Thursday, May 30, 2013

কেন এই বিতর্ক? by সাজেদুল হক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিই তিনি ব্যতিক্রম। সমালোচিত-আলোচিত। তার বই নিয়েও বিতর্ক নতুন কিছু নয়।

ভাবের ঘরে চুরি by সাযযাদ কাদির

কিছু-কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা মেলে না বুদ্ধিতে। অনেক ভেবেচিন্তেও কূলকিনারা করতে পারি না সেগুলোর।  বিশ্বাস হতে চায় না, কিন্তু সত্য।

মঞ্জুর হত্যা মামলায় আদালতে এরশাদ by মবিনুল ইসলাম

বহুল আলোচিত মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার বিচার বিলম্বিত করার অভিযোগ করেছেন মামলার প্রধান আসামি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলাম।

বাংলাদেশ কোন পথে? by আলী রীয়াজ

জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এতে ভারতীয় উপমহাদেশে কীভাবে ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রসার লাভ করেছে এবং গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার দলগুলো কী ভূমিকা রেখেছে, তারও ব্যাখ্যা রয়েছে। তিন পর্বের নিবন্ধের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসঙ্গটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তা এর আগে আমরা কখনোই প্রত্যক্ষ করিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তো নয়ই, এমনকি সম্ভবত গত প্রায় এক শ বছরেও আমরা এই আকারে এই প্রপঞ্চের মুখোমুখি হইনি। এর কারণ কী? এই পরিস্থিতিকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের করণীয় কী? আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখায় তার কী প্রভাব পড়বে? এ ধরনের প্রশ্ন আমাদের সবার মনের ভেতরেই যে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে তা নয়, আমরা সবাই কমবেশি এ নিয়ে আলোচনা করছি। আমরা এ বিষয়ে বেশি করে উৎসাহী হয়েছি সাম্প্রতিক কালে জামায়াতে ইসলামীর সহিংস আচরণ ও তার নিষিদ্ধকরণের দাবির পটভূমিকায়, পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম বলে একটি সংগঠনের উত্থানের কারণে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয়, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বিষয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আপসমুখী অবস্থান, এই সব দলকে আশু স্বার্থে ব্যবহারের জন্য মরিয়া ভাব, ধর্মভিত্তিক দলের আড়ালে ও নামে সহিংসতার ব্যাপক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির চেহারা বিষয়ে উদ্বেগ নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বুঝতে চাইলে, তার বর্তমান অবস্থাকে উপলব্ধি করতে চাইলে কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪২ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয় বলে আমার ধারণা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি যখন তৎকালীন বাংলার সমাজজীবনে আলোড়ন তুলেছিল, তখনো আমরা রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের বিষয় নিয়ে কোনো রকম বিতর্ক দেখতে পাই না। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তখনো এই বিবেচনার মধ্যে আসেনি। কেননা সমাজে ধর্মের উপস্থিতি, ব্যক্তিজীবনে ধর্মাচরণের সঙ্গে রাজনীতির একটা দূরত্ব বজায় থেকেছে। আর তা ছাড়া বিষয়টি বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় একভাবে নিষ্পত্তিও হয়ে গিয়েছিল; বাঙালির ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে পাকিস্তান দাবির পেছনে ধর্মের বিবেচনা সত্ত্বেও এবং এ বিষয়ে চল্লিশের দশকে বাঙালি মুসলমানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও মনে রাখা দরকার, মুসলিম লিগকে কখনোই ধর্মভিত্তিক দল বলে বিবেচনা করা হয়নি, বাঙালি মুসলমান ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ২৫ বছরের ইতিহাসেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্ন কখনোই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল প্রশ্ন হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক দল গঠনের সুযোগ ছিল না; সাংবিধানিকভাবেই বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্ন ওঠেনি।
কিন্তু ইতিহাস হচ্ছে একটা কূপের মতো, আপনি কতটা গভীর পর্যন্ত খুঁড়তে চান তার ওপর নির্ভর করবে আপনি শেষ পর্যন্ত কী ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছেন। ধর্মভিত্তিক দল ও রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান প্রশ্ন ছিল না মানে কি এই যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কখনোই আমাদের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেনি?
১৯৪৭ সালে বাংলা প্রদেশ ভাগ হবে কি না সে প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে সংগঠনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো হিন্দু মহাসভা। ইতিহাসের সনিষ্ঠ পাঠকেরা জানেন যে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, আবুল হাশিম এবং শরৎ বসু স্বাধীন-সার্বভৌম যুক্তবাংলা গঠনের যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের কাছে তীব্র প্রতিবাদ করেন। ২ মে ১৯৪৭ সালে একটি চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘একটি স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা সম্বন্ধে কিছু এলোমেলো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। এর ভাবার্থ আমাদের কাছে একেবারেই বোধগম্য নয় এবং আমরা এর সমর্থন কোনোভাবেই করি না। হিন্দুদের কাছে এই পরিকল্পনা কোনো উপকারে আসবে না। স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা প্রকৃতপক্ষে একটি পাকিস্তানের রূপ নেবে... আমরা কোনোভাবেই ভারতের অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না (দেখুন, মাউন্ট ব্যাটেন পেপারস, নিকোলাস মানসার্গ ও অন্যান্য, দ্য ট্রান্সফার অব পাওয়ার, ১৯৪২-৪৭, ভলিউম ১০, পৃ. ৫৫৭। তা ছাড়া হিন্দু মহাসভার ভূমিকা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে)। বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই যে হিন্দু মহাসভাই কালক্রমে ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বলে পরিচিত ভূখণ্ডে ইসলামপন্থী রাজনীতির উপস্থিতি আরও পুরোনো। কার্যত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে, বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের মধ্যেই তার উদ্ভব। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় হাজী শরীয়তউল্লাহ্র নেতৃত্বে সংঘটিত ফারায়েজি আন্দোলন, বিশেষত দুদু মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন এবং তিতুমীরের নেতৃত্বে তারিক-ই-মুহাম্মাদিয়ার প্রভাবে ‘বাঁশের কেল্লা’ বলে পরিচিত আন্দোলন এই ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। সমাজসংস্কারের এসব আন্দোলন কালক্রমে রাজনৈতিক রূপ লাভ করেছিল। পরে কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের শক্তি সঞ্চয় হলে, তারাই প্রধান দলে পরিণত হলে এসব আন্দোলন হারিয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ মানসে, প্রচলিত লোককথায়, সংস্কৃতিতে তার প্রভাব একেবারে অবসিত হয়ে যায়নি। এখানে এটাও জোর দিয়ে বলতে চাই যে এই ধারার সঙ্গে অতিসমপ্রতি জামায়াতে ইসলামীর যোগাযোগ এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেও জামায়াত এই ধারার রাজনীতির প্রতিনিধি নয়। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তা হলো—আমরা কি এখন বহুধা বিভক্ত ইসলামপন্থী রাজনীতিকে একটি কেন্দ্রে সম্মিলিত হতে দেখছি?
আমরা এখানে এলাম কীভাবে?
ইসলামি রাজনীতির ধারা যদি মুসলিম লিগ আর কংগ্রেসের সাফল্যের কারণে ১৯৪৭ সালে নাগাদ দুর্বল ও প্রায়-নিঃশেষিত হয়ে গিয়ে থাকে, তবে আমরা আজকে কেন তার এই শক্তি দেখতে পাই—এ বিষয়টি বোঝা খুব জরুরি। বাংলাদেশের লোককথায় যে ইসলামি আন্দোলন, সেই ধারাটি পাকিস্তানি শাসনামলে (১৯৪৭-১৯৭১) আর বেগ লাভ করতে পারেনি, তার কারণ বহুবিধ। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জামায়াতে ইসলামীর আবির্ভাব। জামায়াতের নেতারা, এমনকি তাঁদের দীক্ষাগুরু আবুল আলা মওদুদী, প্রচলিত অর্থে মাদ্রাসায় শিক্ষিত নয়। পাকিস্তান আমলে জামায়াতে ইসলামী ইসলামপন্থীদের নতুন রাজনীতির জন্ম দেয়, যা নগরকেন্দ্রিক, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের নেতৃত্বাধীন এবং যার লক্ষ্য মানুষের আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়, এমনকি সমাজে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত নয়, কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। পাকিস্তান আমলে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর আধিপত্য ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে ও রাজনীতির প্রধান ধারায় তারা কোনো আবেদন রাখতে পারেনি; তার অন্যতম কারণ হলো সাধারণ শিক্ষার প্রসার, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ, নগরায়ণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব এবং পাকিস্তানিদের শোষণ।
বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালের পর জামায়াতে ইসলামী এবং ১৯৮১ সালে মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহর (হাফেজ্জি হুজুর) রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইসলামপন্থীরা রাজনীতিতে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করেছে। জিয়া ও এরশাদের আমলে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান, রাষ্ট্রধর্মের ঘোষণা এবং একই সময়ে প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আশ্রয়-প্রশ্রয় যেমন জামায়াতে ইসলামীকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি কওমি মাদ্রাসার প্রসারের কারণে মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামপন্থী দলগুলোর ভিত্তি জোরালো হয়েছে। সামরিক শাসকেরা তাঁদের অবৈধ শাসনকে বৈধতা দিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির শরণাপন্ন হয়েছেন, অন্যদিকে ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতির অতিসরলীকৃত অঙ্কের বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছে। দলগুলোর আচরণ থেকে মনে হয়, তাদের এই ধারণা হয়েছে যে সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার প্রমাণ দিতে হলে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে সব সময় তাদের সঙ্গে রাখা দরকার।
দেশের ইতিহাস এবং অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসারের কারণ সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়; কিন্তু তা সম্পূর্ণ চিত্রটি তুলে ধরে না। কেননা দেশের বাইরের ঘটনাপ্রবাহও এর পেছনে কাজ করেছে। তা ছাড়া প্রশ্ন থাকছে ধর্মভিত্তিক দল শক্তিশালী হয়ে উঠলে তার ফল কী।
l আগামীকাল পড়ুন: ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব বোঝার অক্ষমতা
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগেরঅধ্যাপক।

সংলাপ, তত্ত্বাবধায়ক ও একদলীয় নির্বাচন by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বর্তমান সরকার সম্প্রতি কিছুটা বেদিশা হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়। সরকারের ভেতরে নীতিগত সমন্বয় আছে বলেও মনে হয় না। একেক জন একেক কথা বলছেন। সম্প্রতি ঢাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার কথাই ধরা যাক। তিনি বললেন, ঢাকায় সভা-সমাবেশ এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ। তাঁর আইজিপি বললেন, ‘তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না।’ আওয়ামী লীগের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বললেন, ‘রিলিফের কাজের জন্য (ঢাকা কিন্তু পটুয়াখালী নয়) সভা-সমাবেশ বন্ধ করতে বলেছে।’ সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম ও আরও অনেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করে এ জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। (সূত্র: সংবাদপত্র)
সরকার কে চালাচ্ছে? কীভাবে চালাচ্ছে? মন্ত্রীরা কেন এত বেদিশা হয়ে উঠেছেন, তা অনুমান করা কঠিন নয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নির্বাচন হবেই—এমন নিশ্চয়তা মন্ত্রীরা পাচ্ছেন না। তাহলে? যদি অন্য রকমভাবে নির্বাচন হয়, তাহলে কি তাঁদের দল জিততে পারবে? জিততে না পারলে কী হবে, তা অনুমান করতে মন্ত্রীদের বেশি সময় লাগার কথা নয়। এ মুহূর্তে রাজনীতির অঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সংলাপ। অথচ সেই সংলাপ নিয়েও নানা রকম কথা বলছেন মন্ত্রীরা। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক পরিবেশ সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত করেছেন পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। এক মানববন্ধনে তিনি এসে ঘোষণা করেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা ছাড়া নির্বাচনকালীন কোনো সরকার হবে না। শেখ হাসিনার প্রশ্নে আপস নেই।’ এর মাধ্যমে তিনি তাঁর নেত্রীকে তাঁর ব্যক্তিগত আনুগত্যের বার্তাও দিয়ে দিলেন। বেচারা! সরকার একদিকে শর্তহীন সংলাপের কথা বলছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রেখেই অন্তর্বর্তী সরকার হবে।’ সর্বশেষ আবার সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রাখতে হবে এমন কোনো শর্ত তাঁরা দেননি। এই পদ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছেন, ‘যেকোনো স্থানে আলোচনা হতে পারে।’ এখন বলছেন, ‘যা কিছু বলার শুধু সংসদে এসে বলতে হবে।’
বিগত সাড়ে চার বছরের শাসনকালের কথা মনে পড়লে মন্ত্রীদের উল্টাপাল্টা কথা বলাই স্বাভাবিক। কারণ, তাঁরা জানেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাঁদের পরিণতি কী হবে। এক পার্সেন্ট ঝুঁকি নিতেও তাঁরা রাজি নন। কিন্তু মনে হয় নিজেদের ব্লুপ্রিন্ট মতো নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। দেশে তো বটেই, বিদেশিদেরও ধারণা, নির্দলীয় সরকার ছাড়া উপায় নেই। সরকার এ কথা বুঝতে পেরেছে যে দেশের বেশির ভাগ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির পক্ষে তারা সবাই বিএনপির সমর্থক, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রথম আলো সম্প্রতি যে মতামত জরিপ প্রকাশ করেছে (পরিচালনা করেছে একটি পেশাদারি সংস্থা), সেখানেও ৯০ শতাংশ লোকের মত তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে। অনেকে এই মতামত জরিপ নিয়ে নানা সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সারা বিশ্বে যে পদ্ধতিতে মতামত জরিপ পরিচালিত হয়, এখানেও তাই হয়েছে। ব্যতিক্রম কিছু নয়। প্রথম আলোর মতামত জরিপের পদ্ধতি নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেননি। সাধারণ আলোচনায়ও দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ মানুষ এবং ১৪ দলের বাইরে সব রাজনৈতিক দলই তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে। আমাদের ধারণা, সবাই নির্বাচনে একটা লেভেল প্লেয়িং মাঠ চায়। দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে সেই লেভেল প্লেয়িং মাঠটি পাওয়া যাবে না।
আওয়ামী লীগের কিছু নেতা শেখ হাসিনাকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান রাখার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ। নেত্রীকে খুশি করার এটা কৌশল। তাঁরা ভালোই জানেন, তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না। তবু নেত্রী তো জানতে পারলেন, তিনি (ওই নেতা) নেত্রীর কত অনুগত! আমাদের বড় দুই দলে নেত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রদর্শনের লড়াই রাজনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। আমাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতেও এই আনুগত্যের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে রেখে সংসদ নির্বাচনের যে বক্তব্য আওয়ামী লীগ দিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় আলোচ্য ইস্যু নিয়ে কোনো গঠনমূলক আলোচনায় তারা আগ্রহী নয়। আমাদের মনে হয়, আওয়ামী লীগ ও সরকার ধারণা করছে, বিএনপির ওপর জেলজুলুম চালানোর পর তারা এত দুর্বল হয়ে পড়েছে যে তাদের পক্ষে বড় মাপের কোনো আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। এই ধারণা খুব ভুল, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। বর্তমান সরকার নানা কৌশলে বিএনপির প্রথম সারির অনেক নেতাকে কারাবন্দী করে রেখেছে। অনেকের নামে মামলা ঝুলছে। সব মিলিয়ে বিএনপি প্রায় কোণঠাসা অবস্থায়। তবু একটা কথা আছে, ‘হাতি মরলেও লাখ টাকা।’ বিএনপি বড় একটি দল। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে তাদের কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। নয়াপল্টনে তাদের সমাবেশ দেখলে বোঝা যায় তাদের শক্তি কত। সরকার বিএনপিকে ছোট করে দেখলে ভুল করবে।
কাজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি বড় মাপের আন্দোলন করতে পারবে না, এমন মনে করা ঠিক হবে না। তবে আন্দোলনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হোক, তা আমরা চাই না। তাতে দেশের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি হবে। অনেক মানুষের প্রাণহানিও হতে পারে। আমরা আশা করব, সরকার বিলম্বে হলেও সংলাপের জন্য এজেন্ডাসহ চিঠি দেবে সব বিরোধী দলকে। এজেন্ডাসহ চিঠি না দেওয়া পর্যন্ত বল কিন্তু সরকারের কোর্টেই থেকে যাচ্ছে। চিঠি না দিয়ে সরকারের মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগ নেতারা সংলাপ নিয়ে যত কথাই বলুন, তাতে সরকারের আন্তরিকতার প্রতিফলন হয় না।
অনেকে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন। এটা একেবারেই অসার কথা। সংবিধান জনগণের জন্য। সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। সরকার জনগণের ইচ্ছাকেই সব সময় অগ্রাধিকার দেবে। এটাই বাস্তবতা। সরকার যদি জনগণের মনের কথা পড়তে পারেন, তাহলে সংবিধান সংশোধন করে ‘যা জনগণের দাবি’ সেটাই সংবিধানে সংযোজন করবে। এটা এক ঘণ্টার কাজ। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে সংবিধানের দোহাই যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁরা জনগণকে ‘হাইকোর্ট’ দেখানোর চেষ্টা করছেন।
ইদানীং আরেক রকম চালাকির কথা শোনা যাচ্ছে। সরকারপন্থী কেউ কেউ বলছেন, ‘নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনার বদলে স্পিকারকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিতে পারেন।’ এই কথার মধ্যে একটা আপাত-নিরপেক্ষতার কৃত্রিম আভাসও পাওয়া যায়। এটা আরেক ধরনের চালাকি। ভাবটা এ রকম, ‘শেখ হাসিনার ব্যাপারে তোমাদের আপত্তি তো, ঠিক আছে স্পিকারকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলো। এবার রাজি হও।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল দর্শনটা হলো নির্দলীয় সরকার। স্পিকার কি নির্দলীয় ব্যক্তি? সরকার পরিচালনায় তিনি নেপথ্যে কার কাছ থেকে নির্দেশ বা পরামর্শ গ্রহণ করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। কাজেই দলীয় কোনো ব্যক্তিই নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতে পারবেন না—এটাই বিরোধী দলের দাবি। শেখ হাসিনার বদলে স্পিকারের প্রস্তাব তারা মানবে না।
একটা কথা বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মনে রাখা দরকার। নির্বাচনের সময় এমন একটা সরকার থাকতে হবে, যে সরকার ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে অসংখ্য সরকারি পদে রদবদল ঘটাতে পারেন। আগের সরকারের কোনো ছক যেন নির্বাচনের সময় বাস্তবায়িত না হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে এভাবেই কাজ শুরু করতে হবে। এই রদবদল কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষের জন্য নয়। আগের সরকারের ছক নষ্ট করার জন্য এটা খুবই প্রয়োজন। অনেকে এমনও মনে করছেন, ‘বিএনপিসহ বেশির ভাগ বিরোধী দল অংশ না নিলেও বর্তমান সরকার নির্বাচন করে ফেলবে।’ হ্যাঁ, করে ফেলতে পারে। এটা কষ্টকর, কিন্তু অসম্ভব কাজ নয়। এ ধরনের নির্বাচনে একটি গৃহপালিত বিরোধী দলও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু জেনারেল এরশাদ বলেছেন, তিনি এ ধরনের নির্বাচনে যাবেন না। তাহলে তো এই পার্লামেন্টে বিরোধী দলই পাওয়া যাবে না। ৩০০ আসনেই ১৪-দলীয় জোট জয়ী হবে। এটা বিশ্ব রেকর্ড হতে পারে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ রকম একদলীয় নির্বাচনের সরকার টিকতে পারে না। দেশে বা বিদেশে কারও সমর্থন পায় না। সরকার কাজ করতে পারে না। বিরোধী দল প্রথম দিন থেকে শুরু করবে আন্দোলন। সেই আন্দোলনে একদলীয় নির্বাচনের সরকার টিকতে পারবে কি? টিকতে না পারলে এক বছরের মাথায় আবার সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ১৪-দলীয় জোটের অবস্থা কী হতে পারে, তা কি শেখ হাসিনা একবার ভেবে দেখেছেন?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ওউন্নয়নকর্মী।

লিটলম্যাগের সেই তরুণ by মফিদুল হক

পয়লা বৈশাখ থেকে কয়েক দিন দেশের বাইরে ছিলাম, খবরটি নিশ্চয় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ছোট খবর হবে হয়তো, তবে উপেক্ষা করার মতো সংবাদ তো নয়। ছাপা হলেও আমার চোখ তা এড়িয়ে গেছে। এখন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের মধ্যে সুমুদ্রিত একটি খামের ওপর চোখ আটকে গেল, স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম একবার-দুবার বারবার। নাগরিক শোকসভা কথাটা বড় করে লেখা, পাশে ছাপা হয়েছে ‘জাহিদ আনোয়ার-এর অকালপ্রয়াণে’, বিশ্বাস করা কঠিন এই বার্তা। বৈশাখেই তাঁর জন্ম, ২৮ এপ্রিল, ১৯৫৮ এবং লোকান্তরিত হলেন আরেক বৈশাখে, ১৬ এপ্রিল, ২০১৩। প্রাণবন্ত তরুণ জাহিদকে চিনি অনেককাল, দেখা-সাক্ষাৎ হতো কম, ওর দিক থেকে উদ্যোগ থাকলেই হতো সাক্ষাৎ, তবে যখনই দেখা হতো, জানতে পারতাম কোনো একটা কিছু নিয়ে মেতে আছে জাহিদ আনোয়ার। বলিষ্ঠ শক্তপোক্ত শরীর, ঘুরে বেড়ায় নানা কাজের পেছনে, হুঁশিয়ার মানুষেরা বলবেন অকাজের পিছু পিছু, কিন্তু জাহিদ প্রাণের আনন্দ খুঁজে পান এসব অকাজেই। তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নওগাঁর সংগঠক এবং দেশজুড়ে যেসব পাগলপ্রাণ তরুণকে একত্র করতে পেরেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বেশ বোঝা যায় সেখানে জাহিদের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। নওগাঁর আরও নানা কাজে জাহিদের সম্পৃক্তি, অমন এক ছোট মফস্বল শহর, যা পূর্বতন সৌন্দর্য ও গুরুত্ব হারিয়েছে অনেক আগে, সেখানে আবার সাহিত্যের ও শিল্পের দীপশিখা জ্বালাতে যাঁরা মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন জাহিদ আনোয়ার। তাঁর প্রাণোচ্ছ্বাস আবর্তিত হতো লিটল ম্যাগাজিন অঞ্জলি লহ মোর ঘিরে, সম্পাদক-প্রকাশক তিনি নিজেই, কোনোভাবেই পত্রিকার কোনো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ছিল না, ছিল আকাশচুম্বী স্বপ্ন।
এই স্বপ্নই জাহিদ আনোয়ারকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল, আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল নিঃস্বার্থ শুভব্রতী কর্মতাড়িত এক যুবকের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে নিজের মনের জোর আরেকটু বাড়িয়ে তোলা। সামান্য এক অনুরোধ ছিল জাহিদ আনোয়ারের, কলকাতা বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে তিনি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে হাজির হতে চান। আমি ভালোভাবেই বুঝি এই প্রস্তাবে বাণিজ্যিক কোনো সুবিধা অর্জিত হওয়ার নেই, লিটল ম্যাগাজিন যাঁরা প্রকাশ ও ফেরি করে বেড়ান, তাঁদের সঙ্গে বাণিজ্য-লক্ষ্মীর যোগও বিশেষ নেই। আমার দিক থেকে দু-একটি মামুলি সুপারিশপত্র দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। পরে দেখা গেল, কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে জাহিদ আনোয়ার নিজের জন্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসন করে নিতে পেরেছেন, তাঁর মতো আরও অনেক সমমনা মানুষ তিনি সেখানে পেয়েছিলেন এবং এঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশ নিবিড় হয়ে ওঠে। একবার বইমেলায় দেখি, জাহিদ আনোয়ার সস্ত্রীক মেলা আলো করে বসে আছেন। পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন ছোট শহর থেকে উঠে আসা তাৎপর্যময় লিটল ম্যাগাজিনের যাঁরা সম্পাদক-প্রকাশক, তাঁরাও জাহিদ আনোয়ারের মধ্যে নিজ সত্তার প্রতিরূপ খুঁজে পেয়েছিলেন এবং পরস্পরের জন্য আনন্দদায়ক হয়েছিল এই যোগ।
জাহিদ আনোয়ারকে দুই বাংলার লিটল ম্যাগাজিনের সেতুবন্ধ হিসেবে আমি দেখেছি, জেনেছি। জানি না তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজ ও অবদানের কোনো ধরনের স্বীকৃতি তিনি কখনো পেয়েছেন কি না, কিন্তু মনের আনন্দে এমন কাজ করে গেছেন জাহিদ আনোয়ার, যদিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় জীবনে ও সংসারে সফলতা পাওয়ার জন্য এসব মোটেই অনুকূল ছিল না। তাঁর কাছ থেকে অনেকবারই উপহার পেয়েছি অঞ্জলি লহ মোর, যখনই হাতে নিয়েছি সেই লিটল ম্যাগাজিন, আমার মনে পড়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নওগাঁর কথা, যার শ্রীমন্ত রূপ ধরা আছে ‘কাল মধুমাস’ কবিতায়। মনে হতো হারিয়ে যাওয়া পুরোনো সেই নওগাঁ তার সৌন্দর্য ও শক্তিময়তা নিয়ে আবার বুঝি জেগে উঠতে চাইছে নতুনভাবে। সেই নতুনের প্রতীক এই তরুণকে যে আমি ভালোবেসেছিলাম, সেটা কবুল করতে দ্বিধা নেই। আজ এ-কথা ভাবতে গিয়ে মন আরও বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে যায়, স্ব-সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নাম জাহিদ আনোয়ার কেন রেখেছিল অঞ্জলি লহ মোর, যে নাম-পরিচয়ে কেবল নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার আকুতি আছে, বিনিময়ে কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই। ওর কি কোনো তাড়া ছিল, আর তাই সবটুকু এমন উজাড় করে দিয়ে চলে গেল, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে, কারও কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি না রেখে।
কিন্তু ঋণ তো আমাদের রয়ে গেল অপরিশোধ্য।
মফিদুল হক: লেখক ও সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব।

জনস্বার্থে..by সঞ্জয় কুমার ভৌমিক

আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হরতাল’। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতার উত্তাপ অনেকটাই বেগবান হয়। ভোগান্তি বাড়ে সাধারণ মানুষের। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি। যার কম-বেশি প্রভাব পড়ে প্রত্যেক ক্ষেত্রে। শিক্ষাজীবনে এসএসসির পরই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাফল্য লাভের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যায় তার লক্ষ্যে। হরতালের কারণে বারবার সময়সূচি পরিবর্তনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি অনেকটাই ছিল দোদুল্যমান। সেই সঙ্গে বাড়ল উৎকণ্ঠা। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে যে দুশ্চিন্তা থাকে শিক্ষার্থীদের মনে, তার চেয়েও বেশি চিন্তিত হতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের সময়সূচি নিয়ে। যা পরীক্ষার্থীদের মানসিকভাবে অসহায় করেছে। পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যা দুঃখজনক। অতীত ও বর্তমান পরিবেশকে যদি খতিয়ে দেখা হয় নিখুঁতভাবে, তবে দেখা যাবে আন্দোলনকে চাঙা করতে কিংবা দাবি আদায়ের পথ ধরে অথবা কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো হরতালকে বেছে নিয়েছে বারবার। হয়তো প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে হরতালের বিকল্প তারা খুঁজে পায়নি। হতে পারে এটা ব্যর্থতা। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, সবার আগে দেশ, দেশের জনগণ। যা হতে হবে জনস্বার্থে, জনগণের কল্যাণে।
আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। প্রয়োজন দেশকে নিয়ে ভাবার। আর দেশের জন্য কাজ করতে হলে সাইনবোর্ড লাগানোর প্রয়োজন হয় না। রানা প্লাজা ধসে চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমাদের দেশের পোশাকশিল্পের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি অনেকটাই ক্ষুণ্ন হয়েছে সাভার ট্র্যাজেডির কারণে। হরতালে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাহত হচ্ছে অর্থনীতির সচলতা। নানা সময়ে নানা দুর্নীতি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে উন্নয়নের পথে।  প্রয়োজন দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে এক হয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করা।
সঞ্জয় কুমার ভৌমিক
বসুন্ধরা আ/এ, শ্রীমঙ্গল।

বিসিএসের প্রশ্নপত্র by মো. আবদুর রহমান

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ‘ইনসুলিন নিঃসৃত হয় কোথা থেকে?’ প্রশ্নটির উত্তর হিসেবে প্রদত্ত চারটি অপশনের মধ্যে দুটি অপশন দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে ‘অগ্ন্যাশয়’ ও ‘প্যানক্রিয়াস’। উল্লেখ্য, অগ্ন্যাশয় ও প্যানক্রিয়াস একই জিনিস এবং সমার্থক। সে হিসেবে দুটি উত্তরই সঠিক। ফলে অনেক পরীক্ষার্থী অগ্ন্যাশয় ও প্যানক্রিয়াস দুটি অপশনকেই সঠিক হিসেবে উত্তরপত্রে উল্লেখ করেছেন। এ অবস্থায় পিএসসি কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে এ উত্তরটিকে সঠিক হিসেবে বিবেচনা করবে কি না, সে বিষয়ে পরীক্ষার্থীরা বেশ চিন্তিত। দুটি অপশনই সঠিক বিধায় এ ক্ষেত্রে একটি অপশন চিহ্নিতকারী এবং দুটি অপশন চিহ্নিতকারী উভয়ের ক্ষেত্রেই নম্বর দেওয়া বাঞ্ছনীয়। নতুবা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হবে। এ ধরনের জটিলতা এড়াতে প্রশ্নপত্রে উত্তর হিসেবে সমার্থক দুটি অপশন রেখে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কাম্য নয়। এ বিষয়ে পিএসসি কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
মো. আবদুর রহমান
মালিবাগ, ঢাকা।

ডিএসসিসির গাড়িবিলাস

চার মিনিটে চার শ বছরের ঢাকা ভাগ হয়েছিল। তখনই শঙ্কা ছিল, বহু ক্ষেত্রে জনগণের অর্থের অহেতুক শ্রাদ্ধ হতে পারে। ২৬টি অতিরিক্ত গাড়ি থাকার পরও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রস্তাবিত জনবলের দোহাই দিয়ে পৌনে আট কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ১৬টি নতুন গাড়ি ক্রয়ের উদ্যোগ তারই নমুনা। রাজউকের প্রস্তাবিত দুই হাজার ৭০০ জনবলের ৫০০ ছেঁটে ফেলে গত তিন বছরেও সরকার তা চূড়ান্ত করেনি। উপরন্তু, ডিএসসিসির বিদ্যমান গাড়ির অপব্যবহারের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা ‘ওলট-পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’ কথাটিই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে নতুন গাড়ি কিনতে ডিএসসিসিকে দেওয়া চাহিদাপত্র বাতিল করা। আর তদন্ত করে দেখা যে কী করে গাড়িবিষয়ক দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে ডিএসসিসির তদন্ত কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে ওই চাহিদাপত্র অনুমোদন লাভ করল। এই প্রক্রিয়াও দুর্নীতিগ্রস্ত। সুতরাং, মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী ও মুখ্য হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তারও জবাবদিহি দরকার। প্রতীয়মান হচ্ছে যে সরকারি গাড়ি ব্যবহারে নিয়মনীতি সব লাটে উঠেছে। প্রভাবশালী কর্মকর্তারা পদ-পদবিনির্বিশেষে খেয়ালখুশিমতো গাড়ি ব্যবহার করছেন। এমনিতেই জনপ্রশাসনের বেহাল অবস্থা। শুধু খবরের কাগজে প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার কারণে এসব কর্মকর্তার কিছুই আসবে-যাবে না। পদাধিকারবলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়টা চালান ক্ষমতাসীন দলের দ্বিতীয় শক্তিশালী ব্যক্তি। কিন্তু গত সাড়ে চার বছরে এই মন্ত্রণালয় তার নিজের প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যায় না। গত ফেব্রুয়ারিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করার মুখ্য দায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর। গাড়িবিষয়ক ওই তদন্ত কমিটি বলেছিল, বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী গাড়ি থাকবে ৩৯টি, ব্যবহূত হচ্ছে ৬৫টি। ঢাকা দুই টুকরো হওয়ার আগের আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার জ্বালানি তেল খরচ দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে মন্ত্রী-সচিব নির্বিকার। আশা করব, এবারে অন্তত গাড়ি দুর্নীতির রাশ টানতে কুম্ভকর্ণদের ঘুম ভাঙবে। অবিলম্বে ডিএসসিসির গাড়ি কেনার চাহিদাপত্র বাতিলের পাশাপাশি গাড়ি অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হোক।

শরীরচর্চা শিক্ষক

সরকারি-বেসরকারি কলেজের শরীরচর্চার শিক্ষকেরা নানা পেশাগত বৈষম্যের শিকার। উপযুক্ত যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা থাকলেও পদোন্নতির সুযোগ নেই। নিম্ন পদমর্যাদার এই শিক্ষক ক্রীড়া বিষয়ের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও কলেজের ক্রীড়া কমিটির সম্পাদক হতে পারেন না। নিজের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বিস্তার না করলে স্বাভাবিক নিয়মে শরীরচর্চা শিক্ষককে কলেজ পরিচালনা পরিষদের শিক্ষক প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগও দেওয়া হয় না, শিক্ষক পরিষদের সদস্য হয়ে অন্যদের নির্বাচিত করা সুযোগ থাকলেও অন্য শিক্ষকেরা শরীরচর্চা শিক্ষককে নির্বাচিত করার ঔদার্য দেখান না। কেননা, বরাবরের মতো কলেজের সব কমিটিতে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকের জ্যেষ্ঠতা বিচার করা হয়। কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলা স্তিমিত হওয়ার অন্যতম কারণ প্রভাষক থেকে নিচের পদমর্যাদার শরীরচর্চা শিক্ষকের মতামত যেখানে উপেক্ষিত, অগ্রাহ্য ও গুরুত্বহীন। ফলে ক্রীড়ার ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহী শিক্ষকটিও একসময় চোখ-কান বুজে কোনোরকমে চাকরিজীবন পার করতে ব্যস্ত হন। খেলাধুলাকে সবাই ভালোবাসলেও খেলাধুলাবিষয়ক শিক্ষকের অবস্থান সবার নিচে। উচ্চতর যোগ্যতায় ডিগ্রি কলেজের লাইব্রেরিয়ানদের প্রভাষকের সমমর্যাদা থাকলেও শারীরিক শিক্ষায় মাস্টার্স (এমপিএড) বা অন্য বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রির শর্ত নিয়োগবিধিতে না থাকায় শরীরচর্চা শিক্ষকেরা প্রভাষকের অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে শারীরিক শিক্ষায় অনার্স-মাস্টার্স চালু হওয়ায় সত্ত্বেও উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ের এই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা পরিবর্তন হচ্ছে না। তাই শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আবেদন, কলেজের ক্রীড়া উন্নয়নে শারীরিক শিক্ষা পাঠক্রম চালু ও শরীরচর্চা শিক্ষকদের পেশাগত বৈষম্য অবসানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলা-বঞ্চনার অবসান ঘটানো হোক।
চঞ্চল কুমার কর্মকার
শরীরচর্চা শিক্ষক, কুমারখালী কলেজ, কুষ্টিয়া।