Thursday, April 1, 2010

কেমন আছেন দেবদুলাল by অমর সাহা

না এখন তিনি ভালো নেই। একাত্তরের সেই কণ্ঠও যেন স্তিমিত হয়ে আসছে। কথা বলতে কষ্ট হয়। অস্পষ্ট উচ্চারণ। জড়িয়ে যায়। তবু আকারে-ইঙ্গিতে চেষ্টা করেন কিছু বলতে। কিছু বোঝাতে। তিনি হলেন সেই একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন উত্তাল দিনগুলোর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণাদাতা কণ্ঠসৈনিক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন কে চিনতেন না এই দেবদুলালকে? হয়তো দেখেননি অনেকে, কিন্তু কণ্ঠ ছিল পরিচিত। গোটা বাংলাদেশেই তিনি কোটি মানুষের কাছে পরিচিতি ছিলেন একজন কণ্ঠসৈনিক হিসেবে। পরিচিত ছিল আবালবৃদ্ধ জনতার কাছে তাঁর মধুর কণ্ঠ।
আজ সেই কণ্ঠসৈনিক জীবনসায়াহ্নে এসে দাঁড়িয়েছেন। বয়স ৭৫ পার করেছেন। এখন শুয়ে আছেন কলকাতার সাদার্ন এভিনিউয়ের নিজ বাসভবনের একটি ছোট্ট খাটে।
দিনটা ছিল রোববার। বিকেল পাঁচটা। আমি ও আমাদের চিত্রগ্রাহক ভাস্কর মুখোপাধ্যায় গেলাম তাঁর বাসভবনে। চতুর্থ তলায় থাকেন তিনি। কলবেলের আওয়াজে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন তাঁর একমাত্র মেয়ে দেবারতী বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন দেবদুলালের কাছে। তিনি শুয়ে আছেন। পরনে চেক লুঙ্গি আর সবুজ জামা। বললাম, ঢাকার কাগজের লোক আমরা। শুনেই উঠে বসতে চাইলেন। মেয়ে দেবারতী সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে শুইয়ে দিলেন। দেবারতী বললেন, ‘বাবা দুরারোগ্য পিএসপি বা প্রোগ্রেসিভ সুপ্রা নিউক্লিয়ার পলসি রোগে আক্রান্ত। ধীরে ধীরে তাঁর মস্তিষ্কের কোষগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন তেমন একটা কথা বলতে পারেন না। তবে সব বোঝেন। একটু হাঁটাচলা করতে পারেন। খেতেও পারেন সামান্য। দেবারতী আরও বললেন, ‘২০০৮ সালে মা মারা যাওয়ার পর বাবা একটু বেশি ভেঙে পড়েছেন। এখন আমরা দেখভাল করছি বাবার। চিকিৎসা করছেন ডা. দেবব্রত দে ও ডা. সঞ্জীব কাসেরা।’ দেবারতী বললেন, ‘আমরা দুই ভাইবোন। দাদা দেবরাজ কলকাতা ২৪ ঘণ্টা সংবাদ চ্যানেলে কর্মরত। আর আমি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করি।’
‘মনে পড়ে একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা?’ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন দেবদুলাল। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সব মনে আছে। ভুলব কেমন করে। বাংলাদেশ তো আমার দ্বিতীয় স্বদেশ! তাকে কি ভোলা যায়?’
১৯৬৩ সাল থেকে আকাশবাণী রেডিও কেন্দ্রে চাকরি করেছেন দেবদুলাল। আর সেখান থেকেই অবসর নিয়েছেন ১৯৯৪ সালে।
দেবদুলাল বললেন, তাঁর পেশাগত জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়টা। বললেন, ‘সেদিন আমি প্রাণভরে আমার যৌবন উজাড় করে দিয়েছিলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য। এমন ঘটনা তো সবার ভাগ্যে ঘটে না! আমি তো সেই ঘটনার ভাগ্যবান ব্যক্তি। পেয়েছি কোটি বাঙালির ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে আমি মরতে চাই।’
দেবদুলাল বললেন, ‘আকাশবাণীর খবর পড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারিনি। মনে হতো, আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন আমার বুকের ভেতরের সব লুকানো আবেগ আর উত্তেজনা ঢেলে দিয়েছিলাম আকাশবাণীর সংবাদ, সংবাদ-পরিক্রমা বা সংবাদ-সমীক্ষা পড়তে গিয়ে। রণাঙ্গনের খবর যখন পড়তাম, তখন মনে করতাম, আমিও সেই রণাঙ্গনের সৈনিক, যখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কথা পড়তাম, তখন আমার মনের সমস্ত উল্লাস উচ্ছ্বাস নেমে আসত আমার কণ্ঠজুড়ে। যখন করুণ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা পড়তাম, তখন কান্নায় জড়িয়ে আসত গলা।’
বললেন, ‘মুত্তিযুদ্ধের শেষ দিকটায় যেন নেশায় পেয়ে বসেছিল আমাকে। উত্তেজনা আর প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, কখন পড়ব বাংলাদেশের খবর।’ বললেন, ‘এই খবর পড়ার জন্য কখনো কখনো রাতে বাড়িও ফিরিনি। রাত কাটিয়েছি আকাশবাণী ভবনে। ভোরের খবর পড়তে হবে যে!’
‘একাত্তর কেন, সেই ১৯৬৮-৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতেও পড়েছি বাংলাদেশের খবর। তখন কে জানত, এই অভ্যুত্থানের পথ বেয়ে বাংলাদেশ হবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাঙালিদের রাষ্ট্র! পৃথিবীর বুকে বাঙালিদের জন্য তৈরি হবে একটি স্বাধীন আবাসভূমি।’ বললেন, ‘অদেখা পূর্ববঙ্গের অচেনা বঙ্গভাষীর প্রতি নৈকট্য বোধে মন আপ্লুত হয়েছে আমার বারবার। আর কল্পনায় গড়ে তুলেছিলাম বাংলাদেশ নামের একটি মানসী মূর্তিকে।’
বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের কথা বলতে গিয়ে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলেন, ‘দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে ফিরে এসেছেন স্বাধীন স্বদেশভূমি বাংলাদেশে। ওই সময় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম আমরা। উঠেছিলাম হোটেল পূর্বাণীতে। আমি তখন বেতার সাংবাদিক হিসেবে প্রথম পা রাখি ঢাকায়। বঙ্গবন্ধু যখন বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন হঠাৎ বলে উঠলেন, কোথায় আমাদের সেই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়? আমি তখন উঠে এগিয়ে যাই। বঙ্গবন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন।’
প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল আকাশবাণী আর বিবিসি রেডিও। এই আকাশবাণীতেই সংবাদ, সংবাদ-সমীক্ষা ও সংবাদ-পরিক্রমা পড়তেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সংবাদ-সমীক্ষা আর পরিক্রমা লিখতেন প্রণবেশ সেন। তিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। সংবাদ-পরিক্রমা প্রযোজনা করতেন উপেন তরফদার। তখন পাকিস্তান সরকার আকাশবাণীর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ গোপনে, এমনকি জঙ্গলে গিয়েও শুনেছেন আকাশবাণী বা বিবিসির খবর। আর আকাশবাণীর সেই খবর হূদয় দিয়ে পড়েছেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হয়েছিল ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি একমত হতে পারবে কি -যুদ্ধাপরাধের বিচার by সোহরাব হাসান

স্বাধীনতার ৩৯ বছর পরে হলেও সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, কতিপয় মতলববাজ ও অপরাধী ছাড়া সবাই তাকে স্বাগত জানিয়েছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও মানবাধিকারের প্রশ্ন জড়িত। কোন সরকারের আমলে বিচার হচ্ছে, এর চেয়েও জরুরি হলো বিচারটি কেমন হবে, প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাবে কি না, দেশে-বিদেশে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
বঙ্গবন্ধু হত্যার যে বিচার হয়েছে, রাজনৈতিক কারণে অনেকের তা পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু বিচারের বিরোধিতা করতে পারেননি। কারণ বিচার-প্রক্রিয়ায় কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না। বিচার হয়েছে প্রচলিত আইনে, আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছেন। যে কারণে বিএনপির নেতা মওদুদ আহমদও বলতে বাধ্য হয়েছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধের বিচারকে শুরু থেকে একটি বিশেষ মহল প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ এনেছে। তাদের অভিযোগ যে অমূলক, সেটি প্রমাণ করতেই সরকারকে এগোতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে। আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদও দেশবাসীকে এই বলে আশ্বস্ত করেছেন, বিচার-প্রক্রিয়া শতভাগ আন্তর্জাতিক মানের হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করার জন্য বিরোধী দল বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, ‘আমার তো মনে হয়, বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়।’
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেছেন, ‘যদি সত্যিকার অপরাধীদের নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হয়, আর যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হয়রানি না করা হয়, তাহলে তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সবাই সমর্থন করবে। সরকার যদি সত্যিকার তদন্ত করে, তাহলে আমাদের আপত্তির কোনো কারণ নেই।’ দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিএনপির আপত্তি নেই, তবে এ বিচার-প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ।’ কিন্তু তাদের কথা ও কাজে মিল থাকবে কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। চট্টগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া জঙ্গিবাদের পক্ষে যেভাবে সাফাই গেয়েছেন, তাতে শঙ্কিত না হয়ে পারিনা।
রাজনৈতিক মত ও পথ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিরোধ থাকা স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে, বিএনপি মুসলিম চেতনার মোড়কে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলে। আওয়ামী লীগ মুখে হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, ধর্মনিরপেক্ষতা বিএনপির একদম অপছন্দ। এসবের পরও কিছু বিষয়ে তো দুটি দলের মধ্যে মতৈক্য থাকা প্রয়োজন, যদি তারা গণতান্ত্রিক হয়, যদি তারা দলের চেয়ে দেশকে বড় মনে করে। সেগুলো হলো—গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নাগরিকদের মানবাধিকার সমুন্নত রাখা ইত্যাদি।
যুদ্ধাপরাধের বিচার ন্যায় ও মানবাধিকারেরই অংশ। নির্বাচনী অঙ্গীকার থাকুক বা না থাকুক, কোনো গণতান্ত্রিক দলই এ প্রত্যয় থেকে সরে যেতে পারে না।
যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে দলীয় রাজনীতি কাম্য হতে পারে না। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী আট ধরনের অপরাধকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে: নিরস্ত্র ও বেসামরিক নাগরিককে হত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, বন্দীর ওপর নির্যাতন চালানো এবং বিপক্ষের হয়ে তাকে অস্ত্র ধারণে বাধ্য করা।
কথা হলো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না। অবশ্যই হয়েছে। কারা করেছে? দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসরেরা। আরও খোলাসা করে বললে রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটির সদস্যরা। কেউ সরাসরি এসব অপরাধ করেছে, কেউ প্ররোচিত করেছে। দুই পক্ষই অপরাধী।
যুদ্ধাপরাধ যত পুরোনো হোক না কেন, অপরাধী যে দেশেই থাকুক না কেন, তার বিচারে বাধা নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ৬৫ বছর হলো। এখনো নািস বাহিনীর সদস্যদের বিচার হচ্ছে। কয়েক দিন আগে ৯০ বছর বয়সী এক নািস সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার হচ্ছে কম্বোডিয়ার পলপট সমর্থকদের। বিচার হচ্ছে সার্বীয় বাহিনীর সদস্যদের। বিচার চলাকালে মারা গেছেন সার্বীয় নেতা মিলোসেভিচ। তাঁর সহযোগীরা এখনো বিচারের সম্মুখীন।
সে ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়া খুবই জরুরি। একই সঙ্গে এ প্রশ্নও আসবে, বিচারটি এত দিন কেন হলো না? যুদ্ধাপরাধের বিচারের দায় কোনো দল বা গোষ্ঠীর নয়, সমগ্র জাতির। সে দায়িত্ব পালনে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এ ব্যর্থতা অকপটে স্বীকার করতে হবে। রাজাকার, আলবদররাও বিচার ঠেকিয়ে রাখেনি। সে ক্ষমতাও তাদের নেই। ঠেকিয়ে রেখেছে পূর্বাপর সরকার ও বিভেদের রাজনীতি। অনেকে বলবেন, জিয়াউর রহমানই প্রথম স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করেছেন। কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। পুনর্বাসন-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই। সে সময় ধর্মবাদী কোনো দলের অস্তিত্ব না থাকলেও সে সব দলের নেতা-কর্মীরা ঠিকই ছিলেন। তারা সরকারবিরোধী বিভিন্ন দলে ঢুকে পড়েন। এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানধারী জাসদ মাওলানা মতিনের মতো স্বাধীনতাবিরোধীকে দলে নিয়েছিল এবং নির্বাচনেও প্রার্থী করেছিল।
যদ্ধাপরাধের বিচার অত্যন্ত জটিল বিষয়। বাংলাদেশের জন্য এটি নতুনও বটে। আওয়ামী লীগ সরকার বিচারটি শুরু করেছে, এ জন্য তারা ধন্যবাদ পেতে পারে। কিন্তু যদি তারা বিচার কাজটি শেষ করে যেতে না পারে, তাহলে কী হবে? আগামী নির্বাচনে যদি তারা ক্ষমতায় না আসতে পারে? বিএনপি এসে সব কিছু উল্টে দেবে? কি এত উদ্যোগ-আয়োজন, এত আবেগ-উচ্ছ্বাস, এত কান্না আর অশ্রু—সব বিফলে যাবে? এ কারণেই আমরা চাই, রাজনীতির মঞ্চে যত বিভেদই থাকুক না কেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সব গণতান্ত্রিক দল অন্তত একটি বিষয়ে একমত হোক, তা হর যুদ্ধাপরাধের বিচার । উত্তম হতো, সরকারের এ উদ্যোগকে যদি বিএনপি স্বেচ্ছায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিত। সে কাজটি তারা করেনি বলে সরকার কেন দরজা বন্ধ করে রাখবে? বিএনপি ক্রমশ ডান দিকে ঝুঁকে পড়লেও দলটিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, সরকার তাঁদের সহায়তা নেবে না কেন?
যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে সরকার হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের আদালত গঠন করেছে। নিয়োগ দিয়েছে সাত সদস্যের তদন্তকারী দল এবং ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেল। সর্বস্তরের মানুষ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন, এটি সরকারের প্রধান শক্তি। পাশাপাশি অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে জরুরি অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য। রাজনৈতিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিচারের কাজ খুব এগোবে না। ধারণা করা যাচ্ছে, সরকার দ্বিতীয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য বিমানবন্দর ও সীমান্তে স্থলবন্দরের বহির্গমন বিভাগে তালিকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সরকার তালিকা পাঠানোর আগেই ঢাকা বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ দিয়ে উষ্ণ বিদায় সংবর্ধনা নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি, একাত্তরে যাঁর বিরুদ্ধে বহু হত্যা-অপকর্মের অভিযোগ ছিল।
বিচার-প্রক্রিয়াকে রাখতে হবে সব রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে। আইন সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। এ কথাগুলো বললাম এ জন্য যে, স্বাধীনতার পরও দালাল আইনে বিচার নিয়ে নানা রকম বুজরুকি কাণ্ড ঘটেছে। বাঘা বাঘা দালালকে বাদ দিয়ে চিকন আলীদের ফাঁসি দেওয়ার জন্য নানা কসরত করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত চিকন আলীও ছাড়া পেয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে বিচার হয়েছে নামকাওয়াস্তে। নিম্ন আদালতের রায় উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে গেছে। পরবর্তীকালে কে কী করেছেন, রাজনীতিতে সম্পৃক্ত আছেন কি নেই, বিচারে সেসব বিবেচ্য হতে পারে না। সেটি রাজনীতির বিচার। আদালতে বিচার হবে একাত্তরে সংঘটিত অপরাধের ভিত্তিতে। যুদ্ধাপরাধ নিয়ে মন্ত্রীরাও ওলটপালট কথাবার্তা বলে চলেছেন। কেউ বলছেন, সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে না, প্রতীকী বিচার হবে। কেউ বলছেন, অমুক দলকে দেশ থেকে নির্মূল করতে হবে। কাউকে নির্মূল করতে চাইলে সেও নিশ্চয় বসে থাকবেনা। দন্ড হোক আদালতে, মন্ত্রী-নেতাদের বাক্যবানে নয়। বিচারের এখতিয়ার ঠিক করবে আদালত। তদন্ত করবে রাষ্ট্র-নিয়োজিত তদন্তকারী দল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি নতুন ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। ১৯৭২-৭৫ সালে দালাল আইনে যাদের বিচার হয়েছে, সেটি দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়নি। ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (আদালত) আইন প্রণয়ন করা হলেও এর ভিত্তিতে বিচার হয়নি। দালাল আইনে নিম্ন আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অনেকেই উচ্চ আদালতে গিয়ে খালাস পেয়েছিলেন। এবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে কোনো রকম ত্রুটি বা অসংগতি রাখা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির মামলাগুলো উচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে গেছে তাঁরা সব ধোয়া তুলসীপাতা ছিলেন বলে নয়, মামলার প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে। যেখানে একজন আসামির বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা, সেখানে তদন্তকারী কর্মকর্তা দিয়েছেন ৯৫ বা ১০০ দিনে। এ কারণে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় না যে অভিযুক্ত নিরপরাধ। যুদ্ধাপরাধ বিচারে তদন্তকারী দল ও আইনজীবীরা বিষয়গুলোর প্রতি সুতীক্ষ দৃষ্টি রাখবেন আশা করি।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা যে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন, তা ইতিবাচক বলেই মনে করি। কিন্তু তাঁদের মনে কী আছে আল্লাহ মালুম। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করার কথা বলেছেন। বিএনপির নেতারা বিচার-প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার দাবি জানিয়েছেন। দুই তরফের কথাতেই যুক্তি আছে। এ যুক্তিই হতে পারে ঐকমত্যের ভিত্তি। বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করলেও দলের সবাই তাদের রাজনৈতিক দর্শনে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেছেন বলা যাবে না। বিএনপিতে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা নেতা-কর্মীরাও রাজাকার হয়ে যাননি। এ কারণেই দলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে মীর শওকত আলী সেক্টর কমান্ডারস ফোরামে যুক্ত হয়েছেন। বিএনপিতে তার মত ভিন্ন মতের লোকও কম নেই। তাদের দূরে ঠেলে না দিয়ে কাছে টানার চেষ্টা চালাতে হবে। ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক-দালালবিরোধী যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার শুরুতে বিএনপিও সমর্থন জানিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার রাজনীতির মেরুকরণের নামে তারা সে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। আশা করি এবার যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করে একই ভুল তারা করবে না।
যুদ্ধাপরাধ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। নিজের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ। এই অপরাধের বিচার হওয়া দরকার জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকেরা ব্যর্থ হলে, পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদে বিচার প্রলম্বিত কিংবা বানচাল হলে, জাতি তাদের ক্ষমা করবে না। অন্তত এই একটি বিষয়ে আপনারা একমত হোন। আদালতের বিভক্ত রায় কখনও কখনও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করলেও বিভক্ত জাতি কখনও জয়ী হতে পারেনা।
সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নির্মাণ শেষ হবে কবে -কারমাইকেল কলেজ by শান্ত নূরুননবী

রংপুরের কারমাইকেল কলেজ বাংলাদেশে বিখ্যাত ও ঐতিহ্যমণ্ডিত। আব্দুর রহমান, শাহ সোলায়মান আলী, কালাচাঁদ রায়, চিত্তরঞ্জন রায়, সুনীল বরণ চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ অধিকারী, মুখতার এলাহীসহ এই কলেজের অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেন। অথচ এই বিশাল কলেজ ক্যাম্পাসে আজও মুক্তিযুদ্ধের কোনো দৃশ্যমান স্মারক নেই।
শব্দকণ্ঠ কারমাইকেল কলেজের সাংস্কৃতিক সংগঠন—তারুণ্যে ভরপুর এর সদস্যরা আশি ও নব্বইয়ের দশকে নিছক কবিতা লিখে ও আবৃত্তি চর্চা করে তুষ্ট হতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতির চেতনা বিকাশে নানামুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু কারমাইকেল কলেজে নয়, পুরো রংপুর শহরেই সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বাধীনতার ৩০ বছর পর দীর্ঘ সামরিক শাসন শেষে ১৯৯১ সালে শব্দকণ্ঠ কারমাইকেল কলেজে মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা করে।
ভাস্কর্যের একটি নকশা তৈরি করেন ভাস্কর অনিক রেজা। কলেজের নজরকাড়া স্থাপত্যশৈলীর শতবর্ষী মূল ভবনের সঙ্গে সংগতি রেখেই নকশা করা হয়েছিল। মঞ্চ হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী নকশা করা হয়েছে পাঁচ ফুট উঁচু বেদির। পেছন দিকে সরু ও সামনের দিকে ধাপে ধাপে বেদির ওপরের দিকে উঠে যাবে প্রশস্ত সিঁড়ি। বেদির শরীরজুড়ে জড়িয়ে থাকবে বীর শহীদদের মুখাবয়বের ম্যুরাল। বেদির সম্মুখ ভাগে প্রশস্ত মঞ্চ রেখে পেছনে স্থাপিত হবে ১০ ফুট উচ্চতার মুক্তিযোদ্ধার আদল। মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যয়ী ডান হাতের বজ্রমুষ্ঠিতে ধরা রাইফেল। বাঁ হাত বাবার স্নেহে জড়িয়ে রাখবে কাঁধে বসে থাকা শিশুর পা। মুক্তিযোদ্ধার কাঁধে বসে থাকা শিশু ডান হাতে উঁচু করে রাখবে লাল-সবুজ পতাকা। বাবার মাথায় বাঁ হাত। নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা বাবার পতাকার মান রাখার প্রতিশ্রুতি এভাবেই প্রকাশিত ভাস্কর্যে। ভাস্কর্যের নাম তাই প্রজন্ম। রড-সিমেন্ট-পাথরে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে ৪০০ বছরের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বরে ভাস্কর্য নির্মাণের অনুমতি নিতে শব্দকণ্ঠকে পার হতে হয়েছে নানা দপ্তরের লালফিতার জাল। তখনকার অধ্যক্ষ রেজাউল হক অবশ্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা করেছেন। তারপর শুরু হয় কুপন ছাপিয়ে ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা করে অর্থ সংগ্রহের কাজ। কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও রংপুরের আপামর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততায় অল্প সময়েই জোগাড় হয়ে যায় দুই লাখ টাকা। যা জমা হয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংকের রংপুর শাখার অ্যাকাউন্টে। এটি ছিল রেজাউল হক ও অধ্যাপক মোজাহার আলীর যৌথ নামে। টাকা সংগ্রহের কাজ চলমান রেখে ১৯৯২ সালে স্থাপিত হয় প্রজন্মের ভিত্তিপ্রস্তর। ভাষাসৈনিক আ ন ম গাজীউল হক রংপুরে এসে উন্মোচন করেন এই ভিত্তিপ্রস্তর। বেদির নির্মাণকাজে কেবল শব্দকণ্ঠই নয়, অংশ নিল কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা। মনে করতে এখনো ভালো লাগে, আমরা সবাই সারবেঁধে একজনের হাত থেকে আরেকজন ইট নিয়ে সরবরাহ করেছিলাম নির্মাণকর্মীদের হাত পর্যন্ত।
স্বাধীনতাবিরোধী চেতনার ধারক ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা কারমাইকেল কলেজে ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে শুরু থেকেই। বেদি নির্মাণের প্রাথমিক কাজ যখন সমাপ্তির পথে, ১৯৯২ সালের ২৯ মার্চ জামায়াতে ইসলামীর পোষ্য সংগঠন ছাত্রশিবিরের গুন্ডাবাহিনী কলেজে প্রবেশের মুখে ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে শব্দকণ্ঠের কর্মীদের ওপর। লোহার রড দিয়ে পায়ের হাড় থেঁতলে দেওয়া হলো অবিনাশ রেজার (বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক); বোমার আঘাতে ছিন্ন হয়ে গেল মোজেদুর রহমান সুষমের বাঁ পায়ের লিগামেন্ট; দুই পায়ের হাড় ভেঙে দেওয়া হলো এবং মাথা ফাটিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো জুয়েল মমতাজকে (ছয় মাস চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত)। তার আগেই শব্দকণ্ঠের কাজে সহযোগিতা করার অপরাধে শিবিরের গুন্ডাদের প্রহারে গুরুতর আহত হলেন ছাত্রলীগের তত্কালীন নেতা রফিক সরকার (বর্তমানে ডেইলি স্টার-এর রংপুর প্রতিনিধি)। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ভাস্কর্যের বেদি। পরের দিন ৩০ মার্চ ১৯৯২ বিকেলে ভাস্কর্য নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য ভাস্কর্যের অর্ধনির্মিত বেদির পাশেই পিটিয়ে আধমরা করা হলো ছাত্রলীগের (জাসদ) নেতা প্রদীপকে। পুরো শহর স্তব্ধ হয়ে গেল এই ন্যক্কারজনক ঘটনায়, কিন্তু কিছুই করল না বা করতে পারল না পুলিশ কিংবা প্রশাসন; কারণ তত দিনে ‘ধর্মের নামে বজ্জাতি’ করে বেড়ানো এই দলটি অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
কিছু দিনের মধ্যে ভাস্কর্য বাস্তবায়ন কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করে অপশক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নিল রংপুরের মানুষ। কমিটিতে যুক্ত হলেন রংপুরের ১৭টি রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। কমিটির তত্ত্বাবধানে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ সময়কালে ভাস্কর্যের বেদিমূল সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। তারপর ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই অস্ত্রবাজি করে পুরো কারমাইকেল কলেজ দখল করল ছাত্রশিবির। সেখানে ছাত্রদল, ছাত্রলীগসহ সব দলেরই কার্যক্রম থেমে গেল শিবিরের দাপটের তোড়ে এবং আবারও ভেঙে ফেলা হলো প্রজন্মের বেদি।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কেবল ছাত্রশিবিরের প্রতাপের কারণে কারমাইকেল কলেজে, প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর এই শিক্ষাঙ্গনে, একটি মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নির্মাণ করা যাচ্ছে না। মাসুদ করিম নামের একজন সংস্কৃতিকর্মী দুঃখ করে বলেন, ‘যে দেশে মৌলবাদীদের ভয়ে বিমান বন্দরের সামনে লালনের ভাস্কর্য নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়, ঢাকার বলাকা ভাঙচুরকারীদের সাজা হয় না, সেখানে রংপুরে প্রজন্ম ভাস্কর্য নির্মাণ করা সত্যিই কঠিন কাজ।’
মাসুদকে প্রশ্ন করি, কতটা কঠিন? তীর-ধনুক নিয়ে ১৯৭১ সালে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করার চেয়ে কি কঠিন?
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতাসীন। রংপুরবাসী আশা করে, বাংলাদেশের সপ্তম বিভাগীয় শহর রংপুরের স্বনামধন্য কারমাইকেল কলেজে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য প্রজন্ম নির্মাণে সরকার ও প্রশাসন এখনি উদ্যোগী হবে।
শান্ত নূরুননবী: লেখক ও উন্নয়নকর্মী।

পানির জন্য হাহাকার -জরুরিভাবে অযোগ্যদের সরিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিন

এত দিন দুর্গন্ধময় যে ঘোলা তরলটি ওয়াসা সরবরাহ করত, তার নাম পানি। বাধ্য হয়ে এই তরলটি দিয়েই ঢাকার নাগরিকেরা খাওয়া, গোসলসহ যাবতীয় প্রয়োজন মেটাত। কিন্তু এখন সেই পানিই হয়ে উঠেছে দুর্লভ। লাগাতার বিদ্যুৎ সংকটে ওয়াসার পাম্পগুলো বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকছে। দরিদ্র কি অভিজাত—সব এলাকায়ই দেখা দিচ্ছে পানির অভাবজনিত অসন্তোষ।
প্রতিবছর গরমকালে পানির সমস্যার সঙ্গে নগরবাসী পরিচিত হলেও এবার যেন তা সকল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে পাম্প চলছে না, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না, অর্থ ও উদ্যোগের অভাবে গ্যাস তোলা যাচ্ছে না, গ্যাস তোলার টাকা সরকার জোগাতে পারছে না; সমস্যার এই শেকলের ফাঁসে দুঃসহ হয়ে যাচ্ছে জনজীবন। প্রথম আলোর গত সোমবারের সংবাদ অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ বিদ্যুতের কারণে পাম্প বন্ধ ছিল সাকল্যে ৪৯৩ ঘণ্টা। ২০০৯ সালের ২৩ মার্চ তা দাঁড়ায় এক হাজার ৪৬৩ ঘণ্টা এবং এ বছরের ২৩ মার্চ বহু গুণ বেড়ে হয় দুই হাজার ২০৪ ঘণ্টা। ঘাটতির এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি, জনদুর্ভোগেরও ক্রমবৃদ্ধির পরিমাপক। এ হিসাবই বলে যে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়াতেই সমস্যা পরিণত হয়েছে সংকটে। ওয়াসা এখন বলছে, শিগগিরই এ সমস্যা সমাধানের উপায় নেই। প্রশ্ন হলো, সমস্যা পেকে ওঠার এই দীর্ঘ সময়ে সরকার কেন সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেয়নি? পানির জন্য হাহাকার করা নগরবাসীকে তারা তাহলে কী জবাব দেবে?
পানিসম্পদসমৃদ্ধ বাংলাদেশে বিপন্ন খাতগুলোর মধ্যে পানি অন্যতম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা, উত্তরাঞ্চলে শুষ্কতা এবং মধ্য ভাগের বিরাট অঞ্চলের পানি আর্সেনিকে বিষাক্ত। এখন খোদ রাজধানীতেই হচ্ছে কারবালার দশা। ভেঙে পড়ছে পানি শোধন ও সরবরাহব্যবস্থা। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি এতসব বিপর্যয়কে বহু গুণে বাড়িয়ে তুলেছে। পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ১৩টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান জড়িত। পানি-দুর্নীতির সঙ্গে এদের সবারই কমবেশি সম্পর্ক থাকা সম্ভব। ঢাকাকে এবং বাংলাদেশকে বাসযোগ্য রাখতে গেলে এর অবসান হতেই হবে। দুঃখের বিষয়, অতীতের মতো বর্তমান সরকারও পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যার সমাধানে পরমুখাপেক্ষিতা ও ধীরগতির দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছে।
সরকারের উচিত, সমস্যার গোড়ায় হাত দেওয়া। দুর্নীতি ও বিপর্যয়ের জন্য দায়ীদের শাস্তি দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সর্বস্তরের নাগরিক, বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে, তাদের পরামর্শে জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হোক। দেওয়া হোক প্রয়োজনীয় লোকবল ও অর্থ বরাদ্দ। পানির দেশ বাংলাদেশকে পানিহীনতা থেকে বাঁচাতে এখনই এটা না-করা হবে আত্মঘাতের শামিল।

ভোলায় উপনির্বাচন -রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে

বিগত নির্বাচনের পর ১৩ মাসে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের তুলনামূলক অবস্থানের কতটা পরিবর্তন হয়েছে, তা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা হিসেবে ভোলা-৩ আসনে উপনির্বাচনকে দেখা চলে। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. জসিমউদ্দিন প্রায় ১৩ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিলেন; কিন্তু এখন কী অবস্থা, তার সঠিক হিসাব জানা যাবে, যদি নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। আপাতত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ। বিশেষত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন, ২৯ মার্চ, কোনো প্রার্থীর পক্ষেই ঢাকঢোলসহ মিছিল নিয়ে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া দেখা যায়নি। নির্বাচনী আচরণবিধি সবাই মেনে চলছেন। এটা বড় সুসংবাদ।
বিরোধী দল বিএনপির স্থানীয় নেতারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ধরপাকড় করা হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর। তাই তথ্য-প্রমাণসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তাদের পক্ষ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া উচিত। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে লালমোহন-তজুমদ্দিন উপজেলা দুটির প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করছে। রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা। তাঁরা জেলা প্রশাসক নন, তাই সরকারের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সেভাবে নেই। মঙ্গলবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপির স্থানীয় নেতারা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না। কমিশন ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও দুজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বদলি করেছেন। সুতরাং বড় ধরনের উপদ্রব সৃষ্টি না হলে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে বলে ধারণা করা যায়।
বিএনপি নির্বাচনে সেনা নিয়োগের দাবি করেছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন মনে করছে, এর প্রয়োজন নেই। পুলিশ ও র‌্যাবই যথেষ্ট বলে তারা অভিমত দিয়েছে। কারণ এটি মাত্র একটি নির্বাচনী এলাকার উপনির্বাচন। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথেষ্টসংখ্যক সদস্য পাওয়া যাবে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করে হয়তো ভুল করেনি। বিএনপি এসব ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাশীল থাকতে পারে।
সব প্রার্থী নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলছেন কি না, সেটা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। প্রচারের সময় উসকানিমূলক স্লোগান, মারমুখী মিছিল প্রভৃতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জানা গেছে, এসব বিষয় নজরদারির জন্য কমিশন শিগগিরই প্রতিটি ইউনিয়নে দুজন করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করবেন। তারা প্রার্থীদের আয়-ব্যয়, প্রচারের ধরন প্রভৃতি বিষয়ে খোঁজখবর রাখবে এবং বিধি ভঙ্গ হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করবে।
এখন নির্বাচন কমিশনের কাজে কোনো মহল থেকে যেন কোনো রকম হস্তক্ষেপ না হয়, সেদিকে সরকারের নজর রাখা বাঞ্ছনীয়। নিজেদের প্রার্থীকে জয়ী করানোর জন্য সরকারের প্রশাসন বা অন্য কর্মকর্তাদের ব্যবহারের চেষ্টা করলে নিজেদের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটা সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে বিবেচিত হবে, কোন প্রার্থী জয়লাভ করলেন সেটা বড় কথা নয়।
এর আগে অনুষ্ঠিত নয়টি উপনির্বাচনই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোনো পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তবে সেগুলো হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। সুতরাং ভোলার উপনির্বাচনের প্রতি সবার দৃষ্টি। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেটা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত।

মেক্সিকোতে গুলিতে ১০ শিশু-কিশোর নিহত

মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে মাদক পাচারকারী চক্রের সদস্যদের গুলিতে ১০ জন শিশু ও কিশোর-কিশোরী নিহত হয়েছে। দুরাঙ্গো রাজ্যে শিশু-কিশোরদের বহনকারী একটি পিকআপে গত রোববার আততায়ীরা প্রথমে একটানা গুলি চালায়। এর পর তারা পিকআপটিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।
মেক্সিকোর মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলে এ ঘটনা ঘটেছে। মেক্সিকোতে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক পাচারকারী চক্রগুলো ইদানীং খুব বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত কয়েক সপ্তাহে তারা বেশ কয়েকটি নাশকতামূলক হামলা চালিয়েছে। এমনই এক হামলায় সম্প্রতি দুজন মার্কিন নাগরিক নিহত হন। এসব সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় মেক্সিকোর নাগরিক, পর্যটক, বিদেশি বিনিয়োগকারী, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। বিষয়টির সুরাহা করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে মেক্সিকোতে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গোমেজ মন্ট গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, যদি হামলাকারীরা মনে করে, এভাবে তারা মেক্সিকোতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারবে, তবে তারা ভুল করবে।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জি-৮ মন্ত্রীদের

শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংস্থা জি-৮-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের জন্য যথাযথ ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সংস্থার চূড়ান্ত খসড়া ঘোষণাপত্রে ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কানাডায় জি-৮ মন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠক শেষে গতকাল মঙ্গলবার এ যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়।
ওই ঘোষণাপত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের ব্যাপারে জি-৮ দেশগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে প্রচারণা চালাবে। আন্তর্জাতিক আপত্তি সত্ত্বেও ইরানের অব্যাহত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জি-৮ দেশগুলো উদ্বিগ্ন বলে ঘোষণাপত্রে জানানো হয়।

পাতালরেলে হামলায় নিহতদের স্মরণে মস্কোতে শোক পালন

রাশিয়ার মস্কোতে পাতালরেলে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে গতকাল মঙ্গলবার এক দিনের আনুষ্ঠানিক শোক পালন করেছে নগরবাসী। গত সোমবার শহরের দুটি পাতালরেল-স্টেশনে আত্মঘাতী হামলায় কমপক্ষে ৩৯ জন মারা গেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ হামলায় জড়িতদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি সন্ত্রাসবাদ দমনে নতুন আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান। এখন পর্যন্ত কেউ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি। তবে কর্মকর্তারা উত্তর ককেশাস অঞ্চলের মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোর হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের দেখতে যান। তিনি বলেন, অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভও আহতদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলার আগে দুই নারী আত্মঘাতী হামলাকারীর সঙ্গে আরও তিন ব্যক্তিকে দেখা গিয়েছিল। পুলিশ এখন তাদের খুঁজছে। হামলার পর পর পাতালরেলে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সোমবার সন্ধ্যা থেকে তা আবার চালু করা হয়।
গতকাল এক দিনের শোক ঘোষণা করে মস্কোর নগর কর্তৃপক্ষ। শোক পালনের সময় দেশটির প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ রাখে।

ভারতে ফের জাতীয় উপদেষ্টা পর্ষদ গঠন শীর্ষ পদে সোনিয়া

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আবারও জাতীয় উপদেষ্টা পর্ষদ গঠন করছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পর্ষদের চেয়ারপারসন হবেন কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। চার বছর আগেও এ পদে ছিলেন সোনিয়া। কিন্তু লাভজনক এ পদটি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হওয়ায় তিনি ইস্তফা দেন। একই সঙ্গে তিনি ইস্তফা দিয়েছিলেন সংসদের সদস্যপদ থেকেও। এরপর রায়বেরিলি কেন্দ্র থেকেই উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও লোকসভায় আসেন সোনিয়া। ওই ঘটনার পর মাত্র দুই বছর টিকে ছিল ওই পর্ষদ।
আবার নতুন করে এ উপদেষ্টা পর্ষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। এ পর্ষদের কাজ হবে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের ওপর নজরদারি করা এবং সরকারকে পরামর্শ দেওয়া। চেয়ারপারসনের পদটি পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন। চেয়ারপারসনই পর্ষদের অন্য সদস্যদের মনোনীত করবেন। আর তাঁদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে পর্ষদে যেসব সাংসদ থাকবেন, তাঁরা কোনো বেতন-ভাতা পাবেন না। আপাতত এক বছরের জন্য পর্ষদটি গঠন করা হচ্ছে। পরে এর মেয়াদ বাড়ানোর ব্যাপারে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

থাই প্রধানমন্ত্রীর আরও আলোচনার প্রস্তাব নাকচ বিক্ষোভকারীদের

থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী লাল শার্ট বিক্ষোভকারীরা সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আরও আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, আলোচনার সব পর্ব চুকে গেছে। তাঁরা এখন আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকারের পতন ঘটাতে চান। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত দুই দফা বৈঠক শেষে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ ভেজ্জাজিভা বিক্ষোভকারীদের আবার আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন। কিন্তু গতকাল বিরোধীরা সে প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন।
বিক্ষোভকারীদের নেতা জতুপ্রন প্রমপ্যান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, সমঝোতার চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এখন আর কোনো আলোচনা নয়। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৫ দিনের মধ্যে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু সোমবার দ্বিতীয় দফা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সে দাবি নাকচ করে জানিয়ে দেন, ১৫ দিনের মধ্যে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি জানান, তাঁর সরকারের মেয়াদ আরও দুই বছর থাকলেও তিনি এ বছরের শেষে নির্বাচন দিতে রাজি আছেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা তাঁর সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
জতুপর্ন জানান, তাঁরা সমস্যার সমাধান চান ১৫ দিনের মধ্যে, আর সরকার সময় চায় নয় মাস। তাই তাঁরা ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ এ সরকারের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা করতে চান না।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী ভেজ্জাজিভা দুই দিনের সফরে বাহরাইন গেছেন। যাওয়ার আগমুহূর্তে সাংবাদিকদের বলেন, বিক্ষোভকারীদের নেতারা নিজেদের মধ্যে কোনো রকম পরামর্শ ছাড়াই আলোচনার প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছেন। বিষয়টি দুঃখজনক। তবে এখনো তাঁরা সমঝোতার পথ খুঁজতে নতুন করে বৈঠকে বসার পক্ষে।
২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ২০০৮ সালে আবার নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে থাকসিনপন্থীরা জয়লাভ করে ক্ষমতায় এলে সুপ্রিম কোর্টের বিতর্কিত এক আদেশে তাঁদেরও ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ভেজ্জাজিভা সরকার ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতাসীন সরকারকে সেনাসমর্থিত বুর্জোয়া শ্রেণীবান্ধব সরকার বলে মনে করা হয়। বর্তমানে যাঁরা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করছেন, তাঁদের বেশির ভাগই গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র কৃষক। তাঁরা বতর্মান সরকারের চেয়ে থাকসিনকেই তাঁদের বেশি দরিদ্রবান্ধব হিসেবে মনে করছেন বলে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে বলা হচ্ছে।
নির্বাসিত থাকসিন সিনাওয়াত্রা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং তাঁদের নানা ধরনের নির্দেশনা দিচ্ছেন। বিদেশের মাটিতে বসে থাই সরকারের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালানোর জন্য কয়েক দিন আগে তাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের নির্দেশে দুবাই ছাড়তে হয়েছে। বর্তমানে তিনি সুইডেনে রয়েছেন।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর হায়দরাবাদ শহরে কারফিউ

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী হায়দরাবাদের বেশ কিছু অংশে গতকাল মঙ্গলবার কারফিউ জারি করা হয়েছে। সেখানে আগের দিন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতীয় পুলিশ।
হায়দরাবাদের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট এ কে খান বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে গত সোমবার সাজসজ্জা করা নিয়ে বাদানুবাদ থেকে দাঙ্গা শুরু হয়। এতে কমপক্ষে একজন নিহত হয়েছে। নিহত যুবক হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাকে ছুকিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই পক্ষের বহু মানুষ আহত হয়। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির যাতে আর অবনতি না ঘটে, সে জন্য শহরের বেশ কয়েকটি এলাকায় আমরা কারফিউ জারি করেছি।’
গতকাল শহরের বেশির ভাগ দোকানপাট ও অফিস বন্ধ ছিল, রাস্তাগুলো ছিল ফাঁকা। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবিতা ইন্দ্র রেড্ডি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কারফিউ বলবত্ থাকবে।’
স্থানীয়রা জানান, মুসলিম অধ্যুষিত শহরের পুরোনো অংশে চারমিনার মসজিদের কাছে দাঙ্গা শুরু হয়। উত্তেজিত জনতা পরস্পরের দিকে পাথর ছুড়তে থাকে। পুলিশ জানিয়েছে, দাঙ্গায় পাঁচটি মসজিদ ও একটি মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তেজিত জনতা দোকানপাট, গাড়ি ও বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পাকিস্তানের সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন আদালত

সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জারি করা নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য পাকিস্তান সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল মঙ্গলবার এই সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত ন্যাশনাল রিকন্সিলিয়েশন অর্ডিন্যান্স (এনআরও) বাতিলসংক্রান্ত রায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে এক ঐতিহাসিক রায়ে ২০০৭ সালে জারি করা ওই অধ্যাদেশটি বাতিল ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্ট। অধ্যাদেশটির আওতায় প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও অন্যান্য রাজনীতিককে বিভিন্ন দুর্নীতির মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট অধ্যাদেশটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন এবং দুর্নীতির কয়েক শ পুরোনো মামলা আবার চালু করার নির্দেশ দেন।
ওই রায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা কোটি কোটি ডলার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেন আদালত। পাশাপাশি সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মালিক কাইয়ুমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের বহুতল ভবন স্টিফেন কোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে আছেন সাবেক মুখ্যসচিব সৌরেন রায়। রাজ্যের মুখ্যসচিব অশোক মোহন চক্রবর্তী গতকাল সোমবার রাজ্য সচিবালয় মহাকরণে এ কথা জানান।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৮টি লাশ এখনো কলকাতার পিজি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। লাশগুলোর চেহারা এত বিকৃত হয়ে গেছে যে সেগুলো শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন কবীর সুমন

প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কবীর সুমন তৃণমূল কংগ্রেস দলীয় সাংসদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসও ছেড়ে দিয়েছেন। সোমবার রাতে কবীর সুমন এসএমএস করে তাঁর এই ইস্তফার কথা জানিয়ে দেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সংসদের তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তবে কী কারণে তিনি দল ছেড়েছেন সে ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি এসএমএসে।
ইস্তফা দেওয়ার পর কবীর সুমন সাংবাদিকদের জানান, ‘এখন আমার ভালো লাগছে। আমি মুক্ত। তৃণমূল পরিকল্পনা করে আমাকে অপমান করেছে। অনেক কিছু মেনে নিচ্ছিলাম। ২০১১ সাল পর্যন্ত অনেকেই আমাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন, কিন্তু পারলাম না। এখন আমি মুক্ত। লালগড় জিন্দাবাদ। ছত্রধর জিন্দাবাদ। এখন আমি অনেক ভালো থাকব।’
গত লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে যাদবপুর থেকে জয়ী হয়েছিলেন প্রখ্যাত এ সংগীতশিল্পী কবীর সুমন। নির্বাচনের পর কবীর সুমন এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজেও নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু সংঘাত বাধে দলীয় নেতাদের সঙ্গে। তিনি গত বছরের ১৫ নভেম্বর কলকাতা প্রেসক্লাবে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসেন দল এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। এতে খেপে যান দলীয় নেতারা। এই ঘটনার জেরে দলের মধ্যে ব্রাত্য হয়ে পড়েন সুমন। অনেকটাই একঘরে হয়ে যান তিনি। তার ওপর এবারের বইমেলায় কথিত ‘মাওবাদী নেতা’ ছত্রধর মাহাতোর পক্ষে গানের একটি সিডি বের করে দলের বিরাগভাজন হন তিনি।

সু চির দলের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গুনের অনেক বাসিন্দা গতকাল মঙ্গলবার এএনএলডিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে অনেকে বলছে, এনএলডি নির্বাচন বর্জন করে তাদের সংকটের মুখে ফেলেছে। কেননা, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার মতো আর কোনো পছন্দের প্রার্থী নেই তাদের।
এনএলডির নেতারা গত সোমবার আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে ঘোষণা দেন। দলটির নেত্রী শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী অং সান সু চি সম্প্রতি জান্তা সরকারের তৈরি করা নির্বাচনী আইনকে অগণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করার পর এই সিদ্ধান্ত নেয় এনএলডি।
৮ মার্চ জান্তা সরকার ১৯৯০ সালের নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে নতুন নির্বাচনী আইন পাস করে। এতে বলা হয়েছে, যেকোনো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি কোনো রাজনৈতিক দলের সাজাপ্রাপ্ত সদস্য থাকলে ওই দলের নিবন্ধনও বাতিল বলে গণ্য হবে।
এনএলডির নেতারা বলেছেন, নতুন আইন অনুযায়ী তাঁদের দলকে নিবন্ধিত করতে হলে সু চিসহ কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বহু নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে এটা মেনে দল নিবন্ধন করলে নতুন আইনকে স্বীকার করে নেওয়া হবে, যা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সোমবার এনএলডির নির্বাহী কমিটির ১১৩ সদস্য সর্বসম্মত হয়ে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। এর আগে ১৯৯০ সালের নির্বাচনে সু চির দল ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করলেও তাদের ক্ষমতায় আসতে দেয়নি সামরিক জান্তা।
মিয়ানমারের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬ বছর বয়সী শিক্ষক মিয়িন্ত মিয়িন্ত থেইন বলেন, ‘এনএলডি নির্বাচন বর্জনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বিধ্বংসী। যখন নির্বাচন হবে তখন আমি কাকে ভোট দেব?’
গয়নার দোকানের মালিক মিয়ে মিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচনে অংশ না নিয়ে অন্ধের মতো অনিশ্চিত পথে চলছে এনএলডি। আমরা সবাই ঠিক করেছিলাম এনএলডির প্রার্থীদের ভোট দেব। এখন আর আমাদের কোনো পছন্দের প্রার্থী নেই।’
তবে ৫৫ বছর বয়সী নার্স খিন জ এনএলডির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘সু চি আমাদের নেত্রী। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কি না জনগণের অনুভূতিকে প্রতিফলিত করতে পারেন। আমরা তাঁর সঙ্গে আছি এবং তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি।’
অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ থাকিন চান তুন বলেন, ‘সু চির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কারণে বেশির ভাগ মানুষ সিদ্ধান্তটিকে সমর্থন করবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনের বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।’
নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাকে সাহসিক সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মীরা। ইউএস ক্যাম্পেইন ফর বার্মা সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক অং ডিন বলেন, তাঁরা সবাই অং সান সু চি ও সব রাজনৈতিক বন্দীর পাশে থাকার সিদ্ধান্ত অব্যাহত রেখেছেন। মিয়ানমারের জনগণ সামরিক জান্তার ভুয়া নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে।

গেরিলা রুমী ও তাঁর সহযোদ্ধারা by প্রশান্ত কর্মকার

রেডিও আজ একচোটেই বলে দিয়েছে, আটটা-পাঁচটা কারফিউ থাকবে না। সবাই গেলাম গুলশানে। রুমী-জামীকে বাড়ি নিয়ে আসতে। আজ রুমীর জন্মদিন, অন্তত দুপুরে কিছু রান্না করে খাইয়ে দিই। গিয়ে দেখি কিটি ওখানে বেড়াতে গেছে। গুলশানে বেশির ভাগ বাড়িতে বিদেশিদের বাস; সেখানে চলাফেরার একটু সুবিধে, আর্মির উৎপাত একটু কম।’
জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলির অংশবিশেষ। গতকাল
২৯ মার্চ ছিল রুমীর জন্মদিন। যে গেরিলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন রুমীরা, আজ তারই কিছু ঘটনা বলব। মায়ের সঙ্গে অনেক যুক্তিতর্কে অবতীর্ণ হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি আদায় করতে সক্ষম হন, চলে যান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘরে। তখন মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো মেলাঘরে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছ থেকে গেরিলা ট্রেনিং নেন রুমীরা।
১৯৭১ সালের জুলাই মাস থেকে ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের দিন পর্যন্ত ঢাকায় অনেক সফল অপারেশন চালান গেরিলারা। উল্লেখ্য, ঢাকা ছিল অধিকৃত বাংলাদেশের দখলদার পাকিস্তানি শাসক ও তাদের সহযোগীদের রাজনৈতিক কার্যক্রমের প্রধান কর্মকেন্দ্র। ঢাকার নাগরিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবে চলছে—এ কথা বিশ্ববাসীকে বোঝানোর জন্য হানাদারদের তৎপরতা ছিল প্রবল। ঢাকার বুকে মুক্তিবাহিনীর ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর গেরিলারা একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন ও নানা ধরনের রেইড চালিয়েছেন। গেরিলাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর অস্তিত্ব ঘোষণা করা।
প্রথম দফায় এসে তাঁরা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের (বর্তমানে শেরাটন) সামনের গাড়ি, ওয়াপদা গেট, পুরানা পল্টন ও বিভিন্ন সিনেমা হলে হাতবোমা নিক্ষেপ করেন। এরপর তাঁরা ঢাকা ছেড়ে চলে যান। কিছু দিন পর উন্নত ধরনের অনেক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁরা আবার ঢাকায় প্রবেশ করেন। এ পর্যায়ে তাঁরা ঢাকার পাঁচটি পাওয়ার স্টেশনের মধ্যে প্রথমে দুটির ওপর সফল অপারেশন চালান।
উলন পাওয়ার স্টেশন (রামপুরা এলাকা)
উলন পাওয়ার স্টেশনে (একটি ট্রান্সফরমার ১৩২/৩৩ কেভি, ৩০/৪০/৫০ এমভিএ) অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন গাজী দস্তগীর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মতিন-১, মতিন-২, জিন্না, নিলু ও হাফিজ (পরে শহীদ হন)। রাত আটটা থেকে পৌনে নয়টার মধ্যে স্টেশনটি গেরিলারা সফলভাবে উড়িয়ে দেন। এ সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোটা রামপুরা এলাকা।
খিলগাঁও পাওয়ার সাব-স্টেশন (গুলবাগ এলাকা)
খিলগাঁও পাওয়ার সাব-স্টেশনটি (গুলবাগ পাওয়ার সাব-স্টেশন নামে পরিচিত, ৩৩/৩১ কেভি, দুটি ট্রান্সফরমার ৫ এমভিএ করে) উড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল পুলু, সাঈদ, জুয়েল (পরে শহীদ হন), হানিফ, মুখতার, মোমিন, মালেক ও বাশারের ওপর। গেরিলারা এটি সফলভাবে উড়িয়ে দেন রাত আটটা ৪৭ মিনিটে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দে গোটা গুলবাগ, শান্তিবাগ, মালিবাগ, খিলগাঁও, শান্তিনগর ও মগবাজার এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
বিচ্ছুদের কবলে: গ্যানিজ ও ভোগ
ঢাকার অভিজাত বিপণিকেন্দ্র গ্যানিজ ও ভোগে বিচ্ছুরা গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলি ছোড়ে ১৮ জুলাই বিকেলে। গ্যানিজের অপারেশনে মারা গিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি চার পুলিশ। ।
আচানক সেমসাইড
ভুল বুঝে নিজেদের দুই পক্ষের মধ্যে সারা রাত গুলি বিনিময় হলো। ভোরে দেখা গেল ‘সেমসাইড’। এ পক্ষেও খানসেনা ও পক্ষেও খানসেনা। দুই পক্ষে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৩০। ঘটনাটি ঘটেছিল ঢাকার সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায় জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে। এই সেমসাইড ঘটনার নায়ক ছিলেন ঢাকায় কর্মরত ক্র্যাক-প্লাটুনের চার গেরিলা—পুলু, হানিফ, মোজাম্মেল ও বারেক।
ফার্মগেট অপারেশন
গাড়ি থেকে নেকড়ের মতো নিঃশব্দ অথচ ক্ষিপ্র গতিতে নামলেন পাঁচজন গেরিলা। এক মিনিটের মধ্যে পজিশন নিলেন। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলল পুরো এক মিনিট ব্রাশফায়ার। কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়তে লাগল ফার্মগেট চেকপোস্টের রাজাকার ও মিলিটারি পাকিস্তানি পুলিশেরা। এই অপারেশনে ছয়জন গেরিলা অংশ নেন। এঁদের একজন হলেন সামাদ। তিনি ছিলেন গাড়িচালক। বাকি পাঁচজন হলেন জুয়েল, বদি (এ দুজন পরে শহীদ হন), আলম, পুলু ও স্বপন। অপারেশনটি হয় আগস্টের প্রথম সপ্তাহে রাত আটটা থেকে আটটা পাঁচ মিনিটে।
ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়ক
এই তাত্ক্ষণিক অপারেশনটি সফলতার সঙ্গে চালানো হয় একাত্তরের ২৫ আগস্ট ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কে। হামলাটি চালিয়েছিলেন রুমী, বদি, স্বপন, আলম, কাজী, হ্যারিস, মুক্তার, জিয়া ও আনু। দুটি গাড়ি নিয়ে এ হামলা চালান ক্র্যাক-প্লাটুনের সদস্যরা। এতে সাত-আটজন মিলিটারি পুলিশ নিহত হয়। এই হামলায় সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। ফেরার পথে আবার তাঁরা হামলা করেন বাকি মিলিটারিদের ওপর। এর একটু পরে চেকপোস্টের সামনে তাঁরা হত্যা করেন এলএমজি নিয়ে অবস্থানরত পাকিস্তানি দুই সেনাকে। পাকিস্তানি সেনারা তখন জিপ নিয়ে তাড়া করে তাঁদের। এ সময় গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে ফেলেন রুমী। তারপর সেই ভাঙা অংশ দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন বদি, স্বপন ও রুমীরা। কজন নিহত হলো, তা জানা গেল না। কিন্তু উল্টে গেল জিপ। ওই তিনটি আক্রমণ মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পাকিস্তানি সেনাদের লন্ডভন্ড করে দেয়। এ হামলার বর্ণনা দিয়েছিলেন রুমী। সেই বর্ণনাই লিখেছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর একাত্তরের দিনগুলি বইতে।
এ ধরনের অতর্কিত হামলায় পাকিস্তানি সেনারা রাজধানী ঢাকায় যেমন হতাহত হয়েছিল, তেমনই পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল তাদের মনোবল। এভাবেই রুমীদের মতো তরুণেরা একাত্তরের নয় মাস অসীম সাহস নিয়ে, জীবন বাজি রেখে নগণ্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁরা যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতি না করলে অথবা হানাদারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি না করলে নিয়মিত বাহিনী খুব সহজে রাজধানী দখলে নিতে পারত না। রুমীকে ২৯ আগস্টেই ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানিরা, ওকে হত্যা করেছিল। সে মর্মান্তিক ঘটনার কথা বহুবার লেখা হয়েছে। তাই এখানে আর নয়। ’৭১-এর ঢাকার গেরিলাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবি শামসুর রাহমানের ‘গেরিলা’ কবিতার অংশবিশেষ দিয়ে শেষ করতে চাই—
‘দেখতে কেমন তুমি? অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে
কুলুজি তোমার আতিপাতি। তোমার সন্ধানে ঘোরে
ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য, পাড়ায় পাড়ায়। তন্ন তন্ন
করে খোঁজে প্রতি ঘর।...
তুমি আর ভবিষ্যত্ যাচ্ছে হাত ধরে পরস্পর।
সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ-তাড়ানিয়া
তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন সন্তান আমার।’

আদালতের কৌটায় জামায়াতের প্রাণ by মিজানুর রহমান খান

সুপ্রিম কোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে সংসদ ও সরকার। এত দিনে স্পষ্ট যে তারা সংবিধানের গণতন্ত্রায়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা হয়তো তারা মুখেও আনত না। পঞ্চম সংশোধনীর রায় নিয়েও তাদের মুখে খই ফুটত না। এখন ফুটেছে, কারণ, ক্ষমতার রাজনীতির প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উপাদান আছে এতে। তাই তারা আদালতের ওপর ভর করেছে। উদ্দেশ্য জামায়াত শিকার। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার এত বড় সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় না।
আইন ও বিচারমন্ত্রী শফিক আহমেদের বক্তব্য বেশ ধারালো। এটা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, জামায়াত ইতিমধ্যে কোমায় চলে গেছে। এখন তারা কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। কোমায় যাওয়া রোগীরাও অবশ্য আশার সলতে জ্বালিয়ে রাখেন। কিন্তু জামায়াতের সামনে যেন সেটুকুও নেই। পঞ্চম সংশোধনী আপিল বিভাগেও বাতিল হয়েছে। সেই ভরসায় আইনমন্ত্রী বলছেন, তারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। শুধু আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষা।
আইনমন্ত্রীকে প্রশ্ন রাখি, কী করে এমন নিশ্চিন্তে এ কথা বলছেন। আপিল বিভাগ তো পরিমার্জন বা মডিফিকেশনের কথা বলেছেন। এখন যদি তাঁরা হাইকোর্টের রায়ের এ অংশটি উল্টে দেন? আইনমন্ত্রী যুক্তি দেন, সেটা কেমন করে হবে? পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের মূলনীতি তো এর ওপর দাঁড়িয়ে। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় প্রধানত দুটি ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। প্রথমত, সামরিক শাসন জারি অবৈধ। তাই সামরিক শাসকদের সৃষ্ট পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বদলাতে পারে না। উভয় যুক্তি আমরা মানি। কিন্তু হাইকোর্ট যোগ-বিয়োগের নীতি নিয়েছেন। কিছু বিষয় মার্জনা করেছেন। যেমন, জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমানের ফসল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এই কাউন্সিল ব্যবস্থাটি তো সামরিক শাসনবান্ধব। তা ছাড়া এটি বিচারপতিদের প্রকারান্তরে সরকারি কর্মচারী বানিয়ে রেখেছে। সচিবদের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন (স্যাংশন) লাগত ও লাগবে। বিচারকদের ক্ষেত্রেও লাগে।
হাইকোর্টের রায়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে ক্ষমতার পৃথক্করণ (সেপারেশন অব পাওয়ার) ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়নে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
ধর্মনিরপেক্ষতার মতো অনেক শক্তিশালী ও দরকারি মৌলিক কাঠামো হলো ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে না লিখেও ধর্মনিরপেক্ষ বা মুক্ত সমাজ গঠন করা চলে। ভারত তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখানে একটি পরিহাসও আছে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে বিচারপতি সায়েম ধর্মভিত্তিক দল চালু করতে ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ তুলে দেন। তখনো সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা টিকে ছিল। সেই বছরেই ভারত ৪২তম সংশোধনী আনে। এর মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির সংযোজন ঘটে। সুতরাং, ২৯ বছর তারা ধর্মনিরপেক্ষ ‘না থেকেও’ ধর্মনিরপেক্ষ থেকেছে। বিজেপির জন্ম আরও চার বছর পর ১৯৮০ সালে। তারা প্রমাণ করেছে, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকলেও ধর্মভিত্তিক দল সরকার গঠন করতে পারে।
সাধারণ আইন দিয়ে রাজনৈতিক দলের সংবিধান ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কিন্তু ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তা অবশ্যই সংবিধানে থাকতে হবে। প্রজাতন্ত্রের বিচারিক ক্ষমতা মার্কিন সংবিধানের মতো করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকার কথা লিখে দিতে হবে। অথচ সরকারি দল ও তাদের ভক্তরা সভা-সেমিনারে পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের কীর্তন গাইছেন। বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরার কথা বলে গলা ফাটাচ্ছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে তাঁদের মুখে যথারীতি কুলুপ আঁটা।
বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধানের ১০টি মৌলিক কাঠামো চিহ্নিত করেছেন। এতে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার ঠাঁই দিয়েছেন সবশেষে। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে শাসকগোষ্ঠী হয়তো একটুও মাথা ঘামাত না, যদি হাইকোর্টের রায়ে একটি বিশেষ জাদুমন্ত্র না থাকত। এই জাদুমন্ত্রই হলো আকর্ষণ। এটা হলো ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ। এই শর্তাংশ হলো রাক্ষসের প্রাণসংহারী সেই কৌটা।
জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর প্রাণভোমরা লুকানো এই কৌটায়। হাইকোর্ট কৌটার সন্ধান দিয়েছেন। এখন আপিল বিভাগ সেই কৌটা খুলবেন কি না, সেটাই প্রশ্ন। তাঁরা তা খুলে প্রাণভোমরা মারতে পারেন। মারলে জামায়াত বর্তমান রূপে লুপ্ত হবে। অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনও অচল হবে। তারা তখন অন্য রূপে আসবে। জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জটিল পটভূমিতে সেই রূপটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য ভালো হবে কি না, সে প্রশ্ন খুব জোরালো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মী নিহত হলে মন্ত্রীদের শূন্যগর্ভ চিত্কার ও আস্ফাালন আমরা শুনেছি। এ রকম ঘটনার সময় তাদের শিবির নিষিদ্ধের কথা মনে পড়ে। কিন্তু খুন তো খুন। যে যেভাবে সন্ত্রাস করুক, তার বিচার হতে হবে। কিন্তু তা প্রায় কখনো হয় না। এখন আদালতকে দিয়ে কৌটা খুলিয়ে জামায়াতের সঙ্গে শিবির বধ করার স্বপ্ন দেখছে ক্ষমতাসীন দল। অথচ তারা ঠিকই ছাত্রদের ব্যবহার করে যাবে। ছাত্রলীগকে তারা সামলাবে না। অঙ্গসংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করবে না।
জামায়াতের সঙ্গে রাজপথের ঐক্য গড়ে তোলা, কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করা এবং জিয়া বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক নামকরণেও ধর্মের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ব্যবহারে আমরা ক্ষমতাসীনদের ম্যাকিয়াভেলীয় চরিত্র দেখতে পাই। মূল সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ বলেছে, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোনো সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সংঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোনো প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকিবে না।’ সম্ভবত সে কারণেই আইনমন্ত্রী আমার প্রশ্নের জবাবে মত দেন যে এ বিধানটি জেগে উঠলেই হলো। ধর্মভিত্তিক সংগঠন নিষিদ্ধ করতে সরকারকে নতুন কোনো আইন করতে হবে না। তবে প্রশ্ন হলো, বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্র, যারা রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অর্জন করেছে, তাদের সংবিধানে এমন বিধান কি রয়েছে? বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ রকম খাপ খোলা তলোয়ার দিয়ে কি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির রাক্ষসপুরীকে স্তব্ধ করা সম্ভব? একটা গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা দিতে যদি শাসক দল সম্ভাবনাময় হয়ে উঠত, বা তাকে বিশ্বাস করা যেত, তখন না হয় একটা সান্ত্বনা মিলত।
সরকারি দলের সংকীর্ণ মনমানসিকতার আরেকটি পরিচয় হলো, তারা সংবিধান সংশোধনে ভালো প্রস্তুতি নিতে অনিচ্ছুক। একটা প্রতারণাপূর্ণ প্রচারণাও দেখেছি। সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরিতে আইন কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইন কমিশনের সদস্যরা হয়তো কিছু দিন আশায় ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, বিরাট বড় একটা দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু কোথায় কী। এ সবই শঠতা। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা ছাড়া তাঁদের মাথায় অন্য চিন্তা নেই। থাকলেও তার প্রমাণ পাই না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন, ক্ষমতা পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, না রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা—এর মধ্যে কোনটি আগে চান? আমি বলব, সবটাই একসঙ্গে। যদি বলা হয়, কোথায় অগ্রাধিকার? তাহলে বলব, ক্ষমতা পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতায়। জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বিরাট শূন্যতা চলছে। মাসদার হোসেন মামলার কারণে আমরা বিচার বিভাগ পৃথক্করণ শিখেছি। এখনো ক্ষমতার পৃথক্করণ শিখিনি। বিচারপতি খায়রুল হক বর্ণিত ১০টি মৌলিক কাঠামো কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেওয়ার বিষয়। আদালত যখন রাজনৈতিক প্রশ্নের সুরাহা দেন, তখন তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেন। তবে রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসায় আদালতকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট পারতপক্ষে রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে চলেন। ১৮৫৭ সালে বিখ্যাত ড্রেড স্কট মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট দাসপ্রথাকে বৈধতা দিয়েছিলেন। কোর্ট বলেছিলেন, দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করতে কংগ্রেসের আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। সেই টাইটানিক ভুলের অনুশোচনা তারা আজও করছেন।
আমরা পঞ্চম সংশোধনীর রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। কারণ, এতে যথার্থই জিয়া, সায়েম, মোশতাককে জবরদখলকারী বলা হয়েছে। সামরিক শাসনকে অবৈধ বলা হয়েছে। আমরা আশায় ছিলাম, সংবিধানে গণমুখী পরিবর্তন আনা হবে। বাহাত্তরে তো ফিরবই। ঘাটতিও দূর হবে। সোনিয়া গান্ধী সংসদে নারীর জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করছেন। রাজ্যসভায় বিল পাস হলো। বাংলাদেশে টুঁ শব্দ নেই। অথচ নারীর জন্য ১০০ আসন বাড়াতে স্পষ্ট নির্বাচনী ওয়াদা রয়েছে। এখন সন্দেহ হচ্ছে, আদালতের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া তারা আদৌ আর কিছু করবে কি না।
সংবিধানে তারা হাত দিতে পারে। কিন্তু দেখার বিষয়, তাতে জনগণের ক্ষমতায়ন ঘটছে কি না। প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস কিংবা নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ কোনোভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে কি না। এটা আদালত করে দেবে না। সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ সংসদ যেকোনো সময় ফিরিয়ে আনতে পারে। এ জন্য গণভোটও লাগবে না। সাধারণ একটা আইন দিয়ে যা সম্ভব, তা আদালতকে দিয়ে কেন। আমার তো মনে হয়, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও ৮ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মৌলিক কাঠামো হিসেবে মান্য করা চলে। কিন্তু সেই কারণে ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ মৌলিক কাঠামো বলে গণ্য হতে পারে কি না, তা তলিয়ে দেখার দাবি রাখে।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখার চেয়ে সংবিধানে ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতিফলন ঘটানো অনেক বেশি উপকারী ও আরাধ্য। এটা পেলে রাষ্ট্র গঠনের কাজ অনেকটা এগিয়ে যাবে। রাজনীতিতে কেবল ধর্মের অপব্যবহার কেন, কালো টাকা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধেও তা খুব কাজে আসবে।
এর আগের একটি লেখায় আমি জিয়াকে তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক লিখেছিলাম। ই-মেইলে একজন পাঠক তার কারণ জানতে চান। প্রথমত, বাকশাল বিলোপ সায়েম করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, বহুদলীয় গণতন্ত্র বলতে পাশ্চাত্যের বহুত্ব (প্লুরালিজম) বোঝানো হয়। সেই বহুত্ব একটি সমন্বিত ধারণা। এতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন সংসদ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকতে হবে। এসব না থাকলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পানসে। চতুর্থ সংশোধনীতে আসে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা। জিয়া একে সুরক্ষা দেন। তিনি তাতেই ক্ষান্ত থাকেননি। সংসদের অনুমতি ছাড়া যত খুশি অর্থ খরচে সংবিধানে নতুন বিধান আনেন। বিচারপতি খায়রুল হকের কথায় এভাবে তিনি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের জেমস ও চার্লসদের লজ্জায় ফেলেন। কারণ, সংসদকে পদানত করার এমন ক্ষমতা মধ্যযুগের ওই নৃপতিরাও ভোগ করেননি।
কিন্তু কথা হলো এখন কী চলছে? বহুদলীয় বা সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান। আসলে এটা ছদ্মবেশী রাজতন্ত্র বা ‘কতিপয়তন্ত্রে’র কাজে লাগছে। বর্তমানে বাকশাল নেই ঠিকই। কিন্তু বাকশালের মতো একটি ব্যবস্থায় আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। মাতৃস্নেহে অন্ধ জননী তাঁর কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখতে পারেন। বাংলাদেশের শাসকেরা হলেন সেই স্বৈর-স্নেহান্ধ জননী। পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পর তাঁরা বলেছেন, এই নাও বহুদলীয় গণতন্ত্র। এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মোলাকাত হয়েছিল। তখন তারা বলেছে, এই নাও সংসদীয় গণতন্ত্র। দুটোই মস্তবড় ধাপ্পা ও শঠতাপূর্ণ।
জামায়াতের প্রসঙ্গ টেনে শেষ করি। আদালত যদি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর দোহাই দেন, সরকারি দলের আপাতত কৌশলগত পছন্দনীয় বিষয় জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করেন, কিংবা তা না করলেও তাঁরা যেন সংবিধানের অধিক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক কাঠামোবিনাশী বিষয়গুলোর দিকে সদয় হন। তাঁরা যেন শাসকগোষ্ঠীর ভীষণ পছন্দনীয় ব্যবস্থা, যেমন—অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণ ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিলোপ করে মূল সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলো ফিরিয়ে দেন। ডেনমার্কের রাজপুত্র ছাড়া হ্যামলেট মঞ্চায়ন সম্ভব নয়। চতুর্থ সংশোধনীতে মৌলিক কাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ পাশ কাটিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরাও সম্ভব নয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

কৃষক ও কৃষির দিনবদল by আলী ইদ্রিস

১৫ কোটি মানুষের দেশে প্রায় তিন কোটি কৃষক পরিবার স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর প্রথমবারের মতো কৃষি উৎপাদনের ভর্তুকি নগদে পেতে যাচ্ছে। অর্থাৎ এখন থেকে সেচ, সার, বিদ্যুৎ ও ডিজেলের জন্য সরকারের দেওয়া ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। সেখান থেকে কৃষক নিজের ইচ্ছামতো টাকা তুলে কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। ব্যাপারটা যেন স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। সেচের মালিক এখন আর ইচ্ছামতো পানির দাম হাঁকতে পারবেন না বরং কৃষক দরকষাকষি করে পানি কিনতে পারবেন। সারের ডিলাররা এত দিন ইচ্ছামতো নিজের ভাই-ভাতিজা, বন্ধুবান্ধবের কাছে লুকিয়ে বা কালোবাজারে সার বিক্রি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতেন। এখন ভর্তুকির অর্থ কৃষক নিজের হাতে পাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দরে সারের ডিলারদের কাছ থেকে সার কিনতে পারবেন। সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো, কৃষক স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে তাঁর একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হবে মাত্র ১০ টাকা খরচ করে এবং সে টাকা রেখে তিনি ইচ্ছামতো বাকি টাকা তুলতে পারবেন। এই পাওয়ার আনন্দ কৃষককে আরও অধিক দক্ষতার সঙ্গে এবং কম খরচে ফসল ফলাতে উদ্দীপনা জোগাবে। ফলে ফসলে মুনাফার পরিমাণ বাড়বে এবং সেই বর্ধিত মুনাফা তাঁর সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে। ফলে জাতীয়ভাবে কৃষি খাতে তথা অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে এবং দারিদ্র্য কমবে।
দেড় কোটি পরিচয়পত্র ও ভর্তুকি বিতরণ: তিন কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় করে দেড় কোটি কৃষকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। এই পরিচয়পত্রে কৃষকের পরিচয় এবং বর্গাসহ নিজের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ, সেচযন্ত্রের অবস্থান, কোন মৌসুমে কৃষক কী কী ফসল ফলান, সার, সেচ, বীজ, কীটনাশ ইত্যাদি ব্যবহারের পরিমাণ ও অন্যান্য তথ্য সন্নিবেশিত থাকবে। এই পরিচয়পত্রের তথ্য নিয়ে তৈরি ডেটাবেইজ থেকে কৃষকদের ভর্তুকির পরিমাণ, ঋণের পরিমাণ ইত্যাদি নির্ধারণ করা হবে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মাঝারি শ্রেণীতে বিভক্ত প্রায় দেড় কোটি কৃষক পরিবারকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভর্তুকির টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হবে। এর আগে কৃষক মাত্র ১০ টাকা জমা দিয়ে একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন এবং পরিচয়পত্র দেখিয়ে সেখান থেকে ভর্তুকির টাকা তুলতে পারবেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের কবল থেকে কৃষক মুক্তি পাবেন। তা ছাড়া এই পরিচয়পত্র কৃষকের আত্মমর্যাদা বাড়াবে।
কৃষকের জন্য সুদবিহীন ঋণ: জোট সরকারের কর্মকর্তাদের বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রাষ্ট্রায়ত্ত কতিপয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সাধুবাদ জানাচ্ছি কৃষকের জন্য সুদবিহীন ঋণ চালু করার জন্য। কৃষকদের জন্য ব্যাপারটা স্বপ্নের মতো। ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিয়ে, উেকাচ দিয়ে যে কৃষক ঋণের ব্যবস্থা করতে পারেননি, অনন্যোপায় হয়ে ফসল বন্ধক দিয়ে অথবা শতভাগ সুদে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিতেন, সেই কৃষককে ডেকে অথবা তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে সরকারের প্রতিনিধিরা যদি কৃষকের হাতে সুদবিহীন ঋণ তুলে দেন, তাহলে সেটা স্বপ্নের মতোই মনে হওয়া উচিত। গত বছরের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর শেরপুর জেলার লঙ্গরপাড়া বাজারে ৬০৩ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে কৃষি ব্যাংকের পক্ষে দুই কোটি টাকা সুদবিহীন ঋণ বিতরণ করেন। এর পর থেকে কৃষি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জেলায় সুদমুক্ত কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ২০০৯-১০ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই টাকা সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক এবং বেসরকারি দেশি-বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। সুদবিহীন ঋণ পেলে কৃষক কম খরচে অধিক জমিতে ফসল ফলাতে পারবেন। তাতে কৃষকের মুনাফা তথা সঞ্চয় বাড়লে ১০ কোটি মানুষের দারিদ্র্য হ্রাস পাবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াবে।
কৃষিযন্ত্র কেনায় ২৫ শতাংশ ভর্তুকি: কৃষির উৎপাদন খরচ কমাতে, আধুনিকায়ন করতে এবং উৎপাদন বাড়াতে সরকার ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ইত্যাদি যন্ত্র কেনার জন্য নিম্ন ও মধ্য আয়ের কৃষকদের ২৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২৫টি জেলার ২৭৩টি উপজেলায় ১৪৯ কোটি টাকার ভর্তুকি মঞ্জুর করার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এটাও মহাজোট সরকারের প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত। এতে অনুমানিক ৩৫ লাখ টন অতিরিক্ত ফসল পাওয়া যাবে, যা পল্লী অঞ্চলের কৃষকের দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করবে।
হাইব্রিড বীজ, প্রাকৃতিক সার, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি: ভর্তুকি, সুদবিহীন ঋণ ইত্যাদি দেওয়ার পরও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণের জন্য হাইব্রিড বীজ, প্রাকৃতিক সার এবং সারা বছর ফসল ফলানো বা বহুমুখীকরণের পদ্ধতি কৃষকদের জানা উচিত। এখনো খাদ্যশস্যে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। এখনো ভারত, নেপাল ও অন্যান্য দেশ থেকে পিঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল, ফল-ফলারি প্রচুর পরিমাণে আমদানি করতে হয়। এর কারণ, এ দেশে উন্নত এবং বছরব্যাপী চাষ করার মতো বীজ পাওয়া যায় না। হাইব্রিড বীজও আমদানি করতে হয়। সেই সুযোগে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী কৃষককে ঠকায়। পিঁয়াজ, রসুন, আদা, টমেটো, তরিতরকারি, ফল যদি ভারতে সারা বছর চাষ হতে পারে; তাহলে এ দেশে হবে না কেন? কৃষিতে গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ে গবেষণার ফলকে বাস্তবায়ন করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগকে আরও অর্থ ও জনবল দিয়ে উদ্বুদ্ব করা উচিত। তাহলেই এ দেশের কৃষি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ঘটবে। কৃষি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ঘটলে অর্থনীতিতেও প্রবৃদ্ধি ঘটবে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পাবে।
আলী ইদিরস: এফসিএ
aliidris@yahoo.com

লোডশেডিং আমাদের কী কী উপকারে লাগে by আনিসুল হক

প্রতিটি অন্ধকার জিনিসের নাকি একটা আলোকিত দিক আছে। মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। রাত্রি যত গভীর হয়, প্রভাত নাকি তত নিকটবর্তী হতে থাকে।
আসুন আমরা লোডশেডিং নামের অন্ধকার জিনিসটার আলোকিত দিকগুলো খুঁজতে থাকি। আলোর ইংরেজি হলো লাইট। ইংরেজি লাইটের আরেকটা মানে আছে—হালকা। লোডশেডিংয়ের মধ্যে লাইট যদি না-ও থাকে, লাইটার দিক নিশ্চয়ই রয়েছে।
পৃথিবীজুড়েই এখন কিছুক্ষণের জন্যে বাতি বন্ধ করে রাখাটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এই তো কিছুদিন আগে ঘটা করে পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত স্থাপনার বাতি নিভিয়ে রাখা হলো খানিকক্ষণের জন্যে। নিউইয়র্কের এমপায়ার স্টেট বিল্ডিং, সিডনির অপেরা হাউস কিংবা প্যারিসের আইফেল টাওয়ার—এ ধরনের স্থাপনার বাতি বন্ধ করে রাখা হলো ঘোষণা দিয়ে। কারণ বাতি জ্বালালে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়। কথাটা বেশি সোজা করে বলা হয়ে গেল। ঘুরিয়েই বলি—বাতি জ্বালাতে বিদ্যুৎ লাগে, বিদ্যুৎ বানাতে হলে কার্বন পোড়াতে হয়। এর ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ে, এর ফলে পৃথিবীর জলবায়ু বদলে যায়, এর ফলে বরফ গলে যায়, এর ফলে ঘন ঘন সাইক্লোন ইত্যাদি হয়, অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে, আর তাতে বাংলাদেশ ডুবে যায়। কাজেই আমাদের কর্তব্য হলো, যতটুকু পারা যায় বাতি বন্ধ করে রাখা, যত কম পারা যায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করা। আমরা সেটাই করছি। আমরা নতুন কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করব না বলে ঠিক করেছি। যা আছে, তা-ও একদিন না একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর মধ্যে ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন দেশ, যে দেশে এক ওয়াটও বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় না। জাতিসংঘের মহাসচিব সেদিন আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে নিশ্চয়ই একটা সোনার মেডেল দেবেন।
এই উদ্দেশ্য থেকেই আমাদের নাগরিকদের বিদ্যুিবহীন সবুজ জীবন যাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আগে লোডশেডিং ছিল এক ঘণ্টার জন্যে। এইভাবে দিনের মধ্যে কয়েকবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করত। এবার ঠিক করা হয়েছে—ঝামেলা করার দরকার নাই, দিনের মধ্যে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে, বাকি ২৩ ঘণ্টাই থাকবে না। তাতে লোকে বলতে পারবে না, এতবার কারেন্ট যায়— আজ সারা দিনে ১১ বার গিয়েছে।
বিদ্যুৎ না থাকার আরেকটা সুবিধা হলো পানি না থাকা। বিদ্যুৎ না থাকলে ঢাকা ওয়াসা তাদের অনেকগুলো গভীর নলকূপ চালাতে পারে না। ফলে ঢাকার গভীর তলদেশ থেকে পানি উত্তোলিত হয় না। এটারও একটা ভালো দিক আছে। আমরা পানি ছাড়া চলতে অভ্যস্ত হচ্ছি। যেমন মরুভূমির উট। উটকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ। পানি ছাড়াই সে বহু দিন চলতে পারে। বাঙালির অভিযোজনক্ষমতা বিস্ময়কর। পানি ছাড়া চলতে আমাদের অবশ্যই শিখতে হবে। প্রতিবছর ঢাকার গভীর পানির স্তর ১০ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই শহরের পানি সরবরাহের ৮৭ শতাংশই আসে গভীর নলকূপ থেকে। ৫ বা ১০ বছর পরে এই শহরের নিচে কোনো পানি থাকবে না। তখন আমরা এক ফোঁটা পানিও পাব না। তখন আমরা বাঁচব কেমন করে? কিন্তু বাঙালি তো অমর প্রাণী। তারা মরবে না। আমরা সবাই উট হয়ে যাব। পানি ছাড়া বেশ চলতে-ফিরতে পারব। বছরে যখন বৃষ্টি হবে, তখন আমরা ছাদওয়ালাদের পয়সা দিয়ে ছাদে যাব, হা করে পানি পান করব, সেই পানি আমাদের শরীর ধরে রাখবে, বছরের বাকি দিনগুলো পানি পান না করেই দিব্যি চালিয়ে নিতে পারব। আর আমাদের গোসল, টয়লেট ইত্যাদির কী হবে? গোসল? উট কি কখনো গোসল করে? আর টয়লেট? এটা সারতে হবে বাতাস দিয়ে! উড়োজাহাজের শৌচাগারে কিন্তু পানি লাগে না। ফ্লাশ হয় বাতাস দিয়ে। আমাদের ঢাকা শহরের ঘরে ঘরে থাকবে আধুনিক সব হাওয়াচালিত কমোড। বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে। এটা না পারার আমাদের কোনোই কারণ নেই।
লোডশেডিং আমাদের জীবনের নানা কাজে লাগে। যেমন লোডশেডিংয়ের সময়ে টেলিভিশন চলে না। এটা যে আমাদের জন্যে কত বড় একটা উপকার, তা বলে শেষ করা যাবে না। লোডশেডিং আমাদের টকশো শোনার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। আমাদের ঘরগুলোকে হিন্দি সিরিয়ালের আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখে। হিন্দি সিরিয়াল থেকে আমাদের নারী ও শিশুরা যত দূরে থাকবে, ততই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্যে মঙ্গলজনক।
লোডশেডিং আমাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশে বিশাল অবদান রাখে। যেমন—মোমবাতি, লণ্ঠন, হাতপাখা ইত্যাদির বিক্রি খুবই বেড়ে গেছে। হারিকেন কারখানার মালিকেরা সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন—এত ভালো ব্যবসা এর আগে তাঁদের আর হয়নি। হে আল্লাহ, সরকারের ভালো করো। তাদের সব ইচ্ছা পূরণ করো। তারা যেন চিরকাল এমনি করে ক্ষমতায় থাকে, আর আমাদের জন্যে লোডশেডিংকে চিরস্থায়ী করে দেয়।
লোডশেডিং আমাদের ধৈর্য ধরতে শেখায়। আমরা সেই কবে থেকে শুনে আসছি, একদিনে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অন্তত তিন-চার বছর লাগবে। তারপর কত চন্দ্রভুক লোডশেডিং গেল, সেই তিন-চার বছর আর ফুরোয় না। কিন্তু আমাদের ধৈর্যের বাঁধ তো ভাঙেনি।
জ্ঞানই আলো। আসুন, আমরা জ্ঞানের আলো জ্বালি চারদিকে। হূদয়ের আলোয় আলোকিত করি চারপাশ। কেন আমরা সারাক্ষণ বিদ্যুৎ বিভাগের আলোর জন্যে চেয়ে থাকি?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

রাজায় যা বোঝে রাখালেও তা বোঝে -সহজিয়া কড়চা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

যখন ছোট ছিলাম, আমাদের বাড়িতে এক জ্ঞানবৃদ্ধ আসতেন। দু-চার দিন থাকতেন। আবার অনেক দিনের জন্য উধাও হতেন। বোধ হয় পারিবারিক কোনো বন্ধন তাঁর ছিল না। তাঁর বিদ্যাও বিশেষ ছিল না—বিত্ত তো নয়ই। কিন্তু তাঁর কথাবার্তা ছিল খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। কথায় কথায় প্রাচীনকালের বাঙালি জ্ঞানীদের অনেক প্রবচন তিনি পুনঃপ্রচার করতেন। যেমন একদিন কী প্রসঙ্গে আমার বাবাকে বলছিলেন, ‘রাজায় যা বোঝে রাখালেও তা বোঝে।’ তাঁর ওই কথাটি আমার মনে খুব ধরেছিল। তাই এত কাল পরও তা মনে আছে।
এই যে রাজা ও রাখালের বোঝার বিষয়ের কথা বলা হয়েছে, তা মহাজাগতিক কোনো রহস্য নয়, দর্শনতত্ত্ব নয়, গ্রহ-নক্ষত্রবিষয়ক কোনো জ্যোতির্বিদ্যাও নয়। স্রেফ জগত্-সংসার বা রাজ্যের ভালো-মন্দের ব্যাপার। যে যুগের কোনো জ্ঞানী এই প্রবচনের প্রবর্তক, সে সময়টি ছিল রাজতন্ত্রের। রাজ্য শাসন করতেন রাজা। রাখাল বলতে খুব নগণ্য প্রজাকে বোঝানো হয়েছে, যার বিদ্যাবুদ্ধির দৌড় নিতান্ত কম।
আমরা এখন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। গণতন্ত্রে নাগরিকদের আক্কেলবুদ্ধিকে অবহেলা করার উপায় নেই। কারণ, যে নাগরিক তার রায়ের দ্বারা কাউকে ক্ষমতায় বসাতে পারে এবং কাউকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারে—তার ক্ষমতা কম কিসে। সে যে কিছুই বোঝে না, তা নয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা যা বোঝেন, একজন সাধারণ নাগরিকও তা-ই বোঝে। একজন ফিকশন বা কল্পকাহিনির লেখক যা বোঝেন, হয়তো একজন কলাম লেখক তাঁর চেয়ে সামান্য কম বোঝেন। অর্থাৎ সবাই কমবেশি বোঝেন।
ক্ষমতাসীন দলের নেতা, শীর্ষ আমলা, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাটক ও সংগীতজগতের স্বনামধন্যরা, সংবাদপত্রের উপসম্পাদকীয় লেখকেরা দেশের ভালো-মন্দ ও ভবিষ্যত্ নিয়ে যা বোঝেন, সাধারণ নাগরিকেরাও যে তা বোঝে না, তা নয়। পিলখানার পাশবিকতার কারণ ও পরিণতি নিয়ে বিডিআরের মহাপরিচালকের বোঝাই পরম বোঝা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বিবেচনা আরও মূল্যবান। কিন্তু ওই বর্বরতায় যে সেনা কর্মকর্তা অথবা বিডিআর সদস্য নিহত হয়েছেন, তাঁর বৃদ্ধ বাবাও গ্রামের বাড়িতে আমগাছতলায় বসে বসে ভাবেন। অনেক ‘কেন’-র উত্তর তিনি খোঁজেন। উত্তর পানও। বাড়ির ভেতর থেকে খিটখিটে মেজাজের বুড়ি অথবা বিধবা বউমা ভাত খাওয়ার জন্য ডাকেন। নাতনি এসে হাত ধরে টানে। পুত্রহারা বৃদ্ধ যে চোখের কোনা মুছে উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে বাড়ির ভেতর যাবেন সে শক্তি তাঁর পায়ে নেই। পুত্রকে তিনি হারিয়েছেন, কিন্তু দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবার শক্তি তিনি হারাননি।
স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের সমাজে যুক্তিশীল বিচার-বিবেচনার বিষয়টি লোপ পায়। তার জায়গাটি দখল করেছে পামপট্টি বা স্তাবকতা। আজ প্রত্যেকেই প্রত্যেককে পাম মারছে। মন্ত্রী-রাজনীতিকেরা পাম দিচ্ছেন তাঁদের ভোটারদের। আমলারা পামপট্টি দিচ্ছেন মন্ত্রীকে বা দাতা গোষ্ঠীর লোকদেরও শুধু নয়, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা ও ক্যাডারদেরও। সংস্কৃতিজগতের কর্ণধারেরা তেল দিচ্ছেন ও পাম মারছেন সেই দপ্তরের আমলাদের, যারা বিদেশে ডেলিগেশন পাঠানোর তালিকা তৈরি করেন। প্রকাশক পাম মারছেন লেখককে, লেখক মারছেন প্রকাশককে। লেখা ছাপতে পত্রিকার সম্পাদককে পামপট্টি দিতে যান নতুন ও বুড়ো লেখকেরা। কেউ কাউকে তার ভুল ধরিয়ে না দিয়ে, তার ভুলের জন্য সমালোচনা না করে অযাচিতভাবে পাম দিচ্ছেন। পুরোনো প্রজন্মকে পাম দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের চালাকেরা। অন্যদিকে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য শাসন না করে নতুন প্রজন্মকে পাম দিচ্ছেন প্রবীণেরা। এ অবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রের গলদ দূর হবে কী করে?
নতুন প্রজন্ম নিয়ে আমাদের অনেক মন্ত্রী, রাজনীতিক ও লেখক ভয়াবহ আশাবাদী। ‘নতুন প্রজন্ম’ কথাটি এমনভাবে ব্যবহূত হচ্ছে, মনে হচ্ছে, বাঙালি জাতির আর যেন কোনো প্রজন্ম ছিল না। অন্তত পত্রিকা পড়ে তা-ই মনে হয়। ‘নতুন প্রজন্ম’কে মন-প্রাণ দিয়ে প্রশংসা করা হচ্ছে সম্ভবত এই জন্যও যে তারা মহাজোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। এবং ২০২১ সালের আগেই একটি শ্রেষ্ঠ বাংলাদেশ তারা গঠন করে ফেলবে—সে ব্যাপারে আশাবাদী তো কেউ হতেই পারেন।
দুর্ভাগ্যবশত আমার অবস্থান তাদের বিপরীতে। আমি পরম হতাশাবাদী। নতুন প্রজন্মকে ফুলিয়ে গদগদভাবে লিখতে পারি না বলে নিজের ওপরই রাগ হয়। স্বার্থপরের মতো আমি আমার নিজের প্রজন্ম ও তার পূর্ববর্তী প্রজন্ম দিয়ে গর্বিত। আমি সেই প্রজন্ম নিয়ে গর্বিত যে প্রজন্মের যুবকেরা একটি ছেঁড়া শার্ট গায়ে দিয়ে অবাঙালি আধা-ঔপনিবেশিক শাসকদের বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেয়। যাঁরা পুলিশের রাইফেলের সামনে বায়ান্নতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আমি সেই প্রজন্মকে সালাম করি, যে প্রজন্ম প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ১৯৬২তে দুর্জয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই প্রজন্মকে সম্মান করি, যারা ন্যায়সংগত দাবিতে রাজপথ উত্তাল করেছে, কিন্তু গাড়ি ভাঙচুর করে যন্ত্রাংশগুলো লুট করত না। আমি আমার সেই প্রজন্মের জন্য অহংকার করি, যে প্রজন্মের মানুষ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান বিচারকের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। সেই প্রজন্মের কথা বারবার স্মরণ করি, যে প্রজন্ম ঊনসত্তরে গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়। সেই প্রজন্মের কাছে বারবার মাথা নত করি, যারা একাত্তরের স্রষ্টা।
দুই হাতে দুই কানে সেলফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হতে গিয়ে যে প্রজন্মের যুবক-যুবতী গাড়ির ধাক্কা খায়, সেই প্রজন্মকে নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখা আমার মতো ফোনহীন ও প্রেমহীন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের প্রজন্মের মানুষেরও হূদয় ছিল। তারাও প্রেম করেছে। ভালোবাসার ইতিবাচক সাড়া পেলেও প্রেয়সীকে ফুল দিয়েছে, প্রত্যাখ্যাত হলেও একটি গোলাপ ও একটি চিরকুট দিয়ে শরিফ মিয়ার দোকানের পাশের বাগানে ঝিম মেরে বসে থেকেছে। অথবা লাইব্রেরিতে গিয়ে যাযাবরের দৃষ্টিপাত সেলফ থেকে নিয়ে পাতা উল্টে বারবার আবৃত্তি করেছে: ‘মিনি সাহেব, আমি ইডিয়টই বটে, আমি উপহাসকে মনে করি প্রেম, খেলাকে ভেবেছি সত্য।...’ অথবা যেদিন বজ্রপাতের মতো শুনেছে, ‘তুমি আর আমার সাথে মেলামেশা করো না, আব্বা-আম্মা পছন্দ করেন না, ছোট চাচাও খুব রাগী।’ আসলে মেয়েটি নিজেই ওকে বাতিল করেছে। এবং বিয়েও ঠিক হয়েছে নীলফামারীর সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক সুদর্শন সাবডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। সেকালে তারা এ ধরনের বজ্রাঘাতে আহত হয়ে সোজা চলে যেত গুলিস্তান বা নিশাত সিনেমা হলে। এক সপ্তাহে এগারবার দেখেছে দ্বীপ জ্বেলে যাই, মেঘে ঢাকা তারা অথবা হারানো সুর।
যে প্রজন্ম সহপাঠীকে প্রেম নিবেদন ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে এসিড ছুড়ে দেয়, সে প্রজন্মের ভবিষ্যত্ নিয়ে তাদের স্নেহপ্রবণ শিক্ষকেরা আশাবাদী হতে পারেন, কিন্তু আমার মতো চিরকালের ছাত্র পারে না। যে প্রজন্ম পরীক্ষার তারিখ পছন্দমতো পেছানোর জন্য শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে, সে প্রজন্ম নিয়ে ‘ভীষণ আশাবাদী’ কীভাবে হই? ভর্তি ফি কমানোর জন্য টিভি ক্যামেরার সামনে উপাচার্যের মুখের কাছে জুতা নাচায় যে প্রজন্মের মানবসন্তান সে প্রজন্মকে প্রশংসা করি কীভাবে?
কোনো মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া মাত্র ঝলসে উঠল প্রজন্মের পুরুষত্ব্ব। সহপাঠী বা পাড়ার মেয়েদের টান দিয়ে কামিজ ছিঁড়ে হায়েনার মতো গায়ে হাত দেয় যে প্রজন্ম, সে প্রজন্মের ২০২১ সালে সোনার বাংলা গড়ার সময় কোথায়? সেই প্রজন্ম নিয়ে প্রাচীনকালের সুফিদের মতো এত ‘স্বপ্ন’ দেখা কেন? যে প্রজন্ম সিট দখল করতে গিয়ে সহপাঠীর মাথা ফাটায় বা হাড্ডি গুঁড়া করে, টেন্ডারের বাক্স মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে নেতার বাড়িতে চলে যায়, ভর্তি-বাণিজ্যে কোটিপতি হয়, সে প্রজন্ম নিয়ে কি স্বপ্ন দেখা সম্ভব?
আমাদের প্রজন্মের ছাত্রনেতারা সবাই নির্মল ছিলেন তা বলব না। পরবর্তী জীবনে অনেকের পদস্খলন ঘটেছে। আমরা কোনো না কোনো সংগঠনের সমর্থক বা কর্মী ছিলাম। যে যে সংগঠনেরই হোন না কেন, নেতাদের আমরা সবাই শ্রদ্ধা করতাম। কারা ছিলেন আমাদের প্রজন্মের উজ্জ্বল ছাত্রনেতা যাঁদের ত্যাগ এখনো স্মরণ করি: কাজী জাফর আহমদ, সুরঞ্জিত্ সেনগুপ্ত, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, পংকজ ভট্টাচার্য, মোস্তফা জামাল হায়দার, মাহবুবউল্লাহ, শামসুজ্জোহা, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, তোফায়েল আহমেদ, নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং একটু পরেই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শেখ শহীদুল ইসলাম, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, আব্দুল কাইয়ুম মুকুল, নূহ-উল আলম লেনিন প্রমুখ। ওই প্রজন্মের আরও পনেরোটি নাম উল্লেখ করলে শান্তি পেতাম।
ওই প্রজন্মের নেতা-কর্মীরা হলের সিট দখলে নেতৃত্ব দেননি, সারা রাত হলে হলে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়াও তাঁরা পছন্দ করতেন না। টেন্ডার নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো সময়ই ছিল না তাঁদের। ভর্তি-বাণিজ্য শব্দটি তখন আবিষ্কৃত হয়নি। উপাচার্য বা অধ্যক্ষকে তালা মেরে জানালা দিয়ে গালিগালাজ করার রেওয়াজ তখন ছিল না। শিক্ষককে জুতাপেটা করার কথা স্বপ্নেও কেউ ভাবেনি। চাঁদাবাজি তখন ছিল না—প্রয়োজনে সামান্য কয়েক টাকা চাঁদা তোলা হতো। আমাদের প্রজন্মে কোনো মেয়ের মুখে এসিড ছোড়া হতো না। গুলি করে কোনো মেয়ের চোখ কানা করা হতো না। প্রতিবেশী মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করে তার স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ করা হতো না বা তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হতো না। তারপর যেদিন ডাক এল, একটিমাত্র কাপড় নিয়ে গোটা প্রজন্মের মানুষ দেশের মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। তা হলে কোন প্রজন্ম অপেক্ষাকৃত ভালো?
আমি জানি, প্রজন্মের সবাই এসিড ছোড়ে না, নেশাও করে না, মেয়েদের উত্ত্যক্তও করে না, পাড়ার দোকানে চা-মিষ্টি খেয়ে পয়সা না দিয়ে চলে যায় না, টেন্ডারবাজিও করে না। ওসব শতকরা পাঁচজন করতে পারে। কিন্তু কষ্টটা ওখানে যে, দলবদ্ধ প্রতিরোধ নেই কেন। পঁচানব্বই জনের ভূমিকাটা কী? ভোট দিয়েছে বলে প্রজন্ম যা খুশি তা-ই করবে? আইনের শাসন থাকলে খুনখারাবি, ভর্তি-বাণিজ্য, টেন্ডার ছিনতাই, চাঁদাবাজি, বখাটেপনা, ধর্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মারামারি, ভাঙচুর প্রভৃতি হতে পারত না।
কোনো অবস্থার সুবিধাভোগী ও ভুক্তভোগীর একই অনুভূতি হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনেরা সুবিধাভোগী আর সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী। বিএনপি ও তার সহযোগী দলগুলো কী বলল, তা যদি সরকার গ্রাহ্য নাও করে, ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা এবং বিখ্যাত গেরিলা যোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী কী বলছেন, তা তো মূল্যহীন নয়। তাঁরা বলছেন, দেশ ভালো চলছে না এবং অনেক স্বাধীনতাবিরোধী নবম জাতীয় সংসদে আছেন, রয়েছেন মন্ত্রিসভায়ও। ওদিকে সরকার ও সরকার-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, সরকারের সমর্থনে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ।
অবিচারে নিমজ্জিত বাংলাদেশে ‘বিচার’ শব্দটি আজ খুবই উচ্চারিত। এবং বাংলাদেশে বিচার নয়, বিচারের রায়ই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ বিচারের আগেই বিচারের রায় কী হবে তা জানা চাই। বিচারের রায়ের চেয়েও জরুরি বিচারের রায় কার্যকর করা। এখন শুধু বিচার নয়, ‘দ্রুত বিচার’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এক প্রতিমন্ত্রী বলতে লাগলেন, ‘ষোলোই ডিসেম্বরের মধ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করা হবে।’
পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে গত কয়েক মাসে বিডিআরের মহাপরিচালক ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা অনেক রকমের বক্তব্য দিয়েছেন। এক প্রতিমন্ত্রী বলছেন, প্রতিটি গ্রামে ও ইউনিয়নে রাজাকারদের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হবে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যারা শত্রুপক্ষের সহযোগিতা করেছে, খুনখারাবি করেছে তাদের বিচার ও শাস্তিই প্রাপ্য, তাদের নাম গ্রামের প্রবেশমুখে টাঙিয়ে দেওয়াটা সভ্যজগতের নিয়ম নয়। পৃথিবীর কোনো দেশে তা হয়নি। কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তা করে না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব রাজাকারের নাম পাথরে খোদাই না করে যেসব স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার বিন্দুমাত্র সুফল পাননি, তাদের কিছু উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
শত্রুমিত্র সকলের ক্ষেত্রে আইনের নিরপেক্ষ অনুশীলন ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয় না—আদর্শ রাষ্ট্র তো নয়ই। কোনো এক পত্রিকার জরিপে দেখেছি, আমাদের বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে শতকরা ৭৭ জন নাগরিক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। নিশ্চয়ই তাঁরা সবাই বিরোধী দলের নন। খুনখারাবি নয়, তুচ্ছ কোনো মন্তব্যের কারণে বিরোধী দলের লোকদের বিরুদ্ধে রাশি রাশি মামলা হচ্ছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন আদালতে। মহামান্য ম্যাজিস্ট্রেট তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা সমন জারি করতে মুহূর্ত দেরি করছেন না। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত সরকারি লোকেরা নির্বিঘ্নে খালাস পাচ্ছেন প্রতিদিন। এর নাম আইনের শাসন নয়।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি। এই নীরবতা অর্থহীন নয়। অন্যদিকে আমাদের ৪০তম স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন আমেরিকার কংগ্রেস এক বিশেষ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের কো-চেয়ারম্যান জোসেফ ক্রাউলি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। ৩৮০-৭ ভোটে তা পাস হয়। প্রস্তাবে ‘তিক্ততা ভুলে রাজনৈতিক নেতাদের একত্রে কাজ চালিয়ে যেতে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।’ এই প্রস্তাব আমাদের সরকারের জন্য একটি বার্তা।
দেশে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংকট এখন সর্বকালের সবচেয়ে ভয়াবহ। মন্ত্রীরা অব্যাহতভাবে বলছেন, গত দুই সরকার ‘এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ’ ও ‘এক ফোঁটা পানি’র ব্যবস্থা করে যায়নি। তাই এই সংকট। সাধারণ মানুষের কাছে এর অর্থ: প্রত্যেক সরকার পরবর্তী সরকারের জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ ও প্রকাণ্ড পুষ্করিণীতে টলটলে পানি রেখে যাবে, পরবর্তী সরকার তা শুধু ঘড়ায় ঢেলে বাড়ি বাড়ি বিতরণ করবে। বিদ্যুতের অভাবে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাক, কৃষকের সেচের পাম্প বন্ধ থাক, সিএনজি পাম্পও বন্ধ থাক, ঘরের বাতি না জ্বলুক—কিন্তু মধ্যবিত্তের ঘরে পাখাটি যদি না ঘোরে তাদের চাঁদি গরম হবে এবং ঘুরতে থাকবে বনবন করে মাথা। মাথা গরম হলে ক্রোধের সৃষ্টি হয়।
সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা কি এখনো বিশ্লেষণ করে দেখেননি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ফলাফল, জেলা বারগুলোর নির্বাচনী ফলাফল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের নির্বাচনের ফল, তারা কি কাগজেও পড়েননি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির শ্রমিক অসন্তোষের খবর, পল্লীবিদ্যুৎ অফিসগুলোর ঘেরাওয়ের সংবাদ। এ-জাতীয় অমঙ্গলের তালিকা দিলে তা হবে দীর্ঘ। রাখালেও বোঝে, এসব সরকারের জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার।
বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতা বাড়ায় আমেরিকা ও তার মিত্ররা, খালেদা জিয়ার থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে। এখন গণ-অসন্তোষের ফলে বাংলাদেশে উগ্র বাম বা মাওবাদী তৎপরতা বাড়লে আমেরিকা শুধু নয়, ভারতও শেখ হাসিনার সরকারের ওপর অপ্রসন্ন হবে। অন্ধ্র, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড থেকে মাওবাদী রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত এসেছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বাংলাদেশে ভারতের চেয়ে কম নয়। পরিস্থিতির কারণে মাওবাদী তৎপরতা শুরু হলে শুধু জঙ্গিবাদ জঙ্গিবাদ বলে পার পাওয়া যাবে না। উগ্র বাম রাজনীতি জনপ্রিয় হলে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ হাত গুটিয়ে নেবে। তখন ইসলামপন্থীদেরই পশ্চিমারা মদদ দেবে। চৌদ্দদলীয় মহাজোট তখন কী নিয়ে রাজনীতি করবে?
মানুষের দুর্দশা বাড়লে, বিদেশিদের সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি করলে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তরবঙ্গে কয়লা উত্তোলন করতে গেলে, সেই কয়লা পানির দামে বিদেশিদের কাছে রপ্তানি করলে চরমপন্থী বাম আন্দোলন মাথা চাড়া দেবে। ইসলামি মৌলবাদীদের চেয়ে মাওবাদী চরমপন্থীদের পশ্চিমা বিশ্ব বেশি ভয় করে।
শুরুতে যা বলেছি, তা একটু বদলে বলতে চাই। কখনো কখনো রাখালেও যা বোঝে রাজাও তা বোঝার চেষ্টা করেন না।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ -অচলাবস্থার অবসান হোক

দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাম্প্রতিক ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে পরিচালনা পরিষদের বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট প্রশাসনিক অচলাবস্থা আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
পরিচালনা পরিষদ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রোকেয়া আখতার বেগমকে অব্যাহতি দিয়ে আরেকজনকে দায়িত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করে তাঁর পক্ষে রায় নিয়েছেন। আদালত ১২ এপ্রিল পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিতে দুজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রয়েছেন, একজন পরিচালনা পরিষদের নিয়োগপ্রাপ্ত, অন্যজন আদালতের রায়ে অধিষ্ঠিত। শিক্ষকদের গরিষ্ঠ অংশ পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। পরিচালনা পরিষদ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও ভর্তি-বাণিজ্যের অভিযোগ এনেছেন।
ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিস্থিতি যে সংকটজনক, তা অনুধাবন করা যায় বিশিষ্ট নাগরিকদের বিবৃতিতে। সংকট নিরসনে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করায় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিবছর ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের মাত্রাতিরিক্ত ভিড় লক্ষ করা যায়। সেই সঙ্গে ভর্তি-বাণিজ্যের অভিযোগও অসত্য নয়। সব সরকারের আমলেই পরিচালনা পরিষদকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের নজির রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবছর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও শ্রেণীকক্ষ বাড়ানো হয়নি।
ভর্তি-বাণিজ্যসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে, সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটি চলে শিক্ষার্থীদের টাকায়, অথচ পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের স্বার্থ দেখা হচ্ছে না। অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালনা পরিষদে যাঁরা আছেন, তাঁদের সন্তানেরা এখন আর সেখানে পড়াশোনা করছে না। পরিচালনা পরিষদ ও শিক্ষকমণ্ডলীর সমন্বিত প্রয়াসই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি ও উন্নয়নের ধারা নিশ্চিত করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিচালনা পরিষদ ও শিক্ষকদের মুখোমুখি অবস্থান কাম্য নয়। ১ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে হবে, অন্যথায় পরীক্ষার্থীরা বিপদে পড়তে পারে। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীও উদ্যোগ নিতে পারেন। কোনো পক্ষের খামখেয়ালিতে এই আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

গভীর খাদে বিদ্যুৎ খাত -জ্বালানি খাতকে রাহুমুক্ত করতে সক্রিয় হোন

বিদ্যুতের ঘাটতি ও উৎপাদনের বিপরীত গতি যেন তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠা আর পিছলে যাওয়ার গল্প।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দুরবস্থা পরিমাপের জন্য পরিসংখ্যানের দ্বারস্থ হওয়ার দরকার নেই। সব ঋতুতে চলা বিদ্যুতের ঘাটতির শিকার জনজীবনই এর প্রমাণ। তার পরও গত সোমবারের প্রথম আলোর সংবাদ জানাচ্ছে, প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়ছে ও পুরোনো কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমছে। এদিকে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের গতিও শামুকের মতোই ধীর। বিদ্যুৎ খাতের এই গভীর খাদে পড়া অবস্থা দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। বিদ্যুৎ এখন জাতীয় ভোগান্তি ও ব্যর্থতার অপর নাম।
গত প্রায় দুই দশকে বিদ্যুৎ খাতে সরকার নিজস্ব অর্থে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেনি, অথচ কেবল খুুঁটি পুঁতেই শত শত কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা অন্য কোনো বিনিয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে গত কয়েকটি সরকার আর্থিক সহায়তা না পেলেও, তাদের অনেক শর্ত এই খাতের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সংস্কারের অভাবে সরকারিভাবে স্থাপিত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতাও কমছে; সেগুলো এখন জরাজীর্ণ অবস্থায়। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ চুরি হয়ে যাওয়ার কথাও সুবিদিত। পাশাপাশি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাসের সংকট। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, উৎপাদনক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে না। গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেসব অজুহাত দিয়ে থাকেন, তা কেবল বহুল ব্যবহূতই নয়, অবিশ্বাস্যও বটে। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সামান্য ব্যয়েই আরও গ্যাস উত্তোলন সম্ভব। তা না করে বছরের পর বছর একই অজুহাত চলে আসছে, আর দেওয়া হচ্ছে প্রতিশ্রুতি। এর সঙ্গে জড়িত হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সঞ্চালনব্যবস্থার ত্রুটি, দুর্নীতি, অপচয় ও চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনা। জ্বালানি খাতের দুর্নীতির সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের সম্পর্কের বিষয়টি তাই উপেক্ষা করা যায় না।
বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে গত তিনটি সরকারই বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভরসা দিয়ে আসছে। অথচ বাস্তবে অগ্রগতি সামান্যই। এ ক্ষেত্রেও চলছে দীর্ঘসূত্রতা, দরপত্র নিয়ে অস্বচ্ছতা। আবার বিদ্যুতের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়টির ভবিষ্যত্ কেবল বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে না। উন্নত দেশগুলোতে সরকারি-বেসরকারি অনুপাত ৭০ বনাম ৩০ শতাংশ। বহু বছর ধরে পরমাণু শক্তিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সৌরবিদ্যুৎ ইত্যাদির কথা উঠছে আর পড়ছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে না কিছুই। অভিজ্ঞতা বলে, বিদ্যুৎ বিষয়ে কোনো সরকারই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি। এ রকম এক ধারাবাহিক অবহেলারই ফল হলো আজকের বিদ্যুৎ-সংকট।
সরকারি তহবিলে নিজস্ব অর্থায়নে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা সদিচ্ছা ও পরিকল্পনার ব্যাপার। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্বভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি দিতে হবে এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো এবং পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সংস্কারে হাত লাগাতে হবে। শিল্প-কৃষি-শিক্ষা-চিকিৎসাক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সঙ্গে জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রই যুক্ত। এই খাতে স্থবিরতা সমাজ ও অর্থনীতির সব ক্ষেত্রকে অচল করে দিতে পারে এবং জন্ম দিতে পারে বিরাট বিস্তৃত অসন্তোষের।

নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪২

কলকাতার পার্কস্ট্রিটের বহুতল ভবন ’স্টিফেন কোর্ট’-এর ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে গিয়ে দুই দিনে আরও নয়টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। এ নিয়ে ওই ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ৩৭ জনের মধ্যে ২০ জনের লাশ ইতিমধ্যে তাঁদের পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৭টি লাশ পড়ে আছে কলকাতার পিজি হাসপাতালের মর্গে। এই ১৭ জনের দেহ এমনভাবে বিকৃত হয়ে গেছে যে তাঁদের চেনা যাচ্ছে না। এই ১৭টি লাশের দাবিদার একাধিক হওয়ায় তাঁদের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিবিআই তদন্তের দাবি করেছেন।

ইরাকের যুদ্ধকবলিত এলাকায় জন্ম নিচ্ছে খর্বাকৃতির শিশু

মার্কিন আগ্রাসনের শিকার ইরাকে শিশুরা মায়ের পেটেই যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে খর্বাকৃতির শিশু জন্ম নিচ্ছে। এদের উচ্চতা একই সময়ে মোটামুটি নিরাপদ অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের চেয়ে দশমিক ৩ ইঞ্চি কম।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল ইরাকের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছেন।
গবেষণায় দেখা যায়, দেশটি দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে উদ্বেগজনক হারে খর্বাকৃতির শিশু জন্ম নিচ্ছে। অন্য অঞ্চলের তুলনায় এ প্রদেশগুলোতে সহিংসতার হারও অনেক বেশি।
প্রধান গবেষক গ্যাব্রিয়েলা গুরেরো-সারদান বলেন, এসব এলাকার শিশুদের উচ্চতা নিরাপদ এলাকায় জন্ম নেওয়া শিশুদের তুলনায় গড়ে দশমিক ৩ ইঞ্চি (দশমিক ৮ সেন্টিমিটার) কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, খর্বাকৃতির শিশু জন্মের জন্য মায়েদের নিম্নমানের খাবার ও অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবহারের বিষয়টি অনেকাংশে দায়ী।
গবেষকেরা জানান, নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণ এবং ডায়রিয়াসহ নানাবিধ রোগের কারণে এসব খর্বাকৃতি শিশুর জন্ম হতে পারে।
তাঁরা আরও জানান, জীবনের শুরুতে শারীরিক বিকাশের বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুরা জীবন ধারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেলে অনেক বেশি সুস্থ, কর্মক্ষম ও শিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হিসেবে গড়ে ওঠে।
লন্ডনের কিংস কলেজের পুষ্টি ও পথ্যবিদ্যা বিভাগের প্রধান পিটার ইমারি বলেন, কেবল খাদ্যের পুষ্টিমান কম থাকার জন্যই যে ওই সব এলাকার শিশুরা খর্বাকৃতির হচ্ছে, তা নয়; বরং দিনের পর দিন কম খাদ্য গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় ওই অঞ্চলের মায়েরা খর্বকায় শিশুর জন্ম দিচ্ছেন।
এ গবেষণাপত্র রয়েল ইকোনমিক সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে হত্যার দায়ে ১৭ ভারতীয়র মৃত্যুদণ্ড

সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানি নাগরিককে হত্যার দায়ে ১৭ ভারতীয় নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সেখানে শরিয়া আদালতের বিচারক ইউসুফ আল হামাদি এ রায় দেন। গতকাল সোমবার খালিজ টাইমস পত্রিকার খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
পত্রিকাটি জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহর আল সাজা এলাকায় অবৈধ মদ ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত বছরের জানুয়ারি মাসে একদল ভারতীয় নাগরিক চার পাকিস্তানি নাগরিকের ওপর হামলা চালান। তাঁদের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে ওই পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন। পাকিস্তানের অপর তিন নাগরিক আহতাবস্থায় ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণে বাঁচেন।
আদালতের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি আরও জানায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ওই হামলায় জড়িত থাকার কথা আদালতে স্বীকার করেছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নাগরিকদের বয়স ১৭ থেকে ৩০ বছর।

নিয়মিত যোগব্যায়াম করছেন নেপালের মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড

নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দহল প্রচণ্ড যোগব্যায়াম শুরু করেছেন। শুধু তা-ই নয়, দলীয় কর্মীদেরও যোগব্যায়ামে উদ্বুদ্ধ করছেন তিনি। ‘ইতিবাচক জীবনাচার ও শারীরিক সুস্থতা’র জন্য কয়েক মাস ধরেই যোগব্যায়াম চালিয়ে যাচ্ছেন এই মাওবাদী নেতা।
যোগব্যায়ামের মাধ্যমে নেপালের সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের আগে ‘ইতিবাচক ভাবনা’র জন্য প্রচণ্ড সবাইকে অনুপ্রাণিত করছেন।
গত সোমবার কাঠমান্ডুর তুনডিখিয়েল এলাকার একটি মাঠে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সঙ্গে যোগব্যায়ামে অংশ নেন তিনি। তিনি শার্ট ও কালো রঙের ট্রাউজার পরে মাদুরে বসে যোগব্যায়াম করেন। তাঁর গলায় কাঠের গুটির মালাও ছিল।
এ প্রসঙ্গে প্রচণ্ড বলেন, ‘নয়াদিল্লিতে ভারতীয় যোগগুরু রামদেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি দুই দেশের জনগণের মধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে যোগব্যায়ামের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর কথা শুনে খুব ভালো লাগে। ওই সময় আমি গলার সমস্যায় ভুগছিলাম। তাঁর পরামর্শে তাত্ক্ষণিকভাবে ওই সমস্যার উপশম হলো। তখনই যোগব্যায়ামের ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাই। এরপর উন্নত জীবনাচার ও সুস্থতার কথা বিবেচনা করে দলীয় নেতা-কর্মীদের যোগব্যায়ামে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়টি চিন্তা করি।

ব্যাংককে সরকারের সঙ্গে বিরোধীদের দ্বিতীয় দফা আলোচনাও ব্যর্থ

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ ভেজ্জাজিভার সঙ্গে বিক্ষোভকারী ‘লাল শার্ট’ নেতাদের দ্বিতীয় দফা আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল সোমবার ওই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ বলেন, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই তিনি নতুন নির্বাচন দেবেন। তবে বিরোধীরা তাঁর এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রাজধানী ব্যাংককের কিং প্রচাদিপক ইনস্টিটিউটে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় দুই পক্ষের আলোচনা শুরু হয়। সরকার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ ভেজ্জাজিভা তাঁর দুই সহযোগী কোরবাস্ক সাবাভাসু ও ছামি সাকডিসেট আলোচনায় অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের পক্ষে অংশ নেন জতুপর্ন প্রমপান, ভিরা মুসিকাপং ও ওয়েং তোজিরাকর্ন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ বলেন, আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্তমান পার্লামেন্টের মেয়াদ রয়েছে। তবে মেয়াদের আগে চলতি বছরের শেষ দিকে নতুন নির্বাচন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে ১৫ দিনের মধ্যে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভকারীদের নেতা জতুপর্ন বলেন, ‘আমাদের একমাত্র দাবি পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন দেওয়া।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ আদালত থাকসিন সিনাওয়াত্রার ১৪০ কোটি ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর সমর্থকেরা পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় থেকে রাজধানী ব্যাংককে থাকসিনের হাজার হাজার সমর্থক বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
থাকসিন সিনাওয়াত্রা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রায় নিয়মিত সমর্থকদের দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।

যৌথ বাহিনীর অভিযানে কিষেনজি ও বিক্রম গুলিবিদ্ধ

অবশেষে মাওবাদীরা স্বীকার করেছে, গত বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গল মহলে যৌথ বাহিনীর অভিযানে শীর্ষস্থানীয় মাওবাদী নেতা কিষেনজি ও বিক্রম গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
গত শনিবার ওড়িশার রাজ্য সরকারকে এক ই-মেইল বার্তায় মাওবাদীরা জানায়, তাদের নেতা কিষেনজি ও বিক্রম গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তারা এই আঘাতের বদলা নেওয়া থেকে পিছপা হবে না। ওই ই-মেইল বার্তায় আরও হুমকি দেওয়া হয়, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক যদি মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অপারেশন গ্রিনহান্ট শুরু করেন, তবে ওই দিন থেকেই তারাও পাল্টা যুদ্ধ ঘোষণা করবে। উড়িয়ে দেবে মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের বাসভবন। এ ছাড়া তারা এই রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটাবে।
মাওবাদীদের গেরিলা স্কোয়াড গণমুক্তি বাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো ওই ই-মেইলে বলা হয়, ‘কিষেনজি ও বিক্রমের শরীরে বিদ্ধ প্রতিটি গুলির জবাব আমরা দেব। যখনই যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হবে, তখন আমরা একসঙ্গে রাজধানী ভুবনেশ্বর, পুরী ও কটকে আঘাত হানব। এবার আমাদের হামলা আরও ধ্বংসাত্মক হবে।’
ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার দয়াল গাঙ্গওয়ার বলেছেন, তাঁদের কাছে খবর এসেছে আহত মাওবাদী নেতা কিষেনজি এখন ছদ্মনামে ময়ূরভঞ্জের কোনো এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আইএসআই এখন আর তালেবানের ‘বন্ধু’ নয়

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) এখন আর আফগানিস্তানের তালেবান জঙ্গিদের ‘বন্ধু’ নয়।
ভারতে হামলা চালানোর জন্য আফগানিস্তানের তালেবান জঙ্গিদের সহায়তা দিচ্ছে আইএসআই—ভারতের এমন আশঙ্কা প্রকাশের মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ দাবি করলেন। পিবিএস নিউজ চ্যানেলে ‘চার্লি রোজ শো’তে তিনি এ দাবি করেন।
মেহমুদ কোরেশি বলেন, আইএসআই যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এ প্রতিষ্ঠানটি যেভাবে তালেবান জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, তাতে ভারতের এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি আরও বলেন, পেশোয়ার, লাহোর ও মুলতানে আইএসআইয়ের কর্মকর্তাদের ওপর তালেবানরা হামলা চালিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, আমাদের পক্ষ থেকে তালেবানদের ‘বন্ধু’ বিবেচনা করার কোনো কারণ নেই।
কোরেশি দাবি করেন, যুদ্ধকবলিত আফগানিস্তান ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের জন্যই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সফল অভিযানের কারণেই উপজাতীয় এলাকা থেকে জঙ্গিরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখন পাকিস্তানের কোনো অংশই সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য নয়।

কঙ্গোতে গণহত্যা ঠেকাতে নতুন কৌশল জরুরি: জাতিসংঘ

কঙ্গোতে লর্ডস রেজিস্টেন্স আর্মির (এলআরএ) অতর্কিত হামলা থেকে নিরীহ লোকজনকে বাঁচাতে সেখানে নতুন কৌশল অবলম্বন করা দরকার বলে অভিমত ব্যক্ত করেছে জাতিসংঘ। কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান অ্যালান ডস গতকাল সোমবার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে এ কথা বলেন। গত রোববার মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) কঙ্গোতে এলআরএর সর্বশেষ গণহত্যার প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরদিন মিশনপ্রধান নতুন রক্ষণাত্মক কৌশল অবলম্বন করার কথা বললেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বরে কঙ্গোর একটি প্রত্যন্ত এলাকায় হামলা চালিয়ে গুপ্ত সংগঠন এলআরএ ৩২১ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে এবং ২৫০ জন শিশু-কিশোরকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান বিবিসিকে বলেন, এলআরএ বিদ্রোহীদের ঠেকানোর জন্য নতুন কৌশল অবলম্বন করা দরকার হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, ওই এলাকায় হেলিকপ্টার ও বিমান টহল এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
অ্যালান ডস বলেন, অরণ্যসংকুল বিস্তীর্ণ এলাকায় এলআরএর সদস্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাদের তৎপরতা চালায়। এ কারণে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা খুবই কঠিন কাজ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে তাদের পাকড়াও করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক বিমান যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যালান ডস বলেন, এলআরএর সদস্যদের মূল অস্ত্র হলো আতঙ্ক ছড়ানোর ক্ষমতা। সংখ্যায় অল্প হলেও এত নৃশংসভাবে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায় যে তাদের উপস্থিতির কথা শুনেই লোকজনের পিলে চমকে যায়। কঙ্গোর তাপিলি অঞ্চলে তারা সর্বশেষ যে গণহত্যা চালিয়েছে, তাতে এলাকাবাসী চরমভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্রোহীরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে উল্লাস করেছে। তাদের ভয়ে লোকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। ঘটনা ঘটে যাওয়ার তিন মাস পরও তারা এলাকায় ফেরার সাহস পাচ্ছে না।
এইচআরডব্লিউর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বরে বড়দিনের কয়েক দিন আগে উগান্ডা থেকে নদী পার হয়ে এলআরএর প্রায় ৫০ জন সদস্য কঙ্গোর একটি গ্রামে ঢুকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে ৩২১ জনকে হত্যা করে। তাদের লুট করা মাল বয়ে নেওয়ার জন্য সেখানকার ২৫০ জন শিশু-কিশোরকেও তারা অপহরণ করে নিয়ে যায়।
মূলত উগান্ডার বিদ্রোহী গ্রুপ হিসেবে এলআরএর উত্থান হয়। শুরুর দিকে এই বিদ্রোহীরা উগান্ডায় ‘মুসাবি ধর্মরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা সুদান, মধ্য আফ্রিকা ও কঙ্গোর মতো এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দেয়। তাদের মানুষ হত্যার মূল উদ্দেশ্য কী, তা এখনো নৃতাত্ত্বিকদের কাছে এক রহস্য। তাদের বিগত কর্মকাণ্ডের তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে তারা উত্তর উগান্ডার লামবোতে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেখানে তারা এক দিনেই ৪০০ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে খ্রিষ্টানদের বড়দিন উৎসবের আগমুহূর্তে কঙ্গোর ডরুমা অঞ্চলে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায় ৩০০ লোককে হত্যা করে তারা। ২০০২ সালের মে মাসে সুদানের ইকুয়াটোরিয়ায় তারা ৪৫০ জনকে হত্যা করে। এদের বেশির ভাগকে তারা উঁচু পাহাড় থেকে ফেলে হত্যা করে।

মস্কোতে পাতালরেলে আত্মঘাতী হামলা, নিহত ৩৯

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর পাতালরেলে গতকাল সোমবার দুজন আত্মঘাতী নারী-হামলাকারী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। হামলায় কমপক্ষে দুই হামলাকারীসহ ৩৯ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশ ও স্থানীয় বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকালে একটি ট্রেনে প্রথম হামলাটি চালানো হয়। ট্রেনটি ওই সময় শহরের কেন্দ্রস্থলে লুবিয়াংকা স্টেশনে থেমে ছিল। এর প্রায় ৪০ মিনিট পর শহরের পার্ক কুলটারি স্টেশনে দ্বিতীয় হামলা চালানো হয়।
রাশিয়ার জরুরি দুর্যোগবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সভেত্লানা চুমিকোভা বলেন, লুবিয়াংকা স্টেশনে বিস্ফোরণে ট্রেনের ভেতরে ১৪ জন ও প্লাটফরমে ১১ জন মারা গেছে। আর কুলটারি স্টেশনে বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে ১২ জন। মস্কোতে ২০০৪ সালের পর সবচেয়ে ভয়ংকর হামলা এটি। এ হামলার জন্য কারা দায়ী, তা এখনো জানা যায়নি। মস্কোর পাতালরেল বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত পাতালরেলগুলোর একটি। দৈনিক গড়ে ৫৫ লাখ যাত্রী শহরের পাতালরেল ব্যবহার করে।
বিস্ফোরণের পর প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ একটি জরুরি বৈঠক করেছেন। তিনি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। সরকারি একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, হামলার খবর শোনার পর সার্বিয়ায় সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মস্কোর মেয়র ইউরি লুজকভ বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, দুটি হামলাতেই আত্মঘাতী নারী-হামলাকারী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। হামলায় দুই স্টেশনে কমপক্ষে ১৯ জন আহত হয়েছে। লুবিয়াংকা স্টেশনের অবস্থান মস্কোর গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি) মূল কার্যালয়ের নিচে। এফএসবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা সম্ভবত দেহের সঙ্গে বিস্ফোরক বেঁধে রেখেছিল। সংস্থার পরিচালক আলেক্সান্ডার বোর্তনিকভ বলেন, তাঁদের ধারণা, এই হামলার সঙ্গে উত্তরের ককেশাস অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জড়িত। রাশিয়ার বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, আত্মঘাতী দুই হামলাকারী সম্ভবত মস্কোর দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা থেকে একসঙ্গে রওনা করেছিল।
আত্মঘাতী এই হামলার পরপর শহরের কর্মচাঞ্চল্য থমকে যায়। হামলার শিকার ট্রেনটিতে থাকা ও স্টেশন দুটিতে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা ভয়ে চিত্কার করে ওঠে এবং কাঁদতে থাকে। নিরাপত্তা ও উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এদিকে বিশ্ব নেতারা এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, সহিংস চরমপন্থী ও ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে রাশিয়ার জনগণের পাশে রয়েছে মার্কিনিরা। হামলায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছেন, ‘এ ধরনের হামলার ঘটনা কোনো বিচারেই মেনে নেওয়া যায় না।’ এই হামলার ঘটনায় উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান হোসে ম্যানুয়েল বারোসোও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।
গত এক দশকে মস্কোতে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী ও আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের স্বাধীনতাকামী মুসলিম বিদ্রোহীরা কয়েকটি হামলার দায় স্বীকার করেছে। ২০০৪ সালের হামলার দায়িত্বও স্বীকার করেছে তারা। ওই হামলায় কমপক্ষে ৩৯ জন মারা যায়।

মিয়ানমারে সু চির দলের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা

মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সে দেশের আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। এনএলডির নেতারা বলেছেন, সরকার ‘অন্যায্য নির্বাচনী আইন’ করায় এনএলডি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানী ইয়াঙ্গুনে শতাধিক নেতার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এনএলডির জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খবর এএফপি ও বিবিসি অনলাইনের।
এনএলডির মুখপাত্র নিয়ান উইন বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যে জান্তা সরকার নির্বাচন দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা বেশ কটি অন্যায্য ধারা সংযোজন করে নির্বাচন আইন পাস করেছে। ওই আইন মেনে তাঁদের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে তাঁরা দলের নিবন্ধন করবেন না বলে ঠিক করেছেন।
চলতি মাসের শুরুতে জান্তা সরকার নির্বাচনী আইন পাস করার পর জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো এর তীব্র নিন্দা জানায়।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, যেকোনো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি কোনো রাজনৈতিক দলের সাজাপ্রাপ্ত সদস্য থাকলে ওই রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনও বাতিল বলে গণ্য হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ নতুন আইনকে অং সান সু চিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার সরকারি কৌশল বলে অভিহিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জান্তা সরকারের এ আইন প্রণয়নকে গণতন্ত্রের সঙ্গে ‘নির্ভেজাল তামাশা’ বলেও অভিহিত করা হয়।
এনএলডির নেতারা বলেছেন, নতুন আইন অনুযায়ী তাঁদের দলকে নিবন্ধিত করতে হলে সু চিসহ কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বহু নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে এটা মেনে দল নিবন্ধন করলে নতুন আইনকে স্বীকার করে নেওয়া হবে, যা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব।
নিয়ান উইন বলেন, গত সপ্তাহে তাঁর সঙ্গে সু চির কথা হয়েছে। তিনি পরিষ্কারভাবে তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দল যেন নতুন আইন স্বীকার করে নির্বাচন করার ‘চিন্তাও না করে’।
গতকাল বৈঠক শেষে এনএলডির সবচেয়ে বেশি দিন কারাবরণকারী বর্ষীয়ান নেতা উইন টিন বলেন, এ বৈঠক ছিল তাঁদের ‘জীবন-মরণ ইস্যু’।
তিনি বলেন, তাঁরা যদি নিবন্ধন না করেন, তাহলে সরকারি স্বীকৃতির খাতায় তাঁদের দলের নাম আর থাকবে না। তখন তাঁদের অবস্থা হবে হাত-পা ছাড়া দেহের মতো। অন্যদিকে, দলের নিবন্ধন পেতে হলে যাঁদের বাদ দিতে হবে, তাঁদের ছাড়া দলের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। তবু সব দিক বিবেচনা করে তাঁরা নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের চাপে জান্তা সরকার মিয়ানমারে ধাপে ধাপে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ লক্ষ্যে তারা সাত ধাপের একটি কৌশলপত্র প্রকাশ করে। কৌশলপত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ বছরই সামরিক সরকার সেখানে জাতীয় নির্বাচন দেবে বলে ঘোষণা দেয়। তবে নির্বাচনী আইনে নতুন নীতিমালা সংযোজন করায় অনুষ্ঠেয় নির্বাচন-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আগাম আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংগঠন। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করার অভিলাষ থেকেই সরকার তাদের ছকে ফেলা নির্বাচন দেওয়ার কথা বলছে। আগামী অক্টোবরের শেষ অথবা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সরকার সেখানে নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক নেত্রী সু চি গত ২০ বছরের মধ্যে ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে গৃহবন্দী রয়েছেন।
১৯৯০ সালের নির্বাচনে সু চির দল জয়লাভ করলেও তারা ক্ষমতায় আসতে পারেনি। এক অভ্যুত্থানে তাদের সরিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এর পর থেকে মিয়ানমারে সামরিক শাসন জারি আছে।

দুই ভাইয়ের লড়াইয়ে জয়ী তামিম

শারজা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কিছু দূরে সিটি সেন্টার নামের বিপণিবিতান। দোকানিদের বেশির ভাগই চট্টগ্রামের লোক। দোকানে গ্রাহক হিসেবে হঠাৎ আফতাব আহমেদকে দেখে পুলকিত হন তাঁরা। সঙ্গে আফতাবের স্ত্রী-সন্তান। একই বিপণিকেন্দ্রে কয়েকজন বাংলাদেশি সাংবাদিক যেতেই বাঙালি দেখে এক বিক্রয়কর্মী বলে উঠলেন, ‘আগে এলে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের দেখতে পেতেন।’
দেশি ক্রিকেটারদের সান্নিধ্য পেতে প্রবাসী বাঙালিদের এমন আগ্রহ থাকলেও স্টেডিয়ামের গ্যালারি এখনো সুনসান। চট্টগ্রামের তামিম, আফতাব, নাফিসদের খেলাও তাঁদের মাঠে টানতে পারেনি। এ জন্য আর্থিক সামর্থ্যের পাশাপাশি তাঁরা দুষলেন আয়োজকদের স্বল্প প্রচারণাকেও।
গতকাল প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয় নাফিস ইকবালের ব্রাদার্স ও তামিম ইকবালের চিটাগাং টাইগার্স। আর এতে ৭ উইকেটে জিতেছে ছোট ভাই তামিমের দল। দ্বিতীয় ম্যাচে ঢাকা স্পোর্টস ৮ উইকেটে জিতেছে চিটাগাং পাইরেটসের বিপক্ষে।
টস জিতে ব্যাটিং নিয়েছিলেন নাফিস। ৩৯ রানে ৩ উইকেট হারানো ব্রাদার্সের হাল ধরেন অধিনায়ক নাফিস (২৫)। তবে তাঁকে ছাপিয়ে যান জিয়াউর রহমান। শেষ দিকে তিনি ২০ বলে চার ছক্কায় অপরাজিত ৩৫ রান করলে দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৯ উইকেটে ১৩৭।
১৩৮ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ছোটখাটো ঝড় বইয়ে দেন তামিম। ইনিংসের প্রথম ওভারে তিনি পাকিস্তানি আজহার মেহমুদের বল মিড উইকেট দিয়ে দুবার ও স্ট্রেট ড্রাইভে একবার সীমানাছাড়া করেন। পরের ওভারে তাঁকে আরও দুটি চার মারেন। শফিউলের বলে বোল্ড হওয়ার আগে ২৭ বল খেলে ৯টি চারে করেন ৪৪ রান। ম্যাচসেরা হন তামিম।
দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামার আগে একটা একাদশ দাঁড় করানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল চিটাগাং পাইরেটসের। ভিসা-জটিলতায় তিনজন ক্রিকেটার তখনো বাংলাদেশ থেকে পৌঁছাতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তারা পাকিস্তান থেকে উড়িয়ে আনে রাশেদ হানিফ ও জেনিসার খানকে। পাইরেটসের প্রতিপক্ষ ঢাকা স্পোর্টসের মোহাম্মদ শরীফ পড়েন অন্য রকম বিড়ম্বনায়। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে তাঁকে রোববার পুরো রাত কাটাতে হয়। পাসপোর্ট নম্বরের বিভ্রান্তিতে তাঁকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আটকে রাখে। নানামুখী হস্তক্ষেপে সকালে তিনি ছাড়া পান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ব্রাদার্স: ১৩৭/৯; (জিয়াউর ৩৫*, নাফিস ২৫, তুষার ইমরান ১৮; কামরুল ২/২৫, মিলিন্দা ২/৬, এনামুল ২/১৯, আবুল হাসান ১/৪২, মাহমুদউল্লাহ ১/৩১)। চিটাগাং টাইগার্স: ১৮.৫ ওভারে ১৩৮/৩ (তামিম ৪৪, মিথুন ২৯, খুররম ২৪; শফিউল ১/৩৩, তুষার ১/৪)।
চিটাগাং পাইরেটস: ১৫৪/৮ (রনি তালুকদার ৩৬, কাপালি ৩২, রাশেদ ২৮, জেনিসার ২৫; ফারহাত ২/২১, শরিফ ১/৩৫, নাজমুল ১/২৬)। ঢাকা স্পোর্টস: ১৮ ওভারে ১৫৫/২ (ফারহাত ৭১*, উত্তম ৩৩, শুভাগত ৩১)।

স্বাধীনতা দিবস টেবিল টেনিস

স্বাধীনতা দিবস ইটন উন্মুক্ত টেবিল টেনিসে পুরুষ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন বিমানের মানস। মেয়েদের বিভাগে চ্যাম্পিয়ন আবাহনীর রহিমা। বালক অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়সে চ্যাম্পিয়ন মোলার গ্রুপের হিমেল। লোডশেডিংয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ে খেলা শেষ করতে পারেনি বলে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে বিমান ও পাললিক গ্রুপকে।

নিজেদের সমর্থকেরাই...

ইতালিয়ান ফুটবলে বর্ণবাদ আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে অনেক দিন ধরেই। লড়াইটা যে খুব জরুরি, এর প্রমাণ আরেকবার মিলল রোববার। জুভেন্টাসের খেলোয়াড়েরা নিজেদেরই সমর্থকদের ‘বর্ণবাদী’ আচরণের শিকার হলেন।
সিরি ‘আ’তে আটলান্টার বিপক্ষে ঘরের মাটিতে ম্যাচ খেলতে হোটেল থেকে বেরোচ্ছিলেন খেলোয়াড়েরা। ঠিক সেই সময় একদল সমর্থক বিয়ারের বোতল ও ডিম ছুড়ে মারে তাদের। সমর্থকদের বেশি ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন ফ্যাবিও ক্যানাভারো, জোনাথন জেবিয়ানা ও ফিলিপ মেলো।
এর মধ্যে জেবিয়ানা অভিযোগ করেছেন, তাঁকে ‘বর্ণবাদী’ গালিগালাজ করেছে সমর্থকেরা। ব্রাজিলিয়ান জেবিয়ানার সঙ্গে জুভেন্টাস সমর্থকদের বেশ কিছুদিন ধরেই ঝামেলা চলছে। ঝামেলার শুরু ফুলহামের বিপক্ষে ইউরোপা লিগের ম্যাচ থেকে। হেরে আসা ওই ম্যাচে লাল কার্ড দেখে বেরোনোর সময় সমর্থকদের দিকে মধ্যমা দেখিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছিলেন জেবিয়ানা।
সেই ঘটনা স্বীকার করেই জেবিয়ানা অভিযোগ করলেন ‘অবশ্যই’ তাঁকে বর্ণবাদী গালি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় একজন গ্রেপ্তার হলেও ওই দিন ম্যাচ চলা অবস্থাতেও জুভেন্টাস সমর্থকদের প্রতিবাদ চলেছে। মাঠের বাইরে শ-তিনেক সমর্থক প্রতিবাদ জানিয়েছে।

আন্তজেলা ক্রিকেটা

আটটি ভেন্যুতে কাল শুরু হওয়া আন্তজেলা ক্রিকেটে কুমিল্লায় চট্টগ্রাম বিভাগের ম্যাচে রকিবুল হাসানের (বাবু) সেঞ্চুরিতে (১২৫) কুমিল্লা (২৮৩/৭) ১৫৯ রানে হারিয়েছে রাঙামাটিকে (১২৪)। ঢাকা বিভাগের খেলা হচ্ছে দুই ভেন্যুতে। ‘এ’ গ্রুপে ফরিদপুরে ফরিদপুর (১৭৬/৭) ৩ উইকেটে মানিকগঞ্জকে (১৭৫) এবং ‘বি’ গ্রুপে জামালপুরে ঢাকা (১১৭/৩) ৭ উইকেটে শেরপুরকে (১১৩) হারিয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ‘এ’ গ্রুপে রংপুরে রংপুর (৯৯/২) ৮ উইকেটে কুড়িগ্রামকে (৯৫) ও পাবনায় ‘বি’ গ্রুপে পাবনা (৫৩/২) ৮ উইকেটে জয়পুরহাটকে (৫০) হারিয়েছে। বরিশাল বিভাগে জিতেছে বরিশাল। পিরোজপুরে তারা (৭৪/২) ৮ উইকেটে হারিয়েছে পটুয়াখালীকে (৭২)। সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জে সিলেট (১৭৯/৮) ২ উইকেটে জিতেছে মৌলভীবাজারের বিপক্ষে (১৭৮)। খুলনা বিভাগের খেলায় কুষ্টিয়াতে স্বাগতিকেরা (২৩০) ৩৩ রানে মেহেরপুরকে (১৯৭) হারিয়েছে।

ওয়ার্নার জেতালেন দিল্লিকে

টানা তিন ম্যাচ হারের পর আগের ম্যাচে জয় পেয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। কিন্তু কাল আবার জয়ের ধারা থেকে ছিটকে পড়ল তারা। ৪০ রানে হারল দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের কাছে।
দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায় কাল ঝড় তোলেন ডেয়ারডেভিলসের অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার। ৬৯ বলে ৯টি চার ও ৫টি ছয়ে করেন অপরাজিত ১০৭ রান। এটি এবারের আইপিএলে দ্বিতীয় সেঞ্চুরি (প্রথমটি ইউসুফ)। ওয়ার্নারের সেঞ্চুরি ও কলিংউডের (৫৩) ফিফটিতে দিল্লি ৪ উইকেটে তোলে ১৭৭ রান।
রান তাড়া করতে এসে কলকাতা ২১ রান তুলতেই হারিয়ে ফেলে সৌরভ গাঙ্গুলীসহ (৫) তিন উইকেট। দলীয় ৫০ রানে ক্রিস গেইলও (৩০) আউট হয়ে গেলে কলকাতার পরাজয় সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ডেভিড হাসি ৩২ বলে ২৯ এবং অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস ১৮ বলে ২৪ রান করলেও তা কলকাতার (১৩৭/৯) পরাজয়ের ব্যবধান কমানো ছাড়া কোনো কাজে আসেনি। ম্যান অব দ্য ম্যাচ ডেভিড ওয়ার্নার।