Showing posts with label অগ্নিসংযোগ. Show all posts
Showing posts with label অগ্নিসংযোগ. Show all posts

Thursday, January 1, 2026

লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা by মহিউদ্দিন আহমদ

আমি জ্যোতিষী নই। নিশ্চিত করে বলতে পারি না, কাল কিংবা পরশু কী ঘটবে। ছয় মাস বা এক বছর পর কী হতে পারে, তা আন্দাজ করা তো দূরের কথা। কারণ, আমাদের দেশ, সমাজ, জীবন কোনোটাই সরলরেখায় চলে না। সেখানে নানান বাঁক, খানাখন্দ। যেকোনো সময় ছন্দপতন হতে পারে।

তারপরও আমরা অভিজ্ঞতা আর কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের কথা বলি। কাঙ্ক্ষিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত যা-ই আসুক না কেন, তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিই। কিন্তু যেখানে আমি একা নই, আমার চারপাশে আছে হাজারো মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, সেখানে আমার ব্যক্তিগত অনুমাননির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি কোনো কাজে আসে না, যদি না সেটি সম্মিলিত প্রয়াস হয়। এ রকম ঘটনা ঘটে প্রায়ই।

যা চাই না, যা প্রত্যাশিত নয়, তাকে আমরা বলি অঘটন। এ রকম কিছু ঘটে গেলে আমরা অবাক হই। আমাদের মন ভাঙে। হতাশা জেঁকে বসে।

সম্প্রতি কিছু ঘটে গেছে, যা আমাদের অনেকের কাছে ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু ঘটনা তো আপনা–আপনি ঘটে না। এটি ঘটানো হয়। তার পেছনে থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত প্রয়াস। এর জন্য থাকে পরিকল্পনা। অনুঘটকেরা তো আটঘাট বেঁধেই নামেন। তিনিই ভালো পরিকল্পনাকারী, যিনি অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে পদক্ষেপ নেন। সামরিক পরিভাষায় এটাকে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলা যেতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের একটা উদ্দেশ্য থাকে—হুঁশিয়ার হয়ে যাও; আমরা আসছি বিপুল বিক্রমে।

আপাতত দেখছি, দুটি জনপ্রিয় দৈনিক আর দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা হয়েছে। এটা কি হুট করে হলো? মোটেই না। অনেক দিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার হচ্ছিল। ফেসবুক ও ইউটিউব ঘাঁটলেই জানা যাবে, কে কখন কীভাবে উসকানি দিয়েছে। জানাই ছিল, অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠান চালু থাকার ঘোর বিরোধী। কিন্তু এভাবে আক্রমণ, লুটপাট এবং আগুন দেওয়া হবে, তা আন্দাজ করা যায়নি।

এ দেশে একদল লোক যখন-তখন যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউকে শত্রু বানায়, নিমেষেই তার বিচার করে ফেলে এবং বিচারের রায় বাস্তবায়ন করতে একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না। এটাকে ‘মব জাস্টিস’ বলে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা হয়। আদতে এটা জাস্টিস, নাকি ভায়োলেন্স। এ ধরনের সংঘবদ্ধ আচরণের পেছনে একটা উদ্দেশ্য থাকে। সেখানে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি আছে বদমতলব থেকে ভিন্নমত ও পথের লোককে শায়েস্তা করার ফন্দি।

একটা সমাজে যখন বিচারব্যবস্থা বলে কিছু থাকে না, কাঠামোগত যে ব্যবস্থা আছে, সেটি খুব সময় নেয় এবং অনেক খরচ হয়। ভুক্তভোগীকে বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। আদালত আর উকিলের খরচ জোগাতে তাকে সর্বস্বান্ত হতে হয়। সে জন্য অনেকেই নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। আইনের শাসন নিয়ে আমরা যতই আহাজারি করি না কেন, সহজে, কম খরচে এবং অতি দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে এ রকম মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স বন্ধ করা যাবে না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অবস্থানে যেতে আর কত শতাব্দী লাগবে, কেউ বলতে পারে না।

এ তো গেল বিচার না পাওয়ার কারণে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরেও কিছু আছে। আমাদের সমাজটা এখনো পশ্চাৎপদ। পশ্চিমের শিল্পোন্নত সমাজের ভাষায় বলা যেতে পারে, আমরা মধ্যযুগীয় ‘ট্রাইবাল’ কালচারে আছি। এখানে নানান মতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে গোত্র বা গোষ্ঠী।

প্রতিটি গোত্র বা গোষ্ঠী মনে করে, সে-ই সঠিক। বাকি সবাই ভ্রান্ত এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তার চোখে যে খারাপ, তাকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব বর্তেছে গোত্রপতির ঘাড়ে। এখানে তিনি নিছক নেতা নন, একজন ‘ত্রাতা’। তাঁর কাজ হলো বাকি সবাইকে নির্দশ দেওয়া। তিনি স্লোগান দেন—জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো। অমনি তাঁর অনুসারীরা আগুন হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো আছে মধ্যযুগে, যেখানে চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, জানের বদলে জান—এই হচ্ছে ন্যায়বিচার। আমাদের স্লোগানগুলোও তেমন—একটা-দুইটা ‘অমুক’ ধর, ধরে ধরে জবাই কর। চাষাভুষা, জেলে-তাঁতি, মুটে-মজুরেরা এসব স্লোগান দেয় না। এসব স্লোগান আমরা শুনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা রাজনৈতিক দলের মিছিলে-সমাবেশে।

প্রবল পরাক্রান্ত মোগল বাদশাহ জালালুদ্দিন আকবর ‘অপরাধীর’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। একটা হাতিকে মদ খাইয়ে মত্ত করা হতো। তারপর দণ্ডিতকে হাত-পা বেঁধে ওই হাতির পায়ের নিচে ছুড়ে ফেলা হতো। বাদশাহ তাঁর সভাসদদের নিয়ে এটা দেখতেন, আমোদ পেতেন। তাঁর ছেলে নুরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও কম যান না। তিনি দণ্ডিত ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় গাধার সদ্য ছাড়ানো চামড়ায় মুড়ে সেলাই করিয়ে দিতেন। চামড়া যতই শুকায়, সেটি আঁটসাঁট হয়ে ভেতরের মানুষটির ওপর চেপে বসে। তার হাড়গোড় ভেঙে যায়। একসময় সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। যন্ত্রণা দিয়ে তিলে তিলে মারা।

প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের স্লোগানগুলো অনেকটা সে রকম। আমরা রাস্তায় নেমে যে কারও বিরুদ্ধে ফাঁসি দাবি করি। আমরা অনেকেই বলি, অমুককে প্রকাশ্যে ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াডে দেওয়া হোক, যাতে আশপাশের লোকেরা এটা দেখে বিনোদন পায়। আমাদের স্লোগানে, বক্তৃতায়, বিবৃতিতে আমরা কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে এমন সব কথা উচ্চারণ করি, যা হাজার বছর আগের সমাজ-সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।

আজকাল বক্তৃতায় উত্তেজক কথাবার্তা এবং স্ল্যাং যে যত বেশি ব্যবহার করে, তার জনপ্রিয়তার পারদ ততই ওপরে উঠতে থাকে। হেরে মাইরা ফালামু, তোরে ছিঁড়া ফালামু, ওইডা ভাইঙা ফালামু—এ রকম হুংকার দিলে হাততালি পাওয়া যায়। একশ্রেণির মানুষ তাদের পেছনে ছোটে পঙ্গপালের মতো।

আমি গানবাজনা করি। এতে আমি আনন্দ পাই। আপনার ভালো লাগে না। আপনি গাইবেন না। তাই বলে আপনি আমার ওপর চড়াও হবেন? আপনি রায় দিয়ে দিলেন, এটা ইসলামবিরোধী এবং এর বিরুদ্ধে জিহাদ করা কর্তব্য। আপনি গিয়ে আমার বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে হামলা করলেন, আগুন দিলেন, বাদ্যযন্ত্র লুট করলেন।

এ দেশে পত্রিকার পাঠক হচ্ছে মধ্যবিত্ত। তাদের একটা ভগ্নাংশ পত্রিকা পড়ে। আমার ধারণা, দেশের সব ছাপা পত্রিকার মোট সার্কুলেশন হবে বড়জোর ১০ লাখ। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি মানুষ নগদ টাকা দিয়ে কেনে। বাকিগুলোর তেমন বাজার নেই। আপনি বলছেন, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকাটি জনগণের দুশমন, অমুকের দালাল, গাদ্দার। তো জনগণ আপনার পছন্দের পত্রিকা পড়ে না কেন—এটা কখনো ভেবে দেখেছেন? আপনি কোন জনগণের কথা বলছেন?

পাঠকের রায়ে তো আপনার অপছন্দের পত্রিকাটিই বেশি জনপ্রিয়। আর আপনি যাদের মধ্যে জনপ্রিয়, তারা তো পত্রিকাই পড়ে না। অথচ আপনি বা আপনারা দলবল উসকে দিয়ে আপনার অপছন্দের পত্রিকার ওপর হামলা চালালেন। সঙ্গে কাকে পেলেন? সমাজের যত চোর-ছেঁচড়-লুটেরা। তারা কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল, টাকাপয়সা লুট করে নিয়ে গেল। তারপর আগুন দিল।

একশ্রেণির লোক সব সময় তক্কে তক্কে থাকে, কখন কোথায় লুটপাট করতে পারবে। সুযোগ পেলেই তারা অন্যের ওপর চড়াও হয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখন তো লুটের মচ্ছব চলছে। তার মধ্যে হাতে গোনা দু-একজন পণ্ডিতকে বলতে শুনি, এদের মব বলা যাবে না। এরা হচ্ছে প্রেশার গ্রুপ। যারা মব বলে, তারা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর। লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা!

* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা

Friday, December 27, 2024

মধ্যরাতে সচিবালয়ে ভয়াবহ আগুন: দুর্ঘটনা না নাশকতা?

আগুনে পুড়লো প্রশাসনের কেন্দ্র সচিবালয়ের একটি ভবন। বুধবার মধ্যরাতে রহস্যজনক আগুনে ৭ নম্বর ভবনের চারটি তলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব তলায় অন্তত চারটি মন্ত্রণালয়ের দপ্তর আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। ছাই  হয়ে গেছে নথিপত্র-কম্পিউটার ও আসবাবপত্র। বড়দিনের ছুটির পর মধ্য রাতের এই অগ্নিকাণ্ড নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নাশকতা হতে পারে। তবে ঠিক কীভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত তা পরিষ্কার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কেউ কেউ এই ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ঘটনা তদন্তে একাধিক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিনদিনের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে আগুন লাগার তথ্য পায় ফায়ার সার্ভিস। তাদের ১৯টি ইউনিটের দীর্ঘ চেষ্টায় বৃহস্পতিবার সকালে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভানোর সময় সচিবালয়ের পাশের রাস্তায় ট্রাকচাপায় ফায়ার ফাইটার সোহানুর জামান নয়নের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও দুইজন ফায়ার ফাইটার। আগুনের ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। আগুনের ধরন দেখে নাশকতার বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে। বলা হচ্ছে- কোনো পক্ষ নথিপত্র ধ্বংস করে দেয়ার জন্য এই চেষ্টা চালাতে পারে। আগুন লাগার পর প্রথমে ভবনটির দুই পাশের ভিন্ন তলায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। অনেকে বলছেন, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুন ধরলে সেটা একস্থান থেকে হতে পারে। কিন্তু ভবনের দুই পাশের ভিন্ন তলায় আগুন সন্দেহ তৈরি করেছে। কয়েকদিন ধরে প্রশাসন ও অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টির মধ্যে সচিবালয়ে আগুনের ঘটনা ঘটলো। বড়দিনের ছুটিতে বুধবার প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা সভা করে প্রশাসন সংস্কার কমিটির প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। গতকাল অন্যান্য ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তারাও সারা দেশে মানববন্ধন করেছেন। সচিবালয়ে আগুনের পর ক্যাডার কর্মকর্তাদের এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। আগুনের ঘটনায় ঘাপটি মেরে থাকা কোনো পক্ষের দোসররা জড়িত থাকতে পারে এমনটিও সন্দেহ করছেন অনেকে।

এ ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। তার ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থলোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এখনো জানা যায়নি। আমাদেরকে ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়া হবে না।

আগুন পরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছে বলে মনে করেন সচিবালয়ের কাছে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি মানবজমিনকে বলেন, সুনিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারেন এটা সুপরিকল্পিত। সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। উষ্মা প্রকাশ করে তিনি মানবজমিনকে বলেন, সচিবালয়ের ভেতরে একশ’ থেকে দেড়শ’ সিকিউরিটি গার্ড থাকেন। আগুন লাগার পর কি একজনেরও চোখে পড়েনি। এটা কীভাবে সম্ভব। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সকাল ৯টার দিকে সচিবালয়ে উপস্থিত হন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সেখানে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভেতরে আমরা দেখবো। পুরো সার্চ করে কোনো কিছু পাওয়া যায় কি-না দেখা হবে। নাশকতা কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত হওয়ার পর বিষয়টি জানা যাবে।

অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে আমাদের কাছে খবর আসে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। ১টা ৫৪ মিনিটের মধ্যে আমাদের ইউনিট পৌঁছে যায়। একে একে ২০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। তবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো সচিবালয়ের গেটের মধ্যে ঢোকাতে অনেক বেগ পেতে হয়। পরে সচিবালয়ের গেট ভেঙে দু’টি বড় গাড়ি ভেতরে ঢোকানো হয়। ২১১ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় ৬ ঘণ্টা পর সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন পুরোপুরি নেভে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে। তিনি বলেন, আগুনটা মূলত লেগেছে ৭ নম্বর ভবনের ৬ষ্ঠ তলায়। আগুন নিচের দিকে না এসে উপরের দিকে উঠে যায়। তাই ভবনের নিচের অংশে তেমন ক্ষতি না হলেও উপরের ৬, ৭, ৮ ও ৯ এই চারটি ফ্লোর পুড়ে গেছে।  ষষ্ঠ ও সপ্তমতলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ লাইন দিয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, আগুনে পুড়ে গেছে সচিবালয়ের ৯তলাবিশিষ্ট সাত নম্বর ভবনের ৬ থেকে ৯তলা পর্যন্ত চারটি ফ্লোর। ভবনের ছয়তলায় রয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, সাত তলায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় (একাংশ), আট তলায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়  (একাংশ) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় (একাংশ) ছিল। এছাড়া নবম তলায় রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একাংশ। আগুন লেগে পুড়ে যাওয়া ভবনটিতে থাকা সকল দপ্তরের কাজ আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের অফিসে প্রবেশের জন্য সকাল থেকে এসে অপেক্ষা করলেও সচিবালয়ের মূল গেট দিয়ে কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ৫ নম্বর গেট দিয়ে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। তবে ৪ নম্বর ভবন ছাড়া অন্য কোনো ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় কার্যত সকল কাজ বন্ধ রয়েছে প্রশাসনিক এই সদর দপ্তরের। তাই  যারা ভেতরে প্রবেশ করেছেন তারাও কিছুক্ষণ পর বাইরে বের হয়ে আসেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলেও কোনো কক্ষেই প্রবেশ করা যাচ্ছে না। পুরো সচিবালয় বিদ্যুৎহীন। কিছু স্থানে জেনারেটর চললেও অধিকাংশ স্থানে অন্ধকার পরিবেশ।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মচারী বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের একাংশ পুড়ে  গেছে। পুরো ভবন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে এসেছি। ছয় নম্বর ভবনে থাকা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মী আফসানা আক্তার বলেন, অন্য ভবনে আগুন লাগলেও আমাদের ভবনে বিদ্যুৎ না থাকায় ঢুকতে পারছি না। সেজন্য বেরিয়ে এসেছি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রাজীব আহমেদ বলেন, ভেতরে প্রবেশ করলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের দপ্তরের সকল কাজ বন্ধ রয়েছে। সচিবালয়ের মধ্যে অন্ধকার পরিবেশ।

একটি কুকুরের মরদেহ উদ্ধার: সচিবালয়ে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবন পরিদর্শন করেছে পুলিশের ফরেনসিক বিভাগ। পুড়ে যাওয়া সাত নম্বর ভবনের অষ্টম তলা থেকে আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি কুকুরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণের পর বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সচিবালয়ে প্রবেশ করে পুলিশের ফরেনসিক বিভাগের দল।

তদন্ত কমিটি: সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বৃহস্পতিবার এই কমিটি গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসন ও শৃঙ্খলা শাখার এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন) মোহাম্মদ খালেদ রহীমকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে কমিটি। কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে ওই অফিস আদেশে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের উৎস ও কারণ উদ্‌ঘাটন, অগ্নিদুর্ঘটনার পেছনে কারও ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়দায়িত্ব আছে কি না, তা উদ্‌ঘাটন এবং এ জাতীয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ করা। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন- জননিরাপত্তা বিভাগের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়)। কমিটিকে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের উৎস ও কারণ উদ্‌ঘাটন, অগ্নি দুর্ঘটনার পেছনে কারও ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়-দায়িত্ব আছে কি না তা উদ্‌ঘাটন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া এ জাতীয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশও দেবে তদন্ত কমিটি। কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। এছাড়া সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দু’টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে দু’টি কমিটিকেই প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ ঘটনায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দু’টি কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন। উপদেষ্টার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত দু’টি অফিস আদেশ জারি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড-সমূহের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও তালিকা প্রস্তুত করা এবং ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভূত ক্ষয়ক্ষতি রোধকল্পে করণীয় বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের জন্য প্রশাসন অধিশাখার যুগ্মসচিব মোর্শেদা আক্তারকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন- শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, সহকারী সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং সদস্য সচিব হিসেবে আছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মাসুম।

এছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য প্রশাসন অধিশাখার যুগ্মসচিব মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদকে আহ্বায়ক করে অন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন উপ-সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, সিস্টেম এনালিস্ট সুকান্ত বসাক, সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার এএসএম মেহরাব হোসেন। সদস্যসচিব হিসেবে আছেন, উপ-সচিব মো. কামাল হোসেন। এই দু’টি কমিটিকে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

mzamin


Saturday, September 7, 2024

কেনিয়ায় স্কুলের বোর্ডিংয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৭ শিক্ষার্থী

কেনিয়ার একটি আবাসিক স্কুলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ১৭ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এছাড়া ওই দুর্ঘটনায় ১৩ জনের অধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, শুক্রবার কেনিয়ার মধ্যাঞ্চলের নাইরি নামে এলাকার একটি স্কুলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের বোর্ডিং ভবনে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে বলে সতর্ক করা হয়েছে। নাইরির পাহাড় ঘেঁষা ওই স্কুলটিতে যারা আহত হয়েছেন তাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্কুলটি রাজধানী নাইরোবি থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে এখনও আহত সকলের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তবে হতাহতের বেশির ভাগই শিশু বলে জানানো হয়েছে।

স্কুলটিতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮০০। এদের বেশির ভাগই ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তবে ঠিক কি কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে তা এখনও শনাক্ত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় পুলিশের মুখপাত্র রেসিলা ওনিয়াঙ্গো বলেছেন তারা প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। মৃতদেহগুলো আগুনে এতটাই ঝলসে গেছে যে তাদের দেখে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কেনিয়ার এফএম-৯৬ রেডিওতে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়েছেন এবং তারা কাজ করছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এক্সের এক বার্তায় তিনি বলেছেন, আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সঠিক তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। রুটোর ডেপুটি, রিগাথি গাচাগুয়া জানিয়েছেন, বোর্ডিং স্কুলের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর সুপারিশকৃত সুরক্ষা নির্দেশিকাগুলি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্কুল প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কেনিয়া রেড ক্রস এই অগ্নিকাণ্ডকে ‘দুঃখজনক ঘটনা’ হিসাবে বর্ণনা করেছে, তারা বলেছে যে, কমপক্ষে ১১ জন আহত শিশুকে নয়েরি প্রাদেশিক জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সংস্থাটির এক্স-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলটি পুলিশ ঘিরে রেখেছে। কেনিয়া রেড ক্রস ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে মানসিক সহায়তা সেবা প্রদান করছে এবং স্কুলে একটি ট্রেসিং ডেস্ক স্থাপন করেছে। দুর্ঘটনাকবলিত স্কুলটির আশপাশে একাধিক বোর্ডিং স্কুল রয়েছে। এর আগেও এসব অঞ্চলের স্কুলে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। অভিভাবকরা মনে করেন তাদের বাচ্চারা স্কুলের বোর্ডিংয়ে থাকলে অধিক পড়া-লেখার সময় এবং সুযোগ পাবে। এর আগে ২০১৬ সালে নাইরোবির পার্শ্ববর্তী এলাকা কিবেরায় একটি ছাত্রী বোর্ডিংয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেসময় একাধিক শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। তার এক বছর পর নাইরোবিতে একটি স্কুলে অগ্নিদুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০০১ সালে কিয়াঙ্গুলি এলাকায় অগ্নিদুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়। 

mzamin

গাজী টায়ারসে লুটপাট-অগ্নিসংযোগ: কী ঘটেছিল সেদিন? by নাজমুল হুদা

রূপগঞ্জে ৯৬ বিঘার উপর গাজী টায়ারস কারখানা। আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে পুরো কারখানাটি। অতি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভবনটিতে চালানো যাচ্ছে না উদ্ধার কাজও। অগ্নিসংযোগের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। তাদের সন্ধান পেতে এখানো কারখানার সামনে আসছেন স্বজনরা। এখন পর্যন্ত কোনো মরদেহের আলামত পায়নি উদ্ধারকারী দল। তবে রোববার নিখোঁজের স্বজনরা মানুষের হাড় ও মাথার খুলি সদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছেন। বর্তমানে কারখানাটির প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা ও প্রশাসনিক ব্যক্তি ছাড়া ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না কাউকেই। ২৫শে আগস্টের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় ও কারখানা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দের জেরে লুটপাট করা হয় কারখানায়। তবে লুটপাটের সময় কারখানার ভেতর ৩টি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। তারপরও একটি গ্রুপ সেখানে অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যায়। এ সময় ভবনের উপরের তলায় অনেকেই আটকা পড়ে যান।

সূত্র জানায়, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীকে গ্রেপ্তারের খবরের পরই ঘটে গাজী টায়ারস কারখানায় লুটপাটের ঘটনা। তবে লুটপাটের আগে খাদুন উত্তরপাড়া মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষ জড়ো করা হয় কারখানার সামনে। একপর্যায়ে কারখানার পূর্ব পাশ দিয়ে খাদুন এলাকার একটি গ্রুপ কারখানার ভেতর লুটপাট করে। ওদিকে প্রধান ফটক দিয়ে আরেকটা গ্রুপ ঢুকে লুটপাটে অংশ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র বলছে, গত ৫ই আগস্টও লুটপাট হয় কারখানায়। তার কিছুদিন পর থেকে স্থানীয় সাবেক কমিশনার বিএনপি নেতা তোফাজ্জেল হোসেন, ছাত্রলীগ নেতা রায়হান মোল্লা, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রায়হান মীরের ভাই ছাত্রলীগ নেতা রবিনসহ ২০ জনের একটা গ্রুপ প্রতিদিন ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে কারখানা পাহারা দিতো। তবে তারা প্রতিদিন জনপ্রতি ৫ হাজার করে এক লাখ টাকা দাবি করে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে। সেটা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মসজিদে মাইকিং করে পাহারা দেয়া ওই গ্রুপটি। মসজিদের মাইকে গাজী গ্রুপের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে দ্বন্দে জড়ানো মালিকদের মানববন্ধন করার জন্য ডাকা হয়। মাইকে ঘোষণার পর তারা কারখানায় লুটপাট শুরু করলে সাধারণ পথচারী ও আশেপাশের কারখানার শ্রমিকরা লুটপাট শুরু করেন। এ সময় অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলেও জানায় প্রত্যক্ষদর্শীরা। লুটপাটের খবর ছড়িয়ে পড়ায় বরাবো এলাকা থেকে শহিদুল ওরফে ডাকাত শহিদুল ৫০ জনের একটা গ্রুপ নিয়ে লুটপাটের জন্য কারখানায় ঢুকে পড়ে। তখন আগের লুটপাটকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় শহিদুলের গ্রুপের। এ সময় বন্দুকের গুলির মতো শব্দও পান এলাকাবাসী। এ ছাড়া ওইদিন চনপাড়ার আরও একটি গ্রুপের সঙ্গেও সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে একটি গ্রুপ কারখানার নিচতলায় অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যায়।

গাজী টায়ারস কারখানার পাশেই রূপসী বাসস্ট্যান্ড। সেখানের স্থানীয় দুই সিএনজি চালক মো. উজ্জ্বল ও মিরাজ জানিয়েছেন, আগুন লাগার পরও প্রতিদিন লুটপাট হয়েছে কারখানায়। চনপাড়া, ডেমরা, কাঁচপুর, গাউছিয়াসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন এসে লুটপাট করেছে। অনেকে রিকশা, ভ্যান, অটো, পিকাপ ভাড়া করে নিয়ে এসেছে। এক গ্রুপ ভিতর থেকে বাইরে মালামাল বের করেছে। আরেক গ্রুপ বাইরে থেকে তা বিক্রি করতে নিয়ে গেছে। গাজী টায়ার্সের অপারেটর শহিদুল ইসলাম ঘটনার দিন কারখানায় ছিলেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সেদিন শতশত মানুষ এসে হামলা, লুটপাট করে। আমরা পরে দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যাই। তাদের বাধা দেয়ার কেউ ছিল না।  

এদিকে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখন পর্যন্ত অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। ঘটনার এক সপ্তাহ পরও কারখানার বাইরে নিখোঁজ হওয়া স্বজনদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। গতকাল সকালে হাতে সন্তানের ছবি নিয়ে গাজী টায়ারস কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোকসেদ আলী। তার ছেলে রেজাউল করিম ২৫ আগস্টের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। রেজাউল একটি মশারির কারখানায় কাজ করতেন। বাবা মোকসেদ আলী বলেন, আমার ছেলে সেদিন এখানে দেখতে আসছিল। সেদিন রাত থেকে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। মোবাইল নম্বরও বন্ধ। ছেলে মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে তাও জানি না। শিশু ইসমাইলের (১৪) খোঁজে কারখানার গেটের সামনে বসেছিলেন মা বেদেনা। ইসমাইল মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো। বেদেনা বলেন, সেদিন সন্ধায় ছেলেটা মাদ্রাসায় গেল। কিন্তু মাদ্রাসা থেকে কখন বের হইছে, কোথায় গেছে জানি না। ছেলের আর খোঁজ পাচ্ছি না। আমার একটাই সন্তান। তারে ছাড়া কেমনে থাকবো। কারখানায় এসে ছেলের ছবি আর জন্ম নিবন্ধন জমা দিয়েছেন বলেও জানান বেদেনা। ভাগ্নে নিহাদের খোঁজ নিতে এসেছেন রুবেল। নিহাদও ২৫শে আগস্টের পর থেকে নিখোঁজ। একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ শিখতো নিহাদ। প্রতিদিন সকালে গ্যারেজে দিয়ে রাতে আবার বাসায় ফিরতো। কিন্তু সেদিন রাতে আর বাসায় ফিরেনি। রাতে মামা রুবেল কারখানায় এসে খোঁজ নেয়। রুবেল বলেন, ভবনের ভেতরে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করি। কিন্তু আগুনের কারণে পারিনি। এখন পর্যন্ত তার কোনো খবর নেই।

উদ্ধারকারী টিম মানুষের দেহাবশেষ খুঁজে না পেলেও নিহতের স্বজনেরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ঢুকে মানুষের হাড়, মাথার খুলিসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করেন। পরে সেগুলো পুলিশের কাছে দেন। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ৮০ জনের তালিকা করেছে জেলা প্রশাসন গঠিত ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি। গতকাল দুপুরে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান মাহমুদ রাসেল বলেন, এখন তদন্ত চলমান রয়েছে। ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। বুয়েটের একটা বিশেষ দল ভবন দেখে জানিয়েছে এখানে উদ্ধার কাজ চালানো যাবে না। এটা অত্যাধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার পর কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে সেটা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিবেন।