য স্থায়ী কমিটি থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে ৭০ জনের একটি বিশেষ তালিকা করেছে বিএনপি। তাদের নেতৃত্বে অন্তত ৩০টি কমিটি সেখানে প্রচারণা ও গণসংযোগে অংশ নেবে। অন্যদিকে গাজীপুরে প্রচারণার জন্য ৫৭টি টিম গঠন করা হয়েছে। ২৪শে এপ্রিল গুলশানে বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের সিনিয়র নেতাদের এক বৈঠকে এসব কমিটি গঠন করা হয়। এ টিমগুলো করপোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডে নির্বাচনী কাজ, গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালাবে। জোটের মাঝারির সারির নেতারা ইতিমধ্যে প্রচারণায় যুক্ত হলেও শীর্ষ নেতারা গণসংযোগে নামবেন ৬-৭ মে’র পর। বিএনপি ও জোট নেতাদের পাশাপাশি দুই সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা ও গণসংযোগের জন্য টিম গঠন করেছে অঙ্গসংগঠনগুলো। গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার জন্য ১৫টি কমিটি গঠন করেছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল।  
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ১৯শে এপ্রিল তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণার কাজ শুরু করেন। সেদিন প্রার্থীর টঙ্গীর বাসভবনে গাজীপুর জেলা নেতাদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় করে কিছু নির্দেশনা দেন। দ্বিতীয়দিনের মতো আজ রোববার গাজীপুরে প্রচারণা চালাবেন তিনি। সকাল ১০টায় টঙ্গী থানা বিএনপি কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে তিনি গাজীপুরের শিমুলতলী যাবেন। সেখানে ১২টায় পথসভা শেষে বিকাল ৩টায় হাড়িনালে গণসংযোগ ও ৪টায় সামন্তপুর আরেকটি পথসভায় অংশ নেবেন। এদিকে ২৭শে এপ্রিল গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নানা ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, সিটি নির্বাচনে জোটের সমন্বয়ক মোস্তফা জামাল হায়দার ও লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং শনিবার বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, বরকতউল্লাহ বুলু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, কেন্দ্রীয় নেতা নাজিমউদ্দিন আলম ও রফিক সিকদার প্রমুখ। গতকাল সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হাতিমারা এলাকায় গণসংযোগে অংশ নিয়ে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, ‘সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারকে হলুদ কার্ড দেখাতে চাই। আর আগামী সংসদ নির্বাচনে সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়ে ক্ষমতা থেকে হটানো হবে। এর জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ধানের শীষের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে গতকাল প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় একটি টিম। স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলের নেতৃত্বে টিমে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, সহ-সভাপতি গোলাম সারোয়ার, সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামান, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, সাধারণ সম্পাদক গাজী রেজোয়ানুল হক রিয়াজ প্রমুখ গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করেন।  গাজীপুর সাবেক পৌর শাখার সভাপতি মীর হালিমুজ্জামান ননী কেন্দ্রীয় নেতাদের গাজীপুরে গণসংযোগের সমন্বয় করছেন।
গাজীপুর নির্বাচনে জোটের সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন এলডিপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি বলেন, কয়েকদিন ধরে জোটের নেতারা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা বিএনপি প্রার্থীর তরফে বৈষয়িক কোন সহযোগিতা নিচ্ছি না। জোটের শরিক দলের রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে নিজ নিজ খরচে প্রচারণা চালাচ্ছি। রোববার (আজ) জোট নেতাদের মধ্যে- মোস্তফা জামাল হায়দার, ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, আজহারুল ইসলাম, সাঈদ আহমেদ ও সাইফুদ্দিন মনি গণসংযোগ যাবেন। টঙ্গী থেকে কয়েকটি টিমে বিভক্ত হয়ে তারা গণসংযোগ করবেন। আগামী ৭-৮ তারিখের দিকে জোটের দলগুলোর সভাপতি ও চেয়ারম্যানরা নির্বাচনী প্রচারণায় যাবেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রচারণার ব্যাপারে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিটি নির্বাচনে মিডিয়া সমন্বয়ক ডা. মাজহারুল আলম বলেন, কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনই বিএনপি, অঙ্গদল ও জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা গণসংযোগ করছেন। মে মাসের প্রথম দিন থেকেই এ গণসংযোগ নতুন মাত্রা পাবে বলে আশা করছি।
এদিকে খুলনা সিটি নির্বাচনে বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ২৪শে এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণার কাজ শুরু করেছেন তিনি। প্রথমদিনই তিনি দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও ২০দলীয় ঐক্যজোটের নেতাদের দুইটি সমন্বয় সভা করেছেন। সে সভায় নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল নিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। ২৫ থেকে ২৮শে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিনই সকাল ও বিকাল দুই বেলায় খুলনা ও আশপাশের জেলা বিএনপি নেতাদের নিয়ে ৪-৫টি ওয়ার্ডে গণসংযোগ ও পথসভা করছেন তিনি। ইতিমধ্যে সিটি কলেজ মোড়, রয়্যাল মোড়, সাত রাস্তার মোড়, ২১ নম্বর ওয়ার্ড, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডসহ জেলা আইনজীবী সমিতিতে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করেন। ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার তিনটি মন্দিরে হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান।
দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা ও গণসংযোগের ব্যাপারে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ২৪শে এপ্রিল থেকে খুলনায় অবস্থান করে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি নিজেই নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ করে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব, কাজী আলাউদ্দিন, শেখ রবিউল আলম রবি, জোট নেতা মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, বিজেপি সভাপতি এডভোকেট লতিফুল রহমান লাবু, বিএনপি নেতা এসএম শফিকুল আলম মনা, সাবেক এমপি শেখ মুজিবর রহমানসহ খুলনা ও আশপাশের জেলা বিএনপি ও অঙ্গদল এবং জোটের নেতাকর্মীরা গণসংযোগ করছেন। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে ঢাকা থেকে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রচারণায় অংশ নিতে আসবেন। আশপাশের জেলাগুলো থেকেও নেতারা প্রচারণায় আসবেন। আমরা খুলনা সিটির ৩১টি ওয়ার্ড ও ২৮৯টি কেন্দ্রের প্রতিটিতেই একাধিকবার গণসংযোগের টার্গেট নিয়ে কাজ করছি। গয়েশ্বর রায় বলেন, আমরা যেখানেই যাচ্ছি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন হলে, জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত। আমরা প্রচারণার পাশাপাশি ভোটারদের নির্বাচনের দিন সবধরনের ভয়-ভীতিকে পাশ কাটিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্যও উৎসাহিত করছি।
খুলনা সিটি নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন এনপিপি’র চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। তিনি বলেন, আমরা স্থানীয়ভাবে জোটের একটি সমন্বয় কমিটি করেছি। ইতিমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে জোটের মাঝারি সারির নেতারা প্রচারণা শুরু করেছেন। রোববার এনপিপি’র একটি টিম যাচ্ছে। আগামী ৩রা মে থেকে আমি নিজে নির্বাচন পর্যন্ত খুলনায় অবস্থান করব। সে সময় প্রতিটি দলের সিনিয়র নেতারা খুলনায় যাবেন। তিনি বলেন, খুলনায় জোটের প্রতিটি দল সিরিয়াসলি প্রচারণার মাঠে নেমেছেন। গাজীপুরে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী সরে দাঁড়িয়ে বিএনপিকে সমর্থন করায় তাদের ওপর নির্যাতন নেমে এসেছে। শুক্রবার গাজীপুর জেলা আমীরসহ জামায়াতের ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এটা জামায়াত নেতাকর্মীদের নির্বাচনে কাজে আরও সক্রিয় করে তুলবে।