Thursday, October 23, 2025

পশ্চিম তীর যুক্ত করার বিল অনুমোদন: ইসরায়েলকে হুমকি দিলেন ট্রাম্প

রয়টার্স ও আল–জাজিরাঃ ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য একটি বিল দেশটির পার্লামেন্টে প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর বিরোধিতা করেছেন। হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, এমনটি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সমর্থন হারাবে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে গতকাল বুধবার ২৫–২৪ ভোটে বিলটি অনুমোদন পায়। বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার জন্য চার ধাপে ভোটাভুটির প্রয়োজন। বুধবার ছিল এর প্রথম ধাপ। বিলটি আরও আলোচনার জন্য নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটিতে যাবে। এদিন পশ্চিম তীরে ইহুদিদের মালে আদুমিম বসতি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার একটি বিলও ৩১–‍৯ ভোটে অনুমোদন পেয়েছে।

বুধবার অনুমোদন পাওয়া প্রথম বিলটি পার্লামেন্টে তোলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট সরকারের বাইরে থেকে। এই বিলে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির সমর্থন নেই। যদিও জোট সরকারে থাকা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচের দল বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছে।

কয়েক বছর ধরেই নেতানিয়াহুর জোটের কয়েকজন সদস্য পশ্চিম তীরের কিছু অংশ ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, ওই এলাকাগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ১৯৬৭ সালে আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইসরায়েল আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীর দখল করেনি। তাই এই দখলকে বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি আইন প্রয়োজন।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি এই দখলদারিকে বরাবরই অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ এবং বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) এক রায়ে বলা হয়, পশ্চিম তীরসহ ফিলিস্তিনের অন্য ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারি অবৈধ। সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব ইসরায়েলি অবৈধ বসতি এবং সেনাদের সরিয়ে নিতে হবে।

‘ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে’

ইসরায়েলের পার্লামেন্টে এমন সময় বিলটিতে অনুমোদন দেওয়া হলো, যখন ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি’ পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় যুদ্ধবিরতি চলছে। মাসখানেক আগেই তিনি বলেছিলেন, পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হতে দেবেন না। আর এই বিল অনুমোদনের সময় ইসরায়েল সফর করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতিকে এগিয়ে নিতে আজ বৃহস্পতিবার জেডি ভ্যান্স ছিলেন ইসরায়েলের তেলআবিব শহরে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল পশ্চিম তীর নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যে নীতি, তাতে পশ্চিম তীরকে যুক্ত করার বিষয়টি নেই। তাই এটি যুক্তরাষ্ট্রেরও নীতি হবে না।’

আজ মার্কিন সাময়িকী টাইমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে একই কথা বলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘এমনটি (পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করা) ঘটবে না। কারণ, আমি এ নিয়ে আরব দেশগুলোকে কথা দিয়েছি। আরব দেশগুলো আমাদের বড় সমর্থন দিয়েছে। এমনটি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সমর্থন হারাবে ইসরায়েল।’

পার্লামেন্টে এই বিল অনুমোদনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধীরা নেতানিয়াহু সরকারকে বিপত্তিতে ফেলতে চাইছে বলে মনে করে লিকুদ পার্টি। ট্রাম্প–নেতানিয়াহু সম্পর্ক নষ্টের জন্য এই ভোট হয়েছে বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে দলটি। আর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেয়ন সার বলেছেন, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার কথা ভেবে সরকার এখন এই ভোটাভুটি চায়নি।

বিভিন্ন দেশের নিন্দা

গাজায় টানা দুই বছর ধরে ইসরায়েলি নৃশংসতার পর ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। এরপরও উপত্যকাটিতে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। চুক্তি অনুযায়ী ত্রাণও প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গতকাল একজনসহ দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলের হামলায় গাজায় অন্তত ৬৮ হাজার ২৮০ জন নিহত হয়েছেন।

এরই মধ্যে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার বিল অনুমোদনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, গাজা ও পশ্চিম তীর ফিলিস্তিনের অংশ। এখানে ইসরায়েলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। আর এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরায়েলের ‘ঔপনিবেশিক দখলদারির কুৎসিত রূপ’ প্রকাশ পেয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবচেয়ে কড়া ভাষায় ইসরায়েলের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। একে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছে দেশটি। ইসরায়েলের এ পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে সৌদি আরব। আর নিন্দা জানিয়ে জর্ডান বলেছে, এই পদক্ষেপ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভিত্তি নষ্ট করবে।

যদিও বিল অনুমোদনে আগে থেকেই পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব রয়েছে বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যালেস্টিনিয়ান ফোরাম ফর ইসরায়েলি স্টাডিজের গবেষক ওয়ালিদ হাব্বাস। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, এই বিল অনুমোদন বর্তমান চিত্রপটে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না। কারণ, দখলদারির মাধ্যমে ইসরায়েল এরই মধ্যে পশ্চিম তীরে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ভোগ করছে। তবে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ওপর এই বিল অনুমোদনের প্রভাব পড়বে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-08%2F5arweb8b%2Fprothomalo-Trump.avif?rect=1%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গাজায় সফল, ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অচলাবস্থায় কেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে আসন্ন এক শীর্ষ বৈঠক নিয়ে জোর গুঞ্জন চললেও, তা আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। মাত্র কয়েক দিন আগেই ট্রাম্প ঘোষণা করেন তিনি দুই সপ্তাহের মধ্যে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রাথমিক বৈঠকটিও বাতিল করা হয়েছে।

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প বলেন, আমি সময় নষ্ট করতে চাই না। অর্থহীন কোনো বৈঠক আমি করব না, দেখি কী হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। সাংবাদিক অ্যান্থনি আর্চার এতে আরও লিখেছেন, এ অনিশ্চিত শীর্ষ সম্মেলন ট্রাম্পের ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টার সর্বশেষ অধ্যায়। গাজার যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময় চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার পর ট্রাম্প এখন ইউক্রেনের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। মিশর সফরের সময় সেই গাজা চুক্তি উদযাপন করতে গিয়ে ট্রাম্প তার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান কূটনৈতিক আলোচক স্টিভ উইটকফকে বলেন, এবার আমাদের রাশিয়ার কাজটা শেষ করতে হবে।

গাজায় সাফল্য, ইউক্রেনে অচলাবস্থা: কিন্তু গাজায় যে সব পরিস্থিতি একসঙ্গে হয়ে ট্রাম্পকে সফল হতে সাহায্য করেছিল, ইউক্রেনে  তার পুনরাবৃত্তি করা প্রায় অসম্ভব। উইটকফের মতে, গাজা চুক্তির মূল চালিকাশক্তি ছিল ইসরাইলের কাতারে থাকা হামাস প্রতিনিধিদের ওপর হামলা। এই পদক্ষেপে মার্কিন আরব মিত্ররা ক্ষুব্ধ হলেও ট্রাম্প এতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। ক্ষমতার প্রথম মেয়াদ থেকেই ট্রাম্প ইসরাইলের দৃঢ় সমর্থক। তিনি তেল আবিব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করেছেন। পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি বৈধ ঘোষণা করেছেন। সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ইসরাইলকে সমর্থন সমর্থন দিয়েছেন। সব মিলিয়ে তিনি ইসরাইলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে নেতানিয়াহুর ওপর তার এক ধরনের বিরল প্রভাব আছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও তার জন্য অতিরিক্ত কূটনৈতিক সুবিধা এনে দেয়।

ইউক্রেন নিয়ে কম প্রভাব:
কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে ট্রাম্পের প্রভাব সীমিত। নয় মাস ধরে তিনি কখনও পুতিনকে, কখনও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে চাপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো ফল আসেনি। তিনি রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানিতে নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন। আবার ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র দেয়ার কথাও বলেছেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন এসব পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা দিতে পারে এবং যুদ্ধ আরও তীব্র করতে পারে। এদিকে তিনি প্রকাশ্যে জেলেনস্কির সমালোচনা করেছেন। কিছু সময়ের জন্য ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার বন্ধ করেছেন এবং অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত রেখেছেন। কিন্তু ইউরোপীয় মিত্রদের চাপের মুখে পরে তা পুনরায় শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন।

ট্রাম্প নিজেকে একজন ‘ডিলমেকার’ হিসেবে তুলে ধরতে ভালোবাসেন। মুখোমুখি বৈঠকে চুক্তি করার ক্ষমতা তার আছে বলে দাবি করেন। কিন্তু পুতিন ও জেলেনস্কির সঙ্গে তার একাধিক বৈঠক যুদ্ধের কোনো অগ্রগতি আনেনি। অনেকে মনে করছেন, পুতিন হয়তো ট্রাম্পের চুক্তিতে আগ্রহ এবং সরাসরি আলোচনায় বিশ্বাস ব্যবহার করছেন নিজের সুবিধার জন্য। জুলাইয়ে যখন মার্কিন কংগ্রেসে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ অনুমোদনের পথে ছিল, তখন পুতিন আলাস্কায় এক সম্মেলনের প্রস্তাব দেন। ফলে সেই বিলটি স্থগিত হয়। সম্প্রতি যখন ট্রাম্প ইউক্রেনে টমাহক ক্রুজ মিসাইল ও প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর কথা ভাবছিলেন, পুতিন তাকে ফোন করেন- আর ট্রাম্প তখনই বুদাপেস্ট সম্মেলনের ইঙ্গিত দেন। পরের দিন জেলেনস্কি হোয়াইট হাউসে যান। কিন্তু ফলাফলহীন বৈঠকের পর ফিরে আসেন। ট্রাম্প বলেন, আমাকে কেউ বোকা বানাতে পারবে না। সারা জীবন আমি সেরাদের কাছ থেকে শিখেছি, আর সবসময় জিতে বেরিয়েছি।

কিন্তু জেলেনস্কির মন্তব্য ছিল তীক্ষ্ণ। তিনি বলেন, যখনই দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র বা সহায়তার বিষয়টা দূরে সরে যায়, তখনই রাশিয়া কূটনীতি থেকে আগ্রহ হারায়। কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প একদিকে ইউক্রেনকে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর চিন্তা থেকে সরে এসে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করেন, আবার জেলেনস্কির ওপর চাপ দেন দোনবাস অঞ্চল ছেড়ে দিতে, যার কিছু অংশ রাশিয়া এখনও দখল করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি বর্তমান সীমান্তরেখা ধরে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন, যা রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন। এখন তিনি স্বীকার করছেন, বিষয়টি তার ধারণার চেয়েও কঠিন। এটি তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার এক বিরল স্বীকারোক্তি এবং এটা বাস্তবতা যে, যখন কোনো পক্ষই হার মানতে বা ছাড় দিতে রাজি নয়, তখন শান্তির কাঠামো তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

mzamin

গাজায় এবার আধিপত্যের লড়াই, হামাস কি টিকে থাকতে পারবে? by ববি ঘোষ

ক্ষমতার রাজনীতির প্রথম নিয়ম হচ্ছে কেউ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। দ্বিতীয় নিয়ম হচ্ছে গতকালের মিত্র আজকের শত্রু হতে পারে, আজকের শত্রু কালকের বন্ধু হতে পারে। এই দুই নিয়মই এখন গাজায় বাস্তব রূপ নিচ্ছে। খবর আসছে যে হামাস আবারও গাজায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ছে।

যুদ্ধের অভিঘাতে গাজার প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। হামাস হয়তো সংখ্যায় কমে গেছে, কিন্তু তাদের মনোবল এখনো অটুট। তারা এখন প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির পর গাজায় কোন গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করবে, তার প্রতিযোগিতা চলছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এটাকে হামাস ও তাদের শাসনে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের মধ্যকার সংঘাত বলে উপস্থাপন করতে চাইছেন। কিন্তু বরাবরের মতো এবারও গাজার বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও ধোঁয়াশাপূর্ণ।

হামাসকে চ্যালেঞ্জ জানানো গোষ্ঠীগুলো মূলত গোত্রভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী। এদের অপরাধ ও সহিংসতার ইতিহাস দীর্ঘ। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের আদর্শে অনুপ্রাণিত মুক্তিসেনা তারা নয়। তারা ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের প্রতীক ‘কেফিয়ার’ ধ্বজাধারীও নয়। খুব খোলাখুলিভাবে বললে, তারা নির্লজ্জ রকমের ঠগ চরিত্রের। দশকের পর দশক ধরে তারা ক্ষমতার হাওয়া বুঝে নিজেদের অবস্থান বদলাতে অভ্যস্ত।

হামাস যখন কঠোর হাতে গাজা শাসন করত, এই গোত্রগুলো তখন তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলত। বিনিময়ে গাজার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে এরা নিজেদের সদস্যদের সামান্য কিছু অর্থনৈতিক সহায়তাও দিয়েছে। এখন তারা মনে করছে, তাদের নিজেদের সামনেই ক্ষমতা দখলের সুযোগ এসেছে।

সংঘাতের হেরে যাওয়া পক্ষের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা যুদ্ধের মতোই প্রাচীন একটি বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে লুকিয়ে থাকা জাপানি সেনা থেকে শুরু করে ইরাক দখলের পর সাদ্দাম হোসেনের অনুগত যোদ্ধা—সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে পরাজিত শক্তি সচরাচর পরাজয় মেনে নেয় না। ২০০৭ সাল থেকে গাজায় ক্ষমতায় থাকা হামাসের জন্য এ লড়াই আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হামাস কেবল একটি সরকার বা সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়—এটি একটি আদর্শ, একটি সামাজিক আন্দোলন এবং পৃষ্ঠপোষকতার একটি নেটওয়ার্ক। গাজায় ক্ষমতা হারানো মানে হচ্ছে হামাসের অস্তিত্ব নাই হয়ে যাওয়া।

হামাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া গোষ্ঠীগুলোও সময় নিয়ে নিজেদের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেছে। তারা বিজয়ী পক্ষের (ইসরায়েল) সমর্থনও পাচ্ছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল হামাস ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটিয়ে এই গোত্রগুলোর শক্তি বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে হামাস শক্তিশালী ডগমুশ গোত্রের একজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন, ত্রাণ কাফেলা লুট করেছেন এবং সেই মাল কালোবাজারে বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে ‘শাবাব’ নামে পরিচিত আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের সমর্থন পাচ্ছে।

ডগমুশ, শাবাবের মতো কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী ও গোত্রভিত্তিক সংগঠন খোলাখুলিভাবে ইসরায়েলি বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে। কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক এটিকে হামাসের চরমপন্থী আদর্শের প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এটি গাজার রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি ভুল একটি ধারণা। ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ও লেবাননে এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ইতিহাস দীর্ঘদিনের, যারা সুবিধাজনক সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে বা ইসরায়েলের হয়ে কাজ করেছে, কিন্তু ক্ষমতা সংহত হওয়ার পর তারা তাদের সাবেক পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

হামাসের নিজস্ব ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। ১৯৮০-এর দশকে মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে বেরিয়ে হামাসের জন্ম হয়েছিল। হামাসকে ইসরায়েল কৌশলগত উৎসাহ দিয়েছিল। এটাকে ইসরায়েল ইয়াসির আরাফাতের সেক্যুলার দল পিএলওর বিরুদ্ধে ভারসাম্য হিসেবে হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু এরপর কী ঘটেছে, সেটি সবারই জানা।

আজ যেসব গোত্র ও গোষ্ঠী নিজেদের হামাসের বিরোধী পক্ষ হিসেবে হাজির করছে, তারাও বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারা অনেক বেশি সহিংস ও সুযোগসন্ধানী।

কিন্তু গাজার ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রকৃত ‘বুনো কার্ড’ এই গোত্রভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা প্রায়ই ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদকে (পিআইজে) উপেক্ষা করেন। এই সংগঠন হামাসের কনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করে। যুদ্ধের আগে পিআইজির সশস্ত্র যোদ্ধার সংখ্যা কয়েক হাজার বলে ধরা হতো। যুদ্ধে হামাসের কয়েক হাজার সদস্য নিহত হয়েছেন। ফলে যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতায় পিআইজের নেতৃত্ব নিজেদের শীর্ষ অবস্থানে থাকার দাবি করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ভাবতে পারেন।

পিইজের এমন কিছু আছে, যেটা গোত্রভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেই। সেটি হলো রাজনৈতিক বৈধতা অথবা অন্তত সশস্ত্র আন্দোলনের সমতুল্য স্বীকৃতি। এই সংগঠনের ফিলিস্তিন অঞ্চলের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হামাসের মতোই তাদেরও আদর্শগত ভিত্তি আছে। আছে সুসংহত নেতৃত্ব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনও আছে।

গোত্রভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো পুরোপুরিভাবে ক্ষমতা ও মুনাফার হিসাবে চালিত। অন্যদিকে পিআইজের আছে বৈপ্লবিক বিশ্বাসযোগ্যতা। সংগঠনটির এমন একটি শক্তিশালী কাঠামো আছে, যেটি ইসরায়েলি অভিযানের মুখেও দশকের পর দশক ধরে টিকে আছে। এ ছাড়া পশ্চিম তীরেও পিইজের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। এটি গাজার বাইরে থেকেও সম্পদ আহরণের সুযোগ করে দেয়।

হামাস যদি গাজার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারে, তাহলে পিআইজেকে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখা যায়। ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এক ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জায়গায় আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন।

গাজার সবচেয়ে গভীর সমস্যা হলো এটি এখন দার্শনিক টমাস হবসের সেই ‘সবার জন্য মুক্ত’ জায়গায় পরিণত হয়েছে। সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবন অত্যন্ত কষ্টকর ও নিষ্ঠুর। সংঘাতের মধ্যে পড়ে অকালেই তাদের প্রাণ হারাতে হচ্ছে। ট্রাম্পের শান্তি চুক্তি গাজায় কে শাসন করবে এবং সেখারকার শাসনব্যবস্থা কীভাবে বজায় থাকবে—এই মৌলিক প্রশ্নের কোনো সমাধান দেয়নি। এখানকার শান্তিশৃঙ্খলা স্থিতিশীল করতে কোনো বাহিনী নেই, কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী নেই। এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বন্দুকবাজি ঠেকাতে পারে।

গাজার আকাশে এখনো ঘুরে ঘুরে শকুন উড়ছে। সম্ভবত দীর্ঘদিন ধরেই উড়তে থাকবে। হামাস সহজে তাদের কর্তৃত্ব ছাড়বে না, গোত্রগুলো সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে আর পিআইজে তাদের মুহূর্ত আসার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। এদিকে সাধারণ গাজাবাসীকেই মূল্য চুকিয়ে যেতে হবে।

* ববি ঘোষ, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক
- টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-04-23%2F6yd6y5po%2Fhamas1.avif?rect=97%2C0%2C525%2C350&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ফাইল ছবি: রয়টার্স

পশ্চিম তীরকে সংযুক্ত করার ইসরায়েলের উদ্যোগ শান্তিচুক্তির জন্য হুমকি: যুক্তরাষ্ট্র

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড দখল করা নিয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা সেখানে (পশ্চিম তীর) যে নৃশংসতা চালাচ্ছেন, তা গাজা শান্তিচুক্তির জন্য হুমকি তৈরি করেছে।

ইসরায়েলি আইনপ্রণেতারা গত মঙ্গলবার অধিকৃত পশ্চিম তীরকে (ইসরায়েলের সঙ্গে) সংযুক্ত করা ও ইহুদি বসতি সম্প্রসারণসংক্রান্ত দুটি বিল সামনে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দেন।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে বিলটি ২৫-২৪ ভোটে পাস হয়।

গাজায় ইসরায়েলের দুই বছরের যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে মাত্র এক সপ্তাহ আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেন।

গতকাল বুধবার রুবিও বলেন, পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণ প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার। তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রেসিডেন্টও বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এটি এমন কিছু নয়, যেটি আমাদের এখনই সমর্থন করতে হবে।’

সংযুক্তিকরণে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, তা শান্তিচুক্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে বলেও মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের এই শীর্ষ কূটনীতিক। এদিন সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘তারা একটি গণতান্ত্রিক দেশ; তারা ভোট গ্রহণ করবে এবং লোকজন নিজ নিজ অবস্থান জানাবেন। কিন্তু এ মুহূর্তে, এটি এমন কিছু, যা নেতিবাচক হবে বলেই আমরা মনে করছি।’

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর উগ্র ইসরায়েলি বসত স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রুবিও বলেন, ‘আমাদের অর্জনকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে—এমন যেকোনো কিছু নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’

এদিন রুবিও সামগ্রিকভাবে শান্তিচুক্তি রক্ষার বিষয়েও আশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে হুমকি আসবে। তবু আমি মনে করি, আমরা এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর কাজে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এগিয়ে আছি এবং সপ্তাহান্তে সে লক্ষ্যে যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটা ভালো লক্ষণ।’

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধান সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থক। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও এখন পর্যন্ত অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উদ্যোগের সমালোচনা এড়িয়ে গেছেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন গাজায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে সেনা ও অর্থ প্রদানে কয়েকটি আরব ও ইসলামি দেশকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে বলেছে, পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার পদক্ষেপ একটি বিপৎসীমা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-23%2F9te4zwaj%2FWest_Bank__.avif?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলি হামলার মুখে শরণার্থীশিবির ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। পশ্চিম তীরের জেনিনে। ফাইল ছবি: এএফপি

বিপ্লব আপস করেছে -ড. সলিমুল্লাহ খান by কাজল ঘোষ ও পিয়াস সরকার

জুলাই আন্দোলনের এক বছর। নতুন বাংলাদেশে ঘটনা প্রবাহের অন্ত নেই। অন্তহীন প্রবহমান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। প্রতিটি পদক্ষেপের হিসাব রাখছে বাংলাদেশ। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব কষছেন আন্দোলনে সম্পৃক্তরা। জুলাইয়ের অভূতপূর্ব পরিবর্তনে আমরা কি পেলাম বা কি পাইনি- এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই পট পরিবর্তনের সাক্ষী এবং যোদ্ধা অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান। তাত্ত্বিক, বিশ্লেষক, চিন্তক, অনলবর্ষী বক্তা ড. সলিমুল্লাহ খানের মুখোমুখি হয়েছিল ‘জনতার চোখ’। ফিরে দেখা রক্তাক্ত জুলাই নিয়ে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “পুরনো চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে ক্ষমতা। বড় আকারের মৌলিক পরিবর্তনের আশা করা যাবে না। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে বিপ্লব। ইতিহাসের বিচারে শেখ হাসিনার অপরাধের দায় আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটা কর্মীকে নিতে হবে।” সর্বোপরি তিনি বললেন, “বিপ্লব আপস করেছে। আওয়ামী লীগের নৈতিক পরাজয় হয়েছে, দৈহিক পরাজয় হয়নি।”

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খানের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, “সংস্কার প্রক্রিয়া অনেকটা ধীরগতিতে শুরু হয়েছে। সার্চ কমিটি গঠনটাকেই শুরু হওয়া বলছি না। আসল কাজের কাজ এক বছরে কিছুই হয়নি। বিপ্লবের পরের মুহূর্তে এক বছর অনেক সময়। এক বছর আগে ছাত্ররা অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। অনেকে বলেন, এটা কোটা আন্দোলন। এটা অনেকটা লক্ষণ দেখা, কারণ না দেখা। কোটা ছিল একটা লক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পার হয়ে যাবার পরেও যখন মুক্তিযোদ্ধা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের নাতি-পুতি বা আরও নিচের পুরুষের লোকজনদের কাজে লাগাতে চেয়েছিল হাসিনা সরকার।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন, বৈষম্যের গোড়া কোথায়? ১৯৭২ সালে যে সংবিধান আমরা গ্রহণ করেছিলাম তাতেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যে ঘোষণাপত্র ১০ই এপ্রিল দেয়া হয়েছিল, সেটাই প্রথম সরকারি ঘোষণাপত্র। এটাকে আমি প্রকৃত ঘোষণাপত্র বলতে চাই। জিয়াউর রহমানেরটাও নয়। শেখ মুজিবের নামে প্রচারিত মিথ্যা দলিলটাও নয়। জিয়াউর রহমান যেটা করেছেন সেটা হলো কনটিনজেন্সি (বিকল্প ব্যবস্থা) ম্যানেজমেন্ট। যুদ্ধের জন্য তো একটা ঘোষণা লাগে, জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালন করেছেন। ১০ই এপ্রিল প্রথম বলা হয়েছে, আমরা একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে যাচ্ছি। এর মূল ভিত্তি হবে তিনটি শব্দ- সাম্য মানে বৈষম্য থেকে মুক্তি, মানবিক মর্যাদা মানে পাকিস্তান আমলে যে মানবিক মর্যাদা বা সমতা অস্বীকার করা হয়েছিল সেটা ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক সুবিচার। আমার প্রশ্ন ১৯৭১ সালের ঘোষণাপত্র ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রিয়ম্বল (ভূমিকা) আকারে যোগ হলো না কেন? পরে পরিশিষ্ট আকারে দেয়া হলো। এখানেই তো বৈষম্যের গোড়া।

জুলাই সনদের বিষয়ে বলেন, জুলাই সনদ আমরা রক্ত দিয়ে লিখেছি। তার ভাষাটা অনুবাদ করার বিষয়। ঘটনাটাই আসল ঘোষণাপত্র- ‘আমরা শেখ হাসিনাকে বিদায় দিয়েছি, আমরা শহীদ হয়েছি।’ ৩৬ দিনে- জাতিসংঘের হিসাবে ১৪০০’র বেশি লোক নিহত, ২০ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। মানুষ ট্রমাটাইজড হয়েছে। এটাই ঘোষণাপত্র। এর আগে কতো লোক গুম-খুন হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশটাকে আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা দুটো ঘোষণা দিয়েছি। ‘প্রথমত এদেশে একটা আইয়ামে জাহেলিয়াত কায়েম হয়েছিল, দ্বিতীয়ত আমরা তা মেনে নেইনি।’
সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বললে আমার ১৯৯০ সালের কথা মনে পড়ে। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান সম্পন্ন হয়েছিল সেটার নাম লোকেই দিয়েছিল ‘নাগরিক অভ্যুত্থান।’ এবারেরটার নাম ‘গণ-অভ্যুত্থান’। নাগরিক অভ্যুত্থানের সময় কয়েকটা টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল। সে সময় অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রভৃতি মণীষী বস্তাপচা রিপোর্ট লিখেছিলেন। ওগুলোর খবর কি কেউ জানেন? এগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। এখনকার সংস্কার কমিশনের ত্রুটি হচ্ছে তারা ত্রুটি অনুসন্ধান করছেন না। হাসিনার আমলে তিনবার নির্বাচন হয়নি। সুুতরাং হাসিনা অবৈধভাবে ক্ষমতায় ছিলেন। এরকম সরকারকে হটাতে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। সেটাও আমাদের এখানে করা প্রায় নিষিদ্ধ। জনগণ গ্রহণ করবে না। বাকি পথ হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থান। জনগণ তার সার্বভৌমত্ব নিজেই দাবি করে। সেটাই ঘটেছে। এটাই জুলাই সনদ।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, এর আগে ছিল গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি, গণঅধিকার পরিষদ ইত্যাদি। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হয়েছে। গতবছর জুলাই আন্দোলনের মাঝামাঝি সময়ে বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছিলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এটাকে নৈতিক সমর্থন দিচ্ছি মাত্র। ছাত্রদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন সেটা ছাত্রদের ওপর আস্থার জন্য নয়। হাসিনার বিরুদ্ধে মানুষের যে ঘৃণা আর ক্ষোভ তার কারণেই মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বলছিল- হাসিনার বিরুদ্ধে একটা কলাগাছকে দাঁড় করালেও কলাগাছকেই ভোট দেবো। ছাত্ররাই ছিল প্রকৃতপক্ষে কলাগাছ। তাদের গুণ হচ্ছে সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা। সেটাও বেশি নয়। তারা শেষ কথাটা বলছে গত বছরের আগস্টের এক কি দুই তারিখে। কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৯ দফা দাবি। এরপর কমতে কমতে একদফা। হাসিনা বিদায় নেয়ার পর আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
তিনি বলেন, বর্তমানে ফিরে আসি। বর্তমান সরকার যে অব্যবস্থিত চিত্ত বা আনডিসাইটেড মাইন্ড তার প্রমাণ হচ্ছে ৮ই আগস্টকে তারা নতুন বাংলাদেশ দিবস ঘোষণা করেছিলেন। শ্রদ্ধা রেখে বলছি, এ থেকে বোঝা যায় রাজনীতি সম্পর্কে ড. ইউনূসের কোনো ধারণাই নেই। যদি থাকতো তিনি একথা বলতেন না। পরে বুঝতে পেরেছেন, ভাগ্য ভালো যে তাকে বোঝানোর মতো পাশে কিছু লোক আছে। শেখ মুজিবের পাশে সিপিবি ছিল। এখন ড. ইউনূসের পাশে কারা আছে জানি না। তিনি যদি এই সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন এটা আত্মঘাতী হতো। আসল ঘটনা ঘটেছে ৫ই আগস্ট। তিনি তার নিজের আরোহণ দিবসকে নতুন বাংলাদেশ দিবস বলে ঠিক করেন নাই। প্রত্যাহার করেছেন এটা বুদ্ধিমানের কাজ।

সংস্কার কমিশন প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান বলেন, এগুলোর তুলনা করা যায় টাস্কফোর্সের সঙ্গে। বাংলাদেশের অবনতির আরেকটা কারণ হলো- তারা বাংলা ভাষায় কিছু বলতে পারেন না। যত গর্জে তত বর্ষে না। কিন্তু যেটুকু বর্ষণ হয়েছিল সেটাও ছিল ভুল চিন্তা। প্রথমে শুরু হলো প্রধানমন্ত্রী পদ্ধতি নিয়ে। যেটাকে ক্যাবিনেট সিস্টেম বলে। বাহাত্তরে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্মে গেলেন, ’৭৫ সালে জিয়াউর রহমানও প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিতে থেকে গেলেন। সেই সুখকে কেউ উৎখাত করেননি। জেনারেল জিয়াউর রহমান, এরশাদ কেউ করেননি। সকলেই মনে করলেন প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্মই হচ্ছে আমাদের দেশে গণতন্ত্রহীনতার একমাত্র কারণ।

১৯৯০ সালের অভ্যুত্থানের ফলাফল হলো, চারটা জোট লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে আন্দোলন করলেন। এরপর বললেন, আমরা সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাবো। সেটার পরিণতি আরও খারাপ হলো। ’৯১ সালে নতুন যাত্রা শুরু হলো- নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। এটা যে একটা ভুয়া কথা তা হাসিনা প্রমাণ করেছেন। এখন নতুন আলোচনা চলছে আমরা কি প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে ফেরত যাবো? নাকি প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য করবো? এগুলো লক্ষণ দেখে বিচার করা, কারণে যেতে না পারা। দারিদ্র্য কীভাবে দূর করা যাবে, এটা নিয়ে অনেক কথা। কিন্তু দারিদ্র্য কি কারণে হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয় না। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ সরকার কেউই এ নিয়ে আলোচনায় রাজি নয়।


একটা গল্প রয়েছে- ঘরে সূঁচ হারিয়েছে সে তা রাস্তায় গিয়ে খুঁজছে। কারণ রাস্তায় আলো আছে। যেখানে সূঁচটা হারিয়েছে সেখানে সে খোঁজে না। তাদের দশাও তাই। সংসদে একটা উচ্চকক্ষ যোগ করতে হবে। এটাই কি প্রধান কারণ দেশের ক্ষতির? দেশে গণতন্ত্র না থাকার প্রধান কারণ কি জিজ্ঞাসা করতে তারা রাজি নন। নতুন ধনদৌলত সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিল্প গ্রুপগুলো কীভাবে এত ধন সঞ্চয় করলো? কীভাবে গড়ে উঠলো? এরা দেশের গণতন্ত্রকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? কোন পার্টিকে চাঁদা দিচ্ছে? কোনো সংস্কার কমিশনে তার উল্লেখ নেই। উল্লেখ আছে, আমরা কি প্রধানমন্ত্রী শাসিত থাকবো, ৭০ ধারা থাকবে কি থাকবে না ইত্যাদি। এগুলোকে আমি খারাপ বলছি না। এগুলো সব অর্ধসত্য। তাদের বোধদয় হয়েছে সংসদে এককক্ষ থাকার কারণে বুঝি একনায়কতন্ত্রের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু এই এককক্ষেরই নির্বাচন হয়নি।

তিনি বলেন, পৃথিবীর অর্ধেক দেশ আছে যাদের সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। যেসব দেশ ফেডারেল গোত্রের যেমন ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তারা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। কোনো দেশ রাজাপ্রধান, কোনো দেশ প্রেসিডেন্ট প্রধান। লক্ষণটা কি? তারা বলছেন, এককক্ষ থাকার কারণে গণতন্ত্র ব্যাহত হচ্ছে। হতে পারে একদলীয় ব্যক্তি যখন সংসদের প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং পার্টি প্রধান হন তখন তা হতে পারে। এটা রোধ করার অনেক পথ আছে। দ্বিকক্ষের বিরোধী আমি নই। কিন্তু এটা আমাদের প্রধান সমস্যা না। প্রধান সমস্যা হচ্ছে- স্থানীয় শাসন বলতে কিছু নেই। যেমন ঢাকা একটা বড় শহর যার মেয়রকে বলা যেতে পারে মন্ত্রীর থেকেও শক্তিশালী। চট্টগ্রাম কি ছোট শহর? তাহলে তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদা কেন দেয়া হবে না। বলা হয় অমুক খারাপ লোক, সন্ত্রাসী। তাহলে আপনি খারাপ লোককে মেয়র নির্বাচিত করেছেন কেন? এটাকেই বলে স্বৈরাচার।

স্বৈরাচার নিয়ে একটা বিখ্যাত সংজ্ঞা আছে। ফ্যাসিবাদ সেটা নয় যে, সে কতো লোককে হত্যা করেছে। ফ্যাসিবাদ সে কোন পদ্ধতিতে হত্যা করেছে তার মাপে মাপতে হয়। বিনা বিচারে হত্যা, গুম, টর্চার করে হত্যা, ধরে নিয়ে ভারতের ওপারে পার করে দেয়া ইত্যাদি। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদ বলা জাস্টিফাইড কিনা? আমি বলবো শতভাগ জাস্টিফাইড। সামরিক শাসক আসলে সংবিধান বাতিল করে। শেখ হাসিনা করলো সংবিধানের ভেতর থেকে খেয়ে ঝাঁঝরা। একটা উদাহরণ দেই, সংবিধানে লেখা আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু দেশের উচ্চতম আদালতে বাংলা চলে না। ডেইলি স্টার ইংরেজি মিডিয়াম পাস করা শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেয়। তারা চায় ইংরেজি মিডিয়ামে, বৃটিশ সিলেবাসে পড়ুক। এটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অনাস্থা জানানো। তারা তো এসএসসি, এইচএসসি পাস করাদের সংবর্ধনা দিচ্ছেন না। তারা এ লেবেল, ও লেবেলকে দিচ্ছেন।


অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, হাসিনার আমলে কীভাবে সংবিধানকে ফোকলা করে দেয়া হয়েছে এটা আমরা হাসিনার আমলেই বহুবার বলেছি। অনেকেই বলতেন, ধরে নিয়ে যাবে। ধরলে ধরবে, ধরা তো সম্মানের বিষয়। ফ্যাসিবাদের আরেকটা ধরন হচ্ছে ধরবে কিনা তার গ্যারান্টি নেই। হয়তো দেখা যাবে লাশ পড়ে আছে তুরাগের চরে। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে, ভয়ে রাখা, ভয়ে থাকা। ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য আমরা কি করতে পারি? প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া মোটেও সমাধান নয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ্ধতির ভেতরে কি কি সমস্যা ছিল সেগুলো খুঁজে বের করা। অনেকেই আবার সমালোচনা করেন, ড. আলী রীয়াজ তো বিদেশ থেকে আসছেন। এসব কথা অন্যায্য। বলা উচিত ওনার যুক্তির ত্রুটিটা থাকলে কোথায় আছে? সবাইকে নিয়ে ঐকমত্য করার প্রশ্নটা কোথায়? বলা হচ্ছে কোনো ব্যক্তি একইসঙ্গে দলের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না? এগুলোকে আমি তুচ্ছ কথা মনে করি। কারণ, ছদ্মবেশেও শাসন করা যায়। যেমন ইয়াজউদ্দীন, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট করে দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালানো যায়।

পাকিস্তানে উপরের কক্ষ, নিচের কক্ষ আছে। কিন্তু সেখানেও নানান রকম পরিবর্তন হয়। আমেরিকার এক আমলা নাকি তারেক আলীকে বলেছিলেন, পারভেজ মোশাররফ আমাদের এখানে আসতেন, নানা বিষয়ে একমত হতেন, পাকিস্তানে গিয়ে ঠিক তার উল্টোটা করতেন। বলতেন, প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক কারণে পালন করতে পারছি না। আর আসিফ জারদারি বলার আগেই বাস্তবায়ন করতেন। ঐকমত্য কমিশন লক্ষণ নিয়ে টানাটানি করছে, আসল কারণ বের করতে পারছে না।

অবৈধ ক্ষমতার উৎসে হাত দিতে হবে। উৎসটা হচ্ছে, দেশের পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন প্রক্রিয়াটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পুঁজি ধর্মঘট যখন চলে, তখন পুঁজি প্রত্যাহার করে বিনিয়োগ বন্ধ করে রাখে। এখন যেমন বিনিয়োগ কমে গেছে। বিদেশিরা আসছে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, অতিরিক্ত ভারতের উপর নির্ভরশীলতা, বিদেশি বাজারের উপরে নির্ভরশীলতা। যেভাবে আমরা অর্থনীতি গড়ে তুলেছি, যেটাকে নিওলিবারেলিজম বলে। মানে রপ্তানি করা আয়ের উপর ভিত্তি করেই মাত্র অন্যান্য জিনিস আমদানি করতে পারবেন। দেশীয় বাজার বলতে এদেশে শতকরা ৫০ ভাগও কিছু গড়ে ওঠেনি। এরকম দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে কোনো স্বকীয় রাজনৈতিক তত্ত্ব তৈরি করা যায় না।

তিনি বলেন, ছয়টা সংস্কার কমিশন অনেক কথা বলেছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন রিপোর্টের বিষয়ে বলেন, সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা আছে। কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো কথা নেই। শুধু সরকার আর সংবাদপত্রের কো-রিলেশন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।  অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফলস্বরূপ। এই সরকার গণ-অভ্যুত্থানের পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই সরকারের অধিকাংশ লোকই গণ- অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এখানে আরও অনেক লোক আছে। তাদের নেয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞ আকারে। তারা যা করছেন তারা অক্ষমতার প্রকাশ। যারা সরকারে এসেছেন সবাই অভিজ্ঞ নন। সব দায়দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টাকে নিতে হবে। প্রথমদিকে, তিনি ক্ষমতা নেবেন কিনা তা নিয়েও চিন্তা করেছেন। এরপর শপথ নিয়ে নিজের বিরুদ্ধে রুজু মামলাগুলো প্রত্যাহার করেছেন। তার সব কাজকে আমি খারাপ বলবো না। তার ম্যান্ডেট গণ-অভ্যুত্থান। গণ-অভ্যুত্থানের যারা সাক্ষাৎ নেতা, যেমন নাহিদ ইসলাম- তারা ড. ইউনূসের কথা বলেছেন। অন্যরা মেনে নিয়েছেন। আমরা নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেয়েছি। এখন যেটা চলছে সেটা মবোক্রেসি। মব হচ্ছে কারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধ নয়। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে মারামারি করে। এখন আওয়ামী লীগ গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের মবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রুশবিপ্লবী লেনিনকে কিন্তু গুলি করেছিল মবেরই একজন লোক। এই মব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কারণ অব্যবস্থিত চিত্ততা বা আনডিসাইটেড মাইন্ডের জন্য। সব বিপ্লব তার প্রতিপক্ষ তৈরি করে। অবাক লাগে নবনীতা চৌধুরীর মতো সাংবাদিক কেন দেশ ছেড়ে পালালেন? তাদের বিদেশে পালিয়ে গিয়ে কেন প্রোপাগান্ডা করতে হচ্ছে? গণহারে মামলা হচ্ছে এই সরকারের ত্রুটি। এগুলো সরকার স্বীকারও করেছে। শেখ হাসিনা যেসব টেনডেন্সি দমন করেছিলেন সেগুলোর এখন বিস্ফোরণ হচ্ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই জঙ্গি বলা শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। কওমী জননী উপাধি নিয়েছিলেন তিনি। শেষ মুহূর্তে জামায়াত নিষিদ্ধ করেছিলেন। জামায়াতের বহু নেতাকে যুদ্ধাপরাধী হওয়ার কারণে শাস্তি দিয়েছেন। এসব কারণে একদম বন্ধ আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল। দেশে যেহেতু গণতন্ত্র ছিল না এজন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারগুলো যে নিরপেক্ষ তা তিনি প্রমাণ করতে পারেননি। বেশ কিছু স্ক্যান্ডাল তৈরি হয়েছিল, একজন বিচারপতিকে সরিয়েও দিতে হয়েছিল। বিপ্লবের ভ্যাকুয়ামটা হচ্ছে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের। কারণ তাদের দেশব্যাপী কোনো সংগঠনই ছিল না। যার কারণে সম্ভাবনা ছিল নৈরাজ্য তৈরি হওয়ার অথবা সামরিক শাসন জারি করার। সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত ছিল না। অন্তত তাদের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা ছিলেন। ডিজিএফআই কলঙ্কিত হয়েছিল গুম, খুন, আয়নাঘরের সঙ্গে জড়িত হয়ে। তাদের পায়ের তলায় মাটি ছিল না। জনরোষ সামরিক বাহিনীকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়- এটা তার প্রমাণ। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা কতোগুলো শক্তির উপর নির্ভর করেছে।

সংগঠিত শক্তি হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। বিএনপি বড় দল, কিন্তু জামায়াত অধিক সংগঠিত। এই কারণে নানারকমের মব তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি কিছু ইসলামিক শক্তি রয়েছে, তারা সক্রিয় হয়েছে। পিপল আর মব এক জিনিস নয়। পিপলের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অনেক মব হয়েছে। এখন সুবিধাবাদী একটা গোষ্ঠী শাপলা বনাম শাহবাগ- এরকম কিছু কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করছে। আমার মনে হয়, এগুলো ধোপে টিকবে না। যেগুলোকে মব বলা হয়েছে। তাদের আমি বলবো বুদবুদ। তবে এগুলো লক্ষণ হিসেবে ভালো না। দেশে নানাধরনের যে শক্তি আছে তাদের মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিক পদ্ধতিতে।


ছাত্র নেতাদের বিষয়ে বলেন, তাদের বয়স কম হতে পারে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সাহসের প্রশংসা না করলে অন্যায় করা হবে। রাজনীতি হচ্ছে শেষ বিচারে ক্ষমতার জন্য লড়াই। আমি একদিন বলেছিলাম, উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্রদের শতকরা ৫০টা আসন নেয়া উচিত। কিন্তু তাদের মাত্র দুটা বা তিনটা আসন দিয়েছে। পুরনো সরকারের যে প্রেসিডেন্ট তাকে রাখার যৌক্তিকতা কি? সংসদ বিলুপ্ত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেছেন। ওই সরকার বিলুপ্ত হয়েছে। সংসদ বিলুপ্ত হলে ওই সংসদের স্পিকার আর থাকে না। দেশ চলছে প্রেসিডেন্টের অর্ডিন্যান্সে অথচ সেই প্রেসিডেন্টেরই কোনো বৈধতা নেই। সুতরাং দেশ একটা নৈরাজ্যের মতো চলছে। আমরা ধারাবাহিকতায় চলছি। ১৯৯০ সালে বলতো, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় চলতে হবে। বর্তমান বিপ্লবের অসম্পূর্ণতাটা এখানেই। বিপ্লবটাকে আর বিপ্লব বলা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এটাকে আমি প্রতিবিপ্লব বলবো না। আমি বলবো, বিপ্লব আপস করেছে। দুই বা তিনজন ছাত্রকে স্থান দেয়া হয়েছিল সরকারে। তারা একজনও না থাকতেন; যেটাকে বলা হয় প্রেশার গ্রুপ সেটা হতেন তাহলেও তাদের সনদ বাস্তবায়িত হতো। বিপ্লব যে হয়নি তার প্রমাণ তথাকথিত জুলাই সনদ চূড়ান্ত হতে অনেক বেশি সময় লেগেছে।
একাত্তরে আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো প্রস্তুতি ছিল না স্বাধীনতার জন্য। ইন্দিরা গান্ধীর অনুমতি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হয়েছে। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ থেকে ১০ই এপ্রিল পর্যন্ত এত সময় লাগলো? এটাতেই প্রমাণ, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের জন্য দল হিসেবে প্রস্তুত ছিল না। ব্যক্তি হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ থাকতে পারেন। অনেকে বলবেন, তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কেন দেখা করলেন? দেখা করা ছাড়া উপায় কি? আওয়ামী লীগের সময় ছিল। ’২৪ বিপ্লবীদের সময় ছিল না। তাদের যখন ধরে নিয়ে যেয়ে পেটানো হলো: তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন না থাকলেও গোটা দেশ তাদের নেতৃত্বের অপেক্ষায় ছিল। জিয়াউর রহমান যেভাবে ’৭১ সালে নেতা হয়েছেন শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে। তাজউদ্দীনও বলেছিলেন, জিয়াউর রহমানের বক্তব্য শুনে তিনি উজ্জীবিত হয়েছেন। যিনি পরবর্তীতে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন, যার অধীনে তিনি সেক্টর কমান্ডার হবেন তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ওই বিপ্লবের মুহূর্তে সেক্টর কমান্ডার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখানেও তাই। এই বিপ্লবের প্রকৃত নেতা নাহিদ ইসলাম। ক্ষমতায় নাহিদ ইসলামের প্রধান উপদেষ্টা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা এই: তিনি ইউনূসকে ডেকেছেন। বলেছেন, আমি পারবো না। নাহিদের চেয়ে সামান্য বেশি বয়স ছিল ফিদেল ক্যাস্ট্রোর। ক্যাস্ট্রোর হাতে বন্দুকও ছিল। ফিদেল ক্যাস্ট্রো প্রথমে আরেকজনকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেছিলেন। এই আন্দোলনের কাঠামোগত দুর্বলতা হলো, জনগণ যাদের নেতা মেনে হাসিনাকে পরাজিত করেছে তারা নিজেরাই নেতৃত্ব নিতে সাহস করেননি। তারা আরেকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছেন। তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে। এক বছর পর মনে হচ্ছে ক্ষমতা আবারো পুরনো নহরে, পুরনো চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছে। বড় আকারে মৌলিক পরিবর্তন আশা করা যাবে না। আহা! যে অন্যায় হাসিনা করেছে এই অন্যায় ’৭১ সালে পাকিস্তান আর্মিরাও করেনি।


গত বছরের ৩১শে জুলাই ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বক্তব্যে আইয়ুব খানের উন্নয়ন দর্শন ও শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন আমি বর্ণনা করেছিলাম। কিন্তু আইয়ুব খান এত লোক খুন করেনি। শুধু ৩৬ দিনের কথা বলছি না, রাজত্বকালে যত খুন করেছে, যত জঙ্গি নাটক করেছে- তা আইয়ুব খানকে করতে হয়নি। শেখ হাসিনাসহ যারা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তাদের বিচার না করলে বিপ্লব ব্যর্থ হবে। কিন্তু তাদের বিচার হলে বিপ্লব অর্ধেক সফল হবে। বাকিটা বাস্তবায়ন করার জন্য জনগণের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। মূল আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে- জনগণ তাদের অধিকার ফেরত চায়। যে সরকারই হোক সরকার তাদের অধিকার বদলাতে পারবে না। মাইনোরিটিদের অধিকার বদলাতে পারবে না। মেজোরিটির শাসনকে গণতন্ত্র বলা হয়। কিন্তু মেজোরিটির জোরে মাইনোরিটির অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। ভারতে এখন হিন্দুত্ববাদ চলছে। আমি মৌলভীদের সম্মানের সঙ্গে বলি আপনারা ভারতে যদি সেক্যুলারিজম চান তো বাংলাদেশে চান না কেন? বাংলাদেশে যেহেতু মুসলিম মাইনোরিটি না তাই সেক্যুলারিজম চান না। বাংলাদেশ উপমহাদেশে তখনই নেতৃত্ব দিতে পারবে যখন মাইনোরিটি, মেজোরিটি ভাগ থাকবে না। হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান বলে যাতে কাউকে নির্যাতন করা না হয়। এমনকি কাদিয়ানি বলেও যাতে নির্যাতন করা না হয়। আমাদের দরকার নাগরিক অধিকার।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, শেখ হাসিনার আরেকটা ফ্যাসিবাদী চরিত্রের নজির হচ্ছে রাষ্ট্রভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় উন্নীত না করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বলা। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন হয়েছিল। শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করে বোঝানো হয়েছে এটা একটা বিশাল অর্জন। কোনো লেখককে যদি বলা হয়- মহিলা লেখক। তা ওই লেখকের ডিমোশন। এটাও একটা ফ্যাসিবাদের প্রকাশ।

গণতন্ত্র চাইলে সবাইকে ভোটাধিকার দিতে হবে। ভোটের দিন মারামারি না হয়, কেউ যাতে কারও ভোট কেড়ে নিতে না পারে। এককক্ষ হোক, দ্বিকক্ষ হোক সেটা বড় কথা নয়। প্রত্যেকটা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে হবে। আমার একটা প্রস্তাব আছে- পিআর নয় প্রয়োজন স্থানীয় প্রতিনিধি পদ্ধতি। বাংলাদেশের ৬৪ জেলা আছে। প্রত্যেক জেলা থেকে ২ জন করে সদস্য নেয়া হবে। ১২৮ জন সদস্য নিয়ে একটা জাতীয় পরিষদ হবে। ঢাকায় জনসংখ্যা বেশি, তার সংসদীয় আসন সংখ্যা যাই হোক উচ্চকক্ষে সদস্য দুইজন হবে। কুড়িগ্রাম থেকেও দুইজন হবে। তাহলে উন্নয়নের বৈষম্যে লাগাম টানা হবে। উচ্চকক্ষ যা  হবে সেটা হবে সরাসরি ভোটে। এখন এনজিওতন্ত্র বেশে দানা বাঁধছে মেরিটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা নিয়ে। এটা সাংঘাতিক ফ্যাসিবাদে যাবার পথ। বিনাভোটে বা তথাকথিত পিআর পদ্ধতিতে ভোটে উচ্চকক্ষে নির্বাচনের চক্রান্তটা অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল, গণতন্ত্রহীন। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটা হতে হবে জেলা অনুসারে। প্রতি জেলা থেকে ২ এর জায়গায় ৩ হতে পারে। একসঙ্গে সকল কক্ষের নির্বাচন করা যাবে না। আলাদা আলাদা সময়ে নির্বাচন হতে হবে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য এটা ভালো পথ হতে পারে। উচ্চকক্ষের বিষয়টি এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রমোট করছে। এটা সুকৌশলে আলী রীয়াজের ঐকমত্য কমিশনও চালানোর চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ভারত এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো প্রভেদ দেই। ওবায়দুল কাদের সেনাপ্রধানকে মীর জাফরের সঙ্গে তুলনা করে ফেলেছেন। আওয়ামী লীগের বড় পরাজয় হচ্ছে নৈতিক পরাজয়, হয়তো দৈহিক পরাজয় হয়নি। এসবি’র রিপোর্ট বলছে, দেশে একটা গৃহযুদ্ধ হতে যাচ্ছে। এসবি’র এক পরিচিত লোক আমাকে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার আমলেও আন্দোলন হতে যাচ্ছে বলে তিনি রিপোর্ট দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করেনি। আওয়ামী লীগ ভারতের পার্টি এবং সেটা বিজেপি-কংগ্রেস একসঙ্গেই প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপিও এক্সপোসড হয়েছে। বিএনপি যে একটা প্রো-ইন্ডিয়ান পার্টি সেটাও প্রমাণিত পেয়েছে। শুধু সালাহউদ্দিন নয়, পুরো বিএনপি চাইছে যাকে প্রয়োজন তাকে তোষণ করে ক্ষমতায় যাওয়া। আওয়ামী লীগ এখন রটাচ্ছে এই আন্দোলনটা আমেরিকা ঘটিয়েছে। যেটা ডাহা মিথ্যা কথা। প্রকৃতি শূন্যতা সহ্য করে না। বাংলাদেশে এখন নতুন আন্তর্জাতিক খেলা চলবে এর মধ্যে আমেরিকা আছে, চীন আছে, ভারত তো আছেই। রাশিয়া দূরে হলেও ইনভলব। আওয়ামী লীগের গায়ের কাপড় খুলে গেছে। দলটা পুরোপুরি ভারতনির্ভর। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। ’৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি পরিত্যাগ করেছিল তারা। আওয়ামী লীগকে প্রথম হত্যা করে কে? শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি এটার নাম বাকশাল দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা নামটা বদলাননি। কিন্তু চরিত্র একই ছিল।

ইতিহাসের বিচারে শেখ হাসিনার অপরাধের দায় আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটা কর্মীকে নিতে হবে। তাকে কেন্দ্র করে কীসব স্লোগান দেয়া হয়েছে! আওয়ামী লীগাররা হাততালি দিয়েছে। প্রত্যেককে ইতিহাসের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কথা বলছি না। অন্যদিকে বিএনপি ১৬ বছর আন্দোলন করেছে। অনেক নির্যাতন, অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কিন্তু তারা আখেরে ধরে রাখতে চাইছেন পুরনো সংবিধান। যেটাতে তাদের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী ও দলনেতা রাখতে চায়। যদিও সেটাতে তারা ছাড় দিচ্ছেন- পরে যে তারা সরে যাবেন না- এটার গ্যারান্টি কি?
তিনি বলেন, জুলাই সনদের মানে হচ্ছে ‘লেজিটেমেসি অব জুলাই রেভ্যুলুশন’। জুলাই সনদ না হলে এদের হাসিনা এসে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। সুতরাং ইট শুড বি লিগ্যালাইজড। শুধু অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে নয়, সর্বদলীয়ভাবে হলে ভালো। এটা এরকম হবে যে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা ছিল জাতির পক্ষে কর্তব্য। যারা অংশ নিয়েছে তারা নায়ক। কিন্তু একদল এটা নিয়ে পড়ে আছে। ’২৪ কি দ্বিতীয় স্বাধীনতা? ’২৪ কি ’৭১ বিরোধী? হ্যাঁ, এখানে জামায়াতের একটা টেনডেন্সি আছে; ’৭১কে অস্বীকার করার। জামায়াতের বিচার হয়েছে কেন? তারা একটা সামরিক শক্তি গঠন করেছিলেন আল বদর নামে। নেজামে ইসলাম ও যারা এখন কওমীপন্থি হয়েছেন তারা গঠন করেছিলেন আল শামস। রাজাকার, আল বদর, আল শামস এই পার্টিগুলো যারা করেছেন তাদের বিচার হয়েছে। আমার মনে হয় জামায়াতের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে ’৭১ বিষয়ে তারা এমবিগুয়াস। জামায়াতের একটা তরুণ সমাজ আছে। যারা মনে করে আমার বাংলাদেশ নামকরণের মধ্যেই একটা অনুশোচনা আছে। কিন্তু তারা কি কারণে ক্ষমা চেয়েছেন সেটা পরিষ্কার না। জামায়াতের ’৭১ বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টকরণ করা উচিত। তাতে নতুন যাত্রা হতে পারে।

দক্ষিণপন্থা যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে মূলত মধ্যমপন্থার লোকেরা বেশি ছিল। তাতে বামেরও কিছু হিস্যা ছিল। বামেদের রাজনীতি হচ্ছে না। তারা হয় নিষ্ক্রিয় কিংবা শেখ হাসিনার সহযোগীতে পরিণত হয়েছিলেন। যেমন, সিপিবি, বাসদ। তাদের রাজনীতিতে আমরা হতাশ। বামের রাজনীতি বলতে গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য এনারা মধ্য বামপন্থি। বিএনপিতে ডান-বাম দুটোই আছে। বিএনপিকে মধ্যপন্থি ধরতে পারেন। ডানে আছে জামায়াত। তাদেরও ডানে আছে ইসলামী ব্যানার বহনকারী দল। আগে তারা কথা বলতে পারেনি। তাদের শেখ হাসিনার আমলে দমন করা হয়েছে। যেহেতু তারা বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন সরাসরি কিংবা পরোক্ষ সেহেতু তাদের কথা আপনাকে শুনতেই হবে। তাদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ করলে লাভ হবে পরাজিত ফ্যাসিস্টদের। বাংলাদেশকে একটা স্থিতিশীল করতে চাইলে আমরা গৃহযুদ্ধ চাই না। তবে আমরা ভারত বা পাকিস্তান কারও অধীনস্থতা মেনে নিতে প্রস্তুত নই। ভারতকে মনে রাখতে হবে তার পেছনে চীন লেগে আছে। বাংলাদেশের সঙ্গেও লড়াই করবে, চীনের সঙ্গেও লড়াই করবে এটা ভারতের জন্য সহজ নয়। ভারত যখন ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের পানি বন্ধ করেছে; ভেবেছে এটা তার অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হলেও ভারত পানি দেয়নি। কিন্তু চীন যখন বাঁধ দিয়েছে তখন মাথাব্যথা হয়েছে। এখন ভারত বাংলাদেশকে টানতে চাইছে। চীন বাঁধ দেয়াতে ভারত-বাংলাদেশ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা শক্তের ভক্ত নরমের যম।

তিনি বলেন, নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধিতা নতুন নয়। এটা পাকিস্তান আমলেও ছিল। যখন পরাধীন ছিলাম তখন পরাধীনতার বিরুদ্ধে আমরা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছি। পাকিস্তান আমলে ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের সময় কয়েকটা আইনগত কাঠামো গঠন করেছিলেন। ইয়াহিয়া খান একটা বিপ্লবই করেছিলেন। এক মাথা এক ভোট। চার মাসের মধ্যে সংবিধান রচনা করতে হবে। এমন কোনো আইন করা যাবে না কোরআন-সুন্নাহর বিরোধী হবে। পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র হবে। এগুলো শেখ মুজিব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ’৭০ নির্বাচনে এগুলোর কথা আর কেউ বলে না। মানে ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র করার পক্ষে তো তিনি ছিলেন না। তবু মেনেছিলেন কারণ না মানলে তো আর নির্বাচনে যেতে পারবে না। মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ ভাসানীপন্থিরা স্বাধীনতার স্লোগান দিলেও শেখ মুজিব দিতে পারেননি।  বাংলাদেশ বহু জাতির দেশ। আমরা বলছি সকল জাতির অধিকার রাখতে হবে। ঠিক তেমনি সকল ভাষার অধিকার রাখতে হবে। চাকমা, গারো, মারমা, সাঁওতাল সবার অধিকার-ভাষা রাখতে হবে। নারীরা কিন্তু সংখ্যাগুরুদের অংশ।

প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র আনতে চাইলে শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা চালু করতে হবে। সকল ধর্ম বাংলা ভাষায় শেখাতে হবে। কেন বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেন বা স্কুলগুলো ইংরেজি মাধ্যমে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অন্য বিষয়। বর্তমান সরকার শিক্ষা নিয়ে কোনো কমিশনই গঠন করলো না। ভবিষ্যতে হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশে কয়েকশ’ বিলিয়নিয়ার হয়েছে। দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে তারাই। তারা মিডিয়া, করপোরেট, আন্তর্জাতিক পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যম চালু রাখা। শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ব্যয় করছে সরকার তা লজ্জাজনক। মাত্র ২ শতাংশ। এটা ১০ শতাংশে না গেলে ব্যাপক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে পারবে না। আমাদের দেশে ৩৫ রকমের প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে। যেকোনো রকমের প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করলেই সে নিজ উদ্যোগে বই পড়বে। সুশিক্ষিত ব্যক্তি মানেই স্বশিক্ষিত। স্কুলে কয়েকদিন থাকা মানে জেলখানায় থাকা তো। জেলখানায় থাকার একটা উপকারও আছে। জীবনে শৃঙ্খলা চলে আসে।

তিনি বলেন, সব থেকে বড় সংস্কার করা উচিত ছিল সবার জন্য বিনা পয়সায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ করে দেয়া। এটা হবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। পরিচালনা হতে পারে বেসরকারি।  যারা অর্থের অভাবে পড়তে পারে না তাদের পরিপূর্ণ বৃত্তি দেয়া উচিত। দেশে ‘এ’, ‘ও’ লেবেল নিষিদ্ধ করা উচিত। ইংরেজি মিডিয়াম উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা উচিত। মাদ্রাসা ছাত্ররা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসায় হিন্দুরাও পড়তে পারে। ওখানে মাদ্রাসা হাইস্কুলের মতো। আরবি, ফারসি বিষয় আছে। পড়লে পড়বেন না পড়লে নেই। আমাদের দেশে ইংরেজি পড়ানো বাধ্যতামূলক। ২০০ নম্বরের ইংরেজি না পাস করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করতে পারছে না। কিন্তু গণিত কেন ইংরেজিতে পড়াচ্ছেন? ইংরেজি মিডিয়ামে কেন ভারতের বই পড়াচ্ছেন? নারীদের অধিকার আসবে তখনই যখন গণতন্ত্রের বিজয় হবে। নারীদের নিয়ে যে আলোচনা এগুলো মূল সমস্যা, গণতন্ত্রের সমস্যা লুকানোর জন্য মুখরোচক আলোচনা। মেয়েদের ভাগ্য মেয়েদেরই নির্ধারণ করার অধিকার দিতে হবে।

শেষ কথায় এই চিন্তাবিদ বলেন, ইতিহাসে যত বিপ্লব দেখেছি কোনো বিপ্লব সম্পূর্ণ ব্যর্থ বা সম্পূর্ণ সফল হয়নি। বিভিন্ন বিপ্লবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন কোনো পরিপক্ব ধনিক শ্রেণি তৈরি হয়নি যারা জনগণের উপর কর্তৃত্ব করতে পারেন নৈতিক অধিকারে। তারা এজন্য একটা পরিবারের উপর নির্ভর করেন। আমার বাবা দেশটা স্বাধীন করে দিয়েছে। তার মানে ক্ষমতায় এসেছেন বাবার অধিকারে, নিজের অধিকারে না। একইভাবে বিএনপিও তাই। এটাই বিপ্লবের ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের পোশাক

আমরা ’৭১-এ আংশিক সফল হয়েছি। একটা দেশ পেয়েছি, একটা পাসপোর্ট পেয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ছদ্মবেশী রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। পরিবারতন্ত্র দক্ষিণ এশিয়ায় আছে। আমি বিপ্লব নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখি না। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার যেন থাকে। ফ্যাসিবাদ যাতে না ফিরে আসে।

’৭২-এর সংবিধান পরিবর্তন করা ছাড়া কোনো পথ নেই। অবাক কাণ্ড। বর্তমান সরকার এই সংবিধান বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জুলাই বিপ্লব আংশিক সফল হয়েছে। কারণ আমরা ’৭২ এর সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারছি। ’৭১-এর এপ্রিল সনদের আলোকে ’২৪-এর জুলাই সনদ বহাল হতে হবে। ইতিহাস এটাকে প্রগতি বলে। আমি অবশ্য প্রগতিতে বিশ্বাস করি না। আমি বলি, ইতিহাসে গতি আছে, প্রগতি নেই। আর বিপ্লব কখনো ব্যর্থ হয় না। অন্য বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে।

(জনতার চোখ থেকে ) সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজল ঘোষপিয়াস সরকার

গাজায় কি তাহলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যেও গত কয়েক দিনে গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৩০ জন।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ নিয়ে উত্তেজনা চলার মধ্যে ইসরায়েলি সেনারা একাধিকবার নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন এবং গাজায় বোমা বর্ষণ করেছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার। ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাফা এলাকায় হামাস যোদ্ধারা তাদের সেনাদের ওপর হামলা করেছেন। আর এ অভিযোগ তুলে তারা গাজায় হামলা চালিয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন এবং প্রায় ২০০ জনকে বন্দী করে গাজায় নিয়ে আসা হয়। জবাবে সেদিন থেকেই গাজা উপত্যকায় নির্বিচার ও নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মোট ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজার ২০০ মানুষ আহত হয়েছেন। গাজায় ইসরায়েলের চালানো হত্যাযজ্ঞকে জাতিসংঘ–সমর্থিত একটি কমিশন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিগত নিধন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এখন হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে কিছু প্রশ্ন উঠছে। তা হলো যুদ্ধবিরতি আসলে কে ভেঙেছে? এখনো কি যুদ্ধবিরতি চলছে? ফিলিস্তিনি জনগণ কি শেষ পর্যন্ত শান্তি ও সহায়তা পাচ্ছেন?

এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আমরা যা জানি—

কেন বলা হচ্ছে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হয়েছে

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গত রোববার বলেছে, হামাস চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এবং রাফায় সংগঠনটির দুই যোদ্ধা দুই ইসরায়েলি সেনাকে হত্যা করেছেন।

এরপর ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় ‘ব্যাপক ও বিস্তৃত’ হামলা চালায়।

হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসেম ব্রিগেডস বলেছে, তারা কোনো সংঘর্ষের খবর জানে না। তাদের দাবি, রাফা এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ওই এলাকায় কোনো ফিলিস্তিনি যোদ্ধার সঙ্গে ব্রিগেডসের যোগাযোগ হয়নি।

হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের যে এই একটি অভিযোগই তোলা হয়েছে, তা নয়।

ইসরায়েল বলেছে, হামাস ২৮ জিম্মির মরদেহ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে দেরি করছে। এই জিম্মিরা গাজায় ইসরায়েলের বোমা হামলার সময় নিহত হয়েছিলেন।

হামাস শুরু থেকেই বলে আসছে, যুদ্ধে বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সব জিম্মির মরদেহ এবং প্রায় ১০ হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ খুঁজে বের করতে ভারী খননযন্ত্রের প্রয়োজন।

যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো কী ছিল

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ২০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই যুদ্ধবিরতি হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে এবং কাতার, মিসর ও তুরস্কের সহায়তায় যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করা হয়।

হামাস বলছে, তারা সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার এবং একটি ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রশাসনের’ হাতে গাজার শাসনভার তুলে দেওয়ার শর্তও গ্রহণ করেছে।

বাকি দাবিগুলোর বিষয়ে হামাস বলেছে, এগুলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ফিলিস্তিনি জাতীয় কাঠামোর মধ্যে রেখে সমাধান করতে হবে। তারা ওই জাতীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে এবং এতে তারা সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখবে।

ইসরায়েল কি চুক্তির শর্ত মানছে

গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় বলেছে, ইসরায়েল ৮০ বার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এবং অন্তত ৯৭ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

গত শুক্রবার ইসরায়েলি সেনারা একটি বেসামরিক যানে গুলি চালান। এতে জেইতুন এলাকার আবু শাবান পরিবারের ১১ সদস্য নিহত হন। এর মধ্যে সাত শিশু এবং তিন নারী ছিলেন। পরিবারটি তাদের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

গত রোববার গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার বিমান হামলা ও অন্যান্য হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হন।

গতকাল ইসরায়েল আবার চুক্তি মেনে চলবে বলে ঘোষণা দেওয়ার পরও তারা গাজার উত্তরাঞ্চলীয় শুজাইয়া এলাকায় কয়েকজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলের দাবি, ওই ফিলিস্তিনিরা ‘ইসরায়েলি সেনাদের জন্য হুমকি’ তৈরি করেছিলেন। তাঁরা ‘হলুদ সীমারেখা’ অতিক্রম করেছেন।

যুদ্ধবিরতি শুরুর পর গাজায় যে সীমা বরাবর ইসরায়েলি বাহিনী সরে এসেছে, তাকে ‘হলুদ সীমা’ বলা হয়। এই সীমানা পেরোনোর ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ইসরায়েল গাজায় ত্রাণ প্রবেশের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে রেখেছে এবং রাফা ক্রসিং বন্ধ রেখেছে। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘকে ইসরায়েল বলেছে, তারা কেবল ৩০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের অনুমতি দেবে—যা চুক্তিতে উল্লিখিত সংখ্যার অর্ধেক।

হামাস কি চুক্তির শর্ত মানছে

হামাস ২০ জীবিত জিম্মির সবাইকে মুক্তি দিয়েছে এবং বারবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ২৮ জন মৃত জিম্মির মধ্যে ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার হামাস আবারও বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ইসরায়েলি বোমা হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার করা খুবই কঠিন।

হামাস বলছে, নতুন সরঞ্জাম ও বাইরের সহায়তা ছাড়া এই তৎপরতা ধীর হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তা শেষ করা যাবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।

হামাস যখন জিম্মিদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন গাজার উদ্ধারকারী সংস্থা সিভিল ডিফেন্স বলেছে, অঞ্চলজুড়ে ১০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

মানুষ কি বাড়ি ফিরতে পারছেন

সত্যিকার অর্থে, না।

ইসরায়েলের বোমা হামলায় পুরো এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এতে সেখানকার বাসিন্দারা এলাকায় ফিরে তাঁদের বাড়ির ঠিকানা শনাক্ত করতে পারছেন না।

তা ছাড়া ইসরায়েল একটি ‘অদৃশ্য হলুদ রেখা’ টেনে রেখেছে। ওই রেখার বাইরে গেলে ফিলিস্তিনিরা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। বিষয়টি অনেকের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে। বিশেষ করে যাঁরা জানেন না তাঁদের বাড়ি হলুদ রেখার ইসরায়েলি অংশে নাকি ফিলিস্তিনি অংশে। এ নিয়ে তাঁরা ভয়ে আছেন।

একটি খসড়া মানচিত্রে দেখা গেছে, হলুদ রেখা টেনে দেওয়ার মধ্য দিয়ে গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

মানবিক সাহায্য অবরুদ্ধ রাখায় গাজায় খাদ্য ও অন্যান্য অপরিহার্য সম্পদ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ইসরায়েল সরকার পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তারা বলেছে, ‘নতুন করে সন্ত্রাসের ঝুঁকি দেখা না দিলে’ তারা একটি বাফার জোন মেনে চলবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্তের এসব ফাঁকফোকর ইসরায়েলকে গাজায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করার সুযোগ দেবে।

তাহলে যুদ্ধবিরতি চলছে নাকি ভেঙে গেছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর আছে। তিনি আবারও বলেছেন, মার্কিন কর্মকর্তারা পরিস্থিতি ‘খুব শান্তিপূর্ণ’ রাখার দিকে নজর দেবেন।

ইসরায়েলের হামলায় রোববার বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, গাজায় যুদ্ধবিরতি আবারও শুরু হয়েছে এবং সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

হামাস বলেছে, তারা এখনো যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলতে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ইসরায়েলের হামলায় নিহত এক ফিলিস্তিনি শিশুর মরদেহ। মেডিকেল সূত্র অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর ২০২৫-এ মধ্য গাজার আল-অউদা হাসপাতালে দাফনের প্রস্তুতির সময়
ইসরায়েলের হামলায় নিহত এক ফিলিস্তিনি শিশুর মরদেহ। মেডিকেল সূত্র অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর ২০২৫-এ মধ্য গাজার আল-অউদা হাসপাতালে দাফনের প্রস্তুতির সময়। ছবি: রয়টার্স

সেনা ছাড়াই গাজায় যুদ্ধ চালানোর পরিকল্পনা এঁটেছে ইসরায়েল by আমাল আবু সিফ

ইসরায়েলের ট্যাংকের পিছু হটা কিংবা যুদ্ধবিমানের আওয়াজ নীরব হয়ে যাওয়ার মানেই গাজা যুদ্ধের অবসান নয়। ইসরায়েলি আগ্রাসনে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, লাখো বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

কিন্তু গাজার বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো সামনে অপেক্ষা করছে। কারণ, ইসরায়েল এমন আরেকটি রূপে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, যেখানে সরাসরি সেনা উপস্থিতির দরকার নেই।

ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ যে শূন্যস্থান তৈরি করেছে, সেখানে ভয়ংকর এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। ভেঙে পড়া সামাজিক আর মানুষের তীব্র দুর্ভোগকে পুঁজি করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আবির্ভূত হচ্ছে।

এই দলগুলো একসময় দখলদারদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধের’ বাহিনী হিসেবে নিজেদের দাবি করত। কিন্তু এখন তারা ক্রমে নিজেদের মানুষদের দিকেই অস্ত্র তাক করছে। মাতৃভূমির প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসার বদলে তারা সহিংসতার মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ফিলিস্তিনিদের যন্ত্রণাকে তারা গোষ্ঠীতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির মুদ্রায় পরিণত করছে।

গাজা দীর্ঘদিন ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে ছিল। এখানকার বাসিন্দাদের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন এক দমবন্ধ জীবন যাপন করতে হয়েছে। তবু নিজেদের দেয়ালের মধ্যে তাঁরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিলেন।

গাজার লোকেরা ইসরায়েলি বিমান হামলায় ভয় পেতেন, অপরাধী গোষ্ঠী বা প্রতিবেশীর বন্দুকের ভয় তাঁদের ছিল না। আজ তঁাদের ভয় বহুগুণ বেড়েছে। সেটা দখলদারির দিক থেকে যেমন, আবার নিজেদের লোকদের দিক থেকেও।

গাজা সিটির সাবরা এলাকায় সাংবাদিক সালেহ আলজাফারাউইয়ের হত্যাকাণ্ড এই নতুন পর্যায়ের অন্যতম অশুভ লক্ষণ। ২৮ বছর বয়সী এই প্রতিবেদক দীর্ঘদিন ধরে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতার দলিল তৈরি করেছিলেন।

তিনি তাঁর কাজের জন্য বারবার মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন। শান্তিচুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নিহত হলেন। ইসরায়েলি সেনার গুলি কিংবা ড্রোন হামলায় নয়, তিনি নিহত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীদের হাতে।

এই হত্যাকাণ্ড দেখিয়ে দিল যুদ্ধ এখনো অন্য রূপে চলছে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের একে অপরের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছে, ভয় ও রক্তপাতের এক চক্র তৈরি করেছে। এটি সৈন্যদের উপস্থিতি ছাড়াই ইসরায়েলি স্বার্থের পক্ষে কাজ করছে।

এখানে ইসরায়েলের যুক্তি স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরেই তারা একটি পুরোনো ঔপনিবেশিক কৌশল ‘ভাগ করে শাসন করার’ ওপর নির্ভর করছে। একটি সমাজ যদি অভ্যন্তরীণ সহিংসতার বৃত্তে ঢুকে পড়ে, সেই সমাজ আর দখলদারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানকে নিজেদের হীনস্বার্থে উৎসাহিত করে, ইসরায়েল দুটি লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। এক. ফিলিস্তিনিদের ঐক্য দুর্বল করা। দুই. নিজেদের সেনাবাহিনীর ওপর বোঝা কমানো। এই কৌশল সরাসরি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়ায়, কিন্তু গাজা সেই একইভাবে রক্তাক্ত হতে থাকবে।

গাজায় বর্তমানে যেসব সশস্ত্র গ্যাং ভীতি ছড়াচ্ছে, তারা জন্মভূমির প্রতিরোধযোদ্ধা নয়, বরং ইসরায়েলের রাজাকার গোষ্ঠী। তারা ভিন্ন নামে ইসরায়েলের দখলকে সহায়তা করছে। যুদ্ধের সময় তাদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল সেই সব জায়গায় কাজ করার জন্য, যেখানে ইসরায়েল সব সময় প্রকাশ্যে কাজ করতে পারত না।

ইসরায়েলের স্বার্থে যেসব ফিলিস্তিনি কাজ করে, তাদের নিয়ে ইসরায়েলিদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। ব্যবহার করার পর ছুড়ে ফেলা। উদ্দেশ্য সিদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজাকারদের আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলা।

যে লোকটা এখন নিজেদের মানুষের বুকে বন্দুক তাক করছেন, তিনি নিজেকে শক্তিশালী বলে মনে করতে পারেন, কিন্তু তার পরিণতি সব সময়ের জন্য এক। নিজের দেশের জনগণ ও দখলদার—সবাই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে।

ফিলিস্তিনিদের জন্য এর পরিণতি কোনোভাবেই বিপর্যয়ের চেয়ে কম কিছু নয়। ভয়ের পরিবেশে মুক্তি নির্মাণ করা যায় না। প্রতিরোধ যখন নৈতিক স্বচ্ছতা হারায়, যখন এটিকে নিপীড়কদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আলাদা করা যায় না, তখন এটি তার বৈধতা হারায়। ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম কখনো শুধু খেয়ে–পরে বেঁচে থাকার জন্য ছিল না; এটি সব সময় মর্যাদা, ন্যায় ও স্বাধীনতার জন্য ছিল।

ইসরায়েল হয়তো আশা করছে যে তারা প্রক্সিদের দিয়ে যুদ্ধ জারি রাখবে। তারা এমন এক গাজার কথা কল্পনা করছে, যেখানে ফিলিস্তিনিরা দখলদারদের বিরুদ্ধে না লড়ে নিজেদের মধ্যে লড়বে। ফিলিস্তিনিদের এখনো তাদের পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে। তারা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পথকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং ফিলিস্তিনি সংগ্রাম যেকোনো গোষ্ঠীর চেয়ে বড়, সেটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আমাল আবু সিফ, ফিলিস্তিনি লেখক ও গবেষক
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
[লেখাটি ১৮ অক্টোবর ২০২৫ প্রথম আলো ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়। আজ ২০ অক্টোবর ২০২৫ অনলাইনেও প্রকাশিত হলো।]

যুদ্ধবিরতির পর ফিলিস্তিনিরা ফিরছেন বিধ্বস্ত গাজায়
যুদ্ধবিরতির পর ফিলিস্তিনিরা ফিরছেন বিধ্বস্ত গাজায়। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পকে খামেনির ব্যঙ্গ: আপনার এত সক্ষমতা!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরেই লাখ লাখ মানুষ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন। আর ট্রাম্প অন্য দেশের বিষয়ে নাক গলাচ্ছেন। এর পরিবর্তে তাকে নিজের দেশ সামলানোর আহ্বান জানান তিনি। এক্সে দেয়া বার্তায় খামেনি লিখেছেন, ‘ (যুক্তরাষ্ট্রের) বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সাত মিলিয়ন মানুষ এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। যদি আপনি সত্যিই এত সক্ষম হন, তবে তাদের শান্ত করেন, তাদের ঘরে ফেরান, আর অন্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বন্ধ করেন।’ পোস্টে খামেনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চলা ‘নো কিং’ বিক্ষোভের ছবি শেয়ার করেন। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে লাখ লাখ মানুষ ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে।

আয়োজকরা বলেন, ‘নো কিং’ আন্দোলন আমেরিকাকে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেয়া নীতির প্রতিবাদ। তারা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন নাগরিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ওয়াশিংটন ডিসির রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ স্লোগান দেয়- এটাই গণতন্ত্রের চেহারা! বিক্ষোভকারীদের হাতে নানা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, গণতন্ত্র রক্ষা করো, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বিলুপ্ত করো। তারা ট্রাম্পের ‘কঠোর হাতের শাসন’, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ এবং অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। সবসময়কার মতো ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও ছিল আক্রমণাত্মক। তিনি নিজের ট্রুথ সোশ্যালে একাধিক এআই-তৈরি ভিডিও পোস্ট করেন। তাকে নিজেকে রাজা হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।

এক ভিডিওতে ট্রাম্পকে মুকুট পরে দেখা যায় যুদ্ধবিমান চালাচ্ছেন। যা থেকে তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘মল-সদৃশ বোমা’ ফেলছেন। এ ঘটনার এক দিন আগে ট্রাম্প দাবি করেন, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। খামেনি সেই দাবিও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। বলেন, তোমরা কে যে নির্ধারণ করবে কোন দেশ পারমাণবিক শিল্প রাখবে বা রাখবে না? আমেরিকার এমন কী অবস্থান, যে ইরান কী করতে পারে তা নির্দেশ দেবে? তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া নতুন আলোচনার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/185953_Abul-4.webp

নতুন আতঙ্কে তুরস্ক, আকাশে শক্তি বাড়াতে তোড়জোড়

নিজের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে মরিয়া তুরস্ক ইউরোপীয় অংশীদার ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উন্নত যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছে। এমনটি জানিয়েছে রয়টার্স।

ন্যাটো সদস্য তুরস্ক পশ্চিমাদের সঙ্গে বর্তমান উষ্ণ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তার বিমানবহরে ৪০টি ইউরোফাইটার টাইফুন যোগ করতে চায়। এ নিয়ে দেশটি জুলাই মাসে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেছে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও কিনতে চায় তুরস্ক। যদিও বর্তমানে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা এর পথে প্রধান বাধা হয়ে আছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উন্নত সামরিক শক্তি ইসরায়েল— যার কাছে শত শত মার্কিন সরবরাহকৃত এফ-১৫, এফ-১৬ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। গত এক বছরে দেশটি প্রতিবেশী ইরান, সিরিয়া, লেবানন ও কাতারে একাধিক হামলা চালিয়েছে।

তুর্কি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব হামলায় পর তুরস্ক নিজেদের নিরাপত্তা দুর্বলতা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে। এ কারণেই সম্ভাব্য যে কোনো হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত আকাশশক্তি বাড়াতে চায় আঙ্কারা।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানে ইসরায়েলের হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে একসময়ের উষ্ণ সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি, বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন ও তুর্কি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য হুমকি।

এদিকে, তুরস্কের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিস আগামী তিন বছরের মধ্যে উন্নত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের একটি চালান পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অতীতে দুই ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র এজিয়ান সাগরের আকাশে একাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে। তুরস্কের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গ্রিস।

দ্রুত সরবরাহের জন্য পুরোনো বিমান কিনতে রাজি তুরস্ক তুরস্ক টাইফুন যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ব্রিটেন ও অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি। একটি সূত্র জানিয়েছে, এ চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে দ্রুত ১২টি ব্যবহৃত যুদ্ধবিমান পেতে পারে তুরস্ক।

ইউরোফাইটার কনসোর্টিয়ামের সদস্য ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন এই ব্যবহৃত বিমান বিক্রির অনুমোদন দেবে। একই সঙ্গে তুরস্ককে কয়েক বছরে আরও ২৮টি নতুন টাইফুন সরবরাহ করবে বলে চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তিতে উল্লেখ আছে।

জানা গেছে, বুধ ও বৃহস্পতিবার এরদোয়ান কাতার ও ওমান সফরে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করবেন। যুদ্ধবিমানের সংখ্যা, দাম ও সরবরাহের সময়সূচি আলোচনার মূল বিষয়।

সূত্র জানিয়েছে, এরদোয়ান এরপর মাসের শেষ দিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জকে আঙ্কারায় আমন্ত্রণ জানাবেন। তখনই চুক্তিগুলো চূড়ান্ত হতে পারে।

একজন ব্রিটিশ সরকারি মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেছেন, জুলাই মাসে ব্রিটেন ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ৪০টি বিমান সরবরাহের পথ প্রশস্ত করেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শিগগিরই চূড়ান্ত চুক্তির বিস্তারিত বিষয়ে একমত হবো বলে আশা করছি।’

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল জানিয়েছেন, বার্লিন এটাকে সমর্থন জানিয়েছে। তিনি এক টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, এ বছরের মধ্যেই একটি চুক্তি হতে পারে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখনো চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। তবে ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। কনসোর্টিয়ামের অন্য সদস্যরা এই ক্রয় পরিকল্পনাকে সমর্থন করছে। যদিও কাতার এবং ওমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এফ-৩৫ ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা : উভয় পক্ষই সমাধান চায় সর্বাধুনিক মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কেনা তুরস্কের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, ২০২০ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ওপর মার্কিন ফেডারেল আইনের আওতায় (সিএএটিএসএ) নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তখন থেকেই তুরস্ককে এফ-৩৫ প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়।

গত মাসে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে এরদোয়ান এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আনতে পারেননি। তবে আঙ্কারা এখনো দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে হামাসকে রাজি করাতে এরদোয়ানের ভূমিকা কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি সমাধানে পৌঁছানোর আশায় আছে।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, আঙ্কারা এমন একটি পরিকল্পনা করছে যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘ওয়েভার’ (ছাড়) অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এর ফলে, প্রেসিডেন্টের ছাড়ের আওয়াত মার্কিন ফেডারেল আইনের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল হয়ে যাবে। এতে এফ-৩৫ কেনার পথ খুলে যেতে পারে।

তুরস্কের হাতে থাকা এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো এফ-৩৫ কেনার প্রধান বাধা। তবে আঙ্কারা ও ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে, তারা বিষয়টি সমাধানের রাজনৈতিক সদিচ্ছা রাখে।

সূত্রগুলো বলছে, এই সাময়িক ছাড় যদি দেওয়া হয়, তবে তা তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে পারে এবং মার্কিন কংগ্রেসে তুরস্কের পক্ষে সহানুভূতি বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে।

এরদোয়ানের দলের বৈদেশিক বিষয়ক সহসভাপতি হারুন আরমাগান রয়টার্সকে বলেন, ‘উভয় পক্ষই জানে ‘সিএএটিএসএ’ ইস্যু সমাধান করতে হবে। এটি প্রেসিডেন্টের ছাড় হোক বা কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত তা যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়।’

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন পক্ষের সঙ্গে এই ওয়েভার প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেনি। হোয়াইট হাউসও তাৎক্ষণিকভাবে জানায়নি আঙ্কারা এই প্রস্তাব তুলেছে কি না।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, ট্রাম্প তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব বুঝেন এবং তার প্রশাসন সব অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে সৃজনশীল সমাধান খুঁজছে।

তুরস্কের ৪০টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান কেনার আলাদা চুক্তি সম্পর্কে একটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, দামের বিষয়ে তুরস্কের উদ্বেগ ও সর্বাধুনিক এফ-৩৫ কেনার আগ্রহের কারণে আলোচনা জটিল হয়ে পড়েছে।

নিজস্ব স্টেলথ ফাইটার তৈরি করেছে তুরস্ক

পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে অতীতে ওঠানামা করা সম্পর্ক ও অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞায় বিরক্ত হয়ে তুরস্ক নিজের ‘কান’ নামের স্টেলথ ফাইটার তৈরি করেছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই বিমান সম্পূর্ণভাবে এফ-১৬-এর বিকল্প হতে এখনো বহু বছর লাগবে।

যুদ্ধবিমান উন্নয়ন পরিকল্পনা তুরস্কের বৃহত্তর বিমান প্রতিরক্ষা কর্মসূচির অংশ, যেখানে দেশটির নিজস্ব ‘স্টিল ডোম’ প্রকল্প ও দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সম্প্রসারণও অন্তর্ভুক্ত।

তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির সংসদ সদস্য ও সাবেক বিমানবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়ানকি বাগসিওগ্লু বলেন, ‘তুরস্ককে এখনই কান, ইউরোফাইটার ও এফ-১৬ প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই।’

নতুন আতঙ্কে তুরস্ক, আকাশ শক্তি বাড়াতে তোড়জোড়
তুরস্কের বায়কার কোম্পানির তৈরি মনুষ্যবিহীন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কিজিল এলমা। ছবি : সংগৃহীত