Sunday, November 27, 2016

আলেপ্পোর গুরুত্বপূর্ণ জেলা ‘পুনর্দখল’ সরকারি বাহিনীর

আলেপ্পোর বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনর্দখলে নিতে নতুন
করে অভিযান চালাচ্ছে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী। রয়টার্স
সিরিয়ার বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত পূর্ব আলেপ্পোর সবচেয়ে বড় জেলা পুনর্দখল করেছে দেশটির সরকারি বাহিনী। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। আজ রোববার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। পুনর্দখলে নেওয়া জেলাটির নাম মাসাকেন হানানো। ২০১২ সালে জেলাটি দখলে নিয়েছিল বিদ্রোহীরা। সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর ভাষ্য, মাসাকেন হানানোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। জেলাটির পুনর্দখল সরকারি বাহিনীর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পূর্ব আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকার গত ১৫ নভেম্বর নতুন করে অভিযান শুরু করে। অভিযানের ফলে এলাকাটিতে প্রায় তিন লাখ মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেখানে খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের ভাষ্য, সরকারি বাহিনীর এই অভিযানে দুই শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুরা রয়েছে। পুরো আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তা হবে আসাদ সরকারের জন্য একটা বড় বিজয়। সিরিয়ায় গত সাড়ে ছয় বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে।

বিপ্লবীর বিদায়

হাভানায় মে দিবসের র‍্যালিতে দেশের পতাকা হাতে
কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো, ২০০২ সালে। এএফপি
গত এপ্রিলে হাভানায় কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে দেওয়া শেষ ভাষণে ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘শিগগিরই নব্বইতে পড়ব...অন্য সবার কাতারে মিশে যাব, একে একে আমাদের সবারই পালা আসে।’ নব্বই পূরণ করেই বিদায় নিলেন ফিদেল কাস্ত্র —কিউবান বিপ্লবের নেতা। তবে অন্য সবার কাতারে মিশে যাওয়া তাঁর হবে না। কমিউনিস্ট বিপ্লবের এক দীর্ঘ সোনালি অতীতের প্রতীক হয়ে থাকবেন তিনি ইতিহাসের পাতায়। আমেরিকার সীমানার ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সেটা পাঁচ দশক ধরে টিকিয়ে রাখতে পারার সামর্থ্য বহু দেশের জনপ্রিয় পরিবর্তনে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে। কিউবার স্থানীয় সময় গত শুক্রবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা এক বার্তায় ছোট ভাই বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো ঘোষণা করেন ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুসংবাদ। তিনি জানান, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল সাড়ে নয়টা) জীবনাবসান হয়েছে এই বিপ্লবী নেতার। শনিবার আরও পরে কোনো এক সময় তাঁর দাহ হওয়ার কথা। ফিদেলের নিজের দাবি, ৬৩৪ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে তাঁকে।
কখনো আততায়ী পাঠিয়ে, কখনো খাবারে বিষ প্রয়োগ করে। সবগুলোর পেছনে পরাক্রমশালী ও শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর কারসাজি বলে অভিযোগ ছিল তাঁর। সিআইএ দু-একটি হত্যাচেষ্টার কথা পরবর্তীকালে স্বীকারও করেছে। অতিসাবধানী চলাফেরা বাঁচিয়ে দিয়েছে ফিদেলকে। ১৯৫৯ সালে যে গেরিলা অভিযানে কিউবার মার্কিন মদদপুষ্ট বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো, সেই গেরিলা দলে তাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন আর্জেন্টিনার আরেক বিপ্লবী চে গুয়েভারা। এরপর ৪৯ বছর ধরে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে কিউবা শাসন করেছেন তিনি। মৃত্যুর পর প্রচারিত সংবাদে তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শাসকদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিদেল কাস্ত্রোর শাসনকালের একটা বড় অংশই ছিল নাটকীয়তায় ভরা। ঠান্ডা যুদ্ধের উত্তেজনা, পারমাণবিক যুদ্ধে পুরো বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উৎকণ্ঠা আর দেশে দেশে বামপন্থী আন্দোলনের বিস্তৃতির পটভূমিতে ফিদেল কাস্ত্রো যে কিউবা গড়ে তুলেছিলেন, সেটা একটানা মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধে জর্জরিত হয়েছে। তবু কাস্ত্রো সবার জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষার যে ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত। আবার তাঁর কঠোর হাতে দেশ শাসনের সমালোচনাও আছে। বলা হয়, বিরুদ্ধমতের প্রতি তিনি অসহিষ্ণু ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের দীর্ঘ সময় টিকে থাকা কতটা সম্ভব হবে, এ নিয়ে অনেকেরই সন্দেহ ছিল। কিন্তু ফিদেল কাস্ত্রো যে টিকে থেকেছেন, এর পেছনে বিপ্লবী জেদ আর সাহসের চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করেছে তাঁর সহজাত রণকৌশল প্রতিভা। বেশ কয়েকটি উৎখাত চেষ্টা দমন করতে হয়েছে তাঁকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল ১৯৬১ সালে বে অব পিগসে কিউবার নির্বাসিত লোকজনকে দিয়ে সিআইএর মদদপুষ্ট সামরিক অভিযান। কাস্ত্রো সে যুদ্ধে টিকে যান। ১৯৬২ সালে কিউবায় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৩ দিনের যে টানাপোড়েন দেখা দেয়, সেটা ঠান্ডা যুদ্ধের দুই শিবিরের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ প্রায় বাধিয়ে দিয়েছিল। তবে কাস্ত্রোর কিউবা শুধু টিকে থেকেছে তা-ই নয়, বেশ কয়েকটি দেশে বামপন্থী বিপ্লবে শক্তি ও সহযোগিতাও জুগিয়েছে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশ গ্রানাডা, আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, লাতিন আমেরিকার বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরুতে সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। সারা দুনিয়ার বিপ্লবীদের কিউবায় এসে বিপ্লবের প্রশিক্ষণ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। কলম্বিয়ার নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ছিলেন কাস্ত্রোর বন্ধু। ফুটবলের কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনাও মুগ্ধ ভক্ত তাঁর।
১৯৯০ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা বারবার কাস্ত্রোকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, সফর করেছেন কিউবা। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর একটি কিউবা। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) চতুর্থ সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। সে সময় তিনি বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি। তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমান। এভাবে আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতাই লাভ করলাম।’ শোনা যায়, বঙ্গবন্ধুকে তিনি সাবধান করে দিয়েছিলেন সম্ভাব্য প্রাণনাশের হুমকির ব্যাপারে। অন্ত্রের ক্যানসারে অস্ত্রোপচারের পর ২০০৬ সালে ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর রাজনীতি থেকে দূরে একপ্রকার নিভৃত জীবন যাপন করেছেন। বছরে এক কি দুবার জনসমক্ষে এসে ভাষণ দিতেন। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক নেতা মিখাইল গর্বাচেভ বলেছেন, ‘আমেরিকার কর্কশতম অবরোধের মুখে তাঁর ওপর যখন পাহাড়প্রমাণ চাপ, ফিদেল তখন বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছেন।’ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ফিদেল ছিলেন রাশিয়ার আস্থাশীল ও আন্তরিক বন্ধু।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বলেছেন, সারা বিশ্বের বিপ্লবীদের উচিত কাস্ত্রোর উত্তরাধিকার বহন করা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট বার্তায় লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীতে ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের একজন। ভারত তার এক পরম বন্ধুকে হারাল। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, স্নায়ুযুদ্ধের একনায়ক (ফিদেল কাস্ত্রো)...তিনি বহির্বিশ্বের চাপকে কখনোই তোয়াক্কা করেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার নেতাকে ‘নির্মম স্বৈরশাসক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এখন কিউবার মানুষ যাতে সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতার পথে এগোতে পারে, সে জন্য যা করা প্রয়োজন আমাদের প্রশাসন তা করবে।’ (প্রতিবেদন তৈরিতে রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসি অনলাইনের সহায়তা নেওয়া হয়েছে)

কারো কাছে মহানায়ক, কেউ বলে স্বৈরশাসক

ফিদেল কাস্ত্রোর সমসাময়িক ও পরবর্তী প্রজন্মের বিশ্বনেতা, সতীর্থ ও সাহিত্যিকেরা নানাভাবে তাঁর মূল্যায়ন করেছেন। কেউ তাঁকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। কারও মুখে তাঁর জন্য শুধুই সমালোচনা। নেলসন ম্যান্ডেলা: দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৯১ সালের জুলাইতে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘প্রথম দিনগুলো থেকেই কাস্ত্রো ছিলেন স্বাধীনতাকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী ও পরিকল্পিত চাপ সত্ত্বেও স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কিউবার জনগণের ত্যাগ স্বীকারকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই।
কিউবার বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ফিদেল কাস্ত্রো দীর্ঘজীবী হোন।’ জন এফ কেনেডি: কিউবার কড়া সমালোচক যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির অভিমত ছিল, কাস্ত্রো কেবলই আরেকজন লাতিন আমেরিকান স্বৈরশাসক। তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও অর্জনের জন্য সুচারুভাবে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছেন। তিনি উচ্চাভিলাষী, নিজের গণ্ডির বাইরে যেতে চান। হুগো চাভেজ: ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত হুগো চাভেজ বলেছিলেন, তাঁর কাছে কাস্ত্রো একজন ‘গ্র্যান্ডমাস্টার’। ২০০৭ সালে এক ভাষণে চাভেজ বলেন, ‘একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি কখনো মারা যেতে পারেন না। ফিদেলের মতো একজন ব্যক্তিত্ব কখনো মারা যাবেন না। কেননা, তিনি চিরদিন মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।’ চে গুয়েভারা: কাস্ত্রোর বিপ্লবের সঙ্গী চে গুয়েভারা ১৯৫৫ সালে নিজের মা-বাবার কাছে লেখা চিঠিতে তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘ফিদেল কাস্ত্রোকে আমার একজন অসাধারণ মানুষ মনে হয়েছে। যখন আমরা বিপ্লবের জন্য মেক্সিকো থেকে কিউবা যাই,
তখন তাঁর মনে অসাধারণ বিশ্বাস ছিল। কাস্ত্রো মনে করতেন, “যেহেতু আমরা কিউবা এসেছি, তাই আমরা লড়াই করবই। এবং লড়াই করলে জিতবই”।’ গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ: কাস্ত্রোর ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে এক লেখায় সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ মন্তব্য করেন, ‘ফিদেল কাস্ত্রো বিজয়ী হওয়ার জন্য এসেছেন। পরাজয়ের মুখেও, এমনকি প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্রতম একটি কাজেও তিনি নিজের যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন। পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তরিত না করা পর্যন্ত তিনি এক মিনিটের জন্য ক্ষান্ত হন না।’ অগাস্তো পিনোশে: চিলির সাবেক সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল অগাস্তো পিনোশের মতে, কাস্ত্রো ছিলেন একজন কঠোর শাসক। সাহসী। সর্বদা দৃঢ় থাকেন। প্রয়োজনে নিজের বন্ধুদেরও ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠাতে দ্বিধাবোধ করেন না।

নেতা যখন কেবলই ছবি

কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো মারা গেছেন শুক্রবার রাতে। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া।
পরদিন শনিবার সকালে রাজধানী হাভানায় ফিদেল কাস্ত্রোর ছবিঅলা একটি পোস্টারের সামনে দিয়ে হেঁটে যান এক নারী। পোস্টারে লেখা ‘ফিদেলই কিউবা। সিডিআর (বিপ্লবের সুরক্ষা কমিটি) আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে’
ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া

রাহিল শরিফের মেয়াদ শেষে পাকিস্তানে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ গতকাল শনিবার কামার জাভেদকে নিয়োগ দেন। পাকিস্তানের ক্ষমতাধর এই পদে কে বসতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে সপ্তাহ খানেক ধরে বেশ জল্পনা-কল্পনা চলছিল। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জুবায়ের মেহমুদ হায়াতকে জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন নওয়াজ। দুজনই আগামী মঙ্গলবার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ওই দিনই বর্তমান সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ অবসরে যাবেন।
কামার জাভেদ বর্তমানে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মহাপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। পূর্বসূরি কায়ানির মতো রাহিল শরিফের স্বাভাবিক অবসরকে সম্মানজনক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। রাহিল তাঁর মেয়াদ বাড়াতে চেষ্টা করেননি। তাঁর অবসরে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সেনা সদর থেকে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের কাছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে কোনো সুপারিশ করা হয়নি।

রামপাল প্রকল্প বাতিল না হলে ২৬ জানুয়ারি হরতাল

রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ডাকা গতকাল মহাসমাবেশ
শেষে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা
জাতীয় কমিটির মিছিল। ছবি: প্রথম আলো
সুন্দরবনবিনাশী রামপালসহ সব প্রকল্প বাতিল না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। এরই অংশ হিসেবে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ওই প্রকল্প বাতিল না হলে ২৬ জানুয়ারি রাজধানীতে অর্ধদিবস হরতাল ও সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির নেতারা। গতকাল শনিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় কমিটির ডাকা মহাসমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দিয়েছেন কমিটির নেতারা।
রামপাল প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতির বিষয়ে সরকারকে জাতীয় কমিটি, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘ থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, সরকার ক্ষতির কথা জেনেও সুন্দরবনে এই প্রকল্প করছে। এটা দেশবাসীকে জেনে-শুনে বিষপান করানোর মতো ব্যাপার। তাই দেশবাসীকে ওই বিষাক্ত প্রকল্প থেকে রক্ষা পেতে হলে সারা দেশে আরও কঠোর আন্দোলনের আহ্বান জানান তিনি। সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সরকার রামপালের মতো সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্প করছে। আর বলছে, এসব উন্নয়নের জন্য হচ্ছে। এই উন্নয়ন ৯৯ জনকে বঞ্চিত করে একজনের উন্নয়ন। যারা দেশে লুটপাট করে টাকা বিদেশে পাচার করছে, তারাই এসব উন্নয়নের কথা বলছে। এসব উন্নয়নের মানে হচ্ছে গাইবান্ধায় সাঁওতালদের, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দুদের, রামু থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদের উন্নয়ন। তিনি বলেন, সুন্দরবন রক্ষার এই আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করার সংগ্রাম। সভায় সাংবাদিক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আজকের এই বিশাল সমাবেশ দেখেও যদি সরকারের শিক্ষা না হয়, তাহলে সাহস থাকলে এই প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট দিক। দেখুক জনগণ কী চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রামপাল প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উন্মুক্ত বিতর্কের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘সেখানে আপনিও থাকবেন, আমিও থাকব। দেশবাসী দেখুক কার পক্ষে যুক্তি বেশি।’
জনগণের ন্যায্য দাবি মানা না হলে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের রাজনীতিতে পরিণত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, রামপাল প্রকল্প নিয়ে সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে। প্রকল্পে কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলছেন এক কথা; প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানির কর্মকর্তা বলছেন আরেক কথা। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালিকুজ্জামান সরকারের উদ্দেশে বলেন, সরকার রামপালে যে উন্নয়নের কথা বলছে, তা বন উজাড় করার উন্নয়ন। নদীকে খাল, পাহাড় কেটে সমতল আর দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উন্নয়ন। এসব উন্নয়ন না থামালে এমন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে যে সরকার তা আর সামলাতে পারবে না বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি। গণসংহতি আন্দোলনের সভাপতি জোনায়েদ সাকি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, সময় থাকতে রামপাল প্রকল্প বাতিল করুন। নয়তো এই বিশাল জনস্রোত সরকারকে নাড়িয়ে দেবে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, দেশ এক সর্বগ্রাসী স্বৈরাচারের কবলে পড়েছে। এই স্বৈরাচারকে উৎখাত করতে না পারলে সুন্দরবন রক্ষা করা যাবে না। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিনা ভোটের এই সরকার ভারতকে খুশি করতে রামপাল প্রকল্প করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমতউল্লাহ বলেন, সরকার যদি গায়ের জোরে রামপাল প্রকল্প করেও ফেলে, তাহলে একদিন না একদিন জনগণ তা ভেঙে দেবে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স ও গণসংহতি আন্দোলনের ফিরোজ আহমেদের সঞ্চালনায় মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় গণফ্রন্টের টিপু বিশ্বাস, বাসদের (মার্কসবাদী) শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, সংগীতশিল্পী কফিল আহমেদ। সংহতি জানান সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের শরিফ জামিল, অর্থনীতিবিদ স্বপন আদনান, নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক গীতি আরা নাসরিন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। কর্মসূচি: সমাবেশ শেষে কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ পাঁচটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আগামী ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবস সুন্দরবন রক্ষায় এবং রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে পালন করবে জাতীয় কমিটি।
দেশবাসীকেও এ দুটি দিবস এভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। ২৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ সারা দেশে সমাবেশ পালন করার মধ্য দিয়ে দাবি দিবস পালন করা হবে। বিভিন্ন দেশে সুন্দরবন রক্ষার এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে—এ কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ভারতের ৪৩টি সংগঠন রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে সমর্থন দিয়েছে। ৭ জানুয়ারি বিশ্ব প্রতিবাদ দিবস পালিত হবে। ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই প্রতিবাদ দিবস পালিত হবে। ১৪ জানুয়ারি রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে কীভাবে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই পরিকল্পনা তৈরি করেছেন বলে আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন। এরপরও যদি সরকার এই প্রকল্প বাতিল না করে, তাহলে ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় অর্ধদিবস সর্বাত্মক ধর্মঘট ও হরতাল কর্মসূচি পালন করা হবে। বেলা পৌনে পাঁচটার দিকে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সমাবেশ শেষ হয়। সমাবেশ শেষে জাতীয় কমিটির ব্যানারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি মিছিল শুরু হয়। মিছিলে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র-বিরোধী বিভিন্ন স্লোগানের পাশাপাশি জাতীয় কমিটি ঘোষিত আগামী ২৬ জানুয়ারির হরতালের সমর্থনে বিভিন্ন স্লোগান দেন হাজারো জনতা। শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র পর্যন্ত দীর্ঘ প্রতিবাদমুখর মিছিলটি শাহবাগ ও মৎস্য ভবন মোড় ঘুরে জাতীয় প্রেসক্লাব-সংলগ্ন কদম ফোয়ারার সামনে গিয়ে শেষ হয়।

প্রথম দিনে বাতিল ১০ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিন গতকাল শনিবার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ১ জনসহ ১০ কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের অস্থায়ী কার্যালয়ে শুনানি শেষে মনোনয়নপত্র বাতিলের এ ঘোষণা দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান তালুকদার। বাতিলের কারণ হিসেবে ঋণখেলাপি, কর পরিশোধ না করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কথা উল্লেখ করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। শুনানির সময় সংশ্লিষ্ট সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের প্রার্থী এবং তাঁদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। গতকাল মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয় ১ থেকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের।
আজ রোববার হবে ১৯ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, ৯ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর এবং মেয়র পদের যাচাই-বাছাই। ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগে যাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়, তাঁরা হলেন ২ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে সুমি বেগম, সাধারণ সদস্য পদে ২ নম্বর ওয়ার্ডের সুমন কাজী, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল কালাম দেওয়ান, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দেলোয়ার হোসেন, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা এস এম জিল্লুর রহমান লিটন, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক সাবেক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড জেলা যুবলীগের নেতা শাহ্ ফয়েজউল্লা ফয়েজ। ঋণখেলাপির জিম্মাদার হওয়ার কারণে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক ছাত্রদল নেতা মো. দিদার খন্দকার, কর বকেয়া থাকার অভিযোগে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নূর ছালাম এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম মোস্তাফা সানবিনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন,
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল আবেদন করতে পারবেন। মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ আটজন দলীয় এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আর ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ১৭৬ জন এবং নয়টি সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ৩৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। অসুস্থ আনোয়ার হোসেনের পাশে আইভী: অসুস্থ নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত আনোয়ার হোসেনকে শুক্রবার রাতে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগদলীয় মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ সময় মেয়র প্রার্থী আইভী অসুস্থ আনোয়ার হোসেনের শয্যাপাশে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটান এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।

সুস্থ আছি, ভালো আছি: খাদিজা

খাদিজা বেগম হাসছেন। গতকাল রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের
নিচতলায় সাংবাদিকদের সামনে আনা হয় তাঁকে। প্রথম আলো
দুপুর ১২টা। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিচতলায় অভ্যর্থনাকক্ষের সামনে হুইলচেয়ারে করে আনা হলো সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা বেগমকে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে হাত নাড়লেন সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে। বললেন, ‘আপনাদের দোয়ায় সুস্থ আছি, ভালো আছি। দোয়া করবেন যেন ভালো থাকি, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারি। মিডিয়ার ভাইদের ধন্যবাদ, আপনারা আমার জন্য অনেক করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও ধন্যবাদ।’ খাদিজার সর্বশেষ অবস্থা জানাতে গতকাল শনিবার স্কয়ার হাসপাতাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের এসব কথা বলেন। গত ৩ অক্টোবর ছাত্রলীগের নেতার চাপাতির কোপে গুরুতর আহত হওয়ার পর গতকালই তিনি প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এলেন। তাঁর বাঁ হাতে ছিল ব্যান্ডেজ। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, খাদিজা আজ রোববার হাসপাতাল ছাড়বেন।
ছাড়পত্র দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা গতকালই শেষ হওয়ার কথা। এর আগে ১৬ নভেম্বর বিকেলে হুইলচেয়ারে করে বাবার সঙ্গে হাসপাতালের বারান্দায় ঘুরতে বের হওয়া খাদিজা কথা বলেছিলেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সংবাদ সম্মেলনে স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক (মেডিকেল সার্ভিস) মির্জা নাজিম উদ্দিন বলেন, খাদিজার অবস্থা এখন ভালো। এ কারণে তাঁকে আর এখানে হাসপাতালে রাখার দরকার নেই। তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। তাঁর বাঁ দিকটা এখনো অবশ। এ কারণে ফিজিওথেরাপি দরকার। খাদিজার বাবা মাশুক মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুয়ায়ী খাদিজাকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হবে। সোমবার তাঁকে সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) নেওয়া হতে পারে। ছাত্রলীগের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসম্পাদক বদরুল আলম ৩ অক্টোবর সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে আহত করেন। তাঁকে প্রথমে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ওই দিন গভীর রাতে স্কয়ার হাসপাতালে আনা হয়। ওই ঘটনায় শাহ পরান থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার বদরুল কারাগারে আছেন।

গ্যাসের দাবিতে সিদ্ধিরগঞ্জে সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় গ্যাসের
দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন। ছবি: প্রথম আলো
গ্যাস-সংকট নিরসনের দাবিতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গতকাল শনিবার মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেছেন এলাকাবাসী। এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, সকাল ১০টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি সাহেবপাড়া ও কান্দাপাড়ার লোকজন। একই সময়ে পাশের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেন ফতুল্লার রঘুনাথপুর, নিতাইপুর ও মামুদপুর এলাকার লোকজন। দুটি স্থানে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তাঁদের হাতে ছিল ‘গ্যাস চাই’ লেখা ব্যানার ও ফেস্টুন। একপর্যায়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মু. সরাফত উল্লাহ, উপপরিদর্শক (এসআই) সামছুল আলম ও নিজাম পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। পুলিশের বাধায় আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ তুলে নিয়ে সড়কের পাশে মানববন্ধন করেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মো. সোহরাব হোসেন, আনোয়ার জাফরী, আবদুল মতিন মাস্টার, জাহাঙ্গীর আলম, আবদুর রহমান বিশ্বাস, মজিবুর রহমান মিয়াজি, জি এম আমির হোসেন প্রমুখ। বক্তারা বলেন, এসব এলাকার গ্যাস-সংকট দূর করতে দু-এক দিনের মধ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেবেন তাঁরা। আগামী শনিবারের মধ্যে সমস্যার সমাধান করতে হবে, অন্যথায় কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে। সোহরাব হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের এলাকায় চরম গ্যাস-সংকট চলছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। এতে রান্নাবান্না বন্ধ হতে চলেছে। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিশু ও চাকরিজীবীরা সমস্যায় পড়ছেন। সকালে তাঁদের না খেয়েও কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার সমস্যার কথা জানালেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। তাই নিরুপায় হয়ে এলাকাবাসী রাস্তায় নেমেছেন।

রসুনের কেজি আবার ২০০ টাকা ছাড়াল

ছোট পরিবারে মাসে যদি গড়পড়তা পাঁচ কেজি পেঁয়াজ লাগে, তাহলে রসুন লাগে এক কেজি। কিন্তু সেই এক কেজি রসুন কিনতে এখন আট কেজি পেঁয়াজের সমান দাম দিতে হচ্ছে। রাজধানীর বাজারে আবার আমদানি করা চীনা রসুনের দর প্রতি কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। বিপরীতে ভারতীয় পেঁয়াজ মিলছে প্রতি কেজি ২৫ টাকায়। বাজারে এখন ক্রেতাদের নতুন অস্বস্তির নাম রসুন। সবজির দাম ধীরে ধীরে কমছে। মাছ ও মাংসের দাম স্থিতিশীল। কিন্তু চীনে রসুনের দামের উত্তাপ ভোগাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রেতাদের।
অবশ্য শুধু বাংলাদেশ নয়, রসুনের চড়া দামে ভুগছে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, মালয়েশিয়াসহ বহু দেশ। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রসুন উৎপাদন ও রপ্তানি করে। গত বছরের শেষ দিকে ভারী বৃষ্টিপাত, এরপর তুষারপাতে সেখানে রসুনের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগকারীরা মুনাফার গন্ধ পাওয়ায় রসুন মজুতে বিপুল বিনিয়োগ করছেন। এতে বাজার চড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সম্প্রতি চীনের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট নামের একটি পত্রিকায় ‘রসুনে মধু খুঁজে পেয়েছে বিনিয়োগকারীরা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, চীনে রসুনের কেজিপ্রতি দাম ১৬ ইউয়ানে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দ্রুত অর্থ উপার্জনের একটি পথ এখন রসুন। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টন রসুনের চাহিদা আছে। এর মধ্যে দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন উৎপাদিত হয়। বাকিটা মূলত চীন থেকে আমদানি করা হয়। ঢাকার কারওয়ান বাজারের আড়তে গতকাল শনিবার চীনা রসুন মানভেদে ১৭৮-১৮৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আড়তের কাছাকাছি খুচরা দোকানগুলোতে মিলছে ১৯০ টাকা কেজি দরে। তবে ঢাকার অন্যান্য বাজারে চীনা রসুন কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং দেশি রসুন মানভেদে ১৬০-১৮০ টাকা চাইছেন বিক্রেতারা। কারওয়ান বাজারের আড়তের বিক্রেতা এমদাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মাস খানেক আগে চীনা রসুন প্রতি কেজি ১৬০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন তিনি।
অন্যদিকে দেশি রসুন ছিল কেজিপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। তিনি বলেন, এ বছর কৃষকেরা রসুনের দাম সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন। বছরজুড়েই পণ্যটির দাম বেশি ছিল। রাজধানীর শ্যামবাজারের কৃষিপণ্যের আড়ত নবীন ট্রেডার্সের মালিক নারায়ণ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, চীনে রসুনের দাম অত্যধিক বেশি বলে গুটি কয়েক আমদানিকারক আমদানি করছেন। এ ছাড়া এ বছর ভারত ও মিয়ানমার থেকেও রসুন আমদানি হচ্ছে না। তিনি বলেন, শ্যামবাজারে এখন ভারতীয় পেঁয়াজ ১৭-১৮ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ২২-২৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি নতুন মৌসুমের রসুন বাজারে আসবে আগামী এপ্রিল মাসে। তাঁর আগে দাম কমার কোনো আশাও জানাতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এদিকে রাজধানীর বাজারে অন্যান্য পণ্যের দাম স্থিতিশীল আছে। গেল সপ্তাহে সবজির বাজারে নতুন করে এসেছে পাকা টমেটো (টক)। এর কেজিপ্রতি দর চাওয়া হয়েছে ৫০-৬০ টাকা। অন্যান্য বেশির ভাগ সবজি কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। তবে অভিজাত বাজারে দাম আরেকটু বেশি। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৪০-১৫০ টাকা এবং ফার্মের মুরগির ডিম হালিপ্রতি ৩২-৩৪ টাকা চাওয়া হচ্ছে। গেল সপ্তাহে চাল, ডাল, আটাসহ প্রধান প্রধান নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে তেমন কোনো হেরফের হয়নি।

আয়কর বিবরণী জমার সময় আর চার দিন

ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় আছে আর মাত্র চার দিন। অন্য বছর এমন শেষ সময়ে রিটার্ন জমার জন্য করদাতাদের মধ্যে যেমন তোড়জোড় থাকে; তেমনি বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর দাবি ওঠে। কিন্তু এবার আর সেই পরিস্থিতি নেই। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব করদাতাকে রিটার্ন জমা দিতে হবে। সময় বাড়বে না—এ ঘোষণা বাজেটেই দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। করদাতাদের মধ্যে যাঁরা এখনো রিটার্ন দেননি, তাঁরা এখন ব্যস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে যাঁরা রিটার্ন জমা দিতে পারবেন না, তাঁদের বাড়তি টাকা গুনতে হবে। নির্ধারিত করের ওপর মাসিক ২ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। এমনকি যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে কোনো করদাতা যদি সময় বাড়িয়ে নেন, তবু এ বিলম্ব সুদ দিতেই হবে। যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে আবেদন করলে উপ কর কমিশনার দুই মাস সময় বাড়িয়ে দিতে পারেন। এত দিন প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর রিটার্ন জমার সময় শেষ হতো। প্রতিবার ব্যবসায়ীদের দাবিতে সময় একাধিক দফা বৃদ্ধি করা হতো। কিন্তু চলতি অর্থবছরে ৩০ নভেম্বর সময় বেঁধে দিয়ে অর্থবিল পাস করা হয়েছে।
মানে, সময়সীমা এখন আইনি কাঠামোর মধ্যে চলে এসেছে। এবার ২৪ থেকে ৩০ নভেম্বর আয়কর সপ্তাহ পালন করছে এনবিআর। এ সময়ে আয়কর মেলায় যেসব সুবিধা পান করদাতারা, তাঁরা মাঠপর্যায়ে কর কার্যালয়ে একই সুবিধা পাবেন। প্রতিটি কার্যালয়ে সহায়তা কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। আর করদাতাদের সুবিধার্থে প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত রিটার্ন জমা নেওয়া হচ্ছে। কী পরিমাণ রিটার্ন জমা পড়েছে—এর তথ্য হালনাগাদ করেনি এনবিআর। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকার বেশি হলেই রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক। এর ফলে এ বছর চাকরিজীবীদের মধ্যে রিটার্ন জমার সংখ্যা ৪ লাখ বাড়বে বলে জানিয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। গতবার প্রায় ১২ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন। গতবারের মতো এ বছরও আড়াই লাখ টাকার বেশি আয় হলে বার্ষিক আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দিতে হবে। তবে আড়াই লাখ টাকার কম আয় হলেও কয়েক শ্রেণির করদাতাদের অবশ্যই রিটার্ন জমা দিতে হবে। গাড়ির মালিক ও অভিজাত ক্লাবের সদস্য হলেও বাধ্যতামূলক রিটার্ন দিতেই হবে। এ ছাড়া চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, হিসাববিদদের মতো পেশাজীবীদের করযোগ্য আয় না থাকলেও এনবিআরকে আয়-ব্যয় বিবরণী জানাতে হবে। সব মিলিয়ে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধি, সরকারি চাকরিজীবীসহ ২০ ধরনের করদাতাদের রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক।
চেক লিস্ট: শুধু আয়কর ও সম্পদ বিবরণীর ফরম পূরণ করে দিলেই হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী বেশ কিছু কাগজপত্র আয়কর বিবরণীর দলিলের সঙ্গে জমা দিতে হবে। সেগুলোর অন্যতম হলো বেতন খাতের আয়ের দলিল, সিকিউরিটিজের ওপর সুদ আয়ের সনদ, ভাড়ার চুক্তিপত্র, পৌরকরের রসিদ, বন্ধকি ঋণের সুদের সনদ, মূলধনি সম্পদের বিক্রয় কিংবা ক্রয়মূল্যের চুক্তিপত্র ও রসিদ, মূলধনি ব্যয়ের আনুষঙ্গিক প্রমাণপত্র, শেয়ারের লভ্যাংশ পাওয়ার ডিভিডেন্ড ওয়ারেন্ট, সুদের ওপর উৎসে কর কাটার সার্টিফিকেট। কোনো করদাতা যদি কর রেয়াত নিতে চান, তবে বেশ কিছু কাগজপত্র লাগবে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জীবনবিমার কিস্তির প্রিমিয়ার রসিদ, ভবিষ্য তহবিলে চাঁদার সনদ, ঋণ বা ডিবেঞ্চার, সঞ্চয়পত্র, স্টক বা শেয়ারে বিনিয়োগের প্রমাণপত্র, ডিপোজিট পেনশন স্কিমে চাঁদার সনদ, কল্যাণ তহবিলে চাঁদা ও গোষ্ঠীবিমার কিস্তির সনদ, জাকাত তহবিলে চাঁদার সনদ। শাস্তি: ৩০ নভেম্বরের পর বার্ষিক আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দিলে নির্ধারিত করের ওপর সুদ দিতে হবে—চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশে ৭৩এ নামে নতুন একটি ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে কোনো করদাতা বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা দিতে ব্যর্থ হলে ওই ব্যক্তির করের ওপর মাসিক ২ শতাংশ হারে বিলম্ব সুদ দিতে হবে। তবে সুদ নির্ধারণ হবে সারা বছরে ওই করদাতা যে উৎসে কর ও অগ্রিম কর দিয়েছেন, তা বাদ দিয়ে আয়করের ওপর।

তাঁর বিপ্লবের রেশ রয়ে যাবে

ফিদেল কাস্ত্রো
যে মানুষটি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন, ৫০ বছর ধরে বিশ্বদরবারে পদচারণ করেছেন, সেই মানুষটি পৃথিবী ত্যাগ করার আগে কিউবার জন্য একদিকে বিনা মূল্যের স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যদিকে খাদ্য ঘাটতি রেখে গেলেন। কিন্তু কিউবায় তাঁর নামে একটি রাস্তাও নেই। এমনকি দেশটিতে তাঁর ভাস্কর্যও নেই, যদিও সে রকম স্বীকৃতির প্রয়োজন তাঁর নেই। শিশুরা লাল স্কার্ফ পরে নিখরচার স্কুলে যাচ্ছে, নড়বড়ে বাড়ির সামনে মানুষকে রেশনে টয়লেট পেপার দেওয়া হচ্ছে, পেনশনধারীদের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে, একঘেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় ভর্তি সংবাদপত্র—এসব দেখেই বোঝা যায়, মানুষটি ছিলেন। ইতিহাসবিদেরা হয়তো আগামী দিনগুলোতে বিতর্ক করবেন, কাস্ত্রো কী রেশ রেখে গেলেন। কিন্তু তাঁর বিপ্লবের সফলতা ও ব্যর্থতাগুলো কিউবার সমাজে একদম দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক সময়ের সংস্কার সত্ত্বেও ৫০ বছর ধরে দেশটিতে যে ‘ফিদেলবাদ’ চলেছে, তার দৃষ্টান্ত পরিষ্কার। বিশ্লেষক ও দ্য কিউবা ওয়ার্সের লেখক ড্যান এরিকসন বলেছেন, ‘ফিদেল যখন ১৯৫৯ সালে ক্ষমতায় এলেন, তখন খুব কম মানুষই ধারণা করতে পেরেছিলেন, তিনি এভাবে কিউবার সমাজের খোলনলচে বদলে দিতে পারবেন। সারা বিশ্বের এ রকম অনুসারী তৈরি করতে পারবেন।’ কিন্তু ফিদেলের শাসনের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো, তিনি দেশে সম্পদের স্বল্পতা রেখে গেছেন। কিউবার আমজনতাকে একদিকে যেমন পরিবহন, গৃহায়ণ ও খাদ্যস্বল্পতায় ভুগতে হয়, তেমনি সাবান, বই ও জামাকাপড়ের উচ্চ মূল্যের জন্যও সমস্যায় পড়তে হয়। ২০০৮ সালে রাউল কাস্ত্রো ক্ষমতায় আসার পরও এসব সমস্যা রয়ে গেছে। তখন থেকে কিউবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন শুরু করে। তারা ছোট ব্যবসায় উৎসাহ দেওয়া শুরু করলেও দেশটির অর্থনীতির সিংহভাগ এখনো রাষ্ট্রের হাতে রয়ে গেছে, যেখানে গড় মাসিক মজুরি ১৫ ডলারের নিচে। এতে অনেকেই পার্শ্ব উপার্জন করতে বাধ্য হয়েছেন। যে যেভাবে পারছেন, সেভাবেই বাড়তি আয়ের চেষ্টা করছেন, অনেক নারী বেশ্যাবৃত্তি করছেন, অনেকেই আবার স্বল্পমাত্রায় হলেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। আর যাঁদের ভাগ্য ভালো, তাঁরা পর্যটকদের কাছ থেকে হার্ড কারেন্সি পাচ্ছেন, আবার অনেকেই ফ্লোরিডায় বসবাসরত আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ডলার পাচ্ছেন। নতুন বুদ্ধি বের করতে কিউবার মানুষেরা খুবই পারদর্শী। তাঁরা ছোট পুঁজি নিয়ে সম্মানের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা পরিস্থিতিটা আরও আয়াসসাধ্য করতে চান। ২০ বছরের তরুণ মিগুয়েল আমাদের বলেছিলেন, ‘আমরা ভালো জিনিস কিনতে চাই, আপনারা যেমন নিজেদের দেশে কেনেন।’
কাস্ত্রো মনে করতেন, কিউবার মানুষের এই দুঃখ-কষ্টের কারণ হচ্ছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। দীর্ঘদিনের এই শত্রুতামূলক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক ও কিউবার বিপুল মানুষ মনে করেন, জোড়াতালি লাগানো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ অধিকতর বিপর্যয় বয়ে এনেছে। তবে দেশটিতে সর্বজনীন ও নিখরচার শিক্ষা থাকার কারণে তার সাক্ষরতা বিশ্বমানের, মানুষের গড় আয়ুও অনেক। কমানদান্তে এটা নিশ্চিত করেছেন যে, রাষ্ট্র যেন সবচেয়ে গরিব মানুষটির কাছেও যেতে পারে, লাতিন আমেরিকার অনেক দেশই যা করতে পারেনি। জীবনের শেষ দশকটি তিনি একরকম লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও কাস্ত্রো মানুষের হৃদয়ে ও মনে স্থান করে নিয়েছেন। শেষ দিকে তিনি ক্রমাগত অশক্ত হয়েছেন। এ সময়টা তিনি মূলত বাগান করেছেন। এ ছাড়া যখন তাঁর মৃত্যুর গুজব রটেছে, তখন তিনি রাষ্ট্রীয় পত্রিকা গ্রানমার নতুন সংখ্যা হাতে নিয়ে ছবি তুলেছেন। মাঝেমধ্যে কলাম লিখেছেন তিনি, এমনকি কখনো কখনো কিউবার বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কঠোর সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু ফিদেলের প্রভাব যে কমে আসছিল, তা দৃশ্যমান ছিল। হাভানাভিত্তিক এক কূটনীতিক বলেছেন, ‘ফিদেল বহুদিন ধরে একজন প্রভাবশালী চরিত্র ছিলেন, কিন্তু রাউল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’ ফিদেলের মৃত্যুর যত না রাজনৈতিক তাৎপর্য, তার চেয়ে প্রতীকী তাৎপর্য বেশি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘তাঁর উপস্থিতি কি সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, সম্ভবত। তরুণদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর দেশটিতে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে না। তবে রাউলের মৃত্যু আরও তাৎপর্যময় হতে পারে। কারণ, তিনি সংস্কারের পথে হাঁটছেন। মনে রাখা দরকার, কিউবায় িকন্তু সংস্কার শুরু হয়ে গেছে। ২০১০ সালে রাউল অর্থনীতির যে আধুনিকায়ন পরিকল্পনা হাতে নেন, তার ফলে ১০ লাখ মানুষ চাকরি হারায়। এর সঙ্গে ছোট ব্যবসা যেমন পারিবারিক রেস্তোরাঁ ও পারিবারিক হোটেলের অনুমতি দেওয়া হয়। কৃষকদের বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তাঁদের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সরকার বিদেশ ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি শিথিল করেছে,
বেতনের সীমা বাড়িয়েছে; একই সঙ্গে গাড়ি বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে বিদেশি সহযোগীদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য জোন গড়ে তুলেছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কূটনীতিতে, সরকার যেমন একদিকে ভ্যাটিকানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি করেছে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, এই দেশটি ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে গড়ে ওঠা। রেভল্যুশন স্কয়ারের মার্বেল পাথরের সিঁড়িতে পা রাখুন বা ফিদেল যেখানে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষের সামনে দীর্ঘ বক্তৃতা দিতেন সেখানে দাঁড়ান, দেখবেন, বিপ্লব এই দেশটাকে কতটা বদলে দিয়েছে। তবে বিপ্লবের পর ফিদেল সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তা পেলেও নিজ দেশে সরকার পরিচালনা শুরু করার পর তিনি অতটা জনপ্রিয় ছিলেন না। সম্পদ আত্তীকরণ, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, সন্দেহভাজন শত্রুদের ওপর হামলে পড়া—এসব কারণে অনেকেই তাঁকে ঘৃণা করত, বিশেষ করে আগের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দেশটিতে পরিবর্তন আসছে, তা ঠিক। কিন্তু কিউবা এখনো ভেনেজুয়েলারই কাছাকাছি থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রের নয়। কিন্তু এটাও পরিষ্কার, সে ফিদেলের জমানা থেকে বেরিয়ে আসছে, ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছে। এমন একসময় ছিল, যখন দেশটির মানুষ রাস্তায় গোপনে সালভাদর আয়েন্দের উদ্ধৃতিসংবলিত ফলক লাগিয়েছিল: ‘তরুণ বয়সে কেউ বিপ্লবী হবে না, তা হতে পারে না। ব্যাপারটা জৈবিক, তরুণ বয়সে বিপ্লবী হতেই হবে।’ কথা হচ্ছে, সেই সময় কিন্তু আর নেই।   ব্রিটেনের দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানথেকে নেওয়া।
রোরি ক্যারল: দ্য গার্ডিয়ান-এর লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক পশ্চিম উপকূলের প্রতিনিধি।
জোনাথন ওয়াটস: দ্য গার্ডিয়ান-এর লাতিন আমেরিকা প্রতিনিধি।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।

আবার রোহিঙ্গা—একটি আবর্তিক সংকট

মিয়ানমার থেকে আসা নারী ও শিশুদের কয়েকজন
বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে আবার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমাবেশ হয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ হাজার নর-নারী ও শিশু সীমান্তপারে দাঁড়িয়ে আছে সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য। জানি না এদের আর কয় দিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে। কারণ, এর মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশকে তাগাদা দিচ্ছে রোহিঙ্গাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দিতে। যদি এদের আসতে দেওয়া হয়, এটি হবে তৃতীয়বারের মতো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে সরকারিভাবে প্রবেশ এবং এর জের চলবে আরও অনেক দিন। যেমন হয়েছিল ১৯৭৮-৭৯ ও ১৯৯২-৯৪ সালে। বর্তমান পৃথিবীতে উদ্বাস্তু সমস্যা এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উদ্বাস্তু সমস্যা সারা ইউরোপকে আলোড়িত করেছে। সিরিয়া ও ইরাকের যুদ্ধে লাখ লাখ লোক নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় চাইছে হাজার হাজার মাইল দূরে। বিভিন্ন কারণে কোথাও স্থায়ী হতে পারছে না।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে নিজেদের দেশে অন্তর্ঘাতী যুদ্ধের জন্য, নৌকা নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, মারাও যাচ্ছে পথেঘাটে। তবু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ পালাচ্ছে। রোহিঙ্গারাও পালাচ্ছে নিজের বাসভূমি ছেড়ে। কারণ, সেখানে তাদের থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অন্য উদ্বাস্তুদের তফাত এই যে, রোহিঙ্গারা যুদ্ধের ফলে ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে না; তাদের দেশে কোনো যুদ্ধ চলছে না। তারা নিজ ভূমিতে নিগৃহীত এক সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘু। সে দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী ও সরকার তাদেরকে নাগরিক হিসেবে গণ্য করতে নারাজ। এর পেছনে তাদের প্রধান যুক্তি হলো, রোহিঙ্গারা নাকি আদতে বাঙালি অনুপ্রবেশকারী। তারা এটা বলেই রোহিঙ্গাদের ১৯৭৮ সাল থেকে আরাকান অঞ্চল থেকে খেদানোর চেষ্টা করে আসছে। ১৯৭৮ সালে প্রথম রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় আমি বৃহত্তর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলাম। সে বছরের মে মাসে রোহিঙ্গারা প্রথম চট্টগ্রামের উখিয়া সীমান্তে উপস্থিত হলে আমাদের সীমান্তরক্ষীরা তাদের নিয়মমাফিক বাধা দেয়। তারা সীমান্তের পাশেই বসতি গড়তে থাকে। কিন্তু কয়েক দিনের ভেতর তাদের সংখ্যা বেড়ে কয়েক হাজার হয়ে দাঁড়ায়। তারা সীমান্তরক্ষীদের চাপ দিতে থাকে তাদের সীমান্ত অতিক্রম করতে অনুমতি দিতে।
এমতাবস্থায় স্থানীয় প্রশাসনকে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা অধিনায়ক অনুরোধ জানান তাঁদের এ ব্যাপারে করণীয় কাজে সরকারি পরামর্শ দিতে। মহকুমা প্রশাসকের জরুরি বার্তা পেয়ে আমি চলে যাই উখিয়াতে। বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশপ্রধান ও স্থানীয় সেনাবাহিনী কমান্ডারও পরে যোগ দেন। উখিয়ায় গিয়ে দেখি, সীমান্তের দুই ধারে প্রায় পাঁচ হাজার নর-নারী ও শিশু। সীমান্ত অধিনায়ক বললেন, এরা চার দিন ধরে বসে আছে বাংলাদেশ সীমান্ত পার হওয়ার জন্য। অধিকাংশ উদ্বাস্তু শুকনো জমিতে খড়ের বিছানা পেতেছে, কেউ কেউ মাথার ওপর শালপাতা দিয়ে ছাদ বানিয়েছে। সবার সঙ্গে কিছু বাক্স আর রান্নার হাঁড়িপাতিল। আমাদের দেখে কিছু নেতা গোছের লোক এগিয়ে আসে। তারা বাংলাদেশে আশ্রয় চায়। কারণ, বর্মি সেনারা তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, তাদের ওপর অত্যাচার করেছে। কেউ কেউ দেখাল তাদের গায়ে জখমের দাগ। কেন পুড়িয়ে দিয়েছে জানতে চাইলে তারা বলল, বার্মা সরকার (এখন মিয়ানমার) নাগরিকত্ব তদন্তের নামে অভিযান চালিয়েছে। যেসব লোক নাগরিকত্ব কাগজ দেখাতে পারেনি, পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের উৎখাত করেছে। (নাগরিকত্বের কাগজ ছিল না, কারণ তাদের সরকারের কাছ থেকে এ রকম কোনো কাগজ তারা কখনো পায়নি)।
বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশপ্রধান ও সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধানের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক হলো, উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশের ভেতরে মানবতার খাতিরে আসতে দেওয়া হবে, তবে তাদের অস্থায়ী আশ্রয় হবে সীমান্তের পাশে। স্থানীয় প্রশাসন ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় উদ্বাস্তুদের খাবারের বন্দোবস্ত এবং তাঁবু বানানোর সরঞ্জাম মহকুমার ত্রাণ অফিস থেকে দেবে। একই সঙ্গে আমরা স্বরাষ্ট্র এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়ে দিয়ে আমাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে সরকারের অনুমোদন চাইলাম। সরকারের তরফ থেকে এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকার কথা নয়, তাই সেদিন থেকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে প্রবেশ করার অনুমতি পায়।
সেদিন আমরা বুঝতে পারিনি, এ সিদ্ধান্তের ফলে আমরা একটি বিরাট শরণার্থী জলপ্রপাতের সম্মুখীন হব। সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহের মধ্যে শরণার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এক মাসে দাঁড়ায় এক লাখের ওপর। উখিয়াতে আমরা শুরু করি দুটি শিবির দিয়ে, অচিরেই আরও পাঁচটি শিবির স্থাপন করতে হলো। খুব তাড়াতাড়ি শরণার্থীর সংখ্যা দুই লাখের ওপর দাঁড়ালে আমরা আরও ছয়টি শিবির স্থাপন করি। শিবিরগুলো ছিল সীমান্তসংলগ্ন এলাকায়। বারোটি ছিল কক্সবাজার অঞ্চলে (টেকনাফ, উখিয়া) আর একটি ছিল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায়।
শরণার্থীদের প্রথম দিকে ত্রাণ সরকারের তরফ থেকেই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ক্রমেই এটা দুষ্কর হচ্ছিল। খুব শিগগির সাহায্য আসে ইউএনএইচসিআর থেকে, যার সঙ্গে যোগ দেয় অন্যান্য আন্তর্জাতিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বিদেশি সাহায্যের সুফল ও কুফল দুই-ই ছিল। সুফল বলা বাহুল্য, কুফল ছিল যে সাহায্যের পরিমাণ আর প্রাচুর্য শরণার্থীদের আরও আকর্ষণ করতে থাকে। আমরা স্থানীয় প্রশাসন প্রমাদ গুনলাম যে ত্রাণের বাহুল্যে শরণার্থীরা শিবিরগুলোকে তাদের চিরস্থায়ী আশ্রয় মনে করে বার্মায় ফিরে যাওয়ার কথা ভুলে যেতে পারে।
এ সম্ভাবনা আমাদের মনে প্রথম থেকেই ছিল বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আমার চারটি সুপারিশ ছিল—শরণার্থী শিবির সীমান্তের কাছাকাছি থাকবে; শিবিরগুলো থাকবে কড়া পুলিশ প্রহরায়, যাতে শরণার্থীরা এলাকার অভ্যন্তরে যেতে না পারে; বিদেশি ত্রাণ সংস্থাগুলো কাজ করবে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এবং শরণার্থী সমস্যাকে আন্তর্জাতিক না করে বার্মার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হবে। তৎকালীন মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সব সুপারিশই গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ সরকার বর্মি সরকারের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা শুরু করে। শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দুবার উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়; একবার ঢাকায়, অন্যবার আরাকান রাজ্যের মংডুতে। আমি দুটিতেই শামিল ছিলাম। ঢাকার আলোচনার পর বর্মি দল কক্সবাজারে আসে শরণার্থী শিবির দেখতে। সফরকারী দলে ছিলেন বার্মার উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডিরেক্টর জেনারেল অব ইমিগ্রেশন এবং রাষ্ট্রদূত। আমি নিজে তাঁদের কয়েকটি শিবিরে নিয়ে যাই, তাঁরা স্বচক্ষে শরণার্থীদের অবস্থা দেখেন। মংডুতে আলোচনায় শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের সময়সূচি স্থির করা হয়।
শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন শুরু হয় ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি। অর্থাৎ এ সংকট শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায়। শুরু করি আমি নিজে এক প্রতীকী প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে। ৪০ জন শরণার্থীকে বাসে করে গুন্দুম সীমান্তে নিয়ে পায়ে হেঁটে পুল পার হয়ে নাফ নদীর ওপারে তাদের বর্মি কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছে দিয়ে আসি। এরপর নিয়মিত প্রত্যাবর্তন শুরু হয়। দু-একটি অপ্রিয় ঘটনা ছাড়া সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন কাজ শেষ হয় চার মাসের মধ্যে। আন্তর্জাতিক ইতিহাসে এত কম সময়ে দুই দেশের সহযোগিতায় দুই লাখ শরণার্থীর শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের নজির খুব কম। আজ আবার বাংলাদেশ হয়তো আরেকটি শরণার্থীসংকটের মুখোমুখি হাতে যাচ্ছে। সরকারিভাবে দেশের সীমান্তে জমায়েত হাজার হাজার রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশু আবার এ দেশে ঢুকতে চাইছে। কারণ, তারা নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত, সেখানে তারা অত্যাচারিত। মানবতার খাতিরে বা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশকে হয়তো এদের আশ্রয় দিতে হবে। কিন্তু তারপর? এ আবর্তক সংকটের শেষ কোথায়?
আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে আমরা যদি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সুফল পেয়ে থাকি, এখন তা অনুসরণ করলে অসুবিধা কী? বরং এখন আলোচনা আরও বেশি ফলপ্রসূ হবে। কারণ, রোহিঙ্গা সমস্যা এখন আন্তর্জাতিক চিন্তার বিষয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে এখনই আলাপ করা দরকার (যদি তা শুরু না হয়ে থাকে)। রোহিঙ্গা সমস্যা ৪০ বছর আগের মতো শুধু শরণার্থী ফেরত নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, তা–ও দেখতে হবে। এ আবর্ত থেকে বাংলাদেশকে মুক্তি পেতে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিক অধিকার দেওয়া দরকার। সে জন্য বাংলাদেশকে মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকার পেতে হবে।
এ ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মধ্যস্থতা করতে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে প্রস্তাব দিতে পারে। এই আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, তাই মধ্যকালীন ব্যবস্থা হিসেবে সীমান্ত এলাকায় ইউএনএইচসিআরের সাহায্যে শরণার্থী শিবির স্থাপনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রাজি হতে পারে, যার খরচ ইউএনএইচসিআর বহন করবে। অং সান সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমারে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে এসেছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও আশা করবে যে এ গণতন্ত্র তাঁর দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর উপকার করবে। রোহিঙ্গাদের উৎপত্তিস্থল বিচার না করে তারা কত যুগ ধরে ওই দেশের বাসিন্দা, তা দেখে তাদের নাগরিকত্ব বিচার তিনি এবং তাঁর সরকার করবেন, তা-ই আমরা আশা করব।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: রাজনৈতিক ভাষ্যকার।

ফিট থাকতে বিট

শরীর ফিট বা ঠিক রাখতে চাইলে খাদ্যতালিকায় বিট রাখতে পারেন। যাঁরা এই শীতের মৌসুমেও সতেজ ত্বক চান, তাঁদের জন্য সেরা শীতের সবজি এই বিট। শরীরে ক্ষতিকর উপাদান বা বিষমুক্ত করার বিশেষ উপাদান আছে বিটে।
বিট পছন্দ করুন বা না করুন এর পুষ্টিগুণ কিন্তু অনেক। দেখে নিন কী আছে বিটে:
বিটে আছে পুষ্টি: বিটে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন বি৬, এ, সি, নাইট্রেট আছে। শরীরকে সুস্থ রাখার নানা উপাদান থাকায় শীতের সবজি হিসেবে বিট খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
ত্বকের সুরক্ষায়: ত্বকের সুরক্ষার জন্য নানা উপাদান আছে বিটে। ত্বকের সজীবতা ধরে রাখতে নিয়মিত বিট খেতে পারেন। যাঁদের ত্বক তৈলাক্ত ও ব্রণ হওয়ার প্রবণতা বেশি, তাঁরা বেশি করে বিট খাবেন। এতে প্রদাহবিরোধী উপাদান থাকায় বিটের জুস নিয়মিত খেলে মুখে ব্রণের সমস্যা দূর হয়।
শরীরকে বিষমুক্ত করে: শরীরকে বিষমুক্ত করার উপাদান আছে বিটে। নিয়মিত বিটের জুস খেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে জমা বিষাক্ত উপাদান দূর হয়ে শরীর পরিষ্কার হয়, ত্বক সুন্দর হয়। সবচেয়ে ভালো ফল পেতে প্রতিদিন সকালে সতেজ বিটের জুস খেতে হবে।
নানা পদের খাবার: বিট কিন্তু নানাভাবে খাওয়া যায়। জুস ছাড়াও সালাদ ও সুপ হিসেবে, এমনকি রান্না করেও খাওয়া যায়।
শরীর আর্দ্র রাখে: শীতের সময় ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যায়। শীতের এই শুষ্কতা দূর করতে শুধু বাইরে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলেই হবে না; ভেতর থেকে শরীরকে আর্দ্র করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। প্রচুর পানি পান করার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার, প্রচুর ফল ও শাকসবজি খেলে শরীর আর্দ্র থাকে। শরীর আর্দ্র রাখতে পারে বিট। তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়াটাইমস।

দিনব্যাপী আয়োজনে গুগলের ডেভফেস্ট

‘সেরা আয়োজনটা শুরু হবে এর পরেই’—মঞ্চে ঘোষণা দিলেন সঞ্চালক। কী? কী? একটা চাপা রবে আগ্রহ নিয়ে গলা বাড়িয়ে দেন অংশগ্রহণকারীরা। ‘ভোজন পর্ব’—সঞ্চালকের উত্তর। দর্শকসারিতে যে আট্টহাসির রোল পড়ল, তা যেন আর শেষই হয় না। গতকাল শনিবার দুপুরের ঘটনা। রাজধানীর টিসিবি মিলনায়তনে তখন চলছে গুগল ডেভেলপার্স ফেস্টিভ্যাল বা ডেভফেস্টের বাংলাদেশ পর্ব।
এবার প্রথমবারের মতো গুগল ডেভেলপার গ্রুপের (জিডিজি) তিনটি সংগঠন জিডিজি ঢাকা, জিডিজি সোনারগাঁও ও জিডিজি বাংলা যৌথভাবে ডেভফেস্টের আয়োজন করেছে। এর পৃষ্ঠপোষক গুগল। ডেভফেস্ট শুরু হয় সকাল নয়টায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গুগলের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ইকোসিস্টেম ডেভেলপার রিলেশনসের প্রধান সুনসন কোন। মূল বক্তৃতায় মেশিন লার্নিং এবং টেনসোরফ্লো নিয়ে কথা বলেন তিনি। প্রথম আলোকে সুনসন বলেন, ‘আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে অংশগ্রহণকারীদের আগ্রহ দেখে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তাঁদের সংখ্যাটা কমেনি।’ এরপর ফায়ারবেজ এবং অ্যাঙ্গুলার জাভাস্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে আধুনিক ওয়েব অ্যাপ বানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী জুনায়েদ হোসাইন। অনুষ্ঠানে তিনটি প্যানেল আলোচনা ছিল। জিডিজি ঢাকার পরামর্শক আরিফ নিজামীর সঞ্চালনায় ‘ডিজিটাল রূপান্তর’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় কথা বলেন ডিনেটের প্রধান নির্বাহী অনন্য রায়হান ও রবি আজিয়াটা লিমিটেডের ডিজিটাল সার্ভিসেসের প্রধান মঞ্জুর রহমান।
অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির জনপ্রেক্ষিত বিশেষজ্ঞ নাইমুজ্জামান মুক্তা, বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর, অন্য রকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান ও জুমশেপারের প্রতিষ্ঠাতা কাউসার আহমেদের অংশগ্রহণে ‘লোকাল নিড, গ্লোবাল অপরচুনিটি’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সঞ্চালনায় ছিলেন জিডিজি বাংলার ব্যবস্থাপক জাবেদ সুলতান। বড় বড় বিদেশি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বাজারের নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য হুমকি কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে আমরাই সবচেয়ে ভালো জানি। আর তাই সেরা সমাধানটা আমরাই দিতে পারব।’ এ সময় ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা হচ্ছে, তাদের কাছে আমাদের সম্পর্কে প্রচুর তথ্য আছে। আর এই একটা সুবিধা দিয়ে তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।’ উইমেন টেকমেকার্স বাংলাদেশের লিড রাখসান্দা রুখামের সঞ্চালনায় ‘প্রযুক্তিতে নারী’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন গ্রামীণফোনের অ্যাপ ইকোসিস্টেমের প্রধান জাকিয়া জেরিন, বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক রিদমা খান ও ওয়ান৯৭ কমিউনিকেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার শাহানা শারমিন। অনুষ্ঠানে ইনোভেশন ইন গুগল নিয়ে আলোচনা করেন গুগলের কান্ট্রি মার্কেটিং কনসালট্যান্ট হাসমী রাফসানজানি। এবারের ডেভফেস্টে ছয় শতাধিক ডেভেলপার অংশ নিয়েছেন বলে জানানো হয়।
মেহেদী হাসান

গুগল গ্লাসের মাধ্যমে মস্তিষ্কের রোগ নির্ণয়

মস্তিষ্কসংক্রান্ত রোগ নিয়ে গবেষণার জন্য গুগলের তৈরি স্মার্টগ্লাসের সাহায্য নিচ্ছেন গবেষকেরা। সাইবেরিয়ার গবেষকেরা কোনো নির্দিষ্ট মস্তিষ্কের রোগের প্রাথমিক ঝুঁকিতে পড়ার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। গুগল গ্লাসের সাহায্য নিয়ে গবেষকেরা ব্যক্তির ভার্চ্যুয়াল রিয়্যালিটি-সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া ও তার নড়াচড়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন।
গবেষক ইভান তলমাচেভ বলেন, তাঁরা ব্যক্তির মাংসপেশি, মস্তিষ্ক ও ভেস্টিবুলার সিস্টেম বা ইন্দ্রিয়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। সুস্থ মানুষের ভেস্টিবুলার সিস্টেম ও অসুস্থ মানুষের ভেস্টিবুলার সিস্টেমের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ পরীক্ষার জন্য ব্যক্তিকে তার চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মানতে হয়। এ পরীক্ষা-পরবর্তী সময়ে পাঁচ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রেও করা যাবে। তথ্যসূত্র: আইএএনএস।

তামিমের সঙ্গী হওয়ার অপেক্ষায় গেইল

কুমিল্লা-ঢাকার ম্যাচ তখনো শুরু হয়নি। ডোয়াইন ব্রাভোর
সঙ্গে এই সময় দেখা হয়ে গেল ক্রিস গেইলের। দুই ক্যারিবীয়
তারকার আড্ডায় মজার কিছু খুঁজে পেলেন পাশেই থাকা
তামিম ইকবাল। কাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। প্রথম আলো
টুইটারে কাল একটা ছবি পোস্ট করেছেন ক্রিস গেইল। তাতে লেখা, ‘তামিম ইকবালের সঙ্গে ইনিংস শুরু করতে উন্মুখ’। চিটাগং ভাইকিংস অধিনায়কের সঙ্গে ক্যারিবীয় ওপেনারের হাস্যোজ্জ্বল ছবি বলছে, এবার ২২ গজে দুজনের রসায়নটা জমবে দারুণ। ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই বাংলাদেশের হয়ে প্রায় সব ব্যাটিং রেকর্ড তামিমের অধিকারে। গেইলকে অবশ্য মাপতে হবে টি-টোয়েন্টির নিক্তিতে।
ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে তাঁর একচ্ছত্র দাপট; নিজের করে নিয়েছেন বেশির ভাগ রেকর্ড। দুই বিস্ফোরক ওপেনার এবার বিপিএলে মিলছেন এক বিন্দুতে। তামিম-গেইল নামবেন চিটাগংয়ের হয়ে ওপেন করতে। তামিম-গেইল একসঙ্গে জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষের বোলারদের কী অবস্থা হবে একবার কল্পনা করুন। ব্যাটিংয়ের ধরনে যেমন মিল, দুজনের কথাতেও তাই। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে গেইলকে নিয়ে চিটাগং অধিনায়ক বলেছেন, ‘আমি ওর সঙ্গে ওপেন করতে মুখিয়ে আছি। তার সঙ্গে কখনোই ব্যাটিং করিনি। এটা অন্য রকম হবে। সে এমন একজন খেলোয়াড়, যেদিন খেলে মনে হয় ক্রিকেট খেলাটা অনেক সহজ!’
তামিমের সঙ্গে ব্যাটিং করা নিয়ে গেইলের রোমাঞ্চ টুইট বার্তাতেই পরিষ্কার। বাংলাদেশের কন্ডিশনে চিটাগং অধিনায়কের কাছ থেকে শেখার দিকটিকেও বড় করে দেখছেন ক্যারিবীয় ওপেনার, ‘তামিম কন্ডিশনটা খুব ভালো জানে। আমি একটু সময় নিতে পারি। দেখতে পারি সে কীভাবে খেলছে। ও খেলার মধ্যেই থাকায় জানে কীভাবে খেলতে হবে। ওকে দেখে দ্রুত ধারণা নিতে পারব। সে অনেক অভিজ্ঞ। আমিও চেষ্টা করব যতটা সম্ভব আক্রমণাত্মক থাকতে। চেষ্টা করব দলকে বিস্ফোরক শুরু এনে দিতে।’ টি-টোয়েন্টির সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন গেইলের উপস্থিতি মানেই প্রতিপক্ষের ওপর বিরাট চাপ। তবে চাপটা কখনো কখনো বুমেরাং হতে পারে তাঁর নিজের দলের জন্যও। গেইল-ছায়ায় যেন চিটাগং ঢাকা না পড়ে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সেটাই বলছিলেন তামিম, ‘চাই না দলে গেইল-ফ্যাক্টর থাকুক। যখন এ রকম কোনো ফ্যাক্টর থাকে এবং সে যদি ব্যর্থ হয় তখন তার প্রভাব পুরো দলেই পড়ে। গেইল আমাদের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যরাও তাই।
সবার গুরুত্ব সমান থাকতে হবে। এক্স-ফ্যাক্টর হয়ে থাকবে, এমন কাউকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে চাই না।’ গেইলের ব্যাটিংয়ে নিয়মিত ঝড় দেখা গেছে আগের তিন বিপিএলেই। এই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৩টি সেঞ্চুরিও তাঁর। ১০ ম্যাচে ৭৭.২৮ গড়ে রান ৫৪১। ৫০ ছক্কা মেরে আছেন সবার ওপরে। এবারও নিশ্চয়ই চাইবেন সে ধারা অব্যাহত রাখতে। গেইল অবশ্য আশাবাদী তাঁর ব্যাটিংয়ে হতাশ হবেন না দর্শকেরা, ‘কয়টি সেঞ্চুরি করেছি? দুটি না তিনটি? পরিসংখ্যান নিয়ে কখনোই চিন্তা করি না। সব সময় দর্শকদের যতটা সম্ভব বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করি। সিপিএলের পর প্রায় ৪-৫ মাস ম্যাচ খেলিনি। খেলায় ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। টুইটারে অনেকেই বলছিল আমাকে মাঠে দেখতে চায়। কালই (আজ) তাদের সুযোগ আসছে টিভিতে চোখ রাখার। ক্রিস গেইল ইজ ব্যাক!’ গেইল ফিরছেন, তামিমও আছেন ছন্দে। তৈরি থাকুন দুই ওপেনারের রোমাঞ্চকর ব্যাটিং দেখতে। বিপিএলেতাঁরাদুই
ম্যাচ   ইনিংস    রান   সর্বোচ্চ   ১০০    ৫০      ৪        ৬
তামিম ইকবাল   ২৯     ২৮    ৭৭৩    ৭৫      ০     ৮    ৭৫     ২৫
ক্রিস গেইল     ১০     ১০     ৫৪১    ১১৬     ৩     ১    ৩৫     ৫০

খারাপ খেলছি কই

সাকিব আল হাসান
সাকিব আল হাসানকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন সাংবাদিকেরা। বড় কিছু না ঘটলে বিপিএলের ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন বেশির ভাগ সময়ই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কিন্তু কাল মিরপুরে ঢাকা ডায়নামাইটস অধিনায়কের সামনে কত যে প্রশ্ন! সাকিবও যেন প্রস্তুত ছিলেন সব প্রশ্নের উত্তর দিতে। বিপিএলের প্রথম দুই আসরের ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট সাকিব এবার ম্যান অব দ্য ম্যাচই প্রথম হলেন কাল দলের অষ্টম ম্যাচে। আগের সাত ম্যাচে সব মিলিয়ে রান করেছেন ৯৪, সর্বোচ্চ ইনিংস ২৪ রানের। বল হাতে উইকেট মাত্র পাঁচটি। আইপিএল, বিগ ব্যাশ, ফ্রেন্ডস লাইফ টি-টোয়েন্টি—কী খেলেননি!
তবু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতম টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটারের বিপিএলে এমন নিষ্প্রভ থাকাটা মেনে নেওয়া যাচ্ছিল না। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার বাষ্পটা বেশি ছড়ানোর আগেই সাকিব দিলেন ফিরে আসার বার্তা। কাল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের বিপক্ষে করলেন ২৬ বলে অপরাজিত ৪১ রান, সঙ্গে ১ উইকেট। ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে সাকিবের স্বস্তিটা স্পষ্ট, ‘একটু অবদান রাখতে পারলে তো ভালোই লাগে। অত বেশি ব্যাটিং করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না, আজকে (গতকাল) সেই সুযোগটি ছিল। এর আগে এক-দুই ম্যাচে সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারিনি।’ সঙ্গে একটু রসিকতাও জুড়ে দিলেন, ‘এবার তো গাড়ি-টাড়ি দেখছি না। গাড়ি না থাকলে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়ে লাভ কী!’
বিপিএলে এবার একেবারেই কিছু করতে পারছেন না, এমন ঢালাও সমালোচনা মানতে রাজি নন সাকিব। টি-টোয়েন্টির বাস্তবতা তুলে ধরে বললেন, ‘আমি কয়টা ম্যাচে ব্যাটিং করেছি, কয়টা ম্যাচে খেলার সুযোগ ছিল...এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।  আর উইকেট পাওয়া না-পাওয়া পুরোই ভাগ্যের ব্যাপার। আমার মনে হয়, রাজশাহীর সঙ্গে আগের ম্যাচটা বাদ দিলে আমি ভালো বোলিং করেছি।’ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সময়ের দাবি মিটিয়ে খেলাটাই আগে সাকিবের কাছে। তা ছাড়া এবারের বিপিএলে তাঁর লক্ষ্যের মধ্যে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলীয় অর্জনই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, ‘একেক সময় একেক রকম লক্ষ্য থাকে। এ বছর একটাই লক্ষ্য—ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়া। আমি অবদান রাখি না-রাখি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো দলের পারফরম্যান্স।’ কিন্তু ঢাকার ফাইনালে উঠতে যে অধিনায়ক সাকিবের সঙ্গে অলরাউন্ডার সাকিবকেও জ্বলে উঠতে হবে! কালকের পারফরম্যান্সের পর সাকিব যেন সেটারও বিশ্বাস পাচ্ছেন, ‘আজ (গতকাল) যেমন একটু দরকার ছিল, সেটা করতে পেরে ভালো লাগছে। যখন কিছু করার সময় আসবে, তখন তা করতে পারাই গুরুত্বপূর্ণ।’ আগের তিন আসরের সঙ্গে তুলনা করে সাকিবের কাছে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনে হচ্ছে এবারের বিপিএল।
এ ছাড়া মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবালদের সঙ্গে তিনিও একমত, এবারের আসরের বড় প্রাপ্তি স্থানীয় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, ‘সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক ও সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক সবই তো স্থানীয়। এটা খুব ভালো লক্ষণ। এই কারণেই এবারের টুর্নামেন্ট অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে।’ মেহেদি মারুফ, মোহাম্মদ শহীদ, মোসাদ্দেক হোসেনের মতো এ রকম খেলোয়াড় সাকিবের দলেই আছেন কয়েকজন। মোসাদ্দেককে নিয়ে বেশ আশাবাদী ঢাকার অধিনায়ক, ‘ওর মধ্যে বড় খেলোয়াড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ভালো একজন ফিনিশার হতে পারে। দেখতে ওকে অত বিগ হিটার মনে না হলেও বড় শট খেলতে পারে সে। আমাদের দেশের অনেক ব্যাটসম্যানই এটা পারে না।’ মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারার ঢাকা ডায়নামাইটসে খেলা অন্য রকম অভিজ্ঞতাও দিচ্ছে সাকিবকে। বিপিএলে শ্রীলঙ্কার এই দুই সাবেক অধিনায়কেরও যে অধিনায়ক তিনি! তবে দলে এ রকম বড় ক্রিকেটার থাকার দুই রকম দিকই দেখছেন তিনি, ‘স্বাভাবিকভাবেই যখন সবাই পরামর্শ দিতে থাকে, তখন দ্বন্দ্বে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার যখন কী করা উচিত বুঝে ওঠা যায় না, তখন তাদের দিক থেকে ভালো পরামর্শ আসতে থাকে।’

Saturday, November 19, 2016

যেভাবে ফ্লোরিডা জয়-পরাজয় গড়ে দিল

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্লোরিডা আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। গত চারটি নির্বাচনে ফ্লোরিডা যেদিকে গিয়েছে, হোয়াইট হাউস সেদিকেই ঝুঁকেছে। এবার অভিবাসীদের নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আশা করা হয়েছিল, অভিবাসী-অধ্যুষিত এ অঙ্গরাজ্যটি বিপুল ভোটে ট্রাম্প-টিকিটকে প্রত্যাখ্যান করবে। ফ্লোরিডার মোট ভোটারের প্রায় ১৬ শতাংশ ল্যাটিনো, যাঁদের ভোট নির্বাচনের ফলাফলে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছিল। নির্বাচনের কয়েক দিন আগেও বিভিন্ন জনমত জরিপে হিলারি ক্লিনটন তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে হিস্পানিকদের মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে হিলারি ক্লিনটন ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে রেকর্ড ৩০ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, ততই জনমত জরিপগুলো এ অঙ্গরাজ্যে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছিল। এর মূল কারণ ছিল, অভিবাসী ভোটাররা যতই হিলারি ক্লিনটনের দিকে ঝুঁকছিল, শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা ততই ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে জোট বাঁধছিল। এক অর্থে গণমাধ্যমে হিলারি ক্লিনটনের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে থাকাই ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থকদের সংগঠিত হতে সহায়তা করেছে।
এ প্রবণতাটি হিলারি শিবির আঁচ করতে পারেনি। আর গণমাধ্যমেও এর পূর্বাভাস আসেনি। এটি ছিল শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের অঘোষিত কিন্তু সংকল্পবদ্ধ প্রয়াস। আরেকটি বিষয় হলো আর্লি ভোটিংয়ে ডেমোক্র্যাটদের প্রাধান্য প্রকাশ পাওয়ায় ভোটের দিন রিপাবলিকান, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা ব্যাপক হারে ভোটকেন্দ্রে জড়ো হন। ফলে যতই গ্রামাঞ্চলের ভোটের ফলাফল আসা শুরু করেছিল, ততই ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্লি ভোটিংয়ে পিছিয়ে পড়া সত্ত্বেও ধীরে ধীরে জয়ী হওয়ার পথে এগিয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি এ অঙ্গরাজ্যের ২৯টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট বাগিয়ে নেন। ফ্লোরিডায় গত কয়েক দিনে যা দেখলাম, তা থেকে এ অঙ্গরাজ্যটিকে সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের অন্য অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে স্বতন্ত্র মনে হয়েছে। নিরন্তর ছোট ছোট জাহাজের ভোঁ, মাথার ওপর দিয়ে যখন-তখন কপ্টারের শোঁ শোঁ, সবুজ পামগাছ—সব মিলিয়ে মনে হবে মার্কিন আদবকায়দার হুড়োহুড়ি থেকে এ বুঝি আলাদা৷ হবে না–ইবা কেন? ফ্লোরিডা সবার আদরের ‘সানশাইন স্টেট’ অর্থাৎ​ সূর্যালোকের রাজ্য, যেখানে তা কখনো চুরি যায় না৷ তাই শীত পড়লেই এ রাজ্যে ভিড় বাড়ে মার্কিনিদের। আর ভোটের সময় প্রার্থীদের। তাঁদের কাছেও এটা সানশাইন স্টেটই বটে৷ কারণ, এ রাজ্যের ভোট যাঁর ঝুলিতে যাবে, তাঁর মোটামুটি হোয়াইট হাউসে যাওয়া নিশ্চিতই। ঠিক যেভাবে সবাইকে চমকে দিয়ে সেখানে পৌঁছে গেলেন মার-আ-লাগো রিসোর্টের অধিপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প৷ ফ্লোরিডার খেটে খাওয়া মানুষ ও অবসরপ্রাপ্ত শ্বেতাঙ্গের দল ঝাঁপিয়ে পড়ে ভোট দিলেন এই ধনকুবেরকে। ভোটের মাত্র দুদিন আগে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও বলেছিলেন,
হিলারি যদি ফ্লোরিডা জিততে পারেন, তাহলে তিনিই হবেন প্রেসিডেন্ট৷ অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে সে কথা৷ ফসকে গেল ফ্লোরিডা, ফসকে গেলেন হিলারি৷ প্রমাণ হয়ে গেল, আমেরিকার ‘উত্তর প্রদেশ’ নিয়ে কেন রক্তচাপ ওঠা–নামা করে সব প্রার্থীর৷ ভারতে যেমন একটা কথা চালু আছে—উত্তর প্রদেশ যঁার, দেশ তঁার৷ তাই ভোটের প্রায় এক বছর আগে থেকে সেখানে রাজনীতিক নেতা-নেত্রীদের আনাগোনা বেড়ে যায়৷ কখনো কখনো মনে হতে পারে, সেখানে বুঝিবা উত্তর প্রদেশ ছাড়া কোনো রাজ্যই নেই৷ ফ্লোরিডাও তেমন৷ প্রাইমারি হোক বা মূল ভোট, প্রার্থীরা এখানে পড়ে থাকেন৷ যিনিই ভোটে দাঁড়ান, তঁার কাছেই এটা হয়ে ওঠে ‘সেকেন্ড হোম’৷ প্রচারপর্বে ট্রাম্প এই একটিমাত্র রাজ্যেই নিজের প্রফেশনাল ক্যাম্পেইন টিমকে কাজে না লাগিয়ে দলের সাহায্য নিয়েছিলেন৷ রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম ভরসা সুজি ওয়াইলস দায়িত্ব নিয়েছিলেন ট্রাম্পের প্রচারের৷ তাঁর দলের অনেকে এতে আপত্তি করেছিলেন৷ প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘এ রকম একটা লোকের জন্য কেন তিনি কাজ করছেন?’ ওয়াইলস বলেছিলেন, তাতে তাঁর কিছুই যায়-আসে না৷ তাঁর দল জিতল কি না, সেটাই বড়৷ ট্রাম্পের থেকে একেবারেই বিপরীত মেরুতে অবস্থান৷ তা–ও ৮ নভেম্বর রাত এগারোটা নাগাদ যখন ঘোষণা হলো, ‘ফ্লোরিডায় ট্রাম্প জিতে গিয়েছেন’, তখন সবচেয়ে উল্লসিত বোধ হয় ওয়াইলসই হয়েছিলেন। তাঁর তিন বছরের পরিশ্রম সফল হয়েছে।  নহ্যাঁ, একেবারেই তাই৷ তিন বছর ধরে মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো ও আস্থা অর্জনের কাজটা করে গিয়েছেন রিপাবলিকানরা। ট্রাম্প যতই রাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে থাকুন,
তিনি বিলক্ষণ জানতেন—এই অদ্ভুত ‘দোল খাওয়া রাজ্য’ যদি ঝুলিতে না আসে, তাহলে আর টাকার জোরে ভোটে দাঁড়ালেও ওভাল অফিসে ঢোকা হবে না৷ ফলে এখানে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে কোনো ভুল করেননি৷ ব্যক্তিগত প্রচার কমিটিকে দূরে সরিয়ে এখানে দলের সাহায্য চান, পানও। অর্থাৎ​‍ উর্বর জমির ওপর ট্রাম্প বীজ পুঁততে থাকেন৷ যার নিট ফল, মায়ামি-দাদে ছাড়া আর কোথাও জিততে পারেননি ক্লিনটন। কোথাও বিশাল ব্যবধানে, কোথাও আবার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছেন ট্রাম্পই৷ মায়ামিতে যেমন ৫ লাখ ৭২ হাজার ভোট পেয়েছেন হিলারি, তেমনই ট্যাম্পায় ২ লাখ ২৩ হাজার ভোটে জিতেছেন ট্রাম্প৷ এবার প্রশ্ন হলো, কেন বারবার চরিত্র বদলায় ফ্লোরিডা? সে জন্য তাকাতে হবে এখানকার জনসংখ্যার দিকে৷ মূলত শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকশ্রেণি, অবসরপ্রাপ্ত শ্বেতাঙ্গ, আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিকদের বসবাস এই রাজ্যে৷ অর্থাৎ​ বাসিন্দাদের প্রত্যেকেরই রোজগারের কথা ভাবতে হয়, দেশের অর্থনৈতিক ওঠা-নামা, কর্মসংস্থান বাড়া-কমা, শ্রমিক ছাঁটাই প্রভৃতি তাঁদের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ৷ ২০০৮ সালে লেহম্যান ব্রাদার্স নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করার পরে বিশ্বজুড়ে যে মন্দার সূচনা হয়েছিল, তার সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ছিল এই ফ্লোরিডা৷ তা সত্ত্বেও ওবামার ওপর ভরসা রেখে ২০১২ সালে ফের তাঁকেই জেতান ফ্লোরিডাবাসী। কিন্তু হিলারির ওপর সে আস্থা তঁারা রাখতে পারলেন না। তাই এই রাজ্যে প্রচারের জন্য ৮১টি অফিস তৈরি করেও হিলারি থেকে গেলেন দ্বিতীয় স্থানে৷ এক-চতুর্থাংশ বা ১ লাখ ৩৪ হাজার বেশি ভোট পেয়ে জিতে গেলেন ট্রাম্প৷ ফ্লোরিডার ইলেকশন বোর্ডের হিসাব বলছে, এখানে ৬৪ শতাংশ রেজিস্টার্ড শ্বেতাঙ্গ ভোটার আছেন, যার সিংহভাগ ভোট পেয়েছেন ট্রাম্প, পুরুষ-মহিলানির্বিশেষে।
তাই হিস্পানিকদের ১৩ শতাংশ ও কৃষ্ণাঙ্গদের ১৬ শতাংশ ভোটের বেশির ভাগটা হিলারি পেলেও কাজ হয়নি৷ এমনকি বহু হিস্পানিককে বলতে শোনা গেছে, ‘একবার সুযোগ দিয়ে দেখতে চাই!’ ভোট পণ্ডিতদের মত, হিলারি বুঝতেই পারেননি, তিনি যখন এই রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও একদা শরণার্থী হয়ে আসা মানুষের ভোট নিশ্চিত করতে ব্যস্ত, তখন শ্বেতাঙ্গদের নিজের পকেটে পুরে ফেলেছেন ট্রাম্প৷ সে জন্য তাঁর আলাদা অফিসেরও দরকার হয়নি। হিসাব বলছে, ট্রাম্প মোট ১৭ বার এ রাজ্যে প্রচারে এসেছেন৷ প্রতিবারই তিনি একটা কথা বলেছেন, ‘খেটে খাওয়া মানুষকে ভুলে রয়েছে এ সরকার৷ আপনাদের জন্য কিছু করবে না ডেমোক্র্যাটরা৷ আমাকে একটা সুযোগ দিন। দেখুন, কীভাবে বদলে দিই আপনাদের জীবন!’ দিনের শেষে তিনি একজন দুঁদে শিল্পপতি৷ বিশাল বিশাল হোটেল থেকে শুরু করে গলফ কোর্স—সবই রয়েছে তাঁর৷ তিনি মানুষের ‘পালস’ বুঝতে পারবেন না, তা কি হয়? ফলে সঠিক সময়ে তিনি সঠিক জায়গায় টোকা মেরেছেন৷ এমনকি নিউইয়র্কে তাঁর হোটেলে কাজ করা মেক্সিকানরা পর্যন্ত বলেছেন, ‘আমরা তাঁকেই ভোট দেব৷ কিন্তু উনি আমাদের তাঁকে ভোট দেওয়ার জন্য চাপ দেননি!’ এঁদের প্রত্যেকেই ফ্লোরিডার বাসিন্দা৷ সবাই প্রায় ‘আর্লি ভোটিং’ করেছিলেন৷ অর্থাৎ​‍ ই-মেইলে ব্যালটে নিজের ভোট আগেই দিয়ে এসেছিলেন। এ বছর ফ্লোরিডায় এই ভোটারের সংখ্যাও নেহাত কম নয়৷ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ভোট পোস্টাল ব্যালটে হয়েছে৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন,
আর্লি ভোটে সুবিধা করতে পারেননি হিলারি৷ এর প্রায় পুরোটাই পেয়েছেন ট্রাম্প৷ ২৯টি ইলেকটোরাল কলেজের ভোট রয়েছে ফ্লোরিডায়৷ সেই ভোট অধিকাংশ সময়ই নির্ধারক হয়ে ওঠে৷ ৫৬ বছরের ইতিহাসে এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না৷ এ-ও এক ইতিহাস৷ ১৯৮০ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী রোনাল্ড রিগ্যান হেরে গিয়েছিলেন ফ্লোরিডায়৷ কিন্তু প্রবেশ করতে পেরেছিলেন হোয়াইট হাউসে। তারপর এ ঘটনা আর কখনো ঘটেনি৷ এমনকি ২০০৪ সালে বুশ-আল গোরের লড়াইয়ে বুশ ফ্লোরিডা জেতেন মাত্র ২ হাজার ভোটে৷ দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে থেকে যান৷ এবারও ব্যতিক্রম হলো না৷ মানুষ দেখল, বিতর্কের শীর্ষে থাকা একজন শিল্পপতি কীভাবে পৌঁছে যেতে পারেন ওভাল অফিসে৷ রাজনীতিকদের কাছে ‘সংকেত’ হয়ে ওঠা ফ্লোরিডাবাসী কিন্তু নিজেদের এই চরিত্রে দারুণ খুশি। নইলে কি আর ভোটের পরের দিন একদল তরুণ হিলারি-সমর্থক চিত হয়ে শুয়ে রোদের আদর খেতে খেতে বলেন, ‘এটা তো সূর্যশিখার রাজ্য৷ সব সময়ই উজ্জ্বল! এবার রিপাবলিকানদের জন্য হয়েছে, পরেরবার আমাদের হবে! এখানে এভাবেই উদয়-অস্ত হয়৷’ নেই আফসোস, নেই দুঃখ, নেই হতাশা৷ মেক্সিকো উপসাগরের শাখা-উপশাখা দিয়ে ঘিরে থাকা এই জলাভূমি তাই যেন অবলীলায় বজায় রাখে অদ্ভুত এক নিরপেক্ষতা, যাকে ফি বছর আলেয়ার মতো ধাওয়া করতে হয় রাজনীতিকদের৷
রোজিনা ইসলাম: সাংবাদিক।

রাষ্ট্রধর্মই কি এখন আওয়ামী লীগের রক্ষাকবচ?

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে দলের যে গঠনতন্ত্র আছে, তার মূলনীতি অংশে বলা আছে: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হইবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি।’ কিন্তু ৬৭ বছরের আওয়ামী লীগ কি তার এই ঘোষিত মূলনীতি থেকে সরে এসেছে? ঘোষণাপত্রে তারা অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের কথাও বলেছে, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এখন নাসিরনগর ও সাঁওতালপল্লির ঘটনায় বিএনপিই আওয়ামী লীগকে সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে গালমন্দ করছে এবং আওয়ামী লীগের নেতারা জোর গলায় তার প্রতিবাদও করতে পারছেন না। এই প্রথম কোনো ঘটনায় আওয়ামী লীগ কিছুটা পিছু হটল। বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা বিএনপি–জামায়াতের শাসনামলে এসব অঘটন হলে আক্রান্ত মানুষগুলো আওয়ামী লীগের কাছেই আশ্রয় খুঁজত। কিন্তু এখন তারা কোথায় যাবে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিবদমান স্থানীয় আওয়ামী লীগ এক পক্ষ অপর পক্ষকে শায়েস্তা করতে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে অভিযোগ আছে। এটি অনেকটা অপরের যাত্রাভঙ্গ করতে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার মূলে যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সক্রিয় ছিল, সেটি পুলিশ, মানবাধিকার কমিশন ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের তিনজন নেতাকে সাময়িকভাবে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তবে নাসিরনগর পরিদর্শন করে এসে একজন প্রবীণ রাজনীতিক, যিনি আওয়ামী লীগের সুহৃদ বলেই পরিচিত, বলেছেন, ওই তিনজন নয়, আরও অনেকে সেখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরিতে সক্রিয় ছিলেন। বাইরে থেকে সেখানে  ট্রাকে–বাসে করে মানুষ এনে হামলা চালানো হয়েছিল। ঘটনার দুই সপ্তাহ পরও প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত বা ধরা না পড়ার কারণ সরকারের অক্ষমতা না সদিচ্ছার অভাব? ওই প্রবীণ নেতা স্থানীয় প্রশাসনে উদ্ধৃতি দিয়ে আরও জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই পক্ষেরই মিত্র হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ও হেফাজতে ইসলাম এবং বড় হুজুরের সমর্থকেরা, ১৯৯৮ সালে যারা সেখানে তাণ্ডব ঘটিয়েছিল প্রশিকা নামে একটি এনজিওর সমাবেশ আহ্বানকে কেন্দ্র করে। এরা একসময় আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড বিরোধিতা করলেও সাম্প্রতিককালে গলাগলি করে চলছে।
কয়েক বছর আগেও সেক্যুলার আওয়ামী লীগ ও হেফাজতে ইসলাম মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত নানা অঘটন ঘটায়। এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রশাসন বলছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের অনুরোধে (না হুকুমে!) তারা নাসিরনগরে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরপর সেই সমাবেশ থেকে যখন মিছিল নিয়ে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়, তখন স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার দায় এড়াবে কীভাবে? এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার কাউকেই ছাড় দেবে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের দুজন সাংসদ কারাগারে এবং তিনজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনীত মামলা বিচারাধীন বলে জানান। কিন্তু তাঁর এই আশ্বাসে ওই এলাকার আক্রান্ত মানুষগুলো খুব একটা আশ্বস্ত হবেন বলে মনে হয় না। প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ‘হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গ্রেপ্তার বিএনপির নেতা আমিরুল হোসেন চকদারকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। বৃহস্পতিবার তাঁর পক্ষে আদালতে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার বাদী। আমিরুল উপজেলা সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। ৩০ অক্টোবর মন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামি হিসেবে গত মঙ্গলবার রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন বুধবার তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ নাসিরনগর থানায় গিয়ে দাবি করেন, আমিরুল হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।’ (প্রথম আলো,
১৮ নভেম্বর ২০১৬) অপরাধের প্রধান সাক্ষী আক্রান্ত মানুষ ও পারিপার্শ্বিক আলামত। আক্রান্ত মানুষগুলো যাঁকে নির্দোষ বলে দাবি করছেন, সরকার তাঁকে ধরছে কেন? এর একটি কারণ হতে পারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। আরেকটি হলো প্রকৃত অপরাধীকে  আড়াল করা। এই দুই সূত্র নিয়ে কোনো ঘটনার তদন্ত এবং মামলা এগোলে কোনো দিন সত্য প্রকাশিত হবে না, অপরাধীরা শাস্তির বাইরেই থেকে যাবে। আওয়ামী লীগের ওই নেতা যেমনটি বলেছেন, ‘কেউই ছাড় পাবেন না’, সেটি যদি তাঁদের মনের কথা হয়, তাহলে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি বা গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে। তখনই একটি মামলার অপমৃত্যু হয়, যখন জজ মিয়া কাহিনি সাজানো হয়। থানা-পুলিশ বিএনপি নেতাকে পাকড়াও এবং গয়রহ ৮০/৮৫ জন মানুষকে ধরতে পারলেও সন্দেহভাজন আওয়ামী লীগের কোনো নেতার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি। সুতোর টানটা কোথায় বুঝতে অসুবিধা হয় না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শ্রেণিচরিত্রে খুব একটা ফারাক নেই। নির্বাচন এলে এ দল থেকে ও দলে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়। খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠেন বাংলাদেশি, আর নির্ভেজাল বাংলাদেশি বনে যান নিখাদ বাঙালি। আন্দোলন–সংগ্রাম থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অধিকতর সংবেদনশীল বলে দাবি করে। কিন্তু নাসিরনগর ও গোবিন্দগঞ্জের ঘটনার পর সেই দাবি কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন উঠবেই। কঠিন সত্য যে সমাজের সবচেয়ে নিগৃহীত ওই জনগোষ্ঠী এখন আর কোনো দলের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। দুটি স্থানেই আওয়ামী লীগের অবস্থান আক্রান্তের পক্ষে নয়, বিপক্ষে। গোবিন্দগঞ্জে যে নেতারা সাঁওতালদের চিনিকলের জায়গায় বসতি গড়তে ইন্ধন জুগিয়েছেন,
উচ্ছেদেও তাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভোটের আগে আওয়ামী লীগের নেতারা জনদরদি ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও ভোটের পর তা অনায়াসে ভুলে যান। তাঁরা মুখে বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করলেও সেক্যুলার পোশাকের আড়ালে নিজেদের সাম্প্রদায়িক চরিত্রটি আর আড়াল করতে পারছেন না। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি আগে থেকেই ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করত, এখন আওয়ামী লীগও ওই পথে হাঁটা শুরু করছে। আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি, জামায়াত এবং ক্ষেত্রবিশেষে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে অহরহ সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করে থাকে। সেই অভিযোগ যে অমূলক, তা–ও বলা যাবে না। এসব দল ধরেই নিয়েছে যে সংখ্যালঘু ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভোট তারা পাবে না। আর আওয়ামী লীগ ভাবে, সংখ্যালঘুরা কোথায় যাবে, তাদের ভোট নৌকায়ই দিতে হবে। দুই পক্ষের দ্বিমুখী আক্রমণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা ক্রমেই প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে, নিয়ত িনরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নাসিরনগরে যখন হেফাজতে ইসলাম ও আহলে সুন্নাতের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সদ্ভাবের খবর গণমাধ্যমে এসেছে, তখন আরেকটি খবরও রাজনৈতিক মহলে বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক সম্প্রতি সার্ক কালচারাল সোসাইটির এক সেমিনারে বলেছিলেন, ‘সুযোগ পেলে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা হবে।’ তিনি বাংলাদেশে সামরিক শাসকেরা কীভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি ও সমাজকে কলুষিত করেছেন, তারও চিত্র তুলে ধরেন ওই বক্তৃতায়।
রাজ্জাকের এই বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসলামি আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ওলামা লীগসহ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন হইচই করে উঠল। তারা দল থেকে তাঁকে বহিষ্কারেরও দাবি জানায়। অথচ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সদা উদ্বিগ্ন কোনো প্রগতিশীল দল, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠন ড. রাজ্জাকের পক্ষে দাঁড়িয়েছে বলে জানা যায়নি। বরং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ওটি তাঁর (আব্দুর রাজ্জাক) ব্যক্তিগত মত। সরকার বা আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা কিংবা সংবিধান সংশোধনের চিন্তা করছে না। তবে তিনি এ–ও বলেছেন, দলের একজন নেতা ব্যক্তিগত অভিমত দিতেই পারেন। পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পর সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও বলেছিলেন, ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাবে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেসব প্রতিক্রিয়াশীলতা জেঁকে বসেছে, তার জন্য আওয়ামী লীগের নেতারা দুই সামরিক শাসককে দায়ী করলেও অজ্ঞাত কারণে তাঁরা এরশাদকে ছাড় দিয়ে চলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক চরিত্র নির্মাণে জিয়ার ভূমিকা যদি চার আনা হয়, এরশাদের বারো আনা। অথচ আওয়ামী লীগ সেই বারো আনাকে সঙ্গে নিয়ে চার আনার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। এখন প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে যে আওয়ামী লীগ কি সত্যি সত্যি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে চার মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করবে, না পতিত স্বৈরশাসক–প্রবর্তিত সংবিধানের ক্ষত বয়ে বেড়াবে? এখানে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ১৯৮৮ সালে এরশাদ যখন রাষ্ট্রধর্ম চালু করেন, তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দল ও পাঁচদলীয় বাম জোট তার প্রতিবাদে হরতাল পালন করেছিল। তারা কি এখন সেই হরতালটি ফিরিয়ে নেবে?
কেবল নেতারা নন, আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও মনে করেন, রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করার আগে সমাজকে তৈরি করতে হবে। কিন্তু সমাজ যে তৈরি নয়, সেই কথাটি তাঁদের কে বলল? তাঁরা কি কোনো জরিপ করে দেখেছেন যে সাধারণ মানুষ ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির পক্ষে। উনসত্তরের, একাত্তরের কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি ধর্মবাদী রাজনীতিকে নাকচ করতে পারে, আজকের বাংলাদেশ কেন পারবে না? অনেক বিষয়ে আওয়ামী লীগ স্ববিরোধিতায় ভুগছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে এগিয়ে নিতে গণজাগরণ মঞ্চ যখন সাহসী ভূমিকা নেয়, তখন আওয়ামী লীগ তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই গণজাগরণ মঞ্চকে তারা কীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে, সেটিও সবার জানা। আওয়ামী লীগের পতাকায় চারটি তারকা আছে চার মূলনীতির প্রতীক হিসেবে—জাতীয়তাবাদ (বাঙালি), গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। গণতন্ত্র অত্যন্ত ভঙ্গুর। মুক্তবাজার অর্থনীতি ধারণ করে আওয়ামী লীগ অনেক আগেই সমাজতন্ত্রকে পরিত্যাগ করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদও এরশাদের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে আপস করে চলেছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কি বঙ্গবন্ধুর চার মূলনীতি থেকে সরে এসে এরশাদ–প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্মকেই রক্ষাকবচ হিসেবে মেনে নিচ্ছে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

কিমের পর প্যারিসে হামলার শিকার মল্লিকা

মল্লিকা শেরাওয়াত
প্যারিস যেন এক আতঙ্কের নগর হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। বিশেষ করে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের জন্য প্যারিস তো রীতিমতো ভয়ের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিম কার্দাশিয়ানের পর এবার ফ্রান্সের প্যারিস শহরে ডাকাতের কবলে পড়লেন বলিউডের অভিনেত্রী মল্লিকা শেরাওয়াত। শুধু ডাকাতের কবলেই পড়েননি, হামলার শিকারও হয়েছেন তিনি। ১১ নভেম্বর প্যারিসে মল্লিকা ও তাঁর ফরাসি ব্যবসায়িক প্রেমিক সাইরিলের অ্যাপার্টমেন্টে কয়েকজন মুখোশধারী ঢুকে পড়ে।
এরপর দুজনের চোখে-মুখে কাঁদানে গ্যাস স্প্রে করে এবং তাঁদের প্রহার করে। কিন্তু মল্লিকার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কিছু না নিয়েই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই পুলিশে অভিযোগ করেছেন মল্লিকা ও তাঁর প্রেমিক। গত বৃহস্পতিবার ফরাসি পুলিশ কর্তৃপক্ষ হামলার ব্যাপারে গণমাধ্যমকে জানায়। তারা এও জানায়, এ ঘটনার আরও তদন্ত হচ্ছে। জানা গেছে, মার্কিন রিয়েলিটি শো তারকা কিম কার্দাশিয়ান যে এলাকায় ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন, তাঁর খুব কাছেই মল্লিকার ওপর এই হামলা হলো। ডেইলি মেইল।

‘অজ্ঞাতনামা’ দেখতে দর্শকের ভিড়

অজ্ঞাতনামার প্রদর্শনীর আগে কলকাতার রবীন্দ্রসদনের
বাইরে দর্শকদের ভিড়। ভাস্কর ব্যানার্জি
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা নেমেছে গতকাল শুক্রবার রাতে। ১১ নভেম্বর কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে এই চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন করেছিলেন বলিউড তারকা অমিতাভ বচ্চন। উৎসবে প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশের ছবি তৌকীর আহমেদ পরিচালিত অজ্ঞাতনামা। ছবিটি প্রথমে ১২ নভেম্বর কলকাতার পূর্বাঞ্চলীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে ও ১৭ নভেম্বর কলকাতার রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। এদিনের প্রদর্শনীতে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তৌকীর আহমেদ ও কলকাতার চিত্রপরিচালক গৌতম ঘোষ। সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত এই উৎসবে ৬৫টি দেশের ১৫৬টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়।
উৎসবের উদ্বোধনী দিনে এতে অংশ নেন বলিউড তারকা জয়া বচ্চন, শাহরুখ খান, সঞ্জয় দত্ত, কাজল, পরিণীতি চোপড়া প্রমুখ। উৎসবে প্রদর্শিত বাংলাদেশের ছবি অজ্ঞাতনামা দর্শকদের মধ্যে বেশ আলোড়ন তুলেছে। ছবিটি দেখে উৎসবে আসা কলকাতার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অনেকেই বলেন, বেশ ভালো সিনেমা এটি। তাঁরা মুগ্ধ হয়েছেন এই ছবি দেখে। প্রদর্শনীর শুরুতে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে দেখা যায় দর্শকদের লম্বা লাইন। ছবি দেখা শেষে কয়েকজন দর্শক আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও ভালো ছবি তৈরি করবে। এদিকে পরিচালক তৌকীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সত্যিই আমি মুগ্ধ কলকাতার দর্শকদের বাংলাদেশি ছবি দেখার আগ্রহ দেখে। মানুষ ছবি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন, প্রশংসা করেছেন। দর্শকদের ছবিটি ভালো লাগছে ভেবে আমিও আনন্দিত।’

Thursday, November 17, 2016

প্লুটোর ভূগর্ভে সমুদ্র্রে সন্ধান

দূরবর্তী ছোট গ্রহ প্লুুটোতে হিমায়িত হৃদয়াকৃতি পৃষ্ঠের তলদেশে লুকায়িত এক সমুদ্র থাকার প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যেখানে পৃথিবীর যেকোনো সমুদ্রের সমপরিমাণ পানি ধারণ করা হতে পারে।
এই আবিষ্কার গত বুধবারে নেচার কম এর জার্নালে প্রথম প্রকাশিত হয়, পৃথিবীর বাইরে লুকায়িত সাগর আছে বলে ধারণা করা হয় এমন গ্রহগুলোর তালিকায় প্লুুটো নতুন করে যুক্ত হলো, যেগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটা জীবন ও বসবাস উপযোগীও হতে পারে বলে মনে করা হয়।
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার মহাকাশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস নিম্মো এ ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্লুুটোর এই সাগর যা সম্ভবত বরফে পরিপূর্ণ, ছোট গ্রহটির তুষারাবৃত্ত পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫০-২০০ কিলোমিটার নিচে এবং প্রায় ১০০ কিলো মিটার গভীর।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনলজির বিজ্ঞানী রিচার্ড বিনযেল বলেন, প্লুুটোর সমুদ্র এত বেশি বরফ দ্বারা আচ্ছাদিত যে তা জীবন ধারণ করার জন্য উপযোগী কোনো বিকল্প হতে পারে না, তবে তিনি এও যোগ করেন যে ‘কখনোই অসম্ভব নয়, কথাটা বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত’।
তরল পানি জীবনের জন্য অপরিহার্য এক উপাদান বলে বিবেচনা করা হয়।
জুলাই ২০১৫তে প্লুুটো ও এর পরিপার্শে¦র উপগ্রহের কাছ দিয়ে নাসার ‘হরাইজন’ মহাকাশ যান ঘুরে আসার সময় ধারণকৃত ইমেজ এবং তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই আবিষ্কার করা হয়।
বিনযেল বলেছেন,‘এটা দেখায় যে আমরা যতটুকু কল্পনা করতে সক্ষম প্রকৃতি তার চেয়ে আরো অনেক বেশি সৃজনশীল, আর এই কারণেই আমরা অনুসন্ধান করা থামাই না, আমরা দেখতে চাই প্রকৃতি কি কি করতে সক্ষম’।
সূর্য থেকে পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৪০ গুণ দূরে হওয়া সত্ত্বেও প্লুুটোর ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগের গঠনকালীন তেজস্ক্রিয়তা এখনো পানিকে তরল রেখেছে।
নিম্নে উল্লেখ করেন ‘প্লুুটোতে যথেষ্ট পরিমাণ শিলা আছে যা থেকে এখনো তাপ উদগিরণ হচ্ছে এবং কয়েকশ’ কিলোমিটার বরফশেল তাপ-অপরিবাহী হিসেবে ভালই কাজ করে’ ‘সুতরাং ভূগর্ভস্থ সমুদ্র খুব বিস্ময়কর কিছু নয়, বিশেষ করে যখন অ্যামোনিয়া রয়েছে যা একটি জমাটবিরোধী পদার্থের মত কাজ করে’।
বিজ্ঞানীরা ১০০০ কি.মি.ব্যাপী ‘স্পুটনিক প্লানিশিয়া’ নামে পরিচিত অববাহিকা সম্বন্ধে জানতে গিয়ে এই আবিষ্কার করেন। এখানেই রয়েছে সেই আলোচিত হৃদয়াকৃতির অঞ্চলটি যা প্লুুটোর বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থানে অবস্থিত। কম্পিউটার মডেল অনুযায়ী এই অববাহিকাটা পুরোপুরি বরফে পূর্ণ যা প্লুুটোকে উলটিয়ে এর আবরণে ফাটল সৃষ্টি করে। যেটা একমাত্র ঘটতে পারে ভূগর্ভস্থ মহাসাগর এর উপস্থিতি থাকলে।
‘নিউ হরাইজন’ মহাকাশযান এখন সৌরজগতের কুইপের বেল্ট অঞ্চলের আরেক হিমায়িত গ্রহের দিকে আগাচ্ছে যা প্লুুটো থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন মাইল দূরে। ১ জানুয়ারি ২০১৯ সালে এটি ‘২০১৪ এমইউ৬৯’ পরিচিত এক বস্তুর পাশ দিয়ে উড়ে যাবে।
রয়টার্স থেকে অনুবাদ শাদমান সাকিব

ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা কঠোর করবে ইইউ

গ্রিস সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
মঙ্গলবার রাজধানী এথেন্সে প্রাচীন দুর্গ এলাকা ঘুরে
দেখেন। সঙ্গে ছিলেন দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের
কর্মকর্তা প্রত্নতত্ত্ববিদ এলেনি বানো। ছবি: রয়টার্স
ভিসামুক্ত ভ্রমণের ক্ষেত্রে অনলাইনে যাচাইয়ের পরিকল্পনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পর্যটক এবং ব্যবসায়ীদের ইউরোপ পৌঁছার আগে অনলাইনে ৫ ইউরো (৫ দশমিক ৩৫ ডলার) খরচ করে নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ইইউর নির্বাহী বিভাগ ইউরোপীয় কমিশনে গতকাল বুধবার পরিকল্পনাটি পাস হওয়ার কথা। এই নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়ার আওতায় ভ্রমণ-ইচ্ছুক ব্যক্তিকে নিজের পরিচয় ও বসবাসের বিস্তারিত তথ্য অনলাইনে জানাতে হবে। ইইউর নিরাপত্তা ও অপরাধবিষয়ক ডেটাবেইসে সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্য যাচাইয়ের পরই ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হবে। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হামলা এবং অভিবাসীদের চাপ সামলাতে ইউরোপীয় কমিশন এ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কমিশনের আশা,
অনলাইনে যাচাইয়ের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গ্রিসের সীমান্তে অভিবাসীদের চাপ, ইউরোপে অপরাধী ও জঙ্গিদের সহিংসতা এবং অবৈধ অভিবাসী সৃষ্টির হার কমে যাবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপের শেঙ্গেন অঞ্চলে যে ৬০টি দেশের নাগরিকেরা ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা পেয়ে আসছিলেন, তাঁদের ওপর প্রভাব পড়বে। এমনকি ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্য ইইউ জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর দেশটির নাগরিকেরাও বিপাকে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ভিসামুক্ত ভ্রমণের ব্যাপারে তুরস্ক ও ইউক্রেনের দাবি বাস্তবায়নও ঝুলে যাবে। ইউরোপীয় কমিশনে প্রস্তাবটি পাসের পর অনুমোদনের জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং সদস্যদেশগুলোর সরকারের কাছে পাঠানো হবে। অনুমোদনের পর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০ কোটি ইউরো খরচ করতে হবে। এ ছাড়া বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ইউরো।

রাখাইনে রোহিঙ্গা দমন নিয়ে কফি আনানের ‘গভীর উদ্বেগ’

কফি আনান
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিহত হওয়া এবং সেখানে চলমান অন্যান্য সহিংসতার ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ’ জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। সেখানে সপ্তাহান্তে সেনাবাহিনীর হাতে অনেক লোক নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই রোহিঙ্গা মুসলিম। সেখানে চলমান দমনাভিযানে আতঙ্কিত হয়ে শত শত রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
মিয়ানমারের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কফি আনানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিশন রাখাইন রাজ্যে গেছে। ওই রাজ্যের রাজধানী সিত্তিতে সাবেক এই মহাসচিব স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। এরপর মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে কফি আনান এই রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক সহিংসতায় আক্রান্ত গ্রামগুলোতে গতকাল বুধবার কফি আনানের যাওয়ার কথা। মঙ্গলবার রাতে এক বিবৃতিতে কফি আনান বলেন, সহিংসতায় রাখাইন রাজ্যে পুনরায় অস্থিরতা বিরাজ করছে। নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও বলেন, ‘সব সম্প্রদায়েরই উচিত সহিংসতা পরিত্যাগ করা। এবং আমি নিরাপত্তা বিভাগকে আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্যশীল থেকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করব।’ গত মাসে মিয়ানমারের পুলিশ ফাঁড়িতে প্রাণঘাতী হামলার পর সীমান্তের কাছে থাকা নিপীড়িত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের সেনাবাহিনী অবরোধ করে রেখেছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে, বিদেশি জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত রোহিঙ্গা মুসলিমরা পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার সঙ্গে জড়িত। তারা ওই সব হামলাকারীকে খুঁজছে এবং ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর হাতে প্রায় ৭০ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা (অ্যাকটিভিস্ট) বলছেন,
সংখ্যাটি হবে এর চেয়ে ঢের বেশি। তাঁরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিদের হত্যা, নারীদের ধর্ষণ ও তাঁদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অ্যাকটিভিস্টদের এই দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষককে তদন্ত করতেও দিচ্ছেও না। এদিকে ওয়াশিংটনে বসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র এলিজাবেথ ট্রুডো বলেন, রাখাইনে সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বিগ্ন। এ ঘটনায় ‘স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত’ করার অনুমতি দিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। কয়েক দিন পরিস্থিতি শান্ত থাকার পর সপ্তাহান্তে দুই দিনের লড়াইয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে ৩০ জনের বেশি নিহত হয়। জানা গেছে, দেশটির সেনাবাহিনী এবারই প্রথম হেলিকপ্টার গানশিপ ব্যবহার করেছে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতারা বলেন, সহিংসতার কারণে তাঁদের প্রায় ২০০ লোক বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের ফেরত পাঠানোয় তারা সেখানে আটকা পড়েছে। অক্টোবরের শুরুতে সহিংসতা শুরুর পর গত সোমবারই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয় বলেও তাঁরা জানান। রাখাইন প্রসঙ্গে মানবিক বিষয় সমন্বয়ের জাতিসংঘ অফিস বলছে, দেড় লাখ লোক থাকার অত্যন্ত দরিদ্র এই এলাকায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো ধরনের মানবিক সাহায্য গিয়ে পৌঁছায়নি এবং সাম্প্রতিক সহিংসতায় সেখানের প্রায় ১৫ হাজার লোক বাস্তুহারা হয়েছে।

ট্রাম্পের বন্ধুত্ব আশা করেন বাশার!

আরটিপিকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন বাশার (বঁায়ে)। এএফপি
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বলেছেন, তিনি আশা করছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর একজন বন্ধু হয়ে উঠবেন। তবে সতর্কভাবে তাঁকে পর্যবেক্ষণও করছে সিরিয়া। পর্তুগালের আরটিপি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাশার এ কথা বলেন। বাশার বলেন, ট্রাম্প যদি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার পূরণ করেন, তাহলে তিনি হবেন একজন ‘স্বাভাবিক মিত্র’। তিনি বলেন, ‘তিনি কী করতে যাচ্ছেন তা আমরা এখনো জানি না। কিন্তু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তিনি যদি লড়াই শুরু করেন, সে ক্ষেত্রে রুশ এবং ইরানিদের সঙ্গে সিরীয়দের যে ধরনের বন্ধুত্ব তেমনটাই হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি অনুসারে দেশটি আইএস এবং অন্য ইসলামপন্থী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বাশারবিরোধী পক্ষকে সমর্থন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প তাঁর প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করতে পারবেন, সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন বাশার আল-আসাদ। এই সিরীয় প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ট্রাম্প আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কি তা সত্যিই করতে পারবেন?’ সুতরাং বিষয়টি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে উল্লেখ করেন এই নেতা। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করা নয় বরং সিরিয়ায় আইএস দমনকেই তিনি প্রাধান্য দেবেন। এদিকে সিরিয়ায় সংঘাত আরও জোরালো রূপ নিচ্ছে। সরকারি বিমান থেকে বিদ্রোহীদের দখলে থাকা আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় বোমা বর্ষণ করা হয়েছে মঙ্গলবার। তিন সপ্তাহের মধ্যে এটাই প্রথম হামলা বলে মানবাধিকারকর্মীরা জানাচ্ছেন।