Monday, November 2, 2009

বাবার কথা বলছি -স্মরণ by সুমায়রা আজীম

ছোটবেলায় মায়ের মুখে গল্প শুনেছি রূপকথার এক রাজকুমারের, যে রাজ্য নয়, সেনা নয়, ঐশ্বর্যও নয়, ছোটবেলা থেকে ছিল প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুরাগী।
গ্রাম-বাংলার সাধারণ জীবন, বাংলার শ্যামল প্রকৃতি, বিস্তৃত দিগন্ত আর শান্ত নদী আকৃষ্ট করত সেদিনের সেই ছোট্ট রাজপুত্রের কোমল মন। সে আমার বাবা শিল্পী মবিনুল আজিম; আমার কাছে শিশুকাল থেকে যে কেবলই ছবি।
শিল্পী মবিনুল আজিম। পদ্মার উত্তাল তরঙ্গ আর লাল কৃষ্ণচূড়া, শিশুকাল থেকে যাঁকে দিয়েছে প্রকৃতি ও রঙের জাদুর অনুপ্রেরণা। শিল্পী মবিনুল আজিমের জন্ম ১৯৩৪ সালে ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে, ছেলেবেলা থেকেই বাংলার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ ছুঁয়ে যেত তাঁর মন। ধরণীর শ্যামল দিগন্তের অপার সৌন্দর্য মুগ্ধ করত তাঁকে। এ প্রাকৃতিক দৃশ্য দোলা দিত তাঁর শিশুমনে।
সেসব সুন্দর দৃশ্য স্কুলের খাতায় পেন্সিলে ধরে রাখার চেষ্টায় সদা সচেষ্ট হতেন শিশু মবিনুল আজিম। তাই প্রবেশিকা পরীক্ষা পাসের পর ভর্তি হলেন তত্কালীন ঢাকা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে স্নাতক পাস করে বের হলেন পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। কিছুদিন শিক্ষকতাও করলেন সেখানে। তারপর জীবনের প্রয়োজনে পাড়ি জমান তত্কালীন বন্দরনগর করাচিতে। তখনো ছবি আঁকা অব্যাহত ছিল তাঁর। করাচিতে থাকাকালেই বাবার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়েছিল ঢাকায় ১৯৬৪ সালে। বড় হয়ে স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া বাবার সে সময়ের চিত্রকর্মের এক প্রতিবেদন পড়তে গিয়ে চোখে পড়েছিল কোনো একজন প্রতিবেদক লিখেছিলেন, ‘পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী সভ্যতার আধুনিকতম শিল্পভাবনার সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত রেখেও মবিনুল আজিম পাকিস্তানি কিছু শিল্পীর মতো বিভ্রান্ত নন, নন মোহগ্রস্ত, ফলে তাঁর ছবি স্মৃতির ভারে নয় অবনত, নয় দুর্বোধ্যতার আবরণে চিহ্নিত।’
মায়ের মুখে শোনা—শিল্পী মবিনুল আজিম তাঁর তুলির টানে আর রঙের মিশ্রণে এমন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন, যা আকৃষ্ট করত দর্শককে। বাবার এ রং-তুলির খেয়ালে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় তিনি তুলে ধরেছিলেন বাংলার নৌকা, নদী, মাছ ধরার জাল, পাখি, চাঁদ, ফুল প্রভৃতির অনুষঙ্গ। বাবা যদিও তাঁর যৌবনের অনেক মুহূর্ত কাটিয়েছেন করাচি নগরে, তবু ভুলতে পারেননি তাঁর ফেলে আসা শৈশবের বাংলা, বাংলার মধুর স্মৃতি। তাই তো এক যুগেরও বেশি সময় পার করে দেশের ছেলে আবার ফিরে এলেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে; শৈশব আর যৌবনের প্রারম্ভের স্মৃতিবিজড়িত এ বাংলায়। অনেকটা সেই এক যুগ আগে যেমন করাচিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন শুধু শিল্পসাধনার আকাঙ্ক্ষা আর মনোবল নিয়ে, তেমনই অবস্থায় ফিরে এলেন নিজের দেশে। কিন্তু স্বদেশ তাঁকে দিল আরও দুঃখ, আরও যন্ত্রণা। তাই বলে তিনি বসে থাকেননি, নিজের সাধনা তিনি একাগ্রচিত্তে করে গিয়েছেন। দেশে ফিরে আসার পর এখানকার অনেক শিল্পীই বাবাকে করেননি কোনো সহযোগিতা, বরং তাঁকে কোণঠাসা করতে চেয়েছেন তাঁরা। অভিমানী বাবা আবার জীবিকা নির্বাহের জন্য ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে আর্টের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই শিক্ষকতা করেন। ঢাকায় এসে মাত্র দুবার চিত্রপ্রদর্শনী করেছেন তিনি। নীরবেই কাটছিল তাঁর দিনগুলো। শুনেছি বাবার ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী, অন্তরঙ্গ বন্ধু (রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞ শ্রদ্ধেয় আতিকুল ইসলাম) আতিক চাচা বাবার মৃত্যুর কিছুদিন আগেই হঠাত্ এক দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন থেকে নাকি বাবা প্রায়ই বলতেন, ‘আতিক যখন চলে গেছে, আমিও বোধহয় আর বেশিদিন থাকব না।’ বাবা বোধহয় তাঁর পরপারের অকাল যাত্রার আহ্বান আগেই শুনতে পেয়েছিলেন। সত্যিও হয়েছিল তাঁর ধারণা। তাই তো হঠাত্ বাবা কী তা বুঝে ওঠার আগেই আমাদের দুই বোন আর মাকে একা করে দিয়ে চলে গেলেন নীরবে ১৯৭৫ সালের ১ নভেম্বর মধ্যরাতে। বুকে একরাশ অভিমান চেপে, সেই অভিমান নিজের ওপর। কোনো অপ্রাপ্তির জন্য নয়, মানুষের সংকীর্ণতা দেখতে হয়েছে বলে।
নিতান্ত আপনজন ছাড়া কেউ জানল না তাঁর এ অকাল মৃত্যুসংবাদ। কষ্ট হয় এই ভেবে, কেউ বলাবলিও করল না তাঁকে নিয়ে; পত্রিকার পাতায় সামান্য একটু জায়গাও হলো না তাঁর মৃত্যুসংবাদের। বেশ কয়েকদিন পর রেডিওতে নাকি প্রথম কেউ কেউ শুনতে পায়, তাঁর নীরবে চলে যাওয়ার কথা। আমাদের ছেড়ে দূরে বহুদূরে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া আমার বাবা, ছেলেবেলায় গল্পে শোনা সেই রাজপুত্রের হঠাত্ই মৃত্যু সম্পর্কে।
বাবার আঁকা অসংখ্য জলরং ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: একটি পাহাড়ি নিসর্গ, সেটির সম্মুখ অংশে একটি হ্রদ এবং পেছনে দলবদ্ধ পাইন গাছ, এরই ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া দূরবর্তী টিলা। আরও একটি নিসর্গ, সেটির মূল বিষয় দিগন্তবিস্তৃত ঘোরানো-পেঁচানো মহাসড়ক, এর পেছনে সবুজ বনানী আর খয়েরি পাথররাজি। বাবার আরও একটি উল্লেখযোগ্য কাজ সোনারগাঁ, এ ছবির বিষয় কয়েকটি পাকা ঘর, ঘরের পাশের কয়েকটি কবর ও বৃক্ষের অনুষঙ্গে এমন নিস্পৃহ-নিস্পন্দ আবহের সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক যেন পরাক্রমশালী ইশা খাঁর সময় স্থির হয়ে আছে সে ছবিতে। এ ছাড়া ঘরগুলো নির্মাণে রঙের যে ব্যবহার ও জ্যামিতিক কাঠামোর যে গড়ন-কৌশল, এর পরিণতি সৃজনশীলতার পরিচয় বহনকারী। এ ছাড়া তিনি তাঁর চিত্রকর্মে তেলরং ব্যবহারের এক সৃজনশীল কৌশলও আয়ত্ত করেন এবং উপহার দেন শিল্পরসিকদের তেলরঙে নিজস্ব পদ্ধতি রপ্ত বহু শিল্পকর্ম।
আশা করি, বাবা মবিনুল আজিম নন, শিল্পী মবিনুল আজিম হারিয়ে যাবেন না চিরতরে। তিনি আছেন এখনো যেমন আমাদের পরিবারের মধ্যে, তেমনি থাকবেন এ দেশের শিল্পী ও শিল্পরসিকদের মধ্যে চিরদিন, তাঁর শৈল্পিক সৃষ্টির মাধ্যমে।

প্রস্তাবিত ভৈরব জেলার মানচিত্র কীভাবে আঁকা হবে by সুমন রহমান

সরকার ভৈরবকে জেলায় পরিণত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার সভাপতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব। নয় সদস্যের এ কমিটি সুপারিশ করবে প্রস্তাবিত ভৈরব জেলায় বিভাগীয় কোন অফিসগুলো স্থাপন করা হবে; জেলা অফিসগুলো স্থাপনের জন্য ভৌত অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় লোকবল ও অর্থের সংকুলান কীভাবে হবে, তাও সুপারিশ করবে কমিটি। এর চেয়ে সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ যে সুপারিশটি কমিটিকে করতে হবে সেটি হচ্ছে ভৈরব জেলার সীমানা নির্ধারণ বিষয়ে। কমিটিকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে এক মাস। এ নিয়ে কমিটি কাজ শুরু করার আগেই তেতে উঠেছে মাঠপর্যায়।
ভৈরবের বর্তমান জেলা সদর কিশোরগঞ্জ শহরে এ জেলার ‘অখণ্ডতা’ রক্ষার আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছে। কিশোরগঞ্জের সঙ্গে গাঁটছড়া অক্ষুণ্ন রাখার ঘোষণা দিয়েছে কটিয়াদী ও নিকলী উপজেলাবাসী। বাজিতপুরের লোকজন ভাবছে, তাদের জেলা হওয়ার নৈতিক দাবি ভৈরবের থেকে ঐতিহাসিক কারণেই বেশি। কটিয়াদী বা নিকলীর জন্য জেলা সদর হিসেবে কিশোরগঞ্জ বেশি সুবিধাজনক বলে এসব উপজেলার লোকজনেরা ভাবছে। নিকলী থেকে কিশোরগঞ্জের দূরত্ব যেখানে ১০ কিলোমিটার, সেখানে নিকলী-ভৈরবের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার প্রায়। একমাত্র কুলিয়ারচর উপজেলার ভৈরব বিষয়ে কোনো গুরুতর আপত্তি নেই মনে হয়। আর হাওর অঞ্চলে অষ্টগ্রামের মনোভাব তেমন নেতিবাচক মনে হচ্ছে না। আবার এদিকে রায়পুরা উপজেলার পূর্বাঞ্চলের সাতটি ইউনিয়ন প্রস্তাবিত ভৈরব জেলার আওতায় আসতে চায়। একটি জেলার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ছোট অঞ্চলগুলোর ব্যক্তিত্ব এভাবে জেগে ওঠা বেশ মজার। একদিকে জেলার প্রজ্ঞাপন হাতে পেয়ে ভৈরবে যেমন মিষ্টি বিতরণ চলছে, অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ, বাজিতপুর, কটিয়াদীতে চলছে রেল, সড়ক ও নৌ অবরোধ, আইনজীবীদের কলম বিরতি, স্মারকলিপি প্রদান ইত্যাদি।
আদিতে ময়মনসিংহ জেলার অংশ ছিল ভৈরব। তারপর কিশোরগঞ্জকে জেলা করার সময় ভৈরবকে কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জেলা হিসেবে কিশোরগঞ্জও ময়মনসিংহ-মাতৃকার সিজারিয়ান বেবি, এ কথা বর্তমানের ‘অখণ্ড’ কিশোরগঞ্জের প্রবক্তারা বোধহয় ভুলে গেছেন! জেলা হওয়ার আগে কিশোরগঞ্জ মহকুমা ছিল। ভৈরবেরও মহকুমা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু হয়নি। এরপর মহকুমা জিনিসটিই উঠে গেছে। এসেছে উপজেলা, কোর্টকাচারিটুকু বাদ দিলে সেটি থানার নামান্তরমাত্র। এটি নিশ্চয়ই ঠিক যে ভৈরব স্মরণাতীতকাল থেকেই কিশোরগঞ্জ তথা গোটা হাওর অঞ্চলের বাণিজ্যিক রাজধানী বা বিজনেস ডিসট্রিক্ট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ভৈরবের ঐতিহ্য অনেক পুরোনো, এ জায়গায় কিশোরগঞ্জের জেলা-পরিচয়ের দ্বারস্থ কখনোই ছিল না ভৈরব। একই ভাবে কিশোরগঞ্জের সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাজিতপুরের রাজনৈতিক তত্পরতার ইতিহাস এসব শহরের আলাদা আত্মমর্যাদা তৈরি করেছে। এ রকম প্রতিটি জনপদেরই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা আছে, বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তে সেগুলো তৈরি হয় এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিকতা দিয়ে এর আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনও হয়। বাজিতপুরের লোকজনেরা ভাবছে, পুরোনো পৌরসভা হিসেবে জেলা হওয়ার দাবি ভৈরবের থেকে কোন দিক থেকে কম? আবার কিশোরগঞ্জের লোকজনেরা ভাবছে, ভৈরবের মতো ‘পয়সাঅলা’ উপজেলা হারালে জেলা হিসেবে মানমর্যাদা নিয়ে জেলাসমাজে মুখ দেখানো যাবে কি না! অন্তত কিশোরগঞ্জের আইনব্যবসায় একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়বে, কিশোরগঞ্জের ‘অখণ্ডতা’ রক্ষার আন্দোলনের পুরোভাগে আইন পেশার মানুষজনকে দেখে এটুকু আঁচ করা যায়।
দেখা যাচ্ছে, এ ‘জেলা’ নামক জিনিসটিকে নিছক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ইউনিট ভাবছে না কেউই, এটি জড়িয়ে পড়ছে জনপদের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদাবোধ ও অর্থনীতির সঙ্গে, আবার একই সঙ্গে সেটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের বোধেরও স্মারক হয়ে উঠছে। এটিও ঠিক যে জেলার স্বীকৃতি ভৈরবের জন্য যতটা না প্রশাসনিক প্রয়োজনের, তার চেয়ে বেশি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রের ঐতিহাসিক স্বীকৃতির লক্ষ্যে। যেকোনো ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ কাজে গতির সঞ্চার করে। জেলার স্বীকৃতি ভৈরবকেও সে রকম গতির মধ্যে নিয়ে আসবে সন্দেহ নেই।
তবে যাঁরা আলোচনার টেবিলে বসে ভৈরব জেলার মানচিত্র বানাবেন, তাঁরা এসব ঘটনাকে খাটো করে দেখবেন না আশা করি। লর্ড মেকলের ৪০ দিনে ভারত-বিভাগের মতো কিশোরগঞ্জের ম্যাপ কেটে-ছিঁড়ে একটি ভৈরব জেলা বের করে আনলে ফল খুব স্বস্তিদায়ক না-ও হতে পারে। আপত্তি ও আগ্রহগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার, কোন কোন আপত্তির পেছনে কী কী প্রণোদনা কাজ করছে, সেটিও বোঝা দরকার। যেমন নিকলীর কাছ থেকে তার জেলা সদরকে ৫০ মাইল দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার অর্থ নিশ্চয়ই উন্নয়নের দৌড় থেকে নিকলীকে আরও পিছিয়ে দেওয়া। আবার বাজিতপুরের আপত্তির পেছনে নিছক বঞ্চনার বোধ থাকলে বা ওই এলাকার অধিবাসীদের ইগো আহত হওয়ার মামলা থাকলে, দ্বিপক্ষীয় সংলাপ অনুষ্ঠান করে সংকটের নিরসন করা যায়। বৃহত্তর রায়পুরা উপজেলার পূর্বাঞ্চলের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহকেও হেসে উড়িয়ে দেওয়ার কারণ নেই। ভৈরব জেলাকে শুধু কিশোরগঞ্জের পেট থেকে বের না করে দেখা দরকার কোন অঞ্চলগুলোর সঙ্গে ভৈরবের আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অবস্থানগত নৈকট্য আছে। প্রয়োজনে না হয় আরেকটু জটিল শল্যচিকিত্সা হোক। জেলা তো শুধু রাজনৈতিক ওয়াদার বাস্তবায়ন নয়, একে সাধারণ মানুষের কাজেও লাগতে হবে। জেলা তৈরির প্রশাসনিক কাজটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিবেচনাগুলোকে গুরুত্ব দিক, নয়তো জেলা গুরুত্ব হারাবে। তবে বিশ্বায়নের এ যুগে একটি ক্ষুদ্র জনপদের প্রশাসনিক সীমানা দিয়ে যেমন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চলাচল ব্যাহত করা যাবে না, আবার এটিও ঠিক যে আমাদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক লেনদেনের অভ্যাসকে না চটিয়ে প্রশাসনিক সীমানাগুলো চিহ্নিত করা গেলে তা আখেরে সবার জন্যই লাভজনক।
>>>সুমন রহমান: কথাসাহিত্যিক।

শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত উদ্যোগ নিন -কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

গত শুক্রবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিবদমান ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সহিংসতার আশঙ্কা থেকে এ সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে এই বছর তিন দফা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্ধারিত বন্ধের কবলে পড়ল। এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় এক হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং প্রতিষ্ঠানটির নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হতে পারে।
২০০৭ সালের ২৮ মে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পর বিভিন্ন সময়ে সংঘাত-সহিংসতা আর দলাদলির কারণে এর সুনাম হারিয়ে যেতে বসেছে। এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ‘রাজনীতি’মুক্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে জোরেশোরে ছাত্ররাজনীতি শুরু হয়ে গেছে। ওই রাজনৈতিক অপতত্পরতার গণ্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে শহর এবং গ্রাম এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। কুমিল্লা অঞ্চলের কতিপয় সাংসদ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেদের সমর্থিত নেতাদের দিয়ে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের তত্পরতার কারণেই এখন পর্যন্ত ১০ বার ছাত্র সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হলেও কোনো প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
এ বছরের ৩১ আগস্ট ছাত্রলীগ-সমর্থিত দুই অংশের মধ্যে সংঘর্ষ হলে এক মাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত ৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার তিন দিন পর আবার ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির-সমর্থিত অংশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। অন্যদিকে কয়েকজন শিক্ষক ভর্তি ফরম বিক্রির টাকা পদমর্যাদা অনুযায়ী সমান হারে বণ্টন ও অর্থ বণ্টনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার দাবিতে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখেন, তাঁর দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ ঘটনার পর ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ছাত্ররাজনীতির প্রভাবমুক্ত দাবিদার এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাত-সহিংসতা আর দলাদলির বিস্তার গভীর উদ্বেগজনক।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপের সুযোগ থেকে গেলে শিক্ষা কার্যক্রম বারবার এমনভাবে ব্যাহত হতে থাকবে। প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অংশের রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা যাবে না। তাই এদিকে নজর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন ঠিকমতো চলতে পারে, সে জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের সেশনজটমুক্ত সুন্দর ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব -উৎসব by আবদুল মান্নান সোহেল

নালিতাবাড়ীর কথা বলি।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কোল ঘেঁষে অপূর্ব নৈসর্গিক শোভামণ্ডিত গারো পাহাড়। এ পাহাড়ের শান্ত-স্নিগ্ধ জনপদ শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় এই নালিতাবাড়ী। সেখানেই বারোমারী। এখানকার পাহাড়ি উপত্যকায় খ্রিষ্টান সাধু লিওর ধর্মপল্লী, যা বারোমারী ধর্মপল্লী নামে পরিচিত। সেখানেই ২৯ ও ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব’। ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের এ তীর্থোৎসবকে ঘিরে অন্য রকম সাজে সেজেছিল বারোমারী ধর্মপল্লী। উত্সবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ছাড়াও দেশের বাইরে থেকে ‘মা মারিয়ার’ ভক্তরা এসে সমবেত হয়েছিলেন শুদ্ধ আত্মার অন্বেষণে। প্রতিবছরের মতো এবারও ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসবে একটি মূল সুর ঠিক করা হয়েছিল—‘মা মারিয়া আমাদের সহায়’!
কত মানুষ এসেছিল উৎসবে। সবাই চেয়েছে এই উৎসবে যোগ দিয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে। বর্তমান সময়ের নানা ধরনের অন্যায়, অবিচার থেকে বেরিয়ে পবিত্র জীবনের দীক্ষা নিতে এসেছিল এই মানুষেরা।
এবারের তীর্থোৎসব পরিচালনা করেছেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ মি. পনেন পল কুবি সিএসসি। অন্যান্য ধর্মপ্রদেশের পাল পুরোহিতেরা এবং বারোমারী ধর্মপল্লীর ফাদার উইলসন জাম্বিল উৎসবের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটায় আগমনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল দুই দিনব্যাপী তীর্থোৎসবের। রাতে আলোর মিছিল সহকারে গারো পাহাড়ের উঁচু-নিচু টিলার পথে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করেছেন মা মারিয়ার ভক্তরা। রাত একটার দিকে তীর্থস্থান এলাকায় গীতি আলেখ্যর পাশাপাশি চলেছিল ভক্তি, আরাধনা ও প্রার্থনা। ৩০ অক্টোবর সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথ, মহাখ্রিষ্টের জাগরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দিনের তীর্থোৎসব। এবারের উত্সবে প্রায় ২০ হাজার ক্যাথলিক খ্রিষ্টান অংশ নিয়েছেন বলে ধর্মপল্লী সূত্রগুলো জানিয়েছে। তীর্থযাত্রা উপলক্ষে ধর্মানুসারীরা অনেকেই তীর্থরোজা পালন করেন। যিশুখ্রিষ্টের জন্মস্থান বেথলেহেম এবং তাঁর কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন স্থান তথা গোটা ফিলিস্তিনই পুণ্যস্থান বা তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত। ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশ তথা সারা দেশের ভক্তদের কুমারী মারিয়ার প্রতি গভীর বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপনের অদম্য আগ্রহ ও উত্সাহ লক্ষ করে ১৯৯৭ সালে পর্তুগালের ‘ফাতেমা নগরের’ আদলে ও অনুকরণে বারোমারী ধর্মপল্লীতে গড়ে তোলা হয় এ তীর্থস্থান। তত্কালীন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের ধর্মপাল বিশপ ফ্রান্সিস এ গোমেজ বারোমারীকে ফাতেমা রানীর তীর্থস্থান হিসেবে ঘোষণা দেন। খ্রিষ্টানদের প্রাণের দাবি ছিল মা মারিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর উপযুক্ত স্থান লাভের। যে কারণে ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত সাধু লিওর ধর্মপল্লী বা বারোমারী ধর্মপল্লীকে ১৯৯৭ সালে গড়ে তোলা হয় জাতীয় মহাতীর্থস্থান হিসেবে। খ্রিষ্টধর্মের পবিত্র ধর্মস্থান হিসেবে এ তীর্থস্থানে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে দুই দিনব্যাপী মহাতীর্থোত্সব পালিত হয়। ফাতেমানগরের আদলে এ উত্সব হয় বলে এটি পরিচিতি পায় ‘ফাতেমা রানীর তীর্থোত্সব’ হিসেবে। ধর্মীয় চেতনায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ একত্র হয়ে নির্মল হূদয়ের অধিকারিণী ঈশ্বরজননী, সব স্বর্গদূত ও খ্রিষ্টভক্তদের রানি, স্নেহময়ী মাতা ফাতেমা রানীর করকমলে অবনত মস্তকে হূদয়-মন উজাড় করে ভক্তি শ্রদ্ধা ও তাঁর অকৃপণ সাহায্য প্রার্থনা করেন। তীর্থোত্সব দেখার জন্য খ্রিষ্টভক্তরা ছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বীরা এ দুই দিন বারোমারীতে ভিড় করেছিলেন। এ উত্সব ঘিরে ধর্মপল্লীর পার্শ্ববর্তী চত্বরে বসে ছিল বারোমারী মেলা। তীর্থোৎসবটি এ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্র্রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে।
মানুষে মানুষে হূদয়ের মিলন ঘটে এ ধরনের উৎসবে। সব ধরনের প্রতিকূলতা কাটিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার একটা প্রচেষ্টায় মানুষ নিজেকেই যেন খুঁজে ফেরে। এ কারণেই উৎসব হয়ে ওঠে সর্বজনীন।
আগামী বছর আবার আসবে অক্টোবর; আবার এখানে বসবে উত্সব; আবার প্রাণে প্রাণে মিলন হবে মানুষের। তার আগে এই উত্সবের স্মৃতি নিয়েই মানুষ কাটিয়ে দেবে একটি বছর।

চাঁদাবাজি থেকে চ্যানেলবাজি -দুর্নীতি by শাহ্দীন মালিক

স্কুল-কলেজের অর্থাত্ বহুদিনের বন্ধুবান্ধবের অনেকে বিলেত-আমেরিকায়, যাকে বলে ‘সেটেল্ড’। অর্থাত্ ২০-৩০ বছর আগে ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিল। পড়াশোনা করে চাকরিবাকরি করছে বহুদিন ধরে। এত দিনে গাড়ি-বাড়ি সবই হয়েছে। তাদের ছেলেমেয়েরাও বড় হয়ে অনেকেই চাকরিতে লেগে গেছে। বন্ধুরা মাঝেমধ্যে, অর্থাত্ দুই-তিন বছরে একবার দেশে আসে। দু-এক বেলা আড্ডা হয়।
তবে ওদের অনেকেই আজকাল ইংল্যান্ড-আমেরিকা থেকে প্রায়ই ফোন করে। ওদের ‘জাতীয়’ জীবন বলতে কিছুই নেই। হুলুস্থুল হওয়ার মতো ওদের বিলেত-আমেরিকার ‘জাতীয়’ জীবনে বিরাট কিছু ঘটে না বললেই চলে। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নিঃসন্দেহে বেশ কয়েক মাস ধরে হুলুস্থুল বেধেই থাকে।
আর গত নির্বাচনে ‘বারেক ভাই’-এর প্রার্থিতার কারণে ‘জাতীয়’ হইচই নিঃসন্দেহে ছিল প্রকাণ্ড রকমের। নির্বাচন হলো, ‘বারেক ভাই’ জিতল। তারপর সব শেষ! নির্বাচনে কারচুপি, ভোট জালিয়াতি, বিদেশি রাষ্ট্রের নির্দেশে দেশসুদ্ধ লোক একটা দলকে ভোট দিয়েছে, মহাজাতিক ষড়যন্ত্র কোনো কিছুই ওদের নির্বাচনোত্তর বাজার গরম রাখে না, কংগ্রেসম্যান সিনেটররা অত্যন্ত অরাজনৈতিকভাবে সুড়সুড় করে সংসদে হাজির হয়। রাজপথে ‘শো-ডাউন’ করার মতো প্রতি ভোটারের বাড়িতে একাধিক গাড়ি থাকলেও সেদিকে তাদের নজর নেই। কী বোকা!
মাঝেমধ্যে কিছু বড়সড় অপরাধ হলে ওদের ‘জাতীয়’ জীবন একটু সরগরম হয়। তাও কদাচিত্। ধারণা করি, ইদানীং ‘বারেক ভাই’ স্বাস্থ্যসেবা আইন নিয়ে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছে। ওদের অর্থাত্ আমার বন্ধুবান্ধবের দুর্ভাগ্য, সেই উত্তাপটা কংগ্রেস আর সিনেটেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য বীমার মতো রসকষহীন আইন নিয়ে আড্ডার টেবিলে বসে কত কাপ চা-ই বা সাবাড় করা যায়।
এই দুই দিন আগে ইতালি-প্রবাসী এক বন্ধু এসেছিল একঝলক আড্ডার জন্য। ইতালির প্রধানমন্ত্রী তাঁর নারীসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে দেশটাকে প্রায়ই বেশ মাতিয়ে রাখে। তাই বোধ হয় আমার ইতালি-প্রবাসী বন্ধুরা বেশি ফোনটোন করে না। ‘জাতীয়’ জীবনে তারা অন্য অনেকের তুলনায় বেশ ব্যস্ত থাকে। লাইফটা, যাকে বলে, অত বোরিং না।
জার্মানিতে বলতে গেলে কিছুই হয় না, জাতীয় পর্যায়ে। প্রায় বছরদশেক আগে বা তারও কিছু বেশি, জার্মানির একটা ছোট শহরে দিনসাতেক ছিলাম। প্রতিদিন সকাল নয়টা ১৭ মিনিটের বাস ধরে কর্মস্থলে গিয়েছিলাম। ব্যাটা বাস, একটা দিন যদি অন্তত মিনিটখানেকও দেরি করত, তাহলে যানজট নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা মারার কী মোক্ষম সুযোগটা পেতাম।
বলতে গেলে কোনো কিছুরই হেরফের হয় না। তাই বন্ধুবান্ধবও বিদেশ-বিভুঁই থেকে ফোন করলে ওদের তরফ থেকে কথাবার্তা পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব, ছেলেমেয়ে, মা-বাবার অসুখবিসুখ ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ থাকে। ওদের তুলনায় আমাদের জীবন যে কত উত্তেজনায় ভরপুর তা এতকাল পর তারা বোধ হয় কল্পনাও করতে পারে না।
আমাদের আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি থাকে বইপত্রে। কাজ হয় হুজুরের হুকুম আর ইচ্ছামাফিক। হুজুরবৃন্দের আজ কী খেয়াল হবে, আগামীকাল কী খায়েশ হবে, পরশু কী মতিভ্রম হবে তা নিয়ে। আর কোনো কিছু না হোক, চুটিয়ে তো আড্ডা মারতে পারি, দেশ-জাতি উদ্ধারে থাকতে পারি সর্বদা নিবেদিতপ্রাণ।

২.
চাঁদাবাজি থেকে শুরু হওয়া ‘বাজি’টা তো দেখছি এখন টিভি চ্যানেল পর্যন্ত গড়িয়েছে। আমাদের মতো পুলকমোহ-শিহরণময় জাতীয় জীবন ‘আর কোথাও পাবে নাকো তুমি’। চ্যানেলবাজি হয় এমন দেশ কি ভূবিশ্বে আর একটিও, প্রিয় পাঠক, আপনি খুঁজে পাবেন! খুঁজে পেলে, আমাকে জানালে যারপরনাই বাধিত হব।
নতুন ক্ষমতাধরেরা চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রা শুরু করছে। আরও স্বাভাবিকভাবে ফুল-মিনিস্টার, হাফ-মিনিস্টার, কোয়ার্টার-মিনিস্টার নিয়মিতভাবে জপে যাচ্ছেন এবং যত দিন ক্ষমতায় থাকবেন তত দিন জপে যাবেন—চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ যে দলেরই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আইন তার আপন গতিতে চলবে।
চলতে চলতে প্রথম আলোয় ২৯ অক্টোবর প্রথম পাতার সংবাদ থেকে জানলাম, নতুন সব কয়টি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স-পারমিট-অনুমোদনপত্র অথবা ডকুমেন্ট—সবই শুধু বা একমাত্র বর্তমান ক্ষমতাধরদের পকেটে ঢুকে পড়েছে। ধারণা করছি, গন্তব্য-পকেট দুই কিসিমের—পাঞ্জাবির পকেট আর স্যুটের পকেট (প্যান্ট বা কোর্ট যেকোনোটার পকেটই হতে পারে)। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার একেবারে কাছের হলে পাঞ্জাবির পকেট, আর টাকা-পয়সার জোরে ক্ষমতার কাছের হলে স্যুটের পকেট।
পত্রিকা কেন যেন চ্যানেল বরাদ্দের ব্যাপারে ‘নীতিমালা’ শব্দটা প্রয়োগ করছে। আর আমার মতো হাবাগোবারা বলবে আইন-কানুনের কথা।
এখন ‘বাজি’টাই হলো নীতি। সেটাই আইন—অবশ্য ধর্ম বললে বোধ হয় একটু বেশি বলা হয়ে যাবে। তবে জ্ঞানীজন অনেক আগেই বলে গেছেন, চোরে না শোনে ধর্মের কথা। নোবেল পুরস্কার দেনেওয়ালারা নিশ্চয় নিতান্তই রসকষহীন নীতিবাজ ব্যক্তিবর্গ—না হলে চ্যানেলবাজির মতো এত বড় একটা আবিষ্কারের জন্য তাদের কাছে চ্যানেলবাজদের নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য মনোনয়ন পাঠাতাম।

৩.
সোমালিয়া-সুদান-দক্ষিণ ইয়েমেন-মিয়ানমার-আফগানিস্তান-পাকিস্তান আর ইরাক গোছের দেশের মতো আমাদের দেশ থেকে আগামী দুই-তিন বছরে বা তার কিছু আগে বা পরে, আইন-কানুন যদি একেবারেই নিরর্থক বা মূল্যহীন হয়ে পড়ে, তাহলে এসব চ্যানেলবাজির বদৌলতে আহরিত চ্যানেলগুলো নিঃসন্দেহে বহাল তবিয়তে চালু থাকবে।
যারা ক্ষমতায় থাকেন তাঁরা যদি বদ্ধপরিকর হন যে নিয়মনীতি-আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কাই করবেন না, তাহলে অনেক সময় মনে হয় জনগণের করার কিছুই নেই। এ ধারণা ক্ষমতাসীনদের মনে প্রোথিত হয় অনেক গভীরভাবে। আশা করছি, কিছু দিনের মধ্যে আবার হাম্ভি-হ্যামার গাড়ি ঢাকার রাস্তায় অহরহ দেখা যাবে। নিজের চ্যানেলগুলোর ‘অফিসে’ তো আর যেনতেন গাড়ি চড়ে যাওয়া যাবে না।
বন্ধুরা বিদেশ থেকে ফোন করলে আমাদের জাতীয় জীবনের চ্যালেনবাজি নামক ভীষণভাবে উত্তেজনাকর নতুন ‘জিনিস’টার ফিরিস্তি গাইব বুক ফুলিয়ে।
টিভি চ্যানেল চালাতে যেসব যন্ত্রপাতি লাগে, বাংলাদেশ নিশ্চয় সেসব যন্ত্রপাতির একটা বিরাট বাজার হয়ে গেছে। হোক।
যন্ত্রপাতি কেনা হোক, চ্যানেলবাজরা বিনিয়োগ করুক। তারপর আমি যেটা একটু-আধটু পারি, সেটাই করব। কোর্টে যাব।
শাহ্দীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট।

যুদ্ধ ও জীবনের রং -গণমাধ্যমে যুদ্ধচিত্র by রবার্ট ফিস্ক

আমার বয়স যখন তিন, তখন আমার গর্বিত মা-বাবা তাঁদের প্রিয় সন্তানের ছবি তুলতে এক প্রতিকৃতি-আলোকচিত্রীর শরণাপন্ন হন। আমাদের এলাকায় তিনিই ছিলেন প্রথম ছবি তুলিয়ে। ছবি তোলার সময় তাঁর কাজের জায়গায় সেট হিসেবে বসানো ট্রেন নিয়ে আমাকে খেলতে বলা হয়েছিল।
সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী আলোকচিত্রী সাদা-কালোয় তোলা ছবিতে রং চড়িয়ে যথাসময়ে আমার মা-বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন। ছবি দেখে তাঁরা খুব খুশি হন। আমার উজ্জ্বল চুল, গোলাপি মুখাবয়ব ও নীল চোখ নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠায় তাঁরা ছিলেন মুগ্ধ। কিন্তু আমি মর্মাহত হই। আমার রাগের কারণ আলোকচিত্রী খেলনা ট্রেনটিকে নীল রং করেছিলেন। লন্ডন মিডল্যান্ড ও স্কটিশ রেলওয়ে কোম্পানির রং ছিল টকটকে লাল, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম। ট্রেনের জন্য নিখুঁত রং করার কথা কি আলোকচিত্রী ভেবেছিলেন?
কথাগুলো মনে পড়ল সম্প্রতি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে ধারাবাহিকভাবে অ্যাপোকেলিপস: দ্য সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার দেখার সময়। এটি আর্কাইভ ফিল্মের সর্বশেষ রঙিন রূপ, যাতে সমসাময়িক দর্শকদের সুবিধার্থে সাদা-কালো ফুটেজের ওপর জীবন্ত রং আরোপ করা হয়েছে। বেশ আগে ফ্রান্স টু চ্যানেলের জন্য জঁ-ফ্রাসোয়াঁ দেলাসাসের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ওপর নির্মিত ছবির এক অসাধারণ রঙিন রূপ দেখে প্রশংসা করেছিলাম। ব্রিটিশ টিভি চ্যানেলগুলো তখন থেকে একের পর এক সাদা-কালো ছবির রঙিন রূপ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এবার ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে রূপ দেখলাম, তা আমাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ধারাবাহিকটির একটি পর্বে যুদ্ধজাহাজ থেকে গোলাবর্ষণের রং মনে হয় টকটকে লাল। আর পরের পর্বের বিষয় ছিল ফ্রান্সের পতন। এ পর্বের চিত্রমালার রঙিন রূপ বেশ নিম্নমানের লেগেছে। অদেখা কিছু আর্কাইভ ফিল্ম দেখলাম এতে, বিশেষত মনোবল ভেঙে পড়া ফ্রান্সের সেনাসদস্যদের জার্মানদের কাছে আত্মসমর্পণের দৃশ্যাবলি। কিন্তু রঙিন ছবিতে গাছের পাতা যতটা সবুজ, সে তুলনায় জার্মান ও তাদের যুদ্ধবন্দীদের অনেক সাদা-কালো মনে হয়েছে। আর হিটলারের দয়িতা ইভা ব্রুনের তোলা বাড়ির ভেতর হিটলারের একটা ক্লিপ খুব বেমানান ঠেকেছে। যদ্দূর মনে পড়ে, ব্রুন রঙিন স্টক ব্যবহার করে হিটলারের ছবি তুলেছিলেন। রঙিন বানানোর সময় মূল ছবির রং অনুজ্জ্বল করে বাদবাকি ফুটেজের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
শেষমেশ বাস্তবতার প্রশ্নই মুখ্য—সম্প্রতি টরন্টোতে ইউসুফ কার্শের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে আমার এমনটাই মনে হয়েছে। কার্শের তোলা চার্চিলের সাদা-কালো প্রতিকৃতিগুলোর রঙিন রূপ ভাবা যায় না। তাহলে কি আমরা সেনাদের খাকি পোশাকে আর ধূসর পরিখাকে বাদামি মাটিতে রূপান্তরিত করে আর্কাইভ ফিল্মের বিকৃতি ঘটাচ্ছি?
আমার তা মনে হয় না। কেউ হয়তো বলতে পারে, আর্কাইভের সাদা-কালো ফুটেজ নিজেই বিকৃত, সত্যিকারের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল রঙিন; রক্তের রং ছিল উজ্জ্বল লাল, গাছের পাতার রং ছিল সবুজ। এখন রং ও গভীরতা যুক্ত করার মাধ্যমে আমরা শুধু ১৯১৪-১৯১৮ সালের ফিল্ম স্টকের ঘাটতি পূরণ করছি। আজকের দিনের প্রযুক্তি তখনকার ক্যামেরাম্যানরা ব্যবহার করলে এ রকম ছবিই তাঁরা পেতেন।
মজার ব্যাপার হলো, প্রাচীন রোম নিয়ে কোনো রঙিন ছবি দেখতে আমাদের খারাপ লাগে না। এর কারণ হয়তো নিরো বাঁশি বাজাচ্ছেন বা যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হচ্ছে—এমন দৃশ্যের কোনো সাদা-কালো আর্কাইভ ফিল্ম আমাদের নেই। সিসিল বি ডিমাইল যখন বারবার তাঁর তরবারি-চটির রঙিন মহাকাব্য বানাচ্ছিলেন, তাতে আপত্তিজনক কিছু দেখেনি কেউ, যদিও প্রথম প্রথম হলিউড ছবি রঙিন করতে গেলে অনেকের মনঃকষ্ট হয়েছিল। আমার কাছে রিকস বার আজীবন একরঙা ছবি হয়েই থাকবে; বোগার্টের স্যুট যেমন নতুনের মতো উজ্জ্বল সাদা, তেমনি লুইয়ের ভিচি জন্ডামারি পোশাক কালোই থাকবে, নীল হবে না কখনো।
কিন্তু ছবি তুলি আমরা নানা কায়দা করে। সানডে এক্সপ্রেস-এ দিনপঞ্জি কলাম লেখার সময় আমি শিখি পত্রিকাটির আলোকচিত্রীরা কেমন করে নারীদের ছবি তোলেন। অপূর্ব সুন্দরী নারীরা ইচ্ছামতো ভঙ্গিতে ছবি তুলতেন। কিন্তু যেসব নারী আলোকচিত্রীর প্রত্যাশামতো সুদর্শনা হতেন না, তাঁদের বলা হতো মাথা কাত করতে। তখন সব আলোকচিত্রী ছিলেন নারীবিদ্বেষী। পুরুষদের ক্ষেত্রেও মাঝেমধ্যে এমন করা হতো। কাত করা মাথার মাজেজা হলো- দর্শক ছবিতে তাকানোর সময় চোখ যায় ছবির মানুষটার চোখে, মুখাবয়বে নয়। পত্রিকার বিনোদনের পাতায় নারীদের ছবিতে চোখ রাখলে এটাই দেখতে পাওয়া যায়। এরপর পত্রিকায় আমার যে ছবি ছাপা হয়, সেটি দেখুন। দেখতে পাবেন, আমার কুিসত মুখ ডানদিকে কাত করা।
বসনিয়ার যুদ্ধের প্রতিবেদন করতে গিয়ে আমাদের লেখার সঙ্গে ব্যবহারের অনেক ছবি আমি নিজেই তুলেছি। সাদা-কালোয়, অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই। এই ভয়াবহ সংঘর্ষের মধ্যে আমি চেয়েছিলাম, সেই দুনিয়ার সব রং নিভিয়ে দিতে। বরফ বসনিয়ার শীতকালের একরঙা বিভীষিকার ছবি নিয়ে এসেছিল। যোদ্ধা ও তাঁদের হাতে বন্দী বেসামরিক মানুষ—সবাই মিলে কত যে মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল! কত মানুষ যে খাবারের ব্যাকুলতা দূর করতে সিগারেট খেয়ে খেয়ে কাটিয়েছে, তাদের মুখাবয়বের রং গোলাপি থাকেনি, ধূসর হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এ তো শুধু রঙের প্রশ্ন নয়। নির্বাক আর্কাইভ ফুটেজের সঙ্গে শব্দ যোগ করা হয়েছে ঘটনাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য। কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। ক্যামেরাম্যান নিশ্চয় শুনেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অশ্বারোহী বাহিনী থেকে ভেসে আসা হ্রেষাধ্বনি; জেনারেলের নির্দেশ দেওয়া আর গুলির শব্দ। কিন্তু শব্দগুলো তাঁরা পুনরুত্পাদন করতে পারেননি। অসত্য বয়ান তৈরির কাজ চলছে এখন, তবে তা শব্দ জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে নয়, শব্দ ও ছবির সমন্বয়ের মাধ্যমে।
যুদ্ধের প্রতিবেদন তৈরি করার সময় আমার দৃষ্টি ও শব্দের সমন্বয় ঘটে না। ইসরায়েলি বিমান সব সময় পুরোপুরি নৈঃশব্দের মধ্যে ঠিক করে তার বোমার লক্ষ্যবস্তু। বোমার বিস্ফোরণ কোনো শব্দ বয়ে আনে না। কিছুক্ষণ পরই কেবল শব্দের বিস্ফোরণ আমার কাছে পৌঁছে ঘটনাস্থলের কত কাছে আসি তার ওপর নির্ভর করে।
বিবিসি থেকে সিএনএন পর্যন্ত প্রতিটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক তাই যুদ্ধের শব্দকে পরিপাটি করে পরিবেশন করে। তাদের প্রতিবেদনে ব্যারেলের ভেতর থেকে আলোর ঝলকানি দেখার সঙ্গে সঙ্গে শোনা যায় দূরের গুলির শব্দ। ক্যামেরাম্যানের কাছে সত্যিকার শব্দ পৌঁছার বহু আগেই অনেক দূরের ট্যাংকের গর্জন শোনা যায়। বিবিসির এক প্রযোজক আমাকে বলেছিলেন, দর্শকের কাছে বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে যাওয়ার হ্যাপার কোনো মানে হয় না। আলোর গতি শব্দের চেয়ে বেশি, শব্দের চেয়ে আলো আগে যায়। বিবিসিও তাই সরল করে এক সঙ্গে পরিবেশন করে।
তাঁর কথা একদম ঠিক। এখনকার যুদ্ধগুলো এমন নিশ্চিতভাবে সমলয়ের বানিয়ে তুলতে হবে, যেন তা ১৯৪২ সালের এল আলামাইনে রাতে কামানের গোলার শব্দ দৃশ্যের মতো সমলয়ের হয়। যে ছবি আমরা বানাব, তা দর্শকের চাহিদামতো হতে হবে। চাহিদার সঙ্গে মিলে যেতে হবে। যুদ্ধও বানিয়ে তুলতে হবে দর্শকের চাহিদামতো। শুধু যদি বাষ্পচালিত ট্রেনের রংটা ঠিক রাখা যেত।
দি ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
>>>রবার্ট ফিস্ক: ব্রিটিশ সাংবাদিক।

শীত ও গ্রীষ্মের জন্য পৃথক সময়সূচি প্রয়োজন -জরুরি ভাবনা by ফিরোজ জামান চৌধুরী

শীত কড়া নাড়ছে দরজায়। দিনের আলো ইতিমধ্যে ঘণ্টা দুয়েক কমে গেছে। গ্রীষ্মকালে ঘড়ির কাঁটার যে পরিবর্তন সুখকর ছিল, তাই এখন গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। শীতকালে এ সময়সূচি নিয়ে মানুষজন যারপরনাই চিন্তিত। অনেকে বিরক্তও বটে। ১৯ ও ২০ অক্টোবর প্রথম আলোর টেলিফোনে নাগরিক মন্তব্যে বেশির ভাগ পাঠকই শীতকালে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তি বিদ্যমান সময়সূচি বদল করতে চাইছেন না। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী তো সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ঘড়ির কাঁটা এখন যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে, পেছানো হবে না।’ (প্রথম আলো, ২৬ অক্টোবর ০৯)।
শীতকালে বিদ্যমান ঘড়ির কাঁটার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছে স্কুলগামী শিশুরা এবং তাদের অভিভাবকেরা। সরকারের নতুন ঘোষিত (১ নভেম্বর থেকে কার্যকর) স্কুলসূচি অনুযায়ী স্কুল শুরু করতে হবে সকাল সাতটা ৩০ মিনিট থেকে আটটা ৩০ মিনিটের মধ্যে। যদি সাতটা ৩০ মিনিটে স্কুলে উপস্থিত হতে হয়, তাহলে ওই শিশুকে অবশ্যই ছয়টা ৩০ মিনিটে রওনা দিতে হবে। তাকে ঘুম থেকে উঠতে হবে আরও এক ঘণ্টা আগে অর্থাত্ পাঁচটা ৩০ মিনিটে। তখন তো ভোর। সূর্যিমামার দেখা নেই। শিশুটি ঘুমঘুম চোখে কখন তৈরি হবে, কখন স্কুলে যাবে? এক মাস পর এ অবস্থা আরও ভয়াবহ। শিশুদের এ হেনস্তার হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের কি কিছুই করার নেই?
সরকার ১৯ জুন বিদ্যুত্-সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এক ঘণ্টা সময় এগিয়ে দেয় এবং কমপক্ষে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্-সাশ্রয় হবে বলে ঘোষণা দেয়। বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী প্রথম প্রথম জোর গলায় বিদ্যুত্-সাশ্রয়ের ঘোষণা দিলেও পরে আর তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়নি। লোডশেডিং থেকে জনগণের মুক্তি না মেলায় বিদ্যুত্সাশ্রয় নিয়ে জনগণের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু তার পরও এ পরিবর্তনকে জনগণ স্বাগত জানিয়েছিল। পরিবর্তিত সময়ে সন্ধ্যাতেও বিকেলের ঝকঝকে আলোয় চলাফেরা করতে সবাই সচ্ছন্দ বোধ করত। বিশেষ করে, কর্মজীবী নারীদের জন্য এ সময়সূচি অনেক সহায়ক হয়েছিল। সরকার তখন বলেছিল, শীতকালে নতুন সময়সূচি ঘোষিত হবে অর্থাত্ শীতের শুরু থেকে আবার ঘড়ির কাঁটা আগের সময়ে ফিরে যাবে। তবে কবে থেকে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে, তা তখন নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, সময় আর আগের জায়গায় ফেরত যাবে না।

২.
একটি দেশের ‘স্ট্যান্ডার্ড টাইম’ বা মান সময় নির্ধারিত হয় সে দেশের দ্রাঘিমাংশের তারতম্যের ভিত্তিতে এবং গ্রিনিচ মান সময়ের সঙ্গে তার পার্থক্য থাকে সুনির্দিষ্ট। সে হিসাবে আমাদের দেশে এতকাল গ্রিনিচ মান সময়ের সঙ্গে ছয় ঘণ্টা যোগ করে সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সরকার ১৯ জুন থেকে যেভাবে সময়সূচি পরিবর্তন করেছে, তার সঙ্গে ভূগোলের কোনো সম্পর্ক নেই। এ পরিবর্তনের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নেই। এর ফলে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দ্রাঘিমাংশের হিসাবে সময়ের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে স্থলপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার ঘটনা ঘটছে। কারণ সীমান্তবর্তী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে আমাদের সময়ের ব্যবধান এখন দেড় ঘণ্টা। দুই দেশের স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয় দেড় ঘণ্টা আগে-পরে।
বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত এবং মধ্যম সারির শিক্ষিত দেশে ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ খোদ আমেরিকাতেই এই নিয়ে বিতর্ক চলেছে প্রায় চার দশক ধরে। ১৯৬৬ সালে আইন করে সময় পরিবর্তন করার পর নানা সংযোজন-বিয়োজন শেষে সময়সূচির স্থায়ী রূপ পায় ২০০৭ সালে এসে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই গ্রীষ্ম ও শীতকালীন সময়সূচি বিদ্যমান। প্রায় দেশেই ১ এপ্রিল গ্রীষ্মকালীন ও ১ অক্টোবরকেই শীতকালীন সময়সূচি হিসেবে মানা হয়। আমাদেরও উচিত এই সময়সূচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, তা না হলে দলছুট হওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খানের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ‘১৯৪৩ সালের স্ট্যান্ডার্ড টাইম-সংক্রান্ত একটি আইন আছে, যা এখনো বিদ্যমান। সরকার যেভাবে স্ট্যান্ডার্ড টাইম বা মান সময় পরিবর্তন করেছে, তা ওই আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই মান সময়সংক্রান্ত আইন রয়েছে। আমাদের দেশেও তা থাকতে পারে।’
আমরা মনে করি, বিদ্যুত্—সাশ্রয় এবং দিনের আলোর ব্যবহার বাড়াতে গ্রীষ্মকালে সময়সূচি পরিবর্তন করা যেতেই পারে। তবে সে জন্য সরকারকে অবশ্যই ওই আইন সংশোধন করতে হবে, নতুবা এ-সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। সরকারের উচিত হবে, সংসদে মান সময়সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করা এবং স্থায়ীভাবে একটি আইন পাস করা। প্রতিবছর এ নিয়ে অযথা বিতর্ক কাম্য নয়।

৩.
ডে লাইট সেভিং টাইম বা ডিএসটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পন্থা। যেসব দেশে বিদ্যুতের অভাব নেই, সেসব দেশেও এ ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। শ খানেক দেশ এ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশে শীতের শুরুর (১ অক্টোবর) হিসাবটা বিবেচনায় নিলে বলতে হয়, ইতিমধ্যে দিনের আলো ঘণ্টা দুয়েক কমে গেছে। এখন কোনোভাবেই ডিএসটি বা ডে লাইট সেভিংস টাইম প্রযোজ্য হতে পারে না। তা ছাড়া শীতকালে সকালে এক ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠলে বরং এক ঘণ্টা বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে।
জ্বালানি উপদেষ্টার মতে, গ্রীষ্মকালের যে সময়সূচি তাতে বিদ্যুত্-সাশ্রয় হচ্ছে। তাঁর মতে, শীতকালেও এর সুফল পাওয়া যাবে। শীতকালে দিনের আলো এমনিতেই দুই থেকে তিন ঘণ্টা কমে আসে, তাহলে তিনি কীভাবে দিনের আলো সাশ্রয় করবেন? বিষয়টি শীতকালের কম্বল গরমকালেও গায়ে দেওয়ার মতো হয়ে গেল না! গরমে যেমন কম্বল গায়ে দেওয়া যায় না, গ্রীষ্মকালের দিনের আলো সাশ্রয়ের হিসাবও শীতকালে তাই অবান্তর।
সরকারের যাঁরা বিদ্যমান সময় পরিবর্তনের বিপক্ষে, তাঁদের যুক্তি এ ক্ষেত্রে গ্রীষ্ম ও শীতকালে দুবার ঘড়ি পাল্টাতে হবে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, তাতে সমস্যা কোথায়? অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেমন: পাকিস্তান ও ইরান প্রতিবছর গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন এই সময়সূচির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড টাইম বা মান সময় নিয়ে সরকারের লেজেগোবরে অবস্থা তৈরির কোনো মানে হয় না। অক্টোবর শেষ হয়ে এল। নভেম্বর থেকেই ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন (১ এপ্রিল—৩০ সেপ্টেম্বর) এবং শীতকালীন (১ অক্টোবর—৩১ মার্চ) স্থায়ী সময়সূচির ঘোষণা দেওয়াও জরুরি। বিশ্বের প্রায় ১০০ দেশে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন সময়সূচি প্রচলিত। ঘড়ির কাঁটা তথা সময়সূচির সঙ্গে দেশীয় বিভিন্ন কাজকর্মের পাশাপাশি বিমানের আন্তর্জাতিক সময়সূচিও জড়িত। তাই বাংলাদেশে ঘড়ির সময়সূচির বার্ষিক সময়সূচি প্রবর্তন করা জরুরি। প্রতিবছর যেন এ বিষয়ে নতুন করে ঘোষণা বা হইচইয়ের প্রয়োজন না পড়ে।
সাধারণভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালীন (এপ্রিল—সেপ্টেম্বর) সময়সূচি হওয়া উচিত ‘গ্রিনিচ সময়+সাত ঘণ্টা’, আর শীতকালীন (অক্টোবর—মার্চ) সময়সূচি হওয়া উচিত ‘গ্রিনিচ সময়+ছয় ঘণ্টা’। স্থায়ীভাবে এ সময়সূচি ঘোষিত হলে মানুষ আগে থেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকবে এবং সে অনুযায়ী আপনা-আপনিই ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করে নেবে।
ফিরোজ জামান চৌধুরী: সাংবাদিক।
firoz.choudhury@yahoo.com

মানচিত্র পরিবর্তন, রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য এবং. -রাজনীতি ও সরকার by সৈয়দ বদরুল আহ্সান

দেশের রাজনীতির মান খুব একটা উন্নত হচ্ছে বলে মনে হয় না। আমরা আশা করেছিলাম, দুই বছর জরুরি অবস্থায় থাকার পর এবং বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর আমাদের রাজনীতিবিদেরা অন্তত এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে বাংলাদেশে নতুন ধারার ও নতুন আঙ্গিকে রাজনীতি করার একটা সুযোগ এসেছে। আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল উভয়ই অনেক কষ্ট ও অত্যাচার সহ্য করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। কিছুটা ন্যায়সংগত কারণে আবার অনেকটা বিনা কারণে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো এই যে জানুয়ারি ২০০৭ থেকে জানুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত যে অভিজ্ঞতা আমরা জাতি হিসেবে সম্মিলিতভাবে সঞ্চয় করেছি, তাতে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিলাম যে আমাদের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন আসবে। কেউই চাইবেন না ফিরে যেতে ওই দিনগুলোতে, যখন দুঃশাসন ও দুর্নীতি দেশকে এক গভীর অন্ধকারে ফেলে দিয়েছিল। যেভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি শক্তিশালী করা হচ্ছিল, আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে এ ধারাটি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গণতন্ত্র ফিরে আসার পর ধরে রাখবে।
সে রকম আশা করাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। একটু ভালো করে ভেবে দেখুন আর যদি তা-ই করেন, তখন আপনার মনের মধ্যে এমন একটা ধারণা জন্মাবে যে আমরা আগের সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যাচ্ছি, যার অবসান অক্টোবর ২০০৬ সালে হয়েছে বলে আমরা ধরে নিয়েছিলাম। একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। এই গেল কিছুদিন আগে সাবেক প্রধনমন্ত্রী খালেদা জিয়া আমাদের সবাইকে হতবাক করে বলে ফেললেন, বর্তমান সরকার দেশের মানচিত্র পরিবর্তন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এটি ঘোরতর অভিযোগ। তিনি কোনো কিছু চিন্তা না করে অনায়াসে বলে দিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে ধ্বংস করার কাজে নেমে পড়েছে। বেগম জিয়ার সৌভাগ্য এবং আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা সমাজ হিসেবে এখনো এমন স্তরে পৌঁছাইনি যে এ ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে বা রোধ করতে বা যিনি মন্তব্য করেন তাঁকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যেআদালতে যাব। কোনো উন্নত দেশে কোনো রাজনীতিবিদ এ ধরনের মন্তব্য করবেন অন্য রাজনীতিবিদদের সম্বন্ধে, এটা কল্পনা করা যায় না। আমরা আশা করেছিলাম, যেহেতু বেগম জিয়া দুবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেহেতু তিনি যেকোনো বিষয়ে ভেবেচিন্তে কথা বলবেন। সেটা তিনি করেননি। ভবিষ্যতে যে তাঁর ও তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে রাজনীতিসুলভ আচার-আচরণ পাব, তা বোধ করি একটু বেশি আশা করাই হয়ে যাবে।
এ তো গেল খালেদা জিয়ার কথা। এবার যদি আওয়ামী লীগের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, দেখবেন সেখানেও কেউ পিছিয়ে নেই। বেগম জিয়ার একটি দাবি ছিল নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে যখনই বিএনপি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে, তখনই দলটি একরকম অসহায় হয়ে পড়েছে। ক্ষমতায় না থাকলে দলটি বেশ বেকায়দা ও বেমানান অবস্থায় পড়ে যায়। এবং সম্ভবত এসব কারণেই বেগম জিয়া নতুন নির্বাচন যা তাঁর জন্য সুখকর হবে, সে নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। তা বেশ ভালো কথা। দাবি আসতেই পারে। এতে বিচলিত হওয়ার তো কিছুই নেই। এই মুহূর্তে নির্বাচন চাওয়াটা কতটা যুক্তিসংগত হতে পারে, সেটা বিতর্কের বিষয়। কিন্তু লক্ষ করেছেন আওয়ামী লীগের সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই দাবির বিষয়ে কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, এখন নির্বাচনের দাবি সংবিধানবিরোধী, কেননা একমাত্র জাতীয় সংসদে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমেই একটি সরকারের পতন হতে পারে। সৈয়দ আশরাফের কথায় বেশ যুক্তি আছে। কিন্তু এর পরই যে কথা তিনি বললেন, তা আমাদের বিস্মিত করেছে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আমাদের জানিয়ে দিলেন, এই মুহূর্তে নির্বাচনের দাবি তোলা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের শামিল। কথাটি আমাদের অবাক করে দেয় বটে এবং সেটা এ কারণে যে সৈয়দ আশরাফ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার মতো সরকার ও রাষ্ট্রকে এক করে ফেলেছেন। সরকারের বিরুদ্ধে যদি কেউ অবস্থান নেয়, তাহলে সেই অবস্থান যে রাষ্ট্রদ্রোহিতার আওতায় পড়ে, সেটা কে বলল? অবশ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যে মন্তব্যটি করলেন, সে ধরনের মন্তব্য সব ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সব সময়ই করে এসেছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ধারাটির সূচনা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ করেছিলেন, যখন তিনি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিকে দেশের শত্রুর কাজ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম, যে যুগে আমরা বাস করছি, সেই যুগে স্বাভাবিকভাবেই গঠনমূলক রাজনীতি আমরা পাব। কিন্তু সেটা আমরা এখনো পাইনি। সৈয়দ আশরাফ একজন ভদ্র মানুষ। তিনি কেমন করে এবং কী কারণে ঢালাওভাবে এ মন্তব্য করলেন, সেটাই এখন আমাদের চিন্তার উদ্রেক করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কোনো বিশেষ পরিবর্তন বিগত নির্বাচনের পর আসেনি, সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ওই সব তথাকথিত ‘ক্রসফায়ারে’র ঘটনার মধ্য দিয়ে। আজও মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে ওই সব বাহিনীর হাতে, যাদের দায়িত্ব মূলত ছিল মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একদিকে একটি নির্বাচিত সরকার আর অন্যদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যা—এ কেমন গণতন্ত্র? সেদিন কয়েকজন বিদেশি কূটনৈতিক ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তাঁর সরকার এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘোর বিরুদ্ধে। খুবই ভালো কথা, কিন্তু এসব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বাস্তবিক পদক্ষেপ কোথায়? আর যদি শেখ হাসিনার মন্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই, তাহলে তাঁরই মন্ত্রী শাজাহান খান যে কিছুদিন আগে এই ক্রসফায়ারের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করালেন, সে বিষয়টি আমরা কীভাবে দেখব? আমাদের দুশ্চিন্তা আরও অনেক ধাপ বেড়ে যায় যখন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের এই মর্মে আশ্বাস দিতে নারাজ যে র্যাব বাহিনীর যেসব ব্যক্তি দৈনিক নিউ এজ-এর সাংবাদিক এফ এম মাসুমের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিমানবাহিনী থেকে আগত যে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ওই কাণ্ডটি করেছেন, তাঁকে র্যাব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এটাই কি যথেষ্ট? এতে বিচার বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কোথায় রইল? সরকার যদি তার বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে না পারে অথবা করতে না চায়, তাহলে সাধারণ নাগরিক কী করে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে?
বর্তমানে যে ধারায় রাজনীতি চলছে, তাতে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এই কয়েক মাস আগেও দেশে জরুরি অবস্থা এবং অনির্বাচিত সরকার ছিল এবং সেটা এ কারণে যে আমাদের রাজনীতিবিদেরাই, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন। সেই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীরা কি কোনো রকম অনুশোচনা করেছেন? নিজেদের ভুল, নিজেদের দুর্নীতির ব্যাপারে তাঁরা কি আত্মসমালোচনা করেছেন? বেগম জিয়া ও তাঁর সহযোগীরা এখনো পর্যন্ত শুধু ষড়যন্ত্রই দেখে যাচ্ছেন। তাঁরা ব্যতীত দেশের মঙ্গল কামনা করেন, এমন কোনো মানুষ বা দল নেই। তাঁরা যেভাবে গোটা দেশকে একটি ভয়ানক ও নাজুক অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তাঁরা বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নন। তাঁরা জাতীয় সংসদে যাবেন না। সমস্যা হলো, যখনই তাঁরা ক্ষমতা হারান, তখনই জাতীয় সংসদের ব্যাপারে তাঁদের অনীহা জেগে ওঠে। সংসদের বাইরে তাঁরা অনেক কথাই তুলছেন, যে কথাগুলো আরও গুছিয়ে আরও জোরালোভাবে তাঁরা সংসদে তুলে ধরতে পারতেন।
কিন্তু কে কাকে বোঝাবে? কার কথা কে শোনে? কথা ছিল, দারিদ্র্য বিমোচনসংক্রান্ত একটি সমাবেশে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একমঞ্চে উপস্থিত থাকবেন। শেষ মুহূর্তে বেগম জিয়া সরে দাঁড়ালেন। গোটা অনুষ্ঠান ম্লান হয়ে গেল। আর যদি প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির উল্লেখ করি, তাহলে এ ধারণা ব্যক্ত করা ভুল হবে না যে তাঁর উচিত ছিল দারিদ্র্যকে কেন্দ্র করেই তাঁর বক্তব্য পেশ করা। তিনি ভালো করতেন যদি সাধারণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে তিনি নিজেকে রাখতেন। যদি বেগম জিয়ার অনুপস্থিতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করতেন। করলেন তিনি ঠিক উল্টোটা। তিনি তাঁর বক্তৃতার অনেকখানি অংশ ব্যয় করলেন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সমালোচনায়। সেটা করা কি এতই জরুরি ছিল?
আজ দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে এবং সেই কাজটি হচ্ছে সরকারি মহলে। অন্যদিকে বিরোধী দল অপেক্ষায় রয়েছে সরকারের পতন কবে হবে এবং সেই পুরোনো দিনগুলো কবে ফিরে আসবে।
স্থানীয় সরকার সম্প্রসারণের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। মানবাধিকার কমিশনের কথা কেবল শুনেই আসছি। যেসব ব্যক্তির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করি, তাঁদের বক্তব্য শুনে হতাশ হতে হয়।
আবার বর্তমান সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীকে সুন্দর করে মহাসড়ক ও কাঁচপুর সেতু পরিদর্শনে যেতে দেখা যায়। পুলিশ ও সিভিল প্রশাসন তত্পর হয়ে ওঠে নিশ্চিত করতে, সেই মুহূর্তে যেন বিভিন্ন যানবাহনে মানুষ ওঠা-নামা না করে, পথ যেন পরিষ্কার থাকে। ফলাফল? মন্ত্রী আমাদের অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করেন, কই, যানজট কোথায়? ওই সব নাকি মিডিয়ার তৈরি গল্প। বেশ তো। একদিন মন্ত্রী তাঁর সরকারি গাড়ি, পতাকা এবং দামি পোশাক পরিহার করে আসুন না শীতলক্ষ্যা নদীর ধারে একটি ট্যাক্সি বা বাসে চেপে? তখন না হয় তিনি যানজট দেখবেন।
শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম কোনো একদিন হঠাত্ করেই এ শহরের কোনো থানায় উপস্থিত হয়েছিলেন সেই থানার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে। থানার কর্মকর্তারা প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেননি। ওই না চেনার ফলে মন্ত্রী সাধারণ মানুষের মতো হয়তো অনেক সত্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন সেদিন।
সেই রফিকুল ইসলামের মতো মন্ত্রী পাওয়া কি আজকাল খুবই দুর্লভ?
সৈয়দ বদরুল আহ্সান: সাংবাদিক।

অপরাধীর গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে -এসিড-সন্ত্রাসে আক্রান্ত দুই বোন

সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে ঘৃণ্য প্রকাশ এসিড নিক্ষেপ। সর্বশেষ ২৮ অক্টোবর এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হলেন কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার কমলাপুরের শিলা ও নিলুফার। বিয়ের এক দিন আগে দুর্বৃত্তদের ছোড়া এসিড অন্ধকারচ্ছন্ন করে দিয়েছে শিলার স্বপ্ন। শিলার (২০) সঙ্গে এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন তাঁর বড় বোন নিলুফারও (২৫)।
দেশজুড়ে এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী নানা প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তার পরও এসিড-সন্ত্রাসের ভয়াবহতা থেকে নারীদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। এসিড-সন্ত্রাস বন্ধ করতে এসিডের সহজলভ্যতা বন্ধ করা জরুরি। কিন্তু অসংখ্যবার উচ্চারিত এ বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।
উপরিউক্ত এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে একই এলাকার মিরাজ হোসেন (২৫), মনোয়ার হোসেন (১৮), রেজাউল (১৮) ও আইয়ুব আলীর (২৫) বিরুদ্ধে খোকসা থানায় মামলা করেছেন শিলার বাবা ইদ্রিস আলী। আইনের ফাঁক গলিয়ে অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই রক্ষা পেতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এসিড নিক্ষেপের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, পুলিশের ‘ধীরে চলো’ নীতি কোনো ফল দেয় না। এসিড নিক্ষেপের মতো ভয়াবহ ঘটনায় আমরা পুলিশের আরও ত্বরিত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এক হাজার ৮০৫ জন নারী ও ৭১৪ জন শিশু এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। এ সংখ্যা যেকোনো সভ্য দেশের জন্য উদ্বেগজনক। এসিড নিক্ষেপের মতো নৃশংস ও পৈশাচিক অপরাধ হ্রাস করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। আমরা এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করছি।

দেশীয় বাস্তবতায় সংস্কারের বিকল্প নেই -রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা

অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ নির্দেশিত এ সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ব্যাংকগুলোকে এক পর্যায়ে ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। সে কারণে কোটি কোটি ডলার খরচ করে ভাড়া করা হলো পরামর্শক। কোনোটিতে আনা হলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে ব্যাংকগুলোকে রূপান্তর করা হলো কোম্পানিতে। কিন্তু কয়েক বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি; আসতে পারেনি। ব্যাংকগুলো চলছে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে। প্রথম আলোয় সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই অব্যবস্থাপনা ও দুরবস্থারই চিত্র।
বস্তুত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে লোকসানের বোঝা থেকে মুক্ত করতে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সরকারগুলো এসব ব্যাংককে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ফলে ব্যাংকগুলোয় বেড়েছে খেলাপি ঋণ ও লোকসানের বোঝা। ব্যাংকিং-সেবা বলতে কিছু নেই। সিবিএর দৌরাত্ম্যে ভেঙে পড়েছে নিয়মকানুন। সুতরাং, এসব ব্যাংকের অর্থবহ সংস্কার করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি জোরালো হয়, তাহলে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট অনিয়ম দূর করা সহজ হয়। সে ক্ষেত্রে বাকি কাজগুলো খুব কঠিন হয় না। অথচ, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রেখে বিদেশি পরামর্শক দিয়ে সংস্কার করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোতে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে বই কমেনি। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবেরও পালাবদল হয়, যার প্রভাব পড়ে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে।
আবার, সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্ব খর্ব করা হয়েছে। সরকারের ব্যাংক হওয়ায় তা পরিচালনায় অর্থ মন্ত্রণালয় বিভিন্নভাবে হস্তক্ষেপ করে বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে। তাই, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর তদারকির দায়িত্ব পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি দেশে অনেক ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞ আছেন, তাঁদের পরামর্শ নেওয়াও প্রয়োজন। প্রয়োজন দেশীয় বাস্তবতার আলোকে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ঢেলে সাজানো। এখন পর্যন্ত এ ব্যাংকগুলোরই সবচেয়ে বেশি শাখা সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। সুতরাং, শাখাগুলোকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকাণ্ড গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে; সুযোগ রয়েছে কৃষিঋণ বিতরণ জোরদার করারও।
সবচেয়ে বড় কথা, শক্তিশালী ব্যাংকব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে পরিপূর্ণতা দিতে হলে বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রতিযোগিতায় সক্ষম রাষ্ট্রীয় ব্যাংক। দেশীয় বিশেষজ্ঞ দিয়ে, দেশীয় আঙ্গিকে সংস্কার করে এসব ব্যাংককে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে ব্যবসা পরিচালনা করতে দিতে হবে; তাহলে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব আসবে, ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারবে, পারবে লাভের মুখ দেখতে। নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে যত দ্রুত মনোযোগ দেবে, তত মঙ্গল।

বয়কটের পছন্দ আফ্রিদি

আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে চার নম্বরে শহীদ আফ্রিদি। এক নম্বরে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান, পরের দুটি স্থানে ভারতের যুবরাজ সিং ও জ্যাক ক্যালিস। তবে এই তিনজনকে ছাপিয়ে ওয়ানডের বর্তমান সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে জিওফ বয়কট বেছে নিচ্ছেন পাকিস্তানের আফ্রিদিকে।
না, অন্যের সঙ্গে তুলনা করেই আফ্রিদিকে সেরা বলেননি ইংল্যান্ডের সাবেক টেস্ট ওপেনার। আসলে আফ্রিদির খেলায় মুগ্ধ হয়েই তাঁকে সময়ের সেরা ওয়ানডে অলরাউন্ডার বলছেন বয়কট। অলরাউন্ডার, তবে দ্রুততম ওয়ানডে সেঞ্চুরির মালিকের বোলিংটাই তাঁর ব্যাটিংয়ের চেয়ে আগে আসছে, ‘আফ্রিদি চমত্কার ক্রিকেটার। তাঁর খেলা দেখেতে আমার ভালো লাগে। এই খেলার ও একটা বড় চরিত্র, আনন্দদায়ী। আমি মনে করি, ওয়ানডে ক্রিকেটে সে-ই সময়ের সেরা বোলিং অলরাউন্ডার।’ বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানরাও তাঁর বোলিংয়ে হিমশিম খায় জানিয়ে তিনি বললেন, ‘অনেক ব্যাটসম্যানই তার বোলিং বুঝতে পারে না। তাকে অসাধারণ এক রিস্ট স্পিনারই মনে করি আমি।’
বোলিংয়ের পাশাপাশি আফ্রিদির মারকাটারি ব্যাটিংয়েরও মুগ্ধ-দর্শক বয়কট, ‘আমার মনে হয়, তিন বলের বেশি ধৈর্য আফ্রিদির নেই। টানা দুই বলে ও যদি রান না পায়, তাহলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন তৃতীয় বলে মজার একটা কিছু দেখবেন।’

পাকিস্তানের সিরিজ জয়ের প্রত্যয়

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হোম সিরিজ’ খেলতে কাল আবুধাবি রওনা হয়ে গেছে পাকিস্তান দল। যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে পাকিস্তান কোচ ইন্তিখাব আলম সাংবাদিকদের বলে গেছেন, ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজটি জয়ের প্রত্যয় নিয়েই যাচ্ছেন তাঁরা। আগামী পরশু আবুধাবিতেই প্রথম ম্যাচ।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ব্যর্থতায় দিনকয়েক আগেও পাকিস্তানের ক্রিকেট একেবারে উথালপাথাল হয়ে গিয়েছিল। অধিনায়ক ইউনুস খান তো পদত্যাগই করে বসেছিলেন। পরে অবশ্য পিসিবির অনুরোধে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব ফিরিয়ে নিয়েছেন তিনি।
কিন্তু এসব দলে কোনো প্রভাবই ফেলবে না, দল আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর বলে বিশ্বাস করেন পাকিস্তান কোচ ইন্তিখাব আলম। ‘প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে আরব আমিরাত যাচ্ছি আমরা এবং আমি নিশ্চিত, ছেলেরা সেখানে ভালোই করবে। সিরিজের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল পেয়েছি আমরা’—বলেছেন ইন্তিখাব আলম।
নিউজিল্যান্ড অবশ্য পাকিস্তানের আগেই পৌঁছে গেছে আবুধাবিতে। অ্যান্ডি মোলসের পদত্যাগের পর কিউইরা এখন কোচহীন। অধিনায়কত্বের পাশাপাশি কোচের দায়িত্বও পালন করতে হবে ড্যানিয়েল ভেট্টোরিকে। কথাবার্তায় দ্বৈত ভূমিকার ভেট্টোরিকেও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়। উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান ব্রেন্ডন ম্যাককালামও কোচ না থাকাটাকে বাড়তি চাপ মনে করছেন না।

রুনিকে রিয়ালে চান রোনালদো

প্রিয় বন্ধু ওয়েইন রুনিকে ছেড়ে এসে হয়তো মানসিকভাবে ভালো নেই ক্রিস্টিয়ানো। তাই তাঁকে রিয়ালে চাইছেন পর্তুগিজ উইঙ্গার। রুনি স্পেনে ভালো করবেন বলেও বিশ্বাস ম্যানইউর সাবেক তারকার, ‘ওয়েইন এখানে সেনসেশনই হবে। যদি সে এখানে আসত, তাহলে দারুণ করত।’
রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নাম লেখান ২০০৩ সালে। এক বছর পরই ওল্ড ট্রাফোর্ডকে ঠিকানা করেন ওয়েইন রুনি। দুজনের বয়সটাও ছিল সমান। বয়স-টয়স মিলিয়ে অল্পদিনেই ভাব হয়ে গিয়েছিল রোনালদো-রুনির। অন্তরঙ্গ বন্ধুও হয়ে ওঠেন দুজনে। ২০০৬ বিশ্বকাপে দুজনের মধ্যে একবার মন-কষাকষি হয়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের কাছে হেরে ইংল্যান্ডের বিদায় নেওয়া ম্যাচে রুনি দেখেছিলেন লাল কার্ড। রোনালদোর প্ররোচনাতেই রুনিকে লাল কার্ড দেখতে হয় বলে ভেবে বসেছিল গোটা ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের পর রোনালদোর আবার ইংল্যান্ডে ফেরাটা হবে কঠিন—এমন অনুমান চলছিল। এ নিয়ে দুজনের মান-অভিমানও জন্ম নিয়েছিল, তবে তা ছিল অল্পদিনের জন্য। কিন্তু প্রিয় বন্ধুকে কাছে পেয়ে সব ভুলে বুকে জড়িয়ে নেন রুনি।
এই বন্ধুই রুনিকে ছেড়ে, ম্যানইউ ছেড়ে এ মৌসুমে নাম লিখিয়েছেন স্প্যানিশ পরাশক্তি রিয়াল মাদ্রিদে। তবে সেখানে তিনি রুনির অভাবটা টের পাচ্ছেন এখন। অ্যাঙ্কেলের চোট নিয়ে মাঠের বাইরে বসে এখন আফসোস করছেন, ইস্, যদি রুনি থাকত পাশে!
রুনির মধ্যে স্পেন জয় করার জাদু আছে বলেই মনে করেন রোনালদো, ‘এখানে চমত্কার একটি ক্যারিয়ার গড়ার জন্য যা দরকার সেই দক্ষতা এবং দৃঢ়তা ওয়েইনের আছে। সে যে কত ভালো খেলোয়াড়, গত কয়েক বছরে ইংল্যান্ডে সেটা দেখিয়েছে। স্পেনেও যে সে একই রকম ভালো খেলোয়াড় থাকবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ওকে একদিন এখানে পেলে খুশিই হব।’
রুনিকে রিয়ালে পাওয়ার আশা করলেও একটি বাস্তবতা ঠিকই বোঝেন—ইংল্যান্ড আর ম্যানইউ ছেড়ে রুনির স্পেন পাড়ি জমানো কঠিন। ‘ইংল্যান্ড থেকে অন্য কোথাও যাওয়া ওর জন্য অনেক কিছু। সে দেশকে ভালোবাসে, সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ভালোবাসে। সে লিভারপুলের ছেলে। ইউনাইটেড তার জন্য ভালো ক্লাবও। তবে হ্যাঁ, ভবিষ্যতে কী হয় আপনি তা জানেন না’—বলেছেন ট্রান্সফার ফির বিশ্ব রেকর্ড (৯৪ মিলিয়ন ইউরো) গড়া রোনালদো।

চিতাবাঘের সঙ্গে দৌড়াবেন বোল্ট

ঘোড়ার বিপক্ষে দৌড়েছিলেন জেসি ওয়েন্স। জীবিকার তাগিদে। বলেছিলেন, ‘লোকে বলে, ঘোড়ার বিপক্ষে দৌড়ানো একজন অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নের জন্য অমর্যাদাকর। কিন্তু আমি কী করব? আমার চারটি অলিম্পিক সোনার মেডেল আছে। কিন্তু মেডেল তো আর খাওয়া যায় না।’
একালের ‘জেন্সি ওয়েন্স’ উসাইন বোল্ট এবার দৌড়াবেন চিতাবাঘের সঙ্গে। না, জীবিকার তাগিদে নয়। ওয়েন্সের মতো তিনি তো আর ভুল সময়ে জন্মাননি। বোল্টের এই চিতাবাঘের সঙ্গে দৌড় বিপন্নপ্রায় প্রাণীদের প্রতি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। বিশ্বের দ্রুততম মানব বনাম দ্রুততম প্রাণীর এই দৌড়টা আগামীকাল কেনিয়ায় হওয়ার কথা।
চিতাবাঘের সঙ্গে দৌড়ানোর প্রতিক্রিয়া কী? বোল্ট স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, ‘ভেবে খুবই ভালো লাগছে আমি সিংহের সঙ্গে দৌড়াচ্ছি না! সিংহের তুলনায় চিতা অনেক শান্ত স্বভাবের... যেকোনো আলোকচিত্রী ছবি তুলতে পারে। আমি চিতাটাকে আমার হাত দিয়ে ধরার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। আশা করি, এটা দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হবে।’
বোল্ট শুনে আরও খুশি হবেন, তাঁর ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ নেহাতই একটা বাচ্চা চিতা। সাধারণত চিতাবাঘ ঘণ্টায় ৬৫ মাইল বেগে দৌড়ায়। আর ১০০ মিটারে বোল্টের রেকর্ড গড়া (৯.৫৮ সেকেন্ড) দৌড়টা বিশ্লেষণ করে বায়োমেকানিকাল বিশেষজ্ঞরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, ঘণ্টায় বোল্ট দৌড়ান ২৩.৩৫ মাইল।
দেখাই যাক, বোল্ট জেতেন কিনা। যদিও যেমনটা আগেই পড়েছেন, এই দৌড়ের উদ্দেশ্য হারজিত নয়। বোল্ট ‘লং রান’ নামের একটা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা গড়ে তোলাই মূল উদ্দেশ্য। বোল্ট বলেছেন, ‘আমি এই উদ্যোগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছি, কারণ এর উদ্দেশ্য পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থান। শিশু-কিশোরেরা যারা আমাকে অনুসরণ করে, তাদের মধ্যে আমি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর পরিবেশ রক্ষার বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’
বিভিন্ন দাতব্য কাজের সঙ্গে যুক্ত বোল্ট কিছুদিন আগে ক্রিস গেইলদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিতে ক্লান্ত বোল্ট জানিয়েছেন, এ ধরনের কাজে তাঁর অংশ নিতে কোনো আপত্তি নেই। প্রথমবারের মতো আফ্রিকা সফরে এসে এই জ্যামাইকান ‘বজ্রবিদ্যুত্’ আবারও জানালেন, ‘জ্যামাইকায় আমি অনেক দাতব্য কাজের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তার পরও পরিবেশ রক্ষায় আফ্রিকা যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, আমি সেটি দেখতে চাই।’
কেনিয়ায় আসার আগে বোল্ট যাত্রাবিরতি করেছিলেন লন্ডনে। সেখানে সংবাদ সম্মেলনে আবারও পুরোনো প্রশ্নটা শুনতে হলো—অনেকেই যে তাঁর অবিশ্বাস্য কীর্তির পেছনে ড্রাগের ছায়া দেখে! ‘আমরা যে আসলেই সত্ এটি বুঝতে মানুষের আসলে কয়েক বছর লেগে যাবে। এর পর মুছে যাবে এই কলঙ্ক। কেউ জোরে দৌড়ানো শুরু করলেই কথা উঠে যায়। কিন্তু আমি এসবে কান না দিয়ে জোরে দৌড়েই যাব। আমি যে পরিষ্কার, এতে কোনো সন্দেহ নেই’—বোল্টের উত্তর।
এই লন্ডনেই বসবে আগামী অলিম্পিকের আসর। সেখানে ৪০০ মিটারে দৌড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দেননি ১০০ ও ২০০ মিটারের বিশ্ব রেকর্ডধারী। তবে এসব অনেক পরের ব্যাপার। আপাতত বোল্টের মাথায় একটাই বিষয়—চিতার বিপক্ষে দৌড়!

আবার হারল লিভারপুল

বর্ষপঞ্জির পাতা থেকে মুছে দিতে চাইবেন, রাফায়েল বেনিতেজের জীবনে এমন আরেকটি দিন যোগ হলো কাল। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে কাল যে ফুলহামের কাছে ১-৩ গোলে হেরেছে বেনিতেজের লিভারপুল। এতে যে ‘অল রেড’দের ১৯ বছরের প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা-বন্ধ্যাত্ব ঘোচানোর মিশন একেবারেই ম্লান হয়ে গেল।
ফুলহামের মাঠে জামোরার গোলে ম্যাচের ২৪ মিনিটেই পিছিয়ে পড়েছিল লিভারপুল। ৪২ মিনিটে ফার্নান্তো তোরেসের বেনিতেজের দলকে ম্যাচে ফেরালেও ১৪ মিনিটের একটা ঝড় লিভারপুল শিবিরকে হতাশায় ডুবায়। ৭৩ মিনিটে ফুলহামের দ্বিতীয় গোল করেন নেভল্যান্ড। আর শেষ বাঁশি বাজার খানিক আগে লিভারপুলের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন ডেম্পসি।
লিভারপুলের রাতটিকে আরও দুর্বিষহ করতে ৮০ মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন ডেগান এবং এর ২ মিনিটে তাঁকে অনুসরণ করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ক্যারঘার। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুলের এটি পঞ্চম পরাজয়।
তবে কাল জয় পেয়েছে প্রিমিয়ার লিগের ‘বিগ ফোরের’ অন্য দুই বড় দল। আর্সেনাল ৩-১ গোলে হারিয়েছে টটেনহামকে এবং বোল্টনের বিপক্ষে চেলসি পেয়েছে ৪-০ গোলের জয়।

আবারও পার পেয়ে গেলেন বোথা

এর আগেও দুবার তাঁর বোলিং অ্যাকশন অবৈধ হিসেবে ধরা পড়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনার ইয়োহান বোথার অ্যাকশন সম্প্রতি আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এটি অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে। এবং এক সপ্তাহের ভেতর তিনি আবার ছাড়পত্রও পেলেন।
কিছুদিন আগে ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট সুপার স্পোর্ট সিরিজে ডলফিনসের বিপক্ষে ওয়ারিয়র্সের ম্যাচে বোথা আর তাঁর ওয়ারিয়র্স সতীর্থ পেসার রাস্টি থেরনের অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন আম্পায়ার। দুই বোলারই পরে জাতীয় বোলিং কোচ ভিনসেন্ট বার্নেসের কাছে পরীক্ষা দেন। তৃতীয়বারের মতো ছাড়পত্র দেওয়া হয় বোথাকে।
এ বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে বোথার ‘দুসরা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আম্পায়াররা। এর পর অস্ট্রেলিয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে দুসরা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ২৭ বছর বয়সী বোথার অ্যাকশন প্রথমবার প্রশ্নবিদ্ধ হয় ২০০৬ সালে, তাঁর টেস্ট অভিষেকে।

অতৃপ্তি থেকে গেল এ ম্যাচেও

‘আসলে আমার কী যে হলো আমি নিজেও জানি না। ওই মুহূর্তে উইকেটে যে থাকে সেই বলতে পারবে’—উত্তরটা তামিম ইকবালের। নিজের ভুলে অল্পের জন্য সেঞ্চুরি মিস করার হতাশায় তখনো পুড়ছেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ৮০ রানের মাথায় ঠিক কী মনে করে অমন শট খেললেন? একটু আগেই অধিনায়কের মৃদু তিরস্কার উপহার পেয়েছেন। এই প্রাপ্তি অবশ্য আগের ম্যাচেও ছিল উইকেটে সেট হওয়ার পর আউট হয়ে যাওয়ায়। কাল শুনলেন সেঞ্চুরি না পাওয়ায়, খেলাটা শেষ করে আসতে না পারায়।
ভুল যে করেছেন এটা স্বীকার করেছেন তামিমও। ম্যাচসেরা হয়েও তাই সন্তুষ্ট নন এই ওপেনার। নিজেও মানছেন এভাবে উইকেট থ্রো করে আসা ঠিক হয়নি, ‘‘উইকেটে আমার পার্টনার, ড্রেসিংরুমের সবাই আমাকে বলে, ‘তামিম উইকেটে থাক’ কিন্তু আমার যে কী হয়ে যায় এর জবাব আমার কাছেও নেই।’’ এসব কথাবার্তা শুনলে মনে হতে পারে বাংলাদেশ বুঝি ম্যাচ হেরেছে। স্কোরকার্ড যা বলছে, ম্যাচটি আসলে তার চেয়েও সহজে জিতেছে বাংলাদেশ।
শেষ দিকে কয়েকটি উইকেট হারিয়ে বিশাল জয়টাকে সাকিব আল হাসানের দল রূপ দিয়েছে মাঝারি আকারের জয়ে। অধিনায়কের অসন্তুষ্টিও এখানেই, ‘তামিমের উচিত ছিল ১০০ করা। আশরাফুলের উচিত ছিল ৮০/৯০ করে খেলাটা শেষ করে দিয়ে আসা। আমি চাইনি আজকে আমাকে ব্যাট করতে হোক।’ তবে ব্যাটসম্যানরা রানে ফিরেছেন এতে অন্তত স্বস্তি পাচ্ছেন সাকিব, ‘কোনো দলের এতগুলো ব্যাটসম্যান রানে থাকলে কাজটা তো সহজই হয়ে যায়। যদি জানি যে কেউ না-কেউ অন্তত রান পাবেই তাহলে চাপটাও অনেক কমে যায়।’
সাকিবের যেটা স্বস্তি, হ্যামিল্টন মাসাকাদজার চিন্তাটা সেখানেই। কাল তারা মাঠে নেমেছিল ৮ জন স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান নিয়ে, তার পরও পারেনি দুই শ করতে। উত্তরটা জানা নেই মাসাকাদজারও, ‘প্রতিটি ম্যাচেই আমাদের শুরুটা দারুণ হচ্ছে। কিন্তু মাঝখানে এসে কীভাবে যেন খেই হারিয়ে ফেলছি। আজ (কাল) আমরা স্পিনারদের অনেক ভালো খেলেছি, কিন্তু উইকেট দিলাম নাজমুলকে। কেন এমন হচ্ছে আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। এর একটা সমাধান আমাদের বের করতেই হবে।’
মাসাকাদজারা উত্তর খুঁজতে থাকুন। সাকিবরা আপাতত তাকিয়ে আছেন চট্টগ্রামের দিকে, আগামী ম্যাচটি জিতেই সিরিজ নিশ্চিত করতে চান তাঁরা।

ক্যাম্বিয়াসোকে নিলেন ম্যারাডোনা

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার অবস্থা যত খারাপ হচ্ছিল, ততই জোরালো দাবি উঠছিল—ক্যাম্বিয়াসোকে দলে নেওয়া হোক। সেই এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো অবশেষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা দলে ডাক পেয়েছেন।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব শেষ। খাদের কিনার থেকে উঠে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার টিকিট পেয়েছে আর্জেন্টিনা। এবার আসল মঞ্চের জন্য নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার পালা। এ লক্ষ্যেই ১৪ নভেম্বর ইউরোপ-সেরা স্পেনের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। সেই দলেই ইন্টার মিলানের মিডফিল্ডার ক্যাম্বিয়াসোকে রেখেছেন ম্যারাডোনা।
শুধু আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষই নয়, ইন্টারে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ক্যাম্বিয়াসোকে দলে নেওয়ার পরামর্শ ফুটবল-পণ্ডিতেরাও দিয়েছিলেন ম্যারাডোনাকে। এখন মনে হচ্ছে, তাঁদের কথা শুনতে শুরু করেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলের মহানায়ক। প্রায় এক বছর পর ক্যাম্বিয়াসোকে দলে ফিরিয়েছেন তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে ক্যাম্বিয়াসোর সর্বশেষ ম্যাচটি এক বছর আগে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সেই ম্যাচে চিলির কাছে ০-১ গোলে হেরেছিল আলফিও বাসিলের আর্জেন্টিনা।
এ তো গেল কথা শোনার কথা। লেফট ব্যাকে আর্জেন্টিনার সমস্যা বহুদিন ধরে। বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে এ সমস্যা যাতে না ভোগায়, ম্যারাডোনা এর জন্যও বিকল্প খুঁজছেন। তাই স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে দলে নিয়েছেন রাশিয়ার ক্লাব রুবিন কাজানের লেফট ব্যাক ক্রিস্টিয়ান আনসালডিকে। দলে একমাত্র নতুন মুখও তিনিই। ওয়েবসাইট।
আর্জেন্টিনা দল: গোলরক্ষক—সার্জিও রোমেরো, মারিয়ানো আন্ডুজার। ডিফেন্ডার—ফাব্রিসিও কলোকিনি, গাব্রিয়েল হেইঞ্জ, মার্টিন ডেমিকেলিস, নিকোলাস পারেজা, ক্রিস্টিয়ান আনসালডি। মিডফিল্ডার—হাভিয়ের মাচেরানো, এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো, ফার্নান্দো গ্যাগো, ম্যাক্সিমিলানো রদ্রিগেজ, জোনাস গুতিয়েরেজ, পাবলো আইমার, অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া। ফরোয়ার্ড—লিওনেল মেসি, সার্জিও আগুয়েরো, কার্লোস তেভেজ, গঞ্জালো হিগুয়েইন, এজেকুয়েল লাভেজ্জি।

ধোনি-যুবরাজ জেতালেন ভারতকে

বীরেন্দর শেবাগ ২৫ বলে ১১! না ভুল পড়েননি। ১১ বলে ২৫ করতে অভ্যস্ত শেবাগ কাল সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে খোলসের ভেতর ঢুকেই ব্যাট করলেন। ম্যাচটা যে হয়েছে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায়। যে মাঠ ওয়ানডেতে তিন শ পেরোনো ইনিংস দেখেছে মাত্র একটাই।
আর তাই টস জিতে ব্যাট করে ৫ উইকেটে ২২৯ রানের মামুলি সংগ্রহ তুলেও জয়ের আশা করেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের সেই আশা বালু ঢেলে দিয়েছে যুবরাজ সিং আর মহেন্দ্র সিং ধোনির দারুণ একটি পার্টনারশিপ। ৫৩ রানে বীরেন্দর শেবাগ, শচীন টেন্ডুলকার ও গৌতম গম্ভীরকে হারিয়ে ধুঁকতে শুরু করা ভারতকে জয় দেখিয়েছে তাঁদের ১৪৮ রানের চতুর্থ উইকেট জুটি। মিচেল জনসনের বাঁহাত ফিরিয়ে দিয়েছে দুই ওপেনারকে। প্রথমে শেবাগকে বোল্ড করেছেন, এরপর সরাসরি থ্রোতে রান আউট করেছেন ভালো শুরু করা শচীন টেন্ডুলকারকে (৩২)। গৌতম গম্ভীরকে নাথান হরিজ ৬ রানে বোল্ট করে দিলে ৫৩ রানে তৃতীয় উইকেট হারায় ভারত। এখান থেকেই শুরু যুবরাজ-ধোনির।
এই কোটলাতেই ১৯৯৮ সালে ৩ উইকেটে ২৯৪ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে ১৪৫ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছিলেন পন্টিং। সেই স্মৃতিই হয়তো কোটলার কৃপণ স্বভাবের কথা জেনেও তাঁকে প্রথমে ব্যাটিংয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার ওপেন করতে নামা পন্টিং আর ওয়াটসন মিলে ১৬ ওভারে বিনা উইকেটে স্কোর বোর্ডে তুলে দিয়েছিলেন ৭১ রান।
পন্টিং ফিফটি করে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন ১১ বছর আগের সেই ইনিংসটার কথা। কিন্তু ১ রানের ব্যবধানে পন্টিংয়ের পর ক্যামেরন হোয়াইট বিদায় নিলে চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ফর্মে থাকা মাইক হাসির ৮২ বলে অপরাজিত ৮১ রানের ইনিংসেই অস্ট্রেলিয়া দুই শ পেরোয়।
ভারতকে টেনে তোলা দুজন যুবরাজ আর ধোনিও করেছেন হাফ সেঞ্চুরি। হেনরিকসের বলে এলবিডব্লুর ফাঁদে পা দেওয়ার আগে যুবরাজ করেছেন ৯৬ বলে ৭৮ রান। ৮টি চার ও ২টি চার দিয়ে সাজিয়েছেন তিনি ইনিংসটি। এর পর আর উইকেট পড়তে দেননি ধোনি। ৯৫ বলে অপরাজিত ৭১ রানের ইনিংস খেলা ভারত অধিনায়ক রায়নাকে (৯*) নিয়ে ১০ বল হাতে রেখেই দলকে পৌঁছে দেন জয়ের বন্দরে।

রনির দাপটে রাসেলের জয়

দুই পেনাল্টি, এক লাল কার্ড, চার গোল। একটা ফুটবল ম্যাচ থেকে আর কী চাই!
দুই পেনাল্টির একটি করে পেল দুদলই। গোল হলো দুটিতেই। লাল কার্ডটা গেল মুক্তিযোদ্ধার বিপক্ষে। চার গোলের তিনটিও তাদেরই জালে। যোগ্যতর দল হিসেবেই এই ম্যাচের জয়ী শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র (৩-১)।
রাসেলের এই জয়ে বড় অবদান স্ট্রাইকার মোহাম্মদ রনির। আগের ম্যাচে দুই গোল, কালও তাঁর দুই গোল। দুই ম্যাচে চার গোল করে বাংলাদেশ লিগের গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে তিনি। এভাবে গোল পেতে থাকলে জাতীয় দলের দরজাই তাঁর জন্য খুলে দিতে পারেন ডিডো। এই আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে।
১২ মিনিটে মরোক্কান ফরোয়ার্ড সামির ওমারির মাপা ক্রসে ফাঁকা পোস্টে হেড করে প্রথম গোল। ৩৫ মিনিটে আবদুল্লাহ পারভেজের বক্সে ফেলা বল ঘানাইয়ার সতীর্থ মরো মোহাম্মদের পা ঘুরে ছোট বক্সের সামনে পড়ল। মুক্তিযোদ্ধার গোলরক্ষক তারেক পোস্ট ছেড়ে বেরোলেও বলের নাগাল পেলেন না। সুযোগ সন্ধানী রনির শট জালে। ২-০-তে এগিয়ে গেল রাসেল।
দুটি গোলই মুক্তিযোদ্ধার দুর্বল রক্ষণের খেসারত। সামিরের ক্রসটা দুর্দান্ত হলেও মুক্তিযোদ্ধার রক্ষণে বেরিয়ে পড়া বড় ফাঁকই কাজে লাগিয়ে গোল করেছেন রনি। প্রথম গোলের সময় লেফট ব্যাক হাসান আগেই বলটা ক্লিয়ার করতে পারতেন। দ্বিতীয় গোলে স্টপার শুভ্রও দায় এড়াতে পারবেন না।
মনি, টিপুদের প্রথম একাদশে রেখে এদিন দল সাজিয়েছেন কোচ গোলাম সারোয়ার টিপু। তাঁর দলকে অনেকে ‘বুড়ো’দের দল বলে, তার পরও আস্তে আস্তে মুক্তিযোদ্ধা যখন উন্নতি করছিল তখনই নতুন সমস্যা। মাঝমাঠের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলেও মুক্তিযোদ্ধার রক্ষণে ফাটল ধরেছে। প্রথম দুই ম্যাচেই হার দিয়ে শুরু—সামনে যে আরও কী অপেক্ষা করছে!
উল্টো ছবি শেখ রাসলের। উন্নতির রেখচিত্রটা ক্রমেই উর্ধ্বমুখী। মাঝমাঠ অনেকটা সংগঠিত দেখাল এদিন। পাস, বল নিয়ন্ত্রণ সবকিছুই আগের চেয়ে ভালো। ঘানাইয়ান মরো মোহাম্মদ মূলত স্ট্রাইকার, দলীয় সমন্বয়ের স্বার্থে খেলানো হয়েছে লেফট উইংয়ে। পরিবর্তনটা ইতিবাচক ফলই দিয়েছে। ফেডারেশন কাপে শেখ রাসেল ছিল সাধারণ মানের। এই রাসেল কিছুটা হলেও দাপটা দেখিয়ে লিগে তুলে নিয়েছে টানা দ্বিতীয় জয়।
শেষ ২৫ মিনিট ১০ জনের মুক্তিযোদ্ধার বিপক্ষে খেলেছে রাসেল। ৬৫ মিনিটে সামির ওমারিকে আটকাতে পোস্ট ছেড়ে আসা মুক্তিযোদ্ধার গোলরক্ষক ফাউলই করে বসেন। অবধারিত লাল কার্ড এবং পেনাল্টি। বিকল্প গোলরক্ষক নিজামকে নামাতে তুলে আনতে হয়েছে শুভ্রকে। কিন্তু পেনাল্টি গোল ঠেকানো যায়নি। পেনাল্টি আদায় করে নেওয়া সামিরই গোলটাও আদায় করে নেন।
কয়েক মিনিট বাদে আবার পেনাল্টি। এবার রাসেলের বক্সে রনিকে ফেলে দেন ডিফেন্ডার আমিনুল। ইগুইনি গ্রে গোল করে ব্যবধানটা কমালেন—এই যা।
হ্যাটট্রিকের দেখা পেতে পারতেন রনি। কিন্তু নিজাম গোলবঞ্চিত করেন তাঁকে। পুরো ম্যাচে বোধহয় একটাই আক্ষেপ এই স্ট্রাইকারের।
শেখ রাসেল: মামুন, কামাল, জহির, আমিনুল, আব্বাস ইনাস, আবদুল্লাহ পারভেজ, মারুফ, মোবারক (সানি), সামির, রনি, মরো মোহাম্মদ। মুক্তিযোদ্ধা: তারেক, শুভ্র (নিজাম) হাসান, ফিরোজ মাহমুদ, রনি, সাইফুর, অরূপ, প্রমিস, ফুয়াদ, গ্রে, শাহাজউদ্দিন।