Sunday, February 9, 2014

বাঘের পেটে নয়জন

করবেট ন্যাশনাল পার্কে বিশ্রামরত এক বাঘ
ভারতের উত্তর প্রদেশে একটি মানুষখেকো বাঘের জন্য কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ আতঙ্কে ভুগছে। বাঘটি ২৯ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নয়জনকে খেয়েছে। উত্তর প্রদেশের জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কের কাছে গভীর অরণ্যে ওই বাঘের সাম্প্রতিকতম শিকার হন এক যুবক কৃষক। গতকাল শুক্রবার তাঁর আধা খাওয়া শরীর উদ্ধার করা হয়েছে। বিজনোর জেলার সরকারি কর্মকর্তা সলিল শুক্লা জানান, গবাদিপশুর খোঁজে ওই কৃষক গত বৃহস্পতিবার বনে গিয়েছিলেন।
গতকাল তাঁর ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করা হয়। মানুষখেকো বাঘের শিকারে পরিণত হয়েছেন তিনি। এ ঘটনায় বনের অদূরের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। করবেট ন্যাশনাল পার্কে প্রায় ২০০টি বাঘ আছে। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, মানুষখেকো বাঘের হানা দেওয়ার ঘটনা বহুদিনের মধ্যে এই প্রথম। ভারতে বাঘ শিকার দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধ। তবে ওই মানুষখেকো বাঘকে পাকড়াও করতে কিংবা গুলি করে হত্যার জন্য ছয়জন শিকারিকে অনুমতি দিয়েছে সরকার। প্রাণী সংরক্ষণবাদীরাও বলেন, কোনো বাঘ একবার নরমাংসের স্বাদ পেলে বারবার মানুষ হত্যা করতে থাকে। এই পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পেতে হলে ওই মানুষখেকোকে বন্দী বা হত্যা করা ছাড়া আর উপায় নেই। এএফপি।

অবরুদ্ধ হোমস থেকে মুক্তির প্রহর গুনছে নিরীহ মানুষ

সিরিয়ার অবরুদ্ধ হোমস শহর থেকে বেসামরিক লোকজনকে বেরিয়ে যাওয়ার নিরাপদ পথ করে দিতে সম্মত হয়েছে বাশার আল-আসাদের সরকার। এর আওতায় গতকাল শুক্রবারই হোমস থেকে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আজ শনিবার থেকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তার ত্রাণসামগ্রীবাহী ট্রাকও প্রবেশ করার কথা হোমসে। এদিকে সিরিয়ায় সহিংসতা বন্ধের পথ খুঁজতে জেনেভায় শান্তি সম্মেলনের পরবর্তী পর্বে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে দেশটির সরকার। বাশারবিরোধী বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত হোমস দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে সিরিয়ার সেনাবাহিনী। ফলে ওই শহরে খাদ্য-ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চরম অভাব দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে জেনেভায় অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে অবরুদ্ধ হোমসে ত্রাণ পাঠানোর বিষয়ে বিদ্রোহী ও সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, হোমসের গভর্নর ও সিরিয়ায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের মধ্যে সমঝোতার আওতায় অবরুদ্ধ এলাকা থেকে নির্দোষ বেসামরিক নাগরিকদের বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সিরিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল আল-মুকদাদ বলেন, ‘আমরা খুশি যে শেষ পর্যন্ত অবরুদ্ধ এলাকা থেকে এই মানুষগুলোকে বের করে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে অবরুদ্ধদের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠানো সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, এই সহায়তা যেন সন্ত্রাসী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ না পায়।’
অবরুদ্ধ হোমসের বিষয়ে সিরিয়া সরকারের এ অবস্থানের বিষয়ে বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, তাদের আশা, শুক্রবার (গতকাল) থেকেই অবরুদ্ধ এলাকা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের বের করে আনা শুরু হবে। পরদিন (শনিবার) সেখান থেকে যাওয়া মানুষের জন্য ত্রাণ প্রবেশ করবে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র ফারহান হক জানান, ত্রাণবাহী ট্রাক হোমসে ঢোকার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো ত্রাণ নিয়ে শহরে প্রবেশ করবে। হোমসে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সেখানে খাবারের অভাবে অনেকে ঘাস ও লতাপাতা খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। এদিকে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, জেনেভায় শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিরিয়া সরকার। প্রতিবেদনে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল মুকদাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, আগামী সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া জেনেভায় সম্মেলনের পরবর্তী পর্বের আলোচনায় যোগ দেওয়া হবে। জেনেভায় গত সপ্তাহেই প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় বসে সিরিয়ার সরকার ও বিরোধীরা। প্রায় সপ্তাহব্যাপী ওই আলোচনায় বলার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। তার পরও আলোচনা শেষে পরবর্তী পর্বে আলোচনায় বসার ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানের কথা ঘোষণা করেন বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিরা। তবে সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতারা জানিয়েছিলেন, তাঁরা আলোচনায় ফিরবেন কি না তা শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর জানাবেন। বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্স।

আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেব

প্রতিটি যুদ্ধই মানব সভ্যতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিনিয়ত রচনা করে চলেছে কলংকজনক সব অধ্যায়। হানাহানি আর দ্বন্দ্বের মহামারি থেকে বাদ পড়ছে না নিষ্পাপ শিশুও। এ সব অসহায় মানুষের অভিযোগ আর্তনাদ শোনার যেন কেউ নেই, শুধু ঈশ্বর ছাড়া। প্রতিদিন নানা দেশে বোমা, গুলি আর সহিংসতায় শিশু মৃতুর ঘটনা ঘটে। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন, মিসর, আফগানিস্তান, পাকিস্তানে এমন বহু শিশু মৃত্যুর ঘটনা হয়তো আমাদের চোখেও পড়ে না। কিন্তু সম্প্রতি সিরিয়ায় বোমা বর্ষণে আহত ও পরে নিহত হওয়া একটি তিন বছরের শিশুর ছবি ও কথা ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঝড় তুলেছে।
ছবিটি যখন তোলা হয় তখন বোমার আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হাফপ্যান্ট পড়া শিশুটি রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের বেডে ব্যাথায় কাঁদছে। তার মাথা থেকে টপটপ রক্ত গড়িয়ে ভিজে গেছে কাঁধ, পায়ের অংশ। তার পাশে তখন নেই বাবা-মা কিংবা কোনো স্বজন। তীব্র ব্যাথা আর আতংকে শিশুটি তখন পাগল প্রায়। ছবিটি ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে তোলা হয়েছে। চিকিৎসকদের প্রবল চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেনি নাম না জানা শিশুটিকে। ছবিটি তোলার কিছুক্ষণ পরই সে মারা যায়। মৃত্যুর আগে পৃথিবীতে বিচার না পাওয়া ছোট্ট শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে বলে গেল, ‘আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেব।’

যে প্রশ্নের জবাব খালেদাকে দিতে হবে

সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া
১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ের পর বিএনপির নেতারা বলেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ রায় দেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে সরকার বিএনপির নেতা খালেদা জিয়ার রাজনীতিকে ধ্বংস করতে চায়। তাঁরা বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারেরও অভিযোগ এনেছেন। আমরা মনে করি, সত্যের খাতিরে বিএনপির নেতাদের এসব অভিযোগের ময়নাতদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ক্ষমতাসীনেরা বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে আইন প্রয়োগকারী তদন্ত সংস্থা ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করবে, এটি মেনে নেওয়া যায় না। তবে বিএনপির নেতাদের এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার আগে তাঁদের উদ্দেশে একটি প্রশ্ন রাখা জরুরি বলে মনে করছি। সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা ব্যবহার করছে—তাঁদের এই অভিযোগ যদি সত্যও হয়, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সিইউএফএল জেটি ঘাটে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনাটি তো মিথ্যা নয়। সে সময় আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন না। আমাদের অবশ্যই জানতে হবে, সেই ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি কোথা থেকে এসেছিল,
কারা পাঠিয়েছিল, কোথায় পাঠাচ্ছিল; এর প্রেরক ও প্রাপকের নাম কী? সেই প্রাপক ও প্রেরক যদি বিদেশি হয়ে থাকে, বাংলাদেশের কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল, কারা তাদের সহায়তা করেছে; সেসব প্রশ্নের জবাবও বিএনপির নেতৃত্ব, আরও নির্দিষ্ট করে বললে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দিতে হবে। কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রায় দেওয়া হয়েছে বলে দায় এড়ানো যাবে না। তর্কের খাতিরে আমরা যদি ধরেও নিই যে বর্তমান সরকার মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বিএনপি তথা চারদলীয় জোট সরকার সেই সুযোগটি কেন আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দিল? ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল ঘটনাটি ঘটেছে; এর পরও বিএনপি প্রায় আড়াই বছর ক্ষমতায় ছিল। ওই সময়ে কেন তারা এ ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করল না? কেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হলো না? কেন আটককারী দুজন নিম্নপদস্থ পুলিশ সদস্যকে তদন্তের নামে হয়রানি ও নির্যাতন করা হলো? এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পারলে বিএনপি সম্পর্কে মানুষের মনে যে সন্দেহ ও সংশয়, সেটাই আরও ঘনীভূত হবে। মনে রাখা দরকার, এ ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জড়িত। দেশের বা দেশের বাইরে যারাই এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকুক না কেন, তারা বাংলাদেশের বন্ধু নয়; বরং শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। বিএনপি সরকারের উচিত ছিল সেই শত্রুদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা। বিএনপির কোনো কোনো নেতা ও শুভানুধ্যায়ী বলতে চেষ্টা করেছেন যে তাঁরা যা করেছেন তা জাতীয় স্বার্থে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের জাতীয় স্বার্থের সংঘাত হলে সেটি মীমাংসা করার আন্তর্জাতিক আইন আছে। সে আইন কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না। আমাদের প্রতিবেশী বা অন্য কোনো দেশ যেমন তাদের জাতীয় স্বার্থে এমন কিছু করতে পারে না, যা আমাদের জাতীয় স্বার্থে আঘাত করে।
তেমনি আমরাও জাতীয় স্বার্থে এমন কিছু করতে পারি না, যাতে অন্য কোনো দেশের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়। বিএনপির নেতৃত্বকে এও মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কাশ্মীর সমস্যা নেই যে এর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ‘যুদ্ধ’ জিইয়ে রাখতে হবে। আমরা যুদ্ধ জিইয়ে রাখলে প্রতিপক্ষও যুদ্ধ জিইয়ে রাখবে। তার পরিণাম কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। এর পাশাপশি আমরা স্মরণ করতে পারি, ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যার দায়ে বিএনপি সরকারই শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ সাত জঙ্গিকে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল (যদিও সেই দণ্ড কার্যকর হয়েছিল পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে)। বিএনপি সরকার সেটি করতে চেয়েছিল বলেই হয়েছে এবং সে জন্য তারা দেশে-বিদেশে প্রশংসাও পেয়েছে। কিন্তু ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলা, কিবরিয়া হত্যা মামলা, সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর ওপর হামলা, যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলা, পল্টনে সিপিবির জনসভায় বোমা হামলা কিংবা পয়লা বৈশাখে রমনার বটমূলে বোমা হামলা মামলাগুলোর ব্যাপারে তারা কেন নিশ্চুপ ছিল, সেই প্রশ্নের জবাব নেই। এ ঘটনাগুলো হয় আগের আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে অথবা বিএনপি সরকারের আমলেই ঘটেছে। এসব অঘটনের হোতা হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা।
সেই সহযোগীদের সঙ্গে বিএনপির কার কী সম্পর্ক ছিল, কোন মন্ত্রী বা মেয়র বাংলা ভাইয়ের সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া করেছেন, বিএনপির নেতৃত্বের কাছে দেশবাসী সেসব প্রশ্নেরও জবাব চাইবে। হরকাতুল জিহাদ বা জেএমবি ঘোষিত সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠন। তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। কিন্তু বিএনপি তো একটি গণতান্ত্রিক দল। তাদের নেতা-কর্মীরা কীভাবে এই ভয়ংকর সংগঠনের সঙ্গে হাত মেলান, এসব অঘটনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন? সাম্প্রতিক কালে নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলন সফল না হওয়া বা জনগণকে সম্পৃক্ত করতে না পারার কারণ নিশ্চয়ই বিএনপির বিজ্ঞ নেতারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। জনগণ তাঁদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি সমর্থন করলেও সেই দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যা ও জ্বালাও-পোড়াওকে সমর্থন করেনি। তাহলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানের মতো ঘটনাকে কীভাবে জনগণ অনুমোদন দেবে? এ ঘটনার দুটি দিক আছে। একটি বিচারিক, আরেকটি রাজনৈতিক। বিচারিক দায়িত্ব বিএনপি সরকার সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারও কিবরিয়া হত্যাসহ অনেক হত্যা মামলার বিচার করতে পারেনি। সেটি তাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। কিন্তু সন্ত্রাসী বা জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিএনপি নিজেদের বিযুক্ত করতে না পারা বিএপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা বলে মনে করি। একজন লুৎফুজ্জামান বাবর কিংবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাপ দলটির গায়ে স্থায়ী কালিমা লেপন করে দিয়েছে। সন্ত্রাসী ও নাশকতার ঘটনার সঙ্গে বিএনপির যেসব নেতা-মন্ত্রী-সাংসদ বা উপদেষ্টা জড়িত বলে খবর বের হয়েছিল, বিএনপি নেতৃত্ব তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, তদন্ত পর্যন্ত করেননি।
আমরা একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবেই বিএনপিকে দেখতে চাই। গণতান্ত্রিক আচরণই তার কাছে প্রত্যাশিত। ক্ষমতায় থাকতে কারা জঙ্গি সংগঠনগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল, কারা দলীয় নেতৃত্বকে কুপরামর্শ দিয়েছে, সেটি বিএনপির স্বার্থেই খুঁজে বের করা দরকার। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের মতো দেশের দুটি অতিগুরুত্বপূর্ণ সংস্থার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা উল্লিখিত আসামিগণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ও যোগাযোগ রেখে উলফাকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালানের মাধ্যমে আনয়নপূর্বক এই মামলার ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন। এতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহ-অবস্থানের ব্যত্যয় ঘটার আশঙ্কার প্রতি উল্লিখিত আসামিগণ কোনো গুরুত্বই দেননি। তাঁদের এরূপ আচরণে এটাই প্রতীয়মান হয় যে ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অব্যাহত সুসম্পর্ককে বিনষ্ট করার দুরভিসন্ধি নিয়েই উক্ত আসামিগণ উলফা নেতার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।’ আদালত আরও বলেছেন, ‘এই মামলার ঘটনা সম্পর্কে তাঁদের বিরুদ্ধে যে সাক্ষ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় যে তাঁরা উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়াসহ অন্যান্য আসামির সঙ্গে পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মামলার ঘটনা সংঘটনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
তা না হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে (বেগম খালেদা জিয়া) পিডব্লিউ-৩৭ মেজর জেনারেল (অব.) সাদিক হাসান রুমি ডিজিএফআইয়ের প্রধান হিসেবে এই মামলাসংক্রান্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটকের ঘটনা টেলিফোনে অবহিত করলে তিনি কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ঘটনাটি অবগত আছেন এবং একটি কমিটি করে দেবেন বলে পিডব্লিউ-৩৭-কে জানান। এত বড় একটি ঘটনার বিষয়ে অবহিত হয়ে কোনোরূপ কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে তৎকালীন সরকারপ্রধানের এরূপ নীরব ভূমিকা পালনও রহস্যজনক বলে প্রতীয়মান হয়। একইভাবে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ঘটনার প্রায় এক বছর পর ঘটনাস্থলের চাক্ষুষ সাক্ষী পিডব্লিউ-৯ সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও পিডব্লিউ-১০ সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিনকে অস্ত্র মামলায় জড়িয়ে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছেন বলে তাঁরা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন।’ এতে বলা হয় ‘দোষ স্বীকারোক্তি প্রদানকারী আসামি এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তিতে এসব তথ্যও বেরিয়ে এসেছে যে তাঁরা আরও কিছু দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে হাজার হাজার ডলার ও আকর্ষণীয় উপহারসামগ্রী গ্রহণ করেছেন এবং উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়াসহ অন্য দেশের আতিথেয়তা গ্রহণপূর্বক দেশ-বিদেশে একাধিক গোপন মিটিংয়ে উপস্থিত থেকেছেন।
তাঁদের এসব উক্তি থেকে বোঝা যায় যে তাঁরা নিজ দেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে গোটা জাতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তাই সামরিক-বেসামরিক এসব বিপথগামী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণকে অবশ্যই তাঁদের কৃত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করাই সমীচীন হবে।’ ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ের এই পর্যবেক্ষণ সর্বাংশে সঠিক না-ও হতে পারে। যে আইনে এই মামলা হয়েছে, তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, মানি। কিন্তু যাঁরা অপরাধ সংঘটিত করেছেন এবং যাঁরা জেনেও প্রতিকার করেননি, তাঁদের সবার অপরাধ সমান নয়; যদিও একই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতে কেউ নিজেকে লঘু অপরাধী প্রমাণ করতে পারলে তাঁর শাস্তি লঘু হবে। কেউ নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলে তিনি বেকসুর খালাসও পেয়ে যেতে পারেন। কিন্তু দল হিসেবে বিএনপি এবং সেই দলের নেতা হিসেবে খালেদা জিয়াকে অবশ্যই এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাঁর মনে রাখা দরকার, একজন সিরাজ সিকদারের মৃত্যু এখনো আওয়ামী লীগকে তাড়া করে ফিরছে। তাহলে এতগুলো সন্ত্রাসী ঘটনা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেন বিএনপিকে ছাড় দেবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

একটাই এজেন্ডা: দ্রুত নির্বাচন

আপাতদৃষ্টিতে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সরকার, জাতীয় সংসদ, অর্থনৈতিক কাজকর্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন—প্রায় সবই এখন স্বাভাবিক। কিন্তু সবাই জানেন, এই ‘স্বাভাবিকের’ পেছনে রয়েছে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘অস্বস্তিকর’ পটভূমি। তাই প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা ‘স্বাভাবিক’ বলি, বর্তমান পরিস্থিতি সেই অর্থে ‘স্বাভাবিক’ নয়। তবে গায়ের জোরে (বা দলের জোরে) এই অস্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করা যায়। যেমন এখন অনেকে করেছেনও। তাতে অস্বাভাবিকতাকে মাটিচাপা দেওয়া যায় না। বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদ সদস্যদের দিকে তাকালেই ভোটের পুরো চিত্রটি জনমানসে ভেসে ওঠে। গায়ের জোরে তা মুছে ফেলা সম্ভব হয় না। তবে দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এ রকম অস্বাভাবিক ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ যে আগে কখনো হয়নি, এমন নয়। তবে সেগুলো হয়েছিল সেনাশাসনের সময়। আমাদের দুর্ভাগ্য, এবার এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে গণতান্ত্রিক আমলে এবং আরও কষ্টের হলো, তা হয়েছে গণতন্ত্রের নামে, গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য। পুরোনো কাসুন্দি বেশি ঘেঁটে লাভ নেই। তবু দু-একটি কথা বলতেই হবে বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নির্বাচনপূর্ব অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীই বলেছিলেন: ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংবিধান রক্ষা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার নির্বাচন। প্রকৃত নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হবে।’
এই বক্তব্যকে ভিত্তি ধরে এখনকার রাজনৈতিক আলোচনা, কলাম লেখা, টক শো ইত্যাদি আবর্তিত হওয়া উচিত। অন্য যেকোনো আলোচনা এখন অর্থহীন ও সময় নষ্ট করা মাত্র। আমাদের ধারণা, ২০১৪ সালে এটাই প্রধান এজেন্ডা হতে হবে। কার্যকর সংসদ, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, সরকারের ছয়টি অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্প ইত্যাদি বিষয় এখন আলোচনায় প্রাধান্য পেতে পারে না। এগুলো বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি একটি সঠিক, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন। যে সংসদে জনগণ (ভোটার) ভোট দিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের সরকার গঠন করবেন। সেই নির্বাচনে কে জিতবে, তা কেউ বলতে পারে না। আওয়ামী লীগ যদি জেতে, তাহলে তারা তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এখন যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তারা নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু করলে তা সঠিক কাজ হবে না। তা জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার বরখেলাপ করা হবে। প্রকৃত অর্থে বর্তমান সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একটি অর্থপূর্ণ সংসদ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করাই বর্তমান সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হলো, সেই কাজ কীভাবে শুরু হতে পারে। এ ব্যাপারে সরকার তথা মন্ত্রিসভার সদস্যরা ভালো জানেন।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমরা কয়েকটি প্রস্তাব দিতে পারি। আমরা মনে করি, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক দেশের প্রধান সব দলের কয়েকজন প্রতিনিধিকে একটি সভায় আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সভার এজেন্ডা হবে: ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন।’ সেই সভা থেকেই আমরা জানতে পারব, বিএনপিসহ বিভিন্ন দল কীভাবে নির্বাচন চায়। বিষয়টা শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমস্যা নয়। জাতীয় সমস্যা। কাজেই প্রধান রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সক্রিয় নাগরিক ফোরাম, মিডিয়া ফোরাম ইত্যাদির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হওয়া উচিত। গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী বেশির ভাগ দল ও ফোরাম যেভাবে আগামী নির্বাচন আয়োজন করার পরামর্শ দেবে, সরকারের উচিত হবে সেটাই বাস্তবায়ন করা। গণতন্ত্র হলো আলাপ-আলোচনা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া। আমরা কিন্তু কেউ জানি না, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা বিভিন্ন ফোরাম ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচন আয়োজন সম্পর্কে কী মতামত বা মনোভাব পোষণ করে। শুধু এটুকু আমরা দেখেছি, ১৪-দলীয় জোট ও আওয়ামী ঘরানার সংগঠন ও ব্যক্তিরা ছাড়া দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন নাগরিক ফোরাম, বেশির ভাগ মিডিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বা নিয়মরক্ষার নির্বাচন বলে অভিহিত করেছে। আশা করি, সরকারের তথ্য ও গবেষণা বিভাগ এ ব্যাপারে অবহিত।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সরকার যদি ফেব্রুয়ারি মাসে এ ব্যাপারে কোনো সভা না ডাকে, তাহলে কী হবে? বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ফোরাম ও মিডিয়া সরকারকে এই সভা ডাকার জন্য নানাভাবে চাপ দিতে হবে। নানা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারকে চাপ দিতে হবে। এসব কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিদেশি বন্ধুদের বলতে হবে, তারাও যেন সরকারকে এ ব্যাপারে প্রভাবিত করে। তৃতীয় প্রশ্ন হলো, নানামুখী চাপের পরও যদি সরকার এ ব্যাপারে কোনো সভা না ডাকে, অনড় থাকে, তাহলে বিভিন্ন দল কী করতে পারে? বিভিন্ন দল ও ফোরামকে তখন আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করতে হবে, তাদের পরবর্তী কর্মসূচি কী হতে পারে। নানা গণতান্ত্রিক, স্বীকৃত ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ছাড়া সরকারকে নতি স্বীকার করানোর আর কোনো পথ নেই। এখানে একটা কথা আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই। সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে নতুন নির্বাচন ছাড়া বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়ে কথা হতে পারে না। এই সরকারের অন্য কোনো নীতি বা কাজের সমালোচনা করাও অপ্রয়োজনীয়। মনে রাখতে হবে, এই সরকার কোনো বড় কাজ করার জন্য নির্বাচিত হয়নি। তারা শুধু নিয়মরক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। যদি তারা বড় বা ছোট কোনো প্রকল্প হাতে নেয়, তা নিয়ে পরে নানা সমস্যা হতে পারে, যদি অন্য দল ক্ষমতায় আসে। বর্তমান সরকার শুধু সরকার পরিচালনার রুটিন কাজ করবে। এবং সত্যিকার অর্থে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবে।
এটাই একমাত্র কাজ। সেই নির্বাচনে ১৪-দলীয় জোট বিজয়ী হলে তারা তখন তাদের স্বপ্নের সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। কেউ তাদের বাধাও দেবে না, সমালোচনাও করবে না। চতুর্থ প্রশ্ন হলো, সব রকম গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেও যদি সরকার নির্বাচন না দেয়, তাহলে কী করতে হবে? কিছুই করার নেই। তখন সরকার ও ১৪-দলীয় জোটের শক্তির কাছে বাকি সব দল, ফোরাম, মিডিয়া, গণতন্ত্রকামী জনগণ পরাজয় মেনে নেবে। যেমন ১৮-দলীয় (এখন ১৯-দলীয়) জোট ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করতে না পেরে পরাজয় মেনে নিয়েছে। রাজনীতিতে কৌশল ও শক্তিরও জয়-পরাজয় আছে এবং তা মেনে নিতে হয়। তবে কোনো জয় বা পরাজয় চিরস্থায়ী নয়। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের এ জন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে। বর্তমান সরকার যদি গায়ের জোরে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে চায়, তাহলে বুঝতে হবে, তারা বাস্তবতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা গায়ের জোরে একটা ‘অস্বাভাবিক অবস্থা’ জিইয়ে রাখতে চায়। জনগণ এগুলো পছন্দ করে না। নেতার জোরে, দলের জোরে, সরকারের জোরে, নানা বাহিনীর জোরে কোনো ‘অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড’ জনগণ কখনো পছন্দ করে না। সব মানুষ রাস্তার প্রতিবাদে শামিল হয় না নানা কারণে।
তবে মনের মধ্যে পুষে রাখে যত ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। সময় হলে তার প্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশে অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি তারই সাক্ষ্য দেয়। অনেক মন্ত্রী পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য হুংকার দিচ্ছেন। এসব হুংকারকে গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। তৃণমূলের দলীয় কর্মীদের আশ্বস্ত করার জন্য এসব হুংকার দিতেই হয়। এসব মন্ত্রীও জানেন, কীভাবে তাঁরা এমপি হয়েছেন। তা ছাড়া পাঁচ বছর থাকার কথা না বললে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ‘অগ্রিম’ পাওয়া যাচ্ছে না। ছয় মাসের মন্ত্রীকে কে ‘অগ্রিম’ দেবে? সরকার বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। দেশে-বিদেশে অনেকে ভান্ড নিয়ে বসে আছে। বারবার ‘পাঁচ বছরের’ হুংকার না দিলে ক্লায়েন্টের আগ্রহ চলে যায়। যারা বেশি বেশি ‘পাঁচ বছর’ ধ্বনি তুলছে, বুঝতে হবে ‘অগ্রিম’ নিয়ে তাদের সমস্যা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টরা এখন অনেক সচেতন। তারা প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের নড়বড়ে মন্ত্রীকে সহজে ‘অগ্রিম’ দিতে রাজি হয় না। কখন কী হয়! সুতরাং নিজেদের ‘স্বার্থেও’ একটা প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা দরকার।
আমাদের ধারণা, তা ২০১৪ সালের মধ্যেই সম্পন্ন করা উচিত।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: উন্নয়ন ও মিডিয়াকর্মী।

ইন্টারনেট রেডিও: অপার সম্ভাবনা

নানান নামে পরিচিত। কেউ বলেন ইন্টারনেট রেডিও, কোথাও বলা হয় অনলাইন রেডিও। কোনো কোনো দেশে পরিচিত নেট রেডিও, ওয়েব রেডিও, ই-রেডিও, স্ট্রিমিং রেডিও নামে। এ এক নতুন ধরনের গণমাধ্যম। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এ রেডিওর সম্প্রচার করা হয় বলেই এর নাম ইন্টারনেট রেডিও। বাংলাদেশেও বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট রেডিও সম্প্রচার অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু দেশে যে এ ধরনের রেডিওর সংখ্যা কত, তার হিসাব পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বর্তমানে চালু থাকা এ ধরনের সম্প্রচারমাধ্যমের সংখ্যা ৫০-এর কম নয়। এদের প্রচারপদ্ধতি ভিন্ন। কিছু আছে শুধু গান প্রচার করে, আবার কয়েকটিতে গানের পাশাপাশি খবর প্রচার করা হয়। ইন্টারনেট রেডিওর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি আছে, যারা ২৪ ঘণ্টা সরাসরি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। এরই মধ্যে অনেকগুলো স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া হুটহাট সম্প্রচারে নামাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ।
দুই সরকারি বা বেসরকারি প্রচলিত ধারার রেডিওগুলোর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, কেবল নির্দিষ্ট এলাকার শ্রোতারা তা শুনতে পারেন। কিন্তু ইন্টারনেট রেডিও বিশ্বের যেকোনো জায়গায় অবস্থান করে কম্পিউটার বা মুঠোফোনে শোনা যায়। ইন্টারনেট সংযোগ থাকাটাই মূল কথা। যেমন বাংলাদেশে বসে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকার যেকোনো স্টেশনে যাওয়া যায়। বিশ্বব্যাপী এ রেডিওগুলোর জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ এটি। নগরকেন্দ্রিক তরুণ-যুবারাই মূলত প্রধান শ্রোতা। এ ছাড়া যেকোনো দেশে প্রবাসী শ্রোতাদের টানতে ইন্টারনেট রেডিওর জুড়ি নেই। বাংলাদেশে ইন্টারনেট রেডিওর মধ্যে রেডিও তুফান, রেডিও গুনগুন, রেডিও ভয়েস ২৪ ডটকম, রেডিও লেমন ২৪, রেডিও তোলপাড়, রেডিও স্বদেশ নামগুলো বেশি শোনা যায়। কয়েকটি রেডিও আছে খবর, টক শোসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। কয়েকটি অনুষ্ঠানের নাম এ রকম: সাত সুর, ইচ্ছে ঘুড়ি, মিউজিক মাসালা, নিশাচর, থ্রি জি, মিউজিক জ্যাম, লাভ ল্যান্ড, নন্টে-ফন্টে, লাইফ অ্যান্ড টাচ, ইয়াহু মাস্তি। নামগুলো শুনলেই এর শ্রোতাদের ধরন চিহ্নিত করা যায়। লক্ষণীয় হচ্ছে, এ রেডিওর অনুষ্ঠান চলাকালে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া যায় না। আবার শ্রোতা ইচ্ছে করলেই রিপ্লে করতে পারেন না।
তিন তুলনামূলক কম খরচে, কম জনবল নিয়ে একটি ইন্টারনেট রেডিওর যাত্রা শুরু করা যায়। তবে সেটা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটি দিনে কতটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে, তার ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মাধ্যমের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে, খরচের খাত আছে, আয়ের ব্যবস্থা নেই। বিজ্ঞাপনই আয়ের একমাত্র উপায়। কিন্তু কয়েকটি ইন্টারনেট রেডিওর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেল, বিজ্ঞাপনদাতারা এ মাধ্যমের বিষয়ে আগ্রহী নন। তাদের ভাষায়, এ মাধ্যম গণমানুষের কাছে পৌঁছায় না। কিন্তু এটাও সঠিক, ইন্টারনেট রেডিওতে বিজ্ঞাপন খরচ অনেক কম। এবং তা পণ্যের দামের ওপর বাড়তি কোনো প্রভাব ফেলে না। বিশ্বে অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠান কিন্তু ইন্টারনেট রেডিওতে বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের পণ্যের প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে নিচ্ছে। আমাদের দেশে এই সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হতে ঢের বাকি। আরেকটি বাধা হচ্ছে ইন্টারনেটের অত্যধিক দাম। এই দাম যেমন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রচার-ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি শ্রোতা পর্যায়েও আগ্রহকে অনুৎসাহিত করছে।
চার ইন্টারনেট রেডিওর অগ্রদূত বলা হয় কার্ল ম্যালামাডকে। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রথম চালু করেন ‘ইন্টারনেট টক রেডিও’। প্রতি সপ্তাহে তিনি একজন কম্পিউটার এক্সপার্টের সাক্ষাৎকার নিতেন তাঁর রেডিওতে। এর পর ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রচলিত রেডিও স্টেশন ইন্টারনেটে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে মার্কিন ইন্টারনেট রেডিওগুলো জনপ্রিয় হয় প্রখ্যাত সংগীতশিল্পীদের কনসার্ট লাইভ সম্প্রচার করে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন রেডিওগুলোর আয় ছিল ৪৯ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী তিন বছরে তা পৌঁছায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারে। ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘ব্রিজ রেটিংস অ্যান্ড রিসার্চ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তিন হাজার মার্কিনের ওপর একটা জরিপ করে। এতে বেরিয়ে আসে, মার্কিন ভোক্তাদের মধ্যে ১২ বা এর বেশি বয়সীদের মধ্যে ১৯ শতাংশ ওয়েবভিত্তিক রেডিও শোনে। অর্থাৎ ইন্টারনেট রেডিও অনুষ্ঠানের সাপ্তাহিক শ্রোতার সংখ্যা ৫৭ মিলিয়ন। স্যাটেলাইট রেডিও, হাই ডেফিনেশন রেডিও, সেলফোনভিত্তিক রেডিও থেকে অনলাইন রেডিও মানুষ বেশি শোনে।
পাঁচ বাংলাদেশে এফএম ও কমিউনিটি রেডিওর জন্য পৃথক নীতিমালা আছে। কিন্তু ইন্টারনেট রেডিও কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে নীতিমালা নেই। ফলে ইন্টারনেট রেডিওগুলো নিজস্ব চার্টার অব ডিউটিস ও সম্পাদকীয় নীতিমালা তৈরি করতে পারছে না। এই সুযোগে যে যার ইচ্ছামতো এ ধরনের রেডিওর সম্প্রচার শুরু করছে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ কেউ এ ধরনের রেডিওর মালিক হয়েছেন। শেয়ারবাজারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও ইন্টারনেট রেডিও আছে। তারা কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে, তাতে মানুষ সত্যিকার অর্থে উপকৃত হচ্ছে কি না, তা তদারকির কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। কারণ, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। কেবল শহরে নয়, মফস্বলে, গ্রামেও মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আর এটি নতুন গণমাধ্যম,
শ্রোতারা তরুণ, তাই এই মাধ্যমকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। ভালো কাজে, দেশের কল্যাণে এই রেডিওর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আরেকটি কথা, প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় এক কোটির কাছাকাছি। যাঁরা কয়েক দশক ধরে আছেন, তাঁরা বলতে গেলে বাঙালি সংস্কৃতি ভুলতে বসেছেন। তাঁদের কাছে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-সংস্কৃতি নতুনভাবে পৌঁছার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারে এই রেডিও। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকারের যদি কোনো বিশেষ বার্তা থাকে, তাও পৌঁছানো যেতে পারে ইন্টারনেট রেডিওর মাধ্যমে। আশার কথা হলো, অতি সম্প্রতি চূড়ান্ত হওয়া জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় ইন্টারনেট রেডিওকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আশা করি, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ইন্টারনেট রেডিওসহ অন্যান্য সম্প্রচারমাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করবে।
কাজী আলিম-উজ-জামান: সাংবাদিক।
alim_zaman@yahoo.com