Sunday, September 8, 2013

কৃষকের কণ্ঠস্বর শাইখ সিরাজ by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

শাইখ সিরাজ হয়ে উঠছেন কৃষকের মুখপাত্র। আমাদের দেশে বিভিন্ন পেশা ও ধরনের মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য তাদের প্রতিনিধি রয়েছে, ফোরাম রয়েছে, লোকজন রয়েছে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের আছে মহাশক্তিশালী সংগঠন চেম্বার। সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে এমনকি কখনও কখনও সরকারকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে তারা সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। অনেকে বলেন, তারা সব সময়ে সরকারের মধ্যেই ঢুকে থাকেন এবং সরকার তাদের স্বার্থেই কাজ করে থাকেন। এছাড়া সাংবাদিকদের রয়েছে শক্তিশালী সমিতি। বিভিন্ন পেশাজীবীরও নিজ নিজ মঞ্চ রয়েছে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। এমনকি শ্রমিকদেরও রয়েছে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ইউনিয়ন। দেশের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত। তারা সংগঠিত নন। তাদের পক্ষে কথা বলার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো সংগঠন নেই। কৃষকদের নামে কিছু রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন আছে, যারা দলের স্বার্থে কাজ করে, কৃষকের স্বার্থে নয়। সরকারে কৃষকদের প্রতিনিধি নেই। জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি রয়েছেন, আইনজীবী-পেশাজীবী রয়েছেন। কোনো কৃষক নেই। তাই কৃষকদের কথা বলার কেউ নেই। এই শূন্যস্থানটিতে এগিয়ে এসেছেন শাইখ সিরাজ। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে নয়। জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নয়। তিনি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কৃষকদের লবিস্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিশ্বময় লবিস্টরা মোটা অংকের ফি পেয়ে থাকেন। শাইখ সিরাজ কৃষকদের কাছ থেকে ফি আদায় করেন না। যুগ যুগ ধরে অবহেলিত, অসহায়, দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে কাজ করা বুঝি তার ব্রত। শিক্ষকতা যেমন শিক্ষকদের ব্রত ও পেশা, তেমনি সাংবাদিকতা শাইখ সিরাজের পেশা ও ব্রত। এ পেশার মাধ্যমেই তিনি মানবসেবার ব্রত পালনে আগ্রহী। কর্মজীবনের শুরু থেকেই মিডিয়া জগতে তার প্রবেশ ঘটে। বেতার-টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতায় প্রবেশ। লক্ষণীয়, সে সময় থেকে এ পর্যন্ত অনেকেই সংবাদ পরিবেশনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, বিনোদন, কথা-সাংবাদিকতা প্রভৃতি মিডিয়া অঙ্গনে অবদান রেখেছেন, সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। কিন্তু এসব পরিচিত ক্ষেত্র রেখে শাইখ সিরাজ বেছে নিয়েছিলেন স্বল্প পরিচিত একটি অঙ্গন, কৃষি সাংবাদিকতা। মাটি ও মানুষ নিয়ে তার পুরনো দিনের অনুষ্ঠানগুলো এখনও অনেকের স্মৃতিপটে জেগে রয়েছে।
তার এই ব্যতিক্রমী পেশা নির্বাচন পরিকল্পিত, না দৈব ঘটনা তা আমি জানি না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছি, নতুন কোনো ডিপার্টমেন্ট খোলা হলে অনেক ভালো ছাত্র বহুল পরিচিত ও কাক্সিক্ষত বিষয়ে ভর্তি না হয়ে নতুন বিভাগটিতে ভর্তি হয়। অনেকটা ‘ঐ নতুনের কেতন ওড়ে’ কবিতার ছন্দে। কৃষি সাংবাদিকতার অকর্ষিত ক্ষেত্রেও তেমন মনোভাব নিয়ে শাইখ সিরাজ এসেছিলেন কি-না, তা তিনিই বলতে পারবেন। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সে সময়ে দেশের জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কৃষি-শ্রমিক তথা কৃষিজীবীর সংখ্যা ছিল জনসংখ্যার কমবেশি অর্ধাংশ। অথচ সংবাদপত্রে কৃষি বা কৃষকের কোনো খবর ছাপা হতো না। রেডিও-টিভিতে সংবাদ প্রচারে কৃষির খবর ছিল না। ফিচার অনুষ্ঠানেও কৃষি থাকত না। অবশ্য কৃষকের জন্য রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান হতো। এমন একটি সম্ভাবনাময় অথচ পিছিয়ে থাকা ক্ষেত্র শনাক্তকরণে শাইখ সিরাজের সক্ষমতা তার বাস্তবমুখিতার পরিচয় বহন করে। মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি কৃষিকে চিনতে শিখেছেন এবং কৃষিক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। তখনকার অনুষ্ঠানগুলো ছিল তথ্য প্রদানমূলক। কোন সার কতটুকু দিতে হয়, কোন কীটনাশক কখন কী পরিমাণে প্রয়োগ করতে হয়- এসব তথ্য পরিবেশনই ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান উপজীব্য। কৃষকরা চিঠিপত্রের মাধ্যমে প্রশ্ন করতেন। এখনকার মতো তাৎক্ষণিক টেলিফোনে নয়। এভাবেই দক্ষতার সঙ্গে কৃষি অনুষ্ঠান করে শাইখ সিরাজ সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
তারপর দ্বিতীয় অধ্যায়। ফরিদুর রেজা সাগরের নেতৃত্বে ব্যক্তিখাতে চ্যানেল আই সম্প্রচার শুরু করল। শাইখ সিরাজ এর সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন আঙ্গিকে শুরু করলেন কৃষি-সাংবাদিকতা। বিষয় পুরনো, মাত্রা নতুন। শাইখ সিরাজ চ্যানেল আইতে কৃষিবিষয়ক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ও সংবাদ পরিবেশন শুরু করলেন। তিনি ও তার দল গ্রামগঞ্জ চষে সচিত্র কৃষি সংবাদ সংগ্রহ করতে লাগলেন। শুধু সংবাদই নয়, সংশ্লিষ্ট মানুষদের কথাও। কৃষকের মুখ থেকে ক্যামেরায় ধারণ করা শুরু হল সংবাদের পেছনের কথা। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে কৃষক। এ ছিল অচিন্তনীয়। কিন্তু কৃষক যখন ক্যামেরার সামনে সহজ সরল ভাষায় অকপটে তার মনোভাব ব্যক্ত করতে শুরু করল, তখন শহুরে সাংবাদিক তথা দর্শকের বোধোদয় ঘটতে লাগল। শহর আর গ্রামের সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ল। একদিকে শহরে কৃষি ও কৃষক পরিচিত হয়ে উঠল, অন্যদিকে টেলিভিশন মিডিয়া বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করল।
শাইখ সিরাজের সর্বশেষ অবদান হল কৃষকের লবিস্ট হিসেবে তার কর্মযজ্ঞ। প্রতিবছর জাতীয় বাজেট প্রস্তুতকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সব সেক্টরের স্টেকহোল্ডাররা নিজ নিজ সমিতি, মঞ্চ, চেম্বার প্রভৃতির মাধ্যমে লবিং শুরু করে দেন বাজেটে তাদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য। দেশের বড় অর্থনৈতিক সেক্টর কৃষির কথা বলার কেউ নেই। কৃষকের দাবি পেশ করার কেউ নেই। এগিয়ে এলেন শাইখ সিরাজ। দীর্ঘকাল কৃষি আর কৃষক নিয়ে কাজ করার ফলে তাদের সমস্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন তিনি। তিনি এক অনন্য পন্থা গ্রহণ করলেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি জাতীয় বাজেটের আগে কৃষকের বাজেট প্রণয়ন করেন এবং কৃষকদের পক্ষ থেকে তা যথারীতি অর্থমন্ত্রীর কাছে পেশ করে আসছেন। কাজটি করছেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। দেশের পাঁচ-ছয়টি পল্লী এলাকায় কৃষক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কয়েক হাজার কৃষক সমবেত হন প্রতিটি সমাবেশে। শাইখ সিরাজ চ্যানেল আই-এর ক্যামেরা নিয়ে হাজির হন সভায়। সঙ্গে নিয়ে যান অর্থমন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকদের কাউকে। একবার আমিও গিয়েছিলাম। সমবেত কৃষকেরা ক্যামেরার সামনে মাইকে বর্ণনা করেন তাদের দাবি-দাওয়া এবং সেই সঙ্গে বলেন কেমন বাজেট চাই। শুরুতে কৃষকেরা বাজেট বুঝতেন না। এখন তাদের কথা শুনলে মনে হয়, কৃষকেরা সংসদে বসলে বাজেট প্রণয়নও করতে পারবেন। এসব কৃষক সমবেশ থেকে বেরিয়ে আসা কথাবার্তা অবলম্বনে শাইখ সিরাজ তৈরি করেন কৃষকের বাজেট। তারপর তা পেশ করা হয় অর্থমন্ত্রীর কাছে। সব কিছুই কৃষকদের জানিয়ে দেয়া হয় চ্যানেল আই-এর মাধ্যমে। এভাবেই শাইখ সিরাজ হয়ে উঠেছেন কৃষকের বিশ্বাসযোগ্য লবিস্ট। তথাকথিত কৃষক সংগঠনগুলো এতকালে যা পারেনি, শাইখ সিরাজ তা পেরেছেন এবং প্রতিবছর করে যাচ্ছেন স্বউদ্যোগে এবং কৃষকের অংশগ্রহণে।
গতকাল ছিল শাইখ সিরাজের জন্মদিন। কামনা করি তিনি সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবন লাভ করুন এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে কৃষকদের জন্য কাজ করে যান। এ প্রক্রিয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা কৃষকসমাজ ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে উঠবে এবং নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে নিজেরাই সোচ্চার হবে। অন্তত সে পর্যন্ত শাইখ সিরাজকে এ কাজটি চালিয়ে যেতে হবে।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক

জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলনেই সংকটের সমাধান by ইকতেদার আহমেদ

আমাদের সংবিধান জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে দেশের সর্বোচ্চ আইন। অন্যান্য আইনের ওপর সংবিধানের প্রাধান্য রয়েছে। অন্যান্য আইনের সংশোধন পদ্ধতি সহজতর হলেও সংবিধান যাতে প্রায়ই সংশোধনীর সম্মুখীন না হয় সে জন্য অন্যান্য দেশের মতো আমাদের সংবিধানের সংশোধন পদ্ধতি জটিলতর করা হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় ৪২ বছর সময়কালে সংবিধানে ১৫টি সংশোধনী আনা হয়েছে। কিছু কিছু সংশোধনী সংবিধানের মৌলিকত্বের ওপর আঘাত হেনেছিল। সব সংশোধনী জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলনে হয়েছে এ কথা বলার অবকাশ নেই। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী-পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে বর্তমানে সংবিধানের যে অবস্থান তা হল- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অভিনবভাবে দুটি নতুন ধারা সংযোজিত হয়েছে। এ ধারা দুটি হল ৭ক ও ৭খ। ৭ক-তে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ ইত্যাদি অপরাধ গণ্যে বলা হয়েছে : ‘কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় এ সংবিধান বা এর কোনো অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করলে কিংবা উহা করবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে; কিংবা এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে কিংবা উহা করবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে- তার এ কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে।’ এ অনুচ্ছেদে সহযোগিতাকারী ও উসকানিদাতা বিষয়ে বলা হয়েছে, তারাও সম অপরাধে অপরাধী হবে। অপরাধের সাজা বিষয়ে অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে, প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হবে। উল্লেখ্য, প্রচলিত আইন দণ্ডবিধিতে রাষ্ট্রদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, কিন্তু সংবিধানে প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ড প্রদানের বিধান থাকায় সংবিধানের অধীন রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ সংঘটিত হলে দোষী ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
অনুচ্ছেদ ৭খ-তে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশোধন অযোগ্য উল্লেখপূর্বক বলা হয়েছে, সংবিধানে ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে যা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধন অযোগ্য হবে।
’৭২-এর সংবিধানে কোনোরূপ শর্তারোপ ছাড়াই সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দু’-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান সংশোধনের বিধান ছিল। পরবর্তী সময়ে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন বিষয়ে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দু’-তৃতীয়াংশ ভোটের অতিরিক্ত গণভোটের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছিল। গত ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘জনগণের ভোট নিয়ে আমরা সংবিধান সংশোধন করেছি। আর দেশের নির্বাচন কমিশনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই যা হবে সংবিধান অনুযায়ীই হবে। সংবিধান থেকে এক চুলও নড়ব না। আমি আশা করব গণতান্ত্রিক সব রাজনৈতিক দল আন্দোলন পরিহার করে নির্বাচনমুখী হবে।’
সংবিধানের বর্তমান বিধানাবলীর আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয় তার বক্তব্যটি যথার্থ। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করাকালীন অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছিলেন, তিনি সংবিধানের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন, তাই একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সংবিধানের বিধানাবলী লংঘন, অবজ্ঞা বা উপেক্ষাপূর্বক ভিন্নতর অবস্থান গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আগে ভেঙে না দিয়ে থাকলে প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৫ বছর অতিবাহিত হলে সংসদ ভেঙে যাবে। নবম সংসদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ এবং সে হিসাব অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সংসদ আপনাআপনি ভেঙে যাবে। যদিও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে প্রধানমন্ত্রীর লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শদানের বিধান রয়েছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে অন্য কোনো সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নন- এ মর্মে রাষ্ট্রপতি সন্তুষ্ট হলে তিনি সংসদ ভেঙে দিতে পারেন।
নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের বিদ্যমান বিধানাবলী বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয়, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংসদ বহাল থাকাবস্থায় ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন থাকাবস্থায় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে তা সংবিধান সম্মত হবে কি-না সে প্রশ্নটি দেখা দেবে। ’৭২-এর সংবিধানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার বিধান ছিল। ওই সংবিধানে বলা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বপদে বহাল থাকবেন। ওই সংবিধানে সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে মন্ত্রী নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত আগে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন, তাদের সংসদ সদস্য গণ্যে মন্ত্রী পদে নিয়োগদান আইনসম্মত ছিল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলে উপরোক্ত দুটি বিধান রহিত করা হয়। অতঃপর দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঐকমত্যের ফলে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন করা হলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা বিষয়ে ৭২’র সংবিধানের বিধানাবলী পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন পূর্ববর্তী প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা বহাল থাকলেও ২য়, ৩য় ও ৪র্থ সংসদ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল ছিল। উপরোক্ত ৪টি সংসদের কোনোটিই মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারায় এবং উপরোক্ত সংসদসমূহ ভেঙে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল থাকায় মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টির অবকাশ হয়নি। পঞ্চম সংসদ নির্বাচন তিনদলীয় জোটের রূপরেখায় অস্থায়ী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ বিষয়টি উত্থাপনের অবকাশ সৃষ্টি হয়নি। তাছাড়া মূল কথা হল, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় এ প্রশ্নটি উত্থাপনের কোনো সুযোগ ছিল না। পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে ৭ম, ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা বিষয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ ছিল না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল-পরবর্তী ১০ম জাতীয় সংসদ মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তিত হওয়ায় প্রথমবারের মতো আমাদের সাংবিধানিক ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর স্বপদে বহাল থাকাকালীন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই যে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির তীব্র আন্দোলনের মুখে দলীয় সরকারের অধীনে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি বিরত থাকায় নির্বাচনটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু তারপরও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জনআকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিল এনে সংসদ অবলুপ্ত করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করেন।
উচ্চাদালতে সিদ্ধান্তের প্রতিফলনে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছে এ দাবি করলেও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ যে সার্বভৌম এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। উল্লেখ্য, উচ্চাদালতের আপিল বিভাগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত মামলাটি শুনানিকালে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলসহ ৮ জন অ্যামিকাস কিউরির ৭ জন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাছাড়া আপিল বিভাগের রায়টি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে প্রদত্ত নাকি সমভাবে বিভক্ত, এ বিষয়ে আইনগত প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে এমন ধারণা অনেক আইনজ্ঞ পোষণ করেন।
এটা ঠিক, সংবিধানের বিধানাবলী হতে একচুল নড়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে সংবিধানের লংঘন হবে এবং এ ধরনের লংঘন রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা বিষয়ে সংশোধনী এনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে জনআকাক্সক্ষারই প্রতিফলন ঘটবে, যা প্রকারান্তরে দেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি নিশ্চিত করবে।
সংবিধানের বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারপতি বা বিচারক অবসর-পরবর্তী বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য নন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যখন নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে এক চুল ছাড় দিতে অপারগ, তার কিছুকাল আগে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউশনের মহাপরিচালক পদে যথাক্রমে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিমকোর্টের একজন সাবেক বিচারককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ দুটি নিয়োগ বিষয়ে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন- উভয় পদ বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় না হয়ে থাকলে ওই পদদ্বয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিমকোর্টের একজন সাবেক বিচারকের নিয়োগদানের সুযোগ আছে কি-না? আর সুযোগ না থেকে থাকলে তাতে সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদ লংঘিত হয়েছে কি-না? এ দুটি প্রশ্নের উত্তরসহ নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যই হতে পারে আমাদের আগামী দিনের সমৃদ্ধির সোপান। প্রধানমন্ত্রীর একচুলও না নড়ার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আন্দোলনের বাতাসে সব চুল উড়ে যাবে।’ বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য বিষয়ে সচেতন দেশবাসীর অভিমত, আন্দোলনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে এবং দেশের স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করে যে দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, সেই একই পথ অনুসরণ করে দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং সংঘাত এড়াতে প্রধানমন্ত্রী হয়তো একতরফাভাবে সংবিধানে সংশোধনী এনে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখবেন। তাই এ লক্ষ্য পূরণে আগামী সংসদ অধিবেশন সংকট উত্তরণের পথ প্রশস্ত করতে পারে। সেক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থে এবং জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলনে সংকটের গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাবিহিত ব্যবস্থা নেয়া হলে এ দেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার পথ তিরোহিত হবে। নির্বাচনে কে বিজয়ী ও কে বিজীত হল সে বিষয়টিকে গৌণ হিসেবে নিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে মুখ্য বিবেচনা করে ক্ষমতাসীনরা যদি সংকট সমাধানে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে, তবে তা পরিণামে তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে এমন পূর্বাভাসই পাওয়া যায়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

সাক্ষরতা দিবসে প্রত্যাশা by ড. মীর মন্জুর মাহ্মুদ

এবার আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে- একুশ শতকের জন্য সাক্ষরতা। ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের উন্নত ও উন্নয়নশীল সব সদস্য রাষ্ট্র ১৯৬৫ সাল থেকে এ দিবসটি পালন করে আসছে। প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নিরক্ষর মানুষের মধ্যে অক্ষরজ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই এ দিবসের ঘোষণা দেয়া হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের চেষ্টা করা হয়ে থাকে। দিনটিকে ঘিরে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়ে থাকে। নিঃসন্দেহে এ দিবসটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাক্ষরতা নিরূপণ জরিপের (২০১১) তথ্যানুসারে দেশে সাক্ষরতার হার ৫৩.৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলে ৬৫.৬ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলে ৫০.৫ শতাংশ। বর্তমান সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ এবং জাতীয়ভাবে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের প্রত্যাশিত সময়কাল ছিল ২০১৪। এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে খুব বেশি দিন আগে নয়। তারপরও লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবায়ন চিত্রে এই ফারাক নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবা দরকার। আবার সরবরাহকৃত রিপোর্টে উল্লেখ করা সাক্ষরতার হারের সঙ্গে অন্যান্য সূত্রের পার্থক্য দেখা যায়। সরকারের মৌলিক সাক্ষরতা ও অব্যাহত শিক্ষা নামক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের প্রতি বিশেষ নজর দিলে তুলনামূলকভাবে কম সময়ে আরও বেশি সফলতা আসতে পারে। বিষয়টি দেশের সামগ্রিক ও সুষম উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
সাক্ষরতা বলতে অক্ষর পরিচয় বা অক্ষরজ্ঞানকে বোঝায়। সার্বিক বিবেচনায় এখানে সাক্ষরতার একটি বিশেষ মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে সেক্ষেত্রে কয়েকটি অবস্থানও আমরা লক্ষ্য করি। ১৯০১ সালের লোক গণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্ট-এ সাক্ষরতার মান ধরা হয়েছিল, নিজের নাম লিখতে যে কয়টি অক্ষর প্রয়োজন সেগুলো চিনতে এবং লিখতে পারা, চল্লিশ দশকে এসে প্রয়োজনীয় পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলা হতো, ষাট দশকে পড়ালেখার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশের যোগ্যতা অর্জন করা, আশির দশকে এসে অতিরিক্ত যোগ হয় সচেতনতা ও দৃশ্যমান বিষয় পাঠের দক্ষতা অর্জন করা, আর বর্তমানে অতীতের সবকিছুর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে যোগাযোগ, ক্ষমতায়ন, জীবননির্বাহ, প্রতিরক্ষা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাকে। এখানে নৈতিকতাকে কোন মানদণ্ডে আনা হয়নি, হয়তো বা এটি ব্যক্তিগত হিসেবেই রাখা হয়েছে। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি দেশের সুনাগরিক গঠনে সাক্ষরতা অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি এ মানুষগুলোকে মূল্যবোধসম্পন্ন হওয়াটাও অপরিহার্য। এক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেই সবচেয়ে বেশি সফলতা আসবে বিশ্বাস করি। উন্নত নৈতিক মানসম্পন্ন মানুষ ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত, আইনের শাসননির্ভর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ে আমরা তা ভীষণভাবে প্রত্যক্ষ করছি। এটিও মূল্যায়ন করা জরুরি যে, সাক্ষরতার নির্ধারিত মানদণ্ডে ৫৩.৭ শতাংশ মানুষ কতখানি সাক্ষরজ্ঞান লাভ করেছে। সে জন্য পরিসংখ্যানগত লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি বাস্তবসম্মত ও সময়োচিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। তাহলে সাক্ষরতার হারের দিক থেকে বিশ্বে আমাদের ১৬৫তম অবস্থানের উন্নয়ন ঘটবে। একটি দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে তা সহায়ক হবে। জাতি হিসেবে আমরা আরও গর্বিত হওয়ার সুযোগ পাব। আমাদের দেশের সাক্ষরতার লক্ষ্য বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত আছে। এক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখতে পারে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম। কারণ এখানে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের মধ্যে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে নির্ধারণ করা হয়েছে। ঝরে পড়ার হার কমানো গেলে এ সেক্টরের মাধ্যমেও বড় সহায়তা আসতে পারে। এক পরিসংখ্যান মতে, বর্তমানে দেশের ৯৮ শতাংশ শিশুকে স্কুলে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। এগুলো সবই সম্ভাবনার কথা। দেশের মানুষকে এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর নির্ভর করছে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের সময় ও মানের।
এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের মধ্যে সাক্ষরতা অর্জনের একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, বিজ্ঞানের চরম জয়যাত্রা এবং বিশ্বায়নের যুগের মতো করে সাক্ষরতা অর্জন করতে হবে। তাই অতীতের চেয়ে এবারের লক্ষ্য নির্ধারণে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। আমাদেরও দিবসটি পালনের প্রাক্কালে সেভাবেই চিন্তা করা উচিত। সে জন্য একটি বাস্তবানুগ প্রত্যাশাও থাকতে হবে। আর তা হতে পারে জাতীয় জীবনে স্বনির্ভরতা অর্জন করা। সহজ কথায় স্বনির্ভরতা বলতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখাকে বোঝায়। কোনো দেশ বা জাতি যখন তাদের জীবনমান রক্ষায় নিজের প্রয়োজন মেটাতে নিজেই সক্ষম হয় তখন তাদের স্বনির্ভর বলা হয়। একটি স্বাধীন জাতির জন্য একটি প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশিত লক্ষ্য থাকে। বলতে গেলে স্বাধীনতার স্বপ্নের বীজ এখানে নিহিত।
ড. মীর মন্জুর মাহ্মুদ : গবেষক, প্রবন্ধকার

দোহাই রাজনীতি- তুমি আর নিচে নেমো না by মোকাম্মেল হোসেন

অষ্টধার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শমসের সাহেব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। এ ধরনের মানুষরা সাধারণত শব্দ করে হাসেন না। আজ তাকে হো হো করে হেসে উঠতে দেখা গেল। ঘটনাটা ঘটল ইন্টারভিউ বোর্ডে। স্কুলে একজন বিজ্ঞান শিক্ষক নেয়া হবে। ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত দৈনিক জাহান পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পর মোট আটজন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষা দিতে হাজির হয়েছেন। তাদের মধ্যে নকলা উপজেলা থেকে আসা প্রার্থীকে শমসের সাহেব জিজ্ঞেস করলেন-
: আপনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান কেন?
উত্তরে সেই প্রার্থী নিরীহ ভঙ্গিতে জানালেন-
: স্যার, শিক্ষক হওয়ার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না। কিন্তু ইচ্ছা না থাকলেও শিক্ষক হয়েই আমাকে জীবন কাটাতে হবে। কারণ এটা আমার নিয়তি।
শমসের সাহেব বিষয়টির ব্যাখ্যা দাবি করলে প্রার্থী বললেন-
: স্যার, ছাত্রজীবনে আমি একবার ইতরামি করে এক বিধবা মহিলার বাড়ির উঠানের শসা গাছের প্রথম শসাটি চুরি করে খেয়ে ফেলেছিলাম। ঘটনাটা পরে জানাজানি হয়ে যায় আর সেই বিধবা আমাকে একদিন সামনে পেয়ে সুর করে বলে ওঠে-
চাইয়া খাইলে খাওয়া হয় মায়ের বুকের দুধ।
চুরি করলে খাওয়া হয় ছাগলের মুত
মহিলার কথা শুনে আমি খুবই লজ্জা পেলাম এবং তাকে তার কথা ফিরিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানালাম। সে তখন বলল, এক শর্তে সে তার কথা ফিরিয়ে নিতে রাজি আছে। শর্তটা হল, বড় হয়ে আমাকে শিক্ষক হতে হবে আর চুরি করা যে খারাপ কাজ এটা ছাত্রদের বোঝাতে হবে।
নকলার এই প্রার্থীর নাম শামসুল হক। শেষ পর্যন্ত অষ্টধার স্কুলে শামসুল হকের চাকরিটা হয়ে গেল। চাকরিতে যোগদানের পর শামসুল হক ক্লাস টেন-এ পদার্থ বিজ্ঞানের ক্লাস নিতে গেলেন। প্রাথমিক আলাপ পরিচয় শেষে পাঠ্যসূচি অনুযায়ী শামসুল হক পদার্থের রূপান্তর সম্পর্কে ছাত্রদের পাঠদান শুরু করলেন। তিনি পানির উদাহরণ দিয়ে বললেন-
: পানি সাধারণ অবস্থায় তরল থাকে। তরল পানিকে তাপ দিলে বাষ্পে পরিণত হয়। আবার নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা করলে বরফের আকার ধারণ করে।
এবার ছাত্রদের পালা। শামসুল হক ছাত্রদের কাছে জানতে চাইলেন-
: পদার্থের রূপান্তর সম্পর্কে তোমরা কেউ নতুন কোনো উদাহরণ দিতে পারবা?
শামসুল হকের আহ্বানে হুরমুজ আলী নামের এক ছাত্র সাড়া দিল। হুরমুজ ছাত্র হিসেবে খারাপ না, তবে সুযোগ পেলে ফজুল টাইপের কথাবার্তা বলতে সংকোচ বোধ করে না। সে প্রথমেই শামসুল হকের কাছে জানতে চাইল-
: স্যার, চুল কি একটা পদার্থ?
কাঁধ ঝাঁকিয়ে শামসুল হক উত্তর দিলেন-
: যদি আকার, আয়তন ও ওজন বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে চুল অবশ্যই একটা পদার্থ।
শামসুল হকের উত্তর শুনে হুরমুজ আলী বলল-
: স্যার, আমি এই পদার্থের রূপান্তর সম্পর্কে বলতে চাই।
-গুড। বল...
: এটা যখন আমাদের মাথায় থাকে তখন আমরা তাকে চুল বলি।
-অফকোর্স বলি।
: চোখের ওপরে থাকলে ভ্রু আর চোখের পাতায় থাকলে পাপড়ি বলি।
-রাইট।
: এটা যখন মুখমণ্ডলে থাকে তখন আমরা তাকে দাড়ি ও গোঁফ বলি।
-দাড়ি অ্যান্ড গোঁফ? হ্যাঁ, ঠিক আছে।
: এরপর বগলে ও বুকে যখন থাকে, তাকে বলা হয় লোম।
-বগল ও বুক- হুম, ইউ আর কারেক্ট।
: এরপর...
হুরমুজ আলী এ পর্যন্ত বলতেই শামসুল হক আঁতকে উঠে ছাত্রদের দিকে তাকালেন। দেখলেন- ছাত্ররা হাঁ করে হুরমুজ আলীর কথা গিলছে। তিনি অতি দ্রুত হুরমুজ আলীকে থামার নির্দেশ দিয়ে বললেন-
: স্টপ, স্টপ- আই আন্ডারস্ট্যান্ড! তোমাকে আর নিচে নামতে হবে না...
দেশের রাজনীতিতে চুল নিয়ে হঠাৎ ধাক্কাধাক্কি শুরু হওয়ার পর মনে হয়েছিল- এর স্থায়িত্ব এক-দুই দিনের বেশি হবে না। কিন্তু পরে দেখা গেল এটা রাবারের মতো লম্বা হতে শুরু করেছে। ব্যাপার দেখে আমার ভয় হল- শেষে বিষয়টি গালাগাল পর্যন্ত না গড়ায়। গালাগালের কথা মনে হতেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা ভয়াবহ স্মৃতি মনে পড়ে গেল। এরশাদ সরকারের শাসনামলের মাঝামাঝি সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সংযুক্তি অনুযায়ী হাজী মুহম্মদ মহসিন হলে সিট পাওয়ার চেষ্টা করছি। স্বাভাবিক নিয়মে কিছু না হওয়ায় শেষে ময়মনসিংহের এক পাতি ছাত্রনেতার শরণাপন্ন হলাম। তিনি আমাকে তার কক্ষের মেঝেতে রাতযাপনের অনুমতি দিলেন। ঘুমিয়ে আছি- মাঝরাতে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ভয় পেয়ে উঠে বসলাম। নেতাকে খুবই উত্তেজিত মনে হল। দেখলাম- তিনি লাফ দিয়ে জানালার পাশে খাটের ওপর উঠছেন। কামানের গোলার মতো ফটফট করে কিছুক্ষণ গালাগাল বর্ষণের পর আবার নিচে নেমে আসছেন। গালাগালগুলোর মধ্যে কিছু ছিল এরকম-
‘ওই মাঙ্গির পুতেরা, বেশি ফাল পারিছ না। ধরলে কিন্তু কাঁচা খাইয়া ফালবাম- ন্যাংটা কইরা ছাইড়া দিয়াম। সাহস থাকলে ওইখানে ফালাফালি না কইরা এইমুড়া আয়...’
এইমুড়া আয় মানে এদিকে আয়। মহসিন হলের পাশেই বড়সড় একটা মাঠ। মাঠের পরে রাস্তা। রাস্তার ওপাশে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। সেসময় জহুরুল হক হল আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠনের ঘাঁটি আর আর মহসিন হল বিএনপির ছাত্রসংগঠনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দুই দলের অনুসারীরা একে অপরের উদ্দেশে গালি বিনিময় শুরু করার পর মনে হল, কে কার চেয়ে আরও মারাত্মক অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করতে পারে- তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কিছু গালাগাল ছিল অজু নষ্ট করে দেয়ার মতো। উত্তেজনা দমন করতে না পেরে এক পর্যায়ে আমার আশ্রয়দাতা নেতা দলবল নিয়ে ছাদে চলে গেলেন। অবস্থা দেখে অসহায়ের মতো মনে মনে বললাম- এ আমি কোথায় এসে পড়লাম!
উক্ত ঘটনার পর ২৫-২৬ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়কালে পৃথিবী সূর্যকে অসংখ্যবার প্রদক্ষিণ করেছে। সাগর-মহাসাগরে অজস বার জোয়ার-ভাটা সংঘটিত হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রুচিবোধের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষ আরও বেশি জ্ঞানী, মার্জিত, সংস্কৃতিবান ও সভ্য হয়েছে। অথচ কী আশ্চর্য! দুই যুগেরও বেশি সময় আগে গালাগালের যে সংস্কৃতি আমি মাঝরাতে আমাদের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ করেছিলাম- তা থেকে মুক্তি তো মেলেইনি বরং তার বিস্তার ঘটতে ঘটতে জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক সুশীতল জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
জাতীয় সংসদে গালাগালের চর্চা হতে দেখে অনেকেই অনেক রকম ভাবেন। অন্যরকম চিন্তা করেন। যে যাই ভাবুক, জাতি গঠনে রাজনীতি বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প কিছু আছে কি? অথচ রাজনীতি এখন যে ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে তাতে এ জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করলে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। আমার আব্বা বলেন, শিয়ালের পেট থেকে শিয়ালের বাচ্চাই হয়, সিংহের বাচ্চা হয় না। আমাদের রাজনীতি এখন শিয়ালের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এই হুক্কাহুয়ার আখড়া থেকে আসা দিকনির্দেশনায় আদর্শ জাতি গঠনের কাজ সম্পন্ন হবে কীভাবে?
রাজনীতির এই দুরবস্থার কারণ পেশাদার রাজনীতিবিদের অভাব। একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে গেছি। মা-বাবারা তাদের আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে সে অনুষ্ঠানে এসেছেন। খাওয়া-দাওয়ার আগে সবাই গোল হয়ে বসে সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা বলছিলেন। হঠাৎ ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার প্রসঙ্গ উঠল। একেক বাবা-মা তার সন্তান মেধা ও বুদ্ধিমত্তায় কতটা চৌকস- তা অন্যদের কাছে তুলে ধরে গর্ব করছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় এক শিশুকে একজন জিজ্ঞেস করলেন-
: সোনামণি, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?
-ডাক্তার।
এরপর আরেকজন অন্য একটি শিশুর কাছে জানতে চাইলেন-
: বেবি, তুমি কী হতে চাও?
-ইঞ্জিনিয়ার।
শিশুরা ভবিষ্যতে কে কি হতে চায়- এ ব্যাপারে জানার আগ্রহ সবারই দেখলাম প্রবল। তাদের কাতারে শামিল হয়ে আমিও একজনকে জিজ্ঞেস করলাম-
: মা জননী, বড় হইয়া তুমি কী হইতে চাও?
-পাইলট।
সেদিনের সে অনুষ্ঠানে শিশুরা বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, জজ, ব্যারিস্টার, শিক্ষক, ব্যাংকার ইত্যাদি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও নট অ্যা সিঙ্গেল- একটি শিশুও উচ্চারণ করল না, বড় হয়ে সে রাজনীতিবিদ হতে চায়। বিষয়টি নিয়ে আরও বড় পরিসরে যাওয়া যাক। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর কৃতী ছাত্রছাত্রীদের কাছে সংবাদকর্মীরা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চায়। সেখান থেকেও একই রকম উত্তর আসে। মেধাবীরা অবশ্যই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে। তবে তাদের মূল্যায়ন করার জন্য, তাদের সৃজনশীলতার সহযোগী হওয়ার কিছু মেধাবী রাজনীতিবিদও তো দরকার! গাড়ির সব চাকা সমান না হলে রাস্তায় চলা অসম্ভব। তেমনি একটি জাতি যত মেধাবীই হোক, রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্তদের সঙ্গে অন্যদের চিন্তার সমন্বয় না ঘটলে বিপর্যয় অনিবার্য। এ ধরনের বিপর্যয়কে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয়- আউলা লাগা। বর্তমানে আমরা এই আউলার মধ্যে বসবাস করছি। এই আউলা রাজ্যে কেউ রাজনীতিবিদ হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে জীবন শুরু করে না। কিন্তু পরে যখন বুঝতে পারে, রাজনীতির মধ্যে যে মধু আছে তা আর অন্য কোথাও নেই, তখন সে রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে দেখা যায়, শিক্ষক শিক্ষকতায় মন না দিয়ে রাজনীতির পেছনে ছুটছে, চাকরিজীবী তার চাকরিকে বগলে রেখে রাজনীতির ঢোল বাজাচ্ছে। অর্থাৎ রাজমিস্ত্রির কাজ জোগালি করছে, দারোগার কাজ করছে দফাদার আর কাঠমিস্ত্রির কাজ করছে কামার। কাঠমিস্ত্রির কাজ কামার করলে যে কোনো শিল্পকর্ম ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের রাজনীতিতে এই ফাটাফাটির কারবারই চলছে। রাজনীতি যে একটা শিল্প, এই শিল্প যে যতœ, নৈপুণ্য ও সৃজনশীলতা দাবি করে, চলমান রাজনীতিতে তার অনুপস্থিতি প্রকট। ফলে এর অধঃপতন রোধ করা যাচ্ছে না। এরকম পরিস্থিতিতে আমরা যারা রাজনীতির বাইরে আছি অথচ যাদের জীবন রাজনীতির সুফল ও কুফলের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত, তারা রাজনীতির কাছে করজোড়ে একটাই মিনতি জানাতে পারি- হে রাজনীতি, তুমি আর নিচে নেমো না।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

ভারতীয় পত্রিকায় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ভারতের খেদমতগারির স্বীকৃতি by বদরুদ্দীন উমর

দিল্লির Indian Express পত্রিকায় পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তের একটি প্রবন্ধ ঢাকার Daily Star-এ ০২.০৯.২০১৩ তারিখে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। প্রবন্ধটির নাম National Interest : Dear Norendrabhai. গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীকে উদ্দেশ করে এ প্রবন্ধটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় এর বক্তব্য নিয়ে কিছু কথা বলার প্রয়োজন হল। তাছাড়া এই বক্তব্য যিনি প্রদান করেছেন তিনি ভারতের উচ্চ পর্যায়ের এমন একজন সাংবাদিক, যার সঙ্গে বিজেপির উচ্চতম নেতৃত্বের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। তিনি লিখেছেন, লালকৃষ্ণ আদভানি, সুষমা স্বরাজ, রাজনাথ, অরুণ জেটলির পরিবর্তে নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে তিনি তার বক্তব্য প্রদান করছেন, কারণ প্রথম দু’জন এখন অন্য কারও কথা শোনার মতো অবস্থায় নেই। তাদের অবস্থান খুবই উগ্র। পরের দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গি কিছু নরম হওয়া সত্ত্বেও এবং তারা কিছু চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। কাজটি হল, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিস্তার জলবণ্টন ও ছিটমহল (বহপষধাবং) সমস্যার সমাধান করা এবং ভারত সরকার এ দুই নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, তা পার্লামেন্টে পাস করে সমস্যা দুটির নিষ্পত্তি করা। এক্ষেত্রে অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার এই যে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সম্পাদক এমন একজন বিজেপি নেতার কাছে তার আহ্বান জানিয়েছেন, যার থেকে নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িক বিজেপি নেতা কমই আছেন, যিনি ২০০২ সালে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা সৃষ্টি করে গুজরাটে হাজার হাজার নিরীহ মুসলমান হত্যা করেছিলেন। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শত্র“তার ক্ষেত্রে যিনি সব রকম বক্তব্যই প্রায় প্রদান করে থাকেন। যিনি তার কঠোর নেতিবাচক বক্তব্য তিস্তার জলবণ্টন এবং ছিটমহল সমস্যার বিষয়ে বেশ স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন! যাই হোক, কার কাছে উপরোক্ত পত্রিকা সম্পাদক মশাই বক্তব্য দিচ্ছেন, সেটা আসল কথা নয়। আসল কথা হল, এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতপ্রীতি এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের উল্টো মনোভাবের বিষয়ে যা বলেছেন সেটা।
শেখর গুপ্ত বলেছেন, শেখ হাসিনার উদারনীতি ও সাহসী ভারত-বন্ধু সরকার ভারতকে অনেক সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দেয়া সত্ত্বেও দুই সরকার তিস্তার জলবণ্টন ও ছিটমহলগুলোর হস্তান্তর বিষয়ে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তা পার্লামেন্টে অনুমোদনের বিরুদ্ধে বিজেপি অবস্থান গ্রহণ করে দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা ও বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এভাবে প্রতিকূলতা সৃষ্টি না করে বিজেপি যাতে বিল দুটি পার্লামেন্টে পাস করার পক্ষে ভোট দেয়, এ জন্য তার প্রিয় ‘নরেন্দ্রভাই’-এর কাছে শেখর গুপ্ত উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন! যে ব্যক্তি তার ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম হত্যার জন্য ‘গুজরাটের কসাই’ নামে ভারতেই পরিচিত, তাকে অন্য বিজেপি নেতাদের থেকেও বাংলাদেশের ব্যাপারে নমনীয় তিনি কী কারণে বোধ করলেন এটা বোঝা মুশকিল। এর একটা বোধগম্য কারণ হচ্ছে, তিনি হয়তো মনে করেন, অন্য কোনো পুরনো বিজেপি নেতা নয়, ‘নরেন্দ্রভাই’ই এখন বিজেপির সব থেকে শক্তিশালী বিজেপি নেতা, আগামী নির্বাচনে বিজেপি সরকার গঠন করলে যার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি!
যাই হোক, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘উদারনৈতিক ও সাহসী’ বাংলাদেশ সরকার ভারতকে একতরফাভাবে যে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, ভারতের স্বার্থে কী কী করেছে তার বিবরণ দিতে গিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সম্পাদক তার পাঠকদের মনে করিয়ে দেয়ার জন্য বলেছেন, কীভাবে বাংলাদেশ সরকার তাদের দেশের পলাতক উলফা নেতা রাজখোয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে এবং অনুপ চেটিয়াকে কারাগারে আটক রেখেছে। ত্রিপুরা তার ভূগর্ভস্থ গ্যাস এখন যেভাবে জ্বালানিতে রূপান্তরিত করতে পারছে, সেটা সম্ভব হতো না যদি বাংলাদেশ সরকার ভীষণ ভারি জেনারেটরগুলো নিজেদের নদীতে বার্জের মাধ্যমে সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা না করত। এই জেনারেটরগুলো ভারতের সংকীর্ণ ও ঘোরালো পাহাড়ি পথ দিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে বাধ্য করেছে তাদের তৎপরতা বন্ধ করতে। তারা জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সরকারের আমলের সেই সব অসাংবিধানিক আইন রদ করেছে, যেগুলোর দ্বারা বাংলাদেশকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল! এছাড়া যে বিস্ময়কর কথা সম্পাদক মশাই বলেছেন তা হল, শেখ হাসিনার সরকার বিডিআরকে বিলুপ্ত করেছে, যে সংস্থা ভারতের অনেক ক্ষতি করেছে, তাদের জওয়ানদের হত্যা করেছে ইত্যাদি!
শেখ হাসিনা জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সময়কার সেই সব অসাংবিধানিক আইন রদ করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল- এই সত্য দর্শন তার কীভাবে হল বোঝা গেল না। কারণ সংবিধানের মুখবন্ধে বিসমিল্লাহ এবং এরশাদের সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামবিষয়ক সংশোধনী এখনও বহাল রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ একটি ধর্মবিযুক্ত (secular) রাষ্ট্র কীভাবে হল, তার অর্থ তারাই জানেন! যাই হোক, বিডিআর সম্পর্কিত বক্তব্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের স্বার্থে শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক বিডিআর বিলুপ্তিকে শেখর গুপ্ত ভারতের প্রতি বর্তমান সরকারের একটি বন্ধুসুলভ কাজ বলে উল্লেখ করেছেন! বিডিআর বিলুপ্ত করার আগে ঘটেছিল পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ এবং খুনখারাবির ঘটনা। তাতে যে ভারত সরকারের হাত ছিল, এটা অনেক মহল থেকেই বলা হয়েছিল। এখন ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার প্রবীণ সম্পাদক শেখর গুপ্তের বক্তব্যের মধ্যে তার সমর্থন ও স্বীকৃতিই পাওয়া গেল! বিডিআরের বিলুপ্তি পিলখানার ঘটনার মতো ঘটনা না ঘটিয়ে সম্ভব ছিল না। কাজেই ভারতের স্বার্থে বিডিআর বিলুপ্ত করে তার জায়গায় বর্ডার গার্ড নামে নতুন একটি বাহিনী শেখ হাসিনা সরকার ভারত-বন্ধু হিসেবে তৈরি করেছে, একথা ভারতীয় শাসক মহল থেকে এখন প্রকাশ্যেই বলা হল!
এহেন ভারত-বন্ধুকে আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে সাহায্য না করে তিস্তা ও ছিটমহল-সংক্রান্ত ভূমি চুক্তি যদি ভারতীয় পার্লামেন্টেই বাতিল হয়ে যায়, তাহলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ আশংকা প্রকাশ করে যা বলা হয়েছে তার থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে নয়, ভারতীয় শাসকশ্রেণী ও সরকারের স্বার্থে যাতে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার আবার নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারে, এ লক্ষ্যেই ভারতীয় শাসকশ্রেণী কাজ করছে। এই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বিজেপি যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি না করতে পারে এ জন্যই ভারতীয় পত্রিকা সম্পাদক মহোদয় দুর্বিনীত ও ঘোরতর মুসলিমবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক তার ‘নরেন্দ্রভাই’-এর কাছে মূল্যবান আহ্বান জানিয়েছেন! ভারত সরকার যেখানে বাংলাদেশকে কিছুই না দিয়ে নিজেরা সব কিছু পেতে অভ্যস্ত হয়েছে, সেখানে ‘নরেন্দ্রভাই’-এর কাছে এই আহ্বান যে মাঠে মারা যাবে এতে সন্দেহ নেই।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ টার্গেট

সিরিয়ায় সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়াতে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। শুক্রবার পেন্টাগনের এক সামরিক বিবৃতিতে এমন ইঙ্গিত দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জেনারেল মার্টিন ডেম্পসে। সিরিয়ার সরকারি বাহিনীকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে অক্ষম করে দেয়ার জন্য ওবামা বদ্ধপরিকর বলেও জানিয়েছেন মার্কিন সেনাপ্রধান। ওবামার এমন নির্দেশের অর্থ হচ্ছে ফ্রান্সের সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর যে তালিকা করেছিল তার সঙ্গে নতুন স্থান যোগ হবে। সিরিয়ার ৫০টি বা তারও বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থান যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় থাকতে পারে। বিশেষ কিছু স্থানে তোমাহক ক্রুইজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ মার্কিন ও ফরাসি যুদ্ধবিমান ব্যবহারের কথা ভাবছে ওবামা প্রশাসন। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রাগারে হামলা চালানো হবে। বিদ্রোহীদের ওপর ব্যবহারের জন্য যেসব স্থানে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ রেখেছে সেসব স্থানে হামলা হবে। জেনারেল মার্টিন ডেম্পসে বলেছেন, তাদের হামলা সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেটসহ বিভিন্ন অস্ত্রের অবস্থান লক্ষ্য করা হতে পারে। সিরিয়ার বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর দেশটিতে সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তবে তিনি কংগ্রেসের অনুমতি নিয়েই হামলা চালাতে চান।
ওবামা সিরিয়ায় ‘সীমিত পরিসরে’ হামলা চালানোর প্রস্তাব করেছেন। এদিকে, সিরিয়ায় মার্কিন আগ্রাসনকে অবিবেচকের মতো কাজ উল্লেখ করে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বিশ্ব নেতাদের হুশিয়ার করে বলেছেন, এতে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। তিনি বলেন, সিরিয়ার মানবিক পরিস্থিতি এরই মধ্যে শোচনীয় অবস্থায় পৌঁছে গেছে। ফলে আরেকটি যুদ্ধ সহ্য করার শক্তি দেশটির নেই। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে শিল্পোন্নত ২০ জাতিগোষ্ঠী- জি২০-র শীর্ষ সম্মেলনের অবকাশে শুক্রবার ব্রিটেনের উদ্যোগে আয়োজিত মানবিক সাহায্যবিষয়ক বৈঠকে এ সতর্কতা উচ্চারণ করেন মুন। এদিকে, যুক্তরাজ্যের কাছে সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের নতুন প্রমাণ আছে বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বিবিসিকে এ কথা জানান তিনি। এ সময় যুক্তরাজ্যের প্রোটন ডাউন গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা দামেস্ক থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করছেন বলেও জানান ক্যামেরন। যুদ্ধের পক্ষে ভোট না দেয়ায় টোরি এমপি বহিষ্কার : সিরিয়ায় সামরিক হামলা চালানোর পক্ষে ভোট না দেয়ায় ব্রিটেনের রক্ষণশীল টোরি দলের এমপি জেসে নরম্যানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের একজন উপদেষ্টা ছিলেন। গত সপ্তাহে সিরিয়ায় হামলার ওপর ব্রিটেনের সংসদে বিতর্ক শেষে ভোটাভুটি হয় এবং তাতে সরকারের আনা যুদ্ধ-প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। নরম্যানকে বহিষ্কার করার পর ডাউনিং স্ট্রিট দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, তিনি ছিলেন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের নীতিনির্ধারকদের একজন। তবে, সরকারের পক্ষে ভোট না দেয়ার কোনো সুযোগ তার ছিল না।
কেরি মিথ্যাবাদী : পুতিন : মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন। পুতিন বলেন, সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ‘প্রকাশ্যে মিথ্যা’ কথা বলেছেন তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছানোর আগে এ কথা বলেছেন পুতিন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি মোটেও আমার জন্য সুখকর নয়।
সিরিয়া উপকূলে আরেকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে রাশিয়া : সিরিয়া উপকূলে আরও একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে রাশিয়া। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে- রাশিয়া এবার পাঠাচ্ছে তার সবচেয়ে বড় ল্যান্ডিং শিপ নিকোলাই ফিলচেনকভ। সিরিয়ার বিরুদ্ধে যখন মার্কিন হামলার ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে তখন মস্কো এ জাহাজ পাঠাচ্ছে। এএফপি

জাতীয় ভাষা জানে না ৪০ কোটি চীনা

চীনের জাতীয় ভাষা মান্দারিনে কথা বলতে পারে না দেশটির ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ। আর যারা বলতে পারে তাদের বেশির ভাগের অবস্থা বেশ খারাপ। বৃহস্পতিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম সিনহুয়ার বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি। ভাষাগতভাবে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টায় সরকারের নতুন কার্যক্রম শুরুর প্রাক্কালে দেশটির কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে সিনহুয়া খবরটি প্রকাশ করেছে। জনসংখ্যায় প্রথম ও আয়তনে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দেশ চীন বহুজাতিতে বিভক্ত বহুভাষী দেশ। এই বহুধা বিভক্ত নাগরিকদের একটি ভাষায় অভ্যস্ত করে জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য কয়েকদশক ধরে চেষ্টা করছে চীনের ক্ষমাতসীন কমিউনিস্ট পার্টি। কিন্তু আয়তনের বিশালত্ব ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। পুরো দেশকে মান্দারিন ভাষা শিখাতে পারবে খোদ কর্মকর্তারাও এমনটি মনে করেন না,
কিন্তু সবারই এটি বলতে পারা উচিত বলে মনে করেন তারা। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ মান্দারিন বলতে পারে বলে জানিয়েছেন চীনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শু মেই। যদিও এদের অনেকেই ভাষাটিতে বেশ দুর্বল। বাকি ৩০ শতাংশ বা ৪০ কোটি মানুষ মান্দারিন একেবারে বলতেই পারেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘মান্দারিনের প্রসারের জন্য আরও বিনিয়োগ করা প্রয়োজন,’ মান্দারিন ভাষা প্রসারে ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু হওয়া বার্ষিক প্রচারণা কর্মসূচি শুরুর প্রাক্কালে বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এ বছর মন্ত্রণালয় প্রত্যন্ত এলাকা এবং জাতিগত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার দিকে বেশি নজর দেবে।’ পুরো জাতির এক ভাষায় কথা বলতে পারাটা যে কেনো দেশের জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু জাতীয় ভাষা হিসেবে মান্দারিন প্রচলনের চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চীনে একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় হয়ে আছে। তিব্বতের বাসিন্দারা স্কুলে মান্দারিন ভাষা ব্যবহারের বিপক্ষে। এছাড়া ২০১০ সালে চীনের দক্ষিণাঞ্চলের শহর গুয়াংঝুতে মান্দারিন ভাষা প্রচলন চেষ্টার প্রতিবাদে শত শত লোক রাস্তায় নেমে এসেছিল।