Monday, December 8, 2014

জিম্মি উদ্ধারে শক্তি প্রয়োগ বন্ধ হবে না: আমেরিকা

জিম্মি উদ্ধারে ব্যর্থ এক অভিযানে মার্কিন একজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে বিতর্কের মাঝে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, অ্যামেরিকার কৌশল বদলাবে না। মার্কিন কোনো নাগরিক জিম্মি হলে, প্রয়োজনে তাকে উদ্ধারে ভবিষ্যতেও শক্তি প্রয়োগ করা হবে। ইয়েমেনে আল কায়দার সাথে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের হাতে আটক আমেরিকান ওই সাংবাদিককে উদ্ধারের সময় তিনি ছাড়াও আরেক দক্ষিণ আফ্রিকান জিম্মিও মারা যান। তবে মার্কিন মন্ত্রী স্বীকার করেন, অভিযানে ত্রুটি ছিল। কিন্তু কৌশল বদলের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস সাংবাদিক লুক সমার্সকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা এর আগেও চালিয়েছিল এবং এর আগেও তারা ব্যর্থ হয়েছিল। গত জুলাই মাসে সিরিয়ায় আটক আরেক সাংবাদিক জেমস ফোলির উদ্ধার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এখন সর্বশেষ এই ব্যর্থ অভিযানের জন্যও অপহৃত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে মার্কিন বাহিনীর কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। লুক সমার্সের বিমাতা পেনি বিয়ারম্যান বলছেন, তিনি নিজে না হলেও তার পরিবারের কোন কোন সদস্য এই ব্যর্থতার জন্য মার্কিন সরকারকেই দোষারোপ করছেন। তিনি বলেন, “মি. সমার্সকে জীবিত উদ্ধার করার লক্ষ্যে যে আলোচনা চলছিল, তাতে আরো বেশি সময় দেয়ার দরকার ছিল।” মার্কিন সরকার বলছে, তারা এই অভিযান চালাতে বাধ্য হয়েছে কারণ তাদের কাছে খবর ছিল যে মি. সমার্সের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। ওদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষক পিয়ের কর্কির মুক্তির লক্ষ্যেও আল কায়েদা জঙ্গিদের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। গিফ্ট অফ দা গিভার্স নামে একটি দাতব্য সংস্থা বলছে, মি. কর্কিকে দু-একদিনের মধ্যে ছেড়ে দেয়া হতো। এখন এই অভিযানের ফলে সেই সম্ভাবনা একেবারে চুরমার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এসব ব্যর্থতার পরও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল বলছেন, জিম্মি উদ্ধারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতিমালা রয়েছে তাতে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। মি. হেগেল বলেছেন, যে প্রক্রিয়ায় জিম্মি উদ্ধার অভিযান চালানো হয় তা ব্যাপক। কিন্তু তা কি নিখুঁত বা নিরাপদ? না, তা নয় বলেই তিনি স্বীকার করেন। কিন্তু একজন আমেরিকানকে আটকে রাখা হয়েছে এবং একজন আমেরিকানের জীবন বিপন্ন, এই বিবেচনা থেকেই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের কাজের শুরুও সেখান থেকেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। সূত্র: বিবিসি

স্নোডেনকে পেতে 'লাস্যময়ী' টোপ মস্কোর!

নায়ককে বশ করতে লাস্যময়ী খলনায়িকার ওপর দায়িত্ব বর্তাল। কিন্তু ধুরন্ধর নায়ক সেই ফাঁদে পা দিলেন না। ক্রাইম থ্রিলারের প্লট নয়, বাস্তবে হুবহু এমনই ঘটেছে মস্কোয়, দাবি প্রাক্তন রুশ গোয়েন্দার। এক্ষেত্রে 'নায়ক' নির্বাসিত মার্কিন প্রযুক্তিবিদ এডওয়ার্ড স্নোডেন। 'খলনায়িকা'র চরিত্রে রাশিয়ার গ্ল্যামারাস মডেল আনা চ্যাপম্যান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির হয়ে চরবৃত্তির অভিযোগে ফরাসি আদালতের নির্দেশে দোষী সাব্যস্ত হন ডাচ অভিনেত্রী তথা নৃত্যশিল্পী ডাকসাইটে সুন্দরী মার্গারিতা জার্ত্রাইদা মার্গ্রিট জেললে ম্যাকলিয়দ ওরফে মাতা হারি। আদালতের নির্দেশে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সম্প্রতি রূপের বেসাতি সাজিয়ে চরবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে আরেক সুন্দরীর বিরুদ্ধে। তবে তার নাগাল পাওয়া আইনের অসাধ্য। মার্কিন সরকারের গোপন নথি ফাঁস করে হোয়াইটহাউসের রোষে পড়েন কম্পিউটার বিশারদ এডওয়ার্ড স্নোডেন। গ্রেফতারি এড়াতে রাশিয়ায় সাময়িক আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। আপাতত মস্কো শহরে অস্থায়ী আস্তানা গেড়েছেন তিনি। তাকে আশ্রয় দেওয়ার আগে বেশ কয়েক বার জেরা করেন রুশ গোয়েন্দা দপ্তরের কর্তারা। কিন্তু গোপনীয় মার্কিন তথ্যের হদিশ পেতে দরকার আরও প্রশ্ন পর্বের। অথচ সে দেশে বেশি দিন থাকার পরিকল্পনা নেই স্নোডেনের। তাই কৌশলে তাকে মস্কোয় আটকে রাখার ফন্দি আঁটে রাশিয়া, জানিয়েছেন প্রাক্তন কেজিবি সদস্য বরিস কারপিচকভ। রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার চাকরি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে বৃটেনে আশ্রয় নেন কারপিচকভ। তবে এখনও নিয়মিত দেশের খোঁজখবর রাখেন। তার দাবি, স্নোডেনকে রাশিয়ায় ধরে রাখতে ছলনাময়ী আনা চ্যাপম্যানের সাহায্য নেওয়া হয়। জানা গিয়েছে, পরিকল্পনা মতো মার্কিন প্রযুক্তিবিদের সঙ্গে একবার দেখা করতে যান আনা, তবে তারপর তাদের আর দেখা হয়নি। রুশ গোয়েন্দাদের পরিকল্পনা ছিল, প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে স্নোডেনকে বিয়ে করবেন চ্যাপম্যান, আর সেই সূত্রে আইনত রাশিয়ার নাগরিকত্ব আরোপ হবে মার্কিনির উপর। যার ফলে, রাশিয়া ছাড়তে হলে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হবে স্নোডেনের। আর তখনই তাকে আটকে রেখে দফায় দফায় জেরার সুযোগ পাবেন গোয়েন্দারা। কিন্তু একাজে আনা চ্যাপম্যানকেই বেছে নেওয়া হলো কেন? নথি বলছে, প্রাক্তন কেজিবি কর্তার মেয়ে আনা ২০০২ সালে বৃটিশ নাগরিক অ্যালেক্স চ্যাপম্যানকে বিয়ে করে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু ২০০৪ সালে সে বিয়ে ভেঙে যায়। সেই সময় রাশিয়ার হয়ে চরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার হন আনা। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাশিয়ায় আনা চ্যাপম্যানের প্রবল জনপ্রিয়তা রয়েছে। মডেলিংয়ের পাশাপাশি নামী ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মালিকানা তার নামে। তার সৌন্দর্য এবং যৌন আবেদন নিয়ে হামেশা সরব হয় রুশ মিডিয়া। এহেন আনার উপর তাই স্নোডেনেক মজানোর বার দেওয়া হয়। কিন্তু রাশিয়ার পাতা ফাঁদ আগেভাগেই আঁচ করতে পারেন স্নোডেন। তাই মাত্র একবারের পর যুগলকে জনসমক্ষে আর দেখা যায়নি। বস্তুত গত জুলাই মাসে টুইটারে সরাসরি স্নোডেনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন চ্যাপম্যান। বলা বাহুল্য তাতে সাড়া দেননি ধুরন্ধর মার্কিনি। পরে এক সাক্ষাত্কাহরে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যান রহস্যময়ী চ্যাপম্যান।- ওয়েবসাইট।

গীতাকে ভারতের জাতীয় গ্রন্থ করার দাবি নিয়ে বিতর্ক

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ভগবত গীতাকে ভারতের জাতীয় গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলে বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রভাবশালী বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজ। সংসদে আজ একাধিক বিরোধী দল মিস স্বরাজের এই প্রস্তাবের নিন্দা করে বলেছেন এ ধরনের উদ্যোগ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিকেই বিপন্ন করে তুলবে। ভারতের মুসলিম পার্সোনেল ল বোর্ডও এই প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলে বর্ণনা করেছে - যদিও সংসদে বিজেপি ও তার শরিকরা বলেছে, এই প্রস্তাবে অসুবিধার কিছু নেই! সুষমা স্বরাজের প্রস্তাব ভগবত গীতাকে নিয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত রোববার দিল্লির এক অনুষ্ঠানে, যেখানে এই গ্রন্থের ৫১৫১ বর্ষপূর্তি উদযাপন করা হচ্ছিল। গীতা প্রেরণা মহোৎসব নামে সেই অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, ভাগবত গীতা কার্যত ভারতের জাতীয় গ্রন্থের মর্যাদা পেয়েই গেছে – আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটা শুধু বাকি! মিস স্বরাজ তার ভাষণে বলেন, তিনি সংসদে অনেক আগেই গীতাকে রাষ্ট্রীয় গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। নতুন সরকার এখনও সেই ঘোষণা করেনি ঠিকই, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমেরিকা সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামা-র হাতে গীতা উপহার দিয়ে এই পবিত্র গ্রন্থকে বস্তুত সেই মর্যাদাই দিয়ে দিয়েছেন। গীতা যে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার, এ কথা মোদি নিজেও একাধিকবার বলেছেন – জাপানের সম্রাট থেকে শুরু করে অনেক রাষ্ট্রনেতার হাতেই তিনি গীতা তুলে দিয়েছেন। কিন্তু গীতাকে জাতীয় গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাবে তুমুল আপত্তি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নানা ধর্মীয় সংগঠন। বিরোধীদের যুক্তি, কোরান নয় কেন? দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ নির্মলাংশু মুখার্জি তো সরাসরি বলছেন, এটা একটা অত্যন্ত বিপজ্জনক পদক্ষেপ। অধ্যাপক মুখার্জির যুক্তি, লক্ষ লক্ষ ভারতীয় গীতার পাশাপাশি গীতাঞ্জলি বা কোরানও পড়ে – সেগুলোও তো জাতীয় গ্রন্থের দাবিদার হতে পারে। তা ছাড়া কোনো একটি বইকে জাতীয় গ্রন্থ বলার অর্থ দেশে একটি জাতির অস্তিত্ত্বই স্বীকার করা, কিন্তু তাতে ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে খাটো করা হয়। সংসদে আজ প্রায় একই যুক্তি দিয়ে বিরোধী দলগুলোও মিস স্বরাজের প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বহুজন সমাজ পার্টি নেত্রী মায়াবতী বলেন, গীতাকে জাতীয় গ্রন্থ ঘোষণা করা হলে অন্য ধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলো কী দোষ করল? সিপিআই নেতা ডি রাজা বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ ভারতীয় গণতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকেই নষ্ট করে দেবে। কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসও নিন্দা জানায় প্রায় একই সুরে। অপ্রয়োজনীয় প্রস্তাব, দাবি মুসলিম নেতাদের মুসলিম পার্সোনেল ল বোর্ডের সদস্য কামাল ফারুকি বলেছেন, আসলে এই প্রস্তাবটাই সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত ও অপ্রয়োজনীয়। তার কথায়, ‘মানলাম গীতা কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় – এটা একটা জীবনযাপনের পদ্ধতি বাতলানোর রাস্তা। অনেকেই সেটা খুব আগ্রহভরে পড়ে থাকেন। কিন্তু সেটাকে যখন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা হয়, তখনই প্রশ্ন জাগে এতে কি দেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকে নষ্ট করার চেষ্টা হচ্ছে? দুর্ভাগ্যজনক হলেও তখনই মনে হয়, আমাদের দেশ কি আদৌ ধর্মনিরপেক্ষ?’ গীতাকে জাতীয় গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণার আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে বিজেপি-র ভেতরেও অবশ্য মতভেদের আভাস মিলেছে। দলের আইন-বিশেষজ্ঞ নেতা সুব্রহ্মণ্যম যেমন স্বামী বলেছেন, ঘোষণা হল কি না-হল তাতে কিছু যায় আসে না, গীতাই ভারতের ডি-ফ্যাক্টো জাতীয় গ্রন্থ। সংসদে বিজেপি বা তাদের শরিক শিবসেনার নেতারাও বলেছেন – গীতাকে জাতীয় গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। যা থেকে ইঙ্গিত মিলছে, পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এই ধর্মগ্রন্থ ভারতে নতুন এক রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসছে!

‘নূর হোসেন হত্যার জন্য আমাকে মিথ্যা দোষারোপ করা হচ্ছে’ এখন প্রতিদিনই শোক দিবস: এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, দেশে এখন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে। গতকাল তিনটি মেয়ে মারা গেল। আজও মাগুরায় মারা গেল। প্রতিদিন এখন শোক দিবস। সোমবার দুপুরে বনানী কার্যালয়ে জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তর আয়োজিত দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত জাহাঙ্গীর  মোহাম্মদ আদেলের শোকসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এরশাদ বলেন, এখন মৃত্যু আমাদের নাড়া দেয় না। মানুষের  প্রতি মানুষের প্রেম, ভালোবাসা নেই। দয়া নেই। এখন শিক্ষকরাও মারা যাচ্ছে। অবস্থার  প্রতিদিন অবনতি হচ্ছে। শহীদ নূর হোসেন ও ডা. মিলন হত্যার জন্য আবারও নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের মৃত্যু প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, নূর হোসেন ও ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের জন্য আমার ওপর মিথ্যা দোষারোপ করা হচ্ছে। এখন নূর হোসেনকে নিয়ে কত কথা হয়। অথচ নূর হোসেনের জায়গায় একটা স্মৃতিসৌধও কেউ তৈরি করেনি। রাস্তায় সবাই ফুল দেয়। এই জিরো পয়েন্ট তো আমার তৈরি। আমার তৈরী জায়গায় সবাই ফুল দেয়। এরশাদ বলেন, এখন তো প্রতিদিনই এই ঘটনা ঘটছে। এখন প্রতিদিনই শোক দিবস। প্রতিদিনই নূর হোসেন দিবস। জাপা চেয়ারম্যান বলেন, আমি কী কাপড় পরি, এটা নিয়ে সমালোচনা হয়। আমি কবিতা লিখি, এটা নিয়ে সমালোচনা হয়। আমি কি কবিতা লিখতে পারব না? আগে প্রতিদিন রাতে ডায়েরি লিখতাম। বউকে চিঠি লিখতাম। কত ব্যথা মনে। এখন মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা নেই। আমি মানুষকে ভালবেসে রাজনীতি করি। জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম ফয়শল চিশতীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন- জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, এম এ হান্নান এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়, যুগ্ম-মহাসচিব এডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, যুগ্ম-মহাসচিব বাহাউদ্দিন বাবুল, নুরুল ইসলাম নুরু প্রমুখ ।

‘ভুল হয়ে গেছে, আমি কী করব’

(ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির একটি আদালতে আজ সোমবার ধর্ষণের অভিযোগে আটক ট্যাক্সিক্যাব চালক শিব কুমার যাদভকে হাজির করে পুলিশ। ছবি: রয়টার্স) ভারতে নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক এক ট্যাক্সিক্যাবচালক নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলেছেন, ‘মুঝসে গালতি হো গেয়ি, ম্যায় কেয়া কারু’ (আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি কী করব)? আজ সোমবার পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল রোববার নয়াদিল্লি থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে উত্তর প্রদেশের মথুরা শহর থেকে ট্যাক্সিক্যাবচালক শিব কুমার যাদবকে যৌথভাবে গ্রেপ্তার করে দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের পুলিশ। আজ আদালতে হাজির করা হলে শুনানির পর তাঁকে পুলিশ হেফাজতে পাঠান নয়াদিল্লির মহানগর হাকিম অম্বিকা সিং। ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুলিশ জানায়, এর আগেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছেন শিব কুমার। ২০১১ সালে দিল্লির মেহরওলি এলাকায় ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের হওয়া এক মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তিহার কারাগারে সাত মাস জেল খেটেছেন তিনি।
গত শুক্রবার রাতে দক্ষিণ দিল্লির বসন্ত বিহারে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দিল্লির ইন্দ্রলোকে নিজের বাড়িতে যাচ্ছিলেন এক চাকরিজীবী নারী। পথে রাত ১১টা থেকে পৌনে একটার মধ্যে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।
পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে ওই নারী বলেন, তিনি তাঁর স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে ট্যাক্সিক্যাবটি বুক করেছিলেন। যাওয়ার পথে তিনি খানিকটা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি এই নির্মমতার শিকার হন। ওই নারীকে রাস্তায় ফেলে চালক ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে চলে যান। পরে তিনি ১০০ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ভ্যান গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
চালকের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ না করেই ওই চালককে নিয়োগ দেওয়ায় উবার ডটকম নামে ট্যাক্সিসেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে পরিবহন অধিদপ্তর।

মাদকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুবলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ: ১ কর্মীর মৃত্যু

ফেনী শহরের সহদেবপুর এলাকায় মাদকের নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবুল কাশেম ডালিম (২৭) নামে এক যুবলীগ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। সোমবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত যুবলীগ কর্মী ডালিম ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদ নগর গ্রামের আবুল বাশার কালাম ওরফে খোকার ছেলে। স্থানীয়রা জানান, এলাকার মাদক নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরে ফেনী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলার কোহিনুর আলম পক্ষের সঙ্গে বিরিঞ্চি এলাকার যুবলীগ নেতা স্বপন পক্ষের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় গত কয়েক দিন থেকে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং উভয় পক্ষে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। গত রোববার সন্ধ্যায়ও দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক বার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে সোমবার দুপুরে উভয় পক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে পেছন থেকে গুলিবিদ্ধ হন কোহিনুর আলম সমর্থক যুবলীগ কর্মী ডালিম। তাকে দুপুরে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরন করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে মারা যান তিনি। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কোহিনুর আলম জানান, গত কিছুদিন থেকে কিছু সন্ত্রাসী যুবক এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি শুরু করে। তিনিসহ এলাকার লোকজন মাদক বিক্রিতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে ওই মাদক বিক্রেতারা ক্ষিপ্ত হয়। গুলিবিদ্ধ ডালিম পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। ফেনী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব মোরশেদ জানান, শহরের সহদেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ যুবক ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বলে শুনেছি। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছুই জানি না।

শীতকালের মধ্যে ডিসিসি নির্বাচনের কথা ভাবতে বললেন প্রধানমন্ত্রী

(আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা) প্রশাসকদের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন না করে কীভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন করা যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি শীতকালের মধ্যে নির্বাচন করা যায় কি না, তা ভাবতে বলেন। আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের মেয়াদ ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে এক বছর করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন অধ্যাদেশ ২০১৪ শিরোনামে খসড়াটি মন্ত্রিসভা ফেরত দিয়েছে।
খসড়াটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে বৈঠকে উত্থাপনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রশাসকদের মেয়াদ বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় ঢাকা মহানগরের উন্নয়ন কার্যক্রম ঠিকমতো চলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সিটি করপোরেশনের স্বাভাবিক সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী। সামান্য কাজের জন্য মানুষকে ছুটতে হয় করপোরেশন অফিসে, যা আগে তাঁরা স্থানীয় কাউন্সিলরদের মাধ্যমে নিজ এলাকা থেকেই পেতেন।
সর্বশেষ ২০০২ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচন বর্জন করে তখনকার প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। জয় পান বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকা। ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ডিসিসিকে উত্তর ও দক্ষিণ—এ দুই ভাগে ভাগ করা হয়। নির্বাচন কমিশন ২০১২ সালের ২৪ মে দুই ডিসিসির নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করে তফসিল ঘোষণা করে। কিন্তু উচ্চ আদালতে রিট আবেদনের পর ওই নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ১৩ মে উচ্চ আদালত নির্বাচনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। কিন্তু সরকার কৌশলে সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা জিইয়ে রাখে। তবে ওই বছর আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থীরা মনোনয়ন প্রাপ্তির আশায় ব্যাপক গণসংযোগও শুরু করেছিলেন।

সংসদ কতোটা কার্যকর, জানতে চেয়েছে ইইউ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি দল। আজ বিকালে দুই দলের নেতাদের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের পৃথক বৈঠক হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠকের পর দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ জানিয়েছেন, বৈঠকে বর্তমান সংসদের কার্যকারিতা ও বিরোধী দলের অবস্থানের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বক্তব্যে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলেও দাবি করেন হানিফ। সোমবার বিকাল সাড়ে চারটার পর ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই বৈঠক শুরু হয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত চলে। বৈঠক শেষে হানিফ উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের সংসদের কার্যকারিত সম্পর্কে জানতে চেয়েছে ইইউ। আওয়ামী লীগ সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে।  বৈঠকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, কোন আলোচনা হয়নি। প্রতিনিধি দলের আগ্রহ ছিল পোশাক খাত ও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে। বৈঠকে হানিফ ছাড়াও দলের অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, দলের দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ। ইইউ‘র চার সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ইইউ সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য  জেন ল্যাম্বার্ট।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলটির সঙ্গে বিএনপি নেতারাও বৈঠক করেন। বেলা আড়াইটা থেকে ঘণ্টাব্যাপী বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএনপি নেতাদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

একদলীয় নয়, এক ব্যক্তির শাসন চলছে: খালেদা

আন্দোলন বন্ধ করতে সরকার যুবকদের টার্গেট করে তুলে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, “শুধু একদলীয় নয়, দেশে এক ব্যক্তির শাসন চলছে। এই সরকারের কাছে জনগণের কল্যাণ নয়, ক্ষমতা ধরে রাখাই তাদের লক্ষ্য।” বোরবার রাতে তার গুলশান কার্যাষলয়ে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ‘ব্লু ব্যন্ড কল’  এর সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ব্লু ব্যন্ড কলের সদস্যদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, “সরকারের টার্গেট ইয়ংরা। কারণ তোমরা কথা বলতে পার, আন্দোলন করতে পার। এজন্যই ইয়ংদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে আর সন্ধান পাওয়া যায় না। নির্বাচনের আগের আন্দোলনে সারাদেশে ৩১০ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ৬৫ জনকে গুম করা হয়েছে। আর রাজধানীতে ২৮ জন গুম হয়। এদের মধ্যে অনেকেই কম বয়সী ছিল।” বর্তমান সরকারের সময় কেউ নিরাপদ নয় এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “ঘরে- বাইরে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথায় কেউ নিরাপদ নয়।” সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হাতে যে ‘আধুনিক অস্ত্র’ তা সরকার দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন খালেদা। আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, “ওরা তো ভীতু। সাহস থাকলে ফেস করতো। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মানুষ একটা কিছু করে ফেলত। এসপার-ওসপার করে ফেলত। ফয়সালা করে ফেলত। কিন্তু ভয় পেয়ে আমাকে তিনদিন বাড়িতে আটকে রেখেছিল সরকার। শুধু র্যায়ব, পুলিশ না বালুর ট্রাক দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। যাতে আমি বাড়ি থেকে বের হতে না পারি। ” আওয়ামী লীগের লোক ছাড়া কাউকে চাকরি দেয়া হয় না এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “সারাদেশ দুর্নীতিতে ভরে গেছে। বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ। প্রতিনিয়ত রেমিটেন্স কমছে।” সরকারের কারণে বাংলাদেশ বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে এমন দাবি করে খালেদা বলেন, “বিদেশে জনশক্তি রফতানি কমে গেছে। অনেক দেশ লোক নেয়া বন্ধ রেখেছে। শুধু একদেশ নিয়ে থাকলেই হবে না। আমাদের সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে।” অনলাইন অ্যক্টিভিস্টদের দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকারকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন  দিতে বাধ্য করতে হবে। আমি তোমাদের সঙ্গে থাকবো। এতো দুর্বল হয়ে গেছি এমনটা ভাবি না, যে লড়াইয়ের মাঠে থাকতে পারব না।”

ব্লক করে লাভ নেই!

ফেসবুক, টুইটারের এই যুগে বিরক্তিকর কিছু দেখলেই তা ব্লক করে দেন ব্যবহারকারীরা। ইন্টারনেটে ওয়েবাসাইটে গেলেও বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এই বিজ্ঞাপন দেখবেন না বলে ভাবছেন? আপনার কাছে ব্লক বা বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগও আছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতারা তো কোটি কোটি টাকা এর পেছনে খরচ করছে তাদের প্রচারণার জন্য। যাঁরা বিজ্ঞাপন প্রকাশ করছেন, তাঁরা বিনা মূল্যে আপনাকে ওয়েব কনটেন্ট, ভিডিও দেখাচ্ছেন। তাঁদের টিকে থাকার জন্যও তো দরকার অর্থ। অ্যাড ব্লক নিয়ে তো আপনি ব্রাউজার থেকে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিচ্ছেন কিন্তু একবার ভাবুন তো ওই প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে টিকবে? এ বিষয়টি নিয়েই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এএফপি। বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন না দেখেই ওয়েব ব্রাউজিং কিংবা অনলাইনে ভিডিও দেখার জন্য আছে অ্যাড ব্লক করার নানা সফটওয়্যার। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন অ্যাড ব্লক প্লাসের মতো ছোট ছোট কিছু প্রোগ্রামের জন্য বিজ্ঞাপন না দেখেই ভিডিও দেখা বা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করা সম্ভব হচ্ছে। অ্যাড ব্লক প্লাসের মতো বিনা মূল্যের সফটওয়্যারগুলো আপনার ব্রাউজারের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের পথ রোধ করে দিতে পারে। ফ্ল্যাশিং ব্যানার অ্যাড, প্রি-রোল অ্যাড, পপ-আপ নোটিশের মতো বিজ্ঞাপনগুলো এখন অ্যাড ব্লকিং সফটওয়্যারের কারণেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।
শুরুর দিকে অবশ্য এই অ্যাড ব্লকিং সফটওয়্যারগুলো এতটা জনপ্রিয় ছিল না। প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণেরা বা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাই কেবল নিজেদের সুবিধার জন্য এই সফটওয়্যার ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন এই সফটওয়্যারগুলো তুমুল জনপ্রিয়।
শুধু ফ্রান্সেই অ্যাড ব্লক প্লাস ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ লাখ। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে ২০ লাখ ও স্পেনে ১৫ লাখ অ্যাড ব্লক সফটওয়্যার ব্যবহারকারী আছেন। বিশ্বব্যাপী ১৪ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন, যা গত বছরের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি। বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখার তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান পেজফেয়ার ও অ্যাডোবি সফটওয়্যার নির্মাতাদের সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাড ব্লক সফটওয়্যার ব্যবহার করে এ বছর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন বন্ধ করার হার বেড়েছে। ওয়েবসাইটের ওপর ভিত্তি করে ১০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিজ্ঞাপন ব্লক করে দেওয়ার হার দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা হয়তো বিজ্ঞাপনমুক্তভাবে ওয়েবসাইট ব্রাউজিং করার কথা ভাবেন। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতা ও ওয়েব প্রকাশকেরা তাঁদের আয়ের জন্য ওই বিজ্ঞাপনের ওপরেই নির্ভর করেন। তাঁদের কাছে তাই এই অ্যাড ব্লক করার সফটওয়্যারগুলো এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
ওয়েব প্রকাশকদের সংগঠন গেস্টির প্রধান নির্বাহী লরা দ্য ল্যাটাইলি এএফপিকে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এটা ছোটখাটো কোনো বিষয় নয়, সব প্রকাশকের ওপরেই এর প্রভাব পড়ছে। আমাদের সদস্যদের বিজ্ঞাপনের আয় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যখন ইন্টারনেট বিজ্ঞাপনের ওপর বেশি বেশি অর্থ ঢালছে, তখনই অ্যাড ব্লকার সফটওয়্যারগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ার লক্ষণ দেখা গেছে। এ বছরে ৫৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিজ্ঞাপনের বাজারের এক-চতুর্থাংশ ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে খরচ হচ্ছে।
এএফপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইন্টারনেট বিজ্ঞাপনের এই বিশাল বিনিয়োগ রক্ষার জন্য গুগল, মাইক্রোসফট, লা ফিগারো পত্রিকাসহ ফ্রান্সের একদল প্রকাশক মিলে অ্যাড ব্লকার সফটওয়্যার নির্মাতাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। অ্যাড ব্লকিং সফটওয়্যার নির্মাতাদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকিও দিয়েছে এ দলটি। শুধু ফ্রান্সেই নয়, জার্মানিতেও একটি দল এই অ্যাড ব্লকার সফটওয়্যার নির্মাতাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে অ্যাড ব্লক সফটওয়্যারগুলো ঠেকাতে বিভিন্ন ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষকেও বিভিন্ন পন্থা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। ফ্রান্সের খেলাধুলার ওয়েবসাইট লা ইকুইপস ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ পন্থা বেছে নিয়েছে। যাঁরা অ্যাড ব্লকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন, তাঁরা ভিডিও দেখতে পারবেন না। লা ইকুইপের দাবি, যেহেতু বিনা মূল্যে ভিডিও দেখায় তারা, তাই বিজ্ঞাপনের আয় দিয়েই চলতে হয় তাদের। কাজেই কেবল অ্যাড ব্লকার সরালেই ভিডিও দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে।
লা ইকুইপের ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাভিয়ের স্পেন্ডার বলেন, ‘আমাদের টিকে থাকার জন্যই এটা করতে হচ্ছে। হয় ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করে ভিডিও দেখতে হবে, তা না হলে বিজ্ঞাপন দেখতে হবে।’
পেজফেয়ারের প্রধান নির্বাহী শন ব্ল্যাঞ্চফিল্ড অ্যাড ব্লকারদের বিরুদ্ধে তাঁদের এই প্রচারণাকে এক যুগ আগের ফাইল শেয়ারিং প্রোগ্রাম ন্যাপস্টারের বিরুদ্ধে সংগীতশিল্পের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করেন।
তিনি বলেন, ‘তাঁদের ন্যাপস্টারের গল্প থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। তাঁদের বোঝা উচিত যে ব্যবহারকারী যা চান তাঁরা শেষ পর্যন্ত সেটাই তো পাচ্ছেন।’
অ্যাড ব্লকারদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে ফ্রান্সের ওয়েব ডেভেলপারদের সংগঠন এসআরআই। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হেলেন চার্টার বলেন, ইন্টারনেট যে একেবারেই বিনা মূল্যের, ব্যবহারকারীদের এই ভুল ধারণা দূর করতে হবে। রেডিও ও টেলিভিশনে এত বিজ্ঞাপন দেখে-শুনে যখন কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তখন ইন্টারনেটে সবকিছু বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে—এটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজ্ঞাপন না দেখার হার বেড়ে যাওয়া এবং মোবাইলে বিজ্ঞাপনের জন্য জায়গা ছোট হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়ছেন বিজ্ঞাপনদাতারা। তাঁদের বার্তাটিকে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারছেন না। এই সমস্যা এতটাই প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে যে, গুগলকে পর্যন্ত এখন ভিন্নপথে হাঁটতে হচ্ছে। ওয়েব বিজ্ঞাপনের পরিবর্তে গুগলকে অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। গুগল কন্ট্রিবিউটর সেবার মাধ্যমে মাসিক এক থেকে তিন ডলার অর্থ পরিশোধ করলে গুগল আর ওই ব্যবহারকারীকে কোনো ওয়েবসাইটে গেলে বিজ্ঞাপন দেখাবে না। গুগল বলছে, এভাবে অর্থ পরিশোধ করলে ওই সাইটটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অনিয়নের মতো কয়েকটি সাইটে এই পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এবার চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হলেন শিক্ষার্থীরা

(বটতলী স্টেশন থেকে পুনরায় শাটল ট্রেন চালুর দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের চলমান কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় এক শিক্ষার্থীর টি-শার্ট ছিঁড়ে ফেলেন পুলিশের এক সদস্য। ছবি: প্রথম আলো) বটতলী স্টেশন থেকে পুনরায় শাটল ট্রেন চালুর দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের চলমান কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দিয়েছে। এ সময় তারা কয়েকজন শিক্ষার্থীর জামা ছিঁড়ে ফেলেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার সময় এ ঘটনা ঘটে। এতে ওই সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের গতকাল রোববার রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে লাঠিপেটা করে পুলিশ। এ সময় থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিল হোসেন এক ছাত্রীকে পেছন থেকে লাথি মারেন। এ ঘটনার এক দিন পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, রেললাইন সংস্কারের কারণ দেখিয়ে গত বছরের ৩১ সেপ্টেম্বর থেকে নগরের বটতলী স্টেশনের বদলে ষোলশহর স্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখী শাটল ট্রেন চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কতৃ‌র্পক্ষ।
অভিযোগ উঠেছে, রেললাইনের সংস্কারকাজ শেষ হলেও বটতলী স্টেশন থেকে পুনরায় শাটল ট্রেন চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে বেশ কয়েক দিন ধরে কর্মসূচি পালন করে আসছেন ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা। এর অংশ হিসেবে আজ বেলা সাড়ে ১১টায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। এ সময় ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সদস্যরা বেশ কয়েকবার এসে কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করতে বলেন। কিন্তু এর পরও কর্মসূচি চলতে থাকে। এ নিয়ে একপর্যায়ে পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীদের কথা–কাটাকাটি হয়। পরে পুলিশ ধাক্কা দিতে দিতে তাঁদের সরিয়ে দেয় এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীর শার্ট ও টি–শার্ট টেনে ছিঁড়ে ফেলে।
এদিকে ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিকুল তাজিমের মেইল থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে তিনি ও প্রচার সম্পাদক মির্জা ফখরুলসহ প্রায় ১০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকুল তাজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলাম। কিন্তু এর পরও হঠাৎ পুলিশ এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে আমিসহ সংগঠনের ১০জন নেতা–কর্মী আহত হয়েছি। এই হামলা প্রশাসনের স্বৈরাচারী মনোভাবের পরিচয়।’
তবে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেন পুলিশের হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত)। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘক্ষণ ধরে বিক্ষোভ মিছিলসহ কর্মসূচি চলতে থাকায় রেজিস্ট্রার ভবনে কাজের সমস্যা হচ্ছিল। তাই আমরা তাদের বারবার কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করতে অনুরোধ করি। কিন্তু এরপরও তারা না যাওয়ায় তাদের সরিয়ে দিয়েছি। এর বেশি কিছু না।’

‘যে কোন মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে সরকার’ -মির্জা ফখরুল

ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের সিংহাসন যে কোন মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম  আলমগীর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১৯ নেতাকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। মির্জা আলমগীর বলেন, ভোটারবিহীন সরকারের নির্মম দেশ শাসনে অতিষ্ঠ দেশবাসী। তাদের বিষাক্ত ছোবলে মরণবেদনায় কাতরাচ্ছে। অবৈধ সরকার তাদের জুলুম নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, হত্যা-গুমের রক্তাক্ত পথে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। নিষ্ঠুর নিপীড়ণের একদলীয় দুঃশাসনের পরিণতি থেকে আওয়ামী লীগ কখনও শিক্ষা নেয়নি। তিনি বলেন, অবৈধ সরকার ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক থেকেই ছাত্রদল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৯ জন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে। কারণ গণভিত্তিহীন অবৈধ ক্ষমতার সিংহাসন যে কোন মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভূমিতলে পতিত হবে। জনগণের আন্দোলনের জোয়ারে এই অবৈধ সরকারের বিদায় নিশ্চিত হবে। অবিলম্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রনেতাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। এদিকে যুবদল কেন্দ্র্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদের গুলশানের বাসায় পুলিশি তল্লাশির নামে আসবাবপত্র তছনছ এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অশালীন আচরণের নিন্দা জানিয়েছেন মির্জা আলমগীর।

কঙ্গোয় নৃশংস হত্যাযজ্ঞে নিহত ৩৬

গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোয় উগান্ডার সন্দেহভাজন বিদ্রোহীরা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এতে শিশু ও নারীসহ কমপক্ষে ৩৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দুই জন আহত ও অপর দুই জনকে অপহরণ করা হয়েছে। মাশেটি (দীর্ঘকায় ধারালো ছুরিবিশেষ) ও কুড়ালের সাহায্যে নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় তারা। গতকাল রাতে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে উত্তর কিভু প্রদেশের বেনি অঞ্চলে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। বিদ্রোহী গোষ্ঠী অ্যালাইড ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এডিএফ) এ হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই অঞ্চলে চালানো হত্যাযজ্ঞে এ পর্যন্ত আড়াই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এ ধরনের হত্যাযজ্ঞ রোধে বারবার কঙ্গোর সেনাবাহিনী ও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বেচ্ছায় অ্যানাকন্ডার পেটে ১ ঘণ্টা

মার্কিন প্রকৃতিবিদ পল রসোলির মূল উদ্দেশ্য ছিল ধ্বংসের পথে থাকা অ্যামাজন রেইনফরেস্ট বা বৃষ্টিপ্রধান বনাঞ্চলকে সবার সামনে তুলে ধরা এবং এর মাধ্যমে রেইনফরেস্টটি রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করা। তিনি মনস্থ করলেন, এমন কিছু একটা করতে হবে, যা মানুষের মনোযোগকে আকৃষ্ট করবেই। ব্যস! মৃত্যুর পরোয়া না করেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাপ অ্যানাকন্ডার খাবার হয়ে তার পেটের ভেতর চলে গেলেন তিনি। সাপটি তাকে আস্ত গিলে ফেলার প্রতিটি মুহূর্ত ধারণ করা হলো ক্যামেরায়। ১ ঘণ্টা পেটের মধ্যে রইলেন এবং অক্ষতভাবে বাইরে বেরিয়ে এলেন পল রসোলি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। সাধারণভাবে, অ্যানাকন্ডা তার শিকারকে ধরার পর তাকে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে এবং গিলে ফেলে। ফলে, পলের এ সিদ্ধান্তটা নির্ঘাত মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার মতো ছিল। তবে হার মানেননি তিনি। বেঁচে বেরিয়ে এসেছেন অ্যানাকন্ডার পেট থেকে। সারা বিশ্বের মানুষ এখন ডিসকভারি চ্যানেলের ‘ইটেন অ্যালাইভ’ অনুষ্ঠানের কল্যাণে সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রে রোববার রাত থেকেই অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছে। এক ঘণ্টা অ্যানাকন্ডার পেটের ভেতর ছিলেন পল। দম যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য বিশেষ ডিজাইনের কার্বন ফাইবারের তৈরি স্যুট বা পোশাক পরিধান করেছিলেন। সঙ্গে ছিল শ্বাস নেয়ার যন্ত্র, ক্যামেরা ও যোগাযোগের সরঞ্জাম। টানা ৬০ দিন চেষ্টা চালানোর পর পেরুর একটি জঙ্গলে প্রয়োজন অনুযায়ী একটি অ্যানাকন্ডা পান তিনি ও তার দলের সদস্যরা। এটি দৈর্ঘ্যে ৬ মিটার বা ২০ ফুট লম্বা। মাথার দিক থেকে পলকে গিলতে শুরু করে অ্যানাকন্ডাটি এবং দৈত্যাকৃতির সাপটির পেটে ১ ঘণ্টা কাটিয়ে দেন তিনি। পুরো সময়টা দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন পল। এদিকে অ্যানাকন্ডাটির যাতে কোন ক্ষতি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রেখেছিলেন পল রসোলি এবং তার দলের বাকি সদস্যরা। অ্যানাকন্ডাটিও সুস্থ রয়েছে বলে জানান তিনি। কিভাবে সাপটির পেট থেকে মুক্ত হলেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাননি পল। অ্যামাজন রেইনফরেস্ট ও এর জীববৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন পল। সেখান থেকেই আইডিয়াটি মাথায় আসে তার। পল রসোলি বলছিলেন, বিশ্বের প্রত্যেকেই জানেন রেইনফরেস্ট হারিয়ে যাচ্ছে এবং অধিকাংশ মানুষই আপনাকে বলতে পারেন রেইনফরেস্ট কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, তা সত্ত্বেও যথেষ্ট মানুষ বিষয়টির দিকে নজর দিচ্ছেন না এবং এটাকে সেরকম সমস্যা হিসেবেও অনুধাবন করতে পারছেন না অনেকেই। এদিকে বিভিন্ন প্রাণী অধিকার সংগঠন পলের তীব্র সমালোচনা করেছে। সাপটিকে অযথা কষ্ট দেয়া হয়েছে বলে মনে করছে তারা। এমনকি পলকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে। এতে তিনি অবশ্য দমে যাননি। বরং, তিনি সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে যা করা প্রয়োজন, সেটাই করেছেন বলে মনে করেন।

খালেদার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ- আইনজীবীদের হট্টগোল, পরবর্তী তারিখ ১৭ই ডিসেম্বর

দুই পক্ষের আইনজীবীদের হট্টগোল একেবারে হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এজলাস কক্ষে হট্টগোলের কারণে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় তার বক্তব্য শোনাই যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় বিচারক এজলাস ত্যাগ করে সহকারির মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন নির্ধারণ করে দেন। আজ সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের সময় এ এমন ঘটনা ঘটে। জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আজ সাক্ষ্য গ্রহণের নির্ধারিত দিন থাকলেও খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের করা কয়েকটি আবেদনের ওপর শুনানি করতে দিনের বেশিরভাগ সময় চলে যায়। শুনানির পর আবেদনগুলো খারিজ করে দেয়ার পর বিচারক বাসুদেব রায় মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করলে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা হট্টগোল শুরু করেন। এসময় সরকার পক্ষের আইনজীবীরা ও উচ্চ বাক্য বিনিময় করেন। এসময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তর্কে জড়ান আইনজীবীরা। এসময় এজলাসে মামলার বাদি হারুনুর রশিদ সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন। হট্টগোলের কারণে বিচারক সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি রেখে এজলাস ত্যাগ করেন। পরে বাদীও এজলাস ছেড়ে যান। কিছুক্ষণ পর বিচারক সহকারির মাধ্যমে ১৭ই ডিসেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ জানিয়ে দেন। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি চেয়ে চারটি সময়ের আবেদন করেন। শুনানি শেষে তা খারিজ করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আদেশ দেন আদালত।

‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়’ -গওহর রিজভী

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। তিনি বলেছেন, নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন বিষয়। দেশের সংবিধান অনুযায়ী ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন হয়েছে এতে বিদেশীদের কিছু বলার নেই। এই নির্বাচনের ফলে দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সাজিদুর রহমান ফারুকের পরিচালনায় আলোচনা সভায় গওহর রিজভী বলেন, আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার করা। তাই সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই করা হবে, কোন সমঝোতা করা হবে না। যেসব যুদ্ধাপরাধী দেশের বাইরে আছে, তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে নিতে সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে বলে জানান গওহর রিজভী। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বা নির্বাচন সম্পর্কে বিদেশীদের কোন চাপ আছে বলে মনে করি না, আর যদি কোন চাপ থেকেও  থাকে তাহলে সরকার এসব বিষয়ে অবস্থান বদলাবে না। তিনি  মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত চৌধুরী মঈন উদ্দিনকে দেশে ফেরত পাঠাতে বৃটিশ সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিস্তা চুক্তি সম্পর্কে গওহর রিজভী বলেন, ভারতের সাথে কিছু কিছু বিষয়ে অমত থাকায় তিস্তা চুক্তিতে দেরি হচ্ছে। তবে এসব মতপার্থক্য দুর করার বিষয়ে সরকার সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাস্তবের পথে পদ্মা সেতু by আনোয়ার হোসেন

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ১৪ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এর বেশির ভাগই সংযোগ সড়ক, পুনর্বাসন ও প্রকল্প এলাকার উন্নয়নকাজ। এখন শুরু হয়েছে মূল সেতু নির্মাণের কাজ।  সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, গত অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। জাজিরার সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে যথাক্রমে ২০ দশমিক ৫ ও ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ এগিয়ে গেলে অগ্রগতির হার আরও বেড়ে যাবে বলে প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এখন মূল সেতুর জন্য নদীর বিভিন্ন অংশে মাটি পরীক্ষা চলছে। এরপর হবে পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের (ভিত্তি) কাজ। এর বাইরে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৭০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য প্লট তৈরি করা হয়েছে দুই হাজার ৫৯২টি। অক্টোবর পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৯০টি প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে।
২০১৮ সালে সেতু দিয়ে যুগপৎভাবে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করবে—এই পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সবকিছু। সম্প্রতি প্রকল্পের মাওয়া অংশে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার দুই পাড়ে কর্মযজ্ঞ চলছে। মাওয়ায় বড় বড় বার্জে ক্রেন বসানো হয়েছে নির্মাণসামগ্রী ওঠানো-নামানোর জন্য। বড় বড় যন্ত্রে মাটি কাটা ও সমান করা হচ্ছে। চলছে সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ। পাড়ে গাছ কাটা হচ্ছে। নদীতে চলছে ড্রেজার। মানুষ আসছে চাকরির খোঁজে, ব্যবসার আশায়।
নির্মাণ অঙ্গনে (কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড) শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের থাকার জন্য প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ঘর বানানো হচ্ছে। কয়েক শ শ্রমিক সেখানে কাজ করছেন। কেউ ইট ভাঙছেন। কেউ ভবন বানাচ্ছেন। নিরাপত্তা হেলমেট পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা নির্দেশনা দিচ্ছেন। (স্বপ্নের খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে পদ্মা সেতু by আনোয়ার হোসেন)
একই রকম কর্মমুখর পরিবেশ শরীয়তপুরের জাজিরা ও শিবচরে। সেখানে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে পাথর-বালু-ইট এনে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। একটু পর পর ইট-বালু-সিমেন্ট-পাথর-মাটি নিয়ে বড় বড় ট্রাক প্রবেশ করছে নির্মাণ এলাকায়। বড় বড় যন্ত্র দিয়ে মাটি সমান করার কাজ চলছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সেতু বিভাগ। ওই বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের সমীক্ষা হয়েছিল জাপানি সংস্থা জাইকার অর্থে। নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে। মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দাতারা সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলে জটিলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগান দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতু নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। ওপর দিয়ে যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ চার বছরের মধ্যে শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারদের। তবে বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে না এলে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকাদারেরা।
সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণকাজের জন্য সাড়ে তিন বছর সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কাজ তদারকির জন্য একদল কর্মকর্তা প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করছেন। আর বনানীর সেতু ভবনে যাঁরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন, তাঁরাও বন্ধের দিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করছেন।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা সেতু এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা। বড় বড় চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে হয়েছে। এখন শুধু কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে। ২০১৮ সালে ট্রেন ও যানবাহন চলবে। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়মের ব্যাপারে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) দেখানো হবে। শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।’
পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ ছয় ভাগে (প্যাকেজ) ভাগ করা হয়েছে। পাঁচটি ভৌত কাজের এবং একটি তদারকি পরামর্শকসংক্রান্ত। ভৌত কাজগুলো হলো মূল সেতু, নদীশাসন, দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো। এসব কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে।
মূল সেতু নির্মাণে গত জুনে চীনের চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রকল্প এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্বে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নির্মাণ পর্যায়ে কারিগরি নানা জটিল বিষয় আসতে পারে। তবে সবকিছুই ঠিকঠাকমতো এগোচ্ছে। কাজ নির্ধারিত সময়েই শেষ হবে বলে আশা করা যায়।
পাঁচটি ভৌত ও দুটি তদারক প্যাকেজ মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। নদীর তীর রক্ষা, ফেরিঘাট সরানো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা রক্ষার ব্যয় ধরলে তা ২৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাবে। সব ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করতে হবে বলে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ভৌত কাজের ঠিকাদারদের প্রত্যেককে শুরুতেই চুক্তিমূল্যের ১৫ শতাংশ হারে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ১০ শতাংশ। সব আন্তর্জাতিক দরপত্রেই যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও প্রকল্প এলাকার উন্নয়নের জন্য অগ্রিম অর্থ দেওয়ার নিয়ম আছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রে ঠিকাদারের পাওনার একটি বড় অংশ ডলারে পরিশোধ করতে হয়। এটা চুক্তির সময় উল্লেখও থাকে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ পাওনা ডলারে পরিশোধ করতে হবে বলে সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকায় প্রথম পদ্মা সেতু প্রকল্পটি অনুমোদন করেছিল। ২০১১ সালে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সরকারিভাবে এখনো ২০১১ সালে ধরা ব্যয়ই বহাল আছে।
সেতু বিভাগ থেকে গত এপ্রিলের শেষের দিকে পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়ে প্রকল্প সংশোধনসংক্রান্ত নির্দেশনা থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনসংক্রান্ত সরকারের পরিপত্র অনুসারে একটি প্রকল্প সর্বোচ্চ দুবার সংশোধন করা যাবে। তৃতীয়বার করা যাবে পরিকল্পনামন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনায়।
সরকারের একটি সূত্র জানায়, দুই কারণে সরকার এই প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, এর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের সঙ্গে সরকারের তিক্ততার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এটাকে সরকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের সক্ষমতাকেও তুলে ধরতে চায় সরকার। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। আগামী নির্বাচনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে রাজনৈতিকভাবে সরকার বিশেষ সুবিধা পাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে।
এ প্রকল্পের বিষয়ে সরকারের স্পর্শকাতরতার উদাহরণ দিতে গিয়ে সেতু বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, মাওয়া ফেরিঘাট সরানোর জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েকবার তাগিদ দিয়েছে। এরপর গত ২০ নভেম্বরের মধ্যে ঘাট সরানোর সময় বেঁধে দেওয়া হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে তারা ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চায়। এটা জেনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাৎক্ষণিক ঘাট সরানোর নির্দেশ দেয় এবং ২৭ নভেম্বরই ঘাট সরানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এও জানান, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে সফরে গেলে এসেই প্রথমে পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

স্বপ্নের খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে পদ্মা সেতু by আনোয়ার হোসেন

সব ঠিকাদার নিয়োগ হয়ে গেছে। তদারকির পরামর্শকও প্রস্তুত। এবার পদ্মায় মূল সেতু নির্মাণের পালা। কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে পদ্মার দুই পারেই। নদীর তিন স্থানে চলছে মাটি পরীক্ষা। শিগগিরই শুরু হবে পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের (ভিত্তি) কাজ। ইতিমধ্যে মূল সেতুর জন্য পদ্মাপারে অনেক ভারী যন্ত্রপাতিও ভিড়েছে। অবশ্য সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনর্বাসনের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। তবে গত ২৬ নভেম্বর প্রকল্প এলাকায় গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, মূল সেতু নির্মাণকাজেরই যে এখন অপেক্ষা।
ঢাকা থেকে মাওয়া ফেরিঘাট যাওয়ার পথে চৌরাস্তায়ই চোখে পড়ল সড়কের সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এটি পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজের অংশ। বড় বড় ট্রাকে করে মাটি ফেলা হচ্ছে। সেগুলো সমান করছে এক্সকাভেটর।
চৌরাস্তা থেকে সোজা মাওয়া ফেরিঘাট। কিন্তু সেখানে লঞ্চ-স্পিডবোট-বাসে যাত্রী তোলার হাঁকডাক নেই। ঘাট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আরও পুবে, মাওয়া-মুন্সিগঞ্জ সড়কের পাশে শিমুলিয়ায়। কারণ, মূল সেতুর শুরুটা হবে মাওয়া ফেরিঘাট থেকে। মাওয়া আর আড়াই কিলোমিটার দূরের শিমলিয়া ঘাটের মাঝখানে কুমারভোগ গ্রামে নদীর পারে ডেরা গেড়েছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এটাই পদ্মা সেতুর নির্মাণসামগ্রী রাখার মাঠ (কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড)। তাই এই সড়কটিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। চায়না মেজর মূল সেতু নির্মাণ করবে।
এখানে বিশাল মাঠ ঘিরে দেয়াল দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঠিকাদারের লোকজনের আবাসনসহ অন্য অবকাঠামো। ইট ভাঙার যন্ত্রের গরগর শব্দ, শ্রমিকের দৌড়ঝাঁপ, বড় বড় মিক্সচার মেশিন—এ সবই নির্দেশ করে কাজ শুরু হয়ে গেছে। বিশাল মাঠ পেরিয়ে নদীর পারে ভিড়েছে কয়েকটি বার্জ। এতে রয়েছে বড় বড় কয়েকটি ক্রেন। এগুলো দিয়েই নির্মাণ মাঠ থেকে সেতুর সরঞ্জাম ওঠানো-নামানো হচ্ছে।
মাওয়া ঘাট থেকে নদী পার হওয়ার সময় দেখা গেল, শরীয়তপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচরেও চলছে নির্মাণকাজের তোড়জোড়। শিবচরের কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট থেকে সামনে এগিয়ে সড়কের বাঁ পাশে গড়ে উঠেছে ঠিকাদার, পরামর্শক ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য বাসস্থান। বিশাল এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাথর-বালুর স্তূপ। প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত ভারী যানবাহন-যন্ত্র চলছে দিন-রাত।
২০০১ সালের ৪ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে। মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই তাদের নিয়োগ দেয়।
অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর অর্থায়ন, নকশা প্রণয়ন ও ঠিকাদার নিয়োগ হয়েছে। সামনে আর কী চ্যলেঞ্জ আছে জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সেতুর পাইলিংয়ের কাজটি খুব চ্যালেঞ্জিং। কারণ, ১১৮ মিটার ব্যাপ্তির পাইল বড় হাতুড়ি দিয়ে মাটির নিচে পাঠানো হবে। অনেক সময় মাটি ফেঁসে যেতে পারে। তখন মাটি বের করে আবার পাইল করতে হবে। এটা বেশ জটিল কাজ। তিনি আরও বলেন, নদীশাসনের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা আগামী বর্ষায় নদী এখনকার অবস্থায় থাকবে কি না, সে অনিশ্চয়তা। এ ছাড়া পানির নিচের মাটির ৩০ মিটার পর্যন্ত কেটে ঢাল তৈরি করতে হবে। এটা করার সময় ঢাল ধসে পড়তে পারে। যমুনা সেতু নির্মাণের সময়ও ১৫ মিটার ঢাল করতে গিয়ে ধস হয়েছিল। তখন নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছিল।
কাজের অগ্রগতি এবং কারা কোন কাজ পেয়েছে
মূল সেতুর কাজ পেয়েছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এটির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকসহ দাতারা অর্থায়ন স্থগিত করলে ঠিকাদার নিয়োগও ঝুলে যায়। সরকার দেশীয় অর্থায়নে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলে প্রাকযোগ্য চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক দরপত্রে অংশ নেয়। তবে চূড়ান্ত অর্থাৎ আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয় একমাত্র চীনের মেজর ব্রিজ কোম্পানি।
একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় মেজর ব্রিজ কাজটি পায়। গত জুনে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে সেতু বিভাগ। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনের কাজেও সম্পৃক্ত মেজর ব্রিজ এবং তাদের বিরুদ্ধে সময়মতো কাজ শেষ না করার অভিযোগ আছে।
নদীশাসনের কাজ পেয়েছে চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই ও বেলজিয়ামের জান ডি নাল নামে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও আট হাজার ৭০৭ কোটি টাকা দরপ্রস্তাব করে সিনোহাইড্রো কাজটি পায়। তাদের সঙ্গে গত নভেম্বরে পদ্মার দুই প্রান্তে প্রায় ১৩ কিলোমিটার নদীশাসন করার চুক্তি করেছে সেতু বিভাগ।
সিনোহাইড্রো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করার কাজ করছে। কিন্তু সময়মতো তা শেষ করতে পারেনি। দুই প্রান্তের ১২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও টোল প্লাজা নির্মাণ এবং সার্ভিস এলাকা নির্মাণকাজ পেয়েছে আবদুল মোনেম লিমিটেড।
সেতু বিভাগ সূত্র বলছে, মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজের অগ্রগতি ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৩ কোটি টাকায় মোনেম লি. কাজটি করছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০৯ কোটি টাকায় সার্ভিস এলাকার কাজও করছে। এ পর্যন্ত অগ্রগতি ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এর বাইরে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৭০ কোটি টাকা। পুনর্বাসনের জন্য প্লট করার কথা দুই হাজার ৫৯২টি। অক্টোবর পর্যন্ত ৭৯০টি প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে।
পদ্মাপারের চিত্র পাল্টাচ্ছে
মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ গ্রামটা একদম পদ্মা নদীঘেঁষা। এই গ্রামেরই সন্তান আবুল কালাম আজাদ। সৌদি আরবপ্রবাসী কালাম এসেছেন ছয় মাসের ছুটিতে। পদ্মার পারে যেখানে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ডেরা গেড়েছে, সেখানে দিনে একবার হলেও ঢুঁ মারেন আবুল কালাম। এখানে ভিড়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণের বড় বড় ক্রেনবাহী বার্জ। আজাদ সেগুলো ঘুরে দেখেন আর মুঠোফোনে গান শোনেন।
নদীর যেখানটায় বার্জ থেমেছে, ৩৫ বছর আগে আজাদদের বসতভিটা ছিল সেখানেই। নদীর ভাঙনে সরতে সরতে তাঁদের বসতবাড়ি এখন ঠেকেছে মাওয়া-লৌহজং সড়কের পাশে। আবার যখন আজাদ দেশে আসবেন, সেই ভিটেটাও থাকবে না। পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ হয়ে গেছে তাঁদের বাড়িটি। সরকারিভাবে আজাদ ও তাঁর তিন ভাইয়ের জন্য পাঁচ শতাংশের প্লট বরাদ্দ হয়েছে।
আজাদ জানালেন, ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি সৌদিপ্রবাসী। প্রতিবারই এসে দেখেন গ্রামের কিছু না কিছু পরিবর্তন হয়েছে। তবে এবারের পরিবর্তনটা ব্যাপক। নির্মাণযজ্ঞ, বিদেশিদের দৌড়ঝাঁপ, বড় বড় বার্জ আর ক্রেন—দেখতে তাঁর ভালোই লাগে। বললেন, ‘উন্নয়ন হচ্ছে। তবে রাতে যখন বাড়িতে ঘুমোতে যাই, ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। বসতভিটাটা এবার তাঁদের ছাড়তে হবে।’
আবুল কালাম আজাদের মতো মাওয়া ও জাজিরার পদ্মাপারের অনেক বাসিন্দাই সেতুর কাজের যজ্ঞ দেখে আপ্লুত। তবে এর মধ্যে অনেকেই নীরবে চোখও মুছছেন বসতভিটার মায়ায়।
আজাদের বর্তমান বাড়িটা ১৪ শতাংশজুড়ে। পুরোটাই পদ্মা সেতু প্রকল্পে পড়েছে। আজাদ নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলেন, ‘নদী নিয়ে গেলে তো কিছু করার ছিল না। এখন সরকার দেশের কাজে নিয়েছে।’
পদ্মা সেতু প্রকল্পের শুরুতেই পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবসম্পর্কিত সমীক্ষা করে সেতু বিভাগ। সেই অনুযায়ী পুনর্বাসনেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সামাজিক প্রভাবসম্পর্কিত সমীক্ষা অনুসারে প্রকল্পের কারণে ১৫ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব পরিবারের জনসংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। এর প্রায় সাড়ে আট হাজার কৃষক পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হবে। এর প্রায় দুই হাজার পরিবারকে প্রকল্পের অধীনে সরকারি প্লট দিয়ে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিন হাজার পরিবারের অন্যত্র জমি রয়েছে কিংবা নিজে থেকে দূরে চলে যাবে। বাকি ১০ হাজার পরিবার বসতবাড়ি নয়, কৃষিজমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য কুমারভোগ এলাকার মুদি ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক দাবি করেন, তিনিসহ তাঁর আত্মীয়স্বজনের প্রায় ২১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও টাকা পাননি। সরকার বলছে, এগুলো খাসজমি। রাজ্জাকেরা মামলা করেছেন।
মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের অনেক মামলা হয়েছে। সেগুলো বিচারাধীন।
পরিবেশগত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের কারণে দুই লাখ ৯৫ হাজার ৭২টি বড় গাছ কাটা পড়বে। এর বাইরে বাঁশ আর কলাগাছ কাটা পড়বে চার লাখ ৮৫ হাজার। তবে পরিবেশের ক্ষতিপূরণের জন্য প্রকল্প এলাকায় চার লাখের বেশি গাছ লাগানোর কথা আছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সাত লাখ বাঁশ ও কলার চারা বিতরণ করার কথা।
প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কারণে প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার টন নানা শস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। ৭৬৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা বন্ধ হবে। মাছের চাষ হয় এমন ১২ হেক্টর পরিমাণ পুকুর ভরাট করতে হবে। নদী থেকে প্রায় পাঁচ কোটি ঘনমিটার মাটি ড্রেজিং করে তোলা হবে।
জমির দর বাড়ছে
লৌহজং এলাকায় জমি বিক্রি হয় কানি বা শতাংশ হিসেবে। ১৪০ শতাংশে এক কানি। লৌহজংয়ের নদীপারের বাসিন্দারা জানান, এক যুগ আগে এই অঞ্চলে এক কানি জমির দাম ছিল এক লাখ টাকা। এখন প্রতি শতাংশ জমির দাম ঠেকেছে তিন থেকে চার লাখ টাকায়। তাও বিক্রি করার মানুষ নেই।
পদ্মা সেতুর অপর পার পড়েছে শরীয়তপুরের জাজিরায়। এর টোল প্লাজা ও সংযোগ সড়ক গেছে মাদারীপুরের নদীঘেঁষা উপজেলা শিবচর দিয়ে। সেতুর ভায়াডাক্ট, সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এলাকা ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্প—সব মিলিয়ে নদীপারের প্রায় সব জমিই অধিগ্রহণ হয়ে গেছে। বাকি যেসব জমি আছে, সেগুলো আর কেউ বিক্রি করছে না।
শিবচর ফেরিঘাট থেকে মহাসড়কের পাশঘেঁষে রেললাইন হওয়ার কথা। সেখানকার জমি চিহ্নিত করে খুঁটিও বসিয়েছে রেলের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এরপরই বাড়তে শুরু করেছে সেখানকার জমির দর।
আড়িয়ালখাঁ সেতুর পাশের বাচামারা গ্রামের ওপর দিয়ে ২০০১ সালের দিকে শিবচর-টেকেরহাট মহাসড়ক নির্মাণ হয়। এর আগে সেখানকার বিঘাপ্রতি জমির দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। রেললাইনের জন্য মাপজোক করার আগে বিঘার দাম ছিল ২০ লাখ টাকা। সে দাম এখন ৫০-৬০ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
বাচামারা গ্রামের জমির পরিমাপক (আমিন) আবুল কালাম বলেন, মহাসড়ক নির্মাণের সময় তাঁর নিজের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তখন বিঘাপ্রতি ৩২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। এরপরই জমির দর বাড়তে থাকে। এবার রেলের কথা শোনার পর জমির বেচাই বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রকল্প ঘিরে ব্যবসা-চাকরির হাতছানি
প্রকল্প এলাকা এবং প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় বনানীর সেতু ভবনে প্রতিদিনই ব্যবসায়ী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা নানা তদবির নিয়ে হানা দিচ্ছেন। চাকরি দেওয়ার নাম করে একাধিক প্রতারক চক্রও সক্রিয়।
সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকা ডিপোজিট করার জন্য লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে একাধিক ব্যাংক চিঠি দিয়েছে। সম্প্রতি দুটি বেসরকারি ব্যাংক এ ধরনের চিঠি দেয়। বাংলাদেশে থাকা দেশি-বিদেশি প্রায় সব সিমেন্ট কোম্পানিই তাদের পণ্যের গুণগত মান তুলে ধরে তা ব্যবহারের জন্য আবেদন জানিয়েছে। রড-লোহার কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রতিদিনই প্রকল্পের পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তাদের কক্ষে ধরনা দিতে দেখা গেছে। আছেন পাথর, বালু ও বিভিন্ন ব্যবহার্য পণ্যের কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরাও।
প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেকে দেখা করতে চান। কিন্তু নির্মাণকাজে কী পণ্য ব্যবহার হবে, তা ঠিক করার ক্ষমতা প্রকল্প কর্মকর্তাদের নেই। এটা ঠিকাদারের এখতিয়ার। আর তা তদারকির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে।
গত ২৮ নভেম্বর লৌহজংয়ে চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন চাকরির জন্য এসেছেন। তাঁদের একজন শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি সার্ভেয়ার হিসেবে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে মংলা বন্দরে অন্য একটি প্রকল্পে কাজ করছেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর অধীনে সার্ভেয়ার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে এখানে এসেছেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। চাকরিও করা যাবে অনেক দিন। থাকার ব্যবস্থা পেলে কম বেতনেও রাজি হয়ে যাবেন।
ক্রেন অপারেটরের চাকরির জন্য এসেছিলেন আবুল কাশেম। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করেছেন।
প্রকল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্প চলাকালীন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এর বাইরে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর টোল প্লাজা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে স্থায়ীভাবে আরও অনেক কর্মসংস্থান হবে। এসব কজে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চাকরির এই সুযোগ তৈরির ফলে প্রতারক চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শিকদার ট্রেডিং কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতারণা শুরু করে। প্রতারক চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার এবং ৯৮ জন শ্রমিককে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এর আগেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে জামানত বাবদ কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
পিছিয়ে আছে রেললাইন নির্মাণ, পথ নিয়েও ক্ষোভ
মূল সেতুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে না রেলপথ নির্মাণের কাজ। প্রাথমিকভাবে মাওয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এখনো অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময় সে দেশের সরকারের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাপানি অর্থায়ন ধরে নিয়ে রেলের কর্মকর্তাদের এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় ১৬০ কিলোমটার রেলপথ নির্মাণের কথা রয়েছে। একটি অংশ গেন্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার, বাকিটা যশোর পর্যন্ত ৭৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা-ভাঙ্গা রেললাইন নির্মাণে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি এখনো পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়নি। একাধিক নদী থাকার কারণে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলার সীমানা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার উড়ালপথে রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা তিনটি পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্যের চেয়েও বেশি। জটিল কাজ বলে এই অংশটুকু পরে করা হবে।
দ্বিতীয় ভাগ বা ভাঙ্গা-যশোর অংশের রেললাইন নির্মাণ নির্ভর করবে পরবর্তী অর্থায়ন পাওয়ার ওপর।
সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন ও দরপত্র দলিল তৈরির লক্ষ্যে কানাডাভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যানারেলের নেতৃত্বে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তাদের ২০১২ সালে প্রায় ২৩৭ কোটি টাকায় নিয়োগ দেয় রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে ভাঙা পর্যন্ত রেললাইন করতে হলে ৩৬৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে ২৭৩ হেক্টর ব্যক্তিগত ও ৯২ হেক্টর সরকারি জমি। ইতিমধ্যে কয়েকটি এলাকার মানুষ প্রতিবাদ জানিয়ে নকশা পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ এসেছে মুন্সিগঞ্জের নিমতলা বাজার, শিবচরের বাচামারা গ্রাম ও পুলিয়া বাজারের বাসিন্দাদের কাছ থেকে। কারণ, রেলপথটি এই তিন স্থানের মাঝখান দিয়ে যাবে। প্রায় ৮০টি বাড়ি নিয়ে বাচামারা গ্রামের পুরোটাই সরিয়ে ফেলতে হবে।
সম্প্রতি বাচামারা গ্রামে গেলে বাসিন্দারা বলেন, নদীর পূর্ব পারে যেখানে সীমানা দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে সোজা রেললাইন গেলে বাড়িঘর ভাঙা পড়ে না। জমির ওপর দিয়ে চলে যায়। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণ কমানোর জন্য মহাসড়কের পাশ দিয়ে, বসতির ওপর দিয়ে সীমানা চিহ্নিত করেছে।
বাচামারা গ্রামের বাসিন্দা আলাউদিন মৃধা ও রাজ্জাক মৃধা বলেন, এপার-ওপার করে সাতবার বসতবাড়ি নদীতে গেছে। রেললাইনের কারণে অষ্টমবার ভাঙতে হবে। কিন্তু এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের বসতবাড়ির বাইরে আর কোনো জমি নেই। ফলে অনেক দূরে বা অন্য জেলায় চলে যেতে হবে তাঁদের। এর আগে মহাসড়ক নির্মাণের সময় গ্রামের মানুষ একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্রামের নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা রেললাইন চাই। তবে আরও ১০০ গজ দক্ষিণে রেললাইন হলে সোজা পথে হয় এবং আমরাও বেঁচে যাই। রেলপথ বাঁকা করেই আমাদের সর্বনাশ করা হচ্ছে।’
জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক সাগর কৃঞ্চ চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, সেতু চালুর দিন থেকেই রেল চালুর লক্ষ্যে কাজ এগোচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে কম মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই বিবেচনা শুরু থেকেই ছিল। এর পরও কিছু করার থাকলে দেখা হবে।
জীবন বদলের স্বপ্নে বিভোর দক্ষিণের মানুষ
গত ২৭ নভেম্বরের কথা। নতুন শিমুলিয়া ঘাট থেকে কাওড়াকান্দি যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল। ফেরিতে কথা হলো খুলনার বাসিন্দা কাপড় ব্যবসায়ী দুলাল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। ঢাকায় আসেন নিয়মিত। মাওয়া-কাওড়াকান্দি হয়ে খুলনা যেতে দিনের বেলায় লাগে সাত ঘণ্টা আর রাতে হলে সেটা ১০ ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকে। এর মধ্যে পদ্মাপারে নেমে নৌযানে ওঠা, নদী পাড়ি দিয়ে আবার গাড়িতে উঠতেই তাঁর তিন ঘণ্টা লেগে যায়। অথচ পদ্মা সেতু হলে ট্রেন বা বাস যে যানেই হোক নদী পাড়ি দিতে ২০-৩০ মিনিটের বেশি লাগবে না।
আনন্দে হাসি না চেপেই দুলাল বলেন, কবে যে সেতু হবে আর পাড়ি দেব, তর সইছে না। আসলে দক্ষিণের মানুষের যে এখন কী কষ্ট তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝতে পারবে না। পদ্মা সেতু দক্ষিণের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়েই দেখা দেবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের সমীক্ষা বলছে, সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলার মানুষের জীবন পাল্টে যাবে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বেড়ে যাবে ১ দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। মংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরে চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
এই সেতুকে ঘিরে পদ্মার দুই পার সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই নগরের আদলে শহর গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুরে একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে জমির স্কেচম্যাপ করা হয়েছে। দক্ষিণ পারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পদ্মা সেতুর দুই পারে সেনাবাহিনীর একটি কম্পোজিট ব্রিগেড করার জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ফলে পদ্মা সেতু ঘিরে এ এলাকায় কর্মযজ্ঞ কেবল শুরু বলা যায়।

ইরানে মার্কিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন

ইরানে জেলে থাকা মার্কিন সাংবাদিক জ্যাসন রেজাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। গত শনিবার তাকে আদালতে উপস্থিত করা হয়েছিল কিনা, সে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। খবর আলজাজিরার।
তবে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের পত্রিকার তেহরানের ব্যুরো চিফ রেজাইনকে শনিবার শুনানির সময় প্রায় ১০ ঘণ্টা আদালতে থাকতে হয়। এ সময় তার সঙ্গে পত্রিকার নিয়োগ দেয়া এক দোভাষী ছিলেন। প্রসঙ্গত, ইরানের আদালতে ফারসিতে শুনানি ও রায় পড়া হয়। রেজাইন ফারসি পড়তে না পারায় তার জন্য দোভাষী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, রেজাইনের পরিবারের পক্ষ থেকে এক অ্যাটর্নিকে ভাড়া করা হলেও তাকে আদালতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি।
ওয়াশিংটন পোস্টের নির্বাহী সম্পাদক মার্টিন ব্যারন জানান, রেজাইনকে কেন জেলে নেয়া হয়েছে বা কী অপরাধে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, এ ব্যাপারে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হয়নি।
গত ২২ জুলাই রেজাইন ও তার স্ত্রী ইগানেহ সালেহীকে আটক করে ইরানি পুলিশ। অক্টোবরে ইগানেহকে জামিন দেয়া হলেও রেজাইনকে জেলে রাখা হয়। রেজাইনের বিরুদ্ধে এখনও তদন্ত চলছে। রেজাইন ইরান ও আমেরিকার দ্বৈত নাগরিকত্বের দাবি করেছেন।

হাগুপিটের আঘাতে ফিলিপিন্সে ভূমিধস

ফিলিপিন্সের দেলোরেস জেলা ও পূর্বাঞ্চলীয় সামার প্রদেশে শনিবার রাত ৯টায় আঘাত হেনেছে টাইফুন হাগুপিট। প্রচণ্ড বাতাসের তোড়ে বহু গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাসের আশংকা করা হচ্ছে। প্রথম আঘাতেই দেলোরেস জেলায় ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, উপকূলীয় গ্রামগুলো থেকে ৬ লাখেরও বেশি লোক অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। ফিলিপাইনের তাকলোবান এলাকায় বিভিন্ন বাড়িঘরের ছাদ উড়ে গেছে এবং রাস্তাঘাট বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। তবে হাগুপিটের আঘাতে যে ধরনের ক্ষতির আশংকা করা হয়েছিল তার চেয়ে কম ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত সেখানে প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষ এবার সব রকম প্রস্তুতি রেখেছিল বলে জানিয়েছে। তবে খুবই প্রত্যন্ত এলাকায় কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা জানতে কিছু সময় লাগবে বলে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশংকার চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় ভূমিধসের সম্ভাবনা কম। তবে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া বইছে। এতে গাছপালা ভেঙে বসতবাড়ির ওপর পড়তে পারে। আলবাই প্রদেশের গভর্নর জোয়ে সালসেডা বলেন, ‘গত বছর আঘাত হানা টাইফুন হাইয়ান আমাদের শিখিয়েছে যে, সব সময় প্রস্তুত থাকো এবং সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নাও।’
তিনি বলেন, ‘এবার আমরা তাই করেছি। প্রাণহানি এড়াতে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া ছিল খুব জরুরি।’
স্থানীয়ভাবে এ টাইফুনের নাম দেয়া হয়েছে ‘হাগুপিট বা রুবি’। রোববার স্থানীয় সময় রাতে পূর্বাঞ্চলের সামার প্রদেশের দোলোরেসে এটি আঘাত হানে। এ সময় বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৭৫ কিলোমিটার যা দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
দোলোরেস পুলিশের মুখপাত্র অ্যালেক্স রবিন বলেন, টাইফুনের আঘাতে বহু গাছপালা ভেঙে পড়েছে।
তাকলোবানে ইউনিসেফের মাঠপর্যায়ের কার্যালয়ের প্রধান মাওলিদ ওয়ার্ফা বলেন, প্রচণ্ড ঝড়ে তাদের পাঁচতলা ভবন কাঁপছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন অন্ধকার ঘরের মধ্যে রয়েছি। বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। কোনো বিদ্যুৎ নেই। আমরা মোমবাতি ব্যবহার করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একটি জেনারেটর আছে। তবে প্রবল বৃষ্টি, বন্যা ও জ্বালানি সংকটের কারণে সেটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা খুবই বিপজ্জনক।’ তাকলোবানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়ের মুখপাত্র দেরান্দো বেরনাদাস বলেন, উপকূলীয় গ্রামগুলো থেকে প্রায় ১৯ হাজার লোককে ২৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
১০ ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়
৭ হাজার ১০০ দ্বীপ নিয়ে গঠিত ফিলিপিন্স দেশটি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০টি ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়ে। দেশটির প্রাণঘাতী ১০টি ঘূর্ণিঝড় এখানে তুলে ধরা হল-
সুপার টাইফুন হাইয়ান
২০১৩ সালের ৮ নভেম্বর ফিলিপিন্সের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে। সরকারি হিসাবে কমপক্ষে ৭ হাজার ৩৫০ জন মানুষের প্রাণহানি বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে।
থিমেলা
১৯৯১ সালের ১৫ নভেম্বর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এই ঝড়ে ও সৃষ্ট বন্যায় অন্তত ৫ হাজার ১০০ মানুষের মৃত্যু হয়।
বোফা
২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপে আঘাত হানলে ১৯০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
আইক
১৯৮৪ সালের ৩১ আগস্ট আইকের আঘাতে কেন্দ্রীয় ফিলিপিন্সে ১ হাজার ৩৬৩ জনের মৃত্যু হয়।
ওয়াশি
২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মিন্দানাওয়ের উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানে। মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৮০।
ট্রিক্স
১৯৫২ সালের ১৬ অক্টোবর ট্রিক্সের প্রভাবে বন্যা ও ভূমিধসে লুজন দ্বীপের ৯৯৫ জন মানুষ মারা যায়।
অ্যামি
১৯৫১ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় দ্বীপপুঞ্জে ৯৯১ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে।
নিনা
১৯৮৭ সালের ২৫ নভেম্বর লেগাসপিতে। মৃতের সংখ্যা ৯৭৯ বলে দাবি করা হয়।
ফেংশেন
২০০৮ সালের ২০ জুন ফেংশেনের আঘাতে ৯৩৮ জনের মৃত্যু ঘটে।
অ্যাঞ্জেলা
১৯৯৫ সালের ২ নভেম্বর অ্যাঞ্জেলায় ৯৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এএফপি।

হাগুপিটে তছনছ পূর্ব ফিলিপাইন

ঘূর্ণিঝড় হাগুপিটের প্রভাবে লেগাজপি শহরের বাঁধে গতকাল এভাবেই আছড়ে পড়ে সাগরের ঢেউ l ছবি: এএফপি
ঘূর্ণিঝড় হাগুপিটের আঘাত এবং এর প্রভাবে হওয়া জলোচ্ছ্বাসে তছনছ হয়ে গেছে ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল। এতে প্রাথমিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সতর্কতা হিসেবে ওই অঞ্চল থেকে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। শান্তির সময়ে এত বেশি লোককে সরিয়ে নেওয়া ফিলিপাইনে এটাই প্রথম।
হতাহতের খবর তাৎক্ষণিকভাবে না পাওয়া গেলেও ঝড়ের আঘাতে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে গেছে, ভেঙে পড়েছে গাছপালা। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে ও তার ছিঁড়ে গিয়ে উপদ্রুত অঞ্চল বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেছেন। খবর এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্সের।
স্থানীয় আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় হাগুপিট শনিবার রাতে ফিলিপাইনের সামারা দ্বীপে আঘাত হানে। এ সময় এর গতি ছিল ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার। চলতি বছর ফিলিপাইনে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী।
সামারা দ্বীপের তাকলোবান শহরের মেয়র স্টেফানি ইউ-তান গতকাল রোববার সকালে বার্তা সংস্থা এএফপিকে টেলিফোনে জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে অনেক ঘরবাড়ি উড়ে গেছে। প্রচুর গাছপালা ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। উপকূলীয় এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
ম্যানিলা থেকে কর্তৃপক্ষ জানায়, স্থানীয় সময় রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত হাগুপিটের আঘাতে কোথাও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সামারা দ্বীপের ডলোরেস শহর পুলিশের মুখপাত্র অ্যালেক্স রবিন বলেন, ‘শনিবার রাতেই ঝড়ে গাছপালা ভেঙে ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাত থেকেই আমরা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছি।’
ঝড়ের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে তাকলোবানের ইউনিসেফ কার্যালয়ের প্রধান মাওলিদ ওয়ারফা গতকাল সকালে জানান, তিনি পাঁচতলা একটি ভবনে ছিলেন। ঝড়ের একপর্যায়ে সেই পাঁচতলা ভবনও কেঁপে ওঠে। মাওলিদ ওয়ারফা আরও জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁরা মোমবাতি ব্যবহার করছেন। বাইরে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড়কবলিত লেগাজপি শহর থেকে বিবিসির সংবাদদাতা জানান, ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের ঘূর্ণিঝড়ের আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়। চায়ান এলাকায় গিয়ে একটি পরিবারকে নিজ বাড়িতেই থাকতে দেখা যায়। পরিবারের ৯৮ বছর বয়সী এক সদস্য অসুস্থ থাকায় বাড়ি ছাড়েনি তারা। আরও কয়েকটি বাড়িতে লোকজনকে থেকে যেতে দেখা যায়। এসব বাড়ির বাসিন্দারা জানান, শক্তিশালী কাঠামোর বাড়ি হওয়ায় তাঁরা আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। রাতে ঝড় আঘাত হানার সময় বাড়িতেই ছিলেন তাঁরা। ওই বাড়িগুলোতে যাওয়ার পথে গাছপালা ভেঙে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
তাকলোবান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের মুখপাত্র ইলডেরান্ডো বার্নান্দাস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তাঁর এলাকায় উপকূলীয় প্রায় ১৯ হাজার বাসিন্দাকে ২৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাগুপিটের আঘাতে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেই তুলনায় ক্ষতি অনেক কম হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা দাবি করছেন, আগে থেকেই অনেক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।
সরকারি একটি সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে এক লাখ ২০ হাজার সেনাসদস্য প্রস্তুত রাখা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মানবিক সহায়তাবিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোস স্টাইলিয়ান্ডিস জানান, ফিলিপাইনে তাঁরা শিগগিরই একটি বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছেন। এ দল কেমন ও কী পরিমাণ সহায়তা প্রয়োজন হবে, তার আনুমানিক হিসাব দেবে। সেই হিসাব নিয়ে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হবে।
রেডক্রসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিলিপাইনে ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকাগুলোতে ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। গত বছর প্রচণ্ড শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হাইয়ানের আঘাতে ফিলিপাইনে সাত হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। সাম্প্রতিক সময়ে দ্বীপ দেশটিতে প্রতিবছরই বিভিন্ন মাত্রার ঝড় আঘাত হানছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবেই ইদানীং দেশটিতে এত বেশি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে।
ফিলিপাইনের ১০ শক্তিশালী ঝড়
১. ‘সুপার টাইফুন’ হাইয়ান, ২০১৩: নিহত বা নিখোঁজ অন্তত ৭৩৫০
২. থেলমা, ১৯৯১: নিহত ৫১০০-এর বেশি
৩. বোফা, ২০১২: নিহত বা নিখোঁজ ১৯০০
৪. ইকে, ১৯৮৪: নিহত ১৩৬৩
৫. ওয়াশি, ২০১১: নিহত ১০৮০
৬. ট্রিক্স, ১৯৫২: নিহত ৯৯৫
৭. অ্যামি, ১৯৫১: নিহত ৯৯১
৮. নিনা, ১৯৮৭: নিহত ৯৭৯
৯. ফেংশেন, ২০০৮: নিহত ৯৩৮
১০. অ্যাঞ্জেলা, ১৯৯৫: নিহত ৯৩৬

সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সহায়তা দিচ্ছে ইসরাইল : জাতিসংঘ

সিরিয়া সীমান্তের গোলান মালভূমিতে মোতায়েন করা বাহিনীর ইসরাইলি সৈন্যরা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দলের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ১৫ সদস্যের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে এ রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়েছে। রোববার এ খবর দিয়েছে ডেইলি হারেৎজ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সিরিয়া সীমান্তে গত ১৮ মাস ধরে বাশারবিরোধী বিদ্রোহীদের সরাসরি সহযোগিতা করছেন ইসরাইলের সেনা কর্মকর্তারা। জাতিসংঘের এ বাহিনী ১৯৭৪ সাল থেকে অধিকৃত গোলানে মোতায়েন রয়েছে। ইউএনডিওএফ’এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলি সেনারা সীমান্তের পূর্ব প্রান্তের গেট খুলে দুই ব্যক্তিকে যে ইসরাইলে ঢুকতে দিয়েছে তা এ বাহিনী দেখেছে। এছাড়া বিদ্রোহীদের আহত সদস্যদের ইসরাইলের সাফেদ এবং নাহারিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের এ বাহিনী। যুদ্ধবিরতি রেখার ব্রাভো প্রান্ত থেকে সিরিয়ার সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা অন্তত ১০ জন আহতকে নিয়ে এসেছে বলে দেখতে পেয়েছে জাতিসংঘ বাহিনী। সিরিয়ার সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের হাতে দুটি বাক্স তুলে দিতেও দেখেছেন ইউএনডিওএফ’এর সদস্যরা। সিরিয়ার সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে ইসরাইল ব্যাপক সহায়তা দিচ্ছে বলে এর আগে একাধিকার অভিযোগ করেছে দামেস্ক। এদিকে, সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের মোকাবেলায় ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহার করছে দেশটির সরকার। বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সর্বশেষ এ অভিযোগের কথা শনিবার জানিয়েছে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক এ সংস্থাটি জানায়, আইএসকে প্রতিহত করতে দেশটির পূর্বাঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটি থেকে ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। আইএস সদস্যদের ওপর এর প্রভাবও লক্ষ্য করা গেছে। সংস্থাটি আরও জানায়, ‘দেইর এজর সেনা বিমানবন্দরে বিদ্রোহী কিছু গ্র“পকে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগতে দেখা গেছে।’ দেইর এজরের বেশিরভাগ এলাকা আইএস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেনাবাহিনী সূত্রের বরাত দিয়ে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ‘কিছু এলাকায় জঙ্গিদের প্রতিহত করতে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী।

মুনাফার একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে মুক্ত করে দিয়ে নতুন আঙ্গিকের পৃথিবী গড়ার সুবিশাল প্রচেষ্টা-সামাজিক ব্যবসার সম্ভাবনা by মুহাম্মদ ইউনূস

সামাজিক ব্যবস্থার মূল কথাই হচ্ছে বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিপুল পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সৃষ্টি করা। এই বিশাল দুর্যোগ মোকাবিলায় সামাজিক ব্যবসার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার কি কোনো গুরুত্ব আছে? এটা কি একটি হাস্যকর প্রচেষ্টা নয়? যে নিশ্চিত গতিতে পুঁজিবাদ অর্থনীতির শোষণপ্রবাহ এগিয়ে চলছে, সে প্রবাহে সামাজিক ব্যবসা কি ডুবন্ত মানুষের কাছে ভাসমান বড় গাছের গুঁড়ি, যাকে আঁকড়ে ধরে সে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করবে, নাকি এটা কোনো খড়কুটো, যা ধরে মানুষ নিজেকে শুধু প্রবোধ দিচ্ছে যে সে কোনো রকমে এ যাত্রায় রেহাই পেয়ে যাবে। সামাজিক ব্যবসার গুরুত্ব কিংবা অসারত্ব ভবিষ্যৎই প্রমাণ করবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার, আমাদের সামনে আশু বাস্তবায়নযোগ্য আর কোনো দৃশ্যমান পথ নেই। কাজেই তাকে আঁকড়ে ধরে এগোনো ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। (বাংলাদেশের পরশপাথর by সাজ্জাদ শরিফ)যতই দিন যাচ্ছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে পৃথিবী যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। এ রকম পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না। পৃথিবীতে দারিদ্র্য কমছে, কিন্তু তাও পানির ওপর নাকটা ভাসিয়ে রাখার মতো। পানি ছেড়ে ডাঙায় ওঠার কোনো রূপকল্প নেই। গরিবের আধলা পয়সা উন্নতি হওয়ার আগে ধনীর ঘরে মিলিয়ন ডলার উঠে আসছে। ধনী-দরিদ্রের আয় ও সম্পদের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ার সব আয়োজন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে স্থাপন করা আছে। এর থেকে পরিত্রাণের কোনো আয়োজন এই ব্যবস্থায় নেই। তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে আছে বেকারত্ব। ধনী দেশেও বেকারত্ব, গরিব দেশের তো এটাই প্রাথমিক পরিচয়। মানুষ বাড়ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, শ্রমের চাহিদা সে অনুপাতে বাড়ছে না, বাড়ছে বেকারত্ব। আগে রাষ্ট্রের দানের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির সংখ্যা থেকে বোঝা যেত, ধনী দেশে কত লোক বেকার আছে। এখন তা আর দরকার হয় না। শুধু তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের পরিমাণ দেখলে বোঝা যায় সমস্যাটা কত গভীরে। ইউরোপের অনেক দেশে দেশব্যাপী তরুণ বেকারদের সংখ্যা মোট তরুণদের অর্ধেক। গরিব দেশের কথা তো বলার মতো না। সংখ্যায় এটা এত বেশি যে এ নিয়ে আমরা পরিসংখ্যান তৈরিকেও আর গুরুত্ব দিই না।
এ অবস্থার কি পরিবর্তন হবে? খুব সহজে যে কথাটা বলা যায়, তা হলো, এই অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। পরিবর্তন হতেই হবে। মানুষ যা মেনে নেয় না, সেটা পাল্টে যেতে বাধ্য। যা আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য, আমাদেরই তা পাল্টাতে হবে। অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন ক্ষমতা আমাদের জন্য সেটা করে দেবে না।
সামাজিক ব্যবসার মূল শক্তিটা আসে কোথা থেকে? এ শক্তি হলো মানুষের সীমাহীন সৃজনশীলতার শক্তি। এ শক্তি এখন একটা কাজেই ব্যবহার করা হয়, মুনাফা অর্জনের জন্য, অর্থাৎ ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য। এটা করতে গিয়ে সমাজের যদি কোনো মঙ্গল হয়, সেটা উপরি পাওয়া। কোনো ব্যবসায় এই উপরিপাওনা বেশি, কোনো ব্যবসায় এটা কম। কোনো ব্যবসায় হয় ঠিক তার উল্টোটাই, এখানে সমাজের মঙ্গল করার চেয়ে অমঙ্গল বয়ে নিয়ে আসছে ঢের বেশি। ব্যবসাকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির একটা ব্যবস্থা হিসেবে না রেখে সামাজিক ব্যবসা এটাকে মানবকল্যাণের একটা ব্যবস্থা হিসেবে রূপান্তরিত করে দিয়েছে। এই পরিবর্তন সম্ভব হলো শুধু ব্যবসা থেকে ব্যক্তিগত মুনাফাটাকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। যে-মাত্র ব্যক্তিগত মুনাফার স্থলে উপস্থাপিত হয়েছে মানুষের মঙ্গল, তখনই ব্যবসার স্বভাব ও চরিত্র বদলে গেল। ব্যবসা নামের যে পদ্ধতিটি মানুষের জন্য নানা উৎপাতের সৃষ্টি করত, সেটি এখন সম্পূর্ণ উল্টো কাজের জন্য একটা বিশ্বস্ত যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেল। মানুষের যেকোনো সমস্যার সমাধানে এটাকে এখন কাজে লাগানো যায়।
অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মাধ্যমে মানুষের সৃষ্ট সমস্যাগুলোর অবয়ব এখন এত বিশাল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এগুলো থেকে কোনো দিন নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে, এটা ভাবাই যায় না। একক ব্যক্তির ক্ষমতা এত সীমাবদ্ধ যে সে এত বড় সমস্যা সমাধানের কথা চিন্তা করতেই সাহস করে না। সমস্যাটার আয়তন যদি হাতির সমান কল্পনা করা যায়, তাহলে তার সামনে মানুষ একটা ছোট পিঁপড়ার মতো। পিঁপড়া কীভাবে হাতিকে ঘায়েল করবে। কাজেই ওদিকে এগোনোই আর হয়ে ওঠে না।
সামাজিক ব্যবসা কিন্তু এতে মোটেই নিরুৎসাহিত বোধ করে না। কোনো বিশাল সমস্যার সামনে আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াতে তার কোনো সংকোচ বোধ হয় না। তার রণকৌশল একক ব্যক্তি বা কয়েকজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার জন্য খুবই লাগসই। তার রণকৌশল অনেকটা মহামারির ওষুধ আবিষ্কার করার মতো। একজন রোগীকে যদি এ ওষুধ বাঁচাতে পারে, তবে সহস্র কোটি লোককেও একই ওষুধ একই কারণে বাঁচাতে পারবে। প্রথমে ওষুধটা আবিষ্কার করো। সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে সমাজের যেকোনো রোগের ওষুধ তৈরি করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। এক কোটি বেকার যুবককে বেকারত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার কাজ সবার মাথা একযোগে গুলিয়ে দেওয়ার মতো একটা বিরাট কর্মকাণ্ড। কিন্তু পাঁচজন বেকার তরুণকে বেকারত্ব থেকে বের করে আনা তেমন কোনো আহামরি কাজ নয়, যদি সামাজিক ব্যবসার পদ্ধতি এখানে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে এটা আরও সহজ হয়ে যায়। এমন একটা ব্যবসা সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে পাঁচজন বেকারের স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের মাধ্যমেও এটা করা যায়। কিন্তু সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে এটা খুব সহজে করা যায়, যেহেতু এখানে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার কোনো শর্ত নেই। ব্যবসার খরচ পোষাতে পারলেই হলো। এ রকম একটা ব্যবসা সৃষ্টির জন্য একজন বড় মাপের বিশেষজ্ঞকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে তাও নয়। একজন সাধারণ বুদ্ধির মানুষই এই ব্যবসার সৃষ্টি করতে পারে। এবার ধরুন সত্যি সত্যি আমরা একটা সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে পাঁচজন বেকার তরুণকে স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলাম। এবার ব্যবসাটি নিজের আয়ে নিজে চলতে থাকবে। এ ব্যবস্থায় যিনি বিনিয়োগ করলেন, তাঁর টাকা তিনি কয়েক বছরের মধ্যে ফেরত পাবেন। তারপর যা মুনাফা হবে, তা ব্যবসার কাছেই থেকে যাবে। সেটা ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে লাগানো হবে। পাঁচজন বেকারের সমাধান খুব সহজে হয়ে গেল। কিন্তু এক কোটি বেকারের সমাধান কীভাবে হবে? সোজা উত্তর: একইভাবে হবে, কারণ আমরা বেকারত্ব সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছি। যাদের হাতে টাকা আছে, তারা এ রকমভাবে সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করলেই বেকারত্বের অবসান হবে। একজন ব্যক্তি বিনিয়োগ করতে পারে, ফাউন্ডেশন বিনিয়োগ করতে পারে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করতে পারে, সরকার বিনিয়োগ করতে পারে। বেকারত্ব দূরীকরণের মহোৎসব সৃষ্টি হতে পারে। যতই এসব সামাজিক ব্যবসার সমৃদ্ধি হবে, ততই তারা আরও বেকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে থাকবে। অর্থাৎ, সমস্যা যত ভয়ংকর হোক না কেন, তার ক্ষুদ্রতম একটা অংশ নিয়ে দেখলে দেখা যাবে, সেটা অত ভয়ংকর নয়। এই অংশটি যত ক্ষুদ্র হবে তার সমাধান তত সহজ হয়ে যায়। সামাজিক ব্যবসা সমস্যার ক্ষুদ্রতম অংশ নিয়েই অগ্রসর হয়।
ছোট একটা পদক্ষেপ সফল হলেই বাকি কাজ সোজা। একের পর এক পদক্ষেপ যুক্ত হলেই হাজার মাইলের রাস্তা পাড়ি দেওয়া যায়। নিজেদের ওপর বিশ্বাস জন্মাতে পারলেই আস্থা ফিরে আসে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আসছে বিপুল বেগে। সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টি হলে প্রযুক্তিতে বড় রকমের পরিবর্তন আসবে। পৃথিবীতে যারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, তারা প্রযুক্তিও নিয়ন্ত্রণ করে। প্রযুক্তি বিকাশের আসল উৎসাহ আসে বিরাট মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনাকে ঘিরে। সামনে থাকে ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর লাভবান হওয়ার মুলা, আর তার পেছন পেছন ছোটে প্রযুক্তির বিকাশ। যেখানে ব্যক্তিগত মুনাফা নেই, বর্তমান বিশ্বে সেখানে প্রযুক্তি মোটেই অগ্রসর হয় না। প্রযুক্তি কিন্তু এমন একটি জিনিস, যাকে যেকোনো দিকেই সম্প্রসারিত করা যায়। নামমাত্র খরচে রোগবালাই থেকে সব মানুষকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য অতি শক্তিশালী প্রযুক্তি সহজেই সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু প্রযুক্তিকে ওদিকে নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই। বরং ওদিকে কেউ নিতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়ার জন্য অনেকে প্রস্তুত থাকবে। গরিবের কাছে নামমাত্র খরচে চিকিৎসা নিয়ে গিয়ে লাভ কী? এতে তো ব্যক্তিগত মুনাফা নেই। বরং ওটা করতে গিয়ে যারা এখন রোগীর অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক টাকা মুনাফা করছে, তারা তাদের ব্যবসা হারাবে। কাজেই এই প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকো। এই প্রযুক্তির পেছনে টাকা ঢেলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ছাড়া কোনো ফায়দা নেই।
ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের চিন্তা থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়ে সামাজিক ব্যবসা এমন সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির মহাশক্তিকে উন্মোচন করতে পারে, যা বর্তমান ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। সামাজিক ব্যবসাকে জায়গা করে দিলে প্রযুক্তির অনাবিষ্কৃত বিশাল জগৎ উন্মোচিত হতে আরম্ভ হবে। যে সমস্যার প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান এখন চিন্তাই করা যায় না, সামাজিক ব্যবসার কারণে তা ভবিষ্যতে অতি সহজ একটা বিষয়ে পরিণত হবে।
সামাজিক ব্যবসা নতুন প্রযুক্তির দুয়ার খুলবে এবং এটা আমাদের কাজকে সহজ করে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু নতুন প্রযুক্তির জন্য অপেক্ষা করে থাকারও কোনো দরকার নেই। বর্তমানে প্রযুক্তি যে পর্যায়ে আছে, সেই পর্যায় থেকেই সামাজিক ব্যবসা শুরু হতে পারে। যে প্রযুক্তি শুরু হয়েছিল মুনাফা অর্জনের জন্য, সেটাকে মোড় ঘুরিয়ে সমস্যা সমাধানের কাজে লাগানো কঠিন কাজ নয়। এটাও সৃজনশীলতার কাজ। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি এমন পর্যায়ে আছে, যেটা এখনই বহু রকমের সমস্যার সমাধান সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে সহজ করে দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী প্রযুক্তি যখন আসতে শুরু করবে, এই সমাধানগুলোর বাস্তবায়ন সহজতর এবং দ্রুততর হয়ে পড়বে।
একটা বাস্তব সামাজিক ব্যবসার জন্ম কীভাবে হয়, তার একটা উদহারণ দিচ্ছি।
বছর চারেক আগে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ‘ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। কোনো একটা দেশ থেকে আমন্ত্রণ পেলে তারা সে দেশে সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টির কাজে সাহাঘ্য করতে এগিয়ে যায়। তারা এটা সামাজিক ব্যবসার ভিত্তিতে করে থাকে। অন্য কয়েকটি দেশসহ তিউনিসিয়াতে এভাবে তারা এখন কাজ করছে। কিছুদিন আগে তারা আমাকে আমন্ত্রণ করল তিউনিসিয়ায় তাদের একটা প্রকল্প বাছাই অনুষ্ঠানে যোগদান করতে। তিউনিসিয়ায় তারা স্থানীয়দের নিয়ে ‘ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস তিউনিসিয়া’ নাম দিয়ে একটা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছে। সে প্রতিষ্ঠান তিউনিসিয়াজুড়ে সামাজিক ব্যবসার বিজনেস প্ল্যান তৈরির একটা প্রতিযোগিতা আহ্বান করেছিল। বলা হয়েছিল, এই প্রতিযোগিতায় যেসব বিজনেস প্ল্যান আকর্ষণীয় হবে, তাদের বাস্তবায়নে ‘ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস ফান্ড তিউনিসিয়া’ থেকে অর্থ বিনিয়োগ করা হবে। এই প্রতিযোগিতায় দুই হাজার ৩০০টি বিজনেস প্ল্যান জমা পড়ে। এত বেশিসংখ্যক লোক উৎসাহ নিয়ে কষ্ট করে বিজনেস প্ল্যান তৈরি করে জমা দেবে, আয়োজকেরা আশা করেনি। তারা আশা করেছিল, বড় জোর ১০০ থেকে ১৫০টি প্রস্তাব পাবে। তারা দুই হাজার ৩০০টি বিজনেস প্ল্যান থেকে বাছাই করে ২০টি প্রজেক্ট প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করল। সেগুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করার জন্য তারা এক সপ্তাহের একটা কর্মশালার আয়োজন করে। যে উদ্যোক্তারা এগুলো জমা দিয়েছিল, তাদের তিউনিস শহরে আনা হলো তাদের চিন্তাভাবনাগুলো পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য, পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে তাদের সক্ষমতা যাচাই করার জন্য।
এই তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আমার একটি দিন কাটানোর সুযোগ হলো। আমি খুবই চমৎকৃত হলাম সামাজিক ব্যবসা সম্বন্ধে তাদের স্বচ্ছ ধারণা দেখে এবং তাদের রচিত প্রজেক্টগুলোর বাস্তবমুখিতা দেখে। বলা বাহুল্য, প্রতিটি প্রজেক্ট অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী, সৃজনশীল ও চিন্তাশীল মনের পরিচায়ক। প্রতিটি প্রকল্পই উদ্যোক্তার সমাজচেতনার একটি চমৎকার উদাহরণ। আয়োজকেরা মনস্থির করেছিল, ২০টি প্রকল্প থেকে তারা এই কর্মশালার মাধ্যমে ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাছাই করবে এবং এতে প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগ করবে। বলা বাহুল্য, তাদের তহবিলে যদি পর্যাপ্ত টাকা থাকত, তাহলে তারা ২০টির সব কটিতে আনন্দসহকারে বিনিয়োগ করত। তারা অবশিষ্ট প্রকল্পগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাবে বলে আমাকে জানাল।
এই ২০টি প্রকল্পের মধ্যে মৌমাছি পালনের একটা প্রকল্প ছিল। আমি মৌমাছি পালনে উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতি দেখে অভিভূত হলাম। তার সঙ্গে কথা বললে মনে হবে, সে মৌমাছি-সমাজের একজন সদস্য। তাদের ভালো-মন্দ নিয়েই তার সার্বক্ষণিক চিন্তা। তার আফসোস, কেন মানুষের জন্য উপকারী ছোট্ট এই প্রাণীর প্রতি মানুষ কোনো ভালোবাসা দেখায় না।
মৌমাছি পালন এবং তার অর্থনীতি সম্বন্ধে আগে থেকেই আমার পরিচয় ছিল। বাংলাদেশে যারা মৌমাছি পালনে অগ্রগামী, তাদের অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। সারা বিশ্বে এটা একটা পরিচিত কর্মসূচি। যারা মৌমাছি পালে, তারা মধু উৎপাদন করে অর্থ উপার্জন করে তো বটেই, তাদের সঙ্গে মৌমাছির একটা আত্মিক বন্ধনও সৃষ্টি হয়ে যায়।
তিউনিসিয়ার জানদুবা এলাকার হাসান নামের এই তরুণ বলা যায় মৌমাছি-অন্তঃপ্রাণ। মৌমাছির কথা বলতে গিয়ে সে আবেগে আপ্লুত হয়ে যাচ্ছিল। সে নিজে মৌমাছির চাষ করে অর্থ উপার্জন করে এবং তরুণেরা যারা মৌমাছির চাষ শিখতে চায়, তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। তার নতুন প্রজেক্টটা ব্যাখ্যা করে সে আমাদের বোঝাচ্ছিল। সে তার বর্তমান প্রশিক্ষণের কাজকে আরও বড় আকারে করতে চায় এবং তার সঙ্গে আরও নতুন জিনিস যোগ করতে চায়।
হাসান জানাল, এত দিন তার মধ্যে এত রকমের চিন্তা মাথায় আসেনি। শুধু মধু উৎপাদন নিয়েই সে ব্যস্ত ছিল। যখন শুনল প্রতিযোগিতার জন্য ভালো প্রজেক্ট তৈরি করতে পারলে ‘সামাজিক ব্যবসা ফান্ড’ থেকে পুঁজি দেওয়া হবে, তখন সিদ্ধান্ত নিল, সে একটা প্রজেক্ট দেবে। প্রজেক্টটি বানাতে গিয়ে তার মাথায় অনেক নতুন চিন্তা এসে ভর করতে থাকে। যতই নতুন নতুন চিন্তা মাথায় আসছিল, ততই সে আনন্দে উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল।
হাসান তার প্রজেক্টটা এভাবে তৈরি করেছে: তার বর্তমান ব্যবসাকে সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলে সে এটাকে সামাজিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করবে। ব্যবসা থেকে যে বেতন পাবে, তাতেই তার ব্যক্তিগত আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে পারবে। মধু উৎপাদন, এখন যেটা তার মূল ব্যবসা, সেটা থেকে সে সরে আসবে। মধু উৎপাদনকারী তৈরি করা এবং তাদের মাধ্যমে মধু উৎপাদন করাই হবে তার প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। সে তরুণদের প্রশিক্ষণ দেবে উত্তম মধু উৎপাদনকারী হওয়ার জন্য। যারা তার পরীক্ষায় পাস করবে, তাদের সে একটা অফার দেবে। তারা তার সঙ্গে যৌথভাবে মধু উৎপাদনের কাজ করতে পারবে। এ কাজে যত টাকার বিনিয়োগ লাগবে, সব টাকা সে দেবে (‘ফান্ড’ থেকে যে টাকা বিনিয়োগ হিসেবে পাবে, সেই টাকা থেকে)। মৌমাছি উৎপাদনের যাবতীয় সাজসরঞ্জাম সে সরবরাহ করবে। অর্থাৎ, আগ্রহী তরুণকে নিজের পকেট থেকে কোনো বিনিয়োগ করতে হবে না। সে হবে হাসানের ফ্র্যাঞ্চাইজি। সে হাসানের নিয়মে এবং আদর্শে মধু উৎপাদন করবে, হাসানের নির্দেশিত পন্থায় গুণগত মান রক্ষা করবে। যত মধু উৎপাদন হবে, হাসান সেটা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির দায়িত্ব নেবে। এর চেয়ে ভালো দামে যদি তরুণটি মধু নিজস্ব আয়োজনে বিক্রি করতে পারে, হাসানের তাতে কোনো আপত্তি থাকবে না। কারণ, সামাজিক ব্যবসা হিসেবে হাসানের মূল লক্ষ্য হবে তার ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সবার জন্য আয় বাড়ানোর কাজ করে যাওয়া। হাসানের লক্ষ্য হবে তিউনিসিয়ার তরুণেরা যেন বেকার বসে না থাকে। তারা যেন স্বাবলম্বী হয়। তারা যেন আকর্ষণীয় পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারে। তারা যেন নিজেদের গ্রাম ছেড়ে কর্মসংস্থানের জন্য বেআইনি প্রবাসী হিসেবে ইউরোপের শহরে শহরে ঘুরে না বেড়ায়। মৌমাছি থেকে মধু ছাড়াও যত রকম মূল্যবান বাই-প্রোডাক্ট তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের জ্ঞান সম্বন্ধে হাসান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। ফ্র্যাঞ্চাইজিরা প্রত্যেকে মধু থেকে যেমন আয় করবে, তেমনি তারা নানাবিধ মূল্যবান বাই-প্রোডাক্ট থেকেও উপার্জন করতে পারবে। যে তরুণই আগ্রহী হবে, হাসান তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তার ফ্র্যাঞ্চাইজ ব্যবসার নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে সদা প্রস্তুত থাকবে। সে আমার কথার প্রতিধ্বনি করে বলল: ‘আমি নিশ্চিত করতে চাই, আমরা কেউ চাকরিপ্রার্থী হব না, আমরা চাকরিদাতা হব।’
হাসানের কথা শুনতে শুনতে অবাক হচ্ছিলাম। হাসান কি আমাকে খুশি করার জন্য এসব কথা বলছে, নাকি সত্যি সত্যি এসব কথা তার বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বলছে। যে কারণেই বলে থাকুক সামাজিক ব্যবসার কাঠামোতে ঢুকে সে এখন এ রকম চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছে, সেটা সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত। তার দেশের তরুণদের স্বাবলম্বী করার ব্যাপারে তার আগ্রহ শ্রোতাকে অভিভূত না করে পারছিল না। সামাজিক ব্যবসার ধারণা তাকে যদি পুরোনো চিন্তা থেকে মুক্ত করে থাকে সেটাই হবে সামাজিক ব্যবসার বড় অবদান।
তাকে জিজ্ঞেস করলাম: তুমি তিউনিসিয়ার সব বেকার তরুণ-তরুণীর জন্য মধু উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে চাও। কিন্তু তুমি কি ভেবে দেখেছ, এত তরুণ-তরুণী যদি মধু উৎপাদন করে, তাহলে এত মধু খাওয়ার লোক পাওয়া যাবে কি না। বাজার পাবে কোথায়?
সে তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দিল, মধুর বাজার সীমাহীন। এর বাজার এত বড় যে তিউনিসিয়ার সব তরুণ-তরুণী মধু উৎপাদন করলেও বিশ্ববাজারের চাহিদা অপূর্ণ থেকে যাবে। তা ছাড়া আমরা এখন শুধু মধু বিক্রির কথা বলছি, বাই-প্রোডাক্ট বিক্রির কথা বলছি। মধুর উৎপাদন বেড়ে গেলে মধুভিত্তিক আরও বহু খাদ্যসামগ্রী আমরা তৈরি করতে পারব। যেহেতু মধুর আগাগোড়া বাজারব্যবস্থা আমাদের হাতে থাকবে, তাই বাইরের কেউ আমাদের ঠকানোর সুযোগ পাবে না।
স্বাভাবিকভাবেই খুবই অনুপ্রাণিত বোধ করলাম হাসান এবং তার নয়জন সাথি-উদ্যোক্তার উৎসাহ ও চিন্তার ব্যাপ্তি দেখে। হাসানদের সামাজিক ব্যবসাগুলো তাদের যাত্রাপথে তিউনিসিয়া এবং বিশ্বের আরও বহু তরুণ-তরুণীকে অনুপ্রাণিত করবে। তাদের চিন্তার কাঠামোটিই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। যখন ব্যক্তিগত মুনাফার চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে ফেলা যাবে, চোখের সামনে তখন সব রকম সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের পথ একটার পর একটা ভেসে উঠতে শুরু করবে, মানুষের কল্যাণমুখী উদ্যোগগুলো রূপ পেতে আরম্ভ করবে। যখন এ ধরনের ছোট একটি উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে, তখন সেটিই হবে আমাদের জন্য আশ্চর্য বীজ। মিরাকল সিড। এই বীজ তখন ছড়িয়ে যাবে পৃথিবীর সব প্রান্তে।
এই বীজ নির্মাণে বড় বড় বিজ্ঞানীর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। হাসানদের মতো তরুণেরাই ঘরে ঘরে, মাঠেঘাটে এই বীজ তৈরি করবে। একজনের মধু উৎপাদনের সামান্য একটি উদ্যোগ হঠাৎ করে দেশের একটা বড় সমস্যা সমাধানের জন্য উপযোগী হয়ে যেতে পারবে। তিউনিসিয়ার গ্রামের নারীরা, তরুণীরা, যারা কোনো দিন চাকরির সন্ধানে শহরের দিকে যায়নি, হঠাৎ দেখা যাবে তারা একটা বড় সামাজিক ব্যবসার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেরাই ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছে। মধু উৎপাদন কীভাবে করতে হয়, সেটাও তারা জেনে যাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, টাকা ও সাজসরঞ্জামও পেয়ে যাবে মূল কোম্পানি থেকে, মধু বাজারজাতকরণের চিন্তাও আর তাদের করতে হবে না। সবকিছুর পেছনে থাকবে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ সামাজিক ব্যবসা।
সামাজিক ব্যবসা মানুষের ব্যবসায়িক চিন্তাকে ব্যক্তিগত মুনাফার একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে মুক্ত করে দিয়ে নতুন আঙ্গিকের পৃথিবী গড়ার সুবিশাল সম্ভাবনাগুলো সবার সামনে তুলে ধরছে।
বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে সামাজিক ব্যবসা
১. এসবি (সামাজিক ব্যবসা) ডিজাইন ল্যাবের (পরিকল্পনা ও কর্মশালা) মাধ্যমে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সামাজিক ব্যবসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিজাইন ল্যাবের মাধ্যমে ৪৮৫টি প্রতিষ্ঠান সামাজিক ব্যবসা তহবিলের প্রস্তাব দিয়েছে, ৪৫৫টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
২. বাংলাদেশ ও অন্যান্য স্থানে বেশ কয়েকটি যৌথ উদ্যোগে স্বাধীন সামাজিক ব্যবসা
ডিজাইন ল্যাবের মাধ্যমে পরিচালিত সামাজিক ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশে আরও ১২টি সামাজিক ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ডানোন, ভিওলিয়া, ইউনিক্লো, ইন্টেল, ইউকিগুনি মাইতাকে, গ্লাসগো ক্যালডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি, বিএএসএফ, সাম্পান গ্রুপ এবং ব্যাবিলন গ্রুপের নয়টি যৌথ উদ্যোগ।
৩. ১২টি দেশে পাঁচ শতাধিক সামাজিক ব্যবসা কার্যক্রম চলছে।
৪. সামাজিক ব্যবসা তহবিল তৈরি করা হয়েছে ১০টি দেশে: হাইতি, আলবেনিয়া, ব্রাজিল, তিউনিসিয়া, কলম্বিয়া, ভারত, বাংলাদেশ, উগান্ডা, মেক্সিকো ও ফ্রান্স।
৫. ১৯টি দেশের ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনূস এসবি সেন্টার বা ইউনূস চেয়ার রয়েছে।
সূত্র: ইউনূস সেন্টার

চট্টগ্রামে প্রতিদিন ৫ কোটি টাকার মাদক ব্যবসা

নগরীর ২৫৮টি স্পটে ২৮৪ ব্যক্তি চালিয়ে যাচ্ছেন মাদক ব্যবসা। এদের ৬০ জনই নারী। এসব স্পটে দৈনিক ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার মাদক বিক্রি হচ্ছে। মাদক বিক্রেতাদের গ্রেফতারে মহানগর পুলিশ দুমাস আগে ১৪টি ম্যাপ তৈরি করেছে। অধিকাংশ স্পটে পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর অভিযান পরিচালনা করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নগরীতে মাদক ব্যবসা এমন পর্র্যায়ে পৌঁছেছে যে, মামলা দিয়েও তা রোধ করা যাচ্ছে না। নগরীর থানাগুলোতে দৈনিক ৮টি করে মাদক আইনে মামলা দায়ের হচ্ছে। চলতি বছর নগরীর ১৬ থানায় মামলা হয়েছে ২ হাজার ২৮০টি।
চট্টগ্রামে যেখানে-সেখানে হাত বাড়ালেই মিলছে হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, কোকেন, গাঁজা ও চোলাইমদসহ হরেক রকমের মাদক। সড়ক, নৌ ও রেলপথে এসব মাদক ঢুকছে নগরীতে। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে আনা ইয়াবা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে তৈরি বাংলা মদ পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে চট্টগ্রাম। নগরীতে দিন দিন মাদকসেবীদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের চিকিৎসার জন্য নেই পর্যাপ্ত নিরাময় কেন্দ্র। এসব নিরাময় কেন্দ্র চিকিৎসা নিয়ে এ পর্যন্ত কেউ মাদকমুক্ত হয়েছেন এমন নজিরও নেই। বরং অনুমোদনহীন অনেক মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার আড়ালে মাদক বাণিজ্য হচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
মাদকের স্পট : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সম্প্রতি ১৬ থানা এলাকায় যারা মাদক ব্যবসা করছে তাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। তাদের মধ্যে ১৬ থানায় ২৫৮টি স্পটে মাদক বিক্রি করছে ২৮৪ ব্যক্তি। এর মধ্যে কোতোয়ালিতে ৫৪ স্পটে ৯৬ জন, সদরঘাটে ৪ স্পটে ৪ জন, চকবাজারে ৩ স্পটে ৩ জন, বাকলিয়ায় ২৪ স্পটে ২৪ জন, খুলশীতে ২৬ স্পটে ২৬ জন, পাঁচলাইশে ২২ স্পটে ৫ জন, চান্দগাঁওতে ১২ স্পটে ১৬ জন, বায়েজিদ বোস্তামীতে ১৩ স্পটে ১৩ জন, পাহাড়তলীতে ২৪ স্পটে ২০ জন, আকবরশাহে ১৯ স্পটে ১৯ জন, হালিশহরে ১৪ স্পটে ৪ জন, ডবলমুরিংয়ে ২০ স্পটে ২০ জন, বন্দরে ৬ স্পটে ৪ জন, ইপিজেডে ৪ স্পটে ১৫ জন, পতেঙ্গায় ৩ স্পটে ৫ জন এবং কর্ণফুলীতে ১০ স্পটে ১০ জন।
যারা মাদক বিক্রি করছেন : চান্দগাঁও রাহাত্তারপুল এলাকায় বিক্রি করছেন রোকসানা; ইসহাকের পুল এলাকায় আনু, সান্তা, শানু ওরফে শাহীন ও রোসনা; স্টেশন রোডে রহিমা, পূজা ও আলাউদ্দিন; ষোলোশহরে লাদেন; চকবাজারে মাসুদ ও চন্দু চাকমা; অক্সিজেন এলাকায় পাখি; মুরাদপুরে শফি, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে মিয়া; বায়েজিদে সুন্দরী; আইস ফ্যাক্টরি রোডে কামাল ও মুক্তার; হালিশহরে ডাইল করিম, মহিউদ্দিন, ইকবাল ও কানা মোস্তফা; ছোটপুলে করিম; মনসুরাবাদে জামাল; লালখান বাজারে সোহেল; আগ্রাবাদ বরফকলের পাশে জুয়ারি সাঈদ; বেলুয়ার দিঘির পাড়ে মোজাম্মেল ও শফিক। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে আলতাদি বেগম, ফারজানা, এরশাদ, রুবেল, শামীম, দেলোয়ার, মুন্নি, মুসলিম, নুর আলম ও জহির।
চলতি বছর নগরীর ১৬ থানায় মাদক আইনে মামলা হয়েছে ২ হাজার ২৮০টি। এর মধ্যে নভেম্বরে ২০০, অক্টোবরে ২১৫, সেপ্টেম্বরে ২৫৫, আগস্টে ২০২, জুলাইয়ে ১৮৯, জুনে ২৬১, মেতে ২০৩, এপ্রিলে ১৯৯, মার্চে ২০১, ফেব্র“য়ারিতে ১৯৪ এবং জানুয়ারিতে ১৬১টি। সবচেয়ে বেশি মাদক আইনে মামলা হয়েছে বাকলিয়া থানায়।
নিরাময় কেন্দ্রের নাজুক অবস্থা : যত্রতত্র মাদক পাওয়ার কারণে দিন দিন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে ছাত্র, যুবক, নারী ও শিশুরা। নগরীর প্রায় ২০ হাজারের অধিক শিশু ড্যান্ডি নামক নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামে হাজার হাজার লোক মাদকাসক্ত হলেও তাদের চিকিৎসায় নেই আধুনিক ব্যবস্থা। নগরীতে বেসরকারিভাবে ৯টি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচলাইশ এলাকায় সরকারিভাবে ৫ শয্যাবিশিষ্ট একটি সরকারি মাদক নিরাময় হাসপাতাল থাকলেও তা অযত্ন-অবহেলায় এখন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা হওয়ায় এখানে মাদকসেবী রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন না। বেসরকারি পর্যায়ে নগরীতে ২০টির অধিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র থাকলেও অনুমোদন আছে মাত্র ৯টির। অনুমোদিত নিরাময় কেন্দ্রগুলো হল : আলো, তরি, দ্বীপ, নয়ন, ছায়ানীড়, আর্ক, প্রশান্তি ও সময়। সম্প্রতি হালিশহর এলাকায় অবস্থিত ছায়ানীড় নামে এক মাদক নিরাময় কেন্দ্রে মারা গেছেন মাদকাসক্ত এক যুবক। কেন্দ্রের চিকিৎসাদানকারী ব্যক্তিদের নির্যাতনে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে দাবি করে থানায় মামলা করেছে তার পরিবার।
এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক ইমরুল কায়েস জানান, অনুমোদনহীন মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোকে তালিকাভুক্তির জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সাড়া দিলেও অধিকাংশ সাড়া দেয়নি। এর মধ্যে কয়েকটিতে মাদক সেবন ও বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ থাকলেও তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নগরীতে পুলিশের তৈরি করা ২৫৮টি মাদক স্পট থেকে প্রশাসনের লোকজন মাসোয়ারা আনছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে জানা গেছে, মাদক স্পট থেকে নগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষে মাসোয়ারা আনছে জামসেদ ও সেলিম নামে কথিত দুই ক্যাশিয়ার। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নামে কয়েকজন পরিদর্শক এবং সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের নিযুক্ত কথিত ক্যাশিয়ার নিয়মিত মাসোয়ারা আনছে। এ কারণে নগরীতে মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে স্থানীয় লোকজন মত দিয়েছেন।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার জানান, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। বড় চালানের খবর পাওয়া মাত্র অভিযান চালানো হচ্ছে। গত কয়েক মাসে বেশ কটি মাদকের স্পট ধ্বংস করা হয়েছে। সিএমপির এডিসি (ডিবি) হাছান চৌধুরী জানান, মাদকের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা পুলিশের প্রতিদিনই অভিযান চলছে। কয়েকটি বড় স্পটে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।