Tuesday, July 22, 2025

এই দেশের রাজনীতি বিশ্বের নিকৃষ্টতম রাজনীতি...

দেশের সমস্যা ও সংকট নিয়ে নিজের ফেসবুকে মতামত প্রকাশ করেছেন নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। ফেসবুকে বরাবরই সোচ্চার থাকা উজ্জ্বল এবার মাইলস্টোন স্কুলে ঘটে যাওয়া বিমান দুর্ঘটনার ইস্যু নিয়েও কথা বললেন। মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আরও বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে তুলে ধরেছেন এই পরিচালক।

মাইলস্টোন স্কুলের বিমান দুর্ঘটনার পর সেখানে উৎসুক জনতার ভিড় ছিল, ছিলেন রাজনৈতিক নেতা, কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। যে যাঁর মতো করে লাইভ করেছেন, ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করেছেন। সে বিষয়টি উল্লেখ করে মাসুদ হাসান লিখেছেন, ‘গতকাল মাইলস্টোন স্কুলের ওপর বিমান দুর্ঘটনার খবর শোনার পর থেকে বলতে গেলে অসাড় হয়ে ছিলাম—শোক অনুভব করার ক্ষমতা নেই এমন। উৎসুক জনতা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, ব‍্যবসায়ী—কে কী করেছে সেখানে, আমরা কমবেশি সবাই দেখেছি। তার পর থেকেই মনে হচ্ছিল, আমরা আসলে আর মানুষ নেই, মানুষ নামের একেকটা খোলস মাত্র! প্রকৃতি হয়তো এই নিষ্পাপ ফুটফুটে বাচ্চাগুলোকে আমাদের পাপের শাস্তি দিয়ে দেখতে চাইল—তাতেও আমাদের কোনো শোকতাপ-বিকার হয় কি না! না, আমাদের কিছুই হয়নি, আমরা যে যার কনটেন্ট তৈরি নিয়ে ব‍্যস্ত ছিলাম। যে কারণে নিউজফিডে মেকি শোক আর কনটেন্টের ছড়াছড়ি।’

এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে, তখন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর ভর্ৎসনা প্রকাশ করেন উল্লেখ করে মাসুদ হাসান লিখেছেন, ‘এমন ঘটনা যখন ঘটে, তখন এই নির্বিকার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আমরা ঘৃণাভরে ভর্ৎসনা করি।’ মাসুদ হাসান জানালেন, এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে তাঁর মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন জেগেছে। সেসব প্রসঙ্গে লিখলেন, ‘মানুষগুলো কি এমনিতেই এমন নির্দয়–নির্বিকার হয়েছে, নাকি তাঁদের এমনটা বানিয়ে ফেলা হয়েছে? কনটেন্ট ক্রিয়েশন স্বল্প পরিশ্রমে দ্রুত পরিচিতি পাওয়া এবং সহজ উপার্জনের জনপ্রিয়তম এক মাধ‍্যম। এই ব‍্যবস্থাপনা তো আর সাধারণ মানুষের তৈরি না। পুঁজিবাদের এই ভয়ানক আবিষ্কারে প্রতিনিয়ত করপোরেট লগ্নি বাড়ছে।’

সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে কী কী হচ্ছে তা নিয়েও নিজের মতামত তুলে ধরেছেন মাসুদ হাসান। লিখেছেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে দেশের মন্ত্রী পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে! দেশের বাইরে বসে দেশের রাজনীতিতে জট পাকিয়ে দেওয়া যাচ্ছে!’ তাঁর মতে, রাজনীতির মাঠ, ব্যবসা, হাসপাতাল, মাছের বাজার, আইন-বিচার, সালিস সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে সোশ‍্যাল মিডিয়া। ‘একটা কাজের মিটিং পর্যন্ত করতে গেলে ক্লায়েন্ট সোশ‍্যাল মিডিয়াতে ফলোয়ারের সংখ্যা দেখে নেয়। জ্ঞান, বিদ্যা, শিক্ষাগত যোগ‍্যতা, কর্মদক্ষতা—কিছুই মুখ্য নয়, মুখ্য হলো ফলোয়ার সংখ্যা’ মন্তব্য করে ফেসবুক পোস্টের একেবারে শেষে মাসুদ হাসান লিখেছেন, ‘সাধারণ মানুষের অসংবেদনশীলতা দেখে আমরা ভর্ৎসনা করি, গালি দিই। কিন্তু আমরা কি কখনো কোনো করপোরেট প্রভুকে গালি দিয়ে বলেছি—একজন অধ‍্যাপকের থেকে একজন ইনফ্লুয়েন্সার কেন বেশি প্রভাবশালী? একজন খাদ‍্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞের থেকে একজন ফুড ভ্লগার কেন বেশি গ্রহণযোগ্য? সুরেলা কণ্ঠের সংগীতশিল্পীর থেকে কেন বেসুরো টিকটকার বেশি সফল? এই পরিস্থিতি কিন্তু আমার–আপনার সৃষ্টি নয়, এ দায় কেবল পুঁজিবাদের, এ দায় স্রেফ পুঁজিবাদী দানবদের, এ দায় পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার। আর রাজনীতিবিদদের অমানুষ-পিশাচ হওয়ার দায় কেবলমাত্র তার সীমাহীন লোভের। এই দেশের রাজনীতি বিশ্বের নিকৃষ্টতম রাজনীতি। এরা যেই যুগেই জন্মাত—অমানুষ, লোভী, মিথ্যুক, প্রতারক হয়েই জন্মাত।’

পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের নতুন একটি ছবি মুক্তির অপেক্ষায় আছে। ‘বনলতা সেন’ ছবির শুটিং, ডাবিং, সম্পাদনা, রংবিন্যাস, আবহসংগীতের কাজ—সবই শেষ। শিগগিরই ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডেও জমা পড়বে। পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল জানালেন, এখন পর্যন্ত যে পরিকল্পনা, তাতে আগামী সেপ্টেম্বরে ছবিটি মুক্তি দিতে চান। সেভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের এটি দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। নাটক ও বিজ্ঞাপনচিত্র দিয়ে হাত পাকানোর পর তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’। ছবিটি ২০২০ সালের শেষ দিকে মুক্তি পায়। ‘বনলতা সেন’ সরকারি অনুদানের ছবি। ছবির পরিচালক উজ্জ্বল প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুটিংয়ে যা প্রয়োজন, তা–ই করেছি। গল্পে কোনো আপস করিনি। তাই শুটিং শেষ করতে আট মাসের মতো সময় লেগেছে।’

ছবিটি নিয়ে নির্মাতা বলেন, ‘আমার আফসোস—উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, এডগার অ্যালান পো কিংবা টি এস এলিয়টের থেকে জীবনানন্দ দাশ কোনো অংশে কম নন। এত দিনে গোটা বিশ্বের তাঁকে জানা উচিত ছিল। আমি জীবনে প্রথম এমন বিস্ময়কর এক কবিকে ট্রিবিউট করার সুযোগ পেয়েছি। কেবল আমি কেন, গোটা বাঙালি জাতির জন‍্য জীবনানন্দ দাশ উদ্‌যাপনের একটা বিরাট সুযোগ। এই উদ্‌যাপন জাতীয় পর্যায়ের হওয়া উচিত। কারণ, এ বছরই ছিল কবি জীবনানন্দ দাশের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। আমি অপেক্ষায় আছি কবে সেই পরিবেশ তৈরি হয়, যখন এমন এক কবিকে উদ্‌যাপন করে আমরা ধন‍্য হব।’

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। ছবি : পরিচালকের ফেসবুক থেকে

দক্ষিণ ও পশ্চিম গাজায় ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরু

ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের ২১তম মাসে এসে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ ও পশ্চিম গাজায় স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সোমবার (২১ জুলাই) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক ও সেনাবাহিনী শহরে ঢুকে পড়ে, যেখানে এর আগে কখনো স্থল অভিযানের ঘটনা ঘটেনি। ইসরায়েলি গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সিএনএনের খবরে বলা হয়, ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, ইসরায়েল আর্মি রেডিও জানিয়েছে, গোতানি ব্রিগেড নামের একটি ইউনিট দেইর আল-বালাহর দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করেছে। এর আগে রাতভর ওই এলাকায় বিমান হামলা ও আর্টিলারি গোলাবর্ষণ চালানো হয়।

প্রাথমিকভাবে একটি মাত্র ব্রিগেড এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে বলে জানা গেছে এবং এই অভিযান কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযানের আগের দিন রোববার, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা খালি করতে ফিলিস্তিনিদের নির্দেশ দেয় এবং দেইর আল-বালাহ শহরের আকাশে হাজার হাজার সতর্কবার্তা ছুড়ে দেয়। তবে কোথায় সরে যেতে হবে সে বিষয়ে কোনো বিকল্প পথ বা আশ্রয়স্থলের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র জানান, ‘এই এলাকায় শত্রুদের ক্ষমতা এবং সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংসে জোরালো অভিযান চলছে এবং ইসরায়েল এমন জায়গাগুলোতেও প্রবেশ করছে, যেখানে আগে কখনো অভিযান পরিচালিত হয়নি।’

ইসরায়েলি গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, এর আগে দেইর আল-বালাহে স্থল অভিযান নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে দ্বিধা ছিল। ধারণা করা হয়, সেখানে এখনো জীবিত কিছু ইসরায়েলি জিম্মি থাকতে পারে, যাদের জীবন হুমকিতে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই এই এলাকা এড়িয়ে চলছিল সেনাবাহিনী।

জিম্মিদের পরিবারের একটি ফোরাম সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এই অভিযানে উদ্বিগ্ন এবং সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে। দেইর আল-বালাহ অভিযানে জিম্মিদের জীবনের ঝুঁকি কতটা বিবেচনায় রাখা হয়েছে, তা জানতে চান তারা।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তাকারী সংস্থা এমএপি জানিয়েছে, ইসরায়েল সোমবার সকালে দেইর আল-বালাহ এলাকায় স্থল ও বিমান হামলা শুরু করে। সংস্থার গাজা কার্যালয়ের মুখপাত্র মাই এলাওয়াওদা জানান, অবস্থা চরম সংকটজনক। আমাদের অফিসের চারপাশে গোলাবর্ষণ চলছে, মাত্র ৪০০ মিটার দূরে সামরিক যান মোতায়েন রয়েছে।

সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেন পালিয়ে আসা কিছু বাসিন্দা। কেউ বলেন, ‘আমরা বিস্মিত হয়ে দেখি, ট্যাঙ্কগুলো সরাসরি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কোনো পূর্বাভাস ছিল না।’ চার সন্তান হারানো এক ফিলিস্তিনি মা বলেন, ‘আমি এরই মধ্যে তিনবার গৃহচ্যুত হয়েছি। আজ আবার নতুন করে শুরু।’

অন্য এক বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু আমুস বলেন, ‘রাতভর গোলাবর্ষণ আর বোমা হামলা হয়েছে আমাদের ওপর। তারা শুধু বলেছে, চলে যাও, কিন্তু কোথায় যাব?’

আত্তেফ আবু মুসা নামের এক বাসিন্দা জানান, ‘এই তাঁবুটি আমি ১৩ বার খুলে আবার গুটিয়েছি। আজ রাতটা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর।’ আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা শুধু গায়ের কাপড় পরে পালিয়েছি। ক্ষুধা, অনাহার, হত্যা, গৃহচ্যুতি—আমরা আর পারছি না। আমাদের বাচ্চারা আমাদের চোখের সামনে মরছে। এটা আর সহ্য হচ্ছে না।’

জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচআর জানিয়েছে, ইসরায়েলের নতুন করে জারি করা সরে যাওয়ার নির্দেশনা গাজার মানুষের টিকে থাকার যেটুকু উপায় ছিল, তা আরও একবার ধ্বংস করে দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নির্দেশনার সময় দেইর আল-বালাহ এলাকায় প্রায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ ছিলেন, যাদের অনেকেই আগে থেকেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিল।

এই অঞ্চলে জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার মানবিক গুদাম, চিকিৎসা কেন্দ্র ও পানি সরবরাহ স্থাপনাও রয়েছে, যা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করে সংস্থাটি।

মধ্য গাজায় ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক। ছবি : সংগৃহীত
মধ্য গাজায় ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক। ছবি : সংগৃহীত


স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত: সুইডেনের মুরগি বনাম বাংলাদেশের মানুষ by আমিনুল ইসলাম

ঢাকার উত্তরায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান মাইলস্টোন স্কুল ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। এ ঘটনায় আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে সুইডেনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ছে। সালটা ২০০৬ কিংবা ২০০৭ হবে।

বাংলাদেশ থেকে সুইডেনের বিখ্যাত লুন্ড ইউনিভার্সিটিতে এশিয়ান স্টাডিজে মাস্টার্স করতে গিয়েছি। এয়ারপোর্ট থেকে নেমে জেব্রা ক্রসিংয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় দেখি, গাড়িগুলো সব থেমে গেছে। আমিও দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পর পার হব। কিন্তু হায়! গাড়িগুলো সব দাঁড়িয়েই আছে।

হঠাৎ একজন গাড়ি থেকে নেমে বলেন: ‘তুমি বোধ করি এখানে নতুন এসেছ। এখানে জেব্রা ক্রসিংয়ে মানুষ আগে। তুমি পার হওয়ার পরই আমরা যাব।’

সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম মানুষ হওয়ার মূল্য কত। তবে আমার বোঝার তখনো অনেক বাকি। একদিন পত্রিকা হাতে নিয়ে একটা খবরের শিরোনাম দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! শিরোনাম বলছে, ‘সুইডেনের বিমানবাহিনী একজন মুরগির খামারির কাছে ক্ষমা চেয়েছে’। শিরোনাম দেখে পড়ার ইচ্ছা হলো।

বিস্তারিত পড়ে যা বুঝলাম, সেটা হচ্ছে, বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণরত বিমানগুলো মুরগির খামারের খুব নিচ দিয়ে উড়ে গেছে। এতে যে বিকট শব্দ হয়েছে, তাতে কিছু মুরগি অন্য রকম আচরণ করতে শুরু করেছে। খামারি ভদ্রলোক মুরগিগুলোকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়েছেন। চিকিৎসক নাকি বলেছেন, বিকট শব্দের কারণেই ওরা এমন করছে!

খামারি বেচারা বিমানবাহিনীর নামে মামলা করে দিয়েছেন! কারণ, ওই এলাকায় এত নিচ দিয়ে বিমান উড়ে যাওয়ার কোনো বিধান ছিল না। শেষমেশ সুইডেনের বিমানবাহিনী তাঁকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে এবং ক্ষমা চেয়েছে। তো, এই হচ্ছে সুইডেনের মানবাধিকার। সামান্য কিছু মুরগি অন্য রকম আচরণ শুরু করেছে। এ জন্য পুরো বিমানবাহিনী একজন খামারির কাছে ক্ষমা চেয়েছে।

আমরা কি এটা চিন্তাও করতে পারি? কোনো খামারির কি সাহস হবে একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা করে দেওয়া? খামারির কথা বলছি কেন; দেশের কোনো নাগরিকেরই কি এই সাহস হবে?

ঢাকাকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। এই শহরের ওপর দিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণরত বিমান কেন উড়বে? দেশে কি আর কোনো জায়গা ছিল না? প্রশিক্ষণ যদি নিতেই হয়, অনেক ফাঁকা জায়গা আছে, নদী-নালা, খাল-বিল আছে; কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা আছে। ঢাকায় কেন?

তা ছাড়া এর মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে যে এই বিমানগুলো অনেক পুরোনো। এমন বিমান আকাশে থাকারই কথা না। অথচ সেই বিমান দিয়ে চলছে প্রশিক্ষণ! এই যে একটা ঘটনা ঘটে গেছে; এই লেখা যখন লিখছি, শতাধিক বাচ্চা আগুনে পুড়ে মেডিকেলে কাতরাচ্ছে। এমন পরিস্থিতির জন্য আমরা আসলে কতটা প্রস্তুত?

উৎসুক মানুষের ভিড় আমরা দেখতে পেয়েছি। রাজনীতিবিদেরা এমন একটা পরিস্থিতিতেও হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে ভিড় আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁরা কি ভিড় যাতে কম হয়; সেই চেষ্টা করতে পারতেন না? আর এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কোনো প্রস্তুতি কি আমাদের নেই?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, অনেকগুলো মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে, যাদের আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না। যারা এর জন্য দায়ী তারা কখনো ক্ষমা চাইবে? এই সংস্কৃতি কি আমাদের আদৌ তৈরি হয়েছে?

সুইডেনে ও বাংলাদেশের মাঝে কোনো তুলনাই চলে না। পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলোর একটি হচ্ছে সুইডেন। দেশটির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার একটি দরিদ্র দেশের কোনো তুলনাই হয় না। কিন্তু বাংলাদেশ নামক এই জনপদের নাগরিকেরা তো মানুষ। মুরগি কিংবা পশুপাখি নয়। সামান্য মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্যতাও কি এই জনপদের মানুষের নেই? নাকি বেঘোরে মৃত্যুকেই মেনে নিতে হবে দিনের পর দিন?

* ড. আমিনুল ইসলাম, প্রভাষক, এস্তোনিয়ান এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইউনিভার্সিটি
- tutul_ruk@yahoo.com

স্কুলভবনে বিধ্বস্ত হয় প্রশিক্ষণ বিমান। উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন বাহিনীর তৎপরতা। মঙ্গলবার, উত্তরা।
স্কুলভবনে বিধ্বস্ত হয় প্রশিক্ষণ বিমান। উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন বাহিনীর তৎপরতা। মঙ্গলবার, উত্তরা। ছবি: সাজিদ হোসেন

রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেলে বিতর্কিত গ্যাস সম্পদের মালিকানা পাবে ফিলিস্তিন

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে গাজা উপকূলবর্তী গ্যাসক্ষেত্র ‘গাজা মেরিন’-এর মালিকানা এবং সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনের পূর্ণ অধিকার পাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। এমনটাই বলছেন খনিজ সম্পদ বিশেষজ্ঞ মাইকেল ব্যারন।

ব্যারনের দাবি, বর্তমান বাজারদরে গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্র থেকে অন্তত ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয়ের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর গড়ে ১০ কোটি ডলার রাজস্ব পেতে পারে, যা ১৫ বছর ধরে চলতে পারে।

ব্যারন বলেন, ‘এ আয়ে ফিলিস্তিন কাতার বা সিঙ্গাপুরে পরিণত হবে না ঠিক, কিন্তু এটা হবে তাদের নিজেদের আয়। এতে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পাবে তারা।’

গাজা উপকূলবর্তী গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে বিতর্ক চলছে। মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে অনুসন্ধান কাজ দীর্ঘ সময় ধরে থেমে আছে।

ফিলিস্তিনপন্থী মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ইতালির রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইএনআইকে একটি সতর্কীকরণ চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি জ্বালানি মন্ত্রণালয় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য যে অঞ্চলটিকে ‘জোন জি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার প্রায় ৬২ শতাংশই ফিলিস্তিনের দাবিকৃত সামুদ্রিক জলসীমায় পড়ে। ইসরায়েলের জ্বালানি মন্ত্রণালয় সেখানে গ্যাস অনুসন্ধানের ছয়টি লাইসেন্স দিয়েছিল।

চিঠিতে আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ইসরায়েল সেখানে গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো বৈধ লাইসেন্স দিতে পারে না।

২০১৫ সালে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনে (আনক্লজ) স্বাক্ষর করে ফিলিস্তিন। ২০১৯ সালে তারা তাদের সমুদ্রসীমা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে এবং এ–সংক্রান্ত বিস্তারিত দাবি উপস্থাপন করে। ইসরায়েল এ কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।

ব্যারন বলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেলে, বিশেষ করে যেসব দেশের এখতিয়ারে বড় তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিবন্ধিত, সেসব দেশ যদি স্বীকৃত দেয়, তবে আইনি অনিশ্চয়তা কার্যত শেষ হয়ে যাবে। এতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একটি নিরাপদ নতুন আয়ের উৎস পাবে এবং নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। এ জন্য তাদের ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না।

ওই আইনি চিঠির পর ইএনআই ইতালিতে চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠীগুলোর কাছে জানিয়েছে, এখনো কোনো লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি। কোনো অনুসন্ধান কাজও চলছে না।

গাজা উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রসীমা বরাবর প্রায় ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) দৈর্ঘ্যের একটি সামুদ্রিক গ্যাস পাইপলাইন ইসরায়েলের আশকেলন থেকে মিসরের আরিশ পর্যন্ত বিস্তৃত। সেখানে (আরিশ) গ্যাস তরলীকরণ করে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।

গ্লোবাল উইটনেস নামের একটি সংস্থা দাবি করেছে, বেআইনিভাবে ফিলিস্তিনের জলসীমার ওপর পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কোনো রাজস্ব পায় না।

ব্যারন বলেন, ‘১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে তাদের জলসীমা, ভূগর্ভস্থ সম্পদ, আইন প্রণয়ন এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও লাইসেন্স প্রদানের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। প্রাকৃতিক সম্পদে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইয়াসির আরাফাতের রাষ্ট্র বিনির্মাণ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফিলিস্তিনি সম্পদে ইসরায়েলি শোষণ ছিল দুই অঞ্চলের মধ্যে চলমান সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

২০০০ সালে গাজা উপকূলে প্রথম প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি ছিল ব্রিটিশ গ্যাসের অংশীদারত্বে পরিচালিত একটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল গাজা উপত্যকার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ–সংকট দূর করা হবে।

২০ বছরের বেশি সময় ধরে গাজা মেরিন থেকে ফিলিস্তিনিরা এক ফোঁটা গ্যাসও তুলতে পারেননি। ব্যারন বলেন, এ প্রকল্পের ভাগ্যই আসলে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতির প্রতিচ্ছবি। একদিকে তারা চায় ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল থাকুক, একই সঙ্গে চেষ্টা করে তাদের আলাদা করে রাখতে।

প্রকল্পের প্রথম বড় সমস্যা ছিল, কারা এই গ্যাস উত্তোলনের লাইসেন্স দিতে পারবে, সে বিষয়। ফিলিস্তিন কোনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র নয়। তাই তাদের হাতে স্পষ্ট কোনো আইনি অধিকার ছিল না। ইসরায়েলি আদালত বলেছিল, গাজার উপকূলীয় জলসীমা আসলে ‘নো-ম্যানস ওয়াটার’ অর্থাৎ এটির মালিকানা কারও নয়।

অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জলসীমার অধিকার স্বীকার করা হলেও সেখানে স্পষ্টভাবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উল্লেখ ছিল না; যা সাধারণত উপকূল থেকে ২০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। চুক্তিটি ছিল শুধু একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। ফলে সমুদ্রসীমার স্পষ্ট সীমানা নির্ধারিত হয়নি।

সাধারণভাবে উপকূল থেকে ১২ বা ২০ মাইল পর্যন্তকে বলা হয় ‘টেরিটরিয়াল ওয়াটার’। গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্র গাজার উপকূল থেকে ২০ মাইল দূরে অবস্থিত। ইসরায়েলের দাবি, গ্যাসক্ষেত্রটি ফিলিস্তিনের অধিকার নয়; বরং তাদের দেওয়া ইসরায়েলের ‘উপহার’।

পরিস্থিতির অবনতি ঘটে ২০০৭ সালে হামাস গাজা দখল করার পর। এরপর ইসরায়েল প্রকল্পটি আটকে দেয় এবং ব্রিটিশ গ্যাস কোম্পানি প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।
২০২৩ সালে ইসরায়েল মিসরের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ইগ্যাসকে গাজা মেরিন উন্নয়নের অনুমতি দিলেও গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি আবার থেমে যায়।

সম্প্রতি জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন উপস্থাপনকারী ফ্রানচেসকা আলবানিজ বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের মতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখল অবৈধ। ফলে যেকোনো বেসরকারি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এ দখলকৃত অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে বা ব্যবসা চালিয়ে গেলে তা বৈশ্বিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আলবানিজ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে এমন পদক্ষেপে অংশ নিতে হবে। ইসরায়েল অবশ্য এই দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

গাজায় একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র
গাজায় একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গাজা থেকে ইউক্রেন—যে কারণে এত যুদ্ধ by সাইমন টিসডাল

বর্তমানে বড় বড় সংঘাত বন্ধ করে শান্তি আনতে যেমন মরিয়া চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তেমনি এসব চেষ্টাকে প্রায় বৃথাও হতে দেখা যাচ্ছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি, শান্তি আলোচনা কিংবা সাময়িক বিরতির কথা শেষ পর্যন্ত কান্না আর হতাশায় গড়াচ্ছে।

ইউক্রেনে যুদ্ধ চতুর্থ বছরে পড়েছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তির জন্য ৫০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন; তবে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার তেমন কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।

ওদিকে সিরিয়ায় আবার নতুন করে আগুন জ্বলছে। সুদানের ভয়াবহতাও থামছে না। রাষ্ট্রভিত্তিক বা গোষ্ঠীভিত্তিক সংঘাত শুধু গত বছরেই ৩৬টি দেশের ৬১টি জায়গাতে পৌঁছেছিল। এই সংখ্যা ১৯৪৬ সালের পর সর্বোচ্চ। অবস্থা যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, চলতি বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

যুদ্ধাপরাধ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বর্বরতার মাত্রা ও বিস্তৃতি এত বেশি হয়ে উঠেছে যে তা এখন প্রায় স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষদের ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করা, শিশুদের হত্যা করা, পঙ্গু করা, অপহরণ করা, না খাইয়ে রাখা, যৌন সহিংসতা চালানো, নির্যাতন ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি—সবকিছুই এখন যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

গত সপ্তাহে গাজায় পানি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের ইসরায়েলি সেনারা গুলি করে মেরেছেন। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। অথচ এমন দৃশ্য এখন জলভাত হয়ে গেছে।

বাইবেলের সেন্ট ম্যাথিউ বলেছিলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারীরা ধন্য।’ কিন্তু আজকের দুনিয়ায় নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর খুব অভাব। সবাই মনে করে, নিরপরাধ মানুষদের হত্যা বা গণহত্যা অন্যায়। তারপরও এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটেই চলেছে?

এ প্রশ্নটাই রাফাহ, কিয়েভ ও দারফুরে নিহত ব্যক্তিদের মা–বাবা ও স্বজনেরা জাতিসংঘ, মসজিদ-মন্দির, পাব-পার্লামেন্ট, রাস্তাঘাট কিংবা গ্লাস্টনবারির মঞ্চে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করছেন: কেন? কেন?

মোরাল রিলেটিভিজম বা নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদে এর একটি ব্যাখ্যা রয়েছে।

সত্যি কথা হলো, সবাই আসলে একমত নয়। কোনো একটি কাজ একদলের কাছে সম্পূর্ণ নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হলেও অন্য দলের কাছে তা কিছুটা গ্রহণযোগ্য বা ব্যাখ্যাযোগ্য হতে পারে। এটি মানবেতিহাসে বহুবার ঘটেছে।

তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আগে থেকেই বিভক্ত হয়ে থাকা এই পৃথিবী এখন নৈতিক ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও মারাত্মকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মার্কিন লেখক ডেভিড ব্রুকস নৈতিকতার এই অভাবকে ‘পারমানেন্ট মোরাল অর্ডার’ বা স্থায়ী নৈতিক ব্যবস্থার অভাব বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আন্তর্জাতিক আইনকানুনভিত্তিক শৃঙ্খলা যেভাবে ভেঙে পড়ছে, ঠিক সেভাবেই এই নৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়েছে। কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালা না থাকায় দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান করাটাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ডেভিড ব্রুকস বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক সময়ে আছি, যেখানে কোনো মতকে সঠিক বা ভুল বলে চিহ্নিত করার কোনো নিরপেক্ষ মানদণ্ড নেই। ফলে জনপরিসরে বিতর্ক কখনোই থামে না, বরং তা ক্রমেই আরও রাগী ও বিভাজনমূলক হয়ে ওঠে।’ ফলে যা থাকে, তা হলো বলপ্রয়োগ ও প্রতারণা।

এই বিভ্রান্তিকর নৈতিকতা সবচেয়ে ভালোভাবে যাঁর মধ্যে প্রতিফলিত হয়, তিনি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি একজন প্রতারণার মাস্টার ও চাপ প্রয়োগের নাটের গুরু। তিনি মনে করেন, তাঁর এ বছরই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত। অথচ কিছুদিন আগেই তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে বোমাবর্ষণ করেছেন, যার ফলে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, যদিও সেটি অবৈধ আগ্রাসন ছিল, তবু সেটি ন্যায্য, কারণ ওই হামলার মাধ্যমেই তিনি সেই ‘শান্তি’ ফিরিয়ে এনেছেন (যা তিনি নিজেই প্রথমে নষ্ট করেছিলেন)।

একটা দুনিয়া যেখানে যুদ্ধই যেন স্বাভাবিক বাস্তবতা, সেখানে আলফ্রেড নোবেলের শান্তি পুরস্কার দিনকে দিন যেন কেবল একটা ঠাট্টামশকরায় পরিণত হচ্ছে। এই পুরস্কার রাজনৈতিক হাতিয়ারেও পরিণত হচ্ছে। কোনো কিছু না করেই ওবামা ২০০৯ সালে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। এখন যদি ট্রাম্প আগামী চার বছর ‘কিছু না করেন’, তা–ও বোধ হয় অনেক বেশি শান্তির হবে।

কিন্তু তার চেয়েও দুঃখজনক, ট্রাম্প মনোনয়ন পেয়েছেন ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর কাছ থেকে, যে নেতানিয়াহু নিজেই শান্তি ও ন্যায়ের চরম প্রতিপক্ষ। এসব না করে বরং শান্তি পুরস্কার তুলে দিয়ে একটা ‘সালতানাতের বর্ষসেরা যুদ্ধনেতা’ পুরস্কার চালু করলেই ভালো হয়। বিজয়ীর মাথার ওপর পুরস্কার নয়, বরং পুরস্কারমূল্য রাখলেই হয়।

যেকোনো গির্জা বা মসজিদের নেতাকেই জিজ্ঞাসা করুন, তিনি বলবেন, আজকের দুনিয়ায় শান্তির পক্ষে নৈতিক যুক্তি তুলে ধরা একটা ঝুঁকির কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল মনে হয়, নৈতিকতা শব্দটাই যেন নোংরা কিছু। এ যেন একধরনের ভালো ভাবনার কিছু নয়, বরং নৈতিকতা যেন আবেগ, সুবিধাবাদিতা আর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। না হলে আমেরিকার এত মানুষ কীভাবে ট্রাম্পের নৈতিক দুর্নীতিগুলো দেখেও কিছু বলে না? সামাজিক দায়িত্ববোধ নয়, এখন সামাজিক পরিচয়ই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউক্রেনে পুতিনের চালানো ধ্বংসযজ্ঞের দিকে নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে থাকা রুশ জনগণের একটা বড় অংশও একই রকম নৈতিক শূন্যতায় ভুগছে। যারা সাহস করে প্রশ্ন তুলতে চায়, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। অন্যরা সরকার–নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মিথ্যা গল্পে বিশ্বাস করে। অধিকাংশ মানুষ জানেই না যে তাদের নামেই কী ভয়াবহ অপরাধ ঘটে চলেছে।

একদিন যখন এই যুদ্ধ শেষ হবে, তখন অনেক রুশ নাগরিক হয়তো বলবে, ‘আমরা জানতাম না।’ এই ‘জানতাম না’ ধরনের উদাসীনতা আর মিথ্যার মধ্য দিয়েই নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনে শান্তির সুযোগ নষ্ট করার ফলে ইসরায়েলকে অনেক বড় নৈতিক মূল্য চুকাতে হচ্ছে। দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। তাদের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ আবার বেড়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, গাজার সেনা অভিযানে যখন ৫৮ হাজার মরদেহ পড়ে থাকে, তখন এত ইসরায়েলি কীভাবে চোখ বুজে থাকে? কেউ কেউ বলেন, যদি শেষ কয়েকজন ইসরায়েলি জিম্মিকে ছেড়ে দেওয়া হতো, তাহলে এ সবকিছুর অবসান হতো। আবার কেউ বলেন, সব ফিলিস্তিনিই হামাস। কেউ কেউ আরও ভয়ংকর কথা বলেন, ‘ফিলিস্তিন বলে কিছু নেই, সব ওদের বানানো।’ কেউ আবার গাজার ২০ লাখ মানুষকে এক বিশাল বন্দিশিবিরে পুরে ফেলার প্রস্তাব দেন।

অবশ্য অনেক ইসরায়েলিও এসবের বিরুদ্ধে। তাঁরা শান্তি চান। কিন্তু সরকারের নীতি বদলাতে না পারার কারণ একদিকে রাজনৈতিক ব্যর্থতা হলেও আরেক দিকে নিঃসন্দেহে নৈতিক ব্যর্থতা। সেই বিবেচনায় যে আমেরিকান, রুশ, ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় জনগণ মুখ খোলে না, ঘটনা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে কিংবা অমানবিকতাকে ‘রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে’ মার্জনা করে, তাদের সবাই এসব বর্বরতার জন্য দায়ী।

কেউ কেউ আবার টমাস আকুইনাসের যুক্তি টেনে বলেন, ‘যদি এটি ন্যায়যুদ্ধ হয়, তাহলে হত্যা ও ধ্বংস নৈতিক দিক থেকে মেনে নেওয়া যায়।’

আধুনিক সময়ের এই ব্যর্থতা, এই নিজস্ব সুবিধামাফিক বানানো নৈতিকতা, এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া—এর সবই বিপজ্জনক। কিন্তু এটিকে পাল্টানো সম্ভব।

এখনো আমাদের কাছে কিছু সর্বজনগ্রাহ্য নীতি আছে। জেনেভা কনভেনশন, আন্তর্জাতিক আইন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক চুক্তি—এসব আমাদের এখনো পথ দেখাতে পারে। আমাদের উচিত এসবকে সম্মান করা, মজবুত করা। এগুলো কখনো কখনো অস্বস্তিকর সত্য হলেও এদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

প্রতিদিনের সাধারণ জীবনে মানুষ তার নিজের মতো করে নৈতিক অবস্থান ঠিক করতেই পারে। কিন্তু বড় সংঘাত থামানো এবং কোটি কোটি মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা—এটা নিছক সদিচ্ছার বিষয় নয়, বরং এটি এক নৈতিক দায়িত্ব। আর এ দায়িত্ব পালনে সবাইকে একজোট হয়ে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

এ পথেই আছে শান্তি। এ পথেই আছে মুক্তি।

- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* সাইমন টিসডাল, গার্ডিয়ান–এর পররাষ্ট্র বিষয়াদির বিশ্লেষক

সিরিয়াতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে
সিরিয়াতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি : রয়টার্স

কেন বাহে আমাক মফিজ কওয়া নাগে by সাদ কাশেম

অনেক দিন ধরেই ‘মফিজ’ শব্দটি একটি অবমাননাকর উপাধি হিসেবে রংপুর অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এই অপমানজনক উপাধি মূলত দেশের উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত ও অবহেলিত জীবনের প্রতি অবজ্ঞার প্রতীক। বর্তমানে ‘মফিজ’ শব্দটি সাধারণত বোকার প্রতিরূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ শব্দটির পেছনে আছে একটি জাতীয় ইতিহাসের অংশ, যেখানে দারিদ্র্য ও সংগ্রামকে অঞ্চলভিত্তিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত করা হয়েছে।

এই শব্দের প্রবল উপস্থিতি রংপুর অঞ্চলের মানুষের প্রতি একধরনের স্থায়ী অবজ্ঞা তৈরি করে, যা বাস্তবতার কাঠামোগত বিশ্লেষণ না করে শুধুই বিদ্রূপের আশ্রয় নেয়। এ প্রবণতা একটি দীর্ঘ ইতিহাসকে আড়াল করে দেয়—ঐতিহাসিক সেই শর্তগুলোকে, যা ঔপনিবেশিক আমল থেকেই রংপুরকে দুর্ভোগ ও বঞ্চনার পথে ঠেলে দিয়েছে।

রাজনীতির ভাষায় মফিজ

‘মফিজ’ শব্দের ব্যবহার কেবল সামাজিক তামাশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাজনীতির মঞ্চেও তার প্রবেশ ঘটেছে। ২০২৩ সালে একটি জনসভায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর উত্তরাঞ্চলের পুরোনো পরিকাঠামোর দুরবস্থা তুলে ধরেন এবং সাবেক বিএনপি মন্ত্রী এহসানুল হক মিলনকে অভিযুক্ত করেন উত্তরবাসীকে ‘মফিজ’ আখ্যা দেওয়ার জন্য। নূর নিজ দল আওয়ামী লীগের উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের প্রতিদিনের ১৮টি ফ্লাইটের কথা তুলে ধরেন এবং ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘এখন দেশে একটাই মফিজ আছে, সেটা হলো বিএনপি।’

এ ধরনের বক্তব্য ‘মফিজ’ শব্দকে রাজনৈতিক অপদার্থতার প্রতীক হিসেবে স্থাপন করে। অথচ এ ধরনের চটজলদি ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক কৌতুক ছাড়িয়ে সামাজিক প্রান্তিকতার প্রতিও একরকম অবহেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

পানির জমিন: চিলমারীর বাস্তবতা

চিলমারী বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্র অঞ্চল। এখানে ৭৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এই অঞ্চলে বর্ষাকালে তীব্র বন্যা ও ভাঙন বাসিন্দাদের বারবার বাস্তুচ্যুত করে। তারা চরের বাসিন্দা—চরদ্বীপে ঘর বাঁধে, আবার নদী তা ভেঙে নিয়ে যায়। এই নিরবচ্ছিন্ন বাস্তুচ্যুতি আয়রোজগারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে বাধা দেয়।

বর্ষাকালে কাজ থাকে না। অক্টোবর থেকে জুনের মধ্যে যা আয় হয়, তা-ই সারা বছরের জন্য টানতে হয়। আগাম ফসলের পূর্বে দেখা দেয় মঙ্গা—একধরনের মৌসুমি দুর্ভিক্ষ। জীবন চলে ‘হাত-মুখ’ চালিয়ে এবং প্রতিবছর নতুন করে সংগ্রাম শুরু হয়। এই বাস্তবতা অনেক পুরোনো—১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষেও চিলমারীর মানুষ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেই বাসন্তীর ছবি আজও আমাদের চোখে ভাসে।

মফিজ শব্দের উৎস: দুটি আখ্যান

চিলমারী ও ঢাকার চরবাসীর মধ্যে ‘মফিজ’ শব্দটি নিয়ে দুটি গল্প প্রচলিত। প্রথম শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে, যখন একজন উদ্যোক্তা মফিজ চিলমারী থেকে ঢাকাগামী একটি বাস সার্ভিস চালু করেন। এই বাসে করে ঢাকায় কাজ করতে আসতেন অনেক শ্রমিক। তাঁদের হাতে থাকত ‘মফিজ’ সিলযুক্ত একটি চিঠি, যার মাধ্যমে তাঁরা কাজ শেষে আবার ফিরে যেতেন। কালের পরিক্রমায় ‘মফিজ’ হয়ে ওঠে একপ্রকার পরিত্যাজ্য শ্রমিকদের প্রতীক, যাঁদের শুধু কাজের সময় প্রয়োজন, পরে তাঁরা অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু ‘মফিজ’ নামটা টিকে যায়।

দ্বিতীয় একটি সূত্রে জানা যায়, একজন চিলমারীর মফিজ ঢাকায় এসে শহরের বাস্তবতা ও ভাষায় খাপ খাওয়াতে পারেননি। তাঁর সরলতা ও আচরণকে কেন্দ্র করে শহুরে মানুষদের চোখে ‘চরের লোক’ হয়ে ওঠে অজ্ঞ ও সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষ। ফলে ‘মফিজ’ একটি গালমন্দ হয়ে ওঠে, যা আসলে একক জীবনের সংগ্রামের নামকে লজ্জায় রূপান্তর করে।

ঔপনিবেশিক ধারা ও চরবাসীর বহির্ভূতকরণ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন চিলমারীর চরগুলোকে ‘অস্থিতিশীল’, ‘হিংস্র’ ও ‘বেআইনি’ স্থান হিসেবে বর্ণনা করত। ১৯০৭ সালের একটি রিপোর্টে চর অঞ্চলকে বুনো সীমান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা স্থানীয়দের অসৎ বা ধোঁকাবাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ করতেন, এমনকি পথঘাট জিজ্ঞাসার উত্তরে ‘মুই চেঙড়া মানিষ, মুই কী জানু বাবু?’—এই সরল উত্তরকেও তারা ব্যাখ্যা করত অবিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে।

ঔপনিবেশিক প্রশাসন এই অঞ্চলকে শাসনযোগ্য করার জন্য স্থানীয়দের ভীরু, হিংস্র ও নিয়ন্ত্রণহীন রূপে চিত্রিত করেছিল। চরের জমি নিয়ন্ত্রণে রাখতে লাঠিয়াল বাহিনীর ব্যবহার, অভিবাসী ভাটিয়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সন্দেহ এবং চর এলাকাকে অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন—সবকিছুই এই শ্রেণি বিভাজনের অংশ। এসব গঠনমূলক নিপীড়নমূলক চর্চা এখনো আধুনিক রাষ্ট্র ও নাগরিক চেতনায় প্রতিফলিত হচ্ছে।

চরবাসীর পরিচয়ের স্তর ও অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য

চিলমারীর মধ্যেও একটি অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস রয়েছে। ‘কায়েম’ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা ও চর অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে বিভাজন আছে। চর অঞ্চলে আবার ‘বাঙাল’ ও ‘ভাটিয়া’ নামে ভাষা ও সংস্কৃতিভেদে পরিচয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই পার্থক্য সত্ত্বেও তারা একসঙ্গে জীবন যাপন করে, বিয়ে করে এবং একে অন্যের দুর্দশা ভাগ করে নেয়।

মূল ভূখণ্ডে বসবাসরত মানুষেরা এই বিভেদ ধরে রাখে। ‘ভাটিয়া’দের মসলা বেশি খাওয়া, চিৎকার করে কথা বলা বা ‘রোহিঙ্গা’ বলার মতো মন্তব্য এই বৈষম্যকে আরও উসকে দেয়। নদীভাঙনের শিকার মানুষদের অপমান করা যেন একধরনের স্বাভাবিক কথাবার্তার অংশ হয়ে গেছে।

ভাষার মধ্যেই নিহিত থাকে ভবিষ্যতের বীজ

চরবাসী শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়; বরং সাংস্কৃতিকভাবেও ক্রমাগত প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। যাদের আমরা ‘মফিজ’ বলে ডাকি, তারা আসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমি ক্ষয় ও রাষ্ট্রের অবহেলার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে। ‘মফিজ’ শব্দটি একসময় ছিল দৈনন্দিন সংগ্রামের আলামত, আজ তা হয়ে উঠেছে অন্যকে হেয় করার যন্ত্র।

রাজনৈতিক নেতারা যখন এই শব্দ ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ছোট করেন, তখন তা কেবল ব্যক্তিবিদ্বেষ নয়; বরং একটি জাতিগত শ্রেণির প্রতি অসম্মান। মানুষ তাদের ওপর এমনি ক্ষিপ্ত হয়নি; সরকার অনেক গুরুতর সমস্যার মধ্যে বহু ‘অন্য’কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। ‘মফিজ’ শব্দটি একধরনের পরিচয়ের বোধ তৈরি করে, যেখানে ইতিহাস, ভূগোল, ভাষা ও বাস্তবতা একক অপরাধে পরিণত হয়।

শহুরে ভদ্রলোকেরা আবার মাঝেমধ্যে জাতীয় ঐক্যের কথা বলে। আমাদের ভাষায় গরিবকে হেয় করা। আমরা যদি ভাষায় এই অবচেতন শ্রেণি বিভাজন ব্যাপারে সতর্ক না হই, তাহলে সামনের অনুমেয় সবচেয়ে বিপদ কী করে মোকাবিলা হবে? জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন বা প্রান্তিক জীবনের বাস্তবতায় অনেকেই উদ্বাস্তু হবেন, চিলমারীর চরসহ সারা দেশের নিচু জায়গা থেকে বহু লোকের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ঢাকায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের নাম নিয়ে হেয় করলে বিপদের সময় কি জাতীয় ঐক্য থাকবে?

চরবাসীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি এখন আছে, তা শোধরাতে না পারলে ভবিষ্যতের যেকোনো দুর্যোগেও সমাজ একসঙ্গে দাঁড়াতে পারবে না এবং এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমস্যা নয়।

* ড. সাদ কাশেম, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের দ্য স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের লেকচারার
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

কুড়িগ্রামের চরে ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন গাড়িয়ালরা।
কুড়িগ্রামের চরে ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন গাড়িয়ালরা। ছবি: প্রথম আলো

বিভীষিকা, মর্মান্তিক, মর্মন্তুদ: বিমান বিধ্বস্ত

মর্মান্তিক। মর্মন্তুদ। বিভীষিকাময় এক ঘটনা দেখলো দেশ। স্কুল ভবনে অকস্মাৎ আছড়ে পড়লো প্রশিক্ষণ বিমান। বিস্ফোরণ-আগুনে পুড়ে ঝরে গেল অন্তত ২০টি জীবন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে দেড় শতাধিক কচি প্রাণ। পোড়া শরীর নিয়ে শিশুদের বাঁচার আকুতি। আহত সন্তান নিয়ে অভিভাবকদের গগনবিদারী আর্তনাদ। হাসপাতালে হাসপাতালে কান্না আর আহাজারিতে সোমবারের বিকালটা হয়ে উঠেছিল এক বিভীষিকার বিকাল।

গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান এফটি-৭ বিজিআই রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের স্কুল ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এতে বিমানের পাইলটসহ অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের কয়েকজন ছাড়া সবাই স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থী। গুরুতর আহতদের জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেও অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। তিনদিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থান স্মরণে চলমান কর্মসূচি। দেশের ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা এটিই প্রথম। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ট্র্যাজেডির ঘটনাও বিরল।
আহতদের চিকিৎসায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে ছুটে যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা। সেনাবাহিনী প্রধান, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী প্রধানরাও ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা উদ্ধার ও আহতদের চিকিৎসা তৎপরতা তদারকি করেন। স্থানীয় জনসাধারণ ও স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাও উদ্ধার কাজে সহায়তা করেন। হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোক প্রকাশ করা হয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও। আহতদের দেখতে ও চিকিৎসার খোঁজ নিতে বিভিন্ন দলের নেতারা তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ছুটে যান। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর জানিয়েছে, বিমান বাহিনীর ‘এফ-৭ বিজিআই’ফাইটার জেটটি সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়নের ১২ মিনিটের মাথায় বিধ্বস্ত হয়। মাইলস্টোন স্কুলের উত্তরা ক্যাম্পাসের হায়দার আলী ভবন নামের দুইতলা একাডেমিক যে ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হয় সেখানে ইংরেজি মাধ্যমের ক্লাস থ্রি থেকে এইটের শিক্ষার্থীদের কোচিং হতো। এছাড়া প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ক্লাসও নেয়া হতো এ ভবনে। বেলা একটার পর ক্লাস ছুটি হলেও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কোচিংয়ে থেকে যায়। এছাড়া অভিভাবকদেরও অনেকে ভবনের সামনে অবস্থান করছিলেন। বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। অনেক দূর থেকেও সেখানে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। জ্বলন্ত উড়োজাহাজটির আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট। উড়োহাহাজের আগুন ক্লাসরুমে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে আটকা পড়েন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা। দুর্ঘটনার পরপরই স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আশপাশের লোকজন উদ্ধারে ছুটে যান। পরে যুক্ত হয় ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য বাহিনী। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহত ও দগ্ধদের রিকশা, ঠেলাগাড়িসহ বিভিন্ন বাহনে করে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে ঢাকা সিএমএইচ, উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল, কুর্মিটোলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, লুবনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে নেয়া হয় আহতদের।  সেখান থেকে দগ্ধদের অধিকাংশকে পাঠানো হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঘটনাস্থালে সাংবাদিকদের বলেন, তাদের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। আইএসপিআর পরে জানায়, বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ মোট ২০ জন সেখানে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ঢাকা সিএমএইচ-এ নিহত ১২ জন, বার্ন ইনস্টিটিউটে ২ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটালে ২ জন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে ২ জন, ঢাকা মেডিকেলে ১ জন, উত্তরা আধুনিক হসপিটালে ১ জনের লাশ ছিল।  সোমবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, রাজধানীর ৮টি হাসপাতালে ১৭১ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। রাতে জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান জানান, হাসপাতালে আহত ৮৮ জন ভর্তি আছে। এর মধ্যে বার্ন ইনস্টিটিউটে ৪৪ জন আছেন। তাদের ২৫ জনের অবস্থা গুরুতর।

বেলা দুইটার পর দেখা যায়, বিমান দুর্ঘটনার পর উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশন থেকে সারিবদ্ধ হয়ে একের পর এম্বুলেন্স প্রবেশ করছে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, এপিবিএন সদস্যরা সকলে মিলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। এক একটি এমু্বলেন্সে স্কুলের ভেতর থেকে আহতদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ মেডিকেল, সিএমএইএচ, জাতীয় বার্র্নসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। বিমান বিধ্বস্তের খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক স্কুলের সামনে ভিড় করছেন তাদের সন্তানের খোঁজ নিতে। অনেকে ভেতরে ঢুকতে না পেরে স্কুলের গেটের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আরিফুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, আমার মেয়ে সুফিয়া কামাল হলের ৭ তলার ৯ নম্বর রুমে ছিল। ওর এখন কী অবস্থা, কোথায় আছে আমরা কিছুই জানি না। বাংলা ভার্সনের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নিধির খোঁজে আসা তার বড় ভাই বলেন, যেখানে বিমানটা বিধ্বস্ত হয়েছে সেই ভবনেই আমার বোন ক্লাস করছিল। ও বাংলা ভার্সনের ৩য় শ্রেণিতে পরে। ওর রোল ১১১২। নিধি এখনো বাসায় যায়নি। আমরা সবগুলো হাসপাতাল খুঁজে দেখছি কোথাও নেই।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, গেট দিয়ে ঢুকে ভেতরের বাম পাশে বড় মাঠ। মাঠের সামনেই ইংরেজি ভার্সন ও নাইন থেকে ইন্টার মিডিয়েটের শিক্ষার্থীদের জন্য একের পর এক ভবন। সেখানে গতকাল অনেক শিক্ষার্থীরই পরীক্ষা চলছিল। আর মাঠের সামনে হাতের ডান পাশে ‘হায়দার আলী হল’ নামে পুরনো দুই তলা ভবন। যেখানে প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ভার্সনের শিশুদের ক্লাস নেয়া হয়। ক্লাসের পর সেখানেই হয় কোচিং। বিকট শব্দে বিধ্বস্ত হয়ে ওই বিমানটি ঠিক ওই হায়দার আলী হলের সিঁড়ির নিচে ঢুকে যায়। বিমানের আগুনে মুহূর্তেই ভবনে আগুন লেগে যায়। মো. হুমায়ন কবির নামে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, আমি তখন ক্লাস টেনের রুমে ছিলাম। ওদের একটা পরীক্ষা চলছিল। এর মধ্যেই আমাদের ওই বিল্ডিংয়ের ওপরে বিশাল এক বিস্ফোরণের শব্দ হলো। ওই বিস্ফোরণের বিষয়টি জানতে বাইরে এসে দেখি একটি বিমান বাংলা ভার্সনের প্রাথমিকের ভবনের সিঁড়ির নিচে ঢুকে গেছে। তাতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে। ওই সময় ক্লাসরুমে থাকা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্কুলটির পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র দেব মিত্র বলে, প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের সকলের ওই হায়দার আলী ভবনে ক্লাস হয়। অন্যদিনের মতো কালকেও আমরা ক্লাসরুমে ছিলাম। সাড়ে ১২টায় অনেকের ছুটি হয়ে গেলে কেউ কেউ ক্লাসরুমের সামনের দোলনায় ঝুলছিল, বল নিয়ে খেলা করছিল। আর আমরা যারা বৃত্তির কোচিং করবো তারা ক্লাসরুমে বসে টিফিন খাচ্ছিলাম। এরমধ্যে হঠাৎ বিশাল একটা শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখলাম- এটা বিমান যেন সামনের ভবনের ছাদের আঘাত খেয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি আগুন আর আগুন। আমি তখন খাবার ও বইয়ের ব্যাগ ফেলে দৌড়ে মাঠের দিকে চলে যাই। তখন শিক্ষকরা পাশের ভাঙা গেট দিয়ে আমাদের বেরিয়ে যেতে বলেন। আমিও তখন তাদের সঙ্গে বাইরে চলে আসি। পরে রাস্তার একজনের ফোন দিয়ে আমার বাবার নম্বরে ফোন করে জানাই। আকবর নামে স্কুলটির একজন সিকিউরিটি গার্ড বলেন, আমরা স্কুলের ভেতরেই ছিলাম। কিছু বাচ্চার ছুটি হয়েছে, যাদের অভিভাবক নিতে এসেছে তাদের বের করছিলাম। এর মধ্যেই এই ঘটনা। তিনি বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে এত জোরে শব্দ হয়েছে যে, আশপাশের মানুষ পর্যন্ত চলে এসেছে। তিনি বলেন, এই স্কুলের ওপর দিয়ে বিমানের রুট। হযরত শাহ্‌জালাল বিমান বন্দরে ওঠা-নামা করা সকল বিমানই এই স্কুলের ওপর দিয়ে যায়। তাই বিমান নিয়ে আমরা তেমন কোনো কিছু ভাবি না। কিন্তু বিমান যে এইভাবে স্কুলের ওপর পড়বে তা কখনোই চিন্তা করিনি। হাদি আলমাস নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমরা দেখলাম বিমানটি স্কুলের নতুন বিল্ডিয়ের সঙ্গে মনে হলো ধাক্কা খেলো। এরপরই আগুন ধরে আছড়ে পড়ে। তিনি বলেন, এখানে সব ছোট ছোট বাচ্চা। কতো বাচ্চা ছটফট করে চোখের সামনে চলে গেল কিছুই করতে পারলাম না। দিনভর উদ্ধার কাজ চালানোর পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও বিমান বাহিনীর কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করে ট্রাকে করে নিয়ে যান। বিমানের আগুনে হায়দার আলী ভবনের বেশির ভাগই পুড়ে গেছে। নিচতলা-দুইতলার একাধিক শ্রেণি কক্ষের কিছু অবশিষ্ট নেই। ভবনে প্রবেশের সিঁড়ির নিচে মাটির ভেতর ঢুকে যায় বিমানের মাথা। মাইলস্টোনের মাঠে বসে উদ্ধার তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার। সবশেষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যায় তিনি বলেন, আমরা এটুকু নিশ্চিত করতে পারি যে- যারা আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসার জন্য আমরা ভীষণ রকমভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের গাফিলতি এখানে হবে না। আমরা এটাও মনে করি যে এই দুর্ঘটনার একটা ভালো রকমের তদন্ত হওয়া দরকার, সেটাও করা হবে। শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আমরা অত্যন্ত শোকাহত যে এই ঘটনা ঘটেছে, অনেকগুলো তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে। এই ধরনের একটা ভয়ানক দুর্ঘটনায় আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। যারা আহত হয়েছেন, তারা যেন দ্রুত সুস্থ হন, তার জন্য আমরা পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করছি।

দুর্ঘটনায় পড়া এফ-৭ বিজিআই মূলত চীনের তৈরি চেংদু জে-৭ সিরিজের একটি মাল্টি-রোল জেট ফাইটার। সোভিয়েত আমলের মিগ ২১ এর উন্নত এই চীনা সংস্করণ তৈরি করেছে চেংদু এয়ারক্র্যাফ্‌ট করপোরেশন। চেংদু জে-৭ সিরিজের সবচেয়ে আধুনিক সংস্করণ এফ-৭ বিজিআই। এক ইঞ্জিনের এ বিমানের সর্বোচ্চ গতি মাক ২.২ (শব্দের গতির ২.২ গুণ)। আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, লেজার গাইডেড বোমা ও জিপিএস গাইডেড বোমা, বাড়তি জ্বালানি ট্যাংকসহ দেড় হাজার কেজি ওজন বইতে পারে এসব জঙ্গি বিমান। এ বিমানের ককপিটে একজন বৈমানিক বসতে পারেন। কেএলজে-৬ এফ রাডার ব্যবহার করা হয় এফ-৭ বিজিআই বিমানে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মোট ৩৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এরমধ্যে বেশির ভাগই এফ-৭ বিজিআই। ২০১১ সালে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ১৬টি জেট ফাইটার কেনার চুক্তি করে এবং ২০১৩ সালে সেগুলো বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হয়। ওই বছরই চেংদু এয়ারক্র্যাফ্‌ট করপোরেশন এই মডেলের উড়োজাহাজের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলের মধুপুরে মহড়ার সময় বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ বিজি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। ২০২১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয় একটি এফ-৭ এমবি। ওই দুই ঘটনায় দু’জন বৈমানিক নিহত হন।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। প্রধান উপদেষ্টা এক শোকবার্তায় বলেন, এই দুর্ঘটনায় বিমানসেনা ও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-কর্মচারীসহ অন্যান্যদের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। জাতির জন্য এটি একটি গভীর বেদনার ক্ষণ। তিনি বলেন, সরকার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি এবং সবধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জানিয়েছে, মাইলস্টোনের ঘটনায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হবে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পাশাপাশি সকল সরকারি, বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশি মিশনেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। হতাহতদের জন্য দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।

ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা
আগুনে পুড়ে যাওয়া শিশুদের মা-বাবাকে আমরা কী জবাব দেবো

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুরো জাতি হতভম্ব, বাকরুদ্ধ। আমরা নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। আগুনে পুড়ে যাওয়া শিশুদের মা-বাবাকে আমরা কী জবাব দেবো? প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমার বলার কোনো ভাষা নেই। কীভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। আমার মতো সারা দেশের লোক আজ হতবাক। এ রকম একটা কাণ্ড হতে পারে আমরা কেউ কল্পনা করিনি, ধারণার মধ্যে ছিল না। কিন্তু এ অবিশ্বাস্য জিনিস আমাদের হঠাৎ করে গ্রহণ করতে হয়েছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের যে দুর্ঘটনা প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিশুদের ওপর পড়লো, আগুনে পুড়ে মরলো- মা-বাবাদের আমরা কী জবাব দেবো, কী বলবো। অজানা শিশুদের মুখ সবার চোখে ভেসে উঠছে। সারা জাতি হতভম্ব, বাকরুদ্ধ। শোকাহত বললে কম বলা হবে।

তিনি আরও বলেন, এখনো লাশ আসছে হাসপাতালে। এখনো হাসপাতালে মারা যাচ্ছে। মা-বাবা খোঁজ নিচ্ছে আমার সন্তান কোথায়? তাকে আর কোনোদিন চেনা যাবে কিনা। যাদের লাশ দেখছি তার মধ্যে আমার সন্তান আছে কিনা। পৃথক করার তো কোনো উপায় নেই। এরা আমাদের সবার সন্তান। হঠাৎ করে চিরদিনের জন্য চলে গেল। আমরা তদন্ত করবো কিন্তু তদন্তে তো তারা ফিরে আসবে না। আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সকল হাসপাতালে মানুষ ছুটে আসছেন। সবার প্রতি আমাদের অনুরোধ হাসপাতালে ভিড় করবেন না। আহতদের জন্য এটি ভালো না। তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের শক্তি নেই। আমরা ভিড় করে থাকলে আমাদের শরীর থেকে তাদের মধ্যে কী রোগ ছড়িয়ে পড়ে তা বলা মুশকিল। কাজেই দূরে থেকে দোয়া করেন সবাই। আমরা বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি জানাচ্ছি।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের যত সন্তান আছে সবাই আপনাদের সন্তান। আমরা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আপনাদের সান্ত্বনা দেয়া বিরাট ব্যাপার। আমরা সবাই আপনাদের সঙ্গে আছি। জাতির সবাই আপনাদের সঙ্গে আছে। আমরা তাদের জন্য শোক দিবস ঘোষণা করেছি। সবাই মিলে আমরা তাদের স্মরণ করবো। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করবো। আজ থেকে সবাই তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করবো। আল্লাহ আপনাদের শান্তি দিক। আমাদের জাতির সবাইকে যারা এ দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত সবাইকে শান্তি দিক। তাদের জন্য দেশবাসী সবাই দোয়া করছে। আল্লাহ মৃত শিশুদের জান্নাতবাসী করুক।

প্রত্যক্ষদর্শীর জবানিতে: মেট্রোরেলের শেষ স্টেশন ‘উত্তরা উত্তর পেরিয়ে’ গোলচত্বর। গোলচত্বরের শেষ মাথায় মেট্রোরেলের অফিস। অফিস পেরিয়ে পেছনের দিকটায় বিশাল জায়গায়জুড়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। স্কুলে যেতে ছোট ভাঙা রাস্তা। একটা প্রাইভেটকার ঢুকলে রিকশাও ঠিকমতো যেতে পারে না। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সরু ভাঙা সড়কের কারণে তাই উদ্ধারকাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। ঠিকমতো যাতায়াত করতে পারছিল না উদ্ধারকারী যানবাহনগুলো। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, প্রশিক্ষণ বিমানটি পড়ে একটি স্কুল ভবনে। ভবনটি দোতলা। সেখানে নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মিডিয়ামের ক্লাস হয়। দুপুর একটায় শেষ হয় ক্লাস। এরপরই অভিভাবকরা নিতে আসেন শিক্ষার্থীদের। ইংরেজি মিডিয়ামের একদল শিক্ষার্থী অপেক্ষা করছিল কোচিংয়ের জন্য। তাদের ক্লাস টাইম ছিল দেড়টায়। ভবনটিতে ১৬টি ক্লাসরুম, ৪টি শিক্ষকদের রুম রয়েছে। একটু দূরেই ক্যান্টিন। প্রতিষ্ঠানটির ওপর দিয়ে বিমান যাওয়া-আসার চিত্র নতুন নয়।

ক্যান্টিনের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল শিক্ষার্থী সাদিক ইসলাম, মিলন মৃধা, সজল খানসহ বেশ কয়েকজন। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিক বলে, আমরা ক্যান্টিন ও বিল্ডিংয়ের মাঝখানে ছিলাম। একটা বিমানের শব্দ পাই। মনে হলো, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেখি বিমানটি নিচের দিকে নামছে। স্কুল মাঠে ল্যান্ড করার চেষ্টা করছে। এরপর বিমানটি দোতলা বিল্ডিংয়ের প্রবেশপথ ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির ক্লাসরুমের দিকে আঘাত করে। প্রথমে কিছুটা অল্প আগুন ছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই বিকট শব্দ হয়। এরমধ্যে একজন বিমান থেকে প্যারাসুট দিয়ে নামে স্কুলের সুইমিং পুলের পাশে।

সাদিক বলে, আঘাত হানার পর মনে হয়েছে বিমানে থাকা কিছু ব্লাস্ট হয়েছে। এরপর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমরা কী করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। দেখি বাচ্চারা দৌড়ে বেরিয়ে আসছে। অনেকের শরীরে রক্ত, পোড়া। কয়েকটা শিশুর শরীরে আগুন জ্বলছিল। এক বাচ্চার একটি হাত উড়ে গেছে। আমরা উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলেও আগুনের কারণে ভিতরে যেতে পারিনি।

দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আহমেদ। সে জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কিছুটা দূরে আমাদের ক্লাস চলছিল। আমাদের ক্লাসে বিমানের শব্দ নতুন কিছু না। তবে, এবার কিছুটা জোরে শব্দ হয়েছিল। মুহূর্তেই আরও একটি বিকট শব্দ। শব্দে আমাদের বিল্ডিং কাঁপতে থাকে। আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, ধোঁয়া  উড়ছে। কিন্তু ঘটনাস্থল দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা চিৎকার করছে। বেরিয়ে ঘটনাস্থলে আসি ৫ থেকে ৬ মিনিট পর। তখন দেখি, শিক্ষার্থীরা আহতাবস্থায় ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। অনেকের শরীর-কাপড় পোড়া। কয়েকজন নিচে পড়ে ছিল। এরপর এলাকাবাসীও এগিয়ে আসে। তারা শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে দূরে নিয়ে যায়। ওই সময় সকলেই ভয় করছিল, ফের যদি বিস্ফোরণ হয়।

মাইলস্টোনের গেটের কিছুটা সামনে চা দোকানি লোকমান আলী। তিনি দোকানেই ছিলেন। বলেন, দোকানে টিভি চলছিল। হঠাৎ শব্দ শুনি। প্রথমে ভেবেছি, সিলিন্ডার ব্লাস্ট হয়েছে। শব্দ হওয়ার সঙ্গেই বাইরে আসি। স্কুলের ভেতর আগুন দেখি। ১০-১২ জন সেখানেই পড়ে ছিল। সবাই মিলে দৌড়ে যাই। দেখি বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে। কোথায় যাবে, না যাবে, কিছুই বুঝতে পারছে না। অনেকের শরীর পোড়া। আমরা তখনও জানি না বিমান বিদ্ধস্ত হয়েছে। বাচ্চাগুলোরে উদ্ধার করে একটা ফাঁকা জায়গায় নিই। আহত কিছু বাচ্চাকে নিয়ে ডিসপেনসারিতে যাই। কিন্তু আগুনের ভিতরে যেতে পারিনি।
দুর্ঘটনার সময় স্কুলের মাঠে ছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নদী। সে বলে, আমি আম্মুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ। শব্দের দিকে দৌড়ে চলে যাই। পরে তাকায় দেখি, সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। অনেকেই চিৎকার করছিল, বাঁচাও বাঁচাও বলে। কিন্তু আগুনের কারণে আমরা কাছে যেতে পারিনি। 

mzamin
মুমূর্ষু এক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে- ছবি: সংগৃহীত

এই মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতাদের হাসপাতালে কাজ কী by রাফসান গালিব

রক্তাক্ত জুলাই যেন শেষ হচ্ছে না আমাদের। গত বছরের স্বৈরাচারী শাসকের গুলিতে নিহত শিশুদের চেহারা আমরা ভুলতে পারি না। সেই জুলাইয়ের স্মরণ চলাকালে আরেক জুলাইয়ে এসে আবারও আমাদের শিশুরা লাশ হলো। আগের জুলাইয়ে ঘাতকের গুলিতে আর এবার বিমানবাহিনীর এক প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায়।

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানটি আছড়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে যেভাবে আগুনে পুড়ে যাওয়া বাচ্চাদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তা দেখে যেকোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের চিন্তা অবশ হয়ে যাওয়ারই কথা। আর যাঁরা সন্তানের মা-বাবা, তাঁদের মানসিক বিপর্যস্ততার কথা বললামই না।

এরপর তো একের পর এক পুড়ে যাওয়া শিশুর ছবি-ভিডিও, শিশুর খোঁজ পেতে মা-বাবাদের আহাজারি, হাসপাতালে আহত শিশু নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—যেন পৃথিবীর কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এমন বেদনাদায়ক দৃশ্য একের পর এক হাজির হতে থাকে আমাদের সামনে।

কেউ বাচ্চার খোঁজ পেতে শিশুর ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন, আবার কেউ হাসপাতাল থেকে শিশুর অভিভাবকের খোঁজ পেতে তার স্কুল আইডির ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। আর রক্তের জন্য গোটা ঢাকাবাসী যেন পারলে ছুটে যায় উত্তরার সব হাসপাতাল থেকে শুরু করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে।

বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার অল্প মুহূর্তের মধ্যে মানুষের ঢল নামে যেন। উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত মানুষের চেয়েও উৎসুক মানুষের ভিড় বেশি। কে কত কাছ থেকে ছবি ও ভিডিও তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতাও যেন দেখা যায়। দেখা গেছে, অন্য যেকোনো ঘটনার চেয়ে আজকে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে হেলিকপ্টারে করে সেনাবাহিনীর টিমসহ অন্যান্য উদ্ধার সহায়তা দল ঘটনাস্থলে হাজির হতে সক্ষম হয়েছে। দ্রুত বিধ্বস্ত বিমান ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের আগুন নেভানোও সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু হতাহতদের উদ্ধার থেকে শুরু করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে উদ্ধারকারীদের। ঘটনাস্থল থেকেই বিষয়টি বারবার বলা হচ্ছিল। অতিরিক্ত মানুষের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সময় যত যায়, ততই যেন মানুষের ঢল বেড়েছে।

স্কুলের বাচ্চার খোঁজ নিতে যেকোনো মা-বাবা পাগলের মতো ছুটে যাবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের ঢল কেন? সাধারণ মানুষের সাইকি বা মনস্তত্ত্ব আমরা বুঝি। কিন্তু যেসব রাজনীতিবিদ এ মুহূর্তে দলবলে হাসপাতালে ছুটে গেলেন, সেটিকে আমরা কী বলব?

গত শনিবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে দিতে মঞ্চেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেদিনই রাতে তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা কালচারের জায়গায় বিষয়টি বেশ প্রশংসিতও হয় রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজের মধ্যে। কিন্তু আজকে এই দুই অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার ওপরেই মানুষ ক্ষুব্ধ হলো। কারণ, তাঁরা দুজনই নেতা-কর্মী নিয়ে সদলবলে হাসপাতালে ছুটে গেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট পর্যন্ত মানুষের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এখানের ভিড় প্রধানত রক্ত দিতে ছুটে আসা মানুষের। এরপরও মানুষের ভিড়ের কারণে হাসপাতালে আসা–যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সের গতি কমে গেছে। এর মধ্যে আমরা দেখলাম রাজনৈতিক নেতারা দলবল নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছেন। সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও হাসপাতালে ছুটে গিয়েছেন।

রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্যান্য নেতা–কর্মী–সমর্থক, নিরাপত্তাকর্মী, মিডিয়াকর্মী মিলিয়ে রীতিমতো একটা হট্টগোল পরিস্থিতি তৈরি হলো হাসপাতাল এলাকায়।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে ভিড় সামলাতে কাজ করছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী। তাঁদের একজনের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই তরুণী খুব আক্ষেপ নিয়ে বলছেন, ‘আমরা বাইরে স্ট্রাগল করছি, যাতে রোগীরা ভেতরে ঢুকতে পারে। ওনারা রাজনীতি করেন মানলাম, এখন কি এটা করার টাইম ছিল? ওনারা সবাই দল বেঁধে এক শ জন মিলে যাচ্ছেন, রোগী ঢুকতে পারতেছে না, ওনাদের রাজনীতিটা কি আগে? ওনারা যদি রাজনীতিবিদ না হতো, ওনারা কি এভাবে ঢুকতে পারতেন?’

বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ও যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। সেখানে তাঁদের ঘিরে এক প্রকার ধস্তাধস্তিও হয়েছে। কিছু স্বেচ্ছাসেবী তরুণ এই মুহুর্তে হাসপাতালের ভেতরে যেতে তাঁদের বাধা দিয়েছিলেন। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হচ্ছেও দেখা যায়। আরেক ভিডিওতে দেখলাম এপ্রোন পরা এক নারী চিকিৎসক তাঁদের হাতজোড় করে অনুরোধ করছেন, হাসপাতালে এসে ভীড় না করতে। এটি কি কোনো সভ্য দেশের দৃশ্য হতে পারে?

এ মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতাদের কারোরই হাসপাতালে যাওয়া কি খুব জরুরি ছিল? তাঁরা হাসপাতালে গেলে কি আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন? জাতির এত বড় ট্র্যাজিডিতে সংবেদনশীল আচরণ করলেন কি তাঁরা?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ড, সিদ্দিক বাজারে বিস্ফোরণ, মগবাজার বিস্ফোরণের মতো একের পর এক বড় বড় দুর্ঘটনা সামাল দিয়েছেন জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। এর আগে চুড়িহাট্টা, নিমতলী, রানা প্লাজার মতো আরও বড় বড় ট্র্যাজেডি সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা তো আছেই।

হ্যাঁ, আমাদের অনেক সক্ষমতার অনেক ঘাটতি আছে, অনেক কিছু ব্যর্থতা আছে। কিন্তু একদম জরুরি মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতাদের সদলবলে হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার তো কোনো মানেই হয় না! আরও হাস্যকর বিষয় হলো, তাঁদের কেউ কেউ হাসপাতালের সামনে গিয়ে মানুষের দিকে হাত নাড়ছেন। এটি কি কোনো নির্বাচনী প্রচারণা?

একটি ছবিতে দেখা গেল, জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ কেন্দ্রীয় নেতারা একজন রোগীর শয্যার চারপাশে ঘিরে ধরে তাঁর খবরাখবর নিচ্ছেন। জামায়াতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেই এ ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ এই সময়ে যেকোনো পোড়া রোগীর জন্য এটা হতে পারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, যখন কেউ পুড়ে যান, তখন তাঁর ত্বকের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সেই জায়গায় সহজে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে এবং সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, কোনো পোড়া রোগীর চারপাশে অনেক লোক জমে গেলে তাদের নিশ্বাস, জামাকাপড় বা স্পর্শের মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই রোগীর পাশে অপ্রয়োজনীয় ভিড় কারা যাবে না। রাজনৈতিক নেতাদের এই ভিড় করা যে একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, তা নিঃসন্দেহে যে কেউ স্বীকার করবেন।

সংবাদকর্মীদেরও কোনো পোড়া রোগীর কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ সেটি আমরা করতে দেখলাম কোনো কোনো সংবাদকর্মীকে। সাক্ষাৎকারের নামে কোনো আহতের কাছ থেকে এই মুহুর্তে ‘অনুভূতি’ জানতে চাওয়াকে কোনোভাবেই সাংবাদিকতা বলা যায় না।

মাগুরার এক শিশু ধর্ষণ নিয়ে কয়েক মাস আগে দেশ প্রতিবাদে উত্তাল হলো। সেই শিশুকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় চিকিৎসার জন্য। তখনো আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা ওই শিশুকে দেখার জন্য তার কাছে গিয়ে ভিড় করেছেন। সেখানে গিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছেন। তখন বিষয়টি চরম সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আমাদের রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক নেতাদের আসলে কবে হুঁশ হবে? বিপদের মুহূর্তে মানুষের কাছে ছুটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা জনগণের প্রতি তাঁদের ‘দরদ’ প্রকাশ করতে চান, সেটির জন্য ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানও যে তাঁরা অনেক সময় হারিয়ে ফেলেন, তা আজকের ঘটনায় আবারও প্রকাশ পেল।

* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

উত্তরায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের দেখতে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ছুটে যান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
উত্তরায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের দেখতে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ছুটে যান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত