Sunday, September 15, 2019

সৌদি আরবে তেল শোধনাগারের ওপর ড্রোন হামলা কিসের ইঙ্গিত

সৌদি আরবে চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন দিয়ে দুটি তেল শোধনাগারের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। দুটি শোধনাগারই রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি আরামকোর পরিচালনাধীন।
অন্তত দশটি ড্রোন ব্যবহার করে আবকাইক শোধনাগার এবং খুরাইস তেলক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ চালানো হলে এগুলোতে আগুন ধরে যায়, তবে সবশেষ খবরে সৌদি কর্মকর্তারা বলেছেন দুটি স্থাপনাতেই আগুন নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বলছে, তারাই এ আক্রমণে চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতে সৌদি আরবের ওপর তাদের আক্রমণের আওতা আরো সম্প্রসারিত করা হবে।
হুতি বিদ্রোহীদের সাথে ইয়েমেনে সৌদি-নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের ২০১৫ সাল থেকে যুদ্ধ চলছে।
সৌদি আরবের সরকারি প্রেস এজেন্সি জানায়, শনিবার ভোর চারটার দিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি আরামকোর নিরাপত্তা দল - আবকাইক ও খুরাইসের দুটি স্থাপনায় ড্রোন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে।
কারা এ আক্রমণের পেছনে আছে, বা এতে কতটা ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে সৌদি কর্মকর্তারা কোন মন্তব্য করেন নি।
সৌদি তেল স্থাপনার ওপর ড্রোন হামলা হয়েছে
কিন্তু ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একজন মুখপাত্র আল-মাসিরা টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, তারা ১০টি ড্রোন ব্যবহার করে এই আক্রমণ চালিয়েছেন, এবং ভবিষ্যতে আরো আক্রমণ চালানো হতে পারে।
২০১৫ সাল থেকেই ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সাথে সৌদি-নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের লড়াই চলছে, এবং গত কয়েক মাসে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ভেতরে সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
আবকাইকে আক্রান্ত তেল শোধনাগারটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং সেখান থেকে একশ কিলোমিটার দূরের খুরাইস হচ্ছে সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলক্ষেত্র।
খুরাইসে বিশ্বের মোট চাহিদার ১ শতাংশ তেল উৎপন্ন হয়, আর আবকাইক তেল শোধনাগার বিশ্বের সরবরাহের ৭ শতাংশ তেল যোগান দেবার ক্ষমতাসম্পন্ন।
এ আক্রমণে ক্ষতির পরিমাণ কত তার ওপর নির্ভর করে - আগামী সোমবার আন্তর্জাতিক বাজার খুললে তেলের দামের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে।

ড্রোন হামলা

বিবিসির প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সংবাদদাতা জনাথান মার্কাস বলছেন, সর্বসাম্প্রতিক এই হামলা থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে যে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো হুতি বিদ্রোহীদের দিক থেকে কৌশলগত হুমকির মুখে রয়েছে।
হুতিদের ড্রোন আক্রমণ চালানোর দক্ষতা যেভাবে বাড়ছে তাতে এই বিতর্কটা আবার নতুন করে সামনে চলে আসছে যে তাদের এই সক্ষমতা অর্জনের পেছনে কারা আছে।
তারা কি বাণিজ্যিক পর্যায়ের বেসমারিক ড্রোনকে অস্ত্র ব্যবহারের উপযোগী করে নিয়েছে, নাকি ইরানের বড়ধরনের সহায়তা তাদের পেছনে রয়েছে - এটাও একটা প্রশ্ন।
মি: মার্কাস বলছেন, মি: ট্রাম্প সম্ভবত এর জন্য ইরানের দিকেই সন্দেহের আঙুল তুলবেন, কিন্তু ড্রোন হামলার পেছনে ইরানের হাত কতখানি তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সৌদি বিমান বাহিনী কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনে লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে । এখন দেখা যাচ্ছে অনেকটা সীমিত সক্ষমতার হলেও হুতিদের হাতেও পাল্টা হামলা চালানোর ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
জনাথান মার্কস বলছেন, শক্তিধর মুষ্টিমেয় কিছু দেশের কাছেই একমাত্র সশস্ত্র ড্রোন পরিচালনার সক্ষমতা আছে - এমন দিন শেষ হয়ে গেছে।
ড্রোন প্রযুক্তি এখন আমেরিকা থেকে চীন, ইসরায়েল এবং ইরান,এমনকী হুতি থেকে শুরু করে হেযবোল্লাদের হাতেও পৌঁছে গেছে, যদিও প্রযুক্তির মানের হেরফের রয়েছে।

হুতি কারা?

ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেন সরকার এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে লড়াই করছে।
ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে ২০১৫ সাল থেকে। হুতিদের হামলার কারণে প্রেসিডেন্ট আবদ্রাববু মনসুর হাদি রাজধানী সানা থেকে পালিয়ে যান ২০১৫ সালে।
প্রেসিডেন্ট হাদির পেছনে রয়েছে সৌদি আরবের সমর্থন এবং হুতি বিদ্রোহীদের হঠাতে সৌদি আরব ওই অঞ্চলের কিছু দেশ নিয়ে গঠিত একটি জোটে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
এই জোট ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিদিন বিমান হামলা চালায়। হুতিরাও সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে।
হুতি গোষ্ঠির একজন সামরিক মুখপাত্র মি: সারিয়া আল মাসিরাকে বলেছেন, সৌদি লক্ষ্যবস্তুর ওপর তাদের আক্রমণ ''আরও বাড়বে এবং সৌদি আগ্রাসন ও অবরোধ অব্যাহত থাকলে অতীতের তুলনায় এসব হামলা তাদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে''।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট নিয়মিত ইয়েমেনে হুতিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে

ছিনতাইয়ের ফাঁদ যখন শিশু by পিয়াস সরকার

ফুটফুটে শিশু নোমান। বয়স মাত্র ৮ মাস। নোমান ছিল আরেক শিশু ১২ বছর বয়সী রোকনের কোলে। শুক্রবার রাত ৮টা। মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ার শপিং মলের বিপরীতে প্রিন্স প্লাজার  সামনে জটলা। এর মাঝে দেখা যায়, রোকন ও শিশু নোমানকে ঘিরে আছে সবাই। রোকনকে অনেকেই মারছিল। মারের কারণে ভীত হয়ে যায় কোলের শিশুটি। থেমে থেমে কান্নায় চোখ ভেজাচ্ছিলো। প্রিন্স প্লাজার সামন থেকে রাস্তা পার হচ্ছিলেন দুই নারী।

রাস্তার ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। রোকন নোমানকে কোলে নিয়েই দুজনের পাশে দাঁড়িয়ে যায়। এরপর কৌশলে ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে নেয় পার্স। ঘটনাটি দেখেন জয়নুল আবেদীন নামে আরেকজন পথচারী। তবে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না ব্যাগ থেকে কিছু বের করে নিয়েছে কিনা। তিনি দ্রুত দুই নারীর কাছে গিয়ে ব্যাগের সব ঠিক আছে কিনা নিশ্চিত হতে বলেন। তখন তারা দেখেন একজনের পার্স নেই। আবার দ্রুত রাস্তা পার হন জয়নুল। দেখা যায়, বাচ্চা কোলে নিয়েই রোকন রিকশায় বসে আছে। যানজট থাকায় সহজেই ধরে ফেলেন জয়নুল। চুরি যাওয়া পার্সে ছিলো ২টি মোবাইল ও প্রায় ৭ হাজার টাকা।

এরপর রোশানলে পড়ে শৈশবে ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়া রোকন। হাতে নাতে ধরা পড়ে পিটুনির শিকার হয় সে। তবে কোলের শিশুর কারণে অনেকেই থামিয়ে দিচ্ছিলেন তাদের। মহিলা তার পার্স নিয়ে চলে যান। রোকন বারবার একই কথা বলে সকাল থেকে না খেয়ে থাকার কারণেই ছিনতাই করতে বাধ্য হয়েছে। কান্না করতে করতে সরল স্বীকারোক্তি রোকনের। এরই মাঝে প্রশ্ন ছোঁড়েন সবাই। কোলে থাকা শিশুটি কার?

রোকন জানায়, ওই শিশুটি তার বোনের ছেলে। কিন্তু চেহারা ও পোশাকের সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। রোকনের কাছে বোনের মোবাইলফোন নম্বর চাইলে সে বলে মুখস্ত নেই। অন্য কারো নম্বর চাইলেও দিতে পারে না। তখনই সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। উৎসুকদের ধারণা, রোকন শিশুটি চুরি করেছে। অবশ্য অন্য কেউ কোলে নিলেই কেঁদে উঠছিলো নোমান। কিন্তু রোকনের কোলে গেলেই থেমে যাচ্ছে কান্না।

এবার আর দেরি না করে খবর দেয়া হয় পুলিশে। ঠিক তখনই চিত্র পাল্টে যায়। রোকনকে বাঁচানোর চেষ্টায় উঠেপড়ে লাগে দুই ব্যক্তি। তাদের ভাষ্য, রোকন ওই দুজনের পরিচিত। বাচ্চা তার বোনেরই। তবে কেউ দিতে পারছিলো না বাচ্চার মা বা বাবার মোবাইল নম্বর। মোহাম্মদপুর থানার উপ পরিদর্শক সানাউল হক ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় হুট করেই রোকনকে বাঁচাতে চাওয়া দুই ব্যক্তি ও রিকশা চালক সেখান থেকে সটকে পড়ে।

পুলিশ আসার সঙ্গে সঙ্গে রোকন সেই একই উত্তর দেয়। সে জানায় নোমান তার ভাগ্নে। এতক্ষণ বারবার প্রশ্ন করলেও বাড়ির ঠিকানা বলছিল না সে। শুধু বলছিল জেনেভা ক্যাম্পে থাকে। উপ পরিদর্শক সানাউল হক রোকনকে নিয়ে নোমানের বাড়িতে যান। সেখানে পাওয়া যায় নোমানের মাকে। তার নাম জোসনা বেগম। শিশুটি দীর্ঘ সময় পর পায় তার নিরাপদ স্থান মায়ের কোল। এই সময় প্রায় শতাধিক ক্যাম্পের লোকের ভিড় জমে যায়। জোসনা কোনোভাবেই শিশুটির সঙ্গে তার ছবি তুলতে দেননি। একবার ছবি তোলার চেষ্টা করতেই রীতিমতো ক্ষেপে যান।

কিন্তু শিশুটিকে নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা শুনেও স্বাভাবিক লাগে সেই নারীকে। ভাবটা এমনই ছিল যেন, তিনি জানতেন। তার একমাত্র কোলের শিশুটিকে নিয়ে ভাই ছিনতাইয়ে নেমেছে। গতকালও জেনেভা ক্যাম্পে সরজমিন ঘুরে আসল ঘটনার তথ্য মিলে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই রোকন শৈশব থেকে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। কয়েকবার চুরি করে ধরাও খায়। একেক সময় একেক কৌশল অবলম্বন করে সে। ভাগ্নে নোমান জন্ম নেয়ার পর তাকে কোলে নিয়ে ছিনতাইয়ের অভিনব কৌশল গ্রহণ করে।

জেনেভা ক্যাম্প বাসিন্দাদের একজন বলেন, কয়েকদিন আগে এক নারীর ব্যাগ চুরি করার সময় ধরা পড়ে। তখন সে দাবি করে, না খেয়ে আছে দুজন। ভাগ্নের দুধ কেনার টাকা নেই। এভাবে ছলছাতুরির আশ্রয় নিয়ে সেই নারীর কাছ থেকে ১ হাজার টাকা আদায় করে নেয় রোকন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাসিন্দা আরো বলেন, কোলে বাচ্চা থাকায় অনেকেরই সন্দেহ হয় না। আর ধরা খেলেও বাচ্চাকে নিয়ে মিথ্যা বলে সহানুভূতি পায়।

আসলেই কী অভাবের তাড়নায় দিন কাটছে তাদের? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, রোকনের বোন জামাই মাংসের দোকানে কাজ করেন। আর্থিক অবস্থা খুব ভালো না হলেও না খেয়ে থাকতে হয় না। এটি মূলত অর্থ উপার্জনের একটি উৎস।
আরো জানা যায়, ছিনতাইয়ের সময় তার সঙ্গে থাকে আরো ২ থেকে ৩ জন। রোকন ছিনতাই করার পরপরই তা আরেকজনের হাতে দিয়ে দেয়। আর রিকশা কিংবা সিএনজি চালিত অটোরিকশার মাধ্যমে দ্রুত সটকে পড়ে ঘটনাস্থল থেকে। এছাড়া বিপদ থেকে রক্ষা করাও তাদের কাজ।

ছিনতাই করা মোবাইল কিংবা দামি জিনিস নিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়ে ক্যাম্পে। নিরাপদ স্থানে আসার আগেই খুলে ফেলে সিমকার্ড। এরপর বেশ কিছুদিন লুকিয়ে রাখার পর সেই মোবাইল ফোন বিক্রি হয় পুরাতন মোবাইলের দোকানে। শিশু নিয়ে ছিনতাইয়ের বিষয়টি একেবারে নতুন একটি কৌশল। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ক্যাম্পে অনেক উপায়ে ছিনতাই বা মাদকের কারবার চললেও ছিনতাইয়ের এই ‘ট্রেন্ড’ একেবারেই নতুন। এমন ৪ থেকে ৫টি শিশু রয়েছে যাদের নিয়ে বিভিন্ন সময় ছিনতাই মিশনে নামে বড়দের একটি সক্রিয় গ্রুপ।

সৌদি আরবে বইতে শুরু করেছে পরিবর্তনের হাওয়া by অনিম আরাফাত

সমপ্রতি সৌদি আরবে প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহী হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছেন মাশায়েল আল-জালুদ নামের এক নারী। কট্টর রক্ষণশীল এই দেশটিতে নারীদের জন্য আবায়া বা বোরকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া এই আইন ভেঙে যে পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তা পরেই বেরিয়ে আসেন সাহসী ওই নারী। এরপরই তার আবায়াহীন বেশকিছু ছবি ভাইরাল হয়ে যায় ইন্টারনেট দুনিয়ায়।

বৃটিশ গণমাধ্যম মেট্রো ওই নারীকে বিদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, দেশটিতে এখন অনেক নারীই প্রচলিত প্রথা ভেঙে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। তারা বলছেন, আমি কী পরবো না পরবো সেটি চাপিয়ে দেয়ার অধিকার অন্য কারো নেই। তারা এখন দেশটির ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের দ্বারা হুমকির শিকার হচ্ছেন কিন্তু এটি এখন সপষ্ট যে, ধীরে ধীরে হলেও সৌদি আরবে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এর জন্য দেশটির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানেরও বেশ অবদান রয়েছে।

গত বছর সিবিএসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে পোশাক নিয়ে প্রচলিত আইন শিথিল করবেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, এই ধরনের বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। তবে এ নিয়ে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আইন পাশ হয়নি। তবুও এখন সেখানে অনেককেই দেখা যাচ্ছে যারা তাদের আবায়া বাসায় ফেলে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ আবার বোরকার আধুনিক সংস্করণ পরতে শুরু করেছেন। অন্ধকার কালো রঙ ছেড়ে কেউ রঙিন আবায়া পরছেন। 

৩৩ বছর বয়সী মাশায়েল আল-জালুদও আবায়া ছেড়ে সাধারণ পোশাকেই যাতায়াত শুরু করেছেন। কিন্তু সমপ্রতি রাজধানী রিয়াদের একটি শপিং মলে তার আবায়াহীন কিছু ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়। এতে দেখা যায় উঁচু জুতা, সমপূর্ণ খোলা চুল ও পাশ্চাত্য ধাঁচের দৃষ্টিনন্দন পোশাকে দোকানে দোকানে ঘুরছেন তিনি। তাকে দেখে আশেপাশের সবাই মনে করেছিলেন তিনি হয়তো বড় কোনো তারকা হবেন। কিন্তু বাস্তবে জানা যায়, তিনি আসলে একজন সাধারণ সৌদি নারী। রিয়াদেই একটি প্রতিষ্ঠানে মানবসমপদ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

গত জুলাইতে তিনি একটি ভিডিও পোস্ট করেন টুইটারে। এতে তিনি জানান, সৌদি আরবে পোশাক নিয়ে কোনো সপষ্ট আইন নেই। আমি হয়তো ঝুঁকিতে আছি। ধর্মীয় কট্টরপন্থিরা আমাকে হুমকি দিচ্ছে কারণ আমি আবায়া পরছি না। কিন্তু এটি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়। কারণ তা হলে সৌদি নারীরা দেশের বাইরে গেলে আবায়া ছুড়ে ফেলতো না।
তবে শুধু মাশায়েলই নয় এখন অনেক সৌদি নারীই আবায়া ছাড়া বাইরে বেরুতে শুরু করেছেন। এরমধ্যে একজন হচ্ছেন মানাহেল আল-ওতাইবি। ২৫ বছর বয়স্ক এই যুবতী বলেন, গত ৪ মাস ধরে আমি রিয়াদে কোনো ধরনের আবায়া ছাড়াই আছি। আমি আমার মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। আমাকে কেউ এমন কিছুতে জোর করতে পারে না যেটা আমি চাই না।

সৌদি আরব যে অঞ্চলে অবস্থিত সেখানে কয়েক হাজার বছর থেকেই আবায়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক হয় মাত্র কয়েক দশক পূর্বে। সেখানে যারা অমুসলিম রয়েছেন তাদের জন্যও এটি বাধ্যতামূলক। দেশটির ধর্মীয় পুলিশ এই পোশাকের বিধান নিয়ে অনেককেই হেনস্থা করে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবায়া না পরা নারীদের রাস্তাঘাটে ব্যাপক উত্ত্যক্তের শিকার হতে হয়। তবে দেশটির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দেশের এমন অবস্থায় নাড়া দিতে চাচ্ছেন। কট্টরপন্থাকে ঝেড়ে ফেলে উদার রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য সৌদি আরবের অনেক বিষয়কেই সংস্কার করেছেন তিনি। দেশটিতে তিনি সিনেমা নিয়ে এসেছেন, একইসঙ্গে নির্মাণ করছেন সিনেমা হলও। নারী-পুরুষের জন্য একইসঙ্গে কনসার্টের আয়োজন করছেন এবং নারীদের অধিকতর স্বাধীনতা অনুমোদন করেছেন। দেশটিতে এখন বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের কনসার্ট হচ্ছে।

তারপরেও এখনো সেখানে জীবন নারীদের জন্য সহজ নয়। যারা প্রচলিত প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছেন তাদেরকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়তে হচ্ছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সৌদি নারীরা প্রতিবাদও জানাতে শুরু করেছেন। দেশটির নারীরা দিন দিন নিজেদের অধিকার ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে সচেষ্ট হয়ে উঠছেন। ফলে সেখানে থাকা পুরুষ অভিভাবকত্ব আইনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল হতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে সৌদি আরবে বইতে শুরু করেছে পরিবর্তনের হাওয়া।

রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরা by হাসনাত আবদুল হাই

সবাই ঘরে ফিরতে চায়, রোহিঙ্গারাও চায়। শরণার্থীর জীবন যত নিরাপদ হোক—সেখানে স্বস্তিও নেই, শান্তিও নেই। যত ভালো ব্যবস্থাই করা হোক, থাকা-খাওয়া আর চিকিত্সার জন্য শরণার্থীর মধ্যে ছিন্নমূল হওয়ার কারণে অস্থিরতা কাজ করে সর্বক্ষণ। তারা পুনর্বাসন নয়, প্রত্যাবর্তন করতে চায় নিজ দেশে, স্বগৃহে। সপরিবারে, পাড়াপ্রতিবেশী নিয়ে যে জীবন আর দয়ার সাহায্য নয়, নিজ শ্রমে উপার্জিত আয় দিয়ে জীবনযাপনে যে মর্যাদা আর সন্তুষ্টি তার আকর্ষণ দুর্নিবার। সব শরণার্থী সর্বকালে সব দেশে এভাবেই ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখে, তাদের কেউ ঘরে ফেরে, কেউ ফেরে না।

বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কতজন ফিরে যাবে স্বদেশে, স্বগৃহে তা ভবিষ্যতই বলতে পারে। কিন্তু এখন কিন্তু অনুমান করে বলা যায় কোন পরিস্থিতিতে তারা শরণার্থী শিবির ত্যাগ করে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। শরণার্থী হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে আগেও দলে দলে রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশুরা এসেছে। কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায় বলতে গেলে তাদের স্থায়ী শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছে নব্বইয়ের দশকে থেকে। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে সুনামির মতো একসঙ্গে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফে এসে পৌঁছায় তাদের সংখ্যা এর আগে আসা শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ছাপিয়ে যায় রাতারাতি। সেখানে আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে ৭ লাখ। আর কোনো দেশে একসঙ্গে এই বিপুল সংখ্যায় শরণার্থী উপস্থিত হয়নি। বাইরের বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে কীভাবে ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশ সরকার মানবিক বিবেচনায় এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নিজ দেশের মানুষ অনেক কষ্টে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর তার উদার দৃষ্টিতে সহানুভূতিশীল হয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ইতস্তত করেনি, এর জন্য অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক কোনো খাদ্যাভাব ও মহামারি ঘটতে না দিয়ে দুই বছরের ওপর নতুন ও পুরাতন শরণার্থী প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর থাকা-খাওয়া এবং চিকিত্সার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ শরণার্থী ব্যবস্থাপনার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা মিয়ানমার সরকারের বর্বরোচিত এবং অমানবিক আচরণের শিকার রোহিঙ্গাদের ওপর নজিরবিহীন নিপীড়নে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জেনোসাইড সংঘটিত করেছে সে দেশের সেনা-সমর্থিত সরকার। তিনি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রধান হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগে রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগের নীতিকে এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নির্মূলকরণ নীতি বলে অভিহিত করে এর তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা করেছে। মিয়ানমারের সেনা-সমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকার দীর্ঘকাল এইসব সমালোচনা ও নিন্দা উপেক্ষা করে বলে এসেছে যে এসব তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু যখন একটি দেশের ১০ লাখের ওপর নাগরিক প্রাণভয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয় তখন তার অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকে না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল নীতি আন্তর্জাতিক সব মহলে ও সংস্থার গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এর সংস্থা ইতোমধ্যে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দিয়ে ব্যবস্থা ও গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও মিয়ানমার সামরিক গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ব্যবস্থা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার আদালত থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবতার অধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটনের জন্য মামলা দায়েরের প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই সব আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখে মিয়ানমার সরকার বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু তাদের এই আগ্রহের সঙ্গে সরেজমিনে গৃহীত পদক্ষেপের কতটুকু মিল রয়েছে। তা এখনো বিষদভাবে জানা যায়নি। কেননা রাখাইনের প্রদেশে বাইরের কেউ এখনো প্রবেশ করতে পারে না। রাখাইনদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের ক্রেকডাউনের পর সে অঞ্চলের সঙ্গে বাইরের টেলিযোগাযোগ এবং যাতায়াত ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়নি। ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পূর্ব-ইউরোপে যে আয়রন কার্ডেন বা লৌহ যবনিকা ছিল তার মতো রাখাইন প্রদেশেও বহিরাগতদের জন্য দুর্ভেদ্য, দুর্গম এলাকা হয়ে গিয়েছে যার পরিবর্তন হয়নি আজ পর্যন্ত।

সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছিল। তাদের এই প্রস্তুত কোন ধরনের, সে সম্বন্ধে বিশদ কিছু তথ্য তারা দেয়নি। তবে সম্প্রতি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যেসব ছবি পাওয়া গিয়াছে তা থেকে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা যেসব গ্রামে বাস করত সেগুলো গুঁড়িয়ে মাটির সঙ্গে সমান করে দেওয়া হয়েছে। এ থেকে মনে হয় তাদেরকে নিজ গ্রামে না নিয়ে ক্যাম্পে রাখা হবে। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বলা হলেও এই সব ক্যাম্পে যে স্থায়ী হয়ে যাবে সে আশঙ্কা রয়েছে রোহিঙ্গাদের। ২০০৫ সালে জাতিগত দাঙ্গার পর মিয়ানমারে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বছরের পর বছর ক্যাম্পে বন্দির মতো বাস করছে। সেখানকার জীবন নািস জার্মানির কনসেন ক্যাম্পের চেয়ে কম নয়। তফাত শুধু এই যে, সে ক্যাম্প হত্যার জন্য গ্যাস চেম্বার নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহের অভাবে ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের তিলে তিলে মৃত্যুর ব্যবস্থা বেশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করেছে। শরণার্থী হয়ে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা মিয়ানমার সরকার পরিচালিত মৃত্যু শিবির এই ক্যাম্প সম্পর্কে অবহিত। জেনেশুনে তারা ঐ ধরনের ক্যাম্পে যাবে না, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তারা নিজ গ্রামে প্রত্যার্বতন করে পুরোনো জীবনের হাল আবার ধরতে চায়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের সিটিজেনশিপ বা নাগরিকত্বের প্রশ্ন। তারা পুরোনো নাগরিক হয়ে অন্যান্য নাগরিকের মতো অধিকার ভোগে নিরাপত্তা পেতে চায়। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার দ্ব্যর্থহীনভাবে এই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রী পর্যায়ে তাদের যে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসেছিল তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিদেশি বসবাসকারী হিসাবে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। এই অমর্যাদাকর এবং অনিশ্চিয়তাপূর্ণ পরিচিতি নিয়ে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন করবে বলে মনে হয় না। এটা জেনেও মিয়ানমার সরকার নাগরিত্ব সম্পর্কে এ কথা বলেছে তার অর্থ কি, এই যে তারা প্রকৃত পক্ষে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে খুব আগ্রহী নয়। রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বহিরাগত। এই যুক্তিতেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ, মিলিশিয়া এবং উগ্র বৌদ্ধ নেতারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে হত্যা করেছে এবং তাদেরকে নিজ বাসস্থান থেকে বিতাড়িত করেছে। পূর্ণ নাগরিকের অধিকার না পেয়ে প্রত্যাবর্তন করলে তারা শুধু নিকৃষ্ট শ্রেণির অধিবাসী হয়ে থাকবে না, ভবিষ্যতেও নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হবে। এই আশঙ্কা রোহিঙ্গাদের দূর করা না হলে তারা আগ্রহ নিয়ে দেশে ফিরে যাবে না। এ কথা বলা যায়।

গত বছর নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গাদেরও প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারকে দ্বিপাক্ষিক সম্মতির ভিত্তিতে একটা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। সে সময় কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চায়নি। এই কারণে যে, তাদের নাগরিকত্ব বিষয়টা নিষ্পত্তি করা হয়নি বলে। ২০১৮ সালের জুন মাসে মিয়ানমার সরকার জাতিসংঘের ইউএসডিপি এবং শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হয়। যার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরেজমিনে দেখার এবং পুনর্বাসনের অনুকূল কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা এখনো উপসংহারে আসতে পারেনি যে, রাখাইনে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে এবং সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ব্যবস্থার জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবারকে ইন্টারভিউ করে জেনে নেওয়া হবে তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক কি না। এখানে যে সমঝোতা হয়েছে তাহলো এই যে, জোর করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরত পাঠানো হবে না।

গত বছরের নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারের কাছে ৫০ হাজার শরণার্থীর নাম পাঠালেও তারা বর্তমানে মাত্র ৩ হাজার ৭৫০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছিল। এভাবে মিয়ানমার যদি বাংলাদেশের দেয়া শরণার্থীর তালিকা কাটছাঁট করে নিজেদের পছন্দমতো ক্ষুদ্র সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় তাহলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুধু বিলম্বিত হবে না, তাদের সবার ফিরে যাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়াবে। সে যা-ই হোক, যেসব শরণার্থীকে ফেরত দেওয়া হবে তাদের তালিকা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক প্রতিনিধিকে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী তারা শরণার্থীদের মত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সংস্থা প্রতিনিধি জানিয়েছেন যে, স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে ইচ্ছুক এমন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনে তারা সমর্থন জানাবে। এই পর্যন্ত কোনো শরণার্থী পরিবার স্বেচ্ছায় যেতে রাজি বলে মত প্রকাশ করেনি। তাদের নাগরিকত্ব প্রদানের মাধ্যমে নিজ গ্রামে পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না দিলে তারা যে ফিরে যেতে উত্সাহী হবে না তা তাদের কথায় প্রমাণ পাওয়া যায়।

শুধু নাগরিকত্ব আর নিজ গ্রামে ফেরত যাওয়ার নিশ্চয়তা নয়, প্রত্যাবর্তনের পর তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও রোহিঙ্গারা নিশ্চিত হতে চায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একসময় রাখাইন অঞ্চলে সেফটি জোন বা নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেখানে নিরাপত্তা বিধানের জন্য অন্তত কিছুকাল জাতিসংঘের শান্তিবাহিনী থাকা প্রয়োজন। নিরাপত্তা বিধানের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সংস্থা, মিডিয়া এবং সাহায্যকারী এনজিও সংস্থার প্রতিনিধিদের রাখাইনে অবাধে যাতায়াত নিশ্চিতকরণ নিরাপত্তা বিধানের অংশ হিসেবে দেখাতে হবে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব, নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তনসহ নিরাপত্তা বিধানের বিষয়ে নীরব। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ রাখাইনে প্রত্যাবর্তনে খুব আগ্রহ না দেখালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

>>>লেখক :কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব

পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে ভারতীয় নেতাদের আক্রমণাত্মক অবস্থান, নতুন উত্তেজনা

শুক্রবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগ্রাসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়েছেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি নরেন্দ্র মোদিকে কাপুরুষ ও হিটলার বলে আঘাত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ওইদিন শুধু কাশ্মীর নিয়ে এই একটি বক্তৃতাই আলোচিত হয়নি। একইদিন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আথাওয়েল কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি সপষ্ট করে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে হলে ইমরান খানকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরকে (আজাদ কাশ্মীর) ভারতের হাতে তুলে দিতে হবে। শুক্রবার চণ্ডিগড়ে এক অনুষ্ঠানে ভারতের সমাজকল্যাণ ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক ওই প্রতিমন্ত্রী এমন হুমকি দেন।

তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান যদি তার নিজের ভালো চায়, তাহলে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরকে আমাদের হাতে তুলে দেয়া উচিত। পাকিস্তানের স্বার্থের জন্যই এটা করা উচিত ইমরান খানের। মন্ত্রী রামদাস আথাওয়েল বলেছেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভেতরকার জনগণ আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চান না। তারা চান ভারতের সঙ্গে যোগ দিতে। এমন সব রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। ৭০ বছর ধরে আমাদের কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ দখলে নিয়েছে পাকিস্তান। এটা একটা মারাত্মক বিষয়।

কিন্তু এটি পাক অধিকৃত কাশ্মীর দখল নিয়ে ভারতীয় নেতাদের প্রথম বক্তব্য নয়। এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ভিকে সিংও ভারতের উদ্দেশ্য সমপর্কে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইমরান খানের ওই জ্বালাময়ী বক্তৃতার একদিন আগেই তিনি জানিয়েছিলেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের ‘বিশেষ কৌশল’ রয়েছে।

এর আগে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের এক বিবৃতিতে জানান, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিষয়ে ‘অ্যাকশন’ নিতে সব সময়ই প্রস্তুত ভারতের সেনাবাহিনী। তারা এখন শুধু কেন্দ্রীয় নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। এ বিষয়ে সাবেক সেনাপ্রধান ভিকে সিংকে প্রশ্ন করা হয়। তাতেই তিনি মোদি সরকারের পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেন। তিনি শুধু বলেন, একটি ‘স্ট্র্যাটেজি’ বা কৌশল নেয়া হয়েছে। কিন্তু কি সেই কৌশল তা এখনই জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না।

বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের কাছে কঠোর এক বার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কেন্দ্রকে। যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনী। এমন সব বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের নির্দেশনা মতো কাজ করবে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই সেনাবাহিনী সব সময় প্রস্তুত। জম্মু-কাশ্মীর ইস্যুতে জেনারেল বিপিন রাওয়াত বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে অবশ্যই সহায়তা করতে হবে জনগণকে। তিনি আরো বলেন, কাশ্মীরি জনগণ বহু বছর ধরে সন্ত্রাসের ক্ষত বহন করে বেড়াচ্ছেন। তাই সেখানে শান্তি ও উন্নয়নের জন্য সরকারকে একটি সুযোগ দেয়া উচিত।

স্বাভাবিকভাবেই ভারতের এধরনের আগ্রাসী পরিকল্পনাকে ভালোভাবে নেয় নি পাকিস্তান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কাশ্মীরের নিজেদের অধিকৃত অংশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন ইমরান খান। প্রথম থেকেই ভারতীয় নেতাদের বক্তব্য ও পদক্ষেপগুলোতে এর ইঙ্গিত ছিল। সেটি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় ইমরান খানের মতো চৌকস ব্যক্তির। তাই তিনি উঠে পড়ে লেগেছেন কাশ্মীরে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। বিশ্বব্যাপী সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন তিনি। একইসঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন পেতে ব্যবহার করছেন ধর্মীয় আবেগেরও।

নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারতীয় সেনাদের গুলিতে নিহত পাকিস্তানি সেনা
এদিকে কাশ্মীর নিয়ে নানা উত্তেজনার মধ্যেই ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে আবারো গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারতীয় সেনারা গুলি চালিয়ে এক পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে। শনিবার সকালে গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এ নিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

খবরে বলা হয়, বিনা উস্কানিতে হাজিপীর সেক্টরে গুলি চালায় ভারতীয় সেনারা। এতে নারোওয়ালের অধিবাসী হাবিলদার নাসির হোসেন (৩৩) নিহত হয়েছেন। তিনি ১৬ বছর ধরে সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ৫ই আগস্ট নয়াদিল্লি জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করার পর অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রধর এ দুটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর আগে ওই একই সেক্টরে ভারতীয় সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন ভাওয়ালনগরের অধিবাসী সিপাহি গোলাম রসুল। এসব ঘটনায় নিন্দা জানাতে বেশ কয়েকবার পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের কূটনীতিকদের তলব করা হয় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার চালানো দুঃসাহসী তরুণী by ওয়াসিদ রাজা

লুয়ানা তোরেস
জীবনের বাঁক হুট করে বদলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে তা অনুমান করার সাধ্যি কার! লুয়ানা তোরেসও হয়তো জানতেন না, অর্থনীতির জটিল অধ্যায় সমাধান করতে করতে ১৮০ ডিগ্রি মোড় নেবে তার জীবনযাত্রা। চাহিদা-জোগানের সমষ্টি ছেড়ে অর্থনীতির এই ছাত্রী আকাশপথে উড়াল দিয়ে এভিয়েশন জগতে রাতারাতি খ্যাতি পেয়ে গেছেন।
ভাইকে দেখে হেলিকপ্টারের পাইলট হওয়ার স্বপ্নটা আরও বড় হয়ে লুয়ানা তোরেসের মনে বাসা বাঁধে। ভাইয়ের স্ত্রী আকাশপথের রোমাঞ্চ দারুণভাবে উপভোগ করছেন দেখে তা বড় হয় আরও। নিজের ভাবী মেয়ে হয়ে পাইলট হওয়ার মতো দুঃসাহসিক কাজ করতে পারেন— এটাই অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল লুয়ানার মধ্যে। ব্যস, অর্থনীতি ছেড়ে নেমে পড়লেন হেলিকপ্টার পাইলট হওয়ার মিশনে।
লুয়ানা তোরেস
বিমান কিংবা হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে মেয়েদের কাজ করা নতুন নয়। তবে তাদের চেয়ে লুয়ানা তোরেস আলাদা। একজন মেয়ে হিসেবে বিশ্বের এমন সব জায়গায় তিনি হেলিকপ্টার নিয়ে গেছেন, যা খুব বেশি দেখা যায় না। সেইসব দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে তোলা ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে তারকা বনে গেছেন ২৯ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান তরুণী। ইনস্টাগ্রামে তার ফলোয়ার এখন ১ লাখ ৭৪ হাজার।
অর্থনীতিতে ডিগ্রি থাকা লুয়ানা তোরেসের আকাশে ওড়ার ইচ্ছা ছিল আগে থেকেই। পড়ালেখার একটি প্রোগ্রামে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে প্রথমবার হেলিকপ্টারে ওড়ার অভিজ্ঞতা হয় তার। সেই যে ইচ্ছের বীজটা মনে বুনে নিলেন, এরপর ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রে হেলিকপ্টারের প্রশিক্ষণ কোর্স শেষে কানাডায় গিয়ে পেয়েছেন বাণিজ্যিক লাইসেন্স। তার গলায় এখন ঝোলে হেলিকপ্টার আদলের নেকলেস।
লুয়ানা তোরেস
লুয়ানা তোরেস
কীভাবে এভিয়েশন দুনিয়ায় এলেন, সেই বর্ণনা দিয়েছেন লুয়ানা এভাবে— ‘আমি সবসময় ভাবতাম আমার ভাই দারুণ একজন মানুষ, কারণ সে হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কাজ করেছে। এরপর দেখলাম আমার ভাবীও পাইলট। ওই সময় ভাবতাম, আমার ভাবী কী দারুণ কাজই না করছেন। কারণ মেয়েদের জন্য এটা বিরল ব্যাপার, বিশ্বে খুব বেশি মেয়ে বিমান চালানোর সঙ্গে যুক্ত নয়।’
প্রশিক্ষণের দিনগুলোতে লুয়ানা তোরেস
প্রশিক্ষণের দিনগুলোতে লুয়ানা তোরেস
সেই ইচ্ছে পূরণ হলো কীভাবে? লুয়ানা বললেন, ‘২০১৪ সালে ব্রাজিলে কোর্স শুরু করে হেলিকপ্টার চালানোর লাইসেন্স পাই প্রথম। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে তালিম নিয়ে পাই দ্বিতীয় লাইসেন্স। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় গিয়ে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম। সেখানেই এ বছরের মার্চে পেয়েছি বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার চালানোর লাইসেন্স।’
২০১৫ সালে প্রথম ফ্লাইট চালানোর সময় লুয়ানা তোরেস
২০১৫ সালে প্রথম ফ্লাইট চালানোর সময় লুয়ানা তোরেস
প্রথম হেলিকপ্টার চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছান লুয়ানা। ভালোবাসার ককপিটে বসে দুর্গম সব জায়গায় উড়ে বেড়ান তিনি। বরফে ঢেকে থাকা পাহাড়-পর্বতের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ানোর রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য তার কাছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ওই জায়গার রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে ভোলেন না। তার সেইসব ছবিতে ইনস্টাগ্রামে হাজার হাজার লাইক পড়ে।
তবে ইনস্টাগ্রাম দিয়ে নয়, অন্যভাবে তারকা হতে চান লুয়ানা। দুর্গম এলাকায় বন্দি কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে বিপদে পড়া অসহায় মানুষদের উদ্ধার করা তার জীবনের এখন অন্যতম লক্ষ্য। এভাবে যদি মানুষের মন জয় করা যায়, তাহলেই আসল সন্তুষ্টি আসবে আকাশজয়ী এই ব্রাজিল-কন্যার মনে।
লুয়ানা তোরেস
লুয়ানা তোরেস
হেলিকপ্টার চালানো ছাড়াও ব্লগিং উপভোগ করেন লুয়ানা। নিজের ওয়েবসাইটে ফ্যাশন, সৌন্দর্য, ফিটনেস ও এভিয়েশন নিয়ে লেখালেখি করেন তিনি।
>>>সূত্র: ডেইলি মেইল

ট্রাম্প পয়েন্টে বৃটিশ রাজনীতি by লুক ম্যাকগি

বলা হয়ে থাকে, যার পক্ষে সেরা আইনজীবীরা আছে ব্রেক্সিট ঠিক তার পরিকল্পনা মতোই হবে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে আসার দিন যত ঘনিয়ে আসছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকারকে তত বেশি সময় আদালতে দিতে হচ্ছে। গত বুধবার স্কটল্যান্ডের সর্বোচ্চ আদালত জনসন সরকারের পার্লামেন্ট স্থগিতের আদেশকে বেআইনি ঘোষণা করে রায় দিয়েছে। এতে বলা হয়, পার্লামেন্টকে অযৌক্তিক উদ্দেশ্যে কোণঠাসা করার লক্ষেই এমন স্থগিতাদেশ দিয়েছে সরকার।
এর অর্থ হচ্ছে, আদালত মনে করে চুক্তির মধ্য দিয়ে হোক বা চুক্তিহীন হোক আগামী ৩১শে অক্টোবরই ব্রেক্সিট সমপাদনের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিত করে দিতে চেয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। আগামী মঙ্গলবার লন্ডনের সর্বোচ্চ আদালতে এ মামলার শুনানি হবে। সেখানে থাকা ৯ বিচারপতির মধ্যে বেশিরভাগ যদি স্কটিশ রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেন তাহলে এটি হতে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত বরিস জনসনের জন্য সবথেকে বড় পরাজয়।

এ ছাড়া আদালতে আরেকটি পরাজয়ের পথে আছে জনসন সরকার। বৃটেনের সবথেকে ছোটো অংশ নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কাছে ব্রেক্সিট কোনো খেলা না। বৃটেনের চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট বিখ্যাত গুড ফ্রাইডে শান্তিচুক্তির লঙ্ঘন কিনা এ প্রশ্নে বৃহসপতিবার নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের একটি আদালত রায় দিয়েছেন। আগামী মঙ্গলবার এটি আবারো আদালতে উঠতে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে সেদিনই এই মামলা মিটে যাবে। বৃটেনের অংশ নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র আয়ারল্যান্ডের পাশেই। ফলে চুক্তিবিহীনভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এলে বৃটেনের এই অংশের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের সীমান্তে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলে তা গুড ফ্রাইডে শান্তি চুক্তির লঙ্ঘন হবে এমন দাবি মানতে নারাজ বৃটিশ সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, উভয় রাষ্ট্র এই সীমান্তে যেকোনো ধরনের সংঘর্ষ এড়িয়ে চলবে। তবে চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের পর আইনগতভাবে এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সেটি এখনো সপষ্ট নয়। এখন আগামী মঙ্গলবার দুই আদালতে যে রায় দেয়া হবে তার একটি বা দুটিই সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারে। কিন্তু রায় যা-ই হোক না কেন, জনসন সরকারের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে তা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে বলেই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে সত্যিকারের রায় নির্ধারণ করবে জনগণের আদালত। এটি এখন অনেকটাই সপষ্ট যে বৃটেন একটি সাধারণ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। বেশির ভাগই মনে করেন একমাত্র একটি নির্বাচনই পারে ব্রেক্সিটকে বিলম্বিত করতে। আমরা জানি যে, জনসন সরকারের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা এমন একটি টিকিট ব্যবহার করতে চান যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রামেপর খেলার ধরন থেকে খুব বেশি আলাদা না। শেষ পর্যন্ত যদি ব্রেক্সিট বিলম্বিত করতে আইনগতভাবেই বরিস জনসনকে চাপ দেয়া হয় তাহলে তিনি বলবেন, আমি ব্রেক্সিটের জন্য সবকিছু চেষ্টা করেছি কিন্তু অন্য রাজনীতিবিদরা আমাকে তা করতে দেয়নি। আইনজীবী, প্রশাসন এবং বিচারপতিরা আমাকে থামিয়ে দিয়েছে। কথাগুলো পরিচিত লাগছে না?

স্কটল্যান্ডের আদালতে পার্লামেন্ট স্থগিতাদেশকে বেআইনি ঘোষণা করার পর জনসন সরকারের এক মন্ত্রী জাতীয় টেলিভিশনে বলেন, বিচারকদের পক্ষপাতমূলক রায় নিয়ে দেশের অনেক মানুষ এখন প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। আমি না দেশের অনেক মানুষই এখন বলছে বিচারকরা পক্ষপাতদুষ্ট। পরোক্ষভাবে বিতর্কিত ইস্যুগুলোতে কথা বলার এমন ধরনকে ডনাল্ড ট্রামেপর সমর্থকরা অবশ্যই বুঝতে পারবে।

পরদিন বৃটেনের কিছু সংবাদপত্র আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বিচারকদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি দুর্বল বলে আখ্যায়িত করলো। ২০১৬ সালে যখন বিচারকরা একটি গণভোটের জন্য রায় দিয়েছিলেন তখনো এই সংবাদপত্র বিচারকদের জনগণের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। বর্তমানে বৃটেনের রাজনীতি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তা অনেকটা হওয়ারই কথা ছিল। ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোটের ৩ বছর পরও ইইউ থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যেতে ব্যর্থতা দেশটির বিষাক্ত রাজনৈতিক তর্ককে আরো বিভক্ত করে দিয়েছে। কিছু কিছু ব্রেক্সিটপন্থি তাই ব্রেক্সিট নিয়ে এত বেশি উৎসাহী হয়ে উঠছেন যে, একটি চুক্তির ভিত্তিতে ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তারা অপেক্ষা করতে পারছেন না। আবার অন্যরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্রেক্সিট বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে।
বরিস জনসনকে এখনি বৃটেনের ডনাল্ড ট্রামপ আখ্যা দেয়া ঠিক হবে না। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি সবসময়ই ডানপন্থি পপুলিস্টদের থেকে উদার আন্তর্জাতিকতাবাদী রাজনীতির কাছাকাছি ছিলেন। তবুও তার বিরোধীরা তাকে ট্রামেপর সূত্র ধরে যে আক্রমণ করছেন তা তাদের জন্য কার্যকরী। বরিস জনসনকে ট্রাম্পের সঙ্গে যেভাবে তুলনা করা হচ্ছে তা হয়ত সত্যি না। কিন্তু ব্রেক্সিট নিয়ে বিতর্ক এখন এতই বিষাক্ত হয়ে উঠেছে যে এই পরিস্থিতিকে ট্রামেপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করাই যায়। এভাবে দেখলে, বৃটেন এখন একটি ট্রামপময় সময় পার করছে।

(সিএনএন থেকে অনূদিত)

বাংলাদেশে ঢুকে মসজিদ নির্মাণে বিএসএফের বাধা

লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার বড়খাতা দোলাপাড়া সীমান্তে কেরামতিয়া বড় মসজিদের দোতলা ভবন নির্মাণ কাজে বাধা দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। শুক্রবার দুপুরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নির্মাণ কাজে বাধা দেয় ভারতের শিতলকুচি থানার অমিত ক্যাম্পের বিএসএফের টহল দল। জানা গেছে, বড়খাতা ইউনিয়নের দোলাপাড়া সীমান্ত এলাকায় মোগল আমলে কেরামতিয়া হজুর নামে এক দরবেশ বসবাস করতেন। তার সহযোগিতায় সেখানে সেসময় একটি ছোট মসজিদও নির্মাণ হয়। মৃত্যুর পর মসজিদের পাশেই তার দাফন করা হয়।
পরে একটি বড় আকারের টিনশেড মসজিদ নির্মাণ হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মসজিদ ও মাজারটি জিরো পয়েন্টে পড়ে যায়। কেরামতিয়া হুজুরের মাজার ও মোগল আমলের মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রতি শুক্রবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ নানা নিয়তে নামাজ পড়তে যান সেখানে।
মসজিদটি পুণঃনির্মাণের কাজ শুরু হলে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের অজুহাতে মসজিদ নির্মাণে বাধা দেয় বিএসএফ। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের উচ্চ পর্যায়ে মসজিদের নকশা অনুমোদন হওয়ার পর ওই বছরের ২৯শে এপ্রিল দোতলা মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কোটি টাকা ব্যয়ে এ মসজিদ নির্মাণের কাজ এখনো চলছে। কয়েকদিন ধরে মসজিদের দোতলায় জানালায় গ্লাস লাগালো হচ্ছে। কিন্তু শুক্রবার দুপুরে আকস্মিকভাবে বিএসএফ ওই নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়।
মসজিদে নামাজ পড়তে আসা আসাদুল ইসলাম জানান, জন্মের পর থেকেই দেখছি কেরামতিয়া হুজুরের মাজার ও মসজিদকে ঘিরে এখানে প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার নারী-পুরুষ আলাদা আলাদাভাবে নামাজে সমাবেত হন। কিন্তু দুই দেশের রাষ্ট্র পর্যায়ে নকশা অনুমোদন হওয়ার পরও শুক্রবার দেখলাম, ভারতীয় বিএসএফ বাংলাদেশে প্রবেশ করে নির্মাণ কাজে বাধা দিচ্ছে। ফলে নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় আমাদের নামাজ পড়তে সমস্যা হচ্ছে।
মসজিদ কমিটির সম্পাদক আলিমুদ্দিন জানান, দুই দেশের মধ্যে নকশা অনুমোদন হওয়ার পর আমরা মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু করি। কিন্তু প্রায় সময় বিএসএফ নানা অজুহাতে নির্মাণ কাজে বাধা দেয়। জানালায় রঙিন গ্লাস লাগাতে বাধা দিলে আমরা সাদা গ্লাস লাগাতে শুরু করি। কিন্তু শুক্রবার সেই গ্লাস লাগাতেও বাধা দেয়া হয়।
৬১ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির বড়খাতা কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার ইব্রাহিম মোল্লা জানান, ভারতীয় বিএসএফ মসজিদের নির্মাণ কাজে বাধা দিলেও নির্মাণ কাজ বন্ধ নেই। বিএসএফ আমাদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদের নির্মাণ কাজ ঘুরে দেখেছেন। এখন নির্মাণ কাজ চলছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে বিএসএফের সঙ্গে আলোচনাও হচ্ছে।

শোভন-রাব্বানী আউট: ছাত্রলীগের নতুন দায়িত্বে জয়-লেখক

নানা বিতর্কের মুখে অবশেষে পদ হারালেন ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের জায়গায় নতুন দুইজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। আগামী ২০ এবং ২১শে ডিসেম্বর আওয়ামী লীগর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। গত কয়েক দিন ধরে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নানা ধরণের অভিযোগ নিয়ে আলোচলা চলছিল। সর্বশেষ ৮ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের কর্মকা- নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে ছাত্রলীগের দুই নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেন। সর্বশেষ গতকালের বৈঠকে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় সংগঠনের ১ নম্বর সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের সভায় ছাত্রলীগের প্রসঙ্গটি এসেছিল। আমাদের নেত্রী বলেছেন, ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে। শুধুমাত্র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তাদের স্থানে বর্তমান কমিটির ১ নম্বর সহ-সভাপতি ও ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালন করবেন।

ওবায়দুল কাদের জানান, দলের সব পর্যায়ের সম্মেলন দ্রুত শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ২০ ও ২১শে ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ ও ১২ই মে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়াই ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন শেষে ৩১শে জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দায়িত্ব পাওয়ার দীর্ঘ দিন পরও সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে ব্যর্থ হন তারা। সর্বশেষ কমিটি ঘোষণা করা হলেও এতে বিবাহিত, মাদকের সঙ্গে জড়িত, শৃঙ্খলা বিরোধী অনেককে দায়িত্ব দেয়ায় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। পদ বঞ্চিত পক্ষ নতুন কমিটির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে চিহ্নিতদের কমিটি থেকে বাদ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।
দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকেও তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক রিপোর্ট দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এসব রিপোর্টের সত্যতা পেয়েই প্রধানমন্ত্রী তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন। ৮ই সেপ্টেম্বরের বৈঠকে তিনি নিজেই ছাত্রলীগের প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। এরপর কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে এ বিষয়ে কথা বলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল উপস্থিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে শোভন-রাব্বানীর উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয় বৈঠকে।

এছাড়া দুই নেতার দুপুরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস, নেতাকর্মীদের ফোন না ধরা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন দাবি করার প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে। জাবির হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন দাবির বিষয়ে অভিযোগ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি ফারজানা ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি অবহিত করেন। এদিকে ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি গঠনে অর্থ লেনদেনের বিষয়টিও নতুন করে সামনে আসে। এ অবস্থায় ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নিয়ে চিন্তিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। করণীয় নিয়ে নিজেরা আলোচনা করলেও সিদ্ধান্তের জন্য তাকিয়ে ছিলেন দলীয় সভানেত্রীর দিকে। গতকাল দলের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসায় নেতাদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সাধারণ নেতাকর্মীরাও খুশি। তারা প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।

তৃণমূল আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
এদিকে কার্য নির্বাহী সংসদের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নিয়মিত সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে গতিশীল রাখতে হবে। নেতাকর্মীদের দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের আস্থা বেড়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই আস্থা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সচেতন থাকতে হবে। আওয়ামী লীগ একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা বিরোধী দলে থাকলেও দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে দেশে যে দল সংগ্রাম করে, ত্যাগ স্বীকার করে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে, যাদের আন্দোলনের সংগ্রামের ফলে স্বাধীনতা, সেই দল ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন হয়। আর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে যারা ক্ষমতায় আসে তারা নিজেদের ক্ষমতা নিশ্চিত করে নিজেদের ভাগ্য গড়ার কাজে ব্যস্ত থাকে। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিতে, দেশ ও জাতির কল্যাণে সব সময়ই সংগঠনটি নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে গত এক দশকে বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। এখন বাংলাদেশ নিয়ে সারাবিশ্বের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। এগিয়ে যাওয়ার পথে নানা বাধা আসে বলে মন্তব্য করে সরকার প্রধান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো রয়েছেই, মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগও রয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদ, অগ্নিসন্ত্রাস করার অপচেষ্টা হয়েছিল, সরকার তা কঠোর হাতে দমন করেছে। আগামীতেও এই মনোভাব অব্যাহত থাকবে। একইভাবে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সফলতা ও পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এর সুফল দেশের মানুষ পাচ্ছে এবং তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ তাদের ভাগ্য পরিবর্তন এবং দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে এবং জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে। সে লক্ষ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা বিরোধী দল বা সরকারে থাকুক, আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালা কী হবে, দেশের মানুষের জন্য কী করবো, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কী করবো, সে বিষয়ে সেই পরিকল্পনা সবসময় আগে থেকে নিয়ে থাকে এবং যখনই সরকারে আসে তখন তা বাস্তবায়ন করে।

আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে দলীয় সভাপতি আরও বলেন, শুধু নিজে কী পেলাম, সেটা না ভেবে দেশ ও জাতিকে কী দিতে পারলাম, সেটাই বড় কথা। সবাই যার যার জায়গা থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে দ্রুতই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবো, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারবো।

জাবির ঘটনায় কপাল পুড়লো শোভন-রাব্বানীর:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন দাবি করার ঘটনায়ই মুলত কপাল পড়েছে শোভন-রাব্বানীর। তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও এ কমিশন দাবির ঘটনাটি বেশি আলোচিত হয়। বিষয়টি বিশ^বিদ্যালয় ভিসি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ শুরুর আগেই সমঝোতা হিসেবে ছাত্রলীগ নেতাদের দুই কোটি টাকা দেয়ার অভিযোগ উঠে ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে। বিষয়টি প্রকাশের পর এর বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে শুরু হয় আন্দোলন। তখনও জানা ছিল না ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সেক্রেটারির চাঁদা নিয়ে দেনদরবারের বিষয়টি। অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে কোণঠাসা অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম এই তথ্য প্রকাশ করে নতুন আলোচনার জন্ম দেন। তিনি দাবি করেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উন্নয়ন কাজে ‘পার্সেন্টেজ’ দাবি করে তার সঙ্গে দেন-দরবার করে ব্যর্থ হন। তিনি অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে থাকা অবস্থায়ও ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তার ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। অধ্যাপক ফারজানা ছাত্রলীগ নেতাদের ‘পার্সেন্টেজ’ দাবির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও অবহিত করেছেন। এরপরই ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের গণভবনে প্রবেশের স্থায়ী পাস বাতিল করা হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে দফায় দফায় চেষ্টা করেও দুই নেতা প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেতে ব্যর্থ হন। পরে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি লেখেন তারা। ওই চিঠিতে জাবি ভিসির বিরুদ্ধে তারা গুরুতর অভিযোগ করেন। ভিসির স্বামী ও পুত্র অর্থ লেনদেনে জড়িত বলেও দাবি করা হয় চিঠিতে। ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর খোলা চিঠিতে অভিযোগ তুলার পর ভিসি ফারজানা হক গণমাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে ‘পার্সেন্টেজ’ দাবির বিষয়টি প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেছেন ছাত্রলীগকে কোনো টাকা দেননি তিনি। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করতে তিনি বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে অনুরোধ করবেন। তদন্তেই সবকিছু পরিষ্কার হবে।

জাবির অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে শাখা ছাত্রলীগকে ভিসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ কোটি টাকা দিয়েছেন বলে খবর প্রকাশের পর উত্তাল হয়ে উঠে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তিনদফা দাবিতে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠকে ২ দফা নিয়ে সমঝোতা হলেও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্ত দাবি করেন তারা। কিন্তু এরই মধ্যে ভিসি গণমাধ্যমকে বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তার কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী তার বান্ধবীকে দিয়ে চাঁদার জন্য ফোন দিতেন। শোভন-রাব্বানী আমার বাসায় এসেও চাঁদা দাবি করেছে। এখনকার দিনে ১-২ % এর আলাপ কোথাও নেই। ৪%-৬%-এর নিচে কাজ হয় না। দেশে যে সমস্ত কাজ হচ্ছে ছাত্রলীগ শেয়ার পাচ্ছে। এটা আমাদের অনুমতি আছে। আমি বলেছি এত টাকা চলে গেলে ভবন হবে কীভাবে। আমি তোমাদের কোনো টাকা দিতে পারব না। এর আগে আমি হাসপাতালে থাকাকালে গিয়ে আমার কাছে ২-৩ টি টেন্ডার শিডিউল দাবি করেছেন।’ ভিসির এ বক্তব্যের বিপরীতে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ভিসি ম্যাডাম ঈদের আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন ভিসির স্বামী ও সন্তান কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এই কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে তারা শাখা ছাত্রলীগকে ব্যবহার করছেন। গোলাম রাব্বানী গণমাধ্যমকে আরো বলেন, জাবি ছাত্রলীগ আমাদের জানিয়েছেন ভিসি ম্যাডাম তাদের টাকা দিয়েছেন। পরে আমি আর শোভন দেখা করে বলি, আপনি শাখা ছাত্রলীগকে টাকা দিয়েছেন তাহলে আমাদের ন্যায্য পাওনা কই? আমাদের ঈদ বোনাস কই?

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভিসি ফারজানা ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমি তাদের কোনো ধরনের টাকা দেইনি। এসব তারা ক্ষুব্ধতা ও হতাশা থেকে গল্প বানাচ্ছে। আমি তাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। এ বিষয়ে আমি তদন্ত করতে বলবো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে, মাননীয় আচার্যকে। আমি যাব তাদের কাছে। এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।’

ভিসির পদত্যাগ দাবি: এদিকে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভিসিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ও ‘অর্থলোলুপ’ আখ্যায়িত করে ভিসির স্বপদে থাকার নৈতিক অধিকার নেই বলে পদত্যাগ দাবি করেছেন জাবি’র বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। ভিসিবিরোধী বলে পরিচিত আওয়ামীপন্থি এই শিক্ষক সংগঠন থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অনৈতিক আর্থিক লেনদেনে ভিসি ও তার পরিবারের জড়িত থাকার বিষয়টি দিবালোকের মতো পরিষ্কার। এই ঘটনায় ভিসি কেবল নিজেকেই কলঙ্কিত করেননি, সেইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান-মর্যাদাকেও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এ ছাড়া ভিসি ও তার পরিবার দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ভিসি তদানীন্তন সময় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে রুচিবহির্ভূত ও কা-জ্ঞানহীন মন্তব্য করেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

‘জগন্নাথের নতুন ক্যাম্পাসে বালু ভরাটে টাকা চেয়েছিলেন রাব্বানী’
জবি ছাত্রলীগের কমিটি টিকিয়ে রাখতে মাসোহারা (মাস প্রতি টাকা) ও কেরানীগঞ্জে ২০০ একর জমিতে নতুন ক্যাম্পাসের জায়গা উন্নয়নে ঠিকাদার পাঠিয়ে ঘনফুট প্রতি বালু ভরাটের জন্য টাকা চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ তুলেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেল।
যদিও রাব্বানী এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, অদৃশ্য সিন্ডিকেটের পরামর্শে তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন এই অভিযোগ করা হয়েছে। গত ৩রা ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি তরিকুল ইসলাম ও সম্পাদক শেখ রাসেলের সমর্থকদের সংঘর্ষের পর ওই দিনই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ১৯শে ফেব্রুয়ারি বিলুপ্ত করা হয় ওই কমিটি। গত শুক্রবার শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেল এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ওই কমিটি টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে তার কাছে মাসভিত্তিক টাকা চেয়েছিলেন রাব্বানী। কেরানীগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নতুন ক্যাম্পাসের জায়গা উন্নয়নের বালু ভরাটের কাজের জন্য ঠিকাদার পাঠিয়েছিলেন রাব্বানী এবং প্রতি ঘনফুট হিসেবে টাকা দাবি করেছিলেন। রাসেল বলেন, সংঘর্ষের পর সভাপতি তরিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে কমিটির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করতে রাব্বানীকে অনুরোধ করেছিলেন।

তখন রাব্বানী বলছিলেন, এর আগে সোহাগ ভাই-নাজমুল ভাই ছিল, তাদের বিভিন্নভাবে সুবিধা দিতো জবি ছাত্রলীগের শরীফ-সিরাজ (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি-সম্পাদক) কমিটি। তোরা তো আমাকে কিছু দিস না। তোরা মাসে কত দিতে পারবি বল, তাহলে দেখি কমিটি ঠিক করা যায় কীভাবে। ওই শর্তে রাজি হননি বলে তাদের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন রাসেল। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম রাব্বানী বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারামারিতে ২০-২৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছিল। এই ঘটনায় তিন সাংবাদিকও আহত হয়েছিল। এ ছাড়া জগন্নাথ ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নানা অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার খবর পেয়ে প্রথমে আমরা কমিটির সকল কার্যক্রম স্থগিত করি। পরে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে কমিটি বিলুপ্ত করি। রাব্বানী বলেন, জগন্নাথের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কমিটি বাঁচানোর বিষয়ে কথা বলার প্রশ্নই উঠে না। অনেক তদবির করে কমিটি টিকিয়ে না রাখতে পেরে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. ইউনূসের প্রতিকৃতি স্থাপনের প্রস্তুতি

প্রখ্যাত মার্কিন ভাস্কর ও চারুশিল্পী সেড্রিক হাক্যাবি  নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের একটি প্রতিকৃতি অঙ্কনের উদ্দেশ্যে গত সপ্তাহে ঢাকাস্থ ইউনূস  সেন্টারে আগমন করেন। স্ব-স্ব  ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদানের জন্য ভ্যান্ডারবিল্ট কমিউনিটির বিশিষ্ট সদস্যদের সম্মানিত করতে “ভ্যান্ডারবিল্ট ট্রেইলব্লেজার সিরিজ”-এর অংশ হিসেবে প্রফেসর ড. ইউনূসের পোর্ট্রেট অঙ্কনের অংশ হিসেবে প্রথম পর্বে প্রতিকৃতি স্কেচ করার জন্য তিনি গত সপ্তাহে ঢাকায় আসেন।

আরলিংটনে অবস্থিত টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অধ্যাপক হাক্যাবি পুরু প্রলেপের ম্যুরাল ও বৃহদাকার প্রতিকৃতি তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ। পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত জাদুঘর যেমন সান ফ্রান্সিসকো মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট,  হুইটনি মিউজিয়াম অব আমেরিকান আর্ট,  বোস্টনের মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস, মিনিয়াপলিস ইনস্টিটিউট অব আর্ট, আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো এবং ডিউক ইউনিভার্সিটিতে অবস্থিত ন্যাশের মিউজিয়াম অব আর্ট-এ তার বিভিন্ন শিল্পকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। অধ্যাপক হাক্যাবি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

প্রফেসর ইউনূসের এই “ট্রেইলব্লেজার পোর্ট্রেট” ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন কার্কল্যান্ড হলে প্রদর্শিত হবে। ভ্যান্ডারবিল্ট ট্রেইলব্লেজার সিরিজ অর্থাৎ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে পথিকৃত ভ্যান্ডারবিল্ট কমিউনিটির যে সব সদস্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সার্বিকভাবে সমাজে তাদের অবদানের জন্য বিখ্যাত তাদেরকে স্মরণীয় করার উদ্যোগ হিসেবে এই প্রতিকৃতিসমূহ স্থাপন করা হবে।

এই পর্বের প্রতিকৃতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচ জনকে বাছাই করেছে। উল্লেখ্য যে, প্রফেসর ইউনূস ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে সর্বপ্রথম ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইশ্‌ড অ্যালামনাস পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মাননা “নিকল্‌স-চ্যান্সেলর  মেডেল”-এ ভূষিত হন।

কেন ছাত্রদের আস্থা হারাচ্ছে ছাত্র রাজনীতি? by পারমিতা হিম

আটাশ বছর পরে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ আশার সঞ্চার করেছিলো। তবে নির্বাচনের ছয় মাস পরে শিক্ষার্থীরা বলছেন তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলো।
তাদের অভিযোগ, ছাত্রদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সোচ্চার নয় ছাত্র সংগঠনগুলো। বিশেষ করে হল সিট নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাজিফা তাসনিম খানম বলেন, ডাকসু নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল ডাকসু হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বৈধভাবে সিট পাবে।কিন্তু তিনি এখনো সিট পান নি।
''এগুলো নিয়ে কেউ কথাও বলছে না,'' তিনি বলেন।
''হলে থাকার জন্য জোর করে রাজনীতি করানো হয়। মিছিলে যেতে বাধ্য করা হয়। কেন একজন শিক্ষার্থীকে পড়ালেখা বাদ দিয়ে জোর করে রাজনীতি করাতে হবে?,'' প্রশ্ন করেন মিস খানম। 
নাজিফা তাসনিম খানমের সাথে একমত পোষণ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত সুলতানা
'ছাত্র রাজনীতি হবার কথা ছাত্রদের নিয়ে। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের কেন্দ্র করে হয় না, হয় দলকে কেন্দ্র করে,'' তিনি বলেন।
''তাদের উদ্দেশ্য ক্ষমতা অর্জন করা। ছাত্রদের কথা তারা বলছে না.'' মিস সুলতানা বলেন।

আন্দোলনের সুতিকাগার

একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হত আন্দোলনের সুতিকাগার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও বিশেষ অবদান আছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ছাত্র সংগঠনের অস্তিত্ব থাকলেও দৃশ্যমান কার্যক্রম বাংলাদেশ ছাত্রলীগেরই সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সব ছাত্র সংগঠনই কমবেশি জাতীয় রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।
''নেতিবাচক জাতীয় রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে ছাত্র সংগঠনগুলি অনেক সময়ই ছাত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে,'' মি. হোসেন বলেন।
শিক্ষার্থীদের বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি পরিচালিত হতে হবে এ বিষয়ে সব ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কর্মধারা পরিচালনা করতে পারেনি বলে শিক্ষার্থীরা এমন মনে করেন বলে জানান তিনি।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল

এদিকে, ২৭ বছর পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ৬ষ্ঠ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ডাকসু নির্বাচনের সময় ক্যাম্পাসে বেশ কয়েকবার মিছিল করেছিল ছাত্রদল। এরপরে এ সংগঠনের আর কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি দেখা যায়নি।
এর জন্য ছাত্রদলের ওপর দমনপীড়নকে দায়ী করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার।
তিনি বলেন, যারা ছাত্রদল সমর্থন করে কিংবা হয়ত শুধু ছাত্রদলের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিয়েছে, তাদেরকে নানাভাবে অত্যাচার করা হয়েছে।
''এরকম যদি হয় তাহলে কীভাবে এ প্ল্যাটফর্ম বেছে নেবে শিক্ষার্থীরা?'' প্রশ্ন করেন মি. তালুকদার।
ক্যাম্পাসে বিভিন্ন দাবিতে প্রায়ই নানারকম কর্মসূচি পালন করে থাকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র জোট।তবে এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার খুবই কম। বর্তমানে এ জোটের সমন্বয়ক বাংলাদেশে ছাত্র ইউনিয়ন।
দমন-পীড়নের বিষয়টি উল্লেখ করে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় বলেন, যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে তাতে সব ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের ওপরই এক ধরনের পীড়ন চলছে।আমরাও এর বাইরে নই।
দেশের সামগ্রিক রাজনীতির প্রভাবেই ছাত্রদের কাছ থেকে ছাত্র রাজনীতি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক মির্জা তাসলিমা সুলতানা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, এখনকার ছাত্র ছাত্রীরা অনেক বেশি সচেতন। তারা জানে কে কী করছে।
''ছাত্ররাজনীতির নামে কমিশন খাওয়া, প্রশাসনের সহযোগিতায় নানারকম দুর্নীতির যে অভিযোগ ছাত্রসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে রয়েছে তারা এসব বিষয়ে ওয়াকিবহাল,'' তিনি বলেন।
গত কয়েকবছরের ছাত্র আন্দোলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিভিন্ন ন্যায্য আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই একত্রিত হয়েছে। তারা ছাত্রসংগঠনগুলোর ওপর আর নির্ভর করতে রাজি নয়।
সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই।
আন্দোলন শুরু হবার পরে ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়ার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল।

কাশ্মীর সঙ্কট সমাধানে ট্রাম্পের প্রতি সিনেটরদের চিঠি

কাশ্মীর সঙ্কট সহ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট সব বিরোধ সমাধানে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে তার প্রভাব ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিনেটর ও কংগ্রেসম্যান। এর মধ্যে রয়েছেন সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন, টড ইয়াং, বেন কার্ডিন ও লিন্ডসে গ্রাহাম। তারা বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে ভারত দখলীকৃত কাশ্মীরে মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ৫ই আগস্টের আগে-পরে আটক রাখা হয়েছে অনেক মানুষকে। ট্রাম্প যেন তার প্রভাব ব্যবহার করে এসব মানুষকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।

ওই চিঠিতে ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে তারা লিখেছেন, আপনার প্রতি আমাদের অনুরোধ- ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রতি আপনি আহ্বান জানান কাশ্মীরে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি চালু করতে, অচলাবস্থা ও কারফিউ তুলে নিতে এবং আটক কাশ্মীরিদের মুক্তি দিতে। তারা চিঠিতে লিখেছেন, কাশ্মীর পরিস্থিতিতে আমরা এই চিঠির মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করছি। কাশ্মীরের এ পরিস্থিতি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে চিঠিতে আরো বলা হয়, কাশ্মীরের মর্যাদা বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সব পক্ষকে সহায়তা করা আপনার লক্ষ্য। আমরা আপনার এ লক্ষ্যকে সমর্থন করি। কিন্তু (কাশ্মীরে) এখন যে মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তা বন্ধে অবিলম্বে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

ওদিকে আলাদাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও’র কাছে একটি চিঠি লিখেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেসওম্যান প্রমিলা জয়াপাল। কাশ্মীরে সব রকম যোগাযোগ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভারতীয় অবরোধ তুলে নিতে, আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে ভারতের প্রতি চাপ সৃষ্টির জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছেন পম্পেওর প্রতি।

ওদিকে ট্রাম্পকে যে চারজন সিনেটর প্রথম চিঠি লিখেছেন তাতে স্বাক্ষরকারী একজন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম হলেন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। অন্যজন করাচিতে জন্ম নেয়া সিনেটর ভ্যান হোলেন। এর আগে গত ২২ শে জুলাই কাশ্মীর ইস্যু ও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ অন্যান্য ইস্যুতে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই কথা তাকে আবারো স্মরণ করিয়ে দেন এসব সিনেটর। তারা এ কথা স্মরণ করিয়ে লিখেছেন, আপনি জুলাইয়ে সহায়তার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেকথা অনুযায়ী আমরা বিশ্বাস করি ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ নিয়ে যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতা কাশ্মীরের সব মানুষের স্বস্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই মানবিক সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে যুক্তরাষ্ট্রের। আমরা আপনাকে আহ্বান করছি যত দ্রুত সম্ভব সেই ভূমিকা পালন করুন।

গত ২২ শে জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সঙ্কট সমাধানে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেন। পাকিস্তান এ প্রস্তাবে সমর্থন দিলেও, প্রত্যাখ্যান করে ভারত। এর কয়েকদিন পরেই ৫ই আগস্ট তারা কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে। কাশ্মীরে ভারত মোতায়েন করে হাজার হাজার সেনা সদস্য। জারি করে কারফিউ। বন্ধ করে দেয় সব রকম যোগাযোগ। এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন সিনেটররা। তারা চিঠিতে লিখেছেন, সব কিছু এভাবে বন্ধ করে দেয়ায় স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এতে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পাবলিক সেফটি অ্যাক্টের অধীনে কাশ্মীরে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০০০ মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়টি উল্লেখ করে মার্কিন এসব রাজনীতিক ওই আইনটি সম্পর্কে বলেছেন, এটা একটি বিতর্কিত আইন। এ আইনের অধীনে যেকাউকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই দু’বছর পর্যন্ত জেলে আটকে রাখতে পারে কর্তৃপক্ষ। এসব আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনীতিক, নেতাকর্মী, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থী। কাশ্মীরের নির্যাতিত জনগণকে স্বস্তি দেয়ার জন্য নিজের প্রভাবকে ব্যবহার করতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছেন, প্রতিটি দিন পাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীরি জনগণের অবস্থা আরো জটিল হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভিতরে যেসব সন্ত্রাসী বা জঙ্গি গোষ্ঠী আছে তাদেরকে সমর্থন ও নিরাপদ আশ্রয় দেয়া অবশ্যই পাকিস্তানকে বন্ধ করতে হবে। কাশ্মীর উত্তেজনা অস্থিতিশীলতার দিকে যায় এমন পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

কাশ্মীর সীমান্ত পার হতে আমার ডাকের অপেক্ষায় থাকুন: ইমরান খান

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আজাদ কাশ্মীরের জনগণকে উদ্দেশ করে বলেছেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পর্যন্ত আপনারা অপেক্ষা করুন এরপর প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে প্রবেশ করতে হবে। এজন্য সময়মতো আমি আপনাদের ডাক দেবো।
গত শুক্রবার আজাদ কাশ্মীরের খুরশিদ হাসান খুরশিদ স্টেডিয়ামে এক সমাবেশে দেয়া বক্তৃতায় ইমরান খান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, “আপনাদের অনেকেই নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করতে চান কিন্তু আমি আপনাদের বলব আপনারা অপেক্ষা করুন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি সারা বিশ্বের মানুষকে কাশ্মীরের জনগণের দুঃখ-দুর্দশা এবং নির্যাতনের ঘটনা জানাবো। এরপর প্রয়োজনে আপনারা সীমান্ত পেরিয়ে আপনাদের ভাইদের পাশে দাঁড়াবেন।”
সমাবেশে ইমরান খান নিজেকে ‘কাশ্মীরের রাষ্ট্রদূত’ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, তিনি আন্তর্জাতিক সমস্ত ফোরামে কাশ্মীর পরিস্থিতি এবং সেখানকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরবেন। তিনি বলেন, কাশ্মীর একটি মানবাধিকারের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে নারী-পুরুষ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই ভারতের দখলদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন।
আজাদ কাশ্মীরের জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান
ইমরান খান বলেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সুস্পষ্ট বার্তা দিতে চান যে, একমাত্র কাপুরুষরা জনগণের উপর নির্যাতন চালানোর পথ বেছে নেয়। তিনি বলেন, ভারতের মুসলমান ও সংখ্যাগুরু মানুষের উপর হিন্দু ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার যে ভয়াবহ এজেন্ডা নরেন্দ্র মোদি সরকার হাতে নিয়েছে তার জন্য তাকে চড়া মূল্য দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে ইমরান খান বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে যদি বিশ্ববাসী চুপ থাকে তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশ্বের উপর পড়বে। গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরিদের নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের যে অধিকার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাবে দেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে ইমরান খান বলেন, কাশ্মীরের জনগণ যদি নিজেদের স্বাধীনতা বেছে নেয়, অথবা ভারতের সঙ্গে থাকতে চায় কিংবা পাকিস্তানে যোগ দিতে চাই- ইসলামাবাদ কাশ্মীরের জনগণের যে কোনো সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানাবে।
সমাবেশে আজাদ কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী রাজা ফারুক, পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি, কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রী আলী আমিন গান্দাপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পারভেজ খাট্টাক ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ড. ফেরদাউস আশিক আওয়ান উপস্থিত ছিলেন।
নির্যাতনের শিকার কাশ্মীরের জনগণ (ফাইল ফটো)

ওমা গো, সান ডিয়াগো! by রিম সাবরিনা জাহান সরকার

নোঙর ফেলে ভাসছে পালতোলা শৌখিন কতগুলো নৌকা
বছরখানেক আগের কথা। মুখ ভচকিয়ে ল্যাবে ঘুরে বেড়াই। কাজে জুত করতে পারছি না। দেড় বছরের কাজ ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আবার নতুন প্রজেক্ট শুরু করেছি। পিএইচডি নামের এই সুড়ঙ্গের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। কাজটা ফুসফুসের ক্রনিক রোগ নিয়ে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিড়ি-সিগারেট ধরিয়ে ইঁদুরের বাক্সের সামনে বসে থাকি। বেচারাদের ফুসফুসের বারোটা বেজে গেলে তাদের কেটেকুটে চলে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই করে করে জীবন চিরতার মতো তিতা হয়ে যাচ্ছে।
তেমনি একদিন সকাল। খিটখিটে মেজাজে ল্যাবে ঢুকেছি। দুনিয়াদারি চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কে জানত এমন একটা খবর অপেক্ষা করছে আজকে। ‘ও মাগো’ বলে গালে হাত দিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লাম। কিছুটা নাটুকে হয়ে গেল বোধ হয়। কিন্তু হাজার চেষ্টাতেও অকৃত্রিম প্রতিক্রিয়াটা লুকানো গেল না। তুর্কি সুপারভাইজার ডক্টর ইলদ্রিম কিছু একটা উত্তর শোনার অপেক্ষায় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। বাংলা ওমা গো তিনি বুঝতে পারেননি। ভেবেছেন খুশিতে খাবি খেয়ে হেঁচকি তুলেছি।
কাহিনি হচ্ছে গিয়ে, আমার হেঁজিপেঁজি রদ্দি মার্কা কাজটা কীভাবে কীভাবে যেন আমেরিকান থোরাসিক সোসাইটির কনফারেন্সের ‘বেস্ট অ্যাবস্ট্রাক্ট’ বিভাগে প্রথম হয়েছে। বিশাল বড় পরিসরের কনফারেন্সটা এ বছর পড়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগোতে। সব শুনে আনন্দে ফড়িং নাচ দেওয়ার বদলে কেমন দুঃখ দুঃখ লাগছে। কারণ, এমন দারুণ সুযোগ পেয়েও হারাব। প্রথম কথা, মাত্র চার সপ্তাহের ভেতর জার্মানি থেকে আমেরিকার ভিসা পাব কি না, কঠিন সন্দেহ আছে। দুই নম্বর হলো, খরচে কুলাবে না। ট্যাঁকের পয়সা ফেলে পাগলেও কনফারেন্সে যায় না। বাকি থাকে তুর্কি বদান্যতা। কিন্তু সেও বলে দিয়েছে হাতে টাকা নেই। রিসার্চ গ্রান্টের খরা চলছে। এদিকে প্রাইজ মানিতেও চিড়া ভিজবে না। প্লেনের টিকিট হবে টেনেটুনে। কিন্তু হোটেল আর হবে না। হোটেলের অভাবে রাতে ফুটপাতে চিৎ–কাত হয়ে কাটিয়ে দিতে হলে মসিবত।
কথাগুলো আহমেদ সাহেবকে রাতে খাবার টেবিলে পিনপিনিয়ে বলে সান্ত্বনা আদায়ের চেষ্টা চালালাম। বছরখানেক হলো এই ভদ্রলোকের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূত হয়ে চেপে বসেছি। বিনিময়ে তাঁর পদবিটা নিজের নামের সঙ্গে জুড়ে নেবার সৌজন্যতাটুকুও করিনি। বরং বারো হাত চওড়া সরকারি নামটাই বহাল রেখেছি। তো সিন্দাবাদের ভূত দিন কয়েকের জন্য বিদায় হওয়ার সূক্ষ্ম সম্ভাবনা দেখে সান্ত্বনার বদলে বিরাট উৎসাহ দিয়ে বুদ্ধি বাতলে দেওয়া হলো যেন রিসার্চ সেন্টারের লুকানো চুরানো কোনো ফান্ড আছে কি না, তার খোঁজ নিই। আহমেদ সাহেবের ভূত তাড়ানোর দোয়া কবুল হলো কিনা জানি না, কিন্তু জোড়াতালি দিয়ে ব্যবস্থা একটা হয়েই গেল। ভিসাও বাকি থাকল না। এক ভোরে আলো ফোটার আগেই চাম বাদুড়ের মতো ডানা ঝটপটিয়ে উড়াল দিলাম আটলান্টিক নামের বড় পুকুরটার ওপারে।
একা বোকা যাচ্ছি। সঙ্গী সাথি শূন্য। যাওয়া একেবারে শেষ মুহূর্তে ঠিক হওয়ায় এই দশা। ল্যাবের অন্য কলিগদের বন্দোবস্ত মাসখানেক আগেই করা ছিল। তাদের ফ্লাইট, হোটেল সব আলাদা ব্যবস্থা। একদিন আগেই তারা হল্লা করে দল বেঁধে রওনা দিয়েছে। গিয়ে একটু ধাতস্থ হতে পারবে। আর আমি পৌঁছানোর পরদিনই পড়িমরি করে ছুটব কনফারেন্সে যোগ দিতে। জেটল্যাগ হলেও কিছু করার নেই।
নোঙর ফেলে ভাসছে পালতোলা শৌখিন কতগুলো নৌকা
আটলান্টায় ট্রানজিট। এয়ারপোর্টে দোজখের গরম। তার ওপর ইমিগ্রেশনের বিশাল লাইন দেখে অজানা আশঙ্কা কাজ করছে। পরের ফ্লাইট ছুটে যাবে না তো? ভাবতে ভাবতে ঘেমে কুলুকুলু হয়ে ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে দাঁড়ালাম। এদের সন্দেহপ্রবণ সিস্টেম আবার কাঁধে পোস্টারের খাপকে রকেট লঞ্চার ভাবে কি না, তাই আলপটকা নামিয়ে ফেলতে গেলাম। তড়িঘড়িতে শক্ত প্লাস্টিকের খাপটা মেঝেতে দড়াম করে আছড়ে পুরোনো নকিয়া ফোনের মতো তিন টুকরো হয়ে তিন দিকে ছড়িয়ে পড়ল। ঘাবড়ে গিয়ে আমি পুরো হাঁ। বোয়াল মাছ লেভেলের হাঁ দেখে অফিসারের মনে দয়ামায়া হলো বোধ হয়। হাত বাড়িয়ে ধরা কাগজগুলো নিয়ে বললেন, ‘তোলো তোমার জিনিস আস্তেধীরে, আমি কাগজ দেখি ততক্ষণে’।
উবু হয়ে পোস্টার গুছিয়ে নিয়েছি, ভদ্রলোক সহাস্যে বললেন, ‘আরে তুমি দেখছি ইঁদুরের ডাক্তার।’ মৃদু প্রতিবাদ করতে গেলাম, ‘কোন দুঃখে ইঁদুরের ডাক্তার হতে যাব? আমি বায়োলজির ছাত্র। ইঁদুর আমার গবেষণার মডেল মাত্র।’ লাভ হলো না, তবে পার পেয়ে গেলাম এই দফায়। ইঁদুরের ডাক্তারের তকমা গলায় ঝুলিয়ে দৌড় দিলাম পরের প্লেনটা ধরতে। পোস্টার খাপের গলাটা এবার দুই হাতে ক্যাঁক করে চেপে ধরেছি। বেচারার দম বলে কিছু থাকলে যেকোনো সময়ে ঠুস করে বেরিয়ে যেতে পারে।
-----------দুই----------
দুই কদম হাঁটতেই দেখি মোটাসোটা এক ভদ্রলোক চেহারায় রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে একটা থাম্বা থাবড়ে ক্রমাগত আওড়ে যাচ্ছেন, ‘ট্রানজিটের যাত্রী বাঁয়ে যাবে, ট্রানজিট বাঁয়ে...’। ধরনধারণ পুরোপুরি গাবতলীর বাস কন্ডাক্টরের মতো। ট্রানজিট বাঁয়ে না বলে ‘আয়া পড়েন, সিট খালি, ডাইরেক্ট গুলিস্তান...আয়া পড়েন...’ বললেই বেশি মানাত। যা হোক, বাস, থুক্কু প্লেন কন্ডাক্টরের কথা মেনে শখানেক লোকের সঙ্গে পা মিলিয়ে বাঁয়েই ছুটলাম।
ঝামেলা ঝামেলা লাগছে। প্রথম ফ্লাইট থেকে নামিয়ে দেওয়া স্যুটকেস খুঁজে নিয়ে পরের বিমানে চেক ইন করতে হবে। ল্যাও ঠেলা। এত দৌড়াদৌড়ি কচ্ছপগতির আমার সঙ্গে যায় না। অন্য সময়ে যাত্রাপথে কেউ না কেউ সঙ্গে থাকে। আমি শুধু নিশ্চিন্তে ঝিমাতে ঝিমাতে পিছু পিছু যাই। সেখানে আজকে নিজের বুঝ বুঝে নিয়ে হুঁশিয়ার হয়ে চলতে হচ্ছে। আবার এত প্যারার ভেতরেও চোখ ভেঙে ঘুম আসছে। বেশি টেনশনে কাজ করলে খালি ঘুম পায়। জীবনের যাবতীয় পরীক্ষার ভোরে বন্ধুরা যখন আখেরি চোখ বোলানো বুলাত, আমি তখন প্রচুর টেনশনের কারণে নাক ডেকে বালিশ আঁকড়ে সিন্ধুঘোটকের মতো ঘুমাতাম। আজকেও তেমনি একটা ঘুম দিয়ে টেনশন-ফেনশন বাইপাস করে দিতে ইচ্ছা করছে।
ঘুমটা আমি দিয়েই ফেললাম। তবে পরের প্লেনটা ধরার পর। বরফ কুঁচি দেওয়া এক গ্লাস টমেটোর জুস আর এক মুঠ বাদাম চিবিয়ে ইকোনমির সিটে যত দূর সম্ভব হাত-পা ছড়িয়ে, গা এলিয়ে টপ করে ঘুমিয়ে গেলাম।
এক ঘুমে একঘেয়ে উড়ালপথ পাড়ি দিয়ে সান ডিয়াগো বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম। বিকেলের নরম রোদ মুখে এসে পড়েছে। অপেক্ষাটা তাই খারাপ লাগছে না। দাঁড়িয়ে আছি ইউনিভার্সিটির বন্ধু মাহদির জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন চালু হওয়া জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগে আমাদের ব্যাচে মাত্র তেরোজন ছিলাম। সেই থেকে সবাই হরিহর আত্মা। মাহদি বিভাগের তুখোড় ছাত্র। পিএইচডি করে ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত স্ক্রিপ্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। পেপারের সংখ্যা তখনই কয়েক ডজন। সব হাই ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর। আমার ধারণা বছরখানেকের ভেতর সে ‘বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর অভাবনীয় আবিষ্কার’ ধরনের শিরোনাম হবে পত্রিকার পাতায়। সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত এক তরুণের ছবি। তখন পরিচিত মহলে আমি সেই খবর ভাঙিয়ে ভাব নেব, ‘আরে আমার ক্লাসমেট তো। কার্জন হলের কত চা-শিঙাড়া খেয়েছি একসঙ্গে...’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
মোটেলের পাশে রাস্তার ওপাশ ঘেঁষেই বন্দর
আমার আসার খবর মাহদি আগে থেকেই জানে। প্লেন থেকে নামার আগেই পার্কিং লটে গাড়ি নিয়ে বসে আছে। ফোন পেয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘নড়বে না একদম, আসছি।’ পৃথিবীজুড়ে বন্ধুবান্ধব ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকার সুবিধা অনেক। পাঁচ মিনিটের মাথায় চিকন ধুলার পরতে ঢাকা আপাত ধূসর একটা টয়োটা এসে দাঁড়াল। বলেই তো নিয়েছি গাড়ির মালিক তার ছেঁড়া বিজ্ঞানী টাইপ লোক। ধুলা মোছার ফালতু সময় তার নেই। গাড়িতে উঠে শুরু হলো বেদম হাঁচি। হাঁচির তোড়ে ছোটখাটো একটা বালুর ঝড় বয়ে গেল। রাগী চোখে তাকালাম। উত্তরে ধুলার সওদাগর চাটগাঁয়ের ছেলেটা ফিচেল হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে এস্কেলেটর চাপল।
প্যাঁচার মতো ঘাড় ঘুরিয়ে নতুন দেশের নতুন শহরটাকে দেখছি। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ের সৈকত শহর সান ডিয়াগো। ঝকঝকে চওড়া রাস্তার দুই ধারে সারি সারি পামগাছ মাপা দূরত্বে দাঁড়িয়ে। আকাশে নীলের মাঝে সাদা মেঘ কাশফুল হয়ে ভাসছে। একেবারে তুলির আঁচড়ে আঁকা ছবি। দেখেশুনে পলক আর পড়ে না আমার। বিস্ময় ভেঙে মাহদি জানাল, পুরো শহরটা নিখুঁত নকশার ফসল। গাছপালাও বাইরে থেকে এনে লাগিয়ে বড় করা। কিছু আনা হয়েছে সীমান্তের মেক্সিকো থেকে। সঙ্গে এ–ও বলল, হলিউডের আস্তানা লস অ্যাঞ্জেলস শহর নাকি মাত্র দুই শ কিলোমিটারেরও কম দূরে এখান থেকে। চাইলে ঘুরে আসতে পারি এক ফাঁকে। মনে মনে ভাবলাম, আগে তো কনফারেন্সের পাট চুকাই। গলার কাঁটা নেমে গেলে ঘোরাঘুরি পরে দেখা যাবে নে।
হোটেলের নাম ভারিক্কি গোছের। ডেজ ইন হারাবার ভিউ। তবে চেহারা দেখে দমে গেলাম। টান বারান্দা দেওয়া সাদামাটা তিনটা তলা। হোটেলের বদলে মোটেল ভাব প্রকট। মাহদি সযত্নে স্যুটকেস তুলে দিয়ে বাসায় নাকি ল্যাবে ফেরত গেল। আর বলে গেল ঘণ্টাখানেক বাদে আবার এসে ডিনারে নিয়ে যাবে। চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে বহুদিন পর।
মোটেলবেশী হোটেলের ঘর যথেষ্ট সাজানো গোছানো। বাইরের রূপের উল্টোটা। আর পুরো হোটেল ভর্তি কনফারেন্সের লোকজন। বেশির ভাগই জার্মানি থেকে এসেছেন। কী কাকতাল! কিন্তু মিউনিখের কাউকে চোখে পড়ল না। তাতে কিছু যায় আসে না। ল্যাবের কলিগ আর সুপারভাইজারকে জানিয়ে দিলাম, বহাল তবিয়তে পৌঁছে গেছি; কালকে দেখা হচ্ছে।
রাতে লেবানিজ এক রেস্তোরাঁয় রাতের খানাপিনা সেই মাপের হলো। মোরগ-পোলাওজাতীয় খাবারটার দেড় প্লেট নামিয়ে দিয়েছি। গল্প-আড্ডার চেয়ে আধা লিটারের কোকের বোতলে সুড়ুৎ সুড়ুৎ টানই বেশি পড়েছে। চুর চুর লাগছে এখন। হোটেলে নামিয়ে দিয়ে মাহদি সেদিনের মতো বিদায় নিল। আর বলে গেল, যেকোনো সমস্যায় ফোন দিতে যেন দুবার না ভাবি।
হাতে কয়েকটা ইনস্ট্যান্ট নুডলসের প্যাকেট আর টুকিটাকি নিয়ে ওপরে উঠলাম। মাঝপথে ওয়ালমার্টে থামা হয়েছিল। হোটেল রুমের ইলেকট্রিক কেটলিটা দেখে মনে হয়েছিল, কালকে সারা দিন জ্ঞান কপচানো শেষে ঘরে ফিরে খিদে পেলে চটজলদি নুডলস করে নেওয়া যাবে। প্রবাসে এসে একটা বড় অংশ কেটেছে এই ইনস্ট্যান্ট নুডলসের ওপর ভরসা করে। আর এখন তো প্রবাসের ভেতর প্রবাস। জার্মানি থেকে আমেরিকা। সফদার ডাক্তার তো আর নই যে ‘খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে’ হয়ে বসে থাকব। তার চেয়ে চিবোলাম না হয় আরও খানকতক ইনস্ট্যান্ট নুডলস।
প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ের সৈকত শহর সান ডিয়াগো
রাতের ঘড়ি এগারো ছুঁয়েছে। এক মগ হট কোকো নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছি। মে মাসের হালকা মিষ্টি হাওয়া বইছে। হঠাৎ দেখি অন্ধকার ফুঁড়ে নাকের ডগায় বিশাল মাস্তুল! ভড়কে গিয়ে মগ ছলকে পড়ার দশা হলো। তারপর চোখ সয়ে নিয়ে কাহিনি বুঝলাম। হোটেলের নামে হারবার ভিউ কথাটা আছে কেন স্পষ্ট হলো। রাস্তার ওপাশ ঘেঁষেই বন্দর। তাতে নোঙর ফেলে ভাসছে পালতোলা শৌখিন কতগুলো নৌকা। সঙ্গে স্পিডবোট আর ছোট-মাঝারি ইয়টও আছে। এই নিশুতি রাতের আবছায়ায় কাঠের শরীরগুলোর হালকা দোলাচল মুগ্ধ হয়ে দেখছি। এই সৌন্দর্যের কোনো ভাষা হয় না। এই রূপ কলমের আঁচড়ে বন্দী করা যায় না। এমন একটা নৌকার মাস্তুলে পাল উড়িয়ে যদি পালিয়ে যাওয়া যেত ভাঙার গৎবাঁধা জীবনটা থেকে, কেমন হতো তাহলে? পাগলাটে রোমাঞ্চের জলজ ঘ্রাণ সপাটে ঝাপটা মেরে গেল নাকে।
বেশি আগড়ুম বাগড়ুম ভাবার সময় পেলাম না। সকালে সান ডিয়াগো কনভেনশন সেন্টার খুঁজে বের করে হাজির হতে হবে। সমান্তরালে চলতে থাকা অনেকগুলো সেশনের কোন কোনটা শুনলে আখেরে কাজে দেবে তার একটা লিস্ট বানিয়ে ফেলা দরকার। তাহলে হয়তো পরের দিন নিজের কাজের ওপর বকবক করতে সুবিধা হবে। কইয়ের তেলে কই ভাজার বুদ্ধি আর কী। খালি মগটায় মনের ভুলে আরেকবার চুমুক দিয়ে ঘরে ঢুকলাম।
ল্যাপটপ বের করতে গিয়ে দেখি স্যুটকেসের তালা দারুণ মুনশিয়ানার সঙ্গে ভাঙা। ভেতরে এক টুকরো নোট পাওয়া গেল। তাতে লেখা, ‘নিরাপত্তার খাতিরে তালা ভাঙতে হয়েছে বলে দুঃখিত। তবে মূল্যবান কিছু খোয়া গেলে আমরা কিন্তু দায়ী নই।’ বাহ! খোঁড়া যুক্তির বাহার দেখে রাগ লাগার বদলে হাসি পাচ্ছে। আবার দুঃখও লাগছে। ল্যাপটপটা নিরাপত্তার অজুহাতে রেখে দিলে বেশ হতো। পাঁচ কেজি ওজনের শিল-পাটার পাটা আকৃতির এই যন্ত্রটা কাজের খাতিরে সবখানে বয়ে বেড়াতে হয়। হারিয়ে গেলে পলকা দেখে একটা কিনব ভেবে রেখেছি। কিন্তু বদখত জিনিসটা তো হারাচ্ছে না! হতাশ হয়ে দ্রুত লিস্টিফিস্টি বানিয়ে বাতি নিভিয়ে দিলাম সে রাতের মতো।
------------তিন----------
মাথার ভেতর একজন ইবনে বতুতা বগলে জুতা নিয়ে ঘাপটি মেরে থাকে। সুযোগ পেলেই সে জুতা ফটফটিয়ে বেরিয়ে আসে। আজকেও তাই হয়েছে। হাতের মুঠোয় গুগল ম্যাপ নামের মানচিত্রের বাপ থাকতেও লোকজনকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করে করে হেলেদুলে হাঁটছি। অচেনা দেশে নিজেকে বোহেমিয়ান ভাবতে ভালো লাগে। সকালের মিষ্টি রোদ, ভেসে থাকা নৌকার ভিড়, নতুন শহরের পথঘাট, দালানকোঠার নকশা, মানুষজন-সব দেখতে দেখতে বিশ মিনিটের হাঁটা পথ আধা ঘণ্টা লাগিয়ে পৌঁছালাম জায়গামতো।
লেখিকা: ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার
অতিকায় সান ডিয়াগো কনভেনশন সেন্টার কিছুতেই চোখ এড়াতে পারে না। আমেরিকান থোরাসিক সোসাইটির বিশাল ব্যানারে ছাওয়া পুরো কাঠামোটা। খুঁজে পেতে পরিচিত সবার দেখা মিলল অবশেষে। আমাদের রিসার্চ গ্রুপের হেড, আমার পিএইচডি সুপারভাইজার ইলদ্রিম চোখ নাচিয়ে খুব সাগ্রহে জানতে চাইলেন, ‘কী, কেমন ধরাটা খেলে এয়ারপোর্টে? আটলান্টায় ধরেনি তোমাকে?’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘কিসের ধরা খাওয়া, আমাকে তো আরও ইঁদুরের ডাক্তার ভেবে ঝামেলা ছাড়াই আস্তে করে ছেড়ে দিল। কিন্তু তুমি কোথাও আটকেছ মনে হচ্ছে?’ উত্তরে তার চোয়াল ঝুলে গেল। জানাল, বেচারার তুর্কি চেহারা আর জার্মান পাসপোর্ট ইত্যাদি দেখে তাকে দলছুট করিয়ে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গিয়েছিল। হাজার প্রশ্নের জবাব নিয়ে তারপর নাকি ছেড়েছে। ফ্লাইট মিস একদম কানের পাশ দিয়ে গিয়েছে।
টম আর গেরিট হাতের ইশারায় কিছু একটা বলার চেষ্টা করছেন। সুপারভাইজারকে পাশ কাটিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাদের ল্যাবের দুই পোস্টডক। গেরিট চোস্ত জার্মান, ধারালো চেহারা। জার্মান স্বভাব মোতাবেক সারাক্ষণ খঁচে থাকে। টম আইরিশম্যান, গোলগাল ভালোমানুষ। তবে ব্রিটিশ বললে খেপে যান। তাই তাকে আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রিটিশ ব্রিটিশ বলে খ্যাপাই। কাছে এগোতেই খবর দিলেন, সেভেন সিটার একটা পাওয়া গেছে। অমুক দিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া যাবে। সময়মতো যেন পার্কিংয়ে অপেক্ষা করি।
এই বুদ্ধি আগেই আঁটা। শেষের একটা দিন কনফারেন্সে ক্লিনিক্যাল আলোচনাই বেশি চলবে। আমাদের মতো মৌলিক গবেষণার লোকের জন্য তেমন একটা জরুরি না। সেদিন আমরা ফাঁকি দেব। সারা দিনের জন্য গাড়িভাড়া নেওয়া হয়েছে। আরেক ল্যাবের দু-একজনকে জুটিয়ে সদলবলে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ব। সুপারভাইজার যাবেন না জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি যাবেন মেক্সিকোর সীমান্তের দিকে, যেখানে ব্র্যান্ডের জিনিস পানির দামে পাওয়া যায়। শুনে খুশিই হলাম। নেতা গোছের কেউ থাকলে স্বাধীনতা খর্ব হয়। ভেড়ার পাল বানিয়ে হ্যাঁট হ্যাঁট করে যে দাবড়ানিটা সে সারাক্ষণ দেয় আমাদের, সেটার হাত থেকেও বাঁচা যাবে।
সান ডিয়াগোর নৈসর্গিক দৃশ্য
এলোমেলো ঘুর-ঘুরান্তির দিনটা আর আসে না। এদিকে সকাল-সন্ধ্যা জ্ঞানের ঘ্যানঘ্যান আর কাঁহাতক সহ্য হয়! নিজের পোস্টার প্রেজেন্টেশন না হয় এ রকম উতরে গেল। বাকিরাও ভালো করল। তবু সুপারভাইজার লোকটা গাঁয়ের পাঠশালার পণ্ডিতের মতো পিছে লেগে থাকে। অমুক নামকরা বিজ্ঞানীর আলোচনায় আমরা যেন বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করে তাক লাগিয়ে দিই। নইলে ‘কিন্তু কপ করে খেয়ে ফেলব’ জাতীয় হুমকি চলে। তাই কিছুটা প্রাণভয়ে কোনো সেশনে বোকাটে বোকাটে সব প্রশ্ন ছুড়ি। আবার কোনোটায় সত্যিকারের আগ্রহ নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করি। কাউকে কাউকে তো স্টেজ থেকে কফির টেবিল পর্যন্ত ধাওয়া করলাম। তবে বেশির ভাগ সময়ে সামনের সারিতে বসে হাঁ করে আধ খোলা মুখে ঘুমিয়ে কাটালাম।
সারা বেলা কনফারেন্সের পর রাতে আশপাশের রেস্তোরাঁয় হানা দিয়ে পেটচুক্তি খেয়ে সময় কেটে যাচ্ছিল একরকম। এক–আধ দিন মাহদি এসে আবার সেই লেবানিজ রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়েছিল। নাম যার সুলতান। একদিন সেখানে চোখে পড়ল, এক ধারের দেয়ালে প্রায় সব দেশের খুচরা টাকার নোট ফ্রেম বন্দী হয়ে ঝুলছে। বাংলাদেশের দুই টাকার নোটও আছে দেখলাম। দোয়েল পাখিটা পরিচিত ভঙ্গিতে উঁকি দিচ্ছে। তার একটু বাদেই একদল দেশি ভাই জাতীয় পোশাক চেক লুঙ্গি বিপজ্জনক উচ্চতায় তুলে গটগট করে ঢুকল। নোয়াখালীর ভাষায় চলা আড্ডা দেখে বোঝা গেল তারা নিয়মিত কাস্টমার। ‘এটাই আমেরিকার মজা, বুঝলা?’ চওড়া হাসিতে মাহদি দুই মহাদেশের উদারতার ফারাক ইঙ্গিত করল। দেশি ভাই আর তাদের লুঙ্গির বদৌলতে সম্পূর্ণ ঘরোয়া আমেজে সারলাম সেদিনের ডিনার। মনে হলো, লেবাননি রেস্তোরাঁ সুলতানে না, বসে আছি ‘ইয়ান তুন খাই যান’ জাতীয় দেশি কোনো ভাতের হোটেলে।
------------চার----------
এরই মধ্যে একদিন কনফারেন্সের ইচিং–বিচিংয়ের ফাঁকে কয়েকজন মিলে লাঞ্চে বেরিয়েছি। কাছেই রালফস নামের বড়সড় একটা সুপারমার্কেট আছে। স্যান্ডউইচ কিনে চিবোতে চিবোতে ফেরত যাচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়ল, ফুটপাতে এক উষ্কখুষ্ক লোক কম্বল–টম্বল বিছিয়ে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। তার কোলে হেলান দেওয়া কাগজের সাইনবোর্ডটায় লেখা, ‘আমাকে রালফস থেকে চিকেন উইংস কিনে দিয়ে যাও’। গেরিটকে ইশারা করে বললাম, ‘বস তো দেখছি সেই রকম’। খঁচে থাকা গেরিট গাঁক গাঁক করতে করতে বললেন, ‘কেন, অসুবিধা কী? যা খেতে চায়, পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে।’ একটু দম নিয়ে যোগ করল, ‘আর ওর জায়গায় তুমি হলে তো ঠিকই লিখে রাখতে, আমাকে বাসমতী চালের একথালা ভাত দিয়ে যাও। নইলে চিকেন উইংসগুলো দিয়ে তাড়া করব’। বলেই মুখ টিপে মশকরার হাসি হাসলেন ল্যাবের বাজখাঁই মেজাজের পোস্টডক গেরিট। গালে বিশাল এক কামড় স্যান্ডউইচ থাকায় ঠা ঠা করে হাসতে পারছে না। হায়, আলুখেকো জার্মান এই বাঙালকে ভাতের খোঁটা দেয়!
সান ডিয়াগোর নৈসর্গিক দৃশ্য
সেদিন বিকেলেও আমরা চরম খোশমেজাজে ছিলাম। চার কি পাঁচতারা এক হোটেলে আফটার পার্টি হবে। ডিজেসহ। আগ্রহ নিয়ে এসেছি। এসে দেখি ডিজে–ফিজে ঘোড়ার ডিম। লবিতে এক ছোকরা গিটার বাজিয়ে অনুরোধের গান গাইছে। ওদিকে যাদের জন্য পার্টি সেই বিজ্ঞানীদের দঙ্গল ওয়াইন হাতে নিয়ে আমশি মুখে নিঃশব্দে ঘুরপাক খাচ্ছেন। যেন মুখ খুললেই জ্ঞান উবে গিয়ে কলসি খালি হয়ে যাবে। গিটারওয়ালা ছেলেটা খুব আড়ষ্ট ভঙ্গিতে নিচু স্বরে বলে যাচ্ছে, পরের গানে শ্রোতারা কী শুনতে চান। ভেবে দেখলাম, আরে মওকা তো দারুণ! উড়াধুরা ঢিশটিং–ঢিশটিং গান হাতড়াচ্ছি মনে মনে। কিন্তু দেরি হয়ে গেল। গেরিট ততক্ষণে পিংক ফ্লয়েডের একটা ক্ল্যাসিকের নাম চেঁচিয়ে ছুড়ে দিয়েছে। উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে ছোকরাও বাজাল জানপ্রাণ দিয়ে। এদিকে আমি তক্কে তক্কে আছি। গান পেয়েছি। গানস ‘ন রোজেস। সুইট চাইল্ড ও’মাইন। ছেলেটা প্রশস্ত হাসিতে জানিয়ে দিল, অনুরোধ তার মনে ধরেছে। এক মুহূর্ত কী ভেবে সে হাওয়াই গিটার নামিয়ে পাশে রাখা ইলেকট্রিক গিটারটা প্লাগ-ইন করে নিল। বয়সে বছর সাত-আষ্টেকের বড় গেরিট অবাক হয়ে বললেন, এ্যাই, তুমি আমাদের সময়ের গান–টান শোনা শিখলে কোত্থেকে? তোমার তো পুরোনো গান বলতে বড়জোর ব্যাক স্ট্রিট বয়েজ আর ব্রিটনি স্পিয়ার্স শোনার কথা। বাঁকা হেসে বললাম, তোমার সমান আমার একটা ভাই আছে। সেই সুবাদে টিনেজ পপ না শুনে ক্ল্যাসিক রক শুনে বড় হয়েছি। শুনে গেরিটের কিছুটা হলেও তাক লেগে গেল। বেশ আমোদ পাচ্ছি। সায়েন্টিফিক আফটার পার্টি ব্যাপারটা একেবারে খারাপ লাগছে না। চলে। পরের ঘণ্টা দুয়েক কলিগদের ওয়াইন গ্লাসের সঙ্গে আমার কোল্ড কফির চিয়ারস চিয়ারস ঠোকাঠুকি আর গানবাজনা—দুটোই চলল সমানতালে।
তারপর এক সকালে বহু অপেক্ষার সেই দিন চলে এল। ঠিক হলো উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরেফিরে তারপর সোজা চলে যাব সাগরপাড়ে। বেশ খানিকটা দূরে নাকি দারুণ একটা সৈকত আছে। ভাড়া করা বিশাল গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সবাই। গাড়ির কাচে নাক ঠেকিয়ে দেখি বাইরেটা। দক্ষিণ এশীয় আন্টিরা বেজায় রঙিন সালোয়ার–কামিজের সঙ্গে ধবধবে সাদা কিংবা কটকটে গোলাপি কেডস পরে অলিগলি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। শহরঘেঁষা সাগরপাড়ে অলস সিল মাছ বড় পাথরের গায়ে পেট ভাসিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। কী অদ্ভুতই না দেখাচ্ছে দৃশ্যগুলো।
সান ডিয়াগোর নৈসর্গিক দৃশ্য
বড় সৈকতটা খুঁজে পেয়ে আমরা হইহই করে নেমে পড়েছি। কী ভেবে চপ্পল জোড়া আঙুলে ঝুলিয়ে নিলাম আমি। বালি ওম ওম গরম। কুসুম কুসুম উষ্ণতায় ছেয়ে গেল মনটা। দলের আর মেয়ে দুজন খুব দ্রুত হেঁটে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে এর ভেতর। টম আর গেরিটও যে যার মতো হেলেদুলে ঘুরছে। একা পড়ে যাওয়াতে আমি এক রকম খুশি। বার কয়েক পানিতে পা ভিজিয়ে ক্ষান্ত দিয়ে বালুর ওপর কায়দা করে ডান হাতে ভর রেখে বাম দিকে এমনভাবে কেৎরে বসেছি যেন সৈকত, সাগর আর ঢেউয়ের একটা অনুভূমিক ছবি পাওয়া যায়।
ছবিটা প্রায় তুলে ফেলেছি, আর দুম করে গেরিট ফ্রেমে ঢুকে পড়ল। তা–ও আবার আদুল আদুল খালি গায়ে। শর্টস বাদে বাকি সব তিনি ঢেউয়ের ডগায় রেখে এসেছেন আল্লাহর ওয়াস্তে। যেকোনো মুহূর্তে সেগুলো জলের পেটে চলে যেতে পারে। সেদিকে থোড়াই কেয়ার করে বললেন, সাগরপাড় থেকে তিনি স্লো মোশনে দৌড়ে আসবেন আর আমি যেন পটাপট কটা ফটো খিঁচে দিই। অনিচ্ছাভরে আড়মোড়া ভেঙে আলসেমির বিশাল কুমির হাই তুলে বললাম, ‘এটা তো টমকে বললেই পারতে। আমাকে জ্বালানো কেন?’ কিন্তু টমের দিকে তাকাতেই দেখা গেল তার প্রাগৈতিহাসিক দুই বাই তিন ইঞ্চি ফিচার ফোনটা হাতে নিয়ে তিনি অপরাধী হাসি হাসছেন। এই দিয়ে আর যাই হোক ছবি খেঁচা যাবে না। অগত্যা, আরামের কেৎরে বসা বাদ দিয়ে হাতের ফোনটায় টোকার পর টোকা মেরে গেলাম। পার্টনারকে পাঠানোর জন্য তোলা ছবিগুলো কেমন হয়েছে দেখার আর ফুরসত মিলল না গেরিট মিয়ার। উল্টো দিকে রামদৌড় লাগিয়েছেন ততক্ষণে। পাগলাটে একটা ঢেউ বেসামাল ধেয়ে আসছে। সমুদ্দুরে জামাকাপড় হাতিয়ে নিলে তাকে আদুল গায়েই হোটেলে ফিরতে হবে। কারও কাছে জ্যাকেট নেই। সান ডিয়াগোর আবহাওয়া আজকে খারাপ রকমের ভালো।
--------------পাঁচ------------
সৈকত থেকে শুরু হওয়া কাঠের ছোট্ট সেতুটা একটুখানি এগিয়েই শেষ হয়ে গেছে। সেতুর মাঝপথে দাঁড়ালে মনে হয় নীল সাগরের একেবারে গহিনে দাঁড়িয়ে আছি। দুপুর হয়ে গেছে দেখে টুকটাক হাবিজাবি খেয়ে নিচ্ছি কেউ কেউ। কারও হাতে এই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, নয় তো আইসক্রিম। দূরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেয়ে উড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিসের ধোঁয়া?’ টমের কাছ থেকে উত্তর এল, ‘খবর–টবর পড়া ছেড়ে দিয়েছ মনে হয়? এটা হলো ক্যালিফোর্নিয়ার কুখ্যাত দাবানল। এ বছরেরটা শুরু হলো মাত্র’। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, দু-একটা হেলিকপ্টারের আনাগোনা। আগুন নেভানোর চেষ্টা আর কী। আগুন দেখে বেখাপ্পাভাবে বলে ফেললাম, ‘আচ্ছা, আজকে ওদিকে বনবাদাড় পুড়ছে আর আমরা কপকপিয়ে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাচ্ছি। কেমন যেন রোম পোড়ে, নিরো বাঁশি বাজায় টাইপ হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা?’ অনেকগুলো আলু ভাজা একবারে মুখে পুরে দলের বাকিরা রে রে করে উঠলেন, ‘দেখো, ফটকা লোক নিরোর প্যাঁ পোঁর সঙ্গে আমাদের কপকপ মেলাবে না খবরদার। আর আগুন আমরা লাগাইনি। সুতরাং তোমার মন কেমনের গুষ্টি কিলাই’। গুষ্টি কিলানোর হুমকিতে চুপ মেরে গেলাম।
সান ডিয়াগোর নৈসর্গিক দৃশ্য
তবে চুপ মেরেছিল আরও কয়েকজন। সেতুর এক পাশে তিন চারটি পেলিক্যান। তাদের চেহারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের গাম্ভীর্য। তাদের পাশে কমলারঙা সাইনবোর্ড পতপত করে উড়ছে। তাতে ছোট করে কী যেন লেখা। কৌতূহলী হয়ে পড়তে গেলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে খটাস ঠোকর! আর্কিওপ্টেরিক্স সাইজের ধুমসো একটা পেলিক্যান মাথা ঠুকে দিয়েছে। দিয়ে আবার জায়গায় মতো ফিরে গিয়ে আধবোজা চোখে ঝিমাচ্ছে। যেন কিছুই হয়নি। এদিকে চোখে সর্ষে ফুল দেখার মাঝেও পেলিক্যানের গুষ্টি কিলাতে কিলাতে লেখাটা পড়ে ফেললাম। ‘প্লিজ, সরে দাঁড়াও। বুনো বাদামি পেলিক্যান। আমরা বেকুব কিসিমের লোকজনকে কামড় দিই...উই বাইট স্টুপিড পিপল’। গা টা অপমানে টং করে জ্বলে গেল। কারণ, কথা অতীব সত্য। কিন্তু ঘটে ঘিলু মিলু যে কিছু নেই, সেটা পাখিগুলো জানল কী করে? যা হোক, মাথা ডলতে ডলতেই দেখলাম, লেখাটা টমের চোখে পড়েছে। খুলে আসা ভারী চশমাটা নাকে এঁটে সেও এদিকে আসছে। আজকে তারও ঠোকর কপাল। ভং ধরে থাকা পেলিক্যানটা আধবোজা চোখ খুলে নড়েচড়ে বসেছে। পরের দৃশ্য দেখার জন্য অপমান ভুলে বাকিদের সঙ্গে ঠোঁট টিপে হাসি আটকিয়ে নিষ্পাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম।
ফেরার পথে সাগরের তাজা হাওয়ায় লাগা খিদের গতি করার জন্য গাড়ি থামাতে হলো। শুধু বেচারা টম কিছুই না খেয়ে হাত গুটিয়ে উদাস বসে থাকলেন। ছোটবেলায় বাদাম দেওয়া কী যেন খেয়ে অ্যানাফাইলাক্টিক শকে পড়ে অ্যাম্বুলেন্স-হাসপাতাল করতে হয়েছিল। সেই থেকে খাবার নিয়ে তার নখড়ার শেষ নেই। একবার চটপটি বানিয়ে ল্যাবে নিয়ে গিয়েছিলাম। অবশ্যই ঝালশূন্য। বিচিত্র নতুন খাবারটা সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে খেলেন। আর টম এসে প্রবল বেগে টেবিলের চারপাশে ঘুরপাক খেতে খেতে বললেন, ‘বাহ্ বাহ্‌, স্যাভরি স্ন্যাকস! ওয়াও, ওয়াও, লুকিং স্ক্রামশাস’। কিন্তু তাকে বাটি-চামচ ছুঁতে দেখা গেল না। এই হলো আমাদের আইরিশম্যান টম। এখানে আসা অবধি সাবওয়ে নামের রেস্তোরাঁ ছাড়া কোথাও তাকে খেতে দেখা যায়নি। তাদের খাবারে নাকি বাদামের ব্যাপার নেই।
দেখতে দেখতে সান ডিয়াগোর সূর্যের দিনগুলো ফুরিয়ে এল। আজকে ফেরার দিন। ফ্লাইট ভোররাত চারটায়। মাহদি দায়িত্ববান বন্ধুর মতো দিয়ে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু পারল না। তার বদলে ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে দিল সন্ধ্যায় এসে দেখা করতে এসে। সেই রাতেই তাকে অতি জরুরি একটা এক্সপেরিমেন্ট চালাতে হবে তার ল্যাবে। ক্ষ্যাপা বিজ্ঞানী বলে কথা।
সান ডিয়াগোর নৈসর্গিক দৃশ্য
ট্রানজিট আটলান্টায় এসে এবার আর ভয় পেলাম না। বরং একটু ঘুরেটুরেও বেড়ালাম। ঠিক সময়ে মিউনিখের প্লেন খুঁজে নিলাম। পাশের সিট খালি দেখে হাত–পা ছেড়ে দেব দেব করছি। কিন্তু না। কোত্থেকে সাড়ে ছয় ফুট দশাসই এক তরুণ প্রায় দেড়টা আসন দখলে নিয়ে ফেলল। ওদিকে আমি যে চিপায় পড়ে আছি, সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। বিমান ছেড়ে দেওয়ার প্রায় আধঘণ্টা পর তার মুখ ফোটা শুরু হলো। ‘ভাগ্যিস, তুমি শুটকো পটকা আছ। তাই জায়গা নিয়ে বসতে পারছি। হাই, আমি রবার্ট।’ চিপা থেকে চিঁ চিঁ করে নিজের নাম বললাম। এরপরের পাঁচ-দশ মিনিটের আলাপে রবার্ট সম্পর্কে চমক লাগানো তথ্য বেরিয়ে এল। সে এক আফগানিস্তানফেরত আমেরিকান সৈনিক। আমেরিকান ঘাঁটিতে কিছু বছর সৈনিক জীবন কাটিয়ে দেশে চলে গিয়েছিল। তারপর টিভি সাংবাদিকের কাজ নিয়ে আবার ফিরে গেছে সেই আফগান দেশেই। এখন জার্মানি যাচ্ছে ফুটবল খেলতে। জার্মান একদল সাংবাদিকের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ। কিছুটা যেচে পড়ে জানতে চাইলাম, ‘আফগানিস্তান কেমন দেখেছ? যুদ্ধ আসলে কেমন?’ সপ্রতিভ রবার্ট এক মুহূর্ত আনমনা থেকে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, ‘সাধারণ আফগান মানুষ খুব সহজ–সরল। আর ওদের কাবাব খুব মজার।’ বলেই তিনি আচমকা ফুল স্টপ হয়ে গেলেন। বোঝা গেল, এই প্রসঙ্গের আলাপে তার খুব একটা উৎসাহ নেই। আমিও আর প্রশ্ন বাড়ালাম না। তা ছাড়া, যোদ্ধাকে ‘যুদ্ধ কেমন’ জিজ্ঞেস করা বাতুলতা। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা আর নিষ্প্রয়োজনীয়তা তাদের থেকে ভালো আর কেউ জানে না।
সান ডিয়াগোর নৈসর্গিক দৃশ্য
ঘুমিয়েই গিয়েছিলাম বোধ হয়। নিজের নাম শুনে সোজা হয়ে বসলাম। কাগজ মিলিয়ে এয়ার হোস্ট ভদ্রলোক বলছেন, ‘হ্লালব্রিনি ফর মিস সারকার’। ‘হ্লালব্রিনি’ বস্তুটি যে কী, বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। পাশ থেকে রবার্ট ধাঁধাটা ভেঙে দিলেন, ‘হালাল খাবার প্রি-অর্ডার করেছিলে মনে হয়। চলে এসেছে তোমার হালাল বিরিয়ানি।’ বাড়িয়ে দেওয়া ট্রে নিলাম। আগুন গরম অ্যালুমিনিয়ামের ভাণ্ড থেকে ভুরভুরে সুঘ্রাণ আসছে। আফগান কাবাবের পাঁড় ভক্ত রবার্ট জুলজুল করে চেয়ে আছে এদিকে। তাকে দেওয়া হয়েছে শুকনো রুটি, মাখন ইত্যাদি অখাদ্য। ভদ্রতা করে হ্লালব্রিনি সাধতে গিয়ে ভুল করলাম। পলকেই বিরিয়ানির অর্ধেকটা তার প্লেটে লাফিয়ে পড়ল। বাকিটা পথ বিরিয়ানির জোরেই কি না জানি না, রবার্টের মুখ চলল তুফান মেলের গতিতে। খাজুরে আলাপের ফাঁপরে পড়ে একবার ঘুমের ভান করলে খুঁচিয়ে উঠিয়ে কফি কাপ ধরিয়ে দিল। নিস্তারবিহীন বিমানযাত্রার পুরোটা রবার্ট নামের মূর্তিমান যন্ত্রণায় অস্থির। মিউনিখে নেমে হাসিমুখে তাকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে আসছি, আর কানে ভেসে এল আমেরিকান সৈনিক তার দলের বাকিদের পেয়ে বলছে, ‘উফ্, কী একটা মেয়ের পাশে যে বসেছি, কথা বলে বলে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। কথার মেশিন। খালি পটরপটর আর পটরপটর…’।
মাথা নেড়ে আপন মনে হেসে বাড়ির পথ ধরলাম।
ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার
>>>ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, স্কুল অব মেডিসিন, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি।